৪
বাগবাজারে শরৎ সরকারের বাড়িটি বলরাম বসুর বাড়ির কাছেই। রাস্তা ছেড়ে পশ্চিমের গলির মধ্যে একটু একটেরে বাড়িটা, তা হলেও দু’বাড়ির ঠিকানা সেই একই রামকান্ত বসু স্ট্রিট। এবাড়ি-ওবাড়ি হেঁটে যেতে বড়জোর মিনিট খানেক সময় লাগে। সারদা আগে কখনও এবাড়িতে ওঠেননি। গঙ্গার ওপারে নীলাম্বর মুখার্জির বাড়ি ছাড়া, এপারে বাগবাজার অঞ্চলে ভক্তশিষ্য অনেকে থাকলেও, হয় বলরাম, নয়তো মহেন্দ্র মাস্টারের বাড়িই তাঁর আসল ডেরা। এ দুটি বাড়ির প্রতিটি সদস্যই তাঁর কাছের মানুষ, আত্মার আত্মীয়র মতো। কোনও কারণে সারদা জয়রামবাটি বা কামারপুকুর থেকে এসে, এ দুটি বাড়ির কোনওটায় উঠতে না পারলে, তিনি নন, বাড়ির লোকরাই ব্যতিব্যস্ত হন বেশি। দুঃখও পান।
শরৎ সরকার মানুষটিও ঠাকুরের এক তরুণ ভক্ত। কিছুদিন সারদাকে তাঁর বাড়িতে নিয়ে রাখার ব্যাপারে উৎসাহ এবং আন্তরিকতার কোনও অভাব নেই। কিন্তু বেদনাটা বাজছিল কৃষ্ণভাবিনীর বুকের মধ্যে। অন্য অনেকে যখন ঠাকুরের প্রয়াণের পরে, বিগত বছর দশেকে সারদার মধ্যে দেবীত্ব আবিষ্কার করেছেন, কৃষ্ণভাবিনী তখন তাঁকে পেয়েছেন পরমাত্মীয়া হিসেবে। দিনে দিনে কীভাবে যেন একটি নিবিড় আশ্রয় বলেই ঠাওরেছেন। দুঃখের দিনেই আসল কাছের মানুষ চেনা যায়। প্রথমবার বুঝেছিলেন পতিবিয়োগের সময়। বলরামের শরীর খারাপ শুনে, সব কাজ ফেলে রেখে মহেন্দ্রর বাড়ি থেকে সারদা চলে এসেছিলেন এবাড়িতে। দ্বিতীয়বার তাঁর কন্যার মৃত্যুসংবাদ পেয়ে সারদা তো রীতিমতো ঝুঁকি নিয়েই ছুটে এসেছিলেন জয়রামবাটি থেকে বাগবাজারে। অন্তরে তিনি প্রকৃত মা, টের পেয়েছিলেন, সন্তান হারানোর বেদনায় কৃষ্ণভাবিনীর শোকের তীব্রতা কতখানি হতে পারে। ভুবনমোহিনীর মৃত্যু যে কীভাবে আর কতখানি তাঁকে দীর্ণ করেছিল, একমাত্র সারদা ছাড়া আর কেউ বোধহয় ততখানি উপলব্ধি করেনি। তাঁর জয়রামবাটির বাড়িতে তখন হাজারটা ঝামেলা, ডামাডোল, ছোটভাই অভয়ের বিয়ে, গোটা কয়েক ভাইঝি-ভাইপো, তার মধ্যেই প্রসন্নর বউ রামপ্রিয়া অসুস্থ—। কিন্তু সব ফেলে সারদা চলে এসেছিলেন, শুধু কৃষ্ণভাবিনীর কাছে থাকার দরকার বলে। এমনকী শোকে জর্জরিত তাঁর শরীরের কথা চিন্তা করে ডাক্তার যখন বায়ু পরিবর্তনের উপদেশ দিলেন, সারদাও আর অগ্রপশ্চাৎ চিন্তা নিয়ে বসে থাকেননি। বিহারের নির্জন স্বাস্থ্যকর জায়গা কৈলোয়ার চলে গেলেন তাঁর সঙ্গে।
খুব বেশিদিন আগেকার কথা তো নয়! এসব কি কৃষ্ণভাবিনী ভুলতে পারেন!
আর আজ যখন তাঁর সেই ঘনিষ্ঠতম আন্তরিক মানুষটি বাগবাজারে এসেও অন্য ভক্তর বাড়িতে থাকতে যাচ্ছেন, কৃষ্ণভাবিনীর গভীর বেদনা অনুভূত হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাঁর বাড়ি যে খুব ফাঁকাও নয় এবার। সামনেই ছেলের বিয়ে।
সারদাই আশ্বস্ত করলেন কৃষ্ণভাবিনীকে।
বউমা, তোমার বাড়িতে এখন বিয়ের ধূম। আমি শরতের ওখানে নিরিবিলিতে দিব্যি থাকব। চিন্তা কোরো না।
কৃষ্ণভাবিনী বললেন, চিন্তা করার জন্য নয় মা। ছেলের বিয়ে, বাড়িতে শুভ কাজ। আপনি থাকলে আমার প্রাণটা জুড়োয়।
এই দুটো বাড়ির পরেই তো বউমা, যাতায়াত থাকবেই। তোমার বাড়িতে এখন জায়গার দরকার।
কৃষ্ণভাবিনী তারপরেও বললেন, কিন্তু মা, আপনার জন্য দোতালার গঙ্গামুখী ঘর তো ফাঁকাই রয়েছে।
সারদা বললেন, থাক বউমা। কাজের বাড়ি। এখনও তোমাদের আত্মীয়স্বজন সবাই এসে পৌঁছায়নি।
এসে পৌঁছুলেই বা কী মা? আপনার ওই ঘরে আমি কি প্রাণ ধরে অন্য কাউকে থাকতে দিতে পারব?
ও মা, কেন পারবে না! তোমার আঁটপুরের বাপের বাড়ির সবাই, বলরামেরও শ্যামবাজার-শ্যামপুকুর ছাড়া দূরদূরান্তরেও আত্মীয়স্বজন নেহাত কম নেই। তোমার একমাত্র ছেলের বিয়ে বলে কথা—জায়গা তো লাগবেই।
কিন্তু মা, কেষ্টর (রামকৃষ্ণ বসু) বিয়েতে আপনি বাগবাজারে থেকেও এবাড়িতে নেই— আমি যে ভাবতে পারি না।
নেই বলে ভেবো না বউমা। তোমার বাড়ির নাম দিয়ে গেছেন ঠাকুর তাঁর কেল্লা বলে। তিনি আমি দু’জনেই সবসময় এখানে আছি জেনো।
কৃষ্ণভাবিনী নিমরাজি হওয়ার মতো বললেন, ঠিক আছে মা। ঠাকুর আর আপনার পায়ের ধুলোয় ধন্য বলেই এখন লোকে এবাড়িকে ওঁর নামে (বলরাম) মন্দির বলে জানে। কথা দিন, অন্তত দিনে একবার পায়ের ধুলো দিয়ে যাবেন।
যাব মা, নিশ্চয়ই যাব। ভোর ভোর গঙ্গাস্নান সেরে ফেরার পথে তোমার সঙ্গে দেখা করে যাব। গরমের দিন, কোনও অসুবিধে নেই।
সারদা গিয়ে উঠলেন ঊনষাটের দুই নম্বর রামকান্ত বসু স্ট্রিটে শরতের বাড়িতে।
বিয়াল্লিশ-তেতাল্লিশ বছর বয়স এখন সারদার। দৌড়ঝাঁপ-ছোটাছুটি একটু বেশি হলেই টের পান শরীরটা বিশ্রামের জন্য হাঁকপাক করে। অথচ বয়েসের সঙ্গে সঙ্গে দায়দায়িত্ব টানাপোড়েন উত্তরোত্তর যেন বেড়েই চলেছে। উপায় বা কী। নারীপুরুষ ছেলেবুড়ো নির্বিশেষে ভক্তশিষ্য সন্তানের সংখ্যাও যে বাড়ছে। মানুষগুলো তেতেপুড়ে তাঁর কাছে একটু শান্তির আশায় এলে ফিরিয়ে দিতে কি পারেন। প্রকৃতিগতভাবে তিনি মানুষটাই যে অন্যরকম। একটি সর্বংসহা, শান্ত নিরীহ ভাব আছে তাঁর মুখমণ্ডলে, দৃষ্টিতে আছে অপার স্নিগ্ধ করুণার প্রকাশ। তাঁর দুটি চক্ষু এবং আঁখি পল্লবের বিন্যাস প্রতিমার দু’চোখের মতো ঠিক একরকম নয়। বাঁ চোখের কালো তারাটি দক্ষিণের তুলনায় একটু বেশি পল্লবে ঢাকা পড়ে থাকে। আর সেই কারণেই কি না কে জানে, বহু মানুষেরই একবার তাঁর মুখমণ্ডল অবলোকনের সুযোগ হলে, তাঁদের মনে হয়েছে—মাটির না, যেন তাঁরা জীবন্ত প্রতিমা দর্শন করেছেন। এক দেবীকে দেখেছেন আটপৌরে নারীর মধ্যে।
এসবের কোনও সচেতন ব্যাখ্যাই তাঁর নেই।
তিনি শুধু বোঝেন, ভালবাসা-করুণারও একটা দায় আছে এবং তা স্বতঃস্ফূর্ত। মা বলে একবার কেউ ডাকলে, তাঁর সেই দায়িত্ব বর্তায়। কাউকে আর কিছু বলতে হয় না। কিন্তু অলৌকিক কিছু একটা ঘটে তাঁর মধ্যেই। সেই ‘কিছু একটা’-র জন্যই তিনি দূরে ঠেলতে পারেন না কারওকে। শুধু মানুষ না, এমনকী অবলা জীব, পশুপাখিকেও।
অথচ প্রাণধারণের কিছু পার্থিব শর্ত যে তাঁকেও মানতে হয়। সংসার তাঁকে মুক্তি দেয়নি, আবার বিশ্বসংসারের টানেও মন উধ্বমুখী। কিন্তু জপধ্যান, তপস্যা না করে পারেন না। আছে নিয়মনিষ্ঠা, ব্রত উদ্যাপন, পুজোআর্চা। মাসে দু’দিন একাদশী।
অমাবস্যা-পূর্ণিমায় শরীর যেন একটু ভার, রসস্থ হয়, কোমর ব্যথা, বাত ধরছে একটু একটু করে। গত বছর কোয়ালপাড়ায় এসে এক সাধু একটি রুপোর আংটি বাঁ পায়ের আঙুলে পরার জন্য দিয়ে গেছেন। সেটি পরেন সারদা। উপকার হয় কি না হয় কে বলতে পারে। তবে বিশ্বাস করে দিয়েছেন, পরলে ক্ষতি তো নেই। বিশ্বাসটুকুই তো সব। সেই যে বছর তিনেক আগে, নরেন সমুদ্রযাত্রা করার পরে পরেই, নীলাম্বর মুখার্জির বাড়ির ছাতে পঞ্চতপা ব্রত করলেন, সেও তো এক নেপাল নিবাসিনী ভক্তর অনুরোধ এবং উপদেশে এবং তাঁকে বিশ্বাস করে।
এখন দূরের প্রেক্ষণী দিয়ে বিচার করে সারদার মনে হয়, মনের মধ্যে কী যেন একটা নিঃশব্দ ঢেউয়ের ওঠাপড়া চলছিল তখন। জয়রামবাটি, কামারপুকুরের ঘরবাড়ি, আপনজনদের চাওয়া-পাওয়া এসব তো ছিলই। বেশ কয়েকবছর ঠাকুরের তিরোধানের পরে কেটে গেলেও, নিঃসঙ্গতা তাঁকে পুরোপুরি ছাড়েনি। তার মধ্যেই ধারাবাহিক উদ্বেগ— ছেলেদের ভবিষ্যৎ। মঠ স্থানান্তরিত হয়ে গেল বরানগর থেকে আলমবাজারে। ভক্ত শিষ্যরা অবশ্য যোগাযোগ রাখছিল নিয়মিত। শরৎ-যোগীন-সারদা নিয়মিতই যাতায়াত করত। পুরোদস্তুর সন্ন্যাসী তখনই সবাই। তবু চাঁদা তুলে, খোঁজখবর নিয়ে বারবার তীর্থে পাঠিয়েছে তাঁকে।
কাশীতেই সেই নেপালি সাধুনী গোছের মেয়েটির সঙ্গে দেখা। বলল, মা পঞ্চতপা করো।
পঞ্চতপা কী? না, চারদিকে চারটি অগ্নিকুণ্ড আর ওপরে সূর্য, এই পাঁচটি তাপের উৎসমধ্যে বসে বসে তপস্যা করতে হবে। সারাদিন।
আসলে কৃচ্ছ্রসাধন। হয়তো শান্তভাবে, শারীরিকভাবে দগ্ধ হতে হতে, মনের মধ্যে তীব্র বৈরাগ্য আসবে, তাইতে জ্বালাযন্ত্রণা উদ্বেগও প্রশমিত হবে, কিংবা হতে পারে। আর তাঁর এই কষ্ট করার উদাহরণ, যদি অন্যদের শুভকামনা করার জন্য প্রভাবিত করে, সেটাও ভাল।
যোগীনমা উদ্যোগী হলেন। তিনিও ব্রত পালন করবেন সারদার সঙ্গে।
জ্যৈষ্ঠ মাস। নীলাম্বর মুখার্জির বাড়ির ছাতে বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে মাটি ফেলা হল। তারপর কয়েক হাত অন্তর, চারটে ঘুঁটের অগ্নিকুণ্ড জ্বালানো হল। মাথার ওপর জ্বলছেন সূর্যদেব স্বয়ং। তাপে গনগন করছে।
পারবেন? পারবেন তো সারদা সহ্য করতে। ঠিক যখন করেছেন, পারতেই হবে। উদ্দেশ্য যে শুভ। সবার ভাল হবে।
গঙ্গায় ডুব দিয়ে এসে ঢুকে পড়লেন সারদা। অগ্নিকুণ্ডের মাঝখানে শান্তভাবে বসলেন। তাপে দগ্ধ হলেন। তারপর তাপ সয়ে গেল। দীর্ঘবেলা অতিক্রান্ত হয়ে চলল। সকলের মঙ্গল কামনায় ডুবে রইলেন সারদা। একদিন, দু’দিন—সাতদিন সূর্যের উদয়াস্তের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে পোড়ালেন। গাত্রবর্ণ হল অঙ্গারের মতো।
কী হয়েছিল, কী পেয়েছিলেন সারদা জানেন না। ভাবজগতের উপলব্ধি ‘জানা’ দিয়ে ব্যাখ্যা করতেও চাননি। কিন্তু একটা তুষ্টির অনুভূতি হয়েছিল। মনে হয়েছিল, আর কিছু না, নিজে কষ্ট করে অন্যের কল্যাণ কামনা তো অন্তত করলেন।
শরৎ সরকারের বাড়িটি খুব দীর্ঘ পরিসরের নয়। গলির মধ্যে একটি সংক্ষিপ্ত রোয়াকের পরে দোতালা বাড়ি। ঘরগুলি তেমন বড় আর খোলামেলা নয়, বরং চাপা চাপা, সংকীর্ণ, দিনের বেলাতেও অন্ধকার ভাব। তা হোক, সারদা দিব্যি মানিয়ে নিলেন। কলকাতায় আর যাই হোক, সবসময় তাঁকে দেখাশোনার জন্য কেউ না কেউ আছেই। ইদানীং ভক্ত শিষ্যর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায়, যখন তখন মানুষ দেখা করতে চলে আসেন। একটু বিশ্রামের ব্যাঘাত হয় না, তা নয়। কিন্তু সাধারণত গোলাপমা, যোগীনমা সেদিকে নজর রাখেন। কিন্তু এখন যোগীনমা আবার কাজের বাড়িতে ব্যস্ত। কৃষ্ণভাবিনী সম্পর্কে তাঁর মামিশাশুড়ি। ছেলের বিয়ে উপলক্ষে হাজারটা কাজ ওবাড়িতে। যোগীনমার অভাব-অনুপস্থিতি অবশ্য অনেকটাই পুষিয়ে দেয় ছেলে-সারদা কিংবা যোগীন। আর গোলাপমা তো সঙ্গেই থাকছেন।
সারদা বোঝেন ইদানীং ছেলেদেরও কাজ দায়িত্ব বেড়েছে। বছর বছর জপতপ কৃচ্ছ্রসাধন করে করে এরা সব সিদ্ধপুরুষ, সন্ন্যাসী এখন। তিনি এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সঙ্গিনীরা নাম ধরে ডাকলেও, এদের সকলেরই এখন পুরনো পারিবারিক নাম এবং পরিচিতি অর্থাৎ যাকে বলে পূর্বাশ্রম, বদলে গেছে। সকলেরই সন্ন্যাস জীবনের নতুন নামকরণ হয়েছে। যোগীন হয়েছে যোগানন্দ, শরতের নাম সারদানন্দ, বাবুরাম হয়েছে প্রেমানন্দ, শশী নাম নিয়েছে রামকৃষ্ণানন্দ, সারদা হয়েছে ত্রিগুণাতীতানন্দ। আর এই সবেরই সূচনা হয়েছিল সেই আঠারোশো সাতাশি খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে, যখন নরেন প্রজ্বলিত হোমাগ্নিতে ইহকাল পরকালের সব বন্ধন ভোগবাসনা আহুতি দিয়ে, মাথা ন্যাড়া করে গেরুয়া কাপড় পরে স্ব-স্বীকৃত বিবেকানন্দ নামে ভূষিত হয়েছিল। এখন সবাই তাকে স্বামীজি বলে জানে।
সারদা অবশ্য জানেন, সন্ন্যাস নেওয়া কিংবা মঠের কাজ করতে গিয়ে, তাঁর ব্যাপারে ছেলেদের অবহেলার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। কলকাতায় এলে তো নয়ই, এমনকী জয়রামবাটি-কামারপুকুরে থাকলেও তাঁর হাজারটা ঝক্কি পোয়ায় শরৎ-যোগীন-সারদারাই। ছেলেরা যদিও তাঁর দেখাশোনার কাজটা ‘ঝক্কি’ বলে ভাবে না, বরং নিজেদের পরম ভাগ্যবান মনে করে, মায়ের সেবা করার সুযোগ পেয়ে। প্রাণের কোন ঐশ্বর্য থেকে যে লেখাপড়া করা এইসব ছেলের দল, ঘরসংসার ছেড়ে আত্মাহুতি দিয়ে ঠাকুরের কাজ আর জীব কল্যাণে নেমে পড়েছে, সারদা বোঝেন না। কিন্তু এটুকু বোঝেন—তাঁর সীমাহীন মাতৃত্বের আশ্রয় এবং প্রশ্রয় দুইই এদের পাথেয় এবং অবলম্বন। এখন আবার এদেরই টানে, তত্ত্বাবধানে নতুন নতুন ছেলেরা এসে জুটছে। নরেন বিদেশে পাড়ি দেওয়ার পর থেকেই সারদা জানেন, সারাদেশ জুড়ে একটা পরিবর্তনের হাওয়া বইছে।
পরিবর্তনের পূর্ণ স্বরূপ সারদা ঠিক ঠিক ধরতে না পারলেও, এর মধ্যে দিয়ে সমাজের, মানুষের ভাবনাচিন্তার উন্নতি, শোধন হবে তিনি জানেন। ছেলেরা সর্বস্ব পণ করে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। অলক্ষ্য থেকে নিজের নীরব অথচ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা সম্বন্ধে তিনি সচেতন থাকেন৷
কয়েক মাস আগে শরৎও সমুদ্রযাত্রা করেছে। জয়রামবাটি গিয়ে মায়ের অনুমতি নিয়ে এসেছিল। সারদা বুঝেছিলেন, বড় কাজের দায়িত্ব একা নরেনের পক্ষে সামলানো কঠিন হচ্ছে। প্রাণভরা আশীর্বাদ করেছিলেন শরৎকে। যোগীন আর শরৎ এই দুটি সন্তানই যে দুটি বলিষ্ঠ স্তম্ভের মতন তাঁর যাবতীয় প্রয়োজনের দায়ভার কাঁধে নিয়েছে, সারদা জানেন। নিজেই বলেন, যোগীন আর শরৎ আমার ভারী। যোগীনই নিয়ে এসেছিল শরৎকে। আর তিনি দেখেই বুঝেছিলেন, বড় কাজের দায়িত্ব নিতেই এই সন্তানের জন্ম। সম্প্রতি ছেলে-সারদাও তাঁর কাছে যাতায়াত করে।
এখন শরৎ বিদেশে থাকায় কৃষ্ণলাল বলে একটি ব্রহ্মচারী ছেলে সর্বক্ষণ তাঁকে দেখার জন্য শরৎ সরকারের বাড়িতে রয়েছে। যোগীন নিয়মিত যাতায়াত করে। আলমবাজার মঠে শশী অধিকাংশ দায়িত্ব পালন করলেও, রাখাল-যোগীন-কালী ছাড়া চলে না। সারদা এই মঠেও কোনওদিন পদার্পণ করেননি, কিন্তু এখন ছেলেরা দিকবিদিকে ছড়িয়ে পড়ায়, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মঠের প্রকৃত অবস্থা কী, জানার জন্য উদ্বেগমিশ্রিত একটি কৌতুহল অনুভব করেন। প্রত্যক্ষ দায়িত্ব তাঁর না থাকলেও, অদৃশ্য কাণ্ডারী কে তিনি জানেন। সঙ্ঘবদ্ধ ছেলেদের এই জীবনচর্যার ওপর শুধু মঠের ভবিষ্যৎ নয়, আগামীকালের বিশাল কর্মকাণ্ড মানবকল্যাণের প্রতীক্ষায় রয়েছে সারদা মানসচোখে দেখেন। নিজের প্রচ্ছন্ন দায়িত্ব সম্পর্কেও সচেতন।
গোলাপমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আলমবাজার বাড়ির খবরাখবর কিছু পাও?
গোলাপমা মানুষটি ঠাকুর আর সারদা অন্ত প্রাণ, কিন্তু কালের ইতিহাসে তাঁদের অবস্থান। বা ভূমিকা সম্বন্ধে তেমন সচেতনতা তাঁর গড়ে ওঠেনি। তা ছাড়া তাঁর বাচনিক প্রয়াসে কিঞ্চিৎ মিষ্টতার অভাব আছে। রূঢ় নন, কিন্তু তিনি একটু স্পষ্টবাদিনী। সারদা কলকাতায় থাকলে, ছেলেরা খুব একটা তাঁর কাছে ঘেঁষে না। তাদের জীবনযাপন সম্পর্কেও তেমন ওয়াকিবহাল নন গোলাপমা।
শরৎ সরকারের বাড়ির দোতালার ঘরে সান্ধ্যপুজোর আয়োজন করতে করতে বললেন, আলমবাজার—ওহ্ সেই মঠের কথা বলছ?
সারদা বললেন, হ্যাঁ। বরানগরের ভূতের বাড়ি থেকে ছেলেরা সব আলমবাজারে উঠে গিয়েছিল না—
তা হবে। নরেন সমুদ্রে যাওয়ার আগেই তো। দেখতে দেখতে তিন বছর হতে চলল সে দেশ ছেড়েছে।
গোলাপমা বললেন, খবর যা এই ছেলেদের মুখেই একটু আধটু শুনি।
গ্যাছো কোনওদিন মঠে?
রক্ষে করো মা। ওসব উড়নচণ্ডী ছোঁড়াদের অশৈলী কাণ্ডকারখানার মধ্যে গিয়ে ভিরমি খাই আর কী!
ও কী বলছ গোলাপ! মঠের ছেলেদের তুমি চেনো না? ত্যাগী সন্তান তারা, এক একটি হিরের টুকরো সব। তাদের সম্বন্ধে অমন বলে কখনও?
নিজেকে দ্রুত সামলে নিলেন গোলাপমা। ছেলেদের সম্পর্কে তাঁর খারাপ ধারণার কোনও প্রশ্ন নেই। তবে কথার ধরন-ধারণ তাঁর ওইরকমই। নিজেকে শুধরে নিয়ে বললেন, না মা, মনে কিছু কোরো না, মুখ ফসকে অমন বেরিয়ে গ্যাছে। গুণী ছেলে সব তারা, আমি কি জানি না?
সারদা বললেন, নিজেদের সর্বস্ব ছেড়ে ঠাকুরের কাজে জীবন উৎসর্গ করেছে তারা। ঠান্ডা মাথায় ব্যাপারটা একবার ভেবে দেখো।
বুঝি মা, বুঝি। সাধু-সন্ন্যাসী হলেও, কাছের থেকে ছেলেদের মতন দেখি বলেই—। সারদা বললেন, তো যাক। এখন তো আরও অনেকে যাতায়াত করে শুনেছি। এই কৃষ্ণলাল ছেলেটিও তো মঠ থেকে এসেছে?
হ্যাঁ মা। বড় ভক্ত ছেলে। আগে আগে লাটুও আসত, কিছুদিন দেখছি তার আর খবর নেই।
সারদা বললেন, লাটু তো বরাবরই অমন। বিশ্বাসে ছেলের খামতি নেই—তবে মাঝে মাঝে যেন ভূতে পায়। এইজন্যই তো নরেন আদর করে লাটুর সন্নেসি নাম দিয়েছে, অদ্ভূতানন্দ। কোন পাহাড়ে, না জঙ্গলে এখন ঘুরছে কে জানে!
গোলাপমা বললেন, তুমি ওই কৃষ্ণলাল আর যোগীনকেই জিজ্ঞেস করো না, মঠের সব খবর পেয়ে যাবে।
সারদা মাথা নেড়ে চুপ করে রইলেন। সুযোগমতো যোগীনের সঙ্গেই কথা বলতে হবে। আর কিছু না, নরেন ছেলেদের মাথা, অথচ কয়েক বছর ধরে সে কালাপানির পারে আছে। তার ধ্যানজ্ঞান সবই মঠ নিয়ে আর ঠাকুরের আরব্ধ কাজ নিয়ে সারদা জানেন। কিন্তু তার এতদিনের অনুপস্থিতিতে মানসিকভাবে ছেলেরা সব একজোট হয়েই আছে তো? দিশেহারা কিংবা অসহায় বোধ করছে না তো?
একটু পরে গোলাপমা জিজ্ঞেস করলেন, হ্যাঁ মা, সেই দু’বছর আগে জগদ্ধাত্রী পুজোর সময় জয়রামবাটি গিয়েছিলুম। তারপর তো তোমার মা আর ভাইদের সঙ্গে কাশী-বৃন্দাবন গেলাম। তোমার গাঁয়ে আর যাওয়া হয়নি। খবর সব ভাল তো?
সারদা একটা শ্বাস ফেলে বললেন, সংসারের কথা আর কী বলব বলল। ভালমন্দ লেগেই আছে। বড় ভায়ের বউ রামপ্রিয়াকে তো দেখেছিলে। দুটি মেয়ে তার— নলিনী আর সুশীলা, ডাক নাম মাকু। বড্ড ভোগে বউটা।
আহা গো! কচি কচি দুটো মেয়ে তাইলে— ।
তা হলে আর কী? সে দুটি তো আছেই, নিজের ভাইঝি। মানুষ করছি সব। ওদিকে অভয়ের বউ সুরবালাও আছে, মেয়েটা ভাল, কিন্তু মাঝে মাঝে বাই চাপে।
আর কালীর বউ সুবোধবালা, বরদার বউ ইন্দু—ওরা কেমন আছে?
ঠিকই আছে। সুবোধের একটি ছেলে, ভূদেব। বরদার বউয়ের একটি ছেলে। তার আবার নাম হয়েছে আমার শ্বশুরের নামে। কী বলি, আমি সেই গুড়গুড়েটাকে ফুদি বলে ডাকি। সারদা একটা শ্বাস ফেলার মতন শব্দ করে বললেন, আজ কত বছর হয়ে গেল, বাবা স্বর্গে গ্যাছে—এখন মনে হয়, বাবাই যেন ওপর থেকে সব দায়িত্ব চাপাচ্ছে আমার ওপর। কতটা পারব কে জানে।
পারবে মা, পারবে। কথায় আছে, যে খায় চিনি, জোগান চিন্তামণি।
সারদা বললেন, তা যা বলেছ। এখন ভক্তশিষ্যরা আসে। কত মানীগুণী লোকও আসেন। আর ছেলেরা তো আছেই, যেখানে জল পড়ে সেখানেই ছাতা ধরে। অভাব অনটনের মধ্যেও অত বড় সংসার চলে তো যাচ্ছে। কিন্তু কী জানো গোলাপ, আপনার লোকেরাই বড় বাধা।
তোমার আবার বাধা কী মা। ঠাকুরের সাধনসঙ্গিনী তুমি। হর-গৌরীকে কেউ কখনও বাঁধতে পেরেছে?
ও হল গিয়ে ভাবের কথা গোলাপ। কিন্তু সংসারের কথা ঠাকুর যা বলতেন, পদে পদে দেখছি তাই ঠিক। ঘর-গেরস্থালি, সংসার যেন আখমাড়াইয়ের কল। রস নিংড়ে, ছিবড়ে করে দেয় দিনে দিনে। চাহিদার আর শেষ নেই।
আসলে তুমি যে কাউকেই ঠেলে সরাতে পারো না মা।
কী জানি, সেইজন্যই হয়তো ভায়েদের রেষারেষি-লোভ-ঝগড়াঝাঁটি বেড়ে চলেছে দিনে দিনে। দুঃখ হয় কী জানো, যখন দেখি ভাইয়েরা আমার সব ব্রহ্মচারী ছেলেগুলোর সঙ্গেও ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে দর কষাকষি, বকাবকি করে।
তুমি এসব কথা শরৎ-যোগীন-সারদাবাবুরামদের বলো না কেন মা?
কী বলব বলো! প্রসন্ন-কালী-বরদা—সব তো মায়ের পেটের ভাই। কিছু বলতে গেলেই মনে হয়, ওপর দিকে মুখ করে থুতু ফেললে নিজের গায়ে এসেই পড়বে। জয়রামবাটি থেকে মাঝে মাঝেই পালিয়ে আসি কি আর সাধে?
সাংসারিক টানাপোড়েনের বিষয় যথাসম্ভব মন থেকে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করেন সারদা। বুঝতে পারেন মায়ার বাঁধন থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে রাখা তাঁর পক্ষে সম্ভব না। তা হলেও বারবার নিজেকে স্মরণ করান, শুধু নিজেদের পারিবারিক চিন্তা, ভালমন্দ নিয়ে আবদ্ধ থাকাটাই তাঁর জীবনের ব্রত কিংবা উদ্দেশ্য নয়। আরও বড় কাজ আছে তাঁর। একটি সুদূরপ্রসারী নির্মাণের কেন্দ্রে তাঁর ভূমিকা শান্ত দীপশিখার মতো জ্বালিয়ে রাখতে হবে।
স্বামী যোগানন্দের কাছে খোঁজ নেন, হ্যাঁ বাবা, নরেনের সঙ্গে তোমাদের ঠিক ঠিক যোগাযোগ আছে তো?
হ্যাঁ মা, খুবই আছে। যোগীন বলল, নরেন নিয়মিত আমাদের মঠের সবাইকে চিঠিপত্র লেখে।
সারদা বললেন, নীলাম্বরের বাড়িতে থাকাকালীন শুনেছিলাম, নরেন বিদেশ চলে যাওয়ার পরে বেশ কয়েকমাস তোমাদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না। আমিও সেবার পঞ্চতপা করে বাড়ি ফিরে গেছিলাম কয়েকমাস পরে। আর খবরাখবর নেওয়া হয়নি। তারপর তো দু’-দু’বার দলবল সব নিয়ে ঘোরাঘুরি করতে হল—।
যোগীন বলল, হ্যাঁ মা ঠিক বলেছেন। নরেন আমেরিকা চলে যাওয়ার পরে, বছর খানেক ধরে আমাদের এখানে, মঠে, কিছুটা বিভ্রান্তি শুরু হয়েছিল কারও কারও মনে।
কেন বলো তো? শুনেছিলুম, সে তো পৌঁছানোর দু’-এক মাসের মধ্যেই কোন বিরাট মিটিংয়ে লেকচার দিয়ে সাহেবদের মধ্যে একবারে হুলুস্থুল ফেলে দিয়েছিল।
ঠিক শুনেছিলেন মা। আমেরিকার শিকাগো শহরে ওই বছরের সেপ্টেম্বর মাসেই নরেনের বক্তৃতায় সাড়া পড়ে গিয়েছিল।
তোমরা কি তখন ওর চিঠিপত্র পাওনি?
কী করে পাব মা। সে তখন পাগলের মতো ছুটে বেড়াচ্ছিল এ শহরে ও শহরে। তার মধ্যে যেটুকু ফুরসত পেয়েছে, চিঠিপত্র লিখেছিল মাদ্রাজের পেরুমল, সিঙ্গার ভেলু মুদালিয়র, হরিদাস মিত্রকে। তাঁরাই অজিত সিংয়ের সাহায্যে ওকে আমেরিকা পাঠিয়েছিল এবং যোগাযোগ রাখছিল। এর মধ্যে কলকাতায় স্টেটসম্যান আর ইন্ডিয়ান মিরর কাগজে খবর ছাপা হয়েছে। সেই দেখে কিছু লোক ধন্য ধন্য করে উঠেছিল, আবার চিঠিপত্র না পেয়ে কেউ কেউ ভেবেছিল, নরেন বোধহয় কলকাতা, গুরুভাই, মঠ—এসব সম্বন্ধে উদাসীন হয়ে গেছে। কিন্তু সে তো অন্য ধাতুতে গড়া মা। আর বাঙালির স্বভাব তো জানেন, তলিয়ে ভাববার আগেই প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে ফেলে।
সারদা জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা সোজাসুজি ওর খবর পেলে কবে?
পরের বছরেই। এপ্রিলের উনিশ তারিখে—আমার এখনও মনে আছে মা, সে কী উল্লাস সেদিন আলমবাজারের মঠে। আর নরেনের চিঠি—সে তো শুধু লেখা নয়, যেন তাজা বোমা এক একখানা। কী ভালবাসা, কী আন্তরিক। প্রত্যেকের খুঁটিনাটি খবর জানতে চায়। একটার পর একটা চিঠি যখন আসতে লাগল, খবর ছড়িয়ে পড়ল কলকাতায়।
এখনও নিয়মিত লেখে তো?
লেখে মা।
থাকা-খাওয়া-দাওয়ার কষ্ট নেই তো?
যোগীন হেসে ফেলল। বলল, আশাকরি ঠিকই আছে। এই তো দেখুন না, মাঝেমধ্যেই তার চিঠিতে সব বিচিত্র ফরমাশ। বইপত্র তো আছেই, তা ছাড়া খাবার-দাবারের ফর্দ। অড়হর ডাল, মুগের ডাল, আমসত্ত্ব, বড়ি-মশলা-তেল, আবার কুশাসন, রুদ্রাক্ষের মালা।
চিঠিতে কি ওদেশের কথা, নাকি তোমাদের তৈরি হওয়ার কথা লেখে?
বেশি আমাদের কথাই লেখে মা। কী অসম্ভব গর্ববোধ নরেনের গুরুভাইদের নিয়ে। ঠাকুরের কথা উল্লেখ করে একবার লিখেছিল, তাঁর আজ্ঞায়, আমি তোমাদের সবাইকে সঙঘবদ্ধ করার জন্যই জন্মেছি।… যার মনে সাহস, হৃদয়ে ভালবাসা আছে, সে আমার সঙ্গে আসুক, বাকি কাউকে আমার চাই না। আর সব চিঠিতেই ‘তোলপাড় কর, তোলপাড় কর’ এই কথা। আপনার নাম ভাইকে (সারদা) একটা চিঠিতে লিখেছে, ভাইদের একটাকে চিনদেশে, একটাকে জাপানে পাঠিয়ে দে। এসব গৃহস্থদের কাজ নয়, ঘণ্টানাড়া নয়, সমাজে-জগতে বিদ্যুৎ প্রবাহিত করতে হবে… যদি রামকৃষ্ণ পরমহংস সত্য হন, তোমরাও সত্য। নাম-যশ-মুক্তির সময় নেই, এখন এ জন্মে অনন্ত বিস্তার, তাঁর চরিত্রের, জীবনের, আত্মার…।
যোগীনের মুখ থেকে এসব খবর শুনতে শুনতে একসময় স্থির হয়ে যান সারদা।
ওপর ওপর স্থির। কিন্তু অন্তরে অনুভব করেন একটি নিঃশব্দ তোলপাড় চলছে তাঁর নিজের মধ্যেও। তার গতিপ্রকৃতি চরিত্র সব অন্যরকম। ছেলেদের মতো দুর্দান্ত, দৌড়ঝাঁপ করা কর্মবীর তিনি হতে পারবেন না। কিন্তু একটি শান্ত স্নিগ্ধ ভালবাসার আকর্ষণে সবাইকে কাছে টেনে আনবেন তিনি, ধরে রাখবেন। নিরন্তর মমতায় প্রেরণায়, মাতৃস্নেহে সকলকে জোটবদ্ধ করে রাখবেন। কেউ পর নয়। সবাই আপন, গড়ার কাজে সবাইকে দরকার। একটি নিভৃত নিশ্চিন্ত বোধ আর বিশ্বাসের শক্তি জাগিয়ে দিতে হবে মানুষের মধ্যে। তাঁর সান্নিধ্যে মানুষ যেন শান্তি আর শক্তির আশ্রয় পায়।
কয়েকদিন পরেই ছেলে-সারদা একেবারে স্বামীজির সদ্যপ্রাপ্ত চিঠি নিয়ে হাজির হলেন শরৎ সরকারের বাড়িতে। ছেলে-সারদার নাম এখন স্বামী ত্রিগুণাতীতানন্দ। যোগীন অন্যান্য কাজে ব্যস্ত থাকলে সারদা, মায়ের দেখাশোনা করেন। তা ছাড়া ঠাকুরের যেসব ভক্তশিষ্যারা মাতৃদর্শনে আসেন, তাঁদেরও সামলাতে হয়। ব্রহ্মচারী কৃষ্ণলালও আছে, কিন্তু তার তুলনায় সারদা এবং যোগীনের বয়স-ব্যক্তিত্ব-পরিচিতি সবই বেশি। মা মানুষটিকে অতিথি এবং ভক্তদের আতিশয্যে খুব বেশি ব্যতিব্যস্ত যাতে না হতে হয়, স্বামী ত্রিগুণাতীতানন্দ সেদিকেই বেশি নজর রাখেন।
ওদিকে কৃষ্ণভাবিনীর সঙ্গে সারদার নিয়মিত দেখাসাক্ষাৎ না হলেও, মায়ের জীবনযাপন, স্বাচ্ছন্দ্যের খবর রাখেন তিনি। নিজের মা মাতঙ্গিনীদেবীকে মাঝেমধ্যে পাঠিয়ে দেন শরৎ সরকারের বাড়িতে। সারদা কলকাতায় এসে যেখানেই থাকুন না কেন, সেখানেই ইদানীং জনসমাগম হয় কৃষ্ণভাবিনী জানেন। দর্শনার্থীরা নানান উপাচার নিয়ে সারদার কাছে এলেও, তাঁরও যে কিঞ্চিৎ আতিথেয়তার আয়োজন রাখতে হয়, সেটা মনে রেখে কৃষ্ণভাবিনী প্রায়ই জিনিসপত্র এবং খাদ্যসম্ভার পাঠিয়ে দেন ওবাড়িতে।
আলমবাজার মঠে স্বামীজির চিঠি এসেছে সকালবেলা। গুরুভাইদের উদ্দেশে লেখা, কিন্তু মা জননীসহ প্রত্যেকের সানুপুঙ্খ খবর নিয়েছেন এবং নির্দেশও দিয়েছেন যেন সবাইকে তাঁর চিঠি পড়ে শোনানো হয়। সঙ্গে সঙ্গে ঠিক হয়ে গেল সারদা মহারাজ বিকেলে বাগবাজার যাবেন—মাকে স্বামীজির চিঠি পড়ে শোনাতে।
বলরাম বসুর বাড়ি হয়ে সারদা এলেন শরৎ সরকারের বাড়িতে।
কুমুদবন্ধু সেন নামের একটি ভক্ত ছেলে ইদানীং প্রায় রোজ একবার বিকেলে সারদাকে প্রণাম করতে যায়। মহারাজের সঙ্গে সেও এল। আর এল ঝাঁকা মাথায় নিয়ে একটি ভৃত্য। কৃষ্ণভাবিনী পাঠিয়েছেন। ছেলে-সারদার সঙ্গেও টুকটাক কথাবার্তা বলেন মা, যদিও ঘোমটা টানা থাকে।
দরজার গোড়া থেকে মহারাজ কৃষ্ণলালকে ডাক দিলেন।—কৃষ্ণ, মাকে একটা খবর দে। বল একটা সুখবর নিয়ে এসেছি।
শরৎ সরকার নিজেও আজ বাড়িতে ছিলেন। কৃষ্ণলালের সঙ্গে তিনিও বেরিয়ে এলেন এবং সারদা মহারাজকে প্রণাম করলেন উভয়ে। কৃষ্ণলাল বলল, মহারাজ, মার কাছে সিলেট থেকে এক ভদ্রমহিলা দেখা করতে এসেছেন। ওপরে আছেন।
একটু ভেবে নিয়ে সারদা বললেন, ঠিক আছে, তিনি থাকুন। তা হলেও গিয়ে বল, আমি দেখা করব।
সম্মতি জানিয়ে কৃষ্ণলাল চলে যেতেই, সারদা শরৎকে বললেন, দাদা, জিনিসপত্রগুলো ভেতরে পাঠিয়ে দিন। গোলাপমাকে বলে দিলেই হবে, বলরামমন্দির থেকে বউদি পাঠিয়েছেন।
ভৃত্যটিকে নিয়ে শরৎ সরকার ভিতরে গেলেন। মহারাজ কুমুদকে বললেন, তুমিও যাও, একটু নামিয়ে-টামিয়ে দাও।
কৃষ্ণলাল নেমে এল একটু পরেই। বলল, মহারাজ, মা আপনাদের সবাইকেই ওপরে আসতে বললেন।
চল, আসছি। বলে সবাইকে নিয়েই সারদা মার ঘরের সামনে পৌঁছালেন।
বাড়িটা সত্যি বড় চাপা। সিঁড়িটাও বড্ড সংকীর্ণ। পাশাপাশি দু’জন ভাল করে ওঠানামা করা যায় না। তার ওপর গরমের দিনে ভ্যাপসা, আলো বাতাস ঢোকে না ভাল করে। ওপরে যেতে যেতেই সারদা ভাবেন, যথাশীঘ্র সম্ভব মায়ের জন্য আর একটি বাড়ির খোঁজ করতে হবে।
দরজার সামনে থেকেই সারদা এবং বাকি সকলেও সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলেন মাকে। ঘরে গোলাপমা আর সিলেটের মহিলাও ছিলেন। সারদা ঘোমটা টেনে একটা কুশের আসনে বসেছিলেন কোণের দিকে। সেখান থেকে বললেন, এসো বাবা, বোসো।
সারদা মহারাজ বসতে বসতেই বললেন, মা, আজ একটা সুসংবাদ নিয়ে এসেছি আপনার জন্য।
সারদা খুব অনুচ্চ শান্তস্বরে বললেন, মঠে নরেনের চিঠি এসেছে বুঝি?
মহারাজ হাঁ একেবারে। মুখ তুলে বললেন, হ্যাঁ মা। কে বলল আপনাকে?
তোমার কথা থেকেই মনে হল বাবা। ক’দিন আগে যোগেনের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তোমার ‘সুসংবাদ’ বলে পাঠানট মাত্র মনে হল, নরেনের চিঠি এসেছি। সঙ্গে এনেছ কি?
অবাক ভাব কাটিয়ে মহারাজ বললেন, এনেছি মা। আপনাকে পড়ে শোনানোর জন্যই এনেছি।
সবাইয়ের সামনে পড়তে আপত্তি নেই তো?
না মা। মঠে নরেন চিঠি দেয় সবাইয়ের জন্য। এচিঠিতে লিখেই দিয়েছে যেন সবাইকে পড়ে শোনানো হয়, এমনকী আপনাকেও। কেননা, আপনার কীভাবে চলছে, না চলছে সব। খবর নিয়েছে সে।
পড়ো তা হলে।
সন-তারিখ-সম্বোধন সব উল্লেখ করে মহারাজ চিঠি পড়তে শুরু করলেন। উপস্থিত সকলেই শুনছেন। দীর্ঘ পত্র।
একেবারে অভিভূত হয়ে পড়লেন সারদা। চিঠির বিন্যাস-বক্তব্য-ভাষা এমনকী প্রতিটি শব্দে ঝরে পড়েছে তীব্র আন্তরিক আকুতি। অনুপ্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করার প্রয়াস প্রতিটি ছত্রে। একদিকে শৌর্যের স্ফুরণ, অপরদিকে ভালবাসা, নিঃস্বার্থ প্রেমের প্লাবন। কোথাও আবেগের বন্যা, কোথাও সেই আবেগেরই রাশ পরম নিয়ন্ত্রণে টেনে বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার আবদার। কখনও ভাষা প্রায় যেন তিরস্কারের কিনার ঘেঁষা—“আমার চিঠি না পড়ে কাজ করো কেন? যখন উত্তর দেবে, আগের চিঠিটা সামনে খুলে রাখবে—আমার সব প্রশ্নের উত্তর পাই না কেন? তোমাদের একটু বিজনেস-বুদ্ধি আবশ্যক।” দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন —”আমার ভাইয়েরা, সর্বদা মনে রেখো যে পরমহংসদেব জগতের কল্যাণের জন্য এসেছিলেন—নামের বা মানের জন্য নয়। তিনি যা শেখাতে এসেছিলেন, তাই ছড়াও।” মনে করিয়ে দিয়েছেন স্বাস্থ্যরক্ষার কথা— “বাড়ি-ঘরদোর-বিছানা, জলের ফিল্টার যেন দস্তুরমতো ঠিক সাফ থাকে।… কারও সঙ্গে বিবাদ বিতর্কের আবশ্যক নাই। মায়ের খরচপত্র কীভাবে চলছে? মনে রেখো, তিনিই আমাদের শক্তি।… গেরুয়া কাপড় ভোগের জন্য নয়, মহাকার্যের নিশান…।”
চিঠি শুনতে শুনতে সারদার মনে হল, ‘হৃদয়ের একুল ওকুল দু’কূল ভেসে যায়। কখনও উষ্ণতায় উদ্বেল, কখনও স্নিগ্ধ ধারায় সিক্ত। করুণাঘন নিবিড় প্রার্থনায় সহস্রবার নীরব। আশীর্বাদ করে গেলেন তেজস্বী সন্তানটিকে।
শেষ হওয়ার পরে অন্তরের আলোড়ন সকলেরই, কিন্তু ঘর স্তব্ধতায় ডুবে রইল বেশ কিছুক্ষণ।
সারদা অস্ফূট উচ্চারণে বললেন, নরেন ঠাকুরের যন্ত্র, তাই তাকে দিয়ে এসব লিখিয়েছেন, যাতে তাঁর ছেলেরা এবং ভক্তরা তাঁর কাজ করতে পারে, জগতের কল্যাণ করতে পারে। যা লিখেছে সব ঠিক, কালে নিশ্চয়ই সফল হবে।
দিন দুয়েক পরেই যোগীন এক সকালে শরৎ সরকারের বাড়িতে এসে বললেন, মা, একটি নিবেদন আছে।
বলো বাবা।
আমাদের সকলের ইচ্ছে এবছর দুর্গাপুজো আর কালীপুজোর সময়টা আপনি কলকাতায় থাকুন।
সামান্য ইতস্তত করে সারদা বললেন, কয়েক মাস থাকব ভেবেই এবার আসা—তারপর দেখা যাক ঠাকুরের কী ইচ্ছে।
সম্মতির আভাস পেয়ে খুশি হলেন যোগানন্দ। বললেন, কিন্তু মা আপনি এসেছেন মাসখানেক হয়ে গেল। উপায়ান্তর না দেখে আপনাকে এই বাড়িটায় রাখতে হয়েছে—বুঝতে পারছি, গরমে গুমোটে আপনার খুবই কষ্ট হচ্ছে।
ওসব নিয়ে চিন্তা কোরো না বাবা, কষ্ট করা আমার অভ্যেস আছে।
জানি মা। তা হলেও আর একটি বাড়ির সন্ধান পেয়েছি। কাছেই, সরকারবাড়ি লেনে, একেবারে গঙ্গার ওপর। তিনতলা বাড়ি, নীচেয় হলুদের গুদাম আছে বলে, কেউ কেউ ওটাকে গুদামবাড়ি বলে। দোতালা-তিনতলা বাসোপযোগী, হাওয়া-বাতাস খেলে, খোলামেলা, বড়। তিনতলায় থাকলে আপনি যতক্ষণ ইচ্ছে গঙ্গাদর্শন করতে পারবেন, আর আমরাও আপনার কাছাকাছি দোতালায় থাকব।
গঙ্গাদর্শনের নামেই সারদা উৎসাহিত বোধ করেন সবসময়। বললেন, যা ভাল বোঝে করো বাবা, আমার কোনও আপত্তি নেই।
হর্ষ কিংবা বিষাদ কোনওটাই মুখে ততখানি প্রকাশ করেন না সারদা। কিন্তু নামে গুদামবাড়ি হলেও, গঙ্গার ধারের এই বাড়িটির তিনতলায় থাকতে এসে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। তিনতলায় বেশ বড় দু’খানা ঘর। পুব-দক্ষিণ খোলা, আর সামনেই পশ্চিমদিকে আলসে ঘেরা বড় ছাদ। রোদ পড়ে গেলে ছাদে আসেন সারদা। ধারেকাছে আর খুব একটা উঁচু বাড়ি নেই। উত্তরে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের চুড়া দেখতে পান গাছপালার ফাঁকফোকর। দিয়ে। আর নিবিড় তন্ময়তায় ডুবে যান পশ্চিমে বাধাহীন প্রবাহিত গঙ্গা দেখতে দেখতে। ঝিরঝিরিয়ে হাওয়া আসে দক্ষিণ দিক থেকে। গিলে করা তিরতিরে স্রোত বয়ে যায় ভাটার জলে। রাতে ঘরে শুয়েও শুনতে পান জোয়ারের ছলছল, জলকল্লোলের শব্দ।
গোলাপমা সারদার সঙ্গেই উঠে এসেছেন এবাড়িতে। কয়েকদিন পরে বলরামের ছেলের বিয়ে, আতিথেয়তা, লৌকিকতা সেরে চলে এলেন যোগীনমা-ও। তিনজন একসঙ্গে বসবাস করলেও, আরও ভক্তশিষ্যরা দেখা করতে আসেন। আসেন গোপালের মা আর গৌরী মা। গোপালের মার আসল নাম অঘোরমণি দেবী, কিন্তু তাঁর মানসসন্তান স্বয়ং ঠাকুরই হলেন তাঁর গোপাল, সেই থেকে তিনি গোপালের মা। সারদাকে তিনি বউমা বলে সম্বোধন করেন। যখনই দেখা করতে আসেন, তাঁর বউমার প্রিয় খাবার সজনে ফুল আর কাঠাল বিচি (সংগ্রহ করে, শুকনো করে রাখা) সঙ্গে নিয়ে আসেন। গৌরীমার সঙ্গেও সারদার সম্পর্ক সেই নহবত থেকে। সঙ্গিনী হিসেবে ঠাকুরই তাঁকে হাজির করেছিলেন সারদার কাছে। চমৎকার গানের গলা তাঁর। সারদার মনে আছে, তাঁর সামনেই ঠাকুর একদিন গৌরীমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুই কাকে বেশি ভালবাসিস রে, ওকে না আমায়?
সারদা তো হাসিমুখ লজ্জায় ঢেকে রেখেছেন। কিন্তু গৌরী রীতিমতো সপ্রতিভ। বললেন, ওকথার তো সোজাসুজি জবাব হয় না বাবা!
ঠাকুর বললেন, যেভাবে হয়, সেভাবেই বল তা হলে।।
গৌরী বললেন, গান গেয়ে বলতে হবে।
ঠাকুর উচ্ছ্বসিত। বললেন, বা-বা-বা। তাই বল। কিন্তু উত্তরটা যেন পাই।
গৌরীমা গান ধরলেন।
“রাই হতে তুমি বড় নও হে বাঁকা বংশীধারী।
লোকের বিপদ হলে ডাকে মধুসূদন বলে,
তোমার বিপদ হলে পরে বাঁশিতে বলল, রাই কিশোরী।”
হাসি আর লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠেছিলেন সারদা। আর হাসিতে খুশিতে একাকার ঠাকুর বলেছিলেন, প্রাণটা ভরিয়ে দিয়েছিস মা। বুঝলাম। সেই থেকে মাঝেমধ্যেই কাছাকাছি থেকেছেন গৌরীমা। কখনও মেয়ে, কখনও সঙ্গিনী, কখনও সখী কিংবা শিষ্যা হিসেবেও মনপ্রাণ ঢেলে সেবা করে আসছেন সারদার। বছর দুয়েক আগে মায়ের নামেই ব্যারাকপুর গঙ্গাতীরে শ্রীসারদেশ্বরী আশ্রম তৈরি করেছেন গৌরীমা। মেয়েরা যাতে একইসঙ্গে আদর্শ গৃহিণী, জননী এবং সাধিকা-আচাৰ্যা হয়ে উঠতে পারে সেই উদ্দেশ্যে।
গুদামবাড়ি থেকে একদিন সবাই মিলে জলপথে গৌরীমার সেই আশ্রম দেখে এলেন।
বাড়ির দোতালায় মায়ের নিত্যসেবার জন্য আছেন স্বামী যোগানন্দ-ত্রিগুণাতীতানন্দ। তা ছাড়া আছে কৃষ্ণলাল-তুলসী-হরিপদ-কানাই প্রভৃতি কয়েকটি ব্রহ্মচারী ছেলে। মাঝেসাঝে রাখাল, স্বামী ব্রহ্মানন্দ এসে থাকেন যোগীন-সারদা মহারাজের সঙ্গে। গিরিশও সময় সুযোগ পেলে আসেন। ঊনবিংশ শতকের এই শেষপ্রান্তে তিনি আবার যাবতীয় শোক-অবসাদ কাটিয়ে, মায়ের আশীর্বাদে পূর্ণ সৃষ্টিক্ষম হয়ে উঠেছেন।
দুর্গাপুজোর কিছুদিন আগেই এক বিকেলে কৃষ্ণলাল তিনতলায় গিয়ে সারদাকে বলল, মা, নাগমশাই একবার আপনার পায়ের ধুলো নিতে এসেছেন। দোতালায় বসে আছেন। খুবই কাতর মনে হল।
নাম শুনেই নিবেদিত প্রাণ ভক্তটিকে মনে পড়ল সারদার। অমন ভক্তি সচরাচর দেখা যায় না। সারদাকে তিনি সাক্ষাৎ ভগবতী বলেই বিশ্বাস করেন। তিনবছর আগে নীলাম্বর মুখার্জির বাড়িতে নাগমশাই প্রথম সারদাসমীপে উপস্থিত হয়েছিলেন। ভক্তির আতিশয্যে সারদার সঙ্গে দেখা হওয়ার আগেই বাড়ির দোরগোড়ায় মাথা ঠুকতে শুরু করেছিলেন ভদ্রলোক। যোগানন্দ ঠেকাতে গিয়ে বিফল। দাসীকে বললেন, মাকে একটা খবর দাও, বলল নাগমশায় প্রণাম করবেন।
দাসীটি দ্রুত ছুটল সারদার কাছে। বলল, মা, নাগমশায় কে? তিনি দোরগোড়াতেই আপনাকে প্রণাম করছেন। কিন্তু এত জোরে মাথা ঠুকছেন, মনে হচ্ছে ফেটে রক্ত বেরুবে। মহারাজ ঠেকাবার চেষ্টা করছেন—কিন্তু উনি যেন বেহুঁশ। পাগল নাকি মা?
অল্প চেনা পুরুষ ভক্তদের সঙ্গে তখনও সারদা কদাচিৎ দেখা করতেন। কিন্তু সব শুনে বললেন, যোগীনকে বল ওকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিতে।
নাগমশায় এলেন। কপাল ফুলে গেছে, চোখে অবিরল ধারা, মুখে মা-মা উচ্চারণ।
কী এক গভীর স্নেহের আবেগেই বিচলিত বোধ করেছিলেন সারদা। অভ্যস্ত সংকোচ ভুলে প্রায় পরিচর্যাই করেছিলেন ভক্তটির। সেই প্রথম দেখা। তারপর আরও কয়েকবারই নাগমশাই গেছেন সারদার কাছে। একবার তো বাগবাজার থেকে একঝুড়ি ভাল জাতের আম মাথায় করে বেলুড়ে গিয়ে হাজির। তো মায়ের চরণ দর্শন না হওয়া পর্যন্ত সে ঝুড়ি নামাবেন না মাথা থেকে, কারওর হাতেও দেবেন না। সারা গিয়ে দেখেন, সেই এক অবস্থা। চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে, মুখে মা-মা।
সারদা কৃষ্ণলালকে বললেন, বুঝেছি বাবা। তুমি ওঁকে একবার ওপরেই পাঠিয়ে দাও।
নাগমশাই ওপরে এলেন। যথারীতি কোনও চাহিদা নেই, জিজ্ঞাস্যও কিছু নেই। শুধু পরম ভক্তিতে মাতৃদর্শন। চেহারায় একটা ক্লান্তি আর বার্ধক্যের ছাপ পড়েছে সারদা খেয়াল করেন। না, কোনও অভিযোগ নেই মানুষটির। দু’-একটা ছোটখাটো প্রশ্ন করেন সারদা। কিন্তু অবিরাম অশ্রুপাত আর মা-মা শব্দ ছাড়া কোনও কথা বলেন না। সারদা বোঝেন না, কোনও গভীর বেদনা আছে কি মানুষটার, নাকি তাঁর দর্শনে মানুষটির যাবতীয় আনন্দোচ্ছ্বাসই অশ্রুতে রূপান্তরিত হয়। প্রীতিস্নিগ্ধ আবেগে আলোড়িত হন নিজেও।
শালপাতায় মুড়ে প্রসাদ দিলেন সারদা।
মহাপ্রসাদজ্ঞানে নাগমশাই তা গ্রহণ করলেন, এমনকী ভক্তির ভরে পাতাটিও চিবিয়ে খেয়ে ফেললেন।
কিছুদিন পরে মানুষটি দেহ রাখলেন। আর এলেন না। বিষম ব্যথা বাজল সারদার বুকে। একটা ছবি রেখে দিয়েছিলেন নাগমশায়ের। মন্তব্য করেছিলেন, কত ভক্ত আসে, কিন্তু এমনটি আর দেখলাম না।
হেমন্তের গোড়ায় জয়রামবাটি ফিরে গেলেন সারদা।
মাঝে মাঝে এই টানাপোড়েনটি ইদানীং ক্লান্তিকর মনে হয় তাঁর। শুধু যাতায়াতের ধকল—রেল-গোযান-হাঁটাপথের জন্য শারীরিক ক্লান্তিই নয়, পরিবেশ-পারিপার্শ্বিক-মানুষজন, সামাজিক আর অর্থনৈতিক পরিবর্তনের জন্যও এক ধরনের মানসিক ক্লান্তি অনুভূত হয়। সম্পূর্ণ অন্যরকম আয়োজন আর পরিস্থিতিতে বারবার নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার জন্য প্রথম কয়েকটা দিন অতিবাহিত করতে হয়। এড়ানোর কোনও উপায় নেই। জয়রামবাটির বেড়ে ওঠা পরিবারটি ক্রমশ অনেকটাই যে তাঁর ওপর নির্ভরশীল, সারদা টের পান। কয়েকমাস পরে কলকাতা থেকে ফিরে এসেই বুঝতে পারেন, নানান জাতীয় চাহিদা, বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ ইত্যাদি তাঁর হস্তক্ষেপের প্রতীক্ষায় বসে আছে। এর পূর্ণ দায় শুধু যে পরিবারের অন্য মানুষদের তাও না। আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে-অবলম্বনে তিনি নিজেও সবাইকে কিছুটা নির্ভরশীল করে তুলেছেন।
নির্ভরশীলতা গড়ে উঠেছে কলকাতা তথা বাগবাজারের প্রিয়জনদেরও। কিন্তু জয়রামবাটি থেকে সে নির্ভরতার প্রকৃতি অন্যরকম। সেখানে মাতৃজ্ঞানে নিজেদের মধ্যে সারদাকে পেয়ে সন্ন্যাসী-গৃহী যাবতীয় ভক্তশিষ্যরা ধন্য হতে চান। কৃতজ্ঞ বোধ করেন তাঁর উপস্থিতিতে। সারদা নিজেও কিঞ্চিৎ সচেতন থাকেন—ভবিষ্যতের একটি স্বপ্ন বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনায় তাঁর ভূমিকার জন্য। কিন্তু জয়রামবাটির পারিবারিক আবহে তাঁর ভুমিকা অনেকখানি ‘গৌরী সেন’-এর মতো—যাবতীয় বাস্তব প্রয়োজনে, অভাবে ঠেকা দেওয়া। নিজের বলে কিছু না-ই থাক, কিন্তু ভায়েরা আর তাদের সংসারের মুখ সদাসর্বদা যেন হাঁ করে বসেই আছে। বছরে বছরে সেই হাঁ-মুখ বিস্তৃত হয়েই চলেছে।
কোথা দিয়ে সময় যায় সারদা টের পান না। নিজেকে বসিয়ে রাখার মানুষও নন তিনি। ভ্রাতৃবধূগুলির সঙ্গে ঘর গেরস্থালির কাজে নিজে হাত লাগান। গোরুর জাবনা দেওয়া, উঠোন ঝাট, ঘরদোর নিকোনো, কাপড়কাচা-মুড়ি ভাজা-রান্না করা—এসব তো আছেই নিত্যকর্ম, এর ওপরেও তার আছে প্রায়শই অতিথি সৎকার। দূরদূরান্তর থেকে ইদানীং মা-বলে হাজির হওয়া মানুষজনের সংখ্যা বেড়েই যাচ্ছে। কাউকে ফেরাতে পারেন না সারদা। এটা শুধু তাঁর খ্যাতির প্রশ্ন অথবা বিড়ম্বনা নয়। তিনি বুঝতে পারেন, নারী-পয়স নির্বিশেষে মানুষ তাঁর কাছে একটু জুড়োতে আসেন। নিজের অলৌকিক চেতনা কিংবা আধ্যাত্মিক বোধ নিয়ে সারদা অত সচেতন না, সোচ্চার হওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু অতি গভীর আর প্রগাঢ় একটি মমতা, ভালবাসার অনুভব যে তাঁকে নিরন্তর সজীব রাখে সেটা খুব টের পান। দেহ ধারণ করে থাকলে ক্লান্তি তো আসবেই, আসেও। কিন্তু আপামর মানুষ যে কেউ মা-বলে একবার এসে ডাকলে, তাঁর ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। আর কিছ বাছবিচারের প্রয়োজন হয় না। যে ডাকে, সেই আপন। পর কেউ না। অবারিত দ্বারের প্রান্তে, মনুষ্যরূপী একটি নিভৃত দেবালয় যেন সারদা। তিনি মা। আর কিছু না। এটি তাঁর প্রথম পরিচয়।
গ্রাম্য জীবনের কয়েকটি মাস অতিবাহিত হয়েছে। নামে তিনি ভায়েদের দিদি, ভাইপো-ভাইঝিদের পিসিমা আর শ্যামাসুন্দরীর বিধবা মেয়ে, প্রকৃতপক্ষে তিনিই যৌথ পরিবারটির মাথা, অভিভাবিকা। প্রসন্নকুমার এখনও কলকাতায় থাকেন প্রায়শই, কিছু রুজি রোজগার আছে তাঁর। ইদানীং বরদাও মাঝে মাঝে গিয়ে বড়দাদার কাছে থাকে। কালীকুমার বিশেষ ঠাঁইনাড়া হতে চায় না। পৈতৃক বাড়ি, জমিজমার ওপর সে নজর রাখে। তা ছাড়া সারদার মতো দিদি বাড়িতে বসবাস করলে এবং তাঁর ভক্তশিষ্যদের যাতায়াতের ফলে, সংসারটি যে সবদিক থেকে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের মুখ দেখে, নানান দ্রব্য, বস্তুর আমদানি হয়, কালীকুমার জানে। তার নিজের সেবাটিও দিব্যি জমে ওঠে। ছোটভাই অভয়ও অধিকাংশ সময় কলকাতায় থাকে। সারদা তাকে শ্ৰীম অর্থাৎ মাস্টারমশায়ের বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করে অভয় এখন ‘ক্যাম্বেল’ মেডিকেল স্কুলে ডাক্তারি অধ্যয়নরত।
শীতের সুখী দিনগুলো শেষ হয়ে বসন্তকাল আসার তোড়জোড় শুরু হয়েছে প্রকৃতিতে। ভোরের শিশির দ্রুত শুকিয়ে যায়। কিশলয়ের আভাস উদগম গাছে গাছে। দিকভ্রান্ত বাতাস উত্তর-দক্ষিণের টানাপোড়েনে অকস্মাৎ কখনও ঝোড়ো হয়ে ওঠে। ঋতু পরিবর্তনের সময়গুলোতেই অসুখ-বিসুখের ভয়। সারদা সিঁটিয়ে থাকেন। কচি কচি ছেলেমেয়ে নিয়ে তাঁর(!) সংসার। মায়ের বয়স হয়েছে। ছোটকাকা নীলমাধব, অকৃতদার, তিনিও এই সংসারেরই পাকাপাকি সদস্য এখন এবং বৃদ্ধ। একবার গ্রামে ‘মায়ের দয়া’ (বসন্ত রোগ) শুরু হলে আর রক্ষে নেই। প্রতিষেধক হিসেবে সারদা প্রতিদিন কচি নিমপাতা ভাজা শুকনো ভাতে খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। বাচ্চাগুলো তেতো নিমপাতা কিছুতে মুখে তুলবে না। তিনি হলুদের সঙ্গে বেটে সরষের তেল মিশিয়ে ভাইপো-ভাইঝিদের গায়ে মাখিয়ে দেন। কিছুদিন পরে মা শীতলার পুজোর ভাবনা মাথায় রেখেছেন।
প্রসন্ন একদিন কলকাতা থেকে ফিরে হইহই করে স্বামী বিবেকানন্দর দেশে প্রত্যাবর্তনের সংবাদ দিল সারদাকে।
দিদি, তোমার সেই বীর সন্তান— বিশ্বজয় করে আমেরিকা থেকে কলকাতায় ফিরেছেন। স্বামী বিবেকানন্দ গো!
বিকেলের রোদ পড়ে আসছে। সারদা, রাতে ভিজিয়ে ফেলা বাচ্চাদের বিছানা-তোশক-কাঁথা রোদে শুকনো হওয়ার পরে ঘরে তুলছিলেন। খবরটা কানে যেতেই পরম নিশ্চিন্তি আর গভীর তৃপ্তিতে বুক ভরে একটা শ্বাস নিলেন। বিছানাগুলো মাটির দাওয়ায় রেখেই এগিয়ে গেলেন প্রসন্নর কাছে। নিজের কপালে, বুকে হাত ছুঁইয়ে জিজ্ঞেস করলেন, নরেন কলকাতা ফিরেছে! কবে?
প্রসন্ন রীতিমতো উত্তেজিত বোঝা গেল। হাতের ঝোলা ব্যাগ সিঁড়ির ওপর রেখে বলল, এই তো, বিশে ফেব্রুয়ারি, গেল বুধবার।।
আবেগ-আনন্দ সংযত করে সারদা বললেন, কেমন দেখলি তাকে?
ওরে বাপরে, উজ্জ্বল গৈরিক বেশধারী সন্ন্যাসী— সিংহগ্রীব, বৃষস্কন্ধ, অন্তর্ভেদী দৃষ্টি, দৃঢ় সংকল্পিত ওষ্ঠাধারে হাসির আভাস, শরীরের ভাষায় যেন ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তার দীপ্তি, ভাস্বর, মুখমণ্ডল আর উন্নত শির ঘিরে লাল-কমলা রঙের উষ্ণীষ যেন তার জ্যোতির্বলয়— সহস্র দেশবাসীর কণ্ঠে তাঁর জয়ধ্বনি—।
সারদার মনে হল উচ্ছাসে, আবেগের আতিশয্যে প্রসন্ন যেন মন্ত্রপাঠ শুরু করে দিয়েছে।
ঠাকুর তাকে রক্ষা করুন—বলতে বলতে ঘরের কাজে ফিরতে উদ্যত হলেন সারদা।
উত্তেজনার তোড়ে প্রসন্ন বলল, ও দিদি, যাচ্ছ কোথায়, তাঁর পদার্পণের বিবরণ শুনে যাও আগে—সে যে কী দৃশ্য চাক্ষুষ করে এলাম।।
সারদা ঘুরে দাড়ালেন। ঘরের কাজ পড়ে রয়েছে যে!
থাকুক পড়ে। আগে শুনে যাও সেদিনের কথা—গর্বে আমাদের বুক ফেটে যাচ্ছে যে!
সারদা দাঁড়ালেন। বুকের মধ্যে একটি অবিশ্রান্ত দুব দুব তাঁরও, কিন্তু তার প্রকৃতি, কারণ, প্রসন্নর আতিশয্য থেকে অন্যরকম। নরেনের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের বার্তা, তাঁর মানসপটে যে সুদূর কর্মকাণ্ডের ভাসা ভাসা ধারাবাহিক ছবি এঁকে যাচ্ছে, প্রসন্নর তা দেখতে পাওয়ার কথা না। অধিকাংশ দেশবাসীর মতো এরাও, বাইরের রূপ-আড়ম্বর-হইচই মিলিয়ে হুজুগটাকেই প্রাধান্য দেয়। ক’দিন পরে ভুলেও যায়। কর্মযোগী মানুষের আহ্বানে সাড়া দিয়ে দেশের কাজে লিপ্ত হওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। তার উদ্যোগ সম্বন্ধেও নির্লিপ্ত হয়ে যায়।
তবু সারদাকে একটু শুনতে হল প্রসন্নর উত্তেজিত সেদিনের বর্ণনা আর বিবরণ।
—আমরা তো খবরের কাগজ পড়েই জেনে গেছি, মাদ্রাজ থেকে তিনি সব সঙ্গীসাথীদের নিয়ে মোম্বাসা জাহাজে রওনা হয়েছেন কলকাতা অভিমুখে। উনিশে কিংবা বিশে ফেব্রুয়ারি বজবজ হয়ে কলকাতায় পা রাখবেন—ট্রেনে শিয়ালদা পৌঁছবেন—তো কাতারে কাতারে লোক জড়ো হয়েছে তাঁকে দেখার জন্য। গাড়িঘোড়া সব বন্ধ হয়ে গেছে প্রায়—আমরাও হেঁটে পৌঁছেছি বাগবাজার থেকে…কিছু দেখতে পাই না, শুধু কালো কালো মানুষের মাথা সামনে… রঙিন সালুর তোরণ বাঁধা হয়েছে একের পর এক। ইস্টিশনের মুখের কাছে দেখতে পেলাম চারঘোড়ার বিরাট সাজানো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে স্বামীজির অভ্যর্থনার জন্য, পতাকা উড়ছে, আর গেরুয়াধারী সাধুরা জয়ধ্বনি দিচ্ছেন সামনে দাঁড়িয়ে… হঠাৎ আকাশ বাতাস তোলপাড় করে রব উঠল, এসে গ্যাছেন, এসে গ্যাছেন—ওই যে, ওই যে! অতদূর থেকে কী আর দেখব… শুধু এক ঝলকের জন্য একটা দোকানের বারান্দা থেকে দেখলাম… যেন অগ্নিবর্ণ তেজোদৃপ্ত, হলুদ আলখাল্লা পরা এক মহাপুরুষ, মাথায় গেরুয়া পাগড়ি— বিরাট হট্টগোল আর টানাপোড়েনের মধ্যে তিনি গাড়িতে উঠলেন এবং সাধুরা ঘোড়া খুলে দিয়ে নিজেরাই টানতে লাগলেন তাঁর গাড়ি… শুনলাম, কাছেই রিপন কলেজে (সুরেন্দ্রনাথ) লেকচার দেবেন দেশবাসীর উদ্দেশ্যে—তারপর বাগবাজারে পশুপক্টিাবর বাড়ি আসবেন মধ্যাহ্নভোজন করতে… আমরা সব ওখান থেকেই শুনলাম তিনি আজই আলমবাজার মঠে যাবেন গুরুভাইদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। আমরাও তড়িঘড়ি ট্রাম ধরে ছুটলাম বাগবাজার, তারপর হেঁটে আলমবাজার। ওখানে ভিড় কিছু কম। সাধুরা গেটের মুখে কলাগাছ পুঁতে, মাটির কলসিতে আমের পল্লব দিয়ে সাজিয়ে সব অপেক্ষা করছেন… দেখতে দেখতে লোকে লোকারণ্য… শুনে এলাম এই আটাশ তারিখে শোভাবাজারের রাজবাড়িতে তাঁর নাগরিক সংবর্ধনা…
সারদা আস্তে আস্তে সরে গেলেন।।
প্রসন্নর কথা থেকেই টের পেয়ে গেলেন, কলকাতার তোক এখন নরেনকে নিয়ে হুজুগে মাতবে বা মেতেছে। তার কর্ম-ভাবনা-উদ্যোগ নিয়ে মাথাব্যথা নেই। সুদূর প্রান্তিক গ্রাম থেকে সারদা নির্জনে বীর ত্যাগী সন্তানটির সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ কামনা করলেন, প্রাণভরা আশীর্বাদ করলেন।
দু’দিন পরে বাবুরাম আর কালীকৃষ্ণ এল জয়রামবাটিতে। বাবুরামের নাম হয়েছে প্রেমানন্দ। কালীকৃষ্ণ এখনও ব্রহ্মচারী, তা হলেও ওর সন্ন্যাসী নাম ঠিক হয়েছে স্বামী বিরজান, কিন্তু তা নিশ্চিত হবে দীক্ষান্তে। ওর ইচ্ছে স্বামী বিবেকানন্দর কাছেই দীক্ষা নেবে। বৃন্দাবনে দু’জন তপস্যা করছিলেন। স্বামীজির ফিরে আসার খবরে এবং তাঁর আহ্বানে সব গুরুভাইরা জড়ো হচ্ছেন মঠে। ওরাও যাওয়ার পথে মায়ের আশীর্বাদ নিতে এসেছে।
সারদা লক্ষ করেন, তাঁর নিরাড়ম্বর গ্রাম্য-গৃহস্থ জীবনযাপনের মধ্যে যখনই বিশেষ কোনও অতিথি অথবা সম্ভ্রান্ত সাধু সন্ন্যাসীদের আগমন ঘটে, তখনই এমনকী বাড়ির লোকের কাছেও যেন তাঁর কিঞ্চিৎ কদর এবং খাতির বাড়ে। খুব একটা হ্যাক্-ছি এমনিতেও কেউ করে না বটে, কিন্তু যেটুকু যোগ্য সমাদর, ভক্তিশ্রদ্ধা তাঁর পাওয়ার কথা, তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। সারদা লালায়িত নন আদৌ। অস্বস্তিতে পড়ে যান বাইরের মানুষদের কাছে অকস্মাৎ যখন ঘরের লোকরা তাঁর সঙ্গে কৃত্রিম পূজনীয় আচরণ করতে থাকে। সয়ে যান সারদা। ঠিক আছে। মানুষ অমন করে থাকে। যে ঐশ্বর্যে তিনি স্বতঃস্ফূর্ত, আন্তরিকভাবে সমৃদ্ধ, তার স্বরূপ সকলে জানবে না। ঘরের লোক তো নয়ই।
কালীকৃষ্ণ, প্রেমানন্দ রাত্রিটুকু কাটিয়েই কলকাতা ফিরে গেলেন।
যাওয়ার আগে প্রেমানন্দ বললেন, মা, সাড়ে তিনবছর পরে নরেন কলকাতায় ফিরেছে। এতদিন তার অনুপস্থিতিতে এবং বহির্বিশ্বে বিভিন্ন ধরনের কাজে-যোগাযোগে-পরিকল্পনায় মাঝে মাঝে নানান বিভ্রান্তি এবং বিচ্ছিন্নতার সৃষ্টি হয়েছে। আমরাও কখনও দিশাহারা বোধ করেছি। কিন্তু এই বিশ্বাসের কোনও ব্যত্যয় ঘটেনি যে, মানবকল্যাণে সে নিবেদিত প্রাণ।।
সারদা বললেন, আমি জানি বাবা। যোগীন-শরৎ-মাস্টার-কালী এদের কাছ থেকে নানা কথা শুনেছি। শরৎ সাগরপারে যাওয়ার আগে, নরেনের লেকচারও আমায় বাংলা করে করে বলেছে। কেউ কেউ কখনও ভেবেছে, নরেন বুঝি ঠাকুরের মত-পথ-বিশ্বাস থেকে ক্রমশ সরে গেছে। আমি ওসব বিশ্বাস করি না। তার ভাবনাকে সে মেনেছে নিজের মতন। করে।
বাবুরাম বললেন, আপনি তো তার চিঠিও শুনেছেন। দেশের জন্য, জাতির জন্য, বিরাট কিছু একটা গড়ে তোলার জন্য সে যে কতখানি আন্তরিক, কী পরিমাণ পরিশ্রম করছে, অর্থ সংগ্রহের জন্য প্রাণপাত করছে… আপনি তো সবই জানেন।
সারদা যেন স্বগতোক্তির মতো বললেন, আমার ওসব না-শুনলে, না-জানলেও কোনও ক্ষতি ছিল না বাবা। ঠাকুর তাকে টেনে এনেছেন এ জগতে তাঁর কাজ করাবেন বলে। মুখে সে যাই বলুক, কখনও তার আচরণে যাই প্রকাশ পাক, সে যন্ত্র আর ঠাকুর যন্ত্রী— তাদের এসম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। আমার পূর্ণ আস্থা এবং আশীর্বাদ আছে তার জন্য। ছ’বছর তার সঙ্গে আমার চোখের দেখা নেই, তাইতে কিছু যায় আসে না। যেমন ঠাকুর আমার চোখের সামনে থেকে কোনওদিন হারাননি, নরেনও তার আপন দীপ্তিতে আমার সম্মুখে চিরভাস্বর।।
সারদাকে প্রণাম করে, প্রচণ্ড মনোবল আর উদ্যম নিয়ে বাবুরাম কলকাতা ফিরলেন।
পাড়াগাঁ-এর শান্ত নির্জন তাপ-উত্তাপহীন পরিবেশ, সুখে দুঃখে সারদার আটপৌরে ঘর গেরস্থালির জীবন কাটে। জীবনযাপন ব্যাপারটাই কখনও একটানা নির্বিঘ্ন হয় না। টানাপোড়েন থাকেই। সেইজন্যই জীবনকে নদীর সঙ্গে তুলনা করা হয়। সারদা খেয়াল করেন, হুট বলতেই কখনও কখনও অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি রচিত হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা যে খুব সুখকর হয় না তা বলা বাহুল্য। আবার বিরল সুখের অভিজ্ঞতাও যে কখনও স্নিগ্ধতার পরশ বুলিয়ে দিয়ে যায় না, তা নয়। পারিবারিক কোঁদল, আকচা-আকচি লেগেই থাকে। ছোটখাটো বিষয় নিয়ে, সারদা দেখেন, ভাইয়ে-ভাইয়ে তুলকালাম লেগে যায়। মধ্যস্থতা করতে হয় তাঁকেই। ইদানীং আশপাশের গাঁ-গঞ্জ থেকেও মাঝেমাঝে তাঁকে সালিশি মেনে তোক হাজির হয়ে যায়। তবে একটা ব্যাপার খেয়াল করেন সারদা, দূর দূর থেকে যেসব মানুষরাই খোঁজখবর নিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসেন, কোনও-না-কোনও কারণে সেই মানুষগুলো দুঃখী। দুঃখের তো হাজার ব্যঞ্জনা। কেউ আপাতদৃষ্টিতে সবকিছু পেয়েও দুঃখী, আবার কেউ সারাজীবন মাথাকুটে কিছু না পেয়ে দুঃখী।
মানুষগুলোকে আশ্রয় দেন সারদা। জাতিধর্ম, নারীপুরুষ নির্বিশেষে একটি নিরাড়ম্বর প্রক্রিয়ায় দীক্ষা দেন তিনি। কেউ শূন্য হাতে ফিরে যায় না তাঁর কাছে এসে। খুব নিবিড়ভাবে দুঃখিত আর দীক্ষিত মানুষগুলোর মনের গভীরে ডুব দেওয়ার চেষ্টা করেন সারদা। তারপর কিছু একটা অলৌকিক উপায়েই যেন কিছু কথা, শব্দ উঠে আসে তাঁর মুখে। শব্দেরই তো আর এক নাম মন্ত্র, যা মনকে তারণ করে। বীজমন্ত্র হিসেবে সেই শব্দগুলো কানে দিয়ে দেন তাঁর দর্শনপ্রার্থী বা প্রার্থিীদের। বেশ বুঝতে পারেন, অন্য মানুষের জ্বালাযন্ত্রণা, দুঃখকষ্ট সত্যি সত্যি যেন সঞ্চারিত আর প্রবাহিত হয় তাঁর শিরায়, স্নায়ুতে। আর সেই উপলব্ধির। সঙ্গে এক অপার্থিব বোধে নিজে স্বাক্ষরিত হয়ে যান। মানুষ সে যেখানকার, যে বয়সের, যে লিঙ্গের, যে জাতি-ধর্ম-বর্ণ বা সম্প্রদায়ের হোক না কেন, কাউকে তাঁর সৃষ্টিছাড়া বলে মনে হয় না। করুণায় বঞ্চিত হয় না কেউ। অথচ কারওর কাছে তাঁর কোনও প্রত্যাশা নেই। নিজেকে তিনি ভগবতী মনে করেন না, ধ্রুব কী তা তিনি জানেন না। শুধু জানেন, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের এই বিশালতায় কোনও একটি শক্তি ক্রিয়াশীল আছে, সেই শক্তিই ঈশ্বর তিনিই ক্ষমাস্বরূপ। মুক্তি আর ভক্তির জন্য জীবকে গড় হতে হয় তাঁর কাছে। তিনিও তাই হন।
কলকাতার ভক্ত শিষ্য, সন্তানদের কাজকর্ম, জীবনযাপন, তাদের সব ভাবনা পরিকল্পনার নিয়মিত খবর সারদা জয়রামবাটিতে বসে পান না ঠিকই। কিন্তু আলমবাজারের মঠজীবনকে কেন্দ্র করে তাদের আবর্তিত হওয়ার এবং মতানৈক্য সত্ত্বেও একজোট থাকার সিদ্ধান্ত তাঁর কানে এসে পৌঁছয়। যোগীন, সারদা তো আছেই, তা ছাড়াও তারক-রাজাবাবুরাম-রাখাল পালা করে করে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। ব্রহ্মচারী কেদার-বরদা-তুলসী-সূর্য এরাও অপেক্ষাকৃত বড় গুরুভ্রাতা এবং সন্ন্যাসীদের প্রতিনিধি হিসেবে মায়ের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জয়রামবাটি এসে থাকে মাঝে মাঝে।
স্বামী বিবেকানন্দ হয়ে নরেন যে এখন ঠাকুরের নামে সঙঘ গড়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন এখবর সারদার জানা। দেশে ফেরার আগে থাকতেই তিনি স্থায়ী মঠ স্থাপনের জন্য জমি সংগ্রহের কথা লিখেছিলেন গুরুভাইদের। কিন্তু উপযুক্ত জমি এবং অর্থ কোনওটাই পাওয়া যায়নি। তবু হাল ছাড়ার পাত্র সে নয়, সারদা জানেন। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, হন্যে হয়ে বিবেকানন্দ এখন মঠ নির্মাণের জন্য ঘুরছেন। তার মধ্যেই খেতড়ির রাজা অজিত সিংহকে নিয়ে তিনি তাঁর গুরুস্থান দক্ষিণেশ্বর থেকে ঘুরে এসেছেন। কিন্তু তারপরেই দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে তাঁর ঢোকার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে— শুনে চূড়ান্ত মর্মাহত হলেন সারদা। কালাপানির পারে ম্লেচ্ছদের দেশে গিয়ে তিনি নাকি জাত খুইয়েছেন, অতএব…।
স্বামীজি অবশ্য ওসব নোটিশ ইত্যাদি গ্রাহ্য করেননি এবং ঠাকুরের আবির্ভাব উৎসবে কোনও মন্দিরেই তাঁর প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে কেউ সাহস পায়নি। মনে মনে বিবেকানন্দ স্থায়ী মঠ এবং সেখানেই তাঁর গুরুর অধিষ্ঠানের সংকল্প চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এবং প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবেই হোক, একটি দুরন্ত প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা ইতিপূর্বে আকস্মিকভাবেই মঠের স্থানান্তর অনিবার্য এবং ত্বরান্বিত করে দিয়েছিল। তখনও তিনি আমেরিকা থেকে ফেরেননি।
সেই জুন মাসের বারো তারিখে হঠাৎ বিধ্বংসী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছিল কলকাতা। শহরের অজস্র ঘরবাড়ির সঙ্গে আগে থাকতেই অযত্নে টিকে থাকা প্রায় বিধ্বস্ত আলমবাজারের মঠবাড়ির দোতালা একেবারে ভেঙে পড়ল। কপালগুণে সন্ন্যাসীরা কেউ হতাহত হলেন না, কেননা, সেদিন ছিল রবিবার এবং সদস্যরা অধিকাংশ ছিলেন মঠের নীচের তলার একটি ঘরে, যেখানে নিয়মিত কর্মসূচি অনুযায়ী সুবোধ মহারাজ স্বরচিত প্রবন্ধ পাঠ করছিলেন। হঠাৎ টলমল করে দুলে উঠল পৃথিবী, যেন পায়ের নীচে জমি সরে যাচ্ছে, তারপরেই দুমদাম শব্দ আর মনুষ্যেতর প্রাণীদের ডাকাডাকি। পল্লির ঘরে ঘরে শুরু হয়ে গেল শঙ্খধ্বনি। মঠবাসীরা ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে বেরিয়ে এলেন রাস্তায়। তুলসী মহারাজ তার মধ্যেই ঠাকুরের ফটো আর সেই আত্মারামের কৌটো বুকের মধ্যে ঢুকিয়ে বাড়ির চাতালে এসে ‘জয় রামকৃষ্ণ’ বলতে বলতে ঘুরতে লাগলেন। মিনিট দেড়-দুইয়ের ব্যাপার, কিন্তু তার মধ্যেই আলমবাজারের বাড়ির অবস্থা রীতিমতো শোচনীয়। বিবেকানন্দ বুঝেছিলেন এরপরে ওবাড়িতে বসবাস ঝুঁকি হয়ে যাবে।
চিঠিতে অবশ্য ঠাট্টা করে সুবোধানন্দকে লিখেছিলেন, তোর বক্তৃতার কী জোর, একেবারে সসাগরা পৃথিবী কেঁপে উঠল!
কিন্তু ফিরে আসার পরে গঙ্গার পূর্বদিকে কিছুতেই মঠের জন্য জমি না পেয়ে, বেলুড়ে গঙ্গার ধারে শেষপর্যন্ত দুটো ছোট ছোট বাড়িসহ প্রায় বাইশ বিঘা জমি কেনার জন্য পাটনার ভাগবৎ নারায়ণ সিংহ-র কাছে বায়না করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ঘোরাঘুরি খোঁজাখুঁজি কম হয়নি। কিন্তু কথায় আছে, “গঙ্গার পশ্চিমকূল, বারাণসী সমতুল।” পাকেচক্রে কাছাকাছি সময়েই বিবেকানন্দর ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং ভক্ত হেনরিয়েটা মুলার কলকাতায় এসে ঊনচল্লিশ হাজার টাকা মঠের জন্য দান করতে রাজি হলেন। সুতরাং মঠের কাজকর্মের জন্য সঙ্ঘর সদস্যদেরও কাছাকাছি থাকার দরকার হয়ে পড়ল।
সবদিক বিবেচনা করেই এবার সেই নীলাম্বর মুখার্জির বাড়ি আবার ভাড়া নেওয়া হল। কিন্তু সারদার জন্য নয়। আলমবাজারের মঠ সাময়িকভাবে স্থানান্তরিত হয়ে এল এইবাড়িতে। একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ অবশ্য স্বামীজি সেরে রেখেছিলেন কয়েকমাস আগে। আমেরিকায় থাকাকালীনই তিনি গুরুভাইদের জোটবদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ফিরে আসার মাস তিনেকের মধ্যে বলরাম বসুর বাড়িতে তিনি আনুষ্ঠানিক ভাবেই রামকৃষ্ণ সঙঘ-র প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছিলেন। সব মিলিয়ে বোঝা গেল, আট-ন’ মাসের মধ্যে, দুরন্ত কর্মতৎপরতায় উজ্জীবিত হয়েছেন ঠাকুরের ত্যাগীসন্তানরা।।
কলকাতায় ঠাকুরের নামে সঙ্ঘ, ছেলেদের জীবনযাপন, আরও অনেক মানুষের যোগদান, সমর্থন… ইত্যাদি নানান বিষয়েই ভাসাভাসা খবর পান সারদা জয়রামবাটিতে বসে। একই সঙ্গে অনুভব করেন, স্বচক্ষে দেখার প্রয়োজনীয়তা ছাড়াও, ওই বিশাল কর্মোদ্যোগ সম্পর্কে তাঁর যেন কিঞ্চিৎ কৌতূহলও তৈরি হয়েছে। এমনকী বিদেশ থেকেও যখন পুরুষ-মহিলা অতিথিরা ওইসব কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে আসছেন, তখন তাঁর একবার যাওয়া উচিত। যোগানন্দ সাধাসাধি করছিলেন কয়েকমাস ধরেই। শীতের শেষদিকে এবার প্রায় বছর দেড়েক পরে সারদা কলকাতায় এলেন।
বেঙ্গল নাগপুর রেলওয়ে কোম্পানি হাওড়া থেকে দূরপাল্লার ট্রেন চালানোয় যাতায়াতের কিছুটা সুবিধে হয়েছে। বিষ্ণুপুর-বর্ধমান হয়ে এবার একটানা ট্রেনেই হাওড়া স্টেশন পৌঁছালেন সারদা। পথে নানান খবরাখবর নিলেন কালীকৃষ্ণ আর হরি দুই ব্রহ্মচারী ছেলের কাছে। কিন্তু বুঝতে পারছিলেন, যোগীন, তারক বা সারদা মহারাজের সঙ্গে না দেখা হওয়া পর্যন্ত বিশদ কিছু জানা যাবে না।
যথারীতি যোগানন্দ এসেছেন হাওড়া স্টেশনে মাকে স্বাগত জানিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। প্ল্যাটফর্মের ওপরেই সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে বললেন, পথে কোনও কষ্ট হয়নি তো মা? এবার অনেকদিন পরে গ্রাম ছেড়ে এলেন।।
সারদা যোগানন্দের মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করে বললেন, কষ্ট হবার কি জো আছে বাবা! যা দুই সাগরেদকে পাঠিয়েছিলে… ধরে আনতে বললে বেঁধে নিয়ে আসে। পান থেকে চুন পর্যন্ত খসতে দেয়নি। কালী তো আছেই, হরি আর এক কাঠি সরেস… খুব ভালভাবে এসেছি।
যোগানন্দ কালী আর হরিকে জিনিসপত্র নিয়ে এগিয়ে যেতে বলে ধীরেসুস্থে সারদাকে নিয়ে চললেন। তিনি বলরাম বসুর দু’-ঘোড়ায় টানা ফিটন গাড়ি নিয়ে এসেছেন মাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। কালীকৃষ্ণকে বলে দিলেন, গঙ্গার ঘাটের থেকে গাড়িটা যেন ফটকের কাছে এগিয়ে এনে দাঁড়ায়।
সারদা খেয়াল করলেন, হাওড়া স্টেশনে মানুষজন আর ব্যাপারিদের ভিড়, ছোটাছুটি বেড়েছে। কুলিরা বড় বড় বস্তা গঙ্গার ঘাটে নৌকো থেকে নামিয়ে প্ল্যাটফর্মের দিকে ধেয়ে আসছে। বাক্স-প্যাঁটরা-তোরঙ্গ নিয়ে কিছু মধ্যবিত্ত সংসারী মানুষজনও ট্রেনের অপেক্ষায় বসে আছে। আর প্ল্যাটফর্মের ওপরেই কয়েকটা কাচ দিয়ে ঘেরা ঘরের মধ্যে বসে আছে। ঘাঘরা পরা, মাথায় বাহারি টুপি, সুবেশিনী কয়েকজন মেমসাহেব। শ্বেতাঙ্গিনী সেইসব মহিলাদের খুব তোয়াজ করছে কিছু কিছু লালমুখো সাহেব। এখনও গরম পড়েনি, তা সত্ত্বেও মেমদের হাতে সুদৃশ্য রঙিন জাপানি পাখা।
গাড়িতে যেতে যেতে সারদা যোগানন্দকে বললেন, হ্যাঁ বাবা যোগীন, এসে তো পড়লাম, এবার উঠব কোথায়? মাস্টারের বাড়িটি ছোট, বলরামের বাড়িতে তো সবসময় লোকজনের ভিড়, সংসারও বেড়েছে, তা ছাড়া কৃষ্ণভাবিনীর শরীর ঠিক নেই শুনেছি।
যোগানন্দ বললেন, সব ব্যবস্থা করা আছে মা। আপনি বাগবাজারেই উঠবেন, দশের দুই বোসপাড়া লেন-এর বাড়িভাড়া নেওয়া হয়েছে, ইতিমধ্যে সেখানে গোলাপমা, যোগীনমা পৌঁছেও গেছেন।
সারদা নিশ্চিন্ত বোধ করলেন। বললেন, তা নরেনের কী খবর বাবা?
ওহ্, তার কথা আর কী বলব মা! ফিরে এসে তক একেবারে কালঘাম ঝরিয়ে ফেলছে। মঠ মঠ করে। কলকাতার দিকে তো সেরকম জায়গা পাওয়া গেল না, সবদিক ভেবেচিন্তে শেষপর্যন্ত বেলুড়েই জমি নেওয়া হয়েছে। আর নরেনের তো জানেন, ছোটখাটো কিছু পছন্দ না, তা ছাড়া সে অনেকটা এগিয়ে ভাবে। খুব শিগগির আপনাকে একদিন জমি দেখাতে নিয়ে যাব।
সারদা বললেন, টাকাপয়সা জোগাড় হচ্ছে কোত্থেকে?
সে-ও বলতে পারেন একা নরেনের উদ্যোগেই।
শুনলাম তার কিছু বিদেশি ভক্ত অতিথি এসেছেন। তাঁরা কেউ কেউ বেশ ধনী আর হৃদয়বান, তাঁরাই কি…!
ঠিকই শুনেছেন মা। যোগানন্দ বললেন, এর মধ্যেই শ্রীমতী ওলি বুল, জো ম্যাকলাউড আর হেনরিয়েটা মুলার প্রচুর অর্থ দিয়েছেন এবং নরেনের প্রতি শ্রদ্ধায় এবং তার কাজে সবরকম সাহায্যের জন্য ওঁরা বদ্ধপরিকর।
ওর আর একটি খুব আন্তরিক শিষ্যাও নাকি দেশ ছেড়ে এসেছে এখানে কাজ করবে বলে?
হ্যাঁ মা। মার্গারেট। তিনি যেমন শিক্ষিতা, তেমনই ভক্তিমতী। তিনিই সব থেকে পরে এসেছেন, এখনও একমাস হয়নি। তাঁর খুব ইচ্ছে, এদেশে বিশেষ করে মেয়েদের মধ্যে জ্ঞানের আলো বিতরণ এবং শিক্ষার প্রসার করার।
তার মুখে ফুলচন্দন পড়ুক বাবা। কিন্তু বিদেশি, মেমসাহেব মেয়ে… বড় কঠিন হবে তার কাজ।
তিনি সব জেনে বুঝেই আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তো এখন এরা সব কোথায় রয়েছে?
মিসেস মুলার থাকেন আলমোড়ায় এখন। ওলি বুল, জো আর মার্গারেট রয়েছেন মঠের জমিতে যে বাড়ি রয়েছে সেখানেই। আপনাকে দেখার জন্যও তাঁরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।
একটু চুপ করে থেকে সারদা বললেন, নরেনের শরীর-টরির ভাল আছে তো বাবা?
যোগানন্দ বললেন, ওই একটা ব্যাপারে আমাদের সকলেরই চিন্তা মা। বছর খানেক হল নরেন ফিরেছে, কিন্তু এর মধ্যে যে তার শরীর ভেঙেছে, আমরাও তা টের পাই। পঁয়ত্রিশ বছর বয়েস, কিন্তু এর মধ্যে নরেনের চেহারায় বয়েসের ছাপ পড়েছে। পারিবারিক বহুমূত্র রোগ তো আছেই।
সারদা একটা শ্বাস ফেলে বললেন, বাবা যোগীন, তোমার শরীরও তেমন জুতের বলে মনে হচ্ছে না।
যোগানন্দ বললেন, আমার কথা বাদ দিন মা। গ্ৰহণী (পেটের অসুখ) নিয়ে জেরবার হচ্ছি বেশ কিছুদিন ধরে। কিন্তু নরেন যে আমাদের যাবতীয় ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, পরিকাঠামো, নির্মাণ— এসবের মূল স্তম্ভ। তার সুস্থ থাকা খুব জরুরি— কিন্তু কী পরিশ্রম যে করে! এর মধ্যে দু’-দু’বার দার্জিলিং থেকে ঘুরে এল, কিন্তু কলকাতায় ফিরলেই ও আর ঠিক থাকে না।
বাগবাজার পৌঁছানোর মধ্যে আরও অনেক খবরই জানা হল সারদার। নানান প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে ছেলেরা যে সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে ঠাকুরের নামে বেশ বড়সড় এক জনহিতকর প্রতিষ্ঠান গড়তে নেমে পড়েছে, সেটা বুঝতে পারলেন এবং খুবই স্বস্তি অনুভব করলেন। মনে মনে দীর্ঘকাল ধরেই তিনি ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করে আসছিলেন— যেন স্থায়ী কিছু একটা হয়। ছেলেদের যেন একটা মাথা গোঁজার জায়গা হয়। তাঁর নিজের বাস্তব ক্ষমতা তো সেই অর্থে খুবই সীমিত। একমাত্র অপার করুণা আর ভালবাসা দিয়ে প্রতিটি মানুষকে কাছে টানতে চান তিনি। বিবেকানন্দ অবশ্য বলেছেন, মা-এর ওই আকুতিটুকুই তাঁদেরও মূলমন্ত্র এবং পাথেয়, যে কারণে মা-ই হচ্ছেন সঙ্ঘের যাবতীয় শক্তি, কর্মোদ্যোগের উৎস। তিনিই সঙ্ঘজননী।
এবারই কলকাতায় এসে প্রথম ঘোড়াহীন বিচিত্র একটি শকট চাক্ষুষ করলেন সারদা। চারটি চাকা লাগানো বড় বাক্সর মতো, সামনের দিকে মুখ বার করা গাড়ি, ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। ভেতরে বসে কেউ একটা মোটা রিং ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পথ করে নিচ্ছে। যোগীনকে প্রশ্ন করে জানলেন, ওটা নাকি মোটর গাড়ি। বছর খানেক ধরে। কয়েকটা চলছে কলকাতার পথে।
কয়েকদিন পরেই সপার্ষদ স্বামী বিবেকানন্দ এলেন সারদার সঙ্গে দেখা করতে। বোসপাড়া লেন রাস্তার ওপরেই বেশ বড় একতলা বাড়ি। মাঝখানে ফটক, দু’পাশে বাঁধানো রোয়াক, দু’ ধাপ সিঁড়ি আর বোয়াক পেরিয়ে বাড়ির ভিতরে যাওয়ার দরজা। স্বামীজি ইদানীং যেখানেই যান, তাঁকে দেখার জন্য কৌতূহলী কিছু লোক জুটে যায়। কয়েকটি ব্রহ্মচারী, শিষ্য এবং গৃহীভক্ত তাঁর সঙ্গেই থাকেন। মার্চ মাসের সকালে রোদের তাপ তেমন বাড়েনি। বাগবাজার পল্লিটি বড় বড় গাছের ছায়ায় এমনিতেই শীতল হয়ে থাকে। ঝিরঝিরে হাওয়া দিচ্ছে। যোগানন্দ আগেই বলে রেখেছিলেন সারদাকে নরেন দেখা করতে আসবে। গঙ্গাস্নান, নিত্যপূজা সারা হয়েছে সারদার।
রাস্তার ওপরেই চপ্পল খুলে, খালি পায়ে, সিঁড়ি আর রোয়াক পেরিয়ে অন্দরমহলে ঢুকলেন স্বামীজি। গৈরিক বসন তাঁর অঙ্গে, মুণ্ডিত মস্তকে ছোট ছোট কাঁচাপাকা চুল গজিয়েছে। ক্লান্তির আভাস থাকলেও, তাঁর শরীর থেকে সবসময়ই যেন একটি অলৌকিক জ্যোতি বিচ্ছুরিত হয়। তার সঙ্গেই আছে তাঁর দীঘল আঁখির অন্তর্ভেদী অথচ মায়াময় গভীর নিবিড় দৃষ্টি।
সারদা যথারীতি তাঁর স্নিগ্ধ কোমল আটপৌরে বেশে শান্ত হয়ে ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মাথায় ঘোমটা টানা। আজ সাতবছর পরে পৃথিবীখ্যাত তাঁর এই বীর সন্ন্যাসী সন্তানটির সঙ্গে দেখা।
এক স্মরণীয় ঐতিহাসিক মুহূর্ত যেন। আলোছায়া মেশানো ঘরের প্রতিটি মানুষ স্তব্ধ নির্বাক। কর্মে-জ্ঞানে-দায়িত্বে-পাণ্ডিত্যে ভুবনজয়ী সন্ন্যাসী মানুষটি শ্রদ্ধায় ভক্তিতে নিবেদিত প্রাণ, অনুগত সন্তানটির মতো মায়ের পায়ের সামনে সাষ্টাঙ্গে প্রণত। শ্রীচরণ দুটির সামনে মুণ্ডিত মস্তক আর কপাল ছুঁইয়ে রাখলেন কয়েক মুহূর্ত মাটির ওপর। পাদস্পর্শ করলেন না। মুখ তুলে তাকালেন না।
সারদা অন্তরে গভীরভাবে আলোড়িত, কিন্তু স্থির, নির্বাক, নিস্পন্দ রইলেন, যেন আংশিক সমাধিমগ্ন।
কী এক অবর্ণনীয় আনন্দময় পরিবেশ রচিত হল কয়েক মুহূর্তের জন্য। বোধহয় স্বর্গে অলৌকিক শঙ্খধ্বনি হচ্ছিল তখন। সারদা তার মধ্যেই স্বামীজির স্বাস্থ্যের অবনতি এবং শারীরিক ক্লান্তি বুঝতে পারলেন। খুব মৃদু স্বরে কিছু বাক্যালাপও হল। প্রথমে গোলাপমা-ই সারদার কথাগুলো স্পষ্ট করে উচ্চারণ করে দিচ্ছিলেন। ক্রমশ তিনি নিজেই অল্পস্বল্প কথা বললেন। শরীর-স্বাস্থ্যের খোঁজ নিলেন, মানসিক সমর্থন জানালেন এবং প্রাণভরা আশীর্বাদ করলেন।
তিন-চার দিন পরে মার্গারেট এলেন সারদার সঙ্গে বোসপাড়া লেনের বাড়িতে দেখা করতে। তাঁর মনের মধ্যে একদিকে যেমন দোলাচল, আর একদিকে তীব্র কৌতূহল মায়ের সম্পর্কে। তিনি কী বলবেন, কেমন আচরণ করবেন! বিব্রত হবেন না তো! মায়ের কথা তিনি তাঁর গুরুদেবের কাছে শুনেছেন, তা ছাড়া প্রেমানন্দ এবং যোগানন্দও বলেছেন। সব শুনেই কিছু একটা ভরসা হয়েছে মার্গারেটের মনে মনে। তা সত্ত্বেও একটি চাপা উদ্বেগ থেকে রেহাই পাননি। তাঁর সঙ্গে এলেন জো ম্যাকলাউড এবং মিসেস ওলি বুল।
সারদা মানুষকে মানুষ হিসেবেই দ্যাখেন। ম্লেচ্ছ’ বলে কোনও মানুষের বিশেষণ তাঁর মনে কোনও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে না। তথাপি, শ্বেতাঙ্গিনী একটি কন্যার সঙ্গে এই তাঁর প্রথম সোজাসুজি সাক্ষাৎ হবে জেনে পুলকিত বোধ করেছেন। বিশেষ করে যখন জেনেছেন, এই মেয়েটি এবং তার সঙ্গিনীরাও ঠাকুর এবং নরেনের ভাব ও আধ্যাত্মিক চেতনার বিষয়ে শ্রদ্ধাশীল মেমসাহেব হয়েও, তখন থেকেই তাঁর উদার প্রীতির আকাশে ওদের অনিবার্য ঠাঁই হয়েছে। সকাল থেকে তিনিও প্রতীক্ষায় ছিলেন।
যথারীতি মার্গারেটদের আসতে দেখে সেদিনও বোসপাড়া লেন-এ কৌতূহলী মানুষরা ভিড় করেছে। অন্যান্য বাড়ির বারান্দা, জানালা দিয়ে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে মহিলারাও। কুসংস্কার আর রক্ষণশীলতার আপাত আড়াল রক্ষা করতে চাইলেও, বোঝা যাচ্ছিল, বাগবাজারের নারীপুরুষ নির্বিশেষে ওই দুই আমেরিকান এবং এক ইয়োরোপিয়ান মহিলাদের দেখে একেবারে মুগ্ধ। আর সারদার মনে হল, নরেনের শিষ্যাটির আগমনে, তাঁর এই গলির অভ্যন্তরে বাড়িটিও যেন আলোয় ভরে উঠেছে।
সুঠামদেহিনী মার্গারেট পরে এসেছেন একটি পূর্ণ দৈর্ঘ্যের হাতাওয়ালা ক্রিম রঙের সিল্কের গাউন, কোমরের কাছে একই রঙের পাড়ওয়ালা বন্ধনী। গলায় রুদ্রাক্ষ এবং স্ফটিকের মালা, মাথার বাদামি চুলগুলি চুড়ো করে বাঁধা। তাঁর হাতে একগুচ্ছ অর্ধস্ফুট তাজা পদ্মফুল। হরিণের চামড়ার জুতো খুলে, ধবধবে ফরসা লালচে খালি পায়ে হেঁটে ঘরে ঢুকলেন মার্গারেট।
অপার বিস্ময় আর আনন্দ নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন সারদা। একটি শান্ত হাসি লেগে রয়েছে মুখে। মার্গারেটের মা-ডাক শুনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁর মুখ দিয়ে ঝরে পড়ল, এসো মা, এসো।
কয়েক পা এগিয়ে হাঁটু মুড়ে মার্গারেট বসলেন সারদার সামনে। পদ্মফুলগুলো রাখলেন পায়ের কাছে। তারপর কোমর নুইয়ে কপাল আর মাথা ঠেকালেন মাটির ওপর।
সারদা মার্গারেটের বাহুমূল স্পর্শ করলেন। চিবুকে হাত ছুঁইয়ে চুম্বন করলেন। বললেন, জয়ী হও মা, ঠাকুর তোমার মঙ্গল করুন।
ভাষাটা সম্পূর্ণ বুঝলেন না মার্গারেট। কিন্তু সারদার আন্তরিক স্পর্শে, স্নিগ্ধ উপস্থিতি আর কণ্ঠস্বরে একেবারে আপ্লুত হয়ে গেলেন। ভাঙা ভাঙা যা দু’-একটা বাংলা শিখেছেন, তাই স্মরণ করে বললেন, আম্মি আপনার মেয়ে হয়েন।
সবাইকে নিয়ে সারদা ভিতরের ঘরে গেলেন। গায়ে হাত বুলিয়ে বসালেন। তারপর হৃদয় আর শরীরের ভাষাতেই তাঁদের নিবিড় বাক্যালাপ শুরু হয়ে গেল। মনে হল না তাঁরা সদ্য পরিচিত। মার্গারেট ভেসে গেলেন আনন্দে বিস্ময়ে। এই আটপৌরে রক্ষণশীল হিন্দু রমণীটি যে এতখানি সপ্রতিভ হবেন, তাঁর ধারণা ছিল না। নিভৃতে, তাঁর মধ্যে যেন জন্মান্তর ঘটে গেল সুদুর ভারতবর্ষে এমন একটি মা পেয়ে। দুপুরে তাঁরা একত্রে আহারও করলেন।
আর বিধবা ব্রাহ্মণ হিন্দু নারীর এহেন আচরণ ও সেই সংবাদ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল কলকাতার পাড়ায়, মহল্লায়। কেউ বলল, জাতধর্ম সব রসাতলে গেল। কেউ বলল, মেমসাহেব নিয়ে যত্তসব আদিখ্যেতা! আবার কেউ কেউ নেকনজরে সমস্ত পরিস্থিতির পর্যালোচনা শুরু করল। বিবেকানন্দ টের পেলেন, মা নিঃশব্দে আবার একটি আন্দোলনের সূচনা করে দিয়েছেন। আর মার্গারেট তাঁর দিনলিপিতে দিনটির বর্ণনা করে লিখে রাখলেন, আ ডে অব ডেজ।।
সারদা কোনও প্রতিক্রিয়া নিয়েই মাথা ঘামালেন না। উপরন্তু মার্গারেটের ভাবনা, কর্ম পরিকল্পনা বিশদ জেনে, ইতিমধ্যে খুকি পাতিয়ে ফেলা কন্যাসন্তানটিকে তাঁর গৃহে, তাঁর সঙ্গেই বসবাসের জন্য আমন্ত্রণ জানালেন। তারপর একদিন নৌকো করে বেলুড়ে প্রস্তাবিত মঠের জমিও দেখে এলেন। পরিতৃপ্ত হয়ে মন্তব্য করলেন, এতদিনে ঠাকুর মুখ তুলে চেয়েছেন, ছেলেদের একটা মাথা গোঁজার জায়গা হল।
দেখতে দেখতে শুধু বছর নয়, শতাব্দীটিই শেষ হতে চলল।
কিন্তু শতাব্দী ফুরোনোর আগেই, দুটি প্রিয়জনকে কাল ছিনিয়ে নিয়ে গেল সারদার কাছ থেকে। বোসপাড়া লেন-এর বাড়িতেই দেহত্যাগ করলেন, মায়ের প্রথম দীক্ষাপ্রাপ্ত সন্তান স্বামী যোগানন্দ, তাঁর দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সন্তান যোগীন। আর মাত্র কয়েকটি মাস পরেই, সব থেকে অনুগত কনিষ্ঠভ্রাতা অভয়, চিকিৎসাশাস্ত্রের শেষ পরীক্ষা দিয়ে, অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর গর্ভের সন্তানের মুখদর্শন করার আগেই ইহলোকের মায়া কাটালেন। শুধু বলে গেলেন, দিদি, এরা রইল, দেখো।
সারদা উদাস নিবিড় চিত্তে ভাবলেন, একাধারে মা ও দিদির ভূমিকা পালনে, এ সংসারে তাঁর প্রকৃত অবস্থানটি কোথায়!
