লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ – ৮

মা ডাকের নতুন ব্যঞ্জনা অনুভব হয়েছিল তাঁর প্রাণে।

দিন, মাস পার হয়ে বছর ঘুরে যেতে চলল। ফলহারিণী কালীপুজোর রাতের সেই অভূতপূর্ব ঘটনা, তাঁর জন্মগত মাতৃহৃদয়কে মথিত করে কী এক গভীর অনুভবের টানে সুদূরে ভাসিয়ে নিয়ে চলল। এমনিতেই নিরীহ, শান্ত মানুষ তিনি৷ ঐশ্বর্য নেই, আড়ম্বর নেই, তথাকথিত লেখাপড়া কিংবা বিদ্যাশিক্ষার চটক নেই। তিনি অন্তঃপুরবাসিনী। এবার আপন অস্তিত্ব আর অনুভব থেকে, আংশিক সমাধিস্থ হওয়ার মাধ্যমে, যে মাতৃত্বের চেতনায় উপনীত হলেন, সেই চেতনাই তাঁকে উপহার দিল এক অলৌকিক সোনার হৃদয়। অন্তরের মধ্যে বিশ্বমাতৃত্ব অনুভবের ইঙ্গিত ছিল। মা হওয়ার তীব্র আকুতির বীজ প্রতীক্ষা করেছিল অঙ্কুরোদগমের আশায়। এবার ছাড়পত্র পেয়ে হৃদয় অভিভূত হয়ে গেল। একের নয়, দশের নয়। সতের নয় অসতের নয়, শুধু হিন্দু-মুসলমান-খ্রিস্টানের নয়, গাছপালা-পশুপাখিরও মা তিনি। সারদা মা বিশ্বজননী। গঙ্গার জলধারা অবিশ্রান্ত বয়ে চলল! পালাক্রমে ঘুরে যাচ্ছে ঋতু। দিন যায়, রাত আসে৷ আলো ফোটে, আঁধার নামে। মেঘ ঘনায়, ধারাবর্ষণ হয়। বিদ্যুৎ চমকায়, বাজ পড়ে। দগ্ধবেলায় আগুন ঝরে, আবার হিম কুয়াশায় শীতল হয়। নহবতের বারান্দা ঘিরে দরমার বেড়া। উদয়াস্ত সেখানে পরিশ্রম করে যান এক বাস্তবের নারী। পার্থিব জগতের দায় সামলান। ঘর মোছেন, বাসন মাজেন, রান্না করেন। দোতলায় থাকেন তাঁর বৃদ্ধা শাশুড়ি। দেখাশুনা করতে হয়, ফাই-ফরমাশ খাটতে হয়।

মন্দিরের দর্শনার্থীরা ঘুরতে ঘুরতে ইতিউতি চায়।—মা জননী না কি এখানেই থাকেন?

খাজাঞ্চির উদাস উত্তর। তিনি আছেন শুনেছি, কখনও দেখতে পাইনি।

কে কাকে দেখবে?

সেটাই তো কথা!

মা এক নারী। তিনি পিতার জায়া। মা একটি শব্দ, ভূমিষ্ঠ শিশুর মুখে প্রথম ফোটে। যাঁর শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেই বিরাজ করছে ত্রিভুবন জুড়ে, তাঁকে আলাদা করে ডাকেই বা কে, দেখেই বা কে? তিনি ভাবের মা, তিনিই বিশ্বজননী। তিনি থাকেন অন্তরালে। যাবতীয় কৌতূহল আর কোলাহলের বাইরে। তাঁর অসীম মহিমা একটি প্রচ্ছন্ন অনুভবের মতো, চেষ্টা আর কৌতূহলে আধো অধরা। বিশ্বাসে তিনিই ধ্রুবসত্য। যাঁরা তাঁকে পান, তাঁদেরই তিনি আগলে রেখেছেন। বিশ্বপিতা তাঁকে পেয়েছেন নিবিড়ভাবে। তাঁর সন্তানদের ছেড়ে বিশ্বজননী আর কোথায় যান। তাঁর পিতৃত্ব উপলব্ধি না করেই, শাশুড়ি মন্তব্য করে ফেললেন, এমন পাগল জামাইয়ের সঙ্গে সারুর বিয়ে দিলাম, ঘর-সংসারও করল না, ছেলেপিলেও হল না, মা-বলাও শুনল না। ঠাকুর পিতা হেসে বলেন, দুঃখ করবেন না, আপনার মেয়ের এত ছেলেমেয়ে হবে, শেষে দেখবেন, মা-ডাকের জ্বালায় ও অস্থির হয়ে উঠবে। তাঁর কথা তো মিথ্যে হওয়ার নয়। আবার পুরো সত্যিও হল না। অগণিত সন্তানের মা হলেন সারদা। কিন্তু ডাকের জ্বালায় অস্থির? নাহ্, তাঁর আটপৌরে নিভৃত হৃদয় যতখানি প্রসারিত, ব্যাপক ছিল, অস্থিরতা তার ধারে-কাছে অনুভূত হয়নি।

তবু ব্যথা-যন্ত্রণা-কষ্ট-অনটন-টানাপোড়েন ছিল। দেহ নিয়ে ধরাধামে তিষ্ঠোতে গেলে থাকবারই কথা যে! আবার ভাঙা-গড়ার খেলায় জীবন নদীর মতো। এ কূল ভাঙে, ও কূল গড়ে, এই তো নদীর খেলা। দক্ষিণেশ্বরে গড়ে উঠছিল যে জীবন, তারই ফেলে আসা আর-এক পাড়ে শুরু হয়েছিল ভাঙনের খেলা। কথাবার্তা কানে আসছে, কামারপুকুর থেকে, জয়রামবাটি থেকে। দারিদ্র, অসুস্থতা। এদিকে ঠাকুর বলে দিয়েছেন, ঈশ্বরলাভের পর যে সংসার, সে বিদ্যার সংসার। কামিনী-কাঞ্চন তাতে নেই। কেবল ভক্তি, ভক্ত আর ভগবান। এক দুরন্ত রহস্যময় পুরুষ তিনি। তাঁর রহস্যটা কী? রহস্য হল সমর্পণ। আমি কিছু জানি না, মা-ই আমার সব।

তার মানে কি আলস্য? কর্মবিমুখতা? মোটেও না। কর্ম তোমায় করতে হবে, কিন্তু জেনো, কেউ করিয়ে নিচ্ছে। ফল তোমার। আবার সেই সব ফলও একদিন নিবেদন করে দিতে হবে তাঁর শ্রীচরণে। তা হলে? রইলটা কী? আমি কী পেলাম? কিছু না। তুমি নিমিত্ত। কর্ম করে যাও, দায়দায়িত্ব, বিচারের ভার অন্য হাতে। সহ্য করে যাও। যে সয় সে-ই রয়, যে সয় না, সে নাশ হয়।

ষোড়শী পুজো হয়ে গেছে এক বছর হল। অমানুষিক খাটুনি। শরীরটা বেঁকে বসছে। দেবীরও যে একটা আধার আছে। বছরখানেকের ওপর আগে দক্ষিণেশ্বর আসার পথে জ্বরে প্রাণ যায় যায়। আবার কি ম্যালেরিয়াতে ধরল, না কি পেটের গোলমাল?

শম্ভুবাবুই তাঁর ভরসা, রসদদার। তিনিই আবার ডেকে আনলেন, ডাক্তার প্রসাদবাবুকে।

চিকিৎসা চলল। ওষুধপত্র পড়ল। কিন্তু ফল হল না।

জননী অন্তরালবাসিনী। এদিকে কাজকর্ম সেবা-টেবা করতে পারছেন না বলে কুণ্ঠিতা হয়ে পড়ছেন। মনে মনে ভাবছেন, এই শরীর নিয়ে নহবতে পড়ে থাকলে, ভাবের মানুষটারই উৎকণ্ঠা বাড়ানো হবে বোধহয়। কিছুদিন ঘুরে আসবেন কি জয়রামবাটি থেকে।

কার সঙ্গেই বা আলোচনা করেন! হৃদয় আছে, দীনু আছে। শম্ভবাবু, তাঁর স্ত্রী আর ডাক্তারবাবুও আছেন। শাশুড়ি ঠাকরুনও আছেন, কিন্তু বয়েসের ভার তাঁর মস্তিষ্কেও প্রবেশ করছে। আর আছেন স্বয়ং তিনি। তিনি যে স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবেন না, একথা সারদা নিজেই জানেন। যতটুকু তাঁর ধরিয়ে দেওয়ার দরকার ছিল, তা তিনি সুষ্ঠুভাবেই সম্পন্ন করেছেন। মেজদাদা রামেশ্বর খুবই অনিয়মিত ইদানীং মন্দিরের কাজে। শরীর স্বাস্থ্য ভাল যাচ্ছে না তাঁর। এদিকে হৃদয় সব ব্যাপারে থাকলেও তাকে একটু সমঝে চলেন সারদা।

মা হওয়ার দায় বড় কম না। এদিকেও টান, ওদিকেও টান।

মানুষটা মন্দিরে একলা থাকবেন। কে দেখবে, যত্নআত্তি করবে! ভাবের ঘোরে থাকেন, সমাধিস্থ হয়ে যান প্রায়ই। ইদানীং আবার নিজের মধ্যে প্রকৃতিভাব উপলব্ধি করার জন্য, মাঝে মাঝে তেমন বেশে সাজতে চান। শিশুর মতো আবদার করেন। সে-ও তো মায়েরই দায়। কে করবে? টান জয়রামবাটির বাড়ির জন্যও। নামে পরিচয়ে বড়দিদি, চরিত্রে মা। ভাইয়েরা নিজের পায়ে দাঁড়ায়নি। বাবারও বয়স হল।

সিদ্ধান্তটা শেষ পর্যন্ত প্রায় একাই নিলেন। একবার ঘুরে আসার দরকার।

সেই জয়রামবাটি। চোদ্দো-পনেরো মাস আগে বাইরের নিঃশব্দ নির্যাতন আর অন্তরের প্রগাঢ় বিশ্বাস নিয়ে বাপের বাড়ি ছেড়েছিল বিবাহিতা মেয়ে। ফিরে এলেন মাতৃত্বের পূর্ণ চেতনা নিয়ে। কোলে পেটের ছেলে নেই, অন্তরে হাজার সন্তানের সঞ্চিত স্নেহ নিয়ে। সংহত সুস্থিত করুণাময়ী। বর্ষার জলে মেঘ থমকে রয়েছে আকাশের গায়ে। ভিজে উর্বর মাটি, প্রান্তর সবুজে ঢাকা। গাছে গাছে পাতার ভার। মাথা চাড়া দিচ্ছে রোয়া ধানের চারা। খাল-বিল-পুকুর উপচে উঠেছে বর্ষার জলে। হালকা ভিজে হাওয়ায় গিলে করা তিরতিরে স্রোত। ছাতা মাথায় ছিপ নিয়ে বসে পড়েছে গ্রামবাসী মাছ ধরতে। কলুগেড়ে আর পুণ্যপুকুরের পাড় ধরে চেনা রাস্তা পেরিয়ে বাড়ি আসছে পাড়ার মেয়ে সারু। বুকের মধ্যে তার বিশ্বজননীর উদারতা।

কেউ মুখ ফিরিয়ে তাকাল, চেনা মুখ দেখে কেউ হেসেও বাজল। ও মা সারু যে! কত দিন পরে বাড়ি এলি!

পরিচিত সম্বোধনে, যাকে যেরকম বলার উত্তর দিল সারদা। অন্তরে সক্রিয় তাঁর করুণার হৃদয়। মুখগুলো চেনা। কত রকম সমালোচনায় মুখর হয়েছিল এই সব মুখেরই কিছু কিছু একদিন। এখন সেসব মুখে শান্ত সরলতা, গ্রামীণ মোলায়েম হাসিতে প্রাঞ্জল। কিছুই থামে না। মা-ও মনে রাখেন না, ছেলেমেয়েরা কবে, কী বলেছিল। সংযত উত্তর আর অমায়িক ক্লান্তির হাসি হেসে বাড়ির পথ ধরে সারদা।

পুকুরপাড় আর কালী-মাড়োর সামনের রাস্তা দিয়ে উত্তরে এগুতেই বাঁ হাতে বাড়ির দোচালা। মেঘলা বিকেলে বিষাদমাখা চুপচাপ ভাব হয়ে রয়েছে বাড়ির চারদিকে। আগাছা জন্মেছে বেড়ার গায়ে গায়ে। উঠোনে ঢুকতেই সারদার চোখে পড়ে, ভিতর-বাড়িতে ঢুকতে যাওয়ার মুখে কোণের দিকে খোঁটায় বাঁধা রয়েছে গোরু। ডাবা থেকে মুখ তুলে সে-ই প্রথম সম্ভাষণ জানায় পরিচিত ডাকে, হাম-ম-বা। অবলা জীব, ঠিক চিনতে পেরেছে। শিং নেড়ে দড়িতে টান ফেলে এগিয়ে আসার চেষ্টা করে। সারদাই কাছে যায়। মাথায় গলায় হাত দেয়। ফোঁস ফোঁস শ্বাস ফেলতে ফেলতে ভগবতী নাক, কপাল ঘসে মায়ের গায়ে, ভাষাহীন শব্দে অভিমানী সুখের আকুতি জানায়।

প্রসন্ন আর উমেশই প্রথমে টের পায় দিদির আগমনবার্তা। দ্রুত ছুটে যায় অন্দরবাড়িতে। দিদি এসেছে, দিদি এসেছে বলে হইচই ফেলে দেয়। মুহূর্তে প্রাণসঞ্চার হয় নিঝুম চালাবাড়িটায়। একে একে বেরিয়ে আসে অন্য ভাইয়েরা, শ্যামাসুন্দরী, হুঁকো হাতে রামচন্দ্র, পিছন পিছন নীলমাধবও। মরা আলো আর মেঘলা দিনে ঝিমিয়ে থাকা গ্রামের বাড়িটা হঠাৎ জেগে ওঠে। প্রাথমিক কথাবার্তা, খোঁজখবর নেওয়া মানুষের কণ্ঠস্বরে সচকিত হয়ে ওঠে।

দাওয়ার কাছে পুঁটলি রেখে মা-বাবা-কাকার পায়ের ধুলো নিয়ে মাথায় ঠেকায় সারদা। তারপর বসে পড়ে সিঁড়ির ধারে। মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করেন রামচন্দ্র। বলেন, হ্যাঁ মা, আসবি বলে একটা খবর দিবি তো?

মেয়ের চিবুকে হাত ছুঁইয়ে চুমো খেয়ে জল আনতে গেলেন শ্যামাসুন্দরী। সারদা বলল, কিছু ঠিক ছিল না বাবা। শরীরটা গন্ডগোল করছিল। ডাক্তারবাবু ওষুধপত্র দিয়েছিলেন, তাও ঠিক হচ্ছিল না। তখনই ভাবলাম—

রামচন্দ্র বললেন, আর কিছু না, নীলুকে পাঠাতে পারতাম।

তার জন্য অসুবিধে হয়নি। পাইনদের বাড়ির দু’জন ফিরছিলেন, তাঁরাই কামারপুকুর পৌঁছে দিলেন। তারপর রামলাল এগিয়ে দিল। কখন আবার বৃষ্টি আসে, তাই নৌকো করে আমোদর পেরিয়ে ওকে ছেড়ে দিলাম।

শ্যামাসুন্দরী জল-বাতাসা দিয়ে বললেন, চেহারাটা যে বড্ড শুকনো দেখাচ্ছে মা!

দেখাবে না! সারদা বলল, ভুগছি আজ মাসখানেক ধরে। বর্ষার সময় কলকাতার জলটাও বড্ড খারাপ। সারাদিন খাটুনিও খুব যায়।

শ্যামাসুন্দরী বললেন, এখানেও যে ভালটা কী বুঝি না বাপু।

কথা বলতে বলতেই সারদা খেয়াল করে, কেমন জরাজীর্ণ ভাব চতুর্দিকে। আগাছা, ঝোপজঙ্গল গজিয়েছে। উঠোনে শ্যাওলা। বাবা-মা কাকা সকলের চেহারাতেই বয়েসের ছাপ, ভাঙনের চিহ্ন। সবথেকে বেশি রামচন্দ্রের। বুড়িয়ে গেছেন অনেকটা। মুখের হাসিটি অমলিন থাকলেও শরীরে যেন ধ্বস নেমেছে। নুয়ে গেছেন মানুষটা, ক্লান্তির ছাপ চোখেমুখে। একমাত্র মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে ভাইগুলো। সুয্যিদের ঘরের দিকটা ফাঁকা। বড়কাকা ঈশ্বরচন্দ্র এখন কলকাতায় থেকে যজমানি করেন। নীলমাধব থাকেন ওদিকটা।

মাকেও লক্ষ করে সারদা। শরীরে ভাঁটির টান। বুঝতে পারে মা-ও খুঁটিয়ে দেখছেন মেয়েকে এবং তাঁর হাবভাবে কোনও তুষ্টির ছাপ নেই। কারণটাও সে জানে। কিন্তু তাই নিয়ে আলোচনা কিংবা বোঝাবার কোনও সুযোগ নেই সারদার। সংসার নিয়ে মায়ের উদ্বেগটাও সে বোঝ। ভাইয়েরা এখনও উপার্জনক্ষম হয়নি, রামচন্দ্রও আর খাটতে পারেন না। টুকটাক ঘণ্টা নেড়ে পুজো করেন, চাষবাস যতটা পারেন নীলমাধব দেখেন।

নিজের কথা ভুলে, খানিকটা প্রয়োজনে আর কর্তব্যের খাতিরেই বাবা-মায়ের সংসারে নিজেকে সড়গড় করে নেয় সারদা। যতটা পারে সংসারের দায়দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়। মাঝেমধ্যে পাড়ার মানুষজন আসেন। তাঁদের আচরণ, কথাবার্তাতেও পরিবর্তন লক্ষ করে সারদা। নিজের মধ্যে তার আর কোনও অভাববোধ নেই, নেই অভিযোগ। কীভাবে গ্রাম্য মানুষজনও সেটা টের পেয়েছেন। উত্ত্যক্ত করতে আসার আর প্রশ্ন ওঠে না। বরং কবে থেকে তাঁরা যেন সমব্যথী হয়ে উঠেছে এই পরিবারটির। সারদার উদারতায় কখনও কেউ একটু জুড়োতেও আসে তার কাছে। একমাত্র ভানুপিসির সঙ্গে এখনও মাঝেমধ্যে মনের কথা হয় সারদার। দক্ষিণেশ্বরের অভিজ্ঞতা আর স্মৃতি ফিরে ফিরে আসে তখন।

অগ্রহায়ণের শেষ দিকেই অপ্রত্যাশিত দুঃসংবাদ আসে কামারপুকুর থেকে। মেজভাশুর রামেশ্বর ইহলোকের মায়াত্যাগ করেছেন। মুহূর্তে অভিভাবকহীন শ্বশুরবাড়ির চেহারাটা ভেসে ওঠে সারদার চোখের সামনে। একই সঙ্গে দক্ষিণেশ্বরে শাশুড়ি ঠাকরুনের ওপর পুত্রশোকের কষ্টটাও অনুভূত হয় তার আপন মাতৃহৃদয়ে। কয়েকদিনের জন্য কামারপুকুর চলে যায় সারদা। প্রতিবেশীরাই আত্মীয়ের মতন ওবাড়িতে। বেড়ে উঠেছে রামলাল, লক্ষ্মী আর শিবুও। লক্ষ্মীর এখন এগারো বছর বয়েস। শাড়ি ধরেছে। ছোটখাটো গিন্নি-গিন্নি ভাবভঙ্গি তার। কিন্তু ছোটখুড়ি-অন্ত প্রাণ সে। গানের গলাটাও মিষ্টি, এখন থেকে গুছিয়ে রঘুবীরের কাজকর্ম সামলায়। ছোটখুড়িকে অদ্ভুত একটা সম্ভ্রমের চোখে দেখে শিবুও।

পারলৌকিক কাজকর্মের পরে অশৌচ শেষ হল। রামলালের এখন আঠারো বছর বয়স। দায়দায়িত্ব অনিবার্যভাবে খানিকটা তার কাঁধেই পড়বে। কিন্তু জানা কাজকর্ম বলতে একমাত্র বাপ-কাকার পদাঙ্ক অনুসরণ করে কিছু যাজনক্রিয়া ছাড়া আর কী-ই বা সে করবে! যথারীতি খবর গেল দক্ষিণেশ্বরে। কাকার পরিচয়ে কিছু একটা সেখানে জুটে যাবেই। সারদা জয়রামবাটি ফিরে আসার আগেই রামলাল কলকাতা রওনা হল। কাকা আর ঠাকুমা তো আছেনই, আরও দু’একজন জ্ঞাতিভাই-টাইও আছে। কিছুটা স্বাধীনতা আর পুলকের ভাব নিয়েই পূজারি হতে গেল রামলাল।

জয়রামবাটিতে ফিরে এসেও সারদা বোঝে অভাবের কবল থেকে এ-সংসারটাকে উদ্ধার করার আর কেউ নেই। চাপ অনুভব করে মনের মধ্যে। বাবা রামচন্দ্রও যেন ফুরিয়ে আসছেন দিনদিন। কিন্তু সংসারের তো থেমে থাকার উপায় নেই। আর যতক্ষণ চলছে কাজকর্মও করে যেতে হবে। জনমজুর লাগিয়ে চাষবাসের কাজ কিছু হচ্ছে, যাহোক করে সংসারটা চলছে তাই থেকে। শীত গিয়ে বসন্ত আসছে আবার।

রামচন্দ্র নিজের শরীরের ওপর বোধহয় আর আস্থা রাখতে পারছিলেন না। সারদাকে একদিন বললেন, কালীরও বারো বছর বয়েস হতে চলল। আমি কবে আছি, কবে নেই। ভাবছি ওর পৈতেটা দিয়ে দিই।

কালীকুমার তৃতীয় পুত্র কিন্তু পরিবারের পঞ্চম সন্তান। তারও পূর্বে শ্যামাসুন্দরীর ভ্রূণাবস্থায় দু’-একটি গর্ভ নষ্ট হয়েছে। এই ছেলেটির প্রতি তাঁদের কিঞ্চিৎ অতিরিক্ত দুর্বলতা আছে সারদাও জানে। তা সত্ত্বেও বলল, তাড়াহুড়োর কী বাবা? তোমার শরীরটা ভাল যাচ্ছে না।

রামচন্দ্র বললেন, শরীর আর ভাল হবে বলেও মনে হচ্ছে না। সময় থাকতে সেরে নিতে পারলে… বরদা আর অভয়ের কথা তো ভাবছিই না।

ওরা ঢের ছোট এখনও। সারদা বলল। কালীরও এমন কিছু বয়েস পেরিয়ে যাচ্ছে না। একটু দেরি হলে না হয় প্রায়শ্চিত্ত করে নেবে।

মাথা নেড়ে রামচন্দ্র বললেন, না রে, প্রায়শ্চিত্ত মানে হচ্ছে, পুনরায় চিত্তে গমন।

বেশ বাবা। কিন্তু উপনয়নের দেরি হলে, ওটা একটা রীতিও তো বটে!

তাই মা। কিন্তু আমার কি আর সে-সুযোগ আসবে? এ সময়টা তুইও বাড়িতে রয়েছিস।

তুমি কি আমার কথা ভেবেই তাড়াহুড়ো করছ?

তা নয়। আমার নিজের কথাও ভাবছি। আর তুই বা কতবার যাতায়াত করতে পারবি! সে মানুষটারও যে তোকে দরকার মা।

মনটা হঠাৎই উদাস হয়ে যায় সারদার। তাঁর শিশুসুলভ নিপাট ভালমানুষ মুখখানা ভেসে ওঠে চোখের ওপর। সত্যি, সে মানুষটাকেও একটু দেখার দরকার। আপাতদৃষ্টিতে তাঁর প্রয়োজন, আসক্তি বলে কিছু না থাকলেও ঠাকরের আধার যে দেহটাই। একটু যত্ন-আত্তি পেলে আধারটা টিকে থাকবে। সারদার মতো করে আর কে-ই বা সেটা অনুভব করবে।

মুখে সারদা বলল, তাঁর জন্য গেলেও, আমি তো আবার আসব বাবা।

আসতে তোকে হবেই মা। রামচন্দ্র বললেন, নিজের জন্মস্থান, তা ছাড়া জয়রামবাটিও যে তোর মুখ চেয়ে আছে।

আমার মুখ চেয়ে? ওকথা বোলো না বাবা।

ঠিকই বলছি মা। তোর জন্মের সময় থেকে একথা আমার জানা। আর এখন… গাঁয়ের লোকেরাও তাই বলে।

কী বলে, কেন বলে, সারদা বেশ ভাল বোঝে এখন। কলকাতা থেকে জয়রামবাটিতে খবর এসে পৌঁছতে আর সময় লাগে না। তা ছাড়া সত্যিই তো, জন্মভূমির ওপর একটা বাড়তি টান কি মানুষের থাকে না! গত এক-দেড় বছরে দক্ষিণেশ্বরে কতজনের সঙ্গে দেখা হয়েছে, মা বলে খোঁজখবর নিয়েছে কেউ কেউ, দু’-একজনের বাড়িতেও গেছে সারদা। কিন্তু বারবারই চোখের ওপর ভেসে উঠেছে জয়রামবাটির ছবি। মনে হয়েছে আত্মীয়স্বজন, চেনা পরিচিতদের কথা। মন দখল করে রেখেছে স্মৃতি।

ভাবনার কথা প্রকাশ না করে, হালকা হেসে সারদা বলল, আচ্ছা বেশ। দক্ষিণেশ্বরে গেলেও আমি তো আবার আসছিই।

রামচন্দ্র উদাস কণ্ঠে বললেন, কিন্তু আমি বোধহয় ততদিন আর থাকব না রে! কোথায় যেন একটা তাড়া পড়ে গেছে… মনে মনে সেটা টের পাই। যেটুকু তার মধ্যে গুছিয়ে দিয়ে যেতে পারি…আমি তো জানি মা, তারপরে তোর ঘাড়ে…

সারদা থামিয়ে দিল বাবাকে। আচ্ছা আচ্ছা হয়েছে। তুমি কালীর পৈতের ব্যবস্থা করো, আমি তদ্দিন থাকছি।

অভাবের সংসার হলেও, আচারি সদব্রাহ্মণ পরিবারে উপনয়নের কিছু বিধি, আয়োজন আছে।

আত্মীয়স্বজনকে খবর দিয়ে সব কাজ মিটতে মিটতে আরও মাসখানেক সময় গেল। চৈত্র মাস। সন্ধেবেলা দামাল হাওয়া বইলেও দিনের তাপে জ্বলুনি মিশে যাচ্ছে। রামচন্দ্র শুধু মুখে আর মনে না, শরীরেও ফুরিয়ে আসছেন, সবাই টের পাচ্ছিল। আর সব আশঙ্কাকে সত্যে পরিণত করে, রামগতপ্রাণ মানুষটি রামনবমী তিথির দিনেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন। কালীকুমারের উপনয়নের পরে তখন সবেমাত্র তিনটি দিন পার হয়েছে। মাটির বাডির দেওয়ালে বসুধারা আর স্বস্তিকা চিহ্ন মোছেনি তখনও।

দারিদ্র্যের মধ্যেও আনন্দের অভাব ছিল না এতদিন। রামচন্দ্র চলে যাওয়ার শূন্যতায় সব অভাবই ভয়াবহ আর তীব্র হয়ে দেখা দিল। পিতৃস্নেহের এক নিবিড় ভূমিকা ছিল সারদার জীবনে। মেয়েকেও তিনি একই সঙ্গে মা এবং গৃহলক্ষ্মী বলেই ভাবতেন। মনে পড়ে সারদার, ছোটবেলার সেই দুর্ভিক্ষের সময়, রামচন্দ্র যখন উজাড় করে দিয়েছিলেন তাঁর ধানের সঞ্চয়, অন্নসত্ৰ খুলেছিলেন বুভুক্ষু মানুষদের জন্য, তখনও শ্যামাসুন্দরীকে বলতেন, যা আছে সব দিয়ে দাও, শুধু আমার সারু-মার জন্য দুটি ভাল চালের ভাত কোরো।

সেই স্নেহসিক্ত মানুষটার অকাল প্রয়াণে বেশ কিছুদিন শোকে পাথর হয়ে রইল সারদা।

তবু দিন যায়। চোখের সামনে সারদা দেখে অভাবের সঙ্গে অভিভাবকহীনতার পরিণাম কী দুঃসহ। অবলম্বন দেওয়ার কেউ নেই। শ্যামাসুন্দরীকে ধান ভানার কাজ করতে যেতে হচ্ছে অন্য বর্ধিষ্ণু পরিবারে। এমনকী রাঁধুনি বউয়ের কাজ করতে হচ্ছে অন্নসংস্থানের জন্য। তাতেও ক্ষুন্নিবৃত্তি হয় না অত বড় সংসারের। সারদা যতটা পারে সংসারের দায়িত্ব তুলে নিয়েছে নিজের কাঁধে। একে একে ভাইয়েদের পাঠিয়ে দিতে হচ্ছে সহৃদয় আত্মীয়স্বজনদের ভরসায়। প্রসন্ন গেল জিবটায়, বরদা ঠাঁই পেল শিহড়ের হরেরাম ভট্টাচার্যর বাড়িতে। অভয় সবথেকে ছোট। লেখাপড়াতেও তার মাথা আছে। সে আশ্রয় পেল মামার বাড়িতে।

ঘরের কাজকর্ম সামলালেও বাপের বাড়িতে থাকার ব্যাপারে সারদা সচেতন। আবার সময় চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দক্ষিণেশ্বরের কথা মনে আসে। সেখানকার দরজা খোলা আছে তার জন্য। তা ছাড়া এ-সংসারেও একটা পেট কমবে, মনে করে দক্ষিণেশ্বরে ফিরে গেল। মা জননী বলে সেখানে পরিচয়, কিন্তু থাকতে হয় সেই নহবতের ছোট্ট কুঠুরিতেই। দর্শনার্থীরা মন্তব্য করে, আহা, কী ঘরেই আমাদের সতীলক্ষ্মী থাকেন গো, যেন বনবাস!

সারদার নিজের মাতৃহৃদয়ে সহানুভূতি তেমন দাগ কাটে না। মনের মধ্যে একটি গভীর বিষাদের লাবণ্য আছে তার। পূর্ণ প্রাণে নিজের দায়িত্ব পালন করে যায়। দ্রুত অভ্যস্ত করে নেয় নিজেকে কাজে, স্বামী আর শাশুড়ির সেবায়।

কিন্তু কতদিনের জন্য?

বছরখানেক যেতে-না-যেতেই গ্রাম বাংলার মেয়ে, মন্দিরে মা হলেও, কলকাতার দূষিত পরিবেশ, জল হাওয়া সহ্য করতে পারেন না। আবার অসুখে পড়ে গেলেন। সেই সঙ্গে নিদারুণ মানসিক অশান্তি। তাঁর মনের গঠনটাই অমন। অন্যের জন্য প্রাণ ঢেলে দিচ্ছেন, কিন্তু তাঁর জন্য কেউ কিছু করলেই বড় আড়ষ্ট বোধ করেন। কিন্তু অসুস্থ হলে উপায়টাই বা কী! মন্দির আর গ্রাম, দক্ষিণেশ্বর আর জয়রামবাটি এই দুটিই তাঁর আশ্রয়। কিন্তু পাকাপাকি তিষ্ঠোতে পারছেন কোথায়! ধারাবাহিক ম্যালেরিয়া আর আমাশয়ে জর্জরিত হতে হতে দুর্বল, ক্ষীণাঙ্গী হয়ে পড়ছেন। আর দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হচ্ছে অন্তর-বাহিরে। দীর্ণ হচ্ছেন অসহায়তায়।

কিন্তু আধারটিকে গুরুত্ব দিতেই হবে। ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া আর-কিছু ভাবতে পারলেন না।

মন্দিরের ঘরে বসে ‘তিনি’ও সব খবরই পাচ্ছেন। আপাত নির্লিপ্ত মনে হলেও উদ্বেগ তাঁরও কম না। মায়ের সেবক তিনি। কিন্তু শক্তিস্বরূপা মায়ের উপর তিনি যে স্বয়ং আবার নির্ভরশীল! সেটা জানেন বলেই আগাম সব কর্মভার, এমনকী নিজেকেও নিবেদন করে দিয়েছেন তাঁর শ্রীচরণে। আধ্যাত্মিক উপলব্ধিটি তাঁর এই রকম: মায়ের ওপর ভার ছেড়ে দেওয়া ছাড়া গতি নেই। না, এড়িয়ে যাওয়া নয়, নিবেদন। সমর্পণ। খুব সহজ নয় ব্যাপারটা। তিনি বিশ্বাস করেন, ও সারদা, সরস্বতী। ও-ই জ্ঞানদায়িনী, রক্ষাকর্ত্রী।

কিন্তু বারংবার সেই রক্ষাকর্ত্রীকেই জয়রামবাটি ফিরে যেতে হচ্ছে শরীরটাকে মেরামত করতে! শম্ভুবাবু, প্রসাদবাবু যথাসম্ভব করেছেন, করছেন তিনি জানেন। উৎকণ্ঠা, অসহায়তা চেপে রাখলেও, ভাগ্নের কাছে না বলে পারলেন না।

তাই তো রে হৃদে, ও কেবল আসবে আর যাবে, মনুষ্যজন্মের কিছুই করা হবে না!

একটা কাউকে না বলে পারেন না, তাই হৃদয়কে বলা। প্রতিক্রিয়া যা কিছু নিজের মধ্যেই। একদিকে আধ্যাত্মিক চেতনা, অপরদিকে জীবনযাপন—দোলাচলের মধ্যে অতিবাহিত হয় সময়। মনে মনে হিসেব করেন, ষোড়শীপুজো করেছিলেন কয়েক বছর হয়ে গেল!

ওদিকে অসুখের তাড়না, কষ্ট, পেটের ব্যথায় কাতর মেয়ে শয্যা নিয়েছে জয়রামবাটি ফিরেই। বাড়াবাড়ি হয়েই চলল। অবসন্ন শরীর বারবার টেনে নিয়ে যেতে পারে না শৌচের জন্য। তাই একদিন শয্যাও স্থানান্তরিত হয়ে যায় কলুগেড়ে পুকুরপাড়ের গাছতলায়। চেহারা হয়েছে অস্থিচর্মসার, চোখমুখ ফুলে রস কাটছে। জলে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে আঁতকে উঠল সারদা। দেবীমন উদাসীন। কিন্তু বাইশ বছরের মেয়েটির হতাশা আর বেদনা বেজেছিল কোন গভীরে! ঠেলে নিয়ে গিয়েছিল কি আত্মহননের পথে?

নিঃসঙ্গ, অসুস্থ সারদা, জলের ছায়াকেই মনে মনে বলল, ছিহ্‌, এদেহ আর রাখা কেন! এখানেই পড়ে থাক, এদেহ ছাড়ি।

দয়াপরবশ হয়ে এক পরিচিতা ঘরে তুলে আনলেন সারদাকে। মুমূর্ষু অবস্থা। জল পড়ে পড়ে চোখের দৃষ্টি ঝাপসা, পূর্ণিমার রাত মনে হয় অমাবস্যা। ভাই এসে পরামর্শ দেয় সিংহবাহিনীর দুয়ারে হত্যে দেওয়ার। লাউফুল ছেঁচে রস দেওয়া হল চোখে। বিশ্বাসেই মনে হয় দেবীশক্তি অমোঘ। তাই সিংহবাহিনী মন্দিরের মাটি ওষুধ মনে করে মুখে দিল। গ্রাম্য মেয়েটির আধারে প্রাণ ফিরে পেলেন মন্দিরের দেবী। জয়রামবাটিতে জগদ্ধাত্রী পুজো করল সারদা।

ম্যালেরিয়ায় ভুগে প্লীহা বড় হয়েছে। গ্রাম্য চিকিৎসা হিসেবে পেটের ওপর জ্বলন্ত কাঠের অঙ্গার দিয়ে দাগাতে হবে। অমানুষিক দৈহিক যন্ত্রণা, হাত-পা বেঁধে রাখতে হবে। মেয়েটি সর্বংসহা। বলল, কাউকে ধরতে হবে না, বাঁধনেরও দরকার নেই। আমি সহ্য করব।

সহ্যেরও সীমা আছে, কথাটা খাটল না সারদার ক্ষেত্রে।

উঠে দাঁড়ানোর কয়েক দিনের মধ্যে খবর এল দক্ষিণেশ্বর থেকে। শাশুড়ি চন্দ্রমণিদেবী দেহ রেখেছেন। একমাত্র পুত্র রামকৃষ্ণ জীবিত। কিন্তু তিনি সন্ন্যাসী, মুখাগ্নি করতে পারবেন না। দৌহিত্র রামলাল ঠাকুমার মুখাগ্নি করেছে। অবস্থাটা অনুধাবন করল সারদা। শোকের সময়। মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ানো উচিত। শরীরের ভাবনা নস্যাৎ হয়ে গেল। রওনা হল দক্ষিণেশ্বরে।

মনুষ্যজন্মের দায় আর নিঃস্বার্থ প্রাণের অনুভব, দুইয়ের টানাপোড়েনে দীর্ণ মা সারদাদেবী। শরীর-সমাজ-সংসার একদিকে, আর একদিকে ঈশ্বর-নির্ভর চৈতন্য আর বোধে মায়ের ভূমিকা। দীর্ণতার মধ্যেই শুদ্ধ থেকে শুদ্ধতর হয়ে উঠছেন এক নারী। সহ্য এবং আরও সহ্য তাঁর জীবদ্দশার মূলমন্ত্র। সহ্য শরীরে, সহ্য মনে। কিন্তু অন্তরের অনুভবে মালিন্য নেই।

তবু কষ্ট যে কষ্টই। শম্ভুবাবু মানুষটা হৃদয়বান। নহবতের ছোট্ট কুঠুরিতে একটি মানুষের জীবনযাপন আর হাজারো বায়নাক্কা সামলানো কতখানি কষ্টকর টের পান। তাই কালীমন্দিরের কাছেই আড়াইশো টাকার জমি মৌরসি করে নিলেন। নেপালের রাজকর্মচারী বিশ্বনাথ উপাধ্যায় শাল কাঠ পাঠালেন। চালাঘর তৈরি হল মায়ের বসবাসের জন্য। একটি কাজের লোক। হৃদয়ের স্ত্রীও এসে উঠল মায়ের কাছে। ঠাকুরের পছন্দমতো খাবার-দাবার তৈরি করে দেন মা। মাঝে মাঝে তিনি এসে থেকে যান।

কোথা থেকে উদয় হলেন আর এক প্রবীণা মহিলা। বললেন, কাশী থেকে এসেছি, বাবার সেবা করব। মায়ের বাড়িতে অবারিত দ্বার, তাঁর সংসার অন্নপূর্ণার সংসার। কাজ আর সেবায় দিন বয়ে চলল। প্রবীণা অদ্ভুত একটা কাজ করলেন একদিন। এতকাল ঘোমটার আড়ালে সারদা মুখ ঢেকে রাখতেন ঠাকুরের সামনে এসে। সলজ্জ বধূটির মতন। কিন্তু আর যে বধূটি থাকলে চলবে না। জগতের মা হবার ডাক এসে গেছে। এক রাত্রে সেই কাশীবাসিনী মা-কে ঠাকুরের ঘরে নিয়ে গিয়ে, তাঁর ঘোমটা খুলে দিলেন। যে ঠাকুর লজ্জা আর শালীনতা শেখাতেন মাকে, তিনিও কিছু বললেন না। সারারাত চলল ভগবৎ কথা।

কীভাবে পট পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে জীবনযাপনের। বস্তু জগতে যা-ই ঘটে, তারই অন্যতর আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা পায় সারদা। যখন নেহাত পায় না, তখন দ্বারস্থ হয় তাঁর। তিনি কখনও বলেন, কখনও আচরণে ধরিয়ে, বুঝিয়ে দেন। নিজের মতো করে বুঝে নেয় সারদা। দুরন্ত পেটের অসুখ হয়েছে ঠাকুরের। প্রবীণা বললেন, দূরে দূরে এসময় থাকলে কি চলে? তোমায় তাঁর কাছে যেতে হবে।

সারদা ইতস্তত করছেন। বললেন, কী করব, ভাগ্নে বউটি একা একা থাকবে! হৃদয় রয়েছে ওঁর কাছে।

প্রবীণা বললেন, তা হোক মা। ওরা লোক-টোক রেখে দেবে। তোমায় তাঁর কাছেই থাকতে হবে।

লজ্জা, জড়তা কেটে যাচ্ছে সারদার। ঠাকুরের সমস্ত সাধন শেষ হয়ে এসেছে। মা টের পাচ্ছেন দায়িত্ব বেড়েই চলেছে তাঁর। আবার নহবতের ঘরে ফিরে আসে সারদা। সদা সচেষ্ট তাঁর সেবাযত্নের জন্য। শিকের ওপর হাঁড়িতে শিঙ্গি মাছ জিইয়ে রাখতে হয়েছে, তাঁর পেটের অসুখের জন্য ঝোল করে খাওয়াতে হবে। সেই মাছ সারারাত খলবল করে। ঘুম হয় না সারদার।

যাতায়াতও চলছে। সেবার জয়রামবাটি থেকে ফেরার পথে আরও বেশ কয়েকজনের সঙ্গে শ্যামাসুন্দরী আর লক্ষ্মীও দক্ষিণেশ্বরে এসে পৌঁছল। হৃদয় বোধহয় অসহিষ্ণু হয়ে উঠছিল। বারবার গ্রাম থেকে আত্মীয়স্বজনদের এই যাওয়া-আসায়। মামিকে স্পষ্ট কিছু বলার সাহস হয় না। কিন্তু শ্যামাসুন্দরীকেও সঙ্গে দেখে চটে গেল। শ্যামাসুন্দরী তার গ্রাম শিহড়ের মহিলা, পূর্বপরিচিত। বিন্দুমাত্র শিষ্টাচার না দেখিয়ে বলে উঠল, কী চাই, এখানে কেন এসেছ?

শ্যামাসুন্দরী প্রথম বার কলকাতা এসেছেন। হৃদয়ের আচরণে ভয়ে, অপমানে একেবারে জড়সড় হয়ে রইলেন। সারদা এমনিতেই শান্ত, সেইসঙ্গে চূড়ান্ত অপদস্থ। লক্ষ করল যে মানুষটি প্রতিবাদ করতে পারতেন, তিনি এবার নির্বাক রইলেন। হৃদয়কে তিনি খুব ভালই চেনেন। তার মত্ত আত্মম্ভরিতা রামকৃষ্ণ আগেও দেখেছেন। সাবধানও করেছিলেন। নিজেকে দেখিয়ে রামকৃষ্ণ বলেছিলেন, একে তুই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করলেও, একে কখনও এমন বলিস না। ওর ভেতরে যে আছে, সে ফোঁস করলে, তোকে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরও রক্ষা করতে পারবেন না।

হৃদয় উপেক্ষা করেছিল ঠাকুরের সেই কথা। তিনি সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু এবার আর কিছু বলার দরকার আছে হয়তো প্রয়োজন মনে করলেন না। তিনি কি টের পেয়েছিলেন, যার যার জীবনযাপনের কর্মফল একদিন তার কর্ম অনুসারেই নির্ধারিত হয়ে যায়। অলক্ষ্য থেকে কেউ একজন তার হিসেব রাখে! হৃদয়রাম তার দুর্ব্যবহার আর অহংকারের জবাব পেয়ে গেল কিছুদিন পরে।

মথুরামোহনের নাতনি, ত্রৈলোক্যবাবুর কন্যাকে আড়ালে নিয়ে গিয়ে, হৃদয় তাকে আসনে বসিয়ে কুমারী পুজো করছিল। খবর ছিল সেইটুকু। অসম্ভব ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন মন্দিরের তৎকালীন প্রশাসক ত্রৈলোক্য বিশ্বাস। হৃদয়কে তৎক্ষণাৎ খারিজ করে দিয়েছিলেন মন্দিরের পদ থেকে বহিষ্কারের আদেশ দিলেন দক্ষিণেশ্বর থেকে। মাথা নিচু করে বিদায় নিতে হল হৃদয়রামকে।

কালীমন্দিরের পূজারি হল রামলাল।

কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্যে দিয়ে, এক নিদারুণ সংসার জীবনের সাধনাও করে যাচ্ছেন সারদা। বছরের পর বছর কাটে। তাঁর পার্থিব জীবনের প্রাপ্তি বলতে কিছু নেই। গুছিয়ে নেওয়া, গুছিয়ে তোলার আর্তিটাই ভেতর থেকে তাঁর তৈরি হয়নি। তাঁর কোনও চাহিদা নেই নিজের জন্য। নেই কোনও প্রতিবাদ। কেউ তাঁকে ছেড়েছে, কেউ লাঞ্ছনা, অপমান করেছে। ব্যাধি দিয়েছে চূড়ান্ত শারীরিক যন্ত্রণা। দারিদ্র দিয়েছে ক্লেশ, উপবাস। নির্যাতন করেছে মানুষের আচরণ-অবহেলা-উদাসীনতা। বিদ্ধ করেছে ঈর্ষায়, প্রত্যাখ্যানে।

সারদা ত্যাগ করেননি কাউকে। তাঁর অন্তরের ব্যাপ্তি আর উদারতার কাছে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে পার্থিব ক্ষুদ্রতা, যাবতীয় জাগতিক চাওয়া-পাওয়া। তাঁর আভিজাত্য নেই, চটক নেই, অধিকারও নেই। ছিল না কোনও প্রাচুর্যের গৌরব। সরল, নিরীহ, গ্রাম্য বধূটির চালাঘরে শুরু থেকেই আসন পেতেছিলেন এক সোনার প্রতিমা। অনুভবে ছিল অফুরন্ত লাবণ্যময় ভালবাসা। আর সেই আসন, অনুভব ছিল তাঁর মাতৃহৃদয়ে। তিনি কারওর দোষ দেখেননি। দিনে দিনে আশ্রয় হয়ে উঠেছেন।

বছরে এক-আধবার করে ঠাকুর আসতেন তাঁর গাঁয়ে। কখনও জয়রামবাটি, শিহড়েও। সাধনকালের শেষদিক থেকে ভাঙতে শুরু করে তাঁর শরীর স্বাস্থ্য। অনিয়ম হত জীবনযাপনে, কলকাতায়। গ্রাম বাংলার মুক্ত হাওয়ায়, অন্য পরিবেশে জুড়োতে যেতেন কয়েকদিনের জন্য। কয়েকবার সারদাও ছিলেন সঙ্গে। ঘাটাল পর্যন্ত স্টিমার চলাচল শুরু হল। ঠাকুর মাকে সঙ্গে নিয়েই গেলেন সমৃদ্ধ জনপদ বালি-দেওয়ানগঞ্জে। দ্বারকেশ্বর নদের তীরে বালিগ্রাম। আশ্রয় নিলেন মোদক পরিবারের বংশীধর-গিরিবালার গৃহে। স্বামী-সান্নিধ্যে নিজেকে গৌরবান্বিত করার প্রত্যাশা ছিল না সারদার। তিনি হয়ে উঠতে চেয়েছিলেন তাঁর নীরব সেবিকা। নির্মল আনন্দের অংশীদার হয়েছেন, ধারাবাহিক সমর্থন জুগিয়েছেন। আবার নহবতে ফিরে কর্তব্য করে গেছেন। অভিযোগ ছিল না। ছিল ‘তাঁর’ সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর ভক্ত, শিষ্য-শিষ্যাদেরও মায়ের মতন বুকে টেনে নেওয়ার আকুতি। বোধহয় সময়ের সঙ্গে সচেতন হতে শুরু করেছিলেন সারদা। মাতৃহৃদয়ে কোনও নিঃশব্দ, মৃদু আলোড়ন টের পাচ্ছিলেন কি!

বছরের পর বছর যাতায়াতের ধকল, কায়িক পরিশ্রম, কখনও বঞ্চনা কখনও অভাব সবই সয়ে গেছে তত দিনে।

না গিয়েই বা উপায় কী!

বুঝে গেছেন একটি-দুটি বা কয়েকটি দেহজ সন্তানের জননী তো তিনি নন। তাঁর মুখ চেয়ে আছে অগুনতি সন্তান। আর তাঁরও আকাশের মতো বক্ষতল স্বতঃস্ফূর্ত উন্মুখ হয়ে রয়েছে তাপিত, পীড়িত সন্তানদের আঁকড়ে ধরার জন্য।

কিন্তু তা হলে আর অন্তরে আলোড়ন কেন?

এত বছর পরে কোথাও তাঁর অন্য সুরের একাকিত্ব বাজছে। ইঙ্গিতময় কথাবার্তা বলছেন ঠাকুর। নিজেকে দেখিয়ে বলেছেন, এ আর কী করেছে! তোমায় আরও অনেক বেশি করতে হবে।

সব শুনে যান মা। মনে মনে জানেন, জগতের প্রত্যেকের ওপর মানুষটার মাতৃভাব। বড় সহজ কথা নয়। পিতা তিনি, ঠাকুর তিনি। অথচ সবার ওপর মাতৃভাব! অর্থটা কী? রক্ষা-ধারণ-পালন মায়েরই কাজ। মা-ই শক্তি। শক্তি ছাড়া জগৎ অচল। তিনি আছেন, থাকবেন, সৃষ্টির উদারতা আর তন্ময়তায় মিশে। কিন্তু প্রীতিস্নিগ্ধ করুণায়, পূর্ণপ্রাণের লাবণ্যে লালন করবে কে? মা।

এবার কি ইঙ্গিতে সব দায়িত্বটা সর্ব অর্থে সারদার ওপরেই দিতে চাইছেন! মা-কে তাঁর সম্পূর্ণ জানা বোঝা হয়ে গেছে?

হয়তো। কিন্তু মা মুদু আলোড়নকেও প্রকাশ্য হতে দেন না। তিনি স্বয়ং জলাধার। আধার বিচলিত হলে, নড়লে একটি জলকণাও স্থির থাকবে না। কুঠুরির ঘরে ইদানীং পোষ্য বেড়েছে— গোপালের মা, গোলাপমা, যোগীনমা। নিরাড়ম্বর কর্তব্যে অবিচল থাকেন জননী সারদা। তিনি সকলের সন্তাপহারিণী। কিন্তু তাঁর লুপ্তস্রোত অন্তরের রেখায় রেখায় উদ্বেগের গোপন স্বরলিপি, কে সুর দেয় তাইতে!

ভাবের মানুষটির শরীর স্বাস্থ্য তেমন পোক্ত নয়। পেটের গোলমাল আর এটা-সেটা লেগেই রয়েছে। কবিরাজ গঙ্গাপ্রসাদ সেন একবার চিকিৎসা করতে এসে জল পর্যন্ত বন্ধ করে ওষুধ খাওয়াতে বলেছিলেন। যথাসম্ভব চেষ্টার ত্রুটি করেননি সারদা। দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে তখনও নিত্য আনন্দসভা। শুধু অন্তরালে দেহবোধ বিসর্জিত দাম্পত্য সম্পর্ক নিয়ে স্বামীর জন্য পূর্ণ কর্তব্য পালন করে যান বধূটি। দেখাসাক্ষাৎও অনিয়মিত।

আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাস তবু স্পষ্ট হয়েই চলেছে। বারবার আশঙ্কার কালো মেঘ ছেয়ে আসছে সারদার মনের আকাশে। শরীরের সুস্থতা বা অসুস্থতা নিয়ে মানুষটা মাথা ঘামান না। লোকশিক্ষার জন্য প্রাণপাত করছেন। কিন্তু গলার কষ্ট নিয়ে ভাল করে খেতে পর্যন্ত পারছেন না, জেনে স্তব্ধ হয়ে গেলেন সারদা। অনিয়মিত আহার, খাদ্যের কিছু অংশ বিলিয়ে দেওয়া… ইত্যাদি যে তাঁর লীলা সংবরণের পূর্বপ্রস্তুতি সেকথা জানাই ছিল। কিন্তু শিষ্যরা তটস্থ হয়ে পড়লেন একদিন তাঁর গলা থেকে রক্তপাতের পরে। তাঁর সর্বাপেক্ষা আলোকপ্রাপ্ত শিষ্য এবং সন্তান নরেন্দ্রনাথ, ডাক্তার বন্ধুদের কাছ থেকে বই জোগাড় করে পড়লেন। সিঁটিয়ে গেলেন নরেন। উপসর্গ মিলিয়ে যেটুকু আন্দাজ করলেন, তা ক্যান্সার হওয়াই সম্ভব। সে রোগের ওষুধ নেই।

মানুষটাকে নিয়ে টানাপোড়েন শুরু হল। উপায় বা কী! উদ্বেগ, উৎকণ্ঠায় সকলে তাঁর আরোগ্য কামনাই করছেন। দক্ষিণেশ্বর থেকে নিয়ে যাওয়া হল বাগবাজারে, দুর্গাচরণ মুখার্জি স্ট্রিটের এক ভাড়াবাড়িতে। সেবাড়ি তাঁর পছন্দ হল না। অপরিসর, ঘুপচি ঘর। নিজেই পায়ে হেঁটে চলে গেলেন বলরাম বসুর বাড়িতে। বিশিষ্ট কবিরাজরা এসে দেখলেন ঠাকুরকে। গঙ্গাপ্রসাদ-দ্বারিকানাথ-নবগোপাল একসঙ্গে মত দিলেন তাঁর রোহিণী রোগই হয়েছে। তাঁরা তেমন আশা দিতে পারলেন না।

তাঁকে নিয়ে যাওয়া হল শ্যামপুকুর স্ট্রিটের গোকুলচন্দ্র ভট্টাচার্যর বৈঠকখানা বাড়িতে। সুপ্রসিদ্ধ চিকিৎসক মহেন্দ্রলাল সরকারের চিকিৎসাধীনে রাখা হল রামকৃষ্ণকে। এদিকে খবর রাষ্ট্র হয়ে গেছে, ঠাকুর দক্ষিণেশ্বর ছেড়ে কলকাতায় এসে রয়েছেন। লোক ভেঙে পড়তে লাগল। আর তাঁর আচরণটাও তেমনই, যেন দক্ষিণেশ্বর যাওয়ার যাঁদের অসুবিধে ছিল, তাঁদের জন্যই তিনি কাছাকাছি এসেছেন। দিব্যি আনন্দে, প্রসন্ন মনে রয়েছেন। কিন্তু দক্ষিণেশ্বরে তাঁর আর ফেরা হল না।

অন্তঃপুরবাসিনী নিঃসঙ্গ মা জননী পড়ে আছেন নহবতে। আগেও একা ছিলেন। তবু মানুষটা কাছাকাছি ছিলেন। দিনান্তে অন্তত খাওয়াবার জন্য এক আধবার দেখা, দুটো কথা হত। সে সুযোগটাও গেল। কিছু বলার নেই সারদার। কাকেই বা বলবেন! বুকের মধ্যে অফুরন্ত ভালবাসা আর করুণা নিয়েও তো চিরজীবন তিনি হাততোলা হয়ে রয়েছেন। খেয়াল করেন, উপেক্ষা আর অবহেলায় তাঁর অস্তিত্বটাই যেন মুছে যাওয়ার জোগাড়। দিন যায়, মাস যায়। পারিপার্শ্বিকের উদাসীনতার মধ্যেও বিশ্বাসটা আঁকড়ে থাকেন মা। দেখা হবে।

ভক্ত আর শিষ্যদেরও জল্পনা চলে। মাকে নিয়ে আসা উচিত।

কেউ কেউ অন্তরালে থাকা মায়ের লজ্জাশীলতার কথাও বলেন। কেউ খরচের কথাও উল্লেখ করেন। তা ছাড়া খোলামেলা বাড়িতে অত পুরুষমানুষদের মধ্যে এসে তিনি কি থাকতে পারবেন। সমাধান করে দিলেন ঠাকুরই। বললেন, ওকেই জিগ্যেস কর। আসতে চাইলে আসুক। সিদ্ধান্ত তাঁর নেওয়াই ছিল। নীরবে শ্যামপুকুরে পৌঁছে আসল সেবার ভারটি তুলে নিলেন হাতে।

আড়াল থেকেই সারদা লক্ষ করেন ডাক্তারটিকে। লম্বা-চওড়া, হাঁকডাক করা স্পষ্টবাদী ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার। চিকিৎসার ব্যাপারে মনে হয়, পান থেকে চুন খসলে তিনি হাতে মাথা কেটে ফেলবেন, কিন্তু আসলে মহেন্দ্রলাল মানুষটি নিজেও ভাবের মানুষ। যুক্তিগ্রাহ্য বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ছাড়া তিনি যেন সব কিছুকে ফুৎকারে উড়িয়ে দেন, অথচ ক্রমশ সকলেই খেয়াল করেন মানুষটি, সরল নির্বিরোধী ঈশ্বরে-নিবেদিতপ্রাণ ঠাকুরের প্রেমে মজে যাচ্ছেন একটু একটু করে। প্রচণ্ড ব্যস্ত মানুষ, কিন্তু ক্রমশই বেশি সময় কেটে যাচ্ছে তাঁর কাছে এসে। সংকোচবশত একদিন ঠাকুর বলেই ফেললেন, এত ব্যস্ত কাজের মানুষ তুমি, আমায় দেখতে এসে অনেকটা করে সময় চলে যাচ্ছে…।

ঠোঁটকাটা স্বভাবের লোক মহেন্দ্রলাল। বললেন, ওহে, তুমি কি ভাব শুধু তোমার জন্যই আমি এখানে এতটা করে সময় কাটাই? এর পিছনে আমারও স্বার্থ আছে, বুঝলে!

কিঞ্চিৎ অবাক রামকৃষ্ণ। বললেন, আচ্ছা, তাই নাকি? তোমারও স্বার্থ আছে?

আছে বই কী! আসলে তুমি লোকটা খুব একটা খারাপ নও। সত্যি কথাটা তুমি রাখঢাক না করেই বল।

ঠাকুর বললেন, কিন্তু আমায় তো আবার লোকে পাগলও বলে।

লোকের কথা ছাড়া তো! মহেন্দ্রলাল বললেন, তারা করে এক, বোঝে এক, বলে আর এক। ওসব লোক আমি দু’চক্ষে দেখতে পারি না।

মৃদু হেসে ঠাকুর বলেন, তা হলে আমার কিছু জ্ঞানগম্যি আছে বলছ!

মহেন্দ্রলাল চাঁছাছোলা ভাষাতেই বাজলেন। মনে কোরো না আমি তোমার খোসামোদ করছি। সে বান্দা আমি নই। উলটো-পালটা বললে, বাপকেও ছেড়ে কথা কই না। লোকে তাই দুর্মুখও বলে।

ঠাকুর হেসেই বলেন, হবে হয়তো। কিন্তু আমার তেমন মনে হচ্ছে না!

সেটা তোমার-আমার দু’জনেরই সৌভাগ্য। সত্যি বলে মনে না হলে, তুমিও মহেন্দ্রলালের কাছ থেকে পার পেতে না।

তা বেশ। কিন্তু আমি তো ঈশ্বরে নিবেদিত প্রাণ। আর তুমি যুক্তি, বিজ্ঞানের লোক। এর মধ্যে সত্যি কোনটা?

ওই যে… বিজ্ঞানের চর্চা দিয়ে যে সত্যিটা বুঝি, তাই দিয়েই জগৎ আর ঈশ্বরকে আরও বেশি করে বোঝবার চেষ্টা করি। নাস্তিক ব্যাটাদের কথা বাদ দাও। তারা চোখ থেকেও অন্ধ।

ঠাকুর কিছু না বলে মৃদু হাসির সঙ্গে মাথা নাড়তে লাগলেন।

মহেন্দ্রলাল নিজের থেকে আবার বললেন, তবে একথা যদি কেউ বলে যে অনাদি অনন্ত ঈশ্বরের সবটা বুঝে ফেলেছে, তা হলে সে-ও মিথ্যেবাদী আর জোচ্চোর। তাকে পাগলা গারদে পাঠানো উচিত।

এবার প্রাণ খুলে হাসলেন রামকৃষ্ণ। বললেন, বেশ বলেছ। ঈশ্বরের যারা ইতি করে তাদের মাথায় কিছু নেই। কী জানো, পণ্ডিতরা অনেকে ঈশ্বরের অস্তিত্ব মানলেও, সে যেমন মনে করেছে, তার বাইরে অন্য কিছুকে আর মানতে চায় না।

সেটা হচ্ছে তাদের পাণ্ডিত্যের বদহজম। বললেন ডাক্তার।

ঠাকুর বললেন, ঠিক, ঠিক বলেছ। লেখাপড়া শিখে যদি অহংকার হয়, তা হলেই গন্ডগোল। তুমি বেঁচে গেছ। অনেক লেখাপড়া করেও তোমার সেরকমটি হয়নি।

আমি? আমি আর কতটুকু জেনেছি, বুঝেছি! মহেন্দ্রলাল বললেন, কত লোকের কাছে যে কত কী শেখার আছে…! সেরকম লোক পেলে মনে হয় পায়ের ধুলো নিই।

তাই গো, তাই। যত দিন বাঁচি, তত দিন শিখি।

শিষ্যদের দিকে তাকিয়ে ঠাকুর যোগ করলেন, কেমন নিরভিমান দেখছিস? ভেতরে মাল আছে বলেই অমন।

শরীর খারাপের মধ্যেও আড্ডা-গল্পে-আলোচনায় মাঝেমধ্যে ঠাকুর বেশ ভালই থাকেন। যত দিন যাচ্ছে, তত বিভিন্ন ধরনের লোকজনের আনাগোনাও বাড়ছে। অন্তঃপুর থেকে সবই লক্ষ করেন সারদা। আর কিছু না হোক, অন্তত কাছেপিঠে থেকে তিনি যে মানুষটার সেবা করতে পারছেন, সেটুকুতেই তিনি তুষ্ট, তৃপ্ত। বহুজনের মানসিকতাই তিনি দেখেছেন। অবহেলা আর নিঃসঙ্গতার রূপটাও তাঁর জানা। তার মধ্যেই এক উদার বিশ্বাস নিয়ে চলেন তিনি। কিন্তু খেয়াল করেন তাঁর দায়িত্বও যেন বেড়ে যাচ্ছে।

মহিলা হিসেবে তাঁর ক্ষমতাই বা কতটুকু! ব্যক্তিত্বে, পরিচয়ে, জীবনচর্চায় তিনি যে ঠাকুরের ছায়ার আড়ালে থাকা এক নীরব অস্তিত্ব। তা সত্ত্বেও অনুভব করেন কেন তাঁর দায়িত্ব বেড়ে যাচ্ছে! আসলে নিজের জীবন দিয়ে খুব সূক্ষ্মভাবে সারদা গড়ে তুলছিলেন আরও অনেক জীবন। সামনাসামনি ভক্ত আর শিষ্যরা ঠাকুরকে দেখেন জীব কল্যাণের লোকগুরু হিসেবে। কিন্তু সেই লোকটি ততদিনে চিনে ফেলেছেন উত্তরাধিকারিণীকে। কখনও প্রত্যক্ষ, কখনও পরোক্ষভাবে আপন নির্ভরশীলতা প্রকাশ করেন ঠাকুর মায়ের কাছে। সেই নির্ভরশীলতাই তাঁর দায়িত্ব বাড়ায়।

সত্যনিষ্ঠ, নিবেদিত প্রাণ আর নিঃস্বার্থ একগুচ্ছ তাজা জীবনকে সংকলিত করেছেন ঠাকুর। ভাবী সঙ্ঘের চারাগাছ। হাবভাবে মা-কে বুঝিয়ে দেন তাদের আলো-হাওয়া-জল দিয়ে তাঁকেই বাঁচিয়ে তুলতে হবে। নিজের সময় ফুরিয়ে আসছে। বীজবপন তিনি করে দিয়েছেন। কিন্তু তার থেকে যে প্রশস্ত ডালপালা, ফুলফল, কিশলয়ের উদ্যান হবে, মাতৃস্নেহ ছাড়া তাদের বাঁচাবে কে!

মুখে রা কাড়েন না সারদা। নিভৃত গোপন প্রস্তুতিতে তাঁর মানসিকতায় পরিবর্তনের অন্তঃস্রোত প্রবাহিত হয় ধীরে। আরও বহুদূর অতিক্রম করতে হবে তাঁকে। আরও কষ্ট সহ্য করতে হবে। কিন্তু বিচলিত হলে চলবে না, লক্ষ্য ঠিক রাখতে হবে।

কালব্যাধি সারার কোনও লক্ষণ নেই। মহেন্দ্রলালের চিকিৎসায় সাময়িক উপশম হয়েছিল, কিন্তু তা আরোগ্য নয়। ও রোগ আরোগ্যের হদিশ জানে না কেউ। শীর্ণ হয়ে যাচ্ছে তাঁর শরীর, খিদে কমে গেছে। শহরের বাইরে কোথাও গিয়ে থাকলে, মুক্তবায়ু আর জলহাওয়ায় কিছুটা চাঙ্গা হতে পারেন। সামনে শীত আসছে। পৌষমাস পড়ে গেলে ঠাকুর আবার ঠাঁইনাড়া হতে চাইবেন না। তাই অগ্রহায়ণের সংক্রান্তির আগেই কাশীপুরে গোপালচন্দ্র ঘোষের বাগানবাড়িতে নিয়ে যাওয়া হল। গঙ্গার পাড়ে চোদ্দো বিঘা জমি নিয়ে বাগানবাড়ি। খোলামেলা, গাছপালাওয়ালা। ভক্ত-শিষ্য-কাজের লোক তারাও তো থাকবে। আশি টাকা ভাড়া মাসে।

কয়েকটা মাস ভালই থাকলেন ঠাকুর। হেঁটে-চলে বেড়ালেন। দক্ষিণেশ্বর থেকে লক্ষ্মীকেও আনিয়ে নিলেন সারদা। মাঝেমধ্যে স্ত্রী ভক্তরাও দু’-একদিন এসে থাকেন, কাজেকর্মে সাহায্য করেন। রান্না আর খাওয়ানোর দায়িত্বটা সারদা নিজের হাতেই রাখলেন। গৃহীভক্তরা মাঝেমধ্যে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেন। পুত্রসম যুবক শিষ্যরা অধিকাংশ সময় কাছেই থাকেন। উদ্বেগ হয়, যা ভয়ংকর অসুখ, সত্যি সত্যি ঠাকুর কি দেহ রাখবেন এবার!

দেখতে দেখতে হিমেল হাওয়ার সুখী দিনগুলো শেষ হয়ে প্রকৃতি সেজে উঠছে। ফুল আর নতুন পাতায় ভরে উঠছে কাশীপুর উদ্যানবাটির গাছগাছালি। শুধু কালরোগের নখবিস্তারে বিছানায় মিশে যাচ্ছেন, একটা মানুষ। জীবনীশক্তি ফুরিয়ে আসছে দিন দিন। অসহায় অগণিত ভক্ত আর শিষ্যরা। মা টের পান সবই। জানেন কী ঘটতে চলেছে। তবু জেনেই কি চুপ করে বসে থাকতে পারেন! যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ।

লক্ষ্মীকে নিয়ে তারকেশ্বরে হত্যে দিতে গেলেন সারদা। দু’দিন নির্জলা উপোস করলেন। বোধহয় নিজের দিকে কষ্ট টেনে এনে, আয়ুর অংশ দিতে চাইছিলেন তাঁকে। কিন্তু তা হয় না। মায়ার জাল ছিঁড়ে বৈরাগ্যের ভাস্বর দীপ্তি নিয়েই ফিরে এলেন। মন মানে না ঠিকই, তবু একসময় অখণ্ড দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েই সংকল্পের যৌক্তিকতা বিচার করতেই হয়।

ফিরে আসার পরে ঠাকুর স্মিত হেসে, ক্লান্তস্বরে বললেন, কী গো, কিছু হল? একেবারে কিছুই না!

নিঃশব্দ রইলেন সারদা। নিজে কষ্ট পাওয়া একরকম। কিন্তু চোখের সামনে অসহায়ভাবে কাউকে কষ্ট পেতে দেখাটাও কি কম যন্ত্রণার! অপাপবিদ্ধ যে মানুষটা আজীবন সকলের কল্যাণ কামনা করে যান, তাঁর এই কষ্ট পাওয়ার কী ব্যাখ্যা!

ঠাকুর বললেন, যা ভোগ আমার ওপর দিয়েই হয়ে গেল। তোমাদের আর কাউকে কষ্ট ভোগ করতে হবে না। জগতের সকলের জন্য আমি করে গেলাম। গ্রীষ্মের খরদিনগুলোও শেষ হয়ে এল। এসেছে ঘোর বর্ষার সময়। শ্রাবণ মাসেরও শেষদিক। জলভরা মেঘ যেন ধূসর হাতির পাল, অনড় দাঁড়িয়ে আছে আকাশের গায়ে। স্তব্ধ প্রকৃতি প্রতীক্ষা করছে ধারা বর্ষণের। গভীর বিষাদের ছায়া কাশীপুর বাড়ির অলিন্দে-ঘরে-বারান্দায়। মা-কে ডাকলেন তিনি। ইঙ্গিত স্পষ্টতর করে বললেন, দেখো গো, কেন জানি না, আমার মনে সর্বদাই ব্রহ্মভাবের উদ্দীপনা হচ্ছে।

দীর্ঘশ্বাস মোচন করলেন সারদা।

তিনি আবার বললেন, আমি যেন কোথায় যাচ্ছি, জলের ভিতর দিয়ে… অনেক দূর…।

একদিকে হারানোর বেদনা, নিঃসঙ্গতা, তার সঙ্গেই পাহাড়প্রমাণ আসন্ন দায়িত্বের কাল্পনিক ঝুঁকিতে দীর্ণ একটি মাতৃহৃদয়। চাওয়া-পাওয়ার আকুতি আর বোধটাই গড়ে ওঠেনি সারদার। জানেন তাঁকে শুধু দিতে হবে। রাখতে জানেন না। আজীবন দিয়েই এসেছেন। দেওয়াতেই তাঁর পাওয়া। একবার কেউ মা বলে ডাকলে, তাঁর পৃথিবী সরে যায় আর-একদিকে। জগতের সকলের ওপর মাতৃভাব ওই মানুষটাও এবার মায়া কাটিয়ে তাঁকেই রেখে যাচ্ছেন।

আঁধার হওয়ার আগেই সেদিন পদে পদে অমঙ্গলের বার্তা। হাঁড়িতে খিচুড়ির তলা ধরে গেল। ছাদে শাড়ি শুকোতে দিয়েছিলেন। হারিয়ে গেল।

জলের কুঁজোটাও অসাবধানে হাত থেকে পড়ে ভেঙে গেল। কাকতালীয় সব ঘটনা, চিহ্নিত করে দিচ্ছে একটি পরিসমাপ্তির। সময় এসে যাচ্ছে বুঝেও স্থির থাকার চেষ্টা করেন সারদা। কিছু নেই, তবু তাঁকে দিতে হবে এর পরেও।

রাত গভীর হল। নিঝুম হয়ে এল চরাচর। শহরের উপকণ্ঠে বাগানবাড়ির গাছপালাতেও হাওয়ার শব্দ নেই। খাটের ওপর ধবধবে বিছানায় শয়ান তাঁর শীর্ণ দেহ। ভক্তরা দেখছেন, কী এক স্বর্গীয় জ্যোতিতে উদ্ভাসিত তাঁর মুখমণ্ডল। দেহ নিষ্কম্প, দৃষ্টি স্থির, তিনি চিরসমাধিমগ্ন। শ্রাবণী পূর্ণিমার রাত। মেঘের ফাটল চিরে হঠাৎই জ্যোৎস্নাপ্লাবিত হয়ে উঠল প্রকৃতি কিছুক্ষণের জন্য। তাঁর সমাধি আর ভাঙল না।

আকাশ দ্রুত ছেয়ে এল আবার মেঘে। মহানিশায় এবার মহাসমাধিতে নিমগ্ন হলেন মায়ের প্রাণের ঠাকুর।

তার পর মুষলধারায় বৃষ্টি নামল।

রাত শেষ হয়ে এল একসময়। দিনের আলো ফুটল মেঘলাভাঙা আকাশের পুবদিক থেকে। খবর ছড়িয়ে পড়েছে। দলে দলে মানুষ ভেঙে পড়তে লাগল কাশীপুরের বাগানবাড়িতে। দিন গড়িয়ে গেল। গঙ্গার ঘাটে চিতাগ্নির পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে গেলেন ঠাকুর। শ্মশানভূমি রূপান্তরিত হল তীর্থক্ষেত্রে। একাকিত্বের শোকে পাথর মা সারদা। চূড়ান্ত বৈরাগ্যের অনুভব সম্বল করে থাকতে থাকতেই দেখলেন, গোধূলি কমলা রং পশ্চিম আকাশে। মেঘের সীমান্তে জেগে রয়েছে জীবনের দ্যুতি।

সত্যি কি তিনি চলে গেলেন! তা হলে জীবনের এত উদ্ভাস ছড়ানো কেন চারিধারে!

তিরতির বয়ে যাচ্ছে গঙ্গার জল। পাক খেয়ে উঠছে বাতাস। পাখিরা ডানা মেলেছে আকাশে। মানুষ ঘিরে আছে আরও মানুষকে। নাহ্ নিজে চলে গিয়ে তিনি দিয়ে গেছেন আরও অনেক বেশি। অসংখ্য স্নেহের কাঙাল, হাজার-হাজার ভালবাসার ভিখারি, তাদের জন্য কে আছেন! রইলেন মা। মায়ের মধ্যে তিনি। তবে আর বৈধব্যের নিরাভরণ বেশই বা কেন? মায়ের পরিধানের বস্ত্রে রয়ে গেল সরু লাল পাড়। তিনি চিরসধবা, হাতে রইল সোনার রুলি। বিচ্ছেদ না, সরে যাওয়া না। জীবনে আরও জড়াতে হবে মাকে।

জীবনকে দেখতে দেখতেই তাঁর চলা। চোখের সামনেই দেখলেন, মানুষটা যেতে না-যেতেই তাঁর অস্থি ভস্মাবশেষের আধার নিয়ে ভক্তদের মধ্যে বাদানুবাদ শুরু হয়ে গেছে। হোক। এসব হয়। নিজেকে নির্জনে সরিয়ে নিয়ে এসে বহুদূরে দৃষ্টি ছড়িয়ে দিলেন মা।

শূন্য থেকে যাত্রারম্ভ তাঁর, যেতে হবে পূর্ণের কাছে। দেখতে হবে জীবনরসের উৎসধারাটি শুকিয়ে না যায়। আধ্যাত্মিক সম্পদের খনি ঠাকুর। প্রেমের মিলনভূমি তিনি রচনা করে দিয়ে গেছেন। কিন্তু আড়াল থেকে ইন্ধন জুগিয়ে গেছেন মা। মনের ব্যাপ্তি আর মাতৃত্বের কোমলতায় মহাজীবনের সাধনক্ষেত্রটি বাঁচিয়ে রাখতে হবে তাঁকে। তাই হবে মায়ের জীবনধর্ম। মনকে যা আবদ্ধ করে, চিত্তকে যা ছোট করে, তা কখনও ধর্ম হতে পারে না। ধর্মের চেয়ে জীবন বড় দুইয়ের মিলনেই হবে তাঁর মাতৃত্বের পূর্ণ বিকাশ।

ভাবনা রেখে গেলেন ঠাকুর। মা হাতে নিলেন তাকে জীবনের মুক্তাঙ্গনে ছড়িয়ে দেওয়ার উত্তরাধিকার। বললেন, কেউ পর নয়, জগৎ তোমার। শূন্য হাত, কিন্তু ভালবাসায় পূর্ণ হৃদয়ের পাত্রটি ঢেলে দিলেন সন্তানদের জন্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *