১৫
।। দিল্লি।।
‘রাত এগারোটা বাজে। আর এক ঘণ্টা বাইরে থেকে একবারে পরের দিনই ঘরে ঢুকতে পারতে! প্রথমে সাতটা, তারপর আটটা, ন-টা আর আজ এগারোটা। বাঃ!’
ভূমিকা দরজা খুলে তাকে দেখেই গজগজ শুরু করে দিয়েছেন।
আর পি ক্লান্ত মুখে ঘরে ঢুকে বললেন, ‘আমি একটা শাওয়ার নেবো। ডিনার করব বেরিয়ে। খাবার গরম করে রাখো প্লিজ। আমি খুব ক্লান্ত।’
ভূমিকা বললেন, ‘টাওয়েল নিয়ে যেও। ওয়াশরুমে কিছু নেই।’
আর পি বাথরুমে ঢুকে প্রায় কুড়ি মিনিট ধরে স্নান করে বেরোলেন। মাথা দপদপ করছে। জ্বর আসবে মনে হচ্ছে।
ডাইনিং টেবিলে ভূমিকা চুপ করে বসেছিলেন। আর পির বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে বললেন, ‘কী এমন রাজকার্য করছ বলোতো, এ-রকম হাল হচ্ছে কেন তোমার? ডার্ক সার্কেল বাঁধিয়ে বসে আছ।’
আর পি হাসলেন, ‘রাজকার্যই বটে। তবে গোপন কাজ, বলা যাবে না।’
ভূমিকা বললেন, ‘হ্যাঁ, বুঝেছি। সবই তো গোপন। যাই হোক, শরীর খারাপ করে বোসো না, তাহলেই হবে।’
আর পি খাওয়া শুরু করলেন। ভূমিকা না খেয়ে ছিলেন। তিনিও শুরু করলেন।
আর পির ফোন বাজতে শুরু করল। ধরলেন তিনি, কথা বলতে বলতে উঠে ড্রইং রুমে চলে গেলেন। ভূমিকা গলা তুললেন, ‘খেয়ে নিয়ে কাজ করো।’
আর পি তাড়াতাড়ি এসে বসলেন, ‘সরি সরি।’
ভূমিকা বললেন, ‘একটা পার্সেল এসেছিল আজ। খুলে দেখলাম একটা কাশ্মীরি শাল। কে দিয়েছে? প্রেম-ট্রেম করছ নাকি বুড়ো বয়সে?’ আর পি অবাক হয়ে বললেন, ‘এতক্ষণে বলছ? কোথায় সেটা?’
ভূমিকা বললেন, ‘আগে খেয়ে নাও। তারপর বলব। নইলে খাওয়া হবে না।’
ছটফট করতে করতে কোনো রকমে খাবার শেষ করে মুখ ধুয়ে আর পি বললেন, ‘এবার? বল প্লিজ।’
ভূমিকা বললেন, ‘আলমারিতে।’
আর পি দৌড়ে বেডরুমে গিয়ে আলমারি খুললেন। ব্রাউন পেপারে মোড়া শালটা দেখামাত্র খাটের উপর শালটা খুললেন। অপূর্ব কাজ সাদা শালটার উপরে। আরপি ঘরের সব আলো জ্বালিয়ে তীক্ষ্ণ চোখে শালটা দেখতে লাগলেন। বেশ কিছুক্ষণ দেখার পর তার মুখে হাসি ফুটল।
দীপ্তিকে ফোন করলেন। দীপ্তি ফোন ধরতেই বললেন, ‘বানশাল কোথায়?’
দীপ্তি বলল, ‘বানশাল বাড়িতেই আছে।’
আর পি বললেন, ‘ওকে। কিপ ট্র্যাকিং।’
‘ওকে স্যার।’ ফোন কেটে দিল দীপ্তি।
আর পি শালটা যত্ন করে গুছিয়ে আলমারিতে তুলে দিলেন। ফোনে মেসেজ টোন বেজে উঠল, ‘মোস্তাককে রিলিজের ব্যবস্থা করুন। নইলে বেঁচে থাকবেন না।’
আর পি হেসে মেসেজের উপরে একটা লাভ সাইন দিয়ে দিলেন।
আবার মেসেজ এল, ‘সাহস ভালো, অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো না। আপনার কি ধারণা দিল্লিতে আমাদের কোনো অ্যাক্সেস নেই?’
আরপি আবার লাভ সাইন দিলেন
‘মোস্তাক কোনো মিশনে ছিল না। ইন্ডিয়াতে সবার কাজ থাকে। আমারও থাকে। আপনারও তো বাংলাদেশে কিংবা পাকিস্তানে কাজ থাকে। থাকে না?’
আর পি এবার লিখলেন, ‘আগে বলতে হত। এখন ব্যাপারটা হাতের বাইরে চলে গেছে। আমাকে সরাসরি বললে এই সমস্যা হত না।’
‘আপনি এখনও পারেন। আপনি বললেই ওরা মোস্তাককে ছেড়ে দেবে।’
আর পি উত্তর না দিয়ে ফোন সরিয়ে রাখলেন। এবার ওরা একের পর এক হুমকি দিয়ে যাবে। প্রথমে তাকে, তারপর ভূমিকা, তারপর লন্ডনে তার ছেলে অনামিককে খুনের হুমকি দিয়ে যাবে। আগে অস্বস্তি হত না। আজকাল হয়। হাত-পা কাঁপে।
এই সময়টা ফোন দূরে রেখে চুপ করে বসে থাকেন। ফোনটা বাজতে শুরু করেছে। ইন্টারন্যাশনাল নাম্বার। আর পি ধরতেই ওপাশ থেকে ভেসে এল, ‘আসসালাম ওয়ালাইকুম।’
আর পি বললেন, ‘বলুন যা বলতে চান।’
‘ছেড়ে দিন জনাব। আপনাকে সাহায্য করব। কথা দিচ্ছি। ক্রেডিট পয়েন্ট পাবেন। পরে রিডিম করতে পারবেন।’
ওপ্রান্ত থেকে হাসির আওয়াজ এল। আর পি-ও হাসলেন, বললেন, ‘হুমকিটা না দিলে ভেবে দেখতাম।’
‘হুমকিটা আমি দিইনি বিশ্বাস করুন। আমার লোকেরা দিয়েছে। খুব বকাঝকা করেছি। মোস্তাককে ছেড়ে দিন জনাব। আমি বাকিটা দেখে নেবো। আপনার কাজে দেবো। কথা দিচ্ছি।’
আর পি বললেন, ‘ঠিক আছে। দেখছি।’
‘মোস্তাককে আপনি কাজে লাগাতে পারবেন পরে। পরিবর্তে আমি আপনাকে আরিফকে দিতে পারি। আরিফ কাশ্মীরেই আছে। আমাদের না। আপনাদের কাশ্মীরে। আরিফের ওজন দাঁড়িপাল্লায় মোস্তাকের থেকে বেশি হবে তো?’
‘ওকে। ডিল। লোকেশন পাঠান। আরিফকে পেলেই মোস্তাককে ছেড়ে দেবো।’
‘আগে ছাড়ুন।’
‘আমাকে বিশ্বাস করতে হবে। আমার কথার দাম আছে।’
ওপ্রান্তে নীরবতা। আর পি নিজের হৃদস্পন্দন নিজেই শুনতে পাচ্ছিলেন। কয়েক সেকেন্ড পর ওপ্রান্ত সুর নরম করল, ‘আপনি জিতলেন। তবে মোস্তাক কাল যেন বাংলাদেশের সূর্য দেখে। আমি আপনার উপর ভরসা করে এটা করছি আর পি সাহাব।’
‘ফোন রেখে লোকেশন পাঠান।
‘যথা আজ্ঞা।’
ফোন কেটেই আর পি রমেশ সুরির নাম্বার ডায়াল করতে শুরু করলেন।
একবার রিং হতেই রমেশ ধরলেন, ‘ইয়েস স্যার। আজ্ঞা দিন।’
‘মোস্তাককে ছেড়ে দে।’
রমেশ অবাক হয়ে গেলেন, ‘মানে?’
‘দু-জনের মধ্যে মোস্তাককে ছেড়ে দে। ওর নাম্বার নিয়ে রাখ।’
‘আপনি আর পি-ই বলছেন তো?’
‘হ্যাঁরে। ভেরিফিকেশন করতে কী লাগবে? কোড বলি? বিটা সেভেন থ্রি আলফা থ্রি। ঠিক আছে?’
‘ওকে ওকে। ঠিক আছে, যা বলছেন তাই করছি। ছেলেটাকে ধরে রাখব?’
‘রেখে দে, ওটাকে নিয়ে দিল্লি চলে আয়। মোস্তাকের ফোন অ্যাক্সেস নিয়ে রাখ শুধু।’
‘ওকে স্যার।’
‘ওকে বর্ডারে ছেড়ে আয়। যেন নিরাপদে যায়, সেটাও দেখার ব্যবস্থা করতে হবে।’ রমেশ ফোন কেটে দিলেন।
*****
রাত দেড়টা।
বিদুর ভরদ্বাজ তার কম্পিউটারে কাজ করছিলেন। অফিসের ভেতরে দুটো চেম্বারে আলো জ্বলছে। এক তার চেম্বারে। আরেকটা আরেকটু দূরে কন্ট্রোল রুমে। তার সম্পর্কে একটা কথা প্রচলিত আছে। তিনি নাকি রোবট। রাতে ঘুমোন না।
বিদুরের ফোন বাজছিল। বিদুর নাম্বার দেখে ফোন ধরলেন, ‘হ্যাঁ রমেশ, বলো।’
‘স্যার, একটা অর্ডার এসেছে কিছুক্ষণ আগে, আর পির থেকে। যদিও এই ব্যাপারে নোডাল আর পিই, তবু এত অস্বস্তি হচ্ছে, মনে হল কথাটা আপনাকে একবার ছুঁইয়ে নেওয়া দরকার।’
বিদুর শান্ত কণ্ঠে বললেন, ‘বল।’
‘মোস্তাককে ধরা হয়েছিল। আর পি বলছেন রিলিজ করে দিতে। দরকার হলে বাংলাদেশ বর্ডার অবধি পৌঁছে দিতে।’
‘যা বলছে করো।’
‘আপনি জানতেন?’
‘আমার জানার দরকার নেই। আর পি বললে করে ফেলো।’
‘ওকে স্যার। সরি টু ডিস্টার্ব ইউ।’
‘নো প্রবলেম। টেক কেয়ার।’
‘থ্যাঙ্ক ইউ স্যার। গুড নাইট।’
‘গুড নাইট।’
ফোন রাখলেন তিনি।
মোস্তাক সম্পর্কিত ফোল্ডার খুললেন। বেশ কিছুক্ষণ দেখার পর ফোল্ডার ক্লোজ করে
আবার কাজ করা শুরু করলেন।
আবার কিছুক্ষণ পর তার কাছে একটা মেল এল। আরিফ ভাটের লোকেশন সম্পর্কিত মেল করেছেন আর পি।
বিদুর আর পি কে ফোন করলেন। আর পি ফোন ধরেই বললেন, ‘এখনও জেগে আছেন?’
বিদুর হাসলেন, ‘অফিসেই আছি। মোস্তাকের পরিবর্তে আরিফ?’
‘ইয়েস স্যার। ওরা মোস্তাককে নিয়ে ভীষণ মরিয়া।’
বিদুর পা নাচাতে শুরু করলেন, ‘থ্রেট দিয়েছিল?’
‘হ্যাঁ স্যার।’
বিদুর বললেন, ‘ঠিক আছে, আমি আরিফকে নিচ্ছি। তবে মোস্তাককে তিন-চার দিনের মধ্যে বাংলাদেশেই সরাতে হবে। কে আছে ওদিকে তোমার?’
ও প্রান্তে একটু নীরবতা। বিদুর বললেন, ‘থ্রেট পেয়েছো?’
‘তা তো পাইই। এ আর নতুন কী?’
‘তবে?’
‘মোস্তাককে সরিয়ে আমাদের লাভ কোথায়? ওকে বাঁচিয়ে রাখলে আমি ওর থেকে অনেক কিছু পেতে পারি।’
‘যেমন?’
‘লস্করের নতুন ডেরাগুলো, যেগুলো এখন ‘আলোকিত’ বাংলাদেশে তৈরি হচ্ছে। মারলে এসবের কিছুই পাবো না।’
বিদুর পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে সিগারেট ধরালেন, ‘হু, তুমি কোন রকম ভয় ভীতি থেকে এসব বলছ না? আমাকে বলতে পারো কিন্তু। পরে কেঁদো না।’
‘ছেলেকে মারার ভয় দেখাচ্ছে। কিন্তু তাতে আমার কোন কিছু পাল্টাচ্ছে না। আমি জানি মোস্তাক বেঁচে থাকলেই আমাদের লাভ আছে।’
বিদুর বললেন, ‘তোমার ছেলের টিকি ছোঁয়ার ক্ষমতা ওদের নেই। আমার লোক আছে ওখানে।’
‘জানি স্যার। ভয় পাচ্ছি না।’
‘দু-মাস দেখা যাক। কিছু না পেলে উড়িয়ে দেবো। আমি এখন বাঁচিয়ে রাখতে টাখতে বিশেষ চাইছি না আর পি। বেঁচে থাকা মানেই অনেক ঝামেলা।’
‘দু-মাস? ওকে। আপনি এক মাসও দেখতে পারেন।’
‘শোন আর পি, যতই ওয়েবসিরিজগুলোয় ওসব সাইবার ওয়ার ফোয়ার দেখাক, একটা জিনিস মাথায় রেখো, বেসিক ওদের এক আছে। ওরা বোম ছাড়া কোনোকিছুতে বিশ্বাস করে না। আমাদের ডিফেন্স মেকানিজমের বেসিকসগুলোও যেন সেটাই থাকে।
‘রাইট স্যার।’
‘আর কিছু বলার আছে? এদিক-সেদিকে আর কিছু কেস?’
‘না। আপাতত নেই। আমি বানশালের ফলো আপ রাখছি, কিছু পেলে বলব।’
‘আর?’
‘আর কিছু মনে পড়ছে না।’
‘ঠিক আছে, না বলতে চাইলে বলার দরকার নেই। টেকনোলজিকে এখনও আমি অত ভরসা করি না। সামনা সামনি কথা হওয়াই ভালো।’
‘ঠিক কথা। গুড নাইট স্যার।’
‘গুড নাইট।’
ফোন রাখলেন বিদুর। সিগারেট টানতে টানতে স্ক্রিনের দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আবার একটা নাম্বারে ফোন করে বললেন, ‘আরিফের কো অরডিনেটস পাঠিয়েছি। প্রথমে চেক করো এটা ট্র্যাপ নাকি, ট্র্যাপ না হলে আরিফকে উড়িয়ে দিয়ে এসো। একা থাকুক, দশটা ছেলে নিয়ে থাকুক, যাকে খুশি নিয়ে থাকুক, আরিফকে আজ রাতের মধ্যে পৃথিবী থেকে সরাতে হবে।
‘কপি দ্যাট।’
ফোন কেটে সিগারেটটা অ্যাসট্রেতে গুঁজে তিনি বাথরুমে গেলেন। একটু পরে বাথরুম থেকে বেরিয়ে ধীর পায়ে অফিসের বাইরের দিকে রওনা দিলেন।
১৬
॥ ঢাকা।।
রাত তিনটে।
সোমনাথের ঘুম ভেঙে গেল দুঃস্বপ্ন দেখে।
উঠে বসে দেখলেন ঘামে জামা ভিজে গেছে। অথচ আজকের আবহাওয়া মনোরম। গরম নেই। একটু বৃষ্টিও হয়েছে রাতের দিকে।
ফোনের দিকে হাতটা যেতে গিয়েও থমকে গেল। তনয়াকে ফোন করতে গিয়েও করলেন না। বহুদিন ধরে সবাই বলছিল হয় ইন্ডিয়া চলে যান, নইলে বাইরে চলে যান। তিনি জোর করে, জেদ করে থেকে গেছেন, বলেছেন অপপ্রচারে কান না দিতে। অথচ এখন কেমন অসহায় বোধ হচ্ছে।
রাতে ভালো করে খেতেও পারেননি।
মন্টু তাদের কলেজের ছেলে ছিল। ভালো ছেলে ছিল। রাজনীতিটা মন দিয়ে করতে চেয়েছিল। অথচ ওরা মন্টুকেও সরিয়ে দিয়েছে।
যত ভয় তো রাতেই জাঁকিয়ে আসে। কত লড়াই করবেন? কার বিরুদ্ধে লড়াই করবেন? যে ছেলেগুলো ক্লাস করে না, সারাক্ষণ ঝামেলা করে, মিডিয়া তাদেরই নাম দিয়েছে ‘মেধাবী।’
মেধাবী মানে কী? পড়াশোনা করে শিক্ষিত হয়ে পাকিস্তানপন্থী ভাবধারাকে বুকে জড়িয়ে ধরাকে মেধাবী বলে?
উঠে বসার ঘরে গিয়ে জল খেয়ে ঘরে ঢুকতে গিয়ে দেখলেন বীথিও ঘর থেকে বেরিয়েছেন। তাকে দেখে উদ্বিণ্ণ কণ্ঠে বীথি বললেন, ‘তোমার কি অসুস্থ লাগছে? অ্যাম্বুলেন্স ডাকব?’ সোমনাথ বললেন, ‘না না। অসুস্থ কিছু না। জল খেতে এলাম।’
বীথি বললেন, ‘বোসো বোসো।’
সোমনাথ সোফায় বসলেন। বীথি বললেন, ‘তনয়া আমাকে বলেছে। এখনও সময় আছে। বর্ডার পার করার লোক আছে। ওপারে কোনোমতে চলে যেতে পারলেই হবে।’
সোমনাথ বললেন, ‘তারপর? সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন হয়ে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবো? নিজের জীবনের সব কিছু আমি এদেশকে ভালোবেসে করেছি। এই দেশে আমার সর্বস্ব ইনভেস্ট করেছি আমি। সব ছেড়ে চলে যেতে বলছ?’
বীথি বললেন, ‘এ ছাড়া উপায় নেই। আজকে অন্তত চার-পাঁচ জায়গায় শুধু মাত্র র এর গুপ্তচর সন্দেহে ওরা লোকজনকে পিটিয়ে মেরেছে। আমি এই বয়সে এসে এই অসম্মান নিতে পারব না।’
সোমনাথ মাথা নীচু করে বসে রইলেন। বীথি বললেন, ‘কী ভাবছ?’
সোমনাথ বললেন, ‘দুটো দিন দেখি। এখনই অস্থির হবার কিছু নেই।’
একটা বোম পড়ায় শব্দ হল। বীথি জানলার দিকে ছুটে গেলেন। গেটের বাইরে আগুন জ্বলছে। ভয়ার্ত গলায় বললেন, ‘একী, এখানে কী হচ্ছে?’
সোমনাথ বললেন, ‘ও ঠিক আছে। এসব হয়। চলো ঘুমোই।’
বীথি বললেন, ‘আমার মনে হচ্ছে তোমাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে ভাল হত। তুমি কেমন যেন ঘামছ। আমি একবার পারভেজকে ডাকি।’
সোমনাথ বীথিকে ধমকে বেডরুমের দিকে রওনা দিলেন। তার অসুস্থ লাগছে ঠিকই, কিন্তু সেটা বীথিকে বুঝতে দিলে চলবে না।
বীথি বেডরুমে ঢুকে আলো জ্বাললেন। বললেন, ‘তুমি রাতে এসব নিয়ে কিছু ভেবো না। ঘুমোও। আমি পাখার হাওয়া করে দিচ্ছি।’
সোমনাথ কোনো কথা না বলে শুয়ে পড়লেন। বীথি সত্যিই হাওয়া করতে শুরু করলেন।
সোমনাথ বললেন, ‘তুমি ঘুমোও। হাওয়া করতে হবে না। আমি ঘুমিয়ে যাব ঠিক।’
বীথি বললেন, ‘ঠিক আছে। চিন্তা করো না। সব ঠিক হয়ে যাবে।’
সোমনাথ অন্যমনস্কভাবে বললেন, ‘হুঁ।’
বীথি বললেন, ‘নিপুণের কথা জিজ্ঞেসই করা হয়নি তোমায়। কেমন দেখলে?’
সোমনাথ বললেন, ‘ভালো না। আমি কি আজকাল সব কথা বলতে ভুলে যাই? এসে একবারও বলিনি তোমায়?’
বীথি বললেন, ‘না। বলনি। সকালে বলে বেরোলে নিপুণের সঙ্গে দেখা হবে। আমারও দোষ আছে। আমিও জিজ্ঞেস করিনি। তনয়ার সঙ্গে ফোনেই তো গোটা সন্ধ্যে কাটিয়ে দিলাম। তনয়াকে আমি আর ফোন করব না। ফোন করলেই চিন্তা বেড়ে যায়। আমি আর নিতে পারছি না।’
সোমনাথ বললেন, ফোন করার দরকার নেই। বিকসিদ্ধান্ত নিয়েছ। এত ভালোপা থাকলে ওদেশে নিয়ে যাক আমাদের দু-জনকে। জানে আমার সামর্থ্য নেই, তবু…’ বীথি বললেন, ‘না না। ওভাবে বোলো না। ভালোবাসে আমাদের। তাই তো বলছে। যাক গে, তুমি ঘুমোও তো।’ সোমনাথ বললেন, ‘হ্যাঁ। ঠিক আছে। সেই চেষ্টাই করি।
নীচ থেকে খুব জোরে আরেকটা বোমার শব্দ পাওয়া গেল। সোমনাথ খাট থেকে নেমে জানলার কাছে গিয়ে স্থির হয়ে গেলেন। একজনের গায়ে আগুন দিয়ে দেওয়া হয়েছে। লোকটা ছটফট করতে করতে মাটিতে পড়ে গেল…
১৭
॥ দিল্লি।
সকাল সাতটায় ঘুম ভাঙল আর পি-র। ফোন চেক করে দেখলেন আরিফ ভাটের মৃতদেহের ছবি এসেছে। এক দৃষ্টিতে বেশ খানিকক্ষণ দেখে রমেশকে ফোন করলেন।
রমেশ ফোন ধরে বললেন, ‘গুড মর্নিং স্যার।’
আর পি ঘুম জড়ানো গলায় বললেন, ‘মোস্তাকের আপডেট কী?’
রমেশ বললেন, ‘বাংলাদেশে ঢুকে গেছে।’
আর পি বললেন, ‘ওকে। ট্র্যাক করো।’
‘ওকে স্যার।’
ফোন কেটে দিলেন আর পি। ভূমিকা ঘরে ঢুকে বললেন, ‘রাতে ঘুমোনো ছেড়ে দিয়েছো? এরপর অসুস্থ হয়ে পড়বে।’
আর পি বললেন, ‘ব্রেক ফাস্ট রেডি করো। বেরোবো।’
ভূমিকা বললেন, ‘হয়ে গেছে। তুমি স্নান সেরে এসো। সন্ধ্যেয় আমি থাকব না। মিসেস আগরওয়ালদের সঙ্গে বেরোবো।’
আর পি বললেন, ‘ওকে।’
ভূমিকা ঘর থেকে বেরোতেই আর পি তাঁর ফোন ট্র্যাকারে ভূমিকার ফোনের লোকেশন অন করলেন। কাজে ঢুকলে পরে মনে থাকবে না। ওদিক থেকে হুমকি যখন আছে, ভূমিকাকে ট্র্যাক করে রাখার দরকার আছে।
স্নান সেরে বেরোতেই ফোন বাজতে শুরু করল, দীপ্তি ফোন করছে। ফোন ধরতেই দীপ্তি বলল, ‘স্যার আমি বাকি সময়টা ঘর থেকেই অফিস করে দেবো? চার ঘণ্টার জন্য যাবার দরকার আছে?’
আর পি একটু থমকে গিয়ে বললেন, ‘ঠিক আছে। তাই করো। আমি যাচ্ছি এখনই।’
‘থ্যাঙ্ক ইউ স্যার।’
‘তবে দুটোর বেশিও অনলাইন থাকতে হতে পারে তোমাকে। আমি না বললে লগ আউট করবে না।’
‘ওকে স্যার।’
ফোন রেখে তৈরি হয়ে খেতে বসলেন। ভূমিকা বললেন, ‘আজও কি রাত হবে?’
আর পি বললেন, ‘কিচ্ছু ঠিক নেই। আমি জানি না কী হতে চলেছে। দিনের শুরুতে জানি না দিনের শেষে কী হতে চলেছে।’
ভূমিকা বললেন, ‘তাহলে এমন চাকরি করার দরকারটা কী? ছেড়ে দিতে পার না? বাকিদের তো দেখছি, যারা চাকরি করে, তারা খুব বেশি হলে রাত আটটা অবধি বাইরে থাকে। আগরওয়ালের তো ব্যবসা। অর্ধেক দিন ফ্ল্যাট থেকেই বেরোতে দেখি না। এ-রকম কিছু করতে পার না? তোমার চাকরি করার দরকারই বা কী? মুন্নার কাছে দু-জনে মিলে চলে গেলেই তো হয়।’
আর পি হেসে ফেললেন, ‘কাজ আছে বলে আমি আছি ডার্লিং। তোমার আজ যে বেরোনো আছে, টাকা লাগবে না?’
ভূমিকা বললেন, ‘তোমার মানিব্যাগ থেকে কার্ড বের করা হয়ে গেছে আমার। চিন্তা কোরো না।’
আর পি চোখ বড়ো বড়ো করলেন, ‘তাই নাকি? খুব আনপ্রেডিক্টেবল তো তুমি। কখন কী করছ কিছুই জানতে দাও না। তোমার ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোতে কাজ করা উচিত ছিল। আমি দেখছি তোমার জন্য একটা ভালো জায়গায় অ্যাপ্লিকেশন করে দেবো।’
ভূমিকা বললেন, ‘তাই করে দিও। সারাদিন ঘরে বসে বসে বোর হয়ে যাচ্ছি। একটা এক্সট্রা ম্যারিট্যালও করতে পারলাম না জীবনে।’
আর পি মিটি মিটি হাসতে হাসতে খেয়ে উঠে বেরোলেন। গাড়িতে বসে রৌনককে ফোন করে বললেন, ‘ভাবি বিকেলে বেরোবে। লোকেশন অ্যাক্সেস করে নাও। ওর দিকে নজর রাখবে।’
রৌনক বলল, ‘শিয়োর স্যার।’
আর পি গাড়িতে বসে উপরওয়ালাকে ডেকে নিলেন কয়েক সেকেন্ড। বহুদিনের অভ্যাস। ওদের কাছে সবার খবর থাকে। কয়েক বছর আগে ওরা ডি আই বি চিফের স্ত্রীকেই গুলি করে দিয়েছিল। ভদ্রমহিলা কোনমতে বেঁচে গেছিলেন। দেশের মধ্যেও ওদের নেটওয়ার্কটা খুব কম ফ্রিকোয়েন্সিতে চলে। ও পক্ষকে বোকা ভাবার কোনো কারণ নেই। হতে পারে তার গাড়ির নীচেই একটা টাইম বোম্ব আছে। কপালে থাকলে সেটাও যেকোনো সময় ব্লাস্ট হয়ে যেতে পারে। রাস্তাঘাটে বড়ো কোনো ট্রাক এসে তাকে মুহূর্তের মধ্যে খুন করে দিয়ে যেতে পারে।
গাড়ি খানিকটা এগোতেই ফোন বাজতে শুরু করল। গাড়ির হ্যান্ডস ফ্রি অন করে ফোন ধরলেন তিনি, ‘হুঁ।’
‘আর পি সাব, আপনার কাজ তো হয়ে গেছে। আরিফ খতম।’
‘হ্যাঁ, থ্যাঙ্ক ইউ। আপনার কাজও হয়ে গেছে। মোস্তাক এলাকায় ঢুকে গেছে।’
‘রাইট স্যার, মোস্তাকও এলাকায় ঢুকে গেছে।’
‘তবে? এখন কী করতে ফোন করেছেন?’
‘এমনি করেছি স্যার, আপনাকে ধন্যবাদ জানাতে।’
‘ওকে, রাখছি। আমি ড্রাইভ করছি।’
‘এক মিনিট, এক মিনিট স্যার। একটা কথা।
‘হুঁ।’
‘মোস্তাকের পিছু না নিলেই সবার পক্ষে ভালো হয়।’
ফোন কেটে দিলেন আর পি। বিদুরকে ফোন করলেন। বিদুর একবার রিং হতেই ধরলেন, ‘বলো।’
‘ওরা সন্দেহ করছে কিছু একটা। ফোন করেছিল।’
‘কী সন্দেহ করছে?’
‘মোস্তাকের পিছু নিতে বারণ করছে। ত
‘এত পাত্তা দিতে হবে না।’
‘আরিফকে দিয়েছে। পরেও যদি কিছু পাওয়া যায়?’
‘ভয় পাচ্ছ?’
‘একটু।’
গুড। ভয়ে থাকা ভালো। তাতে সতর্ক থাকা যায়। এখন রাখছি। মিটিং আছে।’
‘ঠিক আছে স্যার।’
ফোন কেটে গেল। অফিসের পারকিং-এ চলে এসেছিলেন আর পি। গাড়ি পার্ক করে বেশ কিছুক্ষণ গাড়িতেই বসে রইলেন। মাথার পেছনে একটা চাপ ব্যথা হচ্ছে। বিপি বেড়েছে কি? যা হয় হোক, ওসব নিয়ে ভেবে লাভ নেই।
১৮
॥ ঢাকা।।
সকাল ন-টা। সোমনাথ কলেজ যাননি। চুপ করে বসে টিভি দেখছেন। রাতে ঘুমোতে পারেননি। সেনার গাড়ি এসেছিল এলাকায়। বডিটা পড়েছিল। অ্যাম্বুলেন্স ডেকে তুলে নিয়ে গেছে। সোমনাথ ভোর রাতে বমি করেছেন একবার। বীথি ঘুমিয়ে পড়েছিল বলে আর বলেননি। একইভাবে টিভির ঘরেই বসে আছেন সেই থেকে।
সোমনাথ কলেজ না যাওয়ায় বীথি খানিকটা আশ্বস্ত হয়েছেন। টিভি দেখতে দেখতেই সোমনাথের মনে পড়ল নিপুণের কথা।
এ-রকমই একটা দিন ছিল।
নিপুণ মাঝে মাঝেই সরকারবিরোধী লেখা লিখত সোশ্যাল মিডিয়ায়। কাজের চেয়ে শেখের মূর্তির সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে কেন, লীগের দুর্নীতি কীভাবে ধীরে ধীরে বেড়ে যাচ্ছে, এসব নিয়ে প্রায়ই লিখত। বেশ কয়েকবার মেসেজে হুমকি পেয়েছিল। পাত্তা দেয়নি। এক সকালে কলেজ যাবার পথে হঠাৎ তার রাস্তা আটকায় র্যাব।
রাতে নিপুণ বাড়ি না ফেরায় সর্বত্র খোঁজ শুরু করেন প্রিন্সিপাল জামাল খোন্দকার সাহেব। কেউ খোঁজ দিতে পারেনি। পঞ্চম দিনের মাথায় একটা অজানা নাম্বার থেকে ফোন আসে তার কাছে। তাতে শুধু একবার, ‘আপনার ছেলে আয়নাঘরে আছে’ বলে ফোন কেটে দেওয়া হয়েছিল।
জামাল সাহেব তখন কলেজেই ছিলেন। প্রায় অজ্ঞান হয়ে গেছিলেন। স্বরাষ্ট্র দফতরে সোমনাথের বন্ধু রেজ্জাক কাজ করেন। সোমনাথ রেজ্জাকের মাধ্যমে অনেক চেষ্টা করেছিলেন, লাভ হয়নি। জামাল সাহেব এবং তার স্ত্রী, প্রায়ই রাত জেগে বসে থাকতেন। কলিং বেল বাজলে ছুটে গিয়ে দরজা খুলে হতাশ হওয়া ইত্যাদি তো ছিলই। দু-জনের কেউই হয়তো বাকি জীবনটা স্বাভাবিক জীবন কাটাতে পারবে না। নিপুণও পারবে না।
সোমনাথ শ্বাস ছেড়ে স্বগতোক্তি করলেন, ‘রাষ্ট্র… রাষ্ট্র চাইলে নিমেষে সব শেষ করে দিতে পারে।’
বেলা বারোটা নাগাদ সোমনাথ স্নান করে তৈরি হয়ে বীথিকে বললেন, ‘আমি একবার নিপুণের সঙ্গে দেখা করে আসি।’
বীথি বললেন, ‘কী দরকার। শুয়ে থাকো না। খেয়ে-দেয়ে একটু ঘুমোনোর চেষ্টা করো।’
সোমনাথ বললেন, ‘রাস্তায় বেরোলে ভয় নেই। কলেজে গেলে ভয় আছে। একটু বেরোই। এতক্ষণ ঘরে থাকা অভ্যেস নেই তো। অস্বস্তি হচ্ছে।’
বীথি ভয়ে ভয়ে বললেন, ‘ঠিক আছে। তাড়াতাড়ি ফিরো।’
সোমনাথ ফ্ল্যাটের গেট পেরিয়ে রাস্তায় বেরোলেন। মাথা ধরেছে। জ্বর জ্বর লাগছে। জ্বর এলে এমনিতেই সাতদিন সিক লিভ নিয়ে শুয়ে থাকবেন। রাতে অতিরিক্ত ঘাম হচ্ছিল। অন্য সময় হলে হার্ট চেক আপ করাতেন। এখন ওসব মাথাতেও আসছে না।
প্রিন্সিপাল সাহেবের স্ত্রী তাকে দেখে যেন স্বস্তি পেলেন, ‘আসুন ভাই, ছেলেটা সেই ঘরে শুয়ে আছে সারাদিন ধরে। দেখুন যদি কথা বলে কিছু করতে পারেন।
সোমনাথ নিপুণের ঘরের দরজায় নক করে বললেন, ‘আসব নিপুণ।’ নিপুণ উঠে বসল। সোমনাথ ঘরে ঢুকে চেয়ার টেনে বসলেন, ‘আজ কেমন আছ?’
নিপুণ সামান্য ঘাড় নাড়ল, ‘ভালো আছি স্যার।’
সোমনাথ বললেন, ‘কী লাভ হল নিপুণ?’
নিপুণ জিজ্ঞাসু চোখে সোমনাথের দিকে তাকাল।
সোমনাথ বললেন, ‘তোমার মতো আমিও স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলাম। কাল কলেজে রাশেদরা আমাকে হুমকি দিয়ে বলল পদত্যাগ করতে হবে। আমরা কি এই বাক স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছিলাম? আমিই তোমাকে বলেছি ভয় পেও না। গলা তুলে প্রতিবাদ করো। আজকাল বড়ো অপরাধী মনে হয় নিজেকে। তোমার এই পরিস্থিতির জন্য আমিই দায়ী।’
নিপুণ বলল, ‘না স্যার। আমি কোনো ভুল করিনি। আপনিও ঠিক শিক্ষা দিয়েছেন। সত্যি কথা বলার শাস্তি যদি পেয়ে থাকি, তাহলেও আমার তাতে কোনো লজ্জা নেই। রাশেদরা তো স্যার আগের দলেরই নেতা ছিল। এখন কি আবার…’
সোমনাথ ম্লান হাসলেন, ‘হ্যাঁ। এটাই এখানকার রাজনীতির বাস্তবতা। সঠিক সময়ে জামা পালটানোটাই রাজনীতির জগতে আসল কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার আজকাল লজ্জা লাগে, কী যে শেখালাম ছাত্রদের! কিছুই ঠিক শিখাইনি মনে হয়। সব ভুল হয়ে গেছে… সব।’
দু-জনেই চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। এক সময় নিপুণ নীরবতা ভঙ্গ করে বলল, ‘স্যার, বাবাকে আমি মিথ্যে বলেছি। আমার সেলে যে লোকটা ছিল, তার নাম আমি জানি না। কিন্তু সে রোজ মার খেয়ে আসত, আর একটাই কথা বলত, বেশিদিন না, খুব তাড়াতাড়ি সবাই আয়নাঘর থেকে ছাড়া পেয়ে যাবে। প্রায় তিন মাস আগে থেকে লোকটা একই কথা বলে যেতো। আমরা ছাড়া পেয়ে গেলাম। লোকটাকে আমি আর দেখিনি। ওরা কি জানত এটা হবে?’
সোমনাথ অবাক হলেন না। তিনিও কি আঁচ পাননি?
১৯
॥ সিলেট।
মোস্তাককে উলটো করে টাঙিয়ে রাখা হয়েছে। সে মাঝে মাঝেই কাশছে। কাশির সঙ্গে মুখ থেকে রক্ত বেরিয়ে আসছে। তবে মোস্তাকের বয়স হলেও সে যথেষ্ট শক্তপোক্ত। এসবে তার বিশেষ কোনো সমস্যা হচ্ছে বলে মনে হয় না।
একটা কম ওয়াটের বাল্ব জ্বলছে ঘরে।
দরজা খুলে আনোয়ার ঢুকল।
আনোয়ার চেয়ার টেনে বসে গলা ছেড়ে ডাকল, ‘ওই কে আছিস, মোস্তাকরে নামায় মেঝেয় বসা।’
দু-জন এসে মোস্তাককে মেঝেয় বসালো। মোস্তাক কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, ‘জনাব, আমারে মেরে কী হবে?’
আনোয়ার বলল, ‘আমি শুধু একটা প্রশ্নের উত্তর চাই। তুই তোর কোচ নাম্বার কাকে দেখিয়েছিলি? তুই এমনিতেই বড়ো বাচাল, ট্রেনে ওঠার সময় কাউকে বলেছিলিস?’
মোস্তাক জোরে জোরে মাথা নেড়ে বলল, ‘না জনাব। আমি কথা বেশি কই, কিন্তু কাউরে বলার লোক আমি না। গুফন কথা আমার কাছে গুফনই থাকে।’
আনোয়ার বলল, ‘ভালো করে বল মিয়াঁ। তোর উত্তরের উপরে অনেক কিছু নির্ভর করছে। মনে করে দেখ।’
মোস্তাক আবার মাথা নাড়ল, ‘আপনারে ছাড়া আমি কাউরে বলি নাই। একবার শুধু আপনেরে ফোন করসিলাম।’
আনোয়ার বলল, ‘হুঁ, তা ঠিক। তুই আমাকে ফোন করেছিলি।’
মোস্তাক এবার সাহস পেল, ‘জনাব, আমি মিথ্যা কথা কই না। এত বড়ো বড়ো কাম করসি, আপনি জানেন আমি কত ছিরিয়াছ।’
আনোয়ার চোখ ছোটো ছোটো করে কয়েক সেকেন্ড ভেবে উঠে দাঁড়াল, ‘ওই কে আছিস, মোস্তাকরে পেইন কিলার দে।’
.
ঘরের বাইরে গেল আনোয়ার। পকেট থেকে ফোন বের করে গম্ভীর মুখে কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে থেকে নিজের মনে বলল, ‘ট্যাপ করছে।’
স্যাটেলাইট ফোন বের করে ফোন করল। ওপ্রান্ত থেকে ফোন রিসিভ হল সঙ্গে সঙ্গে, পুস্তু ভাষায় ভেসে এল, ‘কিছু বলল?’
আনোয়ার পুস্তুতেই উত্তর দিল, ‘ও বলেনি। আমি নিশ্চিত। ওরা ফোন ট্যাপ করছে।’
‘ফোন ট্যাপ করছে মানে? ওভাবে ট্যাপ করা যায় নাকি?’
‘করছে কোনোভাবে। যেটা আমরা ভাবতেই পারছি না।’
‘হুঁ। ঠিক আছে। জানাচ্ছি মৌলানাকে।’
‘জানিয়ে কী হবে? ওরা যদি এভাবে ফোন ট্যাপ করতে পারে, তাহলে তো আমরা কোনোভাবেই আর অপারেট করতে পারবো না। সব কিছুর বারোটা বেজে যাবে। সবার হাতে তো আর স্যাটেলাইট ফোন দেওয়া সম্ভব না।’
‘ঠিক আছে। উত্তেজিত হতে হবে না। এখন কিছুদিন চুপ করে থাকা যাক। আমি ইসলামাবাদে জানাচ্ছি। আই এস আই-এর উপর ভরসা করা যাক।’
আনোয়ার ফুঁসে উঠল, ‘আই এস এর অত ক্ষমতাই নেই। এটা ওদের আগে জানার কথা ছিল। আপনি অন্য কোনো উপায় ভাবুন।’
‘জানাবো। তবে ওভাবে ট্যাপ করা সম্ভব না। তুমি বেশি ভাবছ। হতে পারে ওই ছেলেটা বলেছে। কী নাম যেন?’
‘সোহরাব।’
‘হ্যাঁ, ও বলতে পারে। একা মোস্তাকের উপর সন্দেহ করার কোনো মানে নেই।’
‘হতে পারে মোস্তাক বিক্রি হয়ে গেছে। সোহরাবকে ধরিয়ে দিয়েছে।’
‘না। হতে পারে না। নজর রাখো সব দিকে।’
‘জি জনাব।’
ফোন রাখল আনোয়ার। অস্বস্তি হচ্ছে। মনে হচ্ছে তাকে কেউ দেখছে। ফোনে আর কিছু বলা যাবে না এরপরে। মোস্তাককে কাঁধে করে ফার্স্ট এইড সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মোস্তাক বমি করছে এবার। মরে যাবে নাকি? আনোয়ার চিৎকার করে ওদের নির্দেশ দিল যাতে মোস্তাককে সাবধানে নিয়ে যাওয়া হয়।
বাংলাদেশে আই এস আই-কে পুনরুজ্জীবিত করতে আনোয়ার নিরলস প্রচেষ্টা করে গেছে। যে সময়টা আই এস আইয়ের অস্তিত্ব বিপন্ন হবার উপক্রম হয়েছিল, তখনও আনোয়ার দাঁতে দাঁত চেপে টিকে ছিল এই অঞ্চলে। গোটা দেশটাকে সে হাতের তালুর মতো চেনে। মোস্তাকদের মতো সবাইকেই।
সে প্রথম থেকেই জানত মোস্তাক মিথ্যে বলছে না। তবু ঝুঁকি নেয়নি। এখন বুঝতে পারছে, ইন্ডিয়ান ইন্টেলিজেন্সই খবরটা পেয়েছিল।
সে চেয়ারে বসে পা দোলাতে শুরু করল। এবার সব কিছু নতুন করে ভাবা শুরু করতে হবে তাকে। দরকার হলে কয়েকটা ঘুঁটি ঘরে ফিরিয়ে এনে আবার আক্রমণে যেতে হবে। কীভাবে? চোখ বন্ধ করল সে। চোখ বন্ধ করে ভাবতে খুব ভালোবাসে আনোয়ার…
