৬
তখনও ভোরের আলো ফোটেনি। কিন্তু আঁধার ফিকে হয়েছে। চলন্ত গাড়ির দুলুনি সত্ত্বেও সারদার ঘুম ভেঙে গেল। অভ্যাসের বশেই হয়তো। শোওয়া অবস্থাতে চোখ খুলে দেখলেন, বন্ধ জানালার ফাঁকফোকর দিয়ে যামিনী শেষের আভাস। প্রকৃতি জেগে উঠছে, চরাচরে তারই ইঙ্গিত, আয়োজন। ঠাকুরকে প্রণাম নিবেদন করে নিঃশব্দে উঠে বসলেন সারদা।
দক্ষিণগামী মাদ্রাজ মেল। বগির অভ্যন্তরে অন্ধকারেরই প্রাধান্য। তাপমাত্রা কমের দিকে। দলের যাত্রীরা সব দিব্যি গুটিসুটি হয়ে এখনও গভীর নিদ্রায় ডুবে আছে। ভারী শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ আরও ভারী করে তুলেছে চলমান কক্ষটিকে। যান্ত্রিক ঘর্ঘরের একঘেয়েমি বোধহয় ভোররাতের ঘুম গাঢ়তর করে তুলেছে।
সন্তর্পণে উঠে চোখেমুখে জল দিয়ে এলেন সারদা। এবার সাধারণ বগিতে ছেলেমেয়ে মহিলারা একসঙ্গেই চলেছেন। কৃষ্ণলাল, শুকুল প্রমুখ বাংক-এর ওপরে শুয়েছেন, নীচেয় কাঠের সিটে ভাগাভাগি করে গোলাপমা, কৃষ্ণভাবিনী ও তাঁর জা, সুরবালারা। রাধু এখন আর নেহাত ছোটটি নেই, তাঁর এগারো বছর বয়স। সারদা শুয়েছিলেন ওকে সঙ্গে নিয়ে। ঘুমিয়ে একেবারে কাদাঁ মেয়ে। আলতো করে ওকে একটু সরিয়ে জানালার কোল ঘেঁসে বসলেন সারদা। মাথার ওপর কাপড়টা ভাল করে ঢাকা দিলেন। তারপর জানলাটা অল্প একটু ফাঁক করে খুলে দিলেন। হিমেল হাওয়া ঢুকল বগির ভেতরে, সাবধান হলেন যাতে কয়লার কুচি-টুচি চোখে না ঢোকে। জড়সড় হয়ে বসে বাইরে ফ্যাকাসে ভোরের দিকে তাকালেন। সুপ্তির ঘোর কাটিয়ে জেগে উঠছে প্রকৃতি। আহা, কী অপূর্ব দৃশ্য বাইরে!
কিছু আগে খুরদা রোড স্টেশন পার হয়েছে, সারদা টের পেয়েছিলেন। এখন বিস্তীর্ণ চিলকা হ্রদের গা ঘেঁসে গাড়ি চলেছে অপেক্ষাকৃত ধীর গতিতে। খোলা জানালা দিয়ে ভোরের স্নিগ্ধ বাতাস এসে গা জুড়িয়ে দিচ্ছে। একটা জোলো গন্ধ আসছে বাতাসের সঙ্গে। ফেব্রুয়ারি মাসের তৃতীয় সপ্তাহ এখন। দিনের বেলা গরম তেজি হয়নি, বরং ভোরের হাওয়ায় হিমেল ভাব মিশে আছে।
বাঁদিকের পুব আকাশে সাদা খড়িফোটা চেহারা, তার মধ্যে কয়েকটি মেঘরেখায় খুব হালকা গোলাপি রং ধরতে শুরু করেছে। দুধ সরের মতো পাতলা আলোয় দৃশ্যমান হয়েছে হ্রদের জল। একেবারে নিস্তরঙ্গ নয়, ছোট ছোট ঢেউ উঠছে মৃদু হাওয়ায়। জেগে উঠেছে পাখপাখালি, বকের ঝাঁক। ডাকাডাকি ওড়াউড়ি করছে জলের ওপর। সাদা রঙের একটি পাখির গলার কাছে গভীর আসমানি নীল রং দেখে সারদা ভাবলেন, ওটাই কি নীলকণ্ঠ পাখি! তাই হবে। জোড়হাত কপালে ঠেকালেন। কোথাও কোথাও যেন হালকা ধোঁয়া উঠছে জলের তল থেকে, আর ফিনফিনে পর্দার মতো ঝুলে রয়েছে। অনেক দূরে দূরে ঝাপসা দোচালা-চারচালা ঘরের মতো জেগে রয়েছে ছোট ছোট দ্বীপ। সারদা ভাবেন, কী নিপুণ তুলির আঁচড়ে এই প্রকৃতিকে সাজিয়ে দিয়েছেন সৃষ্টিকর্তা! যারা দেখল না, জানল না, বুঝল না… কে জানে, তাঁরই বোধহয় বেদনা অনুভূত হয় তাদের জন্য। ওদের কিছু যায় আসে না।
সংসার আর ঘর-গেরস্থালি করতে করতে নিজের আত্মীয়স্বজন, কাছেপিঠের মানুষজনকেই সারদা দেখেন, কত ছোট ছোট সব ব্যাপার, স্বার্থপরতা, একটু আত্মসুখের জন্য কী পণ্ডশ্রমটাই না করে! অথচ কাউকেই তো বঞ্চিত করেননি ঠাকুর। দু’হাতে বিলিয়ে দিয়েছেন এই পৃথিবীর সৌন্দর্য, রূপ-রস-বর্ণ-গন্ধ। তবু কেন এত ঝগড়া-কাজিয়া, হানাহানি মারামারি! মানুষ কেন একটু বড় করে ভাবে না, ঈশ্বরের এই জগতে কেউ ছোট নয়, কেউ পর নয়, অসীম করুণা আর ভালবাসা তিনি তো সবার অজান্তেই ছড়িয়ে রেখেছেন সবার জন্য। মানুষ চন্দ্র-সূর্য দেখে, এই পৃথিবীর বাতাসে শ্বাস নেয়, পঞ্চেন্দ্রিয়র তুষ্টি হয় এই প্রকৃতি থেকে। এসবের জন্য কাউকে বিধাতার কাছে কৈফিয়ত দিতে হয় না। স্বতঃস্ফূর্ত আর ধারাবাহিক এই প্রাপ্তিযোগের কোনও একটি থেকে মানুষ যদি বঞ্চিত হয়, তা হলেই এই জীবদ্দশা কত কঠিন, ভঙ্গুর আর সীমাবদ্ধ হয়ে উঠবে— এসব কি মানুষ কখনও ভাবে!
রাধু একটু নড়েচড়ে উঠতেই কামরার মধ্যে চোখ ফেরালেন সারদা। নাহ্, এখনও সব গভীর ঘুমে তলিয়ে রয়েছে। ঝাপসা আঁধারভাবও রয়েছে। থাকো বাবা, শান্তিতে ঘুমিয়ে নাও যতক্ষণ পারো। সামনে বেশ কিছুদিনের ধকল আছে। রামেশ্বর-মীনাক্ষি মন্দির-ব্যাঙ্গালোর ঘুরে ফিরতে ফিরতে বেশ ক’দিন লাগবে। রাধুর গায়ে চাদর টেনে দিয়ে আবার বাইরে তাকালেন সারদা। একটানা দীর্ঘ হ্রদের দূর সীমানায় একটু একটু করে গাছপালার মাথা জেগে উঠছে। গাড়ির সঙ্গে ওরাও যেন চলমান। মিঠে হাওয়াটা বেশ লাগছে।
শরীরটা একটু ভাল হয়েছে এখন সারদার। বড্ড কাহিল হয়ে পড়েছিলেন মাঝখানে জলবসন্তয় ভুগে। সারা গায়ে ছোট ছোট ফোসকার মতো গুটি বেরিয়ে সে কী অবস্থা! নিজের কষ্ট তো ছিলই, তবু সেই সময়েও হরি সুধীর-কালী-শরতের কথা চিন্তা করে উদ্বেগ অনুভব করেছেন। সদ্য সদ্য বাগবাজারের নতুন বাড়ি তখন তৈরি হয়েছে, উদ্বোধন-এর দপ্তর উঠে এসেছে একতলায়। তাঁর মধ্যেই কী বিপত্তি!
যা হোক, ঠাকুর সামলে দিয়েছেন। কিন্তু মনটা পুরোপুরি মেরামত হয়নি। মনটাই যে সব। ঘুরে ঘুরে সে-ই জয়রামবাটিতে পৌঁছে যায়, আর এখনও বিভীষিকার মতন ভায়েদের সেইসব আচরণের কথা মনে পড়ে। কে জানে, মা (শ্যামাসুন্দরী) দেহ রাখার পর থেকেই হয়তো প্রসন্ন-কালী-বরদারা মনে মনে প্যাঁচ কষছিল— দিদি তো এবার পাট গোটালেই পারে! মুখে স্পষ্ট করে বলার সাহস হচ্ছিল না, কেননা, আসলে সারদাই যে বাড়ির অভিভাবিকা এবং টিকিয়ে রাখার মূল স্তম্ভ, এ জ্ঞানটুকু টনটনে ছিল সকলেরই।
বড্ড বড় ঝুঁকি নিয়েছিলেন সারদানন্দ ‘মায়ের বাড়ি’ তৈরি করতে। খোড়ো কেদারের জমি পাওয়ার পর থেকেই টাকা জমাচ্ছিলেন যেখান থেকে যেভাবে পারেন। নিজের চূড়ান্ত পরিশ্রমে, রাত জেগে লিখে কিছু উপার্জন করছিলেন। মিসেস ওলি বুল একটানা সারদার জন্য মাসে মাসে অর্থ সাহায্য করে যাচ্ছিলেন বছর তিনেক ধরে। তা ছাড়াও পাঁচ হাজার সাতশো টাকা ঋণ নিয়ে শেষপর্যন্ত কাজে নেমেই পড়লেন সারদানন্দ। ছোটখাটো নয়, একতলায় ছ’-খানা, দোতালায় তিনখানা এবং তিনতলায় একখানা নিয়ে একেবারে দশখানা ঘরের বাড়ি বানালেন বছর খানেকের ওপর সময় নিয়ে। খরচ লাফাতে লাফাতে এগারো হাজার ছাড়িয়ে গেল। তা যাক, কিন্তু মায়ের যে নিজস্ব একটি বাড়ি বানানো গেছে, এই তুষ্টি আর আনন্দে ভেসে গেলেন শরৎ মহারাজ।
সারদা সব খবরই পান। তা সত্ত্বেও, এমনকী মহারাজ গৃহপ্রবেশের জন্য বাগবাজারে নিয়ে যেতে চাইলেও, গড়িমসি করেন সারদা। তিনি গেলেই জয়রামবাটির বাড়ি-জমি-সম্পত্তি নিয়ে যে লাঠালাঠি শুরু হবে, সে আন্দাজ তাঁর ভালই আছে। খেয়াল করেন, ভায়েরা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কেবলই তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানতে চায়। জানাতে চায় নিজেদের প্রয়োজন আর অসুবিধার কথাও।
বড় ভাই প্রসন্নর স্ত্রী রামপ্রিয়া ইতিমধ্যে দেহ রেখেছে। বেচারি প্রায়ই ভুগত, দুর্বল ছিল। শেষ পর্যন্ত দু’দিনের ওলাওঠায়, দুই মেয়ে-স্বামীকে রেখে চলেই গেল। প্রসন্ন অবশ্য কালক্ষেপ করেনি। সুবাসিনী নামের একটি নবমবর্ষীয়া পালটি ঘরের কন্যার পাণিগ্রহণ করে ফেলেছে। সুশীলা (মাকু) আর নলিনী দুই মেয়ের দাঁয়িত্ব তো আগেই সারদার ঘাড়ে পড়েছিল।
প্রসন্ন একদিন কলকাতা থেকে ফিরে সারদাকে বলল, ও দিদি, সাধুরা যে তোমার জন্য এলাহি ব্যবস্থা করে ফেলেছে।
সারদা কানে তুললেন না কথাটা। আলগোছে উত্তর দিলেন, কী করেছে জানি না বাপু, তবে…।
প্রসন্ন সারদাকে শেষ করতে না দিয়েই বলল, বিশ্বাস করছ না আমার কথা! নিজের চোখে দেখে এলাম।
সারদা বললেন, দেখে এসেছিস, বেশ। অবিশ্বাস করব কেন?
তা হলে শোনো, বাগবাজারের গোপাল নিয়োগী লেনে তিনমহলা বাড়ি বানিয়েছে তোমার জন্য।
তা যা করেছে, করেছে। কম দায়িত্ব এখন ছেলেদের সামনে! কত টাকার ধাক্কা!
হাতে পয়সাকড়ি এলে, দায়িত্ব পালনের আর অসুবিধে কোথায় গো দিদি? ধাক্কা সামলে যাবে।
সারদা বিরক্ত হলেন। বললেন, ওসব কথা বলিস না প্রসন্ন। সাধু মানুষ তারা। পয়সার থেকে কাজই বড় কথা ওদের কাছে।
আহা সে তো একশো বার। তা হলেও টাকা রোজগার না হলে কি পেল্লায় বাড়ি তুলতে পারত?
সারদা শান্তভাবে বললেন, রোজগারের জন্য ছেলেরা গায়ের রক্ত জল করে পরিশ্রম করে। আর সেটাও নিজেদের জন্য করে না।
তা যা-ই হোক; তোমার জন্যই অত বড় বাড়ি হয়েছে… দেখেই শান্তি।
আমি এখানেও খারাপ কিছু নেই। বাড়ি একটা হয়েছে ভাল কথা…কতজনেরই উপকারে লাগবে।
ও কী কথা বলছ দিদি! তোমার বাড়ি, আর উপকারে লাগবে অন্যদের!
আমার কাছে অন্য বলে কেউ নেই রে। একথাটাও তারা এতদিনে বুঝলি না?
সামান্য অপ্রতিভ প্রসন্ন। গলার সুর পালটে বলল, তা বটে, তা বটে। জন্ম থেকে তোমায় দেখে দেখে সেটুকু কি আর বুঝি না ভাবো! তুমি না-হয় একলা মানুষ, ঘরবাড়ি নিয়ে কী-ই বা করবে! তোমার হওয়া মানে… সেও তো আমাদেরই হওয়া গো।
সারদা একটু স্পষ্ট করেই বললেন, তোরা ছাড়াও আমার অসংখ্য আপনার জন আছে, সেটা একটু মাথায় রাখিস। আর তোদের হিসেবে আমি একা হলেও, ঠাকুর আমাকে তেমন রেখে যাননি।
ওহ্-হো দিদি, ওটা একটা কথার কথা। নিজেকে শুধরে নিয়ে প্রসন্ন বলল, আসলে আমি তোমাকে অন্য একটা বিষয়ে…।
বল না, কী বলতে চাইছিস?
মানে… এখন তো তুমিই হচ্ছ বাড়ির বড়… তাই বা কেন! এ পরিবারের মাথা হচ্ছ তুমি। তো কবে আবার কলকাতা চলে যাও… তাই বলছিলুম, জয়রামবাটির ঘরবাড়ির যদি একটা মীমাংসা হয়ে যেত…।
সারদা বললেন, মীমাংসা মানে ভাগ বাঁটোয়ারার কথা বলছিস?
সে যেভাবেই বলো… সংসারটা তো আর ঘোট থাকছে না, উত্তরাধিকারীর সংখ্যাও বাড়ছে, ফয়সালা একটা হয়ে গেলে ভাল না!
ভালমন্দ তোরা নিজেরাই ঠিক কর না।
সে তো করাই যেত। কিন্তু কালীকে তো তুমি চেনো দিদি। তা ছাড়া আমার তো সংসারটাই বড়। উদাস শ্বাস ফেলে প্রসন্ন বলল, মেয়ে দুটিকে রেখে মাকুর মা চলে গেল… এখন ঠাকুরের আশীর্বাদে সুবাসির যদি পুত্রসন্তান হয়… সামলাতে হবে তো… কী-ই বা আয়পয় আমার…! দ্যাখো তুমি, কতটা কী করতে পারো… বলে রাখলুম আর কী!
সারদা শুনলেন। মনে মনে নানান কথা এলেও কিছু উত্থাপন করলেন না। শুধু একটা অশান্তির চাপ টের পেলেন।
কালীকুমার তক্কে তক্কে ছিল সারদা জানতেন না।
প্রসন্ন সরে যেতেই হঠাৎ সামনে হাজির। বলল, সম্পত্তি ভাগ নিয়ে দাদা তোমার কানে মন্ত্র দিচ্ছিল বুঝি?
সারদা বিরক্ত হলেন। বললেন, ও কী কথার ছিরি রে কালী? আর… আমার কানে মন্ত্র দেওয়া অতই সহজ ভাবিস?
কালীকুমার চুপসে গেল প্রাথমিকভাবে। বলল, তা ঠিক বলতে চাইনি। তবে মনে হচ্ছিল যেন… তোমায় ভজাচ্ছে।
মনে হচ্ছিল যখন, তখন নিজেরা সামনাসামনি কথা বলে নিলি না কেন?
তা কী করে হয়! তুমি বড়। সঙ্গে আর একটু যোগ করে দিল কালীকুমার, তোমার মধ্যস্থতাতেই যা হওয়ার হবে।
তবে আর কথা কী? সারদা বললেন, ভাই ভাই, ঠাঁই ঠাঁই— লোকে বলে।
সে বলুক গে। কিন্তু আমার ছেলে আছে, দাদার তো দুটিই মেয়ে। গোত্রান্তর হয়ে গেলেই তারা অন্য পরিবারের।
ওসব কী বলছিস কালী! গোত্র ধরে সন্তানের বিচার? তা হলে আমার কী দায় এই সংসারের জন্য?
তোমার কথা আলাদা। তোমায় লোকে অন্যরকম ভক্তি করে।
সারদা চুপ করে রইলেন। মনে মনে বললেন, কেন করে যদি বুঝতিস! আমার কাছে ছেলেমেয়ে জাত-গোত্র ধর্ম-বর্ণ-দেশ-বিদেশ বলে কোনও কথা নেই। মানুষই সব, সবাই আমার কাছে সমান। আমি সবার মা। আমরা তোমরা বলে কিছু নেই।
মুখে শুধু বললেন, বেশ। তা হলে যা মীমাংসা হবে, তাই মেনে চলিস।
কালীকুমার বলল, আইনকানুন মেনে, সুষ্ঠু মীমাংসা হলে, না-মেনে চলার কিছু নেই। দলিল-দস্তাবেজ সবই আমার কাছে আছে।
শেষের কথাটা শুনে সেদিনই সারদা বুঝেছিলেন, খুব আপোসে এই পৈতৃক সম্পত্তির ভাগাভাগি হয়তো হবে না। কালীকুমারের কথায় মতবিরোধের আভাস রয়েছে। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে প্রকৃতিগতভাবেই তিনি কি খুব উপযুক্ত মধ্যস্থতাকারিণী! ছাপোষা সংসারীর মতো তিনি ঘর গেরস্থালি নিয়ে লেপটে রয়েছেন, হয়তো ঠাকুরেরই ইচ্ছে সেটি। কত কাজ-দায়িত্ব-বেদনা-সহ্য-উদারতা… এইসব নিয়ে চলতে চলতে সংসারটি গড়ে ওঠে, সেই লোকশিক্ষা দেওয়ার জন্যই যেন প্রচ্ছন্ন উদাহরণের মতো সারদাকে রেখেছেন। আর নিবিড় মমতায় তিনি তা পালন করে চলেছেন।
কিন্তু এই ধরাধামে তাঁর অবতীর্ণ হওয়ার উদ্দেশ্য কি শুধু ওই কর্ম সমাধার মধ্যেই সীমাবদ্ধ?
তা তো নয়। তাঁর আটপৌরে জীবনযাপন, তিতিক্ষা, অপার করুণা ও প্রীতি যে প্রকৃতপক্ষে জগতের কাছে একটি মহাজীবনের আদর্শকে তুলে ধরার জন্যই। কোনও সচেতন প্রয়াসে তা নয়, সারদা সেটি জানেন। নদীর মতো, তাঁর জীবনের স্বতঃস্ফূর্ত বহমানতা। কালস্রোতের ধারায় মিশে যায় কত আবর্জনা, আবিলতা। মহাকালের নিরিখে সে পুণ্যসলিলা ধারাবতী।
ভায়েদের মানসিকতা টের পেলেও, সারদা বোঝেন, তাঁর তো ওই ভাবনা নিয়ে বসে থাকার উপায় নেই। বিপর্যস্ত বিধস্ত হয়ে তেতেপুড়ে দুনিয়ার মানুষ আসেন তাঁর কাছে। কীসের আকর্ষণে? আকৃষ্ট করার মতন কী ধন, ঐশ্বর্য তাঁর আছে!
কিছু না, শুধু জেনো, তুমি আমার সন্তান, আমি তোমার মা, নিরন্তর পাশে আছি। তোমার জীবন, আমার জীবন, জগতের একটিমাত্র নদীর মতোই, ‘বহে নিরন্তর অনন্ত আনন্দধারা’-য়।
মানুষজনের যাতায়াতে সাময়িকভাবে ভায়েদের কাজিয়া যেন বিস্মরণ হয়েই গেলেন সারদা।
মনে মনে একটি টানাপোড়েন চলছে কলকাতা যাওয়ার জন্য। বাড়ি সাজিয়ে শরৎ বসে আছে। একতলায় পত্রিকার কাজ হয়, ওই পর্যন্ত। কিন্তু মা না যাওয়া পর্যন্ত গৃহপ্রবেশ হবে না। দিন ঠিক করতে করতেই এক গরমের দুপুরে শ্রীঅরবিন্দর স্ত্রী মৃণালিনী ঘোষ পৌঁছে গেলেন সারদার কাছে। রাষ্ট্রদ্রোহিতা আর সন্ত্রাসবাদ ছড়ানোর অভিযোগে শ্রীঅরবিন্দ তখন বন্দি। উদ্বেগে ত্রাসে ভেঙে পড়েছেন মৃণালিনী। বিদেশি শাসনে দেশের দুর্দশা কতখানি সারদা জানেন। মৃণালিনীর মাথায় হাত দিয়ে বললেন, চঞ্চল হোয়ো না মা, তাতে কিছু লাভ হবে না। তোমার স্বামী ভগবানের পূর্ণ আশ্রিত। ঠাকুরের আশীর্বাদে শিগগির মুক্ত হয়ে ফিরে আসবেন। তারপর তোমরা দু’জনে একবার এসো, আমি শরৎকে বলে রাখব।
নিজের ভাবজগতটির মধ্যে থাকলেও সারদা বোঝেন, ভায়েদের আচরণ আর এই সম্পত্তিগত টানাপোড়েন যেন তাঁকে তিষ্ঠোতে দিচ্ছে না। নিত্য কলহ, বিবাদ লেগেই রয়েছে। ছোটখাটো বিষয়, যাতায়াতের পথ, বেড়া দেওয়া এইসব নিয়েও প্রসন্ন-কালীর মধ্যে বচসা থেকে প্রায় যেন হাতাহাতির উপক্রম হতে চলেছে। কত মেটাবেন, কত মধ্যস্থতা করবেন! ব্রহ্মচারী সন্তানরা চোখের সামনে সব দেখেন। বরদা সামনাসামনি কোনও ব্যাপারে অংশগ্রহণ করে না, কিন্তু প্রয়োজনমতো বড়দা-মেজদা দু’জনকেই হাতে রাখে।
উপায়ান্তর না দেখে, একটি হেস্তনেস্ত করার জন্যই শরৎ মহারাজকে আসতে বলেছিলেন সারদা। জানতেন, ভায়েরা তাঁর সামনে রুচিহীন আচরণ করলেও, সারদানন্দের ব্যক্তিত্বকে মান্য না করে পারবে না। ওদিকে খবর পেয়ে সারদানন্দ মায়ের উদ্বেগ আর বিড়ম্বনা যেমন অনুভব করলেন, তেমনই শক্ত হাতে মীমাংসার মানসিক প্রস্তুতিও নিয়ে জয়রামবাটি হাজির হলেন।
অথচ পৌঁছানোর পরে বিস্মিত হয়েই সারদানন্দ দেখলেন, সারদার গ্রাম্য গৃহিণী জীবনযাপনে যেন কোনওই অতিরিক্ত আবেগ-উৎকণ্ঠা উত্তাপ কিছুই নেই। গোলাপমা, যোগীনমা এবং কানাই নামের একটি ব্রহ্মচারী ছেলেও এসেছেন সারদানন্দের সঙ্গে। তখন বসন্তকাল। সকালের দিকে শুকোরুখো বাতাসে মিঠে ভাব থাকলেও, রোদ চড়া হয়ে ওঠে একটু বেলা বাড়লে। গাছে গাছে নতুন পাতাঁর সমারোহ। আঁকশি দিয়ে কচি নিমপাতা পেড়ে জড়ো করে রাখছিলেন সারদা।
সারদানন্দ ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করতেই সারদা বললেন, এসেছ বাবা শরৎ! এই তোমার কথা ভেবেই নিমপাতা পাড়ছিলাম, জানি খাওয়ার প্রথম পাতে তেতো নিমবেগুন খেতে তুমি খুব ভালবাসো। গোলাপ-যোগীন তোমরাও এসো।
সকলে প্রণাম করতে সারদা আবার বললেন, জল খেয়ে সবাই একটু জিরিয়ে নাও, তারপর চান কোরো। জানি না আজ তোমাদের কপালে মাছ জুটবে কি না। পুকুরের জল শুকিয়ে যাচ্ছে। তবু বরদাঁকে কোতুলপুর পাঠিয়েছি।
নলিনী আর সুবাসিনীকে ডেকে বললেন, তোরা একটু দ্যাখ মা এদের… তেতেপুড়ে কলকাতা থেকে এয়েচে… জল-টল দে, মাদুর পেতে দে দাওয়ায়।
বিকেলবেলা একটু ফুরসত পেয়ে বিশ্রাম সেরে উঠে সারদানন্দ বললেন, মা, আপনার সাংসারিক অশান্তি, ভোগান্তির কথা শুনেই তড়িঘড়ি ছুটে এলাম। কিন্তু এসে দেখছি উলটো ব্যাপার। আপনিই আমাদের সেবা করছেন।
সারদা বললেন, গাঁয়েগঞ্জে সেবা-টেবা কতটুকুই বা করা যায় বাবা! কত কষ্ট করে এসেছ।
কষ্টে তো আপনি আছেন। সম্পত্তি নিয়ে মামারা খুবই বিবাদ করছেন, লিখেছিলেন।
তা করছে বাবা। সারদা বললেন। তবে কষ্ট আর কী? চোখের সামনে এসব ঝগড়াবিবাদ, নীচতা দেখলে মনটা ভার হয়ে ওঠে, অশান্তি টের পাই। কিন্তু গেরস্থ পরিবারে এসবই যে দস্তুর।
সারদানন্দ একটু চুপ করে থেকে মা-মানুষটির উদার উদাসীনতা অনুভবের চেষ্টা করলেন। তারপর বললেন, এখন তা হলে কী করা যায় মা?
সে তো আমার থেকে তুমিই ভাল বোঝো বাবা। দিদি বলে আমার কথা ওরা মানবে না, কিন্তু তোমাকে সমঝে চলবে। তোমার কথাও শুনবে। কিছু একটা নিষ্পত্তি করে দিয়ে যাও।
কিন্তু… আমার কথাও কি মামারা…?
কী বলছ বাবা শরৎ! তাদের ঘাড়ে ক’টা মাথা যে তোমার কথাও মানবে না! তারা কি জানে না তুমি কে আর তুমি কী?
সামান্য ইতস্তত করে, একটু সময় নিয়ে সারদানন্দ বললেন, আমাকে তো মা তা হলে এবাড়ির দলিল-টলিলগুলো একবার দেখতে হয়। তারপর কোয়ালপাড়ার মুহুরি কেদারবাবু (দত্ত)-কে একবার ডাকতে হবে জমিজমা মাপজোখ করার জন্য…।
সে তুমি যা করার করো। কালীর কাছেই সব কাগজপত্র আছে।
একটা কথা ভাবছিলাম মা। আপনার তো জয়রামবাটিতে যাতায়াত থাকবে, আপনার জন্য কোনও একটা ঘর কিংবা…।
সারদা মাঝপথেই বললেন, দরকার নেই বাবা। তেমন হলে কখনও প্রসন্ন, কখনও কালীর ঘরে থাকব। ওরা যার যার মতো শান্তিতে থাক।
শরৎ মহারাজ ঘনিষ্ঠভাবে কমদিন দেখছেন না সারদাকে। তা হলেও একটানা কয়েকদিন ধরে, জয়রামবাটির বাড়ির অমন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মায়ের নিস্পৃহ নির্লিপ্ত মানসিকতার পরিচয় পেলেন এবারও। বিস্মিত এবং আপ্লুত হলেন। দু’-একজনের কাছে না বলেও পারলেন না— আমাদের দ্যাখো, পান থেকে চুন খসলে রেগে আগুন হই। কিন্তু মাকে দ্যাখো। তাঁর ভায়েরা বিষয়-সম্পত্তি নিয়ে কী কাণ্ডটাই করছেন, অথচ তিনি যেমন, তেমনটিই আছেন— ধীরস্থির…।
সম্পত্তি ভাগ করে দলিল রেজিষ্ট্রি করে দিয়েছিলেন সারদানন্দ।
গ্রীষ্মকালের এক দগ্ধদিনেই সেবার কলকাতা ফিরেছিলেন সারদা। আর সেবারই প্রথম তাঁর নামে উৎসর্গীকৃত বাড়িতে পদার্পণ করলেন। দিনটি রবিবার, নয়ই জ্যৈষ্ঠ। মনে আছে সারদার। দু’বছরের ওপর হয়ে গেলেও দিব্যি মনে আছে সব। গেট পেরিয়ে ঢোকার মুখে দু’পাশে ঘটের ওপর ডাব। কলাগাছ বাঁধা ছিল চৌকাঠের সঙ্গে। লাল শালুর চাঁদোয়া উঠোনে। সারদা ঢোকার মুহূর্তেই হুলুধ্বনি আর শঙ্খ বেজে উঠেছিল।
তারপরেই শুরু হল ভক্ত-শিষ্য সন্তানদের প্রণামের হিড়িক।
ক্লান্ত বোধ করলেও সারদা ছিলেন নির্বিকার। বেশ কিছুদিন পরে কলকাতা এসেছেন, তার ওপর নতুন বাড়িতে পদার্পণ। ভক্ত সন্তানদের উচ্ছ্বাস তিনি অনুধাবন করতে পারেন। কিন্তু ভিড় বিশৃঙ্খলা আর গরমে বিরক্ত বোধ করছিলেন যোগীনমা ও গোলাপমা। আর বিরক্তিবোধের সূত্রেই কিঞ্চিৎ অপ্রীতিকর পরিস্থিতির অবতারণা হয়েছিল সেদিন বিকালের দিকে।
গাড়ির গতি বেশ কমে আসতেই অনেকক্ষণ পরে সারদার স্মৃতি রোমন্থনে ছেদ পড়ল।
খেয়াল করলেন, তাইতো, চিলকা হ্রদ কখন শেষ হয়ে গেছে মনেই আনতে পারছেন না। পুব আকাশের স্নিগ্ধ রক্তিমাভাতেও দিনের আলোর স্পর্শ। সূর্যদেব ঘুম ভেঙে দৃশ্যমান হয়েছেন। গাছপালার ফাঁক দিয়ে নরম সকালের সূর্যালোক চলন্ত বগির মধ্যেও আসা যাওয়া করছে। যাত্রীরা এখনও নিদ্রামগ্ন অবশ্য। কিছু ঘরবাড়ি দেখা যাচ্ছে দূরে, সম্ভবত উড়িষ্যা প্রদেশের কোনও নগর-গঞ্জ নিকটবর্তী হতে চলেছে। কিন্তু যতদুর জানেন, গঞ্জাম জেলার বেহরামপুর জংশনই পরবর্তী স্টেশন, যেখানে গাড়ি থামার কথা এবং তাঁরাও সাময়িকভাবে নামবেন। শশী মহারাজ তেমন ব্যবস্থাই করেছেন। বাঙালি স্টেশন মাস্টার মন্মথনাথবাবু তাঁদের আপ্যায়নের আয়োজন করে রাখবেন। তবে কি বেহরামপুর এসে গেল? এত তাড়াতাড়ি? সকাল আটটায় তো সেখানে…।
নাহ্, গাড়ি আবার গতি সঞ্চয় করছে। আটটার কাছাকাছি বেলা হলে সারদা ঠিকই অনুমান করতে পারতেন। কানাডা ইঞ্জিনের গম্ভীর ভোঁ কানে এল সারদার। সেইসঙ্গেই টের পেলেন ভুসভুসে কালো ধোঁয়াও উড়ে আসছে। কাচের জানালাটি টেনে নামিয়ে দিলেন। সকালের আলোয় বাইরের দৃশ্য বেশ দেখা যাচ্ছে। সহযাত্রীরা পূর্ববৎ। সারদা আবার ফিরে গেলেন নতুন বাড়িতে।
ভক্তদের ভিড় কাটতে প্রায় বিকেল হয়ে গিয়েছিল সেদিন। বাড়িটা একটু গলির মধ্যে হলেও সারদা খুশি, কেননা, সামনে গঙ্গা পর্যন্ত পুরো জায়গাটা ফাঁকা মাঠের মতো। কোনও ঘরবাড়ি নেই, গোরু করে। আর বাগবাজার পল্লিটি এমনিতেই গাছপালার ছায়ায় মনোরম। উত্তরে দেবদারু-কদম-তেঁতুল গাছের সারি রাস্তার দু’পাশে। দোতালা থেকে চারপাশ ঘুরে দেখে প্রাণ ভরে আশীর্বাদ করলেন শরৎ মহারাজকে। যোগীনমা-গোলাপমা ততক্ষণে একটু বিশ্রামের আয়োজন করেছেন সারদার।
এদিকে দুপুরবেলা বহু সাধারণ মানুষের ভিড় থাকায়, রাখাল-বাবুরামরা মাকে অনেকদিন পরে প্রণাম করারও সুযোগ পাননি। হাওড়া স্টেশনে গাড়ি দেরিতে পৌঁছানোয় সেখানেও দেখা হয়নি। বিকেলবেলা শুনলেন মা বিশ্রাম করছেন। দোনামনা করে অপেক্ষা করছেন একতলায়। আর ঘর্মাক্ত কলেবরে তখনই উপস্থিত হয়েছে মায়ের প্রিয় ভক্তসন্তান, খ্যাতনামা গিরিশচন্দ্র। হাঁকডাক করা দুরন্ত ব্যস্ত মানুষ গিরিশ। মা এসেছেন, কথাটি কানে যেতেই, নাটকের মহলা ফেলে রেখে, যে অবস্থায় ছিলেন ছুটে এসেছেন। গায়ে ফতুয়া, ঘামে ভিজে সপসপ। মনে একটি অপরাধ বোধ— কী ভাবছেন মা! গিরিশ দেখা করতে এল না একবার!
কিন্তু ঢুকেই অবাক। মহারাজরা নীচে চুপচাপ বসে আছেন। জিগ্যেস করলেন, কী ব্যাপার, তোমরা এখানে বসে আছ যে?
প্রেমানন্দ বললেন, অপেক্ষা করছি… মা বিশ্রাম নিচ্ছেন।
বিশ্রাম নিচ্ছেন… ভুরু কুঁচকে উঠল গিরিশচন্দ্রের, মায়ের শরীর ভাল তো?
রাখাল বললেন, শরীর ঠিক আছে। বোধহয় ক্লান্ত একটু।
তোমাদের সঙ্গে দেখা হয়েছে?
নাহ্ দেখা আর হল কোথায়!
গিরিশ কিছুটা অস্থির হয়েই বললেন, এতদিন পরে মা কলকাতায় এসেছেন, আর তোমরাই দেখা করোনি মহারাজ! ক্লান্ত হলেই বা কী?
বাবুরাম কিঞ্চিৎ হতাশ কণ্ঠেই বললেন, কী করব, দেখা করতে দিলে তো!
গিরিশের বিস্মিত ভাবের মধ্যেই নীচে আবির্ভূত হয়েছেন গোলাপমা। সবাইকে দেখে নিয়েই ভর্ৎসনার সুরে বললেন, বলি, তোমরা কি একটু আস্তে কথা বলতে পারো না? মা তেতেপুড়ে এসেছেন…।
গিরিশই এগিয়ে গেলেন। বললেন, তেতেপুড়ে কাদের জন্য এসেছেন? আমাদের জন্যই তো না কি?
গোলাপমা রুষ্ট স্বরেই বললেন, তাইতে কী? শুনলে না, মা ক্লান্ত, জিরোচ্ছেন। বলিহারি যাই বাবা তোমাদের ভক্তি আর কাণ্ডজ্ঞান দেখে!
গিরিশ যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারলেন না। তাঁর মতন মা-অন্তপ্রাণ সন্তান এবং ব্যক্তিত্বকে এভাবে কেউ মায়ের সঙ্গে দেখা করা ঠেকিয়ে রাখতে পারেন! গোলাপমাকে উপেক্ষা করেই বাবুরাম ও রাখাল মহারাজকে ডাকলেন, এই ওঠো তো দেখি, চলো আমার সঙ্গে।
গোলাপমা তারপরেও একবার ঠেকাবার চেষ্টা করলেন।— হ্যাঁ গো, মা জিরোচ্ছে বললাম, কথাটা কানে গেল না? এই তোমাদের দরদ?
গিরিশ আর সহ্য করতে পারলেন না। সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে প্রায় তোপ দাঁগা কণ্ঠে বললেন, তুমি তো বড় ঝাঁজা মেয়ে দেখছি! আমরা মাকে জ্বালাতন করতে এসেছি? কোথায় এতদিন পরে ছেলেদের দেখে মায়ের প্রাণ জুড়িয়ে যাবে… আর তুমি দরদ শেখাচ্ছ? এসে দ্যাখো দেখি মা কী বলেন।
সারদা সবই শুনছিলেন ওপর থেকে। বোধহয় উতলা হয়েও উঠছিলেন। কিন্তু বাবুরাম-রাখাল-গিরিশকে দেখে সত্যি আনন্দে আপ্লুত হলেন। প্রণামের পর মাথায় স্পর্শ করে আশীর্বাদ দিলেন।
গোলাপমা যে কখনও কখনও একটু বেশি কঠিন আচরণ করে ফেলেন, সারদা জানেন। তাঁর অভিযোগকে খুব একটা গুরুত্ব দিলেন না। সন্তান সম্পর্কে অভিযোগ কি কোনও মা-ই কানে তোলেন! গোলাপমাকে বললেন, ছেলেদের কি মায়ের কাছে আসার জন্য বাধা দেওয়া যায় গোলাপ! ওরা তোমাকে অশ্রদ্ধা করতে চায়নি। কিছু মনে রেখো না।
আজ রেলগাড়ির মধ্যে বসেও, মনে মনে গিরিশচন্দ্রকে আশীর্বাদ করলেন সারদা। অমন ভক্ত মানুষের আবদাঁর না মেনে পারা যায়! বছর চারেক আগে দুর্গাপুজোর সময় সেই সন্ধিপুজোর রাতে গিরিশের বাড়ি যাওয়ার কথাও মনে পড়ল। সেদিন মায়ের উপস্থিতিতে আলো হয়ে উঠেছিল গিরিশের মুখ। অথচ ইদানীং একটি কালচে ছোপ পড়ে গেছে গিরিশচন্দ্রের মুখে, স্বাস্থ্যটাও যেন ভাল নেই। এবারের রওনা হওয়ার কয়েক মাস আগেও মিনার্ভা থিয়েটারে গিরিশের ‘পাণ্ডব গৌরব’ নাটক দেখে এলেন। মঞ্চে দেবীমূর্তির আবির্ভাব দেখে সমাধিস্থ হয়েই পড়েছিলেন সারদা। প্রাণ দিয়ে অভিনয় করেছিলেন গিরিশচন্দ্র। শ্রোতাদৰ্শকরা স্তব্ধ। তবু ফিরে আসার সময়ে বারবার সারদার মনে হয়েছিল, গিরিশ যেন হাঁপিয়ে যাচ্ছিলেন শেষদিকে। দীর্ঘ সংলাপ টানতে দম ফুরিয়ে যাচ্ছিল।
যাত্রীরা একে একে উঠে পড়তে সারদার অতীতচারণ বন্ধ হয়ে এল আবার। প্রায় নির্দিষ্ট সময়ে গাড়ি পৌঁছে গেল বেহরামপুর। দাক্ষিণাত্যের পথে এখন রেলযাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে কেলনার কোম্পানি নামে একটি ব্রিটিশ সংস্থা। স্টেশন মাস্টার মন্মথবাবু তারই কর্মচারী। পুরো একটি দিনের জন্য তিনি আতিথেয়তার আয়োজন করেছিলেন সারদার সম্মানে। পরের দিন আবার সেই একই ট্রেনে তুলে দিলেন মাদ্রাজের উদ্দেশে।
গাড়ি থেকেই পড়ন্ত বিকেলের আলোয় যাত্রীরা দেখলেন ছবির মতো সাজানো শহর ওয়ালটেয়ার।
একই সঙ্গে সমুদ্রের বেলাভূমি আর পাহাড়ের অবস্থান খুব বেশি শহরে নেই। যাত্রীদের চক্ষুসার্থক করার জন্যই গাড়ি কিছুক্ষণ ধীর গতিতে চলে ওয়ালটেয়ারের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময়। খাঁজ কাটা পাহাড়ের গায়ে গায়ে বাড়ি আর পাইন গাছের অরণ্য একদিকে। আর একদিকে কিছু আগেই সারদা দেখেছেন, সমুদ্রতীরের কাছাকাছি বিশাল শিলাখণ্ড, ফেনিলোচ্ছল সমুদ্রের জল আছড়ে পড়ছে তার ওপর। কেউ জানতে পারল না, নিঃশব্দে সারদা তখন মানসচক্ষে তাঁর প্রিয়তম বীরসন্তান নরেনকে অবলোকন করছিলেন। তিন সমুদ্রের সঙ্গমস্থল কন্যাকুমারিকা তাঁর দেখা নেই, হয়তো এযাত্রায় সেখানে যাওয়াও হবে না, কোনওদিনই কি হবে! তা হলেও ছেলেদের কাছে নরেনের সেই শিলায় বসে ধ্যান করার কাহিনি শুনেছেন। আজ ওয়ালটেয়ারের সমুদ্রতটে শিলাখণ্ড দেখে সেই কাহিনি মনে পড়ছিল। নিশ্চয়ই সেই স্থান আরও অনেক বেশি দুর্গম আর নির্জন ছিল।
স্মরণে-মননে, এক নিবিড় অনুভবে রাত্রিটি অতিক্রান্ত হল।
মাদ্রাজ রেলস্টেশনে রীতিমতো আড়ম্বরপূর্ণ অভ্যর্থনার আয়োজনই করে রেখেছিলেন শশী মহারাজ। মায়লাপুর অঞ্চলে একটি দোতালা বাড়ি ভাড়াও করা ছিল। স্বামী বিবেকানন্দ ইতিপূর্বেই ছিলেন দক্ষিণদেশের মানুষদের পরম শ্রদ্ধেয়, আর সেই সুবাদে ঠাকুর এবং সারদা অধিষ্ঠিত ছিলেন অতি উচ্চাসনে। স্বয়ং মায়ের উপস্থিতিতে, ভাষাগত বাধা উপেক্ষা করে, ভারতীয় আধ্যাত্মিক সংস্কৃতির ঐক্যই শয়ে শয়ে নারীপুরুষ ভক্তকে টেনে নিয়ে গেল সারদার চরণপ্রান্তে। তিনি দীক্ষা দিলেন। মুখের ভাষা হার মানল আন্তরিক আকুতির কাছে।
মাদুরাই মীনাক্ষি মন্দির দেখতে গেলেন প্রায় মাসখানের পরে। সেখান থেকে গাড়িতে মণ্ডপম। সমুদ্রের খাড়ি অতিক্রম করে পাম্বান দ্বীপ, আবার রেলগাড়ি চড়ে পৌঁছালেন রামেশ্বর তীর্থ। মন্দির শহরটিতে রাতের অন্ধকার নেমেছে। কিন্তু পাণ্ডা গঙ্গারাম পীতাম্বর সব ব্যবস্থাই করে রেখেছিলেন। সদলবলে বিশ্রাম নিলেন রাতটি।
পাম্বান দ্বীপ এবং সেখানকার রামেশ্বর মন্দির ছিল রামনাদের রাজার অধীনে। আর স্বয়ং রাজা মানুষটি ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দর শিষ্য। আগে থেকে জানতেন রামেশ্বরে কে আসছেন। কর্মচারীদের বলে রেখেছিলেন, আমার গুরুর গুরু, পরমগুরু, মা-জননী যাচ্ছেন মন্দিরে। গর্ভমন্দির খুলে দিয়ে তাঁর জন্য। রত্নাগার উন্মুক্ত করে দিয়ে। কোনও কিছু মায়ের পছন্দ হলে, উপহার হিসেবে নিবেদন কোরো।
মন্ত্রমুগ্ধের মতো তিনদিন ধরে সারদা মন্দির দর্শন করলেন।
কিন্তু কী নেবেন গর্ভমন্দিরের রত্নাগার থেকে? জন্মাবধি দিয়েই যিনি পূর্ণ, তাঁর কী নেওয়ার আছে!
রাধুকে বললেন, তুই দ্যাখ মা। যদি কিছু পছন্দ হয়, নিতে পারিস।
বললেন বটে, কিন্তু বুক ঢিপঢিপ শুরু হয়ে গেল। ঘরবাড়ি, জয়রামবাটির সাংসারিক পরিবেশ মনে পড়ল। কী চেয়ে বসে মেয়েটা! যে লোভী, স্বার্থান্ধ, আত্মকেন্দ্রিক পারিবারিক চেহারা দেখে আসছে… মান রাখবে তো!
কিছুক্ষণ দেখল রাধু। কোষাগারে হিরে-মুক্তো-জহরত ঝকমক করছে। সারদা ঠাকুরকে ডাকছেন।
হঠাৎ রাধু বলল, নাহ্, এসব আর কী নেব?
সারদা নিশ্চিত হতে চাইলেন।—একেবারে কিছুই নিবি না? ঠিক তো?
রাধু সরল হেসে বলল, আমার পেনসিল হারিয়ে গ্যাছে মা। একটা কিনে দেবে?
স্বস্তিতে, আনন্দে চোখে জল এল সারদার। মান রক্ষা হল।
সপ্তাহখানেক ব্যাঙ্গালোরে কাটিয়ে বৈশাখের মাঝামাঝি সারদা কলকাতায় ফিরলেন।
ইদাঁনীং সারদা টের পান কলকাতায় শুধু তাঁর দর্শনলাভের জন্যই না, সঙ্ঘের ভবিষ্যৎ, মঠ-মিশনের পরিচালনা-ব্যয়ভার-দাঁয়িত্ব বিস্তৃতি-প্রশাসন— ইত্যাদি বিষয়েও সাধুসন্তানরা তাঁর ভাবনা এবং মতামতের জন্য প্রতীক্ষা করেন। আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে চান। অথচ সেই অর্থে কোনও প্রশাসনিক দায়িত্ব বা পদে তিনি অধিষ্ঠিত নন। তাঁর একমাত্র পরিচয় তিনি সঙ্ঘজননী। একটি নিঃস্বার্থ নিবিড় ভালবাসায় সকলকে কাছে টেনে রাখা ছাড়া আর কী কাজ জননীর! আসলে তাঁর অনুগত প্রিয় সন্তানরাই জানেন, ওই একটি কাজ-ই কী দুরূহ, কঠিন। এবং একমাত্র তিনি ব্যতীত অন্য কারও পক্ষে ওই ধরে রাখার কাজটি করা সম্ভব না।
নিবেদিতাও সদ্য ফিরেছেন বছর দেড়েক ইংল্যান্ডে কাটিয়ে। স্বেচ্ছাভ্রমণ কিংবা বিশ্রাম নিতে যাননি। তাঁর নামাঙ্কিত মেয়েদের স্কুলটির সুষ্ঠু ও স্থায়ী পরিচালন ব্যবস্থার জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন। করেছেনও। তবু দেহমনের ক্লান্তি যেন বিশ্রামের জন্য হাতছানি দিচ্ছে। মা ফিরেছেন শুনেই দেখা করতে গেলেন।
প্রণাম করামাত্র, খুকি! বলে আনন্দে অভিভূত হয়ে পড়লেন সারদা। চিবুক স্পর্শ করলেন। আবার কী মনে হতেই ডানহাতখানা টেনে নিয়ে চুম্বন করলেন। অনেকদিন পরে মাতৃস্পর্শে শিহরিত, ধন্য হলেন নিবেদিতা। সারদার হাত জড়িয়ে ধরে মাথায় ছোঁয়ালেন।
কী যেন একটা গোপন অনুভবে আজ বুকটা কেঁপে উঠল সারদার মুহূর্ত পরেই। বলেই ফেললেন, তোমার চেহারার এ দশা কেন মা?
একটু পাশ কাটিয়ে গেলেন নিবেদিতা। বললেন, মা সারা-র মৃত্যুর পর থেকেই আমার পরিশ্রম খুব বেড়ে গেছে। আশীর্বাদ করুন যেন সব কাজ ঠিক ঠিক করে যেতে পারি।
ভাঙা ভাঙা বাংলা আর শরীরের ভাষাতেই নিবেদিতা কথা বলেন সারদার সঙ্গে। কিন্তু আত্মিক যোগাযোগ, বোঝাপড়ায় কোনও ব্যবধান থাকে না।
সারদা বললেন, যা, প্রকৃতির অকৃপণ দাঁনের মতোই আমার আশীর্বাদ সবসময় তোমার ওপর আছে, জানবে। কিন্তু তোমার শরীরটি যে যত্ন করে সারিয়ে তুলতেই হবে মা।
নিবেদিতা বললেন, জানি মা। ইতিমধ্যে বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র এবং তাঁর স্ত্রী লেডি অবলা বসু আমাকে তাঁদের সঙ্গে দার্জিলিং-এর বাড়িতে গিয়ে বিশ্রাম নেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
সারদা বললেন, খুব ভাল, তাই করো মা। ওঁদের মতো উদার মহৎ বন্ধু হয় না।
কিন্তু তার আগে একটা জরুরি কাজ আছে মা। বলব?
অবশ্যই বলো মা।
নিবেদিতা বললেন, মা, আমার ইচ্ছে এতদিনে যে সম্পত্তি, অর্থ আমার দ্বারা উপার্জিত হয়েছে, তার সবটা আমি মেয়েদের স্কুলের পরিচালনার জন্য, বেলুড় মঠের ট্রাস্টিদের নামে উইল করে দেব। তারপর…।
নিবেদিতা থেমে গেলেন। সারদাও কোনও প্রশ্ন করলেন না। তার পরের কথাটি বদ্ধ বাতাসের মতো অনুচ্চারিত অস্তিত্বে থমকে রইল দু’জনের মধ্যে।
কয়েকটি দিন পরে দুঃসহ দাবদাহের মধ্যে জয়রামবাটি ফিরে গেলেন সারদা।
দেখলেন তাপে জ্বলছে জয়রামবাটি। পুণ্যিপুকুরের জল শুকিয়ে তলানির কাদা ফুটে উঠেছে। সকালের পরে মানুষজন ঘরের বাইরে যেতে পারে না। মাঠঘাট পাণ্ডুর। কাদাজলে গা ডুবিয়ে বসে থাকে গোরু-মোষ। আকাশে পাখি ওড়ে না, গাছের পাতার আড়ালে বসে ঠোঁট ফাঁক করে হাঁপায়। মাঝে মাঝে ধেয়ে আসে প্রকৃতির ক্রুদ্ধ শাসানির মতন গরম হাওয়ার হল্কা।
কিন্তু কাজ বসে থাকার উপায় নেই তার মধ্যে।
রাধুর জন্য একটি পাত্রের সন্ধান এসেছে তাজপুর থেকে। মন্মথনাথ চট্টোপাধ্যায়। খুব অবস্থাপন্ন নয় পরিবারটি, তবে পালটিঘর। মানুষও ভাল। বর্ষা শুরুর আগেই আয়োজন করে ফেললেন সারদা। তাঁরই তো দাঁয়িত্ব। দেওয়া-নেওয়া কোনও ব্যাপারেই ত্রুটি রাখলেন না। শরৎ মহারাজ নিজে দাঁড়িয়ে সব ব্যবস্থা করলেন।
অথচ সব কাজের মধ্যে কেন যে মনটা বারবার উদাস হয়ে যাচ্ছে!
বর্ষার মধ্যেই খবর এল, মাদ্রাজ থেকে কলকাতা ফিরেই দেহ রেখেছেন শশী মহারাজ। কোন প্রাণে সহ্য করবেন সারদা! এখনও যে ছ’ মাস হয়নি শশীর সেই আয়োজন আর আন্তরিকতাঁর স্মৃতি। তবু সহ্যেরই আর এক প্রক্রিয়ায় জীবন যাপন। জীবনপ্রণালী সঞ্চিত থাকে তার মধ্যে। এবং আরও দুঃসংবাদ এসে তাঁকে বারংবারই নাড়িয়ে দেয়। পুজোর মাত্র ক’দিন আগে তাঁর চির প্রিয়তম খুকি, নিবেদিতাঁর তিরোধানের খবর পেলেন। দার্জিলিং থেকে তাঁর মেয়ে, কলকাতাঁর ভগিনীটি আর ফিরে এলেন না।
ধারাবাহিকভাবে প্রিয়জনদের মৃত্যুবেদনায় দিনে দিনে স্তব্ধ হয়ে যেতে লাগলেন সারদা। তাঁর বেদনার ভাগ দেওয়ার মানুষগুলোই চলে যাচ্ছে।
কেমন যেন বিতৃষ্ণা ধরে যাচ্ছিল সারদার নিজের এই দেহটির প্রতিও। এমনিতেও নড়বড়ে অবস্থা। আধিব্যাধি, বাত, কোমরব্যথা, পেটের অসুখ লেগেই রয়েছে। মনে মনে বলেন, আর কেন ঠাকুর, তোমার কাজ কি এখনও শেষ হয়নি আমাকে দিয়ে! মনের কথার নিশ্চিত উত্তর পান না সারদা। দিনের পরে দিন, ঋতুচক্রের আবর্তনে আবার মাসের পর মাস কাটতে থাকে। যাতায়াত ঘোরাঘুরিও চলে। সাংসারিক কপটাচরণ দেখে ব্যথিত হন, সুসংবাদে আনন্দিত, দুঃসংবাদে অশ্রুমোচন করেন। আর সবকিছু নিয়ে চলতে চলতেই ভাবেন, দেখেন, জগতে যা কিছু ঘটে যাচ্ছে, সব যেন এক অনিবার্য অমোঘ নিয়মের দ্বারা চালিত হচ্ছে। তাঁর কাছে ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনও মূল্য নেই।
নতুন ইংরিজি বছরের দ্বিতীয় মাসেই আবার দুঃসংবাদ— গিরিশ নেই।
সারদার বছর দেড়েক আগেকার আশঙ্কাটি সত্যে পরিণত হল। গভীর শূন্যতার অনুভবে ঝুম হয়ে রইলেন ক’টা দিন।
গ্রাম্য পরিবেশের ছোট জায়গায় থাকলে, ক্রমশ মনটাও ছোট হয়ে আসে। জয়রামবাটির আপনজনদের দেখতে দেখতেই বারবার এই অনুভবটিতে বিদ্ধ হন সারদা। সুতরাং যখনই তীর্থের নামে বেরিয়ে পড়ার আহ্বান আসে, কাছেপিঠে যে ক’টিকে পারেন সঙ্গে নিয়ে যান। কিন্তু তার যে একটি বাস্তব দিক আছে, তিনি তো সে বিষয়েও সচেতন। মায়ের মনের কথাটি জানেন বিশ্বস্ত সন্তান সারদানন্দ এবং কোয়ালপাড়ার আশ্ৰমাধ্যক্ষ কেদারবাবু। তা ছাড়া ইদানীং মা-এর শারীরিক ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও তাঁরা টের পান।
কোয়ালপাড়ার আশ্রমটিকে এমনিতেও সারদা বলেন তাঁর বৈঠকখানা। ভায়েদের সংসারের অশান্তিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠলেই কোয়ালপাড়ায় গিয়ে বসবাস করেন। কালক্ষেপ না করে প্রথমে কোয়ালপাড়ায় কেদারবাবু এবং কিছুদিনের মধ্যেই পুণ্যিপুকুরের সংলগ্ন জমি কিনে সারদানন্দ মায়ের জন্য আলাদা খোলামেলা বড় বাড়ি তৈরি করলেন। অভাব নিয়েই শুরু করা, অথচ ধীরেসুস্থে হয়েও গেল।
হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন সারদা। জানেন আজ উপলক্ষ তিনি হলেও, ভবিষ্যতে উপকৃত হবেন তাঁর শিষ্য-সন্তানরাই।
এক আলোআঁধারি দোলাচল আর মায়ায় যেন আবিষ্ট হয়ে রয়েছেন সারদা। তাঁর কি বাহ্যজ্ঞান নেই! তিনি কি অচৈতন্য অবস্থার মধ্যে আজ নতুন কোনও ধরাধামে অবতীর্ণ হয়েছেন? এখানে কি কোনও স্বর্গীয় দেবালয়ে আরাত্রিক আর মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান হচ্ছে। একটি মিশ্র সুবাস যেন তাঁকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। দূরে কোথাও ঘণ্টা আর শঙ্খধ্বনি তাঁর কর্ণগোচর হচ্ছে। হ্যাঁ, আরও শুনতে পাচ্ছেন যেন তাঁর অগণিত প্রিয় সন্তানদের অনুচ্চ, মৃদু কণ্ঠস্বর। কী বলছে ওরা!
সাহেবের পুলিশ অত্যাচার করছে? দেবেনের পোয়াতি বউকে হঁটিয়ে জেলে ধরে নিয়ে গ্যাছে?
হ্যাঁ বাবা, একটা জোয়ান ছেলে কি ধারেকাছে ছিল না, যে সাহেবকে দু’খানা চড় মেরে বউটাকে ছাড়িয়ে আনতে পারত?
এ যদি ইংরেজের অবস্থা হয়ে থাকে, তা হলে আর বেশি দিন না।… ভিক্টোরিয়ার আমলেও বাবা এসব অনাচারের কথা শুনিনি।…
হ্যাঁ গো, সুরো আর নলিনী কি আবার ঝগড়া করছে? সত্যি বাবা, খুড়ি-ভাইঝি, যেন সাপে-নেউলে সম্পর্ক ওদের! তোদের কাউকে আমি কি কিছু কম দেখি, কম ভালবাসি রে? মা নলিনী, মনটাকে শুদ্ধ কর, তা হলে তোর অত শুচিবাই থাকবে না।
ওগো ঠাকুর, এ তোমার কেমন বিচার! আমায় রেখে দিলে… আমার খুকু-নরেন-যোগীন-শশী-গিরিশকে টেনে নিলে?… সবাই বলে, আমি নাকি রাধি-রাধি করে হেদিয়ে মরছি। কী জানি… ও মেয়েটাকে কার কাছে রেখে যাব!
ওলো ও রাধি, তোর কি লজ্জাশরম নেই? শাড়ির আঁচল ছুঁইয়ে যাচ্ছিস আমার ছেলেদের গায়ে? জানিস না ওরা ব্রহ্মচারী? পায়ে হাত দিয়ে পেন্নাম কর এক্ষুনি। ওরা কি তোদের মতো সংসারী? দেখছিস না কী কষ্ট করে পড়ে রয়েছে ঠাকুরের কাজ করবে বলে!
একটু জল দে মা, জল দে। গায়ে হাত বুলিয়ে দাও তো বউমা… আবার আমবাত বেরিয়েছে বোধহয় গো। বড্ড জ্বালাপোড়া…।
খুকি চলে গেল? জানো আমায় কী বলেছিল? বলেছিল, মাতাদেবী, আপনি হয়েন আমাদিগের কালী। আমি তো কথা শুনে হেসে বাঁচি না। তারপর বললুম, না বাবা, কালী-টালি হতে পারব না, সারা জীবন জিভ বার করে থাকতে হবে। ও কি দার্জিলিং গ্যাছে?
তোমরা সব কারা বাবা এখানে? আমায় দেখতে এসেছ? থাকো বাবা-মা তোমরা সবাই থাকো আমার কাছে। তোমাদের না দেখলে বাঁচি না যে!
কী বলছ, আমার খুব জ্বর বেড়েছে? তা হোক…। তোমাদের জ্বরজারিগুলো আমায় দিয়ে দাও না… সব ঠাকুরের কাছে চালান করে দেব। কিন্তু বাবা, ওই জুতো পরা মেয়েদের সেবা কিন্তু নেব না। ও মা, রাগ করলি নাকি? দুঃখ দিতে চাইনি মা… সংস্কার। তোরা কি আমার পর গো? সবাই ভাল করে খাবি, ভাত-মাছ-শাকপাতা…। ইন্দু, ও ইন্দু, আমার জন্য ছোলার শাক আর আমরুল পাতা আনতে বলিস তুলসীকে…।
কত বেলা হয়ে গেল আজ! তোমরা মুখে দুটি দিয়েছ বাবা?
দ্যাখো দিকিনি কাণ্ড! আমি বিছানায় পড়ে গেলাম… আর রান্না-বান্না সব বন্ধ? কে কুটনো কুটছে? শোনো মা… খোসা-টোসাগুলো ফেলে দিয়ো না যেন। গোরু দুটি তো আছে। ও হ্যাঁ, আমার গঙ্গারাম (টিয়াপাখি)-কে দুটি পাকা লঙ্কা আর ছোলা দিয়ো।
দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে কে মা-মা বলে ডাকছে… ওরে মাকু, ডেকে নিয়ে আয় মা…। দ্যাখ বোধহয় বাংলা জানে না। সাহেব নাকি রে?
আজ কি একাদশী? না, মা তোমরা কেউ নির্জলা নিরম্বু উপোস কোরো না। আমাকেও একটু জল দাও।
মা-মা, আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন?
কে বাবা? শরৎ?
হ্যাঁ মা, আমি, আমি।
তুমি কাশী থেকে ফিরে এসেছ বাবা? তোমায় তার করেছিল আমার অসুখ করেছে বলে?
হ্যাঁ মা, আমি কালকেই ফিরেছি।
ওহ, আমি কি তা হলে বাগবাজারের বাড়িতে এখন?
না মা, আপনি কোয়ালপাড়ায়, জগদম্বা আশ্রমের বাড়িতে।
এতক্ষণ কাদের সঙ্গে কথা বলছিলাম গো?— সারদা যেন এক গভীর আবেশ থেকে, খুব কষ্ট করে চোখের পাতা দুটো খোলার চেষ্টা করলেন।
সারদানন্দ দেখলেন মায়ের চোখ দুটি জুরের তাড়সে করমচার মতো লাল। ঘোলাটে দৃষ্টি মেলে সারদা বললেন, কই বাবা শরৎ, তারা সব কোথায় গেল? কথা বলছিলাম যে…।
কোমল কণ্ঠে শরৎ মহারাজ বললেন, এই তো মা, আমরা ক’জনই। আর কেউ এখানে নেই… আপনার খুব জ্বর হয়েছে মা, সেই ঘোরে বোধহয় নানান কিছু ভাবছিলেন… মাঝেমাঝে কীসব বলছিলেন।
ওহ্ তাই? শরীরটা আর তো সারছে না বাবা… মাথায় বড্ড যন্ত্রণা…।
সারবে মা, সারবে। আমি তো সেইজন্যই কলকাতা থেকে ডাক্তার সতীশ চক্রবর্তী মশাইকে নিয়ে এসেছি।
আবার তাঁকে কষ্ট দেওয়া… এই ক’মাস আগে একবার দেখে, সারিয়ে গেলেন। কাঞ্জিলালবাবুও এসেছেন নাকি?
না মা। সতীশবাবুকেই নিয়ে এসেছি। যোগীনমাও এসেছেন…এই যে।
যোগীনমা এগিয়ে এসে সারদার কপালে হাত রাখলেন। থাক মা, আর কথা বোলো না, ডাক্তারবাবু একটু দেখবেন এবার।
আস্তে আস্তে চোখের পাতা বুজে ফেললেন সারদা।
পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ওষুধপত্রের ব্যবস্থা করলেন সতীশবাবু। জ্বর না কমা পর্যন্ত কোয়ালপাড়াতেই রাখার পরামর্শ দিলেন।
একটানা বেশ কিছুদিন ধরে ধকল যাচ্ছিল সারদার। শরীরের তো বটেই, মনের ওপরও চাপ কম না। একটির পর একটি প্রিয়জন তাঁকে ছেড়ে চলে যাচ্ছিল। শোকের কোনও ওষুধ নেই। মনের বেদনা প্রকাশেরও ভাষা থাকে না অনেক সময়। পাথরচাপা হয়ে তা বসে যাকে বুকের মধ্যে। চতুর্দিকের টানাপোড়েনে কখনও একটু ভুলে থাকেন, হঠাৎ আবার কোনও স্মৃতির সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসে। এর সঙ্গেই আছে হাজারো সাংসারিক অশান্তি। নিজেদের বাড়ি, জমিজমা সব ভাগবাঁটোয়ারা হয়ে গেছে, নিজে উঠে এসেছেন ছেলেদের তৈরি করে দেওয়া নতুন বাড়িতে। ভায়েদের সংসার থেকে নলিনী-মাকু-রাধু-সুরবালাকেও নিজের সঙ্গে এনে রেখেছেন। তা সত্ত্বেও দেখেন প্রসন্ন-কালীকুমার-বরদা প্রায়ই ছোটখাটো বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে বচসা, অশালীন আচরণ করেন। এসব দেখে যে সারদার বক্ষ বিদীর্ণ হয়, ভায়েরা তা বোঝে না। বরং এর ওপরেও নানান ছলছুতোয় তারা সারদার কাছ থেকে প্রতিদিন কিছু আদাঁয় করতে চায়। মাঝে মাঝে ভায়েদের লোভ, কাঙালপনা আর আচরণে, দূর দূর জায়গা থেকে আগত ভক্তশিষ্য ছাড়া, ব্রহ্মচারী ছেলেদের কাছেও তাঁর লজ্জায় মাথা কাটা যায়।
এর ওপর তিনটি বাড়বাড়ন্ত মেয়ে নলিনী-সুশীলা (মাকু)-রাধুকে নিয়েও তাঁর হ্যাপা আছে। তিনটিরই বিয়ে হয়ে গেছে, পনেরো থেকে কুড়ি-একুশের মধ্যে বয়েস, কিন্তু কোনওটিই সেই অর্থে শ্বশুরবাড়ির ঘর করতে গেল না। আসে, যায়। অধিকাংশ সময় জয়রামবাটিতেই থাকে। মুখে কিছু বলেন না সারদা। আপন পিসিমা হয়ে বলা যায়ও না। কিছুটা স্নেহের প্রশ্রয়ও কি নেই? আছে। কিন্তু আসল কথাটিও সারদা বোঝেন না, তা নয়। পিসিমার ছত্রছায়ায় থাকার স্বাচ্ছন্দ্য কোন শ্বশুরবাড়ি দেবে?
নলিনীর জামাই প্রমথ ভটচায তো কয়েকবার বউকে নিতে এসে ফিরে গেল। এরপর সে ছেলে যদি অন্য বউ এনে ঘরে তোলে, কাকে দোষ দেবেন সারদা! তার ওপর মেয়েটা যেমন পিটপিটে, ঘেন্নাবাতিক, তেমন শুচিবাই। আবার মা নেই, বাপ দ্বিতীয়পক্ষের বউ এনেছে, এসব ভেবে সারদার একটু দুর্বলতাও আছে। কিন্তু সুরবালাকে ও দু’চক্ষে দেখতে পারে না। মাকুর অবশ্য একটি ছেলে হয়েছে, সত্যি সত্যি সে যেন একেবারে দেবশিশু। নাম ন্যাড়া। এখনও দু’বছর হয়নি ছেলের, কিন্তু এর মধ্যে ‘শালুক চিনেছে গোপাল ঠাকুর।’ কখনও হামা দিয়ে কখনও থুপথুপে পায়ে এখন থেকে ন্যাড়া ঠাকুরপিসির কোল দখল করে। সবই মায়া। জেনেবুঝেও সারদা নাচার।
আর এদের সবার মধ্যে রাধু তো প্রায় তাঁর মেয়েই। জন্ম থেকে পালছেন। কী যে একটা টান মেয়েটার জন্য, কেনই বা, সারদা ব্যাখ্যা করতে পারেন না। আর নিজেই যখন পারেন না, তখন অন্যদের বলা, মায়ায় জড়িয়ে থাকার অভিযোগের কী উত্তর দেবেন! শুধু একটি নিবিড় বিশ্বাস ধরে রাখেন। সেটি ঠাকুরের নির্দেশ। তোমায় দেখে লোকে শিখুক।… কিন্তু ইদানীং সেই রাধুরও হাবভাব, খিটখিটে মেজাজ, যখন তখন অকথা-কুকথা বলা, এমনকী মাঝেমাঝে তাঁকে শারীরিক নির্যাতনও, দেখে দেখে সারদা ভাবেন, সেই “তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে”–তাঁর কি তেমন অবস্থাই হবে! এখনও রাধুর ছেলেপুলে হয়নি, কিন্তু সারদা আঁচ করেন— হলেই হল।
এসব তো গেল পরিবার সংসার-ঘর-ছেলেমেয়ের কথা। কিন্তু ক’বছর ধরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে, অন্যতর আর একটি উদ্বেগও সতত ক্রিয়াশীল থাকে সারদার মনে। প্রথম যুদ্ধের সন্ত্রাস অপেক্ষাকৃত পড়তির দিকে যদিও, তবুও, মাঝেমধ্যেই তাঁর ভক্তশিষ্য আর ব্রহ্মচারী ছেলেদের নিয়ে ঝামেলা পাকানো, জিজ্ঞাসাবাদ, পুলিশের যাতায়াতে খুবই দুশ্চিন্তা আর অশান্তি ভোগ করেন সারদা। পূর্ববঙ্গ থেকে আসা সাধু আর ব্রহ্মচারীদের নিয়ে পুলিশের সন্দেহ বেশি। তারা মনে করে, স্বদেশি আন্দোলনে যুক্ত কিছু নজরবন্দি ছেলেরা নাম গোপন করে জয়রামবাটি এবং কোয়ালপাড়ায় আশ্রয় নেয়।
ক’দিন আগেই কাটিহার থেকে জ্ঞানমহারাজ জয়রামবাটি আসায় পুলিশ অহেতুক বেশি সতর্ক হয়ে পড়েছিল। আর তার ধকলটা গেল সারদার ওপর দিয়ে। উপায় কী? নিরাপরাধ ছেলেদের সন্দেহবাতিক সাহেব পুলিশদের হাত থেকে বাঁচাবে কে!
গাঁয়ের চৌকিদার সারদার অম্বিকাদাদা। সকাল সকাল বাড়ি বয়ে এসে খবর দিয়ে গেল।
দিদি গো, শিরোমণিপুরের দাঁরোগা আসছে তোমার বাড়িতে।
দারোগা! সারদা আকাশ থেকে পড়লেন। আমার বাড়ি তো আশ্রম, সেখানে দারোগা-পুলিশ কী চায় অম্বিকাদাদা?
ওই আর বলো কেন! কাটিহার থেকে তোমার কোনও শিষ্য এসেছে… জ্ঞানবাবু, না কী মহারাজ…।
তার সঙ্গে দারোগার কী সম্পর্ক?
তিনি নাকি ফেরারি আসামি, কাটিহার থেকে পালিয়ে এসে তোমার এখানে লুকিয়ে রয়েছে।
সারদা বললেন, জ্ঞানের ভাই শুনেছি স্বদেশি না বিপ্লবী কী যেন। কিন্তু জ্ঞান তো ভক্ত ছেলে। কাটিহারে অঘোরনাথ ঘোষ ডাক্তারবাবুর বাড়িতে ম্যালেরিয়ায় পড়েছিল, আমার অসুখ শুনে ছুটে এসেছে।
কী বলব দিদি! পুলিশের এখন ‘মাথার ঘায়ে কুকুর পাগল’ অবস্থা… সরষের মধ্যেও ভূত দেখছে। ওই তাঁকেই তাঁর ভাই মনে করে…।
সারদা মাথা ঠান্ডা রাখলেন। পুলিশ-দারোগা হলেও মানুষ তো বটে। আসছে আসুক। তাদের বোঝাতে হবে আশ্রম এবং তাঁর ভূমিকা। আবার ছেলেকেও বাঁচাতে হবে। সাপও মরবে, লাঠিও ভাঙবে না, তেমন ব্যবস্থা করেই সারদা আরামবাগ-এর উকিল, তাঁর শিষ্য মণীন্দ্রনাথ বসুকে খবর দিয়ে আনালেন জয়রামবাটিতে। আদ্যোপান্ত সব বলে কয়েও রাখলেন।
দারোগা এলেন, দেখলেন, খোঁজখবর দিলেন। মণীন্দ্রনাথই কথাবার্তা বললেন। শেষ পর্বে নিরাড়ম্বর আপন ভূমিকায় মায়ের মতোই আচরণ এবং আপ্যায়ন করলেন সারদা। আগন্তুক দাঁরোগা-পুলিশদের জলখাবারের আয়োজন করেছেন। নীরব শান্ত ব্যক্তিত্ব, উপস্থিতি আর স্বভাবগত স্নেহ মিশিয়েই পরিবেশনও করলেন তাঁদের। পুলিশ-দারোগা-সাহেবসুবো— যে-ই হোক, তারাও তো পর নয়।
কার কাছে এসেছেন দারোগা-পুলিশ! কার গৃহে তদন্ত? মাকে দেখে অবাক মানলেন, যাঁরা গেছিলেন।
নিবিড় শ্রদ্ধায় প্রীতিতে শ্রীচরণে মাথা ঠেকিয়ে পূর্ণ পরিতৃপ্তি নিয়ে ফিরে গেলেন রাজকর্মচারীরা।
শরীরটা একটু সুস্থ হতেই সারদা অনুভব করেন, মনের উদাস অবসন্নভাবটা আর কিছুতে কাটছে না। মুখ ফুটে সেকথা বলতেও পারেন না। অগণিত ভক্ত সন্তানরা তো আছেই, দূরদূরান্তর থেকেও কত মানুষ একটু শান্তির আশায়, দুটো কথা বলতে, একটু জুড়োতে আসে তাঁর কাছে। জাত-বেজাত, গরিব-বড়লোক, নারী-পুরুষ বলে তো কোনও কথা নেই। যে আসে সেই আপন। অথচ দেহের খাঁচায় বন্দি মহাপ্রাণীটি-ও যে বারবার আপন সীমাবদ্ধতাকে সচেতন করে দিতে চাইছে। ডাক আসছে। নোঙ্গর তোলো, পাল গুটিয়ে নাও গো।
বললেই কি আর হয়! ঋদ্ধ জীবনের সূক্ষ্ম শিকড়-বাকড় চারিয়ে গেছে গভীর থেকে গভীরে। কাটান-ছাড়ান, উপড়ে তোলা কি অত সহজ ঠাকুর! খাঁজে-ভাঁজে, শিরায়-স্নায়ুতে পাকে পাকে জড়িয়ে গেছে। ছিঁড়তে, মুক্ত হতেও যে প্রস্তুতির দরকার।
পথ্য গ্রহণের পরে শরৎ মহারাজ বললেন, মা, এবার আর আপনাকে ছেড়ে যাব না। সঙ্গে করেই কলকাতা নিয়ে যাব।
দুটি ভাত মুখে দিয়ে অল্পস্বল্প হাঁটাচলা করেন সারদা এখন। বসে বসে কথা বলেন। সারদানন্দের মতো ব্যস্ত ব্যক্তিত্ব কলকাতা ছেড়ে কোয়ালপাড়ায় তাঁকে নিয়ে সময় অতিবাহিত করলে, বাগবাজারে-বেলুড়ে কী অবস্থা দাঁড়ায়, সে বিষয়ে সম্যক অবহিত তিনি। অনেক নিবেদিত প্রাণ ছেলেরাও এখন দায়িত্ব নিয়ে কাজ করে। প্রশাসন-সেবা-শিক্ষা-কৃষি-পুজোআৰ্চা চালায়। তা হলেও শরৎ-সারদা-বাবুরাম-তারক- কৃষ্ণলাল-রাজা-শুকুল… কাছেপিঠে না থাকলে অনেকসময় চোখে অন্ধকার দেখে। এসব বাস্তব অসুবিধের কথা সারদা বোঝেন। তা ছাড়া মঠের অন্যান্য শাখাতেও স্তম্ভরূপী ছেলেদের ছোটাছুটি করতে হয়।
ধীরেসুস্থে সারদা বললেন, তাই তো বাবা, আমাকে নিয়ে এখানে পড়ে থাকলে তোমাদের চলবে কেন?
সামান্য বিভ্রান্ত বোধ করলেন শরৎ মহারাজ। একটু অভিমানের ছোঁয়া রয়েছে কি মায়ের কথায়! বললেন, পড়ে থাকার কথা নয় মা। কিন্তু অসুখ-বিসুখ হলে আপনার ঠিকমতো চিকিৎসা হওয়াটাই যে বেশি জরুরি।
সারদা মাথা নাড়লেন।— সেটা করতে গিয়ে তোমাদের বড় দৌড়ঝাঁপ হচ্ছে বাবা, আমি বুঝি।
নাহ্, আর সন্দেহ নেই। সারদার সংকুচিত অনুভূতিটি শরৎ মহারাজ ঠিকই টের পেলেন। বললেন, মা, আপনার সেবা করার জন্য এটুকু যাতায়াত… কত জন্মের ভাগ্য করেছিলাম তাই পারছি। কিন্তু আপনাকে কলকাতায় নিয়ে যেতে চাইছি কি সেইজন্য? তা নয় মা। আপনাকে জয়রামবাটিতে রেখে গেলে, আমি যে উদ্বেগে তিষ্ঠোতে পারব না।
এবার সামান্য হাসলেন সারদা। তারপর বললেন, অবশ্য শরীরের যা অবস্থা, এর ওপর গড়বড় হলে, তখন ধারেকাছে তোমায় না দেখলে, আমিই কি আর কারওর ওপর নির্ভর করতে পারব?
তা কেন পারবেন না মা! আপনার একটু সেবা করার জন্য কত ভক্ত-শিষ্য-সন্তান মুখিয়ে…।
থাক বাবা শরৎ, তোমাকে আর ‘কতজন’ দেখাতে হবে না। আমার দায়, আমার ভার, কে নেয়, নিতে পারে, আমার থেকে ভাল কেউ জানে না।
উৎফুল্ল, উজ্জ্বল হয়ে উঠল শরৎ মহারাজের মুখখানা। সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘ শরীরটি নুইয়ে মাথা ঠেকালেন সারদার পায়ে। বললেন, মা আশীর্বাদ করুন, যেন জন্মজন্মান্তরে ওই কাজটিই করে যেতে পারি। আমি আর কিছু চাই না।
শরৎ মহারাজের চিবুক স্পর্শ করে নিজের মুখে ছুঁইয়ে সারদা বললেন, আচ্ছা বেশ। তাই করলুম। হল?
মাথা ঝুঁকিয়ে শরৎ বললেন, হ্যাঁ মা। তার সঙ্গেই যোগ করলেন, তা হলে কলকাতা যাওয়ার ব্যবস্থা করি?
সারদা বললেন, তা… করো। কিন্তু বাবা, কোয়ালপাড়া থেকে একবার জয়রামবাটি গিয়ে যাত্রাটা বদলে আসতে হবে।
শরৎ হাসলেন।— জানি মা। সিংহবাহিনী মা-কে দর্শন না করে আপনি কলকাতা যাবেন না।
বিশ্বাস বাবা। সারদা বললেন, ঠাঁইনাড়া হতে গেলেই ভাবি, যাদের রেখে যাচ্ছি, আর যাদের কাছে যাচ্ছি, মঙ্গলময়ীর করুণা যেন তাদের সবাইকে রক্ষা করেন। তার ওপর রাধুরও তিনমাস চলছে…।
যাত্রা বদলের অছিলায় কয়েকটা দিনই জয়রামবাটিতে কেটে গেল। এমনিতেই জ্যৈষ্ঠ মাস, দুর্ধর্ষ গরম। সকালে আটটার পরে আর বিকেলে ছ’টার আগে ঘর থেকে বেরুনো দায়। তার মধ্যেই পুকুরে জল কমে যাচ্ছে বলে মাছ-টাছ ধরা হল, হইচই করে কাটানো হল। নিজের বাড়িতে থেকে কয়েকটা দিন বিশ্রামও হয়ে গেল সারদার। কলকাতার জীবনযাপনে আয়াস আছে, আবার একটু কৃত্রিমতা, বদ্ধতা থেকেও যেন সম্পূর্ণ রেহাই পান না। গ্রামে সেটি নেই। পরিশ্রম করতে হয়, সাংসারিক ঝামেলা পোহাতে হয়, তবু তো নিজের গ্রাম, ভিটেবাড়ি, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, বাপ-মায়ের স্মৃতি। একটা গাছ, পুকুর ঘাট, অবলা জীব, ধানের মরাই-ঢেঁকি-তুলসীমঞ্চ… সেও যে বড় আপন। তবু শরীরের যা অবস্থা, ভরসা করতে পারেন না। শরতের কথাও ভাবেন বইকী! দলবলসুদ্ধ রওনা হয়ে গেলেন।
অথচ কলকাতায়, বাগবাজারে নিজের ‘উদ্বোধন’ বাড়িতে এসেও এবার যেন পুরো স্বস্তি পান না সারদা। শরীর আর দিচ্ছে না।
গোলাপমা-যোগীনমা সহ ভোর ভোর উঠে গঙ্গাস্নানে যান, সেইটি ভাল লাগে। গলির রাস্তা দিয়ে দু’পা গেলেই গঙ্গা। অশখ-নিম-আম-জামবট কদম বড় বড় গাছের ছায়ায় নিরিবিলিতে স্নান সেরে আসেন। চেনা অচেনা অনেক মেয়ে-বউয়ের সঙ্গে দেখা হয়, দুটো কথা বলেন, প্রণাম নেন, নাম জিজ্ঞেস করেন। বাইশ-তেইশ বছরের একটি মেয়ে একদিন প্রণাম করলে সারদা নাম জিজ্ঞেস করলেন। ‘নির্ঝরিণী’ নামটা শুনেই বড় ভাল লাগল। মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করলেন। প্রতিটি বড় বড় গাছের গোড়ায় একটু করে জল দেন সারদা, প্রণাম করেন। বলেন, এঁরা সব ত্রিকালদর্শী, এদের সম্মান করতে হয়, মানুষ চলে যায়, এঁরা থাকেন।
গরমে এসেছিলেন। বর্ষায় পৃথিবী একটু জুড়োল। কিন্তু বুক ভাঙা দুঃসংবাদ পেলেন মধ্য শ্রাবণের এক বিকেলে। মহাপ্রয়াণ করেছেন স্বামী প্রেমানন্দ, মায়ের ঘনিষ্ঠ সন্তানদের অন্যতম, তাঁর প্রিয় বাবুরাম। কত স্মৃতি— সেই কাশীপুর উদ্যানবাটি, আঁটপুর থেকে শুরু করে কাশী-বৃন্দাবন-পুরী। বেলুড় মঠের কাণ্ডারী, যেন আলো করে রাখত চতুর্দিক মায়ের বাবুরাম। আলোটি নিবে গেল।
কলকাতা থেকে ফিরে যাবেন মনস্থ করেছেন সারদা। অথচ শরীর বইছে না। তার মধ্যেও আসেন দর্শনার্থী, দীক্ষাপ্রার্থী, প্রার্থিনীরা। সারদানন্দ যতটুকু পারেন, মায়ের স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে ঠেকিয়ে রাখেন। কিন্তু তিনি ঠেকিয়ে রাখলে কী হবে, মাঝে মাঝে তদ্গতপ্রাণ কোনও সন্তানের ডাক যে সারদা নিজেই শুনতে পান।
একটি পারশি যুবক এসেছেন— আর কিছু না, মাকে দেখব একবার। বহুদুর দেশ থেকে এসেছেন। অবসন্ন চেহারা, অবিন্যস্ত চুল, টকটকে গায়ের রং।
মা অসুস্থ। যুবকটিকে ওপরে যেতে দেওয়া হয়নি। তিনি ফিরে যাবেন না, নীচে বসে রইলেন।
খবর যাঁর পাওয়ার, তিনি ঠিকই পেয়ে গেলেন। একটি ব্রহ্মচারী ছেলেকে ডেকে বললেন, বাবা, নীচেয় বহুক্ষণ ধরে একটি ছেলে বসে আছে। তাকে আমার কাছে এনে দাও।
দু’জনের দেখা হল। মা ও ছেলে। জাতি-ধর্ম-ভাষা কোনও কিছুরই মিল নেই। দরকারও তো নেই। অন্তরের ভাষার কাছে শব্দই তো বাহুল্য।
তবু প্রণামের পর সারদা জিজ্ঞেস করলেন, বাবা তোমার নাম কী?
ছেলে ঠিক বুঝল।— সোরাব মোদি।
কোথায় থাকো? কী করো বাবা?
বহু দূরের… পারস্য দেশে মা, এখন বোম্বাইতে থাকি। কিছু করব এবার… সিনেমা-ফিলিম… প্রোডিউস করব, পার্ট করব।
তোমার হবে বাবা। আশীর্বাদ করছি… ঠাকুর তোমায় দেখবেন।
ঠোঁট কাঁপছে সোরাব মোদির। চোখ ফেটে জল আসছে। মনে রেখেছেন, মা অসুস্থ। বললেন, যাই মা।
যাই বলতে নেই বাবা, আসি বলতে হয়। এসো।
আর বাধা মানল না চোখের জল। মুখ থেকে বেরিয়ে পড়ল, ওয়ান্ডারফুল, ওয়ান্ডারফুল! মায়ের পায়ের পাতা ভিজে গেল সোরাব মোদির চোখের জলে।
শরৎ মহারাজ সবই শুনলেন পরে। বললেন, মায়ের পারশি শিষ্য… বাপরে, আমার কী বলার আছে!
অনেকদিন পরে দক্ষিণেশ্বর মন্দির থেকে রামলাল আর লক্ষ্মী এল ছোটখুড়ির সঙ্গে দেখা করতে। শুনেছে শরীর ভাল না। কবে আর কামারপুকুর যেতে পারবেন, কি পারবেন না ঠিক নেই। একবার দেখা হবে, সেইসঙ্গে কামারপুকুরের বিষয়সম্পত্তির বিষয়েও যদি একটা ফয়সালা করে যাওয়া যায়… রথ দেখা কলা বেচা দুটোই হয়ে যায়। তাঁর কথাই যে আসল কথা, এ জ্ঞান রামলাল-লক্ষ্মীদের আছে। বিশেষ করে, কামারপুকুরে যে ঠাকুরের মন্দির হবে, ঘরবাড়ি সংরক্ষণের ব্যবস্থা হচ্ছে, এখবর তাদের কানে গেছে।
লক্ষ্মীর বয়সও মধ্য পঞ্চাশ এখন, তা হলেও চেহারায় ভরাভরতি সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের ছাপ। রামলালের চুলে পাক ধরেছে, বিষয়আশয়ের ব্যাপারেও তার মাথা বরাবর পাকা। স্বয়ং ঠাকুরের ভাইঝি ভাইপো, একই পারিবারিক শোণিত প্রবাহিত তাদের মধ্যে, সেই পরিচয়েই একটি সামাজিক মর্যাদা আছে। কিন্তু রামকৃষ্ণদেবের ভিটেবাডি বেলুড় মঠের ট্রাস্টিদের হাতে অর্পণ করা হবে, শুনে তাদের টনক নড়েছে। একমাত্র আইনগত উত্তরাধিকারিণী সারদা। তিনি তো আবার সবার মা, কেউ তার পর নয়। কাকার সম্পত্তিতে তাদের কোনও হক থাকবে না!
প্রণাম করে নরম সুরেই বাজল ভাইবোন। রামলাল বলল, কতদিন তোমায় দেখিনি খুড়িমা। সেই যে রামেশ্বর ঘুরে এলাম… তারপর কতদিন কেটে গেল! মহারাজদের কাছ থেকে খবর অবশ্য সবই পাই। মনটা টানে, কিন্তু তোমায় বিরক্ত করতে ইচ্ছে করে না।
লক্ষ্মী চোখের জল ফেলল।— মা গো, এ কী হাল হয়েছে তোমার! ভায়ের বউরা, মেয়েরা তোমায় দেখে না?
এর মধ্যে আবার আমাশয়ে ভুগে উঠেছেন সারদা। দুর্বল। বললেন, কত আর দেখবে মা! এবার সময় হয়েছে, তাঁর দেখার অপেক্ষাতেই আছি।
ওকথা বোলো না মা। তুমি ঠাকুরের কাছে চলে গেলে, আমরা কোথায় যাব?
তাঁর আশ্রয়ই তো সবায়ের ঠিকানা মা।
তা তো ঠিকই। কিন্তু তোমার তিন-তিনটে ভাই, বউ, অতগুলো ছেলেপুলে… তাদেরও কোলেকাঁখে করে মানুষ করলে, বাড়িসম্পত্তির ব্যবস্থা করে দিলে, তাঁরপরেও যদি তোমায়…।
সারদা থামিয়ে দিলেন।— অন্য কারওর দোষ দেখতে নেই মা, তাইতে বড় অশান্তি। কামারপুকুরের কথা বল।
উত্তর দিল রামলাল। উদাস গলায় বলল, কামারপুকুরে আমাদের আর কী-ই বা আছে খুড়িমা! তুমি থাকলে তবু না হয় একটা কথা ছিল। তুমি স্বয়ং অন্নপূর্ণা, তোমার দৌলতেই কত কিছু হতে পারত।
অতীতের কিছু ধূসর স্মৃতি শুকনো হাওয়ার মতো উড়ে আসছিল সারদার মনে। নাহ্, সেসব মনে আনতে নেই। বললেন, না-না, আমি কে বাবা! তিনিই তো সব। আর তিনি তোদের ঘরের মানুষ। আপন খুড়ো৷ তোদের তো কোনও অভাব নেই।
রামলাল বলেই ফেলল, কিন্তু খুড়োর ঘর তো আর আমাদের দখলে থাকছে না।
সারদা বললেন, তাঁর ঘর যে সবায়েরই ঘর বাবা। আমাদের-তোমাদের বলে কি আর দখল রাখা যায়?
তুমি তাঁর একমাত্র ওয়ারিশন, তুমি বলে দিলেই যায়।
ওকথা বলে না বাবা। আমি নিমিত্তমাত্র। এ জগতের সকলেই তাঁর উত্তরাধিকারী।
আলোচনাটা বাস্তবে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করল লক্ষ্মী। বলল, মা গো, কথাটা আসলে… মানে, তুমি যা বলছ তাই-ই, তবে বিষয় সম্পত্তি মানেই তো আবার আইনকানুনের ব্যাপার। এদিকে কাকার যা কিছু, সেসব তো এখন মঠের হেফাজতে চলে যাচ্ছে…। মহারাজরাই সব…।
সারদা বললেন, তা তো যাবেই মা। সাধু-মহারাজরা তাঁর সবকিছুই দেখেন, তাঁর নামেই ঘর ছেড়ে এসেছে। তাঁরই সন্তান সব।
লক্ষ্মী বলল, সে তো একশোবার খুড়িমা। তা হলেও আপন ভাইপো হিসেবে দাদা, শিবু সবায়ের যদি কিছু বন্দোবস্ত হত!
কী বন্দোবস্ত তোরা চাস মা?
মানে… ওরাও যাতে থাকতে-টাকতে পারে, কাকার নামে মন্দির হলে সেখানকার সেবাইত হিসেবে… নিজেরই ভাইপো…।
সারদা বললেন, এরা সব সাধু-সন্ন্যাসী মানুষ, জাত-বেজাতের বিচার নেই। আর তোরা হলি সংসারী, সমাজ-সংস্কার আছে মা। একসঙ্গে সবাই কি থাকতে পারে?
তা কেন পারবে না মা! লক্ষ্মী কথা আদায় করে নেওয়ার মতো ব্যাখ্যা করে বলল, মঠের তা ধরো গিয়ে এখন এলাহি ব্যাপার। কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা আসছে দেশ বিদেশ, ভক্তদের কাছ থেকে। এদের জন্য না হয় ধারেকাছে কিছু জমিজমা কিনে, ঘরবাড়ি তৈরি করে দেবে… সেখানেই পুজোআর্চা নিয়ে থাকবে… ঠাকুরের বংশ বলে একটা কথা তো আছে…। তুমি বললেই হবে।
বৈষয়িক কথার কচকচানি আর ভাল লাগছিল না সারদার। ক্লান্ত বোধ-ও করছিলেন। শান্ত কণ্ঠে বললেন, আচ্ছা মা, আমি শরৎকে সব বলব। কামারপুকুরে গিয়ে তোদের যাতে কোনও কিছুর অসুবিধে না হয়, ছেলেরা তা দেখবে। গৃহদেবতা তোদের হেপাজতেই থাকবে।
রামলালরা বুঝে গেল, সারদার ওটুকু আশ্বাসেই, তাদের বংশ পরম্পরার হিল্লে হয়ে যাবে।
শীতের শেষে যেন গাঁ-এর টানে থাকতে না পেরেই আবার ফিরে গেলেন সারদা।
যাতায়াত, গাড়ি ঘোড়ার ধকল আর সহ্য হয় না। শরীর অবসন্ন হয়ে পড়ে। ট্রেনে যাতায়াতের সুবিধে হয়েছে, তা হলেও দুটি দিন লেগে যায়। বিষ্ণুপুরে সুরেশ্বর সেন-এর বাড়িতে রইলেন একদিন। প্রতিবারই কয়েকদিন কাটিয়ে যেতেন, কিন্তু এবার ইচ্ছে ছিল না, মাত্র কয়েক মাস আগে সুরেশ্বরবাবু দেহত্যাগ করেছেন। খাঁটি মানুষ। সারদার ভাষায়, সুরেশ যেন দ্বিতীয় গিরিশবাবু। তাঁর অবর্তমানে তাঁর গৃহে সদলবলে আতিথ্য গ্রহণ খুবই বিড়ম্বনার। তবু বিশ্রামের জন্য থাকতে হল।
জয়রামবাটি যাওয়ার পথেই কোয়ালপাড়া। একবার ঢুঁ মেরে না গেলে সেখানেও ছেলেরা মনঃক্ষুণ্ণ হয়। জগদম্বা আশ্রম নাম দিয়ে নতুন বাড়ি তৈরি হওয়া ইস্তক নানাবিধ কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে সেখানে। পরিবেশটি তা সত্ত্বেও শান্ত। আশ্রম আর সারদার বসতবাড়িটির মধ্যে একটু ব্যবধানও আছে। আশ্রমটি কোতুলপুর-দেশড়া সদর রাস্তার ওপরে, বাড়িটি দু’শো গজ দূরে। চারদিকে পাঁচিল দেওয়া, সিমেন্টের মেঝে। গাছপালা, ঢেঁকি, গোরুর গোয়াল আছে। কয়েতবেল আর ঝাঁকড়া তেঁতুলগাছের ছায়ায়, পাখির ডাকে বেশ নির্জন হয়ে থাকে।
একদিন কিংবা বড়জোর দুদিনের জন্য এসেছিলেন, কিন্তু ফেরা হল না। কোয়ালপাড়ার বাড়ির নিবিড় নির্জনতাটাই রাধুর পছন্দ হয়ে গেল। খিটখিটে অস্থির-বদরাগী, তার ওপর অন্তঃসত্ত্বা রাধু। নিজের শরীর, জয়রামবাটি ফেরার কথা সব শিকেয় তুলে রেখে থেকে গেলেন সারদা। লোকজন, মেয়ে-বউ-ঝির অভাব নেই এখানে। আর শরৎ মহারাজ না থাকলেও বরদা আর রাজেন নামের ব্রহ্মচারী ছেলে দুটি যেমন আন্তরিক তেমনই পরিশ্রমী। কলকাতায় থাকার সময়েই রাধুর অস্বাভাবিক মানসিকতার আকস্মিক তারতম্য, ওঠানামা, অন্তত বরদাঁ খুব ভাল জানে। রাধু একেবারেই কোনওরকম শব্দাশব্দি সহ্য করতে পারে না। যে কারণে কলকাতার বাড়িতে সারদা সব ধাতব জিনিসের ওপরে কাপড় জড়িয়ে দিয়েছিলেন। বরদার এসব জানা এবং দেখা। সেইসঙ্গে অনন্ত সহ্যের অধিকারিণী অসুস্থ মায়ের মানসিকতাও বোঝে বরদা।
শীত গেল। উত্তরের হাওয়া ঘুরে যেতে যেতে উদাস। গাছে গাছে ফুল ফুটছে, পাতা গজাচ্ছে। বনজ গন্ধে প্রকৃতি মাতাল। সারদা ভয়ে ভয়ে থাকেন। একটা একটা অযাচিত খবর কানে আসে আর উদ্বেগে তটস্থ হয়ে যান। দেশড়ার মাঠে নাকি ভালুক বেরিয়ে অম্বিকা চৌকিদারের মাকে মেরে ফেলেছে। এদিকে রাধুর ক্ষ্যাপামি কমার কোনও লক্ষণ নেই। তাবিচ-মাদুলি-জ্যোতিষ, সুষেণগড় থেকে চণ্ড তান্ত্রিক আনানো কিছুই বাদ রাখেননি সারদা। কিন্তু মেয়ের অসুখ আর সারে না। কীভাবে যেন টের পান সারদা তাঁর আর কিছু করার নেই। এবার তিনি ফুরিয়ে এসেছেন।
বৈশাখের প্রথমদিকেই কোয়ালপাড়া আশ্রমে প্রথম করুণতম দুঃসংবাদ সহ্য করতে হল সারদাকে। মাকুর ছোট্ট ছেলে ন্যাড়া, তাঁর সেই দেবশিশুটি ডিপথিরিয়ায় প্রাণ হারিয়েছে। শোকের পাথর বুকে চেপে বসে রইলেন সারদা। এ-ও দেখার ছিল! আর কত ঠাকুর? কেনই বা! শরীর গেছে, শোক পাওয়ার জন্যই টিকিয়ে রেখেছ! অন্যদিকে উদ্বেগও বোধহয় শোকের থেকে মনটা সরাতে উদ্যত হল। রাধুর সময় হয়ে এসেছে। স্বাভাবিক প্রসব হবে তো? খবর গেল শরৎ মহারাজের কাছে। ধাত্রীবিদ্যায় অভিজ্ঞা সরলাদেবী কলকাতা থেকে এলেন কোয়ালপাড়ায়। রইলেন।
ঝাঁঝা গরমের দিনে স্বাভাবিক ভাবেই সুস্থ পুত্রসন্তান প্রসব করল রাধু। সেদিন চব্বিশে বৈশাখ।
চৌহদ্দির মধ্যেই গাছপালায় ঘেরা অপেক্ষাকৃত শান্ত ঠান্ডা জায়গায় আঁতুড়ঘর করা হয়েছে রাধুর। মস্তিষ্ক বিকৃতি নাকি অবসাদ কে জানে, কিন্তু ঝুঁকি নেন না সারদা। সরলাদেবী, মন্দাকিনী ছেলেকে দেখে। বনজঙ্গলে জন্মেছে, সারদা নাম রেখেছেন বনবিহারী, ছোট করে বনু।
রাধুর কিন্তু উন্নতি হল না। শারীরিক দুর্বলতার সঙ্গে সঙ্গেই বেড়ে চলেছে মানসিক বিকার। কার কাছ থেকে কীভাবে এরমধ্যেই সে আফিম সেবনে অভ্যস্ত হল কেউ জানে না। গোদের ওপর বিষফোড়ার মতন মানসিক ভারসাম্যহীনতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নেশার বস্তুটির জন্য অদম্য শারীরিক দাবি এবং নির্ভরতা। না পেলে বাড়ি মাথায় করে। চিৎকার করে, কাঁদে, জিনিসপত্র ছুড়ে ভাঙে। আর সব অভিযোগ, অত্যাচার, অভিসম্পাৎ বর্ষিত হয় সেই একটি লক্ষ্যে— নিরীহ এবং সর্বংসহা, দুর্বল অথচ স্নেহান্ধ, ঊর্ধ্বপ্রাণা করুণাময়ীর উদ্দেশে।
তবু কি ছেড়ে দেওয়া যায়! রাধু মেরেছে। রোগা শরীর, যন্ত্রণায় পিঠ বেঁকে গেছে। সারদা যুক্তকর কপালে ঠেকিয়ে বললেন, ঠাকুর ওর অপরাধ নিয়ো না, ও অবোধ। নিজের পা থেকে এক কণা ধুলো নিজেই নিয়ে মেয়ের মাথায় দিলেন। আবার বললেন, মা-রে, এ মানুষটাকে স্বয়ং ঠাকুর কোনওদিন কষ্ট দেননি। তুই কি বুঝবি কাকে যন্ত্রণা দিচ্ছিস! ঠাকুর ওকে রক্ষা কোরো।
একবার জয়রামবাটির ভিটেবাড়ি দেখার বড় সাধ হয় সারদার। সময় যেন ফুরিয়েই এসেছে। তবু যাওয়া আর হয় না। দিন ঠিক হয়েও হল না।
মুষলধারে বৃষ্টির তোড়ে বানভাসি হয়ে গেছে কোয়ালপাড়া-দেশড়া-জয়রামবাটিতে। গাছপালা ঘরবাড়ি ভেঙেছে। তা সত্ত্বেও জন্মভূমি দেখার সাধ। কাউকে ফেলে রেখেও তো যেতে পারবেন না। এদিকে আশ্রয়প্রার্থীর ভিড় বাড়ছে আশ্রমে।
শরৎকাল এসে গেল প্রায় নিজের জন্মভূমিতে পৌঁছাতে। আহা সেই গ্রাম, সেই মাঠ পুকুর, ধানখেত, কাশফুল। কাছের মানুষ-প্রতিবেশী স্মৃতি।
নাহ্ খুব বেশিদিনের জন্য না। মাসখানেকের মধ্যেই সারদার মনে হতে শুরু করল, টকের জ্বালায় পালিয়ে এসে, তেঁতুলতলায় বাস। অথচ নিজের মধ্যেই যেন তাড়াহুড়ো পড়ে গেছে। হাত খালি হয়ে যাচ্ছে। রাধুর ছেলের অন্নপ্রাশনটা সেরে ফেলতে হবে। কে বাজার দোকান করবে তাই নিয়ে কাড়াকাড়ি পড়ে গেছে। কালীকুমারেরই আগ্রহ বেশি, তার খাঁই-ও বেশি। ওদিকে ঘরবাড়ির ভাগজোত, বিলিব্যবস্থা হয়ে গেলেও এখনও প্রতিদিন তাই নিয়ে অশান্তি। আগে ছিল, নিজের নিজের অংশ গুছিয়ে নেওয়া। এবারে তাল উঠেছে নিজের অংশে দিদিকে দেবী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে, মহারাজদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের ফিকির। এর নামই কি সংসার!
লজ্জায় মাথায় কাটা যায় সারদার। মনে মনে বলেন, ভাইগুলো আমার রত্ন বটে!
দিন-কে-দিন নিজের পরিবারের মানুষদের মধ্যেই পার্থিব জীবনযাপনের কুটিলতা, চাহিদা আর সর্বোপরি তিনি মানুষটার প্রতি অবহেলা দেখতে দেখতে সারদা টের পেয়ে যান— মন উঠে যাচ্ছে। ভারাক্রান্ত মনের চাপ দ্বিগুণ হয়ে পড়ে অসুস্থ দুর্বল শরীরে। একমাত্র বরদা মহারাজ ছাড়া তথাকথিত আপনজনদের কাউকেই মনের কথা, কষ্টের কথা বলতে পারেন না। ওরাও জানতে চায় না। মুখে তোষামোদি করলেও, সারদা বোঝেন, এদের সকলের কাছেই তিনি দিদি-পিসিমা-কাকিমা… যাই হোন, আসলে সবাই মনে করে তিনি একটি টাকার গাছ। যেকোনও ভাবে নাড়া দিলেই ঝুরঝুর করে ঝরে পড়বে।
অথচ বাগবাজারে চলে যাওয়ার কথা ভাবলেও যে চোখে জল আসে! ভিড় করে আসে আশৈশব জীবনের স্মৃতিগুলি। দারিদ্র্য ছিল, অভাব ছিল, সেইসূত্রে কায়িক পরিশ্রম দুর্ভোগও ছিল, কিন্তু নির্মল আনন্দ, ভালবাসার অভাব ছিল না। তঞ্চকতা ছিল না। একটি শুদ্ধ নিবিড় তন্ময়তায় ঘেরা ছিল পারিপার্শ্বিক, হৃদয়ের টান ছিল আত্মজনদের মধ্যে।
এখন এসংসারে কাদের কাছে, কী জন্য আর পড়ে আছেন!
নম নম করে দুর্গাপুজো, জগদ্ধাত্রী, কালীপুজোও হয়ে গেল।
মাঝে মাঝে জ্বর আসে, মুখে রুচি নেই। বার দু’-তিন করে মুখে একটু গুল দেন। নারকোল পাতা আর দোক্তাপাতা পুড়িয়ে গুঁড়ো করে কৌটোয় রেখে দেয় মন্দাকিনী। আরামবাগের ভূপতি কবিরাজ ভক্ত মানুষ, একদিন দেখা করতে এসে দুধের সঙ্গে ছোট্ট একগুলি করে আফিম খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে গেলেন। যে যা বলেন তাই শোনেন সারদা। তবু শরীর আর বয় না।
আসন্ন শীতের ছোঁয়া লেগেছে বাতাসে। হেমন্তকাল শেষ হয়ে আসছে। ছোট হয়ে আসছে দিন। ম্লান বিকেলের আলো তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যায়। পাখিদের কলকাকলি কমে গেছে। পাতা ঝরার মরশুমে তাদের নতুন ঠিকানার সন্ধান করতে হয়। এর মধ্যেও বাড়ির আনাচে কানাচে জংলা ফুল ফোটে। ব্রহ্মচারী ছেলেরা গাঁদাফুলের চারা লাগিয়েছে। বিকেলে যত্ন করে জল দেয়, মাটি আলগা করে দেয়। ভেজা মাটি থেকে ধুলোমরা সোঁদা গন্ধ বেরোয়। সূর্যাস্তের সময়টি ইদানীং সংক্ষিপ্ত হয়ে গেছে। তবু নীল আকাশ ধূসর হয়ে আসার আগে যখন লালিমায় সাজে, সারদা দু’চোখ ভরে দেখেন, দেখতে দেখতে উদাস হয়ে যান। মহাকালের ডাক শোনেন কি না কে জানে!
জন্মতিথিটিও এসে পড়ল। গ্রামগঞ্জের মানুষ খোঁজ রাখেন, মা এবার দেশে আছেন। নিজের মধ্যেই কেমন একটা সংকোচ বোধ আসে সারদার। দেহে শক্তি নেই, অথচ দূরদূরান্তর থেকে ভক্ত শিষ্যরা মা বলে প্রণাম করতে আসবে, কী করে আপ্যায়ন করবেন! কিন্তু ভাবনা নিয়ে বসে থাকা তো চলে না। কালীকুমার-বরদাও কিছুটা উৎসাহ দেখাল। ব্রহ্মচারী ছেলেরাও মামাদের উৎসাহ দেখে নেমে পড়ল বাজার হাট করতে। পুজোপাট-ভজন সবই হবে। গোপেশ মহারাজ এসেছেন তদারকি করতে।
এদিকে সারদা খেয়াল করেন, কাজের বাড়িতে ইন্দুমতীর কথাটি সবাই ভুলে বসে আছে। সাতমাসের পোয়াতি বউ। দুটি ভাতমাছ না খেলে নিজেই বা বল পাবে কোত্থেকে, পেটেরটিই বা বাড়বে কীভাবে! মায়ের প্রাণ, যেটি ভূমিষ্ঠ হয়নি, সেটিও তাঁরই তো! চুপচাপ উঠে ব্যবস্থা করলেন। মাছ আনালেন। কেটেকুটে-ধুয়ে-নুন হলুদ মাখিয়ে, বারান্দার কোণে বসে ঝোল রান্না করলেন। মনে মনে হাসলেন, নিজের জন্মদিনের কাজই বটে! বাড়ির পিছন দিয়ে ঘুরে, বরদার বউকে মাছের ঝোল-ভাত দিয়ে এলেন।
এদিকে যা হওয়ার সবই হচ্ছিল। লোকজন-খাওয়া-দাওয়া-কীর্তন।
কিন্তু শেষরক্ষা হল না। বিকেল থেকেই ধূম জ্বর সারদার। প্রায় বেহুঁশ। জন্মদিনের উৎসবের বাড়িতে নেমে এল গভীর বিপদ। ফিসফাস, কানাঘুসো, হা-হুতাশ। গভীর মনোবেদনা নিয়ে ফিরে গেলেন ভক্ত, অতিথিরা।
অবস্থা ঘোরালো হয়েই দাঁড়াল। খুব সাধারণ জ্বর, সর্দিকাশি ঠান্ডা লাগা নয়। দিন যায়, জ্বর একটু কমে তো ঘুরে ঘুরে আবার আসে। বরদা মহারাজ ভরসা রাখতে না পেরে সারদানন্দকে জানালেন। তিনি আবার সদ্য মঠের কাজ সেরে ভুবনেশ্বর থেকে ফিরেছেন। কিন্তু মায়ের শারীরিক অবস্থা অনুমান করে সঙ্গে সঙ্গে লোক পাঠালেন জয়রামবাটিতে। আগে মাকে কলকাতায় নিয়ে এসো।
দ্বিরুক্তি করলেন না সারদা। যেতে হবে। সবাইকেই একদিন যেতে হয়। ডাক এসেছে।
গোছগাছ-বাঁধাছাঁদা, গোরুর গাড়ি-লোকজন সব তৈরি। নলিনী-মাকু-রাধু-সুরবালা-মন্দাকিনী-বরদা সঙ্গে যাবে। পালকিও এসেছে। নাহ্, বাড়ির সামনে থেকে পালকিতে ওঠেন না সারদা। সিংহবাহিনী মা বিরাজিতা আছেন। তাঁকে দর্শন করে আসতে হবে হেঁটে গিয়ে। তারপর একটু দূরে গিয়ে…। ধরে ধরে মন্দিরে গেলেন।
গাঁয়ের মানুষ আজ ভেঙে পড়েছে তাঁর বাড়ির উঠোনে। নির্বাক, চোখে জল। বুকের কাছে জোড়হাত। শরীর সেরে শিগগির ফিরে এসো মা।
ধুঁকতে ধুঁকতে হাঁটছেন সারদা। সেই কালী-মাড়ো, সুন্দরনারায়ণ, সিংহবাহিনী, কলুগেড়ে-পুণ্যিপুকুর, বিশ্বাস-মণ্ডল-ঘোষ-সামুইদের বাড়ি, আটচালা, গোরুর গোয়াল-ঢেঁকিঘর-ধানের মরাই, জলের ওপর তালগাছের ছায়া। প্রণাম সেরে এগোতে এগোতে কালঘাম ছুটে গেল। দূরে পালকির কাছে দাঁড়িয়ে আছে সুবাসিনী, হাতে গুলের ডিবে, ছ্যাঁচা পান, জল। হরি পা ধুইয়ে দিল। বেলা বাড়তে বাড়তেই ফাল্গুনের তাপও বাড়ছে। গায়ের চাদরটা হরিকে দিলেন— রেখে দাও বাবা তোমার কাছে। হাতটা সামান্য তুললেন অন্যদের উদ্দেশে। তারপর ফিসফিসিয়ে উচ্চারণ করলেন, জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরিয়সী। ঠাকুর সবায়ের মঙ্গল করুন। বাহকরা পালকি কাঁধে তুলে নিল।
সহযাত্রীরা এগিয়ে পড়েছে গোরুর গাড়িতে। বরদা চলেছেন সাইকেলে পালকির পাশাপাশি।
পিছনে পড়ে রইল মায়ের শূন্য বাড়ি। নিবিড় নির্জন অবসাদে ডুবে রইল জয়রামবাটির প্রকৃতি, প্রতিবেশী, পশুপাখিরাও।
যোগীনমা-গোলাপমা চমকে উঠলেন সারদাকে দেখে।
কালিপড়া, চোখের কোল বসা, জীর্ণ শীর্ণ এই বৃদ্ধাই কি তিনি! হ্যাঁ তাই তো! সেই সরু লালপেড়ে শাড়ি, রোগা হাতে সোনার রুলি সেই বালা, শীর্ণ কণ্ঠার ওপর ঢলঢল করছে সোনায় বাঁধানো রুদ্রাক্ষের মালা… আর হ্যাঁ, ক্লান্ত-করুণ অথচ অমলিন সেই হাসিটিই এখনও মুখে মাখা। মা-ই যে!
গোলাপমার মুখ থেকে বেরিয়ে পড়ল, তোমরা কী মাকেই নিয়ে এলে গো?
বলতে বলতে দু’চোখ ভেসে গেল।
শরৎ মহারাজের সে সময়ও নেই। তাঁর কাছে কর্তব্য আগে। শুরু হয়ে গেল চিকিৎসা। কোনও কিছু ফেলে রাখতে চান না তিনি। ডাক্তার কাঞ্জিলালের হোমিওপ্যাথি দিয়ে শুরু। একটু উপশম হয় কি না হয়, আবার জ্বর। কবিরাজ শ্যামাদাস বাচস্পতি এলেন। কড়া পাঁচনের মতো ওষুধ দিলেন। বড্ড তেতো। গলা দিয়ে নামে না, বমি এসে যায় সারদার। তবু সহ্য করেন। আহা, সবাই এত চেষ্টা করছে, তিনি ওটুকু সহ্য করতে পারবেন না! কিন্তু তাও বা কতদিনের জন্য! শরীর কঙ্কালসার হয়ে যাচ্ছে, ফিরে ফিরে আসে জ্বর। হাল ধরতে এলেন ডাক্তার বিপিনবিহারী ঘোষ। হ্যাঁ, একটু যেন উন্নতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
কিন্তু সে তো শরীরের। মনের খবর কে রাখে? একজনই। তাঁর শরৎ। নির্বাক গভীর দৃষ্টিতে মহারাজ মাঝেমাঝে নিরীক্ষণ করেন মাকে। এখনও কী অপার প্রীতি আর করুণায় সিক্ত মুখমণ্ডল! এক আধটা প্রশ্ন করেন কখনও।
মা, কেমন বোধ করছেন?
ভাল, বাবা। সবাই এত সেবা করছেন।
মনটা কেমন আছে মা?
খুব ধীরে চোখ খোলেন সারদা। এক চিলতে হাসিই কি ঠোঁটের কোণে! উত্তরটাও যেন এড়িয়ে গেলেন।— একে দিয়ে ঠাকুরের যা করানোর ছিল… বোধহয় শেষ হয়েছে। তুমি আছ বাবা। এরা রইল।
আমার প্রশ্নের উত্তরটা মা…?
মন তুলে নিয়েছি বাবা। নলিনী-মাকু-রাধু সবাইকে দেশে পাঠিয়ে দাও এবার।
রাধুকে ছেড়ে কি থাকতে পারবেন মা?
পারব। কুটো ছেঁড়া করে দিয়েছি।
বাক্য হরে গেল শরত্মহারাজের মুখ থেকে। সারদা ঠোঁট নাড়লেন।— প্রভাকর আর মণীন্দ্র এসেছিল আরামবাগ থেকে। গরমের দিন। দেশে কি জলবৃষ্টি হয়েছে? চাষবাস ঠিক আছে?
কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলেন শরৎ।— এখনও তেমন কোনও খারাপ খবর নেই মা।
লাটু (স্বামী অদ্ভুতানন্দ) আর কেষ্টভাবিনীর ছেলে (রামকৃষ্ণ বসু) বোধহয় ভাল নেই, না বাবা?
শরৎ মহারাজের ঠোঁট কাপছে উত্তর দিতে গিয়ে। নিজেই সমাধান করে দিলেন।— থাক, তোমায় বলতে হবে না। নিরুদ্বেগে আরও একটি মন্তব্য করলেন। (সেজোভাই) বরদারও সময় হয়েছে। জানি বাবা, টের পাই।
তাকিয়ে আছেন শরৎ। ক্ষীণ অশ্রুধারা নামছে মায়ের চোখের কোল গড়িয়ে।
বর্ষার মেঘে ছেয়ে যাচ্ছে আকাশ। এবার আর শুধু জ্বর নয়, অসম্ভব জ্বালা সারদার সমস্ত শরীর জুড়ে। বরফ জলে হাত ডুবিয়ে, মেয়েরা ঠান্ডাহাত মায়ের গায়ে রাখে। খ্রিস্টান ডাক্তার পি ডি (প্রাণধন) বসুকে আনানো হয়েছে। ষোলো টাকা ভিজিট, পাঁচ টাকা ট্যাক্সি ভাড়া। গভীর অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে ডাক্তার দেখলেন, পরীক্ষা করলেন সারদাকে। রক্তাল্পতা, গাত্রচর্মের স্থানে স্থানে ফুটে উঠেছে কালো দাগ, প্লীহা-যকৃত বড় হয়েছে, জ্বর নামছে না— সব লক্ষণই অঙ্গুলি সংকেত করছে একদিকে। এলেন ধন্বন্তরি চিকিৎসক নীলরতন সরকার। একমত হলেন।
সারদা ভুগছেন কালাজ্বর অসুখে। সম্ভবত বাঁকুড়ার প্রান্তসীমা থেকে মাছির দ্বারা সংক্রামিত হয়েছে। ইঞ্জেকশনের প্রতিক্রিয়া, ধকল কি এই দীর্ণ শরীর নিতে পারবে? থাক। বরং অন্যান্য চিকিৎসা আর কবিরাজি চলুক। প্রাণধন বসু দেখেন, কবিরাজ রাজেন্দ্রনাথ আর কালীভূষণ সেনও আসছেন।
বিছানায় মিশে গিয়েও সারদা খবর নেন শরৎ মহারাজ, গোলাপমা কিংবা বরদা বা মন্দাকিনীর কাছে, ডাক্তারদের জল-মিষ্টি-আম দিয়েছ?
খ্রিস্টান ডাক্তারটি একদিন অবাকই হলেন। রোগিণীর শয্যাপার্শ্বে লাগোয়া পরমহংসদেবের পট। আরও অনেকগুলি সূত্র আর বিষয়কে যেন তাঁর চিকিৎসক মন দিয়েই জোড়া লাগালেন।
শরৎ মহারাজকে নীচেয় গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আমি এতদিন কার চিকিৎসা করছি বলুন তো?
উনি আমাদের সকলের মা।
চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করছেন কারা?
মায়ের অগণিত ভক্ত সন্তানরা। আপনি চিন্তা করবেন না।
খ্যাতনামা চিকিৎসকটি প্রথমে নির্বাক, তারপর দ্রুত মাথা আন্দোলন করতে করতে ফিরে গেলেন। যেন লজ্জায়, আত্মধিক্কারে সরে গেলেন।
আসাযাওয়া বন্ধ করলেন না। চিকিৎসা পরিবর্তিত হয়ে গেছে, তারপরেও পি ডি বসু আসেন মাকে দেখতে। নিজব্যয়ে। শুধু একদিন মহারাজকে বললেন, কেন আসি জানেন? প্রায়শ্চিত্ত কথাটার মানে জানতাম— পুনরায় চিত্তে গমন। কখনও করিনি, এখন চেষ্টা করছি।
সব চিকিৎসার পালাই সাঙ্গ প্রায়। বাগবাজার পল্লির গাছের মাথায় মাথায় মেঘের ছায়া। ভরা গঙ্গার কলধ্বনি মাত্র কিছুটা পশ্চিমে, নিরন্তর জীবনের স্পন্দন নিয়ে ছলছল প্রবাহিত। শুধু এক প্রগাঢ় নৈঃশব্দ্যের আবহ ঘিরে রয়েছে উদ্বোধন বাড়িটিকে। মায়ের অনির্বাণ প্রাণপ্রদীপটি টিম টিম করে জ্বলছে, তার মধ্যেই বাদলসাঁঝে যেন কী এক ব্যাকুলতা। ঘনিষ্ঠ ভক্ত সন্তানরা কাছে রয়েছেন। ঠোঁট নড়ছে মায়ের।
মা কিছু বলছেন? কিছু বলবেন?
ভোরের শেষ রাগিণীটি মিলিয়ে যাওয়ার মতো ক্ষীণ অথচ মধুর কণ্ঠস্বর বাজল, যদি শান্তি চাও, কারও দোষ দেখো না।… কেউ পর নয়…। জগৎ তোমার…।
বিংশ শতাব্দীর বিংশতি বছরের মধ্যকালও অতীত হয়েছে। বঙ্গীয় দ্বিতীয় ঋতুর দ্বিতীয় মাস। মেঘে মেঘে আঁধার হয়ে রইল সারাদিনটি। সেই দিন ফুরাল। সন্ধ্যা ঘনাল। রাতের দ্বিতীয় প্রহরটিও অতিক্রান্তপ্রায়। একবার চোখ খুলে দেখলেন সারদা। দৃষ্টি প্রদীপের শেষ শিখাটি বিলিয়ে দিলেন সন্তানদের উদ্দেশে। জীবনতরীর মাঝি শ্রাবণমেঘের অশ্রুভরা হাওয়ায় পাল তুলে দিল। মহাকালের নির্দিষ্ট ঠিকানায় রওনা হয়ে গেলেন সকল সন্তানের একটিই মা। বিশ্বজননী সারদা।
রিমঝিম বৃষ্টি নামল তারপরে।
***
