৫০
॥ ঢাকা।।
উত্তরার ফ্ল্যাটটা তার ফ্ল্যাটের থেকে ছোটো। রাত একটার সময় বেরিয়েছেন। জয়দেব গাড়ি ঠিক করে রেখেছিল।
বীথি বেশ কয়েকবার জিজ্ঞেস করেছেন তারা কোথায় যাচ্ছেন। সোমনাথ শুধু বলেছেন অন্য জায়গায়। জামাকাপড়, প্রয়োজনীয় ওষুধ-সহ সব জিনিসপত্র দুটো ব্যাগে নিয়ে এসেছেন।
ফ্ল্যাটে ঢুকে বীথি বললেন, ‘এই ফ্ল্যাটটা কি তোমার কেনা?’
সোমনাথকে জয়দেব আগেই শিখিয়ে দিয়েছিল। সোমনাথ সেটাই বললেন, ‘না, এক কলিগ ব্যবস্থা করেছে। আপাতত কিছুদিন এখানেই থাকব।’
বীথি ক্লান্ত ছিলেন। ঘুমিয়ে পড়েছেন। জয়দেব বসার ঘরে টিভি চালিয়ে দিল, ‘এই নিন, এখানেও আপনার ফ্ল্যাটের মতো সব চ্যানেল পেয়ে যাবেন। কোনো সমস্যা নেই।’
সোমনাথ বললেন, ‘ইলেকট্রিক বিল, ফ্ল্যাট ভাড়া, এসব নিয়ে কত টাকা দিতে হবে? আমি তো এখন এত টাকা দিতে পারব না। এই ফ্ল্যাটটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে এর ভাড়া খুব একটা কম হবে না।
জয়দেব বলল, ‘এমন কিছু বেশি হবে না কাকাবাবু। আমি যে আপনার ফ্ল্যাটে থাকলাম, আপনি কি আমার থেকে ভাড়া নিয়েছেন? মানুষের বিপদে তো মানুষই পাশে থাকবে। আমার মনে হয় না বেশিদিন আপনাকে এখানে থাকতে হবে। আমরা শুধু এখানেই কিছুদিন অপেক্ষা করে আবার আগের ফ্ল্যাটে ফিরে যাব। ঝুঁকি না নেওয়াই ভালো। বিশেষ করে সেটা যখন প্রাণের ঝুঁকি হয়।’
সোমনাথ জয়দেবের ব্যাগটা দেখলেন, একটু উশখুশ করে বললেন, ‘তোমার ব্যাগে কি অস্ত্রশস্ত্র আছে?’
জয়দেব বলল, ‘আছে। আত্মরক্ষার জন্য। এই দেশে মানুষের বেঁচে থাকার জন্য অস্ত্র অবশ্যই প্রয়োজন।’
সোমনাথ বললেন, ‘তোমার আসল নাম কী? জয়দেব যে না, তা আমি জানি। কী নাম?’
‘আমার আসল নাম নাই বা জানলেন কাকাবাবু। আমার সম্পর্কে যত কম জানবেন, ততই ভালো। চেনা মানুষগুলো কেমন অচেনা হয়ে যায় দেখেছেন না এ দেশে? এত চিনে কী হবে?’
সোমনাথ মাথা নাড়লেন, ‘তা ঠিক। আমরা যে এখানে এলাম, কেউ দেখেনি তো?’
জয়দেব মাথা নাড়ল, ‘না। দেখেনি। আপনার বাড়িতে যারা পাহারা দেয়, তারা রাত দশটা অবধি ঘুরঘুর করে। তারা ভাবতে পারবে না রাত একটার সময় আপনি বেরোতে পারেন।’
সোমনাথ অবাক হয়ে বললেন, ‘তুমি কাউকে দেখেছ?’
জয়দেব বলল, ‘আপনিও দেখেছেন। শুধু বুঝতে পারেননি ওরা আপনাকেই দেখছে। গেটের বাইরে ছেলেগুলো ঘুরে বেড়াত।’
সোমনাথ বললেন, ‘হ্যাঁ। কয়েকটা ছেলে ছিল। প্রিন্সিপাল সাহেবের বাড়িতেও তাই হচ্ছে নাকি?’
জয়দেব বলল, ‘হ্যাঁ। ওর বাড়িতেও একই কাজ হচ্ছে।’
সোমনাথ বললেন, ‘সর্বনাশ। তাহলে ওকেও এখানে আনার ব্যবস্থা করো।’
‘করব। ওর থ্রেটটা এখনই অত বড়ো হয়নি। উনি ওদের কথা শুনে চলে ওরা হয়তো ওর কোনো ক্ষতি করবে না। আপনি রগচটা মানুষ, আপস করেন না। আপনার থ্রেটটা বেশি ছিল। প্রিন্সিপাল সাহেব চাইলে তো আপনার ব্যাপারটা মানতে নাও পারতেন। পেরেছেন কি? তিনি দুর্বলচিত্ত মানুষ, তাঁর ছেলে তাঁর পিছুটান। আপনার সেরকম কিছু নেই বলে আপনি মিডিয়াতেও মুখ খুলতে পেরেছেন।’
সোমনাথ চুপ করে গেলেন। জয়দেব ঠিকই বলেছে। খোন্দকার সাহেবের দোষ ধরে লাভ নেই। তার মতো অনেকেই প্রতিবাদ করতে চাইলেও পারবে না। কারো সংসার আছে, কারো অনেক টাকা লোন, চাকরি করেই সেসব মেটাতে হবে। পিছুটানের জন্য অনেক প্রতিবাদীর প্রতিবাদই শেষ অবধি করা হয়ে ওঠে না।
জয়দেব বলল, ‘আপনি এবার ঘুমোতে যান কাকাবাবু। এভাবে বসে থাকলে কিন্তু শরীর খারাপ হয়ে যাবে। আপনি আপনার ফ্ল্যাটেও ঘুমোতেন না, আমি দেখেছি।
সোমনাথ ম্লান হাসলেন, ‘ঘুম হত না। যাদের সমর্থন করেছি, তাদের পালটে যেতে দেখে বিবেক দংশন হত। চোখের সামনে সব কিছু শেষ হতে দেখে কি ঘুম আসে?’
জয়দেব বলল, ‘তা ঠিক। আপনার জায়গায় আমি থাকলেও তাই হত।’
সোমনাথ বললেন, ‘তুমি কে বললে না তো? ইন্ডিয়ান সিক্রেট সার্ভিস?’
জয়দেব বলল, ‘ওই যে বললাম কাকাবাবু, সব কিছু না জানলেই ভালো। আপনারা এখানে নিরাপদ। আমিও এবার আমার কাজ নিশ্চিন্তে করতে পারব।’
সোমনাথ অবাক হলেন, ‘কী কাজ?’
জয়দেব উত্তর দিল না। হাসল শুধু। সোমনাথ বুঝলেন ছেলেটা আর কিছুই বলবে না।
৫১
সকাল সাতটা।
।। চট্টগ্রাম ডক।।
মোস্তাক একটা চায়ের দোকানে বসে বসে বিড়ি ফুঁকছে।
তার ফোন বেজে উঠতেই সে সঙ্গে সঙ্গে ফোন ধরে সালাম দিল, ওপ্রান্ত থেকে আনোয়ারের গলা ভেসে এল, ‘কী হল, কন্টেনারের খোঁজ পেলে?’
মোস্তাক বলল, ‘পেয়ে গেছি, ট্রাক লোডিংও শুরু হয়ে গেছে।’
আনোয়ার বলল, ‘বাঃ। ক-টা বাক্স আছে?’
‘সতেরোটা।’
‘একটা ট্রাকে হবে?’
‘দুটো ট্রাক নিয়েছি। চেক পোস্ট ক্লিয়ারেন্স না পেলে তো সমস্যা।’
‘সব করে দেওয়া আছে। ট্রাকের নাম্বারগুলো আমাকে পাঠাও। আর ট্রাকের কাছে তোমার যাবার দরকার নেই। ওগুলো রাস্তায় বেরোলে তারপর বেরোবে।’
‘ঠিক আছে জনাব।’
ফোন রেখে আনোয়ারকে ট্রাকের নাম্বারগুলো পাঠিয়ে দিল মোস্তাক। রাত থেকেই মন উশখুশ করছে। চট্টগ্রামে তার কাছের লোক থাকে। তার কাছে যাওয়া যায়। লোড হতে সময় লাগবে। সে ট্রাকের ড্রাইভারকে ফোন করল, ট্রাক রাস্তায় নামার পরে শহরের বাইরে একটা পেট্রোল পাম্পে দাঁড়ানোর জন্য তাকে নির্দেশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে গাড়ির কাছে গিয়ে গাড়িতে উঠল। ড্রাইভারকে বলল, ‘বস্তি চলো।’
গাড়ি চলতে শুরু করল। মোস্তাকের আজকাল মন ভালো থাকে। আনোয়ার তাকে বিশ্বাস করছে আবার আগের মতো করেই, সে বুঝতে পারে। চট্টগ্রামে তাকে একাই পাঠিয়েছে। আর কাউকে কোনো দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।
মারুফা বেগম তাকে দেখলে এখন কী করবে? খুশি হবে? একসময় মারুফা বেগমকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সে। শেষ অবধি সেসব হয়নি। ইন্ডিয়া যাবার কাজ এসেছিল।
বস্তির কাছে গিয়ে গাড়ি দাঁড়িয়ে গেল। মোস্তাক গাড়ি থেকে নেমে হাঁটতে শুরু করল। আগে সে লুঙি পরে থাকত, এখন সাদা টিশার্ট, জিনসের প্যান্ট পরে এসেছে। মারুফা তাকে দেখলে কতটা অবাক হবে ভেবেই আমোদ হচ্ছিল তার। বস্তির কেউই তাকে চিনতে পারল না। কেউ কেউ দাঁড় করিয়ে নাম-ধাম জিজ্ঞেস করছিল কৌতূহলবশত। মোস্তাক সবাইকেই উলটোপালটা বুঝিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল।
বন্দর বস্তি দু-ভাগে বিভক্ত। একপাশে নিম্নবিত্তদের বসতি, অন্যদিকে নিষিদ্ধপল্লী। মোস্তাকের সাধারণ বস্তিতে একটা ঘর ছিল। সে তার পুরোনো ঘরে না গিয়ে মারুফার ঘরের দিকেই রওনা দিল।
বেড়ার ঘর, টিনের দরজা। টোকা দিতে দরজা খুলে মারুফা তাকে দেখে হাঁ করে তাকিয়ে বলল, ‘ও আল্লা, আপনি বেঁচে আছেন?’
মোস্তাক দাঁত বের করে হেসে বলল, ‘কেমন আছিস?’
তাকে ঘরে নিয়ে বসালো মারুফা। ছোটো অপরিসর ঘরে একটা টিভিও আছে।
মারুফা বলল, ‘পাকা ঘর তুলতে হবে। ঝড়ে সব উড়ে গেছিল। আমার আর কী, কাস্টমার না হলে না খেয়ে থাকতে হয়।’
মোস্তাক পকেট থেকে দশ হাজার টাকা বের করে মারুফার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘এটা রাখ। পরে আরও দিয়ে যাব। ঘর তুলে নিস।’
মারুফা টাকাটা নিয়ে বলল, ‘এখন করবে? এই সকালে?’
মোস্তাক হেসে মাথা নাড়ল, ‘না কিছুই করব না। তোর সঙ্গে দেখা করতে এলাম। তোর কথা মনে পড়ছিল।’
মারুফা বলল, ‘মিথ্যা কথা। মনে পড়লে এতদিন পরে তুমি হঠাৎ করে আজ সকালে চলে আসতে না। কী জন্য এসেছ সেটা বলো।’
মোস্তাক মাথা নাড়ল, ‘আমি জানি তোর বুদ্ধি আছে। তুই কী করতে এখানে পড়ে থাকলি, সেটা জানি না।’
মারুফা বলল, ‘ফালতু কথা না বলে কী দরকার সেটা বলো।’
মোস্তাক পকেট থেকে একটা ফোন বের করে মারুফাকে দিয়ে বলল, ‘তোকে মাঝে মাঝে আমি ফোন করব। একটা ছেলে তোর কাছে আসবে। ছেলেটা আসার সময় হলে তোকে আমি আগে থেকে ফোন করব। তুই সেদিন আর কোনো কাস্টমার ধরবি না। ছেলেটা তোর কাছে এক রাত থেকে চলে যাবে।’
মারুফা বলল, ‘আর কোনো কাজ নেই?’
মোস্তাক বলল, ‘আর কোনো কাজ থাকলে সেটাও ফোনেই বলব। আর এই কথা বস্তির কাউকে বলবি না। তুই বলবি না সেটা আমি জানি।’
মারুফা ঘাড় নাড়ল, ‘ঠিক আছে। আর কিছু?’
মোস্তাক বলল, ‘না। আর কিছু না।’
‘চা খাবে?’
‘কর।’
মারুফা চা বসালো। মোস্তাক বিড়ি ধরিয়ে গুনগুন করে গান করতে লাগল। এখন টাকা রোজগারের সময়। এই সময় সবসময় আসে না। যখন আসে, তখন সুযোগের সদ্ব্যবহার করে নিতে হয়…
৫২
।। দিল্লি।
সকাল আটটা।
আঠাশ-উনত্রিশ বছর বয়স ছেলেটার। ইন্টারোগেশন চেম্বারে এনে বসিয়ে রাখা হয়েছে। শেষ রাতেই ধরা পড়েছে ল্যাপটপ সমেত। বিদুর অফিসে ঢুকেই তার চেম্বারে গিয়ে দীপ্তিকে ফোন করলেন। দীপ্তি সকাল ন-টা নাগাদ অফিসে আসে। বিদুরের ফোন পেয়ে খানিকটা ঘাবড়ে গেল, ‘হ্যাঁ স্যার।’
‘ছেলেটাকে তুলে আনা হয়েছে। ছবি পাঠাচ্ছি আবার। কনফার্ম করো।’
‘স্যার অত কম সময়ে দেখেছি…’
‘যা মনে হচ্ছে বলো।’
‘ওকে স্যার।’
বিদুর ছেলেটার ছবি পাঠালেন। দীপ্তি ফোনব্যাক করে বলল, ‘এই হবে মনে হচ্ছে স্যার। ‘ঠিক আছে।’
বিদুর ফোন রেখে চুপ করে কিছুক্ষণ বসে রইলেন। বানশালের ল্যাপটপটা আই টি সেকশন দেখছে। ফোন করে খোঁজ নিলেন ল্যাপটপটা ঠিক আছে নাকি। ঠিক আছে বুঝে আশ্বস্ত নিয়ে উঠে ইন্টারোগেশন চেম্বারে ঢুকে ছেলেটার সামনে বসে বললেন, ‘কী নাম?’
ছেলেটা হাসল, ‘আমার নাম জেনে কী হবে স্যার? আপনার জিনিস তো আপনি পেয়ে গেছেন।’
বিদুর বললেন, ‘আমি বোঝার চেষ্টা করছি জিনিসটা আমি পেয়েছি কীভাবে? তুমি নিজের কাছে রাখতে না পেরে যেচে ধরা দিয়েছ, নাকি সত্যি সত্যিই আমার টিম তোমায় ধরেছে?’
ছেলেটা হাসি মুখেই চুপ করে রইল। তার ঠোঁটের পাশ থেকে কেটে গিয়ে রক্ত পড়ছে। বিদুর কোনো রকমে ফার্স্ট এইড করতে বারণ করে রেখেছেন। তিনি বললেন, ‘তোমার বাড়ি কোথায়? পাকিস্তানে?’
ছেলেটা মাথা নাড়ল, ‘নাহ। এই দেশেই। আমি ফ্রিল্যান্সার।’
বিদুর বললেন, ‘ফ্রিল্যান্সার না, তুমি স্লিপার সেল। তাই না?’
ছেলেটা বলল, ‘সবাই স্লিপার সেল স্যার। আপনার বিরুদ্ধে যারা কথা বলবে, তারাই স্লিপার সেল। যার কথা আপনার পছন্দ হবে না, সেই স্লিপার সেল
বিদুর বললেন, ‘আমাকে এসব ফালতু কথা বুঝিয়ে লাভ নেই। আমি দেশের নিরাপত্তার ব্যাপারটা দেখি। পলিটিক্সের ব্যাপারটা পলিটিশিয়ানরা দেখে। তবে তোমাকে একটা কথা আমি বলতে পারি, দেশের বিভিন্ন ব্যাপারে তোমার আপত্তি থাকতেই পারে। তার জন্য দেশ বিরোধী শক্তি, যারা দেশের নিরীহ মানুষদের মেরে ফেলে, তাদের হাত ধরার সপক্ষে কোনো রকম যুক্তি হয় না।’
‘সেটা আপনার মনে হতে পারে। আমি মনে করি না। দেশের কেউ যখন আমার কথা শুনছে না, তখন আমি বাইরের সাহায্য নিতেই পারি।’
বিদুর হাসলেন, ‘আবার দিকভ্রষ্ট জাহাজের ক্যাপ্টেনের মতো কথা বলা শুরু করে দিয়েছ। যাই হোক, এসবে আমার কোনোরকম আগ্রহী নই, তোমার থার্ড ডিগ্রি ট্রিটমেন্ট যারা করার, তারা করবে, আমার শুধু এটুকু জানার আছে, তোমাদের সামনে প্ল্যান কী?’
ছেলেটা বলল, ‘আমি জানি না। আমি আমার কাজ করি। কার কী প্ল্যান আমার সঙ্গে কেউ কিছু আলোচনা করে না।’
বিদুর উঠে দাঁড়ালেন, ‘ঠিক আছে, তুমি তোমার কাজ করো। আমরা আমাদের কাজ করি। আমার ধারণা ল্যাপটপ থেকে যা যা ডিলিট করার, তুমি করে দিয়েছ।
ছেলেটা মাথা নীচু করে বসে রইল।
বিদুর চেম্বার থেকে বেরিয়ে গেলেন। বানশালের আইনজীবী এসে বসে আছেন। তার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল না তার। অফিস থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠে ড্রাইভারকে বললেন, ‘তুষারের বাড়ি চলো।’
তুষার রঙ্গনাথন বাড়িতেই থাকেন এই সময়টা। ইরাবতী দরজা খুলে বিদুরকে দেখে খুশি হয়ে বললেন, ‘ওহ, সারপ্রাইজ। সকাল সকাল তুমি? অবিশ্বাস্য?’
বিদুর বললেন, ‘বুড়োটা কোথায়?’
ইরাবতী বললেন, ‘এখনও ঘুমোচ্ছে। ভোরে ঘুমিয়েছে মনে হয়। যাও, আমি কফি বসিয়ে দিচ্ছি।’
বিদুর সরাসরি তুষারের বেডরুমে চলে গেলেন। তুষার যেন বিদুরের অপেক্ষাতেই ছিলেন। বিদুর ঘরে ঢুকতে চোখ বন্ধ অবস্থাতেই বলে উঠলেন, ‘বোস।’
বিদুর তুষারের এই আচরণের সঙ্গে পরিচিত। খাটে বসে বললেন, ‘কাশ্মীরের কোনো আপডেট আছে তুষার?’
তুষার বললেন, ‘ইনফিল্ট্রেশনের ঝাপসা খবর আছে। সার্চ বাড়াতে বলা হয়েছে। কেন বল তো?’
বিদুর বললেন, ‘জানি না। আমার সিক্সথ সেন্স বলছে কাশ্মীরে ওরা আবার ঢুকতে শুরু করে দিয়েছে। বড়ো কিছু প্ল্যান করছে।’
তুষার বললেন, ‘কোন সোর্স থেকে মনে হচ্ছে?’
বিদুর বললেন, ‘বানশালের ল্যাপটপ ওর ফ্ল্যাট থেকেই যে ছেলেটা নিয়েছিল, তাকে আমাদের ছেলেরা তেমন কোনো এফোর্ট ছাড়াই খুঁজে পেয়েছে। ছেলেটার সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারছি ওরা যা ডিলিট করার, করে ফেলেছে। সমস্যা হল আনোয়ারের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট রিলেটেড ডেটা ল্যাপটপে আছে। তাহলে কী ডিলিট করতে পারে?’
তুষার বললেন, ‘তা এসবের মধ্যে কাশ্মীরই মাথায় এল কেন?’
বিদুর মাথা নেড়ে বললেন, ‘জানি না। কাশ্মীর আমার দুঃস্বপ্ন তুষার। তুমি জান।’
তুষার একমতো হলেন, ‘হুঁ, আমারও।’
৫৩
।। ঢাকা।।
দুপুর বারোটা। ফ্ল্যাটের কলিং বেল টিপে দাঁড়িয়ে আছে দু-জনে। রজ্জাক আর আসাদুর দুজনেই দামি সুট পরেছে। রজ্জাক ঠিক করেছিল জেল থেকে কোনো দিন ছাড়া পেলে সুট পরবে। এতদিন পর সে সুযোগ পেয়েছে।
আসাদুর পান খাচ্ছিল। পান চিবোতে চিবোতে বলল, ‘ভাইজান, আপনাকে জোশ লাগছে।’
রজ্জাক অধৈর্য হয়ে আবার কলিংবেল টিপল।
এক মহিলা দরজা খুলল। রজ্জাক দাঁত বের করে বলল, ‘ভাবি, বশীর ভাই বাসায় আছেন?’
মহিলাটি বললেন, ‘জি, ডেকে দেব?’
রজ্জাক বলল, ‘জি ভাবি।
মহিলাটি ফ্ল্যাটের ভেতরে চলে গেলেন। কয়েক সেকেন্ড পর বশির দরজায় এসে রজ্জাককে দেখে চোখ কপালে তুললেন, ‘একী, তুমি?’
রজ্জাক দাঁত বের করল, ‘আমার যে কী ভালো লাগছে ভাই, ভাগ্যিস ভাবি সত্যি কথা বললেন, মিথ্যে বললে ভাবিকে রেপ করতে হত। সকালে এত ঝামেলা আমার ভালো লাগে না ভাই।’
বশির ঘামছিলেন। তড়িঘড়ি দরজা বন্ধ করতে গেলেন। রজ্জাক মুহূর্তের মধ্যে পকেট থেকে ছুরি বের করে বশিরের গলায় বসিয়ে দিল।
বশির কাটা পাঁঠার মতো ছটফট করতে করতে মেঝেয় পড়ে গেল। ঘরের ভেতর থেকে আর্তনাদ ভেসে আসছে। রজ্জাক আসাদুরকে বলল, ‘চল। কাজ হয়ে গেছে।’
চিৎকার চ্যাঁচামেচি আর আর্তনাদের মধ্যেই তারা লিফটে উঠল। কেউ বাধাটুকুও দিল না। বেসমেন্টে এসে রজ্জাক বলল, ‘রিকশা ডাক।’
আসাদুর পানের পিক ফেলে রিকশা ডাকল। দু-জনে রিকশায় উঠল। রজ্জাক পকেট থেকে সিগারেট বের করে তাতে অগ্নিসংযোগ করে বলল, ‘পাপ হইল আসাদুর?’
আসাদুর ঘড়ঘড় করে কাশতে শুরু করল। প্রায় তিরিশ সেকেন্ড পর রাস্তার উপর একগাদা কফ ফেলে সে বলল, ‘পাপের একটা সীমা থাকে ভাইজান। আমরা সীমা ছাড়ায় গেছি। আমাগো আর কোনো পাপ হইব না।’
রজ্জাক খিকখিক করে হাসতে হাসতে বলল, ‘ঠিক কইছস। তোর বুদ্ধি হইছে। দেখি ফোন দে।’
আসাদুর পকেট থেকে তার ফোন বের করে রজ্জাককে দিল। রজ্জাক সোবাহান সাহেবকে ফোন করল। ওপ্রান্তে ফোন ধরেই সোবাহান সাহেব বললেন, ‘কাজ হল?’
রজ্জাক বলল, ‘জি জনাব। গলায় ক্ষুর চালায় দিছি। আমি ওসব বন্দুক চালাইতে ভালো পারি না। আমার ক্ষুর ভালো লাগে। আমার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে আপনাকে আমি বলতে পারি, জনাব বশির আলি মইরা গেছে। আমাগো অভিযান সফল হইছে।’
সোবাহান বললেন, ‘অভিযান? এত বাংলা শিখলি কোত্থেকে তুই?’
রজ্জাক আবার খিকখিক করে হেসে উঠল, ‘জনাব, আমি সিনেমা দেখি, সিরিয়াল দেখি। আমারে কি আগের আমলের খুনি বলে মনে হয়? আমি হইলাম জেন জি খুনি। আমি সব জানি।
রিক্সাওয়ালা রিক্সা দাঁড় করিয়ে দিল। রজ্জাক বলল, ‘কী হল মিয়াঁ?’
রিক্সাওয়ালা রজ্জাকের কথা শুনতে পেয়েছিল। তাকে দেখে বোঝা যাচ্ছে সে বেশ ঘাবড়ে গেছে। রজ্জাকের প্রশ্ন শুনে বলল, ‘আমার শরীলডা খারাপ লাগতাসে। আপনেরা চইলা যান।’
রজ্জাক পকেট থেকে ছুরি বের করে হাঁটুতে রেখে বলল, ‘এখানেই মাইরা রাইখা দিমু। চুপ কইরা চালা।’
রিকশাওয়ালা ঘাবড়ে গিয়ে আবার প্যাডেল করতে শুরু করল।
সোবাহান বললেন, ‘রাস্তাঘাটে ঝামেলা করিস নাকি?’
রজ্জাক বলল, ‘জি জনাব, একটু ঝামেলা করতে ইচ্ছে করতাসে। মনে করেন দেশ তো আমাগোই হইয়া গেসে। এখন যা ইচ্ছা করা যাইব।’
সোবাহান গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘আজ আর কিছু করতে হইব না। তোরা বাসায় চইলা যা। এখন একদিনে বেশি অ্যাকশান দেখাইতে হইব না। এখনও সব আমার হাতের নাগালে আসে নাই, অনেক বেজন্মার পুত আছে, তাদের চোখে পড়িস না।’
রজ্জাক ‘জি জনাব’ বলে ফোন রাখল। রিকশাওয়ালার পিঠে একটা থাবড়ে মেরে বলল, ‘কীরে, তুই নাকি যাবি না কইছিলি, কী করবি?’
রিকশাওয়ালা রিকশা থেকে নেমে দৌড়ে পালালো।
রজ্জাক হিহি করে হেসে আসাদুরকে বলল, ‘এই আসাদুর রিকশা চালা। ঢাকা শহরের মানুষজন দেখুক সুট প্যান্ট পইরা কী কইরা রিকশা চালায়। চালা।’
আসাদুর রিকশা চালাতে শুরু করল। সত্যিই শহরের লোক হাঁ করে তাদের দেখতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় দু-জনের ছবি ভাইরাল হয়ে গেল…
* * * * *
‘আমাদের এখানে কোনোরকম সম্প্রদায়ভিত্তিক হানাহানি হয়নি। ইন্ডিয়ান মিডিয়াগুলো যেভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে, তাতে আমরা উদ্বিগ্ন হয়ে আছি। দীর্ঘদিন ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার পরে লীগের রাজনীতিই হল দেশের মধ্যে দাঙ্গা পরিস্থিতি তৈরি করা। আমরা সবরকম ভাবে এই পরিস্থিতি আটকানোর চেষ্টা করছি।’
প্রধান উপদেষ্টা প্রেস কনফারেন্স করছেন। বিবৃতি পাঠের সঙ্গে সঙ্গে একজন সাংবাদিক বলে উঠলেন, ‘কিন্তু জনাব, চট্টগ্রামে যেটা হচ্ছে…’
‘ফেক নিউজ। দেশের মধ্যে এসব গুজব ছড়িয়ে দেশের সম্প্রীতি নষ্ট করার যে চক্রান্ত চলছে, তাতে সবার আগে সাংবাদিকদের রুখে দাঁড়াতে হবে। আমরা আপনাদের উপরে ও সমানভাবে নির্ভরশীল। এমন খবর প্রচার করুন, যাতে মানুষের মন শান্ত হয়। হানাহানি কমে আসে।’
‘কিন্তু জনাব, এই যে জোর করে শিক্ষকদের পদত্যাগ করানো হচ্ছে’…
প্রধান উপদেষ্টা ওয়াকার সাহেব বললেন, ‘কিচ্ছু হচ্ছে না। খোঁজ নিয়ে দেখুন, তারা সবাই লীগের অনৈতিক কাজের সমর্থক ছিল। ছাত্রদের অন্যায়ভাবে দমিয়ে রাখতেন। ফলে এখন যে জনরোষ তৈরি হয়েছে, তা তাদের উপরে পড়বে না। এগুলো ছোটো ব্যাপার, সব বিষয় নিয়ে আমরা চিন্তা করব না। আপনারা বরং আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোটা দেখান। ডেলিগেট টিম পাকিস্তান যাচ্ছে, সেটা দেখিয়েছেন?’
‘স্যার, পাকিস্তানের সঙ্গে কি আমাদের সম্পর্ক আবার আগের মতো হবে?’
‘নিশ্চয়ই, হতেই হবে। পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের ঐতিহাসিক সম্পর্ক। পাকিস্তানকে অস্বীকার করলে দেশের ইতিহাসকে অস্বীকার করতে হয়। কীভাবে ভারত স্বাধীন হয়েছিল, পাকিস্তান তৈরি হয়েছিল, সবাই ভুলে যেতে পারে। আমরা ভুলব না।’
‘অর্থাৎ আপনারা পাকিস্তানের বন্ধু সরকার তৈরি করতে চাইছেন।’
ওয়াকার সাহেব তার বিখ্যাত হাসিটা হেসে বললেন, ‘আমরা করতে চাইছি না। আমরা পাকিস্তানের স্বভাব বন্ধু। যে অনৈতিকভাবে ইন্ডিয়া প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে আশ্রয় দিয়েছে, ঢাকা তার কড়া নিন্দা করে। ইন্ডিয়ার ভোলা উচিত না, তাদের প্রতিবেশীর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক স্থাপন করে চলা উচিত। চিকেন নেকের কথাও তাদের ভোলা উচিত না। বাংলাদেশ গরিব দেশ হতে পারে, কিন্তু তার যথেষ্ট আত্মমর্যাদা আছে। আর সেটা রক্ষা করতে আমরা সর্বদা প্রস্তুত।’
‘জনাব, ভবিষ্যতে কি আমরা পূর্ব আর পশ্চিম পাকিস্তানের পুনর্মিলন দেখতে পাব?’
‘এই ধরনের কথা বলে আপনারা আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নেন। আপনাদের মনে হয় আমরা পাকিস্তানি প্রোপাগান্ডা ছড়াতে এখানে বসে আছি?’
সাংবাদিক আমতা আমতা করতে শুরু করলেন।
ওয়াকার বললেন, ‘আমাদের এখন অনেক কাজ করার আছে। দেশের অবস্থা একবারে দেউলিয়া হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ কিনেছে ভারতের থেকে, সে বিল দেবার টাকা অবধি নেই। গাদাগাদা ইন্ডিয়ান প্রোজেক্ট করার কথা হয়েছিল, অনেক বেশি টাকায়। দেশটাকে একবারে ইন্ডিয়ার কাছে বিক্রি করে দিয়ে গেছে। আমাদের দেশ গঠন করতে দিন।’
‘কিন্তু স্যার’…
ওয়াকার সাহেব থমথমে মুখে উঠে দাঁড়ালেন, ‘আজকের মতো এনাফ। আমার কাজ আছে অনেক। সারাদিন ধরে আপনাদের সঙ্গে সময় কাটানোর মতো সময় আমার নেই।
সাংবাদিকরা আরও প্রশ্ন করতে শুরু করলেও তাদের প্রশ্নে কোনো আমল না দিয়ে ওয়াকার সাহেব বেরিয়ে গেলেন।
চেম্বারে সোবাহান সাহেব অপেক্ষা করছিলেন। ওয়াকার সাহেবকে দেখে উঠে
দাঁড়ালেন। ওয়াকার চেয়ারে বসে বললেন, ‘পুলিশ অফিসার বশিরের খুনের খবরটা পেলাম। আপনার সঙ্গে বশিরের সম্পর্ক খুব একটা ভালো ছিল না শুনলাম।’
সোবাহান সাহেব মুখে ছদ্ম দুঃখ ঝুঁকিয়ে বললেন, ‘কী বলব জনাব, আমার সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হলেও আমি তার মৃত্যু কোনোদিন চাইনি। কী করবেন? এত দুর্নীতি করেছিলেন, জনরোষ… ‘
ওয়াকার বললেন, ‘জনরোষ যে না, তা আমি জানি সোবাহান সাহেব। রজ্জাককে দেখা গেছে। যাই হোক, এসব কাজ যদি ওরা এভাবে করে, আমাকে স্টেপ নিতে হবে। আপনি সেভাবে বোঝান।
সোবাহান বললেন, ‘জি জনাব। আপনি ভাববেন না, আমি দেখে নিচ্ছি।’
ওয়াকার বললেন, ‘আর কী কী দেখছেন?’
সোবাহান বললেন, ‘সবে তো কাজ শুরু করলাম জনাব। আমাকে আরেকটু সময় দিন।’
‘ঠিক আছে। কাজের আগেই রজ্জাকরা অকাজ শুরু করল, এটাই চিন্তার, বুঝলেন?’
‘জি জনাব।’
ওয়াকার বললেন, ‘আমাদের দেশকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে সোবাহান সাহেব। প্রতিরক্ষায় আমি বাজেট বাড়াব। আপনি সেভাবেই প্ল্যান করবেন।’
সোবাহানের দু-চোখ চকচক করে উঠল, ‘জি জনাব। আপনি যেভাবে বলবেন, সেভাবেই হবে।’
৫৪
।। দিল্লি।
রাত আটটা।
আর পি অফিস থেকে ফিরছিলেন। ফোন বেজে উঠল। প্রাইভেট নম্বর। ধরলেন না
প্রথমে। ফোন আবার বাজতে শুরু করল।
এবার ধরতেই ওপ্রান্ত থেকে ভারি গলার শব্দ ভেসে এল, ‘কী ব্যাপার সাহাব, ফোন ধরছেন না কেন?’
আর পি বললেন, ‘ড্রাইভ করছি। কী চাই?’
‘কিছু চাই না। আপনি আমাদের অ্যাভয়েড করছেন। আপনার থেকে এটা এক্সপেক্টেড না।’
‘কী চাই? আমি যথেষ্ট টায়ার্ড। তাড়াতাড়ি বলে ফেলুন।’
‘বানশালের ল্যাপটপে কী ছিল জানতে ইচ্ছে করছে না স্যার?’
‘কী ছিল?’
‘আপনার সঙ্গে আমার বরাবরের ভালো সম্পর্ক। সেটাকে খারাপ করছেন কেন? আপনার বলা উচিত ছিল এর পরিবর্তে আপনি আমাকে কী দিতে পারবেন, তাই না?’
‘আমি কিছু দিতে পারব না। আমি জানিই না কিছু। আপনি আমাকে ফোন করেন, এটা বিদুর স্যার জানেন। তারপর থেকে আমি কিছুই জানি না। তাই আমাকে জোর করে লাভ নেই।’
‘স্যার আপনি আমাকে দূরের লোক মনে করেন কেন বলুন তো? আমি তো আপনাকে হেল্প করার জন্যই বসে আছি। এর বদলে মাঝে মাঝে আপনিও আমাকে দেখেন। এই তো ব্যাপার।’
‘ঠিক আছে, কী দেখতে হবে?’
‘এক কোটি টাকা স্যার। বানশালের ল্যাপটপে কী ছিল জানার জন্য। আমি জানি। টাকা পেলে আপনিও জানবেন।’
আর পি হেসে উঠলেন, ‘বাঃ, শুধু টাকা? আর কিছু না?’
‘হ্যাঁ, টাকা হলেই হবে। আর কিছু লাগবে না।
‘কীভাবে পাঠাতে হবে?’
‘ক্রিপ্টো। আজ রাত বারোটার মধ্যে টাকাটা পেলে বানশালের ল্যাপটপের সব খবর আপনার পায়ের কাছে পৌঁছে যাবে।’
‘এত গুরুত্বপূর্ণ কিছু আছে ল্যাপটপে?’
‘থাকতেই পারে। কিছু নাও থাকতে পারে। কিন্তু আপনারা কি ঝুঁকি নেবেন?’
‘এক ঘণ্টা পরে ফোন করুন। আমি কথা বলি।’
‘ওকে। তবে রাত বারোটা।’
ফোন কেটে আর পি বিদুরকে ফোন করলেন। বিদুর সবটা শুনে বললেন, ‘ফোন ধরতে হবে না। কেটে দিও। ওই টাকাটা টেরর ফান্ডিং-এই যাবে। পাকিস্তান দেউলিয়া হয়ে গেছে, আটা কেনার টাকা নেই অথচ টেররিজম চালিয়ে যাবে। এদের কোনোভাবে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না।’
আর পি বললেন, ‘কিন্তু ল্যাপটপের মধ্যে কী থাকতে পারে স্যার?’
‘বের করে নেব। এদের পাত্তা দিও না।’
‘ওকে স্যার।’
ফোন রেখে আর পি পানের গুমটিতে গিয়ে সিগারেট কিনলেন। মাথা ধরে আছে। সিগারেট ধরিয়ে টান দেওয়া শুরু করতেই আবার ফোন বাজতে শুরু করল। আর পি ফোনের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে ফোন অফ করে দিলেন। সিগারেট শেষ করে গাড়িতে গিয়ে বসলেন। আজকাল ঘুমই হয় না তার। ডাক্তার সিগারেট খেতে বারণ করেছিল। চাপ নিতে পারছেন না আজকাল। সিগারেট ছাড়া মাথায় উঠেছে।
.
বিদুর প্রায় সারাদিনই অফিসে থাকেন। রাতেও অফিসেই ঘুমিয়ে যান কতদিন।
অথচ আর পি বুঝতে পারছেন মানসিক চাপটা ইদানীং অনেকটাই বেড়ে গেছে। লন্ডনে ছেলের কাছে গিয়ে কিছুদিন থেকে আসা যায়। ভূমিকা বহুদিন কোথাও যাননি। দু-জনে মিলেই গেলেন। তাহলে হয়তো কিছুটা ভালো লাগতে পারে।
গাড়ি পার্ক করে ফোন অন করতেই আবার ফোন আসতে শুরু করল। ফোন কেটে আর পি দেখলেন মেসেজ এসেছে, ‘স্যার, আপনি ধারণা করতে পারবেন না ল্যাপটপে কী ছিল। বিদুরকে জানান।’
রীতিমতো সেলসম্যানদের মতো ঝোলাঝুলি শুরু করেছে।
আর পি কলিং বেলে চাপ দিলেন। ভূমিকা দরজা খুলে তাকে দেখে হাঁফ ছাড়লেন, ‘বাঃ, আজ এত জলদি?’
আরপি ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন, ‘চলে এলাম। ভিকির কাছে ঘুরতে যাব ভাবছি। ক-দিন খুব প্রেশার যাচ্ছে। যাবে?’
ভূমিকার মুখ ঝলমল করে উঠল, ‘বাঃ, এ তো সুখবর। যাবে তো শেষমেশ? পরে আবার পিছিয়ে যাবে না তো?’
মেসেজটোন বেজে উঠল আবার। আর পি ফোন বের করে দেখলেন তাতে লেখা, ‘কাশ্মীর রিলেটেড স্যার। আপনারা এত বড়ো ঝুঁকি নিতে পারবেন? ইন্ডিয়া বড়োলোক দেশ স্যার। টাকা নিয়ে তো আমরা চিন্তা করি। ইন্ডিয়াকেও চিন্তা করতে হয় নাকি?’
আরপি বিদুরকে স্ক্রিনশট পাঠিয়ে দিলেন। বিদুর লিখে পাঠালেন, ‘পাঁচ লাখ। ফোন ধরে বলে দিও।’
