৫
নীল জ্যোৎস্নায় ছলছল ভাব চারিধারে। আলোছায়ার রহস্যময় খেলা পঞ্চবটী ঘিরে। বাঁদিকে আকাশ ছোঁয়া মন্দিরের চূড়া। সামনে ধাপে ধাপে সিঁড়ি নেমে মিলিয়ে গেছে গঙ্গার জলে। ঝিরঝিরানো হাওয়া। কার সঙ্গে কথা বলেন সারদা! কথা তো নয়, গানই। কিন্তু গলা ছেড়ে বেরোয় না যে। ঠাকুর, সুরটি কেন দিলে না! তাতেই বা কী! ভাবের গান, ভাবেই গাওয়া। যার বাজে, সে শোনে। সে গায়। ভাবেরই কথা যেন। ‘আমি হেথায় থাকি শুধু গাইতে তোমার গান।’ কোন হেথায়? এই ধরাধামে, এই বিশ্বসংসারে।
অমন করেই যেন শব্দ বাজে। বাজতে বাজতে বয়ে যায় জল কল্লোলের সঙ্গে। বাব্বা, কী ঢেউ গো আজ! উথাল-পাথাল করে ভিজিয়ে একশা করে দিল! মাঝে মাঝে কষ্ট দাও কেন ঠাকুর? ঠান্ডা লেগে অসুখ করলে কে সামলাবে তোমার সংসার! হ্যাঁ, ভোররাতে ওঠার অভ্যাস তুমিই তো ধরিয়েছিলে। সে অভ্যাস আর যায়! আঁধার ফিকে হওয়ার আগেই তো যেখানেই থাকি কানের কাছে বাঁশির ফু… তোমার গান গাইতেই তো আছি ঠাকুর। ভেসে যাই… ভেসে যাই…। ও মা, কে কাদে গো!
ঘুমের চটকা ভেঙে ধড়মড় উঠে বসলেন সারদা। কোথায় চলে গিয়েছিলেন! কী সব ভাবছিলেন যেন!
এ যে নিজের গাঁয়ের বাড়ি, জয়রামবাটিতে! ভোররাত তো নয়, শীত শেষ হয়ে আসা পড়ন্ত বিকেল যে! লালচে হয়ে এসেছে দিনের আলো, গাছগাছালির ছায়া লম্বা হয়েছে, হাওয়ায় দামালভাব। দ্যাখো তো মেয়েটা কেঁদে কেঁদে সারা। তাইতো, রাধি-ই যে কাঁদে। ওই দ্যাখো কচি কচি হাত বাড়িয়ে উঠে আসছে মা-মা করতে করতে। কঁথাটা ভিজিয়েছিস বুঝি! ওহ্ হরি, শুধু কি কাঁথা… আমার কাপড়টাও ভিজিয়েছিস মা! তাই বলি, ভাসতে ভাসতে কোথায় চলেছিলাম মনে হচ্ছিল…।
উঠে বসে তাড়াতাড়ি তিন বছরের মেয়েটাকে কোলের মধ্যে টেনে নিলেন সারদা। গায়ের ওম পেয়েই মেয়ে চুপ। কার কাছে আর যাবে! পিসিমা বলে তো জানে না। পিসিমাই মা। বাবা নেই। মা পাগল। সেই যে চক্ষুবোজার আগে অভয় ঘোলাটে দৃষ্টি আর জড়ানো শব্দগুলো উচ্চারণ করে গিয়েছিল… ব্যস, আর কী! সামলাও সংসার।
রাধারানি, রাধু, রাধি… ওই এখন সব। অভয় চলে যাওয়ার মাস ছয়েকের মধ্যে মেয়ের জন্ম। ক্ষীণ একটা ধারণা ছিল সারদার— বাচ্চাটা জন্মানোর পরে সুরবালা হয়তো ঠিক হয়ে যাবে। নাহ্! সে আশা আর নেই। আজ আড়াই পেরিয়ে তিন বছর হতে চলল। মা-মেয়ের কোনও সম্পর্ক হল না। অভয় বোধহয় বিয়ের পরেই টের পেয়েছিল। তখনই জানত— দিদিই ভরসা। তা ছাড়া পাড়ার ছেলেদের ডাকাডাকিতে সুরবালার তো তখন থেকে নামই হয়ে গিয়েছিল পাগলিমামি মায়ের ভাই মামা, তার বউ মামি।
বিধবা বউটাকে দেখে কষ্টও হয় সারদার। কথাবার্তা, জামাকাপড় কোনও কিছুরই ছিরি নেই। মাথার চুল ঘেঁটে ন্যাড়া করে দেওয়া হয়েছে। কী ভাবে, কী করে, কী বলে কিচ্ছু ঠিক নেই। ভাইঝি তো আছেই। আবার পাগলি হলেও, ওকেই কি ছাড়তে পারেন সারদা! যেখানে যান সঙ্গে করে নিয়ে যান, নিয়ে আসেন। এ কোন দায়ে ঠেকালে ঠাকুর! জন্মের পরেই ভাবের দেখায় জানিয়ে দিয়েছিলেন— এই মেয়েটিকে দেখো, ও যোগমায়া।… তুমি তো বলে খালাস ঠাকুর… আমি কদ্দিন টানতে পারব! বয়েস বসে থাকছে না।
রাধুকে কোলে নিয়েই সারদা পাশ ফিরে দেখলেন, সুরবালা তখনও ঘুমুচ্ছে। একটু সন্দেহ হল। এমন অবেলায় এত ঘুম কেন! পাগলরা তো এমনিতেই কম ঘুমোয়। আবার কেউ কোনও ওষুধ-বিসুধ, শেকড়-বাকড় খাওয়ায়নি তো! শুধু তো ছুটকি মেয়ে নয়, তার মাকেও যে সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখতে হয় তাঁকে। একবার তো বদনগঞ্জের কোন মেলায়, নাকি, তরজা দেখতে গিয়ে ছাইপাঁশ কীসব গিলে এসেছিল। আর কী অবস্থা বউয়ের তারপর! মাথা ঘুরে পড়ে যাচ্ছে, হি হি করে হাসছে। তারপরেই ভলকে ভলকে সুরবালার বমি। সবাই যেন মজা দেখছে। অথচ সারদাই বুঝেছিলেন, পেটের ব্যথায়, কষ্টে মেয়েটা যেন মরে যাচ্ছে। সবাইকে বকুনি দিয়ে সরিয়ে, সুরবালাকে নিয়ে পড়লেন সারদা। মাথায় জল ঢেলে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে, ঘরে নিয়ে গিয়ে নিজেই কাপড়-চোপড় ছাড়িয়েছিলেন। আর এলিয়ে পড়ার আগের মুহূর্তে তিনিই দেখেছিলেন, কী করুণ আর্তি বউটার চোখে মুখে। পাগল মানুষ, বুঝিয়ে সব কথা বলতে পারে না, বললেও লোকে বিশ্বাস করে না।
মায়ের যত্নই দরকার ছিল সেদিন সুরবালার। সারারাত সারদা কোলের কাছে ভাইয়ের বউকে নিয়ে বসেছিলেন। রাধি তখন মোটে বছর খানেকের। নলিনী আর মাকুর কাছে খুড়তুতো বোনটাকে দিয়ে পাগলির শুশ্রূষা করেছিলেন। দু’দিন উঠতে পারেনি বউ। সারদা ছাড়েননি। মনে মনে ঠাকুরকে ডেকেছিলেন, আর বলেছিলেন, অসহায় মেয়ে, রক্ষে করো। ঠাকুর।
খেয়াল করেছিলেন সারদা, পাগল হলেও, কী একটা ভাব নিয়ে যেন সুরবালা তারপর থেকে তাঁকে দেখে। নেহাত বাড়াবাড়ি না হলে, মান্যিগণ্যিও করে। সারদা তখনই ঠিক করেছিলেন, পুরোকে তিরোলের ক্ষ্যাপা কালীর বালা পরাবেন। খবর পেয়েছেন, অনেকের মাথার গোলমাল নাকি তাইতে ভাল হয়েছে।
রাধুর ভিজিয়ে ফেলা কাঁথা সরিয়ে, নিজের কাপড় দিয়ে মেয়েকে সারদা জড়িয়ে নিলেন। তারপর ডাকলেন সুরবালাকে।
বলি ও সুরো, বেলা পড়ে এল মা। এবার ওঠ।
এক ডাকেই চোখ খুলল সুরবালা। ঘোলাটে দৃষ্টিতে এপাশ-ওপাশ দেখেই উঠে বসল। আলুথালু ভাব। হঠাৎ বলল, আমায় আগে ডাকোনি কেন দিদি?
সারদা বললেন, ডাকব কী, ঘুমে আজ আমিই তলিয়ে গিয়েছিলাম। তোর মেয়ের কান্না শুনেই…।
আমার কোথায়, ও তো তোমারই মেয়ে গো।
তা যা বলেছিস, সারদা বললেন, ঠাকুর তো দুনিয়াশুদ্ধ সবাইকে আমার ছেলেমেয়ে করে গ্যাছে।
সুরবালা কী ভাবতে ভাবতে বলল, দিদি, তুমি তো আমারও মা। তাই তো?
আচ্ছা তাই। নে, এবার ধর দেখি মেয়েকে। রোদ পড়ে গেল, গঙ্গাজলের ছিটেফিটে দিতে হবে তো! কাঁথাটা কেচে দিতে হবে।
সারদা রাধুকে এগিয়ে দিতে গেলেই, মেয়েটা হাত-পা ছোড়ে।— না, না, না, নেলি মা-র কাছে যাব না।
সুরবালার ন্যাড়া মাথা বলে, রাধু ওকে নেড়ি মা, আর পিসিমাকে মা বলে। তিন বছরের মুখে কথা ফুটেছে ভাল, কিন্তু র-কে ল বলে প্রায়ই। সারদা আপাত কোপে তাকান রাধুর দিকে।— ওরে মেয়ে, আবার মাকে নেড়ি মা বলে! বলেছি না কতবার, শুধু মা বলবি।
রাধু খিলখিল করে হাসে। বলে, না না, তুমি আমার শুধু মা। ও তো পাগলিমামি।
সারদা বলেন, ছি মা, নিজের মাকে অমন বলতে নেই। যা, মার কাছে যা… রাজ্যের কাজ আমার পড়ে রয়েছে।
রাধুকে সুরবালার কাছে এগিয়ে দিতে দিতে সারদা ভাবেন, ছেলেদের আর পাড়া-প্রতিবেশীদের সবাইকেই এবার বলে দিতে হবে— কক্ষনও যেন সুরবালাকে পাগলিমামি না বলে। ও কী কথা! মানুষের অসুখ কিংবা খুঁত কি তার পরিচয় হতে পারে! সে যে এমনিতেই কত দুঃখী। ডেকে ডেকে আবার কষ্ট দেওয়া কেন!
একটু জোর করেই রাধুকে সুরবালার কোলে বসিয়ে দিলেন সারদা। উপায় নেই। জয়রামবাটিতে যতদিন থাকেন, ততদিনই তাঁর জীবনযাপন সাংসারিক দায়িত্বের আর পরিশ্রমের। আগে আগে সব কাজই একা হাতে করতে হত, এখন তবু হরি-কৃষ্ণলাল-সতীশ-রাসবিহারীরা পালা করে করে ব্রহ্মচর্য জীবন পালন করার জন্য তাঁর কাছে এসে থাকে, তাই রক্ষে। সংসারটি নেহাত ছোট তো নয়। বৃদ্ধা মা শ্যামাসুন্দরী আছেন, অকৃতদার খুল্লতাত নীলমাধব এখনও জীবিত। প্রসন্ন সবসময় না থাকলেও তার সংসারটি আছে, বউটি অসুস্থ থাকে প্রায়ই। ওদিকে বড় মেয়ে নলিনীর সদ্য বিয়ে হয়ে গেলেও শ্বশুরবাড়ি থেকে প্রায়ই চলে আসে, থাকে পিসিমার কাছে। মাকু তো আছেই। এবার তারও বিয়ের জোগাড়যন্ত্র করতে হবে। এরওপর কালী-বরদার সংসার। আর অভয় তো পুরো দায়িত্বই দিয়ে গেছে।
মাঝে মাঝে নিজেকেই প্রশ্ন করেন সারদা, তিনি কি ঘোর সংসারী?
ঠিকই তো, আচার-আচরণ দেখে অস্বীকার করার তো উপায় নেই। যার যা কিছু সাংসারিক আর বাস্তব প্রয়োজন সব কিছু নিয়েই তো জড়িয়ে বসে আছেন। ছাড়তে কি পেরেছেন কাউকে?
নাহ্, তবু একটা বড় ফাঁকা আছে কোথাও। গভীর শূন্যতা। সব কিছুর মধ্যে থেকেও যেন কোনও কিছুর মধ্যে লিপ্ত নেই। সকল নিয়ে বসে থেকে কোনও এক পারঘাটার দিকে যেন উদাস দৃষ্টি। খালি নৌকোটি ভেসে যাচ্ছে অনন্তের দিকে।
কয়েকমাস আগে বাগবাজারে যোগীনমা কৃষ্ণভাবিনীর কাছে বলেই ফেললেন, এবার কি আর পুজোয় মা আসতে পারবেন?
কৃষ্ণভাবিনী বললেন, কথা তো আছে। গিরিশবাবু যে মার মুখ চেয়েই বাড়িতে দুর্গোৎসব করেন।
তা তো জানি বাছা। কিন্তু এখন মাকেই যে জয়রামবাটিতে অনেকের মুখের দিকে চাইতে হয়।
কী আর করবেন মা, কাউকেই তো তিনি ফেরাতে পারেন না যে!
ঠিকই বলেছ। তা হলেও মহাপুরুষের সহধর্মিণী তিনি। দুনিয়ার লোকের প্রত্যাশা তার কাছে।
কিন্তু আপন সংসারের দায়িত্বটাও যে মায়ের কম না।
কী জানি, একটু একটু করে গেরস্ত সংসারীই হয়ে যাচ্ছেন কি না মা!
কৃষ্ণভাবিনী বলেন, তা নয় মা। কাছের থেকে ওঁকে তো কম দিন দেখিনি। মনে হয় যেন, সংসারের মধ্যে থেকেও মায়ের এক অতুলনীয় ধৈর্যশীলতা-ক্ষমা-সহানুভূতি আছে। আর তার প্রয়োজনও আছে। হয়তো আমাদের চোখে সেটা বড্ড ঘরোয়া, গেরস্থালি, বাঁধনে পড়ে যাওয়া মনে হচ্ছে, কিন্তু মা, ভবিষ্যতের জন্য তাঁর এসব কর্মের অবশ্যই উদ্দেশ্য আর মূল্য আছে।
তা হবে হয়তো। স্বগতোক্তির মতো মন্তব্য করেছিলেন যোগীনমা। তারপর বললেন, ঠাকুরকে তো দেখেছি, পূর্ণত্যাগী, মানুষের চেহারায় অবতার। আর মাকে দেখছি, রান্না-বান্না-হেঁশেল-খরচ… এসব নিয়ে পুরো সংসারী। দিনরাত ভাই, ভায়ের বউরা, ভাইপো-ভাইঝিদের নিয়েই আছেন।
কথাটা কানে গিয়েছিল সারদার। মন্তব্য না করে হেসেছিলেন একটু। যোগীনমা তো শুধু তাঁর পার্শ্বচারিণী, সখী নন। তিনিও পূতচরিত্রা, স্নিগ্ধা, মানবিকতায় বিশ্বাসী উচ্চমার্গের সাধিকা। সারদা সম্পর্কে মানসিক দোলাচলের উত্তর তিনি আপনি পাবেন। পেয়েছিলেন।
বাগবাজারের নিশুত গঙ্গার ঘাটে বসে একা একা জপ করছিলেন যোগীনমা।
কী যেন একটা ফিসফিস গলা আর কথা শুনে চমক ভাঙল। কার কণ্ঠ? ঠাকুরেরই না! ভাবচক্ষে তাঁর দর্শন পেলেন অনেকদিন পরে। আর শুনতে পেলেন, মৃদু স্বরে গঙ্গার দিকে তাকিয়ে কিছু নির্দেশ করে বলছেন, দ্যাখো, দ্যাখো গঙ্গায় কী ভেসে যাচ্ছে!
ঘোরের চোখে তাকিয়েছেন যোগীনমা। কী একটা সত্যি ভেসে যাচ্ছে… জড়ানো রক্তাক্ত পুঁটলির মতন। গা শিউরে উঠল যোগীনমার। আহা-হা, ছি ছি ছি, পুণ্যসলিলা সুরধুনীর ধারা স্রোতকে কলুষিত করে ভেসে যায় ও কোন পাপ!
ঠাকুরের হালকা হাসির শব্দ শোনেন কানে। তারপর কথা।
সবাইকে ধারণ করে বলেই ও ধাত্রী। পুণ্যসলিলা। গঙ্গা কি কখনও অপবিত্র হয়?
কেন ওকথা স্মরণ করালেন ঠাকুর! কী বলতে চাইলেন? ফিসফিস কথা শুনলেন আবার।
ওকেও (সারদাকে) তেমনি ভাববে। ওর জন্য মনে সন্দেহ রেখো না। ওকে আর একে অভিন্ন জানবে।
কী একটা ঘটে গেল যোগীনমা-র দর্শনে, অন্তরে। ঠিকই তো, ঠাকুর মানুষটা তো জীবকল্যাণেই জীবনপাত করে তাঁর সহধর্মিণীকে শিক্ষাদীক্ষায়-ভাবে-উপলব্ধিতে আদর্শ উত্তরাধিকারিণী তৈরি করে গিয়েছিলেন। আজ তাঁর সেই আপাত সাংসারিক, গৃহিণী ভাব, দায়িত্বপালন, জড়িয়ে থাকা, সে-ও তো লোকশিক্ষার জন্য তাঁরই দান। ঠাকুরেরই নির্দেশ। ত্যাগী আর সংসারী মিলেমিশে একাকার হয়েই তো রয়েছেন। অভিজ্ঞতার কথা যোগীনমা নিজেই সব সারদাকে বলেছিলেন।
সারদাও জানেন, তাঁর এই উদার আটপৌরে জীবনযাপন আর ভালবাসতে পারার জন্যই দেহধারণ। কিন্তু ভালবাসা মানেই শুধু প্রশ্রয় নয়। মাঝে মাঝে বকুনি দিতে হয়, শাসনও করতে হয়। বিশেষ করে, অধিকাংশ সময় মেয়েগুলোই যে তাঁর ধারেকাছে থাকে। ছেলেগুলোকে তবু শরৎ, ছেলে-সারদা, হরি-কৃষ্ণরা শিখিয়ে পড়িয়ে নেয়। মেয়েগুলোকে তিনি শুধরে না দিলে কী চলে!
রাধুকে সুরবালার কোলে দিয়েও সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত বোধ করেন না সারদা। এদিকে সন্ধে নামার তোড়জোড় শুরু হয়েছে। পাখির ঝাঁক ডাকাডাকি করতে করতে গাছের ঠিকানায় ফিরছে। একটু উঠোন ঝাঁট দিতে হবে। গঙ্গাজলের ছিটে দিয়ে তুলসীতলায় পিদিম দেবেন। সন্ধ্যাহ্নিক সেরে রাতের রান্না-বান্নার আয়োজন আছে। ইদানীং খুব একটা নিজেকে হাত লাগাতে না হলেও, ভাঁড়ার ঘর থেকে আটা-ময়দা, ডাল-তেল-চিনি বার করে দিতে হবে। নবাসনের বউ মন্দাকিনী অনেকটা সামলে দিলেও, নিজেকে দেখতে হয়। নলিনী আর মাকুকে অনেক কিছু হাতে ধরে শেখান।
তা ছাড়াও পরের দিনের প্রস্তুতি আছে। দীক্ষা নিতে ভক্তদের আসার বিরাম নেই। দূর দেশ থেকে পথঘাট ভেঙে এই জয়রামবাটিতে যে-ই আসুক, তা সে ছেলেমেয়ে, মাঝবয়সি, বুড়ো-আধবুড়ো, প্রাণ ধরে কাউকে ফেরাতে পারেন না সারদা। দীক্ষা তো শুধু দেওয়া না, তার জন্য নিজের শুদ্ধি আছে, মঙ্গলময়ের করুণা ভিক্ষা আছে, পুজোর আয়োজন আছে। ইতিমধ্যে শরৎ কৃষ্ণলালকে দিয়ে জানিয়ে রেখেছেন— বালিগঞ্জের সুরেন রায়, বিষ্টুপুরের শিবু দত্ত, আর সব থেকে দূরের নোয়াখালি থেকে যদুনাথ মজুমদার কয়েক দিনের মধ্যে জয়রামবাটি আসবেন মাকে দেখতে এবং দীক্ষা নিতে।
হ্যারিকেন জ্বালানোর জন্য পলতে কেটে ঘরের বাইরে দাওয়ায় আসতেই সারদা দেখেন, যা ভেবেছেন তাই। সুরবালা-রাধু কেউ নেই। একেবারে যাকে বলে, “দ্যাখ তোর, না-দ্যাখ মোর।”
ওরে ও নালু (নলিনী), ও মাকু, দ্যাখ তোদের কাকি আর রাধি গেল কোথায়!
গোয়ালে গোরুর জাবনা দিচ্ছিল মাকু। সেখান থেকে সারদার গলা পেয়ে চেঁচাল, কী বলছ পিসিমা… আসছি।
আর আসছি, বলতে বলতেই সারদার চোখ পড়েছে বেড়ার দরজার দিকে। সুরবালা নেই, কিন্তু উদোম গায়ে রাধি কাঁদতে কাঁদতে বেড়ার ফটক পেরিয়ে যাচ্ছে।
শরীরটা ভার হয়েছে ইদানীং। কিন্তু উপায় কী। দ্রুত পায়ে উঠোন পেরিয়ে মেয়েকে ধরলেন গিয়ে। মুখে বললেন বটে, মুখপুড়ি কোথায় যাচ্ছিস! কিন্তু ত্রস্ত হাতে বুকেই চেপে ধরলেন। কী বাঁধনে যে ফেলেছে এ মেয়েটা!
রাধি তখন হাত দিয়ে পুণ্যিপুকুরের দিকে দেখাচ্ছে। নেলি মা, নেলি মা… জল… চান করবে…।
কী সর্বনাশ, এই ভর সন্ধেবেলা সুরবালা একা একা নাইতে গেল নাকি! মেয়েটাকে ফেলে একলাই চলে গেল! ফটকের সামনে থেকে কালীকুমারের ঘরের দিকে মুখ তুলে ডাকলেন সারদা।
ও কালী, বরদা, শিগগির এদিকে আয়… কে আছিস… সুরো একা পুকুরে গ্যাছে। হরি, কেষ্ট তোমরা কোথায় গেলে বাবা? একসঙ্গে দু’-তিনজন দৌড়ে এসেছে। মন্দাকিনীও সারদার বিছানা বালিশে ওয়াড় পরানো ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। সামনে পেয়ে ওকেই সারদা বললেন, তুই তাড়াতাড়ি দ্যাখ মা আগে… মাথার ঠিক নেই… এই অসময়ে পুকুরে গিয়ে কী কাণ্ড বাধায়। কৃষ্ণলালকে বললেন, পিছু পিছু তুমিও যাও বাবা। দেখো যেন, খবরদার জলে না নামে…।
নলিনী এই সময় এসে রাধুকে সারদার কোল থেকে নামিয়ে নিল। কিন্তু রাধুর সেটা পছন্দ নয়। চিল চিৎকার করতে করতে সরু সরু দাঁত দিয়ে নলিনীর হাতে কামড়ে দিল।
উহ্ মাগো! বলে বিরক্তি আর ব্যথায় ফুঁসে উঠল নলিনী। কী হতচ্ছাড়ি মেয়ে রে বাবা… পাগলির মেয়ে ক্ষেপি… বলতে বলতে গালে একটা ঠোনা মারল রাধিকে। ব্যস আর যায় কোথায়! চিৎকারে সন্ধের পাড়া মাত করে দিল রাধু। অগতির গতি সারদাকেই আবার কোলে তুলে নিতে হল। মৃদু শাসন করলেন নলিনীকে।
ও কী বলছিস নিজের বোনকে! ছি।
না বলবে না! নিজের বোন না হাতি! গরগর করে উঠল নলিনী। যেমন পাগল মা, তার। তেমনি মেয়ে। দাতে বিষ আছে কি না কে জানে বাবা!
তুই চুপ করবি নালু! সারদা ধমক দিলেন। বাপ মরা ঘোট মেয়ে… কে আছে ওর?
তুমিই তো আছ। আর তোমার লাই পেয়ে পেয়ে এখন থেকে খেঁকি হয়ে যাচ্ছে।
একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ে গেল সারদার কিছু বলার আগে। আর তখনই ধুতির কাছি বাঁধতে বাঁধতে ভেতর বাড়ি থেকে কালীকুমার বেরিয়ে এল। কী হয়েছে দিদি? ভরসন্ধেবেলা এত গোল কীসের?
সারদা বললেন, জিগ্যেস না করে একটু এগিয়ে দ্যাখ। সুরো নাকি পুকুরে ডুব দিতে গ্যাছে। পাগল বউ, কী করে, না-করে কিছু ঠিক আছে! মন্দা আর কেষ্ট গ্যাছে।।
গ্যাছে? তা হলে তো ঠিকই আছে।
ঠিক থাকলে কি আর তোদের সবাইকে ডেকে জড়ো করি! সারদা বললেন, জানিস তো। ওর মাথার ব্যামো।
জেনেই বা কী করব বলো তো? আজ তিন বচ্ছর ধরে এই অপয়া, পাগলিকে নিয়ে সবাই জেরবার হচ্ছে।
বাহ্, এই না হলে আর ভাশুরঠাকুরের মতো কথা! নিজের বউ অমন হলে কথাটা বলতে পারতিস রে কালী?
নিজের বউ হলে কবেই বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিতাম! যাকগে এখন দেখি আবার… তোমার সাধু সন্তানদের এসব কথা কানে গেলে তাঁরাই তো আবার আমাদের ওপর ঝাল ঝাড়বেন।
আমার ছেলেদের টানছিস কেন এর মধ্যে? শরত্রা এখানে থাকলে আমি কি আর ততাদের ডাকতুম! তারা একাই একশো।
কালীকুমার আর কিছু বলার আগেই, পুব-দক্ষিণ থেকে হরি ছুটতে ছুটতে এসে বলল, মা চিন্তা করবেন না। মন্দাদিদি আর কেষ্টদা মামিকে নিয়ে আসছেন। জলে নামতে পারেননি, ঘাটে বসে কীসব বলতে বলতে কাঁদছিলেন, আবার রাধুকে খুঁজছিলেন। এই এসে পড়ল বলে।
মাত্র অল্প কিছুক্ষণেরই ব্যাপার। তবু সারদার মনে হল যেন ঝড় বয়ে গেল।
না, শুধু সুরবালার বেরিয়ে যাওয়ার জন্যই না। ছোটখাটো এক আধটা ঘটনায় মনের ওপর যা চাপ পড়ে, তার জন্যও। কত সহজে, এমনকী অসহায় মানুষকেও কাছের মানুষই দূরে সরিয়ে দিতে চায়! সাধারণ মানুষেরই তো এমনিতে কতরকম দোষঘাট, ভুলভ্রান্তি লেগে আছে। ওসব তো থাকবেই। ভালবেসে কাছে টেনে না নিলে কেউ কি টিকে থাকবে! ওবউ-এর তো তার ওপর মাথা খারাপ। দেখেশুনে কাছে না রাখলে ও-ই বা কোথা যায়, মেয়েটাকেই বা দ্যাখে কে!
মায়া। হয়তো এসবই মায়া। তবু এই মায়ার বাঁধনটুকু আছে বলেই না পরিবার, সংসার, মানুষে মানুষে সম্পর্কের টান, ভালবাসাবাসি৷ মিলনে হাসি, বিচ্ছেদে কান্না। কিন্তু ভাবনাকে নিজের মধ্যে পুষে রাখেন সারদা। সব কথা প্রকাশ করাও যেমন ঠিক না, তেমনই বৈরাগ্যের আর একটি দীপশিখা অহরহ নিজের মধ্যে জ্বালিয়ে রাখারও দরকার। মরণশীল এ জগতে কতকিছুই নিয়ন্ত্রণের বাইরে। মানুষ নিমিত্তমাত্র, তা ছাড়া আর কী! আবেগে ভেসে গেলে লোকে বলে— বাড়াবাড়ি! আওপাতালে, আদিখ্যেতা। আবার সহ্যের কষ্ট নিয়ে পাষাণপ্রতিমা হয়ে গেলে বলে, হৃদয়হীন, এমনকী স্বার্থপর। অমন বলাবলি থাকে। জীবন নদীটি বয়ে যায় তার মধ্যেই।
ইংরেজি বছরের প্রথম মাসটি শেষ হয়ে গেছে, আর দেখতে দেখতে ঘুরে গেছে শীতের হাওয়া। সেই জগদ্ধাত্রী পুজোর সময় থেকেই কয়েকটা মাস ব্যস্ততায় কাটে সারদার। ঠান্ডার দিনে যাতায়াতের সুবিধে বলে দীক্ষা নিতে আসা তো আছেই। তা ছাড়া ডিসেম্বরের বাইশ আর পৌষের আট তারিখে তাঁর জন্মতিথির খবরও লোকমুখে ছড়িয়ে পড়েছে।
আজকাল আর শুধু হুগলি-বাঁকুড়া-বিষ্ণুপুর-বর্ধমান বা কলকাতা থেকে নয়, সুদূর উড়িষ্যা, দাক্ষিণাত্য, বিহার থেকেও মানুষজন আসেন। উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি-কুচবিহার আছে, পূর্ববঙ্গের ঢাকা-ময়মনসিংহ-খুলনা বরিশাল জেলার লোক আছেন। ইচ্ছে থাকলেও কিংবা কলকাতা যাওয়ার প্রয়োজন থাকলেও, কাউকে বারণ করতে পারেন না সারদা। তা ছাড়া বেলুড় মঠ তৈরি হওয়ার পর থেকে, একটি বিশাল অলিখিত দায় বর্তেছে তাঁর ওপর। খাতায় কলমে ব্রহ্মানন্দ-প্রেমানন্দ-সারদানন্দের ওপর যাবতীয় মূল প্রশাসনিক দায়িত্ব থাকলেও, তাঁরা সকলেই বিশ্বাস করেন, মঠের মূল স্তম্ভ মা। সারদা সঙ্ঘজননী। সব ব্যাপারে তাঁর কথাই শেষ কথা। যদিও উপযাচক হয়ে তিনি কদাচিৎ ভূমিকা নেন, তা হলেও নিজস্ব আহরিত একটি সহজ বোধ থেকে নানান খোঁজখবর করেন সারদা। কখনও প্রয়োজন অনুভূত হলে বিশ্বস্ত কৃতী সন্তানদের মতামত জানান। নির্দেশ? খুব বিরল যদিও, কিন্তু দিয়ে থাকেন।
পূজা-পার্বণে পশুবলি ব্যাপারটি কিছুদিন যাবৎ নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন সারদা। জয়রামবাটির জগদ্ধাত্রী পুজোয় গতবারও পাঁঠাবলি হয়নি। অথচ মাংস ভক্ষণের প্রয়োজনীয়তা বা উপকারিতা তিনি নস্যাৎ করেও দেননি। বুঝতে পারেন কেউ কেউ মানত করেও পশুবলি দিতে চান। কিন্তু প্রকাশ্যে ভক্তির নামে নৃশংসতা সহ্য করতে পারেন না সারদা।
মাঘ মাসের গোড়ার দিকে বর্ধমানের শ্যামাচরণ চক্রবর্তী এসে বললেন, মা, বলিদান কি একেবারেই বন্ধ?
সারদা বললেন, ও কি আর বন্ধ করা যায় বাবা! জিগ্যেস করছ কেন?
শ্যামাচরণ আমতা আমতা করে বললেন, না… মানে, বাড়িতে তো মাংস খাওয়ার চল আছে… মানে ভক্তিভরেই…।
সারদা হেসেই বললেন, ভক্তি-টক্তি নয় বাবা। পাঁঠার মাংস অতি সুস্বাদু জিনিস, পেলেই লোকে খাবে।
তা হলে ছাগবলি দিয়ে… মানে, ভক্ষণ করলে কোনও পাপ-টাপ…?
সারদা বললেন, বাবা, ভাবের ঘরে চুরি করে লাভ নেই। ভাল করে কষিয়ে রান্না মাংস কবজি ডুবিয়ে খাবে, পাপ হবে কেন?
বড় নিশ্চিন্ত করলেন মা।
তবে বলিটি নিজের হাতে দিয়ো না। যে হাতে খাওয়ার সুখ করবে, সে হাতেই প্রাণীহত্যার অশান্তিটি পুষে রেখো না।
শ্যামাচরণের বন্ধুবর বাঁকুড়া সদরের স্বনামধন্য বিভূতিভূষণ ঘোষ মশাই তাঁর দুই স্ত্রী অমিয়বালা, কমলা এবং ভাই কিরীটিভূষণকে নিয়ে সিংহবাহিনীর পুজো দেখলেন। পাঁঠার মাংস দেখতে দেখতে অলক্ষ্যে জিভের জলসঞ্চার ঠেকাতে পারলেন না। মনের অশান্তিও পুরো যাচ্ছে না। থাকতে না পেরে শেষ পর্যন্ত, ছাড়ানো আস্ত একটি পাঁঠার ঠ্যাং নিয়েই সারদার সঙ্গে দেখা করতে এলেন।
ভিতর বাড়িতে সারদার নির্দিষ্ট ঘরটিতে রাধু আর সুরবালা থাকে। প্রসন্নর ঘর দুটি তার গায়েই। সে কলকাতায় যজমানি করে। অধিকাংশ সময় নলিনী বিবাহিতা হলেও প্রায় সদস্য হিসেবে এবাড়িতেই থাকে। মায়ের দেখাশোনা করে, পিসিমাকেও সে কাছ-ছাড়া করতে চায় না। তার বিয়ে হয়েছে গোঘাটের প্রমথ ভটচায-এর সঙ্গে, মানুষটি তেমন ডাকাবুকো অত্যাচারী নয়। কিন্তু শ্বশুরবাড়িতে মানিয়ে-গুনিয়ে চলতে পারল না নলিনী। বাবা-পিসিমার ঘরই তার নিজের ঘর। কিন্তু সারদা খেয়াল করেন, দিন-কে দিন মেয়েটা বড্ড শুচিবাইগ্রস্ত হয়ে উঠছে। কথায় কথায় জামা-কাপড় পালটানো, চান করা, গঙ্গাজল মাথায় দেওয়া… ঘরসংসারে অত চলে!
সেদিন বিভূতিবাবুর ডাক শুনে নলিনী বেরিয়ে এসেছে। বলল, মা পুজো করছেন, কী দরকার আপনাদের?
বিভূতি বললেন, মায়ের সঙ্গে দেখা করে একটি অনুমতি চাইব।
কথা বলতে বলতে বিভূতি পাঁঠার পা-টি বার করলেন। আর নলিনী প্রায় ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল।
ও মা গো, ছি ছি ছি, মাংস নিয়ে আপনারা এবাড়িতে ঢুকেছেন!
মুহূর্তেই চূড়ান্ত অপ্রস্তুত পরিবারটি। বিভূতি আস্তে ধীরে বললেন, অন্যায় হয়ে গেল কি দিদি? যতদূর জানি মা তো…!
এখনও দাঁড়িয়ে আছেন আপনারা! এইসব ঘরদোর উঠোনে এখন আমাদের গোবরজলের ছড়া দিতে হবে জানেন!
অপ্রতিভ বিভূতি মৃদুভাবে বললেন, পুজো দিয়ে, আমরা শুধু মায়ের একটা অনুমতি ভিক্ষা করতে এসেছিলাম। আমরা ওঁনার দীক্ষিত, ভক্ত।
যে হোন, আর যা-ই হোন, দয়া করে বেরিয়ে যান আপনারা। মাগো… ভর দুপুরে এ কী অনাচার…!
নলিনীর কথা শেষ হল না। সারদা ঘরের বাইরে আসতে আসতে বললেন, কী হয়েছে, কার সঙ্গে অমন করে কথা বলছিস? বলতে বলতেই বিভূতিদের দেখতে পেলেন সারদা। স্বভাববাচিত স্বরেই বললেন, ওহ্ বিভূতি, তোমরা? উঠোনে দাঁড়িয়ে কেন বাবা?
নলিনী ঝংকার দিয়ে উঠল তাঁর মধ্যে। —সরে যাও পিসিমা, দ্যাখো দিকি পাঁঠার ঠ্যাং নিয়ে ঢুকেছে…।
তাইতে কী হয়েছে! ও তো প্রসাদী মাংস। কঠিন চোখে নলিনীর দিকে তাকালেন সারদা।
—অত শুচিবায়ুগ্রস্ত হলে তুই সরে যা। মানুষের সঙ্গে অমনভাবে কথা বলে!
বিভূতি বললেন, আমরা কোনও বিপত্তি ঘটাতে আসিনি মা… সিংহবাহিনীর পুজো দেওয়া হয়েছে, সেই উপলক্ষে মাংস ভক্ষণের জন্য আপনার একটি অনুমতি প্রার্থনা করতে এসেছিলাম।
মৃদু হেসে সারদা বললেন, মাংস-টাংস খাওয়ার জন্য একটা উপলক্ষ তো লাগেই। আত্মার শান্তি হলে তার জন্য আর অনুমতির কী? এসো তোমরা, ভেতরে এসো।
নলিনী দুম দুম পা ফেলে ঘরে ঢুকে গেল। —আমি আর কিছু করতে পারব না এ সংসারের জন্য…।
সারদা নিঃশঙ্কচিত্তে বললেন, তোকে কিছু করতে হবে না মা। বাড়ি বয়ে বিভূতিরা এসেছে, দেখি, আজ আমিই ওদের মাংস রেঁধে দেব। তোমরা বরং একেবারে চান-টান করেই এসো বাবা। বউমারাও এসো। আজ আমিষ প্রসাদই খাবে।
বিভূতিভূষণের পরিবারটি আনন্দে বিস্ময়ে বিহ্বল হয়ে গেলেন।
ভাইঝিটি যে মনের দিক থেকে কেন অত অনুদার সারদা বোঝেন না। কিন্তু তা বলে ওকে তো সরিয়ে দিতেও পারেন না। এক একজন এক একরকম হয়। তাঁর চলতে হয় সবরকম আর সবাইকে নিয়ে।
আমজাদের ধর্ম আলাদা। শিরোমণিপুরে বাড়ি। এক সময় ডাকাতি করে জেল খেটেছে। তুঁতে ডাকাত বলে নাম হয়ে গেছে। কিন্তু মানুষটি খাঁটি, পরিশ্রমী, বিশ্বাসী। জাতধর্ম আলাদা বলে কেউ কাজ দেয় না। অথচ আমজাদ ঘরামির কাজ জানা লোক। সারদারও ঘরে বেড়ার দেওয়াল তুলতে হবে। লোকটিকে মানুষ হিসেবে ডেকে কাজ দিলেন সারদা। পেটচুক্তি ব্যবস্থা।
কাজ সেরে বারান্দায় খেতে বসেছে আমজাদ। সারদার চোখে পড়ল, প্রায় উঠোনের ধার ঘেঁসে যেন নিজেকে বাঁচিয়ে দূর থেকে আমজাদের পাতে রুটি ছুড়ে ছুড়ে দিচ্ছে নলিনী। অবাক হলেন, কষ্টও পেলেন। না বলে পারলেন না, ওকী করছিস মা? মানুষকে ওভাবে খেতে দেয়!
তুমি সরে যাও পিসিমা, সরে যাও। নলিনী বলে উঠল। —দেখছ না মোছলমান খাচ্ছে!
সারদা স্পষ্ট গলায় বললেন, ওর একটা নাম আছে জানিস না?
নলিনী বলল, তা থাক। জাতধর্মটাও তো দেখতে হবে!
না। জাতধর্মে মানুষের পরিচয় নয়। আর ওভাবে মানুষকে খেতেও দেয় না।
ছোঁয়া লেগে যাবে না! আর কীভাবে দেব তা হলে?
তুই না পারিস, সরে যা। আমি ওকে খেতে দিচ্ছি।
ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে সরে যেতে যেতে নলিনী বলল, ওহ্, জাতধর্ম আর কিছু রাখতে দিল না পিসিমা। সব রসাতলে গেল।
সারদা গুছিয়ে পরিবেশন করলেন আমজাদকে। একটু পরে বললেন, বুঝলি মা, শরৎ যেমন আমার ছেলে, আমজাদও তাই। মায়ের কাছে ছেলের জাত-বেজাত বলে কিছু কি আছে রে?
সন্ধেবেলা নবাসনের বউ-এর সঙ্গে গল্প করতে করতে সারদা বলেন, বুঝলি মা মন্দা, ঠাকুর তো ছিলেন অবতার। আর তাঁরই ধর্মসাক্ষী রেখে বিয়ে করা বউ, আমার কী অবস্থা দ্যাখ।
সারদার বয়েসের সঙ্গে চুল কমে গেছে। পাক ধরেছে। মন্দাকিনী তাইতেই তেল দিয়ে আঁচড়ে দিতে দিতে বলে, কেন মা? আমরা তো আপনাকেও দেবী, ভগবতী বলেই জানি।
সারদা হাসতে হাসতে বলেন, তোরা বললে কী হবে! আমার কাজ তো দেখছিস। শুধু সংসারই ঠেলছি। হাজারটা হ্যাপা।
আপনি এত সংসার-সংসার করে ব্যস্ত হন কেন মা?
না হলে কি চলে মা? মনুষ্য ধর্মই যে আসল ধর্ম। সংসারটা মানুষকে নিয়েই তো!
মন্দাকিনী সন্তর্পণে বলে, তা ঠিক মা। কিন্তু সেটাকে আবার কেউ কেউ আপনার দুর্বলতা মনে করে।
সারদা বলেন, অন্যের মনে করার ওপর আমার তো হাত নেই মা। এই নলিনী সবসময় আমায় দুষছে। রাধিটাও একটু একটু করে কেমন যেন বেয়াড়া হয়ে উঠছে। সুরোরও যখন বাড়াবাড়ি হয়, আমায় গালাগাল দেয়। আর ভাইয়েরা তো চিরকালই বলে গেল, আমি তাদের না দেখে, বাইরের ছেলেদের তোয়াজ করছি।
মন্দাকিনী বলল, আপনি তা হলে শুধু ঘরের লোক আর আত্মীয়স্বজনদের নিয়ে থাকলে পারেন।
তা তো পারি। কিন্তু তা হলে এই যে গোবিন্দর গায়ে খোসপাঁচড়া হল, নিমপাতা-হলুদ বেটে মাখালাম, হরিদাস বৈরাগী এল— দুটি মুড়ি-গুড়, কাপড়-চোপড় দিলাম, ডোমপাড়ার মেয়ে রম্ভা এসে বললে বর নেয় না, লোকটিকে ধমক ধামক করলাম… এসব কাজগুলো কে করে বল তো! এর ওপর আবার গোরু-ছাগল-বেড়ালও আছে… অবলা জীব বলে তারাও তো ফ্যালনা নয় মা… ওরাও জীব, ঠাকুরের সন্তান।
মন্দাকিনী একটু পরে বলল, আপনার যে কেউ পর নয় মা। কী করবেন!
হঠাৎ হাসতে হাসতে সারদা বললেন, আবার জানিস তো, এক ডাক্তারের বউ এসে বলে কি না, মা আশীর্বাদ করুন যেন আমার বরের ভাল পসার হয়। আমি বললুম, তা কী করে হয় মা! তোমার বরকে এমন আশীর্বাদ কি করতে পারি, যাতে লোকের অসুখ হয়? হাসতে হাসতেই একসময় চুপ করে গেলেন সারদা।
একটু পরে বললেন, বুঝলি মা, সংসারের মধ্যে গিন্নি-বান্নির মতোই তো কাটাচ্ছি। তো ভেবে দেখি, সংসারের ভেতরেও যেমন কিছু নেই, বাইরেই বা কী আছে! ঘরসংসার আর বিশ্বসংসারের মধ্যে কতটুকু তফাত! ঠাকুর যখন দেহ রাখলেন, শোকে দুঃখে একেবারে বুক ভেঙে যাচ্ছে। মনে হল, আর কিছু নেই এ জীবনে। তারপর একদিন উনি দেখা দিয়ে বললেন, অত ভেঙে পড়ছ কেন? আমি কি কোথাও গেছি? এই তো, এঘর আর ওঘর। তখন অতটা বুঝতাম না। এখন বুঝি। জগৎ-ঈশ্বর-সংসার… এসবই উপলব্ধির এক একটা স্তর। সবকিছু মিলিয়েই এই জীবন, প্রকৃতি, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড। কাউকে ছেড়ে কেউ নেই।
বসন্তকালের গোড়াতেই স্বামী সারদানন্দের চিঠি পেলেন সারদা। শরতের চিঠি বলেই মনোযোগ দিয়ে পড়লেন। মন্দাকিনীই পড়ে দিল।
শরৎ মহারাজকেই সারদা তাঁর দ্বারী, ভারী বলে উল্লেখ করেন। এখন মঠ মিশনের হাজারটা উন্নয়নমূলক, সেবামূলক কাজ ছাড়াও ‘উদ্বোধন’ নামে পত্রিকার প্রায় সব দায়িত্বই বহন করেন সারদানন্দ। আবার মায়ের জীবনযাপন, সুখস্বাচ্ছন্দ্যের প্রতিও নিরন্তর খেয়াল রাখেন। জয়রামবাটিতে সারদাকে যে প্রায়শই নানা ধরনের অসুবিধা উৎপাতের সম্মুখীন হতে হয় তিনি জানেন।
মঠ-গুরুভাই এবং বাগবাজারের বিভিন্ন খবর জানিয়ে চিঠি দেন মহারাজ। কিন্তু সারদা তার ভিতর থেকে শরতের প্রচ্ছন্ন আকুতিটা ঠিকই পড়ে নিতে পারেন। সেটি হচ্ছে, তাঁকে আবার কিছুদিন কলকাতা গিয়ে থাকার সনির্বন্ধ অনুরোধ।
সবই বোঝেন সারদা। সন্তানদের আন্তরিকতাও তাঁকে স্পর্শ করে। তা সত্ত্বেও মাত্র কয়েকটি বছর আগেকার বেদনাবিদ্ধ স্মৃতিতে মুহ্যমান বোধও করেন। আবার তো সেই বাগবাজারের কোনও একটা বাড়িতে গিয়েই ওঠা। সুখ-দুঃখ সবরকমের স্মৃতিই আছে। তবু দুঃখের স্মৃতিগুলিই মনের ওপর এখনও বড় চাপ সৃষ্টি করে। সেই দশের দুই বোসপাড়া লেন-এর বাড়িতে প্রায় চোখের ওপর শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন স্বামী যোগানন্দ, তাঁর যোগীন। সেদিন পনেরোই চৈত্র, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ বছর।
নিবেদিতা কাছে ছিলেন। চোখের জল আর কান্না সংবরণ করতে পারেননি সারদা। স্বতঃস্ফূর্ত তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল, জানি জানি, সে আমার প্রভুর কাছে গ্যাছে… কিন্তু সে যে আমার যোগীন, প্রভু তাকে কেড়ে নিলেন! বাড়ির একটি ইট খসল…।
তারপর ক’মাসও গেল না। ওই বাগবাজারের আর একটি গলির বাড়িতে মাত্র দু’দিনের ভেদবমি আর দাঁস্তায় প্রাণ হারাল ছোট ভাই অভয়চরণ। মনে হয়েছিল, ঈশ্বর এত অকরুণ কেন? কী দোষ করেছিল লেখাপড়া করা ভাইটা!
নাহ্, দায়ী করেননি ভগবানকে। প্লেগ ছড়িয়ে পড়ার সময় যখন নিবেদিতা আর সঙ্ঘের ছেলেরা ঝাঁটা-বালতি-ব্লিচিং পাউডার নিয়ে কলকাতার পথে নামল, সারদা বুঝেছিলেন, ভগবান নয়, মানুষেরই অজ্ঞতা, শিক্ষার অভাব, সীমিত স্বাস্থ্যজ্ঞান যত সব অসময়ে মৃত্যুর কারণ। মাত্র বছর খানেক আগেই তিনি কালীপুজোর দিন নিবেদিতার বালিকা বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন প্রদীপ জ্বালিয়ে। এবার দিনে দিনে প্রার্থনা করে গেলেন, শিক্ষা-সচেতনতা আর জ্ঞানের আলোয় ভরিয়ে দাও ঠাকুর। তাতেই মানুষ বাঁচবে। অবশ্য ওই অবস্থার মধ্যেও একটি দুরন্ত বাস্তব সিদ্ধান্ত নিতে টালবাহানা করেননি সারদা।
তখন সঙ্ঘ প্রতিষ্ঠা হয়ে গেছে। বলরাম বসুর বাড়িতে মিটিং ডেকে স্বামীজি নিজেই সঙ্ঘের পত্তন করেছেন। রামকৃষ্ণ সঙ্ঘ। সারদাকে তিনি স্বয়ং উল্লেখ করেছেন ‘সঙ্ঘজননী’ নামে। গুরুভাইদের মনের যাবতীয় সংশয়, বিভ্রান্তি কাটিয়ে, ‘শিবজ্ঞানে জীবসেবা’ এই আদর্শ আর ঠাকুর প্রবর্তিত সেবাধর্মে মানুষের কাজ করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন তিনি।
কিন্তু প্লেগ-এর প্রাদুর্ভাব আর ভয়াবহতায় উদ্বেগে আকুল হয়ে উঠলেন বিবেকানন্দ। এদিকে অর্থাভাব প্রচণ্ড। কুলিয়ে উঠতে পারছেন না সেবাকর্মের খরচ। উপায়? ঠিক করলেন, মঠবাড়ি, জায়গাজমি সব বিক্রি করে দেবেন। বললেন, কাতারে কাতারে দেশের লোক মরে যাচ্ছে। এই অবস্থায় মঠ রেখে কী হবে! মানুষের সেবার জন্য টাকার দরকার। সুতরাং…।
সিদ্ধান্তটি কানে গেল সারদার। ভাবলেন। অকুতোভয়, মানবদরদি, বীর সন্তানটির আবেগের বিষয় যেমন চিন্তা করলেন, একই সঙ্গে সঙ্ঘজননী হিসেবে নিজের সাধারণ জ্ঞান, দায়বদ্ধতা এবং ভবিষ্যতের কথাও বিস্মরণ হলেন না। মঠ টিকিয়ে রাখা দরকার।
শান্ত, মৃদু, মাত্র কয়েকটি শব্দে নিজের মানসিকতা আর সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলেন সারদা।
মঠের কাজ কি এই একটিবারের সেবাকর্মের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে বাবা? এখন বিক্রি হবে না।
কী হয়েছিল স্বামীজির তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া? কে বলবে?
কিন্তু খুব দ্রুতই নিজের মতামত সংশোধন করে নিয়েছিলেন। বললেন, মায়ের কথার ওপর আর কিছু নেই। তাঁর মতই শেষ কথা।
বহু স্মৃতি, বহু ঘটনা, অনেক কথা। মনে পড়ে সারদার।
ফটো তোলা হবে বলে একেবারে সংকোচে মাটিতে মিশে গিয়েছিলেন। এদিকে নরেনের শিষ্যা ওলি বুল-ও নাছোড়। শেষে রাজি হলেন।
মিস্টার হ্যারিংটন ক্যামেরা এনে ছবি তুললেন। লজ্জাশীলা সারদা সবায়ের চোখের সামনে থেকে পালাতে পারলে বাঁচেন। খুট করে শব্দ আর আলো জ্বলতেই বললেন, হয়েছে কি? যাই তা হলে?
এদিকে ফটোগ্রাফার খেয়াল করেছেন, ছবিতে মায়ের পা দেখা যাচ্ছে না। তা হলে কী করে হবে! ওলি বুল যে তাঁর দেশে ফিরে গিয়ে মায়ের এই ফটোই পুজো করবে। আবার তোলা হোক। মরমে মরে গিয়ে সন্তানের অনুরোধে পা দুটি দেখাতেই হল। উপায় কী! ভালবাসার প্রাবল্যে সংকোচ তো পিছু হাঁটবেই। প্রথম এবং চিরস্মরণীয় ছবিটি উঠে গেল সারদার।
আবার এই বাগবাজারেই স্বামীজি একবার কোনও এক ফকিরের অভিশাপের কথা বললেন সারদাকে। অভিশাপে স্বামীজির পেটখারাপ হয়েছিল।
সারদাকে বললেন, মা এই তোমার ঠাকুর! আমার উদরাময় ঠেকাতে পারলেন না?
সারদা বললেন, বাবা, শঙ্করাচার্যও নিজের শরীরে রোগ আসতে দিয়েছিলেন। তোমার শরীরে রোগ মানে তাঁরও রোগ।
স্বামীজি বললেন, তুমি যা-ই বললো মা, আমি ওসব মানি না।
সারদা সঙ্গে সঙ্গে হেসে বললেন, বাবা, না মেনে থাকার কি জো আছে? তোমার টিকিটি যে তাঁর কাছে বাঁধা!
কয়েক মুহূর্ত অবাক হয়ে এই নিরীহ গ্রাম্য অথচ ক্ষুরধার বুদ্ধিদীপ্ত মহিলাটিকে দেখলেন স্বামী বিবেকানন্দ। বাক্যস্ফুরণ হল না তাঁর। চোখে জল এল। সেই অবস্থাতেই সারদার পা জড়িয়ে ধরলেন। মনে মনে উচ্চারণ— ঠিক, ঠিক বলেছেন মা।
সবই স্মৃতি। আজ শরতের চিঠি পেয়ে উদ্বেল স্মৃতি হাতড়েই মনে পড়ছে মাত্র বছর দুয়েক আগে বীর সন্তানটির প্রয়াণের কথা। বিনা মেঘে মাথার ওপর বজ্রপাত হলেও সারদা বোধহয় অতখানি আঘাত পেতেন না। পরে ভেবে দেখেছিলেন, একেবারে কোনও সংকেত যে পাননি, তা তো নয়। তা নয়তো রাখাল যখন পরের দিন ব্ৰজেন নামে যে ছেলেটি নরেনকে সর্বক্ষণ দেখাশোনা করত, সেই ছেলেটিকে জয়রামবাটি পাঠিয়েছিল, দেখেই কি সত্যি অনুমান করেননি— ছেলেটির শরীরের ভাষায় ইন্দ্রপতনের সংবাদ রয়েছে।
সেদিন ছিল বিশে আষাঢ়। উদাঁস হাওয়া, জোলো মেঘ আর বৃষ্টিতে স্যাঁতানো প্রকৃতি। জংলা আগাছায় ভরে গেছে উঠোন। বিকেলের আলো ফুরিয়ে গেল তাড়াতাড়ি। কিছুতেই পিদিম জ্বালিয়ে সন্ধে দিতে পারলেন না সারদা। ইন্দু-নলিনী-মাকু অনেক চেষ্টা করেও উনুন ধরাতে পারল না। কাঠকুটো ভিজে। স্যাঁতানো ঘুঁটে শুধু ধোঁয়া ওগরাল, আর ভিজে হাওয়ায় ছড়িয়ে চোখে জ্বালা ধরাল। তার মধ্যেই ঘরে ঢুকে আবছা অন্ধকারে ঠাকুরের ছবি প্রণাম করতে গিয়ে সারদা দেখেন, একপাশ থেকে খুলে ছবিটি হেলে পড়েছে। অজান্তে ধড়াস করে উঠল বুকের মধ্যে। অজানা আশঙ্কাই বেজেছিল— কে! কার জন্য স্বয়ং তিনি ভেঙে পড়ছেন!
বেশিক্ষণ ভাবনার সুযোগ হয়নি। হঠাৎ সেদিন চিকুর হানা বিদ্যুতের সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়া আর তুমুল বৃষ্টি নেমেছিল। ফালা ফালা হয়ে যাচ্ছিল অন্ধকার আকাশ। বড় অস্বস্তিতে কেটেছিল প্রায় বিনিদ্র রজনী। অথচ একেবারে শান্ত সমাহিত একটি বৈরাগ্যের আলো ফুটেছিল সকালে। মাঠ ঘাট, উঠোন-বাগান সব ভেজা, গাছের পাতা থেকে টুপিয়ে জল ঝরছিল। বিষ্ণুপুর হয়ে সকাল সকাল জয়রামবাটি পৌঁছেছিল ব্ৰজেন। দূর থেকে ছাতা হাতে ছেলেটিকে আসতে দেখেছিলেন সারদা। কিছু বলতে হয়নি তাকে। শুধু সারদা প্রশ্ন নিয়ে নরেন নামটি উচ্চারণমাত্র মূৰ্ছা গিয়েছিল ছেলেটি।
মনে পড়েছিল, তখনও একবছর হয়নি বেলুড় মঠে স্বামীজি আয়োজিত প্রথম দুর্গোৎসবের কথা। সংকল্প হয়েছিল সারদার নামেই। তখনই তিনি পশুবলি বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কৃষ্ণলাল হয়েছিল পুরোহিত, শশীর বাবা ঈশ্বরচন্দ্র চক্রবর্তী হয়েছিলেন তন্ত্রধারক। আর মায়ের হাত দিয়েই তন্ত্রধারককে পঁচিশ টাকা প্রণামী দিয়েছিলেন স্বামীজি। সেসব কথা কি ভোলা যায়!
বুকে কষ্টের ভার জমেছিল। কিন্তু ভেঙে পড়েননি সারদা। মনে মনে নিজেকে তৈরি করেছিলেন। উঠে দাঁড়ানোই বড় কথা।
শ্রীক্ষেত্রে যাওয়ার দলটি শেষপর্যন্ত বড়ই হল। কাকে ফেলে, কাকে নিয়ে যাবেন!
রাধু-সুরবালা তো আছেই। বৃদ্ধ কাকা নীলমাধব আর মা শ্যামাসুন্দরী ইদাঁনীং কাছে কাছে থাকতে চান। ভায়েদেরও ইচ্ছে দিদির দৌলতে যা যতটা আরাম-আয়াস করে নেওয়া যায়। কিন্তু সবসময় আমল দেন না সারদা। ওদিকে নলিনী-মাকুও পিসির ছায়া। সম্ভবত মায়ের স্মৃতি বিজড়িত মনের অবস্থা অনুমান করেই শরৎ মহারাজ বাগবাজারেই অন্য একটি বাসস্থানের আয়োজন করেছেন। বাড়িটি দুয়ের এক বাগবাজার স্ট্রিটে অবস্থিত, অপেক্ষাকৃত বড় এবং খোলামেলা। তখনও অবশ্য সারদা জানতেন না, প্রায় একটানা বছর দেড়েক জয়রামবাটির গার্হস্থ্য জীবনযাপন এবং একঘেয়েমির কথাও মহারাজ মাথায় রেখেছেন। এবং সেই উদ্দেশ্যে পুজোর পরে নীলাচলে যাওয়ার ব্যবস্থা করে রেখেছেন। আর সত্যি বলতে কী শীতের সময় পুরীর ঝাউবন, সমুদ্র সৈকতের কাছে নিরিবিলি ক্ষেত্রবাসীর মঠে এসেই যেন সত্যি সত্যি দম ফেলতে পারলেন।
দলটি অবশ্য আরও বিস্তৃতই হয়ে গেল তাঁর আকর্ষণে। গোলাপমা, নিকুঞ্জদেবী, চুনীলাল বসুর স্ত্রী কুসুমকুমারী, লক্ষ্মীদেবী এবং বাবুরামসহ দুটি ব্রহ্মচারী ছেলে কলকাতা থেকেই গাড়িতে চাপল। আর ক’দিন পরে মাস্টারমশায়ের সঙ্গে কালীকুমার বরদাও হাজির। কিন্তু সব সুখের দিন একরকম যায় না। সারদার পায়ে একটি কাঁটা ফুটে বিপত্তি ঘটাল। এমনকী পেকে ওঠা পায়ে অস্ত্রোপচার পর্যন্ত করতে হল। আবার একই সঙ্গে নানান উৎপাতে বারবার অসুস্থ হতে লাগলেন নীলমাধব এবং শ্যামাসুন্দরী।
সবদিক ভেবেচিন্তেই ঝুঁকি নিতে চাইলেন না সারদা। শীতের শেষদিকে ফিরে এলেন বাগবাজারের সেই ভাড়াবাড়িতেই। কিন্তু নীলমাধব সত্যি আর পুরোপুরি সেরে উঠলেন না। মাস দুয়েকের মধ্যে দেহ রাখলেন। কিছুদিন উদাস হয়ে রইলেন সারদা।
শত ব্যস্ততার মধ্যে বেলুড় মঠ থেকে সারদানন্দ দেখা করতে আসেন মায়ের সঙ্গে। একটানা মায়ের সেবাকর্মে নিয়োজিত থাকতে পারেন না, সেই কারণে কিঞ্চিৎ কুণ্ঠিত ভাব। আর সারদা সেটা অনুমান করে আগেই বললেন, বাবা শরৎ, আমি বাগবাজারে থাকলেও, তোমায় রাজ্যের কাজ ফেলে রোজ রোজ গঙ্গা পেরিয়ে আসতে হবে না।
মনে মনে একটু নিশ্চিন্ত বোধ করলেও সারদানন্দ বললেন, মা, যত না আপনার জন্য, তার থেকে বেশি নিজের টানেই আসি।
সারদাও খুশি হলেন। বললেন, তা যখন সময় করতে পারবে এসো। তুমি ছাড়া আমার ভারটা আর কে-ই বা বইতে পারে! তবে আমি ঠিকই আছি। গঙ্গাচ্চান করলে বাতের ব্যথা-টেথাগুলোও কম থাকে।
আপনার গঙ্গায় যাতায়াতের অসুবিধে নেই তো মা?
সারদা বললেন, বাগবাজারে থাকলে আমার কি কোনও অসুবিধে হওয়ার জো আছে বাবা! ক’টি বাড়ির পরেই তো আমার খুকির (নিবেদিতা) ইস্কুল, তার পাশেই সে থাকে। সুধীরা থাকে। নিত্য খোঁজখবর নেয়। ওদের ইস্কুলের ঘোড়ার গাড়ি করেই গঙ্গায় যাতায়াত করি।
সারদানন্দ খুশি হয়ে বললেন, যাক, নিবেদিতা তা হলে উত্তম ব্যবস্থাই করেছেন।
শুধু ওটুকুই নয় বাবা, সারদা বললেন, ওদের ওই গাড়িতে করেই এর মধ্যে ছুটির দিন দেখে দেখে কালীঘাট-জাদুঘর-চিড়িয়াখানা, মায় একদিন কোম্পানির বাগানেও (বোটানিক্যাল গার্ডেন) বেড়িয়ে এসেছি।
সারদানন্দ জিগ্যেস করলেন, গিরিশবাবু আসেন?
ওহ্-হো, সেকথা তো বলাই হল না। এর মধ্যে মিনার্ভা থিয়েটারে গিরিশের বিল্বমঙ্গল নাটকও দেখে এসেছি। আসে তো বটেই।
বাহ্। শুনে বড় নিশ্চিন্ত বোধ করছি মা। নাটক ভাল লেগেছে?
সে আর কী বলব বাবা! বিল্বমঙ্গলের একনিষ্ঠ প্রেম দেখে বুকটা ভরে গ্যাছে। ঠাকুরের দেহ থাকতে তাঁর সঙ্গে তো তেমন কোথাও যেতে পারতুম না। কথায় কথায় কেবল বলতেন, তুমি আমি একসঙ্গে গেলে লোকে বলবে, দ্যাখো, হংস-হংসী একসঙ্গে এয়েচে!
নিজেই হেসে উঠলেন সারদা। আবার যোগ করলেন, গিরিশকে বলেছি, এবার থেকে কলকাতায় এসে থাকলেই থিয়েটার দেখতে যাব। ছেলেরা তো আছেই, মেয়েগুলোও যে কী প্রাণ দিয়ে পার্ট করে…!
একটু চুপ করে থেকে সারদানন্দ বললেন, আমি কয়েকটা নতুন উদ্যোগ নিয়েছি মা। ছোটাছুটিও বেড়েছে। তার মধ্যে নিবেদিতা যে আপনার যাওয়া আসা করার জন্য একটি ব্যবস্থা রেখেছেন, জেনে বড় স্বস্তি পেলাম। তাঁর কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতাঁর শেষ নেই।
সারদানন্দের মন্তব্যটির অন্তর্নিহিত কারণ ও অর্থ শুধু অনুমান নয়, অনুধাবন করলেন সারদা। স্বামীজির প্রয়াণের অব্যবহিত পরেই, নিবেদিতা যে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে নীতিগত কারণে নিজেকে সঙ্ঘ থেকে কিঞ্চিৎ পৃথক করে নিয়েছেন, এ খবর তাঁর জানা। মঠ থেকেও তখন খবরের কাগজে এই বলে একটি বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল যে, “অতঃপর সিস্টার নিবেদিতাঁর কোনও কাজই মঠ-কর্তৃপক্ষের সম্মতির অপেক্ষায় থাকিবে না। তাঁহার কাজ সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র বলিয়া গণ্য হইবে।” কিন্তু ও ছিল নীতি, ভাবনার ফারাক। কোনও পক্ষেরই আন্তরিক যোগাযোগ কোনওদিন ছিন্ন হয়নি। আর সারদা তো তাঁর জন্ম জন্মান্তরেরই মা। নিবেদিতা তাঁর প্রিয়তমা কন্যা।
সারদা সংক্ষেপে বললেন, বাবা শরৎ, মা-মেয়ের মধ্যে কৃতজ্ঞতার ব্যাপার বলে কিছু থাকে না। তোমরা যেমন আমার ছেলে বলে সব দেখাশোনা করো, সে-ও মেয়ে হিসেবেই করে। আমরা সবাই একই পরিবার। নীতি-টিতি যার যার, তার তার তো হতেই পারে, তাইতে আমাদের…।
সারদানন্দ দ্রুত মায়ের কথার মধ্যেই বলে উঠলেন, ঠিক, ঠিক বলেছেন মা। তিনি অবশ্যই আমাদের সকলের চিরকালের পরমাত্মীয়।
সারদা প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে বললেন, নতুন কী উদ্যোগের কথা বলছিলে?
সামান্য আনমনা ভাব কাটিয়ে শরৎ বললেন, হ্যাঁ মা। অনেকদিন ধরেই এন্তাম করছিলাম… আপনি এবাড়ি-সেবাড়িতে এসে ওঠেন… আমার ঠিক মনঃপূত হয় না। আপনার একটি নিজস্ব বাড়ি যদি করতে পারতাম… তো দেখি, ঠাকুর যদি এবার…।
ও নিয়ে ভেবো না বাবা, আমি বেশ আছি। আর ঠাকুর চাইলে, একদিন তোমাদের সব মনোবাচ্ছা পূর্ণ হবে।
ব্যস, আপনার এই কথাটাই যথেষ্ট মা। একটা আশার আলো দেখেছি বলেই কথাটা বললাম। আপনার ঠাকুরের সেই এক গৃহীভক্ত কেদারনাথ দাসকে মনে আছে কি?
সারদা একটু ভেবে বললেন, খড়ের ব্যবসা করে যে… ‘খোড়া কেদাঁর’ বলে লোকে, সে?
ঠিক বলেছেন, সে-ই৷ সেই খোড়া কেদারবাবু বেলুড় মঠকে একটি জমি দান করেছেন। জমিটা এই বাগবাজারেই, গোপাল নিয়োগী লেন-এ, তিন কাঠা চার ছটাক। আমার হাতে তো কিছু পুঁজি আছে মা। নরেনের বই বিক্রি করে আছে দু’হাজার সাতশো টাকা। তা ছাড়া নিবেদিতা কয়েক বছর আগেই আপনার একটি বাড়ির ভবিষ্যৎ কল্পনায় চারশো পাউন্ড দিয়েছিলেন। তো এবার সত্যি সত্যি ভাবছি… লেগে পড়ব।
তাড়াহুড়ো কোরো না বাবা। বাড়ি করা তো মুখের কথা নয়!
জানি মা। তাড়াহুড়ো করে যাহোক কিছু একটা খাড়া করে ফেলাও আমার ইচ্ছে নয়। আপনার বাড়ি মানে…। দেখা যাক। আপনি শুধু এই আশীর্বাদটুকু করবেন, আমার ভাবনাকে যেন বাস্তব রূপ দিতে পারি।
সারদা স্মিত হেসে আন্তরিক নিষ্ঠ সন্তানটির মাথায় হাত ছোঁয়ালেন।
পুরী থেকে ফেরার কয়েকমাস পরে সারদা সদলবলে জয়রামবাটি ফিরে গেলেন বটে, কিন্তু শরীরটা বেগতিক হতে লাগল বারবার। নিজের কষ্ট তো আছেই, আছে সাংসারিক অশান্তি, জমিজমা নিয়ে ভায়েদের মধ্যে কলহ। এসবের মধ্যেও সারদা টের পান তাঁর জন্য কলকাতার ভক্ত-শিষ্য এবং বিশেষ করে ছেলেদের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা। বেলুড় মঠের উন্নতিকল্পে নিজের ভূমিকাও মাথায় যাতায়াত করে বই কি! তা সত্ত্বেও গ্রামে কাটালেন কিছুদিন।
শেষ পর্যন্ত গিরিশের ডাকে সাড়া না দিয়ে পারলেন না সারদা। তাঁর গৃহে দুর্গোৎসব, মাকে ছাড়া হবে না। গিরিশের দিদিরও সেই এক মত। পুজোর মাত্র ক’দিন আগে কিছুটা শারীরিক অসুস্থতা নিয়েই আবার কলকাতা এসে পৌঁছালেন সারদা। এদিকে দাঙ্গাবিধ্বস্ত কলকাতার রাত তখন অন্ধকারে ডুবে রয়েছে। কিন্তু হাওড়া স্টেশনে গাড়ি পাঠিয়েছেন ললিতবাবু। মাকে ভিতরে বসিয়ে, প্রহরীর মতন কয়েকজন ভক্তশিষ্য পাদানির ওপর দাঁড়িয়ে চললেন। আগে তাঁকে সেই পুরনো ঠিকানা বলরাম বসুর বাড়িতে পৌঁছে দিতে হবে।
