আয়নাবাড়ি – ১০

১০

।। দিল্লি।।

আর পি প্রশান্তকে চেম্বারে ডেকেছেন।

প্রশান্ত আর পি-র সামনে বসতেই আর পি বললেন, ‘তুমি ঠিক আছ?’

প্রশান্ত ঘাড় নাড়ল, ‘একদম। কেন বলুন তো?’

আর পি বললেন, ‘সমর নেই। তোমার উপর বেশি চাপ পড়ে যাচ্ছে।’

প্রশাস্ত বলল, ‘সমরের উপরেও চাপ পড়ছে স্যার। ওকে মেঘালয়ে না পাঠালেই ভালো হত।’

আর পি ক্লান্ত কণ্ঠে বললেন, ‘তোমরা জানো, তোমরা ছাড়া আমি কারো উপর ভরসা করতে পারব না। উসমান ওখান থেকে ইনফিল্ট্রেশন প্ল্যান করেছে। সমরের মেঘালয়ে থাকা দরকার। এখান থেকে ও বর্ডার সিকিউরিটিকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতে পারবে না। দেওয়া সম্ভব না।’

প্রশান্ত বলল, ‘তা ঠিক। দীপ্তি রেগে আছে সমরের উপর।’

আর পি এবার হাসলেন, ‘দীপ্তির রাগারই কথা। ও দু-দিন ছুটি চেয়েছে। আমি ব্যবস্থা করব বলেছি। তোমার ছুটি নেবার প্ল্যান আছে এর মধ্যে?’

প্রশান্ত মাথা নাড়ল, ‘নাহ। এখন কিছু নেই।’

আর পি বললেন, ‘গুড। বানশালের আপডেট কী আছে আজ?’

প্রশাস্ত ফোন বের করে একটু দেখে নিয়ে বলল, ‘ভোর ছ-টায় ওকে রশ্মিকা মানসুখানি গুড মর্নিং টেক্সট করেছিল। বানশাল সেটা দেখেছে সাড়ে আটটায়।’

আর পি বললেন, ‘রাইট। রশ্মিকার ইন্সমনিয়া আছে। তারপর?’ প্রশান্ত বলল, ‘ঘুম থেকে উঠেই ইন্টিমেট চ্যাট শুরু করেছিল।’ আর পি বললেন, ‘বানশালের বউ কোথায় আছে এখন?’

‘বাড়িতেই। ওর কাছেই। রান্নাবান্না করেন হয়তো। জানেন না।’

‘তা তো বোঝা যাচ্ছে। রশ্মিকার প্ল্যান কী আছে?’

‘জানি না। বোঝা যাচ্ছে না। তবে লাস্ট মাস্থে দোহা গেছিল।’

‘দোহা? কেন? দোহায় কী ছিল?’

‘আই এস আই-এর বড়ো গ্যাং আছে। তবে রশ্মিকা ওদের সঙ্গেই দেখা করেছিল নাকি, এখন অবধি কোন আপডেট নেই।’

‘রাইট। এটা চেক করার জন্য ইন্সট্রাকশন পাঠাও।’

‘ওকে স্যার।’

‘আর? বানশালের মতো এত ইম্পরট্যান্ট লোককে আর কেউ মেসেজ করেনি?’

‘না। সারপ্রাইজিংলি না।’

‘ওর অন্য কোনো ফোন নেই? ওর বউয়ের ফোন?

‘বউয়ের ফোন আমার সিস্টেমে লিংকড নেই।

‘লিংক করো। এসব কি শিখিয়ে দেবো নাকি?’

‘সরি স্যার। এখনই হয়ে যাবে। বানশাল শুধুমাত্র এক জায়গায় মেসেজ করবে না। এর মানে হল ওর অন্য কোনো জায়গায় অ্যাকাউন্ট খোলা আছে। একে যত সহজভাবে নিয়েছিলাম, তত সহজ ও না। বানশালের বউ, ছেলে এবং মেয়ে, তিনজনের ডিটেলস নাও।’

‘ওকে স্যার।’

‘আমি এখন বেরোবো। যদি তেমন কিছু মনে হয়, মেইন সার্ভারে খবর দেবে। সবাই জানুক। এত হেডেক আমি একা নিতে পারছি না। নিজেকে ভগবানের মতো মনে হচ্ছে আজকাল। সবার সব কিছু জেনে বসে আছি।’

‘সাবধানে ফিরুন স্যার। আপনি আছেন বলেই আমরা আছি।’

আর পি হেসে ফেললেন, ‘এসব ঢপের কেত্তন আমাকে শুনিয়ে লাভ নেই ভাই। আমাকে তুমি জানো, আমি কারো তেল খাই না। তোমারটাও খাব না।’

‘না না স্যার। আপনি নমস্য ব্যক্তি।’

‘সাবধানে কাজ করো। সার্ভার সামলে।’

‘নিশ্চয়ই।’

সন্ধ্যে সাড়ে ছটা। আর পি বেরোলেন।

প্রশান্ত আবার নিজের ডেস্কে এসে বসল। এই টুকু সময়ে তার পাঁচ জন প্রচুর মেসেজ করে ফেলেছে। কেউ হোয়াটস অ্যাপে, কেউ-বা টেলিগ্রামে।

মন দিয়ে সব ক-টা মেসেজ প্রত্যেকের নামে নামে বানানো ফোল্ডারে ডাউনলোড করে রাখল সে। কত অসংখ্য তথ্য জমে আছে সার্ভারগুলোতে। এত তথ্যের সব কি দরকারি? তা নয়। কত বাজে বকা আছে। আর পি সেগুলোও প্রাণে ধরে ডিলিট করতে দেন না। বলেন ওই ছাই-য়েও অনেক কিছু থাকতে পারে। রোজ গুড মর্নিং বলা লোকটা একদিন সুপ্রভাত বললে তার মধ্যেও অন্য মানে থাকতে পারে। তারা শুধু অ্যানালিসিস করবে আর তথ্য তাদের কাছে জমা করে যাবে। তাদের ডেটাবেস প্রতিদিন সমৃদ্ধ হবে নতুন নতুন তথ্যে।

বানশালের সঙ্গে রশ্মিকার কথা শুরু হয়েছে, প্রশান্ত মন দিয়ে স্ক্রিন দেখতে লাগল, রশ্মিকা-ডায়মন্ড সার্কেলে এসেছি।

বানশাল—আগে বলনি তো যাবে?

রশ্মিকা-কেন? বললে আসতে?

বানশাল—শিওর।

রশ্মিকা–(হাসির স্মাইলি দিয়ে)-কেন? বউয়ের জন্য কিনতে?

বানশাল—টাং খিচাই মৎ কর ইয়ার।

রশ্মিকা–আই অ্যাম জাস্ট টেলিং দ্য ট্রুথ। টাং খিচাই না।

বানশাল—ওকে। আমি যাচ্ছি। বেরোচ্ছি এখন।

রশ্মিকা-?

বানশাল-ডায়মন্ড সার্কেলে যাচ্ছি। দেখি তোমার কোনটা পছন্দ।

প্রশাস্ত আর পিকে ফোন করল। আর পি নীরস কণ্ঠে ফোন ধরে বললেন, ‘বলো।’

প্রশাস্ত বলল, ‘বনশল ডায়মন্ড সার্কেলে যাচ্ছে। সম্ভবত রশ্মিকাকে কিছু কিনে দেবে।’

আর পি ফোন রেখে দিলেন।

এটুকুই যথেষ্ট। আর পি এবার তার নেটওয়ার্ক অ্যাক্টিভেট করবেন।

প্রশান্ত চিউইং গাম মুখে দিয়ে চিবোতে শুরু করল। একটু চা খেতে পারলে ভালো হত। এই অফিসে আরও অন্যান্য গ্রুপ কাজ করে। এক একটা শিফটে কুড়িজন। অথচ কারো সঙ্গে কারো কথা বলার নিয়ম নেই। পরিচয়টুকুও করা যাবে না।

সে স্মোকিং জোনে গিয়ে সিগারেট ধরালো। আরেকজন সিগারেট টানছে। তাকে দেখে একটা নীরস হাসি দিল শুধু। প্রশান্ত জানলা দিয়ে উপর থেকে নীচের ট্র্যাফিক দেখতে শুরু করল। গাড়িগুলো দাঁড়িয়ে আছে সিগনালে। সিগারেট টানা শেষ হলে আবার কিউবিকলে গিয়ে বসল।

বাংলাদেশে নড়াচড়া দেখা যাচ্ছে। সাংকেতিক মেসেজ যাচ্ছে সিলেট থেকে মেঘালয়ে, সে সবটুকু ডিকোড টিমের কাছে মেইল করে দিল।

বানশালের ফোনে আর কোনো মেসেজ নেই। ফোনও আসছে না।

আইটি টিম বানশালের বউয়ের ফোনের অ্যাক্সেস পাঠিয়েছে। প্রশান্ত মন দিয়ে দেখা শুরু করল।

চারটে ফ্যামিলি গ্রুপ আছে, একটায় জাগরণ হবে ক-দিন পর, তাই নিয়ে আলোচনা চলছে। বানশলের সঙ্গে বানশলের বউয়ের চ্যাটটা খুলল, কতগুলো টাকা পাঠানোর স্ক্রিনশট পাঠিয়েছে বউকে। অ্যামাউন্টগুলো দেড় লাখ, সাত লাখ, পঁচাত্তর হাজার এবং তিন লাখ সত্তর হাজার।

প্রশাস্ত বানশলের ফাইলে এইগুলো ডাউনলোড করে রাখল।

নিজে উঠে কফি নিয়ে এসে বসল। বানশলের ফোন বাজছে। বানশল ফোন ধরে বলল, ‘হ্যাঁ, কোনদিকে আছ?

রশ্মিকা আছে অন্যপ্রান্তে, বলল, ‘লিফটের সামনে আছি। চলে এসো।’

বানশল ফোন কেটে দিল।

প্রশান্ত নিজের মনেই বলল, ‘এরাই লাইফ কাটাচ্ছে। আমি তো শুধু মেট্রোর টিকেট কাটছি, মেট্রোতে উঠছি, আর ফ্ল্যাটে ফিরছি।’

আর পিকে মেসেজ করে দিল সে।

গুজরাটের সাসপেক্ট নাম্বারে পাকিস্তান থেকে হোয়াটস অ্যাপ কল আসছে, প্রশান্ত কানে আবার হেডফোন দিল।

‘প্যাকেজ?’

‘সাত লাখ।’

‘বাড়াতে হবে।’

‘কোনো উপায় নেই।’

ফোন কেটে গেল। প্রশান্ত কল রেকর্ডিং পাঠিয়ে দিল আর পিকে।

রাত নামছে। এবার আর মনিটরের সামনে থেকে উঠে কোথাও যাওয়া যাবে না। যত খেলা এখনই শুরু হবে।

১১

।। ঢাকা।।

বীথি দরজা খুলে সোমনাথকে দেখে বললেন, ‘মাথা ব্যথা নেই তো? আজ তোমায় বেশ কয়েকবার ফোন করেছিলাম, ফোন বিজি বলছিল।’

সোমনাথ ঘরে ঢুকে ব্যাগ রেগে সোফায় বসলেন, ‘মাথা ব্যথার আর দোষ কী? দেশের যা অবস্থা!

বীথি বললেন, ‘কী অবস্থা?’

সোমনাথ বললেন, ‘ছাত্ররা আমার পদত্যাগ দাবি করছে।’

বীথি বসে পড়লেন, ‘দেখেছ? কাল আমি বললাম না তোমাকে? তনয়ারা বাইরে থেকে যে খবর পায়, আমরা দেশে থেকে সে খবর পাই না। তুমি কাকে সমর্থন করেছিলে বা করনি, সেটা বড়ো কথা না, এখন এদেশে বড়ো কথা হল ওরা…’

সোমনাথ হাত তুলে বীথিকে থামালেন, ‘এসব নিয়ে আলাপ করার দরকার নেই। আমার প্রেশার বেড়ে যাচ্ছে। চা করো।’

বীথি বললেন, ‘করছি। তুমি যদি এখন পদত্যাগ কর, তারপর কী করবে?’

সোমনাথ অসহায়ভাবে বললেন, ‘আমার তো বেশিদিন চাকরি নেই। সেরকম হলে করতে হবে। তারপর পেনশনের জন্য তদ্বির করব।’

বীথি মুখে আঁচল চাপা দিলেন, ‘এর থেকে শেখের বেটি থাকলেই ভালো হত। মারত ধরত যা খুশি করত, চাকরি তো থাকত।’

সোমনাথ গম্ভীর হয়ে গেলেন। বীথি চা করতে উঠলেন। সোমনাথ ফ্রেশ হয়ে চেঞ্জ করে টিভি চালালেন। ফোনের দিকে কয়েকবার ইতস্তত করে সেটা হাতে নিয়ে তার এক ছাত্রের নাম্বার খুঁজে তাকে ফোন করলেন। ওপ্রান্ত ফোন রিসিভ করেই সালাম দিয়ে বলল, ‘স্যার, ভালো আছেন তো?’

সোমনাথ বললেন, ‘ভালো আছি বাবা, মন্টু, তুমি কেমন আছ?’

‘এখন খুব ব্যস্ত আছি স্যার। দেশ গড়ার কাজ এখন আমাদের ছাত্রদের, বুঝতেই পারছেন কতটা কাজের চাপ পড়ছে আমাদের উপরে।’

‘তা ঠিক, তা ঠিক বাবা। আমি আমারই একটা দরকারে ফোন করছি। লজ্জিত লাগছে বলতে, তবু এই বিপদের সময়ে তোমার কথাই মনে পড়ল।’

‘এ আবার কী কথা স্যার? আপনি আমার শিক্ষক, আপনি আমাকে আদেশ করবেন, কোনো সমস্যা হয়েছে, আমাকে বলুন।’

‘আজ কলেজে গেছিলাম। ছাত্রদের একাংশ আমার কাছে এসে আমাকে পদত্যাগ করার জন্য জোরাজুরি করতে এসেছিল। আমার মনে হচ্ছে এই ব্যাপারটা কমবে না, বাড়তে থাকবে দিনের পর দিন। আমি মধ্যবিত্ত মানুষ, অনেকটা টাকা লোন করে ফ্ল্যাট কিনেছি, জমা টাকার পরিমাণ যা আছে, তাতে স্বামী-স্ত্রীতে বাকি জীবনটা কী করে কাটাবো তাই চিন্তা করেই আমার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে।’

‘কে স্যার? কার এত বড়ো সাহস যে আপনাকে হুমকি দিয়েছে?’

‘রাশেদ। রাশেদকে চেনো?’

‘খুব ভালো করে চিনি স্যার। যখন আমরা লড়াই দিচ্ছিলাম, তখন তাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি, এখন মোড়ল হবার সময় সবার সামনে এসে হাজির হয়েছে। আপনি আমাকে বলেছেন, এটাই আমার কাছে লজ্জার ব্যাপার স্যার। আপনি ভাববেন না। আমি তো নিয়মিত আপনার ফেসবুক পোস্টগুলো দেখি। আপনি এই সময়ে সবসময় আমাদের পাশে ছিলেন স্যার। আমি কিছুতেই আপনার কোনো ক্ষতি হতে দেবো না। আমি যা করার করছি।

‘ধন্যবাদ বাবা। তোমাকে কী বলে যে ধন্যবাদ দেবো…’

‘আমাকে লজ্জায় ফেলবেন না স্যার, আপনি আমাকে আদেশ দেবেন।’

ফোন রেখে মনটা প্রফুল্ল হল তার। বীথি চা নিয়ে এসে তার সামনে বসলেন, ‘কী হবে এবার?’

সোমনাথ চায়ের কাপ হাতে তুলে বললেন, ‘কিচ্ছু হবে না। আমার ছাত্র ছিল না মন্টু? ওকে সব বলেছি, ও বুঝে নেবে।’

বীথি বললেন, ‘এভাবে অন্যের ভরসায় চাকরি করা তোমার পক্ষে সম্মানজনক হবে? তোমার ভয়ে সবাই কাঁপত, এখন তোমাকে ছাত্রদের হাতে পায়ে ধরতে হবে?’

সোমনাথ রেগে গেলেন, ‘তাহলে কী করব বলো? আমার কি অত সেভিংস আছে, না বিদেশি ব্যাংকে কোনো অ্যাকাউন্ট আছে যে দেশ ছেড়ে চলে যেতে পারব? সারাজীবন নিঃস্বার্থভাবে কলেজের জন্য কাজ করে গেছি, ছাত্র-ছাত্রীদের এক্সট্রা ক্লাস করিয়েছি, এখন আমার আর কী করার আছে?’

বীথি কিছু না বলে উঠে চলে গেলেন।

ঘণ্টাখানেক পরের কথা। টিভিতে খবরের মাঝে হঠাৎই সোমনাথ দেখলেন ব্রেকিং নিউজ দেখাচ্ছে, ছাত্রনেতা আসলাম হোসেন মন্টুকে অজ্ঞাতপরিচয় আততায়ীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে গুলি করে চলে গেছে।

১২

।। দিল্লি ॥

হোটেলের বিছানায় সুহাসে তার শরীরে ডুবে যাচ্ছিল। দীপ্তির ভালো লাগছিল। কতদিন পর তারা একসঙ্গে এসেছে আবার।

বড় ক্লান্ত লাগে আজকাল। এখন সব কিছু যেন রিসেট হচ্ছিল।

একটা সময় পর দু-জন দু-জনকে জড়িয়ে চুপ করে শুয়ে রইল।

সুহাস বলল, ‘আজ ফিরতে হবে না। মিসেস মালহোত্রাকে ফোন করে বলে দাও ফিরবে না।’

দীপ্তি মনমরা গলায় বলল, ‘কাল মর্নিং শিফট আছে। এখান থেকে যেতে পারব না।’ সুহাস বলল, ‘যেতে হবে না। সমরের মতো ডুব মেরে দাও।’

দীপ্তি সুহাসের বুকে আঙুল দিয়ে দাগ কাটতে কাটতে বলল, ‘নাহ, থাক। ডুব দেবো না। তেরোর ছুটিটা আমার লাগব।’

সুহাস বলল, ‘ঠিক আছে, আরেকটু থাকো। ন’টা নাগাদ বেরোবো।’

দীপ্তি বলল, ‘তখন যদি কিছু না পাওয়া যায়? দিল্লিকে ভরসা করছ?’

সুহাস বলল, ‘আমি আছি তো।’

দীপ্তি বলল, ‘ঠিক আছে। থাকো।’

ফোন বাজতে শুরু করল তার। দীপ্তি দেখল প্রশান্ত ফোন করছে। ধরল সে। ‘কী হল? কাল ডুব মারার প্ল্যান আছে নাকি?’

‘না। রিগালে কেন? আর ভালো হোটেল পাসনি? এত কিপটে কেন তুই?’

‘থাম। কী বলছিস বল।’

‘বানশাল অ্যাক্টিভেটেড। ওয়ার্ক ফ্রম হোম করবি রাতে। আর পি বলে দিয়েছে। সকালে দশটায় ঢুকলে হবে। তাড়াতাড়ি ফের।’

‘গো টু হেল।’

ফোন কেটে দিল দীপ্তি।

সুহাস বলল, ‘কী হল?’

দীপ্তি বলল, ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম দিয়ে দিয়েছে রাতে। চলো। উঠি।’

সুহাস ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলল, ‘এ কী ইয়ার? এসব কী? এত কাজ কে করে?’

দীপ্তি উঠে জামা পরতে পরতে বলল, ‘আমি করি। চলো।’

সুহাস উঠে বসে বলল, ‘দু-হাজার টাকা গেল। আরও এক ঘণ্টা থাকা যেত।’

দীপ্তি সুহাসকে জড়িয়ে ওর গালে একটা চুমু খেয়ে বলল, ‘এক সময় তো সারাদিন এক সঙ্গেই থাকব। এত চাপ নেবার কী আছে? চলো। সিরিয়াস কাজ আছে।’

সুহাস শ্বাস ছেড়ে বলল, ‘গরীব হওয়া অভিশাপ। টাকা থাকলে এসব নিয়ে ভাবতে হত বল?’

দীপ্তি বলল, ‘চলো চলো।’

এক প্রকার তাড়া দিয়ে সুহাসকে নিয়ে হোটেল থেকে বেরোলো দীপ্তি। বাইরের কিছুটা জায়গা অন্ধকার।

সুহাস ঘাবড়ে গেল, ‘সেকি? এখনই এত নির্জন হয়ে গেল জায়গাটা?’

দীপ্তি ক্যাব খুঁজছিল। সব রিজেক্ট করে দিচ্ছে।

চারজন যুবক রাস্তার পাশে বাইক দাঁড় করিয়ে বিয়ার খাচ্ছে। তাদের দেখে একজন শিস দিল।

সুহাস বলল, ‘পা চালাও। মোড়ের মাথায় গেলে অটো পেয়ে যাব।’

দীপ্তি পা চালালো। একটা বাইক স্টার্ট দিয়েছে।

দূর থেকে কুকুরের ডাক শোনা যাচ্ছে।

বাইকটা এল ই ডি মারছে তাকে, কী বিচ্ছিরি আলো এটা। একবার জ্বলছে, একবার বন্ধ হচ্ছে। ছেলেগুলোর হাসি শোনা যাচ্ছে।

সুহাস দীপ্তির হাত শক্ত করে ধরেছে। বাইকটা এগোতে শুরু করতেই বাইক চালক পেছনের আরোহী-সহ একটা ছোটো শব্দ করে মাটিতে পড়ে গেল। দীপ্তির মুখে হাসি ফুটল। সুহাস বলল, ‘ক্কী… কী হল?’

দীপ্তি হাঁটার স্পিড বাড়িয়ে দিল। বাকি দু-জন ছেলে কিছু বুঝতে না পেরে চিৎকার শুরু করেছে।

একটা গাড়ি এসে দাঁড়ালো, ড্রাইভার গলা বাড়িয়ে বলল, ‘দীপ্তি ম্যাডাম, আপনি বুক করেছেন আমায়?’

দীপ্তি বলল, ‘হ্যাঁ, ওঠো সুহাস।’

সুহাস ঘাবড়ে গেছিল। গাড়িতে উঠে বসল। গাড়ি চলতে শুরু করেছে। সুহাস বলল, ‘ওটিপি নেবে না?’

দীপ্তি ঠান্ডা গলায় বলল, ‘নামার পরে নেবে।’

সুহাস বলল, ‘কিছু একটা হয়েছে বুঝলে? ছেলেগুলো পড়ে গেল। বাকি দু-জন চিৎকার জুড়েছে!’

দীপ্তি সুহাসের হাত শক্ত করে ধরল, ‘ওসব নিয়ে ভেবো না। পেছনে কী হয়েছে দেখলেই সমস্যা বাড়ে। সামনের দিকে তাকাও।’

সুহাস বলল, ‘তাও ঠিক। ছেলেগুলো ভালো না একবারেই। ওদের উদ্দেশ্য ভালো ছিল না। ফলো করছে না তো’?

পেছনের দিকে দেখে আশ্বস্ত হল সে, ‘নাহ, পেছনে কোনো বাইক নেই। ঠিক আছে তাহলে।’

গাড়ি দীপ্তির পিজির কাছে পৌঁছে গেল। দীপ্তি গাড়ি থেকে নামতে নামতে বলল, ‘তুমি ড্রাইভারকে ঠিকানা বলে দিও। টাকা পে করা আছে। আর দিতে হবে না।’

সুহাস মাথা নাড়ল, ‘ঠিক আছে। টেক কেয়ার।’

দীপ্তি পিজির দিকে হাঁটতে শুরু করল।

প্রশান্ত ফোন করছে, ধরেই সে বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ।’ প্রশান্ত বলল, ‘কাজটা তাড়াতাড়ি ধর। থ্যাঙ্ক ইউ বলার অনেক সময় পড়ে আছে।’

১৩

॥ গৌহাটি।।

ওরা দু-জন ট্রেনে যাচ্ছে। একজন বয়স্ক, ষাট-বাষট্টি বয়স হবে।

অপরজন সাতাশ। সাতাশের যুবক আপার বার্থে ঘুমোচ্ছে। বয়স্ক লোকটা মন দিয়ে খবর পড়ছে। ট্রেন কিছুক্ষণ পর গৌহাটি ঢুকবে।

ব্যাঙ্গালোর থেকে গৌহাটি রুটের ট্রেন। মাঝে পশ্চিমবঙ্গে দাঁড়ায়। বাপ ছেলে ওখান থেকে উঠেছিল।

দীর্ঘ ট্রেন যাত্রা। ব্যাঙ্গালোর থেকে যারা গৌহাটি ফিরছে, তাদের বেশিরভাগের অবস্থা খারাপ। ট্রেন চলছে, এটুকুই। কেউই আর বিশেষ উচ্চবাচ্য করছে না।

কামাখ্যা স্টেশনে ট্রেন দাঁড়াতেই একদল আর পি এফ ট্রেনে উঠে ওই দু-জনের বার্থের কাছে এসে দাঁড়াল, ‘বিপিন বক্সী, রাহুল বক্সী!’

ছেলেটা উপর থেকেই ঝাঁপ দিতে চেষ্টা করেছিল। আর পি এফে-র জওয়ানরা তাকে ধরে ফেলল। বিপিন বক্সীকে কলার ধরে নামানো হল। বিপিন বক্সী চিৎকার করতে গেছিল। কেউ কানে দিল না। দু-জনকে ট্রেন থেকে নামিয়ে সরাসরি আর পি এফ অফিসে নিয়ে বসানো হল।

আর পি এফ অফিসার সুধাংশু শর্মা দিল্লিতে ফোন করছিলেন। ফোন রেখে তার সামনে বসিয়ে রাখা দু-জনকে দেখে বললেন, ‘মেঘালয় হয়ে বাংলাদেশে ঢোকার প্ল্যান ছিল, তাই তো?’

এ-রকম অতর্কিত হানায় দু-জনেই বিধ্বস্ত হয়ে গেছিল। সুধাংশুর কথায় কী বলবে বুঝতে না-পেরে বিপিন বলল, ‘আমার কাছে দু-লাখ টাকার মতো আছে। নিয়ে আমাদের ছেড়ে দিন।’

বিপিনের কথায় বাংলাদেশী টান স্পষ্ট। সুধাংশু বললেন, ‘আই কার্ড দেখি।’

বিপিন পকেট থেকে তার আধার কার্ড বের করে এগিয়ে দিল। সুধাংশু দেখেই হেসে ফেললেন, ‘একবারে আসলের মতো। পাসপোর্টটা দেখি। অরিজিনালটা। যা যা বলার, সত্যি সত্যি বলে দিলে আমি হেল্প করতে পারব। নইলে কী হবে কেউ জানে না।’

বিপিন পাংশু মুখে প্যান্টের গোপন পকেট থেকে দুটো বাংলাদেশী পাসপোর্ট এগিয়ে দিল।

সুধাংশু নাম দুটো দেখে বললেন, ‘মোস্তাক আর সোহরাব। কার কী নাম?’

বিপিন বলল, ‘আমার নাম মোস্তাক।’

সুধাংশু বললেন, ‘বেশ। প্ল্যান কী ছিল?’

মোস্তাক বলল, ‘প্ল্যান কিছু ছিল না স্যার। এখন তো অনেক ঝামেলা চলছে। ছেলেকে নিয়ে ব্যাঙ্গালোর গেছিলাম ডাক্তার দেখানোর জন্য। হয়ে গেছে। ফিরছি।’

সুধাংশু জামা গোটালেন, ‘দেখুন বস, আপনার যথেষ্ট বয়স হয়েছে। মারধোর খেতে ভালো লাগবে? সত্যিটা বলে দিন।’

মোস্তাক চুপ করে গেল। দরজায় দু-জন অফিসার এসে দাঁড়িয়েছেন। সুধাংশু বললেন, ‘এসো এসো। আমার কী সৌভাগ্য। দিল্লির লোকজন আজকাল এত দূরে চলে আসছে। এসব জায়গায় তোমাদের পদধূলি পড়েছে দেখতেও ভালো লাগছে।’

রমেশ সুরি আর রুদ্রনাথ বোস। আই বি অফিসার।

রমেশ সুধাংশুকে ধমক দিয়ে বললেন, ‘থামো, ফালতু কথা বলার দরকার নেই। তুমি গত মাসেই দিল্লি গেছিলে, আমাকে ফোনও করোনি। আর এখন এখানে এসে বাজে কথা শোনাচ্ছো। কোই, আমাদের দামাদরা কী বলছে?’

সুধাংশু পাসপোর্টদুটো রমেশের হাতে তুলে দিলেন, ‘দেখো। বাংলাদেশ থেকে আধার কার্ড বানিয়ে ব্যাঙ্গালোরে ডাক্তার দেখানোর গল্প দিচ্ছে।’

রমেশ বললেন, ‘মোস্তাক হোসেন। ওহ, এ মালকে তো চিনি।’

রমেশ এ কথা বলা মাত্র মোস্তাক মাথা নীচু করে ফেলল। রমেশ মোস্তাকের থুতনিতে হাত দিয়ে বললেন, ‘কী সব নাম যেন তোদের সংগঠনটার? হরকত ই উল মুজাহিদিন না কী যেন?’

মোস্তাক উত্তর দিল না। সোহরাব লাল চোখে রমেশের দিকে তাকাল। রমেশ সোহরাবের গালে সজোরে চড় কষালেন, ‘চোখ দেখাচ্ছিস কাকে মাদারচোদ? এ দেশে বসে আমাকে চোখ দেখাচ্ছিস? জ্যান্ত পুঁতে দেবো।’

সোহরাব হাউমাউ করে কান্না জুড়ে দিল। রমেশ পকেট হাতড়ে হতাশ কণ্ঠে বললেন, ‘এই সুধাংশু, আমার সিগারেটের প্যাকেটটা শেষ হয়ে গেছে।’ সুধাংশু সঙ্গে সঙ্গে ঘরে থেকে বেরিয়ে গেলেন।

রমেশ রুদ্রকে বললেন, ‘এদের বুদ্ধিটা খারাপ ছিল না কিন্তু। নর্থ ইস্ট হয়ে বাংলাদেশ ঢোকাটা সোজা। আবার কিছু একটা বড়ো প্ল্যানিং চলছে। কী চলতে পারে? চিকেন নেক নিয়ে চুলকানি উঠেছে, সে তো জানি, কিন্তু এত বড়ো সাহস হবে? কীরে মোস্তাক? তুই কিছু বল। ফালতু পাকিস্তানের পোঁদে পৌঁদে ঘুরিস তোরা। তোদের পাত্তাও দেয় না।’

মোস্তাক হতাশ গলায় বলল, ‘একটা সিগারেট খাওয়ান। কী করে খবর পেয়ে গেলেন বলুন তো?’

রমেশ হেসে ফেললেন।

১৪

॥ ঢাকা।।

আনোয়ার খান ছাত্রনেতাদের নিয়ে বৈঠকে বসেছে। আনোয়ার আই এস আইয়ের লোক। গত দশ বছর ধরে বাংলাদেশে ছদ্মবেশে ছিল। সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশ থেকে পালিয়ে যাবার পর আনোয়ার প্রকাশ্যে এসেছে। সে বাঙালিদের মতোই বাংলা বলতে পারে।

পাঁচজন ছাত্রনেতা এসেছে তার কাছে। নাহিদ, রাসেল, সামিউল, সইফুদ্দিন আর রাফি।

আনোয়ারের মুখ থমথমে হয়ে আছে। সে বলল, ‘যে সময় আসলামকে আমার সব থেকে বেশি দরকার ছিল, দেখা গেল তখনই ওকে কারা গুলি করে চলে গেছে। সবার আগে আমার এটা ক্লিয়ার হওয়া দরকার, তোমাদের মধ্যে কে ওকে মেরেছে?’

পাঁচজনই জোরে জোরে মাথা নাড়ল।

সইফুদ্দিন বলল, ‘জনাব, আমরা সারাদিন ট্র্যাফিকের কাজে ব্যস্ত ছিলাম। এসব কখন করব?’ আনোয়ার পা নাচাতে নাচাতে বলল, ‘এসবের জন্য সময় বের করতে বেশিক্ষণ লাগে না। আমি এটুকু তোমাদের কথা দিতে পারি, তোমরা এখন স্বীকার করলে বেঁচে যেতে, আমি যদি পরে কিছু জানতে পারি, তাহলে কিন্তু তোমাদের কপালে দুঃখ আছে।’

পাঁচজন মাথা নীচু করে বসে রইল।

আনোয়ার বলল, ‘কে করেছে?’

পাঁচজনই একে একে বলল তারা কেউই করেনি।

আনোয়ার বলল, ‘ঠিক আছে। পরবর্তী বিষয়ে যাই। এখন একটা টালমাটাল সময়ের মধ্যে দিয়ে আমরা যাচ্ছি। একে অরাজকতা বলে। এই মুহূর্তে দেশের রাশ হাতে নেবার

Missing Page 46

বাকিরা আনোয়ারকে সেলাম দিয়ে চলে গেল।

আনোয়ার রাসেলকে বলল, ‘সিলেটে তোমার বাড়ি না?’

রাসেল বলল, ‘জি জনাব।’

আনোয়ার পকেট থেকে একটা ম্যাপ বের করে টেবিলে রাখল, ‘এসো, তোমাকে একটা বড়ো কাজের ভার দেবো এখন।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *