২.৯ গোলাঘরের চৌকি

হাসু খ্যাখ্যানা গলায় বলল, ও ফুবু, ফুবু। শইল তো আমার ভাল হয় না! জ্বর তো ছাড়ে। না!

দুপুরের পর গোলাঘরের চৌকিতে শুয়ে আছে হাসু। অদূরে ধানের ডোলে ঢেলান দিয়া বসে পান চাবাচ্ছে রহিমা। আবজানো দরজার ফাঁক দিয়া বাইরে থেকে প্রখর রোদ্রের একটুখানি ঝলকানি এসে ঢুকেছে ঘরে। তারপরও ঘরটা আবছায়া হয়ে আছে।

ভাতটাত খেয়ে এসময় একটু গড়িয়ে নেয়ার অভ্যাস রহিমার। হাসুর জ্বরের পর থেকে সেই গড়ানোটা বন্ধ করেছে সে। দিনেরবেলা তো জেগে থাকছেই, রাতেও ঘুমটা ঠিকঠাক মতন হয় না। শুয়ে থাকে ঠিকই তবে জেগেই যেন থাকে। হাসুর নড়াচড়ার শব্দে সামান্য ককাককির শব্দেই ধড়ফড় করে উঠে বসে। কোনও কোনও রাতে শোয়ই না। হাসুর। শিথানে বসে থাকে। মাথায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানি দেয়, পানিপট্টি দেয়। দিনেরবেলা সংসারকর্মে ব্যস্ত থেকেও ঘুরে ফিরে এইঘরে আসে, কপালে বুকে হাত দিয়ে ভাইঝির জ্বর দেখে যায়। টুকটাক কথা বলে জানতে চায় কেমন লাগছে হাসুর। মাজার তলা থেকে পেশাবের রাস্তা তরি ব্যথা বেদনা আছে কিনা!

কখনও কখনও কাজের ব্যস্ততায় হয়তো ঘরে ঢোকার সময় পেল না, আবজানো দরজা ঠেলে দরজার সামনে থেকেই হয়তো জিজ্ঞেস করে গেল, কীগো মা, কেমুন লাগতাছে। অহন? জ্বর আছে? মাজার নীচের বেদনাহান?

তিনবেলা খাবার এনে ছোট্ট শিশুকে যেমন করে খাওয়ায় মা ঠিক তেমন করে খাওয়াচ্ছে। বাড়ির কেউ কিছু মনে করল কিনা ভাবছে না।

সেদিন করিম ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিল হাসুকে। পৌনে একমাইল মতো রাস্তা, যাওয়া আসায় মাইল দেড়েক, ইস কী কষ্টটাই যে এইটুকু রাস্তা ভাঙতে হয়েছে! দুই-পা হেঁটেই চকের মাটিতে বসে পড়ছিল হাসু, হাঁটতেই পারছিল না। পারবেই বা কেমন করে! এমন জ্বর শরীরে সারাক্ষণ থাকলে মানুষ কি আর মানুষ থাকে!

তবু যে শেষ পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছিল কাজির পাগলা বাজারে, করিম ডাক্তারকে দেখিয়ে ফিরতে পেরেছিল! যদিও দিনটা পুরাই কাবার হয়ে গিয়েছিল এই কাজে, তবু ডাক্তার তো দেখানো হয়েছে! অমুদ তো পেটে পড়ছে হাসুর!

তারপরও জ্বর কমার কোনও লক্ষণ হাসুর নাই। আজ এগারো দিন।

এই এগারো দিনে রহিমাও বিধ্বস্ত। হাসু বিধ্বস্ত হয়েছে জ্বরে আর রহিমা হয়েছে জ্বরের হাত থেকে হাসুকে বাঁচাতে গিয়া। সেই যে, যে রাতে জ্বরে বেহুশ হয়ে গিয়েছিল হাসু সেই রাতেই রহিমার প্রথম মনে হয়েছিল মান্নান মাওলানার বারবাড়ির সামনে এসে যেন দাঁড়িয়ে আছে আজরাইল। এক-পা দুই-পা করে উঠানের দিকে আগাচ্ছে। কোনও কোনও গভীর রাতে যেন উঠান ভেঙে গোলাঘরের অনেকখানি কাছে চলে আসে, বন্ধ দরজায় ধাক্কা দেয়। সেই শব্দে হাসু না যেন ধড়ফড় করে ওঠে রহিমা। তারপর মাথায় পানি দিয়া, পানিপট্টি দিয়ে এমন মারমুখো ভঙ্গিতে আগলে রাখে হাসুকে, মন খারাপ করে আজরাইল আবার ফিরা যায় বারবাড়ির দিকে।

দিনেরবেলাও একবার দুইবার উঠানের দিকে পা ফেলে আজরাইল, দূর থেকে অপলক চোখে তাকিয়ে থাকে গোলাঘরের দিকে, রহিমার জন্য কিছুতেই জুত করতে পারছে না। ক্ষণে ক্ষণেই সে ছুটে আসছে গোলাঘরের দিকে। চিলের আচমকা থাবা থেকে ছানাপোনা রক্ষার জন্য মা-মুরগি যেমন করে ছানাদের লুকিয়ে রাখে বুক পাখনার তলায় ঠিক তেমন করে হাসুকে আগলে রাখছে আজরাইলের হাত থেকে। ঘরের খুব কাছে এসেও যে কারণে ফিরে যেতে হচ্ছে মৃত্যুদূতকে।

আবার কোনও কোনও সময় গোলাঘরের দরজা আবজায়া এমন ভঙ্গিতে ধানের ডোলে ঢেলান দিয়া বসে থাকে রহিমা যেন হাসুকে সে পাহারা দিচ্ছে। যেন আজরাইল এসে কিছুতেই না ঢুকতে পারে ঘরে, কবজ করতে না পারে হাসুর রুহ্।

এই যেমন এখন।

হাসুর কথা শুনে চোখ তুলে চৌকির দিকে তাকাল রহিমা। চিত হয়ে শুয়ে আছে হাসু। এই গরমেও গলা তরি কাঁথার ঢাকায়। কথায় ঢাকা থাকার পরও পরিষ্কার বোঝা যায় শরীর বিছানার লগে মিশা গেছে। মাথা বের করা না থাকলে আচমকা বোঝাই যাবে না যে বিছানায় কেউ শুয়ে আছে। মনে হবে পুরানা কথাই যেন মানুষের আকৃতির মতন করে ফেলে রাখা হয়েছে।

হাসুর দিকে তাকিয়ে আর তার খানিক আগের কথা শুনে এই ক’দিনের মধ্যে আজই রহিমার প্রথম মনে হল, তা হলে কি সময় ফুরিয়ে এল মেয়েটির? এত চেষ্টার পরও কি আজরাইলকে ঠেকিয়ে রাখতে পারল না সে! জীবন মরণের যুদ্ধে হেরে গেল!

মনে হওয়ার পর অদ্ভুত এক ছটফটানি হল রহিমার। পাগলের মতন ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়াল সে। হাসুর শিথানে গিয়া বসল। যেন তাকে ফাঁকি দিয়ে আবজানো দরজার ফাঁকফোকর দিয়া কখন ঢুকে পড়েছিল আজরাইল। হাসুর রুহের ওপর থাবা বসাবার আগেই রহিমা এসে আড়াল করেছে। নানারকম চেষ্টা করেও যেন সুবিধা করতে পারছে না। তারপর একসময় দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফিরে যাচ্ছে। তবে একেবারেই চলে যাচ্ছে না। বারবাড়ির সামনের নাড়ার পালাটির সামনে গিয়া দাঁড়িয়ে থাকছে। চোখ গোলাঘরের দিকে। কখন রহিমাকে ফাঁকি দিয়া ওই ঘরে ঢুকবে, কখন কবজ করবে হাসুর জান, যেন সেই তালেই আছে।

শিথানে বসে রহিমা তখন হাসুর কপালে হাত দিয়েছে। করিম ডাক্তর তো কইছে, দুই চাইর দিনের মইদ্যেঐ ভাল অইয়া যাবি।

হাসু ক্লান্ত কাতর গলায় বলল, কইলো তো! তয় আমি তো ভাল অই না!

সাতদিনের অষইদ দিছে। সাতদিন যাউক।

আইজ লইয়া ছয়দিন গেল! কাইল সাতদিন অইব। আমার তো মনে অয় না কাউলকার মইদ্যে আমি ভাল অইয়া যামু?

দেখ কী অয়! নাইলে আবার ডাক্তরের কাছে নেওন লাগবো। টেকা তো আছেই। বুজি কইছিলো পনচাশ টেকা দিবো, দিছিলো একশো টেকা।

এই অবস্থায়ও হাসু অবাক হল। সত্যঐ! ক্যা, একশো টেকা দিছিলো ক্যা?

হেই কথা তরে কই নাই? দেখছো কারবার! আমার তো মনে অয় তরে কইছি।

না কও নাই।

তর জ্বরে আমিও মনে অয় শেষ অইয়া গেছি। বেক কথা ভুইল্লা যাই। হোন, হেদিন তরে লইয়া ডাক্তরের কাছে যাওনের আগে বুজির কাছে গেছি টেকার লেইগা, গিয়া দেহি হের মনডা যে কী খুশি! কয় খুব আমোদের একহান সমবাত আছে রহি। পারুরেঐ বিয়া করতে রাজি অইছে আতাহারে।

কথাটা শুনে এরকম জ্বরের ঘোরেও খুবই অবাক হল হাসু। কী?

হ। এই হগল কথা কইতেঐ আতাহারের ঘরে গেছিলো হেয়। যাওনের আগে এই ঘরে আইয়া তরে দেইক্কা গেছে। কইয়া গেছে তরে ডাক্তর দেহানের লেইগা পনচাশ টেকা দিবো। তারবাদের যেই মনোবানচা লইয়া পোলার ঘরে গেছে হেই মনোবানচা পূরণ অইছে। এর লেইগা খুশি অইয়া পনচাশ টেকার জাগায় একশো টেকা হেয় তরে দিছে। তর লেইগা হেদিন খরচা অইছে চল্লিশ টেকা। আরও ষাইট টেকা আছে। লাগলে ওই টেকা লইয়া আর তরে লইয়া আবার করিম ডাক্তরের কাছে যামু।

হেইডা আমি আর যামু না।

ক্যা?

যেই কষ্ট কইরা হেদিন গেছি, হেই কষ্টের থিকা ঘরে হুইয়া হুইয়া মইরা যাওন অনেক ভাল। দরকার অইলে মইরা যামু, তাও ওই কষ্ট আর করুম না।

হাসুর মুখের দিকে তাকিয়ে সামান্য সময় চুপ করে রইল রহিমা। তারপর বলল, তুই অহন না গেলেও অইবো? ডাক্তর সাবে যেই কাগজহান দিছে ওইডা লইয়া গেলে আবার অষইদ দিয়া দিবো। দরকার অইলে আমি যাইয়া অষইদ লইয়ামু।

হাসু দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মনে অয় যাওন আর লাগবো না। যেই অষইদ দিছে হেইডি ফুরানের আগেঐ আমি মইরা যামু।

একথা শুনে রহিমা একটু রাগল। আকথা কইচ না।

আকথা না ফুবু। সত্য মনে হয় আমি মইরা যামু। জ্বর তো আছে, আর ওই জাগার বেদনাডা! ওই বেদনাডাই আসল। আমার মনে অয় জ্বরডা ওই বেদনার লেইগাঐ। বেদনা না কমলে জ্বর কমবো না।

হ। আমারও মনে অয়। তয় ডাক্তর তো কইতে পারলো না বেদনাডা ক্যান অইছে!

এর লেইগাঐ কই, আমি আর বাঁচুম না।

এইসব বাঁচামরার কথা ভাল লাগছিল না রহিমার। থেকে থেকে মনে হচ্ছিল আজ অনেক অনেক বছর ধরে রক্ত সম্পর্কের এই একজন মানুষই তার আছে। একটু দূরের একগ্রামে থাকে ঠিকই, দুয়েক মাস পর পরই ছুটে আসে তার কাছে, দুই-চার-দশদিন থেকে আবার ফিরে যায়। যেতে চায় না, প্রতিবারই চিরতরে থেকে যেতে চায় এই বাড়িতে, ফুফুর কাছে। ফুফুর সাধ্য নাই মা’কে রাখার। এবার শেষ তরি যখন তাকে রাখার ব্যবস্থা হল তখনই ধরল মরণ জ্বরে। এবার বুঝি চিরতরেই যাবে হাসু।

হাসু মরে যাওয়ার পর প্রথম প্রথম কি রহিমার বিশ্বাস হবে যে সত্যি সত্যি মরে গেছে। সে! সত্যি সত্যি আর কখনও ফিরা আসবো না!

না, তা মনে হবে না। সে ভুলে যাবে যে এই বাড়িতে, তার কাছে পাকাপাকি থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল হাসুর। তার মনে হবে যে, কয়েকদিন তার কাছে থেকে আবার নিজের ঝিগিরির জায়গা মউছামান্দ্রার সেই বাড়িতে ফিরা গেছে হাসু। দুয়েকমাস পর আবার যে-কোনও একদিন কাপড়ের পোঁটলাখান বুকে ধরে দীনহীন বেশে মান্নান মাওলানার বাড়িতে এসে উঠবে। রহিমাকে দেখেই দুইহাতে জড়িয়ে ধরবে তার গলা। ফুবু গো, কেমুন আছো তুমি! তোমারে ছাইড়া বেশিদিন আমি থাকতে পারি না, এর লেইগা আবার আইয়া পড়লাম।

দুনিয়ার যে-কোনও জায়গা থেকেই ফিরতে পারে মানুষ, শুধু কবর থেকে পারে না!

এসব ভেবে চোখ ছলছল করে উঠল রহিমার। ভাবনা বদলাবার জন্যই কথা ঘুরাল সে। বলল, তয় কামের কাম একহান করছে বুজি।

কথাটা বুঝতে পারল না হাসু। বলল, কোন কামডা?

এই যে আতাহারের লগে পারুর বিয়ার চেষ্টা।

এইডা কি হেয় করছে?

হ।

তয় খুব ভাল করছে। আতাহার দাদার বিয়া ভাবিছাবের লগেঐ হওনের কাম।

তারবাদেও আমার একহান সন্দ আছে। শেষ পর্যন্ত বিয়াডা অইবো কি না!

ক্যা?

হুজুর আর আতাহারের মতিগতি বোজন বড় কঠিন। যে-কোনও কথা যে-কোনও সমায় ঘুরাইয়া হালাইতে পারে হেরা।

এইডাও ঘুরাইবো?

ঘুরাইতে পারে।

তয় আর লাব অইলো কী?

হ কোনও লাব নাই। মাজখান থিকা বুজি খালি কষ্ট পাইবো।

ক্যা ভাবিছাবে কষ্ট পাইবো না?

হ হেয়ও পাইবো।

একটু থেমে রহিমা বলল, তয় কোনও কথা কওন যায় না রে মা। দেহা গেল আমরা যা চিন্তা করতাছি এইডির কোনওডাঐ সত্য অইলো না। আতাহার ঠিকই পারুরে বিয়া করলো, পারুরে লইয়াঐ সংসার পাতলো। নিজের পোলাপান নিজে বুইজ্জা লইলো।

আল্লায় যেন তাই করে।

হ, আর আল্লায় যেন তরেও একদোম ভাল কইরা দেয়।

দুইজন মানুষের কেউ খেয়াল করে নাই, বাইরেটা ততক্ষণে অন্ধকার হয়ে গেছে। বেলা মুছে গেছে, হাওয়া বাতাস বন্ধ হয়ে থমথমা অবস্থা চারদিকে। সারা আকাশ ছেয়ে গেছে ঘনকালো মেঘে। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, গুরুম গুরুম করে মেঘ ডাকছে। বছরের প্রথম কালবৈশেখি ধেয়ে আসছে।

এই অবস্থা দেখে দরজার কাছে ছুটে গেল রহিমা। আকাশের দিকে তাকিয়ে উৎফুল্ল গলায় বলল, আল্লায় রহম করছে। মেগ তুফান আইতাছে। মেগ তুফান আইলে যুদি দুইন্নাইডা ঠান্ডা অয়!

.

অন্ধকারে নিজেকে গুছাতে গুছাতে পারু বলল, তোমার আইজ কী অইছে?

খাটের মাথার দিকে রাখা শার্টের পকেট হাতড়ে সিগ্রেটের প্যাকেট আর ম্যাচ বের করল আতাহার, সিগ্রেট ধরাল। ম্যাচের কাঠি জ্বেলে সিগ্রেট ধরাবার সময় অন্ধকার ঘরে তার সামান্য আলোকিত মুখ কীরকম ভৌতিক বীভৎস মনে হল পারুর।

হাত ঝেড়ে ম্যাচের কাঠি নিভিয়ে সিগ্রেটে টান দিয়া আতাহার বলল, কী অইবো?

মনে অইলো কিছু অইছে।

ক্যান মনে অইল?

পারু কথা ঘুরাল। আমার আইজ ভাল্লাগে নাই।

ক্যা?

তোমার কেমুন জানি হরতরাইস্যা ভাব আছিলো। এতদিন ধইরা আমার লগে থাক তুমি, আমি কেমুন মাইয়া, কেমতে কী চাই এইডা খালি তুমি জানো। জাইন্নাও আইজ আমার মনের মতন কইরা চলো নাই।

আতাহার আবার সিগ্রেটে টান দিল। টানের লগে লগে সিগ্রেটের একবিন্দু আলো নাকের ডগা আলোকিত করল তার। সেদিকে তাকিয়ে পারু বলল, এর লেইগাঐ কথাডা জিগাইলাম। সত্য কইরা কও তো, কী অইছে তোমার?

আমি একহান চিন্তায় পড়ছি। কীয়ের চিন্তা? বিয়ার।

কী?

কইলাম যে বিয়ার চিন্তায় পড়ছি।

বুক ধক করে উঠল পারুর। তা হলে কি তার এতদিনকার মানুষটি, গোপনে তার তিন সন্তানের বাপ, শরীর-মনের অধিকর্তা অন্যের হয়ে যাচ্ছে! খানিক আগে অন্ধকার বিছানায় যে দুইজন মানুষ দুইজনার শরীরের ভিতর ডুবে গিয়েছিল, সেই দুইজন মানুষ কি তা হলে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। তাদের মাঝখানে এসে দাঁড়াচ্ছে আরেক নারী! তা হলে যখন তখন ধরে থাকা মাথা কে সারাবে পারুর! হাতপায়ের ঝিমঝিমানি কে বন্ধ করবে! কার জন্য বিকালবেলা সাজগোজ করবে পারু! সন্তানদের ঘুম পাড়িয়ে সুগন্ধি পান সাজিয়ে অন্ধকার খাটে বসে কার জন্য অপেক্ষা করবে!

তারপর শাশুড়ির কথা মনে হল পারুর। সেদিন যে লজ্জাশরমের মাথা খেয়ে মায়ের মতন মানুষটাকে সব খুলে বলেছিল সে, মানুষটা যে তাকে বলে গিয়েছিলেন পারুর জন্য চেষ্টা করবেন, চেষ্টা কি তিনি তা হলে করেন নাই! পারুর উঠান থেকে চলে যেতে যেতেই কি ভুলে গেলেন নিজের দেওয়া আশ্বাসের কথা!

পারু স্তব্ধ হয়ে আছে দেখে আতাহার বলল, কী অইলো, চুপ কইরা রইলা যে?

পারু গম্ভীর গলায় বলল, কী কমু?

হোনলা না আমি কী কইলাম?

হ হুনছি।

খালি হোনলে তো অইবো না। কিছু কও। তুমি কিছু কইবা দেইখাই তো কথা উড়াইলাম।

আতাহার আবার সিগ্রেটে টান দিল।

আজ বিকালের পর থেকে অনেকটা রাত তরি ভাল রকমের ঝড়বৃষ্টি হয়েছে। কয়দিন ধরে পড়া ভ্যাপসা গরম কেটে গেছে। গভীর রাতে দেশগ্রামে অবশ্য সারাদিনের গরম ভাবটা থাকে না। কোমল একখান ঠান্ডা নামে। আজ রাতে সেই ঠান্ডার লগে মিশেছে বৈশাখী ঝড়বৃষ্টির গরম থোয়া ভাব। রাতের আবহাওয়া আজ খুবই আরামদায়ক। এই আরামদায়ক আবহাওয়ায় রাতের আঁধারে দুইজন মানুষ মনপ্রাণ ভরে পেতে চেয়েছিল নিজেদেরকে। তবে মিলন তেমন আনন্দের হয় নাই তাদের। পুরুষমানুষটার আচরণে ব্যস্ততার ভাব ছিল।

এই কারণেই কি না কে জানে, পারু টের পাচ্ছিল তার মাথার খুব ভিতরে কেমন একখান ধরি ধরি ভাব! নাকি আতাহারের মুখে তার বিয়ার কথা শুনে মাথা ধরতে যাচ্ছে। তার, নাকি শাশুড়ির উপর মেজাজ বিগড়ে যাওয়ার কারণে এমন হচ্ছে!

সিগ্রেটে শেষ টান দিয়ে খাটের কোনায় ডলে ডলে শেষ অংশটা নিভাল আতাহার। এতক্ষণ আধশোয়া হয়ে সিগ্রেট টানছিল। এখন সিগ্রেট শেষ হয়েছে দেখে গা পুরাপুরি ছেড়ে, হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল। হাত বাড়িয়ে পারুকে টেনে আনতে চাইল বুকের কাছে। পারু নড়ল না, শক্ত হয়ে রইল।

শরীরকর্ম শেষ হওয়ার পরের সময়টা বহুদিন ধরেই তারা কাটায় একজন আরেকজনকে জড়িয়ে, শুয়ে শুয়ে টুকটাক কথা বলে, পরস্পরকে আদর সোহাগ করে। আজ সেটা হচ্ছে না। পারু শক্ত হয়ে বসে আছে। কী কারণে শক্ত হয়েছে বুঝল আতাহার। তবু বলল, কী অইলো?

পারু শীতল গলায় বলল, কী?

বইয়া রইলা যে?

তয় কী করুম?

জানো না কী করবা?

না জানি না।

আতাহার কপট দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আমি তো বুজছিঐ কীর লেইগা তুমি এমুন করতাছো! তয় এমুন করণ তোমার ঠিক অইতাছে না।

পারু রাগী গলায় বলল, তয় কী করুম? নাচুম?

হ নাচনঐ উচিত।

ক্যা? কী এমুন ফুর্তি লাগছে আমার!

তোমার মনের মানুষের বিয়া ঠিক অইতাছে, এইডা তোমার ফুর্তি না?

এইডা আমার ফুর্তি না, এইডা আমার মরণ। আমার মাথা বেদনা, হাত পাওয়ের ঝিমঝিমানি, চোক্কের কোণের কালি।

অন্ধকারে হাত বাড়িয়ে আবার পারুকে কাছে টানল আতাহার। বেক কথা না হুইন্না শক্ত অইয়া গেলা? আহো, কাছে আহো। আসল কথাহান কই। হোনলে সত্যই ফুর্তি অইবো তোমার।

তবু শক্ত হয়ে রইল পারু। বলল, আমি জানি কী অইব!

না তুমি জানো না।

না জানলে কও, জানি।

বিয়া কার লগে, পাত্রী কে, হেইডা হোনো।

হোননের কাম নাই আমার।

তোমারই কাম হোননের।

একটু থামল আতাহার। যে কথাটার জন্য এতক্ষণ ধরে অযথা অনেক কথা বলছে, আচমকাই এখন সেই কথাটা সে বলে ফেলল। মা’য় আমার বিয়া ঠিক করছে তোমার লগে।

শুনে প্রথমে বিশ্বাস হল না পারুর। মনে হল আতাহার ঠাট্টা করছে। গম্ভীর গলায় বলল, আমার লগে ফাইজলামি করবা না। এই হগল ফাইজলামি আমার ভাল্লাগে না।

আমি তোমার লগে ফাইজলামি করতাছি না। বিশ্বাস না অইলে কাইল বিয়ানে আমার মা’রে জিগাইয়া দেইখো।

আতাহারের কথার ভঙ্গিতে পারু এবার পরিষ্কার বুঝল, না সে মিথ্যা বলছে না। এতদিন ধরে মিলামিশার ফলে আতাহারের শরীর মন যেমন চিনে সে, কোন সময় তার কী আচরণ, কোন কথার ধরনে বোঝা যাবে সত্য মিথ্যা, সব মুখস্থ তার। সেই মানুষপড়া মুখস্থ বিদ্যায়। পারু বুঝে গেল আতাহার সত্যকথা বলছে। বুকের ভেতর চাপ ধরে বসা ভাবটা কেটে গেল। মুখের গোমড়া ভাব উধাও হয়ে সেই মুখে ফুটল হাসি, চোখের তারা নেচে উঠল আনন্দে, নারী শরীরের কোমলতায় প্রিয় পুরুষের ছোঁয়ায় যেমন কাঁপন লাগে ঠিক তেমন এক কাপনে কাঁপতে লাগল পারু। মাথা ধরার ভাব কোথায় গেল, কোথায় গেল থমথমা গলা, পলকে সে হয়ে উঠল রঙ্গিনী, সোহাগিনী, পরিপূর্ণ এক যুবতী নারী। আতাহারকে জড়িয়ে ধরে পাগলের মতন তার শরীরের উপর পুরা শরীর মেলে শুয়ে পড়ল। আবেগ জড়ানো গলায় বলল, সত্যঐ কইতাছো তুমি? সত্য?

দুইহাতে পারুকে জড়িয়ে ধরে আতাহার বলল, সত্য।

আথকা আম্মায় তোমার লগে আমার বিয়া দিতে চাইতাছে ক্যা?

আতাহার বুঝে গেল এখন থেকে তার আসল কাজ শুরু হল। পারুর পেট থেকে যে কথা বের করবার জন্য আজ তার কাছে আসছে সে, পারুর শরীর ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়া যে কারণে তাড়াহুড়া হয়েছে, যে কারণে ফালতু কথার ফুলঝুরি ছুটিয়ে এতটা সময় নষ্ট করতে হয়েছে, এত মিথ্যা, এত চালাকি ভণিতা করে আসল অবস্থাটা এতক্ষণে সে তৈরি করতে পেরেছে, কোনও অবস্থাতেই তা সে নষ্ট হতে দিবে না। কাজ হাসিল করবেই। এই কারণেই আচমকা আতাহার বলল, ক্যা দিতে চায় তুমি জান না?

পারুও অবাক হওয়ার ভান করল। না! আমি কেমতে জানুম?

ডাহা মিথ্যা বলল, আতাহার মায় দিহি কইলো।

কী কইলো?

তোমার লগে বলে হের কথা অইছে।

কী কথা?

এই হগল বিয়া সাদির কথা।

ভিতরে ভিতরে ততক্ষণে নিভে গেছে পারু, দমে গেছে। তা হলে কি শাশুড়ি পারুর দিকটা বিন্দুমাত্র ভেবে দেখেন নাই! লজ্জাশরমের মাথা খেয়ে যে কথা পারু তাকে বলেছিল ঠিক সেকথাই পারুর বরাত দিয়া তিনি আতাহারকে বলে দিয়েছেন! ছি! ছি! আতাহার তাকে এখন কী ভাববে!

তবু কথাটা স্বীকার করল না পারু। দৃঢ় গলায় বলল, মিছাকথা। আম্মার লগে এই হগল কথা আমার অয় নাই।

মায় দিহি কইলো।

কইলে মিছাকথা কইছে। তোমারে বুজ দেওনের লেইগা। আর একহান কথা, তোমার লগে নিজের বিয়ার কথা যুদি আমার কওনঐ লাগতো তাইলে কথাডা তো আমি বহুতদিন। আগেঐ কইতাম! তোমার ভাই মরণের চল্লিশদিন পর।

এ কথায় আতাহার দমে গেল। না, আন্দাজে ছোঁড়া ঢিলটা তো তা হলে কাজে লাগছে না। তার মানে পারুর লগে এসব কথা হয় নাই মা’র। পারু তাকে কিছুই বলে নাই। মা নিজ থেকেই চাইছেন পারুকে সে বিয়া করুক। অযথা পারুকে যে আতাহার সন্দেহ করেছিল, সন্দেহ করে আজ এসেছিল কথা বের করতে, সন্দেহটা ঠিক না।

আতাহার থম ধরে আছে দেখে পারু বলল, কী অইলো, চুপ কইরা আছো ক্যা?

চিন্তা করতাছি।

কী চিন্তা?

আবার একখানা ডাহা মিথ্যা কথা বলল আতাহার। মায় আমার লগে এমুন ঠাইট না ঠাইট (ডাহা) একহান মিছাকথা কইলো!

কইছে আমগো দুইজনের ভালর লেইগাঐ। মনে করছে আমার কথা কইলে তোমার মনডা নুলাম অইবো।

হ আমারও তাই মনে অয়।

আতাহারের গলার কাছে মুখ ঘষে পারু বলল, তয় কী কও তুমি? তুমি রাজি? বিয়া করবা আমারে?

পারুর পিঠ দুইহাতে খামছে ধরে আতাহার বলল, আগে তোমার কও। তুমি রাজি? বিয়া বইবা আমার কাছে?

বিয়া তো তোমার কাছে আমি বইয়াঐ রইছি। ওই যে যেদিন বিয়ালে, আইজ থিকা দশ-বারো বচ্ছর আগে, পিছে থিকা তুমি আমারে প্যাঁচাইয়া ধরছিলা, তোমারে লইয়া দুয়ারখোলা ঘরেঐ হুইয়া পড়ছিলাম আমি, স্বামী থাকনের পরও মনে মনে হেদিন থিকাঐত্তো তোমারে আমি আমার আসল স্বামী মাইন্না নিছি। তোমার তিনহান পোলাপান পেডে লইছি। অহনও বউ জামাইর লাহান রাইত্রে রাইত্রে থাকি। সবঐ অইছে, খালি নিয়মের বিয়াড়া আমগো হয় নাই। হেই বিয়াডাঐ আম্মায় অহন আমগো দিতে চাইতাছে। তয় আব্বায় কি রাজি অইবো?

মা’য় যেমতে চেষ্টা করতাছে, রাজি না অইয়া যাইবো কই!

হের ঠিক নাই। হেয় কি কেঐর কথা গেরাইজ্জ করবো?

এইডা মনে অয় করবো।

ক্যা?

মায় তো জীবনে হেরে কোনওদিন কিছু কয় নাই। এই পয়লা কইলো। বাবায় মনে অয় মা’র কথা হালাইবো না।

একথা শুনে খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেল পারু। দুইহাতে শরীরের সব শক্তি দিয়া আঁকড়ে ধরল আতাহারকে। ইস আমার যে কেমুন খুশি লাগতাছে না! এতদিনে আমার পোলাপান তিনডা অগো আসল বাপ রে বাপ ডাকতে পারবো।

আর তুমি পারবা তোমার আসল স্বামীরে স্বামী ডাকতে।

হ গো, হ। দেখবা বিয়ার দিন থিকাঐ আমি একদোম নতুন বউর লাহান অইয়া গেছি। যেন ওইদিনঐ আমার পয়লা বিয়া অইলো। আমার যেন কোনও পোলাপান নাই। বয়েস যেন দশ-বারো বচ্ছর কইম্যা গেছে আমার। বিয়ার রাইত্রে আমার লগে থাকলে তোমার মনে হইবো জিন্দেগিতে পয়লা মাইয়া মাইনষের লগে থাকলা তুমি।

আর তোমার কী মনে হইবো?

বাসর রাইত্রে আমার খুব ডর করবো।

ক্যা?

তুমি বোজো না, ক্যা?

না। তুমি কও।

বাসর রাইত্রে সব মাইয়ারাঐ ডরায়। মনে করে জামাই কেমুন না কেমুন করবো। আমিও অমুন ডর ডরামু। পরের রাইত্রেঐ দেকবা আর ডরাইতাছি না। বেবাক ঠিক অইয়া গেছে। ওইদিন থিকা আমি তোমার লেইগা রাইন্দা বাইড়া রাখুম, তোমার লগে বইয়া। ভাত খামু। এক ফাঁকে নিজের এক লোকমা ভাত তোমারে খাওয়াইয়া দিমু! তোমার এক লোকমা খাওয়াইয়া দিবা আমারে। রোজ বিয়ালে তোমার লেইগা আমি মাথায় তেল দিমু, চোখে কাজল দিমু। রাইত্রে তোমার হাত পাও টিপপা দিমু, মাথার চুল টাইন্না দিমু। গরমের দিনে রাইত্রে আমি ঘুমামু না। হারারাইত শিথানে বইয়া তালের পাঙ্খ দিয়া তোমারে আমি। বাতাস করুম। অসুক বিসুক অইলে জানডা তোমার লেইগা আমি দিয়া দিমু। জীবনের সবগুনি দিন সবগুনি রাইত বিয়ার দিনের লাহান, বাসর রাইত্রের লাহান আমোদে কাড়ামু। তারপর যহন মরণ আইবো, তোমারে আমার পিছে দিয়া আমি খাড়ামু মরণের সামনে। আজরাইলরে কমু, আমার স্বামীরে না, জান কবচ করতে অয় আমারডা করো। সতী নারী পতির আগে মরে।

পারুর কথা শেষ হওয়ার লগে লগে তেঁতুলগাছে রাতভর ঘুমিয়ে থাকা দুই-তিনটা কাক বুঝি জেগে উঠল। আড়ষ্ট গলায় দুই-তিনবার ডাকতেই গলা স্বাভাবিক হল তাদের। গলা খুলে ডাকাডাকি শুরু করল। বড়ঘরের ওদিকে ডাকতে শুরু করল ঘরশালিক। খানিক পরই ভোররাতের পাতলা অন্ধকারে উঠান পালানে নামবে দোয়েল। লাফিয়ে লাফিয়ে চড়বে আর ডাকবে। বাগ দিতে শুরু করবে বাড়ির খোয়াড়ে আটকা মোরগগুলি।

শরীরের উপর থেকে পারুকে নামিয়ে উঠল আতাহার। বিয়ান অইয়া গেছে। অহন আয়জান দিতে উঠব বাবায়। আমি যাইগা।

শার্ট পরল আতাহার। দরজা খোলার জন্য খাট থেকে পাটাতনে নামল।

পারু বলল, ইট্টু খাড়ও। একহান কথা হুইন্না যাও।

কও।

আমি তোমার লগে কয়হান মিছাকথা কইছি আইজ। আম্মায় কইলাম সত্য কথা কইছে তোমারে। কয়দিন আগে একদিন দোফরে তোমার বিয়াশাদির ব্যাপারে আমার লগে হেয় কথা কইতে আইছিলো। হেদিন আমিঐ তারে কইছিলাম বেবাকঐ যহন আপনে জানেন তয় পোলারে অন্য জাগায় বিয়া করাইতে চান ক্যা! যার পোলাপানের বাপ অইছে। হেয় তার লগেঐ তার বিয়া দেন!

শুনে স্তব্ধ হয়ে রইল আতাহার। ও তাইলে এই কারবার! আমার অনুমান ঠিক!

মুখে কিছু বলল না।

পারু আহ্লাদী গলায় বলল, ভাল করছি না কইয়া?

আতাহার মৃদু হেসে বলল, হ, খুব ভাল করছো। তুমি না কইলে মায় এই হগল চিন্তা করতো না। আমার লেইগা অন্য জাগায় মাইয়া দেকতো। তোমারে যাইয়া কইতো। আমারে বুজাইতে, যাতে বিয়া করতে আমি রাজি অই।

হেদিনও কইলাম এই কথা কইতে আইছিলো!

তারবাদে?

কথায় কথায় আমি এই হগল কথা কইছি। কইতে খুব শরম করছে, তাও কইছি। নাইলে তুমি তো আমার চিরতরের পর অইয়া যাইতা! আমি চাইয়া চাইয়া দেকতাম নতুন বউ লইয়া তুমি ঘরের দুয়ার দিতাছো।

মুখে আর কিছু বলল না আতাহার। নিঃশব্দে ঘরের পিছন দিককার দরজা খুলতে খুলতে মনে মনে বলল, সত্যকথা কইয়া তুমি যে আইজ নিজের কী ক্ষতি করলা ভাবিছাব, হেইডা তুমি আইজ বোজবা না। বোজবা পরে। এই সত্যকথার লেইগা হারাজীবন ফস্তাইতে অইবো তোমার।

.

হাসুর জ্বর ছাড়ল সতেরো দিন পর।

সতেরো দিনের দিন সকাল থেকে জ্বরটা আর এল না। গোলাঘরের চৌকিতে শুয়ে জ্বর আসার জন্য যেন অপেক্ষা করছিল সে। সকাল গিয়া দুপুর হল, দুপুর গিয়া বিকাল সন্ধ্যা রাত। না জ্বর আর এল না। সব দেখে শুনে হাসু বুঝে গেল জ্বর ছেড়ে গেছে, আর আসবে না। মাজার তলা থেকে ব্যথাটাও উধাও হয়ে গেছে।

হাসুর জ্বর ছাড়াতে তার চেয়ে যেন বেশি খুশি হল রহিমা। সকাল থেকেই থেকে থেকে গোলাঘরে এসে ঢুকছিল। হাসুর গালে কপালে গলায় বুকে হাত দিয়া দেখছিল নাড়ার তলার আগুনের মতন ধিকিধিকি জ্বরটা রয়ে গেছে কি না। নাই দেখে আনন্দে আত্মহারা। আল্লার রহমত অইছে। আল্লায় মুখ তুইলা চাইছে, বলে আল্লার শুকুর গুজার করল অনেকবার।

তবে জ্বর ছেড়ে যাওয়ার আনন্দ হাসুর মুখে নাই। সে উদাস আনমনা, যেন চিন্তিত। সতেরো দিনের জ্বরে শরীর আর শরীর নাই তার, চেহারা সুরত মানুষের মতন নাই। মেয়েলি কোমলতা ইত্যাদি বহুদিন হল শরীর থেকে উধাও হয়েছে। পুরুষালি একটা ভাব হয়েছিল। জ্বরে যেন সেই ভাব আরও প্রকট হয়েছে। হাসু যেন এখন আর মেয়েই না, হাসু যেন পুরাপুরিই পুরুষ।

রাতেরবেলা হাসুর পাশে শুয়ে রহিমা বলল, আইজ থিকা আমার আর কোনও চিন্তা নাই। আইজ থিকা আমি আবার ঘুমাইতে পারুম। তুই একহান কাম করিচ হাসু, কাইল বিয়ান থিকা ঘর থিকা ইট্টু ইট্টু বাইর হ। উডানে ইট্টু হাঁট। দোফরে ঘাডে গিয়া সাপান দিয়া ডইল্লা ডাইল্লা না (নাওয়া)। এতদিন তো আর নাছ নাই! চুলে জট লাইগ্যা গেছে, শইল্যে জ্বউরা গন্দ। ভাল কইরা নাইলে দেকবি কাউলকাঐ শইল অনেক বেশি ভাল অইয়া গেছে। আর বিচনায় হুইয়া থাকতে থাকতে হাত পাও ওতো অবশ অইয়া যাওনের কথা! বেক কিছু কাইল থিকা আবার শুরু কর। দেকবি দুই-তিনদিনের মইদ্যে তুই এক্কেরে আগের লাহান। ঠাইস্যা ভাতপানি খাবি আর ঘুমাবি কয়দিন, তারবাদে কাম কাইজ শুরু করবি।

রহিমার কথা শুনে কথা বলল না হাসু। অন্ধকার ঘরে চুপচাপ জেগে রইল। হাসু কেন তার কথার জবাব দিল না আজ রাতে তা খেয়ালও করল না রহিমা, হাসুর দিকে পিছনে ফিরে ঘুমিয়ে গেল, মৃদু শব্দে ডাকতে শুরু করল তার নাক।

পরদিন সকালে কিছুটা বেলা হওয়ার পর ঘর থেকে বের হল হাসু। তহুরা বেগম তখন রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছেন। কয়েকদিন ধরে আমোদ আহ্লাদী ভাব তার চেহারা আচরণে। হাসুকে দেখে বললেন, জ্বর ছাড়ছে?

হাসু উদাস গলায় বলল, হ আম্মা, ছাড়ছে।

তার উদাসীনতা খেয়াল করলেন না তহুরা বেগম। রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে। বললেন, তয় নাইয়া ধুইয়া সাফ সুতরা হ। দুই-একদিন পর কামকাইজ শুরু কর। কয়দিন বাদে আমার মাজরো পোলার বিয়া। বাইত্তে অনেক কাম।

এসব কথার কোনও জবাব দিল না হাসু। দুপুরবেলা দুর্বল শরীরেও পুকুরঘাটে গিয়ে সাবান দিয়া অনেকক্ষণ ধরে গোসল করল। ধোয়া শাড়ি পরল। বাড়ির লোকজনের খাওয়া হওয়ার পর সে যখন রান্নাঘরে ভাত খেতে এল তখন তার চেহারায় অনেকখানিই তাজা ভাব, শরীরে ভাল রকম পরিচ্ছন্নতা।

খেতে বসে হাফিজদ্দি বলেছিল, বহুতদিন বাদে হাসুরে দেকলাম। খাইতে বইয়া রোজ মনে অইত। কয়দিন চিন্তা করছি গোলাঘরে গিয়া ইট্টু দেইক্কামু। ডরে যাই নাই।

হাসু আনমনা গলায় বলেছিল, কীয়ের ডর?

বাড়ির মাইনষে কী না কী মনে করে!

হাসু আর কথা বলে নাই। বলেছিল রহিমা। হ এই বাড়ির মাইনষে যে কোনও কিছুতেই যে-কোনও কিছু মনে করতে পারে।

দুপুরটা শুয়ে কাটিয়ে শেষ বিকালের দিকে আবার ঘর থেকে বেরিয়েছিল হাসু। উদাস ভঙ্গিতে হাঁটতে হাঁটতে আসছিল বারবাড়ির সামনের নাড়ার পালায়। এখানে আজ আতাহারের শার্ট লুঙ্গি শুকাতে দেওয়া হয়েছে। এই শার্ট লুঙ্গি তোলার কাজটা আজ হাসু করল। শূন্য বাংলাঘরে গিয়ে আলনায় জিনিসগুলি গুছিয়ে রাখার সময় আতাহারের পুরনা ধুরনা একখান লুঙ্গি আর একখান শার্ট চুরি করে গোলাঘরে নিয়ে এল। রাতটা হাসুর কাটল অদ্ভুত এক উত্তেজনায়।

ভোররাতের কিছু আগে রহিমাকে ডেকে তুলল হাসু। ফুবু, ও ফুবু, ওডো।

হাসুর এরকম ডাকে ভয় পেয়ে গেল রহিমা। ধড়ফড় করে উঠে বসল। কী রে আবার জ্বর আইলোনি?

না।

তয় ডাক পাড়ছ ক্যা?

তোমার লগে কথার কাম আছে।

রহিমা বিরক্ত হল। কথা তো দিনেও কইতে পারতি। অহন ক্যা?

না দিনে কইতে পারুম না। অহনঐ কওন লাগবো।

হাসুর গলায় কী যেন কী ছিল, রহিমা থতমত খেল। অন্ধকারে হাসুর মুখের দিকে তাকাল, মুখ দেখতে পেল না। বলল, আইচ্ছা ক।

হাসু গম্ভীর গলায় বলল, আমার একহান কাম অইয়া গেছে।

কী কাম?

আমি আর মাইয়ামানুষ নাই।

কথাটা বুঝতে পারল না রহিমা। বলল, কী?

আমি বেডা অইয়া গেছি।

তবু কথাটা বুঝতে পারল না রহিমা। আবার বলল, কী?

হ। জ্বর ছাড়নের একদিন আগেঐ বেডা অইয়া গেছি আমি। পেশাবের রাস্তায় এর লেইগাঐ আমার এমুন বেদনা অইছিলো। জাগাডা বদলাইয়া যাওনের লগে লগে বেদনা কইমমা গেছে, জ্বরও ছাইড়া গেছে। আমার পেশাবের রাস্তাডা অহন বেডাগো লাহান।

হাসুর কথা শুনে রহিমা যেন উঠান পালানের মাটির মতন হয়ে গেল। তার যেন নড়াচড়ার ক্ষমতা নাই, কথা বলবার শক্তি নেই। তার চোখে যেন পলক পড়ে না, দম যেন চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। অন্ধকারে হাঁ করে, অপলক চোখে হাসুর দিকে তাকিয়ে রইল সে। যদিও হাসুর মুখ দেখা যাচ্ছে না, তবু তাকিয়ে রইল।

হাসু বলল, এর লেইগাঐ জ্বর ছাড়নের পর থিকা আমার মুখে কথা নাই। আমি গেছি। অন্যরকম অইয়া। শইল বদলের লগে লগে মনও বদলাইয়া গেছে আমার। দুইডা দিন ধইরা জাগাড়া আমি লাইড়া চাইড়া দেকছি। না কোনও ভুল নাই। তারবাদে অহন তোমারে কইলাম। ফুবু, তুমিও হাত দিয়া দেহে।

রহিমার একটা হাত টেনে আনল হাসু, নিজের শরীরের সেই জায়গাটায় রাখল। বোজতাছ?

রহিমার গলা শুকিয়ে খরালিকালের চকের মতন হয়েছে। ঢোক গিলে সেই গলা ভিজাল সে। কোনওরকমে বলল, হ বোজতাছি। পুরাপুরি বেডাগো লাহান।

তারপরই ভয়ার্ত ভঙ্গিতে হাতটা সরিয়ে নিল সে। চাপা আর্তনাদের গলায় বলল, হায় হায় এইডা কোন সব্বনাশ অইলো? মাইনষে হোনলে কইবো কী? এইডা অইলো কামেলদার মাইনষের বাড়ি। মাইয়া থিকা বেড়া হওয়া মানুষ এই বাইত্তে থাকবো কেমতে? হুজুরে হোনলে লগে লগে বাইর কইরা দিবো। খালি এই বাইত্তে ক্যা, দেশগেরামের কোনও বাইত্তে ঐত্তো তরে কেঐ জাগা দিবো না।

হাসু দৃঢ় গলায় বলল, জাগা দেওন লাগবো না। দেশগেরামে আমি থাকুম না।

তয় যাবি কই?

ঢাকা যামু গা। আতাহার দাদার একহান লুঙ্গি আর একহান শাট চুরি করছি। আমার চিকিচ্ছার লেইগা আম্মায় যেই টেকা দিছিলো হেই টেকার ষাইট টেকা অহনও তোমার কাছে আছে। আগে কুপি আঙ্গাও, কুপি আঙ্গাইয়া টেকাডি আমারে বাইর কইরা দেও, আর কুপির আলোয় আতাহার দাদার শাট লুঙ্গি আমি ফিন্দি, ফিন্দা হুজুরে উডনের আগে এই বাইত থিকা বাইর অইয়া যাই।

রহিমাকে ধাক্কা দিল হাসু। ওডো, তাড়াতাড়ি করো।

মরার মতন উঠল রহিমা। বালিশের তলা থেকে ম্যাচ নিয়া কুপি জ্বালল। কুপির আলোয় সব ভুলে হাসুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

রহিমাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে হাসল হাসু। চাইয়া রইলা ক্যা? টেকা বাইর করো।

চৌকির তলায় নিজের কাপড়ের পোঁটলা ভিতর টাকাটা রহিমা রেখেছে। কুপি হাতে সেই পোঁটলার জন্য চৌকির তলার কাছে উপুড় হল। হাসু তখন আতাহারের লুঙ্গি পরছে, শার্ট পরছে।

টাকা বের করে হাসুর হাতে দিতে গিয়া রহিমা দেখে তার এতদিনকার হাসু আর নাই। হাসু নামের মেয়ের জায়গায় দাঁড়িয়ে তার বয়সের এক যুবক।

টাকাটা শার্টের পকেটে রেখে হাসল হাসু। পুরাপুরি বেড়াগো লাহান আমারে লাগতাছে না ফুবু?

রহিমা কোনওরকমে বলল, হ।

চৌকি থেকে নামল হাসু। একহাতে ফুফুকে টেনে আনল বুকের কাছে। আমি বোজতাছি আমারে লইয়া চিন্তায় মইরা যাইতাছো তুমি। ডরে শইল্যের রক্ত পানি অইয়া গেছে তোমার। আমি তোমারে কইতাছি ফুবু, আমারে লইয়া তুমি চিন্তা কইরো না, ডরাইয়ো না। যেইডা অইছে এইডা ভাল অইছে। আল্লায় আমার উপরে রহম করছে দেইক্কা এমুন অইছে। বহুতদিন ধইরা এইডা চাইছি আমি?

কী?

হ। মউচ্ছামান্দ্রার বাইত্তে তুমি আমারে কামে দেওনের পর থিকাঐ চাইছি। দিনরাইত চব্বিশ ঘণ্টা যহন বেডাডি আমারে জ্বালাইছে, নিজেরে তাগো হাত থিকা রক্ষা করতে করতে আল্লারে আমি খালি কইছি, আল্লাহ এই আজাবের হাত থিকা তুমি আমারে বাঁচাও। আমারে পুরুষপোলা বানাই দেও। আমারে ইট্ট শান্তিতে ঘুমাইতে দেও। আল্লায় আমার কথা হোনছে। কহেক বচ্ছর ধইরা ইডু ইট্ কইরা বদলাইছে আমারে, আধাবেড়া বানাইছে। শেষতরি পুরাপুরি বানাই দিছে। আমি মনে অয় এই দুইন্নাইয়ের একহানঐ মানুষ যে আল্লার কাছে যা চাইছি আল্লায় আমারে তাইঐ দিছে। আর একহান সুবিদাও আমার আছে, আমার নামহান। হাসু যেমুন মাইয়াগো নাম অয় তেমুন বেডাগও হয়। নামও বদলাইতে অইবো না আমার। অহন আমি এই বাড়ি থিকা বাইর অইয়া পয়লা যামু ছিন্নগর। ওহেনে গিয়া নাপতের দোকান থিকা চুলডা বেড়াগো লাহান কইরা কাড়ামু। তারবাদে লঞ্চে কইরা যামু ঢাকা। অহন আমার কোনও ডর নাই। যহন যেহেনে ইচ্ছা আমি যাইতে পারুম, যেহেনে ইচ্ছা হুইতে পারুম, যেই কাম ইচ্ছা করতে পারুম, আমার মিহি কেঐ চাইয়াও দেকবো না। অহন পুরা দুইন্নাইডাঐ আমার।

হাসুর কথা শুনতে শুনতে বুকের ভিতর এতক্ষণ ধরে চাপ ধরে থাকা উদ্বেগ কষ্টে রূপান্তরিত হল রহিমার। এই প্রথম মনঅন্যরকম হল তার, চোখে পানি এল। তুই তাইলে আমারে ছাইরা যাইতাছচগা মা?

হাসু হাসল। মা না, কও বাবা। বাজান। তয় যাইতাছি ঠিকঐ, এই যাওনের অর্থ আছে। চিনা পরিচিত কোনও মাইনষেরে বোজতে দিতে চাই না যে আমার শইল্যের ভিতরে এমুন একখান কারবার অইছে। অচিনা জাগায়, অচিনা মাইনষের লগে গিয়া থাকতে চাই এর লেইগাঐ, তারা পয়লা থিকাঐ আমারে পুরুষপোলা হিসাবে চিনবো।

রহিমা চোখ মুছে বলল, আর বিয়ানবেলা এই বাড়ির মাইনষে যহন তর কথা জিগাইবো?

কইবা আমি মউচ্ছা গেছি। ওই বাড়ির মাইনষের কাছ থিকা বিদায় লইয়া কয়দিন বাদে আমু।

যহন আর আবি না, তহন?

কইবা অরা মনে হয় আমারে ছাড়ে নাই। এই হগল মিছাকথা তো কইতেঐ অইবো!

আর যহন এই বাড়ির মাইনষে তরে চোর কইবো? আতাহারের শাট লুঙ্গি তুই চুরি করছস?

এইডা ফুধু তুমি অস্বীকার করবা। কইবা, না, এইডা আমি করি নাই। দোষহান মুকসেইদ্দা চোরার উপরে দিয়া দিবা।

তবু চোখের পানি থামে না রহিমার, তবু সে কাঁদে।

হাসু তখনও বুকে জড়িয়ে রেখেছে রহিমাকে। কাঁদতে দেখে বলল, কাইন্দো না ফুবু, কাইন্দো না। হাসো, ভাল কইরা হাসো। এই দুইন্নাইডা মাইয়াছেইলার না, এই দুইন্নাইডা অইলো পুরুষপোলার। আমি অহন পুরুষপোলা, আমি অহন তোমার পোলা। ঢাকা গিয়া কামকাইজের ভাও কইরা দেকবা এই জীবন আমি বদলাইয়া হালামু। দুয়েক বচ্ছর পর ফুলপেন শাট আর জুতা ফিন্দা ব্যাগ কান্দে লইয়া এই বাইত্তে আমু। আইয়া পরিচয় দিমু আমার নাম হাসেম, ডাক নাম অইলো হাসু। তুমি আমার ফুকু হও। তোমারে আমি ঢাকায় আমার কাছে লইয়া যাইতে আইছি। এই বাইত্তে ঝিয়ের কাম তুমি আর করবা না। ঢাকার টাউনে তুমি তোমার ভাইরবেডার বাসায় থাকবা।

রহিমা কাঁদতে কাঁদতে বলল, হেইডাঐ করিচ বাজান, হেইডাঐ করিচ। আইজ থিকা। আমি খালি তর পথ চামু। তুই কবে আবি, কবে আইয়া আমারে লইয়া যাবি তর কাছে।

রহিমার চোখের পানি মুছিয়ে হাসু বলল, তুমি চিন্তা কইরো না। আমার মনে অয় বেশিদিন লাগবো না।

একটু থেমে বলল, তয় অহন তো বাইর অইতে অয় ফুবু। হুজুরের ওডনের সমায় অইয়া গেছে।

হ বাজান। ল, তরে আমি ইট্ট আউগগাইয়া দেই।

দরজা খুলে দুইজন মানুষ গোলাঘর থেকে বের হল। কুপিটা আগেই নিভিয়ে দিয়েছিল রহিমা, ঘরে অন্ধকার, বাইরে তেমন অন্ধকার নাই। পশ্চিম আকাশে ম্লান চাঁদ আছে, ম্যাটম্যাট জ্যোত্সা আছে চারদিকে। এই জ্যোৎস্না ভেঙে বারবাড়ির সামনে এল দুইজন মানুষ। এসেই দুইহাতে রহিমাকে আবার বুকে চেপে ধরল হাসু। তয় আমি অহন যাই ফুবু। তুমি আমারে দোয়া কইরো।

রহিমার চোখে তখন আবার পানি। কান্নাকাতর গলায় বলল, যাওন নাই বাজান। আহো গিয়া।

হাসু আর কোনওদিকে তাকাল না। নাড়ার পালার পাশ দিয়া পুকুর পার ধরে বড় রাস্তায় উঠল। উঠে পলকের জন্য বারবাড়ির সামনে দাঁড়ানো ফুফুর দিকে তাকাল। তারপর পা চালিয়ে উত্তরমুখী হাঁটতে লাগল। চাঁদের ম্লান আলোয় রহিমা দেখতে পেল শক্ত সমর্থ একজন পুরুষমানুষ ছোট্ট একটা বাড়ি আর একটা গ্রামের বেড়া ভেঙে বিশাল পৃথিবীর দিকে হেঁটে যাচ্ছে। সেই মানুষটার দিকে তাকিয়ে রহিমা মনে মনে বলল, যেহেনেঐ থাকচ বাজান, ভাল থাকিস। সুখে থাকিস। আল্লায় যেন তর বেবাক মনোবাঞ্ছা পূরণ করে।

.

কী রে বাদলা, খবর দেচ নাই মাওলানা সাবরে?

এনামুলের কথা শুনে চমকে তার মুখের দিকে তাকাল বাদলা। দিছি তো! বিয়ানে। গিয়াঐ দিয়াইছি।

তয় অহনতরি আহে না ক্যা?

বাদলা কথা বলবার আগেই মোতালেব বলল, আইয়া পড়বো। অহনঐ আইয়া পড়বো। চিন্তা কইরো না।

তাড়াতাড়ি না আইলে তো মশকিল। মাওলানা সাবের লগে কথা কইয়াঐ মেলা দেওন লাগবো আমার। আইতে আইতে সন্দা অইয়া গেছেলো কাইল। এর লেইগা গাড়ি আর ফিরত পাই নাই। ছিন্নগর বাজারে কাডের আড়ত আছে আমার দোস্ত নূরিসলামের। অগো বাইত্তে গাড়ি রাইক্কাইছি। বিরাট একহান কাম চলতাছে ঢাকায়। সূত্রাপুর বাজারের কাম। ওই কাম হালাইয়া একদিন কোনওহানে থাকন সম্ভবপর না আমার। ওবারসিয়ার ইঞ্জিনিয়ার সাবরা রোজঐ সাইডে আহে। ম্যানাজার আছে গোলাম মাওলা। হারাদিন সাইডে থাকে। তাও ইঞ্জিনিয়ার সাবরা আমারে না দেকলে রাগ করে।

মোতালেব আন্তরিক গলায় বলল, তয় এতবড় কাম হালাইয়া তুমি আইলা ক্যা?

গলার চেন হাতাতে হাতাতে এনামুল বলল, আইলাম মজজিদের কথা চিন্তা কইরা। আপনের মনে আছে না মামা, চাইর-পাঁচমাস আগে আমগো ঘরে বইয়া মজজিদ বানানের চিন্তা ভাবনা করলাম। কইলাম দিন পোনরোর মইদ্যে মাডি কাডনের কাম শুরু করুম, বাড়ি বান্দনের কাম শুরু করুম। মাওলানা সাবেও আছিলো হেদিন।

হ। মনে থাকব না ক্যা?

তারবাদে এতডি দিন গেল গা, কাম তো শুরু করলামঐ না, দেশেও আইলাম না।

হ।

হের লেইগাঐ কয়দিন ধইরা চিন্তা করতাছি, গেরামের মাইনষে আমারে কইবো কী?

কথাটা বুঝতে পারল না মোতালেব। বলল, কী কইবো?

এনামুল অবাক হল। বোজেন নাই আপনে?

মোতালেব বুঝদারের মতো মাথা নাড়ল। বুজুম না ক্যা, বুজছি। মাইনষে মনে করবো মুখের কথার লগে কামের কোনও মিল নাই তোমার।

এনামুল হাসল। আপনে ইট্ট সোন্দর কইরা কইলেন কথাডা। এত সোন্দর কইরা মাইনষে কইবো না মামা। কইবো এনামুইলা একহান টাউটার। মজজিদ বানানের কথা কইয়াও বানায় না, টাউটারি করে।

আরে না মিয়া, তোমার নামে এমুন কথা কওনের সাহস অইবো না কেঐর।

না মামা, হইবো। আমগো দেশের মানুষগ আপনেও চিনেন, আমিও চিনি। এই হগল চিন্তা কইরাঐ কাইল বিয়ালে ঢাকা থিকা মেলা দিলাম। বাসা থিকা বাইর অইয়া সাইডে গেছি, সাইড থিকা সোজা ছিন্নগর। বাইত্তে আইয়াঐ বাদলারে কইছি বিয়ানে গিয়া মাওলানা সাবরে খবর দিবি। সোজা আইতে কইবি আমগো ছাড়াবাইত্তে। ওহেনে খাড়ইয়া বেবাক বন্দবস্ত কইরা আর বাইত্তে যামু না আমি। ছাড়াবাইত থিকাঐ ঢাকা মেলা দিমু। দোগাছির ওইমিহি রিকশা পাওয়া যায়। ওডু হাইট্টা গিয়া রিকশা লইয়া যামু ছিন্নগর। ওহেন থিকা। গাড়ি লইয়া সোজা কামের সাইডে। এর লেইগাঐ একবারে নাস্তাপানি খাইয়া বাইত থিকা। বাইর অইছি। আম্মায় কইছিলো আউজকার দিনডা থাইক্কা যাও বাজান, আম্মার কথা রাকতে পারলাম না।

এনামুলের মাঝারি সাইজের ব্যাগটা বাদলার কাঁধে। এক কাঁধ থেকে ব্যাগ আরেক কাঁধে আনতে গিয়াই মান্নান মাওলানাকে দেখতে পেল সে। সড়কের দিক থেকে মোটা শরীর নিয়া প্রায় ছুটে আসছেন। দেখেই উত্তেজিত গলায় বলল, ওইত্তো হুজুরে আইয়া পড়ছে।

এনামুল আর মোতালেবও দেখল মান্নান মাওলানাকে। দেখে দুইজনেই আশ্বস্ত হল।

এনামুল বলল, তয় দেরিডা মামা ক্যান অইছে জানেন?

না। ক্যান কও তো?

আমি বেবাক দিক ঠিক না কইরা কোনও কামে নামি না। পয়লা মা-খালার কাছ থিকা ছাড়াবাড়ি কিনলাম। নিজের নামে রেস্ট্রি করলাম। মা-খালা দুইজনের টেকাঐ তাগো বুজাইয়া দিলাম।

কত টেকা দিলা?

এনামুল হাসল। হেইডা কমু না। তয় দেশগেরামে যা রেট আছে হেইডাঐ দিছি। একহান পয়সা কম দেই নাই। মায় তার টেকাডি আমার কাছেঐ রাকছে, আম্মায় দিয়া দিছে তার মাইয়ার জামাইরে।

ততক্ষণে মান্নান মাওলানা এসে উঠেছেন ছাড়াবাড়িতে। হাঁপাতে হাঁপাতে এসে দাঁড়ালেন এনামুলের সামনে।

মাওলানা সাহেবকে দেখেই সালাম দিল এনামুল। স্লামালাইকুম।

বিগলিত ভঙ্গিতে সালামের জবাব দিলেন মান্নান মাওলানা। ওয়ালাইকুমসালাম। কেমুন আছো বাজান?

জি, আছি ভালঐ। আপনে ভাল তো?

এই আছি আর কী? কোনওরকম!

কোনওরকম ক্যা?

তুমি তো জানোঐ, দেশগেরামে নানান পদের ঝামেলা। চোরধাউরে দেশ ভইরা গেছে, শয়তান বদমাইশে দেশ ভইরা গেছে। এর মইদ্যে ভাল থাকন যায়নি!

মান্নান মাওলানার লগে গলা মিলাল মোতালেব। হ ঠিক কথাঐ কইছে হুজুরে। দেশ গেরামের মানুষ অহন আর মানুষ নাই, বোজলা মামু? আমানুষ অইয়া গেছে, আমানুষ। দবির গাছির এতডু ইট্টু মাইয়া কী কামডা করলো হুজুরের লগে!

এনামুল বলল, হ হেইডা আমি হুনছি। আম্মায় আমারে বেবাকঐ কইছে। তয় ছেমড়ি মনে অয় কামডা করছে না বুইজ্জা। হুজুরেও এইডা বোজছে। বোজছে দেইক্কাঐ অরে মাপ কইরা দিছে।

মান্নান মাওলানা কথা বললেন না। বলল মোতালেব। হ হুজুরে ভাল মানুষ দেইখা মাপহান করছে। অন্য মাইনষে অইলে করতো?

এনামুল বলল, বাদ দেন এই হগল কথা। লন কামের কথা কই।

মান্নান মাওলানা বললেন, হ বাজান, হেইডাই ভাল। কও দিহি কী চিন্তাভাবনা করলা? কাম ধরবা কবে?

কাম ধইরা হালাইছি।

কী?

হ। বাড়ি রেস্ট্রি কইরা হালাইছি। পশ্চিমের পুকঐর আর এইবাড়ি মিলা চৌদ্দগন্ডা জমিন অহন আমার। এর লেইগাঐ কইলাম কাম ধইরা হালাইছি।

ঠিক কইছো। আসল কাম অইয়া গেছে। অহন খালি মজজিদহান বানান, বিলডিংহান উডান।

হ। তার আগে ছোড ছোড আরও কিছুকাম আছে। পুকঐরডা আরও কাডন লাগবো, পুকঐর থিকা মাডি উড়াইয়া মজজিদের ভিটি বান্দন লাগবো। পুরা ছাড়াবাড়িডাঐ বান্দন লাগবে।

তা তো লাগবোই!

এইডা ঠিক কইলেন না হুজুর। ভিটি বাড়ি না বাইন্দাও এই ছাড়াবাইত্তে মজজিদ করন যায়। বিলডিং না কইরা টিনের ঘর উড়াইয়াও মজজিদ বানান যায়।

হ তা যায়, তা যায়।

মোতালেব বলল, যাইব না ক্যা? আল্লার ঘর যার যেমতে ইচ্ছা উডাইবো। ঘরের আসল কামডা অইলেঐ অইলো। নমজ কালাম। ইমাম সাবের পিছে খাড়ইয়া জামাতে নমজ পড়লেঐ অইলো।

এনামুল বলল, এইডা মুইল্যবান কথা কইছেন মামা। যার যেমতে ইচ্ছা মজজিদ বানাইবো। তয় আমি কনটেকটার মানুষ। নিয়ইত করছি নানার দেশে একহান মজজিদ করুম। এতডি টেকা দিয়া মা-খালার জাগা কিনছি। অহন কোনওরকমে একহান মজজিদ ঘর খাড়া কইরাঐ মনে মনে খুশি হমু যে কামডা আমি কইরা হালাইছি, আমি ঐপদের মানুষ না। আমি যা করি, করি গুছাইয়া, সোন্দর কইরা। এর লেইগাঐ কামডা এতদিন ধরি নাই।

মান্নান মাওলানা গদগদ গলায় বলল, আমি বুঝছি তোমার কথা। জমিন কিন্না হালাইছো, অহন মাড়িমুড়ি উড়াইবা, ভিটিবাড়ি বানবা তারবাদে মজজিদের কাম ধরবা।

এনামুল হাসল। এইত্তো আপনে বোজছেন।

তয় মাডি কাড়ন আর বাড়ি বান্দনের কাম কি অহনঐ ধরবা?

মোতালেব বলল, অহনঐত্তো ধরন উচিত। শুভকামে দেরি করবো ক্যা?

হ হেইডা ঠিক কথা।

এনামুল বলল, আমি ইচ্ছা করলে কাইল থিকাঐ ধরতে পারি। তয় ধরুম কি না চিন্তা করতাছি।

মান্নান মাওলানা সরল গলায় বলল, কীয়ের চিন্তা বাজান?

বৈশাকমাস শেষ অইয়ালো। কয়দিন বাদে জষ্টিমাস। বাইষ্যাকাল আইয়া পড়বো। ম্যাগ বিষ্টি নামবো। এই সমায় মাডি কাডনের কাম, বাড়ি বান্দনের কাম ধরন ঠিক অইবোনি? দেহা গেল একদিক দা বাড়ি বানতাছে আরেক দিক দা বিষ্টিতে মাডি ধুইয়া যাইতাছে।

হ এইডা ঠিক কথাই কইছো।

মোতালেব বলল, আরে না মিয়া। এডু বাড়ি বানতে কয়দিন লাগে! বেশি কইরা মাইট্টাল লাগাইলে আষ্ট-দশদিনে কাম অইয়া যাইবো।

ওই আষ্ট-দশদিনে যুদি ম্যাগ বিষ্টি নামে! কয়দিন ধইরা তো দুই-চাইরদিন পর পরঐ বিয়ালবেলা তুফান ছাড়ে। কোদাইল্লা (কোদালে) বিষ্টি নামে।

মান্নান মাওলানা বললেন, হ। দেশগেরামে ইরি ধান কাডন লাগছে। ঝড়তুফানে ধান লইতেঐ পারতাছে না গিরস্তে! ধান হুগাইতে পারছে না। উডান পালানে মেইল্লা দেওনের লগে লগেঐ ম্যাগ তোফান আরম্ব হয়।

মোতালেব জোর গলায় বলল, ধান হুগান আর বাড়িবান্দন এক কাম না।

এনামুলের দিকে তাকাল সে। এনামুল, কামডা বিসমিল্লা বইলা ধইরা হালাও মামু। বেক কিছু আমারে বুজাইয়া দিয়া যাও, টেকাপয়সা দিয়া যাও কিছু, পশশুকা থিকা বিশ পনচাশজন মাইট্টাল লাগাই দেই।

এনামুল হাসল। আপনে যে মামু নিজের স্বার্থের লেইগাঐ ম্যাগ বিষ্টি মানতে চাইছেন না এইডা আমি আর মাওলানা সাব দুইজনেঐ বুজছি। তয় আমি তো মামু আপনের বুদ্দিতে চলুম না। আমি চলুম আমার বুদ্দিতে। টেকা আমার, মাডি উডামু আমার টেকা দিয়া। হেই মাডি যুদি ম্যাগ বিষ্টিতে ধুইয়া যায় লসটা অইবো আমার। আর লাব অইবো আপনের?

মোতালেব মুখ কালো করে বলল, আমার কেমুন লাব?

এক কাম দুইবার করবেন আপনে! মাইট্টাল সর্দারির পয়সাডা ডবল পাইবেন।

এনামুলের কথা শুনে মুখ চুন হয়ে গেল মোতালেবের। সে আর কথাই বলল না। চুন করা মুখ নিয়া চকের দিকে তাকিয়ে রইল।

মান্নান মাওলানা আর বাদলা তখন মুখ টিপে টিপে হাসছে। তাদের দেখাদেখি এনামুলও একটু হাসল। তারপরই গম্ভীর হয়ে গেল। মান্নান মাওলানার দিকে তাকিয়ে বলল, হুজুর কী কন? কামডা অহন ধরন ঠিক অইবো?

মান্নান মাওলানা আগেই বুঝে গেছেন যত যাই হোক কাজ এখন এনামুল কিছুতেই ধরবে না। তার অন্য কোনও হিসাব আছে। আর হাওয়া বুঝে চলাই মান্নান মাওলানার নীতি, তিনি সেই নীতিই ধরলেন। মাথা নেড়ে বললেন, আমি মনে করি অহন ধরন ঠিক অইবো না। তোমার হিসাবঐ ঠিক। অহন কাম ধরলে ম্যাগ বিষ্টিতে কামের ক্ষতি অইবো।

মান্নান মাওলানার কথা শুনে খুশি হল এনামুল। মোতালেবের দিকে তাকিয়ে বলল, হুজুরের কথা হোনছেন মামা? এইডা অইলো গেনি মাইনষের কথা। গেনি মাইনষে কথা কয় চিন্তা কইরা। খালি নিজের লাবহানঐ দেইনে না। অন্যের লাব লোসখানডাও চিন্তা কইরেন।

মোতালেব মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। কথা বলল না।

এনামুল আর তার দিকে তাকাল না। মান্নান মাওলানার দিকে তাকিয়ে বলল, সবমিহি চিন্তা কইরা আমি দেখলাম হুজুর, এই বচ্ছর কামডা আমরা ধরতেঐ পারুম না। মাসেকহানি পর জোয়াইরা দিন আইয়া পড়বো। তারপর বাইষ্যাকাল। কাম আপনে পউষ-মাগ মাসের আগে ধরতে পারবেন না।

মান্নান মাওলানা বুঝদারের ভঙ্গিতে বললেন, হ।

তয় আমার কথা অইছে পউষ-মাগ মাসে যেদিনঐ কাম ধরুম, হেদিন থিকা আর থামুম না। দশ-পোনরো দিনের মইদ্যে পুকর থিকা মাডি উড়াইয়া ভিটিবাড়ি বাইন্দা হালামু। তারবাদে ঢাকা থিকা আমার বান্দা ওস্তাগার কাদির মিয়ারে লইয়ামু আর একজন ইনজিনিয়ার লইয়ামু, হেরা দুইজনে মাপ মোপ দিয়া দেখবো বিলডিংডা কত বড় অইবো, কেমতে কী অইবো। আমারে টেকাপয়সার একহান বাজেড দিব, কয়দিনে পুরা কাম শেষ অইবো হেই হগল কইবো। আর হেতদিনে সড়কের কামও শেষ অইয়াবো। টেরাক ভইরা ইট বালি রড সিমিট পাডামু। দেকবেন দুই-তিনমাসের মইদ্যে মজজিদ অইয়া গেছে। আপনে ইমামতি করতাছেন।

ইনশাল্লাহ।

তহন আমার হাতে টেকাপয়সাও থাকবো ম্যালা। যেই কামডা অহন করতাছি হেইডার বিল পাইয়া যামু। মজজিদের কামে চাইর-পাঁচলাক টেকা খরচ করন তহন আমার গায়েঐ লাগবো না।

মোতালেব ততক্ষণে যা বোঝার বুঝে গেছে। এখন এনামুলের লগে থেকে তার আর কোনও লাভ নাই। সময়টা নষ্ট হবে। এই সময় অন্যকাজ করলে সংসার আগাবে।

আচমকা এনামুলকে ফেলে যায়ই বা কেমন করে! একটা চালাকি করতে হয়।

চালাকিটা মোতালেব করে ফেলল। হঠাৎ করে চমকে ওঠার ভঙ্গিতে এনামুলকে বলল, দেহো তো মামু কয়ডা বাজে?

এনামুল ঘড়ি দেখল। পোনে দশটা।

ইসসিরে, দেরি অইয়া গেছে।

কই যাইবেন?

বাসু ডাক্তারের কাছে। ময়নার লেইগা একহান অষইদ আনতে অইবো।

তয় যান গা।

আইচ্ছা।

ছাড়াবাড়ির দক্ষিণ দিকে দ্রুত পা চালিয়ে নেমে গেল মোতালেব। সেদিকে তাকিয়ে এনামুল বলল, বোজলেন তো হুজুর মোতালেইব্বা গেল গা ক্যা?

মান্নান মাওলানা হাসলেন। হ বুজছি। যহনঐ বোজছে কামডা পিছাইয়া গেছে তহনঐ দৌড় দিছে। অহন তো তোমার লগে থাইক্কা অর কোনও লাব নাই।

হ একদোম ঠিক বোজছেন।

একটু থেমে বলল, তয় এই কথাঐ রইল হুজুর। পউষ-মাগ মাসে কাম ধরুম।

আইচ্ছা।

দেশগেরামের কেঐ মজজিদের কথা জিগাইলে এইডা কইবেন। আমার য্যান বদলাম না হয়।

আরে না মিয়া, কীয়ের বদলাম অইবো! নিজের গাইটের টেকা দিয়া আল্লার ঘর বানাইবা আবার বদলামও অইবো, আমি বাইচ্চা থাকতে হেইডা অইতে দিমু না।

এনামুল খুশি হল। বলল, খুশি অইলাম হুজুর আপনের কথা হুইন্না। তয় অহন মেলা দেই।

দেও আল্লার নাম লইয়া।

এনামুল বাদলার দিকে তাকাল। ল রে বাদলা, আউগ্নাইয়া দিয়ায় আমারে।

বাদলা উৎসাহী গলায় বলল, লন।

তারপর এনামুলের আগে আগে চকপাথালে হাঁটা দিল।

মান্নান মাওলানাও হাঁটছিলেন এনামুলের লগে লগে। হাঁটতে হাঁটতে বললেন, আগের বার তোমার লগে একহান মিছাকথা কইছিলাম বাজান।

এনামুল চমকে মান্নান মাওলানার মুখের দিকে তাকাল। মিছাকথা কইছিলেন?

মিছাকথা না, কইতে পারো ভুল কথা।

কোনডা কন তো?

নিজের বড় সংসারের কথা কইতে গিয়া তোমারে কইছিলাম দুইডা পোলাপান রাইখা মরছে মোতাহারে। এই কথা ঠিক না। পোলাপান মোতাহারের তিনডা। দুইডা মাইয়া একটা পোলা। বড় মাইয়াডার নাম শিরিন, পোলাডার নাম নওসের আর ছোড মাইয়াডার নাম কোহিনূর। তয় এই নামে কেঐ অগো ডাকে না। শিরিনরে কয় শিরি, নওসেররে কয় নসু, আর কোহিনূররে কয় নূরি।

নিজের কন্ট্রাকটরি বুদ্ধি দিয়া এনামুল বুঝে গেল এরপর কোন লাইনে কথা বলবেন মান্নান মাওলানা। সে কথার কী জবাব দিবে তাও ঠিক করে রাখল। তবে মুখে বলল অন্যকথা। আরে এইডা কী এমুন ব্যাপার! পোলাপান দুইডা আর তিনডা একঐ অইলো।

না এক অইলো না বাজান। একজন মাইনষের খরচা কমনি?।

হ হেইডা ঠিক। তয় আপনের অবস্থাও তো আল্লায় দিলে খারাপ না। পোলা একহান অহনও জাপানে।

অইলে কী অইবো! সংসার তো বড়।

এনামুল কথা বলল না। পা চালিয়ে হাঁটতে লাগল।

নিজের বাড়ি বরাবর এসে মান্নান মাওলানা বললেন, ইট্টু খাড়ও বাজান।

এনামুল দাঁড়াল। কিছু কইবেন?

হ।

তাড়াতাড়ি কন। আমার দেরি অইয়া যাইতাছে।

মান্নান মাওলানা হাত কচলে, বিনীত ভঙ্গিতে বলল, কইতাছিলাম মজজিদের কামে মোতালেইব্বারে তুমি রাইখো না।

সব বুঝেও অবাক হওয়ার ভান করল এনামুল। তয় কামের তদারক করবো কেডা?

আমি করুম। আমি নিজে।

পারবেন?

পারুম না ক্যা? মোতালেইব্বার থিকা ভাল পারুম। আমি থাকলে একটা পয়সাও এদিক ওদিক অইবো না। একটা পয়সাও চুরি কইরা খাইতে পারবো না কেঐ।

হ হেইডা আমি বুঝি।

তয় আমার লেইয্য পয়সাড়া আমারে তুমি দিবা।

এনামুল মনে মনে বলল, এইডাঐ যে আসল কথা আপনের, অনেক আগেই আমি হেইডা বুইজ্জা গেছি। আমি মানুষ চরাইয়া খাই। ক কইলেঐ কইলকাত্তা বুজি।

মুখে বলল অন্যকথা। লেইয্য পয়সা আপনে পাইবেন। ওইডা লইয়া চিন্তা কইরেন না। মোতালেইব্বারে আমি বাদ দিলাম। এইডা ফাইনাল।

শুনে খুবই খুশি হলেন মান্নান মাওলানা। ঠোঁট যতটা সম্ভব লম্বা করে হাসলেন। আমি জানতাম তুমি আমার কথা হালাইবা না। তুমি বড়ঘরের পোলা। ময়মুরব্বিগো দাম দিতে জানেনা।

এনামুল বিগলিত ভঙ্গিতে হাসল। তয় অহন যাই হুজুর। স্নামালেকুম।

ওয়ালাইকুমসালাম।

বাদলার লগে পা চালিয়ে দোগাছিমুখী হাঁটতে শুরু করল এনামুল।

.

এই বাইত্তে কইলাম একখান সাপ আছে। বিরাট সাপ। ওই যে ভাঙ্গনের মিহি ইজলগাছ আর টোসখোলা ঝোঁপ, ওহেনে থাকে।

গণি মিয়ার পাটাতন ঘরের বাইরের দিকে বেড়ার লগের তক্তায় বসে গুড়মুড়ি খাচ্ছে মতিমাস্টার। তার হাতে বেতের মাঝারি সাইজের একখান ডালা। ডালাভরতি জমির চালের মোটা মোটা লালচে ধরনের মুড়ি আর ছোট একডেলা খাজুরা মিঠাই। দুই-তিন মুঠ মুড়ি মুখে দেওয়ার পর এক কামড় মিঠাই খাচ্ছে সে। এক কামড় মিঠাইয়ের স্বাদ মুখে থাকতে থাকতে দুই-তিন মুঠ মুড়ি খেয়ে নিচ্ছে। কারণ প্রতিমুঠ মুড়ির লগে এক কামড় করে মিঠাই খেলে মিঠাইতে কুলাবে না।

মতিমাস্টারের পরনে খদ্দরের পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবির রং খড়নাড়ার মতন। পাজামাটা অবশ্য সাদা। বহু ব্যবহারে সাদা রংটা আর নাই, মাটির মতন রং হয়েছে। হাতের কাছে রাখা আছে কালো আঁটের দুই-তিন তালিপড়া ছাতা, চোখে কালো রঙের মোটা ফ্রেমের চশমা, চশমার বাঁদিককার কাঁচটা বহুদিন হল ফেটে আছে। লম্বা রোগা ধরনের শরীর মতি মাস্টারের, মাথায় কাঁচাপাকা পাতলা চুল। কোনও একটা দিক থেকে না, মাথার চারদিক থেকেই টাক পড়তে শুরু করেছে।

যাদের মাথার চুল পাতলা হয় তাদের দাড়িগোঁফ বোধহয় বেশি ঘন হয়। মতি মাস্টারেরও সেই অবস্থা। মুখের দাড়িমোচ বেজায় ঘন। বেশিরভাগই সাদা হয়ে গেছে। চেহারা সুরত মন্দ না মানুষটির, হঠাৎ করে দেখলে ভালই লাগে। তবে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে মুখ। জুড়ে তার বিষণ্ণতার পরিষ্কার একটা ছায়া দেখা যায়। এই ছায়া দারিদ্র্যের, জীবনযুদ্ধে কোনওরকমে টিকে থাকার।

মতিমাস্টারের অদূরে, রান্নাঘরের কোণের আমগাছতলায় সকালবেলার রোদে ছেড়ে পেছড়ে বসে আছে তার অথর্ব ছেলেমেয়ে হিরামানিক। অ্যালুমিনিয়ামের ভাঙাচোরা বেশ বড় একখান বাটিতে গুড়মুড়ি দেওয়া হয়েছে তাদের দুইজনকেও। বাঁকাচোরা অসহায় হাতে অতিকষ্টে দুটি-চারটি করে মুড়ি বাটি থেকে তুলে কোনওরকমে মুখে দিচ্ছে তারা। খাওয়ার আনন্দে হঠাৎ হঠাৎ বিকৃত শব্দে হেসে উঠছে দুইজনই। জড়ানো গলায় কী কী বলছে। দুই-তিনবার কান খাড়া করেও তাদের কথার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারল না। মুকসেদ। তবে ছেলেমেয়ে দুইটোর দিকে তাকিয়েই যেন সাপের কথাটা মনে পড়েছে। তার। সেজন্যই যেন মতিমাস্টারকে কথাটা সে বলল।

মুকসেদের খয়েরি রঙের লুঙ্গি একটু উঁচু করে পরা। গায়ে হাতাঅলা কোরাগেঞ্জি ডান দিককার বগলের কাছে ছিড়া গেছে। আজ মাথায় সাদা গোল টুপি আছে মুকসেদের। কী কারণে যে টুপিটা আজ সে পরেছে, আল্লায়ই মালুম।

মতি মাস্টারের বউ রান্নাঘরের চুলার পারে বসে স্বামীর জন্য রং চা করছিল। এ সময়ে অচেনা গলায় কে কথা বলছে দেখার জন্য সেখান থেকেই গলা বাড়াল। তারপর মুকসেদকে দেখে অবাক হল। মনে মনে বলল, মুকসেইদ্দা চোরা আমগো বাইত্তে আইছে ক্যা? আমরা গরিব মানুষ। এক গিরস্তে থাকনের জাগা দিছে। ঘরে কিছু নাই! অহন দেইক্কা গিয়া রাইত্রে চুরি করতে আইলে কিচ্ছু পাইবো না!

মতিমাস্টার এসব ভাবছিল না। খারাপ চিন্তাটা তার মাথায় সহজে আসে না। যে-কোনও মানুষের প্রতিই তার অগাধ বিশ্বাস। মুকসেদ যে দাগি চোর, মাস দুইতিনেক হল জেল খেটে গ্রামে ফিরেছে সবই সে জানে, তবে সেই লোককে এই বাড়ির সীমানায় দেখে অন্যকোনও চিন্তা তার মাথায়ই এল না। সাপের কথা শুনে গুড়মুড়ি খাওয়ার কথা ভুলে চিন্তিত চোখে মুকসেদের মুখের দিকে তাকাল। কন কী? কী সাপ?

মুকসেদ বুঝে গেল মতিমাস্টার তাকে পাত্তা দিচ্ছে। জেল খাটা দাগি চোর জেনেও অবহেলা করছে না। হাসিমুখে বলল, সাপহান আমি দেখছি বিয়াইন্না রাইতে। মাইট্টা জোছনায়। ঠিক বোজতে পারি নাই, কী সাপ!

কথাটা বলেই ভিতরে ভিতরে একটু ফাঁপরে পড়ল মুকসেদ। যাহ ভুল তো একটা করে ফেলল! এখন যদি সাপের কথা ভুলে মতিমাস্টার জিজ্ঞাসা করে, বিয়াইন্না রাইতে এই বাইত্তে আপনে কীর লেইগা আইছিলেন, সে-কথার কী জবাব দেবে মুকসেদ! সে যে তার দীর্ঘকালের রাতচরা স্বভাবের জন্য এসেছিল, চুরি করতে, সিঁদ কাটতে যে আসে নাই, এবার জেল থেকে ফিরার পর যে চোরজীবন থেকে সে রিটায়ার করতে চাচ্ছে একথা বললেও কি মতিমাস্টার তা বিশ্বাস করবে! কেউ কি বিশ্বাস করবে!

তবে মতিমাস্টার এসব কথার ধার দিয়া গেল না। সাপের চিন্তায় চশমার ভিতর তার চোখ তখনও অপলক হয়ে আছে। ডালায় রাখা গুড়মুড়ি মুখে দিতে ভুলে যাচ্ছে। অতি বিনয়ী গলায় মুকসেদকে একসময় সে বলল, বসেন ভাই, বসেন। সাপের কথাডা খুইল্লা বলেন আমারে। আমরা এই বাইত্তে নতুন আইছি, বাড়ির কোনহানে কী আছে কিছুই জানি না।

একথা শুনে বুকের ভিতরকার ফাপর ভাবটা কেটে গেল মুকসেদের। বিনীত ভঙ্গিতে মতিমাস্টারের লগে একটু দূরত্ব রেখে তক্তার উপর বসল। রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে মতি মাস্টার তার স্ত্রীকে বলল, হিরার মা, চা যেডু বানাইছো হেডুঐ ভাগ কইরা দুইডা গেলাসে দিয়ো। মুকছেদ দাদায় আইছে। সেও চা খাইব।

মতিমাস্টারের স্ত্রী সাড়া দিল না।

মুকসেদের তখন লজ্জা লাগছে। হাসিহাসি মুখ করে বলল, না না চা আমার লাগবে না। চা আমি একবার খাইছি।

মতিমাস্টার বলল, খান। চা দুই-তিন কাপ খাইলেও অসুবিদা নাই।

তারপর আবার সাপের কথাটা তুলল। কন দিহি, কেমুন দেখলেন সাপটা?

বলেই একমুঠ মুড়ি মুখে দিল সে।

মুকসেদ বলল, বিরাট সাপ। পাঁচ-ছয়হাত লম্বা অইবো।

দেখতে কেমুন? কালা কুচকুইচ্চা?

না।

তয়? শইল্লে চক্কর আছে? খৈয়াজাইত?

না। জাইত সাপ না। আমার মনে অইলো সানকি।

সানকি কথাটা শুনে যেন একটু স্বস্তি পেল মতিমাস্টার। সানকি অইলে তো শইল্লে কালা কালা দাগ থাকবো।

হ আছে।

আপনে ভাল মতন দেখছেন?

হ।

কী করতাছিল?

ভাঙ্গনের মিহি থিকা আস্তে আস্তে আপনেগো উড়ানে উইট্টা আইলো। উডানে অনেকটি ব্যাং লাফাইতাছিল। ছো দিয়া দিয়া ব্যাং ধইরা খাইতাছিল।

মতিমাস্টার কথা বলবার আগেই মাথায় ঘোমটা দিয়া তার স্ত্রী এল এদিকটায়। টিনের থালে কম দামি দুইখান চায়ের কাপ বসায় নিয়ে আসছে সে। মতি মাস্টার আর মুকসেদের। মাঝখানে চায়ের কাপসহ থালটা নামায়া রেখে যেমন নিঃশব্দে আসছিল তেমন নিঃশব্দেই আবার রান্নাঘরে গিয়া ঢুকল।

মতিমাস্টার মুড়ি চাবাতে চাবাতে বলল, দাদা, চা খান।

দেশ গ্রামের নামকরা একজন মাস্টার মুকসেদের মতন দাগী চোরকে দাদা দাদা করছে শুনে খুবই সম্মানবোধ করছিল মুকসেদ। অনেকদিন পর নিজেকে তার মানুষ মনে হচ্ছিল। বিনীত হাতে থাল থেকে চায়ের কাপ নিয়া চুমুক দিল।

মতি মাস্টার বলল, সানকি সাপ হুইন্না ডরডা ইট্টু কমছে।

শুনে অবাক হল মুকসেদ। ক্যা?

এই সাপ মানুষরে দংশায় না।

কে কইছে আপনেরে?

আমি হুনছি।

মুকসেদ আরেকবার চায়ে চুমুক দিয়া বলল, আমি কইলাম হুনছি অন্যকথা।

গুড়মুড়ি শেষ করে হাতের তালুতে মুখ মুছল মতিমাস্টার। কী কথা হোনছেন?

সানকি সাপ সহাজে কেঐরে দংশায় না। তয় যুদি একবার দংশায় তাইলে দুইন্নাইর কোনও ওঝায় হেই সাপের বিষ নামাইতে পারে না।

মতিমাস্টার চায়ের কাপ নিল। কী জানি, অইতেও পারে।

হ। সানকি সাপের লেজের গোড়ায়ও বলে একহান মুখ আছে। যদি কেঐরে কামড় দেয়, তয় বলে দুইমুখ এক লগে কইরা দেয়।

হ, এইডা আমিও হুনছি।

আবার এইডাও হুনছি, যেই বাইত্তে সানকি সাপ থাকে হেই বাইত্তে বলে অন্যসাপ থাকতে পারে না। সানকি সাপে বলে অন্যসাপ খাইয়া হালায়।

মতি মাস্টার চায়ে চুমুক দিয়া বলল, এই হগল হুনা কথা। আমিও হুনছি।

নিজের চা শেষ করে কাপটা জায়গা মতন নামায়া রাখল মুকসেদ। তয় হুনা কথা কইলাম অনেক সময় সত্য অয় দাদা।

হ, অইবো না ক্যা? হয়।

হোনেন, সানকি সাপের নিয়মডা অইলো এই সাপের সামনে একবার যদি কোনও সাপ পইড়া যায়, তয় হেই সাপটা মরছে।

কেমতে?

সানকি সাপ বলে সাপের রাজা। তার সামনে অন্যকোনও জাতের সাপ পড়লেই বলে হেই সাপটা নিজে থিকা আইয়া নিজের লেজটা পয়লা ঢুকাইয়া দিব সানকি সাপের মুখে। সানকি সাপ বলে লেজের দিক থিকা আস্তে আস্তে গিলতে শুরু করবো হেই সাপটারে। গিলতে গিলতে যহন পুরা শইল গিল্লা মাথার কাছে আইবো, মাথাডা গিলবো না। দাঁত দিয়া কট কইরা কাইট্টা হালাইয়া দিবো।

কী জানি, অইতে পারে।

মুকসেদের লগে কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে নিজের চা শেষ করেছে মতি মাস্টার। এখন কাপটা জায়গা মতো রেখে মুকসেদের দিকে তাকাল। আল্লাহপাকের দুনিয়াতে কত যে নিয়ম, কত যে রহস্য! মানুষ এই হগল নিয়ম রহস্যের অনেক কিছুই জানে না।

মুকসেদ বলল, কথা সত্য। তয় আমি আপনেরে আইজ সাপের কথাডা কইতে আইছি ক্যান দাদা, জানেন?

ক্যান?

আপনের ওই পোলাপান দুইডার লেইগ্যা। আতুড় লুলা পোলাপান হারাদিন গাছতলায় বইয়া থাকে। কুনসুম সাপটা আইয়া পড়বো অগো সামনে, অরা হয়তো বুজবো না যে সাপ জিনিসটা কী, হাত দিয়া হয়তো ধরতে যাইবো, তারবাদে..

কথাটা শেষ করল না মুকসেদ। তবে তার কথার অর্থ মতি মাস্টার বুঝল। বুঝে ভয় পেল। হ দাদা, ঠিকঐ কইছেন। সানকি সাপ হোক আর যেই সাপঐ হোক, পোলাপান দুইডারে সাবদানে রাখতে অইবো। যেই পোলাপানের লেইগা এত কষ্ট করি, হেগ যুদি সাপেঐ খায়, তয় আর লাব অইলো কী!

রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে স্ত্রীকে সাপের কথাটা বলল মতিমাস্টার। সাবধান হতে বলল।

মুকসেদ তখন অপলক চোখে তাকিয়ে আছে আমগাছতলায় বসা মতিমাস্টারের অথর্ব ছেলেমেয়ে হিরামানিকের দিকে। এখনও অতিকষ্টে খুঁটে খুঁটে মুড়ি খাচ্ছে তারা।

একসময় ছাতা হাতে উঠে দাঁড়াল মতিমাস্টার। আমার যে দাদা অহন উটতে অয়।

মুকসেদও উঠল। কই যাইবেন?

খাইগোবাড়ির ইসকুলে। ওহেনে মাস্টারির চেষ্টা করতাছি। ইসকুলের কাম সাইরা যামু। দোগাছি। সেজাল খাঁ-র বাইত্তে একজন ছাত্রী পড়ানোর কথা অইবো আইজ। এই হগল। সাইরা আইতে আইতে বিয়াল।

মতিমাস্টারের পিছন পিছন বাড়ি থেকে নামল মুকসেদ।

চকের কোণে নেমে হঠাত্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল মতিমাস্টার। মুকসেদের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, জীবনডা বড় কঠিন দাদা। বউ পোলাপান লইয়া বাইচ্চা থাকন বড় কঠিন। চাইরজন মানুষের পেটের ভাত জোগাইতে জানডা বাইর অইয়া যায়।

মতিমাস্টারের কথাগুলি একেবারে বুকে এসে লাগল মুকসেদের। অপলক চোখে তার মুখের দিকে খানিক তাকিয়ে রইল সে। তারপর বলল, দাদা, বয়সে আমি আপনের থিকা বড় হমু। লেখাপড়া জানি না। আপনের লাহান বিদ্যান না। তয় একহান কথা আমি আমার বয়েস দিয়া বুজছি, দুইন্নাইর একমাত্র সমস্যার নাম অইলো খিদা। এই খিদার তালে পইড়াঐ দুনিয়াডা চলতাছে। যে যা করতাছে খিদার লেইগাঐ করতাছে। ধানখেতের গদ থিকা একহান ইন্দুর বাইর অইলো নিজের খাওন জোগানের লেইগা, এই ইন্দুররে খাওনের লেইগা আবার আসমান থিকা নাইমা আইলো একহান বাজপাখি। সব জাগায়ঐ কইলাম। সমস্যাটা অইলো খিদা। খিদার চক্করে দুনিয়া চলে। তয় মানুষ ইন্দুরও না, বাজপাখিও না। মানুষ অইলো মানুষ, দুনিয়ার সেরা জীব। মানুষ পেটের আহার জোটায় বুদ্ধি দিয়া। কেঐ বিদ্যা বেইচা খায়, কেঐ খায় চুরি কইরা। যে বিদ্যা বেচে হে অইলো মানুষ, যে চুরি করে, হে মানুষের লাহান দেখতে অইলেও মানুষ না। চাইরজন মানুষরে লইয়া কষ্ট কইরা খাইলেও আপনে অইলেন মানুষ। চুরির টেকা পয়সা ম্যালা থাকনের পরও, খাওনের আকাল না থাকনের পরও আমি দাদা মানুষ না।

একটু থামল মুকসেদ তারপর বলল, মানুষ আমি অইতে চাই দাদা। এর লেইগাঐ আইজ টুপি দিছি মাথায়, আপনের লাহান একজন মাইনষের লগে আইছি কথা কইতে। আইজ থিকা আমি অইলাম আপনের ছাত্র। আপনে আমারে মানুষ অওনের পথটা দেখাইয়েন। বুড়া অই আর যাঐ অই, জীবনের শেষ দিনডি আমি মানুষ অইয়া কাডাইতে চাই। মরতে চাই মানুষ অইয়া।

মুকসেদের কথা শুনে নিজের অজান্তেই যেন পা থেমে গেছে মতিমাস্টারের। নিজের অজান্তেই যেন ধানখেতের আলের ওপর স্থির হয়ে দাঁড়িয়েছে সে। এখন অপলক চোখে তাকিয়ে আছে মুকসেদের মুখের দিকে।

চারদিকের চকে এখন বাঘের মতন থাবা বসিয়েছে বৈশেখ মাসের ভয়ংকর রোদ। রোদের তাপে পুড়ছে দেশগ্রাম। ইরিধান কাটা শুরু হয়েছে দিন কয়েক আগে। চকের কোথাও কোথাও ন্যাড়া হয়ে গেছে ধানের জমি, গৃহস্থলোক কেটে নিয়ে গেছে তাদের ধান। কেটে নেওয়া ধানের খেতে কাদা পানিতে মাখামাখি হয়ে আছে কেটে নেওয়া ধানের গোড়ার দিককার গোছাগুলি। কোনও কোনও খেতের ধান পাকতে হয়তো দুই-চারদিন দেরি হয়েছে, ফলে কাটাও শুরু হয়েছে দেরিতে। আজও কোনও কোনও খেতের ধান কাটছে কিষানরা। রোদের ভিতর দিয়া মৃতের মতন বহমান হাওয়ায় ভেসে আছে পাকা ধানের গন্ধ। সেই গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে আছে দেশগ্রাম। এই অবস্থায় একজন নিবেদিত প্রাণ দরিদ্র শিক্ষক আর একজন দাগি চোর মুখামুখি দাঁড়িয়ে আছে ধানখেতের আলপথে। একজন চাইছে মানুষ হতে, সেকথা শুনে আরেকজন আছে স্তব্ধ হয়ে।

.

মুকসেইদ্দা তো আবার চুরিচামারি শুরু করছে!

দুপুরের ভাত খেয়ে পেট ভাসিয়ে মান্নান মাওলানা শুয়ে আছেন বড়ঘরের পালঙ্কে। খালি গা, নাভি বরাবর গিঁটটু দিয়া বান্দা লুঙ্গি। খাওয়ার পর পেটটা আরও ফুলেছে। দেখাচ্ছে পোটকা মাছের মতন। যেন খেলার ছলে কোনও দুরন্ত কিশোর পোটকা মাছের লেজ দুই আঙুলে ধরে অবিরাম এদিক ওদিক নাড়িয়েছে আর মাছটা তার স্বভাব মতন কটকট শব্দে পেট যতদূর সম্ভব ফুলিয়েছে। ফুলিয়ে এখন অসহায় ভঙ্গিতে পড়ে আছে মাটিতে।

বড়ঘরে ঢুকে মান্নান মাওলানাকে কথাটা বলার ফাঁকে কেন যে পোটকা মাছের কথাটা মনে এল আতাহারের বুঝে উঠতে পারল না। একটু হাসিও পেল, হাসল না। পালঙ্কের অদূরে দাঁড়িয়ে রইল।

ছেলের কথা শুনে মান্নান মাওলানা ভুরু কুঁচকেছেন। কী, চুরি শুরু করছে?

হ।

কেমতে বুজলি?

আমার একহান শাট আর একহান লুঙ্গি পাই না। রহি কইলো কয়দিন আগে নাড়ার পালায় রইদ দিছিলো। তারবাদে আর পায় নাই। ডরে আমারে কয়ও নাই। আইজ নাইতে যাওনের আগে আমি যহন ওই লুঙ্গি আর শাট বিচড়াইয়া পাই না, রহিরে জিগাইছি, তহন কইলো।

মান্নান মাওলানা চিন্তিত গলায় বললেন, মুকসেইদ্দার তো এই হগল জিনিস চুরি করনের কথা না।

ক্যা?

অরে আমি ছোডকাল থিকা চিনি, ও কইলাম ছ্যাঁচরা চোর না। গোরু বরকি, মোরগ মুরগি, মাইনষের জামাকাপড় এই হগল ও কোনওদিন চুরি করে নাই।

তয় বাইত থিকা জিনিস দুইহান কই গেল?

এইডাঐত্তো কথা।

একটু থেমে মান্নান মাওলানা বললেন, তর মায় হোনছে?

হ।

কুনসুম হোনলো? আমারে দিহি কিছু কইলো না?

কেমতে কইবো? হোনছে ইট্টু আগে। আমি আইতাছি এইঘরের মিহি, মা’রে দেহি ভাবিছাবের ঘরে যাইতাছে। ডাক দিয়া কইলাম।

হুইন্না কী কয়?

জিনিসটা য্যান হের গায়েই লাগে নাই এমুন একহান ভাব করলো। আমার পিঠটা দোয়াই দিয়া কইলো পুরানা শাট লুঙ্গি চোরে নিছে কী অইছে। তর কি আল্লায় দিলে শাট লুঙ্গি কম আছেনি?

মান্নান মাওলানা হাসলেন। তর মা’য় আছে ফুর্তিতে। পারুরে তর কাছে বিয়া দিবো হেই ফুর্তি। শইল যে এত খারাপ, ভাব দেইখা, চলাফিরা দেইখা মনে অয় না। জুয়ান বসসের লাহান চলাফিরা করতাছে, কামকাইজ করতাছে। এর মইদ্যে দুইদিন আমারে কইছে বসির ঘটকরে খবর দিয়া আজাহারের লেইগা মাইয়া দেকতে কন। আজাহাররে চিডি লেইক্কা বেক কিছু জানান। আতাহারে যে পারুরে বিয়া করতে রাজি অইছে এই হগল জানাইয়া দেন। আইয়া পড়তে কন।

আতাহার এসব কথার ধার দিয়া গেল না। চিন্তিত গলায় বলল, তয় শাট লুঙ্গিড়া আমার কী অইলো বাবা? মুকসেইদ্দা যুদি চুরি না কইরা থাকে তয় কে করলো? বাইত থিকা আপনা আপনি হাওয়া অইয়া গেল?

হ কথা তো ঠিক। রহির ভাস্তি, হাসু না কী জানি নাম ছেমড়ির, না কইয়া যে আমগো বাইত থিকা গেছে গা, ওই ছেমড়ি লইয়া যায় নাই তো?

ও শাট লুঙ্গি দা কী করবো? এতদিন ধইরা আমগো বাইত্তে আহে যায়, কোনওদিন এমুন কিছু অর দেহি নাই।

দেহচ নাই কী অইছে। সবাব মাইনষের বদলাইতে পারে না? ছেমড়ি যাওনের সময় আমারে আর তর মা’রে কইয়া যায়। এইবার কইয়া যায় নাই। যাওনের অর কথাও না। ও মউচ্ছামান্দ্রা থিকা এক্কেরে আইয়া পড়ছিলো! অরে এই বাইত্তে কামে রাকছিলাম আমি!

কী?

হ। রহির কথায় অরে আমি রাইক্কা দিছিলাম!

তয় এমতে গেল গা ক্যা?

হেইডাঐত্তো কই!

খানিক কী চিন্তা করল আতাহার তারপর বলল, আমার অহন ওই ছেমড়িরেঐ সন্ধ অইতাছে। ও কি মউচ্ছাঐ গেছে না অন্য কোনওহানে এইডা আমার জানোন লাগবো।

অন্য কই যাইবো?

মনে হয় কোনও বেডা বোডাগো লগে ভাগছে। দেশগেরামে অহন নানান পদের মানুষ। কার লগে খাতির অইছে, কার লগে পলাইছে কে জানে। মনে অয় ওই বেডার লেইগাঐ শাট লুঙ্গি লইয়া গেছে!

হ এইডা অইতে পারে! রহিরে তো এই হগল জিগাইতে অয়।

রহিরে জিগাইয়া কী অইবো?

ও কিছু কইতে পারে কি না বোজনের চেষ্টা করি।

না অহন জিগাইয়েন না। আগে মউচ্ছার ওই বাইত্তে আমি খবর লইয়া লই। আগে দেহি ছেমড়ি ওই বাইত্তে আছেনি?

আইচ্ছা দেক।

অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল আতাহার। এবার এগিয়ে এসে মান্নান মাওলানার পায়ের কাছে, পালঙ্কে বসল। এনামুল দাদায় বলে বাইত্তে আইছিলো।

হ।

কথাবার্তা অইছে আপনের লগে?

অইছে।

কী কইলো? কবে মজজিদ উঠাইবো?

এনামুলের লগে কী কী কথা হয়েছে, কবে কীভাবে কাজ শুরু হবে, আজ মোতালেবকে কীভাবে কাজ থেকে সরিয়ে দিয়েছেন, সবই ছেলেকে খুলে বললেন মান্নান মাওলানা।

মোতালেবের ব্যাপারটা শুনে খুশি হল আতাহার। এইডা একহান কামের কাম করছেন! ওই চোরারে কোনও মতেঐ মজজিদের কামে ভিড়ান যাইবো না। কাম যা করনের আপনে করবেন। আর আমি তো আছিঐ।

হ এই হগল চিন্তা কইরাঐ কায়দা কইরা এনামুলরে ফিরাইলাম। কামডা আমার হাতে থাকলে ওহেন থিকা রুজি রোজগারও কিছু অইবো। কিছু কী, ভালঐ অইবো।

আমার মনে অয় না।

ক্যা?

এনামুইলাও কম ধাউর না।

কেমতে বুজলি?

ঢাকার টাউনে কনটেকটারি কইরা খায়, হাজার হাজার মানুষ চরায়, লাক লাক টেকা রুজি করে। ধাউর না অইলে এইডা সম্ভবপর না।

মান্নান মাওলানা চিন্তিত গলায় বললেন, মন্দ কচ নাই কথা। কনটেকদার আর মোদি দোকানদাররা অইলো একরকম। পিঁপড়ার গোয়ায় চিমটি দিয়া মিডাই রাইক্কা দেয়।

হ। মজজিদের কাম শুরু অইলে দেকবেন কেমুন হিসাবি মানুষ এনামুল। একহান পয়সাও এইমিহি ঐমিহি অইতে দিবো না।

না দিলে না দেউক। ওই পয়সার থিকাও মজজিদের ইমাম অওনডা আমার বেশি দরকার। মাসে মাসে মায়না পামু আর ক্ষমতাও অহনকার থিকা বাড়বে। অহনও কেঐ কেঐ মোকের সামনে বেদ্দপি করে, ইমাম অইলে হেইডা করনের সাহস পাইবো না।

হেইডা বোজলাম। তয় এনামুল আবার মতলব বদলায় কি না দেহেন।

মান্নান মাওলানা চিন্তিত হলেন। কেমুন মতলব বদলাইবো?

আপনের জাগায় যুদি অন্য ইমাম আনে!

আরে না! এত সোজা না।

ধাউর মানুষগো পক্ষে সব কিছু সোজা।

তয় তুই এইডাও জানচ, আমি এনামুইলার থিকা বড় ধাউর। আমার লগে ধাউরামি কইরা ও পারবো না। তুই কি মনে করছচ ও এমুন আথকা কীর লেইগা দেশে আইছিলো, কীর লেইগা আমার লগে কথাবার্তা কইয়া ঢাকা গেল, কীর লেইগা আমার কথায় মোতালেইব্বারে সরাইলো, এই হগল কামের পিছে অর কী উদ্দিশ্য হেইডা আমি বুজি নাই? বুজছি।

আমিও বুজছি। আপনেরে ও হাতে রাখবো। মজজিদ বানাইতে দেরি অইতাছে ক্যান এই হগল কথা কেঐ উডাইলে আপনে য্যান এনামুলের পক্ষ লইয়া জব দেন। কেঐ য্যান ওই হগল লইয়া কথা কইতে না পারে।

হ ঠিকঐ বোজছচ।

তয় আমার মনে অয় পউষ মাগ মাসেও মজজিদের কাম হেয় ধরবো না।

ক্যা?

আরও দেরি করবো।

দেরিডা করবো কীর লেইগা?

টেকাপয়সার লেইগা। হেয় কনটেকদার মানুষ। আথকা চাইর-পাঁচলাক ক্যাশ টেকা খাপাইয়া হালাইলে অসুবিদা না তার! এর লেইগা যতদিন পারে দেরি করবো।

মান্নান মাওলানা বিরক্ত হলেন। করুগগা যা ইচ্ছা।

একটু চুপ করে থেকে বললেন, তর মা’য় কি অহনতরি পারুর ঘরে?

হ।

কী করে?

কেমতে কমু! মনে হয় ভাবিছাবের লগে কথাবার্তা কয়। কয়দিন ধইরা দুইজনের লেইগা দুইজনের বহুত টান অইছে।

কেমুন টান?

দিনে দুই-তিনবার ভাবিছাবের ঘরে যায় মা’য়। আপনে না থাকলে ভাবিছাবে আহে এই ঘরে। মা’র মাথায় তেলপানি দিয়া দেয়। ভালভালাই খাওয়ায়।

মান্নান মাওলানা হাসলেন। সত্যঐ?

হ।

দুইজনে আছে একরকমঐ মনের সুকে। তয় তর আর আমার লগে যেই কথাবার্তা হইছে হেইডি মনে আছে তো?

আতাহার মাথা নীচা করে বলল, আছে। আপনে যেমতে যেমতে কইছেন অমতে অমতেঐ মা’র লগে কথা কইছি।

চালাকিডা হেয় বোজে নাই তো?

না। কেমতে বুজবো? এই হগল চালাকি হের বোজনের কথা না। মা’য় অইলো সোজা জুইতের মানুষ। ভাবিছাবের লগে আমার বিয়ার চিন্তাডাও তার মাথায় আহে নাই। আইছিল ভাবিছাবের মাথায়। ভাবিছাবেঐ বুদ্দি মা’রে দিছে।

কচ কী?

হ।

পারু কইছে তরে?

কইতে চায় নাই। বহুত কায়দা কোয়দা কইরা বাইর করছি।

আমিও তো কই, এমুন চিন্তা ভোতর মা’র করনের কথা না! এত প্যাঁচঘোচ তার বোজনের কথা না। নষ্টের নারদ তাইলে পারু!

হ।

কামডা ও ভাল করে নাই। এই চালাকির লেইগা জীবনভর ফস্তাইতে হইবো। যাও বড়পোলার বউ হিসাবে, আততিয়র মাইয়া হিসাবে অর লেইগা মায়া মহব্বত আমার আছিলো, আইজ থিকা হেইডা আর থাকব না। ও আমার মন থিকা উইট্টা গেল।

তয় আমার মনে অন্য একহান চিন্তা অইছে।

কী?

মা’য় আর ভাবিছাবে যহন দেখবো তারা যা চাইছে হেইডা অইতাছে না, তহন তো বাইত্তে একহান কেলেঙ্কারি লাগবো। হেইডা হামলাইবেন কেমতে? মা’য় তো হাটের রুগি। যুদি ইসটোক কইরা মইরা যায়?

ঠিক তখনই পারুর ঘর থেকে পান মুখে বেরিয়েছেন তহুরা বেগম। হাসিহাসি মুখে বড়ঘরের দিকে ফিরছিলেন। ঘরের কাছাকাছি এসেই শুনতে পেলেন বাপ ছেলে কথা বলছে। আতাহারের শেষদিককার একটা-দুইটা কথা তাঁর কানে এল, তারপর এল মান্নান মাওলানার কথা। থো, এই হগল চিন্তা করি না। মরলে মইরা যাইবো। তর মা’র মরনের চিন্তা কইরা আমি তর জীবন নষ্ট করুমনি? ধনীঘরের মাইয়া আনলে মাইয়ার লগে সোনাদানা টেকাপয়সা খেতখোলাও আইবো সংসারে। পারুর লেইগা আর তর মা’র লেইগা এতবড় লোসখান আমি করুমনি?

আমিও করুম না বাবা। আমি আছি আপনের লগে। আপনে যা করবেন ঐডাঐ সই। তয় যতদিন সম্ভাব মা’র লগে আর ভাবিছাবের লগে চালাকিডা কইরা যাওন লাগবো।

বাইরে দাঁড়িয়ে ছেলে আর ছেলের বাপের এসব কথা শুনতে শুনতে তহুরা বেগমের শুধু মনে হল, এতদিনকার স্বামী আর গর্ভে ধরা ছেলে শেষ তরি এই করল তার লগে! এই করল! স্ত্রীর লগে কোনও স্বামী করে এই চালাকি? আর স্বামী যদি করেও, গর্ভের সন্তান কি করে!

বুকের ভিতরকার হৃদযন্ত্রটি তখন অদৃশ্য এক শক্তিশালী হাত যেন থাবা দিয়া ধরছে। তহুরা বেগমের। সেই থাবায় যেন পলকে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে তার বহুকালের পুরনা হৃদযন্ত্র। দম বন্ধ হয়ে আসে তহুরা বেগমের। হাত পা শরীর অবশ হয়ে আসে। নিজেকে ধরে রাখতে গিয়েও পারেন না তিনি, উঠানের মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

গোলাঘর থেকে এই দৃশ্য দেখতে পায় রহিমা। দুপুরের ভাত খেয়ে খানিক আগে এই ঘরে এসে ঢুকেছে সে। চৌকিতে বসে আঁচলের গিঁট খুলে পানটুকু মাত্র মুখে দিবে, খোলা দরজা দিয়া চোখ গেছে উঠানের দিকে, দেখে হুজরানি লুটিয়ে পড়ছেন মাটিতে। সব ভুলে চিৎকার করে ছুটে বেরিয়েছে সে।

রহিমার চিৎকারে বড়ঘর থেকে দৌড়ে বেরুল আতাহার আর মান্নান মাওলানা। দিকপাশ না তাকিয়ে আতাহার টেনে কোলে তুলতে গেল মা’কে, থতমত খেল! ফ্যালফ্যাল করে তাকাল মান্নান মাওলানার দিকে।

ছেলের দিকে মান্নান মাওলানা তাকালেন না। ঝুঁকে পড়লেন স্ত্রীর মুখের দিকে। নাকের কাছে হাত নিলেন, বুকে হাত দিলেন, ডানহাত তুলে নাড়ি দেখার চেষ্টা করলেন। তারপর দিশাহারা হয়ে গেলেন।

উঠানে তখন সারাবাড়ির লোক জড়ো হয়েছে। বউঝি পোলাপান মিলে বেশ একখান ভিড়। কারও মুখে কোনও কথা নাই, শব্দ নাই। মা’র মাথা কোলে জড়িয়ে পাথর হয়ে আছে আতাহার।

এসময় ডুকরে কেঁদে উঠলেন মান্নান মাওলানা। আতাহার রে, তর মা’য় তো নাই! তর মা’য় তো চইলা গেছে রে বাজান!

চারদিককার আকাশ তখন ছেয়ে আসছিল বৈশাখের কালো মেঘে। গুমোট গরমে হাঁসফাস করছিল মানুষ আর প্রকৃতি। যখন তখন উঠবে ঝড়। দমকা হাওয়ায় হাওয়ায় লন্ডভন্ড হবে মানুষের সাজানো ঘরবাড়ি, গাছের ডালপালা।

.

হুজুর বাইত্তে আছেননি? হুজুর!

বিকালের দিকে বড়ঘরের পালঙ্কে চাদর গায়ে বসে আছেন মান্নান মাওলানা। তাঁর মুখ বরাবর জানালা খোলা। এই জানালার বাইরেই অল্পবয়সি একটা কদমগাছ। বয়স অল্প হলেও গাছটা বেশ লম্বা। পাতাগুলি একটু যেন বেশি তরতাজা, একটু যেন বেশি সবুজ। এ বছরই প্রথম ফুল ফুটল গাছটায়। আষাঢ় মাস আসতে না আসতেই ফুলে ভরে গেছে। বৃষ্টি বাদলায় আর থেকে থেকে আসা হাওয়ায় গন্ধ ছড়াচ্ছে কদমফুল।

কদমগাছের মাথার উপর দেখা যাচ্ছে একটুকরা আকাশ। সকাল থেকে আজ মেঘলা হয়ে আছে আকাশ। আকাশের চারদিক থেকেই যেন দ্রুত বেগে ছুটাছুটি করছে কখনও ধূসর, কখনও ঘন কালো মেঘ। থেকে থেকে বৃষ্টি হচ্ছে। কখনও কোদাইল্লা (কোদালে) বৃষ্টি, কখনও ইলশাগুড়ি। কখনও একেবারেই ধরে যাচ্ছে বৃষ্টি, কিছুক্ষণ পরই আবার শুরু হচ্ছে।

আজ কয়দিন ধরেই এই অবস্থা। বাড়ির উঠান পালান বৃষ্টি কাদায় পিছল। সড়কের এপাশ ওপাশের চকে মাঠে খাল দিয়া এসে ঢুকছে বর্ষার পানি। লগে আছে বৃষ্টি। পুকুর ডোবানালা সব ডুবেছে। পুকুর আর ডোবানালার উপচানো পানিও ঠেলে উঠছে চকে। কোনও কোনও গিরস্তে পুকুরে ডুবিয়ে রাখা নাওদোন তুলে তাতে গাব আলকাতরা মাইট্টা তেল দিয়া ফেলছে। চকে নৌকাও নেমে গেছে।

আজ সকালে হাফিজদ্দি টেনে তুলেছে মান্নান মাওলানার কোষানাও। তুলে পানি সেচে বিনীত ভঙ্গিতে এসে দাঁড়িয়েছিল মান্নান মাওলানার সামনে। গাব আলকাতরা নাইলে মাইট্টাতেল কোনও একহান তো কোষাড়ায় দিতে অয় হুজুর।

মান্নান মাওলানা বিরক্ত মুখে বলেছেন, দিতে যে অয় তা তো বোজলাম। তয় এই ম্যাগ বিষ্টিতে দিবি কেমতে? একমিহি দা দিবি আরেক মিহি দা ধুইয়া নিব। লাবটা কী!

হ কথা ঠিক। তয় কী করুম? গোরু তো অহন আর চকে নেওন যায় না! বেক ডুইব্বা গেছে। গোরুডি থাকে আথালে। গোরুর ঘাস কচুরি আননের লেইগা কোষাড়া লাগে।

তা তো লাগবোঐ। এক কাম কর, গাবগোব আলকাতরামালকাতরা না দিয়াঐ নামাইয়া হালা। কাম চলতে থাউক।

আইচ্ছা।

আথালের চালের দিকে লম্বালম্বি করে রাখা একখান শক্তপোক্ত লগি আর বড় ধরনের একখান বইঠা বের করে কোষানাও নিয়া পুবের চকে গোরুর ঘাস আনতে চলে গেছে। হাফিজদ্দি। দুপুরের দিকে মেঘবৃষ্টিতে ভিজে একসা হয়ে ঘাস কচুরি নিয়া ফিরছে।

কাজ লোকটা মন্দ করে না। দুপুরের পর থেকে ঘরের পালঙ্কে বসে বসে হাফিজদ্দির কাজ খেয়াল করেছেন মান্নান মাওলানা। একটু ঢিলা জুতের লোক। তবু মন্দ চালাচ্ছে না কাজ।

তহুরা বেগম মারা যাওয়ার পর সংসারটা এলোমেলো হয়ে গেছে, বাড়িটা হয়ে গেছে। নীরব নিথর। যদিও তহুরা বেগম ছিলেন একেবারেই চুপচাপ স্বভাবের মানুষ। নরম, নিরীহ। গলা প্রায় শোনাই যেত না তার। বাড়িতে আছেন কি নাই বোঝাই যেত না। তবু সংসারের কী তো! হার্টের অসুখ হওয়ার পর শুয়েই থাকতেন বেশির ভাগ সময়। দরকার ছাড়া ঘর থেকে বেরুতেন না। তবু সংসারের সবদিকে নজর ছিল। কোনদিন কী রান্না হবে, কে কী খেতে পছন্দ করে, পারুর বাচ্চাগুলির ঠিকঠাক মতন খাওয়া হল কি না, শুয়ে শুয়েই সব খোঁজখবর নিতেন তিনি।

মৃত্যুর কয়েকদিন আগ থেকে তো বেশ চটপটে হয়ে উঠেছিলেন। আতাহারের লগে পারুর বিয়া ঠিক করে অতি উৎসাহে নতুন করে শুরু করেছিলেন জীবন। মৃত্যু এসে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল।

মৃত্যু এসে নিয়ে গেল নাকি জোর করে মেরে ফেলা হল তাঁকে! সেদিন নিশ্চয় বড়ঘরের দিকে ফিরতে ফিরতে বাপছেলের কথাবার্তা শুনতে পেরেছিলেন তিনি। শুনে প্রথমে নিশ্চয় হতভম্ব হয়েছেন, তারপর যখন দেখেছেন স্বামী তার লগে বেইমানি করছেন, পেটের ছেলে। করছে, সেই কষ্ট আর সহ্য করতে পারেন নাই। আচমকা এতবড় আঘাত, এতবড় স্বপ্ন তছনছ হয়ে যাওয়া, লগে লগে হার্টঅ্যাটাক।

আজ সকাল থেকে এসব কথা ভেবেছেন মান্নান মাওলানা। মানুষের জীবনই এমন। আজ মরলে কাল দুইদিন। তহুরা বেগম মারা গেলেন এই সেদিন, তারপরও চোখের পলকে যেন দিনগুলি চলে গেল। আগামী রোববার চল্লিশদিন হবে।

তহুরা বেগমের মৃত্যুর জন্য কি তিনি দায়ী, নাকি আতাহার! না কি তারা দুজনেই দায়ী! দুইজনেই তাঁরা চালাকি করেছিলেন একজন সরল সোজা ইমানদার মানুষের লগে। বেইমানি করেছিলেন। বেইমানিটা করতে তাদের দুইজনকে বাধ্য করেছিল কে? করেছিল পারুল। মোতাহারের বিধবা বউ পারু। নিজের স্বার্থে আতাহারের লগে তার বিয়ার ব্যাপারটা তহুরা বেগমের মাথায় ঢুকিয়ে ছিল। নয়তো তাঁর মতো সহজ সরল মানুষের পক্ষে এত ঘোরপ্যাঁচের বিয়ার কথা ভাবা সম্ভব ছিল না।

আজ দিনভর এসব ভেবে মান্নান মাওলানা নিজে নিজে সাব্যস্ত করেছেন আসলে তহুরা বেগমের মৃত্যুর জন্য পারুলই দায়ী। আতাহারকে পুরাপুরি কবজা করার লোভে কাজটা সে করেছিল। লাভের লাভ তো কিছু হল না। ক্ষতি হল। আতাহার অয় মান্নান মাওলানা দুইজনের কাছেই খারাপ হয়ে গেল সে। চিরকালের খারাপ।

এখনও কি কদমগাছের দিকে তাকিয়ে এসবই ভাবছিলেন মান্নান মাওলানা? এজন্যই কি উঠান থেকে ভেসে আসা ডাকটা শুনেও সাড়া দিলেন না!

যে ডাকছিল সেই মানুষটা তারপর বড়ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। হুজুর, হুজুর! আছেননি ঘরে?

মুখ ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকালেন মান্নান মাওলানা। কেডা?

তারপরই মানুষটাকে চিনতে পারলেন। কাজির পাগলার ঘটক, ল্যাংড়া বসির।

বসিরকে দেখে খুশি হলেন মান্নান মাওলানা। ও বছির! আয় আয়। আরে বেডা তরে ঐত্তো বিচড়াইতাছি।

বসির তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে হাসল। হাতের ছাতা বুজিয়ে দরজার বাইরে দাঁড় করিয়ে ভিতরে ঢুকল। আপনে যে আমারে বিচড়াইতাছেন হেই সমবাত আমি পাইছি।

তয় আহচ নাই ক্যা?

আহি নাই আপনের পরিবারের মরণের কথা হুইন্না। যেই কামের লেইগা মাইনষে আমারে বিচড়ায়, মরা বাইত্তে হেই কামডা সহজে অয় না। এর লেইগাঐ দেরি কইরা আইলাম।

বসিরের পরনে সাদাশার্ট আর চেকলুঙ্গি। শার্টটা ফুলহাতা, তবে হাতা কনুইয়ের ওপর তরি গুটানো। শার্টের পকেটে রমনা সিগ্রেটের প্যাকেট দেখা যাচ্ছে। হাসিহাসি মুখোন নিখুঁত করে কামানো। জন্ম থেকেই ডান পায়ের তুলনায় বা পা-টা একটু ছোট। হাঁটতে হয়। বসিরকে ল্যাংড়াইয়া (লেংচিয়ে)। এজন্য দেশগ্রামে নাম পড়েছে ল্যাংড়া বসির।

ওই নিয়া কোনও মনোকষ্ট নাই বসিরের। সে আছে বেশ। ঘটকালির কাজে খুব নাম করেছে। রুজি রোজগার ভাল। এমনিতে গিরস্তি করে, ফাঁকে ফাঁকে করে ঘটকালি। দুইদিক দিয়া রোজগার। বাড়িতে দোতালা ঘর তুলছে।

বসির এসে এই ঘরে ঢোকার পর বেশ খানিকটা সময় কেটেছে, মান্নান মাওলানা তাকে বসতে বলেন নাই। তবু একসময় পালঙ্কের কোণে বসল বসির। বসে বলল, হুজরানি মরণে আপনে মনে অয় এক্কেরে ভাইঙ্গা পড়ছেন হুজুর, না?

মান্নান মাওলানা চমকালেন। কেমতে বুজলি?

অনেকক্ষুন খাড়ই রইলাম, আপনে আমারে বইতে কইলেন না!

সত্যঐ?

হ।

ওই দেক, আমি খ্যাল করি নাই।

হেইডা আমি বুজছি। বুইজ্জা নিজেঐ বইয়া পড়লাম। আপনের লেইগা ইট্টু মায়াও লাগল।

ক্যা?

আপনে মাশাল্লা অহনও আমগো থিকা বেশি জুয়ানমর্দ। এই বয়সে হুজরানি মইরা গেল, আপনের দশা তো খারাপ অইয়া যাইবো।

মান্নান মাওলানা কপট দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। যাইবো কী রে, গেছেঐত্তো। আমার দশা তো আসলেঐ খুব খারাপ।

হ হেইডা আমি আপনের মোক দেইক্কাঐ বুজছি। তয় বেদ্দপি লইয়েন না হুজুর, একহান কথা কই। আপনে আবার বিয়া করেন।

মান্নান মাওলানা হাসলেন। ধুর বেড়া। মাইনষে কইবো কী?

কী কইবো মাইনষে! আমগো ধর্মে চাইরহান বিয়া জায়েজ। আপনে একহান করছিলেন, বউ মইরা গেছে দেইক্কা আরেকহান করছেন। এইডা লইয়া কে কী কইবো?

মান্নান মাওলানা গম্ভীর হলেন। আরে না বেডা, আমারে আবার কে কী কইবো! ওই হগল কওয়াকওয়ির আমি ধার ধারিনি। কথায় কথায় কইলাম আর কী! হোন, নিজের বিয়ার চিন্তা আমার আছে। হেইডা তরে পরে কইতাছি। তার আগে দুই পোলার বিয়ার কথা কইয়া লই। আতাহার আর আজাহার দুই পোলারে এক লগে বিয়া করামু। তারবাদে। করুম নিজে।

শুনে বসির মহাখুশি। ইস একলগে তিনহান বিয়ার কাম পাইলাম। এমুন কোনওদিন অয় নাই। হুজুর, কেঐরে কন এককাপ চা দিতে। ম্যাগ বিষ্টির দিন, ইট্টু চা খাই। চা খাইতে খাইতে কথা কই।

ঠিক আছে।

মান্নান মাওলানা চিৎকার করে রহিমাকে ডাকলেন। রহি, ওই রহি, দুই কাপ চা দে।

তারপর বসিরের দিকে তাকালেন। অহন হোন দুই পোলার লেইগা কেমুন মাইয়া চাই আমি।

বসির হাসল। আপনের কওন লাগবো না, আপনে আমার কাছ থিকা হোনেন কেমুন মাইয়া আমি দিমু। দেহেন আপনের কথার লগে আমার মিলে কি না।

মান্নান মাওলানাও হাসলেন। আইচ্ছা ক।

মাইয়া দেকতে সোন্দর, জাতপদ ভাল আর বাপ অইলো ধনী। পোলাগ য্যান সোনাদানা, দরকার অইলে নগদ টেকা আর নাইলে দুই-চাইর কানি জমিন দিয়া দেয়। কী, ঠিক না?

একদোম ঠিক, একদোম।

আছে, এমুন মাইয়া আমার হাতে পাঁচ-সাতহান আছে।

হেই পাঁচ-সাতহান থিকা ভাল দুইহান বাইর কর।

কইরা হালামু। আপনে চিন্তা কইরেন না। তয় বিয়া পোলাগো কবে করাইবেন? আজাহার আইবো কবে? বাইষ্যাকালেঐ?

বিয়া ঠিক অইলেঐ আইবো। তয় বাইষ্যাকালে পোলাগো বিয়া আমি করামু না। ম্যাগ বিষ্টির দিনে বিয়াশাদির কাম ভাল অয় না। অহন মাইয়া মুইয়া দেইক্কা কথাবার্তি পাকা কইরা রাখুম, বিয়া করামু পউষ-মাগ মাসে।

হ হেইডাঐ ভাল।

টিনের থালায় করে দুই কাপ চা নিয়া এল রহিমা। নিঃশব্দে পালঙ্কের উপর নামিয়ে রেখে চলে গেল।

একটা কাপ হাতে নিয়া মান্নান মাওলানা বললেন, চা খা বছির।

চায়ের কাপ নিয়া ফুক করে চুমুক দিল বছির। এইবার নিজে কেমুন বউ চান হেইডা কন হুজুর! আছে, আপনের পদের মাইয়াও আমার হাতে বিস্তর আছে।

চায়ে চুমুক দিয়া মান্নান মাওলানা গম্ভীর গলায় বললেন, আমার লেইগা মাইয়া তর দেহন লাগবো না। মাইয়া দেহা আছে।

চায়ে চুমুক দিতে গিয়া থামল বসির। জে?

হ। মাইয়া আমার পছন্দ করা। তুই খালি ঘটকালি করবি।

আইচ্ছা ঠিক আছে। কোন গেরামের মাইয়া? বাপের নাম কী?

বড় করে চায়ে চুমুক দিলেন মান্নান মাওলানা। মাইয়া আমগো গেরামেরঐ। বাপের নাম দবির, দবির গাছি। আর মাইয়ার নাম নূরজাহান।

শুনে ল্যাংড়া বসিরের মতন বারো ঘাটের পানি খাওয়া ঘাঘু লোকটা তরি থতমত খেয়ে গেল। চায়ে চুমুক দেওয়ার কথা আর মনে রইল না তার। ফ্যালফ্যাল করে মান্নান। মাওলানার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

ঠিক তখনই টিনের চালে ঝমঝম করে নামল আষাঢ় মাসের কোদাইল্লা (কোদালে) বৃষ্টি।

.

দ্বিতীয় পর্ব সমাপ্ত

.

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *