কেউ পর নয় – ২

কালের হিসেবে একবছর সময় আর কতটুকু! দেখতে দেখতেই ফুরিয়ে যায়।

সারদা ভেবে দেখলেন, সুখের দিন বলেই যেন যাওয়া-থাকা-ফিরে আসা সবই সমাধা হল রীতিমতো দ্রুত। গত বছর ভাদ্রমাসের মাঝামাঝি তীর্থযাত্রা করেছিলেন। তৃতীয় ঋতুর সেই প্রথম মাসটি আবার ঘুরে এল। নিরবচ্ছিন্ন অলৌকিক মিলন আর সুসঙ্গে চিন্তাহীন সুসময়েরও অবসান হল। মাঝেমাঝে উৎকণ্ঠায় উদ্বেলিত হননি তা নয়, কিন্তু প্রকৃতি-পরিবেশ আর সঙ্গের গুণে সেসব মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারেনি। নিজের মধ্যেও কোথায় যেন একটু করে মানসিক অবলম্বন গড়ে উঠছিল— শক্ত হতে হবে, পর্দানশিন হয়ে থাকলে চলবে না, একলা পথে চলতে হবে।

এমন কিছু সুখের জীবনযাপনে কোনওদিনই অভ্যস্ত নন সারদা। দুঃখ রজনীর আঁধার মাঝেমধ্যে ফিকে হয়েছে বটে, কিন্তু ব্যক্তিগত বলে যাঁর জীবনে কিছু নেই, চিরকালই পাঁচজনকে নিয়ে চলা, তাঁর অবস্থা খানিকটা ঢেঁকির মতো, তিনি স্বর্গে গিয়েও ধান ভানেন— তা সে স্বর্গ জয়রামবাটি-কামারপুকুর-দক্ষিণেশ্বর-শ্যামপুকুর-কাশীপুর হোক, বা দেওঘর-বারাণসী-অযোধ্যা-বৃন্দাবনই হোক।

কিন্তু বরাবর একটা ব্যাপার জানতেন সারদা, ছায়া কায়া এক হয়ে একটি মানুষ তাঁর সঙ্গে সঙ্গে ছিলেন। লোকচক্ষু আর গভীর উপলব্ধিহীন গড়পড়তা মানুষজন ‘তাঁর’ জীবনচর্যা আর যাপনকে তাঁদের সীমাবদ্ধ ভাবনার দৌড় দিয়ে নানা রকমভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, বাস্তবতার নিরিখে বিচার করতে চেয়েছেন, কখনও আপাত-সহানুভূতিতে বেজেছেন সারদার জন্যও। একটা ব্যাপার তাঁরা মাথায় রাখেননি, রামকৃষ্ণ মানুষটি অবতারই হোন কিংবা দার্শনিক, এহেন মানুষের স্ত্রীরূপ আধারটি যে ধাতুতে গড়া, তা আর অন্য কোনও নারীতে মিলত না। সম্পর্কটি ছিল একেবারেই নিরূপিত, যোগসিদ্ধ, একে অন্যের পরিপূরক, অংশে অংশ মিশে পূর্ণ। সারদা করুণা করতেন তাঁদের, যাঁরা লোকদেখানো দুঃখ পেতেন তাঁর জন্য।

কিন্তু বরাবর একটা ব্যাপার জানতেন সারদা, ছায়া কায়া এক হয়ে একটি মানুষ তাঁর সঙ্গে সঙ্গে ছিলেন। লোকচক্ষু আর গভীর উপলব্ধিহীন গড়পড়তা মানুষজন ‘তাঁর’ জীবনচর্যা আর যাপনকে তাঁদের সীমাবদ্ধ ভাবনার দৌড় দিয়ে নানা রকমভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, বাস্তবতার নিরিখে বিচার করতে চেয়েছেন, কখনও আপাত-সহানুভূতিতে বেজেছেন সারদার জন্যও। একটা ব্যাপার তাঁরা মাথায় রাখেননি, রামকৃষ্ণ মানুষটি অবতারই হোন কিংবা দার্শনিক, এহেন মানুষের স্ত্রীরূপ আধারটি যে ধাতুতে গড়া, তা আর অন্য কোনও নারীতে মিলত না। সম্পর্কটি ছিল একেবারেই নিরূপিত, যোগসিদ্ধ, একে অন্যের পরিপূরক, অংশে অংশ মিশে পূর্ণ। সারদা করুণা করতেন তাঁদের, যাঁরা লোকদেখানো দুঃখ পেতেন তাঁর জন্য।

ঢেঁকিসম হলেও, মনুষ্যজীবন বলেই আপাতত একটি দোলাচল অনুভূত হচ্ছে সারদার। ছায়া থাকলেও, মানুষটির কায়া অনুপস্থিত এখন। তীর্থের একটি বছর আনন্দে-আবেশে-আবাহনে কাটল। বহু বিচিত্র অভিজ্ঞতাতেও সমৃদ্ধ হলেন। কিন্তু মূলকথা, একটি প্রচ্ছন্ন ব্যক্তিত্বের গোপন তাড়নাই যেন তাঁর মধ্যে ক্রিয়াশীল। সঙ্গে অপার প্রীতি ও দায়িত্ববোধ। কিন্তু পথ চলতে হবে একা এবং সম্বলহীন।

অনেকদিন পরে এবার ভিটেবাড়ির দিকে চলেছেন সারদা। কু-ঝিকঝিক রেলগাড়ি, মাটির সঙ্গে সমতল কোনও ছোট্ট একটি ইস্টিশনে ঝঁকানি দিয়ে দাঁড়াতেই, ভাবনার ঘোর কাটল। চারদিকে তাকিয়ে দেখলেন, বর্ষা শেষের বৃষ্টিবধাওয়া গ্রামবাংলা। সবুজ নিবিড় উন্মুক্ত। আকাশে হালকা ধূসর মেঘ উড়ে যাচ্ছে। তাঁর গন্তব্য খুব কাছের জায়গা নয়। বর্ধমান। বাগবাজার থেকে হাওড়া, সেখান থেকে রেলগাড়ি ধরে বর্ধমান, তারপর উচালনের পথে কামারপুকুর।

একটু ঘুরিয়ে নাক দেখানোর মতন এবার যাত্রাপথ ঠিক করতে হয়েছে। উপায় নেই। তীর্থ সেরে এসে হাত খালি সারদার। কলকাতা থেকে কামারপুকুর যাওয়ার জন্য বারবার গাড়ি পালটানোর মতো রেস্ত নেই। খানিকটা জলপথে, খানিকটা পদব্রজে গেলেও বার তিনেক অন্তত গো-শকট ভাড়া করতে হবে। তার খরচ কম নয়। কামারপুকুর জায়গাটিও পড়েছে প্রায় তিনটি জেলার সঙ্গমস্থলে। হুগলির উত্তরপশ্চিম কোণে হলেও বর্ধমান আর বাঁকুড়া একেবারে গায়ের ওপর। কোনাকুনি রেলপথও নেই।

বলরামকে কিছু জানতে দেননি। যোগীন আর গোলাপমা পৌঁছাতে যাবেন। তাঁদের সঙ্গেই আলোচনা করে ঠিক হয়েছিল, হাওড়া থেকে একটানা রেলগাড়িতে বর্ধমান চলে যাবেন। সেখান থেকে উচালন পর্যন্ত রাস্তা ভাল। কয়েক ক্রোশ পথ হেঁটে একেবারে কামারপুকুর। খরচ বাঁচাতে গেলে তা ছাড়া আর উপায় কী! বছর দুয়েক আগে হোর মিলার কোম্পানি হাওড়া-তারকেশ্বর রেল চালু করেছে বটে, কিন্তু সেও তো তারকেশ্বরের পরে আর যাবে না। সেখান থেকে কামারপুকুর কম দূর নয়। তাঁর চেয়ে বর্ধমান থেকে হেঁটে যাওয়া সহজ। সকাল সকাল উঠে তাই হাওড়া-রানিগঞ্জ লোকাল ধরেছেন। জেনানা কামরায় না উঠে সাধারণ বগিতে উঠেছেন যোগীন সঙ্গে যাচ্ছেন বলে। তাও ঘণ্টা দেড়েক হয়ে গেছে। বাগবাজার থেকে বেরিয়েছেন তারও কত আগে।

চোখ দুটো টেনে এসেছিল। ঝাঁকানি দিয়ে গাড়ি দাঁড়াতেই গোলাপমাকে সারদা জিগ্যেস করলেন, ও গোলাপ, কদ্দুর এলাম? এটা কোন ইস্টিশন?

গোলাপমার নিদ্ৰাটুকু সারদার চেয়ে গাঢ়ই হয়েছিল সম্ভবত। ঠোঁটের কষে লালা গড়িয়ে এসেছিল। গলা শুনে তড়বড় করে সোজা হয়ে বসে এদিক ওদিক তাকালেন। মুখ মুছে বিভ্রান্ত চোখে দেখে বললেন, ও মা ইস্টিশান কোথায়, এ যে মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে!

সারদা বললেন, না গো, লোক নেমেছে আমি দেখেছি।

গোলাপ বললেন, দাঁড়াও দেখি, যোগেনকে জিগ্যেস করি। কিন্তু সে আবার গেল কোথায়?

এক কামরার মধ্যেই একটু তফাতে উলটোদিকে বসেছিলেন যোগীন মহারাজ। এমনকিছু ভিড় নেই গাড়িতে বরং ফাঁকাই বলা যায়। তাহলে কোথায় গেল জলজ্যান্ত লোকটা! ভাবনার মধ্যে দরজার কাছে যোগীনের মাথা দেখা গেল। পাদানি বেয়ে উঠে আসছে কামরার মধ্যে।

সারদাই জিগ্যেস করলেন, হ্যাঁ বাবা, রোদ তো বেশ চড়ে গেছে, কত দুর এলাম?

এই সবে চন্দনপুর মা। যোগীন বললেন, এর মধ্যেই গাড়ি কুড়ি মিনিট লেটে যাচ্ছে…ওই পানিশ্যাওলা আর নালিকুলের মাঝখানে লেবেল ক্রশিং দিয়ে গোরু পার হচ্ছিল…সেখানেই সময় গেল।

গোলাপমা বললেন, তা তুমি কোথায় গিয়েছিলে?

আমি কোথাও যাইনি তো মা…আসলে সকালের আসন-টাসনগুলো তো করা হয়নি আজ, নেমে একটু হাত-পা চালনা করে নিলাম।

কথার মধ্যেই কুক দিয়ে গাড়ি ছাড়ল সামান্য দোলা দিয়ে, আর একইসঙ্গে কুচো কয়লা মেশানো কালো ধোঁয়াও ঢুকল বগির মধ্যে। বীরবিক্রমে ইঞ্জিনের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে, সে তুলনায় গাড়ি অবশ্য ধীরগতিতেই চলা শুরু করেছে।

সারদা বললেন, আরও কতক্ষণ লাগবে মনে হয় বর্ধমান পৌঁছুতে?

যোগীন বললেন, দাঁড়ান মা, এখনও বেলমুড়ি-রুদ্রাণী-গুড়ুপ যাক আগে…মনে হয় দুপুর দুপুর নাগাদ পৌঁছে যাব।

আজ সন্ধের মধ্যে কি তাহলে উচালনে ঢুকতে পারব?

একবার বর্ধমান পৌঁছে গেলে আর চিন্তা নেই মা। মাঝখানে কোনও একটা চটিতে একবার জল খেয়ে নেব…তারপর…।

গোলাপমা এর মধ্যে পুঁটলি খুলে মোয়া আর নাড়ু বার করেছেন। একটা সরায় করে যোগীনের দিকে বাড়িয়ে দিলেন।—নাও বাবা, জলখাবার বলে তো সকাল থেকে কিছু হয়নি, একটু ক্ষুণ্ণিবৃত্তি করো।

সারদাকে দিয়ে নিজেও নিলেন। পুঁটলির গিঁট বাঁধতে বাঁধতে বললেন, মাস্টারমশাইয়ের বউ ভাল চাঁপাকলা পাঠিয়েছিলেন কালকে, তো কলা অযাত্রা বলে আর আনলুম না, ঝিদের বিলিয়ে দিলুম। নয়তো মোয়র সঙ্গে…।

মাঝখানেই সারদা বললেন, অযাত্রা-টযাত্রা ওসব কুসংস্কার মা। ছেলেদের সামনে ওসব আর বোলা না। আসলে কলা খেয়ে যেখানে সেখানে সব খোসা ফেলে, তারপর অন্য লোকে হড়কে পড়ে পা ভাঙে। সেইজন্যই অমন বলত একসময়।

যোগীন বলল, কিন্তু মা, ঠাকুরও তো শুনেছি সময়, অযাত্রা এসব খুব মানতেন।

তা মানতেন। দিনক্ষণ, গ্রহনক্ষত্রের অবস্থান…এসব নিয়ে তাঁর একটু বাড়াবাড়িই ছিল। সেজন্য আমারও দুর্ভোগ কম হয়নি বাবা। একবার তো জয়রামবাটি থেকে দক্ষিণেশ্বর এসেও আবার ফেরত গেলাম…ওনার হাতে লেগেছিল, বললেন যাত্রা পালটে এসো। তো এসব কুসংস্কার ছাড়া আর কী? তবে বড় বড় মানুষদের অমন কিছু দুর্বলতা থাকে, যা সবসময় যুক্তি দিয়ে বিচার হয় না। তাঁরা একটু কানপাতলাও হন।

গোলাপ বললেন, মানামানি তোমারও তো আছে মা?

কিছু তো আছেই। শুনতে শুনতে ওসব যে রক্তমজ্জায় ঢুকে যায়। তবে বাড়তে দিই না। আর কিছু কিছু ব্যাপার আছে, সংস্কার ভাবলেও একটু খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায় একটা যুক্তিও আছে।

যোগীন বললেন, কী জানেন মা, সংযম শুচিতা এসব অনেকসময় মানুষ অবহেলা করে, সেইজন্যই পণ্ডিতরা অনেকসময় একটু ভয়-টয় দেখিয়ে কিছু কিছু নিয়মনীতি নির্ধারণ করেছেন। তাইতে সাধারণ মানুষের উপকারই হয়।

সারদা বললেন, তাই তো। আবার বাড়াবাড়ি করলেই তখন শুচিবাই হয়ে যায়। নয়তো নিয়মনীতি পুজোপার্বণ তো ভালর জন্যই।

গোলাপ বললেন, এই যেমন ধরো অমাবস্যা-পুন্যিমের পরে একাদশী, কিংবা এঁটোকাঁটার বিচার, ধোয়াধুয়ি এসব তো শরীরের জন্যই, নাকি মা!

বটেই তো। সারদা বললেন। মাঝেমধ্যে উপোস করা খুব ভাল। শরীরের রস মরে, ঝরঝরে লাগে কত।

তারপর ধরো, বিয়ের আগে গায়ে হলুদ—ওতে চর্মরোগ সারে, শ্রাদ্ধের আগে হবিষ্যান্ন গ্রহণ, তাইতে অসুখ-বিসুখ কম হয়, পৈতের পরে গায়ত্রী জপ মনঃসংযোগ শেখায়। আবার বিধবাদের নিরামিষ ভক্ষণের পেছনেও যুক্তি আছে।

অমন হুদো-হুদো নিয়ম আছে বাপু, সারদা বললেন, কিন্তু অন্ধভাবে সব কিছু মানার কী দরকার! অল্পবয়সি বিধবা একটা মেয়ে, বর মরে গেছে বলেই সারাজীবন মাছমাংস বন্ধ করে হেদিয়ে মরবে, তাঁর কোনও যুক্তি আছে?

সে কি কথা মা, বিধবারা মাছমাংস ধরলে যে পৃথিবী রসাতলে যাবে।

কোথাও যাবে না। ওইটিই কুসংস্কার গোলাপ। ইচ্ছে আর প্রয়োজন এ দুটি মিলিয়ে চলতে পারলেই ঠিক আছে।

তাহলে মা তুমি কি বিধবা বিবাহ-ও সমর্থন করো?

করি মানে! একশোবার করি। শুনেছি তো রামমোহন আর বিদ্যেসাগর মশায়ের আন্দোলনের জন্য ছাপান্ন (১৮৫৬) সালেই সাহেবরা বিধবাদের আবার বিয়ে করা আইন করেছে। এ কি কম বড় কাজ মা! রামমোহন তো দেহ রেখেছেন, কিন্তু বিদ্যেসাগর মশাইয়ের কখনও দর্শন পেলে, আমি তাঁর পায়ে হাত দিয়ে পেন্নাম করব।

যোগীন খানিকক্ষণ পরে এবার বলল, মা, রাজা রামমোহন রায় আসলে সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধেই লেখনী ধারণ করেছিলেন। তারপর লর্ড বেন্টিঙ্ক আঠারোশো ঊনত্রিশের চৌঠা ডিসেম্বর আইন করে তা রদ করার ব্যবস্থা করেছিলেন।

সারদা বললেন, তাহলেই দ্যাখো বাবা, সাহেবরা আমাদের পরাধীন করে রেখে শুষে খাচ্ছে বটে, কিন্তু কিছু কিছু ভাল কাজ করেছে, সেটা না বললে ভাবনাটা একপেশে হয়ে যায়। সতীদাহ বা সহমরণ—এর থেকে নিষ্ঠুর প্রথা আর কী হয় বলে দিকিনি।

দুলকি চালে চলছে রেলগাড়ি। জানালা দিয়ে হাওয়া আসছে। মাঝে মাঝে একটু রোদের দেখা মিললেও আকাশের অনেকটাই ময়লা মেঘে ঢাকা। এবছর এখনও ঠিক শরতের সোনা রোদ ফোটেনি। তবে আকাশে বাতাসে ঋতু পরিবর্তনের খবর হয়েছে। মাঠের পর মাঠ জুড়ে সবুজের সমারোহ। মাঝে মাঝে ঢেউ উঠছে জল ছেড়ে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠা আউশের ক্ষেতে। হালকা হাওয়ায় ডানা ভাসিয়ে উড়ছে পাখপাখালি।

সারদা খেয়াল করলেন, একটু আধটু গল্পগাছা করতে করতেই আবার গোলাপমা-র চোখ বুজে এসেছে। পুঁটলিতে ঠেসান দিয়ে ঢুলছে। মনে মনে সারদা বললেন, আহা একটু ঘুমোক। কোন ভোররাতে উঠে পুজোআহ্নিক সেরে গোছগাছ করেছে। মেয়ে-যোগীন আর গোলাপ, এই দু’জন না থাকলে তিনি কোথায় যেতেন! আদর করে নাম দিয়েছেন, জয়া-বিজয়া। তাঁর খুঁটিনাটি সব ব্যাপারেই এ দ’জন ছাড়া দেখার আর কে আছে। ইদানীং বাতের ব্যথায় মাঝে মাঝে কষ্ট পায় বলে মেয়ে-যোগীন আসতে পারল না। তাও আবার কবে দেখা হবে, বলতে বলতে কত চোখের জল ফেলেছে ক’দিন ধরে।

কামারপুকুর ফেরার সিদ্ধান্তটা অবশ্য সারদা নিজেই নিয়েছিলেন।

না নিয়ে উপায় ছিল না, এমন নয়। বলরাম-কেষ্টভাবিনী, মাস্টার-নিকুঞ্জ ছাড়াও গৃহস্থরা অনেকেই তাঁকে কলকাতায় থেকে যাওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। লোকদেখানো আগ্রহ নয়, কারও কারও আন্তরিকভাবও ছিল। ভাবনাচিন্তা করেই শেষপর্যন্ত রাজি হলেন না সারদা।

বৃন্দাবন তীর্থ সেরে আবার বলরামের বাগবাজারের বাড়িতেই উঠেছিলেন। দু’ সপ্তাহ ধরে অনেক প্রশ্নেরই যাতায়াত চলেছিল মনের মধ্যে। অসুবিধে আর অসহায়তার কথা যেমন মনে হয়েছে, তেমনই আত্মসম্মান আর স্বভূমিকার কথাটিও ভোলেননি। মা হিসেবে অনেকে তাকে মেনে নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু আসলে তিনি রামকৃষ্ণর ঘরনি বলেই তো! ভক্তরা প্রাণ দিয়ে তাঁর জন্যও করেছে। কিন্তু প্রচ্ছন্নভাবে তাঁর সঙ্গে কি একটু অনুকম্পা, সহানুভূতিও মিশে থাকে না? ভাবটা যেন, অসহায় দুঃখী, অভাব-অনটনে পড়া বিধবা, নিঃস্ব গ্রাম্য মহিলা, কোথায় আর যাবেন! যাই হোক না কেন, অত বড় যুগাবতারের ধর্মসাক্ষী করে বিয়ে করা বউ তো বটে। তা ছাড়া মানুষটিও নিতান্ত সহজ সরল, মৃদুভাষিণী, সাতেপাঁচে না থাকা নিরীহ। কিছু চাঁদাপত্র তুলেই না হয়…ঝাড়া হাত পা একটা মানুষকে…।

না, এসব কথা কেউ উচ্চারণ তো দূরের কথা, হাবভাবেও ঘনিষ্ঠরা প্রকাশ করেননি। নিজের বোধ আর সচেতনতা থেকে সারদা নিজেই ভেবেছেন। ভেবেছেন, সুযোগ থাকলেই যে সদ্‌ব্যহার করতে হবে, তার তো কোনও মানে নেই। তাঁর থেকে বরং প্রাণপাত করে হলেও নিজের চেষ্টায় যদি টিকে থাকতে পারেন, তাইতে কষ্ট হলেও, বেঁচে থাকার একটা মানে হয়। স্বাক্ষরিত হবেন নিজের কাছেই। কষ্ট না করতে করতে একসময় কষ্ট করাটাকেই ভয় পাবেন হয় তো। তা ছাড়া মানুষের মন তো, বসতে পেলেই শুতে চায়। আরামে আয়েসে থাকতে থাকতে একদিন হয়তো সেটাকেই দাবি বলে মনে হবে। তাঁর চেয়ে যেটুকু নিজের আছে, সেটুকু সম্বল করে বাঁচার চেষ্টাই ভাল।

কলকাতার ভক্তদের কাছ থেকে সরে যাওয়ার আর একটা যুক্তিও ছিল সারদার। তিনি জানতেন, যে গুটিকয়েক ছেলেকে ব্রহ্মচর্যের দীক্ষা আর গেরুয়া থান দিয়ে ঠাকুর একটি সংঘের পত্তন করেছেন, সেই ছেলেগুলি অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক কষ্ট করছে। বেঁচে থাকার জন্যই তারা লড়াই করে যাচ্ছে। উদ্দেশ্য আর কিছু না, অশিক্ষা কুসংস্কারে ডুবে থাকা জাতিকে ওরা ঠাকুরের উদারতা আর ভাবান্দোলনের আলোয় আলোকিত করার ব্রত গ্রহণ করেছে; তাই শত নির্যাতন সহ্য করে টিকে থাকার চেষ্টা করছে, যাতে একদিন পায়ের নীচে মাটি পায়।

কলকাতায় স্বচ্ছন্দে এবং স্বাচ্ছন্দ্যে থেকে মা হিসেবে সারদা কোন উদাহরণ সৃষ্টি করবেন সেই সব ত্যাগী সন্তানদের কাছে। তাদের উপায় থাকা সত্ত্বেও তারা মাটি কামড়ে পড়ে আছে—একটা আদর্শ নিয়ে। সুতরাং তারও কি আরও কৃচ্ছ্রসাধনের দরকার নেই! জীবনে আরও কষ্ট করার অভিজ্ঞতা একা নিজে চলার মতো সাহস এবং শুধু তাঁর অর্ধাঙ্গিনী বলে নয়, সারদা স্বীকৃত হয়ে উঠবেন আপন পরিচয়ে, তিতিক্ষায়, প্রীতিতে।

যোগীনের সামনে ইদানীং অনেকটাই সহজ হয়েছেন সারদা। ঘোমটা মাথায় রেখে কথা-টথা বলেন।

মাত্র কিছুদিন আগেও ছেলেবুড়ো নির্বিশেষে খুব কম পুরুষ মানুষের সঙ্গেই এমনকী তাঁর বাক্যালাপও প্রায় ছিল না। একমাত্র নাটু, নরেন, রাখাল, বাবুরাম, শরৎ এরকম কয়েক জনের সঙ্গে ছাড়া। যোগীনকেও ঠাকুরের আদেশ পেয়ে দীক্ষা দেওয়ার আগে বলেছিলেন, দীক্ষা দেব কি, আমি যে তাঁর সঙ্গে কথাই বলি না। ঠাকুর বলেছিলেন, ঠিক আছে মেয়ে-যোগীনকে দিয়ে তাকে ডেকে পাঠিয়ে, তারপর দীক্ষা দিয়ে। সে ঘটনা বৃন্দাবনে থাকাকালীন। যোগীনই হলেন অতঃপর সারদার প্রথম মন্ত্রশিষ্য। সঙ্গে সঙ্গে ছিলও তো কম দিন না। একটু একটু করে কথাবার্তা বলতে বলতেই সারদা বুঝেছিলেন, যোগীন ছেলেটি একেবারে খাদহীন, সমর্পিতপ্রাণ।

রেলযাত্রার মধ্যেই ছেলেদের খবর নেওয়ার জন্য সারদা যোগীনকে ডাকলেন। ফাঁকা কামরার মধ্যে গ্রাম্য দু’-একটি লোক ছাড়া আর যাত্রী নেই। গোলাপমাও ঘুমুচ্ছেন। সারদা বেশি ঘুমোত পারেন না, ছেলেদের জন্য তাঁর প্রাণে সদাই একটি উৎকণ্ঠা থাকে। যোগীনকে বললেন, বাবা, তুমি একটু এদিকে এসে বোসো তো। জায়গা তো সব ফাঁকাই পড়ে আছে। একটু কথা বলি তোমার সঙ্গে।

যোগীন উলটো দিকের কাঠের সিটে বসে বলল, হ্যাঁ, বলুন মা।

সারদা সামান্য একটু ভূমিকা করে নেওয়ার মতো বললেন, তীর্থ করে আসার পরে ছেলেদের সবায়ের সঙ্গে আর দেখা হল না। খবরাখবর বিশেষ পাইনি। তারা সবাই ভাল আছে?

যোগীন সামান্য ইতস্তত করল। গুরুভাইদের সব খবরই তার জানা। বৃন্দাবন থেকে কিছুদিন আগে ফিরে, শরীর খুব একটা সুস্থ না থাকলেও সে চলে গিয়েছিল ভাইদের কাছে। অবস্থা দেখে প্রথমে তার নিজেরই চক্ষু চড়কগাছ। তাহলেও কয়েকটা দিন সে ওখানে কাটিয়েছে। কিন্তু তার অন্যতম দায়িত্ব সারদার রক্ষণাবেক্ষণ, সুতরাং আবার ফিরতেও হয়েছে মাকে কামারপুকুর পৌঁছে দেওয়ার জন্য।

একটু ধীরেসুস্থে বলল, আছে এই পর্যন্ত, ভালমন্দ আর কী বলি মা!

অবস্থা যে সারদা একেবারে আন্দাজ করতে পারেন না, তা নয়। তবু বললেন, একটু খোলসা করে বলো তো বাবা!

যোগীন বলল, গতবছর আমরা রওনা হবার পরে সুরেন মিত্তির মশাই বরানগরে একটা বাড়ি ঠিক করে দিয়েছিলেন, সে তো আপনি জানেন।

সারদা বললেন, কানে শুনেছি এই পর্যন্ত। আশ্বিন মাসেই তো কাশীপুর ছেড়ে ছেলেরা ওখানে গিয়ে উঠেছিল।

এখনও সেখানেই আছে। ওটারই নাম হয়েছে বরানগর মঠবাড়ি।

মাথা নেড়ে সারদা বললেন, নামে যাই হোক, বাড়ি কেমন? বসবাসযোগ্য?

আর তো কোনও উপায় নেই মা। থাকতে হবে, তাই আছে।

তার মানে অবস্থা খুবই সঙিন।

যোগীন আর না বলে পারল না, মা, সঙিন বললেও বোধহয় কিছু বলা হয় না। নরেনরা সব যে কীভাবে আছে…!

এটুকু বলতে বলতেই যোগীনের চোখ সজল হয়ে এল।

সারদা তা লক্ষ করেই বললেন, তাহলেও একটু বলল আমায়। কতটা খারাপ?

যোগীন বলল, মা, সেবাড়ি এতই পুরনো, ভাঙা, যে একতলাটা প্রায় বসে গেছে। স্যাঁতানো অন্ধকার। সাপখোপের আস্তানা, রাতে শিয়াল-টিয়ালও ঢুকে পড়ে।

ছেলেরা কোথায় থাকে, দোতালায়?

হ্যাঁ মা। তার অবস্থাও অতি করুণ। উঁচু উঁচু সিঁড়ির খানিকটা ধসে গ্যাছে। মেঝে ফাটা, জানালা-দরজার পাল্লা অর্ধেক ভাঙা, ছাদের কড়িবরগা খসে গেছে, দেয়ালের ইট বার করা। চারদিকে তো এমনিতেই জঙ্গল। লোকে বলে ভূতের বাড়ি।

সারদা বললেন, ওখানেই তো সেই কালীসাধক, যাকে দানাকালী বলত লোকে, সে থাকে না?

যোগীন বলল, তার থাকা না-থাকার কোনও ঠিক নেই। তবে তার ঘরটাতেই সবাই থাকে। বলে দানাদের ঘর।

শোয় কোথায়?

মেঝের ওপর কয়েকটা চ্যাটাই আর মাদুর বিছিয়ে, মাথায় ইট দিয়ে শোয়। গায়ে গায়ে সবাই একসঙ্গে লেগে থাকে। শীতের সময় গায়ে দেওয়ার কিছু ছিল না, ওরা উঠে নিজেদের মধ্যে একবার কুস্তি করে নিত গা গরম করে নেওয়ার জন্য।

সারদার মুখে বাক্যস্ফুরিত হল না। একটু পরে শুধু দীর্ঘশ্বাস নির্গত হল।

যোগীন আবার বলল, কিন্তু মা সংকল্প আর এনার্জিতে কোনও খামতি নেই।

সারদা একটু পরে জিজ্ঞেস করলেন, খাবার-দাবার কিছু জোটে?

তাও বলার মতো নয় মা। যোগীন বলল! এমনিতেই ঠিক করা হয়েছে কারুর কাছ থেকে কিছু চাওয়া হবে না। মুষ্টিভিক্ষা করেই পেট চালানো হয়। ভিক্ষার চাল সব একসঙ্গে ফুটিয়ে, নুন-লঙ্কার ঝোল মিশিয়ে সবাই একসঙ্গে খায়। থালাবাটি কিছু নেই, একটা মাত্র ঘটি…।

সারদা থামিয়ে দিলেন।—থাক বাবা, আর বলতে হবে না। যোগীন দেখল, সারদা আঁচল চাপা দিয়েছেন চোখেমুখে।

একটু পরে সারদা নিজের থেকে আবার বললেন, নরেনকে কেমন দেখলে?

যোগীন নিজেকে বোধহয় একটু গুছিয়ে নিল। বলল, নেতৃত্বের কাজ সে যথাযথ পালন করছে। তবে নিজের দিকে কোনও লক্ষ নাই। অনেকটা সময়ই জপধ্যানে কাটায়। রোগা হয়েছে, চোখের কোণে কালি, চুলদাড়ি বড় হয়েছে, হাতে বড় বড় নখ…মাঝেমাঝেই ওর মন যেন শরীর ছেড়ে উধাও হয়ে যায়।

বাড়ির সঙ্গে কোনও যোগাযোগ আছে?

না মা। শুনেছি মাঝেমধ্যে মেজো ভাই মহেন্দ্র দেখা করতে আসে। বাইরে লোকে বলে, নরেন পাগলা হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে রাখাল-শরৎরাও ওর জন্য দুশ্চিন্তা করে। কিন্তু কথাবার্তায় টের পাওয়া যায়, ওর মধ্যে একটি গভীর প্রস্তুতি চলছে। এরমধ্যেই একদিন আমাদের বলল, নিরাশ হওয়ার মতো কিছু হয়নি। গণ্যমান্য আর ধনীর ওপর কোনও ভরসা রেখো না, ওদের জীবনীশক্তি নেই। পদমর্যাদাহীন গরিব বিশ্বাসীদের নিয়েই আমাদের চলতে হবে।

একটু একটু করে বাক্যালাপ থেমে গেল। সারদা খোলা জানালা দিয়ে উন্মুক্ত গ্রাম প্রান্তরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। রেলগাড়ি চলেছে ঝিকঝিক করে। মাঝেমাঝেই তার গতি কমে আসে। ইঞ্জিন থেকে তখনই তারস্বরে হুইসল বাজানো হয়।

তীর্থে কাটানোর দিনগুলির কথা মনে পড়ে সারদার।

মোটমাট নিরুপদ্রবে একটি বছর অতিক্রান্ত হলেও, নানান অভিজ্ঞতায় সারদা এবার সমৃদ্ধ হয়েছেন সন্দেহ নেই। আর সেই সব অভিজ্ঞতাই যে খুব সুখের এবং মধুর তাও না। কিছু বেদনার অনুভবে কখনও মুষড়ে পড়েছিলেন, যদিও কাছের মানুষদেরও সেসব তেমন জানতে দেননি। তবে এটা ঠিকই, জীবনে এই প্রথমবার দীর্ঘ তীর্থযাত্রায় বেরিয়ে একইসঙ্গে আনন্দ, মুক্তির স্বাদ আর কিছু কিছু অলৌকিক অভিজ্ঞতা আর চেতনাও তাঁর হয়েছে। গোলাপ-লক্ষ্মী-যোগেন-নিকুঞ্জদেবী কাছে থাকায়, নিঃসঙ্গতার অনুভব যেমন তীব্র হয়নি, তেমনই একটু একটু করে ‘তাঁর’ অলৌকিক সঙ্গলাভের অনুভূতিও টের পেতে শুরু করেছিলেন। বিশেষ করে শোকের মুহূর্তগুলোতেই যেন তিনি দেখা দিয়ে আশ্বস্ত করে যেতেন। তা ছাড়া রেলগাড়ি থেকেই পাশের বগিতে ছেলেরা ছিল। কালী-যোগীন আর লাটু। দূরের যাত্রায় মানুষের সঙ্গ কীরকম কাজে লাগে সারদা বুঝেছেন।

হাওড়া থেকে রওনা হয়ে পরের দিন সকালেই দেওঘরে নেমে বৈদ্যনাথের মন্দির দর্শন করেছিলেন। আবার বিকেলের গাড়িতে চললেন বারাণসীর উদ্দেশে। চক্ষু সার্থক করলেন বিশ্বনাথ-অন্নপূর্ণার মন্দির দেখে আর বেণীমাধবের ধ্বজায় উঠে। সাত আট দিন ছিলেন। কেমন একটা ভাবাবেশে যেন বিভোর হয়ে যেতেন বিশ্বনাথের আরতি দেখতে দেখতে। একদিন সবাই মিলে উলঙ্গ স্বামী ভাস্করানন্দকেও দর্শন করে এলেন। মনে হয়েছিল, সত্যি কী নির্বিকারচিত্ত মহাপুরুষ, শীতগ্রীষ্ম সব ঋতুতেই সমান উলঙ্গ হয়ে বসে আছেন। কাশী থেকেই গেলেন রামচন্দ্রের লীলাভূমি অযযাধ্যা দেখতে। এই সব তীর্থধামই ঠাকুর ঘুরে গিয়েছিলেন তাঁর ভক্তশিষ্য আর তৎকালীন রসদদারের সঙ্গে। সারদার তখন আসতে কিংবা দর্শনের আকাঙ্ক্ষা ছিল না তা নয়। কিন্তু ঠাকুরের সম্মতির প্রশ্নে যেন কোথায় একটা বাধা ছিল। আর সেটুকু অনুমান করেই আত্মসচেতনতায় সমৃদ্ধ সারদা নিজের ভূমিকা গৌণ করে রেখেছিলেন। আজ তিনি নেই, কিন্তু বারবার অন্তরে তাঁর উপস্থিতি অনুভূত হলেই বেদনায় উদ্বেল হন সারদা।

অযোধ্যা থেকে বৃন্দাবনের পথেই গাড়ির মধ্যে সেই প্রথমবার অলৌকিকভাবে ঠাকুরের দর্শন পেয়েছিলেন সারদা।

গাড়ির দুলুনিতে ঝিমোচ্ছে সবাই। জানালার ওপর হাত রেখে মাথা এলিয়ে দিয়েছিলেন সারদাও। খেয়াল ছিল না, সোনায় বাঁধানো ঠাকুরের ইষ্টকবচটি বাঁধা রয়েছে তাঁর বাহুতে।

হঠাৎ যেন শুনলেন হাওয়ার সঙ্গে ভেসে আসছে তাঁরই কণ্ঠস্বর।

হ্যাঁ গো, কবচটা যে অমনভাবে হাতে বেঁধে সঙ্গে সঙ্গে রেখেছ—দেখো যেন হারিয়ে ফেলো না।

চমকে উঠে তাকালেন সারদা। নাহ, কেউ তো নেই! তাহলে তাঁর গলা শুনলেন কী করে! জানালার বাইরে ছুটে চলেছে দূরের গাছপালা।

যা বোঝার নিজেই বুঝলেন। কাউকে কিছু বললেন না। শুধু কবচটি হাত থেকে খুলে নিরাপদ বাক্সে রেখে দিলেন।

বৃন্দাবনে যখন পৌঁছলেন, ভাদ্রমাস শেষ হয়ে এসেছে। বর্ষার শেষে নিবিড় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরে উঠেছে মধ্য ভারতের উত্তরাঞ্চলটি। গাছে গাছে সবুজ পাতার মেলা, উন্মুক্ত প্রান্তরে তরুণ তৃণের সবুজ সতেজ উদ্ভাস। দূরে নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াচ্ছে মৃগ পরিবার। কোথাও পেখম মেলেছে ময়ূর। নধর গাভী চোখ বুজে জাবর কাটছে। এই সেই ব্রজভূমি! বিরহিণী রাধার নিকুঞ্জ কানন! ব্রজরাজের স্মৃতি বিজড়িত লীলাস্থল।

কী এক অপার সুখের বেদনাই যেন নিভৃতে নীরবে হাহাকার করে উঠেছিল সারদার মনে প্রাণে।

আর বলরামদের কালাবাবুর কুঞ্জে প্রবেশ করতে না-করতেই দীর্ঘ কয়েক মাস পরে আন্তরিক প্রীতিস্নিগ্ধ যোগীনমাকে দেখেই যেন সেই হাহাকার শোকের উচ্ছ্বাসে ভেঙে পড়েছিল। যোগেন গো—বলেই ভেসে গিয়েছিলেন অশ্রুর প্লাবনে।

কিন্তু সংযমের বাঁধনে নিজেকে নিয়ন্ত্রণও করেছিলেন দ্রুত।

তীর্থক্ষেত্রে তোক অথবা বিয়োগ ব্যথার পরে চিত্ত প্রশান্তির জন্য আসা, যাই হোক, আসলে তিনি আতিথ্য গ্রহণ করেছেন। কালাবাবুর কুঞ্জে তিনি মাননীয়া অতিথি। আবেগের শিথিলতা তাঁকে শোভা পায় না। বরং এই শান্ত প্রকৃতির সান্নিধ্যে পুরাণের শ্রীরাধিকার মতোই বিহ্বলচিত্তে সেই মানুষটাকে স্মরণ করবেন সারদা। বৈরাগ্যের সাধনায় তন্ময় থেকে তাঁকে অনুভব করবেন।

একই সঙ্গে আনন্দে আধ্যাত্মিক উপলব্ধিতে আর মানসিক বিকাশ ও প্রসারতায় নিত্যনতুন জীবনের বিভিন্ন দিগন্ত উন্মোচিত হয়ে চলেছিল সারদার চোখ ও মনের সামনে। জয়রামবাটি-কামারপুকুর কিংবা কলকাতায় তেত্রিশ বছর ধরে জীবনযাপনের যে সীমাবদ্ধতা ক্রমশ গড়ে উঠেছিল, অকস্মাৎ যেন সীমানা অতিক্রম করে জীবন ও জগতের এক বৃহত্তর ক্ষেত্রে উপনীত হলেন সারদা। উন্মুক্ত প্রকৃতি, বিভিন্ন ভাষাভাষীর মানুষ, অন্যতর সাংস্কৃতিক পরিবেশ এবং আবহে প্রতিদিন নিজেকে আবিষ্কার করতে লাগলেন নতুন ভাবে। শুধু চোখের দেখা নয়, জীবনকে জানতে হলে দেখার চোখ উন্মীলিত হওয়া দরকার। মুক্তির স্বাদের সঙ্গে সঙ্গে বহুবিধ অভিজ্ঞতা আর চেতনায় সমৃদ্ধ হয়ে উঠছেন সারদা।

একটি নতুনতর দায়িত্বভার সংযোজিত হল সারদার জীবনে বৃন্দাবনে থাকাকালীন।

মানুষকে বিশ্বাস ও শান্তির পথে চালনা করার জন্য কোনও একটি দিশা দেখানোর প্রয়াস। অস্থির-উদ্বেল, ব্যস্ত-ক্লান্ত, অসুখী-অবিশ্বাসী মানবচিত্তকে একটি স্নিগ্ধতার পরশে সঞ্জীবিত করবেন সারদা। অধ্যবসায়-উদারতা-সংযম আর সমর্পণে স্থিতধী হওয়ার বার্তা দেবেন, নিজস্ব প্রেরণা, প্রীতি আর উপলব্ধি থেকে। দীক্ষাদান, বীজমন্ত্র যা-ই বলা হোক, মানুষের এই সেবাকর্মটি সারদা করবেন আপন চৈতন্য থেকে উৎসারিত আলোয়।

প্রাথমিকভাবে কিঞ্চিৎ সংকোচের বোধ আর বাধা যে হল না তা নয়।

আত্মসমালোচনাও করলেন, অন্যদের বক্র ভাবনা মানসিকতার কথাও ভাবলেন।

কেউ কেউ তো বলতেই পারে, মা এর মধ্যে দীক্ষা-টিক্ষা দিয়ে শিষ্য করতে শুরু করে দিলেন। আধ্যাত্মিক চেতনা, জ্ঞানগম্যি কতটাই বা আছে তাঁর।

সময় নিলেন সারদা। চিন্তা করলেন। তারপর স্থির নিশ্চিত হলেন ঠাকুরের একটি অলৌকিক বার্তা আর আশ্বাস পেয়ে।

ঠিকই কথা, আকারে ইঙ্গিতে, অসূয়া আর শ্লেষে কেউ কেউ ঠোঁট ওলটায়, তির্যক দৃষ্টি দিয়ে সততা, গুণের বিচার করে। করতেই পারে। সীমাবদ্ধ এলাকার মধ্যে যাপিত আত্মকেন্দ্রিক মনন, অসূয়া আর বিরূপ সমালোচনাকেই হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। এমনকী ‘নিজের নাক কেটে অপরের যাত্রাভঙ্গ’ করার জন্যও কসুর করে না। ওসব প্রবণতাও মনুষ্য চরিত্রেরই বৈশিষ্ট্য। কাজের মানুষ তা নিয়ে বসে থাকে না।

একটি নিবিড় উপলব্ধিতে, ভাবাবস্থায়, কাছের মানুষ যোগীনকেই প্রথম দীক্ষা দিলেন সারদা। তিনি হলেন যোগীন মহারাজ, স্বামী যোগানন্দ। মায়ের প্রথম মন্ত্রশিষ্য। তাপিত মানুষকে উত্তরণের দিশা দেখাতে, সারদার জীবনে নিভৃতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হল। শোকানুভূতিও একটি অন্যরকম মাত্রা পেল।

ভালমন্দ মাঝারি নানান সংবাদ পান সারদা মাঝেমাঝে, কখনও কলকাতা, কখনও কামারপুকুর, জয়রামবাটি থেকে। উড়ো খবরের বিশ্বাসযোগ্যতা সম্বন্ধেও সবসময় নিশ্চিত হতে পারেন না। তবে এটুকু মনে রাখেন, সুসংবাদ ভুল বা অসত্য, অর্ধসত্য কিংবা অতিরঞ্জিত হলেও, অধিকাংশ দুঃসংবাদই সত্য হয়। কানাঘুষো শুনলেও, খারাপ খবরের প্রায়ই একটা বাস্তবতা থাকে।

যোগীনমা, শ্ৰীমতী যোগীন্দ্রমোহিনী বিশ্বাস, সারদার জয়া তথা মেয়ে-যোগীনের মুখ থেকে এহেন একটি নেতিবাচক সংবাদ শুনে, সম্পূর্ণ অবিশ্বাস করতে পারলেন না সারদা। বিশ্বাস করতে চাইছিলেন না, কিন্তু যোগীনমার বিবেচনা এবং বুদ্ধিমত্তার ওপর তাঁর আস্থা আছে বলেই, অবিশ্বাস করতে দ্বিধা হল। কেননা যোগীনমা তাঁর ঘনিষ্ঠ আপনজনদের অন্যতমা। ঠাকুর বলতেন, ও কুঁড়িফুল নয় যে, একটুতেই ফুটে যাবে। ও যে সহস্রদল পদ্ম! ধীরে ধীরে ফুটবে। সত্যিই যোগীনমা তাই। খড়দার ধনাঢ্য জমিদার অম্বিকাচরণ বিশ্বাসের স্ত্রী হয়েও, দুঃখে কষ্টে নির্যাতনে বীতশ্রদ্ধ হয়ে যোগীন্দ্রমোহিনী সংসার ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন প্রথমে বাগবাজারের বাপের বাড়িতে, অতঃপর দক্ষিণেশ্বরে। প্রাথমিকভাবে সারদাকে যদিও তিনি নেহাত সাধারণ সংসারে আবদ্ধ মহিলা বলেই মনে করেছিলেন, কিন্তু অচিরেই তাঁর মধ্যে দিব্য করুণা আর মাতৃহৃদয়ের সন্ধান পেয়েছিলেন। অতঃপর চিরকালের জন্যই সারদার পদতলে নিজেকে নিবেদন করেছিলেন।

বরাবরই সারদার চুল বেঁধে দিতেন যোগীনমা। সেদিনও দিচ্ছিলেন।

আকাশ বাতাসে পরিবর্তন এসেছে ইতিমধ্যে। শরতের গোড়ায় এসেছিলেন, যদিও তখনই বৃন্দাবনে পৌঁছাননি। মাসখানেক প্রায় চলে গিয়েছিল বারাণসী-অযোধ্যা ঘুরে আসতে আসতে। তাহলেও ইতিমধ্যে তিনটি ঋতু প্রায় অতিক্রান্ত। শরতের শেষদিক থেকেই উত্তর ভারতে হিমেল হাওয়া বইতে থাকে, তারপর শীত আসার প্রস্তুতি চলে কিছুদিন ধরে। গাছে গাছে পাতার বর্ণ পরিবর্তন হয়। আপাতদৃষ্টিতে রঙিন দেখালেও, আসলে তা সবুজ-হারানো স্বাস্থ্যহীনতায় অনুজ্জ্বল বাদামি-কমলা রং, বোঝা যায় ঝরার সংকেত, পত্রহীন হওয়ার দিন সমাগত।

শুষ্ক, নিষ্পত্র হয়ে গেল প্রকৃতি। উত্তুরে হাওয়ার কনকনানিতে কাঁপতে থাকে গাছের শীর্ণ শাখাপ্রশাখা। ভোরের শিশির যেন জমাট বেঁধে থাকে তৃণাচ্ছাদিত প্রান্তরে। প্রকৃতির ঘুম ভাঙে দেরিতে, ওদিকে আলো কমে আসে বিকেল না গড়াতেই। উত্তর ভারতের শীতের অভিজ্ঞতা এই প্রথম সারদার। শুনেছিলেন ভীষণ ঠান্ডা, কিন্তু তাঁর জন্য যে ঘরে অগ্নিকুণ্ড জ্বালিয়ে রাখতে হয়, এতটা ভাবেননি। বাইরে বেরুলেই মনে হয় ঠান্ডায় জমে যাবেন বুঝি। এমনকিছু শীতবস্ত্রও কোনওদিন ব্যবহার করেননি, নেইও। ঘোরা-বেড়াননা স্বাভাবিকভাবেই কমে গেল।

কিন্তু প্রকৃতির নিয়মই পরিবর্তন। শীতে কুঁকড়ে থাকার দিনও একসময় ফুরিয়ে গেল। জীবনের স্পন্দন আর সবুজের উদ্ভাস নিয়ে সেজে উঠতে লাগল প্রকৃতি। গাছে গাছে কিশলয়ের উদগম, ফুলে ফুলে ছয়লাপ হয়ে গেল বৃন্দাবন বসন্ত সমাগমে। নীড় ছেড়ে বেরিয়েছে বিহঙ্গকুল। হিমালয় ছুঁয়ে আসা বাতাস গতি আর দিক পরিবর্তন করেছে। দখিনা বাতাস এখন ঝিরঝিরোচ্ছে মধুমাসে।

কালাকুঞ্জ অতিথি নিবাসের বারান্দায় বসেছিলেন সারদা। পিছনে বসে চিরুনি দিয়ে চুলের জট ছাড়িয়ে দিচ্ছিলেন যোগীনমা। বিকেলের আলোয় গাছের ছায়া লম্বা হয়ে পড়েছে সামনের বাগানে। মালি জল দিচ্ছে ফুলগাছে। লক্ষ্মী যদিও তীর্থযাত্রীদের দলের সঙ্গে এসেছে, কিন্তু সেই অর্থে তীর্থ করতে আসার মতো তাঁর বয়স হয়নি। তাহলেও বদ্ধ জীবনের বাইরে মুক্তির আনন্দে অতিথি নিবাসের নানান কাজকর্মে লক্ষ্মী নিজেকে যুক্ত রাখে।

কিছু যেন ভাবতে ভাবতেই সারদা হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, যোগীন কলকাতার খবর-টবর কিছু পাও?

যোগীনমা চুল আঁচড়ে দিতে দিতে বললেন, তেমন কিছু নয় মা। তবে কালেভদ্রে এখানে তো আমার বাপের বাড়ির জ্ঞাতিগুষ্টির কেউ কেউ হাজির হয়। আবার মাস্টারের চেনাজানা দু’-একজনও তীর্থ-টির্থ করতে আসে। তাদের কাছেই যা একটু আধটু শুনি।

বোধহয় মাস্টারমশায়ের নামেই তাঁর স্ত্রীর কথা মনে পড়ল সারদার।

নিকুঞ্জদেবী মানুষটি ভক্তিমতী এবং সারদা অন্ত প্রাণ। এই তীর্থযাত্রাতেও তিনি সামিল হয়েছিলেন একেবারে প্রথম থেকে। কিন্তু প্রবল জ্বর এবং অসুস্থতায় শেষ পর্যন্ত তাঁকে কলকাতা ফিরে যেতে হয়েছে। খুবই নিঃসঙ্গ বোধ করেছিলেন তখন সারদা।

এখন মনে পড়ায় জিজ্ঞাসা করলেন, নিকুঞ্জ বউমার খবর কিছু শুনেছ?

যোগীনমা বললেন, তাঁর খবর তো পুজোর কিছুদিন পরেই পেয়েছিলাম। ম্যালেরিয়াই হয়েছিল।

ওহ্ সে কি ধূম জ্বর! সারদা বললেন, ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে দাঁত কপাটি লেগে যাচ্ছে। আবার জ্বর ছাড়লেই ভাল মানুষ।

কলকাতা পাঠিয়ে দিয়ে খুব ভাল করেছিলে মা।

এখন তাই ভাবি। এসব বিদেশ বিভুঁই-এও যে ম্যালেরিয়া হয়, তা কি তখন জানতুম!

বলা যায় না, হয়তো কলকাতা থেকেই মশার কামড় খেয়ে বেরিয়েছিল।

সারদা বললেন, হতেই পারে। সামান্য মশা মানুষের কী বিপদ ঘটায় বলো!

যোগীনমা বললেন, তবু তো মা সাহেবরা কুইনিন আবিষ্কার করেছিল তাই রক্ষে। নয়তো মা-দিদিমার মুখে শুনেছি, আগে আগে নাকি ম্যালেরিয়া বসন্তে গ্রাম-কে-গ্রাম উজাড় হয়ে যেত।

বড় শখ করে বউমা এবার তীর্থ করতে বেরিয়েছিল। সারদা বললেন। কিন্তু কপালে না থাকলে কী হবে! মাসখানেকের আগেই ফিরতে হল। তবু কী ভাগ্যিস কালী সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পেরেছিল।

তাই তো বলি মা, ছেলেরাই ভরসা। যোগীনমা বললেন, এই যে গতমাসে রামবাবুর বিপদ শুনে হুট বলতে লাটুকে কলকাতায় পাঠালে, অন্য কেউ হলে যেত?

বাস্তবিকই তাই। সপ্তাহ দুয়েক আগে তীর্থযাত্রা অসম্পূর্ণ রেখেই লাটু কলকাতা ফিরে গেছে সারদার অনুরোধে।

সারদা ঠিকই বুঝতেন, গৃহীশিষ্যদের অনেকেই তাঁর স্বামীকে অবতার বা ততোধিক বলে মনে করলেও, তাঁর ভূমিকাকে কখনওই সাধারণ একজন গ্রাম্য বউ ছাড়া আর কিছু ভাবতেন না। সারদা দোষ দেন না। মানুষের দোষ দেখা তাঁর স্বভাবও না। গৃহী শিষ্যদের কাছ থেকে তিনি কিছু আশাও করতেন না। কিন্তু ঠাকুরকে তারা যেভাবে দেখাশুনা করতেন, সেই কৃতজ্ঞতাবশত তাঁদের তিনি আপনজন জ্ঞান করতেন। ডাক্তার রামচন্দ্র দত্ত তেমনই একজন গৃহীশিষ্য ঠাকুরের। ডাক্তার হয়েও তিনি অবশ্য ডাক্তারি করতেন না। সাধন ভজন আর তাঁর কাঁকুড়গাছির যোগোদ্যান নিয়ে থাকেন। ঠাকুর দেহ রাখার পরে সারদা সম্পর্কে তাঁর উদাসীনতায় বেদনায় বিদ্ধ হলেও, সারদা কখনও তা প্রকাশ করেননি। আপনজনই ভেবে এসেছেন বরাবর।

তীর্থযাত্রার মাঝামাঝি সময়েই খবর পেলেন, রামচন্দ্রর একটি কন্যা অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যু বরণ করেছে। কষ্টে যন্ত্রণায় স্থির থাকতে পারলেন না সারদা। ভাবলেন, যে যাওয়ার সে তো গেলই, কিন্তু এই শোকের সময় ভক্ত রামবাবু মানুষটির কী অবস্থা! দেখাশোনার জন্য কারওর কি কাছে থাকা উচিত না! লাটুকে বরাবরই একটু অন্যরকম স্নেহের দৃষ্টিতে দেখেন সারদা। আচরণে কিঞ্চিৎ উদাসীন, ছেলেমানুষ গোছের ভাব লাটুর, কিন্তু ভালবাসায় গভীর। একবারের বেশি দু’বার বলতে হল না, লাটু বোঁচকা নিয়ে রওনা হয়ে গেল কলকাতায়, রামবাবুর পাশে দাঁড়ানোর জন্য।

যোগীনমাকে সারদা বললেন, ঠিকই বলেছ যোগেন, ঠাকুর যা বলতেন—ছেলে নয়, এরা সত্যি এক একটি রত্ন।

অথচ দ্যাখো মা, তোমার নিজের পরিবারের যে ছেলে, এখন সে-ই কিনা…!

কথাটা বলতে বলতে থেমে গেলেন যোগীনমা। বোধহয় বলা উচিত হবে কিনা ভাবলেন।

সারদা কিছু জানেন না। একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কার কথা বলছ যোগেন? কী হয়েছে?

যোগীনমা আমতা আমতা করে বললেন, তোমার ভাশুরের ছেলে রামলালের কথা বলছিলুম.. মানে তুমি কিছু শোনোনি বোধহয়?

না তো! কী হয়েছে, কী করেছে রামলাল?

ইতস্তত করলেন যোগীনমা। বললেন, তুমি ফিরে গিয়ে শুনবে মা। কানে এল বলেই..শুনে পর্যন্ত মনটা বড় বিষিয়ে রয়েছে।

খুব আহ্লাদের খবর নয় বুঝতে পারছি। জমিয়ে রেখো না, বলে ফ্যালো। খারাপ খবরের জন্য আমায় এখন তৈরি থাকতে হবে। সারদা বললেন।

যোগীনমা সারদার চুল বাঁধতে বাঁধতে সংকোচ নিয়েই বললেন, শোনা কথা মা। রানিমা-র নাতি ত্রৈলোক্য বিশ্বাস দক্ষিণেশ্বর মন্দির থেকে তোমায় মাসে মাসে সাতটি করে টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা করে গেছেন জানি।

সারদা বললেন, হ্যাঁ, তাঁর সময় থেকেই ও ব্যবস্থা চালু আছে।

শুনলুম মা, দীনু খাজাঞ্চি আর রামলাল নাকি সেটা বন্ধ করার চেষ্টা করছে।

সারদা স্তব্ধ হয়ে গেলেন। একে একে নিবিছে দেউটি। একটু পরে শুধু বললেন, যা করার করুক। ঠাকুরই চলে গেলেন… আর টাকা! দেখা যাক। মুখে আর কিছু প্রকাশ করলেন না। অদূর ভবিষ্যতের একটি হতাশ করুণ ছবি মনে মনে কল্পনা করলেন। নিঃশব্দ হয়ে রইলেন।

তীর্থযাত্রায় এসে বিলাপ করা শোভা পায় না। সারদার মানসিক গঠনও তেমন না। প্রায় শূন্য থেকে যাঁর জীবনের যাত্রা শুরু, তাঁর আর হারানোর ভয় কী! বাকি দিনগুলোয় নিজের মনকে সাংসারিক এবং ব্যক্তিগত অনিশ্চয়তার ভাবনা থেকে উর্ধ্বে রাখার চেষ্টা করলেন।

বৃন্দাবন পরিক্রমা শেষ করলেন। জয়পুর দেখে, আজমির হয়ে পুষ্করেও গেলেন। পায়ে বাতের ব্যথা শুরু হয়েছে, তবু কষ্ট করে উঠলেন সাবিত্রী পাহাড়ে। গেলেন হরিদ্বার, স্নান করলেন ব্রহ্মকুণ্ডে। ঠাকুরের কেশ নিক্ষেপ করলেন ব্রহ্মকুণ্ডের জলে। ফেরার সময় হয়ে আসছে। বছর ঘুরতে চলল। প্রয়াগ দর্শন করলেন। লক্ষ্মীর আচরণে মাঝে মধ্যে কিঞ্চিৎ অস্থিরতার প্রকাশ দেখেও নীরব ছিলেন সারদা। তাই প্রয়াগে যখন লক্ষ্মী মস্তকমুন্ডন করল, তখনও তিনি চুপ করেই রইলেন।

কলকাতায় বলরামবাবুর বাড়িতে ফিরে এসেই মনে হয়েছিল, সত্যি একটি বছর যেন ঘোরের মধ্যেই কেটে গেছে। এবং বাস্তবের মাটিতে পা দেওয়ার সময় আসন্ন। মাত্রই পক্ষকাল রইলেন। তাঁর মধ্যেই টের পেয়ে গেলেন, এক বছর আগে যেখান থেকে তীর্থযাত্রা শুরু করেছিলেন, এবার তাঁর থেকেও কয়েক ধাপ নীচে নেমে বাস্তব জীবনের কাঠিন্যের মুখোমুখি হতে হবে।

সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করেননি সারদা। কামারপুকুরেই ফিরে যাবেন।

প্রথম মৃদু আঘাতটাই পেয়েছিলেন লক্ষ্মীর মনোভাব পরিবর্তনে। লক্ষ্মী যাবে না। তার দাদা রামলালই এখন দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দিরের পূজারী। ঠাকুরই অসুস্থ হওয়ার আগে বসিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন। লক্ষ্মী গিয়ে থাকবে দক্ষিণেশ্বরে। কোন পরিচয়ে গিয়ে থাকবে? রামলালেরই বা কী পরিচয়?

নিজেকে নিয়ন্ত্রণে, সহ্যে বাঁধলেন সারদা। মন ছোট করবেন না।

আবারও আঘাত। যোগীনমা বৃন্দাবনে সঠিক সংবাদই দিয়েছিলেন। দীনু খাজাঞ্চি, রামলাল মাসিক সাতটাকা বন্ধ করার চূড়ান্ত উদ্যোগই নিয়েছে; আঘাত হচ্ছে—লক্ষ্মী তা সমর্থন করছে। ছেলেদের সঙ্গে দেখা হল না সারদার। কিন্তু কানে এসেছে, টাকা বন্ধের খবরে বুক ভেঙে গেছে নরেনের। হতাশায় উদ্বেগে দীর্ণ সে। কিন্তু এই মুহূর্তে তার হাত পা বাঁধা। মঠ আর সঙেঘর অঙ্কুরটি বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টায় তাঁর অবস্থাও হা-টাকা, জো-টাকা। মায়ের সামান্য ক’টি টাকার জন্য তাঁর অনুরোধে কেউ কর্ণপাত করেনি।

কোথাও একটা নিবিড় স্বস্তির অনুভবও ছিল সারদার। নরেন আছে। ছেলেরা হাল ছাড়েনি। তিনিও সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবেন না। শ্বশুরের ভিটেতেই ফিরে যাবেন।

অনেকক্ষণ পরে যোগীনের গলা পেয়ে সম্বিত ফিরল সারদার।

মা, গাড়ি বর্ধমানে ঢুকছে। আমাদের নামতে হবে।

সামান্য চমকেই মুখ ফেরালেন সারদা। ঘুমোননি। তাহলেও অন্য জগতে চলে গিয়েছিলেন। কতক্ষণ সময় পার হয়েছে। চারপাশ খেয়াল করে দেখলেন, তাইতো, গ্রাম বাংলার সবুজ মাঠঘাট শেষ হয়ে কখন যেন শহরতলির নাগরিক সভ্যতার ছোঁয়া লেগেছে রেললাইনের দু’ধারে, ঘরবাড়ি দোকানপাট দেখা যাচ্ছে। গাড়ির গতিও কমে এসেছে। গোলাপমা উঠে পড়েছেন।

মিনিট দুয়েকের মধ্যে প্ল্যাটফর্ম এসে গেল। ব্যস্ত জংশন স্টেশন বর্ধমান। খাবার-দাবারের হকার ছাড়া এই দুপুরে অবশ্য ব্যাপারিদেরই ভিড় বেশি। ধান চালের বস্তা ছড়ানো চারিধারে। গুমোট গরম, মাছি ভনভন করছে। ফটকে টিকিট দেখিয়ে বেরিয়ে আসার পরেই অবশ্য হইচই আর ব্যস্ততাও কমে গেল। কয়েকটা গোরুর গাড়ি আর ছ্যাকরা ঘোড়ার গাড়ি দাঁড়িয়েছিল স্টেশনের গা ঘেঁষে। সারদাদের দেখেই গাড়োয়ান বা সহিস বোধহয় বুঝেছিল তাঁরা সওয়ারি হবেন না। এগিয়ে ডাকতে আসেনি।

দক্ষিণ পশ্চিম কোণ বরাবর উচালনের পথে হাঁটতে শুরু করল তিনজনের ছোট দলটি। সারদা আর গোলাপমা দু’জনের হাতেই ছোট ছোট দু’খানা কাপড়ের পুঁটলি। সামান্য আগে যোগেন, তাঁর হাতে একটি ছোট টিনের বাক্স আর ছাতা। আপাতত গন্তব্য দামোদরের ঘাট। বেশিক্ষণের পথ নয়। কিন্তু নৌকোয় নদী পেরিয়ে উচালনের চটিতে পৌঁছাতে দিন পড়ে আসবে সন্দেহ নেই।

যোগীনের কথাতেও তারই আভাস পাওয়া গেল। সামনে থেকে মুখ ঘুরিয়ে যোগীন বলল, মা, দামোদর পেরুবার পর একটু পা চালিয়ে হাঁটলে মনে হয় অন্ধকার নামার আগে উচালন পৌঁছে যাব।

সারদা চুপ করে রইলেন। গোলাপমা বললেন, চলো বাবা, আগে ভালয় ভালয় নদীটা পার হয়ে যাই। ভরা ভাদ্রের দামোদর এখন, জল ফুঁসছে।

যোগীন বলল, ঠাকুর আমাদের সঙ্গে আছেন মা, ভাববেন না।

সেই ভরসাতেই তো আসা বাবা। গোলাপমা বললেন, একবার চটিতে পৌঁছে গেলে চাট্টি চালডাল যাহোক করে ফুটিয়ে নেব।

ব্যবস্থা সঙ্গে এনেছেন, নাকি কোনো দোকান থেকে…?

এসময়ে চালডাল ছাড়া কি পথে বেরুতে আছে বাবা! তোমার টিনের বাক্সটা কি এমনিতে ভারী হয়েছে? চাল-ডাল, নুন-তেল, মায় বলরাম- বাড়ির পরমানন্দ দু’-চারটে মশলাও নাকি ওর মধ্যে দিয়ে দিয়েছে।

যোগীন বেশ ভোলা মনে হাসল। বলল, যাক মা, আমার স্যুটকেসটা অন্তত একটা ভাল কাজে লাগল।

গোলাপও হেসে বললেন, বৃষ্টির কথা মাথায় রেখেই… তা নয়তো আর…

নিঃশব্দে হেঁটে চলেছেন সারদা। নানান কথা-ঘটনা-স্মৃতির টানাপোড়েন তাঁর মধ্যে এখনও। বিশেষ করে তাঁর মনে বিঁধছে লক্ষ্মী আর রামলালের আচরণ। বউ হয়ে কামারপুকুর আসার পর, কত বছর তিনিই দেখেছেন ভাশুরের এই ছেলেমেয়েকে। তেরো বছর বয়েসে যখন একটু বড় হয়ে আবার এসেছিলেন, লক্ষ্মী তখন মোটে আড়াই তিন বছরের মেয়ে। সারাক্ষণ ছোট্ট খুড়িমার আঁচল ধরে গুটগুট করে ঘুরত। শীতের সকালে ঢুকে পড়ত সারদার বিছানায়, কাঁথার ভিতরে। তখন থেকেই কী টকর-টকর কথা মেয়ের! শিবুর বয়েস তখন একবছরও হয়নি। তারপর থেকে একটু একটু করে সকলেরই তো তিনি একটা হিল্লে করে দিলেন। সেই মথুরবাবুর আমল থেকে শম্ভুচরণ ত্রৈলোক্য যে যখন তাঁর রসদদার, তাঁদেরই বলে কয়ে ভাইপো-ভাইঝিদের কাজ, থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। সে মানুষটা না থাকলে, আজ তোরা মৌরসি পাট্টা গেড়ে দক্ষিণেশ্বরে থাকতে পারতিস!

অন্তত লক্ষ্মী যে তীর্থ থেকে ফিরে এসে তাঁর সঙ্গে কামারপুকুরে এসে থাকবে, এ বিশ্বাসটুকু সারদার ছিল। কিন্তু সুযোগ সুবিধে বুঝে সে-ও কিনা সাঁট করল দাদার সঙ্গে। এমনকী নিঃস্ব খুড়িমার সামান্য সাতটি করে টাকা বন্ধ করার জন্য তুই গলা মেলালি ওদের সঙ্গে! নরেনরা বলার পরেও একবার মনে হল না—গ্রামের বাড়িতে কপর্দকশূন্য অবস্থায় একা মানুষটার কীভাবে চলবে! কী খেয়ে বাঁচবে!

সারদা জানেন, মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ। তবু প্রাণে বড় বেজেছে। কে জানে, কালের বেদনা, মহাকালের পটে কোনওদিন আঁকা হবে কিনা! হলেও, মায়ের চোখে। আজকের শুকনো জলের রেখা কি দেখা যাবে!

ঘোমটার আড়ালে নিজেকে সম্বরণ করে হেঁটে যান সারদা।

পরের দিন সকালে ভাদ্রের রোদ চড়া হওয়ার আগেই তিনজন কামারপুকুর পৌঁছে গেলেন।

গতকাল দামোদর পার হতে কোনো অঘটন ঘটেনি। তবে তারপরেও উচালন পর্যন্ত আড়াই তিন ক্রোশ পথ হাঁটতে ক্ষুধায় ক্লান্তিতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত আর যেন শরীর চলছিল না। আকাশে মেঘ জমায় আঁধার ঘনিয়ে এসেছিল। তবে চটিতে পৌঁছে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন গোলাপমা। দু’-চারটে মাটির হাঁড়ি-কলসি-মালসা চটিতে রাখা থাকে। একটা পাতকুয়োও ছিল। যোগীন কাঠকুটো জোগাড় করল। চটপট হাত চালিয়ে গরম গরম খিচুড়ি বানিয়ে ফেললেন গোলাপমা। খেয়ে যেন ধড়ে প্রাণ এল সারদার। বলেই ফেললেন, ও গোলাপ, তুমি কি অমৃতই রেঁধেছ গো আজ!

চাটাই পেতে শুয়ে পড়েছিলেন খাওয়া সেরে। দরজার বাইরে বারান্দায় শুয়েছিল যোগীন। ঘুম আসতে দেরি হয়নি কারওর।

ভোর ভোর আবার বেরিয়ে পড়েছিলেন তিনজনা। পাকুরিয়া কুমারগঞ্জ-মন্ডলঘাট হয়ে কামারপুকুর ঢুকেছিলেন তাপ বেশি বাড়ার আগেই। কিন্তু হাটতলা-ঠাকুরবাড়ি-বুড়ো শিবের মন্দির-দোকানপাট পার হয়ে আসতে আসতে সারদা টের পেলেন, অন্যরকম কী যেন এক শূন্যতা আর আবেগের জল ঝরছে নিঃসাড়ে আজ তাঁর বুকের মধ্যে। একটু দূর থেকে সেই হালদার পুকুরের জল আর তালগাছ চোখে পড়তেই নীরবে দু’চোখ ভেসে গেল সারদার। এ এক নতুনতর শূন্যতার বেদনা, চেনাজানা পরিবেশে উদ্বেল হয়ে উঠতে চাইল।

নিজেকে সামলে নিয়ে এগোলেন সারদা। হালুইকরদের দোকানগুলো এসে পড়েছে। ওই তো লাহাবাবুদের দালানকোঠা আর মন্দিরের মাথা দেখা যাচ্ছে। তালগাছের ছায়া পড়েছে পুকুরের জলে। হ্যাঁ বাড়িতে ঢোকার মুখে সেই বেলগাছ।.. কিন্তু সব যেন কেমন ফাঁকা ফাঁকা। লোকজন যেন কমে গেছে কামারপুকুরে!

এবার অনেকদিন পরে এলেন সারদা স্বামী-শ্বশুরের ভিটেবাড়িতে। দক্ষিণেশ্বরে থাকতে শুরু করার পরে আসা যাওয়া অনেক কমে গিয়েছিল। তাহলেও মা-ভাইদের টানে জয়রামবাটি আসতেই হত মাঝেমাঝে। তখনই ঘুরে যেতেন একদিন। তারপর অবশ্য একটু একটু করে সকলেই তো পাততাড়ি গুটিয়ে হাজির হল দক্ষিণেশ্বরে। ঠাকুর অসুস্থ হওয়ার পরে সারদার তো আর ঠাঁইনাড়া হওয়ারই প্রশ্ন ছিল না।

ইতিমধ্যে নানান পরিবর্তনও ঘটেছে যেন বাড়ির চেহারায়। রাস্তা থেকে বাঁ হাতে ঢুকলে পাঁচিলের এপাশ আর ওপাশে ছিল অন্দরমহল আর বহির্বাটি। বহির্বাটি মানে রাস্তার ওপরেই পাশাপাশি তিনখানা ঘর, তারই পুবদিকেরটা, যাকে বলে, বৈঠকখানা। সারদার মনে আছে যোগেশ্বরী ভৈরবীমা যেবার কামারপুকুরে এসেছিলেন, তখন ওই ঘরেই অনেক জনসমাগম হত। অন্দরমহল কিংবা ভিতরবাড়ির মাঝখানের বড় ঘরটা ছিল ভাশুর রামেশ্বরের। তিনি দেহরাখার পরে রামলাল সংস্কার করেছে ঘরটার। মাঝেমাঝে ওরা দক্ষিণেশ্বর থেকে কামারপুকুরে আসে। হয়তো দখল রাখার জন্যই আসে এবং কয়েকদিন থেকে নিজেদের অধিকার জানান দিয়ে যায়।

আপাতত কেউ নেই বাড়িতে। নিজেকেই যেন বহিরাগত মনে হল সারদার।

পাঁচিলের মাঝখানে টিনের দরজা ঠেলে ভিতরে গেলেন সারদা। রামলালদের ঘরের পশ্চিমে এবং গৃহদেবতা রঘুবীরের ঘরের উত্তরে অপেক্ষাকৃত ছোট নিজেদের ঘরটা না চেনার কিছু নেই। অথচ জনমানবহীন এই শূন্য গৃহের সমস্ত পরিবেশ আর আদলটাই যেন পালটে গেছে। সদ্য বর্ষা গেছে, তাই ঝোপজঙ্গল গজিয়েছে উঠোনের কোণে কোণে, চাতালে শ্যাওলা পড়েছে। নিঃশব্দ নিঝুম ভাব হয়ে রয়েছে। মাটির দাওয়া বৃষ্টিতে খেয়ে গেছে, ক্ষয়ে গেছে দু’ ধাপ সিঁড়িও। জল টপকে পার হওয়ার জন্য রাখা জোড়া ইটের ফাঁকে ফাঁকে ঘাস গজিয়েছে।

ঘরের কাছে এগিয়ে গেলেন সারদা। কাঁঠাল কাঠের দরজার মাথায় শিকল, মরচে ধরা তালা ঝুলছে আংটা আর শিকলের মাঝখানে। চাবি তো নেই! ঘরে ঢুকবেন কী করে! কার কাছে চাবি?

রওনা হবার দু’দিন আগে বাগবাজার থেকে দক্ষিণেশ্বর গিয়েছিলেন। মন্দিরে মন্দিরে প্রণাম সেরে, লোকজনের সঙ্গে দেখা করে এসেছেন। রামলালরা জানে, তিনি কামারপুকুরে যাচ্ছেন এবং ওখানেই থাকবেন এবার। কিছুই তো বলে দেয়নি, কোথায় কী আছে, কী ব্যবস্থা করতে হবে, কার সঙ্গে কথা বলতে হবে। শুধু তিনি ফিরে আসার আগে, ব্যস্ততার ভাব দেখিয়ে রামলাল একটা নামকাওয়াস্তে পেন্নাম ঠুকে, বলে গেল—যাও। গেলেই সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। তুমি ঠাকুর রামকৃষ্ণর বউ, তোমার আর ভাবনা কী!

অকূলপাথারে পড়ে গেলেন সারদা। সঙ্গে চূড়ান্ত অস্বস্তি। নির্বাক তাকিয়ে আছেন গোলাপমা, ইতিউতি চাইছে যোগীন। এ ঘরবাড়ির সঙ্গে অতি সামান্য পরিচয় তাদের। গোলাপমা অনেক বছর আগে একবার এসেছিলেন, যোগীন তাও না। মুখে শুনেছে কামারপুকুরের কথা। কিন্তু এই মুহূর্তে তাঁরা সকলেই একইরকম বিভ্রান্ত। কী করবেন, কোথায় যাবেন কিছুই বুঝতে পারছেন না।

বছর দশেকের ছেলেটি তখনই ঢুকল টিন আর বেড়ার ফটক সরিয়ে।

কীভাবে চিনল সারদাকে কে জানে, কিন্তু সটান গিয়ে তাঁকেই পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল। কালো গায়ের রং, ইজের পরা, খালি গা। কিন্তু চোখেমুখে লাজুক একটি হাসি সত্ত্বেও সপ্রতিভ ভাব। প্রণাম সেরে বলল, মা, আপনিই দক্ষিণেশ্বরের মাঠাকরুন তো?

ছেলেটির মাথায় তেল চুকচুক করছে চুলে। হাত দিয়ে সারদা বললেন, হ্যাঁ বাবা। তুই কে, কোথায় থাকিস?

আমার বাড়ি যুগীপাড়ায়। কিন্তু থাকি ওই গোঁসাইবাড়িতে।

সারদার মনে পড়ল। ঠিকই একটু এগিয়ে দক্ষিণের পাকা বাড়িটাই তো শুকলাল গোস্বামীদের। কাছারিবাড়ির মতো দেখতে। চারদিকে ইটের পাঁচিল আর মাঝখানে বাড়ি। লোকে বলে গোঁসাইমহল বা গোঁসাইবাড়ি।

সারদা জিজ্ঞেস করলেন, তা তোর নাম কী বাবা?

এঁজ্ঞে গণশা … ওই … গণেশচন্দ্র মালাকার।

তা আমায় চিনলি কী করে? কে বলল?

ওই যে পেসন্য (প্রসন্ন) দিদিমা আছে না— লাহাদের বাড়ির, ওনার কাছে থাকি তো!

যেন স্মৃতির পর্দা স্বচ্ছ হচ্ছে সারদার। প্রসন্নময়ী, সেই ধর্মদাস লাহার বালবিধবা কন্যা। খুবই স্নেহ করতেন সারদাকে।

বললেন, ওহ্, প্রসন্নমাসি এখন গোঁসাইমহলে থাকেন বুঝি?

হ্যাঁ। বাড়ির লোকেরা কলকাতা-হাওড়ায় চলে গ্যাছে তো। দিদিমা একলা…।

তোকে কি প্রসন্নমাসি পাঠালেন?

এঁজ্ঞে। কাল থেকে বুলে রেখেছেন… তক্কে তক্কে থাকতে বুলেচ্যে… এবাড়িতে মেয়েছেলা ঢুকলেই যেন…।

সারদা বুঝলেন, একইসঙ্গে উত্তেজনায়, হয়তো একটু আনন্দেও বালকটির প্রাকৃত ভাষা বেরিয়ে পড়েছে। একটু স্বস্তিবোধও করলেন। আর কিছু না হোক প্রসন্নময়ী নিশ্চয়ই একটা খবর পেয়েছেন এবং এটুকু যে মনে রেখেছেন, তাইতেই কৃতজ্ঞ বোধ করলেন। মনে হল, হালে পানি পেয়েছেন। অন্তত কিছু তো জানা যাবে।

গণশা তার মধ্যেই তাড়া দিল।—তা হলে চলুন মা, দিদিমা বসে আছে।

সারদা তাকালেন গোলাপমা আর যোগীনের দিকে।—চলো তা হলে। এই কাছেই। বড় ভাল মানুষ প্রসন্নমাসি৷ খুব দুঃখীও। আমার শাশুড়ি মায়ের খুব আপনার জন, আমাকেও বড্ড ভালবাসেন, হয়তো ঘরের চাবিও পাওয়া যাবে ওনার কাছে।

মাত্রই মিনিট দু’য়েকের পথ। গণশা তাঁর মধ্যেই একটি সুখবর পরিবেশন করল।

দিদিমা কলায়ের ডাল, ভাত আর পোস্ত চচ্চড়ি বেঁধে রেকেচ্যে।

অনিশ্চয়তা আর হতাশ ভাবের মধ্যেও মুখ চাওয়াচাওয়ি করে সামান্য হাসলেন সারদা আর গোলাপমা। আর কয়েক মিনিট পরেই বৃদ্ধা প্রসন্নময়ীর আন্তরিকতায়, সৌজন্যে মুগ্ধ না হয়ে পারলেন না তিনজনে। তিনি যে সারদার সঙ্গে দু’-একজন অতিথি আসবেন অনুমান করে দুটি ডালভাত বেঁধে রেখেছেন শুধু তাই না, দু’-একটি দিন গোঁসাইমহলে থাকার ব্যবস্থাও করেছেন। আর এই আয়োজনটুকুর সবটাই যে সারদার মুখ চেয়ে, তাঁর প্রতি ভালবাসা, প্রীতি, এমনকী কিছুটা শ্রদ্ধাতেও, সারদা বুঝে গেলেন কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার মধ্যেই। সারদাকে যেন ঠিক সেই আগের সারু কিংবা গদাইয়ের বউ, তেমন চোখে না, অতিরিক্ত একটি সম্ভ্রমের প্রচ্ছন্ন বোধ যেন ক্রিয়াশীল রয়েছে প্রসন্নময়ীর আচরণে।

নিজেদের মধ্যে কিছুটা ঘরোয়া প্রতিবেশীর মতন, কাছের মানুষের মতো কথা বলার সুযোগ হল বিকেলবেলা।

গণশাকে নিয়ে কামারপুকুর দেখতে বেরুলেন গোলাপমা, সঙ্গে যোগীন। তাঁরা ঠাকুরের জন্মস্থান- ঢেঁকিশাল-রঘুবীরের আগার ঘুরে কামারপাড়া-হালদার পুকুর-লাহাবাড়ি-মানিক রাজার আমবাগান দেখে ফিরবেন।

বিকেলের রোদ কমে এসেছে। গোঁসাইবাড়ির পাঁচিলঘেরা, ছড়ানো, নিকনো উঠোনে গাছের ছায়া পড়েছে লম্বা হয়ে। ঝিরঝিরে হাওয়া বইছে, কলকাতার থেকে এদিকে গরম কম। উঠোনে চ্যাটাই পেতে বসেছেন সারদা আর প্রসন্নময়ী।

প্রসন্নময়ী বললেন, খবরাখবর সবই পাই মা। বুড়ো হয়ে গেছি তাই নিজে নড়তে পারি না— গদাইয়ের— মানে ঠাকুরের দেহ রাখার খবরে বুকটা হু-হু করে উঠেছিল। আর সত্যি মা, তোর মুখটা বারবার মনে পড়ছিল।

সারদা বললেন, তা তো পড়বেই মাসি, তোমরা সব কবেকার আপনার জন আমার।

প্রসন্নময়ী যেন আগেভাগে একটা কথা সেরে রাখার মতো বললেন, শোন মা, আমার একটি আর্জি আছে। তোকে তুই-তোকারি করি বটে, আর কামারপুকুরের মানুষজন কে কী ভাবে, না-ভাবে, বড় কথা না। কিন্তু আমি তো জানি, তুই স্বয়ং ঠাকুরের জীবনসঙ্গিনী, সাধনসঙ্গিনী— তুই আমাদের সকলের মা, জননী। আমি তোকে পায়ে হাত দিয়ে একটা পেন্নাম করব মা।

সারদা প্রায় শিউরে উঠলেন। বললেন, সে কী মাসি! ঠাকুরের বউ হলেও, আমি তো সেই তোমাদের সারু। তুমি আমার শাশুড়ির মতন।

কিন্তু তুই আর স্বয়ং ঠাকুর যে অভিন্ন মা।

তাতেই বা কী মাসি! সম্পর্ক তো যা ছিল, তাই আছে।

তা হলেও মা, তোর পায়ের ধুলো মাথায় ঠেকাতে পারার পুণ্যি…।

ওকথা বোলো না মাসি, অমন বলতে নেই। তুমি তো আমার গুরুজন গো।

প্রসন্নময়ী তারপরেও সারদার হাত দু’খানা টেনে নিয়ে নিজের মাথায় ঠেকালেন। বললেন, আচ্ছা মা বেশ। তোর করস্পর্শেই ধন্য হই। একটু পরেই বললেন, ভাবি মা, কামারপুকুরের কাছেপিঠের লোকগুলো এখনও বুঝল না, কী কপাল করে তারা তাদের কাছে পেয়েছিল।

সারদা বললেন, তাইতে কী মাসি, কাছের থেকে কোনও কিছুই পুরোটা চোখে পড়ে না। পড়ার কিছু থাকলে, একদিন সবাই টের পাবে। কণ্ঠস্বর পালটে সারদা বললেন, মাসি, এদিকে লোকজন কি আগের থেকে কমে গ্যাছে?

হ্যাঁ মা। এক ম্যালেরিয়ার জ্বালা তো আছেই। তা ছাড়া সাহেবরা কলকারখানা বসাচ্ছে, রাস্তাঘাট বাড়ি বানাচ্ছে। গাঁয়ের লোকের এখন টান হয়েছে শহর গঞ্জের। চাষবাস ফেলে অনেকেই ছুটছে ওদিকে।

শাঁখারি আর পাইনদের বাড়ির সবাই আছে?

পুরনোরা আর কোথায় যাবে মা! উপযুক্ত ছেলেরা কেউ কেউ বেরিয়ে পড়েছে।

ধনী কামারনিকে মনে পড়ে সারদার। ঠাকুরের ভিক্ষে-মা। ছোটবেলায় একা একা যখন এসে থাকতেন শ্বশুরবাড়িতে, কত গল্প করত ধনী বুড়ি, ঘুরে ঘুরে সব দেখাত। জিজ্ঞেস করলেন, ধনী বুড়ি ভাল আছে মাসি?

আছে, এই পর্যন্ত। বয়েস তো কম হল না। চোখে ছানি পড়েছে, কানেও ভাল শোনে না। তবে তোকে দেখতে আসবে নিশ্চয়ই।

নানান কথা মাথায় ওড়াউড়ি করে সারদার। পুরনোদিন- ছোটবেলা- জয়রামবাটি-দক্ষিণেশ্বর- বাগবাজার, তারপর তীর্থ করে এলেন দূরবিদেশে। এখন একটা অসহায় কষ্টে মাঝেমাঝে বুক মোচড়ায়। তবু তার থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করেন। অবস্থা কখনও একরকম যায় না। ঠাকুর বলতেন, যখন যেরকম, তখন সেরকম ভাবে থাকবে। তাই চান সারদা। এখানকার জীবনযাপন কষ্টকর হবে সে তাঁর জানা। কষ্ট করা তাঁর জীবনে নতুন কিছু না। তা হলেও মনে হয়, একদিন কি ঠাকুরকে কেন্দ্র করে কিছু একটা গড়ে উঠবে না! তাঁর টানে যেসব ছেলেরা মানুষের কাজ করবে বলে ঘর ছাড়ল, তাদের আশা-আকাঙক্ষা কি পূর্ণ হবে না! তিনি নিজেই বা কতটা কী করতে পারেন! এই ভিটেবাড়িতেও এসে দেখছেন, তাঁকে যেন হটিয়ে দেওয়ারই ইচ্ছে রামলালদের। অবজ্ঞা আর তাচ্ছিল্য প্রকাশ তো করেই। ক্রমশ যেন তাঁর অস্তিত্বটুকুও ওরা আর মানতে চায় না। অথচ প্রয়োজনের সময় কত খোশামোদ, খুড়িমাকে মা জ্ঞানে কত লোক দেখানো ভালবাসা।

নাহ্ এসব ভাবনাকে বাড়তে দেওয়া ঠিক না। জগৎ সংসারের প্রেক্ষাপটে এসব মানুষিক আচরণ অতি তুচ্ছ ব্যাপার। ছোটখাটো বিষয়কে মনে স্থান দিলে, নিজেকেও ছোট হয়ে থাকতে হয়। ঠাকুরের পৃথিবীতে কেউ ছোট নয়, কেউ পর নয়।

প্রসন্নময়ীকে বললেন, মাসি, তোমার কাছে ওরা ঘরের চাবি দিয়ে গেছে তো?

হ্যাঁ মা, চাবি আছে। প্রসন্নময়ী ইতস্তত করে বললেন, কিন্তু মা, তুই একা মানুষ কি ও বাড়িতে থাকতে পারবি?

পারব মাসি। নিজের ঘর, পারতে তো হবেই। ঠাকুর বলেন, পরভাতা তবু ভাল, পরঘোরো ভাল না।

যোগীন আর গোলাপমা কলকাতা ফিরে গেলেন দু’দিন কামারপুকুরে কাটিয়ে।

সারদা চলে এলেন স্বামী-শ্বশুরের ভিটেতে।

নিঃসঙ্গ নির্জন বাড়িটিরও যেন তাঁর দশা। মানুষ যেমন ঘর চায়, ঘরও চায় মানুষ। কতদিন খোলা হয়নি দরজা-জানালা, আলো বাতাস ঢোকেনি। সোঁদা গন্ধ হয়ে রয়েছে, উই ধরেছে বাঁশের খুঁটিতে। খড়ের ছই থেকে জল চুঁইয়ে পড়ে মাটির মেঝে ফুটো করেছে। উঠোনের অপর প্রান্তে রান্নাঘরের অবস্থাও তথৈবচ। পোড়া-পাঁশুটে চেহারা, তার মধ্যেই একদিকে অযত্নে ডাঁই করা কাঠকুটো, মাটিতে গর্ত করে বানানো উনুনের ভেতর পড়ে রয়েছে পুরনো ছাই। সব জায়গাতেই জল পড়ার দাগ। রামলালরা আগেরবার যখন এসেছিল, ব্যবহারের পরে আর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে যায়নি। ভিতর আর বাইরের বাড়ির মাঝখানে উঠোনটা নেহাত ছোট না। উত্তর পশ্চিম কোণে রঘুবীরের থান আর ঢেঁকিঘরের চারপাশে গজিয়েছে জংলা আগাছা। এখনও উঠোনের জায়গায় জায়গায় শ্যাওলায় সবুজ মাটি পিছল হয়ে আছে। নিম-বেল আর আমগাছও হয়ে রয়েছে পাতার ভারে ঝাঁকড়া।

নাহ্, থাকতে যখন হবেই তখন কাজ ফেলে রাখলে চলবে না। কাজই মানুষকে বাঁচায়, বাঁচিয়ে রাখে। যদিও একা মানুষ, কিন্তু দশভুজার মতো শক্তি নিয়ে সারদা নেমে পড়লেন। কাটারি-শাবল-কোদাল বার করলেন ঢেঁকিঘর থেকে, ঝোপ জঙ্গল কেটে ছেঁটে সাফ করলেন। আবহাওয়া শুকো-রুখো হওয়ায় একটু সুবিধেই হল। মাটি কেটে ঘরের গর্ত, ফুটোফাটা বোজালেন। আর উঠোনের কাটা মাটিতেই ডেঙ্গোডাঁটা আর ঢ্যাঁড়স গাছের চারা পুঁতলেন। ঠিক করে রাখলেন, শীতের আমেজ এলেই নটে আর পালংশাকের বীজ বুনবেন ওখানে। আলকাতরার প্রলেপ দিলেন বাঁশের খুঁটিগুলোয়। গোবরজলের ছড়া দিলেন বাড়ির চারপাশে। দাওয়া-রান্নাঘর নিকোলেন। মইসে ধরা পুরনো বিছানা বালিশ-তোশক যা ছিল, সব ছ্যাঁচাবেড়ার ওপর রোদে দিলেন। ঝাঁকড়া বড় গাছগুলোর ডালপাতা ছেঁটে আঁচের জন্য রেখে দিলেন। হালকা পাতলা হওয়ায়, উঠোন ঘরবাড়িতে আলো বাতাস খেলতে শুরু করল।

ঘরামি ডেকে লোক দিয়ে কাজ করাবেন, তেমন সংগতি নেই। উদয়াস্ত একাই হাড়মাস কালি করে ঘরবাড়ির শ্রী ফেরালেন সারদা। তুলসীমঞ্চে পিদিম জ্বলল, রঘুবীরের থানে ধুনো। লাহাবাড়ির গয়াবিষ্ণু এসে দেখা করে গেল একদিন। একদিকে ঘরে চাল বাড়ন্ত। প্রসন্নময়ী যতটা পারেন দেখেন, ধনী বুড়িও টুকটুক করে এসে মাঝেমধ্যে দাওয়ায় বসেন। হাতে করে একফালি লাউ, কখনো মানকচু কিংবা দুটো শাকপাতা দিয়ে যান। সীতানাথ পাইন একদিন এসে চাষিদের বলে ঠাকুরের ভাগের ধানটুকু দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। রাতে মাঝেমাঝে একা থাকতে গা-ছমছম করে। কোনওদিন ধনী কামারনির বোন শঙ্করী, কখনও প্রসন্নময়ীর ঝি অন্নদা এসে থাকে সারদার সঙ্গে। ধনী বুড়িরই এক ভাই বিশ্বনাথ কখনও- সখনও এসে কাঠ কেটে দেয়, ধান ঝেড়ে দেয়।

জীবনের এক নতুন পর্ব শুরু হয়েছে সারদার। চূড়ান্ত অভাব দারিদ্র্য নিঃসঙ্গতার মধ্যেও অস্পষ্ট একটি বিশ্বাস আঁকড়ে পড়ে থাকেন। কৃতজ্ঞ বোধ করেন মানুষের কাছে। জীবনের কাছে তাঁর কোনও অভিযোগই নেই।

কিন্তু সব মানুষই একরকম নয়। বিশেষ করে পল্লিগ্রামের মেয়েমহলে কুঁদুলে আর খুঁত খুঁজে বেড়ানোর মতো বউ-ঝির অভাব নেই। অশিক্ষিত অনুদার সহানুভূতিহীন গ্রাম্য মহিলারা সারদা মানুষটার আন্তরিক পরিচয় সম্বন্ধেও অজ্ঞ। তারা ‘বিধবা বউ’টার বাইরের পোশাক দেখেই ছিছিক্কারে মেতে উঠল। গাঁয়ে ঢি-ঢি পড়ে গেল— ‘বিধবা মেয়েছেলের’ হাতে বালা, গলায় সোনার হার, এমনকী শাড়িতেও লাল পাড়— এ কোনদেশি বিধবা! ওকে একঘরে করো।

চিরসীমন্তিনী সারদা, আশঙ্কিত নন, কিন্তু বিভ্রান্ত বোধ করলেন, দ্বিধান্বিত হলেন। এই বেশ কি তবে পরিবর্তন করতে হবে!

না, করতে হবে না। কী এক অলৌকিক বার্তা পেলেন সারদা। একইসঙ্গে একদিন ঘুরতে ঘুরতে হাজির হলেন গৌরীমা, গৌরমণি দেবী। আবারও নিশ্চিত করলেন সারদাকে— বৈষ্ণবতন্ত্র মতে তাঁর ‘চিন্ময় স্বামী’। তাঁর বৈধব্য অসম্ভব। তা ছাড়া তিনি নিজেই যে লক্ষ্মী, ভূষণ ত্যাগ করবেন কী করে! তা হলে যে জগৎ লক্ষ্মীছাড়া হবে।

তন্ত্র বোঝেন না সারদা। কিন্তু মনের কাছে স্বাক্ষরিত হলেন।

ওদিকে প্রসন্নময়ীও ভর্ৎসনা করলেন গ্রাম্য বউ-ঝিদের।—

ও কে জানো, গদাইয়ের বউ। এই কামারপুকুরের চাটুজ্যেবাড়ির ছোট ছেলে—ঠাকুর রামকৃষ্ণ। তোমাদের সাত পুরুষের ভাগ্য সে ছেলে এই গাঁয়ে জন্মেছিল। এরা দেবাংশী।

হাত জোড় করে কপালে ছোঁয়ালেন প্রসন্নময়ী। পল্লিগ্রামের কুচুটে, মুখরা সব বউ-ঝিরা চুপ হয়ে গেল।

জীবনযাপনে এমনতরো অশান্তির হাওয়া আসে। আবার উড়েও যায়। কিন্তু ক্রমাগত সারদা টের পেতে থাকেন, মহাপ্রাণীটিকে আর যেন টিকিয়ে রাখতে পারছেন না। হাতের অবস্থা কপর্দকশূন্য। দক্ষিণেশ্বরের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। সামান্য ক’টি টাকা হাতে আসার পথ তো আপনজনেরাই পিছনে লেগে বন্ধ করে দিল। রামলালরা রটিয়েছিল— মা গৃহীভক্তদের কাছ থেকে টাকা পান, একা বিধবা মানুষের আর টাকার কী দরকার! সেই গৃহীভক্তদের সঙ্গেও মাসের পর মাস আর যোগাযোগ নেই। তাঁদের ভাবনা কিছুটা ‘বামুন গেল ঘর, তো লাঙ্গল তুলে ধর’ এইরকম। ঠাকুর অবতার, তিনি আরাধ্য। তাঁকে নিয়েই অধিকাংশের মাতামাতি ছিল। বলরাম বা মাস্টারের মতো হৃদয়বান কয়েকজন প্রাথমিক অবলম্বন দিয়েছিলেন। সারদা কামারপুকুর চলে আসার পরে তাঁদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ নেই। দূরের গ্রামদেশে, নিরালা নিঃসঙ্গ স্বামীর ভিটেবাড়িতে দারিদ্র্যে-শ্রমে অবেহেলিত সারদা ভাঙতে থাকেন নিজের মধ্যে। ভাঙতে ভাঙতে শুধুমাত্র প্রাণে বেঁচে থাকার জন্যই দুটো শাক বোনেন জমিতে। পেট বড় বালাই, জঠরাগ্নি তো নেভাতেই হবে।

একে একে পার হয়ে যায় ঋতু। পুজো গেল। হেমন্তের বাতাসে এল উত্তুরে হাওয়ার চোরাটান। শিউলি ফোটা শেষ হয়ে গেল। অগ্রহায়ণের রাসমেলা গেল। পৌষের গোড়া থেকেই কনকনে হাওয়ার সঙ্গে নিষ্পত্র হতে লাগল গাছেরা। ঠান্ডায় কুঁকড়ে মাটির ঘরে দীর্ঘরাত্রি যাপন করেন সারদা। পরনের দু’খানি সরু-লালপেড়ে শাড়ি, মলিন হয়েছে, জায়গায় জায়গায় ফেঁসে যাওয়ার উপক্রম। ঘর থেকে বাইরে যেতে পারেন না।

সময়ের সঙ্গে ঢিলেঢালা হয়ে আসে কাছেপিঠের মানুষের আবেগও। নিয়মিত কেউ খবরাখবর রাখতে পারেন না। গোলায় দুটি ধানচাল পড়ে আছে ওই পর্যন্ত। শাক-ভাতের সঙ্গে একটু নুনের ব্যবস্থাও নেই। জয়রামবাটি থেকে শ্যামাসুন্দরী মেয়ের অবস্থা অনুমান করেন। কিন্তু অভাব, ছেলেদের সংসার নিয়ে তাঁর অবস্থাও জেরবার। তবু মায়ের মন, শীতের শেষদিকেই একবার কালীকুমারকে পাঠালেন দিদির খবর আনতে। খবর হল, কিন্তু জয়রামবাটিতে ‘বোঝার ওপর শাকের আঁটি’ হয়ে থাকার জন্য সারদা জন্মাননি। বেঁচে থাকলে পরে যাব, বলে ফিরিয়ে দিলেন ভাইকে।

শীতের সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে গেল ইংরিজি বছর। বসন্তে গাছে গাছে পত্রোদগমের সঙ্গেই, সান্ধ্য দখিনা হাওয়াতেও এল মাদকতার স্পর্শ, অথচ দিনের বেলা এর মধ্যেই খর হতে শুরু করেছে সূর্যের তাপ। হুগলি জেলার প্রান্তিক অঞ্চল কামারপুকুর, বাঁকুড়ার আবহাওয়া আর চরিত্রের সঙ্গে মিল বেশি। বেলেমাটি হলেও কাঁকুরে ভাব। গ্রীষ্মের শুরু থেকেই মাটি ফুটিফাটা, শাকসবজি শুকিয়ে হলুদ হয়ে যাচ্ছে।

ভরসা কিছু নেই। তবু হাওয়ায় ভেসে দূরাগত ধ্বনির মতো একটি আশায় বুক বেঁধে কৃচ্ছ্রসাধন করে যান সারদা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *