ফাঁকি দিয়া স্বর্গলাভ

ফাঁকি দিয়া স্বর্গলাভ

আমাদের গোবর্ধন, ওরফে গোবরা, নিতান্ত দুঃখে পড়িয়াই ভিখারি হইয়াছিল। একদিন ভিক্ষা করিতে বাহির হইয়া সে একটিমাত্র পয়সা পাইল পয়সাটি লইয়া বাড়ি ফিরিতেছে, এমন সময় ভিখারির মতো কাপড় পরা এক দেবদূতের সহিত দেখা হইল। দূত বলিলেন, ‘ভাই, সারা সকাল ঘুরে বেড়াচ্ছি, এখনও দুটি অন্ন জুটল না! তোমার কাছে যদি কিছু থাকে, দাও না দাদা।’

‘আরে ভাই, আমারও প্রায় সেই দশা! এই একটি পয়সা পেয়েছি, তা তোমার যদি দরকার থাকে, এইটেই নাও।’ এই বলিয়া গোবরা দূতকে পয়সাটি দিতে গেল।

ভিখারির উদারতা দেখিয়া দূত বলিলেন, ‘বাঃ, তোমার প্রাণটা তো বেশ সাদা! সরল লোককে আমি বড়ো ভালোবাসি। চলো, আমরা দুজনে দিন কয়েক ঘুরেফিরে আসি।’

গোবরা। সে তো বেশ কথা, চলো, বিদেশে গেলে ভিক্ষেও মিলবে ভালো।

দূত। তা ছাড়া, আমি একটা বিদ্যে জানি, তাতেও দরকার মতো কিছু কিছু পাওয়া যাবে। আমি খুব শক্ত অসুখ সারাতে পারি আর মরা লোককেও বাঁচাতে পারি।

গোবরা। তবে তো খুব মজা, চলো।

সেই দিনই দুইজনে দেশভ্রমণে বাহির হইলেন। তারপর ক্রমাগত কয়েকদিন চলিয়া তাঁহারা এক গ্রামে আসিয়া শুনিলেন যে, সেখানকার এক কৃষকের ভারী অসুখ। দেবদূত কৃষকের বাড়িতে গিয়া তাহার স্ত্রীকে সাহস দিয়া বলিলেন, ‘কোনো ভয় নেই, অসুখ আমি সারিয়ে দেব।’ এই বলিয়া ঝুলির ভিতর হইতে একটা ঔষধ বাহির করিয়া কৃষককে খাইতে দিলেন। সেই ঔষধের এমনি গুণ যে, খাইবামাত্র সে আরোগ্য লাভ করিল এবং বেশ সহজভাবে চলাফেরা করিতে লাগিল।

বলিতে গেলে, একরকম যমের দুয়ার হইতে স্বামীকে ফিরিয়া পাইয়া কৃষকের স্ত্রীর আনন্দ আর ধরে না! কৃষকও আহ্লাদে আটখানা! তাহারা দুই স্বামী-স্ত্রীতে চোখের জল মুছিতে মুছিতে দেবদূতের পায়ের উপর পড়িয়া বলিল, ‘বাবা! তোমার দয়াতেই আমরা এ যাত্রা বেঁচে গেলাম। তুমি আজ যে উপকার করলে, তা জন্মেও ভুলব না। কিন্তু বাবা, আমরা বড়ো গরিব। আমাদের কিছু নেই, যা দিয়ে তোমার ঋণ শোধ করতে পারি। থাকবার মধ্যে––এই একটা ছাগলছানা! এইটে নিয়ে আজ আমাদের মাপ করো!’

দেবদূত। না না––আমি কিছুই চাই না। ও ছাগলটি তোমাদেরই থাক!

কিন্তু তাহারা কিছুতেই ছাড়িল না। ‘দোহাই বাবা! আমাদের অনুরোধ রাখতেই হবে’, বলিয়া উভয়ে তাঁহার পা জড়াইয়া ধরিল।

এত কাকুতিমিনতিতেও দূত ছাগলছানা লইতে অস্বীকার করিতেছেন দেখিয়া গোবরার আর সহ্য হইল না। বিশেষ––সেই নধর পাঁঠাটির উপর তাহার বড়ো লোভ পড়িয়াছিল। সে দূতকে গোপনে ডাকিয়া বলিল, ‘তুমি এত বোকা কেন? খিদেয় পেটের নাড়ি হজম হচ্ছে, এ সময় ভাগ্যগুণে যদি বা কিছু জুটল, তাও তুমি নিতে চাও না! এমন করে হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেললে কখনো ভালো হবে না।’ এই বলিয়া পাঁঠাটি লইবার জন্য সেও খুব পীড়াপীড়ি আরম্ভ করিল।

শেষে কিছুতেই তাহাদের অনুরোধ এড়াইতে না পারিয়া দেবদূত পাঁঠার ছানাটি গোবরার স্কন্ধে চাপাইয়া সে স্থান হইতে বাহির হইলেন। ঘুরিতে ঘুরিতে ঠিক দুপুর বেলা তাঁহারা এক জঙ্গলে উপস্থিত হইলেন। তখন দূত বলিলেন, ‘তুমি এখানে রান্নার আয়োজন করো, আমি স্নান করে আসি। ফিরে এসে দুজনে একসঙ্গে খাব।’ এই বলিয়া দেবদূত স্নান করিতে গেলেন।

এদিকে গোবরা পাঁঠাটি রাঁধিয়া বসিয়া আছে, দূত আর আসেন না। মাংসের সুগন্ধে চারিদিক ভরিয়া গেল। গোবরার মুখ দিয়া টসটস করিয়া লাল ঝরিতে লাগিল। তবুও দূতের সাক্ষাৎ নেই। শেষে কিছুতেই আর লোভ সামলাইতে না পারিয়া, সে হৃৎপিণ্ডটা বাছিয়া খাইয়া ফেলিল। তারপর গোবরা মুখ মুছিতেছে, এমন সময় দূত আসিয়া উপস্থিত! দূত পূর্বেই তাহার কীর্তি জানিতে পারিয়াছিলেন। তিনি অসুখের ভান করিয়া বলিলেন, ‘দেখো, আমার বড়ো অসুখ হয়েছে, আমি মাংস খাব না, তুমি খাও আমাকে কেবল হৃৎপিণ্ডটা দাও।’

গোবরা বলিল, ‘সে কী, মাংস খাবে না––হঠাৎ এমন কী অসুখ হল? আচ্ছা, বেশি না খাও, একটু খেতেই হবে। আগে তোমাকে হৃৎপিণ্ডটা এনে দিই।’ এই বলিয়া সে খুব ব্যস্ততার ভাব দেখাইয়া হৃৎপিণ্ডটা খুঁজিতে লাগিল। কিন্তু সেটা যে কোথায় গিয়াছে, পাঠক-পাঠিকার তাহা জানিতে বাকি নাই। অথচ সত্য কথাটা দূতকে বলিতেও গোবরার সাহস হইল না। কিছুক্ষণ পরে সে শুধু হাতে ফিরিয়া আসিয়া বলিল, ‘দেখো ভাই, অনেক খুঁজলাম, কিন্তু হৃৎপিণ্ড তো পেলাম না! বোধ হয়, পাঁঠার হৃৎপিণ্ড থাকে না।’

দেবদূত। বাঃ, সব জন্তুর হৃৎপিণ্ড আছে, আর পাঁঠার নেই? তা কি কখনো হয়!

গোবরা। হবে না কেন? এই তো কতক্ষণ ধরে খুঁজলাম। থাকলে কি আর পাওয়া যেত না?

গোবরার কথায় দেবদূতের ভারী রাগ হইল। কিন্তু তিনি কোনোরকমে সে ভাব চাপিয়া বলিলেন, ‘আচ্ছা না থাকে নাই থাক, এখানে আর দেরি করা হবে না। তুমি শিগগির মাংস খেয়ে নাও।’

দূতের মুখের কথা শেষ না হইতেই গোবর্ধন টপাটপ সেই আস্ত ছাগল ছানাটির সদ-গতি করিল! তার পর দূতের সঙ্গে বাহির হইল।

কিছু দূর গিয়া তাঁহারা সম্মুখে একটা নদী দেখিতে পাইলেন। হাঁটিয়া পার হওয়া ভিন্ন আর উপায় ছিল না। দেবদূত যাহা ইচ্ছা করেন, তাহাই করিতে পারেন। দেখিতে দেখিতে তিনি হাঁটিয়া নদী পার হইয়া গেলেন। হাঁটু পর্যন্তও ভিজিল না। কিন্তু গোবর্ধন যেই নামিয়াছে, অমনি তাহার কোমর অবধি জলে ডুবিয়া গেল এবং ক্রমশই জল বাড়িতে লাগিল। সে ভয়ে চিৎকার করিয়া বলিল, ‘ভাই, তুমি তো খুব মজার লোক আমি ডুবে মরি আর তুমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছ!’ দূত বলিলেন, ‘পাঁঠার হৃৎপিণ্ড কোথায় গেল যদি বলো, তবে তোমাকে ওঠাব!’

গোবরা দেখিল বড়োই মুশকিল। মিথ্যা কথা স্বীকার করেই বা কীরূপে? বলিল, ‘আমি জানলে কি আর আগে বলতাম না!’

একেই গোবরার দেহের ভার, তাহার উপর আস্ত পাঁঠাটা তখনও পেটের ভিতর গজগজ করিতেছিল, সে ভারটাও বড়ো কম নয়! এই দুই ভারে গোবরা ক্রমশই ডুবিতে লাগিল। শেষে তাহার নাক অবধি জল উঠিল––প্রাণ যায় যায়।

দূত বলিলেন, ‘এখনও দোষ স্বীকার করো, তা না হলে তোমার আর রক্ষে নেই!’ কিন্তু গোবরা কিছুতেই দোষ স্বীকার করিল না। যাহা হউক, তাহাকে প্রাণে মারিতে দূতের ইচ্ছা ছিল না। তাই তিনি তাড়াতাড়ি আসিয়া তাহাকে উঠাইয়া ফেলিলেন।

তারপর আবার দুইজনে চলিতে আরম্ভ করিলেন। পরদিন সকালে তাঁহারা এক রাজ্যে উপস্থিত হইয়া শুনিলেন যে, সেই দেশের রাজকন্যা অল্প কিছুক্ষণ পূর্বে মারা গিয়াছে। শুনিয়া দূত বলিলেন, ‘চলো, রাজবাড়িতে যাই।’

রাজবাড়িতে আসিয়া দেবদূত মরা মেয়েটিকে একবার বেশ করিয়া দেখিলেন। তারপর রাজাকে সান্ত্বনা দিয়া বলিলেন, ‘মহারাজ, শোকে অধীর হবেন না। রাজকুমারীকে আমি বাঁচিয়ে দেব। আমাকে একখানা কড়া, এক কলসি জল, কিছু কাঠ ও আগুন আনিয়ে দিন।’

রাজার আদেশক্রমে তখনই সমুদয় দ্রব্য আসিল। দেবদূত সেই জিনিসগুলি আর মরা মেয়েটিকে লইয়া একটি ঘরে প্রবেশ করিলেন! তারপর দরজা বন্ধ করিয়া দিয়া আগুন জ্বালিয়া তাহাতে এক কড়া জল চাপাইলেন এবং মেয়েটির মৃতদেহ খণ্ড খণ্ড করিয়া সেই জলে সিদ্ধ করিতে দিলেন। অনেকক্ষণ সিদ্ধ হইয়া যখন হাড় হইতে সমুদয় মাংস খসিয়া পড়িল, তখন তিনি সেই হাড়্গুলি লইয়া, এক স্থানে সাজাইয়া, কী এক মন্ত্র পাঠ করিলেন। অমনি দেখিতে দেখিতে তাহার উপর মাংস হইল। ক্রমে সর্বাঙ্গ চর্মে আচ্ছাদিত হইল, তার পর মেয়েটি উঠিয়া বসিল। তখন দেবদূত দরজা খুলিয়া দিলেন। রাজা মরা মেয়েকে বাঁচিয়া উঠিতে দেখিয়া, আনন্দে উন্মত্তপ্রায় হইয়া উঠিলেন এবং দেবদূতকে, এই উপকারের প্রতিদানস্বরূপ, অর্ধেক রাজ্য দিতে চাহিলেন। কিন্তু দেবদূত, রাজ্য তো দূরের কথা, সামান্য কিছু অর্থ পর্যন্ত লইতেও সম্মত হইলেন না! দূতের ব্যবহারে গোবরার বড়োই রাগ হইল। সে কৌশলে রাজার নিকট কিঞ্চিৎ অর্থ প্রার্থনা করিল। রাজা আনন্দের সহিত তাহার ঝুলি মোহরে ভরিয়া দিলেন।

রাজবাড়ি হইতে বাহির হইয়া কিছু দূর গিয়া, দূত বলিলেন, ‘তুমি মোহর নিয়ে ভালো কাজ করনি! যাহোক যখন নিয়েছ, তখন এসো ভাগাভাগি করি।’ এই বলিয়া দূত সেই মোহরগুলি তিনটি সমান ভাগে বিভক্ত করিলেন। তিন ভাগ করিবার উদ্দেশ্য কী, গোবরা কিছুই বুঝিতে পারিল না। সে আগ্রহের সহিত দূতকে জিজ্ঞাসা করিল, ‘আমরা তো মোটে দুজন, তবে তিন ভাগ করলে কেন?’

দূত বলিলেন, ‘এক ভাগ তোমার, এক ভাগ আমার, আর এক ভাগ পাঁঠার হৃৎপিণ্ড যে খেয়েছে, তার।’

দূতের মুখের কথা শেষ না হইতেই, গোবরা বলিয়া উঠিল, ‘সে তো আমি––আমিই সেটা খেয়েছি। ও ভাগটা তবে আমার।’

দেবদূত। সেকী, পাঁঠার তো হৃৎপিণ্ড থাকে না!

গোবরা। আরে,––এও কি একটা কথা! সব প্রাণীর হৃৎপিণ্ড আছে, আর পাঁঠার নেই! তখন আমি মিছে কথা বলেছি!

দেবদূত। তুমি মিছে কথা বল? তবে আমি আর তোমার সঙ্গে থাকতে চাই না। মিথ্যাবাদীকে আমি বড়ো ঘৃণা করি। এসব মোহরই তুমি নাও, আমি চললাম।

গোবরার হাতে তখন অনেক টাকা সে ধরাকে সরা জ্ঞান করিতে লাগিল। বলিল, ‘তা এখন যেতে পার, এ টাকায় আমার অনেক দিন চলবে।’

দেবদূত বলিলেন, ‘তুমি নেহাত মূর্খ, এ টাকা কয়দিন! দু-চার বছরের মধ্যেই আবার তোমাকে ভিক্ষেয় বেরোতে হবে! যাহোক, এতদিন একসঙ্গে আছি, তোমাকে একটা কিছু না দিয়ে গেলে ভালো দেখায় না!––এই ঝুলিটা তুমি নাও তোমার যখন যা পেতে ইচ্ছে হবে, তার নাম করে––আমার এই ঝুলির ভিতর আয়––এই কথা বলবামাত্র সেই জিনিস তখনই তোমার ঝুলির মধ্যে আসবে।’ এই বলিয়া দেবদূত গোবরাকে ঝুলিটা দিয়া একদিকে চলিয়া গেলেন।

সঙ্গীকে চলিয়া যাইতে দেখিয়া গোবরার দেশভ্রমণের সাধ মিটিয়া গেল। সে দেশে ফিরিয়া বুক ফুলাইয়া নবাবি আরম্ভ করিল। হাতি-ঘোড়া, লোক-লশকর, সিপাই-শান্ত্রীতে তাহার প্রাসাদ ভরিয়া গেল। বাবুয়ানার চোটে দুই-তিন বৎসর পরে তাহার হাতে আর কিছুই রহিল না। শেষে দূতের কথাই সত্য হইল।

গোবরাকে আবার ঝুলি কাঁধে করিয়া বাহির হইতে হইল। পেটের দায়ে সমস্ত দিন পথে পথে ঘুরিয়া, কোনোদিন দুটি অন্ন জুটে, কোনোদিন জুটে না। সুখের দিনের তেল কুচকুচে ভুঁড়ি দুঃখের পেষণে একেবারে শুকাইয়া গেল! এই সময় গোবরা একদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘুরিয়াও থাকিবার মতো স্থান না পাইয়া, সন্ধ্যার কিছু পরে একটা সরাইয়ে উপস্থিত হইল এবং সেইখানেই রাত্রিবাসের আয়োজন করিতে লাগিল। তাহার উদ্দেশ্য বুঝিয়া সরাইয়ের কর্তা বলিলেন, ‘এখানে জায়গা নেই––তুমি অন্য চেষ্টা দেখো।’

গোবরা। বাঃ, তুমি তো খুব মজার লোক! জায়গা নাই বললেই হল। এত রাত্তিরে আমি এখন যাই কোথায়?

কর্তা। তা আমি কী জানি––যেখানে খুশি যেতে পার।

গোবরা দেখিল, লোকটা নিতান্ত বেয়াড়া। তর্কে কোনোই লাভ নাই। তাই আস্তে আস্তে জিজ্ঞাসা করিল, ‘আচ্ছা সামনের ওই বাড়িটা কার?’

কর্তা। আরে বাপ রে! ও বাড়িতে কি কেউ থাকতে পারে! ওটা ভূতের আড্ডা!

গোবরা। আমার অত ভূতের ভয় নেই!––ওটা যদি তোমাদের বাড়ি হয়, তবে চাবিটা আমায় দাও, আমি ওখানে গিয়ে থাকি।

কর্তা। কেন বাপু, প্রাণটা হারাবে! গরিবের ছেলে, মানে মানে ঘরে ফিরে যাও!

গোবরা। বেশ, প্রাণ যায় আমার যাবে! তুমি চাবিটা দাও।

‘কিছুতেই শুনলে না, তবে মরো গে!’––এই বলিয়াই কর্তা চাবিটা ছুঁড়িয়া দিলেন।

গোবরা একটা আলো লইয়া সেই বাড়িতে প্রবেশ করিল এবং ভালোরকম একটি ঘর বাছিয়া লইয়া তাহাতে শয়ন করিল। তারপর আন্দাজ বারোটা বাজিয়াছে, এমন সময় ভয়ানক একটা শব্দে হঠাৎ জাগিয়া উঠিয়া সে দেখিল যে, বিকট-মূর্তি নয়টা ভূত, রক্তবর্ণ চক্ষু বাহির করিয়া, পরস্পরের হাত ধরিয়া নাচিতেছে আর নাকি সুরে চিৎকার করিতে করিতে ক্রমেই তাহার দিকে আসিতেছে।

ভূতগুলার বেয়াদবি দেখিয়া গোবরার বড়ো রাগ হইল। সে খুব জোরে ধমক দিয়া বলিল, ‘এইও! চোপরাও! ফের চ্যাঁচাবি তো এক ঘুসিতে মাথার খুলি ভেঙে দেব! যদি ভালো চাস, এখনই দূর হ!’

গোবরার তিরস্কারে ভয় পাওয়া দূরে থাক, ভূতগুলা নাচিতে নাচিতে একেবারে কাছে আসিয়া তাহার গায়ের উপর লাফাইয়া উঠিল এবং সর্বাঙ্গে আঁচড়-কামড় দিতে লাগিল। গোবরাও সহজ পাত্র নহে সে সুবিধামতো দুই-দুইটা ভূতের টুঁটি চাপিয়া ধরিয়া, এমন জোরে তাহাদের মাথায় মাথায় ঠুকিয়া দিতে লাগিল যে, ভূত বাছাদের নাকালের একশেষ––এক-একবার বা কয়েকটাকে ধরিয়াই দেওয়ালে এক আছাড়! আর অমনি ঘরের ছাদসুদ্ধ কাঁপিয়া উঠে!––এইভাবে যুদ্ধ চলিতে লাগিল। কিন্তু সে একা, নয়টা ভূতের সহিত কতক্ষণ পারিয়া উঠিবে! যাহা হউক, হঠাৎ দেবদূতের সেই ঝুলির কথা তাহার মনে পড়িল। ইহার পর গোবরা যেই––‘তোরা সবগুলো এইটের মধ্যে আয়’––বলিয়া ঝুলিটা বাহির করিয়াছে, অমনি দেখিতে দেখিতে সেই নয়টা ভূতই গুঁড়িসুড়ি হয়ে তাহার মধ্যে ঢুকিয়া পড়িল! আর গোবরাও সময় বুঝিয়া তাহার মুখ খুব শক্ত করিয়া বাঁধিয়া ফেলিল। বাকি রাতটুকু সে বেশ আরামেই ঘুমাইয়াছিল।

পরদিন সকালে সরাইয়ের কর্তা গোবরাকে জীবিত দেখিয়া আর তাহার মুখে ভূতের কাহিনি শুনিয়া একেবারে আশ্চর্য হইয়া গেলেন। তিনি হাত জোড় করিয়া বলিলেন, ‘আমি মূর্খ, চিনতে না পেরে কাল কটু কথা বলেছি আপনি আমাকে মাপ করুন। আপনি নিশ্চিত কোনো দেবতা, দেবতা ভিন্ন এ কাজ কি মানুষের দ্বারা সম্ভব!’

গোবরা। না বাপু, আমি দেবতা-টেবতা কিছুই নই।––যাহোক, তোমার ভূতের ভয় ঘুচল? এখন তবে আমি আসি।

তখন কর্তা মহাশয় তাহাকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করিলেন এবং যথেষ্ট টাকাকড়ি পুরস্কার দিলেন। গোবরা সেই টাকা ও ঝুলি লইয়া সোজাসুজি এক কামারের দোকানে উপস্থিত। সেখানে কয়েকজন সর্দার কামারকে ডাকিয়া বলিল, ‘আমি যতক্ষণ না থামতে বলি, তোমরা এই ঝুলির উপর খুব ভারী মুগুর দিয়ে ঘা দিতে থাকো। এজন্যে যত টাকা চাও, আমি দেব।’ টাকার লোভে কামারেরা বেদম ঘা দিতে শুরু করিল। এক এক ঘা পড়ে আর অমনি ঝুলির ভিতর হাঁউ-মাঁউ-খাঁউ––মহাচিৎকার! কামারেরা তো ভয়ে জড়সড়! গোবরা তাহাদিগকে সাহস দিয়া বলিল, ‘ভয় নেই, খুব জোরে ঘা দাও।’ তাহারা সাহস পাইয়া আবার ঘা দিতে লাগিল। এইরূপে প্রায় এক ঘণ্টা ঘা দিবার পরেও নাকিসুরের কান্না শুনা যাইতে লাগিল। শেষে সে গোঙানিও যখন থামিয়া গেল, তখন গোবরা ঝুলির বাঁধন খুলিয়া ফেলিল। ভূতদের মধ্যে একটা ছিল ভারী চালাক। চিৎকার করিলেই প্রাণ যাইবে, ইহা সে বুঝিয়াছিল, তাই চুপচাপ এক কোণে পড়িয়াছিল। গোবরা যেই ঝুলির বাঁধন খুলিয়াছে, অমনি সেই ভূতটা বাহির হইয়া বাদুড়ের মতো ডানা মেলিয়া দে পিটটান! বাকি ভূতগুলার হাড়গোড় চুরমার হইয়া গিয়াছিল!

ইহার কিছুকাল পরে গোবরার পরলোকে যাইবার ইচ্ছা অত্যন্ত প্রবল হইয়া উঠিল। কিন্তু কোন রাস্তা দিয়া সেখানে যাইতে হয়, তাহা সে জানিত না। কাহাকেও যে জিজ্ঞাসা করিবে, তেমন মানুষ পাওয়া ভার। কাজেই গোবরার মনের ইচ্ছা কিছুদিন মনেই রহিয়া গেল। ইহার পর একদিন ঘুরিতে ঘুরিতে সে একটা মোড়ে আসিয়া দেখিল যে, পথটা সেখান হইতে দুই দিকে দুই ভাগ হইয়া গিয়াছে। তাহার কোনটাতে যাইবে, ঠিক করিতে না পারিয়া, দাঁড়াইয়া ভাবিতেছে, এমন সময়, এক সন্ন্যাসী সেখানে উপস্থিত হইলেন। সন্ন্যাসীকে দেখিতে পাইয়া গোবরা, কোন পথ কোথায় গিয়াছে, তাহা জানিতে চাহিল। তিনি বলিলেন, ‘এই যে সোজা বড়ো রাস্তাটি দেখছ, এটি নরকে গেছে। এই রাস্তা দিয়ে খুব তাড়াতাড়ি নরকে যেতে পার। আর ওই যে ছোটো আঁকাবাঁকা রাস্তা দেখছ, ওটি স্বর্গে গেছে। ওই রাস্তা ধরে বহুকাল চললে তবে স্বর্গে যাওয়া যায়।’

সন্ন্যাসীর কথা শুনিয়া গোবরা ভাবিল, ‘আমি বুড়ো মানুষ, বহুকাল যে চলতে পারি, সে শক্তি কই! তার চেয়ে এই সোজা রাস্তা দিয়ে তাড়াতাড়ি নরকেই যাই!’––এই ভাবিয়া সে নরকের পথই ধরিল। খানিক দূর গিয়া গোবরা প্রকাণ্ড একটা ফটক দেখিতে পাইল। সেই ফটক দিয়া নরকে প্রবেশ করিতে হয়। সে ফটকের কাছে উপস্থিত হইয়া দেখিল, সেই যে ভূতটা তাহার ঝুলির ভিতর হইতে পলাইয়া বাঁচিয়াছিল, বিকট মুখভঙ্গি করিয়া সেখানে যে পাহারা দিতেছে। ভূত গোবরাকে দেখিবামাত্র কাঁপিতে কাঁপিতে, দরজা বন্ধ করিয়া এক ছুটে তাহাদের রাজার কাছে গিয়া বলিল, ‘সর্বনাশ, সর্বনাশ––সেই গোবরা এসেছে! আর রক্ষা নেই! ও যদি এখানে ঢুকতে পায়, তবে আমাদের সকলকেই প্রাণে মারবে! ওর কাছে একটা ঝুলি আছে, একবার তাতে পুরে আমাদের বাছা বাছা আট জনকে মেরে ফেলেছিল!’ গোবরার ঝুলির কথা শুনিয়া ভূতদের রাজার বড়ো ভয় হইল। যাহাতে সে কোনোমতেই নরকে ঢুকিতে না পায়, তিনি একশত পালোয়ান ভূত ডাকিয়া সেইরূপ বন্দোবস্ত করিতে বলিলেন।

নরকের দরজা বন্ধ! গোবরা অগত্যা ফিরিয়া আসিয়া স্বর্গের রাস্তা ধরিয়া চলিল। ক্রমাগত বহুকাল চলিয়া অবশেষে সে স্বর্গের ফটকের কাছে উপস্থিত হইল! তাহার পূর্বপরিচিত সেই দেবদূত সেখানে পাহারা দিতেছিলেন। তাঁহাকে দেখিতে পাইয়া গোবরার আনন্দ আর ধরে না। সে হাসিতে হাসিতে বলিল, ‘কী হে ভাই, তুমি এখানকার মালিক? তবে তো ভালোই! একবার দরজাটা খুলে দাও আমি স্বর্গে যাই।’

দূত বলিলেন, ‘আরে তাই তো! এতদিন তুমি কোথা ছিলে? ভালো আছ তো? তা এত কষ্ট করে এলে বটে, কিন্তু ভাই, দরজা খোলবার তো হুকুম নেই! যারা যারা এখানে আসবে, আমার কাছে তাদের নামের একটা তালিকা আছে। কই, তার মধ্যে তোমার নাম তো দেখছি না!’

গোবরা। সেকী! তবে আমি যাই কোথা! স্বর্গেও স্থান নেই, নরকের দরজাও বন্ধ! আমার কি তবে কোথাও একটু জায়গা হবে না? তোমার এই ঝুলিটাই তো যত নষ্টের মূল! এইটে দেখতে পেয়েই নরকের দারোয়ান আমায় ঢুকতে দিলে না! তা তুমি যদি আমাকে স্বর্গেও ঢুকতে না দাও, তোমার ঝুলিটা তবে ফিরিয়ে নাও। আমি আবার নরকে গিয়ে চেষ্টা করে দেখি, কোনো সুবিধে করতে পারি, কি না!’

‘তা বরং দাও,’ এই বলিয়া দেবদূত হাত বাড়াইয়া যেই ঝুলি লইয়া ভিতরে রাখিয়াছেন, অমনি গোবরার মহা সুযোগ উপস্থিত! সে মৃদু হাসিতে হাসিতে বলিল, ‘আমার ইচ্ছে––এখনি ওই ঝুলির মধ্যে যাই।’

মুখের কথা শেষ না হইতেই, গোবরা তাহার সেই ঝুলির ভিতর গিয়া উপস্থিত! তাহাকে ফাঁকি দিয়া স্বর্গে প্রবেশ করিতে দেখিয়া, দেবদূত হো হো করিয়া হাসিতে লাগিলেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *