লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ
রাতের আঁধার ফিকে হওয়ার আগেই আজ শয্যা ত্যাগ করলেন শ্যামাসুন্দরী। ইচ্ছে করেই যে উঠে পড়লেন তা নয়। কিন্তু একটা চাপা হুতোশ আজ ক’দিন ধরেই ক্রিয়াশীল হয়ে রয়েছে তাঁর মধ্যে। এই ভোররাতে সেটাই যেন নীরবে তাড়া দিয়ে তাঁকে বাধ্য করল চাটাইয়ের বিছানা ছাড়তে। হাজারটা কাজের ভানা ঘুরপাক খাচ্ছে তাঁর মাথার মধ্যে।।
খুব একটা তাড়াতাড়ি যে শুয়ে পড়েছিলেন তা নয়। তার কোনও উপায়ও ছিল না। ছোট এইটুকু মাটির বাড়িতে আজ ক’দিন ধরেই পাড়াপ্রতিবেশী আত্মীয়স্বজনের যাতায়াত চলছে। মেয়ের বিয়ে বলে কথা। তার ওপর বড় মেয়ে। বাড়ির প্রথম শুভ কাজ। ধারেকাছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে খুড়ো-খুড়িরা তো আছেই, পাড়ার মাসি-পিসি, মামা-মামিরাও আছেন। গতকাল তাঁর নিজের দিদি দীনময়ী আসার পর থেকেই বিয়েবাড়ি একেবারে জমে গেল। তাঁর নিজের মেয়ে না থাকলেও, একেবারে জন্মইস্তক শ্যামাসুন্দরীর এই সর্বগুণসম্পন্না জ্যেষ্ঠা কন্যাটিকেই তো তিনি নিজের মেয়ে বলে মেনে এসেছেন। কয়েকটি জ্ঞাতিভাই ও তাঁদের পরিবারও এসে পৌঁছেছেন। তাঁরা খাওয়া-দাওয়া সেরে থেকেও গেছেন। শুতে রাত হয়েছে।
আচার অনুষ্ঠান নিয়মকানুন শুরু হবে সূর্যোদয়ের প্রাক্লগ্ন থেকেই। শ্যামাসুন্দরীর কি আর শুয়ে থাকার উপায় আছে। রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর কেটে প্রায় মধ্যরাত হয়েছিল গতকাল একটু বিশ্রামের সুযোগ পেতে পেতে। শরীরও তখন আর বইছিল না। কিন্তু মনের মধ্যে কাজের আনাগোনা, চাপা উদ্বেগ থাকলে শরীর যে বিশ্রাম নিতেও ভুলে যায়।
দাওয়া থেকে উঠোনে নেমে শ্যামাসুন্দরী দেখলেন নিঝুম নিশুত ভোররাত্রির অন্ধকার তখনও ঘন, ঝকঝকে কালো আকাশ নক্ষত্রখচিত হয়ে রয়েছে। তারই মৃদু আলোর আবছায়ায় কেমন মায়াময় আর অপার্থিব একটা সৌন্দর্য ছড়িয়ে রয়েছে তাঁদের পুরো জয়রামবাটি গ্রামে। অপূর্ব স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে বয়ে যাচ্ছে আসন্ন ভোরের হাওয়া। গাছের পাতায় তারই মৃদু মর্মর শব্দ। শান্ত অথচ নিবিড় সেই শব্দের অনুভূতি যেন কী এক পুণ্যের বাণী আর বার্তা বয়ে নিয়ে আসছে। বৈশাখ মাসের এই শেষ লগ্নে দিনের আলো ফোটেনি বলেই ধরিত্রীর শীতল স্পর্শে তাঁর গা জুড়িয়ে যাচ্ছে।
নিরাকার অজানা কোনও এক ঈশ্বরের প্রতি গভীর বিশ্বাস আর মমতায় শ্যামাসুন্দরী প্রণাম জানালেন। তারা-ভরা শান্ত আকাশ। অদৃশ্য হিমেল ভোররাতের বাতাস আর প্রকৃতির গভীর অলৌকিক সৌন্দর্যকে স্মরণ করে, পরম নিষ্ঠায় তাঁর প্রাণাধিক প্রিয় সুলগ্না, কল্যাণীয়া জ্যেষ্ঠাকন্যা সারদামণির জন্য আশীর্বাদ প্রার্থনা করলেন। মনে মনে গড় হলেন আরাধ্য গৃহদেবতা সিংহবাহিনীর পাদমূলে। পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে স্পর্শ করলেন চির আশ্রয়ের তুলসীমঞ্চ। বললেন, আমার সারুমাকে দেখো ঠাকুর।
সময়ের ব্যাপারে সচেতন হয়ে উঠলেন শ্যামাসুন্দরী। দেখতে দেখতে পুব আকাশের রং পালটে যাবে, ভোরের আলো ফুটবে। একবার সূর্যোদয় হয়ে গেলে তাঁর আর দম ফেলার সময় থাকবে না। জ্বলজ্বলে শুকতারার অবস্থান দেখে একটা আন্দাজ পান, আর কতক্ষন আঁধারের ভার থাকতে পারে। গরমের দিন বলে সুবিধে আছে, অসুবিধেও আছে। আত্মীয়স্বজনরা যে যেখানে পেরেছে ঘরে-বাইরে-বারান্দায়-দাওয়ায় শুয়ে পড়েছে, লেপ-কম্বল-বিছানার দরকার হয়নি। কিন্তু রাতের এই দুরন্ত গ্রীষ্মকালে অসুবিধেও কিছু কম না। সকাল একটু বাড়তে না বাড়তেই সূর্যের তাপ চড়ে যায়। আধা কাঁকুরে আর পাথুরে লাল মাটিও গরম হয়ে যায়। তার পর তো রোদের তেজ যেন রাগী ষাঁড়ের মতো আগুনে শ্বাস ফেলতে শুরু করে প্রকৃতির ওপর। জ্বলেপুড়ে যাবে মাঠঘাট, উন্মুক্ত প্রান্তর।।
কীভাবে তাঁদের এই জয়রামবাটি গ্রামটুকুতেই যেন ঈশ্বরের অপার করুণা বর্ষিত হয়ে এসেছে অনেক দিন ধরে। খর গ্রীষ্মের দাবদাহে পুরো বাঁকুড়া যখন পুড়ছে, ধুঁকছে, হুগলির কাছাকাছি আর প্রান্তসীমার জয়রামবাটি তখনও যেন স্নেহশীতল নিবিড় ছায়ায় ঢাকা। প্রাণদায়ী প্রহরীর মতো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে বৃক্ষসমূহ আম-নিম-শিমুল-কার্পাস-বট-অশ্বত্থ। পাতার ছায়ায় ঢেকে দিয়েছে মানুষের ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, পুকুর। তাপ শুষে নেয়। বিলিয়ে দেয় অকাতর বাতাস। অন্য গ্রামের পুকুর শুকিয়ে যায়, মাটি ফুটিফাটা, শস্যক্ষেত্র হলুদবর্ণ, কোথাও শুধু শুষ্ক বালুময় প্রান্তর। জয়রামবাটির পুণ্যপুকুর কলুগেড়ে তখনও জলে টলটল। বাতাসে ছায়ায় নিবিড় শান্ত হয়ে থাকে গ্রাম। পাখপাখালি ঝিমোয়, গৃহপালিত পশুরা জাবর কাটে, রাখাল ঘুমিয়ে পড়ে গাছতলায়। এমনকী পুবদক্ষিণে এঁকেবেঁকে চলা যে-আমোদর নদ, শ্যামাসুন্দরী পরশু দিনই গৃহলক্ষ্মীর পট পালটাতে গিয়ে দেখে এসেছেন, এখনও সেখানে জলধারা কুলকুল করে বইছে। কিছু শুকিয়েছে, কৃশ হয়েছে নদীর শরীর, জল নেমে গিয়েছে অনেক। তবু আঁকাবাঁকা স্রোত ছোট ছোট জেগে ওঠা চরের পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে।
মনটা খুশি হয়ে উঠেছিল শ্যামাসুন্দরীর। মাথায় চিন্তা ছিল। মেয়ের বিয়ের দিন জল সইতে আসবে পাড়ার বউ-ঝি। পাঁচ পুকুরের জল নিয়ে যেতে হবে গায়ে-হলুদের পর মেয়েকে চান করানোর জন্য। দুশ্চিন্তা দূর হয়েছিল। তিনি জানেন মেয়ে তাঁর লক্ষ্মীমন্ত। জানা সত্ত্বেও, মেয়ের বিয়ের আগে একমাত্র মায়ের মনেই আবেগ-উদ্বেগ-আনন্দ সব কিছু এক অতিরিক্ত মাত্রা পায়। মোটে পাঁচ পেরিয়ে ছ’ বছরে পড়েছে সারু। বিয়ে তো দিতেই হবে, তা হলেও এমন কিছু তাড়াহুড়ো ছিল না। হচ্ছে-হবে এমনভাবেই চলছিল। বিয়ে দিতে গেলে নিজেদেরও তৈরি হতে হবে।
মুখোপাধ্যায় পরিবারের জমিজমা বলতে তেমন বেশি কিছু নেই, জাতব্যবসা বলতেও কঠোর কোনও বৃত্তি বংশ-পরম্পরা ধরে চলে আসছে তা নয়। পূজা-পার্বণ, বিয়ে-পৈতেয় পৌরোহিত্য করেন বটে রামচন্দ্র, কিন্তু ছোট গ্রামের মধ্যে পুরোহিতকে নগদ বিদায় দেওয়ার ক্ষমতাই বা ক’টা অব্রাহ্মণ পরিবারের আছে! অধিকাংশই সদগোপ পরিবার, কয়েক ঘর গোয়ালা আর একটি করে ময়রা-নাপিত কামার, এই নিয়েই তো গ্রাম। তাদের অবস্থাও নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর মতন। তবু মুখুজ্যে আর তাঁদের মাতুল বংশ বাঁড়ুয্যেদের মান্যগণ্য করে গাঁয়ের লোক। কিছুটা চাষবাস আর কিছুটা পুরুতগিরি করেই রামচন্দ্র সংসার প্রতিপালন করছিলেন। পৈতৃক জমিজমা জ্ঞাতিদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়েও কমে গেছে। এদিকে সংসারটিও রামচন্দ্রের আর ছোট থাকছে না। সারদার পরে কাদম্বিনী, তারপর প্রসন্ন কুমারেরও জন্ম হয়েছে এই পাঁচ বছরের মধ্যে। বলা যায় না মা-ষষ্ঠীর কৃপায় আরও ক’টি সন্তানের জননী হতে হবে শ্যামাসুন্দরীকে।
তুলোর চাষটা রামচন্দ্র নিজের থেকেই শুরু করেছিলেন। এখনও মনে পড়ে শ্যামাসুন্দরীর, সারু যখন মাত্র এত্তোটুকুন মেয়ে, তখন থেকেই মেয়েকে কোলে নিয়ে তুলো কুড়োতে যেতেন। কত দিন এমন হয়েছে গাছতলায় মেয়েকে শুইয়ে রেখে একা তুলো কুড়িয়েছেন শ্যামাসুন্দরী। আর হাতেপায়ে একটু বড় হতে না হতেই, কীভাবে সে মেয়েও টের পেয়ে গিয়েছিল সাংসারিক প্রয়োজনের বিষয়, বুঝেছিল অভাব-দারিদ্রের মধ্যে নিজেদের অবস্থান কোথায়। তুলো কুড়োতে শুরু করেছিল সারদাও…। ওইটুকু মেয়ে বাড়ির গৃহপালিত ভগবতীর কথাও মনে রাখত, জানত, ওরা অবলা জীব, মুখে চাইতে পারে না। ছোট ছোট হাতে জল জমে থাকা ডোবার মধ্যে নেমে সারু দলঘাস কেটে নিয়ে আসত গোরুর জন্য।
সেই মেয়েরই আজ কিনা বিয়ে!
রাত্রির শেষ প্রহরে পাঁচমিশেলি অনুভূতিতেই শ্যামাসুন্দরীর চোখের দু’কূল ছাপিয়ে যায়। আজকের পরে, মেয়ে কি আমার পর হয়ে যাবে! গোত্রান্তর হয়ে যাওয়া মানে তো পরই। কিন্তু অতটুকুন মেয়েকে ছেড়ে তিনি থাকবেন কী করে?
নাহ্, নিজেকেই নিজে মৃদু শাসন করেন শ্যামাসুন্দরী। এমন শুভদিনের সূচনায় চোখের জল ফেলতে নেই। আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে নিজেকে সান্ত্বনা দেন, এ যে আনন্দাশ্রু! ক’টা মায়ের ভাগ্যে এমন মেয়ে হয়, যার বিয়ের জন্য পাত্রপক্ষ নিজে থেকে খোঁজ করে আসে! শুধু তাই বা কেন? তিন-তিনশো টাকা কন্যাপণ দেওয়াটাও কি মুখের কথা।
ভবিষ্যতে কী লেখা আছে শ্যামাসুন্দরী জানেন না। কিন্তু নিজের মনের অজানা কোনও গভীরে, নদীর অন্তঃস্রোতের মতো তিনি টের পান, সারুমা আমার সৌভাগ্যবতী, কল্যাণময়ী।
আবছা আঁধারে উঠোনে বেলগাছের নীচে তুলসীমঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে বারবার তাঁর অজানা ঈশ্বরের উদ্দেশে প্রণাম জানান।
শ্যামাসুন্দরী তার পরেই স্থির করেন, না, আর না, পুণ্যপুকুরে এখনই ডুব দিয়ে এসে বাসি কাপড় না ছাড়লে আর সময় পাবেন না। রাত থাকতে থাকতেই মেয়েকে তুলে যা হোক দুটো চিঁড়েমুড়ি খাইয়ে দিতে হবে। নয়তো ওই কচি মেয়ে সারাদিন না খেয়ে থাকবে কী করে!
কিন্তু খিড়কির দিকে যাওয়ার আগেই দাঁড়াতে হয় শ্যামাসুন্দরীকে। ঘর থেকে কারওর একটা বেরুবার শব্দ পেয়েছেন। খেয়াল করে মুখ ঘুরিয়ে দেখেন। ঠিক যা ভেবেছেন। হেঁটো ধুতির কাছা বাঁধতে বাঁধতে কর্তা বেরিয়ে আসছেন ঘর থেকে। বোধহয় একই রকম উদাস আর ভারাক্রান্ত তাঁরও হৃদয় আজ। গিন্নি উঠে পড়েছেন তিনি জানেন না বোধহয়।
মাটির দাওয়ার কাছে কয়েক পা এগিয়ে আসেন শ্যামাসুন্দরী।
উঠে পড়লে যে! রাত ভোর হয়নি তো এখনও।
স্ত্রীর উপস্থিতি টের পেয়েও প্রথমে নির্বাক রইলেন রামচন্দ্র। উপবীত স্পর্শ করে আগে দক্ষিণদ্বারী সিংহবাহিনীর উদ্দেশে প্রণাম নিবেদন করলেন। একটা হাই উঠল। বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ আর মধ্যমা দিয়ে মুখের সামনে শব্দ করে বললেন, মনটা বড় ব্যাকুল হয়ে রয়েছে বড়বউ…অথচ এমন শুভদিন আজ…।
রামচন্দ্র ওইরকমই সম্বোধন করেন স্ত্রীকে। কখনও বড়বউ, কখনও সারুর মা, কখনও শুধুই ওগো, হ্যাঁগো। ঠান্ডা মানুষ, নিষ্ঠ ব্রাহ্মণ তিনি। অভাব দারিদ্রে কিছুটা নুয়ে পড়লেও মুখের ভাষা আর মনের ভাবকে কখনও কঠিন হতে দেন না। শ্যামাসুন্দরীও মানুষটিকে চেনেন, বোঝেন। বড় মেয়ে যে তাঁর হৃদয়ের কতখানি অধিকার করে রয়েছে তিনি ছাড়া আর কে তা জানে! বাপের বাড়ি শিহড় থেকে ঠাকুর দেখে আসার পথে, যে-অলৌকিক অনুভব তাঁর হয়েছিল, প্রায় কাছাকাছি এক স্বপ্নাদৃষ্টের ভাব যে রামচন্দ্রেরও হয়েছিল সারুর জন্মের আগে, এ তাঁর জানা।
কী একটা অস্বস্তির ভাব হয়েছিল তাঁর সেদিন শিহড় থেকে জয়রামবাটি আসার পথে। পেটটা যেন গুলিয়ে উঠেছিল। ভাবলেন বোধহয় একবার শৌচে যেতে হবে। অন্ধকার হয়ে আসছিল। শেষ পর্যন্ত সঙ্গীসাথীদের দাঁড়াতে বলে এল্লাপুকুরের পাড়ে শৌচে গেলেন শ্যামাসুন্দরী। কিন্তু পৌঁছাতে পারলেন না। বেলগাছের নীচে আসতেই মনে হল কাঁসরঘণ্টার মৃদু আওয়াজ আসছে তাঁর কানে। কিছুটা হতচেতন ভাবের সঙ্গে বসে পড়লেন গাছতলায়। শৌচের কিছু হল না অথচ যেন অনুভূত কী এক আবেশে ভেসে যাচ্ছেন, আর কাঁসরঘণ্টার সঙ্গেই শুনতে পাচ্ছেন একটা ঝুমঝুম শব্দ। প্রায় সংজ্ঞা হারানো অবস্থায় শ্যামাসুন্দরীর মনে হয়েছিল, লালশাড়ি পরা ফুটফুটে এক মেয়ে পিছন থেকে এসে তাঁর গলা জড়িয়ে ধরল তার কোমল হাত দিয়ে। শিহরনের আবেগে আর কিছুই শুনতে পেলেন না শ্যামাসুন্দরী, কিন্তু অচৈতন্য হয়ে পড়লেন। এদিকে সঙ্গীসাথীরা দেরি দেখে খুঁজতে এসে দেখেন বিল্ববৃক্ষের নীচে অচেতন অবস্থায় তিনি পড়ে আছেন। কতক্ষণ ওই অবস্থায় তাঁর কেটেছিল মনে নেই। কিন্তু সেবা-শুশ্রূষার পরেই টের পেলেন তিনি গর্ভবতী। আর কী এক স্থিরবিশ্বাসে জেনেছিলেন, ফুটফুটে ওই বালিকাটিই তাঁর গর্ভে প্রবেশ করেছে।
বিশ্বাসের উপর কথা নেই। কিন্তু স্ত্রীর মুখ থেকে সেই ঘটনার বিবরণ শুনেই চমকে উঠলেন রামচন্দ্র। একই সঙ্গে স্মিত হাসি আর আনন্দে প্রফুল্ল হয়ে উঠল তাঁর মুখমণ্ডল। বললেন, হ্যাঁগো, এও কি সম্ভব!
বিস্ময়াবিষ্ট চোখে স্বামীর দিকে তাকিয়ে শ্যামাসুন্দরী বললেন, তা তো আমি জানি না, তবে যা ঘটেছে বললাম। কিন্তু তোমার চোখমুখ অমন দেখাচ্ছে কেন?
রামচন্দ্র উৎফুল্ল হয়ে বলে উঠলেন, ক’দিন আগে যে আমিও অমনই স্বপন দেখলাম। একবার কলকাতা যাব যাব করে মনের মধ্যে টানাপোড়েন চলছিল। খাওয়া-দাওয়ার পরে বারান্দায় বসে থাকতে থাকতেই কেমন ঝিমুনি এল। তখনই যে স্বপ্ন দেখলাম, টুকটুকে ছোট্ট একটা মেয়ে গলা জড়িয়ে ধরে বলল, এই আমি তোমার কাছে এলাম।
শ্যামাসুন্দরী জানেন তাঁদের উভয়ের শরীরে মনে কী দুরন্ত এক পরিবর্তন ঘটে গিয়েছিল তার পরে। ভক্তি আর ভালবাসায় পূর্ণ হয়ে উঠেছিল তাঁদের হৃদয়পাত্র। যার রেশ ছড়িয়ে পড়েছিল শ্যামাসুন্দরীর সর্বাঙ্গে। উজ্জ্বল হয়েছিল তাঁর গাত্রবর্ণ, ঘন কৃষ্ণ চুলের ঢল নেমেছিল মাথা জুড়ে, রূপ যেন আর ধরে না। সাধভক্ষণের দিন শাড়ি আর উপহারে ভরতি হয়ে গিয়েছিল তাঁদের দারিদ্র্যক্লিষ্ট জীর্ণ মাটির বাড়ি। তার কিছুদিন পরে ঘর আলো করে ভূমিষ্ঠ হয়েছিল এই সারু।
আজ যে সেই সব স্মৃতির দোলাতেই মানুষটার মন ব্যাকুল, ভোররাতের মধ্যেই আঁখি নিদ্রাহারা, শ্যামাসুন্দরী ছাড়া আর কেই-বা বুঝবে! শৌচে, স্নানে যাওয়ার আগে তাঁকে আর একবার দাঁড়াতেই হল। দাওয়ার দিকে, স্বামীর কাছাকাছি এসে কোমল স্বরে শ্যামাসুন্দরী বললেন, মেয়ের বিয়ের দিন বাপের মন তো ব্যাকুল হবেই। তা বলে তুমি যেন আবার ভেঙে পড়ো না বাপু! আর একটু শুয়ে থাকলেই তো পারতে।
নীরবে হাসলেন রামচন্দ্র। তারপর উঠোনে নেমে এসে বললেন, শুয়ে থাকলেই কি ব্যাকুলতা কমে! তবে ভেবো না, মন আমার শক্তই আছে। কিন্তু ভোররাতে তোমারই বা আজ ঘুম ভাঙল কেন বলো তো?
শোনো কথা! শ্যামাসুন্দরী একটু দাঁড়িয়ে বললেন, রাত পোয়াতেই মেয়ের বিয়ে, কিছুক্ষণ যে কাত হতে পেরেছিলাম তাই তো যথেষ্ট। রাজ্যের কাজ, জিনিসপত্র-গোছগাছ… এ কী কম কথা!
তা হলে আমাকেই বা আর শুয়ে থাকতে বলছ কী করে? কাজ আমারই কম কিছু?
তা নয়, কিন্তু তফাত তো আছে। তোমার কাজ বাইরে বাইরে, কিন্তু সংসারের ভেতরটা তো আমাকেই দেখতে হয়।
আবার একটা হাই তোলেন রামচন্দ্র। বললেন, তা বটে, সংসারের কতটাই বা আমি বুঝি! আজ আবার অনেক নিয়মকানুনের ব্যাপারও তো আছে। লোকজন এসে পড়বে, কত দিকে সামলাতে হবে—
ওসব নিয়ে তুমি ভেবো না। আমার হচ্ছে ভক্ত-ভগবানের সংসার। নেই-নেই করেও যা আছে…তাইতে সামলে যাবে। আর বাকিটা হচ্ছে সারুর কপাল।।
হালকা আঁধারে চাপা গলায় কথা হচ্ছিল দু’জনের। গরমের দিন বলে তালপাতার পাখা নিয়ে কেউ কেউ দাওয়াতেও শুয়ে পড়েছিল। ভোর হওয়ার আগে ঝিরঝিরে হাওয়ায় ধরণী একটু ঠান্ডা এখন! সারারাত এপাশ ওপাশ করে সবাই ঘুমোচ্ছ। কোণের দিকে ঠেসান দিয়ে রাখা হুঁকোটা তুলে নিয়ে এলেন রামচন্দ্র। উনুনে আঁচ না পড়লে অবশ্য টিকে ধরানো যাবে না। তা হলেও নেশার বস্তুটি ঘুম থেকে উঠে হাতে ধরলেও ভাল লাগে। প্রাতঃকৃত্যের কথাটাও মনে পড়ে যায়।
কল্কেটা খুলতে খুলতে বললেন, কাল সারারাত্তির সেই কথাটাই ভাবছিলাম। মেয়ের কপালের কথা।
শ্যামাসুন্দরী বললেন, যাঁর ভাবনা তাঁকে ভাবতে দাও। তোমার কাজ তুমি করো।
তাই চেষ্টা করছি। তবু মেয়ের বাপ তো আমি—
হ্যাঁগো, পাত্রপক্ষ যেচে এসেছিল বলেই কি তোমার ভাবনা এখনও?
না-না তা নয়। যেচে এসেছিল সে তো হালের কথা বড়বউ। কিন্তু আসলে সারু মা যে আমার স্বয়ম্বরা…সেকথা ভুলে গেলে!
না, ভুলব কেন? শিওড়ে হৃদয় মুখুজ্যের বাড়িতে সেই যাত্রাদিনের কথা বলছ তো?
সেই সব কথাই মনে হচ্ছিল। ভাব দিকিনি, মামির কোলে বসে দু’ বছরের মেয়ে কিনা এই ছেলেকেই দেখে সেদিন বলে দিল— ওকে বিয়ে করব! এ ভবিতব্য ছাড়া আর কী?
আর সেই ছেলেও তো শুনলাম, মাকে আর দাদাকে শেষ পর্যন্ত স্পষ্ট বলে দিয়েছিল, এদিক ওদিক মেয়ে খুঁজে লাভ নেই। জয়রামবাটির অমুক মুখুজ্যের বাড়িতে যাও, বিয়ের কনে নাকি কুটো বাঁধা আছে।।
তা হলেই বোঝ। একে দৈবনির্ধারিত ছাড়া আর কী বলব! হ্যাঁগো, বীজ ফলের মতন মেয়েও কি বিয়ের জন্য কুটো বাঁধা থাকে?
ও হল ভাবের কথা। জামাই তোমার ভক্ত ছেলে। এই বয়েসে অত বড় দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের পুজুরি।
সেকথাটা ঠিকই। তবে চব্বিশ বছর বয়েসের কথাটাও যে মাঝে মাঝে ভাবাচ্ছে না, তাই বা বলি কী করে!
আমি বলি, পুরুষ মানুষের বয়েস নিয়ে ভাববার কী? কিন্তু ব্রহ্মজ্ঞান না হলে মা কালী কি সে ছেলের হাতে পুজো নিতেন?
একথাটা বড় ভাল বলেছ বড়বউ।
তা ছাড়া মেয়ের কথাটাও ভাব। বেস্পতিবার, কৃষ্ণাসপ্তমীতে মেয়ের আমার জন্ম। রাশির নাম উঠল ঠাকুরমণি। আমরা আর ভেবে কী করব! নিজের অজান্তেই কপালে হাত উঠে গেল শ্যামাসুন্দরীর। বললেন, ঠাকুরই মেয়েকে দেখবেন।
তাই যেন হয়। হুঁকোসুদ্ধ কপালে হাত উঠল রামচন্দ্রেরও। তারপর হেসে বললেন, কিন্তু তুমি তো আবার ক্ষেমঙ্করী নামও দিয়েছিলে মেয়ের।
দিয়েছিলাম। সুলগ্নে জন্ম, মানুষের কল্যাণ করবে মনে করেই দেওয়া। কিন্তু দিদির মনোকষ্টের কথা ভেবে ওর নামটা আর ফেলতে পারলুম না।
বেশ করেছ, বেশ করেছ। সারদা, একই অঙ্গে মেয়ে আমার দুর্গা আবার সরস্বতী…এর থেকে ভাল আর…
গাছের মাথার ওপর থেকে ঘুম ভাঙা কোনও পাখির ডাকেই বুঝি সচকিত হলেন শ্যামাসুন্দরী। আর তখনই আকাশের দিকে মুখ তুলে দেখলেন। নক্ষত্রেরা অপসৃয়মাণ। ক্ষীণ আলোর আভায় শুকতারাও কিঞ্চিৎ নিষ্প্রভ। এখনও ভোরের হাওয়া বইছে। কিন্তু রাত্রি শেষ প্রহরে পৌঁছেছে। সূর্যোদয়ের আর খুব বেশি দেরি নেই।
সামান্য ব্যস্ত হয়ে শ্যামাসুন্দরী বললেন, ওগো আমি আর দেরি করতে পারব না। এরা সব উঠে পড়লেই জল সইতে যাবে, যা হোক দুটি আইবুড়ো ভাতও খাইয়ে দিতে হবে মেয়েকে। একটা ডুব দিয়ে আসি।
হ্যাঁ-হ্যাঁ তাই এসো। আমি বরং দেখি ছাদনাতলার জন্য দুটো কলাগাছের তোড় জোগাড় করতে পারি না কি।
খিড়কির কাছে এগিয়েও দাঁড়ালেন শ্যামাসুন্দরী। কর্তার দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমায় কি দুটো টিকে ধরিয়ে দিয়ে যাব? মাঠে যাবে।
না গো, অত তাড়া নেই। হুঁকোটা দাওয়ার পাশেই আবার রেখে দিয়ে বললেন, উনুন ধরানোর পরে দিলেই হবে। তুমি এসো।
একটা হেঁসো কিংবা কাটারি খুঁজতেই আবার ঘরে ঢুকলেন রামচন্দ্র। ঝুঝকো আঁধার ঘরের মধ্যে। মাটিতেই চাটাই পেতে এখনও ঘুমে আচ্ছন্ন তিন ছেলেমেয়ে, সারু-কাদু আর প্রসন্ন। এর পেটের কাছে ওর মাথা। সাবধানে পা ফেলে দেওয়াল হাতড়ে এগোলেন রামচন্দ্র। ডাঁই করা বাসন-কোসন, তার মধ্যে পুজোর জিনিসপত্র, কিছু কাপড়-চোপড়ও আছে তিনি জানেন। কাছাকাছি এসেই যেন সারুর মাথায় একবার হাত না ছুঁইয়ে পারলেন না। এপাশ ওপাশ করতে করতে ঠিক পেয়েও গেলেন। অভ্রান্ত হাতে ঠিক সারদার মাথাই স্পর্শ করলেন। মনে মনে বললেন, মা-রে, আমি তোকে ঠিকই চিনেছিলাম। তুই কে আমি জানি। জন্মজন্মান্তরের কপাল করে তোকে পেয়েছি। পা টিপে টিপে অন্ধকার ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলেন রামচন্দ্র।
মুহুর্মুহু উলুধ্বনি আর শাঁখের আওয়াজে আজ মুখুজ্যের গৃহ তো বটেই, পুরো জয়রামবাটি গ্রাম সচকিত হয়ে উঠছে। খবর হয়ে গেছে কাছাকাছি কোতুলপুর-কয়াপাট-বদনগঞ্জ-দেশড়া গ্রামেও। কামারপুকুর, জয়রামবাটি যথাক্রমে পাত্র আর পাত্রীর বাড়ি, মাত্র দু’-আড়াই মাইলের দূরত্ব, তা হলেও হুগলি আর বাঁকুড়া দুই জেলার অন্তর্বর্তী, মাঝখানে সীমানা চিহ্নিত করেছে আমোদর নদ। অমরপুরের মধ্যে দিয়ে পায়ে চলার পথে আজ দু’ গ্রামের মধ্যেও লোক চলাচল করছে। বিকেলবেলা বরানুগমনও ওই পথে।
মুখুজ্যে পরিবারের সংগতি সামান্যই অথচ তাঁদের অন্তর বড়। তাই নিমন্ত্রিত মানুষের সংখ্যাও কম না। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এক মিশ্র অনুভূতিতে রামচন্দ্রের উদ্বেগও আজ বর্ধমান। বৈশাখের শেষ হয়ে জ্যৈষ্ঠ মাস আসন্ন। সকাল ফুরিয়ে যাওয়ার পরেই রোদের তাপ আর ঝলকে গ্রাম পুড়ছে। ভোররাতের মিঠে হাওয়া সূর্যদেব চোখ মেলার পরেই অনুপস্থিত। তা হলেও খড়-ছাওয়া মাটির বাড়ি আর উঠোনের এধারে ওধারে বড় গাছগুলোর ছায়া ব্যস্ত মানুষগুলোকে রক্ষা করছে।
শ্যামাসুন্দরীর সঙ্গে একটু আলোচনা করতে পারলে মনে ভরসা পেতেন রামচন্দ্র। কিন্তু লৌকিক আচার, গায়েহলুদ, মেয়েকে স্নান করানো এই সব নিয়ে জা-ননদ-ভাজদের সঙ্গে তিনি অন্তঃপুরে ব্যস্ত। মনে মনে দেবী সিংহবাহিনীকে স্মরণ করে ওপর ওপর নিজেকে নির্লিপ্ত রাখার চেষ্টা করেন রামচন্দ্র। তাঁর নিজের সহোদর ঈশ্বরচন্দ্র-নীলমাধব আর শ্যালকবৃন্দ রামব্রহ্ম-রামতারক-কেদার-শ্রীপতি অবশ্য খোঁজখবর রাখছেন। আবার গাঁয়ের সদগোপ, চাষি পরিবারের মানুষজনও আসছে যাচ্ছে। কারুর হাতই খালি না। যে যেটুকু পারে ঝাঁকায় করে চাল-ডাল-সবজি, মায় ঘোষপাড়া থেকে দইয়ের ভাঁড় আর আহের পুকুর থেকে ধরা দুটো মৃগেল মাছও এসে রেখে গেল এক জেলে। হাটতলার মুদি আর দোকানদাররাও খবর পেয়েছে। দুপুরের আগেই সেখান থেকে এল তেল-নুন-মশলা আর কিছু কাপড়-চোপড়। আনন্দ কৃতজ্ঞতা উদ্বেগ মিলেমিশেই যেন বারবার চোখে জল আসছে রামচন্দ্রের। আবার সংকোচও বোধ করছেন জ্ঞাতিরা কেউ এসে পড়লে। চাপা দিতে কাঠের জ্বালের ধোঁয়াকেই যেন দায়ী করছেন। মুখে বলছেন, বোসো গো, বোসো। এক ছিলিম তামাক খেয়ে যাও।
সঙ্গ দিতে কেউ কেউ বসছেন। এক কথা থেকেই পাঁচ কথা। একটু একটু করে উদ্বেগ দূরীভূত হয় রামচন্দ্রের।
পূর্বদ্বারী ঘরের আঙিনাতেই উনুন বানানো হয়েছে। কাঠের জ্বালে রান্নাও বসে গেছে বড় বড় লোহা আর টিনের কড়াইতে। এমনিতেই কাঠফাটা গরম, তার ওপর আগুনের ভাপ উঠছে। কিছু করার নেই, তপ্ত হয়ে উঠেছে ঘর-বাগান আর উঠোনের চারিধার। তা হলেও বসতবাড়ির সামান্য তফাতে দোচালা ঘরটাতেই এয়োস্ত্রীরা আর অঘোরমণি সমেত কয়েকটি সঙ্গিনীসহ সারদা রয়েছে। পিছনে অন্দর, আর সামনে সদর। দক্ষিণে রান্নাঘর আর ঢেঁকিশালে আজ ব্যস্ততা নেই। তবে সদর, অন্দর দিয়েই কলুগেড়ে আর পুণ্যপুকুরে যাতায়াতের সুবিধে আছে। পুণ্যপুকুরটাই বেশি প্রয়োজনীয়। রান্নার জল, পানীয় জল দুটোই আসছে ওই পুকুর থেকে।
আজ অন্নভোগ নিষিদ্ধ রামচন্দ্রের। তিনি কন্যা সম্প্রদান করবেন। একবার ভেবেছিলেন, বরযাত্রী আর অতিথি আপ্যায়নে তিনি ব্যস্ত থাকবেন, সেই কারণে ভ্রাতা ঈশ্বরচন্দ্র কন্যা সম্প্রদানের দায়িত্ব পালন করবে। কিন্তু পরে সে ভাবনা পরিত্যাগ করলেন। ভায়েদের তিনি যথেষ্ট স্নেহ করলেও এবং তাঁরই ছত্রচ্ছায়ায় রাখলেও সম্ভবত কিছু রুচিগত বাধা ছিল। বোধহয় তাদের সামাজিক আচরণের ব্যাপারে রামচন্দ্র নিঃসংকোচ হতে পারছিলেন না। আজ শুভদিনে তাই তাঁর অকালপ্রয়াত পরের ভাই ত্রৈলোকের কথাও একবার মনে পড়ল। ত্রৈলোক্য শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত, উদারহৃদয় মানুষ ছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত বিবাহের অল্প কিছুদিন পরেই তিনি সন্তানহীন অবস্থাতে দেহত্যাগ করেন।
দুপুর গড়ানোর আগেই অন্তঃপুর থেকে ডাক পড়ল রামচন্দ্রর। শ্যামাসুন্দরী শতকাজে ব্যস্ত থাকলেও গৃহস্বামীর কথাটা মাথায় রেখেছিলেন। সে মানুষটার আবেগ-উদ্বেগের বিষয় একমাত্র তিনিই অনুধাবন করতে পারেন। সামান্য ফলমূল, একবাটি চিঁড়ে আর আখের গুড়সহ একটু টক দই, এই দিয়েই শ্যামাসুন্দরী তাঁর ক্ষুন্নিবৃত্তির ব্যবস্থা করেছেন। মধ্যাহ্নের প্রখর তাপে মাটির ঘরের দেওয়ালও উত্তপ্ত, খড় আর জংলা ঘাসে ছাওয়া চাল বেয়েও নামছে উত্তাপ। তার মধ্যেই ঠাঁই করে দিয়েছেন শ্যামাসুন্দরী, হাতপাখা নিয়ে বসেছেন পাশে।
ছোটখাটো কথার আদানপ্রদানের মধ্যেই রামচন্দ্র খেয়াল করলেন, বহুদিন পরে আজ অর্ধাঙ্গিনীর পরনে একটি পাটভাঙা তাঁতের শাড়ি। লাল পাড়। মণিবন্ধে নোয়া ছাড়াও দুটি নতুন শাঁখা, আর একমাত্র স্বর্ণালংকার বলতে ক্ষুদ্র একটি নাকছাবি। নিজের অভাবজর্জর অবস্থার কথা চিন্তা করে একটি দীর্ঘশ্বাস মোচন করলেন রামচন্দ্র। তা সত্ত্বেও কোথাও একটু সান্ত্বনার স্পর্শও অনুভব করলেন। আর কিছু না হোক, অন্তত অতিথি আর কুটুমবাড়ির নতুন আত্মীয়দের কথা মনে রেখে যেটুকু সম্ভব নিজেকে পরিপাটি করার চেষ্টা করেছেন আজ শ্যামাসুন্দরী।
ফলাহারের শেষ দিকেই ডুরে শাড়ি পরা একরত্তি মেয়েকে দেখে অবাক হয়ে গেলেন রামচন্দ্র। এই আমার মা সারু!
বোধহয় একটা দিনও পুরো নয়, তার মধ্যে পাঁচ বছর চার মাসের মেয়েটা এমন পালটে গেল! শাড়ি পরা চেহারায় সারদাকে এর আগেও দেখেছেন রামচন্দ্র। কিন্তু আজকে তার রূপ, বেশ আর যেন আকস্মিক অচঞ্চল ভাব দেখে বাক্যহারা হয়ে গেলেন তিনি। মেয়েটার ছোট্ট দেহলতায় জড়িয়ে রয়েছে লাল-হলুদ ডুরে শাড়ি। রুক্ষচুলগুলো আজ ভেজা আর তেল চুকচুকে সামনের দিকে। পিছনে বড়ির মতন একটা খোঁপা বাঁধা। কপালে চন্দনের ফোঁটা, ছোট ছোট দু’পায়ে আলতা, সরু সরু হাতে কয়েকগাছা ঢলঢলে কাচ আর পলার চুড়ি। একটা পুঁতির মালা গলায়। কেমন একটা শান্ত, লাজুক ভাব মেয়ের।
নিঃশব্দে কোথাও একটা ঝড় বয়ে গেল রামচন্দ্রের মনে; একইসঙ্গে যেন বুকের মধ্যে সূক্ষ্ম বেদনা অনুভব করলেন। মুহূর্তের জন্য দিশাহারাও। কন্যাকে পাত্রস্থ করার প্রাক্ অনুভূতি কি পিতার এমনই! এঘরে তো কাঠের জ্বালের ধোঁয়া নেই, তা হলে এই উদগত স্বতঃস্ফূর্ত অশ্রুর ঢল তিনি ঠেকাবেন কোন অছিলায়?
নাহ্, ঠেকাতে পারলেনও না। চেষ্টা করার আগেই রামচন্দ্রের দু’চোখ ভেসে গেল। পর মুহূর্তেই দু’হাত বাড়িয়ে কোলে টেনে নিলেন মেয়েকে। শুধু উচ্চারণ করতে পারলেন, মা-রে, আমার সারুমা, আয় কোলে আয়। অশ্রুতে-আনন্দে-আবেগে-বেদনায় আপন অস্তিত্বের পুতুল মানুষটাকে চুমোয় আদরে ভরিয়ে দিলেন।
তারপর এক সময় স্থির হলেন। অশ্রুসিক্ত চোখ অথচ সলাজ হাসির দীপ্তিতে ভরানো মুখ তুললেন। বললেন, হ্যাঁরে, মা সারু, এই একটা দিনের মধ্যে তুই এত বড় হয়ে গেলি?
ছোট কিংবা বড় হয়ে যাওয়া কোনও ব্যাপারেই সচেতন হওয়ার বোধ তৈরি হয়নি সারদার। বরং বাবার কোলের নিশ্চিন্ত আশ্রয় সে উপভোগ করছে। আরামে বসে দু’পা নাচাচ্ছে আর হাতের রঙিন চুড়ি দেখছে। সেই অবস্থাতেই বলল, বা রে, আজকে আমার বিয়ে না? কালকে শ্বশুরবাড়ি যাব তো!
বালিকার মনে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার অর্থ সম্ভবত কাছেপিঠে অন্য কোনও একটি বাড়িতে দু’-একদিন বেড়াতে যাওয়ার শামিল।
রামচন্দ্র বললেন, তারপর, শ্বশুরবাড়ি গিয়ে কী করবি!
মেয়ে বলল, কেন, কানামাছি আর এক্কাদোক্কা খেলব। জাম আর খেজুর কুড়োব।
শ্যামাসুন্দরী রামচন্দ্রের পাত তুলে নিতে নিতে বললেন, হ্যাঁ, তা আর নয়! সেই জন্যেই তোমায় বিয়ে দিয়ে শ্বশুরবাড়ি পাঠাচ্ছি না?
সারদা বলল, হ্যাঁ মা, মেজমামি বলেছে আমার শ্বশুরবাড়ির পোয়ানে অনেক খেজুর গাছ আছে। আর বাড়ির মধ্যে জাম আর বেলগাছ আছে। এখন গরমকাল তো… কুড়োব আর খাব।
স্নেহসিক্ত কণ্ঠে রামচন্দ্র বললেন, তার পর শাশুড়ি-ননদ-ভাশুররা যখন বকবে, কী করবি?
ইস্-স… আমার বরকে বলে দেব না! আমার বর কত বড় জান? একলা কলকাতা যেতে পারে। মন্দিরে পুজো করে।
তাই না কি! মেয়েকে কোলের মধ্যে আরও জড়িয়ে নিলেন রামচন্দ্র। বললেন, কিন্তু বর কলকাতা গেলে তুই কী করবি? বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে সহজ গলায় বালিকা বলে, বা-রে, আমি তো বাড়িতে চলে আসব। কাজ পড়ে থাকবে না? গোরুর জাবনা দিতে হবে, তুলো কাটতে হবে, ভাইকে দেখতে হবে, পুজো দিতে হবে, জল তুলতে হবে… মা একা সব পারে নাকি?
শ্যামাসুন্দরী যেন জনান্তিকে বললেন, এত টান আর দরদ নিয়ে কী করে যে তুই সংসার করবি মা…!
বাবার কোল ছেড়ে টুক করে উঠে পড়ল সারদা। কিন্তু ফিরে যাওয়ার আগে ছোট্ট একটা বাক্যেই প্রায় স্তম্ভিত করে দিল বাবা-মা-কে।
খেলাচ্ছলেই মেয়ের মুখ থেকে বেরিয়ে পড়ল, আমায় তো সবায়ের সংসারই দেখতে হবে। —ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সারদা।
কথাটার ঝঙ্কারে কয়েক মুহূর্ত যেন গুম হয়ে বসে রইলেন রামচন্দ্র আর শ্যামাসুন্দরী।
একটু পরে দিশেহারার মতো রামচন্দ্র বললেন, হ্যাঁগো সারুর মা, তোমার মেয়ে মাঝেমধ্যে এরকম কী সব কথা বলে গো?
আমায় কিছু জিগ্যেস কোরো না বাপু। বিপন্নের মতো শ্যামাসুন্দরী বললেন, এসব কথা কি ও-ই বলে, না কি ওর মুখ দিয়ে কেউ বলায়!
তাই হবে, তাই হবে। বলতে বলতে উঠে পড়লেন রামচন্দ্র।
স্মৃতির উদয় হতে পারে, তেমন কোনও প্রস্তুতি ছিল না। কিন্তু আবার উঠোনে গাছতলায় ফিরে আসতে আসতে মেয়ের জন্মের আগের স্মৃতিই রামচন্দ্রের ভাবনায় দখল নিল। কে দেখিয়েছিল সেই স্বপ্ন? কে ছিল লালচেলি পরা টুকটুকে সেই বালিকা! অবিকল সেই মেয়েটাই তো যেন একটু আগে বলে গেল, আমায় তো সবায়ের সংসারই দেখতে হবে! এ যে নেহাত ছোট মুখে বড় কথা, তা তো নয়! ওকথার ভাব আর ব্যঞ্জনা যে বড় গভীর। মেয়ে যেন ইঙ্গিতময় কোনও এক ভবিষ্যতের ইশারা করে গেল!
কে জানে, মন আজ সব ব্যাপারেই এত কাতর হয়ে রয়েছে বলে ভাবনার দোলাচলও বেশি। অথচ সারদাকে নিয়ে এমন ভাবনার শিকড় যে বহু গভীরে প্রোথিত বলে বারবার মনে হয়, অতটুকু মেয়ের ভাবনায়-কথায়-আচরণে কী করে এত দয়ামায়া প্রতিফলিত হয়! জন্ম থেকে অভাব-দারিদ্রেই তো মানুষ, তবু এতটুকু মালিন্য স্পর্শ করেনি ওকে। নিজের আর পরের বলে কিছু জানে না। একবার ভিখারিকে ভিক্ষে দেওয়ার জন্য পিতলের সরায় করে চাল দিয়ে পাঠিয়েছিলেন শ্যামাসুন্দরী। একটু পরে সারদা ফিরে আসার পরে দেখেন, চালের সঙ্গে সরাটাও ভিখারিকে দিয়ে এসেছে মেয়ে।
নানা কথাই আজ মনে পড়ে যাচ্ছে রামচন্দ্রের। হুঁকো হাতে নিয়ে আবার উঠোনে বেরিয়ে এলেন তিনি। উদাস ভাব হয়ে থাকলেও নিজের ভূমিকা সম্পর্কে তিনি সচেতন। শুধু যে মেয়ের বাবা তাই নয়, তিনি তো বাড়িরও মাথা। পাঁচ কাজের মধ্যে তাঁর উপস্থিতির আলাদা প্রয়োজনীয়তা আছে। পরামর্শ করার জন্য, উপদেশ দেওয়ার জন্য।
প্রখর তাপে ঝলসে যাচ্ছে গ্রীষ্মের দুপুর। একটু নিঝুম ভাব আপাতত। মানুষের সঙ্গে সঙ্গে পাখিপক্ষী, গবাদিপশুরাও যেখানে একটু ছায়ার আশ্রয় পেয়েছে, সেখানেই ঝিমোচ্ছ। হাওয়া নেই। নেহাত কাঠের জ্বালে রান্না চড়েছে, সেই লকলকে আগুনের শিখাই বাতাস টানছে, আর মাঝে মাঝে শুকনো, তপ্ত হাওয়ার ঝাপটা দিয়ে যাচ্ছে এবাড়ির সদরে অন্দরে। বসতবাটির দোচালার দিকটা ছেড়ে দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে বকুলগাছটার গোড়ার কাছে এসে বসলেন রামচন্দ্র। মাথার ওপর থেকে সূর্য একটু সরেছে, তাই ছায়া পড়েছে পুবে। জায়গাটা ভাল। একই জায়গা থেকে পুণ্যপুকুরের জল যেমন দেখা যায়, তেমনই উলটো দিকে সুন্দরনারায়ণের দেবালয় আর পাশে কালী-মাড়োও চোখে পড়ে। মাডোর (মণ্ডপ) পাঠশালা আপাতত ছুটি গরমের জন্য। সন্ধের পরে ওখানেই আজ তেলের বড় লম্ফ জ্বালিয়ে পাত পাড়ার ব্যবস্থা হয়েছে। রাস্তার দিকটাও চোখে পড়ে এখান থেকে। মোড়লপাড়ার লোকজন যাতায়াত করে ওদিক দিয়ে। উনুনের তাপ আর ধোঁয়াটাও একটু কম লাগে এখানে বসলে।
ছোট ভাই নীলমাধব আজ রান্না-বান্নার দায়িত্ব নিয়েছে। এই ভাইটির প্রতি কিঞ্চিৎ দুর্বলতা আছে রামচন্দ্রের। বেচারি অকৃতদার, যজমানি কিংবা পুরোহিতের কাজকর্ম করার মতন পঠন-পাঠনও নেই নীলমাধবের। বড়দাদার ছত্রচ্ছায়ায় মানুষ হতে হতে, একটু মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে সে নিজেই রাঁধুনি বামুনের কাজ করবে ঠিক করে নিয়েছিল। রামচন্দ্র আপত্তি করেননি। পুরুষমানুষের কিছু একটা জীবিকা না থাকলে পরে সে হীনম্মন্যতায় আক্রান্ত হয়।
বকুলগাছের গোড়ায় দাদাকে বসতে দেখে নীলমাধব নিজেই এগিয়ে এল। তার পরনে হাঁটু পর্যন্ত ধুতি, গলায় পৈতে। চাঁদির ওপর তাপের হলকা ঠেকাতে, কোমরের গামছাটা সে মাথায় বেঁধে নিয়েছে। রোদে পুড়ে তার গায়ের রং হয়েছে তামাটে, তা সত্ত্বেও নীলমাধবের চোখমুখ উজ্জ্বল।
রামচন্দ্রের কাছে এসেই বলল, হুঁকোটা দিন, টিকে ভরে আনি।
সামান্য হেসে রামচন্দ্র হুঁকোটা বাড়িয়ে দিলেন। ওইটিই দরকার ছিল। বললেন, দিবি? আচ্ছা নে তা হলে!
অল্প পরেই কল্কের ওপর ফুঁ দিতে দিতে হুঁকো এনে বাড়িয়ে দিল নীলমাধব। গরমের মধ্যেও ভুড়ুক-ভুড়ুক দুটো সুখটান দিয়ে রামচন্দ্র বললেন, হ্যাঁরে, ব্যবস্থাপত্র সব কেমন?
মাথা থেকে গামছা খুলতে খুলতে নীলমাধব বলল, সেই কথা বলার জন্যই তো আপনাকে খুঁজছিলাম। কী বলব বড়দা, এই শুকোরুখের দিনেও যে এমন আয়োজন হয়ে যাবে, তা ভাবিনি।
রামচন্দ্র বললেন, আয়োজন তো নিজে থেকে তেমন কিছু করতে পারিনি। ক্ষমতাই বা কোথায়!
ওসব আর মাথায় রাখবেন না বড়দা। সকালবেলা কড়াইয়ের ডালে মৌরি আর শুকনো লঙ্কার ফোড়ন দেব বলে তেল চাপিয়ে ভাবছিলাম, পুঁইশাকের ছ্যাঁচড়াটা করতে পারব তো! কিন্তু এখন একবার হেঁশেলে এসে দেখে যান…
দুটি শাকভাত তা হলে লোকে মুখে দিয়ে যেতে পারবে বলছিস?
শুধু শাকভাত কেন বড়দা?
আরও কিছু হচ্ছে না কি?
তা নয়তো আর বলছি কী? পুঁইশাকের ঘ্যাঁট কলাইয়ের ডাল আর এক খোলা ভাত তো নামিয়েছি কখন। এদিকে ঘোষ-মণ্ডল-সামুই-বিশ্বাসদের বাড়ি থেকে মাল যে এসেই চলেছে।
এ যে বড় আনন্দের কথা রে। গাঁয়ের সব গরিবগুরবো মানুষ…
সবই সারুর কপাল বড়দা। আর আপনারও সৌভাগ্য।
ভোররাত থেকে সেই কথাই ভাবছি। গরিব বামুন আমরা, তা হলেও গাঁয়ের লোকেরা যা হোক মান্যিগণ্যি করে। মেয়ের বিয়ের দিন সবাই যাতে দু’মুঠো খেয়ে যেতে পারে, সেই কথাই ঠাকুরকে বলছি।
ও নিয়ে আপনি আর ভাববেন না বড়দা। ঠাকুর আপনার কথা শুনেছেন।
তা পদ কি আরও কিছু করবি ভাবছিস?
আপনার কাছ থেকে সেই অনুমতি পাওয়ার অপেক্ষাতেই তো রয়েছি। তাই বলছিলাম, যদি একবার হেঁশেলে আসেন…
আমি আর ওসব কতটা বুঝি বল…।
কথাটা বলতে বলতেই হুঁকোয় একটা টান দিয়ে আবার উঠলেন রামচন্দ্র। দোচালা ঘরের পাশ দিয়ে ধানের মরাই আর ঢেঁকিশাল ফেলে উঠোনের কোণে এগোলেন। পুরনো বটগাছের কয়েকটা ঝুরি-টুরি কেটে, দুটো বাঁশ পুঁতে আর গাছের ডালপালা লাগিয়ে ওখানেই রান্নার আয়োজন করেছে নীলমাধব। উনুন বানিয়েছে মাটিতে গর্ত খুঁড়ে। দু’-তিনটে ছেলেকেও জোগাড় করেছে ওকে সাহায্য করার জন্য। গাছের ছায়াতে তারাই সামাল দিচ্ছে জিনিসপত্র। রামচন্দ্রকে ওদিকে যেতে দেখে কেদার, শ্রীপতিও এগিয়ে গেল।
জিনিসপত্রের বহর দেখে কিছুটা তাজ্জবই হলেন রাম। আনাজ তরকারি, চালডাল, তেলমশলা সবই তো রয়েছে এখনও। কৃতজ্ঞতায়, আনন্দে চোখমুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠল তাঁর। ভাইকে বললেন, হ্যাঁরে, এ যে অন্নপূর্ণার ভাঁড়ার হয়ে রয়েছে।
কেদার বলল, দাদাবাবু, সারুর জন্মের আগে এগাঁয়ে তো এমন ব্যবস্থা আর দেখিনি। এখন মনে হচ্ছে এসবই যেন মা জগদম্বার কৃপা।
রামচন্দ্র যেন কিছুটা আনমনা হয়ে বললেন, বলছ? তা হলে তাই হবে। সবই তাঁর ইচ্ছা।
নীলমাধব বলল, বড়দা, খেসারির ডাল আর কুমড়ো-বেগুন-ডাঁটা দিয়ে একপ্রস্ত চচ্চড়ি আমি বানাচ্ছি। ওদিকে কোতুলপুরের ব্যাপারীরা খানিকটা পোস্ত-গুড়, তেলমশলাও পাঠিয়েছে…
রামচন্দ্র একটু দিশেহারার মতো বললেন, আমায় আর কিছু জিগ্যেস করিস না। রাঁধুনি বামুন তো তুইই, বিয়েও তোর ভাইঝির। যা ভাল বুঝিস কর। ভগবান যখন মুখ তুলে তাকিয়েছেন, তার পর আমি আর বলার কে?
নীলমাধব তার পরেও কিছুটা অনুমতি আদায় করার মতন বলল, তা হলে আমি বলি কী বড়দা, আলু আর ঝিঙে দিয়ে এক গামলা পোস্ত করে ফেলি। আর শুকনো কুলগুলোর সঙ্গে আমড়া দিয়ে একটা অম্বলও করি। কুটুমবাড়ির লোকজনও তো আছেন…।
খুব ভাল হবে, তাই কর, তাই কর—বলতে বলতে নিবে যাওয়া হুঁকোটাতেই টান দিতে দিতে ফিরে চললেন রামচন্দ্র। ঘরের পাশ দিয়ে সদরের দিকে আসতে আসতে শ্যালককে বললেন, শ্রীপতিভায়া, সারুর মাকে একবার বলে দিয়ো, সময় পেলে যেন একবার এদিকে ঘুরে যান…ভক্ত ভগবানের সংসার তো তাঁরই কথা, আয়োজনটা যেন স্বচক্ষে একটু দেখে যান।
বকুলগাছ তলায় ফিরে আসতে আসতেই দেখলেন কলুগেড়ের পশ্চিমপাড় দিয়ে জল নিয়ে ফিরছে রাধানাথ ঘোষ। পাশের পাড়ারই বাসিন্দা। খুশির মুখে দুটো কথা বলার ইচ্ছেতেই হাঁক দিলেন রামচন্দ্র।
ঘোষমশাই, জলটা রেখে এক ছিলিম তামাক খেয়ে যাবেন না কি? আসুন তা হলে ধরাই।
ডাক শুনে খুশিই হল ঘোষের পো। রামচন্দ্র বামুন মানুষ, তার ওপর বাড়িতে কাজ, লোকজনের আনাগোনা চলছে। একটু শামিল হতে পারলে খুশি হওয়ারই কথা। পুকুরপাড়েই জলের টিন নামিয়ে রেখে বললেন, তা মন্দ কী, একটু আপনার প্রসাদ পেয়েই যাই।
নতুন করে টিকে জ্বালিয়ে হুঁকো ধরালেন রামচন্দ্র। দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে, তা সত্ত্বেও শুকনো রোদে আগুনের হলকা বইছে। ঘোষের দিকে হুঁকো বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, আসুন, বসুন ওই ছায়ার দিকটা। নিন।
খোলাটা হাতে নিতে নিতে ঘোষ বলল, বাড়িতে আপনার কাজের দিন, এদিকে গরমটা কী পড়েছে বলুন দেখি।
রাম বললেন, তা আর কী করা যাবে বলুন! প্রকৃতির দায়িত্ব মানুষের থেকে অনেক বেশি যে। ধরিত্রীকে তিনি শীতল করার জন্যই তপ্ত করেন, আবার তপ্ত করবেন বলেই শীতল করেন। এই তার নিয়ম।
সে তো একশো বার। রাধানাথ হুঁকো টেনে বললেন, তবে ওই…কাজকর্ম পড়ে গেলেই দম ছুটে যাওয়ার অবস্থা।
উপায় কী, রামচন্দ্র বললেন, যার যখন কাজ, তার মধ্যেই সারতে হবে তো।
তা বটে। ব্যবস্থাপত্র সব ঠিক আছে তো!
আপনাদের আশীর্বাদে মনে তো হচ্ছে এ-যাত্রা উদ্ধার পেয়ে যাব?
আমাদের কথা বলবেন না কর্তামশাই। আপনি গাঁয়ের সাত্ত্বিক ব্রাহ্মণ, স্বয়ং ঠাকুরই আপনাকে দেখবেন। তা গন্ধ-টন্ধ যেরকম বেরুচ্ছে, আয়োজন তো ভালই মনে হচ্ছে।
ভালমন্দ আপনারা বলবেন। মেয়ের কপালে যা লেখা আছে তাই হবে।
সারু আমাদের গাঁয়ের লক্ষ্মী কর্তামশাই। কী বলব বলুন, এখনও আমাদের ঘরে কথা হয়, ও মেয়ে যে-সে নয়। আজ থেকে পাঁচশত বছর আগে জয়রামবাটি কি এমন ছিল? এই বোশেখে-জ্যোষ্ঠিতে পুকুর ডোবা সব শুকিয়ে খাঁ খাঁ করত। তারপর আপনার মেয়ে হল, আপনার আর গিন্নিমার স্বপ্নের কথাও লোকে জানল। আর এখন তো সকলেরই প্রত্যয় হয়েছে…
কী জানি ঘোষমশাই, রামচন্দ্র কিছুটা উদাস স্বরে বললেন, মাঝে মাঝে ও মেয়ের একটা আধটা কথায় আমরাই কেমন চমকে উঠি…মনে হয়, যেন সারু নয়, আর কেউ যেন ওর মুখ দিয়ে ভরসা আর ভালবাসার কথা বলিয়ে নিচ্ছে।
এ শুধু আপনার নয় কর্তামশাই, আমাদেরও কপাল সারুমা জয়রামবাটিতে ভূমিষ্ট হয়েছে।
ভোররাত থেকেই বুঝলেন, কেমন একটা আড়ষ্ট হয়ে ছিলাম ভাবনাচিন্তায়…কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা আমি…
না-না-না ওকথা মুখেও আনবেন না কর্তামশাই। সারুমা-র জন্য দায় নেই আপনার।
ঠিকই বলেছেন বোধহয়। বেলা বাড়তে বাড়তেই মনে হচ্ছে অলক্ষ্য থেকে কে যেন আজ নজর রাখছে এ ঘর-বারান্দার ওপর। আমার ক্ষমতা কতটুকু আপনাদের তা অজানা নয়। অথচ একটু আগে হেঁশেল দেখে এসে আমিই তো তাজ্জব একেবারে! হুঁকো ফেরত দিয়ে ঘোষ উঠতে উঠতে বলল, তবেই বুঝুন। ও মেয়ে যে মা লক্ষ্মী, এ কি আর এমনি মনে হয় লোকের? রাধানাথের হাত ধরে রামচন্দ্র বললেন, ঘোষমশাই, গাঁয়ের যাঁর সঙ্গে দেখা হবে, দয়া করে বলবেন, আজ যেন কারুর পায়ের ধুলো থেকে আমাকে বঞ্চিত না করেন। কথা দিন, বলবেন। সবায়ের কাছে আমি তো যেতে পারিনি।
অবশ্যই বলব কর্তামশাই। ঘোষ বললেন, খবর এমনিতেই হয়ে গেছে। তারপর রোদ একটু পড়তে দিন না, দেখবেন…।
গ্রীষ্মের বেলা বড়। উঠোনে বাগানে ঘুরে আর পাড়ার লোকের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে বলতে তাও পড়ে এল এক সময়। সন্ধ্যার শেষে রাত্রির প্রথম প্রহরেই লগ্ন। এখনও তার দেরি আছে। তা হলেও অন্দর-বাড়ির ভিতর থেকে মাঝেমধ্যে শাঁখের আওয়াজ আর হুলুধ্বনিতে কেমন একটা চাপা অস্থিরতা অনুভব করেন রামচন্দ্র। কালীমণ্ডপের পাশ দিয়ে একটু এগিয়ে যান গ্রাম্যপথের ধারে। একটু জলশৌচ করে নেওয়ার দরকার। পায়ে পায়ে বাঁড়ুয্যে পুকুরের দিকেই এগোন।
গেরুয়া সূর্যের আলোয় গাছের ছায়ারা লম্বা হয়েছে। পথে বেরিয়েই দেখলেন রাখাল ছেলেটা বাড়ির গোরু দুটিকে চরিয়ে নিয়ে ফিরে আসছে। অবলা গৃহপালিত জীব, তা সত্ত্বেও রামচন্দ্রকে দেখে দুটিতেই হাম্বা ডাক ছেড়ে পরিচিতি জানাল। গায়ে হাত বুলিয়ে দিলেন রামচন্দ্র। আর তখনই মনে পড়ল, আজ ওদের কুঁড়ো-জাবনা দেবে কে! সবাই তো মশগুল অন্দর-বাড়িতে।
রাখাল ছেলেটাকেই বলে দিলেন রামচন্দ্র।
শোন বাবা কালিদাস, গোয়ালের খুঁটোয় বেঁধে ওদের আজ জাবনাটাও দিয়ে যাস বাপ। কার মনে পড়বে, কি পড়বে না—
আচ্ছা কর্তামশাই, দিয়ে যাব।
আর সন্ধেবেলা পাঠশালার মাড়োতে চলে আসিস ভাইবোনদের নিয়ে… ব্যবস্থাপত্র হয়েছে জানিস তো!
রোদে পোড়া ছেলেটা দাঁত বার করে হাসল। —হঁ জানি। মা ঠাকরুন সকালবেলাতেই বলে দিয়েছেন।
বাঁড়ুয্যে পুকুরের জল শুকিয়ে নেমে গেছে। এখন তালগাছের ছায়া পড়েছে তার ওপর। চারপাশে গাছ বলেই জলটা তবু ঠান্ডা। হুটোপাটি করতে নেমেছে কয়েকটা ছোট ছোট ছেলেমেয়ে। হাঁটুর ওপর পর্যন্ত ধুতি গুটিয়ে নামলেন রামচন্দ্র। গায়ে, মাথায় বুকে পিঠে আঁজলা ভরে জল ছিটোলেন। তার পর পৈতে গলায় জড়িয়ে উঠে এলেন।
উঠোনের হাতায় পৌঁছতেই কেদার এসে বলল, দাদাবাবু একবার অন্দরে যান, দিদি ডাকছে।
দোচালার দাওয়ার কাছেই শ্যামাসুন্দরী অপেক্ষা করছিলেন। হাতে তুষ কাপড়ের তৈরি নতুন ফতুয়া। কর্তাকে দেখে এগিয়ে এসে বললেন, ওগো আর দেরি কোরো না। জামাটা গায়ে দিয়ে একটু টেরি কেটে নাও।
ঝিরঝিরে হাওয়া ছেড়েছে একটু। ফতুয়া হাতে নিয়ে রামচন্দ্র বললেন, এ যে নতুন জামা, এসবের আবার কী দরকার ছিল!
শ্যামাসুন্দরী বললেন, তা বললে হয়, মেয়ের বাপ বলে কথা। পছন্দ তো?
একগাল হেসে রামচন্দ্র বললেন, খুব। কে দিল?
কে আবার? ঠাকুরপোকে দিয়ে বদনগঞ্জের হাটতলা থেকে আনিয়েছি।
পাট ভাঙতে ভাঙতে রামচন্দ্র বললেন, কত খরচা পড়ে গেল আবার!
তাতে কী? শ্যামাসুন্দরী চলে যেতে গিয়েও একটু কাছে সরে এসে বললেন, হ্যাঁ গো, তিনশো টাকা কন্যাপণের একটুও কি মেয়ের বাপের ভোগে লাগতে পারে না! অত কিন্তু কোরো না। এবার তৈরি হয়ে নাও।
রামচন্দ্র পিছন থেকে বললেন, হ্যাঁ গো, সারুমা-কে সাজিয়েছ ভাল করে?
চলে যাওয়ার আগে সামান্য হেসে শ্যামাসুন্দরী বললেন, সব হচ্ছে।
আমি কি একবার যাব দেখতে?
আর তো বেশি দেরি নেই। একেবারে ছাদনাতলাতেই দেখো।
শ্যামাসুন্দরী চলে যাওয়ার পরেও কিছুক্ষণ দাওয়ার সামনের উঠোনে দাঁড়িয়ে রইলেন রামচন্দ্র। আকাশের হলুদ ভাব কেটে গিয়ে আঁধার নামার তোড়জোড় চলছে। শিমুলগাছের পাতা গজিয়েছে দেরিতে। হাওয়ায় দুলছে চিকন কিশলয়। পাখিরা ডাকাডাকি সেরে নিয়ে কুলায় ফিরছে। রামচন্দ্রের চোখে পড়ল পুব আকাশের কোণে জ্বলজ্বলে শুকতারা।
সদর পার হয়ে ব্যস্তসমস্ত ঈশ্বরচন্দ্র এসে সেই সময় জানাল, দাদা, বরের পালকি আমোদর পেরিয়ে এসেছে। বরযাত্রীরাও বেশি দুরে নেই। আমি যাই ভেতরে খবর দিই গে।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভেঁপু আর বাঁশির কাঁপা কাঁপা শব্দ ভেসে এল আবছা আঁধার আর বাতাস বয়ে রামচন্দ্রের কানে। হুতোশে-আনন্দে-আবেগে-উত্তেজনায় কেমন দিশেহারা বোধ করলেন তিনি৷ তড়িঘড়ি নিজেও ছুটলেন দোচালার অন্দরে।
