বেলুন

বেলুন

১৭৮২ সালের নভেম্বর মাসে সর্বপ্রথম ফরাসি দেশে বেলুন আবিষ্কৃত হয়। জোসেফ মোগলফিয়ে ও স্টিভেন মোগলফিয়ে নামে দুই ভাই প্রথমে বেলুন উড়াইতে শিখেন। আগুনের ধোঁয়া আপনা আপনি উর্ধ্বে উঠে দেখিয়া, তাঁহারা ভাবিলেন যে, কতকটা ধোঁয়া একটা হালকা থলির মধ্যে পুরিয়া ছাড়িয়া দিলে, সেই থলিও উপরে উঠিতে পারে। এই ভাবিয়া তাঁহারা কাগজের একটা মস্ত থলিও প্রস্তুত করিয়া, তাহাতে ধোঁয়া পুরিয়া ছাড়িয়া দিলেন। অমনি দেখিতে দেখিতে সেই থলি প্রায় চল্লিশ হাত উঠিয়া, কিছুক্ষণ স্থিরভাবে রহিল, তারপরে ধীরে ধীরে নামিয়া পড়িল। প্রথম চেষ্টাতেই এতটা কৃতকার্য হইয়া, তাঁহারা দুই ভাই বিশেষ উৎসাহের সহিত বেলুনের উন্নতির চেষ্টা করিতে লাগিলেন।

তাহার ফলে ১৭৮৩ সালের ৫ই জুন তাঁহারা একটা কাপড়ের বেলুন প্রস্তুত করিয়া বহু দর্শকের সম্মুখে শূন্যে উড়াইলেন। সেই অদ্ভুত ব্যাপার সকলে দেখিয়া আশ্চর্য হইয়া গেল। ক্রমে তাঁহাদের দুই জনের নাম দেশ-বিদেশে ছড়াইয়া পড়িল। সেই বৎসর সেপ্টেম্বর মাসে তাঁহারা আরও একটা বড়ো বেলুন প্রস্তুত করিয়া শূন্যে উড়াইলেন।

সেই বেলুনে একটি হাঁস, একটি মুরগি এবং একটি ভেড়া ছিল। দেড় হাজার ফুট উচ্চে উঠিয়া, বেলুন আবার ধীরে ধীরে নামিয়া আসিল। জীবজন্তুর মধ্যে সেই হাঁস, মুরগি ও ভেড়াই সর্বপ্রথমে বেলুনে আরোহণ করে। সেই বৎসর ১৭ নভেম্বর রোজিয়ার নামে এক বৈজ্ঞানিক পণ্ডিত একটি বন্ধুকে লইয়া বেলুনে আরোহণ করিয়া সকলকে চমৎকৃত করিলেন। ইহার পূর্বে আর কেহ বেলুনে উঠে নাই।

এই ঘটনার পর, ইয়োরোপের নানা স্থানে বেলুন সম্বন্ধে আন্দোলন উপস্থিত হইল এবং উহার উন্নতির জন্য চারিদিকে বিস্তর চেষ্টা হইতে লাগিল। ক্রমে প্যারাসুট প্রভৃতি আবিষ্কৃত হইলে, অনেকে বেলুনে চড়িয়া এবং প্যারাসুটের সাহায্যে নামিয়া দর্শকগণকে বিস্মিত করিতে লাগিলেন।

এখানে সে-সকল কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করিব না। আজ তোমাদিগকে আমাদের দেশীয় বেলুনবাজ রামচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা বলিব। কয়েক বৎসর পূর্বে, একদিন রামবাবু বেলুনে চড়িয়া আর প্যারাসুটের সাহায্যে নামিয়া যে আশ্চর্য বীরত্বের পরিচয় দিয়াছিলেন, এদেশে তাহার তুলনা নাই। রামবাবুর পূর্বে অন্য কোনো বাঙালি বেলুনে চড়িতে সাহস করেন নাই। সুতরাং রামবাবু বেলুনে উঠিবেন শুনিয়া, একদিন আমরা কয়েকজন সেই আশ্চর্য ঘটনা দেখিতে গেলাম। যে স্থান হইতে তাঁহার উঠিবার কথা ছিল, নির্দিষ্ট সময়ের চারি-পাঁচ ঘণ্টা পূর্বে সে স্থান লোকে লোকারণ্য হইয়াছিল। সেই ভিড়ের ভিতর হইতে কোনোরকমে মাথা উঁচু করিয়া আমরা দেখিলাম, রবারের বাঁশি ফুঁ দিয়া ফুলাইলে যেমন হয়, সেইরূপ একটা প্রকাণ্ড বেলুন, মাতালের মতো একবার দক্ষিণে, একবার বামে টলিতেছে আর কতকগুলি লোকে দড়ি ধরিয়া উহা টানিয়া রাখিয়াছে। তখনও গ্যাস ভরা চলিতেছিল।

কিছু পরে রামবাবুকে লইয়া সেই বেলুন শূন্যে লাফাইয়া উঠিল এবং ক্রমশ ছোটো হইতে হইতে, শেষে সামান্য একটা বলের আকার ধারণ করিয়া মেঘের কাছে উপস্থিত হইল। আমরা একদৃষ্টে চাহিয়া রহিলাম। তারপর বেলুন যখন মেঘের ভিতর প্রবেশ করিবার উপক্রম করিতেছে, সেই সময় রামবাবু প্যারাসুটের দড়ি ধরিয়া লাফাইয়া পড়িলেন।

তখনকার সেই ভয়ানক দৃশ্য মনে হইলে এখনও বুক কাঁপিয়া উঠে। কয়েক শত ফুট পর্যন্ত––কখনো প্যারাসুট নীচে, রামবাবু উপরে, আবার কখনো রামবাবু নীচে, প্যারাসুট উপরে––এইভাবে ডিগবাজি খাইতে খাইতে সহসা উহা খুলিয়া ঠিক ছাতার আকার ধারণ করিল এবং ধীর গতিতে রামবাবুকে লইয়া নীচে আসিল। আমরাও যেন হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচিলাম! একজন বাঙালির এরূপ বীরত্ব দেখিয়া উপস্থিত সকলেই, এমনকী সাহেব-মেম পর্যন্ত, ধন্য ধন্য করিতে লাগিল।

এখন তোমাদিগকে ‘কক্সওয়েল’ ও ‘গ্লেসার’ নামে দুইজন বিখ্যাত বেলুনবাজের গল্প বলিব। ১৮৬২ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর ইঁহারা ইংল্যান্ডের উলভারহ্যামটন নামক স্থান হইতে বেলুনে আরোহণ করেন। গ্লেসার লিখিয়াছেন––‘দুপুর ১টা ৩মিনিটের সময় আমরা পৃথিবী ত্যাগ করিয়া শূন্যে যাত্রা করি। প্রায় পাঁচ হাজার ফুট উঠিয়া ১টা ১৩ মিনিটের সময় আমাদের বেলুন প্রকাণ্ড একখানি মেঘের মধ্যে প্রবেশ করিল। মেঘখানা প্রায় হাজার ফুট গভীর ছিল। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যে তাহা অতিক্রম করিয়া, আমরা আবার মেঘশূন্য অনন্ত নীলাকাশে উপস্থিত হইলাম এবং প্রখর সূর্যের কিরণে বেশ আরাম অনুভব করিতে লাগিলাম। তখন নিম্নের দৃশ্য অতি মনোরম বোধ হইতেছিল। ঘন মেঘরাশি, কোথাও পর্বতমালা, কোথাও তুষারমণ্ডিত শৃঙ্গ, কোথাও সমতল উপত্যকার আকার ধারণ করিয়া প্রকৃতির এক অভিনব সৌন্দর্য বিকাশ করিতেছিল।

সেই মেঘপুঞ্জের একখানি ফটো লইবার আমার নিতান্ত ইচ্ছা হইয়াছিল, কিন্তু বেলুন এত তাড়াতাড়ি উঠিতেছিল যে, কোনো প্রকারে ফটো তুলিবার সুযোগ পাই নাই। ১টা ২২ মিনিটের সময় আমরা দুই মাইল উচ্চে উঠিলাম। আকাশ ক্রমেই গাঢ় নীল। সেই স্থান হইতে মেঘের ফাঁক দিয়া পৃথিবীর দৃশ্য অতি রমণীয় বোধ হইতে লাগিল। তাহার পর আর ছয় মিনিটের মধ্যে আমরা আরও এক মাইল উচ্চে উঠিলাম। ইহার কয়েক মিনিট পরেই মিস্টার কক্সওয়েল নিশ্বাস লইতে কষ্ট অনুভব করিতে লাগিলেন। ১টা ৪০ মিনিটের সময় আমরা চারি মাইল উচ্চে উঠিলাম।

ইহার পর বেলুন হইতে কয়েক বস্তা বালি ফেলিয়া দেওয়াতে, আর দশ মিনিটে আমরা পাঁচ মাইল উচ্চে উঠিলাম। এতক্ষণ পর্যন্ত আমি বেশ সুখে স্বচ্ছন্দে চারিদিকের শোভা দেখিতেছিলাম নিশ্বাস লইতে কোনোপ্রকার কষ্ট অনুভব করি নাই। কিন্তু এখন হইতে স্বচ্ছন্দে নিশ্বাস লওয়া আমার পক্ষে কষ্টকর হইয়া উঠিল এবং আমার দৃষ্টিশক্তিও কমিয়া আসিল। ক্রমে চারিদিক অন্ধকার বোধ হইতে লাগিল।

বেলুন ঘুরিতে ঘুরিতে উঠিতেছিল বলিয়া, যে দড়ি টানিয়া গ্যাস বাহির করিতে হয়, তাহা জড়াইয়া গিয়াছিল। মিস্টার কক্সওয়েল উপরে উঠিয়া, সেই দড়ি ছাড়াইতে লাগিলেন। তখন আমরা ২৯,০০০ ফিটেরও উপরে উঠিয়াছি। এই সময় টেবিলের উপর হইতে হাত উঠাইতে গিয়া দেখি, আমার ডান হাত একেবারে অসাড় হইয়া পড়িয়াছে। বাঁ হাতও যে নাড়িব, সে শক্তিও ছিল না। দেখিতে দেখিতে আমার সমুদয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অবশ হইয়া পড়িল, ঘাড় বাঁকিয়া বাম স্কন্ধের উপর লুটাইয়া পড়িল। মাথা সোজা রাখিতে অনেক চেষ্টা করিলাম, মুহূর্তের জন্য সোজা হইয়া, তখনই আবার ডান দিকে ঝুঁকিয়া পড়িল। অবশেষে বসিয়া থাকা অসম্ভব হইলে, আমি ঝুড়ির পাশে হেলিয়া পড়িলাম। বেলুন তখনও উপরে উঠিতেছিল। আমি সেই সীমাহীন, শব্দহীন, অনন্ত নীলাকাশে অর্ধ জাগ্রত এবং অর্ধ অচেতন অবস্থায় কিছুক্ষণ কাটাইয়া, শেষে একেবারে অচেতন হইয়া পড়িলাম। কয়েক মিনিট এইভাবেই কাটিল। তৎপরে অল্প অল্প চেতনা হইলে দেখিলাম, মিস্টার কক্সওয়েল নানা প্রকারে আমার চেতনা সম্পাদনে যত্ন ও চেষ্টা করিতেছেন।

‘বেলুন ৩৭,০০০ হাজার ফুট উচ্চে উঠিবার পর, গ্যাস বাহির করিয়া দেওয়ায়, ধীরে ধীরে আবার নামিতে আরম্ভ করিল। ক্রমে আমার বেশ চেতনা হইল। আমি উঠিয়া বসিলাম এবং ঘুম ভাঙিয়া গেলে, লোকে যেমন কেমন একরকম হইয়া যায়, আমার অবস্থাও ঠিক সেইরকম হইল। ইহার পর একটু একটু করিয়া হাতে পায়ে জোর পাইলাম এবং আমার দৃষ্টিশক্তিও ফিরিয়া আসিল। ঘড়ি খুলিয়া দেখিলাম, আমি সাত-আট মিনিট মাত্র অজ্ঞান অবস্থায় ছিলাম। নামিতে নামিতে শেষে আমাদের বেলুন আড়াইটার কিছু পরে ভূমি স্পর্শ করিল।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *