কেউ পর নয় – ১

কেউ পর নয়

আজ শ্রাবণ মাসের শেষ দিন। রাতের দ্বিতীয় প্রহরটি সদ্য অতিক্রান্ত হয়েছে। এখনও তাঁর সমাধি ভাঙেনি।

কৃষ্ণঘন জলভরা মেঘসম্ভার নিয়ে নিশার আকাশ উপুড় হয়ে রয়েছে শহর কলকাতার উত্তরে প্রান্তিক পল্লি, কাশীপুরের এক নিবিড় উদ্যানবাটিতে। যেকোনও সময় ধারাবর্ষণ শুরু হতে পারে। এই মুহূর্তে অকস্মাৎ যেন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নিরন্তর চলমানতা, গতি, যার নাম সময়, স্থির দাঁড়িয়ে রয়েছে। পত্রপল্লবে উচ্ছ্বসিত দীর্ঘ বৃক্ষরাজি যারা পরিবৃত, পরিবেষ্টিত করে রেখেছে তাঁর এই অন্তিম আবাস, কোনও আন্দোলন নেই তাদের শাখায়। গভীর স্তব্ধতা নেমে এসেছে উদ্যানবাটির ঘরে বাইরে।

বাটির দোতালায় তাঁরই নির্দিষ্ট কক্ষে বিছানার ওপর শয়ান ঠাকুর শ্রীপরমহংসদেব, সমাধিমগ্ন।

কোথাও বুঝি আরাত্রিক আর স্তোত্রপাঠ সমাপ্ত হল এইমাত্র। থেমে গেছে শঙ্খধ্বনি। আর বিলীয়মান তারই রেশ যেন ক্ষীণ প্রতিধ্বনির মতো দমচাপা বেদনার আর্তিতে কম্পমান, ভেসে যাচ্ছে অনতিদূরের গঙ্গাধারায়, জোয়ারের জলকল্লোলের ওপর দিয়ে। তাঁর সমাধি ভাঙছে না। একটি তীক্ষ্ণ চাপা আর্তনাদ শুধু গুমরে উঠেছিল একজনের বুকের মধ্যে। তিনি ঠাকুরের অর্ধাঙ্গিনী। হয়তো আপন বোধেই টের পেয়েছিলেন, বন্ধনের একটি তার বুঝি ছিন্ন হয়েছে। ঘাট থেকে খুলে গেছে একটি অলৌকিক নৌকা। তারপরেও নিবিড় আঁধারে ডুবে রইল দ্বিতীয় ঋতুর শেষ যামিনী। বাতাস নেই। কোনও শব্দাশব্দি নেই। স্তব্ধ হয়ে আছে পারিপার্শ্বিক।

কিছুটা অন্তরাল আর অবগুণ্ঠনের আড়াল থেকে অপলক দৃষ্টি পেতে রেখেছেন চির অনুগত চিরশিষ্যা সারদা, ওই চিরহর্ষের জীবনসঙ্গীর দিকে। ভাবখানা, ‘ওগো তুমি কোথা যাও, কোন বিদেশে!’

কোথাও যাইনি তো! এই তো এঘর আর ওঘর।

তাই? হ্যাঁ তাই তো। আবহমান কাল ধরেই যে পাশাপাশি বিরাজমান। দুই ঘর, দুই ধারা। সংসার আর বিশ্বসংসার। এদিক ছেড়ে মাত্র ওদিকে যাওয়া। তা হলে ওদিক থেকে এদিকে আসাও কি যায় না! সবই তো সেই এক তাঁরই ধারাপ্রবাহের যাতায়াত আর টানাপোড়েন। আমি কি কোথাও গেছি?

বড় ভাবের বিনিময় হয়ে গেল। ভাবেই পাওয়া যাওয়া-আসা। স্তব্ধ স্থির শয়ান শরীর থেকেই যেন ভাবের অমৃত দান মনে মনে এবং নীরবে সাময়িককালের জন্য আনুষ্ঠানিক হয়ে গেল শিষ্যাটির কাছে। …ওই তো, অমরতার আনন্দ ফুটে রয়েছে ওই দেহে। কোনও শীর্ণতা তো নেই অঙ্গসৌষ্ঠবে। জরা নেই, জীর্ণতা নেই। তা হলে আশঙ্কিত মহাসমাধির উৎকণ্ঠায় বিরহ-শোক-বিচ্ছেদের বেদনাই বা কেন! কেন অকারণে বুকের মধ্যে দীর্ঘশ্বাস জমাট বেঁধে যাওয়া।

কিছুক্ষণের জন্য যেন নিজেরই মনের দোলাচল আর বাইরে চরাচরব্যাপ্ত অন্ধকারের দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে কিছু অনুভব করেন সারদা। নিঃশব্দ উথালপাথাল চলে। এত নৈর্ব্যক্তিক কেন আজ পৃথিবী! বড় দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে না কি ঋতুশেষের শেষ দিনটির এই সমাধিলগ্ন? সময় কি পার হয়ে যাচ্ছে না ঠাকুর? অস্বীকার করব কেমন করে যে, সংশয়ের খড়্গটি যেন আঘাত হানার জন্য বারবার গোপনে উদ্যত হয়ে উঠছে। মন মানছে না। ওই যে তোমার ঘরের মধ্যে অবসাদে উদাস, শোকবিহ্বল সন্তানরা বসে আছে। নিদ্রাবিহীন, অনেকক্ষণ আগে থেকে অশ্রু ফুরানো অপলক দৃষ্টি পেতে রেখেছে তোমার দিকে। চকিত ত্রাসের আশঙ্কা নিয়ে তাকিয়েছে আমার দিকে। মা হয়ে আর যে সহ্য করতে পারি না ঠাকুর। সমাধি, নাকি মহাসমাধি! তোমার আজীবনের ওই স্নিগ্ধজ্যোতি ভালবাসা, প্রেম, আজ কি বর্ষারাতের অন্ধকারে দমচাপা নীরব প্রহারের আঘাতে চিরকালের জন্য নিবে যেতে বসেছে!

হঠাৎ শিউরে উঠলেন সারদা। আর একটি প্রহর অতিক্রান্ত হয়ে রাত ভোরের সংকেত জেগেছে প্রকৃতির কোথাও। এসময় ঈশ্বরের করুণার মতো বাতাস বহে। তারই শব্দ উঠেছে উদ্যানবাটির গাছের পাতায়। আর মুষলধারায় বৃষ্টি নামল তারপরেই। শুধু বর্ষণই কি! নাকি স্তব্ধ হাহাকারে দীর্ণ আজ বর্ষারাতের যতেক প্রাণ, মানুষ-পশুপাখি-বৃক্ষ- লতাগুল্মের নীরব কান্না আর অশ্রুর সঙ্গে মিশে যাওয়া এক অলৌকিক ধারাপাত! শোকোচ্ছ্বাসের মিলিত ঐকতানই বুঝি।

আশঙ্কাটি তবে সত্যেই পরিণত হল। সমাধি থেকে মহাসমাধিতে বিলীন হলেন প্রাণের ঠাকুর।

নামের ঠাকুর, প্রাণের ঠাকুর, আসলে মানুষ ঠাকুর। শরীরপ্রাপ্ত। দিনে দিনে তিলে তিলে মিশে যাচ্ছিলেন বিছানার সঙ্গে। গলকণ্ঠের কর্কটরোগ বিষাক্ত নখবিস্তার করেছে শরীরের আনাচে-কানাচে। জ্বালায়-যন্ত্রণায় দীর্ণ, প্রায় স্তব্ধ হয়েছিল বাকস্ফুরণ। কোনও কিছু গলাধঃকরণের সামর্থ্য নেই, লালা গড়িয়ে পড়ে বর্ণহীন শুষ্ক ওষ্ঠের কষ বেয়ে। স্বর্ণাভ শরীর পরিণত হয়েছে ভাঙা জীর্ণ অস্থিচর্মসার কঙ্কালে। চিকিৎসক-বদ্যিরা হাল ছেড়ে দিয়েছেন। মানুষটির বক্ষপিঞ্জরে হৃদয়ের অচিনপাখিটি তারপরেও ধুকপুক করে যায়।

শরীর ত্যাগের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত তাঁর সাধনা, সন্তানদের জন্য প্রার্থনা। অন্তিম ক্ষণটি নির্ধারিত হয়েই ছিল, তবু দায়ভার অর্পণ আর পূর্ণের কাছে লাবণ্যময়ী পাত্রীটির পৌঁছানোর লগ্নটিও ঠাকুর নিশ্চিত করে দেবেন। মেধা-মনন-মন্ত্রে সারদার জীবন হবে অবিরল উৎসবের মতো। তারকেশ্বরে হত্যে দিতে গিয়েছিলেন সারদা তাঁর জন্য। ঠাকুর শুধালেন, কীগো, কিছু হল?

নিজেই হাতের বুড়ো আঙুল নেড়ে, যন্ত্রণাকাতর মুখে হাসি টেনে বললেন, কিছুই না! একটু থেমে আবার বলেন, তুমি স্বপ্ন-টপ্ন দ্যাখো?

ও আবার কেমন প্রশ্ন! ধীরেসুস্থে তবু বললেন, দেখেছিলুম। তারকেশ্বরে।

কী দেখলে বলল তো?

দেখলুম… মা কালী ঘাড় কাত করে রয়েছেন। বললাম, মা তুমি এমন করে রয়েছ কেন? বললেন, কী করব মা, ওর ওইটি যে আমার-ও হয়েছে। বড় কষ্ট গো… বড় কষ্ট।

ঠাকুর মানুষটি যেন তলিয়ে গিয়েছিলেন বেশ কিছুক্ষণের জন্য। ভাষা ফুটেছিল পরে।

যা ভোগ আমার ওপর দিয়ে হয়ে গেল। বাইরের কষ্ট থাকবে… তবু তোমাদের আর কারওকে তেমন কষ্টভোগ করতে হবে না। জগতের সকলের জন্য যতটা পেরেছি আমি ভোগ করে গেলাম।

স্তব্ধ হয়ে সারদা তাকিয়েছিলেন ঠাকুরের দিকে সেদিনই।

আচ্ছন্ন অন্তরের গভীরে অনুভব করেছিলেন, পার্থিব জগতের লৌকিক আশা করার আর কিছু নেই। জবাব যা দেওয়ার ঠাকুর নিজের মুখেই দিয়েছেন। শুধু বুকের ওপর পাথরচাপা কষ্টের আর কয়েকটি দিন মাত্র অতিবাহিত হওয়ার অপেক্ষা।

দিন ফুরোল একটি একটি করে। শেষ দিবসটিও সমাপ্তপ্রায়। জাগরণে অতিক্রান্ত হয়েছে বিভাবরী। বর্ষণক্লান্ত রাত্রির শেষে তখনও আলোর আভাস ফোটেনি। ধারাপাত অপেক্ষাকৃত স্তিমিত হলেও, ধূসর মেঘের দঙ্গল অনড় হাতির পাল হয়ে আকাশ দখল করে রেখেছে। মনে মনে আর কেউ না জানুক, তিনি জানেন, সমাধি থেকে মহাসমাধি প্রকৃতপক্ষে যে তাঁর প্রাণের ঠাকুরের আসন্ন মহাপ্রয়াণেরই ইঙ্গিত ও আয়োজন, তাইতে কোনও সন্দেহ নেই। হৃদয় উৎসারিত তীক্ষ্ণ আর্তনাদের সেই ক্ষণেই তিনি নিশ্চিত হয়েছিলেন, লৌকিক পালাবদল সম্পূর্ণ হয়েছে। দায়ভার ঠাকুর আরও আগেই অর্পণ করে বলেছিলেন, …লোকগুলো যেন অন্ধকারে পোকার মতো কিলবিল করছে। তুমি তাদের দেখবে। আর শেষদিনে যেন সেই ভারের ওপর একটু প্রলেপ দিতেই বলে গেলেন, তোমার ভাবনা কী? যেমন ছিলে তেমন থাকবে। ক্লান্ত চোখের পাতা নিমীলিত হওয়ার আগে, শোকে মুহ্যমান আংশিক বিভ্রান্ত ঘনিষ্ঠ সন্তানদের দেখিয়ে বললেন, এরা রইল। আমায় যেমন দেখেছে, তোমাকেও দেখবে। সঙ্গে আরও যোগ করে দিলেন, লক্ষ্মীটিকে দেখো, কাছে রেখো।

রাতের শেষপ্রহরে সেইসব নিবেদিত প্রাণ সন্তানদের প্রতিই একবার দৃষ্টিপাত করলেন সারদা।

শূন্য থেকে যাত্রা শুরু করেছিলেন, যেতে হবে পূর্ণের কাছে। ঠাকুরপিতা মাতৃত্বের যাবতীয় বীজ রোপণ করে দিয়ে গেছেন তাঁর মধ্যে, অন্তর্নিহিত সমস্ত দায়িত্ব দিয়ে গেছেন বিশ্বব্যাপী অসংখ্য সন্তানদের জন্য। জীবনরসের উৎস ধারাটি মাতৃত্বের কোমলতায় আজীবন বহন করে নিয়ে যেতে হবে তাঁকে। এ তাঁর উত্তরাধিকার, তিনি প্রতিশ্রুতও।

তবু মহাসমাধি পর্বের এই শেষ লগ্নে কেন যে বারবার একাকিত্বে দিশাহারা হয়ে ওঠে মন! ধর্মাচরণ আর আপাত-বাস্তব দৈনন্দিন সংসার-জীবন যাপনের মায়াই কি এই নিঃসঙ্গতার হেতু! ঠাকুরের শরীর বিকল হয়ে যাচ্ছিল দিনে দিনে। এবেলা একটু ভাল থাকেন তো ওবেলাই শয্যাশায়ী। রঙ্গ রসিকতা করতে করতেই দেহযন্ত্রণায় বেঁকে ওঠে অধর ওষ্ঠ। কষ্ট হয় তাঁর, যাঁরা দেখেন তাঁদেরও। তবু তো মানুষটা রয়েছেন। মাঝে মাঝে কথা বলেন, হাত-পা নাড়েন, হেসে মাথা দোলান। অভিমানও করেন।

মায়া, মায়াই সে! নয়তো বুকের মধ্যে পাথরচাপা এই কষ্টের আর কী বা দাম!

কষ্ট কেন? মানুষটা শরীর ছেড়ে যাচ্ছেন বলেই তো!

কিন্তু নিজেই যে বারবার শিখিয়ে পড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। সব ছেড়ে দাও, সব ফেলে দাও। জীবন একটা বিকার বই আর তো কিছু না। গান গেয়েছেন, “একি বিকার শঙ্করী! কৃপা চরণতরী পেলে ধন্বন্তরি।” যতদিন বেঁচে থাকা, যতদিন সংসারে থাকা— আখ-মাড়াই কলে ছিবড়ে হয়ে যাওয়া। মরণের দিকে এগোতে এগোতে জীবনের সাধনা। “মরণ বলে আমি তোমার জীবনতরী বাই।” বলেছেন, কাঁচা আমিটাকে রোজ পোড়াও। বিবেক আর বৈরাগ্যের হাতুড়ি দিয়ে পেটাও। পাকা আমি তৈরি করো। বদ্ধ আমি-কে মক্ত করো, আকাশে উড়তে দাও।

এসব কথা তো তাঁরও অজানা কিছু না। বছর ত্রিশের কাছাকাছি ঘর-ও করলেন যে! কে জানে, কখনও কখনও সেই ঘরই কি বদ্ধ ছিল! মায়ায় ঘেরা ঘরে তিনি আবদ্ধ হয়েছিলেন? আজ এই ভোররাতে কি ঘর ছাড়ারই আয়োজন তবে! কিন্তু…।

বড় উথালপাথাল মন এখনও। চাপ চাপ আঁধার, উদ্যানবাটির মাটি থেকে উঠছে ভেজা ভেজা সোঁদা গন্ধ। পাতাঝরা বৃষ্টির জল টোপাচ্ছে। ঘুমভাঙা কোন পাখি ডানা ঝাপটাল, গোহালে কচি গলায় ডেকে উঠল একটা বাছুর। বড় মায়া তাঁর। বাছুরের ডাকও যেন মা-অ্যাঁ বলে প্রাণে সেঁধোয়। বর্ষাদিনের ভোররাত আরও নির্জন হয়।

দ্যাখো, কেমন গুটিসুটি মেরে ঢলে পড়েছে মেয়েটা। ও লক্ষ্মী, উঠে বোস মা—বলতে গিয়েও প্রাণে বাজে। সারারাত কেঁদেকেটে একশা। মাঝে মাঝে মুখ তুলে তাকিয়ে দেখেছে পাষাণ প্রতিমার মতো খুড়িমার মুখের দিকে। নামে খুড়িমা, আসলে তিনিই যে মা। কেমন বিপন্ন, ত্রস্ত আর বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছিল মেয়েটা। ছোটকাকা ঠাকুরের নিষ্কম্প মহাসমাধি দেখতে দেখতে ডুকরে কেঁদে উঠেছিল। নেহাত ছোট তো না, যা বোঝার বুঝে গিয়েছিল। অনর্গল চোখের জল ফেলেছে তারপর থেকে।

একসময় চোখের জলও ফুরোয়। কান্নাতেও ক্লান্তি আসে।

কোথাও একটা নিরাপত্তার অভাববোধে বোধহয় দিশেহারা হয়ে গিয়েছিল লক্ষ্মী। শোকের সঙ্গেই অভাববোধ মিশে গেলে হতাশা আর আশঙ্কায় আরও ভেঙে পড়ে কেউ কেউ। লক্ষ্মীও তাই পড়েছিল। হয়তো পরিবেশের গাম্ভীর্যেই থিতু হয়েছিল একটু একটু করে। তারপর নীরব অশ্রুপাতও থেমে অবসাদে ঢলে পড়েছে।

তাঁকে সামলানোর জন্য অনেকক্ষণ কাছে ছিলেন গোলাপমা। না, খুব বেশি তাঁকে সামলাতে হয়নি। মুখে কিঞ্চিৎ খর হলেও গোলাপ মানুষটি যে তিনি-অন্তপ্রাণ। প্রায় ছায়াসঙ্গিনীর মততাই সঙ্গে সঙ্গে রয়েছেন, তিনি এই উদ্যানবাটিতে আসা ইস্তক। বড় দুঃখী মেয়েটাকে তিনিই কাছে টেনে নিয়েছিলেন। কুড়ি-বাইশ বছর বয়সের মধ্যে প্রায় সবই হারিয়ে বসেছিল গোলাপ। লোকে বলত শোকাতুরা ব্রাহ্মণী। স্বামী-পুত্র-কন্যা সব হারিয়ে যেন ভাসতে ভাসতেই দক্ষিণেশ্বরে পৌঁছেছিলেন ঠাকুরের কাছে। নামে অন্নপূর্ণা, কিন্তু শোকে শূন্যতায় নিঃস্ব। কী মন্ত্র দিয়েছিলেন ঠাকুর তিনিই জানেন, কিন্তু সবাই জানল— ঠাকুর নাম পালটে করেছেন গোলাপ। আর পাঠালেন তাঁর কাছে। ব্যস, নবীন সরকার লেন বাড়ির ঠিকানা পালটে গোলাপ হয়ে রইলেন তাঁর চিরসঙ্গিনী।

কিছুক্ষণ আগে নীচের ঘরে ফিরে গেছেন সেই গোলাপমা। যাওয়ার আগে তাঁকে ডেকেছিলেন।

চলো মা, একটু গড়িয়ে নেবে। ধকল তো কম যাচ্ছে না। ঠাকুরের সমাধি ভাঙলে না হয় আবার এসে বোসো।

গোলাপের আন্তরিকতা সারদা টের পান, ওর শারীরিক ক্লান্তিও। বিশেষ করে বিগত কয়েকদিন ধরে ওদের ওপরে যে চাপ বেশি পড়েছে তিনি জানেন। কিন্তু জেনেও নিরুপায়। কেননা তাঁর নিজের হাঁটাচলাও পুরো স্বাভাবিক হয়নি এখনও, বাঁ পায়ের ব্যথাটা রয়েছে। আড়াই-সেরি দুধের হাঁড়ি নিয়ে সিঁড়ি ভাঙতে গিয়েই বিপত্তি। কীভাবে টাল খেয়ে পড়ে গেলেন। নরেন-রাখাল বাবুরাম যতক্ষণে এসে তুলল, তার মধ্যেই মচকানো পা ফুলে ঢোল৷

চুন-হলুদ প্রলেপ দিয়ে কমলেও আগের মতো একা হাতে সব তো করতে পারেন না। রান্না-বান্না-গোছগাছ-ধোওয়াধুয়ি অনেকটা গোলাপ আর লক্ষ্মীকেই করতে হয়। একমাত্র খাওয়ানোটা তিনি ছাড়া হয় না। মানুষটির খিদে বলে কিছু নেই, তার ওপর গলাধঃকরণেও অসুবিধে হচ্ছিল। বুঝিয়ে-সুঝিয়ে যেটুকু খাওয়ানোর একমাত্র তিনিই পারেন। ফোলা পায়ের ব্যথা একটু কমতেই কোনওমতে ওপরে উঠে তিনি খাইয়ে আসেন ঠাকুরকে।

কিছুদিন ধরে সেই ব্যবস্থাই চলে আসছে। কিন্তু মনে মনে তিনি টের পেয়ে গেছেন— কোনও ব্যবস্থারই আর প্রয়োজন হবে না। যে মহাসমাধিতে লীন হয়েছেন ঠাকুরমানুষটি, তিনি জানেন, ও আর ভাঙবে না।

কিন্তু সেকথা গোলাপকে বলা যায় না। যেমন তিনি লক্ষ্মীকেও বলতে পারেননি। ছেলেদেরও না। ঠাকুরের সমাধি ওরা দেখে আসছে আগে থাকতে। এবারের এই মহাসমাধি যে অন্যলোকে পদার্পণের প্রস্তুতি, এখনও তা ওরা জানে না।

গোলাপকে মৃদু স্বরে বলেছিলেন, রাত ভোর হতে বেশি দেরি নেই। আর একটু না হয় থাকি। তোমার চোখ-মুখ বড় বসে গেছে মা, যাও একটু বিশ্রাম নাও।

গোলাপ তারপরেও বললেন, মাগো, আমার না হয় চোখমুখ বসে গেছে, তাবলে তোমার ওপর দিয়ে কী ঝড় বয়ে যাচ্ছে, তা কি আর বুঝতে পারি না ভাবো? ঠাকুরের সমাধি হয়েছে বলেই…। নিজেকে আর কত পাত করবে মা!

গোলাপের সহমর্মিতা তিনি বোঝেন। আর এও বোঝেন, এখনও জগৎ-সংসারের স্থূল প্রয়োজন, চাওয়া-পাওয়া, ভাবনা দিয়েই ওদের যা কিছু বোঝার প্রয়াস। আর সেদিক দিয়ে ভাবলে সত্যিই তো তাঁর ওপর দিয়ে যে ধারাবাহিক ঝড়-উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা যাচ্ছে, তার হিসেব করা সম্ভব না। আজীবনই তো সেই অর্থে নিঃস্ব আর দুঃখী তিনি৷ বাপের বাড়ির জীবন থেকে শুরু করে, সাড়ে পাঁচ বছর বয়েসে বিবাহ এবং বিবাহোত্তর এই পর্যন্ত জীবদ্দশায় পার্থিব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য তাঁর আর কবে মিলেছে। বরং উন্মাদ স্বামী, নিজের ছেলেপুলে হল না বলে, কত লোকের নিন্দেমন্দ গঞ্জনা অপমান সহ্য করতে হয়েছে। এসব তো হয়ই।

কিন্তু যা ওরা বোঝে না, যে প্রাপ্তির ভাণ্ডার ঠাকুর তাঁর এই নির্দিষ্ট চিরশিষ্যাটির অন্তরে-অভ্যন্তরে সাজিয়ে দিয়েছেন, তার পুরো হদিশ তো কোনওদিনই আর কেউ পাবে না। হোক সেই মানুষটা এখন সমাধিস্থ, তবু তো সম্মুখে শয়ান। অবসাদে-ক্লান্তিতে, আসন্ন ভবিষ্যৎ জীবনযাপনের অনিশ্চয়তায় যতই তিনি বিদীর্ণ হোন না কেন, ওরা তো জানে না শরীর ছাড়ার এই অন্তিম লগ্নেও মানুষটা কী দান আর ভাবে তাঁকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন। ওরা কী করে জানবে, ঠাকুর তাঁকে স্থূল শরীর নয়, ভাবশরীরের দীক্ষা দিয়েছেন। তুমি আর আমি, পরস্পরের দর্পণ। তোমাতে আমার প্রতিফলন, আমাতে তোমার। একই আলোয় আলোকিত আমরা দু’জন।

গোলাপকে বললেন, পাত করার এই তো শুরু মা, ও নিয়ে ভেবো না। তুমি যাও, একটু শোও গিয়ে। আমি আছি।

গোলাপমা নাছোড়। ফিসফিসিয়ে বললেন, অবস্থা যা দেখছি মা, সমাধি ভাঙলেই ঠাকুর তোমায় চোখে হারাবেন, তখন যে আরও উঠতে পারবে না। সারারাত চোখের পাতা বুজলে না, এত সইবে কী করে!

যিনি সওয়াবার, তিনি সওয়াবেন। তুমি শোও গিয়ে।

এটুকু বলেই চুপ করেছিলেন তিনি। গোলাপের কাছে ভাঙলেন না, এ সমাধি সে সমাধি নয়। এ তাঁর মহানির্বাণের অন্তিমলগ্ন।

আর কিছু বলেননি গোলাপ। শরীর নুয়ে পড়েছিল। কেমন এক অবুঝ দৃষ্টিতে তাঁকে জরিপ করে চলে গিয়েছিলেন। তিনি দোষ দেননি। দেওয়ার প্রশ্নও ওঠে না। সাদা চোখেই তো মায়ার জগতকে দেখতে অভ্যস্ত অধিকাংশ মানুষ। তাঁর দৃষ্টিতে ভাবের আনাগোনা, রং পালটাচ্ছে। তবু তিনিও কি এখনও ভাবের পূর্ণ স্বরূপ চিনেছেন? মায়ার সংসার থেকে বেরুতে পেরেছেন পুরোপুরি? ঠাকুর যে বলেন, আমি কেউ না, তুমিই সব, সেই বোধটা কি এসেছে!

আসতই যদি, তা হলে এখনও কেন বুকের মধ্যে মোচড়াচ্ছে মানুষটার জন্য। কষ্ট হচ্ছে কেন ছেলেগুলোর কথা ভেবে!

পালা করে রাত জাগছে আজ কতদিন হয়ে গেল। এক আধজন তো নয়, একসঙ্গে দশ-বারোটা ছেলে হাজার ঝুঁকি নিয়ে, ঘরবাড়ি ছেড়ে যেন হত্যে দিয়ে পড়ে আছে চব্বিশ ঘণ্টা। নরেন-রাখাল-বাবুরাম-নিরঞ্জন-লাটু-কালী-শশী-শরৎ এরা তো আছেই, সঙ্গে আছে গোপাল-হরি-যোগেন-তুলসী। আবার ঠাকরের টানে শিং ভেঙে বাছরের দলে ভিড়েছে বুড়ো গোপালও, বয়েস হয়েছে, ছেলেরা সব গোপালদাদা বলে, কিন্তু ক্লান্তিহীন এই বয়েসেও। অষ্টপ্রহর পড়ে রয়েছে কাশীপুরে। অবশ্য এসব ছেলেরা না থাকলে, গিরিশ-সুরেন-বলরামরা যত ভাবনাই ভাবুক, মানুষটাকে শ্যামপুকুর থেকে তুলে আনতেই কি পারত!

এমনিতেই গলার কষ্টে জেরবার হচ্ছিল ঠাকুরের শরীর, তার ওপর দক্ষিণেশ্বর থেকে চিকিৎসার জন্য টানাপোড়েন। কিন্তু শ্যামপুকুরের বাড়িতে ঘুপচি-ঘুপচি ঘর আর বদ্ধ পরিবেশে মানুষটা যেন হাঁপিয়ে উঠেছিলেন আরওই৷ কাশীপুর উদ্যানবাটি খোলামেলা, প্রশস্ত, গাছপালায়-পুকুরে ঘেরা নিবিড় পরিবেশ বটে, কিন্তু সে যে শহর কলকাতার বাইরে। নিত্য যাতায়াত করে কে অসুস্থ মানুষটির সেবা করবে! শুধু টাকাপয়সায় হবে না, লোকবলেরও দরকার যে।

আগেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিল নরেন। কী দেখতে দেখতে ছেলে যে ঠাকুরের অমন বশ হয়ে গেল! তো নরেনের কথাই কাজ। আর বন্ধুগুলোও তো তেমনই। বন্ধু তো নয়, ভাই, সব ওরা গুরুভাই। গুরুঠাকুর আর মায়ের জন্য করতে পারে না এমন কাজ নেই। যেন বুক দিয়ে এতদিন আগলে রেখেছে মানুষটাকে। পান থেকে চুন খসতে দেয়নি। এর বাড়ি থেকে অশান্তি, তার বাবা বকুনি দিচ্ছে ছেলে গোল্লায় গেল বলে। আর নরেনের তো আইন পরীক্ষাই এবছর। তার ওপর ভিটে সম্পত্তি নিয়ে পারিবারিক বিবাদ-অশান্তিও চূড়ান্ত। কিন্তু সবক’টা ছেলেই এককাট্টা। কাশীপুর ছেড়ে নিজেরা তো গেলই না, তাঁকেও তুলে নিয়ে এল শ্যামপুকুর থেকে।

কে জানে, মায়া কাটানোর আয়োজনই বোধহয় সম্পূর্ণ হতে চলেছে আজ রাতে।

এতদিন কী এক ভরসায় যেন বুক বেঁধে, জানপ্রাণ নিপাত করছিল ছেলেগুলো। হয়তো কেউ কেউ ভরসা ছাড়েনি এখনও। কিন্তু বাকিরা কাল রাতে ঠাকুরের সমাধির পরে কী বুঝেছে কে জানে, চোখের জল আর ধরে রাখতে পারছিল না। আর নরেন তো বারবার শুধু তাঁর মুখের দিকেই দেখেছে। দেখা তো নয়, একেই বলে অন্তর্ভেদী দৃষ্টি। বুঝে নিতে, আর পড়ে নিতে চাইছিল তাঁর উপলব্ধির কথা। কী বলবেন তিনি।

সেই ছেলেগুলোই এখন অবসন্ন। বিনিদ্র রজনী পার হতে আর দেরি নেই। তাঁর অনুভবই কি ওদের মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছে। তা না হলে আর মুখ তুলে তাকাতে পারছে না কেন? তাঁর কষ্টও কি নরেন-লাটু-বাবুরাম-রাখাল টের পাচ্ছে? এও কি সেই মায়া? নাকি ছিন্ন হওয়ার কাল সমাগত? শোক নয়, দুঃখ নয়, বিবেক আর বৈরাগ্যের তরণী বেয়ে ভাবের আকাশ স্পর্শ করার প্রস্তুতি। টানাপোড়েনটা যাচ্ছে না এখনও। তারমধ্যেই ভোরের ইশারা পেলেন সারদা।

একটি ফ্যাকাসে ভাব হয়েছে পূর্বাকাশে।

জীব আর প্রকৃতির অশ্রু ধারণ করেই যেন বর্ষা ঋতুর শেষ রজনীটি দীর্ঘতর করে রেখেছিল ধূসর বারিদ। কখনও ঝিরঝির, কখনও ঝরঝর ঝরেছে নিশার অন্ধকারে। ঠাকুরের মহাসমাধি ভাঙেনি। দোলাচলের প্রতীক্ষা নিরসনের জন্যই যেন হালকা হয়েছে মেঘপুঞ্জ, একটু সরে দাঁড়িয়েছে। সিক্ত ভোরের গন্ধ নিয়ে বইছে হিমেল হাওয়া। পাখ-পাখালি ডানা মেলেনি এখনও, কিন্তু উষার সংকেত পেয়েই উদ্যানবাটির গাছের ঠিকানা থেকে কা-কা করে কাক ডেকেছে।

বেশ কিছু সংকেত পৌঁছে গেছে তাঁর কাছে, তাঁর মধ্যেও। বার্তা পেয়েছেন মনে মনে। ভাবের আকাশ কিংবা মায়ার সংসার যা-ই বলা হোক, কিন্তু জীবনের দ্যুতি ছড়িয়ে রয়েছে এই পার্থিব জগতে। বাস্তবতার নিরিখে অনেক কিছু দেখে বুঝে নিয়ে এবার পথ চলতে হবে। বন্ধুর পথের ইঙ্গিত ঠাকুর নিজেই অনেক দিয়ে গেছেন উদাহরণ সহ। কিন্তু পাথেয়?

হ্যাঁ, অফুরন্ত পাথেয় তাঁর আছে বইকি। তিনি তো একইসঙ্গে ঠাকুরের প্রথম এবং প্রধান শিষ্যা, আবার আরাধিতাও। সুতরাং ভাবজগতের পথে চলার অন্ধিসন্ধি কম চেনাননি তাঁকে। কিন্তু ব্যবহারিক জীবনচর্যায়, যদিও নেহাত খুদকুঁড়ো, তা হলেও একেবারে নিঃস্ব রেখে তো যাননি৷ বলেছেন, কামারপুকুরের ভিটেটিতে গিয়ে থেকো। নিজে হাতে শাক বুনে, শাকভাত খেয়ে গ্রাসাচ্ছাদন কোরো। কারওর কাছে হাত পেত না। মনে রেখেছেন সারদা।

সুতরাং যদিও এখনও তাঁর অঙ্গে সধবার সকল চিহ্ন আর বেশ, বৈধব্যের ভাবনাও কি আসছে না! শুধু বৈরাগ্য আর সাধনা তপস্যা দিয়ে শরীর ধারণ করে রাখা যায় না। শরীর না থাকলে ভাবজগতের উপলব্ধিটিই বা কে করবে! তা ছাড়া রয়েছে হাজারো সন্তান। নিজে টিকে না থাকলে কে দেখবে তাদের!

কিন্তু টিকে থাকার ভাবনাও কি বিগত কয়েকদিন ধরে নীরবে আলোড়িত হচ্ছে না!

ভাবের মধ্যেও ক্ষুৎ-নিবৃত্তি আর জঠরাগ্নির ভাবনা ধিকিধিকি জ্বলে। মানুষজনের হাবভাব দেখতে দেখতেই ভাবনা। ঠাকুরের মহাসমাধির কিঞ্চিৎ প্রাক্‌কাল থেকেই যেন তাঁর প্রতি কারও কারওর উদাসীনতা তিনি লক্ষ করেছেন। খুবই সূক্ষ্ম, পরিশীলিত, এমনকী প্রায় অনুচ্চারিত, তব, ভাবে-আচরণে-শরীরের ভাষাতেও কি কিছু নিঃশব্দ উচ্চারণ থাকে না? যাক। অমন থাকে।

ভাবনার রাশ টেনে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে বাঁধলেন। সমাধিস্থ হোন, আর যা-ই হোন, এখনও মানুষটা সামনে রয়েছেন। নিষ্কম্প, স্থির, ধবধবে সাদা বিছানায়, সাদা চাদরে আবৃত। ঘি রঙের একটি হালকা শাল দেওয়া রয়েছে বুকের ওপর। পাশে যথারীতি মা কালীর ছবিটি রাখা। খাটের বাঁদিক থেকে পায়ের দিক পর্যন্ত ঘিরে বসে আছে ব্রহ্মচারী ভক্ত সন্তানরা। নিঝুম, নতমস্তক। দক্ষিণে খাটের সন্নিকটে তিনি, প্রয়োজনে স্পর্শ করা যায়, এমন দূরত্বে বসে আছেন। কোলের কাছে লক্ষ্মী তখনও আধশোওয়া।

চিত হয়ে শোওয়া, বুকের ওপর হাত নিঃসাড় মানুষটির মুখের দিকে আর একবার গভীর দৃষ্টিপাত করলেন তিনি। অন্যদিন খাটের দণ্ড থেকে মশারি টাঙিয়ে দেওয়া হয়। গত রাতে সমাধিস্থ হওয়ার পরে মশারি খুলে রাখা হয়েছিল। তা ছাড়া সামান্য হলেও এখন একটু আলোর আভাস আসছে পুবদিকের জানালা দিয়ে, পাল্লার খড়খড়ি ভেদ করে। বৃষ্টি-বাদলার জন্যই পাল্লা বন্ধ করে রাখা, যাতে জোলো বাতাস ঢুকে আবার ঠান্ডা না লাগে। শান্ত মুখমণ্ডলটি অবলোকন করলেন তিনি ম্লান আলোয়।

বালিশের ওপর স্থির মাথাটি, ছাদের কড়ি-বরগার দিকে মুখ। অসুখে ভুগে, যন্ত্রণায় শীর্ণ হয়েছে অবশ্যই, তবু যেন ক্লান্তির চিহ্ন অনুপস্থিত। অধিকাংশই পাকা দাড়ি-গোঁফের ফাঁকে ফাঁকে আজ যেন এক চিলতে স্তিমিত রহস্যময় হাসির আভাস। খুব কাছের থেকে দেখেও শ্বাসপ্রশ্বাস কিংবা হৃদস্পন্দনের লক্ষণ টের পেলেন না তিনি। তা নিয়ে সোচ্চার হওয়ারও প্রশ্ন নেই।

মনে মনে ঠাকুরেরই ভাষ্যে নিজেকে তিনি আশ্বস্ত করলেন: কৃপা করো। তিনি প্রেম, তিনি সহিষ্ণুতা, তিনি সেবা-উদারতা-জ্ঞান। আমার সব অভাব তুমি হরণ করো, সব চাওয়াটি তুলে নাও। তুমি দীপশিখা হয়ে জ্বলো, আমি দীপাধার হয়ে রইব। ধর্ম আর সাধন ছাড়া তোমার তো কিছু নেই, ছিল না ঠাকুর। তাই আমি তোমার ধর্মসঙ্গিনী, তোমার সহধর্মিণী। তুমি সমর্পণ, তুমি সম্বরণ, তুমিই চৈতন্য। চৈতন্যসাগরের হংস হয়ে তুমি ওড়ো, আমি শক্তি জোগাব, আমায় জোগাবেন তিনি…।

একটু সরে এসে তিনি শয্যাপার্শ্ব ত্যাগ করতে উদ্যত হলেন। আর তখনই উদাস গম্ভীর ক্লান্ত অথচ দীপ্ত দুটি চোখের দৃষ্টি ঘোমটা সত্ত্বেও সমান্তরাল হল, তাঁর দৃষ্টিপথের সঙ্গে। ব্যথাতুর তবু অন্তর্ভেদী সেই দৃষ্টি নিয়ে নরেন তাকিয়েছে তাঁর দিকে। অস্ফুট স্বর বাজল, মা!

তাঁর বাক্ স্ফুরিত হল না। কিন্তু দৃষ্টি পেতে রাখলেন আরও কয়েক মুহূর্ত নরেনের চোখের দিকে, নিঃশব্দে। কী ভাবের বিনিময় হল যেন। দেখলেন, নরেনের স্বপ্নীলু দীঘল দু’ চোখের কূল ছাপিয়ে উঠছে। প্লাবনে ভাসবে, আর তাকে বাধা দেওয়ার শক্তি নেই সারদার। নীরবে ঠাকুরের দোতালার ঘর থেকে তিনি নিষ্ক্রান্ত হলেন।

বাদলধারা থমকে আছে। তার মধ্যেই মেঘলা দিন, শান্ত সকালের ফ্যাকাসে আলো ফুটছে। নির্জন হয়ে রয়েছে উদ্যানবাটির পরিবেশ, চতুর্দিক। সদ্য ভোরের হাওয়ায় ভেজা আর জোলোভাব, মৃদু শব্দ তুলছে গাছের পাতায়।

উদ্যানবাটির পরিসরটি নেহাত কম না। প্রায় চোদ্দো বিঘা। রানি কাত্যায়নীর জামাই গোপালচন্দ্র ঘোষ স্বত্বাধিকারী হওয়ার পরেই, কাশীপুরের আঞ্চলিক পরিবেশ থেকে উদ্যানবাটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, গাছপালা সুরক্ষিত করার ও রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন। সীমানা নির্দিষ্ট করে প্রাচীর পরিবেষ্টিত করেছিলেন। বাগবাজার থেকে বরানগর প্রশস্ত তিনমাইল রাস্তার মাঝ বরাবর কাশীপুর, রাস্তার ওপরেই উদ্যানবাটির লৌহফটক। উত্তর-দক্ষিণ থেকে পূর্ব-পশ্চিমেই উদ্যানবাটির আয়তন দীর্ঘ।

উত্তরে পাঁচিলের গায়ে তিন-চারখানা ছোট ঘর—ভাঁড়ার, রান্নার জন্য নির্দিষ্ট। দক্ষিণে সার দিয়ে তাল-সুপারি-খেজুর-নারকোল গাছ। তারই মাঝখানে উদ্যানপথের উত্তর-পশ্চিম দিক ঘেঁষে বাড়ি, বসতবাটি। মোটামুটি বড় দোতালা বাড়ির একতলায় চারখানা এবং দোতালায় ছ’খানা ঘর। নীচেরতলায় মাঝখানের ঘরটাই বড়, হলঘরের মতো, তারই পশ্চিমদিক থেকে কিছুটা খাড়াই কাঠের সিঁড়ি উঠে এসেছে দোতালার এই বড় ঘরে, যেখানে মহাসমাধিতে ঠাকুর এখনও শয়ান।

বাড়িটির চতুর্দিক ঘিরে রয়েছে চওড়া যাতায়াতের পথ, পিছনে পুকুর। তারও পিছনে দু’-তিনটি মালি আর দারোয়ানদের ঘর। উত্তর-পশ্চিম কোণে একটি ডোবা আর গোরুর গোহাল, ঘোড়ার আস্তাবল রয়েছে। সমস্ত উদ্যানবাটি ঘিরেই ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ছড়ানো রয়েছে ফুল ফলের বড় বড় গাছ। আম-কাঁঠাল-লিচু যেমন আছে, তেমনই রয়েছে কদম-নিম-বকুল। মাঝেমধ্যে ছোট ছোট শাকপাতার ক্ষেত, আর কোথাও রয়েছে শুধুই ছাঁটা ঘাসের সবুজ তোয়ালে পাতা ভূমিখণ্ড, লন। মাঝে মাঝে ফুলগাছ বেল-গন্ধরাজ-জবা।

বিগত আট-ন’ মাস ধরে ঠাকুর রয়েছেন কাশীপুরের এই উদ্যানবাটিতে। অগ্রহায়ণের শেষদিকে এসেছিলেন, আজ শেষ হতে চলল শ্রাবণের শেষ দিনটি। কী কৃচ্ছ্রসাধনাটাই না চলছে এতদিন ধরে। অসুস্থ শরীর নিয়ে ঠাকুরের নিজেরই শুধু না, ভক্ত সন্তানদেরও। এবং তাঁরও। আবার কতিপয় গৃহী, বয়স্ক ভক্তদেরও বটে।

সিমলানিবাসী শিষ্য সুরেন্দ্রনাথ মিত্রই প্রথমে এগিয়ে এসেছিলেন।

শ্যামপুকুর বাটিতে চিকিৎসা, যোগাযোগ, ঠাকুরের পুজোপাঠ সব ঠিকঠাক চললেও, অসুস্থ মানুষের বাসস্থান হিসেবে ওই বাড়ি খুব আদর্শ ছিল না। বলরাম-গিরিশ-সুরেন সকলেই সেটা টের পাচ্ছিলেন, আবার তাঁর টানে ভেসে পড়া অল্পবয়সি ছেলে আর যুবকরাও বুঝতে পারছিল। কিন্তু তেমন খোলামেলা, মুক্ত বায়ুর বড় বাড়ি, জায়গাই বা কোথায়। এদিকে ডাক্তারবাবু মহেন্দ্রলাল সরকার কেবলই বলছেন, একটা ভাল বড় জায়গা দ্যাখো, এই ছোট ছোট ঘুপচি বদ্ধ ঘরে লোকটা আরও শুকিয়ে যাচ্ছে। ওইরকমই কথা তাঁর। ভক্ত-শিষ্যরা উঠে পড়ে লাগলেন। তারপরেই খবর পাওয়া গেল, কাশীপুরের বিরাট মতিঝিলের উত্তরে বরানগর যাওয়ার রাস্তা যেখানে বড় রাস্তার সঙ্গে মিশেছে, তার পুব দিকেই গোপালচন্দ্র ঘোষের এই উদ্যানবাটি। ভাড়া নেহাত কম না, মাসিক আশি টাকা। ঠাকুরের গৃহী বয়স্ক ভক্তরা সকলেই যে খুব অর্থবান তা নয়। সুরেন্দ্রনাথ মিত্র ছিলেন পশু চিকিৎসা বিদ্যালয়ের প্রথম বাঙালি অধ্যক্ষ। সমস্ত বাড়িভাড়ার টাকাটা তিনিই দেবেন অঙ্গীকার করে ঠাকুরকে এনে তুললেন উদ্যানবাটিতে। প্রথমে নিয়েছিলেন ছ’ মাসের জন্য। শরীরের তেমন আর উন্নতি না হলেও, জায়গাটা ঠাকুরের ভাল লাগছে দেখেই আবার তিনমাস বাড়িয়ে দিলেন।

ভক্ত ছেলেরা ঘরবাড়ি ছেড়ে এল ঠাকুরের টানে, আর মাকেও নিয়ে এল প্রথম থেকে। তিনি না থাকলে ঠাকুরকে রাখা যাবে না। না, শুধু দেখাশুনো, ওষুধপথ্য, খাওয়া-দাওয়া করানোর জন্যই না। ততদিনে শিষ্যরা জেনে ফেলেছে তাঁর ভূমিকা। ঠাকুরই জানিয়েছেন, তিনি আমার চেয়েও বড়, তিনিই আমার শক্তি। মহামায়া দ্বার ছাড়লে তাঁর দর্শন হয়। মহামায়ার দয়া চাই। তাই শক্তির উপাসনা। শক্তির জন্যই ভক্তি, তারও ঊর্ধ্বে নির্ভর। তিনি অতএব একইসঙ্গে ঠাকুরের শক্তি ভক্তি ও নির্ভর। তাঁকেও থাকতে হবে ঠাকুরের কাছে।

আসলে তিনি কী? তিনি কে তা হলে?

ঠাকুর বললেন, যে মা মন্দিরে আছেন তিনিই এই শরীরের জন্ম দিয়েছেন ও সম্প্রতি নহবতে বাস করছেন এবং তিনিই এখন আমার পদসেবা করছেন…। ওর নাম সারদা, ও সরস্বতী। ঠাকুরের সহধর্মিণী-জায়া-স্ত্রী তিনি।

কে প্রবাহিত করবে ঠাকুরের যুগধর্ম আর বিচিত্র ঐশ্বরিক লীলাতরঙ্গ? কে দেখবে অগুনতি সন্তানদের?

সব দেখবেন, করবেন সারদা, তিনিই হবেন সারদা মা, তিনিই যুগজননী, তিনিই সব, তিনি শ্রীমা। ধর্ম জগতের সব সিদ্ধান্তকে ঠাকুর ফলিত করলেন জীবনচর্যায়। বিবাহ হল কিন্তু বিভ্রাট হল না। মা হলেন প্রধান শিষ্যা। আবার আরাধ্যা।

ঠাকুর আর মা দু’জনেই সমান, জগতের পিতা-মাতা, শঙ্কর-গৌরীর মিলন, তাঁদের অংশে অংশ মিলেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের পূর্ণতা। সেই পূর্ণতার স্বরূপ মা-কে চিনেছে ছেলেরা, শিষ্যশিষ্যা, ভক্তরা। তাদেরই অগ্রগণ্য সিমলার নরেন। মাসের পর মাস হত্যে দিয়ে পড়ে আছে এই উদ্যানবাটিতে, মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ঠাকুরের সেবা করে যাচ্ছে। ভোররাতে উঠে গেলেন কেন মা! উঠে পড়ল নরেনও।

একতলার পুবদিকের ঘরটাই নির্দিষ্ট ছিল মায়ের জন্য। পশ্চিমের ঘরে ওপর নীচে যাতায়াতের সিঁড়ি। মায়ের পিছন পিছন একটু পরেই নেমে এল নরেন। থমথম করছে চোখমুখ, উদ্বেগে আকুল, খালি গা, পরনে গেরুয়া রঙের মালকেঁচা দেওয়া হেঁটো ধুতি। সিঁড়ি বেয়ে পশ্চিম থেকে পুবদিকে মায়ের ঘরের বাইরে এসে দাঁড়াল। জানালার সম্মুখে আসন্ন সিক্ত সকালের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন পাষাণ প্রতিমা সারদা।

মা, নেমে এলে কেন? ঠাকুরের সমাধি তো ভাঙেনি এখনও!

নিঃশব্দ নিপন্দ দাঁড়িয়ে রইলেন সারদা। দীর্ঘ রজনীর অন্ধকার শেষে স্যাঁতানো সকালের আলো ফুটছে। মনুষ্যেতর প্রাণীরা জেগে উঠেছে, গাছের কোটর ছেড়ে নির্গত হতে শুরু করেছে পাখিরা। মুক্তির জন্য হামলাচ্ছে গাভী, বাছুর ডাকছে, পুকুর-ডোবায় নেমে পড়েছে হাঁসের দল। সম্মিলিত জীবনের স্পন্দনে জেগে উঠছে উদ্যানবাটি, তবু থম রানো নির্জনতা আর দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে রয়েছে প্রকৃতি, ভাদ্রের প্রথম প্রভাত। ঘরের আবছা আলো থেকে স্খলিত ঘরে নরেন আবার ডাকল, মা—!

সামান্য পাশ ফিরলেন সারদা। ধারাবাহিক কিছু পতনের শব্দ টের পাচ্ছেন বুকের মধ্যে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুধু মাথা নাড়লেন সামান্য। মুখে কোনও শব্দ ফুটল না। তখনই ধীর পায়ে বেরিয়ে এসেছেন উৎকণ্ঠিত গোলাপমা। সারদার বাহু স্পর্শ করলেন।

কিছু বলো মা। ছেলেরা কী করবে!

নরেনের দিকে তাকাতে পারলেন না সারদা। শান্ত স্বরে বললেন, ডাক্তারবাবুকে খবর দাও বাবা… গেরস্তদেরও আসতে বলো।

স্তব্ধ হয়ে গেল নরেন। কেউ যেন পা-দুটি মেঝেয় পুঁতে দিয়েছে। আর কোনও সন্দেহ নেই, সব আশঙ্কাই সত্য। যে ক্ষীণ সম্ভাবনাটুকু নিয়ে গুরুভ্রাতাদের সঙ্গে রাত্রিযাপন, সেবা, সারদার ইঙ্গিতপূর্ণ সংক্ষিপ্ত বাক্যই তা নস্যাৎ করে দিল। মুখে শব্দ ফুটল না, নড়তেও পারল না। এই প্রথম নিদারুণ শোকে শূন্যতায় নিঃশব্দ হাহাকারে দু’চোখ প্লাবিত হল নরেনের। মুহূর্তের জন্য মনে হল, মাথার ওপর থেকে ছাদটি উড়ে গেছে। যে মানুষটি অসুস্থ শরীরের যাবতীয় জ্বালা যন্ত্রণা নিয়েও বিগত আট-ন’ মাস ধরে নিরন্তর আকর্ষণে টেনে রেখেছিলেন, তাঁর শতজীর্ণ শারীরিক উপস্থিতির যে কী প্রবল ভূমিকা ছিল, সেই সত্যটিই অনুভূত হল আর একবার, যেন পিতৃহীন নিঃস্ব-নিঃসঙ্গ-আশ্রয়হীন হয়ে গেল নরেন।

নিঃস্ব আর নিঃসঙ্গ তিনিও। ঠাকুর লীলা সংবরণ করলেন, অপ্রকট হলেন—এসবই আধ্যাত্মিক ভাব আর উপলব্ধি। দীর্ণতা, একাকিত্বের মধ্যেও ওই উপলব্ধি একটি দীপ্ত শিখার মতো জ্বালিয়ে রেখে তাঁকে পথ চলতে হবে। আভাসে ইঙ্গিতে, কখনও কিঞ্চিৎ অনুশীলন-উপদেশের মাধ্যমে ঠাকুর সেই শিখাটি প্রজ্বলিতও করে দিয়ে গেছেন সারদার মননে।

কিন্তু এই মুহূর্তে, তাঁদের সকলের উপলব্ধিকেই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে ফলিত করার প্রয়োজন আছে। ঠাকুরের মহাসমাধি ঘটেছিল রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে। সেখান থেকে মহাপ্রয়াণ, জীবদ্দশার অন্তিম, সমাপ্তিক্ষণটি জীবনের প্রয়োজনেই চিহ্নিত হতে হবে। শরীর ধারণ করেছিলেন ঠাকুর, হয়েছিলেন মরণশীল মানব। তাঁর নশ্বরতা নিশ্চিত হওয়ার দরকার, এই বাস্তববোধটি সারদা হারাননি।

আবার তিনি এও জানেন, ছেলে এবং যুবকরা নিষ্ঠ-অকুতোভয়-সমর্পিত প্রাণ হলেও, তাদের ব্যবহারিক এবং বাস্তবক্ষমতা সীমাবদ্ধ। আর্থিক দৈন্যে তারা নিজেরাই নাজেহাল। এতদিন ধরে গৃহ থেকে শুরু করে গ্রাসাচ্ছাদনের যাবতীয় ব্যবস্থা, ঠাকুরের চিকিৎসা-ঔষধ-পথ্য সবকিছুর আয়োজন এবং আর্থিক নির্বাহ করে আসছেন কতিপয় বয়স্ক আর গৃহী ভক্তগণ। তাঁরাই অবলম্বন দিয়ে আসছেন, ঠাকুরের সেবায় নিয়োজিত যুবকবৃন্দের সঙ্গে সহধর্মিণী হিসেবে তাঁকেও। সবাই তাঁকে মা বলেই সমীহ এবং সম্বোধন করেন। আবার তাঁর সঙ্গে রয়েছেন গোলাপমা, লক্ষ্মীদেবী এবং একটি দাসীও। সব মিলিয়ে একটি বড় এবং ব্যয়বহুল সাংসারিক ব্যবস্থা।

বাস্তবতার নিরিখে অদূর ভবিষ্যতে ব্যবস্থাটি কোন খাতে প্রবাহিত হবে, সেকথা সময় বলবে। কিন্তু আজ এসময়ে আধ্যাত্মিক এবং বাস্তব জীবনের দোলাচল থেকে বেরিয়ে, একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার কাল সমাগত। মৃত্যুও একটি পরিণতি। প্রকৃতপক্ষে এই পরিণতি থেকেই একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজনের সূচনা আবার। শোক-দুঃখ-হতাশা-আবহের মধ্যে থেকেও বাস্তব অবস্থাকে মাথায় রাখতে হয়। পারলৌকিক আচার ব্যবস্থাপনাও সভ্য মানুষের অনুষ্ঠান।

সারদা সচেতন হয়েছেন সে ব্যাপারে। বুক ভেঙে যাচ্ছে, তবু আভাসে তার উল্লেখ করেছেন। তাঁর সংক্ষিপ্ত বাক্যটির প্রভাব এই প্রখর অনুভূতিশীল সন্তানটির উপর কতখানি, মা হিসেবে তিনি জানেন। কিছুক্ষণ সময় নিজে নিলেন এবং নরেনকেও দিলেন তার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া নির্গত হওয়ার জন্য। আসন্ন দিনটিতে কী ঘটতে যাচ্ছে সারদা অনুমান করতে পারেন।

কয়েক মুহূর্ত পরে নিজেই ঘুরে সস্নেহে নরেনকে দেখলেন। কণ্ঠস্বর নিয়ন্ত্রণ করলেন। আড়াল থেকেই কথা বললেন তারপর।

স্থির হও বাবা। অনেক দায়িত্ব এখন তোমার।

দীর্ঘ সজল চোখ তুলল নরেন। আর কি কোনও আশা নেই মা?

সেকথা তো ডাক্তারবাবু বলবেন বাবা।

মহাসমাধি আর ভাঙবে না?

তিনি নিজের ইচ্ছেতেই যা করার করেছেন। সবই তো পূর্ব নির্দিষ্ট।

মা, তুমি কি তা হলে…!

যাও বাবা, দেরি কোরো না। সারদা থামিয়ে দিলেন নরেনকে। সঙ্গে যোগ করলেন, মেঘে মেঘে বেলা হচ্ছে, অনেক কাজ আজ। তাঁর দৃষ্টির স্পর্শেই কিছু একটা অনুভূত হয়ে থাকবে নরেনের। অশ্রু সংবরণ করে দোতালায় গেল গুরুভায়েদের কাছে।

নিস্প্রভ সকালের আলো, তাইতেই দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে দোতালায় ঠাকুরের ঘরটি। স্পন্দনহীন ঠাকুরের শরীর একইরকম রয়েছে বিছানার ওপর—দেখে মনে হয় তিনি গভীর নিদ্রায় ডুবে রয়েছেন। ত্যাগী আর ভক্ত সন্তানরা যেন কিছুটা সংশয়চিত্তেই তখনও প্রতীক্ষা করছে তাঁর সমাধিভঙ্গের। সংশয়, কেননা ঠাকুরের সমাধি তারা আগেও দেখেছে। কিন্তু এত দীর্ঘক্ষণ তো দেখেনি।

নরেন ঘরে প্রবেশ করতে তার শরীরের ভাষা থেকেই যেন সব সংশয়ের নিরসন হল। কাউকে কিছু বলতে হল না। অন্তরঙ্গ বারোটি সন্তান—যাদের এই কাশীপুর উদ্যানেই ঠাকুর গেরুয়া বস্ত্র দিয়ে ব্রহ্মচর্যের দীক্ষা দিয়েছিলেন, মাত্র কিছুক্ষণের মধ্যে কিংকর্তব্য স্থির করে ফেলল।

গৃহী ভক্তরা অধিকাংশ থাকেন উত্তর কলকাতায়। ঠাকুরের শারীরিক অবস্থা নিয়ে তাঁরা উৎকণ্ঠায় থাকলেও, মাঝরাতে তাঁর মহাসমাধির কথা তাঁরা জানেন না। এসে পৌঁছাতে অবশ্যই বেলা হবে। তার আগে প্রাথমিক আয়োজন আর কর্তব্যগুলো সেরে ফেলা দরকার। শূন্যতার অনুভবে, শোকে হৃদয় বিদীর্ণ হচ্ছে, যদিও তখনও ডাক্তার এসে প্রয়াণের রায় দেননি, তা সত্ত্বেও কাজে নেমে পড়ল বাবুরাম-শশী-রাখাল-যোগেন…। চকিতে একথাও মনে পড়েছিল, মাত্র কিছুদিন আগে ঠাকুর পঞ্জিকা এনে একজন ভক্তকে দিয়ে পড়াচ্ছিলেন। যখনই একত্রিশে শ্রাবণের পাতাটি ওলটানো হল, পড়া বন্ধ করে দিতে বলেছিলেন নিজের থেকে।

দ্রুত প্রাতঃকৃত্য এবং স্নান সেরে নিল ছেলেরা। গঙ্গাজল দিয়ে মোছা হল ঘর। খুলে দিল জানালা-দরজা। প্রতিদিনের মতোই জ্বালানো হল ধূপ-দীপা উদ্যানবাটির অভ্যন্তরেই ফুলগাছের অভাব নেই। এখন সময়ও ফুলের। ঠাকুরের পছন্দমতোই জুঁই-বেল-গন্ধরাজ-বকুল ফুল নিয়ে আসা হল। বর্ষায় ভেজা টাটকা ফুলের গন্ধে সুবাসিত হয়ে রইল ঠাকুরের কক্ষ। নরেনসহ দু’-একজন শয্যাপার্শ্বে রইল, লাটু-গোপাল-হরি কালক্ষেপ না করে পায়ে হেঁটেই রওনা হয়ে গেল বলরামবাবু, সুরেন মিত্র এবং ডাক্তারবাবু মহেন্দ্রলাল সরকারকে মহাসমাধির সংবাদ দিতে।

তিনি মানুষটি তো বরাবর লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকতেই পছন্দ করেন। দক্ষিণেশ্বরে নহবতের চোরকুঠরির মতো ঘরে অবস্থানকালেও ক্বচিৎ সারদা বাইরে আসতেন। ভক্ত-শিষ্যরা মানুষঠাকুরের বউ আছে শুনে কৌতূহলী হয়ে উঠতেন দর্শন লাভের জন্য। নহবতের কাছে এসে খোঁজখবর নিতেন। কিন্তু পাহারাদার খাজাঞ্চি নিজেই তো মাঠাকরুনকে কখনও দেখতে পায় না। ভক্তদের প্রশ্নের উত্তরে উদাস জবাব দেয়, শুনেছি তিনি এখানেই থাকেন, কিন্তু আমিও কখনও তাঁকে দেখিনি।

লৌকিক সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার এই শেষ দিনটিতেও সারদা সকাল থেকে অন্তরালেই রইলেন। উদ্যানবাটির একতলায় নিজস্ব ব্যবহারের ছোট ঘরটিতে বুকের মধ্যে জমাট বেঁধে যাওয়া শোকের পাথর নিয়ে একাকী নিঃশব্দ রইলেন। ওপরে শান্ত, কিন্তু আজ বহু ঘটনা-কথা-স্মৃতির অন্তঃস্রোত ছলছল ফল্গুধারার মতো প্রবাহিত হয়ে চলেছে তাঁর ভাবনায়, অন্তরে।

অঢেল প্রশস্তি আশ্বাস বন্দনা তিনিও পেয়ে আসছেন দীর্ঘকাল ধরে, বিশেষ করে সেই আঠারো বছর বয়সে প্রথমবার বাবা রামচন্দ্রের সঙ্গে দক্ষিণেশ্বরে আসার পর থেকে। একটানা থাকেননি। মাঝেমধ্যেই জয়রামবাটি-কামারপুকুর যাতায়াত করেছেন। অপূর্ব এবং অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা জীবনে কম হয়নি। একইসঙ্গে জুটেছে সীমাহীন আনন্দিত অনুভবের পুরস্কার, আবার নির্মম বিদ্রূপ, হুল ফোটানো তিরস্কারও। না, ওই মানুষটি কোনওদিন ফুলের ঘা দিয়েও আঘাত করেননি, গৃহস্থ-গ্রাম্য মানুষদের মতো তুই-তোকারি করেও কখনও কথা বলেননি। কিন্তু নানান অছিলায় ছেড়ে কথা বলেনি অনেকে। কখনও কাছের মানুষরাও দুষেছে। শেষপর্যন্ত অনেক কিছুই তিনি সহ্য করে নিতে শিখেছেন, শিখিয়েছেন ওই মানুষটাই। তা ছাড়া তাঁর ভূমিকা আর উপস্থিতিতে অনেকে উগ্র হওয়ার সাহস পায়নি। খুব মোলায়েম অভিব্যক্তিতেই ঠাকুর অনেক সময় অনেকের বিষধর ফণাটি নুইয়ে দিয়েছেন। তা হলেও জীবনের বহু অভিজ্ঞতা তাঁর স্বঅর্জিত। সব কথা কি তাঁর মতো স্বামীর কাছে উত্থাপনও করা যায়!

তেত্রিশ বছর বয়স এখন সারদার। এখনও তাঁর জন্মদাত্রী শ্যামাসুন্দরী দেবী ইহলোকে বর্তমান। সুতরাং এই বৈধব্যের মালিন্য নিয়ে আরও কতদিন যে তাঁকে ধরাধামে অতিবাহিত করতে হবে কে বলতে পারে! যদিও ঠারে ঠোরে বেশ কয়েকবারই ঠাকুর বলেছেন, আমার কাজ অর্ধেক করা হয়েছে, জগতের কল্যাণের জন্য বাকি কাজ ও করবে।

এই ‘বাকি কাজ’ ব্যাপারটির লক্ষ্য এবং স্বরূপ এখনও ঠিক ততখানি স্পষ্ট নয় তাঁর কাছে। ঠাকুর অবশ্য কালব্যাধির মধ্যেই, এই কাশীপুর উদ্যানবাটিতে আগামীদিনের অতি গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কর্ম সমাধা করেছেন, সারদার তা অজানা নয়। নরেনকে তিনি আগেই চিনেছিলেন। ক্রমশ চিনে নিয়েছিলেন তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদেরও। নিশ্চিত হয়েছিলেন দশ-বারোটি যুবকের আত্মত্যাগ এবং আন্তরিকতার বিষয়ে। তারপরেই একসূত্রে গেঁথে দিলেন। গেরুয়া কাপড় দিলেন, ব্রহ্মচর্যের দীক্ষার সঙ্গেই অনুপ্রাণিত করলেন সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী জীবনযাপনের। তখনও ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ডের কোনও রূপরেখা ছিল না। নিঃশব্দে আর একটি কাজও করেছেন। ‘আপনি আচরি ধর্ম’ পদ্ধতিতে দিনে দিনে কীভাবে যেন সারদাকেও চিনিয়ে দিয়েছেন মা বলে। ত্যাগী সন্তানরা মা বলতে অজ্ঞান। আজ স্থূল অর্থে বিধবা হলেও, তিনি মা।

নির্জন, মেঘলা দিনের সকালে এই প্রথম ‘বৈধব্য’ বিষয়টি মাথায় আসতেই কেমন দিশাহারা বোধ করলেন সারদা। নারী জন্মের প্রাকৃতিক বোধেই যেন অকস্মাৎ পায়ের নীচে মাটি কেঁপে উঠল। সত্যি কি তিনি বিধবা।

এখনও মানুষটা মহাসমাধিমগ্ন হয়ে ওপরের ঘরে রয়েছেন। চিকিৎসক পরীক্ষা করে মহানির্বাণের রায় দেননি, অথচ কী এক অস্থির হতাশা আর বিভ্রান্তিতে কেঁপে উঠলেন সারদা। তাঁর নিজেরই চোখে দেখা শত শত যন্ত্রণাক্লিষ্ট অসহায় বিধবা রমণীদের মুখগুলোই ভেসে উঠছে চোখের সামনে। মনে পড়ছে জয়রামবাটির ভানুপিসির কথা, কামারপুকুরের ধর্মদাস লাহার বিধবা মেয়ে প্রসন্নময়ীকে। এমনকী হঠাৎ আজ মনে পড়ে গেল শাশুড়ি চন্দ্রমণি আর ঠাকুরের সেই ভিক্ষে-মা ধনী কামারনিকেও।

এঁরা সকলেই বিধবা, আগে তো কখনও তেমনভাবে মাথায় আসেনি। আজ এল কেন!

একটা বুক মোচড়ানো কষ্টের আবেগে, অন্তরালে, নিঃশব্দে আকুল কান্নায় ভেঙে পড়লেন সারদা—যেন ধারে কাছে কেউ রইল না, নিঃস্ব, একাকী হয়ে গেছেন, একমাত্র বৈধব্যই তাঁর সঙ্গী, ওগো-হাঁগো বলে ডাকার কেউ রইল না।

সময় গেল। দিনের আলোও ফুটল না ভাল করে। মেঘের আড়ালে মুখ লুকিয়ে রেখেছেন সূর্যদেব। অন্যদিনের মতো আজ গোলাপমা কিংবা লক্ষ্মীও এসে ডাকাডাকি করল না। দাসীটি এসে জলখাবারের কথা জিজ্ঞেস করল না। তিন পর্বের রান্না হয় বড় সংসারের জন্য, এক পর্ব ঠাকুরের, এক পর্ব সন্ন্যাসী ছেলেদের, আর এক পর্ব বাকি সবাইয়ের। আজ আঁচ পড়ল না হেঁশেলে। সব ডুবে আছে নির্জনতায়।

একসময় নিজে থেকে স্থির হলেন সারদা। কার জন্য এত কষ্ট হচ্ছে? নিজের? নাকি তাঁর জন্য!

আসলে দোলাচলের ঘোর কাটছে না। এঘর-ওঘর যাতায়াত চলছে মনের মধ্যে। ঠাকুরকে মনে করেই বেড়া দিতে চাইলেন আবেগের চারিধারে। অন্য এক ব্যাকুলতার কথা বলেন তিনি। গৃহস্থ মানুষের চাওয়া-পাওয়ার ব্যাকুলতা নয়। উপলব্ধির ব্যাকুলতা। তাইতে অরুণোদয় হয়। ভাবের সূর্য ওঠে। আঁধার কাটে। হারানো বস্তু খুঁজে পাওয়া যায়। তাঁর আলোতেই এবার থেকে খুঁজে পেতে হবে তাঁকে। কাঁদতেও হবে, কিন্তু তাঁর শরীর ছেড়ে যাওয়ার জন্য সে কান্না নয়, উপলব্ধিতে পাওয়ার জন্য। জীবনটা আরও এলোমেলো হয়ে যাওয়ার আগেই সেই ব্যাকুলতা-অনুরাগ-কান্না আর উপলব্ধি দিয়েই ধরে রাখতে হবে তাঁকে, যিনি হাত ছাড়বেন না কোনওদিন। তিনি আমার বিশ্বাসের ঠাকুর।

মন মানে না, তবু নিজেকে বোঝান মা। বোঝান তাঁর কথা দিয়ে। ঠাকুর অপ্রকট হলেও মা-কে রেখে যাচ্ছেন সংসারে। বলে গেছেন, ঈশ্বরলাভের জন্য সংসারে থেকেই এক হাতে ঈশ্বরের পাদপদ্ম ধরে থাকবে, আর এক হাতে কাজ করবে। শেষপর্যন্ত কাজেই নিবৃত্তি, কাজেই মনুষ্য জীবনের সার্থকতা। আর কর্ম যখন মুক্তি দেবে, দু’ হাতে তাঁকে জড়িয়ে ধোরো।

স্নান সেরে এসে সারদা বুঝতে পারলেন, কোথাও একটা পরিবর্তন, ছন্দপতনের আবহ ক্রমশ আজ ঘিরে ধরেছে সমগ্র কাশীপুর উদ্যানবাটিকে। বর্ষাকাল হলেও প্রতিদিনের যে প্রাণোচ্ছলতা, কর্মব্যস্ততা অনুভূত হত সকাল থেকে, আজ তা অনুপস্থিত। আকাশ মেঘে ঢাকা, তা সত্ত্বেও বেলা হয়েছে। কিন্তু নিঝুম ভাব কাটছে না। একটি চাপা আশঙ্কা মিশ্রিত কৌতূহল ছায়া ফেলেছে মানুষের মুখের ওপর। কেউ স্পষ্টভাবে কোনও প্রশ্ন করছে না, গলা উঁচু করে কথা বলছে না।

কখন থেকে যেন উদ্যানবাটির সীমাবদ্ধ এলাকা অতিক্রম করে আবহটি ছড়িয়ে পড়েছে বাইরে। তারপর কাশীপুর ছেড়ে যেন হাওয়াতেই আসন্ন দুঃসংবাদটি মানুষের মুখে মুখে ফিরতে শুরু করেছে। ফটকের বাইরে, উদ্যানবাটির পাঁচিলের ধারে ধারে মানুষের জমায়েত শুরু হয়েছে। এমনিতে আজ রবিবার, ছুটির দিন। রাস্তাঘাটে মানুষের সংখ্যা বেশি। এদিকটা অবশ্য তেমন জনাকীর্ণ অঞ্চল নয়। তা হলেও উত্তর কলকাতার সঙ্গে আরও উত্তরে বরানগর পল্লিকে যুক্ত করার মাইল তিনেক রাস্তাটি চলে গেছে কাশীপুরের ওপর দিয়ে। উদ্যানবাটি ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি খোলামেলা বাগানবাড়ি রয়েছে রাস্তার পূর্ব পশ্চিমে। কাছেই প্রবাহিত গঙ্গা, রাস্তার পশ্চিমের বাগানবাড়িগুলি সে কারণেই বেশি নয়নপ্রীতিকর।

কিন্তু একমাত্র ওটুকুই কাশীপুরের পূর্ণচিত্র নয়। বাগবাজার পুল থেকে কাশীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত অঞ্চল রীতিমতো ব্যস্ত। কলকাতার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার কারণেও ওই অঞ্চলটুকুর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। ওই অংশেই রয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত দিনমজুরদের আস্তানা। বেশ কয়েকটি বড় বড় গুদামঘর, দাস কোম্পানির লৌহ কারখানা, রেলের কুঠিবাড়ি, পাটকলের ঘর। চৌরাস্তার কাছেই থানা, আবার দমকলের ঘাঁটি। সর্বমঙ্গলার মন্দিরও কাছাকাছি। মানুষের নানান প্রয়োজন মেটাতেই রাস্তার দু’ পাশে গড়ে উঠেছে দোকানপাট, বাজার।

দুপুরের মধ্যেই শহরতলি ছেড়ে শহর কলকাতাতেও খবর ছড়িয়ে পড়েছে—ঠাকুর রামকৃষ্ণ মহাসমাধিপ্রাপ্ত হয়েছেন। জনসমাগম বাড়তে লাগল আরও। ডাক্তারবাবু এসে পড়লেন তারমধ্যেই। ধীর গতিতে তাঁর গাড়ি ফটক পেরিয়ে উদ্যানবাটির দোরগোড়ায় এসে দাঁড়াল।

হাঁকডাক করা, রসিক অথচ শ্রদ্ধাবনত লম্বাচওড়া মানুষটির ভূমিকা আজ যেন সম্পূর্ণ অন্যরকম। ঠাকুর মানুষটিকে বেশ কিছুদিন ধরেই দেখে আসছেন মহেন্দ্রলাল। এই যাতায়াতের মধ্যে দিয়েই প্রাথমিক বিতর্ক সমালোচনার পর্ব অতিক্রম করে একটি প্রীতিস্নিগ্ধ নিবিড় শ্রদ্ধেয় সম্পর্ক তৈরি হয়েছে তাঁর ঠাকুরের সঙ্গে। শরীরপ্রাপ্ত এই বিরল মানবসন্তানটির কালব্যাধির পরিণতি সম্পর্কেও তিনি সম্পূর্ণ অবগত। মৃত্যুও তিনি কম দেখেননি। কিন্তু আজ তিনি এসে পৌঁছালেন শোকভারে অবনত, বেদনাবিদ্ধ, পরাজিত অনুগত সন্তানটির মতো। জীবদ্দশাপ্রাপ্ত উচ্চমার্গের মানুষটির শেষ পরিণতির কঠিনতম উচ্চারণটি তাঁকে করতে হবে, সেই ভাবনাতেই যেন বিহ্বল, দিশাহারা, মুহ্যমান।

একে একে দীর্ঘ সিঁড়ি ভেঙে মহেন্দ্রলাল উঠে গেলেন উদ্যানবাটির দোতালার বড় ঘরে।

ইতিমধ্যে জনসমাগম বৃদ্ধি পেয়েছে। গৃহী ভক্তশিষ্যরা সমাগত হয়েছেন। পৌঁছেছেন রামচন্দ্র দত্ত-বলরাম-গিরিশ-অতুল-মহেন্দ্রনাথ-সুরেন্দ্রনাথ-মহিমাচরণ-রাজেন্দ্র। নতমস্তকে দণ্ডায়মান ত্যাগী সন্তানেরা। অবসাদে দীর্ণ আজ উদ্যানবাটির দারোয়ান-মালি-ভৃত্য-পাচকরাও। মহিলারা আশ্রয় নিয়েছেন একতলার ঘরে গোলাপমা আর লক্ষ্মীর কাছে। প্রায় মৌনব্রত অবলম্বন করে নিজের ঘরে একাকী রয়েছেন সারদা।

জুতো খুলে রেখে ঠাকুরের ঘরে ঢুকলেন মহেন্দ্রলাল। একটি মিশ্র সুগন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে ঘরের বাতাসে। নৈঃশব্দ্যের মধ্যে খাটের ওপর শুয়ে আছেন ঠাকুর, হাত দুটি বুকের ওপর ভাঁজ করা। জ্বালাযন্ত্রণা কষ্টের চিহ্নমাত্র নেই মুখাবয়বে। দুই চোখ অর্ধ নিমীলিত। স্পন্দনহীন শরীর স্থির। কয়েক মুহূর্ত ধ্যানগম্ভীর দৃষ্টিপাতে নিরীক্ষণ করলেন মহেন্দ্রলাল। অভিজ্ঞতা এবং অনুভূতি তখনই জানিয়ে দিল প্রকৃত সত্যটি। দ্রুত মনে পড়ল প্রথমবার ঠাকুরের সমাধি দেখে তাঁর যুক্তিবাদী চিকিৎসক মন সংশয়ের দোলায় দুলে উঠেছিল। সঙ্গে সঙ্গে নাকের কাছে হাত, এমনকী নিমীলিত চোখের পাতা তুলে দেখেছিলেন। বুঝতে চেয়েছিলেন সমাধির স্বরূপটি। হতবাক হয়েছিলেন দেখে—শাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে রয়েছে, প্রাণের স্পন্দন নেই, অথচ মানুষটি জীবিত রয়েছেন।

আজ আর সেসব কিছুই করতে হল না। শরীর সচেতন মানুষটি স্থির নিশ্চিত হয়ে গেলেন ঠাকুরের মহাপ্রয়াণের বিষয়ে। তখনও মুখে একটি শব্দ উচ্চারণ করেননি, কিন্তু প্রাণহীনতার যাবতীয় লক্ষণগুলি নিখুঁত পড়ে নিলেন। ঠাকুরের লৌকিক জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। শুধু একটিই অনুমান করার—শারীরিক রসায়নের নিরিখে কতক্ষণ পূর্বে প্রাণটি নির্গত হয়েছে।

হাঁটু মুড়ে ঠাকুরের শয্যাপার্শ্বে বসে পড়লেন মহেন্দ্রলাল৷ ঘরভরতি মানুষের সামনে স্বাক্ষরিত হওয়ারও দরকার আছে। অঙ্গ স্পর্শ করলেন। অতঃপর দুই হাতে ঠাকুরের দক্ষিণহস্ত আকর্ষণ করলেন। বরফের মতো ঠান্ডা, কাঠিন্য স্পর্শ করতে শুরু করেছে। নিঃশব্দে মাথা নাড়লেন কয়েক মুহূর্ত পরে। অস্ফুট উচ্চারণ করলেন, নেই, প্রাণবায়ু নির্গত হয়েছে বেশ কিছুক্ষণ আগেই। সবই জানা ছিল। তবু মহেন্দ্রলালের উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই একটি অনিবার্য, চাপা অথচ বক্ষবিদীর্ণ করা হতাশ গুঞ্জনে মুখরিত হয়ে উঠল উদ্যানবাটির দোতালার ঘর। এবং লেলিহান অগ্নিশিখার মতোই সেই গুঞ্জন, বুকফাটা কান্নায় পর্যবসিত হতে হতে ছড়িয়ে পড়ল দোতালা থেকে একতলায়, উদ্যানবাটির অলিন্দে-প্রাঙ্গণে, প্রাচীর অতিক্রম করে বাইরে, জনপদে।

সবকিছুই কর্ণগোচর হল সারদার। আর চূড়ান্ত অধ্যবসায়েই স্মরণে দর্শনে পাষাণ হয়ে রইলেন নীচের ঘরে। তা সত্ত্বেও বাবহারিক জীবনে কিছু লৌকিক রীতি আছে। একবারটি তাঁকে ওপরে আসতে হবে। লক্ষ্মী, গোলাপমা নিয়ে এলেন। আর শত নিয়ন্ত্রণ সত্ত্বেও বুকভাঙা তীক্ষ্ণ আর্তনাদটি আর চেপে রাখতে পারলেন না—আমার মা-কালী গো…। তুমি কোথায় চলে গেলে!

স্তব্ধ হয়ে গেলেন তারপরেই। মনে পড়ে, ঠাকুরের এঘর আর ওঘর। তিনি চৈতন্য, তিনিই বিশ্বাস, তিনি অনন্ত। থমকানো মেঘ গলে পড়ছে প্রকৃতির অশ্রুধারা হয়ে।

“সাঙ্গ হলে মেঘের পালা শুরু হবে বৃষ্টি ঢালা,

বরফ জমা সারা হলে নদী হয়ে গলবে।

ফুরায় যা, তা ফুরায় শুধু চোখে—

অন্ধকারের পেরিয়ে দুয়ার যায় চলে আলোকে।”

মেধা-মননে, ধীর-স্থির শান্ত হলেন সারদা।

সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসতে আসতে দেখলেন, জীবনের নদীটি সামনে বহমান। ঢেউ আছে, আছে জোয়ার-ভাটা, তবু বহে যেতে হবে। সুখে-দুঃখে, আঁধারে-আলোয় বয়ে যাওয়াই জীবন। নৌকাটি ভাসিয়ে দিয়েছেন ঠাকুর, হাল আর দাঁড় দিয়ে গেছেন মায়ের হাতে, চাপিয়ে দিয়েছেন অগুনতি ছেলেমেয়ে আর যাত্রীদের, কাল থেকে মহাকালের দিকে যাত্রা হল শুরু।

উদ্যানবাটির একতলার ঘরে ফিরে এসে নিজের মুখোমুখি হলেন সারদা।

কয়েক বছর আগে দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরের পদসংবাহন করতে করতে যে কথাটি বলেছিলেন, তাই স্মরণে এল।

আমি তোমার ইষ্টপথেই সাহায্য করতে এসেছি।

সেই পথের সন্ধান দিয়ে গেছেন ঠাকুর। লীলা সংবরণ করলেন। এবার চলতে হবে সারদাকে ভাবনা-পথের পথিক হয়ে।

মহাশ্মশানের নির্জনতা নেমে এসেছে কাশীপুর উদ্যানবাটিতে।

ভারী, গম্ভীর খাঁ খাঁ শূন্যতায় ডুবে রয়েছে চোদ্দো বিঘা পরিসরের খোলামেলা বাগান আর বাড়ির প্রতিটি কোণ। সব থেকেও কিছু নেই। ঋতুর হিসেবে বর্ষা শেষে শরতের পদার্পণ ঘটেছে সদ্য। এমন কিছু পরিবর্তন ঘটেনি প্রকৃতিতে। বিগত কয়েকদিন ধরেই যেমন চলছিল—কখনও মেঘ, কখনও বৃষ্টি, কখনও একটু আধটু আলো আর নীলাকাশের উকিঝুঁকি, তেমনই চলছে। ঘরবাড়ি-বাগান, মানুষজন-পশুপাখি, গাছপালা-পুকুর, যা ছিল, যেমন ছিল সবই আছে। অথচ কেমন এক নিঝুম ভাব হয়ে রয়েছে। উচ্ছলতাহীন, নিরানন্দে দীর্ণ।

মাত্র দুটি দিন অতিবাহিত হয়েছে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণর মর্ত্যলীলা সাঙ্গ করার পরে। তারমধ্যেই আকাশ পাতাল তফাত হয়ে গেছে উদ্যানবাটির আবহ আর পরিবেশে। থম ধরানো, উদাস, জমাট বাঁধা ভাব। কখনও বৃষ্টি ভিজিয়ে দিচ্ছে, বাতাস বয়ে যাচ্ছে, গাছের পাতায় শব্দ উঠছে, আলো আঁধার যাতায়াত করছে, অথচ প্রতিক্রিয়াহীন উদাসীন যেন প্রকৃতি, শান্ত, এলিয়ে পড়ে আছে।

কী এক নিবিড় অবসাদে ধুঁকছে বাসিন্দা মানুষজন, গৃহপালিত পশুপ্রাণীরাও। বাগানে কাজকর্মের ব্যস্ততা নেই, মালিরা বসে আছে গাছতলায়, গাভী জাবর কাটছে, বাছুর দৌড়চ্ছে না। আস্তাবলের ঘোড়া দুটি অর্ধ চক্ষু মুদে দাঁড়িয়ে আছে, মাঝে মাঝে পা ঠুকছে। হাঁসগুলো জলে সাঁতার না কেটে পুকুরপাড়ে বড় মানকচু পাতার তলায় দাঁড়িয়ে। পুকুরজলে ঘাই দিতেও যেন ভুলে গেছে মাছেরা।

বাড়ির একতলা-দোতালাতেও মানুষ আছে কিনা প্রায় বোঝা যায় না। হাঁকডাক হইচই-এর তো প্রশ্নই নেই, কথাও যেন ফুরিয়ে গেছে কিংবা হঠাৎ কমে গেছে। যেটুকু আছে, তাও নেহাত প্রয়োজনে, চাপা আর অস্পষ্ট স্বরে। বাইরে থেকে লোকজন যাতায়াত হঠাৎ কমে গেল। গেট থেকে বাড়ি পর্যন্ত আসতে মোরামের পথে চড়বড় শব্দ হত, দু’দিন ধরে সেই শব্দও কদাচিৎ শোনা গেছে। ঠাকুরের ভক্তশিষ্যরা অনেকেই ফটকের সামনে থেকে তাঁর স্মৃতি আর পুণ্যাত্মার উদ্দেশে প্রণাম জানিয়ে চোখের জল ফেলে ফিরে গিয়েছেন। কেউ কেউ আবার সচেতন, জানেন, উদ্যানবাটিতেই এখনও মা এবং ঠাকুরের ত্যাগী সন্তানরা রয়েছেন। কিন্তু বাজার-দোকান, রান্নাবান্না, হেঁশেল ঠেলার জন্য কেউ কি থাকবে! থাকলেও তারা কতদূর কী করবে কে জানে!

গৃহস্থ সংসারী মানুষরা তাই সিধে এনেছেন কেউ কেউ। চাল ডাল, আনাজ-তরকারি-আলু বেগুন পটল কুমড়ো উচ্ছে, পুঁইশাক, কলমিশাক। সরষের তেল-ঘি-মধু, শেষদিকের ফজলি আম, কলা-নারকোল, সুজি-সাবুদানা, দই-সন্দেশ-ছানার জিলিপি…। দারোয়ানের হাতে ধরিয়ে ফিরে গেছেন সেখান থেকে।

মা-ঠাকরুনের হাতে পৌঁছে দিয়ে বাবা, শোকেতাপেও তো ক্ষুণ্ণিবৃত্তি করতে হবে।

দারোয়ান এসে ধরিয়ে দিয়ে গেছে লক্ষ্মীদিদি-গোলাপমা-হরির মা-শঙ্করী কিংবা মানদার হাতে। রান্নাঘরে সেই ব্যস্ততা নেই, ভাঁড়ারঘর প্রায় শূন্য, নজর দেওয়া হয়নি তিনদিন ধরে। উনুন ধরেছে নামমাত্র। মেঝে নিকনো হয়নি। ভিজে জলো আবহাওয়ায় ঘুঁটে-কয়লাতেও স্যাঁতসেঁতে ভাব। খুটখাট আয়োজন শুরু করতে হয়েছে তার মধ্যেই। পেটের চেয়ে বড় দায় আর কী! একতলার রান্নাঘরে ঠুংঠাং শুরু হয়েছে বাসন-কোসনের। সিধে আসাতেই অনেকটা সুবিধে। ঝুড়ি-বঁটি নিয়ে পিঁড়ে পেতে বসেছেন গোলাপমা, লক্ষ্মীদিদি। শঙ্করী উনুনে আঁচ দিয়েছে। আঁচের দেখা নেই, গলগল করে শুধু ধোঁয়া ওগরাচ্ছে।

দোষ নেই কারওরই। ঘুঁটে কয়লা সেঁতিয়ে থাকলে উনুনই-বা ধরবে কী করে, রান্নাই-বা হবে কখন। ধোঁয়া উঠছে উদ্যানবাটির উত্তর-পূর্ব কোণ থেকে, ভারী হাওয়ায় মিশে যাচ্ছে— যেন ঠাকুরের নিভন্ত চিতাগ্নিরই অবশিষ্ট ধোঁয়ার স্মৃতি… তবু ওটুকুতেই আজ মানুষগুলোর উপস্থিতি আর জীবনের অস্তিত্ব টের পাওয়া যাচ্ছে।

কিন্তু বড়ই ঢিলেঢালা আর অবসন্ন ভাব সকলের। উঠতে হয়, তাই উঠতে হয়েছে। হবিষ্যিই হোক, আর কচুঘেঁচু সেদ্ধই হোক, পেটে দুটি না দিয়ে উপায় কী! চিতাগ্নিও একসময় নিবে যায়, কিন্তু জঠরাগ্নি যে জ্বলবেই। এদিকে বলা কওয়া, জোগাড়যন্ত্র, ব্যবস্থা করার কেউ নেই। কিংবা আছে অথচ উৎসাহ উদ্দীপনার অভাব। একমাত্র খিদে ছাড়া ঠেলা দেওয়ার কিছু নেই, কেউ নেই। সেই যে পরশুদিন সন্ধেবেলা ছেলেরা শ্মশান থেকে ফিরে, লোহা আর আগুন ছুঁয়ে নিমপাতা দাঁতে কেটে বাড়িতে ঢুকেছিল, সব কিছু যেন থেমে রয়েছে তারপর থেকে। চুপচাপ হয়ে রয়েছে, বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে শোকের নিঃশব্দ হাহাকার আর দীর্ঘশ্বাস।

মা জননীর সঙ্গে দেখা হয়নি ছেলেদের। চোখ তুলে তাকাবার ভরসা হয়নি। নিজেকে বিচ্ছিন্ন আর একাকী করে রেখেছেন সারদা। দুরন্ত এক সহ্যে, সংযমে নির্বাক আর অবরুদ্ধ হয়ে রয়েছেন। যেন ধ্যানমগ্না, স্তব্ধ পাষাণ প্রতিমা। কারওর সাহসে কুলোয়নি তাঁর ধ্যান কিংবা শোক কিংবা মৌনী ভাঙাবার। যে মা এতদিন একা দশভূজার মতন সকাল থেকে কাজে নেমে পড়েছেন, চতুর্দিক সামলেছেন, পরশু দিন থেকে তিনি অন্য মানুষ। আকস্মিক সব হারানোর বেদনায়, আঘাতে নিঃস্ব বিপর্যস্ত হতবাক।

সবাই জানে, ঠাকুরের অবর্তমানে মায়েরই শোক আর আঘাতের তীব্রতা সর্বাধিক। তাঁর অসহায়তা অপরিমেয়। তাঁর আশ্রয়ের ছাদ উড়ে গেছে, খুঁটিগুলি হয়ে গেছে ভঙ্গুর, নড়বড়ে। নির্ভরযোগ্য মুখগুলিতে আশঙ্কা আর দোলাচলের ছায়া যাতায়াত করছে। মানুষটি অপ্রকট হওয়ার পরে, আর কতদিন ভক্ত এবং শিষ্যরা তাঁর ভাবান্দোলন ধরে রাখতে পারবেন কে জানে! আর যাঁদের ওপর ভরসা, তাঁদের মনোভাবই যদি অমন বিভ্রান্তির টানাপোড়েনে অস্থির অনিশ্চিত হয়ে ওঠে, তা হলে সারদার চেয়ে একা অসহায় নিঃস্ব আর কে!

সত্যি কি সারদা আজ তিনদিন ধরে সেই কথাই ভাবছেন! কে জানে!

একা নিজেকে ঘরের মধ্যে আটকে রেখে শোকে বুক ভাসাচ্ছেন, আর অজানা ভবিষ্যৎ, নিরাপত্তাহীন শূন্যতার কথা ভেবে দিশাহারা? নিজেকে একগোত্র করে ফেলেছেন আরও সেইসব অবহেলিত, সংসার বিচ্ছিন্ন স্বামীহারা বিধবাদের সঙ্গে।

উদ্যানবাটির একতলায় মহিলামহলে নিচু স্বরে ফিসফাস আলোচনাও একেবারে হচ্ছে না, তা নয়। নেহাতই গুঞ্জন, পর্দা তাঁর বেশি চড়ছে না। কিন্তু সংশয় আর সন্দেহের আনাগোনা চলছে কাছের মানুষগুলোর মধ্যে। তাঁর সঙ্গে মিশে রয়েছে উদ্বেগ, দুর্ভাবনা। আসলে বেশ কয়েক বছর ধরে জড়িয়ে রয়েছেন যে তাঁরাও। গোলাপমা, যোগীনমা, লক্ষ্মীদেবী, গোপালের মা, হরির মা, গৌরী মা…আরও কতজন। একসঙ্গে সবাই ঠাকুরের মহাসমাধি থেকে মহাপ্রয়াণের সময়টিতে কাছে থাকতে পারেননি, নেই। কিন্তু মায়ের সঙ্গে জীবনে জীবনযোগ তো তাঁদেরও হয়েছে। আজ মায়ের জীবনে নেমে আসা এই ধূসর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ যাত্রায় তাঁরাও তো সহযাত্রিণী। তাঁরাও সামিল।

কিন্তু সনাতন হিন্দু রীতির বৈধব্য, নিয়মকানুন, বেশবাস সারদা তো মানলেন না!

কাউকে কিচ্ছুটি বলেননি সারদা। তাঁর উপলব্ধি আর ভাবজগতের বাতাবরণে একটি বিশ্বাসের বোধ সঞ্চিত এবং সঞ্চারিত হয়ে চলেছিল। সেদিন গভীর রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে মানুষটির মহাসমাধির মুহূর্ত থেকেই তো তিনি বুঝে এবং জেনে গিয়েছিলেন, তাঁর বাস্তব জীবনের আকাশ থেকে ধ্রুবতারাটি খসে যাবে। কর্কট রোগের বিস্তার, পরিণতি তিনি জানতেন। জানতেন তাঁর স্বামীরূপী আলোকপ্রাপ্ত ধুরন্ধর মানুষটিও।

শরীর তাঁকে ত্যাগ করবে, নাকি তিনি শরীরত্যাগ করবেন, তা নিয়েও কোনও সংশয়ের অবকাশ ছিল না। সেইসবের অসংখ্য ইঙ্গিত তিনি শ্যামপুকুর থেকে উদ্যানবাটিতে স্থানান্তরের আগে থেকেই জানান দিয়ে আসছিলেন।

ভাব আর জ্ঞানের উপলব্ধি, তন্ময়তা থেকেই তাঁর ভাষ্য, নিজের শরীর দেখিয়ে, এ খোলটার আর কী দাম? থাকলেই বা কী, গেলেই বা কী!

একই সঙ্গে লীলাসঙ্গিনীটিকে সতর্ক, সচেতন করেছেন। ইঙ্গিতময় উচ্চারণ।

এসেছ? দ্যাখো, আমি যেন কোথায় যাচ্ছি—জলের ভেতর দিয়ে, অনেকদূর।

গন্তব্য জানাননি, কিন্তু অনেক দূর। তারও আগে শশী মহারাজকে দিয়ে ডাকিয়ে এনে বলেছিলেন, আমার মনে সর্বদাই ব্ৰহ্মভাবের উদ্দীপনা হচ্ছে।

এসবই যেন ছিল ইঙ্গিতপূর্ণ স্বগতোক্তি, নিজস্ব ভূমিকার আলোআঁধারি ছবি এঁকে দেওয়া।

নির্ভরতা আর নির্দেশ মিশে যাচ্ছিল এসবের ফাঁকে ফাঁকে।

এ আর কী করেছে? অনেক বেশি করতে হবে তোমায়। কখনও আভাসে জানিয়েছেন, একে আশ্রয় করে থাকো। তোমার কাছে কত সব ছেলেরা এখন আসবে। আবার কখনও ঘোষণা করার মতো বলেছেন, তুমি আর আমি অভেদ।

একটি মানসিক প্রস্তুতির রসায়নে নিভৃতে লালিত হচ্ছিল সাদামাটা গ্রাম্য মহিলাটির প্রজ্ঞা। ঠাকুর মানুষটি তৈরি করার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু তৈরি তিনি হয়েইছিলেন। আধারটি ছিল বিশাল, ভালবাসায় পূর্ণ টলটলে দীঘি। সারদা সরোবর। হাজার হাজার শতদল প্রস্ফুটিত হওয়ার উন্মুখ প্রতীক্ষায় বসে ছিল তাঁর গভীরে। সুন্দরকে নিয়ে আসতে হবে জীবনের আলোয়। শরীর ছাড়ার আগেই ঠাকুর যেন দীক্ষা সম্পূর্ণ করে দিয়েছিলেন— “আমার সকল রসের ধারা, তোমাতে আজ হোক-না হারা।”

সেই মুহূর্তটায় কেঁপে উঠেছিলেন সারদা। আবহাওয়া-পরিবেশ-পরিজন সব কিছুরই প্রভাব ছিল। তীক্ষ্ণ আর্তনাদে বিদীর্ণ হয়েছিলেন। চোখের ওপর দৃশ্যটা সহ্য হয়নি। সত্য উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে লৌকিক অনুভবে ভূকম্পন হয়েছিল। নেই।

কিন্তু ওই একবারই। তারপর আর না। সবাই দেখল সংযম। সারদা পেলেন ভাব-বোধ-উপলব্ধি। শোকে, চোখের জলে যখন সবাই ভাসছে, সারদা তাঁকে স্মরণ করেছেন, মনে মনে উচ্চারণ করেছেন সহ্য-সহ্য-সহ্য।

কিন্তু জীবন থাকতে সহ্যেরও সীমা থাকে। ভেঙে পড়ার উপক্রম হল একবার।

মহাপ্রয়াণের স্থির সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে ফিরে গেছেন ডাক্তারবাবু। খবর আগেই হয়েছিল, এবার দাউ দাউ আগুনের মতো খবর ছড়াতে লাগল। উত্তরে বরানগর দমদম, দক্ষিণে কলকাতা ছেড়ে ঢাকুরিয়া-সোনারপুর, আর একদিকে চম্পাহাটি। পশ্চিমে গঙ্গা পেরিয়ে বেলুড়-উত্তরপাড়া-কোন্নগর। আবার পুবেও মধ্যমগ্রাম বারাসত হয়ে বনগাঁ পর্যন্ত। বুক চাপড়াতে চাপড়াতে মানুষজন ধেয়ে আসতে লাগল কাশীপুর উদ্যানবাটির দিকে।

মেঘলা আবহাওয়া, বৃষ্টি উপেক্ষা করে, দলমত নির্বিশেষে, ধর্মাধর্ম মনে না রেখে কাতারে কাতারে মানুষ আসছে। মানবদেহে ভগবান তিনি। ভালবাসা আর আশ্রয়ের একটি পূর্ণ নিবিড় আধার ঠাকুর রামকৃষ্ণ। ধর্মের চেয়ে জীবন বড়। তাঁর শেষ দর্শনের জন্য জাতি ধর্ম মাথায় রাখেনি মানুষ। চিরকালই তাঁর দরজা ছিল সকলের জন্য খোলা। গীতা-বাইবেল-কোরান রেখে মানুষ এল কাশীপুরে।

শোভাযাত্রা করে কাশীপুরের শ্মশানঘাটে নিয়ে যাওয়া হবে ঠাকুরের নশ্বর দেহ। অগ্নিকুণ্ড সাজানো হবে চন্দন কাঠ দিয়ে। পুণ্যসলিলা গঙ্গার উপকূলে সম্পন্ন হবে পরমহংসদেবের শেষকৃত্য। যে স্রোতস্বিনীর বারিতে স্নিগ্ধ, তৃপ্ত, সিক্ত হয়েছেন বরাবর, সেই মা গঙ্গাই ধারণ করবেন ঠাকুরকে।

আয়োজন হচ্ছে কাশীপুর উদ্যানবাটিতে। ঘর ছেড়ে আসা নবীন সন্ন্যাসীরা তো আছেনই, এসে পৌঁছেছেন গৃহীভক্তরা, দক্ষিণেশ্বর-বরানগর-শ্যামপুকুর-বাগবাজারের অগুনতি আত্মজন, কাছের মানুষ, ভক্তরা।

খাটের ওপর সাজানো হয়েছে বিছানা, চিত্রিত হয়েছে পুষ্পদলে। ঠাকুরের দিব্যদেহ সুসজ্জিত করা হল গেরুয়া আর পীতবস্ত্রে, গলায় সুবাসিত ফুলের মালা, বিরলকেশ পেলব মাথাটি আঁচড়ে দেওয়া হয়েছে, কপালে চন্দনের ফোঁটা। পাদপদ্মেও সচন্দন পুস্পার্ঘ্য দিয়ে ক্ষীণতনুটি শায়িত করা হল খাটে। ধূপ জ্বালানো হয়েছে, সুগন্ধ ছড়ানো হয়েছে শয্যার চতুষ্পর্শে। অশ্রু সংবরণ করে শ্রীচরণে মাথা ছোঁয়ালেন শিষ্যরা। তারপরেই উচ্ছ্বসিত কান্নায় ভেঙে পড়লেন। এতক্ষণ তবু শ্রীদেহটি চাক্ষুষ করতে পারছিলেন, এবার লৌকিক চেহারাটি নেই হয়ে যাবে।

বিকেল হয়ে গেল শোভাযাত্রা বেরুতে। নিবেদিত-প্রাণ ত্যাগী ছেলেদের কাঁধে চেপে ঠাকুর চললেন মনুষ্যজন্মের শেষ ঠিকানায়। হরিধ্বনি, সংকীর্তন, পূতবারি সিঞ্চন করতে করতে সর্বধর্ম সমন্বয়ের প্রতীক হয়ে শ্মশানযাত্রীরা রওনা হলেন গঙ্গার দিকে। নিশান উড়ল, সঙ্গে বাজল খোল-করতাল। একসঙ্গে চলল ত্রিশূল, ওঁকার, বৈষ্ণবদের খুন্তি, খ্রিস্টানদের ক্ৰশ, মুসলমানদের অর্ধচন্দ্র।

গোধুলির আকাশে থমকে রয়েছে মেঘ। হালকা হয়ে আছে পশ্চিমাকাশে, তাদেরই মাঝখান দিয়ে গৈরিক আলোর ছায়া পড়েছে গঙ্গার জলে। ধুনি জ্বালিয়ে প্রজ্বলিত করা হল চন্দন কাঠের পবিত্র হোমাগ্নি। বেদমন্ত্রে সুরধুনীর তীর মুখরিত করলেন অগুনতি সন্তানরা। ঘি-মধু-তিল চিতায় ঢেলে আহুতি দিলেন। জ্বলন্ত অগ্নিশিখার কাছে দাঁড়িয়ে পুণ্যাত্মার আঁচ আর তাপ নিজেদের শরীরে গ্রহণ করলেন ত্যাগী সন্ন্যাসীরা। তারপর অন্তঃসলিলা গঙ্গার স্নিগ্ধ পবিত্র বারিতে জুড়নো হল চিতাগ্নি। সন্ধ্যাকাশের মেঘ চিরে তখন কয়েকটি তারা ফুটেছে, যেন সুদূর নক্ষত্রলোক থেকে কেউ আলোর ইশারা পাঠাচ্ছে মর্তবাসীর উদ্দেশে।

ওদিকে গাঢ় অন্ধকার আর নৈঃশব্দ্যে ডুবে রয়েছে উদ্যানবাটি। কান্নার রোল থেমে গেছে। নীড়ে ফিরেছে পাখির ঝাঁক। কীভাবে যেন শোকসন্তাপের বার্তা টের পায় মনুষ্যেতর প্রাণীরা। হাম্বা রবে ডেকেছে গোরু-গাভী, দোচেরা সরু গলায় ডেকে ডেকে ঝিমিয়ে পড়েছে পোষা কুকুরগুলো। মাত্র একটি বড় মাটির প্রদীপ জ্বলছে ঠাকুরের দোতালার ঘরে। আর সব অন্ধকার। বিসর্জনের পরে শূন্যমণ্ডপের চেহারা উদ্যানবাটির।

একতলায় একা নিজের ঘরে, সব হারানোর শোকে বেদনায় বিধ্বস্ত বিপন্ন বোধ করলেন স্বামীহারা মা সারদা। একাকিত্ব বৈধব্য নিঃসঙ্গতা অন্ধকার নৈঃশব্দ্য… সব যেন একসঙ্গে গ্রাস করল জয়রামবাটির তেত্রিশ বছরের নারীটিকে। দিশাহারা, বিভ্রান্ত, স্বজনহীন।

আর কে, আর কী রইল তাঁর জীবনে!

সেই গ্রাম্য পরিবেশে ডুরে শাড়ি পরতে পরতে বড় হওয়া, সেই মজার বিয়ে, তারপর দোলাচলের মধ্যে জয়রামবাটি-কামারপুকুর করতে করতে জ্ঞানচক্ষুর উন্মীলন, ম্যালেরিয়ার জ্বর নিয়ে দক্ষিণেশ্বর আসা…পূজায়-প্রেমে-ভালবাসায় ডুবে যাওয়া… নহবতে হাজার কষ্টের মধ্যেও সোনালি দিনরাত…সবই তো ওই একটি মানুষকে নিয়ে, তাঁকেই কেন্দ্র করে, তাঁর জন্যই। চলে গেল, চলেই গেল। আর কী হবে, কী কাজে লাগবে এ শরীরটা! তাঁর জন্য যে দুটি গলাভাত রান্না, কিংবা একটু সুরুয়া তৈরি তাও তো আর…।

ছাদ থেকে তিনকাঠের শিকেটা তো এখনও ঝুলছে, ফাঁকাই ওটা, ওপরে কিছু রাখা নেই। ঘরে দড়িদড়াও রয়েছে, নিদেন পুরনো শাড়ি-টাড়ি কিছু একটা পাকিয়ে নেওয়া যায়। দড়ির মতো বেঁধে নিয়ে, গলায় একটা ফাঁস লটকে ঝুলে পড়লেই তো…।

অর্ধ-বাহ্যজ্ঞানরহিতের মতো অন্ধকারে অবসন্ন দেহটা হাতড়ে হাতড়ে সরে গেলেন সারদা। কী হবে এ জীবন রেখে… একবার ঝুলে পড়লেই তো শেষ, সব তো শেষ হয়েই গেছে… কিছু নেই… দেখি তবে…।

অকস্মাৎ একটা তীব্র ঝাঁকানি খেয়ে চমকে উঠলেন সারদা। আর্ত অস্ফুট স্বরে বলে উঠলেন, কে? কে!

নিস্তব্ধ অন্ধকার। একটা যেন হিমেল হাওয়ার মৃদু স্পর্শ পেলেন সারদা। ঘুলঘুলি দিয়ে কেউ কি ঘরে এল! তা কী করে হয়! কিন্তু তিনি যেন কিছু একটা অস্তিত্ব অনুভব করছেন। কেউ একটা রয়েছে এ ঘরে।

চাপা কণ্ঠে আবার বাজলেন, কে? ঘরে কে?

মোলায়েম শান্ত কণ্ঠস্বরটি শোনা গেল মৃদু শব্দে।— বলি, মনে মনে ওসব কী ভাবছ? কী করতে যাচ্ছ?

কে? হ্যাঁ গো, তুমিই নাকি?

আমিই তো। আবার কে?

কিন্তু… কিন্তু তুমি যে…!

আমি কি কোথাও গেছি নাকি?

তবে, তবে যে সেই কাল রাত দেড়টায়… আজ ডাক্তারবাবু এসে রায় দিয়ে গেলেন…! ছেলেরা শ্মশানে নিয়ে গেল।

ওসব তো বাইরের চোখে দেখা গো! ওঠো, উলটোপালটা ভাবনা ছাড়ো… কত কাজ রয়েছে তোমার… কে করবে সব? শান্ত হও, ওঠো।

শেষের দিকের কথাগুলো যেন হাওয়ায় ভাসতে ভাসতেই উধাও হয়ে গেল; আর অন্ধকারে একটা ক্ষীণ আলোয় আঁকা হয়ে যাচ্ছে তাঁর মানুষীরূপ— বেশ দিব্যকান্তি, সেই আগের চেহারাটাই যেন… ফরসা রং, পরনে ধুতি, গলায় পৈতে…। মিলিয়েও গেল।

কেমন একটা আবেশে, দ্বিধায়, স্থাণুবৎ হয়ে রইলেন সারদা। আত্মনিধন করতেই যাচ্ছিলেন! হল না। হতাশায়-শূন্যতায়-বেদনায় তিনি কি আত্মবিস্মৃত হয়েছিলেন! হয়তো হওয়ারই কথা। তীব্র অসহায়তা একাকিত্বজনিত অবসাদ থেকেই তো একসময় মানুষ বেঁচে থাকার আর কোনও উদ্দেশ্য খুঁজে পায় না। জীবদ্দশা হয়ে দাঁড়ায় এক বেদনার বোঝা, কুরে কুরে খায় অদৃশ্য যন্ত্রণা। তারপর একসময় সব বোধগুলোই যেন উপশমের জন্য বিদ্রোহ করে, সহ্যের অতীত হয়ে টানতে থাকে অবোধ সিদ্ধান্তের দিকে, আহূতি জানায় মরণকে। মরণেই নিশ্চিন্তি, কষ্টের পরিসমাপ্তি।

চেতন আর অবচেতনের দোলায় ভাসতে ভাসতে সেদিকেই যে এগিয়ে যাচ্ছিলেন সারদা। কী হত তিনি না এলে! এসেছিলেন তো বটেই। কথাও বললেন, আলো-আঁধারিতে দেখাও দিলেন। এ কি প্রহেলিকা! সত্য, বাস্তব, নাকি স্বপ্ন! জেগে আছেন তো সারদা!

হ্যাঁ, জেগেই তো আছেন। ইন্দ্রিয়গুলো তো কাজ করছে।

ওই… ওই তো অনেকক্ষণ পরে শোনা যাচ্ছে মানুষের কণ্ঠস্বর… খোল-করতাল-খঞ্জনির শব্দ…পরমপিতার চিতাগ্নি নিবিয়ে বোধহয় ফিরে আসছে সন্তানরা…। আবার কি বৃষ্টি এল। একটু আলোর আভাস দেখা দিচ্ছে যেন মাঝে মাঝে! হ্যাঁ একটা গন্ধও নাকে আসছে… পোড়ামাটির প্রদীপে রেড়ির তেল দিয়ে সলতে জ্বালানোর গন্ধ। তাই তো… কতক্ষণ সময় কেটে গেছে, হাত-গলা-পিঠ জ্বালা-জ্বালা করছে। তাঁর কি বোধ ছিল না! কত মশা কামড়েছে! জিভটাও যে শুকিয়ে কাঠ!

কী করতে যাচ্ছিলেন সারদা!

চক্ষু-কর্ণ-নাসিকা-জিহ্বা-ত্বক পঞ্চেন্দ্রিয়র অনুভবে যেন বাহ্যদশায় ফিরে এসেছিলেন সারদা। লোপ পেয়েছিল সবকিছু। মস্তিষ্কের কোষে কোষে শূন্যতার বেদনা যেন আলেয়ার মতো মাত্র একদিকেই পথ দেখিয়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল, ফাঁস আর দড়ি দেখতে পাচ্ছিলেন। আর সমস্ত বোধ চলে গিয়েছিল। তোলপাড় চলতে চলতেই কখন শান্ত হয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন অবোধ সিদ্ধান্তের দিকে।

আত্মস্থ, স্বাক্ষরিত হলেন সারদা। আর সেই সঙ্গেই ফিরে এল শোক-স্মৃতি-কষ্ট। ঠিকই, হারানোর কষ্ট আর গভীর বেদনারই তো সময় এখন। অসাড় হয়ে গিয়েছিলেন বেশ কিছুক্ষণের জন্য। ইন্দ্রিয়বোধের সঙ্গেই সচেতন হলেন পার্থিব পরিবেশ সম্পর্কে। সহ্য, সহ্যই একমাত্র রাস্তা। পারতেই হবে। মাঝখানের অভিজ্ঞতার বিষয় আর কেউ জানবে না।

কিন্তু নিজের বিশ্বাসের কাছে স্থিতধী হলেন সারদা— তিনি আছেন। লৌকিকতার নিরিখে পাওয়া যাবে না। কষ্ট দুঃখ যন্ত্রণা অভাব তাচ্ছিল্য…এসব থাকবে, নিত্যসঙ্গী হয়েই লেগে থাকবে তাঁর দিনযাপনের সঙ্গে। কিন্তু অলৌকিক বিশ্বাস আর অনুভবে তিনি হারাননি।

তাই যদি হয়, তা হলে আর কীসের বৈধব্য!

যে মানুষটির সঙ্গে ইহকালের যাবতীয় সম্পর্কের জন্যই এয়োস্ত্রীর চিহ্ন ধারণ, বোধে আর অনুভবে তিনি যখন পরকালেও রয়ে গেলেন, তখন আর সব চিহ্নই বা মুছে দিতে হবে কেন! নিঃশব্দে নীরবে একাকী সারদা এক দুরন্ত দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি তো দেখেছেন— জয়রামবাটি, কামারপুকুর-কোয়ালপাড়া, এমনকী এই খাস কলকাতা শহরেও, মানুষ, বিশেষ করে মহিলারাও যেন কী নির্মম হয়ে ওঠে আর-একজন মহিলার পতিবিয়োগের পরে। ঘষে ঘষে সিঁথির সিঁদুর মুছে দেয়। বেদনা বিধ্বস্ত অসহায় বউটিকে চেপে ধরে ঠুকে ঠুকে ভেঙে দেয় হাতের শাঁখা পলা, খুলে নেয় গলার হার, কানের দুল, হাতের বালা। নিরাভরণ শরীরে জড়িয়ে দেয় একটা সাদা পাড়হীন থান কাপড়। এমনকী মাথার চুল পর্যন্ত ছেঁটে প্রায় নেড়া করে দিত। ব্যস, সংসারী ডগডগে বউটা একদিনের মধ্যে হয়ে গেল সবায়ের করুণার পাত্রী, অসহায়, শ্রীহীন-বর্ণহীন-নিরাভরণ-পাণ্ডুর একটা সাদা বিধবা, শখ আহ্লাদ শেষ, অবহেলা নিরানন্দের অকূল পাথারে অবসন্ন এক অস্তিত্ব মাত্র। শুধু শাস্তি নয়, যেন মরণের অধিক মরণ। কী! না, শুদ্ধাচার, সামাজিক বিধান।

অন্তরে শক্তি আহরণ করলেন সারদা। তাঁকে যেতে হবে অনেক দূর। উদ্যানবাটির নিভৃত কক্ষের অন্ধকারে, নীরবে একটি আন্দোলনের সূচনা করলেন। সদ্য স্বামীহারা, গ্রাম্য, তথাকথিত জৌলুসহীন, অ-কেতাদুরস্ত তেত্রিশ বছরের মহিলাটি নিঃশব্দে বিনয়ী বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন, যুগ যুগ ধরে সামাজিক নিয়মের নামে চাপিয়ে দেওয়া অমানবিক তথাকথিত নৈতিক বিধানের বিরুদ্ধে।

ঘরে একটি লম্ফ জ্বাললেন। হ্যাঁ, শুদ্ধাচার লোকাচার সবই তিনি মানবেন, কিন্তু তাঁর নিজের মতো করে।

অবশিষ্ট যা দু’-একটি শাড়ি ছিল, সেগুলি পেড়ে নিয়ে বসলেন। কারওর সাহায্য মতামত দরকার নেই, জীবনকে যেভাবে দেখেছেন, যেভাবে পেয়েছেন, অন্তরে যা বিশ্বাস করেন, তার ওপর নির্ভর করেই তাঁর সিদ্ধান্ত। সাদা খোলের লালপেড়ে শাড়ি ছাড়া এমনিতেও তিনি পরেন না। পাড়গুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে সরু করে নিলেন। ওগুলিই হবে তাঁর পরিধেয়। গা থেকে অলংকারও খুলতে লাগলেন একটা একটা করে। বুক ভাঙল, তাঁর স্মরণ হল। তিনি বলতেন, ও সারদা, সরস্বতী, সাজতে ভালবাসে। মনে পড়ল, বিবাহের সেই শুভরাত্রির কথা। মাত্র সাড়ে পাঁচ বছর বয়স তখন সারদার। তবু বিয়ের দিন বলেই মনে আছে এখনও। নিজেদের সামর্থ্য নেই, অথচ বউভাতের দিন সদ্যপরিণীতা বধূটির অঙ্গে অলংকার থাকবে না, কিছুতে সহ্য করতে পারছিলেন না চন্দ্রমণিদেবী। জমিদার লাহাবাবুদের বাড়ি থেকে চেয়ে আনলেন। অনুষ্ঠান শেষ হলে আবার ফেরত দিয়ে আসবেন।

কিন্তু একবার পরানো গয়না ওই ছুটকি বউ-এর গা থেকে কোন প্রাণে খুলে নেবেন শাশুড়ি! কেঁদে কেটে একশা করবে যে মেয়ে।

ভেবে আকুল হচ্ছেন চন্দ্রমণি। গদাধরই বাঁচাল।

এত ভাবছ কেন মা, ভোরবেলা ও যখন ঘুমিয়ে থাকবে, আমি একটা একটা করে সব অলংকার খুলে দেব। তুমি ফেরত দিয়ে এসো।

কিন্তু ঘুম থেকে উঠে মেয়ে যখন দেখবে…

চিন্তা কোরো না মা, ওই সব গহনাই আমি আবার ওকে গড়িয়ে দেব।

আজ সেইসব গহনাই খোলার পালা। বৈরাগ্য আর দুঃখের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিলেন সারদা। নাহ্, সব খোলার দরকার নেই। যেন ঠাকুর নিজেই আবির্ভূত হয়ে কানের কাছে ফিসফিস করলেন— আমি কি সত্যি সত্যি মরেছি, যে এয়োস্ত্রীর জিনিস সব খুলে ফেলছ?

হাতের রুলিটি রেখে দিলেন সারদা। গলায় সরু সোনার হারটিও রয়ে গেল। তাঁকে তো হারাননি সারদা। ঠাকুরের নিত্যলীলার যখন বিরাম নেই, তখন মায়েরই বা সত্যিকারের বিচ্ছেদ কোথায়! মনে মনে তো চিরসবাই তিনি। তাই থেকে গেলেন।

খুটখাট শব্দাশব্দি, আলোর রেখা দেখে, পা টিপে টিপে সারদার ঘরে উঁকি দিয়ে দেখে গেলেন গোলাপমা। স্থিরনিশ্চিন্ত হলেন, মা একটি নিজস্ব সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। শত কষ্টের মধ্যেও একটি স্বস্তির শ্বাস ফেলে ঘর থেকে নিষ্ক্রান্ত হলেন গোলাপমা।

ওদিকে ছেলেরা ফিরে এসেছে। ঠাকুরের নির্বাপিত চিতা থেকে ভস্ম আর অস্থি মাথায় করে নিয়ে এসেছে, রাখা হয়েছে তাঁরই শয্যায়। লোকাচারের বন্দোবস্ত করছেন বলরাম, রামচন্দ্র। যথারীতি সারদার জন্য কিনে এনেছেন থান কাপড়। গোলাপমা-র হাতে দিলেন।

এটা কী? কার জন্য বাবা?

বলরাম বসু প্রিয়তম ভক্ত ঠাকুরের, মায়েরও প্রিয় সন্তান। নিজে থেকে আচার-আয়োজনের দায়িত্ব নিয়েছেন। বললেন, মা-কে দিন, তাঁর জন্যই…।

বাপরে! বলে আঁতকে উঠলেন গোলাপমা।— এই সাদা থানকাপড় কে তাঁর হাতে দিতে যাবে?

বিভ্রান্ত বলরাম তাকিয়ে ছিলেন। একটু পরে বললেন, তা হলে কি মার জন্য…!

গোলাপমা বললেন, ভেবো না বাবা, মা নিজেই ঠিক করে নিয়েছেন—এবার থেকে তিনি কী পরবেন। অপেক্ষা করো, দেখতে পাবে।

সত্যি সত্যি নিজেকে সাব্যস্ত করে একটু পরে ঘরের বাইরে এলেন শোকস্তব্ধা সারদা। হাজার দুঃখ দুঃসময়ের মধ্যেও সময়োচিত আচরণ বিস্মরণ হননি তিনি। টের পাচ্ছিলেন, ছেলেরা, ভক্তরা শ্মশান থেকে ফিরে আসার পরে একবার তাঁর বাইরে আসা উচিত। নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে যেমন সকলকে অবহিত করা উচিত, তেমনই তাঁর ভূমিকারও আভাস দেওয়া দরকার।

পায়ে পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ঠাকুরের ঘরে গেলেন সারদা। পূতাস্থিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম নিবেদন করলেন। অশ্রু সংবরণ করে নীরবে নিজের কক্ষে ফিরে এলেন। স্বামীর দেহরক্ষার পরে, তাঁর ব্যক্তিমানসের আচরণ সিদ্ধান্ত চাক্ষুষ করলেন উপস্থিত শিষ্যশিষ্যা, ভক্তরা। নেহাতই স্বাভাবিক এবং করণীয় একটি আচরণ, কিন্তু লোকশিক্ষার একটি সংকেত রেখে গেলেন সারদা। যুগে যুগে সমাজের পুরোহিত, ধর্মধ্বজাধারীরা অবশ্য-পালনীয় আচারের নামে যেসব অবান্তর নিয়ম, অত্যাচার বিধবা নারীদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিলেন, নীরবে তাকেই যেন নস্যাৎ করে গেলেন। একইসঙ্গে তাঁর নিজস্ব উপলব্ধি আর নম্র ব্যক্তিত্বেরও পরিচয় রাখলেন। ভক্ত-শিষ্যরা দেখল।

কিন্তু শোকের আঘাত আর নিঃসঙ্গতাকে সহনশীল করে নেওয়ার জন্য সময়ের দরকার ছিল সারদার। সবকিছু যে আর আগের মতো চলবে না, থাকবে না, এই বাস্তববোধ তাঁর ছিল। ঠাকুরের অবর্তমানে তাঁর অনুগত ভক্ত শিষ্যরাও আর কতখানি নিষ্ঠ, নিবেদিত থাকবেন, এ প্রশ্নও তাঁর মাথায় যাতায়াত করছিল। শ্রদ্ধা-ভক্তি সবকিছুই মানুষের হৃদয়সঞ্জাত এক নিবিড় আবেগ। ঠাকুর মানুষটির জীবনাচরণে যাঁরা দেবত্ব আরোপ এবং অনুভব করেছেন, মানুষটি অপ্রকট হওয়ার পরে, সবাই কি একইরকমভাবে সেই অনুভূতি ধরে রাখতে পারবেন! চোখের সামনে হেঁটে চলে বেড়ানো ঠাকুর আর ভাবের ঠাকুরের মধ্যে তফাত আছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে সেই তফাত অনুভূত হওয়াটাই স্বাভাবিক, এবং তফাত থেকে দূরত্ব, দূরত্ব থেকে উদাসীনতা… সম্ভাব্য এসব বিষয় যাতায়াত করছিল সারদার মনে। অনুমান করছিলেন, দিনে দিনে ঠাকুরের স্মৃতিও শীতল হবে, সংসারী মানুষ ডুবে যাবে দিনগত কাজকর্মে। একটি আধ্যাত্মিক ভাবধারা আর জাগরণের সূচনা মানুষটি অবশ্যই করে দিয়ে গেছেন, কিন্তু স্বতঃস্ফূর্ত প্রেরণায় কতজন ধারাপ্রবাহটি অক্ষুণ্ণ রাখতে পারবে!

এই অবস্থার প্রেক্ষিতে তাঁর নিজের ভবিষ্যতের ছবিও কি দেখছিলেন না সারদা! উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা? অনিশ্চয়তা-অসহায়তার কথা ভেবে কোথাও কি দীর্ণ হচ্ছিলেন না! সংশয়-আশঙ্কা যাতায়াত করছিল না মাথার মধ্যে?

মা-ডাকে অবশ্যই তিনি সম্মানিত হয়ে আসছেন বিগত অনেক বছর ধরে। কিন্তু তার ভাবালুতা আর মানুষের নেতিবাচক মনের কিছু কিছু পরিচয়ও কি কখনও কখনও পাননি! হয়তো ব্যতিব্যস্ত হতে হয়নি। কারণ তিনি ছিলেন মানুষটির ছত্রচ্ছায়ায়।

সাদা চোখে সেই ছাতাটি এখন অদৃশ্য। কিন্তু রোদ-জল-ঝড়ের ঝাপটা নিয়ে তাঁর জীবনতরীটি এরপরেও বাইতে হবে।

না, সাধারণ অসহায় পতিহীনা নারীর মতো ভেঙে পড়লেন না সারদা। বিশ্বাসী মানুষের শক্তি আর সমর্পণ তাঁর পাথেয়। তিনি জানেন, ঠাকুর শরীরপ্রাপ্ত না থেকেও তাঁকে ভাসিয়ে দিয়ে যাননি। আধারটি পূর্ণ করে দিয়ে গেছেন যে শক্তি প্রীতি আর লাবণ্যে, বাস্তব জীবনের দুঃখকষ্ট, কঠোরতা যত তীব্র হয়েই আসুক, উত্তরণ আর সন্ধানের ঠিকানা তাঁর অধরা হয়ে থাকবে না।

প্রায় কৃচ্ছ্রসধনের মধ্যে দিয়ে সারদা অতিবাহিত করলেন আর একটি দিন।

তৃতীয় দিনের ভোরে উঠে স্নান সারলেন। নিঃশব্দে দোতলার ঘরে গিয়ে তাঁকে প্রণাম করে নেমে এলেন। মনে মনে যা আশা করছিলেন, তারই আভাস ইঙ্গিত পেতে লাগলেন। প্রাণীর মধ্যে আছে একটি মহাপ্রাণী। পেটে দুটি ভাত না পড়লে মহাপ্রাণীটি বাঁচে না। শোক-দুঃখও ফিকে হয়ে আসে পেটে টান পড়তে পড়তে। খিদেয় মানুষ পাগল হয়ে যায়। এই সারসত্যটি তিনি অল্প বয়সের অভিজ্ঞতাতেই টের পেয়েছিলেন। মনে পড়ে, দুর্ভিক্ষের সময় বাগ্‌দিদের সেই মেয়েটার কথা। শুকিয়ে থাকতে থাকতে সে-ও পাগল হয়েছিল। গোরুর কুঁড়ো ভেজানো ডাব্বা থেকে দু’হাতে তুলে খেতে শুরু করেছিল। সেসব দিনের কথা কি ভোলা যায়!

গোলাপমা-লক্ষ্মী-হরির মা-রা আয়োজন শুরু করেছে সারদা বুঝতে পারলেন। আবার এটাও অনুমান করলেন, তিনি গিয়ে না দাঁড়ানো পর্যন্ত কেউ যেন ঠিক পুরো জোর পাচ্ছে না, সিদ্ধান্ত নিতে ইতস্তত করছে। কিছুটা যেন সংকোচে বাধছে।

ঘরের বাইরে এলেন সারদা। সবায়ের কথাই তো ভাবতে হবে। ছেলেগুলো উড়নচণ্ডীর মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। উপোসি চোখমুখ বসে গেছে, সেটা এক ঝলক বাইরে গিয়েই শশী-শরৎ-লাটুকে দেখে বুঝেছেন। ওদেরই তো আরও বেশি কষ্ট। ঘরবাড়ি ছেড়ে এসেছে, যাওয়ার জায়গা নেই কোথাও।

গৃহস্থদের ঘরবাড়ি আছে, বাড়িতে গিন্নি আছে। যাতায়াত করলেও ওদের পেটে চড়া পড়ে নেই।

বাইরে আসতেই ভেজা ঘুঁটে-কয়লার উনুন থেকে ধোঁয়ার ঝাঁঝ-গন্ধ আর ঝাপটা লাগল সারদার নাকে মুখে। উদ্যানবাটির রান্নাঘরটি একটু একটেরে, উত্তরদিকের সীমানা পাঁচিলের সঙ্গে লাগোয়া, মূল দোতালা বাড়ি থেকে একফালি রাস্তা পেরিয়ে যেতে হয়। তবু একতলার মুখোমুখি বলেই সুবিধে। মুখের সামনে কাপড় চেপে রান্নাঘরের বারান্দায় এলেন সারদা।

আজ বৃষ্টিটা ধরেছে। তা হলেও ধূসর মেঘের আনাগোনা আকাশে। ভেজা ভেজা ভাবটা কাটেনি। ম্লান আলোয় মিয়নো সকাল। তাঁর মধ্যেই কাকপক্ষীও উড়ে এসে বসেছে গাছের ডালে, ঠোঁট দিয়ে খুঁটছে ভেজা পালক, ডানাপাখনা। ধোঁয়া-ধোঁয়া হয়ে রয়েছে বাইরেটা।

সারদাকে দেখে একটু অবাক হলেও, যেন খুশিতে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল লক্ষ্মী আর গোলাপমা। অবাক ওরা মায়ের স্নান সারা অপেক্ষাকৃত ঝরঝরে চেহারা দেখে। বেশ পরিবর্তনে একটু ধাক্কা তো লাগবেই, তবু নিশ্চিন্তও লাগল। বঁটি আর আনাজ-সবজি ফেলে তাড়াতাড়ি বারান্দায় বেরিয়ে এলেন।

গোলাপমা হাত ধরে ডাকলেন, এসো মা, ঘরে এসে বোসো।

চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখলেন সারদা। মাত্র দিন তিনেকেই যেন কত পালটে গেছে উদ্যানটির পরিবেশ, পারিপার্শ্বিক। একটা দীর্ঘশ্বাস উঠে আসছিল। চেপে রাখলেন। গোলাপমা তার মধ্যে বললেন, পরশু থেকে তো হেঁশেল বন্ধ মা… দেখছি যদি কিছু ব্যবস্থা করা যায়…।

হ্যাঁ, সে তো করতেই হবে। সারদা বললেন স্বগতোক্তির মতো। আবার যোগ করলেন, তো ব্যবস্থা করার জোগাড়যন্ত্র কিছু আছে?

গোলাপ বললেন, যা আছে তাই দিয়েই… দেখছি কী করা যায়।

লক্ষ্মী বলল, ভক্তরা অনেকেই তরিতরকারি চালডাল ফলমূল দিয়ে গ্যাছে মা। পড়ে পড়ে সব শুকোচ্ছে। রামবাবু তো কালকেও আধমন চালের বস্তা আর এক কৌটো ঘি পাঠিয়ে দিয়েছেন। বলরামবাবুও চিঁড়ে-খই-এর ঠোঙা আর দই-এর হাঁড়ি দিয়ে গেছেন কাল বিকেলে।

সারদা বললেন, তা তো দেবেনই মা… উপোসি হয়ে মানুষ আর ক’দিন কাটাবে! ওঁরা সেসব মাথায় রেখেছেন।

গোলাপমা কিঞ্চিৎ উৎসাহিত হয়ে বললেন, বটেই তো। আপনি বাঁচলে তবে না…। কথাটা অসম্পূর্ণ রেখেই থামলেন। তারপর বললেন, তুমি এসেছ মা, সবাই একটু ভরসা পাবে। চলো, ঘরে তুমি গিয়ে বসলেই… দ্যাখো না।

রান্নাঘরে ঢুকতে গিয়েও সারদা দাঁড়ালেন। বললেন, ঘরে গিয়ে বসব? কিন্তু উনুনটাই যে ধরেনি এখনও।

শঙ্করী এসে পৌঁছেছে সারদাকে দেখে। বলল, দ্যাখো দিকিনি মা, ঘুঁটে কয়লা সব ভিজে একশা, কাঠও সেঁতিয়ে আছে। কী করে উনুন ধরবে! আর কতই বা ক্যারাসিন ঢালব! ওদিকে ধোঁয়ায় ধোঁয়া হচ্ছে।

লক্ষ্মী বলল, আর একটু থাক, তারপর ধরবে। তুমি ভেতরে এসো মা।

সারদা দোনামনা করলেন। বললেন, অতবড় তোলা উনুন… ওভাবে ধরবে না গো। এদিকে এসো তো মা, এককাজ করো। লক্ষ্মী আর গোলাপমা-র দিকে ফিরে বললেন, তোমরা যাও রান্নাঘরে। আমি উনুনটা একবার দেখে আসি।

শঙ্করীকে আবার বললেন, সিঁড়ির নীচে গিয়ে দ্যাখো তো মা, পাটের ফেঁসো আছে, আর দ্যাখো ডাঁই করা পুরনো কাগজ আছে। নিয়ে এসো দেখি।

শঙ্করী পাকা বাড়ির ভেতর গেল। সারদা এসে দেখতে লাগলেন উনুনের অবস্থা। ওপরে চুর করে কয়লা দেওয়া, আগুনের দেখা নেই। নীচে কেরোসিনে আধজ্বলা ঘুঁটে— তার থেকে শুধু ধোঁয়াই বেরুচ্ছে, কয়লা ধরার নাম নেই।

টিনের বড় বালতি কেটে তারওপর কাদামাটি লেপে উনুন বানানো হয়েছে। নীচের দিকে বালতির গায়ে একটা বড় কাটা গর্ত। দু’পাশে টিন ছ্যাঁদা করে করে লোহার শিক লাগানো। তারওপর সাজানো ঘুঁটে নীচেয়, ওপরে কয়লা। ভাল করে ঘুঁটেই যদি না ধরে, কয়লা জ্বলবে কী করে!

পাটের ফেঁসো আর কাগজ নিয়ে এল শঙ্করী। সারদা বললেন, দাও দেখি আমার হাতে।

উনুনের সামনে উবু হয়ে বসলেন সারদা। কাগজ আর পাট জ্বালিয়ে বালতির নীচের কাটা গর্ত দিয়ে ভিতরে গুঁজে গুঁজে দিতে লাগলেন। শঙ্করীকে বললেন, ওপর থেকে কয়লা কিছু কমিয়ে দাও তো মা। একটু হালকা হলে আগুনটা ওপরে উঠবে।

নীচে থেকে আগুন পেয়ে ঘুঁটে-কয়লা ধরতে শুরু করল। প্রথমে ধোঁয়া ওঠা বেড়ে গেল দেখেই সারদা বুঝলেন—কাজ হয়েছে। একটু পরেই আঁচ উঠবে।

শঙ্করীকে বললেন, তুমি বোসো এখানটা। আর বেশি আগুন দিয়ো না। ধোঁয়াটা কমে এলে ওপর থেকে দেখো আঁচ উঠছে কি না।

হেঁশেলের ভেতরে এলেন সারদা। দেখলেন জিনিসপত্রের সত্যি তেমন অভাব নেই, কিন্তু গোছগাছের অভাব। দু’-তিনদিন অব্যবহৃত পড়ে থাকায় রান্নাঘরের মধ্যেও কেমন একটা বদ্ধ বদ্ধ ভাব। আগে সব জানালা-দরজা খুলে একটু আলো হাওয়া আসতে দেওয়া দরকার, মেঝে-টেঝে মোছা দরকার। সব কাজ এই গোটা কয়েক মেয়ে-বউ পারবে না, ছেলেদের ডেকে পাঠাতে হবে। জলতোলা ঝাঁটদেওয়া থোয়াধুয়ি আছে।

হরির মাকে ডেকে সারদা বললেন, একবার ওপরে গিয়ে শরৎ আর নাটুকে ডেকে নিয়ে এসো তো মা। বোলো আমি ডাকছি।

ঘণ্টাখানেকের মধ্যে নিথর নৈঃশব্দ্যে ডুবে থাকা উদ্যানবাটিতে শুধু প্রাণের স্পন্দন নয়, কিছুটা কর্মচাঞ্চল্যও ফিরে এল। আবহাওয়াও খানিকটা বাঁচিয়েছে। রোদ ওঠেনি বটে, কিন্তু বৃষ্টি হয়নি বলে একটু শুকোরুখো ভাব ফিরে আসছে। মোটামুটি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে, স্নান সেরে কাজে নেমেছে বেশ কয়েকজন। উনুনটাও ধরে এসেছে, কিন্তু অতগুলো মানুষের দুপুরের খাওয়ার আয়োজন শুধু ওই একটা উনুনে হবে না। শঙ্করী আর একটা ধরাবার ব্যবস্থা করছে।

সারদা রান্নাঘরে গোলাপমাকে বললেন, দুপুরের ব্যবস্থার জন্য তাড়াহুড়ো কোরো না, সময় আছে। তার আগে দেখি যদি একটু জলখাবার করা যায়—দু’দিন তো কারওরই পেটে কিছু পড়েনি… না খেয়ে কাজকর্মই বা করবে কী করে!

লক্ষ্মী তাড়াতাড়ি বলল, তা হলে মা লুচি কিংবা রুটি-তরকারির ব্যবস্থা করব?

ইতিমধ্যে স্নান সেরে লাটু এসে পৌঁছেছে। বিহারের ছাপরা জেলার অধিবাসী ছিল লাটু। ঠাকুরের টানে আট-দশ বছর আগে দক্ষিণেশ্বর এসে ভাবের ভিয়েনে সেই যে আটকে পড়ল, আর ফেরেনি। বরাবর সারদার সঙ্গেই ওর সম্পর্ক বেশি অবশ্য। নহবতে লাটু ছিল মা-এর সহকারী। ভাঙা ভাঙা হিন্দি-বাংলা মিশিয়ে কথা বলে লাটু, অন্য একটি আবেদন আছে ওর উচ্চারণের। অতি সরল এবং কর্মঠ ছেলে। ওর আচরণ-চেহারা-কথাবার্তা সবেতেই কিঞ্চিৎ অদ্ভূত ব্যতিক্রম আছে। সেই কারণে নরেন নামকরণও করেছে অদ্ভূতানন্দ।

লক্ষ্মীর কথায় উৎসাহিত হয়ে লাটু বলল, সে বেওস্থা হলে, আমি তো আছিই মা-এর এসিসট্যান্ট। নোহবতে কত্ত ময়দা মাখলুম।

সারদা একটু ভেবে নিয়ে বললেন, তা করা যায়… তবে আজই আর অত ভারী কাজের কী দরকার বাবা? লক্ষ্মীকে বললেন, তুই রং এক কাজ কর মা, খই চিঁড়ে মুড়ির ঠোঙাগুলো আগে নামা। দই মধু গুড় সবই রয়েছে। কলাইয়ের গামলায় বেশি করে ফলার মাখ। ঠাকুরকে ভোগ দিয়ে আগে সবাই পেটে কিছু দিক, তারপর কাজকর্ম করবে।

সেই ব্যবস্থাই হল। উদ্যানবাটির সকলেই প্রসাদ পেল, মালি দারোয়ানও বাদ গেল না। এমনকী সারদা নিজে কিছু মুখে তোলার আগে বাগানের কাকপক্ষী, বেড়াল কুকুরকেও শালপাতায় করে প্রসাদ দিতে বললেন।

একটু একটু করে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসতে লাগল কাশীপুরের বাগানবাড়িতে। ঠাকুর নিজে অপ্রকট হলেও, কখনওই চাননি, জীবনের সুস্থ স্বাভাবিক ছন্দটি ব্যাহত হোক। সন্তানদের বরাবর সেই শিক্ষা দিয়েছেন, মাকেও রেখে গেছেন জীবনপ্রবাহের ধারাটিকে সদা বহমান, চালু রাখতে। তাঁর অভাবজনিত বেদনা যাঁর এবং যেখানে অনুভূত হওয়ার ঠিকই হচ্ছে, তথাপি পরিবেশটি মালিন্যহীন হওয়াও প্রয়োজন।

মধ্যাহ্ন ভোজনের নানান পদ রান্নাও বাতিল করে দিলেন সারদা। হরির মা-শঙ্করী-মানদাও খুশি হল।

গোলাপমা লক্ষ্মীকে বললেন, দুটো বড় ডেকচিতে চালে-ডালে মিশিয়ে খিচুড়ি বসিয়ে দিলেই ভাল, তার মধ্যে আলু-কুমড়ো-বেগুন বরবটি যা যা আনাজ তরকারি আছে দিয়ে দাও। গরম গরম খিচুড়ির ওপর একটু করে ঘি দিয়ে দিয়ো। দেখো, দু’দিন প্রায় উপোসি থাকার পরে ওই প্রসাদই মহাপ্রসাদ মনে হবে। আজ আর কেউ বেশি খাটুনি খাটতে যেয়ো না। প্রসাদ পাওয়ার পরে দুপুরে সবাইকে একটু গড়িয়ে নিতে বোলো। আস্তে আস্তে সবাইকেই তো কাজে নামতে হবে এরপর।

যথারীতি দুপুরে ভোগ নিবেদিত হল দোতালায় ঠাকুরের ছবির সামনে। তারপর পঙ্‌ক্তি ভোজনে তৃপ্ত হল উদ্যানবাটির বাসিন্দারা। সারদা নিজে বসে থেকে সব দেখাশোনা করলেন। সবশেষে তাঁকে স্মরণ করে নিজেও প্রসাদ গ্রহণ করলেন। তৃতীয় দিনে ভরাপেটে সকলেই বিশ্রাম করলেন কিছুক্ষণ। অপরাহ্ণ থেকে কিছুটা সুস্থ স্বাভাবিক আমেজ ফিরে এল।

তিনদিনের মধ্যে বাইরের মানুষের যাতায়াত অপেক্ষাকৃত কমে গেছে। তবে গৃহী আর প্রবীণ ভক্তরা যাতায়াত করছেন উদ্যানবাটিতে। ঠাকুর দেহ রাখলেও তাঁদের দায়িত্ব শেষ হয়নি। একেবারে গোড়ার দিকে মথুরবাবু থেকে শুরু করে শম্ভুচরণ, ত্রৈলোক্য অনেকেই সময় সময় ঠাকুরের রসদদার হয়েছিলেন। এখন অবস্থার কিছু পরিবর্তন হলেও বলরাম-সুরেশ-সুরেন-গিরিশ-দেবেন্দ্র বেশ কয়েকজন মিলে ভাগাভাগি করেই খরচপত্র চালিয়ে আসছেন বিগত বেশ কয়েকমাস ধরে। নরেন-শশী-রাখাল-যোগেন প্রমুখ যুবক শিষ্যরা ঠাকুরের ছায়াসঙ্গীর মতো দিনযাপন করলেও, আর্থিক দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষমতা কারুরই নেই, বরং ঠাকুরের বড় সংসারের প্রত্যক্ষ সদস্য হিসেবে, প্রকৃতপক্ষে পোয্য হয়েই রয়েছে যুবকরা। সুতরাং ঠাকুর দেহ রাখলেও, খরচপত্র সবই আগের মতোই রয়েছে।

কিন্তু অবস্থাটি কতদিন চলবে কিংবা চলতে পারে, তা নিয়ে যে কিঞ্চিৎ ভাবনার দোলাচল শুরু হয়েছে, সারদাসহ অনেকেরই সেটি না বোঝার কোনও কারণ নেই। গৃহীরা তো ভাবছেন বটেই, ভাবছে ছেলেরাও। কিন্তু দুই গোষ্ঠীর ভাবনায় ফারাক আছে। প্রবীণ আর গৃহী ভক্তদের ভাবনার একটি বাস্তব এবং গার্হস্থ্য দিক আছে। যে ঠাকুর মানুষটিকে নিয়ে এবং যাঁর জন্য তাঁদের উন্মাদনা ভক্তি এবং এতদিনের বদান্যতা, সেই মানুষটিই যখন মর্ত্যলোক ত্যাগ করলেন, তখন তাঁরাই বা আর কতদিন ঠাকুরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বৃহৎ সংসারটির দায়দায়িত্ব খরচপত্র টানতে পারবেন! কেউ কেউ এমনও ইঙ্গিত দিয়েছেন, কেনই বা টানবেন তাঁরা! কোন দায়ে!

ভাবনাটির যুক্তি নেই তা নয়। কিন্তু যুবক শিষ্যদের মাথায় আরও কিছু অতিরিক্ত স্পর্শকাতর বিষয় যাতায়াত করছে।

এই কাশীপুর উদ্যানবাটিতেই ঠাকুর তাঁর ভাবান্দোলন, আধ্যাত্মিক চেতনা এবং কর্মকাণ্ড আগামী দিনের মানুষের হিতার্থে সুদূরপ্রসারী করে তোলার নিমিত্ত, প্রায় অঙ্কুরের মতোই একটি সাংগঠনিক প্রয়াস উদ্দীপিত করে দিয়ে গেছেন। ঘর ছেড়ে আসা দশ-বারোটি তাজা এবং মহৎ উদার প্রাণের ছেলেকে তিনি কয়েকমাস ধরে পাখি পড়ানোর মতো করে ধর্ম, মনুষ্যত্ব এবং সন্ন্যাসের দীক্ষা দিয়েছেন। দেখে আসছিলেন কয়েক বছর ধরেই, অতঃপর আধার চিনতে চিনতেই চূড়ান্ত নির্বাচনটাও সেরে ফেলেছিলেন।

নিজের শারীরিক অবস্থা এবং পরিণতি তো মানুষটা জানতেনই। আপাত-অনুপযুক্ত সময়টাই যে ঠিক, সেই সচেতনতা এবং বিচক্ষণতা তাঁর ছাড়া আর কার থাকবে! ইতিমধ্যে অন্তঃপুরবাসিনী স্ত্রীলোকটির ভবিষ্যৎ ভূমিকাও নিখুঁত পড়ে নিয়েছিলেন। শ্রীমান নরেন্দ্রনাথ দত্ত ছেলেটিকেই নেতা নির্বাচন করলেন একটি আপাতসরল অথচ সুদুর সন্ধানী সংক্ষিপ্ত বাক্যে—তুই আর আমি কি আলাদা! অতঃপর, উদ্যানবাটির খোলা আকাশের নীচে গেরুয়া হাতে তুলে দিলেন নরেন্দ্র-বাবুরাম-শশী-রাখাল-লাটু-নিরঞ্জন-গোপাল… গুনে গুনে বারোটি নির্ভীক ভাবসন্তানের উপর। তিনিই জানতেন, মনুষ্যকল্পিত স্বর্গে তখন পুষ্পবৃষ্টি আর শঙ্খধ্বনি হয়েছিল। সঙ্ঘের গোড়াপত্তন করে দিয়েছেন পরমহংসদেব। আর কিছু নেই, ভবিষ্যৎ জানা নেই। অজস্র নেই-এর মধ্যেই মহীরুহের সুপ্ত বীজ রেখে দিয়েছেন ঠাকুর।

যুবকরা ভাবলেন, তিনি দেহ রাখতে না-রাখতেই এত দ্রুত ছেড়ে চলে যেতে হবে উদ্যানবাটি! আর একটু ধাতস্থ হওয়ার সময় পাওয়া যেতে পারে না? শোক কাটিয়ে ওঠেননি কেউ। কী ব্যবস্থা হবে মা জননীর! কোথায় গিয়ে থাকবেন?

দোনামনা করছেন সুরেন-বলরাম।

ছেলেরা বলল, অন্তত আর কয়েকটা মাস ভাড়াবাড়ি হিসেবে উদ্যানবাটি ধরে রাখা যায় না? একটু থিতু হোন মা। আর কিছুদিন অন্তত ঠাকুরের অস্থি সংরক্ষিত থাকুক এখানে।

ভ্রু তুলে উদাস নিরুত্তর হয়ে রইলেন প্রবীণরা। অবিনাশ-দেবেন্দ্র-মহিমা-বিশ্বনাথ মুখ চাওয়াচাওয়ি করছেন। কেউ একটা মন্তব্য করলেন, লাভ কী? এ বাড়ি তো ছেড়ে দিতেই হবে।

এখনও তো এক বছরও হয়নি। ঠাকুর যদি সশরীরেই থাকতেন!

সে প্রশ্ন ওঠার আর অবকাশ কোথায়!

কিন্তু ঠাকুরের অংশ নিয়েই তো মা রয়েছেন।

তাঁর একটা অন্য কিছু ব্যবস্থা করতে হবে।

তাঁর জন্যও তো কিছুদিন সময়ের প্রয়োজন।

সম্ভব নয়। এ মাসের শেষ পর্যন্ত বাড়ি ভাড়া নেওয়া আছে। মেয়াদ ফুরিয়ে গেলেই ছেড়ে দেওয়া হবে।

অর্থ-সামর্থ্যহীন বিপন্ন যুবারা পরস্পরের দিকে তাকাচ্ছে। তাদের কোনও আশ্রয় নেই। তা নাই থাকুক, ভিক্ষার পরামর্শ ঠাকুর তো দিয়েই গেছেন। অতএব ‘ভোজনং যত্রতত্র, শয়নং হট্টমন্দিরে’— এভাবেই তাদের দিনগুজরান হবে। কিন্তু কোথায় যাবে ঠাকুরের অস্থিভস্ম! মা কোথায় যাবেন! দুর্ভাবনার অকূলপাথারে পড়ে ঠাকুরের প্রয়াণের মাত্র তিনদিন পরেই বোঝা গেল সচ্চিদানন্দঘন উত্তরণের যে তরীটি ঠাকুর ভাসিয়ে দিয়ে গেছেন, বাস্তব প্রতিকূলতার জালে আটকা পড়ে, এখনই তার ডুবুডুবু অবস্থা। যাদের পায়ের নীচে দাঁড়াবার মতো জমি নেই, তাদের সাহস আর সততা-নির্ভর যত স্বপ্নই থাকুক, তার ঘোর কাটতে সময় লাগে না।

আর যাঁদের ক্ষমতা-অৰ্থ-সামর্থ্য আছে, বোঝা যাচ্ছে স্পষ্টতই— হয় তাঁরা ক্লান্ত, নয়তো ঠাকুরের সংসার আর টানতে অনিচ্ছুক। আবার কেউ কেউ বিভ্রান্ত, দ্বিধান্বিত। দ্রুত কোনও একটা সিদ্ধান্ত নিতে ইতস্তত করছেন। ঠাকুরের ভাব প্রেম ত্যাগ, উচ্চমার্গের চিন্তাধারা, আধ্যাত্মিক বোধের আকর্ষণে তাঁরা সামিল হয়েছিলেন ঠিকই, যথাসম্ভব অবলম্বনও দিয়েছেন, হয়তো এখনও তাঁর দেখানো পথের সমর্থক। কিন্তু সম্ভাব্য পরিণতির দোলাচলও তাঁদের মনে ক্রিয়াশীল। তাঁরা ঝুঁকি নেবেন কি না বুঝে উঠতে পারছেন না। গার্হস্থ সংসারী মানুষদের জীবনবোধই সম্ভবত অমন। ভালবাসার আবেগে তাঁরা উদ্বেলিত চিত্তে এগিয়ে যান, উৎসটি অপ্রকট হলেই, আবেগটিকে মোহ বলে চিনতে পারেন। তখন এগোতে দ্বিধা করেন।

একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে গেল। উদ্যানবাটি রাখা, না-রাখা কিংবা ভবিষ্যতে ঠাকুরের ভাবধারা প্রচার প্রসারের কী হবে না-হবে পরের কথা, কিন্তু মতপার্থক্যের একটি অদৃশ্য প্রাচীর গড়ে উঠেছে ঠাকুরের অল্পবয়সি সন্ন্যাসী ভক্ত আর বয়স্ক গৃহী শিষ্যদের মধ্যে। মাত্র দু’দিন আগেই উদ্যানবাটির গাড়িবারান্দার নীচে, ঠাকুরের অন্তিমযাত্রার আগে তাঁর শয্যা ঘিরে যাঁরা একত্রে ফোটো তুলেছিলেন, আজ তৃতীয় দিনের অপরাহ্ণেই তাঁরা প্রায় দুটি শিবিরে বিভক্ত।

আভাসে আর অল্প কিছু কথা কানে আসায় পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল সারদা। ঠাকুরের ত্যাগী শিষ্যরা তাঁরও সন্তান এবং প্রবীণদের তুলনায় তাদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগও বেশি। বাস্তব অবস্থায় তাঁর খুব একটা কিছু করার নেই। অবস্থা যদি তেমনই দাঁড়ায় তিনি কামারপুকুরে স্বামীর ভিটেবাড়িতে ফিরে যাবেন— এমন মানসিক প্রস্তুতি সেরে রেখেছেন।

ছেলেরা মায়ের ভাবনা সম্পর্কে সচেতন। কিন্তু ঠাকুরের অস্থিভস্মের আধারটি কী করা হবে! একমাত্র ওই তাম্রকলসটিই এখনও পর্যন্ত প্রত্যক্ষভাবে ঠাকুরের চিহ্ন বহন করছে। পুণ্যাত্মার প্রতীক ওই আধার, পূজিত হচ্ছেন। কোথায় রাখা হবে তামার কলসি? ঠাকুরের পার্থিব শরীরের অংশ, অস্থি রয়েছে যার মধ্যে, তাঁর বিন্দুমাত্র অবহেলা প্রাণ থাকতে সহ্য করবে না ত্যাগী ছেলেরা।

কে কোথায় যাবে না-যাবে ঠিক নেই, সুতরাং আধারটি নিয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু হয়েছিল আগেই। তখন যুবক সন্ন্যাসী আর গৃহীরা একমত হয়েই স্থির করেছিলেন, পুণ্য ভাগীরথীর তীরে অন্তত একখণ্ড জমি কিনে ঠাকুরের অস্থিভস্মের কলসি যথানিয়মে সংরক্ষিত এবং সমাহিত করা হবে। সকল স্তরের মানুষেরই যেন শ্রদ্ধা নিবেদনের সুযোগ থাকে।

কিন্তু একটি প্রসঙ্গ ঊহ্য ছিল আলোচনার সময়। জমি ক্রয়ের আর্থিক দায়ভারটি বর্তাবে কার অথবা কাদের ওপর। হয়তো প্রচ্ছন্ন ভাবে ধরেই নেওয়া হয়েছিল গৃহীভক্তরাই সমবেতভাবে আর্থিক অনুদান দিয়ে জমি কিনবেন। কিন্তু ধরে নেওয়া ভাবনাটি বাস্তবের মাটি পেল না। জমির দাম কম না। অতএব সংকল্পটি পরিত্যক্ত হয়ে গেল। যুবকরা আবারও হতাশ।

কাঁকুড়গাছির রামচন্দ্র দত্তর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তো বরাবরই ছিল। তিনি ঠাকুরের একান্ত অনুগত ভক্ত তো বটেই, তাঁর অবতারত্ব সম্পর্কেও নিঃসংশয়। আবার তিনি দত্ত বংশের উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক নরেন্দ্রনাথেরও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। ঠাকুর কী চোখে নরেনকে দেখেছেন প্রবীণ রামচন্দ্র সম্যক অবগত সে ব্যাপারে। পার্থক্য কিছুটা অবশ্য ছিলই রাম-নরেনের ভাবনায়। রামচন্দ্র যেখানে পরমহংসের ঠাকুরত্ব প্রতিষ্ঠায় উৎসাহী ছিলেন, সেখানে নরেনের তীব্র আগ্রহ মানুষটির আধ্যাত্মিক চেতনার আলোয় সাধারণ মানুষকে উজ্জীবিত করা। দেবত্ব অবতারত্বের অপেক্ষা বিশাল-হৃদয় মানুষটির যাবতীয় প্রীতি-প্রেম জীবনের হিতার্থে বিকশিত হোক, নরেন তাই চাইছিলেন। সুতরাং অস্থিকলস সংরক্ষণের জন্য রামচন্দ্র দত্তর আগ্রহ এবং পরামর্শও যুবকদের মনঃপূত হল না।

রামচন্দ্রর কাঁকুড়গাছির ভবনে ‘যোগোদ্যান’ নামের একখণ্ড পৃথক পুণ্যভূমি ছিল। ঠাকুরের অস্থিভস্ম সমেত কলসি নিজ বাসভবনেই সংরক্ষিত করে রাখতে পারলে, স্বয়ং ঈশ্বরই সেখানে বাস করবেন, এই বোধ তাঁকে উদ্দীপিত করে থাকবে। তা ছাড়া জায়গা পাওয়া নিয়ে সত্যই অসুবিধাও দেখা দিয়েছে। উদ্যানবাটি ছেড়ে দেওয়া হবে তাও নিশ্চিত।

স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে রামচন্দ্র প্রস্তাব করলেন, অস্থিকলস যোগোদ্যানে রাখাই শ্রেয়।

নরেন সঙ্গে সঙ্গেই বলল, আপনারা অস্থি নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন, কিন্তু মানুষগুলো কোথায় যাবে? এতদিন যারা ঠাকুরের টানে, তাঁর সেবায়…।

কেউ বললেন, আগে ভগবানের মন্দির প্রতিষ্ঠা। তারপর লোকজন কোথায় থাকবে, যাবে ভাবতে হবে।

কেউ মন্তব্য করলেন, যারা সন্ন্যাসী, তাদের আবার থাকার ঘরবাড়ির চিন্তা কেন?

নরেন আবার বলল, বেশ তাই। সন্ন্যাসীদের কাউকে নিয়ে আপনাদের ভাবতে হবে না। কিন্তু ভুলে যাবেন না, এখনও মা এবাড়িতে রয়েছেন।

কোনও সিদ্ধান্তই স্থিরীকৃত হল না। অথচ একটি বিতণ্ডা ও মনোমালিন্যের স্পর্শ লেগে রইল উদ্যানবাটির আবহে।

বাগবাজার নিবাসী বলরাম বসু শুধু হৃদয়বান নন, ঠাকুর এবং মা উভয়েরই অন্যতম শিষ্য এবং সেবক। তিনি একা নন, তাঁরা সপরিবারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশেষ করে সারদার কথা চিন্তা করেই নিবিড়ভাবে বেদনাবিদ্ধ হলেন। মানুষটা যতই সহ্য করে থাকুন, কিন্তু প্রতি মুহূর্তে ঠাকুরকে স্মরণ এবং নিজের নিঃসহায় অবস্থার কথা ভেবে কি দিশাহারা নন!

কিছু একটা উদ্যোগ বলরামকে নিতেই হবে। ভাবনাটির সমর্থন পেয়ে গেলেন স্ত্রী কৃষ্ণভাবিনীর কাছ থেকেও। আপাতত কয়েকদিনের জন্য হলেও মাকে তাঁর বাড়িতে এনে রাখতে হবে। তারপর যদি সম্ভব হয় কিছুদিনের জন্য কোনও তীর্থে…। দেখা যাক।

ওদিকে সুরেন্দ্রনাথ মিত্রও ভাবছিলেন, কাশীপুর বাগানবাড়ি ছেড়ে দিলেও, বরানগরের কাছে যদি একটা আস্তানা করা যায়।

খবর ফাঁস হতে সময় লাগল না। কিন্তু অস্থিকলস বিরোধ তো মেটেনি।

ত্যাগী সন্ন্যাসীরা মনস্থির করে ফেলল দ্রুত। তামার কলসি থেকে অর্ধেকেরও বেশি ভস্মাবশেষ আর বেছে বেছে ঠাকুরের অস্থি স্থানান্তরিত করে ফেলল অন্য পাত্রে। আর যাই হোক, মা যেখানে থাকবেন, ঠাকুরের দেহাবশেষও সেখানেই থাকবে। সুতরাং তাদের শ্রদ্ধাস্পদ এবং গুরুভাই বলরাম বসুর বাড়িতেই নিত্যপূজা আর সংরক্ষণের জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হল নতুন পাত্র। না, হতাশ হতে হল না রামচন্দ্রকেও। মনঃক্ষুণ্ণ তো বটেই। যোগোদ্যানে অস্থিকলস সমাহিত করার আয়োজন করেছেন তিনি। উদ্যানবাটি ছেড়ে দেওয়া হলেও এই ভাদ্রমাসেরই জন্মাষ্টমী তিথিতে তাম্রকলস পাঠিয়ে দেওয়া হবে তাঁর বাসভবনে।

মতান্তর আর বিরোধবিতণ্ডার সব খবরই ঘরে বসে পাচ্ছিলেন সারদা। তাঁর বলার কিছু ছিল না। পুরোপুরি আশ্রয়প্রার্থিনী না হলেও, সাময়িকভাবে তিনি কিছুটা নির্ভরশীল তাইতে সন্দেহ নেই। মত প্রকাশ করতেই পারতেন, হয়তো রুচিতে বাধছিল। কিংবা উদাস বৈরাগ্যে কোনও পক্ষই অবলম্বন করতে চাইলেন না। শুধু জাগতিক বিবেচনার উর্ধ্বে উঠে, তাঁর প্রসারিত বিচারবুদ্ধি একটি মাত্র নিরপেক্ষ মন্তব্যে সীমাবদ্ধ হয়ে রইল।

গোলাপমা-র কাছে নিভৃতে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, এমন সোনার মানুষই চলে গেলেন, দেখেছ গোলাপ, ছাই নিয়ে ঝগড়া করছে! আর কিছু না, স্থির নিশ্চুপ হলেন সারদা। বোধে কল্পনায় অনুভবে চোখের ওপর মানুষটিকে দেখতে লাগলেন। ‘নয়ন সমুখে তুমি নাই, নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই।’

প্রায় অতিক্রান্ত হতে চলল একটি সপ্তাহ। আয়োজন করার কিছু ছিল না সারদার, শুধু ঠাঁইনাড়া হওয়ার অপেক্ষা। উদ্যানবাটি ছেড়ে চলে যাবেন, পড়ে থাকবে ঠাকুরের মর্ত্যলীলার শেষ আট মাসের স্মৃতি, কিছু উদ্বেগ আর হৃদয় মথিত করা বেদনা।

সন্ধ্যার আগেই গাড়ি নিয়ে এলেন বলরাম। বর্ষা যেতে যেতেও যায়নি, তার মধ্যে আসতে শুরু করেছে শরতের আমেজ। দিকভ্রান্ত মেঘ হঠাৎ স্থির হয়ে দাঁড়ায়, বৃষ্টি ঝরায়, আবার চলতে শুরু করে। আটমাসে উদ্যানবাটির অন্ধিসন্ধি তো বটেই, মানুষজন গৃহপালিত পশু গাছপালাও চেনা পরিচিত হয়ে গেছে। এই গোধূলি লগ্নে আজ সবায়ের কাছ থেকে বিদায় নেবার পালা সারদার। যখন এসেছিলেন, ঠাকুরের অসুস্থতা সত্ত্বেও প্রাণের স্পন্দনে মুখরিত হয়ে উঠেছিল কাশীপুরের বাড়ি। আজ শূন্য হয়ে যাওয়ার নিঝুম ভাব নেমে এসেছে। গাড়িবারান্দার সামনেই সার দিয়ে দাঁড়িয়েছে ভক্তরা, ছেলেরা, বাড়ির কাজের লোক-ভৃত্য-মালি। ঢিপ ঢিপ প্রণাম করছে মাকে। চোখে জল।

আঁধার নামার আগেই উদ্যানবাটির মোরামের ওপর শব্দ তুলে ঘোড়ার গাড়িতে কাশীপুর ত্যাগ করলেন সারদা। আপাতত ঠিকানা কলকাতার বাগবাজার— বলরাম বসুর বাড়ি। সারদার মনে আসে, সত্যি কি মানুষের ঠিকানা বলে কিছু আছে? থাকে?

ভাদ্র মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ শুরু হয়েছে।

প্রথম সপ্তাহটি প্রকৃতির মতোই আঁধারে-অবসাদে-নিরানন্দে ডুবেছিলেন সারদা। শূন্যতা ভিন্ন আর কিছুই যেন অনুভূত হচ্ছিল না। মাত্রই দু’-একবার ভেঙে পড়লেও, সকলের সামনে তিনি চোখের জল ফেলতে পারেন না। নিজেকে অন্তরিন করে রেখেছিলেন উদ্যানবাটির একতলার কোণের ঘরটিতে। যত না চোখের জলে ভেসেছিলেন, হৃদয়ে ক্ষরণ হয়েছিল তদপেক্ষা অধিক। মানুষটা চলে গেলেন, নরদেহে আর চোখের সামনে উপস্থিত থাকবেন না— এই বোধে নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার শূন্যতা তো ছিলই এবং তা অনেকটাই ব্যক্তিগত। কিন্তু অলৌকিক উপস্থিতির আভাসে সেই শূন্যতার একটু যেন ভরাট করেও দিলেন। অথচ বাস্তব জীবনের নিঃসঙ্গতাটুকু রয়ে গেল। শুধু নিঃসঙ্গতাই না, যেন মানুষটির মর্ত্যলীলা সাঙ্গ হওয়ার অব্যবহিত পরেই তাঁর এতদিনের সাধনা, প্রেম কেউ কেউ যেন ক্ষণিকের জন্য হলেও বিস্মরণ হয়েছিল। সারদা সেটা টের পেয়েছিলেন। আর পেয়েছিলেন বলেই অতিরিক্ত বেদনার ভার অনুভূত হয়েছিল একাকিত্ব, নিঃসঙ্গতার ওপর।

কিছুই প্রকাশ করেননি সারদা। বরং নিজস্ব সচেতনতা থেকেই নিজেকে সাময়িক করে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সময় কারওর জন্য অপেক্ষা করে না, একজনের সময় আর একজনের মতোও কাটে না। দিনযাপন, তা সুখ অথবা দুঃখের হোক, যার যা নিজের মতো করেই, নিজের বিবেচনা অথবা শক্তি দিয়ে, করে যেতে হবে। পরিবর্তন কিংবা রূপান্তর ঘটে যায় তার মধ্যে। নিজস্ব উপলব্ধির বিষয় কারও কাছে ব্যক্ত করেননি সারদা, কিন্তু অন্তরে জেনেছেন, নিরন্তর একটি অবলম্বনের ছায়া তাঁর সঙ্গে ফিরছে।

পার্থিব জীবন-সংসারের একটি ছন্দ আছে, নিয়মনীতি আছে তার চলার। দ্বন্দ্ব-সংশয়-নিঃসঙ্গতা অতিক্রম করে চলতে হবে— এই বোধ সঞ্চারিত হওয়ার জন্য কোনও আধ্যাত্মিক চেতনার প্রয়োজন হয় না, জীবন আপনি টেনে নিয়ে যায়। ঠাকুর দেহ রাখার তৃতীয় দিনের প্রত্যুষে সারদা আপনিই ঘর থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়েছিলেন সেই টানে। হেঁশেলে ঢুকেছিলেন। আড়ম্বর করে ঠাকুরের পারলৌকিক কর্ম সম্পাদনের দরকার হয়নি। স্বতঃস্ফূর্ত কৃচ্ছ্রসাধন শুরু হয়ে গিয়েছিল সেই রাত থেকে। অতঃপর আবার চলার পথে নামা।

বেদনার অনভবে বিদ্ধ হয়েছিলেন উদ্যানবাটি ত্যাগ করার পর্বে। শুধ নবীন-প্রবীণদের মধ্যে বচসা আর মতান্তরের জন্যই না, তিনি জানতেন, তাম্রকলসের বিরোধ দীর্ঘস্থায়ী হবে না। কিন্তু ত্যাগী যুবকবৃন্দের আসন্ন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে একইসঙ্গে অসহায় এবং বিচলিত বোধ করেছিলেন। কোথায় যাবে ছেলেরা। সুরেন-বলরাম-রামচন্দ্ররা আশ্বস্ত করলেও উদ্বেগ কমেনি সারদার।

সুরেন্দ্র বলেছিলেন, মা চিন্তা করবেন না, এ মাস পুরোটাই বাড়ি ভাড়া নেওয়া আছে।

সারদা বলেছিলেন, জানি বাবা। কিন্তু সে আর ক’দিন! আজই ভাদ্রমাসের ছ’তারিখ হয়ে গেল।

তার মধ্যে কিছু একটা ব্যবস্থা হবে মা।

সারদা বললেন, ঠাকুরের নাম করে ছেলেরা ঘর ছেড়েছে, মানুষের কল্যাণ করবে বলে। কিন্তু নিজেরাই যদি বেঁচেবর্তে না থাকে…।

রামচন্দ্র বললেন, মাথার ওপর তাঁর আশীর্বাদ আছে।

মুখের কথা টেনে নিয়ে সারদা বলেছিলেন, আশীর্বাদে তো পেট ভরবে না বাবা। আবার মাথার ওপর ছাদ না থাকলে রোদে পুড়বে, জলেও ভিজবে।

বলরাম বললেন, আমরা আছি মা। তাঁকে যখন ভালবেসেছি, তাঁর সন্তানরাও অবহেলিত হবেন না। আগে আমার বাড়িতে পায়ের ধুলো দিয়ে আপনি একটু থিতু হোন। তারপর দেখা যাক…।

সারদা স্বগতোক্তির মতো বললেন, যখনই কামারপুকুরে নিজের একাকিত্বের কথা ভেবেছি, ঠাকুর অভয় দিয়েছেন। বলেছেন, তুমি একটি ছেলে চাচ্ছো, আমি তোমাকে এইসব রত্ন ছেলেদের দিয়ে গেলুম।… তারা যদি এখন রাস্তায় দোরে-দোরে ঘুরে বেড়ায়…।

যোগেন-শশী-শরৎ-কালী-লাটু সকলেই কাছাকাছি ছিল।

তারাও নির্দ্বিধায় বলেছিল, ঠাকর আমাদের দেখবেন মা, চিন্তা করবেন না। তা ছাড়া আপনি আছেন তাও জানি।

একমাত্র বিশ্বাস সম্বল করেই সেদিন উদ্যানবাটি ত্যাগ করেছিলেন সারদা। দু’-ঘোড়ায় টানা বলরামের গাড়িতে উঠেছিলেন। তারপর থেকে বাগবাজারের এই নিবাসেই আছেন। একা নয়, তাঁর সঙ্গে লক্ষ্মীদেবী এবং গোলাপমা-ও আছেন যথারীতি। মাঝেমধ্যেই ভক্তরা দেখা করতে আসেন। বিশেষ করে আসেন মাস্টারমশায় শ্রীমহেন্দ্রনাথ গুপ্ত এবং তাঁর স্ত্রী শ্ৰীমতী নিকুঞ্জদেবী। কাশীপুর শহরতলি অপেক্ষা শহর কলকাতার বাগবাজারের পরিবেশ অন্যরকম। মানুষজন, গাড়িঘোড়ার ব্যস্ততাও এখানে বেশি।

অবশ্যই কাশীপুর উদ্যানের নিঝুম গাছপালার ছায়ায় ঘেরা প্রাকৃতিক পরিবেশ এখানে অনুপস্থিত। তা হলেও বলরাম বসুর বাড়িটির আয়তন এবং আবহাওয়া অন্যরকম। বিশাল দোতালা বাড়িটায় শান্তস্নিগ্ধ ভাব বর্তমান। বাগবাজার পল্লিটিও শহরের ভিতর অবস্থান করেও এখনও অপেক্ষাকৃত নিরালা, শিরিষ-ছাতিম-কদম-আম-নিম ইত্যাদি বড় বড় গাছের ছায়ায় সুশীতল ভাব হয়ে থাকে। কাছেই পশ্চিমে প্রবাহিত গঙ্গার উপস্থিতিতে দূষণ কম। কিছুকাল আগেও চারদিকে ছড়ানো অনেক বাগিচা বা বাগান ছিল বলেই নাম হয়েছে বাগবাজার। বলরামের বাড়িটিকে স্বয়ং ঠাকুরই অভিহিত করতেন, তাঁর দ্বিতীয় কেল্লা নামে।

বিনয়ী এবং ভক্ত বলরাম অবশ্য বসবাস করলেও কাউকে জানাতে দ্বিধা করেননি, এই সাতান্ন নম্বর রামকান্ত বোস স্ট্রিটের আবাসটি তাঁর নিজস্ব নয়। জাঠতুতো দাদা হরিবল্লভ বসুই মালিক। লোকে বলত ‘নতুন বোসের বাড়ি’। উত্তরকালে আধ্যাত্মিক জগতের পীঠস্থান হবে বলে নিয়তিই যেন বলরাম বসুকে টেনে এনেছিলেন বাড়িটায়। পূর্বপুরুষের সূত্র একটা ছিলই, কিন্তু প্রত্যক্ষ উত্তরাধিকার বলরামের ছিল না।

হরিবল্লভ ছিলেন ধনী এবং শ্যামবাজারে বসবাসকারী দেওয়ান কৃষ্ণরাম বসুর পৌত্র। কৃষ্ণরাম ধনী হওয়া সত্ত্বেও ঈশ্বরবিশ্বাসী আর ভক্ত মানুষ ছিলেন। গঙ্গার পরপারে মাহেশের রথ-এর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। হরিবল্লভ রায়বাহাদুর উপাধি পেয়ে খ্যাতনামা উকিল হিসেবে কাজ করতেন কটকে। এদিকে পরিবার বৃদ্ধি হওয়ায় শ্যামবাজারের বাড়ি ‘রাধাদামোদর কুঞ্জ’তে স্থান সংকুলানের অসুবিধে হচ্ছিল। বাগবাজারের বাড়িটির তখনই সন্ধান পান হরিবল্লভ। তদানীন্তন নাট্যকার গিরিশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি। কিনেও ফেললেন।

কিন্তু থাকবেন কী করে হরিবল্লভ! তাঁর কর্মক্ষেত্র তো ওড়িশার কটকে। ওদিকে খুড়তুতো ভাই বলরাম স্ত্রীপুত্র কন্যা থাকা সত্ত্বেও ছিলেন সংসারবিবাগী। জগন্নাথদেবের মন্দিরে পড়ে থাকতেন। ভাইকে সংসারমুখী করার জন্য হরিবল্লভই বলরামকে নিয়ে এলেন রামকান্ত বোসের নতুন বাড়িতে। অলক্ষ্যে ঈশ্বর হেসেছিলেন কি না কে জানে! কলকাতায় আসার কিছুদিনের মধ্যেই বলরামের শুধু যে ‘তাঁর’ সঙ্গে দেখা হল তাই নয়, বলরাম হলেন ঠাকুরের গৃহী ভক্তদের অন্যতম এবং কালক্রমে রসদদার। কথাকার মহেন্দ্রনাথ বলরামের বাসভবনকে উল্লেখ করলেন মন্দির বলে। সেই মন্দিরেই কয়েকটা দিন কাটিয়ে ফেললেন সারদা। শোকের মধ্যেও রয়েছে একটি দ্বিধা, সংকোচ।

মনের মধ্যে টানাপোড়েনটা যাচ্ছে না। বিগত বেশ কয়েকবছর ধরে নিরন্তর মা ডাক শুনে তিনি অভ্যস্ত। বয়সের বাছবিচার কিছু নেই, তাঁর পরিচিতি দাঁড়িয়ে গেছে মা বলে। তা হলেও সেই দক্ষিণেশ্বর থেকে শুরু করে, ঠাকুরের মহাপ্রয়াণের কয়েকদিন পরে পর্যন্ত অল্পবয়সি ছেলেছোকরা— ঠাকুরের ত্যাগী সন্তান নামেই যারা পরিচিত, তাদের সঙ্গেই সারদার যোগাযোগ বেশি। সারাদিন তাদের স্বতঃস্ফূর্ত মা-মা ডাক কানে শুনতে শুনতেই তাঁর সময় কাটত— তা সে কাজে-প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে যেজন্যই হোক। ওই নাম আর ডাকের সঙ্গেই কীভাবে তাঁর প্রত্যক্ষ সম্পর্ক আর ভূমিকাও জড়িয়ে গেছে চিরতরে।

বলরামের বাড়িতে আসা ইস্তক কোথায় যেন ওই ডাকের অভাবজনিত বোধে বিদ্ধ হচ্ছেন সারদা। শুধু অস্বস্তি না। নিরুপায় অথচ অনিবার্য অন্যায়বোধও যেন ক্রিয়াশীল তাঁর মধ্যে। যাই হোক না কেন, আপাতত একটি নিরাপদ আশ্রয়ে তাঁর স্থানান্তর ঘটেছে। বসবাসও করছেন লক্ষ্মী এবং গোলাপমা সহ। আবাসিকরাও যথেষ্ট আন্তরিক। বলরামের স্ত্রী কৃষ্ণভাবিনী তো বটেই, দুই কন্যা ভুবনমোহিনী-কৃষ্ণময়ী এবং পুত্র রামকৃষ্ণ সকলেই ভক্তিপথের পথিক, সারদার অনুগত। স্বাচ্ছন্দ্যের অভাব তাঁর নেই।

কিন্তু নিজের অন্তরে সত্যিকারের মা বলেই যিনি চিহ্নিত, কোন প্রাণে সন্তানদের ছেড়ে আশ্রয় বা স্বাচ্ছন্দ্য তাঁর কাছে উপভোগ্য হবে! বিশেষ করে উদ্যানবাটি ত্যাগ করার পূর্বেই তিনি যখন শুনে এসেছেন, বাড়ি ভাড়ার মেয়াদ ফুরোলেই ওবাড়ি ছেড়ে দেওয়া হবে। এখনও মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়নি বটে, কিন্তু আর ক’টা দিন! দশ-বারোটা ছেলে যাবে কোথায়!

ব্যক্তিগত জীবনেও সারদার ভরসা বলতে একমাত্র ঠাকুরের চিন্ময় অস্তিত্বের ওপর বিশ্বাস। তা ছাড়া আর তাঁর কী আছে! চার-পাঁচ দিন হয়ে গেল তেমন কোনও খবর পাননি। বাগবাজার থেকে কাশীপুর দূরত্বেও ঠিক এপাড়া-ওপাড়ার মতো নয়। মাইল তিনেক রাস্তা যখন তখন পায়ে হেঁটেই কি আর যাতায়াত করা যায়। চিৎপুর রোড দিয়ে এখন চারঘোড়ায় টানা ট্রাম চলাচল শুরু হয়েছে বটে, কিন্তু তা কাশীপুর তো দূরের কথা বাগবাজারের দিকেও পুরোটা আসে না। শ্যামবাজারে থেমে যায়। আর গাড়ি তো বড়লোকদের ব্যাপার। তার মধ্যেও যাতায়াত একেবারে চলছে না তা নয়। রামবাবু-সুরেশ-সুরেন-দেবেন্দ্র এঁদের সঙ্গে বলরামের যোগাযোগ আছে সারদা টের পান। কিন্তু ছেলেদের ভাবনার সঙ্গে এঁদের কয়েকজনের ভাবনার পার্থক্য ঘটেছে। হয়তো সেই কারণে কিছুটা দূরত্বও।

তার মধ্যেও অবশ্য লাটু-যোগেন-কালী হেঁটে এসে দেখা করে গেছে। নেহাত চোখের দেখা। কথা হয়নি বিশেষ। তবু সেটুকুতেই যা বোঝার বুঝেছিলেন সারদা। মনে হয়েছিল, ঠাকুরের দেহত্যাগের পর থেকেই যেন কালাশৌচ শুরু হয়ে গেছে ছেলেদের জন্য। প্রত্যক্ষভাবে তাঁর কিছু করার নেই। কিন্তু সকাল বিকেল পুজো করার মতো ঠাকুরের অস্থিকলসের সামনে বসলেই প্রার্থনা করেন ছেলেদের জন্য। বাইরে থেকে সবাই ভাবেন— ঠাকুরের শোক, স্মৃতি-স্মরণে আর নিজের অনিশ্চিত অন্ধকার ভবিষ্যতের চিন্তায় সারদা কাতর, মুহ্যমান। সবই ঠিক। কিন্তু আরও অতিরিক্ত একটি দহনে তিনি যে দগ্ধ হচ্ছেন, সেটা সবাই বোঝে না।

সেদিনও সকালে গঙ্গাস্নান সেরে এসে দোতালায় নিজের ঘরটিতে পুজোর আয়োজন করছিলেন সারদা। উদ্যানবাটি থেকে আসার পরে দোতালার উত্তর-পশ্চিম দিকের একটি ঘর তাঁর জন্য নির্দিষ্ট হয়েছে। পাশের ঘরে থাকেন লক্ষ্মীদেবী ও গোলাপমা। বিশাল দোতালা বাড়িটিতে ঘরের অভাব নেই। প্রকৃতপক্ষে হরিবল্লভ বাড়িটি কেনার পরেই সামনের ও পিছনের দুটি অংশ জুড়ে এক করে দেন এবং পিছন দিকে কয়েকটি ছোট ছোট ঘর তোলেন। তখন অবশ্য হরিবল্লভও জানতেন না যে অদূর ভবিষ্যতে এই গৃহ পরমহংসদেবের একটি লীলাস্থল হয়ে উঠবে। কোঠার থেকে বলরাম এসে বসবাস করার কিছুদিনের মধ্যে দোতালার দক্ষিণে প্রশস্ত ঘরটিই হয়ে উঠেছিল ঠাকুরের ঘর। প্রয়াণের পর তাঁর অস্থি-ভস্ম সহ তামার কলসিটি নিত্যপূজার জন্য ওই ঘরে রাখা হয়েছে। তাঁর নিত্যব্যবহার্য জিনিসগুলিও যত্ন সহকারে স্থান পেয়েছে।

নিজের ঘর থেকে পুজোর সরঞ্জাম গুছিয়ে এনে দু’বেলা সারদা বসেন ঠাকুরের ঘরে, অস্থিভস্মাধারের সামনে। লোকজনের ভিড় এবং বেলা হয়ে যাওয়ার আগে ফাঁকায়, গাছের ছায়ায় গঙ্গাস্নান সেরে আসেন। বাগবাজার ঘাট দূরে নয়, পল্লির ভিতরের রাস্তা দিয়ে হেঁটেই যাতায়াত করতে পারতেন। ভক্তপ্রবর বলরাম তা সত্ত্বেও পালকি-বেহারার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। চার-পাঁচ দিন ধরে সেই ব্যবস্থাই চলছে।

জলস্পর্শের আগে, ভিজে কাপড় ছেড়ে পুজোর প্রস্তুতি সারছিলেন। তখনই গোলাপমা ঢুকলেন সারদার ঘরে। আয়োজন সারতে সারতেই সামান্য অবাক হয়ে মুখ তুলে তাকালেন সারদা। গোলাপমাও পুজোয় বসবেন। অন্য কোনও দরকার আছে কি!

জিজ্ঞাস করলেন সারদা।— গোলাপ কিছু বলবে কি?

সামান্য ইতস্তত করে গোলাপ বললেন, মা, এখানে আসা ইস্তক ঠাকুরের পুজো করতে করতে তোমার অনেকক্ষণ কেটে যায়। কথাবার্তা আর হয় না।

পাটার ওপর চন্দন ঘষতে ঘষতে সারদা বললেন, ঠিকই বলেছ। কাশীপুরে আরও পাঁচজনের সঙ্গে একসঙ্গে ছিলুম, ছেলেরাও ছিল, কাজেকর্মে সময় যেত। এখানে তো বলরাম কুটোটি নাড়তে দেয় না। ঠাকুরের ভাব আর ভাবনা নিয়েই আছি।

গোলাপ বললেন, তা তো থাকবেই মা। তবু একটু অন্য কথা-টথা বললে তোমার মনটা একটু হালকা হত।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সারদা বললেন, অন্য কথা আর কী বলব বলো! দিশেহারা ভাবটা কিছুতে কাটছে না।

জানি মা, গোলাপ বললেন, মুখ ফুটে তুমি কিছু না বললেও তোমাকে কাছের থেকে দেখছি আজ কতদিন। ঠাকুর যাওয়ার পর থেকে তোমার মধ্যে যে কী চলছে, খানিকটা হলেও তো বুঝি।

সারদার পরের কথাটায় একটু যেন অবাকই হলেন গোলাপমা।

সারদা বললেন, ঠাকুর গেলেন ঠিকই, তবে তাঁর যাওয়া তো আর যাওয়া নয় মা। তাঁর হল স্বেচ্ছামৃত্যু। কিন্তু আসলে যে তিনি অনেক দায়দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। কোত্থেকে কীভাবে সব শুরু হবে, চলবে, এসবই মাথায় ঘুরছে।

একটু অপ্রস্তুতভাবে গোলাপমা বললেন, বটেই তো। কিন্তু তোমার নিজের দিকেও যে সেইসঙ্গে দেখতে হবে।

সারদা বললেন, শুধু নিজের বলে কখনও তো কিছু ভাবিনি। তাঁর সংসারের যেকোনও কেউ ছন্নছাড়া হয়ে থাকলেই আমার বাজে।

কেউ ছন্নছাড়া থাকবে না মা। ঠাকুর যাদের ভার নিয়েছেন—

সারদা মাঝপথেই বললেন, ভাবের ভারে প্রাণ বাঁচে না গোলাপ। ওতে শুদ্ধি হয়। তারপরে নিতে হয় কাজের ভার।

এ তো লাখকথার এককথা বলেছ মা।

সারদা বললেন, তিনি দেহ ছাড়লেও আমি তাঁকে হারাইনি। কিন্তু ছেলেরা আজ বাদে কাল ঘরছাড়া হবে। কোথায় যাবে, থাকবে, কী খাবে, সেই ভাবনাতেই আকুল হয়ে রয়েছি মা। বলরাম এখানে তো আমাদের সুখের চোদ্দোপোয় ব্যবস্থা করে রেখেছে, কিন্তু আমার সে সুখ আর সহ্য হচ্ছে না। সেইজন্যই দিনরাত ঠাকুরকে ডাকছি।

গোলাপ বললেন, একবার বলরামের সঙ্গেও কথা বলল না মা। সুরেন-গিরিশ-রাম তো মাঝেমধ্যেই যাতায়াত করে।

সারদা বললেন, বলব। আসলে ছেলেদের সঙ্গে একটু মনোমালিন্য মতো হয়ে গেল…।

ওসব আর নেই মা। পরশু দিন জন্মাষ্টমী গেল। তো ছেলেরাই উদ্যোগ নিয়ে রামবাবুর কাঁকুড়গাছির বাগানে ঠাকুরকে বসিয়ে এসেছে। আর কোনও বিবাদ অশান্তি নেই। বাবুরাম তো বলরামেরই শালা, কেষ্টভাবিনীর ভাই, ওর কাছেই শুনেছি।

সারদা পুজোর জন্য উঠতে উঠতে মাথা নাড়লেন। বললেন, আচ্ছা। পুজো সেরে নিই। ছেলেরা কেউ এলে, বোলো আমার সঙ্গে যেন দেখা করে।

সে কথা বলতে হবে না মা। বাগবাজারে এলে তোমায় পেন্নাম না করে কি ছেলেরা ফিরবে! পিছনে আসতে আসতে গোলাপমা যোগ করলেন, তবে তোমার মনটাও একটু মেরামত করার দরকার মা। এইসব ঠাকুরের চিহ্ন আর পায়ের ধুলো পড়ে থাকা ঘরবারান্দা থেকে একটু বেরুনোর দরকার। তোমার সঙ্গে সঙ্গে তিনি তো আছেনই, কিন্তু তুমি ছাড়া আমাদের গতি নেই।

সারদা আর কিছু বললেন না। দীর্ঘ বারান্দা পেরিয়ে দক্ষিণের বড় ঠাকুরঘরে ঢুকলেন।

অনেকদিন পরে আজ সকালে উজ্জ্বল রোদ উঠেছে। টের পাওয়া যাচ্ছে বর্ষা শেষে শরৎকালের আগমনে আলোয় প্রকৃতি নতুন করে জেগে উঠেছে। সেজেও উঠেছে। বৃষ্টি ধোওয়া গাছের পাতায় মাঝসকালের সূর্যালোক পিছলাচ্ছে। ভাদ্রমাসের প্রথমদিকেই রোদের তাপ বেশি। বর্ষার জলে মেঘলা মেদুর আবহাওয়ায়, ঘরবাড়ির ছাদ-দেওয়াল থেকে শুরু করে মাটি-গাছ-ঝোপঝাড় সবকিছুতেই স্যাঁতানো ভাব লেগেছিল। সোঁদা গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল ঘরবাড়ি বাগানের কোণ থেকে। আজ আলোয় আর তাপে গা সেঁকছে সবাই। উষ্ণতা শুষে নিয়ে ঝরঝরে হচ্ছে প্রকৃতি। মৃদু হাওয়ায় দুলছে গাছের পাতা। কোটর ছেড়ে বেরিয়েছে পাখিরা। আকাশ নীল।

বাগবাজার পল্লি শহর কলকাতার উত্তরপ্রান্তে। এখনও ছায়াঘেরা নিবিড়, ব্যস্ততা অপেক্ষাকৃত কম। গাড়িঘোড়াও এমনকিছু ছোটাছুটি করে না। তবে বেশ কয়েকটি বনেদি পরিবারের বসবাস বলে পাকাবাড়ির সংখ্যা বেশি। অঞ্চলের মধ্যে রামকান্ত বসু স্ট্রিটে বসু-রাই যেন সংখ্যায় বেশি, আরও মানী-জ্ঞানী লোকেরাও আছেন। বাগবাজারের প্রাচীন পুঁটে সিদ্ধেশ্বরী কালীবাড়িও এই রাস্তায়। গিরিশচন্দ্র আদর করে এই কালীর নাম দিয়েছেন ‘বাগবাজারের গিন্নি’। ঠাকুর বাগবাজার থেকে দক্ষিণেশ্বরে যাতায়াতের পথে সবসময় পুঁটেকালীমাকে প্রণাম করতেন সারদা জানেন। ইদানীং স্বয়ং ঠাকুরের পুজো-স্মরণ-প্রার্থনা সেরে ওই মাকালীকেও জানালা দিয়ে তিনি প্রণাম জানান। বর্ষার ছাট আসার জন্য জানালাগুলো বন্ধ থাকত এতদিন, সম্প্রতি খোলা হয়েছে।

নাগাড়ে বৃষ্টির জলে পাকাবাড়ির দেওয়ালগুলোতে ছোপ ধরেছে। তারওপর ছাদ থেকেও বাঘ-সিংহ মুখের নালা দিয়ে বেরুনো জল চুঁইয়ে পড়ে দেয়ালের গায়ে। বারান্দায় পড়ে, গড়িয়ে নামে মাটিতে। ভিজে মাটিতে লকলক করে গজিয়ে ওঠে জংলা ঝোপঝাড়। শ্যাওলা ধরে। আজ রোদে শুকোচ্ছে সব কিছু। বলরামের বাড়িতেও স্যাঁতানো ভাব কম। গঙ্গাস্নান সেরে ফেরার পথে পালকির মধ্যে থেকেই সারদা দেখেছিলেন চনমনে রোদ গাছগাছালির ফাঁকফোকর দিয়ে বাড়ির দেয়ালে মাটিতে পড়েছে। সঙ্গে সঙ্গেই কীভাবে মনে পড়ে গিয়েছিল— আগমনীর বার্তা রটে গেছে প্রকৃতিতে। স্বর্গের দেবী দুর্গা, মর্ত্যের মেয়ে উমা হয়ে বাপের বাড়ি আসবেন কিছুদিনের মধ্যে। আজ আকাশ-মাটি-আলো-হাওয়া যেন তারই আগাম খবর পৌঁছে দিচ্ছে। ঝিরঝির বাতাস বইছে।

কেমন একটা ঘোরের মধ্যে কয়েকমাস ছিলেন বলে সারদার যেন মনেই ছিল না আসন্ন শারদোৎসবের কথা। খেয়াল করেননি, বলরামের বাড়িতে ঢোকার মুখেই ফটকের ডানদিকে শিউলি গাছটায় টুপটাপ ফুলও ফুটতে শুরু করেছে। মাটিতে ঝরছে। ঠাকুরের বড় প্রিয় ছিল শিউলি ফুল। একটি দাসীকে পালকি থেকে নেমেই সারদা বলেছিলেন, মা, কাল থেকে শিউলি গাছের তলায় একটা পরিষ্কার কাপড় পেতে রেখো তো। যে ক’টা ফুল হবে ওঁর পায়ে দেব। তারপর দোতালায় উঠে গিয়েছিলেন।

বলরামদের বাড়িটি সাবেকি ধরনের বেশ বড় দোতালা। উত্তর-দক্ষিণে প্রশস্ত, ঢোকার পথ দক্ষিণে। ফটক পেরিয়ে এসেই ছড়ানো বড় উঠোন, ওপরে আকাশ দেখা যায়। চতুর্দিকে একতলা দোতালার ঘর আর বারান্দা ঘেরা। বহির্বাটির বাঁ হাতে দোতালায় যাওয়ার সিঁড়ি। সিঁড়ির শেষে ডানদিকে সেই বড় হলঘর, ঠাকুরের ঘর। কত লোকের সঙ্গে যে ঠাকুরের দেখাসাক্ষাৎ-গল্পগুজব-আলোচনা হয়েছে ওই ঘরে। আর পাশের ছোট ঘরে রাত্রিবাসও করেছেন কতদিন।

আবার দোতালার চকমিলানো প্রশস্ত বারান্দায় রথটানার আয়োজন। সারাবছর ছোটখাটো সেই রথ আর জগন্নাথের বিগ্রহ রাখাই থাকে দোতালার উত্তরপুব কোণে। এখনও ঠাকুরের সেই রথটানার স্মৃতিও বড় উজ্জ্বল। মাত্র এই গত রথযাত্রাতেই মানুষটার আর সে ক্ষমতা ছিল না। বলরামেরও তাই সেই উৎসব আয়োজনের তেমন আগ্রহ ছিল না। নম নম করে জগন্নাথকে নিয়ে রথটানা হয়েছিল, আবার সাতদিন পরে উলটোরথ টেনে রেখে দেওয়া হয়েছে স্বস্থানে।

হলঘর থেকে পুজো সেরে বেরিয়ে প্রায় পুরো বারান্দাটাই একবার প্রদক্ষিণ করেন সারদা। আজও করলেন। জগন্নাথের বিগ্রহ আর রথের কাছে গঙ্গাজলের ছিটে দিয়ে প্রণাম করলেন। সকলের শুভকামনা সেরে নিজের ঘরে ঢুকে গেলেন। ঘরের দরজা তাঁর খোলাই থাকে প্রায় সর্বক্ষণ। আজ রোদ উঠেছে বলে জানালা দুটো খুলে দিলেন। এদিককার ঘরগুলো একটু নিচু, তা ছাড়া উত্তর পশ্চিম কোণ বলে সকালের রোদ আসে না। তবে গাছপালার ফাঁক দিয়ে গঙ্গা দেখা যায়, সেটাতেই তৃপ্তি পান সারদা। মনে পড়ে কতদিনই ঠাকুর বাগবাজারের যেকোনও ঘাট থেকে নৌকোয় উঠে জলপথে দক্ষিণেশ্বরে ফিরতেন।

সারদার ঘরটা ছোট হলেও দিব্যি গোছানো আর পরিষ্কার। দেয়াল ঘেঁসে একটি চৌকি, তাঁর ওপর বিছানা। মশা আর ম্যালেরিয়ার উৎপাত কলকাতাতে কম না। প্রতিদিন সারদা তাই মশারি টাঙিয়ে শোন। সকালে নিজেই খুলে পাট করে রেখে দেন। দাসী এসে ঝাঁট দিয়ে ঘর মুছে দেয়। চৌকির উলটো দিকে একটা শতরঞ্জি পাতা থাকে। এ-ও-সে এসে তার ওপর বসে, কিছুক্ষণ কথাবার্তা হয়। একটা ছোট দেরাজও আছে, তার মধ্যেই যা কিছু খুঁটিনাটি জিনিস সারদার, কয়েকটি শাড়ি জামা সেমিজ, চাদর, রুদ্রাক্ষের মালা, দু’-একটা চটি বই, রামায়ণ-মহাভারত, শ্রীমদ্ভগবৎ গীতা, পঞ্জিকা আর ঠাকুর দেহ রাখার পরে খুলে রাখা কয়েকটা অলংকার। ঠাকুরের ছবি একটা রাখা থাকে দেরাজের ওপরে। মাঝে মাঝে লক্ষ্মী ওসব গুছিয়ে-টুছিয়ে রাখে।

পুজোর সরঞ্জাম রেখে, সারদা ভিজে গামছাটা শুকোতে দিলেন দরজার পাল্লার ওপর। লক্ষ্মী এসে ঢুকল।

মা, জল খেতে নীচেয় যাবে, না এখানেই নিয়ে আসব?

হাত দিয়েই চুলের জট ছাড়াচ্ছিলেন সারদা। ক্ষুধা-তৃষ্ণার বোধটা এখনও তীব্র হয়নি, নিঃসঙ্গতা আর শোকে আচ্ছন্ন। ধীরে সুস্থে বললেন, টানাটানির দরকার নেই, নীচের রান্নাঘরেই একবার যাব। তাড়া কিছু নেই মা।

দু’-এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে খুড়িমাকে দেখল লক্ষ্মী। তারপর বলল, মা, ঠাকুর দেহ রেখেছেন এগারো-বারো দিন হয়ে গেল। তোমার নিজের দিকে এবার একটু লক্ষ না দিলে চলবে কেন?

বুঝতে তো সবই পারি মা, সারদা বললেন, কিন্তু মনটাকে বাগে আনতে পারছি কই!

লক্ষ্মী বলল, তা বললে কি চলে! দেহ গেলেও, ঠাকুর যে তোমার সঙ্গে সঙ্গেই আছেন, তুমিই তো বলেছিলে সেকথা।

মাথা নাড়লেন সারদা।— সেকথা মিথ্যে নয় মা। চোখে হারালেও, ভাবে আমি তাঁকে হারাইনি।

তবে? লক্ষ্মী বলল, এবার তা হলে একটু বাইরে-টাইরে বেরুতে তো পারো।

বাইরে আর কোথায় যাব বল! সকালবেলা একবার করে মা গঙ্গার দর্শন হয় তাই যথেষ্ট।

গঙ্গাদৰ্শন তো তোমার ঘর থেকেই হয় মা।

তা হয়। তবে গিয়ে ডুব দিয়ে আসি, তাইতে মনটা জুড়োয়।

হঠাৎ লক্ষ্মী জিগ্যেস করল, আচ্ছা মা, তোমার কি এই বাগবাজারে, বলরামবাবুর বাড়িতে থেকে বেশি মন খারাপ হচ্ছে?

সামান্য অবাক হয়ে সারদা বললেন, হঠাৎ ওকথা কেন মা?

বলছি আর কী। এবাড়ি তো প্রায় ঠাকুরের নিজের জায়গা। কতবার এসেছেন, গ্যাছেন, থেকেছেন। চারদিকে ছড়ানো স্মৃতি।

সেইজন্যই তো এবাড়ি এখন মন্দিরের তুল্য।

তা হলেও ভাবি, চারদিকে তাঁর স্মৃতি ছড়ানো, হয়তো মনে মনে তোমায় দগ্ধায়।

না মা। সারদা বললেন, দগ্ধায় না। তাঁর পায়ের ধুলো যেখানে যেখানে পড়েছে সেসবই তো পুণ্যস্থান, তীর্থক্ষেত্র হয়েছে এসব জায়গা। তবে… অন্য একটা কথাও ভাবি।

কী মা?

একটু ইতস্তত করে সারদা বললেন, বলরাম অতি ভক্ত মানুষ, তার পরিবার, ছেলেমেয়েদেরও ভক্তির কোনও তুলনা হয় না। আমিও যে এবাড়িতে আগে আসিনি তা তো নয়। এমনকী শ্যামপুকুর থেকে একবার হেঁটে পর্যন্ত এসেছিলুম। পালকি, গাড়ি কিছু ছিল না, এদিকে কেষ্টভাবিনীর অসুখ। ঠাকুর বললেন, আমার বলরামের পরিবারের এমন অসুখ, তুমি যাবে না! দরকার হলে পায়ে হেঁটে গিয়ে দেখে আসবে।… তো এ জায়গা তো আমার অচেনা নয় মা!

লক্ষ্মী বলল, তা হলে আবার কী ভাবো?

ভাবি… একটু থেমে সারদা বললেন, এখন ঠাকুর তাঁর ইহলীলা সাঙ্গ করছেন, অথচ আমরা এই লৌকিক জগতেরই বাসিন্দা। বেঁচেবর্তে যখন আছি, তখন থাকতে-খেতে-শুতেও তো হয় মা। খরচ-খরচা আছে। কতদিন ঠিক এভাবে… উচিত কি না তাই ভাবি।

লক্ষ্মী বোধহয় একটু সংকোচবোধ করেই চুপ করে রইল। খুড়িমার আত্মসম্মানবোধের এই দিকটা নিয়ে ও সচেতন ছিল না। তা ছাড়া সারদার সঙ্গে সে নিজে এবং গোলাপমা-ও এসে রয়েছেন, সে বিষয়ে ইঙ্গিত না করলেও, প্রশ্নটা মাথায় আসাই স্বাভাবিক। একটু পরে লক্ষ্মী বলল, কথাটা মিথ্যে বলোনি মা। আমার ওটা মাথায় আসেনি। আবার আমরাও রয়েছি তোমার সঙ্গে।

আহা সে তো আমি রয়েছি বলেই, নাকি? লক্ষ্মীর গায়ে হাত বুলিয়ে সারদা বললেন, জানিস মা, ঠাকুর যাওয়ার আগে বলে গেছেন— লক্ষ্মীটিকে কাছে রেখো, দেখো। তা আমায় ছাড়া তুই কোথায় যাবি মা!

একটু পরে লক্ষ্মী বলল, তা হলে কী করবে?

সারদা স্বগতোক্তির মতো বললেন, এই সময় মেয়ে যোগেন থাকলে ভাল হত। সম্পর্কে বলরাম তো ওর মামাশ্বশুর কি না!

লক্ষ্মী বলল, কিন্তু যোগীনমা তো এখন বৃন্দাবনে।

তাই তো জানি। সারদা বললেন, মনটা বড় ভাল ওর। যাওয়ার আগে ঠাকুরের অনুমতি আর পায়ের ধুলো নিয়ে গেল, তখন কি আর জানত…।

লক্ষ্মী একটা বড় দাঁড়ার চিরুনি এনে বলল, একটু বোসো তো মা। গঙ্গার জলে চান করে করে তোমার চুলগুলো শনের নুড়ির মতো হয়ে গেছে। একটু আঁচড়ে জট ছাড়িয়ে দিই।

সারদা বসলেন চৌকির ওপর। বললেন, আচ্ছা তা দে। নিজের দিকে তো আর তাকাই না।

চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতেই লক্ষ্মী আবার বলল, তো মা, বলরামবাবুর এখান থেকে চলে গেলে কোথায় থাকবে?

কেন মা? মাথার ওপর একটা চালার ব্যবস্থা তো তিনি রেখে গ্যাছেন।

কামারপুকুরের কথা বলছ?

হ্যাঁ মা। অনেকদিন যাইনি, তা হলেও শ্বশুরের ভিটেবাড়ি তো আছে।

লক্ষ্মী চুপ করে রইল। সে নিজেও নিঃসন্তান এবং বিধবা। কিন্তু শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে তার আর কোনও সম্পর্ক নেই। ওদিকে বিয়ে হয়ে গিয়েছিল বলেই বাপের বাড়িও তার কাছে পর। সারদার শ্বশুরবাড়ি তারও বাপের বাড়ি। কিন্তু সেখানে গিয়ে কি সে উঠতে পারবে।

একটু পাশ কাটাবার মতো লক্ষ্মী বলল, তা আছে। তবে ওবাড়িতে তো রামলালদাদা আর শিবুও আছে।

জানি মা।। সারদা বললেন, এখন ঠাকুর দেহ রাখার পরে আমার কোথায় ঠাঁই হবে… ওরাই দেখবে। আমি আর কী বলব বল!

একটু অস্বস্তি নিয়ে লক্ষ্মী বলল, শিবুর তুমি ভিক্ষে-মা, তোমার ওপর ওর টানও খুব। কিন্তু রামলালদাদা কী বলে…। কথাটা অসম্পূর্ণ রেখেই চুপ করল লক্ষ্মী। কারণটা সারদার অজানা নয়। রামলাল, শিবু দু’জনেই যে ওর ভাই।

প্রসঙ্গটা শেষ করার মতো বললেন, ও নিয়ে আমার দুশ্চিন্তা নেই মা। যার ধর্ম তার কাছে।

লক্ষ্মী তারপরেও জিজ্ঞেস করল, মা, তুমি কি জয়রামবাটিতে দিদিমা, মামাদের কাছে যাওয়ার কথা ভেবেছ?

হালকা হাসির মতো শব্দ করে সারদা বললেন, সবই ভাবি মা। তারা কে কাকে দেখবে, সেটাও ভাবি। প্রসন্ন-কালী-বরদা-অভয় কারুরই যে তেমন আয়পয় আছে তা তো নয়। তার মধ্যে অভয় ছাড়া সকলেরই সংসার হয়েছে। আবার মা-ও আছে।

চুল আঁচড়ানো সেরে লক্ষ্মী উঠে পড়ল। চিরুনির দাঁড়া থেকে ওঠা চুল আঙুলে জড়িয়ে নিতে নিতে বলল, আচ্ছা চলো এবার। বেলা হয়ে গেল, মুখে দুটি যা হোক দাও, নয়তো এরপরে পিত্তি পড়বে।

সারদা বললেন, চল যাই। তবে মুখে কিছু দেওয়ার কথা মনে হলেই কেমন অরুচি বোধহয়।

রোজ রোজ একরকম খাবার খাচ্ছ… একটু মুখ-পালটানোর মতো কিছু…।

তার জন্য নয় মা। সারদা বললেন, ছেলেদের কিছু জুটছে কি না জানি না, মা হয়ে মুখে কিছু কি আর ভাল লাগে!

বুঝেছি মা। সামান্য এইটুকু উদাস উত্তর দিয়ে লক্ষ্মী চুপ করে গেল। একটু পরে বলল, তুমি একবার বলরামবাবু গিরিশবাবুদের তো জিজ্ঞাসা করতে পারো… ওঁরা তো এখনও এক আধবার কাশীপুরে ছেলেদের সঙ্গে দেখা করতে যান। ওরাও মাঝেমধ্যে আসে।

সারদা বললেন, তা তো করতেই পারি মা। কিন্তু সংকোচ হয় যে!

এতে সংকোচের কী? ঠাকুরেরই ভক্ত-শিষ্য সবাই।

তা হলেও আমি খোঁজ নিলে, ওরা বুঝবে— কেন। একটু থেমে সারদা বললেন, এদের যার অবস্থা যেরকমই হোক, সবায়েরই বউ ছেলেপিলে নিয়ে সংসার। গেরস্ত মানুষের যে অনেক দায় মা। ভালবেসে যেটুকু করে, তাঁর জন্যও প্রাণপাত করতে হয়। তবু করে।

লক্ষ্মী বলল, এখন তো ঠাকুরের আরও কত ভক্ত আছে মা… সেই দক্ষিণেশ্বর-শ্যামপুকুর থেকেই দেখছি চারদিকে একেবারে হইহই।

মাথা নাড়লেন সারদা। বললেন, তা আছে। কেমন শুনবি? তাঁর অসুখের সময়েই বেশ অবস্থাপন্ন এক গৃহীভক্ত ভেগে পড়ল বিশ টাকার জন্য, চাঁদা ধরেছিল। আর এখন তো ঠাকুরের সেবা কঠিনও নয়। ঠাকুরের নামে ভোগ দিয়ে নিজেরাই খায়। ঠাকুর তো ছবি এখন। বসিয়ে রাখো, বসেই আছেন, শুইয়ে রাখো শুয়েই আছেন। ক’জন আর এদের মতন বল!

দিনযাপন করতে করতে সারদা বুঝতে পারেন, বলরামের বাড়িতে সাংসারিক আবহাওয়া আর ছন্দের সঙ্গেই একটা শুদ্ধ আধ্যাত্মিক চেতনার হাওয়াও ঘুরে বেড়ায়। লোকলশকর, দাসী-রাঁধুনি, মালি-গাড়োয়ান সবই আছে, সারাদিন ধরে বেশ একটা ব্যস্তভাব পুরো বাড়ি জুড়ে, অহরহ মানুষ যাচ্ছে আসছে। অথচ তাঁর মধ্যেই নিয়মিত পুজোআর্চা, সন্ধেবেলা কিছুক্ষণ রামায়ণ পাঠ বা নাম সংকীর্তন এসব হয়। আর এই সবই সম্ভব হয়, সারদা জানেন, বলরাম এবং কৃষ্ণভাবিনী দু’জনেরই উদার মন এবং ঈশ্বর ভক্তির জন্য।

উদ্যানবাটি থেকে সারদাকে এবাড়িতে নিয়ে আসার প্রস্তাব করেছিলেন বলরাম। সদ্য সদ্য ঠাকুরের মহাপ্রয়াণের পরে, তাঁর বিস্তৃত সংসারটির ধারাপ্রবাহ যে কোনদিকে গড়াবে, তখন সঠিক এবং পুরো আন্দাজ কারওরই ছিল না। তিনি মানুষটা একা হলেও তাঁকে ঘিরে যে একটা রামকৃষ্ণমণ্ডলী গড়ে উঠেছে এটুকু তখন স্পষ্ট, কিন্তু কী তাঁদের উদ্দেশ্য, কার কী ভূমিকা, জাতি এবং জীবনের ক্ষেত্রে কোন লক্ষ্যে তাঁরা প্রবাহিত হবেন… এসবের কোনও নির্দিষ্ট ধারণা তখনও যেমন ছিল না, এখনও কিছু হয়ে ওঠার অবকাশ মেলেনি। মাত্র সপ্তাহ দুয়েক সময় অবশ্যই কোনও বিশদ ভাবনার জন্য যথেষ্ট নয়। অথচ আভাসে ইঙ্গিতে ঠাকুরমানুষটি দুরারোগ্য অসুস্থতার মধ্যেও কিছু কর্মসম্পাদন করে গেছেন। বলা ভাল, আগামী দিনের কর্মকাণ্ড আর ভাবনার বীজ রোপণ করে দিয়ে গেছেন। বিস্তৃত সংসারটির ভিতর থেকেই কয়েকজন গৃহীভক্ত এবং কয়েকটি ত্যাগী সন্তান তিনি নির্বাচন করে গেছেন। সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে ত্যাগ বৈরাগ্য এবং আধ্যাত্মিক চেতনার দীক্ষা দিয়েছেন কতিপয় যুবককে। তাদের গেরুয়া বসন দিয়েছেন—যা বৈরাগ্য এবং ব্রহ্মচর্যের প্রতীক, এবং ভবিষ্যতের জন্য খুব সুষ্ঠুভাবেই তিনি বীজরোপণ কর্মটি সমাধা করে দিয়ে গেছেন। শত শোকদুঃখ দিশেহারা অবস্থার মধ্যে সারদা ভেবেছিলেন তাঁর ভূমিকা এবং অবস্থানের কথাও। আর একইসঙ্গে তখন থেকে ছায়ার মতো তাঁর ভাবনাসঙ্গী হয়েছে ওই কতিপয় যুবকদের জীবনযাপন, কেননা ইতিমধ্যে এটুকু তিনি উপলব্ধি করেছেন, তাঁর ভূমিকার নির্দিষ্ট ইঙ্গিতও ঠাকুর দিয়ে গেছেন। তিনি হচ্ছেন—মা। এই নির্বাচনও সম্ভবত প্রখর দূরদৃষ্টি সম্পন্ন মানুষঠাকুর সেরে রেখেছিলেন বহু পূর্বে। পরবর্তীকালে সারদা নিজেই ভেবে দেখেছেন অনেক কিছু। কুটো বেঁধে রাখা পাত্রীকে অনুসন্ধান এবং বিবাহ, সতেরো বছর বয়সের তফাত, সাতপাকে ঘোরার সময়েই পাটকাঠিতে আগুন ধরে যাওয়া, দেহসম্পর্ক রহিত জীবনযাপন এবং যোড়শীপুজো…এসবই কি জাতিধর্ম, সৎ-অসৎ নির্বিশেষে একটি চূড়ান্ত মাতৃচরিত্র প্রতিষ্ঠার জন্যই নয়! কে কী ভেবেছে, বলেছে, করেছে, গুরুত্বপূর্ণ নয়। তিনি আধার চিনেছিলেন। তাকে ফলিত করলেন জীবনে, সমাজের ক্ষেত্রেও। বাধা-উপহাস-কটূক্তি বর্ষিত হল। এলও যেমন, গেলও তেমন। ওসব তো হয়ই, কিছু যায় আসে না। সারদা-আধার স্বয়ং স্বাক্ষরিত হয়েছে পূর্ণ মাতৃত্বের বিকাশে।

বলরাম বাগবাজারের বাড়িতে নিয়ে যাবে বলছে, কিন্তু…সারদা যাবেন কি?

ভাবনা এসেছিল মাথায়। ছেলেরা উদ্‌ভ্রান্ত হয়ে কোথায় ঘুরে বেড়াবে কে জানে! আবার গৃহী সন্তানদের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও তাঁর অজানা নয়। এটাও জানেন, ঐক্যমতের অভাব আছে দুই বয়সের দুই গোষ্ঠীর মধ্যে। রাম-গিরিশ-সুরেন-মহেন্দ্র ঠাকুরের অবতারত্ব প্রচারে উৎসাহী, তাঁকে বৈষ্ণবভাবে গ্রহণ করেছেন। নরেন-রাখাল-শশী-বাবুরাম ঠাকুরের আধ্যাত্মিকতাকে লোকজীবনে কার্যকর করার জন্য সন্ন্যাসের সঙ্গে সেবাকে যুক্ত করতে চায়।

মায়ের পাল্লার ভার কোনওদিকেই কম না। ভারসাম্যটি তাঁকে বজায় রেখে চলতে হবে। খুব সহজ কথা নয়। কিন্তু মনস্থ করলেন বলরামের বাড়িতে যাবেন। টানাপোড়েনটা রইল। তবু চলে এসেছিলেন সারদা। বেশ কয়েকটা দিন কেটে গেল। দেখা যাক অবস্থা কোনদিকে যায়।

মাঝেমধ্যেই সারদা দেখেন চেনাঅচেনা নানান লোকের যাতায়াত চলছে বলরামের বাড়িতে। তিনি অনেকটাই অন্তঃপুরবাসিনী। আগেও তাই ছিলেন, এখনও প্রায় তাই আছেন। গোলাপমা-লক্ষ্মী-কৃষ্ণভাবিনী-নিকুঞ্জদেবী— এঁদের নিয়েই আপাতত তাঁর সময় অতিবাহিত হয়। গঙ্গাস্নান-পুজো সেরে খানিকটা মিছরির পানা কিংবা ঘোলের শরবত খান। তারপর দুটি মুড়ি, সুজির হালুয়া, কিংবা কোনওদিন চিঁড়ে ভেজানো কলা দই মেখে জলখাবার সারেন। কাজ ছাড়া বসে থাকতে পারেন না বলে ইদানীং কয়েকদিন হল একবার করে হেঁশেলে ঢোকেন সারদা। তাঁর দেখাদেখি গোলাপমা, লক্ষ্মীও আসে। এ ক’দিনে তাঁরা সবাই মিলেই যেন এক পরিবারভুক্ত। বাড়ির গিন্নি কৃষ্ণভাবিনী মানুষ হিসেবে যেমন উদার, তেমনই আন্তরিক। সারদার তিনি সমবয়সি তো হবেনই, চাই কি বয়সে একটু বড়ও হতে পারেন। তা সত্ত্বেও সম্পর্ক আর সম্মানের কথা মাথায় রেখে তাঁকে তিনি শাশুড়ি জ্ঞান করেন।

আংশিক বৈধব্যের বেশে সারদাকে রান্নাঘরে ঢুকতে দেখে কৃষ্ণভাবিনী বললেন, মা, আপনি আবার কেন এসব কাজকর্মে ঢুকতে এলেন! একটু শুয়ে-বসে বিশ্রাম করলেই তো পারেন।

এবাড়ির রান্নাঘরটি দিব্যি প্রশস্ত। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। পরমানন্দ নামে ওড়িয়া রাঁধুনিটিও যেমন ফিটফাট, তেমনই ভদ্র আর হাসিখুশি। রান্নাঘরের উনুন-মেঝে-তাক লেপাপোঁছা, ঝকঝকে হাঁড়িকড়া বাসন-কোসন হাতা খুন্তি। পরমানন্দ নিজে সব দেখেশুনে নেয়, তারপর গঙ্গাস্নান, পুজো সেরে হেঁশেলে ঢোকে। তাঁর পরনের ধুতিটিও পরিষ্কার, খালি গায়ে পৈতে, কপালে চন্দনের ফোঁটা এবং যথারীতি মুখে এক খিলি পান। বাজার থেকে নিয়ে আসা সবজি, তরিতরকারি সব কিছু সে ধুয়ে এক কোণে রাখে। ঝুড়ি-বাঁটি গামলা এসবও রাখে। আমিষ-নিরামিষ রান্না কোনওদিন সে একসঙ্গে করে না। মাছ রান্নার পাট যেদিন যেদিন থাকে, সেদিন পরমানন্দ দু’বার চান করে।

সারদা বড় রান্নাঘরের কোণে, সবজির ঝুড়ির কাছে একটা পিড়ে পেতে বসে পড়লেন। বললেন, শুয়ে বসেই তো রয়েছি মা। তোমার বাড়িতে এসে পর্যন্ত কাজ বলতে কিছু করি না। কিন্তু একটু আধটু না করলে কি চলে!

কৃষ্ণভাবিনী বললেন, খুব চলবে মা। এতগুলো ঝি-চাকর বাড়িতে।

তা হোক। সারদা বললেন, শরীর তো বসিয়ে রাখার জিনিস না মা। ওদের সঙ্গে সঙ্গে একট কাজ করলেও, কিছু করা হল। সারা দিনের পরে ঠাকরের কাছে নয়তো কী জবাব দেব বলো!

ও মা, ঠাকুর যাওয়ার পর থেকে আপনার এখন আরও কত কাজই তো করতে হবে মা।

সবজির ঝুড়ি টেনে নিতে নিতে সারদা বললেন, হয়তো হবে। কিন্তু এখনও তেমন কিছু আর কই?

এতদিন তো অনেক করেছেন মা। সেই দক্ষিণেশ্বরে নবত থেকে শুরু করে শ্যামপুকুরবাটি-উদ্যানবাটিতে আপনি কম করেছেন?

করেছি, যখন যেমন দরকার হয়েছে।

কী কষ্টটাই না তখন গ্যাছে মা আপনার। ওইটুকু ছোট্ট ঘরে…।

কষ্ট তো কোনওদিন গায়ে মাখিনি মা, মনেও রাখিনি। তাঁরই ভক্ত শিষ্য সন্তান সব, আমারও আপনার। কেউ বলল ছোলার ডাল-লুচি খাব, তো কেউ আবদার ধরল রুটি আর হালুয়া।

কৃষ্ণভাবিনী বললেন, তারওপর ঠাকুরের বায়না তো ছিলই।

তাও ছিল। সারদা বললেন, তবে তিনি তো বরাবর পেটরোগা মানুষ ছিলেন। ওই শিঙ্গিমাছ জিয়নো থাকত শিকের ওপর, সারারাত খলবল করত। মাছের ঝোল আর ভাত এই ছিল তাঁর আসল খাওয়া। এক পদ সেরেই আবার অন্য পদ ধরতাম।

সেইজন্যই তো বলি মা, এখন যে ক’টা দিন পারেন— আপনাকে আর হেঁশেলে ঢুকতে হবে না।

তুমি তো বলো, কিন্তু থাকতে পারি কই? দেখলুম কাজের মধ্যে থাকলে মনটা ভাল থাকে, শরীরটাও ঝরঝরে বোধ হয়।

এই কথাটা বড় সাঁটে বুলেচেন মা জননী। হঠাৎ পরমানন্দ বলল বেশ খানিকক্ষণ কথা শুনতে শুনতে। পানদোক্তা খাওয়া মুখে হেসে বলল, কাজকর্ম করলে শরীল-মন দুই বেশ জুতে থাকে।

হ্যাঁ বাবা, ভগবান সেইজন্যই মানুষকে কিছু না কিছু কাজ দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন।

পরমানন্দের চোখ একটু ট্যারা। ট্যারা চোখেই তাকিয়ে হেসে বলল, এই তো দেখুন মা জননী, আমাকে যেমন পাঠায়েছেন রান্নার ঠাকুর করে।

তা অবশ্য আমি বলতে পারব না বাপু। সারদা বললেন, তবে তুমি যদি কাজটা ভালবেসে করো, তা হলেই সেটা তোমার কাজ।

পরমানন্দ বলল, করতে তো হবেই মা জননী, ওড়িয়াদের রান্না করাই তো কাজ।

ওমা, ও কী কথা বলছ বাবা পরমানন্দ!

কেন মা, সব ওড়িয়া বামুনরাই তো কলকাতার বাবুদের বাড়িতে রান্না করে।

ও হরি, তুমি তো আসল গপ্পোটাই জানো না বাবা। উড়ে-বাঙালি-বেহারি সবাই সব কাজই করে। তবে উড়েরা কেন বেশি রান্নার কাজে গেল জানো? বলি শোনো তবে। আগের দিনে সব নেমন্তন্ন বাড়ির অতিথিদের মধ্যে একটা মোড়ল গোছের লোক থাকত, তাকে বলা হত ‘ভোজপণ্ডে’। তার কাজই ছিল নেমন্তন্ন বাড়িতে যেসব মহিলারা রান্না-বান্না করত, তাদের কারুর নামে কুৎসা রটনা করা এবং তারপরে ভোজনপর্বটা নষ্ট করা। কেননা ভোজপণ্ডে ভোজন না করলে বাকি অতিথিরাও খাবে না। কর্মকর্তা পড়তেন বিপদে। তখন কর্মকর্তারা মেয়েদের বাদ দিয়ে ওডিয়া ছেলে বামুনদের রান্নার জন্য ডাকতে লাগলেন। কিন্তু তাই নিয়ে ভোজপণ্ডেদের সঙ্গে ওড়িয়া বামুনদের বাধল লড়াই। ভোজপণ্ডেরা হেরে ভূত হয়ে গেল। আর উড়িয়া ব্রাহ্মণদের হল জয় জয়কার। একটু একটু করে কাজের বাড়ি ছাড়াও তারা তখন সসম্মানে রান্নাঘরেও বহাল হতে শুরু করল। আর রান্না-বান্নার অনেকটা কাজই তারা গিন্নিদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিল। সেই থেকে…।

পরমানন্দ বলল, এ কাহিনীটুক জানতাম নাই মা।

সারদা বললেন, কাজ মানে কাজই বাবা, কী কাজ সেটা বড় কথা নয়। ভালবেসে করাটাই বড় কথা।

কৃষ্ণভাবিনী বললেন, আচ্ছা মা, আপনি তাহলে শুকতোর আনাজগুলোই কেটে দিন।

তাই দিই। বলে পরমানন্দের দিকে তাকালেন সারদা।—হ্যাঁ বাবা, শুকতো করার সব ব্যবস্থা তোমার আছে তো?

আছে মা। আলু-বেগুন-শিম-কাঁচকলা-উচ্ছে…।

রাঁধুনি আর হিং-এর বড়ি আছে তো? নামাবার সময় এক চামচ ঘি দিয়ে বাবা।

কৃষ্ণভাবিনী জিজ্ঞেস করলেন, ঝিঙে পোস্ত খাবেন তো মা?

সারদা হেসে বললেন, বাঁকড়ার লোক আমরা, পোস্ততে কোনওদিন আপত্তি নেই মা। সে সরষের তেল দিয়ে কাঁচাপোস্তই বলো, কিংবা পোস্তপোড়া, পোস্তর বড়া, কিংবা ঝিঙে-আলু, মায় গরমকালে আমড়াগোস্ত যা-ই বলো। সারদা তাকালেন পরমানন্দের দিকে, বললেন, তবে শোনো বাবা, যা দিয়েই করো, তরকারির মধ্যে পোস্তবাটাটা দেওয়ার পরে আর বেশিক্ষণ উনুনে রাখবে না, নাড়াচাড়া করেই নামিয়ে রেখো। তাইতে পোস্তর স্বাদগন্ধ ভাল থাকে।

পরমানন্দ একগাল হেসে বলল, মা জননী, আপুনি রোজই হেঁশেলে এসে বসলে খুব ভাল হয়। কালকে মোচার ঘণ্ট করব, আগবাগ বলে দিবেন।

সারদা বললেন, শুধু বলে কেন বাবা, বেঁধেও দিতে পারি। তবে মোচার ঘণ্ট রান্নার চেয়ে, কাঁঠালি কিংবা মর্তমান কলার মোচা ঝিরিঝিরি করে কাটার ওপরেই তার স্বাদ। খাটুনির কাজ। ওবেলা কেটে ভিজিয়ে রেখো, শুধু ঘণ্ট কেন, কাল মোচার চপ-ও করা যাবে।

একজন দাসী ডাকতে এল সারদাকে একটু পরে।

মা একবার ওপরে আসবেন? লক্ষ্মী দিদি ডাকছেন আপনাকে।

যাই মা, এই কাঁচকলার কষটা ধুয়েই আসছি।

মিনিট পনেরো পরে সারদা ঘরে যেতেই ঠাকুরের বড় হলঘর থেকে লক্ষ্মী ছুটে এল। বেলার দিকে বাড়ির বেটাছেলেরা কাজেকর্মে বাইরে-টাইরে থাকে। মেয়েরা কিছুটা স্বচ্ছন্দে ঘুরেফিরে বেড়ায়। মেয়ের সংখ্যা অবশ্য কমে গেছে এখন, কৃষ্ণময়ী আর ভুবনমোহিনী দুই মেয়েরই বিবাহকার্য সম্পন্ন করে ফেলেছেন বলরাম। তাহলেও একটি দুটি আত্মীয়া, ভাইঝি ভাগ্নি এবাড়িতে থাকেই।

লক্ষ্মী মাঝেমাঝে উত্তেজনায় সারদাকে মা-এর বদলে খুড়িমা বলেও ডেকে ফেলে। ছোটবেলায় নিজের মা শাকম্ভরী বেঁচে থাকার কালে খুড়িমা বলেই ডাকত। একটু একটু করে সবায়ের মতন ওরও ক্রমশ মা ডাকটাই রপ্ত হয়েছে।

এখন হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বলল, ও খুড়িমা, কাশীপুর থেকে যে ঠাকুরের সব এত এত বনাত-আলোয়ান-গরদ-শাল-চাদর-কাপড় আনা হয়েছিল, সেসব গেল কোথায়?

সারদা একটু অবাক হয়ে বললেন, সেসবই তো ঠাকুরের ওই হলঘরে বাক্স-তোরঙ্গয় ভরা আছে। তুই কী খুঁজছিস?

আমি তোমার জন্য একটা গরদের উড়ুনি করে দেব ভাবছিলাম।

আমার জন্য…কেন মা?

কেন আর! এমনিই। কত লোকজন আসে দেখা করতে…ভাবলুম তোমার ওই সরু লালপেড়ে সুতির কাপড়ের ওপর একটা গরদ কিংবা তসরের উড়ুনি থাকলে বেশ হয়। তাই…।

আমার এই বেশ-ই ঠিক আছে মা, তসর-গরদে আর কাজ নেই।

আচ্ছা তা-নয় তোক। কিন্তু ঠাকুরের ব্যবহার করা জিনিসগুলো যাবে কোথায়?

সব তালাবন্ধ ওঘরের বাকসোতেই থাকার কথা।

এসে দ্যাখো। তালাবন্ধ না ছাই। আদ্দেক জিনিস ওখান থেকে লোপাট হয়ে গ্যাছে।

সে কি মা! ওসব হল ভক্তদের ধন। তারা চিরকাল যত্ন করে রাখবে বলেই এখানে বাক্সবন্দি করে পাঠালে যে!

ঘরের দিকে যেতে যেতে লক্ষ্মী বলল, এঘরটা তো প্রায় বৈঠকখানা মা, এখানে কেউ ঠাকুরের জিনিস এভাবে রাখে! অন্য ঘরে কিংবা তোমার ঘরে তুলে রাখার দরকার ছিল।

সারদা বললেন, কিন্তু সব তত তালাবন্ধ ছিল।

ছিল, কিন্তু আর নেই। কী হবে মা?

সারদা গিয়ে দেখলেন, সত্যি সত্যিই ঠাকুরের বেশ কিছু দামি দামি রেশম-পশমের কাপড়-আলোয়ান-পাঞ্জাবি-ফতুয়া কে বা কারা চাবি দিয়ে তালা খুলে চুরি করে নিয়েছে। কী আর বলবেন! চাকর-বাকরদেরই কাজ হবে। হয়তো বেচে-বুচে দিয়েছে।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, আর কী হবে মা! যারা নিয়েছে, তারা কি আর ওসব জিনিসের কদর বোঝে! এক কাজ কর, ওবেলা বাবুরাম এলে ওকে বলে দ্যাখ। ওরই তো দিদির বাড়ি এটা। যা কিছু আছে, যত্ন-টত্ন করে যদি অন্য কোথাও এখন রেখে দেয়—পরে কোনওদিন…।

ঘরে ফিরে এসে খুব মুষড়ে পড়লেন সারদা। পরিধানগুলোর মধ্যে মানুষটার শরীরের তাপ-ভাপ লেগেছিল। তবু যে ক’টা রয়েছে থাক। কখনও যদি ছেলেরা একটা ডেরা করতে পারে, কালে কালে মানুষ হয়তো দেখে চক্ষু সার্থক করবে।

লক্ষ্মী হতাশ হয়ে ঘরে ফিরে গেল।

দুপুরে আহারের পরে কিছুক্ষণ নিজের ঘরে বিশ্রাম করেন সারদা। কখনও ঘুমিয়েও পড়েন।

আজ কিছুতে ঘুম এল না। ঠাকুরের জামাকাপড় চুরি হয়ে গেল, জানার পর থেকে মনটা একই সঙ্গে উদাস আবার কখনও অস্থির লাগছে। খুব একটা কিছু ক্ষতি হয়ে গেল ভেবে যে কষ্ট হচ্ছে, তা নয়। যেটা হচ্ছে, তা আন্তরিক কিছু হারানোর বেদনা। ওই বনাত চাদর আলোয়ানের সঙ্গে মিশেছিল স্মৃতি সময় অনুভব, ওগুলোর অনুষঙ্গে ফিরে আসত অতীতের সৌরভ।

চৌকি থেকে নেমে পশ্চিমের জানালার কাছে দাঁড়ালেন সারদা। দূরে গঙ্গার জলে জোয়ার এসেছে। আকাশে আজ মাঝে মাঝেই মেঘের আনাগোনা। আলো-ছায়া-বৃষ্টির লুকোচুরি খেলা চলছে। স্নিগ্ধ নিঝুম ভাব হয়ে রয়েছে বাগবাজার পল্লির। বিশেষ সাড়াশব্দ নেই এবাড়িতেও। মধ্যাহ্ন ভোজনের পরে সকলেই এদিক-ওদিক একটু গড়িয়ে নেয়।

কী যেন একটা শূন্যতার বোধে আক্রান্ত হলেন সারদা। জীবনটায় আর কী আছে! দিনগত পাপক্ষয় ব্যতীত ভবিষ্যতের সবটুকুই ধূসরতায় আবৃত, অনিশ্চয়তাই একমাত্র পাথেয়। ‘তিনি’ দক্ষিণেশ্বরে আসার পর থেকে যেন একটা নতুন ভাবের আলোড়ন এনেছিলেন। কেউ কেউ তাকে ভাবান্দোলন আখ্যায় ভূষিত করেছে। জড়ত্ব-কুসংস্কার-নীচতা থেকে বেরিয়ে ভালবাসা আর হৃদয়বত্তার কাছে সমর্পণের ডাক দিয়েছিলেন তিনি। গভীর অনুভব আর উপলব্ধির মধ্যে দিয়ে তিনি এক তীব্র চিত্তশুদ্ধির প্রয়োজনীয়তা টের পেয়েছিলেন। কোনও ছলনা ছিল না মানুষটার। ছিল না লোকদেখানো ভড়ং। পুঁথিগত পাণ্ডিত্যের অহংকার ছিল না। হেটোমেঠো গ্রাম্য ভাযায়, লৌকিক আচার উদাহরণের মধ্যে দিয়ে মানুষকে তিনি উত্তরণের পথ দেখাবার চেষ্টা করে গেলেন আজীবন। লোকগুলো যেন পোকার মতো কিলবিল করছে— স্বগতোক্তির মতো একথা তাঁর মুখ দিয়ে বেরিয়েছে। কেননা মনুষ্যজন্মের অসারতা, অপচয়, স্থূল আত্মকেন্দ্রিকতা দেখে দেখে তীব্র বেদনায় বিদ্ধ হয়েছেন।

বড় দায় চাপিয়ে চলে গেলেন উত্তরপুরুষের কাঁধে। আর ‘তুমি তাদের দেখবে’ বলে মধ্যমণি হওয়ার ইঙ্গিত রেখে গেলেন তাঁর জন্য।

কী করবেন সারদা! কী ঐশ্বর্য তাঁর আছে যা দিয়ে ত্রাণকর্ত্রীর ভূমিকায় অবতীর্ণা হবেন!

ছোট সুখ ছোট দুঃখ, পরশ্রীকাতরতা, ঈর্ষা, নিলেমন্দ, ছলনা-ভয়-কূপমণ্ডুকতা…এই সবই তো যেন মানুষের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে বাসা বেঁধে বসে আছে। তাঁর সঙ্গে আছে অস্বাস্থ্য, আমাশয়-ম্যালেরিয়া-ওলাওঠা। আরও আছে অশিক্ষা…দারিদ্র্য…পরাধীনতা। কোটি কোটি মানুষ জন্মায় চন্দ্রসূর্য দেখার আগে মরার জন্য। সামান্য মানবী তিনি, কী করতে পারেন এদের জন্য!

ঝিরঝির মৃদু হাওয়া আসছে জানালা দিয়ে। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে সারদার চোখে পড়ে, গঙ্গার ওপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছে একটা বজরা। ভরা ভাদ্রমাসের নদী, তবু নিস্তরঙ্গ। ঠায় দাঁড়িয়ে থাকেন। জলধারার শব্দ পাওয়া যায় না এতদূর থেকে, অথচ কীভাবে একাত্ম হয়ে যান ওই নিঃশব্দ নীরব বহমানতার সঙ্গে। আড়ম্বরহীন এক নিরন্তর চলা। স্রোতের উচ্ছ্বাস নেই, ধারাবাহিক বয়ে যাওয়া। সে-মানুষটি ছিলেন, গভীর দূরদৃষ্টি সম্পন্ন এক নিবিড় দার্শনিক। প্রায় শৈশব থেকে তেত্রিশ বছর বয়স পর্যন্ত দেখতে দেখতে, জানতে জানতে কী ভূষণে সাজিয়ে গেলেন সারদাকে। ছয় থেকে এ পর্যন্ত তাঁর জীবনও তো প্রকৃতপক্ষে এক শব্দহীন, নিরাড়ম্বর চলা ছাড়া আর কিছু নয়।

কী দেখেছিলেন, উপলব্ধি করেছিলেন ঠাকুর?

পুণ্যসলিলার মতো ওই নিস্তরঙ্গ নীরব বহমানতা। মেঘ-বৃষ্টি-ঝঞ্ঝা, ক্লেদ-আবর্জনা… সব কিছু ধারণ করেও নিভৃতে নিঃশব্দে সারদা ধারাপ্রবাহটিকে অক্ষুণ্ণ রাখতে পারবেন। তাঁর অহংকারের দাপট আর অস্থিরতা নেই। কিন্তু সীমাহীন ক্ষমা, সহ্য আর উদারতা আছে। ছোট মনের চালাকি, লোভ, বুজরুকি নেই। আছে সাদামাটা সহজিয়া মনুষ্যত্বের প্রাচুর্য। যাবতীয় পার্থিব অলংকার সেই শুভরাত্রির পরের প্রভাতেই তিনি খুলে দিয়েছিলেন, অন্য আসল অলংকার পরাবেন বলে। বিশ্বজননীর অলংকার। সমাজ-সংস্কার, হাওয়া বাতাসের ঝড়ঝাপটা গেল অনেক দিন ধরে, লুপ্তস্রোত বালুপথের রেখায় আঁকা স্বরলিপির মতো জীবনবোধের সুরটি ধরা রইল আধারটির মধ্যে। কোথায় তাঁর সংসার। লৌকিক সংসার তো নেই। বিশ্ব জুড়ে যাঁর কোল পাতা রয়েছে তাঁর সংসার কোনটি?

দোতালার ঘরে পশ্চিমের জানালার কাছে ভাবে আবিষ্ট পাথরের মূর্তি সারদা। ভেসে যাচ্ছেন আবেশে। সদা নির্মাণ চলেছে নিভৃতে। এই নির্জন নীরবতাই তাঁর জীবন। ঈশ্বরের যাবতীয় অপূর্ব সৃষ্টিই নীরব। অজান্তে তা জীবনের মধ্যে প্রবেশ করে, আলো-বাতাস-সৌরভ, নীরবতা দিয়েই ধারণ করে রাখে জীবনকে।

আপন অস্তিত্বটাই কখন যেন উবে গেছে সারদার। মিশে গেছেন তাঁর সৃষ্টির বহমানতায়। রচনার মতো, সংগীতের মতো, কবিতার মতো একাত্ম, আবার অধরাও। নেই, আবার আছিও। তোমার জন্যই আছি। “আমি হেথায় থাকি শুধু গাইতে তোমার গান”…।

রোদ পড়ে গেল। সোনা রং সূর্যের আলোয় লাল আভা। গোধূলির রং মেখে বহে যাচ্ছে নিস্তরঙ্গ সুরধুনী।

বলরাম দেখা করতে এলেন সন্ধ্যার অন্ধকার গাঢ় হওয়ার আগে।

লম্বা চওড়া দশাসই মানুষটি। পল্লির খ্যাতনামা অধিবাসীদের অন্যতম। অথচ আচার আচরণে যেমন সদালাপী ভদ্র বিনয়ী, তেমনই অহংকারশূন্য, নম্র, শিষ্ট। শ্রদ্ধা এবং আন্তরিকতার মিশ্রণেই মানুষটার ব্যক্তিত্বের প্রকাশ। মথুরবাবুর পুত্র ত্রৈলোক্যের পরে বলরামই ঠাকুর মানুষটার যাবতীয় দায়দায়িত্ব, দেখাশুনার ভার স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে কাঁধে নিয়েছিলেন। তিনি অমৃতলোক গমনের পরে, আপন কর্তব্যজ্ঞানেই সারদাকে নিজ ভবনে নিয়ে এসে কৃতজ্ঞ এবং কৃতার্থ বোধ করেছেন। পরমহংসের আগমনে এবং অবস্থানে যতটাই সম্মানিত এবং কৃপানুগত্যে বলরাম সিক্ত হয়েছিলেন, সারদাকে নিয়ে আসতে পেরেও ততখানি তো অবশ্যই, সম্ভবত ততোধিক আনন্দিত এবং সখী।

কিন্তু আত্মপ্রকাশে বলরাম মানুষটি যেন সদাই কুণ্ঠিত। আসলে শ্রদ্ধায় অবনত হয়ে থাকাই তাঁর স্বভাব। ঠাকুরের প্রতি শ্রদ্ধায়-ভক্তিতে এমনকী বলরাম তাঁর পাদস্পর্শ পর্যন্ত করতেন না, ধরে নিতেন, স্বহস্তে তাঁর পা ছুঁলেও যদি ঠাকুরের ঐশ্বরিক অস্তিত্ব কলুষিত হয়!

রসিক রামকৃষ্ণ জেনেবুঝেই বলরামকে ডেকে বলেছিলেন, পা-টায় মশা কামড়েছে…দেখি একটু চুলকে দাও তো। তাইতেও স্পর্শ করতে পারেননি বলরাম। রাখালকে ডেকে বলেছিলেন, ঠাকুরের পা চুলকোচ্ছে, দ্যাখো তো!

এহেন বলরাম সারদার সঙ্গে দেখা করতে এসে যে জোড়হস্তে ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবেন, তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। যদিও ইতিমধ্যে সারদা ‘মা জননী’ বলেই ভক্তদের কাছে স্বীকৃত এবং চিহ্নিত, তথাপি তিনি মানুষটাও তো এতকাল মুখ্যত ছিলেন অন্তঃপুরবাসিনী। বোধহয় খুব সম্প্রতিই অবগুণ্ঠনের আড়াল ঈষৎ অপসারণ করেছেন তিনি সম্ভবত কোনও বোধ অথবা কিঞ্চিৎ প্রয়োজনে। অল্পস্বল্প কথাবার্তা বলেন, যোগাযোগ করেন।

বলরামের পরিধানে সিলকের আলোয়ানের সঙ্গে একটি উষ্ণীষসহ পশমের পাগড়িও থাকে মাথায়। পাগড়িটি খুলে হাতে নিয়ে ঘরের বাইরে থেকে বিনয়ী কণ্ঠে বললেন, মা, আমি বলরাম, আমার প্রণাম নিন।

হ্যাঁ বাবা, আমার আশীর্বাদ নাও। খবর সব ভাল তো! সারদা ভিতর থেকে বললেন।

হ্যাঁ মা, আপনার আশীর্বাদে সব ঠিক আছে। বলরাম বললেন। একটি নিবেদন ছিল মা।

সারদা বললেন, আচ্ছা বাবা। তা বাইরে দাঁড়িয়ে কেন, ভেতরে এসে বোসো।

বলরাম তা সত্ত্বেও বাইরেই রইলেন, কুণ্ঠিত গলায় বললেন, ন্‌না ঠিক আছে। আপনার কোনও অসুবিধে হচ্ছে না তো মা?

কী বলো বাবা, তোমার এখানে অসুবিধে হলে, সুবিধে আর কোথায়?

আপনার মনের অবস্থা আমরা সবাই বুঝি মা।

তা তো বুঝবেই বাবা, তোমরা সবাই তাঁর ভক্ত সন্তান। আত্মার আত্মীয় তোমরা।

ভাবছিলাম…এখানকার পরিবেশে, এই ঘরবাড়ির সর্বত্র ঠাকুরের পদধূলি, স্পর্শ আর স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে…।

ঠিকই বলেছ বাবা। বলরামকে শেষ করতে না দিয়েই সারদা বলে গেলেন, কল্পনায় অহোরাত্রি দিন সেসব কথাই মনে আসে, ভাবি বসে বসে। তোমার এবাড়িতে আগেও এসেছি, কিন্তু তাঁর সঙ্গে তো কখনও আসিনি…এখন বুঝি এত আগ্রহ তাঁর কেন ছিল।

বলরামের একটু অবাক লাগল, আবার ভালও লাগল।

মা জননী মানুষটিকে কখনওই বা‌ক্‌পটু বলে তো ভাবেননি, বরং প্রায় নির্বাক অন্তঃপুরবাসিনী, ঘোমটা দেওয়া বউ মানুষ হিসেবেই জেনে এসেছেন। তিনি যে গুছিয়ে কথা বলেন, বাইরের মানুষজনের সঙ্গে মৌখিক আদানপ্রদানেও কিছুটা নিঃসংকোচ— সেটা বুঝে এবং শুনে বেশ ভাল লাগল।

একটু সহজ হয়েই বলরাম এগিয়ে এলেন দরজার কাছে। ঘরের প্রদীপের আলোয় তাঁকে দেখতেও পাচ্ছেন। বললেন, মা, ঠাকুর দেহ রাখার পরে আপনার কষ্ট শূন্যতা বুঝলেও, আমরা সামান্য মানুষ আপনার জন্য কী আর করতে পারি! বিশেষ করে এসব চেনাজানা জায়গায় আপনার মনোকষ্টের ভার হয়তো বেড়েই যাচ্ছে। সেইসব যৎকিঞ্চিৎ লাঘবের উদ্দেশ্যেই ভাবছিলাম…।

কী, বলো?

আপনাকে যদি…মানে লক্ষ্মীদিদি গোলাপমা সহ কিছুদিন যদি…কোনও তীর্থে-টির্থে… একটু হাওয়া বদলও হবে।

সে তো খুব ভাল কথা বাবা। তোমাদের অন্তর আছে বলেই অমন ভেবেছ। কিন্তু বাবা আমার সংগতি বলতে…।

বলরাম এবার শুধু অবাক না, শেষের ওই সামান্য একটু কথায় সারদার আত্মসম্মানবোধের ঝিলিকটুকু অনুভব করে যেন চমৎকৃত হলেন। সুতরাং সঙ্গে সঙ্গে বললেন, না-না, না মা। এ যে আমাদেরই কর্তব্য।

সারদা তারপরেও বললেন, তীর্থ ঘোরা, বেড়ানো যাই বলো বাবা, খরচ-খরচার বিষয়টি ঊহ্য থাকলে কি চলে! তাই বললুম।

আমাদের এটুকু কর্তব্য পালনের সুযোগ দিন মা। আমি এ নিয়ে মাস্টারমশাই, রামবাবু-গিরিশবাবু-নাগমশাই-সুরেনবাবু সকলের সঙ্গেই কথা বলেছি। তাঁরা সকলেই আপনাকে কিছুদিন তীর্থে পাঠানোর ব্যাপারে মত দিয়েছেন।

আমার আপত্তি নেই বাবা। এ সবই তাঁর ইচ্ছে।

বলরাম বললেন, বৃন্দাবনে এখন যোগীনমাও আছেন। আমার ভাগ্নেবউ তিনি, আপনার দেখাশোনার অসুবিধে হবে না। কালাকুঞ্জে আমাদের একটি পারিবারিক বসতবাটিও আছে। পথে আপনি অযোধ্যা আর বারাণসীধামও ঘুরে যেতে পারেন।

এত সৌভাগ্য সব তাঁরই আশীর্বাদের দান। তাহলেও বলছি বাবা এতগুলো লোক নিয়ে দূরের দেশে…।

মনে বিন্দুমাত্র সংকোচ রাখবেন না মা। বলরাম বললেন, তা ছাড়া আপনি তো জানেন, ঠাকুর আপনার জন্যই কিছু অর্থ আমার কাছে গচ্ছিত রেখেছিলেন। সেটাই আমাদের সামান্য জমিদারিতে খাটিয়ে আপনার হাতে কিছু তুলে দিই…সুতরাং…।

ও যে তোমার ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করা বাবা। ওটুকুর কথা আর তুললা না।

আমি তাহলে ব্যবস্থা করছি মা। দেখি আর কে কে…।

একটা কথা বাবা। তোমরা আপনার জন বলেই বলা। কাশীপুর বাগানবাড়ির মেয়াদ তো ফুরিয়ে এল। ছেলেদের কথা ভেবেই বুক টনটন করে। তিনি দেহ রাখার পরেই এরা যদি সব বাউন্ডুলের মতো হা-ঘরে হয়ে ভেসে ভেসে বেড়ায়… ওরা তো বিষয়সুখ চায় না বাবা। শুধু একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই অন্তত যদি হয় কোথাও!

দেখা চলছে মা। বলরাম শান্ত হয়েই বললেন, বরানগরের দিকে সুরেনবাবু একটা ডেরা দেখেছেন, অবস্থা তেমন সুবিধের নয় বলেই…

তোমাদের মুখে ফুলচন্দন পড়ুক বাবা। অবস্থা যেমনই হোক, রাস্তায় তো পড়ে থাকবে না।

তাহলে মা, এই পনেরোই ভাদ্র, দিনটা ভাল আছে, ব্যবস্থা করছি।

করো বাবা, ওদিন বুধবার, ঠিক আছে। মঙ্গলে উষা, বুধে পা, যথা ইচ্ছা তথা যা।

দু’দিন পরে বলরামের বাড়ি থেকেই তীর্থদর্শনে রওনা হলেন সারদা। লক্ষ্মী আর গোলাপমা তো ছিলেনই। মাস্টারমশাইয়ের স্ত্রী নিকুঞ্জদেবীও সঙ্গ নিলেন। আর মনটা সব থেকে বেশি উৎফুল্ল হল যখন দেখলেন যোগীন-কালী আর লাটুও যাত্রার দিন একটা করে অকিঞ্চিৎকর বোঁচকা নিয়ে তাঁদের সঙ্গেই রেলগাড়িতে উঠছে।

হাওড়া ইস্টিশন থেকে দূরপাল্লার গাড়ি ছাড়ল রাতের অন্ধকারে। তাঁকে স্মরণ করে কপালে হাত ছোঁয়ালেন সারদা। দুর্গা, দুর্গা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *