৩.৫ শেষ বিকালে

শেষ বিকালে গনি মিয়ার ঘাটে কোষানাও ভিড়াল মুকসেদ। নামেন মাস্টার সাব।

মতিমাস্টার বসেছিল নাওয়ের মাঝখানকার পাটাতনে। কোষানাওখান কিনার পরই। নতুন বাঁশের চটি দিয়া সুন্দর করে মাচা করছে মুকসেদ। বেশ শক্তপোক্ত মাচা। আরামছে বসা যায়। মতিমাস্টার সেই মাচায় বসে থাকেন, রোদ বৃষ্টি থাকলে তার মাথায় পুরানা ছাতি। মুকসেদের ছাতির দরকার হয় না। মাথায় গোল একখান টুপি আছে ওই টুপি যেন। ছাতির কাজ দেয়। রোদ বৃষ্টি কিছুই যেন মাথায় লাগে না।

এখন তারা ফিরল সীতারামপুর থেকে। সীতারামপুরের বদর কারিগরের ছোট ছেলেটাকে পড়ান মতিমাস্টার। শ্রাবণমাসে দেশগ্রামের ইসকুলগুলি বন্ধ থাকে। কাজির পাগলা স্কুল বন্ধ, খাইগো বাড়ির স্কুল বন্ধ। এইজন্য ছাত্রছাত্রীরা বাড়িতেই পড়াশুনা করে। সকাল বিকাল মিলাইয়া চারজন ছাত্রছাত্রী পড়ান মতিমাস্টার আর খাইগোবাড়ির স্কুলে মাস্টারি। সব মিলিয়ে টাকা যেটুকু পান, সংসার চলতেই চায় না। গনি মিয়া কিরপিন মানুষ। তাও বাড়িতে এলে পঞ্চাশ-একশো টাকা ধরিয়ে দিয়া যান, তাও ফুরিয়ে যেতে সময় লাগে না। সংসারের চাউল ডাইল বাজার হাট, খরচা কি কম! তব বড় একখান ভরসার জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে মুকসেদ। সেই যে সাত-আটমাস আগে এক সকালে একখান টুপি মাথায় দিয়া আইসা বলল, মাস্টার সাব, আমি মানুষ হইতে চাই। আপনে আমারে মানুষ হওনের পথটা দেখান।

কী পথ মতি মাস্টার তাকে দেখাবে? যদি অল্প বয়েসি পোলাপান হত তা হলে না হয় পড়ালেখা শিখাতে পারত। মানুষ তো মানুষ হয় লেখাপড়া শিখেই। তারচেয়ে বয়সে বড় একজন মানুষ, দেশগ্রামের বিরাট নামকরা দাগি চোর তাকে কীভাবে মানুষ হওয়ার পথ দেখাবেন মতি মাস্টার? তিনি তো চব্বিশঘণ্টা আছেন প্রতিবন্ধী ছেলেমেয়ে দুইটার চিন্তায়, বউর চিন্তায়। নিজেকে নিয়া চারজন মানুষ কীভাবে খেয়ে পরে বাঁচবেন এই চিন্তায়। এই অবস্থায় একটা দাগি চোর আইসা লগে ভিড়ছে। গনির সীমানার পরই তার বাড়ি। আর মতি মাস্টারের স্বভাব এমন, সে কোনও ব্যাপারে কাউকে না করতে পারে না। মুকসেদকে এড়ায় কেমন করে? আস্তে আস্তে এমন হল, মতি মাস্টার আর তার বউ আছিয়া উদিসই পেল না, মুকসেদ তাদের সংসারের মানুষ হয়ে গেল। বাজারে গেছে, হঠাৎ মাঝারি সাইজের একখান বোয়ালমাছ কিনা নিয়া হাজির। মতির বউ হবে তার মেয়ের বয়সি, তাকে ডাকে বুজি। বোয়ালমাছ এনে রানঘরের সামনে ফেলে বলল, ভাল কইরা রান্দো বুজি। বেবাকতে মিলা খামু নে।

মাছ রানতে যে তেল মশলা লাগে, পিঁয়াজ লাগে মতির ঘরে সেইসব আছে কি না ভাবে না। আর আসল জিনিস যেটা, চাউল, চাউল আছে কি না তারও তো খবর নাই মুকসেদের। তখন হয়তো দুপুরবেলার ঠা ঠা রোদ। হিরা মানিক জামতলায় রোদে পুড়েছে। কুলে করে তাদেরকে হয়তো ঘরে নিতে হবে, তার আগে পুকুরঘাটে নিয়া গোসল করাতে হবে, আছিয়া সেই কাজ করবে না বোয়াল মাছ কুটবে! মতি মাস্টার তখনও বাড়িই ফিরে নাই।

আছিয়া পড়ে বিপাকে।

মুকসেদ প্রথম প্রথম এইসব বুঝত না। দিনে দিনে বুঝে গেল। এখন কোনও কোনওদিন হিরা মানিককে কুলে করে ঘর থেকে বের করে আনে সে, জামতলায় বসিয়ে দেয়। রোদ বৃষ্টিতে কুলে করে ঘরে নিয়া যায়। পুকুরঘাটে নিয়া মানিকরে কত সুন্দর করে গোসল করায়। হিরা মেয়ে। প্রতিবন্ধী হোক আর যাই হোক, মেয়ে তো, ষোলো-সতেরো বছর বয়স, তার কাজগুলি আছিয়াই করে। প্রতিবন্ধী হিরা মানিক অবোধের মতন এত কিছু করে, মুকসেদ বিরক্ত তো হয়ই না, তাদের মতন আচরণ করে, তাদের মতন হয়ে যায়। তাদের লগে শিশুর মতন খেলে, খলবল খলবল করে হাসে। মানিকের গুমুত সাফ করে, হোচাইয়া (শৌচকর্ম) দেয়। মতি আর আছিয়া বিস্মিত চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে।

ইরি ধান ওঠার পর একদিন আড়াইমনি বস্তার দুই বস্তা চাউল নিয়া আসল। কাজির পাগলার চাউল কলে ধান ভাঙাতে গিয়েছিল মুকসেদের ভাই জমসেদ। বছর চলার ধানটা একবারেই ভাঙিয়ে ফেলে সে। মুকসেদের কারণে জমসেদের সংসার সচ্ছল। আটজন পোলাপানের মধ্যে তিনটা মেয়ে, তাদের বিয়া দিয়া দিছে, বড় মাজারো পোলা বিয়া করছে, পোলাপানের বাপ হইছে। ধানের জমি, গোরুবাছুর নগদ টাকাপয়সা কোনও কিছুর কমতি নাই সংসারে। তিন ছেলে জমসেদের লগে গিরস্তি করে। চার নম্বর পোলা ঢাকায় ব্যাঙ্কের দারোয়ান। ছোটটা মাওয়ার বাজারে চায়ের দোকান দিছে। তবে তারা সবাই মুকসেদকে খুবই মান্য করে। বউ পোলাপান নিয়া মহাসুখে আছে জমসেদ। তবে ভাইয়ের প্রতি বিরাট কৃতজ্ঞতা তার। ভাই যা বলে তাই সই (সঠিক)। ভাইয়ের কথার উপর দিয়া পরিবারের কেউ কোনও কথা বলে না। চুরি ছাইড়া দিয়া মুকসেদ যে মতিমাস্টারের সংসারে ঢুকছে, ওইসব নিয়া আছে এই কারণে জমসেদ আর তার বউ পোলাপানও খুশি। কারণ চোরের বদনাম এই করে করে মুকসেদের একদিন ঘুচলে সুবিধা তাদেরও। মুকসেইদ্দা চোরার ভাই ভাইস্তা এইসব পরিচয় আর থাকবে না। থাকুক মুকসেদ মতি মাস্টারের সংসারে। হিরা মানিককে নিয়া ব্যস্ত থাকুক। বুড়া বয়সে হলেও মানুষ হোক।

মুকসেদের কারণে সংসারের চেহারা বদলে যেতে লাগল মতিমাস্টারের। চাউল ডাল, বাজার সওদা, মাছ তরকারি সবই ধীরে ধীরে মুকসেদ আনতে লাগল। হিরা মানিকের জামা কাপড়, আছিয়ার জন্য শাড়ি, মাস্টার সাবের জন্য পায়জামা পানজাবি লুঙ্গি, নতুন একখান ছাতি আর একখান কোষানাও, নিজের সংসারে মুকসেদ কোনওদিনও যা করে নাই। সবই মতিমাস্টারের জন্য করছে। বউ মরেছে সেই কবে, তার কথা মুকসেদের মনে নাই। একমাত্র ছেলেটা আছে টেকনাফে ফুফুর কাছে, শুঁটকি মাছের কারবার করে। বাপ বলে যে একটা লোক আছে, মনেও রাখে নাই। রাখইন মাইয়া বিয়া কইরা সংসারী হয়ে গেছে। একটি অসহায় শিক্ষক পরিবার, তাদের দুটি প্রতিবন্ধী ছেলেমেয়েকে নিয়া এই বয়সে মুকসেদ নিজের জন্য নতুন একটা জগৎ তৈরি করেছে। তাদেরকে নিয়া নিজের মতন করে বাঁচছে, মানুষ হওয়ার চেষ্টা করছে। আর এই ঘটনা দেশগ্রামের সব মানুষই জেনে গেছে। জেনে খুশি তারা। কোনও কোনও চোর যে ধর্মের কাহিনিও শোনে মুকসেদ তার প্রমাণ।

ছাতি হাতে নৌকা থেকে নামলেন মতি মাস্টার। মুকসেদের দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনে নামবেন না দাদা।

নামতাছি।

নৌকা থেকে নেমে নৌকাটা হ্যাঁচকা টানে একটুখানি চটানে তুলে রাখল মুকসেদ। পানির টানে যাতে ভাইসা না যায়। তারপর মতি মাস্টারের পিছন পিছন উঠানে উঠল। উঠান থেকে রোদ উঠে গেছে গাছের মাথায়। শেষ বিকালের নরম আলো চারদিকে। এই আলোয় জামগাছতলায় হিরা-মানিকের লগে খেলছে পারুর ছোটমেয়ে নূরি। বছর ছয়েক বয়সের মেয়েটা একদমই মিশা গেছে প্রতিবন্ধী ভাইবোন দুটির লগে। তাদের মতো করে কথা বলে, তাদের মতো করে হাসে। হিরা মানিক বোঝে নূরির কথা, নূরিও বোঝে হিরা মানিকের কথা। একেকজন একেকজনকে দেখলে এত খুশি হয়!

মুকসেদকে দেখলেও খুশিতে ফেটে পড়ে হিরা-মানিক। যেন তাদের কত আপন মানুষটি তাদের কাছে ফিরেছে। পারুর মেয়েটিও মুকসেদকে দেখলে হিরা-মানিকের মতোই খুশি হয়।

এখনও হল।

বাড়িতে উঠে মতিমাস্টার একবার আমতলার দিকে তাকালেন, তারপর চলে গেলেন বড়ঘরে।

মতি মাস্টার আর মুকসেদকে দেখে আছিয়া দৌড়ে গেছে রান্নঘরে। দুইজন মানুষের জন্য চা বানাবে, একথাল করে মুড়ি দিবে। ঘরের সামনের তক্তায় বসে চা মুড়ি খাবে দুইজনে, গল্পগুজব করবে। হিরা মানিককে দিতে হবে না কিছুই। বিকালে মুড়ি মিঠাই তারা খেয়েছে। আর এখন তো মুকসেদ বাড়ি ফিরেছে, এখন তাদের আছে অন্য আকর্ষণ।

আমতলায় এসেই শিশু তিনটির মতো করে তাদের মাঝখানে মাটিতে বসে পড়ল মুকসেদ। হিরা মানিক ছেড়ে পেছড়ে একজন এল তার কোলের কাছে, একজন এল পিঠের কাছে। নিজেদের অথর্ব হাত দিয়া জড়াইয়া ধরতে চাইল মুকসেদকে। নূরি দাঁড়িয়ে রইল দূরে। হিরা-মানিক তখন তাদের অবোধ্য ভাষায় শব্দ করছে। মুকসেদের শার্ট লুঙ্গি ধরে টানাটানি করছে। মুকসেদ ছেলেমানুষি কায়দায় হাসতে হাসতে বলল, ওলে আমাল সোনালে, ওলে আমার মানিকলে, দিতাছি মা, দিতাছি। বাজান তোমারেও দিতাছি। এই যে দেহো কী আনছি আইজ। এই যে দেহো।

শার্টের ঝুল পকেট থেকে একমুঠ লজেন্স বের করল মুকসেদ। দুই ভাইবোন থাবাথাবি শুরু করল সেই লজেন্স নিয়া। একজনে একটা ধরে তো দুইটা ছিটকা পড়ে মাটিতে। ওরা লেছড়ে পেছড়ে যায় সেই লজেন্সের কাছে। মুকসেদ সেই ফাঁকে ইশারা করে নূরিকে। নূরি গুটিগুটি পায়ে আগায়া আসে। একহাতের মুঠ থেকে দুইটা লজেন্স নূরিকে দেয় মুকসেদ। তিনটি শিশুর লজেন্স নিয়া আনন্দে ফেটে পড়া মুখ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। মনে মনে। ভাবে, এর থিকা সুন্দর দৃশ্য কি আল্লাহপাকের দুনিয়াতে আর আছে!

.

কী রে টাকি, খবর কী?

খানিক আগে বড় বড় দুই টুকরা ইলিশমাছ ভাজা দিয়া একথাল পান্তাভাত খেয়েছে মুকসেদ। লগে কাঁচা মরিচ পিঁয়াজ ছিল। খাওয়াটা দারুণ হয়েছে। আজ শুক্রবার। মতি মাস্টারের ছাত্র পড়াবার কাজ নাই। সারাদিন বাড়িতেই থাকবে। মুকসেদও থাকবে সেই বাড়িতে। অন্য একটা পরিকল্পনা আছে তার। এজন্য একবারে টাইট করে খেয়ে নিছে। এখন মাস্টার সাবের বাড়িতে গিয়া আরামছে এককাপ চা খাবে তারপর কাজে নামবে। আছিয়াবুজি চা-টা যা বানায় না! তুকখ্খার (তুখোড়)! পানি ফুটে ফুটে যখন টগবগ টগবগ শব্দ ওঠে তখন ছাড়ে চা-পাতা। চিনি আগেই দিয়া দেয় পানিতে। চা-পাতা গাঢ় খয়েরি রং। হওয়ার পর দেয় ঘন দুধ। তুকখার চা, তুকখৃখকার।

সেই চায়ের লোভে মাত্র ঘর থেকে বের হয়েছে মুকসেদ, ইব্রাজোলা এসে হাজির। ঘাটপারে ডিঙ্গিনৌকাখান রেখে উঠানে উঠছে। ঝুলপকেটঅলা নীল শার্টের বুতাম লাগাতে লাগাতে মুকসেদ মাত্র ঘর থেকে বের হয়েছে, দেখে ইব্রা এসে উঠছে। ইব্রা কথা বলবার আগেই সে খুবই ফুর্তির গলায় প্রশ্নটা করল।

ইব্রা লাজুক হাসল। আছি দাদা, মন্দ না।

তুই তো কোনওদিনও মন্দ আছিলি না বেড়া! মন্দ আছিলাম আমি। চুরি কইরা ধরা পড়তাম, মাইরা ধইরা মাইনষে হাড্ডিগুড়ি গুড়াগুড়া করতো, থানায় দিতো, ওহেনে পিডাইতো পুলিশে, তারবাদে জেল। আমার জিন্দেগি তো মাইর খাইতে খাইতে গেল রে! আর তুই আছিলি টাকি মাছের লাহান। খালি পিছলাইয়া যাইতি। কোনওদিন ধরা পড়ছ নাই, কোনওদিন একখান কিলতা খাচ নাই। বউ পোলাপান নাতি নাতকুড় লইয়া আরামের জীবন। আমি করতাম চুরি, হেই মাল বেইচ্চা ফোকটে (ফাউ) টেকা কামাতি।

ইব্রা কথা বলল না, হে হে করে হাসল।

তয় হেইদিন আমার নাইরে টাকি। চুরির কাম আমি ছাইড়া দিছি। ভদ্রলোকরা চাকরি থিকা রিটার (রিটায়ার) করে না, ভাল বাংলায় কয় অবসর গ্রহণ, আমি চুরির চাকরি থিকা রিটার করছি। অবসর গ্রহণ করছি। অহন জমসেদের সংসারে থাকি আর মতি মাস্টারের কাছে মানুষ হওনের পড়াডা পড়ি।

জমসেদের সইজ্জা মেয়ের নাম করিমন। বিয়া হইছে দামলা গ্রামে। জামাইর লগে বনিবনা হয় না। একটা মাত্র পোলা করিমনের। বছর সাতেক বয়স। ভারী টরটইরা (চঞ্চল) পোলা। নাম টিপু। বাড়ির সবাই ডাকে টিপা। মুকসেদের খুবই বাধুক টিপা। মুকসেদের লগে বসে সেও পান্তাভাত আর ইলিশমাছ ভাজা খাইছে। এখন উঠানে দৌড়াদৌড়ি করছে। মুকসেদ বলল, ওই টিপা, ইব্রা নানারে একখান ফিরি দে।

দিতাছি নানা।

দৌড়ে গিয়া দুইখান পিড়ি নিয়া আসল টিপা।

মুকসেদ অবাক। তরে কইলাম একখান ফিরি আনতে তুই দিহি আনলি দুইডা?

টিপা হি হি করে হাসল। তুমি বইবা না, নানা? ইব্রা নানায় একলা বইবোনি?

মুকসেদ মুগ্ধ। আরে বেড়া, তুই তো বিরাট চালাক। হ আমারও তো বহন লাগবো।

আকাশ আজও মেঘলা। রোদ ওঠে নাই। আকাশের একদিক থেকে আরেকদিকে কানিবকের মতন উড়ে যাচ্ছে মেঘ। যখন তখন নামবে। আবার হয়তো এইদিকটায় নামলই না, অন্যদিকে গিয়া নামল।

পিঁড়িতে বসেই শার্টের বুকপকেট থেকে কেঁচি (সিজার্স) সিগ্রেটের প্যাকেট বের করল ইব্রা। মুকসেদের দিকে বাড়িয়ে দিয়া বলল, নেন দাদা, সিকরেট খান।

নারে টাকি, সিকরেট আমি ছাইড়া দিছি।

কন কী?

আরে হ বেড়া।

তামুক?

তামুকও ছাড়ছি।

আমার তো বিশ্বাসই অইতাছে না।

হোন বেড়া, চুরির নিশাই যহন ছাড়তে পারছি তয় এই হগল বিড়ি সিকরেট পান তামুক এই হগল পারুম না ক্যা?

আপনে পারেনও দাদা।

ইব্রাহিম নিজে সিগ্রেট ধরাল।

মুকসেদ বলল, তয় চা’র নিশাডা আমার আছে। তাও বেবাকতের হাতের চা না। দোকানের চা না। আছিয়াবুজির চা।

আছিয়াবুজিডা আবার কেডা?

মতিমাস্টারের বউ।

মতিমাস্টার, আছিয়া আর হিরা মানিকের কথা ইব্রাকে বলল মুকসেদ। সবই বলল। নিজের বউর কথা তার মনেই পড়ে না। মারা গেছে কত বছর আগে। শ্বশুরপক্ষের লোকজনও মুকসেইদ্দা চোরের লগে সম্পর্ক রাখে নাই। পোলাটারে নিয়া গেছে তার ফুফু। সেই বোনও মুকসেদকে ভাই হিসাবে স্বীকার করে না। শ্বশুরবাড়ির দিক নাই, একমাত্র বোনের দিক নাই, আছে শুধু ভাই জমসেদ আর তার আট ছেলেমেয়ে। মেয়ে তিনটা আর তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন কতটা স্বীকার করে না করে কে জানে, তবে জমসেদের পোলাপান আটটা খুবই মান্যগণ্য করে মুকসেদকে। তাদের জায়গা সম্পত্তি সংসারের আয় উন্নতির মূলে যে মুকসেদের বিরাট অবদান এটা আর ভোলে নাই। মুকসেদ এই বাড়িতে রাজার হালেই থাকে। আর এবার জেল থেকে ফিরা আসার পর থেকে যে চুরির কাজ ছেড়ে দিয়েছে সে এটা দেশগ্রামে রটে গেছে। তাতে সবাই খুবই খুশি। মতি মাস্টারের মতন একজন ভাল মানুষের লগে মিলামিশা করছে, তার প্রতিবন্ধী পোলাপান দুইটারে জান দিয়া ভালবাসে, আগলাইয়া রাখে এসব কথা শুনে মানুষ ধীরে ধীরে মুকসেদের অতীত ভুলতে শুরু করেছে। দিনে দিনে পুরাটাই হয়তো ভুলে যাবে। মানুষের খারাপ দিকটা বেশিদিন মানুষ মনে রাখে না, ভাল দিকটাই রাখে।

জমসেদের জায়গা সম্পত্তি টাকা পয়সার অর্ধেকের অংশীদার মুকসেদ। তবে ওইসব নিয়া সে কখনও কোনও দাবি করে না। বাড়িতে তাকে একটা ঘর দিয়া দিছে জমসেদ। খাওয়াদাওয়া মানসম্মান সব ঠিক আছে। নগদ টাকাপয়সার দরকার হলেই জমসেদ দেয়। মতি মাস্টারের সংসারের জন্য এই তো কয়দিন আগে দুই বস্তা চাউল নিয়া গেল মুকসেদ, ওই নিয়া কেউ কোনও টু শব্দও করল না। তার বদলে ফেলা জীবন ভালই কাটাচ্ছে মুকসেদ। মনের মতন কাটাচ্ছে। গভীর আনন্দে।

এসব শুনে ইব্রাহিম আরও অবাক। তয় তো দাদা একদমই অন্য জীবন অইয়া গেছে। আপনের।

হ বেড়া। তয় কী কইতাছি তরে। জিন্দেগিতে তো ভাল কাম কিছুই করি নাই। খালি মাইনষের মাথায় বাড়ি দিছি। গরিব গিরস্ত মানুষ ধান বেইচ্চা টেকা আইন্না রাখছে ঘরে, সিং (সিধ) দিয়া হেই ঘরে ঢুইক্কা টেকাডি চুরি কইরা লইয়াইছি। গিরস্তের মাথায় বাড়ি। হেরা খাইয়া বাঁচলো না মরলো চিন্তা করি নাই। গরিব গিরস্তে মাইয়া বিয়া দিব, সোনাদানা, পিতলের কলস, তামার থাল বেবাক চুরি কইরা লইয়াইছি। দিঘলি গিয়া তুই হেই হগল বেইচ্চা টেকা আনছস। আমার অন্য শাগরেদগো লগে তুইও ভাগ পাইছস। জিন্দেগিতে পাপের আকাল নাই আমার। জানি না হেই হগল পাপের মাপ, গুনার মাপ আল্লায় আমারে করবো কি না! তয় অহন থিকা যেই কয়ডা দিন বাঁইচ্চা থাকতে পারুম হেই কয়ডা দিন জানা মতে কোনও গুনা করুম না।

ইব্রা ফুক ফুক করে সিগ্রেটে দুইটা টান দিল।

টিপা ছেলেটা তিন-চার হাত লম্বা কঞ্চির একটা ছিপের মাথায় চিকন সুতায় বাঁধা বঁড়শি নিয়া বারবাড়ির দিককার আমগাছতলায় চলে গেছে। আধার নিছে একমুঠ পান্তাভাত। রাতভর পানিতে ভিজে ভাতগুলি গোটা গোটা হয়েছে। ওই ভাত বঁড়শির আধার। এই আধার পুঁটিমাছে টপাটপ খায়।

একবার টিপার দিকে তাকাল মুকসেদ। তারপর ইব্রার দিকে তাকিয়ে বলল, খালি তো আমার প্যাচাইলই পারতাছি রে টাকি। তর খবর কী? তর কথা তো কিছু কইতাছস না?

সিগ্রেটে শেষটান দিয়া উঠানের মাটিতে ডলে ডলে নিভাল ইব্রা। আমি দাদা ভালই আছি। তিন মাইয়ার বিয়া দিছি কত আগে। বড় মাইয়ার বিয়া অইছে আমগো বাইত্তেঐ, চাচাতো ভাই ইনুসের পোলা রমজানের লগে। অর নাম তো আপনের মনেই আছে।

আরে হরে টাকি। তর তিন মাইয়ার নাম আমার মনে আছে। ফরিদা আরজু গুনাই। তর বউর নামও মনে আছে। জহুরা। কী রে, নাম ঠিক কইছি না?

ইব্রা হাসল। হ। একদম ঠিক।

হেয় তো নাতিনাতকুড় লইয়াঐ আছে, নাকি?

হ।

তর মিহি চাইয়া দেহে?

আগে দেখতো না। অহন ইকটু ইকটু দেহে।

ঢাকায় জহুরার ভাইর বাসায় গিয়া না তুই আগে থাকতি?

হ। ঢাকা গেলে অহনও থাকি।

ঢাকা যাচ ক্যা?

কায়কারবার করার চেষ্টা করতাছি।

কী কায়কারবার?

ইসলামপুরে কাপড়ের দালালি। আমার সমন্দি করে। কামাই রুজি ভাল। আমি ওই লাইনডা ধরনের চেষ্টা করতাছি।

ভাল ভাল। ঢাকায় থাকনের চেষ্টাই কর। তয় চুরির বদলামডা তরও ঘুচবো।

আমি নিজে নিজে আগেঐ চিন্তা করছিলাম দাদা…

কী চিন্তা করছিলি?

এই লাইন ছাইড়া দিমু। আইজ আপনের কাছে আইয়া আরও ভরসা পাইলাম। আমগো বয়স অইছে দাদা। এই বয়সে চুরিচামারি কইরা ধরা পড়লে, মাইরধইর খাইলে আর বাঁচুম না। পঙ্গুম অইয়া যামু। বিচনায় পইড়া থাকন লাগবো। হাইগ্না মুইত্তা বিচনা বিনাস করুম। বউ পোলাপানে চাইয়াও দেখবো না। ওই হগলের থিকা ভিক্কা কইরা খাওন ভাল।

ইব্রার কথা শুনে বহুত খুশি মুকসেদ। এইত্তো লাইনে আইছরে টাকি। ঠিক, একদম ঠিক।

তয় আইজ আপনের কাছে আইয়া, আপনের কথা হুইন্না আরও বল ভরসা পাইলাম। তিন মাইয়ার বিয়া দিয়া হালাইছি, বউ আছে নাতি নাতকুড় লইয়া, আমি ঢাকায় থাইক্কা সমন্দির লগে কাপড়ের দালালি করি। বেশি টেকার আমার দরকার নাই। নিজে চলতে পারলেই হইলো। আমিও আপনের লাহান জীবন বদলাইয়া হালাইছি।

তয় খালি নিজেরডা দেহিচ না বেডা, মাইনষের লেইগাও কিছু করি।

মাইনষের লেইগা কী করুম দাদা?

মাইনষের ইট্টু উপকার করলি, বিপদে পড়া মাইনষেরে ইট্টু সাহায্য করলি। এই হগল আর কী? ওই হগল কাম করলে দেখবি মন ভাল থাকবো, আরাম পাবি। রাইত্রে ভাল ঘুম অইবো। এই যে ধর আমি মতিমাস্টারের সংসারে পইড়া থাকি, বড় আরাম পাই থাইকা। লেখাপড়া জানা শিক্ষিত মানুষ। তয় গরিব। এমুন গরিব, তরে কইয়া আমি বুজাইতে পারুম না। দুইডা পয়সা দিয়া সাহাইয্য করনের কেউ নাই। না মাস্টারের নিজের দিকে, না হৌরবাড়ির দিকে। ছাত্র পড়ায়া, খাইগোবাড়ির ইসকুলে মাস্টারি কইরা কয় টেকা পায়। বাড়িঘর যা আছিল পঙ্গু পোলাপান দুইডার তিকিস্সায় (চিকিৎসায়) বেবাক গেছে। গনি মিয়া বাইত্তে জাগা না দিলে রাস্তায় থাকতে অইতো। এই ধরনের মানুষের অসুবিদা। কী জানচ, কইতেও পারে না, সইতেও পারে না। না ফকিরের লাহান মাইনষের কাছে

হাত পাততে পারে, না কিছু করতে পারে। ঘরে বইয়া কান্দে আর না খাইয়া থাকে। গনি মিয়ার অবস্থা ভাল, তয় শালায় অইলো দুনিয়ার কিরপিন। বাইত্তে আইলে পঞ্চাশ-একশো টেকা দেয়। মাস্টার রুজি করে আর কয় টেকা। আমি যেডু পারি করি। আর পোলাপান। দুইডার লেইগা যে আমার কী মায়া লাগে রে ভাই। মাস্টার যেমুন ভাল মানুষ, আছিয়া বুজি তার থিকাও ভাল মানুষ। এমুন দুইডা ভাল মানুষরে কেন যে আল্লায় দুইডা পঙ্গু পোলাপান দিল? আমি সারাদিন পোলাপান দুইডার লগে থাকি। অগো লেইগা যা পারি। করি। হারাজীবন চুরি কইরা টেকাপয়সা রুজি করছি, ভাইরে সচ্ছল কইরা দিছি। অহন হেই হগল টেকাপয়সা জাগাজমিন থিকা যেডু পারি মতিমাস্টারের পঙ্গু পোলাপান দুইডার লেইগা খরচা করুম। লগে আমার নিজের পরিশ্রম। যেমতে পারি অগো বাঁচাইয়া রাখুম। অগো সেবাযত্ন যা লাগে করুম।

ইব্রাহিম খুশি মনে মাথা নাড়ল। খুব ভাল কাম, খুব ভাল। মুকসেদ বলল, একদিন রাইত্রে ওই বাইত্তে গেছি। অনেক রাইত। গিয়া একটা খারাপ দৃশ্যও দেখছি মান্নান মাওলানার সীমানায়। যাইহোক, খারাপ দৃশ্যমূশ্য লইয়া আমি আইজকাইল আর মাথা ঘামাই না। ওই হগল দেকতেও চাই না। তয় যেইডা দেইখা ডরাইলাম হেইডা অইলো, মতি মাস্টারের উডানে অনেকটি ব্যাং ফালাইতাছে। আর পুব দিককার হিজল বউন্না ডুমইর ছিটকি টোসখোলা এই হগল জঙ্গল থিকা বিরাট একটা সাপ আইতাছে।

কন কী?

হ বেডা! কী সাপ চিনতে পারলাম না। সানকি অইতে পারে, জাইতও অইতে পারে। উডানে আইয়া সাপটায় টপাটপ টপাটপ ব্যাং গিলতে লাগল। দেইক্কা এমুন ডরাইলাম আমি। ওই জঙ্গলের পাশেই জামগাছতলায় পঙ্গু পোলাপান দুইডারে বহাইয়া রাখে মাস্টার সাবে। কোনদিন জানি পোলাপান দুইডারে সাপে খায়। এর লেইগা রোজ বিয়ানে দোফরে আর বিয়ালে বড় একখান বাশ দিয়া জঙ্গল পিডাই আমি। সাপসোপ থাকলে য্যান পলায়। আইজ বিয়ানে উইট্টা চিন্তা করছি, জঙ্গলডি আইজ আমি কাইট্টাই হালামু।

ইব্রাহিম অবাক। বাইষ্যার পানিতে জঙ্গল কাটবেন কেমতে?

কাডন যাইবো। কাইট্টা জঙ্গলের লগের ছোট্ট গড়ে (ডোবায়) জঙ্গলডি হালাইয়া রাখুম। বাইষ্যাকালের পানি নাইম্মা গেলে গড়ের ওই কাডা জঙ্গল ঝাঁকার কাম দিবো। মাছ পড়বো গড়ে। এককামে দুইকাম অইবো।

হ ভাল বুদ্দি।

মুকসেদ উঠল। তয় তুই যা রে টাকি। আমিও মাস্টার বাইত্তে যাই। গিয়া চা খাইয়া কামে লাগি।

ইব্রাহিমও উঠল। হ যান দাদা। আমি আইছিলাম আপনের সমবাত লইতে।

মুকসেদ হাসল। সমবাত লইছস?

ইব্রাহিমও হাসল। খালি লইছিনি, বিরাট লওন লইছি।

বুকপকেট থেকে টুপিখান বের করে মাথায় দিল মুকসেদ। আমিও তর সমবাত লইলাম। লইয়া খুশি অইলাম। একটা জীবন আমগো কাইটা গেছে খারাপ কামে। চুরি হ্যাঁচরামি, জেল মাইর। অহন শুরু অইছে আরেকটা জীবন। এই জীবনডা অইলো মাইনষের জীবন। আয় রে টাকি, আমরা দুইজন দুইজনের লেইগা দোয়া করি, বাকি জীবনডা আল্লায় য্যান আমগো মানুষ হিসাবে বাঁচাইয়া রাখে। মাস্টার বাড়ির জঙ্গল কাইট্টা, সাফ কইরা সাপসোপ যেমতে আইজ আমি খেদামু, আল্লায় য্যান ঠিক অমুন কইরা আমগো মন থিকা বেবাক গুনার কাম খেদাইয়া দেয়।

.

আজ সকাল থেকেই ঠাঠা পড়া রোদ।

চইত বৈশাখ মাসের মতন গরম। আশমানের দিকে তাকালে মনেই হয় না শ্রাবণমাস। এইরকম দিনে সকাল দশটার দিকে এনামুল এসে হাজির। শ্রীনগর বাজারের ওদিকে তার এক বন্ধুর বাড়ি আছে। বন্ধুর নাম নূর ইসলাম। নূর ইসলামদের বাড়িতে গাড়ি রেখে রিকশা নিয়া মেদিনীমণ্ডল চলে আসছে। লগে একটা ব্রিফকেস। জাহিদ খাঁ-র বাড়ি বরাবর রিকশা থেকে নেমে ভাড়া মিটাচ্ছে, তাকে দেখতে পেল হাজামবাড়ির আবদুলের বড়পোলা আলালদি। সারারাত বিলের বাড়ির ওদিকে দাঐন বাইয়া বিয়ানবেলা বাড়ি ফিরেছে বাপপুতে। মাজেদার দেওয়া তিনশো টাকা নিয়া সেই যে দান বাওয়ার কাজ শুরু করেছিল, আল্লার রহমতে সেই তিনশো টাকার বরকতে আবদুলের সংসারের চেহারা বদলাইয়া গেছে। মাজেদাকে তিনশো টাকার লগে দশবিশ টাকা করে যা লাভ দিয়েছে তাতে মাজেদার টাকা হয়েছে পাঁচশোর ওপর। মাজেদা তো খুশিই, আবদুল আর আলালদ্দির খুশির অন্ত নাই। সারারাতে বাপপুতে মাছ যা ধরে, কোনও কোনওদিন তিন-চারশো টাকা তরি হয়ে যায়। কে বলেছে দেশগ্রামে মাছ নাই? ইরির চাপে, সার আর কীটনাশকের ঠেলায় বিল বাওয়েরের মাছ সব পলাইছে! এখনও তো বিলে দাঐন বাইতে গেলে মাছ। ভালই ধরে।

আজ মাছ যা পাওয়া গেছে সাড়ে তিন-চারশো টাকা হবে। বিয়ানবেলা বাড়ি ফিরে বাপ পোলায় ভরপেট পান্তা খেয়ে মাছের ডুলা দুইখান নিয়া মাত্র মাওয়ার বাজারে মেলা দিবে, দেখে জাহিদ খাঁ-র বাড়ির সামনে এনামুল সাহেব রিকশা বিদায় করছেন। এখন তিনি হয়তো আবদুলদের বাড়ির কাউকেই ডাকবেন তাকে একটু পার করে দিতে। এই সড়ক থেকে পশ্চিম-উত্তরে গাওয়াল বাড়ির ফাঁক দিয়া পশ্চিমে মিয়াবাড়ি। হাজামবাড়ি বা গাওয়ালবাড়ি এই দুই বাড়ির যে-কোনও বাড়ির লোককেই ডাকতে পারে এনামুল, যে-কোনও বাড়ির লোকই নাও নিয়া আইসা তাকে বাড়িতে নামায়া দিয়া আসবে। আবার কোনও বাড়িতে এই সময় নাও না থাকলে রাবির জামাই মতলাকে ডেকে দিবে। মতলা কোষানাও নিয়া ল্যাডল্যাড়া শরীরে যত দ্রুত সম্ভব সড়ক পারে এসে এনামুলকে নিয়া যাবে।

আলালদি আর আবদুল মাত্র নাওয়ে চড়বে, এনামুলকে দেখে আর কোনও কথা নাই, বাজারে মাছ বেচতে যাওয়ার কথা ভুলে সোজা আসল এনামুলের কাছে। আবদুল বলল, ওঠেন দাদা, ওঠেন। আপনেরে বাইত্তে নামায় দিয়া তারবাদে বাজারে যামু। আলালদ্দি, দাদার বিফকেস ল।

আলালদ্দি লাফ দিয়া নাইমা এনামুলের হাতের ব্রিফকেস নিল। নাওয়ে চড়ে শক্ত হয়ে দাঁড়াল এনামুল। তার পরনে জিনসের প্যান্ট আর হলুদের কাছাকাছি টি-শার্ট, পায়ে কেডস। বর্ষাবাদলার দিনে এরকম পোশাকই ভাল। গলার মোটা সোনার চেন রোদে দুইবার ঝিলিক দিয়া উঠল। চোখে সানগ্লাস এনামুলের আছেই।

আবদুলের দিকে তাকিয়ে এনামুল বলল, খবর কী আবদুলদা? আছেন কেমুন?

আবদুল বিনীত গলায় বলল, আল্লায় রাখছে দাদা। ভালঐ রাখছে।

যাইতাছেন কই?

বাজারে। মাছ বেচুম।

মাছের কথা শুনে খুবই উৎসাহী হলো এনামুল। কী মাছ বেচবেন?

হারারাইত দাঐনে মাছ ধরি দাদা। গুড়াগাড়ি নানান পদের মাছ। ওই যে দেহ ডুলা ভরা। বাপপুতে মাছ ধরি, মাছ বেচি। বাইষ্যাকালে অন্যকাম নাই তো। তয় মাছ ধইরা ভালঐ আছি।

ডুলার দিকে তাকিয়ে মাছ দেখল এনামুল। পুঁটি ট্যাংরা গোলসা ফলি, পাবদা টাকি, শিং রয়না বাইল্লা কই। তাজা মাছের প্রতি বেজায় লোভ এনামুলের। মাছ দেখে সে মুগ্ধ। বলল, দুই ডুলায় কয় টেকার মাছ অইবো আবদুলদা?

আবদুল না, আলালদ্দি বলল, সাড়ে তিন-চাইরশো টেকার অইবো কাকা।

আবদুল বলল, আবার বিশ-তিরিশ টেকা বেশিও অইতে পারে।

হ অইতে পারে। আইজকাইল মাছের অনেক দাম। ভাল মাছ পাওয়াই যায় না। বিক্রমপুরের মাইনষের টেকা অনেক। মাছ কিননের সময় উস থাকে না।

হ দাদা। কথা ঠিক।

তয় আপনে এককাম করেন আবদুলদাদা, বাজারে আইজ আর যাইয়েন না। বেবাক মাছ আমগো বাইত্তে দিয়া দেন। চাইরশো টেকা আমি আপনেরে নৌকা থিকা নাইম্মাঐ দিয়া দিতাছি।

আবদুল বিনীত গলায় বলল, ঠিক আছে দাদা, ঠিক আছে।

আলালদি খুশি। তয় এতদূর নাও বাইয়া আমগো আর বাজারে যাইতে অইলো না।

আবদুল বলল, তুমি বাইত্তে থাকবা কয়দিন?

আইজ বিয়ালেই যামু গা। ওই রিকশাআলারে কইছি বিকাল চাইরটা- পাঁচটার দিকে আইয়া আমারে ছিন্নগর লইয়া যাওনের লেইগা।

রিকশাঅলার কথা শুনে চট করে তছির কথা মনে পড়ল আবদুলের, রুস্তম রিকশাআলার কথা মনে পড়ল। সেদিনও এনামুলই রিকশা নিয়া আসছিল। গ্রামে প্রথম রিকশা আসছিল। ওই একটা দিনে তছির জীবনটা বদলাইয়া গেল। খুনি হয়ে গেল তছি।

আবদুলকে আনমনা দেখে এনামুল বলল, কী চিন্তা করেন আবদুলদাদা?

আবদুল হাসল। না দাদা কিছু চিন্তা করি না। তুমি আইজ বিয়ালেই যাইবাগা, তয় এত মাছ দিয়া কী করবা?

আমি কহেক পদের মাছ দোফরে খামু আর জিয়াইন্না মাছটি আম্মার লেইগ্না রাইখা যামু।

তয় ঠিক আছে।

তারপরই আবদুল বলল, একবেলার লেইগা কী কামে আইলা দাদা?

আইছি দাদা মজজিদের কামে। ঢাকা থিকা ইটা পাডামু হেই হগল বন্দবস্ত করতে আইছি।

আইচ্ছা আইচ্ছা।

এনামুল বাড়িতে ওঠার পর দেলোয়ারাদের সীমানায় সাড়া পড়ে গেল। একে এনামুল লগে দুই ডুলা মাছ, রাবি বেতিব্যস্ত হয়ে গেল। কোন মাছ রানবো, কোনটা জিয়াইয়া রাখবো এই নিয়া চিন্তায় পড়ল। আবদুল আর আলালদি দুইজনেই তাকে সাহায্য করতে বসল। বাদলা বড় বড় দুইটা ঘোপা নিয়া আসল, সেও হাত লাগাল মাছে। শিং টাকি কই। ফলি কয়েকটা বড় বড় রয়না যেসব মাছ জীবিত, ঘোপায় রাখলে অনায়াসে দুই-চাইরদিন। বাঁচবে সেইগুলি বেছে বেছে ঘোপায় রাখল তিনজনে মিলে। মরে গেছে তবে এখনও তাজা এমন কয়েক পদের মাছ কুটতে বসে গেল রাবি। বাড়িতে কেবিনের আলমারিতে লুঙ্গি গেঞ্জি শার্ট একজোড়া স্যান্ডেল রেখে যায় এনামুল। সেসব বের করে একবেলার জন্য পরল। মোতালেব বাড়িতেই ছিল। এনামুলের আসার খবর শুনে দৌড়ে এল। কুনসুম আইলা মামু?

নিমতলায় দুইটা চেয়ার এনে রাখছে মতলা। একটায় দেলোয়ারা বসেছেন, বসে আঁচলে চশমার কাঁচ মুচছেন, আরেকটায় বসতে বসতে এনামুল বলল, এইত্তো আইলাম মামু।

একবার রানঘরের দিকে তাকিয়ে আবদুলদেরকে দেখল মোতালেব, মাছ দেখল। এত মাছ কিনছো ক্যা মামু?

কিনলাম আর কী! তাজা মাছ দেইখা কিন্না হালাইলাম।

মাছের বন্দোবস্ত করে আবদুল আর আলালদ্দি তখন ফাঁকা ডুলা হাতে নিয়েছে। আবদুলকে ডেকে পাঁচশো টাকার একটা নোট দিল এনামুল। গলার মোটা সোনার চেন হাতাতে হাতাতে বলল, আইজকার মাছের দাম চাইরশো টেকা। আর একশো টেকা বেশি। দিলাম। একশো টেকার ভাল মাছ একদিন আম্মারে দিয়া যাইয়েন আবদুলদা।

আবদুল মহাখুশি। আইচ্ছা দাদা, আইচ্ছা। দিয়া যামু নে।

মোতালেব চোখ পিতিপিতি করে বলল, কী মাছ কিনলা মামু চাইশশো টেকা দিয়া?

সব ব্যাপারে মোতালেবের মাতবরি পছন্দ করে না এনামুল। সে একটু বিরক্ত হল। কিনছি, ভাল মাছঐ কিনছি। এই হগল লইয়া আপনের চিন্তা করনের কাম নাই। আপনে। তাড়াতাড়ি নাও বাইয়া মাওলানা সাবের বাইত্তে যান। তারে ডাইক্কা লইয়াহেন। আমি কইলাম যামু গা। মজজিদের কাম ফাইনাল করুম আইজ। যান, দৌড় দেন।

যাইতাছি মামু, যাইতাছি।

মোতালেব পা চালিয়ে নিজেদের সীমানার দিকে চলে গেল। ওইদিককার কদমগাছতলায় তার নৌকা বান্ধা। সেই নৌকা নিয়া চকপাথালে মান্নান মাওলানার বাড়ির দিকে মেলা দিল।

দেলোয়ারা বললেন, একবেলার লেইগা আইছো বাজান, কী দিয়া কী খাওয়ামু তোমারে?

এনামুল হাসল। খাওনের জিনিস তো আমি লইয়া আইছি। মাছ। অল্প অল্প কইরা চাইর-পাঁচপদের মাছ রানতে কন। হবিবর দুধ দিয়া যায় না আপনেরে?

হ বাজান। দেয়।

আপনের ওহেন থিকা ইকটু দুধভাত খামু নে, মাছভাত খাওনের পর।

খাইয়ো বাজান খাইয়ো। তয় আমি ইট্টু রান্নঘর থিকা আহি। রাবিরে কইয়াহি কী মাছ রানবো। তারবাদে তোমার লগে কথা কইতাছি। জরুলি (জরুরি) কথা আছে।

নিমের পাতায় ঝিরঝিরা একখান হাওয়া আছে। একটা কাক ডাকছে আমগাছে। বাদলা রানঘরের ওটায় বসে আছে এমন ভঙ্গিতে যেন এনামুল কোনও আদেশ করলেই দৌড় দিয়া সেই কাজ সেরে আসবে। মতলা রান্নঘরের ভিতরে বসে গুড়ক গুড়ক করে তামাক টানছে। রোদে ঝলমল করছে বাড়ির চারদিককার বর্ষার পানি।

ফিরে এসে দেলোয়ারা যা বললেন, শুনে এনামুল একেবারে হতভম্ব। কোনওরকমে বলল, কন কী আম্মা?

হ বাজান। দউবরা আমার কাছে আইয়া বহুত কান্দাকাটি করছে।

এইডা তো কান্দাকাটি করনের কথা। অহনতরি পুরাপুরি ডাঙ্গর অয় নাই নূরজাহান আর তারে বিয়া করতে চায় মাওলানা সাবে? হেয় তো বসে দউবরার থিকাও বড়।

খালি বড় না, বহুত বড়।

আথকা হুজুরের এই মতলব অইলো ক্যা? নূরজাহানরে মনে অয় তার পছন্দ অইছে। আতাহারের মায় মইরা গেছে অহন তো বিয়া একখান হেয় করতেই পারে। তয় নূরজাহানরে খালি যে তার পছন্দ অইছে হেইডাই না, অন্য কারণ আছে।

কারণ আমি বুজছি আম্মা। ওই যে মাকুন্দার লেইগা মাওলানা সাবের মুখে নূরজাহান ছ্যাপ ছিড়াইয়া দিছিল…।

হেইডা তো মিট্টাই গেছিল।

হ আপনে হুজুররে কইছেন, আমি কইছি। হেয় তো তহন কইছে নূরজাহানরে হেয় মাপ কইরা দিছে।

অহন তো বাজান মনে অয় মাপ করে নাই।

হ ঘটনা আমি বুজছি। নূরজাহানের উপরে শোদ লওনের লেইগা অরে হেয় বিয়া করতে চায়।

দউরাও হেইডাঐ কইলো। আমার কাছে আইছিলো, আমি য্যান তোমারে কই। আর তুমি যুদি মাওলানা সাবরে কও তয় হেয় থাইম্মা যাইবো।

এনামুলের ভুরু কুঁচকে গেল। বাদলার দিকে তাকিয়ে বলল, ওই বাদলা, তর মা’রে ক তো আমারে আদা দিয়া এককাপ চা বানাইয়া দিতে।

বাদলা লাফ দিয়া উঠল। অহনঐ কইতাছি।

দুই লাফে রান্নঘরে ঢুকে গেল বাদলা।

এনামুল বলল, হায় হায় আমি দিহি খালি এককাপ চা’র কথা কইলাম।

দেলোয়ারা বললেন, তয় কয় কাপ কইবা? আপনে খাইবেন না আম্মা?

না বাজান। আমি চা তেমুন খাই না। হেইডা আমি জানি। এর লেইগাঐ মনে অয় কই নাই।

এনামুল যে একটু আনমনা তার কথায় দেলোয়ারা তা বুঝলেন। তারপর অন্যকথা বললেন। বাজান, দেশগেরামের বেবাক মাইনষে জানে, তুমি আমিও জানি মান্নান মাওলানা মানুষ ভাল না। বদ স্বভাবের। এমুন একজন মানুষরে মজজিদের ইমাম বানাইবা?

এইডা আম্মা আমিও চিন্তা করছি। তয় আমি তো তারে কথা দিয়া হালাইছি, অহন হেই কথা ফিরত নেওন ঠিক অইবো না। তয় মাওলানা সাবে দেশগেরামে আমার বদনাম কইয়া বেড়াইবো।

হ কথা ঠিক বাজান।

তয় আমিও কম ত্যান্দর না, মাওলানা সাবরে আমি বিরাট চাপের মইদ্যে রাখুম। ওই যে দেকলেন ওইবার মোতালেইব্বারে ঠিক করলাম, মাওলানা সাবরেও ওইরকম ঠিক কইরা হালামু।

রানঘর থেকে মাছ তরকারি বাগার দেওয়ার ঝাল ঝাল একটা গন্ধ আসছে। সেই গন্ধ নাকে টেনে এনামুল বলল, গাছির মাইয়াডাও কইলাম কম ট্যাটনি না আম্মা? এত মানুষজনের মইদ্যে মাওলানা সাবরে ছ্যাপ ছিড়াইয়া দিল? দারোগা পুলিশ কেঐরে ডরাইলো না? ছেমড়ির কইলাম বিরাট সাহস।

হেইডা তুমি ঠিক কইছো বাজান। তয় আমি তো পরে হাজামবাড়ির মাইনষের কাছ থিকা বেক কথা হুনছি। মাকুন্দারে যেই মাইরড়া মাওলানা সাবে আর তার পোলায়। মারছেলো, একটা বলদা নিরীহ মানুষের ওই চেহারা দেইক্কা সইজ্য করন মুশকিল।

হ এর লেইগাঐ ছেমড়ি ওই কাম করছে।

তয় বাজান দউবরা তো আমার কাছে আইয়া কানছে, হাতে পায়ে ধরছে। অর মাইয়াডার একটা বিহিত কইরা দেও।

দউবরা খাইগোবাড়িত যায় নাই ক্যা?

দেলোয়ারা অবাক। ওই বাইত্তে যাইবো ক্যা?

আপেল মেম্বরের কাছে বিচার দিতে পারে। চেরম্যানও তো ওই বাড়ির। তাগো কাছে বিচার দিলেঐত্তো বেক কিছু ঠিক অইয়া যায়।

দউবরা যে ক্যান ওই মিহি যায় নাই হেইডা আমি কইতে পারি না বাজান। তয় ও মনে করছে তুমি মজজিদ বানাইতাছো, তোমার মজজিদের ইমাম অইবো হেয়, তোমারে থুইয়া তাগো কাছে বিচার দিতে যাওন ঠিক অইবো না। আর বিচার ও দিতেও চায় না। বিচার দিলে মাওলানা সাবে আরও চেতবো। নিজে না পারলে আতাহাররে দিয়া নানানভাবে অগো উপরে অইত্যাচার করবো। এর লেইগা দউবরা চাইতাছে তুমি যুদি অন্যভাবে ভেজালডা। মিডাইয়া দেও।

এনামুলের জন্য আদা চা নিয়া আসল বাদলা। নেন দাদা।

বাদলার হাত থেকে চায়ের কাপ নিয়া চায়ে চুমুক দিল এনামুল। ঠিক আছে, আপনে যহন কইছেন, আমি আইজঐ মিটাই দিতাছি সব।

বাদলার দিকে তাকাল এনামুল। তর বাপরে ডাক দে।

বাদলা আবার দৌড় দিয়া ঢুকল রানঘরে। মতলারে ডেকে নিয়া আসল। লুঙ্গি খাটো করে পরা, খালি গায়ের মতলাকে দেখাচ্ছে বর্ষার পানি সরে যাওয়ার পর, বর্ষার কয়েক মাস পানির তলায় ডুবে থাকা ডুমুরগাছ যেমন কালচে শুকনা ভিজা ভিজা দেখা যায়। ঠিক তেমন। এমনিতেই কাহিল মানুষ, কয়েকদিনের জ্বরে ভুগে আরও কাহিল হয়েছে। এনামুলের অদূরে দাঁড়িয়ে বলল, কন।

নাও লইয়া যা। দবিরগাছিরে ডাইকা লইয়ায়।

মতলা কোনওরকমে বলল, আমি যামু?

দেলোয়ারা বলল, অর শইল্লে জোরবল নাই। ও নাও বাইয়া দউবরারে আনতে গেলে দিন পার অইয়া যাইবো।

তয় কে যাইবো?

বাদলা বলল, আমি যাই দাদা। লগ্নির খোচ দিয়া দিয়া যামু আর আমু।

পারবি?

কয় কী দাদায়? পারুম মাইনি? দেহেন না আপনে।

দেলোয়ারা হাসিমুখে বললেন, হ ও অর বাপের থিকা বহুত ভাল পারবো।

তয় যা।

বাদলা একদৌড়ে মিয়াবাড়ির দিককার মটকুরা গাছটার গোড়ায় বান্ধা ডিঙ্গি নৌকার কাছে চলে গেল। চটপটা হাতে নৌকার বান (বাধ) খুলে লগিতে বড় বড় করে খোঁচ দিয়া গাওয়ালবাড়ি আর মিয়াবাড়ির মাঝখান দিয়া নৌকা চালিয়ে দিল। একদম পাকা মাঝিমাল্লার কায়দায় কাজটা সে করল। সেদিকে তাকিয়ে চায়ে চুমুক দিল এনামুল। বাদলা ছেমড়াডা তো বিরাট কামের অইছে আম্মা। জুয়ান মরদো বেডাগো লাহান নৌকা বায়।

চোখ থেকে চশমা খুলে শাড়ির আঁচলে কাঁচ মুছতে মুছতে দেলোয়ারা বললেন, হ বাদলা ভাল কামের অইছে। মতলা যেমুন ম্যারা, ওই ম্যারার ঘরে যে বাদলার লাহান পোলা অইছে এইডাই আরচার্য।

.

উঠানের তারে ভিজা শাড়ি মেলে দিচ্ছে পারু।

মাত্র গোসল করে আসছে। পরনে হালকা বাসন্তী রঙের শাড়ি। মাথার ভিজা চুলে গামছা প্যাচাননা। দুপুরবেলার রোদে মুখটা যে কী মিষ্টি লাগছে পারুর।

এসময় ঘাটলার ওদিকটায় একটা কোষানাও এসে ভিড়ল। কদমগাছের গোড়ায় নাও বেঁধে ল্যাংড়া বসিরের গোমস্তা ফইজু নামল। একটা কাশ দিল।

ফইজুর কাশের শব্দে তার দিকে ফিরে তাকাল পারু। লোকটাকে চিনতে পারল, হাসল। সে কথা বলবার আগেই ফইজু বলল, হুজুরে বাইত্তে নাই?

না। মেন্দাবাড়ি গেছে। এনামুল সাবে বাইত্তে আইছে। হেয় খবর পাডাইছে। হুইন্না নাকেমুখে কোনওরকমে চাইট্টা গুইজ্জা দৌড় দিছে। তারে নিতে আইছিল মেন্দাবাড়ির মোতালেব।

শুনে ফইজুর মুখটা ম্লান হয়ে গেল।

সেই ম্লান মুখ খেয়াল করল না পারু। বলল, আইজ দেহি আপনে একলা। ঘটকসাবে আইলো না?

না তার জ্বর। এর লেইগাঐ আমারে পাডাইছে।

জরুলি কথা?

হ। হুজুরের মাজারো পোলায় নাই? থাকলে তার লগে কথা কইতাম।

না হেয়ও নাই। কই যে গেছে, কুনসুম যে আইবো আল্লাই জানে। খুব বেশি দরকারি কথা অইলে, যুদি আপনের কোনও অসুবিদা না অয় তয় আপনে আমারে কইতে পারেন। আপনে তো আমারে চিনেন। আমিও আপনেরে চিনি।

এবার ফইজু হাসল। খালি চিনিনি আপনেরে? মাগো, মিছাকথা না, আল্লার কিরা, আপনের লাহান ভাল বউ আমি আমগো দেশগেরামে আর দেহি নাই। আপনে দেকতে যেমুন সোন্দর, আপনের মনডাও তেমুন সোন্দর। ওদিন ফিরা যাওনের সমায় ঘটক সাবরে আপনের কথা কইছি।

পারু হাসল। কী কইছেন?

আমার লাহান একজন মানুষরে আপনে কী খাতির করলেন।

ওইডা এমুন কিছু খাতির না। একজন মানুষ একজন মানুষের বাইত্তে আইলে তারে ইট্টু চা মুড়ি, ইট্টু পান তামুক দিতে অয়। এইডি আমগো মা-বাপে আমগো হিগাইছে।

এর লেইগাঐ কই, বড়ঘরের বউঝি মাইয়াগো আদপ লেহাজঐ অন্যরকম।

পারু রানঘরের দিকে তাকাল। সেখানে বসে ভাত খাচ্ছে পারুর তিন পোলাপান। রহিমা তাদেরকে বেড়ে দিচ্ছে। হাফিজদ্দি বাড়িতে নাই। আতাহারের লগে নৌকা নিয়া গেছে।

ফইজুর দিকে তাকিয়ে পারু বলল, আপনেরে ভাত দিতে কমু?

ফইজু বিনয়ে একেবারে গলে গেলো। নাগো মা। না।

ক্যা? আপনে ভাত খাইয়া বাইর অইছেন?

হ মা, ঘটকবাড়ি থিকা খাইয়াঐ বাইর অইছি।

তয় কন দিহি আমারে কীর লেইগা আইছিলেন।

তিনশো টেকার লেইগা।

পারু অবাক, তিনশো টেকা?

হ। ঘটক সাবের তিনশো টেকা লাগবো। আইজ তার শইলডা ম্যাজম্যাজ করতাছে দেইক্কা নিজে আইতে পারে নাই। এর লেইগা আমারে পাইছে। কাইল বিয়ানে গাউদ্দা যাইবো, নাও ভাড়া বাবদ তিনশো টেকা দিতে কইছে হুজুররে।

আজাহারের লেইগা গাউদ্দার মাইয়া দেখতাছেনি?

ফ্যালফ্যাল করে পারুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল ফইজু।

পারু ভুরু কুঁচকে ফইজুর দিকে তাকাল। এমনে চাইয়া রইলেন ক্যা?

ফইজু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। চিন্তা করতাছি।

কী চিন্তা করতাছেন?

কথাডা আপনেরে কওন ঠিক অইবো কি না।

কী অইছে?

মাগো, আমি খুবঐ গরিব মানুষ। তয় কোনওদিন চোগলখুরি করি নাই। এর কথা অরে, অর কথা তারে এইডি তো করি নাই, মিছাকথাও কোনওদিন কই নাই। তয় আপনে। মানুষটা এত ভাল, এমুন একখান খোয়াব লইয়া আছেন, আমার উচিত আপনেরে আসল কথা কওন। তয় আল্লার কছম খাইয়া আমারে আপনের কথা দেওন লাগবো, আমি যে আপনেরে কথাডা কইছি এইডা আপনে কেঐরে কইবেন না।

পারুর বুকটা তখন ধুগধুগ ধুগধুগ করছে, মুখটা শুকিয়ে গেছে। একটা ঢোক গিলল সে। উঠানের দিক থেকে ঘাটপারের দিকে এল। ফইজুও এল তার লগে লগে।

শুকনা খসখসা গলায় পারু বলল, আল্লার কছম, আপনের কথা আমি কেঐরে কমু না। কোনওদিনও কমু না। মইরা গেলেও কমু না।

তয় ঠিক আছে।

একটু থামল ফইজু। তারপর বলল, আজাহারের লেইগা না, ঘটকে মাইয়া দেখতাছে আতাহারের লেইগা।

শুনে দমটা যেন বন্ধ হয়ে এল পারুর। সে কোনও কথা বলতে পারল না। খানিক আগে ফইজু যেরকম ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল তার দিকে, ঠিক তেমন করে সে তাকিয়ে রইল ফইজুর দিকে।

ফইজু বলল, আইজ যহন সুযুগটা পাইছি, তয় বেক কথাঐ আপনেরে আমি কইয়া যাই। গাউদ্দার ওয়াজদ্দি সাবের মাইয়া কমলার লেইগা আতাহারের সমন্দ ঠিক করতাছে ঘটকসাবে। মাইয়া ট্যারা। ঘটকে কইছে লক্ষ্মীট্যারা, আসলে পুরা ট্যারা। তাতেও হুজুরের অমত নাই। টেকা চাইছে পাঁচলাখ। ট্যারা মাইয়ার লেইগা পাঁচলাক তারা খরচা করবো। তাগো টেকা আছে। মাইয়ার তিনভাই থাকে বিদেশে। ওইদিন আপনেগো কাছ থিকা হোনলাম আপনের লগে আতাহারের বিয়া ঠিক অইয়া রইছে। তয় আবার এইডা কেমতে অয়? ঘটকসাবে আমারে কইলো, এইডা হুজুরের আর আতাহারের চালাকি। তারা একদিক দিয়া আপনেরে ভাইল (ভাও) দিয়া রাকছে, অন্যমিহিদা অন্য মাইয়া দেকতাছে। বিয়াশাদি পাকা অইয়া গেলে আপনে আর কী করবেন? আপনে মাইয়া মানুষ, বাড়ির বউ, ভদ্রলোকের। মাইয়া, আপনে তো আর চিল্লাচিল্লি করবেন না। তিনডা পোলাপান আছে আপনের, তাগো। লইয়া গলায় দড়িও দিবেন না। বিয়াশাদি ঠিক অইয়া গেলে হুজুরে আপনেরে বুজাইবো আর আতাহারে কইবো, বাবার কথার উপরে দিয়া আমি কথা কই কেমতে!

একটু থামল ফইজু। তারপর বলল, মাগো, তারা দুইজনে আপনের লগে একটা বেইমানি করতাছে। আপনের জিন্দেগি অরা ছারখার কইরা দিবো।

পারুর কলিজাটা ভিতরে ভিতরে ততক্ষণে গলে গেছে। মুখটা মরা শোল মাছের পেটের মতন ফ্যাকাশে। চোখে পলক পড়ে না। দমটা যেন বন্ধ হয়ে আছে, মাথাটা যেন কাজ করে না।

ফইজু বলল, আরেকখান কথাও আপনেরে কইয়া যাই মা। কয়দিন আগে হুজুরে তার। নিজের বিয়ার লেইগাও ঘটকসাবরে দিয়া এক বাইত্তে পরস্তাব পাডাইছে। মাইয়াডা তার। নাতিনের বইসসা অইবো। বহুত ছোডঘর। গাছি। দবির গাছির মাইয়া নূরজাহানরে হুজুরে বিয়া করবো। সেই পরস্তাব গাছিরে দিছে। পয়লা গাউদ্দার কমলারে আনবো আতাহারের লেইগা তারবাদে নিজে বিয়া কইরা আনবো দবির গাছির মাইয়া নূরজাহানরে। আর আপনে এই হগল চাইয়া চাইয়া দেখবেন। আপনের মিহি তারা কেঐ চাইবো না।

পারু তবু কথা বলল না, নড়ল না। তার চোখের পাতা কাঁপে না, চোখে পলক পড়ে না। দম পড়ছে কি পড়ছে না বোঝা যাচ্ছে না। যেন সে এখন আর মানুষ না, যেন সে এখন মান্নান মাওলানার বাড়ির পুরানা কোনও গাছ। যেন সে মান্নান মাওলানার বারবাড়ির ওদিককার ওই নাড়ার পালা। যেন সে উঠানের মাটি। নড়াচড়ার শক্তি নাই তার, কথা বলার শক্তি নাই। চোখ আছে, দেখবার শক্তি নাই। দম আছে, ফেলবার শক্তি নাই। হাত পা আছে, নড়াবার শক্তি নাই, চলাফিরার শক্তি নাই।

ফইজু দুঃখী গলায় বলল, যাই গো মা। বেদ্দপি কইরা থাকলে মাপ কইরা দিয়েন।

পারু আগের মতনই।

কদমগাছের গোড়ার লগে প্যাঁচ দেওয়া রসি খুলে ল্যাংড়া বসিরের কোষানাও ছাড়ল ফইজু। বর্ষার পানিতে বইঠা ফেলল। পারু তখনও একই রকম স্থির হয়ে আছে।

ফইজু পারুর দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, আল্লাহ, আল্লাহগো, এইরকম মাইয়াডারে তুমি এই কষ্ট দিলা? এইডা তোমার কেমুন বিচার।

বর্ষার পানিতে তখন ভেসে যাচ্ছিল কদমফুলের রেণু।

.

আমি আমার ইনজিনিয়ারের লগে আলাপ করছি, আমার কনটেকদারি কামের আসল মিস্তিরি অইলো কাদির মিয়া, সে অইলো ইনজিনিয়ারের বাপ। যেইকাম একবার চকু দিয়া দেইক্কা মাল আননের যেই হিসাব দিবো ওইটাই কারেট (কারেক্ট)। তারা দুইজনে মিল্লা আমার মুখ থিকা মজজিদের কথা হুইন্না, কতাহানি জমিনের উপরে মজজিদ অইবো, মজজিদের পিছে, পুকঐরের দিকে জাগা থাকবো কম, তিনদিকে জাগা থাকবো বেশি, একদিকে ইমামসাবের ঘর, আরেকদিকে অজুখানা, পায়খানাঘর, সামনে অনেকখানি জাগা, এই হগল হুইন্না কাদির মিয়া পয়লাঐ কইলো ইটা লাগবো সার (স্যার) বিশহাজার। ঝামাইটা লাগবে ছয়-সাত হাজার। ইনজিনিয়ার কইলো, ঝামাটা ইট্টু বেশিও লাগতে পারে। ফোলোর (ফ্লোর) ছাদ, পিলার মিনার মিল্লা ঝামা বেশি লাগতে পারে। হেইডা আবার না ভাঙ্গাইলে বুজা যাইবো না। রড সিমিটের হিসাবও দিছে। বেবাক মিল্লা ছয়-সাত লাখ টেকা লাগবে।

বড়ঘরের বারান্দায় টেবিলের লগের হাতলঅলা দুইখান চেয়ারে বসে আছে এনামুল আর দেলোয়ারা। মতলা রাবিরা যে চৌকিতে শোয় সেই চৌকিতে পা ঝুলিয়ে বসে আছেন মান্নান মাওলানা আর মোতালেব। রাবি রানঘরে গেছে চা বানাতে। মতলা আর বাদলা দাঁড়িয়ে আছে ভিতর দিককার দরজার সামনে। কে কখন কী অর্ডার দেয় শুনেই দৌড় দিয়া। যাইবো সেই কাজ করতে। দীন দুনিয়ার কোনও কিছুতেই মতলার কোনও উৎসাহ নাই। বাদলার বেজায় উৎসাহ। পারলে সে আইসা মান্নান মাওলানা আর মোতালেবের পাশে বসে। এনামুলের কথা মন দিয়া শোনে।

এনামুলের কথা মতন বাদলা গেছিল দবির গাছিকে ডাকতে। গাছি এখন এই বাড়িতেই আছে। বাদলার লগেই আসছে। এনামুল তাকে রানঘরে বসায়া রাখছে। দরকার মতন ডাকলে সামনে আসবে। মান্নান মাওলানা, মোতালেব তারা কেউ জানেই না গাছি আছে। এই বাড়িতে। জানে এনামুল দেলোয়ারা, আর রাবিরা তিনজন।

মান্নান মাওলানা বললেন, হ তুমি তো আগেও এই রকম হিসাবই দিছিলা। ছয়-সাত লাখ টেকা লাগবে।

মোতালেব বলল, দশ লাখ লাগলেও অসুবিদা নাই। মামুর কি টেকার আকাল আছেনি? একবার যহন মুখ দিয়া কইছে মজজিদ করবো, দশ-বিশ লাখ যাই লাগুক, করবোই। না কী কও মামু?

এনামুল কথা বলল না, হাসল।

মোতালেব বলল, অহন আসল কথা কও মামু, কাম ধরবা কবে?

হেইডা কওনের আগে অন্য কথাডি কই। আমার কনটেকদারি কামে যে ইটা সাপলাই দেয়, তিনডা ইটখোলার মালিক। বিরাট বড়লোক। নাম হইল আজমত, আজমত সাহেব। সে আমারে ডাকে চাচা, আমিও তারে ডাকি চাচা। বাইষ্যাকালে তো ইট পোড়ানো যায় না, বানানোও যায় না। ইট বানানের কাম শুরু হয় ম্যাগবিষ্টি বন্দ অওনের পর। তহন ধুমাইয়া চলে ইটখোলা। এই অফ সিজিনে ইটখোলার মালিকরা করে কী আমগো লাহান বান্দা। পারটির কাছ থিকা টেকা এডভানচ নেয়। আগেই কনটাক করে সিজিনে কতডি ইটা তার কাছ থিকা আমি লমু। চাচার অফিস অইলো ফতুলার ওই মিহি পাগলা নামে একখান জাগা আছে না, হেই পাগলায়। এডভানচ টেকা দিলে ইটার দাম কম পড়ে। আমি এই সিজিনে চাচারে লাখহানি ইটার টেকা এডভানচ দেই। এইবার দিছি এক লাখ বিশ হাজারের। এক লাখ আমার কনটেকদারি কামের, বিশ হাজার মজজিদের লেইগা।

শুনে মান্নান মাওলানা মহাখুশি। ও তয় বিশ হাজার ইটার দাম এডভানচ দিয়া হালাইছো?

হ।

মাশাল্লা মাশাল্লা। তয় তো কাম আউন্নাইয়া গেছে।

আমি আইজ বাইত্তে আইছি আপনেগো লগে এই হগল কথা কওনের লেইগাঐ। একখান। মজজিদ বানান কইলাম সোজা কাম না।

মোতালেব বলল, হ মিয়া। সোজা কামনি! ছাড়া বাড়িডা অইলো উচা নিচা। পয়লা মাডি উড়াইয়া হেই বাড়ি সমান করতে অইবো। তারবাদে মাড়ি কাইট্টা মাডির নীচে ঢালাই দিয়া, রড গাইত্থা পিলার বানান লাগবো। তারবাদে দেওয়াল, ফুলোর, ছাদ। ছাদের উপরে মিনার।

মান্নান মাওলানা বললেন, আরে মিয়া এই হগল আমি জানি। তুমি এত কথা কইয়ো না তো। এনামুল সাবরে কথা কইতে দেও।

এতক্ষণ ধরে আঁচলে চশমার কাঁচ মুছছিলেন দেলোয়ারা। এবার চশমা চোখে পরলেন। বাদলার দিকে তাকিয়ে বললেন, কী রে বাদলা, তর মা’র চা বানাইতে কতক্ষুন লাগে?

বাদলা চটপটা গলায় বলল, আমি গিয়া ইট্টু দেইক্কামু?

যা।

বাদলা মাত্র পা বাড়িয়েছে, ট্রে-তে করে তিনকাপ চা নিয়া আসল রাবি। ঘন দুধের চা। ভারী সুন্দর একখান গন্ধ ছুটছে চায়ের। চায়ের ট্রে-টা সে প্রথমে এনামুলের সামনে ধরল। এনামুল যে ভদ্রতা করে বলবে, আগে মাওলানা সাবরে দে। হেয় মুরব্বি মানুষ। সেটা সে বলল না। চায়ের কাপ নিয়া চুমুক দিল।

রাবি তারপর মান্নান মাওলানা আর মোতালেবের চা দিয়া যেমন চুপচাপ আসছিল তেমন চুপচাপ চলে গেল। রানঘরের দিক থেকে তখন মৃদু গুড় গুড়ক একটা শব্দ আসছে। এনামুল বুঝল দবির গাছি তামাক খাচ্ছে। চায়ে বড় করে চুমুক দিয়া বলল, একবার ভাবছিলাম ইমাম সাবের ঘরডা অহন বানামু না।

মান্নান মাওলানা ফুরুক করে চায়ে চুমুক দিয়া বললেন, ক্যা?

তার এই শব্দ করে চা খাওয়া একদমই সহ্য করতে পারেন না দেলোয়ারা। তার গা কেমন চিড়বিড় চিড়বিড় করে ওঠে। যে শব্দ করে চা খায় তাকে ধমক দিতে ইচ্ছা করে। মান্নান মাওলানা বয়স্ক মানুষ, তাকে তো আর ধমক দেওয়া যায় না। তবে দেলোয়ারার চেহারায় একটা বিরক্তির ভাব ফুটল। বিরক্ত মুখটা নিচা করে রাখলেন তিনি।

এনামুল মান্নান মাওলানার দিকে তাকাল। ইমামতি করবেন আপনে। আপনে তো আর ওই ঘরে থাকবেন না। আপনে থাকবেন আপনের বাইত্তে। ওহেন থিকা আইয়া আয়জান দিবেন, ইমামতি করবেন।

সব সময় হেইডা হয়তো করুম না। অনেক সময় মজজিদের লগের ঘরেই থাকুম। তাহাজ্জুদ (নিশুতিরাতের নামাজ) পড়ম।

হেইডা আপনে থাইকেন, কোনও অসুবিদা নাই। তয় আমি অন্য একখান চিন্তাও করছি।

কী চিন্তা বাজান?

ধরেন আপনেরে ইমাম রাখলাম না, অন্য ইমাম রাখলাম, তয় তার থাকনের জাগা দিমু কই?

মান্নান মাওলানা একটু চমকালেন। অন্য ইমাম রাখনের কথা চিন্তা করতাছোনি?

না অহনতরি করি নাই, তয় করতে অইতে পারে।

ক্যা?

এনামুল মুচকি হেসে চায়ে চুমুক দিল। না, আপনে যুদি আবার বিয়াশাদি করেন, তয় কি আর নতুন বউ থুইয়া মজজিদ লইয়া চিন্তা করনের টাইম পাইবেন। ঘরে নতুন বউ থুইয়া আপনে কি আর আইয়া ইমাম সাবের ঘরে থাকবেন।

মান্নান মাওলানা ভিতরে ভিতরে চমকালেন। তার মানে নূরজাহানকে যে সে বিয়ার প্রস্তাব দিছে সেই কথা এনামুল সাবের কানে গেছে। ঘটকার মুখে প্রস্তাব শুইনা দউবরা দৌড়াইয়া আইসা কইছে দেলোরারে, দেলোরা কইছে এনামুলরে। এইরকম একখান ভজঘট যে লাগবো এইটা মান্নান মাওলানা জানতেন। ওইটা নিয়া তার তেমুন চিন্তা নাই। ইসলাম ধর্মে চাইরখান বিয়া জায়েজ। এক বউ মইরা গেছে অহন আরেক বউ তিনি ঘরে আনতেই পারেন। এইটার লেইগা অন্য কেঐর মতামতের দরকার নাই।

তবে কথাটা ধরল মোতালেব। হুজুরে আবার বিয়া করতাছেননি? আরে মিয়া অহনতরি দুইপোলা বিয়া করান নাই আর নিজে বিয়ার চিন্তা করতাছেন!

মান্নান মাওলানা ধীর শান্ত ভঙ্গিতে পর পর দুই চুমুকে তার চা শেষ করলেন। কাপটা পাশে নামিয়ে রেখে বললেন, তাগো বিয়ার চেষ্টা চলতাছে। তয় ছোটডায় মনে হয় বিয়া অহন করবো না। মনে হয় জাপানে কিছু একখান করছে।

বিয়া করছেনি জাপানে?

কইতে পারি না। তয় অনুমান করি। আর হেইডা যুদি বুদ্দি কইরা কইরা থাকে তয় আমি বিরাট খুশি। কামের কাম করছে। জিন্দেগিভর জাপানে থাকতে পারবো। টেকা কামাইতে পারবো দুইহাতে।

আর আপনের মাজারো পোলা? আতাহার?

মান্নান মাওলানা বিরক্ত হলেন। বাদ দেও তো মিয়া এই হগল প্যাচাইল। এনামুল সাবে মজজিদের কথা কইতাছে হেইডাঐ হুনি।

মান্নান মাওলানা এনামুলের দিকে তাকাল। কও বাজান, কও। আইজঐ বেবাক ফাইনাল করো।

এনামুল তার চা শেষ করে কাপটা টেবিলে রাখল। গম্ভীর গলায় বলল, হ আইজ বেবাক আমি ফাইনাল কইরা যাইতাছি। মজজিদের কাম শুরু অইবো পোষমাসের পয়লা তারিখে।

আলহামদুলিল্লাহ।

পোষমাসের পয়লা তারিখে ক্যান হেইডা হোনেন। তহন পুরাপুরি শীতের দিন। দেশগেরাম খটখটা শুকনা। পচ্চিমের পুকঐর থিকা মাডি কাডন অইলো পয়লা কাম। পোষমাসের পয়লা তারিখে কোদালের কোপ পড়ব পুকঐরে। বিশ-তিরিশজন মাইট্টাল লইয়া পাঁচ থিকা সাতদিনের মইদ্যে ছাড়াবাড়ির উচা নিচা জাগা সমান কইরা হালাইবো মোতালেব মামায়।

মোতালেব বলল, পাঁচ-সাতদিন লাগবো না মামু। তিন-চাইর দিনেঐ অইয়া যাইবো। মজজিদ যেহেনে উটবো ওই জাগাড়া তো সমান আছে। ওহেনে মাডি লাগবো না।

না না ওহেনে মাডি লাগবো ক্যা? ওই জাগার মাড়ি কাইট্টা ঢালাই ঢোলাই দিয়া পিলার উডান লাগবো।

হেইডাঐত্তো কই।

আপনে চাইর দিনের মইদ্যে মাডির কাম শেষ করবেন। ততদিনে জাহিদ খাঁ-র বাড়ি তরি সড়ক কারপেটিং অইয়া যাইবো। টেরাক আইবো। তিনটনি এক টেরাকে ইটা আডে দুইহাজার। রোজ দুই টেরাক কইরা ইটা পাডামু আমি। লেবার লইয়া হেই ইটা টেরাক থিকা আনলোড করবেন আপনে। মজজিদ বাইত্তে আইন্না রাখবেন। পাঁচদিনে বিশহাজার ইটা আইয়া পড়বো। এর মাঝখানে সেনটারিং মেনটারিং-এর লেইগা কাঠ টিন বাশ এক টেরাক ভইরা পাডামু। পুরানা টিনমিন দিয়া একখান আলগা ঘর বানাইবেন সিমিট রাখনের লেইগা। রড তো খালি জাগায় থাকবো। কাদির মিস্তিরিগো থাকনের লেইগাও আলাদা একখান টিনের ঘর বানাইবেন। আম্মার কাছে টেকা থাকবো। টেকা নিবেন আর ধুমাইয়া কাম করবেন। তয় মোতালেব মামায় কইলাম একলা করবেন না। দুইজনে মিল্লা করবেন। একখান মোড়া খাতা কিনবেন। পাই টু পাই লেইক্কা রাখবেন। এক পয়সার হিসাবে যেন গরমিল না অয়। আমি এমতে মাইনষেরে পাঁচশো একহাজার, দরকার অইলে পাঁচহাজার খাওয়াইয়া দিমু, তয় মালের হিসাবে এক পয়সা এদিক ওদিক অইলে হেইডা বরদাস্ত করুম না।

মোতালেব গম্ভীর গলায় বলল, আরে না মামু, হেইডা অইবো না। হুজুরে আর আমি দুইজনে পাই টু পাই হিসাব রাখুম। তুমি কোনও চিন্তাঐ কইরো না।

দেলোয়ারা অনেকক্ষণ কথা বলেন নাই। সবই শুনছিলেন। এবার বললেন, তবে অন্যকথা। বাদলা, চা-র কাপটি লইয়া যা।

নিতাছি বুজি।

চটপটা হাতে কাপ তিনটা নিয়া রানঘরের দিকে চলে গেল বাদলা।

এনামুল বলল, এইবার হুজুর আপনের বেতন বোতনের কথা ফাইনাল করি।

বেতনের কথা শুনে মান্নান মাওলানার কলিজাটা আনন্দে নলামাছের মতন একটা লাফ দিল। তবে সেই আনন্দ তিনি একদমই প্রকাশ করলেন না। অতি বিনয়ের গলায়, যেন বেতন জিনিসটা কোনও বিষয়ই না এমনভাবে বললেন, বেতন দিবা?

দিমু না? এত টেকা খরচা কইরা মজজিদ বানামু আর ইমামের বেতন দিমু না? ইমাম রাখুম মাগনা? না না হেইডা আমি করুম না। আপনে কন, কত বেতন চান?

মান্নান মাওলানা বিনীত গলায় বললেন, এইডা একটা কথা কইলা বাজান?

ক্যা?

তোমার লগে বেতনের কথা কমু আমি?

তয় কইবেন না!

না। তোমার ইচ্ছা অইলে তুমি বেতন দিবা, না ইচ্ছা অইলে না দিবা। কত দিবা না দিবা তোমার ইচ্ছা। আমার কোনও কথা নাই।

এইত্তো একটা বিপাকের মইধ্যে হালাইলেন আমারে।

কীয়ের বিপাক?

আপনে একটা বেতন চাইলে আমি একটা কিছু চিন্তা করতে পারতাম।

তারপরও তো তোমার একহান চিন্তা আছে। তোমার চিন্তাঐ আমার চিন্তা। তুমি যেইডা কইবা হেইডাঐ সই।

আমি অবশ্য একটা বেতন আপনের ধরছি।

অইলো। যেইডা ধরছো ওইডাঐ সই।

আমি আপনের বেতন ধরছি আঠারোশো টেকা। একহাজার আষ্টশো।

মান্নান মাওলানা এনামুলের মুখের দিকে তাকাল। আইচ্ছা।

তয় আপনে যদি আমগো গেরামের না অইতেন, নোয়াখালি থিকা যুদি আপনেরে ইমাম হিসাবে আনাইতাম তয় আর কিছু বেশি দিতাম।

ক্যা?

তার একটা খোরাকির ব্যাপার আছিল না? রাইন্দা বাইড়া খাওন লাগতো। হাটবাজার করন লাগতো। বেতনের বেশিরভাগ টেকাই খরচা অইয়া যাইতো। আপনের তো আর হেই ঝামেলা নাই। বাড়িরডা খাইবেন আর মজজিদে ইমামতি করবেন। বিচার সালিশ মাতবরি করবেন। এই আঠারোশোই তো আপনের লাব।

মান্নান মাওলানা হাসলেন। অইলো। এইসব বেতন বোতন লইয়া এত কথার কিছু নাই। আল্লাহ আল্লাহ কইরা মজজিদটা ঠিকঠাক মতন কইরা ফালাইতে পারলে অয়।

সেইটা আল্লার রহমতে কইরা ফালান। চল্লিশ দিনের মইদ্যে মজজিদের কাম শেষ করুম। এইটা আমার ইচ্ছা। শুরু করলে আর থামাথামি নাই। পোষমাসের এক তারিখে কাম শুরু অইবো, মাঘমাসের দশ তারিখে শেষ। পোষমাসের পয়লা তারিখ থিকা আপনের বেতন।

মোতালেব হঠাৎ করে বলল, আমার কী করবা মামু?

এবার কথা বললেন দেলোয়ারা। তর আবার কী করবো?

হুজুরের বেতন ধরলো আমার কিছু ধরবো না?

তুই তো মাডি কাডনের কামঐ লইছস। তর তো আর বেতনের কিছু নাই।

মাডির কামে আমার কী অইবো?

এনামুল হাসল। আপনে লেবার কনটেকদারি করবেন।

লেবারগো দেখাশুনা করুম, কনটেকদারি করুম না।

ক্যা?

কনটেকদারি অর্থ অইলো টেকা পয়সা এদিক ওদিক করন। কামে ফাঁকি দিয়া টেকা বাঁচানো। কম কাম কইরা বেশি কাম দেহাইয়া টেকা রুজি করন।

হ।

মজজিদের কামে এইডা আমি করুম না।

কন কী?

হ। আমারে তুমি মাডির দায়িত্ব দিছো ওইডা আমি করুম ঠিকঐ, তয় এক পয়সাও এদিক ওদিক করুম না। কম মাইট্রাল লইয়া বেশি দেহামু, রোজ বেশি দেহামু এইডি আমি করুম না।

আগে তো আপনে এমতেঐ করতে চাইছিলেন।

হ আগে চাইছি।

তয় আথকা চিন্তা বদলাইলেন ক্যা?

মরণের ডর আছে না মিয়া? মরুম না একদিন? আল্লারঘরের কাম থিকা চুরি কইরা হাশরের দিন কী জব দিমু? মজজিদের কামে আমার কাছে কোনও দুই নম্বরি তুমি পাইবা না। ওই হগল আমি করুম না।

সত্য?

সত্য মানি। একশোবার সত্য।

দেলোয়ারা হাসলেন। তুই তো মানুষ অইয়া গেছস রে মোতালেবইব্বা। তোর মুখে এইরকম কথা তো ইহজিন্দেগিতে হুনি নাই।

মান্নান মাওলানা বললেন, মানুষ বদলায় বইন। কুনসুম কে যে কেমুন কইরা বদলায় কেঐ কইতে পারে না।

এনামুল উজ্জ্বল মুখ করে বলল, বহুত খুশি অইলাম মামু আপনের কথা হুইন্না। বহুত খুশি অইলাম। যুদি আপনে আপনের কথা মতন চলেন, যুদি খাস দিলে মাডির কামড়া করেন, মজজিদের অন্য কাম কাইজও খাস দিলে দেহাশুনা করেন তয় আপনেরেও আমি মাসে মাসে বেতন দিমু। মাওলানা সাবরে যত দিমু অতো দিমু না আপনেরে। তয় মাওলানা সাবের পরঐ মজজিদের দায়িত্ব থাকবো আপনের উপরে। হেয় যহন থাকবো না, অর্থাৎ কোনও একদিন হেয় যুদি অন্য কোনও কামে যায়, অসুক বিসুকে পড়ে তয় তার জাগায় আপনে।

মোতালেব মহাখুশি। ঠিক আছে মামু, ঠিক আছে।

তয় আমার আরেকখান কথা আছে।

কও মামু, কও।

কাইল থিকা নমজ ধরবেন। পাঁচওক্ত নমজ পড়বেন। মজজিদের কাম করবেন, মাথায় টুপি দিয়া চলবেন। কী ঠিক আছে?

একদম ঠিক আছে, একদম ঠিক।

মাওলানা সাবের লাহান পোেষমাসের পয়লা তারিখ থিকা আপনেরও বেতন ধরুম। কত ধরুম অহন কমু না। তয় যা কইলাম ওইভাবে চলতে হইবো।

তুমি দেইখোনে চলি কি না। কথার কোনও লড়চড় হইবো না মামু।

ঠিক আছে। তয় বেবাকঐ ফাইনাল অইলো। বিয়াল অইয়া আইতাছে আমার যাওনের সমায় অইলো। অহন আরেকখান কাম আছে হেই কামডা সারি।

কী কাম?

বহেন না, আপনের সামনেঐত্তো সারুম।

এনামুল মান্নান মাওলানার দিকে তাকাল। মাওলানা সাব, একটা বিষয়ে আপনের লগে কথা কমু। আপনে কিছু মনে করবেন না। আপনে যুদি আমগো মজজিদের দায়িত্ব না লইতেন তয় এই হগল লইয়া আপনের লগে কথা আমি কইতাম না। অহন বাধ্য হইয়া কইতাছি। কারণ আপনে অহন আমার লোক।

মান্নান মাওলানা লগে লগে মাথা নাড়লেন। হ বাজান হ, আমি অবশ্যই তোমার লোক। কও, কী কইবা কও।

যুদিও ব্যাপারটা আপনের ব্যক্তিগত তবু আমি মনে করি আপনেরে আমার এইডা কওন উচিত।

অইলো, কও।

আপনে বসির ঘটকরে দবির গাছির বাইত্তে পাডাইছিলেন?

মান্নান মাওলানা মাথা নিচা করে বললেন, হ।

দবিরের মাইয়া নূরজাহানের লেইগা বিয়ার পোরাসতাব দিছেন?

হ।

মোতালেব এনামুলের মুখের দিকে তাকাল একবার, দেলোয়ারার মুখের দিকে তাকাল। তারপর তাকাল মান্নান মাওলানার মুখের দিকে। নূরজাহানের লেইগা কবে বিয়ার পোরোসতাব পাডাইছে হুজুরে? আতাহারের? শেষ তরি গাছির মাইয়া বিয়া করবো আতাহারে?

এনামুল বলল, আরে না মিয়া। হুজুর নিজের লেইগাঐ পোরোসতাব পাডাইছে।

কও কী?

হ।

যেই ছেমড়ি হুজুরের লগে এই কাম করছে হেই ছেমড়িরে হুজুরে বিয়া করতে চায়? হায় হায় এইডা কোনও কথা অইলোনি? আর ছেমড়ি তো হুজুরের নাতিনের থিকাও ছোড। অহনতরি সাবালিকা অয় নাই।

মান্নান মাওলানা চোখ তুলে এনামুলের দিকে তাকালেন। না না নূরজাহান সাবালিকা হইছে। আমি খবর পাইছি। মাইয়াডা না বুইজ্জা আমার লগে একটা বেপি কইরা। হালাইছিল। আমি বহুতবার কইছি, নাদান মাইয়া, অরে আমি মাপ কইরা দিলাম। আতাহারের মায় মইরা গেছে, আমার বয়স অইছে, এই বয়সে সেবাযত্নের লেইগা একজন লাগে। এইডা চিন্তা কইরা…। ভাবলাম দউবরা গরিব গাছি। অর মাইয়া বিয়া করলে ওরও ঝামেলা মিটে। মাইয়ার বিয়া লইয়া চিন্তা করন লাগে না। মাইয়া আমার বাইত্তে। সুখে থাকবো। আল্লাহ খোদার নাম লইবো, নমজ রোজা করবো, আমার সেবা করবো। দউবরার সংসার চলনের লেইগা বিলে এককানি জমিন দিয়া দিমু নে আমি। অগো দিন কাইটা গেল। আমি কইলাম খারাপ চিন্তা কইরা পোরোসতাবটা পাঠাই নাই। অগো ভাল চাইছি দেইক্কাঐ পাডাইছি। এইডা লইয়া দউবরা তোমার কাছে নালিশ দিবো…

না না আমার কাছে কেঐ নালিশ দেয় নাই। গাছি আইয়া আম্মারে কইছে, আম্মায় কইছে আমারে। হুইন্না আমি মনে করলাম আপনের লগে কথা কই।

হোনো মিয়া, আমি পোরোসতাব দিছি, অরা তো পোরোসতাব বাতিলও কইরা দিতে পারে। ঘটকারে সোজা কইয়া দিলেই অইতো, না আমরা রাজি না। ঘটনা শেষ অইয়া যাইতো। এইডা লইয়া এত দরবাদরবির কী আছে!

দেলোয়ারা বললেন, না অরা কোনও দরবাদরবি করে নাই। নূরজাহান বিরাট একখান। অন্যায় করছিল আপনের লগে। হেই ঘটনার পর আপনে পাডাইছেন পোরোসতাব, অরা গেছে ডরাইয়া। ডরাইয়াঐ আইছে আমার কাছে। নিজেরা না করনের সাহস পায় নাই। যুদি আপনে চেইত্তা যান।

মোতালেব বলল, তয় দউবার মাইয়াডা বিরাট ট্যাটনি। ওইডারে বিরাট একখান ধমক দেওন দরকার।

খাড়ন, অহনঐ দিতাছি।

বাদলা মতলা রাবি তিনজনই ছিল ভিতর দিককার দরজার সামনে। এনামুল বাদলার দিকে তাকাল। গাছিরে ডাক দে।

দিতাছি দাদা।

বাদলা তার স্বভাব মতন দৌড় দিল।

মোতালেব বলল, গাছি এই বাইত্তেনি?

হ। আমি খবর দিয়া আনছি। মাওলানা সাবের সামনে, আপনেগো বেবাকতের সামনে অরে অহন ধমক দিমু।

এনামুলের কথা শেষ হওয়ার লগে লগে দবির এসে দাঁড়াল ভিতর দিককার দরজার সামনে। পরনে খয়েরি রঙের লুঙ্গি আর সাদা ঝুলপকেটঅলা শার্ট, কাঁধে গামছা ফেলা। মুখটা শুকনা, অপরাধীর মতন। দরজার সামনে দাঁড়িয়েই সে সালাম দিল। আসসেলামালায়কুম।

মান্নান মাওলানা তার সালামের জবাব দিলেন না, জবাব দিল মোতালেব। ওয়ালাইকুমসালাম।

মান্নান মাওলানা আড়চোখে একবার দবিরের দিকে তাকিয়ে কঠিন মুখে মাথা নিচা করলেন। রাবি মতলা বাদলা সবাই দাঁড়িয়ে আছে দবিরের পাশে। এনামুল তাদের দিকে তাকাল। রাবি, তারা বাইরে যা। আমগো কথার কাম আছে।

রাবি ব্যস্ত গলায় বলল, যাইতাছি।

দ্রুত পায়ে তারা তিনজন পুবদিককার দরজা দিয়া রান্নঘরের দিকে চলে গেল।

এনামুল দবিরের দিকে তাকাল। ঘটনা আমি হুনছি গাছি। আম্মায় আমারে কইছে। তয় তোমার অসুবিদা কী? পোরোসতাব তো ভাল।

কথাটা বুঝতে পারল না দবির। বলল, জে? গ্রামের নামকরা হুজুরে তোমার মাইয়ারে পছন্দ করছে, তারে বিয়া করতে চায়, বসির ঘটকরে দিয়া তোমার কাছে পোরোসতাব পাডাইছে, এইডা তো ভাল কথা। বিয়ার লায়েক মাইয়া থাকলে পোরোসতাব তো মাইনষে পাডাইবোঐ।

এনামুলের কথা শুনে দবিরের মুখ কালো হয়ে গেল আর মান্নান মাওলানা অবাক হলেন। মোতালেবও অবাক। এতক্ষণ এইভাবে কথা বলে এখন আবার সুর বদলাচ্ছে এনামুল, ঘটনা কী? সে আসলে কার পক্ষে? দবিরের না মান্নান মাওলানার?

দবির কোনওরকমে বলল, আমার মাইয়াডা দাদা ছোড়। হুজুরের নাতিনের বসি অইবো। তাগো থিকাও ছোড অইতে পারে।

হেতে কী অইছে। বাংলাদেশে সইত্তর বচ্ছইরা বুড়ার লগে ষোল্লো বচ্ছইরা বহুত মাইয়ার বিয়া অয়।

হ হেইডা অয়। তয়…

আমি বুজছি তুমি রাজি না। তোমার রাজি না অওনের কারণও আমি বুজছি। তুমি মনে করছো তোমার মাইয়ায় হুজুরের লগে বিরাট একখান বেদ্দপি করছিল। হেই বেদ্দপির কোনও শোদ হুজুরে লয় নাই। অরে মাপ কইরা দিছিলো। আসলে মাপ করে নাই। মনের মইদ্দে হুজুরের হেই জিদ রইয়া গেছে। অহন নূরজাহানরে বিয়া কইরা হেই জিদ মিটাইবো, মুকে ছ্যাপ দেওনের শোদ লইবো। জিন্দেগিডা ছারখার করবো মাইয়াডার।

দবির কথা বলবার আগেই মান্নান মাওলানা বললেন, এইডা যুদি অরা চিন্তা কইরা থাকে তয় চিন্তাডা ঠিক না। ওই ঘটনা সত্যই আমি মনে রাখি নাই। ভুইল্লা গেছি। শোদমোদ লওনের কোনও ইচ্ছা আমার নাই। থাকলে হেইডা আমি এতদিনে লইয়া হালাইতাম। অহনও ইচ্ছা করলে যহন তহন লইতে পারি।

মোতালেব বলল, হুজুরে ক্যান নূরজাহানরে বিয়া করতে চায় হেইডা ইট্টু আগে হুজুরে তোমারে কইছে মামু। আমগো নবীজীবও তো অল্প বসসি মাইয়া বিবাহ করছিলেন। আমি শুনছি বিয়ার সময় হজরত আয়েশা রাদিআল্লাহুআনহুর বয়স আছিল মাত্র নয় বছর।

এনামুল মোতালেবের দিকে তাকাল। সেইটা আর এইটা এক কথা না মামু। মোতালেব লগে লগে কথাটা মেনে নিল। হ মামু ঠিকঐ কইছো। সেইটা আর এইটা এককথা না।

অনেকক্ষণ পর দেলোয়ারা আবার কথা বললেন। মাওলানা সাবের লগে নূরজাহান যেইডা করছিল, হেই ঘটনার পর হেই মাইয়ারে যহন মাওলানা সাবে বিয়া করতে চাইবো, তহন তো মাইয়ার মা-বাপের আর মাইয়ার মনে এই সন্দ অইবোই যে মাওলানা সাবে শোদ লওনের লেইগা এই বিয়া করতে চায়। নাইলে জাতপদে টেকাপয়সায় নামডাকে গাছির মাইয়ার লগে মাওলানা সাবের সমন্দ চলে না। কই মাওলানা সাবে আর কই দবির গাছির মাইয়া!

এনামুল বলল, আম্মার কথা ঠিক।

মোতালেব বলল, হ লেইজ্জ কথা। এই চিন্তা নূরজাহানের মা-বাপে করবোই।

আর নবীজির আমল আর আইজকার দিন এক না। আরব দেশের সেই আমল আর বাংলাদেশের এই আমল এক না। দেশগেরামে যদিও নাবালিকার লগে বুড়া বেডাগো বিয়া অয়, আইনের চোখে এইডা অন্যায়। এইডা অইতে পারে না। আর আমরা যে যত কথাঐ কই, মাওলানা সাবে যত সুমতলব লইয়াঐ নূরজাহানরে বিয়া করতে চাউক না ক্যান, এইডা দবিররা মাইন্না নিতে পারবো না। অগো মনে ডরডা থাকবোঐ যে মাওলানা সাবে শোদ লওনের লেইগা ইচ্ছা কইরা, ঘুরাইয়া ফিরাইয়া অন্যপথে মাইয়াডারে কবজা করতে চাইতাছে।

এনামুলের প্রথম দিককার কথা শুনে খুবই ঘাবড়াইয়া গেছিল দবির। ভেবেছিল, হায় হায় এনামুল সাবে দেহি হুজুরের পক্ষ লইছে। এখন বুঝল, না, ঘুরাইয়া প্যাচাইয়া সে অহন। আসল কথায় আসতাছে। কনটেকদার মানুষ তো, ঘোরপ্যাঁচ বহুত ভাল বোঝে!

ভিতরে ভিতরে মনটা শান্ত হল দবিরের। ভাল রকম ভরসা পেল। মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

এনামুল বলল, নূরজাহান মাইয়া দেকতে ভাল। সাত-আষ্টমাস আগে অরে আমি একদিন দেখছি। মাওলানা সাবের ঘটনার আগে। মাইয়া ঢকেপদে (দেখতে শুনতে) ভাল। অর মতন মাইয়ারে মাইনষে পছন্দ করবো। যুদি এমুন হইতো, মাওলানা সাবে না, তাঁর পোলা আতাহার পছন্দ করছে নূরজাহানরে, সে বিয়া করতে চায়, তয় একখান কথা আছিলো। গাছির মাইয়া বিয়া করতে চায় মাওলানার পোলায়, যেই মাওলানার অবস্তা মাশাল্লা ভাল, জাগাসম্পত্তি টেকাপয়সা আছে, তহন হেইডা একটা বিবেচনার বিষয় অইতো। তয় ঘটনা তো তা না।

এনামুল আরও কিছু হয়তো বলত, তার আগেই মান্নান মাওলানা বললেন, আরে না মিয়া, আমার পোলায় নূরজাহানির লাহান মাইয়ারে পছন্দ করতো না।

কথাটা তিনি বললেন বেশ রুক্ষ ভঙ্গিতে। শুনে এনামুল একটু রাগল। আথকা বলল, তয় আপনে করছেন ক্যা?

মান্নান মাওলানা থতমত খেলেন। মুখে কথা জুটল না তার।

মোতালেব হাসল। মামুর কথার জব দেন হুজুর।

মান্নান মাওলানা আমতা গলায় বলল, না মাইনি এই বসে মাইনষে তো আর পোলাপান অওনের লেইগা বিয়াশাদি করে না। আমার ইট্টু সেবাযত্ন করতো। হাত পাও টিপ্পা দিতো, অজুর পানি দিতো এই হগল আর কী!

অর্থাৎ বউ না, আপনের একখান বান্দির দরকার। তয় বিয়া করনের কাম কী? একখান বান্দি রাইক্কা লন। নূরজাহানরে বিয়া করলে তো টেকাপয়সা খরচা করতে হইবো, দবিররে আবার বিলে জমিনও লেইক্কা দিতে চান। এতকিছুর কাম কী? একখান অল্প বসি ভাল বান্দি রাখেন।

মান্নান মাওলানা আর কথা বলতে পারলেন না। মাথা নিচা করে বসে রইলেন।

মোতালেব তখন মিটিমিটি হাসছে, দেলোয়ারাও হাসছেন। দবির ভিতরে ভিতরে খুশিতে ফেটে পড়ছে।

এনামুল বলল, মাওলানা সাব, আপনে কইলাম আপনের নিজের কথায়ঐ আইটকা গেছেন। আপনের কথায় পোলাপানেও বুজবো কোন উদ্দেশ্যে নূরজাহানরে আপনে বিয়া করতে চান। যাই হউক এই হগল লইয়া আমরা আর প্যাচাইল পাডুম না। এই ঘটনা আইজ আমি এহেনেই মিটাইয়া দিয়া গেলাম। আপনে সব সময় যেই কথা কন, আইজও যেইডা আম্মার সামনে, মোতালেব মামার সামনে আর আমার সামনে কইলেন, যে নূরজাহান আপনের লগে যেই বেদ্দপি করছিল হেইডা আপনে মনে রাখেন নাই, কোনও শোদ লওনের ইচ্ছা আপনের নাই, এইডাঐ আমরা ধইরা রাখলাম। নূরজাহানের লগে আপনের আর কোনও বিরোধ নাই। আইজ বেবাক শেষ।

তারপর অন্য একটা খোঁচাও মান্নান মাওলানাকে দিল এনামুল। যদিও মাকুন্দা কাশেমের ঘটনা কী ঘটছিল হেইডা কইলাম দেশগেরামের বেবাকতেই জানে। ছনুবুড়ির জানাজার কারণে যে মাকুন্দার উপরে আপনে চেতছিলেন, বেবাক কথা বেবাকতেই জানে। নূরজাহান ক্যান ওই কাম করছিল…।

দেলোয়ারা বললেন, বাদ দেও বাজান এই হগল প্যাচাইল।

আইচ্ছা আম্মা, আপনে কইলেন, বাদ দিলাম। তয় মাওলানা সাব আর নূরজাহানের ঘটনা আইজ আমি এহেনেই শেষ কইরা দিতে চাই। অহন হুজুরের মনে অইতে পারে তার ব্যক্তিগত ব্যাপার লইয়া আমি এত মাথা ঘামাইতাছি ক্যা? আমি তো গেরামের চেরম্যান মেম্বর না, মাতবরও না। তাও আমি ক্যান এইসব লইয়া মাথা ঘামাইতাছি। মাথা ঘামানের কারণ একটাই, মাওলানা সাবে অহন আমার লগে জড়িত। মজজিদ অইলো আল্লার ঘর। এই ঘরের মালিক অইলো আল্লাহপাক। তয় একখান অছিলা লাগে, যে মজজিদ তইর (তৈয়ার) কইরা দেয়। আমি হেই অছিলা। মাওলানা সাবে এই অছিলায় আমার লগে জড়িত। সে মজজিদের ইমাম অইবো। বেতন বোতনের কথা আমি কইলাম না। তয় আমি আইজ থিকা মনে করি মাওলানা সাবে আমার লোক। আমার লোকের ভালমন্দ দেকলের দায়িত্ব আমার। হেই দায়িত্বের কারণে মাওলানা সাব আপনেরে আমি কইতাছি, আপনের বিয়া করতে অয় অন্য জাগায় করেন, নূরজাহানের কথা চিন্তা কইরেন না।

দেলোয়ারা বললেন, মাওলানা সাবের এই বসে বিয়া করনডাঐ ঠিক অইবো না। মাইনষে হাসাহাসি করবো। নতুন দাসী বান্দিরও দরকার নাই। পুরানা কামের বেটি তার বাইত্তে একজন আছে। বড়পোলার বিধবা বউ আছে। হেই বউঐত্তো হোনলাম মাওলানা সাবের সেবাযত্ন করে। মাওলানা সাবের বাইত্তেও অনেক পদের ঘটনা আছে। দেশগেরামের সব খবর সবাই জানে। এই অবস্থায় তার বিয়া করনডা ভাল অইবো না। নতুন মজজিদ অইতাছে গেরামে, হেই মজজিদের ইমামতি করবো যে হে যুদি এই বসসে একখান বিয়া করে…

দেলোয়ারার কথা শেষ হওয়ার আগেই মোতালেব বলল, বিরাট লেইজ্জ কথা কইছে বুজি। না না হুজুর, বিয়াশাদির মতলব আপনে ছাইড়া দেন। মামু মজজিদ করতাছে, লন দুইজনে মিল্লা মজজিদের কাম করি। আল্লায় ভাল করবো।

অনেকক্ষণ পর কথা বললেন মান্নান মাওলানা, আমি এতকিছু চিন্তা কইরা পোরোসতাব পাই নাই। ঠিক আছে, ঘটনা যহন এতদিকে গড়াইছে, তয় চিন্তাডা আমি বাদ দিলাম।

তারপর কথা অন্যদিকে ঘুরালেন। পোষমাসের পয়লা তারিক থিকা মজজিদের কাম আল্লার রহমতে আরম্ব অইতাছে, এইডা ঠিক তো বাজান?

এনামুল বলল, আমি বাঁইচ্চা থাকলে তো আমার কথা ঠিক থাকবোই, আমি মইরা গেলে আপনেগো বউ পারভিনও ওই তারিখেই মজজিদের কাম আরম্ব করবো।

আলহামদুলিল্লাহ।

এনামুল এবার দবিরের দিকে তাকাল। মাওলানা সাবের লগে তোমার মাইয়ার সমস্যা আমি মিটাইয়া দিছি। তয় তোমারে একখান কথা কইয়া যাইতাছি, যত তাড়াতাড়ি পারো মাইয়া বিয়া দিয়া দেও। অহন থিকাই পোলা দেহো। পছন্দ মতন পোলা পাইবা, বিয়া দিয়া দিবা। বিয়ার সমায় আমি যতটা পারি সাহাইয্য করুম। দেরি করবা না। আর মাইয়া রাখবা সাবধানে। তোমার মাইয়ায় য্যান আর কোনও ঘটনা না ঘটায়।

দবির গদগদ গলায় বলল, না দাদা না, এইডার দায়িত্ব আমার। অর সমন্দে আর কোনও কথা আপনেগো কানে কোনওদিন আইবো না। আমি পোলা দেখতাছি, অরে বিয়া দিয়া দিমু।

এনামুল উঠল। বিকাল অইয়া গেছে। আমার অহন যাওন লাগবো। রিকশাআলা আইয়া জাহিদ খাঁ-র বাড়ির সামনে বইয়া রইছে।

.

আথকা এনামুল সাবে তোমারে খবর পাডাইলো! ঘটনা কী?

রান্নাচালার সামনে বসে গুড় গুড়ক করে তামাক টানছে দবির। খানিক আগে বাদলা এসে বাড়িতে দিয়া গেছে তাকে। দুপুরবেলা বাদলা এসে ডেকে নেওয়ার সময় বুদ্ধি। করে যে নিজের নৌকা নিয়া বাইর হইবো দবির সেকথা মনে ছিল না। কোনওরকমে শার্টটা পরে, গামছাটা কান্ধে ফেলে বাদলার নাওয়েই চড়ে বসছে। তখন একবারও ভাবে। নাই ফিরার সময় উপায় হবে কী? এনামুল সাহেবকে সড়কে নামাতে যাচ্ছে বাদলা। সেই নাওয়ে চড়ে বসেছিল দবির। সাবেরে নামাইয়া দিয়া আমারে ইট্টু বাইত্তে দিয়াহিচ বাদলা।

বাদলা মহা উৎসাহী পোলা। বলল, কোনও অসুবিদা নাই মামা। ওডেন নাওয়ে।

বাদলার কায়কারবার দেখে এনামুল হাসিমুখে বলল, তুই তো তর বাপের থিকাও বড় অইয়া গেছস রে বাদলা।

সড়কের ধারে জাহিদ খাঁ-র বাড়ি বরাবর রিকশা নিয়া বসে আছে সকালবেলার সেই রিকশাআলা। এনামুল ব্রিফকেস হাতে রিকশায় ওঠার পর পরই রিকশা চালায়া দিল। দবির তাকে একটা সালাম দিল। আসসেলামালায়কুম।

এনামুল ওয়ালাইকুমআসোলাম বলতে বলতে রিকশা অনেক দূর।

বাদলা তারপর নাও বাইতে শুরু করেছে দবির গাছির বাড়ি বরাবর। দবির বলল, তুই বয় বাদলা, আমি নাও বাই। লগ্নি আমারে দে।

বাদলা লগির খোচ দিতে দিতে বলল, আরে না মামা। আপনে বইয়া থাকেন, আমি বাইতাছি।

বাড়িতে আসার পর নূরজাহানকে দবির বলল, অরে মুড়ি মিডাই দে মা। আমারে আইয়া লইয়া গেছে, আবার নাও বাইয়া দিয়া গেল। আমারে লগ্নি ধরতে দেয় নাই।

বাদলা বলল, অহন বইয়া বইয়া মুড়ি মিঠাই খাইতে পারুম না মামা। বেইল নাই। হাজের আগে বাইত্তে যাওন লাগবো।

তয় এক কাম কর, টুপরে কইরা মুড়ি মিডাই লইয়া যা। বইঠা দিয়া নাও বাবি আর টুপরে থিকা একমুঠ কইরা মুড়ি লইয়া মুখে দিবি। এক কামড় মিডাই খাবি।

নূরজাহান সেইভাবে মুড়ি মিঠাই দিছে বাদলাকে। একথাল মুড়ি টোপরে নিয়া, আর একচাকা নাইরকেল দেওয়া মিঠাই, দবিরের কথা মতনই বইঠা বাইতে বাইতে, মুড়ি মিঠাই খাইতে খাইতে বাড়ির দিকে মেলা দিছে বাদলা।

দবির তারপর রান্নাচালার সামনে গিয়া হুঁকা নিয়া বসছে। ভাদাইম্মাকে নিয়া বাঁশঝাড় তলার ওইদিকে দৌড়াদৌড়ি করছে নূরজাহান। বিকাল শেষ হয়ে আসছে। বড়ঘরের ওটায় বসে মাথা আঁচড়াচ্ছিল হামিদা। নারকেল তেলের বোতল আর কাকুই ঘরে রাইখা আইসা ওই কথা বলল।

শেষ বিকালের এক টুকরা রোদ পড়ছে রান্নাচালার ওইদিকে। সেই আলোয় দবিরের মুখ আনন্দে ফেটে পড়ছে। হুঁকা টানার ফাঁকেও তার ঝলমলা মুখ দেখতে পেল হামিদা।

দবির হুঁকা থেকে মুখ তুলে হাসিমুখে বলল, এইবারও তোমার মাইয়ারে বাঁচাইয়া দিল মরনি বুজি।

হামিদা চমকে উঠল। আবার কী করছে নূরজাহান?

তারপরই চেতে গেল। মাইয়া লইয়া তুমি বাড়িত থন বাইর অইছিলা ক্যা? অরে তো আমি চিনি। ও যেহেনেঐ যাইবো ওহেনে কোনও না কোনও ভেজাল করবো। ঝামেলা লাগাইবো। হায় হায় রে এই বান্দরনিরে লইয়া কী যে করুম আমি!

দবির হাসল। এইবার তোমার মাইয়ায় কিছু করে নাই।

তয়?

ও অহনরি কিছু জানে না। তুমি জানো না।

কী অইছে কী?

তোমগো কেরে আমি কিছু কই নাই।

কও নাই, তয় অহন কও। অহন এত প্যাচাইতাছো ক্যা? খোলসা কইরা কও না কী অইছে। মরনি বুজি কেমতে নূরজাহানরে বাঁচাইলো?

বসির ঘটক আইছিলো না আমগো বাইত্তে। তোমারে কইছিলাম না নূরজাহানের লেইগা সমন্দ আনছে!

হ। দোজবরের সমন্দ আনছিল। হুইন্না আমি কইছি মাইয়ার জিন্দেগিতে বিয়া না অইলেও দোজবরের কাছে বিয়া দিমু না।

ওই সমন্দ লইয়া আমি তোমার লগে অনেক মিছাকথা কইছি।

কেমুন মিছাকথা।

 দোজবরের সমন্দ ঘটকায় ঠিকঐ আনছে, তয় মানুষটা কে হেইডা কই নাই। চাইপ্পা গেছি। হোনলে তুমি আর নূরজাহান ডরে মইরা যাইবা দেইক্কা কই নাই।

কেডা, কার লেইগা সমন্দ আনছিল?

রান্নাচালার বাঁশের খুঁটির লগে হুঁকা দাঁড় করায়া রাখল দবির। হামিদার চোখের দিকে তাকালো। পাত্র অইলো মান্নান মাওলানা।

কী?

দবিরের পাশে রান্নাচালার মাটিতে ধপ করে বইসা পড়ল হামিদা। কী? কার লেইগা সমন্দ আনছিল? মান্নান মাওলানার লেইগা?

হ।

কও কী তুমি?

আরে হ।

মুখ শুকাইয়া পউয়া মাছের লেজের মতন ফ্যাকাশে হয়ে গেল হামিদার। হায় হায় কয় কী?

দবির হাসল। অহন বেক কিছু মিটমাটের পরও তুমি এমুন ডরান ডরাইতাছো, আর তহন যুদি হোনতা, তয় তো ডরে মইরা যাই। আমিঐ মইরা যাইতে লাগছিলাম। কয়ডা দিন যে কী গেছে আমার উপরে দিয়া, জানি খালি আমি আর আমার আল্লায়। একটা রাইতও ঘুমাইতে পারি নাই। তুমি খালি জিগাইছো কী অইছে আমার। আমি তোমারে কইতে পারি নাই। মনে অইতাছিল আমার কইলজাড়া ফাইট্টা যাইতাছে। আমার বুকের উপরে য্যান একখান হাজারমন ওজনের অসুর বইয়া আমার গলা টিপ্পা ধরছে। আমি দম। বন্দ অইয়া মইরা যাইতাছি। আইজ হেই অসুর আমার বুক থিকা নামছে। আইজ আমি বাঁইচ্চা গেছি। এনামুল সাবে আমারে বাঁচাইয়া দিছে।

দবিরের একটা হাত চাইপা ধরল হামিদা। কও, আমারে তুমি পুরা ঘটনা কও। কেমতে কী অইলো কও।

একে একে পুরা ঘটনা বলল দবির। ল্যাংড়া বসির মাওয়ার বাজারে নিয়া যাওয়ার পর চা সিগ্রেট আর সেন্টুর দোকানের রসগোল্লা খাওয়াইয়া, কীভাবে প্যাচাইয়া প্যাচাইয়া প্রস্তাবটা দিল। দবির রাজি হইলে কী কী সুবিধা তার হবে, বিলে এক-দেড় কানি ধানের জমি, বাড়িতে আরেকটা ঘর তুলে দেওয়া, দরকার হইলে নগদ টাকাপয়সা সব দিয়া নূরজাহানরে সে বিয়া করতে চায়। শোনার পর ঘটকার নাওয়ে আর চড়ে নাই দবির, চক সাঁতরাইয়া বাড়িতে আসছে। পরদিন আথকা নূরজাহানরে নিয়া মরনি বুজির বাড়িতে গেল, তার বুদ্ধিতে গিয়া ধরল দেলরা বুজিরে। এনামুল বাড়িতে আসার পর দেলরা বুজি বলছেন তারে, সে মান্নান মাওলানারে ডাইকা কীভাবে সব মিটাইয়া দিল, মাওলানা সাবে কী কইলো, মোতালেব দেলরা বুজি কী কইলো, সব হামিদাকে খুলে বলল দবির। শেষ পর্যন্ত এনামুল যে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নূরজাহানরে বিয়া দিয়া দিতে বলছে তাও বলল।

শুনে বড় করে একটা শ্বাস ফেলল হামিদা। আল্লাহ আল্লাহ, আল্লায় রহম করছে। তয় ওই গোলামের পোর মনের মইদ্যে তো নূরজাহানের উপরে শোদ লওনের ইচ্ছা রইয়া গেছে। শুয়োরের পোয় তো ঘটনা ভোলে নাই। অহনতরি চেইত্তা রইছে আমার মাইয়ার উপরে।

হ, হেই চেতন আইজ এনামুল সাবে ফিনিশ কইরা দিছে। অহন আমার কাম একখান, মাইয়ার লেইগা পোলা দেহন। এইবারের শীতের দিনের মইদ্যে অর বিয়া দিমু। ইকটু সুবিদা মতন ভাল পোলা পাইলেঐ বিয়া দিয়া দিমু।

হ ঘটক লাগায়া দেও।

ঘটক লাগাইলেও ল্যাংড়ারে লাগান যাইবো না। ও তো হুজুরের ট্যান্ডল। শালার পো শালায় অন্য প্যাঁচ লাগাইয়া দিব।

তয় অন্য ঘটক ধরো।

হ। কান্দিপাড়ার রমিজ ঘটকরে ধরুম। তয় ঘটকারা অইলো বদমাইশ টাইপের মানুষ। খালি টেকা খাইবো। নিজেরা পোলা বিচড়াইয়া বাইর করতে পারলে ভাল অইতো।

তয় বিচড়াও।

এনামুল সাবের লগে কথা কইয়া আহনের পর থিকা আমি আসলে মনে মনে পোলা বিচড়াইতাছি নূরজাহানের মা। বিচড়াইতে বিচড়াইতে খালি একহান পোলা আমার চোক্কে পড়ে।

কে! কেডা তোমার চোক্কে পড়ে?

মরনি বুজির পোলা। মজনু।

হামিদা স্নিগ্ধমুখে দবিরের দিকে তাকাল। হেইডা কি অইবো? মরনি বুজি কি রাজি অইবো? মজনু তো অহনতরি তেমুন বড় অয় নাই। মাত্র খলিফা কামে ঢুকছে। এই বসে কি বুজি অরে বিয়া করাইবো? আর আমরা অইলাম দুনিয়ার গরিব। তুমি অইলা গাছি। গাছির মাইয়া কি হেয় তার পোলার লেইগা নিবো?

দবির মাথা নাড়ল। হ এইডা একখান কথা। তয় মরনি বুজি নূরজাহানরে বহুত পছন্দ করে। মজনুও মনে অয় পছন্দ করে।

আবার একখান কথাও আছে। মজনুও তো মরনি বুজির আপনা পোলা না। বইনের পোলা। বইন মইরা গেছে, বাপের খবর নাই।

কইয়া দেহুমনি বুজিরে?

কেমতে কইবা? নিজের মাইয়ার বিয়ার কথা আথকা গিয়া এইভাবে কেঐরে কওন যায়? বেহাইয়া মনে করবো না?

তারবাদে যুদি কোনও ওজর আপত্তি দেহাইয়া না কইরা দেয়, তয় তো বিরাট শরম পামু আমি। মরনি বুজির সামনে আর কোনওদিন যাইতেই পারুম না।

অন্য কেঐরে দিয়া কওয়াইলে কেমুন অয়?

কে, কারে দিয়া কওয়ামু?

হেইডা চিন্তা করো।

দবির আবার তামাক সাজাল। গুড়ক গুড়ক কইরা টানতে টানতে বলল, ঘটনা অইয়া যায় অন্যরকম। উলটা।

কথাটা বুঝতে পারল না হামিদা। বলল, কীরকম?

দেশগেরামের গিরস্তরা পোরোসতাব দেয় পোলার পক্ষ থিকা। আমার পোলার লেইগা। আপনের মাইয়াডারে চাই। আর আমরা চিন্তা করতাছি অন্য।

হ ঠিক কথা। বাদ দেও এই হগল চিন্তা। ভিতরে ভিতরে পোলা বিচড়াও। কিছু টেকা পয়সা খরচা অইলেও রমিজ ঘটকরে লাগাও। কপালে যেহেনে বিয়া আছে, মাইয়ার বিয়া ওহেনেই অইবো। আর অহন এত হুড়াহুড়িরও কিছু নাই। এনামুল সাবে তো আর কয় নাই কাইলঐ মাইয়ার বিয়া দিয়া দেও। হেয় যহন বেক কিছু মিটমাট কইরা দিছে, তয় আর হুড়াহুড়ির কী আছে। আমরা পোলা দেকতে থাকি। ছয়মাস নাইলে এক বচ্ছরের মইদ্যে মাইয়ার বিয়া দিলেই অইবো। অহন তো আর ডরের কিছু নাই।

দিনের আলো কখন মুছে গেছে চারদিক থেকে দুইজন মানুষের কেউ উদিস পায় নাই। বাঁশঝাড়তলার ওইদিক থেকে দৌড়াইয়া আসল নূরজাহান। আর পিছন পিছন আসল ভাদাইম্মা। মা-বাবাকে রান্নাচালায় তখনও বসে থাকতে দেখে নূরজাহান বলল, ওমা, তুমি দিহি অহনতরি এহেনে বইয়া রইছো? হাজ অইয়া গেছে, ঘরে যাইয়া কুপি বাত্তি আঙ্গাও না ক্যা?

হামিদা বলল, তুই আঙ্গা গিয়া।

নূরজাহান তীক্ষ্ণচোখে হামিদার মুখের দিকে তাকাল। দবির গুড়ক গুড়ক করে তামাক টেনেই যাচ্ছে। দুইজনের একজনের চেহারাও আলো বলতে কিছু নাই। তাদের মুখে দুশ্চিন্তার ছায়া নাকি স্নিগ্ধ আনন্দ কিছুই বোঝার উপায় নাই। আর এনামুল সাব কেন ওইভাবে ডাকাইয়া নিছিল দবির গাছিকে, ঘটনা কী সেইটাও জানা হয় নাই নূরজাহানের। জানার খুব ইচ্ছা।

এই ইচ্ছা নিয়াই বড়ঘরে গিয়া ঢুকল সে। ম্যাচ আর কুপিবাতি যেখানে থাকে সেখানে। হাত দিয়া ফস করে ম্যাচের কাঠি জ্বালাল, কপি জ্বালাল। কুপির ওইটুকু আলোয়ই যেন পুরাপুরি আলোকিত হয়ে গেল ঘর। এতটা দূর থেকে সেই আলো যেন খোলা দরজা দিয়া বের হয়ে উঠান পার হয়ে রান্নাচালায় বসে থাকা দবির আর হামিদার কাছে চলে গেল। দূর থেকে দুইজন মানুষকে একটু পরিষ্কার, একটু আবছায়া মনে হতে লাগল।

.

পারুর বড়মেয়ে শিরিনকে কেউ শিরিন বলে ডাকে না। ডাকে শিরি।

কীরকম এক মৃদুকান্নার শব্দে আজ দুপুররাতে ঘুম ভেঙে গেল শিরির। খুব কাছে বসে কে যেন চেপে চেপে কাঁদছে। প্রথমে শিরি ভেবেছে সে আসলে ঘুমিয়ে আছে। ঘুমের ভিতর স্বপ্নে হয়তো কান্নার শব্দ শুনছে। পরে বুঝল না তার ঘুম ভেঙে গেছে। বাস্তবেই কান্নার শব্দটা সে শুনছে। এই তো তার খুব কাছে বসেই কেউ চেপে চেপে কাঁদছে। কেউ যাতে না শুনতে পায়, না বুঝতে পারে, কান্নাটা তেমন কান্না।

কয়েক পলকে শিরি বুঝে গেল পারু কাঁদছে। কেন, রাতদুপুরে এভাবে কোন দুঃখে কাঁদছে পারু? তাকে তো শিরি এভাবে কোনওদিন কাঁদতে দেখে নাই। বাবা মারা গেল তখন পারু বিলাপটিলাপ করে কাঁদছে ঠিকই। রাতদুপুরে এরকম গভীর কষ্টের কান্না কখনও কাঁদে নাই। বরং কোনও কোনও রাতে সে খুবই আনন্দে থাকে। বিকালবেলা একটু বেশি সাজগোজ করে, রাতেরবেলা তাড়াতাড়ি ভাতপানি খাওয়াইয়া পোলাপান তিনটাকে ঘুম পাড়ায়া দেয়। দুই-তিনটা সেন্টের শিশি আছে পারুর স্নো পাউডার লিপস্টিক এইসবের লগে। সেই শিশি থেকে সেন্ট দেয় শরীরে। কোনও কোনও রাতে সেন্টের গন্ধে ঘুম ভেঙে গেছে শিরির। তখন কত রাত কে জানে! তারা তিনটা ভাইবোন কেবিনে শুয়ে ঘুমাচ্ছে। পারুও শুয়েছিল তাদের পাশে, রাতদুপুরে সেন্টের গন্ধে ঘুম ভাঙার পর শিরি উদিস পেয়েছে পারু কেবিনে নাই, সে চলে গেছে কেবিনের বাইরে। ওখানে একটা খাট পাতা আছে পাটাতনের উপর। সেই খাটের দিক থেকে আসছে সেন্টের গন্ধ। সেন্টের গন্ধের লগে আসছে মিষ্টি সুপারিআলা পানের গন্ধ, সিগ্রেটের গন্ধ। দুইজন মানুষ খুবই নিচাগলায় কথাবার্তা বলছে, হাসাহাসি করছে। শিরির অজানা, অদ্ভুত গোঙানির মতন শব্দ করছে।

শিরি বুঝে গেছে কে আসছে এতরাতে তাদের ঘরে। কার লগে ওই খাটে আছে পারু।

প্রথম প্রথম ব্যাপারটা বোঝে নাই শিরি। কাজির পাগলা স্কুলে ভরতি হওয়ার পর থেকে বুঝতে পারছে প্রায় রাতেই আতাহার কাকা আসে তাদের ঘরে। পারু তার লগে ওই খাটে যায়।

বাবা মারা যাওয়ার আগ থেকেই, ওই অতটুকু শিরি শুনছে তারা আসলে মোতাহারের পোলাপান না, তাদের আসল বাপ আতাহার। কোন রহস্যে কীভাবে বড়ভাইয়ের পোলাপানের বাপ হয় মাজারো ভাই, জানত না শিরি। বুঝত না। আজকাল বোঝে।

তারপর থেকে সে পারুকে খুব খেয়াল করে। নয়-দশ বছর বয়সে দুনিয়াদারি সে ভালই বুঝতে শিখছে। স্বামী না থাকলে মেয়েরা পোলাপান নিয়া যেমন দুঃখ কষ্টে থাকে, পারুর তেমন কোনও দুঃখ বেদনা নাই। রান্নাবান্না খাওয়াদাওয়া, পোলাপানের যত্ন, নিজের যত্ন কোনওটাতেই তার কোনও সমস্যা নাই। স্বামীর কথা সে ভাবেই না। পোলাপান তিনটাকেও ভাবতে দেয় না মা-বাপের কথা। যেন বাপ তাদের মরে নাই, বাপ বেঁচেই আছে।

আসলেই তো বেঁচে আছে। মারা গেছে মোতাহার, পারুর স্বামী। বেঁচে আছে আতাহার, শিরি, নসু আর নূরির বাপ। সেই বাপের জন্যই যে বিধবা জীবনে কোনও দুঃখকষ্ট নাই পারুর এসবও ধীরে ধীরে বুঝে গেছে শিরি। দাদি মারা যাওয়ার কিছুদিন আগ থেকে শুইনা আসছিল আতাহারের লগে নতুন করে বিয়া হবে পারুর। তারপর থেকে আতাহারকে আর কাকা ডাকবে না তারা, ডাকবে বাবা। আর পারু যেন তখন থেকে নতুন মানুষ। সারাদিন শালিক পাখির মতন উড়ছে, এই এদিকে যাচ্ছে, এই ওদিকে যাচ্ছে। আগে। তাদের রান্নাবান্না খাওয়াদাওয়া সব ভিন্ন ছিল, দাদি মারা যাওয়ার পর থেকে সব এক লগে। দাদির মতন বাড়ির মালকিন হয়ে গেছে পারু। পোলাপান তিনটারেও আগের থেকে বেশি আদর যত্ন করে, খেয়াল রাখে। দাদার খাওয়াদাওয়া, চা নাস্তা, অজুর পানি সব দেখাশুনা করে, আতাহার কাকার দেখাশুনা করে। মোতাহার বেঁচে থাকতে বাংলাঘরের ওইদিকে সে যেতই না। আজকাল যখন তখন যায়। মানুষজনের সামনেই এমন ব্যবহার করে তার লগে, মনে হয় তারা দেবর-ভাবি না, তারা বউজামাই। আতাহার কাকার লগে বিয়া হইবো দেইখাই তো এমন বদলাইয়া গেছে পারু।

তা হলে আজ এইরকম রাতদুপুরে এইভাবে কাঁদছে কেন সে? কী হইছে?

ঘরের ভিতর গভীর অন্ধকার। বাইরে শেষ শ্রাবণের মেঘলারাত। কোথাও কোনও শব্দ নাই। শুধু ঝিঁঝি ডাকে। শিরিরা তিন ভাইবোন পাশাপাশি শুয়ে আছে। প্রথমে শিরি তারপর নসু, তারপর নূরি। নূরির পাশে পারু।

অন্ধকারেই শিরি বুঝতে পারল পারু শুইয়া নাই, বইসা আছে। বইসা ওইভাবে কাঁদছে। শিরির একবার ইচ্ছা হল শুইয়া থাইকাই পারুকে জিজ্ঞাসা করে, কী অইছে মা? কানতাছো ক্যা?

কী ভেবে জিজ্ঞাসা করা হয় না। সে একটু চাপা স্বভাবের মেয়ে। অনেক কিছু দেখে শুনে বুঝেও ওইসব নিয়া কথা বলে না।

এখনও বলল না। একটু নড়লও না। পারুকে বুঝতে দিল না সে জেগে আছে, মায়ের চাপা কান্না শুনছে। ঘুমের ভান করে পড়ে রইল।

অনেকক্ষণ ওইভাবে চেপে চেপে কাঁদল পারু তারপর কান্নার মতনই চেপে চেপে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, নিঃশব্দে শুয়ে পড়ল।

সকালবেলা পারুকে দেখে অবাক শিরি। কান্নার কোনও চিন্তা নাই মুখে। প্রতিদিনকার মতনই হাসি আনন্দমাখা মুখ। রানঘরে যাচ্ছে, দাদার ঘরে যাচ্ছে, আতাহার কাকার ঘরে যাচ্ছে। রহিমাকে নিয়া সবাইকে নাস্তাপানি খাওয়াচ্ছে। পোলাপান তিনটাকে সামনে বসাইয়া খাওয়াইলো, নিজে খাইলো। নূরি চলে গেল হিরা-মানিকের লগে খেলতে। তারপর জলচৌকিতে বইসা চা খাইতে খাইতে দুপুরে কী রান্না হবে বুঝাইয়া দিল রহিমাকে।

শিরি অবাক। ঘটনা কী? যে মানুষ রাতদুপুরে অমুন করে কাঁদতে পারে, সকালবেলাই সে এমন বদলাইয়া যায় কী করে! একজন মানুষ রাত্রে একরকম আর দিনেরবেলা আরেক রকম হয়ে যায় কী করে! রাত্রে কোন দুঃখে সে কাঁদে, আর দিনে কোন সুখে সংসার করে! একজন মানুষের ভিতরে আসলে কয়জন মানুষের বাস!

নসুর লগে কি বিষয়টা নিয়া কথা বলবে শিরি!

না সেটা ঠিক হবে না। নসু পেটপাতলা ছেলে। পেটে কোনও কথা থাকে না। পারু রাতদুপুরে ওইভাবে কাঁদছে শুনলে সে সোজা গিয়া তারে জিজ্ঞাসা করবো, ওমা, বুজি কইলো তুমি বলে রাইদোফরে ফেঁপাইয়া ফেঁপাইয়া কানছো? কী অইছিল তোমার? কানছিলা কীর লেইগা?

পারু তা হলে বুঝে যাবে পোলাপানের কাছে যতই লুকাতে চাউক সে, রাতের চাপা কান্নাটা সে লুকাতে পারে নাই। শিরি উদিস পাইয়া গেছে।

শিরি চায় না, পারু বুঝুক তার কান্না সে শুনছে। কান্নার পর নিয়াস ছাড়ার শব্দও পাইছে।

বড়ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে এসব ভাবছে শিরি, নসু দৌড়াইয়া আইসা বলল, ল বুজি, মন্তাজ দাদাগো উডানে গিয়া সাচ্চারা খেলি গা।

শিরি তেমন উৎসাহ দেখাল না। কোনওরকমে বলল, ল।

.

বেশ একখান ফুর্তির ভাব নিয়া মাওয়ার বাজারে গেছে দবির।

সকালবেলা হাতমুখ ধুইতে গেছে পশ্চিম দিককার ঘাটলায়, মাঝিবাড়ির নজু নৌকার পানি হেচছিল (সেচছিল), দবিরকে দেখে বলল, গাছি, পদ্মায় ম্যালা ইলশা ধরা পড়তাছে। কাইল বিয়াল থিকা ইলশার বিরাট আমদানি মাওয়ার বাজারে। ডিমআলা বিরাট বিরাট ইলশা দশ টেকা পোনরো টেকা কইরা।

দবির অবাক। কও কী?

হ। ক্যা তুমি হোনো নাই?

আরে না।

তয় বাজারে যাও, বড় একহান ইলশা আইন্না খাও।

তুই যাবিনি?

আমি কাইল বিয়ালে দুইডা আনছি।

কত নিছে?

ছাব্বিশ টেকা। অন্য টাইমে একহানের দাম অইতো তিরিশ টেকা।

ঘাটপার থেকে বাড়িতে কোনওরকমে পিঁয়াজ কাঁচা মরিচ দিয়া একথাল পান্তাভাত খাইছে দবির। তারপর হামিদার কাছ থেকে বিশটা টাকা নিয়া, শার্ট গায়েও দেয় নাই, কান্দে ফালাইয়া নাওয়ের বান খুলছে। হামিদা আর নূরজাহান দাঁড়ায়া ছিল উঠানে। নৌকায় চড়তে চড়তে দবির বলল, নূরজাহানের মা, দোফরে খিচুড়ি রান্দা। ইট্টু নরম নরম খিচড়ি। আমি বাজারে যামু আর আমু। একহান ইলশা মাছ লইয়া আইতাছি। আননের লগে লগে কুইট্টা কাইট্টা ইলশা মাছ কড়কড়া ভাজা করবা। ইলশা মাছ ভাজা দিয়া আইজ খিচড়ি খামু।

কাল থেকে দবিরের লগে হামিদার মনও খুব ভাল। অনেকদিন পর স্বামীর লগে একটু রসের গলায় কথা বলল সে। তোমার মাইয়ারে কও।

দবির অবাক। কী কমু মাইয়ারে?

খিচুড়ি রানতে।

ক্যা?

হেয় বলে হেদিন মরনি বুজির বাইত্তে পোলাও মোরগ রানছে।

নূরজাহান অহংকারের গলায় বলল, হ রানছিঐত্তো। মিছাকথা নি?

তয় আইজ খিচুড়ি রান। তর বাপে খাইতে চাইছে, রাইন্দা খাওয়া তারে।

তুমি কি মনে করছো আমি পারুম না?

দেহি কেমুন পারছ।

আইচ্ছা ঠিক আছে।

বর্ষার পানিতে বইঠা ফেলে দবির বলল, আইচ্ছা মা, তুই রান আইজ। তর মা’রে দেহাইয়া দে তার থিকা ভাল খিচুড়ি রানতে পারচ তুই।

আইচ্ছা বাবা, রানতাছি। তুমি মাছ লইয়াহো।

তারপর রান্নাচালায় গিয়া খিচুড়ি রান্নার আয়োজন করছে নূরজাহান। চাউল ডাইল, পিঁয়াজ কাঁচা মরিচ আর হলুদ বাটা সবই গুছগাছ কইরা দিছে হামিদা, রান্দন চড়াইছে নূরজাহান। ঘরে সেন্টুর দোকানের একটুখানি ঘিও আছে। সেই ঘি নিয়া আসছে নূরজাহান। দেখে হা হা কইরা উঠছে হামিদা। ঘি দিয়া কী করবি?

খিচড়িতে দিমু।

কচ কী?

হ।

তুই কি পোলাও রানতাছস যে ঘি দিবি?

খিচড়িতে ঘি দিলে খাইতে কেমুন সাদ অয় তুমি দেইক্কো নে।

মা-মেয়ের এইসব কথাবার্তা রান্নাচালার সামনে বসে শুনছিল ভাদাইম্মা আর তাকায়া তাকায়া দেখছিল দুইজন মানুষের রান্দনবাড়নের আয়োজন। এইসব দেখতে তার খুব ভাল লাগে। আমদে আনন্দে লেজটা পুরপুর করে নাড়ছিল সে।

নূরজাহান বেশ গুছগাছ করে, পাকা হাতে রানতে শুরু করল। হামিদা বসে আছে পাশে। এটা ওটা আগায়া দিচ্ছে। হঠাৎ বলল, আমি আইজ তরে রানতে দিলাম ক্যা, জানচ?

নূরজাহান মায়ের দিকে তাকাল। না। ক্যা দিছো?

তারপরই হাসল। বুজছি বুজছি।

কী বুজছস ক তো?

তুমি অহন কইবা বিয়াশাদি অইলে জামাইবাড়ি গিয়া আমি য্যান রানতে বাড়তে পারি।

হ।

ওই হগল লইয়া তুমি চিন্তা কইরো না মা। আমি বহুত ভাল রানতে পারুম। ওদিন মজনুদাদাগো বাইত্তে পোলাও মোরগ রানছি, আইজ খিচুড়ি রান্দুম, ইলশা মাছ ভাজুম, দেইখো নে কেমুন সাদ অয় খাইতে।

অইলে ভাল। আমার চিন্তা কমে। আমরা তরে ছয় মাস বচ্ছরে মইদ্যে বিয়া দিয়া দিমু।

আথকা তোমরা আমার বিয়া লইয়া এত পাগল অইলা ক্যা?

মাইয়া ডাঙ্গর অইলে তো মা-বাপে তার বিয়ার লেইগা পাগল অইবোই।

এর লেইগাঐ ঘটকারে খবর দিছিলা?

আমরা খবর দেই নাই।

তয়?

ঘটকা নিজেঐ আইছিল।

আমার লেইগা সমন্দ লইয়া আইছিল?

হামিদা গম্ভীর হল। হ। যেই সমন্দ লইয়া আইছে, হেই সমর কথা হুইন্না তর বাপে পাগল অইয়া গেছিল। তরে তো কিছু বুজতে দেয় নাই, আমারেও বুজতে দেয় নাই। ঘটকার নাওয়ের তলিমলি ভোগলা অইয়া যাওনের কথা বানাইয়া বানাইয়া কইছে। আসলে সমন্দর কথা হুইন্না ঘটকার নাওয়ে হেয় আর ওডে নাই। হাতরাইয়া বাইত্তে আইছে।

নূরজাহান হতভম্ব। কও কী?

হ।

কে, কার লেইগা আমার সমন্দ আনছে যে বাবায় হুইন্না এমুন করছে?

একথার ধার দিয়া গেল না হামিদা। বলল, তুই উদিস পাছ নাই। হেই রাইত্রে তর বাপে একফোঁডা ঘোমায় নাই। বিয়াইন্না রাইত্রে উইট্টা এহেনে আইয়া বইয়া বইয়া তামুক খাইছে। তারবাদে যেই মাইয়ারে বাইত থিকা বাইর অইতে দেয় না হেই মাইয়ারে লইয়া মরনি বুজির বাইত্তে গেল। তার কাছে গেছিল কী করবো অহন হেই বুদ্ধি লইতে। হের বুদ্ধিতে পরদিন তরে লইয়া গেল দেলরা বুজিগো বাইত্তে। তুই এইবাড়ি ওইবাড়ি গেলি আর হেয় গিয়া ধরল দেলরা বুজিরে। এনামুল সাবে কাইল বাইত্তে আহনের পর, হেয় তারে ডাকাইয়া নিছিল এর লেইগাঐ। কাইল এনামুল সাবে হেই ঘটনা মিটমাট করছে। দেলরা বুজি আছিল, মোতালেব আছিল। তাগো সামনে মিটমাট করছে। কইরা তর বাপরে কইছে যত তাড়াতাড়ি পারো মাইয়া বিয়া দিয়া দেও গাছি।

হামিদার এত কথার পরও নূরজাহান বুঝতে পারল না, কার লগে তার বিয়ার সমন্দ আনছিল ঘটকায়? কোন সমন্দর কথা হুইন্না বাবায় এমুন পাগল অইয়া গেল? আর আমি ক্যান বুঝতে পারি নাই বাবায় ভিতরে ভিতরে আমারে লইয়া বিরাট অস্থির অইছে, ডরের মইদ্যে আছে? আমি তহন আছিলাম অন্য আমোদে। এতদিন পর বাবায় আমারে লইয়া বাইত থনে বাইর অইতাছে, এইবাড়ি ওইবাড়ি যাইতে দিতাছে আমারে, এই আমোদে আছিলাম দেইক্কা বাপের মুকহান আমি খ্যাল কইরা দেহি নাই। বুজতে পারি নাই বাপে আমার আছে বিরাট যন্ত্রণায়! আমি আছিলাম আমোদে আর বাবায় আছিলো কষ্টে। আহা রে!

নূরজাহান হামিদার চোখের দিকে তাকাল। আমারে সোজা কইরা কও মা, আমার লেইগা কার সমন্দ আনছিল ঘটকায়? বাবায় এত অস্থির অইছিল ক্যা?

হামিদা বলল, আমি তো হুনলাম কাইল বিয়ালে। সবকিছু যহন মিটমাট অইয়া গেছে। তারবাদেও হুইন্না আমার কইলজা হুগাইয়া গেছে। হায় হায় এইডা কয় কী?

নূরজাহান অস্থির গলায় বলল, এত প্যাচাইল না পাইড়া আসল কথা কও। আমার লগে কার বিয়ার সমন্দ আনছিল ঘটকায়?

তুই চিন্তাও করতে পারবি না।

আমার চিন্তা করনের কাম নাই। তুমি কও।

নূরজাহানের চোখের দিকে তাকায়া হামিদা গম্ভীর গলায় বলল, মান্নান মাওলানা।

আনমনা ভঙ্গিতে জ্বলন্ত চুলায় নাড়া খুঁজতে গিয়া যেন হাতই চুলায় ঢুকায়া দিছে। নূরজাহান, এমন ভঙ্গিতে চমকাল। কও কী?

হ। এর লেইগাঐত্তো তর বাপে ডরাইছে। ঘটকার মুখে ওই শুয়োরের পোর কথা হুইন্নাঐ বুইজ্জা গেছে গোলামের পোয় আসলে তরে মাপ করে নাই। বেক কিছু মনে রাকছে। অহন বউ মরণের উছিলায় তরে বিয়া কইরা তার মুকে ছ্যাপ দেওনের সোদ লইবো।

নূরজাহান তখন আর এই বাড়িতে নাই। তার চোখে ভেসে উঠছে মান্নান মাওলানার বাড়ির বড়ঘরটা। নির্জন গভীর রাত। ঘরে টিমটিম কইরা জ্বলছে হারিকেন। সেই আলোয় নিজেকে নূরজাহান দেখতে পাচ্ছে নতুন বউ সাইজা পালঙ্কে বইসা আছে। আবজানো দরজা ঠেইলা এসময় ঘরে আইসা ঢুকল বরের মতন শেরোয়ানি পরা একটা অসুর। সেই অসুরের নাম মান্নান মাওলানা। ঘরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করল সে, কাটা ঘুরায়া হারিকেন নিভাল। সেই ফাঁকে খুলল নিজের শেরোয়ানি। তারপর গিরস্তবাড়ির নামার দিকে নির্জন দুপুরে চরতে থাকা মুরগি আথকা এসে যেমন করে খাবলা দিয়া ধরে পাতি শিয়ালে ঠিক তেমন করে ধরল নূরজাহানকে। ওইভাবে ধরার পর মুরগি যেমন ছটফট করে ওঠে, নিজেদের বাড়ির রান্নাচালায় বসে, হামিদার পাশে থাকার পরও তেমন ছটফট করে উঠল নূরজাহান।

মেয়ের এই অবস্থা দেখে ভয় পেয়ে গেল হামিদা। কী রে, এমুন করতাছস ক্যা?

নিজের অজান্তে চোখ মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে নূরজাহানের, গলা শুকায়া গেছে, বুকের ভিতর কলিজাটা খইলসা মাছের মতন লাফাচ্ছে। এত আনন্দ নিয়া খিচুড়ি রানতে বসছিল, চুলায় ফুটতে শুরু করছে চাউল ডাইল, আগুনের তাপ গায়ে লাগার পরও খিচুড়ি রান্নার কথা মনে নাই নূরজাহানের। আগুনের তাপটাও যেন গায়ে লাগছে না তার।

.

আমতলা থেকে ছোট্ট ডিঙ্গি নাও নিয়া নিখিলকে আজ মন্তাজদের ঘাটপারে আসতে দেখল ফিরোজা। দুপুর শেষ হয়েছে অনেকক্ষণ। বিকাল হয় হয়। এই সময় নিখিল কেন এই দিকটায় আসছে! সে তো আসে আতাহার দাদার কাছে। হুজুরের সীমানার ওইদিকে নাও ভিড়ায়। আইজ এইমিহি আইলো ক্যা?

তবে নিখিলকে নাও বাইয়া আসতে দেখে ফিরোজার আবার সেই প্রতিদিনকার ইচ্ছাটা হল। এই চকপাথালে হাঁইটা নাইলে নাওয়ে চইড়া সে একদিন দূর কোনওখানে চলে যাবে। নিখিল নাও ভিড়াইয়া তার সামনে এসে দাঁড়াবার পর কথাটা সে বলল। আপনেরে এই মিহি আইতে দেইখা আমার কী মনে অইলো জানেন?

নিখিল হাসল। জানি।

কী কন তো?

আমার নাওয়ে চইড়া এই চক পাড়ি দিয়া তুমি কোনওখানে চইলা যাইবা।

ফিরোজা হাসল। খরালিকালে মনে অয় হাইট্টা যামু গা, বাইষ্যাকালে মনে হয় নাওয়ে কইরা যামু গা। তয় আপনের নাওয়ে না।

নিখিলও হাসল। তয় কার নাওয়ে যাইতে চাও?

কার নাওয়ে যে যামু হেইডা ভাবি না। মনে অয় আপনের মতন নিজেঐ নাও বাইয়া যামু গা।

ওইডা মাইয়ারা পারে না।

জানি। মাইয়াগো অনেক অসুবিদা। তাগো বেবাক কামেঐ পুরুষপোলা লাগে।

আমারে তুমি পুরুষপোলা মনে করো না?

মনে করুম না ক্যা? আপনে তো পুরুষপোলাঐ।

তয় আমার নাওয়ে চইড়া যাইতে চাইলা না ক্যা? খরালিকালে গেলে আমার লগে হাইট্টাও যাইতে পারো।

ফিরোজা কথা বলল না। উদাস চোখে চকের দিকে তাকায়া রইল।

নিখিলের পরনে পুরানা জিনসের প্যান্ট। খুবই ময়লা প্যান্ট। সাদা হাফহাতা শার্ট পরা। তবে শার্টের সাদা রং আর সাদা নাই, আবছা হলুদ মতন হয়ে গেছে। শার্টের বুকপকেটে ক্যাপস্টান সিগ্রেটের প্যাকেট। বুক পকেট থেকে সিগ্রেটের প্যাকেট বের করে, প্যান্টের পকেট থেকে ম্যাচ বের করে সিগ্রেট ধরাল সে। বড় করে সিগ্রেটে টান দিয়া বলল, আমি জানি আমার লগে কীর লেইগা তুমি যাইবা না।

কথার লগে নাকমুখ দিয়া ব্যাপক ধুমা বের হল নিখিলের।

নিখিলের সিগ্রেটের গন্ধটা ভাল লাগল ফিরোজার, সিগ্রেট টানের ভঙ্গিটাও ভাল লাগল। তার মুখের দিকে তাকায়া সে বলল, কীর লেইগা কন তো?

আমি যে হিন্দু।

এইডা আমি চিন্তা করি নাই।

কও কী?

হ। আপনে হিন্দু না মোসলমান এই কথা আমার মনে থাকে না। আমার খালি মনে থাকে আপনে একজন পুরুষপোলা। আতাহার দাদায় যেমুন, হুজুরে যেমুন।

তারপর যেন হঠাৎ মনে পড়েছে এমন ভঙ্গিতে ফিরোজা বলল, আইজ আপনে আমগো সীমানায় আইছেন ক্যা? আতাহার দাদাগো মিহি যান নাই ক্যা?

নিখিল সিগ্রেটে টান দিয়া বলল, আমি জানি আতাহার অহন বাইত্তে নাই।

কই গেছে?

বেপারি বাড়ি গেছে। জহুগো লগে তাস খেলতাছে।

আপনে খেলতে গেলেন না?

না। ওই খেলা খেলনের ক্ষমতা নাই আমার।

ক্যা?

টেকা দিয়া খেলতে অয়।

জুয়া?

হ।

আতাহার দাদায় জুয়া খেলে?

নিখিল হাসল। কোনডা না করে তোমার আতাহার দাদায়।

হ হেইডা তো জানিঐ। ভাবিছাবের লগে এমুন খাতির থাকনের পরও আমার মিহি নজর। তারও নজর তার বাপেরও নজর।

দুইজনের হাত থিকা তুমি বাঁচতাছো কেমতে?

আমগো মতন মাইয়াগো যে কত চালাকি কইরা বাইচা থাকতে অয়। হুজুরে দাদিরে দেহনের নাম কইরা আমগো ঘরে আইয়া যহন আমার লগে খাতির জমানের চেষ্টা করে তহন আমি চালাকি কইরা আতাহার দাদার কথা উডাই। এমুন ভাব করি য্যান আতাহার দাদার লগে আমার খাতির। আবার আতাহার দাদায় আইলে কই হুজুরের কথা। বাপ রে দিয়া পোলারে বুজ দেই, পোলারে দিয়া বুজ দেই বাপ রে।

এর লেইগাঐ এইবাড়ি ছাইড়া চইলা যাইতে ইচ্ছা করে তোমার?

অইতে পারে। তয় আমি জানি হেই যাওনডা আমার কোনওদিনও অইবো না। আজাইর পাইলেঐ এই গাছতলায় খাড়ইয়া আমি চক মিহি চাইয়া থাকুম আর খরালিকালে চিন্তা করুম, একদিন এই চক দিয়া হাঁইট্টা কোনওমিহি যামু গা, বাইষ্যাকালে মনে অইবো নাওয়ে উইট্টা যামু গা। এমতে এমতেঐ দিন যাইবো আমার। দাদি মরলে মন্তাজ কাকায় হয়তো বিয়াশাদি দিয়া দিবো। তহন যুদি এই চক দিয়া অন্য কোনও গেরামে যাইতে পারি।

নিখিল তখন উদাস ভঙ্গিতে সিগ্রেট টানছে। সিগ্রেটে কয়েকটা টান দিয়া হঠাৎ করে বলল, আমি আইজ বেবাক জাইন্না বুইজ্জাঐ এই বাইত্তে আইছি।

ফিরোজা অবাক হল। কী জাইন্না বুইজ্জা আইছেন?

আতাহার বাইত্তে নাই এইডা জাইন্না আইছি।

ক্যা?

তোমার লগে কথা কইতে।

কী কথা?

তারপরই মুখে হাত চাপা দিয়া হাসল ফিরোজা, যেন হাসির শব্দ অন্য কারও কানে না যায়।

পেরেম পিরিতির কথা? আমারে আপনের পছন্দ অইছে? আমারে ভাল্লাগে। আমারে আপনে ভালবাসেন এই হগল কইবেন?

সিগ্রেটে শেষটান দিল নিখিল। টোকা মেরে অনেকটা দূরে ফেলল সিগ্রেটের পিছনটা। হাসিমুখে বলল, না হেইডা তোমারে আমি কোনওদিনও কমুনা। হ তোমারে আমি পছন্দ করি, তোমারে আমার ভাল্লাগে। তারবাদেও কোনওদিন কমু না, তোমারে আমি ভালবাসি।

ক্যা?

আমি জানি ওইডা কইলে তুমি আমারে ফিরাইয়া দিবা। কইবা, নিখিল দাদা, আপনে যে হিন্দু। ধর্মের কারণে আমি আমার ভালবাসার কথা তোমারে কোনওদিনও কমু না। কইয়া

অপমান অমু না।

অপলক চোখে নিখিলের মুখের দিকে তাকায়া ফিরোজা বলল, আসলে তো আপনে কইয়াঐ দিলেন।

নিখিলও ফিরোজার চোখের দিকে তাকাল। উদাস দুঃখী গলায় বলল, না আমি তোমারে কিছুই কই নাই। এইডি আবল তাবল প্যাচাইল। অহন হোনো কীর লেইগা আমি আইজ তোমার কাছে আইছি। আমি আইছি পারুল ভাবির ব্যাপারে।

ফিরোজা চমকাল। তার আবার কী অইছে? হেয় তো অহন আছে বিরাট আনন্দে। যার লগে এতদিনের পিরিত, যার তিনডা পোলাপান পেডে লইছে তার লগে বিয়া হইবো, এর থিকা আনন্দের আর কী আছে?

ঘটনা এইহানে। বিয়া হইবো না। পুরাডা হুজুর আর আতাহারের চালাকি। আতাহার অন্য জাগায় বিয়া করবো। বসির ঘটক মাইয়া দেখতাছে। আতাহার নিজ মুখে আমারে কইছে এক মাইয়ালোক বেশিদিন ভাল্লাগে না অর। ও চায় নতুন বউ আর অর বাপে চায় টেকা। আতাহারের মায় কইলাম হাট এটাক কইরা এর লেইগাঐ মইরা গেছে। আতাহার আর হুজুরে একদিকে তারে বুজাইছে পারুর লগেঐ আতাহারের বিয়া অইবো আর অন্যদিকে বসির ঘটকরে নামাইছে অন্য মাইয়া দেহনের লেইগা। যেদিন আতাহারের মায় মরল হেদিন অরা বাপপুতে বাংলাঘরে বইয়া এই হগল প্যাচাইলঐ পারতাছিল। আতাহারের মায় আইতাছিল ওই ঘর মিহি, বেক কথা হেয় হুইন্না হালাইছে। স্বামী আর পেডের পোলায় এতবড় চালাকি করতাছে তার লগে এইডা হেয় সইজ্য করতে পারে নাই। লগে লগে হাট এটাক কইরা মইরা গেছে।

ফিরোজা ফ্যালফ্যাল করে নিখিলের মুখের দিকে তাকায়া রইল।

নিখিল বলল, হেয় মইরা যাওনের পরও চালাকি পারুল ভাবির লগে অরা বাপ পোলায় কইরা যাইতাছে। একদিকে ভাবিছাবরে কইতাছে তার লগেই আতাহারের বিয়া অইবো, অন্যমিহি ঘটকারে দিয়া মাইয়া দেকতাছে। বিয়াশাদি ঠিক কইরা তারপর হুজুরে পারুল ভাবিরে কিছু একটা বুজ দিবো, আতাহার কিছু একটা বুজ দিবো।

হায় হায় তয় তো ভাবিছাবের কইলজাড়া পুইড়া ছারখার অইয়া যাইবো।

হ। এর লেইগাঐ আমি তোমার কাছে আইছি।

আমি কী করুম?

তুমি পারুল ভাবিরে বেক কিছু জানাইয়া দেও।

তহন আমার যুদি কোনও বিপদ অয়?

তোমার কী বিপদ অইবো?

ভাবিছাবে যুদি আতাহার দাদারে কইয়া দেয় আমার কাছ থিকা এই হগল কথা হোনছে। তহন তো আপনের আমার দুইজনেরঐ বিপদ অইবো। আতাহার দাদায় আমারে ধরলে আমি তো বাইধ্য হইয়া আপনের কথা কইয়া দিমু। আপনে যে আমারে কইছেন আমার তো তহন আপনের নাম না কইয়া উপায় থাকবো না।

হ এইডা ঠিক। তয় তুমি পারুল ভাবিরে কিরা কছম দিয়া কইবা হেয় য্যান তোমার আমার নাম না কয়।

একটু থেমে ফিরোজা বলল, তয় কথাডি আপনে আমারে দিয়া কওয়াইতে চাইতাছেন ক্যা?

তয় কারে দিয়া কওয়ামু?

আপনে নিজে তারে কন।

আমি পুরুষপোলা। এই বাইত্তে আইয়া পারুল ভাবির লগে নিরিবিলিতে কথা কওন আমার পক্ষে সম্ভবপর না। তুমি মাইয়ামানুষ, তোমার হেই অসুবিদা নাই।

হ তা নাই। তয় তারে এই হগল জানাইয়া লাভ কী? আতাহার দাদার বিয়াশাদি ঠিক অইলে হেয় তো এমতেঐ জাইন্না যাইবো?

তহন আথকা অমুন একখান দুঃখ পাইলে গলায় দড়িমড়ি দিতে পারে। আগেঐ যুদি এই হগল জাইন্না যায় তয় মন শক্ত করতে পারবো। তুমি এই কামডা করো ফিরোজা। একজন মানুষরে বাঁচাও। হেয় গলায় দড়িমড়ি দিলে আতাহার বা হুজুর কেঐর কিছু অইবো না, ক্ষতি অইবো পোলাপান তিনডার। অগো আর কেঐ থাকবো না।

আমার কথা হুইন্নাও যুদি হেয় গলায় দড়ি দেয়?

না হেইডা দিবো না।

ক্যা?

হেয় বুদ্ধিমতি মাইয়া। নিজে গোপনে খোঁজখবর লইয়া বোজনের চেষ্টা করবো ঘটনা সত্য কি না। যহন জানবো সত্যঐ এমুন কারবার অইতাছে তহন হেয় যা করনের করবো। হুজুর আর আতাহারের লগে কাইজ্জাকিত্তন করতে পারে, বিয়া বন্দ করতে পারে। আমি চাই হেয় হের অধিকারডা আতাহারের কাছ থিকা আদায় করুক। তুমি তারে এইডাই। বুজাইবা। আতাহার আর হুজুরে যেই চালাকি অর লগে করছে হেই চালাকির শোদটা য্যান হেয় লয়। অগো য্যান ছাইড়া না দেয়। এই জিদটা তার মইদ্যে তুমি ঢুকাইয়া দিবা।

ফিরোজা চিন্তিত চোখে নিখিলের মুখের দিকে তাকায়া রইল।

.

অনেক কিরা কছম দিয়া ফিরোজা আমারে কথাগুলি বলছে। যেদিন নিখিল অরে বলছে তার দুইদিন পরের ঘটনা। এই দুইদিন ও চিন্তা করছে কথাগুলি আমারে বলা ঠিক হইবো। কি না! ও কোনও প্যাঁচঘোচের মইদ্যে পইড়া যাইবো কি না! তারপর সাহস কইরা বলতে আসছে। নিখিল নিজে ক্যান সরাসরি আমারে বলতে পারে নাই তাও বলছে। আর ক্যান। অরা দুইজনে মিলা ঘটনা আমারে জানাইতে চায় তাও বলছে। আতাহারের বিয়াশাদি ঠিকঠাক অইয়া যাওনের পর আমি য্যান কোনও অঘটন না ঘটাই। আগে থিকাই য্যান। আতাহার আর অর বাপের লগে, আমার হৌরের লগে কথাবার্তি কইয়া বেবাক কিছু ঠিকঠাক করি। বিয়া য্যান আতাহার আমারে করতে বাইধ্য হয়। অন্য জাগায় বিয়ার কথা য্যান চিন্তা না করে।

ফইজুর মুখে এই ঘটনা আমি আগে শুনছি। শোননের পর থিকা খালি চিন্তা করছি আমি অহন কী করুম? কেমতে সামাল দিমু বেবাক কিছু? আতাহার আর অর বাপে যেই পদের মানুষ এইরকম দুইডা শয়তানের লগে আমি পারুম? অরা তো আমারে বাঁচতে দিবো। আমার পোলাপান তিনডার মিহিও চাইবো না। দরকার অইলে অগেও ক্ষতি করবো!

তয় আতাহার মানুষ যেমুনঐ অউক, আমি তারে ভালবাসি। আমার পোলাপান তিনডার বাপ সে। সেই প্রথমদিন তার লগে সহবাস করার পর থিকা ওই একটা কারণে আমি তার। লেইগা পাগল। সে আমার মাথা ধরার অষুদ। সে আমার রাতের ঘুম, দিনের আনন্দ। এই যে বিধবা হইয়াও এত আনন্দ লইয়া আমি বাঁইচা আছি, তার কারণ সে। আমি আসলে নিজেরে বিধবা মনে করি না। আমি মনে করি আমার জামাই বাঁইচা আছে, আমার পোলাপানের বাপ বাইচা আছে। শাশুড়িরে মুখ ফুইটা তার লগে বিয়ার কথা যেদিন কইলাম, শাশুড়িও সব বুইঝা যখন বেক কিছু ঠিক করল, তার লগেঐ আমার বিয়া অইবো। সে তো মাইনা নিছেঐ, আমার শ্বশুরেও মানছে হোননের পর থিকা। আমার আনন্দ একটাই। মনে মনে যারে স্বামী মনে করি তারে অহন শরিয়ত মতন স্বামী হিসাবে পামু। পোলাপান তিনডার। ব্যাপারে আমার মনের মইদ্যে আর কোনও ঝামেলা থাকবো না। কোনও দোষে দুষি মনে করুম না নিজেরে। আল্লাহর কাছে হাজার হাজার, লাখ লাখ শুকুর গুজার করছি।

বিয়া হইবো হইবো, তখন গেল শাশুড়ি মারা। বিয়া পিছাইয়া গেল। আতাহার এক রাইতে কইলো শীতের দিনে বিয়া অইবো। আব্বায় বলে কইছে। আমি হেই আশায়। আছি। তারবাদে আথকা কই থিকা কেমতে কইরা ফইজু আইলো, ঘটনা জানলাম। অর্থাৎ আল্লায় আমারে জানাইয়া দিল। হেই জানানের ধাক্কায় কইলজাড়া আমার ফাইট্টা গেল। ভিতরে ভিতরে ছ্যাড়াভেড়া অইয়া গেলাম আমি। আথকা এমুন একখান খবর, কী থুইয়া কী করুম পয়লা কহেক মিনিট নাকি কহেক ঘণ্টা বুজতেই পারলাম না। ঘরে গিয়া খাটে ইট্টু বইয়া রইলাম, ভাল্লাগে না। ইট্টু শুইয়া রইলাম, ভাল্লাগে না। উইট্টা মন্তাজ কাকাগো সীমানায় গেলাম, গনি কাকাগো সীমানায় গেলাম, ভাল্লাগে না। খালি মনে অয় দম বন্ধ হইয়া অহনঐ মইরা যামু। কেউ আমার মনের অস্থিরতা বোঝে না, মুখের মিহি চাইয়াও বোঝে না কিছু। সন্ধ্যা হইল, রাইত হইল, রহিমারে কইলাম, আমার শইলডা ইট্ট খারাপ লাগে। আমি হুইয়া রইলাম। তুমি বেবাকতের খাওনদান দিয়ো।

হঠাৎ ঝমঝমাইন্না বিষ্টি। হেই বিষ্টির মইদ্যেই রাইতের খাওনদাওন বেবাকতেরে দিল রহিমা। আমি একটা কেতামুড়া দিয়া খাটে শুইয়া রইলাম। পোলাপানে খাইয়াদাইয়া আহনের পর দুয়ার মুয়ার লাগাইয়া কেবিনে গিয়া শুইলাম। শিরি আর নসু হারিকেনের আলোয় অনেকক্ষুন পড়ল। নূরি শোওনের লগেঐ ঘুমাইয়া গেছে। আমি নূরির পাশে শুইয়া কাঁথা মুড়া দিয়া এমুন ভাব করলাম, য্যান বেভোর ঘুমে।

শিরি বড় হইছে। সংসার টুকটাক বোঝে। দুই ভাইবইনে পড়া শেষ কইরা হারিকেন নিভাইয়া শুইয়া পড়ল। পোলাপান মানুষের ঘুমের কোনও সমস্যা নাই। শোওনের লগে লগেঐ ঘুম। আমার ঘুম আহে না, কইলজা জ্বলে, বুক ফাইট্টা কান্দন আহে। এই কান্দন আমি ঠেকাইতে পারি না। রাইত দোফরে আর শুইয়াও থাকতে পারি না। মনে অয় বুক ফাইট্টা মইরা যামু। কেঁতার তলে দম বন্দ হইয়া আসে। তহন আর বিষ্টি নাই। নিটাল হইয়া আছে আল্লার দুনিয়া। কেঁতার তল থিকা আস্তে কইরা বাইর অইলাম আমি। চুপচাপ বইয়া রইলাম। তনহ দেহি আর নিজেরে ঠিক রাখতে পারি না। কান্দনের চাপে বুক ফাইট্টা যায়। কোনও মতেই চাইপ্পা রাখতে পারি না।

কানলাম, দুই হাতে মুখ চাইপা কানলাম। তাও আওজ মনে হয় পুরাপুরি ঠেকাইতে পারি নাই। ইট্টু ইট্টু আওজ মনে হয় হইছে। অনেকক্ষুন কানছি, অনেকক্ষুন। দেহি বুকের ভার ইট্টুহানি কমছে। আর এই ফাঁকে একহান সিদ্ধান্তও নিতে পারছি। কী করুম অহন, কেমতে চলুম। বাড়ির মাইনষেরে বুজতে দিমু যে আমি তাগো বাপ পোলার চালাকি জাইন্না ফালাইছি, নাকি কেঐরে কিছু বুঝতে না দিয়া দেহুম তারা কেমতে কী করে? ঘটনা কোনমিহি যায়?

পরের পথটাই আমি বাইচ্ছা নিলাম। না, আমি যে ঘটনা জানছি এইডা কেঐরে বুঝতে দিমু না। আমি আমার মতন চলতে থাকুম। আমার মুখ দেইখা, চালচলন আচার আচরণ দেইখা কেঐ য্যান কিছু বুঝতে না পারে।

পরদিন বিয়ানে আমি আগের মানুষ অইয়া গেলাম। তয় ভিতরে ভিতরে কইলজাড়া আমার পোড়ে। উপরে আমি এক মানুষ, ভিতরে আরেক। এই ফাঁকে অন্য একখান কথাও আমার মনে অইছে। একদিনের পরিচয় ফইজুর লগে। বছির ঘটকের গোমস্তা। তার কথা বিশ্বাস করন কি আমার ঠিক অইতাছে? ফইজু মিছাকথা কয় নাই তো?

আবার চিন্তা করি, ওই বেডা আমার লগে মিছাকথা কইতে আইবো ক্যা? তার কী ঠেকা পড়ছে? একদিন খাতির কইরা মুড়ি মিডাই আর চা খাওয়াইছিলাম, আমারে ভাল মানুষ মনে করছে হের লেইগাঐ কথাডি আমারে কইছে। আমার কাছে অর তো কোনও স্বার্থ নাই। তয় ফইজু যে এই বাইত্তে আইছিল, ঘটকায় তিনশো টেকার লেইগা পাঠাইছিল এই কথা আমি কেঐরে কই নাই। আমার শ্বশুররে জানান উচিত আছিল। জানাই নাই ইচ্ছা কইরা। পরে যুদি তারা কোনওরকমে জাইন্না যায় ঘটনা আমারে ফইজু জানাইছে, তয়। একজন নিরীহ মানুষ বিপদে পড়বো। আতাহার অরে মাইর ধইর দিবো। ঘটকার কাম থিকা ছাড়াইয়া দিবো। ভাবলাম, পরে যুদি আব্বায় আমারে জিগায়, ঘটকায় অর গোমস্তা পাডাইছিল হেইডা আমারে কও নাই ক্যা, তহন মিছাকথা কমু। ভুইল্লা গেছিলাম আব্বা। হেয় বিরক্ত অইবো, অউক গিয়া, আমার কী?

ফইজুর পর আইজ শুনলাম ফিরোজার কাছে। আতাহার নিজেই কইছে নিখিলরে। নিখিল পোলাডা ভাল। আমারে জানানের পথ হিসাবে ধরছে ফিরোজারে। এরপর আর বিশ্বাস না করনের কী আছে। ফইজুর মুখে শুইনা আমি একবার মইরা গেছিলাম, একবার কইলজাড়া আমার ফাটছে, ফিরোজার মুখে শুইন্না আমি আবার মরলাম, ফাটা কইলজা আবার ফাটলো। ফাইট্টা চৌচির হইয়া গেল। মনে অইলো আমারে লইয়া বাপ-পোলার চালাকির কথা নিজ কানে শুইন্না আমার শাশুড়ি যেমুন সইজ্য করতে পারে নাই, হাট এটাক। করল, উঠানে পইড়া মইরা গেল, আমিও মনে অয় অমতেই মইরা যামু। ফিরোজার মুখের মিহি চাইয়া রইলাম। চোক্ষে পলক নাই।

তখন বিকাল। বিকালের দিকে আমার একটু সাজগোজের অভ্যাস। ফইজুর মুখে ঘটনা শোনার পর থিকা আমি তো আসলে দুইজন মানুষ। উপরে এক, ভিতরে আরেক। কাউরে কিছু বুজতে দিতাছি না। এই অবস্থায়ও পুরানা অভ্যাসটা চালু রাখছি। সাজগোজ ইকটু করছি। শিরি নসু নূরি তিন ভাইবইনে মিল্লা কুতকুত খেলতাছে উঠানে। নূরি আইজ বিকালে আর গনি কাকাগো সীমানায় যায় নাই। সকাল দোফর বিকাল তিনবেলাই হিরা মানিকের লগে থাকে। তিনটা পোলাপানের লগে মুকসেদ অইছে আরেক পোলাপান। একদম পোলাপানের মতন পোলাপান তিনডার লগে মিলামিশা গেছে। অগো মতন কইরা অগো লগে খেলে, হাসে, মজা করে।

এই লোকটার ঘটনা শুইনা বহুত খুশি লাগছে আমার। নামকরা দাগি চোর আথকা দুইডা পঙ্গু পোলাপান আর গরিব মাস্টার মানুষের পরিবারের লগে জড়াইয়া গেল। চুরি ধাউরামি ছাইড়া দিল, পঙ্গু পোলাপান দুইডার সেবাযত্ন করে, এমনকী গু-মুত তরি সাফ করে। হিরা মাইয়া, মোল্ল-সতরো বচ্ছর বয়স, পঙ্গু অউক আর যাই অউক, মাইয়া তো, অরে পয়পরিষ্কার করে মাস্টারের বউ আর মানিকরে করে মুকসেদ। নিজে কোষানাও কিন্না মাস্টাররে লইয়া ছাত্রগো বাড়িতে যায় নাও বাইয়া। বাড়িত থিকা নিজের ভাগের চাউল ডাইল টেকাপয়সা আইন্না দেয় মাস্টাররে। বাজার কইরা দেয়।

কারণডা কী?

কারণডা হইলো, তার চোর জীবন মানুষের জীবন আছিলো না। জন্মাইছে মানুষ হইয়া কিন্তু জীবন মানুষের হইল না এর লেইগা শেষ জীবনডা সে মানুষ হইয়া বাঁচতে চায়। জীবনের বেবাক গুনা আল্লায় য্যান মাপ করে এর লেইগা মাস্টারের পঙ্গু পোলাপান দুইডার দায়িত্ব নিছে। মাথায় টুপি দিয়া মাস্টারের মতন একজন ভাল মানুষের লগে থাইকা মানুষ হওনের চেষ্টা করতাছে। চোর বদলাম ঘুচাইয়া মরণের সমায় য্যান মানুষ হিসাবে মরতে পারে।

এইসব কথা আমারে বলছে মাস্টারের বউ।

সেদিনের পর থিকা মুকসেদের কথা আমার খুব মনে হয়। একটা খারাপ মানুষ ভাল। হইয়া গেল আর আল্লার খাসবান্দা হিসাবে পরিচিত আমার শ্বশুর, মান্নান মাওলানা সে করতাছে এই কাম? স্ত্রীর লগে আমারে লইয়া বেইমানি করল, আপন পোলার বউ আমি, আমার লগে করল এই কাম! আতাহার পুরুষপোলা, অল্প বয়স, এই বয়সে তার মতিগতি নানান পদের অইতে পারে, হেয় পরহেজগার লোক, হেয় ক্যান পোলারে ধমক দিয়া ঠিক করলো না?

আমি মনে করি আতাহারের থিকা ওই শুয়োরের পোর দোষ বেশি। টেকার লোভে ওঐ কলকাঠি লাড়তাছে। পোলা বিয়া করাইয়া ধান্দা করবো। একবারও আল্লাহর কথা ভাবে না। হাসরের দিনে আল্লাহয় যে অরে কেমতে তেল মজাইবো!

ফইজুর কাছে যা শুনছি ফিরোজাও তাই কইলো। নতুন কথা খালি একখান, আমার শাশুড়ির মরণের ঘটনা। আহা রে, আমার লেইগা শেষ চেষ্টাটা সে করল! স্বামী আর পেটের পোলার চালাকি সইজ্য করতে না পাইরা মরলো। আল্লাহ, আল্লাহ তুমি তারে বেহস্ত নসিব কইরো। সে মানুষটা বড় ভাল আছিল। আমার লাহান তারও পোড়া কপাল, একটা বদের লগে জীবন কাটাইয়া গেল। আমি পয়লা পয়লা মনে করছিলাম, আমার স্বামীর শরিলের খবর জাননের পর মনে করছিলাম, আমার জীবনডা আল্লায় ক্যান এমুন কইরা পাডাইলো। আমি এমুন মাইয়া আর আমার কপালে জুটলো এমুন স্বামী?

আতাহাররে পাইয়া সেই দুঃখটা আমি ভুলছিলাম। শরিল মন দিয়া তারে আমি চাইছি, পাইছি। জিন্দেগিড়া তার লগে কাটাইতে চাইছি। যদিও এই বাড়িডা কোনও মাইনষের বাড়ি না। এইডা শয়তানের কারখানা, দোযক, জাহান্নাম। আল্লাহর খাসবান্দা হিসাবে পরিচিত মানুষটা, আমার শ্বশুর, আমি তারে আব্বা ডাকি, ওইডা তো মানুষঐ না। ওইডা একটা বদ। মাকুন্দার লগে যেইডা করল ওইডা তো কোনও মাইষের কাম না। আমার লগে যেইডা করল, এইডা তো কোনও মাইনষের কাম না। অরে আল্লায় পাক পবিত্র মাটি দিয়া বানায় নাই, অরে বানাইছে শয়তান ইবলিসের খারাপ জাগার আড়ি গোস্ত দিয়া।

পয়লা পয়লা আল্লার কাছে কইতাম, আল্লাহ, আমারে এইরকম এক দোজকে আইন্না ঢুকাইলা? একদিকে স্বামীর এই অবস্থা আরেক দিকে একটা বদবাড়ি। মাওলানা হিসাবে পরিচিত লোকটা বদমাইশের আড্ডি। পারলে পোলার বউর লগে শোয়। বাড়ির ঝি রহিমা…

আতাহারের কারণে এই দোজকও আমার সইয়া গেছিল। আমি আছিলাম আমারে লইয়া। তিনডা পোলাপান আর আতাহাররে লইয়া, নিজের সুখ আনন্দ লইয়া। অন্য কোনও মিহি আমি চাইয়া দেহি নাই। শ্বশুরে যার লগে ইচ্ছা করুক, আতাহার কিছু না করলেঐ অয়। তাও তার টুকটাক দুই-একখান কথা কানে আইছে। যেমুন নিখিলের বাইল্য বিধবা বইন। ফুলমতিরে সে পছন্দ করে। গোপন একখান খায়েশও ফুলমতির উপরে আছে। ফিরোজার উপরেও চান্স লওনের চেষ্টা করছে। বাপ-পোলা দুইজনেই করছে। ফিরোজা চালাকি কইরা দুইজনরে ঠেকাইতাছে। এইসব লইয়া আতাহাররে দুই-একবার খোঁচাখুঁচি করছি আমি। ঠাট্টা মশকরা করছি। আতাহারও হাসি মজা লইয়াঐ ওই হগল কথার পিঠে কথা কইছে। অরা তো জাত হিসাবেই খারাপ। বাপ খারাপ হইলে পোলা আর কত ভাল হইবো? তয় কোনও কোনও পোলা মা’র স্বভাবও পায়। আহা রে, আতাহার যুদি অর মা’র স্বভাবটা। পাইতো! যুদি মানুষটা ইট্ট ভাল হইতো!

তারপরও এই মানুষের লেইগা আমি পাগল। সে খারাপ হউক, বদ হউক, আর যাই হউক, আমি তো খারাপও না, বদও না। আমি তো তারে ভালবাসি, তারে চাই। সে যা। ইচ্ছা হউক, আমি থাকুম আমার মতন। তারে ছাড়া দুনিয়ার আর কিছু বুঝুম না। এর লেইগা, খালি এর লেইগা তারে ছাইড়া, এই বাড়ি ছাইড়া কোনওহানে আমি যাইতে চাই না। আইজ তিন বচ্ছর মাজারো বইনের বাইত্তে যাই নাই, বাপের বাইত্তে যাই নাই। বড় বইন থাকে ঢাকায়, ঢাকায় তো যাই নাই। বাবায় মাঝে মাঝে বাইত্তে আইয়া দুইমাস-তিনমাস থাকে, বড় দুই ভাইরা আইসা থাকে। কত আমদ আনন্দ হয় বাড়িতে। ঢাকা থিকা বড় বইন আসে, পয়সা গ্রাম থিকা যায় মাজারো বইনে। কত পোলাপান, কত। হইচই। আমার পোলাপান তিনডাও আমার লেইগা যাইতে পারে না নানার বাড়িতে। আমি আতাহারের লেইগা যাই নাই। তারে না দেইখা, তারে ছাইড়া দুইটা দিনও য্যান কোনওহানে টিকতে পারুম না আমি। রাইত্রে আমার ঘুম অইবো না, আমার খাইতে ইচ্ছা করবো না, নাইতে ইচ্ছা করবো না। পোলাপানের মিহি চাইতে ইচ্ছা করবো না, সাজতে ইচ্ছা করবো না। তার থিকা না গেলাম কোনওহানে। আতাহাররে লইয়া, নিজেরে লইয়া এই বাড়িতেই আনন্দে থাকি। মানুষের তো দোয়কখানায়, পাগলাগারদে, জেলখানায় থাকতেও থাকতেও অভ্যাস হইয়া যায়। আমারও এই বাড়িতে থাকতে থাকতে অভ্যাস। হইয়া গেছে। আতাহারের লগে থাকতে থাকতে অভ্যাস হইয়া গেছে। অরে না দেইখা আমি থাকতে পারুম না।

এই পয়লা আমার সবকিছু এলোমেলো হইয়া গেছে। আমার দুনিয়াদারি বদলাইয়া। গেছে। ভাঙ্গা মন ফাটা কইলজা, ভিতরে এক উপরে আরেক, এই অবস্থায় মানুষ বাঁচতে পারে না। আমারও মইরা যাইতে ইচ্ছা করে। ফইজুর কাছে হেননের পর ওই রাইতেই একবার ইচ্ছা হইছিল ঘরের ছাইছের আমগাছটার ডাইলের লগে গলায় দড়ি দেই। ফিরোজা। বলার পরও মনে হইছে। মরণের কথা মনে হইলেই পোলাপান তিনডার চেহারা দেহি চোকে। আমি মইরা গেলে আমার পোলাপান তিনডারে দেখবো কে? অগো জন্ম দিয়া গুনাহ করলে আমি করছি, অরা তো করে নাই। অগো মা-হারা করনের অধিকার আমার নাই। বাপ না হইয়াও বাপ একজন অগো আছিল, হেয়ও নাই। আমি মইরা গেলে আতাহার বিয়া কইরা নতুন বউ আনলে হেই বউয়ে আমার পোলাপান তিনডারে চাকর বাকর বানাইয়া হালাইবো। আমার অনাথ এতিম পোলাপান তিনডারে নানান পদের অইত্যাচার করবো। পোলাপান তিনডা আমার মাগো মাগো কইরা কানবো!

শিরি বড় হইতাছে। দুই-এক বচ্ছর পর আমার মাইয়ার উপরে বদদৃষ্টি দিবো কে না কে! আমি না থাকলে ওই হগল শয়তানের হাত থিকা অরে রক্ষা করবো কে! অল্প বয়সেই। আমার মাইয়াডারে নষ্ট কইরা হালাইবো অরা। পোলাডা যাইবো ভাদাইম্মা অইয়া। তারপর ছোড মাইয়াও বড় অইবো। অর দশাও অইবো শিরির মতন।

না না, না। এইডা আমি হইতে দিমু না। আমি আমার পোলাপানরে রক্ষা করুম। আমি আমার পোলাপানরে মানুষ করুম। এই দোয়কখানা থিকা, শয়তানের আখড়া থিকা বাইর কইরা লইয়া যামু অগো। এই বাড়ির মাইনষের বদছায়া পড়তে দিমু না অগো উপরে। অগো লেইগা আমি নতুন কইরা বাঁচুম। নতুন মানুষ হইয়া যামু। তয় এই বাড়ির কেঐরে কিছু বুঝতে দিমু না। যেমতে এতদিন চলছি অমতে চইলাই এই বাড়ি থিকা বাইর অমু। পোলাপান তিনডারেও অহন বুঝতে দিমু না কিছু। যা কওনের পরে কমু। এহেন থিকা বাইর হওনের পর।

.

মাকুন্দা কাশেমের কায়দায়ঐ বাংলাঘরে থাকে হাফিজদ্দি।

সে মেঝেতে, পুবদিককার বেড়ার লগে, আর আতাহার চকিতে। সন্ধ্যারাতেই ভাতপানি খাইয়া, তামাক খাইয়া বাংলাঘরে আইসা ঢোকে হাফিজদ্দি। চকির তলা থেকে তার কাঁথা বালিশ বাইর কইরা দরজা আবজাইয়া শুইয়া পড়ে। আতাহার কত রাতে আসে, কখন খায় ঘুমায় কিছুই সে উদিস পায় না। ভোরবেলা ঘুম ভাঙার পর দেখে আতাহার চকিতে বেভোর ঘুমে। নিঃশব্দে কাঁথা বালিশ ভাজ করে চকির তলায় রাইখা এমনভাবে দুয়ার খোলে হাফিজদ্দি, দুয়ার খোলার শব্দটা যেন নিজেও পায় না। তারপর বাইরে থেকে এমন করে আবজায়, শব্দ বলতে কিছু হয়ই না।

আজও সেই কায়দায় দরজা আবজাল। বেলা ভালই হয়েছে। রোদে ঝলমল করছে। চারদিক। গরম লাগছে। আতাহারের উঠতে আরও আধাঘণ্টা খানিক দেরি। পারু জানে। তারপরও এককাপ চা হাতে বাংলাঘরের সামনে এসে দাঁড়াল সে। আস্তে করে দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকল।

আতাহার দরজার দিকে পিঠ দিয়া শুয়ে আছে। এই গরমেও তার গায়ে পাতলা একটা কাঁথা। এটা তার অভ্যাস। যত গরমই পড়ক কথা একটা সকালের দিকে গায়ে সে দিবেই।

পারু এক পলক তাকায়া আতাহারের পিঠের দিকটা দেখল, তার পিঠের কাছে এসে দাঁড়াল। মিষ্টি আদুরে গলায় বলল, আতাহার সাহেব, ও আতাহার সাহেব। ওঠেন, ওঠেন। আপনের জইন্য আমি এককাপ চা নিয়া আসছি। এই চারে বলে বেড-টি। বিছানার চা। সাহেবরা ঘুম ভাঙনের লগে লগে এই চা খায়।

পারুর কথা শেষ হওয়ার আগেই ঘুম ভাঙছে আতাহারের। তবে প্রথমেই সে পারুর দিকে মুখ ফিরাল না। পারুর কথা শেষ হওয়ার পর তার দিকে তাকাল। তাকায়া হাসার চেষ্টা করল। তাই নাকি? আপনে আমার লেইগা বেড-টি লইয়াইছেন? দেন, দেন।

মাথাটা জোর বালিশের উপর দিকে তুলল আতাহার, আধশোয়া হয়ে চা নিল। ঘটনা কী? আইজ আমার লেইগা বেড-টি?

আতাহারের ঘরে ঢোকার আগ থেকেই কলিজা জ্বলছে পারুর, কোনও রাগ ক্রোধ তার উপর হচ্ছে না। কীরকম একটা অনুভূতি যে হচ্ছে। এই অনুভূতিকে অভিমানও বলা যাবে না। সত্যই যেন আতাহারের উপর রাগ ক্রোধ, অভিমান কিছু নাই পারুর। যেটা আছে। সেটা ঘৃণা। তীব্র ঘৃণা, তীব্র! তার চেয়েও যেন বেশি ঘৃণা মান্নান মাওলানার ওপর। এই দুইজন মানুষ যেন পারুর রাগ ক্রোধ আর অভিমানের যোগ্যই না। এই দুইজন মানুষ শুধুই ঘৃণা পাইতে পারে। গিরস্ত বাড়ির টংঘরের মতন পায়খানার নীচে, যেখানে দিনের পর দিন জমে মানুষের মল, বাড়ির বউঝিরা ছাই ফালাইয়া সেই মল ঢাকতে দেরি করলে, মলের মধ্যে এক ধরনের সাদা, এক কড়ের আধাআধি মাপের পোক কিলবিল কিলবিল করে। সেই পোক দেখলে যেমন ঘৃণা লাগে, আজ সকালে আতাহারকে দেখে ঠিক তেমন ঘৃণা লাগছে পারুর। আর এই ঘরের দিকে আসার আগে কদমগাছটার ওইদিকে দেখছে তসবি হাতে, মাথায় টুপি, পরনে লুঙ্গি আর সাদা পাঞ্জাবি, পায়ে নীল স্পঞ্জের স্যান্ডেল, পায়চারি করছেন মান্নান মাওলানা, তসবি টিপছেন আর বিড়বিড় করছেন। তাঁকে দেখেও রাগ ক্রোধ অভিমান কিছু হয় নাই পারুর, এই ঘরে ঢোকার আগে যে অনুভূতি সেই অনুভূতিটাই হয়েছে। এখন আতাহারের মুখ দেখে বুঝল সেই অনুভূতি হচ্ছে গুয়ের পোকা দেখে যে ঘৃণা হয় মানুষের সেই ঘৃণা।

তবু মুখে মধুমাখা হাসি পারুর। বলল, খুব জরুরি একখান কথা কইতে আইছি।

আতাহার চায়ে চুমুক দিয়া বলল, আমগো কথা কওনের টাইম তো দিনে না। রাইত্রে। রাইত্রে আমুনে আইজ তোমার কাছে, তহন হুনুমনে কী জরুরি কথা।

আগে এই ধরনের কথা আতাহারের মুখে শুনলে অদ্ভুত এক রোমাঞ্চে শরীর ভরে যেত পারুর। রোমের কূপে কূপে সাড়া জাগত। গা কাটা দিত। মনে হত কখন রাতদুপুর হবে, কখন আতাহারকে সে পাবে!

আজ সেই অনুভূতি তো দূরের কথা, তার মনে হল পায়খানা ঘরের তলা থেকে ওইরকম সাদা দলাদলা পোকা তার শরীরের দিকে আগাচ্ছে। পারু ভিতরে ভিতরে শক্ত হয়ে গেল। একটু সইরা গিয়া টেবিলের লগের চেয়ারটায় বসল। যেন আতাহার তাকে ছুঁইতে না পারে। ছটফটা গলায় ঢঙ্গি মেয়েছেলের মতন বলল, না গো সোনার চান, না। বিয়ার আগে রাইত্রে আর দেখা হইবো না। রাইত্রে আর কথাবার্তা হইবো না।

এইটা তুমি আমারে আগেও কইছো, তারবাদেও তো রাইত্রে তোমার কাছে আমি গেছি। তয় এইডা ঠিক যে আগের থিকা কম। দুই-একদিনের মইদ্যে ইট্টু যাইতে চাই।

না, একদোম না। বিয়ার আগে আর না। কিছুতেই না।

এতদিন কেমতে থাকুম?

বেশিদিন না তো, চাইর-পাঁচমাস।

চাইর-পাঁচমাস বেশিদিন না? কও কী?

আমি কিছু বুজি না। এইডা মানতেই অইবো। তুমি যত চেষ্টাই করো রাইত্রে আমি কইলাম দুয়ার খুলুম না। তুমি জানো আমি যা কই তা করি।

চায়ে চুমুক দিয়া হাসল আতাহার। তয় আর কী করুম? ঠিক আছে। বিয়ার পরেঐ রাইত্রে দেহা অইবো তোমার লগে।

পারু খেয়াল করল সূক্ষ্ম রহস্যময় একটুখানি হাসি পলকের জন্য দেখা গেল আতাহারের ঠোঁটে। সেই হাসি দেখে পারু বুঝল তার কথা থেকে মজা নিচ্ছে আতাহার। সে তো জানেই বিয়া পারুর লগে তার হইতাছে না। সে আছে নতুন নারীশরীরের লোভে। আর পারুর শরীরের প্রতিও এই ফাঁকে তার টান একটু কমছে। সেটা না হলে সে জোর করত, রাইগা যাইত পারুর উপর।

পোক, গুয়ের পোক।

আতাহর বলল, তয় কও কী জরুরি কথা। হুনি।

পারু আবার চটপটা হয়ে গেল। আমি ইট্টু বেড়াইতে যাইতে চাই।

শুনে যতটা অবাক হওয়ার কথা আতাহারের তার কিছুই হল না। অতি সাধারণ গলায় সে বলল, কই বেড়াইতে যাইবা?

পয়লা যামু পয়সা। আমার মাজারো বইনের বাড়ি। ওহেনে কয়দিন থাইকা তারবাদে যামু বেসনাল। আমগো বাইত্তে।

থাকবা কয়দিন?

হেইডা ঠিক কইতে পারি না। তয় মাসেকহানির কম না।

হ হেইডা তো অইবই। মেদিনমণ্ডল থিকা পয়সা যাইতে একদিন, ওহেনে সাত-আষ্ট দিন থাকবা, তারবাদে যাইবা হেই বেসনাল। রাজাবাড়ি দিঘিরপারের ওই মিহি। পয়সা থিকাও বিরাট দূর। ওহেনে গেলে পোনরো-বিশদিন তো থাকা অইবই।

তা অইবো। যাইতাছি তো ম্যালা দিন পর। তিন বচ্ছর।

হ।

চায়ে চুমুক দিয়া কাপটা মাটিতে নামায়া রাখল আতাহার। চিন্তাডা খারাপ করো নাই। তোমগো ওইমিহি বাইষ্যাকালে বেড়াইতে যাওনঐ ভাল। কেরায়া নৌকা কইরা যাওন। যায়। খরালিকালে মাইয়া লোকের যাওন তো বিরাট কঠিন। চৌদ্দ-পোনরো মাইল হাঁইট্টা পুরুষপোলারাঐ একদিনে যাইতে পারে না। মাইয়ালোকে যাইবো কেমতে! যাও বাইষ্যা। থাকতে থাকতে বেড়াইয়া আহো। নৌকা দিয়া যাইবা নৌকা দিয়া আইবা। ভাইঙ্গা ভাইঙ্গা যাইবা আইবা। পয়লা মাজারো বুজির হৌরবাড়ি, তারবাদে নিজেগো বাড়ি। যাও ফিরত আহনের পর তো অন্য জীবন। নতুন জামাই পাইবা।

পারু একথার জবাব দিল না। মনে মনে বলল, গুয়ের পোকরে, এই হগল আমারে আর কইচ না। আমি চাই না, তর লাহান মাইনষের লগে এই জিন্দেগিতে আমার আর দেখা অউক। তুই আর কোনওদিন আমারে ছুঁইতে পারচ!

আতাহার বলল, বাবারে কইছো?

না। আগে তোমারে কইলাম। অহন তারে গিয়া কমু।

মান্নান মাওলানাকে আব্বা ডাকে পারু। এখন সেই ডাকটা তার মুখে আসল না। পারু মনে মনে বলল, জিন্দেগিতেও ওইভাবে বড় গুয়ের পোকটারে আমি ডাকুম না।

আতাহার উইঠা বসল। খুবই স্বাভাবিক গলায় বলল, ঠিক আছে। তয় যাও বাবারে কও। আমার মনে হয় বাবায়ও লগে লগেঐ আমার মতন রাজি অইয়া যাইবো। হেয়ও চাইবো বিয়াশাদির আগে তুমি ইট্ট বেড়াইয়া বোড়াইয়া আহো। এই বাইষ্যায় বেড়াইতে যাইতে না পারলে আরেক বাইষ্যার লেইগা বইয়া থাকতে অইবো।

হ।

পারু উঠল। তয় আমি গেলাম।

যাও। বাবার লগে কথা কওনের আগে রান্নঘরে গিয়া রহিমারে কইয়া যাইয়ো আমার নাস্তা দিতে। চা খাইয়া খিদা যেহেনে কমে, আমার গেল বাইড়া।

পারু বের হয়ে যেতে যেতে বলল, আইচ্ছা কমু নে।

মনে মনে বলল, না কমু না। অহন থিকা এই জিন্দেগিতে তর কোনও কাম আমি আর করুম না। গুয়ের পোকের কাম গুয়ের পোকেরা করে। মানুষে করে না।

পারুর চোখের কোলে যে রাত জাগার কালিমা কাজলের মতন পড়েছে এতক্ষণ সামনে বইসা থাকার পরও আতাহার তা খেয়াল করল না। মান্নান মাওলানা তো আরও করলেন না। পারুর মুখের দিকে তিনি তাকালেনই না। পারু বাংলাঘরে গিয়া ঢোকার পর নিজের ঘরে ঢুকছেন তিনি। জানালার সামনের চেয়ারে বইসা তসবি টিপছেন। পারু আইসা ঘরে ঢুকল, দরজার সামনে দাঁড়ায়া বোনের বাড়ি, বাপের বাড়ি যাওয়ার কথাটা বলল। শুইনা মান্নান মাওলানার তসবি টিপা বন্ধ হয়ে গেল, মুখের বিড়বিড়ানি বন্ধ হয়ে গেল। অতি উৎসাহে তিনি যেন লাফায়া উঠলেন। হ হ যাও যাও। বেড়াইয়া আসো। যতদিন ইচ্ছা থাইক্কা আহো বইনের বাড়ি, বাপের বাড়ি। কবে যাইতে চাও? দুই একদিনের মইদ্যে?

পারু নরম গলায় বলল, কাইলঐ যাইতে চাই।

যাও যাও। কোনও অসুবিদা নাই। কাজির পাগলার বদু মাঝিরে খবর দিমু নে। হাফিজদ্দি আইজঐ গিয়া খবর দিয়া আইবো, কাইল বিয়ানেঐ যাতে তোমরা মেলা দিতে পারো আমি বেবস্তা নিতাছি। পয়লা তো পয়সা যাইবা?

হ।

তয় বদু তোমগো পয়সা তরি দিয়াইবোনে। এই কথা কইতেঐ আতাহারের ঘরে গেছিলা? আতাহার কী কইলো? আমি যেমতে যাইতে কইলাম অমতেই যাইতে কইছে না?

পারু মাথা নাড়ল। মনে মনে বলল, বড় ছোড দুই গুয়ের পোকের তো এককথা অইবো। দুই কথা কি আর অয়!

মান্নান মাওলানা বললেন, আমি অহনঐ হাফিজদ্দিরে বদু মাঝির বাইত্তে পাডাইতাছি। তুমি সব গুছগাছ করো গিয়া। তোমার জিনিস, তিন পোলাপানের জিনিস গুছগাছ করতেও তো সময় লাগে। যাও যাও।

মান্নান মাওলানার ঘর থেকে বের হয়ে আসার সময় পারু শোনে আতাহার চিৎকার কইরা রহিমারে ডাকছে। রহি ওই রহি, আমার নাস্তা দিলি না? তাড়াতাড়ি দে। আমার খিদা লাগছে।

পারু মনে মনে বলল, তুই গু খা, গু।

.

মান্নান মাওলানা বুঝলেন আজ ঘরে বসে সহজে সিগ্রেট ধরাবে না আতাহার।

কারণ সে জানে যখন তখন বাবা এই ঘরে আসবেন, তার লগে পরামর্শের দরকার আছে। হলও তাই। দ্রুত হেঁটে বাংলাঘরের সামনে আইসা দাঁড়ালেন মান্নান মাওলানা। আস্তে কইরা একটা কাশ দিলেন। গম্ভীর গলায় ডাকলেন, আতাহার।

আতাহার লাফ দিয়া চকি থেকে নামল। কন বাবা।

মান্নান মাওলানা ঘরে ঢুকলেন। পারু কী কইলো তরে?

ওইত্তো, বেড়াইতে যাইতে চায়।

তুই কী কইছস?

যাইতে কইছি। আপনের লগে কথা কইতে কইছি।

আমার লগে কথা কইছে। আমিও যাইতে কইছি।

হাতলআলা চেয়ারটায় বসলেন মান্নান মাওলানা। গলা নিচা কইরা বললেন, আল্লায় যা করে ভালর লেইগা করে। এইডা তো বিরাট ভাল কাম অইতাছে। পারু অগো বাইত্তে গেলে ভাদ্রমাস কাবার কইরা আইবো। আমি কাইলঐ অর যাওনের বেবস্তা করতাছি আর পশুদিনঐ ঘটকারে ডাকাইতাছি। পারু অর বাপের বাইত্তে থাকতে থাকতেঐ কাম সাইরা হালামু।

চকিতে বসে মাথা নিচা করল আতাহার। যেন বাপের অতি বাধুক ছেলে সে। বাপ যা বলেন তার উপরে কথা নাই। বলল, আপনে যা ভাল মনে করেন ওইডার্স করেন।

আমি এইডাই ভাল মনে করতাছি। পারু তো আমার গলায় কাডার লাহান বিনদা (বিধে) আছে। ঘটকায় আহে আর আমি খালি উসপিস উসপিস করি। তর বিয়ার কথা কইতে অয় চোরের লাহান। কোনদিক দিয়া পারু হুইন্না হালায়, তারবাদে কোন চিকরা চিকরি লাগায়। কেমতে অরে আমি সামাল দিমু। তুই বা কী করবি! যুদি গলায় দড়িমড়ি দেয় তয় বিরাট কিলিংকার অইয়া যাইবো। তহন তর বিয়া লইয়াও ভেজাল লাইগ্না যাইবো।

হেইডা তো আছেঐ, বাইত্তে পুলিশ দারোগা আইবো না? গলায় দড়ি দেওয়া লাচ লইয়া বিরাট টানাটানি লাইগ্যা যাইবো। পারুর মা-বাপ ভাইবইনরা আইবো। বিরাট ভেজাল।

ওই ভেজাল দ্যাক আল্লায় কেমতে মিটাইয়া দিল! অহন অগো বাইত্তে বেড়াইতে যাইবো, এই ফাঁকে তর বিয়ার কাম আমি সাইরা ফালামু। খবর পাইয়া যুদি বাপের বাইত্তে গলায় দড়ি দেয় পারু তয় হেই ঝামেলা আমগো উপরে পড়বো না।

তাও পড়তে পারে।

কেমতে?

পারু তো লেখাপড়া জানা মাইয়া। যুদি কাগজে লেইক্কা যায় আমার মরণের লেইগা অমুকে অমুকে দায়ী!

মান্নান মাওলানা মুখ বেঁকা করলেন। আরে থো ওইসব অমুকে অমুকে দায়ী! বাপের বাইত্তে মরলে ওইসব লেখাযোখা দিয়া কাম অইবো না। তহন আমরা উলটা কেস কইরা দিমু। অরা ইচ্ছা কইরা আমগো বাড়ির বউ মাইরা হালাইছে। এই লেখা পারুর না। অরা এই হগল বানাইছে।

আতাহার একবার মান্নান মাওলানার দিকে তাকাল। তারপর আগের মতন মাথা নিচা কইরা বলল, হ অরা আমগো লগে পারবো না। অরা ডাইলে ডাইলে চললে আমরা চলুম। পাতায় পাতায়।

মান্নান মাওলানা হাসলেন। হ এইডাঐ কথা। তয় আমি হাফিজদ্দিরে পাডাই বদু মাঝিরে খবর দিতে।

পাডান।

একবারে কি ঘটকার বাড়িও ঘুইরা আইবোনি? পশুদিন ঘটকায় যেন আমার লগে দেহা করে।

যাইতে পারে। আর ঘটকার গোমস্তা ফইজুর বড়পোলাঐত্তো বদু। বদু যুদি খেপ খোপে গিয়া থাকে, অরে যুদি বাইত্তে না পায় তয় ফইজুরে কইয়া আইলেও অইবো। এককামে দুই কাম।

হ ঠিকঐ কইছস। আমি বেবস্তা করতাছি।

মান্নান মাওলানা দ্রুত হেঁটে উঠানে নামলেন।

.

ফিরোজা আঁতকে উঠল। কন কী ভাবিছাব? আপনে চইলা যাইতাছেন? আর কোনওদিন এই বাইত্তে আইবেন না?

পারু এখনও সেই অবস্থায়ই আছে। উপরে এক, ভিতরে আরেক। হাসিমুখে বলল, হ। আমি তো কোনওদিন আমুই না, আমার পোলাপান তিনডারেও আইতে দিমু না। এইডা যে অগো বাপদাদার বাড়ি এইকথা ভুলাইয়া দিমু।

কেমতে ভুলাইবেন?

আমি আমার মতন কইরা অগো মানুষ করুম। শিরি বড় হইছে, আরেকটু বড় অইলে অরে আমি অন্যভাবে বুঝাইয়া কমু এই বাড়ির মাইনষে আমার লগে কোন বেইমানি করছিল। তারবাদে নসু আর নূরি বড় অইলে অগোও কমু। আমার যেমুন ঘিন্না জন্মাইছে ওই দুইডা গুয়ের পোকের উপরে, ঠিক অমুন ঘিন্না আমার পোলাপানের মইদ্যেও জন্মানের বেবস্তা করুম। য্যান এই বাড়ির নাম হোনলে এমুন কইরা অরা নাকমুখ কুচলায়, য্যান খোলা পায়খানার সামনে দিয়া হাইট্টা যাইতাছে।

পারবেন আপনে?

পারুম। আল্লাহর রহমতে পারুম। কাইল মাজারো বইনের বাইত্তে গিয়া পাঁচ-ছয়দিন। থাকুম, তারবাদে যামু আমগো বাইত্তে। আমার মাজারো বইনডা বহুত বুঝদার। অরে বেবাক বুঝাইয়া কমু। দরকার অইলে ও আমার লগে বেসনাল যাইবো। মা-বাবারে, বড় ভাইগো বুঝাইয়া কইবো।

অহন তারা যুদি মিটমাট করনের লেইগা এই বাইত্তে আইতে চায়?

আমি আইতে দিমু না। আমি কোনও মিটমাট চাই না। চাইলে অহনঐত্তো গিয়া ওই দুইডার লগে চিল্লাচিল্লি লাগাইতে পারি। কাইজ্জাকিত্তন কইরা বাড়িঘর উলটপালট কইরা হালাইতে পারি। আমার বাপ-ভাইরে খবর দিয়া আনাইতে পারি, বইন বইনজামাইগো আনাইতে পারি। এই বাইত্তে আমার বিয়া অইছে দেইক্কা না, এমতেও তো এরা আমগো আততীয়। বিরাট পেচিঘুচি আমি লাগাইতে পারি।

পারু হাসল। তুই আবার ভাবিচ না, পেচিঘুচি লাগাইতে গেলে আমি নিখিলরে আর তরে সাক্ষী দিতে কমু, ফইজুরে ডাকাইয়া আনুম। এইসবের দরকার অইবো না। এইসব ছাড়াঐ আমি পারি। বেবাকতেরে ডাইক্কা আইন্না কমু, আইজঐ, অর নাম লইতে আমার ঘিন্না লাগতাছে দেইক্কা নামডা লইতাছি না, তুই তো বুজতাছস…

হ হ আপনে কন।

বেবাকতেরে ডাইক্কা আইন্না কমু আইজ অর লগে আমার বিয়া পড়াইয়া দেও। অরা খালি আমারে ঘুরাইতাছে, খালি আমার লগে মিছাকথা কইতাছে।

ফিরোজা উৎসাহী গলায় বলল, তয় আপনে এইডা করতাছেন না ক্যা ভাবিছাব? এইডাঐত্তো আপনের করন উচিত।

পারু একটু উদাস হল। না রে, এইডা আমার করন উচিত না।

ক্যা? আপনের লগে অরা বেইমানি করছে অগো আপনে ছাড়বেন ক্যা?

আমি যুদি একলা অইতাম তয় অগো আমি ছাড়তাম না। কাইজ্জাকিত্তন চিল্লাচিল্লি কইরা দেশগেরাম গরম কইরা হালাইতাম। ওই দুইডা গুয়ের পোকরে নাকাল কইরা ছাড়তাম। এমুন। বেবস্তা করতাম, দেশগেরামে যাতে মুক দেহাইতে না পারে। এইডা গেল একটা পথ। আরেকটা পথ হইল গলায় দড়ি। আত্মহত্যা কইরা অগো আমি ফাসাইয়া দিয়া যাইতে পারতাম। চাইলে থানায় গিয়া ডাইরি করতে পারতাম। ওই দুইডারে বান্দনের বেবস্তা করতে পারতাম।

অগো লগে এইডাঐ করনের কাম।

ওই যে তরে কইলাম, একলা অইলে করতাম। অহন করুম না পোলাপান তিনডার লেইগা। আমি খারাপ কিছু করলে আমার পোলাপান তিনডা ছ্যাড়াভেড়া অইয়া যাইবো। অরা তো কোনও অন্যায় করে নাই। অগো জীবন আমি নষ্ট করুম ক্যা?

ফিরোজা বুঝদারের গলায় বলল, হ এইডা ঠিক। তয় ভাবিছাব, হুজুরের জাগাসম্পত্তির মালিক তো মোতাহার দাদায়ও। হেয় বাঁইচ্চা নাই, জাগাসম্পত্তির ভাগ পাইবেন আপনে আর আপনের তিন পোলাপানে। এই হগল থিকা পোলাপানডিরে আপনে বনচিত করতাছেন ক্যা?

এই বাড়ির মাইনষের কথা আমি বাদঐ দিলাম, বাড়ির প্রত্যেকটা ধুলাকণার মইদ্যেও। পাপ। এই পাপের মইদ্যে আমি আমার পোলাপানরে তাগো ভাগ চাইতে পাডামু না। আমার বাপের বাড়ির অবস্থা খারাপ না। ওহেনে আমি কিছু জাগাসম্পত্তি ভাগে পামু। ওইসব দিয়া পোলাপান তিনডারে মানুষ করুম। আমার মা বাপ ভাই বইনে কোনওদিন। আমারে হালাইবো না। আমার লেইগা, আমার পোলাপানের লেইগা যা করনের তারা করবো। বেবাক হোননের পর তারাও এই দোযকের মইদ্যে আমারে আর পাডাইবো না।

একটু থামল পারু। তারপর বলল, আমি পড়তাম স্বর্ণগ্রাম হাইস্কুলে। আমার পোলাপান তিনডা ওই স্কুলে পড়বো। লেখাপড়া কইরা মানুষ অইবো। আমার নিজের জীবন নষ্ট অইছে, অগো জীবন আমি নষ্ট অইতে দিমু না।

আবার একটু থামল পারু। তারপর বলল, আমি যে চিরতরে এই বাড়ি ছাড়তাছি এই কথা কেঐ জানে না। খালি তরে কইলাম। তুই যেমুন আমারে ভাল জানচ, আমিও তরে ভাল জানি ফিরি। নিখিলের কথায় তুই সাহস কইরা আমারে বেক কথা কইছস। যতদিন। বাঁইচ্চা থাকুম তর কথা আমি মনে রাখুম। নিখিল আর ফইজুর কথা মনে রাখুম। ভুইল্লা যামু খালি অগো কথা, যাগো লগে এতডি বচ্ছর কাটাইলাম, আমার জীবন যারা ছ্যাড়াভেড়া করল তাগো কথা। তাগো কথা আমি একদোম ভুইল্লা যামু, একদোম। গুয়ের পোকের কথা মানুষের মনে রাখন উচিত না।

পারু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

তখন শেষ বিকাল। বৃষ্টিবাদলার নামগন্ধও নাই আজ। ঝকঝকা পরিষ্কার আকাশ। বিকালের রোদে উজ্জ্বল হয়ে আছে বর্ষাকালের দেশগ্রাম। পারুর কথা শুইনা চোখ ছলছল করছে ফিরোজার। পানি আসতে চাইছে চোখে। চোখের পানি সামলাবার জন্য অন্যদিকে মুখ ঘুরায়া সে বলল, তয় আপনের লেইগা আমার বহুত কষ্ট অইবো ভাবিছাব! এত ভাল একজন মানুষ আপনে আর আপনের জীবনডা এমুন করল আল্লায়! আহা রে!

ফিরোজার কথায় পারুরও খুব কান্না পেল। জোর করে কান্নাটা সে আটকাইয়া রাখল।

.

এতদিন পর মাজারো খালার বাড়ি বেড়াতে যাচ্ছে, সেখান থেকে যাবে নানাবাড়ি, শোনার পর থেকে শিরি নসু আর নূরির আনন্দ উৎসাহের সীমা-পরিসীমা নাই। দৌড়াদৌড়ি ছুটাছুটি কইরা এইটা গুছাচ্ছে, ওইটা গুছাচ্ছে। জামাকাপড় খেলনাপাতি বইপত্র, নূরি তো তার কোল বালিশটাও নিয়া যেতে চায়।

সন্ধ্যার পর পর অনেকক্ষণ তাকায়া তাকায়া এইসব দেখল পারু তারপর বলল, এত কিছু নেওনের কাম নাই। দুই-তিনটা কইরা জামা কাপড় ল এহেকজনে আর বইখাতা। জুতা স্যান্ডেল পায়ে যেইডা থাকবো ওইডাই, বেশি নেওনের কাম নাই।

শিরি অবাক গলায় বলল, ক্যা? আমরা তো মাসহানির কম থাকুম না। এত কম কাপড় চোপড়ে কেমতে অইবো মা?

পারু আসলে এই বাড়ির কোনও কিছুই নিতে চায় না। এক কাপড়ে চলে যেতে চাচ্ছে। তাও বোনের বাড়ি গিয়া এইসব জামাকাপড় ফালাইয়া দিব। দিঘলির হাট থেকে নতুন জামা কাপড় কিনা আইনা দিব পোলাপানরে। নিজের জন্য শাড়ি কিনার দরকার নাই। বাপের বাড়ির দিককার অনেক শাড়ি পারুর আছে। সে শুধু সেগুলিই নিবে। গহনাও নিবে বাপের বাড়ির দিক থেকে পাওয়াগুলি। এই দিককার সবকিছু সে আলমারিতে রেখে যাবে।

পোলাপানরে তো আর এসব কথা বলা যায় না। বলল অন্যকথা। খালার বাইত্তে গেলে খালায় কাপড় চোপড় কিন্না দিবো নে, নানাগো বাইত্তে গেলে কিন্না দিবো নে নানায়, মামারা। তহন তো পুরানা কাপড় চোপড় আর ফিনবি না। তয় এত বোঝা টাননের কাম কী?

শিরি বলল, হ ঠিক কথা।

দুইটা ব্যাগেই চারজন মানুষের সবকিছু গুছগাছ করা হয়ে গেল। সেই ব্যাগের দিকে তাকায়া পারু মনে মনে বলল, আমি এই বাড়ির কিছুই নিতাছি না। পোলাপানে যা নিবো তাও বইনের বাইতে গিয়া হালাইয়া দিমু। এই বাড়ির কোনও চিন্ন (চিহ্ন) রাখুম না।

খাওয়াদাওয়া শেষ করে সকালবেলা রওনা দিবে এই উত্তেজনায় ঘুম আসে না পোলাপান তিনটার। শুইয়া পড়ছে ঠিকই, তবে উসপিস উসপিস করছে। হাকিকি করে এ ওর লগে কথা বলে। হারিকেনের আলোয় কেবিনের ভিতরকার আলমারি খুলে বসেছে পারু। বাপের বাড়ির দিক থেকে পাওয়া গহনাগুলি পোঁটলা করে বাঁধছে একটা শালে। এই শাল কলকাতা থেকে আইনা দিছিল বড় দুলাভাই। কত বছর আগের কথা। পারুর বিয়ারও দুই বচ্ছর আগে। এতগুলি দিন চলে গেছে জীবন থেকে, জিনিসটা ঠিকই আছে। নষ্ট তো হয়ই নাই, পুরানাও হয় নাই। এখনও কেমন নতুন নতুন। গয়নাগুলি শালের ভিতর জড়াবার সময় এমন একটা গন্ধ এল, সেই গন্ধে বুকটা হু হু করে উঠল পারুর। কারণ গন্ধের সঙ্গে ভেসে এল বহুদূর পিছনে ফেলে আসা সেই জীবনের গন্ধ। কত সুখ আনন্দের দিন, কত স্বপ্নের দিন। ভাল ঘরে বিয়া হবে, মনের মতন বর হবে। সুখে আনন্দে ভাসতে ভাসতে জীবন কাটবে। কোথায় মিলায়া গেল সেই স্বপ্ন। কী জীবন কী হয়ে গেল!

নসু আর নূরি কোন ফাঁকে ঘুমায়া গেছে। শিরি তাকায়া আছে হারিকেনের আলোর। দিকে। মা’কে দেখছে শালের মধ্যে গহনা জড়াতে গিয়া কেমন উদাস হয়ে গেছে।

শিরি আস্তে করে ডাকলো, মা।

পারু মেয়ের দিকে তাকাল। কী?

তোমারে একখান কথা জিগাই?

চটপটা হাতে শালের মধ্যে গহনাগুলি জড়ায়া ব্যাগে রাখল পারু। আবার বলল, কী?

তুমি হেদিন রাইতে অমতে কানতাছিলা ক্যা?

পারু চমকাল। তুই উদিস পাইছস?

হ।

কেমতে পাইলি? আমি তো আওজ করি নাই।

তাও ইট্টু আওজ অইছে। রাইতদোফরে কীর লেইগা অমতে কানছো তুমি?

মনডা খারাপ আছিলো না।

বাবার কথা মনে অইছিলো?

পোলাপানের লগে মিছাকথা পারতিকে বলে না পারু। দুই-একটা ব্যাপারে বলতেই হয়। না বইলা উপায় থাকে না। এখন তেমন সময়। মেয়ের লগে মিছাকথা বলতে লাগল পারু। খালি তর বাবার কথা না, আরও অনেক কথা মনে পড়ছিল। কতদিন বাপের বাইত্তে যাই না, ভাই বইনগো লগে দেহা অয় না, বেক কিছু মিল্লা ঘুম অইতাছিল না। খালি কান্দন আইতাছিল।

এর লেইগাঐ আথকা খালার বাইত্তে যাইতাছো, নানাগো বাইত্তে যাইতাছো?

হ মা।

শিরি একটু চুপ করে থেকে বলল, মা, আমি ইট্টু তোমার কাছে আহি?

পারু একটু অবাক হল। তারপর বলল, আয়।

শিরি উঠে পারুর কোলের কাছে আইসা বসল। তোমারে একখান কথা কইতে চাই মা।

মেয়ের মাথায় গালে হাত বুলায়া পারু মায়াবী গলায় বলল, কও মা, কও।

আমার মনে অয় তোমার মন খুব খারাপ মা। উপরে উপরে তুমি ঠিক থাকনের চেষ্টা করতাছো, ভিতরে ভিতরে বহুত কষ্ট পাইতাছো, হেই কষ্টের কথা কেঐরে কইতে পারতাছো না! কোনও কারণে বহুত বড় দুঃখ পাইছো তুমি! এর লেইগাঐ আথকা মাজারো। খালার বাইত্তে যাইতাছো, নানাগো বাইত্তে যাইতাছো।

মেয়ের কথা শুনে কেঁপে উঠল পারু। আরে আমার দশ বচ্ছরের মাইয়া এতকিছু বুজলো কেমতে? ও তো আমারে খ্যাল কইরা দেখছে। ও তো আমার দুঃখ বেদনাটা টের পাইছে। আহা রে আমার মাইয়া, আমার কইলজার টুকরা।

শিরিকে দুইহাতে বুকে জড়াইয়া ধরল পারু। অনেক চেষ্টা করল বুক ঠেলে ওঠা কান্না ঠেকায়া রাখতে পারল না। হু হু করে কাঁদতে লাগল।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *