ছোটো চোর ও বড়ো চোর

ছোটো চোর ও বড়ো চোর

এক গ্রামে দুই পাকা চোর বাস করিত। তাহাদের কাজের মধ্যে ছিল, কেবল চুরি ও বাটপাড়ি। গ্রামে কোথাও কোনো দিন চুরি হইলে, সকলেই বুঝিত, এ সেই হতভাগাদের কাজ। এমনকী, অন্য চোরে চুরি করিলেও লোকের সন্দেহ আগে তাহাদের উপরই পড়িত। তাহারা ভিন্ন আর যে কেহ চুরি করিতে পারে, এ বিশ্বাস ছিল না।

ইহাতে ত্যক্ত বিরক্ত হইয়া একদিন দুইজনে পরামর্শ করিল যে, আর তাহারা চুরি করিবে না অন্য কোথাও গিয়া চাকরিবাকরির চেষ্টা দেখিবে। তাহাদের গ্রাম হইতে তিন ক্রোশ দূরে এক ঘর ধনী লোক বাস করিতেন। তাহারা সেই ধনী গৃহে গিয়া দুইজনে দুইটি কাজের জোগাড় করিল। একজনকে সমস্ত দিন একটা গোরু চরাইতে হইবে আর একজন প্রত্যহ একটা চাঁপা গাছের গোড়ায় জল দিবে।

বড়ো চোর ভারী সেয়ানা। সে ভাবিল, ‘মাঠে মাঠে কে গোরু তাড়াইয়া ঘুরিয়া বেড়ায়! ও কাজটা ছোটো চোরের পক্ষেই মানাইবে ভালো। আমি গাছের গোড়ায় দুই-চারি কলসি জল ঢালিয়া সমস্ত দিন বেশ মজা করিয়া বেড়াইব!’ এই ভাবিয়া সে গাছে জল দিবার ভার লইল। আর ছোটো চোরের ভাগ্যে জুটিল গোরু চরানো। পরদিন ভোরের বেলা ছোটো চোর গোরু লইয়া বাহির হইল, আর বড়ো চোর গাছে জল ঢালিতে শুরু করিল। সে ভাবিয়াছিল, দুই-চারি কলসি ঢালিলেই গাছের গোড়ায় জল দাঁড়াইবে কিন্তু কী সর্বনাশ, যত ঢালে সব জল কোথায় শুকাইয়া যায়! একরত্তি মাটি ভিজিতে না ভিজিতে তাহার আর চিহ্নমাত্রও দেখিতে পাওয়া যায় না। সমস্ত সকাল, সারা দুপুর, এমনকী সন্ধ্যা পর্যন্ত শত শত কলসি জল ঢালিল, কিন্তু কিছুতেই সেই পোড়া গাছের গোড়ায় একবিন্দুও দাঁড়াইল না! শেষে একেবারে ক্লান্ত হইয়া বেচারা মাথায় হাত দিয়া বসিয়া পড়িল।

ওদিকে ছোটো চোরের দুর্দশার অবধি ছিল না। সে যে গোরুটা চরাইবার ভার লইয়াছিল, গ্রামের মধ্যে সেইটাই সকলের ওঁচা। তেমন দুরন্ত গোরু আশপাশে আর একটাও দেখা যাইত না। ছোটো চোর গোরুটা লইয়া যেই মাঠে গিয়া ছাড়িয়া দিয়াছে, অমনি সে শিং বাগাইয়া, ল্যাজ উঠাইয়া, চারি পা তুলিয়া লাফ মারিল এবং চক্ষুর পলকে এ মাঠ-সে মাঠ, একজনের ধানের খেত হইতে অপরের খেতে, কাহারো তরিতরকারির বাগানে, কাহারো বা শস্যের খামারে––এইভাবে ছুটিয়া বেড়াইতে লাগিল। ছোটো চোর সমস্ত দিন গোরুটার পিছন পিছন ছুটিয়া একেই ভয়ানক ক্লান্ত, তাহার উপর যাহাদের ফসল নষ্ট হইয়াছিল, তাহাদের গালাগালিতে দুঃখে-কষ্টে একেবারে নাকালের একশেষ হইল। শেষে কোনো গতিকে গোরুটা ধরিয়া টানিতে টানিতে মনিবের বাড়িতে হাজির করিল। বড়ো চোর বাহিরেই ছিল। জিজ্ঞাসা করিল, ‘কী ভায়া, এত দেরি যে?’

ছোটো চোর। কী আর বলি ভাই, বড়ো সুখেই আজ দিন কেটেছে গোরুটা যে এত শান্ত, তা আমি আগে মনে করিনি। ভেবেছিলাম, না জানি আজ কত নাকালই হতে হবে, কিন্তু আসলে দেখি, কিছুই না। আমিও তাকে ছেড়ে দিলাম, আর সে-ও ধীরে ধীরে চরে বেড়াতে লাগল। কাজ নেই কর্ম নেই, শুধু বসে বসে কী করি, কাজেই গামছাখানি বিছিয়ে শুয়ে পড়লাম যেমন শোয়া, অমনি ঘুম। সেই এক ঘুমে একেবারে দিন শেষ। তারপর তাড়াতাড়ি উঠে দড়্গিাছি ধরে এই আসছি ––আচ্ছা, তোমার খবর কী?

বড়ো চোর। সেকথা আর জিজ্ঞেস কর কেন? বড়ো কপালজোরে এমন সুখের চাকুরি জুটেছে এখন টিঁকলে হয়। তুমি তো সেই চলে গেলে, তারপর আমি গাছের গোড়ায় তিন-চার কলসি ঢেলেছি, অমনি জল থইথই করতে লাগল। আর এক কলসি যে দেব তার জায়গা রইল না। কাজে কাজেই আমিও খানিক ঘুরে-ফিরে, খানিক ঘুমিয়ে এখন এই শেষ বেলায় চুপচাপ বসে আছি।’

কথাবার্তা শেষ হইলে, বড়ো চোর ভাবিল, গাছে জল দেওয়া অপেক্ষা গোরু চরানো ঢের সহজ কাজ। ছোটো চোর ভাবিল, গোরু চরানো আর নয়, বাবা। দুই জনেই মনে মনে আপন আপন কাজ বদল করিতে ইচ্ছা করিল। শেষে বড়ো চোর মুখ ফুটিয়া বলিল, ‘দেখো ভাই, কাল যদি আমরা পরস্পর কাজ বদল করে নিই, তাতে তোমার কোনো আপত্তি আছে কি?’

ছোটো চোর। একটুও না। বেশ তো, একদিন না হয় তুমি গোরুটা চরালে। তবে তোমায় পরামর্শ দিই। আজ সমস্ত দিন চষা মাটির উপর শুয়ে আমার গায়ে ব্যথা হয়েছে। তুমি একখানা খাটিয়া সঙ্গে নিয়ো। গাছের ছায়ায় বেশ আরামে ঘুমোতে পারবে।

পরদিন সকালবেলা বড়ো চোর গোরুটা লইয়া বাহির হইল। আরামে নিদ্রা দিতে পারিবে বলিয়া সে খাটিয়াখানা সঙ্গে লইতে ভুলে নাই। আর ছোটো চোর কলসি লইয়া গাছে জল ঢালিতে শুরু করিল। ভাবিয়াছিল দুই-চারি কলসি ঢালিবামাত্র গাছের গোড়ায় জল থইথই করিবে, কিন্তু সর্বনাশ! দুই শত কলসি জল দিবার পরেও দেখে কিনা, একটুও মাটি ভিজে নাই। জল দিতে দিতে বেচারার হাত টনটন এবং বুক কনকন করিতে লাগিল। শেষে সূর্যাস্তের পর ছোটো চোর একেবারে নাকাল হইয়া বসিয়া পড়িল।

এদিকে বড়ো চোরেরও দুর্দশার সীমা রহিল না। গোরুটা তো সে-ই, সুতরাং তাহার শয়তানির পরিচয় আর নতুন করিয়া কী দিব? ছাড়িবামাত্র সে শিং বাগাইয়া ছুটিল, বড়ো চোরের মহা বিপদ উপস্থিত। আরামের জন্য সে খাটিয়া লইয়াছিল, এখন সে খাটিয়াই বা রাখে কোথায় আর তাহা ঘাড়ে করিয়াই বা ছোটে কীরূপে? কিন্তু আর উপায় নাই। বেচারাকে সেই খাটিয়া লইয়াই সমস্ত দিন লোকের বাড়ির আনাচে-কানাচে, শস্যের খেতে, ফল-পাকুড়ের বাগানে, মাঠে ও জঙ্গলে গোরুর পিছনে পিছন ছুটাছুটি করিতে হইল। কাঁটাবনের ভিতর দিয়া ছুটিতে ছুটিতে তাহার দেহ রক্তারক্তি হইল নালা ডিঙাইতে পা মচকাইয়া গেল। ইহার উপর আবার লোকের গালাগালিই বা কত! মাঝে মাঝে গোরুটা যদিও বা একটু থামে, কিন্তু ছেলেদের চিৎকার ও হাততালিতে তখন আবার খেপিয়া উঠে এবং ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটিতে থাকে। সন্ধ্যা পর্যন্ত ছুটাছুটি করিবার পর, বড়ো চোর কোনোরকমে গোরুটা ধরিয়া ফেলিল। তারপর তাহাকে টানিতে টানিতে যখন মনিবের বাড়িতে পঁহুছিল, তখন সন্ধ্যা অতীত হইয়া গিয়াছে।

দুই চোরে আবার একত্র হইল, কিন্তু কাহারও মুখে কথাটি নাই। দুই-জনেই আড়চোখে তাকায় আর মুখ মুচকাইয়া হাসে! রাত্রে আহারাদির পর শয়ন করিয়া তাহারা আপন-আপন দুঃখের কাহিনি আরম্ভ করিল।

ছোটো চোর। কী ভায়া, দিনটা গেল কেমন?

বড়ো চোর। এই তোমার যেমন গেছে, বরং তার চেয়ে আর এককাটি সরেস।

ছোটো চোর। যাই বল ভাই, আমার কিন্তু এ চাকুরি আর ভালো লাগে না। আমাদের আগের ব্যাবসাই ছিল ভালো।

বড়ো চোর। তার মিছে নয়। অনেক গোরু দেখেছি বাবা কিন্তু এটার জুড়ি মেলা ভার। উঃ, সারাটা দিন আজ কী কষ্টই না দেছে!

ছোটো চোর। আরে, গোরু তো কোনো কোনোটা দুরন্ত হয়েই থাকে। এর চেয়েও দুষ্টু গোরু দেখেছি, কিন্তু বলো দেখি, এমন অদ্ভুত চাঁপা গাছ, আর কোথায় আছে? আচ্ছা, এত যে জল দিলাম, গেল কোথায়? নীচে পুকুর আছে নাকি?

বড়ো চোর। আমার ইচ্ছে হয়, একবার খুঁড়ে দেখি। কী আছে না আছে, তাহলেই জানতে পারব।

ছোটো চোর। তা বেশ তো, সকলে ঘুমিয়ে পড়লে, আজই চলো, সন্দেহটা দূর করি।

গভীর রাত্রিতে ––যখন জনপ্রাণীর সাড়াশব্দ নাই––দুই চোর কোদাল, খোন্তা প্রভৃতি লইয়া চাঁপা গাছের গোড়া খুঁড়িতে আরম্ভ করিল। খানিক খুঁড়িবার পর ছোটো চোরের খোন্তা একটা ধাতুপাত্রে লাগিয়া টং করিয়া উঠিল। শব্দ শুনিয়া দুইজনেই অবাক। ছোটো চোর চক্ষুর পলকে হাত ঢুকাইয়া দেখিল, পাত্রটি মোহরে ভরা! কিন্তু সেকথা গোপন করিয়া বড়ো চোরকে বলিল, ‘ও কিছুই না, একখানা পাথরে খোন্তা লেগে ওরকম শব্দ হয়েছে।’ বড়ো চোর সবই বুঝিল, কিন্তু এমন ভাব দেখাইল, যেন সে কিছুই বুঝে নাই। কিছু পরে দুই জনে হাত-পা ধুইয়া ঘুমাইতে গেল।

আন্দাজ এক ঘণ্টা পরে বড়ো চোর আস্তে আস্তে উঠিয়া বসিল। ছোটো চোর তখন গাঢ় ঘুমে অচেতন। বড়ো চোর পা টিপিয়া টিপিয়া গর্তের কাছে গিয়া, মোহরের ঘড়াটি উঠাইল। কিছু দূরে আর একটি ঘড়া ছিল সেটিও মোহরে ভরা। বড়ো চোর সেই দুইটি ঘড়া লইয়া তাড়াতাড়ি পুকুরের পাড়ে পুঁতিয়া রাখিল এবং হাত-পা ধুইয়া ধীরে ধীরে আবার ছোটো চোরের পাশে আসিয়া শুইয়া পড়িল।

ছোটো চোর এতক্ষণ ঘুমাইতেছিল, হঠাৎ মোহরের স্বপ্ন তাহাকে একেবারে অস্থির করিয়া তুলিল। বড়ো চোর শুইবার অল্প পরেই সে উঠিয়া তাড়াতাড়ি চাঁপা গাছের কাছে গেল। সেখানে মোহরের ঘড়া নাই দেখিয়া তাহার তো চক্ষুস্থির! কিন্তু তাহার বুঝিতে বাকি রহিল না যে, এ সমস্তই বড়ো চোর মহাশয়ের চালাকি! যাহা হউক, তাহাকে ফাঁকি দেওয়া সহজ নয়। সে আস্তে আস্তে বিছানার পাশে আসিয়া বড়ো চোরের হাত, পা পরীক্ষা করিতে লাগিল। দেখিল, স্থানে স্থানে কাদার চিহ্ন রহিয়াছে। ছোটো চোর তখন বেশ বুঝিতে পারিল যে, বড়ো চোর মোহরের ঘড়া পুকুরের পাড়ে লুকাইয়া রাখিয়াছে। কিন্তু পুকুরের তো চারিটা পাড় কোন পাড়ে রাখিল, জানা যায় কীরূপে? ভাবিতে ভাবিতে ছোটো চোর পুকুরের চারি পাড় একবার ঘুরিয়া আসিল। তিনদিন হইতে কতকগুলো ব্যাং লাফাইয়া পড়িল দেখিয়া, ছোটো চোর বুঝিল যে, বড়ো চোর সেই তিন দিকে যায় নাই। তারপর অপর দিকে গিয়া একটু খোঁজ করিতেই ছোটো চোর মোহরের কলসি দেখিতে পাইল। সে জানিত, কেবল একটি কলসিই পাওয়া যাইবে, কিন্তু যখন মোহরে ভরা আরও একটি কলসি পাইল, তখন তাহার আর আনন্দের সীমা নাই! ছোটো চোর তাড়াতাড়ি গোয়াল হইতে সেই দুরন্ত গোরুটা আনিয়া তাহার পিঠে দুই কলসি মোহর চাপাইয়া রাতারাতি বাহির হইয়া পড়িল!

ভোরের বেলা বড়ো চোর ছোটো চোরকে না দেখিয়া ভয়ে ভয়ে পুকুর পাড়ে গেল। হায়! হায়! মোহরের কলসিও নাই আর সেই দুরন্ত গোরুটাও নাই! সে বেশ বুঝিতে পারিল যে, ছোটো চোর গোরুর পিঠে মোহরের কলসি চাপাইয়া দেশে রওনা হইয়াছে। এখন যেরূপে হউক, তাহাকে ধরা চাই!––এই ভাবিয়া বড়ো চোর তখনই বাহির হইল। বাজারের ভিতর দিয়া যাইবার সময়, তাহার নিকট টাকাকড়ি যাহা ছিল, তাহা দিয়া এক জোড়া সুন্দর জুতা কিনিল। সে যে কত সুন্দর, তাহা আর কী বলিব! তাঁহার উপর সোনার ফিতা, রুপার ফুল! তারপর বন-জঙ্গলের পথ ধরিয়া সে খুব তাড়াতাড়ি ছুটিতে লাগিল। একটু বেলা হইলে, বড়ো চোর সদর রাস্তার একস্থানে পৌঁছিয়া দেখিল, ছোটো চোর, অনেক পিছনে পড়িয়াছে। গোরু চালাইয়া সদর রাস্তার আঁকেবাঁকে ঘুরিতে ফিরিতে ছোটো চোরের দেরি হইয়া পড়িয়াছিল। বড়ো চোর দূর হইতে তাহাকে আসিতে দেখিয়া, রাস্তার ঠিক মাঝখানে এক পাটি জুতা ফেলিয়া আর কিছু দূর অগ্রসর হইল সেখানে দ্বিতীয় পাটি ফেলিয়া পাশের একটা ঝুপি জঙ্গলের মধ্যে লুকাইয়া রহিল। এদিকে ছোটো চোর চলিতে চলিতে পথের মাঝে একপাটি জুতা দেখিয়া আশ্চর্য হইয়া গেল। এমন সুন্দর জুতা সে আর কখনো দেখে নাই। ভাবিল ভাগ্যগুণে আমার অবস্থা এখন রাজরাজড়ার তুল্য।

এই জুতা ঠিক আমারই যোগ্য। কিন্তু ইহার জোড়া কোথায়? অপর পাটি না পাইলে এক পাটি জুতা লইয়া কী করিব? সে অনেক খোঁজ করিয়াও যখন অপর পাটি পাইল না, তখন প্রথম পাটি এক পাশে ফেলিয়া দিয়া, পুনরায় অগ্রসর হইতে লাগিল। খানিক পরে দ্বিতীয় পাটি তাহার চক্ষে পড়িল। তখন ছোটো চোরের ভারী অনুতাপ হইতে লাগিল। ভাবিল, ‘আমি কী নির্বোধ? যদি প্রথম পাটি হাতে করিয়া লইয়া আসিতাম, তাহা হইলে কী মজাই না হইত! যাহা হউক, এখনও বোধ করি পাওয়া যাইতে পারে।’––এই ভাবিয়া, সে গোরুটা রাস্তার এক পাশে বাঁধিয়া রাখিয়া প্রথম পাটির সন্ধানে ফিরিল। বড়ো চোর কি এমন সুযোগ ছাড়িতে পারে! ছোটো চোর পিছন ফিরিবামাত্র, সে গোরুটাকে বনে-জঙ্গলের পথে চালাইয়া লইয়া চলিল। বড়ো চোর এমন রাস্তায় গেল যে, কাহার সাধ্য নাই, তাহাকে খুঁজিয়া বাহির করে।

বড়ো চোর সরিয়া পড়িবার পর, ছোটো চোর ফিরিয়া আসিয়া দেখে, গোরুটা সেখানে নাই। সে বেশ বুঝিতে পারিল যে, ইহা বড়ো চোরেরই কাজ। তখন খুব তাড়াতাড়ি ছুটিয়া হাঁপাইতে হাঁপাইতে ছোটো চোর একেবারে বড়ো চোরের বাড়িতে উপস্থিত হইল এবং চুপিচুপি সদর দরজার আড়ালে লুকাইয়া রহিল।

তারপর বড়ো চোর যেই বাড়িতে পা দিয়াছে, অমনি সে হাসিতে হাসিতে বাহিরে আসিয়া বলিল, ‘কী ভায়া, খবর ভালো তো? এখন এসো মোহরগুলো ভাগ করে ফেলি।’ বড়ো চোর কোনো আপত্তি করিল না।

তখন দুইজনে অন্দরমহলে ঢুকিয়া সমুদয় দরজা জানালা বন্ধ করিয়া দিল এবং দুই কলসি মোহর একত্র জড়ো করিয়া, দুই হাতে দুইটি করিয়া তুলিয়া সমান দুই ভাগ করিতে লাগিল। ভাগ শেষ হইলে দেখা গেল, একটি মোহর বেশি রহিয়াছে। এখন সেইটি কাহার হইবে? অনেক বাগবিতণ্ডার পর এই স্থির হইল যে, পরদিন সেইটি ভাঙাইয়া টাকা করিয়া উভয়ে সমান ভাগে ভাগ লইবে। ভালো, তাহা যেন হইল, কিন্তু মোহরটি রাত্রে থাকে কাহার কাছে? তাহা লইয়াও খানিক তর্কবিতর্ক চলিল শেষে সেইটি কেবল এক রাত্রের জন্য বড়ো চোরের কাছে রাখাই স্থির হইল। ইহার পর ছোটো চোর তাহার অংশ লইয়া বাড়িতে ফিরিয়া গেল।

রাত্রে বড়ো চোর বাড়ির মেয়েদের ডাকিয়া বলিল, ‘দেখো, কাল সকালেই ছোটো চোর মোহরের ভাগ নিতে আসবে, কিন্তু আমি কিছুতেই তা দেব না। তোমরা এক কাজ করো––ভোর হতে না হতে আমাকে উঠোনে শুইয়ে, আমার মাথা থেকে পা পর্যন্ত একখানা কাপড় ঢাকা দিয়ো এবং ঠিক মাথার কাছে একটা তুলসী গাছ রেখো। তারপর পথে ছোটো চোরকে আসতে দেখলে খুব চেঁচিয়ে কেঁদো! তাহলে সে নিশ্চয়ই ভাববে রাত্তিরে হঠাৎ আমি মরে গেছি! মরা লোকের কাছে সে কখনো মোহরের ভাগ চাইবে না।’

মেয়েরা বড়ো চোরের পরামর্শমতো পরদিন তাহাকে উঠানে শোয়াইয়া, কাপড় ঢাকা দিয়া রাখিল এবং তাহার মাথার কাছে একটা তুলসী গাছ রাখিয়া দিল। তারপর ছোটো চোরকে আসিতে দেখিয়া, সকলে মিলিয়া বুক চাপড়াইয়া কাঁদিতে আরম্ভ করিল––‘ওগো, কী সর্বনাশ হল গো। একে তুমি কোথায় নিয়ে গেছিলে! হায় হায়! আমাদের কপাল পুড়েছে গো।’

শয়তানিতে ছোটো চোর আরও পাকা। প্রকৃত ব্যাপার বুঝিতে তাহার বাকি রহিল না, কিন্তু মনের ভাব গোপন করিয়া সে কাঁদো কাঁদো সুরে বলিল, ‘আহা এতকাল পরে আমি সঙ্গীহারা হলাম। যাহোক, আর কেঁদে কী হবে? তোমরা আপন আপন কাজে যাও আমি এর সৎকার করে আসি।’ এই বলিয়া সে কতকগুলো খড়ের বিচালি সংগ্রহ করিয়া খুব মোটা একগাছা রশি পাকাইল। তারপর বড়ো চোরের দুই পা একসঙ্গে বাঁধিয়া টানিতে টানিতে শ্মশানঘাটে লইয়া চলিল। ছোটো চোর ভাবিয়াছিল, রাস্তার পাথরে গা ছড়িয়া গেলে বড়ো চোর নিশ্চয়ই কথা বলিবে, কিন্তু সেটা তাহারই বুঝিবার ভুল। বড়ো চোরের গা দিয়া দরদর ধারে রক্ত ঝরিতে লাগিল, তবুও পাছে মোহরের ভাগ দিতে হয়, এই ভয়ে সে একটি কথাও বলিল না––ঠিক মড়ার মতো পড়িয়া রহিল!

তাহাকে টানিতে টানিতে ছোটো চোর শ্মশানঘাটে পঁহুছিল এইবার তাহাকে দাহ করিতে হইবে। কিন্তু কাঠও নাই আর তাড়াতাড়িতে দিয়াশলাই আনিতেও তাহার মনে ছিল না। এখন যদি সে দিয়াশলাই আনিতে যায়, তা হইলে সবই মাটি হইবার সম্ভাবনা। বড়ো চোর হয়তো সেই সুযোগে পিটটান দিবে। এখন উপায় কী? ভাবিতে ভাবিতে ছোটো চোরের মাথায় এক ফন্দি জাগিল। সে একটা গাছে চড়িয়া খড়ের রশি ডালে বাঁধাইয়া টানিতে টানিতে বড়ো চোরকে উঁচুতে তুলিল। সেই অবস্থায় তাহাকে ঝুলাইয়া রাখিয়া নিজে একটা ঝোপের মধ্যে লুকাইয়া রহিল। এভাবে বেশিক্ষণ থাকা বড়োই কষ্টকর। ছোটো চোর ভাবিয়াছিল, এইবার বড়ো চোরকে নিশ্চয়ই কথা বলিতে হইবে। কিন্তু ভাগ দিবার ভয়ে কিছুতেই সে কথা বলিল না––ঠিক মড়ার মতো ঝুলিতে লাগিল।

এই সময়ে এক আশ্চর্য ব্যাপার ঘটিল। একদল ডাকাত সেই শ্মশানের নিকট দিয়া যাইতে যাইতে দেখিতে পাইল, গাছের ডালে একটা মড়া ঝুলিতেছে। কোনো কাজে যাইবার পূর্বে মড়া দেখিতে পাওয়া নাকি একটা শুভ লক্ষণ। ডাকাতেরা পরস্পর বলাবলি করিতে লাগিল, ‘আজ আমাদের শুভযাত্রা সামনে যখন মড়া দেখেছি, তখন লুটপাট যে আমাদের মনের মতো হবে, তাতে আর সন্দেহ নেই।’ দলপতি বলিল, ‘তা যদি হয়, তবে ফেরবার পথে ওকে পুড়িয়ে যাব।’

ডাকাতেরা সেই রাত্রে এক ধনীর গৃহে প্রবেশ করিয়া তাঁহার সর্বস্ব লুঠ করিল। তাহারা এমন কৌশলে গৃহের লোকজনের হাত, পা ও মুখ বাঁধিয়া ফেলিয়াছিল যে, কেহ একটা টুঁ শব্দও করিতে পারে নাই। সুতরাং পাড়াপড়শি কেহই এই ডাকাতির কথা জানিতে পারিল না। ডাকাতেরা যতটা আশা করিয়াছিল, তাহা অপেক্ষা অনেক বেশি টাকাকড়ি সোনাদানা পাইল। তাহাদের তখন কী আনন্দ!

হাসিতে হাসিতে শ্মশানঘাটে আসিয়া তাহার প্রথমেই একটা গর্ত খুঁড়িল! তারপর বনবাদাড় হইতে কাঠ আনিয়া চিতা সাজাইল। চিতা প্রস্তুত হইলে, রশি কাটিয়া দেহটি নামাইয়া তাহার পর শোয়াইল। তারপর যেই আগুন দিবার উপক্রম করিতেছে, অমনি সেই মড়া বিকট স্বরে চিৎকার করিয়া উঠিল! আর ঠিক সেই মুহূর্তে ছোটো চোর ভয়ংকর––‘হারে––রে––রে’ শব্দে শ্মশানভূমি কাঁপাইয়া মাটিতে লাফাইয়া পড়িল।

ডাকাতেরা ভয়ে কাঁপিয়ে কাঁপিতে––‘বাপ রে, মা রে’––ডাক ছাড়িয়া যে যেদিকে পথ পাইল, দৌড় দিল! টাকাটাড়ি সমস্তই পড়িয়া রহিল। তাহাদের আর এমন সাহস হইল না যে, একবার ফিরিয়া চায়। তাহারা ভাবিল, মড়াটাকে নিশ্চয়ই দানোয় পাইয়াছে। আর গেছো-ভূতটা যে তাহাদের ঘাড় ভাঙিবার সন্ধানে ফিরিতেছে, তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই! এই কথা যতই ভাবে, ততই তাহারা ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটিতে থাকে।

তখন দুই চোরে হাসিতে হাসিতে সেই সমুদয় ধনদৌলত ভাগাভাগি করিয়া বাড়ি ফিরিল।

আমার কথাটি ফুরুল, ইত্যাদি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *