৫
ঢাকা
রাত তিনটে। সবে ঘুম এসেছিল।
ফোনটা সশব্দে বেজে উঠল।
সোমনাথ চোখ বন্ধ করেই হাতড়ে ফোন ধরলেন। ওপ্রান্তে মহিলা কণ্ঠে কান্নার শব্দ আসছে, ‘দাদা, আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে। ঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে।’
সোমনাথ বললেন, ‘কে? কে বলছ?’
‘পলাশ বলছি দাদা। বুঝতে পারছ না?’
সোমনাথ উঠে বসলেন, পলাশ তার মাসীর ছেলে। বরিশালের গ্রামে থাকে। বললেন, ‘শেষ হয়ে গেছে মানে?’
পলাশ আতঙ্কিত কণ্ঠে বলল, ‘একটু আগে একগাদা ছেলেপিলে এসে ঘর থেকে জোর করে বের করে আমাদের বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। এলাকার সব ঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে।’
সোমনাথ বললেন, ‘তোরা এখন কোথায়?’
পলাশ কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। তার আগেই ফোন কেটে গেল। সোমনাথ উদ্বিগ্ন হয়ে কলব্যাক করলেন। লাভ হল না। ফোন অফ বলছে।
কাকে ফোন করবেন বুঝতে পারলেন না। বহুদিন ওদের গ্রামে যাননি। ওরাই মাঝে মাঝে ঢাকায় আসে।
বীথি ঘুমোচ্ছিলেন। তাকে বিরক্ত না-করে সোমনাথ টিভির ঘরে গিয়ে বসলেন। টিভি চালিয়ে সেটা মিউট করে দিলেন।
তার একজন পরিচিত পুলিশ অফিসার ছিল। সন্ধ্যে থেকে তার মৃত্যু সংবাদ দেখিয়েছে টিভিতে। জনগণ তাকে তাড়া করেছিল।
প্রিন্সিপাল সাহেব রাত দশটার দিকে আরেকবার ফোন করেছিলেন। দুঃখ করে বলছিলেন এই স্বাধীনতা তারা চাননি। স্বাধীনতা মানে অরাজকতা না। সোমনাথই তখন বুঝিয়েছিলেন, এটা এক ধরনের মধ্যবর্তী সময়। এই সময়ে কিছু অরাজকতা দেখা দিতেই পারে। যেকোনো দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস সে-কথাই বলে। ভারতবর্ষের স্বাধীনতায় মানুষ মুক্তির স্বাদের থেকে দেশভাগের যন্ত্রণা বেশি পেয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর দেশ প্রত্যক্ষ করেছিল অবাধ দুর্নীতি। বহুদিন কোনো জায়গায় আটকে থাকলে মানুষ এভাবেই অরাজকতার আশ্রয় নেয়। তাতে চিন্তিত হবার কিছু হয়নি। যত রাত বাড়ছে, তত চারদিক থেকে ভয়ানক সব খবর আসতে শুরু করেছে। র এজেন্ট সন্দেহে একজনকে মারা হয়েছে। কারো উপর আগের রাগ আছে, কোনো দুর্বলের সম্পত্তি দখল করতে হবে, এসব কারণে বাড়িতে আগুন দেওয়া, খুন করা ইত্যাদি আছে, জেলখাটা অসংখ্য দাগী অপরাধী, খুনিদের নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
সোমনাথ কিছুক্ষণ টিভির দিকে তাকিয়ে টিভি বন্ধ করে দিলেন। মাথার পেছনে একটা চাপ চাপ ব্যথা শুরু হয়েছে। এই ব্যথাটা কি প্রেশার বাড়ার জন্য হয়েছে, নাকি ঢিলের ব্যথা বুঝতে পারছিলেন না। ডাক্তারবাবু দেখে অবশ্য ভয় পাবার কিছু নেই বলেই জানিয়েছেন।
পারভেজ আরেকবার এসে সরি বলে গেছে। পারভেজ ভালো ছেলে। তাদের খোঁজ নিয়ে যায় মাঝে মাঝেই। সোমনাথ পারভেজকে নিজের ভাইয়ের মতো দেখেন।
পলাশের ফোনে আরেকবার ফোন করলেন সোমনাথ। ফোন সেই আগের মতোই সুইচড অফ বলছে। পলাশদের বাড়ি তিনি চার-পাঁচবছর আগে গেছিলেন। খুব যত্ন করেছিল। পলাশ বলত তাদের গ্রামে সবাই মিলেমিশে থাকে। কী এমন হতে পারে যে ওদের বাড়ি জ্বালিয়ে দিল?
চুপ করে বসে থাকতে থাকতে চোখ বন্ধ করে একসময় সোফাতেই শুয়ে পড়েছিলেন তিনি। ঘুম ভাঙল বীথির ডাকে, ‘এখানে এসে ঘুমিয়েছিলে কেন?’
সোমনাথ ঘড়ির দিকে তাকালেন, সাড়ে সাতটা বাজে। বললেন, ‘রান্না বসাও। আজ কলেজ যাব।’
বীথি বললেন, ‘তুমি এখানে এসে ঘুমিয়েছিলে কেন বলো আগে।’
সোমনাথ বললেন, ‘কোনো কারণ নেই। টিভি দেখতে উঠেছিলাম আবার।’
বীথি বললেন, ‘একই খবর তো ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে সারাদিন ধরে দেখায়। এ খবর দেখার কী আছে?’
সোমনাথ উঠে বাথরুমে ঢুকে গেলেন। এখানে বসে থাকলেই বীথি একই কথা বার বার বলে যাবেন। সকালে এত কথা শুনতে ভালো লাগছে না তার।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখলেন মিস্ড কল। প্রিন্সিপাল সাহেব ফোন করেছিলেন।
কলব্যাক করলেন তিনি। প্রিন্সিপাল ফোন ধরেই উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন, ‘সোমনাথবাবু, নিপুণ ফিরে এসেছে। একটু আগে ফিরেছে।’
সোমনাথ বললেন, ‘শরীর কেমন বুঝলেন?’
প্রিন্সিপাল বললেন, ‘কিছুই বুঝলাম না। এসেই ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করেছে। বলে গেছে যতক্ষণ না বেরোবে, কেউ যেন না-ডাকে।’
সোমনাথ বললেন, ‘তাই করুন তবে।’
‘আপনি কি একবার আসবেন? আমি কী করব কিছুই বুঝতে পারছি না!’
‘খেয়ে-দেয়ে বেরোচ্ছি। আপনার ওখান থেকেই কলেজ যাব না হয়।’
‘ঠিক আছে। তাই ভালো। আপনি চলে আসুন, আমার এখানেই খাবেন।’
সোমনাথ বললেন, ‘ঠিক আছে, তাই করছি। বেরোচ্ছি তৈরি হয়ে।’
* * * * *
কলেজে এসেই ভয়ানক খবরটা পেল রাখি। রুমানকে হাসপাতালে ভরতি করা হয়েছে। ভোরের দিকে ওকে হোস্টেলের পেছনের রাস্তায় রক্তাক্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে। মুখ থেকে রক্ত বেরোচ্ছিল। ওই অবস্থাতেই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
রাখির শরীর খারাপ লাগছিল। সে শাড়িটা ফেরত নিয়ে এসেছিল। বাসায় তার মা জানার পরে খুব রাগারাগি করেছেন। বলেছেন তাদের চোরের বাড়ি না। এরপর এ-রকম ঘটনা যেন আর না ঘটে। সে রেগেমেগেই কলেজে এসেছিল। ইচ্ছে ছিল রুমানকে দু-কথা শুনিয়ে দেবার। ফোনে পাচ্ছিল না। রুমানের হোস্টেলের কাউকে সে ফোন করে না। কোনো ছেলেই সুবিধের বলে তার মনে হয় না। কলেজে এসে খবরটা শুনে সে আরেকটু হলেই পড়ে যাচ্ছিল। ফারজানাকে বলল, ‘আমি বাসায় চলে যাই।’
ফারজানা ফ্যাকাসে মুখে বলল, ‘রাশেদরা বলেছে সবাইকে ট্রাফিক কন্ট্রোল করাতে নিয়ে যাবে। এখন চলে যাবি?’
রাখি বলল, ‘রুমান থাকলে যেতাম। আমি এখন যেতে পারব না। তুই থাকলে থাক। আমি যাই।’
ফারজানা বলল, ‘আমি থাকি। তুই চলে যা।’
কলেজের সামনের গেটে রাশেদের দলবল ভিড় করে আছে। রাখি পেছনের গেটের দিকে রওনা দিল। সে বুঝতে পারেনি রাশেদ তাকে ঠিকই লক্ষ্য করছিল। দৌড়ে তার সামনে এসে বলল, ‘কীরে রাখি, কই যাস?’
রাখি বলল, ‘আমার শরীর খারাপ লাগছে। আমি বাসায় ফিরে যাব।
রাশেদ মুখটা করুণ করার চেষ্টা করল, ‘রুমানের খবরটা পেয়েছিস না? সত্যি কি বাজে খবর!’
রাখি রাশেদকে দেখল। রাশেদ একটুও দুঃখিত হয়নি। তার চোখদুটোই সে-কথা বলে দিচ্ছে। সে উত্তর না দিয়ে হাঁটতে শুরু করল।
রাশেদ বলল, ‘দোস্তরে একবার দেখে আসিস। দোস্ত যদি বেঁচে না থাকে, তাহলে কী হবে?’
সবাই তাকে দেখছিল।
রাখি কোনোমতে চোখের জল সামলাতে সামলাতে কলেজ থেকে বেরোল। শহরে আজ আনন্দের দিন হবার কথা ছিল। অথচ আনন্দের লেশমাত্র নেই। স্কুল-কলেজ খুলে গেছে, অথচ চারদিকে কেমন একটা থমথমে ভাব। আগে জানলে কলেজেই যেত না সে।
ফোনে মেসেজ টোন বেজে উঠল। দেখল একটা অজানা নাম্বার থেকে মেসেজ এসেছে, ‘আমি ছাড়া পেয়েছি।’
রাখি কয়েক সেকেন্ড অবাক হয়ে নম্বরটা দেখল, ছাড়া পেয়েছে মানে?
সে সঙ্গে সঙ্গে কলব্যাক করল। ফোনটা প্রথমে রিং হয়ে গেল। কেউ ধরল না।
সে আবার ফোন করল। এবার প্রথম রিং হতেই ওপ্রান্ত থেকে ফোন রিসিভ হল, ‘বলো।’
এই গলাটা সে খুব ভালো করে চেনে। রাখি কেঁদে ফেলল, ‘তুমি?’
‘হ্যাঁ। আমি। কেমন আছ?’
‘ভালো না।’
‘স্বাভাবিক। ভালো থাকা সম্ভব না।’
‘কেমন আছ তুমি?’
‘বেঁচে আছি। এই অনেক। তোমাদের কলেজের খবর কী?’
‘রুমানকে ওরা খুব মেরেছে। খবর খুব খারাপ। ওসব কথা ছাড়ো, তুমি কখন ফিরেছ?’
‘আমি নিজেও জানি না আমি কখন ফিরেছি। শুধু জানি ফিরেছি।’
‘আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।’
‘আমারও হচ্ছে না। আমি ভেবেছিলাম এ জন্মে আর সূর্যের আলো দেখতে পাব না। জীবনের আলোর কথা তো ছেড়েই দিলাম।’
রাখি আর পারল না। ফোন কেটে কাঁদতে শুরু করল। সি এনজি চালক জিজ্ঞেস করল, ‘কোনো সমস্যা আপা?’
সে উত্তর দিল, ‘না না কোনো সমস্যা নেই। চলো।’
বাসার রাস্তায় নেমে আবার সি এন জি নিল সে। বাসায় ঢুকতে ইচ্ছে করছে না। ফোন আসছে তার। ধরল সে, ‘ফোন কেটে দিলে কেন?’
‘কী করব বলো? আমার কি কিছু করার আছে?’
‘নেই? সত্যিই নেই? তোমার আমাকে দেখতে ইচ্ছে করছে না? সাতটা মাস, মিস করনি?’
‘এখন কোথায় দেখা করতে চাও বলো। তোমাদের বাসায় গেলে তো সমস্যা হবে, তাই না?’
ওপ্রান্ত চুপ করে গেল। সে ফোন কাটল না। ধরে রইল।
নীরবতার পর উত্তর এল, ‘ঠিক আছে, আমি তো দাঁড়াতে পারছি না ঠিক করে। কাল দেখা হবে। একটু স্টেবল হয়েনি।’
রাখি বিহ্বল কণ্ঠে বলল, ‘দাঁড়াতে পারছ না মানে?’
‘পায়ে খুব মারত। একটা সময় সিস্টেম ফেল করে গেছিল।’
‘এখনই দেখা করতে ইচ্ছে করছে আমার। ত
‘দরকার নেই। কাল দেখা হবে। একটু রেস্ট করেনি। তুমি সামলে থাকো। সময়টা ভালো না।’
‘হু। বুঝতে পারছি। কাল দুপুর দুটো।’
‘ডান।’
৬
॥ নতুন দিল্লি।
‘বাংলাদেশকে কি তাহলে ফেইলিয়োর বলা যাবে?’ বিদুর সিগারেট টানছিলেন অফিসের স্মোকিং জোনে দাঁড়িয়ে। আর পি বেশ কিছুক্ষণ উশখুশ করছিলেন। অবশেষে আর থাকতে না পেরে প্রশ্নটা করে ফেললেন।
বিদুর বললেন, ‘ফেইলিয়োর বলতে তুমি কি বোঝো আর পি?’
আর পি বললেন, ‘যেখানে আমি আর সুবিধা করতে পারব না। হেরে গেছি যেখানে।’ বিদুর বললেন, ‘মন্দ না। তোমার কনসেপ্টটা নেওয়াই যায়। তবে পৃথিবী একদিনে শেষ হয়ে যায় না। কিংবা পৃথিবী গোল।’
আরপি বললেন, ‘বাংলাদেশে অ্যান্টি ইন্ডিয়ান প্রোপাগান্ডা দাপিয়ে বাড়ছে স্যার।’ বিদুর হাত নাড়লেন, ‘এখন কিছু করা যাবে না। সব বন্ধ থাক। ওরা ক্ষমতা পেলে কত দূর যেতে পারে, সেটা আগে দেখতে চাই।’
আর পি বললেন, ‘আর এর মধ্যে যদি ওরা বড়ো কিছু করে ফেলে?’
বিদুর বললেন, ‘কী করতে পারে? কীই-বা করার ক্ষমতা আছে ওদের? এসব নিয়ে মাথা ঘামিও না। তোমার অফিসের খবর কী?’
আর পি বললেন, ‘মাত্র তিনটে ছেলে-মেয়ে স্যার। এত কম লোকে হয়?’
বিদুর বললেন, ‘টার্গেটও তো কম দিয়েছি তোমাকে। এখনই কান্নাকাটি করার কোনো কারণ আছে বলে তো মনে হচ্ছে না।’
আর পি বললেন, ‘ওদের ছুটিছাটা থাকে। আরও দু-জন হলে ভালো হত।’
বিদুর বললেন, ‘দেশের কাজ করছে। ছুটিছাটা লাগলে আমাকে বলবে। আমি ওদের হয়ে ডিউটি করে দেবো।’
আর পি হেসে ফেললেন, ‘আপনিও জানেন এটা সম্ভব না স্যার।’
বিদুর বললেন, ‘কেন সম্ভব না? তোমার অফিসে কাজ শুরু হবার আগে দিনের পর দিন আমি কন্ট্রোলরুমে বসে কাজটা করিনি? তুমি কি সব ভুলে গেলে?’
আর পি বললেন, ‘সেটা টেস্টিং পিরিয়ড স্যার। এখন তো ওরকম কিছু ব্যাপার নেই। ওদের ডিউটি আপনি করবেন কী করে?’
বিদুর বললেন, ‘করে দেবো। কার ছুটি লাগবে?’
আর পি বললেন, ‘দীপ্তিরই লাগবে বলছিল।’
বিদুর বললেন, ‘ঠিক আছে। অ্যাপ্লাই করতে বলো। আমি অ্যারেঞ্জ করে দেবো। আনোয়ারের লেটেস্ট লোকেশন কোথায়?’
আর পি বললেন, ‘এখন ঢাকা। কিছুদিন আগে সিলেটে ছিল।’
বিদুর চোখ বন্ধ করে সিগারেট টানতে লাগলেন। কয়েক সেকেন্ড পরে বললেন, ‘আনোয়ার বাংলাদেশে যা খুশি করে যাক। তা আমার দেশের সিকিউরিটিতে কোনো থ্রেট না করলেই হল। যে মুহূর্তে থ্রেট বাড়তে শুরু করবে, তখন আমরা স্টেপ নেবার কথা ভাবব।
আর পি বললেন, ‘কীরকম থ্রেটের কথা ভাবছেন? চিকেন নেক নিয়ে ভাবছেন?’ বিদুর বললেন, ‘চিকেন নেকফেক ওদের সোশ্যাল মিডিয়ার ফালতু হুমকি হিসেবে দেখো। ওরা কিছু করতে পারবে না। ওরা কোনোকালই সম্মুখ সমরে যায় না। ওদের কাজ হয় কার্গিলের মতো লুকিয়ে দখল করা, নইলে ২৬/১১র মতো জিহাদি পাঠিয়ে সন্ত্রাসবাদী হামলা করা। এবার সেরকমই কিছু প্ল্যান করতে পারে। পারে কেন বলছি, করবেও। আই এস আই এর হাতে বাংলাদেশ চলে যাওয়া মানে ওখানে এখন আমাদের বিরোধী কারখানা তৈরি হয়ে গেছে এতক্ষণে। বি এস এফ-কে রেড অ্যালার্ট দিয়ে রেখেছি। তবু চিন্তা তো থাকবেই। তুমি কিছু ব্রেক থ্রু পেলে সঙ্গে সঙ্গে জানাবে।’
আর পি বললেন, ‘বানশাল এপিসোডই চলছে এখনও। একটা আননোন নাম্বারে নেগোশিয়েশন চলছে।’
বিদুর বললেন, ‘আনোয়ারই পাঠাচ্ছে। পুরোনো বকেয়া। অনেকদিন হয়ে গেছে।’
আরপি বললেন, ‘কী করব স্যার? আপনি বললে এখনই বানসালকে তুলে আনা যায়।’
বিদুর বললেন, ‘একদম না। আমাকে না-জিজ্ঞেস করে কাউকে তোলার কথা ভাববেও না। বানশালের সমস্ত চালচলন, ফোন কল মনিটরিং করো। সঙ্গে আনোয়ারের সঙ্গে যারা আছে তাদের।’
আর পি বললেন, ‘সেটা অলরেডি শুরু করে দিয়েছি আমরা।’
বিদুর বললেন, ‘তোমার ছেলে-মেয়েগুলোকে আমি বেছে নিয়েছি আর পি। আমি যখন কাউকে সরাতে বলব, ইমিডিয়েট এফেক্টে সরানো হবে। এই কথাগুলো সবাইকে বুঝিয়ে দিও। আমি একমাত্র আমার দেশের কাছে দায়বদ্ধ।’
আরপি হাসলেন ‘জানি স্যার।’
৭
॥ ঢাকা।।
নিপুণকে তিনি ক্লাস নাইন থেকে টুয়েলভ পড়িয়েছেন। গল্পের মতো করে ইতিহাস পড়াতেন। একরকম বন্ধুর মতো হয়ে গেছিলেন তাঁরা। নিপুণের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর ধৈর্য ধরে দিয়ে গেছেন এককালে।
তাঁর সামনে যে ছেলেটা বসে আছে, তাকে দেখে প্রথমে চমকে উঠেছিলেন সোমনাথ। শরীর থেকে অনেকখানি ওজনের সঙ্গে জীবনীশক্তিটুকুও কেউ যেন জোর করে টেনে নিয়ে গেছে। তার সামনে যে ছেলেটা বসে আছে, সে কি আদৌ জীবিত?
গলা খাঁকড়িয়ে সোমনাথ বললেন, ‘নিপুণ।’
নিপুণ বলল, ‘জি স্যার।’
সোমনাথ বললেন, ‘ঠিক আছ এখন?’
নিপুণ মরা মাছের মতো চোখে তুলল, নিঃস্পৃহ গলায় বলল, ‘বেঁচে আছি স্যার।’
প্রিন্সিপাল স্যার দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন। তার হাত পা কাঁপছে।
সোমনাথ বললেন, ‘কী করত ওরা?’
নিপুণ বলল, ‘হঠাৎ হঠাৎ এসে মারত স্যার। পায়ের নীচে লাঠি চার্জ করেছে, সারাদিন ধরে মেরেছে এ-রকমও হয়েছে।’
সোমনাথ নিপুণের কাঁধে হাত দিয়ে নরম গলায় বললেন, ‘আমরা অনেক চেষ্টা করেছিলাম নিপুণ। পারিনি। অনেক দরজায় গেছি। কেউ কোনো উপায় বলতে পারেনি। এই মুহূর্তে তোমাকে কোনোরকম সান্ত্বনার কথা আমি বলতে পারব না। শুধু একটা কথা বলব, উপরওয়ালা তোমাকে শক্তি দিক। তুমি বিশ্রাম করো। শরীরে একটু শক্তি এলে কলেজ যাওয়া শুরু করবে।’
নিপুণ সেই চুপ করে বসে রইল।
প্রিন্সিপাল সাহেব ইশারায় জানতে চাইলেন তিনি ঘরের ভেতরে ঢুকবেন কিনা। সোমনাথ ভেতরে আসার ইশারা করলেন। প্রিন্সিপাল সাহেব ঘরে ঢুকে নিপুণের খাটে বসলেন, ‘তোর সঙ্গে আর কে ছিল?’
নিপুণ বলল, ‘প্রথম দিকে আমাকে একটা ছোটো ঘরে রেখে দিত। পরে একটা ছেলে এসেছিল। ওকে আমি চিনি না। কথা বলার চেষ্টা করেছিলাম। লাভ হয়নি। একটা অন্ধকার ঘরে আটকে রেখে দিত সারাদিন ধরে। কখনো কখনো বের করে নিয়ে গিয়ে মারত। ঘরে যে থাকত, তাকে ইলেকট্রিক শকও দিয়েছিল। সে সারাদিন অচৈতন্য হয়ে পড়ে থাকত। আমাকেই মনে হয় মাসখানেক আর মারতে নিয়ে যায়নি। আমি সৌভাগ্যবান।’
সোমনাথ অস্ফুটে বললেন, ‘রাষ্ট্র। রাষ্ট্র কীই না করতে পারে, তাই না?’
প্রিন্সিপাল বললেন, ‘কী করবেন স্যার? আপনি থাকবেন? আমি কি রওনা দেব? না আপনি যাবেন?’
সোমনাথ বললেন, ‘আপনি কি আমাকে নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন? আমার ধর্ম আলাদা বলে?’
প্রিন্সিপাল বললেন, ‘আপনি আমাকে চেনেন। আমি কোনোদিন এইভাবে ভাবিনি। কিন্তু এই সময়টাই এমন, আমাকে আপনার নিরাপত্তার কথা ভাবতে হবে।’
সোমনাথ বললেন, ‘কোনো কিছুই নিরাপদ না, আবার সব কিছু নিরাপদ স্যার। অত ভেবে কিছু হবে না। নিপুণ, আমরা কলেজ যাই? তুমি থাকতে পারবে তো?’
নিপুণ বলল, ‘আমি ঘুমোবো।’
সোমনাথ বললেন, ‘বিকেলের দিকে একটু বেরোবে। বেরোনো দরকার। সূর্যের আলো গায়ে মাখা দরকার।’
নিপুণ মাথা নীচু করে পায়ের দিকে তাকিয়ে রইল। সোমনাথ দেখলেন নিপুণের পা কাঁপছে। প্রিন্সিপাল স্যারকে বললেন, ‘আমার মনে হয় নিপুণকে একজন ভালো ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া দরকার। একজন মনোবিদের কাছেও যাওয়া দরকার। সব থেকে ভালো হত দেশের বাইরে নিয়ে কিছুদিন ঘুরে আসতে পারলে।’
প্রিন্সিপাল সাহেব বললেন, ‘আপনি জানেন আমাদের অবস্থা। এখন কোথাও বেরোলে প্রচার করবে আমরা পালিয়েছি। এই সময় এটা সম্ভব না।’
সোমনাথ বললেন, ‘কক্সবাজার যেতে পারেন। সমুদ্রস্নানে কিছুটা লাভ হতে পারে। আমাদের চেষ্টা করে যেতে হবে।’
নিপুণ বলল, ‘আমি কোথাও যাব না। আমার ভালো লাগছে না কিছু। আমি ঘুমোতে চাই।’
সোমনাথ উঠে দাঁড়ালেন, ‘ঠিক আছে। আপাতত তাই হোক। আমি আবার আসব নিপুণ। আসব তো?’
নিপুণ বলল, ‘আসবেন স্যার।’
সোমনাথ ঘর থেকে বেরোলেন। প্রিন্সিপাল সাহেবের স্ত্রী কাঁদছিলেন ড্রইংরুমে বসে। সোমনাথ বললেন, ‘আপনার ছেলে মার কাছে ফিরে এসেছে। আপনি এখন মন খারাপ করবেন না। হাসিমুখে ছেলের কাছে যান।
প্রিন্সিপাল সাহেব বললেন, ‘আমাদের ছেলে কি ঠিক হবে কোনোদিন স্যার?’
সোমনাথ ঘাড় নাড়লেন, ‘হবে, নিশ্চয়ই হবে।’
প্রিন্সিপাল বললেন, ‘আসুন খেয়েনি। কলেজের জন্য দেরি করে লাভ নেই।’
৮
॥ দিল্লি।
দুপুর দুটো পনেরো।
প্রশান্তের ফোন পাওয়া যাচ্ছে না।
দীপ্তি বিরক্ত মুখে অফিসে বসে আছে। দুটোর সময় শিফট শেষ হয়ে গেছে তার। প্রশান্ত রিলিফ না দিলে সে বাড়ি যেতে পারবে না। চোখ ধরে এসেছে, মাথা ব্যথা করছে। সেই ভোর থেকে এক কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেছে সে।
খিদেও পাচ্ছে। অত ভোরে স্নান করে আসেনি। পিজিতে ফিরে স্নান করতে হবে।
আবার ফোন করল সে। উফ! এবার রিং হচ্ছে। প্রশান্ত ধরেই বলল, ‘চলে যা। আমি লিফটে আছি।’
দীপ্তি একটা গালাগাল দিয়ে ফোন কেটে চেয়ার ছাড়ল। তাড়াতাড়ি ব্যাগ গুছিয়ে বেরোতেই আর পি-র সামনে পড়ে গেল। আর পি কফি নিয়ে ঢুকছিলেন। দীপ্তিকে দেখে বললেন, ‘এত তাড়াহুড়ো কোরো না। ধীরে সুস্থে বেরোও।’
দীপ্তি বলল, ‘দেখছেন তো স্যার, প্রশান্ত এই ঢুকছে। আমার রাজ্যের কাজ পড়ে আছে। আর পি বললেন, ‘দেখছি। প্রশান্ত নাইট করে গেছে। সমর আসেনি রাতে। প্রশান্তের চাপ পড়ছে।’
দীপ্তি বলল, ‘তাও ঠিক।’
আর পি বললেন, ‘তেমন কিছু পাওনি তো?’
দীপ্তি মাথা নাড়ল, ‘না স্যার। তেমন সিগনিফিক্যান্ট কিছু নেই। নর্থ ইস্টে একটা ইনফিল্ট্রেশনের প্ল্যান ছিল ওদের, প্রচুর বৃষ্টিতে সেটা আপাতত স্থগিত আছে মনে হচ্ছে। কোনো কমিউনিকেশন নেই।’
আর পি বললেন, ‘ওকে।
দীপ্তি গলা নামিয়ে বলল, ‘স্যার, আমি কি দু-দিন ছুটি পেতে পারি? বাড়িতে একটা কাজ ছিল।’
আর পি বললেন, ‘কলিগদের সঙ্গে কথা বলে দেখো। বুঝতেই পারছ তোমাদের কাজের গুরুত্ব কতখানি। কবে যাবে তুমি?’
দীপ্তি বলল, ‘তেরোই অগাস্ট স্যার। তেরো চোদ্দো ছুটি নেবো। পনেরো তারিখ জয়েন করে যাব।’
আর পি বললেন, ‘ওকে, তার মানে তুমি হলিডে ডিউটি করবে। ঠিক আছে, আমি দেখছি, তুমিও বলে রাখো ওদের।’
প্রশাস্ত ঢুকছে।
দীপ্তি প্রশান্তকে কড়া একটা চাউনি দিয়ে মুখ কালো করে অফিস থেকে বেরোলো। মনে হচ্ছে প্ল্যানটা হবে না। ছুটিটা দরকার ছিল। এক একটা দিন ছুটি পেতে হাল খারাপ হয়ে যায় এখানে। সাতাশটা ছেলে দিয়ে অফিসটা চলছে।
প্রশান্ত ছেলেটা তাও বলে ছুটি নেয়, সমর এর মধ্যেই না-বলে একদিন ডুব মেরে দিয়েছিল। তাকে মর্নিং করে আবার ইভনিং শিফট করে বাড়ি যেতে হয়েছে। অফিসে লাঞ্চ আনিয়ে নিতে হয়েছিল।
অটোয় উঠে লোকেশন বলে কানে হেডফোন দিল সে। একটু ভেবে মাস্কও পরে নিল। শহরটার অবস্থা ভালো না। দূষণ বাড়ছে। মাস্ক ছাড়া বেশিক্ষণ থাকলেই কষ্ট হচ্ছে তার। একবার ডাক্তারও দেখাতে হবে। মাঝরাতে হঠাৎ কাশি উঠতে শুরু করে। প্রায় দম বন্ধ হয়ে আসে। অফ ডের দিন ঘুমিয়ে কাটায়। ডাক্তার দেখাতে যেতে ইচ্ছে করে না আর।
সুহাসের মেসেজ এসেছে, ‘বিকেলে দেখা হবে?’
দীপ্তি রিপ্লাই করে দিল, ‘ঠিক নেই। এই সবে বেরোলাম। প্রশান্ত এম সি দেরি করেছে।’
—গালি মত দো ইয়ার।
—খুব প্রেম জেগেছে প্রশান্তের উপরে? প্রেম করবে?
এক গাদা হাসির স্মাইলি দিল সুহাস। দীপ্তিও অটোর মধ্যে বসে ফিকফিক করে হাসতে শুরু করল।
লিখল, ‘জানাবো। গেলে সেম প্লেস। আসলে ঘুম পাচ্ছে।’
‘ঠিক আছে। ঘুমালে ঘুমোও।’
‘নাহ। ঘুমোবো না। তুমি বললে দেখা করতে। আমাদের অনেকদিন দেখা হচ্ছে না।’
‘সে তো ঠিকই। কিন্তু স্ট্রেস হলে ঠিক আছে।’
‘আমি ফিরে জানাচ্ছি।’
‘ওকে।’
ফোন ব্যাগে ঢোকালো সে। অটো জ্যামে পড়েছে। সামনে এক ট্যাক্সি চালকের সঙ্গে এক বাইক আরোহীর হাতাহাতি লেগে গেছে। সিটে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করল দীপ্তি। আর ভালো লাগছে না। এডুকেশন লোনের টাকাটা না থাকলে সে সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে সন্ন্যাস নিয়ে নিত।
পিজিতে ঢুকতে ঢুকতে সোয়া তিনটে বেজে গেল। মিসেস মালহোত্রা তাকে দেখে বললেন, ‘খেতে বসে যাও। চোখ একবারে গর্তে ঢুকে গেছে দেখছি। তোমার চোখের তলায় এত কালি পড়েছে? একবার দেখো।’
সঙ্গে সঙ্গে বাথরুমে ঢুকে নিজেকে দেখে চমকে উঠল দীপ্তি। সত্যি! এ কী চেহারা হয়েছে তার! কয়েকদিন ছুটি নিয়ে ঘুমিয়ে থাকতে পারলে ভালো হত। এভাবে একটানা সারাদিন মনিটরের দিকে তাকালে আর কানে হেডফোন নিয়ে বসে থাকলে এ-রকমই তো হবে!
বেশ কিছুক্ষণ ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ মুছে স্নানে ঢুকল সে। চারটে নাগাদ তৈরি হয়ে সুহাসকে ফোন করল সে, ‘আমি বেরোচ্ছি। কোনো রেস্তোরাঁয় দেখা কোরো। ওখানেই খেয়ে নেবো।’
সুহাস বলল, ‘ওকে। জিটি রোড? ওটা ঠিক হবে।’
দীপ্তি বলল, ‘হ্যাঁ, ওখানেই এসো তবে।’
সুহাস বলল, ‘ফাইন, আমিও ঢপ মেরে বেরোচ্ছি তবে।’
দীপ্তি সেজেগুজে বাইরের ঘরে আসতেই মিসেস মালহোত্রা বললেন, ‘সুহাসের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছো? যাই কর, দেরি করবে না, রাতের রাস্তাঘাট এখানে একবারেই নিরাপদ না। নামেই রাজধানী।
দীপ্তি বলল, ‘না না, আপনি ভাববেন না। আমি রাত করব না।’
বেরিয়ে অটো নিল আবার। অটোয় উঠে আগে ভাড়া ঠিক করে নিতে হয়। এখানে অটোতে দিনে ডাকাতি চলে। কনট প্লেসে নেমে দেখল সুহাস এসে আগে থেকেই দাঁড়িয়ে আছে। সে ভাড়া মিটিয়ে এগিয়ে গেল, ‘আমি বলার সঙ্গে সঙ্গেই অফিস থেকে বেরিয়ে গেছো নাকি?’
সুহাস হাসল, ‘ইয়েস, এতদিন পর ডেট করব, প্রায়োরিটি তো দিতেই হবে।’
দীপ্তি সুহাসের হাতে আলতো চাপড় মারল, ‘আজকাল খুব ভাল ফ্লার্ট করছ দেখছি। কারো কাছে নেট প্র্যাকটিস চলছে নাকি?’
সুহাস বলল, ‘আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্র্যাকটিস করছি। একদিন না একদিন আমি ভাল ফ্লার্ট করতে পারবো নিশ্চয়ই।’
দীপ্তি বলল, ‘ঠিক আছে। চল খেয়েনি। আমার রাক্ষুসে খিদে পেয়েছে।’
দুজনে রেস্তোরাঁয় ঢুকল। দীপ্তি খাবারের অর্ডার করতে গিয়ে সুহাস কী খাবে জিজ্ঞেস করায় সুহাস শুধু একটা সোডা নেবে বলল।
অর্ডার দেবার পর সুহাস বলল, ‘জব সুইচের কথা ভাবছো না? ভাবা উচিত। এইভাবে ডিউটি করাটা কি সম্ভব?’
দীপ্তি ঠোঁট ওল্টালো, ‘নাহ, সম্ভব না। আমার ডার্ক সার্কেল ইতিমধ্যেই খেল দেখাতে শুরু করে দিয়েছে। আমি জানি না শেষ অবধি কী দাঁড়াবে। কোথাও কোনো ওপেনিং পাচ্ছি না।’
সুহাস বলল, ‘প্রশান্তরা পালানোর প্ল্যান করছে না?
দীপ্তি বলল, ‘জানি না। প্রশান্ত ভীষণ চাপা স্বভাবের ছেলে। কিছু বলে না। সমর আবার ফাঁকিবাজ। এই দুটো আমার জীবন নরক করে দিল একবারে।’
সুহাস বলল, ‘কল সেন্টার টাইপ জব, তাই না?’
দীপ্তি কখনো সুহাসকে বলেনি সে কী ধরনের কাজ করে। কল সেন্টারই বলে এসেছে বরাবর। এখনও হ্যাঁ বলল। সুহাস বলল, ‘আমায় তোমার সিভিটা পাঠিও। আমি দেখবো। আমার কয়েকজন বন্ধু ভাল জায়গায় আছে, ওরা তোমায় হেল্প করতে পারবে।’ দীপ্তি খুশি হবার মুখ করল, ‘ইম্প্রেস করার চেষ্টা করছো আমায়?’
সুহাস একটুও অপ্রতিভ না হয়ে বলল, ‘না। আমি তোমাকে সাহায্য করার চেষ্টা করছি। এত কষ্ট চোখে দেখা যাচ্ছে না।’
দীপ্তি বলল, ‘আমার যে কী খিদে পেয়েছে, তা আমি তোমাকে কী করে বোঝাবো? এখন মনে হচ্ছে আকাশ খাই, পাতাল খাই। বাই দ্য ওয়ে, তুমিও কিন্তু কদিন ধরে একটানা ডিউটি করছো। সেভাবে তোমাকে আমি ছুটি নিতে দেখিনি।’
সুহাস বলল, ‘সত্যিই তাই। প্রচুর কাজ জমে গেছে। একটা একটা করে শেষ করছি। একদিন নিশ্চয়ই আমার কাজ শেষ হবে, একদিন তোমার কাজ শেষ হবে, তারপর আমরা কোথাও ঘুরতে যাবো। আমার বাড়িতে বিয়ের কথা বলছিল, আমি ঠিক করেছি তোমার কথা বলে রাখবো। তবে অবশ্যই তুমি পারমিশন দিলে তখনই বলব।’
দীপ্তি বলল, ‘বলতে চাইল বলতে পারো, তবে এখনই হরিয়ানভি বাড়িতে বউ হতে
যাবো না আগে থেকে বলে রাখলাম। তোমরা ভীষণ কনজারভেটিভ হও। তোমার বাবা সরাসরি যদি চাকরি ছাড়তে বলেন, আমি কিন্তু উল্টে কথা শুনিয়ে দিতে পারি।
সুহাস হেসে ফেলল, ‘আমার বাবা একবারেই সেরকম নন। তবে ঠিক আছে, তোমাকে জোর করছি না। তুমি যেদিন বলবে, তখনই আমি জানাবো।
খাবার এসে গেছে, দীপ্তি বলল, ‘ওকে, এসব কথা পরে হবে। আগে খেয়েনি।’
সুহাস সোডার গ্লাস নিয়ে চুমুক দিয়ে বলল, ‘ঠিক। শুরু করো।’
৯
।। ঢাকা।।
কালকেও তো দেশ স্বাধীন হয়েছে বলে সবাই খুব আনন্দ করছিল, তবে আজকে কলেজের পরিবেশটা এত থমথমে কেন? সোমনাথ কিছুই বুঝতে পারলেন না। ফার্স্ট ইয়ারের ক্লাসে ঢুকে দেখলেন সবাই যেন পাথুরে মুখে বসে আছে। বললেন, ‘কী হয়েছে? তোমরা জানো তোমরা কত বড়ো স্বৈরাচারীর হাত থেকে মুক্ত হয়েছো? কোথাও দাঁড়িয়ে জোরে কারো সমালোচনা করতে পারতে না। ফেসবুকে কিছু লিখতে পারতে না। আজ থেকে তোমরা সব কিছু করতে পারবে। দুঃখ পাচ্ছ কেন?’
কেউ কেউ মাথা নীচু করল। বাকিরা উশখুশ করতে শুরু করল। একজন বলল, ‘স্যার আমরা জানতাম আপনি দেশে ফিরে গেছেন!’
সোমনাথ ভ্রূ কুঁচকালেন, ‘দেশ মানে?’
ক্লাসে নীরবতা নেমে এল। রাশেদদের গ্রুপ দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। সোমনাথ তাদের দেখে বললেন, ‘কী হল? তোমাদের ক্লাস নেই?’
রাশেদ ক্লাসে ঢুকে বলল, ‘স্যার, আমাদের ছাত্রদলের একটা দাবি আছে।’ সোমনাথ বললেন, ‘কী দাবি?’
রাশেদ বলল, ‘আপনাকে পদত্যাগ করতে হবে স্যার। নইলে আমরা আপনাকে অবরোধ করব।
সোমনাথ বিস্মিত চোখে রাশেদের দিকে তাকিয়ে রইলেন, বুঝতে পারছিলেন না কী হচ্ছে? প্রিন্সিপাল স্যার কি এসবেরই ভয় পাচ্ছিলেন? বললেন, ‘কেন? আমার অপরাধ কী?’
রাসেদ বলল, ‘প্রথমত আপনি এ দেশের মানুষ না।’
সোমনাথ বললেন, ‘আমি এদেশের মানুষ না? এসব কথা তোমাকে কে বলেছে? তুমি জানো আমার এদেশের প্রতি কী অবদান আছে? ডু ইউ হ্যাভ এনি আইডিয়া?’
রাশেদের পেছনের ছাত্ররা হঠাৎ করে হইহই করে উঠল। রাশেদ তাদের দু-হাত তুলে শাম্ভ করল, বলল, ‘শোনেন স্যার, আমরা সবাই মিলে বসে, মিটিং করে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা আপনার সঙ্গে তর্ক করব না। আপনার কাছে আমরা পড়সি। আমাদের সবার মিলিত সিদ্ধান্ত এটা। এবার আপনি ঠিক করুন কী করবেন। আপনার কাছ থেকে পদত্যাগপত্র না পাওয়া অবধি আপনি আজ কলেজ থেকে বেরোতে পারবেন না।’
সোমনাথ বললেন, ‘রাশেদ, তুমি কি জানো, পূর্ববর্তী সরকারের সমস্ত রকম প্রচ্ছন্ন হুমকি থাকা সত্ত্বেও আমি প্রথমে তাদের বিরুদ্ধে খবরের কাগজে লেখালেখি করেছিলাম? তারপরে খবরের কাগজে যখন আমাকে ব্যান করা হল, আমি ফেসবুকে লিখেছি? তোমরা সে লেখা পড়নি?’
রাশেদরা চোখ মুখ শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইল।
সোমনাথ বললেন, ‘দেখো বাবারা, আমার কাছে এই দেশটা তোমাদের যতটুকু, আমারও ঠিক ততটুকু। আমাকে দিয়ে জোর করে কোনো কাজ তোমরা করতে পারবে না। আপাতত এই ক্লাস থেকে সবাই বেরিয়ে যাও। আমাকে সিলেবাস শেষ করতে দাও। এই বিদ্রোহের সময়গুলো ক্লাস হয়নি। আমাদের কলেজের দু-জন ছেলে শহিদ হয়েছে। এত কিছুর পরেও আসল হচ্ছে পড়াশোনা। আমার সম্পর্কে আগে ভালো করে জেনে আসো, তারপর এসব আবদার করতে আসবে। এখন যাও।’
রাশেদরা বলল, ‘ঠিক আছে, আমি হাইকম্যান্ডে কথা বলে আপনাকে জানাবো। তাহলে ক্লাসের ছেলে-মেয়েদের আমি নিয়ে যাব। আমাদের পথ-ঘাটে গাড়ি চলাচল যাতে ঠিক করে হয়, জ্যাম না হয়, তা আমরা ছাত্ররা দেখব।’
সোমনাথ বললেন, ‘জ্যাম দেখার কাজ পুলিশের। পুলিশ সেটা দেখুক, তোমরা ক্লাসে যাও। ক্লাস করো।’
রাশেদ মাথা নাড়তে নাড়তে চলে গেল। সোমনাথ ক্লাসের দিকে ফিরলেন, ‘তোমরাও জেনে রেখো, এই দেশ গড়ার পেছনে আমরাও ছিলাম, আছি, থাকব। তোমরা ইতিহাস পড়বে, দেশের ইতিহাস পড়বে, জাতির ইতিহাস পড়বে। কিন্তু সবার আগে তোমাদের জানার দরকার এই সমস্ত পরিবর্তন কিন্তু একদিনে হয়নি। সময় লেগেছে। স্বৈরাচার সরিয়ে যদি স্বৈরাচারকেই হাত ধরে নিয়ে আসো, তাহলে এত মানুষের আত্মত্যাগে কার লাভ হল?’
গোটা ক্লাস যেন ভয়ে সিঁটিয়ে আছে। সোমনাথ মাথা ঠান্ডা করে সময় নিয়ে পড়ালেন। ক্লাস শেষে প্রিন্সিপাল রুমে গিয়ে বসে বললেন, ‘রাশেদরা এসেছিল। আমাকে পদত্যাগ করতে বলেছে। আমি আমল দিইনি, কিন্তু মনে হয় না এসব করে বেশিদিন আটকে রাখতে পারব। এই সব কিছুর আগে আমার একটা দ্বিধা ছিল, ছাত্রদের আন্দোলনের নামে আমরা হয়তো কিছু দরজা ভুল করে খুলে দিয়েছি স্যার। সেই দরজাগুলো আমাদের খোলা উচিত হয় না। কাল রাত থেকে আমি অনেকগুলো খবর পেলাম। কোনো খবরই সুখকর নয়। এ-রকম চলতে থাকলে বুঝতে হবে আমার দ্বিধাগুলো ঠিক ছিল।’
প্রিন্সিপাল স্যার বিষণ্ণ হেসে বললেন, ‘দরজাগুলো খুলে গেছে স্যার। এবার সত্যিই দেশ বিপদের মুখে পড়বে।’
