৭
সারদা চলেছে কলকাতার পথে, পায়ে হেঁটে।
সঙ্গে চলেছেন আজীবনের ঘনিষ্ঠ কাছের মানুষ, স্নেহসিক্ত পিতা রামচন্দ্র মুখোপাধ্যায়।
আরও কয়েকজন আছেন সামুই-মণ্ডল-ঘোষ-বিশ্বাস পদবির পাড়া-প্রতিবেশী নারী-পুরুষ। মনে মনে খুব ইচ্ছে ছিল সারদার সঙ্গে যদি ভানুপিসি, অঘোরমণি, এমনকী মাসি দীনময়ীও যেতে পারত। কিন্তু হল না। নির্দিষ্ট দিনটা কাছাকাছি আসতে আসতে, একে একে বাদ হয়ে গেল প্রিয় মুখগুলো। অঘোরমণি শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে আসতে পারল না। ভানুপিসির নিজের কোনও অসুবিধে ছিল না, কিন্তু বিধবা বোনের আশ্রয়দাতা দাদা গৌর বিশ্বাস, নামে গৌর হলেও, আচরণে ছিল ঘোরতর অবৈষ্ণব। সংসারের কাজ ফেলে রেখে সে কি কাজের বোনকে বেড়াতে যাওয়ার অনুমতি দিতে পারে?
সূক্ষ্ম একটা আশা তবু ছিল মানগরবিনীর (ভানুর) শেষ পর্যন্ত। পাড়ার মানুষরা গঙ্গাস্নানে যাচ্ছে, সঙ্গে রামদাদা রয়েছেন, সারুও যাচ্ছে। দাদা রাজি হলেও হতে পারে। হল না। নামে আর চরিত্রে মিল ছিল ভানুপিসিরও। দাদাকে আর অনুরোধ করে নিজে ছোট হতে চায়নি। মুখটা শুকনো আর করুণ হয়ে উঠেছিল।
আগের রাতে এসে জানিয়ে গেল সারদাকে, এবারটা হল না রে।
আনন্দের রেশ মিলিয়ে গিয়েছিল সারদারও। বিষাদের মুখে বলেছিল, গৌরকাকাকে আর-একবার বলে দেখো না পিসি!
ভানু বলেছিল, ও যেতে দেবে না। বিধবা বোনের ওপর দাদার সংসারের দাবি, ঝিয়ের থেকে অনেক বেশি।
সারদা নাছোড়। বলল, একবার বাবাকে দিয়ে বলাব?
মুখ নষ্ট করে লাভ নেই, সারু। ‘না’ বললে, রামদাদার মান থাকবে না। সেটা আমি চাই না।
নিরাশ মুখে অন্ধকার নেমেছিল সারদার।
তার মধ্যে গলার স্বর পালটে ভানু বলেছিল, মন খারাপ করিস না। এই তো প্রথম বার যাচ্ছিস। এর পর যাতায়াত চলতেই থাকবে। তুই থাকলে আমিও থাকব।
মেনে নেওয়া ছাড়া সারদারও উপায় ছিল না। একটু চুপ করে থেকে বলল, জান পিসি, বাবা ঠিকই বুঝেছে, হঠাৎ আমার গঙ্গাস্নান করতে যাওয়ার এত উৎসাহ কেন!
ভানুপিসিও হাসল। বলল, বুঝবেন না-ই বা কেন?
আহা, আমি তো কিছু বলিনি।
বলার দরকার হয় না। রামদাদা যে তোর বাবা রে!
গোপন কথা বলার মতন ফিসফিস করল সারদা। —আমার একটু ভয় ভয় করছে পিসি।
ও মা, ভয় কী রে! সে মানুষ কি তোর অচেনা?
তা নয়। সারদা বলল, তবু চার বছর হয়ে গেছে, শেষবার যখন দেখেছি।
তাতে কী? ভুলে তো যাসনি। আর তিনিও ভোলার লোক নন।
আসলে নানান কথা শুনি তত… যদি দেখি পালটে গিয়েছেন…
শোন সারু, ভানুপিসি বলল, বিশ্বাসের মধ্যে কোনও ‘যদি’ থাকে না। যে মানুষটাকে কাছের থেকে দেখে বিশ্বাস করেছিস, এতদিন যে বিশ্বাস আঁকড়ে পড়েছিলি, সেইটার কথাই ভাববি। তিনি যদি পালটানোর মতো লোক হতেন, তা হলে সেদিন থেকে তোর এই বিশ্বাসটা তৈরিই হত না। ফাঁক থাকলে তোর চোখেই আগে পড়ত।
সেটা এখন বুঝি, পিসি। সারদা বলল, তা হলেও আমরা তো থাকি সংসারে, আর তিনি…
তিনি কী? সংসারের বাইরে? ওভাবে ভাবিস না মা। স্বামী-স্ত্রীকে তিনি নিজেই বলেছেন, দু’জনে মিলে ‘বিদ্যার সংসার’ গড়বে না?
ওই তো, ওসব কথাগুলোই যে বুঝে উঠি না।
সময় হোক, তাঁকে আরও দেখ, বুঝবি। তিনিই বুঝিয়ে দেবেন।
বিদ্যার সংসার কী পিসি?
সেকথাও তো তিনিই বলেছেন, বিবেকরূপ জল-ছাঁকা আরোপ কর সংসারে থেকে। ময়লাটা একদিকে পড়ে, ভাল জল আর একদিকে। ওই ভাল জলের দিকটাই হচ্ছে বিদ্যার সংসার।
সারদা চুপ করে ভাবল কয়েক মুহূর্ত।
ভানুপিসি তার মধ্যেই বলল, ঘাবড়াস না, তাঁর কাছেই তো যাচ্ছিস। এবার তাঁকে নতুন চোখে দেখবি।
ভানুপিসি চলে গেল। দীনময়ীও যেতে পারলেন না। বয়েস হয়েছে, হেঁটে যাওয়ার কথায় উৎসাহ নিবে গেল একটু একটু করে।
দু’-একদিন আলোচনা চলল, কোন পথে যাওয়া হবে তাই নিয়ে। কেউ বলল, উত্তরে বর্ধমান পর্যন্ত হেঁটে গিয়ে, তারপর রেলগাড়ি ধরা যেতে পারে। কিন্তু সে-ও খুব সহজ পথ না, তা ছাড়া কিছুটা উজোনে যেতে হয় বলে দূরত্বও বেশি পড়ে যায়। জয়রামবাটি থেকে আগে আসতে হবে কামারপুকুর, সেখান থেকে আবার হেঁটে বেঙ্গাই চৌরাস্তা, কুমারগঞ্জ, একলকী এবং উচালনের পথ ধরে তারপর বর্ধমান। রাস্তাও ভাল কিছু না। একটানা যাওয়ার প্রশ্ন নেই, চটিতে থামতে এবং রাত্রিবাস করতে হবে।
সুতরাং তাই যদি হয়, তা হলে কামারপুকুর থেকে জাহানাবাদ (আরামবাগ) হয়ে যাওয়াই ভাল। জাহানাবাদ থেকে তেলো-ভেলোর মাঠ পেরিয়ে তারকেশ্বর। তারকেশ্বর থেকে কলকাতা, দূরত্বও অপেক্ষাকৃত কম। যদিও পথে দ্বারকেশ্বর-মুণ্ডেশ্বরী-দামোদর নদ পার হতে হবে। কিন্তু বসন্তকালের এই সময়ে সেটা খুব বড় সমস্যা নয়। তেলো-ভেলো আর কৈকালার মাঠে ঠ্যাঙাড়ে আর দস্যুদের উৎপাতের কথাও উঠল। কিন্তু দলবল একসঙ্গে থাকলে, তাই নিয়ে আর ভয় কী!
শেষ পর্যন্ত আরামবাগ-তারকেশ্বর হয়ে যাওয়াই ঠিক হল। মোট দূরত্ব ষাট মাইল তো হবেই। কম করে পাঁচ-ছ’দিন লাগবে।
বোঁচকা-বুঁচকি নিয়ে দল চলেছে। হাসাহাসি, বকর বকর চলছে। ক্লান্তির আভাস নেই, ভেসে গেছে মুক্তির আহ্বানে।
চৈত্র মাসের প্রথম দিক। অশান্ত বসন্তের হাওয়ায় শুকনো ভাব, তাপ বেড়েছে সূর্যকিরণে। আবার ছায়াও বেড়েছে। গ্রাম্য পথ তৈরি হয়েছে গাছগাছালির ধারপাশ দিয়ে। রোদ বাঁচিয়ে চলার জন্য মানুষ সুবিধে মতো আঁকাবাঁকা রাস্তা করে নিয়েছে গাছের তলা দিয়ে। সেই গাছে এখন হামলে পড়েছে নতুন পাতার ঝাড়। তার নিবিড় ছায়া আর এলোমেলো বাতাস, বাতাসের শব্দেও যেন তাপ ভেসে যায়। পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় গন্তব্যের দিকে।
কোনও পথের বাঁকে, গৃহস্থের আঙিনা থেকে হঠাৎ হঠাৎ চোখে পড়ে রঙের গুচ্ছ, কালের সাজ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অশোক-শিমুল-পলাশ। কখনও তারা আকাশমুখী। সন্ত বাতাসের ঝাপটায় স্থির নয়, যেন তারাও চলমান হয়ে উঠেছে মানুষের দলের সঙ্গে। পায়ে চলা পথের দাগ, শুকনো মাটিতে মাথার সিঁথির মতন, চলেছে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। কখনও মাঠের মধ্যে দিয়ে।
উন্মুক্ত প্রান্তরের মাঝে ছোট ছোট গ্রাম, যেন এক-একটা দ্বীপের মতন। সেখানে গাছপালা বেশি, ছায়ায় ঢাকা। হঠাৎ হঠাৎ উঁচু হয়ে ওঠা একপেয়ে তাল-খেজুর-নারকোল যেমন আছে, তেমন আছে আম-কাঁঠাল-নিম-জাম। ইতিহাসের সাক্ষীর মতন ঝরিনামা বট, অশ্বখ দাঁড়িয়ে আছে কোনও পথের বাঁকে। শিলা আর নুড়ি পাথর তাদের গোড়ার কাছে, গায়ে তেল-সিঁদুরের ফোঁটা। বোঝা যায় ধারেকাছে লোকবসতি আছে। মন্দিরের বিকল্প অক্ষয় বট আর অশ্বথ, লোকে সেখানে মানত করে, পথ চলার ক্লান্তি কাটাতে দু’দণ্ড বিশ্রাম করে। দিঘি, পুকুরগুলো শুকোয়নি এখনও। তৃষ্ণা নিবারণের জন্য দাঁড়াতে হয় সেখানেও। পথচারীদের চেহারা দেখে চিনতে পারে গ্রামবাসী। গৃহে আপ্যায়ন করতে পারে না, কিন্তু বিশ্রাম, জলপান করতে আপত্তি করে না। দুটো কথা বলে, ফলমূল ছিঁড়ে হাতে দিয়ে দেয়। তারকেশ্বর কিংবা কলকাতায় দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে চলেছে সারদারা— শুনেই কপালে হাত ঠেকায় কেউ কেউ। কেউ বা এক পা এগিয়ে দুটো কথা বলে যায়, স্পর্শ নেয়। আমাদের কথাও বোলো গো ঠাকুরকে, এত কষ্ট করে যাচ্ছ, ঠাকুর মঙ্গল করুন।
হাসাহাসি রঙ্গ-রসিকতা চলছে অল্পবয়েসিদের মধ্যে। বড়রাও মন্তব্য করছেন মাঝেমধ্যে, মুখ বুজে একটানা রাস্তায় হাঁটা যায় না। কথাবার্তায় মনটা ভুলে থাকে, শ্রমের কথা মাথায় আসে না। একটা পুরনো ছাতা সঙ্গে এনেছেন রামচন্দ্র, কিন্তু বিশেষ করে তা মেয়ের কথা মনে রেখেই। দলবলের সঙ্গে যেতে গেলে, নিজের জন্য আলাদা সুবিধের ব্যবস্থা করার মতো রুচি নয় তাঁর। তা সত্ত্বেও সঙ্গে রেখেছেন। খুব বেশি দিনের কথা নয়, সারদা ম্যালেরিয়া জ্বর থেকে ভুগে উঠেছিল। ঠিক হয়ে সেরে উঠলেও, মেয়ের ব্যাপারে একটু বেশি সতর্ক থাকেন রামচন্দ্র। ছাতা সেই বগলেই রয়ে গেছে, তা হলেও হাঁটতে হাঁটতে খেয়াল রাখেন মেয়ের দিকে।
এমনিতেই শান্তশিষ্ট, কম কথার মেয়ে সারদা। আজ পথযাত্রায় সে আরও স্বল্পবাক। মাঝেমধ্যে কারওর কথার একটা আধটা উত্তর দিচ্ছে বা সামান্য হাসছে। কিন্তু অধিকাংশ সময়েই সে নীরব। আসলে নানান কথা, আর কথার ভাবনা আজ তার মনে মনে, সঙ্গে সঙ্গে চলেছে। বছর কয়েক আগেকার স্মৃতিরা ধামাচাপা পড়েছিল এত দিন। তারা উদ্বেল হয়ে উঠছে আজ আবার।
হওয়ারই কথা যে! শেষ চোখের দেখার পরে, মাঝখানে কেটে গেছে এতগুলো দিন। তিনি কি তেমনই আছেন!
বুকের মধ্যে বারবার আছড়ে পড়ছে সেই প্রশ্নটাই। প্রশ্নের মধ্যে মিশে রয়েছে আনন্দ-উদ্বেগ-কৌতূহল।
না, সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই। কৈশোরের দেখা-জানা-বোঝায় তখন যে আলো-আঁধারি, ছায়া ছায়া ভাব ছিল, মাঝখানের কয়েক বছরে সেই ছায়ার অনেকটাই অপসৃত। তাঁর কথা, আচরণে হেঁয়ালি মনে হয়েছিল যেখানে, আজ কীভাবে, কবে থেকে যেন স্পষ্টতর হয়ে উঠেছে অনেক কিছু। তিনি জোর করে ধরিয়ে দেওয়ার কিংবা মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেননি। অথচ অনর্গল কত কিছু বলে গেছেন, শুনিয়েছেন, ছোটখাটো ব্যাপার হাতে হাতে করেও দেখিয়েছেন।
আর আজ সারদা ঠিক বোঝে, আসলে তিনি তখন বীজ বোনার আগে মাটি তৈরি করার মতন তাকে তৈরি করছিলেন। চিনেছিলেন তো আরও অনেক আগেই। সংশয়েরও লেশমাত্র ছিল না কখনও তাঁর কথায়, ব্যবহারে। শুধু সময় নিয়েছেন, কখন কতটা দেবেন, বলবেন তাকে তিনি মেপেছেন, হিসেব করেছেন, তার পর দিয়েছেন। দূরত্বও রেখেছেন, তার মধ্যে দিয়েই কাছে টেনেছেন। কম না, আবার বেশিও না। হালকাভাবে ভেসে যেতে দেননি, ভারে ডুবিয়েও দেননি। যখন যেমনটি, তখন তেমনটির মতন গড়ে নিয়েছেন, গড়ে দিয়েছেন।
তা হলে তাঁর দেখা পেতে যাওয়ার আগে, আজ আনন্দ আর কৌতূহলের সঙ্গেই উদ্বেগ কেন?
কারণ মানুষী প্রতিক্রিয়া। শুধু নিজেরই না, তাঁর কথা ভেবেও। তিনি গোড়া শক্ত করে বেঁধে দিয়েছিলেন, জল সিঞ্চনও করে দিয়েছিলেন। সারদা এ-ও জানে, তাঁর দূরদৃষ্টিতে ওকে দেখারও হয়তো কিছু বাকি নেই তাঁর। তবু মাঝে সময় গেছে চার বছর। প্রকৃতি পার্থিব ছোঁওয়া দিয়ে দিয়ে স্থায়ী সাক্ষী রেখে গেছে দেহের ভাঁজে, মনের কোনায়। চর্মচক্ষুতে তার প্রতিফলন কেমন, তা যে জানা হয়নি! ন্যাড়া গাছের পাতা-ডালপালা-কুঁড়ি গজানোর সঙ্গে সঙ্গে কোথাও কি তার উৎকণ্ঠাও বাড়ে না! কিঞ্চিৎ অস্থিরতা!
সে যেমন ছিল, আজ আর ঠিক তেমন নেই। হোক তা বাইরের পরিবর্তন। তবু তা পরিবর্তনই তো!
দুর্ভাবনা নেই, সন্দেহ নেই। তবু আনন্দ আর কৌতূহলের উচ্ছলতা টের পাওয়ার জন্যই আছে একটু উদ্বেগের দোলা। আঠারোটি বসন্তের দানে, দোলায়, দীক্ষায় তখন সে পল্লবিত। মেধা-মনন-মন্ত্রে পূর্ণ। চেতনার শ্রম আর অবচেতনের সাধনায় স্নাত, শুদ্ধ। কৌতূহলটি যেন নিজের বিশ্বাসকেই আর একবার দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরার প্রয়াস। সবাই এমন বলছে, একবার স্বচক্ষেই দেখে আসি। কৈফিয়ত দেওয়ার জন্য না, সন্দেহ-ভঞ্জনের জন্যও না; সারদা চলেছে আত্মার কাছে স্বাক্ষরিত হওয়ার জন্য।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামে, সূর্য চলেছে পশ্চিমে। বাতাসের হলকায় মিশে যাচ্ছে বসন্তের স্নিগ্ধ প্রলেপ। দু’-একবার বিশ্রাম নেওয়া হয়েছে। মুড়িচিঁড়ে, ফলমূল খাওয়া হয়েছে। তারপর আবার চলা। রাতে আশ্রয় নিতে হবে কোনও চটিতে। দলের ইচ্ছে, সূর্যের তাপ কমেছে, আবার আলোও রয়েছে। সুতরাং হাওয়ায় হাওয়ায় যতটা পারা যায় এগিয়ে যাওয়াই ভাল।
সারদা ক্লান্তির কথা উত্থাপন করে না। মনের ইচ্ছেটা—এবার বিশ্রাম নিলেই হত। রামচন্দ্র খেয়াল করেন।
বাবার চাপা উদ্বেগ বুঝতে পারে সারদা। হেসে বলে, কেন, পিছনে আসছি বলে?
না…জিগ্যেস করছি আর কী… ভুগে উঠলি কিছুদিন আগে—
সবাই তো হাঁটছে, যাই আরও কিছুটা।
শরীরটা ঠিক আছে তো মা?
ঠিকই আছে। চিন্তা কোরো না বাবা।
রামচন্দ্র পুরোপুরি নিঃসংশয় হতে পারেন না। বলেন, বেকায়দা বুঝলে বলিস কিন্তু, আমি তো এলাম সেই জন্য!
আঁধার গাঢ় হওয়ার আগেই যাত্রা সাঙ্গ হল সেদিনের মতো। চটিতে নেহাতই রাত্রিটুকু ছাউনির নীচে কাটানোর ব্যবস্থা। বিচুলির ওপর চট পেতে শয্যার আয়োজন, একদিকে ছেলেরা আর একদিকে মেয়েরা। ক্ষুন্নিবৃত্তির ব্যবস্থা ছিল। চটির অদূরে জলাশয়টিও মন্দ না। অল্প গল্পগুজবের পরেই এক এক করে ঢলে পড়ল সবাই। ভোররাত থাকতেই প্রাতঃকৃত্য সেরে আবার রওনা হতে হবে। আবহাওয়াটি ভাল থাকায় ঘুম আসতেও দেরি হল না কারওর। ক্লান্তি তো ছিলই।
শুধু ঘুম আসছে না সারদার চোখে।
ক্লান্তিতে শরীর এলিয়ে পড়লেও, মনের দখল নিচ্ছে নানান ঘটনা, স্মৃতি। চোখ বুজে শুয়ে রইল সে।
কামারপুকুর থেকে কয়েক বছর আগে ভৈরবী ব্রাহ্মণীর কাশী চলে যাওয়ার ঘটনাটাই মনে পড়ছে সারদার। বুদ্ধিশুদ্ধি তেমন পাকেনি তখনও। তাহলেও মনে পড়ে, কেমন একটা দিশেহারা অস্বস্তির ভাব হয়েছিল কয়েকদিন ধরে।
প্রথম প্রথম ভৈরবী তেমন আমল দিতেন না সারদার উপস্থিতিকে। কিন্তু তারপরেই যেন বিরক্ত হতে শুরু করলেন। অদ্ভুত একটা দোটানা অবস্থা তখন ওর। উনি ডেকে ডেকে কাছে বসতে বলেন, এটা সেটা উপদেশ দেন, ঘরসংসারের কাজের কথা, মানুষকে ভালবাসা আর কাছে টেনে নেওয়ার কথা বলেন। ভৈরবী দেখামাত্র ওঁর সান্নিধ্য থেকে সারদাকে হটিয়ে দেন। আর আশ্চর্য কয়েকদিন পরে তিনি নিজেই সরে গেলেন। এমনকী সারদার মনে হয়েছিল, চলে যাওয়ার আগে, নিজের অদ্ভুত আচরণের জন্য ওঁর কাছে দুঃখপ্রকাশও করেছিলেন ভৈরবী। অথচ সে মানুষটা ছিলেন নির্বিকার। চোখের জলও ফেলেছিলেন ভৈরবী ব্রাহ্মণী।
দু’-একটা দিন সংকোচে, আর না-জানা অস্বাচ্ছন্দ্যে পালিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছিল সারদা। তিনিই ডেকেছিলেন।
হ্যাঁ গা, পালিয়ে পালিয়ে বেড়াও যে! কোথায় ছিলে?
রঘুবীরের মন্দিরে। এবার রান্নাঘরে যাব।
বাহ্ বেশ। একটু পাঁচমিশুলি ডাল রান্না করো তো। আর বেশ করে ফোড়ন দিয়ো।
রামলালের মা বলছেন… পাঁচফোড়ন নেই।
অ্যাঁ সে কী! যাতে যা দরকার, না দিলে কী করে হবে!
না-না তুমি এক্ষুনি রামলালকে পাঠাও, এক পয়সার পাঁচফোড়ন নিয়ে আসুক। আর এমন ফোড়ন দেবে, যাতে শুয়োর-ও গোঙায়। নিজেই হেসে ফেললেন তিনি।
সারদার মনটা ভাল না। হাসতে গিয়েও, হাসিটা এল না। তিনি তাও লক্ষ করলেন।
একটু চুপ করে থেকে বললেন, হ্যাঁ গা, মনটা ভাল নেই, না?
সারদা কিছু না বলে প্রথমে ঘাড় নাড়ল। তারপর বলেই ফেলল, মা ঠাকরুন চোখের জল ফেলতে ফেলতে চলে গেলেন…।
ওহ্, সেই কথা! সামান্য হাসলেন রামকৃষ্ণ।
সারদা বলল, তিনি খুব জ্ঞানী, ভক্তিমতী, অথচ…
শেষ করতে না দিয়েই রামকৃষ্ণ বললেন, সেই জন্যই কেঁদেছেন। তাঁর কাছে যে কাঁদতে হয়। মনের ময়লা ধুয়ে গেলে তাঁর দর্শন হয়।
তিনি তো সন্ন্যাসিনী, তাঁর মনে কি ময়লা থাকতে পারে?
তা কী করে বলব বাপু! তবে এই বুঝি, মনটি আমাদের যেন মাটি মাখানো লোহার ছুঁচ, আর ঈশ্বর হচ্ছেন চুম্বক। ছুঁচের মাটি সরে গেলেই, ঈশ্বরচুম্বক তাকে টেনে নেবেন। অর্থাৎ চিত্তশুদ্ধি হলেই ঈশ্বরদর্শন হবে।
সারদা অবাক হয়ে গেল একেবারে। ছোট ছোট সাধারণ উদাহরণের মধ্যে দিয়ে ঈশ্বরতত্ত্বের এমন সব গূঢ় কথা তিনি কী করে বলে দেন! আর এমনভাবে বলেন যাতে সারদা পর্যন্ত বুঝতে পারে, পেরে, সচেতনও হয়। বলল, ভৈরবী মা-র চিত্তশুদ্ধি হয়নি বুঝি?
একটু পাশ কাটিয়ে রামকৃষ্ণ বললেন, হওয়ার জন্যই জ্বালা-যন্ত্রণা, চোখের জল। তিনি উচ্চমার্গের মানুষ, মর্মে মর্মে উপলব্ধি আর চেতনার জন্যই কাশীবাসী হলেন মনে হচ্ছে।
সারদা বলল, সংসারে থেকে ঈশ্বরের উপলব্ধি আর চেতনা হয় না?
কেন হবে না? তিনি হাসলেন। তারপর বললেন, ঈশ্বরের পাদপদ্মে মন রেখে, সংসারের কাজ করো। কর্ম আর ধর্মকে মেলাও। আর যখন একলা থাকবে তখন ভক্তিশাস্ত্র, শ্রীমদ্ভগবৎ, চৈতন্যচরিতামৃত এই সমস্ত পড়বে।
আমি যে ভাল করে পড়তেই পারি না।
তিনি একগাল হেসে একেবারে হইচই ফেলে দিলেন। —এই দ্যাখো দেখি কী কাণ্ড…দাঁড়াও, দাঁড়াও হৃদেকে ডাকি। বর্ণপরিচয় নিয়ে আসুক, তুমি আর লক্ষ্মী দু’জনেই শুরু করে দাও। ওরে হৃদে, হৃদে…
শশব্যস্ত হয়ে সারদা বলল, আচ্ছা—আচ্ছা এখন থাক, পরে এনে দেবে। অন্য একটা কথা আছে।
কী কথা!
ঈশ্বর কোথায় থাকেন?
তাঁর হাসিটা মোলায়েম হয়ে এল একটু একটু করে। বললেন, তিনি বাইরে কোথাও নেই। বসে আছেন মানুষের ভিতরেই। তিনি আমাদের আত্মশক্তি, তিনিই অন্তঃসত্ত্বা।
ওহ্! তো ভিতরেই যখন আছেন, তা হলে সব কিছুকে তো নিয়ন্ত্রণ করতেও পারেন।
পারেনই তো।
কিন্তু করেন না তো! যে কাজ মানুষের করা উচিত নয়, তা সে করে কেন তা হলে? মানুষের বাসনা-অহংকার-ভয়-সংশয় হয় কেন? নিজের জীবন যেন নিজেরই হাতছাড়া হয়ে যায়! ভিতর থেকে নিয়ন্ত্রণের কলকাঠি নেড়ে সব ঠিক করে দেন না কেন?
তিনি আস্তে আস্তে মাথা নেড়ে বললেন, এরই নাম আত্মবিস্মৃতি। তিনিটা কে? তিনি আমাদের আত্মপুরুষ, আমাদের মনেই তাঁর বাস। তাঁর সঙ্গে যুক্ত হওয়াটাই হচ্ছে যোগ। আর সেই যোগই হল সাধনা। সেটি করলে, ভিতর থেকে তাঁর কলকাঠিও নড়বে।
কথাগুলো মাথায় নিয়ে নাড়াচাড়া করে সারদা। ধরতাই পায় না, আবার কিছুটা যেন পায়-ও। কেন না একদিন তিনি দুটো কথা বলেছিলেন। জীবাত্মা আর পরমাত্মা। বলেছিলেন, আমাদের এই দেহটাকে যদি একটা গাছ মনে কর, তা হলে, সেই একই গাছের দুটি ডালে, দুটি পাখির মতন বসে আছে জীবাত্মা আর পরমাত্মা। জীবাত্মার ভোগ আছে, সে গাছের ফল খাচ্ছে। পরমাত্মার ভোগ নেই, সে কিছু করছে না, শুধু দেখছে। কিন্তু জীবাত্মা হচ্ছে শক্তিহীন। শক্তির অভাবেই তার দুঃখকষ্ট ভোগ। কী করবে? পরমাত্মার সেবা, উপাসনা করো। দেখবে আনন্দ কাকে বলে। সেইটাই হচ্ছে যোগ, সাধনা। জীবাত্মাকে জুড়ে দিতে হবে পরমাত্মার সঙ্গে।
একটু পরে কিছুটা আত্মভোলা অবস্থায় সারদা বলল, আমার কি ওসব হবে? যোগ, সাধনা হবে, পারব?
পারবে গো, পারবে। তুমি যে শ্রীময়ী, তুমি যে সুলক্ষণা। এটুকুর পরেই জুড়ে দিলেন। আবার, তাঁর কৃপাটুকু পেতে হবে।
কী করে পাব? কৃপা কী?
রামকৃষ্ণ হেসে বললেন, করে পাওয়ার নামই কৃপা। একটু থেমে বললেন, অর্পণ, নিজেকে অর্পণ করতে হবে।
মনের মধ্যে ওই সব কথাগুলোই ঘোরে সারদার।
ভৈরবী ব্রাহ্মণী চলে গিয়েছিলেন। একটু একটু করে সারদারও অস্বস্তি সংকোচ কেটে গিয়েছিল।
কিন্তু তিনি ছিলেন যথাপূর্বং। গল্প-হাসি-ঠাট্টা-তামাশায় পুরো বাড়ি একেবারে জমিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু এখন সারদা বুঝতে পারে, আসলে সবকিছুর মধ্যে দিয়ে মানুষটা কাজও করে গিয়েছিলেন। অজস্র সূত্র ধরিয়ে দিয়ে গেছেন তাকে। অনেক ভেবেচিন্তে, বুঝেশুনেই তিনি যেন কিশোরী বধূটির সামগ্রিক বিকাশ আর উন্মেষের জন্য একটি মনের ভাঁড়ারঘর গুছিয়ে দিয়েছিলেন তখনই। রসদের অভাব নেই তার। সংসার আর ঘরের অভাব যত তীব্র হয়েছে, মনের প্রাচুর্য তত বেড়েছে।
বাইরের মানুষ যখন তাঁকে উপহাস আর নিন্দা করেছে, সারদার অন্তরের মানুষটির ততই চোখ ফুটেছে।
আজ তাই সে নিঃশঙ্কচিত্ত। শুধু শরীরটা ঠিক রেখে ঠাকুর। পথে পিছিয়ে পড়লেও, ক্লান্তিকে ক্ষমা করো।
ঘুমের দেশের পরিরা কখন যে আপন করে নিল, সারদা তা টেরও পেল না।
যখন চোখ মেলল, দেখে আবছা আলোয় গাছপালা দৃশ্যমান হয়েছে। ভোরের হাওয়ায় মিশে আছে গা-জড়নো স্নিগ্ধতা। পাতায় শব্দ উঠেছে সরসর, পাখিরা কোটর ছেড়ে বেরিয়েছে। চটির বাইরে তাদের ডানা ঝাপটানো আর ডাকাডাকির শব্দ আসছে। স্নানযাত্রীদেরও বেশ কয়েকজন উঠে পড়েছে। মাঠ সেরে, হাতমুখ ধুয়ে আবার রওনা হওয়ারও তোড়জোড় শুরু হয়েছে।
রামচন্দ্র আবার এককাঠি বাড়া। অন্য দিন গৃহদেবতার পূজা সেরে, পাড়ায় এবং দোকানপাটে ঠাকুরের ফুলচন্দন ছোঁয়াতে যান তিনি, সুতরাং ভোরবেলা শয্যা ত্যাগ করা অভ্যাস। আজ তার ওপর ঠাঁইনাড়া হয়েছেন, উঠেও পড়েছেন আগে। হাতমুখ ধুয়ে, একেবারে তৈরি হয়েই বসেছিলেন। সারদা চোখ খুলতেই বললেন, ভাল ঘুম হয়েছে তো মা?
প্রথম রাতে ঘুম না আসার কথা বলল না সারদা। উঠে বসে বলল, হ্যাঁ হয়েছে। আমায় ডেকে দাওনি কেন?
দেখছিলাম…গভীর নিদ্রায় ডুবে আছিস, তাড়ার কী?
সারদা হাই তুলে বলল, বাবা, আজকের দিনটা হাঁটলে কতটা পৌঁছব?
রামচন্দ্র বললেন, দেখা যাক, দিনে দিনে তেলো-ভেলোর মাঠটা পেরিয়ে তারকেশ্বরের কাছাকাছি পৌঁছে গেলে অনেকটাই নিশ্চিন্ত।
তারপরেও তো দু’দিন, না কি?
ওদিকটা নিয়ে চিন্তা নেই। তেমন দরকার হলে গোরুর গাড়ি, পালকিও পাওয়া যায়। আর একবার বৈদ্যবাটি পর্যন্ত…
থাক-থাক বাবা। —সারদা থামিয়ে দিল রামচন্দ্রকে। বলল, পরেরটা পরে ভাবা যাবে আমি বরং তৈরি হয়ে নিই। সবাই উঠে পড়েছে। গোছগাছ করার তেমন কিছু নেই। চোখেমুখে জল দিয়ে, দুটি মোয়া আর জল খেয়ে চটির ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল সারদা। পুব আকাশ ফর্সা হয়েছে, সূর্যদেব উঠি উঠি করছেন। সকালের হাওয়ায় এখনও ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব। গতকাল সব মিলিয়ে তেরো-চোদ্দো মাইল হাঁটা হয়েছে। জাহানাবাদ ফেলে আসা হয়েছে দু’-তিন মাইল আগে। আজ তেলো-ভেলোর মাঠ পেরিয়ে, তারকেশ্বর পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার ইচ্ছে সকলের। তার পরে আবার কৈকালার মাঠ ভাঙা। দুর্গম আর বিপজ্জনক জায়গাগুলো দিনে দিনে পার হয়ে যেতে পারলেই ভাল।
যাত্রীদলের সবাই তৈরি, অপেক্ষা করছিল সারদার জন্যই। ও বেরিয়ে আসামাত্র সবাই মিলে জয় শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য, জয় ভোলেবাবা, জয় মা ভবতারিণী বলতে বলতে রওনা হয়ে গেল। যথারীতি গল্পগাছা হাসাহাসিও শুরু হয়ে গেল। একটা ব্যাপার সারদা খেয়াল করে। সত্যি সত্যি মানুষ কেউ খারাপ না। আজ গ্রামের যে ক’টি মানুষ এই দলে শামিল হয়েছে, কিছুদিন আগে তাদের মধ্যেও কেউ, ওর স্বামী, পরিবার, ওকে নিয়েও কুৎসা করেছে, টীকা-টিপ্পনী কেটেছে। অথচ আজ তারা সেসব ভুলে একসঙ্গে চলেছে। গঙ্গাস্নানের নাম করে, আসলে তো মুক্তির আনন্দে ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে পড়া। আর বেরিয়ে পড়েই সবাই যেন খুশির টানে ভেসে চলেছে একসঙ্গে, এক পথে। সবাই সবাইয়ের আপনজন।
যথাসম্ভব একসঙ্গে পা মিলিয়ে চলার চেষ্টা করল সারদাও। নির্বিঘ্নে পেরিয়ে এল তেলো-ভেলোর মাঠ। দম নেওয়ার জন্য একবার বিশ্রাম নেওয়া, জলপানও হল। আবার চলা শুরু হল তারকেশ্বরের দিকে।
কিন্তু দুপুরের সূর্যের তাপ গনগনে হয়ে ওঠার মধ্যেই সারদা টের পায় শরীর তার বশে থাকছে না। বারবার সে পিছিয়ে পড়ছে। এখনও বেশ কয়েক মাইল হাঁটলে তারপর তারকেশ্বর। পারবে? পারবে সবাইয়ের সঙ্গে আজকের নির্দিষ্ট দূরত্বটুকু সন্ধের মধ্যে অতিক্রম করতে!
মাথা ঝিমঝিম করছে। মুখে প্রকাশ করছে না, সারদার উথাল-পাথাল অবস্থা মনের মধ্যেও যে! তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার দুরন্ত আকাঙক্ষা নিয়ে বেরিয়ে, শেষ পর্যন্ত কি বিফল হতে হবে? ফিরে যেতে হবে?
হাঁটছে, হেঁটে চলেছে সারদা। মাথা ভার। বোঝে শরীরে উত্তাপ বাড়ছে, গায়ে জ্বর আসছে। বাইরে প্রখর মধ্যাহ্ন সূর্যের তাপ, অথচ গায়ে যেন শীত-শীত ভাব, মৃদু কাঁপুনি লাগছে। কিছু বলে না সারদা। যে অগ্নিস্রাবী তাপে সকলে দীর্ণ, হাঁসফাঁস অবস্থা, অদ্ভুত আরামবোধ করে সারদা সেই প্রখর উত্তাপেই। আসলে এ আরাম অসুস্থ হয়ে ঝিমিয়ে পড়ার ইঙ্গিত। তবু পা টেনে যায় ও। কিন্তু এলোমেলো পা পড়ছে।
সন্দেহের সঙ্গে উৎকণ্ঠা নিয়ে রামচন্দ্র তাকান মেয়ের দিকে।
সারু মা, তোর চোখমুখ কেমন ঘোলাটে লাগছে যেন!
না, বাবা। চলো, ঠিক আছে।
নিশ্চিন্ত হতে পারেন না রামচন্দ্র। বলেন, ছাতাটা খুলব? রোদটা এড়ানো যাবে।
সারদা দ্রুত আপত্তি করে। রোদটাই যে তার ভাল লাগছে। বলে, না বাবা, রোদের জন্য কষ্ট হচ্ছে না।
একটু জল খাবি মা?
বাবার উদ্বেগ বাড়াতে চায় না সারদা। বলে, থাক, একটু পরে তো সবাই বসব… তখন…।
একটু পর-টাই বসতে বসতে বেশ খানিকক্ষণ হয়ে গেল। মাঠের মধ্যে অল্প কিছু গাছপালাওয়ালা সামান্য পান্থশালা, সঙ্গে ছোট্ট একটা মন্দির, আর জল নেমে যাওয়া একটা পাতকুয়ো নিয়ে এই চটি, বিশ্রামাগার। সামনে এখনও উন্মুক্ত প্রান্তর। ফসল কেটে নেওয়া, রং জ্বলে যাওয়া ধু-ধু প্রান্তরের মধ্যে দিয়ে পথ চলে গেছে দূরে। তাপে দগ্ধ হচ্ছে দীর্ঘবেলা। নির্জনতাকে নিঃসঙ্গ করে দিচ্ছে চিঁচিঁ চিঁচিঁ চিলের ডাক, ভেসে আসছে সাদা আকাশ থেকে। শুকনো বাতাসে ভেসে, উড়ে যাচ্ছে।
সারদা আর বসেও থাকতে পারল না। কয়েক বার বড় বড় শ্বাস নিয়ে চটির তেলচিটে মাদুরের ওপরে কাত হয়ে পড়ল। জ্বরের তাড়সে শরীর ঠকঠক করে কাঁপছে। চোয়ালের মধ্যে দাঁতে দাঁত ঠুকে যাচ্ছে।
রামচন্দ্র হুতোশে আর বিস্ময়ে, উৎকণ্ঠায় দুই ভুরু তুলে এগিয়ে গেলেন মেয়ের কাছে।
হ্যাঁ মা, সারু! বলেই কাঁধের কাছে হাত দিলেন।
মুখে আর কথা সরল না রামচন্দ্রর। সারদার গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। কিছুটা হতবুদ্ধির মতন তাকালেন অন্যদের দিকে।
কয়েকজনই খেয়াল করেছে ইতিমধ্যে। মহিলারাও এসে সারদার গায়ে হাত দিয়ে চোখ কপালে তুলল।
ও মা, এ কী কাণ্ড! সারুর গায়ে যে বেদম জ্বর! কী হবে গো?
দলে শ্রীপতি বিশ্বাস ছিল। গাঁয়ের লোকেদের টোটকা ওষুধপত্র বলে দেয় সে জ্বরজারিতে। উবু হয়ে বসে সারদার কপালে হাত দিল। তারপর মুখ গম্ভীর করে বাঁ হাতটা তুলে নিয়ে নাড়ি টিপল। আস্তে আস্তে মাথা দোলাল।
ঠাকুরমশাই, এমনি জ্বর বলে তো মনে হচ্ছে না। কাঁপুনি রয়েছে, দাঁত কপাটিও লেগে যাচ্ছে… ম্যালেরিয়া রাক্ষুসিই বোধহয় ধরল।
সন্দেহটা ঠিকই করেছিলেন রামচন্দ্র। কিন্তু এখন উপায়!
পথের ধারে এমন বিজনবিভুঁইয়ে মেয়েকে নিয়ে কী করবেন তিনি!
মেয়েরা তার মধ্যেই গায়ের কাপড়-চোপড় যা আছে, তাই দিয়ে ঢাকাটুকি দিয়েছে সারদাকে। পাতকুয়োতলায় দড়ি-বালতি ছিল। একজন জল তুলে নিয়ে এসে বলল, আগে মাথাটা ধুইয়ে, একটু জলপট্টি দাও কপালে।
ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেছে। কেউ মাথা ধোয়াচ্ছে, কেউ এই গরমের মধ্যেও সারদার ঠান্ডা হাত-পা ঘষে গরম করে দিতে চাইছে। শ্রীপতি তার মধ্যেই উঠে বলল, আমি দেখছি ধারেকাছে পুকুর-টুকুর আছে কি না। যদি খানিকটা ব্রাহ্মীশাক আর থানকুনি পাতা পাই…
ধরণী ঘোষ বলল, ঘৃতকুমারীর পাতা কি পাবে এ অঞ্চলে… না হলে পুনর্নবা শাক যদি পাও, হাতে চটকে কপালে দিলে জ্বরটা টেনে নেবে। তার পর দেখা যাক…। রাস্তাঘাটে আর উপায়টাই বা কী!
তারার মা সুকুমারী জলপট্টি দিতে দিতে আক্ষেপ করল, বাছার কপালটাই মন্দ গা। চান করার থেকে বরের সঙ্গে দেখা করার বড্ড চাড় ছিল… পথের মধ্যে ঠাকুর এমন বেকায়দায় ফেললেন…!
রামচন্দ্র ভাবছেন অন্য কথাও। মেয়ের শরীর খারাপ হয়ে যাওয়ায় বাকিদেরও বিলম্ব হয়ে যাচ্ছে। মুখে এই অবস্থায় কেউ কিছু বলছে না ঠিকই। তা হলেও সময়ের একটা হিসেব আছে সকলের। তা ছাড়া পুণ্যলগ্নের যোগ আছে স্নান করার জন্য। যদি দেরি হয়ে যায় অন্যদের!
ঘণ্টাখানেক পরে কিছুটা সুস্থ বোধ করল সারদা। অন্যরাও একটু উশখুশ করছে। সহানুভূতি, চক্ষুলজ্জা দুই রয়েছে। কিন্তু সারদাকে এই অবস্থায় সঙ্গে নিয়ে যে আবার রওনা হওয়া যাবে না, তাইতে কোনও সন্দেহ নেই রামচন্দ্রর। তাঁকে বাকি দিনটা এবং রাত্রিযাপন করতে হবে এই চটিতেই। মেয়ে তাঁর, দায়িত্বও তাঁর। কিন্তু বাকিদের আর অসুবিধে সৃষ্টি করতে চান না।
সারদার মাথায় হাত দিয়ে রামচন্দ্র জিগ্যেস করলেন, কেমন বোধ করছিস মা?
ভারী চোখের পাতা তুলে তাকাল সারদা। প্রায় রক্তবর্ণ দুই চোখ। ক্লান্ত স্বরে বলল, একটু ভাল বাবা। কিন্তু খুব দুর্বল।
কিছু চিন্তা নেই মা। আমি তো আছি। বাকিদের দিকে তাকালেন রামচন্দ্র। শ্রীপতি আর ধরণীকেই উদ্দেশ করে বললেন, আপনারা বরং রওনা হয়ে পড়ুন। আর সময় নষ্ট হলে, আজ আর তারকেশ্বর পেরুতে পারবেন না। আমি সারুকে নিয়ে রাত্তিরটা চটিতেই থাকব।
শ্রীপতি মৃদু আপত্তির সুরে বলল, সেটা কি ভাল দেখায় ঠাকুরমশাই এমন একটা অসুবিধের সময়… কী বলেন ধরণীদা?
ধরণীও এনতাম করে বলল, সে তো খুব উচিত কথাই বটে! অসুখ-বিসুখ তো মানুষের হাতের মধ্যে না… আর একটু অপেক্ষা করে না-হয়…
সারদাই ধীরেসুস্থে হাত তুলল। ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, আপনারা রওনা হয়ে যান। বাবা রয়েছে, ঠাকুরের দয়া হলে আমরা পিছন পিছন পৌঁছে যাব… আর দেরি করবেন না।
রামচন্দ্রও বললেন, হ্যাঁ-হ্যাঁ, তাই ভাল। সারু ভাল থাকলে… দেখি যদি কালকে কিছু একটা ব্যবস্থা করা যায়। আপনারা বেরিয়ে পড়ুন।
কয়েক মিনিট কথাবার্তার পরে স্নানযাত্রীরা বেরিয়েই পড়ল। দুগগা-দুগগা বলে রামচন্দ্র বসে ছিলেন সারদার মাথার কাছে। তপ্ত দুপুরের রোদে আট-দশ জনের দলটা পথে নেমে পড়ল। একটু একটু করে ছোট হতে হতে এক সময় হারিয়ে গেল দীর্ঘ পথের বাঁকে দৃষ্টির বাইরে। সারদা ততক্ষণে আবার ঝিমিয়ে পড়েছে নিদ্রার কোলে।
নিদাঘবেলায়, নির্জন প্রান্তরের চটিতে বসে ঠাকুরের নাম আর মেয়ের শুশ্রূষা করে গেলেন রামচন্দ্র। বারবার মাথা ধোওয়ালেন, জলপট্টি দিলেন। একসময় সূর্যের তাপ কমল, গেরুয়া আলোয় এল গোধূলির আভাস। গাছের ছায়ারা লম্বা হল। দূরের পথে কাঠকুটো মাথায় নিয়ে কেউ কেউ চলে গেল। কিন্তু চটিতে আর কেউ এল না। সন্ধের শুরুতে পাক খেয়ে উঠল চৈত্রের বাতাস। তারপরেই অন্ধকারে ডুবে গেল চরাচর। জ্বরের ঘোরে প্রায় বেহুঁশ সারদা। তা হলেও কাঁপুনি কমেছে। মাথার যন্ত্রণাটাও কম। কোনও মতে তুলে বসিয়ে দুটি ভেজানো চিঁড়ে খাইয়ে আবার শুইয়ে দিলেন রামচন্দ্র।
ঘুটঘুটে অন্ধকারে একমাত্র নক্ষত্রের আলোতেই সামান্য আবছায়া ভাব। টুপটাপ জোনাকি জ্বলছে কাছে দূরে। একটানা ঝিঁঝির ডাকে একসময় চোখ জুড়ে এল রামচন্দ্রেরও। মেয়ের কাছেই হাতখানেক তফাত রেখে শুয়ে পড়লেন। ঘুমও এসে গেল।
জ্বরের ঘোরে কোনও ভাবনা-চিন্তা দানা বাঁধে না। এলোমেলো ছবি, কথা, দৃশ্য কত কী যাতায়াত করে বেহুঁশ সারদার মনের মধ্যে। কোনও কিছুই নির্দিষ্ট অর্থে স্থায়ী হয় না। তার মধ্যেই কালো গায়ের রং মেয়েটিকে সারদা দেখল। চিনতে পারছে না তো! কে ও? কোনও দিন দেখেছে কি? মনে হচ্ছে না।
ওর পাশেই বসেছে মেয়েটি, আর অপলক প্রসন্ন দৃষ্টি পেতে রেখেছে ওর মুখের দিকে।
অবাক লাগছে সারদার। কালোর ওপর বড় অপরূপা মেয়েটি। যেমন মুখের ডৌল, তেমন টানা টানা, বড় আর মায়াবি চোখ। কী যেন একটা মিষ্টি গন্ধ বেরুচ্ছে তার কোমল অঙ্গ থেকে। গলায় মালা রয়েছে কি?
আস্তে আস্তে মেয়েটি তার নিটোল বাহু বাড়িয়ে দিল সারদার দিকে। তারপর পরম আশীর্বাদের মতন স্পর্শ করল ওর কপাল, চিবুক। মোলায়েম আর শীতল স্পর্শে যেন শরীর মন একসঙ্গে জুড়িয়ে গেল সারদার। মাথাটা হালকা লাগছে, শরীর শীতল। চোখ বুজে এল ওর। কী একটা আনন্দ আর শান্তির অনুভব চারিয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু ও কে?
আবার চোখ খোলে সারদা। একরকম শান্ত, মায়াময় চোখে তাকিয়ে আছে কালো মেয়ে। ও কথা না বলে পারল না।
তুমি কে গো, কোত্থেকে আসছ?
মেয়েটির প্রসন্ন মুখে স্মিত হাসির আভাস যেন। অস্ফুট শব্দে ঠোঁট নড়ল।
আমি দক্ষিণেশ্বর থেকেই আসছি।
অ্যাঁ, দক্ষিণেশ্বর থেকে?
সারদা অবাক হয়ে গেল। যেন কতক্ষণ পরে আবার দক্ষিণেশ্বর নামটা শুনল। অথচ মনে মনে এই জায়গার নাম জপতে জপতেই তো বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল। তা হলে এখন ও কোথায়? বলল, এটা কোন জায়গা?
তুমি ঠিক জায়গাতেই আছ মা।
সারদা বলল, ওহ্ আচ্ছা। কিন্তু তুমি এখানে এলে কী করে?
মনে হল, তাই এলাম।
সারদা এপাশ ওপাশ তাকাল। চোখ গেল মেয়েটির পায়ের দিকে। সত্যিই তো, ধূলি-ধূসরিত দুটি সুন্দর পা!
বলল, মা গো, এত কষ্ট করে এলে, তোমার পা ধুতে কেউ জল দেয়নি?
মৃদু হাসল মেয়েটি। বলল, তার দরকার নেই। আমি চলে যাব এখনই আবার।
ওহ্, কোথায় যাবে তুমি?
আমায় যে তাঁর কাছে দক্ষিণেশ্বরেই ফিরে যেতে হবে মা।
তা হলে এসেছিলে কেন?
তোমাকেই দেখতে এসেছিলাম।
কিন্তু… আমিও যে দক্ষিণেশ্বরে তাঁর কাছে যাব বলে বাড়ি থেকে বেরিয়েছি।
যাবে বই কী মা, যাবে।
আমার গায়ে বড্ড জ্বর, সহযাত্রীরা চলে গেছে। শুধু বাবা আর আমি। আর কি যাওয়া হবে আমার?
হবে মা, হবে। তোমাকে যে যেতেই হবে সেখানে।
কিন্তু দেরি হয়ে গেলে তিনি কি আর…
তোমার জন্যই যে তাকে আমি আটকে রেখে এসেছি সেখানে।
সারদা যেন তলিয়ে যেতে যেতে শুনল কৃষ্ণবর্ণা শ্রীময়ী বলছে, ভাল হয়ে যাবে মা, জ্বর সেরে যাবে। তুমি ঠিকই দক্ষিণেশ্বরে যাবে। দুশ্চিন্তা কোরো না, ঘুমিয়ে পড়ো মা, ঘুমোও। আমি আসি।
নিশুত রাতের অন্ধকার থেকে আকাশের নক্ষত্ররা কখন অপসৃত হল সারদা জানে না। কিন্তু চৈত্রের মিহিন কুয়াশা জড়ানো ভোরে যখন চোখ খুলল, মনে হল শরীর ঝরঝরে। জ্বর নেমে গেছে, মাথা হালকা।
রামচন্দ্র গভীর আগ্রহে জিগ্যেস করলেন, শরীর ঠিক আছে মা? একটু ভাল লাগছে?
সারদা হাসল। হাসিতে সংকোচ, লজ্জার মেশামিশি। বলল, ভাল আছি বাবা। শরীর ঠিক আছে।
আস্তে ধীরে এগুতে পারবি? না কি আর একটা দিন…
এগিয়ে যাওয়াই ভাল বাবা। আমি পারব।
রাতের অভিজ্ঞতার কথা আর ভাঙল না সারদা। কিন্তু টের পেল কীভাবে যেন আত্মবিশ্বাসটা ফিরে এসেছে শরীরে, মনে।
বাপ-বেটিতে বেরিয়ে পড়ল চটি ছেড়ে।
মনে মনে ঠিক করে রাখলেন রামচন্দ্র, তারকেশ্বরের কাছাকাছি একটা পালকি পেলে ধরে নেবেন। ম্যালেরিয়া জ্বরের কথা কিছু বলা যায় না, আবার কখন আসে। কৈকালার মাঠটা পার হয়ে গেলে নিশ্চিন্ত। ঠিক করাই আছে, বৈদ্যবাটি পৌঁছে গেলে সেখান থেকে নৌকো নেবেন। বাকিটা জলপথে দক্ষিণেশ্বর পৌঁছে যাবেন।
কিছুটা কষ্ট সহ্য করলেও, দুটো দিন মুখ বুজে কাটিয়ে দিল সারদা। মাঝে মাঝে জ্বর এল, গেল। কিন্তু ভেঙে পড়ল না। কোথায় যেন একটা বোধ আর শক্তি তৈরি হয়েছে। মন বলছে, সেখানে যেতে হবে। যেতেই হবে। শুধু যে তাঁর কাছে যাওয়া, দেখা করা, সেই জন্যই না।
বারবার মনে হচ্ছে, ভাবীকালের কিছু একটা শুভসূচনার নতুন ইতিহাস লেখা হবে সেখানে। তিনি যেন তেমনই কিছু ইঙ্গিত আর আভাস ছড়িয়ে রেখেছেন আগে থাকতে। সারদার পৌঁছনো খুব দরকার। ঘোষণা নেই, আড়ম্বর নেই, প্রতীক্ষাও আছে কি না সারদা জানে না, কিন্তু মন বলছে, এক গভীর টান ওকে আকর্ষণ করছে।
দু’দিন পরে বৈদ্যবাটি থেকে নৌকো ভাসল ভাঁটার গঙ্গায়। বারবেলা পেরিয়ে গেল। তিরতিরে স্রোতে নৌকো হেলতে দুলতে এগিয়ে চলল কলকাতার দিকে। সূর্যদেব পাটে বসলেন। একসময় ফুরিয়ে গেল দিনের আলো। আঁধার নামতে নামতেই গঙ্গার দু’ পাশে জনপদ আলোকিত হতে শুরু করল। দখিনা বাতাস বয়ে আসছে নদীর জল ছুঁয়ে।
দূর থেকে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের আলোকোজ্জ্বল চূড়া দেখা গেল। পরম ভক্তিতে ভালবাসায় দু’হাত জড়ো করে কপালে ঠেকাল সারদা। এই প্রথম সে কলকাতার মাটি স্পর্শ করবে। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সারদা। অনুভব করে বিশেষ কোনও প্রত্যাশা, প্রতীক্ষা ছাড়াও কোথাও এক অলৌকিক আয়োজন শুরু হয়েছে, তারই টানে ওর আগমন।
তখনও জোয়ার আসেনি। অথচ ভাঁটা শেষ হয়ে এসেছে। গঙ্গার জল স্রোতের টানাপোড়েনে হঠাৎ কেমন থম ধরা, দিক পরিবর্তনের পূর্বমুহূর্তে যেন ভ্রান্তির দোলায় ঈষৎ দিশাহারা। অন্তঃস্রোতের চোরাটান এসে পৌঁছেছে গভীরে, ওপরে ঢেউ-এর উচ্ছ্বাস নেই।
মন্দিরের ঘাটে ভিড়েছে নৌকো। রাত প্রায় ন’টা। সারদা নামল। মনটা হয়ে রয়েছে গঙ্গার জলের মতন।
তিনি আসতে বলেননি, খবরও কিছু দেননি। অথচ নিজেই খবর হয়েছেন। সারদার না এসে আর উপায় কী ছিল!
রাতের নৌকোয় যাত্রী কম, তা হলেও নামতে নামতে ধ্বনি দিচ্ছে, জয় মা ভবতারিণী, জয় মা গঙ্গা। দক্ষিণ থেকে ছুটে আসা হাওয়ায় সমবেত কণ্ঠের ধ্বনি গিয়ে আছড়ে পড়ছে মন্দিরের গায়ে। যাত্রীদের সুবিধের জন্য দু’-একটা আলো জ্বেলে রাখা হয়েছে বাঁশের খুঁটিতে। পুণ্যযাত্রীদের কোলাহল অপেক্ষাকৃত কম এখন। তা হলেও ছড়িয়ে ছিটিয়ে মানুষজন রয়েছে ঘাটের আশেপাশে, মন্দিরের চাতালে আর গাছতলায়। দিনের দাবদাহের পরে নদীর জল ছুঁয়ে উঠে আসা বসন্তের এই হাওয়াটুকুই গা জুড়োনো।
পারঘাটার আলোগুলো নিবু নিবু দেখাচ্ছে। আকাশে চাঁদ দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু তারা আর নক্ষত্রেরা হিরের ফুল হয়ে ফুটে রয়েছে। ডানদিকে পঞ্চবটীর চাতালের ওপর থেকে খোল-করতালসহ কীর্তনের আওয়াজ মিশে যাচ্ছে হাওয়ায়। ক্লান্ত শরীরে একটা একটা সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে আসছে সারদা। আগে আগে রামচন্দ্র। কোথায়, কোন দিকে যাবেন জানেন না। তা হলেও অন্য যাত্রীদের কাছ থেকে খোঁজ নিয়ে এসেছেন, নহবতের বাঁধানো বারান্দায় ঠাঁই নেয় মানুষজন। হয়তো আজ রাত্রিবাস করতে হবে সেখানেই। সারুর শরীর খুবই দুর্বল। নেহাত মনের জোরে এতটা পথ ভেঙে আসতে পেরেছে। রাতবিরেতে আর কোনও ঝুঁকি নেওয়া যাবে না।
রামচন্দ্র একটু দাঁড়ালেন। কয়েক ধাপ নীচেয় সারদা। কোঁচড়ে ধরা পুঁটলি।
সাবধানে আয় মা। হাতটা ধরব?
সারদা ধুঁকছে। একটু দম নিয়ে বলল, ঠিক আছে বাবা, পারব।
ধীরে সুস্থে চাতালের ওপর উঠে এল সারদা। সামনেই মন্দিরের ফটক, তার পরেই উন্মুক্ত বিশাল উঠোন। মাটিতে পা দেওয়ার আগে, হাত ছুঁইয়ে মাথায় ঠেকাল। আর ঠিক তখনই লম্বা-চওড়া একটা লোক নিচু হয়ে ওর পায়ের ধুলো নিল। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে হেসে বলল, এসেছ? কখন থেকে ঘর-বার করছি, আর দেখছি বদ্যিবাটির নৌকো ঘাটে লাগল কি না। এসো, এসো।
আলো-আঁধারির মধ্যে প্রথমে একটু সিঁটিয়ে গেলেও, খেয়াল করে লোকটাকে চিনতে পারল সারদা। ফর্সা গায়ের রং, হৃষ্টপুষ্ট স্বাস্থ্যবান, হেঁটো ধুতির ওপর খালি গায়ে চওড়া। পৈতে।
ওহ্ হৃদয়! আমি বলি কে না কে, এখানে আবার…। দম ফুরিয়ে গেল সারদার।
এসো মামি, এসো। দাও দেখি, পুঁটলিটা ধরব?
না ঠিক আছে। তোমায় দেখে ভরসা পেলাম।
হৃদয় সরে এসে বলল, আমি কে মাইমা! তোমার ভরসা তো বিকেল থেকে ওই ঘরের পশ্চিম জানালায় চোখ রেখে বসে আছেন।
হৃদয় হাত তুলে বাঁদিকের ঘর দেখাল। উঠোনের বাঁ প্রান্তের ঘরে একটি অনুজ্জ্বল আলো জ্বলছে। পাকা ঘর, চারদিকে খানিকটা বাঁধানো বারান্দা। পশ্চিম দিকের জানালা আধখোলা।
রামচন্দ্রও এগিয়ে এসেছেন হৃদয়কে দেখে। হৃদয় তাঁকেও প্রণাম করে বলল, আসুন ঠাকুরমশাই।
সারদা পা বাড়িয়ে ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, উনি জানেন আজ আমরা আসব?
জানেন না? পরশুদিনই তো খবর হয়ে গেছে। তোমাদের জয়রামবাটির লোক, আত্মীয়স্বজন শ্রীচৈতন্যের জন্মতিথিতে গঙ্গাস্নান করতে এসেছেন। সেদিন রাতেই মামা জেনেছেন।
রামচন্দ্র বললেন, বড় বিপদে পড়ে গিয়েছিলাম বাবা। ধুম জ্বর নিয়ে শেষ পর্যন্ত সারুকে নিয়ে পৌঁছতে পারব কি না…
উনি কি সে খবরও জানেন? সারদা জিগ্যেস করল।
হৃদয় চলতে চলতে বলল, মামা সবই জানেন ঠাকুরমশাই। সেই জন্যই তো বারবার জিগ্যেস করছেন, আর দেখছেন। বলছেন, ও হৃদু দ্যাখ তো বারবেলা নেই তো…এই প্রথম আসছে! আর আমিও ঘর-বার করছি।
সারদা আবার জিগ্যেস করল, তো এখন উনি কোথায়?
কোথায় আবার? ঘরে! অপেক্ষা করে বসে রয়েছেন। এসো। আসুন ঠাকুরমশাই।
রামচন্দ্র কী ভেবে একটু দাঁড়ালেন।
হৃদয়কে দেখতে পেয়ে মনে একটু বল পেয়েছেন ঠিকই। জামাই-ও খবর পেয়েছেন এবং অপেক্ষা করছেন শুনে আশ্বস্ত হয়েছেন। তা হলেও তিনি সুদ্ধ একেবারে তাঁর কক্ষে গিয়ে হাজির হওয়াটা কি ভাল দেখায়! সারু তার স্বামীর কাছে যেতেই পারে, কিন্তু শ্বশুর হিসেবে তাঁর একটু রয়েসয়ে দেখা করাটাই উচিত মনে হল।
হৃদয়কে বললেন, বাবা হৃদয়, তোমার মামিকে নিয়ে তুমি ওঁর কাছে যাও, আমি বরং এদিকেই কোথাও বিশ্রাম করি। চেনাজানা আরও দু’-একজন রয়েছেন, সবাইকে নিয়ে আর…
হৃদয় ভাবল একটু। তারপর বলল, বলছেন? আচ্ছা দাঁড়ান দেখি তা হলে… ঘর অবশ্য আরও আছে… আসুন দেখি আমার সঙ্গে।
ঠাকুরবাড়ি আর পঞ্চবটীর মাঝখানে আলাদা বাড়িটাই ‘বাবুদের কুঠি’ বলে পরিচিত। সেখানে ঘরও একাধিক আবার রামকৃষ্ণের বসতঘর থেকেও দূরে না। রামচন্দ্রকে সেখানেই রাত্রিবাসের ব্যবস্থা করে দিল হৃদয়। এদিকে সারদাও রীতিমতো দুর্বল এবং ক্লান্ত। রাতও হয়ে যাচ্ছে। আর দেরি না করে নিয়ে ঠাকুরবাড়িতে তাঁর ঘরে পৌঁছে দিল।
কিছুটা নিঝুম হয়ে এসেছে ঠাকুরবাড়ি। লোকজন, কর্মচারীরা ধারে কাছে থাকলেও, তারা বিশ্রামের জোগাড়যন্ত্র করছে। কয়েক দিনের জ্বর, হাঁটা, রাস্তাঘাটে চলার ধকলে সারদাও বিধ্বস্ত। একটা ঝোঁকের বশেই যেন নিজের অস্তিত্ব ভুলে ছিল। কিন্তু তাঁর ঘরের প্রান্তে এসে এই মুহূর্তে সে অনুভব করল, ঢেউ উঠছে বুকের মধ্যে।
চৌকাঠের কাছে পৌঁছে দিয়ে হৃদয় ফিরে গেছে। স্মৃতির ভার আর সংকোচ একসঙ্গে যেন পাথরের বোঝা সারদার দু’ পায়ে। কী বলবে তাঁকে দেখে!
কিছুই বলতে হল না সারদাকে। হঠাৎ একটা মৃদু সুঘ্রাণ পেতে না পেতেই দেখল, দু’ চোখে অপার করুণা, প্রীতি আর উৎকণ্ঠার আবেশ মেখে চার বছর আগে দেখা স্নেহসিক্ত মানুষটা পায়ে পায়ে এগিয়ে আসছেন।
এসেছ? তুমি এসেছ? এসো…এসো, বেশ করেছ।
কোথাও কি একটু অভিমানের তলানি জমছিল সারদার অন্তরে! কিছুই আর মনে এল না মানুষটার মুখের দিকে তাকানো মাত্র। ক্ষীণ এক চিলতে সংশয়-ও কি বিদ্ধ হয়ে ছিল মস্তিষ্কের কোনও গহ্বরে? স্মরণে আসছে না আর কিছুই। শুধু টের পাচ্ছে প্রদীপ্ত, উদ্ভাসিত ওই মুখমণ্ডলের দিকে এক ঝলক দৃষ্টিপাতের পরেই ও ভেসে যাচ্ছে। বাক্যহারা। ভেসেই যাচ্ছে।
বিহ্বলতার মধ্যেই তাঁর ত্রস্ত ব্যস্ত ভাবটুকুও খেয়াল করে সারদা। যেন বিকেল থেকে প্রতীক্ষা আর উদ্বেগের শেষে শিশুর মতন আত্মহারা হয়ে উঠেছেন মানুষটা। এদিকে যাচ্ছেন, ওদিকে যাচ্ছেন।
ওরে তোরা গেলি কোথায় সব! এদিকে আয়, মাদুর পেতে দে।
মাদুর পাতা হল। তিনি নিজেই ওর হাত থেকে পুঁটলিটা সরিয়ে নিয়ে বললেন, বোসো আগে বোসো।
সারদা বসল। পায়ে যেন আর ভার নিতেও পারছিল না। শরীর তো ভেঙে পড়ারই কথা, তবু সচল করে রেখেছে মন।
কাছে উপবেশন করতে করতেই তিনি আবার বাজলেন, হ্যাঁ গো, অত জড়সড় হয়ে আছ কেন, ভাল করে বোসো। কী দুর্গতিটাই গেছে পথে… শুনলুম খানিকটা…তারপর থেকেই তো খালি মাকে ডাকছি… প্রথম আসছে…
কথা এসেও মুখ ফুটে বেরুচ্ছে না সারদার।
কী বলবে, এমন মানুষের সামনে! নিজের মধ্যে প্রীতি-উপলব্ধি-আকৰ্ষণ কোনওটাতেই ঘাটতি ছিল না, নেইও, তবু অভিমানের ছিটেফোঁটাটাই যে এই মুহূর্তে অনুতাপে পরিণত হচ্ছে। সামান্যই দু’-চারটে কথা, অথচ সেই কথাকে ছাপিয়েই যে নিজের বোধ আর অনুভব এখন ভিজিয়ে দিচ্ছে সারদাকে। বিগত প্রায় বছর খানেকের যে সূক্ষ্ম দোলাচল ছিল মনের মধ্যে, তাই যেন নুইয়ে দিচ্ছে মানুষটার কাছে। চোখ তুলে তাকাতে পারছে না।
মনের ভিতর প্রশ্নগুলো আছড়ে পড়ছে বারবার। এই সেই মানুষ, যাঁকে পাগল বলে অভিহিত করেছিল গ্রামের মানুষ!
এই কি পাগলের লক্ষণ? ক্ষ্যাপা, উন্মাদ বলেছিল এই দিব্যপুরুষকে! এত রূঢ় আর অবিবেচক হয় কী করে মানুষ। যে মানুষকে তারা দেখেনি, জানে না, কী করে তাঁর সম্পর্কে এমন অসম্মানজনক মন্তব্য করে! শুধু মন্তব্য করাই তো নয়, হীন রটনা আর অশালীন উক্তিতে এমন মানুষকে কলুষিত করতেও বাধেনি। এমনকী উত্ত্যক্ত আর অতিষ্ঠ করে তুলেছিল সারদার ব্যক্তিজীবনকেও। কেন না, সারদা তাঁর বিবাহিত স্ত্রী।
অজ্ঞতা আর ঈর্ষার স্পর্ধা কত নিম্নশ্রেণীর হতে পারে, ভেবে অবাক হয় সারদা। শিক্ষা, রুচিহীনতার দোষে মানুষ অজানা অপরিচিত একজনকে সম্মান করতে না পারে, কিন্তু অসম্মান করার অধিকার তো নেই। কারওর জীবনযাপনের পদ্ধতি প্রক্রিয়ার সঙ্গে, নিজের মত আর মানসিকতার মিল খুঁজে না পেলেই কি তার চরিত্র হনন করাটা সামাজিক রীতি? কালিমালিপ্ত করতে হবে তাঁর জীবনচর্চাকে?
মিশ্র অনুভূতি আলোড়ন টের পায় সারদা নিজের মধ্যে। মনের কথা শব্দ হয়ে ফোটে না।
সামনে রাখা কলসি থেকে একঘটি জল গড়িয়ে খেল সারদা। আলগোছে।
একইসঙ্গে খেয়াল করছে মানুষটার একবার বসা, একবার ওঠা, শরীরের ভাষায় অস্থিরতা। একটু যেন অসহায়তা আর অন্যায়বোধও মিশে আছে।
বললেন, কী কাণ্ড বলো দেখি, এত দূরের পথ…। অবশ্য বাবাঠাকুর সঙ্গে আসছেন শুনে প্রথমে মনটা একটু আশ্বস্ত হয়েছিল, কিন্তু মাঝপথে যে অমন জ্বরে পড়বে কে জানত! পরশু রাতে খবর পাওয়া ইস্তক… কী আর করব তখন… মন্দিরে যাচ্ছি আর মা-কে বলছি, রক্ষা কর মা… বিদেশবিভুঁইয়ে কোথায় কোন গণ্ডগ্রামের চটিতে বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছে… ওকে দেখিস মা, সুস্থ করে তোল…
সারদা বলল, আমিও মাকে-ই ডেকেছি সারাক্ষণ। তাঁর ভরসাতেই পৌঁছতে পেরেছি।
তাই তো তাই তো, তাঁর ওপর ভার ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আমাদের আর উপায়টাই বা কী! গলার স্বর পালটে হঠাৎ আবার দাঁড়িয়ে উঠে বললেন, আচ্ছা বাবাঠাকুরও তো খুব ক্লান্ত, তার ওপর দুশ্চিন্তায় রয়েছেন…
হৃদয় তাঁর থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে।
ওহ্ দিয়েছে?
হ্যাঁ, কুঠিবাড়িতেই ঘর পাওয়া গেছে।
যাক, তা হলে তো ঠিকই আছে। কিন্তু সঙ্গে তো আরও কয়েকজন ছিল বোধহয়।
সারদা বলল, অনেকেই আগে চলে এসেছেন।
তিনি আবার বাজলেন। বললেন, তো তোমার যে খুবই কাহিল অবস্থা… কেমন বোধ করছ এখন?
জ্বরটা নেই, খুবই দুর্বল আর ক্লান্ত লাগছে।
তা তো লাগবারই কথা… কিন্তু এই রাত বিরেতে ডাক্তারবদ্যিই বা পাই কোথায়?
অত উতলা হয়ো না। এক্ষুনি না হলেও চলবে।
কিন্তু… মনটায় যে বড় অশান্তি হচ্ছে…! কী করব আর বল, সেজোবাবু না থাকায় আমার কি আর সে দিন আছে!
সেজোবাবু কে?
মথুর গো, মথুর। মথুরামোহন…। সেই তো আমার রসদদার ছিল কি না… সে ছিল আমার ডান হাত একেবারে।
ওহ্, হ্যাঁ হ্যাঁ…তাঁর কথা কত শুনেছি…বড় তাড়াতাড়ি চলে গেলেন।
সে না থাকায় আমার ডান হাতটাই ভেঙে গেছে গো…কী করে তোমার যত্ন হবে।
সারদা মিয়নো গলায় বলল, কিছু একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
সে যে কী মানুষ ছিল…! সারদা বোঝে তাঁর মনটা উদাস হয়ে যাচ্ছে। নিজে থেকে আবার বললেন, দোষে-গুণে মানুষ। প্রথম প্রথম আমাকেও সে খানিকটা বাজিয়ে-টাজিয়ে দেখে যাচাই করে নিয়েছিল। কিন্তু আমার আর কী-ই বা আছে! বিষয়বুদ্ধি কোনও কালেই ছিল না, কূটনীতি-টিতিও বুঝি না। ভক্তি আর বিশ্বাস নিয়ে ঠাকুরের পায়ে পড়ে আছি, মনে মনে শুধু বলি, আমায় চৈতন্য দাও মা। তো সেই সব দেখতে দেখতেই মথুরের বোধহয় একটা পরিবর্তন হয়েছিল, বড্ড জড়িয়ে পড়ল আস্তে আস্তে। যখন তখন পায়ে পড়ে কাঁদত… আমিই সংকোচে পড়ে যেতুম। বাবু মানুষ, রানির জামাই, বলতাম, অমন কোরো না মথুর, ওঠো।… কী জানি, তার কী দর্শন হয়েছিল… বুঝতুম বড় ভালবাসে আমায়। পাঁচজনে পাঁচকথা বললেও, আমার পান থেকে চুন খসতে দিত না সে। অথচ এখন সে কোথায়!
একটু চুপ করে থেকে সারদা বলল, এখন তা হলে রসদদার কে?
এখন আছেন শম্ভুবাবু। শম্ভুচরণ মল্লিক। তিনিও অতি সদাশয়, ভক্ত মানুষ। দেখবে… সকাল না হতেই এসে হাজির হবেন।
হঠাৎই তিনি আবার ব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, এই দ্যাখো, বকর বকর করতে করতে আসল ব্যবস্থাটাই যে ভুলে বসে আছি। কী খাবার-দাবারের ব্যবস্থা করি বলো তো?… না, না তোমাকেই বা জিগ্যেস করছি কেন…
সারদা ধীরেসুস্থে বলল, যা হোক কিছু একটু মুখে দিলেই হবে। জ্বরে স্বাদ-টাদ কিছু নেই।
আরে তাই বললে হয়। দাঁড়াও দেখি… বুঝতে পারছ তো এটা মন্দিরবাড়ি, লোকজনও সব কাজকর্ম সেরে শোওয়ার জোগাড় করছে… দিনেরবেলা হলে চিন্তা ছিল না… হৃদে, ও হৃদে…
থাক, ব্যস্ত হতে হবে না তোমায়।
হলেই বা আর কী করতে পারছি।
হৃদয় আসতেই বললেন, হ্যাঁরে মামির খাবার-দাবারের কী ব্যবস্থা করবি? অসুস্থ মানুষ…
ব্যবস্থা তো কিছু করতেই হবে। হৃদয় বলল, রাতবিরেত বলেই যা একটু সমস্যা… তুমি বলো কী ব্যবস্থা করব, তারপর দেখি…।
রামকৃষ্ণ বললেন, হ্যাঁ গো রাতটুকু মুড়ি-গুড়, নাড়ু এই সব দিয়ে চালিয়ে দাও… কী আর করা যাবে!
ওতেই ঢের হবে। সারদা বলল, মুখে রুচি বিশেষ নেই।
কিছুক্ষণের মধ্যে ধামায় করে মুড়ি, কিছু ফল আর মিষ্টি নিয়ে এল হৃদয়। সারদা দেখেই বলল, ওরে বাবা, এত মুড়ি কে খাবে?
তিনি বললেন, হ্যাঁ রে, বাবাঠাকুরের জন্য কিছু পাঠিয়েছিস?
ওঁর ব্যবস্থা আগেই করেছি। মাইমা-র জ্বরের কথা ভেবেই…
আচ্ছা, তা হলে এক কাজ কর। রামকৃষ্ণ বললেন, ওর মতো রেখে, আর বাকি যারা এসেছে, তাদের জন্য মুড়ির ধামা দুটো পাঠিয়ে দে।
অল্পস্বল্প খেতে খেতে সারদা খেয়াল করছে মানুষটাকে।
কত ভুল যে শুনেছিল! মানুষটার মাথার ঠিক নেই, দরজা বন্ধ করে মন্দিরের ভিতর পড়ে থাকে, গায়ের কাপড় ঠিক থাকে না…। এই-ই কি মানুষটার পরিচয়! আর এই যে মানুষটার দুশ্চিন্তা, অন্যদের খোঁজখবর নেওয়া, ক্ষুন্নিবৃত্তির ব্যবস্থা করা… এগুলো তাঁর পরিচয় নয়! ভাবুক, উদাস ঠিকই, কিন্তু কোথাও কি একটুও মানবিকতার ঘাটতি আছে? লোকটা তো সেই অর্থে কোনও দিন সংসার করেনি৷ নিজেরও চাহিদা বলে কিছু নেই, সন্ন্যাসী বলেই তাঁর পরিচয়। তাই বলে, সামান্যতম অবহেলা আর অবজ্ঞাই কি আছে? ঈশ্বরপ্রেম আর ভক্তিতে তিনি ডুবে থাকতে পারেন, কিন্তু মানুষ হিসেবেও যে সচেতন, তার পরিচয় কি এসে পর্যন্ত পাচ্ছে না সারদা?
চেহারাটাও লক্ষ করে সারদা। একটু বয়েসের ছাপ এসেছে। মাথার চুল পাতলা হয়ে, রগের দু’পাশটা ফাঁকা দেখায় বেশ খানিকটা। পাক ধরেছে দাড়িতে। কালোর মধ্যে রুপোলি ঝিলিক মিশে কাঁচাপাকা। চার বছর আগের চাইতে যেন ঢিলেঢালা ভাব শরীরে। চোখমুখের মধ্যে বারবার একটা উদাস তন্ময়তার ভাব ঘিরে ধরছে। সব মিশিয়ে ওর মনে হয়, এ মানুষটা সবার থেকে আলাদা, অন্যরকম।
ঘরের ভিতর থেকে সারদা টের পায়, গঙ্গায় জোয়ার এসে গেছে পুরোদমে। পাড়ে ঢেউ ভাঙার শব্দ পাচ্ছে। কখন থেকে যেন ঝোড়ো ভাব হয়েছে চৈত্রের হাওয়ায়। গঙ্গার ধার বলেই অবাধ বাতাস আছড়ে পড়ছে বাইরে গাছের ওপর, আর সোঁ সোঁ শব্দ তুলছে। মন্দির চত্বর নিরালা আর নিঝুম হয়ে এলেও, মাঝে মাঝে মানুষের কণ্ঠস্বর আর পায়ের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।
ওঁর কথাতেই কিছুটা চমক ভাঙে সারদার।
হ্যাঁ গো, দেশের ঘরবাড়িতে সবাই ভাল আছে তো?
সারদা বলল, ভালয়-মন্দয় মিশিয়ে সব চলছে। জয়রামবাটিতে কারুরই তো আয়পয় তেমন নেই। ভায়েরাও বড় হচ্ছে।
তা তো হবেই। পাঁচটি ভাইকে মানুষ করা কি চাট্টিখানি কথা!
তার ওপর কাকাদের সংসারও আছে।
রামকৃষ্ণ বললেন, ঈশ্বরকাকা তো শুনি কলকাতায় আসা-যাওয়া করেন।
হ্যাঁ, সারদা বলল, মেজকাকার কিছু যজমান-টজমান আছেন, তাই দিয়ে চলে যায়। ছেলেও একমাত্র সুয্যি, একটু আধটু কাজকর্ম করে।
আর ছোটকাকা নীলমাধব তো বোধহয় তোমাদের সংসারেই…
হ্যাঁ, ছোটকাকা তো বিয়ে-থাওয়া করল না, আর কোথায় যাবে! রাঁধুনি বামুনের কাজ-টাজ করে এখনও, চাষবাসও দেখে যতটা পারে।
রামকৃষ্ণ বললেন, অবশ্য বিয়ে থাওয়া হলেই বা আর কী! বেচারি কাদম্বিনীর অবস্থাটাই দ্যাখো না।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সারদা বলল, সেই। সুধারাম যে এত তাড়াতাড়ি চলে যাবে আমরা স্বপ্নেও ভাবিনি।
রামকৃষ্ণ বললেন, এই তো অক্ষয়ের কথাটাই ভাবো। বড়দাদা মারা যাওয়ার পর থেকে, ও ছেলে আমারই ন্যাওটা ছিল, ভক্তিভাবও ছিল খুব। এই বয়েসে ছেড়ে যাবে… কী জানি… মায়ের ইচ্ছে…। কথাটা শেষ করতে পারলেন না। গলা বুজে এল বাষ্পে।
সারদা বলল, অক্ষয় তো কুঠিবাড়িতে মায়ের সঙ্গেই থাকত?
তাই ছিল। কিন্তু বড় নাতি, শোকটা মা-র বড্ড বেজেছে। সেই জন্যই তো কুঠিবাড়ির ওই ঘরে মা আর টিকতে পারল না।
এখন কোথায় আছেন মা?
ওই তো নহবতের ছোট ঘরেই এসে উঠেছে। বলল, যে ক’দিন আছি, অন্তত মা গঙ্গার দর্শনটুকু তো পাব।
সারদা বলল, বেঁচে থাকতে থাকতে এত বড় শোকতাপ পেলেন—
রামকৃষ্ণ মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, তাই তো বলি…
কথাটা আর শেষ করলেন না। সারদাও কিছু জিগ্যেস করল না। কেন না দ্রুত কয়েক বছর আগের কামারপুকুরে বাড়ির একটা দৃশ্য ওর চোখের ওপর ভাসছে। …উঠোন থেকে দাওয়ায় ওঠার সিঁড়িতে গোবরজল দিয়ে লেপছে সারদা, খানিকটা তফাতে নিমগাছের ডাল ভেঙে দাঁতন করছেন রামকৃষ্ণ। রামলালের মা, হৃদয়ও রয়েছে ধারে কাছে। হাসাহাসি-গল্প-রসিকতাও চলছে। ছেলেপুলে হওয়া, তাদের মানুষ করা এসব নিয়েই কথা হচ্ছিল।
রামকৃষ্ণ হঠাৎ বললেন, ভাল ভাবে মানুষ করতে না পারলে, একগাদা বাচ্চা বিইয়ে কী হয় বলো দেখি। দুঃখ কষ্টই সার।
সারদা বলে ফেলল, সে তো আমার মা-কে দেখেই বুঝতে পারছি। কম কষ্ট?
উনি বললেন, তবেই বোঝ। বরং না হলে, আছ ঠাকরুনটি, থাকবেও ঠাকরুনটি।
সারদা চুপ করে রইল। কোনও কথা পছন্দ না হলে চুপ করে যাওয়াটাই স্বভাব তার। না-হওয়ার কথাটা ওর পছন্দ হয়নি।
রামকৃষ্ণ ওকে লক্ষ করেই আবার বললেন, তোমারও তো ভোগান্তি কম হয়নি, কোলেকাঁখে করে ভাইবোন মানুষ করছ… তারপর দেখলে তো একটি-দুটি চলে গেলেই দুঃখ কষ্ট কতখানি!
সারদা এবারও কোনও উত্তর দিল না। মনে মনে বলল, তা বুঝি। কিন্তু তাই বলে কি আর ছেলেপুলে জন্মাবে না!
দাঁতন ঘসতে ঘসতে রামকৃষ্ণ আবার বললেন, বাচ্চার অন্নপ্রাশনে যে কোমরে গয়না আর ঝালর বেঁধে সব নাচগান করবে, সেই বাচ্চা চলে গেলেই কোমর মাটিতে আছড়ে কাঁদতে হবে…
কথাটা একটু পরিহাসচ্ছলেই বললেন তিনি। কিন্তু ছোট হলেও সারদা এবার আর উত্তর না দিয়ে পারল না। বলেই ফেলল, আহা-হা, তা কেন হবে? সবগুলোই কি আর মরে যাবে!
রামকৃষ্ণ দাঁতনকাঠি হাতে নিয়ে হাসিমুখেই অবাক বিস্ময়ে কিশোরী বধুটিকে দেখলেন। সেই অবস্থাতেই বলে উঠলেন, ওরে বাবা, এ যে জাত সাপের ন্যাজে পা পড়েছে রে! একটু থেমে আবার বললেন, ও মা, আমি ভাবি, সাদাসিধে সরল ভালমানুষ, কিছু বোঝে না। এখন দেখছি পেটের মধ্যে সব আছে! বলে কিনা…
সারদা আর দাঁড়ায়নি। সামনে থেকে ছুটে পালিয়ে গিয়েছিল।
মনে পড়ে সারদার, পরে তিনি ওকে বুঝিয়েছিলেন সংসারের অনিত্যতা, বলেছিলেন, দুঃখকষ্টের কথা। বলতেন, বুঝলে গো, শেষ পর্যন্ত দেখবে— বৈরাগ্য আর ভগবদ্ভক্তিই আসল কথা।
ঘর-সংসারের কথা হতে হতেই সময় গেল আরও কিছুক্ষণ।
রাতও হয়েছে। ক্লান্তিতে শ্রমে চোখ জুড়ে আসছে সারদার। একটু পরে নিজে থেকেই বলল, আমি তা হলে উঠি এবার!
সামান্য অবাক হয়ে উনি বললেন, উঠি কী গো, কোথায় যাবে?
শরীর আর বইছে না, সারদা বলল, নহবতে মা-র কাছে চলে যাই, ওখানেই শোব।
সামান্য বিভ্রান্ত দেখাল ওঁকে। বললেন, কিন্তু.. সে না হয় পরে যাবে…
সারদা বলল, আরও কয়েকজন এসে ওখানে রয়েছেন, আমিও যাই।
মাথা নেড়ে রামকৃষ্ণ বললেন, না, না তাই কখনও হয়! তোমার শরীরের এখনও এই অবস্থা, তুমি এখানেই থাকো। নহবতে থাকলে তোমার চিকিৎসাপত্র, ডাক্তার দেখানোর খুব অসুবিধে হবে যে! এখানেই থাকো তুমি। শোওয়ার ব্যবস্থা করতে বলি।
অস্বস্তিতে পড়ে গেল সারদা। মানুষটাকে ক্রমশ সে চিনতে পারছে ইদানীং। সম্পর্কের রহস্যের বিষয়ে তাঁর মনোভাবও একটু একটু করে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বয়েস আর বুদ্ধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে। এক ঘরে রাত্রিবাসের প্রশ্নটা বোধহয় উদয় হয়েছিল তাই।
কথা বলতে পারছে না তাঁর মুখের ওপর, আবার অস্বস্তিটাও গোপন করতে পারছে না।
রামকৃষ্ণ নিজেই সমাধান করে দিলেন। বললেন, আচ্ছা দাঁড়াও। তোমার একটু কিন্তু কিন্তু লাগছে তো?
জয়রামবাটিরই আর-একটি মেয়েকে ডেকে আনালেন তিনি। সারদারও পরিচিত সে। বললেন, ঠিক আছে? ও-ও থাকবে তোমার সঙ্গে।
শুতে না-শুতেই গভীর নিদ্রায় তলিয়ে গেল সারদা। জায়গা নিয়ে ভাববার মতো আর শরীরের অবস্থা ছিল না। তা ছাড়া কথাবার্তা আর ওঁর সহানুভূতি, আচরণে যে উদারতা, অনুভবের স্পর্শ পেয়েছে, তাইতেই দ্বিধা জড়তার অনেকখানি কেটে গিয়েছিল। মানুষটা যে-ভাবের ঘোরে থাকেন, তা যে কতখানি হৃদয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত বুঝতে বাকি ছিল না সারদার। মনের ভাবটা এই রকম, রাতটা বিশ্রাম নিয়ে বাঁচি, সকালে উঠে আবার ভাবব।
শুধু পরের দিনটাই নয়, পর পর কয়েকটা দিনই আর নিজের ভাবনা নিয়ে চলার সুযোগ পেল না সারদা। সব ভাবনার দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। দ্বিতীয় রসদদার শম্ভুচরণ হাজির হলেন পরের দিন সকালেই। তিনি আরও এককাঠি বাড়া। যেমন হৃদয়বান তেমনই কর্তব্যপরায়ণ। নহবতের ছোট ঘরে তো যেতে দিলেনই না, বরং সারদাকে নিজের বাড়িতে তাঁর স্ত্রীর তত্ত্বাবধানে রেখে চিকিৎসা করানোর প্রস্তাব দিলেন।
রামকৃষ্ণ একটু ভেবে বললেন, একবার যখন এই শরীরে এসে উঠেছে এখানে, আর নাড়ানাড়ির কী দরকার? তুমি বরং এখানেই ডাক্তারবদ্যি এনে ওর চিকিৎসার ব্যবস্থা করো। চোখের সামনে থাকলে আমারও মনটা শান্ত হবে।
শম্ভুচরণ ভেবেছিলেন, তাঁর গুরুপত্নীটি পল্লিগ্রামের ফাঁকা, খোলা আলোহাওয়ায় থেকে অভ্যস্ত। কলকাতার এই ছোট আর বদ্ধ ঘরে, মন্দিরের পরিবেশে প্রথম বার এসেছেন, তার ওপর অসুস্থ। তাঁর নিজের বাড়ির অপেক্ষাকৃত বড়, খোলামেলা জায়গায় গিয়ে থাকলে সারদার ভাল লাগবে এবং শারীরিক উন্নতি হবে দ্রুত। কিন্তু ওঁর ওপর তো আর কথা চলে না। বলা যায় না, সারদাও হয়তো ওঁর সান্নিধ্যে থাকতে চাইছে।
দ্বিরুক্তি না করে রামকৃষ্ণর ঘরেই সারদার যাবতীয় শুশ্রূষার আয়োজন করলেন শম্ভুচরণ। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে নতুন শয্যা রচনা করা হল। চিকিৎসক প্রসাদবাবু এসে দেখলেন। ম্যালেরিয়ারই পুনরাবির্ভাব বলে মত প্রকাশ করলেন। ওষুধপত্র এবং নির্দিষ্ট পথ্য ইত্যাদির নির্দেশ দিয়ে, দেখাশোনা করার লোকের ব্যবস্থাও করতে বললেন।
টানা তিন-চার দিন নিজের ব্যাপারে আর কোনও কথাই বলতে পারল না সারদা।
ঘন ঘন তিনি এসে দেখে যান। কিছুক্ষণ পাশে বসেন, সুবিধে-অসুবিধের খোঁজ নেন। একটু-আধটু গল্পসল্পও করেন। সারদা কাছের থেকে মানুষটাকে দেখে। নিজের সদ্য উনিশ বছরে পড়া বয়েসের পরিণত অভিজ্ঞতা দিয়ে তাঁর ভাবনা আর মনের তল স্পর্শ করার চেষ্টা করে। কিছুটা বিস্মিত, কখনও একটু বিভ্রান্তও বোধ করে মানুষটার দেহবোধরহিত অতল প্রীতি আর ভালবাসার গভীরতা আন্দাজ করতে গিয়ে। তা হলেও টের পায়, আবছায়ামাখা মানুষটার জীবনচর্চাকে এখন দেখতে দেখতে যেন ছায়ারা হালকা হয়ে যাচ্ছে, আলোয় ভাস্বর হয়ে উঠছেন তিনি তাঁর সামগ্রিকতা নিয়ে। সেই কিশোরী বয়েসে দেখা মানুষটার যাপনে, মননে, কথনে এমন কিছুই পরিবর্তন হয়নি, কিন্তু যে-আলোয় সারদা তখন মানুষটাকে দেখেছিল, জেনেছিল, অন্বেষণ করতে করতে বিভ্রান্তও বোধ করেছিল, আজ নিজের মধ্যে তার সেই আলোটারই দীপ্তি অন্য রকম হয়েছে। একপেশে নয়, আজ আরও নানা দিক থেকে আলো ফেলে ফেলে, মানুষটাকে জরিপ করার কুশলতা অর্জন করেছে সারদা।
নিজে থেকেই করেছে কি?
না কি ইঙ্গিতে-ভাষায়-শব্দে-ইশারায়-আচরণে-আয়োজনে তিনিই ধরিয়ে দিয়েছেন, দিচ্ছেন!
হয়তো অনেকটাই তাই। তা হলেও উপলব্ধি আর অন্বেষণের সেই স্পৃহা, রুচি কোমল আবেগের প্রস্তুতি নিজের মধ্যে না-থাকলে হত কি? বীজের অঙ্কুরোদগমের জন্য মাটির ধারণ ক্ষমতা আর তৈরি হয়ে ওঠার কথা তো তাঁরই উদাহরণ। সারদা কি তৈরি হয়ে উঠছে?
খোঁজখবর নিয়ে যান পিতা রামচন্দ্রও এসে এসে। শুধু যে সারুর শারীরিক অসুস্থতার জন্যই তাঁর উদ্বেগ, তা তো নয়। শান্ত, নিরীহ, নির্বিবাদী অথচ বুদ্ধিমতী জ্যেষ্ঠা কন্যাটির মানসিক প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারেও সচেতন লক্ষ আছে তাঁর। চিকিৎসা এবং সারদার যত্নের কোনও ক্রটি হচ্ছে না, এটুকু তিনি স্বচক্ষেই দেখতে পান। তাও জিগ্যেস করেন, সব কেমন বুঝছিস মা?
সারদা উত্তর দেয়, বেশ ভাল আছি বাবা। সেবাযত্ন তো কম হচ্ছে না।
আর জ্বর-টর আসেনি তো?
না-না প্রথম দিকের পরেই তো আর জ্বর নেই।
খাওয়া-দাওয়া করছিস ঠিকমতো?
ওহ্ আর বোলো না। হৃদয় এসে, উনি এসে বারবার খোঁজ নিয়ে যান।
বলকারক খাওয়া-দাওয়ার দরকার, শরীরটাকে চাঙ্গা করে তুলতে হবে যে!
শরীর আমার বেশ সুস্থ হয়ে উঠছে বাবা।
আর মন? আলটপকা প্রশ্নটা করেই ফেলেন রামচন্দ্র।
সারদা হেসে ফেলে এবার। বলে, আমার মন খারাপ হয়ে থাকলে, তুমি কি টের পেতে না বাবা?
মেয়ের মুখে হাসি দেখে প্রাণটা জুড়োয় রামচন্দ্রের। বলেন, পেতাম মা। তাও তোর মুখ থেকে কথাটা শুনলে মন হালকা লাগে।
সারদা বলল, বেশ, শোনো তা হলে। মন আমার ভাল আছে।
ঠিক আছে মা, আর কিছু শুনতে চাই না। রামচন্দ্র বললেন, তবে আমাকে যে এবার পাট গোটাতে হবে মা।
সারদা মাথা নাড়ল। বাবার অনুপস্থিতিতে জয়রামবাটির বাড়ির বাস্তব অবস্থাটা ও ভালই বোঝে। বলল, কবে যাবে?
রামচন্দ্র বললেন, চার-পাঁচদিন হয়ে গেল, ভাবছি কাল-ই ভোর-ভোর রওনা হয়ে যাব। ঠিক আছে?
দেখো… ওদিকেও তো তুমি না থাকলে নয়। আমিও এক্ষুনি যেতে পারছি না।
তুই তাড়াহুড়ো করিস না মা। এত ধকল নিয়ে যখন আসাই হল…
উনিও চান আমি আরও কিছুদিন থাকি।
খুব ভাল মা, খুব ভাল। ওঁর কাজেকর্মে ধর্মে, জীবনের পথে তোক ছাড়া কি চলতে পারে! মানুষটাকে খেয়াল রাখিস মা।
রাখব। তুমিও নিজের খেয়াল রেখো বাবা। সবাই ভাল থেকো।
মেয়ের মুখ থেকে সংশয়ের মেঘ সরে গেছে রামচন্দ্র বুঝতে পারলেন। তিনি জয়রামবাটি রওনা হয়ে গেলেন পরের দিন। গাঁয়ের মানুষদের রটনা আর অপবাদের জবাব দেওয়ার মতন মানসিকতা, রুচি তাঁরও নেই, তা হলেও ভালমানুষি দেখানো যেখানে ব্যক্তিত্বের পরিপন্থী বলে মনে হবে, সেখানে এর পরে তাঁকে মুখ খুলতে হবে— এমন মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই রামচন্দ্র ফিরলেন।
ইতিকর্তব্য স্থির করতে দেরি করল না সারদাও।
শাশুড়ি চন্দ্রমণি দেবীর কথাই ভাবছিল। বৃদ্ধা মানুষটি কুঠিবাড়ির ঘর ছেড়ে নহবতে এসে রয়েছেন কিছুদিন যাবৎ। দোষ দেওয়া যায় না। যে-ঘরের সর্বত্র কয়েক বছর ধরে অক্ষয়ের থাকার যাবতীয় স্মৃতি ছড়ানো রয়েছে, অকস্মাৎ তার মৃত্যুর পরে, চন্দ্রমণির পক্ষে তার পরেও সেখানে থেকে যাওয়া কতখানি মর্মান্তিক, সারদা তা বোঝে। আর তিনি রয়েছেন বলেই, ওর মনে হয়, পরিচর্যার জন্য ওরও সেখানেই থাকা উচিত। অক্ষয়কে ফেরানো যাবে না, তা হলেও মানুষটাকে যদি একটু সেবাযত্ন করে ভুলিয়ে রাখা যায়, পুত্রবধূ হিসেবে সেটুকুই ওর তুষ্টি।
সান্ধ্যপূজা সেরে রামকৃষ্ণ ঘরে আসার পরে সারদা বলল, শরীরটা তো সেরে উঠেছে বলেই মনে হচ্ছে, ভাবছি এবার নহবতে গিয়ে থাকি। ভাব-জগতের উচ্চভূমি থেকে জাগতিক পরিমণ্ডলে ফিরে এলেন রামকৃষ্ণ। —নহবতে গিয়ে থাকবে?
সারদা বলল, মা বুড়ো মানুষ ওখানে রয়েছেন, আরও লোকজন থাকলেও, আমারই তো তাঁকে দেখাশোনা করা উচিত।
উনি প্রীত হয়ে হাসলেন। আবার ঠাট্টাও করলেন।
বটেই তো, বটেই তো। কিন্তু আধবুড়ো এই লোকটা যে একা একা এখানে থাকবে তার কী হবে?
সামান্য ভ্রুভঙ্গি করে সারদা বলল, তুমি তো একাই ছিলে এতদিন!
তাঁর হাসিমুখে একটু একটু করে ঐশ্বরিক মাধুর্য মিশে যেতে লাগল। বললেন, ছিলাম, ব্রহ্মজ্ঞানের সাধনায় নিজের কাছে স্বীকৃত হওয়ার জন্য একা ছিলাম। কিন্তু তা যে অসম্পূর্ণ তাও আমি জানি, কেন না, জাগতিক ক্ষেত্রে আমি বিবাহিত। অতিজাগতিক ভূমিতে এবং ব্রহ্মজ্ঞানে তখনই পূর্ণপ্রতিষ্ঠা হবে, যখন তুমিও হবে আমার লীলাসঙ্গিনী এবং আমরা উভয়ে, একত্রে পরস্পরের পরিপূরক হয়ে, পূজা-পূজকের কৃপা এবং ভূমিকায় আত্মপ্রকাশ করতে পারব।
সারদার মুখে সঙ্গে সঙ্গে কোনও কথা সরল না। যে কথাগুলো উনি বললেন, যেন অনুধাবন করার জন্য চিন্তাচ্ছন্ন এবং কিছুটা বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে পড়ল। তাকিয়ে রইল ওঁর মুখের দিকে।
রামকৃষ্ণ হাসলেন। এ হাসিটা আবার অন্যরকম। বললেন, হ্যাঁ গো, তোমার মাথাটা গুলিয়ে দিলাম না কি?
সারদা আস্তে আস্তে মাথা নিচু করল। একটু পরে অস্ফুট শব্দে বলল, না। ভাবছি।
ভাবো, ভাবো। ভাববার জন্যই যে ওই দেহ, মন নিয়ে, তাঁর অলৌকিক নির্দেশে তোমার আগমন ঘটেছে এখানে।
সারদা স্তব্ধ হয়ে রইল। কিছু একটা আগাম সংকেতের ধ্বনি বাজছে ওর কর্ণকুহরে। আর তার থেকেই যেন গভীর উপলব্ধির স্পন্দন আর তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ছে মস্তিষ্কের মধ্যেও টের পাচ্ছে, পার্থিব এই ঘরের মধ্যে বসেও, যেন ওর উড়ান শুরু হয়ে গেছে অন্য আর-এক লোকে, যে-লোক কিছুটা রহস্যময়, আলোছায়ায় মেশা। এক সময় এই মানুষটার ভাবজগৎকেও ওই রকম মনে হত সারদার। অথচ মনে হচ্ছে, খুব সন্তর্পণে, একটু একটু করে, পরতে পরতে যেভাবে মানুষটা বিকশিত হচ্ছেন, তেমন ধীর গতিতেই ওর টান শুরু হয়েছে সেই আর-এক অতিজাগতিক লোকে।
ওঁর কথাতেই ঘরের পরিবেশে ফিরে এল সারদার চোখ, মন। বললেন, বেশ, তুমি নহবতে মা-র কাছে গিয়েই থাকো। তবে আমারও যে তোমাকে ছাড়া চলবে না। রাত্তিরটুকু এই মন্দিরের ঘরে চলে এসো। আমার সঙ্গেই এখানে থাকবে।
সন্ন্যাসী মানুষের অমন প্রস্তাবে সারদার মনে একটা ক্ষীণ প্রশ্নের উদয় হলেও, তা কোনও চমক ছিল না। কেন না, নিজের ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে একটা ভাবনার রূপরেখা ততদিনে প্রায় স্পষ্টই আঁকা হয়ে গেছে ওর মনের খাতায়। আর সেই রূপ ও রেখার ছবি ওর কাছে যেমন একান্ত, তেমনই গোপন। নিজের যাবতীয় ঘনিষ্ঠ পরিচিত, আত্মীয়স্বজন সকলের ভাবনা অনুমান থেকে, সারদার এই ভাবনার ছবি সম্পূর্ণ অন্য রকম এবং ব্যক্তিগত। কীভাবে এই উনিশ বছর জীবনযাপনের অভিজ্ঞতায় এখন ও বুঝেছে, বাইরের অনেক মানুষ এবং তথাকথিত শুভানুধ্যায়ী এবং সহানুভূতিশীল যাঁরা, তাঁদের কাছে শুধুমাত্র ওই ভাবনা আর বোধের নিরিখে ও সম্পূর্ণ আলাদা একটি মানুষ। হৃদয়বত্তা ও আন্তরিকতায় ও একক নারী সেখানে। নিজস্ব জীবনাচরণের ব্যাপারে কারওর কাছে কৈফিয়ত দেওয়ার দায় নেই। আপাত-সহমর্মিতায় যাঁরা ওর পার্থিব জীবনযাপন দেখে অশ্রুপাত করবেন, সারদা বুঝে গেছে, ওর পরমানন্দের অনুভূত আকাশকে তাঁরা, তাঁদের জীবনচর্চা আর বোধ দিয়ে কখনওই ছুঁতে পারবেন না।
নীরবে, গভীর আবেগ-প্রীতি আর শ্রদ্ধায় মনে মনে প্রণতি জানায় সারদা মানুষটাকে।
নিয়মটাও বহাল রইল উনি যা ঠিক করে দিলেন। নহবতের ছোট্ট কুঠরিতে দিনের বেলা শাশুড়ির পরিচর্যা, রান্না, দেখাশুনা করে সারদা। অন্য আর-এক আধ্যাত্মিক জীবনের পাঠ, অনুশীলন, উপলব্ধির সুযোগ আসে রাতের বেলা। তাঁর সান্নিধ্যে সাহচর্যে। নিরালা হয়ে আসে মন্দিরপ্রাঙ্গণ, গঙ্গার জলধারা বয়ে যায় ছলছল শব্দে, বাতাস শব্দ তোলে পঞ্চবটীর পাতায়। ব্যস্ত শহর ঝিমিয়ে পড়ে, গৃহস্থরা নিদ্রা যায়। সারদা তাঁর কাছে বসে বসে শোনে, কীভাবে ঈশ্বরে নিবেদিত প্রাণ হয়েও বস্তুজগতে টিকে থাকা যায়। রক্ত মাংসের দুটি মানুষ তাঁরা, অথচ দেহবুদ্ধি আসার আগেই তাঁরা বিচরণ করতে শুরু করেন এক অন্য উচ্চমার্গে। দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের এক নির্জন স্বল্পপরিসর ঘরে দিনের পর দিন নীরবে একটু একটু করে রচিত হয় বিশ্ব ইতিহাসের অভূতপূর্ব ধর্মান্দোলনের এক-একটি নতুন পরিচ্ছেদ। পরম ব্রহ্মের সাধনাধারা, রহস্যময়তা ক্রমশ স্বচ্ছ হয়ে আসে সারদার বোধে, হৃদয়মন্দিরে আবির্ভূত হয় সিদ্ধিলাভের প্রেরণা। প্রেম ও করুণার পূরণ হয় সাধিকার অন্তরে।
কে সৃষ্টি করলেন স্ত্রী ও পুরুষ? কোন বিশ্বকর্মা আবির্ভূত হয়েছিলেন অন্ধকারময় এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে সৃষ্টির স্বরূপ বোঝাতে?
আরও আরও আগে যাও। সৃষ্টির পূর্বে কী নিদর্শন ছিল এই বিশাল বিশ্বের! ছিল না, কোনও নিদর্শনই ছিল না।
“তম্ আসীত্তমসা গূঢ়মগ্রেহপ্রকেতম্ সলিলং সর্বমা ইদম্।” সমস্তই ছিল অন্ধকারময়— তমোনিগূঢ়, “তগমীদিদং তমোভূতম্ প্রজ্ঞাতমলক্ষণম্”—
এই সমস্তই ছিল অজ্ঞাত, অলক্ষণ।
তখন প্রকৃতি ছিল গভীর নিদ্রায় নিমগ্না। আলোকের রেখামাত্র ছিল না। ছিল না কোনও রূপের প্রকাশ। তরুলতা, কীটপতঙ্গ, পশুপাখি কিছু না, কোনও প্রাণের প্রকাশ না। শুধু অন্ধকারাচ্ছন্ন জলময় অনন্ত বিস্তার আর অবকাশ। নিঃশব্দ, নিস্তব্ধ, নির্জন— যেন গভীর অমাবস্যার প্রগাঢ় নিশীথে এক বিস্তৃত শ্মশান। বিস্তীর্ণ শূন্যতা।
কে অপেক্ষা করে ছিল এই বিশ্বশ্মশানকে জাগিয়ে রেখে সৃষ্টিকাল পর্যন্ত? তিনি পুরুষ? তিনি কি নারী?
উত্তর নেই। আবার আছেও।
সৃষ্টির প্রাক্কালে এই নিস্তব্ধ অন্ধকারময় বিস্তার আর অবকাশ সেই কোনও এক “তাঁর” আর সহ্য হয়নি, ভাল লাগেনি। একাকী তিনি ক্রীড়া করতে পারেন না। দ্বিতীয়ের ইচ্ছা করলেন। অবিভক্ত স্ত্রী-পুরুষ স্বরূপকে দু’ভাগে পাতিত করলেন। প্রকটিত হলেন পতি ও পত্নীস্বরূপে। কে তিনি? অনুভবে জানো, তিনিই পরমব্রহ্ম।
বিশ্বসৃষ্টির মূলে, তাঁর সৃষ্টি স্ত্রী-পুরুষ উভয় শক্তিই বর্তমান। আর এই দ্বিবিধ শক্তির লীলাবিলাসই, এই বিশ্বপ্রপঞ্চ অর্থাৎ মায়াময় জগৎ সংসার। দুই শক্তির মিলনেই মহাশক্তি। পুরুষ শক্তি হল চিৎ, অর্থাৎ চৈতন্য, জ্ঞান। আর স্ত্রী শক্তি—অচিৎ, মায়া বা প্রকৃতি নামে অভিহিত। তাদের নিত্যমিলন উপলব্ধি করার জন্যই সাধক যুগে যুগে তপস্যা করে আসছে।
সাধক স্বামীটির কথা-ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ শুনতে শুনতে কী এক আবেশে প্রথমে বিভোর, তার পর বিমোহিত হয়ে যায় সারদা। এক একদিন টের পেতে শুরু করে, উপলব্ধির গভীরতার দিকে যেতে যেতে হঠাৎ যেন এক সীমাহীন প্রান্তর আর শূন্যতায় বিরাজ করছে। বাহ্যজ্ঞানরহিত, আত্মসচেতনহীন, অর্ধসমাধিস্থা। যেন সময় থেমে গিয়েছিল কিছুক্ষণের জন্য। কতক্ষণ? সারদা জানে না।
আবার হঠাৎ নিজেকে এক সময় আবিষ্কার করে তাঁর ঘরের মধ্যে। দৃষ্টি ঝাপসা। অনুসন্ধানের মতন তাকায় এদিক ওদিক, ক্রমশ প্রতিভাত হয় পারিপার্শ্বিক। দেখে একটু তফাতেই বসে আছেন সদাহাস্যময় দিব্যপুরুষটি, শিশুর মতন অপাপবিদ্ধ মুখমণ্ডলে কী যেন এক জ্যোতির ঝিকিমিকি। গভীর আগ্রহে নিরীক্ষণ করছেন সারদাকেই।
কী হয়েছিল বলো তো আমার? আমি যেন কোথায় গিয়েছিলাম?
মিটিমিটি হাসেন তিনি। বলেন, কোথাও যাওনি তুমি। এখানেই ছিলে। তবে একটা কোথাও গমনের প্রস্তুতি আর রসায়ন ক্রিয়াশীল হয়ে উঠছে তোমার মধ্যে।
কোথায় সেটা?
আধ্যাত্মিক চেতনার জগতে। বস্তুজগতের নয় আর মনুষ্যজন্মের ক্ষুদ্রতা উপলব্ধির পরে যে ঈশ্বরের ভাবজগৎ, তারই ধারে কাছে। কী ভাবছে সারদা? ভাবছে সেই উড়ানের কথা। পার্থিব জগতের বাইরে যে মহাজাগতিক বিশাল বিশ্বব্রহ্মাণ্ড পড়ে রয়েছে সাধনা আর উপলব্ধির জন্য, কে যেন টানছে ওকে সেই দিকে।
সারদা ঘুমিয়ে পড়ে। ব্রাহ্মমুহূর্তের ঘণ্টাধ্বনি শুনে জেগে ওঠে। কর্মব্যস্ত আর-একটি দিনের সূচনা হয়। দিনের আলোয় আর রাতের অন্ধকারে, বাস্তব জীবনচর্চা আর ভাবজগতে উত্তীর্ণ হওয়ার দোলাচলে, দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে কালযাপন করে যায় এক নারী।
তিনি নিশ্চিন্ত হলেন, সারদা আত্মসুখে সম্পূর্ণ নিস্পৃহ।
তিনি অনুভব করেছেন, ও পূর্ণ রূপে পতিচিত্ত অনুবর্তিনী এক নারী, যদিও সে ব্যক্তিত্বহীনা নয়। ওর ব্যক্তিত্বের প্রকাশ চাপা এবং অন্যরকম। তিনি বুঝেছেন, ওই গ্রাম্য, আটপৌরে, ভাল করে লিখতে পড়তে না জানা, সরল, নিরীহ যুবতীটির মধ্যেই ভবিষ্যতের জন্য একটি আদর্শ মা এবং দেবী সম্ভাব্য প্রকাশের জন্য উন্মুখ হয়ে রয়েছে। উন্মোচনের দায়িত্ব তাঁরই।
সম্ভাব্য কেন? কারণ সূক্ষ্মতম একটি দোলাচলের ঘাট এখনও তাঁকেই পার হতে হবে। তিনি জানেন, তিনি নিষ্কাম। বুঝে গেছেন, বিবাহিত স্ত্রী হলেও, ওই নারী তাঁর কাছে এক অতীন্দ্রিয় আধারশক্তি। তবু, তবু আর একবার তিনি তাঁর গূঢ়তম আত্মিক সত্তার কাছে স্বাক্ষরিত হতে চান। দেবীরূপে, মাতৃরূপে ওকে পূর্ণ গ্রহণ এবং নিজেকে সেই দেবী আর মাতৃচরণে পূর্ণ নিবেদনের আগে, মাত্র আর-একটি বার তিনি তাঁর জৈবিকজন্ম, ক্ষুধা, আকুলতার কিছুমাত্র অবশিষ্ট আছে কি না টের পেতে চান।
আর তারপরেই, তিনি জানেন, মহামায়ার দ্বার উন্মুক্ত করে মাতৃদর্শনের সানুপুঙ্খ আয়োজন তিনি স্বহস্তেই করবেন। দিনটাও ভেবে রেখেছেন। আগামী অমাবস্যার রাতে ফলহারিণী কালীপূজার আয়োজন। দিনটা বোধহয় স্থিরীকৃতই হয়ে রয়েছে।
বৈশাখ শেষ হয়ে জ্যৈষ্ঠমাস আসন্ন। দিনের প্রখর তাপে মানুষের প্রাণ ওষ্ঠাগত। শহরের রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে প্রতিটি ঘরবাড়ি, যানবাহন পর্যন্ত যেন দগ্ধ হয়ে তাপ বিকিরণ করে যাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই গ্রীষ্মকাল দেশীয় মানুষ পছন্দ করে না। যেন গরম হয়ে থাকে মানুষের শ্বাসপ্রশ্বাসও। অথচ গঙ্গার তীরে এই গ্রীষ্মসন্ধ্যাই কী রমণীয়! তিরতিরে স্রোত আর জল ছুঁয়ে উঠে আসা পুব-দক্ষিণের অবাধ হাওয়া এলোমেলো লুটিয়ে পড়ছে মন্দিরের গায়ে, উঠোনে, পঞ্চবটীর শাখায়।
তাঁর মনে আসে, বিবাহের তেরোটি বছর পূর্ণ হতে চলল।
কী অপূর্ব সেই বিবাহ! ছ’বছরের কনে, আর চব্বিশ বছরের বর। তবু তিনি নিয়মকানুন মেনে, সাতপাক ঘুরে, মালাবদল করেই তো গাঁটছড়া বেঁধেছিলেন! আবার পাটকাঠির আগুনে ছল করে, বস্তুজগতের দিকে চোখ ঠেরে, মাঙ্গলিক সুতোও সেদিনই পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। যেন সেদিনই জাগতিক প্রত্যাশা আর বৈবাহিক বাসনা-কামনাকেই আহুতি দিয়েছিলেন। যেন সেদিন থেকে এ যুগের রামকৃষ্ণ-সারদা হলেন পুরাণের শিব-দুর্গা, নল-দময়ন্তী, অগ্নি ও স্বাহা।
কেন করলেন বিয়ে? কী প্রয়োজন ছিল তাঁর ওই বালিকা বধূটির!
আসলে ততদিনে তিনি বুঝে গিয়েছিলেন, আপনি আচরি ধর্ম পরেরে শেখায়। তিনি জানতেন, সনাতন মতের আশ্রম-মর্যাদা রক্ষায় দার পরিগ্রহ ঈশ্বর লাভের অন্তরায় হয় না। দশবিধ সংস্কারসম্পন্ন না হলে মনোবৃত্তি পূর্ণতা প্রাপ্ত হয় না। আর পূর্ণতা লাভ না করলে, প্রকৃষ্টরূপে ধর্মপ্রবর্তক ও আচার্য হওয়া যায় না। সুতরাং বিবাহ তিনি করেছিলেন, কিন্তু তা নারী-পুরুষের তথাকথিত সাধারণ বিবাহ নয়। স্ত্রী হবেন তাঁর শক্তি স্বরূপিণী। উপলব্ধির কথা নিজ মুখে বললেন, মহামায়া দ্বার ছাড়লে তাঁর দর্শন হয়। মহামায়ার দয়া চাই। তাই শক্তির উপাসনা। সেই শক্তি তাঁর সারদা। জানেন, ও বাহ্যরূপ লুকিয়ে, অন্তরে দিব্যরূপের সজ্জা করে এসেছে।
আর একটু পরেই তাঁর সান্ধ্য আহার্য নিয়ে সারদা আসবে। তাঁর সঙ্গে একই শয্যায় রাত্রিযাপন করবে। ঘর-বার করছেন তিনি। কোথাও এক অস্থিরতা বারবার আজ তাঁকে পেয়ে বসছে। আজই তাঁকে স্বাক্ষরিত হতে হবে।
বোধহয় সময় কাটাবার জন্যই সারদার জন্মকুণ্ডলীটা টেনে নিয়ে বসলেন।
তিনি জ্যোতিষশাস্ত্রবিদ নন, নেহাতই কৌতূহল। একটু নাড়াচাড়া করে দেখা।
দেখলেন, সারদা জন্মেছে বারশো ষাট সাল, আটই পৌষ, বৃহস্পতিবার, কৃষ্ণাসপ্তমী তিথি, রাত্রি দুই দণ্ড নয় পল। স্থান বাঁকুড়া জেলার অন্তর্গত জয়রামবাটি গ্রাম। স্থানের অক্ষাংশাদি অবলম্বন করে জন্মলগ্নের বিচারে দেখা যাচ্ছে, মিথুন লগ্নের ষষ্ঠ নবাংশে তার জন্ম। আর মিথুন লগ্নের যষ্ঠ নবাংশের অধিপতি হচ্ছেন বৃহস্পতি। অথচ সারদার হচ্ছে সিংহরাশি। সিংহরাশির অধিপতি রবি।
জন্মকুণ্ডলীর খুব বিশদ ব্যাখ্যার ধারণা তাঁর নেই। কিন্তু লগ্ন আর রাশি অনুযায়ী, বৃহস্পতি আর রবির ভূমিকা নিয়ে কোথায় যেন তাঁর একটা খটকা লাগে। বৃহস্পতির নিয়ন্ত্রণকারী দেবতা হচ্ছেন শ্রীবামনদেব। রবির অধিদেবতা শ্রীরাম। সারদাকে বলা হয়েছে, এই জাতিকা শ্রীরামপত্নী। সাধারণ মানবী কি শ্রীরামপত্নী হতে পারে!
একটা ব্যাপার তিনি টের পান। সাধারণ মানব-মানবীর জন্য জ্যোতিষশাস্ত্রে উল্লিখিত রীতি অনুসারে সারদার জন্মকুণ্ডলী বিচার করলে, খটকা লাগাটাই স্বাভাবিক। আসলে জন্মকুণ্ডলীর গ্রহদের অধিদেবতা এবং তাঁদের অবস্থান হিসেব করে বিচার এবং নির্ণয় করলে সঠিক পরিচয় পাওয়া যাবে। রবির সান্নিধ্যে যে গ্রহ থাকেন, তাঁর প্রভাবে সেই গ্রহ সমাচ্ছন্ন হন এবং অস্তমিত হয়েও রবির আনুগত্যে ফলদাতা হয়ে থাকেন। সুতরাং সারদার কুণ্ডলী স্পষ্টতই ইঙ্গিত দেয়, লগ্নের সপ্তমে বৃহস্পতির অধিদেবতা শ্রীবামনদেব, রবির অধিদেবতা শ্রীরামচন্দ্রের মধ্যে বিলীন হয়ে, তাঁর ফলদানের পূর্ণ সহায়তা করেছেন।
জন্মকুণ্ডলী তুলে রেখে দিলেন তিনি। মন তাঁর পরিষ্কার এবং স্বচ্ছ। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের প্রশ্নের আগেও তিনি অনুধাবন করেন, ওই বিষয়টি অতীব দুরূহ এবং জটিল। ক্ষণের কিঞ্চিৎ এদিক-ওদিক হলে, যেহেতু গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থানের পরিবর্তন হয়, সেই হেতু জন্মকুণ্ডলীর বিচারেও তারতম্য হতে পারে। সারদার ঠিকুজি-কুষ্ঠি সব ঠিকই আছে ধরে নিয়েও, আসলে মানুষটাকে তিনি তাঁর আপন আলোতেই ভাবতে চান। আর ভেবে সত্যি দেখতে পান, সাধারণ ঘরোয়া-নিপাট-ভালমানুষ বহিরঙ্গের মধ্যেই সারদা পবিত্রতা-স্বরূপিণী। কিছুটা তিনি ওকে গড়ে নিয়েছেন, নিচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু আধারটি অমন সুন্দর নির্মল না হলে পারতেন না।
দক্ষিণেশ্বর আসার পরে এবার প্রথম থেকেই তিনি মনে রেখেছেন, স্ত্রীর মধ্যে প্রকৃত অর্থে বিশ্বমাতৃত্বের ভাব এবং উপলব্ধির সঞ্চার করবেন। ওকে উদ্বুদ্ধ করবেন ঈশ্বরচেতনার স্বরূপ অনুভব করার। খেয়াল করেছেন, সে-ও প্রস্তুত। মাঝে মাঝে ওর কথা, প্রশ্ন শুনে তিনি টের পান, গভীর ভাবাবেশের একটি আবহ তৈরি হয়েছে সারদার মধ্যে।
ক’দিন আগে শুক্লপক্ষের রাতে চাঁদের দিকে গভীর আবেগে তাকিয়ে দেখছিল সারদা। ঘরের সংলগ্ন বারান্দায় তিনি পায়চারি করছিলেন। উদাস হাওয়া আর নদীর জলে শব্দ উঠছিল।
সারদা হঠাৎ জিগ্যেস করেছিল, আচ্ছা… ঈশ্বর কার?
প্রথমে সামান্য অবাক হলেও, তারপর স্মিত হাসলেন তিনি। বুঝতে পারলেন বিগত মাসখানেক ধরে দক্ষিণেশ্বরে তাঁর সান্নিধ্যে সারদার বসবাস এবং ক্ষণে ক্ষণে তাঁর আধ্যাত্মিক উপদেশ, ব্রহ্মজ্ঞান সম্পর্কিত তত্ত্বকথা, ওর মনে অহরহ ঐশ্বরিক অন্বেষণ আর প্রশ্ন জাগিয়ে তুলছে।
আকাশে অপূর্ণ চাঁদের দিকে তাকিয়েই তিনি বললেন, চাঁদমামা যেমন সব শিশুর মামা, তেমনি ঈশ্বর সকলেরই আপনার।
সারদা বলল, আমি সব সময় তাঁকে ডাকছি।
তাঁকে ডাকবার অধিকার সকলেরই আছে। যে ডাকবে, তিনি তাকেই দেখা দিয়ে কৃতার্থ করবেন।
আমি কি তাঁর দেখা পাব?
সেই ভাবে ডাকো, তুমিও দেখা পাবে।
গভীর আগ্রহে প্রতিদিন সারদাকে লক্ষ করে যান তিনি। আবার সারদাও মানুষটার স্বরূপ বুঝে নিচ্ছে দিনে দিনে। অন্য মানুষদের কথা, গ্রাম্য লোকের অবিবেচনাপ্রসূত মন্তব্য সব ধুয়েমুছে গেছে সারদার মন থেকে। কাছের থেকে এখন ও শুধু মানুষটাকে দেখছে, আর হাতড়ে হাতড়ে নিজের ভিতর থেকে টেনে বের করে আনতে চাইছে আপন সত্তাকে। বোধ-বিশ্বাস-সংশয়-প্রত্যাশাকে ব্যবচ্ছেদ করে করে স্বীকৃত হতে চাইছে নিজের কাছে। মানুষটার কাছে এসে, সঙ্গেই থাকছে। এক শয্যায় রাত্রি যাপন করছে।
মনে কোনও ভয় নেই তো? কোনও দ্বিধা-আশঙ্কা-দ্বন্দ্ব-অবিশ্বাস-ভ্রান্তি? সর্বাঙ্গ থেকে নিজের আকুলতার প্রতিটি আবরণকে খুলে নিয়ে, ছিন্নভিন্ন করে মানসচক্ষে দেখার চেষ্টা করে সারদা। মাঝে মাঝে বিনিদ্র রজনী পার করে এক দুরন্ত, প্রায় অমানুষিক শ্রমে, সাধনায়। নিঃশব্দে নিরন্তর বিপ্লব ঘটে যায় এক আটপৌরে নারীর মধ্যে। ধূলিসাৎ হয়ে যায় বস্তুজগতের ধ্যানধারণা, তুচ্ছ হয়ে যায় সমাজের আরোপিত সংস্কার। সত্য আর শুদ্ধ হতে চায় শুধু আপনার কাছে।
না, কোনও ক্ষোভ তঞ্চকতা, পাপ নেই সারদার মনে। তার নারীসত্তার উত্তরণ ঘটে গেছে অন্য এক স্তরে, মার্গে, যেখানে পার্থিব নারী জীবনের মোহ, মায়া, সুখ, এমনকী দুঃখও ঝরে পড়ে গেছে জীর্ণ পাতার মতন। সব জানে, সব দেখে সে। কিন্তু তার চিত্তের কাছে ভূলুণ্ঠিত, অস্তিত্বহীন। সারদাকে কেউ দেখায় যুক্তি, কেউ সহানুভূতি। ও শিখেছে তাঁদের করুণা করতে। যুগে যুগে পৃথিবীতে মানুষ আসবে, মনীষী আসবেন, মানুষের চেহারায় দানব-তঙ্কর-শয়তান আসবে, আসবেন ঋষি-পণ্ডিত-কবি। যার-যার বোধ-উপলব্ধি দিয়ে বিচার, সমালোচনা করে যাবেন আর একজনের জীবনচর্যাকে। তারপর সব ইতিহাস হয়ে যাবে একদিন। এক নীরব আন্দোলনের তীরভূমি প্রান্তসীমায় থাকতে জয়রামবাটির শান্ত মেয়ে, কামারপুকুরের নিরীহ বধূ সারদা। মাতৃত্ব আর করুণার আড়ম্বরহীন বিপ্লবের সাক্ষী হয়ে থাকবে সে। তার চিরন্তন বাকি ইতিহাসের কেউ সন্ধান পাবে না।
বাতাসের মতন অদৃশ্য অস্তিত্বে সে অনুভূত হবে মানুষের অন্তরে।
তাঁদের দেওয়া-নেওয়া আর পারস্পরিক বোঝাবুঝি চলে স্বতঃস্ফূর্ত।
একদিন তিনি জিগ্যেস করেছিলেন, হ্যাঁ গো, তুমি কি আমায় সংসারপথে টেনে নিতে এসেছ?
প্রশ্নটা কানে গেল সারদার। মনে মনে ঠাকুর জ্ঞানে তাঁকেই পুজো করে সারদা। আবার এটাও জানে, পুজোর ছলে কখনও কখনও মানুষ আরাধ্যকেই ভুলে থাকে। তাই কিছুটা সেবাযত্নও করে আপাত উদাসীন মানুষটার। প্রশ্নটা কি সেই জন্য?
ধীরেসুস্থে পায়ে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, কেন তা করব?
আমার বেশ যত্ন-আত্তি হচ্ছে, দেখভাল করছ, তাই ভাবলাম…
সারদা জানে ও মানুষটার অজ্ঞাত কিছু নেই। তবু স্পষ্ট কথাটা বোধহয় একবার ওর মুখ থেকেই শুনতে চান।
নিঃশঙ্কচিত্তে বলল, না, আমি তোমার ইষ্টপথেই সাহায্য করতে এসেছি।
জানা ছিল তাঁর। তবু এই স্পষ্ট স্বীকারোক্তিতে চমৎকৃত হয়ে গেলেন।
একটু পরে বললেন, সেপথ কেমন জান কি?
সারদা বলল, ওপর ওপর দেখলে দুঃখকষ্টের বলেই মনে হবে। তোমার ইষ্টকে যে অনুভবে পেয়েছে, তার আর ভয় কী!
রামকৃষ্ণ টের পান, তাঁর একনিষ্ঠ শিষ্যাটি যে প্রায় জন্ম-স্বয়ম্বরা হয়েছিল, সে ঠিক নিখুঁত সুরেই বাজছে। অতএব একাগ্রচিত্তে নিজেকে পরিপূর্ণ সঁপে দেওয়ার পথে তিনি ধাপে ধাপে এগিয়ে চলেছেন। গভীর গোপন মানসিক প্রস্তুতি সম্পূর্ণ হয়ে আসছে।
প্রায় একই পরিবেশ পরিস্থিতিতে, অন্য আর একদিন তাঁকে দাঁড়াতে হল সারদার প্রশ্নের মুখোমুখি। তাঁর পায়ে ওর হাত। মাথা নিচু। জিগ্যেস করল, আমাকে তোমার কী বলে মনে হয়?
যেন উত্তর তৈরিই ছিল। বললেন, যে মা মন্দিরে আছেন, তিনিই এ-শরীরের জন্ম দিয়েছেন, এখন নহবতে বাস করছেন, আর… সামান্য হেসে যোগ করলেন, তিনিই এখন আমার পদসেবা করছেন।
সারদা চমকাল না কাঁপল না। শুধু এক দুরন্ত উচ্ছ্বাসে বিদ্ধ হয়ে বলল, কী রূপে আর কেমন দেখো আমায়?
আবার স্পষ্ট উত্তর। সাক্ষাৎ আনন্দময়ী রূপ বলে, ত্যে সত্য দেখতে পাই।
পারস্পরিক কথা, আলাপনের পরে দীক্ষিত ও স্বীকৃত হওয়ার পালাও শেষ। শুধু একবার নিজের শেষ পরীক্ষাটা নিতে চান। সবাই তাঁকে ঠাকুর বলে। তিনি কি জাগতিক মনুষ্যজন্মের ঊর্ধ্বে বিলীন হয়েছেন! রাতে পরীক্ষা নেবেন আজ।
সারদা এল। তিনি আহার শেষ করলেন। নিত্যনৈমিত্তিক গল্পগাছা হল। চন্দ্রমণি থেকে শুরু করে, ঘরবাড়ি-আত্মীয়স্বজন-শিষ্যশিষ্যা-মন্দিরের খবর-খরচপত্র-হেঁশেলের গল্পও হয়ে গেল। চারিধার শুনশান আর আঁধার গাঢ় হল। শয্যা করলেন দু’জনে। সারদা যথারীতি ক্লান্ত। ঘুমিয়ে পড়তে সময় লাগল না। গভীর নিদ্রায় ডুবে গেল দ্রুত।
নিঃসাড়ে উঠে বসলেন তিনি। আবছা আলো আসছে খোলা জানলা দিয়ে। থিরথির হাওয়ায় কাঁপছে মশারি। দূরের কোনও ঘাট থেকে কুকুরের ডাক শোনা যাচ্ছে। মৃদু ঢেউ ভাঙার শব্দ ভেসে আসছে মাঝে মাঝে। অন্ধকারময় শান্ত চরাচর নিঝুম।
কিছুটা পাশ ফিরে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে সারদা। উনিশ বছরের পূর্ণ যুবতী। অঙ্গ সৌষ্ঠবে, ডৌলে কানায় কানায় ভরা যৌবন, শরীরের ভাঁজে-খাঁজে-মুদ্রায় প্রকৃতির যাবতীয় আয়োজন পেলব পরিণতিতে সম্পূর্ণ হয়ে রয়েছে। মৃদু শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে দেহলতা উঠছে, নামছে। নারীদেহের প্রাকৃতিক সুগন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে নির্জন ঘরের বাতাসে।
তিনি গভীর দৃষ্টি আর নিজের সজাগ মন নিয়ে তাকালেন ঘুমন্ত যুবতীটির দিকে। অস্ফুট উচ্চারণ করলেন, মন, এরই নাম স্ত্রী-শরীর। লোকে একেই পরম উপাদেয় ভোগ্যবস্তু বলে জানে এবং ভোগ করার জন্য লালায়িত হয়। কিন্তু একে গ্রহণ করলে দেহেই আবদ্ধ থাকতে হয়, সচ্চিদানন্দঘন ঈশ্বরকে লাভ করা যায় না। ভাবের ঘরে চুরি কোরো না, পেটে এক মুখে এক রেখো না। সত্যি বলো, তুমি একে গ্রহণ করতে চাও, অথবা ঈশ্বরকে চাও? যদি একেই চাও তো এই তোমার সামনে রয়েছে, নাও।
তিনি চেষ্টাও করলেন, হাত বাড়াতে। চাইলেন ওকে স্পর্শ করতে। কিন্তু এই পর্যন্তই।
অকস্মাৎ কোথায় যেন চাপা, মৃদু, গম্ভীর মেঘের গর্জন কানে বাজতে লাগল তাঁর। পরম কুণ্ঠায় বিজড়িত হয়ে গেল প্রসারিত হাত। পরমুহূর্তেই মেঘগর্জন পর্যবসিত হতে শুরু করল এক অলৌকিক সংগীতের মূৰ্ছনায়, যেন আকাশ বাতাস তোলপাড় করে ধ্বনিত হতে শুরু করল এক মঙ্গলধ্বনি। অনুভব করলেন যেন কোনও এক দোলায় চেপে ঊর্ধ্বলোকে যাত্রা করেছেন তিনি। চতুর্দিক থেকে ভেসে আসছে স্বর্গের সুমধুর ঘণ্টাধ্বনি, আর তাঁর হালকা শরীরটা হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে দুরন্ত গতিতে ধাবিত হয়েছে অসীম মহাশূন্যের দিকে।
আপনার মধ্যে আপনি সংকুচিত হয়ে গেলেন রামকৃষ্ণ, বিলীন হয়ে গেলেন আপন ঐশ্বরিক অস্তিত্বের মধ্যে। কোথায় রয়েছেন, কেন রয়েছেন কোনও কিছু আর অনুভূত হল না। বাহ্যদশার ঊর্ধ্বে উঠে সমাধিস্থ হয়ে গেলেন ভাবের মানুষটি।
কেউ জানল না, কোন গোপন সাধনায় দেহসম্বন্ধবিহীন এক লীলাবিলাস, প্রকৃতপক্ষে ধর্মান্দোলনের চিরকালীন উদাহরণ হয়ে রইল। সারারাত চেতনার ঊর্ধ্বদশা থেকে তিনি আর সাধারণভূমিতে অবতরণ করতে পারলেন না। যথারীতি পরের দিন সকালে বহুক্ষণ ঈশ্বরের নামগানের পরে তাঁর সমাধিভঙ্গ হল। ব্যবহারিক জগতে নেমে এসে ক্লান্ত বোধ করলেও, মুখে ফুটে উঠল আনন্দের হাসি।
নিজের কাছে স্বাক্ষরিত হলেন ঠাকুর রামকৃষ্ণ। জানলেন, ভোগস্পৃহার আর কোনও অবকাশ নেই তাঁর মধ্যে।
কিন্তু মনে মনে নিজের কথাটি জানলেও, প্রকৃতপক্ষে কৃতজ্ঞ হলেন স্ত্রী সারদার কাছেই। সে-ও তো রক্ত মাংসের নারী হিসেবেই পৃথিবীতে এসেছে এবং মনুষ্যজন্মের যাবতীয় শর্ত পূরণ করে জীবদ্দশা অতিক্রম করছে। আপন অধিকারেই তো সে ভার্যা হিসেবে স্বামীকে কামনা করতে পারত। আর তিনি এটাও জানতেন, স্বাভাবিক বাসনা-কামনার বশবর্তী হয়ে প্রকৃতি যদি পুরুষকে আকাঙক্ষা করত, তা হলে সংযমের বাঁধন দিয়ে তিনি কি দেহবুদ্ধি, বোধ ঠেকিয়ে রাখতে পারতেন! নিঃসংশয় হতে পারেন না রামকৃষ্ণ।
আপনার কাছে, মনে, দেহবোধের এই কঠিনতম সংযমের সাধনায় তিনি উত্তীর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই, নিশ্চিন্ত হলেন সারদার বিষয়েও। বুঝেছিলেন, সে-ও মানবীয় দেহসম্বন্ধ ছাড়াই তাঁর একনিষ্ঠ লীলাসহচরী। তাঁদের এই প্রীতিমুগ্ধ, অপার্থিব অথচ বাস্তব বৈবাহিক সম্পর্কে সারদার ভূমিকাতেও কোনও ঘাটতি নেই। কৃতিত্ব-প্রাপ্তি-সংযম যতখানি তাঁর, ততখানিই সারদারও।
উত্তরণের পরেও আধ্যাত্মিক পূর্ণতার আর কিছু কি বাকি ছিল তাঁর?
না কি আধ্যাত্মিক উপলব্ধিকে জীবনচর্যার ক্ষেত্রে ফলিত করার জন্য কোনও পথ অন্বেষণ করছিলেন তিনি? ভাবছিলেন কি অদূর ভবিষ্যৎ থেকে যে ধারাবাহিক লীলা অবতীর্ণ হবে তাঁকে ঘিরে, কে প্রবাহিত করবে সেই ঐশ্বরিক লীলাতরঙ্গ! নিঃসন্দেহই ছিলেন, করবে সারদা। তাঁর ইষ্টপথের সহায়িকা সে, নিজমুখেই একথা কবুল করেছে সারদা। ঠাকুর জানেন, নিত্যসম্বন্ধবশত তাঁর ত্রাণ আর পালনে চিরকাল একজন “সারদার” আগমন ঘটে থাকে। সে তাঁর চেয়েও বড়, সে-ই তাঁর শক্তি। সুতরাং তাকে তিনি অভিষিক্ত করবেন দেবীত্বে, মাতৃত্বে।
তিনি নিঃসন্দেহ হয়েছেন তার পবিত্রতা সম্বন্ধে। এবার আয়োজন শুরু করলেন, পবিত্রতাস্বরূপিণী শক্তির কাছে নিজেকে পূর্ণ নিবেদনের জন্য। মনে বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই। সারদা স্বয়ং নির্বাচিতা। মাতৃজ্ঞানে, দেবীজ্ঞানে তার চরণেই তিনি পূর্ণাহুতি দেবেন। সামগ্রিক উদ্দেশ্য মহাভার অর্পণ এবং সারদাকেও তার স্বীয়শক্তি বিষয়ে সজাগ আর অবহিত করা।
আধ্যাত্মিক সাধনার ইতিহাসে সংযুক্ত হতে চলল এক বিস্ময়কর সিদ্ধিলাভের ঘটনাও।
দশমহাবিদ্যার তৃতীয় দেবী ত্রিপুরাসুন্দরী। তিনিই ষোড়শী। সারদাকে আপন অন্তরে সেই যোড়শীর ভূমিকায় কল্পনা আর প্রতিষ্ঠা করলেন ঠাকুর রামকৃষ্ণ। ভাবীকালের সঙ্ঘজননীরূপে আত্মপ্রকাশের জন্য অপেক্ষমাণ যে সারদা, তাকেই তিনি পুজো করবেন যোড়শোপচারে। স্ত্রী ও বধূ রূপান্তরিত হবেন দেবীত্বে, জননীরূপে। তাঁর কঠিন সাধনা সম্পূর্ণ হয়েছে ইতিপূর্বেই। এবার কঠিনতম অর্পণ, আত্মবিসর্জন।
সারদা জানে কিছু একটা ঘটতে চলেছে। এতদিন একসঙ্গে বসবাসের পরে সে টের পেয়েছে, তাদের জীবনে বিবাহ বন্ধনের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ অন্য রকম। তিনি এক হাত ঈশ্বরের পায়ে রেখেই অন্য হাতে সংসারকে ধরে রেখেছেন। পাছে, গৃহী আর সংসারী মানুষ বলে, নিজে বিয়ে করেননি বলেই অন্য সকলকে ব্রহ্মজ্ঞান আর ধর্মাচরণের কথা বলছেন, সেই কারণে বিয়েটাও তিনি বাদ দেননি। কিন্তু এবার তিনি তাঁর আসল উদ্দেশ্য, বিবাহিত জীবনের উন্নত আদর্শকে প্রতিষ্ঠিত করতেই তৎপর হয়েছেন। হাবভাবে সারদাও তা টের পাচ্ছে এবং জানে, সে প্রস্তুত। অনুভবে এই মাস দুয়েকে সে জেনেছে মানুষটা কোন উপলব্ধির আলোয় তাকে দেখেছে এবং গ্রহণ করেছে।
বোধহয় টের পায় সারদা, মানুষটা স্বল্পায়ু। তাই নিজের শক্তিকে সে অহরহ জাগিয়ে রাখে সত্তায়। প্রস্তুত করে তাঁর আর কাজের জন্য নিজেকে উপযোগী করে নেওয়ার। ওপরে প্রকাশ নেই, কিন্তু বৈপ্লবিক কিছু একটা ঘটনায় ভূমিকা নিতে হবে সে জানে। অর্ধাঙ্গিনী সত্তারও উপরে উঠে এসে, তাকে পালন করতে হবে সহধর্মিণীর ভূমিকা।
নহবতের ছোট্ট কুঠরিতে সারাদিন কাটে সারদার। দেখাশুনা করতে হয় শাশুড়ি চন্দ্রমণির। ঝক্কি সামলাতে হয় ভক্ত আর শিষ্য-শিষ্যাদের। লৌকিক জীবনের দায় কম নয়, দায়িত্বও হাজারটা। আছে সীমাবদ্ধতা। আছে সামাজিকতা। আছে শরীর। জ্যৈষ্ঠের আগুনে দগ্ধ হচ্ছে শহর। তার মধ্যেও বিরাম নেই মানুষের যাতায়াতের। কিছুটা লোকচক্ষুর অন্তরালে তো থাকতেই হয় আটপৌরে বউকে। বৃদ্ধা শাশুড়ির ডাকে দ্রুত সাড়া দিতে আসতে গিয়ে কুঠরির নিচু দরজার চৌকাঠে কপাল ঠুকে যায় সারদার। কেটে গিয়ে রক্ত পড়ে। দিন বড় এখন। এমনকী প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে যাওয়ার জন্যও দুরন্ত কষ্টে অপেক্ষা করতে হয় অন্ধকার নামার জন্য। ভয় আছে অন্ধকারেও। জোয়ারের জলে কখনও ভেসে আসে কুমির-কামট। শৌচে গেলে আক্রান্ত হওয়ার ভয় আছে অন্ধকারে।
রাতে মন্দিরে তাঁর ঘরেও নিরবচ্ছিন্ন বিশ্রামের অবকাশ মেলে না সব দিন। কখনও তিনি সমাধিস্থ হয়ে যান। সারদা বিভ্রান্ত বোধ করে। হৃদয়কে ডেকে পাঠাতে হয়। ভোরবেলা ফিরে আসে নহবতের ঘরে। অপেক্ষা করে থাকে সারাদিনের কাজ। ঘর পরিষ্কার, পুজোর আয়োজন, রান্না করা। কখনও পানিহাটির মণিমোহন সেন, কোনওদিন রসদদার শম্ভুবাবু আর তাঁর স্ত্রী এসে জিনিসপত্রের জোগান দিয়ে যান। ভাবশিষ্যরাও এসে ময়দা ঠেসে দিয়ে যায়। কিন্তু সারদা জানে আপাতত তার সংসার এটি। অবসরহীন দায়িত্ব তারই। অমানুষিক শারীরিক শ্রম, কষ্ট স্বীকার আর চূড়ান্ত সহনশীলতার পরেও তার পার্থিব প্রাপ্তির ভাঁড়ারটি শূন্য। সেই অর্থে কিছুই তো নেই তার। না সম্পদের জৌলুস, না পাণ্ডিত্যের বৈদগ্ধ্য, না যশ কিংবা রূপের আলোকচ্ছটা। কিন্তু অনুভবে জানে, এক অলৌকিক দেবজীবনোচিত সম্পদে সে ঐশ্বর্যময়ী হতে চলেছে।
অনিশ্চয়তা সম্বল করে জয়রামবাটি থেকে বেরিয়েছিল। অসুস্থ অবস্থায় এসে পৌঁছেছিল ভবতারিণী মন্দিরের দোরগোড়ায়। অজানা অচেনা শহর, বিশাল মন্দির প্রাঙ্গণের আলোচ্ছায়ায় সেদিন সারদা ছিল অবসন্ন, দিশাহারা, দ্বিধাগ্রস্ত।
তারপর দুটি মাস অতিক্রান্ত। চৈত্রের ঝোড়ো হাওয়ায় মিশে গেছে জ্যৈষ্ঠের গুমোট। গঙ্গা পুণ্যসলিলা, তবু গ্রীষ্মের অগ্নিবর্ষণে তার জলধারাও হয়েছে শীর্ণ। চর জাগে ভাঁটার সময় মাঝনদীতে। খেয়া নৌকো জোয়ারের অপেক্ষায় আটকে থাকে কাদাজলে। মন্দিরে তবু পুজো হয়। ঘণ্টা বাজে, শঙ্খধ্বনি হয়, ভক্তরা পুজো দিতে আসেন। দিন আর রাতের টানাপোড়েনে এক মহাবোধনের ক্রান্তিলগ্নে পৌঁছে যায় সারদা।
জ্যৈষ্ঠ মাসের ঘোর অমাবস্যা তিথি। ফলহারিণী কালীপূজার মহালগ্ন সে দিন। আদ্যাশক্তি মহাকালীর পূজা, ভিন্ন ভিন্ন রূপে তাঁর শক্তির প্রকাশ। ফলহারিণী কালিকার মধ্যে তাঁর আর-এক রূপেরই প্রকাশ, ফল লাভকেই মানুষ মনে করে কর্মের উদ্দেশ্য, কিন্তু বিপরীত বিধিও প্রচলিত তাঁর পূজায়। নিষ্কাম কর্ম। তাঁর পায়ে সব সমর্পণ করে আত্মলীন, হয়ে কর্ম করা। ফলের প্রত্যাশা নেই। মা ফলেসু কদাচন। সব ঢেলে দেব তাঁর পাদপদ্মে। তিনি হরণ করে নেবেন সব ফল। তাই তিনি ফলহারিণী। জ্যৈষ্ঠের অমাবস্যায় তাঁর আরাধন।
মন্দিরে সকাল থেকে উৎসবমুখর পরিবেশ। মানুষের আনাগোনা। কর্মচাঞ্চল্য। শহর ছাড়াও দূর-দূরান্তর থেকে মানুষ আসছেন। গঙ্গাস্নান সেরে ভিজে কাপড়ে উঠে আসছেন মন্দিরে। গলদঘর্ম অবস্থা, তার মধ্যে ছোটাছুটি, ব্যস্ততা। জুড়িগাড়ির ভিড়, পাণ্ডাদের হাঁকডাক। ফুলওয়ালারা গাঁদা আর জবার পসরা বিকিয়ে যাচ্ছে মুহূর্তে। মানুষের ভিড়ে জায়গা করে নিয়েছে গোরু, ষাঁড়। সাধু-ভণ্ড-ভিখারি-পূজারি কেউ বাদ নেই। পূজার উদ্দেশ্য, ফল সমর্পণ, ফল হরণ—ইত্যাদির চেয়ে বড় কথা আজ বিশেষ উৎসব আর সমারোহ। অগ্নিস্রাবী বাতাসে মন্দিরের পতাকা উড়ছে চূড়া থেকে। ঘণ্টা-শঙ্খ-উলুধ্বনিতে বারংবার মুখরিত হয়ে উঠছে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের আঙিনা।
সারদার জীবন অন্য সুরে বাঁধা। সে অন্তঃপুরবাসিনী। মহাপ্রাণীর আয়োজনে হাঁড়ি-কড়া-উনুন নিয়ে নহবতের হেঁশেলই তার দিনের মন্দির। তার সংসার-দায়িত্ব-সেবাপরায়ণতায় আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা বাস্তব জীবনযাপন। আনন্দ উৎসবের তিথি লগ্ন তার জানা, কিন্তু গা-ভাসানোর সুযোগ তার নেই। বরং উৎসবের দিনেই তার কাজ বেশি। তবু এসবের মধ্যেই খেয়াল করেছে, কয়েক দিন ধরে মানুষটা যেন একটু স্বল্পবাক, একটু উদাসীনতায় আক্রান্ত। ঠিকই আছেন, তবু যেন বেশি সময় ভাবজগতে বিচরণ করছেন।
আর কেউ না জানুক, না বুঝুক, তাকে তো নজর রাখতেই হয় মানুষটার দিকে।
মন্দিরের বিশেষ উৎসবে আজ সবাই ব্যস্ত। অন্যদিন পুজোপাঠ সেরে হৃদয় এক-আধবার ঘুরে যায়। শুধু যে খোঁজখবর নিয়ে যায়, তাই না। মাঝেমধ্যে একটু কর্তামিও করে, উপদেশ-নির্দেশ দেয়। দিদিমাকেও দেখে যায়। আর আসে দীনু। জ্ঞাতি সম্পর্কে মুকুন্দপুরের এক ভাশুরের ছেলে। এখন সে-ও পূজারি। ছেলেটা ভাল, বাধ্য আর ঠান্ডা। আজকে আর কারওর পাত্তা নেই। সারদা জানে, মন্দির বাড়িতে বড় পুজো আর উৎসবের দিনে পুরোহিতদের অবস্থাও শ্রমিকের মতো।
দুপুরবেলা তার মধ্যেই ঘামে-গরমে-ব্যস্ততায় একবার হাঁসফাঁস করতে করতে হৃদয় এল নহবতে।
মামি গো, এক ঘটি জল দাও।
সারদা রান্না করছিল। নহবতের দোতালায় যাওয়ার সিঁড়ির নীচে ঘুপচি রান্নাঘর। যাবতীয় আয়োজন তার মধ্যে। গনগনে তোলা উনুনও জ্বলছে। গলা শুনে দ্রুত বাইরে এল।
ওহ্ হৃদয়, দাঁড়াও দিচ্ছি।
ঘরে ঢুকেই দুটো নারকোল নাড়ু, আর ঘটি করে জল নিয়ে এল সারদা। হৃদয়ের হাতে দিতে দিতে বলল, আজ যা ব্যস্ত তোমরা, ভাবলাম এদিকে আর আসতে পারবে না। গরমটাও যা পড়েছে!
নাড়ু মুখে ফেলে হৃদয় বলল, এইজন্যই তো তোমার কাছে আসা। সকাল থেকে উপোস চলছিল। জানি কিছু না কিছু জুটবে। ঢক ঢক করে পুরো জলটা গলায় ঢেলে দিল হৃদয়। বলল, ব্যস্ত বলে ব্যস্ত! ভোররাত্তির থেকে লোক আসছে।
তা তো আসবেই। ফলহারিণী মায়ের পুজো ব্যবস্থা সব ঠিকমতো হচ্ছে?
তা হচ্ছে বইকী! দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের পুজো বলে কথা।
তোমার মামা করবেন পুজো?
মামা তো এত বড় পুজো, ব্যস্ততা সব সামলাতে হিমশিম খান। আমাদেরই করতে হয়।
ওহ্, বলে সামান্য অবাক হয়ে হৃদয়ের দিকে তাকায় সারদা। আবার বলে, তিনি তা হলে কোথায় আজ?
হৃদয় বলে, মামা তো আজ নিজের ঘরেই পুজো করবেন বলে জানিয়েছেন।
তাই না কি? কী পুজো? কখন?
আজ ফলহারিণী পুজোর রাতেই মামা ষোড়শীরূপে মায়ের পুজো করবেন বলে জানিয়েছেন।
আজ রাতে—ষোড়শী পুজো…
সেই জন্যই তোমার কাছে ছুটে আসা! হৃদয় বলল, মামা জানাতে বলেছেন, একটু আগেই তৈরি হয়ে চলে যেয়ো। পুজোর সময় তোমাকেই উপস্থিত থাকতে হবে। আমরা যতটা পারি জোগাড়যন্ত্র করে দিয়ে চলে যাব মন্দিরে।
হৃদয় আর দাঁড়াল না। যেমন হাঁপাতে হাঁপাতে এসেছিল, তেমনই দ্রুত নিষ্ক্রান্ত হল।
সারদা কিছু একটা অনুমান করছে। পুরোটা জানে না। আন্দাজ করে, তিনি কোনও একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। নিজের ঘরে আলাদা করে পুজোর আয়োজন নিশ্চয়ই সেই জন্য করেছেন।
ব্যাপারটা মাথায় ঘুরল সারাদিন। কিছুটা আনমনা হয়ে রইল সারদা। তার মধ্যে গুছিয়ে নিতে লাগল কাজকর্ম।
কোলাহল আর হট্টগোল চলেছে মন্দির চত্বর জুড়ে। ওদিকে পুজোও চলেছে। সারাদিন ধরে মাঝেমধ্যেই নাটমন্দিরের কাঁসর ঘণ্টার ধ্বনি ভেসে এসেছে সারদার কানে। হুটোপাটি টের পেয়েছে প্রসাদ বিতরণের সময়ে। গুমোট গরম আর ঘামে, ক্লান্তিতে অনেক ভক্ত, দর্শনার্থী শেষ পর্যন্ত মন্দির প্রাঙ্গণ ছেড়ে এসে, খোলা হাওয়ায় পঞ্চবটীর চাতালে আশ্রয় নিয়েছেন। খোল-করতাল বাজিয়ে সেখানেই তাঁরা আসর জমিয়েছেন।
দিনটা শেষ হয়ে এল এক সময়।
ছাই ছাই রঙের ঘোলাটে আকাশ পার হয়ে সূর্য পাটে বসল। হাওয়া পড়ে গেছে। যথারীতি গুমোট। সারাদিন ধকলের পরে বহু মানুষ ফিরে গিয়েছেন। আবার অনেকে থেকে গেছেন, সন্ধ্যারতি দেখে ফিরবেন। তাঁদের আশা, অন্ধকার নামলে গঙ্গার হাওয়া আসবে আবার।
এত হইচইয়ের মধ্যে একটি মানুষ প্রায় বিচ্ছিন্ন ছিলেন। সারাদিন নির্জনে প্রায় একাকী ছিলেন ঠাকুর রামকৃষ্ণ। প্রাতঃকৃত্য সেরে একবার তিনি মন্দিরে গিয়েছিলেন সকালবেলা। ভক্ত সমাবেশের আগেই, তাঁর নিত্য মা ভবতারিণীর চরণ স্পর্শ করে, আশীর্বাদ নিয়ে ফিরে এসেছেন। তখনই দীনু আর হৃদয়ের কাছে তাঁর মনোবাসনা ব্যক্ত করে এসেছিলেন।
পুজো-অর্চনা আয়োজনের ব্যাপারে হৃদয়ই তাঁর মুখ্য আয়োজক। বলেছিলেন, সন্ধেবেলা ঘরেই আমি আজ মায়ের পুজো করব মনস্থ করেছি। হৃদয় একটু অবাক হয়েছিল।
আজ ঘরে পুজো করবে? মন্দিরে আসবে না?
এই তো ঘুরে গেলুম, মায়ের দর্শন নিয়ে গেলাম।
কিন্তু…একটু ইতস্তত করে হৃদয় বলল, আজ বছরকারদিন, অমাবস্যা তিথি, ফলহারিণী মায়ের পুজোয়…
সবই জানি। হৃদয়কে থামিয়ে দিলেন তিনি। বললেন, আমি আজ একটু একা থাকতে চাই, নিরালায়। বড় পুজো আজ—
সেই জন্যই তো তুমি পুজোয় বসবে মনে করেছিলুম।
হইচই, আড়ম্বরের মধ্যে যেতে মন চাইছে না। তোরা তো সবাই আছিস।
তা আছি…
হৃদয় আর কথা বাড়াল না। নিজের গুরুত্ব অনুভব করে বরং একটু খুশিও হল।
ভবতারিণী মা আর দক্ষিণেশ্বর রানিমা-র মন্দিরের মূল পুরোহিত রামকৃষ্ণ। কিন্তু তাঁর ভূমিকা এবং পরিচিতি তার থেকেও যে অনেকটা বেশি একথা সবাইয়ের জানা। তাঁর প্রথম রসদদার এবং তৎকালীন মন্দিরের প্রশাসক মথুরামোহন বিশ্বাসের আমল থেকেই তাঁর স্বাধীন ভূমিকা অন্য তাৎপর্যে প্রতিষ্ঠিত। মথুরাবাবু স্বয়ং তাঁকে ঠাকুর জ্ঞানে আজীবন ভক্তি শ্রদ্ধা করে গেছেন। দ্বিতীয় রসদদার শম্ভুচরণ মল্লিক মশাইও তাঁর প্রতি প্রগাঢ় শ্রদ্ধায় বিনত। সুতরাং ও মানুষটার ওপর আর যে কথা বলা যাবে না, অন্তত হৃদয় তা খুব ভালই জানে। তা ছাড়া ছোটমামাকে ও নিজেও কিছুটা অন্য চোখে দেখে। গুরুর সম্মান দেয়।
রামকৃষ্ণ বললেন, শোন আর একটা কথা। আজই রাতে, আমার ঘরে মা-কে আমি ষোড়শীরূপে পুজো করব। তিথিটা ভাল। তোরা ব্যস্ত জানি। সময় পেলে এসে একটু গুছিয়ে-টুছিয়ে দিয়ে যাস, তাতেই হবে।
হৃদয়ের মনটা খুশিই ছিল৷ বলল, তার জন্য তুমি ভেবো না।
উনি বললেন, পুজোটা ষোড়শোপচারে করব, সুতরাং যোলো রকম উপচার যেন…
ঠিক আছে, ঠিক আছে, হৃদয় উৎসাহিত হয়ে বলল, তুমি যখন মুখ ফুটে একবার বলেছ…আয়োজন-উপচার-বস্ত্র-বাসন-পুষ্প…এমনকী মায়ের একটি ষোড়শী মূর্তিও…
না-না-না! তিনি মাঝপথেই থামিয়ে দিলেন হৃদয়কে। বললেন, মূর্তি-টুর্তি লাগবে না রে। শুধু আলপনা দেওয়া ঠাকুর বসানোর মতো আসনসিঁড়ি থাকলেই হবে।
আবার একটু অবাক হয়েছিল হৃদয়। কিন্তু আর কথার সময় ছিল না ওর। বলেছিল, আচ্ছা ঠিক আছে। আমি আসব পরে, ওদিকে দীনুকেও পাঠিয়ে দেব’খন। কাজের লোক, সন্ধে নাগাদ সব পরিপাটি করে দিয়ে আসবে। কিছু চিন্তা কোরো না।
চলে যেতে গিয়েও আর একবার তিনি ডেকেছিলেন হৃদয়কে। একটু আনমনা, উদাসীন। বলেছিলেন, আর হ্যাঁ, তোর মামিকে একটা খবর পাঠিয়ে দিস—যেন সন্ধেবেলা দেরি না করে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে চলে আসে।
হৃদয় আর দাঁড়ায়নি। চাতাল পার হয়ে উনিও ফিরে আসছিলেন। দীনুর সঙ্গে দেখা তখনই। ওকে জানিয়েছিলেন তাঁর পরিকল্পনার কথা। দীনু সায় দিয়েছিল, আশ্বস্ত করেছিল তাঁকে।
দু’জনকেই তিনি বলেছিলেন, ওঁর ঘরের এই পুজোর কথা যেন গোপনই থাকে। রাষ্ট্র হওয়ার দরকার নেই।
সেই পুজোর আয়োজনই এখন সমাপ্ত প্রায়।
সূর্যদেব অস্ত গেছেন বেশ কিছুক্ষণ আগে। অমাবস্যা নিশির আঁধারে ঢেকেছে চরাচর। একটু একটু করে রাত বাড়ছে। উৎসবমুখর মন্দির প্রাঙ্গণের কোলাহল স্তিমিত হয়ে শান্ত ভাব ফিরে আসছে সারাদিনের পরে। অল্প হাওয়া ছেড়েছে গুমোট গরমের পরে। অনেক ক্লান্ত দর্শনার্থী যাঁরা আর ফিরতে পারবেন না আজ, গা-জুড়োনো হাওয়ায় ঢলে পড়েছেন এদিক-ওদিক।
কালো আকাশে অজস্র তারার মেলা আজ। মেঘের দেখা নেই এখনও। সারাদিন একটু একটু করে জমে গুমোট ভাবটা বাড়ায়। সন্ধের হাওয়াতে আবার অপসৃত হয়। অবশ্য গুমোট তৈরি হওয়াটাই আসন্ন বর্ষার সংকেত। কিন্তু এখনই সে সম্ভাবনা নেই।
নিশুত হয়ে আসছে রাত। ঘরে একা অপেক্ষা করছেন ঠাকুর রামকৃষ্ণ। যেকোনও সময় সারদা আসবে।
বিকেলের দিকে হৃদয় এসে জিনিসপত্র সব রেখে গিয়েছিল। সন্ধের পরে দীনুই চমৎকার করে সব আয়োজন সম্পূর্ণ করল। পুজোর ব্যবস্থা করায় অভিজ্ঞ মানুষ সে। কাকার রুচি সম্বন্ধেও কিছুটা ধারণা আছে। মানুষটাকে ভালও বাসে।
একটু আগে ফিরে গেছে দীনু। তাকে আবার রাত্রিকালীন রাধাগোবিন্দর সেবা পুজোও করতে হয়।
ঝাঁট দিয়ে ঘর মুছেছে দীনু। তার পর গঙ্গাজল ছড়িয়েছে। সুন্দর আলপনা দিয়ে ঠাকুরের আসন পেতেছে। ও জানে রামকৃষ্ণের আজকের পুজোয় আরাধ্যা দেবী, মায়ের কোনও প্রতিমা বা প্রতিকৃতি থাকবে না। মনে প্রশ্ন জেগেছে। জিগ্যেস করেনি। যে চৌকির উপর তিনি শয়ন করেন, তার উত্তরপাশে রেখেছে আসন। উপচার সাজিয়ে দিয়েছে রেকাবি আর ছোট বারকোশের মধ্যে। ফুল-চন্দন-ধান-দূর্বা, কোশাকুশি-কমণ্ডলু-গঙ্গাজল যেমন থাকে, সব গুছিয়ে ধূপ জ্বেলে দিয়েছে। আজ তিনি বড় বাতি জ্বালাতে বারণ করেছেন।
একটি মাত্র তেলের প্রদীপ জ্বলছে পিলসুজের উপর। তারই অকম্পিত শিখা মাঝে মাঝে মৃদু হাওয়ায় কেঁপে উঠছে, আর আলোছায়া সৃষ্টি করছে ঘরের পরিবেশে। অপূর্ব সুগন্ধে ভরে রয়েছে ঘর।
একটি পাট-ভাঙা ধুতি পরে আদুড় গায়ে তিনি সারদার প্রতীক্ষা করছেন। কপালে চন্দনের ফোঁটা। রাত ন’টা বেজে গেছে। দিনের সমস্ত কোলাহল থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখে একান্তে আত্মস্থ তিনি৷ পূর্ণাহুতির জন্য প্রস্তুত।
দেখলেন, সারদা আসছে। স্মিত হাসলেন। আজ তারও আসার ছন্দে যেন অন্যদিনের সেই অভ্যস্ত পদক্ষেপ অনুপস্থিত। সারদা এল যেন কিছুটা শঙ্কা, কিছুটা কৌতূহলের মেশামিশি নিয়ে। কোন এক অজানা লোকের রুদ্ধদ্বার আজ যেন উন্মুক্ত হবে তার সামনে। কয়েকদিন ধরে তাঁর দেওয়া ইঙ্গিতে এটুকু সে ভালই বুঝেছে। তা ছাড়া আজকের আয়োজনের প্রাথমিক খবরও সে পেয়েছে।
সারদা ঘরে আসার পরে মাত্রই সামান্য হাসি দিয়ে নৈঃশব্দ্যটা বজায় রাখলেন তিনি। ঘরের আলোছায়া-উপচার-সুগন্ধের সঙ্গে তাঁর এই আচরণ বেশ মানিয়েও গেল। পূজার জন্য তিনি প্রস্তুত হলেন। মন্ত্রপাঠ করে উপকরণ আর দ্রব্যগুলোকে শোধন করে নিলেন। গঙ্গাজলের ছিটে দিলেন। তার পর যথাবিহিত নিষ্ঠায় পূর্বকৃত্য সুসম্পন্ন করলেন। একমাত্র দর্শক এবং নীরব সাক্ষী সারদা। কী এক আবেশে ভাসছে।
প্রথম পর্ব শেষ করে চোখ খুললেন রামকৃষ্ণ। আবেগঘন দৃষ্টি যেন উধাও হয়ে কোনও দুর লোকের দিকে ধাবিত। তাই নিয়ে তাকালেন সারদার দিকে। তারপর ইঙ্গিত করলে আলপনা-শোভিত আসনের উপর ওকে বসার জন্য।
অবশ্যই কিছুটা বিভ্রান্ত সারদা। প্রাথমিক পুজো দেখতে দেখতেই কেমন ঝিমুনি আসছিল। ঘুমের নয়, ভাবাবেগের ঝিমুনি। এবার তার সঙ্গে যুক্ত হল অনিবার্য সংকোচ। উঠে দাঁড়াল, কিন্তু ইতস্তত করল ওই সাজানো আলপনা দেওয়া পিঁড়িতে গিয়ে বসতে। দৃষ্টিতে প্রীতি আর নম্র স্নিগ্ধতা মিশিয়ে অভয় দেওয়ার মতন আবার তিনি ইঙ্গিত করলেন বসার জন্য। সারদা উঠল, যেন মন্ত্রমুগ্ধ। পায়ে পায়ে এগিয়ে ঈষৎ জড়তা নিয়েই ঠাকুরের জন্য নির্দিষ্ট আসনে বসল। আর পরমুহূর্তেই অনুভব করল যেন নিথর নিস্পন্দ চারিদিক। কেন বসল। কী হতে যাচ্ছে, কী করতে যাচ্ছে কিছুই তার বোধগম্য হল না। আচ্ছন্ন, সমাহিত, যেন বাহ্যদশা লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে।
পশ্চিমে গঙ্গার দিকে মুখ করে বসেছে সারদা। বিপরীতে পুবমুখো পুরোহিত রামকৃষ্ণ।
মন্ত্রপূত জলের কলসি হাতে নিলেন তিনি। বারংবার সারদার গায়ে ছিটিয়ে অভিষেক সম্পন্ন করলেন। চোখ খুলে তাকিয়ে আছে সারদা, অথচ যেন জানে না কী ঘটছে, দৃষ্টি নেই চোখে। এক অদৃশ্য শক্তি শুধু স্থির বসিয়ে রেখেছে তাকে।
এবার প্রার্থনামন্ত্র উচ্চারণ করলেন তিনি। “হে বালে, হে সর্বশক্তির অধিশ্বরী মাতঃ ত্রিপুরসুন্দরী, সিদ্ধিদ্বার উন্মুক্ত কর; এঁর শরীর মনকে পবিত্র করে, এঁর মধ্যে আবির্ভূতা হয়ে সর্বকল্যাণ সাধন কর।”
প্রার্থনা শেষ করে, তিনি সারদার অঙ্গে মন্ত্রের যথাবিধি বিন্যাস করলেন। পায়ে আলতা পরিয়ে দিলেন, সিঁথিতে সিঁদূর, কপালে টিপ, নতুন কাপড়ও দিলেন গায়ে। পান, মিষ্টি ছোঁয়ালেন মুখে। তারপর সামনে পায়ের কাছে বসে, সাক্ষাৎ দেবী জ্ঞান করে পুজো শুরু করলেন। ষোলোটি উপচারের একটি একটি করে নিবেদন করলেন দেবীকে। সারদার সঙ্গে কাল্পনিক দেবী প্রতিমার আর কোনও পার্থক্য নেই তখন। নিমগ্ন চিত্তে পূর্ণ বিশ্বাসে, স্থৈর্যে, অকম্পিত ঠাকুর মাতৃদর্শন করলেন সারদার মধ্যে। ছিল বধূ, ভার্যা; আজ প্রকৃত অর্থে জায়া, যার মধ্যে দিয়ে পুনর্জন্ম নিলেন ঠাকুর রামকৃষ্ণ। সারদা হলেন জননী, মা। পূজকের নিবেদিত ফল, মিষ্টির অংশ ঠাকুর তুলে তুলে দেবী-মায়ের শ্রীমুখে ছোঁয়াতে লাগলেন। আর সাক্ষাৎ জগজ্জননীর দর্শনে কৃতার্থ বোধ করলেন। অর্ধ বাহ্যজ্ঞানশূন্য, সমাহিতা, অভিভূত শ্রীমা সারদা একটু একটু করে সমাধিস্থ হয়ে গেলেন। একই সঙ্গে মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতেই সম্পূর্ণ সমাধিমগ্ন হয়ে গেলেন রামকৃষ্ণ। পূর্ণ নৈঃশব্দ্য বিরাজ করছে ঘরে, প্রদীপের শিখা স্থির, অচঞ্চল। সমাধিস্থ পূজক, সমাধিস্থা দেবীর সঙ্গে আত্মস্বরূপে পূর্ণভাবে মিলিত ও একীভূত হয়ে গেলেন। যেন অদৃশ্য কালতরঙ্গ প্রবাহিত হয়ে চলেছে, আর নিস্তব্ধ চরাচর শ্বাস বন্ধ করে নির্বাক সাক্ষীর মতন দেখছে এক অপূর্ব অলৌকিক মিলন দৃশ্য।…
অতিক্রান্ত হয়ে গেল রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর।
গঙ্গার জলধারা কুলকুল বয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই এখন। অমাবস্যার গভীর অন্ধকারে ডুবে আছে প্রকৃতি।
সমাধিস্থ ঠাকুর জাগছেন আবার। জৈবিক স্পন্দনের লক্ষণ ফুটে উঠছে ধীরে ধীরে। ইতিপূর্বে উপচার নিবেদন করেছিলেন, এইবার করলেন আত্মনিবেদন। নিজেকে তো বটেই, সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত সাধনার ফল, জপের মালা, সর্বস্ব দেবীমায়ের শ্রীচরণে বিসর্জন দিলেন চিরকালের জন্য। মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করতে করতে উচ্চারণ করলেন, হে সর্বমঙ্গলের মঙ্গলস্বরূপে, হে সর্বকর্ম নিষ্পন্নকারিণী, শরণদায়িনী, ত্রিনয়নী, শিবগোহিনি গৌরী, হে নারায়ণী, তোমাকে প্রণাম করি।
পুজো শেষ হল। ধরিত্রীর বুকে অধ্যাত্মবাদ চেতনার নতুন আকাশকে স্পর্শ করল। মূর্তিমতী মানবীর দেহে ঈশ্বরীর উপাসনা করে তাঁর জীবনভর সাধনার লৌকিক পরিসমাপ্তি ঘটালেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ। সম্পূর্ণতা পেল তাঁর দেব-মানবত্ব। আর জন্মলগ্ন থেকে শৈশব-বাল্য-কৈশোর ধাপে ধাপে পেরিয়ে, পূর্ণ যৌবনে কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনের পরে সারদা হলেন আদ্যাশক্তি দেবী, বিশ্বজননী।
পুব আকাশের রং ফিকে হয়ে আসছে। ভোর হতে আর দেরি নেই। জননী সারদা ফিরে আসছেন মন্দির গৃহের পরিবেশে। এ কী, নতুন কাপড় গায়ে, হাতে নতুন শাঁখা, পায়ে আলতা…! বাহ্যদশায়, বাস্তবভূমিতে ফিরে এলেন সারদা। এ সময় ভোরের স্নিগ্ধ হাওয়া বয় চারিদিক থেকে। সেই হাওয়া শব্দ তুলছে গাছের পাতায়। সারদার মনে পড়ে তিনি প্রণাম করেছিলেন ওকে, সেই প্রণাম তো ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি!
মনে মনে তাঁর পায়ে মাথা ঠেকালেন মা। তারপর নিঃশব্দ পায়ে, আবছা ভোরের আলোয় ফিরে চললেন নহবতের দিকে।
