আয়নাবাড়ি – ৫৫

৫৫

রাত দশটা।

॥ ঢাকা।।

সোমনাথ টিভি দেখছেন। গোটা দিন একই ফ্ল্যাটে থেকে থেকে নিজেকে বন্দি মনে হচ্ছে। জয়দেবকে একবার জিজ্ঞেস করেছেন। জয়দেব বলেছে দুটো দিন দেখে তারপর জানাবে। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে হিংসের খবরের সঙ্গে নিউজে দেখানো হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার ইসলামাবাদে দল পাঠাচ্ছে।

জয়দেব খবরটা দেখে বলল, ‘দেখেছেন কাকাবাবু, আপনারা কাদের সাপোর্ট করেছিলেন? সরাতে গেছিলেন ফ্যাসিস্টকে, নিয়ে এসেছেন সন্ত্রাসবাদীদের।’

সোমনাথ বললেন, ‘সন্ত্রাসবাদী? ইসলামাবাদে গেলেই সন্ত্রাসবাদী কেন হবে? ইন্ডিয়া এ দেশের সব কিছুতে নাক গলিয়েছে। এ তো কূটনীতি। কূটনীতিতে নতুন বন্ধু করা যেতে পারে।

জয়দেব বলল, ‘বাংলাদেশ যদি পাকিস্তানকে বন্ধু ভাবে, তাহলে অনেক অঙ্কই ওলটপালট হতে পারে। এটা আপনি খুব ভালো করে জানেন। এদেশে যেভাবে দিনের পর দিন গণহত্যা করেছে পাকিস্তানিরা, মেয়েদের ধর্ষণ করেছে, তারপরে তাদের বন্ধু ভাবার ভুল বাংলাদেশ করছে কীভাবে? আসলে কিন্তু ভুল করেনি, এই সমগ্ৰ বিদ্ৰোহটাই আসলে পাকিস্তানপন্থীদের একটা চাল ছিল, তারা ছাত্রদের সামনে এগিয়ে দিয়েছে। এখন চলছে ফিরিয়ে দেবার পালা। কৃতজ্ঞতা দেখানোর সময়।’

সোমনাথ বললেন, ‘ভারত বাংলাদেশের সব কিছুতে নাক গলায়নি? সেটা ভারতের দোষ ছিল না?’

‘অপ্রয়োজনে নাক গলায়নি। মিডিয়া আপনাদের যেভাবে বুঝিয়েছে, সেই প্রোপাগান্ডাই গোটা দেশবাসী খেয়েছে। নাক গলায়নি, ভারত সাহায্য করেছে, ভারতকে বাদ দিয়ে কি বাংলাদেশের অস্তিত্ব থাকত? ইতিহাসকে অস্বীকার করা যায় কি?’

সোমনাথ মাথা নাড়লেন, ‘বঙ্গবন্ধুর পরিবারের প্রতি তিক্ত হয়ে গেছিল এই দেশের লোকের মনোভাব। বঙ্গবন্ধুও একই দোষে দুষ্ট ছিলেন। একাত্তরের পর তার স্বজনপোষণ যেভাবে বেড়ে গেছিল, তিনি নিজেই বোধহয় বুঝতে পারেননি, জনগণের নেতা থেকে কখন লীগের লোক হয়ে উঠেছেন। উপমহাদেশের ইসলামিস্ট কান্ট্রিগুলোতে গণতন্ত্রের থেকেও সেনার শক্তি বেশি। তাদের তখন মনে হয়েছিল বঙ্গবন্ধুকে সরাতে পারলে দেশের লাভ, তারা সে পথে এগিয়েছে।’

‘বঙ্গবন্ধু হত্যার পেছনেও আই এস আই-এর হাত ছিল কাকাবাবু। এদেশের রাজনীতি স্পষ্টত দু-ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। এক ভাগ ভারতপন্থী, দ্বিতীয় ভাগ পাকিস্তানপন্থী। শুধুমাত্র ধর্মের দোহাই দিয়ে পাকিস্তানপন্থীরা যে প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে, তা বেশিদিন টিকবে না। সমস্যা হল, এই টালমাটাল রাজনীতির মাঝে পড়ে আপনার মতো কিছু লোকের সর্বনাশ হয়ে যাবে। এখনও কত জন ঘরছাড়া…’

সোমনাথ বললেন, ‘তোমার কী ধারণা? এই ঝামেলা শান্ত হবে কবে?’

জয়দেব বলল, ‘কালকে ঢাকায় এক গরিব ছেলেকে র এজেন্ট সন্দেহ করে মেরে ফেলেছে। এরা প্রায় সব খানেই র এজেন্টের ভূত দেখছে। এই সবখানে ভারতের ভূত দেখা, ভারত বিরোধী প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে যাওয়া শেষমেশ দেশের শান্তিপ্রক্রিয়াকেই পিছিয়ে দেবে। ওদের একটা প্রোপাগান্ডা কিন্তু আপনার বিরুদ্ধেও ছিল, কলেজে ওরা প্রচার করেছে, আপনি র এজেন্ট।’

সোমনাথ বিস্মিত হলেন, ‘আমি এ-রকম কিছু শুনিনি তো।’

জয়দেব তার ফোন বের করে একটা ছবি এগিয়ে দিল, তাতে একটা পোস্টারে লেখা, ‘অবিলম্বে কলেজ থেকে ভারতের চর সোমনাথ স্যারের পদত্যাগ চাই।’

সোমনাথ শ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘যে দেশকে ভালোবেসে আমি কোথাও গেলাম না, সেই দেশের থেকে মনে হয় এই পুরস্কারটা পাওয়াই আমার বাকি ছিল। ছি ছি, শেষে এই কলঙ্ক আমার গায়ে লাগল?’

জয়দেব বলল, ‘প্রোপাগান্ডার মজা তো এখানেই। মিথ্যেকেই এমনভাবে প্রেজেন্ট করতে হবে, সেটা যেন সত্যি মনে হয়। সে খবর পড়ে রক্ত গরম হয়, মানুষ রেগে যায় এবং মিথ্যে অভিযোগে অপর মানুষের ক্ষতি করে। আপনার কলেজের অবস্থা এখন এরকমই হয়েছে। এই মিথ্যে প্রচার করা হয়েছে শুধু আপনি সংখ্যালঘু বলে। পাকিস্তানপন্থীরা যে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগকে সমর্থন করেছিল, আপনি থাকলে তাদের এক ধর্মের দেশের লক্ষ্যপূরণ হবে কী করে? এই কারণেই তারা এসব শুরু করেছে। ঠিক এই কারণেই এদেশে পাকিস্তানপন্থীদের মাথা তুলতে দেওয়া যাবে না। শত বিতর্কের পরেও ভারতের বহুত্ববাদ ছাড়া এদের কেউ হারাতে পারবে না।’

সোমনাথ শ্বাস ছাড়লেন। ছেলেটা ঠিকই বলছে। অযথা প্রতিবাদ করা অর্থহীন এখানে।

* * * * *

রাত বাড়ছে। আনোয়ার তার ডেরায় ল্যাপটপের সামনে বসেছিল।

গাড়ির শব্দ শুনে দরজা খুলল। দরজার বাইরে শাকিল দাঁড়িয়ে আছে। আনোয়ার আনন্দিত হয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল, ‘যাক, আমি তোর অপেক্ষাতেই ছিলাম।’

শাকিল ঘরে ঢুকে ব্যাগ রাখল। সোফায় বসে চারদিক দেখে বলল, ‘বাঃ দোস্ত, তুই তো ঢাকায় একদম নিজের বাড়ি বানিয়ে নিয়েছিস।

আনোয়ার বলল, ‘দেশের কথাই ভুলে গেছি। এখন ঢাকাই আমার এলাকা হয়ে গেছে। শাকিল বলল, ‘ইসলামাবাদ থেকে ঢাকার ডাইরেক্ট ফ্লাইট শুরু করা দরকার। দুবাই ঘুরে আসতে অনেক সময় লেগে গেল।’

আনোয়ার বলল, ‘তুই ঘুরে এসেছিস, সেটাই দরকার ছিল। ইন্ডিয়ান মিডিয়ার লোকজন নজর রাখছে।’

শাকিল বলল, ‘এখনও ইন্ডিয়ানদের ভয় পেতে হবে কেন? তুই কী করছিস? ধরে ধরে গুলি কর।’

আনোয়ারের চোখ মুখ শক্ত হল, ‘হবে। সব হবে। চিন্তা করিস না। আমি সব কিছুর ব্যবস্থা করব। তোর আপডেট দে। বাকিরা কোথায় আছে?’

শাকিল বলল, ‘রংপুরে পাঠিয়ে দিয়েছি। গাড়িতে পাঠিয়ে তোর এখানে এলাম। ওরা আগে ক্যাম্পে যাক।’

আনোয়ার বলল, ‘আর তুই? তুই কি আমার সঙ্গে থাকতে এসেছিস? ওদের সঙ্গেই তোর ইন্ডিয়ায় ঢোকার কথা।’

শাকিল হাসল, ‘এতদিন পরে এলাম, তোর সঙ্গে একটা দিন না থেকে চলে যাবো?’

আনোয়ার বলল, ‘এখানে আমরা কেউ পিকনিক করতে আসিনি। সবার নিজের নিজের কাজ আছে। তুই দেরি করলে আমাদের প্ল্যান ফেল করে যাবে। আমি ডেট ফেল করতে চাই না।’

শাকিল হাত তুলল, ‘ঠিক আছে। তুই বেশি উত্তেজিত হয়ে পড়ছিস। এখনই এত রাগার কারণ নেই। মোস্তাক কোথায়? ও আমার জন্য কী কী রেডি করে রেখেছে, সেটা আগে জানতে হবে।’

আনোয়ার এবার একটু ঠান্ডা হল, বলল, ‘মোস্তাক চট্টগ্রামে আছে। ডক শিপমেন্টগুলো দেখার দায়িত্ব ওর।’

‘ওহ্, তাহলে তো ঠিকই আছে। ওর কাছে আমার কাজের জিনিসগুলো পেয়ে যাব। তবে শুনছিলাম শিলিগুড়ির ওখানে বর্ডার আগের মতো নেই। বি এস এফ এখন অনেক বেশি কড়াকড়ি শুরু করেছে।’

আনোয়ার বলল, ‘এই জন্যই তোকে আনা হয়েছে। তুই ওই জায়গার স্পেশালিষ্ট। ছেলেগুলোকে ইন্ডিয়ায় ঢোকানোর কাজ তোর। তুই ঢাকায় সময় নষ্ট করছিস কেন আমি জানি না। কাজ সেরে এসে এখানে আসতে পারতিস।

শাকিল উঠে দাঁড়াল, ইলেকট্রিক কেটলি দেখে সেটা মন দিয়ে দেখতে দেখতে বলল, ‘আমরা ফিল্ডে কাজ করি আনোয়ার। আমি জানি আমায় কখন কী করতে হবে। আর আমি আজ থেকে কাজ করি না। আমাকে কী করতে হবে, তা তোর না বললেও চলবে। ইসলামাবাদ আমাকে তোর সমান গুরুত্বই দেয়। তুই এখানে একটা এক্সট্রা ইম্পরট্যান্স নেবার যে চেষ্টা করছিস, তা অহেতুক। যত তাড়াতাড়ি বুঝতে পারবি, তোর পক্ষে ভালো।’

আনোয়ার বলল, ‘তোর কী ধারণা হয়েছে? এখানে আমি কোনো কাজ করি না? একার হাতে গোটা অপারেশনটা সামলেছি। ঢাকায় র এজেন্টদের মেলা ছিল। সব ক-টা এখন আমার ভয়ে পালিয়েছে। লীগের নেতারা কেউ দেশ ছেড়েছে, কাউকে খুঁজে বের করে মারা হচ্ছে। আমাকে এখন তুই ঠিক ভুলের জ্ঞান দিবি?’

শাকিল আহত কণ্ঠে বলল, ‘আমি ভেবেছিলাম তোর কাছে এলে তুই খুশি হবি। দেখা গেল ভুল ভেবেছিলাম। তুই যে এত রেগে যাবি বুঝতে পারিনি। ঠিক আছে ভাই, আমি চলে যাচ্ছি। তোকে তোর ঢাকার বড়ো পোস্ট মুবারক। থাক তুই নিজের সাম্রাজ্য নিয়ে।’

শাকিল ব্যাগ তুলে বেরোতে যাচ্ছিল, আনোয়ার তাকে জড়িয়ে ধরল, ‘আরে রাগ করছিস কেন? রাগ করার কিছু নেই। বোস। ভালো গোস্ত আনাচ্ছি। খা।’

শাকিল অভিমানী কণ্ঠে বলল, ‘এত দূর থেকে এলাম, কোথায় আপ্যায়ন করবি, তা না। আমার কাজ আমি খুব ভালো করে জানি। তুই ভাবিস না। ইন্ডিয়া খুব ভালো দিওয়ালীই উপহার পাবে।’

আনোয়ার বলল, ‘বোস। প্ল্যানটা তাহলে এখনই করেনি।’

শাকিল ব্যাগ রেখে সোফায় বসল। আনোয়ার নোটপ্যাড আর পেন নিয়ে তার পাশে গিয়ে বসে বলল, ‘আগামী এক বছরের মধ্যে আমাদের ক্যাম্প বানাতে হবে। একটার পর একটা। ইন্ডিয়ান আর্মি আর বি এস এফকে বাংলাদেশ বর্ডার নিয়ে পাগল করে তুলতে হবে। আমি যেভাবে শুঁটি সাজাচ্ছি, তাতে শুধুমাত্র ক্যাম্প তৈরি করেই থামলে হবে না, এই ক্যাম্পগুলো চালানোর লোক আনতে হবে। মুজফফরাবাদের ট্রেনিং ক্যাম্পগুলোর মতো এখানেও সেগুলো বানাতে হবে। কিন্তু ইন্ডিয়ান আর্মি যাতে সন্দেহ করতে না পারে, তার জন্য আমরা এই জায়গাগুলোতে আবাসিক হোস্টেল তৈরি করব। আগামী একবছরের মধ্যে ইন্ডিয়ার মাথা খারাপ করে দেবো আমরা। এই আবাসিক ক্যাম্প বানাবো এদেশেরই সরকারের টাকায়। ভবিষ্যতে যাই হয়ে যাক, ইন্ডিয়া আর কোনোদিন এদেশে দাঁত ফোটানোর সুযোগ পাবে না।’

শাকিল খুশি হল, ‘ঠিক আছে, তাহলে লোকেশনগুলো চিহ্নিত করার কাজ শুরু কর।’

আনোয়ার ম্যাপ বের করল, ‘দেখ, আমি কোনো কোনো জায়গা ভেবে রেখেছি’ …

* * * * *

২০১৯, অক্টোবর।

সোবাহান বাড়িতে ছিলেন। সরকারবিরোধী মিছিল হবে সন্ধে বেলায়। লোকজন জোগাড় করার চেষ্টা করছিলেন। দলীয় কর্মীদের মনোভাব আজকাল অনেক তলানিতে চলে গেছে।

পুলিশের মার খাবার ভয়ে কেউ মিছিলে যেতে চায় না। তার সাগরেদদের ফোন করে করে সোবাহান ধমক দিয়ে লোক বাড়ানোর চেষ্টা করছিলেন।

হঠাৎই দরজা ঠেলে তার বড়ো ছেলে ঢুকে বলল, ‘আব্বা, পুলিশ অফিসার বশির আলি এসেছে। কী কথা বলবে আপনার সঙ্গে!’

সোবাহানের ভ্রূ কুঁচকাল, ‘নিয়ে আয়।’

বশির আলি ঘরে প্রবেশ করে বিনীত কণ্ঠে বলল, ‘জনাব, আপনাকে আমাদের সঙ্গে যেতে হবে।’

সোবাহান অবাক হলেন, ‘মানে?’

বশির বলল, ‘বিশেষ কোর্ট বসেছে জনাব, আপনার বিচার শুরু হবে আজ থেকে।’

সোবাহান আকাশ থেকে পড়লেন, ‘বিশেষ কোর্ট বসেছে মানে? আমি কিছু জানলাম না, আমার উকিলের সঙ্গে কথা বলা হল না, আজকে এখন আপনি বলছেন বিচার শুরু হবে?’

বশির বলল, ‘আমার কাছে তেমনই নির্দেশ আছে জনাব। বলা হয়েছে প্রথমে অনুরোধ করতে হবে। তারপর না যেতে চাইলে বল প্রয়োগ করতে হবে। আপনি বরিষ্ঠ মানুষ। আমি বল প্রয়োগ করতে চাই না।’

সোবাহান বললেন, ‘ও। তা এখনই যেতে হবে?’

বশির বলল, ‘জি জনাব।’

সোবাহান বললেন, ‘বাথরুম পায়খানা করতে দেবেন তো?’

বশির ঘড়ি দেখে বলল, ‘পাঁচ মিনিট।’

সোবাহান বাথরুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করলেন। তার ঘাম হচ্ছে। দুয়েক জায়গায় ফোন করা শুরু করলেন। কেউ ফোন ধরছে না। পাঁচ মিনিটের জায়গায় পনেরো মিনিট হল। বশির আলি দরজায় ধাক্কা মারতে শুরু করলেন।

বিরক্ত মুখে সোবাহান দরজা খুলে বেরিয়ে বললেন, ‘আমি একজন বৃদ্ধ মানুষ। অর্শের ব্যাথায় জেরবার। আপনার আমাকে একটু বেশি সময় দেওয়া উচিত ছিল। ঠিক আছে। চলুন কোথায় যেতে হবে।’

পাড়ার লোকে ভিড় করে দেখল সোবাহানকে গাড়িতে তোলা হচ্ছে। অনেকেই ভিডিয়ো করল। রাস্তায় যেতে যেতে সোবাহান বশিরকে বললেন, ‘আপনি আমাদের সরকারে থাকার সময়েই জয়েন করেছিলেন, আমার যতদূর মনে পড়ছে, আপনিই আমার নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। ভুল বলছি কি?’

সোবাহানের কথায় বশির হঠাৎ করে রেগে গিয়ে তার সার্ভিস রিভলভার বের করে সোবাহানের মাথায় ধরে বলল, ‘অনেকক্ষণ বিরক্ত করেছিস। এবার চুপ থাক। বাড়ির লোক ছিল বলে তোকে বেশি সম্মান দিয়ে ফেলেছি। একটা কথা বলবি, গুলি করে বুড়িগঙ্গায় ফেলে দিয়ে আসব। চুপ থাক। চুপ।’

বশিরের ধমকে সোবাহানের পায়জামা ভিজে গেল। তিনি ভাবতে পারেননি বশির এভাবে তেড়ে আসবে। তিনি চুপ করে গেলেন।

বিচারের নামে যা হল, তাকে প্রহসন বললে কম বলা হয়। তার পক্ষে কিছু বলার উপায়ই রইল না। সব কিছু আগে থেকে ঠিক করে রাখা ছিল। বয়সের জন্য জাস্টিস খান তাকে শুধু ফাঁসি না দিয়ে যাবজ্জীবন কারাবাসে পাঠানোর কথা ঘোষণা করলেন। সোবাহান কাঁদলেন, চিৎকার করে সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন তিনি কিছুই করেননি, কোনো লাভ হল না।

বিচার শেষ হবার পর বশির আলি তাকে টানতে টানতে নিয়ে গিয়ে গাড়িতে তুলে কানের কাছে হিসহিস করে বলল, ‘থাকবি এবার আয়নাঘরে। দেখ থাকতে কেমন লাগে।’

সোবাহান ক্লান্ত গলায় শুধু বলেছিলেন, ‘আমি তোমার কোনো ক্ষতি করেছিলাম বাবা? আল্লাহর কসম লাগে, তুমি একবার শুধু আমাকে বলো আমি কী ক্ষতি করেছিলাম।’

বশির ধমক দিয়ে বলেছিল, ‘চুপ থাক জানোয়ার, চুপ থাক।’

.

সময় এভাবেই পালটায়। বিরাট চেম্বার পেয়েছেন সোবাহান। টেবিলে খবরের কাগজে বশির আলির মৃত্যুসংবাদ ছাপা হয়েছে। চোখ মুখে আজকাল পরম প্রশান্তি ঘোরাফেরা করে তার। মানুষ বোঝে না, চিরকাল কারো সমান যায় না। সময় পালটালে এভাবেই পালটায়।

সোবাহান তার ডায়েরি খুললেন। লিস্টের এক নম্বর নাম ছিল বশির আলি। দুই নম্বর নাম হল জাস্টিস খান। রজ্জাক খবর এনেছে খান সাহেব দেশ থেকে পালাতে পারেননি।

গুলশনেই তার আরেকটা বাড়িতে গা ঢাকা দিয়ে আছেন।

সোবাহান ফোন বের করে রজ্জাকের নাম্বার ডায়াল করা শুরু করলেন…

*****

সকাল সাতটা। খোন্দকার সাহেবের ঘুম ভাঙল কলিং বেলের শব্দে।

দরজা খুলে দেখলেন নিপুণ দাঁড়িয়ে আছে।

দরজা থেকে সরে দাঁড়ালেন, ‘আয়।’

নিপুণ ঘরে ঢুকে সোফায় বসল। সে স্পষ্টতই ভেঙে পড়েছে।

খোন্দকার সাহেব বললেন, ‘তোর আরও দু-দিন থাকার কথা ছিল কক্সবাজারে। আগে চলে এলি কেন?’

নিপুণ বলল, ‘ভালো লাগল না।’

খোন্দকার সাহেব বললেন, ‘এখন কী করবি? ঘরে পড়ে পড়ে ঘুমবি?’

নিপুণ বলল, ‘সোমনাথ স্যারকে পাওয়া যাচ্ছে না বাবা। ফ্ল্যাট তালাবন্ধ। ফোন সুইচড অফ।’

খোন্দকার শ্বাস ছাড়লেন, ‘তাহলে হয়তো উনি ইন্ডিয়া চলে গেছেন।’

নিপুণের চোয়াল শক্ত হল। সে বলল, ‘তাহলে আমরাও হেরে গেলাম? সোমনাথ স্যারের মতো মানুষকেও দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হল!’

খোন্দকার বললেন, ‘এখানে আমাদের কারো কিছু করার ছিল না। প্রবল শক্তির কাছে আমরা তুচ্ছ হয়ে গেছি। তোকে যেভাবে আয়নাঘর থেকে বের করে আনতে পারিনি, একই ভাবে সোমনাথ স্যারকেও হারিয়ে ফেললাম। এখানে আমাদের সত্যিই কিছু করার ছিল না।’

ফোন বাজতে শুরু করল। খোন্দকার সাহেব ফোন ধরতেই ও প্রান্ত থেকে ভেসে এল, ‘স্যার আজকে কলেজে যাবেন না। ঝামেলা হবে।’

ফোন কেটে গেল। খোন্দকার সাহেব উদগ্রীব হয়ে, ‘কে, কে বলছেন?’

বলে যেতে লাগলেন। ঘেমে যাচ্ছিলেন তিনি। কোনোমতে সোফায় বসলেন।

নিপুণ জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে?’

খোন্দকার বললেন, ‘কলেজ যেতে বারণ করছে। বলছে কলেজে ঝামেলা হবে। এ তো মহা উপদ্রব শুরু হল।’

নিপুণ বলল, ‘আমাকে জোর করে ঢাকার বাইরে বের করলে বলে আজ এই দিন দেখতে হল। ওরা বুঝে গেছে আমরা আগে থেকেই হার মেনে নিয়েছি। এখন কী হবে?’

খোন্দকার বললেন, ‘সেক্রেটারি সাহেবকে ফোন করব?’

নিপুণ বলল, ‘ফোন করে কী হবে? উনি তো এর মধ্যেই পাকিস্তানীদের হাত ধরে বসে আছেন, ওর জন্যই তো সোমনাথ স্যারকে তুমি কলেজ থেকে বের করলে।

খোন্দকার অসহায়ভাবে বসে রইলেন। মিনিট খানেক পরে নিপুণকে বললেন, ‘আমরা কোথায় যাব বল তো? আমাদের তো কোথাও যাবার জায়গা নেই। আমরা এদেশে সংখ্যাগুরু, ভারতে তো তা নই। আমরা কোথায় যাব বাবা?’

নিপুণ বলল, ‘আমরা এদেশেও সংখ্যালঘু। ভদ্র সভ্য মানুষ চুপ করে থাকতে থাকতে, সব মেনে নিতে বাধ্য হবার পরে যেটা হয়, সেটাকেই সংখ্যালঘু বলে। চুপ করে থাকাটা কাপুরুষের লক্ষণ। যেদিন সোমনাথ স্যারকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হল, সেদিনই বোঝা উচিত ছিল তোমারও একই দিন আসতে চলেছে। বোঝোনি তুমি?’

খোন্দকার মাথা নাড়লেন, ‘বুঝেছিলাম, স্বীকার করতে চাইনি। ওরা সব কিছু ভাঙার খেলায় নেমেছে। পড়াশোনাটা বড়ো কথা না, অথচ মেধবী নামে সবাইকে অপমান করা যাবে। আমরা তো যথাসময়ে সরকারবিরোধী কথা বলেছি, আমার ছেলে আয়নাঘরে থেকে এসেছে। এরপরে আমার আর কী প্রমাণ করার আছে?’

নিপুণ বলল, ‘আমি আজ কলেজ যাব। এভাবে আমরা হেরে যাব না।’

খোন্দকার সাহেব হঠাৎ নিপুণের হাত দুটো ধরে বললেন, ‘যাস না বাবা, তোকে এতদিন পরে পেয়েছি,আর হারাতে চাই না। যাস না। যাবার দরকার নেই। ওরা চাকরি ছাড়তে বললে ছেড়ে দেবো। দরকার নেই আমার চাকরির।’

খোন্দকার সাহেবকে ভেঙে পড়তে দেখে নিপুণ হতভম্ব হয়ে গেল। সে আর কিছু বলতে পারল না। কলিং বেল বাজছে। খোন্দকার বললেন, ‘দেখ তো কে এল আবার এই সকালে!’

নিপুণ বলল, ‘তুমি সামলে নাও। এভাবে ভেঙে পোড়ো না।’

খোন্দকার সাহেব পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখের জল মুছে নিয়ে বললেন, ‘দেখ।’

নিপুণ দরজা খুলে দেখল বাইরে কেউ নেই। দরজার নীচে চোখ পড়তে দেখল একটা কাগজ পাথর চাপা দিয়ে রেখে গেছে কেউ। বাইরের দিকে তাকালো সে। দিনের বেলায় রাস্তায় লোকজন ভরতি, কে দিয়ে গেছে বোঝা সম্ভব না।

চিঠিটা তুলে খুলে দেখল তাতে শুধু লেখা, ‘রাত বারোটায় তৈরি থাকবেন। আপনারা এই বাসায় নিরাপদ নন। আমি আসব। ইতি সোমনাথ।’

*****

রাত সাড়ে এগারোটা।

বাড়ির ঠিকানা দেখছিল আসাদুর। রজ্জাক বলল, ‘এই বাড়ি? কয় কী? এত ছোটো বাড়িতে জাস্টিস থাকে?’

আসাদুর বলল, ‘আপনি যত্তর তৈরি রাখেন, আমি দরজা দেখতাসি।’

আসাদুর গিয়ে দেখল বাড়ির দরজা বন্ধ। রজ্জাক মিটিমিটি হাসতে হাসতে বলল, ‘জনাব পড়াশোনা করা লোক তো, বুদ্ধি খাটাইসে। দরজা ভাঙতে লাগবো। দা বাইর কর।’

আসাদুর ব্যাগ থেকে দা বের করে দিল। রজ্জাক দা দিয়েই তালার উপর মারতে শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যে তালা ভেঙে গেল। রজ্জাক দরজা খুলে বাড়িতে ঢুকে দেখল সব ঘরের আলো নেভানো। রজ্জাক ফোনের টর্চ জ্বালল। মধুর স্বরে ডাকল, ‘খান সাহেব, ও খান সাহেব। একটু বাইর হইয়া আসেন জনাব। আসাদুর, বাইর কর।’

আসাদুর চকলেট বোম বের করে তাতে আগুন জ্বালিয়ে ঘরের ভেতর ছুঁড়ে দিল। শব্দ হতেই এক শিশুর কান্না ভেসে এল।

রজ্জাক হাসতে হাসতে বলল, ‘ওই দেখো, পিচ্চি কান্দে। বাজি ফাটাইলি, এইবার গ্রেনেড ছোড়। আর লুকাইয়া থাকতে হইব না, জনাবরে সুদ্ধ বাসার সবাইরে মারুম আজ।’

রজ্জাকের কথা শেষ হতেই ঘরের ভেতর থেকে জাস্টিস খান আর্তনাদ করে উঠলেন, ‘দাঁড়াও, আমি আসছি।’

রজ্জাক হাসল, ‘আসেন আসেন জনাব। আপনার জন্যই তো সিনেমা ছাইড়া আইলাম। ভালো সিনেমা আইসে, কী যেন কয় ওরা, নেটফিলিকিস না কী! আসেন।’

জাস্টিস খান বেরিয়ে এসেছেন। রজ্জাক টর্চের আলো তার মুখে ফেলে বলল, ‘জনাব, এইখানে কষ্ট কইরা লুকাইয়া আছেন কেন? সবাই অন্য দেশে পালাইয়া গেছে, আর আপনি এখেনে কেন?’

খান বললেন, ‘আমাকে ছেড়ে দাও। টাকা পয়সা যা চাও, আমি দিয়ে দিচ্ছি। তোমরা আমাকে ছেড়ে দাও। এক কোটি টাকা নেবে? তাই দিচ্ছি।’

রজ্জাক বলল, ‘এই বাসায় কারে কারে লুকায় রাখছেন জনাব?’

খান চুপ করে রইলেন।

রজ্জাক খানের মুখে রিভলভার ঢুকিয়ে দিয়ে বলল, ‘তাড়াতাড়ি বল।’

খান বললেন, ‘আমার নাতি আর আমার স্ত্রী।’

‘বাকিরা পালাইছে?’

‘হুঁ।’

রজ্জাক আসাদুরকে বলল, ‘ফোন কর।’

আসাদুর সোবাহান সাহেবকে ফোন করে স্পিকারে দিল। সোবাহান ফোন ধরতেই রজ্জাক বলল, ‘জনাব, খান সাহেব আপনেরে ছরি বলবেন। শুনে নেন।’

খান আতঙ্কিত কণ্ঠে বললেন, ‘সোবাহান সাহেব, ওদের একটু সামলান। আমি তো কারো কোনো ক্ষতি করিনি। আমাকে যা ইন্সট্রাকশন দেওয়া হয়, আমি তাই করি। আমাকে ছেড়ে দিন প্লিজ।’

সোবাহান বললেন, ‘রজ্জাক, দেরি করিস না। কাজ শেষ করে চলে আয়। মিডিয়ার লোকেদের বিশ্বাস নেই।

রজ্জাক ফোন কেটে দিল। খান সাহেবের স্ত্রী বেরিয়ে এসে কান্নাকাটি করতে শুরু করলেন। রজ্জাক বলল, ‘ঠিক আছে জনাব, আপনারে বেশি কষ্ট দিব না। আপনের জন্য বন্দুক।’

খান এবং খানের স্ত্রী আর্তনাদ করতে উঠতে যাচ্ছিলেন। রজ্জাক খানকে গুলি করল। জাস্টিস খান মাটিতে পড়ে গেলেন। খানের স্ত্রী এসে খানের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে কাঁদতে শুরু করলেন।

রজ্জাক হাসিমুখে বলল, ‘এবার দরজা বন্ধ কইরা দে আসাদুর। আর চিন্তা নাই।’

দু- জনে বাড়ির বাইরে এল। পেট্রল ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দিল।

বাড়ি জ্বলতে শুরু করল।

রজ্জাক খিকখিক করে হাসতে হাসতে ফোনে ছবি তুলে সোবাহানকে পাঠালো। সঙ্গে সঙ্গে সোবাহানের ফোন এল, ‘তোরা ওখানে কী করছিস? কাজ হয়ে গেলে চলে আয়। বলেছি না কোনোকিছুতে বেশি বাড়াবাড়ি করবি না?’

রজ্জাক মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, ‘জি জনাব। এখনই আসছি। এতদিন পর স্বাধীনতা পাইসি তো, তাই পালন করতাসিলাম।’

সোবাহান রেগে গিয়ে বকাবকি করা শুরু করে দিলেন।

আসাদুর বাইক নিয়ে এসেছিল। তার বাইকে উঠে দু-জনে এলাকা ছাড়ল। রজ্জাক বাইকের পেছনে খিকখিক করে হাসতে হাসতে বলল, ‘এই সময় রেপ করতে ইচ্ছা করে আসাদুর। আছে নাকি?’

আসাদুর শুনতে পেল না।

রজ্জাক আসাদুরের মাথায় চাপড় মারল। আসাদুর টাল দামলাতে না পেরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল। দু-জনেই রাস্তায় পড়ে গেল।

রজ্জাক পড়ে গিয়েও একইভাবে হাসতে লাগল…

৫৬

।। দিল্লি।

‘বাংলাদেশ এই মুহূর্তে ভয়ানক পরিস্থিতিতে আছে। আপনি বুঝতে পারছেন দেশটার অবস্থা ঠিক কী এখন?’

সাক্ষাতকার চলছে প্রধান উপদেষ্টা ওয়াকারের। আর পি মরা চোখে সাক্ষাতকার দেখছেন। যে সাক্ষাতকার নিচ্ছে, সে একটার পর একটা অভিযোগ করে যাচ্ছে। ওয়াকার সব কিছু অস্বীকার করে একটা কথাই বলে যাচ্ছেন, ‘দেশটা এখন একটা ভাঙা-গড়ার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। আমাকে সময় দিতে হবে। আমার টিমকে সময় দিতে হবে। দেশের পুরোনো রাজনীতিবিদদের আগের সরকার জেলে আটকে রেখেছিল। আমি তাদের আমার উপদেষ্টামণ্ডলীতে জায়গা করে দিয়েছি। কিছুটা সময় দিলে আমরাই সোনার বাংলাদেশ গড়ব। দেশের যে নতুন শক্তির উত্থান হয়েছে, ছাত্র যুবদের দেখেও আমাদের শিখতে হবে।’

হাই তুললেন আর পি। অদ্ভুতভাবে গতকাল রাত থেকে আর কোনো ফোন আসেনি। তিনি কলব্যাক করার চেষ্টা করে দেখেছেন। কোনো লাভ হয়নি। বিপ বিপ হয়ে কেটে যাচ্ছে। প্রশান্ত মনিটরের দিকে তাকিয়ে বসে আছে। চেম্বার থেকে বেরিয়ে প্রশান্তের কাছে গিয়ে বসলেন। প্রশান্ত বলল, ‘বানশালের বউ মনে হয় না এসবে জড়িত আছে। একবারে সাদাসিধে টাইপের মহিলা। কী করব স্যার? ওর উপরে আর সারভেইলেন্স চালানোর দরকার আছে?’

আর পি বললেন, ‘এই সপ্তাহটা অবধি রাখার অর্ডার আছে। নজরটা রাখো। নর্থ ইস্টে কোনো মুভমেন্ট পাচ্ছো?’

‘শিলিগুড়ি বর্ডারে একটা ট্রেনিং ক্যাম্পে মুভমেন্ট আছে। কুড়িটা ট্রাক ঢুকেছে, মোস্তাক এখন রংপুরে গেছে। চট্টগ্রামে ছিল। ওর ফোন থেকেই ট্রাকের সংখ্যাটা জানা গেছে স্যার।’

‘গুড জব। আর আমাদের তরফে কারো কোনো নড়া-চড়া?’

‘এখন অবধি না।

‘ট্রাকগুলোর অরিজিন?’

‘চট্টগ্রাম থেকে।’

আর পি চুপ করে গেলেন। অস্বস্তি হচ্ছে। বললেন, ‘কুড়িটা ট্রাক? সেটা তো অনেক কিছু হতে পারে। এখনও বর্ডার বন্ধ তো?’

‘হ্যাঁ। টিল ফারদার নোটিফিকেশন। বাংলাদেশ শান্ত না হলে সব বন্ধ থাকার কথা অন্তত মাসখানেক।’

‘চিকেনস নেক নিয়ে একটা সময় আমাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিদের অস্ত্রশস্ত্র সাপ্লাই করার কাজ চলত বাংলাদেশ থেকে। লীগ সরকারের পতনের পর সে কাজ আবার নতুন উদ্যমে শুরু হয়েছে যা বুঝতে পারছি, আমি বিদুরের কাছে যাচ্ছি। তুমি নজর রাখো।’

‘শিওর স্যার।’

আর পি বিদুরের কাছে দৌড়লেন। বিদুর বানশালের অ্যাডভোকেটের সঙ্গে কথা বলছিলেন। আর পি ততক্ষণ বাইরে অপেক্ষা করছিলেন। দীপ্তি তাকে দেখে বলল, ‘গুড মর্নিং স্যার।’

আর পি বললেন, ‘ছেলেটাকে ধরা হয়েছে। এই ছেলেটাই ছিল তো?’

দীপ্তি মাথা নাড়ল, ‘হ্যাঁ স্যার। তবে কী ছিল এখনও জানা যায়নি।’

আরপি বললেন, ‘তাড়াতাড়ি জানা গেলে আর আমাদের কেন রেখেছে দীপ্তি? তুমি আমি তো এই কাজই করে যাচ্ছি আসলে। ওই ছেলেটা কিছু জানে বলে আমার মনেও হয় না। কিন্তু ওর সাহস আমাকে বিস্মিত করেছে।’

দীপ্তি লজ্জিত হল, ‘সাহসের থেকেও আমার অপদার্থতা মনে হয় বেশ ছিল স্যার। আমার সতর্ক হওয়া উচিত ছিল।’

আর পি বললেন, ‘উঁহু, বাজে কথা। এখানে তোমার কিছু করার ছিল না। সবাইকে এই কথাটা বারবার বলবে না। তাহলে যারা বিশ্বাস করে না, তারাও বলতে শুরু করবে তুমিই দায়ী ছিলে। তোমাকে আমি এর আগেও এই বিষয়ে অনেকবার বলেছি। সেগুলো কি ভুলে গেছো?’

আরপির কথা শুনে দীপ্তি জিভ কেটে হাসল, ‘সরি স্যার। আর বলব না।’

আর পি বললেন, ‘গুড।’

বিদুরের চেম্বার থেকে বানশালের অ্যাডভোকেট বেরোতেই আর পি প্রবেশ করলেন। বিদুর বললেন, ‘বোসো বোসো। কোনো খবর আছে নাকি?’

আর পি বললেন, ‘রংপুরের কাছে ওরা কিছু জড়ো করছে।’

‘কী জড়ো করছে?’

‘বোঝা যাচ্ছে না। মোস্তাক সেসব চট্টগ্রাম থেকে ট্রাকে করে নিয়ে এসেছে। আর্মস হতে পারে, ড্রাগস হতে পারে, সব কিছু হতে পারে। এখান থেকে এর বেশি কিছু বের করা সম্ভব না।’

বিদুর বিরক্ত মুখে বললেন, ‘এই জন্য বাংলাদেশের ঠিকঠাক সরকার দরকার। এই টেরোরিস্টগুলো এদের ব্যাক করা শুরু করেছিল মানেই নর্থ ইস্ট এবার গরম হতে শুরু করবে। সুযোগ থাকলে আমি…।’

চুপ করে গেলেন বিদুর। আর পি বললেন, ‘ওই নাম্বার থেকে আর ফোন আসেনি। হঠাৎ করে চুপ করে গেল। এটাও স্ট্রেঞ্জ।’

বিদুর বললেন, ‘আসবে। সব আসবে। ধৈর্য ধরো। এক কোটি টাকা কোনোভাবেই দেওয়া যাবে না। এক লাখ থেকেই শুরু করো তুমি।’

আর পি হেসে ফেললেন।

৫৭

॥ ঢাকা।।

রাত বারোটা।

বীথি ঘুমিয়ে পড়েছেন। তার শরীরটা ভালো ঠেকছে না। জয়দেব সন্ধেবেলা ওষুধ এনে দিয়েছে।

সোমনাথ ঘরের মধ্যে পায়চারি করছেন। জয়দেব দরজা খুলে ঢুকল।

সোমনাথ উদগ্রীব কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী হল?’

জয়দেব হাসল, ‘খোন্দকার সাহেবদের সেফ হাউজে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আর চিন্তা নেই।

‘এখানে আনা যেত না?’

‘না। একসঙ্গে না থাকাই ভালো। আলাদা আলাদা সেফ হাউজ আছে যখন, ওখানে থাকাটাই ঠিক আছে।’

সোমনাথ বললেন, ‘সেফ হাউজ? এই শহরে আর কি কোনো সেফ কিছু আছে? জাস্টিস খুন হয়ে গেলেন, পুলিশ অফিসারকেও মেরে দিয়েছে। আর কী কী হতে চলেছে কে জানে!’

জয়দেব বলল, ‘ওরা এই সময়টাকেই ব্যবহার করবে। বেশিদিন তো ডামাডোল চলতে পারে না। ওদের নিজেদেরই দায় থাকবে সব ঠিক হয়ে গেছে দেখানোর। কিন্তু এখন ওরা খেলবে।’

সোমনাথ সোফায় বসে বললেন, ‘রাজনৈতিক লোকেদের শত্রু আছে জানা কথা, কিন্তু আমাদের উপর কীসের শত্রুতা?’

‘ওদের নিজেদের লোকগুলোকে কলেজে বসাবে। আপনাকে বাঁকানো সোজা ছিল না, খোন্দকার সাহেবও একটা পর্যায়ের পর আর বাঁকবেন না। তা ছাড়া নিপুণ আছে।’

‘নিপুণের সঙ্গে কথা বলা জরুরি। ছেলেটা মানসিকভাবে আরও ভেঙে যাবে।’

‘বলবেন। আমাকে আরেকটু সময় দিন। আপনি ঘুমিয়ে পড়ুন কাকাবাবু। আমি একটু কাজ করি।

সোমনাথ ঘাড় নেড়ে তাদের ঘরে গিয়ে শুলেন। দিন কাটানো দুর্বিষহ হয়ে উঠছে এখানে। এভাবে কি থাকা যায়?

সন্ধ্যে থেকে টিভির খবরগুলোতে আতঙ্কিত হয়ে গেছেন। এর মধ্যেই কিছু কিছু আশার খবর আছে। শহরে ছোটো ছোটো দল তৈরি হয়ে রাত পাহারা শুরু হয়েছে। জয়দেব বলল সব কিছু আবার আগের মতো স্থির হয়ে যাবে। সেটা কবে হবে কেউ জানে না।

রাত নামার ফলে ওঘরের শব্দও এঘরে আসছে। জয়দেবের গলা শোনা যাচ্ছে, ফোনে সাংকেতিক ভাষায় কথা বলছে। আলফা, ব্রাভো… এসব না বলে সরাসরি কথা বললে কী অসুবিধা হত? ভারত বিরোধী পোস্ট করেছেন এক কালে। এখন মনে হচ্ছে জয়দেব না থাকলে এই পরিস্থিতিতে টিকে থাকাই যেত না। মিডিয়া এবং পারিপার্শ্বিক লোকজন কেমন ভুল পরিবেশে নিয়ে চলে যায়। তিনি বুঝতে পারেননি তার ধর্মের জন্য তিনি ভারত বিরোধী হলেও সেটা কেউ বিশ্বাস করবে না। তিনি চেয়েছিলেন তার দেশ স্বতন্ত্র হোক, কোনো দেশের কথা শুনে চলার দরকার নেই। স্বাধীনতার এত বছর পরেও যদি কোনো দেশকে অন্য দেশের উপর নির্ভরশীল হতে হয়, তাহলে তা সে দেশেরই ক্ষতি। কিন্তু তার বোঝা উচিত ছিল, এই দেশগুলো নীতিকথার উপর ভিত্তি করে চলে না। চলে ধর্মের নামে অধর্মের প্রোপাগান্ডায়। বুঝতে বড়ো দেরি হয়ে গেছে।

সোমনাথ বিড়বিড় করে বললেন, ‘ভুল হয়ে গেছে সব… ভুল হয়ে গেছে বিলকুল। বড়ো ভুল করে ফেলেছি।’

বাইরে গুলি চালানোর শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। সোমনাথ ঘাবড়ে গিয়ে ঘর থেকে বেরোতে যেতেই জয়দেব বলল, ‘চিন্তা করবেন না কাকাবাবু, ছোটোখাটো ডাকাতের দল। আপনি ঘুমোন।’

সোমনাথ আবার ঘরে এসে শুলেন। বীথিকে নিয়ে শেষ বয়সটা বড়ো অসহায় বোধ হচ্ছে। এদেশে সব ঠিক হয়ে গেলেও আর আগের মতো আত্মবিশ্বাস নিয়ে থাকতে পারবেন না। একটা সময় জানতেন শহরের মধ্যে থাকলে অত ভয় পাবার কিছু নেই। এই এক মাসের ঘটনা সে ধারণাকেও ভ্রাত্ত প্রমাণিত করে ফেলেছে। এখন ঘর থেকে বেরোতে গেলেও আত্মবিশ্বাসের অভাব হবে।

পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে তো এই সমস্যা হয় না! সেখানে বাংলাদেশী, পাকিস্তানি, ভারতীয়রা একসঙ্গেই থাকে। গরিব দেশগুলোতেই জাত ধর্ম নিয়ে এত সমস্যা হয় কেন? রাজনীতিকরা মানুষের মুখ ঘুরিয়ে দিতে এর থেকে ভালো অস্ত্র পায় না বলে? সব বিষয় এক দিকে থাকে, জাতধর্ম এক দিকে থাকে। এত শেখালেন ছাত্রদের, কেউ কিছুই শিখল না। সেই ধর্মের জন্যই চাকরি ছাড়তে হল তাকে।

ছি ছি… বেঁচে থাকাটাই তো অর্থহীন হয়ে গেছে আজকাল!

* * * *

ভিতরের ঘরের দরজা থেকে ধাক্কার শব্দ আসছে ক্রমাগত। রজ্জাক বসার ঘরে টিভি দেখছে। আসাদুর পেঁয়াজ কাটছে। মাংস রাঁধবে আজ।

টিভিতে জাস্টিস খানের বাড়িতে আগুন লাগার ঘটনা বিস্তারিত দেখাচ্ছে। রজ্জাক দেখতে দেখতে খুশি হয়ে বলল, ‘বুঝলি আসাদুর, আমি ভাবছিলাম আমারে ফাঁসি দিয়া দেবো। আমি আর কোনোদিন কিছু করতে পারুম না। এই যে টিভিতে আমাগো কাম দেখাইতাসে, আমার মন ঠান্ডা হয়ে যাইতাসে।’

আসাদুর দাঁত বের করল, ‘আপনি মন্ত্রী হবেন না ভাই?’

রজ্জাক বলল, ‘হব। সোবাহান সাহেবই আমায় মন্ত্রী করব। তুই সারাক্ষণ আমার সঙ্গে থাকবি। বুঝছস?’

আসাদুর খুশি হয়ে ঘাড় নাড়ে। ভেতরের ঘর থেকে দরজায় ধাক্কা দেওয়ার শব্দ বেড়ে যাচ্ছে। আসাদুর পেঁয়াজ রেখে বলল, ‘ভাইজান, মাগিটারে শাস্ত কইরা আসেন। এত শব্দে মাথা ধইরা যাইতাসে।’

রজ্জাক সত্যিই উঠে দাঁড়াল, ‘ঠিক কইছস। রস বাইড়া গেছে। কমায় দেওন লাগবো।’

ভেতরের ঘরে চলে গেল রজ্জাক। কিছুক্ষণ পর সত্যি সত্যি শব্দ কমে গেল। দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে এসে লুঙির গিঁট পরাতে পরাতে বলল, ‘লাশটা কাল ফালায় আইবি।’

আসাদুর হাঁ হয়ে গেল, ‘মাইরা ফালাইসেন ভাই?’

রজ্জাক তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলল, ‘মরতে পারে। বাইচাও থাকতে পারে। বাইচা থাকলে মাইরা দিবি। অনেক জটল্যা হইয়া গেছে দুনিয়ায়। এত লোকের বাইচা থাকার দরকার নেই। ইচ্ছা হইলেই মাইরা দিবি। সোবাহান সাহেব কইছে, আমাগো বালডাও ধরার ক্ষমতা নাই কারো।’

আসাদুর আমোদ পেয়েছে। হাসতে শুরু করে। আসাদুরের দেখাদেখি রজ্জাকও হাসে। সোবাহান সাহেব ফোন করছেন। রজ্জাক দেখেই ধরল, ‘জি জনাব, বলেন।’

‘সোমনাথ মাস্টাররে চিনস?’

রজ্জাক মনে করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে বলল, ‘না জনাব। চিনি না। ক্যান, কী হইছে? ওরে সরাইতে হইব?’

সোবাহান বললেন, ‘হ। ওরে সরাইতে হইব। আমার বড়ো ছেলেরে ফেল করাইছিল। কত বড়ো সাহস হারামজাদার, আমি যখন বলছিলাম মন্ত্রীর ছেলেরে ফেইল করান? আমারে বলছিল ফেল না করলে শিখবে কেমনে? অর শিক্ষা অর পেছন দিয়া বাইর করতে হইব। মাইরা আয়। ঠিকানা দিতাছি।’

রজ্জাক অবাক হয়ে বলল, ‘এখন জনাব?’

‘হ এখন। ক্ষুর লইয়া যা। মারার আগে মাথা কামায় দিবি।’

‘জি জনাব।’

ফোন কেটে গেল। রজ্জাক ব্যাজার মুখে বলল, ‘এখন বলে মাইরা আসতে হইবে। মাগিটারে কী করুম?’

আসাদুর বলল, ‘পইড়া থাকুক। আইসা মাইরেন।

‘হু। চল।’

রজ্জাকের ফোনে ঠিকানা এসেছে। রজ্জাক আসাদুরকে ঠিকানা দিয়ে বলল, ‘গাঁজা কিনা দিবি। আজ গাঁজা টানতে ইচ্ছা করতাসে। অনেকদিন গাঁজা খাই না।’

আসাদুর বলল, ‘ডিকিতে আছে ভাই। কাম সাইরা টাইনেন।’

রজ্জাক খুশি হল, ‘তাই হইব। চল।’

আসাদুরের বাইক গতি নিল। অ্যাপার্টমেন্টের গেটে সিকিউরিটি ছিল। তাদের দেখেই জিজ্ঞেস করল, ‘কী চাই?’

রজ্জাক রিভলভার বের করে সিকিউরিটির কপালে তাক করে বলল, ‘একটা বেশি কথা বলবি না। চুপ থাক। কাউরে ডাকলে এখানেই খবর কইরা দিমু।’

সিকিউরিটি ঘাবড়ে চুপ করে গেল।।

তারা বেসমেন্টে গিয়ে লিফটের সুইচ টিপল। সোমনাথের ফ্লোরে এসে ফ্ল্যাটের নাম্বার মিলিয়ে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে কলিং বেল টিপল রজ্জাক। কেউ দরজা খুলল না। রজ্জাক অধৈর্য হয়ে বেল বাজাতে শুরু করল। কোনো লাভ হল না। দরজা খুলল না।

রজ্জাক পাশের ফ্ল্যাটে কলিংবেল বাজাল, পারভেজ দরজা খুলল। রজ্জাক পানের ছোপ মাখানো দাঁত বের করে বলল, ‘ছার আছেন? দরকার ছিল?’

পারভেজ মাথা নাড়ল, ‘ওকে পাওয়া যাচ্ছে না।’

রজ্জাক বলল, ‘কবে থেকে?’

পারভেজ বলল, ‘দু-দিন হয়েছে।’

রজ্জাক দেওয়ালে লাথি মারল। পারভেজ ঘাবড়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।

রজ্জাক সোবাহানকে ফোন করল। ফোন ধরতেই সোবাহান বলে উঠলেন, ‘ধরতে পারছিস? ছবি দে।’

রজ্জাক দেওয়ালে থুতু ফেলে বলল, ‘পাখি ফুড়ুত জনাব। কই গেছে কেউ জানে না। সোবাহান বললেন, ‘দরজা ভাঙ। ভেতরেই আছে। তালা ভাঙতে পারবি না?’

রজ্জাক বলল, ‘দেখতাছি জনাব।’

আসাদুর অ্যাসিড নিয়ে এসেছিল। ফ্ল্যাটের তালা গলিয়ে দিল। দু-জনে ফ্ল্যাটের ভেতরে ঢুকে দেখল সত্যিই কেউ নেই। রজ্জাক হতাশ হয়ে সোফায় বসে পড়ে আসাদুরকে বলল, ‘গাঁজা দে। এখন গাঁজা টানা লাগবো।’

৫৮

॥ শ্রীনগর, কাশ্মীর ॥

ডাল লেক সংলগ্ন রাস্তায় হাঁটছে লোকটা। চারদিক দেখছে। মাঝে মাঝে বসছে।

একটা ড্রাই ফ্রুট স্টোরে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আখরোট দাও, দাগ থাকে না যেন।’

দোকানদার ভ্রূ কুঁচকে লোকটার দিকে তাকালো। লোকটা বলল, ‘আছে?’

দোকানদার বলল, ‘পেছনের দিকে আছে। দেখে নিন।’

দোকানদার দোকানের পেছনের দিকে হাঁটতে শুরু করল। লোকটাও দোকানে ঢুকল।

ভেতরে গিয়ে দোকানদার বলল, ‘আপনি কবে এসেছেন?’

লোকটা বলল, ‘গতকাল। হোটেলেই আছি। সন্দেহজনক কিছু দেখলে?’

দোকানদার বলল, ‘না। আমি নজর রাখছি। পাকিস্তানের কাউকে আমি দেখিনি। পুরোনো কোনো কাশ্মীরীও এলাকায় নেই। আপনার কাছে কোনো ইন্টেল আছে?’

লোকটা বলল, ‘আছে। একটা দল কাশ্মীরে ঢোকার খবর আছে। এখানে আসেনি মানে কোনো গ্রামে ঢুকে বসে আছে। কোনো গ্রামে জানা যায়নি। ইন্টেল যদিও স্পষ্ট নয়। কিন্তু আমরা চান্স নিতে পারি না। লস্কর-সহ যারা আছে, তারা সবাই আগের মতো চনমনে হয়ে উঠেছে।’

দোকানদার উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল, ঠিক আছে। সার্চ অপারেশন শুরু করতে হবে সেক্ষেত্রে। আর তো ঝুঁকি নেওয়া যাবে না।’

লোকটা মাথা নেড়ে বলল, ‘না। আর ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। আমাকে আখরোট দাও। রফিকের কাছে যাব।’

দোকানদার একটা বিশেষ প্যাকেট বের করে লোকটার হাতে দিল। লোকটা আখরোটের প্যাকেট হাতে নিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে একটা অটো নিল। হাওয়া দিচ্ছে। লোকটা খানিকটা চিন্তিত মুখে শহরটা দেখছে। শ্রীনগর তার হাতের তালুর মতো চেনা। খারাপ কিছু ঘটার আগে সে গন্ধ পায়। এখনও যেন সেরকম বিশ্রী কোনো গন্ধ আসছে। দুঃখের বিষয় সে গন্ধটা চিহ্নিত করতে পারছে না।

সমুদ্রের জল যেমন ফুরোয় না, শ্রীনগরে ওপ্রান্ত থেকে ‘মেহমান’দের আগমনও তেমন শেষ হয় না। যেন মাটি ফুঁড়ে উদয় হয়ে যায় এক একজন। ওরা গ্রামগুলোতে থাকে। একদল কাশ্মীরেই নাশকতা করে, একদল ধীরে ধীরে কাশ্মীরেই থেকে গিয়ে ওপাশ থেকে আসা নির্দেশের প্রতীক্ষা করে, আর এক দল জম্মুতে গিয়ে সেখান থেকে ভারতের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। ছোটো থেকে তাদের শেখানো হয় একটাই কথা, যেভাবেই হোক ভারতের ক্ষতি করতে হবে।

লালচকে শুকনো রুটির দোকান রফিকের। ব্যস্ত হয়ে রুটি বিক্রি করছিল।

লোকটা দোকানের সামনে গিয়ে আখরোটের প্যাকেট নাড়াতে শুরু করল।

রফিক থমকে গিয়ে লোকটাকে ডাকল, ‘জনাব, আসুন, স্পেশাল ডিসকাউন্ট আছে।’

লোকটা দোকানের ভেতরের টেবিলে গিয়ে বসল। দোকান একবারেই ফাঁকা।

রফিক দোকানের দায়িত্ব তার ছেলের কাছে দিয়ে লোকটার কাছে গিয়ে বলল, ‘জরুরি তলব কেন? কী হয়েছে?’

লোকটা বলল, ‘কিছুই হয়নি। শ্রীনগর ইউনিট ঠিক করে কাজ করছে না। তাই আমাকে চেন্নাই থেকে পাঠানো হয়েছে।’

রফিক রেগে গেল, ‘মুখ সামলে কথা বলো মিয়াঁ, কাজ করছে না মানে? আর কত কাজ করব? সারাটা দিন এই ভিড় বাজারে মানুষ দেখে যাচ্ছি। বাইরে থেকে কেউ এলাকায় এলেই দিল্লিতে জানাচ্ছি, আর কোনো কাজ করতে হবে আমাকে?’

লোকটা বলল, ‘মেহেমানরা কাশ্মীরে ঢুকবে। বা এর মধ্যেই কোনো গ্রামে ঢুকে পড়েছে।’

রফিক বলল, ‘ঠিক আছে। আমি আমার দোকানেও সিসিটিভি ইন্সটল করে রাখছি। কিন্তু আমি কী করতে পারি?’

লোকটা বলল, ‘সবাইকে অ্যালার্ট করে দিন।’

রফিক দোকানের ভেতর থেকে রুটি নিয়ে এসে লোকটার সামনে প্লেট রাখল। লোকটা রুটি খেতে শুরু করল।

দোকানটা পুরোনো। বাইরে শো কেসের কাছে শুকনো রুটিগুলো সাজানো। দোকানের পেছনে রফিক রান্নার ব্যবস্থা রেখেছে। লোকটা খাওয়া শেষ করে উঠে দাঁড়ালো। মানিব্যাগ থেকে একশো টাকার নোট বের করে কাউন্টারে বসা রফিকের ছেলের কাছে দিয়ে লোকটা রাস্তায় বেরোল। আকাশে মেঘ করেছে। বৃষ্টি হতে পারে। লোকটা এবার চকের রাস্তায় হাঁটতে শুরু করল। খানিকটা এগোতেই সেনা চৌকির কাছে দাঁড় করানো হল তাকে। তল্লাশি করে, আই কার্ড দেখে ছেড়ে দেওয়া হল।

লোকটা তল্লাশি করা সেনাকে দেখে বলল, ‘এত চেক করে কী হয়? কোনো লাভ আদৌ হয়কি?’

সেনার চোখে সন্দেহ ফুটে উঠল। লোকটার দিকে রাইফেল তাক করে বলল, ‘ক্যাম্পে। এখনই।’

লোকটাকে ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হল। কিছুক্ষণ আরও চেকিং-এর পর লোকটাকে ছেড়ে দেওয়া হল।

লোকটা ফোন বের করে বিদুরকে মেসেজ করল, ‘চেকিং ঠিক আছে। সবাই তৈরি। পাখি গ্রামের দিকে থাকার সম্ভাবনা বেশি।’

বিদুর সঙ্গে সঙ্গে রিপ্লাই দিলেন, ‘তুমি শহরে থাকো। শ্রীনগরে। গ্রামে যাবে না। গ্রামের অপারেশন আমি দেখছি।’

‘ওকে স্যার।’

লোকটা আবার হাঁটতে হাঁটতে রফিকের দোকানের দিকে রওনা দিল।

৫৯

॥ ঢাকা।।

ব্যালকনিতে গ্রিল দেওয়া, এমনভাবে কাচ দেওয়া যে বাইরে থেকে বোঝা সম্ভব না ভেতরে কে আছে। সোমনাথ চেয়ার নিয়ে ব্যালকনিতে তেতো মুখে বসেছিলেন। এখানে থেকে মনে হচ্ছে জেলে আছেন। ফোন অবধি অফ করতে হয়েছে। জয়দেব কিছুতেই শুনতে চাইছে না। আপাতত সাতদিন দেখে নিতে চাইছে।

‘কাকাবাবু, আমরা ঠিক টাইমে বেরিয়েছি। আপনার ফ্ল্যাটে কাল অতিথি এসেছিল। রীতিমতো তছনছ করে গেছে।’

জয়দেব ব্যালকনিতে এসেই কথাটা বলল। সোমনাথ চমকে উঠে বললেন, ‘সেকি? সত্যি? তুমি কী করে জানলে?’

জয়দেব তার ফোন এগিয়ে দিল। ছবিগুলো দেখে সোমনাথ স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। বসার ঘরের সোফার কভার ছিঁড়ে দেওয়া হয়েছে। টিভিটা ভেঙে গেছে। বেডরুম একবারে তছনছ করে দিয়ে গেছে।

বললেন, ‘কারা করেছে?’

‘রজ্জাক। কুখ্যাত সন্ত্রাসী। ভয়ংকর খুনি। জাস্টিস খানকে ওই মেরেছে। আপনার উপরে এত রাগ কেন ওর?’

সোমনাথ অসহায় ভঙ্গিতে বললেন, ‘জানি না। আমি তো এই ছেলেটাকে চিনিই না।’

‘উপদেষ্টামণ্ডলীর কাকে চেনেন? মুস্তাকিন? সোবাহান?’

সোমনাথের মনে পড়ল, ‘সোবাহানের সঙ্গে একবার তর্কাতর্কি হয়েছিল। ওর ছেলেকে পাশ করানোর জন্য লোক পাঠিয়েছিল। আমি মানিনি। সে তো বহুদিন। ক্ষমতায় তো তারপরেও ছিল। তখন কোনো ক্ষতি করেনি।’

জয়দেব বলল, ‘তখন ক্ষমতা ছিল, কিন্তু এ-রকম সময় ছিল না। কিছু করলে তার দায় নিতে হত। এখন যে যা খুশি করবে। আপনার উপর করলে সেটা ওদের কাছে ব্রাউনি পয়েন্ট হিসেবেই গণ্য হবে।’

‘কেন? আমি কী ক্ষতি করলাম কার?’

‘সেটা আমিও বোঝার চেষ্টা করছি কাকাবাবু। হতে পারে আপনি ইন্ডিয়ার চর।’

সোমনাথ আকাশ থেকে পড়লেন, ‘ইন্ডিয়ার চর? কেন হতে যাব? আমি আমার দেশকে যথেষ্ট ভালোবাসি। অন্য কোনো দেশের সেবা করার আমার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই।’

‘আপনি শেষ কবে ভারতে গেছিলেন?’

‘২০১৯-এ। ভাগ্নের বিয়ে ছিল।’

‘কোনো জায়গায়?’

‘কলকাতায়।’

‘আর কোথাও যাননি?’

‘বিয়ের পরে সবাই মিলে একটা টুর হয়েছিল দার্জিলিঙে। আমি আর বীথি দু-জনেই গেছিলাম।’

‘তারপর সোজা দেশে ফিরে আসেন?’

‘হ্যাঁ।’

‘এর মধ্যে কারো সঙ্গে কোনোরকম কোনো যোগাযোগ বা কথা হয়েছিল? কেউ আপনার থেকে কোনো তথ্য নেবার চেষ্টা করেছিল?’

‘কীসের তথ্য?’

‘বাংলাদেশ সম্পর্কে?

‘উফ! না। তথ্য আবার কী? ওদেশের অনেকেরই বাংলাদেশ নিয়ে একটা আবেগ কাজ করে। আগ্রহ থাকে। আমার আত্মীয়স্বজনরা সেসবই জানতে চেয়েছিল। তেমন কোনো গোপন তথ্য তো বলিনি।’

‘হ্যাঁ। যেমনটা হয় আর কী! কিন্তু এদের দল আপনার উপর কেন রেগে আছে সেটাই

বোধগম্য হচ্ছে না।’

‘কিন্তু এবার কী? এখানেই কি আরও থাকতে হবে? ফ্ল্যাটের যা অবস্থা করেছে, আমার মনে হচ্ছে এখনই যেতে হবে।’

‘একদম না। রজ্জাক খুব একটা স্বাভাবিক টাইপের অপরাধী না। সাইকো এবং জেল ফেরত। ও এসবের মধ্যেই আনন্দ খুঁজে নিতে চায়। আপনি এমন কোনো বোকামি করবেন না যাতে রজ্জাক সহজেই আপনাকে খুঁজে পায়। ভাগ্যিস খোন্দকার সাহেবদেরও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ওরা এবার ওর বাড়িতেও যাবে।’

‘উপায় কী তবে?’

সোমনাথ উঠে দাঁড়ালেন। ঘরের ভেতর গিয়ে টিভি চালিয়ে বসলেন। বীথি রান্না বসিয়েছে। জয়দেব সোমনাথের সঙ্গে ঘরে ঢুকে বসে বলল, ‘অপেক্ষা, নইলে আপনি বললে আমি আপনাকে ইন্ডিয়া নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করতে পারি।’

সোমনাথ বললেন, ‘না। ইন্ডিয়া আমার দেশ না। আমি ইন্ডিয়া যাব না। এত বছরের এত লড়াই করে নিজের দেশে থাকার লড়াই আমি কিছুতেই হারব না।

জয়দেব ম্লান হাসল, ‘তাহলে কাকাবাবু আমার কথা শুনে চলুন কিছুদিন।’

টিভিতে শহরের ডাকাতির খবর দেখাচ্ছে। এক ঝলক তার ফ্ল্যাটের ছবিও দেখালো। সোমনাথ বললেন, ‘ওই যে ছেলেটি, আমার ইন্টারভিউ করেছিল, ও আমার ফ্ল্যাটের ভিডিয়ো দেখাতে পারে তো!’

জয়দেব বলল, ‘ছেলেটাকে চাকরি থেকে ছাঁটাই করে দিয়েছে। আপনার ইন্টারভিউও আর দেখানো হচ্ছে না। আগের আমলে এদেশে যা হয়েছে, সবাই বুঝতে পেরেছে। এ আমলে সব সাইলেন্ট ট্রিটমেন্ট হবে।’

সোমনাথ চ্যানেল পালটে দিলেন। এসব দেখে আর শরীর খারাপ করে লাভ নেই।

*****

আনোয়ার একা ওয়াকার সাহেবের গেস্ট হাউজের ঘরে বসে আছে। ওয়াকার গেস্ট হাউজের চৌহদ্দিতে মর্নিং ওয়াকের জন্য বেরিয়েছিলেন। এখানে আসার পর বেশ কয়েকদিন মর্নিং ওয়াক হয়নি। এতদিন পর বেরোলেন বলে একটু দমের সমস্যা হচ্ছিল।

ঘরে ঢুকে আনোয়ারকে দেখে বললেন, ‘এত সকালে? জরুরি কোনো কিছু নাকি?’

আনোয়ার বলল, ‘হ্যাঁ। আই এস আই একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাইছে।’

ওয়াকার বললেন, ‘বড়ো অস্ত্র নিয়ে তো?’

আনোয়ার হাসল, ‘কেউ কথা বলেছে আপনার সঙ্গে?’

ওয়াকার বললেন, ‘আমি আঁচ পাচ্ছিলাম। ইন্ডিয়ার পশ্চিমে পাকিস্তান একা হয়ে পড়ছে। তাদের পূবে বন্ধু দরকার। কূটনৈতিক বন্ধু চিনের থেকেও অনেক বেশি প্রাণের বন্ধু দরকার। সেটা বাংলাদেশ ছাড়া আর কে হতে পারে? যাই হোক, তোমার সোবাহান সাহেব কিন্তু একটু বেশি তাড়াহুড়ো করছেন।’

আনোয়ার আকাশ থেকে পড়ল যেন, ‘কেন জনাব? কী করলেন তিনি?’

‘বশির আলি কিংবা জাস্টিস খানের ঘটনা। এই ঘটনাগুলোর উত্তর তো আমাকে দিতে হচ্ছে। তোমরা কাণ্ড করবে, উত্তর দেবো আমি।’

‘আপনাকে তো আমি উত্তরের টেম্পলেট দিয়ে দিয়েছি জনাব। এখন সবই জনরোষ। এরা বছরের পর বছর একচ্ছত্রভাবে ক্ষমতা দখল করে বসে ছিল। ক্ষমতা হাত বদলের পর মানুষ যখন বুঝেছে এই লোকগুলো তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না, স্বাভাবিকভাবেই তারা ঝাঁপিয়ে পড়ছে। যেসব ক্রিকেটাররা আগের সরকারের জন্য মুখ অবধি খোলেনি, তাদের কাজের কোনো প্রতিবাদ করেনি, একইভাবে তাদের বাড়িঘরেও হামলা হয়েছে। ঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন কিছুদিন তো অ্যানার্কি চলবে, তাই না জনাব?’

ওয়াকার কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বললেন, ‘আমাকে জানাও ঠিক কতদিনের প্ল্যান আছে? আমি শুধুমাত্র পাকিস্তানের কাছে আনসারেবল কি? ফান্ড তো পাকিস্তান দিতে পারবে না। তার নিজের অবস্থাই দেউলিয়া। তো যাদের যাদের কাছে আমাকে উত্তর দিতে হয়, তারা জানতে চাইছেন। দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে যে ভোট হবে, সেটা হয়তো পিছিয়ে দিতে পারব, সত্যি বলতে কী, আমার মনে হয় উপমহাদেশের কোনো দেশই গণতন্ত্রের উপযুক্ত না, এখানে ওই ব্রিটিশ রুলই ঠিক ছিল। যাই হোক, সেসব ছেড়ে দিলাম, কিন্তু এই খুনখারাবি, ডাকাতি, সো কলড জনরোষ আর কতদিন চলবে? আমি দিন জানতে চাইছি। কতদিন?’

আনোয়ার একটুও না ভেবে বলল, ‘দু-মাস।’

ওয়াকার মাথা নাড়লেন, ‘ম্যাক্সিমাম আর সাতদিন। তারপর দরকার হলে আমাকে সেনা নামাতে হবে। দেশের বদনাম হচ্ছে।’

‘বিরোধীরা রটাচ্ছে আপনি নিজের উপর যা যা কেস ছিল, সব থেকে নিজেই নিজেকে রেহাই দিয়ে দিয়েছেন। নিজের নোবেল জয়ের টাকার উপর যা যা ট্যাক্স ছিল, তাও সরিয়ে নিয়েছেন। আপনার কি মনে হয় এই সমস্ত তথ্য বিদেশী মিডিয়া দেখাচ্ছে না জনাব? এতে বাংলাদেশ কিংবা আপনার কি খুব বেশি কিছু সুনাম হচ্ছে?’

ওয়াকার রেগে গেলেন, ‘তুমি কিন্তু নিজের সীমা ভুলে যাচ্ছ আনোয়ার। আশা করি আমাকে তা মনে করিয়ে দিতে হবে না।’

আনোয়ার হাসল, ‘আমি কিছুই ভুলে যাইনি জনাব। আমি শুধু মানুষের কথা যা চারদিকে চলছে, তা মনে করিয়ে দিচ্ছি। আপনি সাতদিন বলছেন, সাতদিনেই সব শান্ত হয়ে গেলে মানুষ কিন্তু আপনার দিকে আঙুল তোলার সাহস পেয়ে যাবে। ব্যাপারটা দু- মাস চলে কেউ এইটুকু প্রশ্ন তোলারও সাহস পাবে না। এই জন্যই আমি দু-মাস বলছি। এবার বুঝেছেন?’

ওয়াকার উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘বুঝেছি। আমি এখন একটু একা থাকতে চাই। তুমি পরে এসো। রাতের দিকে, যখন কেউ থাকবে না।’

আনোয়ার বলল, ‘ঠিক আছে। আপনার যেমন সুবিধা। আশা করি আমি আপনাকে আমার কথা বোঝাতে পেরেছি। আপনি একই কথা বলে যান। সেনাপ্রধানের সঙ্গে কথা বলুন। সবাইকে বুঝিয়ে একটু ব্যালেন্স করে চলুন। তারপর তো আপনি একাই রাজত্ব করবেন।’

ওয়াকার উত্তর দিলেন না। থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে রইলেন…

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *