কট ইন ফিয়ার

কট ইন ফিয়ার

বাড়ি ফিরছি কলেজের প্রথম শেষনের পড়া শেষ করে। অস্বাভাবিক রকমের বৃষ্টি হচ্ছে কয়েকদিন ধরে। ভরা জোয়ারের একটু আগে বা পরে ছাড়া খেয়া পার হওয়া অসাধ্য। কারণ নদীর জল বাড়তে বাড়তে হেলেমন্টে পৌঁছে গেছে, এমনকি প্রতিটি নালা ও খালের জল তীর ছাপিয়ে গেছে।

আমি সরাইখানায় আটকে রইলাম, পড়ন্ত বিকেল পর্যন্ত। কারণ যেমন বৃষ্টি তেমনই ঝড় চলছে সারাদিন ধরেই। অন্ধকার ঘনিয়ে এল খেয়া ঘাট পৌঁছানোর আগেই। মাঝরাতের আগে পারাপারের উপযুক্ত জোয়ার পাবার কোন আশা নেই। কোনো উপায় নেই অগ্নিকুণ্ডের পাশে বসে অপেক্ষা করা ছাড়া। খেয়ার মাঝি খুবই বৃদ্ধ এবং অথর্ব বলে কেশ অস্বস্তিবোধ করতে লাগলাম, রাতের বেলায় সাধারণতঃ নৌকা চালায় তার ছেলে ডি, রাতে নদী পার হয়ে কোনো যাত্রীরই আসার আশা নেই। কারণ আকাশের অবস্থা তেমন ভালো নয়।

নোঙর করা একটি দড়ির সাহায্যে নৌকাটাকে এপার-ওপার করা যায়, সেই কারণেই এখানে। ডিকের উপস্থিতির কোনো প্রয়োজন ছিল না। যাত্রীরা নিজেরাই যাতে অন্য কারোর সাহায্য ছাড়া নৌকাটাকে টেনে নিয়ে যেতে পারে তাই আরও একটি দড়ি এপার থেকে ওপারে টেনে দেওয়া হয়েছে স্রোত বেশী থাকলে। আমার একটা হাত বুলিয়ে বাঁধা থাকায় আমার পক্ষে এ কাজ সহজ না হলেও যারা করে তাদের কাছে এ কাজটি খুবই সহজ।

একটি চটপটে সুদর্শন গ্রামের ছেলে ঘরে ঢুকল, মাঝি আর তার বৌ, যারা অগ্নিকুণ্ডের পাশে ছিল তাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে। তার সঙ্গে একজন আসন্ন প্রসবা তরুণী এবং মাথায় একটি পালকযুক্ত টুপি। তাদের জানানো হল খেয়ার অবস্থা। খেয়ার অবস্থা জানিয়ে তাদের বলা হল যে ভিক ফিরে আসা পর্যন্ত তাদের অপেক্ষা করতে হবে। অথবা তারা নৌকাটি টেনে নিয়ে যেতে পারে।

তাদের বিয়ে হয়েছে কয়েকদিন আগে। তারা রেজিমেন্টে যোগ দিতে চলেছে। রালফ নক্টন ছেলেটির নাম, সে হল নবনিযুক্ত সৈনিক। গ্রাম্য গীর্জার পুরোহিতরা সেদিনই তাদের বিয়ে দিয়ে দিয়েছে যেদিন তারা সেনাদলে ভর্তি হয়েছিল। অল্প কয়েক মিনিট পরেই মেয়েটি ছেলেটির প্রতি অপ্রসন্ন এবং রুক্ষ হয়ে উঠল এবং ছেলেটিও যে তার প্রতি খুব একটা প্রসন্ন নয় তা বোঝা গেল, যদিও তাদের আগেকার ভালবাসা বা ঘনিষ্ঠতা কতদূর কি ছিল তা জানি না।

মেয়েটি ছেলেটিকে বারবার তিরস্কার করছে, তার দিকে ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে, এবং সামান্য কথাই বলছে, তাতে যা শোনাচ্ছে তা হল, যে ক্ষমতা থাকলে সে কখনই স্বামীর কাছ ছেড়ে দূরে চলে যেত না এবং আরো এই বলে তিরস্কার করছে সে সেনাদলে তাড়াতাড়ি ভর্তি হয়েছে তাকে ও তার অজ্ঞাত সন্তানকে ছেড়ে চলে যাবার জন্য।

একথা অস্বীকার করা যাবে না যে মেয়েটির অসামান্য রূপ এবং ব্যক্তিত্ব আছে এবং একটি কলহপ্রিয়তাও আছে। নক্টন তাকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বিয়ে করেছে এ কথা যখন আমি শুনলাম তখন আমি বিস্মিত হইনি খুব একটা। এই বেচারিকে সারাজীবন একজন দুর্ভাগাকে বয়ে বেড়াতে হবে। গ্রাম্য গির্জার লোকগুলি এমনই সহানুভূতিহীন এবং বিবেকহীন। অথচ গ্রাম্য গীর্জার ঘাড়েও সে তার অজ্ঞাত সন্তানের ভার চাপিয়ে দিতে পারবেনা। এই ভেবেই আমার খুব দুঃখ হয়েছিল। তারা যেন তাদের ভাগ্যকে মেনে নেয় এই বলে খেয়ার মাঝি ও তার স্ত্রী তাকে অনেক ভাবে বুঝিয়েছিল। কিছুটা উদার ও বেপরোয়া স্বভাবের ছিল এই নবনিযুক্ত সৈনিকটি। তাকে কিছুটা শান্ত বলে মনে হলেও তার সঙ্গিনীটি ছিল খিটখিটে এবং খেয়ালী প্রকৃতির। সে রাতে আর এক পাও নড়বে না এই কথা সে কোনো ভদ্রতা বা ভব্যতার পরোয়া না করেই চীৎকার করে বলল, কারণ জলের একটা প্রচণ্ড ঝাপটা জানালার গায়ে এসে আছড়ে পড়েছিল।

কাল সকালেই সেনাদল যাত্রা শুরু করবে, মেরীতুমি যাই কর আমাকে যেতেই হবে, ক্যাপ্টেন আমাকে এত বেশী সময় শহরে থাকার অনুমতি দিয়েছেন সেহেতু তুমি আমার সঙ্গে যাবার জন্য গোছগাছ করে নিতে পার–এই কথা নক্টন বলে উঠল।

এটা একটা নিষ্ঠুরতারই পরিচয় দিচ্ছে যে তার এই অবস্থায় আর এই আবহাওয়ার মধ্যে তাকে জোর করে পথে বার করা হয়েছে। এই কথা মেয়েটি তীব্র ভাষায় বলে উঠেছিল।

নক্টন তার হাসিখুশি স্বভাবের সম্পূর্ণ বিপরীতে কিছু একগুয়েমির সুরে জানিয়ে দিল, বৌয়ের এমন কোন ক্ষমতা নেই যে আমাকে সেনাদলে যেতে আটকে দেবে। সে তার বৌয়ের কোনো কথাতেই কান দিল না।

সে বাইরে কিছুক্ষণ একলা কাটিয়ে ফিরে এল। তার উজ্জ্বল চোখ, ছাইয়ের মতো বিবর্ণ মুখ নিয়ে সে বলতে লাগল, আমি আর অপেক্ষা করতে পারছি না মেরি। নৌকা প্রস্তুত, বৃষ্টি থেমে গেছে। নদীও তত ভয়ঙ্কর নয়। এই কথা বলার সময় তার ঠোঁট কাঁপতে লাগল।

ছেলেটি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল, যদিও মেয়েটি বৃথাই প্রতিবাদ করল। একলা এখানে পড়ে থাকা বা স্বামীর সঙ্গে যাওয়া এছাড়া মেয়েটির আর কোন তৃতীয় পথ খোলা নেই। নদীতে সবে জোয়ার এসেছে, সৈনিকটিকে কিভাবে দড়ি ধরে এগোতে হবে, সেই সম্বন্ধে বুড়ো মানি তাকে কিছু নির্দেশ দিল, এবং তাদের সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে নৌকায় চড়তে সাহায্য করল।

সব সময়ে সুন্দরীদের জন্য করুণা জমা রেখে কেন যে ছেলেগুলোকে দোষ দেওয়া হয়। একথা মাঝি তার বৌকে রসিকতা করে বলল।

বিদ্যুতের একটা ঝলকানির সঙ্গে একটা প্রচণ্ড বজ্রের গর্জন হল যা আমি আগে শুনিনি, এবং ঠিক সেই মুহূর্তেই বৃষ্টি ও ঝড়ের শশঝরঝর শব্দ ছররা গুলির মত এসেআছড়ে পড়ল জানালার ওপর।

একটা আর্তনাদের শব্দ শোনা গেল। বুড়ো বলে উঠল, একটা আর্তনাদের শব্দ শোনা গেল না? সেই শব্দটি কিন্তু আর দ্বিতীয়বার শোনা গেল না। নদীর জলোচ্ছ্বাস এবং সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জন ছাড়া দরজার কাছে ছুটে গিয়ে আর কোন শব্দ পেলাম না।

.

ডিক বাড়ি ফিরল একটু বাদেই। তাকে সঙ্গে নিয়ে আমি নৌকায় উঠলামকারণ নৌকাটা আগের জায়গায় ফিরে এসেছে ইতিমধ্যেই। হঠাৎ একটি অজ্ঞাত ব্রাসে আমি কাঁপতে লাগলাম। একটি আকস্মিক দুর্বোধ্য আতংক আমাকে পেয়ে বসল। সেইমাত্র আমি আমার মাথাটা বালিশের ওপরে রেখেছি। আমি অনেক কষ্টে আমার বাড়ির লোকজনদের জাগিয়ে রাখা থেকে প্রবৃত্ত করলাম। কারণ আমার মনে হল যে আমার চারপাশে অদৃশ্য কেউ যেন ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার ফলে ঘুম ভাল হল না, অদ্ভুত সব স্বপ্ন দেখে বারবার ঘুম ভেঙে যেতে লাগল। স্বপ্নে দেখলাম, মুখ ভোলা কবর, ফাঁসির দড়ি যা বাতাসে দোদুল্যমান, মুখ খোলা কবর এবং একটি সৈনিকের ভয়ঙ্কর মূর্তি যা একটি নারীকে হত্যা করছে। আমার স্মরণে এরকম দ্বিতীয় কোনো রাতের কথা আসে না।

আমার মন থেকে সব মেঘ সরে গেল যখন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে খুশী মনে যাত্রা শুরু করলাম। তাদের কথা আর মনেই এলনা। যারা ছিল সেই নবনিযুক্ত সৈনিক এবং তার বৌ। সকাল বেলার উজ্জ্বল উদয় সূর্যের আলোর মধ্যে।

আমার উপর একটা অকারণ মনের ভাব পরের বছর সেই একই দিনে আমাকে চেপে বসল। মনটা যেন রোগে আক্রান্ত হয়েছে, আজ সেই ভাবকে সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করলেও তা পারলাম না।

অনেক চেষ্টা করেও এই প্রকার অস্বস্তিকে কাটাতে পারলাম না যেমন করে শরীর থেকে জ্বর চেষ্টা করলেও ছাড়ে না। এক সময় মনমরা অস্বস্তিতেও ঘুমিয়ে পড়লেও মধ্যরাতে একটি বীভৎস ও অবর্ণনীয় আতঙ্কে আমার ঘুম ভেঙে গেল। একই ধরনের সেই অভিজ্ঞতা হল যা পূর্বেও একবার ঘটেছিল। এক অদৃশ্য অতিথি আমার চারপাশে যেন ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং সেই মুহূর্তে আমার নক্টন ও মেরি ব্লেকের কথা মনে পড়ে গেল। এই অসুখী দম্পতি যেন পরস্পরের ওপর দোষারোপ করছে এই অপচ্ছায়া ছাড়া কিছু দেখছি না।

হতভাগিনী বধূটি আমার দিকে যেন ঘুরে দেখল। যখন চোখের দৃষ্টি সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে তাকালাম আরেকবার। আমি কেমন করে যে আতংকের কথা বর্ণনা করব একদিন যে রক্তিম সুন্দরীকে দেখেছিলাম তার পরিবর্তে একটি কংকালের মূর্তি। বাড়ির লোক আলো হাতে নিয়ে ছুটে এল আমার ভয়ার্ত কণ্ঠের চিৎকার শুনে। আমি লজ্জায় বলতে পারলাম না। একটি দুঃস্বপ্নের ঘাড়ে সবকিছু চাপিয়ে দিলাম থামবার চেষ্টা করে।

একটি খনিজ জলের স্বাস্থ্যকেন্দ্র যা পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত সেখানেই এই ঘটনা ঘটেছিল। বোর্ডিং হাউসে আমি ছিলাম কয়েকজন অপরিচিত লোকের মধ্যে। সেখানে একজন বুদ্ধিমান এবং তীক্ষ্ণ দৃষ্টিসম্পন্ন লোক দেখেছিলাম, তিনি ছিলেন দীর্ঘকায়, পাণ্ডুর মুখ সম্পন্ন এবং আকর্ষণীয় দেহ গঠন সম্পন্ন একজন জার্মান। অসাধারণ চাতুর্য সম্পন্ন ছিলেন তিনি। দলের অন্য সকলের থেকে একটু দুরে যাবার জন্য তিনি প্রাতঃরাশের টেবিল থেকে উঠে বাড়ির সামনের লনে আমায় নিয়ে গেলেন। তারপর আমায় বললেন

মশাই একটা অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নকরছি আপনাকে, দুঃস্বপ্ন কিছু কিকালরাতে আপনি দেখেছিলেন, যা দেখে আপনার ভয় হয়েছিল?

–আপনার প্রশ্নের আমি খোলাখুলি জবাব দেব, এ প্রশ্নের অর্থ কী?

–এটা খুবই যুক্তিপূর্ণ, প্রকৃতি কোন্ রহস্য মূর্তিতে দেখা দেবে সেই কল্পনাশক্তি আমি আমার এক চিত্রকর বন্ধুর ছিল যা আমি আর কারো মধ্যে তেমনটি দেখি নি। আমার চিত্রকর বন্ধুর একটি ছবির বিষয়বস্তু ছিল যে ব্রুটাসের অশুভ প্রতিভা যখন ফিলিপিনসে নিয়ে যাওয়া হয় সেই দৃশ্যটি এবং আমার চেহারার সঙ্গে বেশ মিল আছে ব্রুটাসের। কাল সকালে যখন আপনার ঘরে ঢুকলাম, তখন আমাকে এতটাই ব্রুটাসের মত লাগছিল যে একটা ভূত দেখেই আপনি চমকে উঠেছিলেন একথা আমি শপথ করে বলতে পারি।

সেই সবকথা তাকেও বললাম যা তোমাকে বলেছি। এটা খুবই আশ্চর্য যে, একটি ধারণাতীত সহানুভূতি আপনাকে জড়িয়ে ফেলেছে এই সব দুঃখী মানুষের ভাগ্যের সঙ্গে। স্বপ্নের অপচ্ছায়ার বাইরেও বেশী কিছু অবশ্যই আছে এইসব নতুন আবির্ভাবের মধ্যে।

আমাকে ছোবল মারল এই সমস্ত অস্বস্তিকর কথাগুলি যেন একটি ভয়ের অনুভূতি নিয়ে। সবকিছু সম্পূর্ণ ভুলে গেলাম অচিরেই সেই ভাবটা কেটে যাবার পর।

সেই মনের ভার ও অকারণ ত্ৰাসতখনও ছিল যখন আবার এল বছর ঘুরে সেই দিনটি। আমার ঘুম ভাঙিয়ে দিল প্রথমবার ঘুমের পরে দ্বিতীয়বার সেই রহস্যময় সন্ত্রাসের অনুভূতি এবং বিভিন্ন প্রকার অশুভ লক্ষণ দেখা দিয়েছিল বিছানায় শুতে যাবার আগে। একটা অন্যরকম দৃশ্য দেখেছিলাম, পার অবস্থা, নতুন কাগজের মোড়ক থেকে খোলা স্কন্ধত্ৰাণ পড়ে পাণ্ডুর অবস্থায় বিছানায় শুয়ে রয়েছে কেবলমাত্র নক্টন।

এই যন্ত্রণা আমি ভোগ করছি সাত বছর ধরে। মেরি ব্লেককে কোনদিনও দেখিনি যদিও প্রতি বছর বছর নতুন ধরনের দৃশ্য দেখি আমি। ভোজ উৎসবের দ্রব্যাদি সাজানো একটি টেবিলের সামনে এড-ডি-রংয়ের পোশাক পরে বসে রয়েছে নক্টন। যা কেবল আয়নায় দেখা যায়, তা আমি দেখেছিলাম চতুর্থ বছরে।

মেরি যেন একটি তরবারি হাতে নিয়ে কামানশ্রেণীর প্রাচীর বেয়ে উঠছে যা আমি পঞ্চম বছরে দেখলাম। সূর্য অস্ত যাচ্ছে পিছনদিকে। সব ছায়া মূর্তি এদিক-ওদিক ছড়িয়ে রয়েছে, যাতে রয়েছে গম্বুজ এবং প্যাগোডা। ছবিটি একটি হলেও সেটি ছিল খুবই স্পষ্ট এবং জীবন্ত প্রকৃতির।

রোগে শায়িত অবস্থায় কিন্তু আঘাতের ফলে নয় এরকম অবস্থায় তাকে একটি কোচে দেখলাম ষষ্ঠ বছরে, বুকে একটি তারকা লাগিয়ে বসে রয়েছে একজন পদস্থ অফিসার তার পাশে। যে অফিসারটির সঙ্গে কথা বলে খুবই খুশি হচ্ছে এই রকম নিস্তেজ অবস্থাতেও।

এরপর রণক্ষেত্রে ঘোড়ার পিঠে তাকে দেখলাম সপ্তম বছরে। তার মুখে একটি তরবারি আঘাত করছে, রক্ত ঝরছে তার সামরিক পরিচ্ছদের উপর থেকে এবং এটি দেখলাম আমি তার দিকে চেয়ে থাকতে থাকতেই।

আর কোনো অশরীরী আত্মা এসে হানা দিল না এবং বছরের পর বছর কেটে গেছে এর মধ্যে। সুস্থ অবস্থা ফিরে এল আমার মন ও স্মৃতিতে। বন্ধুদের কাছে বলি, অদ্ভুত অতীন্দ্রিয় ঘটনা হিসাবে প্রতি বছর তাদের ফিরে দেখার গল্প এবং মাঝে মাঝেই মনে পড়ে নক্টন ও মেরি ব্লেকের কথা।

এটি একটা অদ্ভুত যোগাযোগের কথা আমার জার্মান বন্ধুটি যেখানেই হাজির থাকেন সেখানেই আমি আমার এই স্বপ্নটির কথা বলে থাকি। আমার স্মৃতি তখন বেশ অস্পষ্ট হয়ে আসছে বলে আমি অনেক সময় আর অনেক প্রশ্নের সঠিক উত্তরও দিতে পারি না। সেরকম ঘটনা ঘটেনি তার বেলায়। স্বপ্নের মধ্যে আমি যা কিছু বলেছি, বা আমি নিজে যা কিছু দেখেছি তিনি লিখে রেখে গেছেন তার সমস্ত বিবরণও। তিনি অনেককাল ধরে নির্জন জীবন-যাপন করেছেন, তার স্বাস্থ্য খারাপ। তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত বিনয়ী প্রকৃতির মানুষ আমি তার নাম উল্লেখ করতে চাইছিনা। তিনি এতই উচ্চ পদমর্যাদার অধিকারী যে তার নাম করলেই সম্মুখীন হতে হবে অনেক অবাঞ্ছিত কৌতূহলের। যা এখন আমি আবার গল্পে ফিরে যাই।

এরপর থেকে ঠিক চৌদ্দ বছর পর, যার মধ্যে সাত বছর কেটেছে আমার ভয় এবং আতঙ্কে এবং আর বাকী সাত বছর কেটেছে খুবই নিরুপদ্রবে। আমার সেই জার্মান বন্ধুটি একদিন এসে আমার সঙ্গে দেখা করে গেলেন ঠিক চৌদ্দ বছর পরে। নানা দুঞ্জেয় বিষয়ে তিনি ছিলেন প্রগাঢ় পণ্ডিত তাই তার সঙ্গে সারাদিন আমার বেশ ভালভাবেই কাটল। আমি দেখিনি কোনোদিন তার মত গূঢ় বিদ্যায় এত পারদর্শী মানুষ।

তাঁর মতে জ্যোতিষশাস্ত্র ছিল একটি বিজ্ঞান, এটি কোনো ভাঁওতাবাজী নয়। তিনি ছিলেন একজন সত্যিকারের জ্যোতিষী। তার ধারণা খুবই সুন্দর ছিল তিনি ফলাফলের কথা বলেন অত্যন্ত উজ্জ্বল ও যুক্তিনিষ্ঠ ভাষায় কোনরকম কারণ বা অনুসন্ধানের মধ্যে না গিয়ে। তিনি আমাকে সুন্দর ভাবে বুঝিয়ে বলতেন কিভাবে সমুদ্রের জোয়ারের সঙ্গে চাঁদের ভিন্ন ভিন্ন কলার সাদৃশ্য রয়েছে। নিউটনের মতকে তিনি চাঁদের পরিবর্তনসম্পর্কে স্বীকার করেননা। রাশিচক্রের বিভিন্ন লক্ষণ যেমন সূর্য কখন মেষরাশিতে প্রবেশ করে তা তিনি আমায় বুঝিয়ে বলতেন। বিভিন্ন প্রকার প্রভাব, যেমন রোগ ও অনুভূতি, বিভিন্ন জন্তু ও মানুষের আবেগ, গাছ ও ফুল প্রভৃতির ব্যাখ্যা করতেন। তিনি পাগলের প্রলাপ বলে মনে করতেন সেই ধারণাকে যে নক্ষত্রগুলি সৌরজাগতিক ঘটনার চাইতে কিছু বেশী। 

তার পাণ্ডিত্যের সমান প্রগাঢ় ছিল স্পর্শমনি তত্ত্ব সম্পর্কে রসায়ণগত বিষয়ে। তিনি নীতিশাস্ত্রের মূল কথা বলে মনে করেন পরশ পাথরের পৌরাণিক তথ্যকে এবং মৃতসঞ্জীবনীর কল্পনায় তার হাসি পায়। একটি রূপক বলে মনে করেন তিনি মৃতসঞ্জীবনীকে। তার মতে খ্যাতি অর্জনের মূল উপাদান হল অধ্যবসায়, পরিশ্রম, সদিচ্ছা এবং ঈশ্বরের অনুগ্রহ।

পরশ পাথর সম্পর্কে তার জ্ঞান ছিল খুবই সুন্দর। রোসি-ক্রমীয়ের কথা তিনি উল্লেখ করে থাকেন সেই বিষয়ে, কৃত্রিম প্রতাঁকের সাহায্যে এরা সমস্ত গোপন তত্ত্বকেই প্রকাশ করতে পারত। বাকিরা মূর্খ ছিলেন না সেই সমস্ত সম্প্রদায়ের। যে কোনো যুবকের ক্ষেত্রে সম্পদ ও সম্মান অর্জন করার জন্য, আত্মত্যাগ, ধৈর্য, বিনয় এবং ঈশ্বরে বিশ্বাস প্রয়োজন বলে তার মনে হয়।

আমি অবাক হয়ে গেছি তার নানা বিচিত্র বিষয়ের উপর স্পষ্ট আলোকপাত এবং সব কথাকে অত্যন্ত সরলভাবে বোঝাবার ক্ষমতা দেখে। তার বেশীর ভাগ বিদ্যাই দার্শনিক বিশ্বাসযোগ্যতা লাভ করতে পারে। যেমন মুখ দেখে চরিত্র নির্ণয়ের বিদ্যা, হস্তরেখাঙ্কনবিদ্যা, যাদুবিদ্যা এমনকি ডাইনী বিদ্যাও।

আলোচনা চলতে লাগল এই সমস্ত বিষয় নিয়ে। সুদক্ষ একজন সঙ্গীত শিল্পীও ছিলেন তিনি। তার প্রতিটি সুর ছিল অত্যন্ত সুন্দর এবং গম্ভীর এবং তার মূর্ত আবেগ দেখা যেত পিয়ানো বাজানোয় তার বাজনার সরলতায় যদিও এতে তার চর্চার অভাব দেখা যেত।

মাঠেই কাটল সারাটা দিন। জ্যোতিরে অনেক তথ্য তিনি আমাকে বোঝালেন, গাছপাতা, লতাপাতা এবং ঋতুচক্র প্রভৃতির সাহায্য নিয়ে। একটি অলৌকিক সঙ্গীত তিনি আমাকে শোনালেন সন্ধ্যাবেলায়। তিনি সেই বিরল মানুষ বলে আমার মনে হল, যিনি পারেন দত্যিদানদের ওপর প্রভুত্ব করতে এবং আত্মাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে। এইভাবেই ক্ৰমশঃ রাত বাড়তে থাকল।

খেয়ার মাঝির ছেলে ডিক্‌ সেই সময় এসে ঠিক হাজির হল যে সময় আমরা রাতের খাবার খেতে বসতে যাব। বুড়ো মাঝি মারা গেছে আজ থেকে বেশ কয়েক বছর আগে। আমার সঙ্গে সেই সময় গোপনে কিছু কথা বলতে চাইল ডি। বহুদূর থেকে একজন অফিসার ভদ্রলোক খেয়া পার হয়ে এসেছেন তার স্বাস্থ্যের অবস্থা ভালো নয়। সে একথা জানাল প্রথমে, তার পরে বলল, সরাইখানা খেয়াঘাটে অবস্থিত সেখানে আমি ওঁর থাকার যথাযোগ্য ব্যবস্থা করতে পারিনি।

ডিক আরো বলল আমি জানি আপনি ওর শোবার একটা ব্যবস্থা করে দেবেন, কারণ সরাইখানাটা অনেক দূরে। তাছাড়া লোকটি খোঁড়া এবং ওর উরুতে একটি হাঁ করা ঘা। তিনি ভারতবর্ষের সব চাইতে একজন সাহসী অফিসার এই কথাই তার চাকরটি আমায় বলেছে।

অসম্ভব ছিল তার সেই আবেদনকে উপেক্ষা করা। এগিয়ে গেলাম দরজার দিকে, অপেক্ষা করছিলেন ভদ্রলোক ঠিক সেখানেই। আমার বাড়িতে তার আরামের কোনো ব্যবস্থা করতে পারলে আমি খুব খুশি হব, একথা তাকে আমি খুব আন্তরিক ভাবেই জানালাম।

যেখানে তাকে নিয়ে গেলাম সেখানে আমার সেই জার্মান বন্ধুটি রয়েছে। আমি তার আচরণ ও ভদ্রতা এবং সরলতায় খুবই খুশী হলাম।

মধ্যবয়সী ভদ্রলোকটি ছিল বেশ সুদর্শন। তার মুখশ্রী ক্ষতের ফলে বিকৃত এবং সামঞ্জস্যহীন হয়ে গেছে যদিও তিনি একসময় স্বাস্থ্যবান ছিলেন এবং তার মুখশ্রীও সুন্দর ছিল। বিশেষ কোন বুদ্ধির ছাপ ছিল না তার কথাবার্তায়। তার সঙ্গে হালকা কথা বলে আমার ভালই লাগল যেহেতু দার্শনিক সঙ্গীটির সঙ্গে সারাটা দিন উচ্চ বুদ্ধিদীপ্ত আলোচনায় আমি ব্যস্ত ছিলাম। আগে কোথাও তাকে দেখেছি মনে হলেও ঠিক কোথায় তা আমার মনে এল না।

সে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন স্মৃতির পাতা খুঁজতে খুঁজতে একাধিকবার। তিনি যে আমাকে চিনতে পেরেছেন তখনই বুঝতে পারলাম যখন দেখলাম তার কথা বলতে বলতে দুই চোখ অশ্রুজলে ঝাপসা হয়ে এসেছে। তার কাছে বেশী কিছু জানতে চাওয়া যে আতিথেয়তার বিরুদ্ধে সে কথা বুঝতে পারলাম বলে আর বেশী কিছু জিজ্ঞেস করলাম না।

হঠাৎ দেখলাম, আমাদের সামনের বন্ধুটি প্রথমে আগ্রহ সহকারে আমাদের দুজনের দিকে নজর রাখলেও পরে তার আগ্রহ কমে গেল। এবং তিনি চিন্তার মধ্যে ডুবে গেলেন। আমাকেই তখন অতিথি আপ্যায়নের চেষ্টা করতে হল। অনেক বছর তিনি ভারতবর্ষে কাটিয়েছেন সে কথা বললেন তার কর্মসুখ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে।

আমার মুখটা কেমন বিকৃত হয়ে গেছে তিনি বলে উঠলেন। আট বছর আগে আমি বরপটনায়ের যুদ্ধে এই সময়তেই নিযুক্ত ছিলাম। আমার হঠাৎই মাথা থেকে পা পর্যন্ত শিউরে গেল আমার জার্মান বন্ধুটির দিকে চোখ পড়তেই। কারণ সেই মুহূর্তে নবনিযুক্ত সৈনিক নক্টন ও মেরী ব্লেকের কথা মনে পড়ে গেল। আমার কছে সেটাই দৈববাণী বলে মনে হল যখন জার্মান বন্ধুটি তার সঙ্গে ভাষা ভাষা ভাবে কথা বলতে লাগলেন। তিনি কোনো রকম অসদুদ্দেশ্য ছাড়াই ঘুরিয়ে–ফিরিয়ে নানা কথা বলতে লাগলেন এবং বারবার একটা কথাতেই ফিরে যেতে লাগলেন যে তারও একটা আকস্মিক ভাগ্য বিপর্যয় ঘটেছিল সেই একই দিনে।

 তিনি বলে চললেন, একটা খাতায় আমি এসব ধরনের ঘটনা সবকিছু লিখে রেখেছি, খাতাটা এই বাড়িতেই আছে। আমি সেটি নিয়ে আসছি। আপনার ভাগ্যের সঙ্গে আমার জীবনের কোনো মিল আছে কিনা তা আমি মিলিয়ে দেখছি। এই দিনটিতে আপনার ও আমার অন্যান্য ব্যাপারের সঙ্গে।

ভদ্রলোকের এই সব কথা শুনে মুখখানি ম্লান হয়ে গেল বলে আমি বেশ বুঝতে পারলাম। তিনি তার বিচলিত ভাব ওপরে প্রকাশ করলেন না। কিন্তু নির্বিকার ভাবেই বললেন যে সকালে সেটা দেখবেন। নাছোড়বান্দা ছিল দার্শনিক বন্ধুটি। তাকে খাতাটা আমি নিয়ে আসতে বললাম কারণ আমার যে তখন কি মনে হয়েছিল। অতীতে অনেকবার সে আশ্চর্য আতঙ্কের অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে সেই ভাবই যেন আমাকে ভর করছে এবং সেইটাই যেন আমাকে প্ররোচিত করছে খাতাটা আনতে। আবার এই ঘটনাই ভদ্রলোককে প্ররোচিত করেছে, এবং বিচলিতও করছে। আমাকে এই ঘটনাই যেন সেই কারোর দিকে ঠেলে দিতে চাইছে যার ব্যাখ্যা খোঁজার জন্য অনেক বছর ধরে একটি যন্ত্রণা আমাকে সহ্য করতে হয়েছে।

নবাগত লোকটি যদিও স্বস্তিও বোধ করছেন না তথাপি তিনি বাধা দিলেন না সেহেতু আমরা দুজনেই এটা চাইছি। তিনি এমন কী শুতে যাবারও প্রস্তাব দিলেন কারণ তার অস্বস্তি এতই বেড়ে উঠল, তিনি আর উচ্চবাচ্য করলেন না যখন তাকে আমি ঠাট্টা করে অপেক্ষা করতে বললাম।

খাতা নিয়ে অচিরেই ফিরে এলেন বন্ধুটি। খাতাটা খুবই অদ্ভুত, এটিতে একটি তালা লাগানো, এটি চামড়া দিয়ে বাঁধানো এবং তিনটে পিতলের আঙটা দিয়ে এতে আটকানো থাকে। খাতাটা ঐন্দ্রজালিক। প্রাচীন প্রকৃতির এবং এটি দেখতে খুবই অদ্ভুত। খাতার মাঝখানে একটি আয়না বসানো যাতে টিউটানিক ভাষায় লেখা আমি তোমাকে দেখাব তোমার সত্ত্বাকে এবং এটির কোণ গুলি পিতলের বোতাম দিয়ে আটকানো রয়েছে। বন্ধুটি খাতাখানা প্রথমে নিয়ে নবাগতের হাতে দিলেন। তার প্রস্থানের কিছু কিছু প্রতীক চিত্রকে ব্যাখ্যা করলেন। বিশেষ করে আয়নার চারি দিকগুলো ভালো করে বুঝিয়ে দিলেন এবং অবশেষে তালাটি খুললেন।

আমার বন্ধুর ব্যাখ্যাগুলি খুবই রহস্যময় ও দুর্বোধ্য মনে হল তা প্রতীকগুলোর প্রয়োজনেই হোক বা উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়েই থাক।

অনেক কষ্টে অপরিচিত লোকটি সংযত রাখলেন নিজেকে কারণ তিনি নিজে খুবই বিচলিত বোধ করছেন। একটি বিকৃত বীভৎসতা ফুটে উঠল তার মুখে এবং তার মুখের সব রং মুছে গেল। তার হাত থরথর করে কাঁপতে লাগল যখন তিনি খাতাটা ফিরিয়ে দিলেন। খাতাটা নিয়ে দার্শনিক তখন তাকে বললেনঃ

এ খাতায় যা লেখা আছে তার অর্থ যারা না বুঝবে তাদের কাছে এটি কেবল অর্থহীন চিহ্ন বলেই মনে হবে, এতে এমন অনেক কিছু আছে যা চোখে পড়বে না সকলের।

তিনি এরপর খাতাখানা খুলে ফেললেন চাবি ঘুরিয়ে তালার। আমার নবাগত অতিথিটি শ্বস টানছেন ঘন ঘন তা বুঝতে পেরেছিলাম। চামড়ার কাগজের পাতাগুলি সযত্নে উল্টে দেখতে লাগলেন জার্মান ভদ্রলোক। তিনি উচ্চস্বরে পড়তে শুরু করে দিলেন। আমার সর্বশেষ অপচ্ছায়া দেখার বিবরণটি যখন খুঁজে পেলেন। এটি একটি ভুলে যাওয়া ছবির স্থির চিত্র বলা যেতে পারে। এতে অনেক কিছুই ছিল, আমি নক্টনকে যে অবস্থায় দেখেছিলাম তার বিবরণ ছাড়াও অন্য কিছুর সঙ্গে তারও একটা সুন্দর বিবরণ ছিল যে সেনাপতিটিকে আমি আমার বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলাম।

এ বিবরণ আপনি কোথায় পেলেন, এ যে বৃদ্ধ ত্রিটন স্বয়ং। এর চুলের সিঁথিও ছিল ঠিক ওইরকম বাঁকানো। একথা আমি শপথ করে বলছি।

আমার সারা শরীরকে শিহরিত করে তুলল এক ভয়ঙ্কর কাপুনি। আমি পাথরের মূর্তির মত একেবারে নিশ্চল হয়ে এবং কাঠ হয়ে বসে রইলাম।

এরপর আমার ষষ্ঠ অপচ্ছায়া এই দর্শকের বিবরণটি তিনি খুঁজে পেলেন, খাতার উপর চোখ রেখে। সেই সংবাদের বিবরণই সেখানে লেখা ছিল, সে যুদ্ধে তার মুখে যে আঘাত পেয়েছিল। তার মুখের বিবরণ সহজেই নজরে পড়ল। যদিও তিনি এতে আগের চাইতে কম বিচলিত হয়েছিলেন।

দর্শনের বিবরণ আরো সুস্পষ্ট আতঙ্কের সৃষ্টি করল এই পঞ্চম অপচ্ছায়া। বিবরণটি ছিল সুস্পষ্ট, অতি মাত্রায় এতে ছিল তরবারি হাতে নক্টনের আবির্ভাব, দুর্গ প্রাচীরে জীবন্ত চিত্র, উজ্জ্বল প্রাকৃতিক দৃশ্য যা গম্বুজ ও প্যাগোড়া শোভিত এই সবই ফুটে উঠেছিল শঙ্কুচিত্রের মধ্যে দিয়ে শিল্পীর আঁকা ছবির মত। নবাগত লোকটি তার অতীত স্মৃতি রোমন্থনে খুশি হয়ে উঠলেন, সমস্ত উৎকন্ঠাকে ভুলে গিয়ে।

নক্টনকে এড-ডি-রংয়ের পোশাকে ভোজের টেবিলে উপবিষ্ট অবস্থায় বর্ণনা করা হয়েছে চতুর্থ অপচ্ছায়ার বিবরণ দিতে গিয়ে।

জার্মান সেনাপতির সঙ্গে ডিনার খাবার সম্মান আমি প্রথম লাভ করেছিলাম সেই রাতেই, তিনি চীৎকার করে বলে উঠলেন, তার নিজের কথার অর্থ না বুঝেই।

দর্শকের বিবরণ দার্শনিক পড়তে লাগলেন যা আমি তাকে বলেছিলাম, পাণ্ডুর মুখে আবৃত অবস্থায় নক্টন টান টান হয়ে শুয়ে রয়েছেন এবং তার গায়ে নতুন স্কন্ধত্ৰাণ পরানো। এটাই ছিল সেই নক্টনের বিবরণ। এই পুঁথি তো জীবনের লোকটি হঠাৎ চীৎকার করে বলে উঠলেন।

মেরি ব্লেকের সমাধিস্থ চেহারা দেখে আমার নিজের মনোভাবের বর্ণনাই জার্মান ভদ্রলোক দ্বিতীয় দর্শনের পাতাটা উল্টে ধীরে ধীরে পড়তে লাগলেন। সুতীব্র হাহাকারের মত আতঙ্কের সঙ্গে নবাগত লোকটি বলে উঠলেন। তার আত্মা এসে আমাকে যেন তিরস্কার করছে, সেই রাতে আমার শিবিরে বসে এ কথাও আমার মনে হয়েছিল।

আমার জার্মান বন্ধুটি এরপর আসন থেকে উঠে বাঁ-হাতে খাতাটিকে স্পর্শ করলেন এবং তারপর কঠিন দৃষ্টিতে নবাগতের দিকে তাকালেন এবং বলতে শুরু করলেন এমন সময়ে, যখন আমার মুখে কোনো কথা ছিল না। কথাগুলি হল, আপনিই র‍্যালনক্টন, আপনি সাত দুগুণে চৌদ্দ বছর আগে ঠিক এই রাতেই মেরি ব্লেককে খুন করেছিলেন। এই কথাই আমার খাতায় এবং আপনার বিবেকের পাতায় লেখা রয়েছে।

আতংকে চীৎকার করে উঠে নবাগত লোকটি তার সংযম হারিয়ে ফেললেন।

এ কথাটিই ঠিক, তিনি আমাকে ভর্ৎসনা করতে লাগলেন। সেই সময় বৃষ্টি এবং ঝড় এল ধেয়ে নদীতেও গর্জন উঠল, বিদ্যুৎ চমকাল। আমি তাকে নৌকা থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম, সে বজ্রের গর্জন তার অভিসম্পাতের মতই ভয়ঙ্কর নয়।

তিনি এই কথা বলে তারপর টলতে টলতে সেখান থেকে পা বাড়াবার চেষ্টা করলেন, আর ঠিক সেই মুহূর্তেই মেঝের ওপর ঢলে পড়ে মারা গেলেন তার সমস্ত আত্মদোষ স্বীকৃতির কোনো কিছু জবাব দেবার আগেই।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *