লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ – ৬

জয়রামবাটি থেকে কামারপুকুর, আবার কামারপুকুর থেকে জয়রামবাটি।

দিনের পরে যায় দিন। যেতে যেতে নাম পালটে তারা হয়ে যায় সপ্তাহ মাস বছর। আপন নিয়মে চক্রাকারে পৃথিবী ঘুরে চলেছে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। তার আপেক্ষিক গতির এক ধারণাকে মানুষ সময় নাম দিয়েছে, বলে, সময় বয়ে যাচ্ছে। আসলে কিছুই বয়ে যায় না। গতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই বিপুল গৃহ স্থান পরিবর্তন করে। স্থানের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয় তার আভ্যন্তরীণ বাতাস, তাপমাত্রা। আর তারই প্রভাবে প্রকৃতিতে ঘুরে ঘুরে আসে ষষ্ঠ ঋতু। গরমে পোড়ে, বৃষ্টিতে সিক্ত হয়। আলোয় ভাসে, আঁধারে ডুবে যায়। ঠান্ডায় রিক্ত হয়, উষ্ণতায় ভরে ওঠে।

কালযাপন করে যায় মানুষ। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নিরলস গতি আর প্রকৃতির সঙ্গে আভ্যন্তরীণ পরিবর্তন ঘটে যায় তার মধ্যেও। সময় নামের অলীক ধারণায় সে হিসেব করে বয়স। বয়স পার হয়ে যায় প্রকৃতির খণ্ড খণ্ড এক একটি পরিবর্তন, ঋতুকে। বলে, বয়স বাড়ছে। কিছুই তো থেমে নেই, থেমে থাকার উপায় নেই। থামার অর্থ ধ্বংস পরিসমাপ্তি।

কামারপুকুর থেকে জয়রামবাটি ফিরে আসার পরে সারদা দেখেছিল কিছুই থেমে নেই। কলকাতার স্রোতে ভেসে গিয়েছিল সে নিজেও। এক খর গ্রীষ্মের অপরাহ্নে রওনা হয়েছিল, ফিরে এসেছিল পৌষের উত্তুরে হাওয়ার কনকনানি নিয়ে। মনের পরিবর্তনটাই যেন প্রথম দিকে কেমন ধীর গতি করে রেখেছিল কিছুদিন। পরিবর্তনটা রয়েই গেল, কিন্তু স্বতঃস্ফূর্ত গতি সঞ্চারিত হল জীবনযাপনে। হয়তো মনের সঙ্গে বস্তুজগৎ আর জীবনযাপনের তফাত ওখানেই।

মন বেঁধে রাখা যায়, ধরে রাখা যায়। জীবন আর জগৎ চলমান। আবার প্রকৃতির মতন পরিবর্তনশীলও। চেষ্টা করলে মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তার আধার, মালিক। কিন্তু কাল আর প্রকৃতির মালিক কে! তার নিয়ন্ত্রণই বা কার হাতে। মন বলেও তার কোনও বস্তু নেই। তার আছে শুধু নিয়ম আর গতি, তাই নিয়ে ধারাবাহিক চলা।

দেখতে দেখতেই চলে গেল কতগুলো দিন-মাস-বছর। ঘুরে ঘুরে এল গেল ঋতুর পরে ঋতু। দারিদ্র্যের ভাঙা নৌকোয় জীবনের নদী পার হতে হতে গ্রাম্য সংসারে কেই বা আর খেয়াল রাখে ঋতুর পরিবর্তন! দিনের পরে দিন যায়, আসে। প্রকৃতির কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই। মানুষই শুধু প্রয়োজনের খাতিরে তাকে স্মরণ করে। কখনও আনন্দে উদযাপন করে, কখনও নিরানন্দে সয়ে যায়।

শ্যামাসুন্দরী বছরের একটা দিন স্মরণে রাখেন। আট-ই পৌষ, বৃহস্পতিবার। সারদার জন্মদিন। রাখব বলেই যে রাখেন, তা নয়। শীতের দিন এলে আপনা আপনি মনে পড়ে যায়। সারদার নিজেরও মনে থাকে না। হাজারটা কাজের মধ্যে কোথা দিয়ে দিন যায়, সকাল হয়, রাত্রি আসে আলাদা করে আর মনে করতে পারে না।

কয়েক দিন আগে দুপুরে খেতে বসার সময় হঠাৎ এক বাটি পায়েস দেখেই ভুরু কুঁচকেছিল সারদা। বোন কাদম্বিনী সেই সময় শ্বশুরবাড়ি থেকে কয়েক দিনের জন্য জয়রামবাটিতে এসেছিল। কোকন্দ গ্রামে তার স্বামী সুধারাম চক্রবর্তী মাঝেমধ্যেই অসুস্থ থাকে বলে কাদম্বিনীর বাপের বাড়ি তেমন আসা হয় না। শীতের সময় বলেই এবার কয়েক দিন এসে রয়েছে।

পায়েসান্ন দেখে সারদা কিছু জিগ্যেস করার আগেই শুনতে পেল শ্যামাসুন্দরী বোনকে বলছেন, কাদুমা, ঠাকুরের সামনে পিদিমটা জ্বালিয়ে দিস তো। তারপর একটু শাঁখ বাজা।

বোনের জন্য অপেক্ষা করতে করতে সারদা শঙ্খধ্বনি শুনল। তারপর শ্যামাসুন্দরীকে জিগ্যেস করল, আজ কী মা?

শ্যামাসুন্দরী ঈষৎ গম্ভীর মুখেই জবাব দিলেন, কী আবার! ভাত খাওয়ার আগে পায়েসটা একটু মুখে দাও।

সারদা হেসে বলল, ওহ্‌ আজ আমার জন্মদিন বুঝি? দাঁড়াও তা হলে তো আগে…

উঠে গিয়ে মাকে প্রণাম করল সারদা।

শ্যামাসুন্দরী বললেন, আচ্ছা হয়েছে। এবার বোস তোরা।

পায়েস মুখে ছুঁইয়ে সারদা জিগ্যেস করেছিল, আমার তা হলে কত বছর বয়েস হল মা?

হিসেব-টিসেবগুলো এবার থেকে নিজের মাথাতেই রাখ মা। শ্যামাসুন্দরী একই রকম গলায় বললেন, মেঘে মেঘে বেলা হচ্ছে, বয়েস বসে থাকছে না।

আচ্ছা কত হল বলবে তো?

শ্যামাসুন্দরী একটু ঘুরিয়ে বললেন, ছয়ে পড়তে তোর বিয়ে দিয়েছিলাম। সে আজ বারো বছর আগে। তা হলে হিসেব করে দ্যাখ কত হল।

সারদা হিসেব করে বলল, তা হলে আমি আঠারোয় পড়লাম।

হ্যাঁ মা। মেয়েমানুষ হিসেবে আঠারো বছরটা কতখানি একটু মাথায় রেখো।

এমন কী আর বেশি মা?

তোমার কাছে এমন কিছু না। কিন্তু আমাদের তো সমাজে বাস করতে হয় মা। তোর এই বয়েসে আমার তুই আর কাদু দু’জনেই হয়ে গিয়েছিলি।

আর তেমন কথা এগোয়নি সেদিন। চুপচাপ খাওয়া সেরেছিল মা-মেয়েরা।

শ্যামাসুন্দরীর মনে যে একটি চাপা উৎকণ্ঠা আছে, অষ্টাদশী সারদার তা না বোঝার কোনও কারণ নেই। দুই মেয়েরই বিয়ে হয়েছে আজ অনেক বছর হয়ে গেল। কিন্তু দু’জনের কারওরই সন্তানাদি হয়নি। কাদম্বিনী শ্বশুরবাড়িতে থাকলেও, সুধারামের শরীর স্বাস্থ্য অনেক দিন ধরেই ভাল যাচ্ছে না। সারদার জন্য উদ্বেগটা আরও বেশি। বেশ কয়েক বছর আগেই ও মেয়ে, বুঝে হোক, না বুঝে হোক সন্ন্যাসিনী হওয়ার কথা পর্যন্ত বলে ফেলেছে। ওর স্বামীও যে সত্যি সত্যি সন্ন্যাস নিয়েছেন, সেকথাও কানে এসেছে তাঁর। তা হলেও বিবাহিত মানুষের আজীবন সন্ন্যাসী হয়ে থাকার সম্ভাবনা সম্বন্ধে তাঁর গ্রাম্য মানসিকতায় কিছুটা সন্দেহ আছে এখনও। কখনও-সখনও নিজের ঘনিষ্ঠ জনদের সান্নিধ্যে শ্যামাসুন্দরীর উদ্বেগ কিছুটা উষ্মা নিয়েও প্রকাশিত হয়ে পড়েছে বলে সারদা শুনেছে। শ্যামাসুন্দরী থাকতে না পেরে বলে ফেলেছেন, উনি যদি সন্ন্যাস নেবেন বলেই ঠিক করেছিলেন, তা হলে বিয়ে করতে গেলেন কেন?

সারদা বোঝে, অমন মন্তব্য মায়ের দুর্ভাবনাজনিত উদ্বেগের আকস্মিক বহিঃপ্রকাশ। সঙ্গে সঙ্গে সে এটাও বোঝে ইদানীং যে, শ্যামাসুন্দরীর মতন আষ্টেপৃষ্ঠে সংসারে জড়িয়ে থাকা গৃহবধূর পক্ষে রামকৃষ্ণর মতন মানুষকে সম্যক বুঝে ওঠা কখনও কোনও দিনই সম্ভব হবে না। সে মানুষটাকে তিনি দেখেছেনই বা কতটুকু!

কিন্তু সাম্প্রতিককালে শ্যামাসুন্দরীর আচরণে যে আরও কিছু অসহিষ্ণুতা প্রকাশ পাচ্ছে সেটা খেয়াল করেছে সারদা। কারণগুলো তারও যে অজানা, তা নয়। সারদা জানে, আটপৌরে, অলস আর গুজবে বিশ্বাসী পাড়া-প্রতিবেশী আর গ্রামবাসীদের কিছু কিছু অসংযত মন্তব্য আর গ্রাম্য আলোচনা প্রায়ই শ্যামাসুন্দরীরও কানে আসে। আর সেগুলোই যে নানাভাবে পল্লবিত হয়ে শ্যামাসুন্দরীর উৎকণ্ঠাও বাড়াচ্ছে ও বোঝে। প্রতিক্রিয়া সারদারও যে হয় না, তা নয়। কিন্তু যে বোধ, অনুভূতির গভীরতা কয়েক বছর আগে সারদা অন্তত কিছুটা হলেও অর্জন করতে পেরেছে, সেই মানুষটার কাছে কাছে থেকে, শ্যামাসুন্দরী তা পাবেন কোত্থেকে! তাঁর প্রতিক্রিয়ায় খুব ঘরোয়া আর সাংসারিক মানসিকতাই প্রকাশ পায়। তাঁর ভূমিকায় হয়তো সেটাই স্বাভাবিক। যে সংহত মননে গ্রামবাসীদের মন্তব্য আর আলোচনাকে সহনশীল করে রাখা যায়, সেই শিক্ষা সুযোগ কোনওটাই তো শ্যামাসুন্দরী পাননি। কিন্তু সারদা পেয়েছে। আর পেয়েছে বলেই, নিজস্ব প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারেও ও সাবধান এবং সচেতন।

মনের ভাবটা সারদার এই রকম যে, দেখা যাক না, মানুষের গালগল্প আর সেই মানুষটাকে নিয়ে আলোচনার দৌড় কতখানি। শোনা কথায় গুরুত্ব দেওয়ার আগে নিজের বুদ্ধি বিচার বিবেচনার কি কোনও ভূমিকা নেই? বিশেষ করে, কয়েক বছর আগে কাছের থেকে মানুষটাকে একটানা ছয়-সাত মাস দেখার পরেও!

ভৈরবী ব্রাহ্মণী আর ভাগ্নে হৃদয়কে নিয়ে সেবার কামারপুকুর আসার পরে রামকৃষ্ণ খবর পাঠিয়েছিলেন শ্বশুরবাড়ি জয়রামবাটিতে। স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর দেখা হয়নি বেশ কয়েক বছর। সাধক জীবনের এক অতি দুরূহ অথচ অনিবার্য পর্ব অতিক্রম করছিলেন তখন তিনি। সন্ন্যাসের দীক্ষা এবং তন্ত্র সাধনার পরেই সংকল্প করেন দেশের ভিটেবাড়িতে এসে আত্মীয়স্বজন-প্রতিবেশী আর ঘনিষ্ঠদের সান্নিধ্যে কিছুদিন থাকবেন। বলা যায় না, হয়তো আরও কোনও গূঢ় উদ্দেশ্য তাঁর সেই সময় থেকে থাকবে, বাড়িতে এসে থাকার পিছনে। কেন না, মানব কল্যাণের জন্য এক অলৌকিক বোধ-দর্শন আর চেতনায় রামকৃষ্ণর যে উত্তরণ ঘটেছে, সেটুকু তখন স্বীকৃত। সাধারণ মনুষ্য শরীরের আধারে থেকেও তাঁর মধ্যে যে দেবত্বের প্রকাশ ও প্রতিফলন ঘটছে, দক্ষিণেশ্বর মন্দির ও কলকাতার সীমানা অতিক্রম করে, সেই খবর দেশে বিদেশেও তখন ছড়িয়ে পড়েছে। হয়তো শারীরিক কারণেও বত্রিশ বছরের সাধক মানুষটির কিছুদিন বিশ্রামের প্রয়োজন ছিল।

চোদ্দো বছরের কিশোরী স্ত্রী সারদাকে তিনি ডেকে পাঠিয়েছিলেন তাঁর সঙ্গে ও সান্নিধ্যে থাকার জন্য।

প্রশ্ন উঠতে পারে এবং উঠেওছিল, ইতিপূর্বেই তিনি যখন সন্ন্যাসের দীক্ষা গ্রহণ সম্পূর্ণ করেছিলেন, তা হলে আবার স্ত্রীকে কাছে এনে রাখার জন্য মনস্থির করলেন কেন?

অবশ্যই আলোকপ্রাপ্ত, ঈশ্বরচিন্তায় আপাত উদাসীন রামকৃষ্ণ, নেহাতই মৃদুহাস্য ব্যতীত, এই বাস্তব, পার্থিব প্রশ্নটির উত্তর দেওয়ার কিংবা তাঁর সেই রহস্যজনক সিদ্ধান্তের সমাধান করে দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি। কেন না কথার থেকে, কাজ এবং আচরণেই তিনি তাঁর দায়িত্ব এবং কর্তব্যের ব্যাখ্যা রেখে দিতে চেয়েছিলেন উত্তরকালের জন্য।

কিন্তু উত্তর দিয়েছিলেন তাঁর সন্ন্যাসের গুরু ব্রহ্মজ্ঞানী তোতাপুরী। বলেছিলেন, স্ত্রী কাছে থাকলেও যাঁর ত্যাগ-বৈরাগ্য-বিবেক-বিজ্ঞান পুরোমাত্রায় সচেতন আর অক্ষুণ্ণ থাকে, তিনিই সত্যি সত্যি সন্ন্যাসে এবং ব্রহ্মে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। নারী-পুরুষ উভয়কে যিনি সমান আত্মা রূপে বিচার আর অনুভব করতে পারেন, তাঁরই আসল ব্ৰহ্মবিজ্ঞান লাভ হয়েছে।

দুর্ভাগ্যবশত ভৈরবী ব্রাহ্মণীর ভাবনা ও চেতনায়, তোতাপুরীর ব্যাখ্যা পূর্ণ সমর্থন পায়নি। তাইতে অবশ্য রামকৃষ্ণের সিদ্ধান্ত এবং সারদার কামারপুকুরে এসে থাকা, কোনওটাই ঠেকানো যায়নি, কিন্তু ভৈরবীর সঙ্গে অন্যদের সম্পর্ক ও আচরণে কিছু ছন্দপতন ঘটত, সেটা সকলের সঙ্গে এমনকী রামকৃষ্ণকেও খেয়াল করতে হয়েছিল।

জয়রামবাটি থেকে এসে প্রথম দু’-একদিন স্বামীর খুব একটা কাছে ঘেঁসতে পারেনি সারদা। কিশোরীসুলভ লজ্জা-সংকোচের বাধা একটু ছিলই। আর তেমন লক্ষণীয় না হলেও যেটা সূক্ষ্মভাবে ছিল, সেটা হচ্ছে সারদার অনুচ্চারিত আত্মসম্মানবোধ। জ্ঞানী, আবার রসিক স্বামীটি অবশ্য সবই জানতেন আর বুঝতেনও। তাই দু’-একদিন পরেই এক সকালে সারদাকে বললেন, হ্যাঁ গো, তুমি যে দেখছি নিঃসাড়ে তফাত থেকেই আমার কাজকর্ম গুছিয়ে দিয়ে চলে যাও।

সারদা আর কী বলে! স্বামীর কথা শুনে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এখন থেকে চার বছর আগে কিশোরী বধূটির ওই আচরণই ছিল স্বাভাবিক। এমনিতে অনেক দিন পরে দেখা। একটু বুদ্ধিশুদ্ধি খুললেও, এতদিন ধরে যা শুনে এসেছে তাঁর সম্বন্ধে, তাইতে প্রাজ্ঞ আর জ্ঞানী মানুষটিকে দূর থেকে বিস্ফারিত চোখে দেখতেই প্রথম প্রথম সহজ বোধ করত। তা ছাড়া কিছুটা ভীতির ভাব ছিল ভৈরবী ব্রাহ্মণীর প্রতি। বয়েসে তিনি তার স্বামীর থেকেও কয়েক বছরের বড়। তার ওপর ব্যক্তিত্বসম্পন্না, সুন্দরী এবং বিদুষী শাস্ত্রজ্ঞা। সারদা তাঁকে পরম পূজনীয়া গুরুজন হিসেবেই জ্ঞান করেছিল। তা সত্ত্বেও নিজের গোপন অনুভবে সসংকোচে অনুভব করত, বিশেষ করে তার প্রতিই যেন ব্রাহ্মণী সদয় নন। কিছুটা উপেক্ষা-অবহেলার সঙ্গেই সামান্য ঈর্ষার ভাব মিশে থাকত সারদার প্রতি। ভৈরবী কিছুতেই চাইতেন না, কোনও ব্যাপারেই সারদা তার স্বামীর কাছাকাছি আসে এবং থাকে। যেন রামকৃষ্ণকে তাঁর স্ত্রীর সান্নিধ্য থেকে বাঁচিয়ে রাখা এবং দূরে সরিয়ে রাখাই তিনি উপযুক্ত বিবেচনা করতেন। কেন, তা সারদা বুঝত না। আবার তার নিজের থেকে ভৈরবীর মানসিকতাকে অতিক্রম করার তো প্রশ্নই ওঠে না।

সারদাকে চুপচাপ একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রামকৃষ্ণ বলেছিলেন, দাঁড়িয়ে রইলে যে এসো, এদিকে এসে বোসো।

ভৈরবী সেই সময় উঠোনের ওপারে রন্ধনশালায় দুপুরের রান্না-বান্নার কিছু তদারকি করছিলেন। সারদা ভয় ভয় চোখে এদিক ওদিক দেখে, কিছুটা দ্বিধাজড়িত পায়ে এগিয়ে গেল।

রামকৃষ্ণ স্মিত হাসিতে তাঁর কাছেই একটা আসন এগিয়ে দিয়ে বললেন, নাও, পেতে বোসো।

সারদা নিরুপায়। একটু তফাত রেখেই আসন পেতে বসল। সকালের পুজো-আর্চা, রঘুবীরের ভোগ দেওয়া সমাপ্ত হয়েছে। জিনিসপত্র ধুয়েমুছে তুলতে হবে, গুছিয়ে রাখতে হবে আবার সান্ধপুজোর জন্য। গরমের দিন বলে কিছুক্ষণের মধ্যেই স্নানে যাবেন রামকৃষ্ণ। হয়তো হালদার পুকুরেই যাবেন। তার পরেই তো দু’-একজন সাক্ষাৎপ্রার্থী, প্রতিবেশী, ছোটবেলার বন্ধু-টন্ধুরা আসবেন।

রামকৃষ্ণ বললেন, হ্যাঁ গো জয়রামবাটির খবর সব ভাল তো? বাবা-মা, ভায়েরা ঠিক আছেন?

সারদা কিছু না বলে শুধু ঘাড় কাত করল।

আর তুমি নিজে?

সারদা আবার ঘাড় নাড়ল।

রামকৃষ্ণ বললেন, তোমায় এখানে নিয়ে এসে অসুবিধে করলাম নাকি?

সারদা নীরবে ঘাড় নাড়ল।

হ্যাঁ গো, তুমি যে কথাবার্তা কইছ না দেখছি!

সারদা নীরব। মুখ নিচুই রয়েছে।

মৃদু হাসি মেখে রামকৃষ্ণ বললেন, আচ্ছা তোমায় কেন নিয়ে এলাম জানো?

চকিতে তাকিয়েই সারদার মুখ থেকে বেরিয়ে পড়ল, না তো!

এই তো মুখে বুলি ফুটেছে দেখছি। হেসে বললেন রামকৃষ্ণ। আবার যোগ করলেন, তা তুমি তো আমার স্ত্রী, না কি?

ঠোঁটের পাশে সামান্য একটু ভাঁজ ফুটে, আবার মিলিয়েও গেল। নিঃশব্দই রইল সারদা।

রামকৃষ্ণ সেটুকু খেয়াল করে বললেন, কিন্তু… স্ত্রী না এলে কি সংসার পূর্ণ হয়?

সারদা এবার অবাক বিস্ময়ে চোখ তুলে তাকাল। স্ত্রী, সংসার এসব কী শুনছে এই মানুষটার মুখ থেকে! যে মানুষ সন্ন্যাসের দীক্ষা নিয়েছেন, তাঁর তো ওদুটোর কোনওটাই থাকার কথা নয়। তা হলে?

কিন্তু নিজের ভাসা-ভাসা জ্ঞান নিয়ে সেই প্রশ্ন তো আর ওঁকে করা যায় না। অথচ জানারও দরকার।

অন্তর্যামী মানুষটার মুখ দিয়ে তখনই বেরুল, মনে মনে তুমি কী ভাবছ, আমি জানি।

সারদা বলল, কী?

ভাবছ সন্ন্যাসীর মুখে আবার এসব কী কথা, তাই তো?

সরল মুখে স্বামীর দিকে তাকিয়ে ঘাড় নাড়ল সারদা। —হ্যাঁ।

শোনো, রামকৃষ্ণ ধীরেসুস্থে বললেন, সন্ন্যাস নেয় কেন মানুষ? পরমানন্দ ঈশ্বর লাভের জন্যই তো, না কি?

আবার নিঃশব্দে মাথা নাড়ল সারদা। হ্যাঁ।

তো সংসারে থেকে ভগবান লাভ হয় না? মুনি-ঋষিদের অনেকেই তো সংসারী ছিলেন, আবার তাঁদের ব্রহ্মজ্ঞানও হয়েছে। সারদা চুপচাপ শুনল।

রামকৃষ্ণ বললেন, সংসার মায়া। স্ত্রী-ও মায়া। কিন্তু তার প্রকারভেদ আছে। মায়া হচ্ছে দু’রকম, বিদ্যা ও অবিদ্যা। তার মধ্যে আবার বিদ্যামায়া হচ্ছে দু’প্রকার— বিবেক এবং বৈরাগ্য। আর এই বিদ্যামায়া আশ্রয় করেই জীব ভগবানের শরণাপন্ন হয়। তো স্ত্রী কাছে থাকলেও যদি আমার বিদ্যামায়া দূরে না সরে যায়, তা হলে ভগবান লাভে অসুবিধে কী?

সারদা বসে কথাগুলো শুনল। মাথায় নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতেই টের পেল পুরো যেন বুঝে উঠতে পারছে না। রামকৃষ্ণ একটু হেসে বললেন, হ্যাঁ গা, বড্ড শক্ত শক্ত কথা বলে ফেললাম না?

সারদা খুব ঠান্ডা গলায় বলল, পুরোটা বুঝতে পারিনি।

পারবে, পারবে, আস্তে আস্তে একটু একটু করে পারবে। রামকৃষ্ণ বললেন, আমি যা পেরেছি তোমাকে তা পারতে হবে যে! সারদা একটু সাহস সঞ্চয় করে খুব শান্ত গলায় বলল, সন্ন্যাস নিলে বিয়ে করায় নিষেধ নেই?

না গো না। তবে কী জানো, বে-থা করার আগে, মনটা যখন ষোলো আনা নিজের দখলে থাকে, তখন ভগবানের স্বরূপটা বুঝে নিতে হয়। তা হলে গোল বাধে না।

সেটা কেমন করে হয়?

রামকৃষ্ণ কৌতুক করে বললেন, ওই যে হাতে বেশ করে তেল মেখে কাঁঠাল ভাঙলে যেমন হয় ঠিক তেমনি। হাতে আঠা লাগে না, আবার কাঁঠাল ভাঙাও হল। তবে কী জানো, ভাবের ঘরে চুরি করলে হয় না। মন-মুখ এক করে তাঁকে ডাকতে হয়। সারদা চুপ করে বসে বসে ভেবেছিল কিছুক্ষণ। আর একটু পরেই মনে হয়েছিল, এ মানুষটার কাছে রোজই কিছুক্ষণ করে বসা যায় না! মনে হচ্ছে একটু বসতে পারলেই কত কিছু জানা যায়।

রামকৃষ্ণ বললেন, এখন তো কিছুদিন থাকব এখানে। তুমি সময় পেলেই আমার কাছে এসে বোসো। জগৎসংসারে তুমি আর আমি অভিন্ন জেনো। গলার সুর পালটে আবার বললেন, সংসারে জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ কত কী শেখার আছে বলো তো! এসে বোসো, দেখবে কথায় কথায় কত কী শেখা আর বোঝা হয়ে যাচ্ছে।

সারদার মনে হল, আনন্দে কৃতজ্ঞতায় ও যেন ভরে উঠছে।

রামকৃষ্ণ তার মধ্যেই হেসে বললেন, তা বলে আমাকে যেন আবার তোমার মাস্টার ঠাওরে বোসো না। বসে বকর বকর করতে পারি, পুথি-টুথি পড়তে পারব না।

সারদা ওঠার উপক্রম করতেই দেখল, ভৈরবী ব্রাহ্মণী রান্নাঘর থেকে ফিরে এসেছেন। সামান্য ত্রস্তভাবের মধ্যে মাথায় ঘোমটা টানল সারদা। ভৈরবী তার মধ্যে বললেন, ওহ্ মা, বউ যে দেখছি এখানেই! তা তুমি এখানে কী করছ বাছা?

সারদা ভীত সন্ত্রস্তভাবে ঘোমটার ফাঁক দিয়ে একটু দেখল শুধু। কিছু বলতে পারল না।

রামকৃষ্ণই উত্তর দিলেন। —কী আর করবে, আমার বকবকানি শুনছে।

ভৈরবী কান দিলেন না রামকৃষ্ণর কথায়। বললেন, বউ মানুষ এমন সময়ে ঘরে বসে থাকলে চলে! যাও বউমা, রান্নাঘরে যাও। রামলালের মা একা হেঁশেল ঠেলছে। গিয়ে হাত লাগাও।

সারদা ঢিপ ঢিপ করে দু’জনকে প্রণাম করে বেরিয়ে গেল। মনে হল পালিয়ে বাঁচল ব্রাহ্মণীর সামনে থেকে।

সাময়িক কাছের থেকে সরে গেল বটে, কিন্তু সামান্য ওই কথোপকথনের পরেই সারদা অনুভব করতে শুরু করল মানুষটার আকর্ষণ দুর্নিবার হয়ে উঠছে। ছোটখাটো কথা-হাসি-ঘটনার মধ্যে দিয়ে এমনভাবে তিনি জীবন-সংসার-মানুষকে ছুঁয়ে যান, মন্তব্য করেন, যাতে সারদার মনে হয়, প্রতি দিন যেন তার অভিজ্ঞতার ঝুলিটি ভরে উঠছে। কখনও-সখনও দু’-একটা শক্ত কথা বললেও, অধিকাংশ সময়েই তিনি যা বলেন, সবই তাঁর নিজস্ব উপলব্ধি, দিনযাপন আর অভিজ্ঞতা থেকে। আর এমন প্রাঞ্জলভাবে বলেন যে কখনওই মনে হয় না, শিক্ষা বা জ্ঞান বিতরণ করছেন। বরং সহজ আর স্বাভাবিক ঘর-গেরস্থালির দৈনন্দিন জীবনযাপন থেকে উদ্ধৃতি আর উদাহরণ দিয়ে যা বলেন, পরে বোঝা যায়, সত্যিই তো অনেক গুরুত্বপূর্ণ গূঢ় তত্ত্বকথা যেন একেবারে এলেবেলেভাবেই তিনি বলে দিয়েছেন।

ভৈরবী ব্রাহ্মণীর জন্য সারদার ভয় আর কিছুটা পালিয়ে বেড়াতে হলেও, কয়েক দিনের মধ্যে মনে হয়েছিল, ওই মানুষটা অবশ্য নিঃশঙ্কচিত্ত। সময় সুযোগ হলে তিনি নিজেই ডাকেন সারদাকে। আর ঘরসংসার, মানুষজনদের কথা শুরু করে দেন গল্পচ্ছলে। কিছুই বাদ থাকে না তাঁর কথা আর বিষয়ে। সে দেবদ্বিজে ভক্তি, স্নেহপরায়ণতা, অতিথিসেবা, ঘর-গেরস্থালির কাজ, রান্না কিংবা ধর্মজীবন লাভের উপায় যা কিছুই হতে পারে। সারদাকে চন্দনকাঠ ঘষতে দেখে একদিন তিনি বললেন, বুঝলে গা, চন্দন ঘষতে ঘষতে যেরকম সুগন্ধ বেরোয়, ঠাকুর আর ভগবানের কথা তেমনি আলোচনা করতে করতেই তত্ত্বজ্ঞানের উদয় আর অনুভব হয়।

হারিকেনের পলতে কাটছে সারদা। সন্ধের পরে আলো জ্বালতে হবে। রামকৃষ্ণ বললেন, দেখি, কাঁচি আর পলতেটা দাও তো। সারদা একটু অবাক হয়ে কাঁচি-পলতে তাঁর হাতে দিল। নিখুঁত আর অর্ধচন্দ্রের মতো গোল করে পলতের ডগাটা কাটলেন রামকৃষ্ণ। সারদা দেখছে। তিনি বললেন, এইভাবে কাটবে। তা হলে কেরাসিনে ভিজে যখন পলতে জ্বলবে, আলোটাও গোল হয়ে চার দিকে ছড়িয়ে পড়বে। বুঝলে?

সারদা বুঝল। শুধু পলতের আলোই না, ওর মধ্যে জ্ঞানের আলোর কথাও আছে। মন-পলতে তেড়াবেঁকা হয়ে থাকলে ভাবনার আলোও এলোমেলো পড়ে। নিখুঁত আর পরিপাটি করে মনটা গড়ে নিতে হয়, তা হলে ভাবনায় সামঞ্জস্য থাকে।

একদিন বললেন, জীবনটা যেন ডাল। জাঁতার মধ্যে পড়েছে, পিষে যাবে। তবে যে ক’টি খুঁটি ধরে থাকে, তারা পিষে যায় না। তাই খুঁটি, অর্থাৎ ঈশ্বরের শরণাগত হতে হয়। তাঁকে ডাকো, তাঁর নাম করো, তবে মুক্তি। নয়তো কালরূপ জাঁতায় পিষে যাবে। আরও বললেন, কাম যেন গাছের মূল, কামনা তার ডালপালা। এই কাম-ক্রোধ-লোভ— একেবারে তো যাবে না, তাই ঈশ্বরের দিকে মোড় ফিরিয়ে দিতে হবে।

সারদার মনে প্রশ্ন জাগে। আমি সংসারী জীব, কেন ঈশ্বরমুখী হব, বুঝিয়ে দাও।

অন্তর্যামী রামকৃষ্ণ নিজের থেকে তুলসীদাস গুনগুন করেন।—

অর্থ অনর্থকরহিঁ জগতে মাহী।

দেখহ মন সুখলেশো নাহি॥

যাকো ধন তাকো ভয় অধিক।

ধন কারণ মারত পিতু লড়িক॥

ধনেতে পতিহিঁ বিঘাতহিঁ নারী।

ধনেতে মিত্র শত্রুতা-কারী॥

এই সংসারে অর্থই অনর্থের মূল। ওতে মনের লেশমাত্র সুখ নেই। যার বেশি ধন আছে, তার ভয়ও বেশি। টাকার লোভে ছেলে বাপকে মারতে পারে, স্ত্রী স্বামীকে খুন করতে পারে। অর্থের জন্য বন্ধু শত্রু হয়ে যায়।

বলেন, সংসার সমুদ্রে কামক্রোধাদি কুমির আছে, তাই বিবেক বৈরাগ্যের হলুদ মেখে নামতে হয়। তা হলে কুমিরের ভয় থাকে না। ঈশ্বরই সৎ আর নিত্য, বাকি সব অসৎ অনিত্য। সংসারীকে এই বোধের সাধনা করতে হবে।

কথা শুনতে শুনতে কখনও বিহ্বল, কখনও আনন্দ, কখনও দোনামনা আলোছায়ার টানাপোড়েন সারদার। মাথার ঘোমটা খসে পড়ে যায়। মানুষটাকে যেন একটু একটু করে চেনা হচ্ছে। ভাবে-আবেগে-ভালবাসায় চেয়ে থাকে, চোখের পাতা পড়ে না।

কিন্তু সবই চোখে পড়ছে ভৈরবী ব্রাহ্মণীর।

চোদ্দো বছরের সলাজ কিশোরী বধূটির ‘জ্ঞানচক্ষু উন্মীলনে’র ঘটনাকে তিনি কি খুব ছাপোষা সংসারী দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েই বিচার করতে শুরু করলেন! হ্যাঁ, তত্ত্বজ্ঞানী এবং উচ্চাঙ্গের সাধিকা হলেও বোধহয় সনাতন নারীসুলভ সম্পর্কজাত অধিকারের টানাপোড়েন থেকে রেহাই পেত না তাঁর মানসিকতা। সারদার বয়স কম, নিরীহ শান্তশিষ্ট বালিকা, স্বামীর প্রতি অধিকারের বিষয়েও সচেতন না। তা সত্ত্বেও ব্রাহ্মণীর ভাবনায় এবং আচরণে কখনও সখনও যেন ঈর্ষারই স্ফুলিঙ্গ ঝলসে উঠত। কিংবা বলা যায় না, সাধক মানুষটির প্রতি তাঁর প্রীতি-প্রেম-শ্রদ্ধার মিশ্রিত অনুভব গভীর আর তীব্র ছিল বলেই হয়তো, কোনও কারণে তাঁর ভাবনার আকাশে আসক্তির মেঘ সঞ্চার হোক, ভৈরবী তা চাইতেন না। কিশোরী বউটিকে রামকৃষ্ণর সহজ সান্নিধ্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চাইতেন, তাঁকেই নিরাপদ রাখার জন্য।

সেই সময় একই বাড়িতে বসবাস করে ভৈরবীর সঙ্গে সারদার নিত্য দেখাসাক্ষাৎ তো হতই, আর অনুকম্পা মেশানো প্রচ্ছন্ন স্নেহ-ও যে ছিল না, তা নয়। মাঝে মাঝে একসঙ্গে রান্না করা, খাওয়া-দাওয়াও হত।

ভৈরবী ছিলেন পূর্ববঙ্গের মানুষ, রান্নায় ঝাল দিতেন খুব। লঙ্কার ব্যবহার ছিল অনিবার্য এবং অপর্যাপ্ত। কারুর কারুর অত ঝাল সহ্য না হলেও, ব্রাহ্মণী নিজের রান্নার সম্বন্ধে প্রশংসাই আশা করতেন। একদিন রীতিমতো লঙ্কাবাটা দিয়ে তরকারি করলেন ভৈরবী। খেতে বসে রামলালের মাকে জিগ্যেস করলেন, কী মেজ বউ, কেমন হয়েছে তরকারি?

শাকম্ভরী ঝাল সহ্য না করতে পেরে বলেই ফেললেন, মা ঠাকরুন বড্ড ঝাল হয়েছে।

ভৈরবী স্বাভাবিকভাবেই প্রীত হলেন না। মুখ ঘুরিয়ে সারদাকে বললেন, হ্যাঁ গো বউমা, তোমার কেমন লাগছে?

ঝালের আগুনে সারদা তখন নাকের জলে চোখের জলে অবস্থা। কোনও মতে নিজেকে সামলে, ভৈরবীর ভয় থেকে বাঁচার জন্য বলল, হ্যাঁ মা, বেশ… বেশ হয়েছে।

খুশি হলেন ভৈরবী। আর যথারীতি মৃদু তিরস্কারেই বাজলেন রামলালের মায়ের প্রতি।

তা হলে! এই তো ছোট বউমা বলছে ভাল হয়েছে। তোমার বাপু কিছুতে আর ভাল বেরোয় না মুখ দিয়ে।

সারদা আর শাকম্ভরী মুখ চাওয়া চাওয়ি করে নীরব থাকাই শ্রেয় ভাবল।

মুখ ভার করে ব্রাহ্মণী শাকম্ভরীকে বললেন, কাল থেকে তোমায় আর তরকারি দেব না।

সারদা মুখে, ব্যবহারে কখনওই স্বামীর প্রতি নিজের সদ্য অনুভূত ভালবাসা-প্রীতি বা উদ্বেগের কথা প্রকাশ করত না। অথচ ভৈরবী ব্রাহ্মণী যে যথাসম্ভব তার সদানন্দ স্বামীটিকে আগলে রেখেছেন, তা টের পেত। ঈর্ষা বা অধিকারের প্রশ্ন ওর সরল মনে ঠাঁই পেত না। এমনকী অভিমানও নয়। কিন্তু কখনও ওঁকে অন্যরকম দেখলে, একটু ভয় আর দুর্ভাবনা হত স্বাভাবিক ভাবেই। আসলে মানুষটাকে এইবারই যে আসলে চেনা হচ্ছে ধীরে ধীরে। বয়েসটাও জীবনকে বুঝতে পারারই সূচনা, সময়।

ভৈরবী পুজোপাঠ সেরে একদিন সকাল থেকে ঘরে রামকৃষ্ণকে সাজাতে বসলেন। সাজতে ভালবাসতেন তিনিও। ছোটবেলায় যাত্রাপালা করেছেন, শিব সেজেছেন। ভৈরবী তাঁকে মালা-চন্দন-উত্তরীয় দিয়ে গৌরাঙ্গ বেশে সাজালেন। সাজতে সাজতে কীভাবে মানুষটার মধ্যেও যেন পরিবর্তন এল। চোখমুখ অন্যরকম, যেন ভাবসমাধি হয়েছে।

ব্রাহ্মণী ডেকে দেখাতে চাইলেন সারদাকে। কী বউমা, কেমন দেখছ। কেমন হয়েছে?

ভাবসমাধির রকমসকম কিছুই জানে না সারদা। দেখেওনি কখনও। প্রিয় মানুষটাকে ঊর্ধ্বনেত্র স্থির, প্রস্তরমূর্তির মতো মনে হল। যেন শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে গেছে। গা ছমছম ভয়ে কেঁপে উঠল সারদা। কিন্তু সেকথাটাও যে ভৈরবীকে বলতে বাধছে। উনি আবার তার কী ব্যাখ্যা করে, কী বলবেন! অথচ প্রশ্ন করে, ভৈরবী অপেক্ষা করছেন উত্তরের জন্য।

শেষ পর্যন্ত সারদার মুখ থেকে বেরিয়ে পড়ল, বেশ ভালই তো হয়েছে মা।

মনের না, মুখের কথাটুকু বলেই, ভৈরবীকে প্রণাম করে, তাঁর সামনে থেকে অদশ্য হয়ে গেল সারদা।

কিন্তু রামকৃষ্ণের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ, অল্পস্বল্প কথা আর বিভোর হয়ে জীবনের খুঁটিনাটি জ্ঞান লাভ করা বন্ধ হল না। সংসারে থাকা অথচ উচ্চমার্গের সন্ন্যাস বিশ্বাসে বিচরণ করা মানুষটি যেন উত্তরকালের কোনও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা থেকেই, নিজের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান আর উপলব্ধি ধীর প্রয়াসে ছড়িয়ে দিতে চাইতেন সরলমতি বধূটির জন্য। চেষ্টা করতেন তাঁর মুখাপেক্ষিণী কিশোরী স্ত্রীর ওপর নিজস্ব বিশ্বাসের প্রভাব বিস্তার করে, ভালবাসা দিয়ে তার হৃদয় জয় করার। আবার খেয়ালও রাখতেন ঠান্ডা, শান্ত অথচ বুদ্ধিমতী মেয়েটির প্রতি তাঁর বোধবিশ্বাসের প্রতিক্রিয়া সম্বন্ধেও। ক্রমশই সারদাকে ভাবনার গভীরতার দিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার জন্য বলতেন শ্রদ্ধা-ভক্তি-ত্যাগ-স্নেহপরায়ণতা আর দায়দায়িত্বের কথা। বোঝাবার চেষ্টা করতেন, বৈরাগ্য আর ভগবদ্ভক্তিই সার।

পরিণতির কথা মনে আসত না সারদার। কিন্তু অনুভব করত যেন এক আনন্দিত পূর্ণতা আর আলোর দিকে তার যাত্রা শুরু হয়েছে। জীবনকে দেখার চোখ তার বদলাচ্ছে, মন যেন ক্রমশ সংসারের দুঃখকষ্ট, অনিত্যতার অনুসন্ধানে মাঝে মাঝে উধাও হয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু দাতা-গ্রহীতা কারওরই আলোকসন্ধানের এই প্রয়াস টের পেলেন না ভৈরবী ব্রাহ্মণী। দিন যাপনের সঙ্গে সঙ্গেই তিনি স্বামী-স্ত্রীর প্রেম আর প্রীতির অথচ কামগন্ধহীন নিঃস্বার্থ সম্পর্কের অপব্যাখ্যা করতে লাগলেন মনে মনে। আর প্রিয় সাধক মানুষটির পদস্খলনের আশঙ্কায় জর্জরিত হয়ে গভীর কষ্টও পেতে শুরু করলেন। ক্রমশ যেন কষ্টের অনুভূতিই পরিবর্তিত হতে শুরু করল তাঁর উষ্মায়, ঈর্ষায়। নিজেকে সংবরণ করতে পারলেন না ভৈরবী। তাঁর মনোভাব মৌখিকভাবেও প্রকাশ পেতে লাগল।

এক সন্ধ্যায় ভৈরবী রামকৃষ্ণকে স্পষ্ট বললেন, বাবা, চোখের ওপর এই অনাচার আমি আর দেখতে পারছি না।

গ্রীষ্মকালের সন্ধ্যা, অন্ধকার নেমেছে দেরি করে। সারাদিনের দাবদাহের পরে প্রকৃতি একটু জুড়িয়েছে। পুব-দক্ষিণ থেকে হাওয়া আসছে। গাছের পাতায় সর-সর শব্দ। ক’দিন পরে জ্যৈষ্ঠপূর্ণিমা। অপূর্ণ চাঁদের জ্যোৎস্নাতেও উঠোন বাগান আবছায়া মাখা। রঘুবীরের থানে সান্ধ্যভোগ, পূজারতি সেরে, খালি গায়ে নিজের ঘরে এসে বসেছেন রামকৃষ্ণ। টুকিটাকি ঘর-গেরস্থালির কথাবার্তার মধ্যেই শিষ্যার মতন সারদাকে শেখাচ্ছেন কীভাবে অতিথিসেবা, আত্মসমর্পণ, গুরুজনদের শ্রদ্ধা করতে হয়। তালপাতার পাখা নাড়তে নাড়তে মাঝে মাঝেই সারদার হাত থেমে যাচ্ছে। মুগ্ধ বিস্ময়ে শুনছে তাঁর কথামৃত।

ভৈরবীর কথার সুরে অকস্মাৎ অভিযোগের ইঙ্গিত পেয়ে বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকালেন রামকৃষ্ণ।

অনাচার! কী অনাচার দেখলে মা?

ভৈরবী খর দৃষ্টিতে সারদাকে বিদ্ধ করে, ঈষৎ আদেশের সুরে বললেন, তুমি একটু বাইরে যাও তো বউমা।

সারদা তাঁর পায়ের ধুলো নিয়ে দ্রুত নিষ্ক্রান্ত হল ঘর থেকে।

ভৈরবী সোজাসুজি বললেন, বাবা, তুমি ব্ৰহ্মজ্ঞানী। দীক্ষা নিয়ে সন্ন্যাস গ্রহণ করেছ তো, না কি?

বিস্মিত অথচ স্থির বিশ্বাসে রামকৃষ্ণ বললেন, অবশ্যই। তাতে কি তোমার কোনও সন্দেহ আছে মা?

ছিল না, কিন্তু হচ্ছে।

কেন বলো তো মা!

ভৈরবী বললেন, বাবা, গৃহস্থলোকের মতন ঘরে নিজের বউয়ের সঙ্গে যদি তুমি সারাক্ষণ আলাপ কর, তা হলে তোমার সন্ন্যাস ধর্মের আর রইলটা কী?

মুখে স্মিতহাসি মেখে কিছুক্ষণ নীরব রইলেন নিষ্ঠাবান-প্রাজ্ঞ-বুদ্ধিমান ও রসিক মানুষটি।

ভৈরবী বিরক্তির মধ্যে ঝামরে উঠলেন, বলো বাবা, বিয়ে নয় করে ফেলেছ। কিন্তু বউমাকে কাছে এনে রাখলে কেন?

ধীরে সুস্থে রামকৃষ্ণ বললেন, মা নিজের সাধনা, সিদ্ধিলাভ সত্যি কতটা হয়েছে, অনুভব করার জন্যই ওকে আনিয়েছি।

কিন্তু সেটা যে কথার কথা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বাবা।

না মা। সাধনা, সন্ন্যাসের কথা শুধু মুখে বললে কি কিছু হয়? স্বীয় জীবনে তার প্রমাণও যে দিতে হবে।

ভৈরবী একটু থমকালেন। তার পরেও বললেন, কিন্তু কী প্রমাণ হচ্ছে বাবা?

রামকৃষ্ণ নির্দ্বিধায় বললেন, মা ধর্মকে বৈজ্ঞানিক সত্যের উপর প্রতিষ্ঠা না করলে তা গুরুত্ব হারায়। ‘রমণীমাত্রে মাতৃভাব’ এইটি আমার ধর্ম। সেই সত্যিটি প্রতিষ্ঠা করার জন্যই ওকে আমি কামারপুকুরে আনিয়েছি।

কিন্তু বউমা এখন কিশোরী। তোমার ধর্মজ্ঞান, তত্ত্বকথার কতটুকু তার মাথায় ঢুকছে?

রামকৃষ্ণ বললেন, বিয়ের আগেই, ও আমার বউ হবে বলে কুটোবাঁধা ছিল, আমি জানি, ও সুলগ্না, সুলক্ষণা, পবিত্র, শুদ্ধ। যে মহাসাধনা আমি করেছি, তাইতে যদি কিছু সত্যদর্শনও হয়ে থাকে, তা হলে সেই সত্য থেকেই উপলব্ধি করছি, আমার উত্তরাধিকারিণীরূপে ও-ই জগতে মাতৃত্বের মহিমা প্রচার করবে। ওর শুভযাত্রা শুরু হয়েছে। গন্তব্যের ঠিকানা ভবিষ্যৎ চিনিয়ে দেবে মা।

ভৈরবী তা সত্ত্বেও বললেন, কিন্তু বাবা আমি যে দেখতে পাচ্ছি, সারাক্ষণ বউয়ের কাছে কাছে থেকে তুমি সংসারের মায়া আর বাঁধনে পড়ে যাচ্ছ।

তা নয় মা। রামকৃষ্ণ বললেন, আমি মুক্ত পুরুষ, সংসারে থাকি বা অরণ্যেই থাকি, আমার বন্ধন কী? যতক্ষণ তাঁকে না জানা যায়, ততক্ষণ সংসার মিথ্যা, কামিনী-কাঞ্চনে মুগ্ধ হয়ে মানুষ কেবল আমার-আমার করে। কিন্তু মা, তাঁকে লাভ করলে সংসার অসার বোধ হবে কেন? তাঁকে জেনে সংসার করলে, বিবাহিত স্ত্রীর সঙ্গে ঐহিক সম্পর্ক থাকে না, কেন না দু’জনেই যে ভক্ত তখন।

ব্রাহ্মণী ভ্রুভঙ্গ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন রামকৃষ্ণর দিকে। কী একটা অসূয়ার কাঁটা বিদ্ধ হয়ে রয়েছে তাঁর বুকের গভীরে। জ্ঞানী, শাস্ত্রজ্ঞা হয়েও কিছুতে তা উপড়ে ফেলে দিতে পারছেন না। আবার সারদা এমনই একটি নিপাট নিরীহ কিশোরীবধূ, যে তার সম্পর্কে কোনও অভিযোগেরও অবকাশ নেই। তবু সারদা-রামকৃষ্ণর কাছাকাছি আসাটা তাঁর সহ্য হচ্ছে না।

একটু পরে বললেন, ঠিক আছে বাবা, তোমার কথা তো নয় শুনলাম। কিন্তু বউমার কতটা বোধোদয় হচ্ছে, সেটাই ভাবনার। সে নেহাত ছোটটিও আর নেই, চোদ্দো বছর বয়স হয়েছে। নারীমূর্তি কাষ্ঠনির্মিত হলেও, এত গায়ে গায়ে থাকলে, সে সংযমের বাঁধ ভেঙে দিয়ে সন্ন্যাসধর্মে ভ্ৰষ্টাচার আনতে পারে।

নিজের আসনে বসে থেকেই রামকৃষ্ণ যেন কোন ভাবজগতে বিলীন হয়েছেন। তাঁর কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে সুদূর থেকে। বললেন, মা, ঠাকুর তার দেই, দেহগত মন দুটোই হরণ করে নিচ্ছেন। তার শরীরে প্রবিষ্ট হচ্ছেন জগদম্বা। আর আমি ব্ৰহ্মাসীন, কালজয়ী। আমার স্ত্রী-পুরুষে ভেদ নাই।

ভৈরবী সবই শুনলেন। কিন্তু টের পেলেন, নিজেকে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে তিনি বাঁধতে পারছেন না। বললেন, তোমায় দেখে আমার প্রত্যয় হয়েছিল— নিত্যানন্দের খোলে চৈতন্যের আবির্ভাব। তন্ত্রশিক্ষার সব জ্ঞানটুকুই তোমার মধ্যে ঢেলে দিতে চেয়েছিলাম। দিয়েও ছিলাম। আমি জানি বাবা, তোমার ব্রহ্মজ্ঞান আর সন্ন্যাসের দীক্ষাও সম্পূর্ণ হয়েছে। তা হলেও বলি, বউমার সঙ্গে তোমার এই ঘনিষ্ঠতা, আর তার আচরণে আমার উদ্বেগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সে তোমার বাহ্যরূপের আকর্ষণে পড়ে যাচ্ছে।

অসহায় আক্ষেপে বারংবার নীরবে মাথা নাড়লেন রামকৃষ্ণ। তারপর বললেন, মা গো, তোমাকে যেমন শ্রীশ্রী যোগমায়ার অংশ বলে মনে করে এসেছি, আমার কাছে ও-ও তেমন সাক্ষাৎ জগদম্বারই আর-এক রূপ। আজ যে আচার আচরণ দেখে তোমার উৎকণ্ঠা হচ্ছে, উত্তরকালে তাই দিয়েই আমি আমার জাগতিক আর আধ্যাত্মিক সাধনাকে জীব কল্যাণের জন্য উৎসর্গ করব। কামিনী-কাঞ্চনের আসক্তি আমার নাই। আমার এ জীবন, ধর্মজীবন, এই সংসার— সংসারধর্ম। অপরকে ভালবাসাই ধর্ম, অভেদ দর্শনই আমার ধর্ম। আর বাহ্যরূপের কথা বলছ? মা জগদম্বার কাছে আমি নিত্য প্রার্থনা করি, মা এ রূপের আর দরকার নেই, তুই আমার আধ্যাত্মিক রূপ দে।

শান্ত সমাহিত মানুষটার চোখ দিয়ে অবিরল ধারায় অশ্রুপাত হচ্ছে নিঃশব্দে। বাক্য হরে গেল ভৈরবী ব্রাহ্মণীর মুখ থেকেও। অথচ এক মিশ্র অনুভূতির অন্তঃস্রোত প্রবাহিত হয়ে চলেছে তাঁর হৃদয় মধ্যে। প্রীতি-প্রেম-অসূয়া-অনুতাপে দিশাহারা বোধ করলেন যোগেশ্বরী। সারদার পরিষ্কার মনে আছে, কামারপুকুরের বাড়িতে, সংসারের আনন্দময় পরিবেশে সাময়িক একটা ছন্দপতন ঘটে গিয়েছিল। কিন্তু তা দীর্ঘস্থায়ী হল না। হয়তো সামগ্রিক বিষয়, পরিস্থিতি আর পরিবেশ অনুধাবন করে কোথাও একটা মানসিকতার পরিবর্তন টের পাচ্ছিলেন ভৈরবী ব্রাহ্মণীও।

কয়েক দিন পরে এক সকালে তিনি কামারপুকুর ত্যাগ করলেন। রওনা হলেন মহাতীর্থ কাশীধামের উদ্দেশে। রামকৃষ্ণ আগের মতোই থেকে গেলেন। আর পারিবারিক আনন্দময় পরিবেশটাও ফিরে এল।

সারদা অনুভব করে, একটানা কয়েক মাস ধরে তখনই তার একসঙ্গে শিষ্যা আর সাধিকা জীবনেরও দীক্ষা শুরু হয়েছিল। সাধনপথের ধারা অনুযায়ী, তিনি একের পর এক বোধ-বিশ্বাস আর ভক্তির সানুপুঙ্খ তত্ত্ব আর তথ্যের বীজ রোপণ করে দিচ্ছিলেন তার মনে, ভাবনায়। তিনি যেন ক্রমাগত সারদাকে উড়িয়ে দিয়ে চললেন, জীবনের সার আর ঊর্ধ্ব অনুভূতির দিকে। মায়ার সংসার আর বাস্তবের মাটিতে রইল অনিবার্য পার্থিব পা, কিন্তু চৈতন্যের উড়ান শুরু হয়ে গেল আধ্যাত্মিকতার ঊর্ধ্বাকাশে।

এখন সেই মানুষটা সম্পর্কেই ঘরে বাইরে গ্রাম্য মন্তব্য শুনে কানে আঙুল দিতে ইচ্ছে করে সারদার। হোক তা প্রায় বছর চারেক আগেকার কথা-ঘটনা-স্মৃতি, কিন্তু যে অনুপম আনন্দের মধ্যে তিনি আপন সাধনার ভাবধারায় ভিজিয়ে দিয়েছিলেন কিশোরী সারদাকে, তা কি মিথ্যে! সে যে তখনই উপলব্ধি করেছিল, পটভূমি পরিবর্তিত হচ্ছে। সহধর্মিণীকে উত্তরাধিকারিণী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার যাবতীয় আয়োজন যে তিনি তখনই শুরু করে দিয়েছিলেন। আর আজ অষ্টাদশী সারদা যখন তাঁর প্রেম আর প্রীতির স্নিগ্ধ কিরণে উদ্ভাসিতা, তখন কী করে তার পক্ষে সম্ভব সেই মানুষটার সম্বন্ধে অশালীন, অসংযত মন্তব্য আর সমালোচনা সহ্য করা?

মানুষটা কাছে থাকেন না। রামকৃষ্ণের অধিষ্ঠান কলকাতায় দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে। অথচ মানুষটার সম্পর্কে উড়ো খবর জল্পনার খোরাক জোগাচ্ছে জয়রামবাটির অলস, গ্রাম্য আবহাওয়ায়। কী তীব্র যন্ত্রণায় বিদ্ধ হচ্ছে সারদা, সে-খবর কেউ রাখে না। অথচ পর্বতপ্রমাণ সহ্যের শিক্ষা তো তিনিই দিয়েছেন। তা সত্ত্বেও একবার চাক্ষুস করেই কি সারদার ন্যূনতম দ্বন্দ্ব আর উড়ো খবরের প্রতিক্রিয়া নির্মূল করা উচিত? মনে মনে সংকল্প করলেও, সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে বাস্তব সমস্যার সম্মুখীন হয় সারদা।

কলকাতা। সে যে অনেক দূরের পথ! স্বামী সন্দর্শনে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করার লজ্জা-সংকোচ পরের কথা। কিন্তু দুরত্ব? গ্রামগঞ্জ, মাঠঘাট, বনবাদাড় ভেঙে সেখানে পৌঁছনো কি মুখের কথা!

তা হলেও সংকল্পের প্রদীপটি নিভৃতে জ্বালিয়ে রাখে সারদা মনের মধ্যে। সুযোগ নিশ্চয়ই আসবে।

কিন্তু অনভিপ্রেত, আকস্মিক দু’-দুটি দুঃসংবাদ এসে পৌঁছায় অল্প দিনের ব্যবধানে।

অন্তর-বাহির দু’ জায়গাতেই যে গভীর পরিবর্তন ঘটে গেছে, সারদা নিজেই তা সবথেকে বেশি অনুভব করে। বাইরের ব্যাপারগুলো মানুষের চোখে পড়ে। নিত্যদিনের কাজকর্ম, চলাফেরা, আচরণে যে পরিণতি, পরিপক্কতা আর পরিবর্তন, কাছেপিঠের লোক সহজেই তা দেখতে পায়। কিন্তু বাহ্যিক পরিবর্তনগুলো সবই যে মানসিক প্রতিক্রিয়ার কারণে, অত তলিয়ে আর কে ভাবতে যাচ্ছে! অন্তত জয়রামবাটির মতন প্রান্তিক গ্রামে, সাদাসিধে-সরল-হেটোমেঠো মানুষদের ভাবনার দৌড় যে অত দূর নয়, সে জানে।

সারদা টের পায়, আপন অস্তিত্বের মধ্যে যেন একটা টলটলে নিঃসঙ্গতার দিঘি আছে। নির্জন অথচ তা গভীর। বিচ্ছিন্ন তবু তা পূর্ণ। ভাবে তাই তো হওয়ার কথা। অন্তরের গোপন বোধবিশ্বাস আর অনুভব যদি কোনও পূর্ণতার আকাশ স্পর্শ করতে চায়, বাইরে মানুষটা শুধু যে ধীরস্থির হয় তা-ই না। একাকিত্ব আর নিঃসঙ্গতা হয়ে ওঠে তার আভরণ, হয়তো বা ঐতিহ্যও। অসহায়তায় সে দীর্ণ হয় না। বরং অনুভব করে, হৃদয় মধ্যে আনন্দের পূর্ণ ঘট যেন স্থাপিত রয়েছে। দেখা যায় না, দর্শনে মেলে।

কেমন সেই আনন্দ? দর্শনই বা হয় কেমন করে?

না, জয়রামবাটিতে ফিরে আসার পরে কারওর কাছেই তার হদিশ দিতে পারে না সারদা। গ্রাম্য কূটকচালি, হাস্য পরিহাস আর একঘেয়ে পরনিন্দা-পরচর্চার মধ্যে যাদের অবসর যাপন, ওই জাতীয় বিষয়ই যাদের মুখরোচক বিনোদনের মাধ্যম, তাদের কাছে আর যা-ই হোক সারদা অন্তত নিজের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন আর উপলব্ধির কথা বলতে পারে না। রুচিগত ব্যবধান ঘটে গেছে তার, সেই মানুষটার সান্নিধ্যে কয়েক মাস কাটানোর পরে। উলুবনে মুক্তো ছড়ানোর ইচ্ছে, আবেগ কোনওটাই নেই সারদার।

ক্ষুব্ধ, ঈর্ষান্বিত এবং পরে অনুতপ্ত যোগেশ্বরী ভৈরবী ব্রাহ্মণী বারাণসী ফিরে যাওয়ার পরে সাময়িকভাবে সারদা কিছুটা উৎকণ্ঠিত দোটানার মধ্যে ছিল। চোদ্দো বছর বয়সের স্বাভাবিক জীবনযাপন আর সন্ধিক্ষণে অমন মানসিক দোলাচলই ছিল প্রত্যাশিত। স্বতঃস্ফূর্ত আত্মসচেতনতায় যেকোনও বিপর্যয়কেই মনে করত— হয়তো তারই দোষ, তার অজ্ঞানতা, অজ্ঞতা, ঘাটতি।

কিন্তু যাবতীয় সংশয় আর ধরে নেওয়া উদ্বেগ একটু একটু করে সরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি৷ কাছে টেনে নিয়েছিলেন।

আজ আঠারো বছর বয়েসে পা দিয়ে, পূর্ণ যৌবনের দ্বার-সম্মুখে দাঁড়িয়ে সারদার মনে হয়, সে যেন অগ্নিশুদ্ধা। ছ’-সাত মাস তাঁর কাছে থেকে যে অভিজ্ঞতা ও সঞ্চয় করে এনেছিল, তা যে শুধু সেই মানুষটাকেই আবিষ্কারের পরিমণ্ডল গড়ে দিয়েছিল, তা নয়। আসলে তাঁর ব্যক্তি আর আধ্যাত্মিক জীবনের অসামান্য উজ্জ্বল পটভূমিতে, কিছুটা নিজের প্রতিফলন আর ভূমিকাও বুঝে এসেছিল সারদা। আজ যে একই সঙ্গে তার স্নিগ্ধ উত্তরণ আর নিঃসঙ্গতা, অষ্টাদশী মেয়েটি জানে— সে তাঁরই করুণা আর দূরদর্শিতার দান, উপহার।

জয়রামবাটির পাড়া-প্রতিবেশী, তথাকথিত কাছের মানুষরা তাঁকে বলে পাগল, ক্ষ্যাপা, উন্মাদ। বাড়ি বয়ে এসে কেউ কেউ ঠেস দিয়ে কথা শুনিয়ে যায়। কেউ কেউ ছদ্ম সহানুভূতির প্রকাশ দেখিয়ে হাঁড়ির খবর টেনে বার করতে চায়। কেউ আবার একসময়কার নিজেদের ঈর্ষাকাতর মনের ঝাল মেটানোর জন্য আদিরসাত্মক মন্তব্য আর গালগল্পের অবতারণা করে।

ক’দিন আগে পুকুরঘাটে স্নান করতে আর জল আনতে গিয়ে, অতর্কিত মিছরির ছুরির মতন বাক্যবাণে যেভাবে আক্রান্ত হয়েছিল সারদা, সে ছিল তার স্বপ্নের অতীত। অথচ গ্রাম্য মানুষের মুখ বন্ধ করারই বা উপায় কী।

পালবাড়ির বউ নলিনী বলেছিল, ও সারু, তোর মুখখানা অমন শুকনো করে রাখিস কেন রে?

ভাদ্র মাসের শেষ দিক তখন। শরতের আলোয় আসন্ন উৎসবের খবর ছড়িয়ে পড়েছে আবহাওয়ায়, প্রকৃতিতে। ভরা পুণ্যপুকুরের টলটল জলে নীল আকাশের ছায়া। তার ওপর কখনও ভেসে যায় সাদা মেঘের নৌকো। আবার হঠাৎই কখন রং পালটানো ধূসর মেঘ হুড়মুড়িয়ে ছুটে আসে। ছাগল-তাড়ানো বৃষ্টিতে ভিজিয়ে দিয়ে যায় পথ-ঘাট-বাগান-মাঠ। একটু পরেই হাওয়া আর রোদ হাসে।

মেয়েদের ঘাটে পাড়ার আরও কয়েকজন বউ-ঝি জল নিতে, চান করতে এসেছে। দুপুরবেলা পুকুরঘাটেই কিছুটা মেয়েলি আড্ডা আর গল্পগুজবের অবকাশ মেলে। হাসাহাসি, ঠাট্টাতামাশা, খবরাখবর হয়।

সারদা জল নেওয়ার কলসি ধুতে ধুতে বলল, না তো দিদি, মুখ শুকনো করে রাখব কেন!

আহা সেই কথাই তো জিগ্যেস করছি। পালগিন্নি বলল। মুখটা কালো করে রাখিস, কথাবার্তাও আগের মতো বলিস না। বিশ্বাস বাড়ির পার্বতী কিছুটা উপযাচক হয়েই আধকোমর জলে দাঁড়িয়ে বলে উঠল, ও বউদি সবাই কি তোমার মতন আহ্লাদে আটখানা হয়ে রয়েছে সব সময়? মনের দুঃখ-কষ্টও তো আছে।

তুই থাম দিকিনি। নলিনী বলল, আমি কি সবায়ের কথা বলছি?

তা আমিও তো সারুদিদির কথাই বলছি গো।

তো ওর মনের দুঃখ কষ্টের কথা তুই জানলি কোত্থেকে লো?

না জানার কী আছে বাপু! ঘর-সংসার আমারও তো হয়েছে না কি?

ঘর-সংসারের কথাটা উঠতেই সামান্য আড়ষ্ট হয়ে যায় সারদা। পার্বতীর জিভের ধার কেমন তাও জানে। কোনও উত্তর দেয় না।

নলিনী তার মধ্যেই পার্বতীর উদ্দেশে হেসে বলে, তোর আবার ঘর-সংসার কোথায়? শুধু বিয়ে হলেই কি আর সংসার হয় রে?

পার্বতী বলল, আহা সেই জন্যই তো আমি সারুদিদির অবস্থাটা বুঝি। গায়ে একটু জল ছিটিয়ে আবার বলল, ও সারুদি, বল না গো, বিয়ের পরে বাপের বাড়িতে হাঁড়ি ঠেলতে হলে, মুখ শুকনো থাকবে না তো কি গতরে ফুল ফুটবে?

সারদা বলল, আমার বাপের বাড়ি অন্যরকম ভাই। ভক্ত-ভগবানের সংসার। মা একা সামলাতে পারে না।

সে তো আমারও। পার্বতী বলল, তা হলেও কর্তা এখন হপ্তায় দু’দিন করে এসে থাকে বলেই না টিকে আছি। তা নয়তো ষোলো বছর বয়েসে বর ছাড়া থাকতে থাকতে আমারও তোমার মতন দশাই হত।

কথার টানে রসের আভাস পেয়ে ভিজে গায়ে গামছা জড়িয়ে এগিয়ে এল কার্তিক মণ্ডলের বউ রাধা। খেজুর গাছের গুঁড়ি দিয়ে তৈরি ঘাট। কোণের দিকে জলে পা ডুবিয়ে বসে বলল, ও পার্বতী, হপ্তায় দু’দিনেই তোর বর সব খামতি মিটিয়ে দেয় না কি রে? হেসে গড়িয়ে পড়ল রাধা।

পার্বতী ঝামরে উঠল জল থেকে। দেয়ই তো। আমার বর কি তোমার বরের মতো ষাট বছরের লব কাত্তিক!

রাধা তারপরেও বলল, যাই হোক আর যাই-হোক তবু তো আছে! সারুর অবস্থাটা তা হলে একবার ভাব দিকিনি!

পার্বতী বলল, সারুদি তো আঠারোতেও কুমারী গো, বরের স্বাদই তো পায়নি এখনও…

তোকে বলেছে! রাধা বলল, গেল বারে যখন কামারপুকুর গেছল, তখনই তো…

সারদা টের পেল, ওর রুচিতে আর কুলোচ্ছে না। পুকুরঘাটের মেয়েলি বৈঠকের গড়ান যেদিকে, আলাপ-আলোচনা-মশকরার ভাষা আর বিষয় যেদিকে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, ওর মানসিকতা তাইতে সায় দিতে পারছে না। অংশগ্রহণেরও প্রশ্ন নেই। কলসিটা টেনে নিয়ে নলিনীকে বলল, তোমরা গল্প করো দিদি, আমায় যেতে হবে।

নলিনী প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ওর হাত চেপে ধরল। বলল, আহা বোস না দু’ মিনিট, যাবি আর কি! মায়ের সংসারে ঝিয়ের খাটনি খাটিস, সুখদুঃখের দুটো কথা কইলেও তো মনটা হালকা হয়।

মনে আমার কোনও ভার নেই গো দিদি। সারদা বলল, মায়ের সংসারই আমার ঠাকুরের সংসার।

মিচকে হেসে, ঠেস দিয়ে পার্বতী বলল, তা ঠাকুর তোমায় রাতে এসে দেখা-টেখা দেয় তো গো সারুদি?

শুধু রাতে কেন ভাই, সারদা বলল, ঠাকুর অষ্টপ্রহরই আমার সঙ্গে আছেন।

ও মা, সেই ভাবের ঠাকুর নিয়েই বছরের পর বছর কাটিয়ে যাচ্ছ? তা হলে আর মুখের কী দোষ বল! সাপটে নিয়ে না পড়লে মেয়েমানুষের কি আর মুখের জেল্লা বেরোয়? খিলখিল করে হেসে উঠে দু’ হাতে জল সরিয়ে ডুব দিল পার্বতী।

রাধা বলল, তা আমি বলি, শ্যামাদিদির আক্কেলটাই বা কী? সমত্ত মেয়েকে ঘরে রেখে নিজে বছর বছর..

পার্বতী ডুব দিয়ে উঠেই আবার বলল, আহা-হা নেই ঘরে খাই বেশি বলে কথা আছে, জান না? মেলোমশাই আমাদের পুরুত মানুষ… ঘণ্টা নাড়তে নাড়তে কখন কী হয়ে যায়…। হাসির শব্দে আবার ডুব দিল।

নলিনী মৃদু ধমক দিল। আহ্ তোরা থামবি! সারদার কাছ ঘেঁসে এসে বলল, হ্যাঁ রে সারু, তোর স্বামীর সেই কী সব বায়ুরোগ-টোগের কথা শুনেছিলাম… তা সেসব এখন…

রাধা মুখ বাড়িয়ে গোপন কথা বলার মতো বলল, ও মা সে তো বদ্ধপাগল গো! লোকে তো তাই বলে শুনি।

সারদার গলা দিয়ে স্বর বেরুচ্ছে না। উঠে পালানোরও উপায় নেই।

পালগিন্নি তার মধ্যেই বলল, সত্যি, কী কপাল করেই জামাই এনেছিল শ্যামাদিদি! অথচ সুখী সংসার, পালটি ঘর… রাধা বলল, শুধু পালটি ঘর দেখলেই কি হয় গো দিদি? একটু খোঁজখবর নেওয়ার কথাটাও ঠাকুরমশায়ের মাথায় এল না?

সে লোক তো ছোটবেলা থেকেই নাকি ক্ষ্যাপাটে মার্কা ছিল শুনেছিলাম। নলিনী বলল। তাই তো না কি রে সারু?

সারদা অসহায় আক্ষেপে মাথা ঝাঁকাল। দু’হাত কানের কাছে তুলে বলল, আমায় ওসব কথা জিগ্যেস কোরো না দিদি। কিছু বোলো না।

আহা, এ তো নিজেদের মধ্যেই কথা রে। লোকে কত রকম কুচ্ছো করে জানিস? বলে নাকি…

সারদা মাথা নেড়ে বলল, লোকের কথায় কান দিয়ে না দিদি। আর আমাকে বোলো না। ওসব কথা শোনাও আমার পাপ।

জল থেকে তাড়াতাড়ি উঠে এল পার্বতী। হাঁটু গেড়ে সামনে বসে বলল, ও দিদি, আমার বর তো সেই রানিমা-র মন্দিরে গিয়ে স্বচক্ষে তাকে দেখে এসেছে গো!

রাধা বলল, তাই না কি? কী, কী দেখেছে?

ওহ্‌ সেকথা আর কোন লজ্জায় বলি…। ভিজে কাপড় মুখের ওপর টেনে নিয়ে পার্বতী বলল, সে লোকের তো নাকি মা-মা করতে করতে কাপড়-চোপড়ের ঠিক থাকে না…

অ্যাঁ সে কী! রাধা বলল, ল্যাংটা হয়ে ঘুরে বেড়ায় না কি?

তা নয়তো আর বলছি কী?

পুজো করতে করতে উন্মাদ হয়ে গেছে?

কী করতে কী হয়েছে, বলতে পারব না বাবা। পার্বতী বলল, সারুদিদির জন্যই বুকটা টনটন করে।

নলিনী বলল, ছ্যা-ছ্যা-ছ্যা, মন্দিরে মায়ের সামনে উদোম হয়ে যায়!

রাধা বলল, দারোয়ান-চাপরাশি থাকে না মন্দিরে?

আঁচল নিংড়ে পার্বতী বলল, আমার বর হলে বাবা, ঘেঁটি ধরে টেনে এনে ভগবানের ভূত কবে ছাড়িয়ে দিতাম। সারুদি বলেই সহ্য করছে।

বলি পাগলেরও তো একটা চক্ষুলজ্জা থাকে, না কী গো? নলিনী বলল, তো সে লোক কেমন পাগল বাপু?

সেয়ানা গো দিদি, সেয়ানা। পার্বতী বলল, পড়ত তেমন ঠ্যাঁটা মেয়ের পাল্লায়, ঝেড়ে কাপড় পরিয়ে দিত।

রাধা বলল, কে জানে বাপু, পুজো করতে করতে বোধশোধ চলে গ্যাছে বোধহয়।

ইস্‌-স্‌, তা হলে বিয়ে করতে গিয়েছিল কেন? পার্বতী বলল, মাগ নিয়ে ঘর করার ইচ্ছে ছিল বলেই তো?

সারদা আর সহ্য করতে পারল না। উঠে দাঁড়িয়ে বলল, দয়া করে তোমরা থামো। আমায় যেতে দাও।

ওলো যাবি আর কী! নলিনী হাত টেনে ধরল আবার।— আমরা কি তোর পর রে? চোখের ওপর দুখিনীর মতো তোকে দেখি বলেই না…

আমি দুখিনী নই গো দিদি, সারদা প্রায় আর্তস্বরে বলল, তোমরা তাঁকে দ্যাখোনি, বুঝবেও না…। যদি বুঝতে—

অমন বোঝার মুখে ঝাঁটা মারি। নলিনী ক্ষিপ্ত হয়ে বলে, বিয়ে-করা বউ পড়ে রইল বাপের বাড়ি, আর সে মিনসে কালী কালী করতে করতে হেদিয়ে মরছে পুজো করার নামে! বলিহারি ঠাকুরভক্তি…

সারদা শেষ চেষ্টার মতো বলল, তোমরা জান না। তিনি স্বয়ং ঠাকুরের অংশ।

থাক, আর শাক দিয়ে মাছ ঢাকিস না সারু। আমাদের না হয় অত জ্ঞানগম্যি নেই, তা বলে ঠাকুর আর মানুষের তফাত বুঝব না?

রাধা বলল, কিল খেয়ে কিল হজম করা ছাড়া এখন আর সারুর উপায় কী! কষ্টটা কি আর বুঝি না?

পার্বতী আধখোলা গা মুছতে মুছতে রঙ্গ করে বলল, তোমার কি আঁটকুড়ি হয়ে থাকাই কপালে লেখা আছে না কি গো সারুদি?

জল আর নেওয়া হল না। শূন্য কলসি তুলে নিয়েই দ্রুত পা বাড়াল সারদা।

কানে এল নলিনী বলছে, জাতগোত্র মিলিয়েও অমন ন্যালাক্ষ্যাপা বর জোটাল কোত্থেকে বাপু কে জানে!

পার্বতী আর এককাঠি ওপরে গিয়ে বলল, ন্যালাক্ষ্যাপা না ছাই দেখ গে যাও, সে জামাই বোধহয় নপুংসক। তা নয়তো আঠারো বছরের জ্যান্ত বউ ছেড়ে, মাটির প্রতিমা নিয়ে বছরের পর বছর পড়ে থাকতে পারে!

কিন্তু সে যে সারুকেও গুণ করে রেখেছে দেখছি। সেটা হয় কী করে?

উপায় কী দিদি, রাধা বলল, সাত পাক ঘুরে, মালাবদল করে বিয়ে যখন একবার হয়ে গেছে…

কোনও মতে পালিয়ে বেঁচেছিল সারদা। কিন্তু এক জায়গায়, এক পাড়াতে থেকে সর্বক্ষণ কি আর গা বাঁচিয়ে চলা যায়! তার ওপর শ্যামাসুন্দরী-রামচন্দ্র দু’জনের কেউই ঘরকুনো মানুষ না। রামচন্দ্র তো আবার এককাঠি বাড়া। চেনা লোক বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে গেলেও, ডেকে এনে আলাপ করেন। নিজে কল্কে সেজে এনে, হুঁকো বাড়িয়ে দেন। এ তাঁর চিরকালের স্বভাব।

কিন্তু পাড়ার আর গাঁ-গঞ্জের মানুষের মন, ভাবনাচিন্তা যে সব সময় একরকম থাকে না, উদারতাও ধূসর হয়ে আসে, সে-বিষয়ে রামচন্দ্র বা শ্যামাসুন্দরী সচেতন না। মুখে ওপর ওপর ঠাকুরমশাই, গিন্নিমা বলে কথা-টথা বললেও, সারদাকে একটানা বাপের বাড়িতে থাকতে দেখে, তাদের অলস আর কুচুটে মন যে প্রায়শই সন্দেহ আর প্রশ্ন নিয়ে সারদাকে দেখছে, একথা তাঁদের মনে আসে না। যখন সারদা নেহাত বালিকা ছিল, তখন কেউ গা করত না। কিন্তু আঠারো বছরের মেয়ে তো আর বালিকা না। বিয়েও হয়ে গেছে এক যুগ হতে চলল। পাড়ার কত ছোট ছোট মেয়েও তার পরে বিয়ে হয়ে শ্বশুরবাড়ি চলে গেছে। কারওর কারওর একাধিক ছেলেপুলেও হয়ে গেছে।

রামচন্দ্র টের পান না, কিন্তু পাড়ার বয়স্করাও সারদার এই একটানা বাপের বাড়িতে থেকে যাওয়া লক্ষ করে। আর অনিবার্য কৌতূহলে গ্রাম্য মানুষদের যে পেট ফুলবে, তা বলা বাহুল্য। উপরন্তু ইন্ধন জোগানোর জন্য মাঝেমধ্যে খুচরো খবর এসে পৌঁছয় গ্রামে। সত্যাসত্য বিচার আর কে করতে যাচ্ছে! উড়ো কথার তিল থেকে তাল বানিয়ে অকর্মণ্য লোকেরা চিরকালই কৌতূহল চরিতার্থ করে। আসলে সবকিছুর পিছনে প্রচ্ছন্ন ঈর্ষা, আর গায়ের ঝাল মেটানোর আকুতিও কিছু মানুষের সনাতন বৈশিষ্ট্য।

কামারপুকুরের ক্ষুদিরাম চাটুজ্যের ছোট ছেলের সঙ্গে, জয়রামবাটির গরিব রামচন্দ্র মুখুজ্যের বড় মেয়ের বিয়ের খবরে একসময়ে যারা ঠোঁট উলটেছিল, হিংসেয় গা জ্বলেছিল, কালক্রমে তারাই সরব হতে শুরু করল একটু একটু করে। দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দিরের ভক্ত সাধক, যিনি জ্ঞান আর চৈতন্যের নতুন দিশা দেখাচ্ছেন, কিংবা স্বয়ং মথুর বিশ্বাস তাঁর রসদদার এবং ভাবশিষ্য, এসব খবর পাশ কাটিয়ে, তারা সেই মানুষটাকে উন্মাদ, পাগল ইত্যাদি বিশেষণে চিহ্নিত করতেই দিব্যি পুলক অনুভব করল। আর সুযোগ পেলেই ঠারেঠোরে সেকথা রামচন্দ্রেরও কানে দিয়ে গোপন তুষ্টি অনুভব করল।

রাধানাথ ঘোষ, যিনি কিনা একদিন রামচন্দ্রের প্রতি বন্ধুভাবাপন্নই ছিলেন, তামাক টানতে টানতে একদিন বলে বসলেন, মেয়েটাকে এভাবে আর কত দিন বাড়িতে বসিয়ে রাখবেন ঠাকুরমশাই?

বসিয়ে রাখব? সরল মনে রামচন্দ্র বলেছিলেন, না-না ঘোষমশাই, সারুমা-র আমার বসে থাকার সময় কোথায়? ঘরে-বাইরে সারাক্ষণই তো তার কাজ। দ্যাখেন না, একা মেয়ে প্রায় দশভুজা হয়ে এই সংসার সামলাচ্ছে।

না-না-না, তেমন বসে থাকার কথা বলছি না।

তবে?

বলছি আর কি…বিয়ে-থাও হয়ে গেছে আজ বহু বছর। সারু তো আর ছোটটিও নেই এখন। ধরুন গিয়ে, তারও তো কিছু শখ-আহ্লাদ আছে…!

রামচন্দ্র একটু আতান্তরে পড়ে গিয়ে, আমতা আমতা করে বললেন, কিন্তু মেয়ে আমার নিরানন্দে আছে বলে তো…

আসলে বুঝলেন কিনা, যে বয়েসের যা। গলা খাটো করে রাধানাথ বললেন, শুনছিলাম জামাই বাবাজির নাকি—

সে অতি উঁচুদরের ভক্তমানুষ, ঘোমশাই।

আজ্ঞে সে তো আপনার মেয়ের বিয়ে হওয়া তক শুনে আসছি।

অনেক কপাল করে অমন একটি জামাই পেয়েছি ঘোমশাই।

কিন্তু কপাল দিয়ে হবেটা কী? লোকে বলে, তার নাকি মাথার ঠিক নেই?

ছি-ছি-ছি, এসব কী বলছেন!

আজ্ঞে যা শুনি, তাই বলছি। সে না কি বায়ুগ্রস্ত, যখন-তখন ভিরমি খায়, পাগলার মতন ঘুরে বেড়ায় মন্দিরে!

না-না-না, ওসব কথা মুখেও আনবেন না।

তা না-হয় আনব না। কিন্তু ধামাচাপা দিয়েই বা রাখবেন কত দিন!

আপনারা বুঝছেন না ঘোষমশাই, সে মানুষ ঈশ্বরপ্রেমে বিভোর। আর আমার সারু মা-কেও তো জন্মইস্তক দেখে আসছেন। সে-ও যে কেমন ভক্তিমতী আপনারা জানেন।

ঠাকুরমশাই, ওসব ছেঁদো কথা দিয়ে আর কত দোষ ঢাকবেন?

কী বলছেন আপনি!

গ্রামসুদ্ধ লোকই তো বলছে, শেষ পর্যন্ত একটা উন্মাদের সঙ্গে মেয়েটার বিয়ে হল?

শোনা কথায় বিশ্বাস করবেন না ঘোষমশাই।

না করতে পারলে তো ভালই হত। কিন্তু উপায়টা কী বলুন! এখবর এখন যে সবায়ের মুখে মুখে। আপনিই শুধু জেগে ঘুমোচ্ছেন।

রামচন্দ্র যেন গভীর অবসাদে ঝিমিয়ে পড়লেন। বিমর্ষতা ঘিরে ধরছে তাঁকে।

তার মধ্যেই শুনলেন রাধানাথ আবার বলছেন, অবশ্য আপনার আর করারই বা কী আছে! বড় মুখ করে ভাল ঘরে মেয়ের বিয়ে দিলেন…জেনেশুনে তো আর দেননি যে ছেলে পাগল… মেয়েটারই দুর্ভাগ্য!

একটু পরে রামচন্দ্র হতাশ কণ্ঠে বললেন, ঘোষমশাই, আপনারা সত্যি ওসব রটনায় বিশ্বাস করেন?

রটনা? তা হবে! গলার স্বর পালটে ঘোষ বললেন, দেখুন ঠাকুরমশাই, যা রটে, তার কিছু তো বটে! আমরা আপনার পাড়া-প্রতিবেশী, ভাল ছাড়া খারাপ কি চাইতে পারি! সেই জন্যই বলা।

বিভ্রান্ত রামচন্দ্রের মুখ দিয়ে শব্দ বেরুল না।

রাধানাথ বললেন, তবে শুভাকাঙক্ষী হিসেবে আপনাকে… যদি বলেন, একটা পরামর্শ দিতে পারি।

একই সঙ্গে দুর্ভাবনা আর হতাশায় বিধ্বস্ত বোধ করলেন রামচন্দ্র। খুচরো কথাবার্তা কানে আসছে কিছুদিন ধরেই। তেমন গুরুত্ব দেননি কখনওই। কিন্তু পাড়া-প্রতিবেশীর মতামতকে সব সময় কি এড়িয়েই যাওয়া যায়! তিনিও তো সমাজবদ্ধ জীব!

নীরব, উচ্ছ্বাসহীন চোখ তুলে রাধানাথ ঘোষের দিকে তাকালেন রামচন্দ্র।

রাধানাথ বললেন, আমি বলি কী, একবার স্বচক্ষে দেখে আসুন ব্যাপার কী! আঠারো বছরের মেয়েটাকে তো আর হাত-পা বেঁধে জলে ফেলে দিতে পারেন না। আর কাঁহাতক-ই বা এসব উড়োখবরে কান ভারী করবেন? ভুল করে বিয়ে না হয় দিয়ে ফেলেছিলেন…কিন্তু মেয়ের বাপ হিসেবে, ভুল শোধরানোর চেষ্টাটাও তো করা উচিত। না কি?

বিভ্রান্ত, অসহায় মুখে রামচন্দ্র বললেন, বলছেন? তা হলে আবার সারুমাকেও—

ছোটমুখে বড় কথা বলে ফেলছি ঠাকুরমশাই, রাধানাথ বললেন, মেয়েকেও সঙ্গে নিয়ে যান, আর রেখে আসুন জামাইয়ের কাছে। কতই তো দেখলাম… ভক্ত-পাগল-ক্ষ্যাপা.. বউ পেলে সব রোগই ছেড়ে যাবে।

কিন্তু আমার মেয়েও যে—

দেখুন সেটা। মনে মনে তারও কি আর ঘর-সংসারের ইচ্ছে-টিচ্ছে নেই?

কী জানি… মনে হয় ঈশ্বরে ভক্তি আর বিশ্বাসে তারও যেন মন-প্রাণ সমর্পিত… আচ্ছা দেখি…।

ফেলে না রেখে, সত্যিই দেখুন। রাধানাথ বললেন, ঠাকরুনের সঙ্গেও কথা বলুন। সারুর বর পাগল, একথা শুনতে আমাদেরই কি ভাল লাগে?

রামচন্দ্র বিশ্বাসের জোরটা হারিয়ে ফেলতে ফেলতেও বললেন, সে-মানুষ এলেবেলে মাথা খারাপ পাগল নয়, ঘোষমশাই। প্রেম আর ভক্তি-তে সে ডুবে থাকে বলেই, সাধারণ মানুষ ভুল বোঝে। আসলে কিন্তু…

রাধানাথ উঠে যেতে যেতে বললেন, তা হলে যা ভাল বোঝেন করুন। তবে গ্রামে ঢি ঢি পড়ে গেছে, সারুর জামাই উন্মাদ।

বিগত কয়েক মাস ধরেই সারদা টের পাচ্ছে গ্রাম্য মানুষদের উড়ো কথার জল্পনা আর রসালাপ ক্রমশই ঘনীভূত হচ্ছে। আগে যেসব কথা আকারে-ইঙ্গিতে লোকে বলার চেষ্টা করত, ক্রমশই যেন তা স্পষ্ট আর সোচ্চার হয়ে উঠতে চাইছে। বাইরের কথা যে একটু একটু করে ঘরে এবং আত্মীয়স্বজনের মধ্যেও প্রভাব বিস্তার করছে, সারদা বোঝে। আন্দাজ করে মাঝেমধ্যে শিহড় থেকে মামা-মামিরা এসেও মায়ের কানে মন্ত্র দিচ্ছে। কাঁহাতক শ্যামাসুন্দরীই বা সহ্য করেন! কখনও-সখনও তাঁর কথাতেও অসহিষ্ণুতার স্পর্শ লক্ষ করে সে।

নিজের গোপন উপলব্ধির দ্বারপ্রান্তে খুটখুট কড়া নাড়ার শব্দ পায় সারদা। তারপরেই সে আপন সত্তা আর একাকিত্বের মুখোমুখি হয়। নীরব প্রশ্ন করে, সত্য বল। ক্রমশ একটি গভীর ভাব আর বোধের মধ্যে সে ডুবে যায়। তারপর আবিষ্কারের চেষ্টা করে, একান্ত আপন অস্তিত্বের ভণিতাহীন মূল শিকড়টির। মন সত্যি কী বলে! প্রার্থনা করে, অকপট হও।

নিজের জানা আর বোঝার কাছে, সত্যিই শুদ্ধ আর স্বাক্ষরিত হয়ে ওঠে সারদা একদিন। না, সে-মানুষটা সম্পর্কে বিন্দুমাত্র সংশয়ের দোলাচল নেই তার মধ্যে। তাকে যেভাবে তিনি চিনিয়েছেন, তার মধ্যে ফাঁকি নেই। শরীর-সংসার সবকিছুর মধ্যে থেকেও, আনন্দ আর চৈতন্যের যে উচ্চাসনে তাঁর অধিষ্ঠান, সারদা দ্বিধাহীন মন ও অন্তরে তাকে ছুঁতে পেরেছে। ভাবের ঘরে তারও কোনও চৌর্যবৃত্তি নেই। নিজের আলোতেই চোখ মেলে তাঁর স্বরূপ দর্শন করেছে সারদা। সে নিষ্ঠ, সে শুদ্ধ, সে সত্য।

শুধু এক আকুল, মানুষিক হৃদয়াবেগে সামান্য অস্থির বোধ করে সারদা।

মানুষটাকে একবার গিয়ে দেখে আসা যায় না?

কেন যাবে না। কলকাতা কত দূরের পথ। যত দূরই হোক, অগম্য তো নয়!

একা একা পারবে? হেঁটে, কয়েক দিন ধরে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। তা হলে?

ধৈর্য ধর। সুযোগ আসবে।

মনের উচাটন ভাবটা চেপে রাখে সারদা নিজের মনে। আর নিভৃতে ইচ্ছেটাকেও লালন করে যায়।

কয়েক দিনের মধ্যে আসে প্রথম দুঃসংবাদটা। অক্ষয় মারা গেছে।

প্রথমে শুনে খবরটা যেন বিশ্বাস করতে পারল না সারদা। বড় ভাশুরের একমাত্র ছেলে অক্ষয়কে সে কয়েক বারই দেখেছে। যেমন সুপুরুষ, তেমনই প্রাণময়, ভক্ত আর উদারমনা মানুষ অক্ষয়। অল্প বয়েসে পিতৃবিয়োগের পর কাকারাই ছিলেন তার অভিভাবক। মাতৃবিয়োগও ঘটেছিল প্রায় তার জন্মের পরে পরেই। সারদা জানত, প্রকৃতপক্ষে ছোটকাকা রামকৃষ্ণই ছিলেন অক্ষয়ের গুরু এবং আশ্রয়, আর মনে মনে তিনিও জানতেন— ভাইপোটি আসলে তাঁর ভাবশিষ্য।

মাত্র তেইশ বছর বয়েসে অমন একটা জোয়ান ছেলে হঠাৎ মারা যেতে পারে!

কিন্তু বড়কাকা ঈশ্বরচন্দ্র যখন নিশ্চিত খবর নিয়ে কলকাতা থেকে ফিরলেন, সারদার আর অবিশ্বাস করার উপায় রইল না। শোকে পাথর হয়ে রইল সারদা কয়েক দিনের জন্য।

মাত্র বছর দেড়েক আগে বিয়ে হয়েছিল অক্ষয়ের। উদ্যোগ নিয়েছিলেন মেজকাকা রামেশ্বর। বড়দাদা রামকুমার মারা যাওয়ার পরে এমনিতেই কামারপুকুরের বাড়ির সাংসারিক দায় দায়িত্ব অনেকটা ছিল রামেশ্বরের ওপর। ছোটকাকার পদাঙ্ক অনুসরণ করে অক্ষয়ও চলে গিয়েছিল দক্ষিণেশ্বরে, আপন ভক্তি আর বিশ্বাসে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল বিষ্ণুমন্দিরের পূজক হিসেবে। বলা যায় না, রামেশ্বর হয়তো ছোট ভাইয়ের সংসারবিমুখ উদাহরণের স্মৃতি মনে রেখেই, ভাইপোর ব্যাপারে সতর্ক হয়েছিলেন সময় থাকতে। মাথায় রেখেছিলেন, উপযুক্ত পাত্রী পেলেই অক্ষয়ের বিয়ে দিয়ে সংসারী করার কথা।

সেই মতো কুচকেলি গ্রাম থেকে পাত্রীর সন্ধান পাওয়ার পরেই রামেশ্বর আর দেরি করেননি।

কিছুটা তাড়াহুড়োও করতে হয়েছিল। তখন চৈত্রমাস, বৈশাখের গোড়াতেই বিয়ের দিন স্থির হয়েছিল। সংস্কার অনুযায়ী চৈত্রমাসে স্থানান্তর শুভ নয় জেনেও, রামেশ্বর ঝুঁকি নিতে চাননি। চৈত্রমাসেই অক্ষয়কে দক্ষিণেশ্বর থেকে কামারপুকুরে নিয়ে চলে এসেছিলেন। যথারীতি বৈশাখের নির্দিষ্ট দিনে বিবাহ অনুষ্ঠানও সুসম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল। একুশ পেরিয়ে অক্ষয় তখন সদ্য বাইশ বছরে পড়েছে।

কিন্তু বিয়ের কয়েকমাস পরেই, একবার শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ল অক্ষয়।

পিতৃ-মাতৃহীন ছেলে, রামেশ্বরের উদ্বেগ বাড়ল। তিনি থাকেনও কাছেপিঠে। অক্ষয়কে কামারপুকুরে এনে চিকিৎসাপত্রের ব্যবস্থা করলেন। দ্রুত সুস্থও হয়ে উঠল। স্বাস্থ্যের দীপ্তি ফিরে এল অক্ষয়ের। দেরি না করে দক্ষিণেশ্বরে ফিরে গেল কয়েক দিনের মধ্যে। আসলে ছোটকাকার স্নেহচ্ছায়ায় ফিরে যাওয়ার আকুতি তীব্র ছিল অক্ষয়ের। মনপ্রাণ সঁপে আবার সে কাজে লেগে গেল।

কিন্তু কত দিনের জন্য? মাত্রই কয়েকটা মাস।

একদিন সকালবেলায় আবার ঘুরে জ্বরে পড়ল অক্ষয়। সাধারণ টোটকা চিকিৎসা চলল কয়েকদিন, কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যে বোঝা গেল, এ সাধারণ জ্বর নয়, লক্ষণগুলোও ভাল না। আর কীভাবে যেন ছোটকাকা রামকৃষ্ণই এবার দুরন্ত উৎকণ্ঠা অনুভব করলেন। এমনকী ভাগ্নে হৃদয়কে ডেকে আপন মনোভাব ব্যক্ত না করেও পারলেন না।

হৃদু, অক্ষয়ের জ্বরের লক্ষণগুলো ভাল ঠেকছে না রে!

কপালে ভাঁজ পড়ল হৃদয়েরও। রামকৃষ্ণ সাধারণত এমন মন্তব্য করেন না! বললেন, কেন বলো তো মামা?

কী জানি… মনে হল, তাই বললাম।

তুমি তো সচরাচর অসুখ-বিসুখ নিয়ে কিছু বল না!

রামকৃষ্ণ একটু এড়িয়ে গিয়ে বললেন, হ্যাঁরে বিয়ের সময় পাত্রীর ঠিকুজি-কুষ্ঠি ঠিকমতো দেখা হয়েছিল?

হৃদয় বললেন, মেজমামা নিজেই তো সব উদযোগ করেছিলেন। নিশ্চয়ই দেখেছিলেন। কেন?

ভাবছি… রাক্ষসগণবিশিষ্টা কন্যার সঙ্গে বিয়ে হয়েছে কি না…

হলেই বা কী করা যাবে, হৃদয় বললেন, বিয়ে তো আর ফেরানো যাবে না।

তা তো বটেই! রামকৃষ্ণ বললেন, জন্ম-বিবাহ-মৃত্যুর ওপর তো কারওর হাত নেই।

তোমার কি কোনও অশুভ আশঙ্কা হচ্ছে মামা?

রামকৃষ্ণ যেন এক ভাবের ঘোরে বলে ফেললেন, হৃদু, এ ছেলেটা বাঁচবে না রে… বড়দাদা অনেক বছর আগেও একথা বলেছিলেন।

মুহূর্তের মধ্যে চমকে উঠলেন হৃদয়। বললেন, ছিঃ ছিঃ মামা। তোমার মুখ থেকে ও কী কথা বেরুল?

আমি নিরুপায়, হৃদে।

তাই বলে একেবারে মৃত্যুর কথা বলে ফেললে!

আমি নিমিত্তমাত্র। রামকৃষ্ণ বললেন, মা যেমন জানান, বলান, ইচ্ছে না হলেও আমার মুখ দিয়ে তাই বেরিয়ে যায়।

কিন্তু… কিন্তু ওকথাটা তো না বললেও…

ওরে আমার কি ইচ্ছে যে অক্ষয় মারা পড়ুক? সে যে আমার কতখানি…

এক অশুভ ভবিতব্যের ইঙ্গিত পেয়ে স্থির হয়ে গেলেন হৃদয়রাম।

ডাক্তার-বদ্যি-চিকিৎসা সবই অবশ্য যথাসাধ্য চলতে থাকল। কিন্তু সবই যেন বিফলে যাচ্ছে। যেন ক্ষয়-রোগের করাল আগ্রাসী থাবা ক্রমশ প্রসারিত হচ্ছে অক্ষয়ের দিকে। তার ব্যাধিজর্জর দেহে মৃত্যুর যাবতীয় লক্ষণ ফুটে উঠতে লাগল। ক্রমাগত সে অন্তিম সময়ের দিকে ভেসে চলেছে। একেবারে শেষ মুহূর্তে, বুকে পাষাণভার নিয়ে, নিজের স্নেহচ্ছায়ায় লালিত পুত্রসম ভাইপোর শিয়রে এসে দাঁড়ালেন রামকৃষ্ণ। কপালে হাত রাখলেন। তিনি নিশ্চিত। অক্ষয় চলে যাচ্ছে।

কান্নায় ভেঙে পড়েছেন হৃদয়। আর অকম্পিত, ভাবাবিষ্ট তিনি। বললেন, অক্ষয়, বল গঙ্গা, বল নারায়ণ ওঁ রাম।

অক্ষয়ের অস্পষ্ট কণ্ঠস্বর যেন কোন সুদূর থেকে প্রতিধ্বনিত হল তিন বার। উচ্চারণ করল কাকার বলা শব্দ ক’টি। তার পরেই সব শেষ।

পাথর হয়ে রইলেন রামকৃষ্ণ, অথচ কান্না নয়, অশ্রু নয়; একফালি বাঁকা হাসি লেগে রইল তাঁর ঠোঁটের পাশে। হয়তো মৃত্যুসীমার পরপারে অক্ষয়ের মহাজীবনেরই ইঙ্গিতবাহী সেই হাসি। চৈতন্যের উচ্চ ভাবভূমিতে যাঁর অধিষ্ঠান, একটি অকালমৃত্যুর প্রত্যক্ষ সাক্ষী হিসেবে তাঁর শোকের বহিঃপ্রকাশের রূপ হয়তো অমনই।

সারদা ছটফট করল কয়েকদিন। একটু স্থির হওয়ার পরে মনে হতে লাগল সেই মানুষটার আঘাত আর শশাকের তীব্রতা সম্পর্কে। সাধারণ মানুষ যে ঘটনায় শোকাচ্ছন্ন, তাঁর মতো গভীর অনুভূতিসম্পন্ন মানুষের শোকের তীব্রতা তা হলে কতখানি!

হয়তো তাঁর অবলম্বনের প্রয়োজন নেই, তবু সারদার দক্ষিণেশ্বরে তাঁর কাছে যাওয়ার আগ্রহ আর এক ধাপ বেড়ে যায়।

মথুরবাবুও কি ‘তাঁর’ এই শোকের ভার কিছুটা অনুমান করেছিলেন?

তাঁর মনে হয়ে থাকবে, আপাত উদাসীন শোকজর্জর রামকৃষ্ণকে কয়েকদিন অন্য পরিবেশ থেকে ঘুরিয়ে আনা প্রয়োজন।

খাজনা আদায় করতে মথরামোহন নিজেই যাচ্ছিলেন রানাঘাট। গুরুদেবকে অনুরোধ করলেন তাঁর সঙ্গী হওয়ার জন্য। রামকৃষ্ণ রাজি হলেন। নৌকো নিয়ে জলপথে তাঁরা চললেন রানাঘাট। প্রাচীন শহরের গা ছুঁয়ে ছুঁয়ে প্রবাহিত চুর্ণী নদী। অপর পারে ক্লাইভঘাটা, কালক্রমে চলতি ভাষায় হয়ে দাঁড়িয়েছে কলাইঘাটা।

নিবিড় গ্রামীণ পরিবেশ, স্নিগ্ধ নদীর বাতাসে শোকাপ্লুত মানুষটার কিছু পরিবর্তন হলেও, আবার তিনি উদ্বেল হয়ে উঠলেন। দুঃস্থ অনাহারক্লিষ্ট গ্রামবাসী, প্রজাদের দুর্দশা স্বচক্ষে দেখে কাতর হলেন। গভীর কষ্ট অনুভব করলেন অন্তরে।

রানির জামাই তাঁর রসদদার, মানুষটাকে তিনি ভালবাসেন। মথুরবাবু নিজেও গুরু মেনেছেন তাঁকে। রামকৃষ্ণ খাজনা মকুবের অনুরোধ তো করলেনই, উপরন্তু খাদ্য-বস্ত্র সংস্থানের কথাও বললেন। পাগল ঠাকুরের এই মানসিকতা সম্বন্ধে মথুরামোহনের পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল। বছর দেড়-দুই আগে, কাশী যাওয়ার পথে, দেওঘরের কাছে দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষদের জন্যও অন্নবস্ত্রের আয়োজন করতে বলেছিলেন। কাশী যাওয়া প্রায় বাতিল হয়ে যায় সেবার। হয়নি। কেন না মথুরামোহন তাঁর অনুরোধ ফেলতে পারেননি।

এবারও তিনি বললেন, মথুর, তোমার কাছে যে ধনসম্পদ রয়েছে, সেসবই জগন্মাতার গচ্ছিত ধন। এই গরিব-দুঃখীদের কাছ থেকে নেওয়ার কিছু নেই, বরং যা তোমার কাছে আছে, মায়ের নাম করে দিয়ে দাও।

মথুরামোহন জানতেন, এ মানুষের অনুরোধ তাঁর কাছে ঈশ্বরের আদেশের চেয়ে কম কিছু নয়।

সারদা খবর পেয়ে স্বস্তি অনুভব করল। যে মানুষকে তার গ্রামের লোক উন্মাদ, পাগল-জামাই আখ্যা দিয়ে, তাদের পারিবারিক জীবন অতিষ্ঠ করে তুলছে, তারা জানে না আসলে সে কোন ভাবের মানুষ। মনটা জুড়োল এই ভেবেও যে, অক্ষয়ের মৃত্যুর শোক জমাট বেঁধে রয়েছে যে দক্ষিণেশ্বরে, অন্তত সেই আবহাওয়া থেকে বেরিয়েছেন তিনি।

কিন্তু স্বস্তির অনুভব দীর্ঘস্থায়ী হল না সারদার। মনের টানাপোড়ন আর সুযোগের প্রতীক্ষায় সময় বয়ে যাচ্ছে। একটা বিশ্বাসকে সে সযত্নে লালন করে যায় নিজের মধ্যে। দেখা হবে। আঠারো বছর বয়েসের মনন আর তাঁকে কাছে পাওয়ার স্বল্প অভিজ্ঞতায়, আর কিছু না হোক, এটুকু সারদা বোঝে— তার জীবনযাপন, সংসার কোনওটাই আর পাঁচজন ছাপোষা গৃহস্থের মতন হবে না। তিনি যেন ইতিমধ্যেই তার সংসার-জীবনের ব্যাপ্তি আর বিশালতার ইঙ্গিত দিয়েছেন। শুধু বর-বউ, ছেলেপুলে, নিজেদের ঘরবাড়ি নিয়ে যে সংসার, তা নয়। হাবভাবে বারবার তিনি নির্দেশ করেছেন জগৎ-সংসারের দিকে। সে কেমন, পুরো বুঝে ওঠে না সারদা এখনও। কিন্তু টের পায় তিনি বলতে চান, সবাইকে নিয়ে, সব কিছুকে নিয়ে এক বিশাল সংসার আছে। তাকে সেই সংসারের সদস্য হতে হবে। ক্রমে ক্রমে সদস্য থেকে হতে হবে সেই বৃহৎ সংসারের রক্ষাকর্ত্রী। কত বড় দায়িত্ব সারদা এখনও বোঝে না।

পাড়ার মানুষদের গুজব-সমালোচনা-মন্তব্য ঠেকিয়ে রাখার উপায় নেই, কিন্তু কিছুটা সয়ে গেছে সারদার। ঋতুর পরে ঋতু আসে, যায়। গ্রীষ্মের খরা আর দাহ শেষ হয়েছে। ধূসর মেঘে ঢেকেছে আকাশ। ঠান্ডা হাওয়া আর উতল মেঘ থেকে নেমেছে ধারাবর্ষণ— জুড়িয়ে দিয়েছে মানুষ-জীবজন্তু-পশুপাখিকে। রুক্ষ ফাটা মাঠঘাট হয়ে উঠেছে নিবিড় সবুজ প্রান্তর। পালটে গেছে মাটির রং।

ওদিকে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে ভিজে হয়ে রয়েছে রামকৃষ্ণর মন। জ্বরে পড়েছেন তাঁর রসদদার মথুরামোহন। হাজার দোষঘাট থাকলেও মানুষটাকে ভালবাসেন তিনি। এবার মনটা কু-গাইছিল প্রথম থেকে। অর্থবান লোক, চিকিৎসাপত্রের ত্রুটির প্রশ্ন নেই। এমন নয় যে মথুরামোহনের অসুখ-বিসুখ আগে হয়নি, মন্দিরের কাছেই কুঠিবাড়িতে তাঁর আস্তানা। খবরাখবর নিতে, দেখতে নিজেই চলে যেতেন রামকৃষ্ণ।

এবার যেন তাঁর সে উৎসাহ নেই। নিজে যাচ্ছেন না, বারবার হৃদয়কে পাঠান,— যা তো, একবার দেখে আয় মথুর কেমন আছে।

হৃদয় বলে, একবার তুমিই চলো না, তিনি যে তোমার পথ চেয়ে থাকেন।

দীর্ঘশ্বাস গোপন করে রামকৃষ্ণ বলেন, পথ চেয়ে থাকলে কী হবে, ভেতর থেকে সাড়া পাচ্ছি না যে!

হৃদয় ফিরে এসে খবর দেয়, মথুরবাবুর গলা দিয়ে শব্দ বেরুচ্ছে না।

নির্বাক হয়ে রইলেন তিনি।

হৃদয় আবার বলল, ওঁকে কলিতীর্থ কালীঘাটের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা হচ্ছে।

নিঃশব্দ উদাস দৃষ্টি মেলে চুপ করে রইলেন রামকৃষ্ণ।

পরের দিন ছটফট করছে হৃদয়, কখন মথুরবাবুর খবর নিতে যাবে। বলেই ফেলল, মামা, ওঁকে দেখে আসি?

শ্রাবণের আকাশের মতন থমথমে মুখ তাঁর। বললেন, থাক, যেতে হবে না।

আনমনা, আত্মমগ্ন হয়ে রইলেন। দিন শেষ হয়ে আসছে। বাদল মেঘের ছায়ায় সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। তিনি ভাবের সমুদ্রে নিমগ্ন হয়ে গেলেন। সময় কেটে যাচ্ছে। তিনি জানতেন, তাঁর সান্নিধ্যে থেকে মথুরামোহনের মনে, জীবনযাপনে ব্যাপক রূপান্তর ঘটেছিল, লোকটা ভক্ত হয়ে উঠেছিল দিন দিন, কিন্তু তার শরীর জখম হতে শুরু করেছিল আগে থাকতেই।

কয়েক ঘণ্টা পরে যেন আবার বাহ্যরূপে ফিরে এলেন তিনি। হৃদয়কে ডাকলেন। বললেন, স্পষ্ট দেখলাম, মায়ের সখীরা সাদরে তাদের দিব্যরথে মথুরকে উঠিয়ে নিয়ে চলে গেল। তার দেহটা রয়েছে, কিন্তু শক্তি, তেজ সব দেবীলোকে চলে গেল।

হৃদয় বুঝল, ভাবজগতে থেকেই তিনি মথুরবাবুর মহাপ্রস্থানের দৃশ্যটি অবলোকন করেছেন।

আঁধার ঘন হওয়ার পরেই মন্দিরে খবর এল, মথুরবাবু আর নেই, তিনি অন্তর্লোকের পথে যাত্রা করেছেন।

খবর এল জয়রামবাটিতেও। সারদা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, এবার তাকে যেতেই হবে।

বর্ষা শেষে শরৎ এল। আকাশ আলোয় ভাসছে। দুর্গোৎসবের পরে এল হিমেল হাওয়া। গাছের পাতা রং পালটাল। তারপর ঝরে যেতে লাগল রুক্ষ শীতের বাতাসে। নিষ্পত্র শাখারা হয়ে রয়েছে ঊর্ধ্বমুখী, শীর্ণ। হাওয়া ঘুরে যাচ্ছে, আসছে চৈত্র মাস। কাল মধুমাসে প্রকৃতি সাজতে শুরু করেছে, গাছে গাছে সবুজের সমারোহ, মুকুল ধরেছে। পাখিরা ডেকে ডেকে সারা। সামনে দোল।

ভানুপিসির কাছে খবর পেল সারদা। পাড়ার কিছু বউ-মেয়ে-পুরুষ গঙ্গাস্নান করতে কলকাতা যাচ্ছে।

সারদা উৎসাহী হয়ে উঠল। —কোনও উৎসব আছে নাকি?

শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাব লগ্নের পুণ্যযোগ এবার।

মনস্থির করে ফেলল সারদা। বাবাকে বলার মতন জুতসই একটা কারণও তো দেখাতে হবে। হঠাৎই কলকাতায় স্বামীর কাছে যাব, মেয়ে কি বলতে পারে বাবাকে?

প্রচ্ছন্ন হাসলেন রামচন্দ্র।— সত্যি যাবি? বেশ তো।

পাড়ার অনেকে যাচ্ছে, তাদের সঙ্গেই তা হলে…

তার কী দরকার মা! রামচন্দ্র স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে এক ধাপ বাড়িয়ে বললেন, আমিই না হয় তোর সঙ্গে যাব। তা ছাড়া গঙ্গার পাড়ে মন্দিরে তাঁরও ডেরা। তাঁর কানে কি আর তোর যাওয়ার কথা পৌঁছবে না? দেখা তো করতেই হবে।

সারদা বোঁচকা গুছিয়ে নিল। অন্তরে আবেগের মৃদু কাঁপন, অনুভবে জানে তার ডাক হয়েছে। কল্পনা দৃষ্টিতে ভাসছে, পুণ্যস্রোত গঙ্গার ছলছল ধারা, পাড়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে মা ভবতারিণীর মন্দির।

সারদা চলেছে কলকাতার দক্ষিণেশ্বরে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *