ভালুক-শিকার

ভালুক-শিকার

উত্তর আমেরিকার গ্রিজলির মতো এমন দুর্দান্ত ভালুক আর নাই। একজন আমেরিকাবাসী লিখিয়াছেন যে, তাঁহাকে এই ভালুক ত্রিশ মাইল পর্যন্ত অনুসরণ করিয়াছিল। একটা প্রবল স্রোত-সংকুল নদী সাঁতরাইয়া পার হইয়া তবে তিনি রক্ষা পান। বন্দুকের গুলিতে সর্বাঙ্গ ঝাঁঝরার ন্যায় হইলেও ইহাদের প্রাণ বিয়োগ হয় না! সেই অবস্থায় শিকারির উপর ঝাঁপাইয়া পড়িয়া অনেক সময় তাহাকে একেবারে শেষ করিয়া ফেলে। মস্তিষ্কে বা হৃৎপিণ্ডে গুলি লাগিলে তবেই ইহারা কাবু হয়।

পূর্বে গ্রিজলির সহিত সম্মুখযুদ্ধ লোকে অসম্ভব বলিয়াই মনে করিত, কিন্তু এখন এমন সকল বন্দুক প্রস্তুত হইয়াছে, যাহা মিনিটে অনেকবার ছোঁড়া যায় এবং যাহাদের পাল্লাও খুব বেশি। সেই জন্য গ্রিজলি শিকার আজকাল অনেক সহজ হইয়া আসিয়াছে।

এই জন্তু-শিকারের একটা প্রচলিত কৌশল এখানে বর্ণিত হইল :–যে গুহায় গ্রিজলি থাকে, তাহা চিনিতে শিকারিদের বিলম্ব হয় না। ভালুকের সন্ধান পাইলে, শিকারি এক হাতে একটা মশাল ও অন্য হাতে বন্দুক লইয়া, ধীরে ধীরে গুহার মধ্যে অগ্রসর হইতে থাকে। গুহার শেষ প্রান্তে মশালের আলোকে ভালুককে নিদ্রিত দেখিয়া, সে কিছুক্ষণ দাঁড়াইয়া তাহার লক্ষ্য ঠিক করিয়া লয়। তারপর মশাল মাটিতে পুতিয়া একপাশে সরিয়া দাঁড়ায়। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করিতে হয় না। ঝাপসা আলোক চক্ষে পড়ায়, ভালুক জাগিয়া উঠে এবং একটু অবাক হয়ে মাটি শুঁকিতে শুঁকিতে অগ্রসর হয়। ক্রমে তাহার ভয়ংকর চেহারটা বেশ স্পষ্টই দেখা যায়। ভালুক যখন একমনে মশাল পরীক্ষা করিতে ব্যস্ত থাকে, তখন শিকারিও সময় বুঝিয়া তাহার মস্তক লক্ষ্য করিয়া গুলি মারে। বন্দুকের শব্দের সহিত ভালুকের ভীষণ চিৎকার শুনিতে পাওয়া যায়। তারপর কিছুক্ষণ ছটফট করিয়া সে প্রাণত্যাগ করে। যদি কোনো কারণে প্রথম গুলিটা সাংঘাতিক না হয়, তাহা হইলে শিকারির প্রাণ লইয়া ফিরিয়া আসা অসম্ভব হইয়া পড়ে।

গ্রিজলি-শিকারে বিপদের আশংকা যে কত অধিক, নিম্নলিখিত গল্পটিতে তাহা বুঝা যাইবে :––গারস্টেকার নামক একজন জার্মান উত্তর আমেরিকাতে ভালুক-শিকার করিতে গিয়াছিলেন। তাঁহার সহিত আরস্কাইন নামক একটি যুবক ও পাঁচটি শিকারি কুকুর ছিল। জঙ্গলে সমস্ত দিন ঘুরিয়াও ভালুকের সন্ধান না পাইয়া, গারস্টেকার ও আরস্কাইন হতাশ হইয়া পড়েন, এমন সময়ে, হঠাৎ অদূরে কুকুরগুলির চিৎকারে তাঁহারা চমকিত হইয়া, সেই শব্দ লক্ষ্য করিয়া সেখানে গিয়া যাহা দেখিলেন, তাহাতে তাঁহাদের অন্তরাত্মা শিহরিয়া উঠিল। দেখিলেন, একটা বিপুলকায় ভালুক চারিটি কুকুরকে থাবার আঘাতে ধরাশায়ী করিয়া, পঞ্চমটির সহিত যুদ্ধ শুরু করিয়াছে। কুকুরদের কামড়ে সে খেপিয়া উঠিয়াছে। আরস্কাইন তাঁহার সাধের কুকুরদের এই দুরবস্থা দেখিয়া, রাগে গরগর করিতে করিতে, দুই হাতে দুইখানা শাণিত ছুরিকা লইয়া ভালুককে আক্রমণ করিলেন কিন্তু আহত হইয়াও সেই ভয়ংকর জানোয়ার তাঁহাকে এমন জাপটাইয়া ধরিল যে, তাঁহার আর নড়িবার শক্তি রহিল না। বন্ধুর বিপদ দেখিয়া গারস্টেকার বন্দুকের বাঁট দিয়া ভালুকের গায়ে তিন-চারিবার আঘাত করিতেই, সে আরস্কাইনকে না ছাড়িয়াই, তাঁহাকে এমন এক থাবা মারিল যে, তিনি মূর্ছিত হইয়া পড়িলেন।

যখন জ্ঞান হইল, তখন গারস্টেকার দেখিলেন, সন্ধ্যা হইয়া আসিয়াছে। তিনি মাটিতে পড়িয়া আছেন। তাঁহার সর্বাঙ্গে, বিশেষ করিয়া দক্ষিণ বাহুতে অসহ্য যন্ত্রণা। তাঁহার ভক্ত কুকুর তাঁহার কানের কাছে মর্মান্তিক আর্তনাদ করিতেছে। পাশের দিকে চাহিয়া তাঁহার বুক কাঁপিয়া উঠিল। তাঁহার প্রিয় বন্ধু আরস্কাইন সেই ভয়ংকর ভালুকের পাশে পড়িয়া আছেন! কুকুর চারিটিরও প্রাণ আছে, কি না সন্দেহ।

একে এই বিপদ, তাহার উপর সন্ধ্যা হইলেই, নেকড়েরা আসিয়া তাঁহাদের দেহে যতটুকু প্রাণ আছে, তাহাও রাখিবে না––এই ভয়ে তিনি বহু কষ্টে উঠিলেন। তিনি দেখিলেন, তাঁহার দক্ষিণ বাহু প্রায় ছিন্ন হইয়াছে। তবুও কোনো রকমে শুষ্ক কাষ্ঠ সংগ্রহ করিয়া তিনি বন্দুকের বারুদ ও তাঁহার ছেঁড়া জামার সাহায্যে আগুন ধরাইয়া, কষ্টেসৃষ্টে রাত্রি কাটাইলেন। প্রভাতে সাহায্য আসিলে, তিনি কোনো রকমে তাঁবুতে গিয়া, এক মাস কাল শয্যাশায়ী থাকিয়া সুস্থ হন! আরস্কাইন ও তিনটি কুকুরের সেখানেই মৃত্যু হইয়াছিল।

‘প্রাচীন শিকারি’ নাম দিয়া একজন ইংরেজ ভারতবর্ষের বন্য জন্তু শিকারের যে বই লিখিয়াছেন, তাহা হইতে নিম্নের গল্পটি উদ্ধৃত হইল :–– . . . আমরা এক উচ্চ পর্বতের কাছে আসিয়া পড়িলাম। দেশি শিকারিদল পথ দেখাইয়া চলিতেছিল। তাহাদের নির্দেশমতো কাঁটাঝোপ অতিক্রম করিয়া পর্বত শিখরে উঠিতে লাগিলাম। পাহাড়টি এমনি খাড়া যে, আমাদের পা কাঁপিতে লাগিল বহু কষ্টে হামা দিয়া গাছের শিকড় ধরিয়া উঠিতে লাগিলাম। হঠাৎ দেখিলাম, একটি বৃহৎ গহ্বরের মুখে আসিয়া পড়িয়াছি। দূর হইতে এই গহ্বরের অবস্থান বুঝিতে পারি নাই। দেশি শিকারিরা বলিল যে, সেই গুহার মধ্যেই ভালুকটা লুকাইয়া রহিয়াছে। প্রায় এক ঘণ্টা ধরিয়া বহু অনুসন্ধানের পর, সহসা একস্থানে ভালুকের পদচিহ্ন দেখিতে পাইলাম এবং একটু পরেই কুকুরের চিৎকার শুনিয়া বুঝিতে পারিলাম, ঠিক স্থানেই আসিয়াছি। দুইটি কুকুর আমাদের কিছু আগে আগে চলিতেছিল। তাহারাই ভালুক দেখিয়া চিৎকার করিতেছে। ইহার অল্পক্ষণ পরেই একটি মৃদু গর্জন শুনিতে পাইলাম। বুঝিতে পারিলাম, এইবার সাবধান হইতে হইবে। এই ভাবিয়া একখানা বড়ো পাথরের আড়ালে সরিয়া দাঁড়াইয়াছি, এমন সময় কুকুরের কামড়ে ক্ষিপ্তপ্রায় একটা বিরাট কৃষ্ণকায় ভালুক একেবারে একজন দেশি শিকারির উপর আসিয়া পড়িল এবং সঙ্গে সঙ্গে তাহাকে ভূমিসাৎ করিয়া, তাহার বুকের উপর চাপিয়া বসিল। পাথরের আড়াল হইতে আমি কেবল ভালুকের পিছনটা দেখিতে পাইতেছিলাম, তাহাই লক্ষ্য করিয়া গুলি ছুঁড়িলাম। কিন্তু কী কারণে জানি না, আমার গুলি ব্যর্থ হইল। দ্বিতীয়বার গুলি ছুড়িলাম। আহত ভালুক এবার তীব্র আর্তনাদ করিয়া, তাহার শিকার ছাড়িয়া, পলায়নপর অন্যান্য শিকারিদের পশ্চাৎ ধাবিত হইল। আমি দ্রুতগতিতে বাহিরে আসিয়া আহত লোকটিকে তুলিয়া ধরিলাম এবং একহাতে তাহাকে ধরিয়া, অন্য হাত দিয়া ভালুকটাকে লক্ষ্য করিয়া আরও দুইটি গুলি ছুঁড়িলাম। গুলি খাইয়া সে সহসা পিছন ফিরিয়া গভীর জঙ্গলে পলাইয়া গেল।

আমি তাড়াতাড়ি জন কয়েক লোক ডাকিয়া, আহত যুবকটির শুশ্রূষার বন্দোবস্ত করিয়া, তাহাকে তাঁবুতে পাঠাইয়া দিলাম ও কয়েকজন সাহসী শিকারি সঙ্গে লইয়া আবার ভালুকের সন্ধানে প্রবৃত্ত হইলাম। দুইটি কুকুর ইতিপূর্বেই ভালুকের হাতে নিহত হইয়াছিল। তাহা দেখিয়া অন্যান্য কুকুরেরা আর ভরসা পাইতেছিল না তবু আমাদের তাড়া খাইয়া মাটি শুঁকিতে শুঁকিতে অগ্রসর হইল এবং একটি ঝোপের ধারে গিয়া চিৎকার করিতে লাগিল। বুঝিলাম, ভালুকটা সেই ঝোপেই আশ্রয় লইয়াছে। আমরা ঝোপের কাছে গিয়া ভিতরে দেখিবার চেষ্টা করিলাম, কিন্তু ঘন পত্র-পল্লব ভেদ করিয়া কিছুই দেখিতে পাইলাম না। ভালো করিয়া দেখিবার জন্য, আমি একটি গাছের গুঁড়িতে বন্দুক হেলাইয়া রাখিয়া উপরে উঠিতে যাইব, এমন সময় ভালুকটা গভীর গর্জন করিয়া আমার দিকে অগ্রসর হইল। সৌভাগ্যক্রমে ঝোপটা খুব ঘন ছিল, তাই আমার নিকট আসিতে তাহাকে একটু বেগ পাইতে হইতেছিল। এই অবসরে আমি গাছ হইতে নামিয়া, বন্দুক তুলিয়া প্রস্তুত হইলাম। সেই ভীষণকায় জানোয়ারটা ইতিমধ্যে আমার ঠিক দুই হাতের মধ্যে আসিয়া পৌঁছিয়াছিল। তাহার চোখ দিয়া যেন অগ্নি বর্ষিত হইতেছিল। আমি পর পর দুইবার গুলি করিলাম। সেই দুই গুলির আঘাতেই ভালুকটা দুইবার পাক খাইয়া মাটিতে গড়াইয়া পড়িল, কিন্তু ভালুকের প্রাণ এমনি কঠিন যে, ইহার পরেও সে করুণ আর্তনাদ করিতে করিতে উঠিয়া দাঁড়াইল এবং একবার শেষ আক্রমণ করিবার জন্য প্রস্তুত হইতে লাগিল। আর দেরি করা ঠিক নয় বিবেচনা করিয়া, আমি আর একবার গুলি করিলাম। ভালুকটা এইবার যে পড়িল, আর উঠিতে পারিল না। কিছুক্ষণের মধ্যে তাহার মৃত্যু হইল। আমি জীবিত ও মৃত যত কালো ভালুক দেখিয়াছি, এইটাই সর্বাপেক্ষা বৃহৎ। জানোয়ারটা প্রায় সাড়ে তিন হাত লম্বা এবং ওজনে দশ মনের কম হইবে না।

(২)

এই প্রাচীন শিকারি আর একবার ভালুক মারিতে গিয়া এমন ভয়ানক বিপদে পড়েন যে, তিনি যে প্রাণ লইয়া ফিরিতে পারিয়াছিলেন, ইহাই আশ্চর্য। তাঁহারা কয়েকজন মিলিয়া দক্ষিণ ভারতের কোনো স্থানে এক বন্ধুর গৃহে বেড়াইতে যান। সেখানে গিয়া শুনিলেন, নিকটেই একটা পাহাড়ে কতকগুলা ভালুক দেখা গিয়াছে। এই খবর পাইবামাত্র তাঁহারা সেখানে গিয়া হাজির হইলেন এবং অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই কয়েকটা ভালুক মারিলেন। তারপর তিনি বন্দুকে সবেমাত্র একটা টোটা ভরিয়াছেন, এমন সময় উপর হইতে গড়ুম গড়ুম বন্দুকের শব্দ এবং সঙ্গে সঙ্গে একটা বিকট চিৎকার শুনিতে পাইলাম। তাকাইয়া দেখেন, এক রুদ্রমূর্তি প্রকাণ্ড ভালুক তাঁহার এক অনুচরকে তাড়া করিয়াছে এবং লোকটি ঊর্ধ্বশ্বাসে তাঁহার দিকে দৌড়িয়া আসিতেছে। ব্যাপার অত্যন্ত সঙিন দেখিয়া, শিকারি ভালুককে লক্ষ্য করিয়া সেই গুলিটা ছুঁড়িলেন। ভালুকের থোপনা ভাঙিয়া চুরমার হইয়া গেল, তবু তাহার গতি প্রতিহত হইল না। সেই অবস্থায় সে ছুটিয়া আসিয়া, তাঁহার উপর পড়িয়া তাঁহাকে জাপটাইয়া ধরিল।

অনুচর সে যাত্রা রক্ষা পাইল বটে, কিন্তু সেই বিশাল-দেহ ভালুকের প্রগাঢ় আলিঙ্গনে শিকারির প্রাণ যায়! ইহার উপর ভালুকের মুখের রক্ত দরদর ধারে নাকে মুখে পড়িয়া, তাঁহার শ্বাসরোধের উপক্রম করিল, কিন্তু তিনি তবুও দমিলেন না। সেই অবস্থায় ভালুকের হাত দুইটা এমন কৌশলে আটকাইয়া ফিলিলেন যে, আঁচড়-কামড় দেওয়া তাহার পক্ষে অসম্ভব হইয়া পড়িল! এইভাবে কুস্তি লড়িতে লড়িতে উভয়েই গড়াইয়া পাহাড়ের তলায় পড়িলেন। তখন তাঁহার অনুচর একখানা দা লইয়া ছুটিল। কিন্তু ধস্তাধস্তিতে পাছে দা-খানার কোপ তাঁহার নিজের উপর পড়ে, এই ভয়ে শিকারি তাহাকে নিষেধ করিলেন।

ইহার পর ভালুককে আর বেশিক্ষণ যুঝিতে হয় নাই। অতিরিক্ত রক্তপাতে সে ক্রমেই নিস্তেজ হইয়া পড়িতেছিল। তাহার আলিঙ্গন শিথিল হইতে না হইতে, শিকারি তাহার কোমরবন্ধ হইতে ছোরা বাহির করিয়া, তাহার বক্ষে আমূল বিদ্ধ করিয়া দিলেন। ভালুকের সকল জারিজুরি ফুরাইল।

(৩)

ভালুকের স্বভাব কত উগ্র এবং হিংসা-প্রবৃত্তি কত প্রবল, নিম্নের গল্পটি পাঠ করিলে, তাহা বেশ বুঝিতে পারা যাইবে :–এক ব্যক্তি লিখিয়াছেন ছেলেবেলা হইতে আমার মনে শিকারি হইবার ইচ্ছা অত্যন্ত প্রবল হইয়া উঠে। আমাদের বাড়ির কাছে একজন দক্ষ শিকারি বাস করিতেন। তাঁহার সহিত আমার বেশ ঘনিষ্ঠতা জন্মিয়াছিল। তাঁহার উৎসাহে একদিন তাঁহার সহিত শিকারে বাহির হইলাম। আমাদের দু-জনের হাতে দুইটি বন্দুক ও দু-খানি ধারাল ছোরা ছিল। আমরা অল্প অল্প জঙ্গল অতিক্রম করিয়া, ক্রমে একটা ক্ষুদ্র পাহাড়ের উপর গিয়া উঠিলাম। তখন বেলা প্রায় শেষ হইয়া আসিয়াছে। সেই পাহাড়ে মাঝে মাঝে ভালুক পাওয়া যায়, এইরূপ একটা জনশ্রুতি আছে, কিন্তু অনেক খোঁজাখুঁজি করিয়াও আমাদের ভাগ্যে কিছুই মিলিল না। তখন বন্ধু বলিলেন, ‘আমি আর একটা জায়গা খুঁজে আসি, তুমি এখানে একটু অপেক্ষা করো। আমি এখনই ফিরে আসব। যদি আধ ঘণ্টার মধ্যে না আসি, তবে তুমি বাড়িতে চলে যেয়ো।’ বন্ধু চলিয়া গেল, আমার গা-টা কেমন যেন ছমছম করিয়া উঠিল! যদি হঠাৎ কোন হিংস্র জন্তু আসিয়া উপস্থিত হয়, এই ভয়ে আমি একটা গাছে চড়িয়া বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করিতে লাগিলাম। একটা পাতা নড়িলেই চাহিয়া দেখি, তিনি আসিতেছেন কি না, কিন্তু পরক্ষণেই নিরাশ হই। এইরূপে আধ ঘণ্টা কাটিয়া গেল, তবুও তাঁহার দেখা নাই।

তখন সূর্য একেবারেই ডুবিয়া গিয়াছে। আর অপেক্ষা করা বৃথা মনে করিয়া, আমি নীচে নামিয়া বাড়ির দিকে কয়েক পা অগ্রসর হইয়াছি, এমন সময় হঠাৎ বিপরীত দিকে কী একটা শব্দ শুনিলাম। বন্ধু আসিতেছেন ভাবিয়া, আগ্রহের সহিত ফিরিয়াই দেখিতে পাইলাম, একটা প্রকাণ্ড ভালুক মাথা নিচু করিয়া আমার দিকে আসিতেছে দেখিয়াই, আমার প্রাণ উড়িয়া গেল। সমস্ত শরীর ঠকঠক করিয়া কাঁপিতে লাগিল। আমি সেই অবস্থাতেই তাহাকে লক্ষ্য করিয়া বন্দুক ছুঁড়িলাম। গুলি ভালুকের দেহে বিদ্ধ করিল বটে, কিন্তু তাহাতে ভ্রূক্ষেপমাত্র না করিয়া, সে সরোষে আমায় তাড়া করিল। আমিও বন্দুক ফেলিয়া প্রাণপণে ছুটিয়া নিকটের একটা গাছে উঠিয়া পড়িলাম। কিন্তু গাছে চড়িয়া ভালুকের হাত হইতে রক্ষা পাওয়া অসম্ভব। দেখিতে দেখিতে সেও গাছের উপর চড়িল এবং তাড়াইতে তাড়াইতে আমাকে একটা ডালের প্রায় শেষ পর্যন্ত লইয়া গেল। তখন ছোরাই আমার একমাত্র সম্বল। ছোরা বাহির করিয়া তাহার নাকে, মুখে, চোখে কয়েক ঘা বসাইতেই বেশ কাজ হইল। ভালুক রাগে গর্জন করিতে করিতে তাড়াতাড়ি নামিয়া পড়িল। আমি ভাবিলাম, আপদের শান্তি! কিন্তু পরক্ষণেই তাহাকে সম্মুখের দুই পায়ের দ্বারা গাছের গোড়া খুঁড়িতে দেখিয়া আমার তো চক্ষুস্থির! বোধ করি, গাছটা উপড়াইয়া আমাকে মারিবে, এই তাহার ইচ্ছা। তখন অন্ধকার হইতে অল্পই বাকি। জঙ্গলের মধ্যে আমি একাকী চিৎকার করিলেও কাহারো সাড়া পাইবার আশা নাই। রাত্রেই ভালুকের হাতে মরিতে হইবে ভাবিয়া, আমার মন অত্যন্ত অবসন্ন হইয়া পড়িল। এইরূপ ভাবে অনেকক্ষণ চলিয়া গেল। অন্ধকারে কিছুই দেখা যায় না। মাটি খোঁড়ার শব্দে বুঝিতে পারিলাম, ভালুক আমাকে পরিত্যাগ করে নাই। তখন মৃত্যুই নিশ্চয় জানিয়া, ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করিতে লাগিলাম। কতক্ষণ প্রার্থনা করিয়াছিলাম, বাকি রাত কীভাবে কাটিল, সে সম্বন্ধে আমার কোনো পরিষ্কার ধারণা নাই। সকাল হইলে দেখিলাম, ভালুকটা তখনও গাছের গোড়া খুঁড়িতেছে। ক্রমে মনে হইল, গাছটা একটু দুলিতেছে সেই সঙ্গে আমার জীবনের সকল আশাও ফুরাইবার উপক্রম হইল। তারপর গাছটা একটু হেলিয়া পড়িল, আমি শেষ মুহূর্তের জন্য প্রস্তুত হইতে লাগিলাম। এমন সময়ে হঠাৎ কিছু দূরে লোকজনের কোলাহল শুনিতে পাওয়া গেল। এ কী! তবে কি আমার বন্ধু আসিতেছেন? এই আশ্বাসে আমার অবসন্ন প্রাণেও একটু আশার সঞ্চার হইল! ভালুকও সেই শব্দ কান পাতিয়া শুনিতে লাগিল। শব্দ ক্রমশ নিকটে বোধ হইল। অল্পক্ষণ পরে আমার নাম ধরিয়া বন্ধুকে চিৎকার করিতে শুনিলাম। আমার প্রাণ আনন্দে নাচিয়া উঠিল। ভালুক সেই চিৎকার শুনিয়া, আমার দিকে একবার স্থিরদৃষ্টিতে চাহিয়া জঙ্গলে প্রবেশ করিল। তাহার একটু পরেই বন্ধুও তাঁহার কয়েক জন সঙ্গী আসিয়া উপস্থিত হইলেন। আমি নামিয়া আসিবামাত্র গাছটা পড়িয়া গেল। আমিও আনন্দের বেগ সহ্য করিতে না পারিয়া বন্ধুর বুকের উপর অচেতন হইয়া পড়িলাম।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *