ধ্রুব
রাজা উত্তানপাদের সুরুচি ও সুনীতি নামে দুই রানি ছিলেন। দুই রানির দুইটি ছেলে ছিল। সুরুচির ছেলের নাম উত্তম ও সুনীতির ছেলের নাম ধ্রুব। রাজা সুরুচিকে বেশি ভালোবাসিতেন। সুনীতিকে অবহেলা করিতেন বলিয়া তাঁহার দুঃখের অবধি ছিল না।
একদিন রাজা উত্তমকে কোলে লইয়া সিংহাসনে বসিয়া আছেন, এমন সময় ধ্রুব সেখানে উপস্থিত হইল এবং উত্তমের দেখাদেখি পিতার কোলে উঠিবার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করিতে লাগিল। সুরুচি নিকটেই ছিলেন। শিশু ধ্রুবকে দেখিয়া রাজার হৃদয় করুণায় ভরিয়া উঠিলেও সুরুচির ভয়ে তাহাকে কোলে লইতে সাহস করিলেন না।
ধ্রুবের এই আবদার সুরুচির পক্ষে অসহ্য হইয়া উঠিল। তিনি বলিলেন, ‘নির্বোধ শিশু, কোন সাহসে তুমি রাজার কোলে বসিতে চাও? তুমি কি জানো না, সুনীতি তোমার মা! ভাগ্যক্রমে যদি আমার গর্ভে জন্মগ্রহণ করিতে, তবেই এই উচ্চ আশা শোভা পাইত! তুমি রাজার পুত্র বটে কিন্তু যখন সুনীতির গর্ভে জন্মিয়াছ তখন রাজ্যের কোনো কিছুতেই তোমার অধিকার নাই!’
বিমাতার কঠিন বাক্যে মর্মাহত হইয়া ধ্রুব কাঁদিতে কাঁদিতে মায়ের কাছে গিয়া সকল কথা বলিল। সুনীতি বলিলেন, ‘বাছা সুরুচি যাহা বলিয়াছে, সে কথা মিথ্যা নয়। তুমি মন্দভাগ্য না হইলে এমন হইবে কেন? সুরুচি পূর্বজন্মের পূণ্যবলে আজ রাজার প্রিয়তমা মহিষী হইয়াছে এবং তাহার পুত্রও সিংহাসনে বসিবার যোগ্য হইয়াছে। তোমার যখন সেরূপ পূণ্যের বল নাই, তখন বৃথা অভিমান করিয়া লাভ কী? তুমি পূণ্য সঞ্চয়ে যত্নবান হও। একমাত্র দীনশরণ হরি ভিন্ন দরিদ্রের আর কেহই নাই। তুমি হরিকে ডাকিতে থাকো। তিনি কৃপা করিলে সকল দুঃখ দূর হইবে।’
জননীর কথা শুনিয়া ধ্রুব বলিল, ‘আচ্ছা, উত্তম রাজসিংহাসন লাভ করুক, ইহাতে আমার কোনো দুঃখ নাই। হরির কৃপায় আমি এমন স্থান লাভ করিব, যাহা আমার পিতাও প্রাপ্ত হন নাই।’
এই বলিয়া সেই পাঁচ বৎসরের শিশু ধ্রুব গভীর রাত্রিতে গৃহত্যাগ করিয়া হরির অন্বেষণে বাহির হইল। একটা বনে প্রবেশ করিয়াই ধ্রুব দেখিল, পুলহ, পুলস্ত্ব্য, বশিষ্ঠ প্রভৃতি সাতজন ঋষি তপস্যায় নিযুক্ত আছেন। তাঁহাদিগকে প্রণাম করিয়া ধ্রুব আপনার মনের দুঃখ জানাইল। শেষে চোখের জল মুছিতে মুছিতে বলিল, ‘আমি অর্থ কিংবা রাজ্য কামনা করি না। আমি এমন স্থান পাইতে ইচ্ছা করি, যাহা পূর্বে আর কেহ কখনো লাভ করে নাই। আপনারা আমাকে তাহার উপায় বলিয়া দিয়া কৃতার্থ করুন।’
তখন ঋষিগণ একবাক্যে ধ্রুবের জননী যেকথা বলিয়াছিলেন, সেই কথাই সমর্থন করিলেন। তাঁহারা বলিলেন, ‘বৎস, তুমি হরির আরাধনায় নিযুক্ত হও, তাহা হইলেই নিশ্চিত তোমার অভিলাষ পূর্ণ হইবে। তাঁহার কৃপায় সকল দুঃখই চলিয়া যাইবে। ঋষিগণ ধ্রুবকে হরি-আরাধনার মন্ত্রও শিখাইয়া দিলেন।
ইহার পর যমুনাতটে মধুবন নামক স্থানে উপস্থিত হইয়া ধ্রুব অতি কঠোর তপস্যা আরম্ভ করিল। এইরূপ কথিত আছে, তাহার তপস্যার প্রভাবে দেবগণ পর্যন্ত ভীত হইয়া নানা উপায়ে তাহা ভঙ্গ করিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। কিন্তু শিশুর গভীর বিশ্বাস ও ঐকান্তিক ভক্তির নিকট তাঁহাদের সমুদয় কৌশল ও মায়া পরাস্ত হইল।
দেবগণ তখন বিষ্ণুর নিকট উপস্থিত হইয়া আপনাদের দুঃখ জানাইলেন। বিষ্ণু বলিলেন, ‘তোমাদের ভয়ের কোনো কারণ নাই। উত্তানপাদ-তনয় ধ্রুব ইন্দ্রত্ব বা কুবেরত্ব লাভের প্রয়াসী নহে। আমি তাহার কামনা পূর্ণ করিব।’ এই বলিয়া তিনি ধ্রুবের সমক্ষে স্বপ্রকাশ হইয়া বলিলেন, ‘বৎস, তোমার তপস্যায় আমি প্রীত হইয়াছি। অভিলষিত বর প্রার্থনা করো।’ সেই দিব্যমূর্তি দর্শন করিয়া ধ্রুব রোমাঞ্চিত কলেবরে ধীরে ধীরে বলিল, ‘প্রভু তোমার দর্শন লাভেই আমার অভিলাষ পূর্ণ হইয়াছে। আর কী বর প্রার্থনা করিব? এই আশীর্বাদ করো যেন তোমার চরণে চিরকাল মতি থাকে।’
তখন ভক্তবাঞ্ছাকল্পতরু শ্রীহরি বলিলেন, ‘বৎস প্রাণে কী গভীর বেদনা লইয়া তুমি তপস্যায় বাহির হইয়াছিলে এবং মনে মনে কী প্রার্থনা করিয়াছিলে, তাহা আমার কাছে লুকোনো নাই। তুমি যে সর্বোত্তম স্থানের আকাঙ্ক্ষা করিয়াছিলে তাহা অবশ্য পাইবে। তোমার জন্য সর্বোপরি ধ্রুবলোক নির্মিত হইয়াছে। তুমি কল্প কল্পান্তকাল সেখানে অবস্থিতি করিবে এবং তোমার সৌভাগ্যবতী জননী সুনীতি দেবী তারকারূপে চিরকাল তোমার নিকট বিদ্যমান থাকিবেন।’
বিমাতার কঠিন বাক্যে ধ্রুবের অভিমান
সায়ম্ভূর নামে মনু খ্যাত চরাচরে।
দুই পুত্র লভিলেন বিধাতার বরে।।
জ্যেষ্ঠপুত্র শুদ্ধমতি প্রিয়ব্রত নাম।
কনিষ্ঠ উত্তানপাদ অতীব ধীমান।।
উত্তানপাদের এবে শুনহ চরিত।
দুই নারী ছিল তাঁর জগতে বিদিত।।
সুনীতি, সুরুচি হয় দোঁহার আখ্যান।
সুরুচিতে কিন্তু রত রাজা মতিমান।।
কালক্রমে ধ্রুব জন্মে সুনীতি উদরে।
উত্তম সুরুচি গর্ভে জনমিল পরে।।
প্রেয়সীর গর্ভজাত উত্তম নন্দন।
এ হেতু রাজার হয় অতি প্রিয়তম।।
সুরুচির প্রীতি হেতু সদা নরপতি।
উত্তমেরে কোলে লয়ে করেন বসতি।।
নানা মতে মনসুখে করেন আদর।
একদিন আসে ধ্রুব নৃপতি-গোচর।।
শিশুমতি ধ্রুব আমি পিতার সদনে।
বাসনা করায় হৃদে অঙ্কে আরোহণে।।
ধ্রুবের এতেক ভাব করি দরশন।
কারুণ্যরসেতে ভাসে নৃপতির মন।।
প্রেয়সী সুরুচি কিন্তু আছিল সেখানে।
ধ্রুবেরে না কোলে নিলে এই সে কারণে।।
প্রিয়ার ভয়েতে নাহি করিল আদর।
শিশুর বাসনা, উঠে অঙ্কের উপর।।
ধ্রুবেরে উৎসুক হেরি সুরুচি তখন।
গর্বিত বচনে কহে করি সম্বোধন।।
‘মম গর্ভে নহে শিশু তোমার জনম।
তবে কেন হেন আশা কর অকারণ।।
মম পুত্র যেই ক্রোড় করেছে আশ্রয়।
সেই ক্রোড়ে বসিবার যোগ্য তুমি নয়।।
অট্টালিকা রাজ্য আদি আর সিংহাসন।
যাহা কিছু তুমি শিশু করিছ দর্শন।।
মমপুত্র অধিকারী জানিবে সবার।
দাঁড়ায়ে বিফলে কষ্ট কেন পাও আর।।’
সুরুচির হেন বাক্য করিয়া শ্রবণ।
অভিমানে যায় শিশু জননী সদন।।
রোষে বিষাদে তার কাঁপিছে অধর।
সুনীতি পুত্রেরে হেরি হইল কাতর।।
অঙ্কের উপর তারে করিয়া ধারণ।
মধুর বচনে কহে করি সম্বোধন।।
‘কেন বাছা রোষাকুল নেহারি তোমারে।
ব্যাকুল হয়েছ কেন আপন অন্তরে।।
তোমা ধনে অনাদর কৈল কোন জন।
বলো তাহা বিবরিয়া আমার সদন।।
তব পাশে অপরাধ যদি কেহ করে।
রাজার অবজ্ঞা হয় জানিবে অন্তরে।।’
এরূপে প্রবোধ কত দিলেন সুনীতি।
দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে ধ্রুব মহামতি।।
রোদন করিল কত ক্ষোভ অভিমানে।
ধীরে ধীরে কহে পরে আকুল বচনে।।
নিদারুণ বাক্য যাহা সুরুচি কহিল।
জননী সকাশে ধ্রুব সব নিবেদিল।।
পুত্রের বিষাদ ভাব দেখিয়া নয়নে।
সপত্নীর কটুবাক্য শুনিয়া শ্রবণে।।
শোকাবেগ সম্বরিত নারিল সুনীতি।
নয়ন-সলিলে-ক্রমে ভাসে বসুমতী।।
অশ্রুপূর্ণ নেত্রে পরে গদগদ বচনে
সম্বোধিয়া কহে সতী ধ্রুব পুত্রধনে।।
‘শুনো শুনো বৎস এবে আমার বচন।
সুরুচি বলেছে কটু ওরে বাছাধন।।
হতভাগ্য বলিয়াছে তোমা হেন ধনে।
মিথ্যা নহে সেই কথা কহি তব স্থানে।।
সংসার মাঝারে যারা হয় পুণ্যবান।
তাদিগে না বিধে কভু শত্রু বাক্যবাণ।।
অতএব পরিতাপ নাহি করো আর।
পূর্বকৃত কর্মফল ভুঞ্জ আপনার।।
যেমন করেছ কর্ম পূরব-জনমে।
সেইরূপ ফলভোগ করহ এক্ষণে।।
জন্মার্জিত পাপপুণ্য কে করে লঙ্ঘন।
লঙ্ঘিতে কাহার সাধ্য বলো বাছাধন।।
জন্মার্জিত পুণ্য যদি থাকে বিদ্যমান।
সিংহাসন ছত্র গজ পায় যে ধীমান।।
ঐশ্বর্যের অধিকারী সেই জন হয়।
এত ভাবি হও বৎস প্রশান্ত হৃদয়।।
সুরুচি বিস্তর পুণ্য করেছে অর্জন।
সে হেতু রাজার প্রিয়া হয়েছে এখন।।
পুণ্যশীল উত্তমেরে ধরেছে উদরে।
ভাগ্যহীনা আমি বাছা এ ভব-সংসারে।।
পূর্বজন্মে কত পাপ করেছি না জানি।
কীসে হব প্রিয়তমা রাজার রমণী।।
মন্দভাগ্য তুমি বাছা এ ভব-সংসারে।
সে হেতু ধরেছ জন্ম আমার উদরে।।
অতএব শোকাকুল নাহি হও আর।
জন্মার্জিত কর্মফল ভুঞ্জ আপনার।।
বুদ্ধিমান হয় যারা এ বিশ্ব সংসারে।
সর্ব অবস্থায় রয় সন্তুষ্ট অন্তরে।।
সুরুচির বাক্যে যদি হয়েছ কাতর।
তবে মম কথা শুনো ওরে গুণধর।।
সর্বভূত হিতকামী হয়ে সর্বক্ষণ।
সুশীল সতত হয়ে ধর্মপরায়ণ।।
সর্বফলপ্রদ পুণ্য করিতে সঞ্চয়।
অনুক্ষণ হও বৎস সযত্ন হৃদয়।।
মনে ভাবি দেখো বাছা সলিল যেমন।
নিম্ন স্থান পেলে করে আশ্রয় গ্রহণ।।
সম্পদ সেরূপ বাছা জানিবে অন্তরে।
নম্র হলে সেই পাত্রে সমাশ্রয় করে।।
ধ্রুবের তপস্যায় গমন ও
সপ্তঋষি স্থানে উপদেশ গ্রহণ
উপদেশ যদি দিল এরূপে সুনীতি।
সম্বোধিয়া তাঁরে কহে ধ্রুব মহামতি।।
‘সান্ত্বনা কারণ মাতা তুমি গো আমারে।
উপদেশ দিলে বটে বিহিত প্রকারে।।
কিন্তু গো ধারণে তাহা না হই সক্ষম।
বিদীর্ণ করিছে হৃদি বিমাতা––বচন।।
এখন নিবেদি মাতা, তোমার চরনে।
সর্বোৎকৃষ্ট পুণ্য যাহা এ বিশ্ব ভুবনে।।
সে পরমপদ লাভ যেইরূপে হয়।
করিব সে চেষ্টা আমি জানিবে নিশ্চয়।।
যদিও রাজার প্রিয়া সুরুচি উদরে।
নাহি জন্মি, জন্মিয়াছি তোমার জঠরে।।
তথাপি প্রভাব মাতা, দেখিবে আমার।
উত্তম লভুক রাজ্য সিংহাসন আর।।
কিছুই আপত্তি মম নাহিকো তাহাতে।
অন্য দত্ত, রাজ্যপদ নাহি বাঞ্ছি চিতে।।
যে পদ লভিতে পিতা না হন সক্ষম।
সে পদ লভিব আমি যত্নে অনুপম।।
নিজ কর্মবলে তাহা লভিব নিশ্চয়।
ইথে কিছু হৃদে মাগো, করো না সংশয়।।’
এত বলি জননীরে করিয়া প্রণতি।
বিদায় লইল মাগি ধ্রুব মহামতি।।
নগরের বহির্ভাগে করিয়া গমন।
পশিলেন একচিতে গহন কানন।।
পুলহ, পুলস্ত্ব্য আদি সপ্তর্ষিপ্রবর।
এ ঘটনা হৃদি মাঝে করিয়া গোচর।।
ধ্রুবের উপরে কৃপা করিবার তরে।
বসিয়া ছিলেন আসি কানন ভিতরে।।
একান্তে বিস্তৃত করি কুশের আসন।
তদুপরি স্থাপি কৃষ্ণাজিন আস্তরণ।।
উপবিষ্ট আছে সবে প্রসন্ন বদনে।
ধ্রুব গিয়া ভক্তিভরে বন্দিল চরণে।।
প্রণমিয়া করপুটে কহিল তখন।
‘শুনো শুনো নিবেদন মহাশয়গণ।।
উত্তানপাদের পুত্র ধ্রুব মম নাম।
জননী সুনীতি মম খ্যাত সর্বস্থান।।
নিতান্ত নির্বেদ মম জন্মেছে অন্তরে।
এ হেতু এসেছি আমি কানন ভিতরে।।
আপনা সবারে আমি করিনু আশ্রয়।
কৃপা করো মমপ্রতি হইয়া সদয়।।’
ধ্রুবের এরূপ বাক্য করিয়া শ্রবণ।
সম্বোধিয়া কহে তারে সপ্তঋষিগণ।।
‘পঞ্চম বর্ষীয় শিশু তুমি হে কুমার।
এ হেন বয়সে কিবা নির্বেদ তোমার।।
বিশেষত পিতা তব আছে বিদ্যমান।
কিছুমাত্র চিন্তা তব নাহি মতিমান।।
আকার তোমার বৎস নেহারি যেমন।
পীড়িত বলিয়া তাহে নাহি লয় মন।।
অতএব কিবা তব নির্বেদ কারণ।
প্রকাশ করিয়া কহ, নৃপতি নন্দন।’
মহর্ষিরা এইরূপ জিজ্ঞাসা করিলে।
ভাসিতে ভাসিতে ধ্রুব নয়ন সলিলে।।
বিমাতার কটুবাক্য করি নিবেদন।
জননীর উপদেশ করিল কীর্তন।।
সমুদয় পরিজ্ঞাত হয়ে ঋষিগণ।
বিষাদ-সলিলে সবে হন নিমগন।।
কহিলেন বাখানিয়া সবে পরস্পর।
ক্ষত্রিয় জাতির কী বা তেজ ভয়ংকর।।
পঞ্চম বর্ষীয় এই ক্ষত্রিয় নন্দন।
কটুবাক্য সহিবারে না হয় সক্ষম।।
তারপর কহিলেন রাজার নন্দনে।
‘কহো শিশু, কী বাসনা জাগে তব মনে।।’
এত শুনি ধ্রুব কহে, ‘ওহে ঋষিগণ।
ঐশ্বর্যে বাসনা মম না আছে কখন।।
রাজ্যলাভে ইচ্ছা কভু নাহিকো অন্তরে।
বাসনা আমার যাহা করি সবাকারে।।
সর্বলোক সুদুর্লভ পরম সে স্থান।
সেপদ লভিতে বাঞ্ছা করে মোর প্রাণ।।
সে পরম পদ আমি যেইরূপে পাই।
উপায় বলিয়া দাও, তোমার গোঁসাই।।
মহর্ষি মরীচি শুনি ধ্রুবের বচন।
মধুর ভাষণে কহে করি সম্বোধন।।
‘হরি-আরাধনা বিনা সে পরম স্থান।
কভু নাহি লাভ হয়, ওহে মতিমান।।
অতএব মমবাক্য করহ গ্রহণ।
হরি-আরাধনে চিত্ত করো নিয়োজন।।’
অক্রি ঋষি সম্বোধিয়া কহেন ধ্রুবেরে।
‘ওহে রাজসুত, বলি শুনহ তোমারে।।
হরিরে সন্তুষ্ট করে যেই মহাজন।
অক্ষয় লোকেতে সেই করায় গমন।।’
মহর্ষি অঙ্গিরা বলে, ‘শুনহ কুমার।
ভগবান বিষ্ণু হন সর্বলোক সার।।
ব্যাপিয়া আছেন তিনি এ ভব সংসারে।
শ্রেষ্ঠলোক লাভে বাঞ্ছা থাকিলে অন্তরে।।
আরাধনা করো তাঁর নৃপতি নন্দন।
মনোরথ হবে সিদ্ধ, আমার বচন।।’
পুলস্ত্ব্য কহেন, ‘শুনো, ওহে মহামতি।
পরব্রহ্মরূপ বিষ্ণু সবাকার প্রতি।।
তাঁর আরাধনা করে যেই মহাজন।
মোক্ষপদ পায় সেই শাস্ত্রের বচন।।’
ক্রতু বলে, ‘শুনো বৎস রাজার কুমার।
যজ্ঞীয় পুরুষ যেই হরি গুণাধার।।
পরব্রহ্ম বলি তাঁরে চিন্তে যোগীগণ।
অসাধ্য কী থাকে তাঁরে করিলে ভজন।।’
পুলহ কহেন, ‘শুনো ধ্রুব মহামতি।
ইন্দ্রদেব দেবরাজ যিনি শচীপতি।।
হরি আরাধনা করি, সেই দেবরাজ।
ইন্দ্রত্ব করেন বসি অমর সমাজ।।
একান্ত অন্তরে তুমি, ওহে বাছাধন।
সেই হরি আরাধনে হও নিমগন।।’
বশিষ্ঠ কহেন, ‘শুনো, ওহে মতিমান।
হরি আরাধনা করে যেই পুণ্যবান।।
অসাধ্য কিছুই নাহি জগতে তাহার।
পরম দুর্লভ পদ করতলে তার।।’
এইরূপ উপদেশ করিয়া শ্রবণ।
রাজসুত ধ্রুব কহে করি সম্বোধন।।
‘নিবেদন ঋষিগণ সবার চরণে।
কৃপা করি উপদেশ দিলে এইক্ষণে।।
কিন্তু এক কথা বলি, ওহে ঋষিগণ।
কীরূপেতে আরাধিব সেই নারায়ণ।।
কীরূপে তাঁহারে বলো তুষিবারে হয়।
উপদেশ দিয়া করো কৃতার্থ হৃদয়।।’
ধ্রুব যদি এইরূপ কহিল বচন।
সম্বোধিয়া কহে তারে সপ্ত ঋষিগণ।।
‘যেইরূপে আরাধনা করিবে হরিরে।
বলিতেছি সেই কথা তোমার গোচরে।।
বিষ্ণু দেবে আরাধিতে হইলে মনন।
প্রথমে তাঁহারে চিত্ত করি সমর্পণ।।
নিমগ্ন হইতে ধ্যানে এই মন্ত্র উচ্চারি।
‘হিরণ্যগর্ভ পুরুষ, তুমি ওহে হরি।।
বাসুদেব তুমি শুদ্ধ জ্ঞানের স্বরূপ।
সবার সমান তুমি অবক্তা অরূপ।।
নমস্কার তোমা প্রভু করি বার বার।’
এরূপ পড়িবে মন্ত্র ওহে গুণাধার।।
তব পিতামহ মনু স্বায়ম্ভুর যিনি।
এই মন্ত্র জপ সদা করিতেন তিনি।।
অতএব এই মন্ত্র জপ গুণাধার।
অবশ্য হবেন প্রীত দেব গদাধর।।’
ধ্রুবের তপস্যায় দেবগণের চাঞ্চল্য
হিত উপদেশ এই শুনিয়া শ্রবণে।
উপনীত হয় ধ্রুব যমুনা পুলিনে।।
যমুনার তীরে শোভে দিব্য মধুবন।
সেইবনে প্রবেশিল সুনীতি নন্দন।।
মধু নামে দৈত্য এক ছিল সেই বনে।
মধুবন নাম তাই হয়েছে ভুবনে।।
বলিষ্ঠ শত্রুঘ্ন দশরথের কুমার।
মধুসুত লবনেরে করিয়া সংহার।।
স্থাপন করেন তথা মথুরা নগরী।
অধিষ্ঠান করে তথা নিরন্তর হরি।।
হরি অধিষ্ঠান হেতু মথুরা নগর।
পাপহর তীর্থ বলি খ্যাত চরাচর।।
সেই স্থানে রাজসুত ধ্রুব মহামতি।
একাগ্র অন্তরে সদা করি অবস্থিতি।।
সপ্তর্ষিগণের পূর্ব উপদেশ মতে।
আরম্ভ করিলা তপ ঐকান্তিক চিতে।।
তপস্যা যখন ধ্রুব করে এক মনে।
অন্তরে নেহারে যেন প্রভু নারায়ণে।।
অনশনে একমনে দিবা-নিশি ধরি।
মনে মনে করে জপ শ্রীহরি শ্রীহরি।।
হরি প্রেমে গদগদ, বিশ্ব হরিময়।
বন্যজন্তু হেরি তাহা হরি ভ্রম হয়।।
কোথা হরি, এসো হরি, হৃদয় কমলে।
হেরিব রক্তিম তব চরণ যুগলে।।
কঠোর তপেতে তবে মেদিনী কাঁপিল।
বসুমতী ভার আর সহিতে নারিল।।
হেন দশা দেখি দেব-উপদেব গণ।
নিতান্ত শঙ্কিত হয়ে করেন চিন্তন।।
ইন্দ্রসহ পরামর্শ করি তারপর।
উপনীত হয় আসি ধ্রুবের গোচর।।
ধ্রুবের সমাধি ভঙ্গ করিবার তরে।
বিস্তারিল মায়াজাল বিহিত প্রকারে।।
মহাত্মা ধ্রুবের মাতা ধর্মিষ্ঠা সুনীতি।
পুত্রের সহিতে সদা করিতেন স্থিতি।।
সুনীতির বেশে এবে দিয়া দরশন।
ধ্রুবেরে ছলনা করে মায়াধরগণ।।
অশ্রুপূর্ণ মুখে তারে সম্বোধিয়া পরে।
কহে, ‘শুনো ওরে বৎস, বলি যে তোমারে।।
করিছ দারুণ তপ ওরে বাছাধন।
ইহাতে হতেছে তব শরীর পতন।।
অতএব ক্ষান্ত হও বচনে আমার।
বহু দুঃখ লভিয়াছি তোমা গুণাধার।।
অনাথা আমার মতো কে আছে সংসারে।
অভাগিনী আমি পুত্র জানিবে অন্তরে।।
বিমাতার কটুবাক্য করিয়া শ্রবণ।
মোরে ত্যাগ করা নহে উচিত কখন।।
পঞ্চমবর্ষীয় শিশু তুমি যে তনয়।
তপস্যার সমুচিত নহে তো সময়।।
বাল্যকালে ক্রীড়া করে যত শিশুগণ।
তারপর গুরুপাশে করি অধ্যয়ন।।
বিষয় সম্ভোগ করে আনন্দ অন্তরে।
ভোগ শেষে তপ করে ভক্তি সহকারে।।
মানবের রীতি এই ওরে বাছাধন।
এ বয়সে তবে তপ কর কী কারণ।।
যদি তুমি মম বাক্য করিয়া শ্রবণ।
কঠোর তপস্যা ত্যাগ না কর এখন।।
তোমার সমক্ষে প্রাণ ত্যজিব নিশ্চয়।
বিবেচিয়া করো বাছা উচিত যা হয়।।’
এরূপে বিলাপ করে সুনীতি সুন্দরী।
ধ্রুব নাহি চাহে কিন্তু একবার ফিরি।।
দেখিয়া দেখিতে নাহি পায় জননীরে।
আশ্চর্য ঘটনা ঘটে শুনো তারপরে।।
অসংখ্য রাক্ষসদল বিকৃত আকার।
অস্ত্র ধরি আসে ছুটে অভিমুখে তার।।
তাহা দেখি ভীতা হয়ে সুনীতি সুন্দরী।
ধ্রুবে কহে মিষ্টভাষে সম্বোধন করি।।
‘দেখো দেখি বৎস, ওই বিকট-দশন।
ভয়ংকর রাক্ষসেরা করে আগমন।।
কী ভীষণ অস্ত্র লয়ে আসিছে সবাই।
পড়িলে ওদের হাতে আর রক্ষা নাই।।
অতএব ত্বরা করি উঠো বাছাধন।
এ স্থান ত্যজিয়া শীঘ্র করো পলায়ন।।’
এত বলি ভীতা হয়ে সুনীতি সুন্দরী।
পলায়ন করে সেই স্থান পরিহরি।।
সেইকালে রাক্ষসেরা গর্জিয়া উঠিল।
অগ্নিময় মুখে আসি ধ্রুবেরে ঘেরিল।।
‘বধ করো, বধ করো করহ ছেদন।
মার মার কাট কাট, করহ ভক্ষণ।।’
এরূপ চিৎকার করে রাক্ষসের দল।
ছুটাছুটি করে আর উগারে অনল।।
সিংহ, ব্যাঘ্র রূপ কভু করিয়া ধারণ।
ধ্রুবের বেষ্টিয়া করে ভয় প্রদর্শন।।
চারিদিকে এইরূপ ভীষণ ব্যাপার।
তবু নাহি টলে ধ্রুব কিবা চমৎকার।।
কিছুতে সমাধিভঙ্গ তাহার না হয়।
কাজে কাজে যত মায়া হইল বিলয়।।
ধ্রুবের কঠোর তপে যত দেবগণ।
একান্ত শঙ্কিত হয়ে উঠিল তখন।।
বিশ্বের কারণ সেই হরির গোচরে।
সবে গিয়া করে স্তব অতি ভক্তিভরে।।
‘শুনো শুনো নিবেদন, ওহে ভগবান।
উত্তানপাদের পুত্র ধ্রুব মতিমান।।
কঠোর তপস্যা করে থাকি মধুবনে।
নিতান্ত হয়েছি ভীত আমরা এক্ষণে।।
ঊর্ধ্বপথে দিন দিন উঠিছে সুমতি।
তপ হেরি হৃদিমাঝে জন্মিয়াছে ভীতি।।
প্রসন্ন হইয়া প্রভু নিবারো তাহারে।
কৃপা করি রক্ষা করো, আমা সবাকারে।।’
দেবতাগণের বাক্য করিয়া শ্রবণ।
তাঁহাদিগে সম্বোধিয়া কহে নারায়ণ।।
‘নাহি ভয়, নাহি ভয় অমর নিকর।
ইন্দ্রত্ব না বাঞ্ছা করে ধ্রুব গুণধর।।
সূর্যত্ব বা কুবেরত্ব নাহি সে চায়।
তাহার বাসনা পূর্ণ করিব ত্বরায়।।’
হরির এতেক বাক্য করিয়া শ্রবণ।
প্রণমিয়া দেবগণ করিল গমন।।
শ্রীহরির নিকট ধ্রুবের
বরলাভ ও সর্বোচ্চ পদপ্রাপ্তি
ধ্রুবের তপস্যা হেরি গোলকের পতি।
চতুর্ভুজ রূপে দেখা দেন দ্রুত গতি।।
তপে তুষ্ট নারায়ণ দিয়া দরশন।
কহিলেন সম্বোধিয়া, ‘ওরে বাছাধন।।
বিষয় বাসনা ত্যাগ করি নিরন্তর।
তপেতে নিমগ্ন আছ হয়ে একান্তর।।
ইহাতে পরম প্রীতি লভিয়াছি আমি।
অভিমত বর এবে চাহি লহ তুমি।।’
প্রীতিময় হরিবাক্য করিয়া শ্রবণ।
আগ্রহে দেখিল ধ্রুব মেলিয়া নয়ন।।
শঙ্খচক্রগদাধারী কিরীটি মুরারি।
যে জন ছিলেন হৃদে দিবা বিভাবরী।।
তিনি বিরাজিত আসি সম্মুখে এখন।
আহ্লাদে উন্মত্ত ধ্রুব প্রেমেতে মগন।।
রোমাঞ্চিত কলেবর হয়ে সেইক্ষণে।
স্তুতিবাদ আরম্ভিল দেব নারায়ণে।।
‘ওহে প্রভু ভগবান করি নিবেদন।
নিতান্ত বালক আমি অতি অকিঞ্চন।।
কীরূপে তোমার স্তব করিব না জানি।
মন কিন্তু উচাটন, ওহে চিন্তামণি।।
যদি তুষ্ট হয়ে থাকো তপেতে আমার।
এই বর দেও তবে, ওহে গুণাধার।।
তব স্তব করিবারে শক্তি যেন পাই।
এইমাত্র মাগি ভিক্ষা জানিবে গোঁসাই।।’
এরূপে বিনীতভাবে সুনীতিনন্দন।
অভিলাষ প্রকাশিলে প্রভুর সদন।।
পাঞ্চজন্য শঙ্খ দিয়া দেবাদেব হরি।
ধ্রুবেরে করিল স্পর্শ অতি দ্রুত করি।।
স্পর্শমাত্র হৈল তার প্রসন্ন অন্তর।
দিব্যজ্ঞান উপজিল চিত্তের ভিতর।।
প্রণত হইয়া পরে করজোড় করি।
নারায়ণে করে স্তব, ‘হে অসুর-অরি।।
তুমি ভূত ভবিষ্যৎ, তুমি বর্তমান।
সর্বব্যাপী, সারা বিশ্বে তুমি বিদ্যমান।।
হইয়াছে তোমা হতে ব্রহ্মাণ্ড সৃজন।
তোমা হতে ব্রহ্মা মনু লভেছে জনম।।
তব চক্ষু হতে জন্ম লভেছে ভাস্কর।
কর্ণ হতে বায়ু আর দিক-দিগন্তর।।
মন হতে চন্দ্রদেব লভেছে জনম।
মুখ হতে জন্মিয়াছে দেব হুতাশন।।
আকাশ মণ্ডল হয় নাভিদেশ হতে।
সমুৎপন্ন স্বর্গভূমি তোমার শিরেতে।।
তব পদদ্বয় হতে উদ্ভব ধরার।
জগতের বীজ তুমি, ওহে গুণাধার।।
প্রকৃত পুরুষ তুমি স্বরাট সম্রাট।
অক্ষয় অব্যয় তুমি, তুমিই বিরাট।।
যোগীগণ সদা ধ্যান করেন তোমারে।
সর্বভূত আত্মা তুমি জগৎ সংসারে।।
সবার হৃদয়ে তুমি কর অবস্থান।
হেরিতেছ সর্ব দৃশ্য, ওহে ভগবান।।
কাহার মনের ভাব তব অগোচর।
অন্তর্যামী তুমি প্রভু, খ্যাত চরাচর।।
পুনঃ পুনঃ নতি করি তোমার চরণে।
পূর্ণ করো মনোরথ কৃপা বিতরণে।।’
এইরূপ স্তুতিবাদ করিয়া শ্রবণ।
সম্বোধিয়া কহে ধ্রুবে দেব নারায়ণ।।
‘যখন নয়নে বৎস, হেরিলে আমারে।
তপস্যা হয়েছে পূর্ণ জানিবে অন্তরে।।
কখনো বিফল নহে আমার দর্শন।
আমার সাক্ষাৎ পায় যেই সাধুজন।।
সমস্ত পদার্থ লাভ সে জনের হয়।
অতএব মাগো বর যাহা মনে লয়।।’
হরির এতেক বাক্য করিয়া শ্রবণ।
ধ্রুব কহে সম্বোধিয়া, ‘ওহে ভগবান।
সবার ঈশ্বর তুমি, সর্ব অন্তর্যামী।।
তবু তব আজ্ঞা আমি পালিব গোঁসাই।
নিবেদিত হৃদয়ের ব্যথা তব ঠাঁই।।
যে পদার্থ লাভ হেতু দুর্বিনীত মন।
বাসনা করিছে সদা, হে হৃদিরঞ্জন।।
নিতান্ত দুর্লভ তাহা এ ভব সংসারে।
তথাপি নিবেদি––প্রভু, তোমার গোচরে।।
বিমাতা সুরুচি মম সমক্ষে পিতার।
কহিয়াছিলেন মোরে করি তিরস্কার।।
‘আর যে নির্বোধ শিশু আমার জঠরে।
জন্ম নাহি লভিয়াছে এ ভব সংসারে।।
তবে কেন বৃথা আশা সিংহাসনে কর।
অধিকার নাহি তব ইহার উপর।।’
এহেন নিষ্ঠুর বাক্য করিয়া শ্রবণ।
সে কালে হৃদয় মম হইল বিদারণ।।
সেই হতে করিয়াছি বৈরাগ্য আশ্রয়।
বাসনা করেছি যাহা শুনো দয়াময়।।
সর্বোত্তম সে পরম দিব্য যেই স্থান।
বিশ্বের আধার যাহা, ওহে ভগবান।।
সেই স্থান লাভ হয় যে হেন প্রকারে।
করিব পরম যত্ন একান্ত অন্তরে।।
এই বাঞ্ছা হৃদিমাঝে আছে চিরকাল।
দয়া করি করো পূর্ণ, হে দীনদয়াল।।’
কাতর বচনে ধ্রুব যাচিল এ বর।
সান্ত্বনা করিয়া হরি কহে অতঃপর।।
‘প্রার্থনা করিছ যাহা, ওরে বাছাধন।
অবশ্য পাইবে তাহা আমার বচন।।
এ জন্মে তপেতে তুষ্ট করিলে আমারে।
হেন বোধ নাহি করো আপন অন্তরে।।
জন্মান্তরে তুমি মম করেছ সাধন।
তাহাতে সন্তুষ্ট আমি ছিনু সর্বক্ষণ।।
রাজপুত হতে বাঞ্ছা করে ছিলে মনে।
জন্মিয়াছ রাজকুলে এই সে কারণে।।
যে কুলে জন্মেছ তুমি, ওরে বাছাধন।
সামান্য পুণ্যের ফল নহে তা কখন।।
বিনা বরে হেন জন কে আছে ধরায়।
স্বায়ম্ভুব বংশে জন্মে বলহ আমায়।।
তব তপে তুষ্ট ছিনু পূরব জনমে।
মনু বংশ জন্মিয়াছ সেই যে কারণে।।
এক মনে মোরে যেই করে আরাধন।
মোক্ষপদ অবহেলে পায় সেই জন।।
পরম পদের বাঞ্ছা হয়েছে তোমার।
লভিতে সে স্থান তুমি প্রসাদে আমার।।
ত্রিলোক অতীত স্থান যাহা উচ্চতর।
তথায় থাকিতে তুমি, ওহে গুণধর।।
নক্ষত্র গ্রহাদি তোমা করিবে আশ্রয়।
থাকিবে তোমার নিম্নে গ্রহ-সমুদয়।।
সপ্তঋষি দেবগণ রহে যেই স্থানে।
তাহার উপরে তুমি থাকিবে গগনে।।
দেবগণ মধ্যে কেহ চারিযুগ ধরি।
থাকিবেন সেই স্থানে সুখভোগ করি।।
মন্বন্তর কাল রবে কোনো কোনো জন।
কল্পকাল রবে কিন্তু তুমি মহাত্মন।।
তোমার জননী যিনি সুনীতি সুন্দরী।
থাকিবেন তব পাশে দিবস-শর্বরী।।
বরদান করিতেছি তব জননীরে।
তারকারূপিনী হয়ে সানন্দ অন্তরে।।
তব সহ সেই লোকে করিবেন স্থিতি।
তারপর শুনো বৎস স্থির করি মতি।।
প্রভাতে অথবা সন্ধ্যাকালে যেই জন।
তব নাম মনসুখে করিবে কীর্তন।।
পুণ্যলোকে যাবে তারা নাহিকো সংশয়।
আমার বচন মিথ্যা কভু নাহি হয়।।’
এইরূপে বর লভি হরির সদনে।
প্রেমেতে বিহ্বল ধ্রুব লুটায় চরণে।।
তদবধি ধ্রুব পায়––সর্বোত্তম স্থান।
যাহার সমান স্থান নাহি বিদ্যমান।।
সম্মান মাহাত্ম্য তার করি দরশন।
বিস্মিত হইল যত দেবঋষিগণ।।
ধ্রুবে পুরোভাগে লহে গ্রহ আদি সবে।
মহাশূন্যে অবস্থিতি করে সগৌরবে।।
