গর্ডন কামিং-এর প্রথম সিংহ
শিকার ও শিকারি সম্বন্ধে সামান্য খবরও যাঁহারা রাখেন, তাঁহারা বিখ্যাত শিকারি গর্ডন কামিং-এর নামের সহিত নিশ্চয়ই পরিচিত। ইনি পৃথিবীর সর্বত্র, বিশেষ করিয়া দক্ষিণ আফ্রিকায়, নানাবিধ হিংস্র জন্তু শিকার করিতে গিয়া, ভয়াবহ বিপদ ও সাক্ষাৎ মৃত্যুকে তুচ্ছ করিয়া যে-সকল বীরত্ব দেখাইয়াছেন, তাহা আমাদের নিকট উপকথার মতো চমকপ্রদ মনে হয়। পশুরাজ সিংহের সহিত যেদিন তাঁহার প্রথম সাক্ষাৎ পরিচয়, সেই স্মরণীয় দিনের যে বর্ণনা তিনি তাঁহার ‘দক্ষিণ আফ্রিকার শিকার-কাহিনী’ নামক পুস্তকে লিপিবদ্ধ করিয়াছেন, তাহা হইতে নিম্নলিখিত অংশ সংকলিত হইল।
সমস্ত দিন জঙ্গলে জঙ্গলে পরিভ্রমণ করিয়া সন্ধ্যার প্রাক্কালে তাঁবুতে ফিরিয়া ক্লান্ত পরিশ্রান্ত দেহে বিশ্রাম করিতে যাইতেছি, এমন সময়, কেমন যেন একটা অপরিচিত অস্বস্তিকর আওয়াজ শুনিয়া সন্ত্রস্ত হইয়া উঠিলাম। তখন চাঁদ উঠিয়াছে, আশপাশের প্রান্তরভূমি একটা আবছা আলোকে আলেকিত। সেই আলো-অন্ধকারের মধ্যে দেখিতে পাইলাম, একদল হিংস্র পশু চঞ্চল হইয়া এদিকে-সেদিকে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। আমি লক্ষ্য স্থির করিয়া গুলি ছুঁড়িলাম, তাহাতেই একটি শত্রু নিপাত হইল। আবার গুলি করিলাম, একটি বৃহৎকায় চিত্রিত হায়েনা সেই আঘাতে ধরাশায়ী হইল এবং নিমেষমধ্যে সেই হিংস্র হায়েনার দল চক্ষুর অন্তরালে চলিয়া গেল। আমি কিয়ৎকাল স্তব্ধভাবে বসিয়া থাকিয়া বন্দুকটা হাতের কাছে রাখিয়া ঘুমাইয়া পড়িলাম।
বেশিক্ষণ ঘুমাইয়াছিলাম বলিয়া মনে হয় না। সেই তন্দ্রার ঘোরে যেন স্বপ্নের মধ্যেই একটা অদ্ভুত গর্জন শুনিতে পাইলাম। স্বপ্নঘোরে মনে হইল, যেন সিংহেরা আমার পাছু লইয়াছে––গর্জন বাড়িয়াই চলিয়াছে। হঠাৎ আমার নিদ্রাভঙ্গ হইল। আমি ভয়ে চিৎকার করিয়া উঠিয়া বসিলাম এবং একটু পরেই অতি নিকটে অত্যন্ত লঘুপদক্ষেপ শুনিতে পাইলাম। মনে হইল, একদল রক্তলোলুপ নেকড়ে বাঘ আমাকে ঘিরিয়া ফেলিয়া হর্ষধ্বনি করিতেছে! ব্যাপার কী? স্থির দৃষ্টিতে চাহিয়া থাকিয়া সভয়ে দেখিলাম, একদল বন্য কুকুর অদ্ভুত আওয়াজ করিতে করিতে উন্মত্তের মতো আমার চতুর্দিকে ছুটাছুটি করিতেছে। আমার ডাইনে-বামে, সামনে-পিছনে এই ভয়ংকর কুকুরদল কান খাড়া করিয়া গলা বাড়াইয়া যেন আমাকেই লক্ষ করিতেছে! একদল আমার গুলিতে হত হায়েনা দুইটাকে টানিয়া ছিঁড়িয়া পৈশাচিক তাণ্ডব শুরু করিয়াছে। আমার ভয় হইল, অবিলম্বে এই রক্তলোলুপ কুকুরের দল আমাকেই ছিঁড়িয়া টুকরা টুকরা করিয়া ফেলিবে। এই কথা ভাবিতেই আমার রক্ত যেন ভিতরে জমাট বাঁধিয়া গেল! কিন্তু ভগবানকে ধন্যবাদ, আমি উপস্থিত বুদ্ধি হারাই নাই। আমি জানতাম যে, মানুষের গম্ভীর গলার আওয়াজকে ইহারা ভয় পায়। এই কথা মনে হইতেই, আমি সোজা হইয়া দাঁড়াইয়া, আমার কম্বলটি দুই হাত দিয়া সবেগে নাড়িতে নাড়িতে, চিৎকার আরম্ভ করিলাম। ইহাতে কাজ হইল। হিংস্র কুকুরদল ভয় পাইয়া খানিকটা দূরে সরিয়া গিয়া আমাকে লক্ষ করিয়া ঘেউ ঘেউ করিতে লাগিল। আমি নিমেষ-মধ্যে বন্দুক হাতে লইয়া গুলি ছুঁড়িবার উপক্রম করিতেই, তাহারা উর্ধ্বশ্বাসে পলায়ন করিল, আর ফিরিল না।
কিছুক্ষণ যাইতে না যাইতে, একটা গুরুগম্ভীর গর্জন শুনিতে পাইলাম। আমি ইতিপূর্বে আর কখনো সিংহনিনাদ শুনি নাই, কোন জন্তুর আওয়াজ শুনিতেছি––তাহাও আমাকে কেহ বলিয়া দেয় নাই, তবুও ঠিক বুঝিতে পারিলাম যে, সিংহগর্জন শুনিতেছি। সেই গম্ভীর রব সমস্ত প্রান্তরে প্রতিধ্বনিত হইয়া দূরে মিলাইয়া যাইতে লাগিল। মনে কেমন যেন একটা সম্ভ্রমের ভাব উদিত হইল। আমার ভুল হইবার কোনো কারণ ছিল না, সেই গর্জনধ্বনি একবার মাত্র শ্রবণ করিয়া মনে হইল যেন আশৈশব তাহার সহিত আমি পরিচিত! আওয়াজ শুনিয়া বুঝিলাম, পশুরাজ সিংহ সদলবলে আমার আধ মাইলের মধ্যে কোথাও বিহার করিতেছেন। মাঝে মাঝে মৃদু আর্তকান্নার মতো ধ্বনি শুনা যাইতে লাগিল এবং তাহা গভীর দীর্ঘনিশ্বাসের মতো মিলাইয়া গেল! ক্ষণকাল পরে, পর পর পাঁচ-ছয় বার ক্রমোচ্চমান গভীর গম্ভীর ধ্বনি উত্থিত হইয়া, প্রান্তর ও অরণ্যব্যাপী একটা শান্ত গাম্ভীর্যের সৃষ্টি করিতে লাগিল। মনে হইল, যেন সুদূর আকাশপ্রান্তে মেঘগর্জন আরম্ভ হইয়াছে। সংগীতের আসরে গায়কের মতো প্রথমে প্রত্যেকে আলাদা আলাদা গর্জন করিয়া যেন তারস্বরে ঐক্যতানবাদন শুরু করিল। সে কী গর্জন! যে শিকারির এই অপূর্ব ধ্বনি শুনিবার সৌভাগ্য হয় নাই, সে সত্যই হতভাগ্য! রজনীর অন্ধকারে জনহীন প্রান্তর বা অরণ্যের মধ্যে এই অপরূপ গর্জন, নির্ভীক শিকারির কাছে ঠিক সংগীতের মতো শুনায়––বিশেষ করিয়া শিকারি যদি অসহায় অবস্থায় আত্মনির্ভর করিয়া সিংহের অদূরে দণ্ডায়মান থাকে! তখন তাহার শিকারবৃত্তি সত্যই সার্থক।
সেই রাত্রে আমার আর কোনো বিপদ ঘটে নাই। সিংহের দল দূরে দূরে থাকিয়াই ফিরিয়া গিয়াছিল। সুতরাং আমার জীবনের সর্বাপেক্ষা আকাঙ্ক্ষিত বস্তু তখনও লাভ করিতে পারি নাই। আশৈশব কল্পনা করিতাম, বন্দুক হস্তে একাকী পশুরাজ সিংহের সম্মুখীন হইয়া, তাহার সহিত বোঝাপড়া করিব সে রাত্রে সিংহকে চোখেই দেখিতে পাইলাম না! একটু মনঃক্ষুণ্ণ হইলাম।
কিন্তু আমার আশা পূর্ণ হইতে বেশি দিন লাগিল না। এই ঘটনার চার-পাঁচ দিন পরেই, দুইজন অনুচর সঙ্গে ঘোড়ায় চড়িয়া শিকারে বাহির হইলাম। শান্ত দ্বিপ্রহর। অতি মৃদু বাতাস বহিতেছিল। আমরা একদল বন্য হরিণের পিছনে তাড়া করিয়া একটা ছোটো পাহাড়ের কাছাকাছি আসিয়া পড়িলাম। এই পাহাড়ের একশত গজের মধ্যে একটা মৃত ও অর্ধভুক্ত বন্যপশু পড়িয়া আছে দেখিয়া, ঘোড়া হইতে নামিয়া স্থানটি পর্যবেক্ষণ করিলাম। সিংহের সদ্য পদচিহ্ন দেখিয়া বুঝিলাম, কোনো পশুরাজ জন্তুটিকে শিকার করিয়া মধ্যাহ্ন আহার সারিতেছিলেন, এমন অবস্থায় আমরা তাঁহাকে বিরক্ত করিয়াছি তিনি কাছাকাছি কোথাও আছেন। কারণ, মৃত জানোয়ারের কাছে তখনও পর্যন্ত শকুনি প্রভৃতি আসিতে সাহস করে নাই। আমরা অত্যন্ত সাবধানতার সহিত পর্বতগাত্রের গুহা ও প্রান্তরের ঝোপগুলি নিরীক্ষণ করিতে করিতে চলিলাম, কিন্তু পশুরাজের সাক্ষাৎ পাইলাম না। নিষ্ফল হইয়া তাঁবুতে ফিরিয়া আহারাদির পর আমি সিংহ-শিকারে বদ্ধপরিকর হইলাম এবং ঠিক সন্ধ্যার পরই সদলবলে অশ্বারোহণে পাহাড়টার কাছে উপস্থিত হইয়া অপেক্ষা করিতে লাগিলাম। সেই রাত্রে বিজন পার্বত্যপ্রদেশে আমার কষ্টের অবধি ছিল না। আমরা সেখানে উপস্থিত হইবার অল্পক্ষণ পরেই, চারিদিক গাঢ় অন্ধকারে ডুবিয়া গেল। বাতাসের নিশ্চল-নিস্তব্ধতা দেখিয়া আমি বুঝিতে পারিলাম, শীঘ্রই ঝড় উঠিবে। এক ঘণ্টা অতীত হইতে না হইতে আমার অনুমান সত্য হইল। অন্ধকার ঘনীভূত হইয়া আসিল। মুহুর্মুহু বিদ্যুৎ চমকের সঙ্গে সঙ্গে ভয়ানক বজ্রপাত ও মেঘগর্জন হইতে লাগিল। বাতাসের বেগ ভীষণভাবে বর্ধিত হইল, অরণ্যভূমি ও বাতাসের মাতামাতি শুরু হইল এবং কয়েক মিনিট পরেই প্রবল বর্ষণ আরম্ভ হইয়া, আমাদিগকে একেবারে ধারাস্নান করাইয়া দিল। কিছুক্ষণ পরেই দেখিলাম, প্রান্তরভূমি এক বিস্তীর্ণ জলখণ্ডের আকার ধরিয়াছে। আমার বন্দুক তিনটিকে অত্যন্ত সাবধানে চামড়া দিয়া ঢাকিয়া বাঁচাইতে লাগিলাম। দুই ঘণ্টা ব্যাপিয়া প্রবলভাবে ঝড়বৃষ্টি চলিতে লাগিল। দুর্যোগ কাটিয়া যাইতেই, আমরা মাইল খানেকের মধ্যে সিংহগর্জন শুনিতে পাইলাম। ভোর হইবার কিছু পূর্বে মনে হইল, যেন মৃত জানোয়ারটার নিকট হইতেই সিংহের গর্জনধ্বনি আসিতেছে। আমরা ধীরে ধীরে সেই দিকে অগ্রসর হইলাম। আমাদের সমস্ত পরিচ্ছদ ভিজিয়া ভারী হইয়া গিয়াছিল। কোট-প্যান্টালুন খুলিয়া ফেলিয়া, কম্বল নিংড়াইয়া কোনো রকমে তাহাদ্বারা দেহ আবৃত করিয়া, আমি ও আমার দুই অনুচর ঘোড়ায় চড়িয়া, সিংহ-পাহাড়ের কাছাকাছি আসিয়া পড়িলাম। তখন ধীরে ধীরে অন্ধকার সরিয়া যাইতেছিল আমরা সন্তর্পণে সেই মৃত পশুর দিকে অগ্রসর হইলাম। পথের আশেপাশে বহুবিধ হিংস্র ও বন্য পশু দেখিতে পাইলাম। তাহাদিগকে শশকের মতো নিরীহ বোধ হইতেছিল। সাধারণত ঝড়বৃষ্টির পর তাহাদের এরূপ অবস্থা হয়। আকাশে তখনও মেঘ ছিল। পাহাড়ের গায়ে গায়ে মেঘখণ্ডগুলি শান্তভাবে লাগিয়াছিল। আমরা মৃত জন্তুটার নিকট আসিতেই কতকগুলি শৃগাল কোলাহল করিতে করিতে পলাইল, শকুনি-গৃধিনীর পালও উড়িয়া গেল। কিন্তু পশুরাজের কোনো চিহ্নই লক্ষিত হইল না। তখন সকাল হইয়াছে। তাহার পদচিহ্ন অনুসন্ধানে আমরা আরও অর্ধঘণ্টাকাল ব্যাপৃত হইলাম দুঃখের বিষয়, প্রান্তরটি প্রায় চষিয়া ফেলিয়াও কোনো ফল হইল না। শীতে ও ক্ষুধায় তখন আমরা অবসন্ন হইয়া পড়িয়াছি, ফিরিবার উপক্রম করিয়া তাঁবুর দিকে ঘোড়ার মুখ ফিরাইলাম।
সহসা প্রায় দুইশত গজ দূরে কতকগুলি শকুনির দিকে নজর পড়িল এবং সঙ্গে সঙ্গে দেখিলাম, এক বিপুলকায় সিংহী একটা বন্যজন্তুর মৃতদেহের উপর থাবা পাতিয়া বসিয়া দাঁত দিয়া তাহাকে ছিন্নভিন্ন করিতেছে। একদল শৃগালও এই কার্যে তাহাকে সাহায্য করিতেছে। আমি আমার দেশি অনুচরদিগের দৃষ্টি সেই দিকে আকর্ষণ করিয়া বলিলাম, ‘ওই দেখো, সিংহ!’ তাহারা চকিত ও ভয়ার্ত হইয়া বলিয়া উঠিল, ‘কই, কোথায়?’ এবং সঙ্গে সঙ্গে ‘বাপরে! সত্যিই তো!’ বলিয়া ঘোড়ার পেটে পদাঘাত করিয়া পলায়নপর হইল। আমি বলিলাম, ‘তোমাদের মতলব কী?’ তাহারা কাঁপিতে কাঁপিতে বলিয়া ফেলিল, ‘আমাদের বন্দুকে যে টোটা পোরা নেই!’ কথাটা সত্য। কিন্তু আমাদের এই সামান্য দুই-একটা কথাবার্তার মধ্যেই সিংহীর দৃষ্টি আমাদের দিকে পড়িল। বৃহৎ গোলাকার মুখখানা উঁচু করিয়া সে কয়েক সেকেন্ডমাত্র আমাদের দেখিল এবং পরমুহূর্তে উত্তরের পর্বত লক্ষ্য করিয়া ছুটিল। শৃগালেরাও কোলাহল করিতে করিতে অন্য দিকে পলাইল। আমাদের প্রথম কর্তব্য সিংহকে আমাদের দিকে ফেরানো, কাজেই আর একমিনিট সময়ও নষ্ট করিলে চলিবে না। ঘোড়ার লাগাম ছাড়িয়া ও তাহাকে অগ্রসর হইতে ইঙ্গিত করিয়া, আমি আমার অনুচর দুইজনকেও আমার পিছনে আসিতে বলিলাম। শিক্ষিত ঘোড়া বিদ্যুদ্বেগে প্রান্তরের উপর দিয়া ছুটিল। প্রতি মুহূর্তেই আমি সিংহীর নিকটবর্তী হইতে লাগিলাম। এই কয়েক সেকেন্ডের আনন্দ আমি জীবনে ভুলিতে পারিব না। আমার যেন নেশা চাপিয়াছিল। মনে মনে স্থির করিয়া ফেলিলাম, এই হিংস্র পশুকে হত্যা করিব, না হয় নিজে প্রাণ দিব।
সিংহী পূর্ব হইতেই অনেকটা অগ্রসর হইয়া গিয়াছিল, তাই তাহাকে ধরিতে আমাকে প্রান্তরের বহুদূর অতিক্রম করিতে হইল। সিংহী যখন দেখিল যে, আমি তাহাকে প্রায় ধরিয়া ফেলিয়াছি, তখন সে তাহার গতি কমাইয়া দিল। তাহার সুন্দর লেজটি একদিকে একটু হেলাইয়া সে একবার কদম তালে চলিতে লাগিল। আমি একটু হুংকার দিয়া তাহাকে থামিতে বলিলাম। আমার চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গে সে থামিয়া গেল এবং আমার দিকে পিছন করিয়া চুপ করিয়া বসিল একবার ফিরিয়াও তাকাইল না। সিংহী এই ভাবে আধ মিনিট কাল বসিয়া থাকিয়া, হঠাৎ লাফাইয়া উঠিয়া, আমার দিকে মুখ ফিরাইয়া দাঁড়াইল। তাহার লেজটি তাহার দেহের এক প্রান্ত হইতে আর এক প্রান্তে আঘাত করিতে লাগিল এবং আমার দিকে চাহিয়া সে দাঁত খিঁচাইয়া গম্ভীর গর্জন শুরু করিল। পর মুহূর্তেই সে বেগে আমার দিকে অগ্রসর হইয়া আসিয়া, বজ্রের মতো ভীষণ গর্জন করিয়া উঠিল। কিন্তু যখন দেখিল, আমি ইহাতেও ভীত না হইয়া তাহারই দিকে অগ্রসর হইতেছি, তখন শান্তভাবে ঘাসের উপর চার-পা ছড়াইয়া বসিয়া পড়িল। আমার হটনটট অনুচর দুইটি তখন কাছে আসিয়া পড়িয়াছে। আমরা তিনজনেই ঘোড়া হইতে নামিয়া, পরস্পরের বন্দুক পরীক্ষা করিলাম। যখন আমরা এই কার্যে ব্যাপৃত আছি, তখন সিংহীটা উঠিয়া দাঁড়াইল এবং বিশেষ বিরক্তির ভাব দেখাইতে লাগিল। প্রথমে সে আমাদের দিকে একদৃষ্টে চাহিয়া রহিল, পরে পিছনে চাহিয়া বুঝিবার চেষ্টা করিল, পলাইবার পথ পরিষ্কার আছে, কি না। তারপর একটা ভীষণ গর্জন করিয়া ছুটিয়া আসিল। আমরা ঘোড়া তিনটির লাগাম ধরিয়া অগ্রসর হইতে লাগিলাম, যেন আমরা নিরীহভাবে চলিয়াছি, আমাদের কোনোই উদ্দেশ্য নাই! আসলে আমাদের উদ্দেশ্য ছিল, সিংহীর পার্শ্বদেশের সম্মুখীন হওয়া। কিন্তু সেও অত্যন্ত সাবধান হইয়া চলিতে লাগিল––তাহার পার্শ্বদেশ বরাবরই আমাদের দৃষ্টির অন্তরালে রহিয়া গেল। আমি আমার অনুচরদিগকে যথাকর্তব্য করিবার জন্য উপদেশ দিয়া প্রস্তুত হইতে লাগিলাম। কিন্তু তাহাদের মুখের বিবর্ণ অবস্থা দেখিয়া বুঝিতে পারিলাম যে, তাহাদের উপর নির্ভর করা বুদ্ধিমানের কাজ হইবে না।
এই-ই উপযুক্ত অবসর––আর দেরি করলে চলিবে না। সিংহীটা আমাদের ষাট গজের মধ্যে আসিয়া পড়িয়াছে এবং আরও অগ্রসর হইতেছে। আমার সঙ্গীরা তাহার দিকে ঘোড়ার পিছন ফিরাইল। আমি হাঁটু গাড়িয়া বসিয়া ঠিক তাহাকে লক্ষ্য করিয়া গুলি করিলাম––সিংহীর কাঁধ জখম হইয়া গেল। আহত হইয়া ভীষণ গর্জন করিতে করিতে সেই ক্রোধোন্মত্ত জানোয়ার বিদ্যুৎগতিতে একেবারে আমাদের ভিতর আসিয়া পড়িল। ভয়ে আমার এক অনুচরের বন্দুক তাহার হাতেই আওয়াজ হইয়া গেল, অন্যজন কাঁপিতে লাগিল। সিংহী আমার ঘোড়ার উপর ঝাঁপাইয়া পড়িয়া, তাহার পাঁজর ভাঙিয়া ফেলিল আর তাহার পেট চিরিয়া নাড়ি-ভুঁড়ি বাহির করিয়া দিল রক্তের প্রবাহ বহিতে লাগিল! ইহাতেও কিন্তু আমি বিন্দুমাত্র বিচলিত না হইয়া, নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখিয়া, দ্বিতীয়বার গুলি ছুঁড়িবার জন্য অপেক্ষা করিতে লাগিলাম। এই সুবিধা শীঘ্র জুটিল। তাহাকে প্রতিহিংসায় উন্মত্ত হইয়া, কয়েক পা পিছু হটিয়া, নূতন আক্রমণের চেষ্টা করিতে দেখিয়া, আমি দ্বিতীয়বার গুলি করিলাম। এবার আর তাহাকে অগ্রসর হইতে হইল না। গুলি খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাহার দেহ প্রাণহীন হইয়া মাটিতে গড়াইয়া পড়িল। তাহার মুখ দিয়া রক্ত বাহির হইতে লাগিল। এতক্ষণ পর্যন্ত আমি বিন্দুমাত্র বিচলিত হই নাই। কিন্তু তাহার দেহ ভূতলশায়ী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি আমার বিপদের পরিমাণ উপলব্ধি করিয়া আতঙ্কে শিহরিয়া উঠিলাম। আমার প্রভুভক্ত ঘোড়ার এই দুর্দশার জন্যও আমার দুঃখের অবধি রহিল না। এই আমার প্রথম সিংহ শিকার, কিন্তু ইহাই শেষ নহে।
নির্ভীক শিকারি
কামিং সাহেব লিখিয়াছেন :––দক্ষিণ আফ্রিকার ‘লেপবি’ নামক স্থান ছাড়িয়া আমরা ‘সুবি’র দিকে অগ্রসর হইলাম। সুবিতে উপস্থিত হইয়াই একটা প্রকাণ্ড সিংহের মাথার খুলি দেখিলাম। স্থানীয় অধিবাসীরা বলিল যে, হতভাগ্য সিংহটা স্বজাতীয়ের হস্তে নিহত হইয়াছে। রাত্রে আমি এবং আমার অনুচর শিকারের লোভে এক জলাশয়ের নিকটে গিয়া আড্ডা গড়িলাম। দলে দলে বন্য পশু জলপানের জন্য সেখানে আসিতেছে ও চলিয়া যাইতেছে বুঝিতে পারিলেও, দারুণ অন্ধকারে লক্ষ্য স্থির রাখিয়া গুলি করিতে পারিলাম না। মধ্যরাত্রে একটা সিংহ তাহার সঙ্গিনীর সহিত আমাদের ঠিক দশ গজ দূর দিয়া চলিয়া গেল। আমার চোখে তখন তন্দ্রার ঘোর, কিন্তু আমার সঙ্গী অত্যন্ত তৎপরতার সহিত একেবারে সিংহের মর্মস্থল ভেদ করিয়া গুলি চালাইল। সিংহটা করুণ আর্তনাদ করিতে করিতে এক লম্ভে বহুদূর সম্মুখে গিয়া পড়িল, আর উঠিল না। তাহার আর্তনাদ ক্ষীণ হইতে হইতে একেবারে মিলাইয়া গেল। সিংহী এতক্ষণ অন্ধকারের মধ্যে লুকাইয়াছিল সিংহকে পড়িতে দেখিয়া ও তাহাকে শৃগাল, হায়েনা প্রভৃতি পশুতে মিলিতে টানাটানি করিতেছে বুঝিতে পারিয়া, সে কাছে আসিয়া ভীষণভাবে গর্জাইতে লাগিল। সেই গর্জনে অতি বড়ো সাহসী লোকেরও হৃৎকম্প উপস্থিত হয়। আমার সঙ্গী তখন ভয়ে প্রায় অর্ধমৃত, আমারও ভয় করিতে লাগিল। সহসা আরও কয়েকটা সিংহ-সিংহী সেখানে আসিয়া উপস্থিত হইল ও গর্জনে যোগদান করিল। এই বিপদের মুখে অন্ধকারে থাকাটা যুক্তিযুক্ত নয় বিবেচনা করিয়া, আমরা গনগনে আগুন জ্বালাইয়া, জলাশয়ের দিকে লক্ষ রাখিয়া বসিয়া রহিলাম। সে রাত্রে আর কোনো বিপদ ঘটিল না।
দিন কয়েক পরে আমার মল্লি নামক অনুচর আসিয়া খবর দিল যে, একদল সিংহ কয়েকটা জন্তু মারিয়া নিকটেই ফেলিয়া রাখিয়াছে। আমি অবিলম্বে মার্টিন ও বুশম্যানকে সঙ্গে লইয়া ঘোড়ায় চড়িয়া সেখানে উপস্থিত হইলাম। আমার প্রভুভক্ত কুকুরের দলকেও সঙ্গে লইতে ভুলিলাম না। কুকুরগুলো সেখানে পৌঁছিয়াই সিংহের গন্ধ পাইল এবং আকাশের দিকে চাহিয়া চিৎকার জুড়িয়া দিল। তারপর সিংহকে খুঁজিয়া বাহির করিবার জন্য এদিক সেদিক ছুটাছুটি করিয়া ফিরিতে লাগিল। দুইটি কুকুর আমার দৃষ্টির অন্তরালে চলিয়া গেল। উলফ নামে কুকুরটিকে বিদ্যুৎ গতিতে দক্ষিণে ছুটিয়া যাইতে দেখিয়া বুঝিতে পারিলাম, এক বা একাধিক সিংহের সহিত তাহার সাক্ষাৎ হইয়াছে। দেখিতে দেখিতে অন্য কুকুরগুলোও সেখানে হাজির হইয়া গর্জাইতে লাগিল। শব্দ লক্ষ্য করিয়া আমি ঘোড়া ছুটাইলাম এবং একটা ঘন ঝোপের ধারে আসিয়া থামিলাম। বুঝিতে পারিলাম, সিংহের দল সেই ঝোপে আশ্রয় লইয়াছে। ইতিমধ্যে দেখি, উলফ একলা একস্থানে দাঁড়াইয়া চিৎকার করিতেছে। তাহার নিকটে গিয়া, সেই স্থানের মাটি লক্ষ করিয়া সিংহ ও কুকুরের পদচিহ্ন দেখিয়া বুঝিলাম, কাছের ঝোপেও তাহাদের দুই একটা আছে। পদচিহ্ন ধরিয়া কিছুদূর যাইতে না যাইতেই, আমার অভীষ্ট সিদ্ধ হইল––একটা বিপুল-দেহ সিংহীর সহিত মুখোমুখি হইয়া গেল। ঝোপের অন্তরাল হইতে তাহার গোল কালো মুখের খানিকটা ও খাড়া কান দুইটি দেখা যাইতেছিল। সে কিছুতেই আমার দিক হইতে মুখ ফিরাইল না। এদিকে কুকুরগুলো তাহার আশপাশে ঘেউ ঘেউ জুড়িয়া দিল। এইভাবে অপেক্ষা করিয়া থাকিতে থাকিতে হঠাৎ একবার সিংহীটা পাশ ফিরিয়া কী দেখিতে লাগিল। অমনি গুলি ছুঁড়িলাম। তাহার কাঁধে গুলি লাগিতেই সে কুকুরের দলে ঝাঁপাইয়া পড়িল। সৌভাগ্যক্রমে তাহাদের কাহারও দেহে আঘাত লাগিল না। দ্বিতীয় গুলিতে সে দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া কাঁপিতে লাগিল তৃতীয়বার গুলি খাইয়া সে লম্বা হইয়া মাটিতে পড়িয়া গেল এবং চতুর্থ গুলির সঙ্গে সঙ্গে তাহার প্রাণবায়ু দেহ ছাড়িয়া গেল। আমি তাহার মাথাটি ও নখগুলি কাটিয়া লইয়া তাঁবুতে ফিরিয়া আসিলাম। সে রাত্রে অত্যন্ত ঠান্ডা ছিল এবং বেগে বাতাস বহিতেছিল বলিয়া, জলাশয়ের দিকে আর নজর রাখিতে পারিলাম না। আমাদের তাঁবুর চারিদিকে সমস্ত রাত্রি ধরিয়া সিংহগর্জন শুনা যাইতে লাগিল।
(২)
দুইদিন পরের কথা––আমার নিয়মিত সেই জলাশয়ে পাহারা দিতেছি। সন্ধ্যার ঠিক পূর্বে ছয়টি জেব্রা জল খাইতে আসিল। আমি শান্তভাবে তাহাদের পানকার্য শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করিয়া, শেষে একটাকে লক্ষ করিয়া গুলি ছুঁড়িলাম। জেব্রাটা গড়াইয়া পড়িল গুলির সঙ্গে সঙ্গে তাহার মৃত্যু হইয়াছিল। আমি আমার লোকদের জেব্রার মৃতদেহটা জলের ধারে রাখিয়া দিতে আদেশ করিলাম। আমার বিশ্বাস ছিল, লোভে লোভে সিংহেরা আসিয়া পড়িবে। ইহার পর আমি কফি খাইতে ভিতরে গেলাম। মল্লি ও ক্লিনবয়ের সঙ্গে যখন আমার পাহারার ঘাটিতে উপস্থিত হইলাম, তখন চাঁদের আলোতে চারিদিক উজ্জ্বল হইয়া উঠিয়াছে। আমরা আসিয়া বসিতে না বসিতেই আমাদের ঠিক ডান দিকে কিছু দূরে সিংহের ডাক শুনা গেল। এমন সময়ে, আমার উদ্দেশ্য বিফল করিবার জন্য একদল জেব্রা শুকনো মাটিতে খুরের আওয়াজ করিতে করিতে সেখানে উপস্থিত হইল এবং নিহত জেব্রাটা ভক্ষণ করিবার জন্য ধূর্ত হায়েনা ও শৃগালেরাও আসিয়া পড়িল। ইহাদিগকে না তাড়াইলে সিংহ-শিকার করা যাইবে না ভাবিয়া, জেব্রার দল লক্ষ্য করিয়া গুলি ছুঁড়িলাম। তাহারা প্রাণভয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়িল, একটা প্রায় ষাট-সত্তর গজ পর্যন্ত গিয়া ধরাশায়ী হইল। বুঝিলাম, আমার গুলি ব্যর্থ হয় নাই। এদিকে হায়েনা ও শৃগালের দল গুলির শব্দে চকিত হইয়া জলাশয় ত্যাগ করিয়া সদ্যমৃত জেব্রাটার কাছে উপস্থিত হইল। আবার ভয়ানক সিংহ-গর্জন শুনিলাম। শব্দ লক্ষ্য করিয়া নিবিষ্টভাবে চাহিয়া দেখিলাম, জলাশয়ের ঠিক অপর প্রান্তে একটি উচ্চ ঝোপের ভিতরে পশুরাজ অবস্থান করিতেছেন। তাঁহার চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গে চারিদিকে কেমন একটা অস্বাভাবিক নীরবতা বিরাজ করিতে লাগিল। আমি তখন বন্দুকটি বাগাইয়া ধরিয়া, ঝোপের দিকে দৃষ্টি স্থির রাখিয়া, অপেক্ষা করিতে লাগিলাম। মনে হইতে লাগিল, এই বুঝি পশুরাজ অগ্রসর হইতেছেন! কিন্তু তিনি তখন অত্যন্ত ধূর্ত হইয়া উঠিয়াছেন অন্যান্য জন্তুদের পলায়ন দেখিয়া তিনিও আর সাহস করিলেন না, ঝোপ হইতে বাহির হইয়া ভিন্ন দিকে প্রস্থান করিলেন।
পনেরো মিনিট এইভাবে কাটিলে, হঠাৎ আবার শৃগাল ও হায়েনাগুলাকে মৃতদেহ ছাড়িয়া পাশ কাটাইয়া দাঁড়াইতে দেখিয়া বুঝিলাম, আমার আশা বুঝি পূর্ণ হয়––হইলও তাহাই। একটি বিরাট গম্ভীরদর্শন সিংহ আমার দৃষ্টিপথে পড়িল। তাহার কালো কেশররাজি যেন মাটি ছুঁইয়া যাইতেছিল। সে আসিয়া জেব্রার মৃতদেহটির উপর দাঁড়াইল। মনে হইল, সে আমার অস্তিত্বের বিষয় অবগত আছে কারণ, সে আসিয়াই মাথা নিচু করিয়া জেব্রাটাকে কামড়াইয়া ধরিল এবং পাহাড়ের দিকে খানিকটা গিয়া, তাহাকে মাটিতে নামাইয়া দম লইতে লাগিল। আবার খানিকটা লইয়া গিয়া দম লইতে লাগিল। শেষে সেটা পাশের এক ঝোপের ভিতর রাখিয়া পিছন ফিরিয়া দাঁড়াইল।
মুহূর্ত বিলম্ব করিবার সময় ছিল না। এইবার সে তাহার দক্ষিণ পার্শ্ব আমার দিকে রাখিয়া একটু তির্যকভাবে দাঁড়াইয়াছিল। আমি তখনই গুলি ছুঁড়িলাম। লক্ষ্যভ্রষ্ট হই নাই। গুলির সঙ্গে সঙ্গে সে হুমড়ি খাইয়া পড়িল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য সব নিস্তব্ধ। তারপর সে একটা তীব্র আওয়াজ করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল এবং খোঁড়াইতে খোঁড়াইতে ও করুণ আর্তনাদ করিতে করিতে, একটা ঝোপ লক্ষ্য করিয়া ছুটিতে লাগিল। ঝোপের ভিতর গিয়া সে থামিল বলিয়া মনে হইল। তখন তাহার একটানা গর্জনই শুনা যাইতে লাগিল। আমার বিশ্বাস জন্মিল যে, সে নিশ্চয়––এখনই হউক, কী একটু পরেই হউক––এই আঘাতেই মারা পড়িবে। তাহার গর্জন থামিতেই এ বিশ্বাস দৃঢ় হইল। এখন আমাদের কর্তব্য, অবিলম্বে গিয়া তাহার মৃতদেহ তাঁবুতে লইয়া আসা। কারণ, একটু দেরি করিলেই হায়েনা ও শৃগালেরা মৃতদেহের আর কিছুই রাখিবে না। এই ভাবিয়া আমি ও মার্টিন ঘোড়ায় চাপিয়া কুকুরের দল সঙ্গে লইয়া সেই স্থানে উপস্থিত হইলাম। কুকুর লেলাইয়া দিয়া শৃগাল ও হায়নাগুলাকে দূর করিলাম। তারপর সন্তর্পণে ঝোপের নিকট গিয়া, সে বিপুলকায় কালো কেশরধারী সিংহকে ভূতলশায়ী দেখিয়া নীরবে দাঁড়াইয়া রইলাম। গুলি তাহার পেটে লাগিয়াছিল। সেই অপূর্ব-শ্রী গম্ভীরদর্শন জন্তুর বর্ণনা দেওয়া আমার সাধ্যায়ত্ব নহে। আমি বহুক্ষণ দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া তাহার দীর্ঘ কেশর, প্রকাণ্ড থাবা ও দেহের সামঞ্জস্য লক্ষ করিতে লাগিলাম। আমার মনে হইল, পৃথিবীর কোনো শিকারির ভাগ্যে ইহা অপেক্ষা মূল্যবান পুরস্কার জোটে নাই। সিংহটাকে তাঁবুতে লইয়া যাওয়া হইল।
সিংহের শোভাযাত্রা
গর্ডন কামিং-এর যে কী অপরিসীম সাহস ও উপস্থিত বুদ্ধি ছিল, তাহা নিম্নের ঘটনা হইতেই প্রতীত হইবে। কামিং সাহেব লিখিয়াছেন :––আমি ও আমার অনুচর ক্লিনবয় তাঁবুর এক ছিদ্রপথ দিয়া জলাশয়ের দিকে লক্ষ রাখিয়া বসিয়াছিলাম। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করিতে হইল না, একটা মিশকালো স্ত্রী-গন্ডার হেলিতে-দুলিতে জলপান করিতে আসিল। আমি তাহাকে লক্ষ্য করিয়া দুইবার গুলি ছুঁড়িলাম, কিন্তু সে ইহাতে কিছুমাত্র ভ্রূক্ষেপ না করিয়া বনের মধ্যে অদৃশ্য হইয়া গেল। একটু পরেই দুইটা বৃহৎকার গন্ডার আসিয়া হাজির। দেখিয়া, বোধ হইল, তাহারা আমাদের বন্দুকের আওয়াজ শুনেই নাই। তাহারা নিশ্চিন্ত মনে জল খাইতে লাগিল। আমি ও ক্লিনবয় একসঙ্গে তাহাদের একটিকে লক্ষ্য করিয়া ঘোড়া টিপিলাম। গজ তিনেক ছুটিয়া গিয়া সে পড়িয়া গেল এবং কিঞ্চিৎ পা ছুঁড়িয়া নিশ্চল হইল। বন্ধুর বিপদ দেখিয়া অন্য গন্ডারটা হতভম্ব হইয়া কিছুক্ষণ দাঁড়াইয়া রহিল, পলায়নের চেষ্টামাত্র করিল না। এই সুযোগ আমি ছাড়িলাম না। আমার গুলিতে আহত হইয়া সে প্রায় দুই শত হাত দৌড়াইয়া গিয়া ভূমিশায়ী হইল। সাফল্যে প্রীত হইয়া আমরা সেই রাত্রির মতো নিদ্রা দিতে গেলাম।
পরদিন সন্ধ্যার পূর্বেই স্থানীয় লোকেরা একটা গন্ডারের মৃতদেহ সেখান হইতে সরাইয়া, দ্বিতীয়টাও সরাইতে চেষ্টা করিতেছে, এমন সময় আমি গিয়া বাধা দিলাম। কারণ, আমার বিশ্বাস ছিল যে, সেখানে মৃতদেহ থাকিলে, জলাশয়ের নিকট রাত্রে নিশ্চয়ই সিংহের শুভাগমন হইবে। সন্ধ্যার অন্ধকার গাঢ় হইবার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা আবার লক্ষ্যস্থলের অভিমুখে চলিলাম দুইজন দেশি লোককেও আমাদের সঙ্গে লইলাম। শিকারি কুকুর দুইটি আমার পাশে পাশে চলিল। জলাশয়ের কাছাকাছি আসিয়া গন্ডারের মৃতদেহ অনুসন্ধান করিতে গিয়া চমকিয়া উঠিলাম। অন্ধকারে স্পষ্ট কিছুই ঠাহর হইতেছিল না বটে, কিন্তু মনে হইল যেন, বড়ো বড়ো কয়েকটা জানোয়ার পাহাড় হইতে নামিয়া জলাশয়ের দিকে অগ্রসর হইতেছে। প্রথমটা জেব্রা বলিয়াই বোধ হইল। ক্লিনবয়ও বলিল, ‘মনে হইতেছে, যেন একদল জেব্রা পাহাড়ের উপর মৃতদেহের কাছে দাঁড়াইয়া আছে।’ আমি বলিলাম, ‘হইতে পারে’, কিন্তু আমি ভালো করিয়াই জানিতাম যে গন্ডারের মৃতদেহের নিকট নিশ্চয়ই জেব্রারা আড্ডা গাড়িবে না। আমরা তাড়াতাড়ি আমাদের গোপন পাহারার স্থানে আসিয়া বন্দুক হাতে লইলাম এবং সম্মুখের দিকে একদৃষ্টে চাহিয়া রহিলাম। রাত্রির অন্ধকার তখন চন্দ্রালোকে অনেকটা দূর হইয়াছে। ভালো করিয়া দেখিয়া স্পষ্ট বুঝিতে পারিলাম, এক স্থানে ছয়টা সিংহ, চৌদ্দ-পনেরোটা হায়েনা ও ডজন তিনেক শৃগাল মিলিত হইয়া মৃতদেহের সদগতি করিতেছে। সিংহেরা নিশ্চিন্ত ও শান্তভাবে আহার সমাধা কার্যে ব্যাপৃত থাকিলেও, হায়েনা ও শৃগালেরা যথেষ্ট কাড়াকাড়ি ও কোলাহল করিতেছিল। পরস্পরের মুখের গ্রাস কাড়িয়া লইয়া, তাহারা মৃতদেহের চারিপাশে উন্মত্ত নৃত্য জুড়িয়া দিয়াছিল। গর্জন, হাসি, চিৎকার-কোলাহলে সেই ভূভাগ মুখরিত হইয়া উঠিয়াছিল। হায়েনা ও শৃগালেরা সিংহগুলাকে দেখিয়া যে বিন্দুমাত্র ভয় পাইতেছে, এরূপ বোধ হইল না। এইভাবে এই বিরাট ভোজের দৃশ্য আমরা প্রায় তিন ঘণ্টা ধরিয়া দেখিলাম। আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, আহার সমাধা করিয়া সিংহেরা জলপানের জন্য অন্য জলাশয়ে আসিবে। ইতিমধ্যে দুই চারিটা গন্ডারও কাছাকাছি আসিয়া পড়িয়াছিল, কিন্তু কাঁচা রক্তমাংসের গন্ধে ভীত-চকিত হইয়া পলায়ন করিল।
পরিশেষে সিংহেরা সন্তুষ্ট হইল বলিয়া বোধ হইল এবং মাথা খাড়া করিয়া সম্মুখের দিকে অগ্রসর হইল। সম্ভবত তাহারা জলাশয়ের দিকেই আসিতেছিল। দুই মিনিটের মধ্যে তাহাদের একটা আমার দিকে মুখ তুলিয়া অগ্রসর হইয়া আসিল তাহার পিছনেই আর একটা এবং পর পর আরও চারিটা আসিল। তাহাদের এই শোভাযাত্রা ক্রমশ জলাশয়ের দিকে অগ্রসর হইতে লাগিল। বুঝিতে পারিলাম, অবিলম্বে এই সিংহদল আমারই পনেরো গজের মধ্যে আসিয়া পড়িবে।
ক্লিনবয়ের অবস্থা দেখিয়া আমার ভয় হইল সে যেন ভয়ে একেবারে পাষাণ হইয়া গিয়াছিল। আমি পূর্বেকার পদচিহ্ন লক্ষ করিয়া বুঝিতে পারিয়াছিলাম, ঠিক কোনখানে সিংহেরা জলপান করিতে নামিবে। আমি বন্ধুকটা পরীক্ষা করিয়া লইয়া স্থির হইয়া বসিলাম। সিংহ ছয়টা ধীরে ধীরে পার্বত্যপথ অতিক্রম করিয়া প্রায় ষাট গজ দূরে একবার মুহূর্তকালের জন্য থামিয়া, যেন চারিদিক পর্যবেক্ষণ করিয়া লইল। সম্মুখের সিংহটা হঠাৎ সেইখানেই থাবা পাতিয়া বসিয়া পড়িল। অন্য সকলে অগ্রসর হইয়া আসিলে, সে আবার তাহাদের পিছন পিছন চলিতে লাগিল। আমার ধারণামতো তাহারা তাহাদের সেই পুরাতন স্থানেই আসিয়া জুটিল এবং জলে মুখ দিয়া চকচক করিয়া জলপান করিতে আরম্ভ করিল। ক্লিনবয় ইতিমধ্যে ভয়ে তাহার মাথাটা নাড়িতেই, আমি ইঙ্গিতে তাহাকে স্থির হইয়া থাকিতে বলিলাম। আবার সিংহদের দিকে মুখ ফিরাইতেই দেখি যে, তাহারা আমাদের অস্তিত্ব জানিতে পারিয়াছে।
সেইরূপ ভয়াবহ অবস্থা এখন আর কল্পনাও করিতে পারি না। অন্ধকার অরণ্যে ছয়-ছয়টা সিংহের সম্মুখীন হইলে, যে কোনো অসমসাহসী শিকারিরও প্রাণ ভয়ে দুরু-দুরু করিবে! আমার তখনকার অবস্থা এখন ভাষায় বলিয়া বুঝাইতে পারিব না।
একটা বৃদ্ধ সিংহী দলের অগ্রবর্তী ছিল। সে-ই সর্বপ্রথমে আমাকে লক্ষ করে এবং আমার দিকে তাকাইতে তাকাইতে জলাশয়ের ধার ঘেঁষিয়া অগ্রসর হইতে থাকে। আমি মুহূর্তমাত্র চিন্তা করিয়া দেখিলাম, সিংহীকে গুলি করা ছাড়া গত্যন্তর নাই। কারণ, তখনও পর্যন্ত অন্য পাঁচটা আমাকে দেখিতে পায় নাই। আমি বন্দুক তুলিয়া প্রস্তুত হইলাম। আমাকে নড়িতে দেখিয়া সে চকিতে থামিয়া গেল। তাহার বুক ও পিঠ আমার দৃষ্টির সম্মুখে রহিল। গুলি ছুঁড়িলাম, গুলি খাইয়াই সে বারবার গর্জন করিতে করিতে সম্মুখে লাফ দিল তাহার সঙ্গী পাঁচটাও তাহার অনুবর্তী হইল। বন্দুকের ও ধূলিরাশিতে তখন এমন আচ্ছন্ন যে, কিছুই ঠাওর হইতেছিল না। আমি আহত সিংহীর আর্তনাদের প্রতীক্ষায় কান পাতিয়া রহিলাম। নিরাশ হইলাম না। মনে হইল, সে এক জায়গায় থাকিয়া আর্তক্রন্দন করিতেছে। সম্ভবত গুলিটা মারাত্মক হইয়াছে। তাহাকে এইভাবে ক্রন্দন করিতে দেখিয়া, অপর পাঁচটা সিংহ কেমন যেন ভয় পাইয়া পাহাড়ের দিকে দ্রুত পলায়ন করিল। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করিয়া আমি কুকুর দুইটিকে ছাড়িয়া দিলাম ও নিজে তাহাদের পিছু পিছু গিয়া দেখিলাম, সিংহী মরিয়াছে। এই সিংহীটা দেখিতে সত্যই খুব সুন্দর ছিল। বিপদের অন্তে এইরূপ পুরস্কার পাইয়া আমি নিজেকে কৃতার্থ মনে করিলাম।
ধূর্ত সিংহ ও ক্ষিপ্ত শিকারি
কামিংসাহেব একবার রাগে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হইয়া, একটা সিংহ শিকার করিতে গিয়া, সৌভাগ্যক্রমে আসন্ন মৃত্যুর হাত হইতে রক্ষা পাইয়াছিলেন। তিনি তখন আফ্রিকার গভীরতম প্রদেশে শিকার করিয়া ফিরিতেছিলেন। হেনড্রিক ও স্টোফোলাস নামে দুইজন অনুচর তাঁহার সঙ্গে ছিল। একদিন গভীর রাত্রে কামিং সাহেব তাঁহার তাঁবুর বাহিরে একখানা গাড়িতে নিদ্রা যাইতেছিলেন তাঁহার অনুচর দুইজন কিছুদূরে আগুন জ্বালাইয়া, একটা গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়া, বিশ্রাম করিতেছিল। হঠাৎ গাড়িটানা একটা বলদ কোনো রকমে বাঁধন খুলিয়া এদিক-ওদিক ছুটাছুটি করিতে থাকে। শব্দ পাইয়া হেনড্রিক চমকিয়া উঠিল এবং ঝিমাইতে ঝিমাইতে কোনো গতিকে বলদটাকে আবার যথাস্থানে বাঁধিয়া, সঙ্গীর পাশে আসিয়া শুইয়া পড়িল! ক্ষণকাল পরেই এক ভয়ংকর হুংকারধ্বনিতে তাঁবুর সমস্ত লোক সভয়ে জাগিয়া উঠিল। ‘সিংহ আসিয়াছে, সিংহ আসিয়াছে’, বলিয়া একটা ভীষণ কোলাহল পড়িয়া গেল। স্টোফোলাস ছুটিয়া আসিয়া খবর দিল যে, একটা সিংহ হেনড্রিকের উপর পড়িয়া তাহাকে এইমাত্র টানিয়া লইয়া গেল। স্টোফোলাস তাহার হতভাগ্য সঙ্গীকে রক্ষা করিবার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করিয়াছিল জ্বলন্ত কাঠ তুলিয়া সিংহের কপালে আঘাত করিয়াছে, কিন্তু তবু সেই দুর্দান্ত জানোয়ার তাহার শিকার ছাড়ে নাই। সম্ভবত সে কাছাকাছি কোথাও সুযোগের প্রতিক্ষা করিতেছিল। বেচারা হেনড্রিক যখন বলদ বাঁধিবার জন্য উঠিয়া যায় ও ফিরিয়া আসিয়া ঘুমের চেষ্টা দেখিতে থাকে, সেই সময়ে এই ধূর্ত সিংহটা গাছের আড়াল থেকে লাফ দিয়া তাহার ঘাড়ে পড়ে। এতক্ষণে হয়তো হেনড্রিককে গভীর জঙ্গলে লইয়া গিয়াছে। কামিং সাহেব রাগে গরগর করিতে লাগিলেন। তিনি সেই রাত্রেই ইহার প্রতিশোধ লইতে মনস্থ করিলেন। কিন্তু সেই অন্ধকারে নিবিড় জঙ্গলে, সিংহ ও তাহার শিকারকে খুঁজিবার চেষ্টা বৃথা! সাহেব চারিদিকে তাঁহার হটেনটট অনুচরদিগকে পাঠাইয়া, বনটাকে ঘেরাও করিয়া ফেলিয়া, সকালের প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন!
ভোর হইতে না হইতেই, দুইজন সঙ্গী ও শিকারি কুকুর লইয়া ঘোড়ায় চাপিয়া তিনি বাহির হইয়া পড়িলেন––তাঁহার অনুচরকে মারিবার প্রতিশোধ লইতেই হইবে! ঘুরিতে ঘুরিতে একস্থানে হতভাগ্য হেনড্রিকের হাঁটু অবধি একখানা পা পড়িয়া আছে, দেখা গেল! সমস্ত রাত্রি ধরিয়া সিংহ সেখানে তাহার নৈশ আহার সমাধা করিয়াছে। এখানে সেখানে হেনড্রিকের দেহের অংশবিশেষ পড়িয়া আছে। সেই চিহ্ন ধরিয়া তাঁহারা একটা শুষ্ক নদীখাতে আসিয়া পড়িলেন। ভিজা বালির উপর সিংহের পদচিহ্ন দেখা গেল। আহার সমাধা করিয়া সে নিশ্চয়ই কাছাকাছি কোথাও বিশ্রাম করিতেছে। কুকুরগুলাকে ছাড়িয়া দেওয়া হইল। তাহারা মাটি শুঁকিতে শুঁকিতে একটা ঝোপের কাছাকাছি গিয়া লাফাইয়া ঘেউঘেউ করিতে লাগিল।
বিশ্রামের ব্যাঘাত হওয়াতে, পশুরাজ গা ঝাড়া দিয়া উঠিয়া ঝোপের বাহিরে আসিল এবং কুকুরগুলাকে দেখিয়া সভয়ে দৌড় দিল।
কামিং সাহেব দারুণ ক্রোধে জ্ঞানহারা হইয়া, প্রাণের মায়া পরিত্যাগ করিয়া তাহার পাছু লইলেন। সিংহ প্রথমে খানিকটা নদীর ধার দিয়া ছুটিতে লাগিল ও মাঝে মাঝে এক-আধটা ঝোপ দেখিয়া মাথা লুকাইবার চেষ্টা করিতে লাগিল। কুকুরেরা ততক্ষণে আবার তাহার কাছাকাছি গিয়া পড়িয়াছে। বেগতিক দেখিয়া সিংহটা ফিরিয়া দাঁড়াইল ও থাবা দিয়া মাটি আঁচড়াইতে আঁচড়াইতে ভীষণ গর্জন শুরু করিয়া দিল। রাগে তাহার কেশর ফুলিয়া ফুলিয়া উঠিতে লাগিল।
সাহেব তাহার নিকটবর্তী হইলেন। তাঁহার দিকে বড়ো বড়ো চোখ ঘুরাইয়া সিংহ বার বার হাঁ করিতে লাগিল তাঁহার উপর লাফাইয়া পড়িবে বলিয়া তাহার লেজ ঘন ঘন নাড়িতে লাগিল। তিনি যদি রাগে অন্ধ না হইতেন, তাহা হইলে আর অগ্রসর হইতে সাহস করিতেন না কিন্তু প্রতিশোধ-স্পৃহা তখন তাঁহাকে জ্ঞানশূন্য করিয়া ফেলিয়াছে। তিনি ঘোড়া ছুটাইয়া সিংহের কাছাকাছি গিয়া পড়িলেন ও বন্দুক তুলিয়া ধরিয়াই বলিলেন, ‘বাছাধন, এবার ইষ্টনাম স্মরণ করো!’
সেই ভয়াবহ অবস্থায় কামিংসাহেব সহসা বুঝিতে পারিলেন যে তিনি নিজের জীবন বিপন্ন করিয়াছেন। গুলি ছোঁড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওই দুর্দান্ত জানোয়ার লাফ দিয়া তাঁহার ঘাড়ে পড়িবে। সামনাসামনি গুলি ছুঁড়িলে গুলি ফসকাইবার সম্ভাবনা তখন মৃত্যু অনিবার্য।
অকস্মাৎ এই সুবুদ্ধি ফিরিয়া আসাতে সাহেব সে যাত্রা রক্ষা পাইলেন। তিনি বিদ্যুৎগতিতে একটু পাশ কাটাইয়া, সিংহের ঘাড় লক্ষ্য করিয়া গুলি ছুঁড়িলেন। অব্যর্থ সন্ধান। গভীর হুংকার ছাড়িয়া সিংহ একটি প্রকাণ্ড লাফ মারিল এবং মাটিতে পড়িবার সঙ্গে সঙ্গে আর এক গুলি খাইয়াই মরিয়া গেল।
কামিং সাহেবের প্রতিহিংসাবৃত্তি চরিতার্থ হইল।
