৩৫
ভোর পাঁচটা।
।। ঢাকা।।
বাড়িটার সামনে এক বৃদ্ধ খোঁড়াতে খোঁড়াতে এসে দাঁড়ালেন। দারোয়ান ঘুমোচ্ছিল। বৃদ্ধ গেটে টোকা মারলেন।
দারোয়ানের ঘুম ভেঙে গেল। চোখ খুলে বলল, ‘কী চাই?’
বৃদ্ধ বলল, ‘গেট খোল। বাড়িতে খবর দে।’
দারোয়ান দাঁত বের করল, ‘ইয়ার্কি মারেন? ফজরের সময় ভিক্ষা চাইতে আইছেন তাই না? যান, পরে আইসেন।’
বৃদ্ধ এবার রেগে গিয়ে চিৎকার করলেন, ‘বেয়াদব, সাহস তো কম না। এটা আমার বাড়ি। যা, সবাইকে গিয়ে খবর দে। বল সাহেব এসেছেন। যা।’
দারোয়ান ঘাবড়ে গিয়ে উঠে দাঁড়ালো, বৃদ্ধের গলার স্বর শুনে মিথ্যা বলে মনে হচ্ছে না। সে দৌড়ে গিয়ে বাড়ির কলিং বেল টিপল। কিছুক্ষণের মধ্যে এক মাঝবয়সী ভদ্রলোক বেরিয়ে এলেন, ‘কী হয়েছে…’ কথা শেষের আগেই বৃদ্ধর দিকে চোখ পড়ল তার। ছুটে এসে বৃদ্ধকে জড়িয়ে ধরলেন, ‘আব্বু, আব্বু, আসুন আসুন।
মুহূর্তের মধ্যে বাড়ির ভেতরে হইহই পড়ে গেল। বাড়ির সবাই বসার ঘরে এসে উপস্থিত হল। বাড়ির মালিক সোবাহান সাহেব বরিষ্ঠ রাজনীতিবিদ ছিলেন, তাকে আগের সরকার জেলে পাঠিয়েছিল। এতদিন পর সোবাহান সাহেব বাড়িতে এসেছেন। তার স্ত্রী, তিন ছেলে, ছেলের স্ত্রী, নাতি নাতনীরা সবাই ভোর বেলায় তাকে দেখে হতভম্ব হয়ে গেল।
সোবাহান সাহেবের স্ত্রী আমিনা কাঁদো কাঁদো মুখে বললেন, ‘আমরা জানতাম তুমি বেঁচে আছ। কত খোঁজ করেছি। সবার কাছে গেছি। কেউ কিছু করতে পারেনি। আনিসুর কত ঘুষ দিয়েছে উপর মহলে। টাকা পেয়ে সবাই আবার চুপ করে গেছে। আমি যে কোনোদিন তোমাকে দেখতে পাব, আমি ভাবতেও পারিনি।’
সোবাহান সোফায় বসে চোখ বন্ধ করলেন। তিনি যে বেঁচে আছেন, তার নিজেরও বিশ্বাস হচ্ছে না। তাকে একটা অন্ধকূপে দিনের পর দিন আটকে রাখা হয়েছে। কী খেয়েছেন এখন আর মনে করতে পারছেন না। জ্বর এসেছে, ওষুধও দেওয়া হয়নি। সেসব নিজে থেকে সেরেও গেছে। এত দিন পর মুক্তি পেয়ে খানিকটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছেন। বড়ো ছেলে আনিসুরকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কাকে কাকে টাকা দিয়েছিস?’
আনিসুর বলল, ‘বলব, তুমি আগে ঘরে গিয়ে বিশ্রাম করো। তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে অনেকদিন ধরে তোমার ঘুম হয়নি। একটু ঘুমিয়ে নাও।’
সোবাহান মাথা নেড়ে বললেন, ‘না, আমার এত সহজে ঘুম আসবে না। তুই আমাকে বল কাকে কাকে টাকা দিয়েছিলি? কে কে ঘুষ নিয়েছিল?’
আনিসুর বলল, ‘হামিদ সাহেব দু লাখ টাকা নিয়েছিলেন, ওমর এক লাখ। তা সত্ত্বেও তোমার কোনো খবর দিতে পারেননি। হামিদ দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। তাকে পাওয়া যাবে না। ওমরকে ছাত্ররাই মেরে দিয়েছে।’
সোবাহান বললেন, ‘হামিদের বাড়ি আছে তো। বাড়ির কী অবস্থা?’
আনিসুর বলল, ‘লক অ্যান্ড কী। এখন আর কে এখানে থাকবে।’
সোবাহান বললেন, ‘মন্টুদের খবর দে। হামিদের বাড়ি আজ থেকে আমাদের। ও ফোন করলে আমাকে একবার ধরিয়ে দিবি। ওমর মরেছে তো কী হয়েছে, ওর বাড়িতে লোকজন তো আছে। তাদের সঙ্গে গিয়ে কথা বলবি। যেদিন থেকে টাকা দিয়েছিস, সুদ হিসেব করে পুরো টাকা চাইবি। না দিলে আমাকে ফোন দিবি।’
সোবাহান অশ্লীল গালাগালি দিতে শুরু করলেন। বাচ্চাদের মায়েরা বাচ্চাদের নিয়ে ঘরে চলে গেল। সোবাহান বললেন, ‘আমি মুক্তিযোদ্ধাদের থেকে কোনো অংশে কম না। আমাকে জেলে বিনা কারণে আটকে রাখা হয়েছিল। এবার আমার ভাতা লাগবে। খোঁজ লাগা, এই সরকারে কে কোনো দায়িত্ব নিচ্ছে, আমার সঙ্গে উপদেষ্টার যোগাযোগের ব্যবস্থা কর। সোবাহান আলির অনেককে বোঝার আছে। অনেক বোঝাপড়া করার আছে। এবার এক এক করে সব শুরু করা হবে। ওরা আয়নাঘর বানিয়েছিল। আমি চুমাঘর বানিয়ে দেবো। সারাদিন চুমা খাবে। তবে মানুষের না। ত
আনিসুরের ভাই হাফিজুল বলল, ‘আব্বা, আপনার প্রেশার বেড়ে গেছে মনে হচ্ছে। আমি আজ ডাক্তার আঙ্কেলের সঙ্গে কথা বলব। আপনি কিছুদিন স্পেশাল কাউন্সেলিং-এ থাকবেন।’
সোবাহান বললেন, ‘কাউন্সেলিং-এ আমার শত্রুরা যাবে এবার। আমার কিছু দরকার নেই। কার কার কী দরকার, এবার আমি দেখাবো। এই আমারে ভাত দাও। আমার খুদা পেয়েছে। ভাত খেয়ে আমি কাজ করতে শুরু করব।’
আমিনা রান্নাঘরে ছুটলেন।
* * * * *
সোমনাথের ঘুম ভাঙল সকাল আটটায়। ড্রইং-রুমে জয়দেব বসে চা খাচ্ছে। সোমনাথ মুখ ধুয়ে এসে বসলেন।
জয়দেব বলল, ‘ভালো ঘুম হয়েছে স্যার। নইলে যা যাচ্ছিল।’
সোমনাথ বললেন, ‘আমার এখনও ভালো ঘুম হয় না। দেশের হাল দেখে মন খারাপ হয়ে যায়। এ-রকম দিন তো আমরা কেউ চাইনি।’
জয়দেব শুকনো মুখে হাসল, ‘মিছিল করলাম, বিক্ষোভেও ছিলাম। যেই প্রধানমন্ত্রী পালিয়ে গেল, ওই মিছিলের লোকই আমাদের মারতে আসল। এ-রকম হবে জানলে আগে থেকেই ইন্ডিয়া পালিয়ে যেতাম।’
সোমনাথ বললেন, ‘ইন্ডিয়ায় তোমার কে আছে?’
‘অনেকেই আছে। এক দাদা আছে। ওই কলকাতার কাছেই জমি কিনে বাড়ি করেছে। আমাদের অনেকেই ধীরে ধীরে ওদিকে চলে গেছে। এত ঝামেলার মধ্যে কে থাকবে?’
সোমনাথ বললেন, ‘যাবার হলে আমিও যেতাম। থাকাটাই তো লড়াই। নিজের ভিটে আগলে থাকা উচিত। আমাকে দেখো, কলেজ থেকে পদত্যাগ করার জন্য জোর করছিল। আমি ছাড়িনি। আজ কলেজে গিয়ে সবাইকে বুঝিয়ে দেব, আমাকে হারানো অত সোজা না।’
সোমনাথের কথা শেষ হবার আগেই ফোন বাজতে শুরু করে দিল। সোমনাথ ফোন ধরলেন, ‘হ্যালো।
‘আমি খোন্দকার বলছি।’
‘হ্যাঁ, প্রিন্সিপাল সাহেব, বলুন, নিপুণ ঠিক আছে তো? ওকে ফোন করেছিলাম কাল। ফোনে পাইনি।
‘ঠিক আছে। ওসব নিয়ে ভাববেন না। বলছি কাল আমায় সেক্রেটারি সাহেব ডেকেছিলেন। দেশের অবস্থা বিচার বিবেচনা করা সাহেব বললেন আপনি পদত্যাগপত্রটা জমা দিয়েই দিন। নইলে কলেজ থেকেই আপনাকে বরখাস্ত করা হবে। আপনি পদত্যাগপত্র দিলে আপনার জন্য ভালো, কলেজের জন্যও ভালো। কলেজ থেকে যাতে আপনার পি এফ আর গ্র্যাচুইটির টাকা তাড়াতাড়ি মিটিয়ে দেওয়া হয়, সেটা সেক্রেটারি সাহেব দেখে নেবেন জানালেন।’
সোমনাথ হতভম্ব হয়ে গেলেন। বললেন, ‘কালকেই তো আমার সঙ্গে নিপুণের কথা হল। নিপুণ বলল আমাকে নিয়ে কলেজে যাবে।
‘নিপুণের জন্যও এখন কলেজ খুব একটা নিরাপদ জায়গা না। আপনাদের দু-জনের কারো কলেজে না যাওয়াই ভালো।’
‘আমরা হেরে যাব ওদের চাপের কাছে? চেষ্টা করলে কিন্তু লড়াইটা করা যেত প্রিন্সিপাল সাহেব।’
‘নাহ। আমরা আর কোনো লড়াই করার জায়গাতেই নেই। আমি যা বুঝলাম, তাতে আপনি চাকরি না ছাড়লে আমাদের সবাইকে ছাড়তে হবে। এই অসম লড়াই করে আমাদের কারো কোনো লাভ হবে না।’
‘ঠিক আছে। আপনি যখন বলছেন।’
ফোনটা কেটে গেল। সোমনাথ হতভম্ব হয়ে বসে রইলেন। বীথি চা নিয়ে এসেছিলেন। সোমনাথকে বসে থাকতে দেখে বললেন, ‘কী গো, কী হল? এ-রকম মুখ করে বসে আছ কেন?’
সোমনাথ বললেন, ‘আমি আজ থেকে অফিসিয়ালি বেকার হয়ে গেলাম। আমার চাকরিটা নেই হয়ে গেল।’
বীথি চায়ের কাপ টেবিলের উপর রেখে সোফায় বসে পড়লেন, ‘চলে গেল?’
সোমনাথ মাথা নাড়লেন। জয়দেব বলল, ‘ওরাই করাচ্ছে এগুলো, তাই না স্যার?’
সোমনাথের দু-চোখ জলে ভরে উঠছিল। কলেজের প্রতিটা ছাত্র-ছাত্রীকে প্রাণ ঢেলে পড়িয়েছেন দিনের পর দিন। এভাবে শেষ হয়ে গেল চাকরিজীবনটা। নাহ, তিনি ভাবতে পারেননি এই দিনটা তাকে দেখতে হবে। তিনি বোকা। অনেক আগেই বোঝা উচিত ছিল। বিষয়-আশয়ের ব্যাপারে কোনোকালেই সেভাবে খুব বেশি চিন্তা ভাবনা করেননি। এখন বুঝতে পারছেন, টাকা থাকলে অন্তত দেশ ছেড়ে অন্যত্র গিয়ে থাকা যেত। এখন এই ফ্ল্যাট ছাড়া আর কিছুই রইল না। দু-জনের অন্নসংস্থান হবে কী করে? এখনই কি টিউশন করতে পারবেন? ওরা জানতে পারলে টিউশনও করতে দেবে না বোধ হয়। বুকে প্রবল ব্যথা করতে শুরু করল। সোমনাথ সরবিট্রেট বসার ঘরেই রাখেন। তাড়াতাড়ি জিভের তলায় দিলেন। ঘেমে যাচ্ছিলেন, জোরে জোরে নিশ্বাস নিয়ে স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করলেন।
বীথি বললেন, ‘নিপুণ কি জানে?’
সোমনাথ বললেন, ‘নিপুনের কলেজ যাওয়াই বন্ধ হয়ে যাবে হয়তো। নিপুণ আমার হয়ে কথা বলেছিল, এটা ওরা পছন্দ করবে না। আমি হঠাৎ করে কবে ওদের বিরুদ্ধ পক্ষ হয়ে গেলাম, সেটাই তো বুঝতে পারছি না।’
জয়দেব বলল, ‘ইন্ডিয়ার দাদাদের সঙ্গে কথা বলব স্যার?’
সোমনাথ শূন্য চোখে তাকালেন। শেষ অবধি কি এটাই ভবিতব্য হবে?
৩৬
।। দিল্লি।
বানশালকে চেয়ারেই বসিয়ে রাখা হয়েছে। চেয়ারেই মাথা রেখে ঘুমিয়েছেন শেষ রাতটা। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলেন তার সামনে একজন প্রৌঢ় বসে আছেন।
‘নমস্কার। আমার নাম তুষার রঙ্গনাথন। আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে এলাম।’
বানশাল বললেন, ‘এভাবে কথা বলা যায়? এই ঘরে এসি অবধি নেই। আমার গরমে শরীর খারাপ লাগছে।’
তুষার বললেন, ‘সেসব ফেসিলিটি জেলেও নেই মিস্টার বানশাল। আপনি যে কাজ করেছেন, তাতে যে ধরনের জেলে আপনাকে পাঠানো হবে, সেখানে বাকি জীবনটা খুব একটা আরামে কাটবে না।’
বানশাল ঘাবড়ে গিয়ে চুপ হয়ে গেলেন।
তুষার বললেন, ‘রশ্মিকা ঠিক কী কাজ করে?’
বানশাল বললেন, ‘রশ্মিকার সঙ্গে আমার বিজনেস ট্রানজাকশন হয়।’
‘মানে পাকিস্তানের ব্যবসা রিলেটেড ট্রানজাকশানগুলোও হয়, তাই তো?’
‘হুঁ।’
‘আপনার আই এস আই-এর সঙ্গে কতদিনের যোগাযোগ?’
‘কোনো যোগাযোগই নেই। আই এস আই-এর সঙ্গে আমার কেন যোগাযোগ থাকবে?’
‘আনোয়ার কোত্থেকে এল তবে? আকাশ থেকে?’
‘ওহ্… আনোয়ার… ও হ্যাঁ।’
‘এ-রকম আধাখ্যাঁচড়া কথা বললে কিন্তু নারকো টেস্ট করাতে বাধ্য হব বানশাল সাহেব।’
‘আপনি জানেন না আমি কী করতে পারি। প্রেস কিন্তু আপনাদের ছেড়ে দেবে না। কোর্টেও দেখে নেব।’
‘সব জিনিস কোর্টে যায় না মিস্টার বানশাল। আপনি গুম হয়ে যেতে পারেন।’
বানশাল ঢোক গিলে বললেন, ‘আপনি এ-রকম করতে পারেন না। আমি বিদুর সাহেবকে যা বলার কালই বলেছি। আমার আর কিছু বলার নেই।’
তুষার বললেন, ‘আপনি আমাদের আনোয়ারকে দিতে পারবেন। আমি জানি আপনার সে ক্ষমতা আছে।’
বানশাল অবাক হলেন, ‘আমি আনোয়ারকে দিতে পারি? কীভাবে?’
তুষার হাসলেন, ‘কীভাবে সেটা আমি আপনাকে বলে দেবো। আপনি যদি আমাদের সঙ্গে কো-অপারেট করতে রাজি হন তাহলে আপনার জন্য আমি একটা ক্ষীণ আলো দেখতে পারছি। নইলে আমি আপনাকে কোনোভাবে হেল্প করতে পারব না।’
বানশাল বললেন, ‘সেটা আপনাদের আগে ভাবা উচিত ছিল। হোটেল থেকে যেভাবে আমাকে তুলে এনেছেন, আই এস আই এতক্ষণে সব জেনে গেছে।’
তুষার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, ‘এই কথাটা আপনি ঠিক বলেছেন। আই এস আই জেনে গেছে। কিন্তু আমার যে আনোয়ারকে চাই বানশাল সাহেব।’
‘আনোয়ারের সঙ্গে আমার আজ অবধি একবারও দেখা হয়নি। ও হয় ফোনে, নয় ভিডিয়ো কনফারেন্সে আমার সঙ্গে কথা বলেছে। আনোয়ারকে ধরার হিসেবে আমাকে না রাখাই ভালো।’
তুষার বললেন, ‘আর রশ্মিকা?’
বানশাল বললেন, ‘রশ্মিকার ব্যাপারটা ওর সঙ্গে কথা বলাই ভালো।’
তুষার পায়চারি করতে শুরু করলেন, ‘বানশাল সাহেব, পাকিস্তানের সঙ্গে কোনোরকম ব্যবসায় যাবার আগে আপনার জানা উচিত ছিল আপনার দেওয়া টাকা টেরর ফান্ডিং-এর কাজে যেতে পারে। আপনি তো বাচ্চা ছেলে না। জানতেন না?’
বানশাল চোখ মুখ শক্ত করে বসে রইলেন।
তুষার নরম গলায় বললেন, ‘এই দেশের নিরাপত্তা নিয়ে যদি আপনার মতো বরিষ্ঠ ব্যবসায়ীরা চিন্তা না করে, তাহলে দেশের লোক কোথায় যাবে বলুন তো? আপনি সমস্ত কিছু জেনেই ব্যবসাটা চালিয়ে গেছেন, আনোয়ারকে টাকাও দিয়ে দিতেন। আপনি আপনার দেশকে বিক্রি করতে গিয়ে একবারও ভাবেননি।’
বানশাল বললেন, ‘আপনারা আমার অ্যাডভোকেটের সঙ্গে কথা বলার ব্যবস্থা করুন। প্রেস কিন্তু জানে আমাকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে। আমাকে গুম করে দিলে আপনারা কেউ বাঁচবেন না।’
তুষার থমকে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরালেন, ‘ধুস, ওসব ভাবনা আপনি ভাবছেন কেন? আমাদের ভালো মন্দের কথাটা আমাদেরই ভাবতে দিন না। আপনি আবার বেশি বেশি ভেবে ফেলছেন। আমাদের সম্মতি ছাড়া প্রেস কিচ্ছু করবে না বানশাল সাহেব। আপনাকে আমি চব্বিশ ঘণ্টা সময় দিতে পারি। আপনি বরং বসে বসে ভাবুন আনোয়ারকে কী করে আমাদের হাতে তুলে দিতে পারবেন। বেশি কিছু চাইনি, শুধু আনোয়ার। পারবেন না?’
বানশাল কাঁদো কাঁদো মুখে বললেন, ‘কেন স্যার আমাকে এই গাড্ডায় ফেলে দিচ্ছেন? আই এস আই আমাকে ছাড়বে? যে কোনোদিন আমি খুন হয়ে যেতে পারি।
তুষার বললেন, ‘র কে এত দুর্বল ভাবলেন কেন? আনোয়ারকে না পেলে আমরাই আপনাকে সরিয়ে দেবো। ভাবুন বানশাল সাহেব, ভাবুন। কী করে আপনি আমাদের হেল্প করতে পারেন, ভাবুন।’
বানশাল বলল, ‘র যদি এত শক্তিশালী হত, তাহলে বাংলাদেশে আনোয়ারকে খুঁজে বের করে মারতে পারছে না কেন? আমি কী করতে পারি?’
তুষার আবার চেয়ারে বসলেন, ‘ব্যাপারটা হয়েছে কী বানশাল সাহেব, র আপনার মাধ্যমে তার শক্তি দেখাতে চায়। এই মহান কাজে তাই আপনাকে নির্বাচন করা হয়েছে। আপনি আপনার ক্ষমতা দেখান। বাকিটা র বুঝে নেবে। ঠিক আছে?’
বানশাল বসে বসে ঘামতে শুরু করলেন।
৩৭
সকাল দশটা।
।। কাশ্মীর।।
গাড়িটা অনন্তনাগ চেক পোস্টের থেকে দু-শো মিটার দূরে আছে। ড্রাইভার বলল, ‘ভাইজান, কী করব?’
গাড়ির পেছনের সিটে একজন যাত্রীই বসে আছে। ড্রাইভারের প্রশ্ন শুনে বলল, ‘নর্মাল যাও। আটকাবে না।’
যাত্রীর নাম আকবর খান। আম কাশ্মীরিদের মতো চেহারা। বাস্তবিকই গাড়িটা আটকাল না। চেকপোস্ট পেরোনোর খানিকক্ষণ পরে রাস্তার বাঁ- দিকে একটা ছোটো রাস্তা পড়ল। গাড়ি সেই রাস্তায় ঢুকল।
একটা বাড়ির সামনে এসে গাড়িটা দাঁড়িয়ে গেল। আকবর গাড়ি থেকে নেমে ড্রাইভারকে বলল, ‘সুরিয়া।’
ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল।
বাড়ির দরজায় গিয়ে নক করল আকবর। এক মাঝবয়সী লোক দরজা খুলে আকবরকে দেখা মাত্র তাড়াতাড়ি সরে দাঁড়াল। আকবর ঘরের ভেতর প্রবেশ করামাত্র লোকটা দরজা বন্ধ করে দিল।
আকবর বিদ্রূপের গলায় বলল, ‘কী চাচাজান, এত ভয় পাচ্ছো কেন? এখানে তো এখন আর্মির তেমন কিছুই দেখলাম না।’
লোকটা রাগী চোখে আকবরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি এই দিনে দুপুরে এখানে চলে এলে? তোমাকে কে বলেছে ওরা কেউ কিছু দেখছে না? সবার সব নজর আছে। তুমি নিজের আনন্দেই আছ।’
আকবর ব্যাগ রেখে মেঝেতেই কার্পেটের উপর বসে পড়ে বলল, ‘আমি সব খোঁজ খবর নিয়েই এসেছি। আমি ঘাসে মুখ দিয়ে চলি, এ-রকম ভাবনার কোনো কারণ নেই। তুমি একটু ভালো কাওয়া বানিয়ে আনো। আমার কাজ আছে।’
লোকটা রেগে-মেগে ঘরের ভেতর চলে গেল। আকবর পকেট থেকে একটা ছোটো মোবাইলের মতো যন্ত্র বের করল। তাতে এই গ্রামের ম্যাপটা আছে। একটা পেন নিয়ে যন্ত্রের উপরেই সেনা ঘাঁটিগুলোর উপর গোল করে দাগ দিল।
আরেকটা ফোন নিয়ে মেসেজ করতে শুরু করল। ঘরের ভেতর থেকে লোকটা কাওয়া চা নিয়ে এসে মেঝেতে রেখে বলল, ‘নাও। আর কী লাগবে তোমার? মানে আমার যা শান্তি ছিল, তার সবই তো নিয়ে গেছ, আর কী চাও?’
আকবর কাওয়ায় চুমুক দিয়ে বলল, ‘ইসলামাবাদ গেছিলাম বুঝলে চাচা। তোমার জন্য ভালো সিগারেট এনেছি। খাবে?’
লোকটা চমকে উঠে জানলার কাছে গেল। চারদিকে দেখে এসে বলল, ‘আমার খাবার দরকার নেই। তুমি বসে বসে খাও। আমাকে এর মধ্যে টেনো না। যত তাড়াতাড়ি এখান থেকে যাবে, আমার তত ভালো হবে।’
আকবর বলল, ‘আরিফকে নিয়ে তোমার কোনো কষ্ট হয় না? ছেলেটাকে অকারণে মেরে দিল ওরা।
লোকটা বলল, ‘আরিফকে অকারণে মারবে কেন? আরিফ কম কাণ্ড করেছিল এখানে? একদিন-না-একদিন মরতেই হত। তোমাকেও খুঁজে বেড়াচ্ছে ওরা পাগলের মতো। সাবধানে থাকো। এ-রকম পাগলের মতো ঘোরাফেরা কোরো না।’
আকবর সিগারেটের প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরালো। বলল, ‘আমার নিজের এলাকায় আমাকে এত ভয়ে থাকতে হবে কেন? তোমার কোনোদিন এই প্রশ্নটা মাথায় আসে না? নিজের ভূমিতে পরবাসী করে রেখে দিয়েছে আমাদের, কারো কোনো তাপ-উত্তাপ নেই, ইন্ডিয়ান গভর্নমেন্ট কোথায় কী ভিক্ষা দিচ্ছে, সেখানে সবাই ছুটে গেল। লজ্জা লাগে না? ছি! কাদের জন্য আমাদের এত শহিদ এত আত্মত্যাগ করছে?’
লোকটা বলল, ‘ওসব গা গরম করা কথা আমাকে বলে লাভ নেই। তুমি জান তোমাকে আমি ছোটোবেলা থেকে দেখেছি, আমার গ্রামের ছেলে, তুমি এলে আমি না করতে পারব না। কিন্তু এখন এই অবস্থায় থেকে তোমার যদি মনে হয় তুমি কাশ্মীরকে ইন্ডিয়া থেকে আলাদা করবে, তাহলে মূর্খের স্বর্গে বাস করছ। কাশ্মীরের সেই অবস্থা এখন নেই। ইন্ডিয়া অনেক বেশি সব কিছুতে নিজের দখল দেখিয়ে দিয়েছে। তোমার যদি পাকিস্তানে থাকতে ভালো লাগে, তাহলে তুমি ওদেশেই থেকে যাও। এদেশে আর এস না। আমার মতো যাদের বাড়িতে গিয়ে থাকছ, তারাই ভয় পাচ্ছে। তাদের জীবনকে বিপন্ন করে দিচ্ছ তুমি।’
আকবর উত্তর দিল না। ফিকফিক করে হাসতে হাসতে পকেট থেকে এক তাড়া নোট বের করে এগিয়ে দিল, ‘এই নাও চাচা। খরচা করো।’
চাচা বলল, ‘হয় সবটাই নকল টাকা, নইলে এই টাকা খরচা করতে গেলে আমাকে পুলিশে ধরবে। তোমার টাকা তোমার কাছেই রাখো। তোমার এখানে প্ল্যান কী আমাকে বলো।’
আকবর বলল, ‘আমার প্ল্যান? আমার তো অনেক দিনের প্ল্যান। আমি এখন এখানেই মাস ছয়েক থাকব। সেভাবেই হিসেব করে চলো, এদেশে আরও মেহমান আসবে ওপাশ থেকে। তাদের রাখার ব্যবস্থা করতে হবে তো। ভেবো না, আমি করে নেব। তুমি রান্নাবান্না করবে খালি। কতবার বলেছি তোমায়, চাচী মারা গেছে, আরেকবার নিকাহ করো। শুনলে না। এবার আমার এতদিনের রান্না তোমাকে করতে হবে।’ জিভ দিয়ে চুকচুক করে শব্দ করল আকবর।
লোকটা রেগে-মেগে গজগজ করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
৩৮
॥ ঢাকা।।
সকাল এগারোটা। সোমনাথ প্রিন্সিপালের চেম্বারে চুপ করে বসে আছেন।
বাইরে রাশেদদের গ্রুপের ষাট সত্তরটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের মুখে চাপা উল্লাস।
খোন্দকার সাহেব এসে তাকে দেখে অস্বস্তির সঙ্গে বললেন, ‘ওহ, আপনি এসে গেছেন?’
সোমনাথ খামটা এগিয়ে দিলেন।
খোন্দকার সাহেব খাম থেকে চিঠিটা বের করে পড়ে দফতরিকে ডেকে বললেন, ‘স্যারের চিঠিটা ফটোকপি করে স্যারকে একটা রিসিভ কপি দিয়ে দাও।’
দফতরি চিঠিটা নিয়ে চলে গেল। সোমনাথ বললেন, ‘নিপুণ আসেনি?’
‘না। ওকে কক্সবাজার পাঠানো হয়েছে। সেক্রেটারি সাহেব ওকে এখন কলেজে আসতে বারণ করেছেন। জানি না পড়াশোনা শেষ হবে নাকি ছেলেটার।’
দফতরি কাগজ নিয়ে এসে উপস্থিত হল। সোমনাথ কাগজটা নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। প্রিন্সিপাল সাহেব বললেন, ‘এখনই চলে যাবেন?’
সোমনাথ বললেন, ‘হ্যাঁ, আসি।’
প্রিন্সিপাল সাহেব চুপ করে রইলেন। সোমনাথ বেরোতেই বাইরের ভিড় সরে গেল। সোমনাথ ঘর থেকে বেরিয়ে রাশেদের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘তোমরা চেয়েছিলে। আমি ছেড়ে দিলাম। আশা করব এবার তোমরা ভালো করে পড়াশোনা করবে। ক্লাস করবে। নইলে এত আন্দোলনের কিন্তু কোনো মানেই থাকবে না।’
সবাই উল্লাস করে উঠল। সোমনাথ ধীর পায়ে কলেজ থেকে বেরোলেন। কলেজের সবাই কি খুশি? কারো মুখের দিকেই আর তাকাতে পারলেন না তিনি। নিজেকে বড়ো ছোটো এবং অসহায় মনে হচ্ছে। রাস্তায় একটা বিজয় মিছিল বেরিয়েছে। উপদেষ্টামণ্ডলীর প্রথম বৈঠক হবে আজ। ভারতমুক্ত বাংলাদেশ হবার আনন্দ হচ্ছে।
সি এন জি ধরতে গিয়েও ধরলেন না। এই শহরে বহু বছরের স্মৃতি আছে তার। আজ একটু শহরটা হেঁটে ঘুরবেন। যতবার ভেবেছেন শহরটা পরিণত হচ্ছে, ততবার বুঝেছেন, আদতে কিছুই হয়নি। আজকাল মনে হয় ব্রিটিশদের থেকে স্বাধীনতা না পেলেই বরং ভালো হত। প্রবল দুর্নীতি, স্বজনপোষণের পাঁকে পড়ে পড়ে যত দিন গেছে, তত যেন পাতালে নিমজ্জিত হয়েছে।
‘সোমনাথ সাহেব, ও সোমনাথ সাহেব।’
সোমনাথ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন এক সাংবাদিক ক্যামেরা আর বুম হাতে দৌড়ে আসছে। তার সামনে বুম এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘স্যার প্লিজ, একটা বাইট দিন। আমি কলেজে গণ্ডগোলের খবরে কালকেই একবার এসেছিলাম। কাউকে পাইনি। আজ ভেবেছিলাম কেউ থাকবে। এসে দেখছি আপনি পদত্যাগ করেছেন। কলেজের ছাত্ররা আপনাকে জোর করে পদত্যাগ করতে বাধ্য করল না আপনি নিজেই পদত্যাগ করেছেন?’
সোমনাথ হাত দিয়ে বুমটা সরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আমাকে একটু একা থাকতে দিন।’
‘প্লিজ স্যার, আপনার বাইটটা নিতে পারলে ভালো হত।’
‘বেশ’, সোমনাথ থমকে দাঁড়ালেন, ‘আমি প্রথম থেকেই ছাত্রবিরোধী আন্দোলনে ছাত্রদের পক্ষে ছিলাম। কিন্তু যত দিন এগোলো, দেখা গেল ছাত্রবিরোধী আন্দোলনে ছাত্রদের থেকেও তৃতীয় শক্তির হস্তক্ষেপ বেড়ে গেল। এখন যারা আগে সরকারপক্ষ ছিল, তারাই ছাত্রদল বলে দাবি করছে। এটাই হয়, ক্ষমতা বদলের সময় কিছু সুবিধাবাদী শকুন অপেক্ষা করে থাকে কখন তারা তাদের উদ্দেশ্য সফল করবে। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।’
ক্যামেরা বন্ধ করে দিল সাংবাদিক, বলল, ‘স্যার এ-রকম বলবেন না। তাহলে বিপদে পড়বেন। আপনি ভালো কিছু কথা বলুন। আমি এই বাইটটা ডিলিট করে দেবো। প্লিজ স্যার।’
সোমনাথ বললেন, ‘বিপদে পড়ব? কেন? এই তো সবাই বলেছে আগের সরকারের সময় বাক স্বাধীনতা ছিল না। তাহলে এখন এই কথা বলা হচ্ছে কেন?’
ছেলেটা উশখুশ করতে লাগল। সোমনাথ বললেন, ‘আমাকে সম্পূর্ণ আমার অমতে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছে। যদি ইন্টারভিউ নিতে চান, সেভাবেই নিন। আমি কাউকে ভয় পাই না।
ছেলেটা এবার ক্যামেরা অন করল, ‘ঠিক আছে স্যার, আপনি বলুন।’
সোমনাথ বললেন, ‘আপনারা সবাই জানেন আমি কীভাবে ছাত্রদের সমর্থন করেছিলাম। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে ওদের আন্দোলনের লক্ষ্যবস্তু অন্য কিছু ছিল আমাকে আমারই সন্তানসম ছাত্ররা জোর করে পদত্যাগ করিয়েছে। যারা কোনোদিন ক্লাস করে না, তাদের কীভাবে মেধাবী নাম হল আমি নিজেও জানি না। এই গণআন্দোলনকে যেভাবে প্রতিদিন এরা এদের কাজের মাধ্যমে ছোটো করছে, তাতে আমি ক্ষুব্ধ, বিধ্বস্ত। ভেবেছিলাম এই দেশের জন্য উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করে আছে। বাস্তবে দেখা গেল সেই একই পঙ্কিল যাত্রায় আবার আমরা চলতে শুরু করেছি। এভাবে জোর করে একজন শিক্ষককে যারা পদত্যাগ করতে বাধ্য করল, তারা আর যাই হোক, ছাত্র না। এই ছেলেগুলোর জন্য আমার করুণা হচ্ছে। এরা ভেবেছে রাজনীতি করে, দুর্নীতি করে কিছু টাকা রোজগার করবে। জীবন কখনোই এত সহজ নয়। আশা করব এদের সে জ্ঞানচক্ষু খুলতে বেশিদিন লাগবে না।’
ছেলেটা বলল, ‘আপনি শিয়োর স্যার? এটা আমরা দেখাবো?’
সোমনাথ বললেন, ‘দেখাও। কী আর হবে? দেশ থেকে তাড়িয়ে দেবে তো? দিক! দেশকে অনেক দিয়েছি। দেশ আজ তার প্রতিদান দিল। এই লজ্জা আমি কোথায় রাখব?’
৩৯
।। দিল্লি।
সকাল বারোটা। বানশাল একা একা বসে আছেন। বিদুর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ইন্টারোগেশন চেম্বারে প্রবেশ করলেন।
বানশালের সামনে বসে বিদুর বললেন, ‘তুষারের প্রস্তাবটা নিয়ে ভাবলেন?’
বানশাল বললেন, ‘ভেবেছি।’
‘কী ঠিক করলেন?’
বানশাল বললেন, ‘আমার সিকিউরিটি চাই অফিসার। আই এস আই আমার সম্পর্কে সব জানে। আপনারা যে আমাকে ব্যবহার করবেন, ওরা সেটাও বুঝে গেছে, ওদের বোকা ভাবার কোনো কারণ নেই।’
‘আপনাকে কে বলেছে আমি আই এস আই-কে বোকা ভাবছি?’
বানশাল ক্লান্ত মুখে বললেন, ‘আমার ফ্যামিলি…’
‘আমরা দেখব।’
বানশাল মাথা নাড়লেন, ‘পারবেন না। ইউ হ্যাভ নো আইডিয়া ওরা কী করতে পারে।’
‘আমার সব আইডিয়া আছে। আচ্ছা, আপনি বলুন আপনি কী চান।’
বানশাল বললেন, ‘আমাকে জেলে দিন। আমি কড়া উকিলই অ্যাপয়েন্ট করব, বাইরের পৃথিবী জানবে আমার বিচার খুব সিরিয়াসলি হচ্ছে, ইন্টারনেটেও অ্যাভেইলেবল থাকবে, তিহার বা অন্য কোনো জেলে রাখার ব্যবস্থা করতে পারেন।’
‘তারপর?’
‘তারপর আমি জামিন পাব।
‘কদিন?’
‘দু-মাস। আপনারা কিছু প্রমাণ করতে পারবেন না।
বিদুর সিগারেট ধরালেন। বানশালকেও একটা ধরিয়ে দিলেন।
চুপ করে বসে সিগারেটে কয়েকটা টান দিয়ে বললেন, ‘প্ল্যানটা ফুলপ্রুফ না।’
‘আপনি বলুন কী করতে হবে?’
‘তিহারের জেনারেল সেলে থাকতে হবে। যেখানে আর পাঁচটা কয়েদি থাকবে। কোনো স্পেশাল অ্যারেঞ্জমেন্ট পাবেন না।
বানশাল শ্বাস ছাড়লেন, ‘ক-দিন?’
‘সাতদিন। তারপর আলাদা সেল পাবেন। সেটাও কোনো ফেসিলিটি ছাড়া। আমি রিস্ক নিতে পারব না। কয়েদিদের মধ্যে স্লিপার সেল থাকতেই পারে।’
বানশাল মাথা নাড়লেন, ‘হ্যাঁ, পারে। ওরা সবখানে থাকতে পারে। এখানেও। ‘ বিদুর তীক্ষ্ণ চোখে কয়েক সেকেন্ড বানশালের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘এখানে? এখানে আছে কেউ? আপনি জানেন, এ-রকম কেউ?’
বানশাল বললেন, ‘খোঁজ নিতে পারি। আই এস আই অনেক টাকা দেয়। ত
বিদুর বললেন, ‘তবু আনোয়ার আপনার কাছ থেকে টাকা চাইছে। কেন?’
বানশাল বললেন, ‘ওদের ফান্ডিং এভাবেই হয়। আমাকে আই এস আই ফান্ডিং-এর একটা ইনপুট সোর্স হিসেবে ভাবুন। বাংলাদেশে ওরা প্রচুর ইনভেস্ট করছে। আমার ধারণা সি আই এ-ও ছিল।’
বিদুর বললেন, ‘ধারণা করলে তো হবে না বানশাল সাহেব। যাই হোক, আমি ভাবছি। আপনার ল ইয়ারের নাম্বার দিন।’
বানশাল বললেন, ‘আমার ফোন?’
বিদুর সিগারেটটা অ্যাস্ট্রেতে ফেললেন। হাত দিয়ে ইশারা করলেন। বানশালের ফোন নিয়ে এল দীপ্তি। বিদুর ফোনটা এগিয়ে দিলেন, ‘নিন।’
বানশাল তার ফোন ঘেঁটে একটা নাম্বার বের করে বিদুরকে দিলেন। বিদুর নাম্বারটা তার ফোনে সেভ করে নিয়ে বললেন, ‘আশা করব চালাকি করার চেষ্টা করবেন না। আশা করব দেশকে একটু হলেও আপনি ভালোবাসেন। নইলে আপনি নিজেও জানেন না আপনার জন্য কী অপেক্ষা করে আছে।’
বানশাল বললেন, ‘জানি স্যার। আমাকে এবার অন্তত একটা বেড আর এসির ব্যবস্থা করে দিন। কিছুক্ষণের জন্য একটু ঘুম দরকার আমার।
বিদুর বললেন, ‘দিচ্ছি, আপনার ফোনের পাস কোডটা বলুন তো।’
বানশাল উশখুশ করে বললেন, ‘আমার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ইত্যাদি আছে।’
বিদুর বললেন, ‘সেটা আমি বুঝব। আপাতত আমি আপনাকে বিশ্বাস করব, আর আপনি আমাকে। নইলে আপনার ক্ষতি।’
বানশাল বললেন, ‘এইট থ্রি সেভেন টু সিক্স নাইন।
বিদুর বললেন, ‘থ্যাঙ্ক ইউ। রেস্ট করুন এখন। আপনার খাবারও পাঠিয়ে দিচ্ছি। সন্ধেয় আপনার অ্যাডভোকেটকে আমি এখানে ডাকছি। আমরা একটা মিটিং করে সব ঠিক করে নেবো।’
বানশাল হাঁফ ছাড়লেন, ‘বাঁচালেন স্যার। আমি আর পারছিলাম না।’
বিদুর চেম্বার থেকে বেরিয়ে দীপ্তিকে বললেন, ‘ওকে গেস্ট রুমে নিয়ে যাও। ভেজ খায়, সেটা মাথায় আছে তো?’
দীপ্তি বলল, ‘হ্যাঁ স্যার।’
বিদুর বললেন, ‘গুড। সারভেইলেন্স রাখবে। ওর সঙ্গে কেউ দেখা করতে না পারে। তোমাকেই এটা এনশিয়োর করতে হবে।’
দীপ্তি বলল, ‘ওকে স্যার।’
বিদুর চেম্বারে গিয়ে দেখলেন আর পি বসে আছেন। বিদুর বসে বললেন, ‘বানশাল রাজি হয়েছে। কী করে এগোবে, প্ল্যান জমা দাও। দু-ঘণ্টা টাইম আছে।
আর পি বললেন, ‘দু-ঘণ্টা? অনেক টাইম দিলেন তো স্যার।’
রিদুর বললেন, ‘না। টাইম নেই। আনোয়াররা বড়ো কিছু প্ল্যান করছে। কী করছে, বের করো শিগগিরি।’
