আয়নাবাড়ি – ৩০

৩०

॥ ঢাকা।।

রাত এগারোটা। সোমনাথ টিভির সামনে বসে আছেন। নিপুণকে দু-বার ফোন করেছেন। ফোন সুইচড অফ বলছে। প্রিন্সিপাল সাহেব কোনোদিন ফোন অফ করে রাখেন না, কেন অফ করে রেখেছেন বুঝতে পারছেন না।

বীথি শুয়ে পড়েছেন। ফ্ল্যাটের কয়েকজন মিলে নাইট গার্ডের ব্যবস্থা করেছে। রাতে অনেক জায়গা থেকেই ডাকাতির খবর আসছে।

সোমনাথ জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। দূরে কোথাও একটা আগুন জ্বলছে। আবার কারো বাড়ি পুড়িয়ে দিল ওরা? দেশটা চোখের সামনে বসবাসের অযোগ্য হয়ে গেল। এবং এর জন্য তিনিও দায়ী।

কলিং বেল বেজে উঠল।

সোমনাথ অবাক হয়ে দরজা খুলে দেখলেন এক তেইশ-চব্বিশ বছরের ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। ছোটোখাটো চেহারা। মুখে দাড়ি। হাতে একটা ব্যাগও আছে। সোমনাথ বললেন, ‘এত রাতে… কী চাই?’

ছেলেটা বলল, ‘স্যার আমি আপনার গ্রাম থেকে পালিয়ে এসেছি। আমাকে দু-রাতের জন্য আশ্রয় দিতে হবে।

সোমনাথ সঙ্গে সঙ্গে দরজা থেকে সরে দাঁড়ালেন, ‘এসো।’

ছেলেটা ঘরে ঢুকতে তিনি দরজা বন্ধ করে বললেন, ‘নীচে কেউ ছিল না?’

‘না স্যার। আমাকে আপনার ঠিকানা দিয়েছিল পরিমলকাকা। আমি সেই দুপুরে বেরিয়েছি। গ্রামে আমাদের বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে ওরা। এখন আমাকে খুঁজছে।’

সোমনাথ পরিমলের নাম শুনে বললেন, ‘পরিমলের কী খবর?’

ছেলেটা বলল, ‘ওই কোনোমতে টিকে আছে স্যার। আমি কোনোমতে গা ঢাকা দিয়ে এতদূরে চলে এসেছি। আসলে আমার কাকার বাড়িতে যখন ওরা আগুন দিতে এসেছিল, আমি ওদের বাধা দিয়েছিলাম। ওরা অনেকে ছিল। পারিনি। সকালে শুনছি ওরা দল পাকাচ্ছে আমাকে মারবে বলে। পরিমলকাকাই তখন বললেন এখানে চলে আসতে।’

সোমনাথ বললেন, ‘ঠিক আছে। তুমি নিশ্চয়ই কিছু খেয়ে আসোনি। বোসো আমি দেখছি কী করা যায়।’

ছেলেটা মাথা নীচু করে বসে আছে। সোমনাথ বীথিকে ডাকলেন। বীথি ঘুম জড়ানো চোখে সব শুনে বললেন, ‘বিশ্বাস করা যায় তো?’

সোমনাথ বললেন, ‘সে তো করতেই হবে। বিশ্বাস না করে কী করবে? তা ছাড়া আমাদের কাছে আছেটা কী, যে চুরি-ডাকাতি করতে আসবে?’

বীথি শ্বাস ছাড়লেন, ‘তাও ঠিক। দেখি।’ বীথি উঠে ফ্রিজে যা যা ছিল, গরম করে ছেলেটাকে খেতে দিলেন। ছেলেটা গোগ্রাসে খেয়ে নিল।

বীথি বললেন, ‘তোমার নাম কী বাবা?’

ছেলেটা বলল, ‘জয়দেব।’

বীথি বললেন, ‘গ্রামের অবস্থা কি খুবই খারাপ?’

ছেলেটা ঘাড় নাড়ল, ‘সত্যিই খুব খারাপ। কবে আবার সব ঠিক হবে জানি না। এমনিতেই ওদের নজর ছিল আমাদের উপর, যখনই চারদিকে ঝামেলা শুরু হয়েছে, ওরা সুযোগ বুঝে লোক নিয়ে হামলা করেছে। সম্পত্তি থেকে শুরু করে গয়নাগাটি লুঠপাঠ তো আছেই।’

সোমনাথ বললেন, ‘হু, টাইম অফ কমপ্লিট অ্যানার্কি। তুমি খেয়ে ছোটোঘরটায় শুয়ে যাও। এখানেই থাকো ক-টা দিন। পরিমল এলে ভালো হত।’

জয়দেব ম্লান হাসল, ‘কাকাবাবু কিছুতেই ভিটেমাটি ছেড়ে কোথাও যাবে না বলে দিয়েছে। বলেছে দরকার হলে মরে যাব, কিন্তু এই জমি ছেড়ে আমি কোথাও যাব না। এত কিছু সহ্য করেছি, ঠাকুরদা দেশভাগ দেখেছে, কাকাবাবু খানসেনার অত্যাচার দেখেছে। সব সহ্য করার পরেও যখন টিকে থাকতে পেরেছি, এখনও থাকব। তা ছাড়া সবাই তো শত্রু না। গ্রামের অনেকে কাকার পাশেও আছে।’

সোমনাথ বললেন, ‘দেখা যাক কী হয়। যেভাবে চারদিকে সব কিছু চলছে, তাতে আমি কিছুই ভরসা পাচ্ছি না। আমার তো তেমন কেউ চেনাজানাও নেই। যদি পুলিশ বা আর্মিতে আমার চেনা কেউ থাকত, আমি পরিমলের জন্য বলতাম। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এত বছর পরেও তেমন পরিচিতি তৈরি করতে পারলাম না। আমার ছাত্ররাও মনে হয় আমাকে ভুলে গেছে। যাই হোক, তুমি শুয়ে পড়ো বাবা। এখানে অন্তত একটা রাত নিশ্চিন্তে ঘুমোও। যা পেরিয়ে এসেছ, ভাবলেই আমি শিউরে উঠছি।’

জয়দেবকে ঘরটা দেখিয়ে দিলেন সোমনাথ। তাদের ঘরে এসে বীথি বললেন, ‘আমরা শহরে আছি ভাগ্যিস।’

সোমনাথ বললেন, ‘বেঁচে গেছি বলছ? কে জানে, এভাবে বেঁচে থাকাটাকে কি আর বেঁচে থাকা বলে? এখনও আর কী কী দেখার আছে কে জানে!’

৩১

।। দিল্লি।

রাত এগারোটা বাজে। আর পি এখনও বাড়ি যাননি। ভূমিকাকে ফোন করে বলে দিয়েছেন খেয়ে ঘুমিয়ে পড়তে। প্রশান্তের পাশেই বসে আছেন সন্ধ্যে থেকে। প্রশান্ত একটানা ডিউটি করছে আজ। একবারে ভোর হলে পরের শিফটে হ্যান্ড ওভার করে দিয়ে যাবে।

প্রশান্ত বলল, ‘স্যার, বানশালের বাড়ি থেকে একবার ফোন করেছিল। বানশালের ফোন সুইচড অফ পেয়েছে। এই লোক এতক্ষণ ধরে হোটেলের রুমে কী করছে? কোনো স্পেশাল ওষুধ খেয়ে এসেছে নাকি?’

আর পি বললেন, ‘দীপ্তি পিজিতে ফিরেছে? দেখে নিয়েছ?’

প্রশাস্ত বলল, ‘হ্যাঁ। ফিরেছে। আশা করছি এটা কোইন্সিডেন্স ছিল।’

আর পি কাঁধ ঝাঁকালেন, ‘জানি না বিদুর স্যার কী ভাবছেন, আমি হলে বানশাল আর রশ্মিকাকে তুলে নিতাম এতক্ষণে।’

কথাটা বলেই আর পি দেখলেন কাচের দরজার ওপাশে বিদুর এসে দাঁড়িয়েছেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে উঠে দরজা খুলে বললেন, ‘সারপ্রাইজ দিয়ে দিলেন যে স্যার??’

বিদুর বললেন, ‘বানশাল বেরোয়নি তো?’

আরপি বললেন, ‘না বেরোয়নি।

বিদুর প্রশান্তের পাশের চেয়ারে বসলেন। ভ্রূ কুঁচকে কিছুক্ষণ মনিটরের দিকে দেখে বললেন, ‘রশ্মিকার সঙ্গে শুধুমাত্র সময় কাটাতে ও যায়নি। ওরা এখান থেকে সিকিয়োর লাইনে বাংলাদেশ যোগাযোগ করছে। ইসলামাবাদে যোগাযোগ করছে। ভিডিয়ো কনফারেন্সিং চলছে।’

প্রশান্ত অবাক হল, ‘আমরা তো কোনো কিছু পেলাম না!’

বিদুর বললেন, ‘পাবে না। ওরা স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক ইউজ করছে।’

আর পি বললেন, ‘আমরা কি অপেক্ষা করব?’

বিদুর পকেট থেকে পেন ড্রাইভ বের করে প্রশান্তের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এটায় বানশালের নামে চার্জশিটের একটা ড্রাফট বানিয়ে এনেছি। রেডি করো। দুটোকেই এখন অ্যারেস্ট করা হচ্ছে। আপাতত তুলে নিয়ে আসা হোক। আজ রাতটা এদের জেরা করে কাটাব।’

আর পি একটু চমকালেন, ‘এতক্ষণ যে স্যার বলছিলেন অ্যারেস্ট করবেন না?’

বিদুর হাই তুললেন, ‘মিনিস্ট্রি পারমিশন নেবার ছিল। গ্রিন সিগনাল পেয়ে গেছি। এবার তোলাই যায়।’

প্রশান্ত বলল, ‘এটিবির টিম রিসেপশনে পৌঁছে গেছে। ওরা এবার লিফটে উঠবে।’

বিদুর বললেন, ‘হ্যাঁ, এখনই ধরবে। প্রেসকে জানানো যাবে না বলে রাতে রেইড হল। আর পি, একবার স্মোকিং জোনে এসো।’

আর পি বলল, ‘হ্যাঁ স্যার। চলুন।’

দু-জনে মিলে স্মোকিং জোনের দিকে রওনা হলেন। আর পি উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন, ‘দিস ইজ বিগ স্যার। সমস্যা হল, আই এস আই যদি বুঝে যায় আমরা বানশালের ফোন থেকে সব কিছু করেছি, তাহলে ওরা সতর্ক হয়ে যাবে।’

বিদুর সিগারেট ধরিয়ে বললেন, ‘বুঝবে না। সেভাবেই সব সাজানো চলছে। ভেবো না। তুমি জেরার সময় থাকবে তো? নাকি রেস্ট করবে? সারাদিন মনিটরের সামনে বসে থাকাটা ভীষণই হেকটিক।’

আরপি বললেন, ‘না না স্যার। আমি থাকব। দীপ্তিকে কি আপনিই পাঠিয়েছিলেন?’

বিদুর হাসলেন, ‘হ্যাঁ, রিসেপ্টরের সিগনাল পাচ্ছিলাম না। ও তো প্রায়ই এদিক- সেদিক যাচ্ছে বয়ফ্রেন্ডকে নিয়ে। আজকেরটা আমি স্পন্সর করে দিলাম।’

আর পিও হেসে ফেললেন, ‘দিস ইজ ক্রেজি। আপনার মাথায় যে কখন কী চলে কিছুই বোঝা সম্ভব না। স্যাটেলাইট কল ইন্টারসেপ্ট করার বিটা ভারসানটার কথা শুনেছিলাম, আপনি সেটাকে বানশালের জন্যই যত্ন করে রেখেছিলেন, ভাবতে পারিনি।’

বিদুর বললেন, ‘হুঁ ট্রায়াল রানে আছে। এর অনেক দাম। মিনিস্ট্রি টানাপোড়েনে আছে, গ্র্যান্ট নাও হতে পারে। আপাতত আমি ইউজটা করে নিলাম। পরে কিনবে নাকি সেটা দেখা যাবে।’

বিদূরের ফোন বেজে উঠল। বিদুর ফোন রিসিভ করে বললেন, ‘হ্যাঁ রাজপুত, বলো… নাহ, ওকে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র করার জন্য ধরা হয়েছে, ওকে সেটা ইনফর্ম করে দাও,

দু-জনকেই, ল ইয়ার অ্যালাউ করা হবে না। তুলে নিয়ে এসো। না এলে মারতে মারতে নিয়ে এসো স্কাউভেলদুটোকে। হ্যাঁ, আমাদের কাছেই আনো। গুড জব।’

ফোন রেখে বিদুর হাসলেন, ‘বানশাল ল ইয়ারের বায়না করছে। ভাবতে পারেনি এভাবে ধরা খাবে। আজকের দিনটা ভালো গেল আর পি। এবার তুষারকে ফোন করি। অনেকদিন তুষারের সঙ্গে কথা হয় না…’

৩২

॥ ঢাকা।।

রাত সাড়ে এগারোটা।

মুস্তাকিন তার ড্রইংরুমে চুপ করে বসে আছেন। আনোয়ার আসবে, ফোন করেছিল। বিরক্ত লাগছে। এখন মনে হচ্ছে এসবে না ঢুকলেই ভালো হত। এখন আনোয়ারের হাতের পুতুল হয়ে থাকতে হবে।

ক্যামেরায় দেখাচ্ছে আনোয়ারের গাড়ি তার বাড়ির চৌহদ্দিতে ঢুকল। তিনি নিজেই বেরিয়ে দরজা খুললেন। আনোয়ার বাড়িতে প্রবেশ করে বলল, ‘বাঃ, এ তো দেখছি রাজপ্রাসাদ। বাড়ির বাইরেটা যেমন আলিশান, ভেতরটা আরও বেশি। সিনেমায় এ-রকম বাড়ি অনেক দেখেছি।’

মুস্তাকিন বললেন, ‘ভেতরে আসুন।’

আনোয়ার ড্রইংরুমে এসে বসল। মুস্তাকিন বললেন, ‘উপদেষ্টা সাহেব তখন হঠাৎ করে চলে গেলেন, আমি ভাবলাম কী হল। পরে দেখলাম আপনার গাড়ি।’

আনোয়ার বলল, ‘হ্যাঁ। আমার একটা জরুরি কথা মনে পড়ে গেছিল। তা চিফ সাহেব আপনাকে সব বুঝিয়ে দিয়েছেন তো?’

মুস্তাকিন বললেন, ‘হ্যাঁ, বুঝিয়েছেন। আমি কাল দফতরে জয়েন করব।’

আনোয়ার বলল, ‘পাকিস্তান হাই কমিশনে আপনার ডিটেলস পাঠাতে হবে। এখান থেকেই সব কিছু প্রসেস হয়ে যাবে। যা ডকুমেন্ট লাগবে, তা তাড়াতাড়ি পাঠিয়ে দেবেন।’

মুস্তাকিন বললেন, ‘জি, সেটা বুঝতে পেরেছি। যা যা লাগবে, তার সব আমি দিয়ে দেবো।’

আনোয়ার সিগারেট ধরালো অনুমতি না নিয়েই। মুস্তাকিন অ্যাস্ট্রেটা এগিয়ে দিলেন। আনোয়ার বলল, ‘মুস্তাকিন সাহেব, ইন্ডিয়াকে যারা হালকা ভাবে নেয়, তারা গাধা। আপনি নিচ্ছেন না তো?’

মুস্তাকিন বললেন, ‘ইন্ডিয়াকে আমি ঘোষিত শত্রু হিসেবে দেখিনি কোনোদিন

আনোয়ার বলল, ‘জানি। কিন্তু এখন আপনাকে ইন্ডিয়া সেটাই মনে করবে। র আপনার উপর নজরদরি করবে। যে গর্দভরা মনে করে ঢাকায় র নেই, তারা মূর্খের স্বর্গে বাস করবে। এই মুহূর্তে ওরা স্ট্র্যাটেজির লড়াইতে হেরে গেছে, ঠিক এই কারণে র আরও অ্যাগ্রেসিভ হবে। আপনি এখন এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ মুখ। ইন্ডিয়া কিন্তু আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করবে। এর আগে যখন আপনি ক্ষমতায় ছিলেন, ইন্ডিয়ার কে কে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ রাখত?’

মুস্তাকিন বললেন, ‘তেমন কেউ না। মাঝে মাঝে মিটিঙের জন্য দিল্লি যেতাম, আমার সঙ্গে ওদের তেমন কোনো দহরম-মহরম নেই।

আনোয়ার সিগারেটের ছাই অ্যাস্ট্রেতে ফেলে মাথা নাড়ল, ‘হয় আপনার স্মৃতি বিভ্রম হয়েছে, নয় আপনি মিথ্যে বলছেন। মনে করে দেখুন। তখন ইন্ডিয়ান ডেপুটি হাইকমিশনারের সঙ্গে আপনার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। ইলিশ-টিলিশ দিয়েও এসেছিলেন। আপনি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বই ভালোবাসতেন বলে ওই ভদ্রলোক আপনার জন্য সুনীলবাবুর সব বই নিয়ে এসেছিলেন। এবার কি মনে পড়ছে?

মুস্তাকিন চমকালেন না। আই এস আই খবর নিলে এভাবেই নেবে, এ নিয়ে ঘাবড়োনোর কিছু নেই। বললেন, ‘হ্যাঁ, কিন্তু উনি তো র-এর লোক ছিলেন না। ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভালো থাকতেই পারে।’

আনোয়ার হাসল, ‘জনাব, আপনিও জানেন, আমিও জানি, এই প্রতিনিধিরা আসলে কারা হয়। ইন্টেলিজেন্স থেকেই এদের রিক্রুট করা হয়। কাকে বোকা বানাচ্ছেন, আমাকে না নিজেকে?

মুস্তাকিন বললেন, ‘আপনি যেখান থেকে খবর পেয়েছেন, সেই একই সোর্স আপনাকে জানায়নি শেষ কয়েক বছর আমার সঙ্গে কোনো ইন্ডিয়ানেরই কোনো যোগাযোগ নেই?’

আনোয়ার বলল, ‘রাগ করবেন না। রাগের মতো কিছু বলিনি। হ্যাঁ, আমার সোর্স সেটা আমাকে বলেছে। আপনি ক্লিন। এই জন্যই এত বড়ো পদে আপনাকে আনা হয়েছে। আশা করি তার মর্যাদা রাখবেন।’

মুস্তাকিন বললেন, ‘আপনি বারবার একই কথা বলে যাচ্ছেন। মর্যাদা না রাখতে পারলে আমাকে কেন নির্বাচন করলেন?’

আনোয়ার উঠে দাঁড়াল, ‘এটাই শোনার ছিল। শুক্রিয়া জনাব। কালকের জন্য বেস্ট অব লাক। ইনশাল্লাহ সব ভালো হবে কাল। আমার শুধু এটুকুই বলার ছিল, র-এর সঙ্গে যেন কোনো যোগাযোগ না থাকে। প্রধান উপদেষ্টা সাহেবও আমাকে সেটাই বললেন, আপনাকে যেন কথাটা বলে দেওয়া হয়। উনি তো এ দেশের সবাইকে চেনেন না!’

মুস্তাকিনের রাগ হল। প্রকাশ করলেন না। উপদেষ্টা সাহেব তাকে চেনেন না অথচ আনোয়ারকে চেনেন। এর থেকে দুর্ভাগ্যজনক কথা আর কী হতে পারে?

.

রাখি শুয়ে ছিল। বাবা দরজায় নক করল। রাখি উঠে বসে দরজা খুলে দিল।

বাবা ঘরে ঢুকে তাকে দেখে বলল, ‘তোর অবস্থা তো খুব খারাপ রে মা!’

রাখি বলল, ‘হ্যাঁ, কলেজে যা চলছে। এ-রকমই হবার ছিল বাবা।

বাবা চেয়ার নিয়ে বসে বলল, ‘এই দেশ থেকে আমরা চলে যাব এবার। আর থাকব না। আমার দুটো দোকান পুড়িয়ে দিয়েছে। ব্যবসা যা যা চলছিল, সব লালবাতি জ্বালিয়ে দিয়েছে। এই দেশে আর থাকার কোনো উপায় নেই আমার। আমি ভারতে কথা বলেছি। আমাদের দেশ ছাড়তে হবে। একটা ব্যাগের মধ্যে জামাকাপড় যা আছে গুছিয়ে রাখ। যে কোনো দিন, যেকোনো সময় গ্রিন সিগন্যাল পেলেই আমরা পালাব। ঠিক আছে?’

রাখি ঘাড় নাড়ল। এই দিনটা যে একদিন আসবে, তার আগেই বোঝা উচিত ছিল।

৩৩

।। দিল্লি।।

পি বি বানশাল। পঞ্চান্ন বছর বয়স। দেশের একজন নাম করা ব্যবসায়ী ছিল। তাকে তুলে নিয়ে এসে ইন্টারোগেশন চেম্বারে বসিয়ে রাখা হয়েছে। বিদুর ঠিক করেছেন রশ্মিকাকে

সকালে জেরা করবেন। তাকে আলাদা ঘরে রেখে দেওয়া হয়েছে।

বানশাল চোখ লাল করে বসে আছেন। বিদুর চেম্বারে ঢুকতেই বানশাল বললেন, ‘এসব কী হচ্ছে? আমাকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে কেন?’

বিদুর তার আই কার্ডটা পকেট থেকে বের করে এগিয়ে দিলেন, ‘দেশের নিরাপত্তার ব্যাপারে ডাকা হয়েছে বানশাল সাহেব। পার্টি করতে আনা হয়নি।’

বানশাল বিদুরের আই কার্ড দেখে বললেন, ‘নিরাপত্তা? কেন? আমি কী করেছি?’

বিদুর চেয়ারে বসে বললেন, ‘আপনি কী করেছেন, তা না লুকিয়ে যত তাড়াতাড়ি বলে ফেলবেন, আমাদের তত সুবিধা। আপনি নিজেও জানেন আপনি কী করেছেন। এবার তাড়াতাড়ি বলে ফেলুন। আপনিও রাতে ঘুমোতে পারবেন, আমরাও পারব।’

বানশাল রেগে গেলেন, ‘আপনি দেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ লোকের সঙ্গে এভাবে কথা বলতে পারেন না। আমাকে আমার ল ইয়ারের সঙ্গেও কথা বলতে দেওয়া হচ্ছে না। এর ফল ভালো হবে না।’

বিদুর হাসলেন। বানশাল বললেন, ‘কী হল? হাসছেন কেন?’

বিদুর বললেন, ‘আপনাকে মেরে আপনার লাশ গুম করে দিনের পর দিন রেখে দিতে পারি। কেউ জানবে না। দেশের স্বার্থ যেখানে জড়িত, সেখানে কোনো প্রভাব কাজ করে না। আপনি আমাদের কর্ম প্রণালী সম্পর্কে হয় জানেন না, নয় সব জেনে না জানার ভান করে রয়েছেন। আমাকে কি কিছু বলতে হবে?’

বানশাল চুপ করে রইলেন। বিদুর বললেন, ‘বলুন, আমন খান আপনাকে কী নির্দেশ দিল?’

বানশাল চমকে গেলেন, বিদুর বললেন, ‘আনোয়ারই বা কী বলল? আমি সবই জানি, শুধু আপনার থেকে শুনতে চাইছি।’

বানশাল বললেন, ‘আপনারা ফোন ট্যাপ করছেন, ইন্টারনেট অবধি… মাই গড।’

বিদুর বললেন, ‘হ্যাঁ, আমরা এখন বেশি কাঁচা কাজ করি না। সব পাকাপোক্ত কাজ সুতরাং বুঝতেই পারছেন আপনি বেশিক্ষণ সব কিছু অস্বীকার করে থাকতে পারবেন না। তাড়াতাড়ি বলুন।’

বানশাল মাথা নীচু করে বসে রইলেন।

বিদুর বললেন, ‘বলুন।’

বানশাল বললেন, ‘আপনি জানেন না, এখানে দেশের অনেকেই জড়িত আছে। আমি সামনে এক্সপোজ হয়ে গেছি। কিন্তু বাকিদের নাম বললে আপনি চেয়ার থেকে পড়ে যাবেন।’

বিদুর ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘আমার শুধু আপনার স্টেটমেন্ট লাগবে। তাড়াতাড়ি দিন।’

বানশাল বললেন, ‘কী জানতে চান বলুন।’

বিদুর বললেন, ‘আনোয়ারের সঙ্গে আপনার রিলেশন কী?

বানশাল বললেন, ‘বিজনেস ট্রাঞ্জাকশন। আমার…’

বিদুর বললেন, ‘ওমানের ব্যবসার মাধ্যমে পাকিস্তানের সঙ্গে আপনার যোগ। ওদের ফান্ডিংও করেন আপনি। এর অর্থ হয়, বাংলাদেশে যা হয়েছে, তাতে আপনার ফান্ডও আছে। টাকার জন্য দেশকে বেচতে দু-বার ভাবেননি।

বানশাল মাথা নাড়লেন, ‘ভুল করছেন, এখানে দেশ কখনোই ছিল না। আমি এখানে খুব একটা সুবিধা করতে পারছিলাম না বলেই ওমানে গেছিলাম। সেখানে কাকতালীয় ভাবে পাকিস্তানি ক্লায়েন্টের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল। পরে জড়িয়ে পড়লাম। আমি না চাইতেও জড়িয়ে গেছি।’

বিদুর বললেন, ‘এইগুলো আমি জানি। আপনি বলুন আনোয়ার বা আই এস আই এখন কী চাইছে?’

বানশাল বললেন, ‘ফান্ড চাইছে। বদলে বাংলাদেশে আমাদের কোম্পানিকে ঢুকতে দেবে। আগের সরকারের আমলে সব কিছুই বি এল গ্রুপ দখল করে রেখেছিল। আমি তখন কোনোভাবেই সুবিধা করতে পারিনি। আনোয়ার বলছে আমাকে ওরা এন্ট্রি দেবে। আমার কনস্ট্রাকশন কোম্পানি সরকারি বরাতগুলো পাবে। কিন্তু তার পরিবর্তে আনোয়ার এখনই গ্যারান্টি মানি চাইছে।’

বিদুর বললেন, ‘কত টাকা?’

বানশাল একটু থেমে বললেন, ‘দেড়-শ কোটি টাকা।’

বিদুর অবাক হয়ে গেলেন, ‘এত টাকা আছে আপনার কাছে?’

বানশাল বললেন, ‘না। আমার কোম্পানি লোনে ডুবে আছে। আমাকে লোন রিস্ট্রাকচারিং করিয়ে টাকার ব্যবস্থা করতে হবে। তার জন্য মাস খানেক সময় লাগবে। আমি সে কথাই ওকে বলেছি। ও শুনতে চাইছে না। বলছে ওকে দেশের প্রধান উপদেষ্টাকে টাকাটা দিতে হবে। উনি গ্রিন সিগনাল দিলেই সব হবে। আমি পঞ্চাশ অবধি দিতে পারব বলেছি। শুনছে না।’

বিদুর বললেন, ‘হুঁ, টেরর ফান্ডিং-এর জন্য টাকাটা খুবই কম। ওদের এত কমে পোষাবে না। আপনি ছাড়া আর কার কথা বলেছে?’

বানশাল বললেন, ‘বলেনি। আমি কালকের মধ্যে না দিতে পারলে বলবে।’

বিদুর উঠে দাঁড়ালেন, ‘ওকে। আপনি রেস্ট করুন। আর ভাবুন টাকাটা কী করে জোগাড় করবেন।’

বানশাল অবাক হলেন, ‘জোগাড় করব? মানে এখনও ভাবব?’

বিদুর বললেন, ‘হ্যাঁ, সকালে শুনব কী ভাবলেন। গুড নাইট বানশাল সাহেব।’

বিদুর চেম্বার থেকে বেরিয়ে গেলেন….

৩৪

।। ঢাকা।।

রাত তিনটে। আনোয়ার উঠে বসে আছে। ফোনটা টেবিলে আছে। উঠে চেয়ার টেনে বসল সে। ফোন হাতে নিয়ে ফোন করল।

ওপ্রান্তে রিং হবার সঙ্গে সঙ্গেই ফোন রিসিভ হল, ‘বলো।’

‘এত রাতে ফোন করে বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত জনাব।’

‘দুঃখিত হবার কিছু নেই। তুমি তো অকারণে ফোন করবে না। বলো কী বলবে।’

‘বানশাল ধরা পড়েছে জনাব।’

‘সেকি?’

‘জি জনাব। আমার কাছে কিছুক্ষণ আগে মেসেজ এসেছে। আমি ঠিক করেছিলাম সকালে ফোন করব আপনাকে। কিন্তু ঘুম আসছে না। অনেকগুলো ডলার ওর মাধ্যমে আমাদের কাছে আসার কথা ছিল। এখন কী করব, মাথায় আসছে না।

‘হ্যাঁ, এটা খুব বড়ো একটা সেটব্যাক তো বটেই। তবে এতে আমাদের কোনো অসুবিধা হবে না। তুমি ওয়াকার সাহেবকে দিয়ে ফান্ড অ্যারেঞ্জমেন্ট করতে পারবে। ওকে জানাও, তোমার কত ডলার লাগবে।’

‘স্যার… সবে ক্ষমতায় বসেছেন। আমি কিছুটা বলেছি। তবে এখনই ওকে এত চাপ দেওয়াটা কি ঠিক হবে?’

‘সেটা ওকে বুঝতে দাও। ওর কাজ এখন আমাদের রক্ষা করা। আমাদের গাছে জল দেওয়া। সেটা উনি কী করে করবেন, ওর উপরে ছেড়ে দাও। মুস্তাকিন ঠিক আছে তো?’

‘জি ঠিক আছে জনাব। কিন্তু আমার ঠিক লাগছে না জনাব। ওরা মোস্তাককে ইন্টারসেপ্ট করতে পারল, বানশালকেও ধরে নিল, আমাদের ভেতর থেকে কোনো খবর লিক হচ্ছে না তো?’

‘হোপফুলি না। তাও আমি দেখছি। তোমার ওই ছাত্রগুলো বিশ্বাসযোগ্য?’

‘একবারেই না স্যার। বেশিরভাগই সুবিধাবাদী পরিবারের ছেলে। সারাক্ষণ টাকা মেরে কী করে নিজেদের আলাদা করে নেওয়া যায়, সেই ধান্দায় থাকে।’

‘ভালো তো। এই গুণের জন্যই তো তুমি ওদের কাজে লাগাতে পেরেছিলে। এখন রেগে গেলে চলবে? তুমি আগে নিজের মাথা ঠান্ডা করো। আমার মনে হয় তুমি একটু রেস্টলেস হয়ে পড়েছ।’

‘পড়ছি কারণ এই ছেলেগুলো এখন থেকেই কোরাপ্টেড। আমরা যেটা ভেবেছিলাম, একবারেই না। ফান্ড পেলে ওরা আগে নিজের জন্য খরচ করে, তারপর অন্য কাজ আমার ভীষণ বিরক্ত লাগছে জনাব।’

‘যা পারে করুক। ওরা কি তোমার দেশের লোক? সেভাবেই কাজটা করতে হবে। তুমি তোমার মতো করে ওদের পরিচালনা করার চেষ্টা কর। ওই দেশটা স্বাধীন হবার যোগ্যই না। কথায় কথায় দুর্নীতি হয় সবক্ষেত্রে। এতটা আমি পাকিস্তানেও দেখিনি। যাই হোক, তুমি এখন কোনো কিছু নিয়ে ভেবো না। আগে ঢাকার ডেলিগেটরা পাকিস্তানে আসুক, গোটা পৃথিবী দেখুক পাকিস্তান আবার বাংলাদেশকে তাদের কাছে নিয়ে আসতে পেরেছে, ভারত হিংসেয় জ্বলুক। যশোরের ক্যাম্পের ব্যাপারটা এগোচ্ছে তো?’

‘ওটা আমি মুস্তাকিনকে দিয়েই করাবো জনাব। ওকে ব্রিফ করাশুরু হয়েছে, দায়িত্ব নিয়ে সবার আগে ও যশোরের ক্যাম্পের অ্যাপ্রুভালোটাই করাবে।’

‘গুড। আমেরিকা প্রচুর ইনভেস্ট করবে বাংলাদেশে। তোমাকে আরও বেশি ভিজিল্যান্ট হতে হবে।’

‘আমি আমার সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করছি জনাব। মুস্তাকিনের কয়েকটা ভিডিয়ো আছে আমার কাছে। ছেলেগুলোও আমার কথা ছাড়া কারো কথা শুনবে না। আমাদের শুধু ধৈর্য রাখতে হবে।’

‘সেসব থাকবে ইনশাল্লাহ। তোমার যদি একা মনে হয়, আমি আরও দু-তিন জনকে তোমার কাছে পাঠাতে পারি। তোমার কি কাউকে লাগবে?’

‘না জনাব। আমি একাই পারব। বানশাল বা সোহরাবকে ধরে র কিছু করতে পারবে না। ওরা কিছুই জানে না। বরং বানশাল নিজেই ফেঁসে যাবে। যাক। আমার সেসব নিয়ে কোনো আগ্রহ নেই।’

‘হ্যাঁ, তুমি ফান্ড নিয়ে ভেবো না। শুধু দেখবে, আগ্রাসনটা যেন থেমে না যায়। ভারত বিরোধী প্রোপাগান্ডা জারি রাখো। আর ক্যাম্পগুলো যত তাড়াতাড়ি তৈরি করা যায়, তার কাজ শুরু করে দাও। তা ছাড়া বেজিং তো আমাদের সঙ্গে আছেই। খুদা হাফেজ বেটা।’

‘খুদা হাফেজ জনাব।

ফোন রেখে আনোয়ার বসে রইল আবার। আজ রাতে আর ঘুম হবে না। ঢাকার ক্ষমতা বদল তার লক্ষ্যকে এক ধাপ এগিয়েছে। এবার দ্বিতীয় ধাপের পালা…..

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *