মহেশ সর্দার
ঠেঙিয়ে বাঘ-মারা
বেশিদিনের কথা নয়, ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বৎসর আগে, কেহ সুন্দরবনে চাকুরি করিতে গেলে, লোকে তাঁহাকে বিস্ময়মিশ্রিত সম্মানের চক্ষে দেখিত। অসাধারণ শারীরিক বল ও সাহস না থাকিলে, কেহই সুন্দরবনে যাইতে রাজি হইত না। চতুর্দিকে জঙ্গলে পূর্ণ। জমিদারের কাছারিবাড়িও তেমন নিরাপদ স্থান নহে কখন কাহাকে বাঘের মুখে প্রাণ দিতে হয়, কে বলিতে পারে? দিবসে লোকজনের গোলযোগ এবং কাজকর্মের ব্যস্ততা, কিন্তু রাত্রে প্রাণটা যেন হাতে লইয়া বসিয়া থাকিতে হইত। সন্ধ্যার পূর্বেই আহারাদি সারিয়া যে- যাহার গৃহে আশ্রয় লইত সমস্ত রাত্রির মধ্যে আর ঘরের বাহির হয় কাহার সাধ্য! অন্ধকার একটু ঘনীভূত হইলেই, অমনি ঘন ঘন ভীষণ গর্জন। সেই গর্জন কখনো দূরে, কখনো নিকটে, কখনো বা কাছারিবাড়ির আঙিনায়। অতি সাহসী ব্যক্তিও ভয়ে জড়সড় হইয়া পড়িত।
সুন্দরবনের অবস্থা যখন এইরূপ, সেই সময়ে একদিন সন্ধ্যার পূর্বে মহেশ সর্দার নামে একজন প্রজা কাছারিবাড়িতে আসিয়াছে। নায়েব মহাশয়ের কাছে বিশেষ প্রয়োজন। জমির সম্বন্ধে কথাবার্তা বলিতে বলিতে ক্রমে সন্ধ্যা অতীত হইয়া গেল। নায়েব মহাশয় বলিলেন, ‘মহেশ, এ অন্ধকার রাত্রে তোমার আর বাড়ি গিয়ে কাজ নেই। খাওয়াদাওয়া সেরে রাতটা এখানেই কাটিয়ে দাও।’ মহেশ বলিল, ‘না নায়েব মশাই, বাড়ি যেতে হচ্ছে। আমি কাউকে কিছু বলে আসিনি, তারা ভয় পাবে।’ নায়েব বলিলেন, ‘তবে এক কাজ করো, একটা লন্ঠন আর ওই একনলা বন্দুকটা সঙ্গে নাও। তোমার বাড়ি তো আর কাছে নয় বিশেষ, পথে যে জঙ্গল! সত্যি কথা বলতে কী, তোমাদের ওদিকে দিনেরবেলা যেতেও ভয় হয়।’ নায়েব মহাশয়ের কথা শুনিয়া মহেশ বলিল, ‘নায়েবমশাই, ইস্তকনাগাদ এই সুঁদরবনেই আছি ভয় কাকে বলে, তা জানিনে। আমি লন্ঠনও চাইনে, বন্দুকও চাইনে। আমার ছাটা (বাঘ-মারা লম্বা লাঠি) গাছটাই যথেষ্ট। কপালে মরণ থাকলে কেউ বাঁচাতে পারবে না।’ নায়েব বলিলেন, ‘সেকথা সত্যি, বন্দুকই বলো আর যাই বলো, কপালটাই আদত। আচ্ছা, তবে এখন যাও––তোমার কথা আমার মনে রইল। দু-চারদিন পরে খবর নিয়ো।’
কাছারিবাড়ি হইতে বাহির হইয়া, মহেশ সর্দার ভেড়ির রাস্তা ধরিয়া চলিল। নদীর বাঁকে বাঁকে সেই রাস্তা ঘুরিয়াছে। বরাবর সেই রাস্তা ধরিয়া চলিলে, অনেকটা ঘুরিতে হয় সত্য, কিন্তু মহেশ হয়তো নিরাপদে বাড়ি পৌঁছিতে পারিত। দুঃখের বিষয়, কিছু দূর গিয়াই মহেশ ভেড়ির রাস্তা ছাড়িয়া, শীঘ্র বাড়ি পৌঁছিবার জন্য একটা সংকীর্ণ বিপদসংকুল রাস্তা ধরিল। নিজের শক্তিতে প্রবল বিশ্বাস এবং নির্ভর ভিন্ন, রাত্রে সে-রাস্তায় কেহ অগ্রসর হয় না। চারিদিক ঘন অন্ধকারময়। বীরহৃদয় মহেশ কিছুই ভ্রূক্ষেপ না করিয়া দ্রুতপদে বাড়ির দিকে চলিতেছে। বাড়ি আর বেশি দূরে নহে, আর একটু অগ্রসর হইলেই সম্মুখে একটা নালা, তাহার পরেই মহেশের বাগানবাড়ি।
এদিকে হইয়াছে কী, সন্ধ্যার পরেই এক বিশালকায় ব্যাঘ্র, মহেশদের বাগানবাড়িতে আসিয়া, সামান্য কতকগুলো ঘাসের জঙ্গল আশ্রয় করিয়া বসিয়াছিল। নালা
পার হইয়া মহেশকে সেই স্থান দিয়াই বাড়িতে ঢুকিতে হইত। বাঘ আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করিলে, খাদ্যসামগ্রী তাহার সম্মুখেই হাজির হইত কিন্তু তাহার আর দেরি সহিল না। নালার অপর পারে মহেশের পদশব্দ শুনিয়াই সে চক্ষের পলকে নালার কাছে গিয়া হাজির হইল। ঠিক সেই সময় মহেশও নালার নিকটে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে। কী ভয়ংকর মূর্তি! সম্মুখে কয়েক হাত মাত্র দূরে প্রকাণ্ড বাঘ! তাহার চক্ষু দুইটি জ্বলন্ত অগ্নি! কিন্তু ইহাতেও মহেশের বীরহৃদয় টলিল না। সে তাহার দীর্ঘ ছাটাগাছা বাগাইয়া ধরিল। তারপর তাহাকে লক্ষ করিয়া, বাঘ যেমন গর্জিয়া লাফাইয়া উঠিয়াছে, অমনি তাহার মুখ লক্ষ করিয়া মহেশ তাহার ছাটার প্রবল একটা গুঁতা দিল। সেই গুঁতার চোটে ছাটা একেবারে বাঘের কণ্ঠনালীতে গিয়া প্রবিষ্ট হইল। সে শত চেষ্টাতেও উহা উগরাইয়া ফেলিতে পারিল না! বেচারার পশ্চাতের দুই পা নালার এপারে, আর তাহার দেহের সমস্ত ভার মহেশের ছাটার উপরে! সেই ছাটার গোড়ার দিক দুই হাতে দৃঢ়রূপ ধরিয়া, মহেশ তাহা আপনার কোমরের উপর রক্ষা করিতে লাগিল।
বাঘের মুখের মধ্যে প্রকাণ্ড ছাটা! সে ভীষণ গর্জন আর নাই! কেবল কাতর গোঙানি মাত্র! সেই গোঙানিতে আকৃষ্ট হইয়া, মহেশের ছোটো ভাই রাখাল আর-একগাছা ছাটা লইয়া গৃহ হইতে বাহিরে আসিল। তাহাকে বাঘের পশ্চাতে উপস্থিত দেখিয়া মহেশ বলিল, ‘রাখাল, একটু দেরি কর, আমি ছাটাগাছা আগে কোমর থেকে ওঠাই তারপর ব্যাটার মাথা বরাবর বিরাশি সিক্কা ওজনের এক ঘা বসাবি!’
রাখাল তাহার দাদার উপযুক্ত ভাই। অল্পক্ষণ পরেই প্রকাণ্ড ছাটার ঘা খাইয়া, বাঘ নালার মধ্যে উপুড় হইয়া পড়িল। সামলাইয়া উঠিবার পূর্বেই, দুই ভাইয়ে মিলিয়া দুইদিক হইতে ঠ্যাঙাইয়া তাহার জীবন শেষ করিয়া দিল।
জাগিয়ে বাঘ মারা
আমার বাবা সুন্দরবনে কাজ করিতেন। মহেশ সর্দারের সাহসের পরিচয় পাইয়া তিনি তাহাকে আপনার কাছারিবাড়িতে নিযুক্ত করিয়াছিলেন।
সেবার পূজার ছুটিতে বাবার সহিত আমি সুন্দরবন দেখিতে যাই। আমার বেশ মনে আছে, যেদিন আমরা কাছারিতে পৌঁছিলাম, সেদিন বড়োই দুর্যোগ ছিল! কেবল বাতাস আর বৃষ্টি। যাহা হউক, সমস্ত দিন বৃষ্টির পর রাত্রে আকাশ বেশ পরিষ্কার হইল। বাবা সর্দারকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘মহেশ, আমার ছেলে সুন্দরবন দেখতে এসেছে। আকাশ পরিষ্কার থাকলে, তুই কাল সকালে শিকারে যাবার সময় একে সঙ্গে নিয়ে যাস।’
পরদিন শিকারে বাহির হইব ভাবিয়া আমার মনে খুবই আনন্দ হইতে লাগিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় সকালে উঠিয়াই দেখি, ঝমঝম করিয়া বৃষ্টি হইতেছে। সম�স্ত দিন বৃষ্টি হইয়া সন্ধ্যার পরে আকাশ আবার বেশ পরিষ্কার হইল। এইভাবে তিন-চারদিন ক্রমাগত বৃষ্টি ও বাতাস হইয়া একদিন অপরাহ্নে সকল দুর্যোগ কাটিয়া গেল।
সেইদিন সন্ধ্যার পর, কয়েকজন প্রজা এবং বাবা ও আমি কাছারিঘরের আঙিনায় বসিয়া কথাবার্তা বলিতেছি, এমন সময়, জলা-মাঠের উপর দিয়া কেহ ছুটিয়া গেলে যেমন শব্দ হয়, সেইরূপ শব্দ খালের দিক হইতে আসিতে লাগিল। একটু পরেই কয়েকজন প্রজা ছুটিয়া আসিয়া বলিল, ‘বাবু, গতিক বড়ো ভালো নয়। যেরকম শব্দ শোনা যাচ্ছে, তাতে বাঘ আসছে বলে সন্দ হয়, আপনারা ঘরের ভিতর গিয়ে বসো।’ বাবা বলিলেন, ‘বাঘ আসছে আসুক, তাতে এত ভয় কী? বাঘ তো আর কাছারিবাড়ির ভেতরে আসবে না!’ বাবার কথা শেষ না হইতেই কিন্তু কাছারিবাড়ির অতি নিকটে আমরা ভীষণ একটা গর্জন শুনিতে পাইলাম। ভয়ে আমার আপাদমস্তক কাঁপিতে লাগিল। আমরা তাড়াতাড়ি সকলে ঘরের মধ্যে প্রবশে করিলাম।
তখন বেশ জ্যোৎস্না উঠিয়াছিল। আমরা ঘরের ভিতর হইতে জানালা ফাঁক করিয়া বাঘের গতিবিধি লক্ষ করিতে লাগিলাম। অল্পক্ষণ পরেই কাছারিবাড়ির কয়েকটা কুকুর ভয়ে চিৎকার করিতে করিতে দূরে পলায়ন করিল।
বাঘটা নিশ্চয়ই কাছারিবাড়িতে ঢুকিয়াছে, তাহা না হইলে কুকুরগুলো পলাইবে কেন? এই ভাবিতে ভাবিতে আমরা জানালার ভিতর দিয়া এদিক-সেদিক সন্ধান করিতেছি, এমন সময় কাছারিঘর এবং রান্নাঘরের মাঝের সংকীর্ণ পথ দিয়া তাহাকে চলিয়া যাইতে দেখিলাম। আমাদের নিকট হইতে চার-পাঁচ হাত দূর দিয়া বাঘ নিরাপদে চলিয়া গেল দেখিয়া, আমার দুঃখের সীমা রহিল না। কিন্তু উপায় কী? কাছারিবাড়ির একমাত্র বন্দুক লইয়া তখন মহেশ সর্দার কোথায় চলিয়া গিয়াছিল। যাহা হউক, বাঘকে চলিয়া যাইতে দেখিয়াও ঘরের দরজা খুলিতে আমাদের সাহস হইল না।
কিছুক্ষণ অপেক্ষা করিয়া, দরজা খুলিব মনে করিতেছি, এমন সময়ে, বাঘটা যেদিকে গিয়াছিল, হঠাৎ সেই দিক হইতে বন্দুকের আওয়াজ এবং পর মুহূর্তেই বাঘের ভীষণ গর্জন শুনিতে পাওয়া গেল। বাঘের গর্জন থামিতে না থামিতে, আরও একবার বন্দুকের আওয়াজ শুনিতে পাইলাম। ব্যাপারটা কী, দেখিবার জন্য আমরা দরজা খুলিয়া আঙিনায় আসিয়া দাঁড়াইলাম।
কিছুক্ষণ পরে মহেশ সর্দার হাঁপাইতে হাঁপাইতে আসিয়া বলিল, ‘বাবু মস্ত একটা বাঘ মেরেছি। আমি হরিণ মারবার জন্যে একটা গাছের উপর লুকিয়ে ছিলাম। ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করেও যখন হরিণের উদ্দেশ পাওয়া গেল না, তখন ফিরে আসব ভাবছি––এমন সময় দেখলাম, কাছারিবাড়ির কুকুরগুলো ল্যাজ গুটিয়ে পালাচ্ছে। তাদের রকমসকম দেখে আমার কেমন যেন সন্দ হল, তাই কিছুক্ষণ গাছের উপর থেকে চারিদিক দেখতে লাগলাম। আমাকে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না একটু পরেই দেখি, কাছারিবাড়ি থেকে বেরিয়ে বাঘটা ধীরে ধীরে ঠিক আমার গাছটার দিকেই আসছে! সে ক্রমে এগিয়ে এসে, একটা ছোট্ট ঝোপের ভেতর ঢুকতে যাচ্ছে, এমন সময় আমি গুলি করলাম। প্রথম গুলি খেয়ে বাঘটা চিৎকার করে লাফিয়ে উঠেছিল, কিন্তু পরের গুলিতেই তার দফা রফা হয়ে গিয়েছে।’
মহেশ সর্দারের কথা শুনিয়া আমি আনন্দে লাফাইয়া উঠিলাম। বাবা তখনই কয়েকজন লোক পাঠাইয়া বাঘটাকে কাছারিবাড়িতে আনিলেন। আমি মাপিয়া দেখিলাম, বাঘটা ঠিক সাত হাত।
পরদিন সকালে আকাশ বেশ পরিষ্কার ছিল। বাবার আদেশমতো মহেশ সর্দার আমাকে লইয়া শিকারে বাহির হইল। আমরা কাছারি হইতে কিছুদূর গিয়া ইতস্তত ঘুরিয়া বেড়াইতেছি, এমন সময় একজন পাইক আসিয়া খবর দিল যে, কিছুদূরে একদল হরিণ চরিতেছে। হরিণের কথা শুনিয়া মহেশের উৎসাহ দেখে কে! সে আমাকে লইয়া তখনই পাইকের সঙ্গে চলিল।
আমরা একটা ঘন জঙ্গল পার হইয়া, প্রায় বিশ মিনিট পরে সম্মুখে অপেক্ষাকৃত ফাঁকা এক মাঠ দেখিতে পাইলাম। উহার এক পাশে একটা ডোবা। ডোবার ধারে কতকগুলি হরিণ চরিতেছিল। আমরা ঝোপের আড়ালে আড়ালে অগ্রসর হইতে লাগিলাম। কিন্তু বিশেষ চেষ্টাতেও তাহাদের দৃষ্টি এড়াইতে পারিলাম না। ক্রমে একটা হরিণ বাদে আর সবগুলা জঙ্গলের মধ্যে অদৃশ্য হইল। সেও, বোধ করি, আমাদের সন্ধান পাইয়াছিল। বন্দুকের পাল্লা ততদূর পৌঁছিবে না বলিয়া, আমরা হরিণের প্রতি লক্ষ রাখিয়া ছুটিতে আরম্ভ করিলাম। হরিণও ক্রমে খালের দিকে যাইতে লাগিল। সেই দিকেই আকাট জঙ্গল। পূর্বরাত্রে কাছারি-বাড়ির কাছে যে বাঘ মারা হয়, সেটা সেই খালের দিক হইতেই আসিয়াছিল। হঠাৎ এই কথা মনে হওয়ায়, ভয়ে আমার বুক কাঁপিতে লাগিল। আমি পাইককে সঙ্গে লইয়া কাছারিতে ফিরিয়া আসিলাম।
তখন বেলা প্রায় এগারোটা বাজিয়াছিল। আমি স্নান আহার করিয়া একখানা গল্পের বই লইয়া শয়ন করিলাম এবং অল্পক্ষণ পরেই ঘুমাইয়া পড়িলাম।
কতক্ষণ ঘুমাইয়াছিলাম জানি না, বাবা আমার গা ঠেলিয়া বলিলেন, ‘ওঠ ওঠ, ওই দেখ মহেশ কী মেরে এনেছে!’ মহেশ ফিরিয়া আসিয়াছে শুনিয়া আমি লাফাইয়া উঠিলাম এবং বাহিরে আসিয়াই দেখিলাম, উঠানে প্রকাণ্ড একটা বাঘ পড়িয়া রহিয়াছে! আমি আনন্দে নৃত্য করিতে করিতে, মহেশের কাছে গিয়া সেই বাঘ-শিকারের গল্প বলিবার জন্য পীড়াপীড়ি করিতে লাগিলাম। বাবা বলিলেন, ‘এখন গল্প বলবার সময় নয়, মহেশ নেয়ে-খেয়ে আসুক, তারপর গল্প শুনবি।’
আন্দাজ দুই ঘণ্টা পরে মহেশ ফিরিয়া আসিল। আমরা তিন-চারিজনে তাহাকে ঘিরিয়া বসিলাম। মহেশ আমার দিকে চাহিয়া বলিতে লাগিল, ‘তুমি কাছারিতে ফিরে এলে পর, আমি হরিণ তাড়াতে তাড়াতে একেবারে খালের ধারে গিয়ে উপস্থিত হলাম, কিন্তু সেখানে কোন ঝুপিতে যে সে লুকোল, কিছুই ঠিক করতে পারলাম না। এদিকে বেলাও তখন অনেক হয়েছিল। আমি জঙ্গলের পথ ধরে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসতে লাগলাম। কিছুদূর এসেছি, এমন সময় যেন একটা ঘড়ঘড় শব্দ আমার কানে গেল। শব্দ শুনে আমার সন্দ হল, কী জানি হঠাৎ যদি বাঘের মুখে গিয়ে পড়ি। আমি আর এক পা-ও না এগিয়ে, গলা বাড়িয়ে এদিক-সেদিক খোঁজ করছি, এমন সময় দেখি কিনা, একটা ঝুপির ভেতর থেকে ভনভন করে এক ঝাঁক মাছি উড়ে উঠল। এই মাছি মানে কী, তা আমি জানতাম। বাঘের মুখের পচা রক্ত-মাংসের দুর্গন্ধে অনেক সময় মাছি জড়ো হয়। বাঘ একটু নড়াচড়া করলেই তারা উড়তে থাকে। আমি যা ভেবেছিলাম, তাই। একটু হেঁট হবামাত্র ওই প্রকাণ্ড বাঘ আমার চোখে পড়ল। বাঘটা তখন ঘুমুচ্ছিল।’
আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, ‘তারপর? বন্দুক তুলে ধাঁ করে লাগিয়ে দিলে বুঝি?’
‘না বাপু, শিকারির তা দস্তুর নয়। যত বড়ো শত্রুই হোক না কেন, ঘুমন্ত অবস্থায় কাকেও মারতে নেই। আগে তাকে জাগিয়ে তার প্রাণ বাঁচাবার সুযোগ না দিলে, আমি যে কারো কাছে মুখ দেখাতে পরাতাম না।’
‘তুমি খেপেছ নাকি? বাঘকে কায়দার মধ্যে পেয়ে এভাবে ছেড়ে দেওয়া আর সাধ করে মরণ ডেকে আনা একই কথা! এ তো পাগলের কাজ!’
‘তা যাই বল বাপু, আমাদের সেকেলে শিকারিদের মধ্যে এতটুকু মনুষ্যত্ব এখনও আছে।’
‘যাহোক, তুমি কী করলে?’
‘আমি বাঘের উপর চোখ রেখে খানিক দূর পিছিয়ে গেলাম। তারপর খুব ছোটো একটা সুতি খাল আর কয়েকটা ঝোপ বেড় দিয়ে, বাঘের কাছাকাছি এসে, খুব জোরে গলা খাঁকরি দিলাম! বাঘ অমনি লাফিয়ে উঠল। প্রথমটা তার যেন ধাঁধাঁ লেগে গেল। শেষে মুখ বাড়িয়ে যেই সে আমার দিকে ফিরেছে, অমনি দড়াম করে এক গুলি। গুলিটা ঠিক গলায় লেগেছিল, তাই ব্যাঘ্রমশাইকে বেশিক্ষণ ছটফট করতে হয়নি।’
আমি কেবলমাত্র পনেরো দিন সুন্দরবনে ছিলাম। ইহার মধ্যে দুইটি প্রকাণ্ড বাঘ মারা পড়িল দেখিয়া, আমার আনন্দের সীমা রহিল না। বাঘের দুইখানি চামড়া লইয়া পূজার ছুটির শেষে আমি আবার দেশে ফিরিয়া আসিলাম।
কুপিয়ে বাঘ মারা
বাবার কাছারিবাড়ি হইতে দশ-বারো মাইল দূরে ক্ষুদ্র একটি পল্লি আছে। উহার লোক সংখ্যা দুই শতকেরও কম। পল্লিবাসীগণ কয়েকশত বিঘা জমি বন্দোবস্ত লইয়া চাষবাস দ্বারা বেশ সুখে স্বচ্ছন্দে দিন কাটাইয়া থাকে।
পল্লির চারিদিকেই নিবিড় জঙ্গল। তাহাতে বাঘ, ভালুক, গন্ডার প্রভৃতি হিংস্র জন্তুর অভাব নাই। এইসকল দুর্দান্ত প্রতিবেশীর সহিত বাস করিতে করিতে পল্লির সকলেই ক্রমে নির্ভীক হইয়া উঠিয়াছে। এমনকী, স্ত্রীলোকেরা পর্যন্ত দরকার হইলে, বাঘ-ভালুকের সম্মুখীন হইতে ভয় পায় না।
বাঘের উপদ্রব সেখানে লাগিয়াই আছে। সেটা কিছু নূতন কথা নহে। প্রায়ই শুনিতে পাওয়া যায়, অমুকের মহিষটা বাঘে লইয়া গিয়াছে, অমুকের বলদটাকে বাঘে মারিয়াছে, অমুকের ছাগল, ভেড়া খুঁজিয়া পাওয়া যাইতেছে না। এসব ক্ষতি অধিবাসীগণের এক প্রকার ‘গা সহা’ দাঁড়াইয়াছে। কিন্তু সম্প্রতি একটা মানুষখেকো বাঘ আসিয়া যা ভয়ানক অত্যাচার আরম্ভ করিয়াছে, তাহাতে সকলেই অতিষ্ঠ হইয়া উঠিয়াছে। বাঘটা দিন-দুপুরে লোকের ঘাড়ে পড়িয়া, পল্লিবাসীগণকে বিষম আতঙ্কিত করিয়া তুলিয়াছে। আন্দাজ দেড় মাসের মধ্যে ছোটোয়-বড়োয় তেরোটি লোককে খাইয়াও তাহার তৃপ্তি হয় নাই। নূতন নূতন ফন্দি খাটাইয়া নিত্য নূতন আহার্য সংগ্রহ করিতে সে ব্যস্ত। তাহার মস্তকের জন্য জমিদার পঁচিশ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করিলেন। সরকার বাহাদুর হইতে প্রথম পঞ্চাশ, শেষে একশত টাকা পর্যন্ত পুরস্কার ঘোষণা করা হইল, কিন্তু তাহাতেও কোনো ফল হইল না। দলে দলে শিকারি ব্যর্থমনোরথ হইয়া ফিরিয়া যাইতে বাধ্য হইল। বাঘটা যেন সে রাজ্যের একচ্ছত্র রাজা! কাহাকেও গ্রাহ্যের মধ্যেই আনে না। থাকে থাকে––হঠাৎ কোথায় সরিয়া পড়ে, লোকে একটু সোয়াস্তির নিশ্বাস ফেলিতে না ফেলিতে, আবার আসিয়া রাজকর আদায় করিতে থাকে। পল্লিবাসীগণ দলবদ্ধ হইয়া কত স্থানে-অস্থানে, কত ঝোপে-ঝাপে, কত নদী-নালায় সন্ধান করিল, শয়তান বাঘ কোথায় যে গা ঢাকা দিয়া থাকে, কিছুই ঠিক করিতে পারিল না। এইভাবে আরও কিছুদিন কাটিল। তারপর হঠাৎ একদিন বাঘটা পল্লিতে ঢুকিয়া আসন্নপ্রসবা একটি স্ত্রীলোককে লইয়া প্রস্থান করিল। তখন প্রায় সন্ধ্যা হইয়া আসিয়াছে। কৃষকেরা খেত হইতে সবেমাত্র ফিরিয়াছে, এমন সময় এই দারুণ দুর্ঘটনা। ব্যাপার শুনিয়া ভয়ে সকলে কম্পমান, শোকে তাহাদের বুক ফাটিয়া যাইতে লাগিল। রাগে চক্ষু দিয়া আগুন ছুটিতে লাগিল। লোকে ক্ষুধা-তৃষ্ণার কথা ভুলিয়া, ক্লান্তি-অবসাদ অগ্রাহ্য করিয়া অভাগিনীর বাড়ির পানে ছুটিল। পথে যাইতে যাইতে কেহ কেহ প্রতিজ্ঞা করিল, ‘যদি সারা রাত্রি জাগিয়া বাঘের সন্ধান করিতে হয়, তাও স্বীকার, তথাপি এই অত্যাচারের প্রতিশোধ না লইয়া কোনোমতেই ছাড়িব না।’
দেখিতে দেখিতে আট-দশটা মশাল জ্বালিয়া, বন্দুক, বর্শা, কুড়াল প্রভৃতি অস্ত্র লইয়া, গ্রামের অধিকাংশ যুবাপুরুষ দলে দলে বাঘের অনুসন্ধানে বাহির হইল। উপস্থিত বিপদটাকে নিজের বিপদ জ্ঞান করিয়া সকলেই একেবারে খেপিয়া উঠিয়াছে। কোনোপ্রকার বাধা-বিপত্তি বা শারীরিক দুঃখ-কষ্ট তাহারা অগ্রাহ্য করিল না। বাঘকে বাহির করিতেই হইবে, তা প্রাণ যাক আর থাক!
উৎসাহের অভাব নাই, অনুসন্ধানেরও কোনো ত্রুটি হইল না, কিন্তু দুঃখের বিষয় ফল হইল না মোটেই। দিনের বেলা যে-বাঘকে খুঁজিয়া পাওয়া যায় না, রাত্রে সে-বাঘের সন্ধান পাওয়া অসম্ভব! তথাপি কেহ ভগ্নোৎসাহ হইল না। সকালে আবার অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইবে, এই স্থির করিয়া রাত্রি আন্দাজ তিনটার সময় জঙ্গল হইতে ফিরিয়া আসিল।
পরদিন সকাল হইতে না হইতে নিকটবর্তী পাঁচ-সাতটি কাছারিবাড়ি হইতে দশ-বারোজন শিকারি আসিয়া সেই দলে যোগ দিল। তাহাদের মধ্যে আমাদের পরিচিত মহেশ সর্দার একজন প্রধান। মহেশ আসিয়াই অনুসন্ধানের পদ্ধতি একেবারে বদলাইয়া ফেলিল। তাহার পরামর্শ অনুসারে সকলে একসঙ্গে দলবদ্ধ না হইয়া, ছোটো ছোটো দল করিয়া, এক-এক দল এক-এক দিকে অগ্রসর হইল। প্রত্যেকের হাতে অস্ত্র, প্রত্যেকেই প্রতিশোধ লইবার জন্য প্রাণ পর্যন্ত পণ করিয়াছে, সুতরাং তাহারা কোনো দুর্গম স্থানই খোঁজ করিতে বাকি রাখিল না। অবশেষে দল একটা নালা পার হইতেছে, এমন সময় অগ্রবর্তী লোকটি দেখিল, সম্মুখে একটি গহবরের মুখের কাছে স্ত্রীলোকটির কাপড়ের ছেঁড়া টুকরা পড়িয়া আছে। দেখিয়াই সে শিহরিয়া উঠিল। তাড়াতাড়ি মহেশকে ডাকিয়া তাহা দেখাইল। ততক্ষণে আরও পাঁচ-সাত জন লোক সেখানে উপস্থিত হইয়াছে। সকলে মিলিয়া খোঁজ করিতে, স্ত্রীলোকটির দেহের কোনো কোনো অংশও দেখিতে পাইল। গর্ভস্ত শিশুটি সেই সকল ছিন্নভিন্ন মাংসখণ্ডের মধ্যেই পড়িয়াছিল! তাহার গায়ে একটি আঁচড়ের দাগও নাই। বোধ হয়, সেই সুকুমার অঙ্গে দন্ত প্রবেশ করাইতে বাঘের প্রাণেও করুণার উদ্রেগ হইয়া থাকিবে! এরূপ হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখিয়া কেহ অশ্রু সংবরণ করিতে পারিল না।
মহেশ ক্রোধে আগুন হইয়া উঠিল। বাঘ যে সেখানে কোথাও গুঁড়ি মারিয়া লুকাইয়া আছে, সে বিষয়ে তাহার বিন্দুমাত্রও সন্দেহ ছিল না। আবার নূতন উদ্যমে সন্ধান আরম্ভ হইল। মহেশের দল কয়েক পা অগ্রসর হইয়া আর একটি গহবর খুঁজিতেছে, এমন সময় পিছন হইতে দলের এক ব্যক্তি চিৎকার করিয়া উঠিল। সকলে ছুটিয়া আসিয়া দেখে, বাঘে মানুষে ভয়ংকর কুস্তি আরম্ভ হইয়াছে। লোকটি ছিল বেজায় বলবান––ষণ্ডা-গুন্ডা, কিন্তু বাঘের সহিত কুস্তি করা তো সহজ কথা নয়। মহেশ দেখিল, বাঘটা তাহার বুকের উপর লাফাইয়া উঠিয়া মুখ ও মাথা ক্ষতবিক্ষত করিতেছে। বেচারার সর্বাঙ্গ রক্তারক্তি। লোকটি কিন্তু একেবারে হাল ছাড়িয়া দেয় নাই। যথাসাধ্য বিক্রমের সহিত যুদ্ধ করিতেছে।
মহেশ মুহূর্ত কালের জন্য বাহ্যজ্ঞান হারাইল। কিন্তু পরমুহূর্তেই প্রকৃতিস্থ হইয়া একখানা প্রকাণ্ড কুঠার লইয়া ছুটিল। এক্ষেত্রে গুলি চালাইতে তাহার সাহস হইল না। কী জানি, হঠাৎ যদি লোকটিকে মারিয়া বসে।
মহেশ যে এভাবে পশ্চাৎ হইতে তাহাকে আক্রমণ করিবে, বাঘ ইহার জন্য প্রস্তুত ছিল না। কুড়ুলের দুই-চারি ঘা পিছনের পায়ে ও পিঠে পড়িতে না পড়িতে বাঘ বুঝিল, এবার সে যমের হাতে পড়িয়াছে। লোকটিকে ছাড়িয়া সে ফিরিয়া দাঁড়াইল এবং দাঁত-মুখ খিঁচাইয়া মহেশের উপর ঝাঁপাইয়া পড়িবার উপক্রম করিল, কিন্তু তাহার ওই উদ্যোগই সার! নির্ভীক মহেশ চকিতে একটু হটিয়া গিয়া, ভীমবেগে বাঘকে আক্রমণ করিল এবং কোপের পর কোপ বসাইয়া বাঘের মস্তক প্রায় দেহচ্যুত করিয়া ফেলিল। ব্যাপার দেখিয়া উপস্থিত সকলে স্তম্ভিত!
স্ত্রীলোকটির এবং তাহার গর্ভস্থ শিশুর অপঘাত মৃত্যুর প্রতিশোধ লওয়া হইল বটে, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আহত লোকটিকে বাঁচাইতে পারা গেল না।
প্রস্তাবিত পুরস্কার ১২৫ টাকা, যথা সময়ে মহাশয়ের হাতে পৌঁছাইয়াছিল। কিন্তু সে যাহা করিয়াছে, তাহার মূলে অর্থলাভ প্রত্যাশা একেবারেই ছিল না। পত্নীহারা স্বামীর এবং স্বামীহারা পত্নীর মধ্যে টাকাগুলি সমানভাবে ভাগ করিয়া দিয়া সে যে আত্মপ্রসাদ লাভ করিল, তাহার তুলনা নাই। মহেশ দুই হাত তুলিয়া ভগবানকে প্রণাম করিল।
সিংহে মহিষে
হাতির দাঁতের ব্যবসায়ে প্রচুর লাভ কিন্তু তাহা সংগ্রহ করা সহজ ব্যাপার নহে। আমার এক কাকা সেই ব্যবসায়ই অবলম্বন করিয়াছিলেন। আফ্রিকার জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরিয়া তাঁহাকে হস্তীদন্ত সংগ্রহ করিতে হইত। একার্যে তাঁহার তিন-চারিজন সহকারী ছিল। একবার দেশে আসিয়া তিনি আমাকেও সঙ্গে লইয়া গেলেন।
নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছিবার কয়েকদিন পরে, একদিন কাকা বলিলেন, ‘চল, সিংহ দেখে আসি। সুবিধা হয় তো শিকার করাও যাবে।’
দুইজনে সাজগোজ করিয়া, পাঁচটি চাকর সঙ্গে লইয়া, দুপুরবেলা বাহির হইলাম। চাকরদের মধ্যে একজন, কোনখানে সিংহ থাকার সম্ভাবনা, সব জানিত। সে আমার পথপ্রদর্শক হইল। কিন্তু তাহার নির্দিষ্ট স্থানে গিয়াও সিংহের কোনো সন্ধান পাওয়া গেল না। ছোটো ছোটো পাহাড় ও আশপাশের বনজঙ্গল খুঁজিতে খুঁজিতে বেলা চারিটা বাজিয়া গেল। আমরা হতাশ হইয়া পড়িলাম।
চাকরটা দূরে একটা ছোটো পাহাড় দেখাইয়া বলিল, ‘ওইখানে একটা জলা জায়গা আছে, বুনো মোষ সেই জলায় প্রায়ই থাকে, কাছাকাছি সিংহও থাকতে পারে চলুন, দেখা যাক।’
পাহাড়ের কাছে আসিয়া তাহার নীচে দিয়া আমরা চলিতেছিলাম, কিন্তু চাকরটা নিষেধ করিল, কেন না, সেই দিকে বন্য মহিষের ভয়। সুতরাং তাহার কথামতো আমরা পাহাড়ের উপরে উঠিয়া, জলার দিকে যাইতে লাগিলাম। ক্রমে জলাটা আমাদের দৃষ্টিতে পড়িল। দেখিলাম, কাদায় গা ডুবাইয়া দুইটা মহিষ শুইয়া আছে। আর একটা কাদা মাখিয়া পাহাড়ের গা দিয়া দিয়া বনের দিকে যাইতেছে। হঠাৎ পাশের বন হইতে মস্ত একটা সিংহ বাহির হইল এবং একেবারে মহিষটার সামনাসামনি আসিয়া থমকিয়া দাঁড়াইল। সিংহ বোধ হয় পিপাসা দূর করিবার জন্য জলার দিকে আসিতেছিল আর তখন বিকাল হইয়াছে, তাহার ক্ষুধারও উদ্রেক হইয়া থাকিবে। সুতরাং সম্মুখেই হৃষ্টপুষ্ট রসাল খাদ্য দেখিয়া সে যে উৎসাহে কেশর ফুলাইবে, ইহা আর আশ্চর্য কী?
মহিষটা একমনে গোঁ হইয়া চলিতেছিল। সিংহকে সামনে দেখিয়া সে কিছুমাত্র ভয় পাইল না বরং ভোঁসভোঁস করিয়া তাহাকে পথ ছাড়িয়া দিবার ইঙ্গিত করিতে লাগিল। সিংহ নড়িল না। বিকট আওয়াজ করিয়া সে দাঁত-মুখ খিঁচাইতেছে দেখিয়া, মহিষ ভয়ানক উত্তেজিত হইয়া উঠিল এবং নাক দিয়া আরও জোরে জোরে শব্দ করিতে লাগিল। সিংহের তর্জন-গর্জন খুবই বেশি, কিন্তু আসলে একটু যেন ল্যাজ গুটানো ভাব! মহিষের একবারে ‘রণং দেহি’ মূর্তি!
কিছুক্ষণ এইভাবে কাটিল। সিংহ অগ্রসরও হয় না, পথও ছাড়ে না। মহিষের আর সহ্য হইল না। সে কয়েক পা পিছাইয়া গিয়া গোঁ ভরে মাথা নিচু করিয়া সিংহের দিকে ছুটিল। সিংহও তখন হুংকার ছাড়িয়া, মহিষকে লক্ষ করিয়া লাফ দিতে কিছুমাত্র বিলম্ব করিল না। কিন্তু এমনই তাহার কপাল, মহিষের পিঠে না পড়িয়া, সে পড়িল ঠিক তাহার শিং-এর ডগায়! তারপর যাহা ঘটিল, বুঝিতেই পার। সিংহ সামলাইয়া উঠিবার পূর্বেই, মহিষের প্রবল এক গুঁতায় একেবারে চিতপাত! মহিষটা অমনি ছুটিয়া গিয়া এমন ভীষণ জোরে সিংহকে মাটিতে চাপিয়া ধরিল যে, তাহার শ্বাসরোধ হইবার উপক্রম হইল। আমরা ভাবিলাম, লড়াই বুঝি ফুরায়। কিন্তু হঠাৎ কী যে একটা ব্যাপার ঘটিল, কিছু বুঝিলাম না। চক্ষের পলকে সিংহ একেবারে মহিষের পিঠের উপর! এইবার মনের ঝাল মিটাইয়া, পশুরাজ তাহার দন্ত ও থাবার সদ্ব্যবহার করিতে লাগিল বটে, কিন্তু মহিষ একটুও দমিল না। উভয়ের দেহে তখন রক্তের ধারা বহিতেছিল। সেই রক্ত দেখিয়া মহিষের গায়ের রক্ত দশগুণ গরম হইয়া উঠিল! তখন তাহার কী ভয়ানক লাফলাফি––দাপাদাপি! সেই তাণ্ডব নৃত্যে সিংহ ছিটকাইয়া পড়িবামাত্র মহিষ এমন প্রচণ্ড বলে তাহাকে আক্রমণ করিল যে, সিংহের সব জারিজুরিই ফুরাইয়া আসিল। তাহাকে মাটিতে হুমড়িয়া পড়িতে দেখিয়া, মহিষ হাঁপাইতে হাঁপাইতে আবার জলার দিকে চলিয়া গেল।
আমরা পাহাড়ের মাথা হইতে মৃতপ্রায় সিংহের উপর দুইটা গুলি মারিলাম। সে নিস্পন্দ হইয়া গেল। বন্দুকের আওয়াজে মহিষ আমাদের দিকে চাহিয়া দেখিল মাত্র, কিন্তু কিছুই বলিল না। আমরা ইচ্ছা করিলে তাহাকেও দুই এক গুলিতে মারিয়া ফেলিতে পারিতাম, কিন্তু এমন বিজয়ী বীরকে মারিতে সহজে কি হাত উঠে!
পাহাড় হইতে যখন নামিলাম, তখন প্রায় সন্ধ্যা। আমরা তাড়াতাড়ি বাড়ির রাস্তা ধরিলাম।
