ছড়া কবিতা
ময়ূর
আয় রে ময়ূর আয়––
প্যাখম ধরে নেচে নেচে জাদুর কাছে আয়!
আসতে-যেতে ঘুঙুর বাজে, সোনার নূপুর পায়!
ফানুস
দেখতে বটে একটুখানি,
হাজার রঙের ঝকমকানি
এই ফানুসের গায়––
কে দেখবি ছুটে আয়!
এমন বাহার কে দেখেছে!
ইন্দ্রধনু হার মেনেছে,
ভুলটি নাহি তায়––
কে দেখবি ছুটে আয়!
খোকার নাচন
আয় রে আয় টিয়ে
নায়ে ভরা দিয়ে!
না নিয়ে গেল বোয়াল মাছে,
তা দেখে দেখে ভোঁদড় নাচে!
ওরে ভোঁদড় ফিরে চা,
খোকার নাচন দেখে যা!
তু তু
আয় আয় তু তু,
খেতে দেব দুদু!
ল্যাজটি তুলে
নাচবি সুখে,
হাসবে সোনার খুকু!
ভুঁড়োশিয়ালি
বাঁশবনের কাছে
ভুঁড়োশিয়ালি নাচে
তার গোঁফজোড়াটি পাকা,
মাথায় কনকচাঁপা!
কী-জ্বালা
জাঁক দেখাতে কোথাও বুঝি
জুটল নাকো ঠাঁই?
থপথপিয়ে বসলে এসে
সিঁড়ির উপর তাই?
কটমটিয়ে চেয়ে আছ
জ্বলছে দুটো তারা,
ভাবছ বুঝি, তোমার ভয়ে
অমনি যাব মারা!
দুই ভাই
আমরা দুটি ভাই
শিবের গাজন গাই
একটি দুটি পয়সা পেলে
বাড়ি ফিরে যাই।
খোকা
খোকা আমাদের সোনা
স্যাকরা ডেকে মোহর কেটে
গড়িয়ে দেব দানা––
তোমরা কেউ কোরো না মানা!
মাসির বাড়ি
তাই তাই তাই,
মাসির বাড়ি যাই
মাসির বাড়ি ভারী মজা
কিল চড় নাই।
ছবি আঁকা
খুকুরানি খুকুরানি
করছ তুমি কী?
এই দেখো, না, কেমন আমি
ছবি এঁকেছি।
বাপ ধন
বাপ ধন-ধন-ধনা!
পুঁথি হাতে পড়বে মানিক,
দুলবে কানে সোনা––
আমার বাপ ধন-ধন-ধনা।
ফুলের বন
ধন ধন ধন,
বাড়িতে ফুলের বন!
এ ধন যার ঘরে নাই,
তার কীসের জীবন।
হাসি
হাসিখুশি মুখ দুখানি,
সদাই হাসি ভরা
ভাই-বোনেতে হেসে হেসে
মাতিয়ে তোলে ধরা।
হাসির ছটা হাসির ঘটা,
উঠছে হাসির ঢেউ
জন্মে কভু এমন হাসি
দেখেনি কো কেউ!
চাঁদের মতো চাঁদ
| পাগল বুঝি | হল এরা | চাঁদের শোভা দেখে, |
| উছলে পড়া | হাসিটুকু | নেবে বুঝি মেখে! |
| ভাই-বোনেতে | পেতেছে আজ | চারটি চোখের ফাঁদ, |
| সাধ্যি কী যে | বাঁধন ছিঁড়ে | পালিয়ে যাবে চাঁদ! |
| যেতে যেতে | থেমেছে চাঁদ | হল না আর যাওয়া, |
| কোথায় পাবে | এমন ধারা | চারটি চোখের চাওয়া! |
| ভাবছে এরা, | কেমন করে | যাবে চাঁদের কাছে, |
| ভাবতেছে চাঁদ, | চাঁদের মতো | আরও তো চাঁদ আছে। |
ছেলেমেয়ে
| পরির দেশে | মনের সুখে | থাকত ছেলেমেয়ে, |
| হাসির ছটায় | মুখ দুখানি | থাকত সদা ছেয়ে। |
| ফুলের মতো | কচি মুখে | তারার মতো আঁখি, |
| খেলার সাথি | ছিল তাদের | বনের যত পাখি। |
| সুর মিলায়ে | পাখির তানে | করত তারা গান |
| আকুল হয়ে | উঠত হৃদয়, | জুড়িয়ে যেত প্রাণ! |
| বনে বনে | ফিরত তারা | পাখির সনে গেয়ে, |
| পরির দেশে | মনের সুখে | থাকত ছেলেমেয়ে। |
খোকার স্বপ্ন
ঘুমিয়ে ছিল খোকনমণি
মায়ের কোল ঘেঁষে
কী যেন এক স্বপ্ন দেখে
উঠল ভারী হেসে।
দোয়াত আর কলমে যেন
চলছে হাতাহাতি,
পেনসিল সে তেড়ে এসে
স্লেটকে মারে লাথি।
বেতের চেয়ার লাফিয়ে ওঠে।
টেবিলখানার ঘাড়ে,
লেখার খাতা প্রথম ভাগের
ঝুঁটি ধরে নাড়ে।
পড়ার ঘরে বেধে গেছে
রুশ-জাপানি রণ,
আর কি খোকা থাকতে পারে
ঘুমে অচেতন?
জেগে উঠে বসল খোকা
স্বপ্ন মনে আসে,
যতই ভাবে ততই বেশি
খলখলিয়ে হাসে।
ভাই-বোন
তিনটি বোন আর চারটি ভায়ে রয়েছি এক ঠাঁই,
সবাই মিলে সাতটি মোরা, ভুলটি তাতে নাই!
মিলেমিশে থাকতে মোরা বড়োই ভালোবাসি,
বুকে, মুখে, হাতে, পায়ে তাই তো মেশামেশি।
ভাই-বোনেতে এমনি ধারা মিলন যদি হয়,
হোক না কেন যতই বিপদ, নাইকো তাতে ভয়।
হেসে খেলে বেড়াই সদা, সুখের সীমা নাই,
ভাই-বোনেতে সাতটি মোরা, গুনে দেখো ভাই।
তুমি কে?
খোকন, ফুলের তুমি কে?
দেখছি যেন তেমনি হাসি
তোমার হাসিতে!
খোকন ফুলের তুমি কে?
খোকন, পাখির তুমি কে?
শুনছি যেন সেই কাকলি
তোমার বুলিতে!
খোকন, পাখির তুমি কে?
খোকন, চাঁদের তুমি কে?
মুখটি যেন তেমনি উজল
সুধার রাশিতে!
খোকন, চাঁদের তুমি কে?
খোকন, মায়ের তুমি কে?
বুক-জুড়ানো ধনটি এমন
আর তো দেখিনে!
খোকন, মায়ের তুমি কে?
ওগো, এতটুকুন ছেলে!
এমনতর পাগল-করা
মূর্তি কোথা পেলে?
ওগো, এতটুকুন ছেলে!
মায়ের চুমা
ঘুমিয়ে যখন থাকি,
মায়ের চুমা ফুটিয়ে তোলে
আমার দুটি আঁখি!
হাসলে আবার চুমা,
থাকলে জেগে, চুমা দিয়ে
বলেন, ‘খুকু ঘুমা!’
কাঁদলে আমি পরে,
অমনি যেন ধারার মতো
হাজার চুমা ঝরে!
মায়ের মুখের ছড়া,
তাও যেন ঠিক চুমার মতো
সুধা দিয়ে গড়া!
নাইকো চুমার শেষ,
চুম-চুমা-চুম, চুম-চুমা-চুম,
চলছে মজা বেশ!
সেই ভালো
আমি যদি হতাম কুকুর,
তুমি হতে চারু,
ভেব না যে সুখটা বেজায়
বেড়ে যেত কারু!
তোমায় তখন পড়তে হত
সন্ধ্যা-সকাল বেলা,
লিখতে হত ক, খ, গ, ঘ,
ভুলতে হত খেলা।
পাঁচ দ্বিগুণে কত হয়,
এক ডাকে না হলে,
রামা শ্যামা এসে তোমার
কানটা দিত মলে।
আর, আমায় তখন চলতে হত
বকলেসটা পরে
ভালোবেসে ডাকত না কেউ
খাবার হাতে করে!
এমন ঘরে থাকতে হত––
ভূতের মতো কালো
তার চাইতে যেমন আছি,
তেমনি থাকাই ভালো!
সাধের ঘোড়া
রোজ সকালে খোকনমণি
দিদির সাথে তার,
সাধের ঘোড়া চড়ে সুখে!
বেড়ায় চারিধার!
‘হ্যাট -হ্যাট-হ্যাট জলদি চল’,
যতই খোকা বলে,
থপ-থপ-থপ খোকার ঘোড়া
ততই নেচে চলে।
আদর পেয়ে দুষ্টু পশু
হিংসা গেছে ভুলে
ছুটে ছুটে খাবার খেতে
মুখটি আসে তুলে!
ভালোবাসায় বনের পশু
ধরা দিতে আসে
শিশুর মতো সরল হলে
সবাই ভালোবাসে!
প্রার্থনা
জগতের পিতা তুমি
করুণা নিধান,
হীনমতি শিশু মোরা
দুর্বল অজ্ঞান।
ছোটো প্রাণে আমাদের
দাও ভালোবাসা,
ছোটো ছোটো মুখে দাও
স্বরগের ভাষা
শিখাও এ ছোটো কণ্ঠে
তব নাম-গান!
সুখে দুঃখে চিরদিন
যেন দয়াময়,
তোমাতে সুমতি থাকে,
পাপ পথে ভয়
এই আশীর্বাদ, প্রভু,
করো সবে দান।
অসহায় সন্তানের
সাথে সাথে থাকো,
তোমার কার্যেতে সদা
নিয়োজিত রাখো
ধন্য হোক এই ক্ষুদ্র
দেহ, মন, প্রাণ!
প্রজাপতি
ফুলের দলের প্রজাপতি
হাসির পরে হাসি!
এমন শোভা দেখতে আমি
বড়োই ভালোবাসি!
উড়ে উড়ে কেমন তারা
বেড়ায় নেচে নেচে
ইন্দ্রধনু দিয়ে পাখা,
জানো, কে এঁকেছে?
যাঁর দয়াতে গোলাপ ফোটে––
লোহিত বরণ মাখা,
যাঁর দয়াতে হাসির ছটায়
শিশুর আনন ঢাকা।
রবি-শশী ফুটিয়ে জগৎ
আলো করেন যিনি
প্রজাপতির পাখায় হেন
সাজ দিয়াছেন তিনি!
প্রার্থনা সংগীত
| ছোটো শিশু মোরা | তোমার করুণা | হৃদয়ে মাগিয়া লব |
| জগতের কাজে | জগতের মাঝে | আপনা ভুলিয়া রব। |
| ছোটো তারা হাসে | আকাশের গায়ে | ছোটো ফুল ফুটে গাছে |
| ছোটো বটে, তবু | তোমার জগতে | আমাদেরো কাজ আছে। |
| দাও তবে প্রভু | হেন শুভমতি, | প্রাণে দাও নব আশা |
| জগত মাঝারে | যেন সবাকারে | দিতে পারি ভালোবাসা। |
| সুখে দুখে শোকে | অপরের লাগি | যেন এ জীবন ধরি |
| অশ্রু মুছায়ে | বেদনা ঘুচায়ে | জীবন সফল করি।। |
চরণে প্রণাম
‘ছোটো পাখি, ছোটো পাখি, বলো গো আমায়,
এত মিষ্ট গান তুমি শিখিলে কোথায়?’
‘যাঁহার কৃপাতে, ভাই লভিয়াছি প্রাণ,
ক্ষুদ্র এই কণ্ঠে তিনি দিয়াছেন গান।’
‘রাঙা ফুল রাঙা ফুল, বলো দেখি মোরে,
কে দিয়াছে এত হাসি কচি মুখ ভরে?’
‘জল-স্থল সব ভাই, রচেছেন যিনি,
আমার এ মুখে হাসি দিয়াছেন তিনি।’
‘খুকুরানি, খুকুরানি, অন্ধকার রাতে
একেলা ঘুমায়ে কি গো থাক বিছানাতে?’
‘না থাকি একেলা ভাই, জগৎ-জননী
আমার শিয়রে বসি থাকেন আপনি।’
‘ফুল, পাখি, খুকুরানি তোমরা সকলে
কত ভালো কথা আজ আমারে শুনালে।
সকলের প্রতি এত ভালোবাসা যাঁর,
চরণে তাঁহার কোটি প্রণাম আমার।’
সুখের মিলন
[পাখি ও বালিকা]
বালিকা : খাঁচায় বেঁধে এমন করে
রাখব না আর পাখি তোরে,
কোমল প্রাণে ব্যথা দিতে
প্রাণটা ফেটে যায়
যা উড়ে যা, বনের পাখি,
মনটা যেথা চায়!
পাখি : ভালোবাসায় দিছি ধরা,
প্রাণটা আমার সুখে ভরা,
এমন কচি হাতের পরশ
আর কোথা বা মেলে?
কীসের আশায় যাব রে ভাই
এতটা সুখ ফেলে!
বালিকা : স্বাধীনভাবে আপন মনে,
ফিরগে যা তুই বনে বনে!
হরষ-রবে আকাশ-পাতাল
ফেলগে যা রে ছেয়ে
নূতন জীবন মিলবে সেথা,
নূতন আহার পেয়ে!
পাখি : বনটা অতি সুখের বটে,
সলিল আছে নদীর তটে,
তরুর শাখে মধুর রসাল
ঝুলছে কত ফল
কিন্তু এত আদর যতন
করবে কে বা বল?
বালিকা : ভালোবাসা চাস যদি রে,
মাঝে মাঝে আসিস ফিরে,
মেলিয়ে পাখা নৃত্য করে
বসিস কাছে এসে
সুখের সাথি মিলবে, পাখি
উড়ে যা তোর দেশে।
পাখি : সুখের সাথি চাই না রে ভাই
স্বাধীনতার মুখেতে ছাই,
খাঁচায় বসে মনের সুখে
কাটুক দিবস যামি
এমন সুখটি ছেড়ে যেতে
পারব না ভাই আমি!
মজার মুল্লুক
এক যে আছে মজার দেশ,
সব রকমে ভালো,
রাত্তিরেতে বেজায় রোদ,
দিনে চাঁদের আলো!
আকাশ সেথা সবুজ বরন,
গাছের পাতা নীল
ডাঙায় চরে রুই কাতলা
জলের মাঝে চিল!
সেই দেশেতে বেড়াল পালায়
নেংটি ইঁদুর দেখে
ছেলেরা খায় ‘ক্যাস্টর-অয়েল’
রসগোল্লা রেখে!
মন্ডা-মিঠাই তিতো সেথা,
ওষুধ লাগে ভালো
অন্ধকারটা সাদা দেখায়,
সাদা জিনিস কালো!
ছেলেরা সব খেলা ফেলে
বই নে বসে পড়ে
মুখে লাগাম দিয়ে ঘোড়া
লোকের পিঠে চড়ে!
ঘুড়ির হাতে বাঁশের লাটাই,
উড়তে থাকে ছেলে
বঁড়শি দিয়ে মানুষ গাঁথে,
মাছেরা ছিপ ফেলে!
জিলিপি সে তেড়ে এসে,
কামড়ে দিতে চায়
কচুরি আর রসগোল্লা
ছেলে ধরা খায়!
পায়ে ছাতি দিয়ে লোকে
হাতে হেঁটে চলে
ডাঙায় ভাসে নৌকা জাহাজ,
গাড়ি ছোটে জলে!
মজার দেশের মজার কথা
বলব কত আর
চোখ খুললে যায় না দেখা
মুদলে পরিষ্কার!
বীর শিশু
আমরা যেমন বীর শিশু––
তেমন আর কে?
ভয় ভাবনা কাকে বলে
কিছুই জানিনে!
ও বাবা গো, ওটা কী গো?
জন্মে কভু দেখিনি কো––
এত বড়ো হাঁ!
আজকে বুঝি ফেললে গিলে––
মা––গো––মা!
পালা পালা––ছুটে পালা,
আসছে তেড়ে বাগিয়ে গলা,
ধরলে বুঝি শেষে!
কে আছিস ভাই, আয় না ছুটে––
বাঁচিয়ে দে না, এসে!
বাপ রে বাপ বিষম সাহস,
সন্দেহ কী তার,
বীর না হলে পাখির ভয়ে
পালায় কে বা আর!
সাপ নয় তো––যম!
সাপ নয় তো––যম!
টবটা নিয়ে চাপা দিয়ে,
ফাটিয়ে দেব দম!
যেমন তুমি খল,
কারাগারে অন্ধকারে
ভোগো প্রতিফল!
বাহবা কী মজা,
সিংহাসনে বসে আছি,
কিষ্কিন্ধ্যার রাজা!
উঃ জ্বলে মলুম বাপ!
ল্যাজের গোড়ায় ছুবলেছে রে
হতভাগা সাপ!
প্রাণটা বুঝি যায়!
ল্যাজটা ফুলে কলার গাছ––
করি কী উপায়!
মুখ থুবড়ে পড়ি বুঝি,
হায় হায় হায়!
দুষ্টু তিনু
গড়্গড়––ঘড়ঘড়
চলিয়াছে গাড়ি
তিন লাফে এল তিনু
ছুটে তাড়াতাড়ি
ফাঁকি দিয়া গাড়ি চড়া,
এই তার কাজ
মনে ভাবে, ভারী মজা
করিবে সে আজ।
চেপেচুপে বসে তিনু,
হয়ে গদিয়ান
‘পিছু কেন ভারী ঠেকে’––
ভাবে কোচম্যান।
ছড়ি গাছা লয়ে হাতে,
মিয়া ছাদে চড়ে
মনে মনে হাসে তিনু––
ভয় নাই ধড়ে।
হামা দিয়া কোচম্যান
গুটিগুটি যায়
ঝুপ করে নেমে তিনু
ঢুকিল তলায়।
হেঁট হয়ে কোচম্যান
দেখে চারিধার
কোথা গেল তিনকড়ি––
খোঁজ মেলা ভার!
রেগে জ্বলে নামে মিয়া––
থরথর কাঁপে
তিনকড়ি তরতর
গাড়ি পরে চাপে।
কোচম্যান ভ্যাবাচ্যাকা,
সারা গায়ে ঘাম
মহা খুশি তিনকড়ি––
ধরিল লাগাম।
তার পরে দিল ঘোড়া
জোরে ছুটাইয়া
পথে পড়ে হাহাকার
করে বুড়ো মিয়া।
পেটুক দামু
তিনটে কলা পেয়ে দামুর
মনটা কেমন করে,
গণ্ডা দশেক হলে তবে
পেটটা তাহার ভরে।
খেতে খেতে যাচ্ছে দামু
মুখটা করে ভার,
দুষ্টামি এক গজিয়ে ওঠে
মস্তকে তাহার।
ভাবে দামু, ‘ছোবড়া যদি
ঠিক ফেলতে পারি,
পা পিছলে পড়বে করিম
মজা হবে ভারী!
অমনি কাঁদিসুদ্ধ নিয়ে
সটান দেব পাড়ি
এক্কেবারে উঠব গিয়ে
চণ্ডী ঘোষের বাড়ি।’
এই না ভেবে এসে দামু
পিছন দিক হতে,
চুপিচুপি হাত বাড়িয়ে
ছোবড়া ফেলে পথে।
আর কোথা যায়, একখানি পা
যেই পড়েছে তায়,
পিছলে গিয়ে অমনি করিম
পড়ল দামুর গায়।
হাঁউ-মাঁউ-খাঁউ করে দামু
ঠোঁট দুখানি কাঁপে
পিঠটা বুঝি গেল ভেঙে
করিম মিয়ার চাপে!
পেটের চেয়েও পিঠের জ্বালা
দামু কেঁদে সারা
তার প্রতিফল পায়, যেমন
কাজটি করে যারা!
লোভের সাজা
দুইটি জিরাফ বাঁধা ছিল গাছের দুটি ডালে,
কোথা হতে সিংগিমশাই এলেন হেনকালে
ফুলিয়ে কেশর হুহুংকার ছাড়েন পশুরাজ,
জিরাফ ভাবে, আকাশ ভেঙে পড়ল বুঝি বাজ!
ভয়েতে প্রাণ উড়ে গেল, রক্ষা নাহি আর,
যমের হাত এড়িয়ে যাবে, সাধ্য হেন কার!
সিংহ ভাবে, ঘাড়টি ভেঙে এইবারেতে খাই,
জিরাফ ভাবে, বাঁচতে হলে দড়ি ছেঁড়া চাই।
এই না ভেবে, জিরাফ দুটো প্রাণপণে দেয় টান,
আস্ত সে গাছ অমনি চিরে হল দুই খান।
হাতের শিকার পলায় দেখে ব্যস্ত পশুরাজ,
একটি লাফে পড়লেন ঠিক চেরা-ডালের মাঝ।
ঠিক তখনি বাঁধন-দড়ি হঠাৎ গেল ছিঁড়ে,
সজোরে দুই চেরা-ডাল আবার এল ফিরে
চেপটে গিয়ে সিংগিমশাই করেন হাঁই-ফাঁই,
ইঁদুর যেমন কলে পড়ে, তাঁহার দশাও তাই।
অনুতপ্ত সন্তান
দোহাই বাবা, রাগ কোরো না,
ফিরে চলো ঘরে
তরকারি ভাত ঠান্ডা হল,
মায়ের আঁখি ঝরে।
টানব না আর ল্যাজটি ধরে
মারব নাকো লাফ
দাঁত-খিঁচুনি মুখ-ভ্যাঙানি
এবার করো মাপ।
বলবে যা, তা করব আমি
হব বেজায় সৎ,
দোহাই বাবা, পায় ধরছি,
দিচ্চি নাকে খত!
বইটি নিয়ে পড়ব বসে
সারা সকাল বেলা
এক্কেবারে ভুলব আমি
কিষ্কিন্ধ্যার খেলা।
খাবার পরে ঢুলবে যখন
নাক ডাকাবে কষে
গায়ের উকুন, পাকা চুল
বাছব বসে বসে!
দোহাই বাবা, রাগ কোরো না,
খিদেয় মলুম জ্বলে
এই বারটি ক্ষমা করো
অবোধ শিশু বলে!
আচ্ছা জব্দ
কাণ্ডটা কী তোমার বাপু
বনের শিকার ছেড়ে,
লোভের দায়ে, শেষে কিনা
আমায় এলে তেড়ে!
বৃথা তোমার কষ্ট পাওয়া,
ভালুক বাবাজি!
না হোক শুধু প্রাণটি যাবে
খেয়ে ডিগবাজি।
হা-হা-হা, হো-হো-হো
কেয়াবাত কেয়াবাত
কেমন জব্দ–– ঠিকরে উঠে
একদম চিৎপাত!
তেড়ে আসার যতটা সুখ
অনেকটা তো পেলে
বাকিটুকু পাবে জাদু
সোজা নেমে এলে!
এখন কেন ছটফটানি––
ফোঁসফোঁসানি রোষে!
ভবের লীলা ঘুচল তোমার
আপন কর্মদোষে!
ফড়িংবাবুর বিয়ে
ফড়িংবাবুর বিয়ে!
টিকটিকিতে ঢোলক বাজায়,
ধুচনি মাথায় দিয়ে!
বেয়ারা হল তেলাপোকা
পালকি কাঁধে নিয়ে!
দেখতে এল সেজেগুজে,
পিঁপড়েরা মায়ে-ঝিয়ে।
আরে, ফড়িংবাবুর বিয়ে!
ফড়িংবাবুর বিয়ে!
ঘাসের পাতা লুচি হল
ভাজা শিশির-ঘিয়ে!
দই সন্দেশ তৈয়ার হল
মাটিতে জল দিয়ে!
ব্যাঙের ছাতার নীচে সবে
খেতে বসল গিয়ে!
আরে, ফড়িংবাবুর বিয়ে!
টুনি নাচে টুপি এঁটে,
নেংটি ইঁদুর দামা পেটে
হেলিয়ে দুলিয়ে!
আরে, ফড়িংবাবুর বিয়ে!
ল্যাজে গেরো
সারাটা দিন খেটে খেটে করছে কেমন গা,
একটুখানি না জিরুলে আর তো বাঁচি না।
ওরে বাস রে, কীসের আওয়াজ! কী যেন ওই ডাকে!
বাঘের গায়ের গন্ধ যেন পাচ্ছি আমি নাকে!
মুখ দেখে কার উঠেছিনু আজ সকালে ভাই,
এক্কেবারে বাঘের মুখে পড়ে গেলাম তাই!
ভাগ্যে হেথা পিপে ছিল, মোদের কপালগুণে,
তা না হলে ভবের লীলা ঘুচত এতক্ষণে!
অই রে বাবা, লাফ মেরেছে, এবার দফা সারা,
দুই জনে আজ বাঘের পেটে গেলাম বুঝি মারা!
পিপের উপর বসল এসে, পড়ল সেটা ঝুঁকে,
উলটে যদি চাপা পড়ে, তবেই আপদ চুকে!
যা ভেবেছি, তাই হয়েছে, মোদের কপাল জোরে,
বন্দি হলেন ব্যাঘ্রমশাই পিপে চাপা পড়ে।
ছেঁদা দিয়ে বেরিয়েছে ল্যাজ, ধরছি আমি তাই,
তুই আমারে শক্ত করে ধরে থাকিস ভাই!
খুব জোরে ভাই টেনে রাখিস
হঠাৎ গেলে ছেড়ে,
উলটে ফেলে পিপে, আবার
আসবে বাঘা তেড়ে!
লোভটা যেমন তাহার উচিত
শাস্তি দিয়ে শেষে,
দুই ভায়েতে বাড়ির পানে
যাব হেসে হেসে!
কেমন জব্দ, ল্যাজের ডগায় বেঁধে দিছি গেরো,
পারিস যদি দুষ্টু বাঘা, এবার তবে বেরো।
লাফিয়ে বড়ো এসেছিলি, মুখটা করে হাঁ,
এখন কেন ছটফটানি গোঁ-গোঁ-গাঁ-গাঁ।
কাজের ছেলে
‘দাদখানি চাল, মুসুরির ডাল,
চিনি-পাতা দই,
দুটা পাকা বেল, সরিষার তেল,
ডিম ভরা কই।’
পথে হেঁটে চলি, মনে মনে বলি,
পাছে হয় ভুল
ভুল যদি হয়, মা তবে নিশ্চয়,
ছিঁড়ে দেবে চুল।
‘দাদখানি চাল, মুসুরির ডাল,
চিনি-পাতা দই
দুটা পাকা বেল, সরিষার তেল,
ডিম-ভরা কই।’
বাহবা বাহবা–– ভোলা ভুতো হাবা
খেলিছে তো বেশ!
দেখিব খেলাতে, কে হারে কে জেতে
কেনা হলে শেষ।
‘দাদখানি চাল, মুসুরির ডাল,
চিনি-পাতা দই,
ডিম-ভরা বেল, দুটা পাকা তেল,
সরিষার কই।’
ওই তো ওখানে ঘুড়ি ধরে টানে,
ঘোষেদের ননী
আমি যদি পাই, তা হলে উড়াই,
আকাশে এখনি!
‘দাদখানি তেল, ডিম-ভরা বেল,
দুটা পাকা দই,
সরিষার চাল, চিনি-পাতা ডাল,
মুসুরির কই।’
এসেচি দোকানে–– কিনি এইখানে,
যত কিছু পাই
মা যাহা বলেছে, ঠিক মনে আছে,
তাতে ভুল নাই।
‘দাদখানি বেল, মুসুরির তেল,
সরিষার কই,
চিনি-পাতা চাল, দুটা পাকা ডাল,
ডিম ভরা দই।’
হিতে বিপরীত
যা ভেবেছি তাই!
ইঁদুরের অত্যাচারে
বাঁচবার জো নাই!
থাকি লাঠি নিয়ে বসে,
যেই বেরুবে, ধপাস করে
লাগিয়ে দেব কসে!
ধপ––ধপাং––ধাস!
বাবা রে, গেলুম যে রে,
এ কী সর্বনাশ!
ইঁদুর তো মলো!
মাথায় পট্টি বেঁধে এখন
হাসপাতালে চলো!
একে আর
নামটি আমার মেহের আলি,
শিকার করে কাঠবিড়ালি
হলেম আমি বুড়ো
গর্তে ঢুকে বাঁচবে নাকো,
মারব জ্বেলে নুড়ো।
কোথায় আছে চক্ষু বুজে
ঢুকিয়ে মাথা গর্ত খুঁজে
দেখব চারিধার
হাতের কাছে পড়লে, গলা
ধরব টিপে তার।
উ-হু-হু––গেলুম গেলুম,
দাড়ি কি সয় এত জুলুম,
ছাড় রে তাড়াতাড়ি
কাঠবিড়ালির ল্যাজ নয় রে,
ও যে আমার দাড়ি!
অন্ন শুধু মারবে বসে
দাড়ির গোছা ছিঁড়বে কষে
আচ্ছা কুকুর বটে
তা না হলে তোমায় এনে
এমন বিপদ ঘটে!
ঘুমের ওষুধ
আফ্রিকাতে কাটায় সুখে
কাফ্রি বারো মাস
সেইখানেতে ‘কংগো’ দেশে
‘জাম্বো’ করে বাস।
গেঁটে-গাঁট্টা চেহারাটা
বেজায় তেজীয়ান
কতকটা ঠিক সিন্ধুঘোটক,
কতক জাম্বোবান!
হৃষ্টপুষ্ট কেলেকেষ্ট
চাট্টে তাহার ছেলে
রাত্তির-দিন ঘুমোয় শুধু
কাজকর্ম ফেলে!
কুম্ভকর্ণ হার মেনে যায়,
এমনি নাকের ডাক
কড়ি-বরগা কাঁপতে থাকে,
ছাদ যেন হয় ফাঁক!
কিছুতে ঘুম ভাঙে নাকো––
মুশকিল যে বড়ো
নাকে ঘুসি লাগাও, কিংবা
পিঠের উপর চড়ো!
একদিন ‘সাম্বোরে’ ডেকে
জাম্বো বলে হেঁকে,
‘শক্ত দেখে চাট্টে কড়া,
আনগে দোকান থেকে।’
বুকের উপর চড়ে জাম্বো
দুটো আর দুটো––
চাট্টে নাকে বড়োসড়ো
কল্লে চাট্টে ফুটো!
সেই ফুটোতে লাগিয়ে কড়া
বলে জাম্বোবান,
‘বঁড়শি দিয়ে এবার সাম্বো,
খুব কষে দে টান!’
কানে থেকে কান অবধি
অমনি হল হাঁ
চাট্টে ষাঁড়ে চ্যাঁচায় যেন
গাঁ––গাঁ––গাঁ––!
‘ঘুমের ওষুধ ঠিক ধরেছে,’
সাম্বো হেসে কয়
থুম-থুমা-থুম নাচে জাম্বো
স্ফূর্তি অতিশয়!
তোমরা পাঠক, কেউ যদি এ
ব্যাধিগ্রস্ত থাকো
কংগো থেকে ওষুধ এনে
পরখ করে দেখো!
অবাক কাণ্ড
অবাক কাণ্ড, ভাই!
এমন ব্যাপার আর কখনো,
জন্মে দেখি নাই!
পথের ধারে,––বাপ রে বাপ,
প্রকাণ্ড দুই পাহাড়ে সাপ,
রোষে ফোঁসফোঁসায়,
সামনে কেহ পড়লে যেন
অমনি গিলে খায়!
অবাক কাণ্ড ভাই!
এমন ব্যাপার আর কখনো
জন্মে দেখি নাই!
দিশেহারা খিদের চোটে––
তড়াক করে লাফিয়ে উঠে
ধরলে এ উহায়
পেটের জ্বালা ঘুচল বটে,
প্রাণ বাঁচানো দায়!
অবাক কাণ্ড ভাই!
এমন ব্যাপার আর কখনো
জন্মে দেখি নাই।
নামমাত্র যখন বাকি,
তখন দুয়ে মুখোমুখি,
উগরে ফেলতে চায়
প্রাণের তরে টানাটানি
কিন্তু নিরুপায়!
অবাক কাণ্ড ভাই!
এমন ব্যাপার আর কখনো
জন্মে দেখি নাই।
দেখতে দেখতে কী যে হল––
কোথায় যেন মিলিয়ে গেল
ভেলকি বাজি প্রায়।
এখনও তো মনে হলে
দিচ্ছে কাঁটা গায়!
ফোঁস কেউটে
ফোঁস কেউটে ফোঁ!
বাগিয়ে ফণা ছোবল দিতে
এত কেন গোঁ?
ফোঁস কেউটে ফোঁ!
ভালো যদি চাও,
ফণাটি গুটাও,
যমের দোসর কেরানি-পাখি,
ভুলে কেন যাও?
খেলে তাহার ডানার ঝাড়া,
বেরিয়ে যাবে ফণা নাড়া,
ভাঙবে তোমার বিষের দাড়া,
ঘুরবে মাথা ভোঁ!
ফোঁস কেউটে ফোঁ!
উচিত শিক্ষা
গাছের ডালে ফলটি পেকে
করতেছে টুকটুক
উৎসাহেতে উঠল নেচে
ষণ্ডা হাতির বুক।
জিরাফ ভাবে, লম্বা গলা
কীসের তরে ধরি?
শুঁড় বড়ো কি গলা বড়ো,
আজকে পরখ করি!
হাতি ভাবে, নিরিবিলি
ফলটা খেতে চাই
কোথা থেকে আপদ এসে
জুটল এ বালাই!
যতই ভাবে, রাগে তাহার
অঙ্গ জ্বলে যায়
চক্ষু দুটো মাথায় তুলে
কটমটিয়ে চায়!
মুখের গ্রাসটা কেড়ে খাবে,
এত বড়ো বাড়
রাগের চোটে ধরলে হাতি
জিরাফের ঘাড়!
ঘাড়টা যত নুয়ে আসে,
ততই ধরে চেপে
মারামারির গন্ডগোলে
বনটা ওঠে কেঁপে!
কোথায় ছিল ধূর্ত বানর,
একটি লাফে এসে,
ফলটি নিয়ে, বাহার দিয়ে
বসল ডালে হেসে!
দ্বন্দ্ব করে মল দুয়ে
ভরল নাকো পেট
জিরাফ মরে ফোঁসফোঁসিয়ে,
হাতির মাথা হেঁট!
উচিত শিক্ষা
‘ছানা মাখন চুষবে তুমি
পেটটা পুরে ঠেসে
আর, পাত-ঝাটানি চাটব আমি
চোখের জলে ভেসে!
এত আদর নাই বা হল,
ওগো আমার টিয়ে!
চ্যাঁচামেচি রেখে এখন
পালাও প্রাণটা নিয়ে।
চোখ রাঙানি ঢের দেখেছি,
মরি যে তেজ দেখে
একটা ঠেলা খেলে পরেই
ঘাড়টা যাবে বেঁকে!’
‘ঠেলা দেওয়া বেরিয়ে যাবে
ওরে লক্ষ্মীছাড়া!
ল্যাজের দফা করব রফা,
একটুখানি দাঁড়া!
ফিনকি দিয়ে রক্ত ছোটে
মুখে ‘মেয়াউ’ ধ্বনি,
এখন কেন প্রাণটা নিয়ে,
পালাও জাদুমণি!’
বনের রাজা
কালা পেড়ে ধুতি পরা,
কুর্তা আঁটা গায়
বনের রাজা হাতি চড়ে
বন-ভ্রমণে যায়!
বেরিয়ে আছে দন্তপাটি
কিবা চমৎকার!
ঢুলুঢুলু চোখ দুটিতে
বিচিত্র বাহার!
হস্তে শোভে রাজদণ্ড––
ঝলক মারে তায়!
বনের রাজা হাতি চড়ে
বন-ভ্রমণে যায়!
রাজায় যেন দিস না ফেলে
ওরে ভুঁদো হাতি!
ও বানর, তুই শক্ত করে
ধরে থাকিস ছাতি।
লাগে না রোদ বৃষ্টি যেন
রাজারই মাথায়!
বনের রাজা হাতি চড়ে
বন-ভ্রমণে যায়!
রাজার গুণ সে কব কত––
দয়ার অবতার,
ঘাড়টি শুধু ভাঙতে পেলে
মনটা খুশি তাঁর।
জাত-ব্যাবসা ছেড়ে দিতে
কেউ কি কভু চায়?
বনের রাজা হাতি চড়ে
বন-ভ্রমণে যায়!
ব্যাঙত্ব লাভ
নদীর ধারে বসত ছিল
সাহেব সদাগর
টমি, জিমি দুইটি ছেলে––
দুইটি গুণধর!
পড়ার নামে গায়েতে জ্বর,
মাথা কেমন করে
খেলার নামে সকল কষ্ট,
সকল দুঃখ হরে।
ক্রিকেট, টেনিস, ফুটবল,
সকল খেলাই জানে
লিপ ফ্রগ ছেড়ে কিন্তু
যায় না কোনোখানে।
লিপ ফ্রগের এমনি নেশা––
উঠল তারা মেতে
সকাল-বিকাল সেই খেলাটাই
খেলে দুজনেতে।
আর কিছু না ভাবে তারা,
ভাবে, ‘কোলা ব্যাং,
চ্যাপটা মুখ, থ্যাবড়া মাথা
সরু সরু ঠ্যাং।’
রাত্তির-দিন একই খেলা
যতই ভাবে তারা
ততই ক্রমে বদলে গেল
তাদের সে চেহারা!
গোল মাথা চ্যাপটা হল,
লম্বা হল ঠ্যাং
এক্কেবারে হয়ে পড়ল
আস্ত কোলা ব্যাং।
তাই কি শুধু মুখটি গুঁজে
চুপটি করে থাকা!
দিন-রাত্তির গ্যাঙর-গ্যাং
সুর করিয়া ডাকা!
দেশসুদ্ধ ঝালাপালা
সবাই আসে তেড়ে
পালিয়ে যেতে পথ পায় না,
বাপ-মায়েরে ছেড়ে!
টমি, জিমি কোথায় এখন,
জানতে যদি চাও,
নূতন খেলা দেখতে পাবে,
নদীর ধারে যাও!
বিষম সাহস
কাতারে কাতারে সেনা, বাজে রণভেরি,
সেনাপতি জাম্বো বলে, ‘আর নাই দেরি
বাজিছে সমর-ডঙ্কা, হবে ঘোর রণ,
বুক ফুলাইয়া ছুটে চলো সেনাগণ।’
হুংকারিয়া সেনাগণ দম্ভভরে কয়,
‘জয় জয় আমাদের সেনাপতির জয়!’
উৎসাহে ছুটিয়া চলে যত সেনাদল,
বীর পদভরে ধরা করে টলমল।
বন্দুকে সঙ্গিন খাড়া, সাহস দুর্জয়,
ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে আর বলে ‘জয় জয়’!
উঁচু, নিচু, ঢালু নাহি মানে অ্যাঁক ব্যাঁক
হঠাৎ পশিল কানে, ‘প্যাঁক-প্যাঁক-প্যাঁক’।
গুরুগুরু কাঁপে বুক, মাথা গেল ঘুরে,
‘প্যাঁক-প্যাঁক-প্যাঁক’ ওই তেড়ে আসে দূরে!
হতভম্ব সেনাপতি পিছু দিল রড়,
ছত্রভঙ্গ সেনাদল বুক ধড়ফড়।
হটে আর বলে সবে, ‘দেখো দেখো দেখো
ধরে বুঝি খেয়ে ফেলে, প্যাঁক-প্যাঁক-প্যাঁক।’
ছুটিতে ছুটিতে গেল গভীর জঙ্গলে,
পরস্পর সে বীরত্ব বাখানিয়া বলে––
‘সমান সমান যদি হত আজি রণ
দেখাতাম প্যাঁক-প্যাঁক সাহসী কেমন!
আগে মোরা বড়ো হই, দেখা যাবে পরে,
কাপুরুষ প্যাঁক-প্যাঁক কত বল ধরে!’
সামাল সামাল
গাড়ি ছোটে––গড়্গড়,
ঘোড়া হাঁকে––কড়কড়,
বুক কাঁপে––ধড়ফড়,
তোলপাড় মর্ত্যে
ঘরবাড়ি––পড়পড়,
ভাঙে গাছ––মড়মড়,
ঢুকে পড়ো––তড়বড়
ইঁদুরের গর্তে!
পাঠশালা
চ্যাপটা নাকে চশমা আঁটা––
গুরু মহাশয়
কানে কলম, হাতে ছড়ি,
দেখেই লাগে ভয়!
কানটি মলা খেয়ে মল
গোয়ালাদের গুপি
টেবির পড়া হয়নি বলে
মাথায় গাধার টুপি!
আর সকলে ভয়ে ভয়ে
মিটির মিটির চায়
কার কপালে কী যে আছে
বলা নাহি যায়।
এক গুরুতে জগৎ মাত––
কাঁপে পোড়োর দল
মুখে শুধু–– ‘কেঁউ কেঁউ’,
চোখে শুধু জল!
বিড়াল ও ইঁদুর
বিড়াল। ইঁদুর ভায়া, ইঁদুর ভায়া, ঘরে আছ হে?
ইঁদুর। রাত্তিরেতে ডাকাডাকি করছ তুমি কে?
বিড়াল। ভালোবাসার বন্ধু আমি তোমার আপন জন,
প্রাণের টানে শুধু আমার হেথায় আগমন।
ইঁদুর। ও হো হো, বন্ধু বটে! সামনে আছিস কে?
ঘাড় ভাঙতে যম এসেছে দরজা এঁটে দে!
বিড়াল। ছি-ছি-ছি! ছি-ছি-ছি! এই কি উচিত কাজ?
অপমানের বোঝা লয়ে ফিরব আমি আজ!
ইঁদুর। আর কেন রে জ্বালাস মিছে, যা না যেথা খুশি,
তোর চালাকি বুঝতে বাকি নাই রে দুষ্টু পুসি!
মুখটি রে তোর সুধা ঢালে, মনটি বিষের জালা,
বাঁচতে যদি সাধ থাকে তো প্রাণটি নিয়ে পালা!
যেমন কর্ম তেমনি ফল
এক যে ছিল মুটকি বেড়াল, নামটা ছিল ‘হুনো’,
কাজের মধ্যে আঁকড় কামড় এমনি সেটা বুনো!
আশপাশেতে অন্য বেড়াল দেখতে যদি পেত,
দাঁত খিঁচিয়ে অমনি তারে কামড়াতে সে যেত।
আজ সকালে ঘটল যে তাই, বড়োই মজা ভাই,
সেই কথাটা যতই ভাবি, হেসেই মারা যাই।
হয়েছে কী,––আরশি পরে নিজের মূর্তি দেখে,
ভাবলে হুনো, অন্য বেড়াল এল কোথা থেকে!
এই না ভেবে, রাগের চোটে, উঠল পুসি ফুলে,
কামড়াতে তায় গেল ছুটে, ল্যাজটা সোজা তুলে।
যেমন কর্ম তেমনি ফল ঘটল হাতে হাত,
আরশিখানার আঘাত লেগে ভাঙল দুটো দাঁত!
তোমরা তো ভাই গল্প শুনে বেজায় হলে খুশি,
ওদিকে যে দাঁতের জ্বালায় কাঁদছে বসে পুসি!
হায় রে কপাল
ছিপটি হাতে নিয়ে
বসল মিয়া চেপে চুপে
নদীর ধারে গিয়ে।
‘চারটি’ মেখে ফেলা,
দলে দলে রুই, কাতলা
জুটল এসে মেলা!
টানটি যেমন মারা,
দাড়ির সাথে জড়িয়ে সুতা
মিয়ার দফা সারা!
মাছের দাপাদাপি,
চড়-চড়র-চড় ছেঁড়ে দাড়ি,
বুকটা উঠে কাঁপি!
চক্ষে বহে পানি,
ষাঁড়ের মতো চ্যাঁচায় মিয়া
বলে ‘কোথায় নানি!’
দুষ্টু শিবু
বনেতে এক শেয়াল আছে,
নামটি ‘শিবু’ তার
দুষ্টুমিতে পাকা তেমন
নাইকো কেহ আর।
যখন-তখন দিনে-রেতে
ঢুকে লোকের ঘরে,
ছাগল, ভেড়া, পাখির ছানা
খায় সে চুরি করে।
দুষ্টুমি তার দেখে ভুলো
গেল বেজায় খেপে
ঘাড়ের উপর লাফিয়ে উঠে
ধরলে টুঁটি চেপে।
কামড় খেয়ে দুষ্টু শিবু
ল্যাজটি নিচু করে
ঘরে গিয়ে দেখতেছে মুখ
আরশিখানা ধরে!
বেজায় বুদ্ধি
বৃষ্টি ভেজা বেরিয়ে যাবে
ঠান্ডা লেগে শেষে,
হ্যাঁ-চো, হ্যাঁ-চো হাঁচতে হবে,
প্রাণটা যাবে কেশে।
মাথায় কেন নাইকো ছাতি
গরম কাপড় গায়
এমন দিনে জুতো মোজা
দাওনি কেন পায়?
ঝাঁপিয়ে পড়ো ডোবার জলে
আমার কথা রাখো––
পাঁকের ভিতর মুখটি গুঁজে
চুপটি করে থাকো।’
‘বা-বা-বা––ব্যাং মহাশয়,
বললে তুমি ঠিক।
বুদ্ধি এত যার না আছে
তার কপালে ধিক!
‘বৃষ্টি-জলে ভিজলে পরে
অসুখ হবার ভয়,
ডোবার জলে থাকলে ডুবে
শরীর ভালো রয়!’
ভারী সুবিধা
পাঠশালাতে
যেদিন পড়া শুরু,
সেদিন থেকে দাশুর কানে
নজর দিলেন গুরু!
টানের চোটে
বাড়ল ক্রমে বেশ,
তাতেই কিন্তু দাশুর এখন
মজাটি একশেষ!
রাত্তিরে খুব
ঠান্ডা যেদিন থাকে,
লেপের মতো কানটি টেনে
অঙ্গটি তার ঢাকে!
মেঘের দিনে
বৃষ্টি বাদল হলে,
মাথার উপর ছাতার মতো
কানটি রাখে তুলে!
রোদে যখন
আর সকলে কাবু
পাখার মতো কানের হাওয়া
খান বসে বাবু!
অতিবুদ্ধি
লভিয়া গ্রীষ্মের ছুটি চিন্তামণিবাবু
এসেছেন নিজ গ্রামে––অতি বুদ্ধিমান!
বিদ্যার ভারেতে ক্ষুদ্র দেহখানি কাবু।
জানাতে নিজের বিদ্যা ব্যস্ত তাঁর প্রাণ!
একদিন খেতে বসে বলে চিন্তামণি,
‘এই যে রয়েছে বাবা, দুটি মাছভাজা––
করিব মন্ত্রের বলে তিনটি এখনি,
তা যদি না পারি তবে দিয়ো তুমি সাজা!
‘প্রথমত, এই এক––আর এই দুই,
সাদাসিধে কথা ইহা, জানে তা সকলে
করিলাম যোগ আমি এক আর দুই
এক দুয়ে হল তিন মোর বুদ্ধি বলে!’
‘ঠিক বলিয়াছ বাপু,’ বলিলেন পিতা,
‘বিদ্যার উচিত আজ পাবে পুরস্কার
একটি নিলাম আমি, দ্বিতীয়টি মাতা,
বাকিটি, হে চিন্তামণি! রহিল তোমার!’
সন্দেশের হিসাব
একটি হাতে তিনটি আছে,
আরেক হাতে ছয়
যোগ করিয়া খাই যদি
‘নয়টি’ শুধু হয়।
বিয়োগ যদি করি, মোটে
‘তিনটি’ হবে খাওয়া
ভাগ করিলে, ‘দু’-এর বেশি
যাবে নাকো পাওয়া।
এখন থেকে দুইটি হাতে
যতগুলি পাব,
সবার আগে গুণ করিয়া
তার পরেতে খাব।
একটু মাথা ঘামিয়ে যদি
‘আঠারোটি’ পাই,
বোকার মতো কেন তবে
অল্প খেতে যাই!
সাধে বাদ
আলমারিতে হয় যে রাখা
মন্ডা মিঠাই ছানা,
মা ভেবেছে, সে খবরটা
নাইকো আমার জানা!
পানতুয়া আর রসগোল্লা
হাঃ––হাঃ––হা––হা––
কপালগুণে চাবির গোছা
ফেলে গেছেন মা!
ঢুকিয়ে চাবি কটাস করে
ঘুরিয়ে দেব কল
হাতে হাতে পাবেন তিনি
লুকিয়ে রাখার ফল!
এমনি করে গুটিসুটি
চুপটি মেরে যাই,
ঢাকনা খুলে টপাটপ
পেটটি পুরে খাই!
গোল্লা খাবার উৎসাহে যেই
উঠল নেচে প্রাণ,
হায় রে কপাল, অমনি কিনা,
পড়ল কানে টান!
টানের চোটে চোখেতে জল,
মুখে ভ্যাঁ––আ–– ধ্বনি
গোল্লা খাওয়া চলছে কেমন,
ও আমার নীলমণি!
সেদিন আর নাই
তখন যদি দেখতে আমায়, উঠতে ভয়ে ঘেমে,
শুনলে হাঁকার, ভূমিকম্পের কম্প যেত থেমে!
সেদিন আর নাইকো রে ভাই,
সেদিন আর নাই––
দশজনারে দেখছ যেমন, আমিও এখন তাই।
মনে পড়ে, রাজবাড়িতে হলে প্রয়োজন,
পিঁপড়ের দুধ এনে দিতাম আশি হাজার মন!
সেদিন আর নাইকো রে ভাই,
সেদিন আর নাই––
ভাবতে গেলে সেসব কথা, বড়োই ব্যথা পাই!
মনে পড়ে, দুইটি বেলা দাঁড়িয়ে বাড়ির কাছে
খড়কে কাঠির কাজ সেরেছি আস্ত তালের গাছে
সেদিন আর নাইকো রে ভাই,
সেদিন আর নাই––
তালের গাছে খড়কে-খোঁটার দিন গিয়াছে ভাই।
হাতি নিয়ে লোফালুফি ছিল আমার কাজ,
সবাই আমায় ডাকত তখন ‘মল্ল-মহারাজ’।
সেদিন আর নাইকো রে ভাই,
সেদিন আর নাই––
তিনটি হাতির ভারেই এখন হাঁপিয়ে মারা যাই!
ছেলের চিঠি
বাবা, কালকে ছিল সোনা ব্যাঙের বিয়ে,
গাঁয়ের যত বরযাত্রী নিয়ে,
নৌকা চড়ে হলেম নদী পার––
এমন নৌকা দেখিনিকো আর!
লাগাম টেনে চালিয়ে যেতে হয়,
চাবুকটাও না লাগালেই নয়।
নৌকার গুণ কী কব বিশেষ,
জলেও ভাসে, পায়েও হাঁটে বেশ!
লিখতে নারি বিয়ে বাড়ির জাঁক,
খাওয়ার কথা শুনে লাগবে তাক!
কেঁচোর ঘণ্ট, কাঁকড়া-বিছের ঝোল,
বোলতা ভাজা, টিকটিকির অম্বল।
ফড়িং সিদ্ধ আরশুল্লার রসে,
ছুঁচোর পিত্তি চামচিকার পায়সে।
পিঁপড়ে, মশা, শামুক, গেঁড়ি, বিছু,
কেন্ন, মাছি––বাদ যায়নি কিছু!
এমন খাওয়া খাইনি কভু আর।
শেষে যখন নদী হয়ে পার––
ফিরে এলাম সবাই এক সাথ,
বেলা, তখন প্রায় দুপুর রাত!
স্নেহের কটকটে।
কাকাতুয়া
কাকাতুয়া, কাকাতুয়া, আমার জাদুমণি,
সোনার ঘড়ি কী বলিছে, বলো দেখি শুনি?
বলিছে সোনার ঘড়ি, ‘টিক-টিক-টিক,
যা কিছু করিতে আছে, করে ফেলো ঠিক।
সময় চলিয়া যায়––
নদীর স্রোতের প্রায়,
যে জন না বুঝে, তারে ধিক শত ধিক!’
বলিছে সোনার ঘড়ি, ‘টিক-টিক-টিক!’
কাকাতুয়া, কাকাতুয়া, আমার জাদুধন,
অন্য কোনো কথা ঘড়ি, বলে কী কখন?
মাঝে মাঝে বলে ঘড়ি, ‘টং-টং-টং,
মানুষ হইয়া যেন হয় নাকো সং!
ফিটফিটে বাবু হলে
ভেবেছে কি লবে কোলে?
পলাশে কে ভালোবাসে দেখে রাঙা রং!’
মাঝে মাঝে বলে ঘড়ি, ‘টং-টং-টং!’
সাত বার
সোম আর মঙ্গলবার
নুটুবাবুর মুখটি ভার।
বুধ আর বৃহস্পতি,
নুটুবাবু ক্ষুণ্ণ অতি।
এলে পরে শুক্র, শনি
ক্রমে খুশি নুটুমণি।
যখন আসে রবিবার,
মুখে হাসি ধরে না আর।
ছয় ঋতু
গ্রীষ্ম যখন উঠে মেতে,
আগুন ছুটে দিনে রেতে।
বর্ষা এসে ঘুচায় তাপ,
বৃষ্টি পড়ে ঝুপঝাপ।
শরৎরানি ফুল্ল মুখ,
মেঘের ডাকে কাঁপে বুক।
হেমন্ত সে মহা বাবু,
সর্দি লেগে সদাই কাবু।
শীত যেন গো দিদিমা,
ঠকঠকিয়ে কাঁপে গা।
বসন্ত সে ফুলের রানি,
টকটকে তার ঠোঁট দুখানি।
বারো মাস
বৈশাখ মাসে পুষেছিনু একটি শালিক-ছানা,
জ্যৈষ্ঠ মাসে উঠল তাহার ছোট্ট দুটি ডানা।
আষাঢ় মাসে বাড়ল ক্রমে গায়ের পালকগুলি,
শ্রাবণ মাসে ফুটল মুখে দুই-চারিটা বুলি।
ভাদ্র মাসে ঘুঙুর কিনে দিলাম তাহার পায়,
আশ্বিন মাসে নাইয়ে দিলাম হলুদ দিয়ে গায়।
কার্তিক মাসে শিখল পাখি দাঁড়ের পরে দোলা,
অগ্রহায়ণ মাসে এক্কেবারে হল সে হরবোলা।
পৌষ মাসে থাকত খোলা খাঁচার দুটি দ্বার,
মাঘ মাসে খেলতে যেত ইচ্ছা যথা তার।
ফাল্গুন মাসে দুষ্ট বুদ্ধি জাগল তাহার মনে,
চৈত্র মাসে ফুড়ুত করে উড়ে গেল বনে।
খেলা
১ ২ ৩ –– ছুটব মোরা মনের সুখে,
নাচব তাধিন-ধিন।
২ ৩ ৪ –– খেলার সময় খেলব, তাতে
ভয়টা কিবা আর।
৩ ৪ ৫ –– আমরা নাচি, পারিস যদি
তোরাও সবে নাচ।
৪ ৫ ৬ –– ঘুরিয়ে মাথা লাফিয়ে পড়া
ব্যাপার সহজ নয়।
৫ ৬ ৭ –– লুটোপুটি খাচ্ছে নটু
কেয়াবাতা কেয়াবাত!
৬ ৭ ৮ –– লাফের মতো তিনটি লাফে
পার হব এ মাঠ।
৭ ৮ ৯ –– এই খেলাতে প্রমাণ হবে
জয় কি পরাজয়।
৮ ৯ ১০ –– লেগে পড়ে থাকলে শেষে
পাবই পাব যশ।
মামার বাড়ি
মামাদের দরজায়
বাঘা থাকে এক
তেড়ে নাহি আসে, নাহি
করে ভেক ভেক!
মামাদের পুকুরেতে
আছে বড়ো রুই
পশু আর মাছে মিলে
একে একে দুই।
মামাদের বাগানেতে
চরিছে হরিণ
দুই পশু, এক মাছ––
দুয়ে একে তিন।
মামাদের রাঙা গোরু
কিবা রূপ তার
তিন পশু, এক মাছ––
তিনে একে চার।
মামাদের বানরের
কী মজার নাচ
চার পশু, এক মাছ––
চারে একে পাঁচ।
মামাদের সাদা ভেড়া
উঠানেতে রয়
পাঁচ পশু, এক মাছ––
পাঁচে একে ছয়।
মামাদের খরগোশ
চাটে এসে হাত
ছয় পশু, এক মাছ––
ছয়ে একে সাত।
মামাদের পোষা মেনি
যেন বড়োলাট!
সাত পশু, এক মাছ––
সাতে একে আট।
মামাদের রাজহাঁস
পুকুরেতে রয়,
পশু, পাখি, মাছে মিলে
আটে একে নয়।
মামাদের চাকরের
হয়েছে বয়স,
সবে তারে ভালোবাসে
নয়ে একে দশ।
দশটি ছেলে
হারাধনের দশটি ছেলে
ঘোরে পাড়াময়,
একটি কোথা হারিয়ে গেল
রইল বাকি নয়।
হারাধনের নয়টি ছেলে
কাটতে গেল কাঠ,
একটি কেটে দুখান হল
রইল বাকি আট।
হারাধনের আটটি ছেলে
বসল খেতে ভাত,
একটির পেট ফেটে গেল
রইল বাকি সাত।
হারাধনের সাতটি ছেলে
গেল জলাশয়,
একটি সেথা ডুবে মল
রইল বাকি ছয়।
হারাধনের ছয়টি ছেলে
চড়তে গেল গাছ,
একটি মল পিছলে পড়ে
রইল বাকি পাঁচ।
হারাধনের পাঁচটি ছেলে
গেল বনের ধার,
একটি গেল বাঘের পেটে
রইল বাকি চার।
হারাধনের চারটি ছেলে
নাচে ধিন ধিন
একটি মল আছাড় খেয়ে
রইল বাকি তিন।
হারাধনের তিনটি ছেলে
ধরতে গেল রুই,
একটি খেলে বোয়াল মাছে
রইল বাকি দুই।
হারাধনের দুইটি ছেলে
মারতে গেল ভেক,
একটি মল সাপের বিষে
রইল বাকি এক।
হারাধনের একটি ছেলে
কাঁদে ভেউ ভেউ,
মনের দুঃখে বনে গেল
রইল না আর কেউ।
দশটি ছেলে
হারাধনের সেই যে ছেলে
গিয়েছিল বনে,
সাপে-খাওয়া ভায়ের দেখা
পেলে ওঝার সনে।
হারাধনের দুইটি ছেলে
বেড়ায় হেসে খেলে
মাছের পেটে পায় মেছুনি
মাছে-গেলা ছেলে।
হারাধনের তিনটি ছেলে
ওষুধ নিয়ে আসে
আছাড় খেয়ে মরা ছেলে
চক্ষু মেলে হাসে।
হারাধনের চারটি ছেলে
বাঘ শিকারে যায়
বাঘে-খাওয়া ভাইকে তারা
বাঘের পেটে পায়।
হারাধনের পাঁচটি ছেলে
তা ধেই ধেই নাচে
পিছলে পড়ে মরা ছেলে
হাসপাতালে বাঁচে।
হারাধনের ছয়টি ছেলে
খেলছে সাঁতার-বাজি
জলে-ডোবা ছেলেটিকে
তুললে করিম গাজি।
হারাধনের সাতটি ছেলে
দরজি ডেকে ঘরে,
পেট-ফাটা সে ভায়ের পেটে
রিপুকর্ম করে।
হারাধনের আটটি ছেলে
সুখদুঃখের সাথি
কাটা-ছেলে লাগায় জোড়া
হরে জোলার নাতি।
হারাধনের নয়টি ছেলে
বনের মাঝে যায়,
হারিয়ে-যাওয়া ভাইকে শেষে
চোরের ঘরে পায়।
হারাধনের দশটি ছেলে
চোরকে গেল তেড়ে
চুলের ঝুঁটি ধরে দিল
কানটি কেটে ছেড়ে।
জন্মদিনে
বালকবালিকা :
আজ সুরেনের জন্মদিনে,
মনের মতো জিনিস কিনে
আনব মোরা ভাই––
চলো, বাজারেতে যাই।
নূতন নূতন জিনিস কত,
দিচ্ছে তারে শত শত
আনন্দে সবাই––
চলো, বাজারেতে যাই।
১ম দোকান
বালকবালিকা :
ওগো দোকানদার!
তোমার কাছে কী কী আছে,
দেখাও একটিবার।
১ম দোকানি :
‘সাহস’ আছে আমার কাছে,
‘সদাচার’ আর ‘বিনয়’ আছে,
‘নিষ্ঠা’ ‘সরলতা’
‘চেষ্টা’ ‘শ্রম’ ‘অধ্যবসায়’
আছে ‘সত্যকথা’।
এসব জিনিস খাঁটি অতি
রাখব নাকো বাকি,
ফাউ-টাউ মিলবে না, তা
আগেই বলে রাখি।
বালকবালিকা :
ফাউ দিতে হবে নাকো, নগদ টাকা দেব,
সুরেন যাহা ভালোবাসে, বেছে বেছে নেব।
২য় দোকানি :
নূতন আমদানি জিনিস এই দোকানে আছে,
দোকানদারের সেরা আমি, এসো আমার কাছে।
বালকবালিকা :
দেখাও দেখি কেমন জিনিস আছে তোমার ঘরে?
মনের মতো হলে, মোরা কিনব তাহা পরে।
২য় দোকানি :
ওই দেখো ‘সোনার চেন’
এই ‘সোনার ঘড়ি’,
হাজার টাকার ‘চশমা’ আছে,
পাঁচশো টাকার ‘ছড়ি’।
কিংখাপের ‘টুপি’, ‘শাড়ি’,
‘জ্যাকেট’ আছে ঘরে,
‘সোনার ব্রোচে’ হিরার ফুল
ঝক-ঝক-ঝক করে।
দরদস্তুর করি নাকো,
সস্তা দরে ছাড়ি
মুটে ভাড়া লাগবে নাকো,
পৌঁছে দিব বাড়ি।
বালকবালিকা :
ফিরিয়া টেরি, ঘুরিয়ে ছড়ি বুক ফুলায়ে চলে,
তারাই তোমার এসব জিনিস কিনবে কুতুহলে।
সুরেন যাহা ভালোবাসে, এখানে তা নাই,
বাবুয়ানার মুখে আগুন, কপালেতে ছাই!
৩য় দোকান
বালকবালিকা :
দোকানদার মশাই!
তোমার কাছে, কী কী আছে,
দেখতে মোরা চাই।
৩য় দোকানি :
দেখলে শুধু হবে নাকো,
কিনতে পার যদি,
সারা জীবন কাটবে তবে
সুখে নিরবধি।
আমার কাছে ‘স্নেহ’ ‘প্রেম’
আছে ‘ভালোবাসা’,
‘ক্ষমা’ আছে, ‘দয়া’ আছে,
‘শ্রদ্ধা’ ‘ভক্তি’ ‘আশা’।
এসব জিনিস দামি অতি
বেচব নাকো ধারে,
লক্ষ টাকায় তারা কেনে,
চিনতে যারা পারে!
বালকবালিকা :
মনের মতো অমূল্য ধন তোমার আছে ঠিক,
এমন জিনিস যে না কেনে, তার কপালে ধিক!
টাকাকড়ি সোনাদানা লও তুমি তবে,
এসব জিনিস পেলে সুরেন বড়োই খুশি হবে।
৪র্থ দোকান
৪র্থ দোকানি :
এই দোকানে এসো, ওগো, এই দোকানে এসো,
হরেকরকম জিনিস পাবে, একটুখানি বসো।
বালকবালিকা :
তোমার কাছে কী কী আছে, দেখতে আগে চাই,
কিনব শেষে, মনের মতো জিনিস যদি পাই।
৪র্থ দোকানি :
আমার কাছে ‘স্বার্থ’ আছে,
‘ঘৃণা’ ‘অহংকার’,
‘আলস্য’ আর ‘মিথ্যাকথা’
‘নিন্দা’ ভারে ভার।
‘হিংসা’ ও ‘দ্বেষ’ এই দোকানে
সস্তা দরে পাবে,
নগদ টাকা নাই বা দিলে––
ধারেই দেওয়া যাবে।
একটি টাকায় পাবে জিনিস
হাজার টাকা দামি
‘রাগ’ ‘অভিমান’ ‘কপটতা’
ফাউ দিব আমি!
বালকবালিকা :
চাই না মোরা তোমার জিনিস, দূরে ফেলে দাও
ছি ছি ছি! কী পরিতাপ! লজ্জা নাহি পাও!
আপনি গেছ অধঃপাতে, পরকে কেন ডাকো?
হাত দুখানা দিয়ে কালা মুখটা তোমার ঢাকো।
২য় ও ৪র্থ দোকানির গান :
ব্যাবসা হল মাটি,
মোদের ব্যাবসা হল মাটি!
এত দিন মলেম শুধু
ভূতের ব্যাগার খাটি––
মোদের ব্যবসা হল মাটি!
বুঝেছি এই বাজারে,
ঝুটো মাল বিকোয় না রে,
লাভের মধ্যে লাঞ্ছনা আর
পিঠে বেদম লাঠি––
মোদের ব্যাবসা হল মাটি!
নমস্কার করি সবে,
বিদায় আজ হলেম তবে,
এখন থেকে আমরাও ভাই,
রাখব জিনিস খাঁটি––
মোদের ব্যাবসা হল মাটি!
কাজের লোক
১ম :
বাঃ।––আমার নাম ‘বাঃ’।
বসে থাকি তোফা তুলে পায়ের উপর পা!
লেখাপড়ার ধার ধারিনে, বছর ভরে ছুটি,
হেসে খেলে আরাম করে দুশো মজা লুটি।
কারে কবে ‘কেয়ার’ করি, কীসের করি ডর?
কাজের নামে কম্প দিয়ে গায়ে আসে জ্বর।
গাধার মতো খাটিস তোরা মুখটি করে চুন––
আহামুকি কাণ্ড দেখে হেসেই আমি খুন!
সকলে:
আস্ত একটি গাধা তুমি স্পষ্ট গেল দেখা,
হাসছ যত, কান্না তত কপালেতে লেখা।
২য় :
‘যদি’ বলে ডাকে আমায়, নামটি আমার ‘যদি’––
আশায় আশায় বসে থাকি হেলান দিয়ে গদি।
সব কাজেতে থাকত যদি খেলার মতো মজা
লেখাপড়া হত যদি জলের মতো সোজা!
স্যান্ডো সমান ষন্ডা হতাম যদি গায়ের জোরে,
প্রশংসাতে আকাশ-পাতাল যদি যেত ভরে,
উঠে পড়ে লেগে যেতাম বাজে তর্ক ফেলে।
করতে পারি সবি––যদি সহজ উপায় মেলে!
সকলে :
হাতের কাছে সুযোগ, তবু ‘যদি’র আসায় বসে––
নিজের মাথা খাচ্ছ বাপু, নিজের বুদ্ধি-দোষে।
৩য় :
আমার নাম ‘বটে’ আমি সদাই আছি চটে,
কটমটিয়ে তাকাই যখন, সবাই পালায় ছুটে।
চশমা পরে বিচার করে, চিরে দেখাই চুল,
উঠতে বসতে কচ্ছে সবাই হাজার গণ্ডা ভুল!
আমার চোখে ধুলো দেবে সাধ্যি আছে কার?
ধমক শুনে ভূতের বাবা হচ্ছে পগার পার!
হাসছ? বটে! ভাবছ বুঝি মস্ত তুমি লোক,
একটি আমার ভেংচি খেলে উলটে যাবে চোখ!
সকলে :
দিচ্ছ গালি, লোকের তাতে কিবা এল গেল!
আকাশেতে থুথু ছুঁড়ে––নিজের গায়েই ফেল।
৪র্থ :
আমার নাম ‘কিন্তু’ আমায় ‘কিন্তু’ বলে ডাকে,
সকল কাজে একটা কিছু গলদ লেগে থাকে।
দশটা কাজে লাগি কিন্তু আটটা করি মাটি,
ষোলো আনা কথায় কিন্তু সিকিমাত্র খাঁটি।
লম্ভঝম্ভ বহুত কিন্তু কাজের নাইকো ছিরি––
ফোঁস করে যাই তেড়ে––আবার ল্যাজ গুটিয়ে ফিরি!
পাঁচটা জিনিস গড়তে গেলে, দশটা ভেঙে চূর––
বল দেখি ভাই, কেমন আমি সাবাস বাহাদুর!
সকলে:
উচিত তোমায় বেঁধে রাখা নাকে দিয়ে দড়ি,
বেগার খাটা পণ্ডকাজের মূল্য কানাকড়ি!
৫ম :
আমার নাম ‘তবু’ তোমরা কেউ কি আমায় চেনো?
দেখতে ছোটো, তবু আমার সাহস আছে জেনো।
এতটুকু মানুষ তবু দ্বিধা নাইকো মনে,
যে কাজেতেই লাগি আমি খাটি প্রাণপণে।
এমনি আমার জেদ, যখন অঙ্ক নিয়ে বসি,
একুশ বারে না হয় যদি, বাইশ বারে কষি!
হাজার আসুক বাধা তবু উৎসাহ না কমে,
হাজার লোকে চোখ রাঙালে তবু না যাই দমে!
সকলে:
নিষ্কম্মারা গেল কোথা, পালাল কোন দেশে?
কাজের মানুষ কারে বলে, দেখুক এখন এসে।
হেসে খেলে, রয়ে বসে কত সময় যায়,
সময়টা যে কাজে লাগায়, চালাক বলে তায়!
কাজের ব্যস্ততা
কৃষক :
ছোটো একটি কৃষক আমি, জমিতে দিই চাষ,
দোকানি :
দোকান খুলে বেচা কেনা করি বারো মাস,
মজুর :
পেটের দায়ে খেটে খেটে হাড্ডি হল সার––
(তিন জনে)
সবাই মোরা ব্যস্ত কাজে যে যার আপনার।
কামার:
ছোটো একটি কামার আমি, গড়ি কাঁচি-ছুরি।
স্যাকরা :
সোনা-রুপার কাজে আমি দেখাই বাহাদুরি।
দর্জি :
আমার মতো ওস্তাগর আর খুঁজে মেলা ভার––
(তিন জনে)
সবাই মোরা ব্যস্ত কাজে যে যার আপনার।
হাকিম :
ছোটো একটি হাকিম আমি, গদিয়ানি চাল,
মাস্টার :
পড়তে বসে ফাঁকি দিলে বেতিয়ে করি লাল!
ডাক্তার :
নাড়ি টেপার হাত পেকেছে, খ্যাতি চারিধার––
(তিন জনে)
সবাই মোরা ব্যস্ত কাজে যে যার আপনার।
নাবিক :
ছোটো একটি নাবিক আমি, ভাসাই জলযান,
সৈন্য :
দেশের তরে রণস্থলে দিতে পারি প্রাণ।
রাজা :
মাথায় আমার সোনার মুকুট, করে শাসনভার––
(তিন জনে)
সবাই মোরা ব্যস্ত কাজে যে যার আপনার।
ঝি :
আমি একটি সেকেলে ঝি, হাট-বাজারে যাই,
রাধুনি :
সকাল বিকাল রান্না করি, দিয়ে থুয়ে খাই,
ধাত্রী :
রোগীর সেবা আমার কাছে সকল সুখের সার––
(তিন জনে)
সবাই মোরা ব্যস্ত কাজে যে যার আপনার।
গোয়ালিনি :
আমি একটি গোয়ালিনি, বেড়াই দুধ নিয়ে,
মেছুনি :
রুই-কাতলা বেচি আমি বাড়ি বাড়ি গিয়ে।
ধোপানি :
ময়লা কাপড় আছড়ে কেচে করি পরিষ্কার––
(তিন জনে)
সবাই মোরা ব্যস্ত কাজে যে যার আপনার।
ছোটো মেয়ে :
আমি একটি গৃহস্থের ঝি, খেটেখুটে খাই,
ছোটো বউ :
একরত্তি বউমা আমি, বসতে সময় নাই,
ছোটো গিন্নি :
আমার কাজ গিন্নিপনা! মস্ত পরিবার––
(তিন জনে)
সবাই মোরা ব্যস্ত কাজে যে যার আপনার।
(ছেলে মেয়ে সকলে)
চুপটি করে শুয়ে বসে,
সুখের আশা করে বসে,
এ জীবনে সুখটা যে কী
জানতে কভু পায় না তারা।
আপন কাজে এক মনেতে
দিনটা যাদের কাটে ভাই,
তাদের মতো ভাগ্যবান আর
এ জগতে কেহ নাই।
ভালো ছেলে ও মন্দ ছেলে
ভালো ছেলে পাঠশালে
সোজা চলে যায়,
দাঁড়ায়ে না কথা কয়,
পথে না খেলায়।
মন্দ ছেলে পথে দেরি
করে খেলা নিয়ে,
পুকুরে ভাসায় জুতা
পাল তুলে দিয়ে।
ভালো ছেলে বড়ো আশা
হৃদয়েতে পোষে,
এক মনে আপনার
পড়া করে বসে।
মন্দ ছেলে সারাদিন
ঘোরে হেসে খেলে,
না চায় ছুঁইতে বই,
পায়ে ছুঁড়ে ফেলে।
ভালো ছেলে পড়া দিতে
নাহি করে ডর,
জিজ্ঞাসা যা, দেয় তার
তখনি উত্তর।
মন্দ ছেলে––মাথা তার
চুলকানো সার,
‘চিক্কণ’ বানান করে
‘চ’য়েতে আকার।
ভালো ছেলে পড়া তার
ভাবে শুধু বসে,
অঙ্কটি না দিতে দিতে
দেয় তাই কষে।
মন্দ ছেলে স্লেট ধরে
কাটিয়া আঁচড়,
মুখ লুকাইয়া দেয়
সন্দেশে কামড়।
ভালো ছেলে ধেয়ে চলে
পুলকিত মন,
পাইয়াছে পুরস্কার
মনের মতন।
মন্দ ছেলে দাঁড়াইয়া
যেন জানোয়ার,
মাথায় গাধার টুপি––
খাসা পুরস্কার!
তিনটি বোন
আমরা তিনটি বোন,
আমি মেজো, দিদি বড়ো,
ছোটোটি নোটন!
আমার একটি ভেড়া আছে,
হরিণ থাকে দিদির কাছে,
বাছুর নিয়ে খেলে সুখে
আমাদের নোটন––
আমরা তিনটি বোন।
ভেড়ার যখন খিদে পায়,
আমার কাছে খাবার চায়,
আদর করে ভালোবেসে
খেতে দিই তখন––
আমরা তিনটি বোন।
সে আমারে ভালোবাসে,
তাই তো ছুটে কাছে আসে,
কে পারে তায় আমার মতো
করিতে যতন––
আমরা তিনটি বোন।
আমরা তিনটি বোন,
হরিণ, ভেড়া, বাছুর দিয়ে
থাকি সর্বক্ষণ।
হরিণ আমার বড়োই ভালো,
চোখের তারা কেমন কালো,
মুখের শোভা কেমন তাহার,
কী সুন্দর গঠন––
আমরা তিনটি বোন।
আয় বলে যেই কাছে ডাকি,
আঁখির পরে রেখে আঁখি,
অমনি ছুটে কাছে এসে
দাঁড়ায় সে তখন––
আমরা তিনটি বোন।
ভালোবাসি বলে তারে
ভালোবাসে যে আমারে
তা না হলে বনের পশু
হয় কি গো আপন––
আমরা তিনটি বোন।
আমরা তিনটি বোন
বাবা বলে, ‘তিনটি রাঙা
ফুলেরি মতন!’
দিদিরা সব আদর করে
‘নোটন’ বলে ডাকে মোরে,
বাছুরের নাম আমিও তাই
রেখেছি ‘ঝোটন’––
আমরা তিনটি বোন।
দুধের বাটি লয়ে হাতে
খাওয়াই তারে দুধে ভাতে
খেয়ে খেয়ে ঝোটন আমার
হয়েছে কেমন––
আমরা তিনটি বোন।
তোমরা যদি এমনতর,
কাকেও ভালোবাসতে পার,
দেখবে তখন কেমন সুখে
কাটবে গো জীবন––
আমরা তিনটি বোন।
