সুন্দরবনের গল্প
শিকারের বিপদ
অনেক দিন আগে, আমি একবার সুন্দরবনে মাতলা নদীর তীরে কতকগুলি মাটির কাজ পরিদর্শন করিতে গিয়াছিলাম। আমার সঙ্গে দুইজন সহকারীও ছিল। আমরা একটা খোলা জায়গায় এক চালাঘরে থাকিতাম। সেখানে তখন বাঘের উপদ্রব খুব বেশি ছিল। রাত্রে অনেক সময় আমাদের বেড়ার বাহিরেই ছোটো-বড়ো নানা আকারের বাঘ আসিয়া উপস্থিত হইত। যেসব কুলি-মজুরেরা আমাদের অধীনে কাজ করিত, তাহাদের দুই-একজনকে বাঘে লইয়া গেলে, অন্য সকলে প্রাণভয়ে কাজ ছাড়িয়া পলায়ন করিত। এরূপ ঘটনা অনেকবার ঘটিয়াছিল।
একদিন বৈকালে নিকটবর্তী এক গ্রামের কতকগুলি লোক আসিয়া খবর দিল যে, পূর্বরাত্রে এক বাঘ আসিয়া তাহাদের দুইটা গোরু লইয়া গিয়াছে। বাঘটার উৎপাতে তাহাদের গ্রামে বাস করা ভার হইয়াছে। এই বাঘের হাত হইতে রক্ষা করিবার জন্য তাহারা অতি করূণভাবে আমাদিগকে অনুরোধ করিল। আমি তখনই একাকী ওই গ্রামের দিকে যাত্রা করিলাম। আমার হাতে মুঙ্গেরের কারখানায় তৈরি একটা দু-নলা বন্দুক ছিল। বন্দুকটার একটা মস্ত দোষ এই ছিল যে, ছুঁড়িবার সময় দুইটা ঘোড়াই একসঙ্গে পড়িয়া আওয়াজ হইয়া যাইত। কাজেই দু-নলা বন্দুকের সুবিধা তাহাতে পাওয়া যাইত না।
যাহা হউক, এই বন্দুক লইয়াই আমি যথাস্থানে উপস্থিত হইলাম। গিয়া দেখি সেখানে বহু লোকই জড়ো হইয়াছে। তাহাদের মধ্যে ছেলের সংখ্যাই বেশি। তাহারা বানরের মতো মুখভঙ্গি করিয়া একসঙ্গে কথা কহিতেছিল।
আমার বয়স কম দেখিয়া, গ্রামবাসীগণ আমাকে ওই কাজের অনুপযুক্ত বিবেচনা করিল। এই কারণে বাঘটাকে তাড়া দিবার জন্য কতকগুলি লোক চাহিলে, তাহারা সেকথা গ্রাহ্য না করিয়া, শুধু জঙ্গলের দিকে হাত বাড়াইয়া বলিল––‘বাঘটা ওইদিকে গিয়াছে।’ আমি তাহাদিগকে কত বুঝাইলাম, কিন্তু কিছুতেই তাহারা বাঘকে তাড়া দিতে রাজি হইল না। নিরুপায় হইয়া আমি একাই ঝোপের দিকে অগ্রসর হইলাম। গ্রামের লোকেরা একটা উঁচু বাঁধের উপর সারি বাঁধিয়া বসিয়া প্রতীক্ষা করিতে লাগিল––ব্যাপারটা কীরূপ দাঁড়ায় দেখিবার জন্য।
বাঘটা যে-ঝোপের মধ্যে আশ্রয় লইয়াছিল, তাহার নীচে ভীষণ কাঁটাবন––তাহার মধ্য দিয়া সোজাভাবে চলা কঠিন। লম্বা হইয়া শুইয়া কতকটা হামাগুঁড়ি দিবার মতো করিয়া চলিতে হয়। ঝোপের ভিতরে এত অন্ধকার যে, আমি প্রথমে কিছুই দেখিতে পাই নাই। আমি যে একেবারে বাঘের মুখে আসিয়া পড়িয়াছি, সেটা মোটেই বুঝিতে পারি নাই। অন্ধকারে ক্রমে চক্ষু একটু অভ্যস্ত হইয়া আসিলে দেখিলাম, আমার সম্মুখে––হাত দুই-তিন দূরে––কী যেন একটা পড়িয়া আছে। দৃষ্টি আরও অভ্যস্ত হইলে যাহা দেখিলাম, তাহাতে আমার বুক কাঁপিতে লাগিল, মাথার চুল খাড়া হইয়া উঠিল! আমার সম্মুখে প্রকাণ্ড এক বাঘ। তাহার পাশেই একটা অর্ধভুক্ত গোরু পড়িয়া রহিয়াছে। আমার বন্দুকের গুণের কথা পূর্বেই বলিয়াছি। আমি অতি কষ্টে মাথা স্থির করিয়া, জানুতে ভর দিয়া উঠিয়া দাঁড়াইলাম এবং লক্ষ্য স্থির করিয়া বন্দুকের ঘোড়া টিপিলাম। অমনি দুইটা নলই একসঙ্গে আওয়াজ হইয়া গেল। পরমুহূর্তেই কে যেন ধাক্কা দিয়া আমাকে চিতপাত করিয়া ফেলিয়া দিল। তাহার পর কী হইল, কিছুই জানি না।
আমার জীবনরক্ষার বিবরণ অতি সংক্ষিপ্ত। অতিরিক্ত বারুদ ঠাসায়, আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে দুইটি নলই বন্দুকের বাঁট হইতে ছুটিয়া গিয়াছিল, কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে ফাটিয়া যায় নাই। সেই মুহূর্তে বন্দুকের বাঁট পিছনের দিকে হটিয়া আসিয়া এরূপ বেগে আমার কপালে লাগিয়াছিল যে, তাহাতেই আমি অজ্ঞান হইয়া যাই! অনেকক্ষণ পরে চেতনা লাভ করিয়া, আমি কোনোরকমে হামাগুড়ি দিয়া জঙ্গল হইতে বাহির হইয়া পড়ি। নিকটেই খালের মধ্যে একটা খালি নৌকা পাইয়া, তাহাতে আশ্রয় লইলাম। সেখানে রাত্রি কাটাইয়া, পরদিন পিয়ালি গ্রামে উপস্থিত হই। বাঘটার মাথায় বেশিরভাগই বন্দুকের গুলিতে চুরমার হইয়া গিয়াছিল। আমি যখন তাহার সম্মুখে উপস্থিত হই, তখন বোধ করি সে অতিরিক্ত মাত্রায় ভোজন করিয়া অর্ধনিদ্রিত অবস্থায় পড়িয়াছিল এবং সেইজন্যই তখন আমাকে আক্রমণ করে নাই। ইহাই আমার জীবনরক্ষার কারণ মনে হয়।
বাঘের দফা রফা
একবার আমাকে সুন্দরবনের একটা নদী পার হইতে হইয়াছিল। একে তো খেয়া নৌকাগুলি অত্যন্ত বিশ্রী, তাহার ওপর সেদিন ছিল হাটবার। আমাদের নৌকায় অনেকগুলি স্ত্রীলোক ও বালকবালিকা ছিল। স্রোত ও বাতাস খুব বেশি ছিল বলিয়া নদীতে প্রবল ঢেউ উঠিতেছিল। আমরা প্রায় অর্ধেক পথ গিয়াছি, এমন সময় দেখা গেল, একটা বাঘ আমাদের নৌকার খুব কাছাকাছি সাঁতার দিয়া নদী পার হইতেছে। বাঘটা খুব ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছে বলিয়া বোধ হইল। এক-একটা ঢেউ আসিয়া তাহার মাথা ডুবাইয়া দেয়, আবার সে হাঁপাইতে হাঁপাইতে ভাসিয়া উঠে। হঠাৎ স্রোতের বেগে আমাদের নৌকা বাঘটার নিকটে গিয়া উপস্থিত। সেও প্রাণ বাঁচাইবার জন্য আমাদের দিকে আসিতে লাগিল। স্ত্রীলোকেরা ভয়ে দিশাহারা হইয়া নৌকার অন্য দিকে ঝুঁকিয়া পড়িল––নৌকা প্রায় ডুবিবার উপক্রম! এখন উপায়? বাঘটা যাহাতে নৌকা ধরিতে না পারে, তাহাই করিতে হইবে, নতুবা আর রক্ষা নাই।
আমি তাড়াতাড়ি একটা দাঁড় লইয়া, প্রাণপণে বাঘের মাথায় এরূপভাবে আঘাত করিতে লাগিলাম, যাহাতে সে জলের উপরে মাথা তুলিতে না পারে। তখন ভরসা পাইয়া দুইজন দাঁড়িও সেইরূপ করিতে লাগিল। বাঘটা রাগে ভীষণ জোরে দাঁড় কাড়াইয়া ধরিল, কিন্তু ক্রমাগত দাঁড়ের ঘা খাইতে খাইতে সে আর জলের উপরে মাথা তুলিতে পারিল না। গর্জন করিতে করিতে অতল জলে ডুবিয়া গেল।
পালকি চাপা বাঘ
আমি একবার পালকিসুদ্ধ এক বাঘের ঘাড়ে পড়িয়াছিলাম। সুন্দরবনের পশ্চিম দিকে, বহুদূরে, কোনো স্থানে খাজনা লইয়া কৃষকদিগের সহিত গভর্নমেন্ট-কর্মচারীগণের গোলযোগ হওয়ায়, আমাকে তাহার তদারকে যাইতে হইয়াছিল। সেদিকে লোকের বসতি খুব কম চারিদিকেই ছোটো-বড়ো বন, এই সকল বনে বাঘও খুব বেশি। আমি পালকিতে যাইতেছিলাম। আমার সঙ্গে আটজন পালকি-বেহারা ও রাত্রে মশাল ধরিবার জন্য একজন––সবশুদ্ধ নয়জন লোক ছিল।
আমরা একটা বন পার হইয়া যাইতেছিলাম। ঘোর অন্ধকার রাত্রি, মশালের আলোকে পথটা যেন আরও অন্ধকার দেখাইতেছিল। আমার একটু ঘুমের ভাব আসিয়াছিল, এমন সময় হঠাৎ হুড়মুড় শব্দে পালকিখানা মাটিতে পড়িয়া গেল। সঙ্গে সঙ্গে একটা বিকট শব্দ শুনিতে পাইলাম। পরমুহূর্তে পালকিখানা কাত করিয়া দিয়া কে যেন ছুটিয়া পলাইল! চারিদিক নীরব নিস্তব্ধ! আমি বাহির হইবার চেষ্টা করিতে গিয়া দেখি, পালকির দরজা খুব আটকাইয়া গিয়াছে কিছুতেই খোলা যায় না। অবশেষে পদাঘাত করিতে করিতে একখানা দরজা খুলিয়া গেল। বাহির হইয়া দেখিলাম, কেহ কোথাও নাই, লোকজন সব পলায়ন করিয়াছে। তখন পালকিখানা সোজা করিয়া এবং উহার দরজা ঠিক করিয়া, তাহারই মধ্যে কোনোপ্রকারে রাত্রিটা কাটাইয়া দিলাম।
পরদিন প্রাতঃকালে বাহকগণ ফিরিয়া আসিলে, প্রকৃত ঘটনা জানিতে পারিলাম। বনের মধ্যে রাস্তা অতিক্রম করিবার সময়, হঠাৎ একটা বাঘকে পালকির নীচ দিয়া ছুটিয়া যাইতে দেখিয়া, তাহারা ভয়ে উহার উপরেই পালকি ফেলিয়া পলায়ন করে। সহসা এরূপভাবে পিঠের উপর পালকি পড়াতে, বাঘও খুব ভয় পাইয়াছিল এবং বিকট আওয়াজ করিয়াছিল। তারপর বেচারা সেই সংকটাপন্ন অবস্থা হইতে পলায়ন করিবার সময়, পালকিটা কাত হইয়া পড়িয়া গিয়া থাকিবে। সেসময় বাঘের মনে যে পলায়ন করা ভিন্ন অন্য কোনো দুরভিসন্ধি ছিল না, সে বিষয়ে সন্দেহ নাই।
বাঘে মানুষে লুকোচুরি
সুন্দরবনের আর দুইটা বাঘের কথা বলিয়া এই গল্প শেষ করিব। একদিন আমি ঘরে বসিয়া অনেক রাত্রি পর্যন্ত একখানা বই পড়িতেছিলাম। অত্যন্ত গরম বলিয়া ঘরের দরজা-জানলা সমস্তই খোলা ছিল। হঠাৎ বাহিরের বারান্দায় আরদালির পায়ের শব্দ শুনিয়া চাহিয়া দেখি, সে যেন থামের পিছনে থাকিয়া কাহার সহিত লুকোচুরি খেলিতেছে। ব্যাপার কী? আমার ভারী আশ্চর্য বোধ হইল। তখন বারান্দায় গিয়া দেখিলাম, সম্মুখে ঝোপের মধ্যে প্রকাণ্ড এক বাঘ পাইচারি করিতেছে। একবারমাত্র আমার দিকে চাহিয়া, আবার ঘুরিতে ফিরিতে লাগিল। আমিও মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় কিছুকাল সেখানে দাঁড়াইয়া থাকিয়া, তাহার গতিবিধি লক্ষ করিতে লাগিলাম। বাঘটা এক-একবার শিকারি বিড়ালের মতো গুঁড়ি মারিয়া চলিতেছে, আবার উঠিয়া ঝোপের মধ্যে ঢুকিতেছে! এইরূপ করিতে করিতে হঠাৎ একদিকে চলিয়া গেল। বোধ হয়, ঘরে যে উজ্জ্বল আলো জ্বলিতেছিল, তাহা দেখিয়া তাহার মনে কোনোরূপ সন্দেহ হইয়া থাকিবে এবং সেই জন্যই সে চলিয়া গিয়াছিল।
পরদিন সন্ধ্যার সময়, নিকটস্থ এক নীলকুঠি হইতে দুইজন বন্ধু নিমন্ত্রিত হইয়া আমার বাড়িতে আসিয়াছিলেন। রাত্রে আহারের পর আমি তাঁহাদিগকে গাড়ি করিয়া রাখিয়া আসিতে গিয়াছিলাম। আমার বাড়ি হইতে নীলকুঠি প্রায় এক মাইল দূরে। একটা সরু রাস্তা দিয়া সেখানে যাইতে হয়। রাস্তার দুই পাশে ভয়ানক জঙ্গল। আমরা প্রায় অর্ধেক রাস্তা গিয়াছি, এমন সময় আমাদের ঘোড়া যেন একটু চঞ্চল হইয়া উঠিল! পরমুহূর্তেই বিকট গর্জন করিয়া, প্রকাণ্ড এক বাঘ এক লাফে ঘোড়ার সম্মুখ দিয়া রাস্তার অন্য পাশে গিয়া পড়িল। বোধ হয়, ঘোড়া আগেই বাঘটাকে দেখিতে পাইয়াছিল। সহসা সে একটু পিছু হটিয়া না গেলে, বাঘ নিশ্চয়ই তাহার মাথার উপরে আসিয়া পড়িত। যাহা হউক, ইহার পর ঘোড়া ভয়ে অস্থির হইয়া, ভীষণ বেগে ছুটিতে লাগিল এবং দেখিতে দেখিতে নীলকুঠিতে গিয়া উপস্থিত হইল। সে যাত্রা আমরা ভাগ্যগুণে বাঁচিয়া গেলাম।
এই ঘটনার পর, একদিন সন্ধ্যার কিছু আগে, সেই বাঘটাই আমার কুঠির নিকট হইতে একটি রাখাল বালককে ধরিয়া লইয়া গিয়াছিল। রাখাল আমার বারান্দার সামনেই গোরু চরাইতেছিল।
সুন্দরবনের অজগর
সুন্দরবনের বড়ো বড়ো অজগরকে শুয়োর, হরিণ, এমনকী, বাঘ পর্যন্ত ধরিয়া খাইতে দেখা গিয়াছে। এইরূপ একটা শিকার গিলিয়া ইহারা সহজে নড়িতেচড়িতে পারে না। পাঁচ-সাতদিন একই স্থানে মড়ার মতো পড়িয়া থাকে। সেইসময় ইহাদিগকে সহজেই মারা যায়।
একবার কয়েকটি লোক জঙ্গলে কাঠ কাটিতে গিয়াছিল। দুপুরবেলা তাহারা একটা গাছের শিকড়ের উপর বসিয়া তামাক খাইতেছিল। তামাক খাইয়া কলকে হইতে আগুন ঢালিয়া সেই শিকড়ের উপর রাখিল। কিছুক্ষণ পরে শিকড় মনে করিয়া যাহার উপর তাহারা বসিয়াছিল, তাহা হঠাৎ নড়িয়া উঠায়, তাহারা চমকিয়া উঠিল। তাহার পর একটু মনোযোগ করিয়া যখন দেখিল, তখন বুঝিল, সেটা গাছের শিকড় নহে––কোনো জীবিত প্রাণী! তাহারা ভয় পাইয়া দলের আরও কয়েকজনকে ডাকিয়া আনিল। কিন্তু সকলে মিলিয়া টানাটানি করিয়াও কিছুতেই সেটাকে সরাইতে পারিল না। তখন তাহার নীচে দিয়া মোটা একটা রশি চালাইয়া খুব কষিয়া বাঁধিল এবং সেই রশির অন্য দিক গাছের ডালে আটকাইয়া দিয়া প্রাণপণে টানাটানি করিতে লাগিল। সঙ্গে সঙ্গে আগুন জ্বালিয়া তাহার গায়ে ছেঁকা দিবারও ব্যবস্থা করিল। এইবার তড়বড় করিয়া নড়িয়া উঠায় সেটাকে টানিয়া তুলিতে তেমন বেগ পাইতে হইল না। যখন গাছের ডালে ঝুলিতে লাগিল, তখন সকলে দেখিল, সেটা একটা প্রকাণ্ড অজগর সাপ। শরীরে কাদা লাগিয়া শুকাইয়া গিয়াছিল বলিয়া তাহাকে সাপ বলিয়া বুঝিতে পারা যায় নাই।
পেট চিরিয়া দেখা গেল, সাপটা একটা বড়ো শুয়োর ও দুইটা শুয়োরের বাচ্চা গিলিয়া পড়িয়াছিল। তাহার পেট ফুলিয়া একেবারে আইঢাই। সাপের পেটের ফোলা অংশ গর্তে আটকাইয়া গিয়াছিল বলিয়া তাহাকে সহজে বাহির করিতে পারা যায় নাই।
(২)
একবার সুন্দরবনের কয়েকজন সাপুড়ে ঢোলারহাটে একটা অজগর দেখাইতে আনে, সেরূপ প্রকাণ্ড সাপের কথা খুবই কম শুনিতে পাওয়া যায়। সাপটাকে একটা বড়ো সিন্দুকে ভরিয়া নৌকাতে করিয়া আনা হইয়াছিল। নদীর তীরেই হাট। যখন সিন্দুক হইতে তাহাকে বাহির করা হইল, তখন দেখা গেল, সাপের সর্বাঙ্গে এক হাত অন্তর একটা করিয়া বেতের বাঁধন দেওয়া রহিয়াছে। তাহার তেজ কমাইবার জন্যই নাকি এই ব্যবস্থা করা হইয়াছিল।
সেই মূর্তিমান যমকে দেখিবার জন্য হাট ভাঙিয়া লোকজন আসিয়া জড়ো হইল। সাপুড়িয়াগণ দু-পয়সা রোজগারের আশায় সাপকে চেতাইয়া তুলিতে যথেষ্ট চেষ্টা করিতে লাগিল কিন্তু প্রথমটা কোনোমতেই তাহার জড়তা দূর করিতে পারিল না। শেষে অনেক খোঁচাখুঁচি করায় এবং গায়ে জ্বলন্ত কাঠ চাপিয়া ধরায়, সে ফোঁসফোঁস করিয়া শরীর ফুলায় আর মটমট করিয়া বেতের বাঁধন ছিঁড়িতে থাকে। এতক্ষণ যে মড়ার মতো পড়িয়াছিল, বন্ধনমুক্ত হইয়া সে ভিন্ন মূর্তি ধারণ করিল। তাহার শরীর দুলাইবার আর ল্যাজ আছড়াইবার রীতি দেখিয়া সকলেই ব্যস্ত হইয়া পড়িল। দর্শকগণের বেশিরভাগই প্রাণভয়ে ছুটিয়া পলাইল সাপুড়িয়াগণও নিতান্ত কম ভয় পায় নাই। তাহাকে আবার সিন্দুকে বন্দি করিবার জন্য তাহারা যথাসাধ্য চেষ্টা করিতে লাগিল, কিন্তু সাপটা কোনো বাধাবিঘ্ন না মানিয়া, যে লোকটি নদীর ধারে বসিয়া বাঁশি বাজাইতেছিল, বিদ্যুদ্বেগে তাহার উপর গিয়া পড়িল এবং তাহাকে মুখে লইয়া নদীতে ঝাঁপাইয়া পড়িল।
এই আকস্মিক দুর্ঘটনায় সকলে যে কী পর্যন্ত দুঃখিত হইল, তাহা বলিয়া বুঝানো যায় না। নদীতে পড়িয়া সাপটা কিছুদূরে গিয়া একবার গা ভাসাইয়াছিল, কিন্তু বন্দুক আনিতে না আনিতে সে আবার অদৃশ্য হইল।
(৩)
কোনো ভদ্রলোক লিখিয়াছেন :––মহিষ শিকার করিয়া একদিন আমরা তাঁবুতে ফিরিতেছি এমন সময় একজন লোক দৌড়াইয়া আসিয়া খবর দিল, নিকটেই নদীর ধারে দুই-শিংওয়ালা একটা অজগর পড়িয়া রহিয়াছে। লোকটার কথায় আমাদের বিশ্বাস হইল না, তবু তাহার সঙ্গে সঙ্গে নদীর ধার পর্যন্ত গেলাম। গিয়া দেখি, সত্য সত্যই সেখানে প্রকাণ্ড একটা ‘পাহাড়ে বোড়ো’ কুণ্ডলী পাকাইয়া পড়িয়া রহিয়াছে, তাহার মাথার দুই পাশে প্রায় দুই হাত লম্বা দুইটা শিং দেখা যাইতেছে! ব্যাপারখানা কী? অনেক চেষ্টার পর বুঝিতে পারিলাম, ব্যাপারখানা কী। সাপটা একটা মস্ত হরিণ গিলিয়াছিল, কিন্তু তাহার শিং গিলিতে পারে নাই। সেই শিং দুইটা মুখের দুই পাশ দিয়া বাহির হইয়া পড়িয়াছিল। সেইজন্যই, দূর হইতে তাহাকে শিংওয়ালা সাপ বলিয়া ভ্রম হইতেছিল।
রাতের সুন্দরবন
আমি নিজে কখনো বন্দুক ধরি নাই কিন্তু একটি শিকারি বন্ধুর সহিত ঘুরি নাই, সুন্দরবনে এমন স্থান খুবই কম আছে। দিনের বেলা বাঘ-ভালুক মারিয়া বন্ধুটির শখ মিটিত না রাত্রিকালে গাছে চড়িয়া, অনেক সময় তিনি বড়ো বড়ো জন্তু শিকার করিতেন। একবার তাঁহার খেয়াল হইল, কোন প্রাণী কীভাবে রাত্রিযাপন করে, গর্তের মধ্যে লুকাইয়া থাকিয়া তাহা স্বচক্ষে দেখিবেন। এই উদ্দেশ্যে এমন একটি স্থান নির্বাচন করিয়া গহ্বর প্রস্তুত করাইলেন, যাহার দুই দিকে জঙ্গল, সম্মুখে এক প্রকাণ্ড মাঠ এবং পশ্চাতে একটি ছোটো নদী। মাঠটা এত বড়ো যে, মনে হইতে লাগিল, উহা যেন ঠিক আকাশে গিয়া মিশিয়াছে!
সন্ধ্যার পূর্বেই আমরা গিয়া গর্তের মধ্যে বসিলাম। কাঁটা ডালপালার দ্বারা স্থানটি এমন করিয়া ঢাকিয়া দেওয়া হইল যে, সহজে কোনো জন্তু যেন কাছে আসিতে বা আমাদিগকে দেখিতে না পায়, অথচ আমাদের দৃষ্টি সর্বত্রই চলে।
মেটে মেটে জ্যোৎস্নাতে বসিয়া আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাইতে লাগিলাম। ক্রমে দশটা বাজিল এগারোটাও বাজিয়া গেল, তথাপি কোনো জন্তুর দেখা নাই। ঝিঁঝিঁপোকা ডাকিতেছে, মাঝে মাঝে দুই-একটা গাছের পাতা খসিয়া পড়িতেছে, সেই শব্দই কত না ভয়ংকর বোধ হইতে লাগিল। কোথাও একটা পাতা খড়খড় করিতেছে, আর আমরা ভাবিতেছি, এইবার না জানি কোন মূর্তির সাক্ষাৎ মিলিবে! কিন্তু সাক্ষাৎ আর মিলিল না।
হঠাৎ পিছনের নদীতে ভীষণ তোলপাড় আরম্ভ হইল। আমরা ভাবিলাম, বুঝি বুনো মহিষের দল নদী পার হইতেছে। মহিষের ঊর্ধ্বপুচ্ছ শিং-বাগানো রুদ্রমূর্তি কল্পনা করিয়া আমরা একটু উদ্বিগ্ন হইয়া উঠিলাম। কিন্তু পিছনের দিকে ফিরিয়াই সে ভ্রম দূর হইল। কতকগুলা হরিণ জলপান করিতে আসিয়াছিল। হঠাৎ তাহাদের একটাকে ধরিয়া দুই কুমিরে লড়াই বাধিয়াছে, তাই এই ভয়ংকর, ঝুপঝাপ শব্দ। উঃ! সে কী ভীষণ লড়াই! যাহাকে লইয়া এত মারামারি কামড়াকামড়ি, সে বেচারার সকল কষ্ট যন্ত্রণা অনেক পূর্বেই ফুরাইয়াছে। প্রায় আধ ঘণ্টা পরে যখন যুদ্ধের অবসান হইল, তখন দেখা গেল, একটা কুমির মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করিতে করিতে একবার ভাসিতেছে, আবার ডুবিতেছে!
ঘাসপাতা, শাকসবজি খাইয়া যাহারা জীবনধারণ করে, সেসব জন্তু সাধারণত সন্ধ্যার পূর্বেই জলপান শেষ করিয়া নিজ নিজ বাসায় গিয়া আশ্রয় লয়। এই হরিণের দল, বোধ হয়, কোনো কারণে ভয় পাইয়া এতক্ষণ নদীর ধারে আসিতে পারে নাই।
ভয়ের কারণ সেখানে নাই কখন? কুমিরের লড়াই দেখিয়া আমরা ফিরিয়া বসিলাম। সহসা মাঠের দিক হইতে একটা দুপদাপ শব্দ আমাদের কানে আসিল। চাহিয়া দেখি, মাঠের এপাশ দিয়া একদল হরিণ ছুটিয়াছে, আর একটা কী জানোয়ার তাহাদের পিছন লইয়াছে। জন্তুটা যেরকম মাটির সঙ্গে মিশিয়া গুঁড়ি মারিয়া চলিতেছিল, তাহাতে বাঘ কিংবা চিতা বলিয়া সন্দেহ হইল। অনেকক্ষণ সেই দিকে চাহিয়া রহিলাম, কিন্তু আর কিছুই দেখিতে পাইলাম না। শিকারি ঘড়ি খুলিয়া দেখেন, তখন রাত্রি প্রায় একটা।
এই সময় দুইটা প্যাঁচার ক্যাচক্যাচানি সমস্ত বনটা যেন জাগাইয়া তুলিল। প্যাঁচার ডাক কোনো অমঙ্গলের পূর্বাভাস কি না, বলিতে পারি না কিন্তু সেটা যে ভয়ানক কর্কশ, তাহাতে সন্দেহ নাই।
তিনটার পর কিছু দূরে একটা বাঘের ডাক শুনা গেল। বন্দুকটা এতক্ষণ গহ্বরের দেওয়ালের গায়ে দাঁড় করানো ছিল, বন্ধু উহা হাতে তুলিয়া লইলেন। সে-রাত্রে শখ মিটাইবার জন্য প্রাণীবধ করা তাঁহার উদ্দেশ্য ছিল না তবে আত্মরক্ষার্থ কোনো আয়োজনেরই ত্রুটি করেন নাই। বাঘটা কোনোগতিকে সন্ধান পাইয়া যদি আমাদের ঘাড়ে পড়িবার উপক্রম করিত, তাহা হইলে তিনিও তাহাকে উপযুক্ত শিক্ষা না দিয়া ছাড়িতেন না।
এইবার কাছেই একটা খড়খড় শব্দ হইল। আমরা একটু ব্যস্ত হইয়া পড়িলাম। সাপ নয় তো? কিছু পরে সেই স্থান হইতে একটা সজারুকে বাহির হইতে দেখিয়া আমাদের সাপের ভয় ঘুচিয়া গেল।
আমরা বসিয়াই আছি––মনে হইল, দূরে আকাশের গা ঘেঁষিয়া ছায়ার মতো কী যেন একটা জন্তু ধীরে ধীরে চলিয়া যাইতেছে। বেশ বড়ো জন্তু। মহিষ হইলেও হইতে পারে, গন্ডার হওয়াও আশ্চর্য নহে। কিন্তু ঠিক কিছু বুঝিতে পারিলাম না।
আরও কিছুক্ষণ কাটিল আমরা একদৃষ্টে চাহিতে চাহিতে দেখিলাম, একটা কী জানোয়ার মাঠের দিক হইতে আমাদের দিকে আসিতেছে। শুয়োর নয় তো? না, সেরকম মনে হয় না। তবে কি বাঘ? না বাঘও নয়। এ যে দেখি একটা ভালুক। খুব বড়ো ভালুক নয়, এখনও মায়ের সাথে সাথে ফিরে। ভালুক বড়ো নকুলে জন্তু। খুব স্ফূর্তিবাজ! সে বেশ নাচিতে নাচিতে বুড়ো খোকাটির মতো আসিতেছে। আর মাঝে মাঝে থামিয়া পিছনে চাহিয়া কাহাকে যেন খুঁজিতেছে।
একটা বাঘ যে লুকাইয়া এতক্ষণ তাহার অনুসরণ করিতেছিল, বেচারা তাহা বুঝিতে পারে নাই। সে যখন আমাদের নিকট হইতে আন্দাজ ত্রিশ হাত দূরে, তখন ডানদিকের একটা ঝুপি সহসা আন্দোলিত হইয়া উঠিল। দেখিতে দেখিতে বাঘটা ঝপাং করিয়া লাফাইয়া ভালুকের ঘাড়ে পড়িল। এ অত্যাচার সে সহ্য করিবে কেন? হাজার হউক, সে তো ভালুকেরই ছানা! চিৎকারে বন কাঁপাইয়া সেও আপনার নখ ও দাঁতের সদ্ব্যবহার করিতে ছাড়িল না।
যুদ্ধ চলিতেছে, এমন সময় ‘গাঁক’ ‘গাঁক’ শব্দে হুংকার ছাড়িয়া প্রকাণ্ড এক ভালুক আসিয়া উপস্থিত। বোধ হয়, ওই ছানাটিরই মা। এইবার বাঘের ভালুকছানা খাইবার সাধ মিটিবে।
বাঘও ছানাটাকে ছাড়িয়া ফিরিয়া দাঁড়াইয়াছে! রাগে ভালুকেরও সর্বাঙ্গ ঠকঠক করিয়া কাঁপিতেছে! তারপরই যুদ্ধ। সে এক বিপর্যয় কাণ্ড। বাঘের প্রধান অস্ত্র––দাঁত ও নখ ভালুকও এই দুই মহাস্ত্রে বঞ্চিত নহে, অধিকন্তু বুকে চাপিয়া শ্বাস রোধ করিয়া শত্রুবিনাশ করিতে সে অদ্বিতীয়। বাঘের প্রত্যেক আক্রমণ ভালুকের গুচ্ছ গুচ্ছ লম্বা লোমে আটকাইয়া প্রতিহত হইতেছে, অথচ ভালুকের একটি আক্রমণও ব্যর্থ যাইতেছে না। সে বাঘের সর্বাঙ্গ চিরিয়া ছিঁড়িয়া ফাঁই ফাঁই করিতেছে। বাঘ রুখিয়া গর্জিয়া ভালুকের মাথায় কামড় বসাইতে চায়। ভালুক চিৎকারে আকাশ ফাটাইয়া বাঘকে বুকে চাপিয়া ধরে। একবার বাগে পাইয়া বাঘ এক লাফে ভালুকের পিঠের উপর চড়িয়া বসিল। আমরা ভাবিলাম, এইবার তাহার দফা সারা। কিন্তু পর মুহূর্তেই দেখা গেল, ভালুক চিৎ হইয়া পড়িয়া বাঘকে মাটিতে চাপিয়া মারিবার উপক্রম করিতেছে। এতক্ষণ পর্যন্ত হার-জিত দুই পক্ষেরই সমান।
যুদ্ধের শেষ দিকটার গর্জন আর আস্ফালন যেন দ্বিগুণ বাড়িয়া গেল। একবার শেষ চেষ্টা করিবার জন্য দুইটাতেই খেপিয়া দাঁড়াইয়াছে, কিন্তু তখন আর কোনোটার সামর্থে কুলাইতেছে না। রক্তের কাদাতে মাঝে মাঝে তাহারা পিছলাইয়া পড়িতে লাগিল।
ক্রমে পূর্বদিক পরিষ্কার হইতেছে দেখিয়া ভালুক নেংচাইতে নেংচাইতে জঙ্গলে ঢুকিল। আর বাঘ মাটিতে লুটাইয়া যন্ত্রণায় ধড়ফড় করিতে লাগিল। আমি তাহার অবস্থা দেখিয়া বন্ধুকে বলিলাম, ‘বেচারার শ্বাসরোধ হয়ে আসছে, এইবার এক গুলিতে শেষ করে দাও!’ বন্ধু বলিলেন, ‘মড়ার উপর আর খাঁড়ার ঘা কেন?’
বাঘের গঙ্গাপ্রাপ্তি
কয়েকজন সাহেব জাহাজে চড়িয়া সুন্দরবন দেখিতে গিয়াছেন। জাহাজখানি রায়মঙ্গল নদীতে নোঙ্গর করিয়াছে সাহেবরা একখানি ছোটো স্টিমবোট করিয়া একটা খালে ঢুকিয়াছেন। প্রায় সমস্ত দিন নালায় ঘুরিয়া বিকালবেলায় একটি ছোটো নদীতে আসিয়া তাঁহাদের বোট থামিল।
নদীর অপর পারে কয়েকটা শুয়োরছানা তাহাদের মায়ের সঙ্গে সঙ্গে মাটি খুঁড়িয়া বেড়াইতেছে। জলে অনেকগুলো কুমির নাক জাগাইয়া রহিয়াছে।
হঠাৎ একটা বাঘ ঝোপের ভিতর হইতে লাফ দিয়া আসিয়া, একটা শুয়োরছানাকে ধরিয়া লইয়া গেল তাহাতে অন্য ছানাগুলি চ্যাঁচাইয়া আকাশ ফাটাইতে লাগিল। তাহার পরের মুহূর্তেই বিশাল এক বরাহ, বন হইতে আসিয়া, বাঘের সম্মুখে দাঁড়াইয়াছে। বাঘও তখন শুয়োরছানা রাখিয়া যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হইল। খানিক এ-উহার দিকে তাকাইয়া আছে, কোনোটাই কিছু বলে না। তারপর বাঘ ঘন ঘন ল্যাজ নাড়িতে নাড়িতে গর্জন করিয়া উঠিল, বরাহও রাগে ঘোঁতঘোঁত করিয়া তাহার উত্তর দিল।
বাঘের চেষ্টা, বরাহের পিছনে গিয়া তাহার ঘাড়ে লাফাইয়া পড়িবে কিন্তু বরাহ তাহা করিতে দিবে কেন? বাঘ যতই তাহার পিছনের দিকে ঘুরিয়া যাইতে চায়, সে ততই তাহার দিকে ফিরিয়া দাঁড়ায়। এইভাবে ঘুরিতে ঘুরিতে যেই দুইটাতে কাছাকাছি হইয়াছে, অমনি বরাহ তিরের মতো ছুটিয়া বাঘকে মারিতে গেল। বাঘও তৎক্ষণাৎ তাহাকে ভয়ংকর এক থাবা মারিল। সে চাপড় পিঠে পড়িলে, তাহার পিঠই ভাঙিয়া যাইত, কিন্তু বরাহ কাঁধ পাতিয়া লওয়াতে তাহার কিছুই হইল না কেননা, তাহার সে জায়গাটা লোহার মতো মজবুত। এই গোলমালে বাঘ একটু অসতর্ক হইয়া পড়িয়াছিল সেই হইল বরাহের সুযোগ। সে আর বাঘকে সামলাইতে না দিয়া, তৎক্ষণাৎ তাহার পেটে দাঁত বসাইয়া দিল। সেই যে দাঁত বসাইল, বাঘ আর কিছুতেই তাহা ছাড়াইতে পারিল না। সে প্রাণপণে বরাহকে আঁচড় কামড় দিতে লাগিল বটে, কিন্তু বরাহ তবুও তাহার সমস্ত শরীর ছিঁড়িয়া ফালি ফালি না করিয়া ছাড়িল না। বাঘ মরিয়া গিয়াছে, তথাপি তাহাকে ছাড়ে না শেষে বরাহ চলিয়া গেল। তখন দলে দলে কুমির আসিয়া বাঘটাকে লইয়া টানাটানি করিতে লাগিল।
বেলা শেষ হইয়া আসিল, সাহেবেরাও তাড়াতাড়ি বোট ছাড়িয়া দিলেন। তাঁহারা খানিক দূর আসিয়াছেন, এমন সময় অনেকগুলো শুয়োরছানা ছুটিয়া আসিয়া প্রাণপণে সাঁতরাইয়া নদী পার হইতে আরম্ভ করিল। অমনি দেখা গেল যে, চারিদিক হইতে কুমিরো তাহাদিগকে খাইবার জন্য ছুটিয়া আসিতেছে। পর মুহূর্তেই একটা ছানা চ্যাঁচাইয়া উঠিল, আর তাহাকে দেখা গেল না। আর-একটার পিছনের ঠ্যাং ধরিয়া সাহেবের আরদালি তাহাকে বোটে তুলিয়া ফেলিল। সঙ্গে সঙ্গে একটা কুমিরও জলের ভিতর হইতে মাথা ভাসাইয়া, হাঁ করিয়া সেটাকে ধরিতে আসিল, কিন্তু নাগাল পাইল না। লাভের মধ্যে সাহেবদের বন্দুকের গুলিতে তাহার নাক উড়িয়া গেল। ছানাটা যতই চ্যাঁচায়, কুমিরগুলাও ততই খেপিয়া যায়। শেষে একটা একেবারে বোটের ধারে মাথা তুলিয়া হাঁ করিয়া, একজন খালাসিকে খাইতে আসিল। সাহেবরা তৎক্ষণাৎ গুলি না মারিলে, তাহাকে খাইয়াই ফেলিত। তখন তাঁহারা সকলে মিলিয়া আর সব কুমিরের উপর গুলি চালাইতে লাগিলেন। কিন্তু তাহাতেও তাহারা ভয় পাইল না। একটা তো আসিয়া এক কামড়ে একজনের বন্দুকই কাড়িয়া লইল। বাস্তবিক, সেদিন সাহেবদের একটু বেগতিকই হইয়াছিল হঠাৎ বুদ্ধি না জোগাইলে শেষে কী হইত, কে জানে! কোনোমতেই কুমিরগুলাকে তাড়াইতে না পারিয়া, শেষে তাঁহারা অনেকটা কেরোসিন তেল বোটের চারিদিকের জলে ঢালিয়া দিলেন। কুমিরমহাশয়দের চোখ দুইটি থাকে ঠিক জলের সমানে সমানে। কাজেই দেখিতে দেখিতে সেই কেরোসিন তেল তাহাদের চোখে গিয়া ঢুকিল। এমন ঔষধ আর কখনো তাঁহারা চোখে মাখেন নাই, এমনি চিড়বিড়ে মজাও বোধ হয় পান নাই। শুয়োর খাওয়ার শখ তো মিটিলই, তখন তাড়াতাড়ি সেখান হইতে পলাইতে পারিলেই তাঁহারা বাঁচেন। ইহার পর সেদিন সাহেবদের আর কোনো বেগ পাইতে হয় নাই, তাঁহারা ভালোয় ভালোয় জাহাজে আসিয়া পৌঁছিলেন।
বাঘে কুমিরে
একবার দাক্ষিণাত্যে, নর্দমা নদীর তীরে, কোনো এক গ্রামে বাঘের উপদ্রব আরম্ভ হয়। স্থানীয় বনজঙ্গলে বাঘ এত বেশি যে, সাধারণত গ্রামবাসীরা বাঘের নামে তেমন ভয় পায় না। সে আসে রাত্রিযোগে, ক্বচিৎ-কদাচিৎ দু-একটা ছাগল, ভেড়া বা বাছুর লইয়া পলায়ন করে, কিন্তু সেবার একদিন সকালে চারিদিকে মহা হইচই পড়িয়া গেল। কী ব্যাপার? গ্রামের মোড়লের একটা প্রকাণ্ড হৃষ্টপুষ্ট ষাঁড়কে পাওয়া যাইতেছে না। খোঁজ খোঁজ পড়িয়া গেল। ষাঁড়টাকে পাওয়া গেল না বটে, কিন্তু রাত্রে যে কোনো ব্যাঘ্র মহাপ্রভু তাহাকে লইয়া গিয়াছেন, তাহার প্রমাণ পাওয়া গেল। মোড়ল তো চটিয়া আগুন। তাহার হুকুমে তখনই একদল বলিষ্ঠ লোক বাঘের সন্ধানে বাহির হইল। তাহারা সন্ধ্যার একটু পূর্বে ফিরিয়া আসিয়া জানাইল, বাঘটা খুব বড়ো। সে নদীর ধারে একটা ঝোপে বসিয়া সেই ষাঁড়ের মাংস পরম তৃপ্তির সহিত ভোজন করিতেছে।
অমনি বাছা বাছা কয়েকজন শিকারি অস্ত্রশস্ত্র লইয়া বাহির হইয়া পড়িল। তাহারা প্রথমে আগুন জ্বালাইয়া, চিৎকার করিয়া বাঘটাকে সেই ঝোপ হইতে তাড়াইয়া দিল। তারপর কয়েক মিনিটের মধ্যে ঝোপের কাছাকাছি একটা গাছের উপর মাচা বাঁধিয়া ফেলিল। গাছটা তেমন উচ্চ নহে।
সন্ধ্যার পর একজন ওস্তাদ শিকারি একটা প্রকাণ্ড বর্শা লইয়া সেই মাচার উপর উঠিয়া বসিল। অস্ত্রটি একেবারে ক্ষুরধার! দলের আর সকলে কতকটা আড়ালে গিয়া অপেক্ষা করিতে লাগিল। শিকারিকে কেবলমাত্র তাহার স্থির লক্ষ্য ও কবজির জোরে বাঘটাকে হত্যা করিতে হইবে। অস্ত্র ফসকাইলে আর রক্ষা নাই। ক্রোধোন্মত্ত বাঘ তখন মাচার উপরে লাফাইয়া উঠিয়া তাহার প্রাণসংহার করিবেই। যাহা হউক, রাত্রি আন্দাজ বারোটার সময় বাঘটা খাদ্যের লোভে সেই ঝোপের ধারে অতি সন্তর্পণে উপস্থিত হইল। মানুষের গন্ধ পাইলেও তাহার ক্ষুধার জ্বালা এত অধিক যে, সে এদিক-ওদিক না তাকাইয়া ঝোপে ঢুকিয়া আহার করিতে বসিল। অন্ধকার তখন খুব গাঢ় হইয়া আসিয়াছে। কিন্তু ওস্তাদ শিকারি পাতার মর্মর শব্দ শুনিয়াই বাঘের আগমন বুঝিতে পারিল। তারপর স্থির দৃষ্টিতে অন্ধকার ঝোপের দিকে লক্ষ করিতে করিতে, বাঘের চোখ দুইটি দেখিতে পাইয়াই, সে সজোরে বর্শা নিক্ষেপ করিল। এমনই তাহার হাতের কায়দা যে, অস্ত্রটা বাঘের পায়ের হাড় পর্যন্ত এফোঁড়-ওফোঁড় না করিয়া ছাড়িল না। বাঘ রাগে উত্তেজিত হইয়া গর্জন করিতে করিতে সম্মুখের দিকে দিল এক প্রচণ্ড লাফ। সেই এক লাফে শিকারি যে গাছে ছিল, একেবারে ঠিক তাহার উপরে আসিয়া পড়িল। গাছটি থরথর করিয়া কাঁপিয়া উঠিল। সঙ্গে সঙ্গে বাঘের পা হইতে বর্শাটিও খুলিয়া গেল। শিকারির তো চক্ষুস্থির! তাহার হাতে অন্য কোনো অস্ত্র ছিল না।
এদিকে বাঘের গর্জন শুনিবামাত্র দূরের লোকেরা ঢাক-ঢোল পিটাইয়া ও আগুন জ্বলাইয়া সেই দিকেই ছুটিয়া আসিল। আগুন দেখিয়া আহত বাঘ কোথায় যেন সরিয়া পড়িল। কাছাকাছি অনেক ঝোপঝাপ খোঁজা হইল, কিন্তু বাঘের মৃতদেহ কোথাও পাওয়া গেল না। সে যে বেশিরকম জখম হইয়াছে, কোনো প্রমাণ নাই। সেই রাত্রির মতো সকলে গ্রামে ফিরিয়া আসিল।
মোড়ল কিন্তু নিরস্ত হইবার পাত্র নহে। এবার অন্য উপায়ে বাঘকে হত্যা করিবার চেষ্টা চলিতে লাগিল। এই উপায়টি এ দেশের বন্য জাতিরা প্রায়ই অবলম্বন করিয়া থাকে। কোথাও বাঘের অত্যাচার আরম্ভ হইলে, গ্রামবাসীরা তাহার ভুক্তাবশিষ্ট মাংসে এক প্রকার তীব্র বিষ মাখাইয়া রাখে। সেই মাংস আহার করিবার ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই বিষের কার্য আরম্ভ হয়। বাঘ অত্যন্ত কাবু হইয়া পড়ে। তাহার বুক ও জিব শুকাইয়া আসে। সে তখন নিকটবর্তী জলাশয়ে গিয়া দারুণ পিপাসা দূর করিবার চেষ্টা করে। এইভাবে অসহ্য যন্ত্রণা ভোগ করিতে করিতে বাঘের মৃত্যু হয়।
এরূপ ঘটনা মোড়ল অনেকবার প্রত্যক্ষ করিয়াছে। এক্ষেত্রেও সেই উপায়ে বাঘটা নিহত করিবে, স্থির করিল। ষাঁড়ের তখনও কতকটা অবশিষ্ট ছিল। সে বিশেষভাবে জানিত যে, যতক্ষণ পর্যন্ত মাংসের কিছুমাত্র বাকি থাকিবে, ততক্ষণ বাঘ কোথাও নড়িবে না। সেইটুকু নিঃশেষ করিয়া তবে অন্যত্র যাইবে। পরদিন সকালে মোড়লের পরামর্শমতো সেই ভয়ানক বিষ ষাঁড়ের ছিন্নভিন্ন মাংসে মাখাইয়া রাখা হইল এবং সে নিজে সন্ধ্যার পরে ঝোপের কাছাকাছি নদীর ধারে, একটা গাছে বন্দুক লইয়া অপেক্ষা করিতে লাগিল।
মোড়ল যাহা ভাবিয়াছিল, ঠিক তাহাই ঘটিল। অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়া রাত্রি প্রায় তিনটার সময় বাঘ আসিয়া উপস্থিত। কয়েকটা শৃগাল আশেপাশে ঘুরিয়া বেড়াইতেছিল, কিন্তু সম্ভবত বিষের গন্ধ পাইয়া মাংস আহার করে নাই। বাঘ আসিবামাত্র তাহারা ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড় দিল। ক্ষুধিত বাঘ কিন্তু বিষের অস্তিত্ব কল্পনাও করে নাই। সে মহানন্দে আহার করিতে বসিল। কিছুক্ষণ পরেই বিষের কার্য আরম্ভ হইল। তৃষ্ণায় তাহার ছাতি ফাটিবার উপক্রম। করুণ আর্তনাদ করিতে করিতে সে নদীর দিকে ছুটিল।
তখন ভোর হইয়া আসিতেছে। মোড়ল বন্দুক লইয়া সেখানে অপেক্ষা করিতেছিল। বাঘ কোনোদিকে না চাহিয়া, একেবারে জলে ঝাঁপাইয়া পড়িল এবং চকচক করিয়া জল খাইতে লাগিল। জল খাওয়া শেষ হইলে, যন্ত্রণায় ছটফট করিতে করিতে আর-একটা ঝোপের কাছে গিয়া মাটিতে গড়াগড়ি দিতে লাগিল। বুকের জ্বালা এদিকে বাড়িয়াই চলিয়াছে, সে আবার জল খাইতে ছুটিল।
বাঘের এই যাতনার অবস্থা দেখিয়া মোড়লের আর রাগ রহিল না। গুলি করিয়া সে তাহার কষ্টের লাঘব করিতে মনস্থ করিল। কিন্তু কী আশ্চর্য! মোড়ল বন্দুকের ঘোড়া টিপিবার পূর্বেই, একটা বৃহৎ কুমির আসিয়া বাঘের ঘাড় কামড়াইয়া ধরিল। তারপর মরণাপন্ন বাঘে ও কুমিরে কী ভীষণ লড়াই! মোড়ল বন্দুক নামাইয়া এই অদ্ভুত দৃশ্য দেখিতে লাগিল। লড়াইয়ের উত্তেজনায় বাঘ কিছুকালের জন্য সকল যন্ত্রণা ভুলিয়া গেল।
কুমির বাঘের থাবার আঘাত অগ্রাহ্য করিয়া, তাহাকে জলের ভিতর টানিতে চেষ্টা করিতেছিল বাঘও প্রাণপণ বলে জল তোলপাড় করিয়া, কুমিরকে ডাঙায় তুলিবার জন্য ব্যস্ত। একবার দুইটাই ডুবিয়া যায় পরক্ষণেই আবার বাঘ মাথা তুলিয়া উঠে। কুমির কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও তাহার কামড় ছাড়ে নাই। শেষে কুমিরেরই জিত হইবার উপক্রম হইল। বিষের জ্বালা এবং কুমিরের আক্রমণ সহ্য করিতে না পারিয়া বাঘ আর্তনাদ করিতে করিতে একেবারে হাল ছাড়িয়া দিল। ইহার পর কুমির যেই মাথা তুলিয়া বাঘকে জলের তলে টানিতে যাইবে, মোড়ল অমনি নিমেষমধ্যে অব্যর্থ গুলির আঘাতে তাহাকে বিনাশ করিল। মোড়ল পরের গুলিতে বাঘকেও সকল যন্ত্রণা হইতে নিষ্কৃতি দিল।
