গল্প / যোগীন্দ্রনাথ সরকার

গল্প

বানরের খেয়াল

একদিন এক ব্রাহ্মণ নস্য লইতে লইতে দেখিতে পাইলেন, একটা বানর একদৃষ্টে তাঁহার দিকে চাহিয়া আছে। বানরটা প্রায়ই ব্রাহ্মণের তরিতরকারি চুরি করিয়া লইয়া যাইত। একটু মজা দেখিবার জন্য তিনি নস্যদানিটা খুলিয়া রাখিয়া, সেখান হইতে কিছু দূরে সরিয়া দাঁড়াইলেন! অমনি দেখিতে দেখিতে বানর ছুটিয়া আসিয়া এক টিপ নস্য আপনার নাকের মধ্যে পুরিয়া দিল। আর যায় কোথা,––হ্যাঁচ্চো––হ্যাঁচ্চো––কেবল হাঁচি! সে নাক রগড়াইয়া, মাটিতে মুখ ঘষিয়া কিছুতেই হাঁচি থামাইতে পারে না! বানর-মহলে মহা কোলাহল পড়িয়া গেল। এই ঘটনার পর কয়েক মাস পর্যন্ত বানরটা আর ব্রাহ্মণের বাড়ির ত্রিসীমায়ও ঘেঁষে নাই।

গাধার দুষ্টামি

গাধাকে সকলেই বোকা বলিয়া জানে, কিন্তু বাস্তবিক, গাধা বোকা নহে। গাধার দুষ্টামির একটা গল্প শুনিবে? এক ব্যক্তি তাঁহার ঘোড়াকে একটা ঘেরা জায়গায় রাখিতেন বাহির হইবার জন্য একটিমাত্র দরজা ছিল। সেই দরজাটি, ভিতর ও বাহির, উভয় দিকেই বন্ধ থাকিত। কিন্তু ঘোড়াকে রোজই বাহিরে দেখা যাইত। প্রথমে কেহই ইহার কারণ ঠিক করিতে পারিল না। শেষে দেখা গেল, ঘোড়া প্রথমে ভিতরের হুঢ়কা ঠেলিয়া খুলিয়া ফেলে এবং ‘চেঁহে’ ‘চেঁহে’ শব্দ করে আর তখনই কোথা হইতে একটা গাধা ছুটিয়া আসিয়া নাক দিয়া বাহিরের ছিটকিনি তুলিয়া দেয়। তারপর ঘোড়া বাহিরে আসিলে, দুই বন্ধুতে মিলিয়া ঘাস খায়। এই ঘটনা হইতে বেশ বুঝা যাইতেছে যে, গাধা একেবারেই ‘গাধা’ নহে।

শোভার কুকুর

কুকুরটির প্রতি চাহিয়া দেখো, চোখ দুটি কী সুন্দর! চাহনিতে স্নেহ-মমতা যেন ফুটিয়া রহিয়াছে! শোভার সহিত এই কুকুরের এত ভাব কেন, জান? শোভা যখন আরও ছোটো ছিল, তখন তাহার বাবা নারায়ণগঞ্জে চাকুরি করিতেন। সেই সময় একদিন স্টিমারে পদ্মা পার হইতে হইতে হঠাৎ শোভা জলে পড়িয়া যায়।

এই কুকুরটি স্টিমারেই থাকিত! এক খালাসির উপর উহার দেখাশুনার ভার ছিল। শোভা জলে পড়িবামাত্র খালাসি কুকুরকে কী যেন একটা ইশারা করিল, আর অমনি সে জলে ঝাঁপাইয়া পড়িয়া তাহাকে উদ্ধার করিল।

ইহাতে শোভার বাপ-মায়ের আনন্দের সীমা রহিল না। তাঁহারা অনেক টাকা দিয়া তখনই কুকুরটি কিনিয়া লইলেন এবং খালাসিকেও যথেষ্ট পুরস্কার দিলেন।

সেই অবধি শোভার সহিত কুকুরের খুব ভাব। শোভা যখন যাহা কিছু খাবার পায়, কুকুরকে ভাগ না দিয়া, কখনো একাকী তাহা খায় না। কুকুরটি সঙ্গে না থাকিলে তাহার খেলাধুলা, আমোদ-প্রমোদ সবই মাটি!

শোভার বাপ-মা এই কুকুরের উপকারের কথা একদিনের জন্যও ভুলেন নাই। ইহার সুখ-সুবিধার জন্য তাঁহারা সর্বদাই ব্যস্ত। কুকুরটি যেন পরিবারেরই একজন। সে সকলেরই আদরের পাত্র।

দামোদরের পরিবর্তন

দামোদর সিং-এর বয়স এখন ছাব্বিশ বৎসর। ছয় বৎসর পূর্বে তাহার পিতার মৃত্যু হয়। দামোদরের পিতা সামান্য যাহা কিছু উপার্জন করিত, তাহাতে সংসারের সমুদয় ব্যয় নির্বাহ হইত না! সেইজন্য দামোদরের মা নিজে পরিশ্রম করিয়া বাড়ির চারিপাশে তরিতরকারির বাগান করিয়াছিল! গ্রামের অন্যান্য কৃষকদিগের সহিত সে ফলমূল লইয়া বাজারে বিক্রয় করিতে যাইত। এইরূপে উভয়ের পরিশ্রমে অতি কষ্টে তাহাদের দিন চলিত।

দামোদর তাহাদের একমাত্র সন্তান। পিতামাতার এই কষ্টে সে কোথায় তাহাদের কার্যের সহায়তা করিবে, না, বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দামোদর ক্রমেই অধঃপাতে যাইতে লাগিল। কুসঙ্গীদের সহিত মিশিয়া মন্দ আমোদে দিন কাটাইতে পাইলে সে আর কিছুই চাহিত না। পিতা-মাতা তাহাকে কত বুঝাইল, কত তিরস্কার করিল, কিন্তু কিছুতেই তাহার সুবুদ্ধি হইল না।

দামোদরের বয়স যখন কুড়ি বৎসর, তখন একদিন হঠাৎ তাহার পিতার মৃত্যু হইল। একে কুপুত্রের অত্যাচার, তাহার উপর স্বামীর অকস্মাৎ মৃত্যু––দামোদরের মা চারিদিক অন্ধকার দেখিতে লাগিল। পুত্রকে কী খাওয়াইবে, কেমন করিয়া সংসার চলিবে, ভাবিয়া সে কূলকিনারা পাইল না। দামোদরের কিন্তু কোনো ভাবনাই নাই। তাহার সুখ-সুবিধার সামান্য একটু ত্রুটি হইলে, সে অকথ্য ভাষায় মাকে গালাগালি করিত।

এই ঘটনার এক বৎসর পরে একদিন দামোদরের মা অসুস্থ হইয়া পুত্রকে ডাকিয়া বলিল, ‘বাবা, আমার শরীর আজ কেমন কেমন করছে মাথা যেন টলে পড়ছে। আজ তুমি একবার বাজারে যাও।’

দামোদর বলিল, ‘কী, চাষার মতো আমি বাজারে যাব? কখনোই না।’

পুত্রের ব্যবহারে মর্মাহত হইয়া দামোদরের মা বলিল, ‘আচ্ছা, মরি আর বাঁচি, আমিই বাজারে যাচ্ছি কিন্তু গোরুটাকে দেখতে পারবে তো? যদি কারো খেতে গিয়ে পড়ে, তবে ফাঁড়িতে পাঠাবে, এ কথাটা মনে রেখো।’

এই বলিয়া দামোদরের মা চোখের জল মুছিতে মুছিতে বাজারে চলিল দামোদরও তাহার নিজের দলে গিয়া মিশিল। দুপুরবেলা দারুণ রৌদ্রে হাঁপাইতে হাঁপাইতে দামোদরের মা বাড়িতে আসিয়া শুনিল, গোরুটা এক ব্যক্তির খেতে পড়িয়াছিল বলিয়া, সে তাহাকে ফাঁড়িতে দিয়াছে! হায়! হায়! অভাগিনী যে ভয় করিয়াছিল, তাহাই হইল! ফাঁড়ি তাহাদের বাড়ি হইতে দুই ক্রোশ দূরে। সেই দুপুর রৌদ্রে পুড়িতে পুড়িতে দামোদরের মা ফাঁড়িতে উপস্থিত হইল এবং ফলমূল বিক্রয় করিয়া যাহা উপার্জন করিয়াছিল, তাহা দিয়া গোরু ছাড়াইয়া আনিল।

সেদিন আর তাহাদের খাওয়াদাওয়া হইল না। দামোদর বাড়িতে ফিরিয়া ভাত না পাইয়া, প্রথমে খুব তর্জন-গর্জন করিয়াছিল বটে, কিন্তু দুর্বল শরীরে অতিরিক্ত পরিশ্রম করাতে, মায়ের ভয়ানক জ্বর হইয়াছে দেখিয়া শেষটা কেমন যেন একরকম হইয়া গেল। সেই দিন মায়ের বিছানার পাশে বসিয়া সে কত কথাই না ভাবিত লাগিল! তাহাকে সুপথে আনিবার জন্য পিতার প্রাণপণ যত্ন ও চেষ্টা, মায়ের অশ্রুপাত একে একে সকল কথাই মনে পড়িতে লাগিল, আর যাতনায় সে অস্থির হইয়া উঠিল। সেদিন অনুতপ্ত হৃদয়ে দামোদর প্রতিজ্ঞা করিল যে, আর কখনো কুসঙ্গে মিশিয়া কুৎসিত আমোদে দিন কাটাইবে না।

আরও পাঁচ বৎসর কাটিয়া গিয়াছে। দামোদর এখন তাহাদের গ্রামের একজন আদর্শ কৃষক। পুত্রের সাহায্যে জননী এখন বেশ সুখে-স্বচ্ছন্দে সংসারযাত্রা নির্বাহ করিতেছে।

সাক্ষাৎ পরি

নিরুপমা ও অনুপমা দুই সহোদরা। নিরু এই এগারো বৎসরে পড়িয়াছে, অনুর বয়স সাত। নিরু পড়াশুনাতে বেশ, অনুও কিছু কিছু পড়িতে শিখিয়াছে বটে, কিন্তু সকল কথা এখনও ভালো করিয়া উচ্চারণ করিতে পারে না। ভোরের বেলায় বিছনায় ধারে বসিয়া তাহার দিদি একখানা নূতন বই পড়িতেছিল। অনুও দিদির পাশে বসিয়া তাহা পড়িতে লাগিল। তাহারা কোন গল্প পড়িতেছে, জান?

ভিখারির গল্প

গল্পটি এই––‘ভিক্ষা দে গো, ভিক্ষা দে।

দ্বারে দ্বারে বেড়াই ঘুরে,

মুখ তুলে কেউ চাইলি নে।’

একদিন এক ভিখারি গানটি গাহিতে গাহিতে লোকের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করিতেছিল। তাহার মলিন বস্ত্রখানি একেবারে কুটিকুটি, দেহ এত ক্ষীণ যে, লাঠির উপর ভর না দিয়া চলিতে পারে না। দারুণ গ্রীষ্মকাল। দুপুরবেলা সূর্য যেন আগুন ঢালিতেছে! এমন সময় ভিখারি ঘুরিতে ঘুরিতে এক ধনীর দরজায় আসিয়া ভিক্ষা চাহিল।

বাবু আহারাদি শেষ করিয়া শয়ন করিয়াছেন, কিন্তু ঘুমটা তখনও বেশ জমাট রকমের হয় নাই একটু একটু তন্দ্রা আসিয়াছে মাত্র। পাশে ভৃত্য, ঢুলিতে ঢুলিতে পাখা টানিতেছে। ভিখারির অস্পষ্ট কাতর ধ্বনি বাবুর কর্ণে প্রবেশ করিল। প্রথমবার তিনি শুনিয়াও শুনিলেন না। ভিখারি অপেক্ষাকৃত উচ্চ গলায় আবার ভিক্ষা চাহিল। এবার বাবুর তন্দ্রা ভাঙিয়া গেল। দুপুরবেলা ঘুমের ব্যাঘাত করাতে তিনি তো চটিয়াই লাল! ভিখারিকে দূর করিয়া দিবার জন্য ভৃত্যকে আদেশ করিলেন। ভৃত্য প্রভুর আজ্ঞা পালন করিতে যাইল বটে কিন্তু ভিখারির অবস্থা দেখিয়া তাহার মুখ ফুটিয়া কথা বাহির হইল না। এদিকে ভৃত্যকে দেখিতে পাইয়া ভিখারি অধিকতর কাতর কণ্ঠে ভিক্ষা চাহিল। বাবুর মেজাজ তখন মহাগরম হইয়া উঠিল। ছুটিয়া বাহিরে আসিয়া ভিখারিকে এমন এক ঘুসি মারিলেন যে, সে বেচারা কাঁপিতে কাঁপিতে আধমরার ন্যায় হইয়া মাটিতে শুইয়া পড়িল।

নিকটেই অনিলবাবুর বাড়ি। অনিলবাবুর দুইটি মেয়ে––মেয়ে তো নয়, যেন দুইটি পরি! যেমন তাহাদের রূপ, তেমনি গুণ। আমাদের এই ধনীর বীরত্ব তাহারা স্বচক্ষে দেখিতে পাইয়াছিল দেখিয়া তাহাদের মনে অত্যন্ত ব্যথা লাগিল। দুই বোনে সেই দুপুর রৌদ্রে ছুটিয়া আসিয়া ভিখারির সেবা-শুশ্রূষা করিতে লাগিল। মাথায় শীতল জল ও সর্বাঙ্গে পাখার বাতাস দিতে দিতে ক্রমে ভিখারির শরীর একটু সুস্থ হইয়া উঠিল। তখন তাহাকে বাড়িতে লইয়া গিয়া দুই বোনে নানা প্রকার খাদ্য আনিয়া দিল। ভিখারি পেট ভরিয়া খাইয়া চোখের জল মুছিতে মুছিতে বলিল, ‘মা, তোমরা কে গো? তোমরা কি স্বর্গের দেবী? ভিখারিকে আজ যেমন করুণা করলে, ঈশ্বর তোমাদের তেমনি সুখি করবেন। মা, তোমরা বেঁচে থাকো।’

গল্পটি পড়িয়া নিরু ও অনু অনিলবাবুর মেয়ে দুইটির কথা ভাবিতে লাগিল। আহা! এমন মেয়ে হইতে না পরিলে আর সুখ কী! আর সেই ধনীবাবু?––তাঁহার কথা আর কী বলিব! ঈশ্বর তাঁহাকে সুমতি দিন!

সিংহের মহত্ব

তোমরা সিংহের অত্যাচারের কথাই প্রায় শুনিয়া থাক, আজ তাহার মহত্ব ও দয়ার সম্বন্ধে একটি আশ্চর্য ঘটনার কথা বলিব। লন্ডনের কোনো চিড়িয়াখানায় এক ব্যক্তি কৌতুক দেখিবার জন্য, একটি জীবন্ত কুকুরকে সিংহের খাঁচার মধ্যে ফেলিয়া দিয়াছিল। লোকটা ভাবিয়াছিল, কুকুরকে দেখিবামাত্র সিংহ তাহাকে লুফিয়া লইয়া টুকরা টুকরা করিয়া ফেলিবে, আর সে বাহির হইতে বেশ মজা দেখিবে! কিন্তু হায়, সেই নিষ্ঠুরের প্রাণে যাহা বাজিল না, সিংহের প্রাণে তাহা বিলক্ষণ বাজিল! কুকুরটির অবস্থা দেখিয়া সিংহের দয়া হইল। সে দুই-একবার মৃতপ্রায় কুকুরের দেহ শুঁকিয়া তাহার পাশেই বসিয়া রহিল। সিংহকে উত্তেজিত করিবার জন্য সেই নরাধম দুই-চারিখণ্ড মাংসও নিক্ষেপ করিয়াছিল, কিন্তু তাহার সে চেষ্টাও ব্যর্থ হইল। সিংহ বরং এমন ভাব প্রকাশ করিতে লাগিল যে, কুকুরটিও ওই মাংসের ভাগ লইলে সে খুশি হয়! এদিকে বেচারা কুকুর যখন দেখিল, সিংহ তাহাকে কিছুই বলিতেছে না, বরং স্নেহের ভাব প্রকাশ করিতেছে, তখন সাহসে ভর করিয়া, আস্তে আস্তে সেই মাংসখণ্ডের কাছে গিয়া খাইতে আরম্ভ করিল।

সেই দিন হইতে সিংহ ও কুকুরটির মধ্যে খুব ভালোবাসা জন্মিল! দুটিতে সর্বদাই একসঙ্গে আহার, একত্র বিচরণ ও একত্র শয়ন করিত। অবশেষে প্রায় এক বৎসর পরে হঠাৎ রোগাক্রান্ত হইয়া কুকুরটি মারা গেল। বন্ধুকে নিদ্রিত মনে করিয়া প্রথম প্রথম সিংহ তাহাকে জাগাইতে চেষ্টা করিয়াছিল, কিন্তু যখন বুঝিতে পারিল যে, তাহার বন্ধু বাঁচিয়া নাই, তখন শোকে ও দুঃখে পাগলের ন্যায় হইয়া ভয়ংকর গর্জন করিতে লাগিল! কয়েকদিন এই প্রকারে কাটাইয়া, সিংহ একদিন মৃত বন্ধুর দেহটি আপনার বুকের নীচে টানিয়া লইয়া শয়ন করিল। সেই শয়নই তাহার শেষ শয়ন! সে আর উঠিল না। অনাহারে শুকাইতে শুকাইতে হঠাৎ একদিন প্রাণত্যাগ করিল। মৃত্যুর পর দেখিতে পাওয়া গেল, সিংহের লুণ্ঠিত মন্তক কুকুরের দেহের উপর পড়িয়া রহিয়াছে! কী আশ্চর্য ভালোবাসা। গল্পটি পড়িয়া তোমাদের মনে মানুষের পশুত্ব এবং পশুর মহত্ব দেখিয়া, একসঙ্গে ঘৃণা ও আনন্দের উদয় হয় না কি?

পাপের শাস্তি

কোনো সময় এক শহরে বাঘ, সিংহ প্রভৃতির খেলা দেখাইয়া এক ব্যক্তি বেশ দু-পয়সা রোজগার করিতেন। একটা দুষ্ট লোকের প্রাণে তাহা সহ্য হইল না। আর কোনোরকমে খেলোয়াড়কে জব্দ করিতে না পারিয়া, একদিন সে মনে মনে এক ফন্দি আঁটিল এবং শহরের পথেঘাটে খেলোয়াড়ের নামে এইরূপ মিথ্যা বিজ্ঞাপন প্রচার করিল যে, ‘আজ আমার পাঁচ বছরের ছেলে খাঁচায় প্রবেশ করিয়া বাঘ ও সিংহের সহিত খেলা করিবে।’ বিজ্ঞাপনের ঘটায়, সেদিন যেন সমস্ত শহর ভাঙিয়া লোক আসিয়া জুটিল এবং সর্বাগ্রে সেই ভীষণ খেলা দেখাইবার জন্য খেলোয়াড়কে অনুরোধ করিল। খেলোয়াড় বিজ্ঞাপনের বিষয় কিছুই জানিতেন না। তিনি ভয়ে কাঁপিতে কাঁপিতে বলিলেন, ‘আমি এই বিজ্ঞাপন প্রচার করি নাই। নিশ্চয়ই কোনো দুষ্টু লোক আমার সর্বনাশ করিবার জন্য এরূপ করিয়াছে। আপনারা আমাকে ক্ষমা করুন।’ কিন্তু দর্শকগণের মধ্যে অনেকেই তাঁহার কথায় বিশ্বাস করিল না। কেহ কেহ বা ভয়ানক উত্তেজিত হইয়া কোমর বাঁধিয়া অগ্রসর হইল। তখন অন্য উপায় না দেখিয়া খেলোয়াড় বাঘ ও সিংহকে পেট ভরিয়া মাংস এবং কিছু আফিং খাওয়াইলেন। তারপর শিশুকে বুকে লইয়া প্রার্থনা করিতে করিতে তাহাদের মাঝখানে বসাইয়া দিলেন। শিশু নির্ভয়ে বসিয়া রহিল। ব্যাপার দেখিয়া সকলে আনন্দে করতালি দিয়া উঠিল। দর্শকগণের মধ্যে সেই দুষ্টু লোকটাও ছিল। সিংহ বাঘকে নেশার ঘোরে চুপ করিয়া থাকিতে দেখিয়া সে বলিয়া উঠিল, ‘ও সবই ফাঁকি এ দুটো নিশ্চয়ই সাজানো পশু। এখনই আমি খেলোয়াড়ের চালাকি ভাঙিতেছি।’ এই বলিয়া শিশুকে বাহিরে আনাইয়া, নিজেই খাঁচার মধ্যে প্রবেশ করিল।

পাপের শাস্তি হাতে হাতে। সে যেই ভিতরে গিয়াছে, অমনি বাঘটা চিৎকার করিয়া এক লাফে তাহার পায়ের উপর আসিয়া পড়িল। আর সিংহও রাগে গর্জন করিতে করিতে লাঙুল আছড়াইতে লাগিল। লোকটা তো ভয়ে একেবারে আধমরা! এই সময়ে খেলোয়াড় ছুটিয়া আসিয়া সাহায্য না করিলে তাহার প্রাণরক্ষাই ভার হইত। সে বাঁচিল বটে, কিন্তু জন্মের মতো একখানা পা হারাইল। যেমন কর্ম––তেমনই ফল!

সিলের ভালোবাসা

তোমরা তিমির কথা শুনিয়াছ। তিমির ন্যায় সিলও একরকম জলজন্তু। কিছুদিন হইল, আলিপুরের চিড়িয়াখানায় এই জাতের একটা জন্তু আসিয়াছে। তাহার নাম সিন্ধুঘোটক।

সিল বেশ পোষ মানে। ইহাদের ভালোবাসার গল্প শুনিলে তোমরা আশ্চর্য হইবে। বিলাতে এক ভদ্রলোকের একটি সিল ছিল। সে ঠিক কুকুরের মতো বাড়ির ছেলেমেয়েদের সহিত খেলা করিয়া বেড়াইত। ভদ্রলোকটি অনেক সময় আদর করিয়া তাহাকে পিঠে চড়াইতেন এবং মাঝে মাঝে চুমো দিতেন। চুমো পাইতে পাইতে শেষে এমন হইয়া উঠিল যে, তাঁহাকে দেখিলেই সে মাথা উচু করিয়া মুখ বাড়াইয়া দিত।

আর একটি সিলের কথা শুনিয়াছি, সে যাঁহাদের বাড়িতে থাকিত, একবার তাঁহাদের গোয়ালে মড়ক উপস্থিত হয়। ইহাতে ভয় পাইয়া বাড়ির কর্তা গ্রামের এক বুড়ি ওঝা ডাকিয়া আনিলেন। সে আসিয়া অনেক মন্ত্র-তন্ত্র করিল বটে, কিন্তু কিছুতেই মড়ক থামাইতে পারিল না। তখন বেগতিক বুঝিয়া সে সিলকে দেখাইয়া বলিল, ‘এই অপয়া জন্তুটাকে না তাড়ালে মড়ক ছাড়বে না।’ ভদ্রলোক আর কী করেন, ভয়ে ভয়ে তাহাকে সমুদ্রে ফেলিয়া দিলেন।

সেদিনকার মতো আপদ চুকিল বটে, কিন্তু পরদিন সন্ধ্যার পূর্বেই সিলটি আসিয়া হাজির। পুরাতন বন্ধুদিগকে পাইয়া সে আহ্লাদে আটখানা হইয়া সকলের পায়ের কাছে কাছে লুটাইতে লাগিল। বাড়ির ছেলে-মেয়েদেরও আনন্দের সীমা রহিল না।

ভদ্রলোকটি বিপদে পড়িয়া আবার সেই বুড়িকে ডাকিলেন। বুড়ি আসিয়া বলিল, ‘এ আপদ দূর করাই চাই। এক কাজ করুন, এবার চোখ দুটি নষ্ট করে ওকে ফেলে দিয়ে আসুন।’ মড়কের ভয়ে ভদ্রলোক সেই নিষ্ঠুর প্রস্তাবেই রাজি হইলেন। সিলকে অন্ধ করিয়া জলে ফেলিয়া দেওয়া হইল।

ইহার পর সাত দিন চলিয়া গেল। বেচারা সিলের কোনো খবরই নাই। আট দিনের দিন শেষরাত্রে ভয়ানক ঝড় আরম্ভ হইল। সেই ঝড়ের সময় মনে হইল, কে যেন বাহিরে দাঁড়াইয়া দুঃখে কাঁদিতেছে। ঝড় একটু কমিলে দেখা গেল, প্রভুভক্ত সিল সিঁড়ির উপর মরিয়া পড়িয়া রহিয়াছে।

কী আশ্চর্য ভালোবাসা! এত অত্যাচারেও সে তাহার প্রভুকে এবং খেলাধুলার সঙ্গীদিগকে ভুলিতে পারে নাই। চক্ষু নাই, তবুও কোনোরকমে হাতড়াইতে হাতড়াইতে সে তাঁহাদের দ্বারে আসিয়াই প্রাণত্যাগ করিল!

বানরের বীরত্ব

একবার বিলাতে এক সাহেবের বাড়ি আগুন লাগে! দেখিতে দেখিতে আগুন এমন ছড়াইয়া পড়িল যে, কার সাধ্য সেদিকে যায়! ঘরের কড়ি-বরগা, দরজা-জানালা, এমনকী, উপরে উঠিবার সিঁড়ি পর্যন্ত দাউ দাউ করিয়া জ্বলিতে লাগিল!

চারিদিকে হইহই-রইরই শব্দ। দমকল হইতে রাশি রাশি জল ঢালা হইতেছে, লোকজন ভয়ে ছুটাছুটি করিতেছে, হঠাৎ বাড়ির গৃহিণী চিৎকার করিয়া কাঁদিয়া উঠিলেন। তাঁর কোলের শিশুটি তেতলায় ঘুমাইয়াছিল! এতক্ষণ কেহই তার খোঁজ-খবর লয় নাই। হায় হায়! সে আছে, কি নাই!

যারা দমকল চালায়, আগুনের ভিতর হইতে অনেক সময় আশ্চর্য কৌশলে তারা লোকের প্রাণ বাঁচাইয়া থাকে। কিন্তু এখানে তারাও হার মানিল। জননী কাঁদিতে কাঁদিতে অজ্ঞানের মতো হইয়া পড়িলেন।

এই সময় এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটিল। সাহেবের একটি পোষা বানর ছিল। হঠাৎ দেখা গেল, শিশুটিকে বুকে লইয়া সে জানালার ভিতর হইতে একটা গাছের ডালে লাফাইয়া পড়িতেছে। তারপর ধীরে ধীরে নামিয়া মায়ের ছেলে মায়ের কোলে দিয়া সে আবার ডালে গিয়া বসিল।

বানরের এই কাজে মায়ের বুক কতখানি জুড়াইল, তা বুঝিতেই পার!

আর একটা বানরের কথা বলিতেছি। একবার একটি ছেলে চিড়িয়াখানা দেখিতে যায়। বাঘের খাঁচার কাছে দাঁড়াইয়া সে একমনে কী যেন দেখিতেছিল ওদিকে এক বাঘ যে চুপিচুপি হাত বাড়াইয়া তাহার মাথায় থাবা বসাইবার মতলব আঁটিয়াছে, তাহা সে লক্ষ করে নাই। ছেলেটির সঙ্গে একটা পোষা বানর ছিল। বাঘ কিন্তু তাহার দৃষ্টি এড়াইতে পারিল না। ব্যাপার দেখিয়া বানর এক লাফে বাঘের থাবার উপর আসিয়া পড়িল। কী আশ্চর্য সাহস! ইহাতে ছেলেটি তো রক্ষা পাইলই, বাঘ হঠাৎ থতমত খাইয়া যাওয়ায়, বানরও বাঁচিয়া গেল!

মশার যুদ্ধ

বনের ভিতর এক নদীর ধারে একদল মশা বাস করত। মশার গান বড়ো মিষ্ট! এক ব্যাং সেই গান শুনিয়া মোহিত হইয়া গেল। থপথপ করিয়া লাফাইয়া সে প্রতিদিনই মশাদের গান শুনিতে আসিত। ক্রমে মশাদের রাজার সহিত ব্যাঙের খুব বন্ধুত্ব হইল এবং সেও যে একজন মস্ত ওস্তাদ, তাহার পরিচয় দিতে ছাড়িল না! এখন তাহাদের মজা দেখে কে! কখনো মশারা গান গায়, সে বসিয়া বসিয়া ঘাড় নাড়ে আবার কখনো-বা সে গায়, মশারা বাঁশি বাজাইতে থাকে! এইভাবে কিছুকাল বেশ সুখে-স্বচ্ছন্দে কাটিল। তারপর একদিন ব্যাঙের বাপের শ্রাদ্ধ উপস্থিত। সেবার বড়োই দুর্বৎসর। ব্যাঙের হাতে একটি কানাকড়িও নাই। সে অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া মশাদের রাজার নিকট হইতে এক লক্ষ টাকা ধার করিয়া, পিতৃদায় হইতে উদ্ধার পাইল। ইহার পর অনেক দিন চলিয়া গেল। ব্যাং আর সেদিকেও তাকায় না, কিংবা দেনা পরিশোধের নামও করে না! মশাদের রাজা কতবার তাহার কাছে লোক পাঠাইলেন, কিন্তু টাকা ফেরত দেওয়া দূরে থাক, সে লোকগুলোকেই বরং অপমান করিয়া তাড়াইয়া দিল। রাজা প্রমাদ গনিয়া নিজেই একদিন গুনগুন করিতে করিতে ব্যাঙের কাছে উপস্থিত। তিনি মিনতি করিয়া বলিলেন,––

‘কুঁয়ো ব্যাং, কুঁয়ো ব্যাং,

আঁমার কঁড়ি দেঁও!––আঁমার কড়ি দেঁও!’

ব্যাং তো চটিয়াই লাল! সে গর্তের ভিতর হইতে বলিল––

‘গ্যাঁ-গোঁ! গ্যাঁ-গোঁ!

কেঁ কাঁর কঁড়ি ধাঁরে––কেঁ কাঁর কঁড়ি ধাঁরে?’

মশকরাজ দেখিলেন বড়োই মুশকিল! ব্যাং তাঁহার সর্বনাশ করিতে বসিয়াছে। যাহা হউক, দুষ্টের দমন করিতেই হইবে, ভাবিয়া তিনি উড়িতে উড়িতে সাপেদের রাজার নিকট গিয়া ব্যাঙের নামে নালিশ করিলেন। ধূর্ত ব্যাঙের বিশ্বাসঘাতকতায় সাপ মহা চটিয়া গেল এবং ফণা বিস্তার করিয়া, এমনভাবে ফোঁসফোঁস শব্দ করিতে লাগিল যে, ঠিক যেন সে রাজাকে আশ্বাস দিয়া বলিতেছে,––

‘রোসসো––আসসি, রোসসো––আসসি!’

তারপর সাপ হনহন করিয়া ছুটিয়া আসিয়া ব্যাংটাকে ধরিয়া ফেলিল। যমের মুখে পড়িলে আর রক্ষা আছে! সাপ ব্যাংটাকে যতই গিলিতে থাকে, তাহার গোঙানিও ততই কমিয়া আসে। শেষে––

‘কঁড়ি নেঁ––কঁড়ি দিঁ, কঁড়ি নেঁ––কঁড়ি দিঁ।’

––বলিতে বলিতে সব শেষ! সাপের সুবিচারে মশকরাজ বেজায় খুশি হইলেন।

আর একটা মশার গল্প বলি। সে অনেক দিনের কথা––বর্ধমান যাইবার জন্য একদিন বিকেলে আমি বাড়ি হইতে বাহির হইলাম। ইচ্ছা করিলে, রেলগাড়িতে যাইতে পারিতাম, কিন্তু পথে নানাস্থান দেখিতে দেখিতে যাইব ভাবিয়া, রেলে চড়িলাম না। আমি খুব খানিক দূর গিয়া, একটি লোককে আসিতে দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘ভাই বর্ধমান শহর আর কত দূর?’

‘আপনি বর্ধমান যাবেন? রেলে গেলেন না কেন? হেঁটে আজ বর্ধমান পৌঁছানো অসম্ভব, বিপদের আশঙ্কাও আছে।’ এই বলিতে বলিতে লোকটি চলিয়া গেল।

আমি অনেক দিন সেই পথে শহরে যাই নাই সত্য, কিন্তু রাস্তাটা একেবারে আমার অজানা ছিল না। আমি পথিকের কথায় হতাশ না হইয়া খুব তাড়াতাড়ি চলিতে আরম্ভ করিলাম। তখন সূর্য ডুবিয়া গিয়াছিল। কিন্তু তখনও বেশি অন্ধকার হয় নাই। আমি একটা ছোটো জঙ্গল পার হইয়া, খোলা মাঠে পৌঁছিয়াই বর্ধমানের সাদা সাদা বাড়ি দেখিতে পাইলাম। ‘আর কী, এই তো এসে পড়েছি’––ভাবিতে ভাবিতে খুব তাড়াতাড়ি চলিতে লাগিলাম। সম্মুখের পথ অনেক দূর পর্যন্ত বেশ পরিষ্কার কেবল শহরের নিকটে একটা ঘন জঙ্গল ছিল। সেই জঙ্গল পার হইয়া, আর একটু গেলেই রাজপথে উপস্থিত হওয়া যায়। চলিতে চলিতে আমি প্রায় সেই জঙ্গলের কাছে গিয়াছি, এমন সময় দেখিতে পাইলাম, একখানা গোরুর গাড়ি আসিতেছে। গাড়িখানা খুব কাছে আসিল, গাড়োয়ানকে জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘কী হে বাপু, বর্ধমান শহর আর কত দূর, বলতে পার?’

‘আপনি কি এই জঙ্গল দিয়ে বর্ধমান যাবেন?

‘হাঁ, এইটেই তো সোজা রাস্তা।’

‘সোজা বটে। কিন্তু পথটা সোজা বলেই কি যমের মুখে যেতে হবে? আমার কথা শুনুন, এ পথ ছেড়ে অন্য রাস্তা ধরুন। তা না হলে আপনার প্রাণ নিয়ে টানাটানি পড়বে।’

তাহার কথায় আমি ভারী আশ্চর্য হইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘সে কী, রাস্তায় কীসের ভয়? ডাকাত আছে নাকি?’

‘ডাকাত? এক-আধটা নয়, লক্ষ লক্ষ ডাকাত এই জঙ্গলে বাস করে। সাবধান, আপনি আর এক পা-ও এগোবেন না!––ওই শুনুন, তারা হুংকার দিচ্ছে!’

তাহার কথায়, অতি মনোযোগের সহিত কান পাতিয়া, আমি ঝিঁঝিঁপোকার চিৎকার ও মধ্যে মধ্যে কুকুরের অতি ক্ষীণ ডাক শুনিতে পাইলাম। কিন্তু ইহাতে ভয় পাইবার কী আছে কিছুই বুঝিলাম না।

গাড়োয়ান আমার ভাবগতিক দেখিয়া বলিল, ‘শুনতে পেলেন না? বোধ হয়, তারা মাঝে একবার থেমেছিল। আচ্ছা, আবার খুব মন দিয়ে শুনুন দেখি!’

এইবার আমি অতি কর্কশ একটা শব্দ শুনিতে পাইলাম। অসংখ্য মশা এক সুরে শব্দ করিলে যেমন বোধ হয়, এও কতকটা সেই ধরনের। বোধ হইল যেন, সমুদয় জঙ্গল হইতে সেই শব্দ আসিতেছে। আমি বলিলাম, ‘তুমি কি মশার কথা বলছ?’

‘আজ্ঞে, মশার কথাই বলছি। যদি বাঁচবার সাধ থাকে, এ পথে শহরে না গিয়ে বাড়ি ফিরে যান।’

‘কী, মশার ভয়ে আমি বাড়ি ফিরে যাব? তুমি তামাশা করছ নাকি?’

‘আচ্ছা, তবে যান, কাজটা কিন্তু ভালো করলেন না।’

আমি তাহাকে পাগল মনে করিয়া দ্রুত পদে জঙ্গলের মধ্যে প্রবেশ করিলাম। একটু পরেই দেখি, ঘন মেঘের মতো ঝাঁকে ঝাঁকে অসংখ্য মশা আমাকে ঘিরিয়া ফেলিয়াছে, আমি যত তাড়াতাড়ি যাই, মশার দল তাহার চেয়েও জোরে ছুটিয়া নিষ্ঠুরভাবে আমাকে কামড়াইতে লাগিল। হাতে-মুখে চাপড় দিয়া আমি এক একবারে শত শত মশা মারি, পরক্ষণেই দলে দলে অন্য মশারা ছুটিয়া আসিয়া তাহাদের স্থান পূর্ণ করিতে থাকে। শেষে মশার ঝাঁক এত বাড়িয়া গেল যে, আমি চারিদিক অন্ধকার দেখিতে লাগিলাম।

শুধু হাতে রক্ষা পাওয়া অসম্ভব জানিয়া, আমি তাড়াতাড়ি গাছের একটা ডাল ভাঙিয়া লইলাম এবং উহা ঠিক লাঠির ন্যায় ঘুরাইয়া মশা তাড়াইতে চেষ্টা করিলাম। কিন্তু তাহাতেও বিশেষ সুবিধা হইল না। বহুকাল উপবাসের পর, তাহারা মনের আনন্দে পেট ভরিয়া আমার গায়ের রক্ত শুষিতে লাগিল। আর রক্ষা নাই দেখিয়া আমি ডাল ফেলিয়া উর্ধ্বশ্বাসে ছুটিতে আরম্ভ করিলাম, তবুও নিষ্কৃতি নাই। সেই নিষ্ঠুর দস্যুরাও, পাছে শিকার হাতছাড়া হয় এই ভয়ে, এমনভাবে আমাকে তাড়া করিল যে, আত্মরক্ষায় অসমর্থ হইয়া পাগলের ন্যায় লাফালাফি করা ছাড়া আমার আর উপায় রহিল না! তারপর কোথায় গেলাম, কী হইল, এসব কথা আমার একটুও মনে নাই। শেষে যখন অল্প অল্প জ্ঞান হইল, তখন দেখিলাম, আমি শহরের একটি রাস্তার পাশে পড়িয়া আছি। শরীর অবসন্ন, চক্ষে তেমন তেজ নাই আর হাত, পা, নাক, মুখ, কাপড়চোপড় একেবারে রক্তারক্তি। যাহা হউক, কোনোরকমে খাড়া হইয়া আমি টলিতে টলিতে একটা হোটেলে গিয়া আশ্রয় লইলাম। ইহার পর তিন দিন আমি বিছানা ছাড়িয়া উঠিতে পারি নাই। তিন দিন পরে কতকটা সুস্থ বোধ করিতে লাগিলাম বটে, কিন্তু সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করিতে প্রায় দুই মাস লাগিয়াছিল। এই ঘটনার পর হইতে মশা দেখিলেই আমার ভয় হয়। ইহারা সামান্য প্রাণী বটে, কিন্তু এইরূপ সামান্য প্রাণীর গ্রাস হইতে রক্ষা পাওয়া সহজ নহে।

আষাঢ়ে স্বপ্ন  অথবা জানোয়ারের মেলা

তখন পূজার ছুটি। আমি আলিপুরের চিড়িয়াখানা দেখিয়া সন্ধ্যার সময় বাড়ি ফিরিয়া আসিয়াছি। ক্লান্তিবোধ হওয়াতে সকাল সকাল শুইয়া পড়িলাম। যেমন শোওয়া, অমনি ঘুম। এ অভ্যাসটি আমার ছেলেবেলা হইতে! কিন্তু সেকথা যাক––আমি তো ঘুমাইয়া পড়িলাম। খানিক পরে মনে হইল, আমি যেন আলিপুরে গিয়াছি। সেটা যেন সিংহ, বাঘ আর ভালুকের দেশ। চারিদিকেই জানোয়ারের ঘরবাড়ি, জানোয়ারের পথঘাট, জানোয়ারের হাটবাজার। জানোয়ারগুলো যেন সকলেই স্বাধীন। আবার সম্প্রতি যেন তাহারা কিছু অধিক মাত্রায় শান্তশিষ্ট হইয়া উঠিয়াছে! সিংহ-বাঘেরও যেন রক্ত-মাংসে আর তেমন রুচি নাই! তাই, তাহাদের কাহাকেও আর আটকাইয়া রাখিবার দরকার হয় না।

যাহা হউক, তাহাদের নিকট হইতে একটু দূরে থাকা ভালো মনে করিয়া আমি একটা বড়ো রাস্তা ধরিলাম। কিছু দূর গিয়া, প্রথম পরিচয় হইল একটা উল্লুকের সঙ্গে। তাহার নাম ‘চতুর্ভুজ’। চতুর্ভুজ বেশ ভালোমানুষ! দুই দণ্ডেই আমার সঙ্গে আলাপ-পরিচয় করিয়া লইল। আমি বলিলাম, ‘তোমাদের দেশ দেখতে এসেছি এখানে দেখবার মতো কিছু আছে কি? চতুর্ভুজ বলিল, ‘দেখবার অনেক জিনিস আছে। বিশেষ, কাল আমাদের রাজার ছেলের বিয়ে। তাই কয়েকদিন থেকে খুব ধুমধাম আমোদ-আহ্লাদ চলছে। চলো, তোমাকে কিছু কিছু দেখিয়ে আনি।’

আমরা দুইজনে বাহির হইলাম। রাস্তার মোড় ফিরিয়াই, সম্মুখে খুব বড়ো প্রকাণ্ড বাড়ি দেখিতে পাইলাম। চতুর্ভুজ বলিল, ‘ওই আমাদের রাজার বাড়ি।’ বাড়ির সম্মুখে গিয়া দেখি, মস্ত ফটক! বন্দুকে সঙিন চড়াইয়া পেঙ্গুইন সাহেব পাহারা দিতেছে। বন্দুক দেখিয়া আমার বুকটা গুরগুর করিয়া উঠিল! আর মুখের চেহারাটাও, বোধ করি, কেমন একরকম হইয়া গিয়াছিল। তাহা না হইলে চতুর্ভুজ আমার মনের ভাব বুঝিল কেমন করিয়া! আমাকে সাহস দিবার জন্য সে বলিল, ‘ভয় কী! এ তো মানুষের দেশ নয় যে, এখুনি বন্দুক উঠিয়ে গুলি ছুঁড়বে। এটা জানোয়ারের মুল্লুক! এখানে কাউকে গুলি করবার হুকুম নেই।’

চতুর্ভুজের কথা শুনিয়া আমার একটু সাহস বাড়িল। বাহিরে দাঁড়াইয়া রাজবাড়ি দেখিতে লাগিলাম। রাজবাড়ি অতি পরিপাটি। চারিদিকে মোটা মোটা থাম থামের উপর বড়ো বড়ো খিলান! খিলানে ও কার্নিসে নানারকম কাজ করা। অনেকটা সেকেলে রাজরাজড়াদের বাড়ির মতো। সিঁড়ির দুই ধারে নানারকম ফুল ও পাতাবাহারের গাছ। সম্মুখে ফুলবাগান। আমরা এদিক-সেদিক চাহিতে দেখিলাম, ঘরের ভিতর প্রকাণ্ড এক সিংহ বসিয়া রহিয়াছে, আর একটা ভালুক তাহার চুল ছাঁটিয়া দিতেছে! আমি চুপিচুপি জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘ও কে?’

চতুর্ভুজ বলিল, ‘উনিই আমাদের রাজা। রাজামশাই এখন ক্ষৌরি হচ্ছেন। রাজার সঙ্গে তুমি দেখা করবে?’ আমি বলিলাম, ‘না ভাই, তোমাদের রাজার সুমুখে যেতে আমার সাহস হচ্ছে না। চলো, অন্য রাস্তা ধরি।’

চতুর্ভুজ একটু হাসিয়া বলিল, ‘তুমি এত ভীরু!’

আবার দুইজনে চলিতে লাগিলাম। রাজবাড়ির দক্ষিণ দিক দিয়া একটা সরু গলি গিয়াছে। সেই গলি ধরিয়া কিছু দূর গিয়াই একখানি খোলার বাড়ি দেখিতে পাইলাম সেই বাড়ির ভিতর হইতে একটা যেন নাকি সুরের গোঙানি শব্দ আমার কানে আসিতে লাগিল। চতুর্ভুজ বলিল, ‘এটা আমাদের ছেলেদের পাঠশালা। এক বিদ্যাদিগগজ পণ্ডিত এখানে গুরুগিরি করেন!’ আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘ওই গোঙানিটা কীসের?’ চতুর্ভুজ তাড়াতাড়ি দেখিয়া আসিয়া বলিল, ‘ও কিছুই নয়। এক ছোকরা দুয়ে দুয়ে যোগ করে পাঁচ লিখেছে, তাই গুরুমশাই রাগ করে তার কান ধরে পাঠশালা থেকে তাড়িয়ে দেবার মতলব করেছেন, আর ছেলেটা কাঁদছে।’ আমি বলিলাম, ‘এই সামান্য অপরাধে এত কঠিন শাস্তি!’ চতুর্ভুজ একটু আশ্চর্য হইয়া বলিল, ‘অপরাধটা সামান্য হল কীসে? দুয়ে দুয়ে কত হয়, এ যে না বলতে পারে, তাকে পাঠশালা থেকে তাড়িয়ে দেওয়াই উচিত।’ আমি বলিলাম, ‘ভায়া, তুমি তো আর মানুষের ছেলেদের পাঠশালা দেখনি, তাই অমন কথা বলছ! মানুষের ছেলে হলে হয়তো বলত––

দুয়ের পিঠে দুই

বিছনা পেতে শুই।

‘––একবার একটি ছেলেকে জল বানান করতে বলা হয়েছিল। সে অনেকক্ষণ ভেবে-চিন্তে, ভয়ে এক গা ঘেমে শেষে বললে ফু আর স! আর একটি ছেলের হাতে পাঁচটা সন্দেশ দিয়ে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, এর থেকে যদি কেউ একটা খায়, তবে আর কটা থাকবে! সে তো প্রশ্ন শুনে কেঁদেই আকুল। বাপরে সে কী কান্না! কেবল কাঁদে আর বলে, আমি একটাও দেব না!’

আমাদের খোকাবাবুদের কথা শুনিয়া চতুর্ভুজ বলিল, ‘সত্যি, এমন সব ছেলে নিয়ে তোমরা ঘরকন্না কর! তা মানুষের ছেলে, কত আর ভালো হবে! এরকম ছেলে কিন্তু আমাদের এই জানোয়ারের দেশে একদিনও টিঁকতে পারত না।’

পাঠশালা হইতে বাহির হইয়া গল্প করিতে করিতে আমরা একটা ছোটো নদীর ধারে উপস্থিত হইলাম। ঘাটে দেখিলাম, একখানা নৌকা বাঁধা। ওপারে যাইবার জন্য বিস্তর জানোয়ার জড়ো হইয়াছে। কিন্তু খেয়া-মাঝি কুমির আজ গরহাজির। আফিসের বেলা হইয়া যাইতেছে, তবুও মাঝির দেখা-সাক্ষাৎ নাই। খোঁজ করিতে করিতে শুনিতে পাওয়া গেল, বেচারার একটা দাঁতে বড়ো ব্যথা হইয়াছে, তাই সে ল্যাজমোটা নামে এক নামজাদা ডাক্তারের বাড়ি গিয়াছে। দাঁতটা নাকি তুলিয়া ফেলা নিতান্তই দরকার।

আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘এখানেও আবার ডাক্তার আছে নাকি?’ চতুর্ভুজ বলিল, ‘ডাক্তার? বড়ো যে-সে ডাক্তার নয়! এমন দু-চারজন মানুষের দেশে থাকলে, তোমরা প্রাণের ভয়ে সর্বদা এত অস্থির হয়ে বেড়াতে না!’ আমি বলিলাম, ‘সতি! তবে তো তোমরা বেশ সুখেই আছ। আচ্ছা, এখানে কোন কোন অসুখ বেশি?’ চতুর্ভুজ বলিল, ‘জ্বরজারি বড়ো একটা এখানে নেই। ল্যাজ-ছেঁড়া রোগই এখানকার প্রধান রোগ। এমন দিন প্রায় যায় না যে, একজন না একজনের ল্যাজ না ছেঁড়ে। তা ডাক্তারও তেমন সরেস! তার ওষুধের গুণে বোঁচা ল্যাজ গজিয়ে উঠতে বোধ হয় এক মুহূর্তও সময় লাগে না! আবার যদি তিনি সেই ছেঁড়া ল্যাজটুকুর কাটা মুখে এক ফোঁটা ওষুধ দেন, অমনি দেখতে দেখতে তা থেকে একটা আস্ত নতুন জানোয়ার গড়িয়ে ওঠে! ব্যাপারখানা কী একবার ভেবে দেখো। চার-পাঁচ দিনের কথা––একটা শেয়ালের ল্যাজ ছিঁড়ে গিয়েছিল। সে সেই ল্যাজটুকু মুখে করে নিয়ে তখনই ডাক্তারের কাছে ছুটে গেল। আমি স্বচক্ষে দেখেছি, তার বোঁচা ল্যাজে এক ফোঁটা ডাক্তারি ওষুধ পড়বামাত্র একটা নতুন ল্যাজ বার হল! আর সেই ছেঁড়া টুকরোতে এক ফোঁটা ওষুধ দিতে তা থেকে একটা নতুন শেয়াল গজিয়ে উঠল! তারপর ডাক্তারকে সেলাম করে দুই শেয়ালে গল্প করতে করতে বাড়ি চলে গেল।’

চতুর্ভুজের গল্প শেষ হইতে না হইতেই নিকটে একটা বন্দুকের আওয়াজ শুনিয়া আমি চমকিয়া উঠিলাম। চতুর্ভুজ বলিল, ‘ভয় কী? মানুষের মতো এমন ভীরু আমি আর দেখিনি!’ আমি মুখখানা একটু কাঁচুমাচু করিয়া বলিলাম, ‘না, ভয় আর কীসের? তবে কিনা ভায়া, মানুষের প্রাণের দামটা বড়ো বেশি তাই একটু সাবধানে থাকতে হয়।’ এই সময় আবার বন্দুকের আওয়াজ হইল। আমরা দেখিলাম, রাস্তার একপাশে দুইজন শিকারি বন্দুক হাতে করিয়া বসিয়া আছে। চতুর্ভুজ বলিল, ‘ওই দুজন এখানকার গোরাপল্টন। ওদের সঙ্গে একটা নেউল দেখছ? ওটাই ওদের কুকুর! ওরা তেমন ভালো শিকারি নয়। আমাদের এই দেশে এমন সব শিকারি আছে যে, তাদের কথা শুনলে তুমি অবাক হয়ে যাবে। আমার নিজের শিকারের একটা গল্প বলি, শোনো। একবার শিকারে বার হয়ে আমি একটা রাঙা হরিণ দেখতে পাই। তার সর্বাঙ্গ ঠিক যেন মখমলে ঢাকা! এমন সুন্দর হরিণ দেখলে চামড়াখানির ওপর কার না লোভ জন্মে? কী উপায়ে ওটা আস্ত পাওয়া যায়, তাই ভাবতে লাগলাম। যদি গুলি করে হরিণটি মারি, তাহলে তো চামড়ার দফা রফা! শেষে অনেক ভেবে চিন্তে এক উপায় ঠিক করলুম। হরিণ খুব মোটা একটা গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। আমি পকেট থেকে একটা পেরেক বার করে বন্দুকে পুরে, তার ল্যাজে গুলি করলাম। আমার লক্ষ্য একেবারে অব্যর্থ! পেরেক ঠিক হরিণের ল্যাজ ফুঁড়ে গাছে বিঁধে গেল। অনেক টানাটানিতেও সে পালাতে পারল না। তখন আমি একখানা ধারাল ছুরি দিয়ে তার নাকের মাঝামাঝি খানিকটা চিরে দিলাম, আর একগাছা বেত নিয়ে খুব জোরে তাকে মারতে লাগলাম। মারের চোটে ছটফট করতে করতে বেচারা হরিণ সেই চেরা নাকের ফাঁক দিয়ে বার হয়ে পালিয়ে গেল! আস্ত চামড়াখানা নিয়ে আমি বাড়ি ফিরলাম।’ চতুর্ভুজের কথা শুনিয়া আমি তো অবাক! অনেক শিকারি দেখিয়াছি, কিন্তু এমন আশ্চর্য শিকারের কথা জন্মেও শুনি নাই। ধন্য জানোয়ারের দেশ!

ইহার পর আমরা নদীর ধার হইতে ফিরিলাম। কিছু দূর আসিয়া সম্মুখে হ্যাট-কোট পরা এক সাহেব দেখিলাম। তাহার সঙ্গে দুইটি ছেলে। জানোয়ারের রাজ্যে সাহেব দেখিয়া প্রথমটা আমার আশ্চর্য বোধ হইতে লাগিল। কিন্তু কাছে আসিলে দেখিলাম, সে সাহেব নহে, একটা বুলডগ সাহেবের পোশাক পরিয়া সাহেব সাজিয়াছে। আমাদের খুব কাছাকাছি হইলে, কুকুর-সাহেব ইশারা করিয়া চতুর্ভুজকে তাহার কাছে ডাকিল। তারপর দুইজনের মধ্যে কিছুক্ষণ কথাবার্তা চলিল। কী কথা হইল জানি না, কিন্তু কথাগুলা যে আমাকেই লক্ষ্য করিয়া, তাহাতে আর সন্দেহ ছিল না। কারণ, কথা বলিতে বলিতে সাহেব কেবলই আমার দিকে তাকাইতেছিল। যাহা হউক, সে চলিয়া গেলে, চতুর্ভুজ আমার কাছে আসিয়া বলিল, ‘লোকটা কে জান? এখানকার পুলিশ-সার্জেন্ট। এই দেশে কোনো নতুন লোক এলে, ওকেই তার খোঁজখবর রাখতে হয়। তোমার কথা জিজ্ঞেস করছিল।’

আমি বলিলাম, ‘তা তুমি কী বললে?’ চতুর্ভুজ বলিল, ‘তোমার পরিচয় দিলাম। তোমার মনে কোনো ফন্দি-টন্দি নেই। কেবল জানোয়ারের দেশ দেখাই তোমার উদ্দেশ্য শুনে সাহেব আর কিছুই বলল না।’

আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘নতুন লোক দেখলেই তার খোঁজখবর রাখা কি এখানকার রীতি?’

চতুর্ভুজ বলিল, ‘তা নয় তো কী? এ কি মানুষের দেশ পেয়ছ যে, চোর-ডাকাত, ভদ্র-ইতর––সব একসঙ্গে বাস করবে?’

আমি আর কিছু না বলিয়া মনে মনে হাসিতে লাগিলাম। ইহার পর গলির মোড় ফিরিয়া, আমরা আবার রাজবাড়ির সম্মুখে উপস্থিত হইলাম। কিন্তু, এ কী ব্যাপার! একটু আগে যে স্থান বেশ নিরিবিলি দেখিয়া গিয়াছি, এখন দেখি, সেখানে লোকে লোকারণ্য––অর্থাৎ জানোয়ারে জানোয়ারারণ্য!

আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘আজ এখানে কিছু আছে নাকি?’

চতুর্ভুজ বলিল, ‘বাঃ, তোমাকে তো আগেই বলেছি, রাজার ছেলের বিয়ের জন্যে কয়েকদিন থেকে খুব ধুমধাম চলছে। চলছে। চলো, মেলার ভেতর গিয়ে বসি।’

মেলার মধ্যে একটা জায়গা বাছিয়া আমরা বসিয়া পড়িলাম। কিছু পরে হাতির পিঠে চড়িয়া স্বয়ং রাজা মহাশয় উপস্থিত। চতুর্ভুজ আমরা গা টিপিয়া আস্তে আস্তে বলিল, ‘রাজার মাথায় কে ছাতি ধরে রয়েচে, জান? ও আমার জ্ঞাতি ভাই! দেখলে, আমাদের কত সম্মান?’ অহংকারে তখন চতুর্ভুজের নাক তিনগুণ ফুলিয়া উঠিয়াছে! ল্যাজ থাকিলে, বোধ করি, তাহাও ফুলিয়া কলার গাছ হইয়া উঠিত।

আমি বলিলাম, ‘তা তো বটেই! বন-গাঁয়ে শেয়াল রাজা! জানোয়ারের রাজ্যেও যদি তোমাদের সম্মান না হয়, তবে আর হবে কোথায়?’

আমার মুখের কথা শেষ না হইতেই, ছোটো-বড়ো দুইটা ভালুক পরস্পর হাত ধরাধরি করিয়া নাচিতে নাচিতে মেলার মধ্যে প্রবেশ করিল। এইটাই প্রথম খেলা। আহা, সে কী রগড়ের নাচ! মানুষের হাতেও ভালুক-নাচ দেখিয়াছি, কিন্তু এমন সরেস নাচ আর হয় না! দুজনে ভঙ্গি করিয়া নাচে আর সুর করিয়া গান গায়! ভালুকের ভাষার সে গানটা আমি বুঝিতে পারিলাম না বটে, কিন্তু সকলেই বাহবা করিতে লাগিল।

ইহার পর সিংহ আর ভালুকের ক্রিকেট ম্যাচ। দুই দলই সমান। বাছা বাছা এগারোজন সিংহ আর এগারো জন ভালুক। প্রথমে ভালুকেরা ব্যাট ধরিল, এগারোজন সিংহ ফিল্ড করিতে লাগিল। কিন্তু ফিল্ড আর করিবে কী, ভালুকের একটা হিট, বলটাকে বাউন্ডারি পার করিয়া দেয় আর রান বাড়িতে থাকে। প্রথম দুজনে এমন খেলিল যে, দ্বিতীয় ব্যাট আউট হইবার পূর্বেই ভালুকদের ৭৯ রান হইল! ইহার পর তৃতীয় ব্যাট আসিল। সে-ও বড়ো কম নয়। যদিও সে অল্পক্ষণ পরেই কট-আউট হইল, তবুও তাহার পূর্বে ২৩টা রান করিয়া লইতে ছাড়ে নাই! ক্রমে ক্রমে চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ প্রভৃতি সমুদয় ব্যাট উৎসাহে রান করিয়া আউট হইয়া গেল। প্রথম ব্যাট নট আউট রহিল। ভালুকদের পক্ষে রান হইল––৩৭৫।

ইহার পর সিংহেরা ব্যাট ধরিল। প্রথম ও দ্বিতীয় ব্যাট তেমন সুবিধা করিতে পারিল না, কিন্তু প্রথম ও তৃতীয় ব্যাট এমন জোরে বলটাকে সাঁটাইতে লাগিল যে, প্রথম ব্যাট আউট হইবার পূর্বে সিংহদের রান হইল ১০৬। সিংহদের চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ ব্যাটের কপাল বড়ো মন্দ, প্রত্যেকে ২-৩টি মাত্র রান করিয়াই বোল্ড আউট হইল। তৃতীয় ও সপ্তম ব্যাটের খেলা আবার বেশ জমিয়া গেল। তৃতীয় ব্যাট রানের সংখ্যা ২০৩ না করিয়া ছাড়িল না। বাকি কয়েকজনও পাকা খেলোয়াড় ছিল। সিংহদের পক্ষে রান হইল––৩৯০ সুতরাং সিংহেরাই জিতিল।

মানুষের ক্রিকেট ম্যাচ দেখিয়াছি, খেলিতে খেলিতে কেহ খুব বাহাদুরি দেখাইতে পারিলে, সকলে হাততালি দিয়া তাহাকে উৎসাহ দিয়া থাকে। কিন্তু এই জানোয়ারের ক্রিকেট খেলাতে উৎসাহ দিবার রীতি অতি ভয়ানক। এক-একজন রান করিতে থাকে, আর হাজার হাজার সিংহ, বাঘ, গন্ডার, ভালুক, কুকুর, বিড়াল, শেয়াল, গাধা উৎসাহে একসঙ্গে গলা ছাড়িয়া চ্যাঁচাইয়া উঠে। বাপরে, সে যে কী সাংঘাতিক আওয়াজ, তাহা কী বলিব! ভয়ে গা-টা যেন ছমছম করিয়া উঠে! আর, সে কি একবার? যতবার রান––ততবারই সেই আওয়াজ! সিংহের পক্ষে জয় হওয়াতে, পশুরাজের ভারী আনন্দ। তিনি ল্যাজ নাড়া দিয়া মনের আনন্দ প্রকাশ করিতে লাগিলেন।

ইহার পর ফুটবল ম্যাচ। সিংহ, বাঘ, ভালুক, হাতি, জিরাফ এবং আরও কতকগুলাতে মিলিয়া দুই দলে ফুটবল খেলিতে লাগিল। দুই দলই সমান। অনেকক্ষণ পর্যন্ত লুটাপুটি হুড়াহুড়ি চলিল কোনো পক্ষই জিতিতে পারিল না। ভালুকেরা ক্রিকেট ম্যাচে হারিয়া খুব অপমানিত হইয়াছিল। পাছে আবার ফুটবল ম্যাচে হারে, এই ভয়ে তাহারা কোমর বাঁধিয়া খুব উৎসাহের সহিত খেলিতে লাগিল। একে তাহারা পাকা খেলোয়াড়, তাহারা উপর আবার প্রাণপণ করিয়া লাগিয়াছে, কাজেই বিপক্ষেরা দমিয়া গেল। উঠাউঠি দুই গোল দিয়া ভালুকেরা ফুটবল ম্যাচ জিতিল। ভালুকদের জিত হওয়াতে, তাহাদের আত্মীয়স্বজনেরা এমন বিকটস্বরে চিৎকার করিয়া উঠিল যে, সেখানে দাঁড়াইয়া থাকে কাহার সাধ্য! তাহারা ধেই ধেই করিয়া নাচে আর অনেকগুলাতে মিলিয়া গাঁক গাঁক করিয়া একসঙ্গে চ্যাঁচাইতে থাকে! সে চ্যাঁচানি আর থামে না! শেষে এমন হইয়া উঠিল যে, রাজা হুংকার ছাড়িতে বাধ্য হইলেন! তখন সব একেবারে চুপ।

ফুটবলের পর টাগ-অফ-ওয়ার। এক পক্ষে হাতি, সিংহ, চিতাবাঘ অপর পক্ষে মহিষ, ভালুক, বানর প্রভৃতি। ক্রিকেট, ফুটবলের পর টাগ-অফ-ওয়ার ভালো লাগিবে কি না, ভাবিতেছিলাম। কিন্তু শেষে বুঝিলাম, এই খেলাটাই সবচেয়ে সেরা। অনেকক্ষণ পর্যন্ত দুই দলে প্রাণপণে দড়ি টানাটানি করিতে লাগিল, কিন্তু কেহ কাহাকেও হটাইতে পারিল না। টানাটানিতে হাতির উৎসাহ সবচেয়ে বেশি! তাহার ইচ্ছা, ভালুকের দলটাকে একেবারে মুখ থুবড়িয়া আছাড় দিবে। সেইজন্য এমন জোরে টান দিতে লাগিল যে, ভালুকদের ভ্যাবাচ্যাকা লাগিয়া গেল। সবাই ভাবিল, আর দুই-এক মিনিট পরেই ভালুকের দলকে চিৎপাত হইতে হইবে। ওই––ওই বুঝি গেল! কিন্তু একী, বুড়ো-মদ্দ হাতিটাই কিনা শেষে পা পিছলিয়া দড়াম! আহাম্মক হাতির দোষেই অমন পাকা খেলাটি মাটি হইল! রাগে, দুঃখে, অপমানে সিংহ মাথা নিচু করিয়া রহিল। ভালুকের দল আবার উৎসাহে নাচিয়া উঠিল। কিন্তু এবারকার চ্যাঁচানি অনেকটা ভদ্র রকমের।

টাগ-অফ-ওয়ারের পর আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘আর কিছু বাকি আছে কি?’ চতুর্ভুজ বলিল, ‘খেলা শেষ হয়েছে বটে, কিন্তু এবার আমাদের জাতীয় সংগীত আরম্ভ হবে।’

জানোয়ারের আবার জাতীয় সংগীত! কথাটা শুনিয়া আমার হাসি পাইল। কিন্তু সে হাসি বেশিক্ষণের জন্য নহে––

সামনে এসে দাঁড়ায়, হেন

শক্তি আছে কার?

এক্কেবারে ঘাড়টি ভেঙে

রক্ত শুষি তার!

গানের এই প্রথম চার লাইন শুনিয়াই আমার তো চক্ষুস্থির! মাথাটা যেন ঝাঁ ঝাঁ করিতে লাগিল! কী জানি, আমাকে দেখিয়া যদি কাহারও আবার রক্ত শুষিবার ইচ্ছাটা জাগিয়া উঠে! ভাবিলাম, আর নহে, এইবারে চম্পট দেওয়াই ভালো। চতুর্ভুজকে বলিলাম, ‘চলো, যাই।’ সে বলিল, ‘আরে না না, গানটা শেষ হতে দাও।’

ছোটো-বড়ো পার করেছি––

হাজার হাজার

জোর যার মুল্লুক তার,

এই নীতি সার!

ক্রমেই আমার শরীরটা কেমন যেন করিতে লাগিল। ভয়ে মুখ দিয়া একটিও কথা সরিল না। চতুর্ভুজের গা টিপিয়া ইশারা করিলাম, কিন্তু সে-স্থান ত্যাগ করিবার জন্য তাহার একটুও ব্যস্ততা দেখা গেল না! এদিকে, তাহাকে চটাইয়া একা চলিয়া আসিতেও আমার সাহসে কুলাইল না!

কাকেও না ডরি মোরা,

মানুষ তো ছার

সারা জগৎ কেঁপে উঠে

ছাড়িলে হুংকার!

হুংকার না ছাড়িতেই আমার কাছে সারা জগৎ কাঁপিতেছিল, ছাড়িলে তো রক্ষাই ছিল না! আমি চারিদিক অন্ধকার দেখিতে লাগিলাম। চতুর্ভুজ যদি আরও কিছুক্ষণ সেখানে বসিয়া থাকিত, তাহা হইলে নিশ্চিতই আমি অজ্ঞান হইয়া পড়িতাম। আমার সৌভাগ্য বলিতে হইবে যে, এতক্ষণে তাহার সুমতি হইল––বাহির হইবার জন্য আস্তে আস্তে উঠিয়া দাঁড়াইল। আমি তাহার হাত ধরিয়া বাহিরে আসিয়া, তবে যেন হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচিলাম।

আমার মুখের ভাব দেখিয়া এবার ঠাট্টার বদলে সে বরং সহানুভূতি দেখাইতে লাগিল। আমরা কিছু দূর অগ্রসর হইলে পর, সে বলিল, ‘সত্যি, তোমার ভয় পাবার কথাই বটে। কিন্তু উৎসবের দিনে, বিশেষ রাজার সুমুখে কার সাধ্যি তোমাকে কিছু বলে! তাই আমি অতটা নিশ্চিন্ত হয়ে বসেছিলাম। সে যা হোক, উৎসব কেমন দেখলে, বলো?’

আমি বলিলাম, ‘উৎসব বেশ দেখলাম। ক্রিকেট, ফুটবল, টাগ-অফ-ওয়ার––এসব আমার খুবই ভালো লেগেছে কিন্তু ভাই, তোমাদের জাতীয় সংগীত আমাকে একেবারে আধমরা করে ফেলেছিল! আস্ত দেহ নিয়ে যে আজ ফিরতে পারব, সে আশা বড়ো ছিল না! যাহোক, এখন যে প্রাণে বেঁচে এসেছি, সেই ঢের!’

আমরা চলিতে চলিতে আর একটা নদীর ধারে আসিয়া উপস্থিত হইলাম। সেখানে আসিয়াই চতুর্ভুজের মুখখানা কেমন যেন শুকাইয়া গেল! তেমন স্ফূর্তি, তেমন দন্তবিকাশ আর নাই! তাহার মুখের কথাও যেন ক্রমে অস্পষ্ট হইয়া আসিতে লাগিল! আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘এতক্ষণে তোমার সাহসেই আমি চলাফেরা করেছি, এখন হঠাৎ তোমার কী হল? তুমি এমন জড়সড় হয়ে পড়লে কেন?’ চতুর্ভুজ একটা গাছের উঁচু ডালের দিকে আঙুল বাড়াইয়া, ভয়ে ভয়ে বলিল, ‘ওই যে প্যাঁচা দেখছ, ওটাই আমার যম। তোমার সঙ্গে এই আমার শেষ আলাপ!’

চতুর্ভুজের মুখের কথা না ফুরাতে, সেই প্যাঁচা ভয়ংকর মূর্তি ধরিয়া ছুটিয়া আসিল এবং জালার মুখের মতো প্রকাণ্ড হাঁ করিয়া চতুর্ভুজকে গিলিয়া ফেলিল!

সেই বিদেশে হাজার হাজার জানোয়ারের মধ্যে আমার একমাত্র বন্ধুর এই দশা দেখিয়া, আমি বিশেষ ব্যথিত হইলাম। রাগে আমার গা থরথর করিয়া কাঁপিতে লাগিল। ইচ্ছা হইল, প্যাঁচার মুণ্ডটা ছিঁড়িয়া ফেলি! আমি তাহাকে তাড়া করিলাম। সে ভয় পাইয়া নদীতে পড়িয়া গেল। সেখানে একটা হাঁস ভাসিতেছিল সেই প্যাঁচা তাহার পিঠে চড়িয়া বসিল। তাহাকে ধরিবার জন্য আমি ঝাঁপ দিবামাত্র একটা ভয়ংকর শব্দ হইল, আর অমনি স্বপ্ন ভাঙিয়া গেল।

এ কী! কোথায় জানোয়ারের দেশ, আর কোথায় আমি! জানোয়ারদের মেলা, তাহাদের ক্রিকেট, ফুটবল, টাগ-অফ-ওয়ার খেলা, তাহাদের জাতীয় সংগীত, প্যাঁচার নিষ্ঠুরতা––সবই আষাঢ়ে স্বপ্ন। আমি যেখানে যেভাবে শুইয়াছিলাম, তেমনিই আছি! মাঝে থেকে, কেমন করিয়া কী যেন হইয়া গেল। আমি আশ্চর্য হইয়া আমার স্বপ্নের কথা ভাবিতে লাগিলাম! তারপর কখন ঘুমাইয়া পড়িয়াছি, জানি না। সকালে উঠিয়া রাত্রের স্বপ্নের কথা যাহাকে বলি, সে-ই হাসিয়া মরে!

দ্বিতীয় স্বপ্ন

সন্ধির প্রস্তাব

সারাদিন কাটাইয়া শিকারের সুখে,

একদা ফিরিনু রাতে গৃহ অভিমুখে।

পরিশ্রান্ত দেহে যেই করিনু শয়ন,

অমনি হইনু গাঢ় ঘুমে অচেতন।

বহুক্ষণ পরে, নিশি নীরব নিঝুম,

হঠাৎ কী জানি কীসে ভেঙে গেল ঘুম।

দেখিলাম, নিরজন গভীর গহনে,

বসি, নিজে পশুরাজ পাত্র-মিত্র সনে।

করিছেন ব্যগ্রভাবে নানা আলাপন,

‘কীসে অস্তর পরিত্যাগ করে নরগণ!’

ক্ষণ পরে পশুরাজ দাঁড়াইয়া খাড়া,

কহিলেন উচ্চ কণ্ঠে মাথা দিয়া নাড়া,

‘উভয় পক্ষের দোষ দেখিবারে পাই,

তারা অস্ত্র মারে, মোরা টুঁটি ছিঁড়ে খাই

কিন্তু মানুষের দোষ ক্ষমিবার নয়,

দূর হতে ছোঁড়ে অস্ত্র এত নীচাশয়!

থাকিত বীরত্ব যদি হত বলবান,

করিত সম্মুখ যুদ্ধ বীরের সমান।

দিতে পারি প্রতিশোধ, রাগে অঙ্গ দহে,

কিন্তু নব সভ্যতার রীতি তাহা নহে।

তাই আনিয়াছি সবে করি নিমন্ত্রণ,

যুক্তি করো কীসে অস্ত্র ত্যজে নরগণ।

আমার প্রস্তাব এই, পাঠাইয়া চর,

সর্বাগ্রে পরীক্ষা করি নরের অন্তর,

অস্ত্র পরিত্যাগে তারা যদি রাজি হয়,

গর্জন দংশন মোরা ছাড়িব নিশ্চয়।

গ্রামে ও নগরে নর যাপুক জীবন,

আমাদের তরে শুধু ছেড়ে দিক বন।’

উঠিল দুরন্ত ব্যাঘ্র ঢুলুঢুলু আঁখি,

দুই হাত দু-দিকের পকেটেতে রাখি

কহিল গম্ভীর স্বরে, ‘যে প্রস্তাব আজ,

সভামাঝে করিলেন নিজে পশুরাজ,

সমর্থন করি তাহা, যুক্তি অতি সার।

মানুষের সনে সন্ধি বড়োই দরকার।’

বক্তব্য করিয়া শেষ বসিলেন বীর।

অমনি সজলনেত্রে কহিল কুমির,

‘বড়ো সুখি হইলাম সুপ্রস্তাব শুনে,

দিবানিশি জ্বলিতেছি মনের আগুনে।

শত অসহায় নরে করেছি ভক্ষণ,

বিবেক দংশনে তাই আসিছে ক্রন্দন।’

কুমিরের নীতিকথা শুনিয়া নীরবে

মুখে হাত দিয়া হাসি থামাইল সবে!

তারপর হস্তীবর হাত উঁচু করি,

শুঁড়টি বাঁকায়ে ঠিক শিরোপরি ধরি,

কহিল গম্ভীরভাবে আশপাশে চাহি,

‘মানুষের মতো নীচ ত্রিভুবনে নাহি।

রাজার উদ্দেশ্য ভালো, কিন্তু ভাইগণ,

বিশ্বাস করিতে নরে আছে কি কখন?

সন্ধিতে স্বাক্ষর তার কতক্ষণ লাগে,

শর্ত কিন্তু ভাঙিবে সে সকলের আগে।

ভালো মতো জানি আমি মানবের রীতি,

মুখের বচনে তার অতিশয় প্রীতি,

অন্তরে বিদ্বেষ, সদা বিষবাণ হানে,

আপনার স্বার্থ ছাড়া কিছু নাহি জানে।

যে যত কপট আর যত বেশি খল,

রাজনীতি ক্ষেত্রে সে ততই প্রবল।

বুড়ো-সুড়ো হইয়াছি, বুঝিয়াছি সার,

প্রবলের ক্রীতদাস নর কুলাঙ্গার!

সন্ধির প্রস্তাব রাখি, একেবারে ছুটি

পার যদি ধরিবারে সাপটিয়া টুটি,––

দেখিবে সে কাপুরুষ ঘৃণিত কেমন

পদতলে পড়ি ধূলি করিবে লেহন।’

না বসিতে হাতি, খাড়া হল তিনজন,

চিতাবাঘ, নেকড়িয়া, ভালুক ভীষণ।

কহিল আবেগ ভরে, ‘না করিব আর,

মানুষের প্রতি কভু কোনো অত্যাচার।

প্রাণান্তে ছোঁব না কারো এক গাছা চুল,

তীক্ষ্ণধার দন্তগুলি সমূলে নির্মূল

করিব নোড়ার ঘায়ে এবে প্রাণ ভরি

রাজার প্রস্তাব মোরা সমর্থন করি।’

ছুটিয়া আসিল সর্প, মাথা দিয়া নাড়া,

হাই তুলিবার ছলে দুটি বিষদাড়া

বাহির করিয়া কহে, সরোষে গর্জিয়া,

‘আমাদের বংশ যাক নির্মুল হইয়া––

তবু সেই কুলাঙ্গার মানুষের সনে,

প্রাণান্তেও সন্ধিবদ্ধ হব না জীবনে।

অধম পিশাচ সেই চিরশত্রু নরে,

ক্ষমা শুধু নিতান্তই জ্ঞানহীনে করে

পারিব না কভু তাহা। দোহাই রাজন,

হেন অনুরোধ, প্রভু, কোরো না কখন।’

শুনিয়া সর্পের কথা রাজা মহাশয়

দাঁড়াইয়া সভামাঝে, দুঃখে অতিশয়

কহিলেন ধীরে ধীরে,––‘মম অনুরোধ,

সর্প, তুমি একেবারে হয়ো না নির্বোধ।

আমার প্রস্তাব তুমি করহ চিন্তন,

মানুষেরে ভালোবেসে নাহি প্রয়োজন।

ভান করো, যেন ভালোবাস অতিশয়,

তাহাতেই কার্যসিদ্ধি হইবে নিশ্চয়।’

শিয়াল উঠিল পরে বলে, ‘ঠিক ঠিক

বজায় রাখিতে যদি চাহ সব দিক,

ছল, ভান, চালাকির অতি প্রয়োজন।

দৌত্যকার্যে মোরে, প্রভু, করহ প্রেরণ।’

আদেশ দিলেন রাজা, ছুটিল শিয়াল।

সবে ভাবে, চালিয়াছি অতি পাকা চাল,

এই চালে একেবারে হবে বাজি মাত!

আছিল মর্কট এক দীর্ঘে আধ হাত

শাখার উপরে বলে, ‘শুধু যে সেয়ান

তোমরাই, মনেও তা দিয়ো নাকো স্থান!

তোমাদের চেয়ে নর ধূর্ত শতগুণ,

হিংসা, দ্বেষ, অত্যাচারে তেমনি নিপুণ।

যা কিছু অভাব ছিল দন্ত আর নখে,

ঘুচিয়া গিয়াছে তাহা অস্ত্রের পরখে।

আঁটিছ মতলব, ছলে অস্ত্রহীন করে

আরামে নরের মাংস খাবে পেট ভরে,

সে সাধে পড়িবে বাদ আগে বলে রাখি,

মানুষের কাছে নাহি খাটিবে চালাকি!

ক্রোধ উপজিলে তার রক্ষা নাহি আর,

তাই বলি, সোজা পথ দেখো যে যাহার!’

মর্কটের স্পর্ধা হেরি যত প্রাণীকুল

রাগে থরথর কাঁপে, চক্ষু জবাফুল!

এক সাথে হুংকারিয়া করিল গর্জন,––

অমনি ভাঙিল মোর সাধের স্বপন!

লম্বাদাড়ি

বনে ছিল এক দুরন্ত বাঘ! তাহার হালুম-হুলুম গর্জনে কেউ যে একটু স্থির থাকিবে, সে জো-টি ছিল না। সে একদিক হইতে তাড়া করিয়া যাহাকে সম্মুখে পাইত, তাহারই ঘাড়টি ভাঙিত। বাঘের এই অত্যাচার হইতে রক্ষা পাইবার জন্য একদিন সব জন্তুতে মিলিয়া মস্ত এক সভা করিল। নানা যুক্তি-তর্ক, ফিকির-ফন্দির পর লম্বাদাড়ি নামে এক ছাগল বলিল, ‘তোমরা স্থির হও। বাঘটাকে কাল এমন জব্দ করে দেব যে, সে আর এমুখোও হতে সাহস করবে না।’ ছাগলের কথায় সকলেই খুশি হইল।

পরদিন লম্বাদাড়ি নদীর ধারে এক পাহাড়ের উপর দাঁড়াইয়া আছে, এমন সময় বাঘ নদী পার হইয়া ভিজা গায়ে সেখানে আসিয়া উপস্থিত! ছাগলের খাড়া শিং আর লম্বা দাড়ি দেখিয়া তাহার তো চক্ষুস্থির! সে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করিল––

‘লম্বা লম্বা দাড়ি, ঘন ঘন চোপা নাড়ি––

তুই ভাই কে রে?’

লম্বাদাড়ি বলিল–– ‘সিংগির মামা ভোম্বল দাস,

বাঘ মেরেছি গোটা পঞ্চাশ

হাতির ভেঙেছি পাশ

আর ভিজে বাঘ খাব বলে

বনে করেছি বাস!’

এই না শুনিয়া ভয়ে বাঘের মুখ শুকাইয়া এতটুকু! না সে হালুমহুলুম, না সে লম্ফঝম্প! নাকি সুরে––গেলুম-মলুম––করিতে করিতে একেবারে ভোঁ দৌড়! তারপর কোথায় গিয়া সে যে গা-ঢাকা দিল তাহার ঠিকানা নাই!

কুমিরের বাপের শ্রাদ্ধ

কুমিরের বাপের শ্রাদ্ধ। বন থেকে দলে দলে পশুরা সব ফলার খেতে এসেছে। সিংহ, বাঘ, চিতা, শিয়াল, বিড়াল, ইঁদুর, ব্যাং––কেউ বাকি নেই। কুমিরের বাড়ির সামনে মস্ত উঠানে শামিয়ানা খাটানো হয়েছে। তার নীচে একদিকে সকলে বসেছে, আর-এক দিকে পুরুতঠাকুর আসন পেতে বসে, মাথা নেড়ে, টিকি দুলিয়ে কুমিরকে মন্ত্র পড়াচ্ছেন। শ্রাদ্ধের ঘটা দেখে কে! এদিকে বেলা ক্রমে বেড়েই চলেছে। শেষে পুরুত যখন আসন ছেড়ে উঠলেন, তখন দুপুর বাজতে আর দেরি নেই। এত বেলায় কারো মুখে একবিন্দু জলও পড়েনি। আহা, শুকনো ঠোঁট চাটতে চাটতে বেচারাদের গলা পর্যন্ত শুকিয়ে উঠেছে।

ইঁদুরের পেটের জ্বালা বড়ো বেশি। আর থাকতে না পেরে ব্যাংটাকে ধরে সে টপ করে গিলে ফেলল। ব্যাপার দেখে বিড়াল তো চটে লাল। ফলার খেতে এসে এরকম অভদ্রতা! রাগে পুষি এমন খেপে উঠল যে, টুঁটি ছিঁড়ে ইঁদুরকে ভদ্রতা না শিখিয়ে কিছুতেই ছাড়লে না।

তখন শিয়াল দেখলে হিসেব মতো বিড়ালের মাংসে এখন শুধু তারই দাবি। সে দাবি কড়ায়-গণ্ডায় আদায় না করে সেই-ই বা ছাড়বে কেন!

এইবার চিতাবাঘের পালা। সে ভাবলে, ‘আমি ভদ্রতাও জানিনে, দাবি-দাওয়াও বুঝিনে, আমি শুধু ধরব আর টুঁটি ছিঁড়ব! এই ভেবে শিয়ালকে জাপটে ধরে সে যা করলে তা বোধ হয় না বললেও চলে। চিতার কাণ্ড দেখে বাঘ একেবারে আগুন! যত চুনোপুঁটি মজা লুঠবে, আর সে বসে বসে উপোস করবে? বটে!––এরপর বাঘ যখন ফলারে মন দিলে, তখন চিতার ল্যাজের ডগাটুকুও বাদ গেল না!

পশুরাজ সিংহ আড়চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে সব দেখছিলেন। ফলারের ব্যবস্থা দেখে শেষে তিনিও মেতে উঠলেন! এর পর বাঘটাকে ছিঁড়ে-কুটে শেষ করতে তাঁর আর কতক্ষণ!

কুমির এতক্ষণে কোথায় লুকিয়েছিল, পশুরাজ খাওয়া দাওয়া সেরে বসে আছে, এমন সময় সে এসে হাজির। ব্যাপার দেখে কুমির মহাখুশি। এই তো আসল ফলার! একেবারে হেউ-ঢেউ কাণ্ড! আয়োজন এমন প্রচুর যে, কারো একটা কথা বলবার জো-টি নেই!

কুমির ভাবলে, ভোজের ব্যাপার চুকেছে, এখন আমি নিজের জোগাড় দেখি। এই ভেবে পশুরাজকে সাপটে ধরে সে আপনার প্রকাণ্ড মুখের মধ্যে ফেলে দিলে। রাজা অনেক আপত্তি করলেন বটে, কিন্তু সবই মিছে। খিদেয় কুমিরের পেট চুপসে এতক্ষণ আমসি হয়েছিল, এখন সেটি ফুলে একেবারে ঢাকাই জালা! তাকিয়া ঠেস দিয়ে বসে, পেটে হাত বুলাতে বুলাতে সে গুড়্গুড়ি টানতে লাগল।

ব্যাপার দেখে পুরুতমশাই হতভম্ব। ভাগ্যে তিনি ফলার খেতে আসেননি! ফলারে এলে তাঁর আজ কী দশাই না হত! তিনি ডালে ডালে লাফ মারেন আর ভাবেন :

কুমিরের বাড়ি নেমন্তন্ন সহজ কথা নয়,

বিনা আয়োজন সবাই পরিতুষ্টু হয়।

যার পেটেতে যত ধরে, করলে উদরসাৎ,

ঝড়তি-পড়তি খেয়ে কুমির পেটে বুলায় হাত।

পানতাবুড়ি

গাঁয়েতে এক বুড়ি ছিল, তাহার মতো এমন গরিব কেহ কখনো দেখে নাই। ভিক্ষা করিয়া সে যে-কয়টি চাল পাইত, ভাত রাঁধিয়া চারটি রাতের বেলা খাইত, বাকিগুলি পরদিন সকালের জন্য জল দিয়া রাখিত। সব দিন পানতাভাত খাইত বলিয়া, তাহার নাম ছিল পানতাবুড়ি।

একবার সেই গাঁয়ে এক চোর আসিয়া উপস্থিত। বুড়ির পানতার সন্ধান পাইয়া সে রোজ রোজ তাহা খাইতে লাগিল। চোরের জ্বালায় বেচারি তো অস্থির।

একদিন বুড়ি রাজার কাছে নালিশ করিতে চলিল। যাইতে যাইতে পথে দেখিল, একটা বেল পড়িয়া আছে। বেল জিজ্ঞাসা করিল, ‘বুড়ি, বুড়ি, কোথায় যাচ্ছ?’

বুড়ি। চোরে পানতা খেয়েছে, তাই রাজার কাছে নালিশ করতে যাচ্ছি।

বেল। ফিরে যাবার সময় আমায় নিয়ে যেয়ো।

বুড়ি। আচ্ছা।

কিছু দূরে গিয়া বুড়ি দেখিল, একটা শিঙি মাছ। মাছ বলিল, ‘বুড়ি, বুড়ি, কোথায় যাচ্ছ?’

বুড়ি। চোরে পানতা খেয়েছে, রাজার কাছে নালিশ করতে যাচ্ছি।

মাছ। ফিরে যাবার সময় আমায় নিয়ে যেয়ো।

বুড়ি। আচ্ছা থাকো।

আর কিছু দূর গিয়া বুড়ি একটি সূচ দেখিতে পাইল। সূচ বলিল, ‘বুড়ি, বুড়ি, কোথায় যাচ্ছ?’

বুড়ি। চোরে পানতা খেয়েছে, রাজার কাছে নালিশ করতে যাচ্ছি।

সূচ। ফিরে যাবার সময় আমায় নিয়ে যেয়ো।

বুড়ি। আচ্ছা, বেশ!

আরও কিছু দূর গিয়া বুড়ি দেখিল, একখানা ছুরি পড়িয়া আছে। ছুরি জিজ্ঞাসা করিল, ‘বুড়ি, বুড়ি, কোথায় যাচ্ছ?’

এতক্ষণ বুড়ি বেশ সহজভাবেই জবাব দিতেছিল, ক্রমে তাহার মাথা গরম হইয়া উঠিল। ছুরির কথার উত্তরে সে বিরক্ত হইয়া বলিল, ‘যেথায় যাই না, তোর তাতে কী?’

ছুরি। রাগ করো কেন? একটা কথা শোনো––ফিরে যাবার সময় আমায় নিয়ে যেয়ো।

বুড়ি। আচ্ছা আচ্ছা, সে তখন হবে।

শেষে রাজবাড়ির কাছাকাছি গিয়া বুড়ি দেখিল, পথের ধারে একটা কুমির পড়িয়া আছে। কুমির বলিল, ‘বুড়ি, বুড়ি, কোথায় যাচ্ছ?’

বুড়ির মেজাজ তখন আরও গরম। বলিল, ‘তোর কী? যেথায় খুশি যাচ্ছি! যমের বাড়ি যাচ্ছি, তুই যাবি?’

কুমির। বাপরে বাপ––একেবারে যে আগুন! বলছি কী, ফিরে যাবার সময় আমায় নিয়ে যেয়ো।

বুড়ি। বেশ, দেখা যাবে।

ইহার পর বুড়ি যখন রাজবাড়িতে পঁহুছিল, তখন বেলা প্রায় শেষ হইয়াছে। সেদিন রাজা গিয়াছিলেন শিকারে। কাজেই, বুড়ির আর নালিশ করা হইল না। ফিরিবার পথে সে সেই কুমির, ছুরি, সূচ, শিঙি মাছ ও বেল লইয়া আসিল।

শিঙি মাছ বলিল, ‘আমায় পানতার হাঁড়িতে রাখো।’

বেল। আমায় আগুনের ভিতর রাখো।

সূচ। আমায় দেওয়ালে পুঁতে রাখো।

ছুরি। আমায় উঠানের ঘাসে গুঁজে রাখো।

কুমির। আমায় ঘাটে বেঁধে রাখো।

যাহার যেমন ইচ্ছা, তাহাকে সেইভাবে রাখিয়া বুড়ি রাত্রে ঘুমাইয়াছে, এমন সময় চোর আসিয়া উপস্থিত। সে যেই পানতার হাঁড়িতে হাত দিয়াছে, অমনি শিঙি মাছের কাঁটার এক খোঁচা! আগুন-তাপ দিবার জন্য যেই উনানের ধারে গিয়াছে, অমনি বেল ফাটিয়া চোখ অন্ধ। হাতড়াইতে হাতড়াইতে দরজার ধারে যেই আসিয়াছে, অমনি কাদায় পা পিছলাইয়া দড়াম! আহা, বেচারার শাস্তির আর শেষ নাই। দেওয়াল ধরিয়া উঠিতে যাইবে, অমনি সূচ বিঁধিয়া রক্তারক্তি! উঠান দিয়া পলাইবে, অমনি ছুরিতে পা কাটিয়া খান খান! ঘাটে নামিয়া হাত-পা ধুইবে, অমনি একেবারে কুমিরের মুখে। কুমির চিৎকার করিয়া উঠিল––

‘ও বুড়ি, তোর চোর ধরেছি।

‘ও বুড়ি, তোর চোর ধরেছি।’

কুমিরের চিৎকার––বাপ রে সে কী ভয়ানক! বাঘের ডাক লাগে কোথায়! বুড়ি তো ধড়ফড় করিয়া উঠিয়া বসিল। তারপর লোকজন ডাকিয়া, চোরকে বাঁধিয়া রাজার নিকট হাজির করিল। রাজা তাহাকে এমন শাস্তি দিলেন যে, সে আর কী বলিব!

শেয়াল

মাচার উপরে কয়েকটা মুরগি বসিয়া আছে, আর তাহাদিগকে দেখিয়া শেয়াল ভায়ার জিব দিয়া জল সরিতেছে! কিন্তু উপায় কী! শেয়ালের তো আর উড়িবার শক্তি নাই! তাই চাহিয়া চাহিয়া যখন ঘাড় ব্যথা করিতে লাগিল, তখনই একটা নিশ্বাস ফেলিয়া সরিয়া পড়িল। যাইবার সময় শেয়াল ভাবিল, মুরগিগুলোর কী অন্যায়! একটাও নীচে এল না! আমি না খেয়ে রইলুম! এটা কী ভদ্রতা হল! ছিঃ!

শেয়ালের সম্বন্ধে অনেক গল্প শুনিয়াছ, আমিও এটা বলি। শেয়াল কাঁকড়া খাইতে বড়ো ভালোবাসে। একবার একটা শেয়াল কাঁকড়ার গর্তের কাছে হাঁটু গাড়িয়া বসিয়া বলিল,

‘কাঁকড়ি কাঁকড়ি, পরমেশ্বরী,

গর্তের বাইরে এসো নমস্কার করি!’

শেয়ালের ভক্তিতে কিন্তু কাঁকড়ার বিশ্বাস হইল না। সে ভিতর হইতে উত্তর করিল,

‘ওরে ওরে আমার গায়ে হয়েছে জ্বর,

গর্তের বাইরে থেকে নমস্কার কর!’

কাঁকড়ার কাছে চালাকি খাটিল না দেখিয়া শেয়াল মানে মানে ল্যাজ গুটাইয়া পলায়ন করিল। যাক, এ তো গেল গল্প। সত্য সত্যই ইহারা কীরূপ কৌশলে কাঁকড়া ধরে, জান? কাঁকড়ার গর্ত দেখিতে পাইলে, শেয়াল আপনার লম্বা ল্যাজ তাহার ভিতর প্রবেশ করাইয়া দেয় বুদ্ধিহীন কাঁকড়া রাগের চোটে যেই ল্যাজটি কামড়াইয়া ধরে, অমনি শেয়াল আস্তে আস্তে উহা বাহির করিয়া কাঁকড়ার দাড়া, পাখনা, এমনকী খোলা পর্যন্ত চিবাইয়া খায়। দেখিলে––কেমন দুষ্টু বুদ্ধি! ইহারা কাঁঠাল খাইতেও খুব ভালোবাসে। গাছের নীচের কাঁঠাল পাকিলে তো কথাই নাই, সেটিকে উদরসাৎ করিবেই, এমনকী, কিছু উপরে পাকিলেও ছাড়ে না। একটির ঘাড়ে আর একটি, তার ঘাড়ে আরও একটি––এইরূপ করিয়া উঠিয়া ইহারা সে কাঁঠালটিও পাড়িয়া খায়।

শেয়াল এইরূপ আরও অনেক বুদ্ধির কাজ করে, কিন্তু যখন ধরা পড়ে, তখনই সকলের চেয়ে অদ্ভুত চালাকির পরিচয় দেয়। ধরা পড়িলে শেয়াল কিছুক্ষণ চুপ করিয়া পিঠ পাতিয়া মার খায়। তারপর ঠিক যেন মরিয়া গিয়াছে, এইরূপ ছল করিয়া পড়িয়া থাকে। শেয়াল মরিয়াছে ভাবিয়া, প্রহারকারীরা চলিয়া গেলে, সে-ও আস্তে আস্তে চম্পট দেয়!

শিয়ালের ধূর্তামি

বনের ধারে এক কৃষক বাস করিত। তাহার একটি ঘোড়া ছিল। ঘোড়াটি ছোটোবেলা হইতে প্রাণপণে কৃষকের সেবা করিত। ক্রমে বুড়া হইয়া যখন সে শক্তিহীন হইয়া পড়িল, একদিন কৃষক তাহাকে যা-খুশি গালাগালি দিয়া বাড়ি হইতে দূর করিয়া দিল বলিল, ‘হতভাগা, তুমি শুধু বসে বসে খাবে? দূর হও! আমি তোমার মতো ঘোড়া চাই না! আগে তুমি হাওয়ার মাথায় ছুটতে, সিংহ বেঁধে আনতে বললে আনতে। আর এখন এক পা চলতে পার না! যাও, বনে জঙ্গলে যেথায় খুশি দূর হয়ে যাও। আবার যদি আগের মতো চলতে-ফিরতে পার, বনের সিংহ বেঁধে আনতে পার, তবেই তোমার মুখ দেখব।’

কৃষকের গালাগালিতে ঘোড়ার দুঃখের আর অবধি রহিল না। সে কোনো কথা না বলিয়া কাঁদিতে কাঁদিতে জঙ্গলে প্রবেশ করিল। সেই জঙ্গলে এক শেয়াল বাস করিত। দূর হইতে ঘোড়াকে দেখিতে পাইয়া, সে কাছে আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, ‘ভাই, আজ তোমাকে এমন ক্ষুণ্ণ দেখছি কেন? তোমার চোখে তো কখনো জল দেখিনি!’

ঘোড়া। আর ভাই, জল কি সাধে পড়ে! ছোটোবেলা থেকে যার কাজ করতে করতে বুড়ো হয়ে পড়লাম, আজ কিনা সে-ই আমাকে দূর করে দিলে! কপালে আরও হয়তো কত দুঃখ আছে!

শিয়াল। কে, সেই হতভাগা কৃষক বুঝি? লোকটা তো তেমন মন্দ নয়। হঠাৎ তার এ দুর্মতি কেন? আচ্ছা, সে কী বললে?

ঘোড়া। বলবে আর কী! আগে নাকি আমি হাওয়ার মাথায় ছুটতাম, বনের সিংহ বেঁধে আনতাম আর এখন শুধু বসে বসে খাই! গায়ের জোরে সিংহ ধরতে না পারলে আমার দানাপানি বন্ধ। এমনকী মুখ দেখানও নিষেধ! কিন্তু ভাই, এ বয়সে তা কি সম্ভব?

শিয়াল। অসম্ভব কীসে? একটা সিংহ ধরা––এ আর তেমন কঠিন কাজ কী! আচ্ছা, আমি তার জোগাড় করছি তুমি এখানে ঠিক মড়ার মতো পড়ো থাকো। দেখো সাবধান, আমি ইশারা না করলে, যেন উঠো না।

এই বলিয়া শিয়াল এক দৌড়ে জঙ্গলের মধ্যে প্রবেশ করিল এবং একটা প্রকাণ্ড গর্তের সম্মুখে পশুরাজ সিংহকে দেখিতে পাইয়া, প্রণাম করিয়া বলিল, ‘প্রভু, খুব কাছেই একটা ঘোড়া পড়ে আছে যদি ইচ্ছে হয়, আমার সঙ্গে আসুন আজ বিনা পরিশ্রমে আহারাদি চলে যাবে।’ তাহার কথায় বিশ্বাস করিয়া, সিংহ ঘোড়ার নিকট উপস্থিত হইলে শিয়াল হাত জোড় করিয়া বলিল, ‘মহারাজ, একটু আগে এই পথ দিয়ে একজন শিকারিকে যেতে দেখেছি। এখানে দাঁড়িয়ে আহার করা উচিত নয়। কী জানি, বিপদ ঘটতে কতক্ষণ! আপনি বরং আরও একটু কাছে আসুন আমি ঘোড়াকে আপনার পায়ের সঙ্গে বেঁধে দিচ্ছি। তারপর সুবিধেমতো গর্তে নিয়ে গিয়ে খাবেন।’

দুষ্টের চালাকি বুঝিবে, সিংহের সে বুদ্ধি কোথায়! সে কাছে আসিয়া দাঁড়াইলে, তাহার সম্মুখের পা দুইখানি ঘোড়ার কোমরের সহিত শক্ত করিয়া বাঁধিয়া, শিয়াল যেই ইশারা করিয়াছে, অমনি ঘোড়া লাফাইয়া উঠিয়া এক ছুট! সিংহের গর্জনে তখন চারিদিক কাঁপিতে লাগিল। কিন্তু ঘোড়ার তাহাতে ভ্রূক্ষেপও নাই! সিংহকে টানিতে টানিতে সে একবারে কৃষকের উঠানে উপস্থিত হইল।

ঘোড়ার এই আশ্চর্য বীরত্বে কৃষকের আত্মীয়স্বজন সকলে ‘বাহবা’, ‘বাহবা’ করিতে লাগিল। তখন কৃষকের মুখে আর কথাটি নাই! নিজের ব্যবহারে লজ্জিত হইয়া সে মাথা হেঁট করিয়া রহিল। সেই অবধি ঘোড়ার আদর-যত্নের ঘটা দেখে কে!

টুনি পাখি

এক যে টুনি, তার ছিল এক বেগুন গাছ। সেই গাছে আঁকশি দিয়ে রোজ রোজ সে বেগুন পাড়ত। বেগুনের বোঁটায় কাঁটা থাকে, তা তো জান। একদিন হয়েছে কী, টুপ করে একটা বেগুন পড়ে টুনির পিঠে কাঁটা ফুটে গেল। অমনি ব্যথায় ছটফট করতে করতে সে নাপিতের বাড়ি ছুটল। নাপিত থাকত অনেক দূরে। যেতে যেতে পথেই রাত হয়ে পড়ল। নাপিত খেয়ে-দেয়ে শুয়েছে, এমন সময় টুনি গিয়ে দরজায় ঘা দিয়ে ডাকল––

‘নাপিত ভায়া, নাপিত ভায়া,

ঘরে আছ হে?

নাপিত। রাত্তিরেতে ডাকাডাকি করছ তুমি কে?

টুনি। আমি টুনি পাখি। একটা কাঁটা বের করে দেবে?

নাপিত। দূর বোকা, রাত্তিরে কি কাঁটা বের করা যায়। কাল সকালে আসিস।

নাপিতের উপর চটে গিয়ে টুনি রাজার কাছে নালিশ করতে গেল––

‘রাজা মশাই, রাজা মশাই

আছ তুমি ঘরে?’

রাজা। রাত দুপুরে কে ডাকাডাকি করে?

টুনি। আমি টুনি পাখি। তুমি নাপিতকে মারবে?

দেয় না নাপিত কাঁটা তুলে,

পিঠটা আমার গেছে ফুলে।

রাজা। বাঃ, আমি কেন নাপিতকে মারব?

রাজার উপর চটে গিয়ে টুনি গেল লাঠির কাছে। ‘লাঠি, লাঠি, তুমি রাজার পিঠে পড়বে?’

রাজার নাপিত পায়না সাজা।

দেয় না নাপিত কাঁটা তুলে,

পিঠটা আমার গেছে ফুলে।

লাঠি। আমি কেন রাজার পিঠে পড়ব?

লাঠির উপর চটে গিয়ে টুনি গেল আগুনের কাছে। ‘আগুন, আগুন, লাঠি পুড়াবে?

চায় না লাঠি মারতে রাজা,

রাজার নাপিত পায় না সাজা

দেয় না নাপিত কাঁটা তুলে

পিঠটা আমার গেছে ফুলে।’

আগুন। আমি কেন লাঠি পুড়াব?

আগুনের উপর চটে গিয়ে টুনি গেল জলের কাছে। ‘জল, জল, আগুন নিবাবে?

আগুন নাহি পুড়ায় লাঠি।

চায় না লাঠি মারতে রাজা,

রাজার নাপিত পায় না সাজা

দেয় না নাপিত কাঁটা তুলে,

পিঠটা আমার গেছে ফুলে।’

জল। আমি কেন আগুন নিবাব?

জলের উপর চটে গিয়ে টুনি গেল হাতির কাছে। ‘হাতি, হাতি জল শুষবে?

জল করে না আগুন মাটি,

আগুন নাহি পুড়ায় লাঠি।

চায় না লাঠি মারতে রাজা,

রাজার নাপিত পায় না সাজা

দেয় না নাপিত কাঁটা তুলে,

পিঠটা আমার গেছে ফুলে।’

হাতি। আমি কেন জল শুষব?

হাতির উপর চটে গিয়ে টুনি গেল ইঁদুরের কাছে। ‘ইঁদুর ইঁদুর, হাতির দাঁত কাটবে?

লয় না হাতি জলটা শুষি।

জল করে না আগুন মাটি,

আগুন নাহি পুড়ায় লাঠি।

চায় না লাঠি মারতে রাজা,

রাজার নাপিত পায় না সাজা

দেয় না নাপিত কাঁটা তুলে,

পিঠটা আমার গেছে ফুলে।’

ইঁদুর। আমি কেন হাতির দাঁত কাটব?

ইঁদুরের উপর চটে গিয়ে টুনি গেল বিড়ালের কাছে। ‘বিড়াল, বিড়াল, ইঁদুর মারবে?

হাতির দাঁত না কাটে মুষি,

লয় না হাতি জলটা শুষি।

জল করে না আগুন মাটি,

আগুন নাহি পুড়ায় লাঠি।

চায় না লাঠি মারতে রাজা,

রাজার নাপিত পায় না সাজা।

দেয় না নাপিত কাঁটা তুলে,

পিঠটা আমার গেছে ফুলে।’

বিড়াল। আমায় যদি বাটি ভরে দুধ এনে দিস, তবে ইঁদুর মারি।

টুনি তখন উড়তে উড়তে গোয়ালা-বাড়ি গিয়ে বিড়ালের জন্যে এক বাটি দুধ এনে দিল। দুধটুকু খেয়ে––

এক লাফে যায় পুষি ইঁদুর মারিতে,

ইঁদুর ছুটিল হাতির দাঁত কাটিতে।

হাতি বলে সব জল লইব শুষিয়া,

জল বলে, আগুনের মাথা খাব গিয়া।

আগুন পোড়াতে লাঠি লাল হয়ে উঠে,

রাজাকে মারিবে বলে লাঠি যায় ছুটে।

রাজা বলে, নাপিতেরে দিব আজ শূলে,

চতুর নাপিত বলে, কাঁটা দিব তুলে।

এই বলে নাপিত ভয়ে ভয়ে ছুটে এসে টুনির কাঁটা বের করে দিল। তারপর––

টুনির জ্বালাও জুড়ল

আমার কথাও ফুরুল!

সাত-ভাই-চম্পা

এক ছিল রাজা, তাঁর সাত রানি। রানিদের কাহারও ছেলেপিলে ছিল না, তাই রাজার ভারী দুঃখ! একদিন রাজা মৃগয়া করিতে গিয়াছেন, এমন সময় চর আসিয়া খবর দিল, ‘সুয়োরানির সুন্দর সাতটি ছেলে ও একটি মেয়ে হয়েছে।’ শুনিয়া, রাজার আনন্দ আর ধরে না। তাড়াতাড়ি মৃগয়া সারিয়া তিনি বাড়ি ফিরিলেন।

এদিকে এক কাণ্ড হইয়াছে। সুয়োরানি রাজার প্রিয় বলিয়া আর ছয় রানি তাঁহাকে হিংসা করিত। রাজা ফিরিয়া আসিবার পূর্বেই তাহারা সেই আটটি শিশুকে পাঁশগাদায় পুঁতিয়া ফেলিল। রাজা আসিয়া ছেলে-মেয়েদের দেখিতে চাহিলে, তাহারা ব্যাং, ইঁদুর, কাঁকড়া, বিছা প্রভৃতি ধরিয়া আনিয়া বলিল, ‘এই দেখো, তোমার সুয়োরানির সাধের ছেলে-মেয়ে!’

দুষ্টু রানিদের কৌশলে রাজার মাথা ঘুরিয়া গেল। রাগে গরগর করিতে করিতে তিনি সুয়োরানিকে রাজবাড়ি হইতে তাড়াইয়া দিলেন। আহা! দুঃখিনী আর কী করিবেন, কোথায় যাইবেন––ঘুঁটে-কুড়ানি দাসী হইয়া পথে পথে ঘুরিতে লাগিলেন!

কিছুকাল পরে, রাজার বাপের শ্রাদ্ধ উপস্থিত––ফুলের দরকার। মালী ফুল আনিতে গিয়া দেখে, সারা বাগান শুকনো––ফুল তো দূরের কথা, কোথাও একটি কুঁড়িও নাই। সে আর কী করিবে, ভয়ে ভয়ে ফিরিয়া আসিতেছে, এমন সময় দেখিল––পাঁশগাদায় সাতটি সুন্দর চাঁপাগাছ ও একটি পারুল গাছ হইয়াছে। আর প্রতি গাছে একটি করিয়া সুন্দর ফুল ফুটিয়া রহিয়াছে। ফুলগুলি দেখিয়া মালীর বড়োই আনন্দ হইল কিন্তু সে যেই হাত বাড়াইয়াছে, অমনি পারুল ফুলটি চাঁপা ফুলগুলিকে বলিয়া উঠিল

সাত ভাই চম্পা জাগো রে!

চাঁপারা উত্তর করিল

কেন বোন পারুল ডাকো রে!

পারুল। রাজার মালী এসেছে,

ফুল দিবে কি না দিবে?

চাঁপা। না দিব না দিব ফুল,

উঠিব শতেক দূর

আগে আসুক রাজা,

তবে দিব ফুল।

ফুলগুলির কথা শুনিয়া মালী তো একাবারে অবাক! সে রাজাকে গিয়া সকল কথা বলিল। রাজা আশ্চর্য হইয়া নিজেই ফুল তুলিতে আসিলেন কিন্তু যেই হাত বাড়াইয়াছেন, অমনি শুনিতে পাইলেন

পারুল। সাত ভাই চম্পা জাগো রে!

চাঁপা! কেন বোন পারুল ডাকো রে!

পারুল। রাজা নিজে এসেছে,

ফুল দিবে কি না দিবে?

চাঁপা। না দিব না দিব ফুল, উঠিব শতেক দূর

আগে আসুক বড়োরানি, তবে দিব ফুল।

রাজা ফিরিয়া গিয়া, বড়োরানিকে পাঠাইয়া দিলেন। কিন্তু বড়োরানিও ফুল পাইল না ক্রমে অন্য পাঁচ রানিরও সেই দশা হইল। ফুলেরা বলিল

আগে আসুক রাজার ঘুঁটে-কুড়ানি দাসী,

তবে দিব ফুল।

তখন রাজার হুকুমে ঘুঁটে-কুড়ানি দাসী আসিয়া উপস্থিত হইলেন। সুয়োরানি হাত বাড়াইতেই, ফুলগুলি সুন্দর সাতটি ছেলে ও একটি মেয়ের বেশ ধরিয়া তাঁহার কোলে ঝাঁপাইয়া পড়িল।

ব্যাপার দেখিয়া সকলে অবাক। রাজা শিশুগুলিকে কাছে ডাকিয়া, তাহাদের পরিচয় জিজ্ঞাসা করিলেন। তখন তাহারা একবাক্যে বলিল, ‘আমরা তোমার ছেলে-মেয়ে সুয়োরানি আমাদের মা। তুমি যখন মৃগয়া করতে যাও, তখন আমরা ভূমিষ্ঠ হই। কিন্তু মায়ের উপর হিংসে করে তোমার অন্য ছয় রানি আমাদিগকে পাঁশগাদায় পুতে রেখেছিলেন। আমরা সেখানে চাঁপা ও পারুল গাছে ফুল হয়ে ফুটেছিলাম।

শিশুগুলির কথা শুনিয়া চোখের জলে রাজার বুক ভাসিতে লাগিল। এমন সোনার চাঁদ ছেলে-মেয়ে থাকিতে এতদিন কী কষ্টেই না তাঁহার দিন কাটিয়াছে! আর দুঃখিনী সুয়োরানিকে কী ভয়ানক যন্ত্রনাই না সহ্য করিতে হইয়াছে! ভাবিতে ভাবিতে ক্রমে তিনি আগুন হইয়া উঠিলেন! তখন ছয় রানির কাঁপুনি যদি দেখিতে! রাজা তাহাদিগকে ‘হেঁটে কাঁটা––উপরে কাঁটা’ দিয়া পুঁতিয়া ফেলিতে আজ্ঞা দিলেন। তারপর সুয়োরানিকে লইয়া সুখে স্বচ্ছন্দে ঘরকন্না করিতে লাগিলেন।

আমার কথাটি ফুরোল

নটে গাছটি মুড়োল–– ইত্যাদি।

ভূতের গল্প

আমাদের বাড়ির পশ্চিম দিকে মস্ত একটা দিঘি। তাহার চারি পাড়ে বড়ো বড়ো অশথ, বট, তাল ও তেঁতুল গাছ মাথা উঁচু করিয়া রহিয়াছে। ইহাদের মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের তেঁতুল গাছটার মতো অত বড়ো গাছ আমি আর কোথাও দেখি নাই। উহা যেমন উঁচু তেমনি ঝাঁকড়া! লোকে বলে গাছ নয়––যেন ভূতের বৈঠকখানা! প্রতি রাত্রে আশপাশের চারিদিক হইতে দলে দলে ভূত আসিয়া উহাতে জড়ো হয় এবং নাচ-গান, আমোদ-আহ্লাদে সারারাত কাটাইয়া ভোরের বেলায় যে যাহার বাসায় ফিরিয়া যায়। মানুষের মধ্যে যেমন ভালো মন্দ দুই-ই আছে, তেমনই ভূতেদের মধ্যেও যে ভালো ভূত নাই, এমন নহে। তবে কিনা, আমাদের সেই তেঁতুল গাছের অধিকাংশ ভূতই মন্দ। তাহাদের এক-একটা আবার এমন বেয়াড়া যে, মানুষ দেখিলেই তাহার ঘাড় না ভাঙিয়া ছাড়ে না। যদি কেহ সহজে সেই গাছতলায় আসিতে না চায়, তবে তাহাকে নানা রকমে ভুলাইয়া সেখানে আনিতে চেষ্টা করে কখনো কখনো পরিষ্কার কাপড় পরিয়া, দিঘির দুই পাড়ের দুইটা গাছের উপর পা রাখিয়া মানুষের জন্য অপেক্ষা করিতে থাকে। ভূতেরা অন্ধকারে থাকিতে বড়ো ভালোবাসে। সেইজন্য অন্ধকার রাত্রিতে সেই তেঁতুল গাছে ভূতের বাজার বসে বলিলেই হয়! বিশেষত কালীপূজার রাত্রিতে তাহাদের উপদ্রব ভয়ানক বাড়িয়া যায়। তখন খুব সাহসী লোকেও গাছটার ত্রিসীমায় ঘেঁষিতে চায় না। একবার গ্রামের একটা দুষ্ট ছেলে নাকি কালীপূজার দিন দুপুরবেলা তেঁতুল পাড়িতে গিয়া ভূতের হাতে মারা পড়িয়াছিল। ছেলেবেলা হইতে এই সকল গল্প শুনিতে শুনিতে আমার মনে এমন একটা ভয় দাঁড়াইয়া গিয়াছে, যে, এখনও, এমনকী দিনের বেলাতেও সেই গাছের নিকট দিয়া যাইতে হইলে, ভয়ে বুক ধড়ফড় করিতে থাকে।

আমাদের গ্রামে অতুল নামে একটি ছেলে ছিল। ভূতের কথা উঠিলেই সে হাসিয়া উড়াইয়া দিত বলিত, ‘ও সব গাঁজাখুরি!’ গণেশ ও গোপাল নামে তাহার দুই বন্ধু ছিল। তাহারা কিন্তু প্রাণ গেলেও সেই গাছটার দিতে যাইতে চাহিত না। এই তিন বন্ধুর মধ্যে ভূতের কথা লইয়া প্রায়ই মহা তর্ক উপস্থিত হইল। অতুলের সহিত এ বিষয়ে তর্ক করা বৃথা জানিয়াও গণেশ ও গোপাল কতবার তিন-চারি ঘণ্টা ধরিয়া তর্ক করিয়াছে, কতবার বিশেষ বিশেষ প্রমাণও দিয়াছে, কিন্তু কিছুতেই অতুলকে ভূতের অস্তিত্বে বিশ্বাস করাইতে পারে নাই। একদিন এইরূপ তর্ক করিতে করিতে অতুল বলিল, ‘আচ্ছা, কালীপূজা তো আসছে, এই সুযোগে ভূতের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়ো। যদি সত্যি সত্যি ভূত দেখাতে পার, আমি পঞ্চাশ টাকা দেব, কিন্তু যদি না পার, তবে তিন সত্যি করো যে, আর কখনো ভূতের কথা নিয়ে মিছামিছি তর্ক করবে না।’

অতুলের কথা শুনিয়া গণেশ বলিল, ‘বেশ কথা, এবার নিশ্চয়ই তোমাকে ভূত দেখাব! তখন মজা টের পাবে!’ গোপাল বলিল, ‘আমি কিন্তু ভাই আগেই বলে রাখছি, যদি কোনো বিপদ-আপদ ঘটে, তখন আমাকে দোষী করতে পারবে না!’

অতুল। তোমাদের কোনো ভয় নেই! আমার দোনলা বন্দুক ও তলোয়ারখানা সঙ্গে রাখব। তারপর বুঝব, ভূতের কেমন সাহস!

পরদিন গ্রামময় রাষ্ট্র হইল যে, দত্তদের অতুল কালীপূজার রাত্রিতে একাকী সেই তেঁতুলতলায় যাইবে। শুনিয়া কেহ কেহ বিশ্বাস করিল না, কেহ কেহ বা তাহাকে এমন ভয়ংকর কার্য হইতে থামাইবার জন্য চেষ্টা করিতে লাগিল। কিন্তু অতুল বেজায় একগুঁয়ে। সে মনে মনে যাহা করিবে বলিয়া স্থির করে কাহারো সাধ্য নাই যে, তাহাকে বাধা দেয়। অবশেষে কালীপূজার রাত্রি আসিল। অতুল, গণেশ ও গোপালকে সঙ্গে লইয়া রাত্রি সাড়ে এগারোটার সময় সেই তেঁতুলতলায় উপস্থিত হইল! কী ভয়ানক সে স্থান! আর কী অন্ধকার! চারিদিক এমন নিস্তব্ধ যে, নিজের শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দেই শিহরিয়া উঠিতে হয়! ধন্য অতুলের সাহস! বন্ধু দুইটিকে বাড়ি পাঠাইয়া দিয়া, সে একবার ভালো করিয়া বন্দুক ও তলোয়ারখানি পরীক্ষা করিল তারপর ধীরে ধীরে গাছতলায় পায়চারি করিতে লাগিল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা এইভাবে কাটিল, তথাপি ভূতের দেখাসাক্ষাৎ নাই।

তারপর রাত যখন আন্দাজ তিনটা সেই সময় হঠাৎ তাহার মনে হইল, কে যেন ডালের উপর বসিয়া রহিয়াছে! তখন অন্ধকার অনেকটা কমিয়া আসিয়াছিল। অতুল স্পষ্টই দেখিল, সাদা ধবধবে কাপড় পরা একটা মূর্তি। অন্য কেহ হইলে সেই ভীষণ দৃশ্য দেখিবামাত্র অজ্ঞান হইয়া পড়িত, কিন্তু ভয় কাহাকে বলে, অতুল তাহা জানিত না সে গম্ভীরভাবে জিজ্ঞাসা করিল, ‘কে ওখানে? শিগগির বল, তা না হলে এখনি গুলি ছুড়ব।’ অতুলের কথায় ভয় পাওয়া দূরে থাক, বোধ হইল যেন, মূর্তিটা ক্রমশই নামিয়া আসিতেছে। তখন বন্দুক উঠাইয়া অতুল গুলি ছুঁড়িল কিন্তু তাহাতেও ভ্রূক্ষেপ না করিয়া সেই মূর্তি আরও খানিক নামিয়া আসিল। অতুল আবার গুলি ছুঁড়িল, তথাপি কিছুই হইল না। মূর্তিটা নামিতে নামিতে শেষে একটা নিচু ডালে আসিয়া বসিল। ক্রমাণ্বয়ে দুইটি গুলি ব্যর্থ হইতে দেখিয়া অতুল বিশেষ আশ্চর্য হইয়াছিল, তাই রাগের বসে তলোয়ার উঠাইয়া, সজোর আঘাত করিল। হায় হায়! কী সর্বনাশ! আঘাত করিবামাত্র সেই মূর্তি চিৎকার করিয়া মাটিতে লুটাইয়া পড়িল! অতুল ছুটিয়া আসিয়া দেখিল, আহত লোকটি তাহার প্রিয়বন্ধু গণেশ! অতুল তাড়াতাড়ি ক্ষতস্থান চাপিয়া রক্ত থামাইতে চেষ্টা করিল, কিন্তু তাহাতে বিশেষ কোনো ফল হইল না।

অতুলকে গাছতলায় রাখিয়া গণেশ ও গোপাল বাড়ির দিকে গিয়াছিল। কিন্তু আসলে বাড়িতে না গিয়া, তাহার অন্য দিক দিয়া আবার সে স্থানেই ফিরিয়া আসিয়াছিল। আগেই তাহারা লুকাইয়া বন্দুকে গুলির বদলে কতকগুলি কাগজ ভরিয়া রাখিয়াছিল। তাই গণেশ গাছের উপর উঠিয়া ভূত সাজিয়া কৌতুক করিতে ভয় পায় নাই। তাহারা মনে করিয়াছিল, পরে পরে দুইটি গুলি ব্যর্থ হইতে দেখিলে, অতুল নিশ্চয়ই পলায়ন করিবে। কিন্তু সে যে সত্য সত্যই তলোয়ার খুলিয়া তাহাদিগকে আক্রমণ করিতে পারে, একথা কেহ মুহূর্তের জন্যও ভাবে নাই! তাই গণেশের আজ এই দশা!

অতুল যেরূপ জোরে আঘাত করিয়াছিল, তাহাতে গণেশের দুই টুকরা হইবারই কথা, কিন্তু তাহার কপালগুণে তলোয়ার গাছের একটা ডালে আটকাইয়া যায়, তাই আঘাত তেমন সাংঘাতিক হইতে পারে নাই! যথা সময়ে ডাক্তার আসিয়া ক্ষতস্থানে পরীক্ষা করিলেন। তাঁহার আশ্বাসবাক্যে অতুল ও গোপালের উৎকণ্ঠা অনেকটা কমিয়া গেল। তাহারা প্রাণপণ যত্নে বন্ধুর সেবা-শুশ্রূষা করিতে লাগিল। কিছুদিন দারুণ যন্ত্রণা ভোগ করিয়া শেষে গণেশ সম্পূর্ণরূপে আরোগ্য লাভ করিল।

আশ্চর্য পরিত্রাণ

আমাদের দেশের গারো, আকা, কোল, ভিল, সাঁওতাল প্রভৃতির ন্যায় আমেরিকাতেও কতকগুলি আদিম জাতি আছে, ইংরেজিতে তাহাদিগকে ‘রেড ইন্ডিয়ান’ বলে। তাহাদের কোনো কোনো দল বেশ শান্ত রীতিমতো ঘরবাড়ি বাঁধিয়া বাস করে এবং চাষ-আবাদ করিয়া সংসার চালায়। কিন্তু আর কয়েকটি দল আছে, লুটপাটই তাহাদের ব্যাবসা! কাহাকেও সম্মুখে পাইলে––বিশেষত শ্বেতকায় ইংরেজ প্রভৃতিকে পাইলে, তাহাদের অত্যাচারের মাত্রা খুব বাড়িয়া উঠে এবং যতক্ষণ না তাহাদিগকে প্রাণে মারিতে পারে, ততক্ষণ কিছুতেই নিরস্ত হয় না। তাহাদের গল্প পড়িতে পড়িতে শরীর রোমাঞ্চিত হইয়া উঠে!

এক সময়ে ‘রক’ নামে এক ইংরেজ-পরিবার ব্যাবসা উপলক্ষে আমেরিকার জঙ্গলে গিয়া বসবাস করে। তাহারা সংখ্যায় চারিজন মাত্র।––বৃদ্ধ রক, তাহার স্ত্রী, এক পুত্র ও কন্যা। সকলেই বেশ সাহসী ও শিকারি এমনকী, বৃদ্ধ রকের কন্যা মেরিও হরিণ প্রভৃতি মারিতে পারিত।

ক্রমে ‘স্নো’ নামে আর একটি ইংরেজ যুবকও সেই স্থানে গিয়া বাস করিল। স্নো-এর সহিত রক-পরিবারের পূর্বে পরিচয় ছিল না কিন্তু অসহায় সম্পদহীন সেই নির্জন স্থানে বাস করিতে করিতে শীঘ্রই তাহাদের মধ্যে বেশ ঘনিষ্ঠতা জন্মিল।

যুবক রক, মেরি ও স্নো শিকারের চেষ্টায় প্রায়ই বনে বনে ঘুরিয়া বেড়াইত। কখনো কখনো গভীর জঙ্গলে প্রবেশ করিয়া ভালুক শিকার করিতেও ভয় পাইত না। ক্রমে তাহাদের উৎসাহ খুব বাড়িয়া গেল। সুদূর প্রান্তরে বাইসন শিকার করিবার জন্য একদিন তাহারা ঘোড়ায় চড়িয়া বাহির হইল। সমস্ত দিন চলিয়া সন্ধ্যার পূর্বে একস্থানে নামিয়া তিনজনে গাছপালার সাহায্যে একটা কুঁড়ের মতো প্রস্তুত করিল এবং আহারাদি শেষ করিয়া সেইখানেই রাত কাটাইল। পরদিন ভোরে উঠিয়া আবার চলিতে আরম্ভ করিল এবং সন্ধ্যার পূর্বে রাত্রিবাসের উপযোগী বন্দোবস্ত করিয়া লইল। এইভাবে তাহারা সমস্তদিন ঘোড়া ছুটাইয়া অগ্রসর হইত মাঝে মাঝে নামিয়া প্রয়োজনমতো কিছু শিকার করিয়া লইত এবং রাত্রিতে কোনো এক স্থানে বিশ্রাম করিত।

আট-দশ দিন এইভাবে কাটিয়া গেল। তারপর একদিন সন্ধ্যাকালে ক্লান্তদেহে তাহারা আশ্রয়ের সন্ধান করিতেছে, এমন সময় কিছু দূরে––জঙ্গলের মধ্যে একটা অগ্নিকুণ্ড দেখিতে পাইল। হঠাৎ আগুন দেখিয়া সকলেই খুব আশ্চর্য হইয়া গেল। রেড ইন্ডিয়ানদের স্বভাব-প্রকৃতি সম্বন্ধে স্নো-এর যথেষ্ট অভিজ্ঞতা ছিল। তাহার ভয় হইল, হয়তো সেই দস্যুরাই আগুন জ্বালিয়া ওখানে অপেক্ষা করিতেছে। যাহা হউক, খবর লওয়া দরকার, এই ভাবিয়া সে বলিল, ‘রক ব্যাপার তেমন সুবিধা মনে হছে না। আগুনের সামনে ছায়ার মতো ওই যে কী সব নড়ছে আমার বোধ হয়, ওরা রেড ইন্ডিয়ান। যদি তাই হয় আমাদের সাবধান হওয়া দরকার। তুমি মেরিকে নিয়ে ফিরে যাও। কিছুদূর গিয়ে আমার জন্যে অপেক্ষা করো। আমি ওদের খবর নিয়ে আসি।’

এই বলিয়া স্নো আগুন লক্ষ্য করিয়া চলিল। প্রায় একঘণ্টাকাল অতি সন্তর্পণে চলিয়া, সন্ধ্যার কিছু পরে সে সেই অগ্নিকুণ্ডের নিকট উপস্থিত হইল। তারপর গাছের আড়াল হইতে মাথা উঁচু করিয়া যাহা দেখিল, তাহাতে তাহার আপাদমস্তক শিহরিয়া উঠিল! দেখিল, প্রায় এক শত রেড ইন্ডিয়ান তাহাদের ভীষণ রণসাজে সজ্জিত হইয়া সেই অগ্নিকুণ্ড ঘিরিয়া রহিয়াছে। তাহাদের মধ্যে কয়েকজন ঘুমাইয়া পড়িয়াছে, কয়েকজন ধূমপান করিতেছে আর কয়েকজন বসিয়া পাহারা দিতেছে। পাশেই একটা মস্ত গাছ। প্রায় এক শত তীক্ষ্ণ বর্শা সেই গাছের চারিদিকে সাজানো রহিয়াছে।

এই ব্যাপার দেখিয়া স্নো ফিরিয়া আসিবার উপক্রম করিতেছে, এমন সময়, কয়েকজন চর সর্দারের নিকট গিয়া বলিল, ‘সাহেবরা মোটে তিনজন––দুটি পুরুষ, একটি মেয়ে। তিন জনের হাতেই বন্দুক আছে। কিন্তু তা যেরূপ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, তাতে মনে হয় না যে, রাতারাতি বেশি দূর যেতে পারবে।’

সর্দার। কাল ভোরেই সকলকে ধরতে হবে।

চর। সে তো নিশ্চয়ই।

ইন্ডিয়ানদের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে স্নো-এর মনে এতক্ষণ যে সন্দেহ হইতেছিল, তাহাদের কথাবার্তা শুনিয়া তাহা আরও সুদৃঢ় হইল। আর অপেক্ষা না করিয়া স্নো ধীরে ধীরে সেই স্থান হইতে ফিরিল। কিছু দূর আসিয়াই দেখিল, রক ও মেরি এক জায়গায় আগুন জ্বালিয়া বসিয়া রহিয়াছে। আর ঘোড়াগুলি তাহাদের পাশে চরিয়া বেড়াইতেছে। তাহাদিগকে দেখিয়া স্নো বলিল, ‘আরও কাঠ দাও, আগুন যেন না নিবে––মহা বিপদ উপস্থিত!’ এই বলিয়া সে ইন্ডিয়ানদের আকার-প্রকার কথাবার্তা ইত্যাদি সকল বিষয় তাহাদিগকে জানাইল। ভয়ে রক ও মেরির মুখে কথাটি নাই! স্নো বলিল, ‘ভয় পেলে চলবে না। বাঁচবার উপায় আমাদেরই হাতে। রাতারাতি পালাতে হবে।’

ইহার পর তিনজনে কিছু আহার করিয়া শয়ন করিল, কিন্তু ঘুমের সুখ তাহাদের ভাগ্যে ছিল না! এরূপ উৎকণ্ঠার মধ্যে ঘুম আসিবে কেন? কোনোরকমে কয়েক ঘণ্টা কাটাইয়া, শেষরাত্রে তাহারা চুপিচুপি বাহির হইয়া পড়িল কিন্তু প্রভাত হইতে না হইতেই বুঝিতে পারিল যে, ভুল করিয়া বাড়ির দিকে না গিয়া, তাহারা আরও দূরে আসিয়া পড়িয়াছে! তখন তাড়াতাড়ি ঘোড়ার মুখ ফিরাইয়া আবার বাড়ির পথ ধরিল। সম্মুখে ঘাসে ভরা প্রকাণ্ড এক মাঠ, উহার একদিক ধুধু করিয়া জ্বলিতেছিল। তাহারা সেই অগ্নিরাশি বাঁ দিকে রাখিয়া মাঠের অন্য দিকে ঘোড়া ছুটাইয়া দিল। তারপর সবেমাত্র দুই-তিন মাইল অগ্রসর হইয়াছে, এমন সময় স্নো চিৎকার করিয়া বলিল, ‘তাড়াতাড়ি ঘোড়া ছুটাও। ইন্ডিয়ানরা এসে পড়েছে।’

ঠিক সেই সময়ে তাহারা বিকট চিৎকারধ্বনি শুনিতে পাইল সে যে কী ভিষণ, তাহা না শুনিলে কিছুতেই অনুভব করা যায় না। তখন অসম সাহসে বুক বাঁধিয়া, তিনজনে উত্তেজিতভাবে ঘোড়া ছুটাইয়া দিল।

কিন্তু ক্রমান্বয়ে চারি ঘণ্টা গিয়াও তাহারা নিস্কৃতি পাইল না। সম্মুখে আবার সেই ভীষণ দাবানল। উহা শিখা বিস্তার করিয়া তাহাদের পথ রোধ করিতেছিল। পাশ কাটাইয়া পলাইবারও উপায় ছিল না। বামে প্রবল নদী, দক্ষিণে এক মাঠ। সেই মাঠে কতকগুলি বন্য অশ্ব চরিতেছিল। স্নো জানিত, এক শ্রেণির ইন্ডিয়ান এইরূপ বন্য অশ্বর আড়ালে লুকাইয়া থাকিয়া প্রবল শত্রুর গোলাগুলি হইতে আত্মরক্ষা করে এবং সুযোগ মতো দুর্বলের উপর তাহাদের পড়িয়া সর্বনাশ করে। তাহার ভয় হইল, হয়তো বা তাহারা সেইরূপ একদল নূতন শত্রুর কাছে আসিয়া পড়িয়াছে! সুতরাং সেই দিকে অগ্রসর হইতে সাহস করিল না।

এইরূপে চারিদিক হইতে বাধা পাইয়া স্নো বলিল, ‘পালাবার সব পথই বন্ধ। সামনে আগুন, বাঁয়ে নদী, ডাইনে শত্রু। ওদিকে পিছন হতে যারা তাড়া করেছে, তারাও এসে পড়ল। এখন আমাদের এমন একটা কাজ করতে হবে, যা ভাবতেও বুক কেঁপে উঠে। এই আগুন টপকে পালানো ছাড়া আর রক্ষে নেই। ঘোড়াগুলো ভয় পাবে সত্য, কিন্তু উপায় কী?’

রক ও মেরি স্নো-এর কথা শুনিয়া শিহরিয়া উঠিল, কিন্তু তাহাদিগকে ভাবিবার সময় না দিয়া সে আবার বলিল, ‘এদের হাতে পড়লে মৃত্যু নিশ্চিত। এরা যেরকম নিষ্ঠুরভাবে যাতনা দেয়, আগুনের যাতনা তার চেয়ে অনেক কম।’ স্নো-এর কথা শেষ না হইতেই, তাহারা দেখিতে পাইল, সেই বন্য অশ্বগুলি দল বাঁধিয়া ছুটিয়া আসিতেছে। প্রত্যেকটির পিঠে এক-একজন ইন্ডিয়ান! আর ঠিক সেই সময় গত রাত্রের বর্শাধারী দস্যুরাও, শিকার পলায় দেখিয়া, প্রাণপণে তাড়া করিয়া আসিল! বিপন্নের সহায় ভগবান। ঈশ্বরের নাম জপ করিতে করিতে তাহারা সেই ভয়ানক অগ্নিরাশির মধ্যে প্রবেশ করিল! ধোঁয়ায় চারিদিক অন্ধকার! তিনজনের শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হইবার উপক্রম। শরীর দগ্ধ হইতে লাগিল তথাপি তাহারা প্রাণের মায়া ছাড়িতে পারিল না।

প্রায় এক ঘণ্টা পরে যখন নিরাপদ স্থানে পৌঁছোল, তখন তাহাদের অবস্থা অতি শোচনীয়। যাহা হউক, কোনো গতিকে তাহারা রক্ষা পাইল বটে, কিন্তু তিনটি ঘোড়ার মধ্যে দুইটি তখনই প্রাণত্যাগ করিল, আর একটি মাটিতে লুটাইয়া যন্ত্রণায় ছটফট করিতে লাগিল। ব্যাপার দেখিয়া ইন্ডিয়ানরা স্তম্ভিত হইয়া গেল। এমন বীরত্ব তাহারা আর কখনো দেখে নাই!

আসল ঘুঘু

ন-পাড়ার গোয়ালাদের মধ্যে বংশীর বেশ একটু সুনাম আছে। গ্রামে জমিদার, বড়োলোক সকলেই তাহার খদ্দের কাজকর্মে সে-ই সকলকে দই, দুধ, ছানা, মাখন জোগায় এবং তাহাতে তাহার বেশ দু-পয়সা রোজগার হয়। খুব ধনী না হইলেও বংশীর দিন বেশ সুখেই কাটে।

বাড়িতে বংশী, তাহার স্ত্রী ও এক ছেলে––এই তিনটি লোক। ছেলেটি আকাট মূর্খ––বংশীর সুখের মধ্যে এই যা একটা মহাদুঃখ!

একদিন বংশীকে কোনো কাজে দিন কয়েকের জন্য দূরে অন্য গ্রামে যাইতে হইল। যাইবার সময় সে ছেলেকে ডাকিয়া বলিল, ‘দেখ হাবলা, খদ্দের এলে এই তিনটে গোরু বেচে ফেলিস। দেখিস, একশো টাকার কমে কিন্তু ছাড়িসনে। আর নেহাত যদি নগদ টাকা না পাস, তবে কিছু বাঁধা রেখে গোরু দিবি। বুঝলি তো?’ ছেলে বলিল, ‘তুমি যাও বাবা, আমাকে আর অত করে বলতে হবে না।’ বংশী বলিল, ‘তা তো বটেই। তোর যদি অতটুকু আক্কেল থাকত, তবে তো ভাবনাই ছিল না। যাহোক, আমি যেমনটি বললাম, ঠিক তাই করবি। তা না হলে ফিরে এসে এই লাঠি দিয়ে তোর পিঠের চামড়া তুলে ফেলব! মনে থাকে যেন।’

বংশী চলিয়া যাইবার পরদিনই এক ব্যাপারী আসিয়া উপস্থিত! গাই তিনটির দাম জিজ্ঞাসা করায়, বংশীর ছেলে বলিল, ‘এগুলি পালের সেরা গাই, দুশো টাকার কমে বেচব না।’ যাইা হউক, অনেক দর কষাকষির পরে শেষে দেড়শো টাকাই দাম ঠিক হইল। কিন্তু টাকা দেবার সময় ট্যাঁকে হাত দিয়াই ব্যাপারী এতখানি জিব বাহির করিয়া বলিল, ‘দেখো ভাই, একটা বড়োই বেয়াকুবি করে ফেলেছি। তাড়াতাড়িতে টাকার থলি আনতে ভুলে গেছি। এখন উপায়?’

বংশীর ছেলে বলিল, ‘তুমি তো খুব মজার লোক! শুধু হাতে গাই কিনতে এসেছ! আমাকে এতটা বোকা ভেব না যে, অজানা লোককে তিন-তিনটে গাই অমনি ছেড়ে দেব।’

ব্যাপারী বলিল, ‘আরে না না, তা আমি বলব কেন? আমি ভাবছি কী যে, কাজটা বড়োই অন্যায় হয়েছে! বাড়ি যদি কাছে হত, ক্ষতি ছিল না, এখনই ছুটে গিয়ে টাকা এনে দিতাম কিন্তু সে এতদূর যে, এখন গিয়ে আজই আবার ফিরে আসা অসম্ভব। অথচ দুটি গাই আজ না হলেই নয়––বড্ড দরকার। তা তুমি এক কাজ করো না কেন––আমি তো তিনটে গাই-ই কিনেছি, ওর মধ্যে যেটা তোমার পছন্দ হয়, বাঁধা রেখে বাকি দুটো ছেড়ে দাও। সব টাকা চুকিয়ে দিয়ে পরে ওটা নিয়ে যাব!’

বুদ্ধিমান ছেলেটি ভাবিল, ‘কথাটা মন্দ কী! আর কিছু বাঁধা রেখে গাই ছেড়ে দিতে বাবাও তো বলে গেছেন।’ এই ভাবিয়া সে সকলের ছোটো গাইটা বন্ধক রাখিয়া ব্যাপারীকে অন্য দুইটি লইয়া যাইতে দিল।

তিনদিন পরে বংশী বাড়ি ফিরিল বাড়িতে পা দিয়াই ছেলেকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিল, ‘কী রে হাবলা, গাই বেচতে পারলি?’ ছেলে খুব উৎসাহের সহিত বলিল, ‘পারব না কেন?’ হুঁ, তুমি তো ভারী দাম বলে গিয়েছিলে! আমি ঠিক তার দেড়্গুণ আদায় করেছি! তবু বলো আমার আক্কেল নেই।’

বংশী একটু অবাক হইয়া বলিল, ‘বলিস কী রে? দু-দিনেই তোর বুদ্ধি এমন পেকে উঠল! টাকাগুলো গুণে বাজিয়ে নিয়েছিলি তো?’

ছেলে। সেজন্য ভাবনা কী! ব্যাপারী ভুলে টাকার থলি বাড়ি ফেলে এসেছিল। তা আমি কিছু বাঁধা না রেখে গোরু ছাড়িনি। যখন টাকা নিয়ে আসবে একটি একটি করে বাজিয়ে নেব।

বংশী। কী বাঁধা রেখে গিয়েছে, আন তো দেখি?

ছেলে। ওই যে, আমাদের ওই ছোটো কালো গাইটা। দেড়শো টাকা কড়ায়গণ্ডায় চুকিয়ে দিয়ে তবে সে ওসব নিয়ে যাবে। আমাকে বোকা বলো, আমি কি কম বুদ্ধি খেলেছি? সবচেয়ে ছোটো গাইটা বাঁধা রেখেছি। ওটা খাবে কম।

ছেলের বুদ্ধির দৌড় দেখিয়া বংশীর যা রাগ হইল তা বলিবার নয়! তাহার শরীর থরথর করিয়া কাঁপিতে লাগিল। তারপর ছেলের পিঠে লাঠি পড় পড়, এমন সময় হঠাৎ কী মনে হইল তাড়াতাড়ি আপনাকে সামলাইয়া লইয়া বংশী বলিল, ‘হতভাগা, তোকে বলদ পেয়ে লোকে যে এমন করে ঠকাবে, তা আমি ভাবিনি। যাক––এই আমি চললাম আমার যা লোকসান হয়েছে, তার পাঁচগুণ আদায় করে তবে ফিরব। তা যদি না পারি, তবে বাড়ি ফিরে এসে তোকে আর আস্ত রাখব না!’

রাগে ও দুঃখে বংশী তখন জ্ঞানশূন্য বলিলেই হয়। আর এক মুহূর্তও সেখানে না দাঁড়াইয়া, কপালের ঘাম মুছিতে মুছিতে সে বাহির হইয়া পড়িল।

বংশী হনহন করিয়া চলিয়াছে। পাঁচ-সাতটা গ্রাম পার হইতেই বেলা অনেক বাড়িয়া গেল এবং তাহার রাগও ক্রমে পড়িয়া আসিল। এতক্ষণ ক্ষুধা-তৃষ্ণার কথা তাহার মনেই ছিল না। সহসা পেটের জ্বালায় সে অস্থির হইয়া উঠিল।

কিন্তু উপায় কী! সেই অজানা, অচেনা স্থানে কে তাহাকে খাইতে দিবে? সে আশা বৃথা জানিয়া––বংশী ফলপাকড়ের সন্ধান করিতে লাগিল।

তখন জ্যৈষ্ঠ মাস। রাস্তার ঠিক পাশেই কয়েকটা গাছে আম ও জাম পাকিয়াছিল। তাহার একটাতে চড়িয়া বংশী পেটের জ্বালা নিবৃত্তি করিল! তারপর সে সেই গাছের উপরেই বিশ্রাম করিতেছে এমন সময় রাস্তা দিয়া ক্যাঁচোড়-ম্যাচোড় শব্দ করিতে করিতে ময়লা কাপড়ের বোঝা লইয়া একখানা গোরুর গাড়ি আসিতে দেখিল। গাড়ির ঠিক মাঝখানে একটি স্ত্রীলোক আকাশের পথে হাঁ করিয়া তাকাইয়াছিল। স্ত্রীলোকটির মুখ দেখিয়াই বংশী বুঝিতে পারিল, তাহার মাথায় কিছু গোল আছে।

গাড়িখানা ক্রমে যেই গাছের নীচে আসিয়াছে, অমনি বংশীর মাথায় কী এক খেয়াল চাপিল––কথা নাই, বার্তা নাই এক লাফে ঠিক তাহার উপরে। ইহাতে স্ত্রীলোকটি শুধু যে একটু চমকিয়া উঠিল, তাহা নহে, পরমুহূর্তেই চক্ষু লাল করিয়া, দাঁত-মুখ খিঁচাইয়া সে মনের ঝাল মিটাইতে লাগিল––‘হতভাগা, পাজি, বেয়াদব! তুই কোথাকার বেল্লিক রে! মরতে আর জায়গা পেলিনে! আর মর পোড়ারমুখো মিনসে দাঁড়িয়ে আবার হাসছে! ঘরের কাছে পেতাম তো ঝেঁটিয়ে বিষঝাড়া করে দিতাম––!’

একটু-আধটু গালাগালির জন্য বংশী প্রস্তুতই ছিল, কিন্তু স্ত্রীলোকটি যে এত বাড়াবাড়ি করিবে, ইহা সে কল্পনাও করে নাই! যাহা হউক, গালাগালি হইতে পাছে হাতাহাতি শুরু হয়, এই ভয়ে বংশী নিতান্ত করুণ স্বরে বলিল, ‘আরে মিছে কেন গাল দিচ্ছ? আমি কি আর ইচ্ছে করে পড়েছি। স্বর্গ থেকে নেমে আসছিলাম, হঠাৎ সিঁড়িতে পা পিছলে পড় তো পড় একেবারে তোমার গাড়ির ওপরে।’

স্বর্গের কথা শুনিয়া স্ত্রীলোকটি হঠাৎ যেন থতমত খাইয়া গেল। বলিল, ‘তা বাছা, তুমি কিছু মনে কোরো না। আমি না জেনে গালমন্দ দিয়েছি! আচ্ছা, তুমি যে স্বর্গ থেকে আসছ, আমার স্বামীর কোনো সংবাদ রাখো কি? আজ তিন বছর হল তিনি স্বর্গে গেছেন! তারপর তার আর কোনো খবর পাইনি।’

বংশী। তোমার স্বামীর নামটি কী বলো দেখি।

স্ত্রীলোক। তাঁর নাম––ওই যে কী বলে ‘ফাশী’। তিনি রাজবাড়ির কাপড় কাচতেন।

বংশী। ‘ফাশী’?––সে আবার কী? ওঃ বুঝেছি––কাশী, কাশী ধোপা। তাকে আর চিনি না? রোজই তো তার সঙ্গে দেখা হয়! স্বর্গে যে তার ভারী নাম! সেখানে যত শৌখিন দেবতা আছেন, কাশীর কাচা কাপড় না হলে তাঁদের চলে না। কাপড় ইস্তিরি করা, গিলে করা সবতাতেই কাশী ওস্তাদ। দেবরাজ ইন্দ্রের খাস ধোপাই হচ্ছে কাশী। তবে কথা কী জান, দেবতারা শুধু নিজেদের সুখ নিয়ে ব্যস্ত। তোমার স্বামীর দিকে একবার ভুলেও তাকান না। আহা! বেচারাকে সারাদিনই মোট বয়ে হয়রান হতে হয়। একটু যে ভালো খাবে, ভালো পরবে তার জো-টি নেই। বিশেষ, তার জামাকাপড়ের দশা দেখলে চোখে জল আসে। একেবারে ছেঁড়া কুটিকুটি। স্বর্গে তো আর দর্জি নেই যে, সেগুলো সেলাই করিয়ে নেবে।

বংশীর কথা শুনিয়া ধোপানি কাঁদো কাঁদো স্বরে বলিল, ‘ঘরে তার এত জামাকাপড় পড়ে রয়েছে, আর তিনি কিনা ছেঁড়া কাপড়ে দিন কাটাচ্ছেন? হায় রে হায়, এসব কথা আমি কি জানি? আর জানলেই বা স্বর্গে কাপড় পাঠাতাম কী করে? যাহোক, বাছা, তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে ভালোই হয়েছে। আমার বাড়ি কাছেই, তুমি একটু সবুর করো, আমি এখনই ছুটে গিয়ে তাঁর জামাকাপড় নিয়ে আসছি। তুমি দয়া করে সেগুলো নিয়ে তাঁকে দিয়ো।’

বংশী। আরে রাম রাম! তা কি হয়? কাপড় জামা নিয়ে কি সেখানে ঢুকবার জো আছে? দরজায় যে কড়াকর পাহারা, কাপড় নিয়ে যেতে দেখলে আমাকেসুদ্ধ ধাক্কা মেরে ফেলে দেবে।

ধোপানি। তবে উপায়। আচ্ছা লুকিয়ে কিছু টাকাকড়ি নিয়ে যেতে পারবে তো? অনেক কষ্টে আমি কিছু জমিয়েছি, সেগুলি এনে দিচ্ছি। তুমি যদি দয়া করে সেগুলি নিয়ে আমার স্বামীর হাতে দাও, তাহলে তাঁর খাওয়া-পরার কোনোই কষ্ট থাকবে না। স্বর্গের বাজার থেকে নিজেই পছন্দমতো কিনে নিতে পারবেন।

এ কথায় বংশী বলিল, ‘তা বরং চেষ্টা করতে পারি।’ ইহার পর স্ত্রীলোকটি সত্যসত্যই টাকা আনিতে গেল দেখিয়া বংশী ভাবিল, বাহবা, এ যে দেখি, আমার ছেলেরও কান মলেছে!

দেখিতে দেখিতে ধোপানি ফিরিয়া অসিয়া টাকার থলিটা নিজের হাতে বংশীর কাপড়ের ভিতরে গুঁজিয়া দিল এবং তাহাকে কত যে আশীর্বাদ করিল, তাহা আর কী বলিব।

তারপর গাড়ি লইয়া বাড়ি ফিরিয়াই ধোপানি তাহার বড়ো ছেলেকে আগাগোড়া সমস্ত ঘটনা জানাইল। শেষে চোখের জল মুছিতে মুছিতে বলিল, ‘কে জানত বাছা, তোমার বাবা স্বর্গে গিয়ে খাওয়া-পরার অভাবে এতটা কষ্ট পাচ্ছেন! যাহোক, এখন তাঁকে কিছু সাহায্য পাঠাতে পেরে আমার মনটা ঠান্ডা হয়েছে।’

মায়ের কথা শুনিয়া ছেলের তো চক্ষু স্থির! সে বলিল, ‘তাই তো মা, স্বর্গ থেকে তো এমন ধারা কাকেও পড়তে শোনা যায় না। বোধ করি, তোমাকে কেউ ঠকিয়েছে। এর একটু খোঁজ করতে হবে। দেখি লোকটাকে ধরতে পারি কি না।’ এই বলিয়া সে তখনই সেই গাড়ি চড়িয়া বাহির হইল!

খানিক দূর গিয়া সে দেখিল, রাস্তার ধারে একটা গাছের নীচে বসিয়া একজন লোক টাকা গুনিতেছে। সেই লোকটিই যে বংশী তাহা তো আর সে জানে না। কাজেই তাহাকে পথিক ভাবিয়া যে জিজ্ঞাসা করিল, ‘মশায়, স্বর্গ থেকে যে লোকটা পড়ে গিয়েছে তাকে কি আপনি এ পথে যেতে দেখেছেন?’

বংশী। হ্যাঁ, একজন লোককে যেতে দেখেছি বটে আর বোধ করি সে, স্বর্গের লোকই হবে––স্বর্গে ফিরে যাচ্ছে। ওই যে দূরে পাহাড়টা দেখছ, এতক্ষণে বোধ হয় ওর ওপরে উঠেছে। গাড়িটাকে খুব হাঁকিয়ে দাও, এখনও গিয়ে তাকে ধরতে পারবে।

বংশীর কথা শুনিয়া ছেলেটি বলিল, ‘মশাই, সারাদিন কাপড় কেচে বড্ড কাহিল হয়ে পড়েছি। তার ওপর এখনও নাওয়া-খাওয়া পর্যন্ত হয়নি। আপনি তাকে দেখলেই চিনতে পারবেন। যদি দয়া করে এই গাড়িতে উঠিয়ে তাকে নিয়ে আসেন, আমার বড়োই উপকার হয়। তার সঙ্গে আমার বিশেষ কাজ আছে।’

বংশী মনে মনে ভাবিল, এই ছোঁড়াটা দেখছি, আমার হাবলার চেয়েও ওস্তাদ। যাহা হউক, মনের কথা গোপন করিয়া সে বলিল, ‘তা না পারব কেন? এ আর এমন কী কঠিন কাজ? আচ্ছা তুমি এখানে বোসো, আমি গাড়ি নিয়ে যাই।’ এই বলিয়া বংশী গোরু দুটার ল্যাজ মলিয়া খুব জোরে গাড়ি হাঁকাইয়া দিল।

এদিকে তাহার অপেক্ষায় বুদ্ধিমান ছেলে হাঁ করিয়া বসিয়াই আছে, আর ভাবিতেছে, ‘এই এল বলে।’ শেষে সন্ধ্যা পর্যন্ত যখন কেহই ফিরিল না, তখন ভাবিল, ‘স্বর্গের লোকটি বোধ হয় গাড়িখানা নিয়ে স্বর্গের দিকেই চলে গেছে। এত পথ হেঁটে যাওয়া কি সোজা কথা। এতক্ষণে সে নিশ্চয়ই স্বর্গের কাছাকাছি হয়ে থাকবে। গাড়ি ও টাকা পেলে বাবার কাজের খুব সুবিধে হবে।’

এই ভাবিতে ভাবিতে সে বাড়ি ফিরিয়া তাহার মাকে বলিল, ‘মা, আর ভাবনা নেই। বাবাকে আর মোট বয়ে কষ্ট পেতে হবে না। স্বর্গের সেই লোকটির সঙ্গে আমি গাড়ি ও বলদ পাঠিয়ে দিয়েছি।’ ছেলের কথায় মায়ের বুক যেন জুড়াইয়া গেল। সে ভাবিল, ‘বেঁচে থাক আমার সোনার চাঁদ। এমনটি কি সহজে মিলে!’

এদিকে গাড়ি চালাইয়া বাড়িতে আসিয়া বংশীর আনন্দ দেখে কে? ছেলেকে ডাকিয়া বলিল, ‘যা বাবা, বেঁচে গেছিস। মনে করেছিলাম, তোর মতো ছাগল আর নেই, কিন্তু ঘুরে ফিরে যা দেখলাম, তাতে মনে হয় তুই আমার মানিক।’

ঘরের দাওয়ায় মাদুরের উপর বসিয়া হুঁকা টানিতে টানিতে বংশী ভাবিতে লাগিল, ‘খুব দাঁও মারা গেছে, যাহোক! দুটো আধমরা লিকলিকে গাইয়ের বদলে একজোড়া খাসা বলদ, একখানা গাড়ি আর এক থলি টাকা। বোকামির রোজগার যদি এরকম হয়, তবে সে বোকামির পায়ে দণ্ডবত।

এটা অবশ্য বংশীরই মত। আমরা কিন্তু তাহার কথায় সায় দিতে পারি না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *