রাক্ষুসে বাঘ

রাক্ষুসে বাঘ

সত্তর পঁচাত্তর বৎসর পূর্বের ঘটনা,––আমার এক বন্ধুর বাবা অভ্রের খনির সন্ধানে রাঁচি-হাজারিবাগ অঞ্চলে সদলবলে ভ্রমণ করিতে করিতে একটা রাক্ষুসে বাঘের হাতে পড়িয়া কীরূপ লাঞ্ছিত হইয়াছিলেন, সেই বৃত্তান্ত বলিতেছি।

তখন রেল-লাইন, ও অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হয় নাই। লোকে গোরু, উট বা মানুষ-টানা গাড়ির সাহায্যে যাতায়াত করিত। রাঁচি হইতে হাজারিবাগ যাইবার পথে এখনও যেমন বাঘের উপদ্রব, তখনকার দিনে উহা কীরূপ ভয়ংকর ছিল, সেটা কল্পনা করিবার বিষয়।

যাঁহাকে লইয়া এই গল্প, সৌভাগ্যের বিষয়, তিনি নিজে তাঁহার ডায়েরিতে তখনকার ছোটো-বড়ো সমস্ত ঘটনা লিখিয়া রাখিয়াছিলেন। আমি বড়ো হইয়া সেগুলি পড়িবার সুযোগ পাইয়াছিলাম। তাহা হইতে গল্পটি উদ্ধৃত করিতেছি। আমি জোর করিয়া বলিতে পারি যে, এমন রোমাঞ্চকর কাহিনী তোমরা ইতিপূর্বে কখনো শুন নাই।

সেই ডায়রিতে আছে––১২৫৮ সালের চৈত্রের শেষে আমরা গোমো পৌঁছিলাম। সেখান হইতে পদব্রজে চার-পাঁচ দিনের পথ অতিক্রম করিয়া একজায়গায় একটি ছোটো পাহাড়ের নীচে তাঁবু ফেলা হইল। এই কয়দিন অবিশ্রান্ত হাঁটিয়া সঙ্গের কুলিরা বিশেষ ক্লান্ত হইয়াছিল। সেখানে দুইদিন বিশ্রাম করিবার পর আমরা কয়েকজনে খনির যথার্থ স্থান নির্দেশ করিবার জন্য বাহির হইলাম। ইতিপূর্বে ওই অঞ্চলের সকল স্থানই জরিপ করিয়া কতকগুলি স্থানের মানচিত্র পর্যন্ত আঁকা হইয়াছিল। সেই মানচিত্র লইয়া ঘোরাফেরা করিতে তেমন বিশেষ কষ্ট হয় নাই। সকলের সঙ্গে বন্দুক থাকিলেও আমরা সূর্য অস্ত যাওয়ার পূর্বেই কাজ সারিয়া তাঁবুতে ফিরিবার জন্য ব্যস্ত হইতাম। তখন পর্যন্ত কোনো হিংস্র জানোয়ারের সহিত সাক্ষাৎ না হইলেও, তাহাদের গর্জন প্রায়ই শুনিতে পাইতাম। স্থানীয় সাঁওতালেরাও ভয় দেখাইতে কসুর করিত না।

কয়েকদিন অক্লান্তভাবে অনুসন্ধান করিয়াও বিশেষ কিছু ফল হইল না। দল বাঁধিয়া হাজারিবাগের দিকে অগ্রসর হইতে লাগিলাম। আমরা সংখ্যায় নিতান্ত কম ছিলাম না। প্রায় ছয় শতের উপর কুলি আমাদের সঙ্গে ছিল তা ছাড়া তাঁবু ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি বহন করিবার জন্য একখানা উটের গাড়ি এবং খানকতক গোরুর গাড়িও ছিল।

দুইদিন চলিবার পর একটি বিস্তীর্ণ সমতল প্রান্তরের উপর আসিয়া পৌঁছিলাম। ম্যাপ দেখিয়া বুঝিলাম, কাছাকাছি কোথাও আমাদের কাম্যধন লুক্কায়িত আছে। দুইদিন পথ হাঁটিয়া আমরা সকলেই ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছিলাম। এদিকে সন্ধ্যাও হইয়া আসিয়াছিল।

কোথায় আসিয়া পড়িয়াছিলাম, ম্যাপ দেখিয়া তাহা সঠিক বুঝা গেল না কিন্তু সন্ধ্যার অর্ধ অন্ধকারেও স্থানটিকে বেশ মনোরম বলিয়া বোধ হইল। বহুদূর ব্যাপিয়া বৃক্ষলেশহীন প্রান্তর, এখানে সেখানে দুই-একটা ছোটো ছোটো বুনো খেজুর বা আসশেওড়া গাছ আর দূরে চারিদিকে যতদূর দৃষ্টি যায়, আকাশের গায়ে ক্ষুদ্র-বৃহৎ পাহাড়শ্রেণী জমাট ধূম্রপুঞ্জের মতো কালো হইয়া লাগিয়া আছে। আমাদের উত্তর-পূর্ব কোনে সুবিখ্যাত পরেশনাথ পাহাড়, তাহার বিরাট দেহ লইয়া একটা ভয়ংকর দৈত্যের মতো দাঁড়াইয়া! দক্ষিণে বহুদূরে দ্বারকেশ্বর নদীর দুই পার জুড়িয়া ঘনসন্নিবিষ্ট শাল, আমলকী আর অর্জুন গাছের জঙ্গল। আমরা যে প্রান্তরে আশ্রয় লইলাম, সেখানে বেশি গাছপালা ছিল না। মাটি, বালি সবই কংকরময়, মাঝে মাঝে দুই-একটা বুনো ঝোপ, আবছা আলোতে ঠিক দৈত্যদানার মতো মনে হইতেছিল।

প্রথমদিন স্থানটির মাহাত্ম্য বুঝিতে পারি নাই বলিয়া, যেমন-তেমন করিয়া তাঁবু খাটাইয়া নিশ্চিন্ত মনে শয়ন করিলাম। কুলিরা এদিকে-সেদিকে দল বাঁধিয়া জটলা করিয়া, অনেক রাত্রি পর্যন্ত হইচই করিল এবং গুমোট গরমের জন্য অনেকে তাঁবু না খাটাইয়াই, অনন্ত নীলাকাশের নীচে নিশ্চিন্ত হইয়া নিদ্রা দিতে লাগিল।

আমি আজও মনে করিয়া অবাক হই যে, কেমন করিয়া সেই অপরিচিত স্থানে অমন নির্বিকারভাবে ঘুমাইতে পারিয়াছিলাম ওই ভয়ংকর স্থানের অল্পমাত্র পরিচয়ও যদি আমাদের জানা থাকিত, তাহা হইলে নিদ্রা দূরে থাকুক, আগুন জ্বালাইয়া বন্দুক কাঁধে সারারাত্রি যাপন করিতে হইত। যাহা হউক, সকলেই পথ হাঁটিয়া সবিশেষ ক্লান্ত ছিলাম বলিয়া চিন্তা করিবার অবসর পাই নাই––নক্ষত্রলোকের মহারহস্য দেখিতে দেখিতে ঘুমাইয়া পড়িলাম।

পরদিন যখন ঘুম ভাঙিল, তখন হেমন্তের স্নিগ্ধ সূর্যরশ্মি আমার মুখে আসিয়া পড়িয়াছে। তাঁবুর বাহিরে আসিয়া দেখিলাম, কুলিরা তখন জাগিয়া নিজ নিজ খেয়ালমতো আড্ডায় মাতিয়াছে। এইভাবে সকালটাকে নষ্ট হইতে দিবার ইচ্ছা আমার মোটেই ছিল না আমি আমার সহকারী দুইজনকে সঙ্গে লইয়া স্থানটি পর্যবেক্ষণ করিতে বাহির হইলাম। চারিদিক দেখিয়াশুনিয়া বুঝিতে পারিলাম, ওরূপ নিশ্চিন্তভাবে, কোনোপ্রকার সাবধানতা অবলম্বন না করিয়াই রাত্রি কাটানো, আমাদের উচিত হয় নাই। আমরা সমস্ত কুলিকে জড়ো করিয়া বলিলাম যে, আজকের দিনের মধ্যেই তাঁবুগুলি ঠিকমতো খাটাইতে হইবে এবং আগুন জ্বালাইয়া রাখিবার ব্যবস্থা করিতে হইবে। ওই অঞ্চলের সাঁওতালেরা আমাদের কথায় সায় দিল। তাহারা বলিল, ‘এখানে অনেক দানো-পাওয়া বাঘ আছে। দেবতার কৃপা ছাড়া তাদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া কঠিন। পাঁচ-সাত দিন আগে, দিনের বেলাতে আমরা জঙ্গলের মধ্যে একটা প্রকাণ্ড বাঘকে ঘুমুতে দেখেছি।’ আমাদের সঙ্গে পশ্চিমা কুলিই ছিল অধিকাংশ তাহারা সাঁওতালদের এই দানো-পাওয়া বাঘের কথা শুনিয়া হাসিয়া উঠিল।

যাহা হউক, কুলিদিগকে কাজে লাগাইয়া, আমরা তিনজনে ম্যাপ লইয়া ঠিক জায়গার সন্ধানে বাহির হইব স্থির করিলাম। সঙ্গে খাবার ও বন্দুক ইত্যাদি লইয়া দুইজন কুলি চলিল। আমরা বলিয়া গেলাম যে, সন্ধ্যা নাগাদ তাঁবুতে ফিরিব, তাহার মধ্যেই যেন সমস্ত কাজ ঠিক করিয়া রাখা হয়।

উঁচু-নিচু প্রান্তর অতিক্রম করিয়া সোজা পশ্চিম মুখে চলিতে লাগিলাম। মধ্যে মধ্যে মাটি খুঁড়িয়া পরীক্ষা করিয়া দেখিতে লাগিলাম। প্রথমটা এঁটেল মাটি ও বালিমাটি ছাড়া আর কিছুরই অস্তিত্ব বুঝিতে পারিলাম না। মাইল পাঁচেক যাওয়ার পর অভ্রের খবর পাওয়া গেল। মাটি খুঁড়িয়া দেখিতে হইল না। মাটির উপর সর্বত্র কে যেন রুপার পাত ছড়াইয়া রাখিয়াছে, রৌদ্রালোকে সেগুলি ঝকঝক করিতেছে। আমাদের মন আনন্দে ভরিয়া উঠিল। মাটি খুঁড়িয়া পরীক্ষা করিলাম––যত নীচের মাটি, অভ্রের চাপ ততই বেশি বুঝিলাম, আকাঙ্ক্ষিত স্থানে আসিয়া পড়িয়াছি। ছোটোনাগপুর অঞ্চলে সর্বত্রই মাটির উপরে অভ্র ছড়ানো আছে দেখিতে পাওয়া যায়। কিন্তু আসলে সব জায়গাতেই অভ্রের খনি নাই। পার্বত্য নদীর জলের ধারার সঙ্গে সঙ্গে, মাটির ভিতরকার অভ্রস্তর ধুইয়া অভ্রের কণা চারিদিকে এইভাবে বিস্তীর্ণ হয়। কিন্তু এখানে মাটি যতই খুঁড়িতে লাগিলাম, অভ্রের পরিমাণ ততই বেশি হইতে লাগিল। বুঝিলাম, এখানেই কাজ আরম্ভ করিতে হইবে।

মনে প্রচুর আনন্দ লইয়া তাঁবুতে ফিরিয়া আসিলাম, কিন্তু আমাদের উল্লাস বেশিক্ষণ স্থায়ী হইল না। একদল কুলি আসিয়া বলিল যে, লখিয়া নামে একজন সর্দারকে পাওয়া যাইতেছে না। সে দ্বিপ্রহরে একেলা বেড়াইতে বাহির হইয়াছিল, কিন্তু আর ফিরিয়া আসে নাই। সাঁওতালেরা বলিল যে, তাহাকে নিশ্চয়ই দানো-বাঘ খাইয়াছে। আমার বিশ্বাস হইল না। আমি আমার এই জীবনে অনেক হিংস্র জন্তু লইয়া কারবার করিয়াছি। এতগুলি লোকের এত নিকটে যে দিনের বেলায় বাঘ বাহির হইয়া মানুষ ধরিয়া খাইবে, এ কথা অবিশ্বাস্য। কুলিদিগকে আশ্বাস দিবার জন্য বলিলাম, ‘সে নিশ্চয়ই পথ ভুলেছিল। দেখো গিয়ে, বোধ হয়, এতক্ষণে এসে পড়েছে।’ তাহারা চলিয়া গেল বটে, কিন্তু আমি নিশ্চিন্ত হইতে পারিলাম না। লোকটাকে দিনের বেলায় বাঘে না খাইলেও রাত্রে যদি সে ফিরিতে না পারে, তাহা হইলে তাহার প্রাণ রক্ষা হওয়া কঠিন। উদ্বিগ্ন চিত্ত লইয়া সে-রাত্রে ভালো ঘুমাইতে পারিলাম না। সকালে উঠিয়াই তাহার খোঁজ করিলাম হতভাগ্য আসে নাই। প্রথমটা মনে হইল, হয়তো সে এখানে কাজ করিতে অনিচ্ছুক বলিয়া পলায়ন করিয়াছে এবং গোমোর দিকে চলিয়া গিয়াছে, কিন্তু তবু খোঁজ না করিলে নয়। অন্য কুলিদের মনে ভয় ধরিয়া যাওয়াটা মোটেই ভালো নয়। আমি আমার সহকারীকে লইয়া তাহার সন্ধানে যাওয়াই স্থির করিলাম। অন্য সহকারীকে সমস্ত তাঁবু উঠাইয়া কুলিদের সঙ্গে লইয়া, গত দিবসের নির্ধারিত স্থানে যাইতে আদেশ করিলাম। তাহাকে বিশেষ করিয়া বলিয়া দিলাম, যেন সন্ধ্যার পূর্বেই তাঁবুগুলি ঠিকমতো খাটানো হয় এবং চারিদিকে আগুন জ্বালানো হয়। বন্দুক যাহাদের আছে, তাহারা যেন বন্দুক হাতের কাছে লইয়া শয়ন করে।

এদিককার সমস্ত ব্যবস্থা ঠিকমতো করিতে হুকুম দিয়া, আমরা দুইজনে লখিয়ার অনুসন্ধানে বাহির হইলাম। ধরিয়া লইলাম, তাহাকে বাঘ বা অন্য কোনো হিংস্র জন্তুতে লইয়া গিয়াছে। সেক্ষেত্রে তাহাকে নদীর কাছাকাছি কোনো স্থানে লইয়া গিয়া থাকিবে, এরূপ অনুমান করিয়া আমরা নদীর দিকেই অগ্রসর হইলাম। প্রান্তরে গাছপালার যেমন একান্ত অভাব, নদীর ধারে ঠিক তাহার বিপরীত বন অত্যন্ত নিবিড়––বড়ো বড়ো গাছ বেড়িয়া বন্য লতা উঠিয়া রৌদ্র ও আলোকের পথ প্রায় রুদ্ধ করিয়া আনিয়াছে। বহু কষ্টে নীচের কাঁটাগুল্ম, শুষ্ক পত্র ও ভাঙা ডালপালা ভেদ করিয়া চলিতে লাগিলাম। এইভাবে বহুক্ষণ বৃথা অনুসন্ধান করিয়া ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছি, এমন সময় আমার সহকারীর অস্ফুট আর্তনাদ শুনিয়া, চকিত হইয়া উঠিলাম। সে আমার নিকট হইতে একটু দূরে ছিল। তাহার কাছে গিয়া যাহা দেখিলাম, তাহাতে আমার মুখ হইতেও একটা আর্তনাদ বাহির হইল।

জঙ্গলের মধ্যে একস্থানে একটা ডোবার মতো হইয়াছে। বর্ষার জল তাহাতে সঞ্চিত হইয়া আছে। তাহার ভিতরে শুকনো পাতা পড়িয়া, পচিয়া একটা দুর্গন্ধ বাহির হইতেছিল। ডোবার বাঁ ধারে একটা ছোটো ঝোপ জলের গা ঘেঁষিয়া আছে। দেখিলাম, একটা অর্ধভক্ষিত নরদেহ সেই ঝোপের ভিতর হইতে প্রায় জলের মধ্যে আসিয়া পড়িয়াছে। তাহার মাথাটি তখনও অবিকৃত ও অভক্ষিত। পেটের নাড়িভুঁড়ি ও বুকের হাড় বাহির হইয়া পড়িয়াছে। মাথার চুলগুলি জলের ঢেউয়ের সঙ্গে উঠা-নামা করিতেছিল। তাহার কোমর হইতে পা পর্যন্ত অবিকৃত আছে কি না, বুঝিতে পারিলাম না গভীর ঝোপের মধ্যে তাহা লুক্কায়িত ছিল। অতি সন্তর্পণে, ব্যথিত চিত্তে, বন্দুক উঠাইয়া ধরিয়া তাহার দিকে অগ্রসর হইলাম নিকটে আসিয়া বুঝিতে পারিলাম, সেই হতভাগ্য লখিয়াই বটে! তাহার কালো মিশমিশে ফতুয়াটি ছিন্নভিন্ন অবস্থায় পড়িয়া আছে। খানিকটা তাহার পৃষ্ঠে সংলগ্ন হইয়া আছে। আশেপাশে চাপ চাপ রক্ত ঠিক জবাফুলের মতো পড়িয়া রহিয়াছে। একটা হাত সম্পূর্ণ ভক্ষিত, শুধু হাড়খানি পড়িয়াছিল। বুঝিতে পারিলাম, বেচারিকে কাল দিনের বেলাতেই বাঘে ধরিয়া লইয়া আসিয়াছে, চারিদিকে বাঘের থাবার দাগ। থাবা দেখিয়া মনে হইল, বাঘটা প্রকাণ্ড। লোকটির মুখের দিকে চাহিয়া আতংকে শিহরিয়া উঠিলাম। সেই ভীষণ দৃশ্য আমি জীবনে কখনো বিস্মৃত হইতে পারিব না। চোখ দুইটি নিষ্পলক, একটা ভয়ংকর ভয়ের ভাব যেন তখনও চোখে জড়ানো।

সন্তর্পণে গুঁড়ি মারিয়া ঝোপের ভিতর চাহিয়া দেখিলাম বাঘের কোনো চিহ্ন নাই। লোকটার কোমরের দিকটা একেবারে নাই বলিলেই হয় রক্তাক্ত হাড়ের উপরে এখানে সেখানে থোলো থোলো মাংস তখনও লাগিয়াছিল। সেই বীভৎস দৃশ্য বেশিক্ষণ দেখিতে পারিলাম না। প্রথমে ভাবিলাম, দুইজনে ধরাধরি করিয়া লোকটার অবশিষ্ট দেহটা তাঁবুতে লইয়া গিয়া সৎকারের ব্যবস্থা করি। কিন্তু ভাবিয়া দেখিলাম, তাহা সম্ভব নয়। তাঁবু সেখান হইতে প্রায় ছয় মাইল দূরে। ওই অর্ধভূক্ত দুর্গন্ধপূর্ণ মৃতদেহ অতদূর টানিয়া লইবার মতো সামর্থ আমাদের ছিল না। আমরা দুইজনে সেই হতভাগ্যকে সেইভাবে ফেলিয়া রাখিয়া এদিক-ওদিক বাঘের অনুসন্ধান করিয়া নিতান্ত ব্যথিত চিত্তে তাঁবুর দিকে ফিরিয়া চলিলাম।

আমাদের সৌভাগ্য যে, পথে কোনো প্রকার বিপদ ঘটে নাই। সন্ধ্যার পূর্বেই নূতন স্থানে তাঁবুতে আসিয়া পৌঁছিলাম। সহকারীকে সাবধান করিয়া দিলাম, যেন লখিয়ার মৃত্যুর কথা কাহারো নিকট প্রচারিত না হয়। কুলিদের ডাকিয়া মিথ্যা কথা বলিলাম। বলিলাম, ‘আমরা বিশেষ অনুসন্ধান করে জেনেছি, লোকটা গোমোর দিকে গেছে সেখান থেকে বাড়ি পালাবার মতলব।’ এই সংবাদে কুলিরা নিশ্চিন্ত হইয়া চলিয়া গেলেও, আমি নিশ্চিন্ত হইতে পারিলাম না। ছয় মাইল দূরে যখন বাঘের চিহ্ন স্বচক্ষে দেখিয়াছি, তখন এটা স্থির যে, এখানেও বাঘের ডেরা না থাকিলেও যাতায়াত থাকিবে। আমাদের সঙ্গে গোরু, উট, গাধা ও কয়েকটা ছাগল ছিল তাহাদের প্রাণরক্ষা করাও তো একটা কর্তব্য। এইসব সাত-পাঁচ ভাবিয়া, আমি সন্ধ্যার পরেও কুলিদের তাঁবুতে তাঁবুতে ঘুরিয়া, তাহাদিগকে সাবধানে রাত্রি কাটাইতে বলিলাম। সেই সুবিস্তীর্ন প্রান্তরে প্রায় একশোখানা তাঁবু এখানে-সেখানে খাটানো হইয়াছিল গোরু, ছাগল ইত্যাদি রাখিবার জন্য ব্যবস্থাও মন্দ করা হয় নাই। চারিদিকে গোরুর ও উটের গাড়ি দিয়া একটা ঘেরার মতো করা হইয়াছিল, আর তাহার চারিদিকে শালের খুঁটি পুতিয়া দেওয়াতে বেশ একটা খোঁয়াড়ের মতো হইয়াছিল। প্রত্যেক তাঁবুতে আট-দশজন করিয়া লোক। আমি এক-একটা তাঁবুতে এক-একজন বন্দুকধারীর থাকিবার ব্যবস্থা করিয়া দিলাম। একটু গোলমাল হইলেই যেন আগুন জ্বালাইয়া ও ক্যানেস্তারা বাজাইয়া একটা হইচই করা হয়, তাহাও বলিয়া দিলাম। আমার তাঁবুটি অপেক্ষাকৃত সুদৃঢ় ছিল। আমি একজন সহকারীকে লইয়া মাথার কাছে দু-নলা বন্দুক রাখিয়া শয়ন করিলাম। শয়ন করিবার পূর্বে মনে মনে স্থির করিলাম যে, খনির কাজ আরম্ভ করিবার পূর্বে সমস্ত তাঁবুগুলির চারিপাশে বেড়া বাঁধিবার বন্দোবস্ত করিতে হইবে।

কিন্তু মানুষ চায় এক, হয় আর। বাঘের অস্তিত্ব সম্বন্ধে আমি কুলিদিগকে সম্পূর্ণ অজ্ঞ রাখিতে চাহিলেও, সেই প্রথম রাত্রিতেই বাঘের ভয়ে সকলে আতঙ্কিত হইয়া উঠিল। সর্দারের ভয়ানক মুখখানার কথা স্মরণ করিতে করিতে ক্লান্তদেহে কখন ঘুমাইয়া পড়িয়াছিলাম, হঠাৎ একটা আর্তনাদের সঙ্গে সঙ্গে ঘুম ভাঙিয়া গেল। বিছানায় উঠিয়া বসিলাম, আমার সহকারীও তখন জাগিয়া বসিয়াছে। তাহাকে একটা লন্ঠন জ্বালাইতে বলিয়া, কান পাতিয়া ব্যাপারটা বুঝিবার চেষ্টা করিলাম। শুনিলাম, প্রত্যেক তাঁবু হইতেই কুলিরা চিৎকার করিয়া বলিতেছে––‘বাবু, শের আয়া।’ শের যে আসিবে তাহা জানিতাম, কিন্তু কাজ আরম্ভ হইবার পূর্বেই যে এভাবে কুলিদিগকে সন্ত্রস্ত করিবে, এতটা ভাবিতে পারি নাই। সহকারীকে লন্ঠন লইয়া পিছনে পিছনে আসিতে বলিয়া, আমি বন্দুক লইয়া গোলমাল লক্ষ করিয়া ঘটনাস্থলে উপস্থিত হইলাম। কুলিরা ততক্ষণে আগুন জ্বালাইয়া তাঁবুর বাহিরে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। প্রত্যেকের মুখে ভয়ের চিহ্ন সুষ্পষ্ট দেখিলাম, যে ঘেরাটার মধ্যে গোরু, উট প্রভৃতি ছিল, তাহার মধ্যেই উটের গাড়ির ভিতর একজন জমাদার বন্দুক পাশে লইয়া শয়ন করিয়াছিল। গোরুগুলিকে রক্ষা করিবার জন্য ঘেরার মধ্যে থাকিতে আমিই একজনকে আদেশ দিয়াছিলাম। গোরু ধরিতে আসিয়া বাঘে নাকি সেই বেচারিকেই ধরিয়া লইয়া গিয়াছে! তাহার আর্তনাদ শুনিয়া সকলে এইরূপই আঁচ করিয়াছে। কাছে গিয়া অনুসন্ধান করিতে কাহারো সাহস হয় নাই। একজন কুলি বলিল যে, জমাদার হরি সিংকে কাঁধে লইয়া একটা প্রকাণ্ড বাঘকে সে পলাইতে দেখিয়াছে।

আগুন, লন্ঠন প্রভৃতি লইয়া সেই ঘেরার দিকে অগ্রসর হইলাম। গোরু, ছাগল প্রভৃতি তখনও আর্তনাদ করিতেছে, উটটা দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া হাঁপাইতেছে। চারিদিকের বেড়া ঠিক আছে। কেমন করিয়া কী হইল, বুঝিতে পারিলাম না, তবে দেখিতে পাইলাম হরি সিং-এর পাগড়ি ও বন্দুক বেড়ার বাহিরে পড়িয়া আছে। সেখানকার মাটি বিপর্যস্ত––বাঘের পায়ের দাগ সুস্পষ্ট। অনেকক্ষণ দেখিয়াশুনিয়া ব্যাপরাটা বুঝিতে পারিলাম। যে গাড়িতে হরি সিং শয়ন করিয়াছিল, তাহা খুব উঁচু, তাহার পিছন দিকটা বেড়ার উপরে জাগিয়াছিল। সম্ভবত গরমের জন্য হরি সিং পিছনের ঝাঁপ খুলিয়াই রাখিয়াছিল। বাঘটা লাফাইয়া একেবারে গাড়ির ভিতরে পড়িয়া নিদ্রিত হরি সিংকে অতর্কিতে টানিয়া লইয়া গিয়াছে। হরি সিং বন্দুকটা ধরিয়াছিল বটে, কিন্তু কাজে লাগাইতে পারে নাই। উটের গাড়ি হইতে হরি সিংকে লইয়া বাঘটা যেখানে লাফ দিয়া পড়িয়াছিল, সেখানকার মাটিই ওরূপ ভাবে বিপর্যস্ত হইয়াছিল।

ভোর হইতে তখনও দেরি ছিল। সেই রাত্রিতে কিছু করিবার উপায় ছিল না। আমরা জাগিয়া জাগিয়া সকালের জন্য প্রতীক্ষা করিতে লাগিলাম। ভোরের আলো পূর্বাকাশ ভেদ করিয়া বাহির হইবার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা চারিজন বন্দুকধারীও বাঘের পদচিহ্ন লক্ষ করিয়া চলিতে লাগিলাম। বুঝিতে পারিলাম, জমাদারের মতো ভারী লোককে লইয়া যাইতে তাহাকে যথেষ্ট বেগ পাইতে হইয়াছে। মধ্যে মধ্যে সে তাহার শিকারকে নামাইয়া বিশ্রাম করিয়াছে, সেই সকল স্থানে হতভাগ্য জমাদারের রক্ত তখনও টাটকা। বেশিদূর যাইতে হইল না। মাঠের মধ্যে একজায়গায় মাটি ফুঁড়িয়া একখণ্ড পাথর মাথা খাড়া করিয়া উঠিয়াছে, তাহারই পিছনদিকে কতকগুলি বুনো গাছের ঝোপ খুব ঘন। হরি সিংকে সেখান পর্যন্ত লইয়া গিয়া বাঘটা আর অগ্রসর হইতে পারে নাই। তাহার পেটের ও গালের মাংস খানিকটা খাইয়া, তাহাকে সেখানে ফেলিয়াই পলায়ন করিয়াছে। সেই বীভৎস মৃতদেহের বর্ণনা করা অসম্ভব। তাহা ছাড়া, আমার মনের অবস্থাও এরূপ ছিল না যে, ভালো করিয়া কিছু লক্ষ করি। আমাদের কাজের জন্য দুইটি নিরীহ প্রাণীকে এভাবে অকালে কালগ্রাসে পতিত হইতে দেখিয়া, হৃদয় বিদীর্ণ হইতেছিল। এক-একবার মনে করিতে লাগিলাম, অর্থলোভ ছাড়িয়া দেশে ফিরিয়া যাই আর কাহারো হত্যার পাপ আমাকে স্পর্শ করিবার পূর্বেই এই দুরন্ত বাসনা ত্যাগ করি, কিন্তু মানুষের লোভ সহজে যাইবার নহে। জলের অনুসন্ধানে মরুভূমি অতিক্রম করিয়া, জলাশয়ের কাছে আসিয়া কোন মূর্খ জলপানে বিরত হয়? সকল বিপদকে সে তখন তুচ্ছ করে। ইহা ছাড়াও তখন আমার প্রতিহিংসা-প্রবৃত্তি জাগ্রত হইয়াছিল। যে দুষ্ট জানোয়ারেরা এভাবে আমাদের উপর অত্যাচার করিতে শুরু করিল, তাহাদিগকে শাস্তি দিবার জন্য আমি বদ্ধপরিকর হইলাম। অবশ্য তখন জানিতাম না যে, এই প্রতিজ্ঞা রক্ষা করিতে হইলে, কত বড়ো বিপদের মধ্য দিয়া যাইতে হইবে।

সকলে মিলিয়া তাঁবুতে ফিরিয়া আসিলাম ও কুলিদিগকে প্রত্যেক তাঁবুর চারিপাশে খুব শক্ত শালের বেড়া দিতে আদেশ করিলাম। গোরু প্রভৃতি জন্তুগুলি যেখানে ছিল, সেখানে ডবল বেড়া দিতে বলিলাম। আর সমস্ত রাত্রি আগুন জ্বালাইয়া রাখিবার ব্যবস্থা করিলাম। কাঠের অভাব ছিল না কাটিয়া আনিলেই হইল। এসব সাবধানতা ছাড়াও, খুব ভালোরকম পাহারার বন্দোবস্ত করিলাম। দুই-দুইজন করিয়া লোক এখানে-সেখানে বন্দুক কাঁধে পাহারা দিবে ও বিপদ বুঝিলেই ক্যানেস্তারা ইত্যাদি বাজাইয়া সকলকে সাবধান করিবে। এইসব শেষ করিয়া খনির কাজ আরম্ভ করা স্থির হইল।

হরি সিং-এর মৃতদেহ দেখিয়া আসা অবধি আমার মাথায় একটা মতলব ঘুরিতেছিল। অত বড়ো দেহটাকে অভুক্ত অবস্থায় পরিত্যাগ করিয়া বাঘটা যে ফেলিয়া রাখিবে না, ইহা নিশ্চয়। আর রাত্রেই সে একলা হউক বা দুই একটা সঙ্গী লইয়াই হউক, সেখানে গিয়া উদরপূর্তি করিবে। কাছাকাছি কোথাও লুকাইয়া থাকিলে বাঘ মারিতে হয়তো বেগ পাইতে হইবে না। আমার মনের কথা একজন সহকারীর নিকট ব্যক্ত করিলাম। সে-ও ইহাতে সায় দিল বটে, কিন্তু কাছাকাছি লুকানো যাইবে কোথায়? সেখানে বড়ো গাছ তো কোথাও দেখি নাই। শেষে অনেক বিচারবিবেচনার পর সেই ছোট্ট পাহাড়ের উপরেই বসিয়া অপেক্ষা করা স্থির করিলাম।

কাহাকেও কিছু না বলিয়া, সন্ধ্যার প্রাক্কালে আমরা দুইজনে পাহাড়টার উপরে গিয়া উঠিয়া বসিলাম। বন্দুক ও পিস্তল দুই-ই আমাদের সঙ্গে ছিল। উন্মুক্ত আকাশের তলে শীতের মধ্যে আমরা চুপচাপ বসিয়া রহিলাম। হুহু করিয়া হাওয়া দিতেছিল। বেশ কুয়াশাও পড়িতেছিল। কিন্তু আমাদের ভিতরে রক্ত গরম ছিল বলিয়া ততটা কষ্ট পাই নাই। স্থিরচিত্তে কান পাতিয়া রহিলাম। খসখস খুটখুট করিয়া শব্দ হয় আর প্রস্তুত হইয়া বসি। নীচে ঝোপের দিকে একদৃষ্টে চাহিয়া চক্ষু জ্বালা করিতে লাগিল, দৃষ্টি বিভ্রম ঘটিতে লাগিল। হাওয়ায় ঝোপের পাতা নড়ে আর মনে হয়, ওই বাঘ! বন্দুক তুলিয়া ধরি, পরক্ষণেই ভুল ভাঙিয়া যায়। রাত্রি যত গভীর হইতে লাগিল, এইরূপ ভুল ততই ঘন ঘন হইতে লাগিল। আমরা প্রথমে একটু দূরে বসিয়াছিলাম, কিন্তু কখন ধীরে ধীরে পরস্পরের কাছাকাছি হইয়া গা-ঘেঁষাঘেঁষি করিয়া বসিলাম, জানিতে পারি নাই। অন্ধকারের দিকে একদৃষ্টে চাহিয়া কিছু প্রত্যক্ষ করা বড়ো সহজ নহে, চক্ষু টাটাইয়া জল বাহির হইতে লাগিল। কিন্তু তবু বাঘের দেখা নাই। এতক্ষণ তাঁবু হইতে লোকজনের কোলাহল ও ক্যানেস্তারার আওয়াজ কানে আসিতেছিল, ধীরে ধীরে তাহাও কমিয়া আসিল।

এইভাবে বসিয়া বসিয়া সম্ভবত ঝিমাইয়া পড়িয়াছিলাম। সহসা দূরে তাঁবুর দিক হইতে বহুলোকের আর্তনাদ কানে আসিতেই চমকিয়া উঠিলাম। বুঝিলাম বাঘ আমাদের ঠকাইয়াছে আজ আর এদিকে না আসিয়া আবার তাঁবুর ভিতরেই আহারের সন্ধানে গিয়াছে। নিস্ফল ক্রোধে নিজেই নিজের হাত কামড়াইতে লাগিলাম। হতাশ হইয়া চুপ করিয়া বসিয়া রহিলাম। রাত্রি প্রভাত না হইলে পাহাড় হইতে নামা বাতুলতা মাত্র!

হঠাৎ যেন একটা থপথপ শব্দ কানে আসিল। চকিত হইয়া বসিলাম। শব্দ নিকটে আসিতেছিল কোনো একটা ভারী জন্তু খুব দ্রুত ছুটিয়া গেলে তাহার পায়ের যেরূপ আওয়াজ হয়, শব্দটা ঠিক সেইরূপ। বেশ একটু নজর করিয়া দেখিলাম, যেন একটা সাদা কাপড়ের মতো কী দেখা গেল। পরক্ষণেই বুঝিতে পারিলাম, একটা বাঘ তাঁবুর মধ্যে ঢুকিয়া কোনো হতভাগ্যকে মারিয়া তাহাকে কাঁধে লইয়া পলাইতেছে। এই ধারণা মাথায় আসিবামাত্র, সেই দ্রুতগামী অস্পষ্ট ছায়ামূর্তিকে লক্ষ্য করিয়া দুইজনে একসঙ্গে গুলি ছুঁড়িলাম। গুলির গুরুগম্ভীর আওয়াজ প্রান্তর কাঁপাইয়া পাহাড়ে ধ্বনিত হইল। গুলির সঙ্গে সঙ্গে বুঝিলাম, আমাদের ধারণা সত্য, বাঘই বটে। সে একটা বিকট আর্তনাদ করিয়া উঠিয়া যেন একবার দাঁড়াইল। পরক্ষণেই একটা ভারী জিনিস মাটিতে ফেলার মতো শব্দ কানে আসিল। বুঝিলাম, মুখের গ্রাস সেখানে ফেলিয়াই বাঘ পলাইল।

আর অপেক্ষা করা যুক্তিযুক্ত নহে ভাবিয়া, আমরা দুজনেই নামিয়া সেই স্থান লক্ষ করিয়া ছুটিয়া চলিলাম, হয়তো এখনও বেচারি জীবিত আছে। কাছে যাইতে না যাইতেই আমাদের অনুমানের সত্যতা বুঝিতে পারিলাম। লোকটা ‘জল জল’ করিয়া চিৎকার করিয়া উঠিল। গলার আওয়াজে চমকিয়া উঠিলাম। সর্বনাশ! এ যে আমার পাচক বেহারি! দুইজনে ধরাধরি করিয়া বেচারিকে লইয়া তাঁবুতে আসিলাম। তাঁবু তখন সরগরম! কাহাকে লইয়া গিয়াছে, কুলিরা তখন পর্যন্ত বুঝিতে পারে নাই। বেহারিকে লইয়া আমাদের ফিরিতে দেখিয়া কুলিরা জয়ধ্বনি করিয়া উঠিল। আমি তাহাদের চিৎকারে বাধা দিয়া বেহারির জন্য যথাবিহিত ব্যবস্থা করিতে লাগিলাম। সঙ্গে ডাক্তার ছিলেন, তিনি আসিয়া তাহার চিকিৎসা শুরু করিলেন। বেহারির সৌভাগ্য যে, তাহার আঘাতটা তেমন গুরুতর হয় নাই। একরূপ অক্ষত দেহেই সে রক্ষা পাইয়াছে। প্রথম থাবার আঘাতেই বেচারি অজ্ঞান হইয়া পড়িয়াছিল।

যথেষ্ট সেবা-শুশ্রূষার পর বেহারি সুস্থ হইল। তাহার নিকট ঘটনার বিবরণ যাহা পাওয়া গেল, তাহা এই––রাত্রে তাঁবুতে সে আমাকে না দেখিতে পাইয়া অন্য তাঁবুতে সন্ধান করিতে যাইতেছিল, এমন সময় যমদূতের মতো একটা বাঘ ঠিক তাহার সম্মুখে আসিয়া পড়ে। সে চিৎকার করিয়া উঠিবার পূর্বেই, বাঘের এক থাবাতেই মূর্ছিত হইয়া যায়। তাহার পর আর কিছুই তাহার স্মরণ নাই।

এই ঘটনার পর, দিন চার-পাঁচ কোনো উপদ্রব হয় নাই। খনির কাজ আরম্ভ হইল। বুঝিতে পারিলাম, গুলি বাঘকে জখম করিয়াছে মরিয়া না থাকুক, সে নিশ্চয়ই কোথাও খোঁড়া হইয়া পড়িয়া আছে। আর একটা জিনিস বেশ স্পষ্ট বুঝা গেল, আমরা ভাবিয়াছিলাম, বাঘেরা সংখ্যায় অনেক কিন্তু এখন জানা গেল, একটার বেশি বাঘ আমাদের উপর অত্যাচার করে নাই। কারণ বাঘ বেশি থাকিলে, একটা আহত হইলেও অন্যগুলো আসিত। এই একটা জানোয়ারকেই নিপাত করিতে যে এত বেগ পাইতে হইবে, তাহা কে জানিত!

বেশিদিন অপেক্ষা করিতে হইল না পূর্ববৎ অত্যাচার আরম্ভ হইল। আহত হইয়া নিজেকে সামলাইয়া লইতে বাঘটাকে যথেষ্ট বেগ পাইতে হইয়াছিল। কয়েকদিন সম্ভবত তাহার আহার জুটে নাই, তাই সেই ক্ষুধার্ত জীবটি নূতন উদ্যমে নিত্য নূতন শিকারের সন্ধানে ফিরিতেছিল। ক্রমশ তাহার অত্যাচার এমন বাড়িয়া গেল যে, বাধ্য হইয়া আমাদিগকে খনির কাজ স্থগিত রাখিতে হইল। আত্মরক্ষা করিবার সম্ভব ও অসম্ভব যত প্রকারের উপায় কল্পনা করিতে লাগিলাম, সেগুলিকে কাজে খাটাইয়া নিজেদের নিরাপদ করিয়া তুলিবার চেষ্টা চলিতে লাগিল। কিন্তু যতদিন যাইতে লাগিল, বাঘের সাহস ততই যেন বাড়িয়া চলিল। গোরু, গাধা, ছাগল ইত্যাদির দিকে তাহাকে লোভ করিতে দেখি নাই বাঘটার যত লোভ ছিল, নরমাংসের প্রতি। কুলি লাইন হইতে খাদ্য সংগ্রহের জন্য, সকল প্রকার বিপদকে সে অগ্রাহ্য করিয়া চলিতে লাগিল। মানুষের কোলাহল, আগুন, বন্দুকের আওয়াজ, টিনের শব্দ, কোনো কিছুতেই তাহাকে নিরস্ত করিতে পারিতেছিল না। আমরা সকলেই যথেষ্ট ভয় পাইয়াছিলাম। প্রত্যেকেই ভাবিতাম, আজ বোধ হয় আমরা পালা। দিনরাত এইভাবে মৃত্যুচিন্তা মনের মধ্যে লইয়া সময় কাটানো কীরূপ দুরূহ, যে এই অবস্থার মধ্যে না পড়িয়াছে সে বুঝিতে পারিবে না। আমাদের মনে হইত, যেন আমাদের রাজ্যে একটা রাক্ষস আসিয়াছে, আর উপকথার রাক্ষসের মতোই সে প্রত্যহ একটি করিয়া মানুষ দাবি করিতেছে। তাহার খেয়াল চরিতার্থ না করিয়া উপায় নাই। সকলেই যথেষ্ট সাবধানে চলে ও রাত্রে শয়ন করে, কিন্তু কোন দিক দিয়া কখন যে শয়তানের আবির্ভাব হইত, আমাদের চরমতম কল্পনার সাহায্যেও পূর্বাহ্নে তাহা ঠাহর করিতে পারিতাম না।

এইসময় একদিন আবার একটা ঘটনা ঘটিল, যাহা মনে করিতেও হৃৎকম্প উপস্থিত হয়––ভয়ে হাত-পা আড়ষ্ট হইয়া আসে। সেদিন ছিল হাটবার। দুইজন কুলি হাট করিয়া বেলাবেলি তাঁবুতে ফিরিবার জন্য ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটিয়া আসিতেছিল। তাহারা তাঁবুর প্রায় কাছাকাছি হইয়াছে, লোকজনের কোলাহল শুনা যাইতেছে, এমন সময় ঠিক যেন যম আসিয়া একজনের ঘাড়ে লাফাইয়া পড়িল আর দেখিতে দেখিতে তাহাকে লইয়া বিদ্যুদ্বেগে জঙ্গলের মধ্যে অদৃশ্য হইল।

চক্ষের সম্মুখে এইরূপ লোমহর্ষক ব্যাপার দেখিয়া অপর কুলির যে অবস্থা হইয়াছিল, তাহা অবর্ণনীয় বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। তাঁবুতে পৌঁছিয়াই সে মূর্ছিত হইয়া পড়িল। অনেক চেষ্টায় সংজ্ঞালাভ করিল বটে, কিন্তু কয়েকদিন পর্যন্ত তাহার মুখ দিয়া ভালো করিয়া কথা সরে নাই।

অশিক্ষিত কুলিরা এই ঘটনার সহিত কোনো অপদেবতার যোগ আছে কল্পনা করিয়া একেবারে হাল ছাড়িয়া দিল। ইহার পর হইতে প্রত্যহ দলে দলে কুলি আসিয়া, দেশে ফিরিবার সংকল্প জানাইতে লাগিল। আমি কোনো প্রকারে তাহাদিগকে আর দুই-চারদিন অপেক্ষা করিতে অনুরোধ করিতে লাগিলাম। মোটের উপর, সেই সময়টা কতকটা যেন অরাজক রাজ্যে বাস করার মতো অবস্থা হইয়াছিল।

কুলিদের ও আমাদের তাঁবু পড়িয়াছিল প্রায় আধ মাইল ব্যাপিয়া। এক প্রান্ত হইতে অন্য প্রান্তে যাইতে যথেষ্ট সময় লাগিত। এরূপ অবস্থায় একদিকে ভালো করিয়া পাহারা দিতে গেলে, অন্য দিকের উপর অত্যাচার হইত। প্রতিদিন এইভাবে উৎপীড়িত হইয়া আমি মরিয়া হইয়া উঠিলাম। প্রতিজ্ঞা করিলাম, বাঘটাকে মারিয়া ফেলিবার পূর্বে আর রাত্রে নিদ্রা যাইব না। তাঁবুশ্রেণির মাঝে মাঝে বিশ-বাইশ হাত দূরে দূরে, এক-একটা মাচা তৈয়ার করাইলাম ও প্রত্যেকদিন সেই সকল মাচার কোনো না কোনোটিতে রাত্রি কাটাইতে লাগিলাম। কখনো একা থাকিতাম কখনো বা আমার সহকারী সঙ্গে থাকিত। আমার হুকুম ছিল, সন্ধ্যার পরই তাঁবুর দরজা ইত্যাদি বন্ধ করিয়া থাকিতে হইবে, বাহির হইলেই মৃত্যু অনিবার্য।

কিন্তু এত করিয়াও কিছু সুবিধা করিতে পারিলাম না। বাঘটা আমাকে ফাঁকি দিয়া দৈববলে আপনার কাজ হাসিল করিতে লাগিল। তাঁবুর ভিতরে ঢুকিয়াও লোক ধরিয়া লইয়া যাইতে লাগিল। এইভাবে মাচায় মাচায় বিনিদ্র রজনী যাপন করিতাম। দিনের বেলাতেও বিশ্রাম করিবার সুবিধা হইত না নদীর ধারে ধারে, জঙ্গলে বাঘের বাসস্থান নির্ধারণ করিবার জন্য অনুসন্ধান চলিত। সেখানকার জঙ্গল এত নিবিড় এবং প্রান্তর মধ্যস্থিত ঝোপগুলি এমন ঘনসন্নিবিষ্ট ও কাঁটাগুল্ম পরিবৃত যে, সেই সকল স্থানে দিনের বেলায় যাওয়াও বিপজ্জনক। কিন্তু তবু যাইতাম। বস্তুত সেসময় আমার মাথায়ও যেন ভূত চাপিয়াছিল। এত পরিশ্রম করিয়া খনির সন্ধান পাইয়া, একটা বাঘের জন্য সকল শ্রম পণ্ড হইতে দেখিলে, কাহার না রাগ হয়!

সকল অসুবিধা সত্বেও আমি অবসর পাইলেই ঝোপে ঝোপে, নদীর ধারে বাঘের খোঁজে ফিরিতে লাগিলাম। দুই-একবার এখানে-সেখানে তাহার আহার্যের ভুক্তাবশিষ্ট দেখিয়াছি ও নদীর তীর-সন্নিকটে তাহার পায়ের দাগও লক্ষ করিয়াছি, কিন্তু উপরের দিকে মাটি এরূপ শক্ত যে, সেখানে পায়ের দাগ লক্ষ হইত না।

প্রথম প্রথম বাঘটা যেন আমার মতলব আঁচ করিয়াই একটু সাবধান হইয়া চলিতে ফিরিতে লাগিল। আমাদের সাবধানতার জন্য দুই-একবার সে শিকার ধরিয়া পলাইবার সময় বাধাপ্রাপ্ত হইয়াছে এবং শিকার ছাড়িয়াই পলাইয়াছে, কিন্তু শেষে সে ভয়ানক দুর্দান্ত ও সাহসী হইয়া উঠিল। কিছুতেই সে ভয় পাইত না, ভুল করিলেও আবার ফিরিয়া আসিত। মনুষ্য নামক প্রাণীকে সে যথেষ্ট অবজ্ঞা করিয়াই চলিত।

রাত্রি অন্ধকারে কখন যে সে কাজ সারিয়া পলাইত, ঠিক করিতে পারিতাম না। এভাবে অদৃশ্য শত্রুর সহিত যুদ্ধ করা অসম্ভব। তাহার অত্যাচারে প্রতিদিন আমাদের লোকবল হ্রাস হইতে লাগিল। তাড়াতাড়ি কাজ সারিয়া যে সেখান হইতে পলাইব, ইহা তেমন কাজও নহে। যেমন করিয়াই হউক এখানে বহুদিন থাকিতে হইবে। এদিকে কুলিরাও কাজ করিতেছে না। বাঘ মারাটাই তখন আমার একমাত্র লক্ষ্য হইয়া উঠিল।

মাচার উপর রাত্রি জাগিয়া জাগিয়া ও প্রবল দুশ্চিন্তায় ক্রমেই আমার শরীর ভাঙিয়া পড়িতে লাগিল। প্রত্যহ বাঘ মারিবার জন্য নূতন নূতন কৌশল অবলম্বন করিতাম। মাচার নীচে গোরু ও ছাগল বাঁধিয়া উপরে চুপটি করিয়া থাকিতাম। সমস্ত রাত্রি ভয়ার্ত পশুদের আর্তনাদমাত্র শুনিতে পাইতাম, কিন্তু বাঘ আসিত না। ইত্যবসরে অন্যদিকে সে মানুষের ঘাড় ভাঙিবার জন্য সকল প্রকার কৌশল বিস্তার করিতে ছাড়িত না।

এক-একদিন দিনের বেলায়, এমন নিঃসহায় অবস্থায় গভীর জঙ্গলের মধ্যে গিয়া পড়িয়াছি যে, আজ যে আমি সেই কথা লিপিবদ্ধ করিবার অবকাশ পাইয়াছি, ইহাই আশ্চর্য। মৃত্যু যেন তখন আমার নিত্য সহচর ছিল। শুধু বাঘ মারিবার জন্যই নহে, কুলিদিগকে সাহস দিবার জন্যও আমাকে এই সকল কাজ করিতে হইত।

এদিকে শীতের প্রকোপ অত্যন্ত বাড়িয়া চলিয়াছে। রাত্রে মাচানে বসিয়া থাকা অসম্ভব। তবে সুবিধা এই, কুলিরা এতদিনে সমস্ত তাঁবু ঘেরিয়া কাঠ ও কাঁটা গাছের এমন শক্ত বেড়া দিয়া ফেলিয়াছে যে, ভিতরে আসিতে বাঘকে যথেষ্ট বেগ পাইতে হইত। বেড়া খুব উঁচু করিয়া বাঁধা হইয়াছিল উপর দিয়া টপকাইয়া সে যে সুবিধা করিতে পারিবে, তাহা মনে হয় না। আর সত্য সত্যই সে সুবিধা করিতে পারিতেছিল না। এক-একদিন গভীর রাত্রে শুনিতাম নরমাংসলুব্ধ ক্ষুধার্ত বাঘটা বেড়ার বাহিরে কাতর আর্তনাদ করিতেছে। শব্দবেধী বাণের সন্ধান যদি আমার জানা থাকিত, তাহা হইলে এই সময়ে তাহাকে আমি নিপাত করিতে পারিতাম।

কিন্তু এইভাবে শুধু বেড়ার মধ্যে বসিয়া বসিয়া দিন কাটাইবার জন্য, আমরা স্বদেশ, স্বজন পরিত্যাগ করিয়া ছোটোনাগপুরের জঙ্গলের মধ্যে প্রবেশ করি নাই। আমরা যে উদ্দেশ্য লইয়া আসিয়াছিলাম, তাহার সাফল্য যেন সুদূরপরাহত হইয়া পড়িতেছিল। বহুদিন দেশ ছাড়িয়াছি। দেশে যাইবার, জন্য মনও কেমন করিতেছিল। কুলিদিগকে বসিয়া মাহিনা ও আহার্য জোগানও কষ্টকর হইয়া পড়িতেছিল। মোটের উপর সেসময়ে আমার মনে দারুণ হতাশা আসিয়াছিল, তাহাতে সন্দেহ নাই।

শীতের মাঝামাঝি হাজারিবাগ হইতে একদল বিখ্যাত শিকারি, শিকারের লোভে ওই অঞ্চলে আসিয়া পড়িলেন। তাঁহাদের মধ্যে দুইজন খাঁটি সাহেব ছিলেন। প্রসিদ্ধ শিকারি হিসাবে তাঁহাদের নাম শুনিয়াছিলাম। তাঁহারা এইরূপ অযাচিতভাবে আসিয়া পড়াতে বুকে যথেষ্ট জোর পাইলাম। সাদা চামড়া দেখিয়া কুলিদের মধ্যেও বেশ একটা সাড়া পড়িয়া গেল। তাহাদের সকলের বিশ্বাস হইল, রাক্ষুসে বাঘ এইবারে নিপাতলাভ করিবে।

শিকারিদলকে আমাদের আতিথ্য স্বীকার করিতে বলায়, তাঁহারা সকলেই স্বীকৃত হইলেন। তাঁহাদের পথশ্রান্তি দূর হইলে, আমি তাঁহাদিগকে সেই ভয়ংকর বাঘের কাহিনি বলিলাম। তাঁহারা বেশ একটু অবহেলার সহিত শুনিয়া গেলেন। একজন সাহেব বলিয়া উঠিলেন, ‘ভারী তো একটা বাঘ, তার জন্যে আবার এত ভয়! দেখুন, দু-দিনেই আপনাদের এই জায়গাটাকে বাঘশূন্য করে ছাড়ব!’ আমি সাহেবকে ধন্যবাদ দিয়া বলিলাম, ‘তবু একটু সাবধান হয়ে চলবেন ফিরবেন, সন্ধ্যার পর যেন বেড়ার বাইরে না থাকেন।’ সাহেব ‘বেশ’ বলিয়া অন্য কথা পাড়িলেন।

শিকারিদল সকাল হইলেই আহারাদি শেষ করিয়া সদলবলে বাহির হইয়া পড়িলেন। আমি মাসাধিক কাল ধরিয়া রাত্রি জাগিয়া ও দিনে জঙ্গলে জঙ্গলে নিষ্ফল পর্যটন করিয়া যথেষ্ট পরিশ্রান্ত হইয়া পড়িয়াছিলাম। এই সুযোগে এইটুকু বিশ্রাম লাভ করিবার লোভ সংবরণ করিতে পারিলাম না।

নূতন শিকারিদল আসিবার পর, প্রথম তিনদিন একরূপ শান্তভাবেই কাটিল। আমি এইসময় প্রচুর বিশ্রাম ও নিদ্রাসুখ লাভ করিয়াছিলাম। শিকারিরা সকলে তোড়জোড় করিয়া শিকার ধরিয়া আনিবার ছলে বন্দুক ইত্যাদি লইয়া রওয়ানা হইতেন এবং সন্ধ্যার সময় গোটা দুই খরগোশের ছানা বা শিয়াল মারিয়া লইয়া ফিরিতেন। বাঘ তো দূরের কথা, একটা নেকড়ে পর্যন্ত তাঁহারা কোনোদিন আনিতে পারেন নাই।

যে সাহেবের সঙ্গে আমার প্রথমদিন কথা হইয়াছিল, আমি ইহা লইয়া তাঁহাকে একদিন যথেষ্ট খোঁচা দিলাম। বলিলাম, ‘কই সাহেব, খরগোশের ছানা পর্যন্ত নাকি!’ সাহেব একটু বিরক্ত হইয়া বলিলেন, ‘রাক্ষুসে বাঘের কথা তোমাদের গল্প, নইলে তিনদিন সকলে মিলে এত খোঁজাখুঁজি করলাম, তার খবর কিছুই তো মিলল না বাঘ-টাঘ কিছুই নেই, তোমরা লোকদের ভয় দেখাবার জন্যে গল্প তৈরি করেছ।’ আমি চুপ করিয়া গেলাম বলিতে পারিতাম, ‘সাহেব, রঙ্গ করবার জন্যে কেউ কি নিজের ক্ষতি করে?’ সত্যই কিন্তু একটা আশ্চর্যজনক ব্যাপার ঘটিয়াছিল।

হাজারিবাগের শিকারিদল আসিবার পর হইতে আজ পর্যন্ত বাঘটা একবারও এদিক মাড়ায় নাই। বাঘেও সাদা ও কালো চামড়ার প্রভেদ বুঝিতে পারে নাকি?

কিন্তু আমার খোঁচাটা সাহেবের মনে লাগিয়াছিল। তিনি ভিতরে ভিতরে বাঘ মারিয়া নাম কিনিবার জন্য বদ্ধপরিকর হইতেছিলেন। পরদিন সকালে যখন তাঁহারা শিকার করিতে বাহির হইলেন, তখন আমিও কতকটা পথ তাঁহাদের সঙ্গে গিয়াছিলাম, কিন্তু শেষে খনির কাজ আরম্ভ করিবার জন্য ফিরিয়া আসিলাম। ফিরিবার সময় সাহেব আমাকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘বাবু, আজ একটা হেস্তনেস্ত করে ছাড়ব!’

সাহেব হেস্তনেস্ত করিয়া ছাড়িয়াছিলেন এটা ঠিক, কারণ সেদিন সকলের সঙ্গে প্রাণ লইয়া ফিরিতে পারেন নাই। হঠকারিতার ফলে সুদূর ইংল্যান্ডের অধিবাসীটিকে সেদিন ছোটোনাগপুরের এক জঙ্গলে প্রাণ বিসর্জন দিতে হইয়াছিল। আমি কথার মারপ্যাঁচে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলাম বলিয়া আজিও অনুতপ্ত।

পূর্ব-দিনের মতো সন্ধ্যার আগে শিকারিদল কিছুই সুবিধা করিতে পারেন নাই। কিন্তু ফিরিবার পথে এক জায়গায় একটা ঝোপের মধ্যে পচা কীসের দুর্গন্ধ পাইয়া, তাহার অনুসন্ধান করিতে গিয়া তাঁহারা দেখেন যে, সেখানটায় অনেক হাড়গোড়, কাঁচামাংস ও মাথা ইত্যাদি স্তূপীকৃত রহিয়াছে এবং সেইসব পচিয়া দুর্গন্ধ বাহির হইতেছে। কাছাকাছি কোথাও বাঘ আছে ইহা নিশ্চয় জানিয়া শিকারিরা অন্ধকারের ভয়ে তাঁবুর ঘেরায় ফিরিয়া আসিতে মনস্থ করেন, কিন্তু উপরিউক্ত সাহেবের হেস্তনেস্ত করিবার প্রবৃত্তি তখনও জাগ্রত রহিয়াছে। তিনি সেইখানেই কোথাও লুকাইয়া থাকিয়া বাঘ মারিবেন, স্থির করিলেন। তাঁহাকে প্রতিনিবৃত্ত করিতে না পারিয়া, আরও দুইজন তাঁহার সহিত রহিয়া গেলেন। বাকি সকলে তাঁবুতে ফিরিয়া আসিলেন। শিকারি তিনজন একটা বড়ো কুল গাছের উপর উঠিয়া প্রতীক্ষা করিতে থাকেন।

সন্ধ্যা অতিক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, বনভূমি এক নিবিড় অন্ধকারে আচ্ছন্ন হইয়া পড়িল। কোনো দিকে কোনো শব্দ নাই, শুধু দূরে পার্বত্যনদী খরস্রোত দারকেশ্বরের জলে একটানা ঝিরঝির শব্দ। রাত্রি গভীর হইবার সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকারের গাঢ়তা ও অরণ্যভূমির নীরবতা যেন একটা ভারের মতো শিকারিদের বুকে চাপিয়া বসিল।

শিকারিদের আন্দাজ ভুল হয় নাই। তাঁহাদিগকে খুব বেশিক্ষণ এইভাবে বসিয়া থাকিতে হয় নাই। পাতার একটা খসখস, খড়খড় শব্দ পাওয়া গেল, কোনো ভারী জানোয়ারের থপথপ পায়ের আওয়াজ––শিকারিরা প্রস্তুত হইয়া বসিলেন। নিম্নে অন্ধকারে দৃষ্টিনিবদ্ধ করিয়া, যেন এক জোড়া জ্বলন্ত চক্ষু একবার ঝলসিয়া উঠিতে দেখিতে পাইলেন। একসঙ্গে তিনজনে গুলি ছুঁড়িলেন। একটা করুণ আর্তনাদ শুনা গেল। পাতার মরমর ও শুকনো ডালের খড়খড় শব্দ শুনা গেল। তারপর সব চুপচাপ। শিকারিরা অনুমান করিলেন, বাঘটা আহত হইয়া পলাইয়া গেল। সাহেব তখন নামিবার উপক্রম করিলেন। দেশি শিকারি দুইজনে বাধা দিলেন। কিন্তু সাহেব তাঁহাদের কথা অগ্রাহ্য করিয়া, ডাল ধরিয়া ঝুলিয়া নীচে লাফাইয়া পড়িলেন। মাটিতে তাঁহার পায়ের শব্দ মিলাইতে না মিলাইতে, একটা গভীর হুংকারধ্বনি শ্রুত হইল। তারপর সাহেবের করুণ আর্তনাদ! একটা ঝুটোপুটির আওয়াজ, বাঘের দ্রুত পলায়নে পাতার শব্দ––তারপর সব স্থির! শিকারি দুইজন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া সেখানে বসিয়া রহিলেন। বাস্তবিক, সেই নিবিড় অন্ধকারে গভীর জঙ্গলের মধ্যে কিছু করিবার উপায় ছিল না। ডাকিয়া চিৎকার করিয়া যে লোক জড়ো করিবেন, আলো আনিবার ব্যবস্থা করিবেন, তাহারও উপায় নাই। তাঁবু সেখান হইতে প্রায় ছয় মাইল দূরে। তাঁহারা ব্যথিত মনে সেখানেই রাত্রিযাপন করিলেন তাঁহাদের তৎকালীন মনোভাব কেবলমাত্র কল্পনা করিবার বিষয়।

সকালে তাঁহারা খানিকক্ষণ সাহেবের মৃতদেহের অনুসন্ধান করিবার ব্যর্থ চেষ্টা করিয়া তাঁবুর দিকে ফিরিতেছিলেন। আমরাও সকালের আহার সমাধা করিয়া কী ব্যাপার ঘটিল, তাহা দেখিবার জন্য দ্রুত আসিতেছিলাম। সমস্ত ব্যাপার শুনিয়া স্তম্ভিত হইয়া গেলাম। যেখানে বাঘটা সাহেবকে আক্রমণ করিয়াছিল, সেখানে রক্তের দাগ। যতদূর বুঝিতে পারিলাম, বন্দুকের গুলিতে বাঘটা আহত হইয়াছিল তবে আঘাত নিশ্চয়ই গুরুতর হয় নাই, ল্যাজে কিংবা পায়ে কোথাও লাগিয়া থাকিবে। আমরা তন্নতন্ন করিয়া সাহেবের অনুসন্ধান করিতে লাগিলাম।

কিছুক্ষণ পরে তাঁহার সন্ধান মিলিল। নদীর ধারেই একটা ঝোপের মধ্যে সাহেবের মৃতদেহ পড়িয়া আছে। শিকারির সুসজ্জিত বেশ ছিন্নভিন্ন। পিঠের অর্ধেকটা ব্যাঘ্রের উদরে ইতিমধ্যেই গিয়াছে, শরীরের বাকি অংশ যেমনকার তেমনি আছে। সাহেবের বন্ধুরা হাহাকার করিয়া উঠিলেন। অন্য সাহেবটি মৃতদেহ হাজারিবাগে লইয়া যাইবার কল্পনা করিতে লাগিলেন। আমরা বলিলাম, তাহাতে কাজ নাই হাজারিবাগে পৌঁছাইবার পূর্বেই মৃতদেহ বিকৃত ও দুর্গন্ধপূর্ণ হইয়া পড়িবে। আমি সাহেবের সেই মৃতদেহের সাহায্যেই বাঘটাকে মারিবার কথা বলিলাম। অসমাপ্ত আহারের লোভে ক্ষুধার্ত ব্যাঘ্র আবার আসিবে, এ বিশ্বাস আমার ছিল। আমি আমার সহযোগীকে তাঁবুতে পাঠাইয়া দিয়া, প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি লইয়া আসিবার জন্য আদেশ করিলাম। সাহেবের মৃতদেহটি একটা লোহার তারে বাঁধিয়া, একখানা ভারী পাথরের সহিত সংযুক্ত করিয়া দেওয়া হইল, যেন উহা কাঁধে করিয়া বাঘ পলাইতে না পারে। তারপর নদীর ধারে মৃতদেহের কাছাকাছি, উচ্চ বাঁশের চারিটি মাচা তৈয়ার করা হইল। মাচা শেষ করিতেই সন্ধ্যা হইয়া আসিল। আমরা সেদিনের মতো আহারের আশা ত্যাগ করিয়া, চারিটি মাচায় ভাগাভাগী করিয়া বসিলাম প্রত্যেক মাচায় দুইজন করিয়া লোক রহিল। কুলিদিগকে বিদায় করিয়া দিয়া, আমরা সেখানেই অপেক্ষা করিতে লাগিলাম।

মাচাগুলির উচ্চতা প্রায় আট হাত হইবে। শক্ত শক্ত বাঁশের খুঁটির উপর একখানা করিয়া তক্তা দিয়া মাচা বাঁধা। আমি যে মাচাটায় ছিলাম, তাহারই হাত কয়েক দূরে পাথরের সহিত আবদ্ধ সাহেবের মৃত-দেহ। আমার সহকারীও আমার সঙ্গে একই মাচাতে ছিল। আমরা বন্দুক হাতে নিস্তব্ধ ও সজাগ হইয়া রহিলাম। পাহাড়ের উপর যে-রাত্রে এইভাবে বসিয়াছিলাম, সেদিনের কথা মনে হইতে লাগিল। সেদিনের মতো আজও কি বিফল মনোরথ হইতে হইবে? সাহেবের অকাল ও আকস্মিক মৃত্যু আমাদের মনে একটা বোঝার মতো চাপিয়া ছিল। তাঁহার মৃত্যুর প্রতিশোধ লওয়াও আমাদের একটা কর্তব্যের মধ্যে দাঁড়াইয়াছিল।

কোনো দিকে কোনো শব্দ নাই, কেবল নদীস্রোতের ঝিরঝির শব্দ। ওইভাবে চুপ করিয়া বসিয়া বসিয়া আমার কেমন তন্দ্রা আসিল। হঠাৎ অদূরে একটা খসখস––মড়মড় শব্দ শুনিয়া তন্দ্রা ভাঙিয়া গেল। জাগিয়া বন্দুকটা সজোরে ধরিয়া বসিলাম। কান খাড়া করিয়া রহিলাম। বোধ হইল, যেন কোনো বিপুলকায় জন্তু ঝোপের ভিতর দিয়া পথ করিয়া ধীরে ধীরে কাছে আসিতেছে। বন্দুকটি হাতে তুলিয়া লইলাম। আমি কিছুক্ষণ ঠিক প্রস্তর মূর্তির মতো বসিয়াছিলাম। চক্ষে পলক পর্যন্ত পড়িতেছিল না, শুধু বুকের ভিতর আশা ও আশঙ্কার একটা দ্বন্দ্ব চলিতেছিল।

মুহূর্ত কয়েক এইভাবে অতিবাহিত হইল। আহার-লোভী ব্যাঘ্রের একটা দীর্ঘনিশ্বাস শুনা গেল। তার পরেই একটা ঘোঁতঘোঁত শব্দ শুনিলাম, মনে হইল সে আমাদের অস্তিত্ব জানিতে পারিয়াছে। ভয় হইল, বুঝি বা পলাইয়া যায়।

কিন্তু সে পলাইল না। অন্যান্য মাচা হইতে তখন ফিসফিস শব্দ আসিতেছিল। অনুভবে বুঝিলাম, তাঁহারাও ব্যাঘ্রের আগমনবার্তা পাইয়াছেন। আমার ভয় হইল, পাছে ঠিক সময় উপস্থিত হইবার পূর্বেই কেহ গুলি ছুঁড়িয়া সব পণ্ড করিয়া দেন।

কিন্তু সকলেই পাকা শিকারি, গোলমাল না করিয়া কান পাতিয়া বসিয়া রহিলেন। বাঘটা অন্য কাহারো দিকে না গিয়া আমারই মাচার নীচে ঘুরঘুর করিতে লাগিল। তাহাকে যে দেখিতে পাইতেছিলাম, তাহা নহে, তবে আভাসে, পাতার শব্দে বুঝিতে পারিতেছিলাম, সে নীচেই আছে। আন্দাজে গুলি ছোঁড়াটা যুক্তিযুক্ত মনে হইল না। গুলির আওয়াজে যদি সে লাফাইয়া মাচার উপর পড়ে, তাহা হইলে মাচাসুদ্ধ ভূমিসাৎ হইয়া মৃত্যুমুখে পতিত হওয়া অনিবার্য। আট হাত লাফ দিয়া একেবারে তক্তার উপর উঠা বিচিত্র নহে। ভয়ে আমার শরীরের রক্ত হিম হইয়া গেল। চুপ করিয়া নিষ্পলক নেত্রে বসিয়া রহিলাম।

অনেকক্ষণ এইভাবে কাটিল। নীচে চাহিয়া বাঘের দেহের একটুও আভাস যদি পাই, তাহাই লক্ষ করিতে লাগিলাম। মনে হইল, যেন দেখিতে পাইয়াছি একটা ছায়ার মতো অস্পষ্ট মূর্তি যেন আমারই দিকে অগ্রসর হইতেছিল। বেশিক্ষণ লক্ষ করিয়া থাকিয়া মনে হইল, ছায়া স্পষ্টতর হইল। আর অপেক্ষা করা সঙ্গত নহে ভাবিয়া বন্দুক তুলিলাম এবং ঘোড়া টিপিবার সঙ্গে সঙ্গেই চিৎকার করিয়া অন্যান্য মাচার সকলকে সাবধান করিয়া দিলাম। পরমুহূর্তে আহত ব্যাঘ্রের উল্লম্ভনের দাপটে এবং আকাশ-পাতালভেদী গর্জনে দশদিক কাঁপিয়া উঠিল। বন্দুকের ঝলক ও আওয়াজ মিলাইতে না মিলাইতে এক করুণ আর্তনাদ শ্রুত হইল। সেই বিশালকায় হিংস্র জন্তুও নিতান্ত অসহায় জীবের মতো ক্রন্দন করিতে লাগিল দেখিয়া, কেমন একটা অস্বস্তি অনুভব করিলাম। গুলির আঘাত নিশ্চয়ই মারাত্মক হইয়া থাকিবে, কারণ বাঘটা সেখানেই মাটিতে মুখ গুঁজিয়া আর্তনাদ করিতে লাগিল। সেই শব্দ লক্ষ করিয়া আবার গুলি ছুঁড়িলাম সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য মাচা হইতেও গুলির আওয়াজ হইতে লাগিল।

সেই কাতর আর্তনাদ ক্রমশ নিস্তেজ হইয়া আসিতেছিল। ধীরে ধীরে তাহা অনেকটা দীর্ঘনিশ্বাসের মতো শব্দে পরিণত হইল এবং শেষে তাহাও একেবারে থামিয়া গেল।

আমরা বাঘের মৃত্যু সম্বন্ধে একপ্রকার নিশ্চিন্ত হইলেও, সে রাত্রে কেহ মাচা হইতে নামিলাম না। সাহেবের দুর্দশার কথা তখনও আমাদের মনে জাগিতেছিল। পরদিন সকাল হইবার সঙ্গে সঙ্গে সকলে মাচা হইতে নামিয়াই যে দৃশ্য প্রত্যক্ষ করিলাম, তাহা বর্ণনার ভাষা আমার নাই। অদূরে তারে বদ্ধ সাহেবের অর্ধভুক্ত মৃতদেহ তাহারই অনতিদূরে মূর্তিমান রাক্ষসের মতো বাঘের সেই বিরাট দেহ একেবারে চিত হইয়া পড়িয়া রহিয়াছে। তাহার দাঁতগুলি বাহির হইয়া রহিয়াছে কিন্তু চোখ দুইটি তখনও জ্বলজ্বল করিতেছে। প্রথমটা তাহার কাছে ঘেঁষিতে ভয় হইতেছিল। তারপর ভালো করিয়া দেখিয়া বুঝিলাম, বাঘের ধড়ে আর প্রাণ নাই।

ইহার পর আমরা চারিজনে সাহেবের মৃতদেহ ধরাধরি করিয়া তাঁবুর দিকে লইয়া চলিলাম। অন্য চারিজন ততক্ষণ সেখানে অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। তাঁবুতে ফিরিয়া লোক পাঠাইয়া বাঘের মৃতদেহটিও লইয়া আসা হইল। সাহেবের মৃত্যুতে দুঃখের একটা ছায়া পড়িলেও, বাঘ মারার আনন্দে কুলিরা কোলাহল করিতে লাগিল। কোনো প্রকারে তাহাদের থামাইয়া, তাড়াতাড়ি সাহেবের একটা গোর দিলাম।

বাঘটাকে মাপিয়া দেখা হইল ১১ ফুট লম্বা। এত বড়ো বাঘ আমি ইতিপূর্বে চোখে দেখিয়া থাকিব, কিন্তু এরূপ ভয়ংকর বাঘের সহিত জীবনে আর সাক্ষাৎ হয় নাই।

আমাদের অভ্রের খনির কাজের যে একটিমাত্র ব্যাঘাত ছিল, তাহা দূর হইল। ইহার পর নির্বিঘ্নে কাজ চলিতে লাগিল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *