২.৮ আতাহারের ঘরে নাস্তা

সকালবেলা আতাহারের ঘরে নাস্তা করতে বসেছে আলী আমজাদ, ছুটতে ছুটতে এল হেকমত। ছার, আপনের লগে কথার কাম আছে। তাড়াতাড়ি বাইরে আহেন।

আলী আমজাদের সামনে বড় রেকাবিতে ঘিয়ে ভাজা পরোটা আর চিতনামতো প্লেটে ডিমভাজা। পরোটা ছিঁড়ে ডিমভাজার উপর রেখে ডানহাতের পাঁচ আঙুলের চাপে কায়দা করে পরোটার তলায় ডিমভাজা নিয়ে মুখে দিচ্ছিল সে। চৌকিতে একপাশে বসা আতাহার, অন্যপাশে নিখিল। কাল সন্ধ্যা থেকেই এই ঘরে তারা। সুরুজ আর আলমগীর ছিল না। ফলে পাঁচজনের জিনিস তিনজনে খেয়েছে। জিনিসটাও ভালই ছিল। বিলাতি। ঢাকা থেকে আনিয়েছিল আলী আমজাদ। ভ্যাট সিক্সটি নাইন। ওই জিনিস খেয়ে অনেক রাত তরি জেগে, হইচই গল্পগুজব করে ঘুমিয়েছে। সকালবেলা উঠেছে বেলা করে। সকালের কাজটাজ সেরে মাত্র নাস্তা করতে বসেছে তখন এল হেকমত।

হেকমতের কথা শুনে খুবই বিরক্ত হল আলী আমজাদ। মুখে দেওয়া ডিম পরোটা চিবাতে চিবাতে জড়ানো গলায় বলল, কী অইছে?

হেকমত উত্তেজিত গলায় বলল, বাইরে আহেন। কইতাছি।

ক্যা এহেনে কওন যায় না?

হেকমত কথা বলবার আগেই আতাহার শ্লেষের গলায় বলল, আমরা অইলাম ফালতু মানুষ! আপনের মাইট্রাল সর্দার কথাবার্তা আমগো সামনে কইবো না। যান বাইরে যান, কথা হুইন্নাহেন। আর নাইলে আমি আর নিখিলা বাইরে যাই, এহেনে বইয়াঐ কথা হোনেন আপনে।

পরোটা ডিমভাজা নিখিলের প্লেটেও ছিল। মাত্র মুখে দিতে যাবে সে, আতাহারের কথা শুনে থামল। যদি বাইরে যেতে হয় তা হলে এখন আর মুখে দেবে না, ফিরে এসে দিবে। মাঝপথে খাওয়া থামাতে ভাল লাগবে না।

ওদিকে আতাহারের কথা খুবই গায়ে লেগেছে আলী আমজাদের। রেগেছে সে। হেকমতের দিকে তাকিয়ে শীতল গম্ভীর গলায় বলল, তুই যে একহান আবাল হেই পরমান আমি আগেঐ পাইছি। আইজ আবার নতুন কইরা পাইলাম। তয় এইডা লইয়া অহন তরে আমি কিছু কমু না। কমু পরে। দোস্তগো সামনে আমারে অপমান করলি। আমারে অপমান করনের মজা কেমুন হেইডা তুই পরে উদিস পাবি। অহন ক কী কইতে আইছস। বাইরে আমি যামু না। যা কওনের আমার দোস্তগো সামনেঐ ক।

এসব শুনে ভাল রকমের ফাঁপরে পড়ে গেল হেকমত। মুখটা আগেই ভয়ার্ত হয়েছিল, এখন শুকিয়ে চুন হল। গলাটাও শুকিয়েছে। ইচ্ছা হল আলী আমজাদের সামনে থেকে পানি ভরতি গেলাসটা নিয়ে ঢক ঢক করে পুরা পানিটা খেয়ে ফেলে।

আলী আমজাদ তখন খাওয়া রেখে ক্রুর চোখে তাকিয়ে আছে হেকমতের দিকে। কী রে কচ না কী অইছে?

হেকমত অসহায় গলায় বলল, কেমতে যে কই!

এই ধরনের পরিস্থিতিতে নিখিল সাধারণত কথা বলে না। তয় এখন বলল। মনে অয়। গোপন কথা। কনটেকদার সাব, আপনে বাইরে গিয়া হুইন্নাহেন।

আলী আমজাদ নিখিলের দিকে তাকাল। না আমি এহেনেঐ হুনুম। এহেনেঐ অর কওন লাগব। অর লাহান মাইনষের লগে আমার এমুন কোনও কথা থাকতে পারে না যেইডা তোমগো সামনে ও কইতে পারব না।

আতাহার তখন নির্বিকার ভঙ্গিতে নিজের মতো করে খেয়ে যাচ্ছে আর মনে মনে হাসছে। ভাল ফাঁপরেই কনটেকদার আর তার মাইট্টাল সর্দার আইজ পড়ছে। যত গোপন কথাঐ অউক আতাহারগো সামনে অহন হেইডা কওনঐ লাগবো হেকমতের।

হেকমতও ততক্ষণে ঠিক করে ফেলেছে কথাটা সে বলেই ফেলবে। তার কী! কনটেকদার সাবে যহন অন্যের সামনে হোনতে চাইতাছে, জবরদস্তি করতাছে তার লগে, না কইয়া। উপায় কী হেকমতের!

হেকমত বলল, কাইল রাইত্রে যেইমিহি মাড়ি পড়ছে ওইমিহির ভাঙ্গনে মাড়ির তল থিকা একজন মাইনষের তিন-চাইরহান লউং (আঙুল) বাইর অইয়া রইছে।

শুনে আলী আমজাদের গায়ে যেন আগুনের ছ্যাকা লাগল। কী? কী কইলি?

হ।

আতাহার-নিখিলও আলী আমজাদের মতন চমকেছে। খাওয়া ভুলে দুইজনেই তাকিয়ে আছে হেকমতের দিকে। খানিক আগের কথাবার্তা সবই ভুলে গেছে।

যেরকম দিশাহারা ভঙ্গিতে ছুটে আসছিল হেকমত বসে থেকেও আলী আমজাদের ভঙ্গি এখন সেইরকম দিশাহারা। কোনওরকমে বলল, কার লউং বাইর অইয়া রইছে মাডির তল থিকা? কেডা চাপা পইড়া মরছে? কেমতে মরছে? কেমতে অইলো কামডা?

এদিক ওদিক তাকিয়ে হেকমত খুবই সাবধানি গলায় বলল, ওই যে বুড়া একহান মাইট্রাল আছিল আদিলদ্দি, হেই বেডা।

তুই বুজলি কেমতে? লউং দেইক্কা?

আরে না। লউং দেইক্কা মানুষ চিনন যায়নি?

তয়?

রাইত্রে কাম কইরা গেছে যেই মাইট্টালরা তাগো খোঁজখবর লইয়া বুজছি বেবাকতে ফিরত গেছে খালি আদিলদ্দি ফিরে নাই। ওই বেডারে ফিরতে দেহে নাই কেঐ। কামের ফাঁকে, এশার নমজের সময় থিকা বলে অরে আর দেহে নাই কেঐ। আমার মনে অয় বেড়া তো নমজি মানুষ আছিলো, নমজের সমায় ভাঙ্গনের মিহি গিয়া নমজ পড়তে বইছে আর মাইট্টালরা অর উপরেঐ মাডি হালাইছে।

আলী আমজাদ কথা বলবার আগেই আতাহার বলল, হেইডা কেমতে অয়? একজন মাইনষের উপরে মাডি পড়বো আর হেয় চিক্কইর দিবো না?

হেকমত বলল, দেওনের মনে অয় সমায় পায় নাই। একলগে শয়ে শয়ে মাইনষে মাডি হালায়। চোক্কের নিমিষে এহেকটা জাগা ভইরা যায়।

আলী আমজাদ ভয়ার্ত গলায় বলল, যেমতেঐ মরুক, আমার কামে মাড়ি চাপা পইড়া মরছে একজন মানুষ, এইডা লইয়া তো বহুত বড় বিপাকে পইড়া যামু। কেস অইয়া যাইব আমার নামে। কাম বন্দ অইয়া যাইবো। আমি সাবকনটাকে কাম করি। বেবাক যাইবোগা আমার। হায় হায়, সব্বনাশ অইয়া গেছে।

আবার হেকমতের দিকে তাকাল আলী আমজাদ। মাইট্টালরা বেবাকতে দেকছে লউং? বেবাকতে জাইন্না গেছে ঘটনা?

না, কেঐ দেহে নাই? কেঐ জানে নাই?

শুনে বেশ বড় রকমের একটা ধাক্কা খেল আলী আমজাদ। খানিক আগে ভয়ে আতঙ্কে যে অন্ধকারে একেবারেই ডুবে গিয়েছিল সেই অন্ধকারে যেন মৃদু একটা আলোর রেখা দেখতে পেল। একটা আলোকিত পথ যেন বেরিয়ে এল গভীর অন্ধকার থেকে। খুবই উৎসাহের গলায় বলল, সত্যঐ কেঐ দেহে নাই? কেঐ জানে নাই?

হ। রাইত্রেঐত্তো কাম অনেক আউয়াইয়া গেছে। আদিলদ্দির লউং যেহেনে বাইর অইয়া রইছে তার থিকা বহুতদূর আউগ্নাইয়া গিয়া অহন মাডি হালাইতাছে মাইট্টালরা। ওইমিহি আর আহে নাই কেঐ।

আতাহার বলল, খালি তুমি একলা দেখছো?

হ।

আলী আমজাদ বলল, তুই দেকলি কেমতে? কামে আইয়া পয়লাঐত্তো আগের দিনের কামডা ঠিকঠাক লাহান অইছে কি না দেহি আমি। কোনওহানে মাডি কম পড়ল কি না, দুই-চাইর গোড়া মাডি হালান লাগব কি না, দেহি। কাইল রাইত্রের কাম ঠিক লাহান অইছে কি না হেইডা দেকতে গিয়া দেহি মাডির তল থিকা মাইনষের তিন-চাইরহান লউং বাইর অইয়া রইছে।

তারবাদে কী করলি?

পয়লা তো এক্কেরে ডরাইয়া গেছি। পেরায় চিক্কইর দিয়া হালাইছিলাম। তয় চিক্কইরডা দেই নাই। আর ভাগ্যিডা ভাল যে লগে কেঐ আছিলো না, আর কেঐ দেহে নাই। তয় কারবার কী অইছে লগে লগেঐ আমি বুইজ্জা গেছি। বুইজ্জা নিজের হাতে কহেক খাবলা। মাড়ি দিয়া লউংডি ঢাইক্কা দিছি। তারবাদে মাইট্টালগো কাছ থিকা এমুনভাবে কাইল রাইত্রে কারা কারা কাম করছে বেবাক খবর লইছি, কেঐ চিন্তাঐ করতে পারবো না খবরডা আমি ক্যান লইতাছি। ওই খবর লইয়াঐ বোজলাম, মরছে আদিলদ্দি।

হেকমতের কথা শুনে হারিয়ে যাওয়া সাহস সবটুকুই ফিরত পেল আলী আমজাদ। মুগ্ধ গলায় বলল, তুই তো বাপের বেড়ারে হেকমইত্তা! বাঘের বাচ্চা তুই! নিজেঐত্তো বেবাক কিছু ম্যানেজ কইরা হালাইছস। আমারে তো বড় বাঁচান বাঁচায় দিছস তুই।

আতাহার রহস্যের গলায় বলল, হ। ঠিকঐ কইছেন। অহন আর কেঐ চিন্তাও করতে পারবো না যে রাস্তার মাডির তলে একজন মানুষ চাপা পইড়া মরছে। লাচটা অহনও ওহেনেঐ আছে। কেঐ যুদি, আদিলদ্দি না কী জানি নাম কইলো হেকমত, ওই বেডারে বিচড়াইতে আহে, কইলেঐ অইবো, কাম হালাইয়া রাইত্রের আন্দারে বেডা জানি কই গেছে গা।

হেকমতের মুখে এখন বেশ একটা স্বস্তির ভাব। আতাহারের দিকে তাকিয়ে বলল, হ এমুন কথাঐ কওন লাগবো। তয় মনে অয় না ঐ বেডারে বিচড়াইতে কেঐ আইবো।

ক্যা?

বেডার মনে অয় কেঐ নাই।

আলী আমজাদ গদগদ গলায় বলল, যাউক বিপদ অইতে অইতেও অয় নাই। আল্লায় বাঁচায় দিছে।

আতাহার বলল, কন হেকমইত্তা বাঁচাই দিছে।

হ, আসলে হেকমইত্তাঐ বাঁচাইছে।

আলী আমজাদ আবার খেতে শুরু করল। ডিমভাজা পরোটা মুখে দিয়ে হেকমতের দিকে তাকিয়ে চিবাতে চিবাতে বলল, আমি তর উপরে বহুত খুশি হইছি হেকমত। আইজ থিকা তর রোজ দশটেকা কইরা বেশি। তয় এই কথা য্যান আমরা এই চাইরজন ছাড়া আর কে না জানে।

হেকমত বিনীত গলায় বলল, চাইরজনেও জানতো না ছার। জানতাম খালি আপনে আর আমি। আপনে আমার উপরে চেইত্তা গেলেন দেইক্কা আপনের দুই দোস্তে জানলো।

আতাহারও তখন আবার খেতে শুরু করেছে। খেতে খেতে বলল, আমরা জাননে কোনও ক্ষতি অয় নাই। আমরা কনটেকদার সাবের দোস্ত। জিন্দেগিতেও এই কথা কেঐরে কমু না।

হেকমত না, আলী আমজাদ বলল, হেইডা আমি জানি।

তারপর আবার তাকাল হেকমতের দিকে। হোন, অহন আরেকহান কাম করবি। যেহেনে আদিলদ্দি চাপা পড়ছে ওহেনে আরও বিশ-পঞ্চাশ গোড়া মাডি হালায় দে। মাইট্টালগো কবি জাগাড়ায় মাডি কম পড়ছে। কনটেকদার সাবে দেকলে চেতবো। তয় মাডি হালানের আগে তুই ভাল কইরা খ্যাল করবি লউংমউং দেহা যায়নি। কেঐ য্যান কিছু বোজতে না পারে।

না হেইডা পারব না। হেইডা আমি সাবধানেঐ করুম।

তয় তুই অহন যা। গিয়া কামডা কইরা হালা। আতাহারগো লইয়া আমি পরে আমুনে।

আইচ্ছা।

ঘর থেকে মাত্র বেরুবে হেকমত, আলী আমজাদ বলল, হোন।

হেকমত দাঁড়াল। কন ছার।

আমি তর উপরে বহুত খুশি অইছি, বহুত খুশি। এই জিন্দেগিতে আমার কাম থিকা আমি তরে কোনওদিন বাদ দিমু না। জিন্দেগি ভর তরে আমি দেহুম। আল্লার কছম।

হেকমত কোনও কথা বলল না। হাসিমুখে বেরিয়ে গেল।

হেকমত বেরিয়ে যাওয়ার পর আতাহার নিখিল দুইজনের দিকেই তাকাল আলী আমজাদ। বলল, কীরকম একহান বিপদ ঘইট্টা গেছে দেখছো?

ফাঁকে ফাঁকে আতাহার তার নাস্তা প্রায় শেষ করেছে। যেটুকু ডিম পরোটা প্লেটে ছিল সেটুকু মুখে দিয়া বলল, অহন তো বিপদ আর নাই। কাইট্টা গেছে। রাস্তায় যে মাইনষের জেতা (জ্যান্ত) কবর অইছে আমরা চাইরজন ছাড়া হেইকথা কোনওদিনও কেঐ জানবো না। তয় আপনের ভাগ্যিডা বহুত ভাল, হেকমইত্তার লাহান একজন মানুষ পাইছিলেন। হেকমইত্তার জাগায় যুদি অন্য মানুষ অইতো, অন্য মাইনষের চোক্কে যুদি ব্যাপারডা পড়তো, তয় এতক্ষুনে দেশগেরামের বেবাক মাইনষে জাইন্না যাইতো। থানা থিকা দারগা পুলিশ আইয়া মাড়িরতলা থিকা আদিলদ্দির লাচ বাইর করতো আর আপনেরে এরেস্ট করতো। দেশগেরামে একহান চিকরাচিকরি পইড়া যাইতো।

হ ঠিক কথা কইছো। তয় আরেক দিক দিয়াও আমার ভাগ্যি ভাল, তোমগো লাহান দোস্ত পাইছিলাম। তোমগো জাগায় অন্যমানুষ অইলে তারাও তো এইডা লইয়া আমারে বিপদে হালাইতে পারতো।

এবার নিখিলের দিকে তাকাল আলী আমজাদ। তুমি দিহি এক্কেরে চুপ কইরা আছো। নিখিল! তুমি দিহি কোনও কথা কও না?

ঘটনাটা শোনার পর থেকে নিখিল একেবারে স্তম্ভিত হয়ে আছে। সামান্য একটু খেয়ে। আর খেতেও পারছে না। খেতে ইচ্ছা করছে না তার, গলা দিয়া খাবার নামতে চাইছে না। মুখটাও ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। তবু হাসিমুখে আলী আমজাদের দিকে তাকাল। কোনওরকমে। বলল, কী কমু কন? যা অইছে হেইডা তো চিন্তাও করন যায় না। বিরাট একহান বিপদ আপনের মাথার উপরে আইয়াও গেছে গা। ভগবান আপনেরে বাঁচাই দিছে।

তয় তোমগো দুইজনের কাছে আমার একহান অনুরুদ আছে।

আতাহার বলল, আপনে কী কইবেন বুজছি আমি। তয় কথাডা কওন লাগবো না। আমগো দিয়া আপনের কোনও ক্ষতি অইবো না। আমরা একবার যারে বুক দেহাই তারে পিড দেহাই না। আপনে নিচচিন্ত থাকেন। যেমতে যা চলতাছে ওমতে বেবাক চলবো। আমগো লইয়া চিন্তা না কইরা চিন্তা করবেন হেকমইত্তারে লইয়া। অর লগে রাগারাগি আর খারাপ ব্যাভার করবেন না। অরে খালি হাতে রাখবেন।

হ এইডা ঠিক বুদ্ধি দিছো। আইজ কইলাম এত সহজে আমি বাইচ্চা গেলাম অর লেইগাঐ।

তখনই চায়ের কথাটা মনে পড়ল আতাহারের। আরে এতক্ষণ হয়ে গেছে চা দিয়া যায় নাই কেন রহিমা? হেকমত না এলে অনেকক্ষণ আগেই নাস্তা খাওয়া হয়ে যেত, অনেকক্ষণ আগেই চায়ের দরকার হত! তা হলে কি হেকমতকে দেখেই চা নিয়ে এইঘরে আর ঢোকে নাই রহিমা?

তাই হবে।

আতাহার নিখিলের দিকে তাকাল। ওই নিখিলা, রানঘরে যা। রহিরে জিগা অহনও চা দেয় নাই ক্যা? তাড়াতাড়ি দিতে ক। চা খাইয়া কনটেকদার সাবের লগে বাইর অই। দেইক্কাহি ওইমিহির অবস্তা কী?

নিখিল কোনও কথা না বলে ঘর থেকে বেরুল। হাঁটাচলার ভঙ্গি মনমরা ধরনের।

.

দুপুরের ভাত খেয়ে একটু শোবে মরনি, দুয়ার বন্ধ করবার জন্য হাত বাড়িয়েছে, দেখে তার উঠানের উপর দিয়া হেঁটে যাচ্ছে নিখিল। সেই যে নূরজাহানের ঘটনার দিন মুরগি কিনা নিয়া গিয়াছিল নিখিল তারপর এই এতগুলি দিন তার লগে আর দেখা হয় নাই। এই বাড়িতে নিখিল আর আসে নাই।

আজও যে আসে নাই নিখিলের হাঁটাচলার ভঙ্গিতেই তা বোঝা যাচ্ছিল। হয়তো এদিকে কোথাও আসছিল, নিজেদের বাড়ির দিকে যাওয়ার জন্য মরনির উঠান পার হচ্ছে।

দুয়ারটা আর বন্ধ করল না মরনি। নিখিলকে ডাকল। ওই নিখিলা, হুইন্না যা।

উঠানের মাঝ বরাবর দাঁড়াল নিখিল। মরনির দিকে তাকাল। হাসিমুখে বলল, কন।

এই মিহি আয়।

নিখিল এসে ঘরের সামনে দাঁড়াল। আমার উপরে আপনে খুব চেইত্তা আছেন না পিসি?

মরনি হাসল। হ। চেতনের কারণ তুই জানচ।

ঘরের সামনের তক্তায় বসল নিখিল। তয় ইট্টু বহি। কথাবার্তা কইয়া যাই।

বয়।

মরনি নিজেও বসল দরজার সামনে। কই থিকা আইলি?

আতাহারগো লগে সড়কের মিহি আছিলাম।

ভাত খাইছ?

হ। খাইছি মাওয়ার বাজারের হইটালে?

ক্যা, হইটালে ক্যা?

আমারে আর আতাহাররে কনটেকদার সাবে খাওয়াইলা।

সড়কের কাম শেষ অইবো কবে রে?

দেরি আছে। তয় মাডির কাম বাইষ্যাকালের আগে যেমতে অউক শেষ করন লাগবো। তারবাদে শুরু অইবো অন্যকাম।

মরনি একটু চুপ করে রইল, তারপর বলল, তুই যে কইছিলি নূরজাহানের ব্যাপারে মাওলানা সাবে আর আতাহার কী চিন্তাভাবনা করে জানাবি আমারে, আর দিহি কিছু জানালি না?

নিখিল হাসল। এর লেইগাঐত্তো কইলাম আপনে আমার উপরে চেইত্তা রইছেন।

হ হেইডা আমি বুজছি। তয় অহন ক দিহি অবস্তাডা কী?

না অবস্তা ভালঐ।

কেমুন ভাল?

আতাহার আর অর বাপে খারাপ কিছু চিন্তাভাবনা করে নাই।

কেমতে বুজলি?

আমি তো চব্বিশ ঘণ্টা অগো লগে। চিন্তাভাবনা কিছু করলে আমার কানে আইতো। আর কানে আইলেঐ আমি আপনেরে জানাইতাম। কানে আহে নাই দেইক্কাঐ আপনের লগে আর দেহা করতে আহি নাই।

শুনে খুশি হল মরনি। তয় তো বহুত ভাল কথা। আল্লায় রহম করছে ছেমড়িরে। বাঁচাইয়া দিছে।

নিখিল কথা বলল না, উদাস হয়ে রইল।

নিখিলকে খেয়াল করল মরনি। তারপর বলল, কী চিন্তা করচ?

নিখিল চমকাল। কো কী চিন্তা করি!

তারপর হাসল। না পিসি, কিছু চিন্তা করি না।

আমার মনে অইলো কী জানি চিন্তা করতাছস?

না। আপনের লগে কথা কইতে কইতে হঠাৎ কইরা মজনুর কথা মনে অইলো। অনেকদিন দেহিনা অরে। দেশে আহে না?

মরনি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। না রে বাজান, বহুতদিন হইয়া গেল আহে না।

ক্যা আহে না ক্যা?

মাহাজনে ছুট্টি দেয় না।

ও কি পুরাপুরি খলিফা অইয়া গেছে?

্না অহনও পুরাপুরি অয় নাই। দুই-চাইর মাসের মইদ্যে অইয়া যাইব।

বেতনবেতন পায় না, নাকি পেডেভাতে কাম হিগতাছে?

পয়লা পয়লা পেডেভাতেঐ আছিলো। কয় মাস ধইরা বেতন পায়।

টেকাপয়সা পাড়ায় আপনেরে? চিডিপত্র লেখে?

হ পাড়ায়। পত্রও লেখে। এর মইদ্যে মন্নাদাদার বড়পোলা টিপুর লগে দুইশো টেকা পাড়াইছে। একহান পত্র লেখছে। বাইষ্যাকালের আগে বলে একবার দেশে আইবো। টিপু কইলো বছরহানির মইদ্যে বলে বড় খলিফা হইয়া যাইবো মজনু।

নিখিল কথা বলল না। আবার আগের মতন উদাস হয়ে গেল। নিখিলের এবারকার উদাসীনতা খেয়াল করল না মরনি। আপনমনে মজনুর কথা বলতে লাগল। মাসের পর মাস আমারে ছাইড়া থাকে পোলায়। অর মনডা আমার লেইগা কান্দে কি না কে জানে, আমার কান্দে। আমি অর চিন্তায় খাইতে পারি না, ঘুমাইতে পারি না। খালি পথ চাইয়া থাকি, কোনদিন আমার পোলাডা আইবো। ঢাকা থিকা গেরামের কোনও বাইত্তে কেঐ আইলে দৌড়াইয়া যাই অর খবর লইতে। অনেকের লগে মজনুর দেহা অয়, অনেকের লগে অয় না। তাও যাই। নানান পদের কথা কইয়া মজনুর খবর লই। তয় আমি যে পোলার লেইগা এমুন করি, পোলায় তো আমার লেইগা এমুন করে না।

করে পিসি। পোলায়ও করে। আপনে বোজতে পারেন না। দুই জনের দুই রকম। মজনু তো বিয়ানথিকা রাইত দোফর তরি কাম করে, তারপর খাইয়া দাইয়া ঘুম, তারবাদে বিয়ানে উইট্টা আবার কাম, কুনসুম আপনের কথা চিন্তা করবো। আর আপনে থাকেন একলা বাইত্তে। নিজের রান্ধন বাড়ন ছাড়া কোনও কাম নাই। হারাদিনঐ আজাইর। আজাইর দেইক্কাঐ খালি পোলার কথা চিন্তা করেন।

হ ঠিক কথাঐ কইছস বাজান।

আচমকা অন্য একটা কথা তুলল মরনি। ওই নিখিল, হুনছিলাম এনামুল বলে মজজিদ করবো দেশে, কো, করল না?

হুনছি তো আমিও। আতাহারের বাপে হইবো ইমাম। তার হাতে থাকবো মজজিদের সবকিছু।

কাম কাইজ শুরু অইছে?

না।

ক্যা অহনতরি অয় নাই ক্যা?

হেইডা কইতে পারুম না। তয় আমার মনে অয় বাইষ্যাকাল না গেলে, রাস্তার মাডি হালান শেষ না অইলে মজজিদের কাম শুরু অইবো না।

ক্যা? ইটা বালি রড সিমিট (সিমেন্ট) আনবো কেমতে?

বাইষ্যাকালে তো নৌকা দিয়া আনতে পারে!

আমার মনে অয় রাস্তার মাডি হালান শেষ অইলে, রাস্তার কামে যহন টেরাক ভইরা ইটা পাথর টানন শুরু হইবো তহন মজজিদের কামের লেইগাও টেরাক ভইরা ইটা বালি রড সিমিট পাডাইবো এনামুল দাদায়। আর এই হগল কাম শীতের দিনে করনঐ ভাল। মেগ বিষ্টি থাকে না।

হ ঠিক কথা কইছস।

দুইজন মানুষই তারপর চুপ করে থাকে। নিখিল একাকে আবার আগের মতন উদাস হয়ে যায়।

এবার নিখিলের উদাসিনতা ভাল ভাবেই খেয়াল করল মরনি। বলল, ওই ছেমড়া, কী অইছে তর?

নিখিল চমকাল। কো?

হ। দুইবার দেখলাম তুই জানি কী চিন্তা করতাছস! কী অইছে?

আরে না, কিচ্ছু না।

 আমার মনে অয় অইছে। তুই আমারে কইতাছস না।

নিখিল চিন্তিত গলায় বলল, অইছে একহান কাম। তয় হেইডা আপনেরে কওন ঠিক অইবো কি না বোজতাছি না।

ঠিক না অইলে কইচ না।

তয় কইতে খুব ইচ্ছা করতাছে। এমুন একহান ঘটনা জাইন্নাও কেরে না কইলে কেমুন জানি লাগে।

কইতে চাইলে ক।

কইতে পারি, তয় আমারে একহান কথা দেওন লাগবো আপনের।

বুজছি। আমি য্যান কেরে না কই। নূরজাহানির লেইগাও এমুন কথাঐ কইছিলি তুই। তয় তুই নিচ্চিন্তে কইতে পারচ। আমি কেঐরে কমু না।

কথা দিলেন পিসি?

হ।

তয় কই।

সড়কের কাজে মাটিচাপা পড়া মানুষটার কথা যতটুকু যা সে শুনেছে সবই খুলে বলল মরনিকে। নামাজ পড়তে বসে কীভাবে জ্যান্ত কবর হল মানুষটির, কীভাবে সব সামাল দিল হেকমত, কীভাবে বেঁচে গেল কন্ট্রাক্টর সাহেব, সব। শুনে মরনি মাটির মতন স্থির হয়ে গেল। ফ্যালফ্যাল করে নিখিলের মুখের দিকে তাকিয়ে কোনও রকমে শুধু বলল, কচ কী?

হ পিসি। সত্যকথা।

মাইট্রালডার নাম কী? কোন গেরামের মানুষ?

বুড়া বেডা। কামারগাঁওয়ের ওইমিহি বাড়ি। নাম বলে আদিলদ্দি।

শুনে দিশহারা ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল মরনি। কী, কী কইলি? আদিলদ্দি? কামারগাঁওয়ের আদিলদ্দি?

মরনির অবস্থা দেখে নিখিল অবাক হল। সেও উঠে দাঁড়াল। হ। কামারগাঁওয়ের আদিলদ্দি।

একটু থেমে তীক্ষ্ণচোখে মরনির মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, মাইট্রালডার নাম হুইন্না আপনে এমুন চইমকা উটলেন ক্যা পিসি? চিনেন নি?

ততক্ষণে প্রথম ধাক্কাটা কাটিয়েছে মরনি। একটু স্থির হয়েছে। ভিতরে ভিতরে গুছিয়ে ফেলেছে নিজেকে। না না কোনও ভাবেই নিখিলকে বলা ঠিক হবে না, মানুষটা শুধু তার চিনাই না, তার বোনজামাই, তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটার বাপ। এই বাড়িতেই মানুষটা থাকত! তার মাটিয়াল হওয়ার পিছনে আছে এক দুঃখময় করুণ কাহিনি। নিখিলের কানে এসব কথা গেলে হয়তো বা কথাটা চলে যাবে আতাহারের কানে, হয়তো বা চলে যাবে অন্য কারও কানে। তাতে গ্রামের মানুষের কাছে ছোট হয়ে যাবে মজনু। মজনুর বাপ হয়েছিল মাটিয়াল, কেন হয়েছিল সে কথা বুঝতে চাইবে না কেউ, মজনুকে বলবে মাইট্টালের পোলা, আগে পরে টিটকারি দিবো। গ্রামে মুখ দেখানোই দায় হবে ছেলের। না না মজনুর এই ক্ষতি মরনি কিছুতেই হতে দেবে না। যদিও মানুষটার জন্য বুক ফেটে যেতে চাইছে, চোখ ফেটে যেতে চাইছে কান্নায়, তবু নিজেকে সামলে নিখিলের দিকে তাকাল সে। শুকনা ফ্যাকাশে মুখে হাসার চেষ্টা করল। চইমকা উটলাম কামারগাঁওয়ের কথা হুইন্না। ওই গেরামে আমগো আততিয় স্বজন আছে। আর কিছু না।

নিখিল সন্দেহের গলায় বলল, ও আইচ্ছা।

আদিলদ্দি নামেও আমগো এক আত্মীয় আছে। হেরা বিরাট গিরস্ত। হেগো বাড়ির গোমস্তারাও মাইট্টালের কাম করবো না।

নিখিলের মন থেকে সন্দেহটা গেল না। ভুরু কুঁচকে মরনির দিকে তাকিয়ে রইল।

মরনি আবার যেন একই কথা বলল, কামারগাও আর আদিলদ্দি দুইহান নাম একলগে হুনছি তো, এর লেইগাঐ চইমকা উটছি। আর কিছু না। বোজছচ না?

নিখিল সন্দেহের গলায় বলল, বুজছি।

তারপর উঠানের দিকে পা বাড়াল। তয় অহন যাই পিসি। পরে আবার একদিন আমুনে।

আইচ্ছা বাজান, আহিচ।

নিখিল চলে যাওয়ার পরও অনেকক্ষণ একইভাবে দাঁড়িয়ে রইল মরনি। তারপর ঘর থেকে উঠানে নামল। দক্ষিণের ভিটির দোচালা ঘরটায় গিয়া ঢুকল।

এই ঘরে থাকত মানুষটা।

ঘরের পুবপাশের বেড়া ঘেঁষে কিছু খড়নাড়া ফেলা। সেই খড়নাড়ার উপর ছেঁড়া একখানা হোগলা পাতা আছে। একপাশে ময়লা নোংরা কাঁথার লগে পাচিয়ে রাখা তেল চিটচিটা একটা বালিশ। রাতের আঁধারে নিঃশব্দে এসে এই বিছানায় বসত মানুষটি, নামাজ পড়ে ঘুমাত, উঠে আবার নামাজ পড়ে বেরিয়ে যেত। এই ঘরে, এই বিছানায় আর কখনও ফিরা হবে না তার। মনের ভিতর থেকেই হয়তো বা মরণ তাকে ডাক দিয়েছিল। এজন্যই সেদিন। ওভাবে এসে টাকাগুলি দিয়া গেছিল মজনুর জন্য, মরনির হাত ধরে মাফ চেয়েছিল, শিশুর মতন কেঁদেছিল।

এঘরে ঢোকার পর এসব কথা মনে পড়ল মরনির। বুক তোলপাড় করতে লাগল। খড়নাড়ার উপর পাতা হোগলার বিছানাটার দিকে খানিক তাকিয়ে থেকে বিছানাটায় বসল সে। নিজের অজান্তেই হোগলায় আর কথায় প্যাচিয়ে রাখা বালিশটায় হাত বুলাতে লাগল। মনে মনে বলল, আপনের জীবনডা এমুন অইলো ক্যান দুলাভাই! মরনডা এমুন অইলো। ক্যান! এমুন নমজি মানুষ আছিলেন তাও কাফোন পাইলেন না, জানাজা পাইলেন না? আপনের অইলো জেনতা কবর! আহা রে, আহা।

নিজের অজান্তে চোখের পানিতে গাল ভাসতে লাগল মরনির।

.

কী রান্দ, বউ?

দুপুরের ভাত বসিয়ে গোলালু কুটতে বসেছে পারু। একপায়ে চেপে ধরা বঁটি, দুইহাতে বঁটির ধারে ঘষে ঘষে গোলালুর ছাল বাকল ছাড়াচ্ছে। একপাশে অর্ধেক পরিমাণ পানি ভরতি মালশা। ছাল বাকল পরিষ্কার করা গোলালু মালশায় রাখছিল সে। বঁটির পাশে মাটিতে পড়ে আছে আরও কয়েকটা গোলালু, কয়েকটা পিঁয়াজ।

কাজের সময় পারু একটু বেশি মনোযোগী থাকে। এজন্য শাশুড়ির গলা শুনে চমকাল। মুখ তুলে তাঁর দিকে তাকিয়ে হাসল। ও আম্মায়!

উঠে গিয়ে ঘর থেকে জলচৌকি এনে দিল তহুরা বেগমকে বসতে। আপনের শইল কেমুন আম্মা?

তহুরা বেগম নরম ভঙ্গিতে জলচৌকিতে বসলেন, ক্লান্তির শ্বাস ফেললেন। সেই শ্বাসে পারু টের পেল, না তার শরীর খুব সুবিধার না।

তহুরা বেগম বললেনও তাই। না গো মা, শইলডা ভাল না। ইট্টহানি হাঁটলেঐ বুকটা ধড়ফড় ধড়ফড় করে। এই যে দেহো এড় জাগা হাইট্টা আইছি, বড়ঘর থিকা তোমার উডান, রানঘরের সামনে, হেতেঐ বুকহান ধড়ফড়াইতাছে।

কথা বলতে বলতে ডানহাত দিয়ে বুকের মাঝখানটা চেপে ধরলেন তহুরা বেগম। আজকাল প্রায়ই এভাবে বুক চেপে ধরে রাখেন। একটু মোটার দিকে শরীর। দুধের মতন ফরসা গায়ের রং। দেখে বুঝা যায় একজীবনে অতি সুন্দরী ছিলেন। চোখ মুখের গড়নে বনেদিপনা আছে। সব সময় সুন্দর পাড়ের সাদা শাড়ি পরেন। মান্নান মাওলানা এত পরহেজগার বান্দা হওয়ার পরও তাঁকে দেখলেই যেমন ধুরন্দর বদমাশ মনে হয়, ঠিক তার উলটাটা মনে হয় তহুরা বেগমকে দেখলে। অত্যন্ত নরম সভ্য বিনয়ী হৃদয়বতী সন্তানবৎসল এক মা আর খুবই ধর্মপ্রাণ, আল্লাহ ভক্ত। কথাও বলেন মায়াবী স্বরে। এই ধরনের মানুষ দেখলেই ভক্তি করতে ইচ্ছা করে।

শাশুড়িকে বসতে দিয়ে আবার বঁটি ধরেছে পারু। তহুরা বেগম বললেন, শিরিন ইসকুলে গেছে?

পারু বলল, হ। লেখাপড়ায় বেদম উৎসাহ মাইয়াডার। খাইগোবাড়ির পেরাইমারি ইসকুলে পড়তে চাইলো না। এই বচ্ছর কেলাস ফোরে উটছে। আগে আমারে কইয়া রাকছিলো কাজির পাগলা হাই ইসকুলে যেন ভরতি কইরা দেই।

দিছো না?

হ। অহন কাজির পাগলা ইসকুলে পড়ে।

আর নসু?

ও খাইগোবাড়ির ইসকুলে পড়ে। টু-তে। দুইজনেঐ আউজকা ইসকুলে গেছে।

আর নূরি, নূরি কো?

মনে অয় গণি কাকাগো ওই মিহি গেছে। মতিমাস্টারের পোলামাইয়ার লগে বহুত খাতির। হারাদিন অগো লগে খেলে।

হেইডা খেলুক। তয় পোলাপানের মিহি খ্যাল রাইখো। বাড়ির চাইর মিহি এত পুকঐর। খেলতে খেলতে ঘাট ঘঘাটে যেন না যায়, পাইনতে পুইনতে যেন না পইড়া যায়! একবার যুদি একজন যায় তয় কইলাম কাইন্দাও কূল পাইবা না! এই যে বুকহান দেহ এই বুকের ভিতরে এহেকজন পোলাপানের লেইগা এহেকখান ঘর, একজন গেলে একহান ঘর খালি অইয়া যায়। হেই ঘর আর কোনওদিন ভরে না। আমার মোতাহার গেছে আমি বুজি পোলাপান যাওনের দুঃখড়া কেমুন!

পারু কথা বলল না। গোলালু কোটা শেষ করে পিঁয়াজ কুটতে শুরু করেছে সে।

মোতাহারের কথা মনে করে একটু ভারাক্রান্ত হয়েছেন তহুরা বেগম। কিছুটা সময় নিয়া সেই ভাব সামাল দিলেন তিনি। আবার জিজ্ঞেস করলেন, কী রান্দ, বউ?

পারু বলল, মুরগির ডিম সিদ্দ দিছি ভাতের লগে।

ডিমের তরকারি রানবা?

হ। গোলালু আর পিয়াইজ দিয়া ডিম ভুনা করুম। কাইল রাইত্রে নসু কইছে আইজ দুইফইরা ভাত ডিম দিয়া খাইবো। এর লেইগা বেবাকতের লেইগাঐ ডিম রানতাছি। চাইরখান ডিম সিদ্দ দিছি ভাতের লগে। সিদ্দ অওনের পর খোসা ছাড়াইয়া কড়াইয়ের তেলে ইট্টু ভাজা ভাজা করুম। তারপর আলু পিয়াইজ তেল মেশলা দিয়া বাগার দিমু।

ভালঐ অইবো। খাইতে সাদ লাগবো। তয় পোলাপানের মিহি খ্যাল রাইখো। বাপ মরা পোলাপান, অহন তুমিঐ অগো বাপ তুমিঐ মা। পোলাপানে যা খাইতে চায় খাওয়াইয়ো। নাইলে পোলাপানের আত্মা ছোড অইয়া যাইবো।

শাড়ির আঁচলে গিঁট দিয়ে বাঁধা একখিলি পান বের করলেন তহুরা বেগম। জরুরি প্রয়োজনে এভাবে পানের একখান খিলি আঁচলে বেঁধে রাখেন তিনি। বেশিক্ষণ পান না খেয়ে থাকতে পারেন না বলে এই ব্যবস্থা।

পানের খিলিটা মুখে দিয়া একটু যেন চিন্তিত হলেন তিনি। কিছু যেন ভাবছেন, কিছু যেন বলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

আড়চোখে শাশুড়ির মুখটা একবার দেখল পারু তারপর নারকেলের আইচায় তৈরি হাতা দিয়া বলক পাড়া ভাতের তলা থেকে একখান ডিম তুলল। তুলে বোঝার চেষ্টা করল। পুরাপুরি সিদ্দ হয়েছে কি না!

হয়েছে। একেবারেই ঠিকমতন সেটা হয়েছে। এখনই ডিমগুলি তুলে ফেলা উচিত।

তারপর বাকি ডিমগুলি তুলল পারু। একটা মাটির সরা চিত করে তাতে রাখল। বঁটিটা একপাশে সরিয়ে রেখে বলল, আমি আম্মা পোলাপানডিরে বোজতে দেই না যে অগো বাপ নাই, অগো বাপ মইরা গেছে। যহন যা চায় পোলাপানডিরে আমি দেই, ভালভালাই খাওয়াই। খাজুইরা মিডাই দিয়া দুধভাত, চিনিচাম্পা কেলা, মাস-দেড়মাসে একদিন ইট্টু পোলাও রান্দি, মোরগ জবো করি। আপনের পোলায় মইরা যাওনের পর থিকা আব্বায় মাসে মাসে কিছু টেকা দেয়, জমিনডি বর্গা দেওয়া আছে, গোরু তিনডা আপনেগো গোরুর লগেঐ থাকে, এক দেসসের দুধও পাই রোজ, আব্বায় বাজারে গেলে আমগোও মাচ তরকারি দেয়, মাঝে মাঝে পিডাও বানাইয়া দেই পোলাপানরে, বেবাক মিলা আমি অগ খারাপ রাখি নাই আম্মা।

তহুরা বেগম পান চিবাতে চিবাতে মাথা নাড়লেন। হ হেইডা আমি জানি। তুমি যে বহুত দায়িত্বশীল মাইয়া হেইডা আমি জানি। আমার মোতাহারের লেইগাও অনেক করছো তুমি। আল্লায় অর হায়াত রাখে নাই দেইখা মরছে। অর মরনের লগে তোমার কোনও সমন্দ নাই।

তয় আপনে আম্মা আমারে দোয়া করবেন, আমি যেন আমার পোলাপানডিরে মানুষ করতে পারি।

দোয়া করি না মা, অনেক দোয়া করি। আল্লায় দিলে তুমি পারবা।

পারু তখন ডিমের খোসা ছাড়াতে লেগেছে। পান চিবাতে চিবাতে পারুর ডিমের খোসা ছাড়ানোটা কিছুক্ষণ দেখলেন তহুরা বেগম তারপর বললেন, আইজ তোমার কাছে আমি

একহান আরজি লইয়া আইছি মা।

পারু বুঝল কী বলবেন তিনি। বুঝেও না বোঝার ভান করল। ডিমের খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে বলল, কীয়ের আরজি আম্মা?

পায়ের কাছে চিড়িক করে পানের পিক ফেললেন তহুরা বেগম। তারপর বললেন, কইতাছি। তার আগে অন্য একহান কথা কইয়া লই। কয়দিন আগে মোতাহাররে আমি স্বপ্নে দেকলাম। দেহি মোতাহার যেন আমারে কইতাছে আমি তোমারে ছাড়া আর থাকতে পারি না মা। তুমি আমার কাছে আইয়া পড়। তারপর থিকা আমার মনডা বহুত খারাপ মা। খালি মরণের কথা মনে অয়। মনে অয় যে-কোনওদিন মইরা যামু আমি। তয় কাম তো দুইহান শেষ অয় নাই। মাইয়াডির বিয়া দিছি, বড় পোলাডার বিয়া করাইছি। বাকি আছে খালি দুইডা পোলা। এই দুইডার বিয়া করাইয়া যাইতে পারলে দায়িত্ব শেষ অইতো। তুমি তো বেবাকঐ জানো। আজাহার খালি চিঠি লেখে, আতাহার দাদারে বিয়া করাও না ক্যা? হেরে বিয়া না করাইলে আমি দেশে আহুম না। হেরে বিয়া না করাইলে আমি বিয়া করুম না।

আতাহারের কথা ওঠার পরই গম্ভীর হয়ে গেছে পারু। মুখটা শক্ত হয়ে উঠেছে। সেই মুখেই চারটা ডিমেরই খোসা ছাড়াল সে। হাতায় করে একহাতা ফেনভাত তুলে সেই ভাত থেকে কায়দা করে কয়েকটা ভাত আঙুলের আগায় নিয়া টিপে টিপে দেখতে লাগল ভাত ফুটছে কি না!

না এখনও পুরাপুরি ফোটে নাই। আর একটু ফুটবে।

ভাতের হাঁড়ির ওপর সরা চাপিয়ে কোটা গোলালু ধুতে লাগল পারু।

তহুরা বেগম বললেন, এর লেইগা আইজ আমি তোমার কাছে আইছি মা।

তহুরা বেগমের দিকে তাকাল না পারু। গম্ভীর গলায় বলল, আমি কী করুম?

 তুমি আতাহাররে ইট্টু বুজাইবা।

কী বুজামু?

আমরা ঘটক লাগামু। ও যেন বিয়া করতে রাজি অয়।

চোখ তুলে তহুরা বেগমের দিকে তাকাল পারু। আপনের কি মনে হয় আমি কইলেঐ হেয় বিয়া করতে রাজি অইব?

হ হইবো।

তার অর্থ কী? হের বিয়া আমি আটকাইয়া রাখছি?

তহুরা বেগম নরম গলায় বললেন, আমি তোমার লগে কাইজ্জাকিত্তন, তক্কাতক্কি এই হগল করতে আহি নাই মা। তোমারে অনুরুদ করতে আইছি। তুমিও জানো আমি কী কইতে চাই, আমিও জানি তুমি কী কইতে চাও।

হ আপনে কী কইতে চান হেইডা আমি জানি, তয় আমি কী কইতে চাই হেইডা মনে অয় আপনে জানেন না।

তোমার মনে অয় জানি না?

হ।

তয় তুমি আইজ আমারে কও, আমি হুনি।

কইলে বহুত কথা কওন লাগে।

কও। বেবাক কথাই আইজ কও। মনের মইদ্যে আর কিছু চাইপ্পা রাইখো না। কবে মইরা যামু! তোমার কথা আর হোননঐ হইবো না।

ভাত পুরাপুরি ফুটে গেছে। লুছনি দিয়া নিয়ম মতন হাঁড়িটা ধরে চুলার একপাশে রাখা খাদায় ভাত ঠিকনা দিল পারু। তারপর তহুরা বেগমের দিকে তাকাল, আচমকা একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করল। আপনের বড়পোলার কথা আপনে জানতেন না?

কথাটা বুঝতে পারলেন না তহুরা বেগম। থতমত খেয়ে পারুর মুখের দিকে তাকালেন। কোন কথা?

হের যে বাপ অওনের ক্ষমতা আছিলো না, হেই কথা?

তহুরা বেগম একটু চুপ করে রইলেন। মুখের পান গালের একপাশে নিয়া উদাস গলায় বললেন, আগে পুরাপুরি জানতাম না। ইট্টু ইট্টু সন্দহ আমার আছিলো। তোমার বিয়ার আগে অর বাপরে দুই-একবার কইছি, পোলাডার শইল্যের দশা ভাল দেহা যায় না। বয়স। অইয়া গেছে তাও বিয়া করতে চায় না। বিয়ার কথা হোনলে চুপ কইরা থাকে। খালি ঘুরায়। কয় অহন না, পরে বিয়া করুম। যেই বয়েসে পোলারা বিয়ার লেইগা পাগল অয় হেই বয়েস পার অইয়া যাওনের পরও মোতাহারে বিয়া করতে চায় না ক্যা, এইডা লইয়া তোমার হউরের লগে কথা অইছে আমার। অন্য মানুষজন দিয়া কায়দা কোয়দা কইরা তোমার হউরে জানতেও চেষ্টা করছে অর শইল্যে কোনও সমস্যা আছেনি! সমস্যা আছে। দেইক্কাঐ বিয়া করতে চায় না, নাকি! বিয়ার পর বউর কাছে নিজের শইল্যের লেইগা শরম পাইবো দেইক্কাঐ মনে অয় বিয়া করতে চায় না। তহন কইলাম মোতাহার অস্বীকার করছে। কইছে, না, আমার কোনও সমস্যা নাই। তয় আমি তো মা, আমি কইলাম ইট্টু ইট্টু বুজছিলাম। সন্দহ আমার একখান আছিলো। কারণ ছোটকালে পেশাবে অসুবিদা অইতো মোতাহারের। এর লেইগা এক্কেরে ছোড থাকতেঐ অরে মোসলমানি করাই দিতে অইছিলো। মোতাহার বড় অওনের পর অর বাপে হেই কথা ভুইল্যা গেলেও আমি ভুলি নাই। বিয়া করতে চাইতো না দেইক্কা তোমার হউররে আমি কইছিলাম, পোলার শইল লইয়া আমার সন্দহ হয়। আপনে অরে একবার ঢাকা লইয়া যান। বড় ডাক্তার দিয়া পরীক্ষা করান। দেহেন সমস্যা কী? বিয়া করতে চায় না ক্যা? হেয় আমারে কইলো মদিনার জামাইরে দিয়া বলে ইশারায় ইঙ্গিতে কথাডা মোতাহাররে হেয় জিগাইছিলো, মোতাহার কইছে সমস্যা নাই। তারবাদেও চিন্তা আমার যায় নাই। যায় নাই দেইক্কাঐ তোমারে আনলাম মোতাহারের বউ কইরা।

লোহার মাঝারি ধরনের একটা কড়াইতে সামান্য তেল দিয়া খোসা ছাড়ানো সিদ্দ ডিম ভাজতে দিয়েছে পারু। আগুনের তাপে তেল আর ডিমে ছ্যার ছ্যার করে শব্দ হচ্ছে। একবার সেদিকে তাকিয়ে পারু বলল, আমারে বউ কইরা আনলেন এইডা হিসাব কইরা যে পোলার যুদি কোনও সমস্যা থাকেও, আততিয়র মাইয়া হেইডা মোখ বুইজ্জা মাইন্না লইবো। কেঐরে কিছু কইবো না।

হ। মিছাকথা কমু না মা। এইডাঐ চিন্তা করছিলাম। আর বিয়ার কয়দিন বাদে তোমার চেহারা দেইক্কাঐ বেবাক আমি বুইজ্জা গেছিলাম। তোমার হউরের লগেও এই হগল। প্যাচাইল পারছি, হেয় আমারে থামাইয়া রাখছে। কইছে এই হগল অহন আর চিন্তা কইরা লাব নাই। যা অওনের অইয়া গেছে। আমি কইছি, না এই হগলের চিকিচ্ছা আছে। মোতাহাররে আপনে ডাক্তার কবিরাজ দেহানের ব্যবস্থা করেন। মাইয়ার জামাইগো কন তারা মোতাহাররে বুজাউক। হেয় আমার কোনও কথা হোনেঐ নাই।

হোননের মানুষ হেয় না। হেয় খালি নিজেরহান বোজে। অন্যের দুঃখকষ্ট হেয় বোজেনি! নিজের জিদের লেইগা বাড়ির এতদিনের বান্দা গোমস্তা মাকুন্দার লগে যেই কামড়া করলো।

বাদ দেও, ওই হগল প্যাচাইল পাইড়া আর লাব কী!

হ অন্যের প্যাচাইল পাইড়া কী করুম আমি। আমি আইজ আমার প্যাচাইলঐ পাড়ি। আম্মা, সব জাইন্না হুইন্নাও কইলাম আমি মোক বুইজ্জঐ আছিলাম। আমি আপনেগো কেরে কিছু কই নাই। কোনও অশান্তি লাগাই নাই সংসারে। তয় আমিও তো মানুষ। আমার দিকটা আপনেরা ভাবেন নাই ক্যা? আমার জাগায় যুদি আপনের কোনও মাইয়া অইতো, তার জামাই যুদি আপনের পোলার লাহান অইতো তহন কী করতেন আপনে? মাইয়ারে ছাড়াইয়া আইন্না অন্য জাগায় বিয়া দিতেন না?

হ দিতাম।

তয় আমারে লইয়া আপনে ভাবেন নাই ক্যা? ভাবনের আগেঐত্তো আতাহারের লগে তোমার খাতির অইয়া গেল। তোমার পোলাপান হইয়া গেল।

আপনে আমারে কন তো, আতাহারের লগে যা অইছে হেইডা কি আমার কোনও অন্যায় অইছেনি?

তহুরা বেগম কথা বললেন না। চুপ করে রইলেন।

পারু বলল, আমার কাঁচা বয়স, স্বামী অক্ষম, স্বামীর ভাইর লগে খাতির না কইরা আমি যুদি অন্য বেগ লগে করতাম, ভাইগ্যা ভুইগ্যা যাইতাম আপনেগো বাড়ি থিকা তাইলে কি আপনেগো মানইজ্জত থাকতো? থাকতো না। আল্লার কাছে শুকুর করেন যে আমি হেই কাম করি নাই। যা করছি দেওরের লগে করছি। তার পোলাপান পেডে ধরছি তয় মাইনষেরে বুজাইছি আসল স্বামীর পোলাপানঐ অইতাছে আমার। আপনের পোলারেও মাইনষের কাছে ছোড করি নাই, আপনেগও করি নাই। এই বাড়ির মানইজ্জত আমি রক্ষা করছি।

তহুরা বেগম কৃতজ্ঞ গলায় বললেন, হ মা হেইডা তুমি করছো। মিছাকথা কমু না, সত্যঐ তুমি আমগো মানইজ্জত রাখছে।

তয় আপনেরা আমার কথা কোনওদিনও চিন্তা করেন নাই।

তোমার কথা আর কী চিন্তা করনের আছে, কও?

আছে, চিন্তা করেন নাই দেইখাঐ বোজেন নাই। আউজকা আমার কাছে আইছেন নিজেগো স্বার্থে। আমি কইলে আতাহারে বিয়া করবো, আতাহারে বিয়া করলে আজাহার ফিরত আইবো দেশে। হেয়ও বিয়া করবো। বাইত্তে দুইহান নতুন বউ আইলে আপনের দায়িত্ব শেষ অয়। সবঐ আপনে ভাবলেন, খালি আমার কথাডাঐ ভাবলেন না। এতডু এতড়ু তিনডা পোলাপান আমার, নকল বাপ মরছে, আসল বাপ থাকতেও হেই বাপরে বাপ ডাকতে পারবো না, তার উপরে হেই বাপও আরেকজনরে বিয়া কইরা পর অইয়া যাইতাছে। নতুন একজন মানুষ এই সংসারে আইয়াঐ কোনও না কোনওভাবে এই কেলেঙ্কারির কথা। হোনবো। হের কাছ থিকা হোনবো আরও দশজনে। কোনও অন্যায় না কইরাও বদলামের ভাগী অমু আমি। মাইনষে আমারে খারাপ মাইয়াছেইলা মনে করবো। কিন্তু আপনের বড়পোলায় যুদি আতাহারের লাহান অইতো তাইলে তো তারে ছাইড়া আতাহারের কাছে আমি যাইতাম না! আতাহারের পোলাপান পেডে লওনের দরকার পড়তো না আমার।

হ কথা ঠিক। বেবাক কথা ঠিক। তোমারে আমি কোনও দোষ দেই না।

তয় আমার দুঃখডা অইলো এত কিছুর পরও, অহনও আমার কথাডা আপনে চিন্তা করেন না। আব্বার কথা বাদ দিলাম, আপনেও তো চিন্তা করতে পারতেন আমার কথা।

তহুরা বেগম বললেন, আর কেমতে চিন্তা করুম মা? কিছু তো বোজতাছি না।

ভাবেন নাই দেইখা বোজেন নাই। ভাবলে বোজতেন। দুনিয়াতে এমুন ঘটনা অনেক আছে, বড়ভাই মইরা গেছে, পোলাপানসহ তার বিধবা বউরে বিয়া করছে ছোড় ভাইয়ে। নতুন বউ সংসারে না আইন্না আগের বউরেঐ বাইত্তে রাকছে। আমার বেলায় এইডা তো আরও জায়েজ অইতো, যার পোলাপান আমি পালতাছি, জামাই মরনের পর তার লগেঐ আমার বিয়া অইতাছে। আপনেরা এইভাবে ভাবেন নাই ক্যান? আতাহারের লগে কি আমার বিয়া অইতে পারে না? হেয় তো আমারে পছন্দ করে!

গভীর দুঃখ বেদনাতেও চোখে সহজে পানি আসে না পারুর। আজ এল। অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে আঁচলে চোখ মুছল সে। তারপর কড়াইয়ের দিকে তাকাল। ডিমগুলি প্রায় ভাজা। ভাজা হইয়ে আসছে। এখন চুলা থেকে নামাতে হবে। নামায় আলু পিয়াজ আর নুন তেল মশলা কষিয়ে, তাতে সামান্য পানি সরা দিয়া ঢেকে দিতে হবে। আলু সিদ্ধ হয়ে আসার পর ডিমগুলি দিতে হবে। সব মিলিয়ে খুবই স্বাদের তরকারি। ডিমগুলি তেলে ভাজার আগে সামান্য কেচে তাতে আবার হলুদ লবণ মাখানো হয়েছে। খাওয়ার সময় নুনের অভাবটাও মনে হবে না।

তয় পারুর কথা শুনে তহুরা বেগম তখন একেবারেই স্তব্ধ হয়ে আছেন। কথা বলতে যেন পুরাপুরি ভুলে গেছেন। চিন্তিত চোখে তাকিয়ে আছেন পারুর দিকে।

পারু চোখ মুছতে মুছতে বলল, আপনেও মাইয়ামানুষ আম্মা। একহান কথা আপনে বোজবেন, মাইয়া মাইনষের বুক ফাইট্টা গেলেও মুখ ফোডে না। মইরা গেলেও মনের কথা মনেঐ চাইপ্পা রাখে মাইয়ারা। আমিও রাকতাম যুদি আমার জীবনডা এমুন না অইতো, যুদি পোলাপান তিনহান আমার না থাকতো। বেবাক কিছু চিন্তাভাবনা কইরা, লজ্জাশরমের মাথা খাইয়া মনের কথা আপনেরে আমি আইজ কইয়া দিলাম। এইডা ছাড়া আমার আর কোনও উপায় আছিলো না।

তহুরা বেগম তবু কোনও কথা বললেন না। আগের মতোই চিন্তিত চোখে পারুর দিকে তাকিয়ে রইলেন। মুখে পান আছে, পান চাবাতে যেন ভুলে গেছেন।

.

বড়ঘরের সামনে দিয়া হাসুকে যেতে দেখেই ডাকলেন মান্নান মাওলানা, ওই ছেমড়ি, এইমিহি আয়।

দুপুরের ভাত খেয়ে গোলাঘরের দিকে যাচ্ছিল হাসু। মান্নান মাওলানার ডাক শুনে থমকে দাঁড়াল। বড়ঘরের ভিতর উঁকি দিল। ঘরের দরজা আধাআধি আবজানো। সেই ফাঁক দিয়া দেখতে পেল খালি গায়ের লুঙ্গি পরা মান্নান মাওলানা পেট ভাসিয়ে শুয়ে আছেন। ঘরে আর কেউ নাই।

এই অবস্থায় মান্নান মাওলানা ডেকেছেন, ঘরে ঢোকা ঠিক হবে কি না ভাবছিল হাসু। মান্নান মাওলানা খেকুরে গলায় বললেন, কী অইলো? কথা কানে যায় না? ঘরে আয়।

গলায় এমন একখান ভাব ছিল তাঁর, হাসু দিশাহারা ভঙ্গিতে ঘরে ঢুকে গেল। কীর লেইগা ডাক পারেন?

বয়।

হাসু অবাক হল। কই বমু?

পালঙ্কেঐ বয়। আমার পা-র সামনে।

ক্যা?

পাও টিপ্পা দে।

খালিঘরে মান্নান মাওলানা তাকে পা টিপতে ডেকেছে, তার স্বভাব চরিত্র সম্পর্কে সব কিছুই জানে হাসু, এই অবস্থায় পা টিপতে বসা ঠিক হবে কি না ভাবছিল। তয় কিছু করারও নাই। ঝিয়ের আত্মীয় হয়ে এই বাড়িতে সে দিনের পর দিন পড়ে আছে, বাড়িরটা খাচ্ছে রহিমার লগে সম্পর্কের কারণেই, এই নিয়া মান্নান মাওলানা কখনও কিছু বলেন নাই, সেই মানুষ পা টিপতে ডেকেছেন, তাঁর মুখের ওপর না হাসু কেমন করে করবে। তার ওপর সবকিছু জানার পর রহিমা চেষ্টা করছে হাসুকে এই বাড়িতে রাখার। এই অবস্থায় হুজুর যা চাইছেন তা না করলে তিনি রেগে যাবেন। আর মালিককে রাগিয়ে এই বাড়িতে হাসু কেমন করে থাকবে!

আরেকটা কথা ভেবে চিন্তা কেটে গেল হাসুর। সে তো এখন প্রায় পুরুষ। হুজুরের পা টিপতে অসুবিধাই বা কী?

পালঙ্কের কোণে মান্নান মাওলানার পায়ের কাছে বসল হাসু। বসে দুইহাতে তার পায়ে প্রথম চাপটা দিল। মান্নান মাওলানা একটু হকচকিয়ে গেলেন। হাসুর মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, কী রে এই অবস্থা ক্যা তর?

হাসু বলল, কী অবস্থা?

তর হাত দিহি লোহার লাহান। বেডাগো হাতও তো এত শক্ত অয় না। মাইয়ামানুষ অইয়া এমুন হাত ক্যা তর?

হাসু লাজুক গলায় বলল, মাইনষের বাইত্তে কাম কইরা খাই, আমগো লাহান মাইয়াগো হাত কি আর মাইয়াগো হাত থাকে! বেড়াগো ছাড়াইয়া যায়।

শুনে মান্নান মাওলানা বদ হাসি হাসলেন। কথাডা ঠিক কইলি না। কেমুন?

তর বয়েসে তর ফুবু আমার বাইত্তেঐ কাম করতো। অর হাত তর লাহান আছিলো না। খুবঐ মুলাম হাত পাও শইল আছিলো তর ফুবুর।

সত্যঐ?

তয় মিছানি? কামেলদার মানুষ অইয়া তর লগে আমি মিছাকথা কমু?

না হেইডা কইবেন ক্যা?

তয়?

হাসু কথা বলল না। মন দিয়া মান্নান মাওলানার টিপতে লাগল।

মান্নান মাওলানা বললেন, রহি তর কথা আমারে কইছে।

কী কইছে?

তুই এই বাইত্তে থাকতে চাস।

একটু থেমে বললেন, সত্যঐ তুই থাকতে চাস?

হ।

ক্যা?

যেই বাইত্তে থাকি হেই বাইত্তে থাকতে ভাল্লাগে না।

ক্যা হেই বাইত্তে অসুবিধা কী?

ফুবু আপনেরে কয় নাই?

কইছে। তাও তর মোক থিকা হুনি।

হাসু মাথা নিচা করে বলল, শরমের কথা। ওই হগল হুইন্না আপনে কী করবেন?

মান্নান মাওলানা আবার সেই বদ হাসিটা হাসলেন। হুনি। ওই হগল কথা হোনতে ভাল লাগে।

হাসু বুঝে গেল হুজুরে খুবঐ কায়দা কইরা আউগগাইতাছে। এই হগল প্যাচাইল পাড়তে পাড়তে অন্যকামের কথা কইবো।

ভিতরে ভিতরে প্রস্তুতি নিয়ে ফেলল হাসু। হুজুর যত চেষ্টাই করুক, কায়দা করে তাঁকে সে ফিরাবে। সেদিন যেমন করে ফিরিয়েছিল আতাহারকে আজ তার বাপকেও তেমন। করেই ফিরাবে।

অন্যমানুষ হয়ে গেল হাসু। রঙ্গিনী, ঢঙ্গি ধরনের মেয়েমানুষ। মান্নান মাওলানার মুখের দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত মাদকতাময় এক হাসি হেসে বলল, হেই বাইত্তে পুরুষপোলার আকাল নাই। বেবাকতেঐ আপনের লাহান পাও টিপতে ডাকে।

একবার আবজানো দরজার দিকে তাকালেন মান্নান মাওলানা। তারপর গলা নিচু করলেন। খালি পাও টিপতেঐ ডাকে?

না। আরও মতলব থাকে।

কী মতলব?

বোজেন না আপনে?

বুজি। তাও তর মোক থিকা হোনতে চাই।

ওই হগল কথা কইতে আমার শরম করে।

আবার একটু ঢঙ্গিভাব করল হাসু। জোরে জোরে পা টিপতে লাগল মান্নান মাওলানার।

মান্নান মাওলানার শরীরে তখন জুয়ান বয়সের উন্মাদনা তৈরি হচ্ছিল। গাঢ় গলায় তিনি বললেন, আমি বুজছি। তয় এই বাইত্তে থাকলেও তো অমুন অইতে পারে।

সব জেনে বুঝেও অবাক হওয়ার ভান করল হাসু। কন কী? এই বাইত্তে অমুন অইবো ক্যা? এই বাইত্তে পুরুষপোলা খালি আপনে আর আতাহার দাদায়।

আতাহারের নাম শুনে থতমত খেলেন মান্নান মাওলানা। আইচ্ছা, একহান কথা জিগামু তরে?

জিগান।

আতাহার নজর দিছেনি তর মিহি?

কেমুন নজর?

এইত্তো এই হগল আর কী? বোজচ নাই?

হ বুজছি। না হেয় অমুন না। একদিন খালি নাড়ার পালার সামনে….

কথাটা শেষ করল না হাসু।

মান্নান মাওলানা বললেন, নাড়ার পালার সামনে কী করছে?

কিছু না। খালি কথা কইছে আমার লগে।

কী কথা?

ওইত্তো ভাবিছাবের কথা, ফিরির কথা। হেগো দুইজনের লগেঐত্তো হের খাতির। দুইজন খাতিরের মানুষ থাকতে আমার লগে হেয় আর কী কথা কইবো? তার উপরে আমি অইলাম বেডাগো লাহান শক্তপোক্ত মাইয়া। আমারে হের পছন্দ করনেরঐ কথা না। পছন্দ হেয় আমারে করেও নাই।

হাসুর এসব কথা শুনে যেন বেশ একটা স্বস্তি হল মান্নান মাওলানার। বললেন, তয় ঠিক আছে। ক এইবার।

কী কমু?

ওই যে আমি কইলাম এই বাইত্তেও তো পুরুষপোলা আছে, আতাহাররে বাদ দিলে থাকি আমি। আমারে তর পুরুষপোলা মনে অয় না? তুই যেই বাইত্তে কাম করচ ওই বাড়ির বেড়াগো লাহান আমিও যুদি তরে জ্বালাই?

ধুৎ হেইডা আপনে ক্যান জ্বালাইবেন? আমি একটা মাইয়া অইলাম নি? আমার লগে আপনে অমুন করবেন ক্যা?

না, যত কইতাছস অত মন্দ মাইয়া তুই না। চলনসই আছস। খালি হাত দুইহান ইট্টু বেশি শক্ত।

শইলও শক্ত।

কচ কী?

হ। সত্য। আমি আপনের লগে মিছাকথা কই না।

তয় তো ইট্টু দেহন লাগে।

আবজানো দরজার দিকে তাকাল মান্নান মাওলানা। তারপর শুয়ে থেকেই হাত বাড়িয়ে হাসুর বুক ছোঁয়ার চেষ্টা করলেন। লগে লগে চট করে সরে গেল হাসু। এই দৃশ্য দেখে ফেললেন তহুরা বেগম। ঠিক তখনই আবজানো দরজা ঠেলে এই ঘরে এসে ঢুকেছেন তিনি।

তহুরা বেগমকে দেখেই বুকটা ঘঁাত করে উঠেছে হাসুর। মান্নান মাওলানার মুখটাও চুন হয়েছে। তয় পলকেই ব্যাপারটা সামাল দিয়া ফেললেন তিনি। চটপটা গলায় বললেন, ওই ছেমড়ি, তুই অহন যা। আর পাও টিপন লাগবো না। তর ব্যাপারে আতাহারের মা’র লগে আমি কথা কমু নে। হেয় যুদি রাজি থাকে তয় তরে রাকতে আমার কোনও আপিত্তি নাই।

আইচ্ছা।

ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল হাসু। যেন যত দ্রুত সম্ভব তহুরা বেগমের চোখের সামনে থেকে পালাতে পারলেই সে বাঁচে।

তহুরা বেগম গম্ভীর মুখ করে দাঁড়িয়ে আছেন। দেখে পুরা ব্যাপারটা অন্যদিকে ঘুরাবার জন্য মান্নান মাওলানা অমায়িক গলায় বললেন, এমতে খাড়ই রইলা ক্যা? বহো। এতক্ষুন। আছিলা কই? তোমার লেইগাঐ জাগনা রইছি। দুইফইরা ঘুমড়া দিতে পারি নাই। ওই ছেমড়িরে ডাইক্কা পাও টিপাইতাছিলাম।

তহুরা বেগম গম্ভীর গলায় বললেন, আমি অহনও কানা অই নাই। চোক্কে ভালঐ দেহি। বেবাকঐ আমি দেকছি। তয় এই হগল লইয়া অহন কথা কমু না। বাইচ্চা থাকলে পরে একদিন কমু। কারণ বহুত বড় একখান কাম আমার আছে, হেই কামডা আমি শেষ করতে চাই। আপনের ছাড়া কামডা আমি শেষ করতে পারুম না। আপনের লগে বুদ্ধি পরামশ্ব কইরাঐ আউগগান লাগবো কামড়ায়।

যেন এত কথার বেশির ভাগই তিনি বুঝতে পারেন নাই এমন গলায় মান্নান মাওলানা বললেন, আমি খ্যাল করছি, তুমি আইজকাইল কথা বেশি কও। কথার কোনও আগামাথা নাই। অৰ্দেকঐ আমি বুজি না।

আমি কী কইছি, ক্যান কইছি বেবাকঐ আপনে বোজছেন। ঐযে ডাকের কথা আছে না। ‘যার মনে যা, ফালদা ওডে তা’। আপনে যেই কাম করতে চাইছিলেন, আমি কথা কওনের পর হেইডাঐ আপনের মনে ফালদা উটছে। কইলাম তো এই হগল লইয়া আমি আইজ কথা কমু না। আমি কমু অন্যকথা।

এবার মুখ গম্ভীর করলেন মান্নান মাওলানা। খেটকুরে গলায় বললেন, এতো প্যাচাইল পাইড়ো না। যা কওনের কইয়া হালাও।

পালঙ্কের কোণে বসে গম্ভীর গলায় তহুরা বেগম বললেন, মাসহানির মইদ্যে আতাহাররে বিয়া করামু।

কী?

হ।

আতাহারের মত লইছো?

না। হেইডা লওন লাগবো আপনের।

বোজলাম। পোলার বিয়ার লেইগা তো একহান মাইয়া লাগে, মাইয়া দেকছো?

হ।

মান্নান মাওলানা আকাশ থেকে পড়লেন। আমি জানলাম না আর তুমি মাইয়া দেকলা? কই দেকলা?

তহুরা বেগম আগের মতোই গম্ভীর গলায় বললেন, মাইয়া এই বাইত্তে আছে।

কী, এই বাইত্তে আছে? কেডা?

পারুল। আমগো পারু। আপনের বড়পোলার বিধবা বউ।

পারুর কথা শুনে মান্নান মাওলানার অবস্থা হল ওই অত মানুষজনের সামনে নূরজাহান তার মুখে থুতু ছিটিয়ে দেওয়ার পর যেমন হয়েছিল অনেকটা তেমন। তিনি একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। কথা বলতে পারলেন না। হতভম্ব ভঙ্গিতে হাঁ করে তহুরা বেগমের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর কলের পুতুলের মতন নিঃশব্দে বিছানায় উঠে বসলেন। কী কইলা তুমি? কার কথা কইলা?

তহুরা বেগম বললেন, হোনেন নাই? আমি পারুর কথা কইছি। আতাহারের লগে পারুর বিয়া দিমু। বেবাক ব্যবস্থা আপনের করন লাগবো।

তুমি কি পাগল অইয়া গেছ?

না। পাগল অই নাই। সুস্থই আছি।

আমার মনে অয় অইছো। মাথায় ছিট দেহা দিছে তোমার।

না, আমার মনে অয় আপনের সংসারে আহনের পর থিকা আমি এতদিন পাগল আছিলাম। মাথায় ছিটঐ আছিলো আমার। এর লেইগাঐ আপনে যহন যা কইছেন হুনছি, আপনের বদামি দেইখাও মুখ ফুইট্টা কিছু কই নাই। আমার চোকের সামনে আকাম কুকাম বহুত করছেন আপনে। আমার লগে হুইয়া থাইক্কাও রাইত দুইফরে উইট্টা গেছেন রহির কাছে, মাকুন্দারে ষড়যন্ত্র কইরা মারলেন, জেলে দিলেন। অহন আছেন গাছির মাইয়ারে লইয়া বদামির চিন্তায়, আরও বহুত ধান্দা ফিকির আপনের আছে। মাওলানা অইয়া, আল্লার কামেলদার বান্দা সাইজ্জা যেই হগল কাম জীবনভর আপনে করছেন আর আমি দেকছি, ওইডি দেইক্কা যে মুখ বুইজ্জা রইছি, হেই মুখ বোজনডাঐ আছিলো আমার পাগলামি। মাথায় ছিট না থাকলে স্বামীর আকাম কুকাম কেঐ মাইন্না লয় না। আমার মাথায় ছিট আছিলো দেইক্কা আমি মাইন্না লইছি। আইজ হেই পাগলামি আর ছিট আমার গেছে গা। আইজ আমি ভাল অইয়া গেছি। এর লেইগা এই চিন্তাডা আমি করতাছি। আপনে আতাহারের লগে কথা কন। বিয়ার ব্যবস্থা করেন।

স্ত্রীর এই চেহারা আজও নিয়া দুইদিন দেখলেন মান্নান মাওলানা। প্রথম দিনকার মতো আজও চিন্তিত হলেন। তাঁর স্বভাব অনুযায়ী এই ধরনের কথা শোনার পর হয় স্ত্রীকে লাথথি মেরে পালঙ্ক থেকে ফেলে দেওয়া নয়তো দিকপাশ না তাকিয়ে হাতের সব শক্তি দিয়ে থাপ্পড় মারা। সেদিনও এই কাজটা তিনি করেন নাই, আজও করলেন না। ভেতরে ভেতরে রাগ তার প্রচণ্ডই হচ্ছে তয় সেই রাগ দমন করে তিনি ভাবতে চাইলেন ব্যাপারটা আসলে হচ্ছে কী! সেদিনের পর থেকে এভাবে কেন হঠাৎ করে বদলে গেলেন তহুরা। বেগম! সেদিন বলেছেন অনেক কথা তিনি মান্নান মাওলানার লগে বলবেন। কী কথা বলতে চান? আর আজ হঠাৎ করে আতাহারের লগে পারুর বিয়া দেয়ার জন্যই বা পাগল হয়ে গেলেন কেন? কোথায় কী এমন ঘটেছে যে কারণে মহিলা এমন হয়ে গেলেন! হাসুর লগে মান্নান মাওলানার অশ্লীল একটি আচরণ দেখেও ওই নিয়া কথা না বলে বলছেন পারুর বিয়ার ব্যাপারে!

স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন মান্নান মাওলান। অতিরিক্ত নরম গলায় বললেন, তোমার অইছে কী?

কিছুঐ হয় নাই।

তয়?

তয় আবার কী?

এতদিন বাদে আথকা আতাহারের লগে পারুর বিয়া দিতে চাইতাছো?

এই চাওনডা আমার আগেঐ চাওন উচিত আছিলো। চোক্কের সামনে উপযুক্ত মাইয়া থাকতে আমি দুইন্নাই ভর পোলার লেইগা মাইয়া দেকতাছি।

কই আর দেকলা? তোমার পোলায় তো বিয়াঐ করতে চায় না!

না চাওনের কারণ আমিও জানি, আপনেও জানেন। যার কারণে চায় না তার লগেঐ যুদি বিয়া অয় তাইলে বিয়ায় আর অমত করবো না।

তোমার মনে অয় অমত করবো না?

হ আমার মনে অয়।

আমার মনে অয় না।

ক্যা?

একজনরে লইয়া মইজ্জা থাকনের পোলা আতাহারে না।

হেইডাও আমি জানি। এই সবাবটা ও পাইছে আপনের কাছ থিকা। তারবাদেও পারুরে বিয়া অর করনঐ লাগবো। করন উচিত।

ক্যা? উচিত ক্যা?

চোখ তুলে স্বামীর চোখের দিকে তাকালেন তহুরা বেগম। আপনে জানেন না ক্যান উচিত?

না জানি না। তুমি কও।

জাইন্না হুইন্না ক্যান আমারে দিয়া কথাডি কওয়াইতে চান! খালি আমার একহান কথার জোব দেন আপনে, আপনের যে চাইরহান মাইয়া, আপনের কোনও মাইয়ার জীবন যুদি পারুর লাহান অইতো, তাইলে আপনে কী করতেন?

মান্নান মাওলানা রুক্ষ গলায় বললেন, অন্যের সমস্যার লগে নিজের পোলাপানরে মিলাইয়ো না।

ক্যান মিলামু না? পারু অন্যের মাইয়া ঠিক, তয় আপনের আততিয়। আবার আপনের এক পোলার বউ, আরেক পোলার তিন পোলাপানের মা। এতমিহি দিয়া যে জড়িত তারে আপনে অন্যমানুষ কন কেমতে? আর আপনের লেইগা যেই মাইয়াডার জীবন নষ্ট অইছে। তার কথা আপনে ভাববেন না ক্যা?

আমার লেইগা পারুর জীবন কেমতে নষ্ট অইছে?

বড়পোলার শইল্যের কথা বেবাক কিছু জাইন্নাঐত্তো আততিয়র মাইয়ারে আপনে বউ কইরা আনছিলেন, যাতে আততিয়র মাইয়া বাইরের মাইনষেরে কিছু না কয়, কেলেঙ্কারি না করে।

কেলেঙ্কারি তো করছেঐ।

তহুরা বেগম একটু চমকালেন। কেমতে?

দেওরের লগে ইটিস পিটিস করছে।

এর লেইগাও আপনেঐ দায়ী। আমি বারবার আপনেরে অনুরুদ করছি মোতাহাররে ঢাকা লইয়া যান, বড় ডাক্তার দেহান, চিকিচ্ছা করলে ও ভাল অইবো। হেই কামডা যুদি করতেন, মোতাহারের শইলডা যুদি ভাল অইতো তাইলে এই কেলেঙ্কারি অয় না।

মান্নান মাওলানা চুপ করে রইলেন।

তহুরা বেগম বললেন, হেদিনও কইছি আইজও কই, আমার পোলাডা মরছেও আপনের লেইগা। অর গ্যাসটিকের চিকিচ্ছাডাও আপনে করান নাই। বিয়া করাইয়া বাঁজা জমিন আর ল্যারল্যাইরা দুই-তিনহান গোরু দিয়া ছাইড়া দিছেন পোলাডারে। বউ আর নিজের খোরাকি জোগাড় করতে করতেও পোলাডা আমার মরছে। যাউক ঐহগল লইয়া কথা কইয়া আর লাব নাই। যে গ্যাছে তারে তো আমি আর ফিরত পামু না! পোলার লগে বিয়া দিয়া যেই মাইয়াডারে সংসারে আনছিলেন বাইচ্চা থাইক্কাও তিনহান পোলাপান লইয়া হেয় আছে জিন্দা মরনে মইরা। হেরে আমি বাঁচাইয়া রাকতে চাই। বাইত্তে নতুন বউ আননের কাম নাই। দুইন্নাইতে এমুন ঘটনা বহুত ঘটে। বড়ভাইর বিধবা বউরে অনেক দেওরেঐ বিয়া করে। আর আতাহারের লগে পারুর সম্পর্ক বউ জামাইর লাহান। বেবাক কিছু বিবেচনা কইরাঐ চিন্তাডা আমি করছি। অহন এইডার ব্যবস্থা আপনের করন লাগবো। আমি আর কোনও কথাই হুনুম না।

অনেকক্ষণ ধরে একই রকমের কথা শুনতে শুনতে খুবই বিরক্ত হয়েছেন মান্নান মাওলানা। আতাহারকে নিয়া এই ধরনের চিন্তাভাবনা তাঁর একদমই ভাল লাগছে না। আবিয়াত ছেলে হচ্ছে একধরনের মূলধন। এই মূলধন খাঁটিয়ে অন্য গিরস্তের কাছ থেকে টাকাপয়সা সোনাদানা এমনকী জায়গাসম্পত্তিও বাড়াবেন তিনি। বড়ছেলেটাকে দিয়া সেই কাজ হয় নাই। এখন হাতে আছে অন্য দুই ছেলে! তার একটাকে নিয়া স্ত্রী এর মধ্যেই ভেজাল লাগাবার চেষ্টা করছে। এই ভেজাল এখনই ভাঙতে গেলে ঝগড়াঝাটি লেগে যাবে! সোজা মানুষ এতদিন পর খেপেছে তাকে সামলাতে হবে বুদ্ধি দিয়া, কায়দা করে। সেই কায়দার পথটাই তারপর ধরলেন মান্নান মাওলানা। স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বললেন, ঠিক আছে, তুমি অহন শান্ত হও। আমি ব্যবস্থা করতাছি।

.

হাসুবালা, ও হাসুবালা! ঘুমাইছনি?

গোলাঘরের চৌকিতে কাত হয়ে শুয়ে আছে হাসু। তার পরনে সবুজ রঙের ত্যানা ত্যানা শাড়ি আর নানা রঙের ফুল লতাপাতা আঁকা ছিট কাপড়ের ব্লাউজ। মাথার তলায় তেল। চিটচিটা ধ্যালধ্যাল বালিশ। মাথার ভারে চৌকির লগে এতটাই মিশে গেছে সেই বালিশ হঠাৎ করে তাকালে বোঝাই যায় না যে বালিশ মাথার তলায় একখান আছে।

হাসুর চোখ বোজা, মুখে মুমূর্ষ ভাব। খানিক আগেই রান্নাঘর থেকে ভাত খেয়ে আসছে। সে আর রহিমা একলগেই খেতে বসেছিল। হাফিজদ্দিও ছিল। খেতে আজ ভাল লাগছিল না হাসুর। শরীরের কীরকম একটা ম্যাজম্যাজ ভাব। দুই-তিন লোকমা ভাত খাওয়ার পরই শরীর গুলাতে শুরু করেছে, বমি বমি ভাব হয়েছে। নিজেকে শক্ত করে ব্যাপারটা চেপে রেখেছে হাসু। কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়া কোনওরকমে থালের ভাত শেষ করে এই ঘরে এসে শুয়ে পড়েছে।

রহিমা খেয়াল করেছিল ব্যাপারটা, জানতেও চেয়েছিল। কী অইছে তর? এমুন হরতরাইস্যা ভাব ক্যা?

হাফিজদ্দি হেসেছে। হাসু তো এমুন।

তখনই হাসু ভেবে রেখেছিল খাওয়াদাওয়া শেষ করে ফুফু যখন গোলাঘরে আসবে তখন তাকে সব বলবে।

রহিমা এল অনেকক্ষণ পর। হাসুর ততক্ষণে শরীর আরও খারাপ। বুকের অনেক ভেতর থেকে তাপ বেরুচ্ছে। শরীরে অদ্ভুত এক অবস্থা, হাত পায়ের গাটে গাঁটে ব্যথা, চোখ জ্বলছে, মাথা ঝিমঝিম করছে, জ্বর আসার লক্ষণ।

এই অবস্থায় রহিমা এসে এমন আহ্লাদী গলায় ডাকল।

ভাত খেয়েই আঁচলের গিঁট থেকে খুলে পান মুখে দিয়েছে রহিমা। পান মুখে দিলে এমনিতেই তার আচরণে একটা ফুর্তির ভাব আসে। এখন যেন ভাবটা একটু বেশি আসছে। হাসুকে ডাকছে হাসুবালা বলে।

হাসুর নামের লগে যে বালা কথাটা আছে সেইকথা ভুলেই গিয়েছিল সে। এখন ফুফুর ডাকে বহুদিন পর মনে পড়ল। সত্যিই তো, তার পুরা নাম তো হাসুবালাই। কেউ ডাকে না বলে দিনে দিনে চাপা পড়ে গেছে।

কোনওরকমে চোখ খুলল হাসু। মুমূর্ষ গলায় বলল, কী অইছে? ডাক পাড়ো ক্যা?

হাসুর পাশে বসল রহিমা। একখান সমবাত আছে।

কীয়ের সমবাত?

মুখের পানে দুই-তিনটা চাবান দিল রহিমা। হুজুরের লগে আমার কথা অইছে।

হাসু কথা বলল না। চোখ ছোট করে রহিমার দিকে তাকিয়ে রইল।

রহিমা বলল, জিগাইলি না, কী কথা?

তুমিঐ কও। কথা কইতে আমার ভাল্লাগতাছে না।

ক্যা? কী অইছে তর? দোফইরা ভাতও তো ঠিক মতন খাইলি না!

হ।

ক্যা? শইল ভাল না?

না। কেমুন জানি লাগতাছে।

কেমুন লাগতাছে?

কইতে পারুম না।

জ্বরজ্বারি আইলো নি?

হাসুর কপালে হাত দিল রহিমা। দিয়া চিন্তিত হল। হ শইল ইট্টু ইট্টু গরম। মনে অয় জ্বর আইবো।

হাসু কাতর গলায় বলল, ভাত খাইতে বইয়া খালি উটকি (উদগার) আইছে।

কচ কী?

হ। খালি মনে অইছে উকাল অইব।

রহিমা ভাল রকমের চিন্তিত হল। পান চিবানো ভুলে একদৃষ্টে হাসুর দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, উটকি পারছস, উকাল করতে চাইছস! হাসু, অন্যকোনও ভেজাল বাজাচ নাই তো?

কথাটা বুঝতে পারল না হাসু। বলল, কীয়ের ভেজাল?

বোজচ নাই?

না।

সিয়ানা মাইয়ারা কুনসুম উটকি পারে আর উকাল করে জানচ না তুই?

হাসু মুমূর্ষ মুখে হাসল। জানি। তয় ওই হগল না। ওই হগল অইলে বহুত আগে অইতো। তোমার লাহান বেবাক কিছু মাইন্না লইলে শইল্যের এমুন বেড়া বেড়া দশা হইতো না। মউচ্ছামান্দ্রার বাইত্তে ভালঐ থাকতে পারতাম। কয়দিন পর পর তোমার কাছে আইতাম না। এই বাইত্তে থাকতে চাইতাম না।

এই বাড়িও কইলাম ওই বাড়ির লাহানঐ। হুজুর আর তার পোলায় আছে না?

বেবাকঐ জানি। বহুতদিন ধইরাঐ আতাহার দাদার মতলব আমি বুজি, হুজুরের মতলবও বুজি। হেদিন পাও টিপতে ডাইক্কা হুজুরে আমার শইল্যে হাত দিতে চাইছে। এই হগল অবস্থায় নিজেরে আমি ঠিকঐ বাঁচাইতে পারি। হেদিন আমার বাঁচান লাগে নাই, হুজুরানিঐ আমারে বাঁচাইয়া দিছে।

কেমতে?

হুজুর খালি আমার শইল্যে হাতটা দিবো, লগে লগে হুজুরানি আইয়া ঘরে হানছে।

হেয় দেকছে?

পুরা দেকছে কিনা কইতে পারি না।

তরে কিছু কয় নাই তো?

না।

রহিমা স্বস্তির শ্বাস ফেলল। তয় মনে অয় বোজে নাই। হেয় এই হগল বোজে কম। বহুত ভাল মানুষ। হেয় যদি মানুষ খারাপ অইতো তাইলে এই বাইত্তে আমি থাকতে পারতাম না। হুজুরেও যা মন লয় করতে পারত না। মোতাহারের বউ আর আতাহার যেই হগল করে, এই হগল কিছুঐ এই বাইত্তে অইতো না।

তয় আমার মনে অয় হুজুরানির অমুন হওনঐ ভাল আছিলো। কুত্তা যেমুন অয় ইটামুগইরও হেমুন অওন উচিত।

বাদ দে এই হগল প্যাচাইল। অহন আসল কথা হোন।

হাসু আবার চোখ বুজল। কও।

ভাত খাইয়া এই ঘরের মিহি আইতাছি, দেহি বাইর বাড়ির মিহি যাইতাছে হুজুরে।

এই টাইমে ওই মিহি যায় ক্যা? এইডা তো তার ঘোমের টাইম!

হ। আইজ মনে অয় ঘোম আহে নাই।

ক্যা?

আমি কেমতে কমু!

হাসু কথা বলল না। চোখ বুজে চুপ করে রইল।

রহিমা পান চিবাতে চিবাতে বলল, হুজুরের মুখ দেইক্কা মনে অইলো হেয় জানি কী চিন্তা করতাছে। আমারে দেইক্কা হাত ইশারায় ডাক দিল। গেলাম। জিগাইলো আতাহাররে দেখছিলি? কইলাম, না। আতাহারে আইজ দুইফইরা ভাত খাইতে আহে নাই। মনে অয় দোস্তগ লগে আছে। কনটেকদার সাবের লগে মাওয়ার বাজারের হইটালে খাইয়া লইবো নে। হুজুরে আর কথা কইলো না। বড়ঘরের মিহি কাইক দিছে দেইক্কা আমি সাহস কইরা তর কথা কইয়া হালাইলাম।

হাসু চোখ খুলল। কী কইলা?

কইলাম তুই এই বাইত্তে থাকতে চাস। আমি বুড়া অইয়া গেছি, একলা এতবড় সংসারের কামকাইজ করতে পারি না।

হেয় কী কইলো?

কইলো, যেই বাইত্তে কাম করে ওই বাইত্তে অসুবিদা কী?

তুমি কী কইলা?

অসুবিদার কথা বেবাক ভাইঙ্গা কই নাই। দুই-একখান কইছি। চালাক মানুষ তো, অল্পতেঐ বেবাক বোজে।

তারবাদে কী কইলো?

হাসলো। আইচ্ছা ঠিক আছে, থাউক। তয় বেতন বোতন কইলাম দিতে পারুম না। তুই যেমতে আছস তর ভাইরবেডিও অমতেঐ থাকবো। পেড়ে ভাতে। দুই ইদের সমায় দুইহান কাপড় পাইবো, আর কিছু না।

হাসু আবার চোখ বুজল। কথা বলল না।

হাসুর মুখের দিকে একবার তাকিয়ে আবজানো দরজার ফাঁক দিয়া উঠানের দিকে তাকাল রহিমা। উঠানে এখন বৈশেখ মাসের দুপুর শেষের রোদ। রোদের তেজালো ভাব আবজানো দরজার ফাঁক দিয়া যেটুকু আসছে তাতেও দশা খারাপ অবস্থা হওয়ার কথা মানুষের। রহিমার তেমন হচ্ছিলও। তয় শরীরের ভিতর থেকে অদ্ভুত এক উষ্ণতা ঠেলে বেরুবার ফলে বাইরের উষ্ণতা একদমই টের পাচ্ছিল না হাসু। ফুফুর লগে এতক্ষণ ধরে টুকটাক কথা বলার ফলে ক্লান্ত লাগছে তার, গলাটা কী শুকিয়েও আসছে। গলা ভিজাবার জন্য একবার ঠোঁট চাটল হাসু। ব্যাপারটা খেয়াল করল রহিমা। কী রে তিয়াস লাগছেনি?

হ।

পানি খাবি?

দেও।

ঘরের কোণে ঠিলা রাখা আছে। মুখের উপর মাটির সরা। সরার উপর টিনের চলটা ওঠা মগ। দীর্ঘদিন ধরে মাটির ওপর ভরা ঠিলা রাখতে রাখতে ঠিলার তলার আকৃতির গর্ত হয়ে গেছে জায়গাটায়। গর্তে বসা ঠিলা থেকে পানি ঢালতে সুবিধা। পায়ের পাতার উপর ঠিলা তুলে পানি ঢালতে হয় না। কাত করলেই হয়।

রহিমা দ্রুত হাতে সেই ঠিলা থেকে পানি ঢেলে আনল হাসুর জন্য। কোনওরকমে মাথা তুলে দুই-তিন টোক পানি খেল হাসু। তারপর দুর্বল ভঙ্গিতে মাথা রাখল বালিশে। আবজানো দরজার ফাঁক দিয়ে মগের বাকি পানিটুকু গোলাঘরের ছনছায় ফেলে মগ জায়গা মতন রাখল রহিমা। আবার এসে বসল হাসুর পাশে। বলল, এতদিন বাদে আইজ হুজুরের লগে তরে লইয়া কথা কইলাম, এই বাইত্তে তর থাকনের বেবস্তা করলাম আর আইজঐ তর জ্বর আইলো? কোনও কোনও মাইনষের নছিব এমনুঐ অয়। যেদিন কোনও শুভ কাম অয় হেদিন হেগো অসুক বিসুক অয়। শুভ কামের ফুর্তিডা হেরা করতে পারে না। তুই অইছস হেই পদের মানুষ।

হাসু কথা বলল না। দম টানার ফাঁকে টের পাচ্ছিল শরীরের ভিতর থেকে বেজায় গরম একখান ভাপ বেরুচ্ছে।

.

বারবাড়ির দিক থেকে উঠে আসার সময় মান্নান মাওলানার মুখামুখি পড়ে গেল আতাহার। হাতে সিগ্রেট ছিল। কোনওরকমে সেই হাত পিছনে নিয়া আস্তে করে সিগ্রেটটা ছেড়ে দিল। তারপর মান্নান মাওলানার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, আপনে বলে আমারে বিচড়াইছেন?

ছেলের মুখের দিকে একপলক তাকিয়ে নাড়ার পালার উপর দাঁড়িয়ে থাকা কাকতাড়ুয়াটির দিকে তাকালেন মান্নান মাওলানা। গম্ভীর গলায় বললেন, তরে কে কইলো?

রহি।

হ বিচড়াইছি। কথার কাম আছে।

কন।

এহেনে কইতে চাই না। ঘরে যাইয়া বয়, আমি আইতাছি।

আতাহার বুঝতে পারল না কোন ঘরে গিয়া বসবে! বলল, কোন ঘরে যামু? বড়ঘরে?

না, বাংলাঘরে যা।

আইচ্ছা।

আতাহার বাংলাঘরে গিয়া ঢোকার কিছুক্ষণ পর মান্নান মাওলানা এসে ঢুকলেন। মাটিতে পা রেখে চৌকির মাঝবরাবর বসেছিল আতাহার। ঘরের একপাশে বড়সড় ভারী ধরনের একখান টেবিল আর হাতাআলা একখানা চেয়ার আছে। বহুদিনের ব্যবহারে বার্নিশ মুছে পাকা কাঠের আসল রং বের হয়ে গেছে। এই চেয়ার টেবিলে বসে একসময় লেখাপড়া করেছে আতাহার। এখন টেবিল চেয়ার তেমন কোনও কাজে লাগে না। কখনও কখনও ভাত খাওয়ার কাজে টেবিলটা আজকাল ব্যবহার করে আতাহার। দুপুরে রাতে রহিমা তার ভাত ঢেকে রেখে যায় এই টেবিলে। চেয়ারে বসে আরাম করে খায় আতাহার।

আজ বিকালবেলা সেই চেয়ারটায় ছেলের মুখামুখি বসলেন মান্নান মাওলানা। হাতের তসবি জপতে জপতে বললেন, তর মা’র লগে তর কোনও কথা অইছে?

আতাহার অবাক হল। না তো! কী কথা?

তর বিয়াশাদির ব্যাপারে?

বাপের মুখে নিজের বিয়ার কথা শুনে আতাহারের মতন ছেলেও লজ্জা পেল। মাথা নিচা করে বলল, না।

মান্নান মাওলানা স্বস্তির হাঁপ ছাড়লেন। তয় ঠিক আছে।

আতাহার মুখ তুলে বাবার দিকে তাকাল। কী অইছে?

তর মা’য় একহান ভেজাল লাগাইছে।

কীয়ের ভেজাল?

তর বিয়াশাদি লইয়া।

কী কয়?

আবল তাবল প্যাচাইল। হুইন্না মনে অইলো মাথা খারাপ অইয়া গেছে।

আতাহার কথা বলল না। মান্নান মাওলানার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

মান্নান মাওলানা বললেন, আথকা কেমুন জানি অইয়া গেছে তর মা’য়। যেই মানুষ কোনওদিন। কথাঐ কইতো না, কয়দিন ধইরা বহুত প্যাচাইল পাড়তে শুরু করছে হেই মানুষ।

আতাহার আবার বলল, কী কয়?

একদিন বিয়ানে আমার লগে কাইজ্জাঐ লাগাই দিল।

ক্যা?

আমি নমজ পড়তে ডাক দিছি, এর লেইগা।

কন কী?

হ।

আতাহার চিন্তিত গলায় বলল, মায় তো এমুন মানুষ না!

আমিও তো হেইডাঐ কই। তারবাদে নমজ হেয় পড়ছে। নমজ পড়নের আগে মোতাহাররে লইয়া অনেক প্যাচাইল পাড়লো। আমারে অনেক দোষ দিলো। আমি বলে অর লেইগা কিছু করি নাই, এর লেইগা ও মইরা গেছে।

মা’য় তো দাদারে ইট্টু বেশি আদর করতো, এর লেইগাঐ কইছে।

হেদিন বড়পোলারে হেয় সপনেও দেকছে।

এর লেইগাঐ মনে অয় মনডা খারাপ আছিলো।

হইতে পারে। তয় মোতাহার মরণের পরও তো অরে হেয় সপনে দেকছে! আগে তো কোনওদিন আমার লগে এমুন করে নাই!

এসব কথা শুনে আতাহার চিন্তিত হয়ে রইল। বাড়ি ফিরেছিল টাকাপয়সা নিতে। আলী আমজাদের কন্ট্রাক্টরির ছাপরা ঘরে আজ তিতাস খেলা হবে। লগে কেরু কোম্পানির। হুইস্কি। চারখান মুরগি ভুনা করে পাঠাবে ফুলমতি। লগে খাঁটি ঘিয়ে ভাজা পরোটা। মজাটার আয়োজন দুপুরের পর হঠাৎ করেই করল আলী আমজাদ। তারপর আলম সুরুজ আর আতাহার যে যার বাড়ি গেল টাকা আনতে, আর নিখিল গেল খাওয়াদাওয়ার আয়োজন করতে। পাঁচশো টাকার একখান নোট তার হাতে দিয়া দিল কন্ট্রাক্টর সাহেব।

তয় বাড়িতে এসেই মান্নান মাওলানার মুখামুখি পড়ে গেল আতাহার। বাংলাঘরের। কারের তলায়, দক্ষিণ দিককার বেড়ার লগে চওড়া কাঠের তাক, সেই তাকে আতাহারের টিনের সুটকেস। ওই সুটকেসেই তার টাকাপয়সা। ছোট্ট তালা আছে সুটকেসে। চাবিটা আতাহারের মাজায়, কাইতানের লগে বান্দা। সুটকেস খোলার সময়ই পায় নাই আতাহার। কখন পাবে, কে জানে! বাবা কতক্ষণ কথা বলবে, কে জানে!

তবে খেলা শুরু হতে দেরি আছে। সন্ধ্যার পর ছাড়া হবে না।

মা তার বিয়াশাদির ব্যাপারে কী বলল সেকথা শোনার জন্য খুবই উদগ্রীব হয়ে আছে আতাহার। কেন যে কথাটা এখনও বলছেন না বাবা! শুধু আবোল তাবোল প্যাচালই যে কেন পাড়ছেন!

আতাহারের মনের এই কথাটা যেন টের পেলেন মান্নান মাওলানা। একবার ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে, হাতের তসবি জপতে জপতে উঠানের দিকে তাকালেন। উঠোনে রোদের রং এখন পাকা আমের মতন। বিকালবেলাও গরমের কমতি নাই। রোদের দিকে। তাকিয়ে গরমটা যেন একটু বেশিই টের পেলেন মান্নান মাওলানা। নিজের কাছে নিজে বলার মতন করে বললেন, ইস কী গরমডা যে পড়ছে! বৈশাখ মাস আইয়া পড়লো তাও মেগবিষ্টির দেহা নাই। এমুন অইলে মাইনষের দশা খারাপ অইয়া যাইবো।

আতাহার কথা বলল না। অস্থির লাগছে তার। এইসব আবল তাবল প্যাচাইল পারতাছে ক্যা বাবায়! আসল কথা কয় না ক্যা!

চালাকি করে নিজেই কথা তুলল। বাবা, হেদিনের পর থিকা কি মা’য় প্যাচাইল ইট্টু বেশি পাড়তাছে?

মান্নান মাওলানা চিন্তিত গলায় বললেন, হ।

কী কয়?

বহুত পদের কথা।

আমারে লইয়া কী কইছে?

হেদিন কিছু কয় নাই। কইছে দুই-তিনদিন আগে। আথকা আমারে কয়, আতাহারের লেইগা অন্য জাগায় মাইয়া দেইক্কা লাব নাই। বাইত্তেঐত্তো মাইয়া আছে। হেই মাইয়া অরে বিয়া করান।

আতাহার অবাক হল। এই বাইত্তে আবার মাইয়া কেডা?

বোজচ নাই?

না।

আমিও পয়লা বুজি নাই। তর মায় ভাইঙ্গা কওনের পর বুঝছি।

কার কথা কইলো?

পারুর কথা।

আতাহার আঁতকে উঠল। কী?

হ। তর মায় চাইতাছে পারুরে তুই বিয়া কর।

আতাহার হাঁ করে মান্নান মাওলানার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

মান্নান মাওলানা বললেন, খালি এডু কথাঐ কয় নাই। আরও বহুত কথা কইছে। বাপ অইয়া হেই হগল কথা তরে আমি কইতে পারুম না। যা বোজনের তুই বুইজ্জা ল। তয় তর মা’র কথা হুইন্না আমি বুঝছি হের মাথাডা এক্কেরে বিগড়াইয়া গেছে। এই হগল লইয়া বড় রকমের একহান ভেজাল হেয় লাগাইবো।

আতাহার চিন্তিত গলায় বলল, আথকা এই হগল লইয়া প্যাচাইল পাড়তে আরম্ভ করল ক্যা মা’য়?

বোজলাম না। তয় আমার একহান সন্ধ অইতাছে।

কী?

পারু তর মা’রে কিছু কয় নাই তো?

ভাবিছাবে মা’রে কী কইবো?

মান্নান মাওলানা একটু রাগলেন। কী আর কইবো? এই হগল কথাঐ!

এই হগল তার কওনের কথা না।

ক্যা, কওনের কথা না ক্যা?

কইলে আগেঐ কইতো! দাদায় মরণের এতদিন বাদে কইবো ক্যা?

কইতে পারে। এতদিনে হয়তো চিন্তাভাবনা বদলাইছে।

আমার মনে অয় না।

তয় কী মনে হয় তর? আথকা তর মা’য় এই হগল প্যাচাইল পাড়তে আরম্ভ করলো ক্যা?

এক পলক মান্নান মাওলানার দিকে তাকিয়েই মাথা নিচা করল আতাহার। কেমতে কমু!

মান্নান মাওলানা একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর আচমকা বললেন, তর মতলব কী?

আতাহার চমকাল। কীয়ের মতলব?

তর মা’য় যা চায়, করবি? পারুরে বিয়া করবি?

আতাহার দৃঢ় গলায় বলল, না, মইরা গেলেও করুম না।

শুনে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন মান্নান মাওলানা। চেয়ারের হাতলে থাবড় মেরে বললেন, শাব্বাশ বাপের বেড়া। এই না অইলে আমার পোলা! মা’য় ক্যান, আমার লাহান বাপে কইলেও বড়ভাইর বিধবা বউরে তর বিয়া করন উচিত না। তর লাহান বসসে মাইনষের জীবনে বহুত কিছু ঘডে। পারুর লগেও নাইলে তর ঘটছে। তাতে কী অইছে! ওই হগল ধইরা বইয়া থাকলে কাম অইবোনি?

আতাহার কথা বলল না। মাথা নিচা করে বসে রইল।

মান্নান মাওলানা হাতের তসবি জপতে জপতে বললেন, পারু যেমতে আছে অমতেঐ থাকব। জাগাজমিন বাড়িঘর গাইগোরু যা মোতাহার ভাগে পাইতো বেবাকঐ আমি অগো বুজাইয়া দিছি। তারবাদেও মোতাহার মরণের পর থিকা অগো দেখভাল আমি করি। পোলাপান তিনডাও ঠিকঐ মানুষ হইব। ওই হগল লইয়া তুই একদোমঐ চিন্তা করবি না। তুই তর নিজের চিন্তা কর। আজাহার ঘনঘন চিডি লেকতাছে। জাপানে থাকতে চায় না। দেশে আইয়া পড়তে চায়। আইয়া বিয়াশাদি কইরা সংসার করব। তয় তুই বিয়া না করলে ও আইবো না। এর লেইগা মদিনার জামাইরে আমি কইছি তর লেইগা মাইয়া দেকতে। ল্যাংড়া বইচ্ছারেও (বশির) খবর দিছি। ও তো অহন ভাল ঘটক! দুয়েক মাসের মইদ্যেঐ মাইয়া বিচড়াইয়া বাইর কইরা হালাইবো। ওইদিকে ঢাকা নারাইনগঞ্জে অন্য মাইয়ার জামাইগোও কইছি মাইয়া দেকতে। দুইডা মাইয়া দেকতে কইছি। একহান তর লেইগা আরেকহান আজাহারের লেইগা।

আতাহার আগের মতোই বসে রইল। কথা বলল না।

মান্নান মাওলানা বললেন, মোতাহাররে বিয়া করাইয়া কোনও লাব অয় নাই আমার। দুইডা পয়সাও আহে নাই সংসারে। লোয়াজিমা (বিয়ের আসবাবপত্র, গয়নাগাটি ইত্যাদি) যা পারুগো মিহি থিকা দিছে, চাইর পশা দাম নাই হেই হগলের। ওইডা আমি আশাও করি নাই। মোতাহারের শইল্যের দশা দেইক্কাঐ আততিয়র মাইয়া বাইত্তে আনছিলাম, যাতে ঘরের কথা পরে জানতে না পারে। তয় তর আর আজাহারের দশা তো মোতাহারের লাহান না! তগ দুই ভাইরে আমি ধনীর ঘরে বিয়া করামু। লোয়াজিমা, সোনাদানা টেকা পয়সা দিয়া যেন হেরা আমার বাড়ি ভইরা দেয়, এমুন বাড়ির মাইয়াঐ আমি বেবাকতেরে দেকতে কইছি।

মান্নান মাওলানার কথা শুনে ভিতরে ভিতরে খুবই পুলকিত হয়ে আছে আতাহার। একে তার বউ হয়ে আসবে নতুন তরতাজা কচি একখান নারীশরীর, তার উপর আসবে টাকা পয়সা, সোনাদানা, সব মিলিয়ে খুবই আনন্দের ব্যাপার। এই সুযোগ ফেলে কে যাবে ওই তিন পোলাপানের মা পারুরে বিয়া করতে! শরীরস্বাস্থ্য যতই কচিখুকির মতন হোক, বয়স তো কম হয় নাই! তা ছাড়া ওই শরীরের স্বাদও দশ-বারো বছর ধরে পেয়ে আসছে আতাহার। নতুন করে আর কী পাওয়ার আছে তার কাছে!

মান্নান মাওলানা বললেন, তর লগে আমার যা কথা অইলো এইডাঐ কইলাম ফাইনাল!

অনেকক্ষণ পর কথা বলল আতাহার। আইচ্ছা।

তয় তর মা’য় কইলাম আইবো তর লগে কথা কইতে। হেরে কী কবি?

কমুনে। ওই হগল লইয়া আপনে চিন্তা কইরেন না। মা’রে যেমতে পারি বুজামুনে।

হ বুজাইচ। কায়দা কইরা বুজাইচ। সোজা মানুষ, একহান জিনিস লইয়া চিন্তা করতাছে, এই চিন্তা কইলাম সহাজে হের যাইবো না। ঠান্ডা মাথায় সোন্দর কইরা বুজাইয়া হেরে অহন থামাবি। ওদিন কইলাম আমিও অমতেঐ থামাইছিলাম। তারবাদে আমাগো কাম। আমরা করুম।

আতাহার খুবই বাধুক ছেলের মতন বলল, আইচ্ছা।

মান্নান মাওলানা চেয়ার ছেড়ে উঠলেন। আর কোনও কথা বললেন না। তসবি জপতে জপতে উঠানে নামলেন।

দুই এক পলক তাকিয়ে বাবার বের হয়ে যাওয়া দেখল আতাহার তারপর চৌকির উপর উঠে দাঁড়াল। দুই হাতে যত্ন করে ধরে তাকে রাখা সুটকেস নামাল।

.

গভীর রাতে দুর্বল হাতে কোনওরকমে রহিমাকে দুই-তিনটা ধাক্কা দিল হাসু। ক্লান্ত অসহায় গলায় ডাকল, ফুবু ও ফুবু, ফুবু।

রহিমার ঘুম অদ্ভুত ধরনের। শোয়ার লগে লগে ঘুমায়া পড়ে সে। ঙো আঁ করে নাকও ডাকে। তবে দুই-একটা ধাক্কা দিয়া ডাকলে ঘুমটা ভাঙে।

এখনও তাই হল। হাসুর ধাক্কা খেয়ে প্রথমে নাক ডাকা বন্ধ হল রহিমার, সাড়া দিল। কী রে মা? কী অইছে?

হাসু মুমূর্ষ গলায় বলল, জ্বরে আমি যাইতাছি। আমার মাথাডা মনে অয় ফাইট্টা যাইবো।

রহিমা ধড়ফড় করে উঠে বসল। কচ কী?

হ। আর একহান অসুবিদা অইতাছে।

কী?

মাজার নীচ থিকা পেশাবের রাস্তা তরি কেমুন জানি অবশ অবশ লাগতাছে।

দিশাহারা হল রহিমা। কী করবে না করবে বুঝতে পারল না। ছটফট হাতে বালিশের। তলা থেকে ম্যাচ বের করল, কুপি জ্বালল। কুপির আলোয় হাসুর মুখের দিকে তাকাল। জ্বরক্লান্ত ম্লান ফ্যাকাশে মুখ হাসুর। চোখে আতঙ্কের দৃষ্টি। সেই দৃষ্টি দেখে রহিমা বুঝল হাসু খুবই ভয় পাচ্ছে। সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য হাসুর মাথায় হাত দিল রহিমা। দিয়ে এমন করে চমকাল যেন মউলকা ভাজার তপ্ত খোলায় আচমকা হাত লেগে গেছে। নিজের অজান্তেই বলল, মাগো! এমুন জ্বর আইছে! এমুন জ্বর জিন্দেগিতে কেঐর দেহি নাই। এমন জ্বরে মাথায় বিগার (বিকার) উইট্টা যাওনের কথা! মাথার দুইমিহির রগ ছিড়া যাওনের কথা। এর লেইগাঐ মাথা ফাইট্টা যাইতে চাইতাছে তর।

হাসু মুমূর্ষ গলায় বলল, আর মাজার নীচের অবশ অবশ ভাবহান?

ওইডাও জ্বরের লেইগাঐ।

ডানহাত কোনওরকমে বাড়িয়ে রহিমার একটা হাত ধরল হাসু। ফুবু, আমি কি মইরা যামু?

একথায় বুকটা মোচড় দিয়া উঠল রহিমার, চোখ ফেটে কান্না এল। কান্না সামলে কোনওরকমে বলল, ধুৎ ছেমড়ি! মরবি ক্যা? বেশি জ্বর আইছে দেইক্কা এমুন লাগতাছে। খাড়ো, আমি তর মাথায় পানি দেই। মাথায় পানি দিলে জ্বর নাইম্যা যাইবো। আরাম লাগবো।

হাসু কথা বলল না।

একবার হাসুর দিকে তাকিয়ে কুপি হাতে গোলাঘরের দরজা খুলল রহিমা, উঠানে নেমে গেল।

কুপির আলোয় ঘরের ভিতরটা এতক্ষণ আলোকিত ছিল, সেই আলোয় কীরকম যেন একটু সাহসী হয়েছিল হাসু। এখন আলো নাই, গভীর অন্ধকারে ভয়ংকর এক জ্বরে পুড়ে যেতে যেতে তার মনে হল সে আসলে বেঁচে নাই। যেন অনেকক্ষণ আগেই মরে গেছে। গোরস্থানের মাটিতে কবর খুঁড়ে যেন নামিয়ে দেয়া হয়েছে তাকে। তারপর মাটি চাপা দিয়ে গিরস্তরা যে যার কামে চলে গেছে। এখন অন্ধকার কবরের ভিতর একা পড়ে আছে সে। এই কবরের ভিতর এখন দিনে দিনে পচতে শুরু করবে তার সাধের শরীর। বড় হয়ে। ওঠার পর যে শরীর নিয়া নানারকমভাবে এতকাল ধরে খাবলা খাবলি করার চেষ্টা করছে। মউছামান্দ্রার এক বাড়ির নানা বয়েসি পুরুষ, মান্নান মাওলানার বাড়ির মাওলানা সাহেব নিজে আর তার জুয়ান ছেলে আতাহার। নিজেকে ওইসব খাবলা খাবলি থেকে রক্ষা করবার জন্য দিনরাত্রির প্রায় প্রতিটি মুহূর্ত তাকে এক ধরনের যুদ্ধ করতে হয়েছে। সেই যুদ্ধ করতে করতে নরম কোমল নারীদেহ শক্ত হয়ে গেছে, যুদ্ধক্ষেত্রের ক্লান্ত যোদ্ধার মতন রুক্ষ, পাথর। হয়ে গেছে তার মোলায়েম নারীদেহ। হায় রে মেয়েমানুষের জীবন!

এইসব ভাবতে ভাবতে হাসু একসময় টের পাচ্ছিল কোথায় যেন জ্বলে উঠেছে এক টুকরা মোলায়েম আলো, সেই আলোর মায়াবী একখান পরশ এসে যেন লাগছে তার বন্ধ চোখের পাতায়। আর ভয়ংকর জ্বরে ফেটে পড়তে চাওয়া তার মাথায় যেন সাত আশমানের উপর থেকে এসে পড়ছে শীতকালের কচুরিপানার তলায় লুকিয়ে থাকা শীতল জলের মতো। মৃদু একখান জলধারা। এ যেন আল্লাহর আরশ থেকে আসা এক রহমতের ধারা, যে ধারায় মানুষের শরীর থেকে উধাও হয় জরাব্যাধি।

হাসু চোখ বুজল।

কতক্ষণ ধরে হাসুর মাথায় পানি দিয়েছে রহিমা সেকথা পলকে মনে নাই। সেই যে কুপি হাতে বের হয়েছিল, বের হতে ছুটে গিয়েছিল রান্নাঘরে। রান্নাঘরের সামনে লোহার পুরানা মাঝারি সাইজের একটা বালতি আছে। রান্নাবান্নার কাজে এই বালতি ভরে পানি আনে রহিমা বহুবছর ধরে, এই বাড়িতে আসার পর থেকে। ছুটে গিয়ে সেই বালতিটা নিয়েছে সে। তার ব্যবহারের প্লাস্টিকের খয়েরি রঙের বদনা আছে। বদনাটা পড়ে থাকে পায়খানায় যাওয়ার পথের ধারে। সেই বদনা নিয়েছে। সোজা গেছে পুকুরঘাটে। এক বালতি পানি নিয়া ঘরে এসে ঢুকেছে। এসে দেখে হাসু অচেতন। দিকপাশ না তাকিয়ে কুপিটা রেখেছে মাটির মেঝেতে, টানা হ্যাঁচড়া করে উত্তর-দক্ষিণে শোয়া হাসুকে টেনে পুবে-পশ্চিমে করেছে। পা দুইটো পুবে, মাথা পশ্চিমে। মাথার তলা থেকে বালিশ সরিয়ে মাথা ঝুলিয়ে দিয়েছে চৌকির বাইরে। ঠিক মাথার তলা বরাবর রেখেছে বালতি। তারপর বালতি থেকে বদনা ভরে পানি তুলেছে আর নল দিয়ে অতিযত্নে পানি দিয়েছে মাথায়। জ্বরের ঘোরে তখন যেমন অচেতন হয়ে আছে হাসু, হাসুর মাথায় পানি দেওয়ার কাজে রহিমাও যেন একরকম অচেতনই।

এই অচেতনতা ফিরল বিয়ান রাতে, বাংলাঘরের কোণে পশ্চিমমুখী দাঁড়িয়ে মান্নান মাওলানা যখন ফজরের আজান দিলেন। ‘আছোলাতু খায়রুল মিনাননাউন’। সেই পবিত্র ডাকে রহিমা যেমন নিজের মধ্যে ফিরল, হাসুও প্রথমে কেমন কেঁপে উঠল, তারপর চোখ খুলল। হাসুকে চোখ খুলতে দেখে বুক থেকে যেন পাথর নেমে গেল রহিমার। হাতের বদনা বালতির পানিতে রেখে হাসুর কপালে হাত দিল, গলায় বুকে হাত দিল, দিয়ে স্বস্তির হাসি হাসল। আল্লায় রহম করছে। জ্বর নামছে।

হাসু তখন একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে রহিমার দিকে। তাকে ওইভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে রহিমা বলল, কী রে মা, চাইয়া রইছচ ক্যা?

হাসু গভীর আবেগের গলায় বলল, তোমার মুখহান দেকতাছি।

ক্যা, আমার মুখ দেহনের কী অইলো?

ইচ্ছা করলো তোমার মুখের মিহি চাইয়া থাকতে।

তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

রহিমা বলল, নিয়াস ছাড়ছ ক্যা?

একহান কথা মনে কইরা নিয়াস ছাড়লাম।

কী কথা?

রহিমার কথার জবাব না দিয়া হাসু একটু নড়েচড়ে উঠল। আগে আমারে ভাবদি মতন হোয়াও, তারবাদে কই।

হাসুর কথা শুনে রহিমা একটু চমকাল। সত্যঐত্তো! তরে তো ভাবদি মতন হোয়ানের কাম! হায় হায় আমি তো ভুইল্যাঐ গেছি। মাথায় পানি দেওনের লেইগা তর যে সিথান বদলাইছি, হেই কথা আমার মনেঐ আছিলো না।

হাসুর গলার তলায় দুইহাত ঢুকিয়ে তাকে টেনে হিঁচড়ে আগের ভঙ্গিতে শোয়াল রহিমা।

হাসু বলল, লইড়া চইড়া হোওনের জোরডাও আমার শইল্লে নাই ফুবু।

কেমতে থাকবো! আইজ তিনদিন ধইরা জ্বর। আর যেমুন তেমুন জ্বরনি? এমুন জ্বরে শইল্লে জোর বল থাকেনি মাইনষের! তুই তো কিছু মুখেও দিতে চাস না। ভাত রুটি যাঐ দেই কিছুঐ খাচ না। না খাইলে জোর থাকেনি শইল্লে!

খাইতে ভাল্লাগে না। খালি উটকি আহে।

তাও জোর কইরা খাইতে অয়।

একটু থামল রহিমা। অহন ক কী মনে কইরা নিয়াস ছাড়লি? কী মনে কইরা আমার মুখের মিহি চাইয়া আছিলি?

নিয়াস ছাড়লাম এইডা চিন্তা কইরা, তুমি না থাকলে মাথায় পানি দিয়া আইজ রাইত্রে আমারে বাঁচাইতো কে? যুদি মউচ্ছামান্দ্রার বাইত্তে এমুন জ্বর আইতো আমার, আমারে দেকতো কেডা? রান্নঘরে হুইয়া জ্বরের ঘোরে মইরা থাকতাম। বাড়ির কেঐ উদিসও পাইতো না। আর নাইলে…..

কথা শেষ না করে থামল হাসু। হাঁপাতে লাগল।

রহিমা বলল, কী অইলো?

ইট্টু কথা কইয়াঐ পরিশ্রম লাগতাছে। মনে হয় অনেক বড় কাম করলাম।

তয় চুপ কইরা থাক।

না ইট্টু কথা কই তোমার লগে।

রহিমা মায়াবী মুখে হাসল। কথা কইতে ইচ্ছা করতাছে?

হ।

তয় ক।

কইতে চাইলাম জ্বরের ঘোরে ওই বাড়ির রানঘরে হুইয়া হয় আমি মইরা যাইতাম নাইলে কোনও না কোনও বেড়ায় আইয়া ওই অবস্থায় আমারে জাইত্তা ধরতো, জ্বরের ঘোরে শইল্লে জোরবল থাকতো না, এতদিন ধইরা যেই জিনিস রক্ষা করছি হেই জিনিস রক্ষা করতে পারতাম না। আকাম কুকাম কইরাঐ বেড়ায় আমারে মাইরা হালাইতো!

রহিমা গম্ভীর গলায় বলল, আকথা কইচ না।

না গো ফুবু, আকথা না। এইডাঐ হাছাকথা। আবার একটু থামল হাসু, আবার একটু দম নিল। আর তোমার মিহি চাইয়া চাইয়া আমার খালি মার কথা মনে অয়। কত আগে মইরা গেছে মা’য়। মা’র চেহারাডাও মনে নাই। জ্বরের পর থিকা ফাঁক পাইলেঐ তোমার মুখহান আমি চাইয়া চাইয়া দেহি আর আমার খালি মনে হয় এইডা তোমার মুখ না, এইডা আমার মা’র মুখ। মা’য় মরে নাই, এইত্তো আমার মা’য় বাইচ্চা রইছে। এইত্তো তার জুরে পোড়া মাইয়ার শিথানে বইয়া। মাইয়ার মাথায় পানি দিতাছে।

হাসুর কথা শুনতে শুনতে বুকটা তোলপাড় করছিল রহিমার। চোখ পানিতে ভরে আসছিল। নিজের জীবনের কথা মনে পড়ছিল। কী আশ্চর্য জীবন তার। মেয়েমানুষ হয়ে জন্মানোর পরও, সব দিয়াও আল্লাহ তাকে মা হতে দেন নাই। নারী জন্মের সবচেয়ে বড় পাওয়া সে পায় নাই। সন্তান। এই জীবনে কেউ তাকে মা বলে ডাকল না। একটা জীবনে। সামান্য দেড়দুইটো বছর স্বামীর সংসার, সোহাগ। তারপর থেকে এই বাড়ির ঝিয়ের। জীবন। যতদিন শরীর ছিল ততদিন রাতবিরাতে মান্নান মাওলানাকে গোপনে শরীর দেয়া। তিন-চারবার পেট হতে হতেও রক্ষা পাওয়া। জারজ সন্তানের মা হতে হতেও বেঁচে যাওয়া। তারপর শরীরে ভাটার টান লাগার পর থেকে সেই জীবনও শেষ হয়েছে। এখন শুধুই খেয়ে পরে বেঁচে থাকা। মরণের অপেক্ষা করা। কবে আসবে মরণ, কবে শেষ হবে এই জীবন।

.

বেলা অনেকটা হয়ে যাওয়ার পর বড়ঘর থেকে বেরুলেন তহুরা বেগম।

খানিক আগে ডুলা হাতে বাজারে গেছেন মান্নান মাওলানা। এসময় বাংলাঘরে আতাহারকেও পাওয়া যাবে। এখনও নিশ্চয় ঘুমাচ্ছে সে। রাতদুপুরের আগে বাড়ি ফিরার অভ্যাস নাই ছেলের, ঘুমোবার অভ্যেস নাই। ফলে সকালবেলা বিছানাও ছাড়তে পারে না। অনেক বেলা তরি ঘুমায়। বাংলাঘরের উত্তর দিককার বেড়ার লগে লেগে গুটিসুটি হয়ে আগে ঘুমাত মাকুন্দা কাশেম, এখন ঘুমায় হাফিজদ্দি। ফজরের আজানের লগে লগেই বিছানা ছাড়ে সে। নিজের বালিশ কাঁথা নিঃশব্দে ভাঁজ করে আতাহার যে চৌকিতে ঘুমায় সেই চৌকির তলায় রেখে খুবই সাবধানে দরজার খিল ডাসা খোলে। সন্ধ্যারাতেও রাতের খাবারটাবার সেরে ঠিক একই কায়দায় বাংলাঘরে ঢোকে, চৌকির তলা থেকে বিছানা বের করে নিঃশব্দে সেই বিছানা জায়গা মতন পেতে ঘুমোয়। যদিও তখন আতাহার ঘরে থাকে না, তবু যেন আতাহারের ভয়টা থাকে।

যদি কখনও রাতবিরাতে পেশাব পায়খানার কাজে বাইরে যেতে হয়, তখন হাফিজদ্দির চালচলন হয় বিলাইয়ের মতন। যদি কখনও হাফিজদ্দির করা শব্দে ঘুম ভেঙে যায় আতাহারের। তা হলে আর রক্ষা নাই, উঠেই কোকসা বরাবর পা চালাবে। লাথথিগুতা কিলঘুসি যা যা সম্ভব সবই মারবে। আর গালাগালের তো অন্তই থাকবে না! মাকুন্দা কাশেম জেলে যাওয়ার কয়েকদিন আগ থেকে এই বাড়িতে এসে এরমধ্যেই তিন-চারবার আতাহারের হাতের মারটা হাফিজদ্দি খেয়ে ফেলেছে। এজন্য আতাহার বাড়ি আসছে শুনলে, আতাহারের ছায়া দেখলেই বুক ধরাস ধরাস করে হাফিজদ্দির। গভীর রাতে পেশাব পায়খানা পেলেও আতাহারের ভয়ে চেপে থাকে।

আর যেদিন সন্ধ্যারাত থেকেই বাংলাঘরে থাকে আতাহার, ইয়ার দোস্তদের নিয়া মজমা বসায় সেদিন এই ঘরে শোয়াই হয় না হাফিজদ্দির। সেদিন অবশ্য বুকটা হালকা থাকে তার। নিজের ইচ্ছা স্বাধীন মতন রান্নাঘরের চুলার একপাশে নিজের বিছানা পেতে শুয়ে পড়ে। রাতে যতবার ইচ্ছা ওঠে, যতবার ইচ্ছা পায়খানার ওদিকটায় গিয়া জুতমতো বসে আরামসে পেশাব করে আসে।

এই স্বাধীনতাটুকু ভোগ করার জন্য মান্নান মাওলানা আর তহুরা বেগম দুইজনকেই হাফিজদ্দি অবশ্য অনুরোধ করেছিল, বাংলাঘরে না তাকে যেন রান্নাঘরেই থাকতে দেওয়া হয়। দু’জনের কেউ রাজি হয়নি। কারণ রাতবিরাতে বাড়ি ফিরার পর আতাহারের ঘরের দরজা খুলে দিবে কে!

এখন এই সকালবেলা, অনেকটা বেলা হয়ে যাওয়ার পরও আতাহারের ঘরের দরজা আবজানো। এখনও নিশ্চয় ভোস ভোস করে ঘুমাচ্ছে। তহুরা বেগম একবার সেই দরজার দিকে তাকালেন। এখন দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকতে হবে তহুরা বেগমকে। ঘুমন্ত ছেলেকে ডেকে তুলে কথা বলতে হবে। ঘুম থেকে ডেকে তুলতে গেলে ছেলে হয়তো রেগে যাবে, তবু উপায় নাই। ডেকে তাকে এখন তুলতেই হবে, কথা তার লগে তহুরা বেগমকে বলতেই হবে। মান্নান মাওলানা বাজার সেরে আসার আগেই ছেলের লগে কথা শেষ করবেন তিনি।

বাংলাঘরের দিকে পা বাড়িয়ে আনমনা চোখে উত্তরের ভিটির গোলাঘরের দিকে তাকিয়েছেন তহুরা বেগম, তাকিয়ে দেখতে পেলেন ঘরের দরজা খোলা আর চৌকির ওপর। অসহায় শিশুর ভঙ্গিতে বসে আছে হাসু। টিনের মগ হাতে তার সামনে বসে আছে রহিমা। একহাতে বড় একখান আটার রুটি পাচিয়ে গোল করা। সেই রুটি মগে চুবিয়ে চুবিয়ে হাসুকে খাওয়াচ্ছে।

দেখে হাসুর জন্য মায়া লাগল তহুরা বেগমের। কয়দিন ধরে এই বাড়িরই লোক হাসু। মান্নান মাওলানা তাকে কাজে রেখেছেন। বাড়ির একজন তোক অসুস্থ, জ্বরে পড়ে আছে। চার-পাঁচদিন ধরে, বাড়ির মালকিন হিসাবে তহুরা বেগমের দায়িত্ব অসুস্থ মানুষটার খোঁজ খবর নেওয়া, দুই-একটা ভালমন্দ কথা বলা। এই কাজটা সেরেই না হয় আতাহারের ঘরে যাবেন তিনি।

তহুরা বেগম গোলাঘরে এসে ঢুকলেন। তাঁকে দেখে হাসু-রহিমা দুইজনেই আড়ষ্ট হল। রহিমার চেহারায় অপরাধীভাব ফুটে উঠল। যেন কাজে ফাঁকি দিয়া ভাইঝিকে এভাবে খাওয়ানোটা তার ঠিক হচ্ছে না, বাড়ির মালকিনকে না বলে ভাইঝির জন্য এভাবে খাবার এনে সে অন্যায় করেছে।

তহুরা বেগম ওই নিয়া ভাবছেন না। হাসুর দিকে তাকিয়ে বললেন, জ্বর কেমুন?

হাসু কাতর গলায় বলল, ভাল না আম্মা।

রহিমা বলল, জ্বরডা এক্কেরে যায় না। থাকেঐ।

অহনও আছে?

হ। এক দুইঘণ্টা ইডু ইট্টু জ্বর থাকে, তারবাদে ফালা ফালদা জ্বরডা বাড়ে, এমুন বাড়ন বাড়ে হাসু এক্কেরে বেউস হইয়া যায়। তয় অর একহান সুবিদা অইলো জ্বরের ঘোরে মাথায়। বিগাড় উটলেও আবল তাবল প্যাচাইল ও পাড়ে না। ঝিম মাইরা পইড়া থাকে।

মাথায় পানি দেচ না?

দেই।

হ পানিডা বেশি কইরা দিবি। যেসুম জ্বর বেশি উটবো হেসুম মাথায় খালি পানি দিবি। ঠান্ডা পানিতে ত্যানা ভিজাইয়া পানিপট্টি দিবি কপালে।

তহুরা বেগমকে এরকম আন্তরিক ভঙ্গিতে কথা বলতে দেখে হাসু-রহিমা দুইজনেই খুশি। রহিমা কৃতজ্ঞ মুখে বলল, হ দেই! বেশি জ্বরে মাথায় পানি না দিলে, পানিপট্টি না দিলে মাথার রগ ছিড়া মরবো!

তহুরা বেগম আনমনা গলায় বললেন, হ।

হাসুকে কী খাওয়াচ্ছে রহিমা খেয়াল করলেন। খেয়াল করেও জানতে চাইলেন, কী খাওয়াইতাছস অরে?

রহিমা হাসিহাসিমুখে বলল, দুধ মিডাই দিয়া এক গেলাস চা বানাইয়া আনছিলাম আর একহান রুটি। চায়ে রুটি ভিজাইয়া ভিজাইয়া খাওয়াইতাছি। মাইয়াডা ত্যাড়া আছে, খাইতে চায় না।

তহুরা বেগম মায়াবী গলায় বললেন, কেমতে খাইতে চাইবো? এমুন জ্বরে মাইনষের মুখে সাদ থাকেনি যে খাইবো?

হাসু বলল, হ। মুখে একদোম সাদ নাই আম্মা। মুখের ভিতরডা তিতা অইয়া রইছে।

আইজ কয়দিন অইলো জ্বর?

পাঁচদিন।

এক্কেরে ছাইড়া যায় না জ্বর, না?

হ।

তয় তো চিন্তার কথা!

রহিমা বলল, হ। টাইফোট টুইফোট অইলোনি, না কালাজ্বর কিছুঐ বোজতাছি না। ডাক্তার দেহাইতে পারলে ভাল অইতো। জ্বর ছাড়াও আরেকহান সমস্যা আছে।

কী সমস্যা?

মাজার নীচ থিকা পেশাবের রাস্তা তরি সময় সময় খুব বেদনা করে, সময় সময় এক্কেরে অবশ অবশ লাগে।

তহুরা বেগম চমকালেন। কচ কী?

হ।

এইডা তো চিন্তার কথা!

হ। কী করুম কিছু বোজতাছি না।

তহুরা বেগম তীক্ষ্ণচোখে হাসুর মুখের দিকে খানিক তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, ডাক্তার দেহান উচিত। সিয়ানা মাইয়া, কোন বিপদ আপদ অয়, এক কাম কর, কষ্টমষ্ট কইরা কাজির পাগলা লইয়া যা। করিম ডাক্তাররে দেহা।

রহিমা বলল, হেরে দেহাইতে টেকা লাগবো না?

লাগুক।

টেকা পামু কই?

টেকা লইয়া চিন্তা করি না। দিমুনে আমি।

নাকি সরকারি ডাক্তারখানায় লইয়া যামু?

না, ওই হগল ডাক্তাররা ভাল মতন রুগি দেহে না। করিম ডাক্তারের কাছে নে। যহন জ্বর কম থাকবো তহন ধইরা ধইরা কাজির পাগলা লইয়া যাবি। আস্তে আস্তে হাঁইট্টা গেলে অসুবিদা অইবো না। ডাক্তার যদি দেইক্কা অমুইদ দিয়া দেয় তাইলে দুই-চাইর দিনের মইদ্যে দেকবি ভাল অইয়া গেছে।

গভীর আগ্রহ নিয়া তহুরা বেগমের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল রহিমা। তয় কবে নিতে কন বুজি?

পারলে আইজঐ নে।

টেকা?

কইলাম যে আমি দিমুনে।

কয় টেকা লাগতে পারে?

কইতে পারি না। আমি পনচাশটা টেকা দিমুনে। করিম ডাক্তার মানুষ ভাল। তারে বুজাইয়া কবি যে তরা গরিব মানুষ। তাইলে হেয় রুগি দেহনের টেকাড়া নিবো না। খালি অষইদের দামহান নিবো। আমার মনে অয় পনচাশ টেকায় অইয়া যাইবো।

তয় যামু কুনসুম?

অহন তো মনে অয় জ্বর নাই। অহনঐ যা। অহন ডাক্তার সাবরে পাবি।

আনন্দে আত্মহারা গলায় রহিমা বলল, আইচ্ছা।

দরজার দিকে পা বাড়িয়ে তহুরা বেগম বললেন, আমি বাংলাঘরে যাইতাছি। আতাহারের লগে কথার কাম আছে। কথা সাইরা ঘরে যামু। আমি ঘরে যাওনের পর আইয়া টেকা লইয়া যাইচ।

আইচ্ছা।

তহুরা বেগম বেরিয়ে গেলেন।

রহিমার হাতে তখনও ধরা চায়ের মগ আর রুটি। তহুরা বেগম বেরিয়ে যাওয়ার লগে লগে হাসুকে তাড়া দিল সে। ওই ছেমড়ি, তাড়াতাড়ি খাইয়া ল। হুনলি না বুজি কইয়া গেলো তরে ডাক্তরের কাছে লইয়া যাইতে।

চায়ে ভিজানো রুটি এক কামড় খেয়ে মুখ সরিয়ে নিল হাসু। আর খামু না। খাইতে ইচ্ছা করে না।

জোর কইরা অইলেও খা। তারবাদে ল কাজির পাগলা যাই করিম ডাক্তরের কাছে।

হাসু শিশুর মতন ঘ্যানঘ্যানা গলায় বলল, আইজ যাইতে পারুম না ফুবু। এই যে ইট্ট বইয়া রইছি, এতেঐ আমার মাজা ভাইঙ্গা আইতাছে। কাজির পাগলা তরি হাইট্টা আমি যাইতে পারুম না। রাস্তায় দেখবা উপ্তা অইয়া পইড়া মইরা গেছি।

হাতের রুটি আর চায়ের মগ সরিয়ে হাসুকে একটা ধমক দিল রহিমা। আকথা কইচ না। জোর কইরা উইট্টা খাড়া। কষ্ট কইরা ডাক্তরের কাছে ল, হেয় দেইক্কা অষইদ দিলে দেকবি দুই-তিনদিনের মইদ্যে পুরা ভাল অইয়া গেছচ। দশদিন জ্বরে না ভুইগ্যা একদিন ইট্টু কষ্ট কর, দেকবি বেক ঠিক অইয়া গেছে।

কাত হয়ে কোনওরকমে চৌকির উপর শুয়ে পড়ল হাসু। ক্লান্ত বিষণ্ণ গলায় বলল, তয় ইট্টু জিরাই লই। এই ফাঁকে আম্মার কাছ থিকা টেকা আইন্না রাইখো।

আইচ্ছা।

রহিমা বেরিয়ে যাওয়ার পর মৃতের ভঙ্গিতে চোখ বুজল হাসু।

.

খানিক আগে ঘুম ভেঙেছে আতাহারের। তয় বিছানা ছাড়ে নাই সে। চিত হয়ে শুয়ে মুখ বরাবর দক্ষিণের জানলা দিয়া বাইরে তাকিয়ে আছে। বাইরে সকালবেলাই কঠিন হয়েছে রোদ। চিড়বিড় একখান গরমিভাব এর মধ্যেই খোলামেলা জায়গা থেকে এসে ঢুকতে শুরু করেছে মানুষের বসত ভিটায়, ঘর দুয়ারে।

শুয়ে শুয়ে গরম ভাবটা টের পাচ্ছিল আতাহার।

ফজরের আজানের পর এই ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় দরজা আবজায় রেখে গেছে হাফিজদ্দি। এখনও ঠিক সেই অবস্থায়ই আছে। আতাহার ভাবছিল উঠে দরজা খুলে দিবে। তা হলে বাইরে থেকে রোদের ভিতর দিয়েই বয়ে আসবে হাওয়া। কিছু না কিছু শীতলতা সেই হাওয়ায় থাকবেই।

আতাহার উঠি উঠি করার আগেই ঘরে এসে ঢুকলেন তহুরা বেগম। আবজানো দরজা। যেইমাত্র ঠেলেছেন, ঠিক তখনই আতাহার তাকিয়েছে দরজার দিকে। মা’কে দেখে প্রথমে খুবই অবাক হয়েছে, তারপর বুঝে গেছে কেন তিনি আজ এই ঘরে আসছেন! কী কথা। আতাহারের লগে তিনি বলবেন!

আতাহারের তারপর বাবার কথা মনে পড়ল। বাবা তাকে আগেভাগেই সব জানিয়ে দিয়েছেন। সুতরাং আতাহার ঠিক করে ফেলল মা’র লগে ব্যবহারটা সে কেমন করবে! মা’র কথা কীভাবে শুনবে!

প্রথম কথাটা আতাহার তহুরা বেগমকে বলল খুবই বিনীত গলায়, আদুরে শিশুর ভঙ্গিতে। দুয়ারডা পুরা খুইল্লা দেও মা। গরম লাগতাছে। দুয়ার খুইল্লা দিলে হাওয়া বাতাস আইবো।

ছেলের এই ধরনের গলা অনেকদিন শোনেননি তহুরা বেগম, শুনেছেন শুধুই রুক্ষ বাজে গলা। শুরুতেই মনটা তাঁর ভাল হয়ে গেল। হাসিমুখে বললেন, হ বাজান, ঠিকঐ কইছচ।

দরজাটা খুলে ছেলের পাশে এসে বসলেন। অহনতরি উডো নাই বাজান?

না মা!

উডো।

হ উড়ুম। তয় তুমি আথকা এই ঘরে আইছ ক্যা? কিছু কইবা?

হ।

কী?

খাড়ো বাজান, কইতাছি। ইট্ট জিরাই লই।

এড় হাইট্টা আইলা তাতেঐ জিরান লাগবো?

হ বাজান। ইট্টুহানি হাঁটলেঐ বুকটা কাঁপে!

বুকে হাত দিলেন তহুরা বেগম।

আতাহার বলল, তাইলে তো তোমার শইল ভাল না মা!

হ বাজান, ভাল না। খালি মরণের কথা মনে অয়।

যেন মায়ের মৃত্যুর কথা শুনে খুবই কাতর হল আতাহার, এমন গলায় বলল, ধুৎ এই হগল কথা কইয়ো না তো! কী এমুন বস অইছে তোমার যে অহনঐ মইরা যাইবা?

তহুরা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মরণের লেইগ বস লাগে না বাজান। তর ভাইরে দেকলি না কোন বসসে মইরা গেল!

আতাহার কথা বলল না।

তহুরা বেগম ছেলের মুখের দিকে তাকালেন। মরণের কথা মনে অয় দেইক্কাঐ আরও অনেক কথা মনে হয়।

কী কথা মা?

অনেক দায়িত্বর কথা।

কী দায়িত্ব?

মা-বাপে সব সময় চায় মরণের আগে বেক পোলাপানরে বিয়াশাদি করাইয়া সংসারী দেইখা যাইতে। আমার অহনও ওই দায়িত্ব শেষ অয় নাই বাজান।

আতাহার হাসল। বেশির ভাগঐ শেষ অইছে। বাকি আছে খালি দুইজন।

হ বাজান। হেই দুইজনের মইদ্যেও একজনরে লইয়া আমার কোনও চিন্তা নাই।

সবজেনে বুঝেও আতাহার বলল, কারে লইয়া?

আজাহার। অরে লইয়া চিন্তা নাই। দেশে আইলেঐ বিয়া করান যাইবো।

হাসিহাসি মুখ করে মায়ের মুখের দিকে তাকাল আতাহার। তোমার কথা আমি বুজছি মা। অহন তোমার খালি চিন্তা আমারে লইয়া।

হ বাজান। তুই বিয়া করলেঐ ঝামেলা শেষ হয়। আমি শান্তি লাহান মরতে পারি।

আতাহার ঠাট্টার গলায় বলল, তয় বিয়া আমারে করাও না ক্যা?

তহুরা বেগম মুগ্ধ গলায় বললেন, হ করামু বাজান। এর লেইগাঐ অহন তর লগে কথা কইতে আইছি?

মনে অয় মাইয়া দেকছো আমার লেইগা?

হ বাজান, দেকছি।

কোন গেরামের মাইয়া?

তহুরা বেগম রহস্যের হাসি হাসলেন। মাইয়াগো গেরাম অইলো বেসনাল।

সব জেনে বুঝেও যেন অবাক হল আতাহার। বেসনাল! ভাবিছাবগো গেরামে?

তহুরা বেগম মুখে সেই রহস্যময় হাসি রেখে বললেন, হ।

তাইলে তো তোমার বড়পোলা আর মাজরো পোলার এক গেরামেঐ শ্বশুরবাড়ি হইল।

হ। ক্যা, এক গেরামে দুই ভাইয়ের শ্বশুরবাড়ি অইলে অসুবিদা আছে?

না, কীয়ের অসুবিদা? এক গেরামে ক্যান এক বাইতে অইলেও কোনও অসুবিদা নাই। এমুন কত অয়! দুই ভাইয়ে দুই বইনরেও তো বিয়া করে, ভাইয়ে ভাইয়ে অয় ভায়রা।

আবার এক মাইয়ারেও দুই ভাইয়ে বিয়া করে, এমুনও অয়।

আতাহার বুঝে গেল কথার একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে গেছেন তহুরা বেগম। এখনই আসল কথাটা তিনি বলবেন। তবু না বোঝার ভান করে খুবই অবাক হওয়ার একটা ভঙ্গি মুখে ফুটাল সে। তোমার এই কথাডা বোজলাম না। এক মাইয়ারে দুই ভাইয়ে বিয়া করে কেমতে?

ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে তহুরা বেগম বললেন, বড়ভাইর রাড়ি বউরে বিয়া করে ছোড ভাইয়ে?

হ, কোনও কোনও মাইনষে তো করেঐ।

এইডাঐ কইলাম আমি।

কপট সন্দেহের চোখে মায়ের মুখের দিকে তাকাল আতাহার। তুমি আসলে কি কইতে চাও মা?

তুই বোজচ নাই বাজান?

না।

বেসনালের মাইয়া, দুই ভাইয়ের এক বউ এই হগল কওনের পরও বোজচ নাই?

আমার বোজন না বোজ কথা না, তোমার তুমি কও।

তহুরা বেগম পরিষ্কার গলায় বললেন, তর লেইগা আমি তর বড়ভাইর বউ পারুরে দেকছি। তর লগে পারুর বিয়া দিতে চাই।

আতাহার জানত যে এই কথাটাই শেষ তরি বলবে মা। শোনার জন্য তৈরিও ছিল। তারপরও ভাবভঙ্গিতে এমন একটা অবস্থা ফুটিয়ে তুলল যেন এমন অবাক জীবনেও সে হয় নাই, এমন অবাক হওয়া কথা জীবনেও শোনে নাই! অপলক চোখে হাঁ করে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কোনওরকমে বলল, এইডা তুমি কী কও, মা?

ক্যা খারাপ কইছিনি?

বলে এতক্ষণে এই প্রথম ছেলের মাথায় হাত দিলেন তিনি। তুই তো বেবাক জানচ বোজচ বাজান! কীর লেইগা পারুর লগে তর বিয়ার চিন্তাডা আমি করছি, হেইডা আমার থি কা তুই কম বোজ না। মা অইয়া এই হগল লইয়া তর লগে বেশি কথা আমি কইতে পারুম না। তয় চাইরমিহি চিন্তা কইরাঐ, তর কথা পারুর কথা ভাইবা, পোলাপান তিনডার কথা ভাইবা আমি চাই বিয়া তুই পারুরেঐ কর। এইডা বেবাকতের লেইগাঐ ভাল অইবো। আর পারু অইলো লাখে একজন। কী সোন্দর মাইয়া! তিন পোলাপানের মা, দেকলে মনেঐ অয় না! মনে অয় অহনও বিয়া অয় নাই, অহনও আবিয়াতো। তর লগে বেদম মানাইবো। পারুরে বিয়া করলে লাবও আছে তর।

কীয়ের লাব?

মোতাহারের সয়সম্পত্তি বেবাক পাবি তুই। তর ভাগেরডা তো আছেঐ, মোতাহারেরও যুদি পাঁচ, তয় তর আর জিন্দেগিতে লাগে কী!

আতাহার গম্ভীর গলায় বলল, এই হগল কথা তুমি বাবারে কইছো?

কইছি।

হেয় কী কয়?

হেয় আমার লগে একমত।

কী?

হ। কইছে তুমি চিন্তা কইরো না। আমি বেবস্তা করতাছি।

একথাও জানে আতাহার। বাবা তাকে বলেছেন। তবু বাবার পরামর্শ মতন অবাক হওয়ার ভানটা সে করেই গেল। কও কী তুমি, বাবায় কইছে বেবস্তা করবো?

হ।

ক্যা হেয়ও আথকা এমুন শুরু করলো ক্যা?

ছেলের কপাল থেকে হাত সরিয়ে তহুরা বেগম বললেন, তরে আর পারুরে লইয়া তর বাপে আর আমি ম্যালা কথাবার্তা কইছি। আমার কথাবার্তা হুইন্না তর বাপের মনে অইছে, কামডা মন্দ অইবো না। এইডা হওন উচিতও।

ক্যা, উচিত ক্যা?

তহুরা বেগম অপলক চোখে ছেলের মুখের দিকে তাকালেন। একবার তরে আমি কইছি বেক কথা তরে আমি কইতে পারুম না। মা অইয়া পোলারে এই হগল কথা কওন যায় না। আর কমুঐবা ক্যা, তুই নিজে জানচ না পারুর লগে তর বিয়া অওন উচিত ক্যা?

ভিতরে ভিতরে রেগে যাচ্ছিল আতাহার, আবার অতিকষ্টে এই রাগ দমিয়েও রাখছিল। বাবার পরামর্শে চলাটাই এখন বুদ্ধিমানের কাজ। এইসব নিয়া চিল্লাচিল্লি রাগারাগি করা ঠিক হবে না। আর এই জীবনে প্রথম মান্নান মাওলানা দেখছেন তাঁর নিরীহ স্ত্রীকে কোনও একটি বিষয়ে নিজের মতন করে চলতে, আতাহার দেখছে তার মা’কে কোনও একটি বড় কাজ নিজের দায়িত্বে সম্পন্ন করতে চাইছেন, সুতরাং এই অবস্থায় এই মানুষের বিরুদ্ধে সরাসরি যাওয়া বা কথা বলা ঠিক হবে না। এই ধরনের মানুষকে ঠান্ডা করতে হয় বুদ্ধি দিয়া, কায়দা করে।

আতাহার সেই পথটাই ধরল। খুবই নরম ভঙ্গিতে বিছানায় উঠে বসল, লুঙ্গি গোছগাছ করল। মায়ের মুখের দিকে তাকাল। তোমারে একহান কথা জিগাই মা?

জিগাও বাজান।

এই হগল লইয়া কি ভাবিছাবের লগে তোমার কোনও কথা অইছে?

মিথ্যে বলতে আটকাল না তহুরা বেগমের। পরিষ্কার গলায় বললেন, না বাজান। কোনও কথা অয় নাই।

তয় এইডা খালি তোমার চিন্তা?

হ।

ভাবিছাব জানে?

না। আমি পয়লা তর বাপরে কইছি, তারবাদে আইজ কইলাম তরে। তর বাপে তরে কিছু কয় নাই?

ঠিক মায়ের মতো করেই মিথ্যেটা বলল আতাহার। না তো!

কইবো।

বোজলাম। তয় ভাবিছাবের লগে কথা না কইয়া আমার লগে কথা কইলা ক্যা?

আগে তর লগে কথা কওনঐ ভাল। তর মতামত জাইন্না তারবাদে পারুরে কই।

তোমার মনে অয় হেয় রাজি অইবো?

অইবো না ক্যা?

অইবো না ক্যা হেইডা আমি জানি না। অইব কিনা আমি জানতে চাই।

আমার মনে অয় অইবো।

একটু থেমে আতাহার বলল, তয় অহনঐ ভাবীছাবের লগে কথা তুমি কইয়ো না।

এতক্ষণ ধরে ছেলের লগে কথা বলে, তার নরম বিনয়ী ভাব দেখে খুবই আশাবাদী হয়েছিলেন তহুরা বেগম। বুকে ভরসা পেয়েছিলেন এই ভেবে যে ছেলে তার কথা শুনবে। এখন আচমকা পারুর লগে এখনই তাকে কথা বলতে মানা করায় বড় রকমের ধাক্কা খেলেন। থতমত খেয়ে বললেন, ক্যা, অহন কথা কইতে অসুবিদা কী?

আতাহার সরল মুখ করে বলল, না তেমুন কোনও অসুবিদা নাই। আমি অন্য একটা কথা চিন্তা কইরা অহন তোমারে কথা কইতে না করলাম।

কী চিন্তা কইরা?

দেহি বাবায় আমার লগে এই হগল লইয়া কথা কয় কিনা! আর কী কয়?

বুকের পাথর যেন নেমে গেল তহুরা বেগমের। অন্ধকার মুখ আলোকিত হলো। হ এইডা ভাল বুদ্ধি করছ?

হাত বাড়িয়ে ছেলের ডানহাতটা ধরলেন তহুরা বেগম। তরে আমি শেষ একহান অনুরুদ করি বাজান। এতাহানি ডাঙ্গর অইছচ তুই, কোনওদিন তরে আমি কিছু কই নাই, কিছু চাই নাই তর কাছে। আইজ জিন্দেগিতে পয়লা আর শেষবারের লাহান চাইতাছি। কয়দিন ধইরা ঘনঘন মোতাহাররে আমি স্বপ্নে দেহি। ও যেন আমারে খালি ডাক পাড়ে। এই হগল স্বপ্ন দেইখা আমার খালি মনে অয় আমার দিন ফুরাইয়া আইছে, আমি আর বেশিদিন নাই। তয় তর কথা চিন্তা কইরা, পারু আর অর তিনডা পোলাপানের কথা চিন্তা কইরা মরণরে আমি কই, মরণ, তুমি আর কয়দিন পরে আহো। নমজ পড়তে পড়তে আল্লারে কই, আল্লাহ, তুমি আমারে আর কয়ডা দিন পরে উড়াইয়া নেও। আমি আমার মাজারো পোলাড়ার গতি কইরা লই, আমার বড়পোলার বউ আর নাতি নাতকুড়ের গতি কইরা লই, তারবাদে তুমি আমারে উড়াইয়া নিয়ো।

মায়ের কথা শুনে মন যে গলল বা নরম হল আতাহারের তা না, ভাব দেখাল যেন সে খুবই নরম হয়েছে, মায়ের কথা মন দিয়া শুনছে আর তার কথা জীবন দিয়া হলেও রাখবে। এই ভাবটা দেখাবার জন্য কপট একখান দীর্ঘশ্বাসও ফেলল।

এই দীর্ঘশ্বাস শুনে তহুরা বেগম ভাবলেন তার অবস্থাটা হৃদয় দিয়া বোঝার চেষ্টা করছে ছেলে। তিনি খুশি হলেন। বললেন, তর কাছে আমি আর কিছু চাই না বাজান, তুই খালি আমার কথাডা রাখিস। পারুরে বিয়া কইরা সংসারী অইচ। তর বাপরে আমি কমু দুই এক মাসের মইদ্যেই যেন বেবস্তা করে। তগ দুইজনের হাসি মুখ দেইখা আমি যেন মরতে পারি।

আতাহার মাথা নীচা করে বলল, তুমি চিন্তা কইরো না। আগে দেহি বাবায় কী কয়!

তহুরা বেগম গদগদ গলায় বললেন, তর বাপেও আমার কথাঐ কইবো।

তয় আর অসুবিদা কী?

তুই তাইলে রাজি বাজান?

মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসল আতাহার। তোমরা বেবাকতে রাজি অইলে আমি আর রাজি না অইয়া যামু কই!

শুনে এতটাই খুশি হলেন তহুরা বেগম, মুখে গভীর আনন্দের হাসি ফুটল। যেন দুনিয়ার সবচাইতে মূল্যবান জিনিসটা তিনি তাঁর হাতের মুঠায় পেয়ে গেছেন এমন ভাব হল তাঁর আত্মায়। গভীর আবেগে আনন্দে দুইহাতে ছেলের মাথাটা বুকে টেনে আনলেন। মমতায় আবেগে ফেটে পড়া গলায় বললেন, আমি খুব খুশি অইছি বাজান, খুব খুশি অইছি। এমুন খুশি জিন্দেগিতে কোনওদিন অই নাই। আইজ আমার জীবন সার্থক, আমি যুদি অহনঐ মইরা যাই, আমার কোনও দুঃখ নাই। তুই বহুত ভাল পোলা, বহুত ভাল পোলা তুই। মাইনষে যে ক্যান আমার এত ভাল পোলাডারে খারাপ কয়? মা’র কথা যেই পোলায় হোনে হের থিকা ভাল পোলা আর কেডা রে!

কথা বলতে বলতে নিজের অজান্তেই কাঁদতে শুরু করেছেন তহুরা বেগম। চোখের পানি গাল ভাসছে তাঁর। তখনও দুইহাতে আতাহারের মাথাটা বুকে জড়িয়ে রেখেছেন। মায়ের এই আবেগের বিন্দুমাত্রও ছিল না আতাহারের মনে। সে ভিতরে ভিতরে হাসছিল।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *