লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ – ৪

দূরত্বের হিসেবে এসব কিছু না, অথচ জয়রামবাটি আর কামারপুকুর দুটি স্থানের মধ্যে কোথায় যেন তফাত আছে। জেলার অন্তর্ভুক্তি পৃথক তো বটেই। জয়রামবাটি বাঁকুড়ায় আর কামারপুকুর হুগলি জেলার উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে। মাঝখানে আমোদর নদটিও আসলে শাখানদ। বর্ষায় ফুলে ফেঁপে উঠলেও হেমন্তের শেষ দিন থেকে শীর্ণ হতে শুরু করে। গ্রীষ্মকালে তো নেহাতই চর। নদের দুই তীরের দুই গ্রামে আবহাওয়ায়, প্রকৃতির তফাতও বোঝা যায় খেয়াল করলে।

জয়রামবাটির মাটি যেন ঈষৎ রুক্ষ, কাঁকুরে, লালচে। কামারপুকুর সে তুলনায় বালুময়, পেলব। উঁচু-নিচু ভাবও নেই। গাছপালা, শস্যক্ষেত্র অবশ্য দুই জায়গাতেই আছে। কিন্তু তুলোর চাষ আর তামাকপাতা জয়রামবাটিতেই দেখা যায়। গরমটা বেশি পড়ে জয়রামবাটিতে আবার ঠান্ডাও বোধহয়। তবে সারদা আর ক’বারই বা যাতায়াত করেছে! কিন্তু এটুকু সে বোঝে, জয়রামবাটির দারিদ্র্য আর কামারপুকুরের দারিদ্রের মধ্যেও পার্থক্য আছে। কামারপুকুরের অবস্থা অপেক্ষাকৃত ভাল। লাহা এবং হালদাররা সেখানকার বর্ধিষ্ণু পরিবার। চট্টোপাধ্যায়রাও সাত্ত্বিক ব্রাহ্মণ, সজ্জন, শিক্ষিত পরিবার। গদাধরের ঠাকুর্দা মানিকরাম আগে সপরিবারে ফেরে গ্রামে থাকতেন। সে জায়গা ছিল কামারপুকুর থেকে মাইল তিনেক দূরে। মানিকরামের পুত্র এবং গদাধরের বাবা ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে সেখানকার স্থানীয় জমিদারের মনোমালিন্য হয়। ক্ষুদিরাম জমিদারের হয়ে মোকদ্দমায় সাক্ষ্য দিতে অসম্মত হন। কিন্তু জলে বাস করে কুমিরের সঙ্গে সমঝোতা না করে থাকা যায় না। চট্টোপাধ্যায়রা তখন সপরিবারে কামারপুকুরে এসে বসবাস শুরু করেন।

ক্ষুদিরামের পরিবার পার্থিব দৃষ্টিতে ও বিষয়ে ধনী ছিলেন না, কিন্তু তাঁদের একটা সামাজিক ভূমিকা ও পরিচিতি নিষ্ঠাবান, আলোকপ্রাপ্ত পরিবার হিসেবে। স্থানীয় জমিদারের সঙ্গেও তাঁদের আন্তরিক সম্পর্ক ছিল। পূজাপার্বণ, ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে তাঁরাই পৌরোহিত্য করতেন অধিকাংশ ক্ষেত্রে। বিয়ের পরে মাত্রই কয়েক বার শ্বশুরবাড়িতে এসে সারদা এসব খবর জেনেছে। সম্মাননীয় গ্রামবাসী হিসাবে দারিদ্র্য থাকা সত্ত্বেও ক্ষুদিরামের পরিবার যৎকিঞ্চিৎ স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করতেন।

জয়রামবাটিতে মুখোপাধ্যায় আর তাঁদের মাতুল বংশ বন্দ্যোপাধ্যায়রাই ছিলেন সামাজিক ভাবে মাননীয়। আর্থিক সচ্ছলতা তাঁদের কোনও দিনই ছিল না। মাত্র শতখানেক বিভিন্ন জীবিকার পরিবার নিয়ে ছোট গ্রাম। তার মধ্যে নাপিত-গোয়ালা-কামার-ময়রা-বাগদিরাও ছিলেন। বাদ বাকিরা সবই প্রায় কৃষিজীবী। গ্রামে কোনও পাকা বাড়িও ছিল না। সংগতিহীন হলেও পারস্পরিক সৌহার্দ্য ছিল গ্রামবাসীদের মধ্যে। সম্ভবত জয়রামবাটি নামটিও মুখোপাধ্যায়দের কোনও আরাধ্য দেবতা কিংবা পূর্বপুরুষদের কারওর নাম থেকে দেওয়া হয়েছিল। সারদার ইদানীং মনে হয় কামারপুকুরে তার বিয়ে হওয়ার পর থেকেই যেন জয়রামবাটি আর কামারপুকুর দুটো গ্রামের নাম প্রায়ই লোকমুখে একসঙ্গে উচ্চারিত হয়।

কখনও কখনও সারদার মনে বেশ একটা খুশির সঞ্চার সে টের পায়। মুখে প্রকাশ করে না, কিন্তু বোঝে, তাদের দুই পরিবারের যে বৈবাহিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেটাকে কাছেপিঠের সাধারণ মানুষজন বেশ মান্য করেন। আর এই সব কিছুর মূলে যে সেই মানুষটাও আছেন, এটুকু ভেবেই তার সুখ। কাছেপিঠে না থাক, তবু তো তিনি রানি রাসমণির অত বড় মন্দিরের পূজারি। বড় ভাশুরও সেখানে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। কী আর করা যাবে, অল্পবয়সেই তিনি ইহজগতের মায়া কাটালেন। এখন তো সেই মানুষটার কাঁধেই বড় দায়িত্ব। তা হলেও শ্বশুর আর বড় ভাশুরঠাকুরকে চোখের দেখাও হয়নি বলে কষ্ট বাজে সারদার।

শ্যামাসুন্দরী যে শিক্ষা দেন, শ্বশুরবাড়ির সবায়ের সেবাযত্ন করবি, কিন্তু কারই বা সেবা করবে সারদা!

শ্বশুর, বড় ভাশুর নেই। মেজ ভাশুরও মাঝেমধ্যে দক্ষিণেশ্বরের পুরোহিত হয়ে কাজ করেন। যাতায়াতের মধ্যে থাকেন। অবশ্য বড় ভাশুরকে চোখে না দেখলেও তাঁর একমাত্র ছেলে অক্ষয়কে মনে আছে সারদার। ভারী ভাল ছেলে সে। বছর ছয়েক আগে যখন দেখেছেন, তখনই মনে হয়েছিল যেমন ভদ্র সভ্য, তেমনই সুদর্শন অক্ষয়। এখন নিশ্চয়ই পূর্ণ যুবক সে। রামকৃষ্ণরও বিশেষ প্রিয়পাত্র অক্ষয়। সেও এখন দক্ষিণেশ্বরে থাকে। বিষ্ণু মন্দিরের পুরোহিত সে।

মাত্র তেরো বছর বয়েসে সংসারের পুরো চেহারাটা তেমন স্বচ্ছ নয় সারদার কাছে। চাহিদা-প্রাপ্তি, আশা-নিরাশার বিষয়গুলোও তেমন বুঝে ওঠে না। তা সত্ত্বেও কখনও-সখনও মনে হয়, তার শ্বশুরবাড়ির মানুষদের যেন কামারপুকুর ছেড়ে দক্ষিণেশ্বরের দিকে যাওয়ার টান বেশি। এক এক করে সবাই তো চলে যাচ্ছেন। বড়দাদা মারা যাওয়ার আগে ‘তিনি’ দ্বিধান্বিত ছিলেন বেশ কিছুদিন। সারদা অনুমান করে, কিছু একটা পরিবর্তন বোধহয় তিনি টের পাচ্ছিলেন নিজের মধ্যে। এমনিতেই সংসার সম্বন্ধে কিছুটা উদাসীন, গভীর ভাবুক মানুষ তিনি। কলকাতায় গিয়ে ঝামাপুকুরের গোবিন্দ চাটুজ্যের বাড়িতে, মিত্রদের বাড়িতে কিছুদিন পুজো-আর্চা করা, চতুষ্পঠী টোলে কিছুদিন থাকলেও শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়েছিলেন রানিমার মন্দিরে। সেখানে ভবতারিণী মায়ের প্রতিষ্ঠা, সামনে বহমান পুণ্যসলিলা গঙ্গা, নির্জন পঞ্চবটীর উদ্যান— এই সব মিলেমিশে মানুষটার ভাবনাচিন্তাকে হয়তো প্রভাবিত করেছিল। পরিবেশের একটা প্রভাব তো থাকেই।

বুদ্ধিমান আর বাস্তববাদী হৃদয় পৌঁছে গিয়েছিল তখন। ছোটমামাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে সে-ই রাজি করিয়েছিল মায়ের পুজোর দায়িত্ব নিতে। অবশ্য রানিমা আর বিশেষ করে মথুরবাবুর ঐকান্তিক আগ্রহ ছিল বলেই সেটা সম্ভব হয়েছিল। সারদা জানে এখন তো মথুরবাবুই তাঁর রসদদার। কী চোখে যে তিনি তাঁকে দেখেছেন, একটু-আধটু শুনেছিল সারদা। মথুরবাবু নাকি তাঁকেই স্বয়ং ঠাকুরজ্ঞানে শ্রদ্ধাভক্তি করেন। ইতিমধ্যে কাশীর রেল যোগাযোগ চালু হওয়ার পরে মথুরবাবুর উদ্যোগে একবার তীর্থও করে এসেছেন রামকৃষ্ণ। এর পরে অক্ষয়-ও চলে গেল দক্ষিণেশ্বরে। একেই সে পিতৃহীন, তা ছাড়া ছোটকাকারও যথেষ্ট দুর্বলতা তার ওপর। হয়তো ছোটছেলে আর বড় নাতির আকর্ষণেই শেষ পর্যন্ত নিজেকে আর কামারপুকুরে টিকিয়ে রাখতে পারছিলেন না চন্দ্রমণি। তিনিও চলে গেলেন।

সারদা ভাবে, কে জানে, একদিন তারও ঠিকানা দক্ষিণেশ্বর হবে কি না! অবশ্য তিনি যেখানে আছেন, সে জায়গা তো এমনিতেই তারও ঠিকানা। তা হলেও তিনি যে অন্য মাপের মানুষ! তারও পর মায়ের মন্দির বলে কথা। ডাক না হলে অত দূরের পথ ভেঙে তার কি আর যাওয়া হবে। দেখা যাক। তাড়াহুড়ো মাথাব্যথা কিছু তো নেই। বরং মাঝেমধ্যে এরকম কামারপুকুরে আসতে পারলেই ভাল লাগে সারদার। জয়রামবাটির টানও কি কম? বাবা-মা-ভাইবোন-পাড়া-প্রতিবেশী তো আছেই। তা ছাড়াও আরও কিছু কি নেই? অভাব-দারিদ্র্য-গরম-দুর্ভিক্ষ-পরিশ্রম… এসব সত্ত্বেও নিজের জন্মভূমির জন্য কোথায় যেন একটা নাড়ির টান থাকে না মানুষের! মুখে প্রকাশ করা যায় না, লোককে বলেও বোঝানো যায় না, অথচ, হয়তো একটা গাছ কিংবা কোনও একটা নির্জন পুকুরের পাড় কিংবা শিমুল পাতার ফাঁক দিয়ে দেখা কোনও একটা জ্যোৎস্না রাতের চাঁদ… এসমস্তও কি প্রাণের সঙ্গে নিজের জন্মভূমিকে জড়িয়ে ফেলে না! দৃশ্য-স্মৃতি-আবহাওয়া-গন্ধ— এসব!

আমোদর নদ পেরিয়ে অমরপুর গ্রামের নির্জন রাস্তা দিয়ে গোরুর গাড়ি করে কামারপুকুরে আসতে আসতে কত কথা ভাবল সারদা। এবড়ো-খেবড়ো রাস্তায় কতবার টাল খেল গোরুর গাড়ি। মাঝখানে আমোদরের চর পেরুনোর জন্য একবার নামতেও হল। আবার উঠে গিয়ে বসে পড়ল ছই-এর মধ্যে, ভাবনারাও বেশ দিব্যি সঙ্গে সঙ্গে চলছে। তেমন বিশেষ কিছু দরকারি ভাবনা তো নয়। যেমন মনে আসে, তেমনই ভাবে সারদা। আগে ঠিক এতসব কথা মনেও আসত না। টেরই পেত না, কোথা দিয়ে দিন আসে, যায়। এখন একটু একলা হওয়ার সুযোগ পেলেই, ভাবনারা আপনি আসে। আর মনটাকে দখল করে নেয়।

সত্যি বলতে কী ভাবনার সঙ্গে এই বন্ধুত্বটা বেশ ভালই লাগে সারদার। আবার হাসিও পায়। ভাবনার সঙ্গে কারওর বুঝি বন্ধুত্ব হয়! যা হোক, এরকম মনে আসাটাই বেশ মজার। অঘোরমণি, ভানুপিসি শুনলে খুব হাসবে।

ভানুপিসির মুখটাই চোখের ওপর ভেসে ওঠে সারদার। কালোর ওপর কী সুন্দর দেখতে ভানুপিসিকে। বড় বড় চোখ, একমাথা চুল, ভরাট গাল। অথচ কী দুঃখীর জীবন ওর! ওপর-ওপর দেখলে বোঝা যায় না। বরং উলটোটাই মনে হবে, যেন কত হাসিখুশি, হইহই ঠাট্টা-তামাশা করছে সর্বক্ষণ। কিন্তু সারদা তো জানে ওর মতন দুঃখী ক’টা আছে!

দু’-এক বছর আগে অবশ্য ও-ও কি আর কিছু বুঝত!

কামারপুকুর থেকে একবার ঘুরে যাওয়ার পরে, কী কথা হতে হতে ফস করে সারদা জিগ্যেস করে ফেলেছিল, ভানুপিসি, তুমি শ্বশুরবাড়ি যাও না কেন গো?

বছর দশেক বয়েস তখন সারদার। মুখে এমনিতেই এসে গিয়েছিল প্রশ্নটা। বিশেষ করে সেইবারই ও তৃতীয় কিংবা চতুর্থ বার সদ্য কামারপুকুর থেকে ঘুরে এসেছে বলে, শ্বশুরবাড়ি কথাটাই বারবার যাওয়া-আসা করছিল মাথায়। গল্পগাছা, হাসাহাসিও হচ্ছিল তাই নিয়ে। আর অঘোরমণি জয়রামবাটিতে না থাকলে, ভানুপিসিই তো আসলে তার সই।

প্রশ্নটা শুনে হঠাৎ যেন মুখটা অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল ভানুপিসির। অথচ সরল বালিকা সারদা যে সাংসারিক জটিলতার কিছুই না বুঝে একটা প্রশ্ন করে ফেলেছে, মুহূর্তেই ভানু তা টের পেয়েছিল। তাই সরাসরি উত্তর না দিয়ে, মুখের ভাবটা আবার পালটে বলেছিল, কেন যাব? আমি কি তোর মতন বোকা?

সারদা নিস্পাপ চোখে তাকিয়ে বলল, ওহ্‌, বোকারাই শ্বশুরবাড়ি গিয়ে থাকে?

ভানু নিজেকে চেপে রেখে বলল, তা ছাড়া আর কী? হাতি-ঘোড়া কী আছে শ্বশুরবাড়িতে?

কেন? গুরুজনরা আছেন, তাঁদের সেবা করলে পুণ্যি হবে।

তা হয় ঠিকই। কিন্তু সে তো পুণ্যিপুকুরে ডুব দিয়ে এলেও হয়।

ইস্‌-স, সে তো অন্যরকম। শ্বশুরবাড়ি আর পুণ্যিপুকুর বুঝি এক হল?

একটু উদাস স্বরে ভানু বলে, আমার কাছে তা-ই রে! সব জলে ভাসাভাসি।

কেন পিসি, বলো না?

ভানু আবার হালকা স্বরে বলল, ওরে পাগলি, বর না থাকলে শ্বশুরবাড়ি বলে মেয়েদের আর কিছু থাকে না।

সারদা বলল, ও মা, আমার বরও তো ছিল না। কিন্তু বাড়ি আর বাড়ির সবাই-ই তো ছিল। জান, আমার মেজ জায়ের ছেলের পরে একটা টুকটুকে মেয়ে হয়েছে, এবার গিয়ে দেখে এলাম। নাম লক্ষ্মীমণি।

ওহ্‌ তাই বুঝি? মেয়ে? মেয়ে হয়েছে…

সারদা টেরও পেল না, মেয়ে হওয়ার কথা কানে যাওয়ার পরেই ভানুপিসির গলাটা কেঁপে উঠল। কিন্তু একটু পরেই আবার গল্প পালটে বলল, পাগলি কি তোকে আর সাধে বলি! বর না থাকলে শ্বশুরবাড়ি গিয়ে কোনও মজা নেই।

আমি কিন্তু খুব মজা করেছি।

আর একটু বড় হ মা। বুঝবি, বর না থাকলে শ্বশুরবাড়িও পর।

সারদা তার পরেও বলেছিল, বুঝেছি। আবার যোগ করল, ভানুপিসি, তোমার বর বুঝি দক্ষিণেশ্বর কলকাতা থেকেও দূরে থাকে?

চোখের জল লুকোনোর জন্যই সারদাকে কোলের কাছে টেনে নিয়েছিল ভানু। বলল, এই তো, এতক্ষণে ঠিক বুঝেছিস। আমার বর না অনেক অনে-ক দূরে থাকে। সেই জন্যেই আর যাই না।

সারদার দশ বছরের বুদ্ধিমত্তা ওই অনে—ক শব্দটার টান শুনেই চুপ করে গিয়েছিল। আর প্রশ্ন করেনি।

আরও কতদিন পরে, মায়ের কাছ থেকে শোনার পরে সারদা টের পেয়েছিল, লক্ষ্মীমণি হওয়ার কথাটাতেই সত্যি কী অসম্ভব কষ্ট হয়েছিল সেদিন ভানুপিসির। একটা মেয়ে যে ওর নিজেরও হয়েছিল!

এত, এত বড় শাস্তি ঠাকুর কেন দেন মানষকে! মেজ ভাশুর আর জায়ের ছোট্ট মেয়েটাকে আগের বার দেখে এসে, কোলে নিয়ে, চটকে সারদারই তো এমন মায়া পড়ে গিয়েছিল যে, ফিরে আসবার সময় যেন বুক ভেঙে যাচ্ছিল। বাড়ির গোরুটার বাচ্চা হওয়ার পরেও দেখেছে, কী মায়া আর টান বাছুরটার জন্য। সারাক্ষণ চেটে গা পরিষ্কার করে দিচ্ছে। আদর করে সারদাও একটু গায়ে হাত বুলোতে গেলে মা-টা শিং নেড়ে নেড়ে ড্যাবড্যাব করে তাকাত। যেন সাবধান করে দিত, আমার বাচ্চার গায়ে বেশি হাত দিয়ো না, নোনা লেগে যেতে পারে— খুব আলতো করে কিন্তু…!

আর ভানুপিসির নিজের মেয়েটাই বাঁচল না! কী কপাল ওর!

ক্ষেত্র বিশ্বাস অল্প বয়েসেই বিয়ে দিয়েছিলেন, আদরের মেয়ে মানগরবিনীর। জয়রামবাটির দক্ষিণ-পশ্চিমে ফুলুই শ্যামবাজার গ্রাম। সেখানকারই পালটি ঘরে বিয়ে হয়েছিল ভানুর। অথচ কুড়ি বছরের মধ্যেই সব শেষ! মেয়েটাও বাঁচল না, স্বামীও মারা গেল। বিধবা ভানুপিসির নির্জন জীবন কাটছে বাপের বাড়িতে। তাও খুব নির্ঝঞ্ঝাটে নয়।

ভানুপিসির শ্বশুরবাড়ি ফুলুই-শ্যামবাজার ছিল বৈষ্ণবপ্রধান গ্রাম। সব চলে যাওয়ার পরে ভানু শুধু ওইটুকুই সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল, বাকি জীবনের পাথেয় হিসেবে— বৈষ্ণব ভাব। কিন্তু ওর দাদা নামে গৌর হলেও, বিধবা বোনের এই গৌর ভক্তির জন্যই অহরহ হেনস্থা করে। আসলে হয়তো গলগ্রহ বলেই ভাবে।

মনে মনে ঠিক করে রাখে সারদা, জয়রামবাটিতে ভানুপিসি যেমন তার আপন, তেমন আপনজনের মতোই তাকে আশ্রয় দিয়ে যাবে সারদা সারা জীবন। তার নিজের হয়তো ক্ষমতা কিছুই নেই, তবু দুটো জুড়োনোর কথা তো বলতে পারবে। মানুষের দুঃখ-কষ্ট-শোক-তাপ-লাঞ্ছনা দেখতে দেখতেই এখন থেকে সারদার মনে হয়, ঠাকুর যেন ওইটুকুই আশীর্বাদ করেন তাকে। দুঃখী মানুষকে যেন কাছে টেনে নিতে পারে।

রামচন্দ্র ঢুলছিলেন। প্রথম দিকে খানিকক্ষণ বকর বকর করার পরেই আস্তে আস্তে সারুর তোরঙ্গটায় ঠেসান দিয়ে ঝিমোচ্ছিলেন। শুনশান ফাঁকা রাস্তা, একঘেয়ে চাকার ক্যাঁচোর-কোঁচর শব্দ, গোরুর গলার ঠুনঠুন ঘণ্টা আর হেমন্তের মোলায়েম রোদ মিলেমিশে চোখ দুটো জুড়ে এসেছিল। দোষ নেই। পুরোহিত মানুষ। চিরকাল ভোর ভোর শয্যা ত্যাগ করার অভ্যাস।

সারদার ডাকেই ঘুমের চটকা ভাঙল রামচন্দ্রের।

ও বাবা, আর কত ঘুমুবে? হাটতলা ফেলে এলাম যে!

চোখ মেলেই রামচন্দ্র বললেন, কই ঘুমুইনি তো! হাটতলা এসে গ্যাছে!

এসে যায়নি। ফেলে এসেছি।

মিটিমিটি হাসল সারদা। বলল, ঘুমোচ্ছ দেখে এমন মায়া হল যে, ডাকিনি। এবার ওঠো।

একটা হাই তুলে, মুখে অস্বস্তির হাসি মেখে রামচন্দ্র বললেন, ঘুমের আর দোষ কী বল মা! দেখি… কদ্দূর এলাম।

সারদা বলল, ওই তো বাঁয়ে হালদার পুকুরের জল দেখা যাচ্ছে। আর ডাইনে লাহাবাবুদের দালান কোঠা।

বেলার খানিকটা বাকি আছে তখনও। তা হলেও নিঝুম পল্লিগ্রামে গাছের ছায়ারা লম্বা হতে শুরু করেছে। তাপ নেই, হাওয়াও নেই। আকাশ দিব্যি পরিষ্কার। পাখিরা ওড়াউড়ি করছে। গোরুর গাড়ি থামতেই টুক করে লাফিয়ে নামল সারদা। আর ভাশুর-পো রামলালই প্রথম দেখতে পেল ওদের। আরও কয়েকটা ছোট ছোট ছেলের সঙ্গে খেলা করছিল। সারদাকে দেখেই বেলগাছের তলা দিয়ে উঠোনের দিকে ছুটল। মা, মা, খুড়ি আর দাদু এসে পড়েছে।

বাড়িতে বিশেষ কেউ ছিলেন না। এমনকী রামেশ্বরও যে তখন কামারপুকুরে রয়েছেন জানা ছিল না। ছেলের গলা পেয়েই মাটির ঘরের ভিতর থেকে রামেশ্বর আর জা শাকম্ভরী উঠোনে নেমে এলেন। সদর পেরিয়ে এসে মেজ ভাশুরকে দেখেই অনভ্যস্ত হাতে মাথায় ঘোমটা টানল সারদা। তারপর এগিয়ে গিয়ে প্রণাম করল। জা-কেও প্রণাম করতে যেতে, আগেই শাকম্ভরী ধরে ফেললেন সারদাকে। তারপর জড়িয়ে ধরে বললেন, হ্যাঁরে সারু বছর খানেকের মধ্যে তুই এত বড় হয়ে গেছিস। গতবারেও তো দেখলুম এত্তটুকুন… আয়… ঘরে আয়।

রামচন্দ্রকেও ডাকল, আসুন, ঠাকুরমশাই।

রামচন্দ্রকে প্রণাম করল রামেশ্বর-শাকম্ভরী। দেখাদেখি সারদাও প্রণাম করল বাবাকে।

ছোট জা-কে নিয়ে দাওয়া পেরিয়ে ঘরে ঢুকল শাকম্ভরী। চাটাই বিছিয়ে বসল রামেশ্বর আর রামচন্দ্র। খুব বেশি সময় নেই রামচন্দ্রের হাতে। বেলা ছোট হয়ে এসেছে। আঁধার নামার আগেই তাঁকে জয়রামবাটি পৌঁছতে হবে।

তা হলেও কুটুম্বিতা বলে একটা ব্যাপার আছে। মা চলে গেছে দক্ষিণেশ্বর। কামারপুকুরের বাড়িতে কর্তা বলতে রামেশ্বরই। রামলালকে দিয়ে আগেই বোঁদে আর জিলিপি আনিয়ে রেখেছিলেন। ভাইয়ের শ্বশুরকে হাতমুখ ধোওয়ার জল দিয়ে, ঘরের দিকে মুখ করে ডাকলেন, কই গো, ঠাকুরমশাইকে জল-মিষ্টি কিছু দাও। ওঁকে যে আবার ফিরতে হবে।

নির্জন বাড়িতে অনেক দিন পরে ছোট জা-কে পেয়ে শাকম্ভরীও খুশি। বিশেষ করে শাশুড়ি আর বড় ভাশুর-পো দক্ষিণেশ্বর চলে যাওয়ার পর থেকে বড্ড একা হয়ে পড়েছেন তিনি। তা ছাড়া, আগের বার তিনি যখন সারদাকে দেখেন, তার থেকে এবার সে পালটে গেছে অনেক। চেহারা, কথাবার্তা সবেতেই বড় বড় ভাব হয়েছে সারদার। আপনা থেকেই অনেক কথা এসে যাচ্ছে তাঁর।

ওদিকে কথাবার্তার মধ্যেই সারদার চোখ গেছে ঘরের আর-এক পাশে। সাড়ে তিন বছরের ছোট্ট মেয়েটাই যে লক্ষ্মীমণি তা সে দেখামাত্র চিনেছে। আর নিঃশব্দে গুটগুট করে এসে দাঁড়িয়ে লক্ষ্মীও কিছুটা খুশি, কিছুটা বিস্ময় নিয়ে চেনা অথচ চেনা নয় এমন দৃষ্টিতে খুড়িমাকে দেখছে। সারদাই এগিয়ে গিয়ে কোলে টানল ভাশুরঝিকে। আর মুহূর্তের মধ্যে হাসিতে আদরে খুশিতে বছর খানেক অদর্শনের অচেনা ভাব, দূরত্ব ঘুচে গেল। ছোট্ট কাকিমার গলা জড়িয়ে ধরল লক্ষ্মীমণি।

শাকম্ভরী বললেন, ও যে কী কথা কইতে শিখেছে, দেখিস সারু। এখন থেকে দাদার বই শ্লেট নিয়েও ওর টানাটানি।

সারদা বলল, হ্যাঁগো দিদি, এবাড়িতে লক্ষ্মীই তো আমার একমাত্র সই।

ওই একজনই তোর সারাদিনের পক্ষে যথেষ্ট হবে দেখিস। শিবু নেহাত ছোট আর ঠান্ডা না হলে আমি যে কী করতুম!

কথাটা বলেই বাইরে যাওয়ার জন্য ব্যস্ত হলেন শাকম্ভরী। বললেন, আচ্ছা তুই একটু রাখ ওদের। ঠাকুমশাইয়ের ফিরে যাওয়ার তাড়া আছে। আগে আমি ওঁকে জল দিয়ে আসি।

প্রথম কয়েকটা দিন মেজ ভাশুর আর জায়ের ছেলেমেয়েদের নিয়েই দিব্যি মেতে রইল সারদা। গত বছর এসে সে শিবরামকে দেখেনি। এখনও সে শিশু। মাত্র ছ’-সাত মাস বয়েস। জেগে থাকলে মায়ের কোল সে ছাড়তে চায় না। একটু একটু করে চেনাচিনিও শুরু হয়েছে তার। সুতরাং সারদা কোলে নিতে গেলেই কাঁদে। কিন্তু কয়েক দিন দেখতে দেখতে সেও বুঝে গেল, সারদা এবাড়িরই সদস্য। শুধু চোখের দেখা কি না কে জানে। শিশুরা বোধহয় গন্ধেও আপন-পর টের পায়। কিংবা স্পর্শে। শিবরামকেও কোলে নিয়ে ঘোরে সারদা। লক্ষ্মী আর রামলাল তো আছেই। লক্ষ্মীর এখন কথা বলার বয়েস। ছোট্ট খুড়িমার সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে সারাক্ষণ সে বকর বকর করে যায়। দুই ননদ কাত্যায়নী আর সর্বমঙ্গলার বিয়ে হয়ে গেলে, তারা চলে গেছে শ্বশুরবাড়ি।

মাঝেমধ্যে একটু ফাঁকা লাগলেও, কয়েক দিন পর থেকে পাড়া-প্রতিবেশীদের সঙ্গে আলাপ হতে শুরু করল সারদার। ধর্মদাস লাহার বিধবা মেয়ে প্রসন্নময়ী, চন্দ্রমণির ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তিনি এলেন। লাহা বাড়িরই ছেলে গয়াবিষ্ণু, গঙ্গাধরের ছোট বয়েসের বন্ধু। তার সঙ্গেও পরিচয় হল। আরও চেনা হল সীতানাথ আর দুর্গাদাস পাইনের বাড়ির লোকজনদের সঙ্গে। আলাপ করল চিনু শাঁখারির বাড়ির লোকরাও। এঁরা সকলেই চাটুজ্যে বাড়ির পুরনো পরিচিত মানুষ। বিশেষ করে গদাধর যখন রামকৃষ্ণ বলে পরিচিত হননি, তখন থেকেই এঁরা সেই ছেলেকে অন্য চোখে দেখতে শুরু করেছিলেন। এমনকী সারদার দেখা হয়ে গেল বুড়ি ধনী কামারনির সঙ্গেও। গদাধরের নাড়ি কেটেছিল ধনী কামারনি।

আগে আগে যতবার সারদা কামারপুকুর এসেছে, নানান গল্প শুনেছে। কখনও চন্দ্রমণির কাছে, কখনও তার স্বামীর কাছে। কিন্তু কত গল্পই বা আর শুনবে ওই বয়েসে! শুনতে শুনতে ঘুমিয়েই পড়ত মাঝে মাঝে। এবার শুধু যে খানিকটা চড়কো হয়েছে, তাই নয়। স্বাধীনতা পেয়েছে সারদা। এর-ওর-তার সঙ্গে মাঝেমধ্যে পাড়া বেড়াতে বেরুল, আর গল্প তো আছেই। তার নিজের মধ্যে কখনও কখনও যে একটা উদাস আর নির্লিপ্ত ভাবের উদয় হয়, তা নিয়ে সারদার খুব একটা মাথাব্যথা নেই; কিন্তু পাঁচজনের কাছে শুনতে শুনতে এই বারই সে টের পায়, তার স্বামী মানুষটা যেন ছোট থেকেই অন্যদের থেকে আলাদা। তার স্বভাব-কৌতূহল-কথা-আচরণ-মেলামেশা… সবকিছু ঠিক আর পাঁচজনের মতন নয়। যেন জন্ম থেকেই ওঁর সবকিছুতে একটা বিশেষত্ব আছে। পুরনো কথা শুনতে শুনতে কৌতূহল বাড়ে সারদারও। আর মনে হয়, শ্রদ্ধা-ভক্তি-ভালবাসায় কম দেখা মানুষটাই যেন ওর মনের সবটুকু দখল করে নিচ্ছে ক্রমশ।

ধনী বুড়ি মাঝেমধ্যে গল্প করতে আসে সারদার সঙ্গে। লাহা আর চাটুজ্যেদের বাড়ির কাছেই পুকুরধারে কামারদের বাড়ি। ধনী সেই বাড়ির বউ। অনেকেই চেনে ধনীকে। সে ছিল পাড়ার ধাই। কেউ কেউ তাকে ধনী বলেও ডাকে। চাটুজ্যেদের বাড়িতে ধনী বুড়ির অবাধ যাতায়াত, কেন না, গদাইয়ের আবার সে ধাইমা। চন্দ্রমণি দক্ষিণেশ্বর চলে যাওয়ায় বুড়ির মনটা খারাপ। তা হলেও মাঝেমধ্যে সে এবাড়িতে এসে কিছুক্ষণ বক বক করে যায়। সারদারও ধনীবুড়িকে বেশ লাগে।

বিকেলবেলা দাওয়ায় বসে মুড়ি খেতে খেতে গল্প করছিল সারদা ধনীবুড়ির সঙ্গে। দাঁত পড়ে গেছে বলে ভাল করে মুড়ি চিবোতে পারে না ধনী। মুখের মধ্যে নরম হতে সময় লাগে। এদিকে রোদ পড়ার আগে পায়ে পায়ে একটু বেরিয়ে আসার ইচ্ছে সারদার। সন্ধে হতে-না-হতেই আবার তুলসীতলায় পিদিম জ্বালতে হবে, রঘুবীরের থানেও ধূপধুনো দিতে হবে।

উঠেই পড়ল সারদা। বলল, ও মাসি, আর কতক্ষণ ধরে মুড়ি খাবে! রোদ পড়ে এল যে!

ধনী ফোকলা মুখে আস্তে আস্তে জিভ নাড়তে নাড়তে বলল, দাঁড়া বাপু, নরম না হলে কি মুড়ি গিলতে পারি এই বয়েসে?

একটু তাড়াতাড়ি করো, সারদা বলল। বেড়িয়ে আসি চলো।

এক ঢোক জলের সঙ্গে মুড়ি গিলে ফেলল ধনী। কাপড় দিয়ে ঠোঁটের কষ মুছে নিতে নিতে বলল, ও বউ, বলি যাবিটা কোথায় লো?

সারদা একটু কাছে সরে এল। কানের কাছে এসে বলল, যাব আর কোথায়? আগে দাওয়া থেকে নামো তো!

বুড়ির হাত ধরে উঠোনে নেমে সারদা আস্তে আস্তে আবার বলল, হ্যাঁ মাসি, সেদিন যে বলেছিলে, ‘ওঁর’ জন্মের কথা বলবে…

সারদার কথার মধ্যেই ফোকলা মুখের হাসি আর ঘোলাটে চোখ তুলে ধনী বলল, ও রে মেয়ে, বরের কথা শোনার খুব শখ বুঝি!

মৃদু শাসন করল সারদা। —আহ্‌, আস্তে কথা বলতে পার না! ঘরে দিদি আছে যে।

গদাইয়ের কথায় উৎসাহ পেয়েছে ধনীও। পায়ে পায়ে উঠোন দিয়ে এগুতে এগুতে বলল, বরের কথা শুনবি, তো লজ্জা কীসের রে! আর তোর স্বামী হলেও, সে কি যে-সে ছেলে মা? আয়, তোকে দেখাই।

বাড়ির পুবদিকে বেড়ার পাঁচিল। তারই মাঝামাঝি একটা টিনের দরজা। বেরিয়ে এসেই সোজাসুজি ঢেঁকিশাল আর ডানদিকে ধান সিদ্ধ করার জায়গা, উনুন। এখন আর সেদিকে বিশেষ কাজ হয় না, ঘর তোলা হবে বলে কথা হচ্ছে। ধনী বেড়ার কাছ থেকে হাত দেখাল। বলল, এই যে ঢেঁকি দেখছিস, ওর ওপরে তখন একটা ছাউনি ছিল, আর ওই পাশের জায়গাটায় ঘর ছিল। ধান সেদ্ধ করার ঘর তো! উনুন, জলের ব্যবস্থা সবই ছিল, তাই আঁতুড়ঘর হয়েছিল গদাইয়ের জন্মের সময়।

গভীর আগ্রহ নিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখল সারদা। আপন মনেই কপালে হাতও উঠে গেল। ধনী কামারনি লক্ষ করে বলল, এই যে ঢেঁকির পাশটা দেখছিস, এখানেই সে ভূমিষ্ঠ হয়েছিল। মাথা ঠেকিয়ে পেন্নাম কর দিদি। এ বড় পবিত্র জায়গা।

উবু হয়ে বসে ঢেঁকির পাশে মাটিতে মাথা ঠেকাল সারদা। উঠে বলল, মাসি, এত জায়গা থাকতে এই ঢেঁকির পাশে তিনি জন্মালেন?

দন্তহীন মুখে ধনী হেসে বলল, এ যে লক্ষ্মী ঠাকুরেরই জায়গা মা। আর সে নিজেই তো ঢেঁকি রে। বলে না, যে ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে! সে যে ক্ষণজন্মা পুরুষ মা। এখনই তার সম্বন্ধে যেসব কথা কানে আসে… মনে হয়, যেন যদ্দিন পৃথিবীতে মানুষ থাকবে, তার আর ছাড়ান নেই। তোর শাশুড়ির কোলে ছেলে হয়ে ঠাকুর জন্মেছে।

কিছুটা আনমনা আর অবাক হয়ে যায় সারদা এই সব কথা শুনলে। মানুষটা অনেকের থেকে আলাদা এটুকু সে বোঝে। কিন্তু ঠাকুর কিংবা ভগবান কী করে মানুষের শরীর নিয়ে পৃথিবীতে জন্মাবে, এটা সে বুঝতে পারে না।

কোনও কোনও মানুষই কি তা হলে আসলে ঠাকুর।

একটু পরে ধনীকে প্রশ্ন করল সারদা, আচ্ছা মাসি, তোমার কি জন্মের সময়েই ওনাকে ঠাকুর ঠাকুর মনে হয়েছিল?

তা যদি বলিস তো গল্প বলি শোন। বাড়ির হাত থেকে বেরিয়ে পুকুর পাড় দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ধনীবুড়ি বলল, আমি তো ছেলেকে খালাস করে তোর শাশুড়িকে নিয়ে ব্যস্ত। দু’মিনিট পরে ছেলে নিতে এসে দেখি, ও মা খোকা কোথায় গেল! দিশেহারা হয়ে এদিক-সেদিক দেখছি। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে মনে হল। হঠাৎ দেখি, উনুনের পাশেই গায়ে ছাই-টাই মাখা ছেলে দিব্যি পড়ে রয়েছে। হঠাৎ কী যে মনে হল মা… মনে হল স্বয়ং মহাদেবই যেন ছাইভস্ম মেখে একটু আগে ধরাধামে নেমে এসেছেন। বিশ্বাস কর মা… কত ছেলেমেয়েরই তো নাড়ি কেটেছি তখন… কিন্তু আর কখনও অমনটি মনে হয়নি।

সারদা অবাক বিস্ময়ে বলল, জন্ম থেকেই গায়ে ছাইভস্ম মাখা! সাধু হয়েই জন্মেছিলেন?

সাধু বল, ঠাকুর বল, আমার তো সেই রকমই মনে হয়েছিল মা। শুনেছিলাম, অবতাররা কখনও কখনও মর্তে আসেন, পাপীতাপী মানুষদের করুণা করতে। ওই ছেলেকে কোলে নিয়েই, কেন জানি না, মনে হয়েছিল, আমারই ইহকাল পরকাল ধন্য হয়ে গেল। আর তার পরের গল্প সবই তো শুনেছিস।

সারদা মাথা নেড়ে বলল, পরের গল্প তো এখনও শুনি। তবু ভাবছি… অমন জায়গায় ওভাবে জন্মালেন…

মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ধনী বলল, শুনেছি তো মা, সাহেবদের ঠাকুর যিশুখ্রিস্টও নাকি ওই রকম কোন কামারশাল না আস্তাবলে জন্মেছিলেন… আর তারার আলো এসে পড়েছিল ঘরের মধ্যে… সে আজ দেড়-দু’ হাজার বছর আগেকার কথা।

রোদ পড়ে আসছে। গাছপালা ঘেরা নিঝুম গ্রামে হেমন্তের বিকেল হলুদ মায়া আলোয় ভাসছে। পাখিরা কুলায় ফিরছে। শান্ত পুকুরের জলে নীল আকাশের ছায়া। পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে গভীরভাবে কত কী ভাবে সারদা। মানুষটাকে দেখা হয়নি অনেক দিন হয়ে গেল। খবরাখবর আসে মাঝেমধ্যে। স্বয়ং মা কালীকে তিনি দর্শন করেছেন, তাঁর সঙ্গে নাকি কথা হয়। মাঝে মাঝে তাঁর নাকি ভাবসমাধি হয় মাতৃদর্শন করতে করতে। ইদানীং তিনি আবার তোতাপুরী গুরুর কাছে বেদান্ত চর্চা করেন। এক ভৈরবী ব্রাহ্মণীর কাছে তাঁর নাকি তন্ত্রসাধনারও দীক্ষা হয়েছে।

একটু পরে ধনী বলল, চুপ হয়ে গেলি যে মা! কী ভাবছিস?

তাঁর কথাই ভাবছি মাসি৷ চোখে দেখিনি কতদিন হয়ে গেল তো!

দেখবি মা, দেখবি। সময় হলে তিনি নিজেই দেখা দেবেন। একটু থেমে ধনীবুড়ি আবার বলল, চোখে আর কতটুকুই বা দেখা যায় বল! মনে মনে আর অনুভবেই আসল দেখা। এই আমাকেই দ্যাখ না, চোখের মাথা খেয়ে বসে আছি, তবু একবার ভাবলেই মনে হয়, জলজ্যান্ত সব স্পষ্ট চোখের সামনে।

সারদা হেসে বলল, ও মাসি, তুমি কি চোখ বুজেও সব দেখতে পাও?

কিছুটা পাই মা। ধনী বলল, কিন্তু সেই দেখাটারই তখন নাম পালটে হয়ে যায় দর্শন।

হঠাৎ সারদা বলল, জান মাসি, আমিও না মাঝে মাঝে চোখ বুজলে, আমার জন্মের সময়কার সব যেন দেখতে পাই।

পাবি বই কী মা, পাবি বই কী!

বৃদ্ধা ধনী তার শীর্ণ, শিরা ওঠা হাত দিয়ে সারদাকে স্পর্শ করল। বলল, তোর জন্মের কথাও যে আমার জানা মা! আর সেই ছেলের সঙ্গে তোর বিয়ের গল্পও আমি শুনেছি। আমি জানি তুই কে।

মিটিমিটি হেসে সারদা বলল, কে, কে বলো তো আমি?

মাথার ওপর কাপড় টানতে টানতে ধনীবুড়ি বলল, মুখ্যু-সুখ্যু কামারনি আমি, তাই বলে মহাদেবের বউ কে, তা কি আর জানি না! মা-মা করে তোর কাছে আসি কি আর সাধে! তুইও যে সাক্ষাৎ…

থাক, থাক, আর বলতে হবে না তোমায়। গলার স্বর পালটে সারদা বলল, তো মাসি, তুমি তো তাঁরও ভিক্ষে-মা, তাই না?

জোড়হাত মাথায় ঠেকিয়ে ধনীবুড়ি বলল, কপালে ছিল মা। নয়তো, কামারবাড়ির বউ বলে বাদ পড়েই যাচ্ছিলাম। সে ছেলে কথা দিয়েছিল, পৈতের সময় আমার কাছ থেকে ভিক্ষে নেবে।

নিয়েছিলেন তো?

নিয়েছিল। কিন্তু কথা উঠেছিল তাই নিয়ে। বড়দাদা রামকুমার বললেন, চাটুজ্যেরা কুলপুরোহিত বামুন, কামারনির কাছ থেকে কী করে ভাই ভিক্ষে নেবে? কিন্তু গদাইও নাছোড়বান্দা। সে যে আমায় কথা দিয়েছিল! তখন আমাদের এই লাহাবাড়ির জমিদার, ধর্মদাস লাহা, বড়ঠাকুরের বন্ধু, বললে, জাতপাতের ব্যাপার থাকলেও, অনেক সৎ ব্রাহ্মণও অন্য জাতের বউ-ঝির কাছ থেকে ভিক্ষে নিয়েছে। তো জমিদারবাবুর ওপর বড়দাদা আর কথা বলতে পারল না। গদাই আমার ভিক্ষে নিল, আর তার প্রতিজ্ঞাও রইল। আমি তার ভিক্ষে-মা হলাম।

দিনগুলো ভালই কাটতে লাগল সারদার। এর আগে কয়েকবার এসে কেবল পালাই পালাই করত মন। একটু ভয় ভয় করত এদিক ওদিক যেতে। তেমন চেনাজানাও ছিল না কামারপুকুরের পাড়া-প্রতিবেশীদের সঙ্গে। হয়তো নিজে ছোট ছিল বলেও তেমন একটা আগ্রহ হত না লোকজনের সঙ্গে আলাপ পরিচয় করার। এবার এসে যেন তার চোখ খুলে যাচ্ছে। কৌতূহলের আর শেষ হয় না। শ্বশুরবাড়ি আর তার স্বামীকে নিয়ে যে এত গল্প আছে কিছু জানত না সারদা।

মেজ জা শাকম্ভরী ঘর সংসারের এটা সেটা গল্প করে। কিন্তু সে-ও এসেছে অন্য পরিবার থেকে। তা ছাড়া রামলাল-লক্ষ্মীমণি আর শিবু তিন ছেলেমেয়ে, সংসার, স্বামী সব মিলিয়ে সারাক্ষণ ব্যস্ত সে। মাঝে মাঝে আর-একটা কথাও মনে হয় সারদার। তার যেন ঘরসংসারের চেয়ে অন্য কথা গল্প—মানুষের সঙ্গে যোগাযোগেই আগ্রহ বেশি।

ধনীবুড়ির মতন প্রসন্নময়ীকেও খুব ভাল লাগে সারদার। প্রসন্নময়ী বিধবা, প্রায় তার শাশুড়িস্থানীয়া, খুবই স্নেহ করেন সারদাকে। বয়েসের তফাত যথেষ্ট হলেও দিব্যি ভাব জমে গেল দু’জনের। মাঝে মাঝে এপাড়া ওপাড়ায় সারদাকে সঙ্গে নিয়ে বেড়াতে যান প্রসন্নময়ী। পুরনো দিনের মানুষ বলেই তাঁর চেনাজানা বেশি। কয়েক দিন ঘুরে ঘুরে অনেক কিছু দেখিয়ে দিলেন সারদাকে। কৌতূহলের শেষ নেই তারও। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নানান প্রশ্ন করে যায় সারদা। একটু একটু করে তার চোখ ফোটে। জ্ঞানের ঝুলি ভরে অভিজ্ঞতা বাড়ে প্রতিদিন। কামারপুকুর জায়গা, লৌকিক অলৌকিক কাহিনি, শ্বশুরবাড়ি আর পাড়া-প্রতিবেশী মানুষদের কথা শোনে, আর সব কিছুর মধ্যে দিয়ে সেই একটি মানুষকেই উপলব্ধি আর অনুধাবন করার চেষ্টা করে। কীভাবে তাঁর একটা উদার সৎ ঐশ্বরিক ছবি মনের মধ্যে গাঁথা হয়ে যায়।

কামারপুকুরের উত্তর-পশ্চিম আর উত্তর-পুব সীমান্তে ভুতির খাল আর বুধুই মোড়লের শ্মশান দেখেছে সারদা। ভুতির খালের জলই আবার আঁকাবাঁকা স্রোতে গিয়ে মিশেছে তাদের আমোদর নদের সঙ্গে। তাদের বিয়ের আগে একটা সময় তিনি বৈরাগ্য সাধনার জন্যই ওই দুই শ্মশানের নির্জনতায় একা গিয়ে বসে থাকতেন।

হঠাৎই একবার বিদ্যুচ্চমকের মতন একটা প্রশ্ন জেগেছিল সারদার মনে।

তিনি যদি বৈরাগ্য সাধনাই করতেন, তা হলে আবার লৌকিক আচার মেনে বিয়ে করতে গেলেন কেন সারদাকে!

বৈরাগ্য তো সংসারহীন সাধু-সন্ন্যাসী মানুষদেরই ভূষণ বলে শুনেছে সারদা। তা হলে? তিনি কি সংসারের পথে যেতে চান না? সংসার কথাটার ব্যাখ্যা, ব্যাপ্তি, অর্থ কি তাঁর কাছে অন্য রকম? না কি একটা সাংসারিক পরিচয়, আবহ আর পরিমণ্ডলের আওতায় নিজেকে রেখেও, কীভাবে বৈরাগ্য আর উচ্চমার্গের সাধনভজন করা যায়, মানুষকে সেটা শেখাবার জন্যই তাঁর ওই সিদ্ধান্ত।

কিছুক্ষণের জন্য কেমন একটা ঝিম ধরানো ভাব হয়ে গিয়েছিল সারদার। ওপরে শান্ত অথচ ভিতরে দিশেহারা। আর ঠিক তখনই কি তাঁর সদাশিব, সৌম্য মুখটা মিটিমিটি হাসি নিয়ে ধারাবাহিক ছবির মতন ভেসে যাচ্ছিল না তার চোখের ওপর দিয়ে। হ্যাঁ, খুবই স্পষ্ট, একেবারে জ্যান্ত সেই মুখ। যেন ধরতে চাইলেই ধরা যায়।

কিন্তু না। তিনি দেখা দিলেন, হয়তো দেখেও গেলেন। অথচ অধরা হয়ে রইলেন। সারদার কিছুই বলা হল না।

বিদ্যুচ্চমকের মতন যে প্রশ্নের উদয় হয়েছিল সারদার মনে, ভাবনার আকাশে ঝিলিক দিয়ে বিদ্যুতের মতোই তা আবার মিলিয়ে গেল। কিছু একটা রেশ রেখে গেল কি? ঠিক উত্তর কিছু পাওয়া গেল না বটে, কিন্তু এমন ভাবনা ধরানোর মতন প্রশ্ন যে আপনাআপনি তার মাথায় আসতে পারে, সেটুকু ভেবেই নিজেকে বেশ অন্য রকম মনে হল সারদার। একটু হাসিও পেল, আর একটু একটু বড় হচ্ছে বলেও মনে হল।

আসলে এমনভাবে যে তাঁকে দেখা গেল, সেটাও তো কম আনন্দের নয়। সারদা টের পেল, দেখা নয়, সেই যে ক’দিন আগে ধনী-কামারনি বলেছিল, এটা হচ্ছে সেই দর্শন। মনে একটা দ্বন্দ্ব, খটকা রয়ে গেল অথচ বেশ ভাল লাগল তার। তা নয় তো, এই তেরো বছর বয়সে, সংসার-বৈরাগ্য এসবের সে বোঝেটাই বা কী? আন্দাজ করলেও কতটুকু!

এইবারই কামারপুকুরে এসে সারদার কয়েকবার মনে হয়েছে, আলোছায়া মেশা কিছু কিছু শব্দ যেন হঠাৎ হঠাৎ শরীর পেয়ে যাচ্ছে তার ভাবনায়, বোধে। স্থায়ী হচ্ছে না, খুব ঝকঝকে স্পষ্টও না। যেন এখনকার সকালের হিমকুয়াশার মতন। তলিয়ে আর-একটু ভাববার আগেই উবে যায়, তা হলেও শিশির বিন্দুর মতন কিছু চিকচিক করে আরও কিছুক্ষণ তার মনের বাগানে। সুখী সুখী কাঁথার ওমে তাদের আর একটু ধরে রাখারই কি উপায় আছে। লক্ষ্মীমণি গুটি গুটি এসে দখল নেয় ছোট্ট খুড়ির কোলের মধ্যে। তারপরেই শুরু হয় মেয়ের বকবকানি। আদর আর আবদারের ঝাঁপি খুলবে, খিলখিল করে হাসবে।

ভাল লাগে, বেশ ভাল লাগে সারদার। শুধু অন্য রকম ভাবনা আর শব্দগুলো তলিয়ে যায় মনের কোন গভীরে। তখনই আর মনে পড়ে না। কিন্তু ভেসে ওঠে আবার কখনও একা হলে। মনে মনে নাড়াচাড়া করে বৈরাগ্য-দর্শন—সাধনা—শক্তি—বিশ্বাস—এইরকম শব্দগুলো নিয়ে। আরও ভাবে, এর পর যখনই তাঁর সঙ্গে দেখা হবে, সোজাসুজি তাঁকেই জিগ্যেস করবে।

কয়েক দিন থাকতে থাকতে এখানকার জীবনযাপনে এবার বেশি অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে সারদা। ঘুম থেকে উঠে হাতমুখ ধুয়ে কাপড় পালটে প্রথমেই যায় গৃহদেবতা রঘুবীরকে প্রণাম করতে। পুবমুখী মাটির চালাঘরটাই তাঁর থান। প্রয়াত শ্বশুরঠাকুর ক্ষুদিরাম যে এই রঘুবীর শালগ্রাম শিলা স্বপ্নে পেয়েছিলেন, সে কাহিনিও সারদা জানে।

যজমানি সেরে গ্রাম্যপথে ঘরে ফিরছিলেন ক্ষুদিরাম। গরমের দিন, প্রখর তাপে জ্বলছে প্রকৃতি। ক্লান্ত, অবসন্ন ক্ষুদিরাম বিশ্রাম নেওয়ার জন্য বসে পড়লেন একটা গাছতলায়। শরীর আর বইছিল না। ছায়া আর হাওয়ার স্পর্শে ঘুমিয়েই পড়লেন। আর ঘুমের মধ্যে হঠাৎ দেখেন, তাঁর আরাধ্য দেবতা স্বয়ং রামচন্দ্র এসে দাঁড়িয়েছেন সামনে। একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে তাঁর হাত প্রসারিত। পরিষ্কার শুনতে পেলেন ক্ষুদিরাম, ঠাকুর বলছেন, ওরে, আমি যে সেবা-যত্ন-খাদ্যহীন হয়ে অনেক দিন পড়ে আছি এখানে। তুই আমাকে উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে রাখ—এই আমার ইচ্ছে।

আবেগে অশ্রুতে ভেসে গেলেন ক্ষুদিরাম। কিন্তু তিনি যে দরিদ্র ব্রাহ্মণ, নিজের সংসার চালাতেই প্রাণান্ত। হাতজোড় করে বললেন, প্রভু, আমার নিজেরই যে হতদরিদ্র অবস্থা, ভাঙা মাটির ঘরে কায়ক্লেশে দিন যাপন করি। আপনাকে নিয়ে আমি কোথায়ই বা রাখব, কী দিয়েই বা সেবা করব।

রামচন্দ্র বললেন, কিন্তু আমি যে তোর গৃহদেবতা হয়েই থাকতে চাই।

ক্ষুদিরাম বললেন, ঠাকুর, সম্বলহীন দীন ব্রাহ্মণকে এ আপনি কী পরীক্ষায় ফেললেন! এ কাজ যে আমার অসাধ্য!

রঘুবীর বললেন, ভয় পাস না। সৎ আর ভক্ত মানুষের কাছে অসাধ্য বলে কিছু নেই।

কিন্তু সেবা করতে যে ত্রুটি হয়ে যাবে ঠাকুর।

রামচন্দ্র বললেন, ভগবান কখনও সত্যি সত্যি ভক্তর কোনও দোষ দেখেন না। শুধু আমায় নিয়ে চল।

ঘুম ভেঙে ক্ষুদিরাম দেখেন তাঁর চোখ জলে ভেসে যাচ্ছে, বিশ্বাস করতে পারছেন না, যা দেখলেন শুনলেন, তা স্বপ্ন না সত্যি! কৌতূহলবশতই পথ ছেড়ে আগাছার জঙ্গলে নামলেন। আর একটু খোঁজাখুঁজি করতেই পেয়ে গেলেন শালগ্রাম শিলা। কিন্তু কাছে যাবেন কী করে! এক বিরাট সাপ ফণা তুলে সেই শিলাকে আগলে রেখেছে। বুক ধকধক করছে ক্ষুদিরামের। আর এগুবেন কি না ভাবছেন। তার মধ্যেই দেখলেন, সাপটা নিঃসাড়ে ফণা নামিয়ে গর্তের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে।

আর থাকতে পারলেন না ক্ষুদিরাম। পরম শ্রদ্ধায়, মমতায় কোলে তুলে নিলেন শালগ্রাম শিলা। মাথায় ঠেকালেন। পাথরের ওপর কারুকাজ দেখে নিশ্চিন্ত হলেন, এই তাঁর আরাধ্য রঘুবীর। বাড়িতে নিয়ে এসে তাঁকে অধিষ্ঠিত করলেন। সেই থেকে প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে আছেন।

শ্বশুরবাড়ির আচার-আচরণ সারদারও অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে।

পুজো দিয়ে এসে কিছুক্ষণ লক্ষ্মীমণি আর শিবুকে নিয়ে খেলা করে সারদা। রামলাল বই-শ্লেট নিয়ে পাঠশালায় চলে যায়। রামেশ্বরও বেরিয়ে যান পুজো-আর্চা করতে। কোনও দিন সে একটু বর্ণপরিচয় নিয়ে নাড়াচাড়া করে। জয়রামবাটিতে ঘরে-বাইরের কাজ আর ভাইদের দেখতে গিয়ে পড়তে পারে না সারদা। অথচ একটু-আধটু না শিখলে তো রামায়ণ-মহাভারতও পড়তে পারবে না। মনে মনে ঠিক করে, লক্ষ্মী আর একটু বড় হলে, ওর সঙ্গেই সারদাও লেখাপড়া করবে।

জা-এর সঙ্গে রান্না-বান্নাতেও হাত লাগায় সারদা। তার স্বামী যে ভোজনরসিক একথা জেনেছে সে। তাদের জয়রামবাটির রান্না ভালই করতে পারে। কিন্তু এবাড়ির রুচি, পছন্দগুলোও শিখে নিতে চায়। কোন ডাল, কোন তরকারিতে কী ফোড়ন দিতে হয়, গভীর আগ্রহে সেই সব লক্ষ করে সারদা। তার মধ্যেই পাড়া-প্রতিবেশীরা কেউ এসে গেলে একটু গল্পগুজবও হয়।

শুধু পুকুরে ডুব দিয়ে চান করার কথাটাই কাউকে বলতে পারে না সারদা। অথচ বাড়ির উলটো দিকেই হালদার পুকুর। টলটলে জল, শরতের বৃষ্টির পর এখনও প্রায় কানায় কানায় ভরা। গাছ-গাছালির ছায়ায় তিরতিরে স্রোত। খিড়কির দোর দিয়ে বেরিয়ে সংকীর্ণ পথটুকু পেরিয়ে গেলেই পুকুরঘাট। খুব ইচ্ছে করে ঝাঁপিয়ে পড়ে কিছুক্ষণ হুটোপাটি করে আসে।

কিন্তু একা যেতে ভয় ভয় করে সারদার। এমনিতেই নিঝুম গ্রাম, বাড়িতেও লোকজন বিশেষ নেই। চারদিকে শান্ত পরিবেশ। অত বড় পুকুরে একা নামতে ভয় করারই কথা। তা ছাড়া একটু বড় হয়েছে বলে লজ্জা লজ্জা ভাবও আছে। কয়েকজনের সঙ্গে গেলে ঠিক আছে। আলাদা করে তাকে আর কে-ই বা লক্ষ করবে! তা নয়তো বাড়ির বউ, একা নাইতে যাওয়াটা কি ভাল দেখায়?

একদিন তা সত্ত্বেও তৈরি হল সারদা। শাড়িটা গাছকোমর করে বেঁধে, গামছা নিয়ে, মাথায় ঘোমটা দিয়ে খিড়কির দরজার কাছে এল। খুলে এদিক ওদিক দেখছে, যদি আর দু’-একটা বউ মেয়ে কেউ ঘাটের দিকে যায়। ও মা, হঠাৎই দেখে প্রায় তার বয়সি আরও চারটে মেয়ে চলেছে হালদার পুকুরের দিকে। এই সুযোগ। দরজা থেকে টুক করে বেরিয়ে পড়ল সারদা। মেয়েগুলো কারা, কোত্থেকে এল কিছুই জানে না, কিন্তু তাদের পিছু পিছু চলল সে। কিন্তু কয়েক পা এগিয়েই আরও অবাক সারদা। দেখে কী, পিছনেও ওই রকম আরও চারটে মেয়ে আসছে ঘাটের দিকে। মনে মনে খুব নিশ্চিন্ত হল। একবার ভেবে বেশ হাসিও পেল, সে যেন সত্যি সত্যি রাধা-ই। অষ্টসখী পরিবৃতা হয়ে স্নানে চলেছে।

মনটা খুশি হয়ে গেল পুকুরে চান করে। অতগুলো মেয়ে থাকায় সংকোচও কিছু ছিল না। শুধু তাই না। চান সেরে উঠে আসার সময় আবার একইরকম ভাবে চারটে মেয়ে আগে, আর চারটে পিছনে হাঁটতে হাঁটতে প্রায় বাড়ির খিড়কির দরজা পর্যন্ত এল। যেন পৌঁছেই দিয়ে গেল সারদাকে। বেশ মজা তো!

পরের দিন খানিকটা কৌতূহলই আবার টেনে নিয়ে এল সারদাকে খিড়কির দরজার কাছে সেই এক সময়ে। আর আশ্চর্য হয়ে দেখল, ঠিক সেই মেয়েগুলোই আবার চলেছে পুকুরঘাটে। পায় কে সারদাকে আর! বাক্য ব্যয় না করে সে-ও চলল চান করতে। আর তার পর থেকে যেন নিয়মই হয়ে গেল ওই ভাবে প্রতিদিন পুকুরে যাওয়া। কিন্তু কারওর কাছেই ও-ব্যাপারে মুখ খুলল না সারদা। কী দরকার! পল্লিগ্রামের ব্যাপার, নিস্তরঙ্গ উত্তেজনাহীন জীবনযাপন মানুষের। অন্য রকম একটু কিছু শুনলেই, এক কথা থেকে আবার পাঁচ কথা আলোচনা শুরু হয়ে যাবে। তার চেয়ে চুপচাপ এরকম যা চলছে, চলক।

কিন্তু কোনও কিছুই একটানা একরকম ভাবে চলে না।

দেখতে দেখতে প্রায় মাস দেড়েক সময়ও কেটে গেল। ঠান্ডা পড়েছে ভালই। শুকনো অথচ কনকনে হাওয়া বয়ে আসে উত্তর দিক থেকে। আর গাছপালাগুলোর পাতা ঝরতে ঝরতে ন্যাড়া হয়ে আসে পল্লিগ্রামের বন-জঙ্গল। উঠোন ঝাঁট দিতে গিয়ে সেই পাতাগুলোই আবার জমিয়ে রাখে মানুষ। কখনও আগুন পোয়ানো হয়, কখনও খেজুরের রস জ্বাল দেওয়ার জন্যও কাজে লাগে। এবাড়ির আশেপাশে বেশ কয়েকটা খেজুর গাছ দেখে আসছে সারদা সেই বিয়ের পর থেকে। এখন অবশ্য অধিকাংশ গাছেরই আগা চেঁছে ফেঁড়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে রস সংগ্রহ করে রাখার জন্য।

লোকজনের মুখে মাঝে মাঝে জয়রামবাটির খবরও কানে আসে সারদার। বুঝতে পারে ঘর-সংসার-ছেলেমেয়ে নিয়ে একা শ্যামাসুন্দরী একটু বেকায়দাতেই পড়ে গেছেন। ভাইগুলো তো ছোটই এখনও। আবার এদিকেও কিছুটা মায়া পড়ে গেছে সারদার। পাড়া-প্রতিবেশী মানুষগুলো বড় সহজ সরল আর ধার্মিক। রামকৃষ্ণর বউ বলে সারদার একটা পরিচিতিও হয়েছে এখন। সে মানুষটাকে চোখের দেখা না হলেও, তাঁর পরিচিত আর ছোটবেলার বন্ধুদের কাছ থেকে গল্প-টল্প শোনে সে। আর তাইতেই দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতন একটা তৃপ্তি হয়। কথাবার্তার মধ্য দিয়ে সঙ্গ অনুভব করে। কবে দেখা হবে জানে না, কাউকে জিগ্যেস করতেও ইদানীং সংকোচ হয়। তা হলেও ধনীবুড়ি, প্রসন্নমাসিরা প্রায়ই তাঁর কথা বলে।

বাপের বাড়ি আর শ্বশুরবাড়ির মধ্যে সে যে একটা টানাপোড়েনে আছে, তা ভালই বোঝে সারদা। অথচ এখনও ছোট বলে তার কিছু বলার নেই। তিনিও থাকেন দূরে, দক্ষিণেশ্বরে। সুতরাং গুরুজনদের কথাই মান্য করে চলতে হয়। এবাড়ি ওবাড়ি কথাবার্তা হওয়ার পরে যখন যেখানে তাকে যেতে, থাকতে বলা হয়, তাই করে সে। বড় হয়ে গেলেও মেয়েদের যেন একজন অভিভাবকের দরকার হয়, তা তিনি বাবা-স্বামী-দাদা যিনিই হন না কেন। আর সারদা তো সেই হিসেবে ছোটই।

এক সকালে সত্যি সত্যি ছোটকাকা নীলমাধব এলেন সারদাকে জয়রামবাটি নিয়ে যেতে। সঙ্গে বড়কাকার ছেলে সুয্যি। সুয্যিকে দেখে অনেক দিন পরে ভাল লাগলেও, এখানকার সবাইকে ছেড়ে যেতে খুব মন খারাপ হয়ে গেল। বিশেষ করে লক্ষ্মীর জন্য। বয়সে ন’বছরের ছোট হলেও, অধিকাংশ সময়টা ওই সঙ্গে সঙ্গে থাকত। যেমন কথা বলে মেয়েটা, তেমনই বুদ্ধিমতী। ছোটকাকিমাকে সে-ও ছাড়তে চায় না। ওদিকে এখন থেকে শিবুর দিকে হাত বাড়ালে সে-ও ঝাঁপিয়ে সারদার কোলে আসে।

কিন্তু নিরুপায় সারদা। তাকে বাপের বাড়ি যেতে হবে। মা-বাবা, ভাইদের মুখগুলোও মনে পড়ছে। পোঁটলা-পুঁটলি গুছিয়ে নিল সারদা। কামারপুকুরে ভাল ভাল মিষ্টির দোকান আছে। রামেশ্বর কুটুমবাড়ির জন্য জিবেগজা আর সাদা বোঁদে আনিয়ে দিলেন। বেরুবার আগে গৃহদেবতা রঘুবীরকে প্রণাম করে এল সারদা। মনে মনে বলল, ঠাকুর, এর পরের বার এসে যেন তাঁর দেখা পাই।

বেলা থাকতে থাকতে অমরপুরের ভিতর দিয়ে পায়ে চলার পথে জয়রামবাটি রওনা হয়ে গেল সারদা নীলমাধব আর সূর্যর সঙ্গে। তখন অবশ্য একবারও মাথায় আসেনি, কয়েক মাস পরেই আবার বেশ কিছুদিনের জন্য তাকে শ্বশুরবাড়ি এসে থাকতে হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *