৩
বেলুড়ে নীলাম্বর মুখোপাধ্যায়ের বাড়িটি ভাড়া নেওয়া হয়েছে সারদার বসবাসের জন্য। প্রশস্ত ছড়ানো দোতালা বাগানবাড়ি, সামনে অর্থাৎ পুবদিকে প্রবাহিত গঙ্গা। বাঁদিকের ফটকের বাইরে বাঁধানো ঘাট, ধাপে ধাপে সিঁড়ি নেমে গেছে জল পর্যন্ত। ভাটায় জল নেমে গেলেও সিঁড়ি ফুরোয় না, জোয়ারে ওপরের দিকের সিঁড়ির ধাপ জলে ডুবে যায়। পশ্চিমে বাড়িতে যাতায়াতের মূল ফটক। তার দু’ধারে এবং উত্তর দক্ষিণেও অনেকটা বাগান, বড় ছোট নানান গাছে সাজানো। জামরুল-কাঠাল-আমগাছ যেমন আছে, তেমনিই আছে বকুল- কাঠচাঁপা-করবী-কদম। জুঁই হাসনুহানা সন্ধ্যামালতীর ঝাড় সামনের দিকে, গঙ্গার জল ছুঁয়ে আসা বাতাসে গন্ধে ম-ম করে সন্ধেবেলা। বড় গাছের ছায়ায় দগ্ধ দিন শীতল নিবিড় হয়ে থাকে, চকমিলানো বিশাল বাড়িটি স্নিগ্ধতার পরশ পায়।
একেবারে অজ পাড়াগাঁ না হলেও, মফস্সল-শহরতলির ব্যস্ততা নেই বেলুড় গ্রামে। তার মধ্যেই শৌখিন অর্থবান কিছু মানুষ একলপ্তে বড় জমি কিনে বাগানবাড়ি করেছেন। থামওয়ালা, পেটানো ছাদের পাকাবাড়ি, খড়খড়ির জানালা, রেলিং দেওয়া ভোলা বারান্দায় চিক ঢাকা দেওয়ার ব্যবস্থা। একতলার বারান্দার মেঝে থেকে টানা চওড়া সিঁড়ি নেমে গিয়ে মিশেছে বাগানের মাটিতে। তার দু’পাশে শানবাঁধানো বসার জায়গা। দোতালার সিঁড়ি উঠে গেছে ছাদে। একটিমাত্র চিলেকোঠার ঘর ছাড়া বাকি সবটাই আলসে ঘেরা খোলা ছাদ। শ্যাওলা না-ধরার জন্য টালিপাতা পেটানো ছাদের ওপরেই আবার চুন-সুরকির জলছাদ বানানো, ঢালের দিকে নালার মুখ। গাছের ছায়া পড়ে ছাদে। ঘুড়ি আর পায়রা ওড়ানো হত একসময়। গঙ্গার ওপারে পুবদিকে দক্ষিণেশ্বরের মন্দির দেখা যায়।।
আপাতত ছ’মাসের জন্য বাড়িভাড়া করা হয়েছে। কার্তিক মাস পর্যন্ত মেয়াদ। ভক্ত-শিষ্যরাই খরচপত্র চালাচ্ছেন চাঁদা করে। তার মধ্যে বলরাম-মহেন্দ্র-গিরিশ, এরাই প্রধান। আবার রামচন্দ্র-সুরেন-সুরেশ-দেবেন্দ্র এঁরাও আছেন। বৈশাখের শেষদিকে সারদা ফিরে এসেছেন কামারপুকুর থেকে। নিজে থেকে আসেননি, তাঁকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বলরামের শরীরটা গণ্ডগোল করছে মাঝেমাঝেই, তবু তাঁর বাড়িতেই উঠেছিলেন। আত্মীয়স্বজনের ভিড়, ঘরের অসুবিধে, সব মিলিয়েই নীলাম্বরবাবুর বাড়ি ভাড়ার ব্যবস্থা। সারদা থাকলে যোগীনমা-গোলাপমাও সঙ্গে থাকেন। ওদিকে ছেলেরা যদিও কিছুটা ছন্নছাড়া, কিন্তু বরানগরের তথাকথিত মঠবাড়ি এখনও তাদের আবাস। নরেন্দ্রনাথ প্রথম থেকে, সঙ্ঘ গঠনের কাজে মনোনিবেশ করেছে, কিন্তু খুব সম্প্রতি সে-ও কাশী-অযোধ্যা বৃন্দাবনে তীর্থ দর্শনের নামে সনাতন হিন্দু ধর্মের গভীরতা অনুভবের জন্য বেরিয়ে পড়েছে কয়েক মাসের জন্য। সারদা এসে পর্যন্ত তার সঙ্গে দেখা হয়নি, কিন্তু মনে মনে জানেন, ও ছেলে বসে থাকার নয়। ছোটাছুটি দৌড়ঝাঁপ সবকিছুর পিছনে নরেনের একটি উদ্দেশ্য এবং সিদ্ধিলাভের ঐকান্তিক প্রয়াস এবং একাগ্রতা আছে। লাটু আর যোগীন মাঝেমধ্যে খেয়া পেরিয়ে বেলুড়ে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে আসে। যোগীন কখনও কখনও থেকেও যায়। শরৎও আসে।
জ্যৈষ্ঠ মাসের কিছুদিন কেটে গেছে, এখনও বর্ষার দেখা নেই। কয়েকবার কালবৈশাখীর ঝড় হয়েছিল, কিন্তু সেই সাময়িক স্বস্তি, গ্রীষ্মের দাবদাহ অবশ্যই প্রশমিত করে না। আকাশে মেঘের বর্ণ এখনও পিঙ্গল। জলভরা ধূসর মেঘের অপেক্ষায় মানুষও চাতকপাখির মতো আকাশের দিকে তাকায়। আশা করে কবে একদিন মেঘ ছেয়ে আসবে।
দিনের বেলা এবাড়ির একতলা ঠান্ডা। ভোর ভোর গঙ্গাস্নান সেরে এসে একতলায় ঠাকুরঘরেই সারদা পুজোআর্চা, জপধ্যান করেন। কিন্তু সন্ধ্যায় অন্ধকার-গুমোট আর মশায় সম্পূর্ণ মনঃসংযোগের অসুবিধা হয়। দুই সঙ্গিনীসহ সেই কারণে ছাদে চলে যান। সূর্য ডুবে গেলে তাপ কমে, খোলা আকাশ আর সামনে নদী বলে গুমোট ভাবও কম। নির্জনে নিরুপদ্রবে মাদুর বিছিয়ে বসে তিনজনে ধ্যান করেন। এই জপ, ধ্যান, তপস্যার মধ্যে দিয়েই একসঙ্গে আধ্যাত্মিক চেতনার বিকাশ ঘটে সারদার, কী ভাবে যেন অলৌকিক মিলন হয় ঠাকুরের সঙ্গে, সকলের মঙ্গল কামনা করেন।
সেদিন কী এক আবেশ আর ভাবের ঘোরে ধ্যানাবস্থা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে চলল সারদার। পাশাপাশি বসে জপ করছিলেন যোগীনমা ও গোলাপমা। অন্ধকার গাঢ় হয়েছে। টুপটাপ জোনাকি জ্বলছে-নিবছে ঝাঁকড়া গাছে। মেঘহীন আকাশে তারার মেলা। হাওয়া নেই, আবার গুমোটও নেই। মাঝেমাঝে গঙ্গার পাড়ে ঢেউ ভাঙার ছলাৎ ছল শব্দ। যোগীনমা তাকিয়ে দেখলেন। সারদার দেহ নিথর, স্পন্দনহীন। ভাল করে খেয়াল করলেন। সত্যি যেন বাহ্যজ্ঞান লুপ্ত পাথরের মূর্তি। স্থির নিশ্চল, বোধ বাক্যহীন সারদা সমাধিস্থা, দেহটি পড়ে রয়েছে, জীবদ্দশার অস্তিত্ব আর প্রাণ যেন কোন সূদুর চৈতন্যলোকে বিলুপ্ত। কাঠামোটি জড় পদার্থের মতন একটি মানুষি অবয়বমাত্র।
নির্বাক রইলেন যোগীনমা। মাত্র কিছুদিন আগেই কামারপুকুর থেকে বলরাম বসুর বাড়িতে ওঠার পরে, একদিন রাতে ছাদে প্রায় এরকমই এক নির্বিকল্প উচ্চাবস্থা দেখেছিলেন সারদার। সেদিন সম্পূর্ণ নিশ্চিত হতে পারেননি দশাটি সম্বন্ধে। আজ নিঃসন্দেহ হলেন সারদা সমাধিস্থ। সময় গেল বেশ কিছুক্ষণ।
আগেরবারের অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে সারদা বলেছিলেন, শরীরটা ছেড়ে যেন কোন এক সুন্দর জায়গায় চলে গেছি। সবাই আমাকে খুব খাতির যত্ন করছে, ঠাকুর সেখানে রয়েছেন। ভীষণ আনন্দ হচ্ছিল। একটু পরে হুঁশ হল। নিজের শরীরটাই যেন অচেনা। মনে হচ্ছিল ওটার মধ্যে কি আবার ঢুকতে পারব! একটু পরে আস্তে আস্তে সব আবার স্বাভাবিক হয়ে এল।
কোথায় যেন একধরনের টানাপোড়েন চলছিল, সারদার বাহ্যিক ব্যবহারিক জীবন আর আধ্যাত্মিক অলৌকিক চেতনার মধ্যে। নিজের স্বরূপ আর পারিপার্শ্বিকের মধ্যে একটা অসামঞ্জস্যতা অনুভূত হচ্ছিল প্রায়শই। এইবার কামারপুকুর থেকে ফিরে আসার আগে পর্যন্ত, নিবিড় অধ্যবসায় আর জপধ্যানের মাধ্যমে আত্মোপলদ্ধির কদাচিৎ সুযোগ মিলেছে তাঁর। কিন্তু সাধারণ মানবী অনুভব আর চেতনার উর্ধ্বে কিছু একটা অতিরিক্ত উপলব্ধি যে তাঁকে বারবার কোনও এক সীমাহীন অপার্থিব আলো-আঁধারি জগতে টেনে নিয়ে যায়, এ বিষয়ে তিনি নিঃসংশয় হয়েছেন। সেই উপলব্ধির কালে তাঁর বাহ্যিক আর পারিপার্শ্বিক সম্বন্ধে সচেতনতা থাকে না। আচরণও স্বাভাবিকতাকে অতিক্রম করে। সংলাপ যেন আংশিক প্রলাপে পর্যবসিত হয়। খুব দীর্ঘস্থায়ী হয় না অবস্থাটা। কিন্তু সেই আবহের ঘোরটি অপসারিত হতে হতেই বুঝে ফেলেন— সাময়িকভাবে তিনি যেন এই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বাস্তবভূমি ছেড়ে অন্য কোথাও বিচরণ করছিলেন। এই উপলব্ধির সানুপুঙ্খ ব্যাখ্যা কারওকে দিতে পারেন না সারদা। দেওয়ার প্রয়োজনই বা কী, ভেবে নীরব থাকেন। কিন্তু বেহুঁশ ভাবটা অপসৃত হওয়ার পরে পরেই আবার যথারীতি আপন ভূমিকাতেই বিরাজ করেন।
যোগীনমা গভীর শান্ত দৃষ্টিতে সারদার এই নির্বিকল্প উচ্চাবস্থাটি লক্ষ করলেন এবং মানুষটিকে এক নতুনতর শ্রদ্ধার আসনে বসালেন মনে মনে। আর একটু পরেই দেখলেন, নিস্পন্দ নিষ্কম্প ভাবটি কেটে যাচ্ছে সারদার দেহ থেকে। প্রাণের বিকাশ আর স্ফুরণ ঘটছে সারদার মধ্যে। কিছুটা অর্ধবাহ্য দশাতেই সারদা বললেন, আহ্ কোথায় যেন চলে গিয়েছিলাম।
যোগীনমা কোমল স্বরে বললেন, এই তো মা, তুমি এখানেই আছ।
অ্যাঁ! চোখ খুলেও সারদা যেন দৃষ্টিহীন, কিছুটা বিভ্রান্তির কণ্ঠে বললেন, আছি? কিন্তু …. ও যোগেন, আমার হাত কই, পা কই?
যোগীনমা সারদাকে স্পর্শ করে আশ্বস্ত করলেন।
এই তো মা, তোমার হাত-পা! সবই ঠিক আছে।
শারীরিক অনুভূতি টের পেলেন সারদা। দেহবোধ সম্পর্কে সচেতন হলেন একটু একটু করে। সাময়িক হলেন পরিস্থিতি ও পরিবেশে। মৃদু হাওয়ার স্পর্শ পেলেন গায়ে। গঙ্গার জলের কলধ্বনি শুনলেন কানে। চোখ খুলে দেখলেন আবছা আঁধারে ছাদে বসে আছেন। ক্রমশ একটু আধটু বাক্যালাপও শুরু করলেন দুই সঙ্গিনীর সঙ্গে। গোলাপমা সারদার ঠিক এহেন বেহুঁশ হয়ে যাওয়ার অবস্থা আগে চাক্ষুস করেননি। কিন্তু প্রসঙ্গটা সঙ্গে সঙ্গে উত্থাপন করলেন না। গত বছর শরৎকালের গোড়ায় যোগীনসহ তিনিও সারদাকে কামারপুকুরে পৌঁছাতে গিয়েছিলেন। কয়েকদিন পরেই কলকাতায় ফিরেও এসেছিলেন। অতঃপর ন’ মাস যে নিদারুণ দারিদ্র্যে আর দুর্ভোগে সারদা দিনযাপন করেছিলেন, সে বিষয়ে সম্যক অবগত ছিলেন না, এমনকী গোলাপমা-যোগীনমাও। ছোটখাটো আলাপচারিতা হল সেইসব কথা নিয়ে।
গোলাপমা জিজ্ঞেস করলেন, হ্যাঁ গো মা, আজকে তোমার যেরকম ভাব দেখলুম, কামারপুকুরে হলে কী করতে?
সারদা অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে এসেছেন। ঘটি থেকে গঙ্গাজল নিয়ে আচমন করলেন এবং সামান্য ছিটে দিলেন গায়ে। শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখমুখ মুছতে মুছতে বললেন, কী হয়েছিল বলো তো? একটু যেন বেঁহুশ মতো…।
যোগীনমা স্পষ্ট করেই বললেন, তোমার ভাবসমাধি হয়েছিল। ঠাকুরের যেমন হত, ঠিক তেমনই৷
সারদা নিস্পৃহ উত্তর দিলেন, কী জানি! তবে কামারপুকুরে এমনটি কখনও হয়নি।
কী করে হবে মা, যোগীনমা বললেন, পরে তো জানলুম, কী কষ্ট করে বেঁচে ছিলে প্রায় একটি বছর!
সারদা বললেন, কষ্ট যে করতে হবে, সে তো জানাই ছিল। বৃন্দাবনে থাকতেই শুনেছিলাম, পরে বলরামের বাড়ি থেকে যাওয়ার সময়েই শুনে গেছিলাম— দীনু খাজাঞ্চি পিছনে লেগেছে। তার সঙ্গে রামলালরাও যোগ দিয়ে মানুষবুদ্ধি করে টাকাটা বন্ধ করল।
গোলাপমা বললেন, একি ভাবা যায় মা, নিজের আপন ভাশুরপো ভাশুরঝি এমন ব্যবহার করবে!
যোগীনমা বললেন, কিন্তু সব জেনেও তুমি তা হলে গেলে কেন মা?
ঠাকুরের ওপর ভরসা রেখেই গিয়েছিলাম। তিনি বলতেন, কামারপুকুরের ঘরটি নষ্ট কোরো না। তা ছাড়া নিজেকে একটু বোঝারও দরকার ছিল।
কিন্তু বলরামের ওখানে তোমার তো কোনও অসুবিধে ছিল না।
মাথা নাড়লেন সারদা। বললেন, না-না, সে কি কম করেছে! এখনও করে চলেছে। তবু ভাবলুম.…। বলতে বলতে থেমে গেলেন সারদা।
কী ভাবলে মা?
ভাবলুম— ‘তাঁর’ আলোতেই আমার যা কিছু পরিচয়, এমনকী খাতির যত্ন। কিন্তু মা, হাবভাবে ইঙ্গিতে তিনি যে আমার ওপর অনেক দায়িত্ব দিয়ে গ্যাছেন।
গোলাপমা বললেন, আস্তে ধীরে সেসবও করবে।
সারদা বললেন, করতে গেলে নিজেকেও একটু যাচাই করে দেখার দরকার মা। চিরকাল অন্যের ওপর নির্ভর করে থাকলে নিজের শক্তিটাও যেমন টের পাওয়া যায় না, কৃচ্ছ্রসাধন বলেও কিছু হয় না। নিজে কষ্ট করতে না পারলে, অন্যকে দেখব কী করে!
কিন্তু মা আগে তো প্রাণে বাঁচতে হবে।
শাক-ভাত খেয়েও প্রাণে বেঁচেছিলাম.… কিন্তু…।
যোগীনমা বললেন, কেষ্টভাবিনীর কাছে তোমার যে অবস্থার কথা শুনলুম, তাকে কি বাঁচা বলে মা! ছেঁড়া শাড়িতে গিঁট দিয়ে পরছ, ভাতের সঙ্গে একটু তেলনুন পর্যন্ত নেই, তারওপর ঝগড়ুটে মুখ্যু গাঁইয়া বউ-ঝিদের গালাগালি, দস্যিপনা… তুমি তো ফৌত হয়ে যেতে মা!
তাতেও আমার দুঃখ ছিল না। কিন্তু…
যেন সংকোচবশতই চুপ করে গেলেন সারদা। বারবার কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে যাচ্ছেন।
গোলাপমা বললেন, নিজে ফুরিয়ে গেলে আর তাঁর কাজ করবে কী করে মা?
সারদা বললেন, ফুরিয়ে যেতাম না। আসলে… পরের দিকে অপমানটাই বড্ড গায়ে বিঁধছিল। দেখি এখন, ক’টা দিন যাক। আবার কামারপুকুরে ফিরব মনস্থ করেই এসেছি।
সারদার বচন এবং বাচনে কোথাও একটা সূক্ষ্ম দৃঢ়তার আভাস ছিল। অপমানের বিষয়টা সম্বন্ধে গোলাপমা এবং যোগীনমার কিঞ্চিৎ কৌতূহল থাকলেও প্রশ্ন করা থেকে বিরত রইলেন। শুধু ‘আবার কামারপুকুরে ফিরব’— কথাটি দু’জনেই খেয়াল করলেন। সারদা তাহলে পাততাড়ি গুটিয়ে, কামারপুকুর ত্যাগ করে আসেনি! কিন্তু সেই প্রসঙ্গেও আর কোনও প্রশ্ন করা সমীচীন বোধ করলেন না। বয়সের কিঞ্চিৎ তফাত থাকলেও দীর্ঘকাল তাঁরা তিনজনই পরস্পরের কাছে ঘনিষ্ঠ, তা সত্ত্বেও, সারদার যে একটি অন্যরকম পরিচিতি আর নিজস্ব অস্তিত্ব আছে এ বিষয়ে গোলাপমা যোগীনমা দু’জনেই সচেতন ছিলেন। ক্রমশ তাঁর একটি শান্ত ব্যক্তিত্বের রূপও স্পষ্ট হয়ে উঠছিল দু’জনের কাছে। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের সহধর্মিণী হিসেবেই যাঁকে তাঁরা এতকাল দেখে আসছেন, যাঁর পরিচয়েই তিনি পরিচিত, সেই মানুষটির যে কোথাও একটা নিজস্বতা এবং আত্মসম্মান বোধ আছে, বিশেষ করে সেটি আবার অনুধাবন করলেন গোলাপমা ও যোগীনমা।
নিজের দুঃখ-দারিদ্র্য, মানসম্মানবোধ ইত্যাদি নিয়ে সারদাও আর বিস্তারিত আলোচনায় গেলেন না। আত্মপ্রচার বিষয়ে এমনিতেই চূড়ান্ত বিমুখ সারদা। আগ বাড়িয়ে কোনও কথা বলাও তাঁর স্বভাববিরুদ্ধ। তিনি সনাতন হিন্দুনারীর আদর্শে অনুপ্রাণিত এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অন্তঃপুরবাসিনী। এখনও পরিচিত পুরুষ মানুষদের সঙ্গেও তিনি বিশেষ প্রত্যক্ষভাবে বাক্যালাপ করেন না। পুত্রস্থানীয় ঠাকুরের শিষ্যদের সঙ্গে কথা বলার সময়ে তাঁর মাথায় থাকে ঘোমটা। নেহাত শরৎ-যোগীন-লাটু এইরকম গুটি কয়েক আপনার জনের সঙ্গে তাঁর মৌখিক সম্পর্ক সহজ। তবে প্রয়োজনবোধে নিজের মতামতটি জানাতে দ্বিধা করেন না সারদা। এমনকী, অবস্থা যদি কখনও চরম বলে বোধহয়, অবগুণ্ঠনের আড়াল ছিঁড়ে সমুচিত জবাবও দিতে পারেন।
বিশেষ একটি অভিজ্ঞতা সারদার খুব পুরনো নয়। তাঁর মতো শান্ত নিরীহ মানুষের কাছ থেকে যে দুরন্ত আচরণ সাধারণভাবে কল্পনাতীত, কিছুকাল আগে কামারপুকুরে নিজেকে বাঁচাবার জন্য সেরকম আচরণই করতে হয়েছিল তাঁকে। আত্মসম্মান এবং অন্যের কুপ্রবৃত্তি থেকে নিজেকে রক্ষার জন্য সারদা সেদিন আর মৌখিক নয়, শারীরিক ভাবেই মোকাবিলা করতে পিছপা হননি।
কামারপুকুরের বাড়িতে তাঁর হতদরিদ্র অবস্থার মধ্যেও ক্কচিৎ কখনও স্ত্রী-পুরুষ ভক্তরা আসতেন দেখা করতে। দূরদূরান্তর থেকে কেউ এলে শেষ পর্যন্ত রাত্রিযাপন করা ছাড়াও উপায় থাকত না। সহ্যের পরাকাষ্ঠা হয়েই সারদা তা মেনেও নিতেন। কখনও দু’-একজন চেনা পরিচিত মানুষের উপস্থিতি, আলাপচারিতা তাঁর ধারাবাহিক নিঃসঙ্গ জীবনে সামান্য স্বস্তির প্রলেপ বুলিয়ে যেত। ঠাকুরের ভক্তদের মধ্যেই তেমন একজন, ঠিক গৃহীভক্তদের মতো না, আবার ঘনিষ্ঠ ত্যাগী সন্তানদের মতোও না, শ্রীযুক্ত হরিশ কামারপুকুরে এসেছিলেন সারদার কাছে। পূর্বপরিচিত হরিশের কিঞ্চিৎ ক্ষ্যাপাটে-পাগলাটে ভাব ছিল তাও জানতেন সারদা। কিন্তু কোনও ভক্তজনকেই ফিরিয়ে দেন না তিনি। হয়তো হরিশের প্রতি তাঁর কিছু সহানুভূতিও ছিল। শুনেছিলেন, সাধু-সন্ন্যাসীদের কাছে বিবাহিত হরিশ যাতায়াত করতেন বলে, তার পত্নী ব্যাপারটিকে খুব সুনজরে দেখতেন না। সম্ভবত কুসংস্কারাচ্ছন্ন হরিশের বউ তার মতিগতি ফেরাবার উদ্দেশ্যে কিছু ওষুধপত্র, গাছের শিকড়বাকড় খাইয়েছিলেন। বলা যায় না, উপকারের বদলে হরিশের ক্ষেত্রে সেইসবের প্রভাব অপকার করেছিল কি না!
সারদা কিন্তু হরিশের আচরণে চাঞ্চল্য অস্থিরতার প্রকাশ লক্ষ করেছিলেন। উদ্বেগও অনুভব করেছিলেন। দেরি না করে সেই খবর তিনি চিঠি লিখে জানিয়ে দিয়েছিলেন বরানগরের তথাকথিত মঠে, ছেলেদের কাছে। কিন্তু বিপত্তি ঘটল, ছেলেরা হরিশ সম্পর্কে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই। চিঠি যাওয়া, ছেলেদের আসা, সময় লাগে তার জন্যও। হরিশের আচরণ মাত্রা ছাড়াল তার মধ্যেই একদিন।
প্রতিবেশী পাইনদের বাড়ি থেকে ফিরে আসছিলেন সারদা। বিকেল ফুরিয়ে এসেছে কিন্তু তখনও পুরো সন্ধে হয়নি। বাড়িতে অতিথি এলে সামান্য আয়োজনও একটু বেশি করতে হয়। সে কারণেই পাইনদের বাড়িতে যাওয়া। ভাশুর তথা রামলালদের ঘরের দিক ফাঁকা, হরিশ ওইদিকে থাকে। সারদা থাকেন নিজের ঘরে, শঙ্করী কিংবা অন্নদা এসে শোয় রাতে।
বাড়ির ভিতর ঢুকতে ঢুকতেই কীরকম সন্দেহ হল সারদার। কেউ তাঁর পিছু নিয়েছে। তাকিয়ে দেখলেন। নাহ্, নিঝুম গ্রাম্যরাস্তায় মানুষজন কেউ নেই। পাঁচিল পার হয়ে উঠোনে এসেছেন, ঘরের দিকে যাবেন। কিন্তু নিশ্চিত হলেন, অবশ্যই কেউ তাঁর পিছন পিছন ছুটে আসছে। তার হাপরের মতো শ্বাসপ্রশ্বাস পড়ছে, সেই শব্দও পেলেন। আর তখনই তাকিয়ে দেখেন, হরিশ ক্ষ্যাপার মতন তাঁর দিকে ছুটে আসছে। নাহ্, এ ছুটে আসার লক্ষণ তো ভাল না। নিজের স্বতঃস্ফূর্ত প্রাকৃতিক বোধেই সারদা হরিশের কুপ্রবৃত্তি টের পেলেন। কিন্তু কোথায়, কোনদিকে যাবেন, পালাবেন! ধারে কাছে আর কেউ নেইও যে! এ কী বিপদ হল!
ধানের গোলার চারদিকেই ছুটতে ছুটতে ঘুরছেন। মনে মনে ঠাকুরকে ডাকছেন। কিন্তু হরিশও ছাড়ার পাত্র নয়। সে তখন পুরো ক্ষ্যাপা। কয়েক পাক ঘুরে আর পারলেন না সারদা। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত। কিন্তু তৎক্ষণাৎ দশভূজা দেবীর মতোই অসুরদলনী শক্তি অনুভূত হল নিজের মধ্যে এবং যেন সেই মূর্তিতেই রুখে দাঁড়ালেন। হরিশ কাছে আসতেই ধাক্কা দিয়ে ফেললেন মাটির ওপর। তারপর বুকের ওপর হাঁটু দিয়ে চেপে বসে, এলোপাথাড়ি চড় মারতে লাগলেন। হাত লাল হয়ে গেল মারতে মারতে। আর ট্যাঁফো করার সাহস হয়নি হরিশের, সারদার ওই মূর্তি দেখে। একেবারে কেঁচোর মতো ভয়ে গুটিয়ে গেল।
সারদা নিস্তার পেলেন ঠিকই, কিন্তু নিজেকে রক্ষা করার জন্য এমন অযাচিত ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার গ্লানি এবং বেদনাও অনুভূত হয়েছিল। এবং বেদনার উলটোপিঠে ছিল অপমানেরও অনুভব। দেবীত্বের অলৌকিক উপলব্ধিতে যিনি সিক্ত, সিঞ্চিত, তাঁকেও অপমান আর অসহায় অভিজ্ঞতার দায় মেটাতে হয়েছিল। বুঝেছিলেন, আধ্যাত্মিক চেতনার থেকে জীবন বড়। আগে তিনি মানুষ এবং স্ত্রীলোক। তারপরে দেবী কিংবা যে যা বলে।
বিগত আট-ন’ মাস কামারপুকুরের জীবনে পারিবারিক হৃদয়হীনতার অভিজ্ঞতাও খুব কম হয়নি সারদার। বারবার দেখেছেন, নিজের ভূমিকাকে তিনি একটি চাহিদাহীন নিরুদ্বেগ আবহে ধরে রাখতে চাইলেও, সংসার যেন নিজস্ব দাবিতেই তার আবর্তে টেনে নামায়। সেই অর্থে কামারপুকুরে তাঁর সংসারই বা কোথায়! নেই তো। কিন্তু তা বললে কী হবে! এক সময়ের যৌথ পরিবারের সদস্য যে তিনিও। আপাতত একা মানুষ, নিরুপায়-নিঃসম্বল হয়ে ভিটে আগলে পড়ে আছেন, একমাত্র আত্মসম্মান বোধটুকু নিয়ে। পরিবারভুক্ত বাকিরা স্বার্থ আর স্বাচ্ছন্দ্য বুঝেই দক্ষিণেশ্বরে থানা গেড়েছে। থাকুক ওরা ওদের মতো। সারদার কোনও বক্তব্য নেই।
কিন্তু তাঁর কোনও বক্তব্য না থাকলেও, বাকিদের দাবিটুকু তো ফুরোয় না। অতিরিক্তের প্রতি আকর্ষণটুকুও মজ্জাগত। দক্ষিণেশ্বরে বসবাস করলেও কামারপুকুরের সম্পত্তির দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখে রামলালরা। প্রয়োজন না, অধিকার রাখাটাই উদ্দেশ্য। রাখুক, সারদার কিছু যায় আসে না। একা মানুষ তিনি। কারোর কাছে হাত পাতেন না। অসূয়া-লোভ জন্মগত ভাবেই তাঁর মধ্যে গড়ে ওঠেনি। তারপর যে মানুষটিকে দেখে দেখে আজ তিনি পঞ্চত্রিংশতি বর্ষীয়া, তাঁর আদলেই খানিকটা গড়ে নিয়েছেন নিজেকে। চেষ্টা করেন জাগতিক ব্যাপারের একটু ঊর্ধ্বে উঠে জপ-ধ্যান ইত্যাদি নিয়ে থাকার। অহরহ মানুষের কল্যাণকামনাই তাঁর সাধনা।
রামলালরা কিন্তু মাঝেমধ্যে আসে। খুড়িমার অবস্থা জরিপ করতে করতে নিজেদের অধিকার রেখে যায়। উপরন্তু প্রয়াত কাকার অংশটুকুতেও থাকে তাদের নেকনজর। ভাবখানা, কাকার তো নিজের ছেলেপুলে নেই, অতএব উত্তরাধিকারসূত্রে তাঁর সম্পত্তি তো আমাদেরই। যদিও সারদা তাঁর ধর্মপত্নী, তিনি সশরীরে কামারপুকুরেই বর্তমান, তা হলেও সহায়হীন একাকী বিধবা মহিলাকে কে পাত্তা দেয়! মন্দিরের সাতটাকা রামলালরা বন্ধ করেছে আগেই, এবার নানান অজুহাত এবং অসুবিধে সৃষ্টি করে সম্ভবত তাঁকে উৎখাত করতেই চায়।
মাস ছয়েক আগে লক্ষ্মী আর রামলালরা গিয়েছিল কামারপুকুরে। হয়তো সারদার অবস্থা সরেজমিন দেখে আসারই উদ্দেশ্য ছিল। সারদা বোঝেননি। একা মানুষ থাকেন, ভ্রাতুস্পুত্র এবং কন্যাসমা ভ্রাতুস্পুত্রীকে দেখে খুশিই হয়েছিলেন। তাদের অতীত আচরণ মনে, রাখেননি। কিন্তু রামলালরা প্রথম থেকেই বাঁকা সুরে বেজেছিল।
কী গো খুড়িমা, একা একা শ্বশুরবাড়িতে তো ভালই আছ দেখছি।
সারদা মনে বিদ্বেষ পুষে রাখেন না। চটজলদি মুখে মুখে উত্তর দেওয়াও তাঁর স্বভাববিরুদ্ধ। বললেন, আছি বাবা। ভালমন্দ নিয়ে ভাবি না।
রামলাল বলল, মন্দের তো কথাই ওঠে না, ভাববেই বা কেন!
সারদা বললেন, তাঁর ভিটেবাড়ি, তাঁর ইচ্ছেতেই আছি। যেমন রাখবেন, তেমন থাকব বাবা।
আরে তিনি তো স্বর্গে গেছেন। আর আমরাও থাকি দক্ষিণেশ্বরে। মনের আনন্দে তুমি একাই তো দিব্যি সব ভোগ করছ।
রামলালের কথার অন্তর্নিহিত অর্থ সারদা বোঝেন। বললেন, ভোগ বাসনা আমার নেই বাবা।
রামলাল ঠেস দিয়ে বলল, আলাদা করে থাকার কী দরকার! এত বড় সম্পত্তি, জায়গা জমি পেয়েছ। তারপর কাকার দেবোত্তর করা শিওড়ে আর লক্ষ্মীজলার জমির ফসল-টসলও তো পাও শুনেছি।
ওসব দিয়েই কোনওমতে বেঁচে আছি বাবা।
কোনওমতে! ব্যঙ্গ মিশিয়ে হাসল রামলাল। আবার বলল, সেই ভক্ত ছেলেগুলোও তো তোমায় কিছু দেয়, নাকি?
সারদা অবাক হয়ে গেলেন। বললেন, বাবা, তাদের নিজেদেরই অন্নসংস্থান হয় ভিক্ষাবৃত্তি করে। আমায় কী দেবে?
তা হবে! কিন্তু বড়লোক ভক্তদের তো খুব দরদ তোমার প্রতি। টাকাপয়সা খারাপ আসে না নিশ্চয়ই?
সারদার রুচিতে বাধছিল রামলালের কথার ধাঁচে এবং মন্তব্য শুনে। ভাবছিলেন, কী পরিবারের, কী ছেলে! সহায়সম্বলহীন খুড়িমাকে দেখা তো দূরের কথা, খোঁজ নিচ্ছে তার পয়সাকড়ির। অথচ আজ দক্ষিণেশ্বরে পূজারী সেজে করে খাচ্ছে সেই কাকার দৌলতেই। সারদার মনে পড়ে, সেই ঠাকুর বেঁচে থাকাকালীনই, রামলালরা চায়নি তিনি আবার কোনওদিন কামারপুকুরে এসে বসবাস করেন। রামকৃষ্ণ রামলালকে বলেছিলেন, দেখিস, তোর খুড়িমা যেন কামারপুকুরে থাকে। রামলাল উদাস উত্তর দিয়েছিল, ওঁর যেখানে ইচ্ছে হবে সেখানে থাকবেন। অসুস্থ ঠাকুর তখন বেদনাবিক্ষুব্ধ কণ্ঠে ভর্ৎসনা করে রামলালকে বলেছিলেন, সে কী রে? তুই তা হলে পুরুষমানুষ হয়েছিস কী জন্য? খুড়িমাকে দেখবি না?
কোনও কথাই তুললেন না সারদা। নিজের দীনতা-শ্রম-কষ্ট গোপন করে প্রসঙ্গটা শেষ করার জন্য বললেন, গৃহীভক্তদের কাছ থেকে আমি কোনও অর্থ সাহায্য পাই না।
এই অবস্থার মধ্যেও সারদা রামলালরা আসার পরে সেই পুরনো একান্নবর্তী আবহাওয়াই ধরে রাখতে চেয়েছিলেন। সংসারে নিজের ভূমিকা, সম্পর্কের কথা মাথায় রেখেই রান্না- খাওয়ার আয়োজন করছিলেন। কিন্তু হল না। রামলালরা হাঁড়ি আলাদা করে ফেলল। গভীর বেদনা বাজল সারদার বুকের মধ্যে। কিন্তু চুপ করে রইলেন। মনে মনে বললেন, ঠাকুর ওদের সুমতি দাও। ওরা কেউ তো পর নয়।
লক্ষ্মীর হাবভাব, আচরণে চপল চটুলতা সারদা আগেও দেখেছেন। ও নাকি বৈষ্ণবভাবাপন্না। গানের গলাটা খারাপ না। কিন্তু লোকজন জুটিয়ে অঙ্গভঙ্গি করে কীর্তন গাওয়া সারদা কখনও পছন্দ করতেন না। কামারপুকুরে গিয়েও আবার তাই করেছিল। সারদা নিস্পৃহ থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছিলেন। বুঝেছিলেন, দিনে দিনে ওদের সঙ্গে ভাব আর রুচির বৈষম্য স্পষ্টতর হয়ে উঠছে। কিন্তু যেটা সারদা কখনও স্বপ্নেও ভাবেননি, সেটা টের পেয়েছিলেন রামলালরা দক্ষিণেশ্বরে ফিরে যাওয়ার পরে।
দু’-একদিনের জন্য জয়রামবাটি গিয়েছিলেন সারদা। হয়তো লক্ষ্মী-রামলালদের থেকে সাময়িকভাবে দূরে থাকার জন্যই। তা ছাড়া আগে একবার কালীকুমারকে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিলেন, সে কারণেও মা শ্যামাসুন্দরীর সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছে হয়েছিল। ফিরে এসে দেখলেন, রামলালরা নেই। কিন্তু ওরা যাওয়ার আগে ঘরবাড়ি, এমনকী গৃহদেবতা রঘুবীরের থানটুকু পর্যন্ত ভাগাভাগির ব্যবস্থা করে গেছে। তালা লাগিয়ে গেছে নিজেদের অংশে। একমাত্র কাকার ভাগের একখানি ঘর খুলে রেখে গেছে সারদার জন্য। জমি থেকে আসা ধান-চালও ভাগ বাঁটোয়ারা করে নিয়ে গেছে। শুধু অবাক আর কষ্ট অনুভব না। কপর্দকহীন সারদা এবার আশংকিত হয়ে উঠলেন। যেটুকু ধানচাল আছে, তাতে আর ক’দিন! এবার কি অনাহারে মৃত্যুবরণই তাঁর কপালে আছে! ঠাকুর দেহ রাখার পরে এখনও দু’ বছর অতিবাহিত হয়নি। তিনি কি সারদাকেও অমৃতলোকে তাঁর কাছে টেনে নিতে চাইছেন? কিন্তু তেমন কোনও অলৌকিক ইঙ্গিত তো দেননি! বরং প্রায়ই স্মরণ করান তাঁর আরদ্ধ কাজের কথা। সুতরাং সেসব ভাবনা নিয়েই থাকেন সারদা।
এদিকে তপ্ত হয়ে উঠছে চৈত্রের দিনগুলি। গরম হাওয়ায় শুকনো ধুলো ওড়ে দুপুরবেলা। অথচ ঋতুরাজের দাক্ষিণ্যে পত্রহীন শিমুল গাছে রক্তবর্ণ ফুলের ছড়াছড়ি। তাপে ফেটে যাওয়া ফল থেকে তুলো ওড়ে। থোকা থোকা লাল কৃষ্ণচূড়া আর হলুদ রাধাচূড়া ফুটে রয়েছে গাছে। বিকেল পড়ে এলে পাখিপক্ষী ডানা মেলে আকাশে। দখিনা হাওয়ায় হিমেল স্পর্শ লাগে গায়ে। নিবিড় সন্ধ্যায় আরও নিঃসঙ্গ বোধ করেন সারদা।
এরমধ্যেই এক দুপুরে অপ্রত্যাশিতভাবে আঁটপুর থেকে কামারপুকুর এসে পৌঁছালেন কৃষ্ণভাবিনী এবং তাঁর মা মাতঙ্গিনী দেবী। সঙ্গে আর এক আশ্রিতা একটি ব্রাহ্মণকন্যা এবং একজন বিশ্বাসী কাজের লোক। উদ্দেশ্য আর কিছু না,বসু পরিবারের পরম শ্রদ্ধেয় গুরুদেব ঠাকুর রামকৃষ্ণদেবের জন্মভূমি দেখে যাওয়া। তাঁদের কাছেপিঠে কামারপুকুরই সব থেকে বড় পুণ্যস্থান এবং তীর্থক্ষেত্রে। তা ছাড়া বলরামগৃহ ছেড়ে আসার পরে সারদা যে কামারপুকুরে বসবাস করছেন, এ খবর কৃষ্ণভাবিনীর জানা ছিল। শুধু জানা ছিল না কী অবস্থায় আছেন। তাঁকেও দেখে যাবেন একবার।
চৈত্রের নিদাঘ দুপুরে দুটি শাকভাত মুখে দিয়ে ঘরের সামনে মাটির দাওয়ায় শুয়ে ছিলেন সারদা। ক্লান্ত অবসন্ন শরীর এবং মন। পোশাক-আশাকের এমনই জীর্ণ অবস্থা যে খুব বেশি ঘরের বাইরে যেতে পারেন না। প্রসন্নময়ীর সেই বালক কাজের ছেলেটি, গণেশ, মাঝেমধ্যে সারদার বাড়িতে এসে কাকতাড়ুয়ার দায়িত্ব পালন করে। গাছে গাছে কুশি কুশি আম ধরেছে। পাখিরা যাতে নষ্ট না করে, গণেশ তাই একটি লাঠি হাতে দুপুরে পাহারা দেয়। কখনও তার মনোরাজ্যের অজস্র প্রশ্ন নিয়ে সারদার সঙ্গে বকবক করে। নিঃসঙ্গ সারদার কিছুক্ষণ সঙ্গ হয়। সেই গণেশ-ই এসে ডেকে তুলল সারদাকে।
মা মা, ওঠেন। তিনজন মেয়েলোক আর একটা লোক এসেছে তোমার কাছে।
ধড়মড় করে উঠে বসলেন সারদা। চোখ দুটো একটু জুড়ে এসেছিল। তন্দ্রা ভাবটা কাটিয়ে বললেন, আমার কাছে! আমার কাছে এখন আবার কে আসবে!
গণেশ বলল, হ্যাঁ মা, তোমারই খোঁজ করেছে। বুলেচ্যে ঠাকুরের ইস্তিরি… লয়তো আমি বুঝতে লারতুম।
সারদা বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলের মধ্যেই বললেন, হ্যাঁ, বাবা গণেশ, কোত্থেকে এসেছেন জিগ্গেস করেছিস নাকি?
গণেশ মাথা নাড়ল, হ্যাঁ মা। বইললেন, আঁটপুর থেকে আইসচেন।
আঁটপুর! বিভ্রান্তি কাটিয়ে সারদা যেন কিঞ্চিৎ সন্ত্রস্ত হয়েই উঠলেন এবার। আঁটপুর তাঁর অনেকবার শোনা নাম। নিজে কখনও যাননি, কিন্তু যাওয়ার কথা হয়েছিল বেশ কয়েকবার সেই দক্ষিণেশ্বরে থাকার সময়, এমনকী বলরামের বাড়িতে থাকার সময়েও। ঠাকুর নিজে সেখানে গিয়েছিলেন, দু’–একবার ভক্তদের আমন্ত্রণে, তাঁর ভক্ত সন্তান বাবুরামের বাড়ি আঁটপুরে, তা ছাড়া বলরামের শ্বশুরবাড়িও তো…. তা হলে কি বউমা কেষ্টভাবিনী আর… ।
দ্রুত উঠলেন সারদা। তা হলে তো মানী অতিথি তাঁর দ্বারে। কিন্তু এই জীর্ণ দীর্ণ বেশে তাঁদের সামনে কী করে দাঁড়াবেন তিনি! অথচ উপায় তো আর কিছু নেই। নাহ্, দারিদ্র্য তো তাঁর অপরাধ নয়। সংকোচ ঝেড়ে ফেললেন সারদা। অতিথিকে আপ্যায়ন করার অবস্থা না থাকুক, স্বাগত জানাতে বাধা কোথায়! বিশেষ এই দুপুরের রোদ মাথায় করে বাড়ি বয়ে যখন এসেছেন।
উঠোন পেরিয়ে, বেড়ার ফটক খুলে বাইরে গেলেন সারদা। যা ভেবেছেন তাই! বলরামের গিন্নি আর শাশুড়ি এসেছেন ঠাকুরের ভিটেবাড়ি দেখতে। বোধহয় তাঁরাই সংকোচে পড়ে গেলেন সারদাকে দেখে। কিন্তু তা গোপন করে কৃষ্ণভাবিনী সারদার পায়ের ধুলো নিয়ে মাথায় ছোঁয়ালেন। দেখাদেখি আশ্রিত মেয়েটি এবং কাজের লোকটাও। কিন্তু মাতঙ্গিনী এগুতেই জিব কেটে সরে এলেন সারদা।
ও কী করছেন মা, আপনি গুরুজন যে!
বৃদ্ধা মাতঙ্গিনী দেবী, সারদাকে ওই চেহারায় অবস্থায় দেখেও যেন বিমোহিত। কুঞ্চিত চর্ম, ফোকলা মুখে হেসে বললেন, তাইতে কী মা, সাক্ষাৎ ভগবতীকে সামনে পেয়ে পেন্নাম করব না! কার বউ তুমি তা কি জানি না!
সারদা নিজেই নিচু হয়ে মাতঙ্গিনীর চরণ স্পর্শ করতে গেলেন। কিন্তু বৃদ্ধা শিউরে উঠে সরে গেলেন।— আমি কায়েতের ঘরের বিধবা বউ মা! তুমি ব্রাহ্মণ কন্যা, আবার স্বয়ং ঠাকুরের ধর্মপত্নী। তুমি আমার পায়ে হাত দিলে যে নরকেও আমার ঠাঁই হবে না।
বৃদ্ধা সারদার হাত টেনে চুমো খেলেন, মাথায় ঠেকালেন।
সবাইকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ির ভিতরে এলেন সারদা। গাছের ছায়া আর মাটির দাওয়াতেই সবাই বসলেন। সারদা জল এনে দিলেন। দগ্ধ দিনের তাপে, শ্রান্তিতে, ছায়ায় বসে জলপান করেই যেন কৃতার্থ বোধ করলেন মানুষগুলো। একটু পরে পার্বতী নামের মেয়েটি মাতঙ্গিনীকে হাত ধরে নিয়ে উঠল। ঘুরে ঘুরে চারপাশ দেখাবে। সতীশ নামের লোকটিও বাইরে গেল।
কৃষ্ণভাবিনী এতক্ষণ পরে একান্তে আলাপের সুযোগ পেলেন সারদার সঙ্গে। কোনও কিছুই তাঁর দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি৷ ছ’-সাত মাস পূর্বেও বৃন্দাবন থেকে ফিরে আসার পর সারদার যে চেহারা তিনি দেখেছিলেন, আজ তাঁর সর্বাঙ্গীণ অবস্থা দেখে কৃষ্ণভাবিনীর বক্ষ বিদীর্ণ হয়ে উঠেছিল। অশ্রু সংবরণ করে প্রথমেই কৃষ্ণভাবিনী বললেন, মা, কোনও দিন স্বপ্নেও ভাবিনি আপনাকে এই অবস্থায় দেখব।
একটু চুপ করে থেকে সারদা বললেন, ঠিক আছে বউমা, অবস্থা তো চিরদিন একরকম থাকে না।
তা বলে এই দীনহীন অবস্থা হবে আপনার! এ আমি সহ্য করতে পারছি না মা।
ব্যস্ত হোয়ো না বউমা, আমি কিছু খারাপ নেই।
কৃষ্ণভাবিনীর চোখের জল উপচে পড়ল। বললেন, মা, আপনি ঠাকুর পরমহংসদেবের জীবনসঙ্গিনী, তাঁর ভক্ত-শিষ্যদের গুরুপত্নী আপনি। আপনাকে তো তাদের সকলে মিলে মাথায় তুলে রাখার কথা।
তাই তো রেখেছিল মা। বাগবাজারে তোমার বাড়িতেও কি কম সুখে ছিলাম! বলরাম কুটোর আঁচড় পর্যন্ত গায়ে লাগতে দেয়নি।
তাহলে আজ আপনার এই অবস্থা কেন?
আমি ইচ্ছে করেই তো চলে এসেছিলাম বউমা। ঘরবাড়ি সব এখানে রয়েছে, ভাল হোক মন্দ হোক তাও তো নিজের।
কিন্তু নিজের বাড়িতে থেকে এভাবে আপনি নিঃশেষ হয়ে যাবেন! আপনার পরনে ছেঁড়া শাড়ি! ভক্তরা কেউ কি আপনার অবস্থার কথা জানে!
সারদা একটু সময় নিয়ে ধীরেসুস্থে বললেন, শোনো বউমা, কলকাতায় সবায়ের ‘মাথার ঘায়ে কুকুর পাগল’ অবস্থা। তার মধ্যেও যা করেছে তার তুলনা নেই। এখন ঠাকুর দেহ রেখেছেন, আমার তো আমার মতোই চলা উচিত।
কিন্তু এ অবস্থাকে তো চলা বলে না মা!
চলছে তো। তা ছাড়া ছেলেরাও শুনেছি অত্যন্ত কষ্ট করে সেই বরানগরের ভূতের বাড়িতে রয়েছে। আমি মা হয়ে…।
কৃষ্ণভাবিনী সারদার কথার মধ্যেই বললেন, এখানকার মানুষ কি আপনাকে চেনে না মা?
যারা চেনার তারা চেনে। সবাই তো একরকম হয় না মা। প্রথম প্রথম আমায় দেখে হয়তো গ্রামের বউঝিদের একটু চোখ টাটিয়েছিল… তাদের দোষ নেই। আমার মতন বিধবা তো তারা চোখে দ্যাখেনি আগে। আস্তে আস্তে সেসব সয়ে গ্যাছে।
আপনার চলে কী করে? মানে হাতে পয়সাকড়ি…. তা ছাড়া তো মানুষের…।
সারদা বললেন, বউমা, মাথার ওপর একটা খোড়ো চাল আছে, জমি থেকে কিছু ধান আসে, নিজে একটু শাকপাতা বুনি…।
কৃষ্ণভাবিনী থামিয়ে দিলেন সারদাকে।— থাক মা, আপনাকে আর বলতে হবে না।
ঝুম হয়ে কিছুক্ষণ বসে রইলেন কৃষ্ণভাবিনী। বুঝলেন, কোনও ভাবেই সারদা তাঁর ক্লিষ্ট দৈন্যের কথা মুখে স্বীকার করবেন না। শুধু তাই না, কোথাও যেন এই চুড়ান্ত দারিদ্র্যকে মেনেও নিয়েছেন। কারওর প্রতি কোনও অভিযোগ নেই। অদৃষ্টের হাতে নিজেকে সমর্পণ করে জীবদ্দশা টেনে চলেছেন। নিরাড়ম্বর নিভৃত এই জীবনধারণের চেয়ে বড় কৃচ্ছ্রসাধন আর কী হয়!
মনে মনে শতকোটি প্রণাম জানিয়ে, আত্মসম্মানবোধে পুষ্ট, দুঃস্থ, নিরভিমানী অথচ মহীয়সী এই মহিলার পায়ে মনে মনেই নিজের মাথাটি আর একবার নুইয়ে দিলেন কৃষ্ণভাবিনী৷ ঠাকুরকে তিনি অনেকবারই দেখেছেন, সারদাকেও কিছুদিনের জন্য কাছের থেকে স্বগৃহে দেখেছেন। কিন্তু অভাবে-দারিদ্র্যে দীর্ণ-জীর্ণ-শীর্ণ যে আত্মসচেতন, আত্মবিশ্বাসী, নির্লোভ, চাহিদাহীন সারদাকে আজ চিনতে পারলেন, এ তাঁর নতুন অভিজ্ঞতা। জীবনে এই প্রথম প্রকৃত দেবীদর্শনের আবেগে-উচ্ছাসে-উপলব্ধিতে ভেসে গেলেন কৃষ্ণভাবিনী। মাটির প্রতিমা নয়, এই নারীমূর্তিই ভগবতী, দেবী।
সারদার কণ্ঠস্বরেই চমক ভাঙল কৃষ্ণভাবিনীর।
আমার জন্য কষ্ট পেয়ো না বউমা। বেঁচেবর্তে তো আছি। শুধু ভাবছি…. তোমরা আজ অতিথি হয়ে তাঁর ঘরে এসেছ….।
আমাদের জন্য ভাববেন না মা। কৃষ্ণভাবিনী বললেন, আপনার কাছে আসতে পেরেছি, তাতেই আমি ধন্য। কিন্তু ঠাকুরের আর আপনার গৃহদেবতার সেবা করার অনুমতিটুকু দিন। আমরা তাঁর পুজো দিতেই এসেছি।
তার জন্য আবার অনুমতি কেন মা? তোমরা কেউ তো আমার পর নও।
কৃষ্ণভাবিনী বললেন, তা জানি মা। কিন্তু আমার মায়ের আবার সংস্কার আছে। অব্রাহ্মণ হয়ে, যতক্ষণ না পর্যন্ত ঠাকুরের পুজো এবং ভোগ হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত নাকি ব্রাহ্মণগৃহে অন্নগ্রহণ করা যায় না।
সারদা উদাস হেসে বললেন, তা বেশ। তোমাদের যেভাবে মনোস্তুষ্টি হয় সেভাবেই পুজোর আয়োজন করে। কিন্তু আমার অতিথি তোমরা। অসুবিধে, কষ্ট হলেও আমার কাছেই থাকবে তোমরা সবাই।
পুজো বা সেবা যেভাবেই বলা হোক, সব আয়োজনেরই একটি বাস্তব দিক আছে। আর সে ব্যাপারে কৃষ্ণভাবিনী যেমন সচেতন ছিলেন, সারদাও জানতেন কোত্থেকে, কী ব্যবস্থা হবে। ঠাকুরের আশীর্বাদে কৃষ্ণভাবিনীর অর্থাভাব নেই। স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়েই উদ্যোগ নিলেন। একই সঙ্গে আগামী কিছুদিনের মধ্যে সারদার জন্য নিজের কর্তব্যের বিষয়টিও মনে মনে পুষে রাখলেন। মাকে এভাবে এখানে ফেলে রাখা যাবে না।
বিকেলের রোদ পড়ে এল। হলুদ আলোয় গাছপালা প্রকৃতি নতুন রূপ ধারণ করেছে। ডাকাডাকি করছে পাখপাখালি। কামারপকর বাজার আর হাটখোলার কাছে দোকানপাট খুলতে শুরু করেছে। সতীশকে ফর্দ করে দিয়ে, টাকা দিয়ে বাজারে পাঠালেন কৃষ্ণভাবিনী। ওদিকে গণেশের মুখে খবর পেয়ে এসে পড়লেন প্রসন্নময়ী আর বৃদ্ধা ধনী কামারনি— ঠাকুরের ভিক্ষে-মা। গল্পে জমে উঠলেন মাতঙ্গিনীদেবীও। কিছুটা কাজকর্ম, উৎসবের সাড়া পড়ল ঠাকুরের নিঝুম ভিটেতে অনেকদিন পরে।
শঙ্করীও হাজির হয়েছে। পার্বতী তো আছেই। জল তোলা, উঠোন ঝাঁট দেওয়া, ঠাকুরের থানে গঙ্গাজল, পুজোর ব্যবস্থা শুরু হয়েছে। হাত লাগিয়েছে গণশাও। রান্নাঘরে ভোগ রান্না হবে। উনুন লেপা, কাঠকুটোর ব্যবস্থা দেখছেন সারদা, বাসন-কোসন যা আছে সব বেরিয়েছে। সেইসব ধোয়াধুয়ি হচ্ছে। রামলালরা সব অপরিচ্ছন্ন অগোছালো করে গিয়েছিল। একটু একটু করে আজ শ্রী ফিরে এল।
সূর্য ডোবার আগেই কাঁধে-মাথায়-হাতে ব্যাগ আর ধামায় করে রাজ্যের বাজার সেরে ফিরল সতীশ। হাতে হাতে নামানো, গোছানো হল। সন্ধে হতে না হতে, আজ বড় মাটির প্রদীপে রেড়ির তেল দিয়ে তুলসীমঞ্চ আলোকিত করলেন সারদা। আলো জ্বলল বাড়ির আনাচে কানাচেও। রঘুবীরের থানে পুজোর আয়োজন শুরু করলেন কৃষ্ণভাবিনী নিজেই। সঙ্গে ধনী বুড়ি, প্রসন্নময়ী। ফলমূল ধোওয়া, কাটা হচ্ছে। ঘরের চৌকির তলা থেকে গোটা কয়েক ঝুনো নারকোল বার করে দিলেন সারদা। কাটারি দিয়ে ছাড়াচ্ছে সতীশ। সেই ছোবড়া তুলে নিয়ে গিয়ে জ্বালিয়ে ধুনোর ধোঁয়া দেওয়া হল রঘুবীরের ঘরে। পুজোর আসন, বাসন সব তোলাই থাকে। একা সারদার পুজোর জন্য ওসব দরকারও হয় না। আজ কোশাকুশি থেকে শুরু করে চন্দনপাটা-ঘট-রেকাবি-প্রদীপদান-ঘণ্টা-চামর-কুশের আসন… সব বার করা হল। ঝেড়েঝুড়ে, ছাই দিয়ে মেজে ঝকঝকে করা হল। ফুল-বেলপাতা- আমের পল্লব আগেই জোগাড় হয়েছে।
কৃষ্ণভাবিনীর ফর্দে সারদার শাড়ি-জামার কথা লেখা ছিল। অনেকদিন পরে আজ গা ধুয়ে এসে, নতুন সরু লাল পাড়ের শাড়ি পরে সারদা নিজেই সন্ধ্যাহ্নিক আর পুজোয় বসলেন। শুক্লপক্ষের মাঝামাঝি তিথি আজ। সন্ধে নামতেই কুমডোফালির মতো চাঁদ উঠেছে আকাশে। গাছপালার পাতার ফাঁক গলে তারই হালকা আর ছোপ ছোপ জ্যোৎস্না পড়েছে উঠোনে।
ওদিকে কাঠের জ্বালে ভোগ রান্না চাপিয়েছে পার্বতী। সাহায্য করছে শঙ্করী, সতীশ আর গণেশ। পদ খুব বেশি নয়। খিচুড়ি, দু’-এক রকমের ভাজা, আর একটা পাঁচমিশেলি তরকারি। মিষ্টি তো কিনেই আনা হয়েছে। মুগ ডাল ভাজার গন্ধ ছড়িয়েছে ঠাকুরের বাড়িতে।
প্রাণের স্পর্শ পেয়ে অনেকদিন পরে জেগে উঠল কামারপুকুরের জীর্ণ কুটির। পুজোর পরে তুলসীমঞ্চের সামনে হল হরির লুঠ, তারপর প্রসাদ বিতরণ। ভোগ নিবেদন হল গৃহদেবতার কাছে, সবাই প্রসাদ পেলেন রাতে। তারপর হরিনাম সংকীর্তন।
তিনটে দিন মহানন্দে কাটল। চতুর্থ দিন সকালে সবাইকে নিয়ে জয়রামবাটি রওনা হলেন সারদা। কৃষ্ণভাবিনী আগেই ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। সেই অনুযায়ী দুটি গোরুর গাড়ি বলা ছিল। চৈত্রের মাঝামাঝি আমোদর নদের জল প্রায় শুকিয়ে এসেছে। তা হলেও অমরপুর গ্রাম পেরিয়ে সবাইকে হেঁটে পার হতে হল নদীটুকু, নয়তো চাকা বসে যেতে পারে। আমোদরের অপর পারেই বাঁকুড়া জেলা। দেশড়া গ্রামের মধ্যে দিয়ে আবার গো-যানেই জয়রামবাটি পৌঁছালেন সকলে।
নিবিড় আনন্দে আরও তিনটি দিন কাটিয়েছিলেন কৃষ্ণভাবিনীরা। ঘুরে ঘুরে দেখেছিলেন সারদার বাপের বাড়ি তথা ঠাকুরের শ্বশুরবাড়ির এধার ওধার। পুজো দিলেন সিংহবাহিনীর দেবালয়ে, কালী-মাড়ো আর সুন্দরনারায়ণের গৃহে। স্নান করলেন পুণ্যপুকুরে। আলাপ পরিচয় হল মুখোপাধ্যায়দের শুভার্থী পাড়া-প্রতিবেশীদের সঙ্গে এবং বিশেষ করে সারদার ভানুপিসি—মানগরবিনীর সঙ্গে।
কলকাতা ফেরার আগে কৃষ্ণভাবিনী কিন্তু আবার কামারপুকুর ছুঁয়েই এসেছিলেন।
শুধু যে সারদাকে পৌঁছে দেওয়াই তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, তা নয়। আর একবার সরেজমিন তাঁর দারিদ্র্যপীড়িত দুঃস্থ অবস্থাও চাক্ষুষ করে আসতে চেয়েছিলেন—যাতে ভক্তদের কাছে গুরুপত্নীর অবস্থার সানুপুঙ্খ বিবরণ দিতে পারেন। দিয়েছিলেন। আর তার প্রতিক্রিয়াও হয়েছিল দুরন্ত। নিজেদের গাফিলতি, উদাসীনতা আর অপরাধবোধে যেমন সংকুচিত হয়েছিলেন কতিপয় গৃহীশিষ্য, তেমনই অসহায় কষ্টে বিদীর্ণ হয়েছিল বরানগরের ভূতেরবাড়ির যুবক সাধুরা। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আবার সেই বলরাম-গিরিশ- মহেন্দ্ররাই। আর কালক্ষেপ না করে কামারপুকুরে ছুটেছিল যোগীন আর শরৎ। তারা নিজেরাই নিঃস্ব, কিন্তু মাস আটেক পরে মায়ের অবস্থা দেখে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। খবর পাওয়া পর্যন্ত নিদারুণ বেদনা আর উদ্বেগে কাটিয়েছিলেন গোলাপমা এবং যোগীনমাও।
বলরামের বাড়ি হয়ে নীলাম্বর মুখোপাধ্যায়ের বাসাবাড়িতে এসেও নিজমুখে দুর্দশার কথা কিছু বলেননি সারদা। সোচ্চার হওয়া এমনিতেই তাঁর স্বভাববিরুদ্ধ, আর নিজের ব্যাপারে তো বরাবরই বুক ফাটলেও, মুখে কিছু ফোটে না। তবু এখনও সারদার মনে আছে, বেশ একটা দোনামনায় পড়েছিলেন, কামারপুকুর ছেড়ে আসার আগে।
শ্বশুরবাড়ি, স্বামীর ঘর কামারপুকুরে। সেখানকার মানুষজনের কথায় কর্ণপাত করতেই হয়। একদিন যারা তাঁর বৈধব্যবেশ দেখে নিলেমন্দ, সমালোচনা এমনকী উৎখাত করার ষড়যন্ত্র করতেও পিছপা হয়নি, এবার তিনি ফিরে যাবেন শুনে তারাই আবার বলতে লাগল, ও মা, সে কী কথা! ঠাকুরবাড়ির বিধবা বউ, সে কিনা গিয়ে থাকবে ওইসব উড়োনচণ্ডী জোয়ান ছেলেদের মধ্যে, তাদের সঙ্গে! ছি ছি ছি।
সারদা শুনে গেলেন কয়েকটা দিন। সামান্য বিভ্রান্তও। ভক্তদের ডাকে আপাতত কলকাতায় গেলেও, স্বামীর ঘরে আবার তো ফিরতেও হবে। আজ না হয় কাল, এখানে এসেই আবার থাকবেন। কে কীভাবে পিছনে লাগবে কে জানে! অথচ একটানা এভাবে… !
সেই প্রসন্নময়ীই মানসিক সমর্থন জানালেন আবার।
বাড়িতে এসে বলেছিলেন, তুমি অবশ্যই যাবে বউমা। তারা সব শিষ্য, তোমার ছেলের মতো। একশোবার যাবে।
মনে মনে সারদা বলেছিলেন, ‘মতো’ না, সত্যি সত্যি তারা আমার সন্তান, আমি তাদের সত্যিকার মা।
আর দ্বিধা না করে চলে এসেছিলেন। আর দিনে দিনে টের পেয়েছিলেন, অপরাধবোধে ক্লিষ্ট কয়েকজন ভক্ত অন্তত আন্তরিকভাবেই তাঁর সেবা করছেন, কাছে টেনে নিয়েছেন। ছেলেরা কয়েকজন এদিক সেদিক বেরিয়ে পড়েছে, বাকিরা, বিশেষ করে যোগীন নিয়মিত যোগাযোগ রাখে। সারদা উদ্বিগ্ন বোধ করেন সব ছেড়ে আসা ছেলেদের কথা ভেবে। খোঁজ নেন, কে কী করছে।
গ্রীষ্মকালটা কেটে গেল দেখতে দেখতে। আষাঢ় মাসের গোড়ার দিক থেকেই বর্ষা নামল জাঁকিয়ে। ধূসর মেঘের যাতায়াত শুরু হয়েছিল আগেই, ধারাবর্ষণ আরম্ভ হল ক’দিন পরে। এবাড়ির ঘর বারান্দা থেকেই গঙ্গা দেখতে পান সারদা। প্রথম যখন এসে উঠেছিলেন, তখনও নদীর চেহারা শীর্ণ। বর্ষা শুরু হওয়ার ক’দিনের মধ্যে দেখা গেল তার রূপ পালটাচ্ছে।
ভাঁটার সময় চর জেগে উঠত কিছুদিন আগেও। খেয়া পারাপারের নৌকো যাতায়াত করত ঘুরে ঘুরে। ক্ষীণাঙ্গী কিশোরীর মতো গঙ্গা হঠাৎ যেন ঢল ঢল যুবতী হয়ে উঠল বৃষ্টি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে। প্রথমে ভরাভর্তি, এখন দিনে দিনে যেন ভয়াল ভয়ংকর হয়ে উঠছে। বাঁধানো ঘাটের অর্ধেক সিঁড়ি এখনই জলের তলায়। তাই বলে গঙ্গাস্নান বন্ধ করেননি সারদা। চিরকালই তাঁর গঙ্গা বাই।
সারদা টের পান, সেবা যত্ন আতিথেয়তায় তাঁর শরীর কিছুটা চাঙ্গা হয়েছে বটে, কিন্তু নিরন্তর একটি বেদনাবোধ তাঁকে মুহ্যমান করে রাখে। সেই বোধটি অনিবার্যভাবেই বরানগরের মঠবাসী ছেলেদের জন্য। তিনি নিজে কোনওদিন সেখানে যাননি, কিন্তু মাঝেমাঝেই যোগীনের বলা সেই বর্ণনা তাঁর কল্পনায় ভেসে ওঠে। এই বর্ষার জলকাদায় কী অবস্থা সেই ভূতুড়ে বাড়ির!
যোগীন এখন তাঁর দেখাশোনার জন্য অনেকদিন বেলুড়েই থেকে যায়। রাখাল-শরৎ-লাটু মাঝে মধ্যে আসে। গল্প-টল্প করে, কিছুক্ষণ হাসাহাসি করে যেন মায়ের আশীর্বাদ নিয়ে ফিরে যায়। নিজেদের জীবনযাপন, মঠের অবস্থা কোনওকিছু নিয়েই কোনও অভিযোগ নেই। অথচ শরীরের অবস্থা, পরিধান ইত্যাদি দেখে সারদা ঠিকই ওদের দুর্দশা আর দারিদ্র্য টের পান। কেউ কেউ পায়ে হেঁটেই তীর্থ করতে বেরিয়ে পড়েছে। শুনেছেন, একমাত্র শশী, যদিও সে অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলে, কিন্তু মঠ-অন্ত প্রাণ। ক্লান্তিহীন পরিশ্রমে ও সারাদিন কাজ করে যায়। পুজোর আয়োজন, যোগ-ধ্যান থেকে শুরু করে, জল তোলা ধোওয়া-মোছা রান্না করা এবং গুরুভাইদের দেখাশোনা পর্যন্ত শশী নির্বিকারে করে যায়। ও মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে, ঠাকুর সূক্ষ্ম শরীরে মঠে অবস্থান করছেন। সকালবেলা উঠে ও এখনও ঠাকুরের দাঁতন আর মুখ ধোওয়ার জল রাখে। বিছানা তুলে পরিষ্কার করে গুছিয়ে রাখে। পুজোর ব্যবস্থা করে দেয়, ভোগ দেয়। এমনকী বিশ্রামের কাল্পনিক সময়ে গুরুভাইয়েরা কথা বললে বকে এবং গরমের দিনে চৌকির পাশে বসে তালপাতার পাখা দিয়ে বাতাস করে।
সারদা একদিন যোগীনকে জিজ্ঞেস করলেন, হ্যাঁ বাবা, শশী যে একা এতসব সামলায়, তো পয়সাকড়ি পায় কোথায়?
যোগীন বলল, মা, চাঁদাপত্র যে যা দেন, তাই থেকেই যা কিছু।
কিন্তু সে তো খুবই সামান্য শুনেছি।
যোগীন বোধহয় নিজেদের দুরবস্থার কথাটা এড়িয়ে যেতে চাইল। বলল, মা, শশীর অসাধ্য কিছু নেই।
সারদা বললেন, ওর নিজের পয়সাকড়ি কিছু আছে?
না মা। তবে মাঝখানে একমাত্র ওই একটি কাজ ধরেছিল। বাইরের কাজ।
কী কাজ?
ও বরানগর উচ্চ বিদ্যালয়ে তিনমাস শিক্ষকতা করেছিল।—মানে মঠটা বাঁচিয়ে রাখার জন্য।
সারদা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এত কাজের মধ্যে সময় পেত কী করে?
যোগীন বলল, দুপুরের বিশ্রাম আর জপধ্যান বাদ দিয়ে ও চাকরি করত, আবার রাত জেগে সেটা পুষিয়ে নিত।
সারদার বাক্য হরে গেল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, আর নরেন?
সেই তো আমাদের মাথা, মা। হাজারটা ভাবনা ওর মাথায়। কিছুদিন তত বেরিয়ে চলে গিয়েছিল কাশী-অযোধ্যায়। এখন ফিরে এসেছে বটে, তবে আবার বেরুবে বলছে। কিন্তু আমাদের মঠের আসল গিন্নি হচ্ছে শশী। ওর জন্যই আমরা এখনও টিকে আছি।
মাঝে মাঝে সারদা ভেবেছেন, একবার গিয়ে দেখে আসেন বরানগরের মঠের প্রকৃত অবস্থাটা। কিন্তু কেউই উৎসাহ দেয়নি। কথাটা কানে গিয়েছিল নরেনের। শুনে বলেছিল, বাপরে, মা কষ্ট করে এখানে আসবেন কেন! আমরা এখান থেকেই তাঁকে শতকোটি প্রণাম জানাচ্ছি। আর… মাকে সত্যি সত্যি সেদিন নিয়ে আসব, যেদিন বলতে পারব—এই যে মা… আপনার জায়গা, আপনার ঘর…।
লাটু একদিন কথা বলতে বলতে বলল, মা, আপনি হামাদের জন্য কুছু চিন্তা করবেন না।
সারদা মাথা নেড়ে বললেন, তুমি তো বাবা বলেই খালাস… ভূতের বাড়ির যেসব কথা কানে আসে…।
লাটু দিব্যি হেসে বলল, মা, লরেন ভাই বলেছে, হামাদের জপধ্যান আর নাচ দেখলে ভূত ভি পালিয়ে যাবে।
কতক্ষণ জপধ্যান করো?
কুছু তো ঠিক নেই মা, কোনও কোনও দিন সারারাত কাবার হয়ে যায়। এমনিতে রাত তিনটেয় শশীভাই নয়তো লরেনভাই ঘণ্টা বাজিয়ে সবাইকে তুলে দেয়। আর শশী ভায়ের তো… চুন-পান খসে না।
সারদা ঘোমটার মধ্যেই লাটুর বাংলা বলার বহর দেখে নিঃশব্দে একটু হাসলেন। জানেন, সকলে ওর ওই বিশেষ বাংলা বলাটাই পছন্দ করে। আরও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব জানার চেষ্টা করলেন।
মঠে কী খাও তোমরা?
যেদিন যো জোটে মা। ভাত-নুন আর তেলাকুচো পাতা সিদ্ধ হয়… আবার কোনওদিন ঠাকুরের যা ভোগ আসে… ওসব মনে আসে না মা।
টাকাপয়সা দেয় কেউ?
হাঁ মা। বোলোরামদাদা ঠাকুর সেবার জন্য এক টাকা করে দেন। সুরেনবাবু মাসে তিরিশ টাকা দেন। গিরিশবাবু, মহেন্দরদাদাও যা পারেন….। আবার চুনীবাবু-রামবাবু- দেবেনবাবু মাঝে মাঝে কুছু কুছু পাঠান।
হ্যাঁ বাবা, তোমরা চুরি-টুরি করো না তো?
লাটু বেশ শব্দ করে হাসল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, মা, হামাদেরই তো সবকুছু ঠাকুর চুরি করে নিয়েছেন। লোকের ঘরে আর কী আছে। তবু কি জানেন মা, যখনই ঠাকুরের ভোগে ভাল ফল দেওয়া হয়, ওখানকার লোক দেখে বলে, ভূতের বাড়িতে সাধু লেড়কারা ঘড়া ঘড়া মোহর পেয়েছে। হামরা সব ফুর্তিসে থাকি তো…। কোত্তো মজা হয় মা। শোরোট ভাইয়ের তো ভাল স্বাস্থ্য, একটা বউ একদিন বলল, তুমার এমন গোতর আছে, ভিখ্ মাগো কেন? টেরামের কন্ডাক্টারি করতে পারো না?
সারদা বললেন, তোমাদের গা, হাত পা সব দেখি কেমন খড়ি ওঠা, ফাটাফাটা। কাপড় গামছা-টামছা আছে?
লাটু নিজের হাত-পা দেখে বলল, ওসব হামাদের মনে নাই মা। গঙ্গায় ডুব মেরে আসি, হাওয়ায় সব শুখায়ে যায়। অনেকেই শুধু কৌপিন পরে থাকে তো। তবে দুটা কাপড় রাখা থাকে দালানের ঘরে, যে যখন ভিক্ষা করতে যায়, গায়ে দেয়। শুধু লরেন ভাই একটা পাগড়ি বানধে।
ওখানে আবার পুজো, উৎসবও তো হয় শুনেছি।
হাঁ মা, গত বছর লরেনভাই বলল, কালীপুজো করব। সুরেনবাবু বেওস্থা করে দিলেন। হোম-যজ্ঞ, পাঁঠাবলিও হল। তবে লরেনভাই বলেছে, পাঁঠাবলি এই ফার্স্ট আর লাস্ট। অ্যাখুনো আমাদের শিবপুজো আর ঠাকুরের তিথি পুজো হয়। আবার গুড ফ্রাইডে, খ্রিস্টমাসও হয়েছে। একটা সাহেব দেখে বলল, আমরা যেন যিশুখ্রিস্টেরও শিষ্য আর সন্তান।
সারদা জিজ্ঞেস করলেন, একটু আধটু লেখাপড়া করো তো বাবা?
লাটু বলল, লরেনভাই আমাদের লিডর মা, ও যা বলে শুনি। আবার কালীভাই, শশীভাইও খুব পণ্ডিত। ওরা সব তর্ক-আলোচনা করে, তারপর হামাদের শিখিয়ে পড়িয়ে দেয়। তবে লরেন ভাইকে কেউ ছাপিয়ে যেতে পারে না।
তা তো হবেই বাবা। ঠাকুর বলতেন, নরেন তাঁর হাতের যন্ত্র। তার প্রতিভার বিকাশ সবদিকে।
লাটু নিজের থেকে বলে যায়, লরেন ভাই গানও গায় এতো আচ্ছা। নতুন গান লিখেছে, ‘নাহি সূরয (সূর্য) নাহি জ্যোতি নাহি শশাঙ্ক সুন্দর।’ ওর সঙ্গে পাখোয়াজ বাজায় কালীভাই, আর বুড়ো গোপালদাদা তবলা বাজায়। হামরা সবাই নাচ করি।
তা বাবা, পাড়ার লোকজন ঝামেলা করে না তো?
আখুন আর করে না। আগে আগে ঢিল মারত, গাল দিত। আখুন অনেক লোক কীর্তন শুনতে আসে৷ দেখে তো মা, আমাদের কুছু নাই। তার মধ্যে আখুন আমরা মানুষের বিপদ দেখলে সাহায্য করি, ভিখারিদেরও আমাদের খাবার দিই, কারুর ওসুখ হলে সেবা করি। কত বড় বড় মানুষ হামাদের ঘরে আসেন, সে তো দেখে। ইংরিজি কথাবার্তা বলে শশীভাই, লরেন ভাই… সেসবও শুনে। হামাদের কুনো দুঃখু নেই মা।
মঠ বাড়ির একটা খণ্ডচিত্র দেখতে পান সারদা। বুঝতে পারেন শারীরিক কষ্ট, খাওয়ার কষ্ট থাকলেও, ছেলেগুলোর আনন্দে কোনও ঘাটতি নেই। আর সবকিছুর ওপর, একমাত্র ঠাকুরকে স্মরণ করে, এখনও যে সবাই ভাই ভাই হয়ে রয়েছে, তাও বড় কম কথা না।
নিজের খুদকুঁড়ো যা থাকে, তাই ওদের হাত দিয়ে বরানগরে পাঠিয়ে দেন সারদা। বলে দেন, সবাইকে গিয়ে বোলো বাবা, আমি তাদের প্রাণ ভরে আশীর্বাদ করেছি, আর নিত্য ঠাকুরের কাছে সবার জন্য প্রার্থনা করে যাচ্ছি। তোমরা ভাল থেকো।
রথের দিন মহেন্দ্রনাথ এলেন সারদার সঙ্গে দেখা করতে।
গ্রামদেশ আর হাওড়া কলকাতার সামাজিক চেহারায় তফাত আছে। গ্রামে যতটা পর্দানশিন হয়ে, ঘোমটার আড়ালে থাকাটাকেই শিষ্টাচার মনে করা হয়, এখানে আদবকায়দা তেমন নয়। সারদা অবশ্য বাইরের, বিশেষ করে পুরুষমানুষদের সামনে এখনও লজ্জাপটাবৃতা, তা হলেও কিছু কিছু ভক্ত শিষ্যদের সঙ্গে তাঁর মৌখিক আদানপ্রদান হয়। মাথার ঘোমটাটি তাঁর প্রায় সর্বক্ষণই থাকে। গৃহী শিষ্যদের সঙ্গে কথাবার্তা বলার সময় মুখটাও একটু পাশ ফিরিয়ে রাখেন বটে, তবে ক্রমশই সহজ হয়েছেন অনেক।
মাস্টারমশাই মহেন্দ্র এবং তাঁর স্ত্রী নিকুঞ্জদেবীর সঙ্গে সারদার আগে থেকে আন্তরিক সম্পর্ক। মহেন্দ্র মানুষটিকে বলরামের মতোই গভীর প্রীতি এবং স্নেহের দৃষ্টিতে দেখেন। মহেন্দ্র বিশ্বাস করেন, শ্রীমায়ের আশীর্বাদেই তাঁর ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ জীবনচর্যার মধ্যেও একটি চির প্রশান্তির স্পর্শ আছে। মনের গভীর গোপনে একটি দুরন্ত অভিলাষ আছে মাস্টারের। একটি আকাশ ছোঁওয়া ইচ্ছার বীজ মানুষটি লালন করেন নিজের মধ্যে। দীর্ঘকাল ধরেই মহেন্দ্র তাঁর রোজনামচাতে ঠাকুরের নানান কথা, বাণী ইত্যাদি টুকে টুকে রাখতেন। মনে আশা, কোনওদিন যদি সম্ভব হয়, তা হলে যুগাবতার মানুষটির কথামৃত বই আকারে প্রকাশ করবেন। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন, এই দুরূহ কর্মটি মায়ের আশীর্বাদ এবং অনুমতি ভিন্ন তিনি কিছুতে করে উঠতে পারবেন না।
রথযাত্রার শুভদিন, ঊনবিংশ শতাব্দীর আশির দশকের শেষদিক, মহেন্দ্রনাথ গঙ্গায় খেয়া পার হয়ে নীলাম্বর মুখোপাধ্যায়ের বাগানবাড়িতে উপস্থিত হলেন সারদার সঙ্গে দেখা করতে। বিগত বেশ কয়েকদিন বিনিদ্র রজনী কাটিয়ে, ঠাকুরের বাণী সংকলন করে করে তিনি একটি পাণ্ডুলিপি তৈরি করেছেন। সশঙ্কচিত্তে সেই পাণ্ডুলিপিটি বগলদাবা করে নিয়ে এসেছেন। দীর্ঘ কিছু না, কিন্তু একটি নিবিড় প্রত্যাশা নিয়ে এসেছেন—মাকে যদি পাণ্ডুলিপির কিয়দংশ শোনাতে পারেন।
প্রণাম এবং কুশল বিনিময়ের পরে ইচ্ছাটি নিবেদন করলেন মহেন্দ্র।
মা, আপনার কাছে একটি আর্জি আছে।
সারদা ঘোমটা টেনে কিছুটা তফাতে বসেছেন। মৃদু স্বরে বললেন, আর্জি কেন বাবা, আপনারা কাছের মানুষ। এমনিই বলুন।
আপনার কাছে একটি বিষয়ে মতামত চাইব, কিন্তু সংকোচটা কাটিয়ে উঠতে পারছি না।
সংকোচ কেন বাবা? মা বলে ডেকেছেন, তারপর কি আর সংকোচ রাখতে আছে!
একটু ভরসা পেয়ে মহেন্দ্র বললেন, মা, ঠাকুর শুধু যুগাবতার তাই নন; পাপীতাপী মানুষ, স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের হৃদয়ে তাঁর অধিষ্ঠান। সংসারী মানুষকে সংসারের হাজার জ্বালাযন্ত্রণা, কষ্ট-দুঃখ-লাঞ্ছনা থেকে তিনি উত্তরণের পথ দেখিয়েছেন। তাঁর জীবনই তাঁর বাণী। সে বাণী গঙ্গার ধারার মতোই স্বচ্ছ পবিত্র। তাকে লিপিবদ্ধ করতে পারি সে ক্ষমতা আমার নেই। কিন্তু তাঁর মুখনিঃসৃত কিছু কিছু সংলাপ আমি যখন যতটুকু পেরেছি খাতায় লিখে রেখেছি। আর কিছু না মা, উত্তরকালের মানুষ, আমাদের বংশধররা, যারা তাঁকে চাক্ষুষ করে ধন্য হবে না, তারা যেন তাঁর বাণী কর্ণগোচর করেই ধন্য হওয়ার সুযোগ পায়… এটুকুই আমার উদ্দেশ্য।
আবেগে আনন্দে উচ্ছ্বসিত হলেন সারদা। বললেন, বাবা, যা কাজ করেছেন, তাইতে মা সরস্বতী আপনাকে কৃপা করবেন।
মহেন্দ্র তাঁর চটি খাতাটি বার করলেন। বললেন, মা, আমার তীব্র বাসনা, আমার লিখে রাখা ঠাকুরের বাণী আপনাকে যতটুকু পারি শুনিয়ে ধন্য হতে চাই। অনুমতি দিন।
পড়ুন বাবা, সারদা বললেন, আপনার এত শ্রমের ফসল… শুনতে পারলে আমিই ধন্য হব।
দিনক্ষণ উল্লেখ করে করে মহেন্দ্র তাঁর রোজনামচা থেকে ঠাকুরের মুখনিঃসৃত সংলাপ পাঠ করে গেলেন।
স্বপ্নাবিষ্টের মতো শুনলেন সারদা। খুব বেশিক্ষণের কিছু না। কিন্তু এত তন্ময় বিভোর হয়ে গিয়েছিলেন যে, শেষ হওয়ামাত্র বললেন, আহা বড্ড তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল, এ যে জন্ম-জন্মান্তর ধরে শোনার জিনিস বাবা।
মহেন্দ্র এত খুশি আর কৃতজ্ঞ বোধ করলেন যে, প্রথমে মুখে কথা এল না। একটু পরে বললেন, মা, তা হলে আপনি অভয় দিচ্ছেন যে এই কাজটি নিয়ে আমি আরও অগ্রসর হব?
সারদা বললেন, আমাকে আর অভয় দিতে হবে না বাবা। স্বয়ং বীণাপাণি ভর করেছেন আপনার ওপর। এ কাজ আপনাকে করতেই হবে।
তবু আপনার আশীর্বাদ আর কৃপাই আমার শক্তি আর পাথেয় হোক মা।
আপনি নিশ্চিত থাকুন বাবা, ঠাকুর আপনাকে দিয়ে তাঁর কাজ করিয়ে নেবেন। আপনি জগদ্বিখ্যাত হবেন এই কাজ করে। আমি বলে রাখলাম।
বুকভরা আনন্দ আর উদ্দীপনা নিয়ে ফিরে গেলেন মহেন্দ্র। জেনে, বুঝে গেলেন, তাঁর জীবন ও সাধনার উদ্দেশ্য ধ্রুবতারাটির মতোই ভাস্বর আর নির্দিষ্ট হয়ে গেল জীবদ্দশার বাকি দিনগুলোয়।
সারদাকে যে ভক্তশিষ্যরা তাঁর দারিদ্রপীড়িত নিঃসঙ্গ কামারপুকুর থেকে প্রথমে কলকাতায় এনেছেন এবং তারপর বেলুড়ে নীলাম্বর মুখার্জির বাড়িতে রেখেছেন, একথা চাউর হতে সময় লাগেনি। যথারীতি খবর পৌঁছেছে দক্ষিণেশ্বরেও। বর্ষা শেষ হয়ে শরৎকাল আসতে আসতেই দেখা গেল, বিশেষ করে লক্ষ্মী, আবার যোগাযোগ শুরু করেছে খুড়িমার সঙ্গে। বোধহয় কানাঘুষো শুনে থাকবে, ভক্তরা এবার মাকে শ্রীক্ষেত্র দর্শনে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছে। সুতরাং দলে ভিড়ে যেতে পারলে, লক্ষ্মীও আর ওই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে না। কিংবা বলা যায় না, মাত্র কয়েক মাস আগেই নিজেদের আচরণ আর কৃতকর্মের জন্য লক্ষ্মীর হয়তো একটু অনুশোচনা হয়ে থাকবে।
দুর্গাপুজোর সময় একটু বেশি ঘোরাঘুরি হল সারদার। বাগবাজার-বেলুড় যাতায়াত করলেন। বিজয়া দশমীর দিন গঙ্গার পশ্চিমপাড় থেকেই ছাদে বসে বসে ঠাকুর বিসর্জন দেখলেন। লক্ষ্মী ক’দিন ধরে নীলাম্বর মুখার্জির বাড়িতে এসেই রয়েছে। একাদশীর দিন যথারীতি সকাল থেকে উপোস করে রয়েছেন সারদা। লক্ষ্মীকে বললেন, গঙ্গার জল এনে আমার মাথায় একটু ছিটিয়ে দে তো। তারপর পুজোয় বসব।
লক্ষ্মী বলল, ছিটে দেব কেন। একটা ডুব দিয়েই এসো না।
সারদা বললেন, সদ্য সদ্য মা-দুর্গার ভাসান হয়েছে, এখনও গঙ্গার জলে পা ডোবাতে পারব না মা।
লক্ষ্মী বলল, শয়ে শয়ে তোক তো গঙ্গায় নেমেছে।
তা হোক, ওরা জানে না তাই। পুজোর পরে শান্তিজল কেন মাথায় দেয় জানিস? মনে করা হয় পুজো আর বিসর্জন শেষ হলে দেবদেবীর দেহ সব জলে মিশে গেছে। হিন্দুরা তাকেই শান্তিজল হিসেবে মাথায় ধারণ করে। ও জল পায়ে লাগাতে নেই… ক’দিন যাক, তারপর…।
হেমন্তের গোড়ার দিকে পুরী যাওয়ার দলটি নেহাত ছোট হল না।
গোলাপমা-যোগীনমা তো আছেনই, বাগবাজার থেকে যোগীন্দ্রমোহিনীর বৃদ্ধা মা সর্বজয়া এবার দলভুক্ত হতে চাইলেন। লক্ষ্মী সারদার সুখের সঙ্গিনী, ঠাকুরের ভাইঝি বলেও তার দলভুক্তিতে কেউ প্রশ্ন তোলেন না। সারদা খুশি হলেন শরৎ-যোগীন ছাড়া এবার রাজা (ব্রহ্মানন্দ) তাঁদের সঙ্গে চললেন বলে। খুব ইচ্ছে ছিল কৃষ্ণভাবিনী আর নিকুঞ্জও সঙ্গে চলুন। কিন্তু বলরামের শরীরটি মাঝেমধ্যেই উৎপাত করছে, কৃষ্ণভাবিনী রয়ে গেলেন। সব ব্যবস্থা অবশ্য মূলত বলরামই করে দিয়েছেন। নিকুঞ্জদেবী রয়ে গেলেন সংসার, ছেলেমেয়ের জন্য। তা ছাড়া মহেন্দ্রর অনুপস্থিতিতে মঠের ছেলেরাও অভিভাবকহীন মনে করে নিজেদের। নরেন আবার বেরিয়ে পড়েছে উত্তর ভারত পরিক্রমায়।
জগন্নাথ দর্শনের আগ্রহ খুবই আন্তরিক, কিন্তু কলকাতা থেকে শ্রীক্ষেত্র পৌঁছানর পথটি খুব সহজ নয়। সময়সাপেক্ষ, কষ্টকর এবং দুর্গম। রেল যোগাযোগের ব্যবস্থা নেই। নদী পথে গঙ্গার মোহনা পেরিয়ে বড় জাহাজে সমুদ্রের উপকূলবর্তী চাঁদবালি বা চাঁদপুর পৌঁছাতে হবে আগে। সমুদ্রের চেহারা তারপরেই উত্তাল। চাঁদবালি থেকে আবার স্টিমারে বুড়িবালাম-রুসিকুল্যা-বংশধারা নদীপথে যেতে হবে কটক। সেখান থেকে গোযানে পুরী।
রওনা হওয়ার আগে সারদা আলাদা করে একবার আলোচনা করলেন শরৎ আর যোগীনের সঙ্গে।
বাবা, জলপথে এত দূরের যাত্রা… নিজের জন্য ভাবি না, কিন্তু দায়িত্ব পড়ে যাচ্ছে বাকিদের জন্য।
শরৎ বলল, কিন্তু মা নীলাচলে তীর্থ করতে যাওয়ার তা ভিন্ন আর পথ কোথায়?
সারদা বললেন, ডায়ামন্ড হারবারের পরে চাঁদবালি পর্যন্ত সমুদ্রপথটাই ভয়ের। যদিও বড় জাহাজ… কিন্তু বাবা এর আগে কয়েকশো যাত্রীসহ জাহাজডুবি হয়েছিল… সেইসব ভেবেই…।
যোগীন বলল, মা সেবার জাহাজ রওনা হওয়ার সময়টা ঠিক ছিল না। রথ দেখার জন্য মানুষ ব্যস্ত হয়েছিল, কিন্তু ভরা বর্ষায় সমুদ্রের কথা ভাবেনি। এখন সমুদ্র অনেক শান্ত… ঠাকুরের নাম করে বেরিয়ে পড়ব। তা ছাড়া আপনি তো সঙ্গেই আছেন।
নির্বিঘ্নেই পৌঁছালেন। নীলাচলের কাছাকাছি আসতে প্রকৃতির চেহারায় পরিবর্তন টের পেলেন সারদা। শুনশান, নিবিড় নির্জন পরিবেশ, বালিয়াড়ির পথে মাঝেমাঝেই কাঁটা ঝোপ আর লম্বা লম্বা ঝাউ, দেবদারু গাছের সারি যেন আঁকাবাঁকা সীমানা টেনে দিয়েছে দূর থেকে দূরান্তরে। আর তারই ফাঁকে ফাঁকে হঠাৎ চোখে পড়ছে সীমাহীন নীল আর ধূসর জলরাশি। বাতাসের সঙ্গে হঠাৎ হঠাৎ ভেসে আসছে একটি মৃদু গর্জনের সোঁ-সোঁ ধ্বনি। নির্জনতার সঙ্গেই উদাস হাওয়া-গাম্ভীর্য-দূরাগত সমুদ্র গর্জন-গাছের ছায়া সব মিলিয়ে সারদার মনে হল পুরো শ্রীক্ষেত্র যেন এক উদার দেবালয়। ঈশ্বর স্বয়ং এখানে প্রকৃতির সঙ্গে নিভৃত সংসার পেতেছেন।
আর একটু এগোতেই গোযানের অভ্যন্তর থেকে দূরে দৃশ্যমান হল জগন্নাথ দেবের মন্দিরের চূড়া। মাথা থেকে উড়ছে রঙিন নিশান। দু’ হাত জড়ো করে মাথায় ঠেকালেন সারদা। মনে মনে সংকল্প করলেন, বলরামদের ক্ষেত্রবাসীর মঠে পৌঁছে, আজই পদব্রজে জগন্নাথ দর্শনে যাবেন। শরীর থাকাকালীন ঠাকুরের আর সময় হয়নি শ্রীক্ষেত্র দর্শনের। কিন্তু সঙ্গে আনা পটের ছবিতেও তিনি জীবন্ত বলেই সারদা বিশ্বাস করেন, সুতরাং আঁচলে ঢেকে তাঁর পট নিয়ে যেতে হবে পুরুষসিংহ জগন্নাথ দর্শনের জন্য। পাণ্ডাদের বলতে হবে, কোনও আড়ম্বর নয়, তিনি মন্দিরে যাবেন জগৎপ্রভুর নিতান্ত নিভৃত সেবিকার মতো, নিজেকে নিবেদন করবেন, প্রার্থনা করবেন অগুনতি ভক্তশিষ্য, সন্তানসন্ততিদের জন্য।
নাতিশীতোষ্ণ সামুদ্রিক আবহাওয়ায়, পুণ্যভূমে-পুণ্যস্নানে-সৎসঙ্গে পুরীর তীর্থযাত্রার কয়েকটি সপ্তাহ বড় আনন্দে অতিবাহিত করলেন সারদা। আনন্দের মধ্যেই উপলব্ধি করেন, কোথাও একটি মানসিক পরিবর্তনের রসায়ন জারিত হয়ে চলেছে তাঁর মধ্যে। এই যাওয়া-আসা মেলামেশা আনন্দ করা, মানুষকে ভালবাসতে চাওয়া, কাছে টেনে নিতে চাওয়া… সবই ঠিক আছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও যেন তাঁর করণীয় আছে আরও কিছু। প্রত্যক্ষভাবে কোনও বড় বাস্তবকর্মে একা মহিলা হিসাবে তাঁর ঝাঁপিয়ে পড়ার অসুবিধা আছে, কিন্তু অনেকগুলি নিবেদিত তাজা প্রাণকে তিনি তো প্রকৃত জীবনধর্মে, কর্মে উদ্বুদ্ধ আর উৎসাহিত করতে পারেন। মেধায়-মননে সঞ্জীবিত করতে পারেন আগামীদিনের কোনও শুভ পরিকল্পনা আর পরিকাঠামোকে। পূর্ণ দিশা পান না সারদা ঠিকই, কিন্তু সেই মানুষটার জীবনযাপন আর তাঁর ভাবান্দোলনকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে যেসব আত্মত্যাগী, নিষ্ঠাবান সন্তানরা, তাদের যৌথপ্রয়াসে যেন সুদূরপ্রসারী কোনও সাংগঠনিক আয়োজনের স্বপ্ন দেখেন সারদা—যার কেন্দ্রে নিজের অস্পষ্ট ভূমিকাও কল্পনা করেন। আর কিছু না হোক, তিনি অন্তত মানসিক শক্তি জোগাতে নিজেকে প্রস্তুত রাখবেন তেমন কর্মকাণ্ডে।
শ্রীক্ষেত্র থেকে ফিরে প্রথমে কলকাতা তারপর কয়েকদিন আঁটপুরে বাবুরামদের বাড়িতে রইলেন সারদা। ছেলেরা দেখা করতে এল তাঁর সঙ্গে। সময় কাটালেন তার ঘনিষ্ঠ সঙ্গিনীরা ছাড়াও নরেন-শশী-শরৎ- বাবুরামসহ মহেন্দ্র মাস্টার, বৈকুণ্ঠ সান্যাল প্রমুখের সঙ্গে। নির্দিষ্ট কোনও আলোচনা, পরিকল্পনার প্রসঙ্গ উত্থাপিত না হলেও, যে ভাবনাগত পরিবর্তনের রসায়ন নিজের মধ্যে টের পান, তেমনই একটা ধারা পরিবর্তনের অন্তঃস্রোত যেন প্রবাহিত হচ্ছে ওঁদের মধ্যেও এটুকু অনুভব করেন।
সপ্তাহখানেক পরে সারদা আবার বেশ কিছুদিনের জন্য ফিরে গেলেন তাঁর নিজস্ব ডেরা তথা স্বামী-শ্বশুরের ভিটেবাড়ি কামারপুকুরে।
দূরের গ্রামদেশে কলকাতার খবর এসে পৌঁছায় শীর্ণ নদীতে জোয়ার আসার মতন। তেমন খুব একটা হেলদোল হয় না তাইতে, অবশ্যই যদি না বড় কোনও ঘটনা ঘটে। নিত্যদিন তেমন কিছু ঘটেও না। তা হলেও শাখানদীর জলধারায় মৃদু আন্দোলনের মতে, প্রান্তিক গ্রামেও মোটামুটি নিয়মিত কলকাতার খবরের হালকা স্রোত এসে পৌঁছায়। গঞ্জের মানুষকেও যোগাযোগ রাখতে হয় রাজধানীর সঙ্গে। মুখে মুখেই কথা রটে, ওড়ে। তারপর হাটতলাতেই হোক কিংবা কোনও মোড়লমশায়ের উঠোনে খবরাখবর পরিবেশিত, আলোচিত হয়, কখনও পল্লবিতও হয়। কিছুক্ষণের গল্পগুজব বা সাময়িক একটু উত্তেজনা অথবা কিঞ্চিৎ কৌতুহল চরিতার্থ হয়, কোনও কিছুই তেমন দাগ কেটে বসে না।
তবু এসবেরই একটি ক্ষীণ প্রতিক্রিয়া আছে। কোনও কোনও আপাত গুরুত্বহীন খবরও সাধারণ মানুষের অবচেতন মনে থেকে যায়। প্রসঙ্গক্রমে কথা উঠলে মনে পড়ে যায়, তাইতো কী যেন শুনেছিলাম কখনও!
সারদার কথা এভাবেই জয়রামবাটির সাধারণ মানুষের মনে ইদানীং মাঝে মাঝে ভেসে ওঠে।
কলকাতার বাগবাজারে শ্যামপুকুরে কিংবা বরানগর-দক্ষিণেশ্বরে কতিপয় লোক কিংবা ছেলেছোকরা, সারদাকে নিয়ে কিঞ্চিৎ আলোচনা, মাতামাতি করল কি না, কিংবা চাঁদা তুলে তীর্থে পাঠাল কি না, তাইতে গরিবগুরবো গ্রাম্য জয়রামবাটির অধিবাসীদের কিছু যায় আসে না। কিন্তু সেই সারদা নামের গাঁয়ের মেয়েটি আজ মধ্যবয়সে যখন বাপের বাড়িতে এসে বসবাস করেন, তাঁর সঙ্গে দেখা করতে কলকাতার মানুষজনও এই গণ্ডগ্রামে এসে হাজির হন, স্থানীয় গ্রামবাসীরা একটু নড়েচড়ে বসেন। মনে পড়ে, শুনেছিলুম বটে, পরমহংসদেব ঠাকুর দেহ রাখার পরে, তাঁরই ‘ইস্তিরি’ আমাদের গাঁয়ের সারদা, তারও… না-না, তেনারও কিছু সুখ্যাতি-টুখ্যাতি নাকি হচ্ছে। রামকৃষ্ণদেবের চেলারা তাঁকে খুবই খাতিরযত্ন করে। সাক্ষাৎ দেবী, জগদম্বা বলেই তার পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে।
জয়রামবাটি সারদার জন্মস্থান। নিজের গ্রাম, গ্রামের মানুষ, তাঁদের মানসিকতা—এই সবকিছুর সঙ্গেই তাঁর পরিচয় জন্মাবধি। প্রান্তিক এই গ্রামটির প্রকৃতি-আবহাওয়া- বসতির সঙ্গে তাঁর যেন জন্মজন্মান্তরের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। শ্বশুরবাড়ি কামারপুকুর, ভৌগোলিক পরিচয়ে অন্য জেলা হলেও, বাঁকুড়া আর হুগলি দুই জেলার মধ্যবর্তী সীমারেখা থেকে জয়রামবাটি গ্রামের দূরত্ব প্রায় এক। কামারপুকুর হুগলিতে, জয়রামবাটি বাঁকুড়ায়। হাঁটাপথে দুই গ্রামের দূরত্ব আড়াই-তিন মাইলের বেশি না।
সারদা বোঝেন, ঠাকুর দেহ রাখার পরে, এই সাড়ে চার-পাঁচ বছরের মধ্যে, কামারপুকুরের সঙ্গে সঙ্গে জয়রামবাটি নামটিও বারংবার উচ্চারিত হওয়ার ফলে, কিঞ্চিৎ পরিচিতি অর্জন করেছে বাইরের মানুষদের কাছে। নামোচ্চারণের কারণ অবশ্যই ঠাকুরের সঙ্গে তাঁর সম্বন্ধ ও সম্পর্ক। এই সম্পর্ক নিয়েই গ্রাম্য কৌতূহল, কূটকচালি, এমনকী আদি রসাত্মক, রসনাতৃপ্তকর আলোচনাও একদিন বেদনায় দিশেহারা করেছিল তাঁকে। কিন্তু সেসব ধোপে টেকেনি। কালের স্রোতে ধুয়ে গেছে মানুষের জুগুপ্সা, অন্যের বিষয়ে নাক গলানো অশালীন কৌতূহল। আর মহাকালের ইতিহাসে তাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যা সত্য এবং অনিবার্য। রটনাকারীরা দিনে দিনে মুখ লুকিয়ে ফেলেছে লজ্জায়, পরে অনুশোচনায়।
সারদা ওসব মনে রাখেননি। তাঁর ভাবজগৎ, ব্যক্তিজীবন দুইয়েরই বিস্তৃতি ঘটেছে এক কল্যাণময় আকাশ স্পর্শ করতে। ক্ষমা আর ভালবাসার মধ্যে ডুবে থেকেই, বাস্তব জীবনের রূঢ়তা-হিসেব-অসূয়া-কাতরতা সম্বন্ধে অদ্ভুত এক নিস্পৃহ উদাসীনতায় ডুবে থাকেন। আবার তার মধ্যেই তীব্র সচেতনতা এবং আত্মসম্মানবোধ জিইয়ে রাখেন মনের গভীর গোপনে।
বছর দুয়েক আগেও যখন সারদা চূড়ান্ত দারিদ্রে, নিঃসঙ্গতায়, অর্ধাহারে কামারপুকুরে ছিলেন, শ্যামাসুন্দরীর হৃদয় উদ্বেল হয়েছিল জ্যেষ্ঠা কন্যাটির অভাবনীয় কষ্টের কথা শুনে। তাঁর কিছুতে বোধগম্য হয়নি, সেই বিখ্যাত পরমপুরুষটির গৃহিণী, তাঁর মেয়ের জীবনযাপন কী করে অমন অভিশপ্ত দারিদ্র্যপীড়িত হয়ে উঠল আবার! বুক মোড়ানো কষ্টে দীর্ণ হয়েছিলেন শ্যামাসুন্দরী। মেজ ছেলে কালীকুমারকে (উমেশের মৃত্যুর পরে কালীকুমারই মেজ ছেলে বলে পরিচিত) পাঠিয়েছিলেন, সারদাকে জয়রামবাটিতে নিয়ে আসার জন্য।
সারদা আসেননি।
দুঃস্থ অবস্থা সত্ত্বেও ভাইকে দিয়ে মাকে বলে পাঠিয়েছিলেন, ঠাকুর যেদিন নিয়ে যাবেন, সেদিন যাব।
নেহাত স্তোকবাক্যই কি ছিল উক্তিটি! কে বলতে পারে।
কিন্তু আসলে জয়রামবাটিতে বাপের বাড়ির প্রকৃত সাংসারিক, অর্থনৈতিক ছবি আর চেহারাটি শুধু অনুমান নয়, পরিষ্কার দেখতে পেয়েছিলেন সারদা। শ্যামাসুন্দরীর উদ্বেগ, বেদনা সবই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। কিন্তু একবার গিয়ে পড়লে, ওই যৌথ সংসারে নিজের ভূমিকা এবং পরিস্থিতি কী হতে পারে বা দাঁড়াবে, সেটাও বোঝার চেষ্টা করেছিলেন। মানসিক কষ্টও এক ধরনের আবেগ। কিন্তু দারিদ্র-ক্ষুধার কাছে কোনও আবেগই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। নিজের দুঃস্থাবস্থা দারিদ্র্য থেকেও যথেষ্ট অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন সারদা।
কামারপুকুরে আর কিছু থাক, না-থাক, ঘরটি নিজের। দেবোত্তর করা ঠাকুরের জমি থেকে কিছু ধান এসে গোলায় ওঠে।
জয়রামবাটি বাপের বাড়ি হলেও, তা ভায়েদের সংসার। অভয় ছাড়া, প্রসন্ন-কালী-বরদা সকলেরই নিজস্ব সংসার হয়েছে। শ্যামাসুন্দরী ভাগের মা। সারদা অসহায়, নিঃস্ব এবং বিধবা ভগ্নী, দিদি হলেও, নিজের সঠিক ছবিটি দেখতে পেয়েছিলেন। অভিজ্ঞতা ছিল না ঠিকই, কিন্তু অনুমানই যথেষ্ট। মনে পড়েছিল, দাদার সংসারে বিধবা ভানুপিসির চেহারাটাও। নিজেকে সেই ভূমিকায় দেখতে চাননি সারদা।
এত বছরে একবারও যাননি সারদা তা নয়। কৃষ্ণভাবিনীদের নিয়ে ঘুরে এসেছেন জয়রামবাটি বছর দুয়েক আগে। অতিথিদের নিয়ে বাপের বাড়িতেই উঠেছিলেন, কিন্তু ভাইয়েদের ওপর নির্ভর না করে। বরং প্রচ্ছন্নভাবে তাদের অবলম্বন দেওয়ারই একটা আবহ রেখে এসেছিলেন। কৃষ্ণভাবিনী সারদাকে জানেন বোঝেন অন্য এক বোধ আর রুচি থেকে, তাঁর হৃদয়বত্তাকে শ্রদ্ধা করেন মানুষটির প্রকৃত পরিচয় পেয়ে। কাছের থেকে মানুষ সহজলভ্যের গুণ বিচার করতে ভুলে যায়। কিন্তু দূরত্বের সঙ্গে মূল্যবোধের একটি আনুপাতিক হিসেব আছে। সারদা সেটি বজায় রাখতে চান।
এবার সারদা জয়রামবাটি এলেন এক অন্যতর পরিচিতি নিয়ে। কিংবা বলা উচিত, পরিচিতি যা ছিল, তাই রইল, কিন্তু তাঁর উপস্থিতি আর ভূমিকার সঙ্গে আরও অতিরিক্ত কিছু এমনভাবে জড়িয়ে রইল, যা তাঁর পরিচয়কে অন্যরকম বৈশিষ্ট্যে চিহ্নিত করল। পিতাহীন নিজেদের বাড়িতে তথা ভায়েদের সংসারে অবাঞ্ছিত অতিরিক্ত বিধবা বোন হিসেবে সারদা আসেননি। আশ্রিতার হীনমন্যতা নিয়েও না। সারদা এলেন স্নেহসিক্ত শ্যামাসুন্দরীর কন্যা হিসেবে। কৃতজ্ঞচিত্ত ভায়েদের এবং তাদের পরিবারের অতিবাঞ্ছিত পরমপ্রিয় দিদি হিসেবে। এমনকী উত্তেজনাহীন, নিরাড়ম্বর জয়রামবাটির অধিবাসীদের গ্রাম্যজীবনেও তিনি যেন এক নতুন প্রীতিস্নিগ্ধ পরিচয়ে আবির্ভূত হলেন।
সারদা অনুভব করেন, ঠাকুর মানুষটি জীবদ্দশা সংবরণ করার পরে, এই ক’বছরে তাঁর অভ্যুত্থান এবং ভাবান্দোলনে এখনও আর অতিরিক্ত কিছু সংযোজন বা প্রসারের ব্যবস্থা হয়নি, বরং যে উদ্যোগ আর উদ্দীপনা তাঁর জীবৎকালে হু হু করে সঞ্চারিত হচ্ছিল মানুষের মনে এবং সাড়া ফেলে দিয়েছিল শহর অতিক্রম করে নগর গঞ্জে, সেই ব্যাপারটিতে ঢিলে পড়ে গেছে। একমাত্র তার কিছু ঘনিষ্ঠ ভক্ত শিষ্য এবং জনা পনেরো কুড়ি নিবেদিতপ্রাণ ত্যাগী সন্তানরা ছাড়া, বহু সাধারণ মানুষের মধ্যে তাঁর ভাবনা-উপলব্ধি-বাণী প্রচারের আরব্ধ কাজটি যেন থমকে রয়েছে।
ঠাকুর নিজে বীজ বপন করে গেছেন। তাঁর ভাবান্দোলনের প্রসারের জন্য একটি সঙ্ঘের অঙ্কুরোদগম দেখে গেছেন এবং অলৌকিক বিশ্বাসে স্থির নিশ্চিত হয়েছিলেন, একদিন পত্র পল্লবে অগুনতি সাধারণ মানুষই তাঁর সঙেঘর চারাগাছটিকে মহীরুহে পরিণত করবে। তাঁর জীবন এবং সাধনসঙ্গিনী হিসেবে সারদাকেও তিনি সেই স্বপ্ন দেখিয়ে গেছেন। আর সারদাও জানেন সেই স্বপ্ন পূরণই তাঁর জীবনের লক্ষ্য।
কিন্তু ব্যাপ্তি আর গভীরতায় এই কর্মকাণ্ড একইসঙ্গে সীমাহীন, বিশাল এবং জটিলও।
হয়তো আপাতত সমস্ত বিষয় এবং পদ্ধতিটি কিঞ্চিৎ থিতিয়ে রয়েছে। হয়তো সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একটি নিরন্তর অদৃশ্য প্রয়াস যে ক্রিয়াশীল, সারদা তাও অনুভব করেন। বিশ্বাসও করেন। আর করেন বলেই, নিজের ভূমিকা সম্বন্ধে তিনি সচেতন। এখনও পাঁচ বছর হয়নি ঠাকুরের আপাত অনুপস্থিতির, কিন্তু সারদা জানেন, নিজের নিরাড়ম্বর জীবনচর্যার মধ্যে দিয়েই তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তাঁকে পালন করতে হবে।
বরানগরের তথাকথিত মঠবাড়ির জীবনযাত্রা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হলেও এখনও চলছে। ছেলেরা কেউ কেউ শিবির আগলে ধরে রাখার মতো ওখানেই জপধ্যান, কৃচ্ছ্রসাধন, ঠাকুরচর্চা করে যাচ্ছে। বেশ কয়েকজন তীর্থ করতে যাওয়ার নামে আত্মান্বেষণে বেরিয়ে পড়েছে। অপেক্ষাকৃত বয়স্ক আর গৃহীভক্তদের মধ্যে কেউ কেউ নিরুৎসাহের শিকার হলেও, কেউ কেউ আবার নতুন উদ্যমে কাজে নেমেছেন। এমনকী বেশ কিছু নতুন মুখও স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রামকৃষ্ণ অধ্যাত্মবাদ প্রচারে সম্পৃক্ত হয়েছে। সারদা জানেন, ঠাকুরের ভাবজীবনের ধারা, তার ব্যাখ্যা এবং প্রচার পদ্ধতি ইত্যাদি নিয়ে ভক্তদের মধ্যে মতানৈক্য আছে, কিন্তু তাঁর সামগ্রিক জীবনচর্যা এবং নিবেদন নিয়ে ভক্তদের অবিশ্বাস নেই, সেটাই বড় কথা।
মনে মনে সারদা নিজেও বিশ্বাস করেন, এই সব উদ্যোগের পরিণতিই শুভ।
ঠাকুরের ভক্তশিষ্যরা তাঁর প্রয়াণের পরে হয়তো সাময়িক শূন্যতাবোধে, সারদার প্রতি দায়িত্ব পালনে কিছু ত্রুটি প্রদর্শন করেছিলেন। নিজেদের ব্যক্তিজীবনের টানাপোড়েনে সীমান্তবাসিনী মহিলাটির দিকে কেউ কেউ একটানা গুরুত্ব দিতে পারেননি।
কিছু যায় আসেনি সারদার। কষ্ট পেয়েছেন, অমানুষিক কষ্টও করেছেন, কিন্তু ফুরিয়ে যাননি।
আর তারই সব থেকে বড় প্রমাণ, আজ তিনি ঠাকুরের সহধর্মিণী ছাড়াও, অনেকটা স্বপরিচয়ে, স্বভূমিকায় গৃহীত এবং প্রতিষ্ঠিত। সাধু, গৃহী, সংসারী বা সংসারত্যাগী নির্বিশেষে ভক্তশিষ্যদের মা তিনি। মনে মনে সকলেই ক্রমশ অনুভব করেছেন, মাতৃসত্তার যে অগাধ ঐশ্বর্য সারদার অন্তরে সিঞ্চিত এবং সঞ্চিত রয়েছে, আগামীকালে সেই ঐশ্বর্য আর সম্পদই হবে তাঁদের মূল বাঁধন। একমাত্র মাতৃহৃদয়ের সীমাহীন উদারতা প্রীতি এবং নিঃস্বার্থ ভালবাসা কাউকে দূরে ঠেলে না দিয়ে, কাছে টেনে আনতে এবং রাখতে পারবে।
তাঁকে আশ্রয় করে থাকার জন্যই, তাঁকে বাস্তব অবলম্বনও দিয়ে যেতে হবে।
সুতরাং জয়রামবাটিতে সারদা এলেন, দুঃস্থ বিপন্ন দিদি বা মেয়ের পরিচয়ে নয়, ভক্ত শিষ্যদের নিবিড় নির্ভর মায়ের পরিচয়ে—আত্মসচেতনতা, আত্মসম্মানবোধ, দায়িত্ব, উদারতা আর ভালবাসা নিয়ে।
খর রোদ আর দাবদাহের পর চৈত্রের গোধূলিবেলা সদ্য একটু শীতল হতে শুরু করেছে। কামারপুকুর থেকে আমোদর নদ পেরিয়ে দেশড়া আর অমরপুরের মধ্যে দিয়ে গোরুর গাড়িটি পুণ্যিপুকুরের পাড় ঘেঁষে মুখুয্যেবাড়ির হাতায় এসে দাঁড়াল। গেরুয়া গোধূলির আলো পড়েছে গাছের মাথায়। ছায়ারা লম্বা হয়েছে। সারাদিন তাপে হাঁসফাঁস করে পাখির ঝাঁক ডানা মেলেছে আকাশে। গাড়ি থেকে নামার আগে ছইয়ের মধ্যে থেকেই সারদা সিংহবাহিনীর মন্দিরের দিকে করজোড়ে প্রণাম জানালেন।
কামারপুকুর থেকে সারদা একা আসেননি। গত বছর থেকে ভক্তরা তাঁর দেখাশোনার দায়িত্ব নেওয়ার পরে সাগরের মা নামের মধ্যবয়সি এক মহিলা তাঁর দেখাশোনা করেন, সঙ্গে সঙ্গে থাকেন। সেই সাগরের মা এসেছে। গণেশ বলে প্রসন্নময়ীর কাজের ছেলেটিও এসেছে। প্রসন্নময়ীই পাঠিয়েছেন। সারদার বাপের বাড়ির পরিবেশ, ভায়েদের মানসিকতার উপর খুব একটা ভরসা নেই তাঁর। তেমন কোনও প্রয়োজন হলে, একটা ছোকরা ছেলে সঙ্গে থাকলেও কাজে দেয়, সেই ভেবেই পাঠিয়েছেন। সব ঠিকঠাক থাকলে, সাগরের মা আর গণেশ আবার কামারপুকুর ফিরে যাবে।
সেই গণশাই গাড়ি থামতে আগে টুকুস করে লাফিয়ে নামল। গাড়োয়ান বলদ দুটিকে খুলে দিয়ে, নিজেই জোয়াল চেপে ধরে বলল, মা ঠাকরুন এবার ধীরেসুস্থে নামুন।
বোঁচকা-বুঁচকিসহ সাগরের মা, তারপর সারদা নামলেন।
রাস্তার ওপর থেকেই তাঁদের বহির্বাটির সীমানা শুরু হয়েছে। রামচন্দ্র বেঁচে থাকতে যা ছিল, ঘরবাড়ির চেহারা এখনও প্রায় তেমনই আছে। শুধু ভিতরবাড়িতে কালী আর বরদার বিয়ের পর দু’খানা মাটির ঘর ওঠা ছাড়া কোনও পরিবর্তন হয়নি। উঠোন আর রাস্তার সীমানা নির্দেশ করে একটি নামমাত্র বেড়া আছে বটে, কিন্তু বোঝা যায়, পৈতৃক সম্পত্তি এখনও ভাগবাঁটোয়ারা না হওয়ায়, ভায়েদের কারুরই এমনকী বেড়াটি পর্যন্ত মেরামত করার উদ্যোগ নেই।
বাড়িতে ঢোকার আগেই সারদা গাড়োয়ানকে বললেন, বাবা, তোমার গোরু দুটিকে উঠোনে নিয়ে এসে খোঁটায় বাঁধো, তারপর একটু জল আর জাবনা দাও, আমি বলে দিচ্ছি। অবলা জীব, এই ঝাঁঝা রোদে এতটা পথ টেনে নিয়ে এল…।
বেড়া পেরিয়ে ঢুকতেই সারদা দেখলেন হেঁটো ধুতি পরা খালি গায়ে, হাতে কয়েক আঁটি খড় নিয়ে ভিতরবাড়ি থেকে বাইরের দিকে আসছে কালীকুমার। প্রথমে গোরুর গাড়ি, তারপর সারদাদের দেখেই কিছুটা অবাক। হাতের খড় নামিয়ে রেখে দ্রুত এগিয়ে এল কালীকুমার। তারপর অবাক ভাবটা কাটিয়েই বলল, আরে কী আশ্চর্য দিদি! তুমি একা একাই চলে এসেছ!
সারদা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে বললেন, একা কোথায়! এই তো সাগরের মা আর গণশাও সঙ্গে এল।
তা হলেও একটা খবর দিতে পারতে।
বলতে বলতেই কালীকুমার নিচু হয়ে সারদাকে প্রণাম করল। তারপর এসো, এসো বলতে বলতে নিজেই আগে ছুটল ভিতর বাড়ির দিকে। মাঝপথ থেকে খড়ের আঁটিগুলো তুলে নিয়ে, সেখান থেকেই প্রায় হইচই ফেলে দিল।
ও মা, ও বউদি, কোথায় গেলে গো তোমরা… এই দ্যাখো দিকি কে এসেছে… তাই বলি তখন সক্কাল থেকে হাতের জিনিস বারবার কেন পড়ে যাচ্ছে…হ্যাঁ গো তুমি গেলে কোথায়?
ভিতরবাড়িতে ঢোকার আগেই সারদা বুঝে গেলেন কালীর ডাকাডাকিতে একটা সাড়া পড়ে গেছে। এর ওর তার গলার সঙ্গেই গোয়ালের দিক থেকে গোরুর হাম্বা ডাকও কানে এল। তারমধ্যেই শ্যামাসুন্দরীর গলা পেলেন। — কী হয়েছে, ও কালী চেঁচাচ্ছিস কেন, কে এসেছে?
মাটির দাওয়ার পাশে খড়গুলো রেখে কালী বলল, বলি, এসেই দ্যাখো, আজ মেঘ না চাইতেই জল! দিদি এসেছে গো কামারপুকুর থেকে, দিদি…।
কে? সারু এসেছে? কই, কোথায় রে?
বলতে বলতে উঠোনেই নেমে এসেছেন শ্যামাসুন্দরী। আর ঘরে ঢোকার আগেই দাওয়ার সামনে সারদাকে দেখে মুহূর্তে অশ্রুপ্লাবিত হয়ে গেল তাঁর দু’ চোখ। কাছে এসে প্রায় জড়িয়ে ধরার সঙ্গে থুতনিতে হাত দিয়ে চুমো খেলেন মেয়েকে। বললেন, হ্যাঁ মা, এ কী কাণ্ড বল দেখি তোর! মাসের পর মাস কোনও খবর নেই, যোগাযোগ নেই… আর আজ এমন হুট বলতে…।
কথার মধ্যেই সারদা নিচু হয়ে শ্যামাসুন্দরীর পায়ের ধুলো নিয়ে মাথায় ছোঁয়ালেন। তাঁর দেখাদেখি সাগরের মা আর গণেশও তাঁকে এবং তারপর সারদাকেও প্রণাম করল। সারদা বললেন, নিজেদের গাঁয়ে বাড়িতে আসব, তার জন্য আবার ঢাকঢোল পিটিয়ে খবর দেব কেন মা?
তা নয় বাপু, তা নয়। তুই এখন কলকাতা ছেড়ে গয়া-কাশী-পুরী কত জায়গায় ঘোরাঘুরি করিস…।
সারদা বললেন, তাতেই বা কী মা? তোমার মেয়ে সেই সারু আমি তো আর বদলে যাইনি!
বালাই ষাট, বদলাবি কেন মা! জয়রামবাটি তোর জন্মস্থান, বাপের বাড়ি। তবু আগে একটা খবর পেলে ঘরদোর একটু গুছিয়ে রাখতুম।
তার কোনও দরকার নেই মা, গোছগাছ যা করার আমি করে নেব। দেখি, আগে বসে একটু জিরিয়ে নিই… এবড়ো খেবড়ো রাস্তায় গোরুর গাড়িতে আসতে আসতে কোমরটা ধরে গেছে একেবারে।
কালীকুমারও তাড়া দিল। হ্যাঁ হ্যাঁ, সরো তো, আগে দিদিকে বসতে দাও।
এরমধ্যেই বেরিয়ে এসেছে রামপ্রিয়া—প্রসন্নর বউ, আর কালীকুমারের বউ সুবোধবালা।
রামপ্রিয়া প্রণাম করল সারদাকে। সঙ্গে ছুটকি, ইজের পরা বছর তিনেকের মেয়েটাও অবাক চোখে সারদাকে দেখতে দেখতে পায়ে হাত দিল।
থাক, থাক বলতে বলতে সারদা শিশুকন্যাটিকে দেখলেন। রামপ্রিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন, এটিই কি নলিনী?
রামপ্রিয়া বলল, হ্যাঁ দিদি… সেই আগেরবার যখন এসেছিলেন, এত্তটুকুন ছিল।
পাশ থেকে সুবোধবালাও এগিয়ে এল সারদাকে প্রণাম করতে। নিচু হওয়ার আগেই সারদা ওর স্ফীত উদর দেখে ধরে ফেললেন। —তোমায় আর নিচু হয়ে পেন্নাম করতে হবে না গো। এখানটাতেই বোসো বরং।
কালীকুমার সেটা লক্ষ করেই বলে উঠল, ওর এখন পাঁচ পুরিয়ে ছ’ মাস চলছে দিদি।
সারদা বললেন, তা বেশ, বর্ষার গোড়ার দিকেই তা হলে হবে বোধহয়।
সুবোধবালা ঘোমটা টেনে, আমি জল নিয়ে আসি, বলে ঈষৎ লাজুকভাবে সরে গেল সামনে থেকে। দাওয়ার সামনে দুই ধাপ সিঁড়ির ওপরেই বসে পড়লেন সারদা। আর শিশু নলিনীও ঠেলেঠুলে গায়ের কাছে লেগে বসল। সারদা কোলের কাছে টেনে নিলেন।
রামপ্রিয়া বলল, ও যে কী কটকট করে কথা বলে দেখবেন দিদি। মাঝে মাঝে আপনার ভাই কলকাতা থেকে এসেই দেখে নতুন কথা শিখেছে।
সারদা নলিনীর দিকেই তাকিয়ে বললেন, হ্যাঁরে তাই নাকি? তুই আমাকে চিনিস?
নলিনী কয়েক মুহূর্ত পরে হঠাৎ বলল, পিসি। আমি বিন্দাবন যাব।
সারদা হেসে জড়িয়ে ধরলেন ভাইঝিটিকে। বললেন, তা যাবি বইকি মা। শ্যামাসুন্দরীর দিকে তাকিয়ে বললেন, প্রসন্ন তা হলে এখন কলকাতাতেই থাকে?
তাই তো রয়েছে মা। কদ্দিন থাকবে কে জানে।
কালীকুমার বলল, আয়পয় ভাল হচ্ছে, থাকবে না কেন!
শ্যামাসুন্দরী বললেন, কী হচ্ছে তা কি আর জানি মা! যজমানি করে আর ক’ পয়সাই বা পায়?
কালী বলল, ভাল না হলে কি আর কলকাতায় ঘরভাড়া করে থাকতে পারত? শুধু তো বাড়ি বাড়ি ঘুরে পুরুতগিরি নয়, বিবাহ-অন্নপ্রাশন-শ্রাদ্ধ-উপনয়ন আছে, তারওপর সত্যনারায়ণ-ইতুপুজো-রামনবমী-আমবারুণী-মনসাপুজো-শনিপুজো—তো লেগেই আছে একটা না একটা। শুধু আমিই এখানে বসে বসে ধুঁধুল চুষছি আর হেলে গোরু চরাচ্ছি।
রামপ্রিয়া মুখ ঘুরিয়ে সরে গেল দেওরের মন্তব্য শুনে। সারদাও টের পেলেন কালীর কথার সুরে অন্যরকম ঝাঁঝ।
শ্যামাসুন্দরী প্রসঙ্গটা পালটালেন। গণেশকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এ ছেলেটি কে সারু?
মুহূর্তেই আনমনা হয়েছিলেন সারদা। ভাবটা কাটিয়ে নিয়ে বললেন, ওর নাম গণশা। আমাদের লাহাবাড়ির প্রসন্নমাসির কাছে থাকে, আমারও দেখভাল করে মাঝেমধ্যে। তো বেরুতে বেরুতে দুপুর হয়ে গেল, মাসি বলল, শুধু সাগরের মাকে নিয়ে যাবি এতটা পথ, সঙ্গে একটা ছেলে থাক।
সাগরের মা বলল, মাকে পৌঁছে দিতেই আমাদের আসা— আজই আবার কামারপুকুর ফিরে যাব।
সারদা চুপ করে রইলেন। সন্ধে না নামলেও, রোদ পড়ে এসেছে। সাগরের মা আর গণশা এখন রওনা হলেও কামারপুকুর হাটতলা পৌঁছাতে অন্ধকার হয়ে যাবে। পাড়াগাঁয়ের মেঠো পথ রাত বিরেতে চলাচলের খুব উপযুক্ত নয়।
সারদার ভাবনাটিই শ্যামাসুন্দরীর কথায় প্রকাশ পেল। শ্যামাসুন্দরী বললেন, কিন্তু বাছা, দেড়-দু’ ক্রোশ রাস্তা—এখন রওনা হলেও পৌঁছুতে দেরি হয়ে যাবে। এমনিতে কৃষ্ণপক্ষের রাত… আমোদরের চর পার হয়ে…।
শ্যামাসুন্দরীর কথার মধ্যেই কালীকুমার বলে উঠল, না-না, আজ আর ফেরার কোনও প্রশ্ন নেই। ও দিদি, বলো না।
সারদা খুশি হলেন। বললেন, আমি আর কী বলব, তোরা যা ভাল বুঝিস। বেলাবেলি এলে না হয় একটা কথা ছিল—।
কালীকুমার বলল, মার তো কথাই আছে, আমাদের হল ভক্ত ভগবানের সংসার। আজ রাতে যাহোক দুটি মুখে দিয়ে ঘুমোক। গরমের দিন, চাটাই পেতে দাওয়ায় শুলেও ক্ষতি নেই। কাল ভোর ভোর আমাকেও বদনগঞ্জের দিকে যেতে হবে, খানিকটা এগিয়ে দেব’খন। বলতে বলতেই ঘরের দিকে মুখ তুলে হাঁক দিল কালী। — হ্যাঁ গো তোমরা সব গেলে কোথায়— ও বউদি— বলি তেতে পুড়ে এল এরা—এখনও জল বাতাসা দিলে না। রামপ্রিয়া আর সুবোধবালা প্রায় একসঙ্গে বলল, এই আসছি, আসছি।
সারদা জানেন, মেজভাই কালীকুমারের মুখে একটু ধার বেশি, হাঁকডাক করে বটে। কিন্তু ওর মনটা তত খারাপ না। চটপট রেগেও যায়, আবার নিজেই মানিয়ে নেয়। বড় ভাই প্রসন্ন সে তুলনায় মিতভাষী কিন্তু হিসেবি আর কিপটে। বউ মেয়েকে বাড়িতে রেখে, কলকাতায় নিশ্চয়ই রোজগারের ধান্দাতেই পড়ে আছে। আর ভিটেবাড়িতে সব সামলাচ্ছে কালী আর বরদা। অভয়টা তো এখনও ছোটই।
রামপ্রিয়া সরায় করে মুড়ি-নারকোল আর বাতাসা নিয়ে এল। পিতলের ছোট থালায় তুলে দিল সাগরের মা আর গণেশকে।
সারদা হঠাৎ বলে উঠলেন, ওরে কালী, দ্যাখ তো বলতেই ভুলে গেছি—গাড়োয়ানটা বাইরে বসে আছে, গোরু দুটোকে জল দিতে বলেছিলাম—।
তোমরা বোসো, আমি দেখছি।
কালীকুমার উঠোন পেরিয়ে সদরের দিকে গেল।
রামপ্রিয়া আর সুবোধবালা সন্ধে দেওয়া, হেঁশেল দেখার জন্য উঠল। গণশা ইতিমধ্যে ভাব করে নিয়েছে ছোট্ট নলিনীর সঙ্গে। ওকে কোলে নিয়ে উঠোনে নামল। সাগরের মা পুণ্যিপুকুরে হাত মুখ ধুতে গেল। বেশ খানিকক্ষণ পরে সারদা আর শ্যামাসুন্দরী এবার মা-মেয়ের নিজেদের মতো করে একটু সুখ-দুঃখের কথা পেড়ে বসলেন।
সারদার চেহারায় ইদানীং একটু চকচকে ভাব হয়েছে। অনেকদিন পরে মেয়েকে দেখায় শ্যামাসুন্দরী সেটা প্রথমেই ঠাহর করেছেন। সেই বছর দুয়েক আগে যখন কৃষ্ণভাবিনীদের নিয়ে জয়রামবাটি এসেছিলেন, তখন মেয়ের কালি পড়া শরীর দেখে বুক ভেঙে গিয়েছিল শ্যামাসুন্দরীর। তারপরে গত বছর শ্রীক্ষেত্র থেকে ঘুরে সারদা একবার এসেছিলেন। কিন্তু বেশিদিন থাকতে পারেননি। মাস্টারমশায়ের স্ত্রী নিকুঞ্জদেবী খুব ডাকাডাকি করছিলেন। তাঁদের কম্বুলিয়াটোলার বাড়িতে ঠাকুরের অধিষ্ঠান ছিল, আবার তাঁরা সপরিবারে সারদার কাছেই মন্ত্রদীক্ষা নিতে চাইছিলেন। সারদার নিজের অবশ্য অন্য আর একটি উদ্বেগ ছিল সেইসময়। পরমভক্ত বলরামের বারবার অসুস্থ হওয়াটা তাঁকে পীড়া দিচ্ছিল। তাঁদের পুরো পরিবারটি যে ঠাকুর এবং সারদার কাছেও কতখানি, তা শুধু তিনিই জানেন।
শ্যামাসুন্দরী সারদার মাথায়-গায়ে-পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন, এবার তোকে দেখে বুকটা জুড়িয়ে গেল মা। তো কিছুদিন থাকবি তো, নাকি ক’দিন পরেই আবার পালাই পালাই করবি।
সারদা বললেন, থাকব বলেই তো এসেছি মা, তারপর দেখি ঠাকুর ক’দিন রাখেন।
তুই থাকলে আমারও একটা ভরসা। শ্যামাসুন্দরী বললেন। ছেলেদের সংসারে তা নয়তো—।
সারদা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কেন? ছেলেরা তোমায় দেখে না।
দেখার কথা নয় মা।
তা হলে আবার কী?
সংসারের নিয়ম তো জানিস মা। কর্তার ইচ্ছেয় কর্ম। এখন তোর বাবা স্বর্গে যাওয়া ইস্তক… প্রথমে প্রসন্নই সব দেখাশোনা করত। তোর ছোটকাকা যখন থাকত সেও খানিকটা সংসার দেখত। বিয়ে-থাওয়া করেনি, নিজের সংসার নেই, অসুবিধে কিছু ছিল না। কিন্তু এখন তো সবাই কর্তা। ছেলেদের সংসারে আমিই বাড়তি এখন।
সারদা একটু ভেবে বললেন, বাড়তি কেন? তুমিই তো সংসারের মাথা।
তা হয় না মা। যাদের হাতে ক্ষমতা সংসার তাদেরই। আমি বিধবা মা ছেলেদের আশ্রিত। দেখাশুনা অবশ্য করে না তা নয়। তবে নিজেদেরই যা অবস্থা, আমায় আর কী দেখবে!
ভায়ে ভায়ে ভাবসাব আছে?
আছে, আবার নেইও। এ তো চিরকেলে প্রথা মা। ভায়েরা সব একসঙ্গে থাকে, বড় হয়, তারপর একটি করে বউ আসে আর সংসার একটু একটু করে ভাঙতে থাকে।
সারদা টেরচা চোখে তাকিয়ে বললেন, ওহ্, তার মানে বউরাই সংসার ভাঙার জন্য দায়ী বুঝি?
তা বলিনি, তবে—যা ঘটে, দেখি, তাই বললাম।
কিন্তু মা, আমাদের তো বাবা-কাকারা অনেকদিন একসঙ্গে ছিল।
সে ছিল, কেননা, তোর বাবার মতন সৎ উদার একটা বড়দাদা ছিল মাথার ওপর, সেইজন্য।
সেটাই আসল কথা মা। সারদা বললেন, সব বড় সংসারে ওইরকম একটা লোক দরকার। সে বাবা হোক, বড়দা-জ্যাঠা এমনকী ঠাকুমা বা একটা বিধবা পিসিমা-জেঠিমাও হতে পারে। তাকে সহ্য করতে হয় খুব বেশি, আবার ভালবাসতেও হয় সবাইকে। কিন্তু সব ছাপিয়ে দরকার তার বুদ্ধি-ব্যক্তিত্ব আর মমতা—সবাইয়ের দোষঘাট, ভালমন্দ সেই মানুষটাকে সহ্য করতে হয়। সেরকম লোক তো বেশি হয় না মা। শুধু বউদের কী দোষ বলো?
শ্যামাসুন্দরী এবার প্রশ্ন করলেন, কিন্তু মা তুই তো সেভাবে সংসার করলি না, এতসব বুঝলি কী করে?
সারদা উদাসভাবে একটা হাসির মতো শব্দ করে বললেন, তোমরা তাই ভাবো, আমাকে যে কত বড় সংসার দেখতে হয় তা যদি জানতে—।
শ্যামাসুন্দরী থেমে গেলেন প্রসঙ্গটা আর না বাড়িয়ে। নিজের ছেলেপুলে না হলেও, ঠাকুরের চেলাবা যে সারদাকে মা বলে এবং যথেষ্ট ভক্তিশ্রদ্ধাও করে, এ ব্যাপারে তাঁর একটা ভাসা ভাসা ধারণা আছে। গৃহস্থ মধ্যবিত্তরা ছাড়া, বেশ কিছু অল্পবয়সি ছেলে, যারা নাকি ঠাকরের নামে ঘরবাড়ি ছেড়ে এসেছে তাঁর কাজ করবে বলে, সেইসব ছেলেরাও শুনেছেন সারদাকে মা বলতে অজ্ঞান। আবার এটাও ঠিক, সেইসব ছেলেরা তাঁর সারুকে দেখে বলেই তো আজ তিনিও মেয়ের ওপর ভরসা রাখেন।
শ্যামাসুন্দরী সামান্য তোয়াজের সুরেই বললেন, জানি বইকি মা। ঠাকুরের সংসার কি কম! তার সব দায় তো এখন তোরই।
সারদা জিজ্ঞেস করলেন, বরদা আর অভয়কে দেখছি না কেন? বরদার বউ ইন্দুই বা গেল কোথায়?
ইন্দুর বাবার শরীরটা ঠিক নেই, শ্যামাসুন্দরী বললেন, ও আর বরদা দু’জনেই বিষ্ণুপুর গেছে আজ, কাল পরশুই ফিরবে। আর অভয়টা তো এখনও পড়তে ভালবাসে। তো শিওড়ের কাছে আমার সেই জ্ঞাতিভাই, তোদের চণ্ডীমামার কাছে মাঝে মাঝে পড়া বুঝতে যায়, আজও গেছে। ফিরে আসবে।
তো অভয়ের একটা বে-থা কবে দেবে?
দাঁড়া, দেব। পনেরো পেরিয়ে এই সবে মোলোয় পড়েছে। এখনও তো ওর মাথায় ডাক্তারি পড়ার ইচ্ছেটা আছে।
সারদা বললেন, খুব ভাল। তা হলে আর বে-থার জন্য তাড়াহুড়ো কোরো না।
তা বললে কি চলে মা! শ্যামাসুন্দরী বললেন, কবে ছেলে ডাক্তার হবে, তার জন্য সংসারধর্ম বসে থাকবে! খোঁজখবর করতে করতেও সময় যায়। দেখি, একটি লক্ষ্মীমন্ত পাত্রীর খবর পাই আগে—। এখন মাথার ওপর তুই আছিস, দাদারা আছে। আমার ভাবনা কী?
তো প্রসন্ন-কালী-বরদা সব ভায়েদের মধ্যে সদ্ভাব আছে তো?
চলছে মা। মাঝে মাঝে লাঠালাঠি লেগে যায় না তা নয়। তবে প্রসন্ন বেশিরভাগ সময় কলকাতায় থাকে, শুনলি তো রোজগারপাতি খারাপ করে না। শুনছি পুকুরের উত্তরে ওর ভাগের জমিতে নাকি ঘর তুলতে পারে। ও তো স্বভাবেই কৃপণ জানিস—পয়সাকড়ি জমায়। এদিকে কালী আর বরদা জমিজমা, চাষবাস যতটা পারে দেখে। কালীটা গোঁয়ারগোবিন্দ একটু, তবে ভাল পুজোপাট করে, তাই যজমানিতে ওর ডাক পড়ে। বরদার অতসব হেলদোল নেই মা। বউগুলো মানিয়েগুনিয়ে চললেই আমার শান্তি।
সারদা বললেন, শান্তি পাওয়াটা নিজের ওপর মা। যত তুমি অন্যদের দোষঘাট দেখবে, ততই অশান্তি।
তা যা বলেছিস মা। চোখ বুজে বসেও থাকতে পারি না, আবার চোখের সামনে গোলমাল, গণ্ডগোলও সহ্য করতে পারি না।
যত পারো জপধ্যান আর হরিনাম করো মা। সবাইকে নিয়ে তো থাকতেও হবে, তার মধ্যেই তাঁকে স্মরণ ছাড়া মানুষের উপায় কী!
তুই এসেছিস, এবার আমারও একটু ফুরসত হবে। সংসারের কাজই কি কম মা। তার ওপর এখন সংসার তো ছড়ানোর দিকে।
ছড়ানোর দিকে মানে?
মানে—তোর ভায়েদের সংসার তো এখন বাড়তেই থাকবে। কালীর বউ সুবোধকে তো দেখলি। ওদিকে ইন্দুও আসলে পোয়াতি—হয়তো সেইজন্যই একবার মায়ের কাছে গেছে। আবার বড় বউমার নলিনীও তিন বছর হয়ে গেল—যেকোনওদিনই নতুন খবর হতে পারে। তোর বাবা একটা কথা বলত—যে, সংসার হচ্ছে ঝ্যাঁটার মতো, বেশ গোছ করা সরুটি থাকে প্রথমে, তারপর যতদিন যায় ছেতরে বড় হতে থাকে।
সারদা নীরব রইলেন।
অনিবার্য আর একটি সংসারের কথা মাথায় আসে। সেটি তাঁর ভাবসংসার। ঠাকুর তার পত্তন করে গিয়েছেন—তাঁর ত্যাগী সন্তানদের একত্র করে। কবে তা শাখাপ্রশাখায় পল্লবিত হবে কে জানে। কিন্তু চরিত্রে এই সংসার আর সেই সংসারের মধ্যে অনেক তফাত। গৃহী মানুষদের আশ্রয় দেওয়ার জন্যই যেন আত্মভোলা ঘরছাড়াদের জড়ো করে ঠাকুর অন্যরকম একটি সংসার রচনার স্বপ্ন দেখতেন। স্বপ্নকে পরিপূর্ণ রূপ দেওয়ার সময় পাননি, কিংবা হয়তো সূচনাটুকু করে দেওয়াই যথেষ্ট মনে করে নিজে অপ্রকট হয়েছেন। কিন্তু বিশাল বড় দায়িত্ব দিয়ে গেছেন সারদার ওপর।
মাঝে মাঝেই ভেবে আকুল হন সারদা, কী ঐশ্বর্য আছে তাঁর, যা দিয়ে রক্ষা করবেন ঠাকুরের স্বপ্নের সংসার। মানুষগুলো পোকার মতো কিলবিল করছে। তাদের দেখতে হবে একটু জুড়োবার ব্যবস্থা করতে হবে। অনেক কিছুই বলে গেছেন ঠাকুর, কিন্তু সেই অর্থে কী দিয়ে গেছেন সারদার হাতে।
নাহ্, হাতে তিনি কিছুই প্রায় দিয়ে যাননি। কিন্তু সারদা ক্রমশ টের পাচ্ছেন, আসলে তিনি ভরে দিয়ে গেছেন অন্যত্র। সাদা চোখে এখনও সেসব কিছু দেখা যাচ্ছে না, বোঝাও যাচ্ছে না। কিন্তু একটা কিছু ভেতরে ভেতরে ঘটছে, ধীর গতিতে নিভৃতে কিছু কাজ হচ্ছে। সেসব কাজ আড়ম্বর করে ঘোষণা করার মতো নয়। মানুষকে চিত্তশুদ্ধির আলো দেখানোর কাজ তেমন আনুষ্ঠানিক হয় না। আপনার ঐশ্বর্য নিয়ে সারদা তো সচেতনও না, কিন্তু একটি খুব গভীরে প্রোথিত নিরন্তর বিশ্বাসে তাঁর কোনও ফাঁক নেই। সেটি হচ্ছে, কেউই পর নয়, তাই নিজের সবটুকু দিয়ে ভালবাসতে হবে। কাউকে ছাড়া যাবে না।
ইদানীং একটি ধারাবাহিক উদ্বেগে প্রায়ই চিন্তিত হয়ে পড়েন সারদা।
উদ্বেগটি বরানগরের মঠবাড়ির অবস্থা, ছেলেদের মানসিকতা, অর্থনৈতিক দুরবস্থা, সাহেবদের শাসনে পরাধীন দেশবাসীর সামাজিক আর মানসিক অবস্থা এবং ভূমিকার পরিপ্রেক্ষিতে, ঠাকুরের তৈরি ছোট্ট ভাবসঙঘটির অবস্থান নিয়ে। খুব বিশদ কিছু সারদা জানতে পারেন না, কিন্তু এটুকু শুনে এসেছেন, গয়া আর বুদ্ধগয়া থেকে ফিরে কলকাতায় এসে, যে একটি পরিবর্তনের প্রবল প্রবাহ এসেছে মঠবাসীদের জীবনে। এমনিতেই এতদিন ওই ভাঙাচোরা জঙ্গুলে, ভূতের বাড়িতে কীভাবে ছেলেরা জীবনযাপন করছে তিনি ভাবতে পারেন না, কিন্তু তবু চালিয়ে যাচ্ছিল। খেয়ে, না-খেয়ে, অভাবে-অপমানে-অবহেলায় অথচ চূড়ান্ত বৈরাগ্যে, নিজেদের ঈশ্বরে নিবেদন করে এত বছর টিকে রয়েছে। এবার যেন ছেলেদের কর্মকাণ্ড ভাবনাচিন্তা জীবনযাপন সবই একটা বাঁকের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। ভাবের অভাব হয়নি তাঁর ত্যাগী সন্তানদের। এ ব্যাপারে সারদা নিশ্চিত। কিন্তু ভাবান্দোলনকে এবং তার সুফল মানুষের জীবনে প্রত্যক্ষভাবে ছড়ানোর জন্যই এবার যেন ওরা উঠে পড়ে লেগেছে।
আর এ সবেরই হোতা কে, সারদা জানেন খুব ভাল করে।
আবার সেই হোতাটিও জানে, আপাতদৃষ্টিতে অলক্ষ্যে থেকেও, আসলে যাবতীয় কর্ম নিয়ন্ত্রণের অলৌকিক অদৃশ্য চাবিকাঠিটি কার হাতে আছে। মাতা-পুত্র, সারদা ও নরেনের মধ্যে খুব সূক্ষ্ম আর গভীর একটি বোঝাবুঝি আছে।
গত বছর বাংলা সনের একেবারে গোড়াতেই পরপর দুটো ঘটনায় সারদা পরিবর্তনের আঁচ পেয়েছিলেন।
গয়ায় শাশুড়ির পিণ্ডদান করে সদ্য কলকাতায় ফিরেছেন সারদা। এসে উঠেছেন মাস্টার মহেন্দ্র আর নিকুঞ্জদেবীর বাসাবাড়িতে। মাত্রই কিছুদিন আগে এবাড়ির দোতালায় গৃহদেবতা প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি স্বয়ং। সামনেই চৈত্র সংক্রান্তি এবং পয়লা বৈশাখ। আপাতত আর ঠাঁইনাড়া না হয়ে, কয়েকদিন বিশ্রাম করে তারপর কামারপুকুর ফিরবেন। কিছু বিলিব্যবস্থা করার ব্যাপার আছে সেখানে। কেননা, ভাশুরপুত্র রামলালরা এতদিনে নিজেদের কৃতকর্ম এবং কাকিমার ভূমিকা কিছুটা আন্দাজ করেছে। যে দুর্ব্যবহার এবং অসৌজন্য তারা দেখিয়েছিল সারদার প্রতি, তাইতে তাঁর কোনও ক্ষতি হয়নি শেষপর্যন্ত, কিন্তু ছিছিক্কারে বিদ্ধ হয়েছিল নিজেরাই। সারদা যে সেসব কিছু মনে রাখেননি, শুধু তাই না, এবার অবস্থা পরিবর্তনের সঙ্গেই, আপন উদারতাতেই ঠিক করেছেন, শ্বশুরবাড়ির জমি-সম্পত্তি-চাষবাসের কিছু কিছু ওদের দিয়েই দেবেন।
একা মানুষ তিনি। তাঁরটা খাবেই বা কে। ভক্তশিষ্যরা তাঁকে মাথায় করে রেখেছে মা বলে। দুঃখ কষ্ট নির্যাতনের দিনের কথা মনে রাখেননি। রামলালরা ছাপোষা গৃহস্থ মানুষ, খুড়োর দয়ায় ঘণ্টা নেড়ে জীবন কাটাচ্ছে—যদি ওরা একটু ভাল করে থাকতে পারে, সেইজন্যই—।
কিন্তু মাস্টারের বাড়িতে থাকা হল না সারদার।
কৃষ্ণভাবিনী খবর পাঠিয়েছেন, বলরামের নাকি এখন-তখন অবস্থা। স্তম্ভিত হয়ে গেলেন সারদা। যন্ত্রণাবিদ্ধ অবস্থায় ছুটে গেলেন বাগবাজারে। কাউকে কিছু বলতে হল না। পরিস্থিতির গুরুত্ব দেখে, পরিণতিটি নিখুঁত পড়ে নিলেন। সাতান্ন নম্বর রামকান্ত বসু স্ট্রিটের বাড়িটির ভিতরে বাইরে পরিচিত অপরিচিত অজস্র উৎকণ্ঠিত মানুষের ভিড় আজ। বরানগর মঠ থেকে ছেলেরা ক’দিন ধরে পালা করে এসে রাত জাগছে। বলরাম বসু শুধু মঠবাসীদের গৃহী গুরুভ্রাতা তাই নন, ঠাকুরের নাম নিয়ে খুব ধীর গতিতে হলেও যে সমিতি ক্রমশ গড়ে উঠছে তিনি হচ্ছেন তার একটি মূল স্তম্ভ। আবেগ এবং অভাব, দুটি ক্ষেত্রেই বাস্তব প্রয়োজন মেটানোর দায়ভার কাঁধে নিয়েছেন বলরাম।
আজ বারোশো ছিয়ানব্বই বঙ্গাব্দের শেষ প্রান্তে বাগবাজারের ঐতিহাসিক বাড়িটিতে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় সেই মানুষটি শয়ান। উদ্বেগে দীর্ণ পুত্রসম সাধু গুরুভায়েরা, চিকিৎসকরা বিমর্ষ। সারদা এলেন। এবাড়ির আনাচে কানাচে তাঁর অবাধ যাতায়াত অনেক বছর ধরে। দোতালার উত্তর পশ্চিমে তাঁর ব্যবহারের জন্য ঘরটি নির্দিষ্ট করাই থাকে। আত্মীয়-বন্ধু-স্বজন পরিবেষ্টিত বলরামের কাছে না গিয়ে, নিজস্ব ঘরটিতে অন্তরিন হয়ে রইলেন সারদা। উন্মুক্ত জানালা দিয়ে সুরধুনির ধারাপ্রবাহ দেখতে দেখতে তাঁর বলরামের কল্যাণ কামনা করলেন।
নতুন বছরের প্রথমদিন। বারোশো সাতানব্বই সনের পয়লা বৈশাখ। মাত্র আটচল্লিশ বছর বয়সে বলরাম ইহলোকের মায়া কাটালেন। গভীর উদ্বেগ আর একইসঙ্গে নিবিড় প্রত্যাশা নিয়ে কাশীতীর্থ মুলতুবি রেখে ফিরে এসেছিল ভ্রাতৃপ্রতিম নরেন। কিছুই হল না। ওদিকে সারদা যেমন টের পেলেন একটি ইন্দ্রপতন হল, আর মঠবাসীদের নেতা ও মাথা নরেন অনুভব করল সমিতি গড়ার কাজে পরিবর্তন আনার কাল সমাসন্ন।
সারদাকে দ্বিতীয় অনুমানটির জন্য বেশিদিন অপেক্ষা করতে হল না।
কাজের তাড়না এবং মঠের ভবিষ্যৎ গঠনের জন্য পরিবর্তন আনতে বদ্ধপরিকর নরেন, তবু নিজস্ব উপলব্ধিকে ফলিত করার জন্য একটি কল্যাণহস্তের আশীর্বাদ আর সমর্থন দরকার ছিল। ছুটে গেলেন সারদার কাছে। তিনি তখন সাময়িকভাবে রয়েছেন বেলুড়ের কাছে ঘুসুড়ির এক বাড়িতে।
সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাতের পরে সুস্পষ্ট বক্তব্য পেশ করল নরেন।
মা, এভাবে মঠে বসে বসে জপধ্যান আর আধ্যাত্মিক চিন্তায় ডুবে থাকলে ঠাকুরের কাজ কিছু এগোবে না।
কী করতে চাও বাবা?
শিবরূপী জীব-এর চরণে মন প্রাণ শরীর অর্পণ করতে হবে। আমাদের স্বাবলম্বী হতে হবে মা।
তোমার চেতনা আর চৈতন্যই সঠিক পথের সন্ধান দেবে। কী উপায়ে তা ফলবতী হবে ভেবেছ?
মা, দারিদ্রে অশিক্ষায় দেশ জর্জরিত। ধর্মের নামে কতকগুলো অসার আচার অনুষ্ঠান আঁকড়ে দেশবাসী পড়ে আছে। শিক্ষার প্রসার করতে হবে, নিরন্ন মানুষের মুখে অন্ন দিতে হবে। আমাকে বেরিয়ে পড়তে হবে। উঁচুনিচু, ধনীদরিদ্র, রাজা মহারাজা সমস্ত স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে—জাতির প্রাণশক্তিকে সচেতন করতে হবে।
আমি সর্বান্তঃকরণে তোমায় আশীর্বাদ করছি বাবা। কিন্তু নিজের দিকেও লক্ষ রেখো।
মা, যদি মানুষ হয়ে ফিরতে পারি, তবেই আবার আসব। নয়তো এই-ই—।
সে কী বাবা! অমন অনিশ্চিত ভবিতব্যের ধারণা নিয়ে তুমি—
না-না মা, ঠিক বলেছেন। আপনার আশীর্বাদে নিশ্চয়ই ফিরে আসব।
সারদার আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে, সেই গত বছরের বর্ষাকালেই নরেন পরিব্রাজকের বেশ ধারণ করে মঠ ছেড়ে বেরিয়ে গেছে।
বেশ কিছুক্ষণ সারদাকে চুপ করে থাকতে দেখে শ্যামাসুন্দরী বললেন, কী হল মা সারু, সংসারের কথা উঠতেই তুই অমন চুপ হয়ে গেলি কেন?
একটু আনমনা অবস্থাতে উত্তর দিলেন সারদা।
অন্য আর এক সংসারের কথা ভাবছিলুম মা। তার চেহারা-চরিত্র-উদ্দেশ্য সবই এখানকার সংসার থেকে আলাদা। এখানে সবাই নিজেদেরটুকু গোছানোর তালে আছে, ভায়েরা যার যার স্বার্থ দেখতে ব্যস্ত। ওখানকার সংসারে ভায়েরা সব নিঃস্বার্থ, তাদের অবস্থা—‘আপনি খেতে পায় না, আবার শঙ্করাকে ডাকে’। পোড় ভাঙাবাড়িতে ছেলেরা থাকে, ভিক্ষে করে খায়। এক এক করে এদিক সেদিক বেরিয়ে পড়ছে আরও ভিক্ষার ধন সংগ্রহ করে নিয়ে আসার জন্য। গত বছর বুদ্ধগয়ায় গিয়ে আশ্রমবাসী ছেলেদের এমন ভিক্ষে করে জীবনযাপন করতে দেখেছিলাম, কিন্তু তাদের একটি নিজস্ব বাসস্থান অন্তত আছে। ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করেছি, তাঁর নামে যারা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে, তাদের যেন থাকা-খাওয়ার জন্য প্রাণপাত করতে না হয়। কিন্তু কোথায় কী! বরানগরের মঠ কি থাকবে! কোথায় যাবে ছেলেরা—এসবই ভাবি সবসময়।
শ্যামাসুন্দরী আর বিশেষ উচ্চবাচ্য করলেন না। শুধু একটা ব্যাপার টের পেলেন, সারদা জয়রামবাটিতে থাকবে মনস্থ করে এলেও, ওর ভাবনাচিন্তায় আবর্তিত হয়ে চলেছে কলকাতার ভক্তশিষ্য আর ঠাকুরের চেলা সেইসব ভবঘুরে ছেলেদের কথা।
একটু পরে প্রসঙ্গ পরিবর্তনের চেষ্টা করলেন শ্যামাসুন্দরী।
তোর কামারপুকুরের ঘরবাড়ির কী ব্যবস্থা করলি মা?
সারদা বললেন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, মেরামত-টেরামত করে রেখে এসেছি। মাঝে মাঝে ইচ্ছে হলে গিয়ে থাকব। কলকাতা থেকেও ভক্তরা এসে থাকতে পারবে।
আর রামলাল-শিবু, লক্ষ্মীরা?
ওরা থাকবে নিজেদের অংশে। রামলাল নতুন ঘর তুলেছে, যতটা পেরেছি ওকে পয়সাকড়ি দিয়েছি। এখন তো ঘুরে ঘুরে সেই আমাকেই ধরে সবাই। ছাড়তে তো পারি না কাউকে। এখন দেখি, এখানে ক’দিন টিকতে পারি।
পারবি না কেন মা? নিশ্চয়ই পারবি। আপন ভাই ভাজ, তাদের সংসার—।
আমার যে কেউই পর নয় মা। দেখো না, এখানে থাকলেও কত লোকজন আসতে শুরু করবে।
করুক মা। আসুক। কপালে থাকলেই না মানুষের পায়ের ধুলো পড়ে নিজের বাড়িতে।
কথাটা শুনে ভাল লাগল সারদার। তাঁর উপস্থিতির খবর জেনে ইদানীং দূরদূরান্ত থেকে মানুষ দেখা করতে আসেন লক্ষ করেছেন।
কাজ ছাড়া বসে থাকতে পারেন না সারদা। জয়রামবাটিতে এসেই খেয়াল করেছেন, বাড়িতে ভাই-ভাজ, মা ছাড়াও গোরু দুইবার জন্য গোয়ালা, ঘর ছাইবার ঘরামি, ক্ষেত জমিতে কাজের লোক, গোরু চরানোর বাগালের যাতায়াত থাকলেও, পুরো বাড়িটায় যেন লক্ষ্মীশ্ৰীয়ের অভাব। কারণটা অনুমান করতে পারেন সারদা। ঘরদোরের যেটুকু অংশ প্রসন্ন-কালী-বরদা নিজেদের বলে দাগিয়ে নিয়েছে, তার বাইরের অংশের রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে আর কারওর মাথাব্যথা নেই। শ্যামাসুন্দরীরও বাহান্ন-তিপান্ন বয়স হয়েছে, একা সবদিক গুছিয়ে উঠতে পারেন না।
দু’-একদিন পর থেকেই কাজে নেমে পড়লেন সারদা।
গরমের দিন, ভোর হয় তাড়াতাড়ি। সূর্য ওঠার আগেই শয্যাত্যাগ করেন সারদা। গোবর জল ছিটিয়ে আগেই ঝাঁট দেন পুরো বাড়ি। তারপর গোরু আর গোয়ালের পরিচর্যা করেন। অনেকদিন আগে রামচন্দ্র বেঁচে থাকাকালীন সেই ভগবতী নামের গোরুটি একেবারে অবিকল মানুষের গলাতেই যেন তাঁকে মা-অ্যাঁ বলে ডাকত। এখন মঞ্জরি নামের গোরুটিও প্রায় সেইরকম। রাখাল চরাতে নিয়ে যাওয়ার আগেই সারদা মঞ্জরির গায়ে জল ঢেলে, খড় দিয়ে ঘষে পরিষ্কার করে দেন। তারপর ফাঁকা গোয়াল থেকে গোবর তুলে রাখেন ঘুঁটে দেওয়ার জন্য। নালা কেটে দিলেন মলমূত্র বেরিয়ে যাওয়ার জন্য। ধোঁয়া দিয়ে মশা তাড়াবার ব্যবস্থা করলেন। কালীপদ নামের মুনিশটিকে সঙ্গে নিয়ে বেড়া বাঁধলেন বাড়ির চতুর্দিকে। ইঁদুরের গর্ত বোজালেন উঠোনে। দেখতে দেখতে বর্ষা এসে যাবে, তখন শুকনো কাঠকুটো জোগাড়ের জন্য রান্না আটকে থাকবে। একটা পুরনো ধানের মরাইয়ে জ্বালানি হিসেবে শুকনো গাছের ডাল, কাঠ ভরে রাখলেন। ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করলেন তুলসীমঞ্চ। ঘরামিকে দিয়ে নতুন খড় ছাওয়ালেন। কৃষ্ণকলি-টগর-বেল-জুঁই-গন্ধরাজ গাছগুলোর মাটি উশকে, জল দিয়ে দিয়ে চেহারা ফেরালেন।
দেখতে দেখতে রাম মুখুজ্যের বাড়িঘরের শ্রী ফিরে এল। সঙ্গে সারদার নিত্যকর্ম তো আছেই। সুবোধবালা, ইন্দুমতী দু’জনেই সন্তানসম্ভবা। তাদের আর বেশি কাজকর্মে না জড়িয়ে, সকাল থেকে নিজেই গোরুর জাবনা দেওয়া, জল তোলা, কাপড়কাচা সেরে হেঁশেলে ঢোকেন। শ্যামাসুন্দরী-রামপ্রিয়া দু’জনেই সাহায্য করেন। বাসন মাজা-মুড়ির চাল ধোওয়া-উনুন পরিষ্কার-কুটনো কাটার পরে রান্নাতেও হাত লাগাতে হয়। দুপুরে একটু গড়িয়ে নেওয়ার পরেও কাজ থাকে। রোদ পড়ে গেলেই পুণ্যিপুকুর থেকে জল আনতে হয়। গঙ্গাজলের ছিটে দেন ঘরদোরে, তুলসীতলায় পিদিম জ্বালেন। পাড়ায় খবর হয়ে গেছে সারদা জয়রামবাটিতে এসে রয়েছেন। ঘোষ-বিশ্বাস-সামুইদের বাড়ি থেকে কেউ কেউ সন্ধের পরে আসেন, কখনও রামায়ণ, ভাগবত পাঠ হয়, কোনওদিন হরিনাম সংকীর্তন। মাঝে মাঝে ভানুপিসি আসেন।
নিবিড় সাংসারিক গৃহস্থ জীবনযাপনের মধ্যেই কিছুটা সময় সারদা একা হয়ে যান। সবকিছুর মধ্যেই তিনি জানেন, পার্থিব লৌকিক তাঁর এই জীবনাচরণের উর্ধ্বে আর একটি ভূমিকা আছে। কখনওই সে ব্যাপারে তিনি সোচ্চার নন। অথচ আপন উপলব্ধির আলোতেই নিভৃতে একটি নিরাড়ম্বর মাতৃহৃদয় জেগে থাকে তাঁর মধ্যে। ক্ষমারূপী তপস্বিনী তিনি। গ্রাম্য চেহারা, শ্যামবর্ণ মাজা গায়ের রং, প্রায় নিরাভরণ মহিলাটির বাইরের চেহারা আর জীবনচর্যা অতিক্রম করে, অনন্য আর একটি রূপ আছে তাঁর। সেটিই তাঁর প্রকৃত স্বরূপ। তিনি পাহাড়ে তপস্যা করতে যান না, জ্ঞানগম্ভীর আধ্যাত্মিক ভাষণ দেন না, এমনকী এখনও অনেকটাই লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকতে ভালবাসেন। কিন্তু মহাজীবনের একটি অনির্বাণ দীপশিখা অদৃশ্যে প্রজ্জ্বলিত থাকে তাঁর মধ্যে। সেই শিখাটি তাঁর মাতৃহৃদয়। তাপিত সন্তানদের নিভৃত চিরআশ্রয় সেই হৃদয়ে।
চৈত্র সংক্রান্তি, পয়লা বৈশাখ গেল।
মাত্র একবছর আগে বলরামের অকালমৃত্যুর বেদনাদীর্ণ ছবি ভেসে উঠল সারদার মানসচক্ষে। একইসঙ্গে ধারাবাহিক মিছিলের মতো স্মৃতিরা এল, আবার সরেও গেল। আকাশের পশ্চিম দিগন্তে অস্তরাগের বর্ণচ্ছটা। অনির্বাণ দীপশিখাটি জ্বলছে তাঁর মাতৃহৃদয়ে। সেই আলোকেই আলোকিত তাঁর শিষ্য ভক্ত সন্তানরা। মাঝে মাঝে তাঁরা খোঁজ নেন, সুদূর জয়রামবাটি গ্রামে তাঁদের পরম নির্ভর মা জননী কেমন আছেন।
অক্ষয় তৃতীয়ার পরের দিন ভক্তসন্তান নিরঞ্জনের চিঠি পেলেন সারদা। নিরঞ্জন আসছে জয়রামবাটিতে, মার সঙ্গে দেখা করতে। আর একটু খবর ছিল। নিরঞ্জনের সঙ্গে আসছেন মহাকবি, প্রখ্যাত নট এবং নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষ। ঠাকুরের চিহ্নিত গৃহীভক্তদের অন্যতম—প্রত্যয়ে ও সংশয়ে দ্বন্দ্বমূখর অথচ কর্ম ও প্রাণশক্তিতে ভরপুর যে গিরিশের জীবন, সেই মানুষটির হৃদয় উদ্বেল হয়েছে মাতৃদর্শনের জন্য। সামান্য হাসির সঙ্গেই মনে মনে অদ্ভুত একটি স্বস্তির অনুভূতি টের পেলেন সারদা। গিরিশ কী মানুষ ছিলেন, কীভাবে রূপান্তরিত হলেন আর এক মানুষে, বিশ্বাসে-শ্রদ্ধায়-ভালবাসায়। আসুন তিনি। সন্তানই তো!
ঠাকুর বলেছিলেন, গিরিশ শিবের অংশ। কে জানে দুরন্ত জীবনযাপন আর মদের নেশায় চুর হয়ে থাকতেন বলেই হয়তো অমন উপমায় ভূষিত করেছিলেন। অথচ বিশ্বাসে অনড় মানুষটি তাঁর সংস্পর্শে কীভাবে পালটে গেলেন। সারদা জানেন, মাতৃচরণেও পূর্ণ সমর্পিত প্রাণ এখন গিরিশের। শুনেছিলেন, সেই বছর তিনেক আগে গিরিশ একদিন ছাদে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। সারদাও কী কারণে বলরামের বাড়ির ছাদে গিয়েছিলেন। গিরিশের স্ত্রী দূর থেকে দেখেই বলেছিলেন, ওই দ্যাখো, দ্যাখো, মা ওই বাড়ির ছাতে বেড়াচ্ছেন।
গিরিশ কিন্তু মুহূর্তে চোখ বন্ধ করে মুখ ঘুরিয়ে ফেললেন। বললেন, না-না এভাবে আমি মাকে দেখতে পারব না। আমার যে পাপনেত্র! সারদা কিছুই জানতেন না তখন। পরে শুনেছিলেন গিরিশজায়ার মুখেই।
গিরিশের এটি দ্বিতীয় পত্নী, নাম সুরতকুমারী, সিমলা পল্লির বিহারীলাল মিত্রর কন্যা। ভক্তিমতী বউটিকে সারদা বলেছিলেন, মা, তোমার স্বামীর বকলমা নিয়েছিলেন ঠাকুর স্বয়ং। ওঁর কি পাপনেত্র হতে পারে! পাপ তো চোখে থাকে না, থাকে মনে। উনি অত বড় মাপের মানুষ, কবি-নাট্যকার-অভিনেতা, ওঁকে কোনও পাপ স্পর্শ করবে না।
সুরতকুমারী গিয়ে কী বলেছিলেন, সারদা জানেন না। কিন্তু গিরিশচন্দ্রের যে একটি আবেগতাড়িত দুর্বার ভক্তি ছিল সারদার প্রতি, তা তিনি জানতেন। ঠাকুর দেহ রাখার পরে, নানান সময়ে সারদার রক্ষণাবেক্ষণে গিরিশের প্রত্যক্ষ ভূমিকা তো ছিলই, তা ছাড়া একটি ঘটনাতেও তাঁর প্রত্যয় দৃঢ় হয়েছিল। সে ঘটনাও মাত্র বছরখানেকের কিছু বেশি আগেকার। দুঃখের বিষয়, গিরিশের সুলক্ষণা দ্বিতীয় স্ত্রী সুরতকুমারীও ততদিনে প্রয়াত।
সারদা তখন ছিলেন বরানগরে সৌরীন্দ্র ঠাকুরের বাড়িতে। শারীরিক-মানসিক দু’দিক দিয়েই কিঞ্চিৎ বিধ্বস্ত তিনি। গয়া, বুদ্ধগয়া ঘুরে আসার ক্লান্তি যায়নি, তার মধ্যে চলে গেলেন বলরাম। গভীর বেদনা বাজল বুকে।
মঠের টলমল অবস্থা, দারিদ্র্য তাঁর একটি ধারাবাহিক উদ্বেগ। অস্থির ছন্নছাড়া হয়েও নিন্দামন্দ-কটূক্তি, কিছুটা সামাজিক উপহাস-পীড়ন-অবহেলা সহ্য করেও ত্যাগী সন্তানরা মঠ টিকিয়ে রেখেছে। গৃহীশিষ্যরা কিয়দংশে ঠাকুরের ভূমিকা এবং সমাজ কল্যাণে তার প্রচার-প্রসার নিয়ে বিভ্রান্ত। কখনও মতানৈক্য ঘটছে যুবক ভক্তবৃন্দের সঙ্গে। তার মধ্যেই অনির্দিষ্ট কালের প্রব্রজ্যায় বেরিয়ে পড়েছে আপন সংকল্প এবং প্রতিজ্ঞায় স্থিতধী নরেন। অনুমতি, আশীর্বাদ দিয়েছেন সারদাই। এর মধ্যে সদ্য ভুগে উঠেছেন রক্তামাশয় থেকে। প্রকৃতপক্ষে চিকিৎসার জন্যই তাঁর সৌরীন্দ্র ঠাকুরের বাড়িতে অবস্থান।
স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সেবারই প্রথম গিরিশচন্দ্র হাজির হলেন সারদা সমীপে। সঙ্গে তিন বছরের ফুটফুটে শিশুপুত্র। ঠাকুর লীলা সংবরণ করার পরে অতিশয় মুহ্যমান হয়েছিলেন গিরিশ, আশ্রয়হীন বোধ করেছিলেন। তাঁদের সম্পর্ক খুব সহজে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। গিরিশ ছিলেন দুর্দান্ত, তর্কবাগীশ, কিছুটা দাম্ভিকও এবং পানাসক্ত। অথচ সৃষ্টিশীল নাট্যকার শিল্পী হিসাবে বিরাট হৃদয়ের সঙ্গেই কোথাও তাঁর ছিল নিবিড় বিশ্বাসবোধ। পরমহংসদেবকে গ্রহণের পূর্বে তাঁর ছিল সংশয়, দ্বিধা; সংঘাতের দোলাচল টের পেয়েছিলেন নিজের উপলব্ধিতে। কিন্তু একবার যখন নিজের আন্তরিক বোধে স্বীকৃত হলেন, গুরু ও পিতা হিসাবে গ্রহণ করলেন ঠাকুরকে, তাঁর শ্রদ্ধাভক্তির সবটুকু উজাড় করে দিয়েছিলেন ঠাকুরের চরণপ্রান্তে। মানুষ হিসাবে পরিবর্তন টের পেয়েছিলেন নিজের মধ্যে। নিজেকে পূর্ণ সমর্পণ করেছিলেন। আর তাঁর প্রয়াণের পরে, সেই সমর্পণ, নির্ভরতাই চিহ্নিত হল জননী সারদাকে আশ্রয় করে। ভাবুক শিল্পীটি বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন সারদা তাঁর ইহকাল পরকালের মা।
শিশুপুত্রটি কিছু বোঝে না, অথচ সৌরীন্দ্র ঠাকুরের বাড়িতে কী এক অবোধ আকর্ষণেই বারবার ইঙ্গিত করতে শুরু করেছিল সারদার ঘরের দিকে। একইসঙ্গে গিরিশচন্দ্রের হাত ধরে টানাটানি শুরু করল তাঁর কাছে যাওয়ার জন্য। গিরিশ বিভ্রান্ত, দ্বিধান্বিত। মাতৃদর্শনের সৌভাগ্য কি অর্জন করেছেন এখনও!
নিজের অতীত জীবনচর্যার স্মরণে, অনুশোচনায় অশ্রুসিক্ত। বললেন, ওরে মাকে দেখতে যাব কী, আমি যে মহাপাপী।
শিশু ছাড়ল না। গিরিশ বাধ্য হলেন সারদার কাছে যেতে। কিন্তু মুখ তুলে তাকালেন না মায়ের দিকে।
দণ্ডবৎ হয়ে মাথা ঠেকালেন সারদার পায়ে। ভক্তিপ্লাবিত কণ্ঠে শুধু বললেন, মা, ঠাকুরের আশীর্বাদে আমার এই পুত্রলাভ। আজ এই ছেলের দৌলতে তোমার শ্রীচরণ দর্শন হল। প্রণাম নাও।
সারদার মুখের দিকে না তাকিয়েই ফিরে গিয়েছিলেন গিরিশ সেদিন।
সেই পরিচিত ব্যক্তিত্ব, মহাকবি এবং মানী অতিথিটিই আজ নিরাড়ম্বর ভক্তের মতোই হাজির হয়েছেন জয়রামবাটিতে। যথারীতি সঙ্গে এসেছে নিরঞ্জন, খোকা এবং সত্যেন— ঠাকুরের ত্যাগী সন্তান এবং গিরিশের গুরুভাই হিসেবে এবং একটি ব্রাহ্মণ পাচক এবং ভৃত্য। বর্ধমান হয়ে উচালনের পথে জয়রামবাটি পৌঁছাতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেল। আগে খবর পাওয়ায় সুবিধে হয়েছিল সারদার। গরমের দিন, গ্রামগঞ্জে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বলে প্রায় কিছুই নেই। কোথায় থাকতে দেবেন, কীভাবে আপ্যায়ন করবেন, ভেবে আকুল হয়েছিলেন। কিন্তু গিরিশচন্দ্রের নাম শুনে কালী এবং বরদা ঘর ছেড়ে দিল। কয়েকটা দিন বা সপ্তাহ ওরা জ্ঞাতিভাইদের সঙ্গে পাশের বাড়িতে থাকবে। সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা, সারদা লক্ষ করলেন, গিরিশচন্দ্রের মতো মানী এবং নামী মানুষটি একেবারে নিরাড়ম্বর-নিরভিমানী এলেবেলে সাধারণ মানুষের মতোই নিজেকে একাত্ম করে নিলেন গ্রাম্য আবহ এবং আবাসে। সারাদিনের পথের ক্লান্তি নিয়ে, তেতে পুড়ে সন্ধ্যায় পৌঁছেও, ঘাটে যাওয়া, মাটির দাওয়ায় খেতে বসা, খড় ছাওয়া ঘরে শোওয়া—কোনও ব্যাপারেই সামান্য অস্বাচ্ছন্দ্য নেই।
অবগুণ্ঠনের আড়ালে থেকেও স্বস্তি বোধ করলেন সারদা৷ নিরঞ্জনের কাছেই শুনলেন, আগামীকাল ভোরে স্নান সেরে তবেই সারদার চরণস্পর্শ করবেন গিরিশ, তার আগে নয়। অভিভূত হলেন সারদা, অত বড় মানুষটার নিরহংকার ভক্তি আর সৌজন্যে।
কিন্তু নিরঞ্জনের পরের কথাটি শুনেই দুঃখে যন্ত্রণায় বক্ষবিদীর্ণ হয়ে গেল সারদার।
কথা প্রসঙ্গে নিরঞ্জন বলল, মা, মানসিকভাবে গিরিশ খুবই যন্ত্রণা আর অবসাদে ভুগছে।
সারদা বললেন, কেন বাবা? নাটক লেখা, অভিনয়—এসব নিয়ে কোনও ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়েছে কি?
প্রত্যক্ষভাবে তা নয়। লেখা, থিয়েটার করা এই তো গিরিশের ধ্যানজ্ঞান। কিন্তু সেই গতবছর হাতিবাগানের স্টার থিয়েটারে ‘মহাপূজা’ নাটকের পরে এখনও ওর হাত থেকে নতুন কিছু বেরোয়নি।
তাই নাকি? সারদা বললেন, বছরে দুটো-তিনটে নাটক তো ও নিজেই লেখে, তাতে পার্টও করে।
হ্যাঁ মা সাতাত্তর-আটাত্তর খ্রিস্টাব্দ থেকে তাই চলে আসছিল। কিন্তু বড্ড ভেঙে পড়েছে ইদানীং। আমি খানিকটা জোর করেই আপনার কাছে নিয়ে এলাম।
বেশ করেছ বাবা। অত ভাল বউটি চলে গেল। ও বাড়িতে কি আর টিকতে পারে!
মৃত্যু যেন গিরিশকে ধাওয়া করে চলেছে মা। প্রথম স্ত্রী প্রমোদিনী মারা গেলেন এক ছেলে আর মেয়েকে রেখে। তার আগেই ছোটভাই ক্ষীরোদচন্দ্র আর প্রায় ওর অভিভাবিকার মতো দিদি কৃষ্ণকিশোরীও চলে গেলেন। দ্বিতীয় পক্ষেও দুটি মেয়ে আর—
মেয়ে দুটি বোধহয় বাঁচেনি, তাই না?
হ্যাঁ মা। আপনি কলকাতায় ছেলেটিকে দেখেছিলেন, মনে আছে?
থাকবে না! সে যে দেবশিশু বাবা। সৌরেন ঠাকুরের বাড়িতে অতটুকু ছেলেই তো গিরিশকে ওপরে টেনে নিয়ে গেল।
সেই ছেলেটি আর নেই মা। ক’ মাস আগেই—।
সারদা যেন বিশ্বাস করতে পারলেন না নিরঞ্জনের উচ্চারিত শব্দগুলো। স্তব্ধ, নির্বাক তাকিয়ে রইলেন শুধু। এমন মর্মান্তিক দুঃসংবাদ তার কল্পনার অতীত ছিল। শিশুটির জীবন্ত স্মৃতি তখনও ভাসছে তাঁর চোখের ওপর। টুকটুকে ফর্সা, বেশি কথা বলত না, ইঙ্গিতে আর হাবভাবে সব বোঝাত। সে ছেলেকে একবার কেউ দেখলে কোলে নিয়ে মুখচুম্বন না করে থাকতে পারত না।
বুক মোড়ানো কষ্টে, নীরবে সারদার দু’চোখ প্লাবিত হল। গিরিশের শোক, যন্ত্রণা অনুভব করলেন নিজের মধ্যে। আর তখনই স্থির করলেন, কী ঐশ্বর্য তাঁর আছে জানেন না, কিন্তু সৃষ্টিশীল মানুষটির শোকতাপ হরণ করে বাঁচিয়ে রাখার জন্য তিনি যথাসাধ্য করবেন।
পরের দিন ভোরবেলা স্নান সেরে ভিজে গায়ে, ভিজে বস্ত্রে সারদাকে প্রণাম করতে গেলেন গিরিশ।
সারদা জানতেন। ফুল-বেলপাতা সাজিয়ে, চন্দন ঘষে, ধুপ জ্বালিয়ে রেখেছেন। নিজের পুজো সেরে নিয়েছেন। গিরিশ এলেন। কী এক দুর্বার শ্রদ্ধায়, প্রতি ভক্তিতে মানুষটা কম্পমান। পূর্ণ নিবেদনে সাষ্টাঙ্গে প্রণত হলেন মায়ের চরণে। প্রাণ ভরে আশীর্বাদ করলেন সারদা। মাথায় ফুল বেলপাতা দিলেন। কর্মক্ষম থাকো, সৃষ্টিশীল থাকো, শোক দুঃখের অবসান হোক, ঠাকুর তোমায় রক্ষা করুন।
সময় যাচ্ছে। গিরিশ টের পেলেন, কী এক প্রশান্তিতে প্রাণশক্তিতে আপ্লুত হয়ে যাচ্ছেন, ভরে উঠছেন। ধুয়ে যাচ্ছেন।
সারদা চন্দনের ফোঁটা দিতে গেলেন গিরিশের কপালে। ঘোমটা খসে পড়েছে মাথা থেকে। তখনই মুখ তুলে তাকালেন গিরিশ। এই প্রথম এত বছরের মধ্যে মাতৃদৰ্শন। কিন্তু এ কী। কাকে দেখছেন! আনন্দে-রোমাঞ্চে বিহ্বল হয়ে গেলেন খ্যাতনামা মানুষটি। এ মুখ যে বহুকাল আগেই একবার দেখেছিলেন তিনি। তখন গিরিশ বিসূচিকায় শয্যাশায়ী, জীবনের আশা নেই। ঘোরের মধ্যে দেখলেন মাতৃমূর্তি, কী এক প্রসাদ ছুঁইয়ে গেলেন মুখে। এক অপার্থিব জ্যোতি আর জীবনের স্পর্শ বুলিয়ে নিষ্ক্রান্ত হলেন। এ যে সেই মা, সেই প্রশান্ত নিবিড় প্রীতিস্নিগ্ধ স্নেহসিক্ত মাতৃমুখ! বিহ্বল অবস্থাতেই গিরিশের মুখ দিয়ে শুধু বেরুল, এ কী মা, তুমি!
রহস্যাবৃত স্মিতহাসি মুখে সারদা বললেন, ওঠো বাবা। ভিজে কাপড় ছেড়ে নাও।
গভীর প্রতীতিতে স্বাক্ষরিত হলেন গিরিশচন্দ্র। এই দেবী অথবা মা সততই তাঁকে রক্ষা করে আসছেন। নির্ভয়ে নির্ভরতায় প্রত্যয়ে ধীর, স্থিতধী গিরিশ, জয়রামবাটির নির্জন গ্রাম্য পরিবেশ, শান্ত প্রকৃতি আর সারদার সান্নিধ্যে শান্তিময় অন্য আর এক জীবনের উদ্ভাস অনুভব করলেন। কোলাহলপূর্ণ ব্যস্ত কলকাতার জীবনযাপনকে কিছুদিনের জন্য সরিয়ে রেখে, নিরিবিলি পল্লিগ্রামের শান্ত আবহে ডুবে রইলেন।
কলকাতার শহুরে স্বনামধন্য ডাকসাইটে কৃতী মানুষ গিরিশচন্দ্র, কিন্তু জয়রামবাটির মতো প্রান্তিক নিরালা অজ পাড়াগাঁয়ে পুকুরধারে, ধানক্ষেতের পাশে, গাছের ছায়ায় ক্রমশ জীবনের আর এক অর্থ খুঁজে পেলেন। তাঁর শোকে দুঃখে ব্যস্ততায় জর্জরিত বদ্ধ অথচ সৃষ্টিশীল মস্তিষ্কে আবার প্রেরণার স্নিগ্ধ বাতাস প্রবাহিত হতে শুরু করল। ভোরে ঘুম থেকে উঠে স্নান করেন পুকুরে, কিছু পুজোপাঠ সারেন। স্থানীয় ক্ষেতের শাক-সবজি, পুকুরের মাছ, ঢেঁকি ছাঁটা চালের ভাত দিয়ে পেটপুরে আহার করেন। সূর্যাস্তের পরে উদার প্রকৃতি প্রান্তরে হেঁটে বেড়ান, গ্রাম্য মানুষজনদের সঙ্গে আলাপ করেন। সন্ধেবেলা গল্পগুজব, আধ্যাত্মিক আলোচনা, এমনকী মাঝে মাঝে গানও করেন। তাঁর খ্যাতি পরিচিতির আকর্ষণে কখনও বাউল-বৈরাগী-ফকির এসে জোটেন। গ্রামীণ পরিবেশে অন্যরকম আনন্দের হাট বসে, মধ্যমণি হয়ে থাকেন গিরিশচন্দ্র। নীরবে দেখেন সারদা।
কয়েকটি মাস অন্যরকম তুষ্টি নিয়ে কাটালেন সারদা। যতটা পারেন নিজেই দেখভাল করেন গিরিশের। ভৃত্য আর পাচকটি সাহায্য করলেও, মানুষটির গুণ, শোকতাপ, নিঃসঙ্গতা অনুমান করে, আপন সন্তানের মতোই যত্নআত্তি করেন। ঘরদোর গুছিয়ে দেন, বিছানার চাদর, বালিশের ওয়াড় কেচে দেন। গ্রামদেশের আবহে পরিবেশে যতটুকু সম্ভব স্বাচ্ছন্দ্য আয়োজনের ব্যবস্থা করেন।
ওদিকে নিরন্তর একটি স্নিগ্ধ আন্তরিকতার স্পর্শে, আনন্দে কৃতজ্ঞতায় ভরে ওঠেন গিরিশচন্দ্র। অবাক হয়ে লক্ষ করেন, যাঁকে রক্ষাকর্ত্রী বলেই স্থির বিশ্বাস তাঁর, সেই মানবী সত্তাটিরই কী আটপৌরে আচরণ। কখনও কি ভেবেছিলেন, তাঁর আরাধ্যা ভগবতীকে এত কাছের থেকে, ঠিক এরকম সাধারণ চেহারায় তাঁর দেখার সৌভাগ্য হবে। উপলব্ধি করলেন, দেবী নয়, এ হচ্ছেন মা। নিজের মা, রাইমণি দেবীর অষ্টম গর্ভের সন্তান তিনি, কিন্তু তাঁকে তো প্রায় চোখেই দেখেননি গিরিশ। বঞ্চিত হয়েছিলেন মাতৃস্তন্য থেকে। তাঁকে বাঁচিয়েছিল উমা নামের এক বাগদি দাসী। আর আজ প্রায় অর্ধ শতাব্দীর কাছাকাছি বয়সে, জীবনের চারিদিকে যখন অন্ধকার, মৃত্যুর মিছিল, তখনও আশ্রয়-সেবা-করুণায় বাঁচিয়ে রেখেছেন আর এক মা-ই। তিনি সারদা, তাঁর গুরুর অর্ধাঙ্গিনী।
তুমি কীরকম মা আমার? একদিন জিজ্ঞেস করেই ফেললেন সারদাকে।
সারদা অকপট জবাব দিলেন, বাবা, আমি তোমার সত্যিকারের মা। গুরুপত্নী নই, পাতানো মা নয়, কথার কথা মা নয়—সত্যি জননী।
আর একটি নিবিড় বিশ্বাসে উপলব্ধিতে নতুনতর উত্তরণ ঘটে গেল গিরিশচন্দ্রের।
ইতিপূর্বে সেই মানুষটির সংস্পর্শে এসে পান করেছিলেন ঈশ্বরপ্রেমের অমৃতসুধা। এইবার মাতৃস্নেহের স্নিগ্ধ কিরণে আলোকিত হল অবচেতন মনের যাবতীয় ধোঁয়াশা, ধূসরতা। স্বক্ষেত্রে প্রত্যাবর্তনের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল গিরিশের মনে মনে। তা সত্ত্বেও, সন্ন্যাস গ্রহণের বাসনা আর একবার নিবেদন করলেন মায়ের কাছে।
সারদা অনুমতি দিলেন না। বললেন, না বাবা, স্বধর্মে, স্বক্ষেত্রে এখনও তোমার জীবনে অনেক কাজ করার আছে। সন্ন্যাসের দরকার নেই তোমার।
গিরিশচন্দ্রের উপস্থিতিতেই যেন এক আনন্দযজ্ঞের আয়োজনে ভরপুর করে রেখেছিল জয়রামবাটিকে। গভীর নিঃসঙ্গতা আর অবসাদ নেমে এল মানুষটির কলকাতা প্রত্যাবর্তনে। শুধু সারদা নন, বাড়ির অন্যান্য সদস্যরাও অনুভব করলেন, কী এক শূন্যতার অনুভবে তাঁরা আক্রান্ত। উমেশ-কালী-বরদা-অভয় তো বটেই, এমনকী বাড়ির বউ-ঝি, কাজের মানুষ, পাড়াপড়শিদের সঙ্গেও দিব্যি এক সহজ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন গিরিশ। আর সকলের মধ্যেই সারদা মানুষটির সম্বন্ধে সচেতনতা জাগিয়েছিলেন, তাঁকে চিনতে সাহায্য করেছিলেন।
গিরিশ কলকাতা ফিরে যাওয়ার পর থেকেই সারদা বোঝেন, ঘর-গেরস্থালির কাজ, সংসারের হাজারটা দৈনন্দিন চাওয়াপাওয়ার মধ্যেও অতিরিক্ত কিছু ভাবনা সদাই ক্রিয়াশীল থাকে তাঁর মধ্যে। মাঝে মাঝে যেন অন্য কোনও দায়িত্বে, ঘোরের মধ্যেই একটানা কয়েক মাস কেটে যায়। তার মধ্যে আনন্দ যেমন থাকে, কখনও থাকে ক্লান্তি-অবসাদ। কিন্তু যা-ই থাকুক, সময়টি উত্তীর্ণ হওয়ার পরেই বোঝেন, সেই অতিরিক্ত ভাবনাগুলোই যেন তাঁর জীবনচর্যার প্রকৃত লক্ষ্য, দায়িত্ব। এবং সেই ভাবনার অধিকাংশই জুড়ে থাকে, ছেলেদের ভালমন্দ, গতিবিধি আর আগামীদিনে ঠাকুরের কাজ। বাকিটুকু থাকে ওসবের সঙ্গে নিজের ভূমিকা সম্পৃক্ত করার মানসিক প্রস্তুতি এবং আয়োজন।
সারা দেশের বিশেষ একটি গোষ্ঠীর মনের মধ্যে বিভিন্ন পরিবর্তনের হাওয়া বইছে, সারদা এই সুদূর গ্রামে বসেও সেটা টের পান। পরাধীনতা-অশিক্ষা-দারিদ্র্য বিষয়ে নরেনের বলে যাওয়া কথাগুলো তাঁকে প্রভাবিত করেছে সন্দেহ নেই। পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন তিনি নিজেও। কিন্তু অনুভব করা আর তাকে কাজে পরিণত করার মধ্যে বিস্তর ফারাক। তাঁর ক্ষমতাই বা কতটুকু! কখনও একটু দিশাহারা বোধ করেন নিজস্ব ক্ষমতার প্রশ্নে এবং ব্যাপ্তি নিয়ে। কিন্তু স্থির হন তারপরেই। সব ক্ষমতার উৎসই কি অর্থ, বাহুবল? মানুষকে ভালবাসতে পারা, বিশ্বাস করতে পারা, নিজেকে নিঃস্বার্থ মানবকল্যাণে নিবেদন করতে পারাও কি ক্ষমতা নয়!
নির্জন গ্রাম্য পরিবেশে, আটপৌরে জীবনাপন করতে করতেই আপন প্রজ্ঞা আর মননে দিনে দিনে স্বীকৃত হন সারদা। বছরান্তে জগদ্ধাত্রী পুজোর সময়েই ত্যাগীসন্তান শরতের কাছে শুনলেন, বরানগরের ভূতের বাড়ির মঠ উঠে গেছে।
উঠে গেছে! শিউরে উঠলেন সারদা। তা হলে এতদিনের ভাবনা-কষ্ট-কৃচ্ছ্রসাধন সব ডকে উঠে গেল।
দ্রুত শরৎ নিশ্চিন্ত করলে সারদাকে। উঠে যায়নি, স্থানান্তরিত হয়েছে। ভালই হয়েছে। বরানগরের বাড়ির মালিক ছাড়বার জন্য তাগাদা দিচ্ছিল। তার ওপর মঠবাসীর সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এখন দক্ষিণেশ্বরের আরও কাছে আলমবাজার চৌমাথার কাছে অপেক্ষাকৃত একটি বড় বাড়িতে মঠ উঠে এসেছে। এমন কিছু আহা মরি বাড়ি এটাও না। তবে ঠাকুরের পদধূলিতে ধন্য। রাম চাটুজ্যের ছেলে জয়কৃষ্ণ চাটুজ্যের বাড়ি, রামলোচন ঘোষের ঘাটে যাওয়ার পথের দক্ষিণ দিকে, রামচন্দ্র বাগচি লেন-এ অবস্থিত। সামনের দিকে ভাঙাচোরা হলেও, অক্ষত একটি বড় ঠাকুরদালান আছে। ঠাকুরের জন্মতিথির ক’দিন আগেই, ছেলেরা তাঁর পূতাস্থির সেই আত্মারামের কৌটো, জুতো-লাঠি-ছাতা-চাদর, কিছু বই, পুজোর বাসন-কোসন তুলে নিয়ে এসেছে। বাড়িতে বাগান-পুকুর-কুয়ো আছে। একতলা দোতালা মিলিয়ে বেশ কয়েকটা ঘর আছে। এবাড়িতেও দু’জন আত্মঘাতী হওয়ার পর থেকে, কিছুটা ভূতের গন্ধ আছে বটে, সেইজন্য কেউ ভাড়া নেয় না। কিন্তু মঠবাসীদের আর ভয় কী! তারা তো নিজেদেরই বলে দৈত্য বা দানা। ভূতেরা কৌলীন্যে দৈত্যদের চেয়ে নিম্নস্তরের।
সারদা হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন। যাক। তা হলে আছে, এখনও সঙেঘর চারাগাছটি বেঁচে আছে।
টের পাচ্ছিলেন, মনে মনে প্রায়ই তাঁর একটা উৎকণ্ঠা জাগে, নরেনের খবরের জন্য। নিশ্চিত খবর পান না কারওর কাছেই। ছেলেরা অথবা গৃহীশিষ্যরা যখনই আসেন, খোঁজ নিয়ে বোঝেন, সকলের কাছ থেকেই সে যেন কিছুটা দূরত্ব রচনা করে ঘুরে বেড়াচ্ছে এখানে সেখানে। উত্তর থেকে দক্ষিণ ভারতের নানান জায়গাতেই সে ছুটে বেড়াচ্ছে। সারদা বোঝেন, নিষ্কর্মা পুরুষ সে নয়। বড় এবং বিশেষ কোনও উদ্দেশ্যেই নরেন প্রাণপাত করছে।
পরের বছর গোড়ার দিক থেকে সারদা অনুভব করেন নরেনের জন্য তাঁর উদ্বেগ ক্রমশ যেন অস্থিরতায় পর্যবসিত হচ্ছে। কিছু একটা নিশ্চিত খবর তাঁর অবশ্যই পাওয়া উচিত, দরকার। একটানা দীর্ঘকাল জয়রামবাটিতে রয়েছেন বলেই কি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছেন। কিন্তু এদিকেও এমন একটা এলোমেলো অবস্থা, এমনভাবে দিনে দিনে জড়িয়েও পড়েছেন যে, হঠাৎ ফেলে চলে যেতে পারেন না। ভায়ে-ভায়ে মনোমালিন্য, জায়গাজমি ভাগাভাগি নিয়ে চিরকেলে সাংসারিক অশান্তি, তার মধ্যে বাড়ছে সংসার। ইতিমধ্যে দুটি নতুন মুখ এসেছে দু’ভাইয়ের ঘরে, আবার বরদার বউ সন্তানসম্ভাবা।
বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি। বেলা বাড়তে না বাড়তেই খরতাপে ঝাঁঝা করে গ্রামপ্রান্তর।
সকালে উঠেই সারদা কালীকে বললেন, আজ একবার গাছতলায় যাস তো। চিঠি আসবে মনে হচ্ছে।
গাছতলা মানে জয়রামবাটি থেকে কয়াপাট-বদনগঞ্জের দিকে যেতে বটতলার পোস্ট অফিস। ঘরবাড়ি-ছাউনি কিছু নেই, কিন্তু সপ্তাহে দু’দিন পিওন আসে। কাছেপিঠের গাঁয়ের মানুষ খোঁজ নিতে যায় কারওর চিঠি এল কিনা। আবার চিঠি পাঠানোর দরকার হলেও পিওনের হাতে দিয়ে দেয়।
কালীকুমার অবাক হয়ে বলল, আজ তো পিওন আসার দিন না দিদি। এতটা পথ উজিয়ে যাব—।
একবার গিয়েই দেখ। মনে হচ্ছে নরেনের চিঠি আসবে।
কালীকুমার আর আপত্তি করল না। সারদাকে দিদি হিসেবে দেখলেও, গত বছর গিরিশচন্দ্র থাকাকালীন তাকে প্রায় জোর করেই বুঝিয়ে ছেড়েছিলেন, তোমার দিদি শুধুমাত্র এলেবেলে হেটোমেঠো গ্রাম্য মহিলা নন। তোমাদের মন নেই, চোখ নেই, তাই বুঝতে পারছ না। আসলে তিনি মানবীদেহে দেবী।
গাছতলায় পৌঁছে অবাকই হল কালীকুমার। পিওন বসে আছে একটিই চিঠি নিয়ে। কাছে যেতেই বলল, যাক, এসে পড়েছেন আপনি! ভাবছিলাম আজকে কীভাবে পৌঁছাবে—এই নিন, আপনার দিদির চিঠি।
খামের ওপর লেখা—URGENTI কলকাতা থেকে শরৎ পাঠিয়েছে।
আসল চিঠি এসেছে মাদ্রাজ থেকে। নরেন লিখেছে সারদার কাছে। আলসিঙ্গার নেতৃত্বে দক্ষিণবাসীরা চাঁদা তুলে, এই নবীন সন্ন্যাসী, তাঁদের স্বামীজিকে শিকাগোর ধর্ম মহাসম্মেলনে পাঠানোর সব আয়োজন করেছেন। পূর্ণ মনস্থির করতে পারছেন না স্বামীজি। নরেন তাই চিঠি লিখেছে মায়ের অনুমতি প্রার্থনা করে। সুদূর মাদ্রাজ থেকে তাঁর অবস্থান জানেন না বলে, গুরুভাই শরতের কাছে চিঠি লিখে অনুরোধ করেছেন, যেন যথাশীঘ্র মায়ের কাছে তার চিঠি পাঠানো হয়।
জয়রামবাটির পিওন আর্জেন্ট চিঠি নিয়ে গাছতলায় না এসে কী করবে!
দাওয়ায় বসে কুটনো কাটছিলেন সারদা৷ কালীকে বললেন, চিঠি খুলে পড় তাড়াতাড়ি।
আমেরিকা কোথায়, কতদূর, কতদিন লাগে যেতে কিছুই জানেন না সারদা। শুধু জানেন, কালাপানি পার হতে হবে। তাঁর চোখের ওপর ভাসছে সীমাহীন নীল দরিয়া। বুকের মধ্যে উথাল-পাথাল ঢেউ ভাঙছে, সন্তানকে ছাড়তে হবে। তাঁকেই অনুমতি দিতে হবে। সন্ন্যাসীর গেরুয়া গায়ে ছেলে প্রতীক্ষায় বসে আছে সাগর পাড়ের দূর শহরে। দ্বিধাগ্রস্ত, সংশয়াচ্ছন্ন। তাঁর অনুমতি পেলেই জাহাজে উঠবে।
কালীকে বললেন, কাগজ কলম নিয়ে আয়। লিখে দে, যাবে বইকি। যেতে হবে। ইহাতে জগতের মঙ্গল হইবেক। প্রাণভরা আশীর্বাদ লও। ইতি, তোমার মা।
কোণে বসে জপ করছিলেন শ্যামাসুন্দরী। চমকে উঠে বললেন, কোথায় পাঠাচ্ছিস, সাত সমুদ্দুর তেরো নদীর পারে?
কেন যে কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ হয়ে আসে! দ্রুত ঠাকুরের পটের কাছে সরে যাওয়ার আগে সারদা বললেন, কাল রাতে ঠাকুর দেখা দিয়েছিলেন। নরেনের চিঠি আসবে বলেছিলেন, আগাম অনুমতি তিনি দিয়েই রেখেছেন। আমাকে ছাড়তেই হবে।
কালের ইতিহাসে জয়রামবাটির পল্লিগ্রামে কোনও ঢেউ উঠল না, কিন্তু মহাকালের পটে ভাবী ভারতের একটি সুস্পষ্ট ছবি আঁকা হয়ে গেল লোকালয় আর দেশবাসীর অলক্ষ্যে, নিভৃতে, নিবিড় নির্জনতায়। এক মহান দেশের সভ্যতাকে বিশ্বঅঙ্গনের দরবারে বহন করে নিয়ে চলল এক বীরসন্ন্যাসী সন্তান। অনুমতি দিলেন সারদা।
বর্ষাকালের প্রথমদিকেই কলকাতা হয়ে, আবার বেলুড়ে নীলাম্বর মুখার্জির বাড়িতে গেলেন সারদা।
