৬৫
।। ঢাকা।।
আকাশে মেঘ করে আছে। রজ্জাক আর আসাদুর টাকা গুণতে বসেছে। গুণতে গুণতে রজ্জাকের মুখেও মেঘ জমছে, সে বলল, ‘সব টেহাই যদি দিয়ে দিতি হয়, তাইলে আমাগো কাছে কী থাকব রে আসাদুর?’
আসাদুর বলল, ‘ওস্তাদ, টেহা না দিলেই আবার জেলে ঢুকাই দিবো। তখন কী করবেন?’
রজ্জাকের ফোন আসছে। রজ্জাক ফোন ধরতেই সোবাহানের গলা ভেসে এল, ‘চারদিন ছুটি থাকবে তোদের। আজ বিকেল থেকে আমি থাকব না। ইসলামাবাদ যাব।’
রজ্জাক বলল, ‘জি জনাব। আপনি কইসিলেন। আমাগোও লইয়া যাইতি পারতেন। নতুন দেশ ঘুরতাম।’
‘চুপ থাক। তোরা তগো কাম কর। আনোয়াররে টেহা পাঠাইছস?’
‘দিমু। সেই গুনার কামই করতাসি জনাব। বুকে ব্যথা করে। কষ্ট করলাম আমরা, সব টেহা লইয়া যাইব ওই হালার পুত।’
সোবাহান জোরে হেসে উঠলেন, ‘ঠিক কইছস। কিন্তু ওরে সমঝায় চলতে হইব। নইলে তগো কপালে দুঃখ আছে। দুইডাই তো শয়তানের শয়তান। তগো আমি কইছিলাম যা কাম করবি, চুপ কইরা করবি। কেউ জানতে না পারে। তা তরা করিস নাই। নিজের মতো বদমাইশি করছস। শহরের সবাই মোবাইলে তগো দেখে। প্রমাণ রাইখা দিছস।’
‘আপনিই তো কইলেন জনাব, আমাগো এখন স্বাধীনতা হইছে। প্রমাণ দিয়া কী হইব?’
‘বুঝস না কী হইব? আনোয়ার তগো এই ভিডিয়ো দিয়া বেলাকমেইল করব। শোন, গাধার গাধা। টেহা পাঠায় দে। দুইটা ঠিকানা পাঠামু। রাতে কাম সারবি। কাল কত কালেকশন করছস?’
‘বেশি না জনাব। লাখও পেরোয় নাই। পাহারা বাইরা গেছে। আগের মতো সুখ নাই।’
‘ঠিক আছে। এবার অন্য কাম করতে হইব। তোরে আমি ঠিকানা পাঠাইতাছি। যত লোকে কম জানবো, তত ভালো হইব। ঠিক আছে?’
‘জি জনাব।’
‘গেস্ট হাউজে গিয়া টেহা দিয়ে আয়।’
ফোন কেটে গেল। রজ্জাক ব্যাজার মুখে বসে রইল। আসাদুর বলল, ‘কী ওস্তাদ, কী হইল?’
রজ্জাক বলল, ‘নেতা হইতে লাগবো আসাদুর, নেতার লোক হইয়া কোনো লাভ নাই। চল টেকা দিয়া আসি। গাড়ি বাইর করতে বল।’
কিছুক্ষণের মধ্যে দু-জনে বেরোলো। গোটা রাস্তা রজ্জাক থমথমে মুখে বসে রইল। গেস্ট হাউজের গেটে নিরাপত্তারক্ষীরা তাদের গাড়ি দাঁড় করিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কোথায় যাবেন?’
রজ্জাক তার পান খাওয়া দাঁত বের করল, ‘ভেতরে যামু, কাম আছে।’
নিরাপত্তারক্ষীরা ঢুকতে দিল না। গাড়ি ব্যাক করে রজ্জাক সোবাহান সাহেবকে ফোন করল, ‘জনাব, গাড়ি ঢুকাইতে দেয় না। টেকা নিয়ে ফিরা যামু?’
সোবাহান বললেন, ‘তুই আমার চেম্বারে আয়। আমাকে দিয়ে যা।’
রজ্জাক ফোন রেখে আসাদুরকে বলল, ‘সোবাহান সাহেবের চেম্বারে চল।’
আসাদুর আবার গাড়ি স্টার্ট করল। রজ্জাক বিড়বিড় করে বলে যেতে লাগল, ‘আমি টেকা দিমু, আর আমার কোনো সম্মান নাই… আমি টেকা দিমু… আমার কোনো সম্মান নাই’ …
সোবাহানের চেম্বার ঢেলে সাজানো হচ্ছে। বড়ো একটা বাড়ি নেওয়া হয়েছে। রঙ করা চলছে। গেটের ভেতরে ঢুকে রজ্জাক হাঁ হয়ে গেল। সোবাহানেরও নিরাপত্তারক্ষী আছে। তারাও জিজ্ঞাসাবাদ করল, গেটে বলা ছিল বলে রজ্জাককে ঢুকতে দেওয়া হল।
সোবাহান বিরাট টেবিলের উলটো দিকে বসে আছেন। রজ্জাক আর আসসাদুরকে দেখে খুশি হয়ে বললেন, ‘দরজা বন্ধ কর।’
রজ্জাক দরজা বন্ধ করে এল।
টেবিলের উপর ব্যাগ রাখল। সোবাহান ব্যাগ খুলে কয়েক সেকেন্ড সেটার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সব টেহা আনোয়ার নিয়া লইব?’
রজ্জাক রাগী গলায় বলল, ‘জি জনাব। বিশ লাখ। জনাব, আপনি আমারে নেতা কইরা দেন। উপরওয়ালার কসম লাগে, আমি বুইঝা নিবো, সব টেহা আমি আপনেরে দিমু।’
সোবাহান ব্যাগটা নিয়ে আলমারিতে ঢুকিয়ে দিয়ে তালা দিয়ে বলল, ‘আমি কথা কমু। শহরের কোনো পদে তোর নাম প্রস্তাব করে দিমু নে। তুই আমার কাম কর। নাম দুটো পাইছস?’
রজ্জাক বলল, ‘জি জনাব। পাইছি। আজ রাতেই কাম হইয়া যাইব। আপনি কখন যাইবেন?’
সোবাহান বললেন, ‘বিকেলে। কাজ হয়ে গেলে মেসেজ দিয়া রাখবি। আমি দেইখা নিমু। এই কদিন চুপ কইরা থাকবি। ইসলামাবাদ থিকা আইসা আমি দেখতাসি কী করার আছে।’
আসাদুর ইতস্তত করে বলল, ‘জনাব ব্যাগটা দিয়া দেবেন তো? না হইলে ওরা আবার আমাগো ধরব।’
সোবাহান রাগী গলায় বললেন, ‘ওই মিয়াঁ, আমারে চুর ভাবছ নাকি? যা কামে যা। কাম কর।’
আসাদুর জিভ কেটে মাথা নিচু করে বলল, ‘না না জানব। বিষয়ডা বোঝেন নাই?’
রজ্জাক আসাদুরকে বকাঝকা করতে করতে সোবাহানের চেম্বার থেকে বেরিয়ে গেল।
*****
রাখি ঘুমোতে পারেনি সারারাত। মা সারাক্ষণ কেঁদে গেছে। রাখি উঠে বসেছিল। বাবাকে যে লোকটা বলেছিল নিশ্চিন্তে ইন্ডিয়া নিয়ে যাবে, সে লোকটার ফোন পাওয়া যাচ্ছে না। বাবা সন্ধ্যে থেকে পাগলের মতো করছিল। বারবার একই কথা বলে যাচ্ছে, ‘ফোন ধরবে না কেন হ্যাঁ? ফোন না ধরার কী আছে? অসভ্য লোক কোথাকার! কত টাকা নিয়েছে আমার থেকে, আর এখন বলছে ফোন ধরবে না। এ আবার কী?’
পিসি বলেছে, ‘চিন্তা করিস না দাদা। নিশ্চয়ই কোনো কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফাঁকা হলেই ফোন করবে।’
বাবা শুনতে চাইছে না। রাখি বুঝেছে বাবা কেন এ-রকম করছে। তৌফিকের ঘটনাটা ঘটানোর পর থেকে বাবার মাথা ঠিক নেই। কী করে যে এতটা রাস্তা গাড়ি চালিয়ে চলে এসেছে তা ভাবলেই হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে তার। গোটা রাস্তা বাবা একটা কথা বলেনি। যন্ত্রের মতো গাড়ি চালিয়েছে।
আর তৌফিক? বাবা না থাকলে কী হত তার? একটা মানুষ ঠিক কতটা পালটে গেলে তৌফিকের মতো হতে পারে, তা রাখি জানে না। রুমানের জন্য কাঁদবে না তৌফিকের জন্য, সেটাই ঠিক করে বুঝে উঠতে পারছিল না রাখি।
রাতে কোনোমতে আলুভর্তা ভাত খেয়ে ঘুমোতে গেছে তারা। পিসিদের গ্রামে এখনো আগুনের আঁচ এসে পৌছোয়নি, তবে যেকোনো সময় সেটাও এসে পড়তে পারে। পিসি বলছিল এ গ্রামের মানুষদের মধ্যে একতা আছে। গ্রামটা খানিকটা বিচ্ছিন্নও বটে। বাবা শুধু বলে গেছে, ‘ও বেশিদিনের জন্য না। তুই জানিস না, যখন সময় খারাপ হয়, চেনা মানুষগুলো চোখের নিমেষে সব অচেনা হয়ে যায়। তুই ভাবতে পারবি না, যাদের অন্ধের মতো বিশ্বাস করতিস, তারাই পিঠে ছুরি গেঁথে চলে যাবে। এদেশ আমাদের জন্য না, কিছুতেই আমাদের জন্য হতে পারে না।’
রাখি অস্বীকার করে কী করে? সবাই কেমন দূরে চলে গেছে তার থেকে। সবার সঙ্গে মিছিলে গেল সে, পুলিশের লাঠি খেতে খেতে বেঁচেছিল সেদিন, বন্ধুদের দুঃখে বারবার চোখে জল আসছে, ঘর থেকে সবাইকে ফোন করে করে সাবধান করে দেওয়া, প্রধানমন্ত্রীর দেশ ছাড়ার খবরে সবার সঙ্গে আনন্দ করা… আর তারপরে সব কেমন উলটে গেল! রাশেদরা শুরু করল, তৌফিক শেষ করে দিল।
বাবা সন্ধেবেলায় পিসিকে বলছিল, ‘সব ফাঁদ, ফাঁদে ফেলেছিল ওরা। সবাইকে বুঝিয়েছে কোটা আন্দোলন, আসলে ওসব কিচ্ছু না। আমাদের দেশ থেকে বের করার খেলা। আমরা গাধা, আমরাই বুঝিনি।’
রাখিরও তাই মনে হয়েছে বারবার। সত্যিই সে বুঝতে পারেনি। নইলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এভাবে সব পালটে গেল কী করে?
সোমনাথ স্যারকেও ওরা জোর করে পদত্যাগ করালো। গোটা দেশে কত শিক্ষককে জোর করে পদত্যাগ করিয়েছে।
সে জানে না ওপারে পৌঁছোতে পারবে নাকি। পারলে আবার নতুন করে পড়াশোনা শুরু করতে হবে তাকে।
দু-বছর আগে একবার ইন্ডিয়া গেছিল তারা। কলকাতা হয়ে দার্জিলিং ঘুরে এসেছিল। কিন্তু সে তো ঘুরতে যাওয়া। ওদেশে থাকার কথা ভাবতেই পারেনি তারা। এমন একটা পরিস্থিতি হল যে তাদের দেশ ছেড়েই চলে যেতে হচ্ছে। বাবা এত ঘাবড়ে যাচ্ছে কেন? যে লোকটা বাবার ফোন ধরছে না, সে কি বাবার থেকে অনেক টাকা নিয়ে নিয়েছে?
সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে ঘুম এসে গেছিল তার। যখন ঘুম ভাঙল, তখন ভোর হয়েছে। বাবা ঘরের মধ্যেই জোর পায়ে পায়চারি করছে। তাকে উঠতে দেখেই বলল, ‘ফোন ধরছে না, কী করি বলতো? বর্ডার নাকি বন্ধ করে দিয়েছে। এবার কী হবে?’
রাখি বলল, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে বাবা, তুমি বোসো। এসো, এখানে বোসো।’
উত্তম বসলেন। নিজের মনেই বললেন, ‘শেষে আমি খুনও করে ফেললাম হ্যাঁ? এটাই মনে হয় বাকি ছিল, খুনও করে ফেললাম। উফ! ভাবতে পারছি না।’
রাখি বাবাকে জড়িয়ে ধরল, বাবার কষ্ট আর সহ্য করতে পারছে না সে…
*****
শোয়েব শাহর এলিফ্যান্ট রোডে জুতোর দোকান। দোকানে কোনো কর্মচারী নেই। শোয়েব নিজেই সকাল দশটায় দোকান খোলে। সারাদিন তার দোকান খোলা থাকে। রাত সাড়ে ন-টা বাজলেই সে দোকান বন্ধ করে দোকানের ভেতর বিছানা করে শুয়ে পড়ে।
শোয়েবের দোকানের বিকিকিনি মন্দ নয়। বাকি দোকানদারদের সঙ্গেও তার ব্যবহার ভালো। তার বাড়ি চট্টগ্রামে। এই দোকানের মালিকের ছেলে-মেয়ে ছিল না। শোয়েব দোকানের একমাত্র কর্মচারী ছিল। মরার আগে দোকানী তার নামে দোকান করে দিয়ে যায়। শোয়েব তার পরেও বিয়ে থা করেনি। দোকানেই থাকে। ঈদে ইচ্ছে হলে বাড়ি যায়। নয়তো যায় না। দোকানেই থাকে।
শোয়েবের এখন চল্লিশ বছর বয়স।
প্রতিদিন সকাল ন-টায় ঘুম ভাঙে তার। ঘুম ভেঙে উঠে সে চুপ করে বসে থাকে। এদিন তার ঘুম ভেঙে গেল সাড়ে সাতটায়। তার কাছে একটা ফোন আছে, যেটায় কোনোদিন ফোন আসে না। প্রথমদিকে বহুদিন সে ফোনটায় রিং-এর অপেক্ষা করত, একটা সময় পর হাল ছেড়ে দিল। সে ফোন আর কোনোদিন রিং হল না। তবে নিয়ম করে সে ফোনটা চার্জ দিয়ে গেছে। তার মনে দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, একদিন-না-একদিন ফোনটা বেজে উঠবেই।
সে দিনটা যে আজ হবে, তার ধারণা ছিল না। ফোনটা বাজতেই সঙ্গে সঙ্গে রিসিভ করে সে বলল, ‘খ্রি ফাইভ সেভেন থ্রি নাইন রিপোর্টিং স্যার।
‘ঠিক আছ?’
‘হ্যাঁ স্যার।’
‘ঘুমোচ্ছিলে?’
‘হ্যাঁ স্যার। এতদিন পর আমায় মনে পড়ল স্যার?’
‘তোমাকে একটা কঠিন কাজ করতে হবে। কাজটা শেষ হবার পর তুমি এক মুহূর্তও আর ওদেশে থাকতে পারবে না। তোমাকে পালিয়ে আসতে হবে। সঙ্গে পাবে আরেকজন এজেন্টকে। ও এখন ঢাকাতেই আছে। লোকেশন সেভেন্টিনে যাও। ও ওখানে থাকবে।’
শোয়েবের মুখে হাসি ফুটে উঠল, ‘কাজ বলুন স্যার।’
ওপ্রান্ত থেকে অর্ডার আসা শুরু হল। শোয়েব মন দিয়ে সব শুনে ফোন কাটল।
সকাল আটটায় দোকান থেকে বেরিয়ে রাস্তার মোড় থেকে রিকশা নিল সে। রিকশায় উঠে মন দিয়ে সিগারেট টানতে লাগল। আধঘণ্টা লাগল মগবাজার পৌঁছোতে। রিকশা থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে সে হাঁটতে শুরু করল। বহুদিন পরে সে মগবাজারে এসেছে। অথচ তার হাঁটাচলা দেখে সেটা বোঝার উপায় নেই। দেখে মনে হচ্ছে এখানে তার নিত্যদিনের যাওয়া আসা।
প্রায় দশ মিনিট হাঁটার পর একটা পুরোনো বিল্ডিং-এর নীচে এসে দাঁড়ালো শোয়েব। পকেট থেকে নোটবুক মিলিয়ে বিল্ডিং-এর নম্বর মিলিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে বিল্ডিং-এর ভেতরে প্রবেশ করল। তিনতলা সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে এগারো নম্বর ঘরের দরজার সামনে গিয়ে তিনবার নক করল।
দরজা খুলে গেল।
শোয়েব ঘরের ভেতরে প্রবেশ করামাত্র দরজা বন্ধ হয়ে গেল। ছেলেটা বলল, ‘আমি জয়দেব। মানে ঢাকায় আমার নাম জয়দেব। তুমি অনেক চেষ্টা করেছ, এখনো তোমার মধ্যে কলকাতার লুকসটা মুছতে পারনি কিন্তু! ধরা পড়নি কী করে বলো তো?’
শোয়েব চেয়ার টেনে বসল, ‘বাজে কথা, তুমি উত্তরটা জান বলে আমাকে কলকাতার লোক বললে। এখানে কারো পক্ষে বোঝা সম্ভবই না আমি কোনোদিকের? একটা যা তা কথা বলে দিলেই হল?’
জয়দেব ফিক ফিক করে হাসতে হাসতে বলল, ‘সিগারেট দাও, তোমার দাঁত দেখেই বোঝা যাচ্ছে তুমি মারাত্মক ফোঁকো। দাও দাও।’
শোয়েব সিগারেটের প্যাকেট এগিয়ে দিল। জয়দেব সিগারেট বের করে তাতে এক টান দিয়ে বলল, ‘আহ, কী যে আরাম। এক কলেজের স্যারের সঙ্গে থাকি, বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ, চাইলেই ফোঁকা যায় না, কী যে অস্বস্তি লাগে! তুমিই ভালো আছ। একা একা থাক যখন খুশি ফুঁকতে পার।’
শোয়েব বলল, ‘গাড়ির ব্যবস্থা করেছ তো?’
জয়দেব বলল, ‘ওসব দেখে নিচ্ছি।’
শোয়েব বিরক্ত গলায় বলল, ‘তুমি কি ব্যাপারটা হালকা নিচ্ছ? এটা খুব সহজ কাজ বলে তোমার মনে হচ্ছে?’
জয়দেব বলল, ‘মাথা ঠান্ডা করো দোস্ত। গরম করলে কিচ্ছু হবে না।’
শোয়েব আর কিছু বলল না। ছেলেটার মতিগতি তার একবারেই সুবিধার ঠেকছে না…
৬৬
সকাল দশটা।
॥ দিল্লি।
দীপ্তি অফিসে এসে চুপ করে বসে আছে। সারারাত ঘুমোতে পারেনি সে। চোখের তলায় কালি পড়ে গেছে।
তার ডেস্ক ফোন বেজে উঠল, ধরতেই বিদুর ধরে বললেন, ‘চেম্বারে এসো।’
বিদুরের চেম্বারের দিকে রওনা দিল সে। হাতে নোটপ্যাড। এখন কি বিদুর কোনো চিঠি লিখতে বলবেন? কিংবা অন্য কোনো কিছু? কে জানে?
দরজায় নক করতেই ‘কাম ইন’ বললেন বিদুর
চেম্বারে ঢুকতে বললেন, ‘কাজটা হেকটিক হয়ে যাচ্ছে, বুঝতে পারছি। বোস।’
দীপ্তি বসে বলল, ‘ঠিক আছে স্যার। হেকটিক বলে আর কী হবে?’
বিদুর বললেন, ‘কাল যেটা ঘটেছে, সেটা আমাদের প্রত্যেকের সঙ্গেই ঘটতে পারে দীপ্তি। মনিটরিং টিম আছে, তারা নজর রাখছে। সমস্যা হল এর ফলে আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে একটা প্রভাব পড়ে। সুহাস কিছু বুঝতে পেরেছে?’
দীপ্তি মাথা নেড়ে বলল, ‘না। বোঝেনি। কিন্তু স্যার, আমাদের দেশে ওরা লুকোচ্ছে কী করে? হঠাৎ করে যেন মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসছে।’
বিদুর বললেন, ‘যেভাবে ওদের দেশে আমরা লুকিয়ে আছি। তবে ওরা এখন খানিকটা বেপরোয়া। ঠিক কোনো কোনো কারণে এতটা মরিয়া হয়ে গেছে, সেটা বোঝার চেষ্টা চলছে। বেশ কয়েকটা আড্ডায় রেইড হয়েছে, দাগী কয়েকজনকে তুলে নেওয়া হয়েছে। ওরা অ্যাসাইনমেন্ট দিচ্ছে। যাদের তোলা হচ্ছে, তারা কিছুই জানে না। শুধু বলছে টার্গেটের ছবি দেওয়া হয়েছিল, টাকা পেয়েছে। ব্যস। আর কী চাই?’
দীপ্তি বলল, ‘আমাদের সবার সম্পর্কে ওরা জেনে যাচ্ছে, এটা তো চিন্তার।’
বিদুর মাথা নাড়লেন, ‘এগুলো ধরে নিয়েই পথে নামা হয়েছিল। ওরা তোমাকে চেনে না, কিন্তু আমাকে চেনে। তুমি আমার অফিসে আছ। সে জন্যই টার্গেট হয়ে যাচ্ছ। তুমি কী ছুটি চাও? তোমার একটা ছুটি নেবার কথা ছিল না?’
দীপ্তি ম্লান হেসে বলল, ‘আর সেসব মাথায় নেই স্যার। অন্য কোনো জীবন নিয়ে ভাবার ফুরসত আমাদের কোথায়?’
বিদুর কয়েক সেকেন্ড চুপ করে বসে থেকে বললেন, ‘হালকা কোনো ডিপার্টমেন্টে ট্রান্সফার নেবে? নিশ্চিন্ত জীবন হবে, তেমন কোনো চাপ থাকবে না। ঘুরবে, ফিরবে, সিনেমা দেখবে, সব করতে পারবে। করবে এ-রকম কাজ?’
দীপ্তি মাথা নাড়ল, ‘না স্যার। আমি তো ওই সব কাজ করার জন্য এই ডিপার্টমেন্টের পরীক্ষা দিইনি। জীবনে এত শাস্তিও চাই না।’
বিদুর বললেন, ‘ভেবে নাও। যদি শাস্তি না চাও, তাহলে আগামী ছ-মাস তোমাকে হায়দ্রাবাদে একটা স্পেশাল ট্রেনিং-এ পাঠানো হবে। এই ধরনের ছোটোখাটো থ্রেট, তখন আর কোনোভাবেই ভয় ধরাবে না।’
দীপ্তি বলল, ‘ভাবার কিছু নেই স্যার, আমি রাজি। কবে যেতে হবে?’
বিদুর বললেন, ‘দিওয়ালির পরের দিন। আমি দেখে নেব সব। সুহাসকে এখনই কিছু বলার দরকার নেই। পিজির মালকিনকেও নয়। ওকে?’
দীপ্তি বলল, ‘ঠিক আছে স্যার। ঘুম হচ্ছে না আজকাল রাতে। এত টেনশন হয়।’
বিদুর হাসলেন, ‘স্বাভাবিক। আশা করি তুমি এখন বুঝতে পারছ তোমাকে কেন এই অফিসে নিয়ে আসা হয়েছিল? রাগ যেটা হয়েছিল, সেটা কমেছে তো?’
দীপ্তি বলল, ‘সরি স্যার। অতোটা ডিউটি করার পর যখন হঠাৎ করে ট্রান্সফারের কথা শুনেছিলাম, সত্যি রাগ হয়েছিল।’
বিদুর বললেন, ‘গুড। রাগ থাকা দরকার। রাগ না থাকলে আমরা যে মানুষ, তা বুঝব কী করে? তুমি এই মাসের শেষের দিকে ছুটি নিতে পার দীপ্তি। আপাতত আজ থেকে সামনের সাত দিন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
দীপ্তি বলল, ‘স্যার কোনো দিনটা গুরুত্বপূর্ণ না বলতে পারবেন?’
বিদুর ফিকফিক করে হাসতে শুরু করলেন। দীপ্তি বুঝল ভদ্রলোক আজ ভালো মুডে আছেন। এর কারণ কী হতে পারে? বানশাল কিছু বলে দিয়েছে? নাকি অন্য কোথাও বড়ো কোনো সাফল্য পাওয়া গেছে? তার জানার কথা না। সে বিদুরের চেম্বার থেকে বেরোতে যাচ্ছিল, বিদুর বললেন, ‘আজ স্ন্যাকসে ভালো কিছু খাবার অর্ডার করো। আমি আর তুমি আর পি-র অফিসে খাব আজ।’
দীপ্তি এবার সত্যি সত্যি অবাক হল, ‘স্যার, অকেশন?’
বিদুর কাঁধ ঝাঁকালেন, ‘আরে কোনো অকেশন না। এমনিই ইচ্ছে হল। তোমারও পুরোনো অফিসে যাওয়া হবে, আমারও একটু আড্ডা হবে ওদের সঙ্গে। রোজ এক কাজ আর কাজ, আর ভাল্লাগছে না।’
‘ওকে স্যার। অর্ডার করছি।’
৬৭
॥ ঢাকা।।
যমুনা গেস্ট হাউজ। প্রধান উপদেষ্টার থেকে বিদায় নিতে এসেছে প্রতিনিধিদল।
প্রথমদিকে গেস্ট হাউজে এত জাঁকজমক ছিল না। এখন সব ঢেলে সাজানো হয়েছে। নিরাপত্তাবলয়ের প্রথম স্তরে আছে সাধারণ পুলিশ, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় স্তরে রয়েছে সেনা। চাইলেই যে কেউ গেস্ট হাউজে ঢুকতে পারবে না।
মূল ব্যাঙ্কোয়েট হলে সবাই একত্রিত হয়েছে। একদল আমলার সঙ্গে তিন রাজনীতিবিদ ইসলামাবাদে রওনা হবে।
সোবাহান সাহেব একটা কালো রঙের স্যুট পরেছেন। গরম লাগছে। খুলতে পারছেন না। বিরক্ত লাগছে তার। কিছুক্ষণ আগে পান খেয়েছিলেন। স্যুটে পানের দাগ লেগে আছে।
ওয়াকার সাহেব সেটা দেখে বললেন, ‘সোবাহান সাহেব, আপনি পাকিস্তানে পান পাবেন কোথায়?’
সোবাহান দাঁত বের করলেন, ‘পঞ্চাশটা পান নিয়ে যাচ্ছি জনাব। এই তিনদিনে হয়ে যাবে ইনশাল্লাহ।’
ওয়াকার বললেন, ‘হয়ে গেলেই ভালো। আমি আপনাদের কাছে প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি, আমারও আপনাদের সঙ্গে যাবার কথা ছিল। আমি যেতে পারছি না। এত কঠিন পরিস্থিতিতে দেশের দায়িত্বভার নিতে হয়েছে। আমাকে অন্যান্য কাজও করতে হবে। আপাতত আপনারা গিয়ে ঘুরে আসুন। কেউ এমন কোনো বেফাঁস কথা বলবেন না কোনো রকম প্রেসের সামনেই। মনে রাখবেন দুবাইতে ইন্ডিয়ান প্রেস আপনাদের বিভিন্ন বেকায়দার প্রশ্ন করতে পারে। এড়িয়ে যাবেন।
সালাউদ্দিন সাহেব সাদা পাঞ্জাবি পরে এসেছেন। দাড়িতে হাত বুলিয়ে বললেন, ‘চিন্তা করবেন না জনাব। আমরা কেউই হিন্দি বুঝি না। কী কইবে, কী বুঝুম, কোনো কথাই কমু না।
ওয়াকার মুস্তাকিনের দিকে তাকালেন, ‘জনাব, আপনি তো হিন্দি জানেন, তাই না?’
মুস্তাকিন মাথা নাড়লেন, ‘জানি। তবে বলব না কিছু। ভাববেন না।’
ওয়াকার সাহেব তাদের সঙ্গে বসে লাঞ্চ করলেন। ভাত, ডাল, চাররকম মাছ, দু ধরনের গোস্ত, দই, মিষ্টি। ওয়াকার কিছুই খেলেন না। সামান্য ভাত আর ডাল খেলেন।
লাঞ্চের শেষের দিকে আনোয়ার এল। ওয়াকার বললেন, ‘তুমি দেরি করলে। বোসো বোসো।’
আনোয়ার বলল, ‘আমি খেয়ে এসেছি জনাব। আমি সবার সঙ্গে দেখা করতেই এলাম।’
ওয়াকার বুঝলেন আনোয়ার খানিকটা ক্ষুব্ধ হয়ে আছেন এখন। তিনি বেশি কথা বাড়ালেন না।
সোবাহান আনোয়ারকে জোরাজুরি করে মিষ্টি খাওয়ালেন।
খাওয়া শেষে সবাই যখন একে একে গাড়িতে উঠতে শুরু করেছেন, আনোয়ার সোবাহান সাহেবের কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, ‘রজ্জাকদের কালেকশন এখনো আসেনি জনাব, ওরা কি আপনার কাছে কিছু দিয়ে গেছে?’
সোবাহান আকাশ থেকে পড়লেন, ‘না তো! ঠিক আছে ফিরে এসে দেখছি।’
আনোয়ারের মুখ থমথমে হয়ে গেল। সোবাহান গাড়িতে উঠে মুস্তাকিনের পাশে বসলেন। কনভয় বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। সোবাহান উপরওয়ালাকে স্মরণ করে বললেন, ‘কত কাজ করতে হয় উপদেষ্টা হইলে। আগে তো এত কাম ছিল না। কী বলেন জনাব?’
মুস্তাকিন হাসলেন, ‘তা ঠিক। দেশ নতুন করে স্বাধীন হয়েছে। এখন তো কাজের চাপ থাকবেই জনাব।’
সোবাহান জানলার কাচ নামিয়ে বাইরের রাস্তায় থুতু ফেলে বললেন, ‘থামেন তো ভাই, স্বাধীন হইসে না বাল, কিছুই হয় নাই, সব লুটতে আইসে। লুইটা চইলা যাবে। ওই হাসিমুখের মানুষডারে দেখেন না? শয়তানের শয়তান।
মুস্তাকিন বললেন, ‘সেকি, আপনি এ-রকম বলছেন কেন?’
সোবাহান গলা নামিয়ে বললেন, ‘সব টার্গেট দেয়, টেহা তোলো আর টেহা তোলো। বোঝেন না? আপনি কত দিসেন?’
মুস্তাকিন বলল, ‘এখনো দিতে পারিনি। চেষ্টা চলছে। বুঝতেই পারছেন, পকেট থেকে তো আর দেব না।’
সোবাহান হো-হো করে হেসে উঠলেন, ‘যা কইসেন। এরা পারলে আমাগো পকেট কাইটা টেহা লইয়া যাইব। আমিও ছাড়ুম না। যত দেরি হয়, তত ভালো।’
মুস্তাকিন হেসে চুপ করে গেলেন। তার ফোনে একটা মেসেজ এসেছে। দেখা মাত্ৰ ফোনটা অফ করে দিলেন।
সোবাহান সাহেব একাই বকবক করে যেতে লাগলেন। বিমানবন্দরে পৌঁছে তারা ভি ভি আই পি প্রস্থানের দিকে এগোলেন। যাত্রার প্রথম পর্বে তারা দুবাই যাবেন, সেখান থেকেই কানেক্টিং ফ্লাইটে ইসলামাবাদ রওনা হবেন।
সালাউদ্দিন গোটা রাস্তা চুপ করে এসেছিলেন। প্লেনে উঠে দাঁত বের করে বললেন, ‘মাইয়াগুলা সুন্দরী, দেখসেন?’
*****
‘ফান্ড লাগবে জনাব। আপনি যতই আমার উপর রাগ করেন, বাস্তবটা আমরা কেউই অস্বীকার করতে পারব না। আমাদের এগোতে গেলে ফান্ড লাগবে।’
আনোয়ার কথাটা বলে ওয়াকার সাহেবের দিকে তাকালো। ডেলিগেট টিম বেরিয়ে গেলেও আনোয়ার এখনো গেস্ট হাউজেই আছে। ওয়াকার সাহেবের সঙ্গে সন্ধ্যের দিকে ছাত্রদের একটা দল দেখা করতে আসবে। ওয়াকার সাহেব তার নোটবুকে সন্ধ্যে কী বলবে, তার একটা ড্রাফট লিখছিলেন। আনোয়ারের কথা শুনে লিখতে লিখতেই বললেন, ‘সরকারি ফান্ড অ্যারেঞ্জ করতে মাস খানেক লাগবে এখনো। ভদ্রমহিলা যে অবস্থায় রেখে গেছেন, সেখান থেকে ফিরতে আমাকে কিছুটা সময় তো দিতে হবে।’
আনোয়ার বলল, ‘এ ছাড়া? আর কোনো ভাবে কি কিছুই করা যাবে না?’
ওয়াকার বললেন, ‘সোবাহান সাহেব আমাকে বলেছেন তোমার ফান্ড অ্যারেঞ্জের ব্যবস্থা করবেন। সেটার কী হল?’
আনোয়ার বলল, ‘হয়নি। আপনার দিকের শিল্পপতিদের মধ্যে কয়েকজন দেবেন বলেছেন। তবে সবার অবস্থাই আপনার মতো, সময় নিচ্ছেন। ছোটো আপা আপাতত কিছুদিন পর দেখা করবেন বলেছেন। এবার কী করব আমি?’
ওয়াকার লেখা থামালেন। শ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘জঙ্গল তোমার, চারপাশে শিকার ঘোরাফেরা করছে, আর তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করছ কী করব? এ-রকম কেন আনোয়ার?’
আনোয়ার কয়েক সেকেন্ড চুপ করে বসে থেকে বলল, ‘আমি আপনার থেকে আরেকটু বেশি কিছু আশা করেছিলাম ওয়াকার সাহেব। আপনি জানেন আই এস আই না থাকলে এত বড়ো অপারেশন হত না। সি আই এ শুধু সুবিধা নেবার জন্যই আছে।’
ওয়াকার বলল, ‘আমি কিছু বলিনি। আমি তোমাকে বলছি তোমার কাছে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা আছে। তুমি তোমার স্বাধীনতার প্রয়োগ করছ না শুধু। সোবাহান সাহেবের ভরসায় থাকবে কেন? তুমি জান না সোবাহান সাহেব কোত্থেকে ফান্ড জোগাড় করেন?
আনোয়ার মাথা নাড়ল, তার মুখে হাসি ফুটল, ‘জি জনাব। আমি বুঝেছি আপনি কী বলতে চাইছেন। শুক্রিয়া জনাব। খোদা হাফেজ।’
ওয়াকার হেসে বললেন, ‘খোদা হাফেজ।’
গেস্ট হাউজ থেকে বেরিয়ে আনোয়ার তার গাড়িতে বসে গাড়ি স্টার্ট দিল। গেস্ট হাউজ থেকে বেরিয়ে কিছুটা রাস্তা গিয়ে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রজ্জাককে ফোন করল। ওপ্রান্তে আসাদুর ফোন ধরে বলল, ‘কে বলছেন?’
আনোয়ার বলল, ‘রজ্জাক কোথায়?’
আসাদুর বলল, ‘ভাই এখন ছিরিয়াস কামে আছে। পরে করেন।
‘আমি আনোয়ার বলছি।’
‘আনোয়ার কন আর জানোয়ার কন, পরে করতে বলসে যখন, পরে করেন।’
ফোন কেটে গেল। আনোয়ারের মাথা গরম হয়ে গেল। সে তার পরিচিত এক পুলিশ অফিসারকে ফোন করার চেষ্টা করল। ফোন সুইচড অফ বলছে। সে মাথা ঠান্ডা করার চেষ্টা করল, সিগারেট ধরিয়ে মন দিয়ে টান দিতে শুরু করল।
মোস্তাকের ফোন আসছে। সে ধরতেই মোস্তাক বলল, ‘জনাব, ডকের পেমেন্টের জন্য মনসুর ভাই জিজ্ঞেস করছিল। কী কমু? কিছু টেহা দিলে ভালো হইত।’
আনোয়ার বিরক্ত গলায় বলল, ‘কত চাইছে? আগের সপ্তাহেই তো দিলাম।’
মোস্তাক গলা নামিয়ে বলল, ‘জনাব, দু কন্টেনার মাল আইচে, বোঝেন তো।’
আনোয়ার বলল, ‘ঠিক আছে, রাখ, আমি দেখছি।’
সে ফোন রেখে আবার রজ্জাককে ফোন করল। এবার রজ্জাকই ফোন ধরল, ‘কে?’
আনোয়ার ফুঁসে উঠল, ‘শুয়োরের বাচ্চা, তোর আজ টাকা দেবার কথা ছিল না? টাকা কোথায়?’
রজ্জাক আকাশ থেকে পড়ল, ‘আরে জনাব, সে তো আমি সোবাহান সাহেবরে দিয়া আইলাম।’
আনোয়ার আরও রেগে গেল, ‘আবার মিথ্যে বলছিস?’
রজ্জাক বলল, ‘মিথ্যে কই না। রজ্জাক মিথ্যা কওনের লোক না।’
আনোয়ার গালাগালি দেওয়া শুরু করল।
রজ্জাক ফোন কেটে গেল।
আনোয়ারের মাথা দপদপ করছে।
সে আবার উত্তেজিত অবস্থায় তার পরিচিত পুলিশ অফিসারকে ফোন করতে শুরু করল।
এবারও ফোন সুইচড অফ। বিরক্ত হয়ে গাড়ি স্টার্ট দিতে গিয়ে দেখল তার পাশে একটা বাইক এসে দাঁড়িয়েছে।
আনোয়ার কাচ নামিয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘হোয়াট দ্য ফাক? কী হচ্ছে? মজা দেখছিস বানচোত?’
বাইক আরোহীর বাঁ হাতের রিভলবারটা তার প্রথমে চোখে পড়েনি। হাতটা উদ্যত হতেই সে তড়িঘড়ি কাচ তুলতে গেল। পারল না। মুহূর্তের মধ্যে তার দুচোখের মাঝখানে একটা বুলেট গেঁথে গেল। আশেপাশের লোকজন কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাইকটা তীব্র গতিতে বেরিয়ে গেল…
৬৮
।। দিল্লি।
বিকেল পাঁচটা।
প্রশাস্ত কফি নিয়ে এসে টেবিলে রাখল। দীপ্তিকে নিয়ে বিদুর কিছুক্ষণ আগে এসেছেন। তুষার দরজা ঠেলে ঢুকলেন।
দীপ্তি অবাক হল। তুষারের আসার কথা ছিল সে জানত না।
বিদুর হেসে বললেন, ‘এক্সট্রা বলেছিলাম না? তুষারের জন্যই।’
তুষার বললেন, ‘ধোসা ট্রিট জেনে তড়িঘড়ি চলে এলাম। যদিও ইরাবতী তোমাদের সবাইকে আমার বাড়িতেই ইনভাইট করেছে এই রবিবার। সবাই মিলে অবশ্যই এসো।’
বিদুর কফি মাগ তুলে নিয়ে বললেন, ‘সে তো অবশ্যই যাব। আপাতত ধোসাটা খেয়ে দেখো কেমন হয়েছে। দীপ্তি ওর ফেবারিট দোকান থেকে আনিয়েছে।’
দীপ্তিই পরিবেশন করল। তুষার একটু মুখে দিয়েই বললেন, ‘দারুণ, আমাকে রেস্তরাঁর অ্যাড্রেসটা দেবে দীপ্তি। এদের খাবারের টেস্টটাই আলাদা।’
বিদুর বললেন, ‘হ্যাঁ, আমাকেও দেবে।’
কয়েক মিনিটের মধ্যেই তুষার আর বিদুর গল্পে মশগুল হয়ে গেলেন।
দীপ্তি প্রশান্তের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী কেস? আজ বুড়োগুলো এত খুশি কেন বল তো?’
প্রশাস্ত ছোলা বাটুরা খাচ্ছিল, খেতে খেতে বলল, ‘আনোয়ার সাফ।’
দীপ্তি হাঁ হয়ে গেল, ‘বলিস কী?’
প্রশান্ত বলল, ‘হুঁ। কিছুক্ষণ আগে। অবশ্য আজকেই সাফ হবে এ-রকম কোনো ব্যাপার ছিল না। তাড়াতাড়িই হল। আজকের খাবারের প্ল্যানটা এমনিই ছিল। আমাদের কাজটা নাকি খুব একঘেয়ে হয়ে যাচ্ছে। বিদুর স্যার আর পি-কে কালকেই জানিয়েছিলেন।
দীপ্তি বলল, ‘আর পি কোথায়?
প্রশাস্ত বলল, ‘কন্ট্রোল রুমে।’
দীপ্তি বলল, ‘কাজ হয়ে যাবার পরেও?’
প্রশান্ত ঘড়ি দেখে বলল, ‘আধ ঘণ্টা আগে হয়েছে। এখনো ফোন টোন করে আসবে বোধহয়।’
দীপ্তির বুক ঢিবঢিব করছিল। আনোয়ার সাফ? এই জন্যই বিদুর স্যার কাল মিটিং-এ গেছিলেন? পারমিশন নিতে?
তুষার বললেন, ‘কী হল? তোমরা চুপ করে আছ কেন? কিছু বলো।’
প্রশান্ত বলল, ‘দীপ্তিকে জাস্ট বললাম স্যার। জানত না।’
বিদুর বলল, ‘ওহ, বলে দিলে? আমি ভেবেছিলাম আমিই বলব। দীপ্তির খুব বড়ো ভূমিকা ছিল অবশ্য। বানশালকে না ধরতে পারলে আনোয়ারের পারমিশন পেতাম না আমরা। সেদিন দীপ্তি র্যাডিসনে না থাকলে কোনো রেকর্ডিংই পাওয়া যেত না।’
দীপ্তি লজ্জা পেল, ‘না স্যার, আপনি যেভাবে বলেছিলেন, আমি সেভাবেই করেছিলাম।’
বিদুর বললেন, ‘হ্যাঁ, এর জন্য সুহাসকেও আমি একদিন ট্রিট দেব। বেচারা জানেই না কতকিছুতে জড়িয়ে গেছে।’
দরজা ঠেলে আর পি ঢুকতেই তুষার এগিয়ে গিয়ে আর পি-কে জড়িয়ে ধরলেন, ‘থ্যাঙ্ক ইউ আর পি, ইউ মে মেড মাই ডে।’
আর পি চেয়ারে বসে ঘাম মুছে বলল, ‘এবারেই আসল কাজ শুরু হবে।’
বিদুর বললেন, ‘শুরু কিছু হবে না, আমরা একটু ব্রিদিং স্পেস পাব। এই স্পেসটার ভীষণ দরকার ছিল। রংপুরের কী খবর?’
আর পি বললেন, ‘মোস্তাক ওখানেই আছে। আই এস আই-এর আরেকটা পুরোনো পাপী আছে।’
বিদুর বললেন, ‘আর বাকি খবরটা?’
আর পি ঘড়ি দেখলেন, ‘এখনো খবর হয়নি।’
দীপ্তি প্রশান্তের পেটে খোঁচা মারল, ‘আবার কী খবর আছে?’
প্রশান্ত মাথা নাড়ল, ‘জানি না।’
আর পি ধোসা খেতে শুরু করলেন। তুষার বললেন, ‘এজেন্টদের সেফটি সম্পর্কে চিন্তার কিছু নেই তো আর পি?’
আর পি বললেন, ‘দু-জনেই সেফ আছে। তবে শোয়েব… মানে শান্তনুর মন খারাপ। বলছে দোকানটার উপর মায়া পড়ে গেছিল। আমি বলেছি দিল্লি আয়, এখানে তোর জন্য আমি জুতোর দোকান খুলে দেব না হয়।’
তুষার হো-হো করে হেসে উঠলেন। বিদুর বললেন, ‘কেউই যেন এখন বর্ডার না ক্রস করে। বাংলাদেশেই লুকোতে হবে। সে বুঝে কাজটা করতে বলেছ তো?’
আর পি বললেন, ‘হ্যাঁ। আপনি বলার সঙ্গে সঙ্গেই সেই অর্ডার দিয়েছি।’
তুষার বললেন, ‘আর ফোন আসেনি তোমার? কাশ্মীরের কী খবর?’
আর পি বললেন, ‘সার্চ অপারেশন শুরু করা হয়েছে। শ্রীনগরে কিছু পাওয়া যায়নি।’
তুষার বললেন, ‘দাঁড়িপাল্লার একদিক নড়েছে ওদের। অন্যদিকটা স্টেডি হবার আগেই ধরে ফেলতে হবে। এদের কোনো বিশ্বাস নেই, আমি যা খবর পাচ্ছি, আরিফ ভাট দল ছাড়তে চেয়েছিল। সে জন্যই ওকে সরানো হয়েছে।’
বিদুর প্রশান্তকে বললেন, ‘চেস বোর্ডটা নিয়ে এসো প্রশাস্ত। আলমারিতে একটা রেখেছিলাম। অনেকদিন তুষারের সঙ্গে চেস খেলা হয় না। দেখা যাক চেস খেলতে খেলতে আর কোনো আপডেট আসে নাকি।’
প্রশান্ত আর দীপ্তি দু-জনেই অবাক হল। তারা জানত না আলমারিতে চেস বোর্ডও রাখা আছে।
৬৯
॥ ঢাকা।।
ছাত্রনেতাদের সঙ্গে বৈঠকের সময় প্রেসকেও ডাকা হয়েছে। বেশ একটা ফিল গুড ব্যাপার থাকবে। সন্ধ্যের মিটিং-এ আরও তিনজন বুদ্ধিজীবীকে ডাকা হয়েছে, তাদের বয়স কম। উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করলে ভালো বার্তা যাবে।
ওয়াকার তার বক্তব্য নিজেই লিখছিলেন, শেষের দিকটা মনঃসংযোগের দরকার হয়। ছাত্ররা জাতীয় সংগীত পালটানোর প্রস্তাব রেখেছে, সে বিষয়েও আলোচনা হবার কথা আছে। আপ্তসহায়ক একবার দরজায় নক করেছিল, ওয়াকার বলেছেন পরে ঢুকতে। বক্তব্যের শেষটা আবেগঘন করার জন্য খানিকটা সময় লাগছিল। দরজায় আরেকবার নকের শব্দ হল।
ওয়াকার বিরক্ত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেন, ‘কী হয়েছে? এত তাড়া কীসের? ভেতরে এসো।’
আপ্তসহায়ক ব্যস্ত হয়ে চেম্বারে প্রবেশ করে বলল, ‘জনাব, আনোয়ার…’ ওয়াকার বললেন, ‘আবার এসেছে? উফ… জ্বালিয়ে খেল তো!’
আপ্তসহায়ক বলল, ‘আনোয়ার খুন হয়েছে জনাব।’
ওয়াকার স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। বললেন, ‘মানে?’
‘এখান থেকে বেরিয়েই… গাড়ি দাঁড় করিয়ে ফোন করছিল, কেউ গুলি করে পালিয়েছে। বডি ওখানেই পড়ে আছে। সুমন সাহেব ফোন করছেন আপনাকে।’
ওয়াকার বললেন, ‘ফোনটা এনে দাও।’
আপ্তসহায়ক ওয়াকার সাহেবের দিকে ফোন এগিয়ে দিল, কী ভেবে আবার ফোনটা ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘ছাড়ো, সুমনকে বল লাশ প্রেস পাবার আগেই সরিয়ে দিতে।’
আপ্তসহায়ক বলল, ‘কাউকে কিছু বলার…’
‘না। লাশ গুম করে দিতে বলো। এখনই।
‘জেনে যাবে জনাব। রাস্তার উপরে তো। এইরকম দিনের বেলায়… আর কি কারো জানার বাকি আছে?’
ওয়াকার চুপ করে গেলেন। তাই তো! অকারণ উত্তেজিত হবার কোনো কারণ নেই তো। তিনি হাত নেড়ে আপ্তসহায়ককে চলে যেতে বললেন।
ঘর খালি হয়ে গেলে তিনি উঠে ইলেকট্রিক কেটলে গরম জল বসালেন। দু-দিন ধরে গলা খুসখুস করছে। অনেকবার ভেবেছেন গারগল করবেন। করার সময় পাচ্ছিলেন না। এখন মনে হল গারগল করবেন। জল গরম হলে বাথরুমে গিয়ে কিছুক্ষণ গারগল করলেন। পা কাঁপছে কি তার? নাহ, ভয় পাবার তো কিছু নেই! একা আনোয়ার কীই-বা করত?
কীই-বা করত?
মাথা ফাঁকা হয়ে গেছে হঠাৎ করেই। কাপ রেখে চেয়ারে এসে বসলেন। ব্যক্তিগত ফোনটা বের করে অন করলেন। কয়েকটা জায়গায় খবরটা জানানো দরকার। কিন্তু টাইপ বা ফোন, কোনোটা করতেই ইচ্ছে করছে না। ফোন বাজছে। আই এস আই চিফ আমন খান ফোন করছে।
ওয়াকার ধরতে গিয়েও ধরলেন না। পরে কথা বলবেন। টিভি চালিয়ে দিলেন। টিভিতে ব্রেকিং নিউজ দেখাচ্ছে। শহরের রাস্তায় আবার খুন হয়েছে। চারদিকে চঞ্চল্য ছড়াচ্ছে। মানুষের ভিড় বাড়ছে। পুলিশ প্রধান এখনো কোনো বিবৃতি দিতে রাজি হননি।
ওয়াকার ফোন বন্ধ করে দিলেন। দরজায় আবার নক হওয়া শুরু হয়েছে।
ওয়াকার ক্লান্ত কণ্ঠে বললেন, ‘এসো। কী হয়েছে আবার?’
আপ্তসহায়ক ঘরে প্রবেশ করে বলল, ‘মুস্তাকিন সাহেবকে দুবাই নামার পর থেকে পাওয়া যাচ্ছে না জনাব।’
ওয়াকার কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘পাওয়া যাচ্ছে না? ঠিক আছে, ওদের জানাও ওকে ছাড়াই ওরা যেন ইসলামাবাদ রওনা হয়।’
আপ্তসহায়ক একটু দাঁড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
ওয়াকারের ফোনে মেসেজ টোন বাজল। প্রাইভেট নম্বর থেকে একটা মেসেজ এসেছে, মেসেজটা খুলতেই মুস্তাকিন আর তার কথোপকথনের রেকর্ডিং বাজতে শুরু করল। ওয়াকার ফোন অফ করে দিলেন।
টেবিলের ওপর এখনো বেশ কয়েকটা ফুলের বুকে আছে। এখন যেই দেখা করতে আসে, সে ফুলের বুকে নিয়ে আসে। একদিন রেখে পরের দিন ফেলে দিতে বলেন তিনি। এখন ফুলের গন্ধে অস্বস্তি হচ্ছে। বেল বাজালেন। আপ্তসহায়ক ছুটে এল। ওয়াকার বললেন, ‘এই ফুলগুলো এখনই ফেলে দিয়ে আসুন তো।’
‘জি স্যার।’
টেবিল থেকে ফুল খালি হল কয়েক মিনিটের মধ্যে।
আপ্তসহায়ক বললেন, ‘স্যার ছাত্রদের সঙ্গে মিটিংটা?’
‘পোস্টপন করুন, কালকে হোক।’
‘জি স্যার, এখন কাউকে আসতে বারণ করে দিন।’
আপ্তসহায়ক বেরিয়ে গেল।
আমন খান আবার ফোন করা শুরু করেছে। ওয়াকার ধরলেন না।
পরে কথা বলবেন।
চেয়ারের ভার হঠাৎই বেড়ে গেছে যেন…
*****
জাতীয় সংগীত বদলানোর প্রস্তাব দিয়েছে ছাত্রসমাজ। খবরটা দেখার পর থেকে সোমনাথের মাথা ভার হয়ে আছে। তিনি ক্লাসে কোনোদিন ছাত্রদের গায়ে হাত তোলেননি। এখন ইচ্ছে হচ্ছিল টিভিতে ঢুকে দুটো চড় মেরে আসেন।
বীথি তার পাশে বসেই টিভি দেখছিলেন। সোমনাথকে বললেন, ‘তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে? এ-রকম করছ কেন?’
সোমনাথ সোফায় ঘুষি মারছিলেন নিজের মনেই। খেয়াল ছিল না বীথি দেখেছেন সেটা। বললেন, ‘এই গর্ভস্রাবগুলোর জন্য আমি লেখালেখি করেছিলাম ভাবলেই রাগ হয়ে যাচ্ছে। আমার সোনার বাংলা পৃথিবীর সেরা জাতীয় সংগীত। গর্দভেরা বলছে সেটাকে পালটাতে হবে! ভাবো! মাথার মধ্যে কতটা গোবর ঢুকলে কেউ এই কথা বলতে পারে!’
‘ঠিক আছে, তুমি শান্ত হয়ে বোসো। এসব নিয়ে বেশি ভেবো না। তোমার শরীর ভালো নেই। বেশির ভাগ দিন রাত জেগে বসে থাকো। এভাবে বেশিদিন চললে তো হাসপাতালে ভরতি হতে হবে!’
সোমনাথ চুপ করে গেলেন। মেসেজ টোন এল একটা। সোমনাথ দেখলেন বীথির হাতে একটা নতুন ফোন। মেসেজটা দেখছেন। সোমনাথ অবাক হলেন, ‘এই ফোনটা কে দিল তোমায়? জয়দেব তো ফোন অফ রাখতে বলেছিল!’
বীথি বললেন, ‘জয়দেবই দিয়েছিল।’
সোমনাথ কিছুই বুঝতে পারলেন না, ‘মানে? কেন দিয়েছিল? ল্যান্ডলাইন আছে তো!’
বীথি বললেন, ‘হতে পারে ল্যান্ডলাইনের তার ছিঁড়ে দিচ্ছে কেউ। তখন কী হত? ওই জন্যই দিয়েছে।’
সোমনাথ বললেন, ‘কী লিখেছে?’
বীথি বললেন, ‘ওই যে কাজে গেছিল, সেটা হয়েছে লিখেছে। এখন ফিরছে জানালো।’
টিভিতে ব্রেকিং নিউজ দেখাচ্ছে। যমুনা গেস্ট হাউজের কাছে একটা খুন হয়েছে। গাড়ি চালককে কেউ গুলি করে দিয়ে চলে গেছে। সোমনাথ টিভি বন্ধ করে বললেন, ‘তুমি কি জানতে জয়দেব কে?’
বীথি উঠে দাঁড়ালেন, ‘চা করে আনি।’
সোমনাথ কড়া গলায় বললেন, ‘না। চা আনতে হবে না। তুমি দাঁড়াও। আমাকে সত্যি কথা বল। তুমি জয়দেবের আসল পরিচয় জান?’
বীথি সোফায় বসে বললেন, ‘জানি।’
সোমনাথ বললেন, ‘তাহলে আমাকে আগেই বলনি কেন?’
বীথি শান্ত গলায় বললেন, ‘তোমাকে তো মাঝে মাঝে আমি চিনতে পারি না। কখন সব কিছু মেনে নাও, কখন রেগে যাও, কী করে বুঝব?’
সোমনাথ বললেন, ‘অ। তা তুমি কতটা জান ওদের সম্পর্কে?’
বীথি বললেন, ‘যতটুকু জানার ততটুকু জানি।’
সোমনাথ বললেন, ‘আর এতে তোমার ভূমিকা কী ছিল?’
বীথি বললেন, ‘আমাকে তো তুমি রোজ চোখের সামনেই দেখতে পাও। আমার কী ভূমিকা থাকতে পারে বলো? আমরা তো নিঃসন্তান। ছেলেটা যেদিন থেকে এসেছে, আমার মনে হয়েছে আমার ছেলে থাকলে জয়দেবের মতোই হত এতদিনে।’
সোমনাথ বললেন, ‘প্রথম থেকেই ওর পরিচয় জানতে? তনয়াই বলেছিল?’
বীথি বললেন, ‘মায়েদের সব কিছু বলে দিতে হয় না। মায়েরা সব জেনে যায়। এবার চা বানাই?’
সোমনাথ হাল ছেড়ে দিলেন, ‘বানাও।’
দরজা খোলার শব্দ হল। সোমনাথ চমকে উঠলেন, তাকে আশ্বস্ত করে জয়দেব ঘরে প্রবেশ করল। বীথিকে দেখেই বলল, ‘কাকিমা, চা খাব।’
বীথি বললেন, ‘বোসো। ওদিকেই যাচ্ছিলাম।’
বীথি রান্নাঘরে প্রবেশ করলেন।
জয়দেব জুতো খুলে সোফায় বসে শ্বাস ছাড়ল।
সোমনাথ কিছু বলতে গিয়েও চুপ করে গেলেন
জয়দেব বলল, ‘একটা সেফ প্যাসেজ পাওয়া গেছে। ইন্ডিয়া চলে যাওয়া যাবে। যাবেন কাকাবাবু? ব্যবস্থা করব?’
সোমনাথ বললেন, ‘তোমার কী মনে হয় জয়দেব? আমি এই দেশ ছেড়ে কোথাও যাব? বাঁচলে এখানেই বাঁচব, মরলে এখানেই মরব। আমি কোথাও যাব না।
জয়দেব হাসল, ‘জানতাম। তবু একবার জিজ্ঞেস করলাম।’
সোমনাথ টিভি ছাড়লেন আবার। খুনের খবরটাই দেখিয়ে যাচ্ছে।
সোমনাথ বললেন, ‘কী লাভ হবে? আমি কী আবার কলেজ যেতে পারব?
জয়দেব বলল, ‘যে প্রবল ঝড়টা উঠেছিল, সেটা থামবে। এর ফলে বাহ্যিক কোনো কিছুই পালটাবে না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে যে খেলাটা ওরা শুরু করেছিল, সেটা বাধা পাবে। কোনোকিছুই কি একবারে বিফলে যায় কাকাবাবু?’
বীথি চা নিয়ে এসেছেন। সোমনাথ চুপ করে চা শেষ করলেন।
অনেক কিছু সাত-পাঁচ ভেবে শেষে বললেন, ‘কিন্তু নিপুণের কলেজ যাওয়াটা দরকার। একটা প্রজন্ম এভাবে শেষ হয়ে যেতে পারে না।’
জয়দেব বলল, ‘যাবে। আর দিন পনেরো।’
সোমনাথ টিভি দেখতে শুরু করলেন।
জয়দেব বীথিকে বলল, ‘কাকিমা, আজ রাতেও একবার বেরোবো। ছোটো একটা কাজ বাকি আছে। আপনাদের নিশ্চিন্তে ফ্ল্যাটে ফেরার ব্যবস্থা তো করতে হবে। এ ক-দিন ধরে এরা র-এর ভূত দেখেছে, এবারে একবারে দেখে নিক সে গল্প সত্যি হলে কী হয়।’
বীথি দু-হাত জোড় করে বললেন, ‘দুর্গা দুর্গা!’
*****
সারাদিন প্রবল টেনশনের মধ্যে কেটেছে। সকাল দশটা নাগাদ বাবার ফোনে সেই লোকটা ফোন করেছে। বাবা পাগলের মতো করছে, ‘হ্যাঁরে, তোরা ব্যাগগুলো নিয়ে তৈরি হ। গাড়ি চলে আসবে। আমরা বেরোতে পারব।’
মা-বাবাকে অনেকবার বোঝাতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে।
লোকটা আরও দু-লাখ টাকা চেয়েছে। বাবা তাতেই রাজি হয়েছে। কথা হয়েছে ভারতে পৌঁছে লোকটার হাতে টাকা তুলে দেওয়া হবে।
একটা দেশ ছেড়ে চিরকালের মতো চলে যাওয়া। দেশভাগের গল্প শুনেছিল সে ছোটোবেলায় ঠাকুমার মুখে। ঠাকুমার ভাই-বোনেরা ভারতে চলে গেছিল। তারা থেকে গেছিল শেষমেশ। ঠাকুমা চোখ বোজার আগে বলেছিল ভালোই হয়েছে দেশ ছাড়তে হল না। এখন তো আর কোনো সমস্যা নেই!
সমস্যা নেই, তা আর এখন বলা যাবে না। কলেজে যা হয়েছে, তারপরে আর কোনোভাবেই ঢাকায় তারা ফিরতে পারবে না। রুমান, তৌফিক সবাই কেমন নেই হয়ে গেল। রাখির মাথা ভরতি বিষাদ আর অবসাদ মিলেমিশে যাচ্ছে। কোনোমতে দু-মুঠো খেতে পারল সে। সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ একটা গাড়ি এল। লোকটা বাবার সঙ্গে ফিসফিস করে কথা বলল। বাবার আর তর সইছে না। গাড়িতে উঠে বাবা বলল, ‘কিছুটা রাস্তা জলা জায়গার উপর দিয়ে হাঁটতে হবে। ভয় পাবি না কেউ। ও ঠিক নিয়ে যাবে।’
মা বলল, ‘সাপ থাকে যদি?’
বাবা ধমক দিল, ‘এখানে মেরে ফেলছে লোকজন, আর তুমি সাপের ভয় পাচ্ছ। কিচ্ছু হবে না।’
মা চুপ করে গেল। পিসি বলল, ‘কিছুদিন দেখে নিলে হত না রে দাদা? আবার যদি সব ঠিক হয়ে যায়?’
বাবা বলল, ‘এখন চলো। পরে ঠিক হলে আসবি। আমি তোকে ফেলে রেখে যেতে পারব না।’
পিসি আর কিছু বলল না। পিসি নিঃসন্তান। পিসেমশাই মারা যাবার পর এখানে এতদিন ভূতের মতো থেকে গেছে। পিসিকে রেখে যাওয়া সত্যিই অসম্ভব। বড়ো রাস্তা ছেড়ে একটা সময় গাড়ি মাটির রাস্তায় নামল। গাড়ি দুলছে, রাস্তা এতটাই খারাপ। আলো নিভিয়ে আরও খানিকটা পথ যাবার পর গাড়ি দাঁড়িয়ে গেল। লোকটা টর্চ জ্বেলে বলল, ‘আমি এখান থেকে আলো জ্বেলে রাখলাম, আপনারা আলো দেখে এগিয়ে যান। ওদিক থেকেও আলো জ্বলবে। দিন, টাকাটা দিন।
মা আতঙ্কিত কণ্ঠে বলল, ‘আপনি যাবেন না?’
লোকটা বলল, ‘না। গোলাগুলি চলে। কোনো ঠিক থাকে না। আমি যাব না।’
মা রাখির হাত শক্ত করে ধরে বলল, ‘তাহলে আমরাও যাব না।’
বাবা নীচু গলায় ধমক দিল, ‘চুপ করো। বোকার মতো বকবক কোরো না। লোকটা বলল, ‘যান। তাড়াতাড়ি যান। এখন ওদের শিফট পালটাচ্ছে। এই সময়ে ঢুকে যেতে পারবেন।’
বাবা লোকটার হাতে টাকার প্যাকেট তুলে দিয়ে মার হাত ধরে জোর করে এগিয়ে নিয়ে গেল। রাখি পিসির সঙ্গে হাঁটছে। একটু পরেই জলা জমি। প্রথমে গোড়ালি, একটু পরেই হাঁটু থেকে জল প্রায় কোমর সমান হয়ে এল। এপারের আলো নিভে গেছে। ওপার থেকেও আর কোনো আলো দেখা যাচ্ছে না। মা ফিসফিস করে বলল, ‘কী গো, ফিরে যাবে? চলো না।’
বাবা বলল, ‘চলো। কোনোদিকে দেখতে হবে না। ভয় পেও না। চলো।’
পায়ে কি কিছু একটা জড়িয়ে ধরছে? রাখির বোধশক্তি হারিয়েছে। হেঁটেই চলেছে উদ্দেশ্যহীনের মতো। কোথায় যাচ্ছে তারা?
বাবার হাঁফ ধরে যাচ্ছে। তার শৌখিন বাবা। বাজারে সব থেকে ভালো জামাটা তার জন্য কিনে দেওয়া বাবা, তাকে ছোটো থেকে বুক দিয়ে আগলে রাখা বাবা। একটা গোটা জীবন শুধু তাদের জন্য নিংড়ে দেওয়া তার বাবা মা…
আরও কিছুটা যাবার পর বাবা দাঁড়িয়ে পড়ল। বিহ্বল কণ্ঠে বলল, ‘আমরা কি পথ হারিয়েছি?’
কথাটা বলেই বাবা কেঁদে উঠল। এতক্ষণে বাবা বুঝেছে
মা আর পিসিও কাঁদছে। রাখির কান্না পাচ্ছে না। তীব্র আতঙ্ক তাকে বাকরুদ্ধ করে দিয়েছে। এই অন্ধকারটাই তো সে দুঃস্বপ্নে দেখে এসেছে এতদিন। চারদিক থেকে ঘিরে থাকবে তীব্র কালো একটা রাত, কতগুলো হাত এসে তাকে নোংরাভাবে স্পর্শ করবে, আর সে কিচ্ছু করতে পারবে না… সেই দুঃস্বপ্নটাই যেন সত্যি হচ্ছে এভাবে।
আলো দেখার কথা ছিল তাদের। অথচ কিছুতেই আর কোনে আলো দেখতে পাচ্ছে না কেউ।
পিসি হঠাৎ বলে উঠল, ‘এই দাদা, ওই তো আলো… ওই দ্যাখ, ওই যে…’
বাবা আরেকটু হলেই চিৎকার করতে যাচ্ছিল। মা বাবার মুখে হাত দিয়ে বলল, ‘চুপ করো। চলো, শিগগিরি চলো।’
তারা আবার হাঁটতে শুরু করল…
