ষষ্ঠ অধ্যায়। নিষিদ্ধ ফল

ষষ্ঠ অধ্যায়। নিষিদ্ধ ফল

২৮

এবার গঙ্গাজিকে ছেড়ে আমরা তাঁর পোষ্যদের দিকে ফিরব। এতক্ষণ যে গল্প বলছিলাম, তাতে দুই রাজপুত্র—ধৃতরাষ্ট্র আর পাণ্ডু ছিল না। এ কথা শুনলে অবশ্য তাদের অনুগামীরা রাগ করবে। কারণ বহু ঐতিহাসিক লিখে গেছেন, গঙ্গাজির সংগ্রামে সর্বদাই তারা পাশে ছিল। গণপতি, তুমি এটা জেনে রেখো যে, সব থেকে কঠিন দিনগুলিতে গঙ্গাজি একা সংগ্রাম করেছেন, চালিত হয়েছেন তাঁর বিবেক এবং মূল্যবোধ সম্বল করে।

তাঁর উত্তরসূরীরা একেবারে চুপ করে বসেছিলেন, তা নয়। স্বাধীনতা তো আর কয়েকটা ঘটনামাত্র নয়, হাজার হাজার মানুষ দিবারাত্রি পরিশ্রম করেছিলেন বলেই তো স্বাধীনতা এসেছিল! আমরা ইতিহাসের দিকে ফিরে দেখি নাটক দেখার চোখ নিয়ে। এক দৃশ্য থেকে আরেক দৃশ্যে কী সহজেই চলে যাই। কিন্তু জীবন অত সহজ নয়। জীবন যদি নাটক হত তাহলে স্টেজের বাইরে বসে থাকা মানুষের কোলাহলে প্রধান চরিত্রগুলির কথাবার্তা ঢাকা পড়ে যেত।

গণপতি, আমরা যখন এই গল্পটা বলতে গিয়ে সেই ঘটনাপ্রবাহের একটা অংশে আলোকপাত করি, একজন নেতার বা একটি গ্রামের সাহসের পরিচয় পেয়ে উদ্বেলিত হই, তখন জীবন কিন্তু অন্যত্র অন্য খাতে বয়ে চলেছে। বিবিগড়ে যখন গুলি চলছিল, তখনও অন্যত্র শিশুরা জন্মাচ্ছিল, স্বাধীনতা সংগ্রামীরা জেলে যাচ্ছিলেন, স্বামীরা স্ত্রীদের সঙ্গে ঝগড়া করছিলেন, কোর্ট এ আবেদন জমা পড়ছিল, পুলিশ-এর গায়ে ঢিল পড়ছিল আর মেধাবী ভারতীয় ছাত্ররা লন্ডনে পরীক্ষায় বসে নিজের দেশের লোকেদের ওপরে ছড়ি ঘোরাবে বলে বিদেশি রাজার গোলামির জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল। আমাদের গল্পের চরিত্রদের জীবনগুলোও খুব অন্যরকম ছিল না। আমি তো মাত্র কয়েকটি চরিত্রকেই বেছে নিয়েছি, তার মানে এই নয় যে অন্যদের কোনও অবদান নেই। গঙ্গা যখন মোতিহারির পথে পথে হাঁটছেন, বা যখন বজবজে অনশন করছেন, তাঁর সাথীরাও যে যার মতো কাজ করে চলেছিলেন। কিন্তু সব কি আর লিখে রাখা যায়? মাত্র কয়েকটি ঘটনাকেই তো আমরা নথিভুক্ত করতে পেরেছি আমাদের গল্পের স্বার্থে। অন্যদের কথা নিশ্চয়ই অন্য বালুকাবেলায় লেখা হয়েছিল।

ইতিমধ্যে পাণ্ডু আর ধৃতরাষ্ট্র নিরলস কাজ করে চলেছিল হস্তিনাপুরে, দিল্লি আর বম্বেতে। দুজনে মিলে তারা কৌরব পার্টিকে ধীরে ধীরে গড়ে তুলছিলেন—এই পার্টি-ই একদিন দেশে স্বাধীনতা আনল।

প্রথমে দুই রাজপুত্র একসঙ্গে কাজ করে। তারা যতদিন না গঙ্গার আহ্বানে রাজনীতিতে এসেছিল, ততদিন কৌরব পার্টি ছিল শুধু আলোচনা আর ইংরেজি জানা মানুষের ইংরেজ বিরোধী তর্কের জায়গা। কালো চামড়ার সাহেবরা থ্রি পিস স্যুট পরে, পকেট ঘড়ির চেন ঝুলিয়ে ইংরেজি ভাষায়, খাঁটি অক্সফোর্ড কেম্ব্রিজের উচ্চারণে যুক্তি খাড়া করে বলতেন, কেন ইংরেজদের আর ভারতীয়দের সমান অধিকার থাকা উচিত।

ইংল্যান্ড অবশ্য এসবে মোটেই পাত্তা দিত না। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত নেতাদের কৌরব পার্টির কথা শুনতে ইংরেজদের বয়েই গেছে! পার্টিটা তৈরি করেছিলেন একজন স্কটিশ উদারমনা মানুষ। তিনি পার্টিটা গড়েছিলেন ইংল্যান্ডের রানির পতাকা উড্ডীন রাখবার আশায়। পার্টিটা নাকি সংবিধান মেনে তৈরি করা। গঙ্গাজি যখন রাজনীতিতে পদার্পণ করলেন, তখন কৌরব পার্টির বয়স তিরিশ বছর পেরিয়েছে। ব্রিটিশরা তখন ভারতকে স্বশাসন দেওয়ার কথা মাথায় একেবারেই আনেননি। হস্তিনাপুরীরা কৌরব পার্টিতে প্রবেশ করায়, পুরো পরিস্থিতি পালটে গেল।

ধৃতরাষ্ট্র ইংল্যান্ডে গিয়ে ইংরেজদের মতো করে ইংরেজি উচ্চারণ করতে শিখেছিল। কিন্তু তার মাথায় কিছু কিছু ভুল ধারণার বীজও সেই দেশেই বপন হয়। যেমন, ন্যায় আর সাম্য। সে এটা বুঝত না, ইংরেজরা এই দুটো কথা তাদের নিজেদের জন্য উদ্ভাবন করেছে, এসব ভারতীয়দের জন্য নয়। ফেবিয়ান বৈপ্লবিক মতবাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল সে। ফেবিয়ানরা ইংল্যান্ডের অধিকর্তাদের বাধ্য করেছিল খেটে খাওয়া মানুষকে রান্নার গ্যাস আর পরিশ্রুত জল নিখরচায় সরবরাহ করতে। সেই দর্শন ধৃতরাষ্ট্র নিয়ে এল ভারতবর্ষে যেখানে রান্নার গ্যাস বা পরিশ্রুত কলের জলের কথা মানুষ কোনওদিন শোনেনি। সে লন্ডনে ওয়েস্ট মিনিস্টারের উনিস্টা হিউগান পিয়ারের বক্তৃতা শুনেছিল, শ্রমিকদের সাহায্য করার।

ভারতে ফিরে সে ভেবে নিল যে সরকারের উচিত সাধারণ মানুষের দায়িত্ব নিজেদের হাতে তুলে নেওয়া। স্বাভাবিকভাবেই এই ভাবনা ওই বিদেশিদের মাথায় আসেনি। শত চেষ্টা সত্বেও ওদের এসব কথা বোঝানো গেল না। ধৃতরাষ্ট্র বুঝল, ভারতীয়দের জন্য কাজ করবে একমাত্র সেই সরকার, যা ভারতীয়দের দিয়েই তৈরি। সে কৌরব পার্টির আমূল পরিবর্তন করল। নিয়ে এল এমন সব নতুন ভাবনা যা এক আলোড়ন সৃষ্টি করে দিল কৌরব পার্টিতে।

ইতিমধ্যে গঙ্গাজির অভিনব সংগ্রাম পার্টিতে বেশ চাঞ্চল্য ফেলে দিয়েছিল। এর আগে পার্টির বড়রা সংগ্রাম মানেই বোমাবাজি, অথবা চেঁচামেচি-মারামারি বলে মনে করতেন। তাই তাঁরা সংগ্রাম থেকে বিরত থাকতেন। গঙ্গাজি প্রমাণ করে দিয়েছিলেন, গুন্ডামি না করেও স্বাধীনতার জন্যে সংগ্রাম করা যায়। অহিংসা, স্বেচ্ছায় গ্রেপ্তার হওয়া এবং অনশন—এই তিনটে পথ বড় অংশের মানুষদের মনে খুব ধরেছিল। সংবিধান মেনে রাজনীতি যারা করত তারা বিশ্বাস করত, আইন অমান্য করে শান্তভাবে শাস্তি মেনে নেওয়াই হল সংগ্রামের আসল কথা, দাঙ্গা নয়। এই বিশ্বাস নিয়ে তারা ধৃতরাষ্ট্রকে স্বাগত জানাল। আধার তৈরি-ই ছিল। ধৃতরাষ্ট্রের হস্তিনাপুরের সঙ্গে যোগসূত্র এবং গঙ্গাজির আলোয় উদ্ভাসিত অস্তিত্ব তাকে সকলের কাছে অত্যন্ত প্রিয় করে তুলল। ধৃতরাষ্ট্র সমাজতন্ত্রের মনোভাবে কোনও কোনও ক্ষেত্রে গঙ্গাজির দেখানো পথকে অতিক্রম করলেও, গঙ্গাজির প্রতি তার যথেষ্ট সমর্থন ছিল। সবাই জানত, ধৃতরাষ্ট্র গঙ্গাজির এক নম্বর লোক।

শুরুতে মনে হয়েছিল পাণ্ডুও বুঝি গঙ্গার ততটাই স্নেহের। তার ধর্মীয় গ্রন্থপাঠ এবং ব্রহ্মচর্য তাকে গঙ্গার প্রতিচ্ছবি করে তুলেছিল। তিনি ধৃতরাষ্ট্রকে অপত্যস্নেহ করতেন। ভরসা করতেন পাণ্ডুর ওপর। পাণ্ডু গ্রামে গ্রামে গিয়ে পার্টির ঝান্ডা গেড়ে দিয়ে এসেছিল। ধৃতরাষ্ট্র শহরের হল আর মিটিং রুমগুলিতে ঘুরে বেড়াত। ধৃতরাষ্ট্রের অন্ধত্ব তাকে এর বেশি জায়গা দিতে পারেনি।

পাণ্ডু কিন্তু ধুতি হাঁটুর ওপরে তুলে সত্যাগ্রহীদের মিছিল নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরতেন। এইসব ধরনার ওপর চড়াও হত পুলিশ। পাণ্ডু মুহুর্মুহু লাঠির বাড়ি খেয়েছেন, মাথায়, গায়ে। ধৃতরাষ্ট্রকে খুব বেশি হলে শুনতে হয়েছে ইংরেজদের থেকে কিছু কটু কথা, বড় বড় বক্তৃতা দেওয়ার ক্লান্তি আর রাত জেগে পার্টির বক্তব্যের বয়ান তৈরি করতে হয়েছে।

গঙ্গাজি ওদের দুজনের শ্রম ভাগ করে দিয়েছিলেন। কিছুদিনের মধ্যেই তাই ধৃতরাষ্ট্র হয়ে উঠল দেশের উজ্জ্বলতম নেতা আর পাণ্ডুর সঙ্গে রইল সংগ্রামী কিছু ভলান্টিয়ার। যারা তাঁর সঙ্গে গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে বেড়িয়েছিলেন। অনেক বছর পর যখন দুর্যোধনী তার বাবার এবং তার কথা দেশের মানুষের কাছে গর্ব করে বলল, আমার পাণ্ডুর জন্য একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। বেচারা পাণ্ডু ততদিনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, বেশিরভাগ লোক তাকে ভুলেও গেছে। পাণ্ডুর ঘাম-ঝরা, রক্ত জল করা পরিশ্রমের কি কোনও মূল্য এই দেশ দিয়েছিল?

ধৃতরাষ্ট্র যে-কোনও আত্মত্যাগ করেনি, তা নয়। সেও পাণ্ডুর মতো জেলে যেত। বহু বছর সেখানে কাটাত। বিবেকের রক্ষক এই ধৃতরাষ্ট্র হয়তো কিছু বেশিই সময় জেলে কাটিয়েছে, পাণ্ডুর তুলনায়। কিন্তু জেলে থাকার সময়টাকেও সে কাজে লাগিয়েছে বই আর বিধি লিখে। পৃথিবী জেনেছে ধৃতরাষ্ট্রের জ্ঞানের পরিধি। জেল অন্যদের বন্দি করে, কিন্তু ধৃতরাষ্ট্র জেলের মেধ্যে থেকে নিজেকে ভারতের সব থেকে নামী সংগ্রামী হিসেবে প্রমাণ দিয়েছে। গঙ্গাজির পরে সে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ নেতা। প্রতিবার জেলে গিয়ে সে এক-একটি বই লিখেছে। ব্যাপারটা এমন পর্যায়ে চলে গেল যে একজন সাহেব ব্যঙ্গচিত্রকর আঁকলেন ধৃতরাষ্ট্র আর এক জজসাহেবকে। ক্যাপশন—’আমি কেন আইন অমান্য করলাম? ধর্মাবতার আমার প্রকাশকরা অধৈর্য হয়ে উঠেছিল।’

গণপতি, ধৃতরাষ্ট্র আর পাণ্ডুর মধ্যে দূরত্ব বাড়ছিল। এটাই ভবিতব্য ছিল। আমি তাদের দুজনকেই খুব কাছ থেকে দেখতাম, আবার কখনও খুব দূর থেকে। কৌরব পার্টি-কর্মীর চোখ দিয়ে। পাণ্ডু অধৈর্য হয়ে পড়ল ধৃতরাষ্ট্রের বক্তৃতা, বিবেক দর্শন আর উচ্চাকাঙ্ক্ষা দেখে। পাণ্ডুর মাটির কাছাকাছি রাজনীতি আর তার পাঁচ পুত্রকে নিয়ে গর্বের ব্যাপারটা ধৃতরাষ্ট্র একটুও বুঝত না। গঙ্গাজি এসব বুঝতে পারলেও মুখে কিছু বলেননি। তিনি দেশের কঠিন সমস্যা সমাধানে নিজেকে ব্যস্ত রাখলেন। এই দুই রাজপুত্রের মধ্যেকার বিরোধ মেটাতে এতটুকু চেষ্টা করলেন না।

২৯

তাদের দুজনের লড়াই এবার ঢাকা রইল না। পাণ্ডু ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে কঠিন পদক্ষেপ নেওয়ার পক্ষে সওয়াল করলেন। পার্টি কিন্তু গঙ্গাজির এবং ধৃতরাষ্ট্রের দেখানো রাস্তাতেই হাঁটতে চাইল। ইংল্যান্ডের রাজপুত্র যখন সাম্রাজ্যের সব থেকে উজ্জ্বল নক্ষত্রটিকে দেখতে এলেন, পাণ্ডু বয়কটের ডাক দিল। ধৃতরাষ্ট্র কিন্তু মত দিল যে রাজপুত্রকে একটা আবেদন করা হবে। লন্ডন থেকে যখন সাতজন সাহেবের একটা কমিশন আসে, ভারতে স্বশাসনের তোড়জোড় কেমন চলছে তা সরেজমিনে দেখতে, তখন পাণ্ডু বলল, ডকে একটা অহিংস আন্দোলন করা হবে যাতে সাহেবরা জাহাজ থেকে নামতে না পারে। কিন্তু ধৃতরাষ্ট্র ঠিক করল, রাজপুত্রকে বয়কট করা হবে। গঙ্গাজির ফোকলা দাঁতের হাসি অবশ্যই তার পিছনে ছিল। পাণ্ডু ধীরে ধীরে বুঝতে পারল, ধৃতরাষ্ট্রের জয়ের পথ গঙ্গাজি প্রস্তুত করে দিচ্ছেন। সে এও বুঝল, কৌরব পার্টিতে অধিকাংশ লোক তার সৎভাইকে সমর্থন করত তার নিজের চিন্তাধারার জন্য নয়, গঙ্গাজির প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ের জন্য।

একবার একটা ওয়ার্কিং কমিটির মিটিং-এ পাণ্ডু তার উষ্মা সর্বসমক্ষে প্রকাশ করেছিল। আমি অবশ্য বড় নেতা ছিলাম না কৌরব পার্টির। আমাকে বরিষ্ঠ নেতা আখ্যা দিলেও আমার বয়স খুব বেশি ছিল না। পাণ্ডু সেদিন ক্রিশ্চানদের ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, ফাদার, সান আর হোলি গোস্ট বলে আমার ধৃতরাষ্ট্রের আর গঙ্গাজির প্রতি কটাক্ষ ছুঁড়ে দিয়েছিল। ধৃতরাষ্ট্র চুপ করে থাকার পাত্র নয়। সে সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, ‘তার চেয়ে ভাই হিন্দুদের সংস্কার অনুযায়ী বলো না ব্রহ্মা, বিষ্ণু আর মহেশ্বরের কথা—জন্মদাতা, পালনকর্তা আর সংহারকর্তা। শেষেরটা অবশ্যই তুমি!’

ঘুষোঘুষি না করেও তারা একে অপরকে ঘায়েল করতে ছাড়ল না। ওদের লড়াই খুব শিগগির বাইরে বেরিয়ে এল। ব্রিটিশরা একটা মিটিং ডাকল। নাম দিল রাউন্ড টেবিল কনফারেন্স। উদ্দেশ্য ছিল ভারতবর্ষের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করা। ভাবো, একটা ফালতু পুতুলের নামে এত বড় মিটিং! তারও কারণ ছিল। অনেক ভেবেচিন্তেই তারা নামটা ঠিক করেছিল। এক, এতে ইংরেজ জাতের আদিপুরুষ, রাজা আর্থার-এর কথা তারা মনে করিয়ে দেবে। দ্বিতীয় কারণ হল, গোল টেবিলের চার ধারে বসলে ইংরেজ আর ভারতীয়দের মধ্যে ছোট-বড়র ব্যবধান কমবে। অন্য টেবিল হলে নেতাদের বসবার জায়গা নিয়ে অনেক বিতর্ক হত।

গণপতি, তুমি নিশ্চয়ই ভাবছ ব্যাপারটা খুবই অভিনব এবং গণতান্ত্রিক। কিন্তু এটা বোঝো যে যত রাজা-গজা, ভাঁড়েদের সঙ্গে স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতাদের পাশাপাশি বসানোর চেয়ে খারাপ আর কী হতে পারে? কৌরব পার্টিকে কেমন অবলীলায় ওরা অন্যান্য ভারতীয় স্বাধীনতার মোড়লদের সঙ্গে এক আসনে বসিয়ে দিল!

কৌরব পার্টি তখন ছিল গোটা দেশের একমাত্র রাজনৈতিক সংস্থা যা সব প্রান্তের মানুষকে অহিংস পন্থায় উজ্জীবিত করে অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধীনতা সংগ্রামকে এক অভিনব পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছিল। তার সঙ্গে অন্যদের তুলনাই হয় না। কিন্তু ব্রিটিশরা সবাইকে এক করে দিল। গঙ্গাজি বসলেন রাউন্ড টেবিলে। বসল কত অছ্যুৎ, কত বর্ণচোরা, কত শুশ্ন, কত ল্যাটাদের নেতা, কত নীল চোখো, কত সম্ভ্রান্ত বংশীয় আর কত ভারতীয় তালেবর, যারা তখনও বিশ্বাস করত সূর্য চাঁদের চারিদিকে ঘোরে। কৌরব পার্টি কিন্তু এদেরও প্রতিনিধিত্ব করত। কিন্তু ব্রিটিশরা এসব বুঝত না। তারা ইচ্ছে করেই ভারতীয়দের মধ্যে গরমিল সৃষ্টি করে তাদের লড়িয়ে রাখত যাতে গোটা দুনিয়াকে দেখানো যায় যে ভারতীয়রা স্বশাসনের জন্য এখনও প্রস্তুত নয়।

কনফারেন্স-এর অনেক আগেই এসব অবশ্য জানা গেছিল। গণপতি, যা বলছি তার নথি আছে। পণ্ডু বারে বারে কৌরব ওয়ার্কিং কমিটির কাছে আবেদন করেছিল এই রাউন্ড টেবিল কনফারেন্স-এ যেন অংশগ্রহণ না করা হয়। ‘কেন এই নাটকের খুঁটি হব আমরা?’ সে অনুনয় করেছিল। কিন্তু ওয়ার্কিং কমিটির মিটিং-এ ধৃতরাষ্ট্র কী অপূর্ব বক্তৃতা দিয়ে সবার মন ঘুরিয়ে দিল। ঠিক হল গঙ্গাজি যাবেন, কৌরব পার্টির প্রতিনিধি হিসেবে। পাণ্ডু এটাকে পাগলামো মনে করল। ‘আমাদের একটা বড় দল নিয়ে যাওয়া উচিত, যাতে সবধরনের মানুষ থাকবে। তাহলে ব্রিটিশরা বুঝবে আমরা গোটা দেশের প্রতিনিধিত্ব করছি।’ সে বলেছিল। পাণ্ডুর কথা কেউ কানে নিল না।

পাণ্ডু এদেশে থেকে গেল তার খারাপ লাগা নিয়ে আর তার গুরু ঠান্ডা একটা কাঠের চেয়ারে বসে অপেক্ষা করতে লাগলেন তাঁর বক্তব্য রাখার জন্য। রাজতন্ত্রী এবং উদারচেতারা বক্তব্য রাখার পর তাঁকে বলবার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। পাণ্ডু যদিও তাঁর সৎভাই-এর থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছিল। তখনও সে পার্টির প্রতি নিষ্ঠাবান ছিল। গঙ্গা ফিরে এসেছিলেন খবরের কাগজে খালি গায়ে প্রচুর ছবি তুলে আর ইংল্যান্ডের রাজার সঙ্গে চা খেয়ে। তিনি নাকি এও বলেছিলেন, মহারাজ, আপনি আমাদের দুজনের জন্য যথেষ্ট পোশাক পরে আছেন।

কিন্তু সেই গোল মিটিং-এ ভারতবর্ষের জন্য কোনও ইতিবাচক সূত্র আদায় করতে পারলেন না মহাগুরু। পাণ্ডু, ‘আমি জানতাম,’ বলতে গিয়েও বলল না। বরং মন দিয়ে পার্টি কাউন্সিলের কাজ করতে লাগল সে। আমার পাংশু, মাথা গরম ছেলে সেবারে সুযোগের অপেক্ষায় ছিল।

তোমার কি মনে হচ্ছে গণপতি যে আমার অন্ধ আর পাংশু দুই ছেলের মধ্যে আমি পক্ষপাত করছি? ভারতবর্ষ সন্তানের মধ্যে পক্ষপাত করে না। আমিও করি না। তারা দুজনেই আমার নিজের—তাদের ভালো-মন্দ, আত্মম্ভরিতা, গর্ব সব আমার স্বভাবেরই বিচ্ছুরণ। আমি অস্বীকার করব কী করে?

পাণ্ডু কি ভুল করেনি? এই গল্প বলতে গিয়ে সেগুলোও বলব তোমায়।

৩০

ম্যানিকিয়ান ঐতিহাসিকরা ব্রিটিশ শয়তানদের সম্বন্ধে এমন লিখেছেন যেন তারাই ভারতবর্ষের সর্বজ্ঞ বিধাতাপুরুষ। তাঁদের দয়ায় দেশের সার্বিক বিকাশ ঘটেছিল। প্রতিটি অসাধারণ মেধাবী ইংরেজের সঙ্গে এদেশে এসেছিল পাঁচটি নিরেট মাথার ইংরেজ আর পনেরোটি মানুষদেহী পিশাচ ইংরেজ। তারা যদি একটা ঠিক কাজ করত, সেটা ঢেকে যেত গন্ডা গন্ডা ভুল ভ্রািন্ততে। তারা ভেবেছিল বন্দুকের জোরেই তারা রাজত্ব চালাতে পারবে। ভুলে যেও না, এই ব্রিটিশদের দৌরাত্ম্য থামাতে আমেরিকানদের সংগ্রামী হতে হয়েছিল।

ব্রিটিশ প্রশাসকদের নাক এত উঁচু আর লম্বা ছিল যে নিজের পায়ে হোঁচট খেত তারা। বেশি দূর অবধি ওরা দেখতে পেত না। চিনের বক্সার যুদ্ধই হোক, আফ্রিকার বোয়ার যুদ্ধ বা আমেরিকার বস্টন টি পার্টি—সবই ব্রিটিশ প্রশাসনের যুগান্তকারী ভুলেরই প্রমাণ দেয়।

এদেশেও সবকিছু সেই ট্যাক্স থেকেই শুরু হয়। যেমন অন্য দেশেও হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাস ইংরেজদের তেমন শিক্ষা দিতে পারেনি। কেন যে লালমুখোরা ভারতীয়দের ওপরে কর বসিয়ে চাপা দিল, তা কেউ জানে না। ওরা তো সব কিছুই চুরি করে ইংল্যান্ডে পাচার করে দিয়েছিল এর মধ্যে। তা সে তাজমহলের মণিমুক্তখচিত কারুকার্যই হোক বা রানির মুকুটের জন্য কোহিনুর হিরেই হোক। কেউ ভাবতেও পারেনি, এর পরেও ওই লালমুখোরা গরিব ভারতীয়দের পেটে লাথি মারার কথা ভাববে। যেহেতু তারা লেখাপড়া করে, চারবার দরখাস্ত দিয়ে প্রতিটি পদক্ষেপ নিত, লোকে ভেবে নিত যে তারা ভুল করতে পারে না।

রবার্ট ক্লাইভের কথাই ধরো না! ইংল্যান্ডে একটা গোটা বরো বা অঞ্চল কিনে ফেলেছিলেন ভারতবর্ষ থেকে জড়ো করা অর্থে। নিজের সততার বড়াই করে ক্লাইভ তারপর বলত, সে বেহিসেবি হয়নি। তার মহান দেশ আবার এর জন্য তাকে, ‘ক্লাইভ অফ ইন্ডিয়া,’ আখ্যা দেয়। ভাবটা এমন যেন সে এদেশেরই ছেলে। এদিকে দেশটাকেই হজম করে ফেলেছে। ক্লাইভের বিংশ শতাব্দীর উত্তরসূরীরা, যারা লুঠ শব্দটি তাদের ইংরেজি অভিধানে ঢুকিয়েছিল, সাংবিধানিক রাস্তায় এই শোষণ চালিয়ে গিয়েছিল। সম্পত্তি, রোজগার, ফসল, পেট্রল, ধৈর্য এমনকী মৃত্যু—সব কিছুর ওপর কর বসল। ইংরেজরা গোটা দুনিয়ায় যুদ্ধ বাধিয়ে রাখল। তার টাকা জোগাড় করার জন্য আমাদের চাল, কাপড় এমনকী নুনের ওপরেও কর বসিয়ে দিল। আমরা ভেবেছিলাম যে এর থেকে বেশি ক্ষতি আমাদের আর কী হতে পারে? যখন ওরা আমের ওপরেও কর বসাল, আমরা হতভম্ব হয়ে গেলাম।

অমৃত ফল আম তো ফলের রাজা! যদিও আমাদের দেশের রপ্তানির নীতিগুলি এই ফলটাকে এখন রাজাদের বা আরব দেশের শেখদের হাতে তুলে দিয়েছে। ঈশ্বর আমাদের দেশের সাধারণ মানুষকে অন্তত যথেচ্ছ আম খাবার সুযোগটা দিয়েছিলেন। আমাদের দেশের গরিব চাষিকে বন্যা, খরা, প্রখর তাপ, ধুলো, অনাহার ইত্যাদি দেওয়ার পরে বোধহয় তাঁর মনে দয়ার উদ্রেক হল। তখন তিনি আম সৃষ্টি করে ওদের হাতে তুলে দিলেন। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আমগুলি আমাদের গ্রামেই হত। আগাছার মতো আম ভরতি গাছ মাটির কাছে হয়ে থাকত। খালি পাড়ো আর খাও। আমরা জানতাম যে ইচ্ছামতো আম খাওয়া যায়!

তারপর আমাদের চক্ষু চড়কগাছ করে সরকার ঘোষণা করল, আম হল বাণিজ্যিক ফল। তাই এর ওপর কর বসানো হবে। প্রতিটি গাছের আনুমানিক ফলনের আন্দাজে তার কর ঠিক করা হত। যার যত আমগাছ ছিল সেগুলো স্থানীয় জমিদারের জমির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হল যাতে কর বসাতে সুবিধে হয়। যে গাছগুলি কারো নিজস্ব জমিতে নেই, সেগুলির জন্য গ্রামবাসীদের সমবেত ভাবে কর দিতে হবে। জেলার অফিসারদের গাছ গণনার কাজে লাগানো হল। গরিব মানুষেরা আর জমিদারেরা দু-পক্ষই হয় গাছগুলি কেটে দিল আর নয়তো বেড়া দিতে আরম্ভ করল।

প্রথমে মানুষ নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারেনি। তার পরে তারা রাগে ফেটে পড়ল। গঙ্গাজির কানে এসব একটু একটু যাচ্ছিল। তারপর একদিন তিনি আশ্রমে যখন বাদাম আর ফল খেতে বসলেন, তখন কৌরব পার্টির এক কর্মী, মহাদেব মেনন গঙ্গাজির কাছে কথাটা পাড়ল।

‘মহাগুরু।’ সে উঁচুগলায় ইংরেজিতে বলল, ‘কী ভীষণ কাণ্ড শুরু হয়েছে আপনি জানেন?’ ওই ভাষাতেই সে গঙ্গাজির সঙ্গে কথা বলত।

মহাদেব মেনন ছিল ছোটখাটো চেহারার একটা মানুষ। ধবধবে সাদা জামাকাপড় পরা, একটা সাদা উড়নি বাঁ-কাধে আলগোছে ফেলা। পালঘাটের মহাদেব গঙ্গাজির অহিংসার পথের অনুগামী। সে বোঝাতে থাকল, কেমন করে আমের ওপর বসানো কর মানুষের মনোবল একেবারে ভেঙে দিচ্ছে। ‘মহাগুরু আপনাকে কিছু করতেই হবে।’

এক মিনিট চুপ করে ভাবলেন গঙ্গাজি। তারপর বললেন, ‘হ্যাঁ মহাদেব। মনে হচ্ছে সময় হয়েছে।’

৩১

পাণ্ডু খুশি হলেন না। গঙ্গাজি এইসব ছোটখাটো ব্যাপারে মাথা ঘামাচ্ছেন কেন? দেশে কি কাজের অভাব হয়েছে? ‘কৌরব পার্টির সামনে এখন অনেক কাজ। ইংরেজরা তাদের অত্যাচার বাড়িয়েছে। আর আপনি কিনা এখন আমের পেছনে আপনার মূল্যবান সময় এবং উপস্থিতি নষ্ট করবেন? সবাই হাসবে যে!’ পাণ্ডু গঙ্গাজিকে অনুরোধ করতে থাকে।

মহাগুরুকে কিন্তু টলানো গেল না। ‘বিশ্বাস রাখো,’ শান্ত হয়ে গঙ্গাজি বোঝাবার চেষ্টা করলেন। তিনি তখন আশ্রমের কলঘর পরিষ্কার করছেন সাবান, ব্রাশ আর অ্যাসিড দিয়ে। তাঁর কাছে কোনও কাজই ছোট নয়। তিনি আমের জন্য সত্যাগ্রহ-ও সমান মনোযোগ দিয়েই করবেন বলে মনস্থির করেছেন।

প্রথমেই ভাইসরয়কে একটা অভিনব চিঠি লিখলেন যা থেকে তাঁর ঔদ্ধত্য, অভিনবত্ব, বাস্তব এবং কৌশল সবই প্রকট হয়!

প্রিয় বন্ধু,

আপনি জানেন আমি ভারতে ইংরেজ শাসনকে একটা অভিশাপ মনে করি। আর আপনি যেহেতু সেই শাসনের শীর্ষে বসে আছেন তাই আমার কাছে আপনিই এই অত্যাচারের প্রতীক। তবু আপনাকে বন্ধুর মতো লিখছি। কারণ আপনার দপ্তরের যথেষ্ট ক্ষমতা রয়েছে মানুষের মঙ্গল করার।

এর আগেও আপনাদের তৈরি করা বহু আইনের অমতে আমি আন্দোলন করেছি। নিজে অমান্য করেছি, অন্যদের অমান্য করতে উৎসাহ দিয়েছি, এবং তার জন্য যা শাস্তি তা মাথা পেতে নিয়েছি। আমি মনে করি, অহিংস অসহযোগ আন্দোলন হল আমাদের সামনে একমাত্র পথ। আমরা আত্মরক্ষার খাতিরে লড়াই করছি, কিন্তু যত অপছন্দই করি না কেন, কখনওই চাইব না যে একজন ইংরেজের একটুও ক্ষতি হোক।

আমি আপনার সাহায্য চাই। একটা ঘোর অন্যায় করেছে আপনার সরকার। আমি চাই আপনি তার প্রতিকার করুন। আমি ম্যাঙ্গো ট্যাক্স-এর কথা বলছি। এই একটি ফলই তো এখানকার গরিব মানুষ প্রাণভরে খেত। তার ওপরেও আপনারা কর বসালেন? মানুষ ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ হয়েছে। আমি হাঁটু গেড়ে, হাতজোড় করে আপনাকে অনুরোধ করছি এই কর তুলে নিতে।

আমার প্রার্থনা মেনে নিলে আপনারা লাভবান হবেন। স্থানীয় প্রশাসন-এর হিসেব অনুযায়ী, এই ম্যাঙ্গো ট্যাক্স থেকে আপনারা মাত্র ৫ মিলিয়ন পাউন্ড রোজগার করবেন। কিন্তু যে সরকার এদেশে বসানো বিভিন্ন ট্যাক্স থেকে, ৮০০ মিলিয়ন পাউন্ড আয় করে, তার কাছে এ অতি সামান্য ব্যাপার! তার ওপর, এই ট্যাক্স তুলে নিলে মানুষের মধ্যে আপনাদের জনপ্রিয়তা বাড়বে। ট্যাক্স লাগু থাকলে মানুষের ক্ষোভ চরম পর্যায়ে চলে যাবে। এমনিতেই তারা বলতে শুরু করেছে, এবারে সূর্যের আলোর ওপরেও আপনারা ট্যাক্স বসাবেন।

তাহলে বুঝতেই পাচ্ছেন যে এই ট্যাক্স তুলে নেওয়াতে দু-পক্ষের মঙ্গল। এটা ভুলবেন না, আপনার মাইনে যে-কোনও করভোগী সাধারণ ভারতীয়ের তুলনায় পাঁচ হাজার গুণ বেশি আর সে টাকা তো তাদেরই ঘাম ঝরানো টাকা! আপনার নিজের বিবেকের কাছে পরিষ্কার থাকতে আপনি এই ট্যাক্স তুলে নিন।

এর অন্যথায় আমি বাধ্য হব এই করের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন করতে। আমি চাই ইংরেজদের ভারতবর্ষের দুঃখকষ্টের সঙ্গে অবহিত করতে। অহিংসার পথে আমি তাদের দেখিয়ে দেব আপনারা ভারতবর্ষের প্রতি কত বড় অন্যায় করেছেন। আমি আপনাদের ক্ষতি চাই না। আমি আপনাদের মঙ্গল কামনা করি, ঠিক যেভাবে আমার দেশের মানুষের মঙ্গল কামনা করি।

তিন সপ্তাহ পরে গঙ্গা এর উত্তর পেলেন :

স্যার,

ভাইসরয়ের প্রাইভেট সেক্রেটারির অনুমতিক্রমে আপনাকে লিখছি যে আপনার চিঠি আমরা পেয়েছি।

মহানুভব ভাইসরয় আপনার চিঠির ভাষা অনুমোদন করেননি। চিঠির শেষদিকে আপনি রাজকীয় সরকারের আইনের অমান্য করবার হুমকি দিয়েছেন যাতে তিনি ঘোর আপত্তি জানিয়েছেন। তিনি আপনার আচরণকে দুঃখজনক আখ্যা দিয়েছেন।

আপনাকে জানানো হচ্ছে, আইনের কোনওরকম বিরোধ সহ্য করা হবে না। আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চিঠিটা সই করেছিল ভাইসরয়ের প্রাইভেট সেক্রেটারির অধস্তন দ্বিতীয় ডেপুটি আন্ডার সেক্রেটারি।

‘খুব ভালো।’ গঙ্গা বললেন। তাঁর ঠোঁটদুটোয় তাঁর মহিলা অনুগামীদের সেই প্রিয় ভঙ্গি, ‘সারা বহিন, আমার এবং এই চিঠিদুটির পুরো বয়ানটা ভারতীয় এবং বিদেশি সংবাদপত্র এবং এজেন্সিগুলোতে পাঠিয়ে দাও। আর অল্পবয়সি ছেলেটি সেদিন এসেছিল নিউইয়র্ক টাইমস থেকে, তাকেও অবশ্যই পাঠিও।’

কিছুদিন পরে যখন গঙ্গাজি তাঁর আশ্রমের বাইরে একটা মঞ্চে বসে তাঁর বিখ্যাত আম সত্যাগ্রহের বক্তৃতা দিলেন, তখন সারা তাঁর পিছনে বসে সেটা টুকে নিয়েছিলেন। ‘আমার ভাই বোনেরা,’ তিনি তাঁর পায়ের কাছে জড়ো হওয়া ভিড়কে উদ্দেশ্য করে বলছিলেন, ‘আমি তোমাদের এখানে প্রার্থনার জন্যে ডেকেছি, যেমন প্রতি সপ্তাহেই ডেকে থাকি। সত্যের আর ন্যায়ের জন্যে আমরা ভগবানের কাছে প্রার্থনা করব কিন্তু আজকের প্রার্থনার একটা আলাদা গুরুত্ব আছে।

এরপর অনেক দিন আমি তোমাদের কাছে কিছু বলবার সুযোগ পাব না। তোমরা জানো যে অন্যায়ভাবে আমের ওপরে কর বসানো হয়েছে। তার বিরুদ্ধে আমি সত্যাগ্রহ করছি। আমি এখান থেকে আমার পদযাত্রা আরম্ভ করব কাল সকালে। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার আমাকে পথে আটকাবে। ফলে তোমাদের মধ্যে আবার খুব সহজে ফিরে আসতে পারব না। হস্তিনাপুরের পুণ্যভূমিতে দাঁড়িয়ে, তোমাদের কাছে হয়তো এই আমার শেষ বক্তৃতা।

বলতেই হচ্ছে, তিনি একেবারেই ভূমিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন না। বরং অনেক ওপরে ছিলেন, মঞ্চে। কিন্তু তাঁর বক্তৃতা শুনে সকলের চোখ ছলছল আর গলা বুজে আসছিল, তাতে কোনও ভুল নেই। গঙ্গাজি জানতেন কী করে নাটকীয়ভাবে প্রতিটা মুহূর্তকে ব্যবহার করতে হয়। হায় পাণ্ডু! তুমি কিনা ভেবেছিলে এটা একটা সামান্য ব্যাপার? গঙ্গাজি তুচ্ছকেও অমূল্যে পরিবর্তিত করতে পারতেন ম্যাজিকের মতো।

‘আমি এবং আমার সঙ্গীরা আমের করের আইন ভাঙবে। আমরা গ্রেফতার হব, কিন্তু তা সত্বেও আরও সত্যাগ্রহী এসে দাঁড়াবে আমাদের অসমাপ্ত কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য।

‘কিন্তু সামান্য হিংসার প্রয়োগও যেন না হয়। এমনকী আমরা সবাই যদি গ্রেফতার হয়ে যাই, যদি আমরা মার খাই তাহলেও তোমরা শান্তি বজায় রাখবে। আমরা অহিংসাকে পাথেয় করেছি। একটা আঙুলও যেন রেগে গিয়ে কারো দিকে আমরা না তুলি। এটাই আমার প্রার্থনা। দেশের সর্বত্র একথা পৌঁছে দাও।

‘সারা দেশের সব মানুষ আম সত্যাগ্রহে অংশগ্রহণ করুক। ইংরেজ সরকারের আইন অনুযায়ী, যে গাছ তারা মার্ক করে কর বসায়নি তা থেকে আম পাড়া অপরাধ। সেই সব আম খাওয়া বা বিক্রি করাও নাকি অন্যায়। তোমরা এর যে-কোনও একটি বা সবক’টি উপায়ে ব্রিটিশ সরকারের এই কালো আইন অমান্য করো।’

সবাই উল্লাসে ফেটে পড়ল কিন্তু গঙ্গার তখনও অভিভূত জনসমুদ্রকে কাঁদানো বাকি ছিল।

‘উঠে দাঁড়াও! দেশের জন্য লড়াই করতে প্রস্তুত হও! আমার জন্য নয়। আমি তো দেশের এবং তোমাদের অনুগত ভৃত্য। আমাকে গ্রেপ্তার ওরা করবেই। তাই জানি না আবার কবে দেখা হবে, কিন্তু ভেব না, তোমাদের পথ দেখাবার জন্য কেউ রইল না। আমার অনুপস্থিতিতে ধৃতরাষ্ট্র হবে তোমাদের গুরু। সে অন্ধ হলেও তার দূরদৃষ্টি তুলনাহীন। সেই হবে তোমাদের নেতা।’

গঙ্গা মানুষের চোখের জলে ধৃতরাষ্ট্রের অভিষেক করলেন। পাণ্ডু সেখানে এসে উপস্থিত হয়েছিল। সে যদিও গঙ্গার এই আম নিয়ে আন্দোলনের ভাবনায় সায় দিতে পারেনি, তাও গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সেদিন আশ্রমে এসে পৌঁছেছিল। গঙ্গার এই ভাষণের পর আর কোনওদিন সে তার গুরুর পাশে ফিরে আসেনি।

৩২

পরের দিন সকালে পদযাত্রা আরম্ভ হল। আমরা সব খোলা আকাশের নীচে আশ্রম চত্বরে শুয়েছিলাম আগেরদিন রাত্রে। বিদেশি সংবাদমাধ্যমের সংবাদদাতারা ঝাড়ুদার আর দোকানদারদের পাশে রাত কাটাল। পরদিন সকালে গঙ্গাজি বেশ অবাক হলেন, তখনও হাতকড়া পড়েনি দেখে।

‘সরকার বোধহয় চিন্তায় পড়েছে।’ তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন। আগের দিন তিনি ওদের বলেছিলেন, পদযাত্রা শুরু হওয়ার আগেই অ্যারেস্ট হয়ে যাবেন।

আমরা বেরিয়ে পড়লাম পদযাত্রায়। সব মিলিয়ে আটাত্তর জন। গঙ্গা যা করতেন বেশ নাটকীয়ভাবেই করতেন। যাতে একটা আলোড়ন পড়ে যায় চারিদিকে। রিপোর্টাররা যাতে ভালো খবর তৈরি করে লিখতে পারে। তাই কাছেপিঠে গিয়ে কোনও গাছ থেকে আম তিনি পাড়লেন না। বরং ২৮৮ মাইল হেঁটে পৌঁছোলেন কৌরব পার্টির ভক্ত এক জমিদারের বাগানে। সেই জমিদার সরকার চাপ দেওয়া সত্বেও নিজের গাছগুলি করের আওতায় আনতে দেননি। শেষে দেখা গেল যে তাঁর পদযাত্রার মাহাত্ম্য করের বিরুদ্ধে আইন অমান্যর চেয়েও অনেক বেশি। ব্রিটিশরা তাঁকে গ্রেপ্তার করলে ষোলো কলা পুর্ণ হয়!

তোমার যুগের ছেলেমেয়েরা এটাকে বলবে অল্প ঝুঁকির কৌশল। আমাদের নেতা ছিলেন অত্যন্ত বাস্তববাদী এক রাজনীতিবিদ। যিনি প্রতিটি পদক্ষেপ হিসেব করে নিতেন। তুমি যদি সে সময়ের আম্র সত্যাগ্রহের সাদাকালো ফিল্মগুলো দ্যাখো, তাহলে দেখবে কেমন তাড়াতাড়ি প্রায় দৌড়ে সবাই হাঁটছে। পেছনের ভাষ্যপাঠের মধ্যেও রয়েছে ছেলেমানুষি দ্রুততা। গঙ্গাজিকে দেখবে একেবারে মিছিলের সামনে। টাক মাথা, অর্ধানাঙ্গা, ফোকলা মুখ, হাতে একটা লম্বা ডান্ডা ধরে আছেন। কী দৃঢ়তার সঙ্গে হেঁটে চলেছেন।

তখনকার দিনের ফিল্ম-এ সত্যিকারের স্পিডটা ধরা যেত না, রিলগুলো খুব জোরে ঘুরত তাই মনে হত সবাই দৌড়োচ্ছে। কিন্তু গঙ্গাজির স্বাধীনচেতা মনোভাব সেখানেও ধরা পড়ত। তাঁর পাশে ছিলেন সারা-বহিন। কঠিন আর দৃঢ় তাঁর ভঙ্গি। মহাদেব মেননকে কেরালার জমিদার মনে হচ্ছিল। আর পিছনে খদ্দর আর সস্তা চামড়ার চটি পরে। চলেছি আমরা কোনও ভয় বা ক্লান্তির কোনও রেশ নেই।

আমরা আনন্দ করে মিছিল করে এগিয়ে গেছি। গঙ্গাজি হেসে সবাইকে আপন করে নিয়েছেন, গ্রামের পর গ্রাম তাঁকে স্বাগত জানিয়েছে, মহিলারা রঙিন শাড়ি পরে সেজেগুজে আমাদের দেখতে বেরিয়ে এসেছে, বাচ্চারা লজ্জায় মুখ লুকিয়ে, আমাদের হাতে ফুল গুঁজে দিয়েছে আর প্রতি মোড়ে স্বেচ্ছাসেবকদের দল যোগ দিয়েছে আমাদের মিছিলে, যেটা কালে-কালে বন্যার আকার ধারণ করেছে।

চব্বিশ দিন ধরে বারো মাইল করে হাঁটা হয়েছে। কিন্তু গঙ্গাজি বা আমাদের কারুর মধ্যে কোনও ক্লান্তি দেখা দেয়নি। পুলিশের কোনও দেখা নেই, যদিও গঙ্গাজি প্রতি মোড়ে রিপোর্টারদের আশ্বস্ত করে গেছেন। এটাও বোধহয় তাঁর একটা কৌশলই ছিল। কারণ পুলিশও এল না আর রিপোর্টাররাও থেকে যাওয়ার একটা কারণ পেল। কিন্তু গঙ্গাজি জানতেন, হেঁটে তিনি কোনও আইন ভাঙছেন না, তাই পুলিশও আসছে না। তিনি তখনও এমন কিছু করেননি, যাকে বেআইনি বলা যায়।

আমরা অবশেষে আমবাগানে পৌঁছোলাম। তখনও পুলিশের দেখা নেই। রিপোর্টাররা ক্যামেরা আর নোটবুক নিয়ে তৈরি হল। জমিদার আমাদের অভ্যর্থনা করতে বেরিয়ে এলেন। বাড়ির মহিলারা কাঁসার ঘড়ায় জল আনলেন আমাদের পা ধোয়াবেন বলে। গঙ্গাজি সব থেকে বড় গাছটার দিকে এগিয়ে গেলেন। একমুহূর্ত মনে হয়েছিল, তাঁর চারিপাশের প্রচণ্ড ভিড়ে তিনি হারিয়ে যাবেন। তাঁর এই প্রচণ্ড নাটকীয় আইনভঙ্গ বুঝি দেখতে পাব না।

কিন্তু সত্যের স্বার্থে খাড়া করা কৌশল আবার কাজে এল। জমিদার একটু উঁচু মাচা বানিয়েছিলেন গঙ্গাজির জন্যে। কাঠের সিঁড়ি বেয়ে চশমা পরা ছোট্ট মানুষটি তাঁর লাঠি নিয়ে উঠে গেলেন সেই মাচায়। তারপর হাত বাড়িয়ে কাছের একটা ডাল থেকে একটা পাকা ল্যাংড়া আম পেড়ে নিলেন। নীচের জনতা আনন্দে উন্মত্ত হল। গঙ্গাজি আমটা উঁচু করে তুলে ধরলেন।

সে মুহূর্তটি যেন কবিতা হয়ে গিয়েছিল গণপতি। সেই ফল যেন ভারতবর্ষের উর্বল ফসলের প্রতীক, তার প্রাচীন ইতিহাসের প্রতীক, সেই ফলের বীজের মধ্যে যেন অঙ্কুরিত হয়েছিল আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ। ক্যামেরায় সে ছবি উঠে গেল! গঙ্গাজি একা দাঁড়িয়ে রইলেন, সূর্যের আলো তাঁর চশমায় ঝিলিক দিয়ে গেল, তাঁর হাত যেন স্বাধীনতার উদ্দেশ্যে প্রসারিত।

তারপর ঝামেলা বেধে গেল। সমবেত জনতা আনন্দে আত্মহারা হয়ে গঙ্গাজির চতুর্দিকে নৃত্য করতে লাগল। সেই আম আমাদের স্বাধীনতার প্রথম ফল! নিলাম হয়ে গেল ষোলোশো টাকায়। বাকি ফলগুলো ছিড়ে নিয়ে চুষে চিবিয়ে খেয়ে সত্যাগ্রহীরা একেবারে রণক্ষেত্র করে তুলল। তাদের সাদা খদ্দরের পোশাক হলুদ হয়ে উঠল। যে ফলগুলি সহজে পাড়া গেল না, সেগুলোকেও পাথর মেরে নামানো হল। অনেকের তাতে হাত পা, কপাল, মুখ ফাটল। হলুদের সঙ্গে রক্তের রং মিশল।

গণপতি, আমাদের দেশের এইভাবেই পুণ্যের পিছন পিছন পাপ আসে, শুদ্ধের সঙ্গে অশুদ্ধের মিশ্রণ হয়। স্বাধীনতা সংগ্রামেও সাদা-কালোর বৈচিত্র্য ছিল বই কি!

৩৩

গঙ্গাজি অতশত দেখতে পেলেন না। তিনি ততক্ষণে জমিদারের বাড়ির মধ্যে গিয়েছিলেন বিশ্রাম নিতে। এবং পুলিশের জন্য অপেক্ষা করতে।

অবশেষে তারা এল। পরের দিনের কাগজে সামনের পাতায় বেরোল গঙ্গাজির আম হাতে ছবি। খবরে লেখা হয়েছিল তাঁর গ্রেফতারের কথা। তাঁর সঙ্গে জমিদার এবং সত্যাগ্রহীরাও গ্রেফতার হয়েছিল। গঙ্গাজির এই পদযাত্রা চারিদিকে সাড়া ফেলে দিল। কৌরবরা সারা দেশে আম পেড়ে বিক্রি করতে আরম্ভ করল। সরকার পক্ষ গাছ গণনা করতে এলে তারা বাধ সাধল। প্রতিবাদী ভলান্টিয়ারদের জেলে পুরেও খুব লাভ হল না। আবার একদল খাড়া হয়ে গেল। প্রতিবাদের ভাষা আরও তীব্র হল। নিষিদ্ধ আম তুলে খাবার জন্য বড় বড় সামিয়ানা টাঙিয়ে উৎসবের আয়োজন করা হল।

শেষে যখন ৫০,০০০ মানুষ নিষিদ্ধ আম খেয়ে জেলে গিয়ে ঢুকল, পাশ্চাত্যের খবরের কাগজ ব্যাপারটাকে উদ্ভট বলে মনে করতে লাগল। গঙ্গার কৌশল কাজ দিল। ইংরেজরা নিজেদের জালে জড়িয়ে পড়ে হাস্যকর প্রমাণিত হল। কিন্তু যত হাসি ততই কান্না, কবি বলেছিল না?

পাণ্ডু নিজেকে আম সত্যাগ্রহ থেকে দূরে সরিয়ে রাখলেও বুঝতে পেরেছিল, গঙ্গার ইন্দ্রজাল এক্ষেত্রেও কাজ করেছে। কিন্তু সব ভালোরই তো শেষ আছে!

গঙ্গাজি তখনও জেলে। আম সত্যাগ্রহের একটা ঘটনা হঠাৎ একটু রত্তাক্ত হয়ে দাঁড়াল। চৌরাস্তার ঘটনা। ফলপাড়া আর খাওয়ার মধ্যে একটা বন্য বিশৃঙ্খলা আছে। পাড়ার গুন্ডারাও জুটে যায়। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। সবাই মিলে হইহই করে ইট-পাথর ছুড়ে ফল নামাতে লাগল। সেই সময়ে পুলিশ এল।

হঠাৎ করে কিছু দুষ্কৃতি পুলিশের দিকে ঘুরে গিয়ে তাদের গায়ে ঢিল ছুড়ে আক্রমণ চালাল। পুলিশকর্মীরা সবাই ভারতীয়। তারা অনিচ্ছাসত্বেও দেশীয় ভাইদের ওপরে লাঠি চালাল। নাক-মুখ, মাথা ফেটে রক্ত পড়তে লাগল। গ্রেপ্তার হওয়া সংগ্রামীদের ‘অত্যাচার’ কথাটি মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল আর সন্ধের মধ্যে মারমুখী জনতার স্রোত থানার সামনে জড়ো হল।

তাদের মুখে তখন একটাই স্লোগান ‘রক্তের বদলে রক্ত চাই’—এ বুলি তো তোমাদের প্রজন্মের অনেকেই কপচে থাকে, তাই না? এর পরিণতি করুণ হতে বাধ্য!

থানায় দুজন অল্পবয়সি পুলিশকর্মী ছিল। একজন বোকার মতো বেরিয়ে এসে সবাইকে চলে যেতে চলল। মুহূর্তের মধ্যে তাকে টেনে নিয়ে গিয়ে, লাথি মেরে খুন করা হল। তার সঙ্গী তখন থানার ভেতরে প্রাণপণে চেষ্টা করছিল বাইরে খবর পাঠিয়ে অন্য জায়গা থেকে পুলিশ আনিয়ে নিজেকে বাঁচাতে। কয়েক পলকের মধ্যে, রে-রে করে মারমুখী জনতা থানার ভেতরে ঢুকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলল পুলিশকর্মীটিকে। তারপর তাদের রক্তপিপাসা মিটে গেলে তারা থানাটায় আগুন ধরিয়ে দিল। মৃত এবং মৃতপ্রায় পুলিশ কর্মীরা তখনও ভেতরে ছিল। পরদিন জেলে গঙ্গার সঙ্গে দেখা করতে এলেন কারাগারের ডেপুটি গভর্নর। তার হাতে একটা খবরের কাগজ। খবরের হেডলাইনগুলি এতদিনের আম সত্যাগ্রহের তুলনায় অনেক বড়। সাহেব কাগজটা বন্দির সামনে ফেলে দিয়ে গম্ভীরগলায় বলল, ‘এই অহিংসার কথাই তুমি বলো, মিঃ দত্ত?’

গঙ্গা খবরটা পড়লেন। তার সঙ্গে নিজের ছবিটা দেখলেন। সেখানে লেখা ছিল, ‘মহাগুরু গঙ্গা দত্ত, ইন্ধনকারী!’ হাত থেকে কাগজটা পড়ে গেল। গঙ্গার চোখে আঁধার নেমে এল।

‘আমি আন্দোলন বন্ধ করে দেব।’ তিনি খুব স্তিমিতভাবে বললেন।

‘কী?’ জেলার অবাক হয়ে বলল।

‘আমি এই মুহূর্তে আম্র সত্যাগ্রহ বন্ধ করে দেব। তুমি একটা ব্যবস্থা করে দাও। যাতে আমি সর্বসমক্ষে এই ঘোষণা করতে পারি।’ গঙ্গা বললেন। তিনি দেখলেন যে জেলার সাহেব একেবারে হতবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে।

‘আমার দেশের মানুষ আমাকে আজও বুঝতে পারেনি।’

৩৪

গঙ্গাজি যখন সর্বসমক্ষে ঘোষণা করলেন তখনও সবাই স্তম্ভিত। কেউ কেউ তাঁকে বিশ্বাসঘাতক মনে করল। এত সফল একটা আন্দোলন কেউ মাঝপথে বন্ধ করে দেয়?

‘উনি চাপের মুখে ভেঙে পড়ছেন মনে হয়।’ পাণ্ডু কৌরব পার্টিতে মিটিং করতে গিয়ে বলল।

‘ব্রিটিশরা এবারে ওঁকে বাগে পেয়েছে। নয়তো বয়স হয়েছে বলে উনি আর পেরে উঠছেন না।’

‘সে যাই হোক, উনি আমাদের বড্ড ছোট করে দিলেন সকলের কাছে।’ একজন পার্টিকর্মী বলল।

‘দাঁড়াও দাঁড়াও!’ আমি বললাম। নিজে কৌশল করে আমি তখনও পুলিশের হাতের বাইরে থাকতে পেরেছিলাম। ‘তোমাদের কী করে উনি ছোট করলেন? তোমাদের একজনকেও আমি পদযাত্রায় দেখিনি। পাণ্ডু! তুমি তো এই সত্যাগ্রহের বিরোধিতা করেছিলে, তাই না?’

‘হ্যাঁ, করেছিলাম।’ পাণ্ডু নির্লজ্জের মতো বলল, ‘কিন্তু আমি তখন বুঝতে পারিনি যে এই সত্যাগ্রহে এত মানুষ সাড়া দেবে। প্রতিটি গ্রাম স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে যোগ দিয়েছিল এই আন্দোলনে। গঙ্গাজি সবার মনের কথা যেন পড়ে নিয়েছিলেন। কোন ভারতীয় মানুষ আবার আম ভালোবাসে না? গোটা দেশ এই করের বিরুদ্ধে জেগে উঠেছিল আর ইংরেজদের লজ্জায় ফেলে দিয়েছিল। আর এটা তিনি কী করলেন? হঠাৎ একদিন কাউকে কিছু না বলে, নিজের ইচ্ছেয় তিনি আন্দোলন তুলে নিলেন!’

‘তিনি কি আমাদের জিগ্যেস করে সত্যাগ্রহ শুরু করেছিলেন?’

‘এটাই তো আমাদের পার্টির অভ্যন্তরীণ গোলযোগ। কৌরব পার্টি কি একটা মানুষের কথায় উঠবে বসবে?’

এর উত্তর হয় না। সবাই চুপ করে রইল। কিন্তু সবার মনেই প্রশ্নটা উঁকি দিচ্ছিল। ‘তুমি যখন স্বীকার করছ যে তিনি কাউকে না জিগ্যেস করেই সত্যাগ্রহ আরম্ভ করেছিলেন, তখন তুমি এটাও জেনে নাও যে তাঁর আন্দোলন শেষ করার অধিকারও রয়েছে। হয়তো সময়ের সঙ্গে আমরা অহিংস আন্দোলনের গুরুত্ব বুঝতে পারব। বুঝতে পারব কোনও একটা ঘটনার চেয়ে এই পুরো ভাবনার দাম অনেক বেশি।’

‘মাত্র দুটো পুলিশের জীবনের কী দাম? ইংরেজরা শত শত মানুষের প্রাণনাশ করেছে দুশো বছর ধরে, তার বেলা?’

‘গঙ্গাজি গোটা পৃথিবীকে দেখাতে চেয়েছিলেন, অহিংসা একটা নতুন অস্ত্র। পুরোনো পন্থায় ফিরে গেলে এই অস্ত্র ভোঁতা হয়ে যাবে। ইংরেজদের অন্যায় প্রকট ভাবে পৃথিবীর কাছে তুলে ধরতে গেলে আমরাও তাদের মতো হিংসার আশ্রয় নিতে পারি কি?

ঠিক এই কারণে গঙ্গাজি তাঁর আন্দোলন তুলে নিলেন। তোমাদের মতো অভিজ্ঞ নেতাদের এই কথা বোঝাতে হবে, আমি ভাবিনি।

মতবিরোধের মতো শত্রু আর নেই। ছুরির ফলার মতো বিনাশ করে দেয় যে-কোনও উদ্যোগকে। আমি জানতাম, আসন্ন রণক্ষেত্রে আমার নিজের রক্তের বন্যা বয়ে যাবে, আমার ব্যথা কে বুঝবে? আমার রক্তের দুটি স্রোত। আমার অন্ধ ছেলে আর আমার পাংশু ছেলে। এই যুদ্ধের দুই প্রধান।

৩৫

আন্দোলন উঠে যেতেই ইংরেজরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তারা বন্দিদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ তুলে নিয়ে তাদের মুক্তি দিল। কেউ কেউ প্রশংসা করলেও, অনেকেই এটাকে সান্ত্বনা বলে মনে করল। কেউ কেউ আবার বিষোদগার-ও করল। গঙ্গাজির ‘প্রিয় বন্ধু’, ভাইসরয় তাঁকে চায়ের নিমন্ত্রণ জানালেন। সবাইকে অবাক করে দিয়ে গঙ্গাজি রাজি হলেন যেতে। ভাইসরয়ের প্রাসাদের বিশাল বসার ঘরে তিনি তাঁর খাটো ধুতি পরে পৌঁছে গেলেন। তাঁকে অভ্যর্থনা জানালেন আমাদের পুরোনো বন্ধু স্যার রিচার্ড যিনি তখন ভাইসরয়ের প্রধান সচিব।

‘শ্রদ্ধেয় ভাইসরয় এখুনি আসবেন।’ বলে বেশ কঠোরভাবে স্যার রিচার্ড গঙ্গাকে একটা চেয়ার দেখিয়ে দিলেন।

গঙ্গাজি আরাম করে বসলেন। তাঁর সরু পা দুটি সোফায় তুলে বসার জন্য নিশপিশ করছিল। সারা বহিন গিয়েছিলেন তাঁর সঙ্গে। তিনি সোফার পিছনে দাঁড়িয়ে রইলেন। স্যার রিচার্ড তাঁর দিকে ঘৃণার ভঙ্গিতে একবার তাকালেন, কিন্তু তাঁকে বসতে বললেন না।

‘আপনার জন্যে একটু চা আনতে বলি?’ স্যার রিচার্ড বললেন।

‘ধন্যবাদ। আমি এই সময়ে একটু ছাগলের দুধ খাই,’ বলে সারা বহিনের দিকে হাত বাড়ালেন। তাঁর হাতে ছিল একটি স্টিলের টিফিন বক্স।

স্যার রিচার্ড কী একটা বলতে গিয়েও হতবাক হয়ে চুপ করে গেলেন। ওঁদের পিছনে দেওয়াল ঘড়িটা জোরে জোরে গুনে চলল।

‘আমি কি খুব তাড়াতাড়ি এসেছি?’ গঙ্গাজি বললেন।

‘না, না, তা নয়। ভাইসরয় একটু আটকে পড়েছেন।’

‘আটকে পড়েছেন…বাঃ! ইংরেজদের থেকে এই সুন্দর কথার মারপ্যাঁচ আমাকে শিখতেই হবে, কিন্তু কেন যে ঠিকসময়ে এসব মনে পড়ে না আমার!’

স্যার রিচার্ডের লাল মুখটা আরও লাল দেখাল। খুকখুক করে অনাবশ্যক একটু কাশলেন তিনি। বুঝতে পারলেন না, গঙ্গা দত্ত তাঁর সঙ্গে মশকরা করছিলেন কিনা। তিনি বড় একটা শ্বাস নিলেন। পরের কথাটা বলার জন্য একটু সময় পেলেন এতে। ‘আশাকরি আপনার খুব একটা অসুবিধে হবে না, মিঃ দত্ত। জাঁহাপনা কিছুক্ষণের মধ্যে এসে পড়বেন।’

গঙ্গাজি হাসলেন একটু। ‘আমার কোনও অসুবিধে নেই। এত আরামদায়ক এক চেয়ারে বসে আছি এরকম বিশাল একটা ঘরে, যাতে একটা আস্ত রেলগাড়ি ঢুকে যেতে পারে। আর আপনার মতো রাজকীয় একজনের সঙ্গ পাচ্ছি। আমার কীসের অসুবিধে? বরং এ কথা সারা বহিনকে যদি আপনি জিগ্যেস করেন সে অন্য কথা বলবে। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে তো!’

বেচারা স্যার রিচার্ডের মুখটা দেখবার মতো হল গণপতি। তিনি তড়িঘড়ি ইংরেজ ভদ্রমহিলাটিকে বসার আসন দেখিয়ে দিতে বাধ্য হলেন। সারা বহিন-এর মুখে কোনও অভিব্যক্তি ফুটল না। তিনি শাড়ির ভাঁজ ঠিক করে বসে পড়লেন চেয়ারে। হাতের টিফিন ক্যারিয়ারটা ঠক করে পায়ের কাছে শব্দ করে রাখলেন।

‘আমার ছাগলের দুধ। সারা বহিন খুব যত্ন করে খাওয়ায় আমাকে।’

‘তাই নাকি?’ স্যার রিচার্ডের গলা শুনে বোঝা গেল যে তিনি এই অসম বন্ধুদুটির খাদ্যবৃত্তান্ত নিয়ে এতটুকু মাথা ঘামাতে চান না।

‘হ্যাঁ।’ গঙ্গা উৎসাহ পেলেন, ‘একদিন রাত্রে একটা দুঃস্বপ্ন দেখলাম।’

‘কী দুঃস্বপ্ন?’

‘হ্যাঁ, যেন একটা গরু আমার সঙ্গে কথা বলছে।’

‘গরু!!’

‘হ্যাঁ, একটা সাদা গরু। খুব দুঃখী চোখ তার। সে যেন আমার কাছে মিনতি করে চলছে, মহাগুরু আমায় বাঁচান! আমি দেখলাম যে তার পেটের নীচে বসে ছেলে মেয়ে বাচ্চা, সবাই তার স্তন ধরে টানাটানি করছে দুধের লোভে, আর সে আমার কাছে কান্নায় ভেঙে পড়েছে।’

স্যার রিচার্ড জোর করে হাসির ধমক চেপে রাখলেন।

‘আমি দেখেছিলাম, দুধ নয়, রক্ত বেরিয়ে আসছে তার স্তন থেকে! আমি স্বপ্নের মধ্যে আতঙ্কিত হলাম। জেগে উঠে প্রতিজ্ঞা করলাম। কোনওদিন আর গরুর দুধ খাব না।’

গঙ্গা এরপর রিচার্ড-এর দিকে ফিরলেন, ‘গরু আমাদের মা, স্যার রিচার্ড, আপনার এবং আমার। আমাদের দুজনের ধর্মগ্রন্থে তাই বলে। সে আমাদের বাঁচিয়ে রাখে, আমরা তাকে কষ্ট দেব কেন?’

স্যার রিচার্ড বাক্রুদ্ধ হয়ে রইলেন।

‘আমি তারপর থেকে কোনওদিন গরুর দুধ খাইনি।’

গঙ্গা থামলেন। স্যার রিচার্ড নিঃশ্বাস ফেললেন, ‘বুঝতে পারছি।’ স্যার রিচার্ড বললেন। তিনি ঠিক কী বুঝেছেন তা অবশ্য বোঝা গেল না।

‘কিন্তু আমার শরীর খারাপ হল তারপর। ডাক্তাররা বললেন আমার শরীরের মিনারেল আর প্রোটিনের অভাব রয়েছে। তাই দুধ খেতে হবে। আমি বললাম, দুধ তো খেতে পারব না, কারণ আমি প্রতিজ্ঞা করেছি দুধ খাব না বলে।’

স্যার রিচার্ড মরিয়া হয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে রইলেন। যেন কেউ এসে তাঁকে বাঁচাবে।

‘আমি ডাক্তারদের জিগ্যেস করলাম যে দুধ যদি না খাই তাহলে কী হবে? তারা বলল, দুধ না খেলে আমি মরে যাব। আমি বলেছিলাম যে মরতে তো একদিন হবেই। কিন্তু তারা বলল দুধ না খেলে আমি নাকি পরের সপ্তাহেই মরে যাব।’

স্যার রিচার্ডের মুখ দেখে মনে হল যে তিনি ব্যাপারটাতে খুশিই হচ্ছেন।

‘তখন সারা বহিন আমায় বাঁচায়। আমার মনে দুঃখ হচ্ছিল যে এত কাজ ফেলে রেখে মরে যেতে হবে ভেবে। কিন্তু নিজের প্রতিজ্ঞাও কোনওমতে ভাঙবার কথা মাথায় আনতে পারছিলাম না। সারা বললেন ছাগলের দুধের কথা। মিনারেল প্রোটিন-এ ভরপুর। আমি বেঁচে গেলাম।’

অলিন্দে একটা হালকা পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। একজন উর্দি পরা বেয়ারা চায়ের ট্রে নিয়ে ঢুকল। গঙ্গাজি কাপটা তুলে নিলেন। সারা টিফিন ক্যারিয়ারের একটা বাটি থেকে তাতে দুধ ঢেলে দিলেন।

আরেকজন বেয়ারা একটা রুপোর ট্রলির ওপর লেস দিয়ে ঢাকা ট্রে নিয়ে ঢুকল। তাতে অনেক রকমের খাবার রাখা ছিল।

‘অন্তত একটা শশা দেওয়া স্যান্ডউইচ খান। আপনার ডাক্তাররা নিশ্চয়ই আপনাকে ভালো করে খেতে বলেছে, তাই না?’ স্যার রিচার্ড কষ্ট করে বললেন। তাঁর আভিজাত্যে ব্যাপারটা আটকাচ্ছিল।

একটু দুষ্টু হাসি ছড়িয়ে পড়ল গঙ্গার মুখে, ‘আমার জন্যে চিন্তা করবেন না, আমি খাবার এনেছি।’ নিজের গায়ের উড়নির ভেতর থেকে একটা পাকা হলদে রঙের আম বের করে আনলেন গঙ্গাজি, ‘আপনাকে আরও একটা বিখ্যাত চা-য়ের অনুষ্ঠানের কথা মনে করিয়ে দিই। বস্টনেই বোধহয় সেটা হয়েছিল, তাই না?’

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *