১. আমি উড়বই

১. আমি উড়বই

আমি পাখাগুলো সঙ্গে নিয়ে জন্মেছি তাই,
হামাগুড়ি দেওয়া আমার সাজে না,
আমার পাখাগুলো আছে, আমি উড়বই।

.

প্রিয় ছাত্র ও শিক্ষকগণ, জীবনে কীভাবে লক্ষ্যে পৌছাতে হয় তার উপর আমি আমার চিন্তাভাবনা আপনাদের সঙ্গে মত বিনিময় করতে চাই।

কয়েকটা প্রমাণিত স্তর আছে—

  • বয়স বিশ বছর হওয়ার আগেই জীবনের লক্ষ্য স্থির করা।
  • সেই লক্ষ্যে পৌছানোর জন্য অবিরত জ্ঞান অর্জন করা।
  • কঠিন পরিশ্রম করা এবং অধ্যবসায় চালিয়ে যাওয়া, যাতে সব সমস্যাকে হটিয়ে কৃতকার্য হওয়া যায়।

তেরো শতকের পারস্যের কবি সুফি জালালউদ্দিন রুমীর ‘আমি উড়বই’ নামে একটি বিখ্যাত কবিতাটি আছে, তা হচ্ছে

আমি উড়বই

আমি সম্ভাবনা নিয়ে জন্মেছি
আমি সততা ও বিশ্বাস নিয়ে জন্মেছি
আমি কল্পনা ও স্বপ্ন নিয়ে জন্মেছি
আমি মহত্ত্ব নিয়ে জন্মেছি
আমি আস্থা নিয়ে জন্মেছি
আমি পাখা সাথে নিয়ে জন্মেছি
তাই, হামাগুড়ি দেওয়া আমার সাজে না,
আমার পাখা আছে, আমি উড়বই
আমি উড়বই উড়বই।

তরুণ বন্ধুরা, শিক্ষা হচ্ছে একটা চাবিকাঠি, যা আপনাদেরকে উড়ার জন্য পাখাগুলো দেয়। শুধুমাত্র আপনাদের অবচেতন মন বলে, ‘আমি জয়লাভ করবই’ এবং আপনারা বিশ্বাস করেন যে আপনারা লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবেন, এটা বাস্তব সত্য। উদ্দীপনার পাখাগুলো থাকায় আপনাদের প্রত্যেকেই এখানে বা অন্য কোথাও মিলিত হয়েছিলেন। উদ্দীপনার পাখাগুলো জ্ঞানকে চালিত করে, যা আপনাদেরকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী, শিক্ষক, রাজনৈতিক নেতা, আমলা বা কূটনীতিবিদ বানিয়ে দিতে পারে। আপনারা চাঁদ ও মঙ্গল গ্রহে হাঁটতে পারবেন, বা আপনারা যা ইচ্ছে হতে চান তাই হতে পারবেন।

বৈদ্যুতিক বাল্ব দেখলে তাৎক্ষণিকভাবে তার আবিষ্কারক টমাস আলভা এডিসনের কথা আমাদের মনে পড়ে। তিনি বৈদ্যুতিক বাল্ব ও বৈদ্যুতিক আলোর পদ্ধতি আবিষ্কার করেন।

মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাওয়া এ্যারোপ্লেনের শব্দ শুনে কাদের কথা আপনারা ভাবেন? রাইট ভ্রাতৃদ্বয় প্রমাণ করেছিলেন মানুষ উড়তে পারে। টেলিফোন আপনাদেরকে কার কথা মনে করিয়ে দেয়? নিশ্চয়ই আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের কথা।

যখন সারা পৃথিবীর মানুষ বিবেচনা করল সমুদ্রে ভ্রমণ শুধুমাত্র একটা অভিজ্ঞতা বা একটা সমুদ্রযাত্রা। ইউনাইটেড কিংডম থেকে ভারতে একজন মানুষের সমুদ্রভ্রমণ শুরু হয়েছিল। তা থেকেই জানা গিয়েছিল কেন দিগন্তরেখায় আকাশ ও সমুদ্র মিলিত হয়ে নীল দেখায়। তার গবেষণা ফল বয়ে এনেছিল আলোকচ্ছটার বিচ্ছুরণের আবিষ্কার। এই আবিষ্কারের ফলে স্যার সি.ভি. রমন নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন।

একজন ভারতীয় গণিতবিদ আনুষ্ঠানিকভাবে উচ্চশিক্ষা লাভ না করেও গণিতে তাঁর উদ্দীপনা ও ভালোবাসা ছিল। এই উদ্দীপনা ও ভালোবাসার পথ ধরে তিনি গাণিতিক গবেষণা চালিয়েছিলেন। তাঁর গবেষণার ফলে, সারা পৃথিবীতে একজন গণিতজ্ঞের প্রচেষ্টার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ ঘটে। তিনি ছিলেন একজন প্রতিভাধর গণিতজ্ঞ। তিনি ক্যাম্ব্রিজের প্রোফেসর জি.এইচ হার্ডির মন গলিয়ে ফেলেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে প্রফেসর হার্ডি আবিষ্কার করেছিলেন, শ্রীনিবাস রামানুজন একজন বিখ্যাত গণিতবিদ। তিনি শ্রীনিবাসের সংখ্যাতত্ত্ব থিওরি ও প্রতিভার কথা সারা পৃথিবীতে তুলে ধরেন। এই সমস্ত মানুষগুলো জ্ঞান আহরণের জন্য নিবেদিত ছিলেন। তাঁদের নাম ও খ্যাতি এখন অবিনশ্বর।

আমি এক দশক সময়কালে ২১.৫ মিলিয়ন তরুণতরুণীদের সঙ্গে মিলিত হয়েছি। এই সব সমাবেশ ও মতবিনিময়ের মধ্যে এটিও একটি। তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করে আমি জানতে পারি প্রত্যেক তরুণতরুণী চমৎকারিত্ব দেখাতে চায়। আপনিও হতে পারেন তাঁদের একজন! আপনার চারপাশের পৃথিবী কিন্তু দিনরাত সর্বোত্তম কাজ করে চলেছে। বাড়িতে আপনার পিতামাতা আপনাকে আপনাদের প্রতিবেশীদের ছেলে-মেয়েদের মতো হতে বলছে, যাতে আপনিও তাদের মতো পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেতে পারেন। স্কুলে গেলে, আপনার শিক্ষক আপনাকে বলেন, ‘কেন তুমি ক্লাসের প্রথম পাঁচজনের মধ্যে একজন হতে পার না?’ আপনি যেখানেই যান না কেন, তারাও একই কথা বলেছে, ‘আপনাকে তাদের মতো হতে হবে।’ কিন্তু তরুণ বন্ধুরা, আমি আপনাদের সবাইকে চমৎকারভাবে গড়ে তুলতে চাই।

আমার তরুণ বন্ধুরা, আপনাদের কাছে চ্যালেঞ্জ এইটা যে আপনাদেরকে কঠিনতম যুদ্ধ করতে হবে। গন্তব্যে না পৌঁছা পর্যন্ত আপনারা কখনোই যুদ্ধে ক্ষান্ত দিতে পারবেন না। এই সংগ্রামে আপনাদের লড়তে হলে কী কী প্রয়োজন? যেগুলো প্রয়োজন তা হচ্ছে: জীবনের একটা বড়োসড়ো লক্ষ্য ঠিক করা, অবিরতভাবে জ্ঞানার্জন করা, কঠিন পরিশ্রম করা ও বড়োসড়ো অর্জনের ইচ্ছাকে মনে সংরক্ষণ করা।

বিদ্যালয়ে আপনাদের পড়াশোনাকালে আপনার অন্তরঙ্গ বন্ধু পাবেন, যে আপনার সঙ্গে চিরদিন থাকবে। সেই বন্ধু কে? সেই বন্ধু হচ্ছে জ্ঞান। আমি এখানে আপনাদেরকে জ্ঞানের সমীকরণ উপস্থাপন করছি :

জ্ঞান = সৃজনশীলতা + ধার্মিকতা + সাহস। আসুন আমরা একে একে এই সমস্ত অংশগুলোর উপর আলোচনা করি।

সৃজনশীলতা

শিক্ষা থেকে সৃজনশীলতা আসে,
সৃজনশীলতা চালিত হয় চিন্তাভাবনায়
চিন্তাভাবনা যোগান দেয় জ্ঞান,
জ্ঞান আপনাকে মহান করে।

জ্ঞানের পরবর্তী উপাদান ধার্মিকতা। এই বিষয়টি বর্ণিত হতে পারে একটা স্বৰ্গীয় স্রোত্রে।

ধার্মিকতা

যখন হৃদয়ে ধার্মিকতা দেখা দেয়,
তখন চরিত্রে সৌন্দর্যের বিকাশ ঘটে
যখন চরিত্রে সৌন্দর্যের প্রকাশ ঘটে
তখন গৃহে ঐক্যতান সৃষ্টি হয়।
যখন গৃহে ঐক্যতান থাকে
তখন দেশে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়
যখন জাতিতে শৃঙ্খলা থাকে
তখন পৃথিবীতে শান্তি সুসংহত হয়।

এখন প্রশ্ন: কেমনভাবে আমরা আমাদের হৃদয়ে ধার্মিকতা প্রতিষ্ঠা করতে পারি? আমার মতে, তরুণদের হৃদয়ে ধার্মিকতা সৃষ্টি করতে তিনটি উৎসের কথা বলা যায়। তাঁরা হচ্ছেন মা, বাবা আর তৃতীয় উৎসটি হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা হচ্ছে শিক্ষক, বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক।

তৃতীয় উপাদানটি হচ্ছে সাহস, সাহসকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায়:

সাহস

নানাভাবে ভাবার সাহস,
আবিষ্কার করার সাহস,
একটা অনাবিষ্কৃত পথে ভ্রমণ করার সাহস,
সমস্যাকে মোকাবিলা করে সাফল্য লাভের সাহস,
তরুণদের এই সব অসামান্য গুণাবলি লাভ করতে হবে।
আমাদের দেশের একজন তরুণ হিসাবে আমি সাহসের সঙ্গে
কাজ আর কাজ করবই সব মিশনের সাফল্য লাভের জন্য।

জ্ঞান কোথা থেকে লাভ করা যাবে? জ্ঞান লাভ করা যাবে বাড়িতে বসেই বই পড়ে, বা শিক্ষকের কাছ থেকে। জ্ঞানবান মানুষের সাহচর্যে জ্ঞান আহরণ করা যেতে পারে। যখন স্কুলগুলো ছাত্রছাত্রীদেরকে জ্ঞান দান করে, তখন সৃজনশীলতা, ধার্মিকতা এবং সাহস তার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়; তখন দেশ বিপুল সংখ্যক খ্যাতিমান ও আলোকিত নাগরিকদের লাভ করে। পরিবার ও দেশের সার্বিক উন্নতি সাধিত হয় ও তার ফলে পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। পৃথিবীর বর্তমান অবস্থায় প্রত্যেক নাগরিক সমৃদ্ধি ও শান্তির আবহে বসবাস করতে চায়। তরুণতরুণীদের যোগ্যতাসম্পন্ন হয়ে আলোকিত মানুষ হওয়া অতি জরুরি। এটার জন্য তিনটি দিকদর্শন আছে, তা হচ্ছে:

  • তাৎপর্যপূর্ণ শিক্ষালাভ
  • আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে ধর্মপালন
  • সার্বিক উন্নতি লাভ

স্কুলের পরিবেশ ও শিক্ষকের শিক্ষাদানের মাধ্যমে ক্লাসের ভেতরের ও বাইরের উভয় ক্ষেত্রেই তরুণরা অনুপ্রাণিত হতে পারে। আজ ছাত্রছাত্রীদেরকে আমার কাছে প্রতিজ্ঞা করতে হবে। প্রতিজ্ঞাটির অনেকগুলো অংশ আছে। আমি জানি আপনারা সবগুলোই পূরণ করতে পারবেন।

১. আমার একটা লক্ষ্য আছে, লক্ষ্যটাকে পূরণ করতে হলে কঠিন পরিশ্রম করতে হবে। আমি উপলব্ধি করি লক্ষ্য না থাকাটা একটা অপরাধ।

২. আমি সততার সঙ্গে কাজ করবই এবং সততার সঙ্গে সফল হবোই।

৩. আমি আমার পরিবারের একজন উত্তম সদস্য হবোই, এবং পৃথিবীর একজন উত্তম সদস্য হবোই।

৪. আমি সদাসর্বদা সম্প্রদায়, জাতি, ধর্ম, ভাষা ও সমাজের কোনো প্রকার বৈষম্য না করে একজন মানুষের জীবন বাঁচাতে বা ভালো করতে চেষ্টা করব।

৫. কোনো প্রকার তর্কবিতর্ক না করে প্রত্যেক মানুষের সম্মান রক্ষা করবই। ৬. আমি সদাসর্বদা সময়ের গুরুত্বের কথা মনে রাখব। আমার দিনগুলোকে বৃথা নষ্ট করব না।

৭. আমি সদাসর্বদা পৃথিবীর গ্রহটি এবং শক্তিকে পরিষ্কার রাখার জন্য কাজ করবই।

৮. আমাদের দেশের পতাকা আমার হৃদয়ে উড্ডীন। আমি আমার দেশের গৌরব বয়ে নিয়ে আসবই।

(২১ জুলাই ২০১৫ বিজনোর ছাত্রছাত্রীদের কাছে ভাষণ ও মতবিনিময় থেকে। )

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *