১৬. নিজেকে আবিষ্কার করুন : আপনার মত আর কেউ নেই

নিজেকে আবিষ্কার করুন : আপনার মত আর কেউ নেই

আমি নর্থ ক্যারোলিনার মাউন্ট এয়ারির মিসেস এডিথ আলরেডের কাছ থেকে একখানা চিঠি পাই। চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন : ছোট বয়সে আমি অত্যন্ত স্পর্শকাতর আর লাজুক ছিলাম। বয়সের তুলনায় আমার ওজন বড় বেশি ছিলো আর আমার ফোলা গাল দুটোর জন্য আমাকে আরও মোটা দেখাতো। আমার মা ছিলেন একেবারে সেকেলে ধরনের, তার ধারণা ছিলো সুন্দর পোশাক বানানো হলো বোকামি । তিনি সব সময় বলতেন ঢিলে ঢালা পোশাক টেকে বেশি, আটো পোশাক ছেড়ে তাড়াতাড়ি। সেই ভেবেই তিনি আমায় পোশাক পরাতেন। আমি কোনদিন কোন অনুষ্ঠানে যোগ দিতাম না, কোন আনন্দও করতাম না। তাছাড়া যখন স্কুলে যেতাম অন্য সব ছেলে মেয়েদের সঙ্গে কোন ব্যাপারে যোগ দিতাম না।

এমন কি খেলাধুলোতেও না। আমি অস্বাভাবিক রকম লাজুক ছিলাম। আমার খালি মনে হতো আমি বাকি সবাইয়ের চেয়ে আলাদা আর আমাকে কেউই চায় না।

আমি যখন বড় হলাম তখন আমার চেয়ে বেশ কয়েক বছরের বড় একজনকে বিয়ে করলাম। কিন্তু আমার কোন রকম পরিবর্তন হলো না। আমার শ্বশুর বাড়ির আত্মীয়–স্বজনেরা সবাই বেশ ফিটফাট আর আত্মবিশ্বাসে ভরপুর ছিলো। তাদের মনোগত ইচ্ছে ছিলো আমিও তাদের মত হই, কিন্তু কিছুতেই তা আর হলো না। আমি আপ্রাণ চেষ্টায়, তাদের মত হতে চাইলেও পারলাম না। তারা যতই আমাকে খোলসের মধ্য থেকে বাহিরে টেনে আনার চেষ্টা চালালো আমি ততই যেন আরও বেশী করে খোলসের মধ্যে ঢুকে গেলাম । এতে আমি বেশ অস্বস্তি আর বিরক্তিও বোধ করতে আরম্ভ করলাম। সব বন্ধু বান্ধবদের এড়িয়ে চলতেও শুরু করলাম আমি। এমনই অবস্থাটা খারাপ হয়ে দাঁড়ালো যে দরজার ঘন্টা বাজার শব্দ শুনতে পেয়েও আমি ভয়ে সিঁটিয়ে থাকতাম! আমি বুঝতে পারতাম আমি সবদিক দিয়েই একদম ব্যর্থ। আমি এটা বেশ ভালো করেই বুঝতে পারতাম আর আমার খালি ভয় হতো আমার স্বামী সব একদিন টের পেয়ে যাবেন। তাই যখনই আমরা বাইরে বেরোতাম, আমি হাসিখুশি থাকতে চেষ্টা করতাম এবং তাতে ভয়ে বেশ একটু বাড়াবাড়িই করে ফেলতাম। আমি বুঝতে পারতাম এই বাড়াবাড়িটা, এবং এরপর কয়েকদিন বেশ মনমরা অবস্থায় কষ্টে কাটাতাম। শেষ পর্যন্ত আমি এমনই অসুখী হয়ে উঠলাম যে মনে হতো আর আমার বেঁচে থাকারই বোধহয় কোন যুক্তি নেই। আমি আত্মহত্যা করার কথা ভাবতে শুরু করলাম।

এই অসুখী মহিলার জীবনধারা কেমন করে কিভাবে বদলে গেলো জানেন? আচমকা বলা একটা মন্তব্যের মধ্য দিয়ে।

আচমকা বলা একটা মন্তব্যই মিসেস আলরেড তাঁর চিঠিতে লেখেন, আমার সমস্ত জীবনটাই বদলে দিলো। আমার শাশুড়ি একদিন বলেছিলেন কিভাবে তিনি তাঁর ছেলেমেয়েদের মানুষ করে তোলেন। তিনি বললেন, যাই ঘটুক না কেন আমি সব সময়েই তাদের নিজের মত চলতে দিতাম…নিজের মত চলতে দিতাম…এই মন্তব্যটাই সব কিছুই ওলোট পালোট করে দিলো। একটা বিদ্যুতের পরশেই যেন আমি বুঝতে পারলাম, যে অবস্থার সঙ্গে আমার খাপ খায় না আমি তার মধ্যেই কেবল আমায় মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে চলেছি।

.

রাতারাতিই আমি পালটে গেলাম। আমি নিজেকে ফিরে পেয়ে নিজের মতই হতে শুরু করলাম। আমি আমার নিজের ব্যক্তিত্ব পর্যালোচনা করতেও শুরু করে দিলাম এবং কি ছিলাম সেটা জানতে চেষ্টা করতে লাগলাম। আমি আমার দোষ গুণ সম্পর্কে কি আছে বারবার সেটা জানার চেষ্টা করলাম। আমি রঙ আর পোশাকের কায়দা কানুন পর্যালোচনা করে আমায় যা মানায় সেই পোশাক পরতে শুরুও করে। দিলাম। এরপর বন্ধুত্ব লাভের জন্য হাত বাড়িয়ে দিলাম। একটা প্রতিষ্ঠানে আমি যোগদানও করলাম–প্রথমে এক ছোট প্রতিষ্ঠানে–সেখানে আমি ভয়ে প্রায় সিঁটিয়েও গেলাম, যখন দেখলাম তারা আমাকে একটা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার ব্যবস্থা করলো। কিন্তু প্রতিবার কথাবলার পর থেকেই একট একটু করে আমার সাহস বেড়ে গেলো। এসবে বেশ সময় লেগেছে সেটা ঠিক–তবে আজ আমি যে রকম সুখী তা কোন কালে সম্ভবপর বলে স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি। আমার নিজের ছেলেমেয়েদের মানম করে তোলার কাজে আমি বিশেষ ভাবেই তাদের এটাই শিখিয়েছি। যে তিক্ত অভিজ্ঞতা আমার জীবনে ভোগ করতে হয়েছে, আর আমি যে শিক্ষাটি লাভ করেছি তাহলো : যাই ঘটুক না কেন সব সময় নিজের মত হও।

নিজের মত হওয়ার ইচ্ছের এই সমস্যা প্রায় ইতিহাসের মতই পুরনো, কথাটা বলেন ডঃ জেমস গর্ডন গিলকি । তার আরও বক্তব্য হলো, এ ব্যাপারটা আবার মানুষের জীবনের মতই সার্বজনীনও বটে। নিজের মত না হওয়ার এই সমস্যাটা বহু জটিলতা, মনোবিকলন আর মানসিক অশান্তির আড়ালে থেকে গেছে। এঞ্জেলে পাদ্রি শিশুদের শিক্ষাদানের ব্যাপারে তেরো খানি বই আর হাজার হাজার সাময়িক খবরের কাগজে প্রবন্ধও লিখেছেন। তাঁর কথা হলো : যারা অন্যের মত হওয়ার চেষ্টা করে তাদের মত হতভাগ্য আর কেউ নেই। যদি সে নিজে শারীরিক এবং মানসিক দিক দিয়ে অন্যরকম কিছু হয়।

.

নিজে যা নয় সেই রকম হওয়ার চেষ্টা বা ইচ্ছে বিশেষ করেই হলিউডে অত্যন্ত বেশি রকম প্রকট। স্যাম উড অতীতের একজন হলিউডের অতি প্রখ্যাত পরিচালক বলেছিলেন, উঠতি অভিনেতাদের নিয়ে তার সবচেয়ে বেশি সমস্যা ছিলো এই : তাদের ঠিক নিজেদের মত গড়ে তোলা। সমস্যাটা হলো তারা প্রায় সবাই চাইতো লানা টার্নার বা ক্লার্ক গেবেল হয়ে উঠতে । জনসাধারণ তো ইতিমধ্যেই বিখ্যাত ওই সব অভিনেতাদের দেখেছে, স্যাম উড তাদের বোঝাতে চাইতেন, এখন তারা চায় নতুন কিছু।

‘গুডবাই মিষ্টার চিপস্’ আর ‘ফর হুম দি বেল টোলস্’–এর মত ছবি পরিচালনা শুরু করার আগে স্যাম উড বহু বছর সম্পত্তি বেচা–কেনার কারবারে কাটিয়েছিলেন, তাঁর কাজ ছিলো ব্যবসার কাজে ব্যক্তিত্ব তৈরি করা। তিনি বলতে চেয়েছিলেন যে ব্যবসা জগতে যে নীতি চলে ঠিক সেই নীতিই আবার চলে চলচ্চিত্র জগতটাতেও। বনমানুষের মত নকল নবীশ হয়ে কোথাও পৌঁছনো যায় না, এমন কি তোতাপাখি হয়েও লাভ নেই। স্যাম উড আরও বলেন, অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই আমি শিখেছি, যে সমস্ত লোক তারা যা নয় সেটাই হবার ভান করে তাদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিদেয় করা যায় ততই নিরাপদ হওয়া যায়।

আমি কিছুদিন আগে সোকোনি–ভ্যাকুয়াম অয়েল কোম্পানীর চাকুরী সংক্রান্ত নিয়োগ বিষয়ে ডাইরেক্টর পল বয়েনটুনকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম চাকরির আবেদন করার সময় মানুষ সবচেয়ে বড় ভুল কি করে? তাঁর একথা জানা আছে অবশ্যই, কারণ জীবনে তিনি প্রায় ষাট হাজারেরও বেশি আবেদনকারীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। এছাড়াও তিনি আবার ‘চাকরি পাওয়ার ছ’টি উপায়’ নামে একখানা বইও রচনা করেছেন। তিনি জবাবে বলেছিলেন : চাকরির আবেদন করার সময় মানুষ সবচেয়ে বড় যে ভুল করে তা হলো তারা আত্মবিস্মৃত হয়ে পড়ে। নিজেদের প্রকৃত তথ্য গোপন রেখে তারা মোটেই খোলাখুলি সবকথা বলতে চায় না, বরং এটা না করে তারা এমন সব উত্তর দেয় যা তারা মনে করে আপনি এতে খুব খুশী হবেন। তবে এতে কাজ হয় না কারণ কেউই গোপনীয়তাপ্রিয় মানুষকে চায়না। যেহেতু কোন মানুষই জাল মুদ্রা চায় না।

এই ব্যাপারটা একজন গাড়ির কন্ডাকটারের মেয়েকে বেশ কষ্ট করেই শিখতে হয়েছিলো। সে একজন গায়িকা হতে চেয়েছিলো, কিন্তু ওর দুর্ভাগ্যের কারণ হয়ে উঠেছিলো ওর মুখোনা। ওর মুখ বেশ বড় আর দাঁতগুলো সামনের দিকে বেরোনো অবস্থায় থাকতো। সে যখন প্রথম জনসাধারণের সামনে গানে অংশ নেয়–নিউ জার্সির এক নাইট ক্লাবে–সে বারবার গান গাওয়ার ফাঁকে উপরের ঠোঁট দিয়ে দাঁত ঢাকার চেষ্টা করছিল। সে অবশ্য আপ্রাণ চেষ্টায় নিজেকে সুন্দরী প্রমাণ করতে চাইছিলো। এর ফল কি হলো? সে নিজেকে হাস্যকর করে তুললো। ব্যর্থতার দিকেই সে এগিয়ে চলছিলো।

যাই হোক, ওই নাইট ক্লাবে একজন ছিলেন, তিনি মেয়েটিকে গান গাইতে দেখে বুঝেছিলেন ওর প্রতিভা আছে। এই যে শোনো, ভদ্রলোক সোজাসুজি বলে ফেললেন, আমি তোমায় গান গাইতে দেখেছিলাম আর আমি জানি তুমি কি লুকোবার চেষ্টা করছো। তুমি তোমার দাঁতের জন্য লজ্জা পাচ্ছো। মেয়েটি বেশ অস্বস্তিতে পড়ে গেলো, তবুও ভদ্রলোক বলে চললেন, এতে হয়েছে কি? এরকম দাঁত থাকা কি অপরাধ? এটা লুকোবার চেষ্টা করো না! মুখ খুলেই গান গাইবার চেষ্টা করো তাতে শ্রোতারা বুঝতে পারবে তুমি লজ্জিত নও। তাছাড়া ভদ্রলোক বেশ দূরদৃষ্টি নিয়ে বললেন, যে দাঁত তুমি লুকোনোর চেষ্টা করছো তাই হয়তো তোমাকে একদিন ঐশ্বর্য এনে দেবে!

ক্যাস ডেলি ভদ্রলোকের উপদেশে সত্যিই দাঁতের কথা ভুলে গেলো। ওই সময় থেকেই মেয়েটি শুধু ওর শ্রোতাদের কথাই ভাবতে লাগলো। সে মুখ খুলে এমন দরাজ স্বরে আর আনন্দে গাইতে আরম্ভ করলো যে অল্পদিনের মধ্যেই সে বেতার আর চলচ্চিত্রে শিল্পী হয়ে উঠলো। এখন অন্যান্য কমেডিয়ান তাকেই নকল করার চেষ্টা করছে।

বিখ্যাত উইলিয়াম জেমস একবার কিছু লোকের কথা বলেছিলেন যারা নিজেদের চিনতে পারে না। তাঁর মতে সাধারণ মানুষের মধ্যে মাত্র শতকরা দশ ভাগই নিজেদের মানসিক শক্তির উজ্জীবন ঘটাতে পারে। তিনি লিখেছিলেন, আমাদের যা হওয়া উচিত সে সম্পর্কে আমরা অর্ধ জাগরিত। আমরা আমাদের শারীরিক আর মানসিক ক্ষমতার সামান্য অংশই কেবল কাজে লাগাতে পারি । ভালো করে বলতে গেলে একজন মানুষ নিজের খোলসের মধ্যেই থেকে যায়। তার বহু ধরণের চাপা ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সে তার অনেকটাই কাজে লাগাতে পারে না।

.

আমার বা আপনার এই ক্ষমতা আছে তাই আমরা অন্য লোকের মত নই একথা ভেবে আর এক মহর্ত সময়ও নষ্ট করা উচিত নয়। এ পৃথিবীতে আপনারও কিছু নতুনত্ব আছে। সময়ের আদিকাল থেকে আজ পর্যন্ত ঠিক আপনার মত কেউ জন্মায় নি, আর আগামী হাজার হাজার বছরেও ঠিক আপনার মতই আর কেউ কখনই জন্মাবে না। আধুনিক জীবন বিজ্ঞান থেকে জানা যায় আপনি হলেন আপনার বাবা আর মায়ের প্রত্যেকের দেওয়া চব্বিশটি করে ক্রোমোসোম থেকে জন্ম নেওয়া একজন। এই চব্বিশটি আর চল্লিশটি অর্থাৎ আটচল্লিশটি ক্রোমোসোমই জানিয়ে দিচ্ছে আপনি যা তাই! আমরাম শিনফিল্ড বলেছেন, প্রতিটি ক্রোমোসোমে কুড়ি থেকে একশটা পর্যন্ত জিন থাকতে পারে–আর একটা মাত্র জিনই কোন কোন ক্ষেত্রে একজনের সারা জীবনধারাই বদলে দিতে পারে। সত্যি কথা বলতে গেলে আমরা বেশ ভিত্তিকর আর অপূর্ব কিছু দিয়েই তৈরি।

আপনার জন্মের সময় এটা কোটি কোটি বারের মধ্যে একবারও জানা সম্ভব ছিলো না ঠিক আপনারই জন্ম হবে! অন্যভাবে বললে আপনার যদি কোটি কোটি ভাই বোন থাকতো তাহলেও আপনি হতেন তাদের চেয়ে আলাদা। এটাকে কি আন্দাজ বলে ভাবছেন? না, এটা বিজ্ঞানসম্মত সত্য। এ সম্পর্কে সত্যিই যদি কিছু জানতে আগ্রহী হন তাহলে লাইব্রেরীতে গিয়ে আমরাম শিনফিল্ডের ‘আপনি ও বংশধারা’ বইটা পড়ে ফেলুন।

আমি এই আপনার নিজের মত হয়ে ওঠা নিয়ে দৃঢ়তার সঙ্গে কথা বলে যেতে পারি কারণ এ ব্যাপারে আমার আগ্রহ অপরিসীম। কি নিয়ে কথা বলছি আমি বেশ ভালোই জানি। এটা আমি লাভ করেছি বেশ তিক্ত আর ব্যয়বহুল অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। উদাহরণ হিসেবে বলছি : আমি যখন প্রথম মিসৌরীর শস্যক্ষেত্রে থেকে নিউইয়র্কে আসি, তখন আমেরিকান অ্যাকাডেমী অব ড্রামাটিক আর্টসে আমি ভর্তি হই। আমার ইচ্ছে ছিলো অভিনেতা হওয়া। ব্যাপারটা আমার মনে হয়েছিলো দারুণ একটা কিছু আবিষ্কার করেছি। এটা আমার কাছে সাফল্যের সহজ পথ বলেই মনে হয়েছিলো–কেমন সহজ সরল ব্যাপার। আমি বুঝতেই পারিনি এমন একটা পথ উচ্চাকাঙ্ক্ষী হাজার হাজার মানুষ কেন আগেই আবিষ্কার করতে পারেনি। ব্যাপারটা এই রকম : আমার কাজ হবে সেকালের সব বিখ্যাত অভিনেতা কেমন করে কাজ করতেন সেটা শেখা–যেমন জন ডু, ওয়াল্টার হ্যাঁম্পডেন আরও অনেকে কেমন করে খ্যাতির শিখরে ওঠেন। এরপর আমি তাঁদের প্রত্যেকের সেরা ব্যাপারগুলো নকল করবো আর তার ফলে তাদের সকলের কৃতিত্ব জড়িয়ে আমি হয়ে উঠবে দারুণ খ্যাতিমান দক্ষ শিল্পী । কিন্তু কি বোকার মত ধারণা! কতখানি অবাস্তব, অসম্ভব! অন্য সব লোককে নকল করতে গিয়ে এইভাবে আমার জীবনে বেশ মূল্যবান কটা বছর আমি নষ্ট করে বসলাম । মিসৌরী এলাকায় আমার মোটা মাথায় এটা ঢুকলোনা, আমায়–আমার মতই হতে হবে, আর পক্ষে অন্য কেউ হয়ে ওঠা সম্ভব হবে না।

ওই দুঃখজনক অভিজ্ঞতা থেকে আমার চিরকালীন একটা শিক্ষা হওয়া উচিত ছিলো। কিন্তু তা হলো । অন্ততঃ আমার ক্ষেত্রে হলো না। আমি নেহাতই আকাট ছিলাম। আমাকে আবার গোড়া থেকেই শিখতে হলো। বেশ ক’বছর পরে আমি ব্যবসাদারদের জন্য একখানা বক্তৃতা দেওয়ার বই লিখতে আরম্ভ করেছিলাম, আমি ভেবেছিলাম এমন বই আগে আর কেউ লেখেন নি যাতে সব থাকবে। বইটা লেখার সময় আমার সেই আগেকার বোকার মত ধারণা ছিলো, সেই অভিনেতা হওয়ার ধারণা–আমি এমন বই লিখতে চাইছি, যে সব ধারণা আগে বহু লেখকই তাদের বইতে লিখে গেছেন। অতএব আমি কি করলাম? আমি বেশ কিছু বই জোগাড় করে ফেলোম জনগণের সামনে বক্তৃতা দেওয়ার উপর লেখা, তারপর একবছর ধরে সব কিছু আমার বইয়ের পাণ্ডুলিপিতে লিপিবদ্ধ করলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমার মাথায় জাগলো আমি আবার সেই বোকার মত কাজ করতে চলেছি। অন্য সব মানুষের ধারণা মেশানো আমার লেখাটা এমনই একটা খিচুড়ির মত ব্যাপার আর সেটা এমনই মূল্যহীন, নীরস যে কোন ব্যবসাদার মানুষ তাতে চোখ বোলাতেও চাইবেন না। অতএব আমি সব কিছু বাজে কাগজের ঝুড়িতেই ফেলে দিয়ে আবার গোড়া থেকে শুরু করলাম। এবারে নিজেই নিজেকে বললাম : তোমাকে ডেল কার্নেগী হতে হবে, তার সব ত্রুটি আর যত কম ক্ষমতাই থাকনা কেন । তুমি সম্ভবতঃ অন্য কেউ হয়ে উঠতে পারবে না। অতএব আমি অন্য কারো মিশেল না হতে চেয়ে জামার হাতা গুটিয়ে প্রথমেই যা করা উচিত ছিলো তাই করতে লেগে গেলাম।

.

আমার নিজের দেখা অভিজ্ঞতা, দেখাশোনা আর বক্তৃতা এবং বক্তৃতা শিক্ষক হিসেবে যে ধারণা আর অভিজ্ঞতা আমার হয়েছিল তাই সম্বল করেই একটা বই লিখতে আরম্ভ করলাম । আমি সারা জীবন ধরে যা শিখলাম–আমার মনে হয় স্যার ওয়াল্টার র‍্যালে যা শিখেছিলেন তাই। (আমি অবশ্য সেই ওয়াল্টার র‍্যালের কথা বলছি না যিনি রাণীর যেতে সুবিধে হবে বলে নিজের কোট কাদায় বিছিয়ে দেন। আমি বলছি ১৯০৪ সালের কাছাকাছি অক্সফোর্ডের ইংরাজী সাহিত্যের অধ্যাপক স্যার ওয়াল্টার র‍্যালের কথা ।) তিনি, বলেছিলেন, শেক্সপিয়ারের মত কোন বই আমি লিখতে পারি না তবে আমি নিজের যোগ্য বই লিখতে পারি।

নিজের মত হোন। প্রয়াত জর্জ গার্সউইনকে আরভিং বার্লিন যে মূল্যবান পরামর্শ দিয়েছিলেন সেই ভাবেই কাজ করুন। বার্লিন আর গার্স উইনের যখন প্রথম দেখা হয়, তখন আরভিং বার্লিন বিরাট খ্যাতিমান মানুষ আর গার্স উইন জীবন সংগ্রামরত টিন প্যানআলীতে সপ্তাহে মাত্র পঁয়ত্রিশ ডলার উপার্জনকারী এক তরুণ গীতিকার । বার্লিন গার্স উইনের দক্ষতা লক্ষ্য করে তাঁকে তাঁর সঙ্গীত সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করার জন্য প্রায় ওর তখনকার মাইনের তিন গুণ বেশী দিতে চাইলেন। তাসত্বেও বার্লিন ওকে উপদেশ দিয়ে বললেন, তুমি কাজটা নিওনা। যদি এটা নাও, তুমি হয়ত দ্বিতীয় শ্রেণীর এক বালিন হয়ে উঠবে । কিন্তু তুমি যদি নিজের মত হছে চাও তাহলে তুমি কোনদিন হয়তো প্রথম শ্রেণীর গার্স উইন হতে পারবে।

গার্স উইন ওই সতর্কতার কথা মেনে নিয়ে ধীরে ধীরে নিজেকে সে সময়কার একজন বিখ্যাত আমেরিকান সঙ্গীত রচয়িতা করে গড়ে তুলেছিলো।

চার্লি চ্যাপলিন, উইল রোজার্স, মেরী মার্গারেট ম্যাকব্রাইড, জিন অট্রি আর এই রকম লক্ষ লক্ষ মানুষকে আমি এই পরিচ্ছেদে যে শিক্ষা আপনাদের মাথায় ঢোকাতে চাইছি, ঠিক সেইভাবেই শিখতে হয়েছিলো। তাদের সকলকেই কঠিন পথে সব শিখতে হয়–যেভাবে আমাকেও হয়।

চার্লি চ্যাপলিন যখন প্রথম ছবি বানাতে আরম্ভ করেন, ছবির পরিচালক তাঁকে সে যুগের একজন বিখ্যাত জার্মান হাস্যরসিককে নকল করার কথা বলেন। নিজের মত অভিনয় না করা পর্যন্ত চ্যাপলিন প্রায় দাঁড়াতেই পারেন নি। বব হোপের একই রকম অভিজ্ঞতা হয়–তিনি বহুবছর নাচগানের অভিনয় করেও কোথাও পৌঁছতে পারেন নিশেষ পর্যন্ত সব ঝেড়ে ফেলে নিজের মত হয়ে ওঠার পরেই তার খ্যাতি আসে। উইল রোজার্সেরও অভিজ্ঞতা একই রকম–বহুবছর ঘসার পরেই তাঁর আত্মদর্শন ঘটে, তিনি বোঝেন তার মধ্যে অদ্ভুত হাস্যরসের ভাণ্ডার রয়েছে।

মেরী মার্গারেট ম্যাকব্রাইড যখন প্রথম বেতারে যোগ দেন তিনি এক আইরিশ কমেডিয়ান হতে চেয়ে ব্যর্থ হন। তারপর যখন তিনি নিজে যা অর্থাৎ মিসৌরীর এক সাধারণ গ্রাম্য মেয়ে বলে পরিচিতি রাখেন–তিনি হয়ে ওঠেন নিউইয়র্কের অন্যতম জনপ্রিয় এক বেতার শিল্পী।

জিন অট্রি তার টেক্সাস কথার ভঙ্গী পাল্টানোর জন্য চেষ্টা করে শহরে ছেলের মত পোশাকও পরতে শুরু করে। সে দাবী করতে আরম্ভ করেছিলো যে নিউইয়র্ক থেকেই এসেছে। ব্যাপারটা দেখে সবাই আড়ালে হাসাহাসি করতে শুরু করে দেয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জিন অট্রি তার ব্যাঞ্জো বাজিয়ে কাউবয়দের গান গাইতে আরম্ভ করার পরেই সে হয়ে ওঠে চলচ্চিত্র আর বেতারে অত্যন্ত জনপ্রিয় এক কাউবয়।

আপনি এবং এ দুনিয়া একটা নতুন কিছুই । এটা ভেবেই খুশী হয়ে উঠুন আর প্রকৃতি যা আপনাকে দিয়েছে তাই যতটা পারেন কাজে লাগান। বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায় সমস্ত শিল্প কর্মই আত্মজীবনী মূলক। আপনার নিজের মতই আপনি গাইতে পারেন আর নিজের মত আঁকতে পারেন। আপনাকে হতে হবে আপনার অভিজ্ঞতা, পারিপার্শ্বিকতা আর বংশধারা আপনাকে যা দিয়েছে। খারাপই হোক আর ভালোই হোক আপনার নিজের বাগানের পরিচর্যা আপনাকেই করতে হবে। ভালো বা মন্দ যাই হোক আপনার জীবনের সঙ্গীত ব্যঞ্জনা আপনাকেই বাজিতে যেতে হবে ।

এমার্সন তার ‘আত্ম–নির্ভরতা’ নামের প্রবন্ধে যেমন লিখেছিলেন : প্রত্যেক মানুষের শিক্ষাজীবনে একটা সময় আসে যখন তার বোধ জাগে, ঈর্ষা হলো অজ্ঞতা, নকল করা হলো আত্মহত্যা আর কে ভালো বা মন্দ হোক এ শিক্ষা গ্রহণ করতেই হবে। সমস্ত পৃথিবী যদিও উদারতায় ভরা তবুও গড়ে ওঠার জন্য যে শস্যের প্রয়োজন সেই শস্যের জন্য পরিশ্রম করা চাইই, চাই চাষ করা । তার মধ্যে মসলা আছে তা প্রকতিতে নতুন আর সে নিজে জানতে না চাইলে বা চেষ্টা না করলে সেও সেটা বুঝতে পারবে না।

এমার্সন এই ভাবেই তার কথা বলে গেছেন। এছাড়াও ঠিক এমন কথাই আবার কবিতায় লিপিবদ্ধ করে গেছেন কবি ডগলাস ম্যালচ।

তাঁর কবিতার মূল কথা হল এই রকম :

তুমি যদি পাহাড়ের বুকে দেবদারু না হতে পারো,
        তবে হয়ে উঠো উপত্যকায় কোন ঝোপ।
        তুমি ঝোপও যদি না হতে পারো,
        তবে হয়ে উঠো এক মুঠো ঘাস।
        যদি দলপতি না হতে পারো।
        হয়ে উঠো কিছু সেনা।
        যদি রাজপথ না হতে পারো।
        হতে চেও কোন সরু পথ।

আসলে মূল কথাটি হলো আমাদের সকলেরই নিজের মত কিছু করার রয়েছে সেটাকেই কাজে লাগানো চাই।

আমাদের মনকে তৈরি করে চিন্তাভাবনা ছেড়ে শান্তির পথ আবিষ্কার করতে হলে এই নিয়মটা মেনে চলা চাই :

অন্যকে নকল করবেন না। নিজেদের আবিষ্কার করে আসুন নিজেদের মতই হয়ে উঠি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *