জয়-পরাজয়

জয়-পরাজয়

প্রথম পরিচ্ছেদ

তখন আমার বয়স বারো বৎসর। একদিন মা আমাকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘মোহনলাল, দেখতে দেখতে তুই বড়ো হয়ে উঠলি। আর হেসে-খেলে সময় নষ্ট করলে চলবে না। কালই তোকে স্কুলে ভরতি করে দেব।’

এত বয়স পর্যন্ত স্কুলে ভরতি হই নাই শুনিয়া, কেহ কেহ হয়তো আশ্চর্যই বোধ করিবেন। কিন্তু তাঁহারা যদি সকল দিক দেখিয়াশুনিয়া বিচার করেন, তাহা হইলে নিশ্চয়ই বুঝিতে পারিবেন যে, ইহাতে আশ্চর্য হইবার কিছুই নাই। প্রথম, আমি নেহাত গরিব লোকের ছেলে নই––ঘরে অন্নের বিশেষ অভাব ছিল না। দ্বিতীয়, আমি মায়ের একমাত্র সন্তান––আবদারের সীমা ছিল না। তৃতীয়, নিতান্ত শিশু অবস্থায় আমি পিতৃহীন হই––শাসন করিবার কেহই ছিল না। কাজেই এমন সুযোগের মধ্যে পড়িলে, কোন বালকই বা বারো বৎসরের পূর্বে স্কুলে ভরতি হয়! আমি মায়ের আদুরে গোপাল হইয়া হাসিয়া-খেলিয়া দিন কাটাইতাম। মাকে বেলা দুপুর পর্যন্ত ফাঁকি দিয়া, বাগানে বাগানে পাখির ছানা খুঁজিয়া বেড়াইতাম কখনো সমবয়সীদের সঙ্গে জুটিয়া প্রতিবেশীর বাগানে পাকা কুল, বাতাবি লেবু, কাঁচা আম, কচি শশা প্রভৃতি চুরি করিতে যাইতাম। কখনো জেলের ছেলেদের সঙ্গে মিশিয়া, ঝড়-বৃষ্টি মাথায় করিয়াও নদীতে নৌকা চড়িয়া বেড়াইতাম কখনো বা নদীর চড়ায় গিয়া চড়িভাতি করিতাম। একদণ্ড আমাকে বাড়িতে কেহ স্থির হইয়া থাকিতে দেখে নাই। দুপুরবেলা মা আমাকে ‘হাসিখুসি’ ও স্লেট পেনসিল দিয়া বসাইয়া দিতেন, কিন্তু আমি তাঁহার চোখে ধুলা দিয়া, পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে গিয়া মিশিতাম এবং ডান্ডা-গুলি ও কপাটি খেলায় সারাদিন কাটাইয়া সন্ধ্যার সময় ঘরে ফিরিতাম।

আমি আরও কয়েক বৎসর হাসিয়া-খেলিয়া কাটাইতে পারিতাম, কিন্তু পাড়ার কয়েকটি দুষ্টু ছেলের সহিত আমার কিছু বেশি ঘনিষ্ঠতা হওয়াতে, মা বড়োই ভয় পাইলেন এবং স্কুলে যাইতে আরম্ভ করিলে, তাহাদের সঙ্গে আমার বেড়ানো বন্ধ হইবে, এই ধারণায় তিনি পরদিনই আমাকে স্কুলে ভরতি করিয়া দিলেন। মায়ের বুঝিবার নিতান্তই ভুল হইয়াছিল। স্কুলে গিয়া অতি অল্পদিনের মধ্যেই আমি অনেকগুলি কুসঙ্গী পাইলাম এবং তাহাদের সঙ্গে মিশিয়া, স্কুল হইতে পলাইয়া, বাগানে বাগানে ঘুরিয়া, পাখির ছানা ও ফলমূল চুরি করিয়া বেড়াইতে লাগিলাম।

স্কুলেও আমার মন্দ স্বভাবের কথা প্রকাশ হইয়া পড়িল আমাদের ক্লাসে নেপাল ও মণিরাম নামে দুইটি ছেলে ছিল। নেপাল আমার সমবয়স্ক, মণিরামের বয়স নিতান্ত অল্প। এই দুইজনের সঙ্গে আমার একেবারেই বনিত না––প্রায়ই ঝগড়া-বিবাদ হইত। মণিরাম বয়সে ছোটো বলিয়া অনেক সময়, এমনকী, বিনা দোষে তাহাকে প্রহার করিতাম। কিন্তু মনে মনে খুব রাগ থাকিলেও, নেপালের উপর কোনো অত্যাচার করি, এমন সাহস আমার ছিল না।

ক্লাসের প্রায় সকলেই আমাকে ও নেপালকে ভয় করিত। তাহার কারণ, নেপালের ভালোবাসা ও আমার অত্যাচার। নেপাল সকলকে এত ভালোবাসিত যে, তাহার সম্মুখে কোনো অন্যায় কাজ করিতে কাহারও সাহস হইত না আর আমার অত্যাচার-প্রবৃত্তি এমনই প্রবল ছিল যে, আমাকে ভয় না করিত, এমন ছেলে ক্লাসে কেহ ছিল না। এমনকী, আমি কোনো অত্যাচার করিলেও শিক্ষককে বলিয়া দিতে কেহ সাহস করিত না।

অভ্যাসমতো একদিন আমি মণিরামকে ধরিয়া দুই-চারি ঘা দিতেছি, এমন সময় নেপাল আসিয়া বলিল ‘দেখো ভাই, মণিরাম একে ছোটো, তাতে আবার ভারী রোগা। আর তুমি তার চেয়ে কত বড়ো! মণিকে মারা কি তোমার ভালো দেখায়!’

‘আচ্ছা, আচ্ছা, এ বিষয়ে তোমার কোনো কথা বলবার দরকার নেই। জ্যেষ্ঠতাতের মতো উপদেশ দিচ্ছ কেন! মণিকে মারছি সে বুঝবে, মাঝখান থেকে তোমায় ফোড়ন দিতে ডাকলে কে?’––এই বলিয়া রাগের চোটে আমি মণিরামের ঘাড় ধরিয়া ঠেলিয়া দিলাম।

আমার অভদ্র ব্যবহারে বিরক্ত হইয়া নেপাল সেখান হইতে চলিয়া গেল। কিন্তু আমার কথার কোনো উত্তর না দিয়া তাহাকে চলিয়া যাইতে দেখিয়া, আমি ভাবিলাম, নেপাল নিশ্চিতই ভীরু। ভীরু না হইলে সে কখনো চুপ করিয়া বলিয়া যাইত না।

সেইদিন হইতে নেপালের উপর আমার রাগ দ্বিগুণ বাড়িয়া গেল। ক্লাসের অন্যান্য বালকের উপর আমি এতদিন যেরূপ প্রভুত্ব করিয়াছি, মিথ্যা ভয়ে নেপালের উপর সেরূপ করিতে সাহস করি নাই বলিয়া, মনটা কেমন খুঁতখুঁত করিতে লাগিল! ভাবিলাম, এবার সুবিধা পাইলেই নেপালকে উত্তমমধ্যম ঘা কতক দিতে হইবে। তখন হইতে নেপাল যাহাতে চটে, আমি বাছিয়া বাছিয়া সেইরূপ কাজ করিতে লাগিলাম।

ঝগড়া বাঁধাইবার জন্য বড়ো বেশিদিন অপেক্ষা করিতে হইল না! আমাদের স্কুলে যাইবার পথে, এক কৃষকের বাগানে কয়েকটি লিচু গাছ ছিল। তখন জ্যৈষ্ঠ মাস। গাছগুলি লিচুতে ভরিয়া গিয়াছিল। একদিন স্কুলে আমরা কয়েকজনে পরামর্শ করিলাম যে, সেই বাগানের লিচু খাইতে হইবে। আমাদের মধ্যে মণিরাম বেশ গাছে উঠিতে পারিত। আমি তাহাকে ডাকিয়া বলিলাম, ‘দেখ মণি, আজ লিচু পেড়ে খাব, তুই গাছে উঠবি, কেমন?’ মণিরাম ঘাড় নাড়িয়া বলিল, ‘আচ্ছা।’

স্কুলের ছুটি হইলে আমরা দল বাঁধিয়া, কৃষকের লিচু গাছের তলায় জড় হইলাম। কৃষক তখন বাড়িতে ছিল না। আমি মণিরামকে গাছে তুলিয়া দিয়া সকলকে পাহারা দিতে বলিলাম। মণিরাম সবেমাত্র দশ-বারোটা লিচু পাড়িয়াছে, এমন সময় বৈদ্যনাথ আসিয়া বলিল, ‘ওহে মোহনলাল, ব্যাপার বড়ো সহজ নয়! নেপাল দলবল নিয়ে এই দিকে আসছে। বোধ হয়, মারামারি হতে পারে।’ আমি বলিলাম ‘কী, নেপাল আসছে? আসুক, আজ তাকে একবার দেখাব! তোমরা এই দিকে থাকো, আমি ওই গাছের আড়ালে লুকাই। খবরদার, তোমরা ভয় পেয়ো না। আমি ঠিক সময়ে বাইরে এসে নেপালকে দু-চার ঘা লাগিয়ে দেব। তোমরা তার চেলাদের মাথায় চড়টা-আসটা দিতে ভুলো না।’ আমার কথায় সকলে রাজি হইল আমি গাছের আড়ালে গিয়া লুকাইলাম।

একটু পরেই নেপালের দল গাছতলায় আসিয়া উপস্থিত হইল। মণিরাম তখন ভয়ে নামিয়া আসিবার উদ্যোগ করিতেছিল। তাহাকে দেখিতে পাইয়া নেপাল বলিল, ‘ছিঃ মণি, তোমার এই কাজ! আমি তোমার মাকে বলে দেব।’

মণিরাম ভয়ে কাঁপিতে কাঁপিতে বলিল, ‘না ভাই, আমার কোনো দোষ নেই। তুমি তো জান, শুধু মার খাবার ভয়েই আমি এ কাজ করতে রাজি হয়েছি।’

নেপাল। তা জানি, আসল ব্যাপার বুঝতে আমার বাকি নেই। ছিঃ! ছিঃ! এর চেয়ে লজ্জার কথা আর কী আছে!

নেপালের কথা শেষ হইতে না হইতে বৈদ্যনাথ সগর্বে বলিয়া উঠিল, ‘সাবধানে কথা বলো, অত বাড়াবাড়ি ভালো না!’

নেপালের দলে গোপীনাথ নামে একটি ছেলে ছিল। তাহার চেহারা যেমন গুন্ডার মতো, তাহার গায়ের জোরও তেমনি বেশি। সে বৈদ্যনাথের দিকে মুখ ফিরাইয়া বলিল, ‘কী, সাবধান হব! কেন, এত ভয় কীসের? আয় না, কার ঘাড়ে কটা মাথা দেখি!’ এই বলিয়া গোপীনাথ যেই একটু অগ্রসর হইল, লিখিতে লজ্জা হয়, আমার দলের সকলেই অমনি প্রাণভয়ে দৌড় দিল। দলের ছেলেদের কাণ্ড দেখিয়া আমি যারপরনাই দুঃখিত হইলাম। এক-একবার ভাবিলাম, ছুটিয়া গিয়া নেপালের মুখে এক ঘুসি লাগাই। কিন্তু গোপীনাথের ভয়ে আমারও সাহস হইল না। আমি যেমন লুকাইয়া ছিলাম, তেমনি রহিলাম। তখন নেপাল মণিরামকে ডাকিয়া বলিল, ‘নেমে এসো, এমন কাজ আর কখনো কোরো না।’

মণিরাম ধীরে ধীরে নামিয়া বাড়ির দিকে চলিল। নেপালের দলও অন্য একটি রাস্তা দিয়া চলিয়া গেল। তাহারা অনেক দূর যাইলে পরে, আমি তাড়াতাড়ি বাড়ি চলিলাম। সেইদিন আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করিলাম যে, নেপালকে ইহার প্রতিশোধ দিবই দিব। তাহা যদি না পারি, আমার মোহনলাল নাম মিথ্যা!

ইহার পর কয়েক দিনের মধ্যেই নেপালকে মারিবার সুযোগ উপস্থিত হইল। একদিন স্কুলের ছুটির পর নদীর ধার দিয়া যাইতে যাইতে, আমি নীচে বই রাখিয়া, একটা গাছে পাখির ছানা পাড়িতে উঠিয়াছি, এমন সময় নেপাল, মণিরাম এবং আমাদের ক্লাসের আরও কয়েকটি ছেলে সেখানে আসিল। গাছের তলায় বই দেখিয়া নেপাল বলিয়া উঠিল, ‘এই দেখ, কোন হতভাগা ছেলে বই ফেলে গেছে! কার নাম লেখা আছে, খুলে দেখ তো?’

আমি গাছের উপর হইতে বলিলাম ‘কী, এত বড়ো আস্পর্ধা! তুই আমাকে হতভাগা বলবার কে? দাঁড়া, তোকে দেখাচ্ছি!’ এই বলিয়া আমি তিন-চারিটি ডিমসুদ্ধ পাখির বাসাটা নেপালের মুখের উপর ছুঁড়িয়া দিলাম, ডিমগুলা ভাঙিয়া তাহার নাক, মুখ রসে ভরিয়া গেল নেপালের মুখের শ্রী দেখিয়া সকলে হো হো করিয়া হাসিয়া উঠিল। আমি তাড়াতাড়ি নামিয়া তাহার কাছে গিয়া বলিলাম, ‘এখন তোর গুপে কোথায়? সেদিন যে বড়ো মারামারি করতে চেয়েছিলি! আয় তিন ঘুসিতে এখনই তোর দাঁত উড়িয়ে দেব।’

‘মারামারি করা ভদ্রলোকের কাজ নয়! যতক্ষণ ভালো কথায় চলে ততক্ষণ মারামারি না করাই উচিত। কিন্তু তুমি ক্রমেই যেরকম বাড়িয়ে তুলছ, তোমাকে একটু শিক্ষা দেওয়া দরকার। আমি মিষ্টি কথা বলে দেখেছি, ভালো ব্যবহার করে দেখেছি, তুমি কিছুতেই শুনলে না। যেন মারামারি করাই তোমার উদ্দেশ্য! যদি তাই হয়, এসো, দেখা যাক!’ এই বলিয়া নেপাল তাহার জামার আস্তিন গুটাইতে লাগিল।

আমি আর কালবিলম্ব না করিয়া, নেপালের মুখ লক্ষ্য করিয়া সজোরে এক ঘুসি চালাইলাম! সে হঠাৎ মাথা সরাইয়া সেই ঘুসি এড়াইল। তখনই আবার আর একটা ঘুসি মারিলাম, সেটাও তাহার গায়ে লাগিল না। রাগে, ঘৃণায় উত্তেজিত হইয়া আমি আবার তাহাকে মারিবার উপক্রম করিতেছি, এমন সময়, নেপালের প্রকাণ্ড এক ঘুসি ঠিক আমার নাকের উপর আসিয়া পড়িল! সে তো ঘুসি নয়, যেন লোহার মুগুর! আমি চারিদিক অন্ধকার দেখিতে লাগিলাম! মাথা ঝাঁ ঝাঁ করিতে লাগিল।

আমি বেশ বুঝিতে পারিলাম যে, নেপালের সহিত আঁটিয়া উঠা সহজ নয়। সে একজন রীতিমতো পালোয়ান। তখন আমি––‘যাক, প্রাণ, থাক মান’––মন্ত্র জপিতে জপিতে একেবারে মরিয়া হইয়া তাহার দিকে ছুটিয়া গেলাম। নেপাল চক্ষুর নিমিষে অমনি একধারে একটু সরিয়া দাঁড়াইল, আর বেগ সামলাইতে না পারিয়া আমি সম্মুখের নদীতে পড়িয়া গেলাম। নদীটা বড়ো না হইলেও গভীর ছিল। আমি সাঁতার জানিতাম না নদীতে পড়িয়া আঁকুপাঁকু করিতে করিতে ভাসিতে চেষ্টা করিলাম, কিন্তু আমার সকল চেষ্টাই ব্যর্থ হইল! আমার এই আসন্ন বিপদে নেপাল স্থির থাকিতে পারিল না––তাড়াতাড়ি লাফাইয়া পড়িয়া আমাকে ধরিয়া ফেলিল। আমিও তাহার কাপড় ধরিলাম। নেপাল বলিল, ‘তোমার কোনো ভয় নাই কাপড় ছেড়ে দাও, আমি তোমাকে এখনই উঠাচ্ছি।’

কিন্তু তাহার কাপড় ছাড়িতে আমার সাহস হইল না কী জানি, শত্রু ভাবিয়া সে যদি আমাকে ফেলিয়া চলিয়া যায়। আমার নির্বুদ্ধিতায় লাভের মধ্যে এই হইল যে, আমরা দুইজনেই ডুবিতে লাগিলাম। শেষে নেপাল জোর করিয়া আমার হাত হইতে তাহার কাপড় ছাড়াইয়া লইল এবং অনেক কষ্টে আমাকে লইয়া ভাসিতে ভাসিতে তীরে আসিয়া উঠিল। এইরূপে আমি যে যাত্রা বাঁচিয়া গেলাম।

কিন্তু কুশিক্ষার এমন দোষ যে, সে সময়েও আমি নেপালকে ভালো চক্ষে দেখিতে পারিলাম না। সে যে আপনাকে এত বিপদে ফেলিয়া, আমার জীবন রক্ষা করিল, সেজন্য কৃতজ্ঞ হওয়া দূরে থাক, বরং অপমানে যেন আমি মরিয়া গেলাম! নেপাল এই ঘটনা লইয়া যেখানে-সেখানে গর্ব করিবে, আর সকলের কাছে আমার মাথা হেঁট হইবে, ইহা অপেক্ষা লজ্জা ও অপমানের বিষয় কী আছে! নদীর জলে ডুবিয়া মরাই বরং আমার পক্ষে সহস্র গুণে ভালো ছিল! এই ভাবিতে ভাবিতে আমি বাড়ি চলিয়া গেলাম।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

বাড়ি আসিলে, নেপালের প্রতি আমার অন্যায় ব্যবহারের কথা শুনিয়া, মা আমাকে যারপরনাই তিরস্কার করিলেন। তারপর কয়েকজন আত্মীয়স্বজনের সহিত পরামর্শ করিয়া আমাকে কলিকাতায় পাঠানো স্থির করিলেন। ১২৮২ সালের জ্যৈষ্ঠ মাসে, ১৫ বৎসর বয়সের সময়ে আমি মামার সহিত কলিকাতায় আসিয়া উপস্থিত হইলাম। এত বয়স পর্যন্ত আমি কখনো বাড়ির বাহির হই নাই। সেইজন্য ট্রেনে উঠিয়া প্রথম প্রথম আমার খুব কষ্ট হইয়াছিল বটে, কিন্তু কলিকাতায় পৌঁছিবার পরে, দিন কয়েক মামার সঙ্গে চিড়িয়াখানা, জাদুঘর, গড়ের মাঠ, কেল্লা প্রভৃতি দেখিয়া, সে কষ্টের অবসান হইল। রোজ সকালে বিকালে চারিদিক থেকে কত বাঁশি বাজে, কত হারমোনিয়ম বাজে, কত গোরার বাজনা বাজাইয়া, রোশনাই করিয়া বিয়ে যায়––এইসব আমার কাছ খুব নূতন বোধ হইতে লাগিল। মামা আমাকে একটি বোর্ডিং স্কুলে ভরতি করিয়া দিয়া, এক সপ্তাহ পরে দেশে ফিরিয়া গেলেন। আমি বোর্ডিং-এর ভালো ছেলেদের ত্রিসীমানায়ও ঘেঁষিতাম না। কয়েকটি ওঁচা ছেলে আমার সঙ্গী হইল। আমি তাহাদের সঙ্গে মিশিয়া লুকাইয়া লুকাইয়া চুরুট খাইতে শিখিলাম। বড়ো বড়ো হনি সোপ কিনিয়া গায়ে মাখিতাম, আর প্রত্যহ এক ঘণ্টা ধরিয়া ঝাঁঝরা কলের নীচে মাথা পাতিয়া, আনন্দে স্নান করিতাম। তারপর আরশি বরুশ লইয়া, আলবার্ট কাটিয়া চুল ফিরাইতাম। ভালো ভালো চুনট করা কামিজ, চীনে বাড়ির বার্নিশ করা হাপ-জুতা, হাপ মোজার উপর গার্টার, এইসব অষ্টপ্রহর পরিয়া বাবুগিরি করিতাম। বোর্ডিং-এ আমার স্বেচ্ছাচারিতা ক্রমশ বাধা পাইতে লাগিল। বোর্ডিং স্কুলের বাঁধাবাঁধি নিয়মের মধ্যে বাস করা যে কী ভয়ানক কষ্টকর, তাহা মনে হইলে এখনও আমার হৃৎকম্প উপস্থিত হয়। এক মাস যাইতে না যাইতে, আমি পর পর সাত বার নিয়মভঙ্গঅপরাধে তিরস্কৃত হইলাম। বোর্ডিং-এ আমার সমবয়স্ক আরও কয়েকটি বালক ছিল। তাহাদের মধ্যে রমানাথ দুষ্টামিতে সর্বাপেক্ষা পাকা। তাহার সহিত আমার খুব ভাব হইল। আমাদের পরস্পরের মধ্যে এত ভাব দেখিয়া, হেডমাস্টার মহাশয় নিয়ম করিয়াছিলেন যে, আমরা কেহ কাহারো সহিত কথা বলিতে পারিব না। কিন্তু মাস্টারের চক্ষে ধূলি দিবার শক্তি আমাদের যথেষ্ট ছিল। আমরা গোপনে একত্র হইয়া সর্বপ্রকার দুষ্টামির মতলব আঁটিতে লাগিলাম। লেখাপড়াও যে কিছুই শিখিলাম না, এমন নয়। তখন আমি গড়্গড় করিয়া রয়েল রিডার থ্রি পড়িতে পারিতাম একটানে আমার নাম লিখিতে পারিতাম অঙ্কশাস্ত্রের জ্ঞানও নিতান্ত কম হয় নাই,––হড়হড় করিয়া কুড়ির কোটা পর্যন্ত নামতা মুখস্থ বলিতে পারিতাম। এইরূপে একটু লেখাপড়া এবং অনেকখানি দুষ্টামি শিখিয়া আমি পূজার ছুটির সময় বাড়িতে আসিলাম। পূজার কয়দিন বেশ কাটিয়া গেল, মা কিছুই বলিলেন না। কিন্তু বিজয়ার পরদিনই মা আমাকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘মোহনলাল, এই কয় মাস কলকাতায় থেকে তুমি তোমার শিক্ষকের এবং বোর্ডিং-এর ছেলেদের সঙ্গে যেরূপ ব্যবহার করেছ, তা সবই আমি শুনেছি। তোমার মামাকে মাস্টারমশাই যে চিঠি লিখেছেন, তা আমি দেখেছি। তুমি এখন আর ছেলেমানুষটি নও, বড়ো হয়েছ কিন্তু কী দুঃখের বিষয়, এখনও তুমি কুসংসর্গ ছাড়তে পারলে না! যাহোক, আমি আর তোমাকে কিছু বলতে চাই না। তোমার যা ইচ্ছে, তাই করো।’ এই বলিয়া মা চোখে কাপড় দিয়া কাঁদিতে লাগিলেন। মাকে কাঁদিতে দেখিয়া আমার বড়ো কষ্ট হইল। আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করিলাম, মা যাহাতে কষ্ট পান, এমন কাজ আর কখনো করিব না। আমার ভাবগতিক দেখিয়া মাও বোধ করি ভাবিলেন যে, আমার সুমতি হইবার উপক্রম হইয়াছে। তারপর যে কয়দিন বাড়িতে ছিলাম, আমার সে কয়দিনের ব্যবহার দেখিয়া মা যারপরনাই সন্তুষ্ট হইলেন। অবশেষে ছুটি ফুরাইয়া আসিলে, মা আমাকে আদর করিয়া, নানাপ্রকার সদুপদেশ দিয়া, আবার কলিকাতায় পাঠাইয়া দিলেন।

ছুটির পর বোর্ডিং-এ ফিরিয়া আসিয়া দেখি, যেন সব উলটপালট হইয়া গিয়াছে। আমি যে ঘরটাতে থাকিতাম, সে ঘর মেরামত হইতেছে, আমার জন্য অন্য একটা ঘরে স্থান নির্দিষ্ট হইয়াছে। অন্যান্য কয়েক জন বালকের ঘরও বদলাইয়া গিয়াছিল। রমানাথ আমার আসিবার একদিন পূর্বে বোর্ডিং-এ ফিরিয়া আসিয়াছিল। আমি যেদিন আসি, সেইদিন বিকালে রমানাথ আমাকে চুপিচুপি বলিল, ‘দেখো মোহনলাল, আজ একটা মজা করতে হবে, তাতে তোমার সাহায্য চাই। তুমি বোধ হয় জান, ছোটো কুঞ্জ রাক্ষসের কথা শুনলে বড়ো ভয় পায়। কেউ রাক্ষসের গল্প বললে কুঞ্জ তার কাছেও যায় না আজ রাত্রে কুঞ্জকে নিয়ে একটু মজা করব। আমি দুটো রাক্ষসের মুখোশ কিনে এনেছি। কুঞ্জ ঘুমুলে আমরা রাক্ষস সেজে তাকে গিয়ে ভয় দেখাব। কেমন, তুমি রাজি আছ তো?’

রমানাথের কথায় কোনো উত্তর দিবার পূর্বেই মায়ের চোখের জলের কথা আমার মনে পড়িল। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবিলাম, ইহা তো দুষ্টামি নয়––একটু মজা করা মাত্র! এতে দোষ কী! এই ভাবিয়া রমানাথকে বলিলাম, ‘আচ্ছা, আমি রাক্ষস সাজব, কিন্তু ভাই, খুব সাবধান––মাস্টারমশাই যেন টের না পান।’

‘আরে সে ভাবনা নেই। মাস্টারমশাই আমাদের কোনো কাজটাই বা জানতে পারেন!’ এই বলিতে বলিতে রমানাথ অন্যত্র চলিয়া গেল।

রাত প্রায় বারোটা বাজিলে ক্লাসের কয়েকজন ছেলে আমাদের দুইজনকে, বেশ ভালো করিয়া রাক্ষস সাজাইয়া দিল। পূর্বেই বলিয়াছি, আমাদের বোর্ডিংগৃহ মেরামত হইতেছিল, বাড়িতে অনেক খড়ের দড়ি ছিল। সুতরাং আমাদের এক-একটি ল্যাজেরও অপ্রতুল হইল না। আমরা বিকট মূর্তি ধরিয়া বাতি হাতে পা টিপিতে টিপিতে ছোটো কুঞ্জের ঘরের সম্মুখে গিয়া উপস্থিত হইলাম। রমানাথ চাবি ঘুরাইবামাত্র দরজা খুলিয়া গেল। তখন বাতি নিবাইয়া ভূতের মতো অন্ধকারের সহিত মিশিয়া গিয়া, আমরা ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিলাম। তারপর পশ্চিম দিকের জানালা খুলিয়া দিলাম। ঘরে বেশ চাঁদের আলো আসিয়া পড়িল। কুঞ্জের বিছানা ঘরের এক কোণে ছিল বলিয়া, কেবল সেইখানায় আলো পৌঁছিল না। আমরা কুঞ্জের নাক ডাকার শব্দে বুঝিলাম, সে গাঢ় নিদ্রায় অভিভূত।

পূর্বের বন্দোবস্ত অনুসারে রমানাথ ও আমি একসঙ্গে লাফাইয়া কুঞ্জের উপর গিয়া পড়িলাম। সে হাঁউমাঁউ করিয়া চিৎকার করিতে লাগিল, আমরাও ততই তাহাকে ল্যাজের বাড়ি মারিতে মারিতে,বিকট শব্দ করিয়া বলিলাম, ‘আঁমরা রাঁক্ষস, তোঁকে গিঁলে খাঁব!’

আমাদের কথা শেষ হইতে না হইতেই, কুঞ্জ জানালার ধারে জ্যোৎস্নাতে আসিয়া দাঁড়াইল।––কী সর্বনাশ! সহস্র বজ্র যেন একেবারে আমাদের মাথার উপরে পড়িল! চারিদিক অন্ধকার বোধ হইতে লাগিল! এ তো কুঞ্জ নয়! এ যে দেখি, আমাদের হেডমাস্টার! হেডমাস্টারকে দেখিয়া, আমাদের হাত-পা আড়ষ্ট হইয়া গেল। কিন্তু তবুও আমরা প্রাণভয়ে ছুটিয়া ঘরে আসিয়া লুকাইলাম।

বাকি রাতটা যে কীভাবে কাটিল, তাহা লিখিয়া জানাইতে পারি না। এমন কোনো ভাষা নাই, যাহাতে ঠিক আমাদের মনের ভাব প্রকাশ হয়। সকাল হইলে কী করিব, ভাবিয়া কিছুই ঠিক করিতে পারিলাম না। আমরা গায়ের রং ধুইয়া দুইটিতে মড়ার মতো পড়িয়া রহিলাম। মুখোশ আগেই পুড়াইয়া ফেলিয়াছিলাম।

পরদিন ভোর না হইতেই, বোর্ডিংময় রাষ্ট্র হইল যে, দুইটি ছেলে মুখোশ পরিয়া রাত্রে হেডমাস্টারকে খুন করিতে আসিয়াছিল। সেই ছেলে দুইটি কে কে, জানিবার জন্য মাস্টারমহাশয় বোর্ডিং-এর সব ছেলেকে একত্র হইতে বলিলেন। আমরা যতদূর সম্ভব মনের ভাব গোপন করিয়া সকলের সঙ্গে গিয়া বসিলাম এবং যাহারা আমাদের কীর্তি জানিত, ইঙ্গিতে তাহাদিগকে কোনো কথা প্রকাশ করিতে নিষেধ করিয়া, নিরীহ বালকের ন্যায় মাস্টারমহাশয়ের আগমন প্রতীক্ষা করিতে লাগিলাম।

কিছু পরেই বোর্ডিং-এর সম্পাদক ও হেডমাস্টারমহাশয় সেখানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন এবং কে কে এরূপ অসমসাহসিক কার্য করিয়াছে, জানিতে চাহিলেন। কিন্তু বালকদিগের মধ্যে কেহই তাঁহাদের কথার উত্তর দিল না! তাঁহারা আবার জিজ্ঞাসা করিলেন। সে বারেও কেহ কোনো উত্তর দিল না। তখন তাঁহারা এক-একজন করিয়া একদিক হইতে সকলকে জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন।

প্রথম চার-পাঁচটি ছেলে উত্তর দিল যে, তাহারা কিছুই জানে না। তারপর মাস্টারমহাশয় পঞ্চানন নামে একটি ছেলেকে জিজ্ঞাসা করিলেন। পঞ্চাননের সহিত রমানাথের খুব শত্রুতা ছিল। আমিও পঞ্চাননকে মনে মনে ঘৃণা করিতাম। মাস্টারমহাশয়ের প্রশ্নের উত্তরে পঞ্চানন দাঁড়াইয়া বলিল, ‘আমার বোধ হয় রমানাথ এর মধ্যে ছিল। কাল বিকেলে তাকে দুটো মুখোশ কিনে আনতে দেখেছি।’ পঞ্চাননের কথা শুনিয়া, ভয়ে আমাদের মুখ শুকাইয়া গেল, বুক গুরগুর করিতে লাগিল। বোর্ডিং-এর সম্পাদকমহাশয় তখনই রমানাথের হাত ধরিয়া হিড়হিড় করিয়া টানিতে টানিতে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘তুমি এই কাজ করেছ?’

‘আজ্ঞে না, আমি কিছুই জানি না,’ বলিয়া রমানাথ আত্মদোষ গোপন করিতে চেষ্টা করিল, কিন্তু সে চেষ্টা বৃথা। প্রহারের যন্ত্রণায় দুই-তিন মিনিটের মধ্যেই রমানাথ তাহার দোষ স্বীকার করিল এবং আমার নামও প্রকাশ করিয়া দিল। হেডমাস্টার মহাশয় আমাকেও টানিতে টানিতে, সম্পাদকের কাছে লইয়া গেলেন! খুনিকে ফাঁসি দিবার সময় তাহার মনের ভাব কেমন হয়, এই সময়ে তাহা আমি ভালো করিয়া বুঝিতে পারিয়াছিলাম। আমরা কোনোরকমে দোষ গোপন করিতে না পারিয়া, প্রকৃত ঘটনাটি কী, তাহা তাঁহাদিগকে বুঝাইতে চেষ্টা করিলাম। কিন্তু তাঁহারা কিছুতেই আমাদের কথায় বিশ্বাস করিলেন না মনের সাধ মিটাইয়া প্রহার করিতে লাগিলেন। চাবুকের আঘাতে যখন আমাদের সর্বাঙ্গ ফুলিয়া লাল হইয়া উঠিল, তখন তাঁহারা আমাদের দুইজনকে দুই ঘরে বন্ধ করিয়া রাখিলেন। এইখানেই যে আমাদের শাস্তি শেষ হইল, তাহা নহে দশটার পর স্কুলের ছেলেরা উপস্থিত হইলে, মাস্টারমহাশয় আমাদের দুইজনের মাথায় দুইটা গাধার টুপি পরাইয়া ক্লাসে ক্লাসে ঘুরাইয়া আনিলেন এবং ভবিষ্যতে আর কখনো কোনো প্রকার দুষ্টামি করিলে, বোর্ডিং হইতে তাড়াইয়া দিবেন বলিয়া ভয় দেখাইলেন। এইরূপে সেইদিনের গোলযোগ একরকম থামিয়া গেল।

গোলমাল চুকিয়া গেল বটে, কিন্তু ছোটোলোক পঞ্চাননের শত্রুতার কথা আমরা কিছুতেই ভুলিতে পারিলাম না। দুইজনে গোপনে পরামর্শ করিলাম যে, বোর্ডিং ছাড়িতে হয় তাহাও স্বীকার, পঞ্চাননকে একবার ভালো করিয়া শিক্ষা দিতে হইবে।

আমাদের ইচ্ছা পূর্ণ হইতে বড়ো বেশি দেরি হইল না। পাঁচ-ছয়দিন পরে একদিন সামান্য দোষে আমরা পঞ্চাননকে বেশ করিয়া প্রহার করিলাম। হেডমাস্টারমহাশয় তাহা শুনিয়া, আমাদের দুইজনকে বোর্ডিং হইতে তাড়াইয়া দিলেন।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ

বোর্ডিং হইতে বাহির হইয়া, আমি ও রমানাথ একজন চেনা মুদির দোকানে জিনিসপত্র রাখিয়া, গড়ের মাঠের দিকে চলিলাম। রাগে, দুঃখে ও অপমানে তখন আমাদের মন এত উত্তেজিত ছিল যে, ভবিষ্যতে কী করিব, কোথায় যাইব, সেকথা আমাদের মনেই আসিল না! গড়ের মাঠের নির্মল বায়ু সেবনে শরীর মন কতক শীতল হইলে, একটা গাছতলায় বসিয়া আমাদের ভবিষ্যৎ কার্যকলাপের বিষয় আলোচনা করিতে লাগিলাম। রমানাথ জিজ্ঞাসা করিল, ‘বাড়ি গিয়ে তোমার মাকে এসব কথা বলবে নাকি?’ রমানাথের প্রশ্ন শুনিয়া হঠাৎ মা-র কথা আমার মনে হইল। তাঁহার সেই মলিন মুখ, সেই চোখের জল, সেই স্নেহ-ভরা আদর, সেই সুমধুর উপদেশ––একে একে সকল কথাই আমার মনে পড়িতে লাগিল। আমি বলিলাম, ‘ভাই, কোন মুখে আর মা-র কাছে যাব! এসব কথা শুনলে তিনি বিষ খেয়ে মরবেন!’

রমানাথ বলিল, ‘আচ্ছা, এখন তবে বরিশালে চলো সেখানে আমার কাকা থাকেন।’

আমার কাছে টাকাকড়ি যাহা ছিল, তাহাতে পাঁচ-ছয় মাস বেশ সুখে স্বচ্ছন্দে কাটাইতে পারিতাম। কিন্তু কলিকাতায় থাকিতে আমার ইচ্ছা ছিল না এবং বাড়িতে যাইতেও সাহস হইল না। সুতরাং রমানাথের সহিত বরিশালে যাওয়াই স্থির করিলাম। তারপর রাত্রি আন্দাজ দশটার সময় সেই মুদির দোকানে ফিরিয়া আসিয়া কিঞ্চিৎ জলযোগ করিয়া দুইজনে শয়ন করিলাম। কিছুক্ষণ পরে আমার বেশ তন্দ্রা আসিয়াছে, এমন সময়, রমানাথ আমার গা টিপিয়া আস্তে আস্তে জিজ্ঞাসা করিল, ‘তোমার কাছে কত টাকা আছে? সাবধানে রেখেছ তো?’

‘আমার মানিব্যাগে নোটে ও টাকায় মিলিয়ে প্রায় দেড়শো টাকা আছে,’ এই বলিতে বলিতে পাশ ফিরিয়া শুইয়া আমি ঘুমাইয়া পড়িলাম।

পরদিন সকালে উঠিয়া দেখি, রমানাথ নাই। মুদিকে জিজ্ঞাসা করিলাম। সে বলিল, ‘তিনি একটু আগে বাহিরে গেছেন।’ তখন পকেটে হাত দিয়া দেখি, আমার মানিব্যাগটি নাই! আমি মাথায় হাত দিয়া বসিয়া পড়িলাম। কী সর্বনাশ! রমানাথ শেষে এই করিল! এই জন্যই বুঝি কাল রাত্রে টাকার কথা জিজ্ঞাসা করিয়াছিল? ওঃ কী ভয়ানক!––আমি একেবারে অস্থির হইয়া নানা বিপদের আশঙ্কা করিতে লাগিলাম। ভাবিতে ভাবিতে হঠাৎ সোনার ঘড়ি ও চেনের কথা মনে পড়িল। সেগুলি আমার বাকসের মধ্যে ছিল। তাড়াতাড়ি বাকসো খুলিয়া দেখিলাম, ঘড়ি ও চেন লইতে পারে নাই।

আমি তখনই আবার বাকসো বন্ধ করিয়া, রমানাথের অম্বেষণে বাহির হইলাম। বেলা প্রায় বারোটা পর্যন্ত নানা স্থানে খুঁজিলাম, কোথাও তাহার সন্ধান পাওয়া গেল না। পকেটে কয়েক আনা পয়সা ছিল। একটা হোটেলে কিছু খাইয়া, আবার রমানাথের অম্বেষণে বাহির হইলাম। এইরূপে দুই-তিন দিন ধরিয়া ক্রমাগত নানা স্থানে খুঁজিলাম, তবুও তাহার সন্ধান করিতে পারিলাম না। ক্রমে পকেটের পয়সা কয়টিও ফুরাইয়া আসিল, আমি মহা বিপদে পড়িয়া গেলাম। বাড়ি যাইতে সাহায্য করা দূরে থাক, এক বেলা খাইতে দিবে, এমন আত্মীয়ও আমার কেহ ছিল না। শেষে অনাহারে মরিতে হইবে ভাবিয়া, আমি চারিদিক যেন অন্ধকার দেখিতে লাগিলাম এই সময়ে একদিন সন্ধ্যাকালে হঠাৎ পঞ্চাননের সহিত আমার দেখা হইল। আমাকে দেখিতে পাইয়া সে জিজ্ঞাসা করিল, ‘কী হে মোহনলাল, তুমি এখনও বাড়ি যাওনি! হেডমাস্টারমশাই তোমার মাকে পত্র লিখেছিলেন। শুনলাম তিনি খাওয়াদাওয়া ছেড়ে শুধু পড়ে পড়ে কাঁদছেন।’

কয়েক দিন পূর্বে যে পঞ্চাননের উপর নানা অত্যাচার করিয়াছি, তাহার এরূপ ভদ্র ব্যবহারে, লজ্জা ও অনুতাপে আমার মস্তক নত হইয়া পড়িল। আমি মনে মনে আপনাকে ধিক্কার দিতে লাগিলাম! আমাকে চুপ করিয়া থাকিতে দেখিয়া পঞ্চানন বলিল, ‘মোহনলাল, তোমার মুখ দেখে বেশ বুঝতে পারছি যে, লজ্জায় তুমি কথা বলতে পারছ না! কিন্তু সত্য বলছি, তোমার উপর আমার এক বিন্দুও রাগ নেই। দুষ্টুলোকের কুপরামর্শে চললে, মানুষ অনেক সময় পশুর চেয়েও হীন হয়ে পড়ে। যাহোক, সেদিনকার কথা ভুলে যাও।’ পঞ্চাননের মিষ্ট কথায় আমি আরও লজ্জিত হইলাম এবং চক্ষের জল মুছিতে মুছিতে বলিলাম, ‘ভাই যা হবার হয়ে গেছে, তুমি আমাকে ক্ষমা করো।’––এই বলিয়া বোর্ডিং ছাড়িবার পর হইতে যাহা যাহা ঘটিয়াছিল, একে একে সকল কথা তাহাকে বলিলাম। রমানাথ আমার দেড় শত টাকা ফাঁকি দিয়াছে শুনিয়া, রাগে পঞ্চাননের চক্ষু লাল লইয়া উঠিল। সে বলিল, ‘রমানাথের প্রকৃতি যে অতি নীচ, তা আমি আগেই জানতাম কিন্তু সে যে এত বড়ো পাকা চোর, তা আমার জানা ছিল না। যাহোক, এখন আর দুঃখ করা মিছে। আমি তোমাকে পাঁচটি টাকা দিচ্ছি, তুমি আজই বাড়ি চলে যাও।’ পঞ্চাননের এই অনুগ্রহের জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাইয়া, আমি তাহার নিকট হইতে পাঁচটি টাকা লইলাম এবং সেই রাত্রেই বাড়ি যাইবার জন্য ট্রেনে উঠিলাম। ট্রেনে উঠিয়া তাহার মহত্বের কথা ভাবিতে ভাবিতে আমি ঘুমাইয়া পড়িলাম। ঘুমাইবার পূর্বে ঘড়ি ও চেন সাবধানে বাকসের ভিতরে তুলিয়া রাখিতে ভুলি নাই। তারপর, কতক্ষণ ঘুমাইয়াছিলাম, জানি না।

হঠাৎ বোধ হইল, যেন গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির ফোঁটা আমার মুখে আসিয়া পড়িতেছে। উঠিয়া দরজা-জানালাগুলি বন্ধ করিয়া দিবার ইচ্ছা হইল, কিন্তু উঠি উঠি করিয়া আবার ঘুমাইয়া পড়িলাম। কিছুক্ষণ পরে বৃষ্টির বড়ো বড়ো কয়েকটি ফোঁটা মুখে আসিয়া পড়ায়, আবার আমার ঘুম ভাঙিয়া গেল। আমি তাড়াতাড়ি উঠিয়া বসিলাম।

তখন আমার সহযাত্রীগণের মধ্যে প্রায় সকলেই নামিয়া গিয়াছিল। সমস্ত গাড়িখানিতে আর দুইজন মাত্র যাত্রী ছিল। ক্ষীণ আলোকে তাহাদিগকে ভালো করিয়া দেখিবার সুবিধা হইল না বটে, কিন্তু আমার ভয় হইতে লাগিল, কী জানি, যদি তাহাদের মনে কোনো কু-অভিসন্ধি থাকে! যদি আমার ঘড়ি-চেনের সন্ধান পাইয়াই তাহারা আসিয়া থাকে! তাহা হইলে কী উপায়ে সেইগুলি রক্ষা করিব, আর কী উপায়েই বা প্রাণ বাঁচাইব! আমি এইরূপ নানা কথা ভাবিতেছি, এমন সময় তাহাদের একজন বলিয়া উঠিল, ‘আর দেরি কেন? তুমি ক্লোরোফরমের শিশি বের করো!’

২য় ব্যক্তি। লোকটা অজ্ঞান হলেই কাজ শেষ করতে হবে। সাবধান, ও যেন দড়ি ধরে ঘণ্টা টানতে না পারে।

এইরূপ আলাপ করিতে করিতে তাহারা আমার কাছে আসিয়া বসিল। তখন রাগে ও ঘৃণায় আমার সর্বশরীর জ্বলিয়া উঠিল!

দেখিলাম, দস্যু দুজন আর কেহ নয়––আমার চিরশত্রু নেপাল ও গোপীনাথ! কী, ইহারা আমার সর্বনাশ করিতে আসিয়াছে! এত বড়ো বুকের পাটা! আমার সর্বাঙ্গ রোমাঞ্চিত হইয়া উঠিল। আমি কর্কশস্বরে বলিলাম, ‘তোমাদের এই কাজ! ভদ্রলোকের ছেলের ডাকাতি ব্যাবসা! তোমাদের কি লজ্জা নেই!’

নেপাল। মিছে গোলযোগ কোরো না! যদি বাঁচবার সাধ থাকে, বাকসোটি ছেড়ে দাও। তা না হলে, ঘড়ি-চেন তো যাবেই, এমনকী তোমার প্রাণও যেতে পারে! পিস্তল দেখছ তো? আমাদের কাছে ছোরাও আছে!’

নেপালের কথা শুনিয়া ভয়ের পরিবর্তে আমার মন সাহসে উদ্দীপ্ত হইয়া উঠিল। আমি উত্তেজিতভাবে বলিলাম, ‘প্রাণ থাকতে বাকসো ছাড়ব না আগে আমাকে খুন না করলে এক কপর্দকও পাবার আশা কোরো না।’ এই কথা বলিতে বলিতে, হঠাৎ লাফাইয়া উঠিয়া আমি ঘণ্টা টানিবার চেষ্টা করিলাম, কিন্তু নেপাল লৌহমুষ্টির আঘাতে আমাকে বেঞ্চের উপর ফেলিয়া দিল। ঠিক সেই সময় গোপীনাথ তুলাতে ক্লোরোফরম মাখাইয়া আমার নাকের কাছে ধরিল। সমুদয় গাড়ি দুর্গন্ধে পূর্ণ হইয়া গেল। দস্যুরা পূর্বে দরজা, জানালা বন্ধ করিয়া দিয়াছিল। আমি গোপীনাথের হাত হইতে শিশিটা কাড়িয়া লইয়া, জানালার গ্লাসের উপর ছুঁড়িয়া দিলাম। ঝনঝন করিয়া গ্লাস ভাঙিয়া পড়িল। তখন প্রাণপণ চেষ্টায় আমি জানালার ধারে ছুটিয়া গেলাম এবং ভাঙা কাচের ভিতর দিয়া গলা বাড়াইয়া,––‘খুন করল, খুন করল’––বলিয়া চিৎকার করিতে লাগিলাম! পর মুহূর্তেই দস্যুরা আমাকে টানিয়া ভিতরে আনিয়া ফেলিল এবং খুব জোরে আমার মুখ চাপিয়া ধরিল। আমি পুনরায় চিৎকার করিবার চেষ্টা করিলাম, কিন্তু কণ্ঠের স্বর ফুটিল না। ক্রমে গলা শুকাইয়া আসিল, তারপর মনে হইল, যেন তাহারা আমাকে বাঁধিতেছ। তারপর আর কী হইল, আমার মনে নাই।

কতক্ষণ এইভাবে কাটিল, বলিতে পারি না। শেষে অল্প চেতনা হইলে দেখিলাম, গাড়ি খুব জোরে ছুটিতেছে! আমি বসিতে চেষ্টা করিলাম, কিন্তু কিছুতেই উঠিতে পারিলাম না। চিৎকার করিতে চেষ্টা করিলাম, আওয়াজ ফুটিল না। আস্তে আস্তে হাত সরাইয়া টিনের বাকসোটি খুঁজিলাম সেটিও পাওয়া গেল না। মুখ ফিরাইয়া দেখিলাম, ডাকাতেরাও পলায়ন করিয়াছে। আমার সমুদয় শরীর তখন রক্তারক্তি হইতেছিল, সর্বাঙ্গ জ্বলিয়া যাইতেছিল। এইসময় আমি হঠাৎ কী যেন একটা আওয়াজ শুনিতে পাইলাম। অল্প পরেই গাড়ির গতি একটু একটু করিয়া কমিতে লাগিল। তারপর––‘বগুলা, বগুলা’––এই শব্দ শুনিতে পাইলাম! স্টেশনে গাড়ি থামিবামাত্র একজন টিকিট কালেকটার আসিয়া আমার গাড়ির দরজা খুলিয়া দিল। অমনি আমি উঠিয়া বসিলাম এবং বিশেষ বিস্ময় ও আনন্দের সহিত দেখিলাম, আমার শরীর সম্পূর্ণ অক্ষত বাকসো যেখানে ছিল, ঠিক সেইখানেই আছে। বলাবাহুল্য ঘড়ি ও চেন চুরি যায় নাই এবং গাড়ির দরজা জানালা কিছুই ভাঙে নাই!––কী ভীষণ স্বপ্ন! এমন স্বপ্নও মানুষে দেখে! নেপালের প্রতি আমার আন্তরিক ঘৃণা ছিল সেই ঘৃণা হইতেই যে এই স্বপ্নের উৎপত্তি, ইহাতে আর কোনো সন্দেহ নাই। আমি জিনিসপত্র লইয়া স্টেশনে নামিয়া পড়িলাম এবং সেই অদ্ভুত স্বপ্নের বিষয় ভাবিতে ভাবিতে একখানি গাড়ি করিয়া বাড়ি রওনা হইলাম।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ

দশ বৎসর পরের কথা বলিতেছি। এই দশ বৎসরে আমাদের গ্রামে, কয়েকটি বিষয়ে কিছু কিছু পরিবর্তন হইয়াছিল, তাহার মধ্যে এখানে কেবলমাত্র দুইটি ঘটনা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। প্রথম আমার মামার হঠাৎ মৃত্যু হওয়াতে, সুযোগ পাইয়া এক দুর্দান্ত জ্ঞাতি ফাঁকি দিয়া আমাদের সমুদয় বিষয়সম্পত্তি আত্মসাৎ করেন মা ও আমি পথের ভিখারি হইয়া পড়ি। দ্বিতীয়––আমার চিরশত্রু নেপালচন্দ্র রায় কৃষ্ণনগর কলেজ হইতে বি.এ., বি.এল. পাস করিয়া ওকালতি ব্যবসা আরম্ভ করেন।

নেপাল ওকালতি আরম্ভ করিয়া, সর্বপ্রথমেই গ্রামস্থ বালকগণের জন্য নিজ বাড়িতে একটি পুস্তকালয় স্থাপন করিল। সপ্তাহে সপ্তাহে সেখানে নানা সদ্বিষয়ের আলোচনা হইতে লাগিল! আমার পূর্বসঙ্গীগণের অনেকেই নেপালের বশীভূত হইয়া, তাহার দলে গিয়া যোগ দিল। কেবল কতকগুলো ওঁচা ছেলে আমার দলেই রহিল। আমি ‘বনগাঁয়ে শেয়াল রাজা’র ন্যায় তাহাদের উপর আধিপত্য করিতে লাগিলাম! আমার ন্যায় তাহাদের কাহারো ঘরে অন্নের সংস্থান ছিল না। কিন্তু আমার দেখাদেখি সকলেই তেল কুচকুচে চুলে আলবার্ট কাটিতে এবং কোঁচানো চাদর বুকে বাঁধিয়া চুরুট টানিতে টানিতে নদীর ধারে বেড়াইতে শিখিয়াছিল।

আমরা কয়েকজনে মিলিয়া পূর্ব হইতেই একটি কনসার্টের দল গঠন করিয়াছিলাম। আমাদের বেহালা ও বাঁশির ক্যাঁ-কোঁ রবে এবং ঢোলকের দুমদাম শব্দে পাড়ার লোক ব্যতিব্যস্ত হইয়া উঠিয়াছিল।

নেপাল যখন পুস্তকালয় স্থাপন করিয়া, পাড়ার ছেলেদের লইয়া, নানা সদ্বিষয়ের আলোচনায় প্রবৃত্ত হইল এবং একে একে আমার দলের ছেলেদের টানিতে লাগিল, তখন আমিও তাহার কার্যে বাধা দিতে সাধ্যমতো চেষ্টা করিতে লাগিলাম। ইহাতে দুই দলের মধ্যে শীঘ্রই আবার পূর্বের ন্যায় শত্রুতা বাধিয়া উঠিল।

এইরূপে কিছুদিন যায়, একদিন বৈকালে উচ্চতানে আমাদের কনসার্ট চলিতেছে, এমন সময় আমাদের বাড়ির নিকটে জেলে পাড়ায় একটা হইহই শব্দ উঠিল। আমি দলের একজনকে কারণ অনুসন্ধান পাঠাইয়া দিলাম। সে ফিরিয়া আসিয়া বলিল, ‘জেলেপাড়ায় আগুন লেগেছে। শ্রীমন্ত আর দুলের ঘরদোর, জিনিসপত্র দাউদাউ করে জ্বলছে!’

‘নিবাবার কোনো চেষ্টা হচ্ছে না?’

‘হ্যাঁ, বহু লোক জড়ো হয়েছে। নেপালের দলও সেখানে গেছে। তারা সকলে প্রাণপণে কলসি কলসি জল তুলে আগুনে ঢালছে।’

নেপালের দল সেখানে গিয়াছে শুনিয়াই, আমার পরোপকার-প্রবৃত্তি নিবিয়া গেল। আমি বলিলাম, ‘সেই সাধুরাই তবে নাম জাহির করুক––আমাদের যাওয়ার কোনো দরকার নেই। এসো, আমরা বাজাই।’ পুনরায় আমাদের কনসার্ট চলিতে লাগিল।

খানিক পরে গোলমাল থামিয়া গেল। নেপালের দল আগুন নিবাইয়া, ভিজা কাপড়ে আসিয়া আমাদের আড্ডার মধ্যে প্রবেশ করিল। নেপাল সকলের আগে ছিল নিতান্ত বিরক্তির স্বরে বলিল, ‘তোমরা মানুষ, না কী? পাড়ায় আগুন লেগে ছারখার হয়ে গেল, আর তোমরা স্বচ্ছন্দে কনসার্ট বাজাচ্ছ? একেবারে অধঃপাতে গেলে। ছি!’

নেপালকে সকলেই মান্য করিয়া চলিত, সুতরাং কেহ তাহার জবাব দিতে সাহস করিল না কিন্তু আমি আর চুপ করিয়া থাকিতে পারিলাম না। বলিলাম, ‘মুখ সামলে কথা কও! ফের যা তা বলবে তো টের পাবে! আমি কাউকে কেয়ার করি না!’

গোপীনাথ বলিল, ‘কী হে মোহনলাল, এত চটো কেন? আমাদের কি বোর্ডিং-এর মাস্টার পেয়েছ যে, ভয় দেখাচ্ছ?’

আমার আঁতে ঘা দিয়া গোপীনাথ কথা বলাতে, রাগে আত্মহারা হইলাম এবং ‘দেখ গুপে, আমার সঙ্গে চালাকি করিসনে’––বলিয়া তাহাকে আক্রমণ করিতে গেলাম। গোপীনাথও ঘুসি বাগাইয়া ছুটিয়া আসিল। আমি হাতের কাছে আর কিছু না পাইয়া, একটা লোহার হাতুড়ি উঠাইয়া তাহার দিকে খুব জোরে ছুঁড়িয়া দিলাম। সে নিমেষের মধ্যে একটু সরিয়া দাঁড়াইল, আর মনে করিতে এখনও গা কাঁপে, সেই হাতুড়ি ঠিক নেপালের কপালে গিয়া লাগিল। নেপাল চিৎকার করিয়া অজ্ঞান হইয়া পড়িল। রক্তে তাহার নাক-মুখ, কাপড়-চোপড় একেবারে ভাসিয়া যাইতে লাগিল। মা উচ্চৈঃস্বরে রোদন করিতে করিতে, বাড়ির ভিতর হইতে ছুটিয়া আসিয়া, ক্ষতস্থানে কাপড় ভিজাইয়া জল দিতে লাগিলেন। দেখিতে দেখিতে অনেক লোক জড়ো হইল এবং নানাপ্রকার আশঙ্কা করিতে লাগিল। কেহ বলিল, ‘নেপাল বাঁচবে না।’ কেহ বলিল, ‘মোহনলালের ফাঁসি হবে।’ আমি দেখিয়া শুনিয়া একেবারে স্তম্ভিত! কী সর্বনাশ––ফাঁসি হইবে!

আমার পা ঠকঠক করিয়া কাঁপিতে লাগিল, বুকের ভিতর গুরগুর করিতে লাগিল, মুখ শুকাইয়া উঠিতে লাগিল! গোপীনাথ বজ্রমুষ্টিতে আমার হাত ধরিয়াছিল, আমি আর দাঁড়াইয়া থাকিতে পারিলাম না, দেওয়ালে ঠেস দিয়া বসিয়া পড়িলাম।

নেপালের সঙ্গীদের ইচ্ছা, আমাকে পুলিশে দেয়, কেবল নেপালের অনুমতির জন্য তাহারা অপেক্ষা করিতে লাগিল। সন্ধ্যার কিছু পূর্বে নেপাল চেতনালাভ করিলে, তাহার দলস্থ কয়েকটি বালক পুলিশে যাইবার উপক্রম করিল। মা আবার চিৎকার করিয়া কাঁদিয়া উঠিলেন। কিন্তু নেপাল কিছুতেই আমাকে পুলিশে দিতে সম্মত হইল না। সে বলিল, ‘রাগের বশে মোহনলাল একটা অন্যায় কাজ করে বসেছে! তা বলে কি পুলিশে দিতে হবে! কখনোই না! তোমরা ওকে ছেড়ে দাও।’

বাল্যাবধি অন্যায় কার্য করিতে করিতে আমার স্বভাব এতদূর বিকৃত হইয়া পড়িয়াছিল যে, নেপালের এই মহৎ ক্ষমাগুণকেও আমি শ্রদ্ধা ও ভক্তির চক্ষে দেখিতে পারিলাম না। ভাবিলাম, আমাকে পুলিশে না দিবার মধ্যে নিশ্চয়ই নেপালের কোনো মতলব আছে। তাহা না হইলে, সে এত বাগে পাইয়াও আমাকে ছাড়িয়া দিবে কেন!

ইহার কিছুদিন পরে আর এক বিপদ উপস্থিত হইল! তখন আষাঢ় মাস। আমাদের বাড়ি হইতে দুই ক্রোশ দূরে, একটি পল্লিতে রথের বড়োই ধুম। তাহাতে দেশ-বিদেশের বহুলোক সমাগম হইয়া থাকে। রথের পূর্বদিন সন্ধ্যার সময় তিনটি পথিক আমাদের বাড়িতে অতিথি হইলেন। পরদিন সকালে আমি বাহিরে আসিলে, তাঁহারা বলিলেন, ‘মশাই, আপনি আমাদের চেনেন না, কিন্তু আপনার মামার সঙ্গে আমাদের যথেষ্ট আত্মীয়তা ছিল। তিনি বেঁচে থাকতে আমরা কতবার এ বাড়িতে এসেছি, দায়ে-অদায়ে কতবার তাঁহার সাহায্য পেয়ে কৃতার্থ হয়েছি। সেই ভরসায় একটা অনুরোধ করতে সাহস কচ্ছি!––আমরা মেলায় যাব সঙ্গে কিছু টাকাকড়ি আছে, তা আপনার কাছে রেখে যেতে চাই। অজানা জায়গায়––বিশেষ মেলার মধ্যে––এত টাকা নিয়ে যেতে আমাদের সাহস হয় না।’ আমি জিজ্ঞাসা করিলুমা, ‘কত টাকা?’

পথিকগণ। আজ্ঞে, জমিদারি খাজনা দিবার জন্যে বহু কষ্টে আমরা ১২০০ টাকা জোগাড় করেছি, সেই সব টাকাই রেখে যেতে চাই।

এতগুলি টাকা গচ্ছিত রাখিতে আমার ভয় হইল। বলিলাম, ‘আমাকে মাপ করবেন এত টাকা আমি রাখতে পারব না।’

পথিকগণ। দেখুন, অন্য কোনো উপায় থাকলে, আপনাকে কষ্ট দিতাম না। আপনার অনুগ্রহে কাল আশ্রয় পেয়েছি, আজ কিছুক্ষণের জন্যে টাকাগুলি রেখে আমাদিগকে নিশ্চিন্ত করুন।

এই বলিয়া তাঁহারা টাকাগুলি গুনিয়া দিয়া একখানা রসিদ লইলেন। রসিদে এইরূপ লেখা থাকিল যে, পথিকেরা তিনজনে একসঙ্গে আসিয়া সমুদয় টাকা লইবেন। তিনজনে একত্র না আসিলে, আমি গচ্ছিত টাকা যেন হস্তান্তর না করি।

রসিদখানা কাপড়ের খুঁটে বাঁধিয়া পথিকেরা মেলাদর্শনে বাহির হইলেন। আমিও বাড়ির ভিতর গেলাম। তারপর সবেমাত্র লোহার সিন্দুক খুলিবার উদ্যোগ করিতেছি, এমন সময় বয়োজ্যেষ্ঠ পথিকটি ফিরিয়া আসিয়া আমাকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘মশাই, তাড়াতাড়িতে একটু ভুল হয়ে গেছে। নম্বরি নোটের নম্বরগুলি আমরা টুকে রাখতে চাই। আপনি অনুগ্রহ করে টাকাগুলি নিয়ে একবার বাইরে আসুন।’

পথিকের কথায় বিশ্বাস করিয়া, থলিটা তাঁহার হাতে দিয়া বলিলাম, ‘নম্বর টুকতে থাকুন, আমি আসছি।’

চতুর পথিক সে সুযোগ খুঁজিতেছিল, আপনা হইতেই তাহা উপস্থিত হইল। আমি বাহিরে আসিবার পূর্বেই সে টাকার থলি লইয়া চম্পট দিল। বাহিরে আসিয়া কাহাকেও না দেখিয়া, আমি ভয়ে ম্রিয়মাণ হইয়া পড়িলাম এবং আসন্ন বিপদের কথা ভাবিয়া শিরে করাঘাত করিতে লাগিলাম। সারাদিন আমার যে কীভাবে কাটিল, তাহা বলিতে পারি না। সন্ধ্যার সময় অপর দুইজন পথিক উপস্থিত হইয়া তাঁহাদের গচ্ছিত টাকা প্রার্থনা করিলেন।

আমার মাথা ঠিক ছিল না। বিরক্তির সহিত বলিলাম, ‘টাকা তো তখনই আপনাদের তৃতীয় সঙ্গী নিয়ে গেছেন! আবার কীসের টাকা?’

পথিকগণ। সে কী কথা! তাকে টাকা দিলেন কোন হিসাবে? রসিদে কী লেখা আছে, তা কি আপনার মনে নেই? এখন ওসব বাজে কথা রেখে, আমাদের টাকাগুলি ফিরিয়া দিন।

‘কেন মিছে জ্বালাতন করেন?’

‘আচ্ছা, সহজে না দেন আমরা আদায় করে তবে ছাড়ব’,––এই বলিতে বলিতে পথিক দুইজন কোথায় চলিয়া গেলেন।

এই ঘটনার তিন-চারিদিন পরে, আদালতের একজন পেয়াদা আসিয়া আমাকে শমন দিয়া গেল।

তারপর যথাসময়ে মোকদ্দমা আরম্ভ হইল। আমার নামে অতি গুরুতর অভিযোগ। যথাবিহিত মোকদ্দমার বন্দোবস্ত করিতে আমি চেষ্টা করিলাম, কিন্তু আর্থিক অভাববশত কোনো অভিজ্ঞ উকিলের সাহায্য পাইলাম না। কেবল একজন বৃদ্ধ মোক্তার দয়াপরবশ হইয়া আমার পক্ষ অবলম্বন করিলেন এবং সাধ্যমতো যত্নে মোকদ্দমা চালাইতে লাগিলেন। ফরিয়াদি দুইজনের পক্ষে দুইজন অভিজ্ঞ উকিল নিযুক্ত হইলেন।

প্রথম চারিদিন ধরিয়া ফরিয়াদি পক্ষের উকিলগণ নানা যুক্তিতর্কের সাহায্যে মোকদ্দমাটি বেশ সুন্দর করিয়া দাঁড় করাইলেন। তাঁহাদের পঞ্চম দিনের সুদীর্ঘ বক্তৃতা শুনিয়া মোকদ্দমার ফলাফল বুঝিতে আর কাহারও বাকি থাকিল না। সকলেই বুঝিলেন, আমাকে কঠিন শাস্তি পাইতে হইবে!

মোকদ্দমার ষষ্ঠ দিন উপস্থিত হইল। মোক্তার মহাশয় উঠিয়া দাঁড়াইলেন এবং সাধ্যমতো যত্নে গুছাইয়া দুই-চারিটি কথা বলিতে চেষ্টা করিলেন, কিন্তু ফরিয়াদি পক্ষের উকিলের তাড়ায় তাঁহার অর্ধেক কথা মুখেই রহিয়া গেল! যেটুকু বলিলেন, তাহাতে মোকদ্দমার গতি ফিরিবার কোনো লক্ষণই দেখা গেল না।

মোক্তারের বক্তৃতা প্রায় শেষ হইয়াছে, এমন সময় এক আকস্মিক ঘটনা ঘটিল। আদালতের চাপরাশি একখানি কার্ড আনিয়া বিচারকের হাতে দিয়া, তাহার উত্তর প্রতীক্ষা করিতে লাগিল। বিচারক কার্ডখানি পড়িয়া কী লিখিয়া দিলেন, চাপরাশি বাহিরে চলিয়া গেল। একটু পরে উকিলের সাজ-পরা আমার চিরশত্রু নেপাল আসিয়া, সম্মুখের আসনে উপবেশন করিল।

আদালতের মধ্যে নেপালকে দেখিয়া আমার আপাদমস্তক জ্বলিয়া উঠিল। একী! নেপালের এখানে আসিবার কী প্রয়োজন! এখানেও সে শত্রুতা করিতে আসিল! ছিঃ, নেপাল এত নীচ! আমি এইরূপ নানা কথা ভাবিতেছি, এমন সময় নেপাল উঠিয়া দাঁড়াইয়া বিচারককে লক্ষ করিয়া বলিল, ‘হুজুর আপনার অনুমতি পাইলে আমি আসামির পক্ষ অবলম্বন করিয়া, এখানে কিছু বলিতে চাই।’

বিচারক সম্মতি প্রদান করিলেন। আমি স্থিরনেত্রে অবাক হইয়া নেপালের দিকে চাহিয়া রহিলাম। নেপাল বলিতে লাগিল, ‘আমি যতদূর বুঝিয়াছি, এই মোকদ্দমায় আসামির পক্ষে বলিবার বিশেষ কিছু নাই। আসামির কাছে টাকা যে গচ্ছিত ছিল তাহার রসিদ রহিয়াছে। এখন সেই টাকা দিলেই সব গোলযোগ মিটিয়া যায়। কিন্তু টাকা দেওয়া যায় কাহাকে? রসিদে লেখা রহিয়াছে––তিন জনে একত্র টাকা লইতে না আসিলে, মোহনলালবাবু গচ্ছিত টাকা যেন হস্তান্তর না করেন––অথচ এখানে কেবলমাত্র দুইজনে টাকার দাবি করিতেছেন। যতক্ষণ পর্যন্ত না তৃতীয় ব্যক্তিটি উপস্থিত হন, ততক্ষণ টাকার দাবি করিবার ইহাদের কোনোই অধিকার নাই!’

এইটুকু বলিয়াই নেপাল বসিয়া পড়িল। বিচারক মৃদু হাসিতে হাসিতে কাগজপত্র উলটাইতে লাগিলেন। সকল চেষ্টা ব্যর্থ হইল ভাবিয়া ফরিয়াদি পক্ষের উকিল দণ্ডায়মান হইয়া, নেপালের কথাগুলি যে অর্থহীন, তাহা প্রতিপন্ন করিতে চেষ্টা করিলেন, কিন্তু বিচারক তাঁহার কথায় কান দিলেন না। মোকদ্দমা ডিসমিস হইয়া গেল।

সহস্র ভার নিমেষমধ্যে যেন আমার বক্ষ হইতে নামিয়া গেল! আমি জাগ্রত কী নিদ্রিত, ঠিক করিতে পারিলাম না! বিকারগ্রস্ত রোগীর ন্যায় ছুটিয়া গিয়া, নেপালের পায়ে জড়াইয়া পড়িলাম! আমার বাক্য রোধ হইয়া আসিল সহস্র চেষ্টাতেও তাহাকে আমার হৃদয়ের কৃতজ্ঞতা ব্যক্ত করিয়া জানাইতে পারিলাম না। এতদিনের এত চেষ্টায় যাহা হয় নাই, আজ এই ঘটনায় তাহা সম্পন্ন হইল। দেবত্বের কাছে পশুত্ব পরাজিত হইল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *