আয়নাবাড়ি – ২৫

২৫

॥ ঢাকা।।

মুস্তাকিন তার বাড়ির বাগানে চিন্তিত মুখে হাঁটাহাঁটি করছিলেন। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পালটাচ্ছে। অথচ তাকে এখনও কেউ ডাকাডাকি করেনি। ভেবেছিলেন ডাক পড়বে। তাঁর ম্যাডামকে জেল থেকে ছাড়া হয়েছে। যে ধরনের জনপ্লাবন হওয়ার কথা ছিল, যে প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণ হয়নি। ম্যাডামের কাছে তিনি ঘেঁষতে পারেননি। নোবেলজয়ী দেশের দায়িত্ব নেবেন। মুস্তাকিনের আশা ছিল ম্যাডামকে দায়িত্ব দেওয়া হবে। সেটাও হয়নি।

চিরকাল রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক হবার ভয় পেয়ে এসেছেন। শেষ কয়েক বছর তাই হয়েছে। এখন যেন যত সময় যাচ্ছে, তত বেশি করে হারিয়ে যাচ্ছেন। অথচ তা হবার কথা ছিল না।

তিনি বিয়ে করেননি। সারাজীবন রাজনীতিই করে এসেছেন। ইদানীং দিশেহারা লাগছে কেমন।

‘স্যার। একজন লোক এসছে।’

দারোয়ান কাদের মিয়াঁ এসে সালাম দিল। মুস্তাকিন বিরক্ত মুখে বললেন, ‘বিদেয় কর। আমার এখন কিছু ভালো লাগছে না।’

.

কাদের মিয়াঁ একটা চিরকুট এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘দেখুন স্যার, এটা দিছে।’

মুস্তাকিন কাগজটা দেখে ব্যস্ত হয়ে বললেন, ‘ডাকো ডাকো।’

কাদের মিয়াঁ গেটের দিকে দৌড়োল।

গেট খুলতে লাল রঙের টয়োটা গাড়ি প্রবেশ করল। গাড়ি বাগানের কাছে দাঁড় করিয়ে গাড়ি থেকে নেমে আনোয়ার হাসিমুখে এগিয়ে এসে বলল, ‘প্রাসাদটা তো মাশাল্লাহ দারুণ বানিয়েছেন। আমি শুনেছিলাম আপনি অনেকটা জমি নিয়ে বাড়ি করছেন, সে যে এমন প্রাসাদ হয়ে দাঁড়াবে, সেটা আমি আশা করিনি।’

মুস্তাকিন হাত কচলে বললেন, ‘কী যে বলেন আনোয়ার সাহেব, আমি নিতান্তই দরিদ্র মানুষ, ব্যবসা করে যা করেছি, তা কিছুই না। লীগের একটা ছোটো মাপের বাড়িও আমার থেকে বড়ো। এখন তারা দেশ থেকে পালাচ্ছে, আপনি খোঁজ নিয়ে দেখুন একবার। আসুন বসুন।’

বাগানের চেয়ারে বসল আনোয়ার। সানগ্লাস খুলে পকেটে রেখে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে ধরিয়ে বলল, ‘আপনার এখন অনেক দায়িত্ব মুস্তাকিন সাহেব।’

মুস্তাকিন দুঃখিত মুখে মাথা নেড়ে বললেন, ‘কোথায় দায়িত্ব দেখছেন জনাব? কেউ পাত্তা দিচ্ছে? এই যে এত সাহায্য করলাম ছাত্র আন্দোলনে, কেউ একবার নামটুকু নিল না। মানুষের উপর আমি আর কোনো আশা করি না।’

আনোয়ার বলল, ‘মানুষের উপর আশা না করলেও আপনার অনেক কাজ আছে।’

মুস্তাকিন আশান্বিত কণ্ঠে বললেন, ‘কী রকম?’

আনোয়ার বলল, ‘সরকারের একটা গুরুত্বপূর্ণ পদে আপনাকে বসানো হবে। তবে তার জন্য আপনাকে আপনার আপার দল ত্যাগ করতে হবে। প্রেস কনফারেন্স করে আপনাকে ওরা বাণিজ্য উপদেষ্টা করবে, আপনার ওই প্রেস কনফারেন্সেই জানিয়ে দিতে হবে আপনার জিয়া আপার দলের সঙ্গে আপনার কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা একটা দলহীন সরকার গড়ার চেষ্টা করছি। যে সরকারে লীগ থাকবে না, তার বিরোধীরাও থাকবে না। সরকারের দায়িত্বে থাকবেন একজন প্রবীণ ব্যক্তি, কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা থাকবেন, আর গোটা দেশ চালাবে ছাত্রসমাজ। পৃথিবীর কাছে খুব ভালো বার্তা যাবে।’

মুস্তাকিন অবাক হয়ে বললেন, ‘দল ছেড়ে দেবো? তাহলে বিপদে আপদে আমাকে দেখবে কে?’

আনোয়ার সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে বলল, ‘পাকিস্তান দেখবে। যেভাবে চিরকাল দেখে এসেছে। আপনাকে পাকিস্তানের থেকে বেশি নিরাপত্তা কে দেবে?’

মুস্তাকিন বললেন, ‘কী যে বলেন আনোয়ার সাহেব, পৃথিবীর খবর কি আমিও রাখি না? পাকিস্তানের এখন খুবই দুর্বল অবস্থা। নিজের পেটে ভাত নেই, পাকিস্তান কী করে বাংলাদেশকে দেখবে?’

আনোয়ার উত্তর দিল না। চুপ করে সিগারেট টেনে যেতে লাগল।

মুস্তাকিন বললেন, ‘জনাব কি আমার উপর রাগ করলেন?’

আনোয়ার বলল, ‘নাহ, রাগ করিনি। বুঝতে পারলাম আপনার এখন এই অবস্থা কেন! ভেবেছিলাম আপনাকে সাহায্য করব, দেখছি আপনার কথাবার্তার ঠিক নেই। এভাবে হবে না। দেখি ফিরদৌস সাহেবের সঙ্গে একবার দেখা করে আসি।’ আনোয়ার উঠতে গেল।

মুস্তাকিন শশব্যস্ত হয়ে বললেন, ‘জনাব দেখছি রাগ করলেন। আপনাকে তো কাছের মানুষ, মানে বড়োভাই হিসেবেই দেখেছি চিরকাল। খোলামনে দুটো কথা বললাম বলে রেগে গেছেন দেখছি, রাগবেন না জনাব। আমি রাজি আছি। আমাকে কী করতে হবে?’

আনোয়ার আবার চেয়ারে বসে পড়ে বলল, ‘সামনের দিন আমাদের হতে পারে, যদি আপনি এফিসিয়েন্সি দেখান। বলুন, পারবেন?’

মুস্তাকিন দাঁত বের করল, ‘এই বাড়িটা ছাড়াও দেশে আমার দশটা বাড়ি আছে, বাইরের দেশে আরও খান সাতেক। আর কী কী আছে তা জনাব আপনার থেকে ভালো কেউ জানে না। আমি পারব না তো কে পারবে জনাব?’

আনোয়ার হাসল না। সিগারেটটা বাগানে ছুড়ে ফেলে দিয়ে বলল, ‘অ্যাস্ট্রেতে ফেলবেন। বাগান নোংরা করতে চাইনি, এখানে অ্যাসট্রে পেলাম না বলে ফেললাম। উঠছি। বিকেলে আসুন প্রেস ক্লাবে। নাহিদ আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করে নেবে। খুদা হাফেজ।

* * * *

তৌফিক সিগারেট ফুঁকছে কলেজের ক্যান্টিনে বসে। পা তুলে রেখেছে টেবিলের উপরে। রাশেদ তার দলবল নিয়ে তৌফিকের আছে বসে আছে। তৌফিক বলল, ‘রাখি আজ কলেজ আসেনি?’

রাশেদ বলল, ‘না ভাই। আসেনি।’

তৌফিক ভ্রূ কুঁচকে ফোন বের করে রাখিকে ফোন করল। ফোন বেজে গেল। কেউ ধরল না। বলল, ‘রুমানের খবর কী? বেঁচে আছে এখনও?’

রাশেদ বলল, ‘আছে ভাই।’

তৌফিক বলল, ‘আমাদের সামনে অনেক কাজ আছে। আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে লীগের বেজন্মাগুলো যেন কলেজে না ঢোকে। ঢুকলে আমাদের বুঝে নিতে হবে। বোঝা গেল কী বললাম?’

রাশেদ বলল, ‘জি ভাই, আপনি কালকেও একই কথা বলেছেন।

নিপুণ ক্যান্টিনে প্রবেশ করল। এতদিন পরে কলেজটা দেখে তার মন ভালো করে দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল ছাড়া পাবার পর বাড়ি না ফিরে আগে কলেজ যাওয়া উচিত ছিল।

তৌফিক তাকে দেখা মাত্র উঠে দাঁড়িয়ে দু-হাত ছড়িয়ে বলল, ‘দোস্ত, এই তো আমার দোস্ত এসে গেছে।’

নিপুণ তৌফিককে জড়িয়ে ধরে চেয়ারে বসে বলল, ‘কী খবর কলেজের? সব ঠিক আছে?’

তৌফিক বলল, ‘দেখতেই তো পারছিস। সূর্যের আলো ঝলমল করছে, আমাদের কলেজ হেসে হেসে উঠছে। ওই দেখ, তোর মতো আমিও কবিতা বানিয়ে ফেললাম।’

নিপুণ বলল, ‘ভালো করেছিস। সোমনাথ স্যারকে কারা পদত্যাগ করতে বলেছে?’

তৌফিক বলল, ‘তাই তো! কে বলেছে পদত্যাগ করতে?’

রাশেদ বলল, ‘জি ভাই, আমরা বলেছি। এই দেশের শিক্ষার্থীদের ওর থেকে পড়ার দরকার নেই। উনি কলকাতা চলে যাক।’

নিপুণ তৌফিককে বলল, ‘তুই জানিস এটা?’

তৌফিক থুতু ফেলে বলল, ‘জানার দরকার ছিল না। রাশেদরা কলেজ দেখে রেখেছে এতদিন। রাশেদ যদি মনে করে, ঠিকই মনে করেছে।’

নিপুণ বলল, ‘সোমনাথ স্যারের ব্যাপারে কেউ ঠিক হতেই পারে না। স্যার অনেকদিন থেকে আমাদের ব্যাপারে সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন। কাগজে লিখেছেন। অনেকরকম থ্রেট ছিল লীগের থেকেও, তারপরেও থেমে যাননি। সমস্ত ঝুঁকি সত্ত্বেও বলে গেছেন।’

তৌফিক বলল, ‘আচ্ছা? আমরা সরকার বিরোধী লেখা লিখলাম, আমাদের তুলে নিয়ে গেল, আয়নাঘরে আদর করা হল, আর স্যারকে কিছুই করা হল না, এই বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?’

নিপুণ বলল, ‘ভয় পেয়েছিল। তা ছাড়া স্যার নিরীহ মানুষ। সরকার ওকে অত বড়ো থ্রেট বলে মনে করেনি।’

তৌফিক মাথা নাড়ল, ‘না, ব্যাপারটা তা না। স্যারের সঙ্গে লীগের অনেকেরই যোগাযোগ ছিল। এও হতে পারে স্যার র এজেন্ট।’

নিপুণ হেসে ফেলল, ‘কাম অন তৌফিক, তুই কী বলছিস সেটা নিজে শুনছিস কি? স্যার র এজেন্ট? মানে হিন্দু হলেই সে র এজেন্ট? তুই জানিস না এ দেশে যদি র এজেন্ট থাকে তাহলে সে মুসলিমই হবে? র কোনোদিন হিন্দুকে এখানে অ্যাপয়েন্ট করবে?’

তৌফিক মাথা নাড়ল, আবার থুতু ফেলে বলল, ‘ঠিক, মুসলিমই ধরবে। তাহলে সেই র এজেন্ট কে? তুই?’

রাশেদরা হেসে উঠল। নিপুণ বলল, ‘দিস ইজ নট ফানি তৌফিক। সোমনাথ স্যারকে কলেজে ক্লাস করতে দে। তাতে কলেজেরই ভালো।’

তৌফিক বলল, ‘নাহ। ওকে আমরা ক্লাস করতে দেবো না। ওকে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে। সেই ছোটোবেলায় পড়েছিলাম না, গাধার পিঠে চড়িয়ে মাথায় ঘোল ঢেলে দেশ থেকে বের করে দেওয়ার কথা? সেরকম করে ওকে বের করতে হবে।’

নিপুণ বলল, ‘ঠিক আছে, তাহলে আমিও দেখব স্যারকে কে কলেজ থেকে বের করে।’

তৌফিক বলল, ‘স্যার পাঠিয়েছে তোকে, তাই না?’

নিপুণ বলল, ‘তোর মনে হয় আমায় স্যার পাঠিয়েছে? তুই স্যারকে চিনিস না?’

তৌফিক রাশেদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দেখেছিস রাশেদ? মালাউনের উপর দোস্তর কত পিরিত? মালাউনই ওর বাপ মনে হয়। বাপটা তো কিছু পারে না। দেখলেই কেমন লেডিজ লেডিজ লাগে।’

নিপুণ তৌফিককে সজোরে একটা ঘুষি মারল। তৌফিক মেঝেয় ছিটকে পড়ল। রাশেদ উঠতে যাচ্ছিল, নিপুণ বলল, ‘আমি রুমান না। সাবধান।’

তৌফিক মেঝেতেই পড়েছিল। উঠতে গিয়ে মাথা ঘুরে গেল তার।

নিপুণ বলল, ‘কাল স্যারকে নিয়ে কলেজে আসব। দেখব কে স্যারের পদত্যাগ চায়।’

রাশেদ ঘাবড়ে গেছিল। নিপুণ ধীর পায়ে ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে গেল…

২৬

॥ দিল্লি।

দীপ্তি জয়েন করেছে বিদুরের অফিসে। বিদুর বেশ কিছু ফাইল ওয়ার্ক দিয়েছেন তাকে। দীপ্তি চুপ করে সেসবই করে যাচ্ছে সকাল থেকে।

আর পি বিদুরের অফিসে তাকে দেখে বললেন, ‘সব ঠিক আছে?’

দীপ্তি বলল, ‘কী ঠিক আছে স্যার? আমি কী করেছিলাম যে আমাকে ট্রান্সফার করে দেওয়া হল?’

আর পি বললেন, ‘কোনোটাই ট্রান্সফার না দীপ্তি। দেশের প্রয়োজনে তোমাকে এখানে আনা হয়েছে। যেকোনো সময় আবার আমাদের অফিসে তোমাকে দিতে পারে, আমাকে এখানে দিতে পারে। এই নিয়ে তো রাগ করার কিছু নেই।’

দীপ্তি বলল, ‘আমার মনে হয় না আমাকে আর ওই অফিসে দেবে। সকাল থেকে ক্যাশ ভাউচার মিলিয়ে ফাইলে রাখছি স্যার। এটা কোনো কাজ হল? এটা তো পিয়নও করতে পারে।

আর পি হাসলেন, ‘তাই? পিয়নও করতে পারে? দেখি ফাইলটা দাও।’

দীপ্তি ভাউচার ফাইল এগিয়ে দিল। আর পি ভাউচারটা মন দিয়ে দেখে দীপ্তিকে দেখালেন, ‘এটা ডাউকি বর্ডারে খাওয়ার বিল। সরকারি টাকা বলে এই সমস্ত হিসেব আমরা গোপন ফাইলে রেখে দিই। তুমি জানো না মেঘালয়ে আমাদের এজেন্টরা কী করছে? এটা বিশ্বাসযোগ্য লোক ছাড়া অন্য কাউকে দিয়ে করানো যাবে? ওখানের থেকে এখানের কাজটা অনেক বেশি এফেক্টিভ। অকারণ ভেবে মন খারাপ কোরো না। স্যার কোথায়?’

দীপ্তি বলল, ‘চেম্বারেই আছেন।’

আর পি বিদুরের চেম্বারের দরজায় নক করতেই ভেতর থেকে বিদুর বললেন, ‘এসো।’

চেম্বারে প্রবেশ করে আর পি দেখলেন বিদুর নকল দাড়ি লাগিয়ে বসে আছেন। তিনি অবাক হলেন না, ‘বেরিয়ে ছিলেন নাকি?’

বিদুর বললেন, ‘হ্যাঁ, বানশালের বাড়ির রাস্তায় ঘুরে এলাম। অফিস ওয়ার্ক করে করে বোর হয়ে গেলে বেরোই। জানোই তো।’

আর পি বললেন, ‘হ্যাঁ স্যার জানি, তবে খুব আর্জেন্ট কোনো কাজ না হলে এভাবে আপনি বেরোন না। কিছু কি হয়েছে?’

বিদুর বললেন, ‘হয়নি, হতে পারে। বাংলাদেশ বর্ডার রেড অ্যালার্টে আছে। চীনও খুব

Missing Page 84-86

না হয়ে ও ভাবছে একসঙ্গে অনেক ক্ষমতা পেয়ে গেছে। এর ফল খুব একটা সুখকর হবে না।’

নিপুণ বলল, ‘আপনি স্যার কাল আমার সঙ্গে কলেজ যাবেন। এভাবে ঘরে বসে থাকলে কিন্তু ওরাই জিতে যাবে।’

সোমনাথ মাথা নাড়লেন, ‘ঠিক। কাল আমি কলেজ যাব। যাই হয়ে যাক, আমাকে যেতেই হবে।’

*****

সন্ধ্যে সাতটা। ঢাকা।

মুস্তাকিন সাহেবের প্রেস কনফারেন্স চলছে।

আনোয়ার ক্লাবের স্মোকিং জোনে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছিল। নাহিদ এসে দরজায় নক করল।

আনোয়ার ইশারায় নাহিদকে ভেতরে আসতে বলল। ছোটো কাচের ঘরটা ধোঁয়ায় ভরে যাচ্ছে।

নাহিদ বলল, ‘জনাব, এখানে অনেক বিদেশী আছে।’

আনোয়ার ভ্রূ কুঁচকালো, ‘তো?’ নাহিদ মাথা চুলকালো।

আনোয়ার বলল, ‘এখন তুমি আমাকে শেখাবে আমার কোথায় থাকা উচিত আর কোথায় নয়?’

নাহিদ লজ্জিত হয়ে জিভ কাটল, ‘না না জনাব, সেটা না।’

—তবে কী?

—মানে আপনি হয়তো জানেন না। এই জন্যই আপনাকে বলতে এলাম।

আনোয়ার হাসল, ‘আমি সব জানি। আমি কী কী জানি সেটা তোমরা, এই ভিখিরি দেশের করাপ্ট পলিটিশিয়ানরা জানতেও পারবে না। ভাবতেও পারবে না। এই নিয়ে কোনো চিন্তা করার দরকার নেই।’

—কিন্তু জনাব ইন্ডিয়ান মিডিয়া জেনে গেছিল মুস্তাকিন সাহেবদের সুপ্রিমোদের সঙ্গে আপনারা যে মিটিং করেছিলেন। তারা সেটা ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়ায় জানিয়েছে প্রমাণসহ।

—তাতে কী হবে? ইন্ডিয়া জানল বা ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া জানল, তাতে কিছুই হবে না। ইন্ডিয়া যে এই দেশের সবাইকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করত, তা তো ওপেন সিক্রেট, সেটা নিয়ে কোথাও কোনো ঝামেলা হয়েছে?

নাহিদ মাথা নীচু করল, ‘না জনাব, তা হয়নি। মুস্তাকিন সাহেব বলছিলেন…’

আনোয়ার গলা তুলল, ‘মুস্তাকিন এখন বলতে শুরু করেছে? বলছিলেন মানে কী? নর্দমা থেকে তুলে ওকে ওই চেয়ারে বসিয়েছি। এখনই যদি চাই, তবে এই মুহূর্তে ওকে তুলে নিয়ে গিয়ে বঙ্গোপসাগরে ফেলে দিয়ে আসব। ও কোনো মতামত দেবারই লোক না। আমি যেভাবে বলব, ওকে সেভাবে চলতে হবে। এখন যাও। আমাকে বিরক্ত করো না।’

নাহিদ স্মোকিং রুম থেকে পালিয়ে বাঁচল। প্রেস রুমে রুবেল খান ঢুকল। রুবেল প্রায় ছ-ফুট লম্বা, দেশের প্রথম সারির ব্যবসায়ীদের মধ্যে একজন। মুস্তাকিনের প্রেস কনফারেন্স হয়ে গেছিল। রুবেলকে দেখে প্রায় ছুটে এল, ‘আরে, তুমি? কী ব্যাপার?

রুবেল বলল, ‘আপনার কাছেই এলাম। প্রেস ক্লাবের কাছেই ছিলাম। আপনার গাড়ি দেখে চলে এলাম। যশোরে একটা মাদ্রাসা ক্যাম্পের কন্সট্রাকশন হবে মুস্তাকিন সাহেব। আপনার সঙ্গে এই ব্যাপারে আনোয়ারভাই কথা বলে নেবেন। আপাতত আমার একটা পঞ্চাশ কোটির গ্র্যান্ট চাই। কাল অফিস খুললেই যেন অ্যাপ্রুভালো হয়ে যায়, দেখবেন।’

মুস্তাকিন আকাশ থেকে পড়লেন, ‘আরে ভাই, সবে তো আমি প্রেস কনফারেন্স করলাম, এখন এত তাড়াতাড়ি গ্র্যান্ট দেবো কোত্থেকে? তা ছাড়া সব কী অবস্থায় আছে, তার সম্পর্কে আমার তো কোনো ধারণাই নেই। একটু সময় দিন।’

রুবেল হেসে বলল, ‘স্মোকিং জোনে আনোয়ার ভাই আছেন। কথা বলে নিন। আমাকে উনি যা বলেছেন, আমি সে কথাটাই আপনাকে রিপিট টেলিকাস্ট করলাম। আপনি এসব কাজে এক নাম্বার লোক আছেন, সে কথা আমার থেকে কে আর ভালো জানে? বনানীর সবুজায়ন প্রকল্পে আপনি আমার থেকে দশ কোটি নিয়েছিলেন, সেই কত বছর আগে। এখন এইটুকু কাজ কি আপনার থেকে আমি পেতে পারি না?’

মুস্তাকিন শশব্যস্ত হয়ে বলল, ‘গলা নামিয়ে ভাই। আপনি জানেন আমি এই কাজ ঠিক করে দেবো। আপনি কাজ শুরু করেন না। আমাকে অফিসটা বুঝতে দেন, কীভাবে কী চলবে সব বুঝতে দেন, এই সপ্তাহের মধ্যে আমি সব ব্যবস্থা করে দেবো।’

রুবেল বলল, ‘দেখেন কী করবেন। দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে সবাইকে এক হয়ে কাজ করতে হবে। উপদেষ্টা সাহেব তো এসেই কাজ শুরু করে দিয়েছেন। তার যত ট্যাক্স ছিল, সব নিজেই মকুব করিয়ে নিয়েছেন। ডিফল্টার লিস্ট থেকে তার কোম্পানির নাম অবধি সরে গেছে। এমন লোকের সঙ্গে থেকে আপনি কাজ করবেন, আপনার তো গর্ব হওয়া উচিত। দেখা করছেন?’

মুস্তাকিন বললেন, ‘না। রাত দশটায় ডেকেছেন।

রুবেল বলল, ‘ঠিক আছে। তখনই কথাটা তুলবেন। অ্যাপ্রুভালো নেবার হলে নিয়ে নেবেন।

মুস্তাকিন বললেন, ‘এখনই? তাড়াতাড়ি হয়ে যাচ্ছে না ব্যাপারটা? উনি যদি রাজি না হন?’

রুবেল হাসল, ‘হবেন। ঠিক রাজি হবেন। উনি রাজি হবার জন্য বসেই আছেন। আপনি শুধু বলুন।’

মুস্তাকিন পাংশু মুখে বললেন, ‘ঠিক আছে। দেখছি কী করা যায়।

.

স্মোকিং জোন থেকে বেরিয়ে আনোয়ার একটা ম্যাপ’ নিয়ে বসে আছে। পেন দিয়ে ম্যাপে দাগ দিয়ে যাচ্ছে সে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের প্রতি পঞ্চাশ কিলোমিটারে একটা করে ক্যাম্প বানানোর পরিকল্পনা পাঠিয়েছে আই এস আই। সশস্ত্র ক্যাম্প, ট্রেনিং থেকে শুরু করে মগজ ধোলাই, প্রতিটা কাজের জন্য দরকার উপযুক্ত পরিকাঠামো।

বাজেট বানানোর কাজ মুস্তাকিনকেই দিতে হবে। আনোয়ার ফোন বের করে মুস্তাকিনকে ফোন করে বলল, ‘একবার আসুন দেখি। আপনার জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে।’

২৮

॥ দিল্লি ॥

প্রশান্ত কাজ করতে করতেই আর পি-কে ডেকে নিয়েছিল। সিসিটিভি ফুটেজের লাইভ ফিড চালিয়েছে প্রশান্ত। হোটেল র‍্যাডিসনে ঢুকছে বানশাল।

আর পি চেয়ারে বসে বললেন, ‘রশ্মিকা কোথায়?’

প্রশান্ত বলল, ‘চেক ইন করে গেছে। বানশাল ওর কাছেই যাচ্ছে।’

আর পি বিদুরকে ফোন করলেন, ওপ্রান্তে ফোন রিং হয়ে যাবার পর মেসেজ এল, ‘মন্ত্রীজির সঙ্গে। কী হয়েছে? আর্জেন্ট কিছু?’

আর পি লিখলেন, ‘বানশাল র‍্যাডিসনে যাচ্ছে রশ্মিকার কাছে।

‘যাক। কিছু করার দরকার নেই। শুধু ট্র্যাক করো। ফোন কি এখনও অন আছে?’

আর পি প্রশান্তকে মেসেজটা দেখালেন। প্রশান্ত চেক করে বলল, ‘না, অফ করে দিয়েছে।’

আর পি বিদুরকে জানালেন। বিদুর রিপ্লাই দিলেন, ‘ওকে, অন হলে জানিও।’

‘ওকে স্যার’ লিখে দিলেন আর পি।

প্রশান্ত বলল, ‘এই তো সুযোগ ছিল স্যার। বানশালকে তুলে নেওয়া যেত। রশ্মিকাকে জেরা করলেই সব বেরিয়ে যেত।’

আর পি বললেন, ‘ঠিক আছে, স্যার ধীরে এগোতে চাইছেন। আমরা অপেক্ষা করি।’

প্রশান্ত বলল, ‘তারপর পাখি বেরিয়ে গেলে?’

আর পি বললেন, ‘পাখি বেরিয়ে কোথায় যাবে? আমরা সবসময় নজর রাখছি। ১০ টাকার ইউ পি আই করলেও জানতে পারছি। আর কী চাইছ?’

প্রশান্ত বলল, ‘জানি না স্যার, এদের বিশ্বাস নেই।’

আর পি বললেন, ‘স্মোক করে আসি। যাবে?’

প্রশান্ত বলল, ‘নাহ, আমি ছেড়ে দিয়েছি। আপনি যান।’

আর পি প্রশান্তের পিঠে চাপড়ে দিলেন, ‘ভেরি গুড। ভালো কাজ করেছ।

প্রশান্ত হঠাৎ মনিটর দেখে উত্তেজনায় উঠে দাঁড়াল, ‘একী, দীপ্তি?’

আর পি উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। আবার বসে পড়লেন, ‘ওহ হ্যাঁ, তাই তো। ছেলেটাকে নিয়ে গেছে।’

প্রশান্ত বলল, ‘বিদুর স্যার পাঠিয়েছেন?’

আর পি মাথা নাড়লেন, ‘নো আইডিয়া।’

প্রশান্ত বলল, ‘ফোন করব? ও যেদিন থেকে বিদুর স্যারের ওখানে গেছে, আমরা তো ট্র্যাক করা বন্ধ করে দিয়েছি।’

আর পি বললেন, ‘ফোন করার দরকার নেই। ওর সঙ্গে সিনক্রোনাইজেশন করতে হলে বিদুর জানিয়ে দিতেন। জানাননি যখন, তখন আমরা নিজে থেকে কিছু করব না।’

প্রশান্ত বলল, ‘ওকে স্যার।’

সুহাস আর দীপ্তি কথা বলতে বলতে রিসেপশনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। সুহাসকে একটা কাগজ দেওয়া হয়েছে। সেটা সে সই করছে। অন্য স্ক্রিনে বানশালকে সাত তলায় দেখা যাচ্ছে লিফট থেকে বেরিয়েছে।

আর পি বললেন, ‘ইন্টারেস্টিং।’

দীপ্তিরাও লিফটে উঠেছে। সাত তলাতেই নেমে ওরা হাঁটতে শুরু করেছে। আর পি ফিসফিস করে বললেন, ‘নাহ, কনফিউজড লাগছে। বিদুর পাঠাবেন কেন?’

প্রশাস্ত বলল, ‘জানি না স্যার, দীপ্তি নিজে থেকে বানশালকে ফলো করেনি তো? তাহলে কিন্তু…’

আর পি বললেন, ‘শিট!’

সঙ্গে সঙ্গে আর পি ফোন বের করে দীপ্তিকে ফোন করলেন। দীপ্তি ফোন ধরে বলল, ‘হ্যাঁ স্যার।’

আর পি বললেন, ‘র‍্যাডিসনে কী করছ? নিজে থেকে কিছু করতে যাচ্ছ নাকি? ‘ দীপ্তি শ্বাস ছেড়ে বলল, ‘বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে এসেছি স্যার। যেমন আসি। আর কিছু নেই।’

আর পি বললেন, ‘শিয়োর?’

দীপ্তি বলল, ‘শিয়োর।’

আর পি আশ্বস্ত হয়ে ফোন রাখলেন। দীপ্তি সুহাসকে নিয়ে ৭৩২ নম্বর রুমে ঢুকল। ঢোকার আগে একবার ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাসল।

আর পি ভ্রূ কুঁচকে সেটা দেখে বললেন, ‘আমার বিদুরকে ঠিক ভরসা হয় না। দীপ্তিকে উনিও পাঠাতে পারেন। বলতে চাননি মানে আমাদের জানার দরকার নেই। সেটা কি ঠিক হচ্ছে?’

প্রশাস্ত বলল, ‘আমরা তো হুকুমের চাকর স্যার। যা করতে বলবে, আমরা তাই করব। এখন এসব নিয়ে ভাবার দরকার নেই।

আর পি বললেন, ‘হুকুমের চাকর ইত্যাদি ঠিক আছে, কিন্তু দীপ্তি রিলেটেড কিছু থাকলে আমাদের বলা উচিত ছিল। যাই হোক, বানশাল রুমে ঢুকেছে যখন-তখন আর খুব তাড়াতাড়ি বেরোবে না। তুমি বানশাল আর রশ্মিকা, দু-জনের ফোনই ট্র্যাক করতে থাকো। আমি স্মোক করে আসছি।’

প্রশান্ত বলল, ‘ওকে স্যার।’

আর পি বেরোলেন। প্রশান্ত বানশালের ফোনের স্ট্যাটাস দেখল। এখনও অফ। দীপ্তির ফোন দেখতে ইচ্ছে হচ্ছিল। আর পি-র পারমিশন ছাড়া দেখা যাবে না। দেখতে পারে, কিন্তু সেটা কি ঠিক হবে?

দোলাচলে পড়ল সে। নাহ… থাক আপাতত। পরে দেখা যাবে।

২৯

॥ ঢাকা।।

খোন্দকার সাহেবকে কলেজের সেক্রেটারি মোখলেস সাহেব সন্ধ্যে বেলায় ডেকে পাঠিয়েছেন। মোখলেস সাহেবের চায়ের ব্যবসা আছে। বেশ কয়েকটা চায়ের বাগান আছে। গুলশানে অফিস। খোন্দকার সাহেব সেক্রেটারিকে তার আসার কথা জানাতে বসতে বলা হয়েছে। খোন্দকার সাহেব একবার রুমাল দিয়ে ঘাম মুছে নিলেন। গরম বেড়েছে। এসি চলছে এখানে। ঘামের সঙ্গে এসির হাওয়া মিলেমিশে ঠাণ্ডা লাগিয়ে দেবে। তার অ্যালার্জি আছে। একবার হাঁচি হলে থামতে চায় না।

‘জনাব, আপনাকে ডাকছে।’

খোন্দকার সাহেব রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে মোখলেস সাহেবের চেম্বারে প্রবেশ করলেন। মোটা ফ্রেমের চশমা পরে থাকেন মোখলেস সাহেব। ল্যাপটপে কাজ করছিলেন। তিনি চেম্বারে ঢুকতেই হাত দিয়ে চেয়ার দেখিয়ে বললেন, ‘বসুন বসুন জনাব।’

খোন্দকার সাহেব বসে বললেন, ‘হঠাৎ জরুরি তলব?’

মোখলেস ল্যাপটপ বন্ধ করে বললেন, ‘কলেজে কী হয়েছে বলুন তো?’

খোন্দকার সাহেব বললেন, ‘রাশেদদের একটা গ্রুপ আছে। তারা আইন ভাঙছে। অসভ্যতা করছে। সোমনাথ স্যারকে ঘেরাও করে পদত্যাগ করতে বলছে।’

‘রাশেদ? মানে মেধাবী?’

‘কীসের মেধাবী জনাব? প্রতি পরীক্ষায় একটা না একটা পেপারে ব্যাক পায়, এদের কেউ মেধাবী বলে?’

‘ওহ। আপনি বুঝতে পারছেন না। এটা একটা টার্ম। ফেল করুক, পাশ করুক, এখন ছাত্র মাত্রেই মেধাবী। কুড়ি বছর ধরে কলেজ পাশ করতে পারেনি, সেও মেধাবী, বুঝতে পারলেন?’

কথাটা বলে মোখলেস সাহেব হো-হো করে হেসে উঠলেন। খোন্দকার সাহেব বললেন, ‘কড়া অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অ্যাকশন নিতে হবে জনাব। নইলে এদের জন্য কলেজের পড়াশোনা মাথায় উঠেছে। ক্লাস করতে দিচ্ছে না, যখন-তখন ছাত্র-ছাত্রীদের তুলে নিয়ে চলে যাচ্ছে কোথাও বিক্ষোভ করবে, কোথাও বা রাস্তায় ট্র্যাফিক কন্ট্রোল করবে। আমি নাজেহাল হয়ে গেলাম।’

‘আপনার বয়স হচ্ছে খোন্দকার সাহেব।’

চোখ থেকে চশমা খুলে রুমাল দিয়ে মুছতে শুরু করলেন মোখলেস।

খোন্দকার সাহেব বললেন, ‘তা হয়েছে। ছাপ্পান্ন পেরোল। বেশিদিন চাকরি করতে পারব না।’

‘তাহলে ছাত্রদের ব্যাপার নিয়ে এত চিন্তা করছেন কেন? তারা বহমান নদী, তাদের বইতে দিন।’

খোন্দকার অবাক হয়ে বললেন, ‘মানে?’

মোখলেস বললেন, ‘দেশের পরিস্থিতি এখন কোনোদিকে যাচ্ছে, কেউ বলতে পারবে না খোন্দকার সাহেব। দেশ সব দিকে যেতে পারে। বড়ো আপা ফিরে আসতে পারে, ছোটো আপাও চার্জ নিতে পারে, আবার নোবেলজয়ী মেধাবীও আমেরিকার কথা শুনে দেশ চালাতে পারে। এই সময় আমরা কেউই এমন কিছু করব না যাতে কেউ রেগে যেতে পারে। আমরা সবাইকে সমান গুরুত্ব দেবো। সেটার মধ্যে ছাত্ররাও পড়বে।’

খোন্দকার সাহেব বললেন, ‘মানে ছাত্রদের অসভ্যতাও মেনে নিতে বলছেন?’

‘মেনে নিতে হবে না। চুপ করে দেখে যাবেন। তাদের চিহ্নিত করে রাখবেন। পরে সুবিধা বুঝে ব্যবস্থা নিতে হবে। সোমনাথ স্যারকে বলুন আপাতত রেজিগনেশন দিয়ে দিতে। চিঠিটা নিয়ে রেখে দিন। ছাত্ররা ঠান্ডা হয়ে ক্লাস করতে শুরু করে দিক। আমরা সোমনাথবাবুর পি এফ গ্র্যাচুইটি বা যা যা পাওনাগণ্ডা আছে, তার সব ওকে বুঝিয়ে দিই। পরে একটা অনারারি পোস্টে গেস্ট ফ্যাকাল্টি হিসেবে ওকে কন্ট্রাকচুয়াল বেসিসে কলেজে পড়ানোর ব্যবস্থা করে দেবো। ঠিক আছে?’

খোন্দকার সাহেব হাঁ করে রইলেন, ‘মানে আমরা ছাত্রদের এই অন্যায় জেদের কাছে মাথা নীচু করব?’

মোখলেস হাসলেন, ‘কোনোটা ন্যায়, কোনোটা অন্যায়, সেসব এখন ভাবার সময় নেই জনাব। দেশে অ্যানার্কি এলে আমাদের মতো ছোটো ছোটো প্রতিষ্ঠানদের সারভাইভ করার প্ল্যান আগে বানাতে হয়। তারপর বাকি কাজ করতে হয়। আপনি কথা বলুন। দরকার হলে সোমনাথ স্যারকে এখানে নিয়ে আসুন। আমি বোঝাবো। আর আপনার ছেলের সঙ্গে কী একটা ঝামেলা হয়েছে শুনলাম?’

খোন্দকার সাহেব বললেন, ‘জি, ওই ছেলেটাও আয়নাঘরে ছিল। সোমনাথ স্যারকে নিয়েই ঝামেলা। নোংরা কথা বলেছিল নিপুণকে।

‘নিপুণকে সামলান জনাব। ওকে কোথাও ঘুরতে পাঠিয়ে দিন। কক্সবাজার উইল বি গ্রেট। আমি ব্যবস্থা করে দেবো?’

খোন্দকার সাহেব আর বিস্মিত হলেন না। চুপ করে বসে রইলেন।

চা এল। প্রিমিয়াম কোয়ালিটির চা।

চায়ে চুমুক দিয়ে মোখলেস সাহেব বললেন, ‘কলেজটা চালাতে হবে। নতুন তরঙ্গের কথাও শুনতে হবে। আমাদের কত বছর আর আয়ু আছে বলুন, নতুন প্রজন্মের হাতেই তো সব ছেড়ে দিতে হবে। আমাকে শিক্ষা উপদেষ্টা ফোন করে তো বলছিলেন নতুন প্রজন্মকেই কলেজের ভার দিতে হবে। আমিই বলে-কয়ে আটকেছি। এই সময় ল অ্যান্ড অর্ডার প্রবলেম যাতে না হয়, আমাদের সেদিকেই ফোকাস করা উচিত। কী বলেন?’

খোন্দকার সাহেব ঘাড় নাড়লেন, ‘আপনি যেভাবে বলবেন।’

* * * *

এসির তাপমাত্রা এত কমানো হয়েছে, মুস্তাকিন সাহেবের মনে হচ্ছে একটা কম্বল থাকলে ভালো হত। উপদেষ্টা সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। এসে জানতে পেরেছেন তাকে একাই ডাকা হয়েছে। চেম্বারেই বসেছেন। উপদেষ্টা সাহেব যেকোনো মুহূর্তে এসে যাবেন।

মুস্তাকিন ভালো করে ঘরটা দেখে নিলেন। এরপরে দেশের ছাত্ররা খেপলে এই ঘরটাও ভাঙচুর করবে। এখানের জিনিসপত্রও লুট করে নিয়ে যাবে।

কারো হাতে হঠাৎ করে অপরিসীম ক্ষমতা চলে এলে সে কী করবে বুঝতে পারে না। দেশের ছাত্রদের অবস্থা সেরকমই। তারা ধরাকে সরাজ্ঞান করছে। আজকেও দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে শিক্ষকদের জোর করে অবসর নিতে বাধ্য করানোর খবর তার কাছে এসেছে।

.

মুস্তাকিন জীবনে অনেক বেআইনি কাজ করছেন। রাজনীতি করেছেন, প্রচুর দুর্নীতি করেছেন। কিন্তু এখনও তার শিক্ষকদের সঙ্গে হঠাৎ দেখা হলে মাথা নীচু করে সেলাম দেন। এদের মতো করেন না।

‘বেশিক্ষণ অপেক্ষা করালাম না নিশ্চয়ই।’

উপদেষ্টা সাহেব এসে গেছেন। শশব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন মুস্তাকিন।

‘না না জনাব। ঠিক আছে। আপনি খুব ব্যস্ত আমি জানি।’

‘বসুন বসুন।’

প্রধান উপদেষ্টা সাহেবের বয়স আশিরও বেশি। দেশের বাইরে ছিলেন এতদিন। দেশে ক্ষমতার পালাবদল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কোনো এক জাদুমন্ত্রে দেশে চলে এসেছেন।

‘আমাদের নতুন করে দেশ গড়তে হবে মুস্তাকিন সাহেব। তবে সবার আগে মনে রাখতে হবে, দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করাতে হবে। আমরা আর ভারতের চাকর থাকব না, ঠিক কি না?’

‘জি স্যার, আমরা কারো চাকর রইব না।’

‘গুড। তবে পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের সম্ভাবটা রাখা দরকার। কেন রাখা দরকার?’

‘জি জনাব আমরা দুটো দেশই আসলে একই রকমের।’

‘নাহ। একই রকমের না। দুটো দেশ দুই রকমের। পাকিস্তানিরা ইন্ডিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারে। আমরা পারিনি। সাম্প্রতিক ইতিহাসে আপনাদের বড়ো আপা দেশটাকে ওদের হাতে বিক্রি করে দিয়েছে। ভদ্রমহিলা দেশে আর দু-বছর থাকলে বাংলাদেশ ইন্ডিয়ার আরেকটা রাজ্য হত।’

‘একমতো জনাব।’

‘বিভিন্ন রাজনীতির খেলা তো চলবেই। আমরা আমাদের কাজ করে যাব।’

‘জি জনাব।’

‘আমি বেশ কয়েকটা বিদেশী ব্যাঙ্কে কথা বলেছি। অদূর ভবিষ্যতে আমরা অনেক ফান্ড পাব। আপনার কাজ হবে সেই টাকাগুলো যেন ঠিক পথে চলে, সেটা দেখা। আপনি বরং একটা ব্ল প্রিন্ট তৈরি করুন। আমি একবার দেখে নেব। বুঝতেই পারছেন, লীগের রাজনীতিকদের যে হাল জেন জিরা করল, আমরা সবাই চাইবো যেন তারা না রেগে যায়। আপনি আনোয়ারের সঙ্গে কথা বলে নিয়েছেন তো?’

মুস্তাকিন এবার চমকালেন। আনোয়ারের কথা প্রধান উপদেষ্টার মুখেও?

বললেন, ‘জি জনাব। ওর সঙ্গে আমার সকালেই দেখা হয়েছে। তারপর প্রেস ক্লাবেও দেখা হয়েছে।’

‘ভেরি গুড। ওর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলবেন। ধরে নিন আনোয়ার আমাদের অদৃশ্য উপদেষ্টা। পরের সপ্তাহে ইসলামাবাদে একটা উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হতে চলেছে। ওখানে আমি আপনাকে পাঠানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আপনি এক সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে যথেষ্ট সুসম্পর্ক রেখে চলেছিলেন। যদিও এখন আপনার পরিচিত মানুষেরা ইসলামাবাদে নেই, নতুন টিম আছে। আশা করছি আপনার কোনো অসুবিধা হবে না।’

মুস্তাকিন বললেন, ‘জি স্যার, আমি এই কাজটা পারব। কিন্তু আনোয়ার আমাকে একটা প্ল্যান দিয়েছে, মানে প্ল্যানটা খুবই বড়ো, তার জন্য অনেকটা বাজেট লাগবে।’

‘জানি তো।’

প্রধান উপদেষ্টা হাসলেন।

মুস্তাকিন অবাক হয়ে বললেন, ‘আপনি জানেন জনাব।’

‘জানি। ঠিক আছে। আবার দেখা হবে। আপনি খুব তাড়াতাড়ি ব্লু প্রিন্টটা আমায় দেখিয়ে নিন। ইসলামাবাদে যাবার আগেই। আমাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কটার যত তাড়াতাড়ি উন্নতি হয়, বাংলাদেশের জন্য তত মঙ্গল। গুড নাইট মুস্তাকিন সাহেব।’

উপদেষ্টা হঠাৎ করেই উঠে দাঁড়ালেন। মুস্তাকিনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। মুস্তাকিন বুঝতে পারলেন না কী হল। কথা বলতে বলতে ভদ্রলোক ঘর থেকে চলে গেলেন কেন?

তিনি একটু অপেক্ষা করে বেরোলেন। বাইরে বেরিয়ে দেখলেন আনোয়ারের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।

‘ওহ। বুঝলাম।’ বিরক্ত মুখে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে নিজের গাড়ির দিকে রওনা হলেন মুস্তাকিন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *