6 of 8

সৈয়দ মুজতবা আলি

সৈয়দ মুজতবা আলি

অনেকদিন পরে এবার একজন জ্যান্ত মানুষের কথায় আসছি, সৈয়দ মুজতবা আলি।

আমার এই অল্পবেশি চার দশকের সাহিত্যজীবনে কত উত্থানপতন দেখলাম। কত দিগ্বিজয়ী লেখককে ঘোড়া থেকে ছিটকিয়ে মুখ থুবড়িয়ে পড়তে দেখলাম। ঈশ্বরের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছিল যে লেখককে, মৃত্যুর দু’ বছর পরে তাঁর আর কোনও পাত্তা নেই। তাঁর বইয়ের বিজ্ঞাপন নেই, তাঁর রচনার আলোচনা নেই, থাকলেও দায়সারা। দোকানের শো-কেসে তাঁর বই নেই। শৌখিন পাঠিকার বালিশের নীচে কেশতেলে সিক্ত সেই পুরনো পত্রিকা আছে কিন্তু তাতে তাঁর কোনও কথা নেই।

বেশি বলে লাভ নেই। মোদ্দা ব্যাপার হল, জীবদ্দশায় অতি বিখ্যাত, অতি জনপ্রিয় অনেক লেখকই মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে মরে যান। দু’-চার দিন ওই শ্রাদ্ধশান্তি, নিয়মভঙ্গ পর্যন্ত টিকে থাকেন। তারপর কানা মাছি ভোঁ-ভোঁ কিন্তু আশ্চর্য কৌশলে মুজতবা বেঁচে রয়েছেন। এখনও তাঁর বই, গ্রন্থাবলি প্রকাশক ছাপেন। লোকে কেনে লোকে পড়ে। ‘কোরক’ নামে একটি সাহিত্য-পত্রিকা এই বইমেলায় সৈয়দ মুজতবা আলির ওপরে একটি সংখ্যা বার করেছেন। প্রায় তিনশো পৃষ্ঠার রীতিমতো গ্রহণযোগ্য সংকলন।

‘শেষমেষ’ নামক এই তরল নিবন্ধমালায় পুস্তক বা পত্রিকা সমালোচনার সুযোগ নেই। আমরা সে ব্যাপারে যাচ্ছি না। সৈয়দ মুজতবা আলির অতি বিখ্যাত, অতি পরিচিত সরস কবিতা কথিকাগুলি পুনরুদ্ধার করারও কোনও প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। সেই সব রসিকতার আখ্যান বাঙালি পাঠকের খুবই পরিচিত।

কোরকের এই মুজতবা সংখ্যায় আমি মুজতবা সাহেবের কয়েকটি অলিখিত রসিকতার সন্ধান পেলাম, তাঁর চিঠি বা আলাপচারিতা থেকে এইগুলি উৎকলিত। বলাবাহুল্য, মুজতবা-বাক্যের কোনও তুলনা নেই। শেষমেষের পাঠক-পাঠিকারা একবার দেখুন।

বিশিষ্ট চর্মরোগ চিকিৎসক এবং বিশেষজ্ঞ ডা. মহম্মদ আব্দুল ওয়ালির সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ঠতা ছিল সৈয়দ মুজতবা আলির।

ডাক্তার ওয়ালি এক বৃষ্টির দিনের গল্প বলেছেন। সকালবেলা প্রতিবেশী এক বন্ধুর বাড়িতে চা-পানের আসর বসেছে। সে আসরের মধ্যমণি, বলা বাহুল্য, সৈয়দ মুজতবা আলি। বাইরে ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে, এমন সময় মুজতবা উঠে দাঁড়ালেন আরামকেদারা ছেড়ে একবার নিজের বাসায় যাবেন, সেখান থেকে কী একটা দরকারি বই নিয়ে আসবেন। বাইরে তুমুল বৃষ্টি। সবাই হাঁ হাঁ করে উঠল। ‘যাবেন না, যাবেন না। বাইরে বেরবেন না।’

মুজতবা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কেন?’ সবাই বলল, ‘দেখছেন না বৃষ্টি। বৃষ্টির জলে ভিজে যাবেন যে।’ শুনে মুজতবা হেসে বললেন, ‘আমি মিছরি না চিনি? ভিজলে কি আমি গলে যাব।’

অল্পক্ষণ পরে নিজের বাড়ি থেকে প্রয়োজনীয় বইটি হাতে নিয়ে মুজতবা ফিরে এলেন। তারপর হাসতে হাসতে সবাইকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমরা কী জানো যে ইহুদিরা ছাতা কেনে না।’ সবাই বলল, ‘না, এ রকম কথা তো আমরা কখনও শুনিনি।’ মুজতবা বললেন, ‘না, শুনে থাকো তাতে কিছু আসে যায় না। তবে কারণটা জানতে চাও কি ?’ সবাই জিজ্ঞাসা করল, ‘কী কারণ?’ মুজতবা বললেন, ‘ইহুদিরা এতই বুদ্ধিমান ও হিসেবি যে তারা বৃষ্টির ফাঁক দিয়ে হাঁটতে পারে, তাই বৃষ্টির মধ্যে হাঁটলেও তারা ভেজে না।’

আরেকবার প্রাণীবিজ্ঞানের এক নবীন অধ্যাপক ও গবেষককে নিয়ে ওয়ালি সাহেব মুজতবা আলির কাছে গেছেন। তাকে দেখে বক্রদৃষ্টিতে তিনি শুধালেন, ‘হঠাৎ এখানে এসে হাজির কেন?’ ওয়ালি সাহেব বললেন, ‘আপনার ভক্ত। আপনার সঙ্গে পরিচিত হবার আগ্রহে এসেছে।’ মুজতবা আলি সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘না। না। না। আসল মতলবটা হল এই চ্যাংড়া অধ্যাপকের রিসার্চ সেক্টরে জন্তু-জানোয়ারের নিশ্চয় কিছু অভাব ঘটেছে। তাই আমাকে দেখতে এসেছে। পছন্দ হয় কি না।’

সৈয়দ মুজতবা আলি সম্পর্কে আর একটি মারাত্মক গল্প লিখেছেন ওয়ালিসাহেব। সৈয়দ মুজতবা আলি অতিথিবৎসল ভদ্রলোক ছিলেন। একবার সপরিবারে ওয়ালিসাহেবকে তিনি নৈশভোজে নিমন্ত্রণ করেছিলেন। খাওয়া-দাওয়ার পর রাতে মুজতবা সাহেব বেশ কিছুটা পথ অতিথিদের এগিয়ে দিয়ে এলেন। অনেকটা পথ এগিয়ে দেওয়ার পরে স্বাভাবিক সৌজন্যবশত ওয়ালিসাহেব আপত্তি জানালেন, ‘অনেকটা পথ এসে গেলেন, আপনি আর এগোবেন না।’ কিন্তু মুজতবা আলি আরও অনেকটা পথ তাঁদের এগিয়ে দিলেন। শেষপর্যন্ত ফিরে আসার সময় বললেন, ‘আমি আমার বন্ধুদের ঠিক সেই পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে যাই যেখান থেকে তাদের ফিরে আসার আর কোনও সম্ভাবনা থাকে না।’

পুনশ্চ:

শেষ কাহিনীটি শ্ৰীযুক্ত রাধাপ্রসাদ গুপ্তের। এই ‘কোরক’ কাগজেই তাঁর সৈয়দ মুজতবা আলি সম্পর্কে ‘কিছু ব্যক্তিগত স্মৃতি’ প্রকাশিত হয়েছে।

শ্ৰীযুক্ত গুপ্ত মুজতবার ‘দেশে বিদেশে’ বইটির একটি রিভিউ করেছিলেন। সেটি পড়ে মুজতবা রাধাপ্রসাদবাবুকে এক কপি ওই বই ‘দেশে বিদেশে’ পাঠিয়ে দেন এবং সেই সঙ্গে লেখেন, ‘শাঁটুল মামু, (রাধাপ্রসাদের ডাকনাম শাঁটুল) তুমি আমার বইয়ের যে রকম বেশরম প্রশংসা করেছ তা থেকে পরিষ্কার মালুম হচ্ছে তুমি আমার লেখাটা পড়োনি। যাতে ভাল করে পড়তে পারে সেজন্য এই বইটা দিলাম।’

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *