৩
সময় আর সংসার বসে থাকে না। প্রকৃতির মতন তাদেরও নিজস্ব নিয়মে চলার হিসেব আছে। চলতে চলতে তারা পালটে যায়। একটা তফাত আছে সংসারের সঙ্গে অবশ্য। সময়ের হিসেবে সকাল-দুপুর-সন্ধে-রাত পেরিয়ে আবার ভোর হয়, সকাল আসে। প্রকৃতিরও নিয়ম পরিবর্তন। তা হলেও ষষ্ঠ ঋতুর হিসেবে সে চক্রাকারে ঘুরে ঘুরে আসে। গ্রীষ্মের দাবদাহের পরে আকাশে মেঘ জমে। ক্রমশ তা কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করে। তারপর চিকুর হানা বিদ্যুতে ঝলসে উঠে বৃষ্টি হয়ে নামে। শীতল হয় ধরিত্রী। শুকনো ফাটা ভূমিপ্রান্তর হয়ে ওঠে শস্যশ্যামল। এক সময় উধাও হয় মেঘের দঙ্গল। তাদের রং বদল হয়। উৎসবের আমেজ নেমে আসে আকাশে বাতাসে। তারপর আসে হিম পড়ার ঋতু। নীলিমার অদৃশ্য করুণার মতো ভোরের শিশির জমে থাকে ঘাসের ডগায়। হাওয়া ঘুরতে থাকে, এক সময় কনকনানি বয়ে আনে উত্তর থেকে। গাছের পাতা ঝরিয়ে শীর্ণ হয়, রুক্ষ হয়ে ওঠে। তারপরেই আসে তাদের সেজে ওঠার দিন। সাড়া পড়ে যায় হাওয়া-মাটি গাছে-জলে। চিকন পাতা নতুন রং নিয়ে আসে গাছে গাছে, মুকুল আসে। সুগন্ধ টেনে নিয়ে আসে প্রজাপতি-ভ্রমর-মৌমাছিদের। দখিনা বাতাস বয়।
ছয় ঋতু ঘুরে ঘুরে আসে প্রকৃতিতে। পালটায় আবার আসে। প্রহরও পরিবর্তন হয়, আবার ফিরে আসে। সংসারেরও থেমে থাকার উপায় নেই। কিন্তু সে একই জায়গায় আর ফিরে আসে না। চির চলমান সংসার অতীতের কাছে আর মাথা নোয়াতে পারে না। এগিয়ে চলার নিয়মে অতীতের লুপ্তস্রোতে থেকে যায় সংসারের বাকি ইতিহাস। আবর্তনের টান নেই তার। দাগ রেখে সে এগিয়ে যায়।
এখন কার্তিক মাসের শেষ দিক। আর কিছুদিনের মধ্যে তেরো বছরে পড়বে সারদা। অথচ ভেবে তার অবাক লাগে, মাঝখানে কতগুলো বছর কখন কেটে গেল! সেই যেবার বিয়ের পরে দ্বিতীয় বার স্বামীর সঙ্গে কামারপুকুর গিয়েছিল, তারপর মাস দুয়েকের মধ্যেই ফিরে এসেছিল জয়রামবাটি। তখনও শীত ফুরোয়নি। স্বামী ফিরে গেলেন দক্ষিণেশ্বরে তাঁর কাজে সাধনায়। হ্যাঁ, ইদানীং যেন সারদা খানিকটা অনুভব করতে পারে, ও মানুষটার কাজই সাধনা, সাধনাই কাজ। তখন সেই সময়, সেই সাত বছর বয়েসে পারত না। খুব অভিমান হত মানুষটার ওপর। তখন অবশ্য বারবার গদাধর বুঝিয়ে বলতেন, এখন যা বুঝতে পারছ না, যা নিয়ে দুঃখ অভিমান করছ, দেখবে, একদিন তাই হবে তোমার গৌরব, তোমার সম্পদ।
ওপর ওপর মুখ ভার করে রাখত সারদা। ভেতরে অবশ্য টের পেত, খুব সূক্ষ্ম আর গভীর কী যেন একটা থাকত মানুষটার বলায়-কথায়-আচরণে। গল্প করা-গান-রসিকতা কম হত না, কিন্তু হঠাৎ হঠাৎ আভাসে-ইঙ্গিতে কী যেন একটা ঝলসে উঠত তাঁর মধ্যে থেকে। উপদেশ দেওয়ার মতো বলতেন না, অথচ ভাবনায় স্মৃতিতে একটা দাগ রেখে যেতেন। কিছুক্ষণের জন্য মুখের ভাব পালটে যেত সারদার। একটা কিছু সঞ্চারিত হত বালিকা মনে, মস্তিষ্কে। তারপর আবার ভুলে যেত।
আজ এই তেরো বছরে পৌঁছেও যে সব টের পায় সে তা নয়। এখনও তার এই সদ্য কিশোরী মনে, চোখে সমাজ-সংসার-মানুষ, তাদের প্রকৃতি-অবয়ব-আচরণ সবই কিছুটা ঝাপসা, দুর্বোধ্য। তা হলেও আলোছায়া মেশা সেই দুর্বোধ্যতার মধ্যে কিছু বর্ণের হদিশ পায়, যেন সংগীতের মূৰ্ছনা শোনা যায়। আর একই সঙ্গে শরীর মন যেন এক ঐশ্বরিক আনন্দসুধায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। সে আনন্দে মিশে থাকে যেমন প্রীতি আর পুলকের অনুভব, তেমনই করুণার স্নিগ্ধ কিরণও।
মানুষটাকে চোখের সামনে দেখা হয়নি কত দিন, কত বছর। কিন্তু সত্যি কি দেখা হয়নি?
মনের চোখ বলে কথাটা তো তিনিই মনের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। বলতেন, মনেতে বদ্ধ, আবার মনেতেই মুক্ত। যে রঙে মনটাকে ছোপাবে, সেই রঙেই দেখবে জগৎকে। কত কী যে বলতেন মন নিয়ে! আবার ছড়া কেটে বলতেন রামপ্রসাদের গানের কথা।
“মন তুমি কি রঙ্গে আছ।
তোমার ক্ষণে ক্ষণে ফেরা ঘোরা, দুঃখে রোদন সুখে নাচ।
রঙের বেলা রাঙে কড়ি, সোনার দরে তা কিনেছ।”
কথাগুলো মনে হলেই সারদা ভাবে, নাহ্, অদেখার অন্ধকারে তো নয়। তার স্বামী আছে ভাবনার আলোয়। তো, তাই যদি সে চায়, তা হলে আমিও তাই নিয়ে থাকব। দেখতে দেখতেই তো ছ’টা বছর পার হতে চলল। কই তেমন তো কখনও মনে হয়নি, সে ছেড়ে গেছে! তা ছাড়া যাবেই বা কোথায়? বাপ-মা-দাদাবউদি, আত্মীয়স্বজন সব কামারপুকুরে। জয়রামবাটিতে শ্বশুরবাড়ি। আর যাই হোক, এটুকু সারদা বুঝে গেছে, ছাড়ার লোক সে নয়। ছাড়ার কথায় আসলে সে আরও জড়িয়েই ধরে। হাত দিয়ে না হোক, অন্তর দিয়ে সে কি কিছু কম অধিকার করে রেখেছে তাকে!
খানিকটা তাঁর কাছ থেকে শুনে, পরে কিছু কিছু বাবা-মা-কাকাদের কথায় ইদানীং সারদা বোঝে, রানি রাসমণির তৈরি দক্ষিণেশ্বরের ওই ভবতারিণী মন্দিরে তাঁর পৌঁছে যাওয়াটাই যেন ছিল নিয়তি নির্দেশিত। যেন পূর্বনির্দিষ্ট কোনও একটা প্রস্তুতির অনিবার্য পরিণতিতেই আজ তিনি সেখানে অধিষ্ঠিত। তা নয় তো সদ্য যুবাবয়সে কামারপুকুর থেকে বেরিয়ে তিনি তো মন্দিরে পৌরোহিত্য করার জন্য কষ্ট করে কলকাতায় যাননি। আর সে মন্দিরের কাজও তখন শেষ হয়নি। গদাধর গিয়েছিলেন বড়দাদা রামকুমারের ঝামাপুকুরের চতুষ্পাঠীতে শিক্ষানবিশি করতে।
অথচ বিধির বিধানই হয়তো অন্য রকম ছিল। চতুষ্পঠী টোল ছেড়ে রামকুমারই স্বয়ং শেষ পর্যন্ত রানি রাসমণির অনুরোধে সম্মত হয়ে গেলেন এবং দ্বারোদঘাটন করে পৌরোহিত্যের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। গদাধর একটু একা পড়ে গেলেন।
গল্প শুনেছে সারদা। বারাণসীধাম তীর্থ করতে যাবেন রানি রাসমণি। দূরের যাত্রা, নদীর পথ। সঙ্গে অনেক আত্মীয়স্বজন-ভক্ত-প্রতিবেশী। বজরা-নৌকো-মাঝি-মাল্লার-কয়েক মাসের রসদ সব ব্যবস্থা হয়েছে। এলাহি আয়োজন। রানি তীর্থ করতে যাচ্ছেন বলে কথা। তাও আবার যে-সে রানি নন, তেজস্বিনী, ‘কালীপদ অভিলাষী শ্রীমতী রাসমণি দেবী’ বলে যাঁর নামে শিলমোহর খোদিত ছিল। স্বামী রাজচন্দ্র দাস মারা যাওয়ার পরে নিজের বুদ্ধি আর ব্যক্তিত্বে যিনি নিজে থেকে জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন বহু বাধার সম্মুখীন হয়েও। একক প্রচেষ্টায় যিনি চার কন্যাকে সুপাত্রস্থ করেছিলেন। শুধু তাই নয়, তৃতীয় কন্যাটির আকস্মিক মৃত্যুর পরে, তারই স্বামী মথুরামোহনের সঙ্গে আবার বিয়ে দেন চতুর্থ কন্যা জগদম্বার। আসলে অপুত্রক রাসমণির প্রগাঢ় বিশ্বাস আর নির্ভরশীলতা ছিল হৃদয়বান সুপুরুষ মথুরামোহনের ওপর। প্রিয় জামাতাটিকে তিনি কাছ-ছাড়া করতে চাননি। কীভাবে বুঝেছিলেন, মথুরামোহন শুধু উদার হৃদয় বুদ্ধিমান ছাড়াও, অত্যন্ত ধার্মিক আর পরিশ্রমী মানুষ।
তীর্থযাত্রার আয়োজনে মথুরের ভূমিকাও কিছু কম না।
কিন্তু সব আয়োজনই বাতিল হয়ে গেল। কলকাতা শহরের উত্তর প্রান্তে দক্ষিণেশ্বর গ্রামে রানিমা-র বজরা বাঁধা হয়েছে রাত্রিবাসের জন্য। পরদিন ভোরেই আবার ছাড়বে। রাত্রে স্বপ্ন দেখলেন রাসমণিদেবী। স্বপ্ন তো নয়, স্বপ্নাদেশ। দেবীর বেশে কালীঠাকুর উদয় হয়ে বললেন, কাশী যাওয়ার দরকার নেই। ভাগীরথীর তীরে আমার মূর্তি প্রতিষ্ঠা করো। ওই মূর্তির আশ্রয়ে আবির্ভূত হয়ে, আমি তোমার পুজো নেব নিত্যদিন।
রানি ব্যক্তিত্বসম্পন্না হলেও ছিলেন ধর্মপ্রাণা। কাশী যাওয়া বন্ধ করে উঠেপড়ে লাগলেন মন্দির প্রতিষ্ঠা করার জন্য জমি খুঁজতে। দায়িত্ব পড়ে গেল মথুরামোহনে ওপরেও। নির্বাচিত স্থান দক্ষিণেশ্বর গ্রাম। কিন্তু তার একদিকে ইংরেজ এটর্নি জেমস হেস্টি সাহেবের কুঠি, আর একদিকে মুসলমানদের কবরডাঙ্গা এবং গাজিসাহেবের পিরের থান। কথাবার্তা স্থির হয়ে গেল। আঠারোশো সাতচল্লিশ খ্রিস্টাব্দের ছয়ই সেপ্টেম্বর রানি রাসমণি হেস্টি সাহেবের কাছ থেকে পঞ্চান্ন হাজার টাকায় গঙ্গার ধারের যাট বিঘা জমি কিনে নিলেন মন্দির তৈরি করার জন্য। ভবিষ্যতে যেখান থেকে সর্বধর্ম সমন্বয়ের বাণী উচ্চারিত হবে, কোনও এক অলৌকিক নির্দেশেই যেন সেখানে মন্দিরের জায়গা চিহ্নিত হয়ে গেল।
কিন্তু জায়গা ঠিক হয়ে গেলেও মন্দির বানাবার কাজ তত সহজ হল না। বিশেষ করে সামনে নদী বলে। প্রবল বানে নদীর পাড় ভেঙে যাচ্ছে। সুতরাং আগে গঙ্গার পাড় বাঁধিয়ে ঘাট তৈরি শুরু হল। মেকিনটশ কোম্পানি কাজের বরাত পেয়ে দ্রুত বাঁধ তৈরি করতে লেগে গেল। শুরু হল দ্বাদশ শিবমন্দিরের জন্য মূর্তি তৈরির কাজ। দক্ষিণে থাকবেন যজ্ঞেশ্বর-জলেশ্বর-জগদীশ্বর-নাগেশ্বর-নন্দিকেশ্বর ও নরেশ্বর এবং উত্তরে বিরাজ করবেন যোগেশ্বর-যত্নেশ্বর-জটিলেশ্বর-নকুলেশ্বর-নাকেশ্বর ও নির্জলেশ্বর। শিবমন্দিরের উত্তর-দক্ষিণ ও পশ্চিম দিক জুড়ে বিশাল আঙিনায় তৈরি হবে ন’টি চূড়া-বিশিষ্ট মা ভবতারিণীর মন্দির, তার পাশে বিষ্ণু মন্দির। হবে নাটমন্দির, যেখানে ভক্তরা এসে মিলিত হবেন, পুজো-কীর্তন-অনুষ্ঠান হবে। করতে হবে অতিথিশালা, নহবতখানা। যেমন এলাহি ব্যাপার, তেমনই বিশাল কর্মকাণ্ডের আয়োজন। দীর্ঘ পরিকল্পনা, অর্থ আর একনিষ্ঠ মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রানি রাসমণি কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লেন।
দশ বছর সময় যায় যায়। এদিকে বাংলা বারোশো বাষট্টি সনেও মন্দিরের কাজ সম্পূর্ণ হয়নি। রানি বিচলিত হয়ে পড়ছেন। বয়স বসে থাকছে না। নিজের শরীর স্বাস্থ্য নিয়েও চিন্তা হচ্ছে। মনস্থির করে ফেললেন ওই বছরেই জ্যৈষ্ঠমাসে স্নানযাত্রার দিন তিনি ভবতারিণী মায়ের প্রতিষ্ঠাকার্য সম্পন্ন করবেন।
কিন্তু করব বললেই করা যায় না। জাতপাত বর্ণ-সামাজিক গোঁড়ামির ব্যাপার আছে। রানি নিজে জাতিতে কৈবর্ত। বুঝে গেলেন আরাধ্য দেবীকে তাঁর অন্নভোগ দেওয়ার পথে প্রধান বাধা তাঁরই জাতি আর সামাজিক প্রথা। পণ্ডিত এবং ব্রাহ্মণ সম্প্রদায় নানান কৌশলে রানিকে নিরুৎসাহিত করতে লাগলেন। রীতিমতো হতাশ হলেন রাসমণি।
কিন্তু ঝামাপুকুর চতুষ্পঠী থেকে রামকুমার এবং অন্যান্য পণ্ডিতরা তখন অন্তত সাময়িকভাবে উদ্ধার করলেন তাঁকে। তাঁরা বিধান দিলেন, মাতৃপ্রতিষ্ঠার আগে রানি যদি সমস্ত সম্পত্তি কোনও ব্রাহ্মণকে দান করে দেন, তা হলে শাস্ত্ৰনিয়ম রক্ষা হবে এবং তারপর দেবীর প্রতিষ্ঠা অনুষ্ঠানে ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের যোগদানে আর বাধা থাকবে না। অন্নভোগ গ্রহণেও আপত্তি থাকা উচিত নয়।
সরাসরি এই ব্যবস্থাকে কেউ নাকচ করতে পারলেন না ঠিকই, কিন্তু ব্রাহ্মণ সম্প্রদায় তলে তলে প্যাঁচ কষতে লাগলেন। প্রচারও চালাতে লাগলেন, ওই মন্দিরে ব্রাহ্মণরা প্রসাদ গ্রহণ করবেন না। নিরুপায় রানি দ্বারস্থ হলেন রামকুমারের। তাঁরই কর্মচারী শিহড়ের মহেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আর দেশড়া গ্রামের রামধন ঘোষের মাধ্যমে তিনি হৃদয়বান রামকুমারকে অনুরোধ করলেন মন্দিরের পূজকের পদ গ্রহণ করতে। ইতিমধ্যে রানি তাঁর গুরুদেবের নাম মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবেও জানিয়ে দিয়েছিলেন। প্রাথমিকভাবে একঘরে হওয়ার আশঙ্কায় রামকুমার রানির প্রস্তাবে সম্মত হতে পারলেন না। কিন্তু বিভিন্ন প্রচারপত্র এবং রানির দানধ্যানের খতিয়ান দেখে টের পেলেন ইতিমধ্যেই কত ব্রাহ্মণ আবার তাঁর আতিথ্য গ্রহণ করবেন বলে সম্মত হয়েছেন। আর তিনি অনুরোধ ফেলতে পারলেন না। পূজকের পদ গ্রহণ করতে রাজি হয়ে গেলেন রামকুমার। আঠারোই জ্যৈষ্ঠ পুণ্য স্নানযাত্রার দিনেই মন্দির প্রতিষ্ঠার কাজ সম্পন্ন হল। ব্রাহ্মমুহূর্তে নহবতখানা থেকে উঠল সুরধ্বনি, পণ্ডিতরা এসে আসন গ্রহণ করলেন। মহামানবের মিলনক্ষেত্র হয়ে উঠল দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরপ্রাঙ্গণ। অতিথিদের রাসমণি উত্তরীয়, শাল এবং একটি করে স্বর্ণমুদ্রা প্রণামি দিয়েছিলেন। সন্ধ্যায় সেই দিনই প্রথম দক্ষিণেশ্বর এসেছিলেন রামকৃষ্ণ।
কিন্তু মন্দিরে এলেও, বড়দাদার পূজকের পদ গ্রহণ করার ব্যাপারটা তিনি নিজেও তখন মানতে পারেননি। হয়তো গদাধরের মনে হয়ে থাকবে, দাদা যদি স্থায়ীভাবে মন্দিরের পুরোহিত হয়ে থাকেন, তা হলে ঝামাপুকুরের টোল চালাবেন কে! আর টোল উঠে গেলে তিনি নিজেই বা থাকবেন কোথায়? একই সঙ্গে রানি রাসমণি দেবীর মন্দিরে দাদার পৌরোহিত্য করা নিয়ে তাঁর নিজের মনেও যেন একটা সংস্কারাচ্ছন্ন সংশয় কাজ করেছিল। ভাবনার দোলাচলে পড়ে গিয়েছিলেন রামকৃষ্ণ। একদিকে উত্তরকালের আবছায়া-মাখা অনন্ত সাধক জীবনের জন্য অমোঘ আকর্ষণ, অন্যদিকে তখনও অতিক্রম করতে না-পারা সংস্কারাচ্ছন্ন ব্রাহ্মণত্বের প্রতি জন্মগত নিষ্ঠা, এই দুই ভাবনার টানাপোড়েনে আসলে তখন ক্ষতবিক্ষত হচ্ছিলেন গদাধর।
ক্ষতবিক্ষত? না কি ভাবীকালের জন্য শুদ্ধ হয়ে উঠছিলেন রামকৃষ্ণ!
দক্ষিণেশ্বর মন্দির ছেড়ে অবশ্য আর তাঁর যাওয়া হল না। প্রসাদ গ্রহণে দ্বিধা ছিল। কিন্তু চাল-ডাল-তেল-নুন সিধে নিয়ে গঙ্গার পাড়ে স্বহস্তে রান্না করে অন্নগ্রহণ করতে তাঁর নিজের ভেতর থেকে কোনও বাধা আসেনি। কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্যে দিয়েই কি প্রকৃতপক্ষে তাঁর পরম প্রেমময় জীবদ্দশার উদ্বোধন পর্ব চলছিল তখন? রামকৃষ্ণ কি মনুষ্যজীবনের সকল অসম্পূর্ণতাকে অতিক্রম করার জন্যই তখন পরমেশ্বরের করুণা ভিক্ষা করে চলেছিলেন? আত্মানুসন্ধান চলছিল কি তাঁর?
কিছু একটা পরিবর্তন ঘটছিল। ভাগীরথীর তীর, ভবতারিণী মন্দিরে বড়দাদার সনিষ্ঠ পৌরোহিত্য, মথুরবাবু আর রানি রাসমণির শ্রদ্ধাভক্তি, নিজের ভিতর থেকে জেগে ওঠা বিশ্বাস আর চৈতন্যের অজস্র প্রশ্ন… গদাধরকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল কোন এক সুদূর আহ্বানে, যা তাঁকে সংস্কারের ঊর্ধ্বে উঠে সত্যের আকাশ স্পর্শ করার প্রেরণা জুগিয়েছিল। ভাগ্নে হৃদয়রাম মুখোপাধ্যায় ইতিমধ্যে এসে পৌঁছেছেন দক্ষিণেশ্বরে।
চাকরি খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন হৃদয়। বর্ধমানে আত্মীয়র বাড়িতে এসে খবর পান, দক্ষিণেশ্বরে রানি রাসমণির মন্দিরে বড় আর ছোট, দুই মামাই সসম্মানে রয়েছেন। বড়মামা মন্দিরের পুরোহিত। আর ছোটমামা রামকৃষ্ণ কোনও পদ গ্রহণ না করলেও, মন্দির চত্বরে নিজের সাধন-ভজন নিয়ে থাকেন। আপাত দৃষ্টিতে তিনি কিছুটা উদাসীন, খেয়ালি মানুষ। কিন্তু মথুরবাবু আর রানি তাঁকে অন্য চোখে দেখেন।
হৃদয় আর ছোটমামার বয়েসের তফাত বেশি নয়, সখ্যও তাঁদের মধ্যে। কিন্তু হৃদয় খেয়াল করে রামকৃষ্ণ এক অদ্ভুত আসক্তিবিহীন, নির্লোভী, আলোকসন্ধানী মানুষ, জাগতিক চাওয়া-পাওয়া তাঁকে স্পর্শ করে না। তিনি যেন একটা ঘোরের মধ্যে থেকে অহরহ কিছু একটা খুঁজে বেড়াচ্ছেন। ইতিমধ্যেই খ্যাপাটে, পাগলা, বায়ুগ্রস্ত… ইত্যাদি বিশেষণ জুটে গেছে তাঁর নামের সঙ্গে। বারংবার অনুরুদ্ধ হয়েও তিনি নির্দিষ্ট কোনও কাজ নেওয়ার ব্যাপারে অনাগ্রহী। তা সত্ত্বেও রানিমা এবং মথুরবাবু অসম্ভব শ্রদ্ধা করেন এই যুবকটিকে।
পঞ্চবটীতে স্বপাক রান্না করে খান রামকৃষ্ণ। মাঝে মাঝে কোথায় যেন উধাও হয়ে যান। হৃদয় জিগ্যেস করলেই বলেন, কেন, কোথাও যাইনি তো, এখানেই ছিলাম। বলেন, আর মিটিমিটি হাসেন। হৃদয় কিছুটা আতান্তরে পড়ে যান। কাজ নেওয়ার কথা বললেই গদাধর উত্তর দেন, ওসব বড় হাঙ্গামার ব্যাপার রে, আমার পোষাবে না।
হৃদয় বলেন, কিন্তু তুমি তো মায়ের পুজো-আর্চা নিয়েই থাকতে চাও।
রামকৃষ্ণ বলেন, তা তো চাই। কিন্তু এখানে মায়ের গায়ে বড্ড দামি-দামি গয়না আছে। চাকরি করলে ওসবেরও দায়িত্ব পড়ে যাবে আমার ওপর। আমি সেসব সামলাতে পারব না।
হৃদয় তো এদিকে চাকরিই খুঁজছেন। হঠাৎ বলে বসলেন, আচ্ছা আমি যদি ওসবের দায়িত্ব নিই?
রামকৃষ্ণ বললেন, নিবি? ঠিক আছে, তা হলে শুধু পুজো করতে আমার আপত্তি নেই।
মথুরবাবু দারুণ খুশি। হৃদয়ের নিজের একটা হিল্লে হয়ে গেল। আর বড়দাদা রামকুমারের সঙ্গেই রামকৃষ্ণও পূজকের কাজ শুরু করলেন। এসবই মন্দির প্রতিষ্ঠা হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে ঘটে গেল। সেটা ইংরাজি আঠারোশো পঞ্চান্ন সাল, বাংলা বারোশো বাষট্টি। ঠিকঠাক চলছিল সব। হঠাৎ মাত্র বাহান্ন বছর বয়েসে, আঠারোশো সাতান্ন সালে বড়দাদা রামকুমার প্রয়াত হলেন। আর উপায় রইল না রামকৃষ্ণর। তিনি পাগল ঠাকুর বলে খ্যাত হলেও, এবার মূল পুরোহিত বলে তিনি অভিষিক্ত হলেন। আঠারোশো তিপ্পান্ন সালে গদাধর কলকাতায় এসেছিলেন প্রথম। ছিলেন ঝামাপুকুরের টোলে। কিন্তু প্রায় বছর চারেকের মধ্যেই তাঁর পাকাপাকি ঠিকানা হয়ে গেল রানি রাসমণির দক্ষিণেশ্বর মন্দির।
সারদা হাতের কড় গুনে হিসেব করে দেখল রামকৃষ্ণ যে-বছর প্রথম কলকাতায় গেলেন, সে বছরেই তার জন্ম। আর আঠারোশো ঊনষাটের বৈশাখ মাসে যখন তার বিয়ে হয়, তার বছর আড়াই আগে থাকতেই পাগল ঠাকুর দক্ষিণেশ্বরে।
ফিক করে এক চিলতে হাসি বেরিয়ে এল সারদার মুখ থেকে। আসলে বিয়ের সময়কার, এমনকী তার আগেকার কথা খুব সামান্য এখনও মনে পড়ে সারদার। অধিকাংশই অবশ্য গল্পে শোনা। বাবা-মা-খুড়িমা কিংবা ভানুপিসির কাছ থেকে। কে জানে, আজ এত দিন পরে আবার শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার কথা বলেই হয়তো সেই সব গল্পকথা আর ঝাপসা স্মৃতিরা তার মনের দখল নিচ্ছে। বিয়ে আর বউভাতের সময়কার কথা তো প্রায় কিছুই মনে নেই। একমাত্র সেই খেজুর কুড়োনোর কথা আর ফুলশয্যার পরের দিন গায়ে গয়না নেই দেখে কান্নাকাটির ব্যাপারটাই যা একটু মনে পড়ে। তার দু’বছর পরে জোড়ে যাওয়ার ঘটনা, মাস দুয়েক থাকার কথা অবশ্য আর একটু বেশি মনে পড়ে এখনও। আসলে গদাধর তখন গল্প বলতেন অনেক। কত সব মজার মজার গল্প। হাঁ করে শুনত সারদা। কিন্তু ওই পর্যন্তই। রাত্তিরে শুতে যাওয়ার সময় হলেই মা-বাবার জন্য বড় মন কেমন করত। কতদিন শাশুড়িই তখন কোলের কাছে টেনে এনে মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়েছেন। ঠিক মায়ের মতোই মনে হত চন্দ্রমণিকে।
এবার গিয়ে শাশুড়ির সঙ্গে দেখা হবে কি না জানে না সারদা। শুনেছে তিনিও নাকি দক্ষিণেশ্বরে গিয়েই থাকবেন এবার থেকে। চন্দ্রমণি না থাকলে ওর গিয়ে খুব ফাঁকা লাগবে ঠিকই। কেন না রামকৃষ্ণও এখন থাকবেন না। তা হলেও এত বছর পরে যখন একবার যাওয়ার কথা হয়েছে, ঘুরেই আসবে। ভাশুর-জা আর ছেলেপুলেরা আছে। গরমটাও কমে গেছে এখন। বরং একটু একটু ঠান্ডা পড়ছে। ভালই লাগবে হয়তো। তা ছাড়া বছর ছয়েক ধরে শুধু সংসারের কাজ, ভাই-বোন মানুষ করা, রান্না, গোরুর জাবনা দেওয়া…এসব করতে করতে, তার যে একটা শ্বশুরবাড়ি আছে, তাই তো প্রায় ভুলতে বসেছে।
আবার মা-র জন্যও যে কষ্ট হয় না, তা নয়। ঘরবাড়ি-সংসার অতগুলো ছেলেমেয়ে একা সামলাতে হিমসিম খেয়ে যান শ্যামাসুন্দরী। এখন সাতটি ভাই-বোন সারদারা। কালীকুমারের পর আরও দুটি ভাই হয়েছে সারদার। বরদাপ্রসাদ আর অভয়চরণ। দুই বোন আর পাঁচ ভাই। অবশ্য এর মধ্যে কোকন্দ গ্রামের সুধারাম চক্রবর্তীর সঙ্গে কাদম্বিনীর বিয়েও হয়ে গেছে। ওর শরীর-স্বাস্থ্যটা তেমন পোক্ত নয়। মাঝে মাঝেই ভোগে, আর তখন জয়রামবাটিতে এসেই থাকে। রামচন্দ্র মাঝেমধ্যে কলকাতায় যান বটে, কিন্তু সারদা বোঝে বাবার আয়পয় তেমন কিছু বাড়েনি। সংসারের যে দারিদ্র আর দুরবস্থা ছিল তাই আছে।
তার ওপর রামচন্দ্র আবার ধার্মিক, পরোপকারী মানুষ। কথায় যে বলে, ‘আপনি খেতে পায় না, আবার শঙ্করাকে ডাকে’— রামচন্দ্র একেবারেই সেই স্বভাবের মানুষ। লোকে উপোস করছে দেখলে, তাঁর যা খুদকুঁড়ো জমানো থাকে, তাই দিয়েই অন্য লোককে তিনি খাওয়াতে ছোটেন। আর সারদা-ই বা কী! বাপের সেই স্বভাব যে মেয়েও পেয়ে বসেছে। মানুষের দুঃখকষ্ট দেখলে এই বয়েস থেকেই মেয়ের বুক ফেটে যায়। অগ্র পশ্চাৎ বিবেচনা করার আগে সারদাও কি লোকের দুঃখ ঘোচানোর জন্য ঝাঁপ না দিয়ে পারে!
দু’বছর আগেই তো কী অবস্থা বাঁকুড়া-হুগলি জেলায়। হাহাকার পড়ে গিয়েছিল দু’মুঠো ভাতের জন্য।
সেবার বসন্তকালের মাঝামাঝি থেকে বোঝা যাচ্ছিল দুরন্ত গরম পড়বে এ বছর। নদীনালা, খালবিল দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে। কালবৈশাখীর নামও নেই। ভোরের দিকে অল্প কিছুক্ষণ একটু কুয়াশা-কুয়াশা ভাব, তার পরেই পাঁশুটে আকাশ। আকাশ মেঘহীন, শুকনো তাপে ন্যাড়া হয়ে যাচ্ছে গাছগাছালি। সন্ধের দিকে ঝিরঝিরিয়ে খানিকক্ষণ দখিনা বাতাস বয়, কিন্তু তাতেও গা-জুড়নো হিমেল স্পর্শ নেই। গাঁ-গঞ্জের মানুষ অধিকাংশই কৃষিজীবী, চাষবাস নির্ভর জীবনযাপন তাদের। আবহাওয়া তাদের মনে আশঙ্কা বাড়ায়।
কিন্তু অবস্থা যে অতখানি চরমে উঠবে, সে-ধারণা তখনও ছিল না। রাঢ় বাংলার মানুষ গ্রীষ্মকালের আগুনে-গরম সহ্য করে আসছে চিরদিন। কিন্তু এ বছরের অবস্থা, চরিত্র যে আলাদা, মানুষ টের পেয়ে গেল চৈত্রের শেষ দিক থেকেই। কালবৈশাখির ঝড়বৃষ্টি হয়নি, এমনিতেই শুকোরুখো হয়েছিল মাঠঘাট-শস্যক্ষেত্র-ধানক্ষেত্র।
কিন্তু বৈশাখের প্রথম দিক থেকেই শুরু হল অগ্নিস্রাবী বাতাসের হলকা। সেইসঙ্গে খর সূর্যের তাপ। বেলা একটু বাড়ার পরেই আর চোখ খুলে প্রায় তাকাতে পারে না মানুষ। রোদের ঝলকে পুড়ে যাচ্ছে অঙ্গ। বাইরে বেরুতে গেলে নাক মুখ মাথায় কাপড় জড়িয়ে বেরুতে হয় উত্তাপ ঠেকাতে। মাঝেমধ্যে একটু ঘোলাটে ভাব হয় আকাশের, বোধ হয়, বুঝি বা মেঘ করে আসবে। কিন্তু কোথায় কী! মেঘ আসে না, অথচ ক্ষয়টে আকাশের রং হলেই অকস্মাৎ হাওয়া পড়ে যায়। প্রখর তাপ তখন গনগন করে গাছপালা বাড়ি ঘরের ওপর। ঝকঝকে রোদে পুড়ে যেতে থাকে প্রকৃতি। গ্রামের পর গ্রামের শস্যক্ষেত্র হলুদ হয়ে যাচ্ছে পুড়ে। নীরস হয়ে উঠছে কচি ডালপালা, পাতা অঙ্কুর। থম ধরা আগুনে অসহায় জ্বলে যাচ্ছে ক্ষেত-মাঠ-প্রান্তর। ঠোঁট ফাঁক করে পাখিরা হাঁপাচ্ছে আশ্রয় খুঁজে খুঁজে। ধান ক্ষেতের মাটি মানচিত্রের রেখার মতো ফেটে চৌচির। জল নেই। পুকুর-ডোবার তলানিতেও কাদা। মাঠ ছেড়ে গোরু-মোষ ডুবে বসে থাকে সেই কাদার মধ্যে। গ্রামবাসীর বুক ঢিপঢিপ করে, অবিশ্বাসী চোখে তাকিয়ে থাকে নিজের জমিটুকুর দিকে। ফসল জমিয়ে রাখার অভ্যাস নেই গরিব-গুরবো মানুষদের। যখন যেরকম, তখন সেরকম ভাবেই চলে তারা। কিছুটা সম্পন্ন চাষি আর অপেক্ষাকৃত শিক্ষিত গ্রামবাসী ছাড়া ধানের মরাই-ও নেই সব ঘরে। সরবরাহ না থাকায় জিনিসপত্র কমে যাচ্ছে হাটে বাজারে-দোকানে। অগ্নিমূল্য হয়ে উঠছে আনাজ তরকারি, চালডাল। জল সেচে চুনোপুঁটি-গুগলি-শাকপাতাও আর মিলছে না। রুক্ষ হয়ে উঠছে চারদিক। সেইসঙ্গে রুক্ষ হয়ে উঠছে মানুষের মেজাজ মর্জি। অসহায়তার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে অস্থিরতা-সন্দেহ-হিংসা।
এল জ্যৈষ্ঠ মাস। যেন দাবানলে পুড়ে গেছে গ্রাম নগর। উত্তপ্ত অঙ্গারের মতো হয়ে রয়েছে মাঠঘাট রাস্তা। ঘরেও থাকতে পারছে না মানুষ। ঘরে চাল, দেওয়ালও আগুন। বাধ্য হচ্ছে গাছের ছায়ায় আশ্রয় নিতে। ঘরে দানাপানি নেই। আমোদরের চর খুঁড়ে জল বার করতে গিয়ে মারামারি কাড়াকাড়ি। অবশিষ্ট গাছের পাতাও চিবিয়ে খেয়ে ফেলছে মানুষ। চেহারা হয়ে যাচ্ছে কঙ্কালসার।
জেলায় দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করে দিয়েছে ইংরেজ সরকার। তার কালো ছায়ায় মড়ক ওঠার উপক্রম গ্রামে গঞ্জে। দলে দলে মানুষ বেরিয়ে পড়তে শুরু করেছে পথে। গনগনে তাপে শুধু নেই নেই হাহাকার সর্বত্র। দেশের মানুষকে রক্ষা করার ক্ষমতা নেই বিদেশি সরকারের। ইচ্ছেও কতটা, তাইতে সন্দেহ আছে। তারা আগলে রাখছে নিজেদের মজুত ভাণ্ডার।
জয়রামবাটির পরিচিতি ছিল শস্যশ্যামল বলে। ভৌগোলিক অবস্থানের জন্যই বোধহয় এখানকার কলুগেড়ে-পুণ্যপুকুর বাঁড়ুয্যেপুকুরের জল শুকোত না, গাছপালায় পাতা-ফল-মুকুল থাকত। এ বছর খরার থাবা সেখানেও। তবু ধানের মরাই আছে রামচন্দ্র মুখুজ্যের বাড়িতে। তাঁকে সহজ, ধার্মিক লোক বলেও জানে গ্রামের মানুষ। সতৃষ্ণ নয়নে রামচন্দ্রের বাড়ির কাছে দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষ ভিড় জমাতে লাগল, যদি ঠাকুরমশাই খুদকুঁড়োর কিছু ব্যবস্থা করতে পারেন।
নিজের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা আর মজুত শস্যের পরিমাণ সম্বন্ধে সচেতন ছিলেন রামচন্দ্র। তাঁর নিজের সংসারটিও ছোট না। আছে পোষ্যবর্গ, ভাইয়ের সংসার, কিছু জ্ঞাতিগুষ্টি। খরার কোপানল থেকে রক্ষা পায়নি তাঁদের জমিজমাও। বন্ধ হয়েছে তাঁর যাজনক্রিয়া।
নিজের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা আর মজুত শস্যের পরিমাণ সম্বন্ধে সচেতন ছিলেন রামচন্দ্র। তাঁর নিজের সংসারটিও ছোট না। আছে পোষ্যবর্গ, ভাইয়ের সংসার, কিছু জ্ঞাতিগুষ্টি। খরার কোপানল থেকে রক্ষা পায়নি তাঁদের জমিজমাও। বন্ধ হয়েছে তাঁর যাজনক্রিয়া।
তা সত্ত্বেও দুঃস্থ উপোসি মানুষের হাহাকারে চূড়ান্ত বিচলিত হয়ে পড়লেন রামচন্দ্র। নিরন্ন মানুষের কথা চিন্তা করে ভাতের গ্রাস মুখে তুলতে পারেন না তিনি। চাপা উদ্বেগে মনমরা শ্যামাসুন্দরীও। আর মানুষের দুর্দশা দেখতে দেখতে মাত্র এগারো বছরের মেয়ে সারুরও যে ছোট্ট বুকের মধ্যে পাষাণভার জমে রয়েছে রামচন্দ্র তা টের পান। ভাবেন, এইটুকু বয়েস থেকে মেয়ের মনে এত দয়ামায়া, করুণা, ভালবাসা! ছোট ছোট সরু হাতে সংসারের যাবতীয় কাজে সে জড়িয়ে থাকে। কাঁখে কোলে করে ভাইদের চান করাতে নিয়ে যায়। গোরুর জন্য ঘাস কেটে আনে। দরকার পড়লে রান্নাও করে, ঘর গোছায়, উঠোন ঝাঁট দেয়, গোবর লেপা দিয়ে দাওয়া নিকোয়। দুর্ভিক্ষের চেহারা দেখে সেই সারুরও মুখ থমথমে। রামচন্দ্র শ্যামাসুন্দরীকে বললেন, ওগো, গাঁয়ের মানুষের এই কষ্ট আমি আর দেখতে পারছি না। একটা কিছু তো করতে হয়। শ্যামাসুন্দরী বলেন, আমিও তো সেই কথাই ভাবছি। খিদের জ্বালায় পাড়াপড়শি মরছে, আমার গলা দিয়ে আর ভাত নামে না। সারু মা’র-ও বড্ড মনোকষ্ট যাচ্ছে। রামচন্দ্র বললেন, ঠাকুরের ঘরে বসে মেয়ে কাঁদছে আমি দেখেছি।
শ্যামাসুন্দরী বলেন, আমিও তা জানি। বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে লোকের দোরে দোরে মানুষ ফেন ভিক্ষে করছে, সারু দেখেছে। ফিরে এসে আমায় জড়িয়ে ধরে সে কী কান্না!
কী করি বলো দিকিনি?
আমিও তো সেই কথা ভেবে ভেবে সারা হচ্ছি।
একটু চিন্তা করে রামচন্দ্র বললেন, আমি বলি কী… কিছু ধান তো মরাইয়ে জমানো রয়েছে, কাল থেকে কুটতে শুরু করে দিই। কী বলে?
সেকথা আমার মাথাতেও এসেছে। ভাবছিলাম, তুমি কী বলবে!
আর ভাবাভাবির কিছু নেই গো। মানুষ না খেয়ে মরছে, কোন লজ্জায় তারপরে আর ধান জমিয়ে রাখি?
তাই তো। ছেলেপুলে নিয়ে সব গাছতলায় বসে বসে ধুঁকছে, মা হয়ে আমিই কি আর তা দেখতে পারি।
কিছু কলাই-খেঁসারিও তো ভাঁড়ারে আছে?
তা আছে।
তা হলে আর দেরি না করে লেগে পড়ি। চালে-ডালে মিশিয়ে যদি কয়েক হাঁড়ি করে খিচুড়ি করে ফেলতে পারি… হ্যাঁ, শুধু একটা কথা। হেঁশেলের ভাল চাল শুধু দুটি রেখে দিয়ো আমার সারুমা-র জন্য। প্রাণ ধরে ওটুকু আমি আর কাউকে দিতে পারব না।
আচ্ছা সে হবে’খন। কাল আগে তা হলে ধান কোটার ব্যবস্থা তো করি।
সারদা যে এতক্ষণ বাবা-মা’র সব কথাই শুনছিল কেউ টের পাননি। ধান কোটার কথা শুনেই এবার সে ছুট্টে এল। শ্যামাসুন্দরীর কাছে এসেই বলল, মা, আমি তা হলে ঢেঁকিতে পাড় দেব।
ও তোমার কর্ম নয় মা। পাথরের জোয়াল অনেক ভারী। হাতে-পায়ে বড় হও আগে— তার পর।
তা হলে কে করবে?
ধান কুটতে এখন লোকের অভাব হবে না মা। তা ছাড়া তোর খুড়িমা আছে, ভানু আছে, ঘোষগিন্নি আছে…
আচ্ছা আমি তা হলে খিচুড়ি লোকের পাতে দেওয়ার আগে, হাওয়া করে করে জুড়িয়ে দেব।
রামচন্দ্র বললেন, তাই করিস মা। তুই যেন সারাজীবন ধরে মানুষের দুঃখকষ্ট জুড়োতে পারিস।
হঠাৎ সারদা বলল, আমি তো কাজ করতেই এসেছি। কথাটা বলেই সারদা ঘরে ঢুকে গেল ভাই-বোন সামলাতে।
শ্যামাসুন্দরী আর রামচন্দ্র হতভম্বের মতন মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলেন। কোনও কথা বেরুল না।
অন্নসত্র খোলা হল পরের দিন থেকেই।
ধান সিদ্ধ করার উনুন ছিল অন্দর বাড়ির দোচালার গায়ে। মরাইবাঁধা ধান কুটে নিয়ে, চাল আর কলাইয়ের ডালের খিচুড়ি চড়ে গেল হাঁড়িতে হাঁড়িতে। কীভাবে খবরও ছড়িয়ে পড়ল— জয়রামবাটির রামচন্দ্র মুখুজ্যের বাড়িতে খিচুড়ি পাওয়া যাচ্ছে। দুর্ভিক্ষপীড়িত অঞ্চল। আশপাশের গ্রাম থেকেও লোক এসে ভিড় করল পাত পাড়তে।
সদ্য কাঠের জ্বালে রান্না করা খিচুড়ি দেখে তর সয় না ক্ষুধার্ত মানুষের। দৃষ্টি চকচক করে ক্ষুন্নিবৃত্তির আশায়। অথচ হাত ছোঁয়াতে পারে না গরমে। ছুটে গিয়ে ঘর থেকে তালপাতার পাখা নিয়ে আসে সারদা। দু’হাতে বাতাস করে জুড়োবার জন্য। তারপর গোগ্রাসে অভুক্ত মানুষের খাওয়া দেখে। ক্ষুধার তাড়নার কাছে কী অসহায় মানুষ! শুধু মানুষই বা কেন? সমস্ত অবলা জীবেরাও তো তাই। স্নিগ্ধ করুণার তুষ্টিতে মনটা ভিজে যায় সারদার। অবচেতন মনে আপনা-আপনি যেন একটা সংকল্প তৈরি হয়ে যায়। আর কিছু চাই না ঠাকুর, আমাকে সেই ধর্মেই দীক্ষিত কর, যা দিয়ে দুঃখী, ক্ষুধার্ত মানুষকে তুমি জ্ঞানেই সেবা করতে পারি।
পরের দিন ভিতর-বাড়ির উঠোন থেকেই এক দৃশ্য দেখে বুকটা মুচড়ে উঠল সারদার।
বাবা-মা-র সঙ্গে সে-ও হাত লাগিয়েছে খিচুড়ি রান্নায়। হাঁড়ির তলায় যাতে ধরে না যায়, সেই জন্য দু’হাতে খুন্তি দিয়ে নাড়ছে। এগারো বছরের ছোট্ট শরীরে তার ক্ষমতাই বা কতটুকু! তা হলেও নাড়তে নাড়তে বোঝে চাল-ডাল সিদ্ধ হয়ে এসেছে। এবার নামাতে হবে। কিন্তু অত বড় হাঁড়ি সে একা নামাতে পারবে কেন! রামচন্দ্রকে ডাক দিল।
বাবা শিগগির এসো। খিচুড়ি হয়ে গেছে, এবার না নামালে গলে যাবে।
হ্যাঁ মা, এই আসি, বলে রামচন্দ্র এসে গরম হাঁড়ি নামালেন।
এদিকে লোজন পাত পেড়ে বসে পড়েছে। বোঝা যাচ্ছে, যা খিচুড়ি আছে, তাইতে কুলোবে না। শ্যামাসুন্দরী আগেই তা আন্দাজ করেছেন। চাল-ডাল ধুয়ে আয়োজনও করে ফেলেছেন আর একপ্রস্ত চড়াবার। তার মধ্যেই পাতে পাতে গরম খিচুড়ি ঢেলে দিয়ে হাওয়া করছে সারদা। হঠাৎ চোখ গেল সদরের উঠোনের দিকে।
বোধহয় বাগদি পাড়ার মেয়েই হবে। চোদ্দো-পনেরো বছর বয়েস। উদ্ভ্রান্তের মতো ঢুকে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। পরনে শতচ্ছিন্ন জীর্ণ ডুরে শাড়ি, রোদে পোড়া চেহারা। একমাথা ঝাঁকড়া চুল, তেলের অভাবে উশকো-খুশকো। খিদে-তেষ্টা-ক্লান্তিতে দিশেহারা। ক’দিন ধরে উপোসি কে জানে! চোখ দুটো লাল, বসে গেছে কোটরে, তা সত্ত্বেও খাবার খোঁজার জন্য হন্যে হয়ে জ্বলছে।
পাখা ফেলে রেখে ছুটল সারদা মেয়েটাকে ধরে আনতে।
কিন্তু ওইটুকু সময়ের মধ্যেই সে সরে গেছে বেড়ার ধারে গোয়ালের কাছে। গোরুর জাবনা দেওয়ার ডাবা রাখা আছে কোণে, কুঁড়ো ভিজিয়ে রাখা হয়েছে তার মধ্যে। চোখে পড়ামাত্র মেয়ে আর খিদে সহ্য করতে পারেনি। দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটে গিয়ে হাত ডুবিয়ে দিয়েছে তার মধ্যে। তারপর আর মানুষ না, যেন গোগ্রাসেই হাতে তুলে খেতে শুরু করেছে ভেজানো কুঁড়ো।
স্তম্ভিত সারদা। মুহূর্তের জড়তা কাটিয়েই চেপে ধরল মেয়ের হাত।
ও মা, ও কী করছ… ও যে গোরুর খাবার গো…
কিন্তু কে কার কথা শোনে! খিদের আগুন জ্বলছে তার পেটের মধ্যে দাউদাউ করে। সে অর্ধোন্মাদিনী তখন। পাগলের মতন গোরুর ভেজানো কুঁড়ো হাতে তুলছে আর মুখে ঢোকাচ্ছে। সারদা যত বলে, ভেতরে এসো। খিচুড়ি খাও। কিন্তু তার ধৈর্য আর বাধা মানছে না। বেশ কয়েক গ্রাস গোখাদ্য গেলার পরে তার হুঁশ হল। তার পর বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে তাকাল সারদার দিকে। চোখ ফেটে জল এসেছে তখন সারদার, আর কান্নায় ভেঙে পড়েছে সে মেয়েও। রামচন্দ্র বেরিয়ে এসে ভেতরে নিয়ে গেলেন দু’জনকেই।
ক’দিন ধরে নিজেই যেন ভাল করে খেতে পারেনি সারদা। বারবার তার চোখের ওপর ভেসে উঠেছে বুভুক্ষু মানুষের সেই অসহায়তার দৃশ্য। কত মানুষ যে না খেতে পেয়ে ইঁদুর-বেড়ালের মতন মরে গিয়েছিল তার হিসেব নেই। মাঝে মাঝেই সেই সব পুরনো কথা মনে পড়ে সারদার। আবার চক্রাকারে ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মনের ভাবও পালটায়। স্মৃতি জড়ানো থাকে সুতোর মতন। একটায় টান পড়লেই তার থেকে একটা, তারপর আর-একটা মনের দখল নেয়।
কামারপুকুর যাওয়ার কথা হওয়ার পর থেকেই এবার বেশ ভাল লাগছে। সেই মানুষটার সঙ্গে দেখা হবে না বলে একটু মন খুঁতখুঁত করছে বটে। তা হলেও অনেক দিন পরে একটু পালটানো, অন্য লোকজনদের সঙ্গে দেখা তো হবে। ক’জনকে চিনতে পারবে তাই বা কে জানে! বড় ভাশুরের ছেলে অক্ষয়ের চেহারাটা অবশ্য সারদার মনে আছে। আর আছে শাশুড়ি ঠাকরুনের মুখটা। কিন্তু এক এক করে সবাই তো এখন দক্ষিণেশ্বরে চলে যাচ্ছে। গত বছর থেকে অক্ষয় সেখানে বিষ্ণু মন্দিরের পুরোহিত হয়েছে। গিয়ে হয়তো দেখবে এর মধ্যে শাশুড়ি ঠাকরুনও মন্দিরের কোথাও বসবাস করার জন্য চলে গেছেন। আর ‘তিনি’ তো নিজের সাধনাতেই ডুবে আছেন বলে খবর পায় সারদা।
দেখতে দেখতে রওনা হওয়ার দিন এসে গেল।
এমন কিছু দূরের পথ না। তা হলেও শ্বশুরবাড়ি যাওয়া বলে কথা। তার ওপর এতদিন পরে। আগের থেকে জ্ঞানবুদ্ধিও বেড়েছে সারদার। মাঝেমধ্যে পুরনো কথা ভেবে একটু লজ্জা-লজ্জা ভাবই হয়। কিন্তু তার স্থায়িত্বই বা কতক্ষণের! এটা সেটা পাঁচ রকম উত্তেজনায় আবার ভুলে যায়। সদ্য কিশোরী বয়েসের চঞ্চলতায় পৃথিবী প্রকৃতির যাবতীয় ব্যাপার এখনও তার চেতনায় আবেগ আর আলো-আঁধারিতে মেশামিশি। শুধু স্বামী-শ্বশুরবাড়ি-শাশুড়ি-ভাশুর… এই সব শব্দ আর সম্পর্কগুলোর কথা ভাবলেই তার নিজেকে বেশ বড়-বড় আর বউ-বউ মনে হয়। ছোট্ট তোরঙ্গ গুছিয়ে দিলেন শ্যামাসুন্দরী। উঠতে বসতে ক’দিন ধরেই তিনি পাখি পড়ানোর মতন করে আচার-আচরণ শিখিয়েছেন মেয়েকে। লজ্জাশীলা নম্র আর ভক্তিপরায়ণা হতে বলেছেন। বুঝিয়েছেন, শ্বশুরবাড়ির পরিচয়ই তার আসল পরিচয়। শত বলা, বোঝানো সত্ত্বেও মেয়েকে ছাড়তে বাজে মায়ের প্রাণে। মনে পড়ে যায় তার শৈশবের কথা।
বেরুনোর আগে ঢিপ করে মায়ের পায়ের ধুলো নিয়ে সারদা মাথায় ঠেকাতেই দু’চোখ ছাপিয়ে উঠল শ্যামাসুন্দরীর। চিবুকে হাত ছুঁইয়ে আশীর্বাদ করে বললেন, লক্ষ্মী হয়ে থাকিস, মা। বড় ভাল মানুষ তাঁরা, সব্বাইকে দেখিস।—আঁচল দিয়ে চোখ মুছলেন শ্যামাসুন্দরী।
ঘাড় কাত করে, আচ্ছা, বলল সারদা। আবার যোগ করল, দেড়-দু’মাস পরেই তো বাড়ি চলে আসব। মন খারাপ কোরো না।
উঠোনে দাঁড়িয়েছিলেন রামচন্দ্র, হাতে মেয়ের টিনের তোরঙ্গ। বললেন, এবার আয় মা, পৌঁছতে বেলা পড়ে যাবে নয়তো।
বউয়ের সাজে সদ্য কিশোরী মেয়ে বাবার হাত ধরে আস্তে আস্তে উঠোন পেরিয়ে গোরুর গাড়িতে উঠল। হেমন্তের রোদে তেজ কম। আকাশ নির্মেঘ। ক্যাঁচোর-কোঁচর চাকার শব্দ তুলে মেঠো গ্রাম্য রাস্তায় চলতে শুরু করল গোরুর গাড়ি।
