২.৪ গভীর রাতে ঘুম ভেঙে যায়

কোনও কোনও গভীর রাতে আজকাল ঘুম ভেঙে যায় কুট্টির।

আগে কখনও এমন হত না। সারাদিন আর রাতের অনেকখানি সময় পর্যন্ত এতবড় বাড়ির সবকাজ, রান্ধন বাড়ন, নাওন ধোওন, বড়বুজানকে নিয়ে আন্নাতান্না (বিরক্তিকর কাজ অর্থে)। দিনভর পলকের আজার নাই। ফলে রাতের খাওয়াদাওয়া শেষ করার পরপরই শরীরের ভিতর থেকে ঠেলে বেরুত ক্লান্তি। হাত-পা আর চলতে চাইত না, চোখ ভেঙে আসত দুনিয়ার ঘুমে। বড়বুজান দিনরাত শুয়ে আছে পালঙ্কের উপর, একটার পর আরেকটা তোশক ফেলা মোটা নরম বিছানায়। কুট্টি শোয় তাঁর মুখ বরাবর মেঝের পাটাতনে। নিজের পুরানা দুইখান ছেঁড়ামোটা কথা আর একখান মাথার তেল আর ঘুমের তালে মুখের কষ বেয়ে কখনও কখনও পড়া লোলের (লালা) গন্ধ মাখা বালিশ আছে। যে কাঁথা মেঝেতে বিছিয়ে শোয় বালিশ থাকে তার ভিতর প্যাঁচ দিয়ে রাখা। আর গায়ে দেওয়ার কথা থাকে আলাদা। বড়বুজানের পালঙ্কের তলায়ই থাকে জিনিসগুলি। রাতের খাওয়া দাওয়া শেষ করেই, পালঙ্কের তলা থেকে কোনওরকমে কাঁথা বালিশ টেনে বের করে কুট্টি। একটানে কাঁথা মেলে দেয় মেঝেতে, বালিশ রাখে জায়গামতো। তারপর ঘরের উত্তর-দক্ষিণ দুইদিককার দরজার দিকে একবার তাকায়। দরজা বন্ধ আছে কি না দেখে। দক্ষিণের ঝুলবারান্দার দরজাটা সন্ধ্যা থেকেই বন্ধ। সকালবেলা ঘুম ভাঙার পর খুলে দেয়, দিনভর খোলা থাকে, সন্ধ্যার মুখে মুখে বন্ধ। একটা হাতলআলা চেয়ার আছে বারান্দায়। কোনও কোনওদিন বড়বুজানকে নিয়ে সেই চেয়ারে জোর করে বসিয়ে দেয় কুট্টি। শিশুর মতন দুইহাতে চেয়ারের দুইদিককার হাতল ধরে, পাকা রোয়াইল ফলের মতন খোলা। চোখে বারান্দা ছাড়িয়ে ভাঙনের দিকে নেমে যাওয়া ঝোঁপঝাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকেন বড়বুজান, ঝোঁপঝাড় ছাড়িয়ে কচুরি ভরতি পুকুরটার দিকে তাকিয়ে থাকেন। পুকুরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে অনেকখানি জায়গা কচুরি পরিষ্কার করে ফাঁকা করে রেখেছে আলফু। শক্ত বাঁশের খুঁটি পুঁতে পুকুরের অনেকখানি জায়গা পর্যন্ত এগিয়ে যাওয়া কাঠের সিঁড়ি ফেলে ঘাটলা করে দিয়েছে। এই ঘাটলায় বসেই থোয়া পাকলা, নাওনষেধাওনের কাজ করে কুট্টি। আলফুও করে। সংসারের যাবতীয় খুঁটিনাটির দিকে চোখ তার। পরিষ্কার করা জায়গাটার তিনদিক থেকে কচুরি এসে যাতে দখল নিতে না পারে সেজন্য পানির ওপর তিনদিকে তিনটা লম্বা বাঁশ ফেলে কচুরি আগাবার পথ বন্ধ করে দিয়েছে।

কচুরি হচ্ছে অদ্ভুত আগাছা। রাতারাতি বংশ বাড়াবার ওস্তাদ। আজ দেখলে একখান কচুরি কালই দেখলে চারপাশে আরও সাত-আটখান ছোট ছোট গজিয়ে গেছে। নীল বেগুনি আর সাদায় মিশানো ফুল ছাড়া কচুরির আর কিছুই সুন্দর না।

তবে তিনদিকে কচুরি, একদিকে ঘাটলা আর অনেকখানি জায়গা জুড়ে পবিত্র মানুষের মনের মতো পানি, সেই পানির দিকে তাকিয়ে থাকতে খুব ভাল লাগে।

বড়বুজানের লাগে কি না কে জানে! নিভে আসা চোখের আলোয় পানির স্বচ্ছতা সে দেখতে পায় কি না কে জানে! তবু তাকিয়ে থাকে।

পুকুরের ওপারে বাঁশবন, দুই-তিনটা হিজল বউন্নাগাছ। গাছগুলি জড়িয়ে আছে গাঢ় সবুজপাতার এক রকমের লতা। দুপুরের নির্জনতায় ঘুঘু ডাকে সেই ঝোপে। ঘুঘুর ঘুঘ, ঘুঘুর ঘুঘ।

বড়বুজানকে ঝুলবারান্দায় বসিয়ে কুট্টি হয়তো তখন নাইতে আসছে ঘাটলায়। বদনা ভরে পানি তুলে মাথায় ঢালবার আগে রান্নাঘর থেকে হাতের তালুতে করে আনা কয়লার ফাঁকি আঙুলের আগায় নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে দাঁত মাজার অভ্যাস আছে তার। উদাস আনমনা ভঙ্গিতে দাঁতটা হয়তো সে তখন মাজছে, ঘুঘুপাখি তখনই হয়তো ডাকছে ঝোপে, সেই ডাকে, সেই দুপুরের নির্জনতায় মনটা কেমন করে তার! ঘাটলায় বসে পানির আয়নায় মুখ দেখতে দেখতে কুট্টির মন যে চলে যায় কোনখানে!

এই জীবন কি এমন হবার কথা ছিল কুট্টির?

সতিনের সংসার হোক, সংসার তো একটা পেয়েছিল। সেই সংসারে না ছিল ভাত কাপড়ের সুখ, না ছিল স্বামীর আদর সোহাগের সুখ। সতিনটা ছিল দজ্জাল। কথায় কথায় চুলাচুলি করত, মারধর করত। তিন-চারটা পোলাপান জন্ম দেওয়ার পরও দেহে ছিল মাগির দামড়ির মতো জোর। খেয়ে না-খেয়ে বড় হওয়া কাহিল কুট্টি কিছুতেই কুলাত না তার সঙ্গে। বেদম মারধর খেয়ে বাড়ির আঙিনায় বসে অসহায়ের মতো কাঁদত। এই নিয়ে স্বামী কোনও কথা বলত না। হয়তো ওরকম করে বসে কাঁদছে কুট্টি আর সেই লোকটা রান্নাচালার সামনে বসে নির্বিকার ভঙ্গিতে নারকেলের হুঁকায় গুড়ুক গুড়ুক করে তামাক টানছে।

মানুষটার সঙ্গে শোয়ার সুযোগও তেমন পেত না কুট্টি। কোনও কোনও রাতে তো সতিন মাগিটা এসে কুট্টির পাশ থেকে টেনেই তুলে নিয়ে যেত তাকে। দেহ অনুযায়ীই চাহিদা ছিল তার। লোকটা বোধহয় কুলাতেও পারত না তার সঙ্গে। ফলে যে দুই-চারদিন তাকে ভাগে পেত কুট্টি, পাশে শুয়ে এমন ম্যাড়ার মতন (দুর্বল অর্থে) আচরণ করত, ওই আচরণে খুশি হওয়ার কথা না কোনও যুবতী মেয়ের। কিন্তু ওইটুকুতেই যেন শরীরের সুখে মরে যেত কুট্টি। ওইভাবেই হয়তো জীবনটা সে কাটাতেও পারত।

কিন্তু ভাতের কষ্ট!

ক্ষুধার কষ্ট!

কোনও কোনও দুপুরে ঘাটলায় দাঁড়িয়ে দাঁত মাজতে মাজতে পানির তলায় নিজেকে দেখতে দেখতে সেই জীবনটার কথা মনে পড়ে কুট্টির। আজকের জীবন আর সেদিনকার জীবনের মাঝখানে পরিষ্কার আবরণ। চোখ খুলে তাকালেই ফেলে আসা জীবনটা সে দেখতে পায়। মনটা খারাপ হয়।

তবে যে-কোনও দুঃখের জীবনেও একটু না একটু সুখ থাকেই মানুষের। সেই জীবনেও তেমন এক সুখ কুট্টির ছিল। সতিনের ছোট ছেলেটির বয়স ছিল তিন-সাড়ে তিন বছর। শ্যামল রঙের ল্যাংটাপুটো ছেলেটি সারাদিন ঘুরঘুর করত বাড়ির আঙিনায়। শরীরের কোথাও কোনও বস্ত্র নেই, মাজায় কালো কাইতান বাঁধা, কাইতানের সঙ্গে পিতলের ছোট্ট ঘুঙুরদানা। চলার তালে তালে মৃদু ঝুমঝুম শব্দ হত। সেই শব্দে বোঝা যেত কোনদিকে যাচ্ছে সে। বারবাড়ির দিকে গেল, একলা একা কি নেমে গেল চকের দিকে, নাকি সবার অজান্তে গেল পুকুরঘাটে! পানিতে পড়ল!

কী মিষ্টি মায়াবী মুখ ছিল শিশুটির! টানা টানা চোখ, মেয়েলি ধাচের। মাথাভরতি ঘন চুল। ছোট্ট সুন্দর দাঁতে এত সুন্দর করে হাসত, সেই হাসিতে চারপাশ ফকফক করে উঠত।

যখন তখন মুগ্ধ চোখে শিশুটিকে দেখত কুট্টি।

সতিনের ছেলেমেয়েরা দুইচোক্ষে দেখতে পারত না কুট্টিকে। তার সামনেও আসত না। সত্যা হোক, মা তো ছিল কুট্টি, কেউ মা বলত না। কখনও কখনও বলত ওই শিশুটি। নাম ছিল নয়ন। কুট্টির পাশ দিয়ে কাইতানে বাঁধা ঘুঙুর দানার শব্দ তুলে ছুটে যেতে যেতে আচমকাই সে দুষ্টুদু চোখ করে তাকাত কুট্টির দিকে। মিষ্টি একটুখানি হেসে পাখির গলায় একবার দুইবার ডেকে উঠত, মা মা।

সেই ডাকে কুট্টির বুকের ভিতর তোলপাড় করত। সতিনের সংসার, ক্ষুধার কষ্ট আর মারধর সব মুহূর্তের জন্য ভুলে যেত। নয়নের পিছু পিছু ছুটে গিয়ে দুইহাতে পাগলের মতো বুকে নিত তাকে। মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে, গালে মুখে চুমু খেয়ে আদরে আদরে ভরিয়ে দিত ছেলেটিকে।

এইটুকু ভাল লাগাও তার ছিনিয়ে নিয়েছিল সতিন মেয়েছেলেটি। এক বিকালে মা ডাকার পর অমন করে নয়নকে আদর করছিল কুট্টি, নামার দিকে কী কাজে গিয়েছিল নয়নের মা, নয়নকে কুট্টির কোলে দেখে চিলে থাবা দিতে আসা ছানা রক্ষার জন্য যেমন করে ছুটে আসে মুরগি তেমন করে ছুটে এল। এসে ছোঁ মেরে নিল নয়নকে। তারপর তুবড়ির মতো। গালাগাল। পোলাডারে আমার ভাগাইয়া নেওনের চিন্তায় আছচ মাগি? চুপ্পে চুপ্পে হিগায় দিছচ আমার পোলায় য্যান তরে মা ডাকে? জামাইরে হাত করতে না পাইরা অহন আমার। পোলার মিহি হাত বাড়াইছচ? ওই হাত ভাইঙ্গা (মুদ্রণযোগ্য নয়) ভইরা দিমু!

ঠাটাপড়া মানুষের মতন কুট্টি তখন স্থির। মায়ের কোল থেকে নয়ন দুঃখী মুখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সেই তাকানোয় কী যে মায়া ছিল! আজও যখন তখন সেই স্মৃতি মনে পড়ে কুট্টির। কতকাল আগের কথা, তবু সেই শিশুটিকে পরিষ্কার দেখতে পায় কুট্টি। তার। মিষ্টি মুখখানি, তার ডাগর চোখ দেখতে পায়। আর কানের অনেক ভিতরে থেকে শুনতে পায় পাখির গলায় সে ডাকছে, মা মা।

সন্ধ্যার মুখে মুখে ঝুলবারান্দার দিককার দরজাটা বন্ধ করতে হয় ওদিকে আর কোনও কাজ থাকে না বলে। তা ছাড়া দেশগ্রাম এখন আর আগের মতো নাই। রাস্তার কাজ শুরু হওয়ার পর দেশগ্রামে এখন বারো পদের মানুষ। চোরধাউরে ভরে গেছে। মুকসেইদ্দা চোরাও নাকি জেল থেকে ছাড়া পেয়ে ফিরেছে। দরজা খোলা থাকলে দক্ষিণের ঝুলবারান্দা টপকে কে এসে ঢুকবে ঘরে কে জানে! কুট্টি থাকবে তখন রান্নাঘরে, উত্তরের বারান্দায়, উদিসও পাবে না কে এসে ঢুকল ঘরে! আর বড়বুজানের তো যোদববাদ (বোধ অর্থে) নাইই, মানুষের পায়ের শব্দ পেলে ভাববে কুট্টিই চলাফেরা করছে। কথাই বলবে না।

সুতরাং বিকাল ফুরিয়ে চারদিক ছায়াময় হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ওদিককার দরজা বন্ধ করে কুট্টি। তারপর নিশ্চিন্ত মনে রান্নাঘরের কাজ সেরে উত্তরের বারান্দায় এসে ঢোকে। কুপিবাতি জ্বেলে প্রথমে বড়বুজানকে খাওয়ায়, সেই ফাঁকে আলফু এসে বাইরের দিককার দরজা বন্ধ করে। দরজার আড়ালে রাখা হোগলা পেতে বসে।

বড়বুজানকে খাইয়ে আলফুকে খেতে দেয় কুট্টি, নিজে খায়। আগে বেশ তাড়াতাড়িই সারত কাজটা। কথাবার্তা আলফু কম বলে, কুট্টিও তেমন বলত না। খাওয়াদাওয়া সেরে যে যার মতো ব্যস্ত হত। খাটালে ঢুকে বারান্দা আর খাটালের মাঝখানকার দরজা বন্ধ করে, হারিকেন নিভুনিভু করেই শুয়ে পড়ত কুট্টি। বন্ধ দরজার ওপাশে বারান্দায় বিছানা পেতে শুয়ে পড়ত আলফু। যে যার মতো চলে যেত ঘুমের জগতে।

মাকুন্দা কাশেমের ঘটনার ক’দিন আগে, সেই যে সেই দুপুরে চালতাতলায় পিছন থেকে আলফুর পিঠ কাঁধ দেখে শরীরের খুব ভিতরে আশ্চর্য এক কাঁপন লাগল কুট্টির, আর একদিন কী কাজে ঘাটলায় গিয়ে কচুরির চাক তুলে মাছ ধরতে থাকা আলফুকে দেখেও সেই একই অনুভূতি। শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কী যেন কী চাহিদা। শরীর যেন উন্মুখ হচ্ছে, মন উন্মুখ হচ্ছে। তারপর ঘটল মাকুন্দা কাশেমের ঘটনা। নিজের ভাগের ভাতটুকু কাশেমের সঙ্গে ভাগ করে খেতে বসেছিল আলফু, সেই দৃশ্যের ভিতর দিয়ে আলফুর মনেরও যেন অনেকখানি দেখে ফেলল কুট্টি। একদিকে শরীর আরেকদিকে মন, ভিতরে ভিতরে আলফুর জন্য কী যেন কী একটা কাণ্ড ঘটতে লাগল কুট্টির। আলফুর দিকে এখন তাকাতে লজ্জা তার, কথা বলতে লজ্জা। ইচ্ছা করে খুব। খুব তাকাতে ইচ্ছা করে মানুষটার দিকে। খুব দেখতে ইচ্ছে করে তার চোখ, মুখ। খুব বলতে ইচ্ছা করে তাকে মনের সবকথা। সামনে বসিয়ে খাওয়াবার সময় এটা ওটা তুলে দিতে ইচ্ছা করে পাতে। আর গভীর রাতে ঘুম ভাঙার পর ইচ্ছা করে নিঃশব্দে উঠে বারান্দা আর খাটালের মাঝখানকার দরজা খুলে চুপিচুপি চলে যায় মানুষটার কাছে। মা হওয়ার আগে মেয়েবেড়ালটা যেভাবে যেত মেন্দাবাড়ির হোলোটার কাছে, ঠিক তেমন এক টান শরীর মনে।

আজ রাতে ঘুম ভাঙার পরও সেই একই অনুভূতি হল কুট্টির। ঘরের এককোণে নিভুনিভু হয়ে জ্বলছে হারিকেন। গভীর রাতের জমাট অন্ধকার সেই আলোয় আবছায়া তৈরি করেছে। ঠাকুরবাড়ির ওদিককার গাছে বসে ডাকছে কোকিল। কী আকুল করা। ডাক! রাতের দিকবিদিক ভেঙে সেই ডাক চলে যাচ্ছে প্রান্তর থেকে প্রান্তরে। এমন করে কেন ডাকে কোকিল? এই ডাকও যে মনের ভিতর, শরীরের ভিতর আশ্চর্য এক শিহরন জাগায় কুট্টির!

ফাগুন রাতের হাওয়া বইছে। আঙিনার গাছপালায় বয়ে যাওয়া হাওয়ার শব্দ, ঝিঁঝিরাও ডেকে যাচ্ছে তাদের মতো করে। এইসব শব্দ ছাপিয়ে হঠাৎ করেই কুট্টির কানে এল মানুষের কষ্টযন্ত্রণার ক্ষীণ একটা শব্দ। যেন গভীর কষ্টেও শব্দ করতে চাইছে না মানুষটা, আবার চেপেও রাখতে পারছে না, নিজের অজান্তেই শব্দটা যেন বেরিয়ে আসছে।

কুট্টির বুকটা ধ্বক করে উঠল। কে করছে এমন শব্দ? বড়বুজানে?

ঘুমের তালে মওত এসে গলা টিপে ধরেনি তো বড়বুজানের? মরণ যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে না তো সে!

সর্বনাশ! যার জন্য এই বাড়ির বাধা ঝি কুট্টি, যার জন্য তিনওক্ত ভরপেট খেয়ে, বছরের দুই ইদে দুইখান শাড়ি ছায়া ব্লাউজ আর স্পঞ্জের স্যান্ডেল পেয়ে, কখনও কখনও নগদ দশ-বিশটাকা পেয়ে বেঁচে আছে, সেই মানুষ যদি রাতের অন্ধকারে গোপনে মরে যায় তা হলে কুট্টির দশা হবে কী! বড়বুজান মরলেই এই বাড়িঘর বিক্রি করে দিবে মাজারো বুজানে, জমিজমা ছাড়াবাড়ি সব বিক্রি করে দিবে। দেশগ্রামের সঙ্গে সম্পর্কই রাখবে না। তখন কুট্টির উপায় হবে কী? কোথায় যাবে সে? গ্রামের কোন বাড়িতে কাজ নিবে! কে তাকে দিবে এই বাড়ির মতো ভাত কাপড়, স্বাধীনতা? 

আর তেমন হলে আলফুরই বা উপায় হবে কী? কোথায় যাবে সে, কোথায় কাজ নিবে?

আলফু পুরুষমানুষ, তার কাজের অভাব হবে না। চরে, নিজের দেশে গিয়েও কাজকাম করে বেঁচে থাকতে পারবে। কিন্তু মানুষটার জন্য কুট্টির শরীরমনে তৈরি হয়েছে যে অনুভূতি, বড়বুজান মরে গেলে জীবনের টানে দুইজন মানুষ ছিটকে যাবে দুই ভুবনে, আলফুর কোনও মায়ামমতা হবে কি না কুট্টির জন্য কে জানে! কুট্টির হবে। মানুষটিকে ছেড়ে সে থাকবে কেমন করে!

এসব ভেবেই ধড়ফড় করে উঠে বসল কুট্টি। নিজের জন্য আর আলফুর জন্য যেমন করে তোক বাঁচিয়ে রাখতে হবে বড়বুজানকে। গলা টিপে ধরা মওতকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিতে হবে বড়বুজানের শিথান থেকে।

সেরকম মারমুখো ভঙ্গি নিয়েই উঠে দাঁড়াল কুট্টি। তীক্ষ্ণচোখে তাকাল বড়বুজানের বিছানার দিকে।

কিন্তু শব্দ ওদিক থেকে আসছে না। কুট্টির দিকে পিছন ফিরে বেড়োরে (নিঃসাড়ে) ঘুমোচ্ছেন বড়বুজান।

তা হলে শব্দ আসে কোত্থেকে?

কুট্টি দিশাহারা হল, কানখাড়া করল। তারপরই বুঝে গেল শব্দটা আসছে উত্তরের বারান্দা থেকে। আলফু করছে।

কী হল মানুষটার? এমন করছে কেন? বোবায় ধরল নাকি?

বোবায় ধরার শব্দ এমন না। বোবায় ধরলে শব্দ করে গোঙায় পুরুষমানুষ। ছোটবেলায় বাবাকে দুই-একবার গোঙাতে শুনেছে সে। প্রায় রাতেই বাবাকে বোবায় ধরত। তখন জোরে জোরে বাবাকে দুই-তিনটা ধাক্কা দিত মা। সেই ধাক্কায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসত বাবা।

বোবা হচ্ছে একধরনের অলৌকিক শক্তিধর অসুর। রাতদুপুরে ঘুমন্ত মানুষের বুকে চেপে বসে। গলা চেপে ধরে। মৃতপ্রায় মানুষ তখন গোঙাতে থাকে। অন্য কেউ জোরে ধাক্কা না মারলে বুক থেকে ছিটকে পড়ে না বোবা। মানুষের জান কবচ করে তবে যায়।

কিন্তু এতদিন ধরে এই বাড়িতে আছে আলফু, বারান্দায় ঘুমাচ্ছে, কই কখনও তো বোবায় ধরেনি তাকে! কখনও তো রাতদুপুরে তার কোনও সাড়াশব্দ পাওয়া যায়নি!

আজ কী হল? কেন এমন করুণ স্বরে কাতরাচ্ছে? কুট্টির ইচ্ছা করে দরজা খুলে আলফুর কাছে যায়। আস্তে করে ধাক্কা দিয়ে জিজ্ঞেস করে, কী অইছে আপনের? এমুন করতাছেন ক্যা?

নারীর সংকোচ তার পা চেপে ধরে রাখে। এরকম গভীর রাতে পরপুরুষের কাছে কেমন করে যাবে সে? নিজেকে কেমন মেয়েমানুষ মনে হবে তখন! আলফুই বা কী ভাববে আর এতকাছে বড়বুজান শুয়ে আছে, মরণের মুখে দাঁড়িয়েও যতটা সম্ভব কুট্টির দিকে নজর রাখে সে। আলফুর সঙ্গে কুট্টির কথাবার্তার শব্দ পেলেই কান খাড়া করে। জিজ্ঞাসা করে, কী এত প্যাচাইল পারচ জুয়ানমর্দ বেড়ার লগে? তুই যুবতী মাইয়া, হিসাব কইরা চলাফিরা করি। আকাম কুকাম কইরা পেটপোট বাজাইয়া মরিচ না।

এখনও বড়বুজানের কথাগুলি মনে পড়ল।

কিন্তু মানুষটা এমন করছে! তা ছাড়া কুট্টির মন শরীর সবই তো তার জন্য অনেকদিন ধরে উন্মুখ। নিজেকে কুট্টি কতদিন ফিরিয়ে রাখবে?

নাকি আজ রাতেও ফিরাবে নিজেকে! আলফুর কাছে যাবে ঠিকই কিন্তু অন্যভাবে, সবদিক রক্ষা করে। প্রথমে বড়বুজানকে ডাকবে। ডেকে বলবে, আলফু জানি কেমুন করতাছে। হারিকেনডা লইয়া দুয়ার খুইলা দেহি।

তারপর শব্দ করে দরজা খুলে বারান্দায় যাবে, আলফুকে ডাক দিবে। কী অইছে আপনের?

দরকার হলে বড়বুজানও পালঙ্কে শুয়ে গলা উঁচু করে ডাকবে আলফুকে। কী রে আলফু, কী হইছে তর?

এসবের কিছুই কুট্টি করল না। বহুদিন ধরে শরীর মন উন্মুখ হয়ে আছে যে মানুষটির জন্য, আজকের এই রাতদুপুরে সেই মানুষের কষ্ট যন্ত্রণার শব্দ শুনে শেষ পর্যন্ত যেরকম করে যাওয়ার কথা তার কাছে ঠিক তেমন করেই কুট্টি গেল। নিঃশব্দে দরজা খুলে, পা টিপে টিপে অন্ধকার বিছানায় আলফুর পাশে গিয়ে বসল। ফিসফিস করে ডাকল, হোনছেন? হোনছেননি? এমুন করতাছেন ক্যা? কী অইছে আপনের?

কুট্টির মতোই ফিসফিস করে মুমূর্ষ গলায় আলফু বলল, মাথাডা ছিট্টা পড়তাছে বেদনায়। বেদম জ্বর আইছে।

কন কী? কুনসুম জ্বর আইলো?

ভাতপানি খাইয়া হোওনের পরঐ।

তারপরও নারীর সেই সংকোচ কিছুটা সময় আটকে রাখল কুট্টিকে। ভিতরে ভিতরে নিজের সঙ্গে খানিক যুদ্ধ করল কুট্টি। তারপর আর পারল না। ডান হাত গভীর মমতায় রাখল আলফুর কপালে। কেন যে তখন সেই ছোটবেলার কথাটা আবার মনে পড়ল,

কুট্টি লো কুট্টি
তরে দিলাম ছুট্টি!

.

কী লো বানেছা, মাইয়াডা এমতে কান্দে ক্যা?

বিকালবেলা দুয়ারের সামনে আলার মা’কে দেখে মুখে কীরকম একটা স্বস্তির ভাব ফুটে উঠল বানেছার। ছয়দিন বয়সের মেয়েটা ওঁয়াও ওঁয়াও করে কাঁদছে। কান্নার শব্দে বোঝা যায় বহুক্ষণ ধরে একটানা কেঁদে কেঁদে ক্লান্ত হয়েছে। এখন আর ঠিকমতো কাঁদতেও পারছে না। গলা ভেঙে আসছে।

মেয়ের কান্না থামাতে নানারকম চেষ্টা করছে বানেছা। কখনও বুকের দুধ খাওয়াবার চেষ্টা করছে, দুধ মুখে না নিয়ে মেয়ে কাঁদছেই। তখন দিশাহারা ভঙ্গিতে দুইহাতে মেয়েকে দোল দিতে দিতে বলছে, ও কান্দে না, কান্দে না। ওরে আমার সোনারে, আমার মানিকরে, কান্দে না।

মেয়ে কাঁদছেই।

এই অবস্থায় আলার মা এসে দাঁড়িয়েছে দুয়ারের সামনে। মেয়ের কান্না শুনে প্রশ্নটা করেছে।

কথা কাপড়ে জড়ানো মেয়েকে দোল দিতে দিতে বানেছা বলল, কীর লেইগা যে এমুন কান্দন কানতাছে কইতে পারি না চাচি।

কুনসুম থিকা কান্দে?

বিয়াইন্না রাইত থিকা।

হারাদিন কানছে?

হ। কানতে কানতে গলা ভাইঙ্গা গেছে।

ইটুও থামে নাই? ইট্টুও ঘুমায় নাই?

না।

বুকের দুদ দিছচ? খাইছে?

দিছি, খায় না।

আলার মা চিন্তিত হল। পেড বেদনা করে নি?

কেমতে কমু?

তালমিছরির পানি আর মধু বেশি খাওয়াচ নাই তো?

না। ঘরে তালমিছরি আর মধু তো নাই। নাদেরের বাপে আনে নাই। দিমু কই থিকা?

তাইলে খাওয়াইছচ কী? খালি বুকের দুদ?

হ।

বুকের দুদে পেড কামড়ানের কথা না। মাইয়া তাইলে কানবো ক্যা?

বুজতাছি না। বহো চাচি, বহো।

ঘরের মেঝেতে হোগলা পাতা। হোগলার উপর পাতলা কাঁথা পিঠের তলায় দেওয়া মেয়ে কোলে নিয়ে বসে আছে বানেছা। আজিজ গাওয়ালে গেছে সকালবেলা, এখনও ফিরে নাই। পোলাপানরা নামার দিককার খোলা জায়গায় গোল্লাছুট খেলতে গেছে। ছ’দিন আগে, মেয়ে হওয়ার আগে যে ছেলে ছিল বানেছার কোলে সে এখন নিজের অজান্তেই দূরে সরে গেছে। এখন থাকে পরি জরির কোলে। বড়বোনের কোলে চড়ে সেও গেছে গোল্লাছুটের মাঠে। সে তো আর খেলার উপযুক্ত হয়নি, নিশ্চয় কোনও বোন তাকে কোলে নিয়ে মাঠপারে দাঁড়িয়ে আছে। অন্যরা খেলছে ওরা দুইজন তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে।

বানেছার কথা শুনে তার পাশে বসল আলার মা। ক্লান্তির শ্বাস ফেলল।

বানেছা বলল, বাইত থিকা আইলা নি?

না।

তয়?

গেছিলাম কুতুব আলীগো বাড়ি। কুতুব আলীর ছোড ভাইর বউর আহুজ পড়বো। আট মাস চলতাছে। পয়লা পখম তো, বউডা ডরায়। আইজ দোফরের সমায় চিইক্কাইর শুরু করছে, কয় বেদনা উটছে। আমারে খবর দিছে। আমি তো জানি এই বেদনা আসল বেদনা না। এইডা অর মনের বেদনা। গিয়া বুজ দিয়া আইলাম। যাওনের সমায় মনে করলাম তর মাইয়াডারে দেইক্কা যাই। ওই বানেছা, মাইয়ার নাই (নাভি) হুগাইছে?

না, অহনতরি কাঁচা। নাইর চাইরমিহি রাঙ্গা হইয়া রইছে।

কচ কী?

হ।

দেহা আমারে।

বুকের কাছ থেকে এনে সামনের দিকে দুইহাতে শিশুটিকে মেলে ধরল বানেছা। সে তখনও তার মতো চেঁচিয়ে যাচ্ছে। কান্না খেয়াল করল না আলার মা। বয়সি চোখ যতদূর সম্ভব তীক্ষ্ণ করে শিশুটির নাভির দিকে তাকাল। তাকিয়ে চমকে উঠল। নাভির চারপাশটা বেশ লাল হয়েছে। সুতার গিট দেওয়া জায়গাটায় একটু যেন পাক ধরেছে, ভিতরে যেন একটু একটু পুঁজ। এই ব্যথায়ই কাঁদছে মেয়ে? কিন্তু এমন কেন হল? এমন হওয়ার তো কারণ নাই।

আলার মা’র বুকের খুব ভিতরে অশুভ একটা কাঁপন লাগল। লক্ষণটা ভাল না। নাভিতে পচন ধরেছে। আজ রাতেই খিচুনি হবে। কাল সকাল নাগাদ থেকে থেকে হাত-পা বাঁকা হয়ে আসবে। ধনুষ্টংকার। এখন আর ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেও কাজ হবে না। অষুদ ইঞ্জেকশান কোনও কিছুতেই কাজ হবে না। কাল দুপুর নাগাদ চলে যাবে শিশুটি।

মুখে ম্লান ছায়া পড়ল আলার মা’র। চোখ উদাস হল। তবু বানেছাকে কিছু বুঝতে দিল না। চিন্তিত গলায় বলল, নাইডা এমুন হইছে ক্যা? পাতলা কাপড়ের ত্যানা পোড়া ছাই লাগাচ নাই নাইতে?

লাগাইছি তো?

তয় এমুন অইবো ক্যা?

এবার বানেছাও চিন্তিত হল। তয় কি নাইর বেদনায় কানতাছে মাইয়াডা?

হ।

বানেছা দিশাহারা হল। এই বেদনা তাইলে কমামু কেমতে?

হেইডা বোজতে পারতাছি না। এক কাম কর, আজিজ বাইত্তে আইলে, যহনঐ আইবো তহনঐ মাইয়াডারে লইয়া কাজিরপাগলা যাবি। করিম ডাক্তাররে দেহায় আন। অষইদ দিলে, সুঁই দিলে বেদনা কইমা যাইবো।

শুনে ঠোঁট উলটাল বানেছা। হ, তুমিও যেমুন! এই মাইয়া লইয়া হেয় যাইবো ডাক্তারের কাছে! পোলা মাইয়ার কোনও দাম আছেনি হের কাছে?

এবার আলার মা একটু রাগল। দাম না থাকলে পোলাপান হওয়ায় ক্যা?

হেইডা তো আমিও কই?

তুই বা অরে কচ না ক্যা, তুইই বা হওয়াচ ক্যা?

আমি কী করুম?

যা করনের তাই করবি। পোলাপান যাতে না অয় হেই বেবস্থা করবি।

শিশুটি তখন আরেকটু নিস্তেজ হয়েছে। গলার স্বর আরও বসে গেছে। এমন করুণ শোনাচ্ছে কান্না! জাতসাপে থাবা দিয়ে ধরার পর, সাপের বিষাক্ত মুখে আটকা পড়ে যেমন করে গোঙায় কুনোব্যাং, শিশুটির কান্না অনেকটাই তেমন।

আলার মা মনে মনে বলল, আল্লাহ রহম করো, রহম করো।

তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠল। যাই লো মা।

বানেছা হতাশ গলায় বলল, ডাক্তরের কাছে যাওন ছাড়া আর কোনও উপায় নাই?

কইতে পারি না।

আলার মা আর দাঁড়াল না। শিশুটির দিকে একপলক তাকিয়ে ঘর থেকে বেরুল। পশ্চিম দিককার ভাঙন দিয়ে চকে নামল। নেমেই মনে হল তার কোনও গাফিলতির জন্য এমন হয়নি তো? আজিজ গাওয়ালের কথা শুনে মনটা অন্যরকম হয়েছিল বলে নাভিটা সে কি যত্ন করে কাটেনি? সুতার গিটটু কি যত্ন করে দেয়নি? পোড়া কাপড়ের ছাই কি জায়গা মতো লাগায়নি? নিজের অজান্তে কি সে তা হলে আজিজের কথা মতোই কাজ করেছে? শিশুটি যাতে বেঁচে থাকতে না পারে সেই ব্যবস্থা করেছে?

হায় হায় এতকাল ধরণীর কাজ করে এই শেষ বয়সে এসে এ কোন পাপ সে করল? ছয়দিনের হোক আর যাই হোক মানুষ তো! আলার মা তা হলে মানুষ খুন করল!

এসব ভেবে বুক কেমন করতে লাগল আলার মা’র। চিন্তা চেতনা এলোমলো হয়ে গেল।

মাঠ থেকে রোদ তখন গুটিয়ে নিচ্ছিল সূর্য। দিগন্তরেখা অতিক্রম করে আগাচ্ছিল সন্ধ্যাবেলার ছায়া। রোদে পোড়া দিনের তাপ মুছে দিতে হু হু করে বইছিল মায়াময় হাওয়া। মাঠ প্রান্তর থেকে বিষয়কর্ম সেরে মানুষ ফিরছিল যে যার সংসারে, পাখিরা উড়ে উড়ে যাচ্ছিল আপনগাছে। আলার মা’র আঙিনার তালগাছের বাসায় আর ডালে ডগায় বসে কিচিরমিচির করছিল বাবুই পাখিরা।

চক ছাড়িয়ে, ভাঙন ঠেলে নিজের আঙিনার দিকে উঠতে উঠতে আলার মা টের পেল পা চলছে না তার। কোমরের তলা থেকে পায়ের বহু বহুবছরের পুরানা হাড়গুলি অসাড় হয়ে গেছে। হাড়ের ভিতর থেকে যেন টেনে নিয়েছে মজ্জা। চামড়ার তলায় লুকিয়ে থাকা পুরানা মোটা চিকন রগ বন্ধ করে দিয়েছে রক্তের চলাচল। মাংসপেশিগুলি করে দিয়েছে অকেজো।

তবু কোনওরকমে যেন তালগাছটার তলায় এসে দাঁড়াল সে। আতুর লুলা শিশুর মতো লেছড়ে পেছড়ে বসে পড়ল গাছতলায়। কোমরের তলা থেকে অসাড় ভাবটি তখন ঠেলে উঠছে উপর দিকে। পেট, পেটের পরে বুক গলা মুখ আস্তে ধীরে অসাড় হয়ে আসে। শরীরের ভিতর লুকিয়ে থাকা হাজার লক্ষবাতির সবগুলো যেন এক এক করে নিভে আসছে, নিভে আসছে। তালগাছে হেলান দিয়ে তবু মাথার ওপরকার ডালে ডগায়, নারীগর্ভের মতো বাসার মুখে ভিতরে বসা বাবুই পাখিদের কিচিরমিচির শব্দটা সে শুনতে পায়। চোখের অনেক ভিতর থেকে ধীরে কমে আসা আলোয় দেখতে পায় পুকুরের দক্ষিণ দিককার উঁচু পার ধরে হেঁটে আসছে ছোটখাটো পবিত্র চেহারার একজন মানুষ। মাথায় টুপি, মুখে সুন্দর চাপদাড়ি আর আশ্চর্য স্নিগ্ধতা। ধীরে, অতিধীরে পুকুরপার ঘুরে তালগাছটির দিকে এগিয়ে আসে সেই মানুষ।

বাবুই পাখিরা তখনও ডাকছিল।

.

ও কুট্টি, কার লগে কথা কচ? কেডা মরছে, আ?

উত্তর দিককার বারান্দার সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে আছে কুট্টি। তার মুখোমুখি উঠানে দাঁড়ানো বাদলা। বাদলার পরনে লাল সবুজের ডোরাকাটা লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জি। দুইটা পুরানা, ধুলা ময়লায় মলিন কিন্তু ছেঁড়া না।

আজই প্রথম বাদলাকে লুঙ্গি গেঞ্জি পরা দেখল কুট্টি। রাবির ওইটুকু ছেলে লুঙ্গি পরার ফলে আচানক বড় হয়ে গেছে। দুইটা মৃত্যুসংবাদ কুট্টিকে দিল একেবারে বড়দের কায়দায়।

আলফু বসে আছে রান্নাঘরের ছেমায়। গায়ে খাকি রঙের পুরানা চাদর। পাঁচদিন জ্বরে ভুগে উঠেছে। এমনিতে পাঁচ-সাতদিনে একবার মুখ কামানোর স্বভাব। জ্বর আসার তিন-চারদিন আগে কামিয়েছিল। ফলে মুখে এখন আট-নয়দিনের দাড়ি মোচ। তীব্র জ্বরে মুখ এমনিতেই শুকিয়েছে, তার উপর এমন দাড়ি মোচ, মুখোন আলফুর খুবই ম্লান দেখাচ্ছিল।

বাদলার কথা শুনতে শুনতে আড়চোখে প্রায়ই আলফুকে দেখছিল কুট্টি আর মনটা ভরে যাচ্ছিল আশ্চর্য মায়ায়। দিনে দিনে কেন যে এত মায়া বাড়ছে মানুষটার জন্য! দুইটা মৃত্যু সংবাদেও সেই মায়া চাপা পড়তে চাইছে না।

বাদলা কথা বলছিল জোরে জোরে। এজন্যই খাটালে শোয়া বড়বুজানের কানে গেছে। এজন্যই কুট্টিকে তিনি ডেকেছেন।

বড়বুজানের কাছে গেল না কুট্টি। পিছনদিকে মুখ ঘুরিয়ে গলা চড়িয়ে বলল, খাড়ন, বেক কথা হুইন্নালই। তারবাদে আপনেরে আইয়া কইতাছি।

সকালবেলার রোদ ভালভাবে ছড়িয়েছে। গাছপালা ঘরের চাল টপকে উঠানপালানে নেমেছে। বাদলার হাঁটু তরি রোদ, তার উপর থেকে বড়ঘরের ছায়া।

কুট্টি বলল, নিজের উডানের তালগাছতলায় আলার মা চাচি বইলো ক্যা? ঘরে গিয়া মরলো না ক্যা?

বাদলা বলল, হেয় তো বাইত্তে আছিলো না।

গেছিলো কই?

কুতুব আলীগো বাড়ি। বাইত্তে যাওনের সমায় গাওয়াল বাড়ি অইয়া গেছে। গাওয়ালের যেই মাইয়াডা অইছিল, হেইডারে দেইক্কা তারবাদে বাড়িমিহি মেলা দিছে।

বাদলার কথা শেষ হওয়ার আগেই আলফু বলল, মনে অয় বাইত্তে ওডনের সময়ই আজরাইল আইয়া সামনে খাড়ইছে। ঘর তরি চাচিরে আর যাইতে দেয় নাই।

বাদলা বড়দের কায়দায় বলল, হ, এর লেইগাঐ হেয় তালগাছতলায় বইয়া পড়ছিল।

কুট্টি বলল, বাড়ির মাইনষে কেঐ হেরে দেকলো না? হাইজ্জাকালে উডানের তালগাছতলায় কীয়ের লেইগা বইয়া পড়লো হেয়, এইডা কেঐ খ্যাল করবো না? তোতা দাদার বউ পোলাপানরা আছিলো কই?

বাইত্তেঐ আছিলো। যেই পোলাডা দাদির কাছে থাকতো ওঐত্তো পয়লা দেকছে তালগাছতলায় বইয়া রইছে দাদি। রাইত অইয়া যাইতাছে আর দাদি বইয়া রইছে তালগাছতলায়, ঘরে আহে না, এইডা দেইক্কাওই ছেমড়া দৌড়াইয়া গেছে দাদির কাছে। কী অইছে দাদি? এহেনে বইয়া রইছো ক্যা? ঘরে লও। দাদি কথা কয় না দেইক্কা হাত ধইরা টান দিছে। লগে লগে কাইত অইয়া মাডিতে পড়ছে আলার মা’য়।

কুট্টি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আহা রে, কেমন মউত মরলো।

আলফু বলল, দাফোন অইয়া গেছে?

না অহনতরি অয় নাই। রাইত্রেঐ গোসল দেওয়াইছে। মাওয়ার বাজার থিকা কাফোনের কাঁপোড়চোপড় আইন্না ফিন্দাইছে। বড়ঘরেঐ রাকছে লাশ। আমি গিয়া দেইক্কাইছি। জহুর নমজের আয়জানের লগে লগে লইয়া যাইবো খাইগো বাড়ির মজ্জিদের সামনে। নমজ শেষ কইরা মাওলানা সাবে জানাজা পড়বো। তারবাদে গোরস্থানে লইয়া যাইবো।

কুট্টি বলল, তুই যাবি না?

বাদলা গভীর আগ্রহের গলায় বলল, কন কী? যামুনা মাইনি? অবশ্যই যামু। পুরানবাড়ি থিকা ফিরনের সময় আপনেগো বাড়ির উপরে দিয়া যাইতাছিলাম, মনে করলাম খবরডা আপনেগো দিয়া যাই। অহন বাইত্তে গিয়া নাইয়া ধুইয়া তারবাদে আবার যামু পুরানবাইত্তে। লাশের লগে যামু মজ্জিদে। নমজ পইড়া, জানাজা পইড়া গোরস্থানে মাডিও দিতে যামু।

মাড়ি দিয়া আহনের পরও তো তর আবার নাওন লাগবো।

ক্যা?

মানুষ গোর দিয়া আহনের পর নাইতে হয়।

এইডা নিয়ম?

হ।

তয় নামু। দিনে দুইবার নাইলে অসুবিদা কী? আর অহন তো শীতের দিনও না। চইত মাস আইয়া পড়ছে। গরমের দিনে দুই-চাইরবার নাইলে অসুবিদা নাই।

বাদলার শেষ দিককার কথাগুলি যেন কানে গেল না আলফুর। আপনমনে সে বলল, শইলডা ভাল থাকলে আমিও যাইতে পারতাম চাচিরে মাড়ি দিতে।

তারপর কুট্টির দিকে তাকাল। না কি পুকঐরে গিয়া দুইহান ডুব দিয়াইয়া যামু চাচিরে মাড়ি দিতে?

জ্বর আসার রাত থেকে, সেই যে কুট্টি এসে কপালে হাত দিয়েছিল, তারপর গামছা ভিজিয়ে বড়বুজান যাতে টের না পান এমন নিঃশব্দে রাতভর পানিপট্টি দিয়েছিল আলফুর কপালে, পাঁচটা দিন ধরে জ্বর উঠলেই পানিপট্টি, মাথায় বদনার পর বদনা পানি, শিশুর মতো মুখ মুছিয়ে, জোর করে খাওয়াইয়াদাওয়াইয়া এমন একটা অবস্থা কুট্টি তৈরি করেছে, যেন আলফু আর আলফু না, আলফু যেন ছোট্ট শিশু, কুট্টি যা বলছে তাই করছে, যেভাবে চালাচ্ছে সেইভাবেই চলছে।

এজন্যই কুট্টির দিকে তাকিয়ে কথাটা এখন আলফু বলল। যদি কুট্টি বলে তা হলে কাজটা করবে, কুট্টি না বললে করবে না।

কুট্টি না করল।

আলফুর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, কাম নাই। এই শইল লইয়া দুইবার নাইলে আবার জ্বর আইবো। কাইল রাইত্রে জ্বর ছাড়ছে। রইদের মইদ্যে এতাহানি হাইট্টা গেলে শইল বহুত খারাপ লাগবো।

আলফু কথা বলল না। বলল বাদলা। হ। আপনের যাওনের কাম নাই কাকা। আপনে বাইত্তে থাকেন। আমরা বেবাকতে গেলে জানাজার মাইনষের টান পড়বো না।

বাদলার কথার ভঙ্গিতে হেসে ফেলল কুট্টি। তুই দেহি বড় অইয়া গেছচ রে বাদলা? কথাবার্তা হুইন্না তরে তর বাপ মতলার থিকাও বড় লাগতাছে।

শুনে বাদলাও হাসল। আমি তো বড় অইয়া গেছি। দশ-পোনরো দিনের মইদ্যে আমারে মোসলমানি করাইয়া দিবো।

চইত মাসে কেঐর মোসলমানি করায়নি? মোসলমানি করান লাগে শীতের দিন শেষ অইয়া আহনের লগে লগে। ফাল্গুন মাসে। ওই দিনে করাইলে ঘাওডা তাড়াতাড়ি হুগায়। গরমের দিনে করাইলে ঘাও হুগাইতে দেরি অয়।

অউক গা। মায় কইছিল আর বচ্ছর শীতের দিনে করাইবো। আমি কইছি, না, গরমের দিন অউক আর যাই অউক, এই বচ্ছরঐ করায় দেও। আমি ডাঙ্গর অইয়া গেছি।

এসময় আবার ডাকল বড়বুজান। কী লো কুট্টি, আইলি না? কইলি না আমারে কেডা মরছে?

কুট্টি আগের ভঙ্গিতে আবার মুখ ফিরাল পিছনদিকে। অহনও বেক কথা হুনি নাই। হুইন্নাইতাছি।

তারপর বাদলার দিকে তাকাল। অহন পরির বইনডার কথা ক তো! মাইয়াডা মরলো কেমতে?

অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে থাকার ফলে পা ধরে এসেছে বাদলার। কাঠের সিঁড়িতে বসল সে। বসে মুখটা ঘুরিয়ে রাখল কুট্টির দিকে। আউজকা সাতদিন অইতো খুকির। আউজকা বিয়াইন্না রাইতে মরলো।

অইছিলো কী?

নাইডা পইচ্চা গেছিলো।

কচ কী?

হ। কাইল হারাদিন কানছে। রাইত্রে খালি খিচ উটছে। বিয়াইন্না রাইত্রে মইরা গেছে।

তুই গেছিলি ঐ বাইত্তে?

গেছিলাম।

দাফোন দোফোন করছে?

বাদলা ঠোঁট উলটে বলল, ধুরো। আজিজ গাওয়ালরে আপনে চিনেন না? সাতদিনের মরা মাইয়ার লেইগা হেয় খরচা করবো নি? দুনিয়ার কিরপিন মানুষ।

কথাটা শুনে কুট্টি আলফু দু’জনেই চমকাল। কুট্টি কথা বলবার আগেই আলফু বলল, তয় করবো কী? মাডি দিবো না? মাড়ি দিতে অইলে কাফোন লাগবো, জানাজা লাগবো।

বাদলা হাসল। এই খরচার কথাঐত্তো আমি কইলাম।

কুট্টি অধৈর্যের গলায় বলল, তয় মাইয়ার লাচটা করবো কী?

নিজের ডানহাত লম্বা করে, বাঁহাতে কনুই ধরে শিশুটির দেহের মাপ বুঝতে চাইল। বাদলা। আমার হাতের একহাত লাম্বা অইবো মাইয়াডা। আমি আহনের সমায় দেকলাম গাওয়ালের বউ উ উ কইরা ইট্টু কানলো আর গাওয়ালে কেঁতা কাপড়ের মইদ্যে প্যাচাইয়া মাইয়ার লাচ কুলে লইয়া বিড়ি টানতে টানতে চকের মিহি নাইম্মা গেলো।

কচ কী?

হ। লিশ্চই (নিশ্চয়) বিলের বাড়ির ঐমিহি গিয়া, গোরস্থান বরাবইর জঙ্গল মঙ্গলে কেঁতা কাপড় সুদ্দা হালাইয়া দিবো।

কুট্টি হায়আপশোসের গলায় বলল, আহা রে হিয়াল খাডাসে খাইবো লাচটা।

আলফু বলল, যেই বাপে পোলাপানের লাচও দাফোন করতে চাইবো না হেই রকম বাপের পোলাপান জন্ম দেওনের কাম কী?

কুট্টি কথা বলল না, আলফুর দিকে তাকিয়ে রইল।

একপলক কুট্টিকে দেখে অন্যদিকে তাকিয়ে বসে রইল আলফু।

আজ সকাল থেকেই কুট্টি খেয়াল করছে জ্বর থেকে ওঠার পর আগের সেই গম্ভীর মানুষটা যেন আর নাই। প্রয়োজন ছাড়া একটিও কথা না বলা মানুষটা যেন আর নাই। আজ যেভাবে টুকটাক কথা বলছে, আজকের আগে কখনও মানুষটার এরকম কথাবার্তা শোনেনি কুট্টি।

তা হলে কি কুট্টি যেমন বদলেছে আলফুও তেমন করে বদলাচ্ছে?

বাদলা বলল, কুট্টিখালা, আপনেরা কি নাস্তাপানি খাইয়া হালাইছেন নি?

কুট্টি চমকাল। হ। ক্যা রে?

আমি অহনতরি কিছু খাই নাই।

কুট্টি ব্যস্ত হল। আগে কবি না।

তারপর বারান্দার পশ্চিম দিককার কোণে গিয়ে জের থেকে পরিমাণ মতো মুড়ি নিঃশব্দে আঁচলে নিয়ে বাদলার সামনে এল। গলা নিচু করে বলল, লুঙ্গি পাত।

বাদলা লুঙ্গি পাতল, আঁচলের মুড়িটা ঢেলে দিয়ে কুট্টি বলল, মিডাই দিতে পারলাম না।

একমুঠ মুড়ি মুখে দিয়ে বাদলা বলল, ক্যা, মিডাই নাই?

আছে। তয় আছে বড়বুজানের পালঙের তলে। ওহেন থিকা অহন বাইর করন যাইবো না। তুই তো জানচঐ বুজানরা বহুত কিরপিন। তরে মুড়ি দিছি, আবার মিডাও দিছি, উদিস পাইলে খাইয়া হালাইবো আমারে।

বুজছি। তয় খালি উরুম খাইতেও সাদ লাগে।

কুট্টি সরল, হাসিমাখা স্নেহের গলায় বলল, যা অহন খাইতে খাইতে বাইত যা।

বাদলা উঠল। হ যাইতাছি। বাইত্তে গিয়া ম্যালা কাম। নাইয়া ধুইয়া পানজামি ফিন্দা পুরানবাড়ি যামু।

পানজামি আছেনি?

আছে একহান। আর বচ্ছর রোজার ইদে দেলরা বুজি কিন্না দিছিলো।

লুঙ্গির কেঁচড় উঁচু করে ধরে, কেঁচড় থেকে মুড়ি নিয়ে মুখে দিতে দিতে আমরুজতলার ওদিক দিয়ে মিয়াবাড়ি থেকে নেমে গেল বাদলা।

কুট্টি তখন খাটালে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েছে। এখন গিয়ে বড়বুজানকে সব বলতে হবে। তার আগেই আলফু বলল, তোমার লগে কথার কাম আছে।

কুট্টি ঘুরে দাঁড়াল। কন।

অহন না, পরে কমুনে। তুমি আগে বড়বুজানের লগে কথা কইয়াহো।

পলকের জন্য আলফুর মুখের দিকে তাকাল কুট্টি তারপর খাটালের দিকে পা বাড়াল। আইচ্ছা।

বুকের ভেতর কুট্টির আশ্চর্য এক উত্তেজনা খেলা করছে তখন। আলফু কি এমন কোনও কথা বলবে যে কথা শুনে গভীর আনন্দে ভরে যাবে তার বুক! যে কথা শুনে মন আর শরীরে বয়ে যাবে অচেনা শিহরন। যে কথা শুনে জেগে আর ঘুমিয়ে অপূর্ব সব স্বপ্ন দেখবে কুট্টি!

.

পরিকে দেখে দবির-হামিদা দুইজনেই অবাক।

শেষ কবে এই বাড়িতে এসেছিল মেয়েটি দুইজনের কারওই সে কথা মনে পড়ল না। যখনই এসে থাক, নিশ্চয় ছনুবুড়ি মরার আগে। তখন আজকের তুলনায় অনেকখানি ছোট সে।

আজ বড়সড় লাগছে পরিকে।

লম্বা ঝুলের ছিটকাপড়ের জামা পরা। হাঁটু বরাবর নেমেছে জামা। অনেকখানি পথ হেঁটে আসার ফলে মুখে গলায় ঘাম চিকচিক করছে। চোতমাস এল কি এল না, নাকি দুই-চারদিন এখনও বাকি আছে, হলে হবে কী, বেজায় গরম সকালবেলা থেকেই পড়তে শুরু করেছে দেশগ্রামে। রোদ ওঠে বাঘের মতো। খোলামেলা জায়গায় বেরুলেই খাবলা মেরে ধরে।

পরিকেও ধরেছিল। ফলে মুখ রোদে পুড়ে ম্লান হয়েছে। এমনিতেই চোখেমুখে ছিল বিষণ্ণতা, গভীর মনখারাপের ছায়া, তার উপর রোদ ঘাম, আচমকা বড় হয়ে ওঠা পরিকে কাহিল দেখাচ্ছিল। দবির-হামিদা দুইজনেই তা খেয়াল করল।

দবির বসেছিল ঘরের ছেমায়। হাতে হুঁকা। গুড়গুড় করে তামাক টানছিল। হামিদা ছিল রান্নাচালার ওদিকে। উঠানের কোণ থেকে খড়নাড়া নিয়ে রাখছিল চুলারপারে। খানিকবাদেই রান্না চড়াবে। নূরজাহান বসে আছে ঘরের ভেতর, চৌকির উপর। বসে নিজের শাড়ির ছিঁড়ে যাওয়া পাড় সুইসুতায় মেরামত করছে। কোনও দিকেই খেয়াল নাই তার। মান্নান মাওলানার মুখে ছাপ ছিটিয়ে দেওয়ার পর, মজনুদের ঘর থেকে, মরনির ডানার আড়াল থেকে সেই যে সেইরাতে মেয়েকে বাড়িতে নিয়ে এসেছিল দবির-হামিদা তারপর একমুহূর্তের জন্যেও মেয়েকে আর চোখের আড়াল করেনি কখনও। এক মুহূর্তের জন্য বাড়ির সীমানার বাইরে যেতে দেয়নি। পাখির মতো স্বাধীন মেয়েটি আচমকাই বন্দি হয়ে গেছে খাঁচায়।

প্রথম ক’দিন বাড়িতে বসে থাকতে খুবই কষ্ট হয়েছে নূরজাহানের। যখন তখন ইচ্ছা করেছে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে। হাজামবাড়ি মিয়াবাড়ি মেন্দাবাড়ি হালদারবাড়ি আর নয়তো খোলামাঠ সড়কপার, কোথাও না কোথাও ছুটে যেতে ইচ্ছা করেছে। মা-বাবা যেতে দেয়নি। অসহায় নূরজাহান তখন বন্দিপাখির মতো ছটফট করেছে, কান্নাকাটি করেছে। আদরে শাসনে, রাগে সোহাগে মা-বাবা দুইজনেই তাকে বুঝিয়েছে, যে কাণ্ড সে করেছে, আল্লাহপাকের রহমত ছিল বলে সেই কাণ্ডের পরও তার কিছু হয়নি, সে এখনও ভাল আছে, বেঁচে আছে। মান্নান মাওলানা যদি তাকে মাফ না করতেন তা হলে কেউ বাঁচাতে পারত না নূরজাহানকে। কাক চিলে শকুনে শেয়ালে যেমন করে ছিঁড়ে খায় সড়কখোলায় ফেলে রাখা গোরু বরকির মৃতদেহ, জীবন্ত নূরজাহানকেও তেমন করে ছিঁড়ে খেত মান্নান মাওলানার লোকজন। দূরের লোকজনের দরকারই হত না, মাওলানা সাহেবের ছেলে আতাহার আর তার ইয়ারদোস্তরাই যথেষ্ট ছিল।

এসব কথাই মেয়েকে বুঝিয়েছে দবির। তুই পোলাপান মানুষ দেইক্কা, নাদান মাইয়া দেইক্কা, কিছু না বুইজ্জা আকামডা কইরা হালাইছিলি, এর লেইগা হুজুরে তরে মাপ করছে। আতাহাররে কইছে তর য্যান কোনও ক্ষতি না করে। তয় মনের মইদ্যে কইলাম রাগহান তাগো রইয়া গেছে। তুই যুদি আবার আগের লাহান চকে মাডে যাচ, সড়ক নাইলে এইবাড়ি ওইবাড়ি, আর হেই ফাঁকে যুদি আতাহরগো চোক্কে পইড়া যাচ, মাইনষের রাগের কথা কওন যায় না, একবার তুই বাচ্ছচ, আর কইলাম বাঁচবি না।

হামিদা ভয় দেখিয়েছে অন্যভাবে। তুই ডাঙ্গর মাইয়া, আতাহাররা যুদি তরে ধইরা লইয়া একরাইত কোনওহানে আটকাইয়া রাখে আর দল বাইন্দা আকাম কুকাম করে, তয় তুই বাঁচবি না। তয় তুই মইরা যাবি। আর যুদি বাইচ্চা থাকচও তর পেটপোট অইয়া যাইবো। বচ্ছর ঘোরনের আগে পোলাপান অইবো। আবিয়াত মাইয়াগো পোলাপান অইলে কী অয় জানচ! মাইনষে গু উড়াইয়া দিবো মোকে। শরমে মোক দেহান যাইবো না কেঐরে। তরে। লইয়া দেশগেরাম ছাইড়া যাওন লাগবো। তুইঐ অহন ঠিক কর, কোনডা করবি। আমার কথা হুনবি না নিজের লাহান চলবি?

নূরজাহান কথা বলেনি।

কাজ করে ফেলার পর ভয়ে আতঙ্কে মরে যেতে বসেছিল সে। মরনি তাকে বাঁচিয়েছে। মায়ের কথা শুনে সেই ভয় আতঙ্ক যেন নতুন করে ফিরে এসেছিল নূরজাহানের বুকে। মুখে বলেনি কিছুই কিন্তু ভিতরে ভিতরে মেনে নিয়েছে মা-বাবার কথা, বন্দিজীবন।

সেদিনের পর থেকে নূরজাহানের বিয়াশাদির প্যাচালও কখনও কখনও পাড়ে দবির হামিদা। সেইসব কথা টুকটাক কানে আসে নূরজাহানের। লজ্জায় লাল হয়।

কার লগে বিয়া হবে নূরজাহানের? কে হবে নূরজাহানের জামাই? কোন গ্রামে বাড়ি? দেখতে কেমন?

এসব ভাবতে ভাবতে কেন যে একজন মানুষের মুখ ভেসে ওঠে নূরজাহানের চোখে। ঢাকায় থাকে মানুষটি। খলিফাগিরি করে। মান্নান মাওলানার চোখ থেকে, আতাহারদের থাবা থেকে সেদিন যে মানুষটি বাঁচিয়েছিল নূরজাহানকে, বোনের ছেলে হয়েও মানুষটি আসলে তারই ছেলে। মজনু। মজনু খলিফা।

সেইসব মুহূর্তে মজনুর কথা ভেবে মন যখন নূরজাহানের ভরে গেছে আশ্চর্য এক ভাললাগায় তখনই হয়তো দবির বলছে, তয় বিয়া যে মাইয়ার দিতে চাও, মাইয়া তো সংসার কইরা খাইতে পারবো না। সংসারের কাম কাইজ হিগাও মাইয়ারে। রান বাড়ন হিগাও।

তারপর থেকে চঞ্চল মেয়েটিকে সংসারের কাজে ঢুকিয়েছে হামিদা। রান্নাবাড়া করায়, এটা ওটা করায়। আজ যেমন দিয়েছে নিজের শাড়ির পাড় সিলাই করতে। নূরজাহানও কেমন ধীরস্থির ভঙ্গিতে কাজগুলি করে। নিজের অজান্তেই যেন জীবনটা সে মেনে নিয়েছে।

এখন কি পরিকে দেখে পলকের জন্যে হলেও নিজেদের মেয়েটির কথা মনে পড়ল দবির-হামিদার? পরি যেভাবে একা একা চলে এসেছে এই বাড়িতে একদিন নূরজাহানও এইভাবেই চলে যেত তাদের বাড়িতে। একটি মাত্র ঘটনা সেই জীবন বদলে দিয়েছে। মেয়ের। নিজের রাগ জিদ মুহূর্তের ভুলে যে জীবনটা সে হারিয়ে ফেলল সেই স্বাধীন সুখের জীবন এই জীবনে আর কখনও ফিরে পাবে না।

হুঁকা নামিয়ে পরিকে দবির বলল, বাইত থিকা আইলা মা?

পরি কথা বলবার আগেই হামিদা বলল, তয় কইথিকা আইবো?

অন্যকোনও বাইত্তেও যাইতে পারে! ওহেন থিকাও আইতে পারে।

পরি ম্লান গলায় বলল, না বাইত থিকা আইছি।

হামিদা এগিয়ে এসে পরির মাথায় হাত দিল। তরে আমি ম্যালাদিন বাদে দেকলাম মা। তুই তো ডাঙ্গর অইয়া গেছচ।

দবির বলল, আমার কাছে অত ডাঙ্গর লাগে না। আমি তো দুই-চাইর দিন পর পরঐ দেহি। তুমি দেহো না দেইক্কা তোমার চোক্কে বেশি ডাঙ্গর লাগে।

মা-বাবার কথা শুনে, পরির কথা শুনে শাড়ির পাড় সিলাই করতে করতেই মুখ বাড়িয়ে বাইরের দিকে তাকাল নূরজাহান। পরিকে দেখে খুশি হল না বেজার, বোঝা গেল না। আবার নিজের কাজে মন দিল।

তখনই যেন পরির মুখের বিষণ্ণতাটা দেখতে পেল দবির। বলল, কী গো মা, কী অইছে, মোকহান এমুন হুগনা ক্যা?

হামিদাও বলল কথাটা। হ। মুকহান বহুত হুগনা। কী অইছে রে পরি?

পরি উদাস গলায় বলল, আমার একহান বইন অইছিল সাতদিন আগে। আইজ বিয়াইন্না রাইতে মইরা গেছে।

দবির-হামিদা দুইজনে প্রায় একসঙ্গে বলল, ইন্নালিল্লা….।

পরি বলল, আলার মা দাদিও তো মরছে কাইল সন্ধ্যায়।

একসঙ্গে দুইটা মৃত্যুর কথা শুনে দবির-হামিদা দু’জনেই হকচকাইয়া গেল। হুঁকাটা পিড়ার লগে ঢেলান দিয়ে রেখে উঠে দাঁড়াল দবির। কী কলি, ধরণী খালায় মইরা গেছে? হায় হায় আমার নূরজাহান জন্মাইছিল তার হাতে।

দুইজন মানুষের মৃত্যুর কথা শুনে হাতের কাজ ফেলে নূরজাহান বেরিয়ে এল ঘর থেকে। পলকের জন্য সেই আগের নূরজাহান হয়ে গেল সে। ইচ্ছা হল কাউকে কিছু না বলে ঘর থেকে বেরিয়েই চক পাথালে দৌড় দেয়। সোজা চলে যায় পুরানবাড়ি। ধরণীদাদির মুখোন শেষবারের মতো একবার দেখে আসে। তারপর যায় আজিজ গাওয়ালের বাড়ি। সাতদিন বয়সে মরে যাওয়া মেয়েটি কেমন হয়েছিল দেখতে, দেখে আসে।

ঘর থেকে বেরিয়েই বাবা-মায়ের মুখ দেখে সে টের পেল দুইপায়ে তার শিকল বাঁধা। বাড়ির সীমানার চারপাশ জুড়ে যেন তৈরি হয়ে আছে লোহার খাঁচার চারপাশ জুড়ে যেমন থাকে জানলার শিকের মতো সরু সরু শিক তেমন অজস্র শিক। এই বাড়িটিই যেন হয়ে গেছে এক অদৃশ্য লোহার খাঁচা। এই খাঁচা ভেঙে বের হবার সাধ্য নূরজাহানের নাই।

পলকেই আগের নূরজাহান ফিরে এল বর্তমানে। পরির দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, আয় পরি, ঘরে আয়। তর কাছ থিকা হুনুম নে বেবাক কথা।

নূরজাহানের লগে ঘরে ঢুকল পরি। চৌকিতে বসল।

উঠানে তখন দবিরগাছি হামিদাকে বলছে, ধরণী খালারে শেষ দেহাড়া দেইখা আইতে অয় না?

হামিদা বলল, হ।

তয় গেলে তো মাডি না দিয়া আইতে পারুম না।

আইবা। অসুবিদা কী?

দিনডা কাবার অইয়া যাইবো?

যাউক।

এইমিহি যে ইট্টু কাম আছিলো!

কী কাম? শীতের দিন গেছে গা, রসের কারবার তো অহন নাই।

রসের কাম না থাউক অন্যকাম আছে না? খেতখোলার কাম!

হামিদা তাচ্ছিল্যের গলায় বলল, যেডু খেত তার আবার কাম? এক দেড়কানি খেত আবার খেত অইলো নি?

আমার লেইগা ওডুঐ অনেক। ইরি বুনছি। ধানও ভাল অইছে। অহন ইট্টু ফাসফোঁস (সারটার) দিলে বচ্ছরের খাওন অইয়াও বেশি। মনে করছিলাম আইজ থিকা খেতে নামুম।

গলার স্বর বদলে আন্তরিক হল হামিদা। কাইল থিকা নাইম্মো। আইজ যাও ধরণী খালারে গোর দিয়া আহো। আহনের সময় পরিগো বাইত অইয়াও। মাইয়াডা মরছে, অগো ইট্টু বুজ দিয়াইও।

আইচ্ছা।

আগের দিন থাকলে আমিও যাইতাম তোমার লগে। নূরজাহানরে রাইক্কা যাইতাম বাইত্তে।

না হেইডা পারতা না।

ক্যা?

আমগো দুইজনের আগে নূরজাহানঐ যাইতো গা। অরে তুমি বিচড়াইয়াঐ পাইতা না।

হ ঠিকঐ কইছো। বাইত্তে থাকন লাগতো আমার। তুমি যাইতা একমিহি দা তোমার মাইয়ায় যাইতো আরেক মিহি দা।

দবির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। দিনগুনি বইলা গেল! কী দিন কী অইয়া গেল? ক্যান যে এমুন কামডা করলো মাইয়ায়?

একটু থেমে বলল, আইচ্ছা আরেক কাম করলে অয় না? পরি আর নূরজাহান থাউক বাইত্তে আমরা দুইজনে যাই।

না।

ক্যা?

পয়লা কথা, তোমার মাইয়ার মতিগতি বুজা যায় না। কুনসুম কী করবো কেঐ বুজতে পারবো না। তারবাদে তোমার আশকারায় মাইয়াডা গাছে উইট্টা গেছিলো। গাছ থিকা একবার পড়ছে, ভাল একহান আছাড় খাইছে। আমি চাই না আবার গাছে উড়ুক, আবার পড়ুক, আবার আছাড় খাউক। বছরহানির মইদ্যে বিয়া দিয়া জামাইবাড়ি না পান তরি এই মাইয়ারে আমি পলকের লেইগাও চোক্কের আঐল করুম না। আমার যাওনের কাম নাই। আমি বাইত্তেঐ থাকুম। তুমি যাও।

হামিদার কথায় সেদিনের পর আজ আবার দবির টের পেল নূরজাহানের জন্য কী পরিমাণ টান তার মায়ের। নূরজাহান ছাড়া দুনিয়ার আর কোনও কিছু নিয়েই তার কোনও আগ্রহ নাই।

খুশি হল দবিরগাছি। মনে মনে বলল, নূরজাহানের মা গো, তোমার কাছে আমার আর কিছু চাওনের নাই। আমার মাইয়াডারে তুমি সব সময় এমতে আগলাইয়া রাইখো।

মুখে বলল, তয় আর কী! তয় আমি একলাঐ যাই।

হ যাও।

চকের দিকে নেমে যেতে গিয়েও থমকে দাঁড়াল দবির। আরেকহান কথা কই?

কও।

পরি আইছে, নূরজাহান আইজ পরির লগে কথাবার্তা কউক।

কউক। আমার অসুবিদা কী?

না কইতাছিলাম আইজ আর অরে কাম কাইজ করতে কইয়ো না। আইজ ও ইট্টু আজাইর থাউক। পরির লগে কথাবার্তা কইয়া দিনডা কাডাউক।

হামিদা হাসল। এইডা তুমি না কইলেও অইতো। আমি আগেঐ চিন্তা করছি আইজ অরে কিছু করতে কমু না। আইজ অর ছুটি।

তয় ঠিক আছে।

দবির খুশিমনে চকের দিকে নেমে গেল।

.

বড়বুজানের সঙ্গে কথা শেষ করে অনেকক্ষণ আগে রান্নাঘরে এসেছে কুট্টি। যে মানুষটার জন্য বড়বুজানের সঙ্গে কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে আনমনা হচ্ছিল সে, ভিতরে ভিতরে ছটফট করে মরে যাচ্ছিল, কখন কথা শেষ হবে, কখন বড়বুজানের কবল থেকে ছাড়া পাবে, কখন ছুটে যাবে মানুষটার কাছে, সেই মানুষটা নেই কেন? এইটুকু সময়ের মধ্যে কোথায় চলে গেল?

আসলে কি এইটুকু সময়?

না, সময় অনেকখানিই কেটে গেছে। দুই দুইটা মওতের খবরে বড়বুজান খুবই বিচলিত হয়েছিলেন। আজিজ গাওয়ালের মেয়েটার ব্যাপারে কথা কমই বলেছেন, বলেছেন বেশি ধরণীচাচিকে নিয়ে। তার মৃত্যুসংবাদে বড়বুজান কাতর হলেন। কীভাবে কী হল অনেকক্ষণ ধরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব জিজ্ঞাসা করলেন কুট্টিকে। বাদলার কাছ থেকে যেভাবে যা শুনেছে কুট্টি ঠিক সেভাবেই বড়বুজানকে সব বলল। শুনে বড়বুজান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, নিজের মওতের কথা বললেন। কবে আসবে তার, কখন কীভাবে আজরাইল এসে দাঁড়াবে শিথানে, জান কবচ করবে! দিনের আলোয় নাকি রাতের অন্ধকারে! নাকি দিনরাত্রির মিশেল দেওয়া সন্ধ্যাবেলা, ভোরবেলা! কখন, কখন আসবে মওত!

হয়তো আসবে রাতের অন্ধকারে। ঘরের কোণে তখন নিভুনিভু হয়ে জ্বলবে হারিকেন। পালঙ্কের মুখামুখি পাটাতনের মেঝেতে ঘুমে অচেতন হয়ে থাকবে কুট্টি, দরজার ওপাশের উত্তরের বারান্দায় থাকবে আলফু, পাঁচ ছানা নিয়ে বেড়ালটা চুপচাপ ঘুমাবে পালঙ্কের তলায়, বাইরের অন্ধকার কিংবা চাঁদের আলোয় হু হু করে বইবে গভীর রাতের হাওয়া, ঘুমন্ত গাছের পাতারা তিরতির করে কাঁপবে, গলায় মৃদুশব্দ তুলে উড়ে যাবে রাতচরা পাখিরা, কেউ টের পাবে না এরকম সময়ে আজরাইল এসে দাঁড়িয়েছে দুনিয়ার বহুকালের পুরানা এক মানুষ মিয়াবাড়ির বাসিন্দা বড়বুজানের শিথানে। তোশকের পর তোশক ফেলা নরম বিছানায় শোয়া, শীতকাল হলে থুতনি তরি ঢাকা থাকবে মোটা লেপে, গরমকাল হলে পাতলা চাদরে, এই সবের আড়ালে লুকিয়ে থাকা দেহের অভ্যন্তর থেকে তার রুহ কবচ করে নিয়ে যাবে আজরাইল। পরদিন অনেক বেলা হওয়ার পর হয়তো টের পাবে কুট্টি। তারপর একে একে জেনে যাবে গ্রামের সব মানুষ। খবর যাবে ঢাকায়। রাজা মিয়া আর রাজা মিয়ার মা ছুটে আসবেন। সামান্য একটু কান্নাকাটি। তারপর গোরস্থানে নিয়ে দাফন কাফন। দুই-চারটা দিন তাঁকে নিয়ে টুকটাক কথা বলবে মানুষজন, তারপর ভুলে যাবে। এই তো মানুষের জীবন।

আর যদি দিনেরবেলা হয় বড়বুজানের মউত কুট্টি হয়তো তখন রান্নাঘরে, হয়তো রান্না শেষ করে নাইতে গেছে পুকুরঘাটে, বিকালের মুখে মুখে হয়তো সিঁড়িতে বসে আরামছে মাথা আঁচড়াচ্ছে, কাঁকুইয়ের ফাঁদ থেকে নিজের মাথার উকুন বের করে নিজেই মারছে, ওদিকে সামান্য দূরে যে পালঙ্কে শোয়া মানুষটা মরে যাচ্ছে, টেরও পাবে না।

ভোরবেলা হলে কুট্টি থাকবে থালবাসন ধোয়ার কাজে, সন্ধ্যাবেলা কুপিবাতি জ্বালাবার কাজে, অর্থাৎ যখনই আসুক বড়বুজানের মওত এত কাছে থেকেও কুট্টি উদিস পাবে না।

আলার মা’র মৃত্যুর কথা শুনে নিজেকে নিয়ে এসব কথাই কুট্টিকে বলছিলেন বড়বুজান। কথার কিছু কানে যাচ্ছিল কুট্টির কিছু যাচ্ছিল না। তার মন পড়েছিল রান্নাঘরের সামনে বসা মানুষটার কাছে।

কী কথা সে কুট্টিকে বলবে!

কুট্টিকে চুপ করে থাকতে দেখে বড়বুজান বলেছিলেন, কী অইলো, ওই ছেমড়ি, চুপ কইরা আছচ ক্যা?

কুট্টি আনমনা গলায় বলেছে, কী কমু?

ক কিছু। আমার মরণ লইয়া ক কিছু।

একথায় কেন যে হঠাৎ করে গভীর মমতায় মন ভরে গিয়েছিল কুট্টির। বড়বুজানের মাথায় হাত দিয়ে বলেছিল, না এমতে আপনে মরবেন না। আইজ এতডি বচ্ছর আপনেরে আমি দেইক্কা রাকছি, আর আমি উদিস পামুনা আপনে মইরা যাইবেন, এইডা অইবো না। আপনে মরবেন আমার কুলে। আমার চোকের সামনে।

শুনে বুড়া মানুষটা কেঁদে ফেললেন, আল্লায় য্যান হেইডাঐ করে। আলার মা’র লাহান একলা একলা মরণ য্যান আমার না অয়। আর কেঐ না অউক, আমি য্যান তর সামনে মরি।

তারপর কুট্টি তার স্বভাব মতো বদলাল। অইছে, এত মরণ মরণ কইরেন না তো! সহাজে আপনেরে আমি মরতে দিতাছি না। আপনি মরলে আমার উপায় অইবো কী? চুপচাপ হুইয়া থাকেন, আমি রান্নঘরে গেলাম। আইজ আপনেরে ঘইন্না পুঁটকি দিয়া ভাত খাওয়ামু।

কিন্তু যে মানুষটার জন্য এত ছটফটানি কুট্টির, তার সঙ্গে কথা আছে বলে কোথায় চলে গেল সে। মাত্র জ্বর থেকে উঠেছে এই শরীর নিয়ে রোদে বেরুলে জ্বর আবার আসবে।

কুট্টি নিজেই কি একটু খুঁজে দেখবে কোথায় গেল সে। চালতাতলায় নাকি ঘাটপারে? নাকি ছাড়াবাড়ির দিকে গেল! খেতখোলার দিকে যায়নি তো? পাঁচদিনের জ্বরে ঘর থেকে বেরোয়নি। পাঁচদিনে খেতের অবস্থা কী, ইরিধানের চারা কতটা বাড়ল, শরীরের কথা ভুলে এসব দেখতে চলে যায়নি তো!

কুট্টি কি একটু খুঁজে দেখবে?

হাতের কাছে খাদায় ভিজানো হয়েছে ঘইন্না মাছের পুঁটকি। বহুদিন ধরে টিনের পটে ছিল সুঁটকি। বেজায় শক্ত। অত শক্ত সুঁটকি কাটতে গেলে গুঁড়া হয়ে যাবে। ভিজিয়ে নরম করে তবে কাটতে হবে। এভাবে পুঁটকি ভিজিয়ে রেখে অন্যদিকে গেলেই উঠানে তক্কে তক্কে। থাকা কাকগুলি এসে ঢুকবে রান্নাঘরে। খাদায় ভিজানো পুঁটকি ঠোঁটে নিয়ে উড়াল দিবে। পাঁচ ছানা নিয়ে বিড়ালটাও আছে উঠানে। ফাঁক পেলে কাণ্ডটা সেও ঘটাতে পারে। বিড়ালরা সহজে পানির কাছে আসে না। খিদার জ্বালায় আসতেও পারে। খাদায় ভিজানো পুঁটকির। যে দিকটা উপর দিকে আছে কায়দা করে সেখানটাই কামড়ে ধরবে। তারপর যে-কোনও ঘরের পাটাতনের তলায় গিয়ে ছানাদের নিয়ে আরাম করে খাবে। ওদিকে বড়বুজানকে বলা হয়ে গেছে তাকে আজ দুপুরে ঘইন্না মাছের পুঁটকি দিয়ে ভাত খাওয়াবে কুট্টি, আর এদিকে সুঁটকি গেল কাক বিড়ালের পেটে, না এটা ঠিক হবে না।

তা ছাড়া মানুষটাকে নিয়ে এত আদেখলাপানা দেখানোও ঠিক হবে না। মানুষটা তাকে বেহায়া ভাবতে পারে। লোভী ভাবতে পারে। দুনিয়ার বেশিরভাগ পুরুষই মেয়েমানুষের মন বোঝে না। মেয়েরা যা ভাবে, পুরুষরা ভাবে তার উলটা।

তারপরও মানুষটার জন্য অস্থিরতা কুট্টির কমে না। জ্বর থেকে ওঠা দুর্বল শরীরে কোথায় চলে গেল? আসছে না কেন? যে কথা কুট্টিকে বলতে চায় বলছে না কেন? কুট্টি যে উদগ্রীব হয়ে আছে তার কথা শোনার জন্য কেন বুঝতে পারছে না!

এসব ভাবতে ভাবতে পিয়াজ কুটতে বসেছে কুট্টি। ঘইন্না সুঁটকি ম্যালা পিয়াজ দিয়ে ভুনা করতে হয়। প্রথমে তেল মশলা পিঁয়াজ, তারপর পুঁটকির টুকরা ছেড়ে সরার ঢাকনা দিতে হবে কড়াইতে। পুঁটকি সিদ্ধ হয়ে আসার পর থেকে কাঠের হাতায় ডলে ডলে ঘেঁতলাতে হবে। রান্না শেষ হওয়ার পর পুঁটকির চেহারা দাঁড়াবে ভর্তার মতো। গন্ধে ভরে যাবে ঘরবাড়ি। পেটের ভিতর চনচন করে উঠবে ক্ষুধা।

ধারালো বঁটিতে পিয়াজ কুটতে কুটতে কুট্টি বোধহয় আনমনা হয়েছিল। এসময় উঠান থেকে হঠাৎই উড়াল দিল দুটা কাক। কুট্টি বুঝে গেল মানুষটা ফিরেছে। বুকের ভিতরটা অচেনা আবেগে ভরে গেল। একপলক মানুষটার মুখের দিকে তাকিয়েই চোখ নামাল সে।

কিন্তু মুখটা আলফুর একটু যেন ফরসা লাগছে!

কুট্টি আবার তাকাল। সত্যি মুখ ফরসা লাগছে আলফুর। আট-নয়দিনের দাড়ি মোচ সাফ হয়ে গেছে।

কুট্টি বুঝল এই কাজেই গিয়েছিল আলফুর। তবু বলল, কই গেছিলেন?

রান্নাঘরের তিনদিকে বেড়া আর একটা দিকে কিছু নাই, খোলা। দু-চারদিন পর পর রান্নাঘরের মেঝে পিঁড়া লেপেপুঁছে তকতইকা করে রাখে কুট্টি। রোজ সকালে উঠে রান্নাঘর উঠান এসব ঝট দেয়। ফলে চারদিকটা বেশ পরিষ্কার।

রান্নাঘরের ভোলা দিককার পিড়া বরাবর বসল আলফু। গেছিলাম চাউলতাতলায়। ওহেনে বইয়া মুক বানাইলাম। তারবাদে ঘাডে গিয়া মোক হাত ধুইয়া আইলাম। বেলেড বুলেড রাইক্কা দিছি জাগা মতন।

কুট্টি হাসল। ভাল করছেন। অহন মোকহান সোন্দর অইছে। জ্বরে যা কাহিল না করছিল মোচ দাড়িতে তার থিকা বেশি কাহিল দেহাইতাছিল।

আলফু কথা বলল না। আনমনা হয়ে রইল।

কুট্টি বলল, খিদা লাগছেনি? খাইবেন কিছু?

না, কী খামু কও?

উরুম আইন্না দেই?

না থাউক।

জ্বর থিকা ওডনের পর মাইনষের কইলাম অনেক খিদা লাগে। খিদা লাগলে খাইতে অয়। খাইলে শইল তাড়াতাড়ি ভাল অয়।

আলফু হাসল। না খিদা আমার লাগে নাই। ঘণ্টাহানি পর লাগবো। তহন তো ভাত অইয়া যাইবো।

হ।

তরকারি আইজ কী রানতাছো?

সেচিশাক, ঘইন্না সুঁটকি আর ডাইল।

ঘইন্না সুঁটকির কথা শুনে আলফু খুশি হল। সুঁটকি রানতাছো? ভাল, ভাল। জউরা (জ্বরো) মোকে সুঁটকি দিয়া ভাত খাইতে সাদ লাগবো।

কুট্টি খুশি হল। হ, এইডা আমি জানি। জ্বর থিকা ওডনের পর ইট্টু ঝালঝোল খাইতে মন চায়।

একটু থেমে মাথা নিচু করে কুট্টি বলল, আপনের কথা চিন্তা কইরাঐ পুঁটকিডি আমি আইজ বাইর করছি।

শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল আলফু। জ্বরের রাইত থিকা আমারে লইয়া বহুত চিন্তা করো তুমি, না?

কুট্টি লজ্জা পেল। তারপরই নিজেকে সামলে নিয়ে কথা ঘুরাল। আপনে যে কইছিলেন আমার লগে কথার কাম আছে। কী কথা?

আলফু সরল গলায় বলল, না তেমুন কিছু না।

কুট্টি নিভে গেল। আলফুর কথা আছে তার সঙ্গে শোনার পর থেকে যে উত্তেজনা ছড়িয়েছিল শরীর আর মনে, যেরকম ছটফটানি অস্থিরতা, আর যে অপেক্ষাটা ছিল এতক্ষণ ধরে, আচমকাই নিভে গেল সব। কোনওরকমে বলল, তাও কন। হুনি।

আমি ইট্টু দ্যাশে যাইতে চাই।

কুট্টি চমকাল। কী?

হ। বচ্ছর অইয়াইলো দ্যাশে যাই না। দুই-চাইর মাস পর পর মাওয়ার ঘাডে গিয়া দ্যাশের মানুষ বিচড়াইয়া বাইর কইরা তাগো লগে টেকাপয়সা পাড়াই। চউরা দ্যাশের মাইনষে বিক্রমপুর অহন ভইরা গেছে। ঘাডে গেলেঐ আমগো চরের মানুষজন পাওয়া যায়। তয় খালি টেকা দিয়া তো অয় না। বুড়া মায় আছে, বউ পোলাপান আছে তাগো লগে তো ইট্টু দেহাও করন লাগে, না কী কও?

কুট্টি কথা বলল না। মন উথালপাথাল করছে। মন আশা করেছিল কী, শুনছে কী!

কুট্টি কেন কথা বলছে না এটা যেন ভেবেও দেখল না আলফু। বলল, ধান কাডন লাগবো বৈশাখ মাসের শেষ মিহি। বাড়িঘর পুকঐর কোনওহানেঐ কাম কাইজ অহন তেমুন নাই। অহনঐ যুদি মাসেকখানি দ্যাশে থাইক্কাহি তয় ভাল অয়। জ্বর থিকা উটছি, বাইত্তে ইট্টু জিরাইয়াও আইলাম।

একথায় কুট্টির কেমন অভিমান হল। বাড়ি না গেলে কি জিরানো আলফুর হবে না? এই বাড়িতে এখন কোনও কাজই নাই। দিনরাত আলফু যদি শুধুই জিরায়, কে তাকে মানা করবে? রাতভর দিনভর সে যদি পড়ে পড়ে ঘুমায়, খাওয়ার সময় উঠে যদি খায়, কে তাকে মানা করবে? তা ছাড়া জ্বরের সময় সে কি টের পায়নি কত মায়ায়, কত যত্নে স্নেহে মমতায় সেবায় কুট্টি তাকে সারিয়ে তুলেছে। বড়বুজান টেরও পায়নি এমন করে খাটাল আর বারান্দার মাঝখানকার দুয়ার খুলে চলে গেছে আলফুর বিছানায়, সারারাত বসে থেকেছে আলফুর শিথানে। মাথায় পানিপট্টি দিছে, হাত বুলায়া দিছে।

প্রথম রাতের পরই বড়বুজানকে কুট্টি বলে দিয়েছিল, আলফুর বহুত জ্বর।

শুনে বুজান বলল, ফাল্গুন চইত মাসে জ্বরজ্বারি অয়। মাথায় বেশি কইরা পানি দিতে কইচ, আর কাজিরপাগলা বাজারে কেঐরে পাডাইয়া আমগো বাড়ির কথা কইয়া করিম ডাক্তারের কাছ থিকা টেবুলেট (ট্যাবলেট) য্যান আইন্না লয়। মাথায় পানি দিলে আর টেবুলেট খাইলে দুই-তিনদিনের মইদ্যে ভাল অইয়া যাইবো। তর কাছে হাটবাজার করনের লেইগা যেই টেকা রাজা মিয়ার মায় দিয়া গেছিলো ওহেন থিকা পাঁচহান টেকা আলফুরে দিচ। টেকাডা বেতন থিকা কাড়া যাইবো। ওই টেকা দিয়া য্যান টেবুলেট আইন্না খায়।

তারপর কুট্টিকে সাবধান করেছেন বড়বুজান। জ্বরজ্বারি অউক আর যাই অউক, পুরুষপোলারা পুরুষপোলাঐ। আহ্লাদ দেহাইতে যাইচ না। ঝামেলায় পইড়া যাবি।

শুনে কুট্টি মনে মনে হেসেছে। ঝামেলায় আর নতুন করে পড়বে কী, পড়ে তো গেছেই। এতদিন দূর থেকে শরীরমন উন্মুখ হয়েছে, কাল রাতে নিঃশব্দে দুয়ার খুলে যখন আলফুর বিছানায় গিয়ে তার জ্বরে পোড়া কপালে হাত দিয়েছে, তারপর থেকে নিজের বলে কুট্টির আর কিছু নাই। সবই আলফুর হয়ে গেছে। শরীর, মন। যদিও কোনওটার ওপরই আলফু এখনও দখল নেয়নি কিন্তু কুট্টির তো ছুটি হয়ে গেছে।

বড়বুজানের কথা কিছুই আলফুকে কুট্টি বলেনি। জ্বরের ঘোরে দিনের বেলা আলফু শুয়ে থেকেছে পশ্চিমের ঘরে, যখন তখন সেই ঘরে গিয়ে পুকুর থেকে বালতি ভরে পানি এনে বদনার নল দিয়ে পানি ঢেলে গেছে আলফুর মাথায়। রাবির জামাই মতলাকে দিয়ে করিম ডাক্তারের কাছ থেকে ট্যাবলেট আনিয়ে নিয়েছিল, সময় মতো ট্যাবলেট খাওয়াইছে। বুজানের দুধ থেকে দুধ বাঁচিয়ে আটার রুটি আর দুধ খাওয়াইছে, ভাত খাওয়াইছে জোর করে।

দিনভর পশ্চিমের ঘরে থাকলেও সন্ধ্যাবেলা আলফু চলে এসেছে বড়ঘরের বারান্দায়। রাতভর জ্বরে পুড়ত। বুজান টের পাবার ভয়ে শোয়ার সময় মাঝখানকার দরজা বন্ধ করার ভান করেও করত না কুট্টি। আবজায়া রাখত এমন ভাবে, দেখলে যে কেঐ ভাববে দরজাটা বন্ধ। তারপর নিজের বিছানায় শুয়ে ঘুমের ভান করে পড়ে থাকত কিছুক্ষণ। যখন টের পেত বুজান ঘুমিয়ে গেছে তখন উঠে যেত আলফুর কাছে। শব্দ হবে বলে রাতে মাথায় পানি দিত না, দিত পানিপট্টি। দিত নিঃশব্দে মাথা টিপে।

দুয়েকদিন ধরা পড়ে যেতে যেতেও পড়েনি। গভীররাতে আলফুর মাথা টিপছে কুট্টি, ঘুম ভেঙে বুজান ডাকলেন, কুট্টি ও কুট্টি, ওট বইন। পেশাব করুম।

শোনার সঙ্গে সঙ্গে বিড়ালের মতন পা টিপে টিপে নিজের বিছানায় চলে এসেছে কুট্টি। এসে প্রথমে শুয়ে পড়েছে তারপর যেন বড়বুজানের ডাকে ঘুম ভেঙে উঠেছে, এমন করে উঠে বসেছে।

দিনেরবেলাও হয়েছে এমন। পশ্চিমের ঘরে জুরে অচেতন আলফুর মাথায় হয়তো পানি দিচ্ছে কুট্টি, বড়বুজান ডাকলেন, কুট্টি ও কুট্টি, কই গেলি, আ?

কুট্টি মিথ্যা সাড়া দিয়েছে, আমি রান্নঘরে। কাম সাইরা আইতাছি।

এই বাড়ির মানুষরা হাড় কৃপণ। অসুখ বিসুখের সময় ঝি গোমস্তাকে অষুদবিষুদের পয়সা দিলেও বেতন থেকে পয়সাটা কেটে রাখে। আলফুরটাও রাখবে। কিন্তু জ্বরের সময় কথাটা শুনে মন খারাপ হবে আলফুর এজন্য কথাটা তাকে বলেনি কুট্টি। যার জন্য এত ভাবনা কুট্টির আর সে কিনা জ্বর থেকে উঠেই চলে যেতে চাইছে বাড়ি। মুখে না বললেও কুট্টি তার কথায় বুঝেছে, বউর আদরযত্নের আশায়ই বাড়ি যেতে চাইছে। এদিকে যে একজন মানুষ নিজের দিনরাত হারাম করে, বড়বুজানকে ফাঁকি দিয়ে, নিজের ভিতর থেকে নিজেকে ছুটি দিয়ে মানুষটার সেবা করে গেল তার কথা একবারও ভাবল না? এত করতে পেরেছে যে মানুষটি সে কি আরও পারবে না? বউর কাছে আলফু যা পাবে তা কি কুট্টির কাছে পাবে না?

এসব ভেবে কুট্টি স্তব্ধ হয়ে রইল। বুক ঠেলে উঠতে চাইল গভীর কষ্টের কান্না। কান্নাটা জোর করে রাখল সে।

.

পরির কথা শুনে নূরজাহান হতভম্ব হয়ে গেল। কী কইলি? গোর দেয় নাই খুকিরে? কেঁতা কাপড়ের মইদ্যে পঁাচাইয়া বিলে হালাই দিয়াইছে?

পরি মন খারাপ করা গলায় বলল, হ।

হায় হায় এইডা কেমুন কাম অইলো? তর মায় কিছু কয় নাই?

মায় কইলে বাবায় হের কথা না হুইন্না পারলেতানি? মা-বাবায় দুইজনেঐ চাইছে যে মইরা গেছে তার লেইগা আর টেকাপয়সা খরচা করনের কাম নাই। কাফোনের কাপড়চোপড় কিনতে টেকা লাগতো না?

হের লেইগা এমুন করবো?

পোলাপানের লেইগা আমার মা-বাপের কোনও মায়া নাই।

নূরজাহান রাগল। মায়া না থাকলে বচ্ছর বচ্ছর হওয়ায় ক্যা?

হেইডা তাগো কে কইবো!

পরির কথা শুনে নূরজাহান টের পাচ্ছিল হঠাৎ করেই যেন কেমন বড় হয়ে গেছে সে। কথাবার্তা চিন্তাভাবনা এমনকী মুখের ভাবভঙ্গিও বড়দের মতো।

কোন ফাঁকে এমন হল পরি? নূরজাহান যে টের পেল না।

আগে তো দুই-চারদিন পর পরই তাদের বাড়ি যেত নূরজাহান। পরির সঙ্গে দেখা হত। আজ দেড়-দুইমাস না হয় বাড়ি থেকে বেরোয় না সে, পরি কেন, তাদের বাড়িতে না এলে গ্রামের কারও সঙ্গেই নূরজাহানের দেখা হয় না। পরির সঙ্গেও হয়নি।

কিন্তু দেড়-দুই মাসে একটি মেয়ে এভাবে বড় হয়ে যেতে পারে! বদলে যেতে পারে!

কথাটা নূরজাহান বলল, পরি, তুই কইলাম বড় অইয়া গেছচ।

নূরজাহানের দিকে তাকাল পরি। হ আমারও মনে অয় আমি বড় অইয়া গেছি।

ক্যান মনে হয় রে?

বহুত কথা চিন্তা করি আমি।

কেমুন কেমুন কথা ক তো আমারে!

নূরজাহানের চোখের দিকে তাকিয়ে পরি বলল, হুইন্না তুমি আমারে পাকনা মাইয়া ভাববা না তো!

নূরজাহান হাসল। না।

আমি কইলাম আইজ এই হগল কথা কওনের লেইগাঐ তোমগো বাইত্তে আইছি।

সত্যঐ?

হ। তুমি তো আমার থিকা অনেক বড়। তুমি বেবাক কিছু জানো। যা জানো বেবাক আমারে বুজাইয়া দিবা।

নূরজাহান চিন্তিত হল। কী বুজাইয়া দিমু তরে?

আমি যা যা জিগামু।

একটু থেমে বলল, যেদিন খুকি অইলো হেদিন মিয়াবাইত্তে গেছিলাম কুট্টি ফুবুর কাছে। ফুবুরেও জিগাইছিলাম দুয়েকহান কথা। ফুবু যা কইলো হেই হগল তো আমি জানিঐ। আমি ক্যা, আমার থিকা ছোড জরিও জানে। কুট্টি ফুকু যুদি বেবাক কথা আমারে হেদিন কইতো তয় মনে অয় আমি আইজ তোমগো বাইত্তে আইতাম না।

নূরজাহান বলল, ও তয় তুই খুকি মরছে দেইক্কা, খুকিরে গোর দেয় নাই দেইক্কা মন খারাপ কইরা আমগো বাইত্তে আহচ নাই? আইছচ আমার লগে ওই হগল প্যাচাইল পারতে?

পরি নির্বিকার গলায় বলল, হ।

একটু চুপ করে রইল নূরজাহান। তারপর বলল, ওই পরি, ছোড অউক আর যাই অউক একজন মানুষ মরল তগো বাইত্তে, তরা কেঐ কান্দচ নাই?

না আমরা ভাইবইনরা কেঐ কান্দি নাই। বাবায় তো নাঐ। বাবার মোক দেইক্কা মনে অইলো মাইয়াডা মরণে হেয় খুশি। খালি মায় ইট্টু উঁ উঁ করলো। হেইডাও আমার মনে অয় অন্তর থিকা না। মাইনষেরে দেহানের লেইগা। অন্তর থিকা যুদি মাইয়াডার লেইগা হের মায়া অইতো তাইলে তো বাবারে কইয়া গোরঐ দেওয়াইতো খুকির!

পরির কথা শুনে নূরজাহান আবার টের পেল, যতটা না বয়স তারচেয়ে অনেক অনেক বেশি বড় হয়ে গেছে পরি। যেসব কথাবার্তা বলছে, যেভাবে বলছে, পরির বয়সি কোনও মেয়ের এভাবে বলার কথা না। নিশ্চয় সংসারের সবকিছু খেয়াল করতে শুরু করেছে সে, সবকিছু ভাবতে এবং বুঝতে শুরু করেছে। গভীরভাবে সবকিছু নিয়ে চিন্তা করতে শুরু করেছে বলেই এভাবে বলতে পারছে।

পরিকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে পরির পাশে বসেও আনমনা হয়ে রইল নূরজাহান। বাইরে তখন দুপুর। খা খা করছে রোদ। হাওয়া নাই। ঘরের ভিতরও টের পাওয়া। যাচ্ছে রোদের তাপ। রান্নাচালার পিছন দিককার বাঁশঝাড়ে শিস দিচ্ছে কী একটা পাখি। দুই তিনটা লোভী কাক নেমেছে বাড়ির উঠানে। ভাত চড়িয়ে মাছ কুটতে বসেছে হামিদা। টাকিমাছ। কাকগুলি সেই মাছের লোভে আছে। ফাঁক পেলে যখন তখন মাছের টুকরা নিয়ে উড়াল দিবে।

ভাত চড়াবার আগে এইঘরে একবার এসেছিল হামিদা। পরিকে বলে গেছে, তুই কইলাম অহন যাবি না পরি। নূরজাহানের লগে বইয়া কথাবার্তা ক। দুফইরা ভাত খাইয়া তারবাদে যাবি।

শুনে নূরজাহান বলেছিল, পরি, বাইত্তে কইয়াছচ যে তুই আমগো বাইত্তে আইছচ?

না।

তয় বাড়ির মাইনষে তরে বিচড়াইবো না?

না। বেশি পোলাপানআলা বাইত্তে কেঐ কাঐরে বিচড়ায় না। আর খুকি মরণে আমি তো গেছি আজাইর অইয়া।

কেমতে?

কুলের ভাইডা আছিল মা’র কুলে। বইনডা অওনে মা’র কুল থিকা আইয়া পড়ছিল আমার কুলে। সাতদিন আমার কুলে আছিল। আইজ বইনডা মরণে ভাইডা আবার গেছে গা মা’র কুলে। আমার অহন কোনও কাম নাই। এর লেইগা আমারে কেঐ বিচড়াইবো না।

শুনে হামিদা আর কথা না বলে চলে গিয়েছিল রান্নাচালায়।

যে শাড়িটার পাড় সিলাই করছিল নূরজাহান, শাড়িটা দলা মোচড়া হয়ে আছে চৌকির ওপর। সুই সুতা রাখা আছে শাড়ির উপর। নূরজাহান একবার শাড়িটার দিকে তাকাল, তারপর চৌকির উত্তর দিকে সরে গিয়ে বেড়ার সঙ্গে ঢেলান দিয়ে বসল। হাসিমুখে বলল, আইচ্ছা তয় অহন ক কী কবি?

চৌকিতে পা ঝুলিয়ে বসেছিল পরি। নূরজাহানের দেখাদেখি সেও পা তুলল চৌকিতে তারপর আসনপিড়ি করে বসে ফ্রক টেনেটুনে পায়ের দিক যতটা সম্ভব ঢেকে দিল। দিয়ে বলল, আগে কও, হুজুরের মোকে তুমি ছ্যাপ ছিড়াইয়া দিছিলা ক্যা?

আচমকা এই প্রশ্নটা করবে পরি, নূরজাহান কল্পনাও করেনি। সে একটু চমকাল। তারপর বলল, তুই বলে কবি অন্যকথা, এই হগল জিগাচ ক্যা?

যেদিন তুমি কামডা করছ হেদিন বাবায় আর মায় তোমারে লইয়া যেই হগল কথা কইছে হেইডা আমি আঐল থিকা হুনছি। বাবায় তেমুন কিছু কয় নাই, কইছি মায়।

কী কইছে?

কইছে হুজুরের লগে এমুন কাম করছো তুমি, হুজুরের পোলায় তোমারে ধইরা লইয়া যাইবো। নিয়া আকাম কুকাম কইরা তোমার পেটপোট বানাইয়া দিবো। পোলাপান অইয়া যাইবো তোমার।

নূরজাহান চুপ করে রইল।

পরি বলল, আমি পরে মাইনষের কাছে হুনছি মাকুন্দা কাকায় চুরি করে নাই, তারে চোর সাজাইয়া গেরাম থিকা বিদায় করনের লেইগা হুজুরে এই কামডা করছে।

হ, এইডাঐ আসল কথা। আর কামডা হেয় ক্যান করছে জানচ?

না। ক্যান?

তর দাদির লেইগা।

আমার দাদি কী করছে? হেয় তো মইরা গেছে।

মইরাঐত্তো ভেজালডা লাগাইছে। হুজুরে কইছিল তর দাদি চুন্নি আছিলো, চুন্নির জানাজা অইবো না। আর খাইগো বাড়ির মাওলানা সাবে তার জানাজা পড়াইছে। হুজুরের বাড়ির গোমস্তা অইয়া মাকুন্দা কাকায় আইছিল হেই জানাজা পড়তে। কাকার উপরে এইডা

অইলো হুজুরের আসল রাগ।

বুজছি।

মাকুন্দা কাকায় আমারে বেবাক কথা কইছে। জীবন ভইরা হুজুরের বাড়ির গোরুডি হেয় পালছে, এর লেইগা গোরুডির লেইগা আছিলো ম্যালা টান। শীতের রাইত্রে গোরুডিরে হেয় দেকতে গেছিলো। হেই ফাঁকে হুজুর আর তার পোলায় ধইরা ….।

কথা শেষ করল না নূরজাহান, চোখ মুখ অন্যরকম হয়ে গেল তার। বলল, যেই মাইর মাকুন্দা কাকারে অরা মারছিল, কাকার মোকহান দেইক্কা আমি আর কিছু সইজ্জ করতে পারি নাই। এর লেইগাঐ ছ্যাপ ছিড়াইয়া দিছিলাম হুজুরের মোকে। মাইয়া না অইয়া আমি যুদি পোলা অইতাম, তয় যেই লাডি দিয়া হুজুরে আর তার পোলায় কাকারে পিডাইছিল হেই লাডি দিয়া অগো দুই বাপপুতেরে আমি ঠিক ওমতে পিডাইতাম।

কথাগুলি বলেই দিশাহারা হল নূরজাহান। চট করে এগিয়ে এসে পরির একটা হাত ধরল। ভয়ার্ত গলায় বলল, যাহ্ কথার তালে বেক কথা তরে কইয়া হালাইলাম। আল্লার কিরা লাগে তর, এই হগল কথা কেরে তুই কইচ না পরি। ক কেঐরে কবি না।

পরি দৃঢ় গলায় বলল, না কমু না।

আল্লার কিরা?

আল্লার কিরা।

এবার মুখ থেকে ভয়ার্ত ভাব উধাও হল নূরজাহানের। তবু পরির হাতটা সে ধরে রাখল।

পরি বলল, নূরজাহান বুজি, তোমার কথা হুইন্না আইজ আমি ছ্যাপ ছিডানের কারণ বোজলাম। অহন আমারে আসল কথাগুনির জব দেও।

ক।

আমি জানি, কুট্টি ফুবুও ওদিন কইছে, বিয়া অওনের পর মাইয়াগোপোলাপান অয়, তয় মায় যে কইছিল হুজুরের পোলায় তোমারে ধইরা লইয়া গিয়া আকাম কুকাম কইরা পেটপোট বাজাইয়া দিব, পোলাপান হওয়াই দিব, এইডা কেমতে অইবো? আকাম কুকাম জিনিসটা কী? পেট অয় কেমতে? পোলাপান অয় কেমতে?

নূরজাহান গম্ভীর গলায় বলল, অহনঐ এই হগল জাননের কাম নাই তর। আটু বড় হ, এমতেঐ জাইন্না যাবি। বেবাক মাইয়াঐ জানে।

না আমি অহনঐ জানুম। অহনঐ তুমি আমারে কইবা।

নূরজাহানকে ভয় দেখাল পরি। না কইলে কইলাম তুমি যে আমারে কিরা দিছ হেই কিরা আমি ভাইঙ্গা হালামু।

পরির ভঙ্গি দেখে হাসল নূরজাহান। তুই বহুত চালাক অইছচ রে পরি। আইচ্ছা কইতাছি। তয় তুই কইলাম এই হগল কথা আর কেঐরে কইচ না।

কারে কমু?

তর ভাই বইনগো।

আরে না।

আল্লার কিরা?

আল্লার কিরা।

নূরজাহান তারপর মেয়েমানুষ পুরুষমানুষের শরীর, বিয়া সন্তান জন্মের রহস্য যতটা সে জানে বোঝে ততটাই ফিসফিসা গলায় বুঝিয়ে বলল পরিকে। খুব মনোযোগ দিয়ে কথাগুলি শুনল পরি, শুনে চিন্তিত গলায় বলল, তয় পুরুষপোলাগো তো আরাম বেশি। তাগো কাম একটাঐ, মাইয়া মাইনষের লগে হোওন। কষ্ট তো বেবাক মাইয়া মাইনষের। আমার মা’রে দেইক্কাও কষ্টটা আমি বুজছি। নয়-দশটা মাস এত বড় পেট লইয়া কষ্ট করে। তারবাদে আহুজ পড়নের দিন, যহন বেদনা ওড়ে, আহা রে কী কষ্ট। মা’য় বেদনায় মরে আর বাবায় বইয়া বইয়া উক্কা খায়।

নূরজাহান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হ বেডাগো সুবিদা অনেক। ধর আমি যুদি মাইয়া না অইয়া পোলা হইতাম, তয় হুজুরের মোকে ছ্যাপ দিতাম না, দিতাম পিডান। কাকারে যেমুন পিডাইছে অমুন পিডানহান দিতাম। তারবাদে বিচার সাল্লিশ যা অইতো অইতো। এমুন কইরা বাইত্তে তো পলায় থাকন লাগতো না আমার। মাইয়ামানুষ দেইখা পলাইয়া রইছি। কোনওহানে যাই না। আমারে লইয়া মা-বাপের যেই ডর আমারও হেই একঐ ডর। যুদি আতাহাররা আমারে ধইরা লইয়া যায়, জোর কইরা আকাম কুকাম করে! আর মাইয়া মাইনষের শইল এমুন, একবার ওইকাম হইয়া গেলে শইলডা গেল নষ্ট অইয়া। যত সোন্দরঐ হচ কেঐ তরে আর বিয়া করতে চাইবো না।

পরি চিন্তিত গলায় বলল, বুজছি। আইজ বেবাক কথা বুজছি আমি। তয় বুইজ্জা নিজে যে মাইয়ামানুষ অইয়া জন্মাইছি হেইডার লেইগা বহুত দুঃখ অইতাছে আমার। ইস, আল্লায় যে ক্যান আমারে মাইয়ামানুষ বানাইয়া পাডাইলো!

একটু থেমে বলল, আমার যেই বইনডা মরছে, মইরা বাইচ্চা গেছে। মাইয়ামানুষ অইয়া বাঁইচ্চা থাকনের থিকা মইরা যাওন অনেক ভাল।

.

তোমার কী অইছে?

বিকালবেলা বড়ঘরের সিঁড়ির মাঝবরাবর উদাস হয়ে বসে আছে কুট্টি। নামার দিক থেকে আমরুজতলা পেরিয়ে তার সামনে এসে দাঁড়াল আলফু। কুট্টি তাকে একপলক দেখেই চোখ ফিরিয়ে নিল, আগের মতোই উদাস হয়ে গেল। আলফু খানিক চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল তারপর প্রশ্নটা করল।

কুট্টি আর আলফুর দিকে তাকাল না। পায়ের দিককার সিঁড়ির ধাপগুলির দিকে তাকিয়ে মন খারাপ করা গলায় বলল, কী অইবো! কিছু হয় নাই।

আমার মনে অয় অইছে।

না।

তয় তোমার মনডা এমুন খারাপ ক্যা?

কুট্টি তবু আলফুর দিকে তাকাল না। আগের মতোই মাথা নিচু করে বলল, আপনে কেমতে বোজলেন আমার মন খারাপ?

বুজা যায়। জ্বরের সমায় থিকা আমি তোমার মনডা বুজি। চরের মাডির লাহান মুলাম তোমার মন।

এবার চোখ তুলে আলফুর দিকে তাকাল কুট্টি। অপলক চোখে তাকিয়ে থেকে বলল, যুদি এতডু বুইজা থাকেন তয় আপনেঐ কন মনডা আমার কীর লেইগা খারাপ।

আলফুও কুট্টির মতো করেই তাকিয়ে রইল কুট্টির দিকে। চোখে পলক না ফেলে ধীর শান্ত গলায় বলল, আমার লেইগা। আমার লেইগা তোমার মন খারাপ। দুইদিন আগে আমি। যে তোমারে কইছিলাম আমি ইট্টু দ্যাশে যাইতে চাই, মাসেকহানি বাইত্তে থাইক্কাহি, এই কথা হোননের পর থিকা তোমার মন খারাপ। তারপর থিকা আমার মিহি ভাল কইরা চাও না, আমার লগে কথা কও না। ভাত খাইতে দিয়া অন্যমিহি চাইয়া থাকো, আমার শইলের কথা জিগাও না। কপালে হাত দিয়া দেহ না আবার জ্বর আইলোনি?

গলায় কী ছিল আলফুর কে জানে, কুট্টির মনের ভিতরটা খানখান হয়ে গেল। বুক থেকে চোখের দিকে ঠেলে উঠতে চাইল অভিমানের কান্না। অতিকষ্টে কান্নাটা কুট্টি ধরে রাখল। মাথা নিচু করে বলল, আপনের লেইগা আমার মন খারাপ অইবো ক্যা? আপনে আমার কে?

তোমার এই কথার জব অহন আমি দিতে পারুম না। তয় দিমু একদিন, সমায় মতন দিমু।

জব দেওনের কিছু নাই। আমি জানি আমি আপনের কেউ না, আপনে আমার কেউ না।

কেউ না অইলে নিজের কথা তোমারে আমি কইছি ক্যা?

কুট্টি আবার চোখ তুলে তাকাল। কোন কথা কইছেন আমারে?

দ্যাশে যাওনের কথা! ওই কথা তো তোমারে না কইয়া বড়বুজানরেঐ কইতে পারতাম। বড়বুজানরে কইয়া তার পরদিনই যাইতাম গা। যাওনের সমায় তোমারে কইতাম, আসি গিয়া। তোমারে কওনের পর আইজ দুইদিন অইলো, গেলাম না ক্যা? বড়বুজানরেও যাওনের কথাডা কইলাম না ক্যা?

ক্যান যান নাই, ক্যান কন নাই?

আলফু আবার তাকাল কুট্টির দিকে। মায়াবী গলায় বলল, তোমার লেইগা।

কী?

হ। তোমার লেইগা যাই নাই, তোমার লেইগাঐ কথা কই নাই বড়বুজানের লগে।

ক্যা আমি আপনেরে যাইতে না করছি?

হ করছো।

কুট্টি অবাক হল। কুনসুম করলাম?

করছো।

কী কন আপনে? আমি তো কোনও কথা কই নাই।

অনেক সময় কথা না কইয়াও অনেক কথা কওন যায়। তুমি হেদিন না কইয়া কইছো আমি য্যান দ্যাশে না যাই।

কুট্টি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। যাইবেন না ক্যান? আমার লেইগা আপনে ক্যান এহেন বইয়া থাকবেন। আমি তো আপনের আপনা কেঐ না। দ্যাশে আপনের বউ পোলাপান আছে, মা বইন আছে, হেরা আপনের আসল আপনা। আপনা মাইনষের কাছে আপনে যাইবেন না ক্যা?

তুমিও আমার আপনা।

কেমতে?

এই বাইত্তে আমি ম্যালাদিন ধইরা কাম করি। তুমিও করো। দুইজন দুইজনরে চিনি বহুত বচ্ছর ধইরা, কেঐ কোনওদিন কেঐর আপনা আছিলাম না। আমার যহন মন চাইতো দ্যাশে যাইতাম গা। তোমারে জিগাইতামও না। তুমিও ফিরা চাই না আমি বাইত্তে আছি

গেছি গা। যে যারে লইয়া আছিলাম। তুমি তোমারে লইয়া, আমি আমারে লইয়া। যেই রাইত্রে আমার জ্বর আইলো, নিজের কথা না ভাইবা, মান ইজ্জতের ডর না ডরাইয়া দুয়ার খুইল্লা তুমি আমার কাছে আইলা, আমার কপালে হাত দিলা, তহন থিকা আমি জানি আমি তোমার কে, তুমি আমার কে?

ক্যা এর আগে জানেন নাই?

না। তয় ইট্টু ইট্টু বুজছিলাম।

কবে থিকা বোজছেন কন তো?

মাকুন্দারে লইয়া নিজের ভাত যেদিন চাউলতাতলায় বইয়া ভাগ কইরা খাইছিলাম।

ঠিক কইছেন। একদোম ঠিক। তয় আমারে কিছু বোজতে দেন নাই ক্যা?

তোমার কথা চিন্তা কইরাঐ তোমারে বোজতে দেই নাই।

কুট্টি আবার তাকাল আলফুর দিকে। কথাডা বুজলাম না।

আলফু বলল, আমি বিয়াতো মানুষ। তিনডা পোলাপান ডাঙ্গর অইয়া গেছে। তোমার থিকা বসে অনেক বড়। আমি তোমারে কী দিতে পারুম, কী করতে পারুম তোমার লেইগা?

আমি কিছু চাই না আপনের কাছে।

আলফু দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

কুট্টি বলল, আমারও তো বিয়া অইছিলো।

অইছিলো তয় সংসারের বন্ধন তো তোমার নাই। আমার আছে। এই হগল চিন্তা কইরা তোমার মিহি আউগ্নাই নাই আমি। তোমারে বোজতে দেই নাই তোমার মনে যা। আমার মনেও তা।

আলফুর কথা শুনতে শুনতে কখন যে মনের ভিতর চেপে বসা অভিমান কেটে গেছে কুট্টির, কখন যে মন হয়ে গেছে শরতকালের মেঘ সরে যাওয়া আকাশের মতো কুট্টি তা টের পায়নি। এখন মন জুড়ে আশ্চর্য এক ভাললাগা, আশ্চর্য এক অনুভব। এই ভাললাগা মনের মানুষকে হঠাৎ করে পাওয়ার জন্য, এই অনুভব মনের মানুষের সঙ্গে মন বিনিময়ের অনুভব।

আর আলফুর কথা শুনে কী যে মুগ্ধ কুট্টি, কী যে মুগ্ধ। এই মুগ্ধতা জীবনে প্রথম তার। দিনের পর দিন চুপচাপ থাকা মানুষটি তা হলে এইরকম! এত সুন্দর করে কথা বলে, এত সুন্দর করে বোঝে মনের মানুষকে! ইস এই মানুষকেই কিনা ভুল বুঝেছিল কুট্টি!

ততক্ষণে বিকাল একেবারেই ফুরিয়ে গেছে। গাছপালা ঝোঁপঝাড় ঘরদুয়ারের আনাচ কানাচ থেকে বেরিয়ে আসছিল অন্ধকার। নিজস্ব গাছপালায় ফিরছিল দিন শেষের পাখিরা। মাঠ থেকে মাঠে ছড়িয়ে যাচ্ছিল সন্ধ্যাবেলার হাওয়া আর পশ্চিম আকাশে পাকা কুমড়ার ফালির মতো উঠেছিল লক্ষ কোটিবার ওঠা পুরানা চাঁদ।

বড়ঘরের খাটাল থেকে বড়বুজান ডাকলেন, কুট্টি ওই কুট্টি, আন্দার অইয়া গেছে। কুপিবাত্তি আঙ্গা।

কুট্টি উঠে দাঁড়াল।

আলফু বলল, তয় দ্যাশে কইলাম আমি যাইতাছি না।

শুনে এই প্রথম সুন্দর করে হাসল কুট্টি। গভীর মমতার গলায় বলল, হাইজ্জাকালে বাইরে থাকনের কাম নাই। হাত পাও ধুইয়া তাড়াতাড়ি ঘরে আহেন।

সিঁড়ি ভেঙে দ্রুত পায়ে খাটালের দিকে চলে গেল কুট্টি।

.

দুপুরবেলা মামুদপটির ওদিক থেকে ফিরছিল আজিজ গাওয়াল।

কাঁধে তামা পিতল অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি পাতিল লোটা বদনা কলসি ভরতি ভার। বেশ ওজনদার ভার। এমনিতে চোত মাসের প্রথম দিককার খাড়া রোদ, তার ওপর কাঁধে ওজনদার ভার, আজিজের দশা বেশ কাহিল। পথের ধারে ছায়াময় কোনও গাছপালা পেলে তার তলায় বসে খানিক জিরাবার মতলবে ছিল।

বহ্নিছাড়ার কাছাকাছি এসে ওরকম একটা জায়গা পেয়ে গেল।

বহ্নিছাড়ার পশ্চিম দিককার পুকুরের পশ্চিমপার দিয়ে চলে গেছে হালট। সেই হালটের পশ্চিমপাশে কানিখানেক জমির পর ঝাঁপড়ানো একটা হিজলগাছ। ভার কাঁধে হেলেদুলে সেই গাছটার কাছে এল আজিজ। এসে দেখে একজন মানুষ বসে আছে গাছতলায়। হিজলের গোড়ার দিকটায় ঢেলান দিয়ে পা দুইটা ঘাসের উপর মেলে দিয়ে বসে আছে মানুষটা। পরনে খয়েরি রঙের লুঙ্গি, মাজায় বান্দা গামছাটা এখন আর মাজায় নেই। ডান দিককার কাঁধে ফেলা। কিন্তু চোখের জলে গাল ভেসে যাচ্ছে মানুষটার। দুপুরের নির্জনতায় একাকী মাঠপারের হিজলতলায় বসে আকুল হয়ে কাঁদছে সে।

পলকেই মানুষটাকে চিনতে পারল আজিজ। পুরানবাড়ির তোতা। ধরণীচাচির সাইজ্জা পোলা।

তোতা এখানে এভাবে বসে কাঁদছে কেন?

গ্রামের লতাপাতা ধরে তোতার সঙ্গে আজিজের একটা আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে। তোতার বাপ আজিজের বাপের দূর সম্পর্কের ভাই। সেই হিসাবে তোতাও আজিজের ভাই। ওই একই হিসাবে ধরণীচাচিকে চাচি ডাকত আজিজ। দিন কয়েক আগে মরল চাচি। যাকে দেখতে আজিজের বাড়িতে এসেছিল সে মরল বিয়ানরাতে।

তোতাকে দেখে এসব কথা মনে পড়ল আজিজের।

তোতা প্রথমে টের পায়নি ভার কাঁধে একজন মানুষ এসে দাঁড়িয়েছে হিজলতলায়। ভার যখন নামাতে গেছে আজিজ, চমকে তার দিকে তাকিয়েছে। তারপর যেন এরকম জায়গায় এভাবে বসে কান্নাটা তার ঠিক হয়নি, যেন ভারী একটা লজ্জার কাজ সে করে ফেলেছে এমন ভঙ্গিতে কাঁধের গামছা টেনে চোখ মুছল। গলা যতখানি সম্ভব স্বাভাবিক করে বলল, কই থিকা আইলা আইজ্জাদা?

তোতার পাশে বসল আজিজ। ক্লান্তির শ্বাস ফেলে বলল, গেছিলাম কান্দিপাড়া। কান্দিপাড়া থিকা কালিরখিলের ওইমিহি অইয়া আইছি মামুদপট্টি। গরমে এক্কেরে শেষ অইয়া গেছি। জিরানের লেইগা গাছতলায় আইছি। আইয়া দেহি তুই বইয়া রইছস? তুই এহেনে এমতে বইয়া রইছস ক্যা ভাই?

তোতা ধরা গলায় বলল, এমতে। এই খেতটা আমার। হিজলগাছটাও আমার খেতের মইদ্যে পড়ছে। আইছিলাম ধানের অবস্থা দেখতে। রইদ দেইখা গাছতলায় বইয়া রইছি।

তয় কানতাছিলি ক্যা?

তোতা বুঝল। তার কান্না দেখে ফেলেছে আজিজ। বলল, বোজ নাই কীর লেইগা কানতাছিলাম?

বুজুম না ক্যা, বুজছি। চাচির লেইগা।

হ। এহেনে আইয়া বহনের পর মা’র কথা বহুত মনে পড়ছিল। কুনসুম যে চকু বাইয়া পানি নামছে, উদিস পাই নাই।

আজিজ তারপর চিরকালীন সেই প্রবোধের কথাটা বলল, কাইন্দা আর কী করবি ভাই? যে গেছে সে তো আর ফিরত আইবো না। আর মা-বাপ কেঐর চিরকাল থাকে না। আমার মায়ও তো মরলো। কেমুন মরণডা মরলো ক! রাইতের বেলা তিয়াস লাগছিল, পানি মনে কইরা খাইল মাইট্টা তেল। বড়ঘরের একহান খামে উলু লাগছে, খামোয় দেওনের লেইগা। মাইট্টা তেল আইন্না রাকছিলাম, হেই তেল খাইয়া মরলো। লোসকান অইলো আমার দুইহান। মাইট্টাতেলও গেল, মায়ও গেল। খামড়ায় অহনতরি আর মাইট্টা তেল দেওয়া অয় নাই।

আজিজের কথা শুনে গা জ্বলে গেল তোতার। আশ্চর্য মানুষ! তেল খাইয়া মায় মরছে তাতে নাকি দুইটো লোকসান হইছে। তেল গেছে, মাও গেছে। পরের দিককার কথায়। বোঝা গেল মায়ের থেকে তেলটাই তার বেশি দরকার ছিল। মা মরছে মরছে, তেলটা না খেয়ে মরলেই পারত। ঘরের খামটা রক্ষা পেত আজিজের।

তোতার একবার ইচ্ছা হল এসব নিয়ে কিছু কথা আজিজকে সে শোনায়। তারপরই মনে হল, কী দরকার কটু কথা বলার! কথায় কথা বাড়বে। সে আজিজকে বললে আজিজও তাকে কিছু বলবে। নিজের সংসার হওয়ার পর ছনুবুড়ির দিকে আর কখনও ফিরে তাকায়নি আজিজ। সংসারে থেকেও ছনুবুড়ি হয়ে গিয়েছিল সংসারের বাইরের মানুষ। ছেলের সংসারে তিনওক্ত খাবার পেত না। তার ওপর বানেছার যা তা ব্যবহার। এই বাড়ি ওই বাড়ি ঘুরে, এর বদনাম ওকে ওর বদনাম তাকে, এই করে পেটের আহার জোটাত। যখন এইসব কায়দায়ও আহার জুটত না তখন করত চুরি। আজিজ জানত সব কিন্তু মা’কে নিয়ে ভাবত না।

তোতা কি ভাবত?

সেও কি একটু অন্য রকমভাবে আজিজের মতোই আচরণ করেনি তার মায়ের সঙ্গে। বিয়ের পর, সংসারে বউ পোলাপান আসার পর সেও কি আর ভেবেছে মায়ের কথা? তার বউ কি আজিজের বউয়ের মতন না হোক, একটু কম হলেও যা তা ব্যবহার তোতার মায়ের সঙ্গে করেনি?

এসব কথা কমবেশি গ্রামের সবাই জানে। সুতরাং আজিজকে ওসব নিয়ে কথা শোনাতে গেলে আজিজই বা তাকে ছাড়বে কেন?

মনে মনে ভাবা কথা মনে মনেই চেপে গেল তোতা। উদাস চোখে সামনের ধানখেতের দিকে তাকিয়ে রইল। মনের ভিতর বারবারই ভেসে উঠছিল মায়ের মুখ। জন্মের পর থেকে দেখে আসা মুখ বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বদলাল। এক বয়সের মানুষ আরেক বয়সে যেন দুই

ভুবনের দুই বাসিন্দা। একই মানুষের চেহারায় এখন যেন দুইজন মানুষকে দেখতে পাচ্ছে। তোতা। একজন সেই প্রথম জীবনের, স্বামী উধাও হয়ে যাওয়া, চার চারটা সন্তান নিয়ে দিশাহারা মা। আরেকজন ক’দিন আগের, বুকের কাছে গভীর মায়ায় যে জড়িয়ে রেখেছে। নাতির মুখ।

নিজের কাছেই নিজে বলছে এমন গলায় তোতা বলল, আমার পোলাডা থাকত মা’র কাছে। মরণ কারে কয় বোজে না পোলাডা। দিনভইরা দাদিরে বিচড়ায়। এই মিহি যায়। ওই মিহি যায়। দাদি গো, ও দাদি, দাদি বইল্লা ডাক পাড়ে। মনে করে দাদি মনে হয় কোনওহানে গেছে, কোনও বাইত্তে ধরণীর কামে গেছে। ওই কামে কোনও কোনও রাইত্রেও থাকন লাগে, পোলাডা মনে করে অমুন কামেঐ গেছে দাদি, ফিরত আইবো। কয়দিন অইয়া গেল আহে না দেইক্কা আইজ বিয়ান থিকা চিইক্কর পাড়তাছে। দাদি গো, ও দাদি আমারে থুইয়া তুমি কই গেলা গা? দাদি, ও দাদি, তোমারে ছাড়া আমার তো ঘুম আহে না। আমার তো খিদা লাগে না।

কথা বলতে বলতে আবার কেঁদে ফেলল তোতা। আবার গামছায় চোখ মুছল।

আজিজ ততক্ষণে বিড়ি ধরিয়েছে। তোতার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছে কি শুনছে না বোঝা যাচ্ছে না। তোতার মুখের দিকে তাকিয়ে বিড়ি টানছে ঠিকই, কিন্তু চোখের ভিতর যেন এখনকার এই দৃশ্য নেই। চোখের ভিতর যেন খেলা করছে অন্যকিছু।

আজিজের এই উদাসীনতা খেয়াল করল না তোতা। আগের মতোই আপনমনে বলল, পোলাডার লেইগা বহুত খারাপ লাগতাছে। অরে থামাই কেমতে? কেমতে বুজাইয়া কই, বাজান রে, দাদি তো তর মইরা গেছে। ওই যে হেদিন দেকলি না, হাইজ্জাকালে তালগাছতলায় বইয়া রইছিলো, তুই ডাক পাড়লি, হোনে না, তারবাদে যহন হাত ধইরা টান দিলি, ধুরুম কইরা পড়লো মাডিতে, তহনঐ তর দাদি মইরা গেছে। তারবাদে দেকলি না নাওয়াইয়া ধোয়াইয়া, কাফোনের সাদা কাপড় ফিন্দাইয়া তারে গোরস্তানে নিয়া গোর দিয়া আইলাম। বাজান রে, গোর দেওনের পর কেঐ আর ফিরত আহে না। তর দাদিও ফিরত আইবো না বাজান। মনে রে বুজ দে। অহন থিকা হারাডা জীবন দাদিরে ছাইড়া তর থাকন লাগব। দাদির লগে এই জীবনে তর আর কোনওদিন দেহা অইবো না।

কথা বলতে বলতে আবার কাঁদে তোতা, আবার চোখ মোছে। পোলায় আমার এই হগল কথা বুজবো না। ভাতপানি খাওন ছাইড়া দিছে, রাইত্রে উইট্টা বইয়া থাকে। দাদিরে ডাক পাড়ে। দাদি গো, ও দাদি! এই পোলারে আমি কেমতে বাঁচামু?

তোতার কথা শুনে আজিজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হাতের বিড়ি শেষ হয়ে এসছিল, শেষটান দিয়ে ভার রাখা জায়গাটার ওদিকে ঘাসবনে ফেলে দিল। বলল, মানুষ বহুত স্বার্থপর রে ভাই। নিজের সুক সুবিদা ভালমন্দ ছাড়া আর কিছু বোজতে চায় না।

আচমকা এরকম কথা আজিজ কেন বলল বুঝতে পারল না তোতা। চোখ মুছে আজিজের দিকে তাকাল। আথকা এমুন কথাডা কীর লেইগা কইলা আইজ্জাদা? কথাডা বুজলাম না।

বুজাইয়া কইলে বুজবি।

তয় কও।

দেক, মাইট্টা তৈল খাইয়া আমার মায় মরলো, আমি তরে কইলাম আমার সেখান হইল দুইখান। মায়ও গেলো, মাইট্টা তেলও গেলো। সত্য কথাডা তরে কই, মায় মরছিলো মরছিল, মাইট্টাতেলহানি যুদি থাকতো, আমি মনে হয় খুশিঐ অইতাম। বড়ঘরের খামড়া বাঁচাইতে পারতাম। অহনও মাইট্টাতেল কিন্না আইন্না বাঁচামু ঠিকঐ, তয় কয়ডা টেকা আমার যাইবো। যেই মায় দশমাস দশদিন পেডে রাইক্কা, মতো কষ্ট কইরা জন্ম দিল, লাইল্লা পাইল্লা ডাঙ্গর করলো, বিয়াশাদি কইরা সংসার পোলাপান অওনের পর হেই মা’র মিহি আমরা আর ফিরা চাই না। মায় যেন পর অইয়া যায়, কান্দের বোজা অইয়া যায়। তিনওক্ত খাওনও তারে দিতে চাই না। খালি সংসার, খালি পোলাপানের কথা চিন্তা করি। বুজি না এমুন চিন্তা আমার মায়ও আমারে লইয়া একদিন করছে। আইজ আমার মা’র মিহি আমি যেমুন ফিরা চাই না, এমুন একদিন আইবো যহন আমার পোলাপানেও আমার মিহি চাইয়া দেকবো না। আমারেও ভাত দিবো না। আমার কাছে মা’র থিকা মাইট্টাতেলের দাম বেশি। তর কাছে তর মা’র থিকা অহন তর পোলার চিন্তা বেশি। মায় মরছে মরছে, তারে। লইয়া চিন্তা করতাছচ না, করতাছচ পোলাডারে লইয়া। পোলারে বাঁচাবি কেমতে। এর। লেইগাঐ কইলাম, মানুষ বহুত স্বার্থপর। নিজেরে ছাড়া কিছু ভাবে না।

আজিজের কথা শুনতে শুনতে তোতা একটু বিচলিত হল। ঠিক কথাই সে বলেছে। আসলে তো মা’র কথা ভাবছিল না তোতা, ভাবছিল নিজের ছেলেটির কথা। নিজের ছেলের ভালমন্দ কথার রেশ ধরে তার ভাবনা চলে গিয়েছিল মায়ের স্মৃতিতে। কান্নাটা তার ছেলের জন্য না মায়ের জন্য বুঝতে পারছিল না।

এখন আজিজের কথায় বুঝল।

তারপর ছনুবুড়িকে নিয়ে যেসব কথা মনে হয়েছিল তোতার সেসব কথা আজিজকে না বলে মনের ভিতর চেপে রাখার জন্য নিজের ওপর খুশি হল। আজিজকে ওসব কথা বললে। আজিজ নিশ্চয় খুব খারাপ ভাবে তাকেও কিছু কথা বলত। এখন যেভাবে বলল তাতে যে মায়ের ব্যাপারে আজিজের সঙ্গে তার আসলে কোনও ব্যবধান নাই সেটা পরিষ্কার।

আজিজ বলল, চিন্তা কইরা দেহিচ কথাডি আমি সত্য কইলাম না মিছা।

 তোতা ধীর গলায় বলল, না সত্য কথা কইছো। খাঁটি কথা। সত্যঐ আমরা বহুত স্বার্থপর।

হোন, আমি তরে আমার মনের আরেকহান কথা আইজ কই। মা’র দাফোনকাফোনের লেইগা যেই খরচাডা অইছে, হেইডাও আমার করতে ইচ্ছা করে নাই। মনে মনে মা’র উপরে বিরক্ত অইছি। কী কাম আছিলো মরণের? না মরলে তো টেকাডি আমার খরচা হয়। না। মনের মইদ্যে খালি খচখচ খচখচ করছে। হিসাবের একহান খাতায় মনে মনে আমি খালি হিসাব কিতাব করছি। মা’র দাফোনকাফোনের টেকাডা আমি কবে রুজি করতে পারুম, কবে উডাইতে পারুম। তারবাদে আবার এইডাও বুজছি, যেই টেকা যায় হেই টেকা আর কোনওদিন ওডে না। পরে যেই টেকা তর হাতে আইবো, হেইডা তো তুই আগের টেকাড়া না গেলেও রুজি করতি! বোজছচ আমার কথা?

তোতা ম্লান গলায় বলল, বুজছি।

আজিজ বলল, মান্নান মাওলানায় কইছিল চুন্নিবুড়ির জানাজা অইবো না। অর লাচ মড়কখোলায় হালাই দিয়াইতে ক, শিয়াল হকুনে খাইবো। তুই বিশ্বাস কর, হুইন্না আমি মনে মনে খুশি অইছিলাম। কেঐরে কইতে পারি নাই, আইজ তরে কইলাম। যদি অমতে হালায় দিয়াইতে পারতাম তয় তো দাফোন কাফোনের খরচাড়া আমার বাচতো। কাফোন। কিনতে গিয়া মোতালেইব্বাও কয়হান টেকা চুরি কইরা খাইতে পারতো না।

আজিজের কথা শুনে তোতা তখন স্তব্ধ হয়ে গেছে। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। আজিজের মুখের দিকে। এতকথা জীবনে কোনওদিন আজিজের সঙ্গে তার হয়নি। মেউন্না ধরনের মানুষটি যে এরকম করে ভাবে, এভাবে কথা বলে জানা ছিল না তোতার। আর কত সহজভাবে অকপটে নিজের ভাবনার কথা বলে যাচ্ছে! সত্যি, বহুকাল ধরে কাছ থেকে দেখা মানুষকেও আসলে দেখা যায় না। তার ভেতরটা কেমন, দেখা যায় না। মনের ভিতর কী আছে, বোঝা যায় না। কোনও কোনও সময় মানুষ নিজের অজান্তে মনের অনেকখানি খুলে বসে। আজিজও যেন আজ সেভাবেই বসেছে। আর তোতা নীরব দর্শক হয়ে দেখছে। তার মনের ভিতরটা।

আজিজ খুবই হিসাব করে বিড়ি খায়। দিনরাত মিলিয়ে কয়টা বিড়ি খাবে, কতক্ষণ পর পর খাবে সব তার হিসাব করা। কিন্তু এখন সেই হিসাবটা সে মানল না। লুঙ্গির কোচড় থেকে বিড়ি বের করে ধরাল। তোতা বিড়ি খায় কি খায় না, তাকে জিজ্ঞাসা করা উচিত কি না, বিড়ি সাধা উচিত কি না ভাবল না, বিড়ি ধরিয়ে বড় করে টান দিয়ে নাকমুখ দিয়ে ধুমা। ছাড়ল। দুপুরবেলার হিজলতলা কুম্ভিপাতার বিড়ির গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে গেল।

তোতা বিড়ি খায় না। তবে গন্ধটা তার ভাল লাগল।

বিড়ি টানতে টানতে আজিজ বলল, ধরণীচাচি বহুত ভাল মানুষ আছিল। এই পদের মানুষরে আল্লায় বহুত ভাল জানে। বেহস্ত নসিব এইপদের মাইনষেরেঐ আল্লায় করে।

তোতা বলল, কেমতে বোজলা?

বুজছি। বহুত ভাল কইরা বুজছি। একহান ঘটনায় আমি যেমতে চাচিরে বুজছি, দুইন্নাইর আর কেঐ তারে অমতে বোজে নাই। তরা তার পেডের পোলা অইয়াও বোজচ নাই।

কও তো ঘটনাটা।

যে মেয়েটি হয়ে মরল তার জন্মের দিন বানেছার আহুজ ঘরে ঢোকার আগে ধরণীচাচির সঙ্গে যা যা কথা আজিজের হয়েছিল সব তোতাকে সে খুলে বলল। সে কী চেয়েছিল, ধরণী চাচি কী বলেছিল সব বলল।

শুনে তোতা এতটাই অবাক হল, প্রথমে কোনও কথা বলতে পারল না। তারপর গভীর বিস্ময়ের গলায় বলল, কও কী?

আজিজ বলল, হ।

তুমি এমুন মানুষ?

কী করুম ক? বচ্ছর বচ্ছর পোলাপান অয়, না তর ভাবিছাবরে কিছু বুজাইতে পারি, না নিজে বুজি। রাইত্রে বউর লগে হুইলে বেউস অইয়া যাই। তহন আর পোলাপানের কথা মনে থাকে না। কয়দিন পর তর ভাবিছাবে যহন উকাল করতে শুরু করে তহন মনে মনে খালি ইসাব করি। ইসাবের খাতায় খালি যোগ বিয়োগ করি। আরেকজন আইতাছে, তারে খাওয়ামু কী? এর লেইগাঐ কথাডা চাচিরে কইছিলাম। মাইয়াডারে মাইরা হালাইতে চাইছিলাম। তয় আল্লায় কইলাম অনেক সময় মাইনষে যা চায় হেইডা করে। আমি মাইয়াডারে মাইরা হালাইতে চাইছিলাম, মারতে আমার অইলো না। আল্লায়ঐ অরে। উড়াইয়া নিলো।

তুমি বলে মাইয়াডার দাফোনও করো নাই?

না করি নাই। মা’র দাফোন করতে যেই পোলার বুক টনটনায় হে কেমতে ওডু মাইয়ার দাফোন করে? টেকা খরচের কাম কী?

এইডা লইয়া তো গেরামে কথা অইছে।

হ আমি হুনছি।

এর লেইগা মাওলানা হুজুরে বলে তোমারে ডাকাইবো?

কোন মাওলানা হুজুরে? খাইগো বাড়ির নাকি আতাহারের বাপে?

আতাহারের বাপে।

 ডাকাইলে আর কী করুম? যামু। গালি দিলে গালি হুনুম। পায়ের খড়ম দিয়া পিডাইলে পিডাইবো।

বিড়িতে শেষটান দিল আজিজ, আগের মতোই ঘাসবনে ছুঁড়ে ফেলল। তয় তরে একহান কথা কই ভাই, এই জীবনডা এমুন আমি আর রাখুম না।

কী করবা?

বদলাইয়া হালামু।

কেমতে?

চাচি আমারে পথটা দেহাইয়া গেছে।

কী পথ?

হেইডা তরে আমি কমু না। তয় এইডা জাইন্না রাখিচ, এই আজিজ গাওয়াল আর কোনওদিন বাপ অইবো না। মনের মইদ্যে হামলাইয়া রাখা ইসাবের খাতাড়া ছিড়া হালাইবো।

তোতা আবার উদাস হয়েছে। মেলে দেওয়া পায়ের সামান্য দূর থেকে শুরু হওয়া রোদে ভেসে যাওয়া ধানিমাঠের দিকে খানিক তাকিয়ে রইল, তারপর বলল, তোমার কথা হুইন্না আবার মনে অইলো মা’র কথা। কী কষ্ট চাইরডা পোলাপান লইয়া এক সময় করছে। বাবায় কোনওদিন ফিরত আইলো না। একহান পয়সা নাই ঘরে। দুই-তিনকানি জমিন বর্গা দেওয়া। ধান যে পায়, বচ্ছর চলতে চায় না। ধরণীর কাম কইরা কইরা মায়। আমগো বাঁচাইয়া রাকছিলো। আশা করছিলো পোলারা বড় অইলে এই দুঃখের দিন শেষ অইবো। কাম কাইজ ব্যাবসা বাণিজ্য চাকরি বাকরি নাইলে গিরস্তালি কইরা পোলারা তারে খাওয়াইবো। কীয়ের কী! বড় অইয়া পোলারা যে যার লাহান নিজের ভাগের জমিন বেইচ্চা। গেল গা। মা’র লগে রইলাম খালি আমি। হেই আমিও বিয়ার পর মা’র মিহি আর ফিরা চাইলাম না। এক সংসারে থাইক্কাও বউ পোলাপান লইয়া ভিন্ন অইয়া গেলাম। মায় কুনসুম খায়, কই যায় কই থিকা আহে কিছু খবর রাখি না। পায়ে বাতের বেদনা আছিলো মা’র। ছোডকালে আমি যহন মাইয়াগো লাহান মা’র লগে লগে থাকতাম, বাতের বেদনা উটলেঐ মা’র পাও আমি টিপ্পা দিতাম। আইজ তোমার কথায় বোজলাম, ওই টিপনডাও আমি টিপতাম স্বার্থে। আপনা স্বার্থে। য্যান অন্য তিনপোলার থিকা মায় আমারে বেশি আদর। করে। য্যান মা’র ভাগের জমিনডু আমারে দিয়া দেয়।

চাচি তো তরেঐ দিছে।

হ। তয় মরণের আগেও আমাবইশ্যায় পুন্নিমায় বাতের বেদনাডা উটতো মা’র। রাইতভইরা বেদনায় কষ্ট পাইতো মায়, কেফিনের দুয়ার আটকাইয়া বউর লগে হুইয়া ঘুমাইতাম আমি। খাটালে যে মায় বাতের বেদনায় কোঁকায়, উদিসও পাইতাম না।

এইডাও কইলাম স্বার্থের কারণে।

হ। অহন তো মা’র পাও টিপ্পা আমার কোনও লাভ নাই। মা’র ভাগের জমিন তো আমি পাইয়াঐ গেছি। বউ পোলাপান সংসার বেবাকঐ পাইয়া গেছি। আর মায় মরণেও আমার লাভ অইছে। ধরণীর কাম কইরা কইরা বারো তেরেশো টেকা জমাইছিলো মায়, হেই টেকাডি অহন আমার।

আজিজ হাহাকারের গলায় বলল, স্বার্থ স্বার্থ। মাইয়াডা হওনের দিন চাচিরে পাঁচহান টেকা দিছিলাম। নেয় নাই দেইক্কা বহুত খুশি হইলাম আমি। যাউক পাঁচহান টেকা তো বাঁচলো!

মাঠের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে তোতার দিকে তাকাল আজিজ। তোতা রে, আমি ম্যালা ডাঙ্গর অওনের পর আমার বাপে মরছে। আমি একহান মাত্র পোলা, তাও বাবায় আমারে দুই চোকে দেখতে পারতো না। গিরস্তালির কামে খেতে লইয়া যাইতো, গোরু রাকতে বিলে পাডাইতো, কোনও কামঐ আমি ঠিক লাহান করতাম না। এই মিহি ওই মিহি যাইতাম গা। এর লেইগা বাবায় আমারে মারতে চাইতো। তয় কোনওদিন মারতে। পারে নাই, বোজছচ।

ক্যা?

মায় মারতে দেয় নাই। বাবায় থাই থাপড় উডাইলেঐ পাগলের লাহান দৌড়াইয়া আইতো মায়। আমারে সরাইয়া দিয়া খাড়ইতো বাবার সামনে। খবরদার আমার পোলার শইল্লে হাত উডাইবা না। পোলার দরদ তুমি কী বুজবা? গরভে রাকছি আমি। লাইল্লা। পাইল্লা ডাঙ্গর করছি আমি। তুমি কে আমার পোলার শইল্লে হাত উডানের? বাপ অইতে একমিনিট লাগে, মা অইতে লাগে দশমাস দশদিন। জন্মের পরও বুকের দুধ দিয়া, আদর। যত্ন দিয়া পোলাপান ডাঙ্গর করে মায়। বাপে করে কী! খালি খাওনদাওন জোগাড় করে। খাওনদাওন লইয়া বড়াই কইরো না। যেই পোলাপানের বাপ না থাকে মায়ঐ তাগো খাওয়াইয়া বাঁচাইয়া রাখে। আলার মা’য় রাকছে না তার পোলাপানরে! বাবায় থাইম্মা যাইতো। আমার শইল্লে আর হাত উডাইতো না।

একটু থামল আজিজ। বিয়াশাদি কইরা হেই মারে আমি কেমতে ভুইল্লা গেলাম! খাওন দাওন দিতাম না। পেডের দায়ে মায় কূটনামি করতো, চুরি চোট্টামি করতো, বেবাকঐ আমি হোনতাম। এককান দিয়া হোনতাম আরেককান দিয়া বাইর কইরা দিতাম। সব থিকা। বড় অন্যায় যেইডা করতাম, কহেক বচ্ছর ধইরা কাইজ্জাকিত্তন লাগলে মা’র শইল্লে হাত উডাইতো বানেছা। যেমতে অমতে মারতো আমার মা’রে। আমি দেইক্কাও দেকতাম না। বইয়া বইয়া বিড়ি খাইতাম। মাইর খাইয়া কানতে কানতে যেই মিহি ইচ্ছা যাইতো গা আমার মায়। আইজ মনে অইতাছে, বাপের মাইরের হাত থিকা যেই মায় আমারে হারাডা। জীবন বাঁচাইয়া রাকছে, আমার চোক্তের সামনে হেই মায়রে পিছাদাও পিডাইছে আমার। বউয়ে, আমি কোনওদিন আমার মা’রে বাঁচাইতে যাই না। যুদি মা’র পক্ষ লই তয় বউ বিগড়াইবো। সংসারে অশান্তি। স্বার্থ, হায় রে স্বার্থ।

কথা বলতে বলতে শেষদিকে গলা ভেঙে এল আজিজের। বুক ঠেলে উঠল বহুকাল। ধরে চেপে রাখা কান্না। রোদে ভেসে যাওয়া শস্যের চকমাঠের দিকে তাকিয়ে গভীর কষ্টের কান্নায় কাঁদতে কাঁদতে আজিজ বলল, মাগো মা, আমারে তুমি মাপ কইরা দিয়ো মা। তোমার এই মেউন্না পোলাডারে তুমি মাপ কইরা দিয়ো। আমি তোমার লেইগা কিছু করতে পারি নাই মা। আমারে তুমি মাপ কইরা দিয়ে।

আজিজের কান্না দেখে নিজের মায়ের জন্য নিঃশব্দে চোখ ভাসছিল তোতার।

.

কেমন কেমন করে যেন মোতালেবের লগে খাতির করে ফেলেছে বাদলা। সারাক্ষণই মোতালেবকাকা মোতালেবকাকা করছে আর তার পিছন পিছন ঘুরছে। কবুতর দেখছে, কবুতরদের খাবারও দিচ্ছে। কোনও কোনও সময় উঠানের কোণে, ঘরের ছনছায় ছেড়ে পেছড়ে বসে থাকা মোতালেবের আতুড় লুলা মেয়ে ময়নার সঙ্গেও কথাবার্তা বলছে। এর মধ্যে একদিন সকালবেলা মোতালেবের বউ মউলকা বানিয়েছিল, টিনের থালায় করে একসঙ্গে দুইখান মউলকা দিয়েছিল মোতালেবকে। বাদলা ছিল সামনে, একখান মউলকার। অর্ধেকটা ভেঙে বাদলাকে দিয়েছিল মোতালেব।

এরকম কাণ্ড যে ঘটতে পারে জানা ছিল না বাদলার। খুবই মগ্ধ হল সে। সেই মউলকা। খেতে খেতে মোতালেবের যেন আরও ভক্ত হয়ে গেল। মোতালেবের ফুটফরমাশ খেটে দিচ্ছে, মোতালেব যেখানে যাচ্ছে বাদলাও যাচ্ছে। আর সারাক্ষণ নানা রকমের কথা। বলছে।

এসব দেখে বাড়ির লোকজন তো অবাকই, বেশি অবাক রাবি আর মতলা। দেলোয়ারা তো একদিন হাসিমুখে রাবিকে বললেনই, কী রে রাবি, তর পোলায় দেহি মোতালেইব্বার ট্যান্ডল অইয়া গেছে।

রাবি লাজুক গলায় বলল, হ। দুইজনের বহুত খাতির।

ভালঐ অইছে। কাইজ্জাকিত্তনডা কমলো।

আজ দুপুরের মুখে লুঙ্গি কাছা মেরে মাজায় শক্ত করে গামছা বেঁধেছে মোতালেব। কাঁধে নিয়েছে পলো। নিয়ে বাদলাকে বলল, যাবি নিরে বাদলা?

বাদলা উৎসাহী গলায় বলল, কই?

গোরস্থানের পুকরে যামু। ওই পুকুরে আইজ মানুষ নামবো। পলো চাবাইতে যামু। তুই যুদি ডুলা রাকচ তয় তরেও মাছের ভাগ দিমুনে।

বাদলা রাজি। লন কাকা।

তারপর ডুলা হাতে মোতালেবের পিছন পিছন চকে নেমেছে। আজকাল কথা বলার স্বভাব হয়েছে বাদলার। চকে নেমেই মোতালেবকে বলল, মোতালেবকাকা, একহান কথা জিগামু?

মোতালেব নির্বিকার গলায় বলল, জিগা।

আপনেগ বাড়ির নাম মোবাড়ি ক্যা? মেন্দা জিনিসটা কী?

মুখ ঘুরিয়ে বাদলার দিকে তাকাল মোতালেব। হাসল। আথকা এইডা তর মনে অইলো। ক্যা?

আথকা মনে অয় নাই। বহুতদিন ধইরাঐ মনে অয়। গেরামে খালি তিনডা বাড়ি মেন্দাবাড়ি। আর কোনও মেন্দাবাড়ি নাই। দেলরা বুজির মোকে একদিন হুনছি পুরা বিক্রমপুরেও বলে আর কোনও মেন্দাবাড়ি নাই।

পুরা বিক্রমপুরে কী রে বেড়া, পুরা বাংলাদেশেও নাই।

কন কী?

হ। এই তিনবাড়ি ছাড়া মেন্দা পদবির কোনও মানুষও নাই কোনওহানে।

মায় একদিন কইছিল এইডা কেমুন পদবি? মেন্দা? মাইনষের পদবি অয় চদরি খা সৈয়দ বেপারি ফকির। আপনেগো মেন্দা অইলো ক্যা?

হুনবি?

হ কন।

আমগো পরদাদারা আছিলো কাউলিপাড়ার মানুষ।

কাউলিপাড়াডা কোনহানে?

ফরিদপুর জিলায়। সাবাসনগর, বিলাসপুর এই হগল গেরামে আছিলো আমগো তারা। কাউলিপাড়ার বাবুরা আছিল তহনকার জমিদার। আমগো পরদাদারা আছিলো বাবুগো প্রজা।

কাম আছিলো কী তাগো? কী করতো?

গিরস্তালি। গোরু পালতো। তয় বহুত সাহসী মানুষ আছিলো তারা। আর সাই (মহা) জুয়ান, পাজি। কেঐর কথা হোনতো না। বাবুগো ধানখেতে গোরু ছাইড়া দিতো। বাবুরা ডাকলেও যাইতো না।

কন কী?

হ। তয় খেতখোলা গোরু ছাড়া ম্যালা নৌকাও আছিলো তাগো। এই নৌকার লেইগাঐ পদবি আছিলো তহন বেপারি।

বাদলা অবাক হল। বেপারি?

হ বেড়া। আমরা আদতে আছিলাম বেপারি।

বাদলা হি হি করে হাসল। অইয়া গেলেন মেন্দা।

মোতালেবও হাসল। হ। হোন ঘটনাডা।

আইচ্ছা কন।

একবার আমগো এক পরদাদায় বিরাট বিরাট দুইহান চিতলমাছ ধরছে। ধইরা বাইত্তে লইয়াইছে। তার মায় চিতলমাছ দেইক্কা কইলো, এতবড় দুইডা মাছ দা আমরা কী করুম। একহান মাছ জমিদার বাবুরে দিয়ায়। মাছ লইয়া হেয় গেছে জমিদারবাড়ি। জমিদারে মাছ দেইক্কা বহুত খুশি। জিগাইছে এতবড় মাছ পালি কই? আমার লেইগা লইয়াইছচ কী মনে কইরা? মাছের আবার দাম দেওন লাগবোনি? এতবড় জুয়ান মর্দ মানুষ, এত সাহসী, এত জিদি, বাবুর কথা হুইন্না কোনও জব দিতে পারে না। খালি মিনমিন মিনমিন করে। ওই মিনমিনানি দেইক্কা বাবু কইলো, এইডা এমুন মিনমিনায় ক্যা? মেন্দা নি? ওই যে বাবু মেন্দা কইলো, তারপর থিকাঐ বেপারিরা অইয়া গেল মেন্দা। বুজলি?

বাদলা আবার হাসল। হ বুজছি। কিচ্ছাডা বহুত ভাল।

মোতালেব একটু রাগলো। কিচ্ছা না বেডা। সত্য ঘটনা।

আইচ্ছা ঠিক আছে।

ছেউল্লার বাড়ি ছাড়িয়ে ওরা ততক্ষণে বিলে নেমে গেছে। চারদিকে চৈত্রমাসের বাজখাই রোদ। এই রোদে বিলভরা ইরিধানের খেত গোড়ায় পানি নিয়ে ঝিমঝিম করছে। দূরে গোরস্থানের লগে পুকুরে ম্যালা লোকজন। কারও হাতে পো, কারও ঝকিজাল। এখনও পলোয় চাব দিতে শুরু করেনি কেঐ, খ্যাও দিতে শুরু করেনি ঝকিজাল। পুকুর জোড়া ঠাসা কচুরি। কচুরি তোলা শুরু হয়ে গেছে। কচুরি তোলা হয়ে গেলে পরিষ্কার পানিতে পলো নিয়ে নামবে লোকে, খ্যাও দিতে শুরু করবে ঝাঁকিজাল।

ওদিকে তাকিয়ে বাদলা উত্তেজিত হল। মোতালেবকাকা, বেবাকতে তো নাইম্মা গেছে। আমরা যাওনের আগেঐ বেবাক মাছ ধইরা হালাইবো।

এতদূর থেকেও আগেই ব্যাপারটা দেখে নিয়েছে মোতালেব। শান্ত গলায় বলল, আরে বেডা। খালি কচুরি উড়াইতাছে। আস্তে হাঁট। কচুরি উডাইন্না শেষ কইরা মাইনষে যহন পলো লইয়া জাল লইয়া নামবো তহন গিয়া আমরা পুকঐর পারে খাড়ামু। অহন গেলে কচুরি উড়ান লাগবো। কচুরি উডান বহুত কষ্টের কাম। মাইনষে উড়াইয়া সাফা করুক, আমি গিয়া পলো লইয়া নামুম। কোনও কষ্ট করুম না, মাছটি ধইরা লইয়ামু।

শুনে খুশি হল বাদলা। আপনে বহুত চালাক মানুষ মোতালেবকাকা।

আমার লগে থাক, তুইও চালাক অইয়া যাবি।

হ আছি তো আপনের লগে। চালাকও ইডু ইট্টু অইতাছি।

খানিক চুপচাপ হেঁটে বাদলা বলল, মেন্দাগো আর কোনও কিচ্ছা নাই?

মোতালেব আবার একটা ধমক দিল। তরে না কইলাম, কিচ্ছা না, সত্য ঘটনা।

হ কইছেন।

তয়?

মোক দিয়া আইয়া পড়ছে। কন আরও সত্য ঘটনা কন।

আমার পরদাদার নাম আছিলো কিয়ামুদ্দিন হাজি। তার ভাই আছিলো কাদির মেন্দা। এমুন জুয়ান আছিলো, এইরকম চইত মাইস্যা রইদ্রে নৌকা মাথায় দিয়া হাঁটতো।

কী? কী মাথায় দিয়া হাঁটতো?

নৌকা। ডিঙ্গিনৌকা, কোষানৌকা মাথলার লাহান মাথায় দিয়া হাঁটতো। সাবাসনগর বিলাসপুর এই হগল গ্রাম আছিলো পদ্মার পারে। পদ্মায় তহন ম্যালা কুমইর (কুমির) আছিল। একদিন গাঙ্গে নাইতে নামছে কাদির মেন্দা, তার পাও কামড় দিয়া ধরছে বিরাট এক কুমইরে। হেয় করছে কী, কুমইরডারে টাইন্না ছুডাইছে। তারবাদে পারে উড়াইয়া আছড়াইয়া আছড়াইয়া মারছে।

শুনে বাদলা হতভম্ব। কন কী, কুমইর আছড়াইয়া মারছে?

হ বেড়া। যেই মানুষ নাও মাথায় দিয়া হাঁটতো, হেয় একহান কুমইর আছড়াইয়া মারতে পারবো না?

হ পারনের তো কথা।

মোতালেব একটু চুপ করে রইল। কাঁধে ধরা পলো এক কাঁধ থেকে আরেক কাঁধে আনল। আইজ থিকা একশো সইত্তর বচ্ছর আগে ফরিদপুরের সাবাসনগর বিলাসপুর এই হগল গ্রাম পদ্মায় ভাইঙ্গা যায়। আমার পরদাদারা আছিল ছয় ভাই। ওই যে কইলাম, বহুত জুয়ান আছিলো তারা। তয় গাঙ্গের লগে তো জুয়ানকি চলে না। গাঙ্গের ভাঙ্গনে তারা গেল বাস্তুহারা অইয়া। বাড়িঘর জাগাজমিন বেবাক গেল পদ্মায়। ছয়ভাই বউ পোলাপান লইয়া নৌকায় কইরা পদ্মা পাড়ি দিল। ভাইগ্যাকূলে আইয়া নামলো। নাইম্মা তাগো এক জ্ঞাতি আউয়াল তালুকদারের পরদাদার লগে দেহা অইলো। আউয়াল তালুকদারের পরদাদার নামডা আমি ভুইল্লা গেছি।

বাদলা উৎসাহী গলায় বলল, কাম নাই নামের। আপনে কন।

হ কই। হেয় কইলো, লন মেদিনমণ্ডল যাই। হেইডা হিন্দু বাবুগো গেরাম। দুই-চাইর ঘর মোসলমানও আছে। গেলে বাবুরা তালুক দিতে পারে, থাকখাওনের জাগাজমিন দিতে পারে। আমগো লাহান জুয়ান মর্দ মানুষগো বহুত দরকার তাগো। এই আমার পরদাদায় আইলো মেদিনমণ্ডল গেরামে। আহনের পর ঠিকঐ বাবুরা তাগো তালুক দিল, জাগা সম্পত্তি দিল। তালুক পাইয়া আউয়ালের পরদাদায় অইয়া গেল তালুকদর। আর আমার পরদাদারা পাইলো জাগাসম্পত্তি, বাড়িঘর। তালুক পাইলো না দেইক্কা তালুকদার অইতে পারলো না। কাউলিপাড়ার জমিদাররা মেন্দা কইছিলো মেন্দাঐ রইয়া গেল।

একটু থামল মোতালেব। তয় একহান কথা কইলাম দেলরা বুজি আর আমি দুইজনেঐ তরে ভুল কইছি। এই মেদিনমণ্ডল গেরাম ছাড়াও কইলাম আরেকহান মেন্দাবাড়ি আছে।

সত্যই?

হ।

কোন গেরামে?

ভাইগ্যাকূল। ওই যে কাদির মেন্দা, নৌকা মাথায় দিয়া চলতো, কুমইর আছড়াইয়া মারতো, হেয় কইলাম মেদিনমণ্ডল আহে নাই। ভাইগ্যাকূলেঐ রইয়া গেছিলো। এর লেইগা ওই গেরামে আরেকহান মেন্দাবাড়ি আছে। তয় আমগো লগে তাগো কোনও সমন্দ নাই। কে কোনহানে গেছে গা কে জানে! মেন্দা পরিচয়ও অহন আর অনেকের নাই। নামের লগে পদবিডা কেঐ আর লাগায় না। এই ধর আমার নাম। পুরা নাম অইলো আব্দুল মোতালেব মেন্দা। মেন্দা তো আমিঐ লাগাই না। নাম কই মোছাড়া। খালি আব্দুল মোতালেব।

পুকুরের কাছাকাছি চলে এসেছে ওরা। হঠাৎ করেই যেন মোতালেবের মনে পড়েছে এমন গলায় বলল, ওই বাদলা, তর বলে মোসলমানি?

বাদলা মহা উৎসাহের গলায় বলল, হ।

কবে?

শুক্কুরবার বিয়ালে।

ঠিক আছে। মোসলমানির সমায় আমি কইলাম ধরুম তরে।

আইচ্ছা ধইরেন।

তর মা’রে কইয়া রাখিচ। আর ক্ষীর য্যান আমারে ইট্টু বেশি কইরা খাওয়ায়।

বাদলা আবার হাসল। আইচ্ছা কমু নে।

একটু থেমে বলল, ও মোতালেবকাকা, মোসলমানি করনের সমায় কেমুন লাগে? অনেক দুঃকু পাওয়া যায়?

আরে না বেডা। খালি একহান পিপড়ার কামোড়। তুই উদিসঐ পাবি না। তয় তর মা’রে কইচ আবদুলরে দিয়া করাইতে। হাজামবাড়ির মইদ্যে আবদুলের কামড়াঐ ভাল।

বাদলা আবার বলল, আইচ্ছা।

.

রোয়াইলতলার ছাপরাঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আবদুল খুবই মোলায়েম গলায় তার মাকে ডাকতে লাগল। মা, ওমা মা।

দুপুরের ভাত খেয়ে মেয়ের পাশে একটু কাত হয়েছিল তছির মা। তছি কাঁথা মুড়া দিয়া শুয়ে আছে। তার পাশে শাড়ির আঁচলে মুখ ঢেকে শুয়েছিল মা। কখন ঘুমঘুম ভাব হয়েছে। উদিস পায়নি। আবদুলের ডাকে ভাবটা কাটল। ধীর শান্ত ভঙ্গিতে উঠে বসতে বসতে বলল, কী রে বাজান, ডাক পারচ ক্যা?

ইট্টু বাইরে আহো। কথার কাম আছে।

কাঁথার তলায় তছি জেগে না ঘুমিয়ে বোঝা যায় না। তবে দিনেরবেলাটা সে কমবেশি ঘুমায়। জেগে থাকে সারাটা রাত।

তবে কারও গলার বা পায়ের শব্দ পেলে যে ঘুমঘোরেও চমকে ওঠে সে, ভেঙে যায় ঘুম, মা সেটা টের পায়। যদিও তছি নিজে কোনও শব্দ করে না, কথা বলে না, কাঁথার তলার অন্ধকার দুনিয়ায় লুকিয়ে থাকে, তবু মা টের পায়।

এখনও পেল।

আবদুলের ডাকে তার যেমন তন্দ্রা ভাঙছে, সে যেমন জেগে উঠছে, তছিও তেমনই জেগে উঠছে। ভাইর গলা চিনে আশ্বস্ত হয়েছে।

তছির মা ঝাঁপ সরিয়ে ঘর থেকে বেরুল। কী রে বাজান? কী অইছে?

বাইরে তখন বিকাল প্রায় হয়ে আসছে। তবু রোদের তেজ কমেনি। গাছপালা উঠান পালান আর ঘরের চাল রোদের তেজে ভাল রকমই পুড়ছিল।

মা’কে দেখে ভারী আনন্দের একখান হাসি হাসল আবদুল। একহান কাম আইছে।

এই কাম যে মুসলমানির মা তা বুঝে গেল। মুসলমানির কাজ পেলে এভাবেই বলে হাজামবাড়ির লোকে। অন্যান্য নানানপদের কাজ করে তারা বেঁচে থাকে ঠিকই কিন্তু মূল পেশার কাজ যখন হাতে আসে তখন চেহারায় খেলা করে অন্য রকমের ভাললাগা।

আবদুলের চেহারায় আজ তেমন ভাললাগা খেলা করছিল।

ছেলের মুখ দেখে মাও খুশি। বলল, ভাল, খুব ভাল। তয় কোন গেরামের কাম? কোন বাড়ির?

আমগো গেরামেরঐ। মেন্দাবাড়ির।

কোন মোবাড়ি?

ওই তো দেলরা আম্মাগো বাড়ি।

মা অবাক। ওই বাইত্তে মোসলমানি করানের পোলা কো?

আবদুল হাসল। আছে।

কেডা?

দেলরা আম্মাগো ঘরে থাকে রাবি আর মতলা, অগো পোলা বাদলা।

হ বুজছি। তয় কামডা কবে?

এইত্তো রাবি আইয়া কইয়া গেল। শুক্কুরবার বিয়ালে।

অরা টেকাপয়সা দিতে পারবো?

আমিও পয়লা এইডা চিন্তা করছি। রাবিরে কইলাম। হুইন্না কইলো হেইডা চিন্তা কইরেন না। অন্যহানে কাম কইরা যা পান আমার পোলার কামেও হেইডাঐ পাইবেন।

তয় মনে হয় দেলরা দিব টেকাডা।

আমারও মনে অয়। দেলরা আম্মায় দিলে আর কোনও চিন্তা নাই। কাম অওনের লগে লগেঐ টেকা হাতে পামু।

মায়ের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে আবদুল বলল, পাগলনির খবর কী? রাইত ভইরা জাইগ্না থাকে, দিন ভইরা ঘুম, বাইত থিকা তো দূরের কথা আইজ দুই-আড়াইমাস ঘর থিকাঐ বাইর অয় না। এইডা কেমুন পাগলামি মা?

চোখ তুলে ছেলের মুখের দিকে তাকাল মা। খানিক তাকিয়ে থেকে ভাবল, কথাটা কি আবদুলকে সে বলবে! একা একা এই যন্ত্রণা সে আর বুকে চেপে রাখতে পারছে না। তছির সঙ্গে তার জীবন বদলে গেছে। তারও দিন গেছে রাত হয়ে, রাত হয়েছে দিন। হাত পা কান মাথা শরীর সব বাঁধা পড়ে আছে রোয়াইলতলার ঘরে। আবদুলের যে ছেলেটা, বারেক দিনরাত চব্বিশঘণ্টা দাদির কাছে সেই বারেকের দিকেও আগের মতো নজর দিতে পারছে না।

এই যন্ত্রণার কারণ কি সে আবদুলকে বলবে?

কিন্তু তছি যদি কোনওমতে টের পায় বা জানতে পারে যে মা তার বড়ছেলেকে কথাটা বলে দিয়েছে তা হলে আর রক্ষা নাই। কাঁথার তলা থেকে দুইহাত বের করে গলা টিপে ধরবে মায়ের, মায়ের দশাও করবে রুস্তম রিকশাআলার মতো।

তবু কথাটা আবদুলকে বলা উচিত। এমনভাবে বলবে, এত সাবধানে যেন সে আর আবদুল ছাড়া দুনিয়ার আর কেউ জানতে না পারে। ছেলেকে সব খুলে বলতে পারলে মায়ের বুক কিছুটা হলেও হালকা হবে। কিছুটা হলেও বেঁচে যাবে মা।

তছির মা তারপর আবদুলের মতোই ফিসফিস করে বলল, তর লগে আমার একহান কথা আছে। এহেনে কওন যাইবো না। কেঐ য্যান না হোনে এমুন কইরা কওন লাগবো। কোনও নিটাল জাগায় ল।

নিটাল জাগা অহন বাড়ির সবহানে। তোমগো বউ পোলাপান লইয়া ঘরে হুইয়া রইছে। যেহেনে ইচ্ছা বইয়া কথা কইতে পারো।

তছির মা আগের মতোই ফিসফিস করে বলল, তয় যেই মিহি ইচ্ছা ল। এই ঘরের সামনে কওন যাইবো না। কোনওভাবে যুদি পাগলনির কানে যায় তয় সব্বনাশ অইয়া যাইবো। অর হাত থিকা আমারে বাঁচাইতে পারবি না।

মায়ের কথা শুনে আবদুল চিন্তিত হল। কও কী?

হ।

ছেলের হাত ধরে অনেকটা যেন জোর করেই তাকে নিয়ে বাড়ির উত্তর-পশ্চিম কোণে চলে এল তছির মা। এদিকটায় বিশাল দুইখানা বড়ইগাছ। বড়ইতলাটা ঝকঝকা তকতকা। বাড়ির পোলাপান খেলা করে বলে আবদুলের বউ যত্ন করে ঝাট দিয়ে রাখে। বড়ইতলার একপাশে কিছু খড়নাড়া কিছু শুকনা ধইনচা (ধনচে) পড়ে আছে। অর্ধেকটা গাছের ছায়ায় অর্ধেকটা রোদে। খড়নাড়ার উপর ছায়ার দিকটায় গিয়ে বসল মা-ছেলে। বসেই উল্কণ্ঠিত গলায় আবদুল বলল, কী অইছে মা?

ছেলের কাছে কথাটা বলার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় যে চাপা উত্তেজনা মায়ের মনে ছিল, এতক্ষণে সেই ভাব সে চাপা দিয়েছে। এখন ধীর গম্ভীর গলায় বলল, তয় তুই আর আমি ছাড়া কথাটা অন্য কেঐ জানলে, বাজানরে, সব্বনাশ অইয়া যাইবো।

আবদুল অধৈর্যের গলায় বলল, কী অইছে হেইডা কও। আসল কথা না কইয়া এত প্যাচাইল পারতাছো ক্যা?

তর বইনে এক বেডারে মাইরা হালাইছে।

কথাটা যেন বুঝতে পারল না আবদুল। বলল, কী? কী করছে?

খুন করছে এক বেড়ারে, খুন।

আবদুলের বুকটা হিম হয়ে গেল। চোত মাসের বিকালের দিককার গরমেও কেমন শীত করে উঠল তার। গলা শুকিয়ে এল। ঢোক গিলে কোনওরকমে বলল, কী কইলা? খুন। করছে? আমার বইনে মানুষ খুন করছে?

হ।

কারে, কারে খুন করছে?

কথাটা তুই হোনছচ। ওই যে দুই-আড়াই মাস আগে একদিন ছিন্নগর থিকা আইয়া আমারে কইলি, রোস্তম নামের এক রিকশাআলার লাচ পাওয়া গেছে একহান ছাড়াবাড়ির লগের খালে….।

মায়ের কথা শেষ হওয়ার আগেই আবদুল উত্তেজিত গলায় বলল, হ। বেড়ার গলায় গামছার ফাঁস আছিলো।

হ ওই খুনডা তর বইনে করছে।

কও কী তুমি?

হ। সত্য। পাগলনি আমারে বেবাক কইছে।

রোস্তম রিশকাআলারে ও পাইলো কই? অতদূর গেছিলো কেমতে?

রিশকাডা লইয়াইছিল এনামুল। পাগলনিরে দশহান টেকাও দিছিল। পাগলনি চাইছিল মুরলিভাজা খাইতে। মুরলি খাওনের লোভ দেহাইয়া কুমতলবে রোস্তম অরে রিশকায় উডাইছিল….।

এবারও মায়ের কথা শেষ করতে দিল না আবদুল। ধরা গলায় বলল, বুজছি বুজছি। আর কওন লাগবো না। কেমতে কী হইছে আমি অহন পানির লাহান বোজতাছি।

যেন নিজের কাছে নিজে বলছে এমন গলায় আবদুল বলল, হায় হায় অহন কী অইবো? থানার পুলিশ দারগারা তো বেবাক খোঁজখবর লইয়া হালাইবো, কেমতে কী অইছে, কে খুন করছে বেবাক বিচড়াইয়া বাইর কইরা হালাইবো। ধরা পড়লে পাগলনির তো ফাঁসি অইবো।

হ এই চিন্তায়ঐত্তো মইরা যাইতাছি আমি।

শিশুর মতো অস্থির গলায় আবদুল বলল, ওমা, হেদিন থিকাঐ পাগলনি এই ভেক ধরছে? নাইড়া অইয়া গেছে, হারাদিন কেঁতার তলে পইড়া থাকে, ঘুমায়। ঘর থিকা বাইর অয় না। খায়ও না। রাইত্রে উইট্টা চুপ্পে চুপ্পে বেবাক কাম করে। নায় পোয়, দিন রাইত্রের ভাত তুমি রাইক্কা দেও হেই ভাতপানি খায়!

হ।

তয় এমুন কইরা ও বাঁচতে পারবো?

কেমতে কমু বাজান?

দুইদিন আগে আর পরে পুলিশ দারোগারা বিচড়াইয়া বাইর করবোঐ ওদিন রিশকা লইয়া কোন গেরামে আইছিলো রোস্তম। কারে নামাইয়া কারে উডাইছিলো রিশকায়। কেমতে কী অইছে বেবাক বাইর কইরা হালাইবো।

হ আমিও এই ডর ডরাইতাছি।

একটু থেমে বলল, তয় এতডি দিন অইয়া গেল অহনতরি তো কিছু অইলো না বাজান। পুলিশ দারগারা ভুইল্লা যায় নাই তো ঘটনা?

আরে না। পাগল অইছো তুমি। খুনের মামলা পুলিশ দারগারা কোনওদিন ভোলে না। বারো বচ্ছর পর অইলেও বিচড়াইয়া ঠিকঐ বাইর করবো।

এবার তছির মা একেবারে ভেঙে পড়ল। তয় অর বাচন নাই বাজান? পুলিশ দারগার হাত থিকা, ফাঁসির দড়ি থিকা অর বাঁচন নাই?

আবদুল ভাঙাচোরা গলায় বলল, আল্লাহ ছাড়া কেঐ কইতে পারবো না। অরে অহন বাঁচানের মালিক আল্লায়।

নাকি অরে বাইত থিকা কোনওহানে সরায় দিবি বাজান? অন্য কোনওহানে গিয়া পলাই থাকুক।

কই সরাই দিবা? কই পলাই থাকবো?

তগ জ্ঞাতিগুষ্ঠির কাছে। রানাইদ্যা।

না, জ্ঞাতিগুষ্ঠিরা নানান পদের চিন্তা ভাবনা করবো। কীর লেইগা পাগলনিরে আমরা ওই গেরামে পাইছি এই হগল লইয়া প্যাচাইল পোচাইল পাইড়া আরও ভেজাল লাগাই দিব। আর পুলিশ দারগারা আইয়া যুদি অরে বাইত্তে বিচড়াইয়া না পায় তয় পয়লাঐ যাইবো রানাইদ্যা।

ক্যা?

পুলিশ দারগারা জানে রানাইদ্যায় আমগো বংশের মানুষ বেশি। পাগলনিরে আমরা ঐ গেরামে হামলাইয়া রাকছি।

হ ঠিক কইছচ বাজান। তয় সুবইদ্দা (সুভাই) লইয়া যা। শইপ্পার (শফির) হৌর বাইত্তে থুইয়া আয়।

শইপ্পা অরে রাকতে রাজি অইবো না।

ক্যা?

ও থাকে ঘরজামাই। হেই বাইত্তে নিজের বইনরে নিয়া রাখবো কেমতে?

হ কথা ঠিক। তয় কি কুগইট্টা রাইক্কাবি? অজুফার জামাই বাইত্তে?

আবদুল অসহায় গলায় বলল, এই বইসা পাগল মাইয়া কেঐ কাঐর বাইত্তে রাকতে চাইবো, কও। আমরা অইলে চাইতাম?

না চাইতাম না। তয় শইপ্পা তর ভাই, অজুফা তর বইন। পাগলনি অউক আর যাই অউক, বিপদে পড়া বইনরে অরা জাগা দিবো না?

মা দিবো না। তোমার ওই দুইডা পোলা মাইয়া বহুত স্বার্থবাজ। নিজেরডা ছাড়া কিচ্ছু বোজে না।

মা কেঁদে ফেলল। তয় কি আমার মাইয়াডা বাঁচবো না? জেল ফাঁসিতে যাইবো?

একথায় আবদুলেরও চোখ ভরে পানি এল। অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে চোখের পানি সামলাতে লাগল সে। তারপর যেন হঠাৎ মনে পড়েছে এমন গলায় বলল, ওমা, আমরা যে মতো চিন্তা করতাছি পাগলনিরে লইয়া, আমরা যুদি কোনও ব্যবস্থা করিও, কোনওহানে অরে পাড়াইতে চাই, ও তো যাইবো না। চিইইর বাইকইর পাইড়া বেবাক আন্ধার কইরা হালাইবো।

মা হাহাকার করে উঠল। না বাজান না, তছি অমুন করবো না।

কেমতে বোজলা?

ও ভাল অইয়া গেছে বাজান, একদোম ভাল অইয়া গেছে।

এই অবস্থায়ও আবদুল খুবই অবাক হল। কী কইলা? ভাল অইয়া গেছে? হ বাজান। ও অহন আর পাগল না। এর মইদ্যে একদিন, বানেছার যেদিন মাইয়া অইলো, হেদিন আমার লগে বহুত কথা কইলো। এতো ভাল কথা কোনও পাগলে কয় না বাজান। ও একদোম ভাল অইয়া গেছে।

আবদুল কাতর ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। না মা, তুমি বোজো নাই। ভাল ও অয় নাই। এইডা অর আরেক রকমের পাগলামি। যুদি ভাল অইতো তয় এমতে ও থাকতো না। দিনরে রাইত কইরা, রাইতরে দিন, নাইড়া মাথা, কেঁতার তল, না মা, এইডা ভালর লক্ষণ না। এইডা আরও বড় পাগলামি। মানুষ খুন কইরা ও বদ্ধপাগল হইয়া গেছে।

হ ঠিক কথাই কইছচ। আসলে এইডা আরও বড় পাগলামি।

একটু থেমে হাহাকারের গলায় তছির মা বলল, আহা রে, আহা। কী পোড়া কপাল মাইয়াডার আমার। জন্ম থিকা পাগল। যুদি পাগল না অইয়া ভাল অইতো তয় অজুফার লাহান অরও বিয়াশাদি অইতো, জামাই সংসার পোলাপান অইতো। জীবনডা মাইনষের জীবন অইতো। হেইডা তো অইলোঐ না, মইদ্যে থিকা ও অইলো খুনি। মানুষ খুন করলো। জীবন যেমতে কাটতে ছিল কাটতো, অহন যে যাইবো জেল ফাঁসিতে! গলায় ফাসের দড়ি লইয়া যে মরবো! আহা রে আহা, আল্লা মাবুদে ক্যান অর জীবনডা এমুন করলো? জন্ম থিকা যে পাগল হে তো কোনও গুনা করতে পারে না। তয় অরে জীবনডা ভর এমুন শাস্তি আল্লায় ক্যান দিলো? কোন গুনার শাস্তি এইডা?

মা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।

মায়ের পাশে বসা আবদুলও তখন নিঃশব্দে কাঁদছিল।

.

শোয়াব উল ঈমান নামক বিখ্যাত হাদীস গ্রন্থে কাবাগৃহের আদি ইতিহাস বর্ণিত হইয়াছে। সেই গ্রন্থে বলা হইয়াছে, হজরত আদম আলাইহেওয়াসাল্লাম ও বিবি হাওয়া যখন বেহেশত থেকে দুনিয়ায় নির্বাসিত হইলেন, তখন আদম আলাইহেওয়াসাল্লাম সারণদ্বীপে, অনেকের মতে বর্তমানে যাহা লঙ্কা, শ্রীলঙ্কা আর বিবি হাওয়া আরব দেশে পতিত হইলেন। প্রায় একশত বৎসর উভয়ে এইভাবে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকিলেন। অতঃপর, অনেক সাধনার পর হজরত আদম আলাইহেওয়াসাল্লাম আরব দেশে আসিয়া বিবি হাওয়ার সহিত মিলিত হইলেন। তখন হজরত আদম আলাইহেওয়াসাল্লাম কৃতজ্ঞতাভরে আল্লাহতায়ালার সমীপে প্রার্থনা করিলেন, হে আল্লাহ, পাকপরোয়ারদিগার! বেহেশতে অবস্থান কালে বায়তুল মামুর নামক যে মসজিদে ফেরেশতাগণের সহিত আমি নিত্য তোমার ইবাদত করিতাম সেই রকম একটি মসজিদ তুমি আমাকে দান করো, যাহাতে দুনিয়াতেও আমরা তোমার গুণগান। করিতে পারি। আদম আলাইহেওয়াসাল্লামের এই প্রার্থনা আল্লাহপাক কবুল করিলেন। তখন সেই বেহেশতি বায়তুল মামুরের একটি প্রতিকৃতি দুনিয়াতে নামিয়া আসিল। হজরত আদম সন্তুষ্টচিত্তে সেইখানে ইবাদত বন্দেগি করিতে লাগিলেন। ইহাই হইতেছে কাবাগৃহ। একটি বেহেশতি ঝরনাও সেইখানে প্রবাহিত হইতে থাকে। সেই ঝরনাই পবিত্র জমজম।

মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেবের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সোনামিয়া ফিসফিস করে বলল, সোবহানাল্লাহ, সোবহানাল্লাহ।

জুমার নামাজের অনেক আগেই আজ খাইগো বাড়ির মসজিদে চলে আসছে সোনামিয়া। অনেকদিন ধরেই মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেবের মুরিদ হয়েছে সে। যখন তখন হুজুরের এখানে এসে বসে থাকে। হুজুরের কথা শোনে। ধর্মের কত কিছু যে জানেন হুজুর। যে-কোনও বিষয়ে প্রশ্ন করলে কোরান হাদীস থেকে বয়ান করে যান। কথা বলার ভঙ্গিটা কী সুন্দর! শুনলে শুধু শুনতেই ইচ্ছা করে।

আজ মসজিদে এসে সোনামিয়া দেখে তখনও নামাজিরা কেউ আসেনি। হুজুর একাকী চুপচাপ বসে আছেন মসজিদের বারান্দায়। যেন গভীর করে ভাবছেন কিছু। সোনামিয়াকে দেখে মৃদু হাসলেন। আসেন বাবা, আসেন।

তারপর কথায় কথায় সোনামিয়া জানতে চেয়েছিল দুনিয়ার প্রথম মসজিদের কথা। হুজুর এতক্ষণ ধরে সে-কথাই বলছিলেন। হয়তো আরও অনেক কথাই বলতেন, তার আগেই আজানের সময় হয়ে গেছে। নামাজিরা আসতে শুরু করেছে।

নামাজ শেষ হওয়ার বেশ খানিক পর মসজিদ থেকে বেরিয়েছেন মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব। তখনও সোনামিয়া আছে, অন্য সবাই যে যার মতো চলে গেছে। সোনামিয়াকে কিছু একটা বলতে যাবেন তিনি, দেখেন মসজিদের বারান্দার দক্ষিণ কোণের দিকে ঘোমটা ঘামটা দিয়ে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক মহিলা। সঙ্গে দশ-এগারো বছরের একটি ছেলে। মা-ছেলে কাউকেই তিনি চিনতে পারলেন না।

চিনল সোনামিয়া। বলল, কী রে বাদলা, কীর লেইগা আইছচ?

বাদলা তার স্বভাব মতন চটপটা গলায় বলল, আমি আহি নাই। মায় আমারে লইয়াইছে।

কীর লেইগা?

হেইডা মারে জিগান।

সোনামিয়া রাবির দিকে তাকাল। কীর লেইগা আইছো কও।

ঘোমটায় মুখ ঢাকা রাবি বলল, আইছি হুজুরের কাছে।

এবার মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব নরম মায়াবী গলায় বললেন, কী জন্য আসছেন মা, বলেন।

আমার পোলাডার আইজ বিয়ালে মোসলমানি করামু। এর লেইগা আপনের কাছে লইয়াইছি। অরে আপনে ইট্টু দোয়া কইরা দেন হুজুর। কামডা য্যান ভাল মতন অয়। ও য্যান দুঃকু মুক্কু না পায়।

আচ্ছা ঠিক আছে, ঠিক আছে।

বলেই ধীর পায়ে বাদলার কাছে এগিয়ে এলেন তিনি। বাদলার মাথায় হাত রেখে বললেন, আল্লাহপাক তার রহমতের সব দরজা তোমার জন্য খুলে দেবেন বাবা। কোনও ভয় নেই। ইনসাল্লাহ ভালয় ভালয় সব কাজ হয়ে যাবে।

মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেবের আচরণে এতটাই মুগ্ধ হল রাবি, বাদলাকে ধাক্কা দিয়ে বলল, ওই বাদলা, ছেলাম কর হুজুররে। ভাল কইরা ছেলাম কর।

বাদলা নত হয়ে পায়ে হাত দিল মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেবের। বাদলার পর রাবিও করল কাজটা। তারপর দ্রুত পায়ে দক্ষিণ দিককার আমগাছগুলির গা ছুঁয়ে নেমে যাওয়া পথ ধরে মাঠের দিকে নেমে গেল।

মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব তখন সোনামিয়ার দিকে তাকিয়েছেন। মুসলমানি বা সুন্নতে খত্যর ইতিহাসটা আপনি জানেন বাবা?

সোনামিয়া বলল, না হুজুর। জানি না। কেমতে জানুম কন? আপনে তো কন নাই।

এখন কি শোনার সময় হবে আপনার?

ক্যান অইবো না?

দুপুর হয়ে গেছে। বাড়ি গিয়ে ভাত খাবেন না?

আমার অহনতরি খিদা লাগে নাই হুজুর। আরও ঘণ্টাহানি পর বাইত্তে গিয়া খামুনে।

তারপর হাসিমুখে বলল, আপনের লাগে নাই?

না বাবা। ভাত দিয়া গেছে?

জি দিয়ে গেছে।

আইজ কোন বাইত থিকা দিল?

কাজিবাড়ি থেকে।

কী খাইবেন জিগাই গেছিলো?

জি সকালবেলা এসে জানতে চেয়েছিল কী মাছ খাব। নাকি মুরগি রান্না করবে। এই কথাটা বলতে আমার কোনওদিনও ভাল লাগে না বাবা। গ্রামের একেকবাড়ি থেকে একেকদিন আমার খাবার দিচ্ছেন আপনারা, বেতনটা দিচ্ছে মসজিদ কমিটি। সবকিছু অতি সুন্দরভাবে চলছে। কিন্তু মানুষগুলো আপনাদের গ্রামের এত ভাল, যে বাড়ি থেকে যেদিন তিনবেলার খাবার পাঠাবার কথা সেই বাড়ি থেকে সেদিন কিংবা আগের দিন রাতে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করে কোন বেলায় কী খাব। আমি বলি আপনারা যা খাবেন তাই দিয়ে যাবেন বাবা। আমার জন্য বিশেষ কিছু করতে হবে না। কিন্তু তারা শোনে না। জোরাজোরি করে। কাজিবাড়ির লোকেরাও তাই করেছে। শেষপর্যন্ত আমি বলেছি যে কোনও মাছ হলেই হবে। তারা মাছই পাঠিয়েছে।

তয় আপনে খাইয়া লন হুজুর। আমি বহি। তারবাদে মোছলাডা (মাছলা মাছায়েল) হুইন্না বাইত্তে যাই।

না আমারও এখনও ক্ষুধা লাগেনি।

তয় লন মজ্জিদের ভিতরেঐ বহি হুজুর। ভিতরডা ঠান্ডা।

চলুন।

দুইজন মানুষ আবার ঢুকেছে মসজিদে। খোলা দরজা বরাবর বসেছে। বসেই নিমীলিত চোখে, পরিষ্কার মায়াবী গলায় মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব বলতে শুরু করেছেন মোসলমানি বা সুন্নতে খত্নার কথা। আল হোরায়রা রাদিআল্লাহুআনহু থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহুআলাইহেওয়াসাল্লাম বয়ান করিয়াছিলেন, আল্লাহর নবী হজরত ইব্রাহিম আলাইহেওয়াসাল্লাম নিজহস্তে নিজের খত্না করিয়াছিলেন। তখন তাহার বয়স আশি বৎসর। খৎনা করিলেন নিজহস্তের কুঠারের সাহায্যে।

এইটুকু শুনেই স্তম্ভিত হয়ে গেল সোনামিয়া। আপনমনে ফিসফিস করে বলল, সোবানাল্লাহ, সোবানাল্লাহ।

মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব তা খেয়াল করলেন না। আগের মতনই বলতে লাগলেন, হজরত ইব্রাহিম আলাইহেওয়াসাল্লামের পূর্বে খনা করিবার নিয়ম ছিল না। সর্বপ্রথম তিনিই খনা করিবার জন্য পরোয়ারদিগারের আদিষ্ট হন। যখন আল্লাহপাকের এই আদেশ তিনি উপলব্ধি করিলেন তখন তাঁহার বয়স আশি বৎসর। তিনি আল্লাহপাকের আদেশ পালনে এতই অনুগত ও উদগ্রীব রহিয়াছিলেন যে আশি বৎসর বয়সেই খত্নার মতো কঠিন ও যন্ত্রণাদায়ক কর্তব্য অতি তৎপরতার সঙ্গে সম্পন্ন করিলেন। আল্লাহপাকের আদেশ প্রাপ্তির সময় তাহার কাছে কাঠ কাটিবার একখানা কুঠার ছিল। অন্য কোনও অস্ত্র ছিল না। আল্লাহপাকের আদেশ পালনে বিলম্ব হবে এই আশঙ্কায় তিনি তৎক্ষণাৎ কুঠারের সাহায্যেই নিজের হাতে নিজের খত্নকার্য সম্পন্ন করিয়াছিলেন।

সোনামিয়া আবার বলল, সোবানাল্লাহ, সোবানাল্লাহ।

মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব বললেন, হজরত ইব্রাহিম আলাইহেওয়াসাল্লাম সম্বন্ধে আরও অনেক কথা আপনাকে আমি বলব বাবা। আস্তে আস্তে বলব। তার কাছ থেকে ইসলাম ধর্ম বহু কিছু পেয়েছে।

আইচ্ছা হুজুর, আইচ্ছা কইয়েন।

মাওলানা মহিউদ্দিন সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। তা হলে আপাতত…

তার কথা শেষ হবার আগেই যতটা দ্রুত সম্ভব উঠে দাঁড়াল সোনামিয়া। বিনীত গলায় বলল, জি হুজুর, জি। আপনে খাওয়াদাওয়া করেন। আমিও বাইত্তে যাই।

মসজিদের দক্ষিণ দিককার আমগাছে বসে একটা কাক ক্লান্ত গলায় কা কা করছিল।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *