জীবজন্তুর কথা
শিম্পাঞ্জি
এঁরা বনমানুষের জাত,
পায়ের চেয়ে খানিক আরও
লম্বা এঁদের হাত
এঁরা বনমানুষের জাত।
থাকেন কাফ্রিভায়ার দেশ,
মনের সুখে ঘরকন্না
করেন এঁরা বেশ
থাকেন কাফ্রিভায়ার দেশ।
দেখতে মানুষেরই মতো
কেবল চোয়াল দুটো উঁচু,
নাকটা বেজায় নত
দেখতে মানুষেরই মতো।
ঘটে বুদ্ধিও বেশ আছে,
রোদ-বৃষ্টির ভয়ে এঁরা
কুঁড়ে বাঁধেন গাছে
ঘটে বুদ্ধিও বেশ আছে।
শিম্পাঞ্জি আফ্রিকাবাসী। মধ্য ও পশ্চিম আফ্রিকার ঘন জঙ্গলে ইহাদের বাস। পুরুষ শিম্পাঞ্জি সচরাচর সওয়া তিন হাত উঁচু হইয়া থাকে। স্ত্রীজাতি আকারে কিছু ছোটো। ইহাদের হাত, পা, মাথা, পিঠ ও গলায় বড়ো বড়ো ঘন লোম জন্মে। দেহের রং কালো, মাঝে মাঝে অল্প নীলের আভা মুখের রং মেটে। শিম্পাঞ্জির স্বভাব মন্দ নহে, কিন্তু যদি কেহ অনিষ্ট করে, তবে তাহার আর রক্ষা নাই! তীক্ষ্ণ দন্তের দ্বারা তাহাকে একেবারে ক্ষতবিক্ষত করিয়া ফেলে। শিম্পাঞ্জি বেশ পোষ মানে এবং মানুষের চাল-চলনের সুন্দর নকল করিতে পারে। বনমানুষদের মধ্যে ইহারাই সর্বাপেক্ষা বুদ্ধিমান।
সিংহ
লম্বা কেশর ফুলিয়ে তোলা,
গম্ভীর মেজাজ
রাজার মতো চেহারা, তাই
নামটি পশুরাজ।
হয়তো ফিরেন একা একা
কিংবা দলে দলে
বলে যা না কুলিয়ে ওঠে,
সাধেন তাহা ছলে!
হুংকারেতে বাজিমাত––
চৌদিক গমগম
কার্যকালে সাহস কিন্তু
অনেকখানি কম।
তেমন তেমন দুরন্ত বাঘ
দাঁড়ায় যদি ফিরে
ল্যাজ গুটিয়ে অমনি রাজা
পিছু হটেন ধীরে।
আফ্রিকার প্রায় সর্বত্র এবং এশিয়ার পারস্য ও আরব দেশে সিংহ বাস করে। পূর্বে আমাদের এই ভারতবর্ষেও সিংহের বাসভূমি ছিল। কিন্তু এখন কেবল রাজপুতানায় (রাজস্থানে)––কাটিওয়ারের জঙ্গলে মাঝে মাঝে সিংহ দেখা যায়। সিংহের চেহারা খুব জমকালো। ইহারা ল্যাজসুদ্ধ প্রায় সাড়ে ছয় হাত উচ্চেও আড়াই হাতের কম নহে। সিংহ রাগিয়া উঠিলে কেশর ফুলায়, তখন ইহাকে অতি ভয়ংকর দেখায়। সিংহী আকারে কিছু ছোটো। সিংহের ছানার গায়ে বাঘের ন্যায় ডোরা থাকে বয়স বৃদ্ধির সহিত ক্রমে তাহা মিলাইয়া যায়।
বাঘ
লম্বাটে ছাঁদ, মস্ত মাথা,
গঠন পরিপাটি,
কালো কালো ডোরায় ভরা
হলুদ বরন গা-টি।
থাবায় শোভে ধারাল নখ,
দাঁতে ক্ষুরের ধার
চলন-ফেরন এক্কেবারে
বাদশাহি কায়দার!
এই দেশেতে নানা স্থানে
করেন এঁরা বাস
গোরু ভেড়া টাটকা-পচা––
সবই করেন গ্রাস।
চক্ষু দিয়ে আগুন ছোটে
নাই কো ভয়ের লেশ
যার উপরে নজর পড়ে
দফাটি তার শেষ।
দেখিতে সিংহের মতো জমকালো না হইলেও বাঘের চেহারা বেশি সুন্দর। ডোরাদার বড়ো বাঘ কেবল এশিয়াতেই বাস করে। ভারতবর্ষের প্রায় সর্বত্রই বাঘ দেখিতে পাওয়া যায়। সুন্দরবন, আসাম, ওড়িশা, মধ্যপ্রদেশের জঙ্গল এবং ব্রহ্মদেশ ইহাদের প্রিয় বাসস্থান। বাঘ উচ্চে সিংহ অপেক্ষা কিছু ছোটো কিন্তু লম্বায় অনেক বড়ো। সিংহ নামেই পশুরাজ সাহস অথবা বিক্রমে সিংহের তেমন সুখ্যাতি শুনা যায় না,––এই দুই বিষয়ে বরং বাঘই শ্রেষ্ঠ। শত্রু যতই বলশালী হউক না কেন, বাঘ তবু ‘যদ্ধং দেহি’ বলিয়া দাঁড়াইতে পারে।
বাঘের মাসি
বিল্লিরানি নেহাত তুমি
কেউ-কেটা নও
কোন বংশে জন্ম, সেটা
ভুলে কেন রও!
দিক টলমল যাহার দাপে
হুংকারে যার বিশ্ব কাঁপে,
যমের দোসর সেই যে বাঘা,
তাহার মাসি হও।
বিল্লিরানি, নেহাত তুমি
কেউ-কেটা নও।
আহা, কী রূপ মরি মরি,
ঠিক যেন গো বাঘেশ্বরী!
গড়ন-পেটন ধরন-ধারণ
কিছুতে কম নও
বিল্লিরানি, তুমি যে গো
বাঘের মাসি হও!
ভারতবর্ষের প্রায় সকল স্থানেই বনবিড়াল দেখিতে পাওয়া যায়। ইহারা আমাদের গৃহপালিত বিড়ালেরই জাতভাই। কিন্তু সর্বদা বনে জঙ্গলে থাকে বলিয়া ইহাদের স্বভাবটা বুনো রকমের। বিড়ালি ছোটো ছোটো বাচ্চাগুলিকে এমন আদর ও যত্নে পালন করে যে, দেখিলে আশ্চর্য হইতে হয়। অতি শিশুকাল হইতেই ইহাদের শিকার-প্রবৃত্তি উত্তেজিত হইয়া থাকে। বনবিড়াল কিছুতেই পোষ মানে না, কিন্তু তেমন আদর-যত্ন পাইলে গৃহপালিত বিড়াল প্রায় কুকুরেরই মতো পালকের বাধ্য হয়। কাবুলি ও এংগোরা বিড়াল দেখিতে খুব সুন্দর।
কুত্তা
কুত্তা আমার মানিক!
আদর পেলে, ল্যাজটি তুলে
ছুটে বেড়ায় খানিক,
আর, নাচে ধিনিক ধিনিক।
কুত্তা আমার সোনা।
খাবার সময় হলে কাছে
অমনি আনাগোনা
ধরে রাখবে কোন জনা!
কুত্তা আমার ধন!
একটু কিছু খেতে পেলে
বেজায় খুশি মন
সুখে মাটিতে শয়ন।
কুত্তা আমার বীর!
এক কামড়ে ফেলে ছিঁড়ে
চোর-ডাকাতের শির
তারা ভয়েতে অস্থির!
কুকুর নানা রকমের হইয়া থাকে। কোনো কোনোটি আকারে বিড়াল অপেক্ষাও ছোটো, আবার কোনো কোনোটি প্রায় বাঘের মতো বড়ো। গায়ের লোম কাহারো ছোটো ও কর্কশ, কাহারো ঝাঁকড়া ও কোমল। ইহাদের কোনো কোনো শ্রেণীর ঘ্রাণশক্তি অতিশয় তীক্ষ্ণ, আবার কোনো কোনোটা বা শুধু দৃষ্টিশক্তির জন্যই প্রসিদ্ধ। কুকুরের মতো এমন বিশ্বাসী প্রভুভক্ত প্রাণী আর নাই। চতুষ্পদ জন্তুদিগের মধ্যে ইহারাই মানুষের সহবাস বেশি ভালোবাসে। প্রয়োজন হইলে কুকুর নিজের প্রাণ দিয়াও প্রভুর উপকার করিয়া থাকে।
গ্রিজলি ভালুক
ভালুক আছে অনেকরকম
তার মধ্যে এরা,
গুন্ডামি আর শয়তানিতে
অন্যগুলির সেরা।
আমেরিকার উত্তরেতে
আদিম কালের বন
সেই বনেতে করে এরা
সুখে বিচরণ।
ফল-পাকুড়ে পেট ভরে না,
হিংসাতে ভরপুর
গায়ের জোরে জন্তু মেরে
ক্ষুধা করে দূর।
বাঘের গ্রাসে পড়ে বরং
পালিয়ে আসা যায়
এদের হাতে পড়লে পরে
প্রাণ বাঁচানো দায়!
আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়া ছাড়া পৃথিবীর প্রায় সকল স্থানেই ভালুক দেখিতে পাওয়া যায়। ইহাদের সর্বাঙ্গ বড়ো বড়ো ঘন লোমে ঢাকা। চলিবার সময় ইহারা বিড়াল-কুকুরের মতো কেবল আঙুলের উপর ভর দিয়া চলে না, মানুষের মতো পায়ের পাতার উপর ভর দিয়া চলে। ভালুক জাতির মধ্যে উত্তর আমেরিকার গ্রিজলি এবং মেরুপ্রদেশের সাসা ভালুক ভয়ানক দুর্দান্ত। গ্রিজলির বিক্রমে সব জানোয়ার, এমনকী, মানুষ পর্যন্ত অস্থির। ইহারা বড়ো বড়ো বাইসন ও গোরু, ঘোড়া, হরিণ প্রভৃতি শিকার করিয়া থাকে।
চমরী
তিব্বতের গোরু
বুনো ভেড়ার মতো শিং,
নাক, চোখ, ভুরু
সিংহের মতো ঝাঁকড়া কেশর,
পিছন দিক সরু!
চমরী ভারী বীর
চেহারাটা মোটাসোটা,
মস্ত বড়ো শির
শিং বাগিয়ে ছুটলে সবাই
ভয়েতে অস্থির!
আয় চমরী আয়!
লম্বা পশম নেড়েচেড়ে
হাত বুলাব গায়
আদর করে রাখব ঘরে,
খেলব দুজনায়!
চমরী গো-জাতীয় জন্তু। আকারে ইহারা সাধারণ গোরু অপেক্ষা কিছু ছোটো। ইহাদের গড়ন-পেটন বেশ মোটাসোটা। পা ছোটো ও দৃঢ়, কপাল চওড়া, মুখ সরু, শিং প্রকাণ্ড। চমরীর মাথা, ঘাড়, পিঠ ও ল্যাজের গোড়ায় তেমন বড়ো বড়ো লোম জন্মে না, কিন্তু শরীরের দুই পাশ ও ল্যাজের শেষ দিক হইতে গোছা গোছা লোম ঝুলিয়া পড়ে। ইহারা গরম একেবারেই সহ্য করিতে পারে না। তিব্বত প্রভৃতি শীতপ্রধান দেশের পনেরো-কুড়ি হাজার ফুট উচ্চ পর্বত-দেশে দলে দলে বিচরণ করে। ইহাদের ল্যাজে চামর হয়। সেইজন্য ইহাদিগকে চমরী বলে।
বাইসন
ঘাসে ভরা বেজায় ভীষণ
আমেরিকান বন
থাকে সেথা ষণ্ডামার্কা
দুরন্ত বাইসন।
এদের সামন দিকটা মোটা
ভরা লোমের জটা
অভ্যাস এই, নামিয়ে মাথা
ল্যাজ উঁচায়ে ছোটা।
চক্ষু আগুনেরই গোলা,
শিং উঁচুতে তোলা,
মস্ত দুটো নাকের ছেঁদা
ভয়ংকর ফোলা।
এরা বেড়ায় দলে দল,
গায়ে বেজায় বল
হঠাৎ যদি সামনে পড়,
অমনি রসাতল।
উত্তর আমেরিকায় ইহাদের বাস। এরূপ বিকটাকার জন্তু গো-জাতীয়ের মধ্যে আর একটিও নেই। মস্ত মাথা, বাঁকা শিং, জ্বলন্ত চোখ। মাথা, ঘাড় ও দেহের সম্মুখ ভাগ গোছা গোছা ঝাঁকড়া লোমে ভরা তার উপর আবার মাথা গোঁজ করিয়া শিং বাগাইয়া চলিবার রীতি। দেখিলেই ভয়ে বুক কাঁপিয়া উঠে। বাইসনের কাঁধে ষাঁড়ের ন্যায় ঝুঁটি এবং ল্যাজে সিংহের ন্যায় চুলের গোছা থাকে। ইহারা ঘন জঙ্গল অপেক্ষা খোলা মাঠে থাকিতে বেশি ভালোবাসে। আমেরিকার ঘাসে ভরা বড়ো বড়ো মাঠে ইহারা দলে দলে বিচরণ করে।
গন্ডার
গড়ন-পেটন যেমন ইহার
নিতান্ত বেয়াড়া
মেজাজটাও রুক্ষ তেমন––
যেন সৃষ্টিছাড়া!
একটি কারো, কারো দুটি
খড়্গ শোভা পায়
বর্ম হেন চর্মরাশি
ঝুলে পড়ে গায়!
কভু জলে, স্থলে কভু
যেথায় খুশি বাস
খাদ্যের নাই বিচার কিছু––
কাঁটা, খোঁচা, ঘাস।
মেজাজ যখন বিগড়ে ওঠে,
হঠাৎ এলে রুখে
সিংহ-বাঘের হয় না সাহস
দাঁড়াতে সম্মুখে!
এশিয়া ও আফ্রিকা গন্ডারের জন্মস্থান। এশিয়ার ভারতবর্ষ, বোর্নিও, সুমাত্রা ও যবদ্বীপে তিন জাতীয় গন্ডার দেখিতে পাওয়া যায়। তাহার মধ্যে ভারতবর্ষের এক-খড়্গ কালো গন্ডারই প্রধান। ইহারা লম্বায় প্রায় সাত হাত এবং উচ্চতায় তিন হাতের কম নহে। গন্ডার জাতির মধ্যে আফ্রিকার শ্বেত গন্ডারই সর্বাপেক্ষা বড়ো। লম্বায় উহারা কখনো কখনো দশ-বারো হাত পর্যন্ত হইয়া থাকে! উহাদের মস্তক হইতে দুইটি করিয়া খড়্গ বাহির হয়। ডালপালা, কচি পাতা, তৃণ এবং নানা জাতীয় কাঁটা গাছ গন্ডারের প্রধান খাদ্য।
হাতি
হস্তী মশাই, হস্তী মশাই,
কীসের এত রাগ?
দেয়নি বুঝি হস্তিনী আজ
খাবার সমান ভাগ!
তাইতে কি গো এমন করে
দাঁড়িয়ে আছ মানের ভরে?
বুক ফেটে জল আসছে চোখে,
মানছে না কো বাগ!
হস্তী মশাই , হস্তী মশাই,
কীসের এত রাগ?
নাই-বা গেলে তাহার কাছে,
সারাটা বন পড়ে আছে,––
সাবাড় করো গোড়া থেকে
গাছের অগ্রভাগ!
হস্তী মশাই, হস্তী মশাই,
কীসের এত রাগ?
গন্ডারের ন্যায় হাতিও এশিয়া ও আফ্রিকা দেশবাসী। ভারতবর্ষ, সিংহল, ব্রহ্ম, শ্যাম, কোচিন, চীন, মালয়-উপদ্বীপ এবং সুমাত্রা প্রভৃতি দ্বীপে যে জাতীয় হাতি পাওয়া যায়, সাধারণত তাহাদিগকে ভারতবর্ষীয় হাতি বলে। ইহারা আফ্রিকার হাতি হইতে স্বতন্ত্র। আফ্রিকার হাতি লম্বায় কিছু বড়ো। হাতির বুদ্ধি সম্বন্ধে অনেক আজগুবি গল্প প্রচলিত আছে তাহার অধিকাংশই মিথ্যা। হাতির মস্তক প্রকাণ্ড হইলেও মস্তিষ্কের পরিমাণ অতি সামান্য। হাতি অপেক্ষা কুকুরের বুদ্ধি প্রখর। আফ্রিকার হাতি ভয়ানক দুরন্ত, কিছুতেই পোষ মানিতে চায় না।
তিমি
ঢেউয়ের সাথে সাথে মোরা
ঘুরে বেড়াই জলে।
রাজার রাজা মহারাজা
বিক্রমে ও বলে––
মোরা ঘুরে বেড়াই জলে।
মানুষগুলোর বুদ্ধি মোটা
সিংহে বড়ো বলে
‘বন-গাঁয়েতে শেয়াল রাজা’
হলেন সিংহ ছলে!
আসুন দেখি কেমন রাজা,
উচিত মতো দেব সাজা,
এক ঢুঁয়েতে বাছাধন
যাবেন রসাতলে।
রাজার রাজা মহারাজা
বিক্রমে ও বলে––
মোরা ঘুরে বেড়াই জলে!
আমরা কথায় বলি তিমি মাছ। তিমি কিন্তু বাস্তবিক মাছ নহে––একপ্রকার জলচর জন্তু। জলের মধ্যে অক্লেশে চলাফেরার সুবিধার জন্যই তিমির চেহারা কতকটা মাছের মতো হইয়াছে। আরসব বিষয়ে অন্যান্য পশুদের সহিত ইহাদের বিশেষ কোনো প্রভেদ নাই। প্রধানত পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণ প্রদেশের সাগরজলে তিমি বাস করে। ইহারা পাঁচ-ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন জাতিতে বিভক্ত। তন্মধ্যে গ্রিনল্যান্ডদেশীয় তিমি আকারে সর্বাপেক্ষা বড়ো। উহারা লম্বায় পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন হাতের কম নহে। তিমির ছানা জলের মধ্যেই জন্মগ্রহণ করে।
সাপ
ফোঁস-ফোঁস-ফোঁস বাগিয়ে ফণা
দুলছে রোষের ভরে
লাফিয়ে উঠে কামড় দিতে
জিব লকলক করে।
দুই কশে দুই বাঁকা দাঁত––
ক্ষুরের মতো ধার
সর্বনেশে বিষের থলি,
গোড়ায় থাকে তার।
কাউকে যদি বাগে পেয়ে
ছোবল মারে এসে,
দাঁতের ছেঁদা দিয়ে বিষ
রক্তে গিয়ে মেশে!
এক দণ্ডে দেহের বাঁধন
এলিয়ে পড়ে তার
ঝাড়ন-ফুঁকন সকল মিছে,––
অমনি যমের দ্বার!
আমাদের দেশের ‘গোখুরা’ ও ‘কেউটে’ এবং আমেরিকার ‘র্যাটেল স্নেক’-এর মতো এমন ভয়ংকর বিষধর সর্প পৃথিবীতে আর নাই বলিলেই হয়। এইসকল সাপের উপর চোয়ালের দুই পাশে বড়ো বড়ো দুইটি বাঁকা দাঁত আছে। সেই দাঁতের গোড়ায় বিষের থলি থাকে। সাপ উত্তেজিত হইয়া দংশন করিলে অল্প বিষ দাঁতের ছেঁদা দিয়া ক্ষতস্থানে প্রবেশ করে। সেই বিষ রক্তের সহিত মিশিলেই সর্বনাশ। মানুষ এক ঘণ্টা বা দেড় ঘণ্টার বেশি বাঁচে না ইঁদুর, পায়রা প্রভৃতি ছোটো ছোটো প্রাণী কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মারা পড়ে।
গোরিলা
গোরিলার চেহারা অতি ভয়ংকর। প্রকাণ্ড শরীর, মস্ত মাথা, মুখ কুচকুচে কালো। ইহার উপর আবার বাঘের মতো বড়ো বড়ো দাঁত! পশ্চিম আফ্রিকার ঘন বন-জঙ্গল ইহাদের বাসস্থান। অন্যান্য বানরের ন্যায় গোরিলা দলবদ্ধ হইয়া বাস করে না। স্ত্রী, পুরুষ এবং দুই একটি বাচ্ছা––এইরূপ ছোটো ছোটো দলে ইহারা ঘুরিয়া বেড়ায়।
বড়ো বড়ো পুরুষ গোরিলা খাড়া হইয়া দাঁড়াইলে মানুষের মাথা ছাপাইয়া উঠে। কিন্তু ইহাদের পায়ের গড়ন এরূপ যে, মানুষের মতো সোজাভাবে বেশিক্ষণ চলাফেরা করিতে পারে না।
গোরিলার চেহারা ভয়ংকর হইলেও স্বভাব খুব হিংস্র নহে তবে কেহ অনিষ্ট করিলে ইহারা তাহাকে সহজে ছাড়ে না। ইহাদের দেহে প্রচুর বল। কোনো কারণে উত্তেজিত হইলে, গোরিলা কামড়াইয়া শত্রুর দেহ খণ্ড-বিখণ্ড করিয়া ফেলে।
একবার কয়েক জন শিকারি গোরিলা সন্ধানে ঘুরিতে ঘুরিতে হঠাৎ দেখিতে পাইল, প্রকাণ্ড এক জোয়ান গোরিলা আর একটা দুর্বল কানা গোরিলাকে কাঁধে লইয়া পালাইবার চেষ্টা করিতেছে। জন্তুরাও যে একভাবে নিজ নিজ জীবনকে তুচ্ছ করিয়া অপরের প্রাণরক্ষা করিতে ব্যস্ত হয়, ইহা তাহাদের জানা ছিল না। শিকারিদের প্রাণ গলিয়া গেল! শুনিয়াছি, একবার একটা ইঁদুরও বিপদের সময়ে আর একটা বুড়ো ইঁদুরকে এইভাবে বাঁচাইয়াছিল! জানোয়ারদের মধ্যে এরূপ উচ্চ ভাব, খুব আশ্চর্যের বিষয় নয় কি?
সাপের গল্প
যত প্রকার সাপের বিষয় জানা গিয়াছে, তাহাদের মধ্যে আমাদের দেশের কেউটে, গোখুরা ও আমেরিকার র্যাটেল সাপ বড়ো ভয়ংকর। ইহাদিগকে ভয় করে না, এমন প্রাণী নাই। সামান্য ব্যাং, ইঁদুর হইতে বাঘ, মহিষ প্রভৃতি বড়ো বড়ো জন্তুরাও কোনো একটা বিষধরকে দেখিলে অস্থির হইয়া উঠে এবং প্রাণভয়ে পলাইতে চেষ্টা করে।
গোখুরা প্রভৃতি সাপ খুব রাগী বটে, কিন্তু ইহারাও সময়ে সময়ে পোষ মানিয়া থাকে। একবার লঙ্কাদ্বীপের একজন বড়ো লোক তাঁহার বাড়ি পাহারা দিবার জন্য কয়েকটা গোখুরা সাপ পুষিয়াছিলেন। তাহাদের ভয়ে চোর-ডাকাত কেহ সেই বাড়িতে আসিতে সাহস করিত না। সাপগুলা কিন্তু বাড়ির কাহাকেও কিছুই বলিত না। আমেরিকার নানা স্থানে এই সাপ দেখিতে পাওয়া যায়। ইঁহাদের ল্যাজের শেষ দিকে চামড়া নাই, কেবল কয়েকখানি হাড় সাজানো দেখিতে পাইবে। যখন এই সাপ চলিতে থাকে, তখন ওই সকল হাড় হইতে একপ্রকার খড়খড় শব্দ বাহির হয়। সেই শব্দের অনুকরণে ইহাদের র্যাটেল সাপ নাম হইয়াছে।
এ দেশের গোখুরা প্রভৃতির মতো ইহারা ফণা ধরিতে পারে না বটে, কিন্তু ইহাদের বিষ ভয়ানক তীব্র। একবার একটা র্যাটেল সাপ ছেঁড়া জুতার ফাঁক দিয়া একটি লোককে কামড়াইয়াছিল তাহাতে লোকটি মারা যায়। পরে সেই জুতা পায়ে দেওয়ায়, আর একজনের মৃত্যু হয়। শেষে আরও একজন জীবন হারাইলে বিশেষ অনুসন্ধানে, জুতার ভিতর সাপের বিষ-দাঁতের ছোটো একটা টুকরা দেখিতে পাওয়া যায়। সেই সামান্য একটু বিষের তেজে ক্রমে ক্রমে তিনজনে জীবন হারাইয়াছিল।
সচরাচর আমরা যে-সকল সাপ দেখি, তাহাদিগকে কখনো দল বাঁধিয়া থাকিতে দেখা যায় না। কিন্তু এই র্যাটেল সাপ অনেক সময় খুব বড়ো বড়ো দলে বাস করে। সুবিখ্যাত হামবোলড সাহেব বলেন, ‘একবার আমরা কয়েক জনে গায়না প্রদেশের এক জঙ্গলের ভিতর দিয়া চলিয়াছি, এমন সময় একটি লোক ছুটিতে ছুটিতে আসিয়া বলিল, মশাই, দেখুন এসে, কী সর্বনেশে কাণ্ড! এই বলিয়া লোকটি পথ দেখাইয়া চলিল। আমরা কিছু দূর গিয়াই একটা সাপের পিরামিড দেখিতে পাইলাম। তাহাতে কমপক্ষে হাজার বারোশো র্যাটেল সাপ ছিল। হঠাৎ লোকের ভিড় দেখিয়া সাপগুলা ভয়ানক চঞ্চল হইয়া উঠিল এবং আগুনের মত চোখ বাহির করিয়া ফোঁস ফোঁস শব্দ করিতে লাগিল।’
পাহাড়ে বোড়া
এই জাতীয় সাপ খুব বড়ো বড়ো হয়। ইহাদের দেহের বলও অসাধারণ। পাহাড়ে বোড়ার নিকট পরাস্ত হয় না, এমন প্রাণী অতি অল্পই আছে। ইহারা আস্ত হরিণ পর্যন্ত গিলিতে পারে কখনো কখনো বাঘকেও আক্রমণ করিতে ভয় পায় না। অন্য কোনোরকমে আহার সংগ্রহ করিতে না পারিলে, ইহারা নদী অথবা হ্রদের ধারে লুকাইয়া থাকে এবং কোনো জন্তু জলপান করিতে আসিলেই অমনি তাহাকে ধরিয়া ফেলে।
একবার এক সাহেব কুকুর লইয়া আফ্রিকার জঙ্গলে শিকার করিতে গিয়াছিলেন। কুকুর ছুটাছুটি করিতে করিতে হঠাৎ একটা ঝোপের ভিতর হইতে ভয়ে কেমন যেন কান্নাকাটি করিতে লাগিল। সাহেব অনেক ডাকাডাকি করিলেন কিন্তু কিছুতেই সে বাহিরে আসিল না, বরং অধিকতর কাতরভাবে চিৎকার করিতে লাগিল। তখন অনুসন্ধান করিতে করিতে সাহেব দেখিতে পাইলেন, প্রকাণ্ড একটা পাহাড়ে সাপ কুকুরকে জড়াইতেছে। তিনি অমনি বন্দুক উঠাইয়া তাহার মাথায় গুলি মারিলেন। সাপ ভয়ানক উত্তেজিত হইয়া উঠিল এবং কুকুরকে ছাড়িয়া সাহেবকে তাড়া করিল সাহেব উর্ধ্বশ্বাসে ছুটিলেন। কিন্তু সাপের সহিত আঁটিয়া উঠা সহজ নয়। বেগতিক দেখিয়া সাহেব তাড়াতাড়ি একটা গাছে উঠিয়া পড়িলেন। দেখিতে দেখিতে সাপও শিকারের লোভে সেই গাছে চড়িতে লাগিল। তখন সাহেব তাহার মাথা লক্ষ্য করিয়া আরও দুইটা গুলি মারিলেন। ইহাতে তাহার চক্ষু দুইটি নষ্ট হইল বটে, কিন্তু প্রাণ নষ্ট হইল না। সাপ সেই অবস্থায় গাছে চড়িতে লাগিল, কিন্তু চক্ষুহীন হওয়াতে, ঠিক সাহেবের দিকে যাইতে পারিল না। সুযোগ বুঝিয়া, সাহেব আরও কয়েকটা গুলি ছুঁড়িয়া উহাকে মারিয়া ফেলিলেন। সাহেবের কপালগুণে আগেই সাপের চক্ষু দুইটি নষ্ট হইয়াছিল, তাহা না হইলে তাঁহার যে কী দশা হইত, বলা যায় না।
কোনো কোনো প্রাণীতত্ববিদ পণ্ডিত বলেন, ‘সাপের দৃষ্টিতে এমন একটা শক্তি আছে যাহার বলে, সে যেকোনো প্রাণীর দিকে চায়, তাহাকেই জাদু করিয়া ফেলে।’
একবার একটা সাপ একই সময়ে ছয়টি পাখিকে তাহার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দ্বারা অভিভূত করে। পাখিগুলি অবশ্য কাছাকাছি বসিয়াছিল। সাপের মোহে পড়িয়া পাখিগুলি ছটফট করিতে লাগিল, কিন্তু কিছুতেই পলাইতে পারিল না। ইহাতে সাপের মহা আনন্দ! সে এক-এক করিয়া ক্রমে সেই ছয়টি পাখিকেই খাইয়া ফেলিল।
সামুদ্রিক সর্প
সামুদ্রিক মহাসর্পের অস্তিত্বে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করেন, এরূপ লোকের সংখ্যা পৃথিবীতে নিতান্ত অল্প নহে। রোমের বিখ্যাত ইতিহাসজ্ঞ পণ্ডিত লিভি লিখিয়াছেন, ‘রোমক সৈন্যগণ কার্থেজ আক্রমণকালে আফ্রিকার এক নদীর তীরে প্রকাণ্ড একটা সাপ দেখিতে পায়। তাহারা বহু চেষ্টায় উহাকে বধ করে। রোমনগরে ওই সর্পের চর্ম প্রেরিত হইয়াছিল, দৈর্ঘ্য উহা ৮০ হাত!’
কোনো মার্কিন গ্রন্থকার তাহার একখানি পুস্তকে কতকগুলি ভীষণ সামুদ্রিক সর্পের উল্লেখ করিয়াছেন। ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দে একখানি জাহাজ পেনোবস্কট সাগর দিয়া যাইতেছিল। সেই জাহাজের নাবিকগণ সহসা দেখিতে পাইল, কিছুদূরে একটা ভীষণ প্রাণী সাগরজলে বিশাল দেহ ভাসাইয়া সাঁতার দিতেছে। উহার দেহের বর্ণ গাঢ় নীল এবং পিঠের উপর অসংখ্য সারিগাঁথা পিপের মতো জিনিস ভাসিতেছিল। নাবিকেরা প্রথমে উহাকে সাপ বলিয়া বুঝিতে পারে নাই। কিছুক্ষণ পরে যখন তাহারা সেই প্রকাণ্ড প্রাণীকে জল হইতে প্রায় ২০ হাত পরিমাণ দেহাংশ উচ্চে তুলিয়া তাহাদের খুব নিকট দিয়া যাইতে দেখিল, তখন আর উহাকে সাপ বলিয়া বুঝিতে কাহারও বাকি রহিল না সেই ভীষণ সর্পকে দেখিয়া তাহারা অবাক হইয়া গেল। মহাসর্পটি দৈর্ঘ্য ৮০ হাতেরও অধিক ছিল।
আর একজন গ্রন্থকার আর একটা মহাসর্পের উল্লেখ করিয়াছেন উহা দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩৩ হাত এবং উহার দেহের বেড় ১৫ হাতের কম নহে। সেই সর্প মহাশয় নাকি ভেড়া, বাছুর, শূকর প্রভৃতি অক্লেশেই গিলিয়া ফেলিতেন এবং কখনো কখনো মাস্তুলের মতো ঘাড় তুলিয়া, জাহাজের ডেকের উপর হইতে মানুষ ধরিয়াও জলযোগ করিতে ছাড়িতেন না! পন্টোপিড়ান নামে কোনো বিখ্যাত প্রাণীতত্ববিদ তাঁহার ‘নরওয়ে দেশের প্রাকৃতিক ইতিহাস’ নামক গ্রন্থে চারিশত হস্ত দীর্ঘ এক সামুদ্রিক মহানাগের উল্লেখ করিয়াছেন। সেই ভয়ংকর সর্পকে ১৮১৯, ১৮২২ এবং ১৮২৭ খ্রিস্টাব্দে নরওয়ের উপকূল হইতে কিঞ্চিৎ দূরে দেখিতে পাওয়া যায়। অপর কোনো প্রাণীতত্ববিদ বলেন, ‘সেই নাগবর ১৭৩৪ খ্রিস্টাব্দে একবার গ্রিনল্যান্ডের সমুদ্র-উপকূলে বেড়াইতে আসিয়াছিলেন এবং ১৮১৫, ১৮১৭, ১৮১৯, ১৮৩৩ ও ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে তাঁহাকে আমেরিকার বোস্টন নগরের কাছে দেখা যায়।’ ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে ‘ডিডেলাস’ নামক জাহাজের নাবিকগণ তাহাকে দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে দেখিতে পাইয়াছিল। তাহার দেহের পরিধি ৬ হাতের কম নহে।
একবার এক জাহাজের নাবিকগণ দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে আরও একটা মহানাগ দেখিতে পায় সেই সর্প নাকি প্রকাণ্ড এক তিমির শরীরে দুই পাক জড়াইয়া, উহাকে জল হইতে উচ্চে তুলিয়া, পরক্ষণেই আবার ডুবাইয়া লইয়াছিল!
সামুদ্রিক মহাসর্পের বিষয়ে এইরূপ আরও অনেক গল্প শুনিতে পাওয়া যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ের অধিকাংশ বৈজ্ঞানিক পণ্ডিত এইরূপ সাপের অস্তিত্বে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তাঁহারা বলেন, ‘নাবিকগণ সামুদ্রিক অন্যান্য প্রাণী দেখিয়া, ভুল করিয়া অনেক সময় তাহাদিগকে সাপ মনে করিয়া থাকে।’ কিন্তু এরকম সাপ থাকা একেবারেই যে অসম্ভব, একথা এখনও ভালো করিয়া প্রমাণিত হয় নাই।
ইতর প্রাণীর কথা
পিপীলিকা নানা রকমের হইয়া থাকে। আকারে ছোটো হইলেও ইহাদের কোনো কোনো শ্রেণীর সাহস, অধ্যবসায় ও স্বজাতীয়ের প্রতি ভালোবাসা দেখিলে অবাক হইতে হয়। ইহারা দলে দলে বাস করে। এক-এক দলে হাজার হাজার পিপীলিকা দেখিতে পাওয়া যায়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই, দলের সকলেই পরস্পরের সহিত সুপরিচিত। ইহাদের হিংসাপ্রবৃত্তিও খুব বেশি। যদি ঘটনাক্রমে কোনো পিপীলিকা ভিন্ন পিপীলিকার বাসায় প্রবেশ করে, তবে আর রক্ষা নাই মুহূর্ত মধ্যে তাহার প্রাণ লইয়া টানাটানি পড়ে। কিন্তু স্বজাতীয় কোনো পিপীলিকা বহুদিন পরে দলে ফিরিয়া আসিলেও ইহারা সহজেই চিনিতে পারে এবং তাহাকে দলভুক্ত করিয়া লয়। পরস্পর শুঁড়ে শুঁড় স্পর্শ করিয়া ইহারা আপন-পর চিনিয়া থাকে।
পিপীলিকা মাটির নীচে শহর নির্মাণ করে। শহরের ঘরঘুলি নানাভাবে বিভক্ত। ইহারা কোনো ঘরে ডিম, কোনো ঘরে ছানা, কোথাও খাদ্যাদি, কোথায় বা পীড়িত আত্মীয়-স্বজনকে রাখে। প্রত্যেক শহরে পুরুষ ও স্ত্রী ছাড়া আর এক জাতীয় পরিশ্রমী পিপীলিকা দেখা যায়, তাহারা চাকরের কাজ করে। তাহাদের উপর গৃহের কাজকর্মের সমস্ত ভারই পড়ে। তাহারা ডিমগুলি গুছাইয়া রাখে, ছানাগুলি প্রতিপালন করে, ঘর-দ্বার পরিষ্কার করে এবং বাসস্থান পরিবর্তনের প্রয়োজন হইলে, নূতন বাসা ঠিক করিয়া আসে। এই শ্রেণীর পিপীলিকা ভিন্ন মনিবগুলির জীবন রক্ষা হওয়া ভার। অনেক সময় তাহারা খাওয়াইয়া দিলে, তবে মনিবদের খাওয়া হয়। এই সকল চাকর কোথা হইতে আসে বলিতেছি। পিপীলিকাজাতি বড়োই যুদ্ধপ্রিয়। বিশেষ কোনো কারণ না থাকিলেও কেবল লুটপাটের জন্যই ইহারা ভিন্ন ভিন্ন দলে যুদ্ধ শুরু করিয়া দেয়। কখন যুদ্ধ বাধে কিছুই ঠিক নাই বলিয়া শহরের প্রত্যেক ফটকে পাহারাওয়ালা পিপীলিকা থাকে। বিপদের আশঙ্কা দেখিলেই তাহারা ছুটিয়া ভিতরে গিয়া খবর দেয়, অমনি হাজার হাজার যোদ্ধা বাহিরে আসে। তারপর ভীষণ যুদ্ধ বাধিয়া যায়। দুই দল বলবান পিপীলিকার যুদ্ধ আরম্ভ হইলে, তাহা সহজে মিটে না ক্রমান্বয়ে চারি-পাঁচ দিন ধরিয়া সেই ভয়ানক যুদ্ধ চলে। কিন্তু এক পক্ষ দুর্বল হইলে, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যুদ্ধ শেষ হইয়া যায়। যুদ্ধে যে পক্ষ জয়লাভ করে, তাহারা বিজিত দলের গৃহে প্রবেশ করিয়া, ডিম ও ছানাগুলি দখল করিয়া বসে। তারপর গৃহে লইয়া উহাদিগকে যত্নের সহিত পালন করে। উহারাই বড়ো হইয়া চাকর হয়। তখন শিশুপালন, পীড়িত আত্মীয়ের শুশ্রূষা, খাদ্যাদি সংগ্রহের চেষ্টা প্রভৃতি সকল কাজের ভারই উহাদের উপরে পড়ে।
মানুষের ন্যায় পিপীলিকারাও ভবিষ্যতের জন্য খাদ্যাদি সঞ্চয় করিয়া রাখে, ইহা সকলেই জানে। কিন্তু আমেরিকায় এক শ্রেণীর পিপীলিকা আছে, তাহারা যে অদ্ভুত উপায়ে খাদ্যসঞ্চয় করে, তাহা শুনিলে অবাক হইতে হয়। তাহারা দলের কতকগুলি পিপীলিকা বাছিয়া, আশ্চর্য কৌশলে উহাদের হজমশক্তি নষ্ট করিয়া দেয় তারপর চারিদিক হইতে মধু সংগ্রহ করিয়া আনিয়া উহাদিগকে পান করাইতে থাকে। হজমশক্তি না থাকায়, ক্রমে উহাদের পেট ফুলিয়া এক-একটি মধুভাণ্ড হইয়া উঠে। যখন অন্য খাবার না জোটে, তখন পিপীলিকার দল সেই মধুপান করিয়াই জীবনধারণ করে।
ইহা অপেক্ষাও আশ্চর্যের কথা এই যে, মানুষ দুগ্ধের জন্য গোরু পালন করে, কোনো কোনো পিপীলিকাও তেমনি এক প্রকার কীট পুষিয়া থাকে। সেই কীটের গায়ের রস মিষ্ট। তাহাদের পিছন দিকে দুইটি শুঁড় বাহির হয়।
পিপীলিকা সেই শুঁড়ে মুখ দিয়া রস পান করে। কীটগুলিকে পিপীলিকাদের গোরু বলা যাইতে পারে। উহারা সেই কীট দেখিলেই ধরিয়া আটকাইয়া রাখে।
আফ্রিকার জঙ্গলে একজাতীয় পিপীলিকা দেখিতে পাওয়া যায়, তাহাদের দৌরাত্ম্যের কথা শুনিলে শরীর শিহরিয়া উঠে। যখন সেই পিপীলিকার দল শিকার অন্বেষণে বাহির হয়, তখন জঙ্গলের ছোটো বড়ো সকল প্রাণীই ভয়ে পলায়ন করে। বিখ্যাত পর্যটক ডুশেলু বলেন, ‘অনেক সময় আমি উহাদের ভয়ে গৃহত্যাগ করিয়া, জলে আশ্রয় লইতে বাধ্য হইয়াছি। উহারা যে গৃহে প্রবেশ করে, তাহার সমস্ত প্রাণীই মারিয়া ফেলে।’
এই অত্যাচারীর দল রাতদিন কেবল ঘুরিয়াই বেড়ায়। যেখান দিয়া চলে, সে স্থান একেবারে ঝাঁটাইয়া লইয়া যায়। বড়ো বড়ো হাতি এবং গোরিলাকেও উহাদের ভয়ে পলাইতে দেখা গিয়াছে। একবার দাড়া দিয়া যাহাকে ধরে, তাহার আর নিস্তার নাই! নিগ্রোরা বলে, ‘সেকালে দোষী ব্যক্তিকে নির্দয়রূপে সাজা দিবার জন্য, এই পিপীলিকাদের রাস্তায় ফেলিয়া রাখা হইত।’
মাকড়সা
পিপীলিকার ন্যায় মাকড়সাও নানা রকমের হইয়া থাকে। আকারে মশা, মাছি অপেক্ষা ছোটো জাতের মাকড়সাও আছে, আবার বড়ো বড়ো কাঁকড়ার মতো প্রকাণ্ড মাকড়সারও অভাব নাই। ইহাদের কোনো কোনো জাতি জাল পাতিয়া শিকার ধরে, কোনো কোনো জাতি অন্য উপায়ে আহার সংগ্রহ করিয়া থাকে।
যাহারা জাল বুনিতে জানে, তাহাদের জাল পাতিবার কৌশল দেখিলে আশ্চর্য হইতে হয়। সহজে শিকার জুটিবার সম্ভাবনা, এরূপ স্থান বাছিয়া তাহারা জাল পাতে এবং দক্ষ শিকারির ন্যায় উহার ঠিক মাঝখানটিতে লুকাইয়া থাকে। মশা, মাছি প্রভৃতি পড়িবামাত্র সেই জাল থরথর করিয়া কাঁপিয়া উঠে। অমনি মাকড়সা ছুটিয়া গিয়া শিকার ধরিয়া ফেলে।
মাদাগাস্কার, মরিসাস প্রভৃতি গরম দেশে খুব বড়ো বড়ো মাকড়সা দেখিতে পাওয়া যায়। তাহাদের জালও তেমনি প্রকাণ্ড। সময় সময় সেই জালে বড়ো গাছের আগাগোড়া ঢাকা পড়ে। শিকার ধরিবার জন্য তাহারা এত বেশি জাল পাতে যে, অনেক সময় স্থানীয় দৃশ্য একেবারে বদলাইয়া যায়। লঙ্কাদ্বীপে কয়েকরকম মাকড়সা আছে, তাহাদের জালে টিকটিকি, গিরগিটি, ইঁদুর ও ছোটো ছোটো সাপ পর্যন্ত ধরা পড়িতে দেখা গিয়াছে। সেই জালের সূতা এত শক্ত ও ধারালো যে, উহার ঘর্ষণে নাক, মুখ দিয়া রক্তপাত হয়।
মাকড়সার মধ্যে যাহারা জাল বুনিতে জানে না, তাহারা শিকারি জন্তুর ন্যায় তাড়া করিয়া শিকার ধরে। কোনো কোনোটা আবার ঠিক বাঘের মতো লাফাইয়া শিকারের পিঠে চড়িয়া বসে। এইরকম কয়েক জাতিকে বাঘ-মাকড়সা বলে।
ইহারা দেওয়ালের ফাটলে, ঘরের চালে, গাছের ফোকরে এবং এইরকম নানাস্থানে বাসা প্রস্তুত করে। যাহারা মাটিতে গর্ত করিয়া বাস করে, তাহাদের বাসার ভিতর পিঠ এমন মোলায়েম যে, ঠিক যেন রেশমি কাপড় দিয়া মোড়া। উহার বাহির দিকে এক-একটি ঢাকনা থাকে। ঢাকনাগুলি বাসার সহিত এমনভাবে আবদ্ধ যে, মাকড়সা ইচ্ছা করিলেই তাহা খুলিতে ও বন্ধ করিতে পারে।
ইহারা দিনের বেলায় সেই বাসার মধ্যে লুকাইয়া থাকিয়া রাত্রে আহার অন্বেষণে বাহির হয়। সেই সময় হঠাৎ যদি নিকটে কোনো শত্রু দেখে, তবে তাড়াতাড়ি বাসায় ঢুকিয়া ভিতর হইতে ঢাকনা টানিয়া রাখে। চোর-ডাকাত দেখিলে অমনি আমরা যেমন ঘরের দরজা বন্ধ করি, ইহারাও ঠিক সেই উপায়ে রক্ষা পায়।
আর একরকম শিকারি মাকড়সা জলের মধ্যে আশ্চর্য কৌশলে বাসা প্রস্তুত করিয়া ছোটো ছোটো জলচর প্রাণী শিকার করে। পাছে ভাসিয়া যায়, সেই ভয়ে ইহারা বাসাগুলি জলজ উদ্ভিদের সহিত বাঁধিয়া রাখে। কিন্তু কী উপায়ে যে জলের মধ্যে ইহাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের কাজ চলে, তাহা বুঝা কঠিন।
মাকড়সার বিষ খুব উগ্র মশা, মাছি প্রভৃতি মুহূর্তের মধ্যে মারা পড়ে। কোনো কোনোটার বিষ এত তীব্র যে, মানুষের পক্ষেও মারাত্মক হইয়া উঠে। শুনিতে পাওয়া যায়, ইতালির কোনো কোনো স্থানে একরকম মাকড়সা আছে, তাহাদের দংশনে মানুষ নাচ-গানে মত্ত হইয়া উঠে। কিন্তু একথা কতদূর সত্য, তাহা বলা যায় না।
