৪৫
।। দিল্লি।
দীপ্তি সন্ধ্যে সাতটায় ছুটি পেল। ভেবেছিল আরও রাত হবে। সাতটার সময় হঠাৎই বিদুর বললেন, ‘তুমি বেরিয়ে যাও। আর রাত করতে হবে না। আমার গাড়ি নিয়ে যাও।’
দীপ্তি খুশিই হল। ভেবেছিল রাত হলে সুহাসকে আসতে বলবে। মেসেজ করে ওকে সরাসরি কনট প্লেসে যেতে বলল। পিজা খেতে ইচ্ছে করছে। কিছু উইন্ডো শপিং করা যেতে পারে সুহাসের হাত ধরে।
বিদুর স্যারের গাড়িতে উঠতেই ড্রাইভার বলল, ‘আপনাকে সিলভার টাওয়ারে নিয়ে যেতে বলেছেন স্যার।’
দীপ্তি অবাক হল। বিদুর তাকে কিছু বলেননি তো। অবশ্য উনি এ-রকমই। আগে থেকে কিছুই বলেন না। তাও ফোন করে নিল সে। ফোন ধরেই বিদুর শুধু ‘যা বলছে শোনো’ বলে ফোন কেটে দিলেন। সে শ্বাস ছেড়ে সুহাসকে মেসেজ করল, ‘এসো না, কাজ পড়ে গেছে।’
সুহাস শুধু একটা ‘?’ দিল। সে বলল, ‘পরে বলব।’
সুহাসকে কিছু বলা যাবে না। এদিকে সুহাস সন্দেহ করছে। সেদিন হোটেলে জোর করে পাঠালেন বিদুর। সুহাস তাকে ল্যাপটপ বের করতে দেখে অবাক হয়েছিল, ‘আবার এখানে কাজ নাকি?’
সে মুখ কাঁচুমাচু করে বলেছিল, ‘পাঁচ মিনিট।’
আর পির সঙ্গে কাজ করার সময় এত রহস্য ছিল না। সে অনেকটা একই ধরনের কাজে অভ্যস্ত হয়ে গেছিল। বিদুরের কাছে কাজের ধরনটা পুরোটাই আলাদা। বিদুর কখনো আগে থেকে কোনো কাজ ঠিক করে বলে রাখেন না। কাজগুলো হঠাৎ করে করতে বলেন। ‘এখানে চলে যাও’, ‘সেখানে চলে যাও।’
সুহাসকে নিয়ে যাবার ব্যাপারে অবধি একদিন নির্দেশ দিয়ে দিলেন। দীপ্তি প্রথম দিকে রাগ-টাগ করত। এখন সে জায়গাটাও নেই। গাদাগাদা কাজের ফাঁকে নির্দেশ মেনে চলতে চলতে সে যেন একটা রোবট হয়ে গেছে।
সিলভার টাওয়ারে বানশালের একটা ফ্ল্যাট আছে। সেখানে কী করতে হবে তাও সে জানে না। গাড়িতে এসি চলছে। ঠান্ডার মধ্যে সিটে হেলান দিয়ে বসে রইল। যা হবে দেখা যাবে। বেশি কিছু ভেবে লাভ নেই।
ড্রাইভার তাকে গেটের সামনে নামিয়ে দিতেই দেখল প্রশান্ত দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখে এগিয়ে এল, ‘তোকে কোনো ব্রিফ দিয়েছে?’
দীপ্তি বলল, ‘না। কী করতে হবে?’
প্রশান্ত বলল, ‘বানশাল ফ্ল্যাটের চাবি দিয়েছে। দরজা খুলেই একটা ল্যাপটপের ব্যাগ পাওয়া যাবে সোফার উপরে। ওটা নিয়ে আসতে হবে। তুই এই আই ডিটা নে। নাম-ধাম এন্ট্রি করে যা। আমি দাঁড়িয়ে আছি। ব্যাগটা নিয়ে আয়।’
দীপ্তি ঘাবড়ে গেল, ‘আমি একা যাব?’
প্রশান্ত বলল, ‘হ্যাঁ। আমি যাব না। আমার কোনো এন্ট্রি পাশ নেই। একটা মেয়ের আই কার্ড পেয়েছি শুধু। এই নে। টাওয়ার সেভেন, ফ্ল্যাট নাইন ও ওয়ান।’
পকেট থেকে কার্ড বের করে দিল প্রশান্ত।
দীপ্তির এবার রাগ হচ্ছিল। সে কার্ড নিয়ে গেটে এন্ট্রি করল। সিকিউরুটি আই কার্ড চক করে ছেড়ে দিল।
সে সাত নম্বর টাওয়ারের লিফটে উঠে নয় নম্বর টিপল। লিফট ন নম্বরে দাঁড়াতে সে ন শো একের সামনে গিয়েই থমকে দাঁড়াল। ফ্ল্যাটের ভেতর থেকে টিভির শব্দ আসছে।
দীপ্তি প্রশান্তকে ফোন করল। প্রশান্ত বলল, ‘কী হয়েছে?’
‘ফ্ল্যাটের ভেতর থেকে টিভির শব্দ আসছে।’
‘শিট। চলে আয়। কিছু করতে হবে না।’
দীপ্তির ফোন রেখে লিফটের দিকে রওনা হতে গিয়েও দাঁড়িয়ে গেল। কলিং বেলে টিপবে? দেখবে কে আছে?
তাকে খানিকটা চমকে দিয়েই দরজা খুলে দিল। এক যুবক ফ্ল্যাট থেকে ব্যাগ হাতে বেরোল। দীপ্তি লিফটের দিকে হাঁটতে শুরু করল। লোকটা তার পিছনে। দীপ্তি কিছুতেই মনে করতে পারছিল না লোকটাকে কোথায় দেখেছে। লোকটা বেশ প্রশান্ত মনে ফাঁকা লিফটে উঠল। দীপ্তিকে দেখে হাসল। লিফট নামতে শুরু করল। দীপ্তি চোখ বন্ধ করে মনে করার প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগল। নাহ। মাথাটা কেমন ফাঁকা হয়ে গেছে। কিছুই মনে পড়ল না।
হঠাৎ লোকটা বলে উঠল, ‘আপনি কখনো ট্রেন মিস করেছেন ম্যাডাম?’
দীপ্তি অবাক হয়ে কিছু বুঝে ওঠার আগেই লোকটা পকেট থেকে একটা বোতল বের করে তার নাকে স্প্রে করল।
জ্ঞান হারানোর আগে দীপ্তি শুনল লোকটা হাসতে হাসতে বলছে, ‘এ কাদের ধরে নিয়ে কাজ দিচ্ছে এজেন্সি!’
৪৬
॥ ঢাকা।।
রাত আটটা।
মুস্তাকিন তার বাড়িতে স্টাডি রুমে বসে আছেন। টিভি চলছে। টিভির দিকে তার মন নেই। ওয়াকার সাহেব তাকে একটা প্রোজেক্ট প্ল্যান বানাতে বলেছেন।
তার সময়ের চিফ ইঞ্জিনিয়ার হাসানকে ডেকেছেন। প্রোজেক্ট হাসান বানিয়ে দেবে। দু-তিন দিনের মধ্যেই যা করার করতে হবে।
বেশ কয়েকবার অন্য নাম্বার থেকে ফোন এসেছে। ফোন না ধরায় মেসেজ আসা শুরু করেছে, মেসেজগুলো এ-রকম-
‘মুস্তাকিন সাহেব, আপনি খুব ভালো করে জানেন পাকিস্তানের আর্থিক অবস্থা কীরকম। পশ্চিমী দেশগুলো পাকিস্তানকে ভারতের বিরুদ্ধে লড়িয়ে দেবার চেষ্টা করছে এখন। আশা করি আপনি জানেন তাদের কোনো নিশ্চয়তা নেই। যেই মুহূর্তে পাকিস্তানের পাশ থেকে তারা সরে যাবে, পাকিস্তান আপনার পাশ থেকে সরে যাবে। আপনার একজন শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে আপনাকে অনুরোধ করছি আমাদের সাহায্য করুন। আপনিই বলুন কী চাইছেন।’
‘আমাদের ফোন করুন জনাব। না করলে ক্ষতিটা আপনারই। মেসেজগুলো ডিলিট করে দেবেন।’
মুস্তাকিনের কপালে ঘাম জমছে। তিনি জানেন ওরা ভুল কিছু বলছে না। পাকিস্তানের তুলনায় এদের ইন্টেলিজেন্স অনেক বেশি শক্তিশালী। এরা এই মুহূর্তে একটু নড়বড়োে হয়ে থাকলেও যেকোনো সময় ঘুরে দাঁড়াবে। বড়ো আপাও যেকোনো সময় ক্ষমতায় ফিরে আসবে। তখন যারা এদের পক্ষে থাকবে, তাদের রক্ষা নেই। খুঁজে খুঁজে বের করে মারবে তাদের।
‘স্যার, হাসান সাহেব এসেছেন।’
‘ভেতরে নিয়ে এসো।’
হাসান বৃদ্ধ হয়েছেন।
মুস্তাকিন তাকে দেখে অবাক হয়ে বললেন, ‘তুমি তো আমার থেকে অনেক ছোটো ছিলে। এত বয়স হয়ে গেল কী করে? চুল দাড়ি সবই পেকে গেছে দেখছি। বোসো, বোসো।’
হাসান বসলেন, বললেন, ‘বহুদিন কোনো কাজ নেই জনাব। আপনার প্রিয় পাত্ৰ হবার জন্য প্রায় সবাই ব্ল্যাক লিস্ট করে দিয়েছিল। লীগের নেতাদের ঘুষ দিয়েও কিছু করতে পারিনি।’
মুস্তাকিন বললেন, ‘তা ঠিক। এই দিন ওদের দেখতেই হত। এত দুর্নীতি খুব বেশিদিন ক্ষমতায় থাকতে দেয় না। অবশ্য আমাদের আমলেও…’
মুস্তাকিন চুপ করে গেলেন।
হাসান বললেন, ‘আমার জন্য কি কোনো কাজ আছে জনাব? আপনার ফোন পাবার পর থেকেই আশাবাদী হয়ে আছি।’
মুস্তাকিন বললেন, ‘হ্যাঁ। আশাবাদী হবার কারণ আছে। আমি স্টেট ডেভেলপমেন্ট সেক্টরের উপদেষ্টা হয়েছি। ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কে আমাদের কিছু প্রোজেক্ট জমা দিতে হবে। সেগুলোর প্ল্যান বানিয়ে দিতে হবে দু-দিনে।’
হাসান চোখ কপালে তুললেন, ‘দু-দিনে? কী বলেন জনাব? এত তাড়াতাড়ি কিছু হয় নাকি?’
হাসানের ফোন বাজতে শুরু করল।
হাসান পকেট থেকে ফোন বের করে নাম্বারটা দেখে বিরক্ত মুখে বললেন, ‘এই একটা নাম্বার সেই থেকে ফোন করে যাচ্ছে। ফোন ধরলে কিছু বলে না। দেখুন।
হাসান ফোনটা রিসিভ করে স্পিকারে দিয়ে বললেন, ‘হ্যালো।’
‘স্লামালিকুম হাসান সাহেব। মুস্তাকিন সাহেবের সঙ্গে দেখা হয়ে কেমন লাগছে?’
ফোনে ওপ্রান্তের কথা শুনে মুস্তাকিনের দিকে তাকালেন। মুস্তাকিন চমকালেন না। শুধু বললেন, ‘হুঁ, বুঝেছি। ওরাই। কথা বলো। আমরা কোথায় যাচ্ছি না যাচ্ছি, এরা সব জানে।’
হাসান বিস্মিত কণ্ঠে বললেন, ‘কারা?’
ফোন থেকে ভেসে এল, ‘আপনার ভারতীয় বন্ধুরা। আপনার এখন ভালো সময় হাসান সাহেব। একটা সময় আমরা আপনাকে হেল্প করেছিলাম, ভুলে গেছেন নিশ্চয়ই?’
হাসান ফোনটা কেটে দিলেন। মুস্তাকিন শ্বাস ছাড়লেন, ‘আমি যে কী দোটানায় পড়েছি! কী করে ইন্ডিয়ানরা সব জেনে যাচ্ছে বুঝতে পারছি না।’
হাসান চুপ করে রইলেন।
মুস্তাকিন বললেন, ‘হতে পারে ফোন ট্যাপ করছে। আমি হাল ছেড়ে দিয়েছি। একদিকে আনোয়ার… আনোয়াররা চাইছে যশোরে একটা ট্রেনিং ক্যাম্প করতে। আরও কত কী প্ল্যান করছে কে জানে। শুধু প্রোজেক্ট প্ল্যানিং আর তার থেকে ডলার আনার প্ল্যান চলছে। কাজ কী হবে তা এখন থেকেই বুঝতে পারছি।’
হাসান বললেন, ‘ওরা এখান থেকে টাকা নিয়ে আবার পালাবে জনাব। মাঝখান থেকে আপনি ফেঁসে যাবেন। হয়তো আমিও।’
মুস্তাকিন বললেন, ‘জানি। ওদের এটাই প্ল্যান। তোমাকেই ভারতীয় বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করতে হবে হাসান। আমার ধারণা সে সময় তুমিই ওদের আমার কাছে এনেছিলে। আমি ঠিক বলছি তো?’
হাসান উত্তর দিলেন না। সন্তর্পণে একটা নোট লিখে এগিয়ে দিলেন মুস্তাকিনের দিকে, ‘আপনার ঘরে কোনো অডিয়ো রেকর্ডিং ডিভাইস থাকতে পারে। আপনি লিখে উত্তর দিন।’
মুস্তাকিন মাথা নাড়লেন। কাগজে লিখলেন, ‘ওরা তোমার সঙ্গে কি আজকেই যোগাযোগ করেছে?’
হাসান লিখল, ‘জি জনাব। ওরা ধারণা করেছিল আপনি আমাকে ডাকবেন, আমার কাছে একটা ডিভাইস দিয়ে পাঠিয়েছে। আমি যে ব্যাগটা নিয়ে এসেছি, সেটা রেখে যাচ্ছি। সামনের পকেটে ছোটো জিনিসটা আছে। যখনই আপনি আনোয়ার বা উপদেষ্টা সাহেবের সঙ্গে দেখা করবেন, ওটা সবসময় আপনার পকেটে রাখতে বলা হয়েছে।’
মুস্তাকিন শ্বাস ছাড়লেন। এত সব বুদ্ধিমান মানুষের মাঝখানে নিজেকেই আজকাল বড়ো বোকাসোকা মনে হয় তার।
* * * * *
সন্ধ্যের দিকে জয়দেবকে নিয়ে হাঁটতে বেরিয়েছিলেন সোমনাথ। নিজেই বললেন, ‘চলো বাবা। একটু হেঁটে আসি। সারাদিন ঘরে বসেই বা কী করবে? এখানে তোমাকে কেউ চিনবে না। চলো।’
জয়দেব বারণ করেনি। খুশিমনেই তৈরি হয়ে নিল।
সোমনাথের মন ভার হয়ে আছে। আজ তিনি হেরে গেছেন। ছাত্রদের এতদিন শিখিয়ে এসেছেন কোনো চাপের কাছেই মাথা নত করতে নেই। সেই তিনিই মাথা নীচু করতে বাধ্য হয়েছেন। নিপুণের মতো ছাত্রকে হেরে যাবার শিক্ষা দিয়েছেন।
রাস্তাঘাট সাতদিন আগেও উত্তাল ছিল। কেউ বাড়ির বাইরে বেরোলে ফেরার নিশ্চয়তা ছিল না। এখন এদিক-সেদিক অশান্তির খবর এলেও দ্রুত ছন্দে ফিরছে সব কিছু। এটাই নিয়ম। বাঙালি বেশিদিন অশান্তি পছন্দ করে না। যত কষ্টই হোক, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ছন্দে ফিরতে চায়। সোমনাথের সিগারেট খেতে ইচ্ছে হচ্ছিল। ফ্ল্যাটের কম্পাউন্ড ছেড়ে অনেকটা রাস্তা হেঁটে গিয়ে সিগারেটের দোকান পড়ে। এক প্যাকেট সিগারেট কিনে পাড়ার পার্কে ঢুকে সিগারেট ধরালেন। জয়দেবকে জিজ্ঞেস করলেন না সিগারেট খাবে নাকি। অনেক ছোটো ছেলে। লজ্জা পাবে।
অন্ধকার হয়ে এসেছে চারপাশে। সিগারেট টানতে টানতে সোমনাথ বললেন, ‘দেশ ছেড়ে যাবার কথা হলেই অসুস্থ লাগে বুঝলে জয়দেব। এই দেশের অনেক মায়া।’
জয়দেব বলল, ‘ঠিক হয়ে যাবে সব দেখবেন কাকা। আমার মনে হয় না এই অশান্তি খুব বেশিদিন চলবে।’
সোমনাথ শ্বাস ছেড়ে বলতে যাচ্ছিলেন, ‘তাই হবে’, কিন্তু কিছু বলার আগেই যেন মাটি ফুঁড়ে তিনজন উদয় হল। তিনজনের চেহারা অন্ধকারে না দেখতে পেলেও বিড়ি আর অ্যালকোহল মেশানো ঘামের গন্ধ মুহূর্তের মধ্যে বুকের ভেতরটা ঠান্ডা করে দেবার জন্য যথেষ্ট। আধো অন্ধকারে সোমনাথ দেখতে পেলেন সামনের লোকটা একটা ছুরি তার গলায় ধরেছে, ‘এই মাস্টার, তোর খুব বাড় বাড়সে, আজ রাতের মধ্যে যদি চ্যানেল ডাইকা সকালে যা কইছিলিস তা মিথ্যা না কইস, তাহলে তোরে তোর ভগবানের কাছে পাঠাইয়া দিমু। মালাউন কোথাকার, দেশ ছাইড়া পালা, নইলে মাটিতে পুইতা রাইখা দিমুনে।’
সোমনাথ টলে উঠলেন। মাথা ঘোরাচ্ছিল তার। আমতা আমতা করে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন। প্রয়োজন হল না। একটা ছোটোখাটো ঝড় উঠল যেন। তিনজন মাটিতে ছিটকে পড়ল।
গড়াগড়িই খাচ্ছিল যেন তিনজনে। কয়েক সেকেন্ড অবিশ্বাসী চোখে তাদের দিকে দেখে ছেলেগুলো পড়িমরি করে ছুটে পালালো।
জয়দেব হাসতে হাসতে বলল, ‘দেখুন কাকু, হুমকি দিতে এসেছে খেলনা নিয়ে। এই হল ঢাকার গুণ্ডাদের হালত। ছিছি।’
সোমনাথের সিগারেটের প্যাকেট মাটিতে পড়ে গেছিল। জয়দেব প্যাকেট তুলে তার হাতে দিয়ে বলল, ‘চলুন কাকু।’
সোমনাথ একটু থমকে গিয়ে কড়া গলায় বললেন, ‘তুমি কে?’
জয়দেব বলল, ‘কেন কাকু?’
সোমনাথ মাথা নাড়লেন, ‘সত্যি কথা বল, আমি কাউকে বলব না। তুমি কে? তুমি এখন যেটা করলে, সেটা সাধারণ কোনো মানুষের কাজ না। তোমার অ্যাক্সেন্টও গ্রামের অ্যাক্সেন্ট না। আমার প্রথম থেকেই সন্দেহ হচ্ছিল। তুমি কলকাতার লোক, তাই না?’
জয়দেব সন্তর্পণে চারদিক ভালো করে দেখে নিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ স্যার, আমি কলকাতার লোক। আমাকে তনয়াদি আপনার কথা বলেছিলেন। কিন্তু প্লিজ আপনি এখন এই নিয়ে কোনো কথা বলবেন না। চলুন আপনার ফ্ল্যাটে ফিরে যাই।’
সোমনাথ রেগে গেলেন, ‘তনয়া তোমাকে এখানে পাঠিয়েছে কেন?
জয়দেব বলল, ‘আমি এখন আপনাকে সব কথা বলতে পারব না কাকু, তবে এটুকু বলতে পারি, আপনার জীবন সঙ্কটে আছে। আপনারই শুধু না, এই মুহূর্তে ঢাকা শহরের পনেরোজন শিক্ষকের জীবন সংকটে আছে। আই এস আই তাদের বেসিকসে ফিরে গেছে। ৭১-এর বুদ্ধিজীবী হত্যার প্যাটার্নটা মনে আছে?’
সোমনাথের হা-পা কাঁপছিল। তিনি বললেন, ‘আই এস আই? গল্পকথা শুরু হয়ে গেল তোমাদের।’
জয়দেব সোমনাথের হাত ধরল, ‘ফ্ল্যাটে চলুন কাকাবাবু। মাথা ঠান্ডা করুন। চলুন।’
৪৭
।। দিল্লি।।
জ্ঞান ফেরার পর দীপ্তি দেখল প্রশান্ত তার চোখে মুখে জল দিচ্ছে। চারদিকে তাকিয়ে বুঝল এটা সিলভার টাওয়ারের কমিউনিটি রুম। সিকিউরিটি কৌতূহলী চোখে তাকে দেখছে। তাকে চোখ খুলতে দেখে প্রশান্ত বলল, ‘কীরে, কী হয়েছিল?’
দীপ্তি বলল, ‘এখানে বলব?’
প্রশান্ত বলল, ‘ঠিক লাগছে?’
দীপ্তি ঘাড় নাড়ল।
প্রশান্ত বলল, ‘চল।’
দীপ্তিকে নিয়ে গেটের বাইরে বেরোল প্রশান্ত। দীপ্তি বলল, ‘একটা লোক – বানশালের ফ্ল্যাটে আমি যাবার আগেই গেছিল। ওই লিফটে আমার মুখে কিছু একটা স্প্রে করেছে।’
প্রশাস্ত বলল, ‘শিট! এর অর্থ হল তুই যেটা নিতে গেছিলি সেটা নিয়ে নিয়েছে।
দীপ্তি বলল, ‘হ্যাঁ। আর পিকে জানা। এখানের সিসিটিভি ফুটেজ দেখলেই সব বেরিয়ে যাবে।’
প্রশান্ত ফোন বের করে আর পিকে ফোন করে সব জানিয়ে ফোন রেখে বলল, ‘চল, তোকে পিজিতে নামিয়ে দিয়ে আসি।’
দীপ্তি মন খারাপ করে বলল, ‘আমাকে সবাই ইডিয়ট বলবে তাই না? একটা কাজ দিয়েছিল, তাও করতে পারলাম না।’
প্রশান্ত দীপ্তির কাঁধে চাপড় মারল, ‘ধুস, আগে থেকে খবর না থাকলে এ-রকমই হয়। তোর জায়গায় আমি থাকলেও তাই হত। এসব নিয়ে ভাবিস না তো। চল ওঠ।’
দীপ্তি প্রশান্তের বাইকে উঠল। লোকটা যাবার আগে তাকে যে কথাটা বলল, সেটা যেন মাথায় গেঁথে গেছে তার। মাথা দপদপ করছে। সে একবারে অপ্রস্তুত অবস্থায় লিফটে উঠেছিল। লোকটা চাইলে তাকে মেরেও ফেলতে পারত। ঠিকই তো বলেছে! সে ওই ‘কাদের কাদের’ অ্যাপয়েন্ট করেছে, তাদের দলেই পড়ে গেছে আজ। অনেক বেশি সতর্ক হওয়া উচিত ছিল।
সরোজিনী বাজারের কাছে প্রশান্ত বাইক দাঁড় করালো। দীপ্তি বলল, ‘কী হল?’
প্রশান্ত বলল, ‘বিদুর দাঁড়াতে বলেছেন।’
দীপ্তির লজ্জা লাগছিল। এরপরে বিদুর তাকে আর কোনো কাজ দেবেন না।
একটা গাড়ি এসে দাঁড়াল। গাড়ি থেকে বিদুর নেমে তাদের দিকে এগিয়ে এসে দীপ্তিকে বললেন, ‘আমারই ভুল। আমি তোমাকে কোনো সময় দিইনি। আগে থেকে বললে কাজ হত। লোকটা কেমন দেখতে মনে আছে?’
দীপ্তি যতটা পারল মনে করে লোকটার বর্ণনা দিল। বিদুর ভ্রূ কুঁচকে বললেন, ‘নতুন রিক্রুট তো না। ঠিক আছে আমি মনে করে দেখি। পালাবে আর কোথায়? ঠিক আছে, আমি ঠিক বের করে ফেলব। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে একে আমরা তুলব। চিন্তা কোরো না। তুমি পিজি চলে যাও। কাল অফিসে এসো।’
দীপ্তি বলল, ‘সরি স্যার। আমার আরও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল।’
বিদুর বললেন, ‘সরি বলার কিছু নেই। ইট হ্যাপেন্স। এ-রকম হতেই পারে। গুড নাইট।’
বিদুর গাড়িতে উঠে চলে গেলেন। দীপ্তি পাংশু মুখে প্রশান্তের কাছে এসে বলল, ‘নিশ্চয়ই আমাকে গাধা ভাবলেন।’
প্রশাস্ত বলল, ‘চল, কিছু খেয়ে নে। পিজা খাবি?’
দীপ্তি বলল, ‘না, পানিপুরি খাব।’
প্রশাস্ত বলল, ‘ঠিক আছে। তাই খাবি। চল।’
দু-জনে মিলে পানিপুরি খেলো। দীপ্তির মুড কিছুটা ঠিক হল।
প্রশান্ত বলল, ‘তোকে নামিয়ে আবার অফিসে যাব। আজ নাইট শিফট করব।’
দীপ্তি বলল, ‘নতুন ছেলেটা কেমন করছে?’
‘ঠিকঠাক। আর পি মনে হয় তোকে মিস করছেন। ঠিক কমফোর্টেবল হতে পারছেন না নতুনদের সঙ্গে।’
দীপ্তি বলল, ‘জানি না আমাকে নিয়ে কার কী প্ল্যান আছে। বানশালকে…’ বলতে বলতে দীপ্তি থমকে গেল। প্রশান্ত বলল, ‘কী হল?’
দীপ্তি বলল, ‘এসব এখানে বলব না। এমনিতেই জঘন্য একটা দিন গেল। আবার মুখ ফসকে কী বলে দেব, কিছু না বলাই ভালো।’
প্রশান্ত বলল, ‘তা ঠিক। আর কিছু খাবি? কোল্ড ড্রিংক্স?’
‘না। আমাকে নামিয়ে দিয়ে আয়।’
‘ওকে। চল।’
দীপ্তি যখন পিজিতে নামল, তখন রাত সাড়ে আটটা। রুমে ঢুকতেই তার ফোনে বিদুরের মেসেজ এল, ‘চারটে ছবি পাঠাচ্ছি। দেখে জানাও তো এদের মধ্যে কাউকে দেখেছিলে নাকি!’
৪৮
।। ঢাকা।।
রজ্জাকের ফাঁসির আদেশ হয়েছিল। সে জেলে বসে ফাঁসির অপেক্ষা করছিল। এক রাত তার জীবন পাল্টে দিয়েছে।
আসাদুরের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ হয়েছিল। আসাদুর অন্য সেলে ছিল। মাঝরাতে হঠাৎ পাগলাঘণ্টি বেজে উঠল। রজ্জাক শুয়েছিল। ধড়মড় করে উঠে বসে দেখল তার সেলের দরজা খুলে আসাদুর দাঁড়িয়ে আছে, দাঁত বের করে বলল, ‘চল দোস্ত, আমাগো ছুটি।’
রজ্জাকের প্রথমে বিশ্বাস হয়নি। নিজেকে চিমটি কেটেছে। ব্যথায় ককিয়ে উঠে আসাদুরকে জিজ্ঞেস করেছে, ‘কী বলিস দোস্ত? ছুটি মানে?’
আসাদুর তার হাত ধরে তাকে বের করেছে, হাসতে হাসতে বলেছে, ‘ছুটি মানে ছুটি। সবার ছুটি।’
শেষের দিকে আর দেশের খবর শোনার প্রয়োজনীয়তা বোধ করত না রজ্জাক। আসাদুরের থেকে সব শুনে কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিল না, একই কথা জিজ্ঞেস করে যাচ্ছিল শুধু, ‘আমাগো আবার জেলে ঢুকায়ে শাস্তি দেবে না তো?’
আসাদুর জোরে জোরে মাথা নেড়েছে, ‘না দোস্ত। আর কোনো চিন্তা নাই। সবার ছুটি।’
তাও রজ্জাক প্রথমে বিশ্বাস করেনি। পুরোনো ঢাকায় নিজের ডেরায় ফেরার আগে দু-দিন লুকিয়ে ছিল। তিনদিনের দিন যখন বুঝল ছুটিটা সত্যিকারের হয়েছে, তখন বেরিয়েছে। আসাদুর জেল থেকেই তার রাজত্ব চালিয়েছে বলে রজ্জাকের এলাকা দখল করতে বিশেষ চাপ হয়নি।
সুযোগ এমনি এমনি আসে না। সুযোগ করে নিতে হয়। সরকার বদলের সময়ে পুলিশ নড়বড়ে অবস্থায় ছিল। রজ্জাক তার ছেলেদের দলে দলে ভাগ করে দিয়েছে। সেনার গাড়ি এলাকা টহল দিয়ে বেরোতেই বিভিন্ন বাড়িতে ডাকাতি করা হয়েছে। ডাকাতির গয়না থেকে টাকা, আবার আগের মতো তার কাছে পৌঁছোনো শুরু হয়েছে। রজ্জাক তার বাধা মেয়েছেলেকেও আবার ডেরায় ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে।
আসাদুর শিক্ষিত ছেলে, সে কাগজে লুটের হিসেব লিখছিল বসে বসে। রজ্জাক বলল, ‘কী বুঝলি আসাদুর, দেশ কি আবার সেনার হাতে চলে গেল?’
আসাদুর বলল, ‘না মিয়াঁ। দেশ কার হাতে চলে গেল সেটা কেউ বুঝতে পারছে না। কেউ কয় সেনার হাতে গেছে, কেউ কয় ছাত্রদের হাতে গেছে।’
রজ্জাক খিকখিক করে হাসতে হাসতে বলল, ‘পাগল হইয়া গেছে সব। ছাত্ররা দেশ চালাইব নাকি? সব চুর। চুরি করার ধান্দা বুঝস না? যেই সরকারে থাকবো, সেই চুরি করব। তুই মালগুলো লুকায় ফালাবি। এগোরে বিশ্বাস করা যায় না। দেখা যাইব রেইড মারতে চইলা আইসে।’
আসাদুর গম্ভীর মুখে বলল, ‘জানি। সোনা সব গলাইয়া দিছি। আর টেকা যা আছে, পুইতা ফালাইছি। সোবাহান সাব তোমারে ফোন করবে মিয়াঁ। তুমি দেখা কইরা আসবা। উনি ক্ষমতায় থাকলে তো আমাগোই লাভ।’
রজ্জাক বলল, ‘হ। আমাগো লাভ তো আছে। কিন্তু সোবাহান টেকা চাইব। আমরা বইলা দিবোনে আমরা টেকা কোই পাব, আমরা তো জেলে ছিলাম।
আসাদুর বলল, ‘সবাই টেকা চাইব মিয়াঁ। টেকা সামলাইয়া রাখতে হইবে। টেকা দিতেও হইব মিয়াঁ, না দিলে আমাগো আবার জেলে পাঠাইয়া দিতে পারে।
আসাদুরের ফোন বেজে উঠল। রজ্জাক বলল, ‘কে ফোন করে?’
আসাদুর বলল, ‘চিনতে পারি না। ধইরা দেখি।’
ফোন ধরল সে, ওপ্রান্ত থেকে ভেসে এল, ‘আসাদুর, আজ বিকেল পাঁচটার মধ্যে রজ্জাককে নিয়ে যমুনা গেস্ট হাউজে দেখা করবে। কাজ আছে।’
আসাদুর সন্দিগ্ধ গলায় বলল, ‘কে বলছেন?’
‘চলে এসো। পরিচয় পেয়ে যাবে।’
‘আমরা কীভাবে বিশ্বাস করব?’
‘আবার জেলে যেতে ইচ্ছে করছে কি? যা বলছি করো।’
ফোন কেটে গেল।
আসাদুরের ভ্যাবাচ্যাকা মুখ দেখে রজ্জাক অবাক হল, ‘কী হয়েছে? কে ফোন দিল?’
আসাদুর মাথা নেড়ে বলল, ‘জানি না। শুধু বলল যমুনা গেস্ট হাউজে যেতে হবে। না গেলে মনে হয় আমাগো আবার জেলে পাঠায় দেবে।’
রজ্জাকের মুখে হাসি ফুটল, ‘তাহলে মনে হয় সোবাহান সাহেবই ফোন করছে।’
আসাদুর বলল, ‘না মিয়াঁ। এটা সোবাহান সাহেবের গলা না। আমার মনে হচ্ছে অন্য কেউ।’
রজ্জাক বলল, ‘তাহলে যামু না।’
আসাদুর বলল, ‘না গেলে জেলে পাঠাবে আবার। যেতে হবে মিয়াঁ।
রজ্জাক ঠান্ডা গলায় বলল, ‘ঠিক আছে। চল। ফাউ কাম হলে যে ডাকল, তাকে আগে মারব।’
* * * * *
সোমনাথ চা নিয়ে চুপ করে বসে আছেন। বীথি আর জয়দেব খেলা দেখছে। তার মাথা ঠিক কাজ করছে না। জয়দেবের কথা অনুযায়ী তাকে তনয়া পাঠিয়েছে। তার কি রাগ করা উচিত? আজ জয়দেব না থাকলে কী হত? ছেলেগুলো তাকে মেরেও ফেলতে পারত।
সব জায়গা থেকে একই খবর আসছে। ডামাডোলের সময় মানুষকে এভাবেই মারা হয়।
একাত্তরের সময় তার বয়স কম ছিল।
পাকিস্তানি দেশগুলোয় মানুষের জীবনের কোনো দাম নেই। কিন্তু তিনি কী এমন কাজ করলেন যে তার বিরুদ্ধে খুনি লেলিয়ে দিতে হল? তিনি তো আগের সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে বলেছিলেন। ওদের অনেকেই এখন উপদেষ্টা হবে। কিছু লোক আছে যে দলই ক্ষমতায় থাকুক, তারা সরকারেই থাকবে। এ-রকম কিছু লোক এখনও আছে। তারা কি ভয় পাচ্ছে? সোমনাথ তাদের নিয়ে লেখালেখি করবেন?
আগের সরকারের শেষের দিকে বাক স্বাধীনতা তলানিতে ঠেকেছিল। সামান্য ফেসবুক পোস্টের জন্য আয়নাঘরে নিয়ে যাওয়া হত। হুমকি দিয়ে পোস্ট ডিলিট করানো হত। ডিজিটাল সভ্যতা দেশের জন্য এতটা অভিশাপ নিয়ে আসবে কে ভেবেছিল?
পার্ক ফেরার পথে তিনি শুধু একটা কথাই জিজ্ঞেস করেছিলেন জয়দেবকে, ‘তুমি কি সত্যিই পরিমলকে চেনো? নামটা জানলে কী করে?’
জয়দেব বলেছিল, ‘পরিমলবাবুর কথা আমাকে তনয়াদি বলেছেন। আপনার সম্পর্কে যতটা ব্রিফিং দেওয়া সম্ভব দিয়েছেন। আমি আমার পরিচিতদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি এক দল আপনাকে পছন্দ করছে না। প্রিন্সিপাল খোন্দকার সাহেবকেও সরতে হবে এক মাসের মধ্যে। তিনি এখনও জানেন না। আপনাদের কলেজের অধ্যাপকদের একটা দল, আপনারা যাকে আপনাদের কাছের বলে মনে করেন, তারাই ছাত্রদের খেপিয়েছে। কলেজগুলোতে অনেক ডলারের বিদেশি গ্র্যান্ট আসবে, সেসব টাকা আপনাদের মতো আদর্শবাদী লোক থাকলে লুটে নেওয়া সম্ভব হত না। আমাদের উপমহাদেশে টাকা এভাবেই দুর্নীতিকে ডেকে নিয়ে আসে।’
সোমনাথ কিছু বলেননি আর। ছেলেটার কথা ঠিক। উপমহাদেশে দুর্নীতি একটা ক্যান্সার। এখানে দলগুলোর অগণিত সমর্থক তৈরি হয়, সে সমর্থকরা তাদের আমলের দুর্নীতিকে সমর্থন করে আগের আমলের দুর্নীতির সঙ্গে তুলনা করে। কেউ এটুকু বলার ক্ষমতা রাখে না যে যেকোনো ধরনের দুর্নীতিই সে জাতকে পঙ্গু করে দেয়। দেশ গঠনের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। দুর্নীতিতে যদি কোনো দেশ পৃথিবীর মধ্যে প্রথম স্থান দখল করে, তবে তার থেকে দুর্ভাগ্যজনক আর কী হতে পারে?
টিভিতে দেখাচ্ছে দেশের কয়েকটা জায়গায় শিক্ষকদের জোর করে পদত্যাগ করানো চলছে। একই পদ্ধতিতে।
সোমনাথের মাথা দপদপ করছিল। ঢাকায় থেকে যেভাবে ওরা তাকে পদত্যাগ করালো, গ্রামের দিকে এভাবে কাজটা হবে না। প্রচুর পরিমাণ হুমকি আর হিংসার মুখোমুখি হতে হবে লোকগুলোকে। ছাত্র পড়াতে গিয়ে এরকম পরিণতি হবে তারা কি কেউ ভেবেছিলেন? দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়লে বাংলাদেশে যেসব পাকিস্তান প্রভাবিত মাদ্রাসা তৈরি হবে, তাতে কী হতে পারে ভাবলেই শিউরে উঠতে হচ্ছে। নতুন প্রজন্মের উত্থানের নামে কতগুলো ধর্মোন্মাদের উত্থান কোনোমতেই কোনো দেশের পক্ষে ভালো হতে পারে না।
টিভি দেখতে দেখতে বীথির ফোন বেজে উঠল। বীথি অন্য ঘরে যেতেই জয়দেব বলল, ‘কাকাবাবু, আপনি কিছুদিন ফ্ল্যাটে না থাকলে ভালো হত। আমি একটা জায়গা জানি, যাবেন?’
সোমনাথ বললেন, ‘পালিয়ে যাব?’
জয়দেব বলল, ‘আপাতত প্রাথমিক লক্ষ্য হওয়া উচিত সুস্থ থাকা। এখানে ওদের হামলার চান্স আছে। ওরা কিন্তু আপনার ঠিকানা জানে। নিজের কথা না ভাবুন, কাকীমার কথাটা ভাবুন। আপনাদের নিরাপদ কোনো জায়গায় রাখলে আমি নিশ্চিন্ত হতে পারতাম।’
সোমনাথ সম্মতই দিলেন, ‘ঠিক আছে, তুমি যদি সেরকম কোনো জায়গা পাও, আমার যেতে আপত্তি নেই।’
জয়দেব বলল, ‘আপনি তাহলে কাকিমাকে বলে দিন জিনিসপত্র প্যাক করে রাখতে। আমি ঢাকাতেই আরেকটা ফ্ল্যাটে আপনাদের নিয়ে যাব। আপনি কাকিমাকে বলবেন উত্তরায় বন্ধুর ফ্ল্যাটে গিয়ে উঠবেন কাল। ঠিক আছে?’
সোমনাথ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘ঠিক আছে।
সেই ঘর ছাড়াই হতে হল শেষমেশ!
* * * * *
রজ্জাকরা গেস্টহাউসে পৌঁছে দেখল সেখানে আগে থেকেই সালাউদ্দিন সাহেব আর সোবাহান সাহেব বসে আছেন। সালাউদ্দিন বৃদ্ধ, তার অনেক বয়স। কুখ্যাত রাজাকার ছিল একটা সময়ে। রজ্জাক আর আসাদুরকে দেখে দু-জনেরই মুখে হাসি এল। রজ্জাক বলল, ‘আপনেরা ডাকসেন আমাগো?’
সালাউদ্দিন বলল, ‘না। আমরা ডাকি নাই। আনোয়ার মিয়াঁ ডাকসে। চেনো ওরে?’
আসাদুরের মুখ ছোটো হল, ‘চিনি না জনাব। তবে শুনছি উনি পাকিস্তানের লোক।’
সালাউদ্দিন তার মেহেন্দি করা দাড়িতে হাত বুলিয়ে বলল, ‘জি, উনি পাকিস্তানের লোক। বাংলাদেশ আবার পূর্ব পাকিস্তান হতে চলেছে ইনশাল্লাহ। পাকিস্তানিরা এদেশে যত তাড়াতাড়ি দখল নেবে, তত এ দেশের জন্য ভালো। দিন দিন বাংলাদেশ জাহান্নামে চলে যাচ্ছে। কী বলেন সোবাহান সাহেব?’
সোবাহান বললেন, ‘তা তো বটেই। শেখের বেটি আমাগো সবাইরে আয়নাঘরে আটকায়া রাখছিল। কিন্তু আমাকে ধরেছিল যে মোকসেদ, সে শুনি এখন পুলিশের বিরাট দায়িত্ব পাইসে। আমি কিনতু ওরে ছারুম না। পালাইয়া যাইবে কোই?’
আনোয়ার রুমের দরজা খুলে ঢুকে দরজা বন্ধ করে বসল। বলল, ‘বাঃ, সবাই এসে গেছেন দেখছি। রজ্জাক আর আসাদুর, এই কদিনে কত টাকা জমল?’
রজ্জাক আকাশ থেকে পড়ার ভান করল, ‘কী বিষয়ে কথা বলছেন জনাব?’
আনোয়ার বলল, ‘আপনারা যদি ভাবেন আমি ঘাসে মুখ দিয়ে চলছি, তাহলে ভুল করবেন। আমি সব জানি। কোথায় ডাকাতি চলছে, কারা সেসব করাচ্ছে, সব। কত টাকা হল? কোটি হয়েছে?’
রজ্জাক পাংশু মুখে একবার আসাদুরের দিকে তাকিয়ে আনোয়ারকে বলল, ‘কী যে বলেন জনাব।ফকিন্নির ঘরের ফকিন্নি দেশের লোক। কারো কাছে অত টেকা থাকে নাকি? পাঁচ-ছ লাখ হইসে।’
আনোয়ার ফিক ফিক করে হাসতে হাসতে বলল, ‘মিথ্যা বলা কেউ আপনার থেকে
শিখবে। যাই হোক, আপনি কত টাকা তুললেন, সেটা আমার দেখার দরকার নেই। আপাতত এই মাসের শেষে আমার বিশ লাখ টাকা দরকার। সেভাবেই প্ল্যান করে এগোন। পুলিশ, আর্মিকে আমি বুঝে নেব। বাকিটা আপনারা করবেন।’
রজ্জাক বলল, ‘বিশ লাখ? জনাব, সে তো অনেক টাকা।
আনোয়ার বলল, ‘জেলের বাইরে থাকার টাকা হিসেবে দেখলে টাকাটা কিছুই না। আমার কাছে আর্মি আছে, পুলিশ আছে, আপনাদের অপরাধের প্রমাণ আছে। পাস্ট হিস্ট্রি আছে। সবই আছে। টাকাটা তো দরকার মিয়াঁ।’
আসাদুর তড়িঘড়ি বলল, ‘জে মিয়াঁ, আমরা দিয়ে যাব। আর কোনো কাজ আছে?’
আনোয়ার বলল, ‘আছে তো, সোবাহান সাহেব প্রতিরক্ষা দফতরের উপদেষ্টা হচ্ছেন, আপনারা ওর সঙ্গে থাকবেন, উনি একটা লিস্ট বানাবেন, কাকে কাকে সরানো দরকার, আর্মি বা পুলিশের তো অত সময় নেই, আপনারা সে কাজ করে দেবেন।’
রজ্জাক দাঁত বের করল, ‘এটা ভালো কাজ। কত টাকা পাব?’
আনোয়ার বলল, ‘সিকিউরিটি পাবেন, সেটাই কি যথেষ্ট না?’
রজ্জাক ব্যাজার মুখে মাথা নাড়ল, ‘জে জনাব। তাহলেই হবে।’
আনোয়ার সালাউদ্দিনের দিকে তাকাল, ‘আপনাকেও উপদেষ্টা করার কথা বলা হয়েছে। অ্যাপ্রুভালো এসে যাবে। মুস্তাকিন সাহেব পাকিস্তান যাবেন, আপনি সে টিমের সঙ্গে যাবেন। আশা করি পাকিস্তানের পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে আপনার দেখা হবে।’
সালাউদ্দিন হাত কচলে বলল, ‘জনাব, আপনি যেভাবে এই দেশের জন্য ভাবছেন, তা দেখে আমি খুশিতে আপ্লুত হয়ে পড়েছি।’
আনোয়ার বলল, ‘আশা করি আপনি জানেন আমাদের লক্ষ্য কী হতে চলেছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পূর্ব পাকিস্তানকে শক্তিশালী হতে হবে। ইন্ডিয়া কিন্তু এই হার কিছুতেই ভুলতে পারবে না। যেকোনো সময় তারা প্রতি আক্রমণ করবে।’
সালাউদ্দিন বলল, ‘জি জনাব। আমি তো সবসময় বলে এসেছি, পাকিস্তান জিন্দাবাদ।’
আনোয়ার রজ্জাককে বলল, ‘মোস্তাক মিয়াঁ আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করবে। খুব শিগগিরি একটা বড়ো অপারেশনের কথা ভাবা হচ্ছে। আর্মস থেকে শুরু করে যা যা লাগবে, তা যোগান দেবার দায়িত্ব আপনার। দেশকে পাকিস্তানের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে আমাদের খুব তাড়াতাড়ি কাজ করতে হবে।
রজ্জাক বলল, ‘জে জনাব। পাকিস্তান জিন্দাবাদ। পাকিস্তান না থাকলে আমার এতদিনে ফাঁসি হয়ে যেত।’
আনোয়ার বলল, ‘এ ক-বছরে শেখের নামে অনেক মূর্তি হয়েছে, বিল্ডিং হয়েছে। এ সব কিছুই এক সপ্তাহের মধ্যে নাম পরিবর্তন করা হবে। দেশ পালটাবে। এই পথে যে আসবে, তাকে সরিয়ে দিতে হবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।’
সোবাহান বললেন, ‘কিন্তু আমার লিস্ট…’
আনোয়ার হাসল, ‘আপনি আপনার লিস্টের কাজ করুন। কোনো অসুবিধা নেই।’
সোবাহান খুশি হলেন। ক্ষমতার স্বাদের কাছে পৃথিবীর সব স্বাদ তুচ্ছ।
৪৯
।। দিল্লি।
রাত এগারোটা। বানশালকে আবার ইন্টারোগেশন চেম্বারে বসানো হয়েছে। বিদুর আর পি-কে নিয়ে বানশালের সামনে বসেছেন।
বিদুর বললেন, ‘আপনার ফ্ল্যাটের ঠিকানা কে কে জানত? আমি তো ভেবেছিলাম আমার লোক গেলেই ল্যাপটপের ব্যাগটা পেয়ে যাবে। ব্যাপারটা তো সেটা হল না। ওরা জানে তাহলে?’
বানশাল চোখ বড়ো বড়ো করে বলল, ‘কারা?’
বিদুর হাসলেন, ‘সেটা আপনাকে বলে দিতে হবে? আপনি আই এস আই-এর সঙ্গে কতটা জড়িয়েছেন, তা আমরা জানব কী করে?’
‘আমি তেমন কিছুই জড়াইনি স্যার!’
বিদুর উঠে দাঁড়ালেন, বললেন, ‘আপনি আমাকে জোর করতে বাধ্য করছেন। আমি কোনোভাবেই আপনাকে জোর করতে চাইছিলাম না। আপনার জন্য এসকেপ প্ল্যান ও দিয়েছিলাম। এরপর কিন্তু আমাকে স্টেপ নিতে হবে।’
বানশাল মাথা নীচু করে বসে থাকলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, ‘আমাকে একটা ল্যাপটপ দিন। আর কিছুক্ষণ একা ছেড়ে দিন।’
বিদুর আর পিকে বললেন, ‘ব্যবস্থা করো।’
ল্যাপটপের ব্যবস্থা করে বিদুর আর পি-কে নিয়ে স্মোকিং জোনে এলেন।
সিগারেট ধরিয়ে বললেন, ‘কী মনে হচ্ছে? বানশাল কী দিতে পারে?’
আর পি বললেন, ‘বানশালের কাছে খুব বেশি হলে নর্থ ইস্টের প্ল্যানের ব্লু প্রিন্ট থাকতে পারে। তাও কষ্ট কল্পনা মনে হচ্ছে। আনোয়ার ঢাকাকে নিজেদের মতো করে সাজাচ্ছে এখন। তার জন্য ফান্ড লাগবে ওর।’
বিদুর সিগারেটে টান দিয়ে বললেন, ‘আই এস আই ছাড়াও বাংলাদেশে অনেক দেশই ইন্টারেস্টেড। তারাও আনোয়ারকে ফান্ড দিতে পারে। এখানে ফান্ডের থেকেও বেশি বিপজ্জনক হল আনোয়ার।’
একজন স্টাফ এসে বলল, ‘স্যার, আপনাদের খোঁজ করছে বানশাল।’
বিদুর সিগারেট ফেলে দিয়ে বললেন, ‘চলো।’
বানশালের সামনে গিয়ে বসলেন দু-জনে। বানশাল বললেন, ‘আনোয়ার আমাকে যে অ্যাকাউন্ট নাম্বার দিয়েছিল, আপনাদের সেটা দিচ্ছি আমি। এই নাম্বার থেকে যা যা উদ্ধার করা সম্ভব, আপনারা করতে পারেন।’
বিদুর বললেন, ‘এটা থেকে কি কিছু বার করা যেতে পারে?’
বানশাল বললেন, ‘পারে। যদি ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্ট বের করতে পারেন, তাহলে ফান্ডিং সোর্স সম্পর্কে অনেক কিছুই জানা যাবে।’
বিদুর মাথা নাড়লেন, ‘গুড। তাহলে জেলের প্ল্যানটাই থাকুক। আমাদের আপনার থেকে আরও কিছু জানার থাকলে আপনাকে এখানে তুলে আনা যাবে। বাই দ্য ওয়ে, ল্যাপটপে কী ছিল? ওরা বের করতে পারবে?’
বানশাল বললেন, ‘না পারার চান্সই বেশি। পাসকোড প্রোটেক্টেড। ওরা হয়তো ওই পাসওয়ার্ড ব্রেক করতে পারবে না, আপনাদের হাতে আসা থেকে বাঁচালো, ল্যাপটপে এই বিজনেস রিলেটেড ডকুমেন্টগুলো আছে। ওদের একটা ছেলেই আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল।’
বিদুর বললেন, ‘হুঁ, ছেলেটা গাজিয়াবাদে আস্তানা গেড়েছিল। আপনার ল্যাপটপ নিয়ে এখন কোথায় লুকিয়েছে, দেখার সেটাও। এটাও দেখতে চাই ছেলেটা কতক্ষণ লুকিয়ে থাকে। গাজিয়াবাদ বেরিয়েছে যখন বাকিটাও বের করে ফেলব। কোনো গর্তে লুকোবে? সেসব চিন্তা আমি করি না। ছেলেটা আপনার কাছে কী করতে আসত?’
বানশাল বললেন, ‘আমার কাছে একবারই এসেছিল। অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠিয়েছিলাম, রশ্মিকা ওকে পাঠিয়েছিল ট্রান্সফারটা লাইভ দেখার জন্য।’
বিদুর বললেন, ‘আপনাকে আমি একটা পেন আর একটা পেপার দিচ্ছি। রশ্মিকার এগেইন্সটে আপনার যা যা বলার আছে আপনি এক জায়গায় লিখুন। রশ্মিকার বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার প্রমাণ চাই আমার। ওকে ভাঙতে গেলে প্রমাণ দেখাতে হবে। নইলে কোনো লাভ হবে না।’
বানশাল বললেন, ‘আমি লিখব অফিসার। কিন্তু আমার সিকিউরিটি…’
বিদুর বললেন, ‘সবার আগে দেশের নিরাপত্তা। তারপরে আমাদের। আপনার এই ব্যবসাগুলোর জন্য দেশের কত ক্ষতি হয়েছে সেটা আমাকে আগে খতিয়ে দেখতে হবে।’
বানশাল মাথা নীচু করলেন, ‘ঠিক আছে। আমি লিখব।’
বিদুর চেম্বার থেকে বেরিয়ে গেলেন। বানশালের কাছে কাগজ কলম পৌঁছোল।
আর পি বললেন, ‘স্যার, বানশালকে রাজসাক্ষী করাটাও ঠিক না। ও সমান দায়ী। ওর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
বিদুর সিগারেট ফেলে দিয়ে বললেন, ‘চলো।’
বানশালের সামনে গিয়ে বসলেন দু-জনে। বানশাল বললেন, ‘আনোয়ার আমাকে যে অ্যাকাউন্ট নাম্বার দিয়েছিল, আপনাদের সেটা দিচ্ছি আমি। এই নাম্বার থেকে যা যা উদ্ধার করা সম্ভব, আপনারা করতে পারেন।’
বিদুর বললেন, ‘এটা থেকে কি কিছু বার করা যেতে পারে?’
বানশাল বললেন, ‘পারে। যদি ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্ট বের করতে পারেন, তাহলে ফান্ডিং সোর্স সম্পর্কে অনেক কিছুই জানা যাবে।’
বিদুর মাথা নাড়লেন, ‘গুড। তাহলে জেলের প্ল্যানটাই থাকুক। আমাদের আপনার থেকে আরও কিছু জানার থাকলে আপনাকে এখানে তুলে আনা যাবে। বাই দ্য ওয়ে, ল্যাপটপে কী ছিল? ওরা বের করতে পারবে?’
বানশাল বললেন, ‘না পারার চান্সই বেশি। পাসকোড প্রোটেক্টেড। ওরা হয়তো ওই পাসওয়ার্ড ব্রেক করতে পারবে না, আপনাদের হাতে আসা থেকে বাঁচালো, ল্যাপটপে এই বিজনেস রিলেটেড ডকুমেন্টগুলো আছে। ওদের একটা ছেলেই আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল।’
বিদুর বললেন, ‘হুঁ, ছেলেটা গাজিয়াবাদে আস্তানা গেড়েছিল। আপনার ল্যাপটপ নিয়ে এখন কোথায় লুকিয়েছে, দেখার সেটাও। এটাও দেখতে চাই ছেলেটা কতক্ষণ লুকিয়ে থাকে। গাজিয়াবাদ বেরিয়েছে যখন বাকিটাও বের করে ফেলব। কোনো গর্তে লুকোবে? সেসব চিন্তা আমি করি না। ছেলেটা আপনার কাছে কী করতে আসত?’
বানশাল বললেন, ‘আমার কাছে একবারই এসেছিল। অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠিয়েছিলাম, রশ্মিকা ওকে পাঠিয়েছিল ট্রান্সফারটা লাইভ দেখার জন্য।’
বিদুর বললেন, ‘আপনাকে আমি একটা পেন আর একটা পেপার দিচ্ছি। রশ্মিকার এগেইন্সটে আপনার যা যা বলার আছে আপনি এক জায়গায় লিখুন। রশ্মিকার বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার প্রমাণ চাই আমার। ওকে ভাঙতে গেলে প্রমাণ দেখাতে হবে। নইলে কোনো লাভ হবে না।’
বানশাল বললেন, ‘আমি লিখব অফিসার। কিন্তু আমার সিকিউরিটি… ‘
বিদুর বললেন, ‘সবার আগে দেশের নিরাপত্তা। তারপরে আমাদের। আপনার এই ব্যবসাগুলোর জন্য দেশের কত ক্ষতি হয়েছে সেটা আমাকে আগে খতিয়ে দেখতে হবে। বানশাল মাথা নীচু করলেন, ‘ঠিক আছে। আমি লিখব।
বিদুর চেম্বার থেকে বেরিয়ে গেলেন। বানশালের কাছে কাগজ কলম পৌঁছোল।
আর পি বললেন, ‘স্যার, বানশালকে রাজসাক্ষী করাটাও ঠিক না। ও সমান দায়ী। ওর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
বিদুর বললেন, ‘সেসব আমি পরে ভাবব। আমাকে আগে ওই ছেলেটাকে এনে দাও। এত সাহস কী করে হয় যে এদেশে এসে আমাদের চোখের সামনে থেকে বানশালের ল্যাপটপ নিয়ে চলে যাবে? আজ রাতের মধ্যে আমার ছেলেটাকে চাই। অ্যাট এনি কস্ট।’
বিদুর প্রায় গর্জন করে উঠলেন।
আর পি মাথা নাড়লেন, ‘রাইট স্যার।’
