লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ – ২

দিনগুলো যেন চোখের পলক ফেলতে ফেলতে চলে যাচ্ছিল। রামচন্দ্রের যজমানি কাজ কিছু বৃদ্ধি পেলেও তাঁর সাংসারিক হতদরিদ্র অবস্থার কিছু উন্নতি হয়নি। হবেই বা কী করে। বড় মেয়ে সারদার বিয়ে হয়ে গেলেও, তাঁর নিজের সংসারটাই যে আর ছোট থাকছে না। পারিবারিক চিত্র পালটে যাচ্ছে বছরে বছরে। সারদা-কাদম্বিনী দুই কন্যা আর প্রসন্নকুমারের পরে ইতিমধ্যেই শ্যামাসুন্দরীর কোল আলো করে ভূমিষ্ঠ হয়েছে তাঁর আরও দুটি পুত্র সন্তান। উমেশচন্দ্র আর কালীকুমার। তাও কালীকুমারের জন্মের পূর্বেই অতি কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিল শ্যামাসুন্দরীকে। ভ্রূণাবস্থায় তাঁর দুটি গর্ত বিনষ্ট হওয়ার কালে প্রায় যমে-মানুষে টানাটানি পড়ে গিয়েছিল জীবন নিয়ে। একই সঙ্গে মানসিকভাবেও বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিলেন শ্যামাসুন্দরী শোকে দুঃখে। কালীকুমার অবশ্য সুস্হ সবল হয়েই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। শ্যামাসুন্দরীর জয়রামবাটিস্থ এক সখীই তাঁকে উদ্ধার করেন। দেবীভক্ত সখী তাঁকে ওষুধপত্র দিয়েছিলেন। ভক্তিমতী শ্যামাসুন্দরী ধরে নিয়েছিলেন, মা ষষ্ঠীই তাঁকে কৃপা করেছেন। তথাপি শিশু কালীকুমার চিৎকার করে কাঁদলে, কোনও একটা গোপন আশঙ্কায় এখনও জর্জরিত হন শ্যামাসুন্দরী।

সাংসারিক আয়-ব্যয়, পুত্রকন্যার প্রতিপালন জীবনধারণ নিয়ে রামচন্দ্রের উদ্বেগের শেষ নেই। ভাইদেরও তিনি ত্যাগ করতে পারেননি। নামে এবং চরিত্রে উভয়েই তিনি যেন সত্যিই রামায়ণের রাম। আদর্শ জ্যেষ্ঠভ্রাতা। মেজোভাই ত্রৈলোক্যের বিবাহের কিছুদিন পরেই তিরোধানের ঘটনা তাঁর অন্তরে একটি গভীর বেদনার ক্ষত রেখে গেছে। শাস্ত্রজ্ঞ আর পণ্ডিত বলে ত্রৈলোক্যের সুপরিচিতি ছিল। তাঁরই কিছু কিছু আরব্ধ কাজের দায়িত্ব ইদানীং রামচন্দ্রকে নিতে হয়েছে। অবশ্য পারিবারিক সাশ্রয়ের জন্য তার কিছু সুফলও আছে। পরের ভাই ঈশ্বরচন্দ্র পাশের দোচালাতেই থাকেন। সামান্য হলেও কোথায় যেন তাঁর সঙ্গে একটা রুচিগত ব্যবধান অনুভব করেন রামচন্দ্র। মুখে তিনি তা প্রকাশ করেন না কখনওই। ঈশ্বরচন্দ্রের কোনও কোনও আচরণে কুষ্ঠিত বোধ করেছেন তিনি। ফুলশয্যার পরের দিন অমন তাড়াহুড়ো করে সারদাকে কোলে নিয়ে আবার বাপের বাড়ি জয়রামবাটিতে ফিরিয়ে নিয়ে আসার ঘটনাটাও রামচন্দ্র কোনও দিন মন থেকে মানতে পারেননি। কামারপুকুরে তাঁর নতুন কুটুমবাড়ি। অতি সজ্জন আর নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ পরিবার বলে খ্যাত তাঁরা। আর সদাশিব জামাতাটির তো কোনও তুলনাই হয় না।

সারদা না-হয় নেহাতই বালিকামাত্র। সদ্য সম্পর্ক হওয়া শ্বশুরবাড়ির ভূমিকা, তার গুরুত্ব সম্পর্কে তার কোনও ধারণাই ছিল না সারদার। কিন্তু ঈশ্বরচন্দ্রের তো বোঝা উচিত ছিল, তাঁদের সংস্কৃতিতে বৈবাহিক সম্পর্ক রচিত হয় প্রকৃতপক্ষে দুটি পরিবারের মধ্যে। ছেলে এবং মেয়ে উভয়েরই আর-একটি করে নতুন পরিচিতি ঘটে, তারা উভয়েই আর-একটি পরিবারের সদস্য হয়। তাঁদের সুখ-দুঃখ আনন্দ-বেদনার অংশীদার হয়ে যায় তারা। তা ছাড়া সারদার যে ওটাই বাড়ি, ওটাই হয়ে উঠবে তার আশ্রয়-সংসার।

রামচন্দ্র বিশেষ করে আরও ক্ষুণ্ণ হয়েছিলেন জেনে যে, সারদাকে নিয়ে চলে আসার সময়, ঈশ্বরচন্দ্র তাঁর চাপা ক্রোধও শেষ পর্যন্ত সংবরণ করতে পারেননি। হয়তো সেদিনের ঘটনায় তাঁর কিঞ্চিৎ ক্ষোভ কিংবা ভ্রাতুষ্পুত্রীর জন্য কষ্ট হয়ে থাকবে। কিন্তু তাঁদের পারিবারিক অবস্থার কথাও বিবেচনা করা উচিত ছিল। তা ছাড়া ঈশ্বরচন্দ্রের কি এটুকু বোঝা উচিত ছিল না যে, কোনও কারণেই ক্রোধের অভিব্যক্তি ও প্রকাশ, বেদনার অনুভবকে লঘু করে দেয়!

রামচন্দ্রের মনে পড়ে কি আনন্দের মধ্যেই না সেই গ্রীষ্মের সন্ধ্যাটি অতিবাহিত হয়েছিল!

গৃহ তাঁদের পর্ণকুটিরই বলা চলে। তা হলেও সদরে-অন্দরে-অঙ্গনে থইথই করছে আত্মীয়স্বজন, পাড়ার মানুষ। মেঘহীন আকাশ জুড়ে বাগান সাজিয়েছে নক্ষত্রেরা। দিনের দাবদাহের পরে মৃদুমন্দ হাওয়া বইছে। তেল আর গ্যাসের বাতি জ্বালানো হয়েছে কয়েকটা। কন্যা সম্প্রদান করে ছাঁদনাতলা থেকে উঠে এলেন রামচন্দ্র, তাঁকে অতিথি আপ্যায়ন করতে হবে। তখনই ওদিকে আনুষ্ঠানিক ক্রিয়াকর্মের দায়িত্ব নিলেন দুই বাড়ির বন্ধু-আত্মীয় আর কুলবধূরা। মুহুর্মুহু উলুধ্বনি আর হাসাহাসিতে মুখরিত হয়ে উঠছে গৃহপ্রাঙ্গণ। সারদাকে পিঁড়িতে বসিয়ে বর প্রদক্ষিণ করানো হচ্ছে। সাতপাকের পরে গাঁটছড়া বাঁধনের মুহূর্তেই আবার হাসির কলরোল ছুটল। কী? না সাতাশটি পাটকাঠি জ্বেলে রমণীরা যখন সারদাসহ বর প্রদক্ষিণ করছিলেন, তখনই জামাইয়ের হাতে বাঁধা মাঙ্গলিক সুতো গেল পুড়ে। ব্যস, কেউই আর ছাড়ে না, বলে, আবার নতুন করে বিয়ে করতে হবে। জামাই মৃদু হেসে বললেন, সাতপাকে বাঁধা হয়ে গেছে, আমার হাতের সুতো আর রইল কি না-রইল তাতে কী যায় আসে!

ছাঁদনাতলার সমবেত নারী-পুরুষরা অবাক বিস্ময়ে এবার খেয়াল করলেন, ওরে বাবা, এ তো যে-সে লোক নয়! এ জামাই যে রসের ঠাকুর গো! হাসি ঠাট্টার মধ্যেই দুরন্ত উৎসাহে সবাই মিলে গাঁটছড়া বেঁধে দিলেন তারপরে।

খবর পৌঁছল রামচন্দ্রের কানেও। কী এক অজানা অনুভবে তিনি টের পেলেন, এ যেন শুধু তাঁর কন্যার লৌকিক পাত্রস্থ হওয়াই নয়, কোথায় যেন এক অলৌকিক আলিঙ্গনের বন্ধনেও স্বীকৃত হয়ে গেল তাঁর সারুমা।

মেয়ের বিয়ের দিন বাবার হৃদয়ে কোথাও একটা গোপন বেদনার ভার থাকেই। কিন্তু রামচন্দ্র টের পেলেন, আজ তাঁর আনন্দের ভারও বড় কম না। বিশেষত কন্যা সম্প্রদানের মুহূর্তে জামাতার মুখমণ্ডলে অকস্মাৎ যে-জ্যোতিপ্রভা তাঁর চোখে পড়েছিল, সেটাই আর একবার তাঁর স্মরণে এল। অন্তরে উচ্ছ্বসিত বোধ করলেন রামচন্দ্র।

বাসি বিয়ের দিন সকালে নববিবাহিত বরবধূকে নিয়ে রামচন্দ্রও গেলেন কালীমন্দিরের পশ্চিম কোণে। উন্মুক্ত আকাশের নীচে মন্দিরের সংলগ্ন প্রাচীরের পাশে কৃষ্ণপ্রস্তরই মা ষষ্ঠীর প্রতীক। রীতি অনুযায়ী কন্যা-জামাতাকে প্রণাম করতে বললেন। মা ষষ্ঠীর কৃপা কী অথবা কেন, সে-বিষয়ে বালিকা সারদার কোনও বোধ নেই। টিপ করে একটা প্রণাম সেরেই সে উঠে দাঁড়াল। অথচ সেই একই সময়ে গভীর ভাবের উদয় দেখলেন রামচন্দ্র তাঁর জামাতার সমস্ত মুখ জুড়ে।

সারদা কী বুঝল কে জানে! গতকাল সন্ধ্যারাত্রি থেকেই মাঝে মাঝে তার বরের রহস্য আর রসিকতা সে নিরীক্ষণ করে আসছে। আর শুধু যে কৌতুক অনুভব করেছে তাই নয়, হঠাৎ হঠাৎ তার বালিকাসুলভ বোধও যেন আচমকা নাড়া খেয়েছে কিছু একটা অবচেতন উপলব্ধিতে। এই মুহূর্তেও যেন তেমনই কী একটা ঘটল সারদার। স্বামীর পাশে বসে আবার সে মাথা ঠেকাল কৃষ্ণপ্রস্তরে।

অল্প দূরে দাঁড়িয়ে রামচন্দ্র প্রত্যক্ষ করেছিলেন এই আপাত তুচ্ছ ঘটনাটি। সম্যক ব্যাখ্যার সময় বা মানসিকতা কোনওটাই তাঁর ছিল না। অথচ টের পেয়েছিলেন, কোথাও যেন স্বস্তির জলধারা বয়ে যাচ্ছে, সিদ্ধ অনুভবে সিক্ত হয়ে উঠছেন তিনিও।

সময় বসে থাকছিল না। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তাপও বাড়ছে। কিছু কিছু লৌকিক আচারও বাকি ছিল মেয়ে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার আগে। সুন্দরনারায়ণ আর সিংহবাহিনীর দেবালয় ঘুরে সকলেই ফিরে এসেছিলেন। আর বিকেলের রোদ পড়তে না-পড়তেই সারদার, যাকে বলে পতিগৃহে যাত্রার আয়োজন শুরু হয়ে গিয়েছিল। সন্ধ্যা নামার আগেই বরবধূকে নিয়ে কামারপুকুর রওনা হয়ে গিয়েছিলেন বরপক্ষ। বেশি দূরের পথ না, তা হলেও শুভযাত্রার একটা নির্দিষ্ট সময় ছিল।

মেয়েকে ছেড়ে দিতে বুক ভেঙে যাচ্ছিল শ্যামাসুন্দরী-রামচন্দ্র উভয়েরই। তা হলেও নিয়ম যা, তা মানতে হবে। অশ্রুসজল চোখে শ্যামাসুন্দরী তাঁদের দারিদ্রক্লিষ্ট অবস্থাতে যতটুকু সম্ভব, ততটুকু সাজ আর আভরণে সাজিয়ে দিলেন সারদাকে। ছোট্ট মেয়ে একেবারে শেষ মুহূর্তে বাস্তবের মাটিতে পা দিয়ে বুঝল, বাবা-মা কেউ সঙ্গে যাবে না। আঁধার ঘনিয়ে এল সারদার চোখে। তারপরেই ভেসে গেল দু’চোখ। এখনও মনে পড়ে রামচন্দ্রের। সে এক অদ্ভুত দৃশ্য। যত কাঁদেন বাবা-মা, ততই কাঁদে মেয়ে।

এদিকে শুভযাত্রার সময় এগিয়ে আসছে। সবাইয়ের অনুরোধে নতুন জামাইকেই পরিস্থিতি সামাল দিতে হল। কীভাবে ইতিমধ্যেই লক্ষণীয় হয়ে উঠেছে, গদাধরের একটি দুটি কথাতেই অবস্থা আয়ত্তের মধ্যে এসে যায়। তাঁর মুখের ভাব, ভাষা, শব্দচয়নে সাধারণ কথাই যেন মন্ত্রের মতো কাজ করে। এক অপূর্ব প্রীতি-ভালবাসা আর বিশ্বাসের আবহ রচনা করে তাঁর মুখনিঃসৃত কথা। আস্থা জন্মায় মানুষের মনে। শ্বশুরমশায়ের হাত ধরে গদাধর বলেছিলেন, বাবা আপনারা কষ্ট পাচ্ছেন কেন? হেঁটে হেঁটে এই দেড়-দু’মাইল শরীরের জায়গা পালটানোয় কিছুই যায় আসে না। মন যেখানে থাকে, সেখানেই তো সব।

কী একটা ছিল তাঁর কথায়, স্পর্শে। বিয়োগব্যথার কষ্ট নির্বাপিত হয়েছিল যেন মুহূর্তে। আনন্দাশ্রুতে পরিপূর্ণ হল সকলের চোখমুখ। শুভলগ্নেই বরযাত্রীরা রওনা হয়ে গেলেন কামারপুকুর। একমাত্র ঈশ্বরচন্দ্র তা সত্ত্বেও রওনা হলেন। ভাইঝিকে কোলে নিয়ে তিনি পৌঁছতে গেলেন শ্বশুরবাড়ি।

নিরালা নির্জন হয়ে রইল জয়রামবাটির দোচালা গৃহ। ওদিকে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল কামারপুকুরের চাটুয্যে বাড়িতে। একটা হুতোশ আর ভাবনা ছিল রামচন্দ্রের মনে তার পরেও। মেয়েকে বউ হিসেবে কেমন করে গ্রহণ করবেন কুটুমবাড়ি সেই কথাই যাতায়াত করছিল মনে। কয়েকজন আত্মীয় আর পাড়া-প্রতিবেশীর মুখে সারদাকে বরণ করে নেওয়ার বৃত্তান্ত শুনে নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন তিনি।

ওদিকে খুশির অন্ত ছিল না গদাধরের জননী চন্দ্রমণি দেবীর মনেও। আজ তিনি শাশুড়ির ভূমিকায় থাকলেও, তিনিও তো কাত্যায়নী আর সর্বমঙ্গলার মা। মেয়েদের বিয়েও তাঁকে দিতে হয়েছে। দুঃস্থ পরিবার তাঁদেরও। মেয়ে বিয়ে হয়ে শ্বশুরবাড়ি চলে গেলে, মায়ের মনের কী উচাটন ভাব হয় তিনি খুব বোঝেন।

তা ছাড়া ঈশ্বরচিন্তা আর ভাবের ঘোরে থাকা কনিষ্ঠপুত্রের বিয়ে দেওয়া নিয়েও তাঁকে যথেষ্ট উদ্বেগের মধ্যে থাকতে হয়েছিল। ছোটছেলে গদাধর যে ছোট থেকেই কিঞ্চিৎ অন্য প্রকৃতির, সাংসারিক বিষয়ে উদাসীন, ঈশ্বরভাবনা আর চেতনার স্তরে বিরাজ করে… এসবই চন্দ্রমণি দেবী অবগত ছিলেন। কিন্তু যতদিন ছেলে তাঁর চোখের সামনে ছিল, ওসব বিষয়ে তাঁর কোনও দুর্ভাবনা হয়নি। উদ্বেগের শুরু গদাধর দক্ষিণেশ্বর চলে যাওয়ার পর থেকে। জ্যেষ্ঠপুত্র রামকুমার ছিলেন রানি রাসমণির দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের পুরোহিত। তাঁর অকাল প্রয়াণের পরে শেষ পর্যন্ত নিষ্ঠাবান কনিষ্ঠভ্রাতা গদাধরের ওপরেই সেই দায়িত্ব ন্যস্ত হয়। তাতে আপত্তিরও কিছু ছিল না।

কিন্তু কালীমন্দিরে পৌরোহিত্য করতে করতেই গদাধর তাঁর শরীরে-মনে এক দুরন্ত পরিবর্তন অনুভব করতে শুরু করেন। তাঁর চিন্তায়-মেধায়-মননে অলৌকিক চিরশক্তির স্বরূপ উদঘাটন সাধনায় পর্যবসিত হয়। বাস্তবের ভূমিতে দাঁড়িয়ে, ক্রমশ তিনি চেতনা আর উপলব্ধির সূক্ষ্মতম স্তরে নিজেকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেন শক্তির অনুসন্ধানে। চৈতন্যের অপার্থিব আকাশকে স্পর্শ করার জন্য তাঁর আগ্রহ আর একাগ্রতায় অস্তিত্বহীন হয়ে যেত বাহ্যিক জগৎ।

এমন সাধনা, উপলব্ধি আর অনুসন্ধানের প্রয়াসকে সাধারণ মানুষ যে ভুল ব্যাখ্যা করবেন, তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। হলও তাই। আর পল্লবিত হয়ে সেই সব খবর আসতে লাগল কামারপুকুরে চন্দ্রমণির কাছেও। একেই জ্যেষ্ঠপুত্র প্রয়াত, শোকে কাতর মায়ের মন তাঁর। কনিষ্ঠপুত্র সম্বন্ধে অতিরিক্ত সচেতন আর অন্তরে পীড়িত হয়ে উঠেছিলেন চন্দ্রমণি।

সরল-গ্রাম্য-স্নেহশীলা মা তিনি। মেজ ছেলে রামেশ্বরকে ডেকে বললেন, সাধন-ভজন ঢের হয়েছে, কপালে থাকলে পরেও হবে। আগে ভাইকে বাড়িতে নিয়ে আয়। তাকে দেখি আমি, তার পর কী ব্যবস্থা করা যায় ভাবতে হবে।

এসব ক্ষেত্রে পরামর্শদাতা জুটতে অসুবিধে হয় না, দেরিও হয় না। গদাধর দক্ষিণেশ্বর থেকে ফিরে আসতে না-আসতেই আত্মীয়-প্রতিবেশী-বন্ধু নানা মুনি নানা মত ব্যক্ত করতে ছুটে এলেন। শুরু হয়ে গেল শান্তিস্বস্ত্যয়ন, চণ্ডনামানো, ঝাড়ফুঁক। কিন্তু এসবই তো সাময়িক। যুবা বয়সে পুরুষ মানুষের যাবতীয় মানসিক আর শারীরিক বৈকল্যের আসল চিকিৎসা যে বিবাহ, এ তো শুধু ধারণা নয়, আবহমানকালের সংস্কারাচ্ছন্ন মনের বিশ্বাস। চন্দ্রমণিদেবীও ধরে নিলেন, সুলক্ষণা দেখে একটি মেয়ে খুঁজে বিয়ে দিয়ে দিতে পারলেই ছোট ছেলের যাবতীয় আবেগ, বায়ুরোগ, উদাসীনতা সব কেটে যাবে। যেন এসব ক্ষেত্রে মেয়ের থেকে ভাল ওষুধ আর কিছু হয় না।

আবার আশঙ্কাও যে ছিল না, তা নয়। বিয়ের কথায় ছেলে বেঁকে বসতে পারে। কিছুটা গোপনেই চন্দ্রমণিদেবী আর রামেশ্বর পাত্রী দেখা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু অমন ছেলের জন্য সঠিক, সগোত্রের পাত্রী নির্বাচনও তো নেহাত মুখের কথা না! তা ছাড়া দরিদ্র গ্রাম্য পরিবারে তাঁদের বাস্তব সীমাবদ্ধতাও ছিল অনেক। যত সুন্দরী, যত বিবাহযোগ্য পাত্রী হবে, তার জন্য তেমন কন্যাপণও যে দিতে হবে। সেটাই রীতি। এদিকে সময়ও বসে থাকছে না। উৎকণ্ঠা বেড়ে যাচ্ছিল চন্দ্রমণিদেবীর।

গদাধর চুপচাপ ছিলেন। মা ও পরিবারের সকলের ধারণা ছিল তিনি কিছুই জানেন না। কিন্তু তিনি যে আলোকপ্রাপ্ত, সূক্ষ্ম বিবেকবুদ্ধিসম্পন্ন উচ্চ মার্গের রসিক। পরিবারের সকলের যখন প্রায় হাল ছাড়ার দশা, তখনই সবাইকে প্রায় অবাক করে নিজের মত প্রকাশ করলেন। কুটো বেঁধে রাখার উদাহরণ দিয়ে অতীত-নির্বাচিতা মানস স্বয়ম্বরার খোঁজ দিয়েছিলেন। চন্দ্রমণিদেবী, রামেশ্বর সকলেই স্বস্তি আর নিশ্চিন্তির শ্বাস ফেলেছিলেন। বয়সের তফাত নিয়ে কিছুটা খুঁতখুঁতুনি ছিল পরিবারে। কিন্তু কয়েক বছর আগে শিহড়ের ঘটনা শোনার পরে কীভাবে যেন সকলেই বিশ্বাস করে ফেললেন, এ বিয়ে পূর্বনির্ধারিত। আর কিছু করার নেই। বরযাত্রীদের ফিরে আসার খবর পেয়েই উদ্বেল হয়ে উঠেছিলেন চন্দ্রমণিদেবী। বউমাকে তখনও তিনি চোখে দেখেননি। কুলো-বরণডালা-ধানদূর্বা-ফুলের মালা নিয়ে অধীর আগ্রহে উঠোনে নেমে এসেছিলেন পুত্রবধূকে বরণ করে ঘরে তুলতে। বধূ যে তাঁর বালিকা এটুকু জানা থাকলেও, নারী হৃদয়ের চিরন্তন বোধেই দুরন্ত কৌতূহল জমে ছিল তাঁর মনে। বরবেশে গদাধরের পাশে বউটিকে কেমন মানিয়েছে দেখার জন্যই সতৃষ্ণ নয়নে তাকিয়েছিলেন। কিন্তু…

ও মা, বউ কোথায়? টুকটুকে সাজে লাল চেলি পরা যে-বউমাকে দেখে চক্ষুসার্থক করবেন বলে বুকের মধ্যে তাঁর তোলপাড় হয়ে চলেছে, সে বউ কোথায়!

প্রায় দিশাহারা চন্দ্রমণির সামনে তখনই পৌঁছলেন ঈশ্বরচন্দ্র। তাঁর কোলে রূপের আলোয় উদ্ভাসিতা, পরম কল্যাণময়ী, টুকটুকে পুত্রবধূ সারদা। কী একটা ঘটে গেল চন্দ্রমণির সমস্ত অস্তিত্ব আর চেতনা মথিত করে। কয়েক মুহূর্ত শুধু অপলক দৃষ্টিতে তিনি চেয়ে রইলেন সরল অপরূপা বালিকাবধূর দিকে।

মাত্রই মুহূর্তের উপলব্ধি। কিন্তু কী এক অলৌকিক অথচ স্থির বিশ্বাসে চন্দ্রমণি টের পেয়ে গেলেন, এ যে-সে মেয়ে নয়। শুধু তাঁর বালিকা পুত্রবধূও নয়। ছোট্ট বধূর বেশে তাঁর ঘর আজ আলোয় ভরিয়ে দিয়েছে এক দেবী। যেন স্বর্গের দেবী দুর্গা মর্তের মেয়ে উমা হয়ে, নাম পালটে সারদা হয়ে আজ নেমে এসেছে তাঁর দেউলে।

বরণ করতে ভুলে গেলেন চন্দ্রমণি। যেন ঘোরের মধ্যে পাশে দাঁড়ানো কাত্যায়নীর হাতে কুলো-বরণডালা ধরিয়ে দিলেন। বললেন, ওরে, ধর এসব। হাতটা খালি করতে দে।

সন্ধ্যা নেমে এসেছে কিছু আগে। সারাদিন দাবদাহের পরে ঝিরঝিরিয়ে বাতাস বইছে। আজ কালরাত্রি। আগামীকাল বাড়িতে বউভাতের অনুষ্ঠান, তারপর গদাধর-সারদার ফুলশয্যা। কয়েকটা প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে নিকনো উঠোনের প্রান্তে, মাটির দাওয়ার ওপর। ঘরের মুখেই পাতা হয়েছে শিল। দুধে-আলতায় পা ডুবিয়ে নতুন বউকে শিলের ওপর দাঁড়িয়ে আশীর্বাদ নিতে হবে। তার পর গৃহপ্রবেশ। আলপনা এঁকে রাখা হয়েছে সিঁড়ির দু’ধারে।

কিন্তু বধূ বরণের পালা যে তারও আগে।

কাত্যায়নী অবাক হয়ে মা-র দিকে তাকিয়ে বলল, কী হল মা, বরণ করবে না?

চন্দ্রমণি দেবী ততক্ষণে এগিয়ে গেছেন ঈশ্বরচন্দ্রের কাছাকাছি। বললেন, এ বউকে আর অন্য কিছু দিয়ে বরণ করা যায় না, ওসব পরে হবে। বলতে বলতে হাত বাড়িয়ে দিলেন চন্দ্রমণি সারদার দিকে। আবার বললেন, আয় মা কোলে আয়। এতদিন তোকে চোখে দেখিনি, কিন্তু ঠিকই টের পেয়েছি, লক্ষ্মী আমার ঘরে আসছে। বুকে আয় মা, শুধু বরণ করে এ বুক জুড়োবে না। আয়।

লাল চেলি পরা, আটপৌরে ছোট্ট বউকে কোলে তুলে নিলেন শাশুড়ি ঠাকরুন। আর একই সঙ্গে আত্মীয়স্বজন পাড়া-প্রতিবেশীরা উলু দিয়ে, শঙ্খধ্বনি করে মুখরিত করে তুলল কামারপুকুরের শান্ত নির্জন পল্লি। কেউ কেউ ফুল ছড়িয়ে দিল। যেন শঙ্খধ্বনি আর পুষ্পবৃষ্টির মধ্যে দিয়ে এক স্বর্গীয় বাতাবরণ রচিত হল কোনও ভবিষ্যৎ তীর্থক্ষেত্রের।

পরের দিন সকাল থেকেই ব্যস্ততা ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়ের গৃহে। লোকজনের আনাগোনা। পল্লিগ্রামে খবর ছড়িয়ে পড়েছে, সাক্ষাৎ মা লক্ষ্মীর সঙ্গে বিয়ে হয়েছে গদাধরের। খবর পৌঁছেছে গ্রামের জমিদার বাড়িতে। হৃদয়বান জমিদার ধর্মদাস লাহা গদাধরকে স্নেহ করতেন ছোট থেকেই। তাঁদের গৃহসংলগ্ন পাঠশালাতেই পড়তেন গদাধর। পুজোআর্চাও করতেন জমিদার বাড়ির আটচালায়। লাহাবাবু স্বয়ংপ্রবৃত্ত হয়ে ধর্মপ্রাণ ব্রাহ্মণ বাড়িতে এলেন কনে দেখতে।

মাত্র ছ’বছরের বালিকাকে দেখে বোধহয় নিঃসংশয় হতে পারেননি ধর্মদাস লাহা। চন্দ্রমণিকে জিগ্যেস করলেন, এই মেয়েটির সঙ্গে বিয়ে হয়েছে। স্নেহবিগলিত চন্দ্রমণি উত্তর দিলেন, হ্যাঁ জমিদারবাবু, এই আমার ছোট বউমা, সারদা। জয়রামবাটির রামচন্দ্র মুখুজ্যের বড় মেয়ে। আশীর্বাদ করুন, যেন আমার গদাই আর বউমা চিরসুখী হয়।

ধর্মদাস বললেন, আপনারা কামারপুকুরের সজ্জন পরিবার। আমার থেকে অনেক বেশি পুণ্যবান পুণ্যবতী আপনারা।

চন্দ্রমণি বললেন, তা বললে কী করে হবে লাহাবাবু? আমরা গরিব ব্রাহ্মণ, কিন্তু আপনি যে কামারপুকুরের জমিদার। আপনার আশীর্বাদের অন্য মূল্য আছে।

কিছু একটা চাপা আকুতি বোধহয় ফুটেছিল চন্দ্রমণির কণ্ঠস্বরে। ধর্মদাস তা খেয়াল করেও নীরব রইলেন। কিছু পরে নতুন বউকে আশীর্বাদ করে চলে যাওয়ার আগে চন্দ্রমণিকে বললেন, সত্যি বড় লক্ষ্মীমন্ত, সুগৌরী আপনার বউমা। এর চোখমুখের মধ্যে যেন আলাদা একটা জ্যোতি আছে। এইটুকু বলে আবার যোগ করলেন, আজ শুভদিন। যদি কোনও কিছুর প্রয়োজন অনুভব করেন, অবশ্যই নিঃসংকোচে জানাবেন।

সুখী হয়েছিলেন চন্দ্রমণি। একটা স্বস্তির শ্বাস পড়েছিল তাঁর ধর্মদাস লাহার কথায়। আসলে মুখ ফুটে তখনই কিছু বলতে পারেননি, কিন্তু মনে মনে সাময়িক একটা সাধ জেগেছিল তাঁর। আর কিছু না, দারিদ্র্য তো তাঁদের চিরসঙ্গী, তা সত্ত্বেও এমন একটা শুভদিনে যখন আত্মীয়বন্ধুর সমাবেশ ঘটবে সন্ধ্যায়, অন্তত কিছুক্ষণের জন্য হলেও যদি কয়েকটা স্বর্ণালংকারে সাজাতে পারতেন বউমাকে। অন্তরে তিনি নিজেও কি আর জানেন না স্বর্ণাভরণের দ্যুতির চেয়ে, তাঁর পুত্রবধূর উজ্জ্বলতা অনেক বেশি। তা হলেও এমন শুভদিনে মায়ের মন যে একটু বেশি সাজ-প্রসাধন-অলংকারের প্রত্যাশা করেই। হাজার হোক তিনিও তো মহিলাই। তা ছাড়া সামাজিক সম্ভ্রম রক্ষা করার কিঞ্চিৎ আগ্রহ কি খুব বেশি চাওয়া, কিংবা দোষের?

কিছুটা কুণ্ঠার সঙ্গেই পরের দিন দুপুরের নির্জনতায় লাহাবাবুদের বাড়িতে গিয়েছিলেন চন্দ্রমণি। আর ফিরে এসেছিলেন সারদাকে সন্ধ্যাবেলা সাজাবার জন্য কয়েকটা সোনার অলংকার নিয়ে। নানা রকম যৌতুক এমনিতেই পেয়েছিল সারদা। কিন্তু কনে সাজাবাব সময় সোনার গহনা দেখে দু’চোখে ঝিলিক দিয়ে উঠল তার। এমন সুন্দর অলংকার সে কোনওদিন চোখেই দেখেনি। আবেগে খুশিতে কৌতূহলে বারবার এপাশ, ওপাশ ঘুরে বালিকা তার অঙ্গসজ্জা দেখল।

অতিথিরা নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে এসে গদাধরের বউ দেখে ধন্য ধন্য করে গেলেন। বউ তো নয়, যেন ছোট্ট দেবীপ্রতিমা এসে কামারপুকুর আলো করে দিয়েছে। ভূরিভোজের পরে ফিরে গেলেন নিমন্ত্রিতরা। নির্জনতা নেমে এল মাটির বাড়ির উঠোনে, ঘরে। গ্যাস আর তেল কমে গিয়ে নিবু-নিবু হয়ে এল আলোর ছটা। গদাধরের ছোট্ট মাটি আর বেড়ার ঘরেই ফুলশয্যার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সারাদিনের উত্তেজনা আর ব্যস্ততার পর ক্লান্তি নেমে এসেছে পরিবারের মানুষজনদের শরীরে। বউ আর মেয়েরা তার মধ্যেও হইচই আর হাসাহাসি করে নববধূকে ফুলশয্যায় পৌঁছে দিয়ে গেল। বাচ্চা মেয়ে সে। সারাদিন ধকলের পরে সে নিজেও ক্লান্ত।

মাত্র একজনের চোখেই ঘুম আসছে না। চন্দ্রমণি দেবী। বুকের মধ্যে তাঁর পাথর চেপে থাকার অনুভূতি। নিঃশব্দ উভয়সংকটের দোটানায় একটা চাপা হাহাকারের আর্তি বিদীর্ণ করে দিচ্ছে তাঁর মাতৃহৃদয়। লাহাবাবুর বাড়ি থেকে অলংকার চেয়ে নিয়ে এসে তিনি পুত্রবধূকে সাজিয়েছিলেন। কিন্তু সেসব তো ফেরত দিতে হবে। অথচ কেমন করে কন্যাসমা সরলা বালিকাবধূর গা থেকে সেই সব গহনা তিনি এবার খুলে নিতে পারেন!

গহনা পরিয়ে সাজিয়ে দেবার সময় ছোট্ট বউমার সেই আনন্দোজ্জ্বল মুখ তো তিনি দেখেছিলেন। খুশিতে হাসিতে মেয়ে যে ভেসে যাচ্ছিল তখন। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিজেকে দেখে সে নিজেই তো মুগ্ধ। চেলিতে-মালায়-চন্দনে-অলংকারে বিভোর হয়েছিল সারদা নিজের রূপে।

প্রাণ থাকতে চন্দ্রমণি কি স্নেহের বালিকাকে আর নিরাভরণা করতে পারেন!

বুক ফেটে যাচ্ছে তাঁর। আবার লাহাবাবুদের বাড়িতে কথার খেলাপ হলে আত্মসম্মান খোয়ানোর প্রশ্নটাও যে তাঁকে বিদ্ধ করছে। উৎসব শেষের নির্জন, আবছায়ামাখা গ্রাম্য বাড়িতে দ্বন্দ্ব আর সংকটে একাকী দীর্ণ হতে লাগলেন চন্দ্রমণি। কাকে বলা যায়? কার সঙ্গে নিজের এই টানাপোড়েন নিয়ে আলোচনা করা যায়! কে সত্যি সত্যি বুঝবে তাঁর বেদনা কোথায়!

কাছেই পায়ের শব্দে মুখ তুললেন চন্দ্রমণি। গদাধর। তাঁর আপাত উদাসীন কনিষ্ঠপুত্র গদাই। কী এক মায়াময় আলোয় এই আবছা আঁধারেও তাঁর সৌম্য মুখখানি জ্যোতির্ময়। তখনও ফুলের মালা তাঁর গলায়। সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে।

দৃষ্টিতে প্রশ্ন গদাধরের। জন্মদাত্রীর সামনে এসে স্মিত হেসে মাকে স্পর্শ করলেন৷

মা, কী হয়েছে? শুতে যাবে না?

মনের কথা বলতে বাধল চন্দ্রমণির। নিজেকে গোপন করতে চাইলেন। বললেন, হ্যাঁ বাবা, এই… যাব এবার। কাজকর্ম মিটল সবে…। ঘনিষ্ঠ হয়ে এলেন গদাধর। —কী হয়েছে বললে না তো?

না, তার পরেও বলতে পারলেন না চন্দ্রমণি। আসল কথাটা এড়িয়ে শুধু বললেন, কী আর হবে বাবা? বড় আনন্দের দিন আজ…

তা হলে তোমার মুখে দুশ্চিন্তা আর নিরানন্দের ছায়া কেন মা?

চমকে উঠলেন চন্দ্রমণি। ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় দ্রুত বললেন, কোথায়? না তো! অন্ধকারে ভুল দেখছিস বাবা।

ছেলে হয়ে মাকে ভুল দেখব?

ছোট্ট বাক্য। কিন্তু চন্দ্রমণি টের পেলেন, এ ছেলের কাছে নিজেকে লুকোতে পারবেন না।

তাঁর নৈঃশব্দ্যের মধ্যে গদাধর আবার বললেন, মনটাকে মুক্ত করে দাও না মা। আমি তো রয়েছি।

আর নিজেকে চাপতে পারলেন না চন্দ্রমণি। ‘আমি তো রয়েছি’ কথাটাতেই তাঁর মনে হল, এ যেন গদাধর নয়, আর কেউ বলছে। কয়েক মুহূর্তের নীরবতার পরে আত্মসংকট প্রকাশ করে ফেললেন চন্দ্রমণি। শেষে যোগ করলেন, আমায় ভুল বুঝিসনি বাবা। কিন্তু মা হয়ে কি বউয়ের গা থেকে…

থাক, থাক, থাক আর বলতে হবে না। মায়ের হাত ধরে হেসে উঠলেন গদাধর। তারপর অভয় দিলেন।

শোনো মা, রাত্রিবেলা ও যখন ঘুমুবে, আমি আস্তে আস্তে সব গয়না খুলে দেব। তুমি লাহাবাবুদের ফেরত দিয়ে এসো। ঠিক আছে?

ছোট্ট মেয়ে, বড্ড কান্নাকাটি করবে বাবা।

আবার ভুলেও যাবে।

কিন্তু আমি ভোলাব কী করে বল তো?

মুহূর্তমাত্র চিন্তা না করে গদাধর বললেন, তুমি ওকে বলবে, গদাই তোকে এর থেকেও অনেক ভাল ভাল গয়না পরে গড়িয়ে দেবে। অবাক হয়ে চন্দ্রমণি বললেন, তুই কোত্থেকে দিবি বাবা?

একটু হেসে গদাধর বললেন, মা, ওর নামই সারদা। সরস্বতী ঠাকুরের কি কখনও গয়নার অভাব হয়েছিল?

কেমন যেন বিভ্রান্ত বোধ করলেন চন্দ্রমণি। কী কথা সব বলে গেল গদাই!

কিন্তু আর কোনও প্রশ্ন করতেও পারলেন না। মনটা ঠান্ডা হয়ে গেছে তাঁর। শুধু তাকিয়ে দেখলেন, একটা হালকা আলোর আভাও যেন গদাধরের পায়ে পায়ে ঘরে চলে গেল।

গায়ে গহনা নেই দেখে, ঘুম থেকে উঠে সারদা কান্নাকাটি করল বটে। কিন্তু কোলে নিয়ে শাশুড়ির আদর আর ছেলের শিখিয়ে-দেওয়া কথাতে সত্যি সত্যি ভুলেও গেল কিছুক্ষণ পরে। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন চন্দ্রমণি। খেয়াল করে দেখলেন ছোট্ট বউমার মনে কোনও আক্ষেপ নেই, আচরণেও নেই কোনও অসংগতি। ইতিমধ্যেই বাড়ির আর পাড়ায় আরও কয়েকটি ছোট ছোট মেয়ের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব পাতানো হয়ে গেছে। গল্প, হাসাহাসি শুরু হয়ে গেছে। বালক বালিকাদের আলাদা নিজস্ব জগৎ থাকে, নির্মল আনন্দে তারা আপনি ভেসে যেতে পারে। সংকোচ, উৎকণ্ঠা তাদের কাবু করতে পারে না। বেলা একটু বাড়ার আগেই অন্যান্য বাচ্চাদের সঙ্গে সারদাও ছুটল শ্বশুরবাড়ির আঙিনা পার হয়ে গাছ থেকে ঝরে পড়া খেজুর কুড়োতে। নতুন জায়গায় এসে চোখেমুখে তার খুশি আর ধরে না।

সবই ঠিক ছিল। কিন্তু গতকালের সেই গহনাকে কেন্দ্র করে আবার যে কোন কোনও পারিবারিক জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে, কারওরই তা মাথায় আসেনি। অথচ দুর্ভাগ্যবশত তাই হল এবং অশান্তিটা ঘটালেন সারদারই বড় কাকা ঈশ্বরচন্দ্র। রামচন্দ্র হাজারটা কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন জয়রামবাটিতে মেয়ের বিয়ের পরে। অভিভাবকস্বরূপ ভাইকেই দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছিলেন মেয়ের সঙ্গে নতুন কুটুমবাড়িতে। ঈশ্বরচন্দ্র খুশিই হয়েছিলেন নতুন আত্মীয় বাড়ির আপ্যায়নে-যৌতুকে-আতিথেয়তায়।

বিকেলবেলা জয়রামবাটি ফিরে আসার আগে ঈশ্বরচন্দ্র দেখা করেছিলেন ভাইঝির সঙ্গে। কিন্তু সারদাকে দেখামাত্র তাঁর ভ্রু কুঞ্চিত হয়ে উঠল। দুরন্ত ক্ষোভ আর হতাশা সঞ্চারিত হল তাঁর মনে। সারদা নিরাভরণা। গত কাল বউবেশে যেসব স্বর্ণালংকার শোভা পাচ্ছিল তার গলায় হাতে-কানে, তার কিছুই নেই! কী করে তা হতে পারে!

খোঁজ করলেন ঈশ্বরচন্দ্র।

কিন্তু বৃত্তান্ত শুনে তিনি আদৌ আশ্বস্ত তো হলেনই না, তাঁর ক্ষোভও বিন্দুমাত্র প্রশমিত হল না। বিষয়টা যে তলিয়ে ভাববার দরকার ছিল, সেটুকুও মাথায় এল না ঈশ্বরচন্দ্রের। রীতিমতো ক্রোধ আর উম্মা প্রকাশ করে, দ্রুত একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন তিনি। রোদ একটু পড়তে না-পড়তেই ভাইঝিকে শ্বশুরবাড়ি থেকে কোলে তুলে নিয়ে ঈশ্বরচন্দ্র জয়রামবাটি ফিরে গেলেন। ক’দিন পরে নব বরবধূ এমনিতেই জোড়ে আসতেন জয়রামবাটি, কিন্তু ঈশ্বরচন্দ্র এতটাই ক্রোধে উন্মত্ত হয়েছিলেন যে, তাঁর আর তর সইল না।

চন্দ্রমণি দিশাহারা। নিরানন্দ আর অবসাদের ঢল নেমে এল কামারপুকুরের বাড়িতে। ঘটনার আকস্মিকতায় গ্রাম্যগৃহের সকলেই মনমরা। কিন্তু স্মিত হেসে সকলকেই আশ্বস্ত করলেন গদাধর। বললেন, তোমরা ভাবছ কেন? একবার যখন মন্ত্র পড়ে, মালাবদল করে, সাতপাক ঘুরে গাঁটছড়া বাঁধা হয়ে গেছে, তখন বিয়ে তো আর ফেরত নিতে পারবে না কেউ। তাড়াহুড়ো কোরো না। দেখো না কী হয়!

প্রায় দেড়বছর পরে এখনও রামচন্দ্রের মনে হয়, কী নিদারুণ উদ্বেগ আর মনঃকষ্টে এতদিন কেটেছে তাঁর। ঈশ্বরচন্দ্র যে একটা হঠকারিতা করে এসেছেন, এ-বিষয়ে বিন্দুমাত্র সংশয় ছিল না তাঁর। শত হোক, তিনিই তো মেয়ের বাবা। তা ছাড়া জামাতাটিকে গভীর ভাবে লক্ষ করে তিনি একটি স্থির বিশ্বাসেই বুঝেছিলেন, গদাধর সম্পূর্ণ অন্য প্রকৃতির এক আলোকপ্রাপ্ত ছেলে। সে প্রেমিক ও হৃদয়বান।

এতদিনের মধ্যে বারবারই রামচন্দ্র চেষ্টা করেছেন, যাতে দুই পরিবারের মধ্যে সম্পর্ক-সৌজন্য-আত্মীয়তা ফিরে আসে। আবার তিনি এটাও জানতেন, বৈবাহিক সম্পর্কের এসব আত্মীয়তার অনুভব এমনই স্পর্শকাতর, জটিল, যে, একবার কোথাও ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হলে, তার জের কাটতে সময় লাগে। অনেক তুচ্ছ বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। গ্রাম্য পরিবেশ আর মানসিকতায় মুখে মুখে আলোচিত হতে শুরু করে নানান কথা, জটিলতা বৃদ্ধি পায়।

অবস্থাটাকে একটু থিতোতে দিয়েছিলেন রামচন্দ্র। তা ছাড়া বিয়ের সময় তাঁর মেয়ের বয়েসও ছিল সাড়ে পাঁচের কম। এখন সারদার বয়স সাত বছর। যদিও এখনও নেহাতই বালিকা সে, তা হলেও দেড়-দু’বছর আগেকার স্মৃতি কিছুই কি তার মনে নেই!

আছে বলেই রামচন্দ্রের ধারণা। তা নয়তো আজ এতদিন পরে জামাই এবাড়িতে আসছে জানার পর থেকে, মেয়ের অমন খুশি খুশি ভাব-ই কি তিনি লক্ষ করতেন? খুশি আজ শ্যামাসুন্দরীও। মনোবেদনা তিনি চেপে রেখেছিলেন। বিয়ের পরে মেয়ে-জামাইয়ের জোড়ে আসা হয়নি। আজ এতদিন পরে আসছে। জোড়ে না হলেও, আসার পরে তো জোড়েই দেখতে পাবেন।

সামর্থ্যের মধ্যে যেটুকু সম্ভব আজ আয়োজনও করেছেন শ্যামাসুন্দরী-রামচন্দ্র। একদিক থেকে ভাল হয়েছে শীতকাল আসছে বলে। তা ছাড়া আর ক’দিন পরে সারুমা-র জন্মদিন, সেটাও মাথায় রেখেছেন শ্যামাসুন্দরী। ক’টা দিন জামাইকে আটকে রাখতে কি পারবেন না?

বড় সুন্দর আর পরিচ্ছন্ন দিন আজ। অগ্রহায়ণের মাঝামাঝি। মিঠে রোদে বাঁকুড়া জেলার প্রান্তিক জয়রামবাটি গ্রাম সকালের উষ্ণতা উপভোগ করছে। রাঢ়বঙ্গের আবহাওয়ার তীব্রতা, ভোরবেলা শীতের কনকনানি আবার দুপুর হতে না-হতেই তেতে ওঠা, হুগলি জেলার কাছাকাছি এসব গ্রামে ততখানি অনুভূত হয় না। শীতকালের ঠান্ডা আর শুখোরুখো আবহাওয়ারই আধিপত্য এখন। উত্তুরে হাওয়া ঝাপটা দেয় মাঝে মাঝে। মাঠে ঘাটে শস্য আর সবজির নধর সবুজ পাতায় শিশির চিকচিক করে সকালবেলা। ভিজে ভাব হয়ে থাকে ঘরের চালে-উঠোনে বাগানে। খেজুর আর তালগাছগুলোর অগ্রভাগ চেঁছে ফেঁড়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে রস আহরণের জন্য। শুকনো পাতা ঝরার মরশুমও এখন। উঠোন ঝাঁট দিয়ে সেই সব পাতাও সংগ্রহ করে রেখে দেওয়া হয়েছে দেউড়ির দিকে। রস থেকে গুড় আর পাটালি বানাবার সময় ওই সব শুকনো পাতার জ্বাল কাজে লাগবে। গরিব গ্রাম্য মানুষদের সারা বছরই এটা সেটা গুছিয়ে রাখার কথা ভাবতে হয়।

রামচন্দ্রের নির্জন গ্রাম্য ভিটেবাড়িতে আজ সকাল থেকে কিঞ্চিৎ ব্যস্ততার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। মেয়ের বিয়ের পরে জামাই আজ প্রথম আসছে। সঙ্গে আরও দু’-একজন আসতে পারেন। ভাগ্নে হৃদয় মুখুজ্যে যে আসবে, সেকথা শ্যামাসুন্দরী-রামচন্দ্র আগেই শুনেছেন। দারিদ্র্য সত্ত্বেও যেটুকু দিয়ে জামাইকে আপ্যায়ন করা যায়, তার ত্রুটি করতে চান না রামচন্দ্র। প্রাতঃকৃত্য সেরেই তিনি একটা থলে নিয়ে বেরিয়েছেন শিহড়ের হাটতলা থেকে যা হোক কিছু বাজার-দোকান করে আনতে। নীলমাধব-ও আজ বাড়িতে রয়েছে বড় বউদি শ্যামাসুন্দরীকে কাজেকর্মে সাহায্যের জন্য। ছোট ছোট ছেলেমেয়ে, তার ওপর সংসারের কাজ সামলাতে এমনিতেই তাঁর প্রাণান্ত। একমাত্র সারদাই যেটুকু পারে মাকে সাহায্য করে। ঈশ্বরচন্দ্র সম্ভবত নিজের অস্বস্তি এড়াবার জন্যই সকাল থেকে বেরিয়ে গেছেন। সেজ জা অবশ্য ঘরেই আছে। ছেলে সূর্য, সারদার খুড়তুতো ভাই হলেও প্রায় সমবয়সি এবং প্রায়শই কাছাকাছি থাকে।

ভিতর-বাড়ির মাটির ঘরের দাওয়ায়, চাটাই আর কাঁথা পেতে কালীকুমারকে শুইয়ে রেখে হাতের কাজ সারছিলেন শ্যামাসুন্দরী। মুড়ি ভাজছেন পোড়ামাটির হাঁড়িতে। একই সঙ্গে খেয়াল রেখেছেন সদরে আর অন্দরে। আগের দিন রাতে চাল ভিজিয়ে রেখেছিলেন কয়েক কুনকে। একটুখানি তফাতেই নীলমাধব শিলজোড়া নিয়ে বসেছে চাল বাটতে। ওদিকে উঠোন ঝাঁট দিচ্ছে সারদা। যথারীতি সঙ্গে বকর বকর করে ঘুরছে সূর্য। কাদম্বিনী-প্রসন্ন আর উমেশও রয়েছে ভিতর-বাড়িতে। নরম রোদ গাছের ছায়া পড়েছে উঠোনে।

শ্যামাসুন্দরী দেখলেন উঠোন থেকে ধুলো উড়ছে। একটু গলা উঁচু করে সারদাকে বললেন, মা সারু, একটু জল ছিটিয়ে দে উঠোনে। ধুলো উড়ছে। আর পাতাগুলো জড়ো করে রেখে দে বেড়ার ধারে।

সারদার পরনে ছোট্ট ডুরে শাড়ি। পাতলা চাদরটা গাছকোমর করে বাঁধা। সরু সরু ছোট দু’হাত দিয়ে নারকোল কাঠির ঝাঁটার গোছ ধরে উঠোন ঝাঁট দিচ্ছে। মা-র গলা শুনে একটু এগিয়ে এসে বলল, জল ছিটোলে আবার পাতা ভিজে যাবে না! আজ যে রস জ্বাল দেবে বলছিলে?

তা হোক বাপু, শ্যামাসুন্দরী বললেন, অনেক শুকনো খেজুরপাতা ডাঁই করে রাখা আছে। ধুলোতে বড় নাক জ্বালা করে। টিনের হাঁড়িটায় জল আছে, নিয়ে যা। তারপর এসে সিঁড়ির ধারে একটু আলপনা দিয়ে দিস। কাকা চাল বাটা আলাদা করে রেখে দেবে।

বরের স্মৃতি কিছুটা ঝাপসা হয়ে এসেছে সারদার। তা হলেও ফর্সা মুখটা তার মনে আছে। আর সে আজ আসবে বলেই যে বাড়িতে ব্যস্ততা এসব তার জানা। মনটা খুশি হয়ে রয়েছে। জল নিতে এসে বলল, মা, আমি কখন নাইতে যাব?

গরম বালির খোলায় চাল নাড়তে নাড়তে শ্যামাসুন্দরী বললেন, তাড়া কিছু নেই মা। জামাই এসে পৌঁছতে বেলা হবে।

মা, আমি কি মালা গেঁথে রাখব?

ঠোঁট টিপে হাসলেন শ্যামাসুন্দরী। বললেন, আচ্ছা হবে। আগে হাতের কাজ সেরে নে। খুড়িমা সাজিয়ে গুছিয়ে দেবে, তারপর।

একটু ইতস্তত করে সারদা আবার বলে, আমি কবে শ্বশুরবাড়ি যাব মা?

শ্যামাসুন্দরী কিছু বলার আগেই পাশ থেকে নীলমাধব হেসে বললেন, শ্বশুরবাড়ি যাবি কী রে? আগে দেখ তোর বর তোকে নিয়ে যায় কি না। হয়তো ভুলেই গেছে এত দিনে।

সারদা ভ্রুকুটি করে বলল, ইস্‌-স, ভুলে গেলে আসছে কেন?

নীলমাধব ঠাট্টা করে বললেন, তোর জন্য কি আর আসছে! সে কত বড় মানুষ জানিস? দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের সে পুজুরি, সাধন-ভজন নিয়ে থাকা লোক।

সারদা হঠাৎ বলল, আমায় ছাড়া তার সাধনভজন হবেই না।

নীলমাধব চোখ বড় বড় করে বললেন, ওমা, সেকথা আবার তোকে কে বলল?

সরলমতি বালিকা হেলায় বলে দিল, আমি জানি। আমি যে তার বউ। বউ-ই তো বরের শক্তি, জানো না?

সাত বছরের ভাইঝির কথা শুনে বিস্মিত হয়ে গেলেন নীলমাধব। চাল বাটা থামিয়ে শ্যামাসুন্দরীকে বললেন, ও বউদি, তোমার মেয়ে কথাটা কী বলল শুনলে?

শ্যামাসুন্দরী চালুনির ওপর পোড়া বালি আর ফুটফুটে মুড়ি ঢেলে দিতে দিতে বললেন, ঠাকুরপো, আমি তো মাঝেমধ্যেই ও মেয়ের কথা শুনে প্রায় ভিরমি খেয়ে যাই। তোমার বড়দাদাকেও বলেছি সেকথা।

সারদা ততক্ষণে আবার আঁজলা করে জল ছড়াতে ছড়াতে উঠোন ঝাঁট দিতে চলে গেছে। নীলমাধব কিছুক্ষণ থম হয়ে থেকে বললেন, হ্যাঁ বউদি, সেই যে একবার জগদ্ধাত্রী পুজোর সময় হলদে পুকুরের রামহৃদয় ঘোষাল সারুকে জগদ্ধাত্রীর সামনে দেখে, কে দেবী আর কে সারু গুলিয়ে ফেলেছিলেন, সেই সবের পিছনে কি তা হলে…

আমায় আর কিছু জিগ্যেস কোরো না ঠাকুরপো। মুড়ি চালতে চালতে শ্যামাসুন্দরী বললেন, মনে আমার অনেক কিছুই হয়, মুখ ফুটে সব কি আর বলতে পারি? শুধু এইটুকু টের পাই, জন্মজন্মান্তরের পুণ্যি না থাকলে, ও মেয়ে আমি পেটে ধরতে পারতাম না। মাথা নেড়ে নীলমাধব বললেন, কেন তোমার অমন মনে হয় বলো তো?

কী জানি… সেই ওর জন্ম থেকে, বিয়ে হওয়া থেকে, কথাবার্তা শুনতে শুনতেই বোধহয় দেখেশুনে মনে হয়, ও যেন আর সবায়ের মতন নয়। কয়েক মুহূর্ত আনমনা থেকে নীলমাধব আবার চাল বাটতে লাগলেন। কাদম্বিনীকে ডেকে শ্যামাসুন্দরী দাওয়ায় শুইয়ে-রাখা কালীকুমারের কাঁথাটা পালটে দিতে বললেন।

নীলমাধব বললেন, বউদি চাল তো বাটছি। কিন্তু জামাইয়ের জন্য যে পায়েস, পুলিপিঠে করবে, তার দুধ কোথায়!

শ্যামাসুন্দরী বললেন, রাধানাথ ঘোষকে তো পরশু দিনই বলে রেখেছি। শিওড় থেকে এসে তোমার দাদাও একবার খোঁজ নেবেন।

দ্যাখো… নেহাত না হলে সেদ্ধপিঠে আর সরুচাকলি করেই জামাইকে খাওয়াবে। আমাদের গাই-এর দুধে কি হবে?

ও তো জোলো দুধ এখনও। তা ছাড়া সদ্য বিইয়েছে…প্রাণ ধরে ও দুধ এখন আমি দুইতে পারব না। শ্যামাসুন্দরী বললেন।

নীলমাধব নিজেই হাসতে হাসতে বলল, তাই তো… মায়ের জাত বলে কথা…!

শ্যামাসুন্দরী মনে করানোর মতো নীলমাধবকে বললেন, ঠাকুরপো, ঝুনো দেখে দুটো নারকোল ছাড়িয়ে রাখতে ভুলো না। তোমার সেজ বউদিকে বলা আছে, পরে কুরিয়ে দেবে। ছোবড়াগুলো যেন ফেলে দিয়ো না, আঁচ ধরাতে কাজে লাগবে।

রামচন্দ্র ফিরে এলেন তাড়াতাড়িই। সদ্য শীতের সবজি-টবজি ভালই পেয়েছেন হাটতলায়। সবচেয়ে বড় কথা, মাঝারি সাইজের গোটা কয়েক টাটকা সরপুঁটি মাছও এনেছেন। মুদি দোকান থেকে অল্প কিছু তেলমশলা, ডাল, আর ঘানি-ভাঙা একশিশি সরষের তেল। বাজার নামিয়েই বললেন, ওগো, আমাদের আর দেরি করার উপায় নেই। ঘোষের পো দুধটা এখনই নিয়ে যেতে বলেছে। আঁশের হাতে আর ছুঁতে পারিনি। যাই নিয়ে আসি।

উঠোন দিয়ে বেরুবার মুখে ভাইপোকে ডাকলেন রামচন্দ্র।

ও সুয্যু, একটু গোয়ালের কাছে আয় তো বাবা আমার সঙ্গে। এঁড়ে বাছুরটা খোঁটা উপড়ে ফেলছে, একটু ঠুকে দিয়ে যা।

বাবাকে গোয়ালের দিকে যেতে দেখে সারদা বলল, বাবা, বেশি দেরি কোরো না, এখনও তোমার পুজো করা হয়নি আজ।

মনে আছে মা, সব মনে আছে। বলতে বলতেই ঘুরে দাঁড়ালেন রামচন্দ্র। মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, হ্যাঁ রে, তুই এখন সেই বাসি কাপড়ে উঠোন ঝাঁট দিচ্ছিস? একটু সাজগোজ করবি কখন? তারা তো সকাল সকালই এসে পড়বে।

উত্তর দিলেন শ্যামাসুন্দরী দাওয়া থেকে। চেঁচিয়ে বললেন, আচ্ছা ওসব নিয়ে তোমায় ভাবতে হবে না। দুধটা তাড়াতাড়ি নিয়ে এসো। আর ক্ষেত্র বিশ্বাসের বাড়িতে বলে দিয়ো, ভানু যেন সময় পেলেই একবার আসে।

সদগোপ বংশীয় ক্ষেত্রমোহন বিশ্বাসের মেয়ে সারদার ভানুপিসি। রামচন্দ্রেরই যজমান তাঁরা। বড় ভক্তিমতী মেয়ে ভানু। অথচ অভাগিনী। কুড়ি বছরের মধ্যেই নিঃসন্তান আর বিধবা হয়ে জয়রামবাটি বাপের বাড়ি ফিরে আসে। আসল নাম অবশ্য মানগরবিনী, সেই থেকে মানু, তার পর ভানি। সারদাকে বড় ভালবাসেন ভানুপিসি। বাপের বাড়িতে ভানুকে যে অনেক লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সহ্য করে থাকতে হয়, শ্যামাসুন্দরী জানেন। কিন্তু তিনিও নিরুপায়। সুযোগ-টুযোগ হলে ভানুকে তিনি ডেকে পাঠান বাড়িতে। কাজেকর্মে নিজেরও উপকার হয়, আর ভানুরও বদ্ধ বাড়ির পরিবেশ থেকে বেরিয়ে মনটা হালকা হয়।

সবথেকে বড় কথা, ভানুপিসি এলে সারদাও খুব খুশি হয়।

নাম শুনেই ছুটে এল সারদা আবার দাওয়ার কাছে। —ভানুপিসি আসবে মা?

শ্যামাসুন্দরী বললেন, বলে তো রেখেছি মা, তারপর দেখি… কখন বাড়ি থেকে ছাড়া পায়। বাপের জন্য তো নয়, ওর দাদা গৌর বিশ্বাসটাই বড্ড হাঁকডাক করে কষ্ট দেয় মেয়েটাকে।

আমি ডেকে আনব মা ভানুপিসিকে?

শ্যামাসুন্দরী বললেন, থাক। তুই বরং এবার পুণ্যিপুকুর থেকে ডুবটা দিয়ে আয়। জামাই আসবে ভানু জানে। সময় পেলে ঠিক আসবে। দাওয়ার কোণে ঝাঁটাটা লুকিয়ে রেখে পুকুরে গেল সারদা।

কেমন একটা ছটফট আনন্দে বার বার আজ আনমনা হয়ে পড়ছে সারদা। দেড় বছরের ওপর অদর্শনে মানুষটার চেহারা কিছু ঝাপসা হয়ে গেছে। খেলাধুলো-ভাইবোন-ঘরের কাজকর্মে থাকায় সব সময় মনে করতেও পারেনি। তা সত্ত্বেও যখনই মনে পড়েছে, অদ্ভুত একটা টান অনুভব করেছে, মনে হয়েছে, অনেকের মধ্যে থেকেও ওই মানুষটা ছিল অন্য রকম। আর তার ঠাট্টা-রসিকতারও তুলনা হয় না। গুরুজন বলে এমনিতেই যথেষ্ট সম্ভ্রমের চোখে দেখতে হয়েছিল, তা ছাড়া পরে রাতের দিকে তো সারদারই ঘুমে চোখ জুড়ে আসছিল।

একা একা পুকুর পাড়ে বসে মনটা উদাস হয়ে যায় সারদার। কেন যে এমন একটা চাপা উথাল-পাথাল ভাব হচ্ছে। আর কারুর জন্য কখনও তো ঠিক এমন আকুলি-বিকুলি করেনি মন। শুধু স্বামীর জন্যই কি মেয়েদের অমন হয়? পুণ্যিপুকুরের স্থির জলের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে খুব গভীরভাবে ভাবার চেষ্টা করে সারদা স্বামী ব্যাপারটা আসলে কী!

নাহ্‌ খুব স্পষ্ট পরিষ্কার কোনও উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না।

আপনা থেকে হাত দুটো কপালে উঠে এল। তারপরেই টুপ করে জলে পড়ে সাঁতার দিল সারদা। গা শিরশিরে ভাবটা কেটে গিয়ে দিব্যি আরাম বোধ হল। শাড়ি নিংড়ে গা মুছে যখন উঠে এল, তখন মাঝসকালের রোদে, পাখির ডাকে, সবুজে, গাছের ছায়ায়—জয়রামবাটি যেন সুখী উষ্ণতায় ভেসে যাচ্ছে।

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু ব্যস্ততাও বেড়েছে বাড়িতে। একই সঙ্গে অঘোরমণি আর ভানুপিসিকে দেখে খুশি হয়ে উঠল সারদা। পাশে কাকিমার ঘরে সাজগোজ হাসাহাসিও শুরু হয়ে গেল। আর দুপুরের আগে তাঁরাও এসে পড়লেন। রামচন্দ্র একটি গোরুর গাড়ির ব্যবস্থা করেছিলেন আমোদর নদের এপাশ থেকে জামাইকে আনার জন্য। কিন্তু গদাধর আর ভাগ্নে হৃদয়সহ জনা পাঁচেকের দলটি মুকুন্দপুর হয়ে পায়ে হেঁটেই এসে পৌঁছলেন। হেমন্তের শুরু থেকেই জল কমে যায় আমোদর নদের। চর জেগে ওঠে। মাঝে মাঝে ছোট-বড় দহ সৃষ্টি হলেও হুগলি থেকে বাঁকুড়া জেলায় চরের ওপর দিয়ে আসাটাই সুবিধে। মিঠেল রোদ, ঝিরঝিরে হাওয়া আর গাছের ছায়ায় ছায়ায় দু’-আড়াই মাইল পথ হেঁটে আসতে ক্লান্তির প্রশ্ন ছিল না। জামাই এসে পৌঁছতেই যেন অনেক দিন পরে আবার প্রাণের সাড়া পড়ে গেল গাঁয়ের বাড়িতে। বাচ্চারা হইহই করে উঠল। অন্দর মহলে শাঁখও বাজল।

অভিভাবক হিসেবে মেজদাদা রামেশ্বর, সঙ্গে বড়দাদার ছেলে বারো বছরের অক্ষয় আর হালদার বাড়ির এক অনাত্মীয় বন্ধুও এসেছিলেন। কিন্তু তাঁরা তিনজনই জলখাবার খেয়ে, কিছুক্ষণ বিশ্রামের পরে কুটুমবাড়ি ছেড়ে ফিরে গেলেন। রামকুমার আগে থেকে দক্ষিণেশ্বরে ছিলেন বলে রামেশ্বরের দায়িত্ব বেশি কামারপুকুরের বাড়িতে। ছোটমামার সঙ্গে হৃদয় থেকে গেলেন আপাতত। জয়রামবাটি থেকেই পরে তিনি শিহড় ফিরে যাবেন। শ্যামাসুন্দরীর গাঁয়ের ছেলে হিসেবে হৃদয়ের একটা আলাদা পরিচিতিও ছিল এবাড়িতে।

আনন্দে-আড্ডায়-গল্পে-গানে-কীর্তনে বড় দ্রুতই যেন কেটে গেল কয়েকটা দিন। তার মধ্যেই হৃদয় এক কাণ্ড ঘটিয়ে বড়ই কুণ্ঠিতা করে তুলেছিল সারদাকে। ভাবলে এই দু’দিন পরেও লজ্জায় রাঙা হয়ে ওঠে সারদার মুখ কান। আসলে শুধু যে রঙ্গ করার জন্যই হৃদয় কাণ্ডটা করেছিল তা নয়। তার মামা প্রকৃতপক্ষে কত বড় সম্মাননীয় মানুষ, হয়তো তার একটা আন্দাজ দেওয়ার জন্যই করেছিল। বালিকা হলেও, সম্পর্কে তো সারদা তার মামি। তাকেও নিজের সম্মাননীয় ভূমিকা সম্পর্কে সচেতন করা দরকার।

গদাধররা এসে পৌঁছনোর কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ দেখা গেল হৃদয় বেপাত্তা। ইতিমধ্যে রামেশ্বররা ফিরে গেছেন কামারপুকুর। ঘণ্টাখানেক পরে হন্তদন্ত হয়ে ফিরে এল হৃদয়। তার হাতে একগোছা টাটকা পদ্মফুল। উঠোন পার হয়ে দাওয়ার কাছে আসতে আসতেই সে গলা তুলে ডাকল, মামি, ছোটমামি, কোথায় গেলে গো?

মামি ডাক শুনে সারদা নিজেই অভ্যস্ত না। তাও আন্দাজে বুঝে নিয়ে ঘর থেকে মুখ বাড়াল।

হৃদয় আবার বলে উঠল, এই যে মামি, এগুলো দেখছ? কী ফুল বলো তো?

সারদা সংকুচিত স্বরে বলল, পদ্মফুল।

হ্যাঁ, অনেক কষ্টে জোগাড় করে এনেছি। কী হবে বলো তো এগুলো দিয়ে?

সারদা মুখের কাছে শাড়িসুদ্ধ হাত মুঠো করে ধরে বলল, তা আমি কী করে জানব? কী হবে?

হৃদয় বলল, দেখতে পাবে, এখনই দেখতে পাবে। দাঁড়াও আগে হাতমুখ ধুয়ে নিই।

দ্রুত মুখহাত ধুয়ে ফুল নিয়ে ঘরে এল হৃদয়। গদাধর মিটমিট করে হাসতে হাসতে চুপচাপ সব দেখছেন। বাচ্চাগুলোও ভিড় করে দাঁড়িয়েছে। সারদাকে হাত ধরে একটা উঁচু পিঁড়িতে বসিয়ে দিল হৃদয়। তারপর জোড়াসন করে নিজে বসল ছোট্ট মামির পায়ের কাছে। সারদা তো অস্বস্তিতে কুঁকড়ে গেছে ততক্ষণে। কিন্তু উঠে পালাতেও পারছে না।

নিবিষ্ট চিত্তে কিছুক্ষণ ধরে হৃদয় ছোটমাইমার পা পুজো করল পদ্মফুল দিয়ে। তারপর সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করল।

মুখ দিয়ে একটাও কথা বেরুল না মা সারদার। সংকোচে লজ্জায় অধোবদন হয়ে রইল।

পুজো সেরে হৃদয় বলল, শুধু আমার মামি বলে তো কথা নয়, তুমি হচ্ছ রামকৃষ্ণের অর্ধাঙ্গিনী। আজ যাকে ঘরে দেখছ, কোনও দিন দক্ষিণেশ্বরে গেলে বুঝবে সে কত বড় সাধক। তোমায় পুজো করে আমিও ধন্য আজ।

সারদা কিছু না বলে চুপটি করে রইল। কিন্তু রামকৃষ্ণ নামটা শোনার পরেই কোথাও একটা নিঃশব্দ আলোড়ন টের পেল নিজের মধ্যে। আর মনে মনে তখনই একটা সংকল্প করে ফেলল।

দুপুরে খেতে বসার আগেই সারদা কাউকে কিছু না বলে, জল নিয়ে এসে রামকৃষ্ণর পা ধুইয়ে দিল নিজের হাতে। তার পর ছোট্ট শাড়ির আঁচল দিয়ে পা মুছিয়ে পাখা দিয়ে হাওয়া করতে লাগল।

ব্যস, হাসাহাসির ধুম পড়ে গেল। ভানুপিসিই প্রথমে হইহই করে বলল, ও মা গো, মেয়ের পেটে পেটে এত? ও বউদি, এসে দেখে যাও তোমার মেয়ের কী ভক্তি!

রামকৃষ্ণ তো ভাবের মানুষ। কথার চেয়ে তাঁর অনুভব বেশি। ঘটনা পরম্পরা সবই তিনি স্মিত হাসি দিয়ে উপভোগ করে গেলেন। শ্যামাসুন্দরীও খুশি হলেন মেয়ের একটু কাণ্ডজ্ঞান হয়েছে দেখে। জামাই হিসেবে তাঁর গদাধরের তুলনা হয় না। কিন্তু মেয়ে ছোট হলেও তার যে বুদ্ধি খুলছে একটু একটু করে, এটুকুতেই পরম তৃপ্তি পেলেন।

খুড়িমা এসে হাসতে হাসতে বললেন, বড় ভাল কাজ করেছিস মা। আচ্ছা এবার ওঠ। জামাইয়ের পায়ে ঠান্ডা লাগবে। ভানুপিসি প্রায় কোলে তুলে নিয়ে আদর করলেন সারদাকে।

আনন্দের ঘোরের মধ্যে কেটে গেল দিনগুলো। রামচন্দ্র-শ্যামাসুন্দরী খুব খুশি। বিশেষ করে রামচন্দ্র। ভক্ত মানুষ তিনি, দারিদ্র্য তাঁর নিত্যসঙ্গী হলেও দয়ালু স্বভাব তাঁর। কোনও কারণে মানুষের মনে ব্যথা লাগলে তিনি নিজেও ব্যথিত বোধ করেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিয়ের পর দিনই সারুকে নিয়ে রাগ করে বাড়ি ফিরে আসায়, কুটুমবাড়ির মানুষগুলোর জন্যই তাঁর কষ্ট বেজেছিল বুকে। আজ এতদিন পরে তিনি টের পেলেন, সেই কষ্টটার লাঘব হয়েছে।

গদাধর ঠিক করেই রেখেছিলেন এবার ফেরার সময় তিনি সারদাকে সঙ্গে নিয়েই কামারপুকুর ফিরবেন। পাছে এই আসাটাকে বালিকাবধূ জোড়ে আসা বলে ভুল ভেবে বসে, সেই জন্য ঠাট্টাচ্ছলে একদিন বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, শোনো, কবে বিয়ে হয়েছে, একথা কেউ জিগ্যেস করলে যেন এখনকার বয়েস সাত বছর বোলো না। বোলো পাঁচ বছর। ঠিক আছে?

ফিক করে হেসে ঘাড় নেড়েছিল সারদা।

এবার সত্যি সত্যি জোড়ে ফিরছেন গদাধর। তাড়াহুড়ো কিছু ছিল না। তা সত্ত্বেও গোছগাছ, খাওয়া-দাওয়া সেরে বেরুতে দুপুর গড়িয়ে গেল। আসন্ন শীতের বেলা ছোট। রোদ থাকলেও তার সে তেজ নেই। গোরুর গাড়ি ঠিক করাই ছিল। বোঁচকা-বুঁচকি তুলে, দুগ্‌গা দুগ্‌গা বলতে বলতে রামচন্দ্র রওনা করে দিলেন মেয়ে জামাইকে।

গ্রাম্য রাস্তায় ধীর গতির গো-যান এগিয়ে চলল। দাওয়ায় দাঁড়িয়ে যতক্ষণ দেখা যায় দেখলেন শ্যামাসুন্দরী। তারপর হারিয়ে গেল দৃষ্টির বাইরে। মনে হল শুধু এই দোচালার বাড়িতেই না। আলো কমে গেল পুরো জয়রামবাটিতেই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *