ঘোর নিষ্ঠুরতা
প্রায় দুই হাজার বৎসর পূর্বে রোম নগর পৃথিবীর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ স্থান অধিকার করিয়াছিল। কী শিল্পে, কী সভ্যতায়, কী ব্যবসা-বাণিজ্যে, রোমীয়দের সমতুল্য আর কেহই ছিল না। কিন্তু রাজ্যবিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে ক্রমে তাহাদের স্বভাব-চরিত্র যারপরনাই কলুষিত হয়ে পড়ে। অন্যান্য পাপাচরণের মধ্যে কলোসিয়াম ক্রীড়াগারে তাহারা যে নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিত, তাহা স্মরণ করিতেও হৃৎকম্প উপস্থিত হয়। এই ক্রীড়া রোমের সর্বত্রই প্রচলিত ছিল। তজ্জন্য বহু অর্থব্যয় করিয়া ক্রীড়াগার সকল নির্মাণ করা হইত। শুনিতে পাওয়া যায়, রোমের সুবৃহৎ ক্রীড়াগারটি পনেরো বিঘা জমি ব্যাপিয়া নির্মিত হইয়াছিল। ইহার সুবিস্তৃত প্রাঙ্গনের চতুর্দিকে দর্শকদিগের জন্য গ্যালারি প্রস্তুত ছিল। প্রায় নব্বই হাজার লোক সেই গ্যালারিতে বসিয়া খেলা দেখিতে পারিত। প্রথম প্রথম সেই বিশাল ক্রীড়াস্থলে সার্কাসাদির ন্যায় নির্দোষ ক্রীড়াই প্রদর্শিত হইত। কিন্তু নানা পাপাচারে রোমীয়গণ যতই অন্তঃসারশূণ্য হইতে লাগিল, তাহাদের নিষ্ঠুরতাও ততই বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। জঘন্য আমোদ-স্পৃহা চরিতার্থ করিবার জন্য, তাহারা জঙ্গল হইতে সিংহ, ব্যাঘ্র, মহিষ, গন্ডার প্রভৃতি দুরন্ত জন্তু ধরিয়া আনিয়া সেই ক্রীড়াস্থানে ছাড়িয়া দিত এবং হতভাগ্য বন্দি ক্রীতদাসদিগকে উহাদের সহিত যুদ্ধ করিতে বাধ্য করিত। কখনো কখনো এই সকল র্দুদান্ত প্রাণীর সহিত মল্লযুদ্ধ করিবার জন্য এক-এক দল লোক প্রস্তুত করা হইত এইসকল যোদ্ধা গ্ল্যাডিয়েটর নামে প্রসিদ্ধ ছিল। অতি সামান্য অস্ত্রশস্ত্র লইয়া ইহাদিগকে সিংহ, ব্যাঘ্র প্রভৃতির সহিত যুদ্ধ করিতে হইত। কখনো কখনো বা ইহারা পরস্পর মারামারি করিয়া প্রাণত্যাগ করিত। দুরন্ত জন্তুর গ্রাসে পড়িয়া, অথবা প্রতিদ্বন্ধী অন্য গ্ল্যাডিয়েটরের অস্ত্রাঘাতে আহত হইয়া কাহাকেও কাতর কণ্ঠে চিৎকার করিতে শুনিলে, এইসকল পশু-প্রকৃতি নরনারী উল্লাসে নৃত্য করিতে থাকিতে! কী ভয়ানক ব্যাপার! মানুষ কতদূর পশ্চাচার প্রাপ্ত হইলে, অপর নির্দোষ ব্যক্তিকে দুরন্ত জন্তুর গ্রাসে অথবা বলবান প্রতিদ্বন্ধীর হস্তে ক্ষতবিক্ষত শরীরে, ছটফট করিতে দেখিয়া আনন্দ প্রকাশ করিতে পারে, তাহা আমরা কল্পনাও করিতে পারি না! মানুষের ইহা অপেক্ষা আর কী অধোগতি হইতে পারে! নিতান্ত দুঃখের বিষয় এই যে, রোমীয় নারীগণও সেই সকল পৈশাচিক অভিনয় দর্শন করিতে লজ্জাবোধ করিত না।
সময় সময় রোমীয়গণের এই নিষ্ঠুরতার পরিমাণ এতদূর বৃদ্ধি পাইত যে, মনে হইলে এখনও শরীর শিহরিয়া উঠে! সম্রাট ক্লডিয়সের সময়, রোমীয় সৈন্যগণ কোনো একটি যুদ্ধে জয়লাভ করে। তাহাতে দেশব্যাপী আনন্দ উৎসবের ধুম পড়িয়া যায়। তখন ক্রমান্বয়ে ১২৩ দিন ধরিয়া কলোসিয়াম ক্রীড়া প্রদর্শিত হয় এবং সেই নারকীয় যজ্ঞের আহুতিরূপ এগারো হাজার জন্তু এবং দশ হাজার গ্ল্যাডিয়েটর প্রাণদান করিতে বাধ্য হয়! আর একবার পাঁচ হাত র্দুদান্ত সিংহ ও বহুসংখ্যক গ্ল্যাডিয়েটর ক্রমান্বয়ে পাঁচ দিন ধরিয়া যুদ্ধ করে। এই পাঁচ দিনে সমুদয় সিংহ নিহত হইয়াছিল, কিন্তু কতগুলি গ্ল্যাডিয়েটর যে প্রাণত্যাগ করিয়াছিল, ইতিহাসে তাহার উল্লেখ নাই।
কীরূপে এই ভীষণ ক্রীড়া চিরদিনের মতো বিলুপ্ত হইল, এখন সেই কথা বলিব। বিলাসিতা ও পাপাচারে রোমীয়গণের দুর্দশার যখন পরিসীমা ছিল না, সেইসময় সেনাপতি এলারিক একদল প্রবল শত্রু পরাজিত করিয়া রোমনগর রক্ষা করেন। তাহাতে সমুদয় দেশ আনন্দ-উৎসবে মাতিয়া উঠিল এবং সেই সঙ্গে কলোসিয়ম-ক্রীড়ারও আয়োজন হইল। সেই ক্রীড়াগারে প্রথম কতকগুলি নির্দোষ ক্রীড়া প্রদর্শিত হইতে লাগিল, কিন্তু তাহাতে রোমীয়গণের মনস্তুষ্টি হইল না। অবশেষে গ্ল্যাডিয়েটরগণ অগ্রসর হইল এবং অল্পকাল মধ্যেই তাহাদের মর্মভেদী চিৎকার ও দর্শকগণের পৈশাচিক মহোল্লাসে চতুর্দিক প্রতিধ্বনিত হইয়া উঠিল!
তখন এক আকস্মিক ঘটনা ঘটিল। সেই বীভৎস কাণ্ড দর্শন করিয়া রোম-প্রবাসী এক বৃদ্ধ সাধুর প্রাণে বিষম আঘাত লাগিল। তিনি আর স্থির থাকিতে পারিলেন না। ছুটিয়া ক্রীড়াস্থানে উপস্থিত হইলেন, এবং আপনার বাহুযুগল বিস্তার করিয়া উচ্চ কণ্ঠে বলিলেন, ‘কী করো, কী করো! এমন অন্যায় কার্য করিয়ো না! মানুষ হইয়া নিরপরাধ মানুষের রক্তে এমন করিয়া আপনাদের হস্ত কলঙ্কিত করিয়ো না। ঈশ্বরের ন্যায়বিচারে তোমাদের কী ভীষণ দুরবস্থা হইবে, একবার চিন্তা করো।’ সাধুর হিতবাক্যে রোমীয়দের চিত্ত বিচলিত হইল না। তাঁহাকে ক্রীড়াস্থল হইতে বিদূরিত করিবার জন্য, শত শত নরাধম অগ্রসর হইল! কিন্তু তিনি নিরস্ত বা ভীত ইহবার লোক ছিলেন না। সকল বাধাবিপত্তি অগ্রাহ্য করিয়া তিনি প্রাঙ্গণের মধ্যস্থলে দণ্ডায়মান হইলেন এবং কাতর কণ্ঠে দর্শকদিগের প্রাণে দয়ার উদ্রেক করিতে চেষ্টা করিলেন! তখন চতুর্দিকে প্রলয় কাণ্ড উপস্থিত হইল। সকলে ‘মার মার’ করিয়া ছুটিয়া আসিল! দেখিতে দেখিতে বহু অস্ত্র ও প্রস্তুরখণ্ডের দারুণ আঘাতে তিনি ধরাশায়ী হইলেন। নরপশুগণের হস্তে সাধুর পবিত্র জীবন বিনষ্ট হইল।
তিনি আহত হইলেন বটে, কিন্তু সেইসঙ্গে এই লোমহর্ষক ক্রীড়াও চিরদিনের জন্য বিলুপ্ত হইল। যে রোমীয় নরনারী শত শত নিরপরাধ ব্যক্তির মৃত্যুতে বহুকাল সুখ ও আনন্দ উপভোগ করিয়াছে, একটি সাধুর অপঘাত মৃত্যু তাহাদের সেই কঠোর প্রাণকে বিগলিত করিয়া ফেলিল! তখন চারিদেকে হাহাকার পড়িয়া গেল! এই মহাপাপের প্রায়শ্চিত্তরূপ সমুদয় রোমরাজ্য হইতে উক্ত পৈশাচিক ক্রীড়া চিরদিনের জন্য বিলুপ্ত হইল। সেই সাধু আপনার রক্তের দ্বারা পৃথিবীর এই কলঙ্ক প্রক্ষালন করিয়া, স্বর্গে চলিয়া গেলেন।
