আলিবাবা ও চল্লিশজন দস্যু
পারস্য দেশের কোনো এক নগরে একজন বণিক বাস করিতেন। তাঁহার দুইটি ছেলের মধ্যে বয়সে যেটি বড়ো, তাহার নাম ছিল কাশিম, আর ছোটোটির নাম ছিল আলিবাবা। বণিকের অবস্থা তেমন ভালো ছিল না। মৃত্যুকালে তিনি সামান্য যাহা কিছু রাখিয়া গিয়াছিলেন, দুই ভাই তাহা সমানভাবে ভাগ করিয়া লইয়াছিল। কিন্তু সে অতি সামান্যই তাহাতে কাহারো স্বচ্ছলে দিন চলিবার সম্ভাবনা ছিল না।
কিছুকাল পরে কাশিম একটি বড়োলোকের মেয়েকে বিবাহ করিল, লোকটির এই একমাত্র কন্যা ভিন্ন আর কেহই ছিল না। বিবাহের অল্পদিন পরেই শ্বশুরের মৃত্যু হওয়ায়, তাঁহার সমস্ত টাকাকড়ি পাইয়া কাশিম খুব বড়োলোক হইয়া উঠিল। অধিকন্তু একখানা দোকানেরও মালিক হইল।
আলিবাবাও বিবাহ করিয়াছিল, কিন্তু অর্থাভাবে তাহার সাংসারিক কষ্ট দিন দিন বাড়িয়া যাইতে লাগিল। বেচারার সম্পত্তির মধ্যে ছিল তিনটি গাধা। আলিবাবা সমস্ত দিন বনে-জঙ্গলে কাঠ সংগ্রহ করিয়া, গাধাগুলির পিঠে চাপাইয়া, প্রত্যহ সন্ধ্যার সময় বাজারে উপস্থিত হইত। সেই কাঠ বিক্রয় করিয়া সামান্য যাহা পাইত, তাহা দ্বারা অতি কষ্টে তাহার দিন চলিত।
একদিন আলিবাবা কাঠ কাটিয়া গাধার পিঠে বোঝাই দিতেছে, এমন সময় দেখিল, দূর হইতে একদল অশ্বারোহী হনহন করিয়া ছুটিয়া আসিতেছে। ঘোড়ার খুরে ধুলা উড়িয়া ঠিক যেন মেঘের মতো দেখাইতেছে। তাহাদিগকে দেখিয়াই আলিবাবার মনে সন্দেহ উপস্থিত হইল। ভাবিল, হয়তো কোনো দস্যুদল দেশ-বিদেশ হইতে লুঠপাট করিয়া জঙ্গলের মধ্যে তাহাদের গুপ্ত আড্ডায় ফিরিতেছে! সে তাড়াতাড়ি গাধাগুলিকে ছাড়িয়া দিয়া একটা গাছে উঠিয়া পড়িল এবং ঘন ডালপালার ভিতর হইতে তাহাদের চালচলন লক্ষ করিতে লাগিল।
আলিবাবা যে গাছে চড়িয়াছিল, উহার পাশেই খুব বড়ো একটা পাহাড় ছিল। অশ্বারোহীগণ সেই পাহাড়ের সম্মুখে আসিয়াই ঘোড়া থামাইল। তাহাদের বিকট চেহারা এবং নানারকম লুঠের জিনিস দেখিয়া, আলিবাবা বেশ বুঝিতে পারিল যে, সত্য সত্যই তাহারা দস্যু। সে গনিয়া দেখিল, সেই দলে চল্লিজন দুস্য আছে।
যে লোকটা ইহাদের দলপতি, তাহার সাজগোজ ও চেহারা অতি ভয়ংকর। তাহাকে দেখিবামাত্র আলিবাবার দৈত্য বলিয়া সন্দেহ হইল। যাহা হউক, দলের সকলে ঘোড়া হইতে নামিলে, দলপতি পাহাড়ের দিকে অগ্রসর হইয়া বলিল, ‘সিসেম, দ্বার খোলো।’ অমনি প্রকাণ্ড এক পাথরের দরজা খুলিয়া গেল। দস্যুগণ ভিতরে প্রবেশ করিলে, দরজাটি পুনরায় বন্ধ হইয়া গেল।
কিছুক্ষণ পরে দস্যুগণ একে একে বাহিরে আসিয়া আবার ঘোড়ায় চাপিয়া বসিল। তখন ‘সিসেম, দ্বার বন্ধ করো’––এইকথা বলিবামাত্র দরজাটি বন্ধ হইয়া গেল। তারপর দস্যুরা যে পথে আসিয়াছিল, সেই পথেই ঘোড়া ছুটাইয়া দিল।
আলিবাবা অতি নিকটেই ছিল, দলপতির কথাগুলি বেশ স্পষ্টই শুনিতে পাইল কিন্তু সহসা নীচে নামিতে তাহার সাহস হইল না। দস্যুদল বহুদূরে চলিয়া গেলে, সে ধীরে ধীরে নামিয়া, দরজার কাছে গিয়া খুব আস্তে আস্তে বলিল, ‘সিসেম, দ্বার খোলো!’ দেখিতে দেখিতে দরজাটি খুলিয়া গেল। আলিবাবা ভিতরে প্রবেশ করিয়া একেবারে মোহিত হইয়া গেল। পাহাড়ের চূড়া হইতে গহ্বরের ভিতর পর্যন্ত একটা ফোকর ছিল। সেই ফোকরের আলোকে আলিবাবা দেখিল, একদিকে রাশি রাশি মোহর, আর একদিকে মণি, মুক্তা, হিরা, জহরতের ছড়াছড়ি। তাহাদের উজ্জ্বল প্রভায় সমুদয় গহ্বরটি যেন ঝকমক করিতেছে।
আলিবাবা অবাক হইয়া চাহিয়া রহিল। তারপর ছয়টি থলি সংগ্রহ করিয়া সেগুলি কেবল মোহর দিয়া ভরিল। শেষে বাহিরে আসিয়া থলিগুলি তিনটি গাধার পিঠে চাপাইয়া ডালপালা দ্বারা এমন ঢাকিয়া ফেলিল যে, কাহার সাধ্য দেখিতে পায়। বাহিরে আসিবার পর আলিবাবা দরজা বন্ধ করিবার মন্ত্র উচ্চারণ করিতে ভুলে নাই।
আলিবাবা যেরূপ কৌশল অবলম্বন করিয়াছিল, তাহাতে মোহর সম্বন্ধে তাহার উদ্বেগের কোনোই কারণ ছিল না, কিন্তু তথাপি সে নিশ্চিন্ত হইতে পারিল না পাছে কেহ কিছু জানিতে পারে, সেই ভয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত জঙ্গলের মধ্যেই লুকাইয়া রহিল। সন্ধ্যার পর বনের পথ দিয়া ধীরে ধীরে গাধা চালাইয়া, একেবারে বাড়িতে উপস্থিত হইল। মোহরের রাশি দেখিয়া আলিবাবার স্ত্রী তো অবাক। কপালের উপর চোখ টানিয়া অনেকক্ষণ ফ্যালফ্যাল করিয়া চাহিয়া রহিল! শেষে জিজ্ঞাসা করিল, ‘এত মোহর তুমি কোথায় পেলে? দুঃখেকষ্টে পড়ে ডাকাতি আরম্ভ করেছ নাকি?’ আলিবাবা বলিল, ‘ছি ছি! তুমি আমাকে এতটা হীন মনে করতে পারলে। আমি ডাকাতি করিনি, চোরের উপর বাটপাড়ি করেছি!’ ইহার পর জঙ্গলে যাহা যাহা ঘটিয়াছিল, সকল কথাই খুলিয়া বলিল। তখন আলিবাবার স্ত্রীর আনন্দ দেখে কে। উল্লাসে অধীর হইয়া সে এক-একটি করিয়া মোহর গনিতে আরম্ভ করিল। তাহা দেখিয়া আলিবাবা বলিল, ‘তুমি কি পাগল হলে? এত মোহর কি গুনে শেষ করা যায়? একটা গর্ত খুঁড়ে তাড়াতাড়ি পুতে ফেলো। রাতারাতি এই কাজ শেষ করা চাই। নচেৎ বিপদের সম্ভবনা।’ গৃহিণী বলিল, ‘আচ্ছা, মেপে রাখি। আমি ও বাড়ির দিদির কাছ থেকে একটা কুনকে চেয়ে আনি।’
কাশিমের স্ত্রী আহারাদি শেষ করিয়া শয়নের উদ্যোগ করিতেছে, এমন সময় আলিবাবার স্ত্রী আসিয়া বলিল, ‘দিদি, তোমাদের কুনকেটা একবার চাই। একটু দরকার আছে।’
আলিবাবার অবস্থার কথা কাহারো জানিতে বাকি ছিল না। তাহার স্ত্রী কুনকে চায় কেন? কী মাপিবে? কাশিমের স্ত্রীর মনে ভয়ানক সন্দেহ উপস্থিত হইল। সে গোপনে কুনকের তলায় একটু আঠা লাগাইয়া, উহা আলিবাবার স্ত্রীকে আনিয়া দিল। আলিবাবার স্ত্রী বাড়িতে গিয়া সেই রাত্রেই মোহরগুলি মাপিয়া ফেলিল। তারপর সেগুলি গর্তের মধ্যে লুকানো হইলে, কুনকেটা ফিরাইয়া দিয়া আসিল।
এখন ব্যাপার হইয়াছে কী, মাপিবার সময় একটা মোহর সেই কুনকের তলায় আটকাইয়া গিয়াছিল। আলিবাবার স্ত্রী তাহা লক্ষ করে নাই। মোহর দেখিয়া কাশিমের স্ত্রী হিংসায় গরগর করিতে লাগিল। ও বাবা! এত বড়োলোক যে, কুনকে করিয়া মোহর মাপে! সে আর সহ্য করিতে পারিল না ছুটিয়া কাশিমকে বলিল, ‘তুমি তো ভারী ধনের বড়াই কর। তোমার আছে কী? যদি বড়োলোক দেখতে চাও আলিবাবার বাড়ি যাও। এইমাত্র তার স্ত্রী কুনকে চাইতে এসেছিল। কী মাপে, দেখবার জন্যে আমি তার তলায় একটু আঠা লাগিয়ে দিয়েছিলাম। এই দেখো, একটা মোহর আটকে রয়েছে। আজকাল তারা কুনকে করে মোহর মাপে।’ স্ত্রীর কথায় উত্তেজিত হইয়া কাশিম সেই রাত্রেই আলিবাবার কাছে উপস্থিত হইল। বলিল, ‘আলিবাবা, সত্যি করে বলো, এত ধন তুমি কোথায় পেলে? তোমার স্ত্রী কুনকে করে মোহর মাপে, এ তো বড়ো সহজ ব্যাপার নয়। আমাকে সব খুলে না বললে, আমি এখুনি পুলিশে খবর দেব।’
আলিবাবা দেখিল, তার স্ত্রীর বোকামিতেই এই বিপদ ঘটিয়াছে! এখন আর প্রকৃত কথা লুকাইবার চেষ্টা বৃথা। সে বলিল, ‘ভাই, তুমি স্থির হও, আমি সকল রহস্যই প্রকাশ করছি।’ এই বলিয়া জঙ্গলের মধ্যে যাহা যাহা ঘটিয়াছিল, এক এক করিয়া সব কথাই কাশিমকে বলিল। দরজাটি খুলিবার এবং বন্ধ করিবার মন্ত্রও তাহাকে শিখাইয়া দিল।
কাশিম আহ্লাদে উৎফুল্ল হইয়া বাড়ি ফিরিয়া গেল। তাহার ইচ্ছা, একেবারে সমুদয় গুপ্তধন আনিয়া দস্যুদিগকেও ফাঁকি দেয়, আলিবাবারও মুখের গ্রাস কাড়িয়া খায়। পরদিন ভোর হইতে না হইতে কাশিম দশটি গাধা লইয়া সেই পাহাড়ের দিকে চলিল। তারপর যথাকালে সেখানে উপস্থিত হইয়া দরজার সন্ধান করিয়া ধীরে ধীরে বলিল, ‘সিসেম, দ্বার খোলো।’ অমনি দরজা খুলিয়া গেল! কাশিম গহ্বরে ঢুকিয়া যাহা দেখিল, তাহাতে মাথা ঠিক রাখাই দায়। এত সোনাদানা মণি-মুক্তা দেখিলে কে বা স্থির থাকিতে পারে। যাহা হউক, দেখিতে দেখিতে সে কুড়িটা থলি শুধু মোহরেই ভরিয়া ফেলিল।
কাশিম গহ্বরে ঢুকিবার পর দরজা বন্ধ হইয়া গিয়াছিল সে দরজার নিয়মই এই আবার খুলিবার মন্ত্র না বলিলে কিছুতেই তাহা খুলে না। ইহাতেই কিন্তু কাশিমের সর্বনাশ হইল। ধনের আনন্দে সে এতটা মত্ত হইয়াছিল যে, আর কোনো কথাই তাহার মনে ছিল না। এমনকী দরজা খুলিবার ও বন্ধ করিবার মন্ত্রও সে ভুলিয়া গিয়াছিল। কাশিম ভয়ে পাগলের ন্যায় হইয়া কত কথাই উচ্চারণ করিতে লাগিল দরজা ধরিয়া কত ঝাঁকাঝাঁকি টানাটানি করিতে লাগিল, তবু কিছুতেই তাহা খুলিল না! তখন সে বেচারার যে কী ভয়ানক অবস্থা, তাহা সহজেই বুঝিতে পারা যায়। কাশিম বালকের ন্যায় কাঁদিতে আরম্ভ করিল।
ঘটনাক্রমে সেইদিনই ডাকাতের দল আসিয়া উপস্থিত। পাহাড়ের সম্মুখে দশটা গাধা দেখিয়া তাহারা তো অবাক। দলপতি বিশেষ ভয় পাইয়া তাড়াতাড়ি মন্ত্র উচ্চারণ করিয়া দরজা খুলিয়া ফেলিল। কাশিম অমনি ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটিয়া পলাইবার চেষ্টা করিল, কিন্তু চল্লিশজন ডাকাতের হাত হইতে রক্ষা পাওয়া কি সম্ভব! দেখিতে দেখিতে তাহাদের ছোরার আঘাতে কাশিমের দেহ চারি টুকরা হইয়া গেল। আহা! বেচারার সব সাধই মিটিল।
কাশিমকে বধ করিয়াও কিন্তু দুস্যদের ভয় ঘুচিল না। কী জানি, যদি তাহাদের গুপ্ত মন্ত্রের কথা প্রকাশ হইয়া পড়িয়া থাকে! যদি আরও কেহ কেহ তাহাদের আড্ডার সন্ধান পাইয়া থাকে। তবেই তো সর্বনাশ। অনেক কল্পনা-জল্পনার পর, তাহারা অপরকে ভয় দেখাইবার জন্য কাশিমের দেহের টুকরাগুলি দুই পাশে ঝুলাইয়া রাখিয়া, দরজা বন্ধ করিয়া চলিয়া গেল।
এদিকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাশিম বাড়ি ফিরিল না দেখিয়া, তাহার স্ত্রী আলিবাবার কাছে আসিয়া কান্নাকাটি করিতে লাগিল। আলিবাবা বলিল, ‘তোমার কোনো ভয় নেই। আমার ভাই নির্বোধ নয়। সন্ধ্যার পর লোকজনের ভিড় কমলে বাড়ি ফিরবে।’ কিন্তু কাশিম রাত্রেও বাড়ি ফিরিল না।
পরদিন কাশিমের স্ত্রীর সহিত দেখা হইবার পূর্বেই, আলিবাবা তিনটি গাধা লইয়া জঙ্গলে প্রবেশ করিল। সে আশা করিয়াছিল, পথেই কাশিমকে দেখিতে পাইবে, কিন্তু পাহাড় পর্যন্ত অগ্রসর হইয়া যখন তাহার সহিত দেখা হইল না, তখন আলিবাবারও খুব ভাবনা হইতে লাগিল। শেষে পাহাড়ের দরজা খুলিয়া আলিবাবা সকল রহস্যই জানিতে পারিল। কিন্তু ভাইয়ের শোকে নিতান্ত কাতর হইলেও সে আসল কাজ ভুলিল না।
তাড়াতাড়ি দুইটি গাধার পিঠে বহু ধনরত্ন এবং অপর গাধাটির পিঠে কাশিমের চারিখণ্ড মৃতদেহ চাপাইয়া আলিবাবা বাড়ির দিকে ফিরিল। থলিগুলি এমন কৌশলে ঢাকিয়া ফেলিয়া ছিল যে, কাহার সাধ্য প্রকৃত ব্যাপার বুঝিতে পারে।
বাড়িতে পৌঁছিলে, আলিবাবাকে দেখিয়া কাশিমের স্ত্রী বুক চাপড়াইয়া কাঁদিয়া উঠিল। আলিবাবা বলিল, ‘চুপ করো! একেই সর্বনাশ হয়েছে, এখন কেঁদেকেটে গোলযোগ করলে আরও বিপদ ঘটতে পারে!’ এই বলিয়া চোখ মুছিতে মুছিতে সমুদয় ঘটনা খুলিয়া বলিল।
কাশিমের স্ত্রী প্রথমে অধীর হইয়া পড়িয়াছিল! শেষে কতকটা শান্ত হইলে, আলিবাবা বলিল, ‘তোমার যদি আপত্তি না থাকে, তবে এখন থেকে আমার বাড়িতেই থাকতে পার।’ কাশিমের স্ত্রী সহজেই ইহাতে রাজি হইল। মরজিয়ানা নামে তাহার এক দাসী ছিল। আলিবাবা তাহাকে কাশিমের কবরের বন্দোবস্ত করিতে বলিয়া বাড়ি ফিরিয়া আসিল।
মরজিয়ানাকে এক কথা দুইবার বলিতে হয় না। সে তখনই এক হাকিমের দোকানে গিয়া একটা অতি সাংঘাতিক পীড়ার ঔষধ কিনিয়া আনিল। হাকিম জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘কার অসুখ?’ মরজিয়ানা চোখ মুছিতে মুছিতে বলিল, ‘আমার প্রভু কাশিমের অবস্থা খুবই খারাপ এ যাত্রা রক্ষা পান, কি না, সন্দেহ!’ পরদিন মরজিয়ানা পুনরায় সেই দোকানে গিয়া একেবারে শেষ সময়ের ঔষধ চাহিল। হাকিম ঔষধ দিয়া ‘হায়, হায়’, করিতে লাগিলেন। সমস্ত দিন আলিবাবা ও তাহার স্ত্রীকে কাশিমের বাড়িতে ছুটাছুটি করিতে দেখিয়া পাড়াপ্রতিবেশী সকলেই ভাবিয়াছিল, কাহারও কঠিন পীড়া হইয়াছে। শেষে সন্ধ্যার সময় যখন কাশিমের বাড়িতে কান্নারোল উঠিল, কাশিম মরিয়া গিয়াছে বলিয়া সকলে হা-হুতাশ করিতে লাগিল, তখন আর অন্য কোনো সন্দেহ কাহারো মনে স্থান পাইল না।
পরদিন ভোরে মরজিয়ানা বাবা মুস্তাফা নামে এক মুচির নিকট উপস্থিত হইয়া বলিল, ‘বাবা মুস্তাফা, তোমাকে এখনই একটা কাজ করে দিতে হবে। এই নাও, আগে একটি মোহর দিচ্ছি। কাজটি শেষ হলে আর একটি মোহর পাবে।’ বাবা মুস্তাফা গরিব মানুষ। একটা টাকাও সে কখনো চোখে দেখে নাই। হঠাৎ একটি মোহর পাইয়া তাহার আনন্দ আর ধরে না। সে আগ্রহের সহিত বলিয়া উঠিল, ‘চলো, চলো, কী কাজ করতে হবে, এখনই চলো।’ মরজিয়ানা বাবা মুস্তাফাকে লইয়া খানিক দূর অগ্রসর হইয়া বলিল, ‘এইবার তোমার চোখে রুমাল বেঁধে, আমি পথ দেখিয়ে নিয়ে যাব। এই নাও আর একটি মোহর।’ বাবা মুস্তাফা দ্বিরুক্তি করিল না কেবল তাহার অতুল ঐশ্বর্যের কথা ভাবিতে লাগিল। মরজিয়ানা বাবা মুস্তাফার চোখে রুমাল বাঁধিয়া, তাহাকে একেবারে কাশিমের অন্দরমহলে লইয়া গেল।
সেখানে একটি অন্ধকার ঘরে মৃতদেহের টুকরাগুলি ছিল সেইগুলি দেখাইয়া বলিল, ‘বাবা মুস্তাফা, কাজটা কঠিন, তাই তোমাকে ডেকেছি। এই চার টুকরা এমন করে জুড়বে যে, কেউ যেন বুঝতে না পারে।’ বাবা মুস্তাফা পাকা কারিকর দেখিতে দেখিতে সেই টুকরাগুলি বেমালুম সেলাই করিয়া ফেলিল। তখন মরজিয়ানা আবার তাঁহার চোঁখ বাঁধিয়া, রাস্তা পর্যন্ত আনিয়া বলিল, এখন তোমার চোখের বাঁধন খুলে দিচ্ছি, এই নাও আর একটি মোহর। কিন্তু সাবধান, একথা যেন প্রকাশ না হয়।’ বাবা মুস্তাফা কথাটা গোপন রাখিবে বলিয়া বার বার তিনবার শপথ করিয়া, মরজিয়ানাকে প্রাণ ভরিয়া সেলাম করিল। তারপর হাসিতে হাসিতে দোকানে ফিরিয়া গেল।
ইহার পর কাশিমের দেহে কাপড় ঢাকা দিয়া এবং তাহার উপর আতর, গোলাপ-জল প্রভৃতি ছিটাইয়া, মরজিয়ানা ধর্মযাজকের নিকট উপস্থিত হইল। ধর্মযাজক আসিলে, কয়েকজন আত্মীয়স্বজনের সাহায্যে কাশিমকে কবর দেওয়া হইল। পাড়াপ্রতিবেশী কাশিমের স্ত্রীর কাতর চিৎকারে ব্যথিত হইয়া ঘরে ফিরিল।
কাশিমের মৃত্যুর একমাস পরে তাহার স্ত্রী আলিবাবার বাড়িতে চলিয়া আসিল। আলিবাবার পুত্র এক বণিকের দোকানে কাজকর্ম শিখিত। এখন হইতে তাহার উপর কাশিমের দোকানের ভার পড়িল।
এদিকে দস্যুদল গহ্বরের মধ্যে কাশিমের মৃতদেহ না দেখিয়া বড়োই ভয় পাইল। ক্রমে অনুসন্ধান করিতে করিতে তাহারা দেখিল, শুধু যে মৃতদেহ পাওয়া যাইতেছে না, তাহা নহে, মণি-মুক্তা এবং মোহরের রাশিও অনেক কমিয়াছে। তাহাদের তো চক্ষুস্থির। আহা বেচারাদের এতদিনের পরিশ্রম সমস্তই মাটি হইতে বসিয়াছে। যাহারা এমন করিয়া তাহাদের সর্বনাশ করিতেছে, সেই দুর্বৃত্তদের মুণ্ডপাত না করিলেই নয়! দস্যুদল মহা চিন্তার মধ্যে পড়িয়া গেল। অবশেষে দলপতি বলিল, ‘এ কাজে আমি এক লক্ষ মোহর পুরস্কার ঘোষণা করছি। যে কেউ আসল চোরের সন্ধান বলে দিতে পারবে, সে-ই লক্ষ মোহর পাবে। কিন্তু মনে রেখো, মুখে বড়াই করে শেষে চোর ধরিয়ে দিতে না পারলে, তার প্রাণদণ্ড হবে।’
দলপতির কথায় আর সকলেই চুপ করিয়া রহিল। কেবল একজন সাহসী দস্যু অগ্রসর হইয়া বলিল, ‘আমি এই কাজের ভার নিচ্ছি আমি চোর ধরিয়ে দেব।’ এই বলিয়া লোকটা তখনই চোরের সন্ধানে বাহির হইল। সে ঘুরিতে ঘুরিতে ঠিক ভোরের বেলা বাজারে উপস্থিত হইয়া দেখিল, আর সমস্ত দোকানই বন্ধ, কেবল বাবা মুস্তাফা দোকান খুলিয়া কী যেন সেলাই করিতেছে। দস্যু তাহার নিকট গিয়া জিজ্ঞাসা করিল, ‘তুমি বুড়ো মানুষ, এই অন্ধকারে কিছু দেখতে পাচ্ছ কি?’ বাবা মুস্তাফা বলিল, ‘আমি বুড়ো বটে কিন্তু আমার চোখে এখন বেশ তেজ আছে। এই সেদিন অন্ধকার ঘরে আমি একটা আস্ত মড়া সেলাই করেছি।’
দস্যু মড়া সেলাই করেছ! ব্যাপারখানা কী?
বাবা মুস্তাফা না, না, মিছে কথা!––মিছে কথা!
দস্যু কখনো মিছে কথা নয়। আমি জানি, তুমি মিছে কথা বলবার লোক নও। এই নাও মোহর। সেই বাড়িটি যদি দেখিয়ে দিতে পার, তবে আর একটি মোহর পাবে।
বাবা মুস্তাফা সে অসম্ভব কথা! আমার চোখে তারা রুমাল বেঁধে নিয়ে গেছিল!
দস্যু আচ্ছা চলো, যেখান থেকে তারা রুমাল বেঁধেছিল, আমিও সেখান থেকে তোমার চোখে একখানা রুমাল বেঁধে দেব। তাহলে সেই বাড়িটা বের করতে তোমার ভুল হবে না!
মোহরের লোভে বাবা মুস্তাফা দস্যুর কথায় রাজি হইয়া তাহার সহিত চলিল। তারপর কতক দূর গিয়া বলিল, ‘এইবার রুমাল বেঁধে দাও। এখান থেকেই সেদিন তারা আমার চোখে রুমাল বেঁধেছিল।’
দস্যু বাবা মুস্তাফার চোখে রুমাল বাঁধিয়া দিয়া আবার তাহার সঙ্গে চলিল। কতক দূর গিয়া বাবা মুস্তাফা বলিল, ‘আর যেতে হবে না। আমার বোধ হয়, সেদিন আমি এই পর্যন্ত এসেছিলাম।’
দস্যু দেখিল, বাবা মুস্তাফা একটা খুব বড়ো বাড়ির সম্মুখে আসিয়া থামিয়াছে। তখন তাহাকে বিদায় দিয়া, সে সেই বাড়ির দরজা খড়ির দ্বারা চিহ্নিত করিয়া স্থানান্তরে চলিয়া গেল।
মরজিয়ানা তখন কী কার্যে বাহিরে গিয়াছিল। ফিরিবার সময় দরজায় খড়ির চিহ্ন দেখিয়া তাহার মনে কেমন যেন সন্দেহ হইতে লাগিল। সে একখানা খড়ি লইয়া তখনই রাস্তার দুই পাশের সমস্ত বাড়ির দরজায় সেইরকম চিহ্ন দিয়া রাখিল।
এদিকে দস্যু বনে গিয়া তাহার সহচরদিগকে চিহ্নিত বাড়ির কথা বলিল। এ সংবাদে দলপতির উৎসাহের সীমা নাই, কিন্তু সেখানে গিয়া সে যাহা দেখিল, তাহাতে রাগে আগুন হইয়া উঠিল। সে দেখিল, সেই রাস্তার প্রত্যেক বাড়ির দরজায় একই প্রকার খড়ির চিহ্ন রহিয়াছে। তখন দলপতির হুকুমে সেই দস্যুর প্রাণদণ্ড হইল।
ইহার কয়েক দিন পরে অপর একজন দস্যু বাবা মুস্তাফার সাহায্যে আলিবাবার বাড়ি ঠিক করিয়া, দরজার এমন স্থানে একটি লাল চিহ্ন দিয়া গেল যে, সহজে তাহা কাহারও চোখে না পড়ে। কিন্তু মরজিয়ানার দৃষ্টি এড়ানো কঠিন। মরজিয়ানা সেদিন রাস্তার দুই পাশের সব বাড়ির দরজাতে সেইরূপ লাল চিহ্ন দিয়া রাখিল। সুতরাং সে দস্যুরও প্রাণদণ্ড হইল।
অবশেষে দলপতি বলিল, ‘তোমাদের দিয়ে কিছুই হবে না। আমি নিজে গিয়ে বাড়িটা ঠিক করে আসছি। তোমরা বাজার থেকে ১৯টা গাধা ও ৩৮টা তেলের পিপে কিনে আনো।’ ইহার পর সে বাবা মুস্তাফার সহিত দেখা করিয়া দুইটি মোহর দিয়া বলিল, আমাকে সেই বাড়িটা একবার দেখিয়া দাও। মোহর পাইয়া বাবা মুস্তাফার লোভ খুব বাড়িয়া গিয়াছিল দলপতিকে আলিবাবা বাড়ি দেখাইয়া দিয়া সে আরও কিছু ধন উপার্জন করিল। বাবা মুস্তাফা চলিয়া আসিলে, দলপতি বাড়িটা বেশ ভালো করিয়া চিনিয়া লইল। তারপর জঙ্গলে গিয়া ৩৭ জন দস্যুকে ৩৭টা পিপার ভিতর ঢুকিতে বলিয়া, নিজের অপর পিপাটি তেলে পূর্ণ করিল। এইরূপে ৩৮টা পিপা পূর্ণ হইল, সেইগুলিকে ১৯টা গাধার পিঠে চাপাইয়া সে জঙ্গল হইতে বাহির হইল!
সন্ধ্যার ঠিক পূর্বে দলপতি অলিবাবার বাড়ির সম্মুখে উপস্থিত হইয়া সেই রাত্রের জন্য আশ্রয় ভিক্ষা করিল। বলিল, ‘আমি বিদেশি বণিক তেল বেচতে এসেছি। এখানে কারো সঙ্গে আমার জানাশুনা নেই যদি আজ রাতটুকুর জন্যে আপনি আশ্রয় দেন, তাহলে আমার বড়োই উপকার হয়।’
দস্যুর কথায় বিশ্বাস করিয়া আলিবাবা তখনই মরজিয়ানাকে ডাকিয়া বলিল, ‘এই লোকটি তেল বেচতে এসেছে। আজ রাত্তিরে আমাদের এখানেই থাকবে, তুমি এর খাওয়াদাওয়ার বন্দোবস্ত করে দাও। আর এই গাধাগুলো আস্তাবলে পাঠিয়ে দাও। তেলের পিপেগুলো উঠানেই থাক।
রাত্রে আহারাদির পর, আলিবাবা দস্যুর সহিত কিছুক্ষণ কথাবার্তা কহিয়া শয়ন করিতে গেল। দস্যু তাহার নির্দিষ্ট বিছানায় গিয়া শুইয়া পড়িল। আবদুল্লা নামে একজন ক্রীতদাস আর মরজিয়ানা তখনও রান্নাঘরের কার্যে ব্যস্ত ছিল! আলিবাবা ঘুমাইয়া পড়িলে, দলপতি করিল কী আস্তে আস্তে বাহিরে আসিয়া, এক-একটি করিয়া সমস্ত পিপার মুখে খুলিয়া ফেলিল এবং দস্যুদিগকে এইরূপ উপদেশ দিল যে, সে ঢিল ছুঁড়িয়া সংকেত করিবামাত্র যেন সকলে অস্ত্রশস্ত্র লইয়া বাহিরে আসে। পরামর্শ স্থির হইলে, সে আবার তাহার বিছানায় গিয়া শুইয়া পড়িল।
এদিকে হইয়াছে কী, রান্নাঘরের কাজ শেষ হইবার পূর্বেই প্রদীপের তেল ফুরাইয়া গেল। আবদুল্লা বলিল, ‘বণিকের পিপে থেকে একটু তেল নিলে হয় না?’ মরজিয়ানা বলিল, ‘ঠিক বলেছ।’ এই বলিয়া সে যেই একটা পিপার মুখ খুলিয়াছে, অমনি তাহার ভিতর হইতে একজন ফিসফিস করিয়া জিজ্ঞাসা করিল, ‘সময় হয়েছে কি?’ মরজিয়ানা পিপার মধ্যে মানুষের কথা শুনিয়া শিহরিয়া উঠিল। কিন্তু সে বড়ো সহজ মেয়ে নয়! দস্যুদের চালাকি বুঝিতে তাহার বাকি থাকিল না! সে কিছুমাত্র বিচলিত না হইয়া বলিল, ‘এখন নয়––একটু পরে।’ ইহার পর মরজিয়ানা বাকি পিপাগুলি খুলিয়াও ওই একই প্রশ্ন শুনিয়া সকলকে ঠিক একই প্রকার উত্তর দিল। শেষে মনে মনে প্রতিশোধের উপায় স্থির করিয়া, যে পিপাতে সত্য সত্যই তেল ছিল, তাহা হইতে কয়েক গামলা ঢালিয়া লইল এবং উহা আগুনে চড়াইয়া দিল। তারপর দুইজনে মিলিয়া সেই ফুটন্ত তেল ঢালিয়া ক্রমে ক্রমে ৩৭ জন দস্যুকেই যমালয়ে পাঠাইল।
দস্যুদল তো নিহত হইল এইবার দলপতি কী করে দেখিবার জন্য মরজিয়ানা জানালার পাশে লুকাইয়া রহিল। একটু পরেই সে দেখিল, ছদ্মবেশী বণিক কতকগুলো ঢেলা লইয়া পিপার গায়ে ছুঁড়িতেছে! কিন্তু তাহার এই সংকেত কেহই সাড়া দিল না। তখন সে একে একে পিপাগুলি পরীক্ষা করিতে লাগিল। ক্রমে সকলগুলি পরীক্ষা করা হইলে, ভয়ে তাহার আপাদমস্তক কাঁপিয়া উঠিল। কী সর্বনাশ! ৩৭ জন দস্যুর একটিও জীবিত নাই! দলপতি আর মুহূর্ত বিলম্ব না করিয়া, দেওয়াল টপকাইয়া পলায়ন করিল।
মরজিয়ানা সে রাত্রে কাহাকেও কিছু বলিল না। পরদিন তাহার মুখে ছদ্মবেশী বণিকের বৃত্তান্ত শুনিয়া আলিবাবার চক্ষুস্থির।
মরজিয়ানা ক্রমে ক্রমে দস্যুদলের সকল কথাই প্রকাশ করিল। জঙ্গল হইতে ধনরত্ন আনিবার পর ইহারা যে নানা উপায়ে আলিবাবাকে প্রাণে মারিবার চেষ্টা করিতেছে এবং কেবল মরজিয়ানার বুদ্ধি কৌশলে দস্যুদের সকল চেষ্টাই ব্যর্থ হইয়াছে, ইহা বুঝিতে পারিয়া আলিবাবা শতমুখে মরজিয়ানার প্রশংসা করিতে লাগিল। শেষে উৎসাহের সহিত বলিল, ‘মরজিয়ানা, আজ থেকে তুমি আমার কেনা দাসী নও তোমাকে আমি সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিচ্ছি। পরে তোমার এই মহৎ কাজের উপযুক্ত পুরস্কার দেব! এখন লোকগুলার কবরের বন্দোবস্ত করো।’
আলিবাবার কথায় আহ্লাদিত হইয়া মরজিয়ানা ও আবদুল্লা প্রকাণ্ড একটা গর্ত খুঁড়িয়া মৃতদেহগুলা পুতিয়া ফেলিল। ৪০ জন দস্যুর মধ্যে বাকি রহিল শুধু দলপতি। এখন তাহার কথা বলিতেছি।
সেই রাত্রে তো দলপতি পলায়ন করিল। তারপর বহুকাল আর তাহার দেখাসাক্ষাৎ নেই। শেষে ছদ্মবেশে ফিরিয়া আসিয়া সে আলিবাবার পুত্রের দোকানের ঠিক সম্মুখে একখানা দোকান খুলিয়া বসিল। দোকানের বিজ্ঞাপনে সে খাজা হোসেন নাম প্রচার করিল। সুতরাং লোকে তাহাকে খাজা হোসেন বলিয়াই ডাকিত।
খাজা হোসেন সকলের সহিত এমন ভদ্র ব্যবহার করিতে লাগিল যে, লোকে আশ্চর্য হইয়া গেল। তাহার মতো মিষ্টভাষী প্রায়ই দেখা যাইত না।
আলিবাবার পুত্রের সহিত তাহার বিশেষ ঘনিষ্ঠতা জন্মিল। অনেক সময়েই এই দুই বন্ধুকে একত্র আহার বিহার করিতে দেখা যাইত!
একদিন পিতার অনুমতি লইয়া আলিবাবার পুত্র তাহার এই বন্ধুকে নিমন্ত্রণ করিল। খাজা হোসেন যথাসময়ে উপস্থিত হইল বটে, কিন্তু আহারে বসিতে কোনোমতেই রাজি হইল না। সে অনেক অনুনয়-বিনয় করিয়া বলিল, ‘আমাকে মাপ করুন, আমি কারো বাড়িতে খাই না।’ কিন্তু আলিবাবা কিছুতেই ছাড়িল না বলিল, ‘এখানে খেতে কী আপত্তি, বলুন?’ খাজা হোসেন বলিল, ‘আমি নুন দেওয়া তরকারি খাই না সেইজন্যই কোথাও আহার করা আমার পক্ষে অসম্ভব।’
আলিবাবা বলিল, ‘আচ্ছা, আমি সে ব্যবস্থা করছি।’ ইহার পর পাকশালে গিয়া মরজিয়ানাকে বলিল, ‘দেখো, ওই ভদ্রলোকটি নুন দেওয়া তরকারি খেতে রাজি নন। আজ বিনা নুনে তরকারি রাঁধো।’
মরজিয়ানার মনে কেমন যেন সন্দেহ উপস্থিত হইল। নিমন্ত্রিত ব্যক্তি যদি ভদ্রলোক হয়, তবে লবণাক্ত তরকারি খাইবে না কেন? বোধ হয়, কোনো দুষ্টু লোক ছদ্মবেশে প্রভুর সর্বনাশ করিতে আসিয়াছে। যাহা হউক, একবার ভালো করিয়া খবর লইতে হইতেছে। এই ভাবিয়া মরজিয়ানা দরজার আড়াল হইতে লুকাইয়া সেই লোকটিকে দেখিয়া আসিল, আর দেখিবামাত্রই তাহাকে দস্যুপতি বলিয়া চিনিতে পারিল। কিন্তু তখন কাহাকেও কিছু বলিল না।
আহারাদির পর আমোদ-আহ্লাদ চলিতে লাগিল। মরজিয়ানা নর্তকীর বেশে সজ্জিত হইয়া নাচিতে আরম্ভ করিল। তাহার হস্তে একখানা তীক্ষ্ণধার ছোরা। সে নাচিতে নাচিতে সেই ছোরা ঘুরাইয়া নানা ক্রীড়া-কৌতুক দেখাইতে লাগিল। আলিবাবার পুত্র খুশি হইয়া তাহাকে একটি মোহর পুরস্কার দিল। দেখাদেখি খাজা হোসেনও কিছু দিবার উপক্রম করিতেছে, এমন সময় মরজিয়ানা ছোরা উঠাইয়া সজোরে তাহার বুকে মারিল। সেই এক আঘাতেই সব শেষ।
হায় হায়! কী সর্বনাশ! কী সর্বনাশ! এই ব্যাপারে আলিবাবা ও তাহার পুত্র মরজিয়ানার উপর চটিয়া আগুন হইয়া উঠিল। ‘হতভাগী, তোর এতদূর স্পর্ধা? ভদ্রলোকের বুকে ছোরা মারতে ভয় হল না? আজ তোর আর রক্ষে নেই!’
মরজিয়ানা বলিল, ‘প্রভু, আমি কোনো অন্যায় কাজ করিনি। আপনারা অন্ধ, কিন্তু লোকটিকে দেখিবামাত্র আমি চিনেছি, এ সেই দস্যুপতি। আমি একে না মারলে, আজ আপনারা পিতা-পুত্রে এর হাত মারা পড়তেন। যখনি লোকটা নুন দেওয়া তরকারি খেতে আপত্তি করেছে, তখনই বুঝেছি, এ আপনাদের চির শত্রু––সেই দস্যু ছাড়া আর কেউ নয়।’
মরজিয়ানার কথায় আলিবাবার চক্ষু ফুটিল। যেদিন হইতে সে দস্যুদের ধনের সন্ধান পাইয়া, তাহার অংশ গ্রহণ করিতে আরম্ভ করিয়াছে, সেই দিন হইতেই তাহারা তাহাকে বধ করিবার জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করিয়াছে। আলিবাবা আত্মরক্ষার জন্য এ পর্যন্ত কিছুই করিতে পারে নাই। কেবল চতুরা মরজিয়ানার বুদ্ধির প্রভাবেই সে তখনও বাঁচিয়া আছে। ভাবিতে ভাবিতে আলিবাবা আনন্দে কাঁদিয়া ফেলিল। তারপর চোখের জল মুছিতে মুছিতে বলিল, ‘মরজিয়ানা, তুমি যে উপকার করেছ, টাকা দিয়ে তার ঋণ শোধ করা যায় না। আগে আমি তোমাকে স্বাধীন করে দিয়েছি আজ তোমার সঙ্গে আমার ছেলের বিয়ে দিয়ে সুখী হব!’ এই বলিয়া আলিবাবা পুত্রের দিকে মুখ ফিরাইল। পুত্রও আহ্লাদের সহিত পিতার এই প্রস্তাবে রাজি হইল।
মহা জাঁকজমকে তাহাদের বিবাহ হইয়া গেল। ইহার পর দস্যুদের বাকি টাকাকড়ি আনিয়া, আলিবাবা ও তাহার পুত্র মনের সুখে ঘরকন্না করিতে লাগিল।
আমার কথাটি ফুরুল, ইত্যাদি।
