৫
গরমের দেশে শীতের সুখী দিনগুলোর আয়ু বড় কম। মাত্র কিছুদিন ভোরবেলা কাঁথার নীচে ওম কিংবা দুপুরে উষ্ণ মোলায়েম রোদে পিঠ দিয়ে বসার সময় ফুরিয়ে যায় তাড়াতাড়ি। তার পরেই হাওয়া এলোমেলো হতে শুরু করে। দিক পালটায়। উত্তর থেকে পুব-দক্ষিণে ঘুরতে শুরু করে। দিন বড় হয়। খাল, বিল শুকোতে শুরু করে, পুকুরে তল নেমে যাওয়া জলের দাগ শীত শেষ হয়ে আসার আভাস দেয়। ভিজে মাটি শুকোয়, ফাটলের রেখা ফুটে ওঠে। খেতের সবজি মরকুটে চেহারা হয়।
সারদার মনে মনে একটা হুতোশ হয়, আবার সেই কাঠফাটা গরমের দিনগুলো আসছে! আশঙ্কা হয় দুর্ভিক্ষের দিনগুলোর কথা স্মরণ করেও। কে জানে এ বছর আবার কোন চেহারায় গ্রীষ্মকাল আসবে। গরম তো চিরকালই আছে, তা নিয়ে দেশের মানুষের চিন্তা করেও লাভ নেই। কিন্তু খরা আর দুর্ভিক্ষর সেই ছবি মনে পড়লেই বুক শুকিয়ে যায়। গ্রামের পর গ্রাম শুকনো ধু-ধু হাওয়ায় পুড়ছে সকাল থেকে, রাক্ষসের চোখের মতন ঘোলাটে আকাশ, বাতাসে আগুনের হলকা। ঠোঁট ফাঁক করা পাখি মরে পড়ে আছে মাটিতে। লাইন দিয়ে কঙ্কালসার মানুষ পুঁটলি আর মাদুর বগলদাবা করে চলেছে শহরের দিকে।
বিগত দু’-তিনটে বছর অবশ্য তেমন খারাপ অবস্থা হয়নি। অন্তত মাঝেমাঝে কালবৈশাখী হয়েছে। পুড়তে পুড়তেও হঠাৎ মানুষ এক ঝলক ঠান্ডা হাওয়া আর বৃষ্টির জলে জুড়িয়েছে। কাদাজলে গা ডুবোতে পেরেছে গোরু-মোয। ঘোর বিপদ আর বুভুক্ষায় পড়ে বোধহয় একটু টনক নড়েছে মানুষের। গোলা আর মরাইয়ে ইদানীং কিছু ধান-গম জমিয়ে রাখতে চেষ্টা করে কেউ কেউ।
সবই আগাম ভাবনা সারদার। খুব একটা কিছু তার করার নেই, তবু অসহায় আর উপোসি মানুষের কষ্ট দেখলে ভেতরে ভেতরে কেমন একটা যন্ত্রণা হয়। মনে মনে ভগবানকে ডাকে, জীব তো তোমারই সৃষ্টি ঠাকুর, তাকে রক্ষা করো। এসব কথা বলার সময় আজকাল যেন নিজের মধ্যে কী একটা হয় সারদার। কাকে বলছে, কেন বলছে এরকম ভাবনাও মনে আসে। ভগবানের একটা ছবি আঁকা হয়ে থাকে সব মানুষের মনে। সেটা এক একজনের কাছে এক একরকম। কোনওটা তার নিজস্ব, মনগড়া। আবার কোনওটা হয়তো জন্ম থেকে দেখে আসা কোনও ঠাকুরের ছবি কিংবা দেবদেবীর মূর্তি বা প্রতিমার সঙ্গে মিলে যায়।
সারদারও তাই হত। পরিবর্তনটা সে টের পায় গেলবার কামারপুকুর থেকে ঘুরে আসবার পরে। জয়রামবাটির ঘরে শিব-বিষ্ণু-জগদ্ধাত্রী-কালী-দুর্গা-রাম-সীতা—সব ঠাকুরই আছেন। ওখানেও ছিল। শালগ্রাম শিলার আধারে ছিলেন গৃহদেবতা রঘুবীরও। কিন্তু সবাইয়ের কাছে গল্প-কথা-কাহিনি-ঘটনা শুনতে শুনতে, কেমন ভাবে কে জানে, সব ঠাকুরের মধ্যে যেন ‘তাঁর’ চেহারাটাই অস্পষ্ট ভেসে উঠত ওর চোখের সামনে। অস্পষ্টই, কেন না, তাঁকে তো শেষ দেখেছে কত বছর আগে। একটা ঝাপসা আদল গাঁথা আছে তার মনে। সে নিজেই বা কতটুকু ছিল তখন! এখন দেখলে না হয় আর সে-ছবি হালকা হবে না। চোখ যে তারও ফুটেছে। সাত বছরের চোখ আর তেরো-চোদ্দো বছরের দৃষ্টির মধ্যে ফারাক অনেক। কিন্তু দেখা তো হয়নি, অথচ প্রসন্নময়ী, ধনীবুড়িই হোক কিংবা গয়াবিষ্ণু বা শ্রীনিবাস অথবা পাইনদের কারওর মুখ থেকেই হোক, ওঁর গল্প কথা শুনতে শুনতে… হয় মানুষের, একটা ছবি, এমনকী তা যদি কাল্পনিকও হয়, সেটা জুড়ে যায় গল্পকাহিনির সঙ্গে। সারদার ক্ষেত্রে তাঁর চেহারাটা পুরো কল্পনার নয়। কিন্তু ঠাকুর, ভগবানের সঙ্গে কী করে যেন ওঁর সেই অস্পষ্ট চেহারা, মুখটাই মিলে যায় ওর মনে। দেবদেবী-ঈশ্বর-ভগবান এই সব নিয়েই তাঁর অন্বেষণ আর সাধনা বলেই কি সারদার মন আর কল্পনার তলায় তলায় সেই মানুষটা ছবি হয়ে থাকেন!
খুব বেশি আর ভাবতে পারে না সারদা। একটু গুলিয়ে যায়, ভাবে, কেন অমন হয়! কিন্তু এটুকু বোঝায় কোনও ভুল নেই, ঠাকুরের কাছে গড় হওয়ার মুহূর্তে, তার চোখ বন্ধ করা অনুভবের দৃষ্টিতেও ওই মানুষটাকেই সে দেখে। দেবদেবী নির্বিশেষে তাঁকেই দেখে। একটু হাসিও পায় সারদার। অল্প দেখা আর শুনতে শুনতেই এত? সামনে এসে দাঁড়ালে তা হলে, কী হবে!
হাসির বদলে তখন লজ্জা পায় সারদা।
কিন্তু এসবই তো তার একলা মনের গোপন ভাবনা। নিজের কাছে, নিজের জন্য আবার লজ্জা কীসের!
সেকথা আর কে বলে! তবু হয়। কেন, কে জানে!
শ্রদ্ধা-ভক্তি-ভালবাসার অনুভবের সঙ্গেই, বর বলেই বোধহয়, একটু লজ্জার অনুভব ইদানীং হয়েছে তার। আবার এও ভাবে, লজ্জা পাওয়ার অর্থ কি নিজেকে একটু খাটো করে দেখা?
কক্ষনও তা নয়। যে ভালবাসে, সে কি কখনও খাটো হয়?
মনে মনে নিজের সঙ্গেই এমন কত কথা হয় আজকাল সারদার! জয়রামবাটিতে ফিরে এলেই রাজ্যের কাজ যেন অপেক্ষা করে বসে থাকে তার জন্য। ঘুম থেকে উঠে গোরুর জাবনা দেওয়া থেকে শুরু। তারপরেই একের পর এক আসে—উঠোন ঝাঁট দেওয়া, বারান্দা নিকোনো, কোনও দিন ঘুঁটে দেওয়া, জল তোলা, কাপড় কাচা। রান্না-বান্না, কুটনো কাটাতে মাকে সাহায্য করতে হয়। বাসন ধোওয়া, উনুন ধরানো, আটা চালা, মুড়ির চাল ভেজানো— কাজের কি আর শেষ আছে! একটু বেলা বাড়তেই আবার ক্ষেতের মুনিষদের জন্য জল-খাবার নিয়ে যেতে হয়, ভাইদের নিয়ে চান করাতে হয়, ফেরার পথে গোছ বেঁধে লম্বা ঘাস কেটে আনতে হয় গোরুর জন্য। পুজোপাট, ঠাকুরকে জল দেওয়াও আছে। খাওয়া-দাওয়ার পরে সামান্য একটু বিশ্রামের পরেই আবার তুলোর পুঁটলি নিয়ে বসতে হয়, সুতো কেটে পৈতে তৈরি করতে হবে। রামচন্দ্র কিংবা নীলমাধব সেগুলো আবার বদনগঞ্জের হাটে বিক্রি করতে পাঠান। সংসারের জন্য সামান্য কিছু উপার্জন হয় তাই থেকে। শ্যামাসুন্দরী অবশ্য সেই সময়টা হাত লাগান মেয়ের সঙ্গে। টুকটাক কথাবার্তা হয় তখন।
বিকেলবেলা গা ধোওয়ার পরেও যে নিরবচ্ছিন্ন অবসর তা নয়। কাচা জামাকাপড় তুলতে হয়, গোরু দুইতে হয়। তুলসীতলায় পিদিম জ্বালান, শনি-মঙ্গলবারে হরির লুঠ, বেস্পতিবারে লক্ষ্মীপুজো আছে। আর নিত্যদিনের কাজ হচ্ছে ভাইয়েরা পড়তে বসলে পাহারা দেওয়া। বড়দা আর অভয় এখনও ছোট, পড়াশুনা না থাকলে ওদের দেখতে হয়, ঘুমোনোর আগে খাইয়ে দিতে হয়। আর একটু রাত্তির হলে সারদা নিজেই কি আর জেগে বসে থাকতে পারে! ঘুমে চোখ জুড়ে আসে তারও।
তা হলেও বিকেলের দিকটাই যা একটু ফুরসত পাওয়া যায়। শীত কমে যাওয়ার পরে এখন বেলা বড় হয়েছে। ক’দিন আগেও বিকেলটা দেখতে-না দেখতেই ফুরিয়ে যেত, তার পরেই কনকনানি মিশে যেত উত্তুরের হাওয়ায়। ঘরবন্দি হয়ে থাকতে হত। ইদানীং বিকেলটা যে শুধু বড় হয়েছে, তাই নয়। সুন্দরও হয়েছে। উত্তরের ঠান্ডা হাওয়া কমে গেছে, শীতও যাই যাই করছে। ভোরের দিক ছাড়া, সত্যি বলতে কী, আর ঠান্ডা তো লাগেই না, বরং দুপুরের রোদ তেতে ওঠে। শুধু হাওয়াটাই শুকনো এখনও, দিনের বেলা চামড়ায় টান ধরে, খড়িফোটা ভাব হয়। আবার সেই হাওয়াটাই বিকেল পড়ে আসার সময় বেশ মিঠে লাগে। পশ্চিম আকাশে লাল আবির মাখিয়ে সূর্যদেব যখন অস্ত যান, গেরুয়া আলো ছড়িয়ে পড়ে চরাচরে, মিঠে হাওয়া বইতে শুরু করে তখনই।
নিজের মনের মতো, পড়ন্ত বিকেলের হাওয়াটাকেও ইদানীং কেন যে উদাস মনে হয় সারদার কে জানে! আগে এসব মনে আসত না। এখন সে খেয়াল করে ন্যাড়া গাছগুলোয় কচিপাতা গজাচ্ছে, শিমুল আর বকুল গাছগুলো ফুলে ভরতি। একটা পাঁচমিশেলি গন্ধ যেন সন্ধের মুখ থেকেই ঝিরঝিরে হাওয়ায় ভেসে বেড়ায়। সঙ্গে সঙ্গে ভেসে যায় তার মনটাও। বেশ ভালই লাগে, অথচ ভাললাগার মধ্যেই যেন কী একটা নেই-নেই মনে হয়। ঠিক ধরতে পারে না, কাউকে জিগ্যেস করতেও পারে না। কেমন যেন সংকোচ হয়।
ভাবনাগুলো সব মনের মধ্যে জমিয়ে রাখে সারদা। মা শ্যামাসুন্দরী যে মুখে কিছু জিগ্যেস না করলেও, ঠারেঠোরে মেয়েকে খেয়াল করেন, সেটাও সারদা বোঝে। কিন্তু নিজে থেকে কিছু বলে না। আর শ্যামাসুন্দরীরও যেন বড় মেয়েকে ভালবাসার সঙ্গেই কোথাও একটা ভয় আর ভক্তি মিশে থাকে। হয়তো স্নেহের দুর্বলতা থেকেই তার উৎপতি। তবু নিজে থেকে মেয়ের মন আর ভাবনা নিয়ে কথা তোলেন না। কৌতূহল যে তাঁর আছে, সেটা সারদাও এখন বোঝে। কিন্তু শ্যামাসুন্দরী মেয়ের শ্বশুরবাড়ি, পাড়া-প্রতিবেশী, ঘরদোর এসব ছাড়া অন্য কিছু জিগ্যেস করেন না। মেয়ে যে তাঁর অন্য পাঁচটা এই বয়েসের মেয়ে থেকে আলাদা ধরনের, সেটা তিনিই সব থেকে ভাল জানেন। জন্মের আগে থাকতেই জেনে এসেছেন।
বিকেলবেলা দাওয়ার সিঁড়িতে বসে সারদার চুল বেঁধে দিতে দিতে মেয়ের বয়সের কথাটা একবার মনে আসে শ্যামাসুন্দরীর। শ্বশুরবাড়ি থেকে এবার ফেরার কয়েকদিন পরেই সারদাকে পায়েস করে খাইয়েছিলেন শ্যামাসুন্দরী। একমাত্র তিনিই বোধহয় মনে করে রেখেছিলেন মেয়ের জন্মদিনের ব্যাপারটা। চোদ্দো বছর বয়েসটা তখনই হিসেব করেছিলেন। আজও একবার মনে পড়ল।
সিঁড়ির এক ধাপ নীচে দুই হাঁটু জড়ো করে বসেছে সারদা। পিছনে উঁচুতে শ্যামাসুন্দরী। ত্রিশ ছুঁইছুঁই বয়স শ্যামাসুন্দরীর। এর মধ্যে প্রৌঢ়া মহিলার মতো একটু ভার আর ঢিলেঢালা তাঁর চেহারা। লালপাড় পুরনো তাঁতের শাড়ি তাঁর পরনে, গায়ে জামা নেই। সারদারও পরনে ডুরে সাদা হলুদ শাড়ি, কাঁধ ঢেকে পিঠের ওপর দিয়ে ঘোরানো। প্রসন্ন-উমেশ আর কাশী কাছেপিঠে কোথাও খেলাধুলো করছে। সূর্য ডুবলেই ওরা ঘরে ফিরে আসবে। বিকেলের আলোয় এখনও বেশ উষ্ণভাব।
চিরুনি দিয়ে সারদার চুলের জট ছাড়াতে ছাড়াতে শ্যামাসুন্দরী বললেন, মা সারু, মাথায় তোর এত চুল, কাপড় কাচার সময় একদিন সাবান ঘষে নিতে পারিস না?
হাঁটুর ওপর দু’হাতের পাতা আর থুতনি রেখে চুপচাপ বসে রইল সারদা। উত্তর দিল না।
চিরুনি টানতে টানতে শ্যামা আবার বললেন, এর পরে যে জটা হয়ে যাবে তোর মাথায়।
সারদা আস্তে আস্তে একটু পরে বলল, হোক না। আমি তা হলে সন্ন্যাসিনী হয়ে যাব।
শ্যামাসুন্দরী প্রায় শিউরে উঠে বললেন, মা গো, এসব কী সব্বোনেশে কথা তুই বলিস! কে শেখাল তোকে?
সারদার কোনও হেলদোল নেই। একইরকম ভাবে বলে, কেন মা?
ওরকম বলতে নেই। শ্যামাসুন্দরী থামিয়ে দিতে চাইলেন মেয়েকে।
তা সত্ত্বেও সারদা প্রশ্ন করে, সন্ন্যাসিনী হওয়া খুব কঠিন, তাই না মা?
কঠিন হোক, যা-ই হোক, তুমি ওসব ভেবো না মা।
ভাবলে কী হয়?
ওরে বাপু, আমরা হলাম গৃহী-সংসারী সাধারণ মানুষ। সাধু-সন্ন্যাসী হওয়া-টওয়া অনেক বড় ব্যাপার মা।
কিন্তু লোকে যে বলে, সৎ পিতামাতার ঘরেই সন্ন্যাসী-সন্ন্যাসিনীরা অবতীর্ণ হন। তুমি আর বাবা তো খুব সৎ। তা হলে আমিও সন্ন্যাসিনী হতে পারব না কেন?
শ্যামাসুন্দরী আতান্তরে পড়ে যান মেয়ের প্রশ্নের উত্তর দিতে। ঘুরিয়ে প্রশ্ন করেন, আচ্ছা তোর মাথায় ওকথা কে ঢোকাল বল তো?
আর কিছু পেলি না? সন্ন্যাসিনী হওয়ার কথাটাই ভাবতে বসলি?
উনি যদি সন্ন্যাসী হন, আমারও তা হলে সন্ন্যাসিনী না হলে চলবে?
শ্যামাসুন্দরীর হাতে চিরুনি থেমে গেল। বড় জামাই যে সাধক মানুষ একথা তিনি জানেন। ভবতারিণী মায়ের মন্দিরে পুজো-আর্চা আর উচ্চমার্গের সাধনভজন নিয়ে তিনি আরও ব্যস্ত আর তৎপর হয়েছেন এসব তাঁর কানে আসে। কিন্তু তা হলেও মেয়ের বর তিনি, নিয়মকানুন মেনে বিয়ে-থাওয়াও করেছেন। পুজো-আর্চা নিয়ে থাকলেই মানুষ কি আর সন্ন্যাসী হয়ে যায়, না কি, সংসার, স্ত্রী সব ছেড়ে থাকতে পারেন! সারদাই ছোট বলে, কী শুনতে কী শুনেছে, কী বুঝেছে ভগবান জানেন।
কিন্তু নিজের এই ভাবনার কথাটাও স্পষ্ট করে শ্যামাসুন্দরী মেয়েকে বলতে পারেন না। তাঁর মেয়ে হলেও, ও যে অন্যরকম সেটা তিনিই সবথেকে ভাল বোঝেন। একটু মোলায়েম স্বরে বলেন, শোন সারু, তোর বর বড় ভক্ত আর গুণী মানুষ, তা হলেও বিয়ে করা সংসারী মানুষ কি আর সন্ন্যাসী হয় মা? তাকে তো সংসার ধর্ম পালন করতে হবে।
সারদা বলল, প্রসন্নমাসি বলেছে, উনি সংসারে থেকেও সন্ন্যাসী। সেই জন্যই তো…
শ্যামাসুন্দরী একটু বিব্রত স্বরে সারদার কথার মাঝখানেই বললেন, বলেছে, বেশ করেছে। তোমার এখনও ওসব কথা বোঝার বয়েস হয়নি। দয়া করে তোমার মাথা থেকে সন্ন্যাসিনী হওয়ার ভাবনাটা দূর করো। যত সব অলুক্ষুনে চিন্তা!
মায়ের কণ্ঠস্বরে বিরক্তির ঝাঁঝ শুনে হেসে ফেলল সারদা।
কিন্তু একটু পরেই যেন কোন সুদূর থেকে যে কথাটা ওর মুখ থেকে বেরুল, শুনে একেবারে স্তম্ভিত হন শ্যামাসুন্দরী।
সারদা বলল, সন্ন্যাসী-সন্ন্যাসিনী হলেও আমাদের অনেক ছেলেপুলে থাকবে। দেখো।
কয়েক মুহূর্ত শ্যামাসুন্দরীর মুখ দিয়ে একটিও শব্দ বেরুল না। বিনুনি করার জন্য চুলের গোছ ধরা রয়েছে হাতে। আস্তে আস্তে ঘাড় কাত করে পাশ থেকে মেয়ের মুখটা একবার দেখার চেষ্টা করলেন। নাহ্, চোখে চোখ পড়ল না।
মাথাটা সোজা করে নিতে নিতে বললেন, হ্যাঁরে সারু, তোর মাথায় কি ছিট আছে?
কেন, ছেলেপুলের কথা বললাম বলে? সন্ন্যাসীদের কি ছেলেপুলে থাকে না মা?
ওরে আগে তো সংসারধর্ম। সন্ন্যাসীর যে সংসারই থাকে না মা। তার আবার ছেলেপুলে হবে কোত্থেকে?
শোননা মা, ধর্মকে ধারণ করে সংসারী, সন্ন্যাসী দুই হওয়া যায়। ধর্মকে আলাদা করে দিলে আর সংসারই বা রইল কোথায়? আর ধর্ম, সংসার নিয়েই তো সন্ন্যাসী, বহুজনের হিত করে সে। তার কি ছেলেমেয়ের অভাব হয়?
মাথাটা কেমন গুলিয়ে গেল শ্যামাসুন্দরীর। কথাগুলো সারুই বলছে তো? বেশ যেন শক্ত শক্ত কথা, ভাল করে ধরতে পারছেন না। অথচ প্রলাপ বলে উড়িয়ে দিতেও পারছেন না। কিন্তু তার থেকে বড় কথা, ও মেয়ে এসব কোন জ্ঞানবুদ্ধি থেকে বলছে!
মনের ভাবনা, প্রশ্ন মনেই চেপে রাখলেন শ্যামাসুন্দরী। থাক, ওকে আর ঘাঁটিয়ে লাভ নেই।
গলার সুর পালটে বললেন, তোমার ভাবনা নিয়ে তুমি থাকো মা। আমার উত্তর দেওয়ার ক্ষমতা নেই।
মনে মনে বললেন, বাব্বা কী কুক্ষণেই যে মেয়ের মাথার চুলে সাবান ঘষার কথা বলেছিলাম!
ধীরে সুস্থে সারদার ঘাডের দু’পাশে দুটো বেণী তৈরি করে মাথার ওপর দিয়ে বেড়াবিনুনি করে দিলেন শ্যামাসুন্দরী। হালকা গলায় বললেন, হ্যাঁরে, শ্বশুরবাড়িতে তোর চুল বেঁধে দিত কে?
সারদা বলল, আমার মেজ জা আছে না!
তার তো তিন ছেলেমেয়ে, সংসার নিয়ে পাগল-পাগল অবস্থা। শিবরাম তো একেবারেই বাচ্চা এখনও। সময় পেত?
আরও কত মানুষের যাতায়াত ওবাড়িতে। সারদা বলল, জান মা, ধনীমাসি আর প্রসন্নমাসি আমাকে খুব ভালবাসে। কেউ না কেউ তো রোজ আসত। কত বেড়াতাম, কত গল্প করতাম। গয়াদাদা-সীতানাথদাদা-চিনুদাদারাও আসত। ওঁর ছেলেবেলার গল্প বলত।
তোর শাশুড়ি ঠাকরুন কি দক্ষিণেশ্বরেই থেকে যাবেন? কামারপুকুরে ফিরবেন না আর?
তার আমি কী জানি! সবাই তাঁর কাছে কাছে থাকতে চান। এক এক করে সবাই তো চলে যাচ্ছেন।
খুব সন্তর্পণে এবার আসল প্রশ্নটা করেন শ্যামাসুন্দরী। মায়ের মন তাঁর। বিয়ের সময় না হয় মেয়ে নেহাতই বালিকা ছিল। কিন্তু এখন তো সে চোদ্দো বছরের কিশোরী, আস্তে আস্তে জ্ঞানবুদ্ধিও হচ্ছে, নিজের বিবেচনা, হিসেব অনুযায়ী মেয়ে-জামাইয়ের এবার একসঙ্গে থাকা উচিত। অনেক বছর দু’জনের যে দেখাই নেই।
উঠোনে নেমে এসে শ্যামাসুন্দরী বললেন, তোকে কবে নিয়ে যাবেন কিছু বলেননি?
সারদা হালকা গলায় বলল, সময় হলে ঠিকই বলবেন।
হ্যাঁ রে সারু, বরকে না দেখে তোর কষ্ট হয় না?
আমি তো তাঁকে দেখতে পাই মা।
সে আবার কী কথা! কয়েক বছর ধরে তিনি তো দক্ষিণেশ্বর ছেড়েই বেরোননি। দেখবি কোত্থেকে!
এমনি চোখে নয় মা। মনের চোখে যে দর্শন হয় তাইতে।
শ্যামাসুন্দরী থতমত খেয়ে গেলেন। আর কথা না বাড়ানোই ভাল।
সারদা নিজেই একটু পরে বলল, চিন্তা কোরো না মা। তাঁর মাথায় সব আছে। আমাকেও তো তাঁর যোগ্য হতে হবে।
মেয়ের কথা শুনে শ্যামাসুন্দরী যেমন অবাক হন, আবার কী এক ভাবনাতেও যেন পড়ে যান বারবার। জুতসই উত্তর দিতে পারেন না। এদিকে উৎকণ্ঠাও বাড়ে। কিন্তু অসচ্ছল, বড় সংসার তাঁর। পাঁচ কাজে আলাদা করে সারদার কথা আর ভাবতে পারেন না। হঠাৎ হঠাৎ কখনও মনে হয়, পাড়া প্রতিবেশীরা ইদানীং যেন একটু নেকনজরে সারদার বাপের বাড়ি থাকাটা দেখে। মুখে কেউ কিছু অবশ্য প্রকাশ করে না। মুখুজ্যে পরিবারকে একটু সম্ভ্রমের চোখেও দেখে। অস্বস্তিটা বোধহয় শ্যামাসুন্দরীরই।
সারদা দিব্যি যেমন ছিল, তেমনই আছে। মায়ের সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে এক-আধটা কী সব ভাবের কথা তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে পড়ে বটে, কিন্তু তাই নিয়ে সে বসে থাকে না। তেমন সচেতনও না। উদয়াস্ত পরিশ্রম করাটাই তার কাজ। বাপের বাড়িতেই ঘোরতর সংসারী সে। অভাব, অনটন আর মানুষের দুঃখ দারিদ্র্য নিয়ে ছোটবেলা থেকেই চলছে সে। একেবারে ছোটবেলায় পাঠশালায় যেত, কিন্তু পড়তে শেখার আগে বাড়ির বড় মেয়ে হিসেবে সংসারটাকেই তার বুঝতে হয়েছিল বেশি। রাজ মুখুজ্যের বোন অঘোরমণির সঙ্গে সারদার গলায় গলায় ভাব ছিল। কিন্তু বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরে এখন তার সঙ্গে দেখা কমে গেছে। আলেকালে অঘোরমণি জয়রামবাটি আসে।
একমাত্র ভানুপিসির সঙ্গেই ওর ঘনিষ্ঠতা এখন। সুয্যি আর ছোটকাকার সঙ্গে গল্প-টল্প করে। ঘোষ-বিশ্বাসদের বউ-ঝিরা মাঝেমধ্যে পাড়া বেড়াতে আসে। কথাবার্তা বলে তখন। আলেকালে আসেন মামারা কিংবা সন্তানহীনা মাসি দীনময়ী।
শরীরে-মনে কিছু পরিবর্তন হলেও পুরনো দিনের কথা মনে পড়ে সারদার।
ভাইয়েরা তখন আরও ছোট ছিল। তাদের চান করাতে নিয়ে যেতে হত। আমোদর নদকেই সবাই ধরে নিত গঙ্গা বলে। চান সেরে গাছতলায় বসে মুড়ি খেত সবাই মিলে, সারদা গল্প বলত। শ্যামাসুন্দরী নিশ্চিন্ত বোধ করতেন বাড়িতে। কাজ সেরে নিতেন ঘরদোরের, গোরুর জন্য দল ঘাস কাটতে কোনও কোনও দিন জলের মধ্যেই নামতে হত সারদাকে। ছোট ছোট হাতে আঁটি বাঁধা ঘাস তুলে রেখে আবার নামতে হত। মাঝে মাঝে মনে হত, তারই মতো আর একটা মেয়ে ওর জন্য ঘাস কেটে দিচ্ছে আর গোছ করে ডাঙায় তুলে রাখছে। মেয়েটা যে কে, কখনও চিনতে পারত না সারদা। কাউকে কিছু বলত না। কেন না, মেয়েটাকে পরে আর দেখা যেত না।
একবার শোরগোল পড়ে গ্রামে। শীতের শেষে, মাঠে মাঠে তখনও পাকা ধান গোলায় ওঠার অপেক্ষায়। হঠাৎ হেমন্তের আকাশকে অন্ধকারে ঢেকে দিয়ে দূর থেকে দেখা গেল যেন একখণ্ড কালো মেঘ ধেয়ে আসছে জয়রামবাটির ওপর। একসঙ্গে ভেসে আসছে দূরাগত গর্জনের মৃদু ধ্বনি। ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে ধ্বনি আর গর্জন। কিছুক্ষণের মধ্যেই বোঝা গেল গর্জিত মেঘপুঞ্জ আসলে পঙ্গপালের এক বিশাল ঝাঁক। দ্রুতগতিতে এসে তারা হামলে পড়ল ক্ষেতের শস্যর ওপর। মানুষ অসহায়। প্রায় প্রাকৃতিক তাণ্ডবের মতোই হিংস্র পতঙ্গের এই আকস্মিক আক্রমণের কাছে সম্পূর্ণ পরাভূত হল গ্রামবাসীরা। তছনছ হয়ে গেল শস্যক্ষেত্র।
কিছু করার নেই। পঙ্গপালরা যে সব ধান খেয়ে ফেলে তাও না। শুধু কেটে দিয়ে আর ধ্বংস করেই তাদের খেয়াল মেটে। তার পরেই আবার ঝাঁক বেঁধে তারা উড়ে চলে যায়। সারদার মনে পড়ে, গ্রামবাসীদের সঙ্গে তারপর ক্ষেতে গিয়ে সেও কাটা ধান কুড়িয়েছিল
ফাল্গনের গোধূলির আলোয় বসে, কুড়িয়ে আনা তুলোর সুতোয় পৈতে তৈরি করতে করতে নানান স্মৃতির উদয় হয় সারদার মাথায়। বরাবরই নিরাড়ম্বর-শান্ত-গ্রাম্য জীবনযাপন তার। প্রায় উত্তেজনাহীন। মনটাও নরম, সরল, সাদাসিধে। বিবাহ প্রাথমিকভাবে তার জীবনে কোনও অতিরিক্ত ঘটনা কিংবা পরিবর্তনের সূচনা বলে চিহ্নিত হয়নি। ছোটখাটো কিছু হইচই, আমোদ-আহ্লাদ হয়েছিল। স্বামী মানুষটার ভূমিকা, গুরুত্ব কিছু বোঝারই বয়েস হয়নি তখন।
কিন্তু সেই মানসিকতার যে একটু একটু পরিবর্তন হচ্ছে, সেটা শুধু সারদাই না, বোঝেন শ্যামাসুন্দরী আর রামচন্দ্রও। মাত্র কয়েক মাস আগেই একবার শ্বশুরবাড়ি থেকে ঘুরে এসেছে সারদা। স্বামী-শাশুড়ি কেউ ছিলেন না বাড়িতে, তা হলেও নানান কিছু ভাবনার রসদ এবার সে যে নিয়ে এসেছে, কয়েকদিন পর থেকে বেশ কয়েকজনই তা টের পেয়েছেন। সারদা মুখে কিছু বলে না। কতটুকুই বা বোঝে যে বলবে! কিন্তু চোদ্দো বছর বয়েসের, কখনও চপলতা, কখনও উদাস ভাবটা কি সব সময় ঠেকিয়ে রাখতেই পারে!
এর মধ্যেই একদিন খবর এল ‘তিনি’ কামারপুকুরে এসেছেন ছ’-সাত বছর পরে, সারদাকে স্বয়ং আহ্বান করেছেন। তাকে আবার যেতে হবে। সুখ, না কি আনন্দ, না কি উত্তেজনা—কোনওটাই আলাদা করে অনুভূত হল না সারদার। কিন্তু খবর শোনার পরেই সে টের পেল, অজান্তেই যেন কর্তব্যপ্রসূত একটা মানসিক প্রস্তুতি সারা হয়ে যাচ্ছে তার। হ্যাঁ, গভীর এবং চাপা টানও। একটু কৌতুহলও কি?
সারদা প্রস্তুত। তিনি এসেছেন, ডেকেছেন। সারদাকে যেতে হবে। সে যাবে।
আবার সেই খর গ্রীষ্মের দিন। জ্যৈষ্ঠ মাস। সকাল থেকে সূর্যের কিরণে আগুনের গুঁড়ো ঝরছে। কাঁকুরে মাটিতে পা পড়লে যেন পুড়ে যায়। রাস্তা-ঘাট শুনশান হয় বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে। মাঝে মাঝে গরম হাওয়ায় শুকনো লাল ধুলো ওড়ে। গাছের পাতার রং পালটে যায়। ক্ষেতজমি সব ফুটিফাটা। দুপুর নিঝুম, ঝোপ জঙ্গলের আড়ালে বসে ঘুঘু আর ডাহুক ডাকে। শ্রান্ত গোরু গাছের ছায়ায় বসে জাবর কাটে। সন্ধ্যা নামে দেরিতে। একটু জুড়োবার জন্য আঁধারের প্রতীক্ষা করে মানুষ।
মনে মনে একটু দোলাচলও ছিল সারদার। তিনি যে সন্ন্যাস নিয়েছেন একথা সে আগেও শুনেছিল। সন্ন্যাস গ্রহণের ভাব, গুরুত্ব সম্পর্কে সম্যক ধারণা তার আগেও ছিল না, এখনও স্পষ্ট নয়। শুধু ওপর ওপর সে জানে, সন্ন্যাসীদের ঘর-সংসার-বউ-ছেলেপুলে বলে কিছু থাকে না। কিন্তু ‘তিনি’ মানুষটা যে আবার তেমন সন্ন্যাসী নন, সেটাও বোঝে সারদা। কেন না তা হলে তিনি বিয়ে করতেন না। আবার কিছুদিন আগে সে শুনেছিল—দশনামী সম্প্রদায়ের তোতাপুরীর কাছে তিনি নাকি আনুষ্ঠানিকভাবে সন্ন্যাসের দীক্ষা নিয়েছেন।
ভাবনার গন্ডগোল আর কৌতূহলটা সেখানেই সারদার। তার স্বামী যে সাধক এটুকু সে জানে। কিন্তু সাধন পদ্ধতির যে নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা কুল ভাগাভাগি আছে, নিয়মনিষ্ঠার হেরফের আছে এসব বোঝে না। কালী সাধক মানুষ তিনি, কেন যে আবার তিনি আলাদা করে সন্ন্যাসের দীক্ষা নিয়ে পুরী সম্প্রদায়ভুক্ত হয়েছেন, সে এক ধাঁধা সারদার কাছে। আবার যোগেশ্বরী ভৈরবী ব্রাহ্মণীও তাঁর অন্যতম গুরু। তাঁর কাছেই শিখেছেন তন্ত্রসাধনা এবং সিদ্ধিলাভ করেছেন।
নানান শোনা কথার ওপর নির্ভর করেই সারদা হিসেব করে, যাই হোক আপাতত তাঁর বারো বছর সাধক জীবন পূর্ণ হয়েছে। আর সে এখন মাত্র চোদ্দো বছরের কিশোরী। নিজের মনকে নিজেই সান্ত্বনা দেয় সারদা। আধ্যাত্মিক জীবনের কী-ই বা সে আর বুঝবে এই বয়েসে! কিন্তু শুনেছে এবার নাকি তিনি সেই ভৈরবী ব্রাহ্মণীকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন কামারপুকুরে। তিনি মধ্যবয়স্কা এবং অতি সুরূপা নাকি। এসেছে হৃদয়ও। তার চেহারা খানিকটা মনে আছে সারদার। কিন্তু এত বছরে সবাই কি খানিকটা পালটে যায়নি!
অনেক ধরনের ভাব আর মানসিক টানাপোড়েনের মধ্যে কামারপুকুর রওনা হলেও, একটা বিষয়ে নিশ্চিন্ত ছিল সারদা। সেই মানুষটার প্রতি শ্রদ্ধা, ভালবাসা আর অটুট বিশ্বাস নিয়েই এত বছর পরে তাঁর ডাকে যাচ্ছে। ও জানে, তাঁর ডাকে কোনও ফাঁকি নেই।
দিনের আলো থাকতে থাকতেই কামারপুকুর পৌঁছে গেল সারদা।
বাড়ি থেকে বেরুতে যথারীতি একটু দেরিই হয়েছিল। ঈষৎ চাপা উদ্বেগ ছিল শ্যামাসুন্দরী-রামচন্দ্র দু’জনেরই। বারবেলা দিনক্ষণ শুভযোগ এসবের জন্য পাঁজি-টাঁজি দেখতেই সময় যাচ্ছিল। সামান্য কিছু গোছগাছেরও দরকার ছিল। এতদিন পরে রামকৃষ্ণ পৈতৃক ভিটেবাড়িতে এসেছেন, সারদার সঙ্গেও দেখা হবে বেশ কয়েক বছর পরে। কতদিন থাকবেন তাও জানা নেই। প্রস্তুতি খানিকটা ছিলই। উদ্বেগের সঙ্গে মিশেছিল খানিকটা আবেগও। সেই অর্থে মেয়ে একটু মাথা চাড়া দেওয়ার পরে এইবারই প্রথম বরের কাছে যাচ্ছে।
জামাইয়ের সন্ন্যাস নেওয়ার কথা কানাঘুষো শুনলেও ব্যাপারটা সম্বন্ধে সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত হতে পারেন না শ্যামাসুন্দরী। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলায় কিছুটা আতান্তরে পড়ে যান। কিছুটা অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কিন্তু জামাইয়ের থেকে মেয়েকে নিয়েই তাঁর ভাবনা বেশি। মাঝে মাঝে মেয়ের কথা শুনে মনে হয়, তিনি আকাশ থেকে পড়লেন। বছরের পর বছর দেখা নেই, শোনা নেই, তা সত্ত্বেও যে মেয়ের কী করে স্বামীর জন্য এখন থেকে এমন তফাত ভাব হয়, তিনি বুঝে ওঠেন না।
তা হলেও মেয়েকে এটা সেটা বলে দেন, বুঝিয়ে দেন। সংসারে খুবই অসুবিধে হবে জেনেও, তাঁর অবশ্য আনন্দই হয়েছে। মনে মনে ভাবেন শ্যামাসুন্দরী, জন্মজন্মান্তরে অমন একটি মেয়েই তিনি চেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু জীবনযাপনের জন্য তাকে তো ছেড়ে দিতেই হবে। সারদা বেরোনোর আগে যথারীতি তার মঙ্গল কামনা করে পুজো দিয়েছিলেন, সঙ্গে ঠাকুরের ফুল-বেলপাতা দিতেও ভোলেননি।
মাত্র কয়েক মাস আগে সারদা এবাড়ি থেকে ঘুরে গেছে। তখন হিমেল হাওয়ার সঙ্গে অন্ধকার নেমে আসত তাড়াতাড়ি। এবার এল গোধূলিবেলায়। সূর্য অস্ত গেছে, অথচ তার আভাস এখনও আলো হয়ে রয়েছে চারিদিক। রাস্তা ছেড়ে বেড়ার পাশ দিয়ে বাড়ির ভেতরে আসতে গিয়েই সারদা টের পায়, কীভাবে যেন পরিবেশটা পালটে গেছে। সেই ফাঁকা নির্জন ভাবটা নেই। ছোট মাটির বাড়ি ছড়ানো উঠোন, উলটো দিকে বাগান, ঢেঁকিঘর, গৃহদেবতার থান…সবই যেমন থাকার তেমনই রয়েছে, অথচ যেন একটা প্রাণের স্পর্শ পেয়েছে বাড়িটা। মানুষের কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে। দেউড়ি পার হয়ে ঘরের কাছাকাছি আসার আগে কয়েকজনকে ঢুকতে বেরোতেও দেখল।
শাকস্তুরীই প্রথমে দেখতে পেলেন সারদাকে। সঙ্গে নীলমাধবকেও। বোধহয় উঠোনের দিকেই আসছিলেন তুলসীতলায় সন্ধে দিতে, পিছন পিছন লক্ষ্মীমণি। ওদের দেখেই দ্রুত হাত খালি করে এগিয়ে এলেন। খুশির গলায় প্রায় একটা ছোটখাটো হইচই ফেলে দিলেন।
ও মা, এসেছিস! আমরা ভাবছি সন্ধে হয়ে এল, সারু আজও পৌঁছল না…ওরে রামলাল, তোর পিসিদের খবর দে, বল ছোটখুড়ি এসেছে…
হাতের থেকে পুঁটলি নিলেন শাকস্তুরী আর লক্ষ্মীমণি তার মধ্যেই খামচে ধরল শাড়ি। এই ক’মাসেই যেন একটু বেড়ে গেছে সে। দাওয়ার কাছে যেতে না যেতেই কাত্যায়নী সর্বমঙ্গলা, আরও কয়েকটা বাচ্চাকাচ্চা আর নন্দাই রামসদয়ও এসে পড়লেন। এমনকী পাশের ঘর থেকে আস্তে ধীরে প্রসন্নময়ীও বেরিয়ে এলেন।
দিব্যি খুশি হয়ে উঠল সারদার মন। পরিবেশটাও বুঝে নিতে অসুবিধে হল না। এত বছর পরে সেই ভালবাসার মানুষটা গাঁয়ের বাড়িতে এসেছেন। আনন্দে কৌতূহলে আত্মীয়স্বজন পাড়া-প্রতিবেশীরাও নিত্য যাতায়াত করছেন। প্রণাম আর প্রাথমিক কুশল বিনিময় করতেই চলে গেল কয়েক মিনিট। পশ্চিম দিকের দক্ষিণমুখী ঘরটায় যে তিনি রয়েছেন, সারদা তাও বুঝে নিল, কেন না এখনও আরও কয়েকজন রয়েছেন ওই ঘরে। কথাবার্তা, হাসির আওয়াজ আসছে।
প্রসন্নময়ী প্রায় ঘরের মানুষ। কাছে এসে অন্য সবাইয়ের উদ্দেশে বললেন, ওরে এতটা পথ হেঁটে এসেছে, আগে ওদের বসতে দে। হাতমুখ ধুয়ে নিক, জল খাক, তার পর কথা বল।
রামসদয় এসে নীলমাধবকেও বসালেন। সর্বমঙ্গলা জল নিয়ে এল। লক্ষ্মী অবশ্য আর কাকিকে ছাড়ছে না।
বাস্তবিক এবার আসার ধকলটা বেশিই হয়েছে। ওবাড়ির অভাব-দারিদ্রে পালকির তো প্রশ্নই ওঠে না। গরম আর রুক্ষ আবহাওয়ায় গোরুর গাড়িও পাওয়া যায়নি; এদিকে খবর যাওয়ার পরে আর অপেক্ষাও করা যাচ্ছিল না। ফলে ক্রোশখানেক ওপরের রাস্তা হেঁটেই আসতে হয়েছে সারদাকে ছোটকাকার সঙ্গে।
নীলমাধবের অপেক্ষা করার উপায় ছিল না। শিহড়ের এক বর্ধিষ্ণু পরিবারে সে রাঁধুনি বামুনের কাজ করে। জল খেয়ে, কিছুক্ষণ জিরিয়ে সে আবার রওনা হয়ে গেল জয়রামবাটি। বড়দা-বউদিও খবরের আশায় তার ফেরার জন্য অপেক্ষা করবেন। তা ছাড়া সংস্কারনিয়মও আছে। মেয়ের বাচ্চাকাচ্চা না হওয়া পর্যন্ত পিতৃকুলের কেউ মেয়ের শ্বশুরবাড়ি রাত্রিযাপন করবেন না। নীলমাধব ফিরে গেলেন।
একটু কথা বলার সুযোগ পেয়ে প্রসন্নময়ী দাওয়ায় একটা হাতপাখা নিয়ে সারদার পাশে বসলেন।
হ্যাঁ মা, এই ক’মাসে চেহারাটা যে কালি করে ফেলেছিস! খুব খাটুনি পড়েছে বাড়িতে?
সারদা একটু এড়িয়েই যাওয়ার চেষ্টা করল। বলল, সে জন্য নয় মাসি। এখান থেকে বেশি দূর না হলেও, আমাদের বাঁকুড়ায় যেন গরমটা বড্ড বেশি। একটু বেলা হলেই আর ঘর থেকে বেরুনো যায় না, আবার ঘরের মধ্যেও গুমোট গরম।
প্রসন্নময়ী বললেন, গরম তো আছেই বাছা, তা হলেও গেল শীতের শুরুতেই তো তোকে দেখেছি। চেহারাটা তোর খারাপ হয়েছে মা।
সারদা প্রসঙ্গ পালটানোর জন্য বলল, গাঁয়ের খবর সব ভাল তো মাসি?
খবর তো এখন একটাই রে! প্রসন্নময়ী বললেন, গদাইয়ের নামে একডাকে এখন কামারপুকুরকে চেনে লোকে। এতদিন পরে সে গাঁয়ে এসেছে…ওটাই তো বড় খবর। আজ আবার তুইও এসে পড়েছিস। যোলোকলা পূর্ণ এখন।
সারদা জিগ্যেস করল, ধনীমাসি ভাল আছে?
আছে আর কী! বয়েসের শরীর তো, গেঁটে বাত ধরেছে, চোখটাও খারাপ হয়েছে। একটু থেমে প্রসন্নময়ী আবার বললেন, এই তো আমাকেই দ্যাখ না…আজ এটা, কাল সেটা লেগেই রয়েছে।
তা বোলো না মাসি। সারদা বলল, তোমার এখনই শরীর পড়ে যাওয়ার বয়েস হয়নি
প্রসন্নময়ী সামান্য বিষাদের হাসি মিশিয়ে বললেন, বয়েস কি শুধু শরীরের মা! মনটাও তো ফেলনা নয়। সারদা সঙ্গে সঙ্গে বলল, মনটাকে আনন্দে রাখলেই পার মাসি।
সবাই কি আর সব পারে রে! এই তো দ্যাখ না, তোর বরের সঙ্গে যে উনি এসেছেন, তাঁর বয়েসও তো শুনলাম চল্লিশ পেরিয়েছে। কিন্তু দেখে কি বোঝার জো আছে। এখনও কী গায়ের রং…
কার কথা বলছ মাসি? সারদা অবাক মুখ তুলল প্রসন্নময়ীর দিকে।
প্রসন্নময়ী একবার রামকৃষ্ণর ঘরের দিকে তাকিয়ে নিয়ে সমীহ মেশানো গলায় বললেন, ওই যে রে যোগেশ্বরী ভৈরবী ব্রাহ্মণী, তোর স্বামীর তন্ত্রসাধনার গুরু তো তিনিই, বহু তীর্থ ঘুরেই তো দক্ষিণেশ্বরে পৌঁছেছিলেন—
প্রসন্নময়ীর কথার মধ্যেই সারদা বলল, ও হ্যাঁ শুনেছি। আমি এখনও তাঁকে চোখে দেখিনি।
দেখবি মা, দেখবি। ঘর আলো করে বসে আছেন।
সারদা একটু অবাক হয়ে শুধু বলল, ওহ্ আচ্ছা।
প্রসন্নময়ী আগের কথার খেই ধরে বললেন, তো আমার আর তাঁর বয়েস তো কাছাকাছিই মা। কিন্তু কোথায় তিনি, আর কোথায় আমি। তাঁর চেহারা-কথা-দাপট-ব্যক্তিত্ব থেকে যে জ্যোতি বেরুচ্ছে, তা আমি কোত্থেকে পাব বল! এই বয়েসেও যে কী পরমাসুন্দরী, সেটা কাছের থেকে দেখলেই টের পাবি।
সারদা বলল, চেহারা, সৌন্দর্য তো ভগবানদত্ত মাসি।
প্রসন্নময়ী বললেন, তার সঙ্গে আলো আর আনন্দও মিশেছে বলেই তিনি অপরূপা। তা নয় তো গদাইয়ের মতন মানুষের তিনি গুরু হন!
সারদা সহজভাবেই বলল, নিজের আনন্দ নিয়ে থাকলে, তুমিও তোমার মতন অপরূপা মাসি।
আহা একথাটা বড় ভাল বলেছিস মা…।
সারদার থুতনিতে হাত দিয়ে আদর করলেন প্রসন্নময়ী। আর আবছা অন্ধকারে তখনই মাঝারি চেহারার এক সুপুরুষ ব্যক্তি এসে সারদার আর প্রসন্নময়ীর পায়ের ধুলো নিতেই ওদের কথা বন্ধ হয়ে গেল। সারদা সিটিয়ে গেল একটু। ভাল করে ঠাহর করার আগেই শুনল প্রসন্নময়ী বলছেন, এটা কে রে? ওহ্-হো হৃদে নাকি! তো আমায় কেন বাপ, মামিকে পেন্নাম করলেই তো হত।
হৃদয় ততক্ষণে সোজা হয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। হেসে বলল, তাই হয় দিদি? মামিকে প্রণাম করলেও, বয়োজ্যেষ্ঠা দিদিকে কি বাদ দিতে পারি, বল! চন্দ্রাদিদি বাড়িতে না থাকলেও, তুমি তো তাঁরই বান্ধবী গো।
প্রসন্নময়ী বললেন, বোস বাবা, বোস। মামির সঙ্গে কথা বল। আমায় এমনিতেও উঠতে হবে। অন্ধকার হয়ে গেল। সারদার দিকে ফিরে বললেন, কপাল করে স্বামী পেয়েছিস মা। আবার তার সাকরেদ ভাগ্নাও জুটেছে ভাল। আচ্ছা, তোরা কথা বল, আমি আজ আসি।
সারদা বলল, কালকে আবার এসো মাসি, আমি তো এখন থাকছি।
হৃদয় আলো নিয়ে প্রসন্নময়ীকে একটু এগিয়ে দিয়ে এসে সারদার কাছে বসল। বলল, মামিগো, তোমায় বাইরে দেখলে আমি যে চিনতেই পারতাম না। সম্পর্কে মাইমা আর গুরুজন হলেও, বয়েসে সারদা হৃদয়ের থেকে ছোট। একটু জড়সড় হয়েই রইল। এমনিতে রামকৃষ্ণর যথেষ্ট দেখভাল করলেও, হৃদয় যে মাঝেমধ্যে কিঞ্চিৎ উদ্ধত হতে পারে সারদা সেটা জানে। অবশ্য তার সঙ্গে হৃদয়ের দেখাসাক্ষাৎই বা কতটুকু!
সারদা ধীরেসুস্থে বলল, ওঁর শরীর স্বাস্থ্য ভাল আছে তো?
হৃদয় বলল, এখন চলছে মোটামুটি। মাঝে কিছু গন্ডগোল হয়েছিল।
ওখানে দেখাশোনার সব বন্দোবস্ত আছে তো?
আছে তো সবই মামি, হৃদয় বলল, তবে ছোটমামাকে তো জানো, উচ্চমার্গের মানুষ, সব সময়ই খেয়াল রাখতে হয়।
সারদা বলল, তা তো বটেই। বড় জায়গা, বড় কাজ, পুজো-আর্চা…
সেসব তো আছেই। হৃদয় যোগ করল, কিন্তু মামার যে ধাত আলাদা, ঈশ্বর লাভের সিদ্ধি আর সাধনার জন্য আরও অনেক কিছুই করেন কিনা।
ঠিকঠাক লোকজন ধারেকাছে পান তো?
লোকজনের কি আর অভাব আছে গো দক্ষিণেশ্বরে। কিন্তু যাকে-তাকে দিয়ে তো আর ওঁর কাজ করানো যায় না।
সারদা অবাক আর চিন্তিত মুখে বলল, ওহ্, তা হলে?
তা হলে আর কী! এই যে দেখছ, নিজের দিকে আঙুল দেখিয়ে হৃদয় বলল, এই শর্মার ওপরেই যাবতীয় দায়-দায়িত্ব। ভাবের ঘোরে থাকা অমন মানুষকে দেখাশোনা করা কি চাট্টিখানি কথা মাইমা!
সারদা মাথা নেড়ে বলল, তোমার তো আরও অন্য কাজও আছে।
থাকলে কী হবে! দক্ষিণেশ্বরের আসল মানুষটা যে আমার মামা। অন্য কাজের থেকে তাঁকে দেখাটাই জরুরি।
ঠিকই তো।
তারপরে বুঝলে না, কখন ভাবসমাধি হয়, কখন মায়ের চরণে নিজেকে নিবেদন করে পড়ে থাকেন, পুজো করতে করতে কখন বাহ্যজ্ঞান লুপ্ত হয়ে যায় এসব তো মানুষটাকে না জানলে বোঝা সম্ভব নয়।
অত সব কাজের মধ্যে তুমি সামলাতে পার?
উদয়াস্ত খাটতে হয় মামি। একটু সময় নিয়ে হৃদয় বলল, রানিমা দেহ রেখেছেন আজ পাঁচ বছর হয়ে গেল। তাঁর জামাই মথুরবাবুই মন্দির প্রশাসনের সর্বেসর্বা। তিনি মামার একান্ত ঘনিষ্ঠ ভক্ত, আবার রসদদারও বটেন। আবার আমার ওপর তাঁর অগাধ বিশ্বাস আর আস্থা। তো তাঁরই গুরুকে আমার না দেখলে কী করে চলবে বলো।
সারদা কিছু না বলে চুপ করে রইল। অন্ধকার নেমেছে কিছুক্ষণ আগে। ঝিরঝিরে হাওয়া ছেড়েছে একটু। রামকৃষ্ণর ঘরে এখনও লোকজন রয়েছেন। বোধহয় ভাগবত পাঠ আর কথাবার্তা আলোচনা হচ্ছে গ্যাসের আলো জ্বেলে। ভৈরবীও রয়েছেন ওই ঘরে।
হৃদয় বলল, তারপর মামার নাম শুনে এখন দেশবিদেশ থেকে বড় বড় মানুষের আনাগোনা বেড়েছে। তোতাপুরী ঘুরে গেলেন কিছুদিন আগে। ওঁর কাছে সন্ন্যাসের দীক্ষা নিতে নিতেই ভৈরবী ব্রাহ্মণীর কাছে তন্ত্রসাধনা শুরু করলেন মামা। খেয়াল করছিলাম শরীরটা যেন একটু ভেঙে পড়ছে। মামা নিজে সত্যি সত্যি ভগবানেরই অংশ, তা হলেও নরদেহে অত পরিশ্রম আর ধকল নেওয়ার তো একটা সীমা আছে। কিছুদিন একটু হাওয়া বদলের জন্যই তাই মথুরবাবুকে বলে এখানে নিয়ে এলাম।
সারদা বলল, ভালই করেছ। তাতে হয়তো ওঁর উপকারই হবে।
চেষ্টা করি মাইমা। আমি ছাড়া নিজের বলতে আর তো কেউ নেই ওখানে।
সারদা একটু অবাক হয়ে বলল, কেন, মা আছেন ওখানে। শুনেছি অক্ষয়ও বিষ্ণু মন্দিরের পুরোহিত—, মেজদাদাও তো প্রায়ই যান।
নামে অনেকেই আছে মাইমা। হৃদয় কিছুটা হালকা সুরে বলল, কিন্তু ওদের থাকা না-থাকায় মামার তো কোনও উপকার নেই। সে মানুষটার ভাব-গভীরতা সাধক জীবনের ওরা বোঝেটাই বা কী!
সারদা খুব মিনমিন করে বলল, অক্ষয় তো শুনেছি খুবই ভক্ত ছেলে। উনিও যথেষ্ট স্নেহ করেন।
হৃদয় হেলাভরে বলল, বড়মামার ছেলে, আবার ঠাকুর রামকৃষ্ণর ভাইপো, সেই হিসেবে খানিকটা খাতির-টাতির পায় অক্ষয়। পুজোটাও মন্দ করে না। কিন্তু সে তো আর হৃদয় মুখুজ্যে না, মামাকে সেবাযত্ন করার যোগ্য হতে হবে তে!
সারদা তারপরেও বলল, কিন্তু নিজের গর্ভধারিণী মা স্বয়ং রয়েছেন…
হৃদয় বলল, বললাম তো, নামে অনেকেই রয়েছে।
একটু এদিক ওদিক দেখে নিয়ে হৃদয় আবার বলল, মামাকে ওরা আর কী দেখবে! ওদের কে দ্যাখে তারই ঠিক নেই। একটু গলা নিচু করে বলল, বরং মামার নাম ভাঙিয়ে যে যার নিজেরটা সামলাচ্ছে। বুঝলে কিছু?
কথাটা এবং তার বলার ধরন কোনওটাই ভাল লাগল না সারদার। কিন্তু সে নিজেই অতি নিরীহ, ঠান্ডা প্রকৃতির মেয়ে। দক্ষিণেশ্বর কলকাতার ব্যাপারে জানেও না কিছু। তা ছাড়া বড় আর গুরুজনদের ব্যাপারে তার কি কোনও মন্তব্য করা শোভা পায়?
একটু পরে শুধু বলল, আমি আর কতটুকু বুঝি। মঙ্গলময় ওনাকে ঠিক রাখলেই হল।
তুমি কিছু চিন্তা কোরো না মাইমা। হৃদয় বলল, যতক্ষণ মথুরবাবু আছেন, আর এই হৃদে আছে, ততক্ষণ ঠাকুর রামকৃষ্ণর গায়ে কেউ ফুলের ঘা-টি দিয়েও আঘাত করতে পারবে না।
সর্বমঙ্গলা এই সময় রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে কাছে আসতেই হৃদয় চুপ করে গেল।
সারদার কাছে এসে বলল, ও বউদি, তুমি এখনও এই দাওয়াতেই বসে আছ? আমরা তো ভাবছি, তুমিও ওঘরে ভাগবত শুনছ।
সারদার আগে হৃদয়ই উত্তর দিল। বলল, না গো মাসি, মাইমা ওসব তত্ত্বকথার মধ্যে গিয়ে কী করবে! তা ছাড়া গরমও খুব। আমি তো সেই জন্যই একটু হাওয়ায় বসে মাইমার সঙ্গে গপ্পো করছি।
সর্বমঙ্গলা আর একটু কাছে এসে বলল, হ্যাঁ বউদি, ভৈরবী ব্রাহ্মণীকে দেখলে নাকি?
সারদা বলল, না তো। উনি একবারও বেরোননি ঘর থেকে।
ওহ্! তা তুমি একবার তোমার বরের সঙ্গে দেখা করতে যাওনি?
সারদা বলল, উনি তো ডাকেননি, যাওয়া কি উচিত হবে।
হৃদয় সঙ্গে সঙ্গে বলল, ঠিক ঠিক। ছোটমামা নিজের ঘরে থাকলেও ওঁর দৃষ্টি পরিব্যাপ্ত সর্ব দিকে। মনে করলে মাইমাকে অবশ্যই ডেকে পাঠাতেন।
সর্বমঙ্গলা আর কিছু বলল না। সারদা উঠে পড়ল দাওয়া থেকে। উঠোনে নেমে এসে বলল, চলো ছোড়দি, আমি বরং বাচ্চাগুলোকে খাইয়ে-দাইয়ে ঘুম পাড়াবার ব্যবস্থা করি।
সেই ভাল। সর্বমঙ্গলা বলল, চলো রান্নাঘরে বসে আমরা একটু গল্পও করতে পারব।
একটা দুটো দিন ব্যস্ততার মধ্যে চলে গেল। পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজনদের আনাগোনা চলল। বাড়ি জমজমাট প্রায় সর্বক্ষণ। এর মধ্যেই সারদার সঙ্গে অল্প দু’-একবার রামকৃষ্ণ আর ভৈরবীর সঙ্গেও দেখা হয়েছে। সারদা প্রণাম করে পায়ের ধলো নিয়েছে দু’জনেরই। ভৈরবী তেমন নজর করেননি। বোধহয় শান্তশিষ্ট ছোট মেয়েটাকে চিনতেও পারেননি। রামকৃষ্ণ অবশ্য মৃদু হাসি আর অল্পস্বল্প দু’-একটি মিষ্টি কথায় বেজেছেন। বুঝিয়েও দিয়েছেন, কয়েকটা দিন যাক, ধীরেসুস্থে তাঁর সঙ্গে বাক্যালাপ হবে। সারদাও ওইটুকুতেই খুশি। যতক্ষণ তিনি আছেন, ওর আর তাড়াহুড়োরই বা কী।
আস্তে আস্তে থিতিয়ে এল বাড়ির পরিবেশ। ভৈরবী ব্রাহ্মণী যদিও রয়েছেন, তা হলেও ঘরোয়া পরিবেশটা ফিরে এসেছে। রামকৃষ্ণ যে এবার আরও কিছুদিন কামারপুকুরে থাকবেন, সেটা তাঁর হাবভাব কথাবার্তাতেই বোঝা যাচ্ছে। যদিও ভৈরবী ব্রাহ্মণী অবশ্য তাঁদের এই পারিবারিক-সাংসারিক আবহাওয়ায় কতটা স্বচ্ছন্দ বোধ করছেন, তাই নিয়ে মাঝেমধ্যে প্রশ্ন জেগেছে সারদার মনে। কিন্তু ওসব সে নিজের মনেই চেপে রেখেছে। এমনিতেই বাড়ির ছোটবউ সে। বয়েসেও ছোট অনেক। তার ওপর বেশি কথা বলার ধাতই নয় তার।
শুধু দিন যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটা ব্যাপার টের পায় সারদা। কী অসাধারণ মানুষ তার পরমানন্দ স্বামীটি! ভাবে-জ্ঞানে-চেতনায়-অনুভবে অমন আকাশছোঁয়া অনাবিল মন যাঁর, তিনিই যে আবার গল্পে রসিকতায় গানে কৌতুকে কী করে এমন ঘরোয়া গ্রাম্য পরিবেশের সঙ্গে একান্ত হয়ে থাকতে পারেন, এটা তার মাথায় ঢোকে না।
কাছের থেকে মানুষটাকে দেখতে দেখতে সারদা ভাবে, বোঝে, প্রতিদিন সে একটু একটু করে সম্পৃক্ত হচ্ছে তাঁর ভাবধারায়। তিনি যেন একটা আলোর বৃত্ত রচনা করেছেন, আর কেন্দ্রে বসে থেকে নিঃসাড়ে তাকেও আকর্ষণ করে চলেছেন।
অথচ ভৈরবী ব্রাহ্মণী কি এই আনন্দময় পরিবেশ পূর্ণ উপভোগ করতে পারছেন। কিশোরী সারদা নিঃসংশয় হতে পারে না। আবার মুখেও বলতে পারে না। আনন্দের মধ্যে একটি সংশয়ের খচখচানি নিয়ে তার দিন কাটে!
