৪০
॥ ঢাকা।।
সোমনাথ বাড়ি ফিরলেন দুপুর নাগাদ। বীথি দরজা খুলেই তাকে দেখে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন, ‘তুমি কোথায় গেছিলে? কতবার ফোন এসেছে কলেজ থেকে।
সোমনাথ নিঃস্পৃহ কণ্ঠে বললেন, ‘কী বলছে ফোন করে?’
বীথি বললেন, ‘তোমাকে চাইছেন প্রিন্সিপাল স্যার।’
সোমনাথ ধীর পায়ে ঘরে ঢুকলেন। জয়দেব খেতে বসেছিল। তাকে দেখে উঠে দাঁড়াল। সোমনাথ বললেন, ‘বোসো। বোসো। বসে খাও। ব্যস্ত হবার কিছু নেই।’
জয়দেব বলল, ‘কাকীমা চিন্তা করছিলেন।’
সোমনাথ বললেন, ‘হ্যাঁ, ফোন করছে কারা। দেখি কী বলে।’
কলেজে ফোন করলেন তিনি। প্রিন্সিপাল স্যারই ফোন ধরলেন, তার কণ্ঠস্বর শুনে বললেন, ‘সোমনাথবাবু, আপনি মিডিয়াতে কী বলেছেন? কোনো একটা চ্যানেলে দেখিয়েছে, সেক্রেটারি সাহেব ফোন করেছিলেন।
সোমনাথ বললেন, ‘যেটা ঘটেছে, সেটাই বলেছি। আপনি তো জানেন, আমি মিথ্যে কথা বলতে পারি না। মিথ্যে বললে আমার সমস্যা হয়।’
‘সেটা তো বুঝেছি, কিন্তু সেক্রেটারি সাহেব রেগে গেছেন। বলছেন এই কথাগুলো এখনই না বললে ভালো হত। যদি এবার এটা নিয়ে চারদিকে খবরটা বেরিয়ে যায়, তাহলে আপনার পি এফ পাওয়া নিয়েও সমস্যা হতে পারে।’
‘দেখুন খোন্দকার সাহেব, যে ছেলেটা আমার সাক্ষাতকার নিয়েছে, তাকে তো আমি চিনি না। সে যখন নিয়েছে, তখন তার চ্যানেলে সে দেখাবে। যদি দেখায়, তাহলে তার যা প্রতিক্রিয়া হবে, তাতে যাই হোক, আমার তো কিছু করার নেই।’
‘আপনি বুঝতে পারছেন না স্যার, এর ফলে আপনার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে।’
‘আর কী বিঘ্ন ঘটা বাকি আছে প্রিন্সিপাল সাহেব? আমার চাকরি চলে গেল। আর কী ক্ষতি হবে বলুন তো?’
ওপ্রান্ত চুপ করে রইল। সোমনাথ বললেন, ‘আমি রাখছি। খেয়েনি।’
ওপ্রান্ত কোনো উত্তর দিল না। সোমনাথ ফোন রেখে দিলেন।
বীথি দাঁড়িয়ে শুনছিলেন। বললেন, ‘চাকরি চলে গেল?’
সোমনাথ বললেন, ‘হ্যাঁ। স্বাভাবিক। ব্যাপারটা সেদিকেই যাচ্ছিল। এবার উপর থেকে নির্দেশ এল। ধরে নাও ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিল।’
বীথি শূন্য চোখে তাকিয়ে রইলেন। জয়দেব পাংশু মুখে বলল, ‘এবার কী হবে কাকাবাবু?’
সোমনাথ বললেন, ‘কিছু হবে না। বুড়ো-বুড়ি এভাবেই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবো। আমি ভাবছি না। অনেক কষ্ট পেয়েছি জীবনে। এসব নিয়ে ভেবে সেসব কষ্ট আর বাড়াতে চাই না।’
জয়দেব উঠে নিজের ঘরে চলে গেল। বীথি বললেন, ‘আমি কি একবার তনয়াকে ফোন করব?’
সোমনাথ বললেন, ‘না, কোনো দরকার নেই।’
বীথি বললেন, ‘জেদ করে থেকে থেকে তো এই দিনটা এল। আর জেদ করে কী করবে? আবার কোথায় ইন্টারভিউ দিয়ে এসেছ? সবাই যদি এখানে এসে চড়াও হয়?’
সোমনাথ বললেন, ‘হলে হবে। গোটা পৃথিবী দেখবে এই দেশে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। যে ছাত্রদের পড়ালাম, যে প্রিন্সিপালের কাছে এতদিন চাকরি করলাম, যে সেক্রেটারি সাহেব দেখা হলে সবসময় ভালো ভালো কথা বলতেন, সবাই এখন আমাকে বাতিল করে দিল। আমি কী করব এখন? আমার কি কিছু করার আছে? আমাকে মেরে দিলে মেরে দিক। আমি আর কারো কাছে কৃপা ভিক্ষা করে নিজেকে ছোটো করতে পারব না।’
সোমনাথ টিভির রিমোটটা নিয়ে চ্যানেল পালটাতে শুরু করলেন। বুমে কোনো চ্যানেলের নাম লেখা ছিল যেন? লাল রঙের বুম ছিল। নামটা মনে করতে পারলেন না, তবে চ্যানেল পালটাতে পালটাতে ওই রংটা খুঁজে পেলেন, হ্যাঁ এটাই হবে। মিনিট খানেক বাদেই নিজেকে দেখতে পেলেন সোমনাথ, গম্ভীর মুখে স্টেটমেন্ট দিয়ে যাচ্ছেন।
তার কি ভয় পাওয়া উচিত? তাকে টিভিতে দেখাচ্ছে। দেশের সবাই দেখবে। যারা মানুষের ক্ষতি করে দিতে পারে, তারাও দেখবে, ঝোঁকের বশে কাজটা করলেন। কিন্তু না করলে কি ঠিক হত? সব পক্ষের খবরই তো মিডিয়ার দেখানো উচিত। তিনি তার কথা বলবেন না কেন?
আর বীথি? বীথির কী হবে? তার অপরিণামদর্শিতার শাস্তি বীথি পাবেন কেন?
অবশ্য সেটাই হয়েছে সারাটা জীবন। বীথিকেই সব কিছু সহ্য করতে হয়েছে।
শ্বাস ছাড়লেন সোমনাথ।
সর্বস্ব চলে যাওয়া কোনো মানুষের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাবে, সেটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তিনি যা করেছেন ঠিক করেছেন।
ফোন বাজছে। ধরতেই ওপ্রান্ত থেকে সেক্রেটারি সাহেবের গলা ভেসে এল, ‘ভালো আছেন বিশ্বাস সাহেব?’
সোমনাথ বললেন, ‘আপনার কি মনে হয়? আমি ভালো আছি?’
‘আপনি কিন্তু আমার উপর রেগে আছেন স্যার। আপনি আমার পরিস্থিতিটা বুঝতে পারছেন না। দেখুন জনাব, দেশটা এখন যে পরিস্থিতিতে আছে, তাতে পদত্যাগ করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ ছিল। পরে যখন সব শান্ত হয়ে যাবে, আপনাকে আমি গেস্ট লেকচারার হিসেবে আবার জয়েন করিয়ে দেবো। আপনি তো আমার কথাটা বুঝুন। কলেজটা চালাতে হবে তো। আমার উপর অনেক চাপ আছে। আপনি স্যার দয়া করে আর কোনো সাক্ষাতকার দেবেন না। আমি ব্যক্তিগতভাবে আপনার ব্যাপারটা দেখছি।’
‘কীভাবে দেখবেন, জানান।’
‘আপনি আমার অফিসে জয়েন করুন স্যার। আমি পুরোটা দেখে নিচ্ছি।’
‘আপনি মানুষটা ভালো সাহেব, কিন্তু তাতে কোনো লাভ হবে না। ওরা যখন জেনে যাবে, তখন ওদের সমস্ত আক্রোশ আপনার উপর এসে পড়বে। তখন আপনি আবার আমাকে পদত্যাগ করতে বলবেন।’
‘আপনি কি একবার আমার অফিসে আসতে পারবেন? আচ্ছা দরকার নেই, আমিই আপনার ফ্ল্যাটে যাচ্ছি। এই সময়টা আমাদের সবাইকে একসঙ্গে থাকতে হবে স্যার, বোকা মানুষের মতো রাগ করাটা কি ভালো দেখায়? আপনি আমাকে চেনেন, আপনার উপর আমার কোনো ব্যক্তিগত রাগ নেই, বরং আমি আপনাকে খুবই পছন্দ করি, সম্মান করি। আমরা একটু বসে কথা বলি?’
‘বেশ। আসুন।’
‘ধন্যবাদ জনাব।’
ফোন রাখলেন সোমনাথ। সেক্রেটারি সাহেবের গলা শুনে রাগটা খানিকটা কম লাগছে। সত্যিই কি আর চিন্তার কোনো কারণ নেই তার?
৪১
।। ঢাকা।।
গেস্ট হাউজে প্রধান উপদেষ্টা ওয়াকার সাহেব প্রেস কনফারেন্স করছেন।
আনোয়ার খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে। নাহিদ হেঁটে যাচ্ছিল, আনোয়ার ডাকল, নাহিদ সঙ্গে সঙ্গে তার কাছে এসে দাঁড়াল, ‘জি জনাব।’
আনোয়ার বলল, ‘উপদেষ্টা সাহেব তোমাদের সঙ্গে সবসময় যোগাযোগ রাখবেন, সেই কথা ওকে কালকেই আমি জানিয়ে দিয়েছি। যদি উনি সেটা না শোনেন, তাহলে আমাকে জানাবে।’
নাহিদ মাথা নাড়ল, ‘জি জনাব।’
আনোয়ার বলল, ‘প্রেসের লোকজন আমাদের চেনাশোনা তো?’
‘জি জনাব।’
‘খেয়াল রাখবে। কোনোরকম আজেবাজে মন্তব্যওয়ালা প্রেসের লোক থাকলে তার সঙ্গে সরাসরি কথা বলবে এবং আমাকে তার ডিটেলস দেবে আমি বাকিটা বুঝে নেবো।’
নাহিদ মাথা নাড়ল। একজন ফোটোগ্রাফার তার ফোটো তুলছিল, আনোয়ার হাত নেড়ে তাকে ডাকল। ফোটোগ্রাফার দাঁত বের করে এগিয়ে এল।
আনোয়ার তাকে সেলাম জানালো। ফোটোগ্রাফার তাকেও সেলাম জানাতে আনোয়ার বলল, ‘আপনার নাম কী জনাব?’
‘আতিফ জনাব।’
আনোয়ার মধুর গলায় বলল, ‘বাঃ। সুন্দর নাম। আপনি আমার ছবি তুললেন দেখলাম। দেখান ভাই।’
আতিফ ক্যামেরা ঘেঁটে আনোয়ার আর নাহিদ এর ছবি বের করে ক্যামেরাটা এগিয়ে দিল। আনোয়ার ক্যামেরাটা নিয়ে নাহিদকে দিয়ে বলল, ‘ক্যামেরাটা নিয়ে নাও নাহিদ। উনি আরেকটা ক্যামেরা কিনে নেবেন।’
আতিফ হতভম্ব হয়ে গেল। নাহিদ ক্যামেরাটা নিয়ে হাঁটতে শুরু করল। আতিফ নাহিদের পিছনে ছুটতে ছুটতে বলল, ‘ভাই, এটা অনেক দামি ক্যামেরা ভাই, মালয়েশিয়া থেকে কেনা হয়েছিল, আমার ক্যামেরা ফিরিয়ে দিন আমায়।’
নাহিদ উত্তর দিল না। ক্যামেরা গাড়িতে উঠে বসল। আতিফ আবার ছুটে এল আনোয়ারের কাছে, কাতর কণ্ঠে বলল, ‘জনাব, আমি আপনার সব ছবি ডিলিট করে দিচ্ছি, আমার ক্যামেরাটা ফিরিয়ে দিন জনাব।
আনোয়ার নাহিদকে হাত দিয়ে ইশারা করল। নাহিদ গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে এল। আনোয়ার আতিফের দিকে তাকাল, ‘আপনি বুদ্ধিমান, তাড়াতাড়ি বুঝে গেছেন আমি কী বলতে চাইছিলাম। কতজন আছে বুঝতে না পেরে ক্যামেরার প্রেমে নিজের প্রাণটাই হারিয়ে ফেলেছে। আপনি ভালো সাংবাদিক হবেন। ডিলিট করুন।
আতিফ কাঁপছিল। কোনোমতে ছবিগুলো ডিলিট করল।
আনোয়ার বলল, ‘আমাদের একটু চোখ কান খুলে চলতে হচ্ছে বুঝলেন আতিফ সাহেব? র-এর সব লোক তো সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। আপনি যদি এখন র-কেই সাহায্য করতে চান, তাহলে তো আর আপনাকে আমি ছাড়তে পারি না, তাই না?’
আতিফ ক্যামেরা নিয়ে দৌড়ে বাঁচল।
আনোয়ার বলল, ‘দেখলে নাহিদ, এই জন্যই মিডিয়ায় ফিলটার করা দরকার। সবাইকে আমরা এখানে ঢুকতে দিতে পারি না। বিলিভ মি, বাংলাদেশের মতো এত অবাধ গণতন্ত্র কোথাও নেই। একটা বুম নিয়ে এরা যেকোনো জায়গায় ঢুকে যেতে পারে। ব্যাপারটা কি এত সহজলভ্য হওয়া উচিত?’
প্রধান উপদেষ্টা সাহেবের প্রেস কনফারেন্স হয়ে গেছে। তিনি বাইরে বেরিয়ে এসেছেন। ছাত্রনেতারা তার সঙ্গে গিয়ে দাঁড়াল। তার ছবি তোলা চলছে।
আনোয়ার তার ঘরে গিয়ে বসল। কিছুক্ষণ পর প্রধান উপদেষ্টা তার ঘরে প্রবেশ করলেন। আনোয়ার সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে মাথা নীচু করে বলল, ‘জনাব। প্রেস কনফারেন্স কেমন হল?’
প্রধান উপদেষ্টা সাহেব বললেন, ‘ভালো হয়েছে। বাংলাদেশ একজন নিরপেক্ষ এবং শক্তিশালী শাসক চায়।
আনোয়ার হাসল, ‘পাকিস্তানও চায়। কিন্তু পায় না। আমাদের এই দুটি দেশ বরাবরই শক্তিশালী শাসক খুঁজে গেছে। আশা করব আপনি সবার আশা পূর্ণ করবেন। পাকিস্তান আপনাকে দেখে শিখুক, আমি সেটাই চাই। দু দেশের যোগাযোগ বাড়ুক, পাকিস্তান ইতিমধ্যেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে এ দেশের মানুষদের জন্য তারা ভিসা ফ্রি করে দেবে। গোটা
পৃথিবী জানুক, বাংলাদেশ আর পাকিস্তান আবার পরস্পরের কাছে এসেছে।’
প্রধান উপদেষ্টা ওয়াকার সাহেবও হাসলেন, ‘তা নিশ্চয়ই হবে। আমাদের ডেলিগেটরা ইসলামাবাদ গেলে পৃথিবী এমনিতেই জানবে।
আনোয়ার বলল, ‘আমাদের ফান্ডিং এর ব্যাপারে আরও আলোচনা করতে হবে জনাব। কাল র বানশালকে আটক করছেন। এটা কিছুটা সেট ব্যাক হবে।’
‘আমি শুনেছি খবরটা।’
আনোয়ার হঠাৎ উঠে দরজার কাছে গিয়ে দেখল নাহিদ বাইরে দাঁড়িয়ে দরজা পাহারা দিচ্ছে। তার মুখে হাসি ফিরে এল। আবার সোফায় গিয়ে বসল।
ওয়াকার বললেন, ‘কী দেখলে?’
আনোয়ার বলল, ‘দেশের অবস্থা টালমাটাল এখন। একটু নজর রাখতে হচ্ছে জনাব যে কেউ ছবি তুলে মিডিয়ায় দেবার চেষ্টা করে যাবে। এখন দিনের বেলা, বুঝতেই পারছেন। এ দেশের কোণায় কোণায় র এজেন্ট আছে।’
ওয়াকার গম্ভীর হলেন, ‘আমাকে সে নিশ্চয়তা দিয়েই নিয়ে আসা হয়েছে যে এই দেশে আমি নিরাপদ। র যদি আমাকে মেরে ফেলার প্ল্যান করে?’
আনোয়ার মাথা নাড়ল, ‘সেটা করবে না জনাব। কিন্তু আমার সঙ্গে আপনার ছবি তোলার চেষ্টা করবে। আমি সেটার জন্য কিছু প্রিকশান নিচ্ছি। আগামী পনেরো দিন আমরা পরস্পরের সঙ্গে বেশি দেখা করব না। এর ফলে র-কে বিভ্রান্তিতে ফেলা যাবে।’
ওয়াকার বললেন, ‘ঠিক আছে। ভিডিয়ো কনফারেন্সিং করা যেতে পারে।
আনোয়ার বলল, ‘জি জনাব। সেটাই করা হবে। আমরা আমাদের মতো করে যোগাযোগ করব। তবে দেখা করব না এখনই। ইসলামাবাদে ওরা দেখা করে আসার পর আমি তখন সামনে আসব। আপাতত এই সময়টা না আসাটাই ঠিক হবে।’
ওয়াকার কাঁধ ঝাঁকালেন, ‘ঠিক আছে। তুমি যেমন ভালো বোঝো।’
আনোয়ার বলল, ‘আমাদের প্রতিটা পা খুব সাবধানে ফেলতে হবে জনাব। আমি একটা ক্লিন আপ অপারেশন শুরু করেছি, আর্মিকে সরাসরি বলাটা আপনার পক্ষে ঠিক হবে না। তবে আর্মিকে এখানে ইনভলভ করতে পারলে আমাদের কাজে দিত।’
ওয়াকার চিন্তিত মুখে বললেন, ‘না। এই দেশের আর্মিকে আমি বিশ্বাস করি না। এদের কোনো ঠিক নেই। ওদের মধ্যেও যে র-এর লোক নেই…’
আনোয়ার বলল, ‘মেজর আতরকে কি আপনি বিশ্বাস করেন জনাব?’
ওয়াকার বললেন, ‘আমি এই দেশের কাউকেই বিশ্বাস করি না।’
‘ঠিক। আপাতত যত দেরি করে সাধারণ নির্বাচন করা যায়, তার চেষ্টা করতে হবে। বাকিটা তারপরে দেখা যাবে।’
ওয়াকার বললেন, ‘ঠিক। আপাতত সেটাই প্রাথমিক লক্ষ্য হোক।’
৪২
॥ কাশ্মীর।
রাত এগারোটার সময় বাড়িটার দরজায় দুটো নক হল। বাড়িতে কোনো আলো জ্বলছে না। রাস্তাঘাট জনশূন্য।
আকবর অপেক্ষায় ছিল। নক হওয়া মাত্র দরজা খুলে দিল। এক বাইশ বছরের যুবক দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। দরজা খুলতেই ছেলেটা ঘরে প্রবেশ করল। আকবর দরজা বন্ধ করে দিল। ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘ফাহিম, উফ, উপরওয়ালাকে অসংখ্য শুক্রিয়া যে তুই পৌঁছোতে পেরেছিস। কোথাও চেকিং হয়নি তো?’
ফাহিম আশরাফ। ফয়সলাবাদে আবু কাসেমের ট্রেনিং ক্যাম্পে বড়ো হয়ে উঠেছে। সে অনাথ। একটানা চার বছর মুজফফরাবাদের ট্রেনিং ক্যাম্পে বিশেষ ট্রেনিং দেবার পর তাকে কাশ্মীরের এপারে পাঠানো হয়েছে।
আকবরের প্রশ্নের উত্তরে ফাহিম আকবরকে আশ্বস্ত করল, ‘না জনাব। কিচ্ছু হয়নি। উসমান ভাই ঠিক নিয়ে এসেছে।’
‘আয়।’ ফাহিমকে নিয়ে আকবর বাড়ির ভেতরের ঘরে প্রবেশ করল।
ছোটো একটা মোম জ্বলছে ঘরের ভেতরে। ফাহিমকে বসালো সে।
ফাহিম বলল, ‘ভালো আছেন ভাইজান?’
আকবর জোরে জোরে মাথা নাড়ল, ‘আমরা তখনই ভালো থাকব, যখন আমরা আমাদের লক্ষ্য পূর্ণ করতে পারব। তুই বা আমি যেভাবে এখানে এসেছি, একইভাবে বখতিয়ার আর কাজীকেও এখানে আসতে হবে। তারপর আমাদের মকসদের জন্য তৈরি হতে হবে। আশা করি বুঝতে পারছিস আমি কী বলতে চাইছি?’
রাতের সঙ্গে সঙ্গে শীত বাড়ছে। ফাহিমের গায়ে গরম পোশাক আছে। আকবর খানিকটা উৎকণ্ঠিত হয়েছিল। ফাহিম আসায় শান্ত হয়েছে। তবু তার হাত কাঁপছে। ঘর প্রায় অন্ধকার বলে ফাহিম সেটা বুঝতে পারছে না।
ফাহিম বলল, ‘মৌলানা সাহেব বলেছেন আগামী কয়েকদিন ওপারে ফোন করার কোনো দরকার নেই। ওর কোনো দরকার হলে ঠিক যোগাযোগ করে নেবেন।
আকবর যেন নিজেকে সাহস দিতেই হেসে উঠল, ‘মৌলানা সাহেবকে বলো আকবর কাউকে ভয় পায় না। আর ভয় পাবার কোনো কারণও নেই। ঠিক আছে, আদেশ যখন দিয়েছেন, তখন পালন করতেই হবে।’
বাইরে, খানিকটা দূর থেকে কয়েকটা গাড়ির শব্দ পাওয়া গেল। আকবরের মুখ সঙ্গে সঙ্গে ফ্যাকাসে হয়ে গেল, বলল, ‘চলে আয়।’
একটা কাঠের পাটাতন সরালো সে। নীচ থেকে একটা সিঁড়ি নেমে একটা গোপন বাঙ্কারে চলে গেছে। মোম নিয়ে আকবর পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল, দু-জন নীচে নেমে বাঙ্কারে গিয়ে লুকোলো। অপরিসর বাঙ্কারে বসে আকবর বলল, ‘আর্মি যখন-তখন চেকিং করে। দিনের বেলা এখানে লুকিয়ে থাকতে পারবি?’
ফাহিম বলল, ‘পারব জনাব, আপনি কি এখানেই থাকেন?’
আকবর বলল, ‘হুঁ, সেরকম পরিস্থিতি হলে এখানে নেমে আসি। যদিও আমার কাছে এখন ওদের টহলদারির কোনো খবর নেই, তবু মাঝে মাঝে নিজের মনে হওয়ার উপরেও বিশ্বাস করি। মনে রাখবি, আমাদের কাজ এখন শুধু লুকিয়ে থাকা। উপযুক্ত সময় এলে আমরা এখান থেকে বেরোবো।’
ফাহিম বলল, ‘জি ভাইজান, ট্রেনিং-এর সময় এভাবে থেকেছি।’
আকবর তার ডিভাইসটা বের করল। শ্বাস ছেড়ে বলল, ‘বেরিয়ে গেছে। চল। তুই খেয়ে নে। আমার বেশ কিছু হোম ওয়ার্ক করা বাকি আছে।’
বাঙ্কার থেকে বেরিয়ে বাড়িটার পেছনের ঘরে গিয়ে বসল তারা। আকবর সন্তর্পণে জানলার পর্দার ফাঁক দিয়ে বাইরে দেখল। বলল, ‘বুড়োটা আজকে নেই। থাকলে সুবিধা হত। এখন আলো দেখলেই সন্দেহ করবে। বাখরখানিটাই খা। আর কিছু নেই এখন।’
বাখরখানি বের করে ফাহিমকে দিল সে। ফাহিম জল দিয়ে সেটাই খেয়ে নিল। আকবর বলল, ‘পেট ভরেনি, তাই না?’
ফাহিম বলল, ‘পেট না ভরাই ভালো। পেট ভরলেই ঘুম পাবে। দু-জনেই ঘুমোলে হবে না, আপনি চাইলে ঘুমিয়ে নিতে পারেন। আমি গাড়িতে কিছুটা সময় ঘুমিয়েছি।’
আকবর বলল, ‘না, ওসব নিয়ে চিন্তা করে লাভ নেই। দু-জনেই ঘুমোতে পারব। শুধু আলোটা সাবধানে জ্বালাতে হবে। আর্মি মাঝে মাঝে টহলে আসে। কখন ওদের মাথায় কোনো বুদ্ধি আসে, তা উপরওয়ালাও জানে না।
ফাহিম বলল, ‘মৌলানা সাহেব বলেছিলেন আপনি এখানে যে বাড়িটায় আছেন, সেটা যথেষ্ট নিরাপদ।’
আকবর বলল, ‘এটা ঠিক বলেননি। শত্রুর এলাকায় কোনো বাড়িই নিরাপদ না। প্রত্যেকটা পদক্ষেপ আমাদের সাবধানে ফেলতে হবে।’
আকবর ফোন চেক করল। একটা অদ্ভুত নাম্বার থেকে মেসেজ এসেছে। লেখা, ‘পরের পার্সেল শনিবার পৌঁছোবে। এলাকায় এসে গেছে।’
৪৩
॥ দিল্লি ।।
‘স্যার।’
বিদুর চেম্বারেই ছিলেন। আর পি নক করলেন।
বিদুর বললেন, ‘এসো, অনুমতি নেবার জন্য সময় নষ্ট করলে হবে না। আমাদের এখন অনেকগুলো কাজ আছে।’
আর পি বললেন, ‘বলুন স্যার।’
বিদুর বললেন, ‘প্ল্যান বানালে?
আরপি বললেন, ‘বানিয়েছি স্যার।’
বিদুর বললেন, ‘বলো।’
আর পি বললেন, ‘স্লিপার সেল অ্যাক্টিভেট করতে হবে। ঢাকায়।’
বিদুর ভ্রূ কুঁচকালেন, ‘স্লিপার সেল লাগবে?’
আর পি বললেন, ‘হ্যাঁ স্যার। এখান থেকে হবে না। বর্ডার প্রবলেম আছে, তা ছাড়া ওদের মনিটরিং-এর ব্যবস্থা করতে হবে। পারমিশন পেলেই অ্যাক্টিভেট হয়ে যাবে।’
বিদুর বললেন, ‘ওকে। কাশ্মীরের খবর কী?’
আর পি তার ফোন এগিয়ে দিলেন বিদুরের দিকে। একটা মেসেজে লেখা, ‘কবুতর যেন কাউকে ফোন না করে।’
বিদুর বললেন, ‘কবুতর? হাফিজকে তো সরানো হয়েছিল। এটা আবার কোনো কবুতর?
‘স্লিপার সেল স্যার। কাশ্মীরে ওদের কেউ আছে।’
বিদুর বললেন, ‘রেড অ্যালার্ট জারি করে দাও। ঘরে ঘরে তল্লাশি শুরু করতে বলো।’
আর পি রুমাল বের করে ঘাম মুছলেন, ‘কাশ্মীরে এই তল্লাশিগুলো খুবই ক্ষোভের জায়গা তৈরি করে স্যার।’
‘স্বাভাবিক। তুমি রোজ রোজ আমার বাড়ি এসে আমাকে তল্লাশি করলে, জিজ্ঞাসাবাদ করলে আমিও রেগে যেতাম, রাগের কারণ থাকবে। সেই সহানুভূতির সঙ্গেই যা করার করতে হবে। মাস অ্যাওয়ারনেস প্রোগ্রামগুলো আবার শুরু করতে বলে দাও। লোকজনকে বোঝাও যে পাকিস্তান থেকে মেহেমানরা এলে তাদের ধরিয়ে দিতে হবে। তাদের সহযোগিতা করলে সব থেকে ক্ষতিটা আম কাশ্মীরিদের হবে।’
আর পি উঠে দাঁড়ালেন, ‘ঠিক আছে স্যার। আমি সব জায়গাকে অ্যালার্ট করছি। মেহেমানের খবরটা চিন্তা বাড়িয়ে দিল।’
বিদুর বললেন, ‘দেখো। যত তাড়াতাড়ি হয় আমাকে সুখবর শুনিও।’
‘রাইট স্যার।’
আর পি বেরিয়ে যেতেই বিদুর তুষারকে ফোন করলেন, তুষার ফোন ধরে বললেন, ‘বলো। ফোন করলে কী জন্য? বানশালের ব্যাপারে কিছু বলবে?’
‘না। বানশাল না।’
‘তবে?’
‘একটা মেসেজ ইন্টারসেপ্ট করা হয়েছে। কাশ্মীরে স্লিপার সেল জেগেছে। মনে হচ্ছে কিছু প্ল্যান হচ্ছে।’
‘স্লিপার সেল? ঠিক আছে আমি বলে দিচ্ছি। এর মধ্যে তোমার কাকে সন্দেহ হচ্ছে? আই এস আই, নাকি মৌলানা?’
‘এটার ফিড এসেছে আই এস আই থেকে। ওরা আটঘাট বেঁধে নেমেছে। আমার আসলে ক্লান্ত লাগে তুষার। কাশ্মীরে আবার একটা সার্চ অপারেশনে আমি জাস্ট ফেড আপ হয়ে গেছি। কতগুলো লোকের জন্য গোটা রাজ্যের লোকগুলোকে হয়রানি করতে হয়। এর থেকে দুর্ভাগ্যজনক কিছু হয় না।’
‘ঠিকই। কিন্তু আমাদের হাত-পা বাঁধা। এখানে স্টেপ নিতেই হবে।’
‘একবার মন্ত্রীসাহেবের সঙ্গে কথা বলবে?’
‘রাতে ব্যবস্থা করছি। চলে এসো।’
‘ওকে।’
ফোন রাখলেন বিদুর। বেল বাজিয়ে দীপ্তিকে ডাকলেন। দীপ্তি দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকতেই বললেন, ‘বানশালের আর কোনো দাবিদাওয়া আছে?’
দীপ্তি বলল, ‘না স্যার। খেয়েছে। এখন শুয়েছে। এসি চালিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
‘গুড জব। রশ্মিকার খবর কী?’
‘আপাতত একই রকম। আপনি কি একবার বসবেন?’
‘হ্যাঁ। সেই বিষয়েই প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। চেম্বারে নিয়ে এসো। পাঁচ মিনিটের মধ্যে যাচ্ছি।’
‘রাইট স্যার।’
দীপ্তি বেরিয়ে গেল। বিদুর বেশ কয়েকটা রিপোর্টে চোখ বুলিয়ে ইন্টারোগেশন চেম্বারে প্রবেশ করলেন।
রশ্মিকার চোখ মুখে ক্লান্তির ছাপ এসেছে। চোখের নীচে কালো দাগ পড়ে গেছে। বিদুর চেয়ারে বসে বললেন, ‘আই এস আই-এর হয়ে কতদিন কাজ করছেন?’
রশ্মিকা বলল, ‘হোয়াট রাবিশ! এসব কী কথা বলছেন?’
বিদুর হেসে বললেন, ‘সোজাসুজি কথা বলুন। আমরা সবাই সব কিছু জানি। অকারণ আকাশ থেকে পড়ার এক্সপ্রেশন না দিলেই ভালো হয়। কত দিন কাজ করছেন?’
রশ্মিকা বলল, ‘আমি এসব বেসলেস প্রশ্নের কোনো উত্তর দেব না। আমাকে আমার ল ইয়ারের সঙ্গে কথা বলতে দিন।’
‘আপনি যে ধারায় গ্রেফতার হয়েছেন, তাতে আপনাকে কোনো ল ইয়ার দেওয়া সম্ভব হবে না মিস আগরওয়াল। আপাতত আপনি সত্যি কথা বললে তাড়াতাড়ি ছাড়া পেতে পারেন। বলুন যা জিজ্ঞেস করছি।’
‘মানে? রশ্মিকার ভ্রূ উপরে উঠল, ‘ল ইয়ার দেওয়া সম্ভব হবে না মানে কী? আপনি কী ভেবেছেন আমি দেশের নিয়মকানুন জানি না?’
‘আপনার পাকিস্তান যোগের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ আছে আমার কাছে। আপনি চাইলে এক এক করে দেখাতে পারি। কেন কথা বাড়াচ্ছেন?’
‘আমি বেশ কিছু বছর দুবাইতে ছিলাম। আমার কিছু বন্ধুবান্ধব হয়েছিল। তাদের মধ্যে ইরান, পাকিস্তান, টার্কি, সব দেশের লোক আছে। পাকিস্তানে পরিচিতি থাকলেই আই এস আই যোগ আছে, কথাটা বলার কোনো মানে নেই।’
‘বানশাল কিন্তু বলেছেন আপনার পাকিস্তানী যোগের কথা। আপনি সময় নষ্ট করে যাচ্ছেন।’
‘উনি কী বলেছেন তা ওর ব্যাপার। আমি কাউকে চিনি না।’
‘আপনি ওর সঙ্গে হোটেল রুমে কী করছিলেন?’
‘সেটা আমার পার্সোনাল ব্যাপার। এই ব্যাপারেও আমি আপনাকে কোনো কিছু বলতে বাধ্য নই।’
‘বেশ, আপনি সহযোগিতা করছেন না। আপনি কিন্তু আমার কাছে আর কোনো অপশন খোলা রাখলেন না মিস আগরওয়াল। এবার আমি আমার মতো করে কাজ করব। থার্ড ডিগ্রি ইন্টারোগেশনের সাহায্য নেওয়া ছাড়া আমার কোনো উপায় নেই। এই পদ্ধতিতে প্রথমে আপনার ডান হাতের তর্জনীর নখগুলো আমরা উপড়ে নেবো। আশা করি আপনার এতে কোনো অসুবিধা হবে না।
রশ্মিকা কাঁদতে শুরু করল হঠাৎ করে, ‘আপনারা আমাকে ব্লেম করার চেষ্টা করছেন। আমি কিছু জানি না। এভাবে আপনারা আমাকে অত্যাচার করতে পারেন না।’
‘দেশের স্বার্থের জন্য আমি কী কী করতে পারি সে সম্পর্কে আপনি একবারেই ব্লু লেস ম্যাডাম। বলুন, কর্তারপুর করিডোরে আপনি গত বছর তিনমাস ধরে কী করছিলেন?’
রশ্মিকা এবার চমকে উঠল। আরেকটু হলে চেয়ার থেকেই পড়ে যাচ্ছিল।
বিদুর বললেন, ‘আমরা কিন্তু আরও অনেক কিছু জানি মিস আগরওয়াল। আমি চাইব আমি কিছু বলার আগে আপনিই সব বলে দেন। উলটোটা হলে সেটা আপনার জন্য খুব একটা সুখকর অভিজ্ঞতা হবে না, এটা আমি আপনাকে কথা দিতে পারি।’
রশ্মিকা বলল, ‘আপনারা আমার ফোন ট্যাপ করেছেন। হাউ ডেয়ার ইউ!’
‘আপনি দেশকে নির্দ্বিধায় বেচে দিয়ে আসতে পারেন, আর আমি আপনার ফোন ট্যাপ করলেই দোষ? বাঃ! আপনার চিন্তা ভাবনাগুলো তো ভীষণ ইন্টারেস্টিং। আবার বলছি, বানশাল রাজি হয়েছেন, আপনিও রাজি হয়ে যান। সব বলুন। আপনার জন্য ভালো।’
‘আমি কিছু জানি না। অকারণ আমাকে চাপ দিচ্ছেন আপনারা।’
‘ওকে। এরপর আর কোনো কিছু আমার হাতে রইল না।’
‘আপনি কি সবসময় এরকমই ব্লু লেস থাকেন?’
‘মানে?’
‘মানে আমাকে তুলে এনে জেরা করছেন। আমি যা বলব তাই বিশ্বাস করবেন? আমি যদি বলি আপনার এজেন্সির দু-জন গুরুত্বপূর্ণ অফিসার আমার পে রোলে আছে, আপনি বিশ্বাস করবেন?’
‘করতেও পারি। আপনি নাম বলুন। আমি অঙ্কটা উত্তর দেখে ব্যাক ক্যালকুলেশন করে মিলিয়ে দেখব। আছে নাকি?’
রশ্মিকা হঠাৎ ফিকফিক করে হাসতে শুরু করল।
বিদুর উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
.
ঢাকার বাইরে একটা গ্রামে এসেছে আনোয়ার। একটা বাড়িতে একজনকে আটকে রাখা হয়েছে।
আনোয়ার গাড়ি থেকে নেমে ঘরে ঢুকল। লোকটার চোখ মুখ ফেটে রক্ত বেরোচ্ছে। আনোয়ার চেয়ার টেনে বসে বলল, ‘কী নাম যেন আপনার?’
‘খোকন।’
‘হুঁ। খোকন। কলকাতায় বাড়ি?’
খোকন মাথা নেড়ে বলল, ‘না জনাব। আমি কোনোদিন কলকাতা যাইনি।’
আনোয়ার হাসল। সিগারেট ধরালো, ‘তাহলে আপনার ফোন থেকে কলকাতার নাম্বার পাওয়া গেল কী করে… খোকন ভাই?’
খোকন বলল, ‘আমার ডাক্তার দেখানোর নাম্বার ওটা। আপনি ফোন করুন।’
‘এ-রকম হাজার হাজার ডাক্তারের নাম্বার বের করে দেবো আমি। ডাক্তার চেনাও তুমি আমায়? সত্যিটা বলো, তাহলে ভেবে দেখতে পারি।’
‘সত্যি ভাই।’
‘বর্ডার বন্ধ, কোনোদিন কলকাতা যাসনি, আর এখনই ডাক্তারের খোঁজ করতে হল তোকে?’
খোকন চুপ করে গেল।
আনোয়ার তার পকেট থেকে একটা ছোটো ফোনবুক বের করল। খোকনের কাছ থেকে পাওয়া গেছে। বেশ কয়েকটা নাম্বার মন দিয়ে দেখে বলল, ‘প্ল্যান কী আছে?’
খোকন অবাক হয়ে বলল, ‘মানে?’
আনোয়ার বলল, ‘কোনো প্ল্যান নেই?’
খোকন কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, ‘কী বলছেন আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।’
আনোয়ার বলল, ‘বুঝতে পারছিস কিছু? তোকে কিন্তু বাঁচিয়ে রাখা হবে না।’
খোকন কাঁদতে শুরু করল, ‘আমার আত্মীয়স্বজন অনেকেই ওদেশে আছে। ওদেশে আত্মীয় থাকা কি অন্যায়?’
আনোয়ার কয়েক সেকেন্ড চুপ করে বসে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। বাইরে মোস্তাক দাঁড়িয়েছিল। আনোয়ার বলল, ‘মেরে ঝুলিয়ে দে রাস্তায়। আর কোনো ইন্ডিয়াপ্রেমী যেন আর ইন্ডিয়ার নাম মুখেও না আনতে পারে।’
* * * * *
জয়দেব ছেলেটাকে দেখে মায়া হচ্ছিল সোমনাথের। চুপ করে শূন্য চোখে বসে আছে ব্যালকনিতে। মানুষে মানুষে রাজনীতি হয়, আর কত মানুষ এভাবে ঘরছাড়া হয়। শুধুমাত্র দেশ ছাড়বেন না বলে তিনি মাটি কামড়ে পড়েছিলেন এই দেশে। আর জয়দেবকে তার বাড়ি ছেড়ে চলে আসতে হয়েছে। মানুষ কবে বুঝবে, অহেতুক মারদাঙ্গা করলে আদতে তারই ক্ষতি হয়। যারা জয়দেবকে ঘরছাড়া করেছে, তারা বোধহয় জানে না, রাজনীতি চিরকাল এককালীন থাকে না। একসময় তাদেরও ঘরছাড়া হতে হবে। খুন হতে হবে। চিরদিন সব কিছু সমান থাকে না।
‘টিভি দেখলে এই ঘরে এসে বোসো জয়দেব।’
গলা তুলে ডাকলেন।
জয়দেব তার কথা শুনে ড্রইং রুমে এসে বসল।
সোমনাথ বললেন, ‘কী দেখছিলে বাইরে বসে? বাড়ির জন্য মন খারাপ করছে?’
জয়দেব বলল, ‘তার থেকেও বেশি চিন্তা হচ্ছে কাকাবাবু। কী কী হয়ে গেল এখান থেকে কিছুই তো বোঝা যায় না। এটা বড়ো শহর। শহরের কোণায় কোণায় কী হয়, সবার কানে সে খবর চলে যায়। গ্রামের খবর আপনারা কী করে জানবেন? আজ একরকম আছে, কাল সকালেই হঠাৎ করে দেখলেন সব শেষ হয়ে গেছে। এই লড়াই তো আজকের না। দিনের পর দিন আমাদের যুদ্ধ চলে যাচ্ছে।’
সোমনাথ শ্বাস ছাড়লেন, ‘এসব নিয়ে ভেবো না। যেটা আমাদের হাতে নেই, তা নিয়ে আমরা কিছু করতে পারব না।’
কলিং বেল বাজল।
সোমনাথ উঠে দরজা খুলে অবাক হলেন, নিপুণ দাঁড়িয়ে আছে।
বললেন, ‘এসো।’
নিপুণ ঘরে ঢুকে এল, সোমনাথ দরজা বন্ধ করে বললেন, ‘তুমি কক্সবাজার যাবে, এরকমই শুনেছিলাম তোমার বাবার কাছে।’
নিপুণ সোফায় বসে বলল, ‘হ্যাঁ স্যার, কিন্তু আমি পালিয়ে এসেছি। এক ফ্যাসিস্টকে তাড়িয়ে আমি আবার সেই ফ্যাসিজমকেই প্রশ্রয় দিই কী করে? আপনিই বলুন? বাবা ফোন করেছিল?’
সোমনাথ বললেন, ‘আমি ফোন বন্ধ করে রেখেছি। জানি না করেছেন নাকি। আমার ফোনে না পেলে তোমাকে খুঁজতে উনি এখানেই আসবেন নিশ্চয়ই।’
নিপুণ দৃঢ়কণ্ঠে বলল, ‘আমি কিছুতেই এখান থেকে পালাব না স্যার। এ আমি কিছুতেই মেনে নেব না। রাশেদের মতো রাস্কেলের হাতে কলেজ ছেড়ে দেব? আপনিই বলুন,এটা মেনে নেওয়া যায়?’
সোমনাথ বললেন, ‘তোমার সঙ্গে কে আছে?’
নিপুণ বলল, ‘কেউ নেই স্যার। যারা ছিল, তারা সবাই পালিয়ে গেছে।’
সোমনাথ বীথিকে ডেকে বললেন, ‘আমাকে একটু চা করে দাও তো। দেখো ওরাও যদি খায়।’
নিপুণ বলল, ‘আমি খাব না।’
জয়দেব জানালো সে খাবে।
বীথি রান্নাঘরে যেতে সোমনাথ বললেন, ‘মানুষের জোর কখন হয় জান তো নিপুণ, যখন সে সঙ্ঘবদ্ধ থাকে। তুমি এখন একা আছ। একা থাকার অর্থ হল তোমার কথা অনেকের গর্জনের মাঝে চাপা পড়ে যাবে। আমাদের সবার আগে মবকে বুঝতে হবে। একজন সৎ মানুষের কণ্ঠস্বর এই মব ধুলিস্যাৎ করে দিতে পারে। আমার করেছে, তোমার করছে, এখন কথা বলে কোনো লাভ নেই। তুমি এখন কক্সবাজার যাও। ঘুরে এসো। তারপর আবার স্বাভাবিকভাবে কলেজ যাওয়া শুরু করো। শূন্য থেকে যখন রাজনীতিটা আবার শুরু হবে, যখন আর কোনো বিরোধী থাকবে না, তখন দেখবে এরা আরও অনেক বেশি ফ্যাসিস্ট হয়ে গেছে। তোমার রাজনীতিটা শুরু হবে তখন। তুমি লোক জড়ো করবে। এক এক করে তোমার পাশে তোমার বন্ধুরা, সহপাঠীরা এসে দাঁড়াবে, সেই মব তখন তোমার হবে। ওরা হয়ে যাবে সংখ্যালঘু। তখন তুমি যা বলবে, তোমার যা প্রতিবাদ হবে, সেটা সবাই শুনতে পারবে। তোমার উপযুক্ত সময়ের জন্য তোমাকে অপেক্ষা করতে হবে।’
নিপুণ ভেঙে পড়া কণ্ঠে বলল, ‘আমাকে পালিয়ে যেতে বলছেন স্যার?’
‘না। পালিয়ে যেতে বলছি না। সময়ের অপেক্ষা করতে বলছি। দুটোর মধ্যে পার্থক্য আছে। তুমি আয়নাঘরে ছিলে। তুমি এখন অধৈর্য হলে হবে? দিনের পর দিন ওই মৃত্যুভূমিতে থেকে এসেছ। এখন তো তোমার কোনো অসুবিধা হবার কথাই না।’
নিপুণ বলল, ‘ঠিক আছে স্যার।’
আর দাঁড়াল না। উঠে বেরিয়ে গেল।
জয়দেব বলল, ‘ছেলেটা রেগে গেল কি কাকাবাবু?’
সোমনাথ হতাশায় মাথা নেড়ে বললেন, ‘তাই হবে।’
88
॥ ঢাকা।।
মুস্তাকিন সাহেব দুপুর বেলায় বাড়ি ঢোকার ঠিক আগে, গাড়িতেই ফোনটা পেলেন। নাম্বারটা দেখে ভ্রূ কুঁচকে ফোন ধরলেন, ‘এতদিন পরে আমার কথা মনে পড়ল?’
‘কী করব মুস্তাকিন সাহেব? আপনি নিজে তো ইন-অ্যাক্টিভ হয়ে যাচ্ছিলেন। আমাদের দরকার ছিল না বলে আমরাও আর বিরক্ত করিনি।’
‘তা তো বলবেনই। সবটাই দরকারের উপর নির্ভর করছে।’
‘হুঁ। যেভাবে আপনাকে আনোয়ার পিক করে নিল, আমি তো অবাকই হলাম। খুশিও হয়েছি অবশ্য।
বাড়ির গেট পেরোতেই নেমে গেলেন মুস্তাকিন। লনে গিয়ে বসলেন। বললেন, ‘আমিও অবাক হয়েছি। তবে ওরা একবারে আটঘাট বেঁধে নেমেছে। প্রতিদিন স্পষ্ট হচ্ছে আন্দোলনের পেছনে আই এস আই কতখানি ছিল।’
‘আমার তো সেটা দিয়ে দরকার নেই মুস্তাকিন সাহেব। আমার আপনাকে দরকার। আপনি কী বলছেন?’
মুস্তাকিন সন্তর্পণে চারদিকে দেখে নিয়ে বললেন, ‘আনোয়ার আপনাদের লোকজনদের পাগলের মতো খুঁজে বেড়াচ্ছে।’
‘সে তো জানি। আনোয়ারকে ছাড়ুন। আপনি বলুন। আপনি কী করবেন বলুন।’
‘আমি? আমি কী করব? আমার কী করার আছে বলুন তো? একটা নোবেলজয়ী লোক অবধি ওদের কথা বলা পুতুল হয়ে গেছে, সেখানে আমার কী করার আছে?’
‘আপনার অনেক কিছু করার আছে মুস্তাকিন সাহেব। তবে তার জন্য সদিচ্ছা থাকতে হবে।’
‘বিনিময়ে আমি কী পাব?’
‘কী চান বলুন।’
‘আমি মনস্থির করে নিয়েছি। এই দেশে আমি আর থাকব না। একটা নিরাপদ দেশে আমার থাকার ব্যবস্থা করে দিন। ব্যাঙ্কে কিছু ডলার দিয়ে দেবেন। আমি আপনাদের। এমনিতেও আই এস আই ফান্ড জোগাড় করতে গিয়ে নাকানি-চোবানি খাচ্ছে। এখন ওদের টার্গেট হচ্ছে প্রোজেক্ট দেখিয়ে ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কের থেকে লোন নেবে। ইসলামাবাদ যা করছে, ঢাকায় সেম ফর্মুলা ব্যবহার করা হবে। তারপর টাকা এসে গেলে লুঠতরাজ শুরু হবে।’
‘উঁহু, শুধু লুঠতরাজ হবে না। এই টাকার কিছু অংশ ক্যাম্প তৈরি করতে কাজে দেবে, অস্ত্র কিনতেও লাগবে। কিন্তু আপনার ডিমান্ডটা আমি কথা বলে দেখছি। আশা করি হয়ে যাবে। না হলে কী করা যাবে মুস্তাকিন সাহেব? আনোয়ারের সঙ্গ দেবার জন্য জীবনটা উৎসর্গ করে দেবেন?’
গেটে হর্নের শব্দ পাওয়া গেল। মুস্তাকিন দেখলেন আনোয়ারের গাড়ি ঢুকছে। সঙ্গে সঙ্গে ফোন কেটে দিলেন। ঘড়ি দেখলেন। এখন তো আনোয়ারের এখানে আসার কথা না! তার ফোন ট্যাপ করছে নাকি? ঘেমে গেলেন হঠাৎই।
গাড়ি থেকে নেমে আনোয়ার তার দিকে এগিয়ে এসে বলল, ‘আমার সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে গেছিল মুস্তাকিন সাহেব। আপনাকে নতুন অফিসে মুবারক জানাতে যেতে পারিনি। অফিসে গিয়ে শুনলাম আপনি বাসায় চলে এসেছেন। তাই আমিও চলে এলাম।
Z
মুস্তাকিন হাসার চেষ্টা করলেন, ‘আমার তো আপনাকে ধন্যবাদ জানানো উচিত। আপনি আমাকে কেন ছোটো করছেন এসব বলে?’
আনোয়ার পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরালো, ‘মুস্তাকিন সাহেব, সাহিল বলে কাউকে চিনতেন এক সময়?’
মুস্তাকিন ভাব করলেন যেন তিনি মনে করার চেষ্টা করছেন। বললেন, ‘নামটা চেনা চেনা লাগছে। কে বলুন তো?’
মুস্তাকিন সাহেবের মুখের উপর ধোঁয়া ছেড়ে আনোয়ার বলল, ‘পাশের দেশের কুত্তা। অনেকেই বলে আপনার সঙ্গে তার আলাদা সম্পর্ক ছিল। কুত্তাদের এখন অনেক রকম অ্যাক্টিভিটি করার সময় মুস্তাকিন সাহেব। আমি ওটাও একটু মনে করিয়ে দিলাম।’
মুস্তাকিন বললেন, ‘ওহ্, ইন্ডিয়ান ইন্টেলিজেন্সের কথা বলছেন? না না, প্ৰশ্নই নেই। ওসব ইতিহাস। তা ছাড়া সাহিল আমার কাছে তেমন সুবিধা করতে পারেনি কোনোকালেই। আপনি খুব ভালো করেই জানেন আমি বা আমার দল, কট্টর পাকিস্তানপন্থী। দেশের এই নতুন পরিস্থিতিতে আমি এমন কোনো ভুল করব না যাতে আমাকে পস্তাতে হতে পারে।’
আনোয়ার সিগারেট টানতে টানতে মুস্তাকিনের দিকে চুপ করে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। সিগারেটটা লনে ফেলে দিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে তবে, আমি বেরোই। আবার দেখা হবে। খুদা হাফিজ।’
মুস্তাকিন বললেন, ‘খুদা হাফিজ।’
আনোয়ার গাড়িতে উঠে বেরিয়ে গেল। মুস্তাকিন অনুভব করলেন হঠাৎ উত্তেজনায় তার পা দুটো কাঁপছে। তিনি চিৎকার করলেন, ‘কেউ আছিস? আমার জন্য এক কাপ চা নিয়ে আয় তো।’
কেউ সাড়া দিল না।
মুস্তাকিন বিরক্ত মুখে বললেন, ‘হোয়াট দ্য হেল!’
ঘরের ভেতর রওনা হলেন তিনি। ড্রইং রুমে ঢুকতেই ফোনটা আবার বেজে উঠল, ফোনটা সোফায় ছুঁড়ে দিলেন, ‘উফ! আমারই ভুল হয়েছে, কী কুক্ষণে আনোয়ারের কথায় রাজি হয়েছিলাম!’
*****
দুপুর তিনটে।
সোবাহান সাহেব প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন দুপুর একটায়। তাকে এখনও বসিয়ে রাখা হয়েছে। গেস্ট হাউজের রিসেপশনিস্টকে বার তিনেক পরিচয় দিয়েছেন, তাতে কোনো লাভ হয়নি।
তিনটে পনেরো নাগাদ সোবাহান দেখলেন আনোয়ার রিসেপশনিস্টের সঙ্গে কথা বলছে। খানিকটা উত্তেজিত হয়েই ডাকলেন, ‘আনোয়ার, আনোয়ার…’
আনোয়ার পিছন ফিরে তাকে দেখে হাসল, ‘আরে, সোবাহান সাহেব, আপনি এখানে?’
সোবাহান স্খলিত কণ্ঠে বললেন, ‘দু-ঘণ্টা ধরে বসে আছি ভাই। সাহেব নাকি মিটিং করছেন, এখনও আমার সঙ্গে দেখা করার সময় পেলেন না। এত বছর আয়নাঘরে কাটালাম, এখন যাদের আমায় সম্মান দেওয়া উচিত, তারা দেখা অবধি করার সময় পাচ্ছে না।’
আনোয়ার সোবাহানের পাশে এসে বসে বলল, ‘সোবাহান সাহেব, পরের সপ্তাহে ইসলামাবাদে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা ডেলিগেট টিম যাবে। সেটা নিয়েই সকাল থেকে সাহেব ব্যস্ত হয়ে আছেন। ঘনঘন মিটিং করছেন। আপনি আমার সঙ্গে আসুন।’
সোবাহান অবাক হলেন, ‘তোমার সঙ্গে? আচ্ছা, চলো।’
সোবাহান সাহেবকে নিয়ে আনোয়ার প্রধান উপদেষ্টার চেম্বারে ঢুকলেন। নিরাপত্তারক্ষীরা আনোয়ারকে দেখা মাত্রই স্যালুট করল। সোবাহান বিড়বিড় করে বললেন, ‘এসব আবার কবে থেকে হল?’
উপদেষ্টা সাহেব চেয়ারে বসে পেপার ওয়ার্ক করছিলেন। আনোয়ারকে দেখে বললেন, ‘এসো।’
আনোয়ার বলল, ‘আপনি সোবাহান সাহেবকে চেনেন তো? ওকে মিথ্যা মামলায় কয়েদ করে রাখা হয়েছিল। সবে ছাড়া পেয়েছেন।’
উপদেষ্টা সাহেব বললেন, ‘ওহ, আমি ওকে চিনি না। তবে নাম শুনেছি।’
সোবাহান সাহেব ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, ‘আমি অনেকবার আপনার রিসেপশনিস্টকে বলেছি। আমাকে শুধু অপেক্ষা করতে বলে যাচ্ছে।’
‘আমি এক্সট্রিমলি সরি সাহেব। আমি খুবই ব্যস্ত ছিলাম। আপনি চা খাবেন?’
‘তা খেতে পারি।’
উপদেষ্টা সাহেব বেল বাজিয়ে চায়ের কথা বলে সোবাহানকে বললেন, ‘বলুন, আপনি আমার কাছে হঠাৎ করে?’
সোবাহান বললেন, ‘হঠাৎ করে নয়। আমি দেশের কাজে যুক্ত হতে চাইছি। এত বছর ধরে আমাকে আটকে রাখা হল, দেশের কাছে কি আমি কিছু প্রত্যাশা করতে পারি না?’
উপদেষ্টা আনোয়ারকে বললেন, ‘আনোয়ার, তুমি সোবাহান সাহেবের ব্যাপারটা দেখো। এই ভারটা আমি আপনাকে দিচ্ছি।’
সোবাহান বললেন, ‘আনোয়ার দেখবে?’
‘হ্যাঁ, এখন ওই দেখছে গোটা ব্যাপারটা। কেন? দেখতে পারে না? হতে পারে ও পাকিস্তানের নাগরিক, কিন্তু এই দেশকে ও আমার আপনার থেকে কম ভালোবাসে না। ওর নিজের জীবনের অনেকটা অংশ এই দেশের উন্নতির পিছনে ব্যয় করেছে। আমার মনে হয় ওকে আমাদের ধন্যবাদ জানানো উচিত।’
সোবাহান তেতো গলায় বললেন, ‘তা ঠিক। আচ্ছা আমি আজ উঠি। আনোয়ারের সঙ্গে আমি যোগাযোগ করে নেব।’
উপদেষ্টা সাহেব হাসিমুখে বললেন, ‘হ্যাঁ। আপনি ওর সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন। তাহলেই হবে।’
সোবাহান বেরিয়ে গেলেন। আনোয়ার বলল, ‘সোবাহান সাহেবকে কাজে লাগানো যেতে পারে।’
ওয়াকার বললেন, ‘আমার কোনো আপত্তি নেই। তবে মনে রেখো, উনি এখন প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে আছেন। ক্ষমতা পাওয়া মাত্র লোকের উপর সেটা প্রয়োগ করার চেষ্টা করবেন। দেশ এই মুহূর্তে প্রতিহিংসার উপরেই দাঁড়িয়ে আছে। ইন্ডিয়ান মিডিয়া কিন্তু ইতিমধ্যেই পৃথিবীকে এই নিয়ে রিপোর্ট দেখাচ্ছে।’
আনোয়ার বলল, ‘দেখাক। ওদের এখন গাত্রদাহ হবেই। আমরা ওদের নিয়ে ভয় পাবই বা কেন? সোবাহান সাহেবকে নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রকের উপদেষ্টা করে দিন জনাব। বাকিটা আমি ওর সঙ্গে কথা বলে নেব।’
ওয়াকার চোখ কপালে তুললেন, ‘প্রতিরক্ষার মতো জায়গা ওকে দিয়ে দেবে? আয়নাঘরে যারা ছিল, তাদের এখনই এত গুরুদায়িত্ব দেওয়া কি ঠিক হবে? এদের কারোই তো মাথার ঠিক নেই। কী করতে কী করে বসবে!’
আনোয়ার বলল, ‘জি জনাব। ঠিক হবে। সোবাহান সাহেবকে তো লীগের লোকেরা জেলে ঢুকিয়েছিল। তাদের বেশিরভাগই দেশ থেকে পালিয়েছে। যারা আছে, তাদের উনি ওর মতো করে দেখুন, আমরাও দেখি উনি কী করতে পারেন।’
ওয়াকার বললেন, ‘তুমি কি বড়ো কিছু প্ল্যান করছ আনোয়ার? সেরকম হলে আমাকে একবার হলেও জানাবে। একদিন আগে হলেও।’
আনোয়ার হাসল, ‘জানাবো জনাব। আপনাকে না জানিয়ে আমি কিছু করব না।’
