আয়নাবাড়ি – ১

।। নতুন দিল্লি।।

ভদ্রলোকের মাথায় ধবধবে সাদা চুল। বয়স ৬০ পেরিয়েছে বলেই মনে হয়। ছোটোখাটো গড়ন। চোখ দুটো ভীষণ শার্প।

নিজের চেম্বারে বসে একটা ডায়েরিতে আঁকিবুকি কাটছেন।

নেমপ্লেটে লেখা ‘বিদুর ভরদ্বাজ। চিফ ইনফরমেশন অফিসার।’

ভদ্রলোকের চেম্বারের দরজায় আর পি একটা টোকা দিতেই ঘরের ভেতর থেকে গম্ভীর

গলায় শোনা গেল, ‘কাম ইন।’

আর পি দরজা ঠেলে চেম্বারে প্রবেশ করলেন।

বিদুর ভরদ্বাজ একবার আর পিকে দেখেই চোখ নামিয়ে আবার ডায়েরিতে মনোযোগ দিয়ে বললেন, ‘আসতে কোনো অসুবিধে হয়নি তো?’

আর পি বললেন, ‘ফ্লাইটে একটু টার্বুলেন্স ছিল স্যার। এ ছাড়া সব ঠিক আছে।’ বিদুর বললেন, ‘বসুন।’

আর পি বসলেন।

বিদুর বললেন, ‘আপনি আমার থেকে প্রায় পনেরো বছরের ছোটো। আপনাকে তুমি বললে অসুবিধে আছে?’

আর পি সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘না না স্যার। অবশ্যই বলুন।’

বিদুর বললেন, ‘ঠিক আছে। আমি বেশি ভণিতা পছন্দ করি না আর পি। সরাসরি কাজের কথাতেই যাচ্ছি। ফিল্ডে তোমার ট্র্যাক রেকর্ড খুব ভালো। কিন্তু আগের মাসেই তুমি অফিসে জানিয়েছিলে আপাতত দিল্লিতে পোস্টিং হলেই তোমার পক্ষে সুবিধাজনক হয়। আমারও এখানে একটা সেট আপ তৈরি হচ্ছে। আমি তোমার কথাই রেকমেন্ড করেছি। আমি চাই আমার একটা অফিসের দায়িত্ব তুমি নাও।’

বিদুর বললেন, ‘থ্যাঙ্ক ইউ স্যার। আমি অনেকদিন নর্থ ইস্টে ছিলাম। ছেলে লন্ডনে গেল যেদিন, সেদিনও এয়ারপোর্টে যেতে পারিনি। স্ত্রী দিল্লিতে একা আছেন। এখানে পোস্টিং হলে আমার সুবিধাই হয়।’

বিদুর বললেন, ‘এই জন্যই আমি বিয়ে করিনি। আমাদের চাকরিতে পিছুটান না থাকাই ভালো।’

আর পি কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গেলেন।

বিদুর বললেন, ‘তুমি যেটা বলতে চাইছ আমাকে বলতে পারো। আমাদের যে ধরনের কাজ, তাতে কোনো ফিল্টার থাকলে হবে না। বল।’

আর পি বললেন, ‘স্যার আমি শুনেছিলাম আপনি পাকিস্তানে থাকাকালীন বিয়ে করেছিলেন। একটা সংসারও ছিল।’

বিদুর মাথা নাড়লেন, ‘ছিল। খোঁজ নিয়ে দেখেছি চলে আসার পর সে মহিলা বিয়ে করে নিয়েছেন। তাই পিছুটান নেই।’

আর পি বললেন, ‘তাতেও পিছুটান থাকে স্যার।’

বিদুর বললেন, ‘তা থাকে। যাই হোক, তোমার কাজটা সম্পর্কে একটা ব্রিফিং দি। তুমি একটা অফিস পাবে। তিনজন স্টাফ পাবে। তাদের কাজ হবে সারভেইলেন্স করা।’

আরপি বললেন, ‘কারো সিসিটিভি ক্যামেরায়?’

বিদুর বললেন, ‘না। মোবাইলে। আমাদের সন্দেহভাজনদের মধ্যে কে কী চ্যাট করছে, কোথায় কী মেইল করছে, সেই ডেটা থেকে থ্রেট অ্যানালিসিস করে তুমি আমাকে রিপোর্ট করবে। তোমার মতো আরও দশটা টিম আছে আমার। তুমি নর্থ ইস্টে ছিলে, তোমার টেরিটরি নর্থ ইস্টই হবে। আবার আমার যখন মনে হবে, তোমাকে অন্য টেরিটরির দায়িত্বও দেবো। ইন্টারেস্টিং লাগছে?’

আর পি ঈষৎ বিস্মিত কণ্ঠে বললেন, ‘কী চ্যাট করেছে জানব কী করে স্যার?’ বিদুর বললেন, ‘তার ব্যবস্থা আমি করে দেবো। তোমাদের কাজ হবে সুপারভিশন করা।’

‘কিন্তু স্যার… এখানে প্রাইভেসি ব্রিচ হবে না?’

‘সবার অ্যাক্সেস পাবে না। শুধুমাত্র টার্গেটের অ্যাক্সেস পাবে। ন্যাশনাল সিকিউরিটির প্রশ্নে প্রাইভেসি ব্রিচ ইত্যাদির কোনো জায়গা নেই আর পি। আমরা একটা আগ্নেয়গিরির উপর দাঁড়িয়ে আছি। দাঙ্গার থ্রেট থেকে শুরু করে দেশভাগের থ্রেট, সব কিছু নিয়ে আমাদের বেঁচে থাকতে হয়। তাই না?’

আর পি মাথা নাড়লেন, ‘রাইট স্যার।’

তুমি এখনই জয়েন করে যাও। আমার হাতে সময় নেই। চা খাও। খেয়ে অফিসটা দেখে নাও। স্টাফেদের সঙ্গে কথা বলে নাও। ওদের বয়স কম। মেন্টর তুমিই। তিনজনের মধ্যে একজনকে আবার যেকোনো সময় ফিল্ডে যেতে হয়। আপাতত দু-জনকে দিয়ে কাজ চালাতে হবে।’

‘চব্বিশ ঘণ্টাই অফিস চালাতে হবে?’

‘হ্যাঁ চব্বিশ ঘণ্টা। তুমি দশটা ছ’টা ডিউটি করবে। তিনটে শিফট চালাবে ওদের দিয়ে। সকালে আগের দিনের রিপোর্টের ব্রিফ করে আমাকে সাবমিট করবে।’

‘তিনজনের মধ্যে একজন না থাকলে বাকি দু-জনকে ডাবল শিফট করতে হতে পারে স্যার।’

‘ওরা করবে। সেসব নিয়ে চিন্তা কোরো না। আর কিছু?’

আর পি বললেন, ‘না স্যার। কাজটা শুরু হোক। তারপর যা যা চ্যালেঞ্জ আসবে, আপনাকে জানাবো।’

‘গুড। শুরু করো।’

বিদুর চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে দিলেন করমর্দনের জন্য।

॥ ঢাকা।।

সোমনাথ দু-দিন কলেজ যাননি। সারাদিন ঘরে বসে টিভি দেখে গেছেন।

দেশের অবস্থা ভয়াবহ ক-দিন ধরেই ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। বীথি মাঝেমাঝেই ড্রইং রুমে এসে সোমনাথকে দেখে কথা ঘুরোনোর চেষ্টা করছেন, ‘তুমি এইসব ছেড়ে একটু শুয়ে থাকো না! এভাবে টিভির সামনে বসে থেকে কি কিছু হয়?’

সোমনাথ যেন শুনতে পান না। মাথা ঘুরিয়ে বীথিকে দেখার প্রয়োজনটুকুও বোধ করেন না। টিভিতে বলে যাচ্ছে, ‘প্রধানমন্ত্রীর দেশ ছাড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে, যদিও কদিন ধরে অনেক গুজবই আমাদের কাছে এসেছে, কিন্তু এটা গুজব নয়, সুধী দর্শকমণ্ডলী, আপনাদের জানিয়ে রাখি, এটা একবারেই গুজব নয়। প্রধানমন্ত্রী দেশ ছেড়েছেন। সম্ভবত তিনি লন্ডনের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন। অন্য কোথাও যেতে পারেন, আমরা এখনই জানি না…’

বাইরে থেকে বাজি ফাটার শব্দ আসছে। সোমনাথ উঠলেন, জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন, সেভেন্থ ফ্লোরে থাকেন তারা, জানলা থেকে দেখা যাচ্ছে জনগণ উন্মাদ হয়ে গেছে। হাসছে, কাঁদছে, লাফাচ্ছে আনন্দে।

সোমনাথ ঘরে ঢুকে টিভি বন্ধ করে ডাইনিং টেবিলে বসে বললেন, ‘ভাত দাও।’ বীথি অবাক হলেন, ‘হয়ে গেল তোমার? টিভি বন্ধ করে দিলে?’

সোমনাথ বললেন, ‘হ্যাঁ। আর দেখব না।’

বীথি বললেন, ‘সব ঠিক আছে তো?’

সোমনাথ বীথির কথার উত্তর না দিয়ে বললেন, ‘ভাত দাও। খেয়ে ঘুমোবো।’

বীথি রান্নাঘরে চলে গেলেন। কলিং বেল বাজল। সোমনাথ উঠে দরজা খুললেন। পারভেজ আলম। তাদের পাশের ফ্ল্যাট। হাসিমুখে বলল, ‘সবাই নীচে নামছে দাদা, চলুন, একটা এত বড়ো বিজয় দিবস, আপনি যাবেন না?’

সোমনাথ বললেন, ‘মাথাটা খুব ধরেছে রে ভাই, আপনি যান, আমি সন্ধ্যেবেলায় বেরোবো।’

পারভেজ বলল, ‘আরে চলেন। আমি আপনাকে মাথা ব্যথার ওষুধ দিয়ে দেবো। চলেন তো।’

সোমনাথ বাইরে থেকেই গলা তুললেন, ‘বেরোচ্ছি। এসে খাচ্ছি।’

লিফটের সামনে সবাই ভিড় করেছে। সোমনাথকে দেখামাত্র আসাদুর ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলেন, ‘স্বৈরাচারের পতন হয়েছে দাদা। আপনি যেভাবে শুরু থেকে এর বিরুদ্ধে গলা তুলেছিলেন, আপনার জন্য আমরা গর্বিত। চলেন, চলেন। নীচে একটা গেট টুগেদার মতো করা হচ্ছে, একটু কিছু বলবেন আপনি।’

সোমনাথ বললেন, ‘আমি তো সন্ধ্যেয় নামব ভাবলাম, এই পারভেজ জোর করে নিয়ে এল আমায়। চলো তবে।’

লিফট এসে গেছিল। সবাই মিলে হইহই করতে করতে নীচে নামা হল। ফ্ল্যাটের কম বয়সীরা আনন্দে লাফালাফি জুড়েছে। পারভেজ চিৎকার করে বলল, ‘আজ অকাল ঈদ। আজ কারো বাড়িতে রান্না করতে হবে না। সবাই কমিউনিটি হলে আসবেন, ওখানেই আমরা খাওয়া-দাওয়া করব।’

রাস্তায় মানুষের ঢল নেমেছে। মিছিল হচ্ছে। আবাসনের বাইরের গেট বন্ধ করা হয়েছে। আবাসনের জমায়েত আবাসনের ভেতরেই হয়েছে। উৎসাহী জনতা আবাসনের গেট ধরেও ঝাঁকিয়ে যাচ্ছে।

মিছিল থেকে হঠাৎই পর পর ঢিল এসে পড়তে শুরু করল। সেকেন্ডের মধ্যে সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে বিল্ডিং-এর ভেতর ঢুকে পড়ল। সোমনাথের মাথায় একটা ছোটো ঢিল এসে পড়েছে। মাথায় হাত দিয়ে দেখলেন হাতে রক্ত লেগে গেছে।

সোমনাথকে টেনে নিয়ে গিয়ে বিল্ডিং-এর ভেতরের চেয়ারে বসালো পারভেজ, ‘শয়তানগুলো ইবলিশগুলোও বেরিয়েছে বুঝলেন না? এখন এসবই চলবে।’ রুমাল বের করে সোমনাথের মাথায় চেপে ধরল সে। কমিউনিটির ফার্স্ট এইড বক্স এনে মলম লাগানো হল।

সোমনাথের যন্ত্রণা হচ্ছিল। তিনি কোনোমতে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আমি ফ্ল্যাটে ফিরছি। পরে আসব।’

পারভেজ বলল, ‘আমি নিয়ে যাচ্ছি, চলেন।’

সোমনাথকে ধরে লিফটে তুলল পারভেজ। অনুতপ্ত কণ্ঠে বলল, ‘আমার জন্যই হল দাদা। আমি এক্সট্রিমলি সরি।’

সোমনাথ হাসার চেষ্টা করলেন, ‘সরি বলার কিছু নেই ভাই। দেশ স্বাধীন হলে কিছু কিছু কোল্যাটেরাল ড্যামেজ হবেই। এসব নিয়ে ভাবার দরকার নেই।’

ফ্ল্যাটে পৌঁছে দিয়ে গেল পারভেজ। বীথি সোমনাথকে দেখে আঁতকে উঠলেন, ‘এর মধ্যে এসব হল?’ সোমনাথ বললেন, ‘চিন্তার কিছু নেই। ঠিক হয়ে যাবে।’

পারভেজ বলল, ‘ভাবি, আমি দেখছি ডাক্তারবাবু ঘরে আছেন নাকি, থাকলে একবার দাদাকে দেখিয়ে নেবো।’

সোমনাথ বললেন, ‘না না, ব্যস্ত হবার মতো কিছু হয়নি। এসব নিয়ে ভেব না। তুমি যাও, আমার দরকার হলে ডেকে নেব।’

পারভেজ ঘাড় নেড়ে বেরিয়ে গেল।

বীথি দরজা বন্ধ করে এসে বললেন, ‘আমাকে তনয়া ফোন করেছিল।’

সোমনাথের বোন তনয়া। নিউ জার্সিতে থাকেন। সোমনাথ বললেন, ‘কী বলছে?’

বীথি বললেন, ‘বলছে আমাদের জন্য দেশটা এখন নিরাপদ না।’

সোমনাথ বললেন, ‘দূর থেকে এ-রকম অনেক কিছু মনে হয়। ওকে চিন্তা করতে বারণ করে দিও।’

বীথি বললেন, ‘তা বলেছি। কিন্তু ওদের ওখানে নাকি আলোচনা চলছে, এখানে যা হয়েছে, সব পাকিস্তান করিয়েছে। পাকিস্তানপন্থীরাই নাকি ক্ষমতায় আসার প্ল্যান করে সব কিছু করেছে।

সোমনাথ এই যন্ত্রণার মধ্যেও হেসে ফেললেন, ‘দূরে থেকে বুকনি না মেরে দেশে দু- দিন ঘুরে যেতে বলো। যত বাজে কথা। একটা স্বৈরাচার চলছিল এদেশে। আয়নাঘরের নাম শোনেনি ওরা? কতজনকে ঢুকিয়ে রেখে দিয়েছিল ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী, ওরা জানে না? জানলে আজ একথা বলত না। ঠিক আছে, তোমার তর্কে যাবার দরকার নেই। তুমি এসব নিয়ে কিছু বোলো না। শুনে যাও।’

নীচ থেকে প্রবল শব্দ ভেসে এল। বোম পড়ল একটা। বীথি বললেন, ‘বোম মারছে? কী গো?’

সোমনাথ বললেন, ‘ভয়ের কিছু নেই। চিন্তা করো না। আনন্দ করছে, করতে দাও। দু-দিন পর সব ঠিক হয়ে যাবে। আমায় খেতে দাও। খিদে পেয়েছে।’

বীথি আর কথা বাড়ালেন না। টিভি চালিয়ে দিলেন।

টিভিতে দেখাচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর আবাস ভাঙচুর শুরু হয়েছে। লুঠ চলছে। সোমনাথের ফোন বাজছিল। উঠে ফোন ধরলেন তিনি। প্রিন্সিপাল ফোন করছেন, ‘সোমনাথ, ঠিক আছেন তো?’

‘হ্যাঁ স্যার। ঠিক আছি। ফ্ল্যাটেই তো আছি। ঠিক না থাকার কিছু নেই। আপনার সব ঠিক আছে?’

‘হ্যাঁ, ঠিক আছে। আমরা কাল কলেজ খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

‘গুড ডিসিশান স্যার। কলেজ খোলা দরকার। স্কুল-কলেজ এভাবে দিনের পর দিন বন্ধ হয়ে থাকতে পারে না। দেশের মেধাবীরাই দেশকে নতুন করে স্বাধীন করেছে, এই সময়ে দাঁড়িয়ে দেশ গড়তে তাদের আরও বেশি করে শিক্ষিত করে তোলাই আমাদের কাজ।’

‘নিশ্চয়ই। সে-দিকেই সব কিছু হবে। তবে সেক্রেটারি সাহেবের সঙ্গে একটু আগে কথা হল। তিনি জানালেন আপনার নিরাপত্তার স্বার্থেই, মানে… বুঝতে পারছেন তো কী বলছি… মানে আপনার নিরাপত্তার স্বার্থে আপনি দিন সাতেক পেইড হলিডেতে থাকুন।’

সোমনাথ অবাক হয়ে বললেন, ‘আমার নিরাপত্তার স্বার্থে মানে? আমি তো এই সরকারের পতন চেয়েছিলাম। ফেসবুকে এই বিষয়ক পোস্টও দিয়েছি আমি, তার জন্য লিগের লোকেরা আমাকে হুমকিও দিয়েছিল। আমার ভয় পাওয়ার কোনো কারণ তো নেই। আমার মনে হচ্ছে আপনার কোনো ভুল হচ্ছে স্যার।’

‘কোনো ভুল হয়নি। দেখুন সোমনাথ স্যার, এটা একটা অরাজকতার সময়। এই সময় কী হয় জানেন তো? চোর, ডাকাত, বাটপার সব রাস্তায় থাকে, যেখানে যা খুশি করে বেড়ায়। আপনার নিরাপত্তার জন্যই কিন্তু আমরা কথাটা বলেছি।’

সোমনাথ বললেন, ‘ঠিক আছে। এই দেশটা তো আমারও। আমি এসব নিয়ে ভাবছি না। আর সবার মতো আমিও খুশি। আমি কাল যাব। অবশ্যই যাব। আপনারা আমাকে নিয়ে ভেবেছেন দেখে আমি খুশি হয়েছি স্যার। যে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে আমরা চাকরি করি, সেখানে অন্য কিছু হবে বলে আমি বিশ্বাস করি না। আমার ছাত্ররা আমার জীবন। আমি ওদের সঙ্গে ছিলাম, আছি, থাকব।’

কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে প্রিন্সিপাল বললেন, ‘ঠিক আছে। আপনাকে আমি আটকাব না। কিন্তু আরেকবার ভেবে দেখতে পারেন। আজ বঙ্গবন্ধুর মূর্তি ভাঙা চলছে চারদিকে। আরও কত কী হবে কেউ কিছু বুঝছি না।’

সোমনাথ বললেন, ‘দেখছি, কী করা যায়। আপনার খবর কী স্যার? নিপুণের কোনো খবর পেলেন?’

প্রিন্সিপালের গলাটা কেঁপে উঠল, ‘না। আমি এখনও অন্ধকারে। আপনাকে ফোন করলে…’

সোমনাথ বললেন, ‘আমি সঙ্গে সঙ্গে আপনাকে জানাব।’

প্রিন্সিপাল কিছু না বলেই ফোন রেখে দিলেন। সোমনাথ বুঝলেন ভদ্রলোককে এখন একা ছেড়ে দিতে হবে।

॥ নতুন দিল্লি

‘আমরা যার উপর সারভেইলেন্স অ্যাপ্রুভালের জন্য মিটিং করছি, তার নাম পি বি বানশাল। তোমরা কেউ পিবি বানশালকে চেনো? কিংবা নাম শুনেছ?’

বিদুর প্রশ্নটা করে বাকি দু-জনের দিকে তাকালেন।

মিটিং রুমে শুধু চিফ এবং তুষার রঙ্গনাথন বসে আছেন।

আপাতত ঠিক করা হয়েছে, সারভেইলেন্স অ্যাপ্রুভাল কমিটিতে এই দু-জন থাকবেন। কোনো ভারতীয় নাগরিকের ফোনে এবং ব্যক্তিগত জীবনের নজরদারির জন্য এই দু- জনেরই সিলমোহর জরুরি। একজন বারণ করলে নজরদারি করা যাবে না।

চিফ বললেন, ‘পিবি বানশাল এক কালে বেশ নাম করেছিল। তারপর দেউলিয়া হয়ে গেছিল কোনো একটা স্ক্যামে। আমার এর বেশি কিছু মনে নেই।’

তুষার বললেন, ‘হ্যাঁ, তবে বানশাল এখন একটা স্টার্ট আপ খুলেছে। ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। মিডল ইস্টে ওর যাতায়াত আছে।’

বিদুর বললেন, ‘ঠিক। একদম ঠিক। সম্প্রতি বানশাল আমন খানের সঙ্গে বাকুতে দেখা করেছিল। আমার কাছে তার প্রমাণ আছে।’

বিদুর আই এস আই চিফ আমন খানের সঙ্গে বানশালের ছবি দেখালেন।

তুষার অবাক হয়ে বেশ কিছুক্ষণ স্ক্রিনটা দেখে বললেন, ‘বাকুতে এখন কে আছে? ছবিটা পেলে কী করে বিদুর?’

বিদুর বললেন, ‘ফ্রি এজেন্ট। আমাদের কেউ না। ডার্ক ওয়েবে পঁচিশ হাজারে কিনেছি। এ আই চেক হয়েছে। ছবিটা জেনুইন।’

চিফ বললেন, ‘অ্যাপ্রুভাল গ্র্যান্টেড। এখানে আর কোনো প্রশ্ন নেই।’

তুষার হেসে ফেললেন, ‘বিদুর যদি কাউকে সন্দেহ করে, তাহলে আমাদের সেখানে আর কীই-বা বলার আছে। এই নিয়ে আর আমারও আর কিছু বলার নেই।

বিদুর বললেন, ‘না, এসব বললে হবে না। একটা লোকের প্রাইভেসিতে ঢুকব, তোমরা কনফার্ম হয়ে নাও।’

তুষার বললেন, ‘আমন খানের সঙ্গে দেখা করা মানে ডিল হয়েছে। এই নিয়ে কোনো দ্বিধা নেই। বানশাল এখন কোথায় আছে?’

বিদুর বললেন, ‘দিল্লিতেই আছে। ওর বাড়ি, ফ্ল্যাট, সেট আপ সব এখানেই। মাঝেসাঝে মুম্বই যায়। আর বছরের অনেকটা সময় মিডল ইস্টে থাকে।’

চিফ উঠে দাঁড়ালেন, ‘আমি অ্যাপ্রুভাল দিয়ে দিচ্ছি। তুষারও দিয়ে দেবে। ছেড়ে রাখা যাবে না। কাজ শুরু করে দাও। বানশাল সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া শুরু করো। আমি জানি তোমার সব কাজ হয়ে গেছে। তাও বলছি।’

তুষার বললেন, ‘বহুদিন সমুদ্র শান্ত আছে। আমার এত শান্ত সমুদ্র দেখলে ভয়ই লাগে। গো অ্যাহেড বিদুর।’

‘থ্যাঙ্ক ইউ জেন্টলমেন।’

সেমিনার রুম থেকে বেরিয়ে বিদুর নিজের চেম্বারে এসে আর পি-কে ফোন করলেন, ‘এসো।’

আর পি অপেক্ষা করছিলেন।

দরজায় টোকা দিয়ে চেম্বারে প্রবেশ করলেন। বিদুর ইশারায় আরপি-কে বসতে বলে বললেন, ‘বানশালকে দিয়ে শুরু করো। ফাইল তোমাকে পাঠিয়ে দিয়েছি। পুরোটা স্টাডি করে অপারেশন শুরু করো, কোনো অ্যালার্ট সিস্টেম না। আমার কমপ্লিট হিউম্যান সুপারভিশন চাই ওর উপরে, এর পরের পার্টটা আমি ঠিক করব কী করতে হবে।’

আর পি বললেন, ‘ওকে স্যার।’

বিদুর বললেন, ‘ওয়াইফ খুশি তো এখন?’

আর পি বললেন, ‘হ্যাঁ, ওই আর কী! একা থাকতে থাকতে ডিপ্রেশনে চলে গেছিল। কাউন্সেলিং চলছে।’

বিদুর বললেন, ‘দেখে রেখো। মাঝেমাঝে বাড়িতেও ফোন কোরো। ওপারের বন্ধুরা ফোন করে না এখন তোমায়? কিংবা ফ্রিল্যান্সাররা?’

আর পি বললেন, ‘কিছুদিন বন্ধ আছে। আবার কখন কবে তাদের কোন খেয়াল চাপে দেখা যাক।’

বিদুর হাসলেন, ‘তা ঠিক।

আর পি একটু ইতস্তত করে বললেন, ‘স্যার, ছেলে-মেয়েগুলো খুবই ভালো, কিন্তু এই কাজের জন্য ওরা কি…’

বিদুর বললেন, ‘হ্যাঁ, ওরা বিশ্বাসযোগ্য। প্রত্যেককে আমি নিজের হাতে বেছে নিয়েছি। ওদের নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। তুমি তোমার কাজ শুরু করে। আমি কিন্তু মাঝেমাঝেই তোমার অফিসে সারপ্রাইজ ভিজিটে যাব। কোনো শিফট যেন ফাঁকা না থাকে।’

আর পি বললেন, ‘শিওর স্যার। ইউ আর অলওয়েজ ওয়েলকাম।’

॥ ঢাকা।।

রুমান একটা শাড়ি নিয়ে এসেছে। রাখি ক্যান্টিনে বসেছিল। ক্যান্টিন চলছে না। ক্যান্টিনে রান্না নেই। কিন্তু চেয়ার-টেবিলগুলো আছে। রাখি, ফারজানার সঙ্গে বসে গল্প করছিল। আজ তাদের মুক্তির দিন। আরেকটা স্বাধীনতা দিবস। এমন দিনে প্রাণ খুলে হাসা যায়। গল্প করা যায়।

রুমান শাড়ি এনে রাখির সামনে রাখল, ‘এই নাও বন্ধু, দেখো তোমার জন্য কী স্মারক নিয়ে এসেছি।’

রাখি শাড়িটা দেখামাত্র চোখ ওলটালো, ‘মাই গড, এটা কোত্থেকে আনলি?’

রুমান চোখ ছোটো ছোটো করে তার বিখ্যাত রহস্যময় হাসি হেসে বলল, ‘গেস কর।’ রাখি চোখ ওলটালো, ওঁর শাড়ি?’

রুমান হো-হো করে হেসে উঠে বলল, ‘ইয়েস, ইয়েস বন্ধু। ওঁর শাড়ি। দ্য গ্রেট ডিক্টেটরের শাড়ি।’

ফারজানা শাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, ‘এটা ইন্ডিয়ান শাড়ি মনে হচ্ছে। আমার আব্বু আম্মু ভেলোর গেছিল। ফেরার সময় কাঞ্জিভরম নিয়ে এসেছিল আম্মু। এটা ওইরকম। অনেক দাম। অ…নে…এ…ক।’

ফারজানা চোখ বড়ো বড়ো করে অনেক বলল।

রাখি বলল, ‘এটা এ-রকম না বলে নিয়ে আসলি?’

রুমান বলল, ‘ইয়েস। না বলে নিয়ে এসেছি। কাকে জিজ্ঞেস করব? আমি তো কম এনেছি, সবাই যে কত কিছু এনেছে তোদের বলে শেষ করতে পারব না।’

রাখি ঠোঁট ওলটালো, ‘কিন্তু এটা আমি নিতে পারব না। এটা দিয়ে আয়। এটা রাষ্ট্রের সম্পত্তি। আমি নিতে পারি না।’

রুমান ফুৎকারে উড়িয়ে দিল রাখির কথা, ‘এটা স্মারক। ভালো করে, যত্ন করে সাজিয়ে রাখবি। আজ আমাদের স্বাধীনতার দিন। আজ এসব নিয়ে ভাববি না। জাকিরের রক্তের বিনিময়ে এই স্বাধীনতা। এই রাষ্ট্রের সব কিছু এখন ছাত্রদের। আমরা শক্তি আমরা বল, আমরা ছাত্রদল। আমরা যা বলব, তাই হবে। কাল থেকে আমরা রাস্তায় নামব। দেশ পালটাব। দেশের দুর্নীতি দূর করব। সব কিছু আবার নতুন করে হবে।’

রাশেদদের গ্রুপ ক্যান্টিনের বাইরে হইহই করছে। রুমান রাখিকে বলল, ‘শাড়িটা ব্যাগে ঢোকা। ওরা এলে এটা কেড়ে নিতে পারে।’

ফারজানাও বলল, ‘হ্যাঁ, ব্যাগে ঢোকা।’

রাখি শান্তিনিকেতনি ব্যাগ নিয়ে কলেজে আসে। ব্যাগে ঢোকাতে সমস্যা হল না।

রুমান দেখে আশ্বস্ত হল।

রাখি বলল, ‘আমরা এবার বেরোই। আর দেরি করব না। বাসায় চিন্তা করবে।’

রুমান বলল, ‘আমি দিয়ে আসব। একা একা বেরোস না। লোকজন পাগল হয়ে গেছে। আনন্দের চোটে কী করছে বোঝা যাচ্ছে না।’

ফারজানা বলল, ‘রুমানভাই ঠিক বলেছে। কেউ একজন থাকুক। আমরা একা গেলে সমস্যা আছে।’

রাশেদরা ক্যান্টিনে ঢুকেছে। চেয়ার টেনে বসে রাশেদ চিৎকার করল, ‘কীরে রুমান, তুই কোই ছিলি? তোকে একবার মনে হয় আমি দেখলাম, তারপরই আর তোকে চোখে পড়েনি।’

রুমান বলল, ‘এই তো এখানেই চলে এসেছিলাম। ওদের বাসায় দিয়ে আসি।’

রাশেদ বলল, ‘কেন ওরা কি পিচ্চি খুকি? বাসায় একা একা যেতে পারবে না?’

রুমান হাসল, ‘পিচ্চিই তো। তোরা কোই যাবি এখন? এখানেই থাকবি তো? আমি ওদের দিয়ে এসে তোদের সঙ্গে জয়েন দিচ্ছি।’

রাশেদ উঠে এগিয়ে এল, রাখির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কীরে, তোরা একা একা ফিরতে পারবি না? কী সমস্যা হবে যদি তোরা নিজেরাই ফিরিস?’

রাখি আমতা আমতা করে বলল, ‘কোনো সমস্যা নেই। আমরা চলে যাচ্ছি। রুমান, তুই ওদের সঙ্গে থাক।’

রুমান রেগে গেল, ‘কেন? ওদের সঙ্গে থাকব কেন? আমার যেখানে ইচ্ছে হবে, আমি সেখানে যাব, চল আমার সঙ্গে, দেখি কে আটকায় আমায়।’

রাখির হাত ধরে একপ্রকার জোর করেই ওকে আর ফারজানাকে নিয়ে ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে গেল রুমান।

রাশেদ বাধা দিল না। রুমান বেরিয়ে যাবার পর আবার নিজের চেয়ারে ফিরে গিয়ে বসে বলল, ‘রাতে রুমানকে কমনরুমে ডাকিস, আজ একটা হিসেব করার আছে। অনেকের ডানা দেখা যাচ্ছে, সব ডানা কাটার সময় এসেছে এবার।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *